Chinno_35 Cover

নি য় মি ত–বি ভা গ

অভিজিৎ সেনের সাক্ষাৎকার

চিহ্ন : বারাসাত গভ. কলেজে রহু চণ্ডালের হাড় উপন্যাসটি পাঠ্য…

অভিজিৎ সেন : বারাসাত গভ. কলেজে? আচ্ছা, এটা আমি জানতাম না। এটা ওখানকার সিলেবাসে আছে নাকি? বারাসাত গভ. কলেজ কোন ইউনিভার্সিটির আন্ডারে?

চিহ্ন : ওয়েস্টবেঙ্গল স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্ডারে। ওখান থেকে অনেক তথ্য পেয়েছিলাম। রহু চ-ালের হাড়-এ আপনি যে সময়ের প্রেক্ষাপটটা তুলে ধরেছেন তাতে যে রহু একটা শতক থেকে শুরু হল কিন্তু একটা শতকে সে কি করে তার পরিবার পরিজনেরা বা তার গোষ্ঠীর লোকেরা তাকে ভুলে যাচ্ছে? কারণ একটা দেখিয়েছেন যে, কেউ হিন্দুধর্ম গ্রহণ করছে আবার কেউ মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করছে। এ বিষয়ে যদি বিস্তারিত কিছু বলেন?

অ. সেন : বিস্তারিত আমি উপন্যাসের মধ্যেই বলেছি। আমি যেভাবে উপন্যাসটি সাজিয়েছি তাতে একজন কথক আছে, যে হচ্ছে একেবারে ডাইরেক্ট প্রধান চরিত্রের সঙ্গে রিলেটেড। নানি, সারিবা প্রভৃতি চরিত্রের কথাবার্তার ভিতরেই গল্পটা আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। তাতে প্রত্যক্ষ জীবনও আছে আবার অতীতের জীবনও আছে, বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটও আছে। তাতে যাযাবর গোষ্ঠীর অতীত আমি যেভাবে দেখিয়েছি, ব্যাপারটা হচ্ছে যে, আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগছে তোমার প্রশ্নটা। আমার সম্পর্কে একসময় সমরেশ বসু আমার প্রকাশককে বলেছিলেন যে, ‘আমি অভিজিতের এই তথ্যটা মানতে একেবারেই রাজী নই যে, কোনো যাযাবর গোষ্ঠী তারা গৃহস্থ হতে চায়। এটা আমি মানতে পারবো না। কারণ এদের নেচারেও এটা নেই, রক্তের মধ্যেও নেই। ‘আমার সঙ্গে সমরেশদার এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ কথাবার্তা হয়নি। হলে পরে যেটা আমি বলতাম- সেটা হচ্ছে যে, ইস্ট ইউরোপে ব্যাপকভাবে যাযাবররা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে তারা গৃহস্থ হয়েছে। কারণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে তাদের কোথাও আর যাওয়ার ছিল না সেটা একটা কারণ’। একটা সাধারণ বিশ্বাস বা তাত্ত্বিক আলোচকরা মনে করেছেন যাযাবরদের বহির্গমণ শুরু হয়েছে ভারত থেকেই, ইংরেজিতে তাদের ‘জিপসি’ বলা হয়। ইউরোপের লোকেদের ধারণা ছিল ‘জিপসি’ কথাটি ইজিপ্ট থেকে এসেছে ইউরোপে। যদি ভারত থেকেই তারা গিয়ে থাকে, যেটা আমার উপন্যাসেও আছে— পশ্চিমভারতের কোনো জায়গা থেকে, তাহলেও তাদের ইজিপ্ট দিয়েই ইউরোপে ঢুকতে হয়েছে। ইউরোপে বিশেষ করে ইস্ট ইউরোপে ব্যাপকভাবে এরা ছিল এবং সমস্ত ইউরোপেই ঘুরে বেড়াত। ইস্ট ইউরোপে এরা বসত অর্থাৎ গৃহস্থ হতে শুরু করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে এবং একটা সময় পর্যন্ত, কমিউনিজম ইস্ট ইউরোপে যতদিন জীবিত ছিল, তার মধ্যে অনেকগুলো দেশেই কমিউনিস্ট সরকার ছিল যেমন চেকস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়া ইত্যাদি। তাদের আশঙ্কা হতে লাগলো, (বর্তমানে আসামে যে আশঙ্কা হচ্ছে। আসামের একটা অংশের আশঙ্কা যে বাংলাদেশি মুসলিমরা এসেই জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে।) ইস্ট ইউরোপে এই ব্যাপারটা হয়েছিল এবং কোনো কোনো জায়গায় বিশেষ করে আমি পোল্যান্ডের কথা বলতে পারি, সেখানে সরকার থেকেই ঘোষণা করা হয়েছিল যে মূলবাসী থেকে জিপসিদের সংখ্যা দেশে বেশি হয়ে যাচ্ছে। ইউরোপে জনসংখ্যা কমানোর কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কখনো হয়েছে বলে জানি না। কিন্তু এশিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ করে ভারতে এবং চীনে পরিবার পরিকল্পনা করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর চেষ্টা হয়। চীন এ ব্যাপারে সফল হলেও- এখন যেটা বুমেরাং হয়েছে। পোল্যান্ডে দেখা গেছে যে, অরিজিনাল জনসংখ্যার থেকে জিপসিদের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। পোল্যান্ডে সরকারি ঘোষণা হয় যে, একজনের জায়গায় যাদের দুজন সন্তান হবে তাদের চাকরির ইনক্রিমেন্টও অনেক বেশি হবে এবং তারা বড় ফ্ল্যাট পাবে। অবশ্য পোল্যান্ডে বা ইউরোপের ঐসব অঞ্চলের ফ্যামিলি প্ল্যানিং আমাদের এখানকার মত হয়নি। এমনিতেই ওদের জীবনযাত্রা সামাজিক অবস্থা যেভাবে এগিয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই ওদের সন্তান সংখ্যা অনেক কম, স্বার্থপরতাও আধুনিক জীবনে অনেক বেশি, ফলে পরিবার না বানাবার চেষ্টা, এগুলো হয়েছিল। একটা লেখাতে পড়েছিলাম, পোল্যান্ডে একসময় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, যাতে জিপসিরাই না সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়!

তুমি যে প্রশ্নটা করেছো, তোমার মনে হয় না যে বইয়ের মধ্যে উত্তরটা তুমি পাবে? ইদানিং আমার এই উপন্যাসটি নিয়ে অনেকগুলো নোট বই তৈরি হয়েছে। রাহেল (বাংলাদেশের) একটা আগেই করেছে, এ ব্যাপারে রাহেল পায়োনিয়ার। এখানে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং আরও একজন অধ্যাপক একটা করে বার করেছেন। আমার মনে আছে আমাদের সময় বি.এ. পড়ার সময় সেক্সপিয়রের দুটো নাটক পড়তে হত- জুলিয়াস সিজার ও মার্চেন্ট অব ভেনিস। আমি যখন সিটি কলেজে পড়তাম, তখন অরিজিনাল সেক্সপিয়র আর কে পড়ে? নামটা জানতাম এই যথেষ্ট! এখন তো নামও অনেকে জানে না। তা তখনও নোটবই বিক্রি হত। অনেক ছাত্র পরীক্ষার খাতায় ব্যাখ্যা লিখতে গিয়ে এরকমও লিখতো যে, ‘দিস লাইন্স আর টেকেন ফ্রম এস ব্যানার্জিস মার্চেন্ট অব ভেনিস’- এ নিয়ে আমরা অনেক সময় রসিকতাও করতাম। রহু চ-ালেরও সেই অবস্থা। তোমরা টেক্সট বই না পড়ে শুধু নোটবই পড়ছো।

চিহ্ন : না না, পড়েছি কয়েকবার। আমার সময় নোটবই একেবারেই ছিল না। সুতরাং টেক্সট বই পড়তেই হয়েছে। তা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে বলতে হচ্ছে যে রহু যে হাড়, তারা খোঁজা বাদ দিল কেন?

অ. সেন : রহু তো? আমার বই পড়লে বুঝতে পারবে একদিকে সে যেমন একটা মিথ হয়ে গেছে, আবার তার মধ্যে একটা রিয়্যালিটিরও সাক্ষাত পাবে। হাড় খোঁজার যে মিথ আমি বলেছি, সেটা ডেফিনিটলি আধুনিক যুগে ব্যাপারটা আর সেরকম থাকছে না।

চিহ্ন : কেন থাকছে না? সেখানে কি অর্থের সংগ্রাম বেশি করে এসে যাচ্ছে?

অ. সেন : সে তো আমার লেখাতেই আছে তাদের সংগ্রামের কথা। তারা থিতু হতে চাচ্ছে অথচ পারছে না। রহু বা দলু তাদের প্রাচীন লিডার ছিল। বর্তমান লিডার যে প্রিতেম, সে একটা সময়ে এসে শতখানিক বছর আগে উপলব্ধি করতে পারলো যে এই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আর সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিটা তার কাছে সত্য হয়ে উঠেছিল এবং তা যথার্থ। ফলে নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ বুঝতে পারলো- এই সমাজের মেজর দুই গোষ্ঠী হিন্দু ও মুসলিম, এদের কোনোটার মধ্যেই তাদের সঙ্গে মিলছে না। তাদের টিপিক্যাল ধর্মীয় ধারণা আদৌও কিছু আছে কিনা সেটাই সংশয় হচ্ছে। তুমি আদিবাসীদের সঙ্গে কখনো মিশেছো? সাঁওতালদের দেখবে, ওঁরাও কিংবা মু-াদের দেখবে, এদের রিলিজিয়নের সঙ্গে তোমার বা এক্সিটিং মেজর রিলিজিয়নের উপলব্ধির ভীষণ ফারাক আছে।

চিহ্ন : হ্যাঁ, ভীষণ ফারাক, মহাশ্বেতা দেবী দেখিয়েছেন তাঁর গল্প উপন্যাসে।

অ. সেন : তার থেকেও শোচনীয় অবস্থা এই বাজীকরদের। তাদের ঈশ্বর সম্পর্কে কোনও চেতনাই নেই। আমি বিশ্বাস করি যে, ধর্ম ব্যাপারটা একসময় আমাদের সংস্কৃতির কাজ করেছে। আধুনিক যে সংস্কৃতি, যার মাধ্যমে আমরা নাস্তিক হতে পারি, আমরা যেকোনো বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে পারি, আমরা যুক্তি দিয়ে বিচার করি বা করতে পারি। ধর্ম কিন্তু একসময় সেই রোলটা প্লে করতো, সেই ভূমিকা ধর্মও পালন করতো। ধর্ম তোমাকে ঠিক করে দিত তোমার জীবনযাত্রা কি হবে, তোমার সমাজে অবস্থান কি হবে, তোমার পারিবারিক কর্তব্য কি হবে? শুধু যে ঈশ্বর বিশ্বাস করতো ধর্ম তা নয়, এবং সেটা একটা সময়  ধর্ম এই সংস্কৃতির জায়গাটা পালন করতো। তার ফলে কতগুলো ব্যাপারে আমার মনে হয় যেমন ঈশ্বর ব্যাপারটা স্বর্গ-নরক ইত্যাদি এগুলো আমরা যারা যুক্তিবাদী লোক তারা সবাই জানি যে এগুলি খুব অ্যাবস্ট্র্যাক্ট শব্দ। আরও কতগুলো শব্দ আছে যেমন সত্য, মিথ্যা, মরালিটি, নীতিবোধ, পাপ-পূণ্য ইত্যাদি।

চিহ্ন : ঠিক আছে দাদা, আপনি যেটা বলেছেন সেটা খুবই ইম্পর্টেন্ট কথা এবং যেটা বিষয় সেটা হচ্ছে যে, বাংলাদেশে অভিজিত সেন খুব কম পরিচিত। আমি সম্প্রতি আপনার সাথে দেখা হবার পরে, আপনার বইগুলো একটু ঘেঁটেঘুঁটে দেখেছি, তাতে করে আমার মনে হয়েছে যে, আপনার লেখালিখি এবং ভাবনা-চিন্তার মধ্যে একটা বিরাট উচ্চতা আছে। এটা আমি আপনার ইন্টারভিউ নিচ্ছি বলে বলছি না; আমি ভেতর থেকে একটা প্যাশন অনুভব করছি। আর যেটি বিষয় সেটি হল এই ইন্টারভিউটা একটা দায়বোধ থেকেই নিচ্ছি। সে দায়বোধটা আপনার বিভিন্ন রকমের লেখা যেমন রহু চ-ালের হাড়, ছায়ার পাখি, দেবাংশী, হলুদ রঙের সূর্য, বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর, ঝড়, অন্ধকারের নদী, আঁধার মহিষ, স্বপ্ন এবং অন্যান্য নিলীমা, নি¤œ গতির নদী এসব আমি সম্প্রতি পেয়েছি। আসলে আমি যে ভেতর থেকে আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারবো তা নয়। আরও সময় লাগবে পড়ার জন্য। সর্বশেষ আপনি যে বইটি আমাকে দিয়েছেন সেটা হল শিরিন এবং তার পরিজনরা

অ. সেন : তুমি বইটা পড়েছো?

চিহ্ন : হ্যাঁ, আমি পড়ে দেখেছি বইটা। তাতে সবকিছু মিলিয়ে যেটা আমার মনে হয়েছে আপনার উপরে একটা বড় রকমের কাজ হতে পারে। কিন্তু সেই দিকটা অ্যাকাডেমিক প্রসঙ্গ, এ বিষয়ে আমি পরে আসছি। আমার যেটা মনে হয়, আপনার লেখার মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটা নানাভাবে এসেছে। বিশেষ করে দিনাজপুর, মালদা ইত্যাদি অঞ্চলের ভৌগলিক বিষয়গুলি নানাভাবে এসেছে এবং ব্যাপকভাবেই এসেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের বিষয়টি, তাদের ক্যাম্পে থাকা, ক্যাম্পে থাকা নিয়ে তাদের স্ট্রাগল, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে থিতু হবার সমস্যা এবং এই থিতু হবার ব্যাপারটা আপনার লেখার মধ্যে ঠিক স্থানান্তর বা চালাকির মতো ব্যাপার তা নয়। আসলো-থাকলো-বাস করলো, ঠিক সাধারণ নয়। তার মধ্যে যেন সাইকোলজির ব্যাপারটাও আছে। বিশেষ করে আপনার হলুদ রঙের সূর্যের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি যে, রাধানাথ কিংবা মহাদেব, ব্রাম্ভনী এবং রিফিউজি ক্যাম্প। তারপর মহানন্দা, পুনর্ভবা নদীতীর অঞ্চলে তাদের জনবসতি স্থাপন- একটা বিশাল স্ট্রাগল। আপনার লেখার যে ধারাবিবরণী বা বর্ণনা দেখছি- তার মধ্যে স্যোসিও, নৃতাত্ত্বিক এবং কালচারাল ব্যাপারটা উঠে এসেছে। এই যে একটা বিরাট এলাকা, তার চেয়ে আপনার বর্তমান সময়ের শিরিন এবং তার পরিজনরা উপন্যাসের চেয়েও আগের লেখাগুলি আমার কাছে বেশি ইম্পর্টেন্ট মনে হচ্ছে। সেটা হয়তো স্থানিক, ভোগৌলিক কিংবা স্যোসিও পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড অথবা একটা একটা মানুষের অভিবাসন বা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়ার স্ট্রাগল- এ রকম বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি উপন্যাসে সিরিয়াস স্ট্রাকচার ডেভেলপ্টড করেছে এবং সে সিরিয়াস স্ট্রাকচারটা রহু চ-ালের হাড়ে একরকম। সেখানেও আপনি যেভাবে ধরতে চেয়েছেন (এ সম্পর্কে আমার একটি লেখাও আছে রাহেল রাজিবের বইয়ের মধ্যে) সেটা একরকম। সেটারই একটা ফ্লেবার এর মধ্যেও আছে। বিশেষ করে আদিবাসিদের লাইফস্ট্রাগল, তাদের যে টোটেম গ্রহণ, ট্যাবু গ্রহণ সেগুলি আপনি নানাভাবে আনার চেষ্টা করেছেন। আমার এই সমস্তকিছু নিয়ে পার্টিকুলার যে প্রশ্ন, সেটি হল যে, আপনি কেন এই বিষয়টিতে আত্মমগ্ন হলেন? আপনার বেশ কয়েকটি উপন্যাসে ফিরে ফিরে এইরকম লাইফই আসছে? কারণটা আসলে কি? হয়তো প্রশ্নটা সিলি হয়ে গেল কিছুটা!

অ. সেন : না না, সিলি নয়, ঠিকই আছে।

চিহ্ন : কারণের ব্যাপারটা না। আসলে রাইটার যেটি ভাববেন, যেদিকে প্যাশন, যে দায়িত্বটা মনে করবেন- সেটিই হয়তো তাঁর কাজ। এর উত্তর হয়তো আমার কথার মধ্যেই আছে। তারপরেও…

অ. সেন : আমার ভীষণ ভালো লাগছে এই কারণে যে, এর আগে আমি অনেকগুলো ইন্টার্ভিউ দিয়েছি। কিন্তু কেউ এই প্রশ্নটা আমাকে করেনি (তোমাকে তুমি করে বলছি বলে কিছু মনে করো না) হতে পারে এ প্রশ্নটা কারোরই মনে হয়নি। তোমার কাছেই প্রথম শুনলাম। এর কারণ হচ্ছে যে, এ সম্পর্কে একটা গল্প বলি- আমি নর্থ-বেঙ্গলে অনেকদিন ছিলাম, একসঙ্গের জীবনের প্রায় ৩৫-৩৬ বছর। আমার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবে। বালুরঘাটে একটি বাড়ি করেছিলাম আমি ও আমার স্ত্রী দীপিকা সেন। যখন বালুরঘাটে প্রথম যাই, তখন আমরা দরমার বেড়ার ঘরে থাকতাম। সেখান থেকে ৩০-৩৫ বছরের মধ্যে আমরা বাসস্থান করেছি, বাড়ি করেছি। বাড়ি করা একটা সিরিয়াস ডিসিশান। কলকাতা হলে তবুও ভাড়া বাড়ি পাওয়া যায়, কিন্তু বালুরঘাটে যে বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকতাম, সে বাড়ির বাড়িওয়ালা কিছু একটা মনোমালিন্য হলেই বলতেন, ‘যাঃ শালা! পরের বাড়িতে থাকে, তাদের আবার বড়ো বড়ো কথা!’ আমি খুব অবাক হয়ে যেতাম কথাটা শুনে। ঐ রিয়েলিটিটা আমাকে খুব হার্ট করতো। তারপরে বুঝেছি যে, মানুষের একটা শিকড় থাকা দরকার। এবং সেই শিকড়টা যদি কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক অথবা অন্য কোনো কারণে ছিঁড়ে যায়, তাহলে মানুষ কোনোভাবেই আর স্বাভাবিক হতে পারে না। আমাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়েছে। আমি একজায়গায় লিখেওছি। আমরা যখন দুজনে বাড়ি করেছি, বাড়িটি দোতলাও করেছিলাম, তাতে থেকেওছি অনেকদিন। তারপর যখন সেটা ছেড়ে চলে এলাম, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন গাড়িতে উঠছি, পিছন থেকে বাড়িটার দিকে তাকালাম এবং আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, ‘তোমার কি খুব খারাপ লাগছে? আমার কিন্তু খারাপ লাগছে না।’ ও বললো ‘না না! তেমন কিছু না!’ আমি এটা লিখেওছিলাম। বিশেষ করে বালুরঘাট অঞ্চলে যারা পত্রপত্রিকায় লেখালেখির সঙ্গে জড়িত, তারা অনেকেই আমার উপর অভিমান করেছিলেন। আমি লিখেছিলাম একজায়গায় যে, ব্যাপারটা আমার কাছে মনে হয়েছিল- কেন এই খারাপ লাগার অনুভূতিটা হচ্ছে না! তখন তা আমি বুঝতে পারিনি, পরে বুঝেছি। পূর্ব-পাকিস্তানের গ্রাম ছেড়ে আসার ৪০ বছর পরে সেই বাড়িতে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম ব্যাপারটা। ওই যে শিকড়টা ছিঁড়ে গেছে, সেটা যেখানেই গাছ তৈরি করার চেষ্টা করেছি, কোথাও আর ছেঁড়া শিকড়টি জোড়া লাগছে না, ছেঁড়া শিকড় নতুন করে মাটিতে ছড়িয়ে যেতে পারছে না। ফলে তুমি যে প্রশ্নটা করেছো তার রুট ঐখানেই আছে।

চিহ্ন : প্রথমত অভিবাসনের পাশাপাশি আপনার লেখায় আদিবাসীদের যে কালচার বা নৃতাত্ত্বিক বা সামাজিক জীবন বা স্ট্রাগল- এই দুটো জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কারণ একজন কথাশিল্পীর যে তাত্ত্বিক চেতনাটা দেখি, সেটি আসলে ফিকশন সমাজের দায় এবং মানুষের মধ্যে যে সাম্য বা যে অধিকার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে উপন্যাসের দর্শন। তো সেই বিষয়টা আমি এমনভাবে আপনার লেখার মধ্যে পেয়েছি এবং বেশ কয়েকটি উপন্যাসে ফ্রিক্যুইন্টলি পাচ্ছি, এতে করে আপনার লেখার প্রতি আমার একটা শ্রদ্ধা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আপনার লেখার মধ্যে নকশাল আন্দোলনের বিষয়গুলিও এসেছে। সিক্সটিজের শেষের দিকে, বিশেষ করে ছোটগল্পের মধ্যে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এই জিনিসগুলো এমনভাবে মিশে গেছে ক্যারেক্টারের সাথে, আমরা বুঝতে পারি এগুলি আরোপিত নয়। একটা বিষয়কে এমনি এমনি হাইলাইট করে একটা দিকে নিয়ে যাচ্ছেন তা নয়; বরং ভিতরে ভিতরেই তৈরি হচ্ছিল স্টোরিটা। এটার আর্ট ভিউ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

অ. সেন : এটা তোমাদের অধ্যাপকদের দায়িত্ব, আমার দায়িত্ব না। তবে তুমি যে ব্যাপারটা ধরেছো, সেটি নিয়ে যদি বলতেই হয় তবে আমি বলবো যে, আমি খুব ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি শুরু করেছি। ক্লাস সিক্স থেকে। দেশভাগের ব্যাপারটার সঙ্গে জড়িত লড়াই, দেশত্যাগ বা বিতাড়ন, অসহ্য নিপীড়ন, আত্মত্যাগ, দুঃখকষ্ট আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটার যেন পরেরটা আগেরটার পরিপূরক, আমি আমার লেখায় যেন নিজের অজান্তেই বিষয়টা ওইভাবেই নিষ্পত্তি করেছি। দেশত্যাগের পরে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের সংগ্রাম আমার, আমার মতো অসংখ্য লোকের। ফলে অবচেতনে যেন সব মিশে গেছে, যেমন তুমি বলছ।

চিহ্ন : আমি এখানে একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি, সেটা হল আপনার যে লেখালেখি। যা একটু আগেই বলছিলেন যে শুরুতেই একজন কমিউনিস্ট হয়ে গিয়ে তারপর মানুষ হওয়া- এ রকম একটা ব্যাপার ছিল আর কি! এবং এই জিনিসগুলি আপনার রক্তে-মাংসে-অস্থিমজ্জায় কিংবা একেবারেই ভিতর থেকে তৈরি হওয়া। নাহলে আপনি বহু চটকদার উপন্যাস লিখে অনেককিছু করতে পারতেন বা হতেও পারতেন। সেদিকে আপনি যাননি। কারণ আপনার বেজ টা এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে আপনার বেড়ে ওঠার মধ্যেই সেটা আছে। এই বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার সাথে আপনার যে উপন্যাস, কিংবা বেড়ে ওঠার যে গল্প, তার সিরিয়াস জায়গাগুলো, সিরিয়াস বাঁকগুলোর কথা আমরা জানতে চাই।

অ. সেন : লেখকজীবন তৈরি হয় তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই। তার নিজের জীবনকেই তাই সে বার বার লেখে।

চিহ্ন : ঐ যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কথা- প্রত্যেকটা মানুষের লাইফই হচ্ছে ব্যক্তিজীবনের ডায়েরি।

অ. সেন : ঐ ভদ্রলোক যেমন নিজের কথাই লিখেছেন। তুমি ওঁর লেখা পড়ে দেখবে একই কথা এখানে লিখেছেন আবার অন্য জায়গাতেও লিখেছেন নিজের অভিজ্ঞতা। যাই হোক আমাদের সময়ের সাহিত্যের লেখকরা আমাদের আদর্শ। তাঁদের সাহিত্য পড়লে তোমারও এই প্রশ্নটা জিজ্ঞাস্য হতে পারে। পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি পঞ্চাশের দশকের পরে বাংলা সাহিত্যে এক পপুলার লেখকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে এবং তাঁরা পৃষ্ঠপোষণা পেয়েছে, তাঁদের খ্যাতি বেড়েছে, তাঁরা বিজ্ঞাপণ পেয়েছে, তাঁরা পুরস্কার পেয়েছে অজ¯্র। তাঁরা নানাভাবে পরিপোষণা পেয়েছে কিন্তু তোমার মতো পাঠক হয়তো তাঁদের লেখা পড়ে তৃপ্তি পায়নি। আমার দুর্ভাগ্য যে তোমার মতো লেখক বা পাঠকেরা আমার লেখা অনেক দেরিতে পড়তে শুরু করেছে।

চিহ্ন :  না না, এটা আসলে আমার বা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমি বাংলাদেশে থাকি, এটাই হয়তো কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনাদের সব লেখা আমাদের ওদেশে পাওয়া যায় না। ইচ্ছে করলেও খুঁজে পাই না। এখন যখন রহু চ-ালের হাড় একটা পুরস্কার পায়, তখন সেটা হয়তো ঐদিকে চলে যায়। এই যে ব্র্যান্ডেড না হলে কিছু পাওয়া যায় না। আর ব্র্যান্ডেড হওয়ার জন্য আপনারা তো রাস্তায় রাস্তায় ঘোরেনও না!

অ. সেন : ব্র্যান্ড যে ঘুরেও সব সময় পাওয়া যায়, তাও না। ব্র্যান্ডেড হলে পুরস্কারের তো আবার রকমফের আছে। শুধু তাই নয়, পুরস্কারের আবার ছোটো-বড়োও আছে। আমি যেমন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নামে পুরস্কারটা পেয়ে নিজেও গর্বিত হয়েছি এবং ঐ অনুষ্ঠানটাতে যারা উপস্থিত ছিলেন, তারাও সকলে আমাকে পেয়ে খুশি হয়েছিলন। যাঁরা পুরস্কার হাতে তুলে দিয়েছেন, শঙ্খ ঘোষ বা ওখানে যাঁরা বক্তৃতা করেছেন আমার সম্পর্কে তাঁরাও। কিন্তু এটা তো সাধারণ লোকের ব্যাপার না! যাকগে তোমার অরিজিনাল প্রশ্নে ফিরে আসি- জীবন যেভাবে তৈরি হয়েছে। সেটা যার জীবন তাকে যত যন্ত্রনা দিয়েছে, আনন্দ দিয়েছে, যত ভালোবাসা দিয়েছে, যত ঘৃণা দিয়েছে- এ সবগুলো নিয়েই একজন লেখক তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা যদি না থাকে তার ঝুলিতে, তাহলে সে লেখক হয়েও একটা গাছতলায় বসে হিরো-হিরোইন গান গেয়ে যাচ্ছে, প্রেম করে যাচ্ছে, প্রেম করে যাচ্ছে, গান গেয়ে যাচ্ছে এই জিনিসই তৈরি হবে তাতে বক্তব্য কিছু থাকবে না। আদিবাসীদের কথা জিজ্ঞাসা করলে, আদিবাসী যারা হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসা করলে- এটা তো আমার সারাজীবনের অভিজ্ঞতা। এটা তো আমি কলকাতা থেকে পারিবারিক কারণেই বা আমাদের যেহেতু বাবা, জ্যাঠামশাই তখনও দেশের বাড়িতে ছিলেন, আমি ক্লাস নাইনে থাকতে চলে আসতে হল আমার পিসির বাড়িতে। আমি ঝাড়গ্রামে দেড় বছর ছিলাম, আমি ওখান থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি একটা সময়।

চিহ্ন : ঝাড়গ্রামে কেন গেলেন? ওটাতো মেদিনীপুর ডিস্ট্রিক? অতদূর কেন গেলেন এই দিনাজপুর বা বালুরঘাট থেকে?

অ. সেন : প্রথমেই আমরা এসে পার্কসার্কাসে ছিলাম। পার্কসার্কাসে আমার দুই কাকা ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন মিলিটারি ডাক্তার ছিলেন, আর একজন রেলওয়েতে চাকরি করতেন। এখন দেশ থেকে অতবড়ো ফ্যামিলি এসে পৌঁছুতে ওদের পক্ষে স্বাভাবিক কারণেই প্রেসারটা পড়ে গেল। আর আমরা যারা ল্যান্ডেড জেনট্রি ভূস্বামী সম্প্রদায়, নিজেরা পরিশ্রম করতাম না কিন্তু জমি থেকে রোজগার হচ্ছে আমাদের- সেটা দেশের বাড়িতে থাকাকালীনই ছিল। তারপরে ইন্ডিয়া ও পাকিস্থান দুই দেশে, দুই জায়গাতেই যখন জমিদারী কনফিসকেশান হল তখন অল অন এ সাডেন উই ফাউন্ড আওয়ারসেল্ভ অ্যাজ বেগাস। তারপরে দেশ ভাগ হল, দেশভাগের ফলে এখানে আসতে হল মা-বাপ, ছোটো ভাই-বোনেদের ছেড়ে। এবং তার ফলে যেটা হল একটা অদ্ভুত স্ট্রাগল ঐ বয়স থেকে। নয়-দশ বছর বয়স থেকে। আমার নাতির বয়স এইবছরে এগারো থেকে বারোতে পড়েছে। আমি ওকে দেখি আর ভাবি যে, এই বয়সে আমার মস্তিষ্কের ডেভেলপমেন্ট, আমার অভিজ্ঞতা কোথায় ছিল আর ওর কোথায় আছে! ওকে আমি বোঝাবার চেষ্টা করি ছেলেমানুষ, একটু বেশি হয়ে যাচ্ছিস? একটু ইয়ে হ.. পরোক্ষণেই আমি ভাবি যে, যেটা আমার ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল সময়, সমাজ এবং আমার দেশ, সেটা আমি ওর ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছি। যাই হোক সেই অভিজ্ঞতায় পার্কসার্কাসে ছিলাম। সেখান থেকে কাকারা, যারা সহায় ছিলেন। তারা আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগলেন। একটা দিন দেখলাম আমরা বিচ্ছিন্ন কয়েকটা ভাইবোন পড়ে আছি। তখন আমি আমার পিসির বাড়িতে গেলাম, আমার ওপরের ভাই আর এক জায়গায় গেল। আমার এক দাদা যে সদ্য স্কুল ফাইনাল পাশ করেছে, সে টিউশনি ফিউশনি করে কোনোরকম একটা মাথাগোঁজার ব্যবস্থা করে নিল। এইভাবে আমি পিসির বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমি বাবাকে চিঠিতে লিখলাম যে, তুমি পিসিমাকে লিখো, আমি কলকাতায় থাকলে আমার লেখাপড়া হবে না। আমি পিসিমার কাছে গিয়ে থাকলাম। আমার পিসতুতো দাদা, ওরা পার্টিশানের অনেক আগেই এসেছে-এক-আধ বছর আগে। পিসতুতো দাদা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তিনি ঝাড়গ্রামে তখন পোস্টেড। তা আমি ঐখানে গিয়ে ওদের সঙ্গে থাকলাম। ওখান থেকেই স্কুলফাইনাল পাশ করলাম। ফলে তোমার আগের একটা প্রশ্নের উত্তর দিই এই আদিবাসীদের সংস্পর্শে আসা আমার এখান থেকেই শুরু হয়েছে। শুধু ওখানেই না, ওখান থেকে আমার পিসতুতো দাদা বদলি হয়ে গেলেন পুরুলিয়া। আমি সেখানেও ওর সঙ্গে থেকেছি।

চিহ্ন : পুরুলিয়া তো আদিবাসিদের খনি একটা।

অ. সেন : হ্যাঁ, মেদিনীপুর এবং বাঁকুড়াও। প্রাচীন ঝাড়খ-েরই অংশ এগুলো। এমনিতে আমার ছোটোবেলা থেকেই অনুভূতি একটু বেশিই ছিল। আমি যখন অনেক ছোটো, দেশের বাড়িতে থাকতেই নয়-দশ বছর বয়সেই দাদারা একটা স্কুলের বইতে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা- ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিমডিম রবে/সাঁওতাল পল্লীতে উৎসব হবে।’ এটার যে ইমেজটা, এর ছবিটা আমি ঐ ছোটবেলা থেকেই ভেবে এসেছি। ফলে আদিবাসিদের সম্পর্কে একটা কৌতুহল আগাগোড়াই ছিল। মানে কলকাতায় থাকতেও ছিল।

চিহ্ন : এটা কিন্তু ডিফারেন্ট। ডিফারেন্টটা কি যে, এই যে রহু চ-াল, তার যে হাড়টা। এটা কিন্তু আমরাও ছোটোবেলায় বাজিকরদের কাছে দেখে এসেছি।

অ. সেন : ইলিয়াসই তো লিখেছে আমার সম্পর্কে যে প্রবন্ধটা আছে। রাজশাহী থেকে স্টিমারে ঢাকা যাবার পথে ঐ স্টিমারের উপরেই খেলা দেখাতো বাজিকরেরা-

চিহ্ন : হ্যাঁ, হ্যাঁ।

অ. সেন : ইলিয়াসের লেখাটা আমি পড়েছি। উনিও ঐ কথাই লিখেছেন।

চিহ্ন : এখনো যে বাজিকরেরা লুপ্ত হয়নি, সেটা গ্রামাঞ্চলে গেলে দেখা যায়।

অ. সেন : তুমি গ্রামাঞ্চলে যাদেরকে দেখো, তাদেরকে কি বলো?

চিহ্ন : বেদে বলি।

অ. সেন : হ্যাঁ, ওদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বীরভূম, বর্ধমান অঞ্চলে। আমি পুরুলিয়াতে দেখেছি বেদেদের প্রায় দেড় মাইল লম্বা একটা দলকে, পুলিশ গার্ড দিয়ে এক থানা থেকে অন্য থানা পার করাতে দেখেছি, পরবর্তী থানা আবার তাদের দায়িত্ব নিত। তাদের সঙ্গে উট থাকতো, ঘোড়া থাকতো। পরবর্তীকালে নর্থবেঙ্গলে থাকতে গাড়ি নিয়ে আসতে দেখেছি। পুরনো গাড়ি, কিন্তু গাড়ি নিয়ে বাজিকররা আসতো।

চিহ্ন : আমরা আবার আগের কথাতে ফিরে যেতে চাই। সেটা হল আপনার দুটো বিষয়-একটি মাইগ্রেশন ও দ্বিতীয়টি আদিবাসী। এবং আপনি যেটা বললেন যে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুরে আপনার থাকার অভিজ্ঞতার কথা।

অ. সেন : শুধু এই জেলাগুলিতেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক জেলাতে আমি বসবাস করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমি কলকাতা, চব্বিশ পরগণা, হুগলী, হাওড়া, তারপর মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, নর্থবেঙ্গলের দুই দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ- এই সমস্ত জেলায় আমার বসবাস করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।

চিহ্ন : আচ্ছা, এখন আমি একটু অন্যদিকে যাচ্ছি। সেটা হচ্ছে কি যে, রহু চ-ালের হাড় পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে যে এই লেখাটিকে কি আরও এক্সটেন্ডেড অথবা আরও শিল্পম-িত করার সুযোগ ছিল। আপনার কি কোনো তাড়াহুড়ো ছিল লেখাটার সময়?

অ. সেন : সেটা তো আমার ঐ লেখাটার মধ্যে আছে কিছুটা। রাহেলের বইটাতেও আছে লেখাটা, যে রহু চ-ালের হাড় সম্পর্কে দু-একটি কথা যা আমার বলা উচিত’ বলে একটি প্রবন্ধ আছে।

চিহ্ন : সেটা কোথায় আছে?

অ. সেন : রাহেলের বইটাতেও আছে বোধহয়।

চিহ্ন : আমি কিন্তু এটা পাইনি। আমার কাছে একজন রিডার হিসাবে পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে যে, রহু চ-ালের হাড় আপনি যেভাবে শুরু করেছেন এবং যে ফাইটটা, সারিবা কিংবা মালতির যে জায়গাটা সমস্তকিছু মিলে যেটা গেছে আর কি! তাতে আমার মনে হয়েছে যে ফিনিশিংটা বোধহয় একটু দ্রুত হয়ে গিয়েছে। এখন এক্ষেত্রে কি মনে হয়? একজন রিডার হিসেবে আমি আপনাকে হস্তক্ষেপ করতে বলছি না, বা সে সুযোগও হয়তো নেই। আমি যেটা বলছি, আসলে আমরা তো মানুষ! মাস্টারদের যেটা থাকে আর কি! এটা আর একটু শিল্প সাফল্যের যে জায়গাটা সে সম্পর্কে এই আর কি!

অ. সেন : আমি সংক্ষেপে দু-একটা কথা বলছি। ঐ প্রবন্ধটা তুমি রাহেলের বইটাতে আছে অথবা যদি না থাকে তাহলে আমি তোমাকে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। যেটা ঘটনা হয়েছিল- আমি বলছি আমাদের সময় এক্ষণ পত্রিকাটা কলকাতার একটা ভীষণ প্রেস্টিজিয়াস পত্রিকা ছিল। মানে একজন লেখক তার কোন একটা লেখা যদি এক্ষণ পত্রিকায় বের হতো। তাহলে লেখক হিসেবে তার ভবিষ্যত তৈরি হয়ে যেত। লেখক হিসেবে সে এস্টাব্লিসড হয়ে যেত। নির্মাল্য আচার্য্য এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (ফিল্মের) এঁরা দুজনে এই পত্রিকাটি শুরু করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় আগাগোড়াই এই পত্রিকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন। সত্যজিতের অনেক লেখা এই পত্রিকায় বেরিয়েছে এবং ফিল্মের যে স্ক্রিপ্টগুলো, সেগুলোও এরাই ছেপেছিল। যাইহোক সেটা আলাদা ব্যাপার। তো এই নির্মাল্য আচার্য্যরে সঙ্গে আমার আলাপ হয়। ওখানে আমার একটা গল্প ছেপেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী গল্পটা নির্মাল্য আচার্য্যকে দিয়েছিলেন। তিনি সেটা ছাপলেন এবং মহাশ্বেতাদি আমাকে লিখলেন যে, তুমি কলকাতায় এলে একবার নির্মাল্যের সাথে দেখা কোরো। আমার একটা ছোট উপন্যাস আমি মহাশ্বেতাদিকে পাঠিয়েছিলাম ‘বর্গক্ষেত্র’ বলে যে লেখাটা। সেটা এক্ষণ পত্রিকা ছাপলো। আমি নির্মাল্য আচার্য্যরে সঙ্গে কফি হাউসে একদিন দেখা করতে গেলাম। আমি তাকে চিনি না, তিনিও আমাকে চাক্ষুষ চেনেন না। তা তখন আমাকে বর্গক্ষেত্র উপন্যাসটার সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং আমাকে বললেন যে পুজো সংখ্যার জন্য আপনার কাছে কোনো নতুন লেখা আছে কিনা? আমি বললাম যে এই মুহূর্তে তো নেই, পুজো আসছে, কাজেই অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। আমি একটা উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলাম। তার বিষয়বস্তু হচ্ছে যাযাবর। তিনি বললেন যে এটা কতখানি লিখেছেন? আমি বললাম জাস্ট শুরু করেছি, পুজো চলে আসার জন্য ওটা ফেলে রেখে গল্প লিখছি। তা আমি চলে গেলাম বালুরঘাটে, পরে তিনি চিঠি দিয়ে জানতে চাইলেন যে, লেখাটা কতখানি হয়েছে? যদি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে পাঠিয়ে দিন, আমরা তাহলে পুজো সংখ্যাতেই ছাপিয়ে দেব। তা আমি ৫০-৬০ পৃষ্ঠা মতো লিখেছিলাম তখন। এখন এক্ষণ পত্রিকা থেকে এ রকম একটা প্রস্তাব আসছে, সুতরাং আমি দিনরাত পরিশ্রম করে আমি আমার হাতের লেখা ফুলস্কেপ কাগজে শ-দেড়েক পৃষ্ঠায় রহু চ-ালের হাড় লেখাটা শেষ করলাম এবং পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু তখন অলরেডি পুজো সংখ্যার কাজ শেষ হয়ে গেছে, পুজোও এসে গেছে। তা সেটা পেয়ে তিনি আমাকে টেলিগ্রাম করলেন যে, লেখাটা পেয়েছি, আপনার কাছে চিঠি যাচ্ছে, চিঠিতে (তখন তো টেলিফোন এতো হয়নি) লিখলেন যে আমি অ্যাজ ইট ইজ ছেপে দিতে পারি। আমার লেখাটা পছন্দও হয়েছে, তবে আমি যেহেতু সম্পাদনা করি এবং আপনার থেকে বয়সেও একটু বড়ো সেই জন্য আমি বলছি যে লেখকের প্রথম বড়ো কাজটা সর্বাংশেই বড়ো করা উচিত। কাজেই আপনি যদি এটাকে ইলাবোরেট করে বড়ো উপন্যাস তৈরি করেন। আপনার এই লেখা প্রকাশ করার জন্য এক্ষণ প্রস্তুত আছে। অথবা যদি আরও বড়ো হয়ে যায় তাহলে যাতে কোনো পাবলিশার্স রাজী হয় আমি সে ব্যবস্থাও করবো। আপনি ভেবে দেখবেন এটাকে বিস্তারিত লিখবেন কিনা। ফলে আমি সেইমতো পুজোর পরে এটা নিয়ে বসে গেলাম এবং ছমাস পরিশ্রম করে বর্তমান যে বইটা পাচ্ছো সেটা প্রস্তুত করি।

চিহ্ন : আচ্ছা, আচ্ছা!

অ. সেন : সুতরাং এটাকে আরও এক্সটেন্ড করা যেত, মালতি, সারিবার বৃত্তান্তকে আরও বাড়ানো যেত- তা ঠিকই। কিন্তু ঐখানেই আমি শেষ করলাম। কেন না ক্রমশ তা বেড়ে যাচ্ছিল, ব্যাপারটা বিস্তারিতও হয়ে যাচ্ছিল তাই!

চিহ্ন : আচ্ছা ঠিক আছে, আমার উত্তরটা আমি এরকমই মনে করেছিলাম আর কি! আসলে একটা জায়গায় গিয়ে থামতেই হয়। সুতরাং ঠিকই আছে। এখন যেটা বিষয় সেটা হচ্ছে কি- আজকাল তো ফর্মের অনেকরকম ব্যাপার আছে, সেক্ষেত্রে যেটা বিষয় আপনার যে’কটা উপন্যাস আমি দেখলাম, যেগুলির নাম আমি একটু আগেই বলেছি- সেগুলির ফর্মের দিকটাতে মনে হচ্ছে যে এক্সটারন্যাল অ্যাপিয়ারেন্সটা একটু বেশি।

অ. সেন : মানে?

চিহ্ন : মানে হচ্ছে গিয়ে, এই যেমন বহির্মুখী যে ঘটনাগুলির বর্ণনা করা হচ্ছে। যেমন আদিবাসিদের স্ট্রাগলটা বাইরের স্ট্রাগল, তারপর একটা সমাজের স্ট্রাগল দেখানো হচ্ছে, একটা পলিটিক্যাল দিক দেখানো হচ্ছে। কিন্তু মানুষের তো একটা ইনার ওয়ার্ল্ড আছে, সেই ইনার ওয়ার্ল্ড নিয়ে কিংবা যেমন আমরা বলি স্ট্রিম অব কন্সাস্নেস। যেমন মানুষের মনের যে প্রবাহ বিভিন্ন রকম, কিংবা তার ভিতরে অবসাদ অথবা একধরণের ক্লিন্ন কিংবা অবক্ষয়ী জীবনের যে ব্যাপারগুলি আছে অথবা নাগরিক জীবনের যে জটিলতাগুলি দেখি- এই ব্যাপারগুলো আপনার লেখার মধ্যে একেবারে সর্বশেষ পর্যন্ত (আমি এখানে কোনও টাইম ফ্রেমের কথা বলছি না)। দীর্ঘদিন থেকেই আপনি লিখছেন। তো সেটা কি আপনার কোনো লেখায় এসেছে? কিংবা সেই ধরণের কোনো ইন্স্পিরেন্স আপনার ভিতরে কাজ করে?

অ. সেন : খুব পরিষ্কার করে আমি তোমার কথা বুঝলাম না। যেটুকু বুঝলাম, সেটুকু হচ্ছে তুমি বলতে চাইছো কাফ্কা যেমন..

চিহ্ন : রাইট, রাইট। কাফ্কা, কামু আমি সেই জায়গাটার কথাই উল্লেখ করতে চাইছি।

অ. সেন : এ ধরনের লেখা আমি লিখিনি। তবে একেবারেই যে লিখিনি তাও নয়। তুমি আমার গল্পগুলো পড়লে তার মধ্যে পাবে।

চিহ্ন : হ্যাঁ, আমি সেটাই জানতে চাইছি। যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র কাঁদো নদী কাঁদো দেখি, কিংবা চাঁদের অমাবস্যা নামক উপন্যাস দেখি। অথবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ম্যাজিক রিয়েলিটির কথা বলছে খোয়াবনামা উপন্যাসে, চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে বিরাট ক্যানভাসে ইনার রিয়েলিটির কথা বলছে। ওখানে ওসমান নামে যে ক্যারেক্টারটি আছে, সে আসলে বাইরে অনেককিছু হচ্ছে, সেটা তার মনের মধ্যে একটা রিফ্লেক্শান তৈরি হচ্ছে, সে হিজিবিজি কিংবা ইল্যুশান দেখছে কিংবা তারমধ্যে একটা অবসেশানের কাজ করছে। আসলে প্রকরণের মধ্যে যে ভেরিয়েশান সেগুলি আপনাকে তেমন ভাবিয়েছে কি না?

অ. সেন : ডেফিনিট্লি। আমাদের সময় ম্যাজিক রিয়েলিটি নিয়ে ভাবেনি এমন লেখক খুব কমই আছে। তবে আমাদের সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়েলিটি কেউ সেভাবে এক্সপোজ করতে পারেনি, আসেওনি সেভাবে। আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম বহুদিন আগে, অন্তত পঁচিশ বছর আগে ম্যাজিক রিয়েলিটির উপরে ‘সাহিত্যে মিথ ও লোককথার সম্ভাবনা’ এটা একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। (চাইলে ওর একটা কপি জেরক্স করিয়ে দিতে পারি তোমাকে।) তাতে এই ব্যাপারটা সম্পর্কে আমার ধারণা আমি ক্লিয়ার করেছিলাম। আর আমাদের সাহিত্যে যাঁরা চেষ্টা করেছে, আমার মনে হয় তাঁরা খুব একটা সাকসেস্ফুল কেউ হয়নি। ইলিয়াসের লেখার ঐ একটা চরিত্রের মধ্যেই তুমি পাচ্ছো। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের মধ্যে অনেকেই চেষ্টা করেছে আবোল-তাবোল ইয়ে করে- কিন্তু ম্যাজিক রিয়েলিটি কী, এই ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার মজুমদার, তার সাথে আমার ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না। আমার ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের একটা গল্প সংকলন বেরিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে বইটা প্রকাশ উপলক্ষ্যে ওকে বক্তব্য  রাখার জন্য ডাকা হয়েছিল। তিনি আমার প্রথম যে পঞ্চাশটি গল্প সংকলন বেরোয় তার একটা রিভিউ করেছিলেন একটা পত্রিকায়। তাতে একটা কথা বলেছিলেন- বক্তব্যের লাস্টের লাইনগুলোর বক্তব্য ছিল এই যে, ‘অভিজিৎ সেনের লেখায় এমন একটা বিষয় আছে যা আমি এখনো পর্যন্ত অন্য কোনো লেখকের লেখায় পাইনি’। মানে অন্য কোনো বাংলা সাহিত্যের লেখকের লেখায় পান নি। এই ব্যাপারটা আমি সেদিনকে ঐ বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে ওনার সঙ্গে দেখা হবার পর বলেছিলাম যে, আপনি এ রকম একটা কথা বলেছিলেন- যদি অসুবিধা না থাকে আজকে যখন আপনাকে কিছু বলতেই হবে- এই ব্যাপারটা যদি ক্লিয়ারলি বলেন। তা তিনি বলেছিলেন এই কথাটা যে ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম, যেটা আমাদের এই যুগে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্য আমাদের কাছে পৌঁছানোর পরে যেটা হয়েছে, সেটা আমাদের দেশের অনেক লেখকরাই চেষ্টা করেছেন তাঁদের রিয়েলিটি খুঁজতে, কিন্তু কেউই বিশেষ সাফল্য অর্জন করেননি। অনেকে তো বোঝেইনি বিষয়টা। আমার মনে হয় আপনার লেখা পড়ে এই বিষয়গুলি অনেকটা পরিষ্কার ভাবে এসেছে’। সেটা তুমি আমার গল্পে পাবে। ‘রহমতে ফেরেস্তা’ বলে একটি গল্পে পাবে। এছাড়াও অন্যান্য গল্পের মধ্যেও তুমি পাবে। উপন্যাসের মধ্যেও যে নেই তা না, আছে। কিন্তু যেহেতু তুমি আমার বেশি লেখা পড়নি এখনও পর্যন্ত পড়লে, পরে দেখবে আছে।

চিহ্ন : আমার এই প্রশ্ন করার কারণটা হচ্ছে এই রকম, সেটা হচ্ছে গিয়ে- আমি কিন্তু চাইছি না যে, অভিজিত সেন কোনো ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে এখনই বসে যাক। আসলে কথা হচ্ছে কি যে, বঙ্কিম থেকে শুরু করে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে বা কথাসাহিত্যের যে যাত্রাটা শুরু হয়েছে, সেখানে আমরা কিন্তু এ রকম একটা ফর্মই দেখছি। তারপর মানিকের পরে বা সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পরে, কিংবা এই যে আমি মনে করি আপনার লেখার মধ্যে বিশাল এক্সিস্ট যে পজিশানগুলো এসেছে, সেই পজিশানগুলোর একটা ক্রুয়েল, একটা জটিল ব্যাপার সেখানে ঘটেছে- সেই জায়গা থেকে মনে হয়েছে যে এইজাতীয় কাজ বাইরে নানাভাবে হয়েছে। বাংলা ভাষায় বা বাংলা কথাসাহিত্যে এই ধরণের কাজ আপনার হাতে কিভাবে আসতে পারে কিংবা কোনো কোনো জায়গায় এসেছে কিনা? যদিও আপনার সব লেখা পড়া নেই আমার। সেই জায়গা থেকে যদি কিছু বলেন?

অ. সেন : এটা আমাদের সাহিত্যে যে একেবারেই নেই তা নয়। তুমি নিশ্চয় ত্রৈলোক্যনাথের কিছু লেখা পড়েছো।

চিহ্ন : হ্যাঁ, ডমরুচরিত।

অ. সেন : মানিক বন্দ্যোপাধ্যের একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে এই মুহূর্তে আমার। তুমি পড়েছো নিশ্চয় গল্পটি। ‘হলুদ পোড়া’ বলে একটা গল্প আছে। তুমি যদি ম্যাজিক রিয়েলিজম ল্যাটিন আমেরিকানরা যেভাবে ব্যবহার করেছে, সেভাবেও যদি বিচার করো, তাহলে হলুদ পোড়াতে একজন অত্যন্ত আধুনিক মনস্ক মার্ক্সবাদীই বলতে পারো, শিক্ষক সে শেষ মুহূর্তে ঐ বাঁশটা ডিঙিয়ে যেতে পারছেনা। এখানে মানিক যেভাবে বর্ণনা করেছেন সেটাকে তোমার ম্যাজিক রিয়ালিজম মনে হচ্ছে না? তারাশঙ্করের লেখায় তুমি দেখবে- আমি ঐযে লেখাটির কথা বললাম ‘মিথ এবং লোককথার সম্ভাবনা’ তারাশঙ্করের নাগিনী কন্যার কাহিনীতে পাবে। তৈরি লেখা, তৈরি গল্প কিন্তু নাগিনী কন্যার কাহিনীতে দেখবে দ্বিতীয় যে নাগিনী কন্যা তাকে যে বেদে সর্দার নষ্ট করতে চাচ্ছে এবং সেটা নিয়ে বেদেদের কমিউনিটির মধ্যে একটা কমোশন তৈরি হয়েছে। নাগিনী কন্যা যদি ভ্রষ্টা হয় তাহলে সে আর নাগিনীকন্যা থাকতে পারছে না। আর তাকে ভ্রষ্টা করার জন্য দলের যে সর্দার, সেই চেষ্টা করছে। কারণ সে তাকে আলাদাভাবে ভোগ করতে চায়। সেখানে নাগিনীকন্যা একটা কা- করে বসলো একদিন- অর্থাৎ যখন সে একেবারে অতীষ্ট হয়ে উঠেছে, তখন তার ঘরে দোকান থেকে সেন্ট কিনে এনে ছড়িয়ে রাখছে সর্দার, কেননা বেদেদের বিশ্বাস যে নাগিনীদের যখন মেটিং সিজন আসে তখন তাদের গা থেকে চাঁপাফুলের মতো একটা গন্ধ বের হয়। সেটা যাতে নাগিনীকন্যার গা থেকে বেরোয় এবং দল যাতে সন্দেহ করে ওকে, সেইজন্য সে এটা করছে। এতে অতীষ্ট হয়ে নাগিনীকন্যা তাদের ঠাকুরঘরের থানের মতো যেটা ছিল, সেখানে একটা শঙ্খচূড় ঝাঁপিতে রাখা থাকতো। পুজো উপলক্ষ্যে ও সেদিনকে দলের সবাইকে ডাক দিয়ে সেখানে ঢুকলো এবং সাপের ঝাঁপির ঢাকনাটা খুলে দিল। এবং একেবারে বুক উন্মুক্ত করে ওর সামনে হাঁটুগেঁড়ে বসে পড়লো। অর্থাৎ বিষয়বস্তুটা লেখক ওখানে বলতে চেয়েছেন, পরিষ্কার বলেওছেন যে যদি নাগিনীকন্যা ভ্রষ্টা হয়, তার গা থেকে যদি চাঁপাফুলের গন্ধ বেরোয় তাহলে নাগ তার সঙ্গে মিলন করতে আসবে। চতুর্দিকে বেদেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সাপটা ফণা তুললো এবং তুমি জানো যে শঙ্খচূড় অনেক বড়ো হয়। প্রায় ১৮-২০ ফিট লম্বা হয়, অর্থাৎ ছ ফুট উঁচুতে সে ফণা তুলতে পারে। এখান থেকে বেদেরা পরিষ্কার বুঝতে পারলো ছোবল মারার ভঙ্গীতে অর্থাৎ নাগিনীকন্যা যদি ভ্রষ্টা না হতো তাহলে তাকে ছোবল মারতো না সাপ, বরং পাকে পাকে জড়াতেই চেষ্টা করতো। যাকে আমরা সাপেদের শঙ্খলাগা বলি। তা একজন বেদে সঙ্গে সঙ্গে সাপটিকে বল্লম দিয়ে বিঁধে ফেললো এটা আমি বলেছিলাম যদি তারাশঙ্কর এই উপাখ্যানটার পরিসমাপ্তি এভাবে না করতেন, যদি শঙ্খচূড় তাকে পাকে পাকে জড়াবার চেষ্টা করতো তাহলে ডেফিনিটলি একটা চমৎকার ম্যাজিক রিয়ালিটির উপাখ্যান হতো। এখন তারাশঙ্কর নিজের মতো যা করেছেন, মানে পিসির যদি গোঁফ থাকতো, তাহলে পিসি কী হতো? সেটা বলে লাভ নেই।

চিহ্ন : আপনার লেখায় আমি যতটুকু দেখেছি, সেখানে নদী একটা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নদী, তার পাড় ভাঙছে, সেখানকার জনবসতি, তারপর নদীর ¯্রােতের সাথে, নদীকেন্দ্রীক জীবনযাপনের সাথে মানুষের লাইফস্টাইলের অ্যাকোমোডেট করার একটা ব্যাপারও ভিতরে ভিতরে তৈরি হয়েছে আপনার লেখার মধ্যে। যেমন ‘নি¤œগতির নদী’, ‘মেঘের নদী’ কিংবা অন্যান্য লেখার মধ্যেও ব্যাপকভাবে নদীর কথা এসেছে। এটি কি মিথিক্যাল কোনো ব্যাপার?

অ. সেন : মিথিক্যাল নয়— নদী তো সভ্যতা। প্লেন হবার আগে এবং পরবর্তীকালে এরোপ্লেনের ঘাঁটি হবার আগে, রেলগাড়ির আগে যাতায়াত বা যোগাযোগ বা সভ্যতার বিকাশ তো নদীপথেই হয়েছে। মানুষ যেখানেই বসত করে, বাংলায় একটা কথাই আছে যে, ‘নদীর পাড়ে বাস, ভাবনা বারোমাস’। কিন্তু কিছুতেই মানুষ নদীর পাড় থেকে সরতে পারছে না। তার কারণ তার সভ্যতা, তার বিকাশ, তার যাবতীয় নদীর সঙ্গে। তো সেটিই আমাকে আকর্ষণ করেছে। আর নদী ইট্স অ্যা ওয়ান্ডারফুল। আমি পূর্ববঙ্গে ঢাকা থেকে যতবার বরিশাল গেছি, যারাই নিয়ে গিয়েছেন আমাকে, কন্ডিশন হল- আমি আমার বাড়ি বরিশালে যাবো এবং সেটা নদীপথেই যাবো। আমি দুবার গেছি, তা ওরা দুবারই ব্যবস্থা করেছে। আমি তো নদীর দেশেরই লোক। বরিশাল ডিস্ট্রিক, এখন তো অনেকগুলো ডিস্ট্রিক। কিন্তু আমার সময়ের বরিশাল, তারপর বেভারিজের হিস্ট্রি অব বাকেরগঞ্জে লেখা আছে ইচ ভিলেজ হ্যাজ রিভার ইন ইটস নেম। যে গ্রামের পাশ দিয়ে যাই, সেই গ্রামটাই নাম হয় নদীর। বরিশালে ট্রেন নেই, আমরা যখন ছিলাম বরিশালে তখন কোনও রাস্তাই ছিল না গাড়ি চলার জন্য। হয়তো শহরের মধ্যে একটু রাস্তা- আর তো কোনো রাস্তা নেই। রাস্তা দিয়ে তুমি বেরতে পারবে না। বাইরে বেরুতে হলে তোমাকে নদী দিয়েই বেরুতে হবে।

চিহ্ন : এখন একটি জিজ্ঞাসা আপনার কাছে— আপনার পড়াশোনা, লেখালিখি, বোধবুদ্ধি, উপলব্ধি, স্ট্রাগল ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যে দিয়েই অথবা যেটা আপনার কথায় জানতে পারলাম, তা হচ্ছে গিয়ে একধরণের সাম্যবাদী চিন্তা বা কমিউনিজমের থিম— এটা কি আসলে নিজের মনের মধ্যেই অথবা জীবন থেকে শেখা?

অ. সেন : আমি তো কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ছিলাম। যখন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া ছিল সে সময়। আমি মিছিলেও হেঁটেছি কলকাতায় থাকাকালীন। পরবর্তীতে সিপিআইএম যখন হয়েছে, তখন এর মেম্বারও হয়েছিলাম। তারপর যখন তৃতীয়বার ভাঙন হল কমিউনিস্ট পার্টিতে, আমি সবসময় ঐ পরেরটাতেই ছিলাম। আমি সিপিআইএমএল তেও অংশগ্রহণ করেছিলাম, সভ্য হয়েছিলাম এবং একটি জেলাতে আমার বছর চারেক আন্ডারগ্রাউন্ড থাকতে হয়েছিল।

চিহ্ন : কোথায় এটা?

অ. সেন : তবে ওটা একটা উপন্যাসই। এটা তুমি আমার ‘লাশকাটা ঘরের সামনে অপেক্ষা’ বইটা পড়লে ওর মধ্যে আমার এই জীবনটা দেখতে পাবে।

চিহ্ন : এখন যেটা বিষয়, আসলে লেখালিখি কিংবা একজন কথাসাহিত্যকের যে গ্রোথ, সেটা তো আছেই। এখন যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এই মূর্তি ভাঙার ব্যাপার চলছে চারিদিকে। তারপর এমনকি শ্যামাপ্রসাদ, তারও মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। মধুসূদন দত্তের মুখে কালি লাগিয়ে দেওয়া কিংবা নেতাজীও বাদ যাচ্ছে না। তা এই যে ব্যাপার চলছে, আর এ প্রজন্মের যে জায়গাটা সেখানে ফেসবুক, ইন্টারনেট, হোয়াট্স আপ, ভার্চুয়াল যে বিশ্ব সে বিষয়ে লেখাপড়া বলি, এক্সপ্লেইন বলি, রাজনৈতিক সচেতনতা বলি কিংবা মূল্যবোধ বলি এগুলি কিন্তু আর ঐভাবে থাকছে না। কিংবা আপনি যে কথাটি বলেছেন যে, সত্য-মিথ্যার যে আপেক্ষিকতা অথবা নীতি-নৈতিকতার যে আপেক্ষিক ধারণাগুলো—

অ. সেন : আপেক্ষিক কেন বলছো? আসলে এই ধারণাগুলোই অ্যাবস্ট্রাক্ট। যেমন আল্লা কিংবা গড কিংবা ঈশ্বর যদি অ্যাবস্ট্রাক্ট ওয়ার্ড হয় তাহলে মরালিটি, সত্য, মিথ্যা এগুলিও অ্যাবস্ট্রাক্ট হয়।

চিহ্ন : এই যে অ্যাবস্ট্রাক্ট থিংক। এইটা আমরা যারা আছি, যারা পড়াশোনা, লেখালিখি করি। অবশ্যই আমরা আপনার পরের জেনারেশান কিংবা আরও পরের জেনারেশান অথবা আমাদের পরে আরও যারা দু-একটা জেনারেশান আছে। এদের সেন্স এবং যেটা বিষয় একধরণের বিশৃঙ্খলা চলছে এবং সেখানে এক ধরণের উগ্রতাও কিন্তু তৈরি হচ্ছে। তো এইসব দেখে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে একজন লেখকের জায়গা থেকে কি পারসেপশন একটু যদি বলেন? যদিও এটা নিয়ে আসলে বেশি কিছু বলারও নেই! তারপরেও আপনার মতো লেখকের কাছে প্রশ্নটা করতেই হচ্ছে।

অ. সেন : আমার মতো লেখক মানে! তুমি ধরো আশির দশক থেকে।

চিহ্ন : না, আপনার মতো লেখক কথাটা এই কারণেই বলছি যে, আপনার সমস্ত লেখাই খুব সিরিয়াস এবং পজিটিভ। তার ভিতর থেকে একটা জ্ঞানের ব্যাপার আছে তাতে।

অ. সেন : আমাদের সময়ের পর থেকে। মানে আমি বলবো যে আশির দশকের পর থেকে সারা পৃথিবীর অবস্থাটা হচ্ছে আমার সঙ্গে বা তোমার সঙ্গে আগের জেনারেশানের একটা গ্যাপ হতোই। আমাদের হয়েছে, তোমাদেরও হয়েছে কিংবা আমাদের পরের জেনারেশানের সঙ্গেও এটা হবে। কিন্তু আশির দশকের ব্যাপারটা যেন হঠাৎ করে কয়েকটা জেনারেশান লাফ দিয়ে চলে গেছে। যেন চার-পাঁচটা পুরুষ অতিক্রম করে আশির দশকের জেনারেশান শুরু হয়েছে। আমার সঙ্গে আমার বাবা বা জ্যাঠামশায়ের বিরোধ আছে, ধর্মীয় বিরোধ হয়েছে, রাজনীতির বিরোধ হয়েছে, মানে যাবতীয় বোধবুদ্ধির বিকাশের— সেখানেও বিরোধ হয়েছে। আমরা ভেঙে নতুন উপলব্ধিতে এসেছি কিন্তু আমাদের পরের জেনারেশান, আমাদের সন্তানদের জেনারেশান একটা জিওমেট্রিক প্রোগ্রেশনের নিয়মে চলে। সেটা আশির দশককে তুমি যদি দেখো, যেন কয়েকটা জেনারেশান পার করে এসেছে।

চিহ্ন : হ্যাঁ, একটা বিরাট উল্লম্ফন যেন।

অ. সেন : হ্যাঁ, এটা হয়তো ক্যাপিটালিজমের কারণেই হয়েছে। এমন কি তুমি দেখবে, তুমি যদি ইংরেজি নভেল পড়ো, দেখবে— লন্ডন কিংবা প্যারিসেও এখন যে সামাজিক স্তরে আমাদের সম্পর্ক, স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক, সেটা ষাট এবং সত্তর দশক অবদি ইউরোপেও অতটা ‘লুজ’ সম্পর্ক ছিল না। এটা একটা বিশ্বাসের ব্যাপার। এটা ভালো কি মন্দ আমি সে ব্যাপারে যাচ্ছি না কিন্তু এই জিনিসটা হয়েছে। প্রচ- নাড়াচাড়া পড়েছে সমাজে, তাতে এই যে পরিবর্তনগুলো এসেছে এটাকে একজন ব্রিটেনের কমিউনিস্ট লেখক ঐতিহাসিক হব্স বম বলেছেন-ফ্যাকচার্ড টাইমস, ভাঙাচোরা সময়। কাজেই ভাঙাচোরার সময়ের উপন্যাস লিখতে আমি এখনও পারিনি। যদি পারি কখনো, লিখতে তো হবেই, চেষ্টা করতেই হবে- তাহলে হয়তো পারতেও পারি। লিখতে পারা শুধু ক্ষমতার কথা নয়, লিখতে পারার ব্যাপারটা হচ্ছে- আমি এটা লিখবো। লিখতে গেলে কতলোক আহত হবে এবং আঘাত পাবে- সেটাও আমাকে ভাবতে হয়- সেটা আমার জেনারেশানের লোক। আমি এই কারণেই লিখতে পারিনি, চেষ্টা করলেও হয়তো লিখতে পারবো না। তবে চেষ্টা আমি নিশ্চয় করবো।

চিহ্ন : খুব মূল্যবান কথা। এখন যে ব্যাপারটা- আমাদের এই যাদের মধ্যে লেখালিখির ব্যাপারটায় আসতে চায়, তাদের সম্পর্কে কি আপনি আশাবাদী ?

অ. সেন : তোমাদের প্রজন্মের যারা লেখালিখির জগতে এসেছে অথবা আসতে চায় তো অনেকেই। একটা জিনিস হয়েছে, যেহেতু টাকাপয়সা রোজগারের অনেকগুলো আধুনিক কায়দা এত বেশি ছড়িয়ে গেছে বা প্রচার পাচ্ছে, সেইসব করতে ইন্টেলিজেন্ট এবং ব্রিলিয়ান্ট মস্তিষ্করা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। লেখার ব্যাপারটায় সেই গ্লামারও নেই আর আর্থিক দিক থেকেও কোনোরকম তার সুরাহা নেই।

চিহ্ন  : তাহলে তো ভবিষ্যৎ পরিণতি ভালো নয়।

অ. সেন : পরিণতি ভালো নয় তো! এটা আমার সোজাকথা। এটা আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি।

চিহ্ন : আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে কিরকম অভিমত পোষণ করেন আপনি?

অ. সেন : বাংলাদেশের লেখা সম্পর্কে আমার শুধু না, আমাদের এখানকার বেশিরভাগ লেখক-সাহিত্যিকই মনে করেন কবিতাটা ভালো লেখেন, বিশেষ করে সুনীলদা এটা মনে করতেন। কিন্তু উপন্যাসটা ভালো এখনো সেভাবে হয়নি। এটা অনেকেই এইমত বিশ্বাস করেন। এখন আমি যদি সুনীলদা কে বলি ইলিয়াস নিয়ে আপনার ধারণা কি? তাহলে সুনীলদা হয়তো প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতেন। কেননা তিনি কোনো ঝামেলায় যাবার ব্যক্তি নন। বাংলাদেশে তাঁর একটা অসম্ভব বড়ো রিডারশিপ আছে, তাঁর বই দুই বাংলাতেই এখনো বিক্রি হয় ভালো। কাজেই এসব ঝামেলায় তিনি যেতেন না। এ ক্ষেত্রে ইলিয়াসের পাঠক, যে দায়িত্ব পত্র-পত্রিকার লেখকদেরও ছিল যে, পাঠকের পাঠ এই অভ্যেসটা কে আধুনিক করা। সেটা আমাদের দেশে হয়ে ওঠেনি, পশ্চিমবঙ্গে তো একেবারেই হয়নি। কেননা পশ্চিমবঙ্গে এই ব্যাপারটা কন্ট্রোল করে আনন্দবাজার পত্রিকাগোষ্ঠী। তারা পৃষ্ঠপোষণা করেছে এমন কিছু লেখককে। তাদের সমস্তরকম সাপোর্ট দিয়েছে, বিজ্ঞাপন দিয়েছে এবং এইসব লেখকেরা আনন্দবাজারে চাকরি করেছে। ফলে আনন্দবাজারের মত যাইহোক না কেন, এইসব লেখকরাই চেষ্টা করেছে তারা যা লেখে সেইটাই আদর্শ হোক, সেটাই প্রচার পাক, সেইটাই বিক্রি হোক। আর ‘আমরা ঊনষাট, বাকীরা সব বালাইষাট। আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপন, মানে আনন্দবাজার পত্রিকার ঊনষাট লক্ষ পাঠক আর বাকীসব বালাইষাট’। কাজেই অভিজিৎ সেন বালাইষাটের দলেই পড়ে গেছেন। আমি এটাই সিরাজ পুরস্কারের এর বক্তৃতায় বলেছিলাম।

চিহ্ন : তাহলে বাংলাদেশেরও এইরকম একটা আনন্দবাজার গোষ্ঠী আছে।

অ. সেন : সব জায়গাতেই আছে হয়তো। আনন্দবাজার এটাকে লালন করে চলেছে। আগে কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এটা ছিল না। অনেকগুলো পত্র-পত্রিকা ছিল আগে। ভারতবর্ষ ছিল, প্রবাসী ছিল, বসুমতি ছিল। ঢাকা থেকে এইধরণের কি পত্রিকা বেরতো আমি জানি না বা জানার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাদের এই রকম গোষ্ঠীবদ্ধ করে লেখকদের আটকে রাখার ভূমিকা ছিল না। এটা প্রথম আনন্দবাজারই করেছে। যুগান্তর বলে যে পত্রিকাটা একটা সময় আরও বেশি বিক্রি হতো আনন্দবাজারের থেকেও, সেটাও এদের সাথে কম্পিটিশানে হেরে গিয়ে বা নিজেদের পাপে চুরি-চামারি করে পত্রিকাটাই উঠিয়ে দিল। তারাও চেষ্টা করেছিল এটা করতে।

চিহ্ন : আচ্ছা এবার আমার শেষ প্রশ্ন আপনার কাছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু লেখা আছে যেমন, পূর্ব-পশ্চিম, সেইসময় কিংবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের দারাশুকো- এই ধরণের যে বৃহৎ কলেবরের উপন্যাস তাঁরা লিখেছিলেন, তো আপনার কি ইচ্ছে আছে এই ধরণের বৃহৎ কলেবরের উপন্যাস বা একটা মহাকাব্যিক উপন্যাস লেখার?

অ. সেন : না। এই উপন্যাসগুলো মহাকাব্যিক হয়েছে কিনা সেটা তুমি প্রশ্ন করতে পারো। আমার খুব শ্রদ্ধা নেই এই লেখাগুলোর ওপরে। অন্তত যেকটা নাম বললে। এগুলো ‘দেশ’ পত্রিকায় সিরিয়াল করলে বিক্রি হবে, ‘দেশ’ পত্রিকাও বিক্রি হবে। ওদের উপন্যাসও যাতে বিক্রি হয় এইজন্যই এগুলিকে যতটা দীর্ঘ করা যায়, করে গেছে। কিন্তু শ্যামলদারটা তা নয়। শ্যামলদা দারাশুকো আর একটা পত্রিকায়। তখন শ্যামলদা আনন্দবাজার থেকে বিতাড়িত। আনন্দবাজারের সম্পাদকের সঙ্গে শ্যামলদার হাতাহাতি, ঘুঁষোঘুষি পর্যন্ত হয়েছিল বলে শুনেছি। শ্যামলদাও আনন্দবাজারের লেখক ছিলেন। তারপর যুগান্তর পত্রিকায় গিয়ে শ্যামলদা ঢুকলেন। সেখানে তো যুগান্তর আস্তে আস্তে উঠেই গেল কয়েক বছরের মধ্যে। শ্যামলদা এখানে-ওখানে ভেসে বেড়াতে লাগলেন এবং তাঁর খ্যাতি পড়ে গেল। তাঁর লেখার জায়গা আমাদের মতোই অবস্থা হতে লাগল। তখন ‘দারাশুকো’ প্রতীক্ষণ বলে যে পত্রিকাটা বেরতো, সেই প্রতীক্ষণেই ওটা সিরিয়াল করেছিল। দারাশুকো সম্পর্কে আমার ধারণা এটা ফাঁপানো লেখা। ফাঁপানো লেখা মানে যা বিষয়কে অকারণ বড় করার চেষ্টা। এটা তোমরা যারা তরুণ, তারাও জানো যে ফাঁপানো লেখা কি জিনিস। বইটাকে মোটা করবো, কি লিখছি তার কোনো ইয়ত্তা থাকে না। এটা হয় এই সিরিয়াল করার জন্য। টেলিভিশনের সিরিয়ালে যা হয় আরকি! অরিজিনাল গল্পের কোনো ঠিক থাকেনা।

চিহ্ন : তাহলে দাদা যেটা বিষয়, যেটা দাঁড়াচ্ছে যে আমাদের আর টলস্টয়ের মতো, দস্তাভয়স্কির মতো লেখক আর পাওয়া হচ্ছে না, হবে না কিংবা আপনারা এটার দিকে যাচ্ছেন না, যাবেন না। বা প্রয়োজনও নেই।

অ. সেন : আমি অন্তত যাচ্ছিনা। টলস্টয়ের, দস্তাভয়স্কির ব্যাপারটা যখন তুললে, তখন আমি বলবো যে এঁদের বিষয়টি আলাদা। যদিও তাঁদেরও একটা ফাঁপানোর ব্যাপার ছিল। বাংলাদেশে আশির অথবা নব্বয়ের দশকে একটা বই বেরিয়েছিল। আমি বইমেলা থেকে সেই বইটা কিনেছিলাম। টলস্টয়ের উপর, টলস্টয় বিষয়ে যে প্রবন্ধ আছে তার উপর। তুমি কখনো বইটা দেখেছো?

চিহ্ন : না, কি যেন নামটা বললেন বইটার? নামটা বললে হয়তো জানতে পারতাম।

অ. সেন : টলস্টয়। বইটা অনেক উপকারও দিয়েছে আমায়। সম্পাদনায় অনেকেই ছিলেন, বোধহয় হায়াত মামুদও ছিলেন। তা ঐ টলস্টয় বইটা পড়ে আমার অনেক কা-জ্ঞান হয়েছে। আমি অবশ্য টলস্টয়ের লেখা অনেক আগে থাকতেই পড়তে শুরু করেছি। ছোটবেলায় তো এমনিতে ঐ মস্কো পাবলিকেশনের, সোভিয়েত পাবলিকেশনের লেখা পড়েছি। তাছাড়া টলস্টয়ের প্রধান উপন্যাসগুলো আমি আমার এই রাজনীতি ছেড়ে আসার পরে, আমার স্ত্রী থাকতো বালুরঘাটে। তা ওখানে গিয়ে একটা কাঠের তক্তাপোশের ওপর একবান্ডিল বিড়ি আমার বরাদ্দ থাকতো প্রতিদিন। ও চাকরি করতো, সাধারণ সরকারি একটা চাকরি, দেড়শো টাকা মাইনে পেত। তা আমার জন্য বরাদ্দ ছিল একবান্ডিল বিড়ি। তো একটা তক্তাপোশের উপর চব্বিশ ঘন্টা আমি শুয়ে থাকতাম আর বিড়ি টানতাম। এই করে একটা বছর চলে যাবার পরে, আমার কিছু কিছু বন্ধু-ঐ সরকারি অফিসাররাই বিশেষ করে আমাকে চিনতো এরকম দু-চারজন, তো তারা এসে আমাকে বললো, কি হচ্ছেটা কী ব্যাপারটা? একবছর হয়ে গেছে আপনি এখানে আছেন। বিড়ি টানছেন আর ঘরে বসে আছেন? আপনার একটা মেয়ে হয়েছে, তার একটা দায়িত্ব আছে! হয় ভেসে উঠুন, নাহয় ডুবে যান। তারপর ওদের প্রচেষ্টাতেই আমি বাইরে বেরতে শুরু করলাম। তা, সেই সময় ঠিক করলাম- এ জীবন লইয়া কি করিব? এটা একটা বড় প্রশ্ন! এই রাজনীতিতে আমি উপযুক্ত না, অথবা এই রাজনীতি আমার উপযুক্ত না, অথবা এই রাজনীতি আমার দেশের পক্ষেও উপযুক্ত নয়। এই তিনটের একটা আমি বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। যাইহোক আমার খুব ক্লিন ধারণা হয়েছিল, আমি বুঝেছিলাম যে, আমার দ্বারা এই রাজনীতি করা সম্ভব হবে না। আমি চারবছর এই রাজনীতির সঙ্গে ছিলাম। তার মধ্যে দু-বছর একেবারে হার্ডকোর অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম। আমি যেকোনো সময় খুন হয়ে যেতে পারতাম। (এগুলো কি রেকর্ড করছো নাকি? করলে কেটে দিও। আসলে এগুলো যাওয়া আমার পক্ষে রিস্কি) আমি ছোটবেলা থেকে লিখলেও অনেকদিন আমার লেখা বন্ধ ছিল। দু-বছর একেবারে হার্ডকোর অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে যেকোনো সময় খুন হয়ে যেতে পারতাম পুলিশের অথবা অন্যদের হাতে। তা যখন হইনি- তখন এ জীবনটা নিয়ে কি করবো? তখন মনে হল, ছোটবেলা স্কুলে থাকতে যে কাজটা করেছি, (স্কুলে থাকতে আমার লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বেরিয়েছে) তা সেই কাজটাই করবো। সেই সময় টলস্টয়, দস্তাভয়স্কি ইত্যাদি বিদেশি সাহিত্য যতটা সম্ভব ব্যাপকভাবে পড়েছি। টলস্টয়ের তো প্রধান উপন্যাস সবটা পড়েছি, দস্তাভয়স্কি পড়েছি। ওরা যে ভ্যলুয়ম করেছে, তার কারণ হচ্ছে-তখন রাশিয়াতে বা ইউরোপের সর্বত্রই ভ্যলুয়মের উপরে পাতা গুনে গুনে প্রকাশক টাকা দিত।

চিহ্ন : এটা একটা নতুন তথ্য, নতুন কথা।

অ. সেন : নতুন কথা নয়, এটা সবাই জানে। তুমি দেখবে ঐসময় সমস্ত উপন্যাস…

চিহ্ন : আচ্ছা, সোভিয়েত ইউনিয়নের রাদুগা প্রকাশন থেকে যে বইগুলো আমাদের এখানে আসতো- সেগুলিও কি ঐ নিয়মেই চলতো?

অ. সেন : না না, তারা তো ওটা- সে বই তো অনেক আগেই লেখা হয়ে গেছে। টলস্টয়ের সেরা বইগুলো উনিশ শতকেই লেখা হয়ে গেছে। যদিও টলস্টয় বিশ শতকের প্রথমদিকে কমিউনিজম আসার পরেও বেঁচেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রধান লেখাগুলো তো আগেই লেখা হয়ে গেছে। দস্তাভয়স্কি, তিনি তো উনিশ শতকেই শেষ, তারও আগে তাঁর সব লেখা হয়ে গেছে। টলস্টয়,দস্তাভয়স্কি এক্সেপশোনাল। তাঁরা ভ্যলুয়ম বাড়ালেও, তার মধ্যে যে মণিমুক্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন- সেটা তো তাঁদের পক্ষেই সম্ভব বা তাঁদের হাত থেকেই বেরিয়ে এসেছে। সেটা তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেও হবে না, আমরা লিখলেও বেরুবে না। কাজেই শুধু মোটা হবে, থান ইট হবে।

চিহ্ন : আচ্ছা, এবার এটারই একটা সাপ্লিমেন্টারি প্রশ্ন, যেটা হল ফিকশনে কিন্তু আমরা বুঝে আসছি- সেটা হচ্ছে গিয়ে একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একধরণের ফাইট, স্ট্রাগল কিংবা পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট কিংবা একটা সমাজ, আইন, বিচার কিংবা রাজনীতি- টোটাল একটা পিরামিড স্থাপত্যের মতো, অনেক বড়ো ব্যাপার থাকবে সেখানে। একটা ডিটেইল যেটা হচ্ছে পার্ট। তো আপনার যে কথাগুলো আমরা শুনছি, আমরা যেটা চাই আপনার রহু চ-ালের হাড় যেখানে থেমেছে কিংবা আরও অন্যান্য লেখাগুলো যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা তো আছেই, এটার চাইতে বড়ো কিছু, বৃহৎ কিছু, যেটাকে আমরা মাস্টারপিস বলে থাকি। সেই ধরণের লেখার জন্য এ রকম ধাউস কিছু হতেই হবে? কিংবা ফিকশনের পোর্শনে যদি কিছু…

অ. সেন : না, তাহলে কাফকা মাস্টারপিস হতো।

চিহ্ন : কাফকা, কামু বা মার্কেজ মাস্টারপিস না?

অ. সেন : না, মার্কেজের লেখার মধ্যে তো ঐ একটা লেখাই কেবল শ-তিনেক পৃষ্ঠা। আর সব লেখাই চটি। আর লেখাই বা কটা!

চিহ্ন : এখানে একটা জিনিস, সেটা হচ্ছে কি মহাকাব্য তো একসময় লেখা হতো, তো আধুনিক সময়ে আমরা বলছি উপন্যাস। আবার একসময় গীতিকবিতা লেখা হতো, এখন বলা হচ্ছে গল্প। তাহলে এখন গল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে ফারাক করতে গিয়ে বড় গল্প হয়ে যাচ্ছে উপন্যাস কিংবা বড়গল্পকে উপন্যাস বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একশো পৃষ্ঠায় উপন্যাস হয়ে যাচ্ছে।

অ. সেন : এটা কেউ কোনোদিন করেনি এই ডিভিশনটা। তোমরা তাত্ত্বিকেরা একটা ভাগ করার চেষ্টা করেছিলে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও ঐ তালে তাল দিয়ে ঐ ছড়াটা লিখেছিলেন। কি যেন ছড়াটা? ঐ ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা- কিন্তু তিনি নিজেও এটা মানেননি। আমরা লিখতে শুরু করলে, একজন লেখক লিখতে শুরু করলে সেটা শেষে কি হবে, তা আগে থাকতে নির্দিষ্ট হয়না।

চিহ্ন : খুব সুন্দর, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমাদের এই আলোচনায় যেটা হল- সেটা হচ্ছে কি আমাদের সবকিছু পড়া না থাকার জন্য আমরা অনেক অংশ ফেল করেছি। এটা একটা পার্শিয়াল অংশ। এরপরে যখন আমরা বসবো, তখন সব পড়ে বসবো-এটা আপনার কাছে অগ্রিম অনুরোধ করে রাখলাম।

……………

সংযোজন : তোমাকে আর একটা বইয়ের কথা বলছি  তোমার পড়ার জন্য। সেটা হল নি¤œগতির নদী এখনো বাজারেই পাওয়া যাচ্ছে। আর একটা বই এটা হয়তো পাবে না, সেটা হচ্ছে মৌসুমী সমুদ্রের উপকূল। এই বইটা হচ্ছে একেবারেই বাঙাল দেশের ব্যাপার নিয়ে, মানে ঐ সেভেন্টিন, এইটটিনথ এবং নাইনটিনথ সেঞ্চুরিতে কতকটা পর্তুগিজ হার্মাদরা এবং মগেরা লোয়ার বেঙ্গলে যে ডিপ্রেডেশান, অত্যাচার করে প্রায় দুশো-আড়াইশো বছর ধরে সেটা চলেছিল। সেটা আমাদের বরিশালের ভাষায় বলতে হয় পরনকথাতেও আছে, কিন্তু কোনো ইতিহাস নেই। একমাত্র মোগলদের মিলিটারি হিস্ট্রিতে কিছু থাকতে পারে। কেননা মোগলরাই একমাত্র ওদের তাড়াতে পেরেছিল আমাদের কোস্টাল ডিস্ট্রিকগুলো থেকে। তবুও তুমি দেখবে চট্টগ্রামে এখনও মগ বাজার আছে, ঢাকাতেও মগ বাজার আছে। বরিশালে মগ কমিউনিটিই আছে, একদম সমুদ্রের কাছাকাছি গ্রাম। এই মগদের নিয়ে কোনো উপন্যাস আমাদের সাহিত্যে লেখা হয়নি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাসে কিছুটা এসেছিল বোধহয়।

সেটা নিয়ে আপনার কোনো উপন্যাস আছে?

মৌসুমী সমুদ্রের উপকূল। আর একটি উপন্যাসের কথা এখানে বলে রাখি, সেটা হল গিয়ে- ‘নক্ষত্র, নদী ও নারী’ এই বইটা পড়ো। এর মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটা আছে ভীষণ ভাবে।

আমাদের আরও কিছু প্রশ্ন বাদ পড়ে গেছে- সেটা হচ্ছে গিয়ে ‘রাজপাট ধর্মপাট’এ শ্রীচৈতন্যের ব্যাপারটা এসেছে। এছাড়াও আরও কিছু কিছু প্রশ্ন ছিল, এগুলো আমি পড়ে হজম করি আগে। আজ কিছু মৌলিক উত্তর পাওয়া গেছে, সেগুলি ভীষণ কাজে লাগবে আমাদের।

ধন্যবাদ।

[কথাসাহিত্যিক অভিজিৎ সেনের সঙ্গে কলকাতার আ্যপার্টমেন্টে কথা হয়, গত ১১ মার্চ ২০১৮ তে। তাঁর লেখালেখি, বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আদিবাসী-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংগ্রাম, মধ্যবিত্ত জীবন প্রভৃতি নিয়ে এন্তার আলাপ চলে অনেকক্ষণ। সে কথাবার্তার অংশবিশেষ এখানে পত্রস্থ হলো।

তাঁর গ্রন্থ : রহুচ-ালের হাড়, বর্গক্ষেত্র, ছায়ার পাখি, নি¤œগতির নদী, স্বপ্ন ও অন্যান্য নীলিমা, বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর, মৌসুমী সমুদ্রের উপকূল, লাশ কাটা ঘরের সামনে অপেক্ষা, নক্ষত্র নদী ও নারী, শিরিন এবং তার পরিজন ইত্যাদি।]

***********************************************

অনুবাদ

আজরা আলাভি
আবুল ফজলের ধর্ম ও সমাজ ভাবনা
মাহবুব বোরহান অনূদিত

মুখবন্ধ

আবুল ফজলের দৃষ্টিভঙ্গি আকবরের উপর কতটা আরোপিত হয়েছিল অথবা আবুল ফজল নিজে স¤্রাটের দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ আকবরের শাসন কাল সম্পর্কে গবেষণার অত্যন্ত আকর্ষণীয় সমস্যাগুলোর একটি। আবুল ফজল যে আকবরের চিন্তাধারা দ্বারা খুব কম প্রভাবিত হন নি এতে কোনো সন্দেহ নেই। উপরন্তু আকবরের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে আবুল ফজল অবশ্যই তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যাকেও এর সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। একই সঙ্গে এটাও অনস্বীকার্য যে আকবর ছিলেন অসাধারণ শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর ঘনিষ্ট সহযোগীদের মধ্যে কেউই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেন নি। এই অভিসন্দর্ভে মিস আজরা নিজামি আবুল ফজলের নিজস্ব সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে চিহ্নিত করার মতো অত্যন্ত কঠিন একটি কাজকে তাঁর  প্রতিপাদ্য হিসেবে ধার্য করেছেন। যদিও ড. এস আত্হার আব্বাস রিজভি তাঁর ‘আবুল ফজল ও তাঁর সময়’ নামক পি-এইচ.ডি অভিসন্দর্ভ প্রায় সিকি শতাব্দী আগে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাখিল করেছেন, যা এখনও প্রকাশিত হয় নি তার মধ্যেও এ বিষয়টি রয়েছে। বর্তমান গবেষণাটি তাই আবুল ফজলের সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে মিস নিজামির নিজস্ব বিশেষণ। এই প্রবন্ধটি বাস্তবিকই মিস নিজামির মাস্টার অফ ফিলোজফি ডিগ্রির জন্য পেশকৃত দীর্ঘ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রচিত। আমি মনে করি আবুল ফজলের চিন্তার এ পর্যন্ত যে দুর্বল প্রকাশনা সামগ্রী আছে সেখানে এটি একটি মূল্যবান এবং চমৎকার সংযোজন।

পরিবার ও সামাজিক পরিবেশ

একজন মানুষের চিন্তাধারা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে তার বংশগতি ও পরিবেশের প্রভাব অপরিসীম। এ কারণেই আবুল ফজলের পরিবার কোন পরিস্থিতিতে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং এতে সেই সময়ের বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলন এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতিতে কী ধরনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে অনুসন্ধান প্রয়োজন। আবুল ফজলের পূর্বপুরুষেরা ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন । তাঁর পূর্বপুরুষদের একজন শেখ মুসা যিনি ছিলেন আগন্তুকদের পঞ্চম পুরুষ সিউইস্তানের (siwstan) রেল১ (জবষ) নামক স্থানে বাস করতেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পরিবারটি সিউইস্তানেই বসবাস করে। পরে শেখ মুবারকের পিতা শেখ খিজির ভারতের সাধু ও উলামাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অভিপ্রায়ে সিউইস্তান পরিত্যাগ করেন।২ শেখ খিজির যখন ভারতে তার ধর্মীয় ও সাহিত্য অনুরাগী ভ্রমণে নাগাউর (nagaur) পৌঁেছন নাগাউর তখন আজমীরের শেখ মঈনউদ্দীন চিশ্তীর একজন খলিফা শেখ হামিদ-উদ-দীন সুফি সওয়ালির অধীনে আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে বিশাল খ্যাতি অর্জন করে। শেখ খিজির শেখ হামিদ-উদ-দীনের সমাধির নিকটেই বসবাস শুরু করেন। এই নাগাউরে  ৯১১ হিজরি, ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে আবুল ফজলের পিতা শেখ মুবারক জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের পরই শিখ খিজির নাগাউর-এ স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে নিয়ে আসার জন্য সিউইস্তানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু তিনি পথিমধ্যে মারা যান। এই পরিস্থিতিতে নাগাউরে মুবারক এবং তার মা ভয়াবহ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। একই সময়ে আবার সহসা এক দুর্ভিক্ষের আবির্ভাব ঘটে যা নিঃসঙ্গ পরিবারটির দুর্দশাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে প্লেগের মহামারী নাগাউরকে বিধ্বংস করে ফেলে এবং খিজির পরিবারের অনেক সদস্য এর শিকার হয়। পরিবারে অনেক কষ্ট ভোগ করা সত্ত্বেও মুবারকের মা শিশুকে অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে লালন পালন করেন এবং তার জন্য সম্ভাব্য সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষার আয়োজন করেন। সেই শৈশবেই মুবারক অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। যখন তার বয়স চৌদ্দ বছর তখনই তিনি বিজ্ঞানের এমন অনেক বিষয় হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হন যেগুলো তখন মাদ্রাসাসমূহে শেখানো হতো।

মুবারকের শৈশককালের শিক্ষকদের মধ্যে একজন ছিলেন শেখ আতান (Attan)৩। যিনি একশত বিশ বছর জীবিত ছিলেন এবং তিনি তার ধর্মানুরাগ ও পা-িত্যের জন্য বিশেষ পরিচিত ছিলেন। আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক যিনি শেখ মুবারককে প্রভাবিত করেছিলেন তিনি হোলেন শেখ উবায়দুল্লাহ আহরার (Shaikh Obaidullah Ahrar) -এর শিষ্য শেখ ফয়য়াজি (ঝযধরশয ঋধুুধুর)। মুবারক চারমাস৪ শেখ ফয়য়াজির অত্যন্ত ঘনিষ্ট সংসর্গে কাটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মুবারক আহমদাবাদে চলে যান; যেখানে ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও বিরাটসংখ্যক বিদ্বান এসে মিলিত হন। এখানে তিনি বিশিষ্ট বিদ্বান ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। মওলানা আবুল ফজল গজরুনি (Abul fazl Gazruni) নামে একজন বিশিষ্ট প-িত ব্যক্তি তাকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। আহমাদাবাদে মুবারক শাত্তারী (Shattari), চিশ্তী (Chishti),  সোহরাওয়ার্দি (Suharawrdi ), ইত্যাদি অতীন্দ্রিয়বাদী (Mystic) মতবাদের সান্নিধ্যে আসেন এবং সুফিবাদ সম্পর্কে প্রচুর পড়াশুনা  করেন।

মুবারক পরবর্তীকালে তার পারলৌকিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। হয়তো তিনি সংসার ত্যাগ করতেন কিন্তু শেখ ইউসুফের জন্য তা করেন নি। শেখ ইউসুফ তাকে  আগ্রা গিয়ে সেখানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার উপদেশ দেন। শেখ মুবারক হিজরি ৯৫০ সনের মহররম মাসের ৬ তারিখে খ্রিস্টীয় ১৫৪৩ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে আগ্রা পেীঁছেন। আগ্রায় অবস্থান থেকে তার জীবনের একটি নতুন এবং আরোবেশি প্রভাব বিস্তারকারী অংশের শুরু হয়। এখানে তিনি শেখ আলাউয়াল (অষধধিষ) বালাউয়াল (ইধষধধিষ) নামে পরিচিত শেখ ‘আলা-উদ্-দিন মাজযুব’ (অষধ-ঁ’ফ-ফরহ গধলুঁন) -এর সংস্পর্শে আসেন।৫ তার পরামর্শে মুবারক যমুনার উত্তর পাড়ে ইনজু (ঝযরৎধু)’র  মীর রফি-উদ্-দিন সাফাবি (গরৎজধভর’ঁফ-ফরহ ঝধভধার)’র বাড়ির নিকটে বাবর (ইধনঁৎ) নির্মিত চার  বাঘ ভিলা (ঈযধৎ ইযধম ঠরষষধ)’য় তার বাসস্থান গ্রহণ করেন।৬

বেভারিজ (ইবাবৎরফমব)৭ এর মতে মুবারক মির রফি-উদ্-দিন এর নিকট আতœীয়া একজন বালিকার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু আবুল ফজল তার মা সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। এ জন্যই বেভারিজের বিবৃতি গ্রহণ বা পরিত্যাগ করা কঠিন। এতদসত্ত্বেও আবুল ফজল অলঙ্কারিক ভাষায় তার মায়ের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন ‘তিনি মানুষের সকল মহৎগুণের অধিকারী ছিলেন এবং সর্বদাই তিনি তার মূল্যবান সময়কে শুভ কর্ম দ্বারা ভূষিত করতেন। তিনি চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে বিনয়ের ও ন¤্রতার সংযোগ ঘটিয়েছিলেন এবং তার কথা ছিল তার কর্মের সঙ্গে সংঙ্গতিপূর্ণ।’৮

শেরখান, সেলিম খান এবং তাদের উচ্চপদস্থ আরো মহৎ ব্যক্তিরা তার জন্য একটি সুবিধাজনক নিষ্কর সম্পত্তির প্রস্তাব দেন, এ রকম সুবিধা গ্রহণ তার দৃষ্টিভঙ্গির এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় দেখে মুবারক এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং এভাবেই তিনি নিজের সুখ্যাতির বিস্তার ঘটান।৯ মুবারক তার আগ্রা পৌঁছানোর অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার শিক্ষার একটি বিশেষ ক্ষেত্র ছিল দর্শন। তিনি তার বক্তৃতায় বহু বিজ্ঞ ব্যক্তিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর বিখ্যাত প-িতদের অনেকেই ছিলেন তার ছাত্র। মোল্লা আব্দুল কাদির বাদাউনি (গঁষষধ অনফঁষ ছধফরৎ ইধফধঁহর) ছিলেন তাদের একজন। মোঘল শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল তাকে এড়িয়ে তিনি তার মাদ্রাসার কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। সেই সময়ের কিছু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রবণতার উল্লেখ বোধ হয় অযৌক্তিক হবে না যার দ্বারা সমকালীন সাধারণ ধর্মীয় আবহাওয়া অনেকটা পরিচালিত হতো এবং সমাজের বুদ্ধিদীপ্ত সম্প্রদায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে যা প্রলুব্ধ করে।

ভক্তি আন্দোলন মধ্যযুগের ভারতীয় ধর্মচিন্তায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যা নানক, কবীর, ধান্না (উযধহহধ) ও চৈতন্যের  মতো আরো মানুষ তৈরি করেছিল, যারা এই মতবাদের প্রস্ফুটন যুগের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু যে চেতনার কথা এরা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিলেন তা নি®প্রাণ ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীতে ভক্তি মতবাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাধকের আবির্ভাব ঘটে যারা জনসাধারণের মনকে প্রভাবিত করেছিলেন। উদহারণস্বরূপ দাদু দয়াল (উধফঁ উধুধষ)১০ -এর নাম করা যায় যিনি আকবরের সময়ে বসবাস করতেন। ধর্মের মৌলিক ভাবকে তিনি কতটা জোরালো করে তুলেছিলেন তা তার নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ থেকে পরিমাপ করা যেতে পারে— ‘(দাদু) হৃদয় যমুনায় ¯্রষ্টাকে ধারণ করে তার মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিয়ে সেখানে আল্লাহর সামনে আমি আমার প্রার্থনা করি। ‘দাদু শরীরকে তার মসজিদ বানিয়ে মনের মধ্যে জামাতের পাঁচজন সদস্য ও তাদের নেতাকে খুঁজে বের করে বর্ণনাতীত স্বয়ং ঈশ্বরকে সম্মুখে রেখে সে মাথা নত করে তার প্রণতি জ্ঞাপন করে।’ ‘দাদু তার সমগ্র শরীরকে জপমালা হিসেবে বিবেচনা করে যেখানে মহৎ কারো নাম (করিম) বার বার উচ্চারিত হয়, যেখানে পরম একজন আছেন যার কোন দ্বিতীয় নেই এবং এই ধ্বনি (কালিমা) তিনি স্বয়ং। ‘গভীর আত্মনিমগ্নতার মাধ্যমে দাদু এভাবে আল্লাহর সম্মুখে হাজির হয় এবং সে নিজে রহমান যেখানে থাকেন  সেই স্বর্গে (আরশ) গমন করে।’১১

অন্যত্র তিনি ঘোষণা করেন :

‘হিন্দু অথবা মুসলিম যাই হোক না কেন সকলেরই চালক একজন।’

দাদুপন্থিরা এই মতবাদই প্রচার করে। দাদুর অনুসারীদের মধ্য থেকে খাকিপন্থী (কযধশরং) নামে অন্য একটি দলের আবির্ভাব ঘটে। কিলহ (করষয) এবং মালুক দাস (গধষঁশ উধং) এই দলের অর্ন্তভুক্ত। মালুক দাস ধর্মের বহিরাঙ্গিকতাকে বাতিল করে দিয়ে ঘোষণা করেন যে, সত্যিকারের ধর্ম হলো অন্তরে এবং ঐ মায়া (গধুধ)ই হলো মানুষের শত্রু। তিনি বলেন : ‘মালুক দাস তোমার এত ভ্রান্তি কেন রাম-রহিম একজনেরই নাম।’১২ এই সমস্ত ভক্তি-সাধকদের শিক্ষাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নি¤েœাক্ত ধারণাসমূহের উপর তারা বিশেষ জোর দিয়েছিলেন :

ক) প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষের পক্ষেই কোনো রকম মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য ছাড়াই তাঁর (এড়ফ)’র সমীপবর্তী হওয়া এবং তাঁর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

খ) সকল মনুষ্য প্রজাতিই একটি সাধারণ বন্ধন দ্বারা দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ এবং তাদের মধ্যে যে কোনো বর্ণ বা জন্মগত বিভাজনই অবাস্তব এবং সে কারণে পরিহার্য।

গ) বাস্তব ধর্ম এর মূলনীতিকে অনুসরণ করেই গঠিত হয়, যা সকল ধর্মের মৌলিক ঐক্যের উপর জোর দেয়, কেবল মাত্র তার কাঠামোর প্রতিই অনুগত থাকে না এবং বহিরাঙ্গিক চর্চা ও শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানের উপরই গুরুত্ব আরোপ করে না।

একই আঙ্গিকে অথবা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এগুলোই ছিল প্রচলিত মতবাদ যখন শেখ মুবারক এবং আবুল ফজল ভারতে বসবাস ও বিচরণ করতেন। ড. তারাচাঁদ যথার্থই পর্যবেক্ষণ করেছেন যে ভক্তি আন্দোলনের চেতনা আকবরের মনের উপর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিল। আকবরের দীন-ই-ইলাহী পর্যবেক্ষণ করে ড. তারাচাঁদ বলেন, ‘এটা কোনো স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্ন খেয়াল ছিল না, যার অনেক ক্ষমতা ছিল যিনি জানতেন কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, বরং ভারতের অন্তরে গভীরভাবে স্ফীত যে শক্তি ছিল এটা ছিল তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণাম, কবীর এর মত লোকের শিক্ষায় আমরা যার প্রকাশ লক্ষ করি।১৩ এই সময়ের অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ যা মুবারক ও তার পুত্রের মনের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল তা  হলো মাহদাভী (গধযফধারং) পন্থি মতবাদ।

মাহদীপন্থীদের ধারণা হলো আক্ষরিক অর্থেই একক নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়া। ইসলামে সবচেয়ে পুরাতন, সম্ভবত মুহাম্মদ-বিন-আল-হানাফিয়াই প্রথম যিনি হিজরি প্রথম শতাব্দীতে ঐ আসন দাবী করেন। হিট্টি নির্ভুলভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ‘মাহদী এমন একটি ধারণাযুক্ত প্রকল্প যা আশা করে একজন ত্রাণকর্তা নেতার আগমন ঘটবে যিনি মুক্তি ও সৌভাগ্যের নবযুগের সন্ধান দেবেন, নিঃসন্ধেহে  এটা মিসাইঅ্যানিক (গবংংরধহরপ) এবং তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ধারণার বহিঃপ্রকাশ।১৪ সহীহ্ মুসলিম এবং সহীহ্ বুখারিতে মাহদী’র কোনো উল্লেখ নেই, কিন্তু তিরিমিজি ইব্ন-ই-মাজা (ওনহ-র-গধলধ) এবং ই’বন দা’উদ (ওনহ-উধ’ঁফ) মাহদীর আগমন সম্বলিত নবীদের অনেক কাহিনির বর্ণনা দেয়। সংক্ষেপে এ সম্পর্কিত ধারণাসমূহ নি¤œরূপ :

১. হযরত মুহাম্মদের (Prophet) পরিবার থেকে একজন পরিচালক বা মাহদীর আর্বিভাব

ঘটবে, যার নাম হবে আবদুল্লাহ্ (অনফঁষষধয)।

২. যিনি একদম শেষ সময় অথবা কেয়ামতের পূর্বে আবির্ভূত হবেন।

৩. তিনি অবিচার এবং অপরাধে পরিপূর্ণ পৃথিবীতে পুনরায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।

এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা প্রতিশ্রুতিশীল উদ্ধারকারী মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশের মনোযোগ আকর্ষণ করে, যারা মাহদীর সংগ্রামের মধ্যে অন্যায় ও প্রজাপীড়নকারী রাজার কবল থেকে মুক্তি পাবার সুযোগ অনুসন্ধান করে। এই রকম উদ্ধারকারীরা ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক অনৈতিকতাকে সংস্কার করার জন্য। ক্ষমতাসীনরা সাধারণত এরকম ধারার চিন্তাকে অপরাধ বলে সাব্যস্ত করতো। নৈতিক জড়ত্ব এবং অধঃপতন হতাশাগ্রস্ত ধার্মিক মানুষের মনে এরকম একজন মাহদীর প্রত্যাশাকে জাগিয়ে তোলে, স্বভাবতই যা শাসকবর্গের প্রচ- ক্রোধ ও সন্দেহকে সক্রিয় করে তুলেছিল। জৌনপুরের শারকি রাজবংশের পতন সাঈদ মুহাম্মদ১৫ এর মনে সামাজিক নিয়মকানুন সংস্কার ও জনসাধারণকে ধর্মীয় অনুরাগ এবং নৈতিক বিশুদ্ধতার দিকে নিয়ে যাবার অনুপ্রেরণাকে ত্বরান্বিত করে। সাঈদ মুহাম্মদ এক দীর্ঘ পরিভ্রমণের পর বারহলি (ইধৎযষর) (গুজরাটের পাটনা থেকে অল্প কয়েক মাইল দূরে) এসে পেঁৗঁছেন এবং ১৪০৯ এ নিজেকে মাহদী হিসেবে ঘোষণা করেন। ধর্মের প্রতি তার অনুরাগ এবং আন্তরিকতার জন্য এক বিশাল সংখ্যক জনসাধারণ তার মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। তিনি ধনীদের বস্তুবাদী বৃত্তি, উলামাদের আনুষ্ঠানিকতা এবং জনগণের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনকে সাধারণভাবে  সমালোচনা করেন। তার শিক্ষা মূলত নি¤েœাক্ত আটটি নীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে :

১.            তারক-ই-দুনিয়া— আনুষ্ঠানিকভাবে পার্থিব সবকিছু পরিহার

২.           সুহবত-ই- সাদিকিন— সত্যবাদীর সঙ্গ

৩.           নৈঃসঙ্গতা— (Seclution from mankind)

৪.           আল্লার ইচ্ছার নিকট আত্মসমর্পণ

৫.           আল্লার দিদার লাভের চেষ্টা

৬.           আয়ের একদশমাংশ গরীবের মধ্যে বিতরণ

৭.           নিরন্তর আল্লাকে স্মরণ

৮.           দেশ-ত্যাগ (হিজরত)

সাঈদ মুহাম্মদ বিপুল সংখ্যক অনুসারীদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরোধী উলামারা তাকে স্থান থেকে স্থানে ছুটে বেড়াতে বাধ্য করে। গুজরাট থেকে তিনি মক্কার পিলগ্রিমেজে যান এবং সেখান থেকে তিনি বেলুচিস্তানের ফারাহ শহরে পৌঁছেন। ১৫০৫ সালে তার মৃত্যু হয়। শেখ আলাই (ঝযবরশয অষধর) ছিল মাহদীদের সবচেয়ে অসাধারণ উত্তরাধিকারী। শেখ আলাই মূলত বাংলার লোক কিন্তু তিনি দক্ষিণ-পূর্ব আগ্রার বায়ানা-তে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। এখানে তিনি প্রচুর লোককে তার চারপাশে ভেড়াতে সক্ষম হন এবং এ স্থানের একজন অসাধারণ বিদ্বান ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এ সময় সাঈদ মুহাম্মদ মাহদীর শিষ্য মিয়া আবদুল্লাহ নিয়াজী মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বায়ানার নিকটবর্তী এক নিরালা স্থানে বসতি স্থাপন করেন। মিয়া নিয়াজী বাক-ক্ষমতায় বিশেষ সমৃদ্ধ ছিলেন। তিনি তার বাগ্মিতার দ্বারা অনেক মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন, বিশেষভাবে ভিশতিওয়ালারা এবং কাঠুরেরা তার শিষ্যচক্রে যোগদান করেন। শেখ আলাইও মাঝে মাঝে তার বক্তৃতা শুনতেন। তিনি নিয়াজীর শিক্ষা দ্বারা এতটাই উৎসাহিত হন যে নিজে মাহদী বিশ্বাসে দীক্ষিত হন।

মাহদীরা তাদের আদর্শ প্রচার করার জন্য এবং জনসাধারণকে ধর্মীয় অনুরাগ ও গভীর চিন্তার জগতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডেরা (মাহদী মতবাদে বিশ্বাসীদের ক্ষুদ্র চক্র বা সম্প্রদায়) সংগঠনে বিশ্বাসী ছিল। ডেরার সদস্যরা তাদের মধ্যে একটি সামাজিক সম্পত্তি গড়ে তোলে এবং তার আয় সবাই ভাগ করে নেয়। শেখ আলাই ডেরার একজন ঈর্ষান্বিত সদস্যে পরিণত হন। তার সুনাম ইসলাম শাহ’র কানে পৌঁছে এবং তিনি তাকে আগ্রা ডেকে পাঠান। আলাই’র বাক চাতুর্য ইসলাম শাহকে অভিভূত করে এবং তার দরবারের বহু লোক এই নতুন সম্প্রদায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। শেখ আলাই দরবারে এক বিতর্কে উলামাদেরকেও পরাজিত করেন, যার ফলস্বরূপ তারা তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণের  পরিকল্পনা করে। মকদুম-উল-মূলক, আবদুল্লাহ সুলতানপুরী, শেখ-উল-ইসলাম এবং সদর-উস-সুদুর শেখ আলাইকে নির্বাসিত করার সিদ্ধান্তে সুলতানের উপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হন এবং আলাই ও তার প্রতি নিবেদিত একদল অনুগামী সে আদেশ মান্য করতে ঐ স্থান ত্যাগ করে ডেক্কান-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নর্বদার (ঘধৎনধফধ) পাড়ে হান্দিয়ায় যেটি ছিল ইসলাম শেখের সা¤্রাজ্যের সীমান্ত, শেখ আলাই তার মতবাদ দিয়ে বাহার খান আজম হুমায়ুনকে এতটা মুগ্ধ করেন যে তিনি সেখানে তার অর্ধেক সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব শেখ আলাইকে দান করেন। ইসলাম শাহ যখন এই খবর শুনেন তখন তিনি তার নির্বাসন আদেশ বাতিল করে আলাইকে আবার প্রত্যাবর্তনের জন্য ডেকে পাঠান। এর কিছুকাল পর ইসলাম শাহকে পাঞ্জাবের নিয়াজি আফগানদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বায়ানা পৌঁছে মকদুম-উল-মুলক আবদুল্লাহ নিয়াজির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, নিয়াজি আফগানদের উপর যার গভীর প্রভাব ছিল এবং পাঞ্জাবের বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতায় সাহায্যকারী হতে পারেন। আবদুল্লাহ নিয়াজি দরবারের শিষ্ঠাচার অনুসরণে অস্বীকার করে সুলতানের অসন্তুষ্টি লাভ করেন এবং ইসলাম শাহ তাকে প্রহারের আদেশ দেন। তিনি ঘোড়ার পিঠে বসে একঘণ্টা তার শাস্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করেন এবং তখনই কেবল স্থান ত্যাগ করেন যখন চিন্তা করলেন আবদুল্লাহ নিয়াজি মারা গেছেন। তিনি আকবরের শাসনামলে জীবিত ছিলেন এবং সাধারণভাবে বসবাস করতেন।

ইসলাম শাহ শেখ আলাইকে তার মতবাদ প্রত্যাহার করতে বলেন কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। ইসলাম শাহ তখন তাকে কশাঘাত করার আদেশ দেন। শেখ আলাই তার গলায় আঘাত প্রাপ্ত হন এবং তা ফেটে বের হয়ে পড়ায় তিনি অজ্ঞান হয়ে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর অর্থ হলো গোঁড়া উলামাদের বিজয় এবং মাহদীপন্থিদের উপর নির্যাতন প্রচ- আকার ধারণ করা।

শেখ মুবারক মাহদী মতবাদে যার সম্মতি ছিল, তাকেও অনেক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। উলামাদের সঙ্গে শেখ আলাই প্রসঙ্গে প্রথম আলোচনাতেই মুবারক শেখ আলাইকে সমর্থন করেন এবং প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধীদের একজন সমর্থক হিসেবে পরিচিত হন।১৬ তিনি তার জমি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন এবং তার জীবন রক্ষার  জন্য এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন। অনেক বছর তিনি উলামাকর্মীদেও সৃষ্টি সন্ত্রাস ও ভয়ঙ্কর আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। তার জীবনের এই সকল অনুষঙ্গ ও ঘটনা আবুল ফজলের মনে অবশ্যই প্রচ- প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আবুল ফজলের শৈশব জীবনে যখন তার পরিবার গোঁড়া ধর্মতাত্ত্বিকদের নিপীড়নের চিরস্থায়ী আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতো সেই স্মৃতি সম্ভবত আবুল ফজলকে উলামাদের প্রতি নিদারুন বিরক্তি এবং প্রচ- ঘৃণার মনোভাব  তৈরিতে সাহায্য করেছে। এই সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা ছিল শাত্তারি সিল সিলাহ্ যা উদার চেতনা সৃষ্টিতে সাহায্য করে এবং যা বিশেষভাবে হুমায়ূনকে আকৃষ্ট করে। শাহ্ আবদুল্লাহ্ শাত্তারি যিনি মনডুতে ১৪৮৫ সালে মারা যান, ভারতে শাত্তারি মতবাদের প্রচলন করেন। শাত্তারি শব্দটি আরবি মূল শাতর থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে যার অর্থ কোন নির্দিষ্ট পথে চলা। শাত্তর এর অর্থ যে কারণে হতে পারে এমন কেউ যে দ্রুত চলে। শাত্তিরা একে একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করে এবং বিশ্বাস করে যে আধ্যাত্মিক উন্নতিতে তারাই দ্রুততর এবং অন্যান্য পদ্ধতি অপেক্ষা সহজ পথে মারিফত অর্জন করতে পারে। গুলজার-ই-আবরার -এর লেখক শাহ আবদুল্লাহর ‘লাতা-ইফ-ই-গায়েবিয়া’র উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার অনুশীলনীর ভিন্ন ভিন্ন তিনটি পদ্ধতি রয়েছে— যা আখের, আবরার এবং শাত্তারি নামে অভিহিত। সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং দ্রুততম বলে এটিকে শেষে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এজন্যই এটাকে বলা হয় সুলক-ই-শাত্তার। শাহ আবদুল্লাহ শাত্তারি ব্যাপকভাবে মুসলিম জাহান ভ্রমণ করেছিলেন। ভারতে পৌঁছে তিনি সমগ্র দেশব্যাপী পরিভ্রমণ করেন এবং শেখ হুসাম-উদ্-দিন মানিকপুরী এবং সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর-এর মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাধকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শাহ আবদুল্লাহর কাজ করবার এক বিশেষ অদ্ভুত পদ্ধতি ছিল। তিনি রাজকীয় পোশাক পরতেন যেখানে তার অনুসারীরা পরতো সামরিক ইউফনিফরম। তিনি ঢোল এবং ব্যানারও বহন করতেন। যেখানেই তিনি যেতেন সেখানেই তিনি এই ঘোষণা দিতেন, ‘এমন কেউ আছেন যিনি ঈশ্বর প্রাপ্তির পথ দেখার ইচ্ছাপোষণ করেন?’ শেখ আবদুল্লাহর আধ্যাত্মিক বংশধরদের মধ্যে শেখ বুদ্ধন এবং সাঈদ মুহম্মদ গাউস উল্লেখযোগ্য। শেখ বুদ্ধন ছিলেন ওয়াকি ’অত-ই-মুশতাকি’১৭র বিখ্যাত লেখক শেখ রিজকুল্লাহ্ মুশতাকির আধ্যাত্মিক গুরু।

সাঈদ মুহম্মদ গাউস ছিলেন হিন্দু অতীন্দ্রিয় মতবাদ ও তান্ত্রিক ধারণায় সুপ-িত। তিনি চুনার পর্বতের নি¤œঢালুতে ভয়াবহ রকম কঠোর আত্মসংযম অনুশীলন করে এবং গাছের পাতা খেয়ে বারো বছর অতিবাহিত করেন।১৮ তিনি বাহর-উল-হায়াৎ নামে অমৃতকু-কে পারস্য ভাষায় অনুবাদ করেন এবং মুসলিম অতীন্দ্রিয়বাদী পরিভাষার বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে হিন্দু অতীন্দ্রিয়বাদী ধারণাকে উপস্থাপন করেন। বাহর-উল-হায়াৎ কে কেউ কেউ দ্বারাশুকোর মজমা-উল-বাহরাইন-এর অগ্রদূত বলে বিবেচনা করেন।১৯ হিন্দু অতীন্দ্রিয়বাদী চিন্তা সম্পর্কে সাঈদ মুহম্মদের সুগভীর জ্ঞান ছিল। হিন্দুদের সঙ্গে তার অত্যন্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। ষাঁড় ও গাভী প্রতিপালন করা ছিল তার সখ। শাত্তারিরা সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে, এবং তাদের সমগ্র আদর্শগত কাঠামো এই মৌলিক চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা আচার আনুষ্ঠানিকতার সারাংশীকরণের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে। হুমায়ূনের সঙ্গে সাঈদ মুহম্মদ গাউস এবং তার ভাই শেখ বাহলুলের চমৎকার সম্পর্ক ছিল। জাহাঙ্গীর তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তার জন্য হুমায়ূনের ছিল গভীর অনুরাগ এবং তার মধ্যে ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ ঈশ্বরভক্তি।’২০

‘ইকবাল নামা’র লেখক বলেন যে শেখ বাহলুল ছিলেন হুমায়ূনের নিকটতম সহযোগীদের একজন।২১ তার জন্য হুমায়ূনের শ্রদ্ধা তার সম্মানকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাজদরবারের মাওলানা জালাল উদ্দীন এবং মাওলানা মুহম্মদ আলী ফারঘুলির মত বিদ্বান ব্যক্তিরা তার মতবাদে যোগদান করেন।২২ এইভাবে শাত্তারি মতবাদ এবং আদর্শ হুমায়ূনের সময়ে দিল্লীর মুঘল রাজদরবারে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ধারায় পরিণত হয়। শাত্তারিরা তাদের শিক্ষাকে যে মৌলিক ভিত্তির উপর বিকশিত করে তোলেন তাদের ভাষায় তা হলো ‘তারিখ-উল-তাজিম’। এই মতবাদ অনুসারে তারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর নামসমূহ যখন নির্দিষ্ট সংখ্যকবার আবৃত্তি করা হয় তখন তা একটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল প্রদান করে; স্বর্গীয় শরীরসমূহের চলাচলের সঙ্গেও যার কিছু সম্পর্ক আছে। এইভাবে শাত্তারিরা তাদের অতীন্দ্রিয়বাদকে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। শাত্তারি মতবাদের প্রতি হুমায়ূনের অনুরক্তি ছিল সম্ভবত এর জন্যই।

রাজশাসন ক্ষমতার পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে সাঈদ মুহম্মদ গাউসকে অত্যন্ত কঠোর সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে। যাহোক তিনি ১৫৫৮ সালে আগ্রা আগমন করেন এবং সসম্মানেই আকবর তাকে বরণ করেন।২৩ সাঈদ মুহম্মদের জন্য আকবরের শ্রদ্ধা শেখ গাদাই-এর ঈর্ষাকে উদ্দীপ্ত করে তোলে এবং তিনি তার প্রভাবকে শেখের অবস্থান খর্ব করার জন্য ব্যবহার করেন।২৪ শেখ গাদাই তার ‘রিসালা’ প্রদর্শন করেন, ‘রিসালা-ই-মিরাজিয়া’ যার মধ্যে তিনি তার কিছু অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি নবীর চেয়েও উচ্চতর আধ্যাত্মিক পদমর্যাদা দাবি করে বৈরাম খান-ই-খানান এর নিকট আবেদন করেন।২৫ যদিও শাত্তারি সিলসিলাহ্ আকবরের সময়ে কোনো সুনির্দিষ্ট গুরুত্ব অর্জন করতে পারে নি তবুও সমসাময়িক ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার উপর তার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারা যা বিশেষভাবে শেখ মুবারক এবং তার পুত্র আবুল ফজলের চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল, তা হলো নুকতাউই আন্দোলন। নুকতাউই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাহমুদ পাসি খানি জিলানি। ব্যাপক পরিভ্রমণের পর তিনি আসতারাবাদ পৌঁছেন এবং হিজরি ৮০০ ও খ্রিস্টীয় ১৩৯৭ সালে তার নতুন ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তিনি তার ধর্মীয় মতবাদ বিশদ ব্যাখ্যা করে বারোটির বেশি গ্রন্থ এবং এক হাজার ক্ষুদ্র পু¯িতকা রচনা করেন।২৬ তিনি বিশ্বাস করতেন ইসলাম আরবেই সমাপ্ত হয়েছে এবং সেজন্যই আজম-এর জনগণের জন্য তার নিজের ধর্ম। ‘মাআসির-উল উমারা’র লেখক বলেন মাহমুদের অনুসারীরা নি¤œলিখিত ধারণাসমূহ বিশ্বাস করতেন :

১.যখন প্রফেট মুহাম্মদের শরীর পরম পরিশুদ্ধতা অর্জন করে তখন তার মধ্য থেকেই মাহমুদের সৃষ্টি হয়।

২.ধূলিই মনুষ্য জীবনের মূল এবং প্রারম্ভিক বিন্দু।

৩.আত্মার পুনর্জন্ম একটি কার্যকর মতবাদ।

৪.উপরিউক্ত মাহমুদ ছিলেন একজন মাহদী।২৭

ইস্কান্দার মুন্শী ‘তারিখ-ই-আলম-আরা-ই-আব্বাসী’ গ্রন্থের লেখক উল্লেখ করেন যে নুকতাউইদের নি¤েœাক্ত ধারণাসমূহ মৌলবাদী সম্প্রদায়কে সমালোচনার দিকে পরিচালিত করেছে :

১.            সৃষ্টি অবিনশ্বর

২.           শরীরের কোনো পুনর্জন্ম হবে না এবং প্রলয় দিবস বলে কিছু নেই।

৩.           বিশ্বজনীন সম্মান এবং অপমান যা মানুষের কর্মের অত্যাবশ্যকীয় ফলাফল— ই যথার্থ

স্বর্গ এবং নরক।২৮

খাজা উবায়দুল্লাহর মতানুসারে নুকতাউইরা কোরানকে প্রফেটের রচনা হিসেবে বিবেচনা করতো। পাশাপাশি তারা অজাচারে বিশ্বাসী ছিল এবং ইবাহাতি মতবাদকেও ধারণ করতো।২৯ নুকতাউইরা তাদের বংশানুক্রমিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ইরানের শাহ আব্বাসের দ্বারা কঠোর শাস্তি ভোগ করেন এবং বিপুলসংখ্যক নুকতাউই কবি ও বুদ্ধিজীবী আকবরের রাজদরবারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের সময় কাটানোর জন্য ভারতে চলে আসেন। মীর তাশবিহি কাশি কাশান থেকে ভারতে আসেন এবং আবুল ফজলের জন্য একটি ‘রিসালা’ লেখেন যার মধ্যে তিনি নুকতাউই সম্প্রদায়ের নীতিসমূহকে বিশেষণ করেন।৩০ বাদাউনি তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি শেখ আবুল ফজলকে প্ররোচিত করেছিলেন যে তিনি একজন অভ্রান্ত আধ্যাত্মিক নেতা এবং তার (আবুল ফজলের) মাধ্যমে সেই সময়ের খলিফার নিকট তিনি একটি গাথা উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন, যার উদ্দেশ্য ছিল স¤্রাটকে জিজ্ঞেস করা কেন তিনি তার নিজস্ব রীতির মৌলবাদকে ছুড়ে ফেলে নিজেকেও নিবেদন করেন না, যাতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।৩১ একদিন তাশবিহি আবুল ফজলের উপস্থিতিতে আবদুল কাদির বাদাউনিকে একটি ‘রিসালা’ প্রদান করেন। তার ভূমিকায় ছিল :

হে ঈশ্বর, তোমার সৃষ্টির মধ্যে কে সবচেয়ে যোগ্য (মাহমুদ), যাকে আমি নরকের জন্যও আহ্বান করি, যার জন্য এটা বলা হয় যে, ‘কোনো ঈশ্বর নেই কিন্ত ‘সে’ আছে।

প্রশ্ন : সেটি কি যাকে ‘প্রকৃতি’ বলা হয়?

উত্তর : ‘সেটি হলো ঈশ্বর যাকে বলা হয় প্রকৃতি।’৩২

ওয়াকি নিশাপুরী৩৩, হাকিম ইবাদুল্লাহ কাশানি এবং আবদুল ঘানি ইয়াজদির মতো এরকম অন্যরাও ছিল যারা বাইরে থেকে এসে আকবরের দরবারে বসবাস শুরু করে নুকতাউই মতবাদ প্রচার করেছিল। এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে এই সমস্ত নির্যাতিত নুকতাউই বিদ্বৎজনেরা আকবর এবং আবুল ফজলের সহানুভূতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল এবং আকবর শাহ আব্বাস সাফাউইকে যে চিঠি লিখেছিলেন তা নুকতাউইদের জন্য তার সহানুভূতি দ্বারা ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত ছিল।৩৪

এই সকল ভারতীয় ও ইরানীয় চিন্তাধারা প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে মুবারক এবং তার পুত্রগণ আবুল ফজল ও ফয়েজীর মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। আবুল ফজল তার পিতা সম্পর্কে বলেন :

তিনি মহান শিক্ষক (ঈশ্বর)-এর নিকট থেকে সকল প্রকার জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তিনি অতি আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের উপর থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানের অবগুন্ঠনকে সরিয়ে ফেলেন এবং সমাজের মধ্যে তার স্বাতন্ত্র্যের অনুশীলন করেন। তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া তিনি নিজের উপলব্ধি বা অনুরক্তিকে দেখতেন না এবং তার বিষয়াবলি বিপনন করতেন না। তিনি তার ভাবাবেশকে বিসর্জন দিতেন না এবং কোনো চাতুরী জানতেন না।৩৫

বাদাউনি’র মতানুসারেও তিনি ছিলেন সত্যের জ্বলন্ত সন্ধানী এবং কখনোই জ্ঞান সন্ধানে পরিতৃপ্ত ছিলেন না। সনাতন বিশ্বাসে তার বিশাল জ্ঞান সত্ত্বেও তিনি সকল ধর্ম থেকে সত্যকে প্রতিপাদন করার চেষ্টা করতেন। শিয়া, মাহদাভী, খ্রিস্ট, পারসী, হিন্দু ও জৈন যারাই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, সকলেই বিভিন্ন ধর্মের প্রতি তার সহানুভূতিশীল অনুভব দ্বারা সর্বদাই গভীরভাবে প্রভাবিত হতেন। আবুল ফজল আমাদের জানান, ‘কিছু সংখ্যক খারাপ মানসিকতার মানুষ তার শিয়া মতাদর্শ সম্পর্কে অন্যায়ভাবে তাকে প্রচ- দোষারোপ করতো, তারা বুঝতো না জ্ঞান এক জিনিস এবং পেশা অন্য জিনিস’।৩৬

মৌলবাদী গোষ্ঠী সর্বদাই মুবারকের উপর অসন্তুষ্ট ছিল। তারা তার মতামত পরিবর্তনের জন্য তাকে অভিযুক্ত করতো এবং তাদের ধারণা অনুসারেই মানুষজনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতো।৩৭ তিনি সর্বদাই শরীয়তের বিধানাবলির অত্যন্ত উদার ব্যাখ্যা করতেন এবং মনে করতেন যে,‘প্রথমত তা হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থসমূহে ভুলভাবে প্রক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল, অনুরূপভাবে সেগুলো ইসলামের গ্রন্থসমূহের মধ্যে ছিল; সুতরাং দুয়ের মধ্যে একটিকে বিশ্বাস করা অসম্ভব।’৩৮ খাজা উবায়দুল্লাহ, যিনি শেখ মুবারকের কন্যার বাড়িতে লালিত পালিত হন, মুবারকের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অত্যন্ত চমকপ্রদ প্রতিবেদন প্রদান করেন। তিনি শেখকে একটি বাত-শকুন হিসেবে বিবেচনা করেন যার দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। সুলতান ইব্রাহীম লোদির শাসনামলে তিনি ছিলেন একজন কট্টর সুন্নী, সুর আমলে হয়ে পড়েন একজন মাহদী। হুমায়ূনের শাসনামলে তিনি ছিলেন একজন ‘নক্শবন্দী’ এবং আকবরের সময়ে উদারনৈতিক চিন্তার অধিবক্তা। অতঃপর তিনি পর্যবেক্ষণ করেন: সকল যুগের শাসক এবং সেই সময়ের মহৎ ব্যক্তিদের ধর্মীয় মনোভাবকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন এবং এগুলোর প্রতি তিনি তার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলেছিলেন (যা উপযোগিতা এবং মুখাপেক্ষিতা থেকে উৎপন্ন)।৩৯

বাদাউনি মুবারক এবং তার পুত্র আবুল ফজলের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত ছিলেন না, কিন্তু তার মূল্যায়ন থেকে প্রতীয়মান হয় যে শেখ মুবারক সম্পর্কে তার অত্যন্ত উচ্চধারণা ছিল। বস্তুত প্রচ- অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাদাউনি তার সমালোচনা করেছেন এবং এই সমালোচনা ছিল তার পুত্র আবুল ফজলের প্রতি তার তিক্ত অনুভূতির জন্য। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন যে, মানুষ মুবারকের প্রতি যেসব তীব্র কটূক্তি নিক্ষেপ করেছে তা ছিল মূলতঃ তার পুত্রের খারাপ কাজের জন্য।৪০

মুবারক সম্পর্কে বাদাউনির মূল্যায়ন অত্যন্ত চমকপ্রদ যা সরাসরি উদ্ধৃতির দাবি রাখে। তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত সুফিদের একজন এবং তার সময়ের মানুষ ও সমকালীনদের মধ্যে ধর্মানুরাগ, ঈশ্বরের উপর ঐকান্তিক অনুরক্তি ও বিশ্বাসের জন্য বিশিষ্ট। জীবনের প্রথম পর্বেই তিনি পবিত্রতার পথে অনেক কঠোরতা ও সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেন এবং পবিত্র আইনের আদেশ ও নিষেধ জোর করে চাপিয়ে দিতে এতই আসক্ত ছিলেন যে, যখন তিনি ধর্মীয় নির্দেশাদি প্রচার করতে থাকতেন তখন যদি কেউ সোনার আংটি, সিল্কের কাপড়, লাল পাজামা অথবা লাল বা হলুদ পোশাক পরে হাজির হতেন তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে সেগুলো খুলে ফেলতে বলতেন। কেউ যদি লম্বা চোগা পরে আসতেন যা জুতোর হিলের নিচে নেমে যেত, তিনি অনতিবিলম্বে তাদেরকে তা কেটে যথাযথ দৈর্ঘ্যে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করতেন। যদি কখনও রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোনো গানের শব্দ শুনতেন সাথে সাথে তিনি অত্যন্ত দ্রুত হাঁটতে শুরু করতেন। খোদার প্রতি গভীর ভাবাবেগের গানে তিনি এতই নিবেদিত ছিলেন যে সারা দিনে খোদার স্তোত্র, প্রার্থনা সঙ্গীত, অতীন্দ্রিয় সঙ্গীত ও গান না শুনে একটি মুহুর্তও বিশ্রাম নিয়েছেন এটি ছিল বিরল ঘটনা। সংক্ষেপে বলা যায় তিনি জীবনের বহু ও বিচিত্র রকম নিয়ম কানুন অনুসরণ করতেন। আফগান স¤্রাটের শাসনামলে তিনি কিছু সময়ের জন্য শেখ আলাই-এর সঙ্গ লাভ করেন এবং স¤্রাটের শাসনামলের শুরুতে যখন নক্শবন্দী মতবাদ গভীর শ্রদ্ধার আসন লাভ করে তখন তিনি নিজেকে তাদের প্রথার সঙ্গে সংযুক্ত করেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি হামাদানি শেখের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন এবং সবশেষে যখন রাজদরবারে ইরাকিরা সবচেয়ে প্রিয় ছিল তখন তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যেন তিনি তাদের ধর্মের একজন।’

‘মানুষের সঙ্গে তাদের বোধ অনুসারে আলাপ করা’ ছিল তার অভ্যাস এবং তা তিনি বজায় রাখতেন। তিনি সর্বদাই ধর্মীয় প্রশিক্ষণ দাতা হিসেবে চাকুরি করতেন। কবিতা, ধাঁধাঁ এবং অন্য সকল কলা ও জ্ঞানের শাখাসমূহে তিনি ছিলেন অতিশয় সুপ-িত, কিন্তু বিশেষভাবে সুফি ধর্মতত্ত্বে তার ছিল অসাধারণ পা-িত্য। ভারতের বেশির ভাগ অন্য জ্ঞানী লোকের মতো নয়, তিনি তাদের (সুফিদের) রীতি নীতি পুরোপুরিই অনুশীলন করতেন। শাতিবি তার মুখস্থ ছিল এবং উত্তরাধিকার আইন শিক্ষা দিতে তিনি তা ব্যবহার করতেন। পাঠ করার দশটি পদ্ধতির প্রত্যেকটি অনুসারেই মহিমান্বিত কোরানও তার মুখস্থ ছিল।’ ‘তিনি কখনওই উচ্চপদস্থদের বাড়ি যেতেন না, কিন্তু একজন খুবই আনন্দদায়ক সঙ্গী ছিলেন এবং তার আশ্চর্যজনক সত্য কাহিনির এক বিশাল ভা-ার ছিল।’৪১

শেখ মুবারক ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ের লোক এবং সেজন্য  কষ্ট ভোগ করার সাহস তার ছিল। তিনি এমন এক সময় মাহদাভীদের সাহায্য করেন যখন মীর রফি-উদ্-দীন সাফাউই এবং শেখ বুধ’র মতো প্রভাবশালী লোকও তাদের রক্ষা করতে পারে নি। মখদুম-উল-মুলক এবং আবদুন নবী’র কর্তৃত্ব যখন সর্বোচ্চ তখন তিনি শিয়াদের রক্ষা করেন। এটা তারই অবদান যা আকবরকে অত্যধিক স্বাধীনভাবে কাজ করার পথ প্রস্তুত করে দেয়। প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন তার কালের সবচেয়ে করিৎকর্মা ব্যক্তিত্ব, যিনি সেই সময়ের চলমান জীবনধারা ও ধর্মচিন্তায় উপলব্ধি করার মতো প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। আবুল ফজল ছিলেন মুবারকের পুত্র এবং চরিত্র ও চেতনায় তার উত্তরাধিকারী।

৯৫৮ হিজরির ৬ মহরম ১৫৫১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি আবুল ফজল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিস্ময়কর স্মরণ শক্তি দ্বারা সমৃদ্ধ ছিলেন। এমনকি এক বছরের অল্পকিছু বেশি বয়সেই তিনি জড়তাহীনভাবে কথা বলতে পারতেন। আরবি দ্বারা তার শিক্ষা শুরু হয়।৪২ পাঁচ বছর বয়সেই কোন বিঘœ ছাড়াই তিনি পড়তে লিখতে পারতেন। তারপর তার পিতা তাকে প্রচলিত বিজ্ঞানের সকল শাখার কিছু কিছু শিক্ষা দিতে শুরু করেন। কিন্তু তার মেধাবী মন প্রচলিত শিক্ষায় দীর্ঘ সময় এটে লেগে থাকাতে উৎসাহ বোধ করলেন না। তিনি গভীরভাবে মানসিক বিষন্নতায় ডুবে গেলেন।৪৩ এক বন্ধু পরামর্শ দিয়ে তাকে তার পড়াশুনায় ফিরিয়ে আনলেন এবং তার কিংকর্তব্যবিমূঢ় মন স্থির হলো।

শেখ মুবারক তখন তাকে জ্ঞানের সকল শাখার প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ আত্মস্থ করার প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ করেন। তিনি প্রায়ই অনেক দিন নিদারুণ ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করেও নিজেকে পড়াশুনায় ডুবিয়ে রাখতেন। সেই শৈশব বয়সে, তিনি নিজে বলেন, তিনি পূর্ববর্তী লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করতে শুরু করেছেন।৪৪

তার প্রতিভার অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন :

আমার পড়াশুনার প্রথম দিকে ইসফাহানির অভিধান, যার অর্ধেকের বেশি সাদা পিপীলিকায় খেয়ে ফেলেছে এ অবস্থায় আমার চোখে পড়ে, লোকজন তখন এটা ব্যবহারে উপকৃত হবার ব্যাপারে প্রচ- হতাশ, আমি খাওয়া অংশকে সরিয়ে ফেলে অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে সাদা কাগজ যুক্ত করলাম। সকালের স্নিগ্ধ সময়ে আমি একটু ভেবেচিন্তে প্রত্যেকটি ভগ্নাংশের শুরু এবং শেষ আবিষ্কার করলাম এবং আনুমানিকভাবে একটি পা-ুলিপি তৈরি করলাম। ইতোমধ্যে পুরো লেখাটিই আবিষ্কৃত হয় এবং যখন উভয়ের মধ্যে তুলনা করা হয়, দু’তিন স্থানে শব্দের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়, যদিও অর্থে তা ছিল সমার্থক; এবং তিন চার স্থানে তা মূল থেকে ভিন্ন রকম ছিল কিন্তু ভাবার্থে ছিল প্রায়ই যথাযথ। সকলেই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।’৪৫

পনের বছর বয়সেই তিনি যৌক্তিক ও সনাতন উভয় বিজ্ঞান সম্পর্কেই অবগত হন।৪৬ এটা উল্লেখ্য যে, আবুল ফজলের শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সুবিস্তৃত যা তাকে সমালোচনাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, ‘(তার পিতার) অত্যন্ত মহিমান্বিত চেতনাধারার অনুগ্রহে প্লেটোবাদীদের গূঢ় রহস্য, সুফিদের বিশাল রতœভা-ার এবং অ্যারিস্টটলপন্থিদের বিস্ময়কর বীক্ষণসমূহ আমার দ্বারা অর্জিত হয়েছিল।’৪৭ অতঃপর তিনি আরো দশ বছর আলাপ আলোচনা ও সংলাপে অতিবাহিত করেন।৪৮

এভাবে আমরা দেখি যে অধিভুক্ত বিজ্ঞান যা শেখ মুবারকের মতো শিক্ষক তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তিনি তাতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন নি। তার সারা জীবন, তিনি অতিশয় তীক্ষèতা ও নিষ্ঠতার সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের সমস্যাসমূহ অধ্যয়নের জন্য আকুল আকাক্সক্ষা প্রকাশ করতেন এবং প্রকৃত জ্ঞান লাভহীন কোন ধারণা বা গৃহীত দাবির উপর তিনি আস্থা স্থাপন করতেন না।

রাজদরবারে উলামাদের হাতে শেখ মুবারককে যে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে তা তার বালক মনে একটি স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। অহিষ্ণুতার প্রতি তার তীব্র ঘৃণা গড়ে উঠেছিল এবং বৌদ্ধিক স্বাধীন জীবনের জন্য তার সাগ্রহ আকাক্সক্ষা ছিল। কিন্তু তিনি তার জ্ঞান লাভের অসাধারণ প্রচেষ্টা দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তির কৌতূহলকে পরিতৃপ্ত করতে পারতেন। বিস্তারিত সমালোচনামূলক অধ্যয়ন এ স্তরে তার জীবনকে এক সুন্দর স্থানে স্থাপন করেছিল, যখন আকবরের দরবারে ধর্মীয় আলোচনার সময় তিনি উলামাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারতেন এবং তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রেই তিনি তাদের পরাজিত করতেন।

আকবরের শাসনকালের চতুর্দশ বছরের (১৫৬৯-৭০) মধ্যে মুবারকের বক্তৃতার সুনাম ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছিল এবং বিদ্বানরা  তার কাছে বসতে গর্ব বোধ করতেন। উলামারা তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং মোটের উপর মাহদাভী এবং শিয়া বিশ্বাস সম্পর্কে স্পষ্ট সত্য প্রতিপাদন করার বিরোধিতা করতো। একদা উলামাদের সামনে আবুল ফজলের আকস্মিক  বক্তৃতা শেখ মুবারকের জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

আবুল ফজল লেখেন :

শিক্ষায় আত্মগর্বিত ও সমৃদ্ধ যুবকেরা আমাকে অবগত ছিল। আমি পূর্বে কখনো কলেজের বাইরে কোথাও জন সম্মেলনে উপস্থিত হতে প্ররোচিত হই নি, কিন্তু তার (সম্ভবত : মুখদুম-উল-মুলকের) কথা আমাকে ঠোঁট খুলতে বাধ্য করে এবং আমি এত যথার্থভাবে বলি যে তিনি লজ্জিত হয়ে পড়েন এবং শ্রোতারা বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে।৪৯

মুবারক এবং তার পুত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়। যাদেরকে উলামারা এখন দেখছেন অজেয় তার্কিক হিসেবে। তাদের জন্য এখন একমাত্র খোলা পথ হলো সন্ত্রাস সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে আগ্রার  বাইরে তাড়িয়ে দেওয়া। শেখ আবদুন নবী, মুখদুম-উল-মুলক এবং অন্যান্য বিজ্ঞ ব্যক্তি দরবারে স¤্রাটের নিকট উপস্থাপন করেন যে, ‘শেখ মুবারক, যতদূর সম্ভব তিনি একজন মাহদাভী, পরিবর্তনকারী সম্প্রদায়ের একজন, এবং শুধুমাত্র নিজেই ধ্বংস হচ্ছেন না, অন্যদেরও ধ্বংসের দিকে চালিত করছেন।’৫০ রাজদরবার থেকে এরকম একটি আদেশও জারি করা হয় যে, ‘তাদের (উলামাদের) সঙ্গে পরামর্শ না করে রাষ্ট্রের বিষয়াবলি সম্পাদিত হবে না; এটা ছিল বিশ্বাস ও ধর্মের প্রশ্ন যে বিষয়ের পুরোটাই ছিল উলামাদের হাতে, পলাতককে বিচারকদের বিচার সভার সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং সুবিখ্যাত আইন যা-ই নির্ধারণ করুক সরকার প্রধানদের তা পালনে বদ্ধপরিকর থাকতে হবে।’৫১

পরবর্তীকালে মুবারক ও আবুল ফজলকে হত্যা করার জন্য উলামারা পরিকল্পনা করে। আবুল ফজল তার পরিবারের নির্বাসন এবং এর বিচার ও কঠোর দুর্দশার করুণ বর্ণনা দিয়েছেন। তার বন্ধুরাও কষ্ট ভোগ করেছিলেন। বাদাউনি আমাদের জানান যে শেখ মুবারক প্রথমে ফতেহপুর শিকরিতে শেখ সেলিমের কাছে আশ্রয় নেন, যিনি তখন তার সুখ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছেন এবং মুবারকের পক্ষে সুপারিশ করার জন্য যাকে অনুরোধ করা হয়েছিল কিন্তু উত্তরকালে তিনিও তাকে পরিত্যাগ করেন।

এভাবে মুবারক ও তার পুত্র আবুল ফজল দ্বারে দ্বারে আশ্রয় খুঁজে ফেরেন কিন্তু কোথাও আশ্রয় পান নি। শেষ পর্যন্ত একটি নিরাপদ নির্জন আশ্রয় খুঁজে পেতে সক্ষম হন এবং সেখানে কিছুদিন বাস করেন। মুবারক ফয়েজী এবং তার বন্ধুদেরকে ফতেহপুর শিকরি দরবারে যাওয়ার জন্য পত্র লেখেন।৫২ একদিন আকবরের রাজদরবারের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুবারককে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং স¤্রাটের নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করেন। ‘পৃথিবী কি শেষ হয়ে গেছে অথবা কিয়ামতের দিন কি হাতের মুঠোয় যে তার দরবারে বিদ্বেষ পরায়ণ ধর্মান্ধরা এই পথ গ্রহণ করেছে এবং ভালো মানুষদের বন্দী করা হচ্ছে?’ আকবর পরের দিন উলামাদের সমাবেশে মুবারককে উপস্থিত হবার আদেশ দেন। কিন্তু ফয়েজী চিন্তা করলো যে যদি মুবারক তার দরবারে উলামাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ দ্বন্দ্বে উপনীত হন তা হলে তার জীবনে আরো অধিক দুর্ভোগ নেমে আসবে। সে তার পিতার কাছে ফিরে গেল এবং তাকে পুনরায় গৃহকর্তাকে না জানিয়ে ভ্রমণে বের হয়ে পড়ার জন্য রাজী করলো।৫৩ আবার মুবারক স্থানে স্থানে ও দ্বারে দ্বারে আশ্রয়ের সন্ধানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে লাগলেন। এই পলাতক পরিবারটির কিছু বন্ধু পরিণামে মুবারকের ধর্মানুরাগ ও আত্মনিবেদন সম্পর্কে স¤্রাটকে প্রভাবিত করতে শুরু করলেন। আকবর আবার তাকে দরবারে হাজির হবার আদেশ দিলেন। এবার দরবারে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মুবারকের জীবনের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে শুরু করলো। ‘অকৃতজ্ঞতার ভীমরুলের বাসা যেন তৎক্ষণাৎ শান্ত হলো এবং অশান্তির জগতে যেন শান্তির আবির্ভাব ঘটলো। শিক্ষার পথ ও পবিত্র ধ্যানের শান্ত উপাসনালয় পূর্বের ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলো।’৫৪

বাদাউনির মতানুসারে তিনি ছিলেন মির্জা আজিজ কোকা যিনি স¤্রাটের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেন এবং তাকে শেখ মুবারকের পা-িত্য ও তার দুই পুত্রের যোগ্যতা সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি স¤্রাটকে আরো বলেন যে, তিনি নিজে বুঝতে পারেন না কেন শেখকে এমন নির্মমভাবে শাস্তি দেয়া হলো।৫৫

শেখ মুবারক দরবারে প্রবেশ করলেন কিন্তু আবুল ফজল তখনও এর বাইরে রয়ে গেল। এ সময় আবুল ফজলের মধ্যে জীবন সম্পর্কে একজন যোগীর মনোভাব গড়ে ওঠে। তার মনে একটি দ্বন্দ্ব ছিল, তার আন্তরিক অভিপ্রায় ছিল একজন যোগীর মতো জীবন অতিবাহিত করা, যখন তার পিতা রাজদরবারে তার কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চিন্তিত ছিলেন। আবুল ফজল প্রথমে তার পিতা ও ভাইয়ের রাজদরবারে যোগদানের উপদেশ অগ্রাহ্য করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি স¤্রাটের সম্মুখে নিজেকে উপস্থিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কোরানের ‘আরশ’ সম্পর্কিত একটি সুরার টীকা রচনা করেন এবং আকবরের নিকট তা উপস্থাপন করেন। এটি স¤্রাট কর্তৃক যেমন তেমনি বিদ্বান ব্যক্তিদের দ্বারাও প্রশংসিত হয়েছিল। আবুল ফজল তার রাজদরবারে পৌঁছানোর পটভূমি এভাবে বর্ণনা করেন :

আমি আমার নিজ দেশের প-িতদের উপর বিরক্ত ছিলাম, আমার ভাই ও অন্যান্য আত্মীয় তখন আমাকে রাজদরবারে যোগদানের পরামর্শ দিলেন, এটা আশা করে যে আমি স¤্রাটের মধ্যে চিন্তার মহত্তম জগতে একজন নেতাকে খুঁজে পাব। প্রথমে আমি তাদের উপদেশ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি। বাস্তবিকই আমি এখন সুখি এজন্য যে, আমার সার্বভৌমত্বের মধ্যে কর্ম জগতের একজন পরিচালক পেয়েছি এবং যিনি একাকীত্বের অবসরের একজন শান্তিদাতা, তার মধ্যে আমি আমার আকাক্সিক্ষত বিশ্বাসকে ও আমার আরাধ্য কর্ম সম্পাদনের অভিপ্রায়কে লাভ করেছি, তিনিই মূল উৎস যেখান থেকে সুন্দর সুবেহ সাদিকের আলো ফুটে ওঠে, তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন জগতের কর্ম বিচিত্র রকম হতে পারে যেখানে এখনও সত্যের আধ্যাত্মিক ঐক্যের সমন্বয় সাধন হয় নি।৫৬

বাংলার বিদ্রোহ কিছু সময়ের জন্য আকবরকে ব্যস্ত রেখেছিল। ফয়েজী স¤্রাটের সঙ্গে তার পূর্বী অভিযানে গিয়েছিল কিন্তু আবুল ফজল যেতে পারেন নি কারণ তখনও তিনি রাজকীয় চাকুরির বিষয়ে চূড়ান্ত মনস্থির করেন নি। স¤্রাট তবুও আবুল ফজলকে ভুলেন নি। ফয়েজী উপস্থাপন করেন যে, ভ্রমণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে সামরিক বাহিনীর বাংলা অভিযানে তিনি (আবুল ফজল) যোগদান করেন নি।৫৭ ১৫৭২ সালের ২০ জুন আকবর যখন ফতেহপুর প্রত্যাবর্তন করেন আবুল ফজলও তখন সেখানে পৌঁছেন। তাকে দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য উচ্চপদস্থদের কেউ ছিলেন না, যখন তিনি নিজে তার পক্ষ থেকে কারো অনুগ্রহ লাভের মিনতি জানাতে চাচ্ছিলেন না। একদিন ঘটনাক্রমে তিনি প্রধান মসজিদে যান এবং আকস্মিকভাবে স¤্রাটও সেখানে আবির্ভূত হন এবং তাকে স¤্রাটের সামনে তলব করেন। আবুল ফজল তখন নিজেকে দরবারে উপস্থাপন করেন এবং সুরা ফাতিহার উপর রচিত তার টীকা নিবেদন করেন। এটা ছিল অত্যন্ত চমৎকার উপস্থাপনা যেন স¤্রাটের মনে হলো তিনি এইমাত্র বাংলার দাউদকে জয় করলেন। এই টীকাও স¤্রাট এবং বিদ্বানদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। বাদাউনি বলেন, কিছু লোক মনে করেন যে টীকাটি ছিল মুবারকের রচিত।৫৮

ইবাদতখানায় আবুল ফজলের মেধা তার পরিপূর্ণ প্রকাশের সুযোগ লাভ করে। আকবরের হুকুমে ১৫৭৫ সালে ইবাদতখানা নির্মিত হয়। বাদাউনি ভাষাচিত্রের সাহায্যে এটির নির্মাণ পটভূমি বর্ণনা করেন :

বহু বছর পূর্ব থেকেই স¤্রাট পর্যায়ক্রমে উল্লেখযোগ্য ও নিশ্চিত বিজয় লাভ করছিলেন। দিন দিন সা¤্রাজ্য বিস্তারলাভ করছিল এবং সবকিছু অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। সারা জাহানে তার কোনো বিরোধী পক্ষ ছিল না। এই অবসরে মহামতি স¤্রাটের সুযোগ হয়েছিল সাধু সন্ন্যাসী, যোগী এবং তার শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় শেখ মুঈন উদদীন চিশতীর শিষ্যদের ঘনিষ্ঠ সং¯্রবে আসার। তিনি তার বেশিরভাগ সময়ই ব্যয় করতেন প্রফেট ও সৃষ্টিকর্তার জগত নিয়ে আলাপ আলোচনায়। সুফিবাদের প্রশ্নসমূহ, বৈজ্ঞানিক আলাপ আলোচনা, দর্শন ও আইনের অনুসন্ধান প্রভৃতি ছিল তার দিনের নিয়মিত কর্মসূচি। স¤্রাট সৃষ্টিকর্তার আরাধনায় সারারাত কাটিয়ে দিতেন। তিনি অনবরত তাকে ইয়াহু এবং ইয়াহাদি জিকিরে লিপ্ত রাখতেন যে বিষয়ে তিনি ছিলেন সুবিজ্ঞ। তার হৃদয় ছিল তাঁর (সৃষ্টিকর্তা) জন্য অসীম শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ, যিনি সত্যিকারের দাতা। বিগত দিনগুলোর সার্থকতার জন্য একধরনের কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে তিনি খুব ভোরে একা তার প্রাসাদের নিকটে একটি নির্জন স্থানে একটি পুরোনো দালানের বড় সমতল পাথরের উপর, তার বুকের সঙ্গে মাথা লাগিয়ে বসে প্রার্থনা এবং ধ্যান করে সুবেহ সাদিকের প্রথম প্রহরগুলোর পরম পুলক অনুভব করতেন। তিনি বিশেষভাবে ইবাদত খানা তৈরিতে আগ্রহী হলেন যখন তিনি জানতে পারলেন বাংলার গভর্নর সুলায়মান প্রায় একশত পঞ্চাশজন প্রখ্যাত শেখ ও উলামা সহযোগে প্রার্থনা করেন এবং তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও উপদেশ শুনে তাদের সঙ্গেই সকাল পর্যন্ত অতিবাহিত করেন এবং তারপর সকালের প্রার্থনা শেষ করে নিজেকে তার রাষ্ট্রীয় এবং সামরিক বিষয়ক বিভিন্ন কাজে লিপ্ত করেন; এবং সবকিছুর জন্য তার সময় সুনির্দিষ্ট ছিল এবং কখনোই তিনি তার এই সুন্দর নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতেন না।৫৯

আবুল ফজল লক্ষ করলেন উলামারা পরিপূর্ণভাবেই তাদের আলোচনায় কর্তৃপক্ষ ও সনাতনী রীতির উপর নির্ভর করে।৬০ তিনি সেজন্য যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মুতাজিলা পদ্ধতির প্রয়োগ করতেন। উলামারা কর্র্তৃপক্ষ এবং দরবারে তারা যে সম্মান ভোগ করে তার দ্বারা আবুল ফজলকে নীরব করার চেষ্টা করতো। যদিও আবুল ফজল অত্যন্ত সতর্কতা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য অটল থাকতেন। ইবাদতখানায় তার কাজ করার পদ্ধতি বাদাউনি নি¤েœাক্ত ভাষায় বর্ণনা করেন :

তিনি সাব্বাহির বাতি জ্বালাতেন, পাশাপাশি ঐ সমস্ত মানুষের গল্প ব্যাখ্যা করতেন যাদের সম্পর্কে তিনি জানতেন না কী করতে হবে, স্পষ্ট দিবালোকের মধ্যে প্রদীপ জ্বালানোর মতো, কোমরে অব্যর্থতার কোমরবন্ধ বেঁধে সকল গোত্রের বিরোধিতা করে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করতেন। তার বক্তব্য অনুসারে, ‘তিনি যিনি অবিরতভাবে আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করতেন কিন্তু নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা বোধ করতেন না যেমন করতেন তার সত্য মতামতের প্রতি।৬১

আবুল ফজলের পদ্ধতি ছিল একগুচ্ছ উলঙ্গ বিরোধিতাকে সামনে রেখে সকল গোঁড়া বিশ্বাস ও মতবাদ সম্পর্কে প্রমাণ দাবি করা। সম্ভবত যে সমস্ত মতবাদকে তিনি চ্যালেঞ্জ করতেন তা খুব কমই তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি যে সমস্ত জটিল সমস্যাপূর্ণ প্রশ্ন উলামাদের করতেন তা স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে বিষন্ন করে তুলতো। একদিন বাদাউনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন এই সমস্ত কুখ্যাত বিরুদ্ধ বিশ্বাস, আপনি নিজেই কি নিজের সর্বশ্রেষ্ঠ বক্রতা?’ আবুল ফজল উত্তর দিলেন, ‘আমি রঙ্গ করার জন্য কিছুদিন অবিশ্বাসের উপত্যকায় ভ্রমণ করতে চাই।’৬২

এতদ্সত্ত্বেও আবুল ফজল ইবাদতখানায় তার আলোচনায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আচরণ করতেন। তিনি মল্লভূমির নিঃসঙ্গ যোদ্ধার মতো শুরু করতেন না। তিনি পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উলামাদের বিভিন্ন দলের মানসিক চাপের উপর ক্রীড়া করতেন। তিনি হাজি ইব্রাহীমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুখদুম-উল-মুলুককে তার সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতেন। তার বিগত ফতোয়াগুলোকে ভর্ৎসনামূলক সমালোচনার বিষয়ে পরিণত করা হত। এমনকি তার চরিত্রও আলোচ্য বিষয় হিসেবে আসতো। এভাবে  জাকাত প্রদানকে এড়ানো সম্পর্কে শরিয়তের সঙ্গে তার চাতুরি — বছরের শেষে তার সম্পদকে স্ত্রীর নামে বদল করা এবং পরে তা নিজের কাছে পুনরায় ফিরিয়ে আনা— দরবারে তার অবস্থানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এটা প্রমাণিত ছিল যে তিনি ধার্মিক ও উপয্ক্তু লোকদের সঙ্গে কারচুপি করেছিলেন, বিশেষভাবে পাঞ্জাবের  ঐরকম লোকের সঙ্গে।৬৩

একইভাবে ‘আবদুন নবী’র পতন অনিবার্য হয়ে আসে। স¤্রাট তার অসংখ্য স্ত্রীর জন্য একটি বৈধ ন্যায্যতা প্রতিপাদন করতে চেয়েছিলেন। আবুল ফজল তাকে এমনভাবে হেঁচড়িয়ে বিরোধের মধ্যে ফেলে দেন যে তিনি স¤্রাটের অসন্তুষ্টি অর্জন করেন। আবুল ফজল মুতা বিবাহ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রথা স¤্রাটের সম্মুখে তুলে ধরেন যেগুলো বাদাউনির মতে, তার পিতা কর্তৃক সংগৃহীত হয়েছিল। এভাবে আবদুন নবী’র পতনের পটভূমি তৈরি করা হয়েছিল।

ইবাদতখানায় গোঁড়া উলামারা কখনোই বিরোধীদের যুক্তি তর্কের সামনে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হত না। আবুল ফজলের সম্মান ও অবস্থানের উন্নতি হতে শুরু করে। কেন তিনি তাদের এত বিরোধিতা করেন, এটা জানতে চেয়ে কিছু উলামা আবুল ফজলকে ব্যক্তিগত পত্র প্রেরণ করে। আবুল ফজল প্রতুত্তরে বলেন, ‘কি আশ্চর্য! আমি সঠিক চিন্তাধারাকে ছড়িয়ে দিচ্ছি এবং মানুষের কল্যাণ কামনা করছি। কেন মানুষ মিছেমিছি আমাকে আক্রমণের জন্য ওঁত পেতে থাকে?’৬৪ আবুল ফজল ঘৃণার সঙ্গে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন।  আবুল ফজল মন্তব্য করেন, ‘কীভাবে এ সকল তন্দ্রাচ্ছন্ন চক্রান্তকারী বুদ্ধিমানরা আমার শুভেচ্ছা আশা করে?’৬৫

এই ইবাদতখানায়ই আবুল ফজল হিন্দু চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের সংস্পর্শে আসেন যারা বিশেষভাবে তার চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি নির্দিষ্টভাবে মধু সরস্বতী, মধুসূদন, নারায়ণ অসরাম, হরজিত সুর, দামোদর ভাট, রাম তীর্থ, নরসিংহ, প্রেমিন্দর এবং অদিত-এর নাম উল্লেখ করেন। তিনি এসকল বিদ্বানকে শেখ মুবারকের সমমর্যাদায় স্থাপন করেন৬৬ সত্যিসত্যিই যা তাদের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধাকে প্রকাশ করে।

ইবাদতখানায় আবুল ফজল অগ্নি-উপাসকদের ধর্মগুরুদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। বাদাউনির মতানুসারে, আকবর তার দরবারের আলোর দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন এবং তাকে সতর্ক থাকার জন্য আদেশ করেন যেন এ আলো দিবা-রাত্র কখনো নির্বাপিত না হয়।৬৭

যখনই খ্রিস্টান মিশনারিরা আসতেন তখনই আবুল ফজল তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা ও দৃষ্টিভঙ্গির আদান প্রদান করতেন। মনসেররাত বলেন যে, স¤্রাট তাদেরকে আবুল ফজলের সঙ্গে পরামর্শ করার উপদেশ দেন এবং ‘তাদের সমস্যাদি তার কাছে আস্থার সঙ্গে বলতে বলেন যেমন আস্থার সঙ্গে স¤্রাটকে বলেন।’৬৮ মিশনারি ফাদাররা মনে করলেন তারা যদি ফারসি ভাষা শেখেন তা হলে তারা দরবারে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবেন। রুদলফকে ফারসি শেখানোর জন্য আবুল ফজলকে আদেশ দেয়া হয়।৬৯ আবুল ফজল মাঝে মাঝে উলামাদের সঙ্গে বিতর্কে ফাদারদেরকে সাহায্য করতেন এবং এতে তাদের মনে এই চিন্তার উদ্রেক হয়েছিল যে ইসলামের সঙ্গে আবুল ফজলের শত্রুতা আছে।৭০ এটা কথিত আছে যে, কোনো জন সমাবেশে মিশনারি ফাদাররা আবুল ফজলের উপস্থিতিতে তাদের মতামত ব্যক্ত করতেন, যেন অতিরিক্ত যুক্তির ক্ষেত্রে তিনি তাদেরকে সাহায্য করতে পারেন। কোনো এক অনুষ্ঠানে ফাদাররা তার সমর্থন দ্বারা এতোটাই উদ্বেলিত হয়ে পড়েছিলেন যে তারা চিন্তা করেছিলেন তিনি একজন খ্রিস্টান হয়ে গেছেন।৭১ আবুল ফজলের মতো প-িত জৈনদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। ফতেহপুর আগমনের পর থেকে এমন একটা সময় পর্যন্ত হিরা বিজয় তার অতিথি ছিলেন যখন তিনি সহজেই স¤্রাটের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন।৭২

ইবাদত খানার বিতর্ক এবং আলোচনা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যা আকবরের মননের সঙ্গে ছিল বেমানান। একবার শেখ মুবারক ফতেহপুর শিকরিতে স¤্রাটকে সংবর্ধনা নিবেদন করতে এসেছিলেন। আকবর উলামাদের ভূমিকায় বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং এ বিষয়ে তার মতামত জানতে চাইলেন। মুবারক শ্রদ্ধার সঙ্গে উপস্থাপন করেন : ‘মহামতি স¤্রাট হলেন একালের ইমাম এবং মুজতাহিদ, ধর্মীয় অথবা ইহজাগতিক বিষয়ে আদেশ জারির জন্য এ সকল উলামাদের সাহায্যের আপনার কী প্রয়োজন? ভিত্তিহীন খ্যাতি ছাড়া তাদের সত্যিকারের জ্ঞানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।’ আকবর বললেন, ‘যেখানে আপনি আমার শিক্ষক, আপনি কেন আমাকে এই সমস্ত মোল্লাদের উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করেন না?’৭৩ এরপর থেকে মুবারকের মানসিকতা এমনভাবে কাজ করতে শুরু করে পরিণামে যা ‘মাহজার’ প্রস্তুতির দিকে পরিচালিত করে।

সম্ভবত মাহজার প্রচারের পটভূমি তৈরি করার জন্যই আকবরকে প্রার্থনা সমাবেশ পরিচালনার পরামর্শ দেয়া হয়। জামাদি ১, ৯৪৭/জুন ২৬, ১৫৭৯-এর প্রথম শুক্রবার ফয়েজি একটি খুতবা প্রস্তুত করে। বাদাউনি বলেন যে, আকবর তোত্লিয়ে তোত্লিয়ে এবং কেঁপে কেঁপে খুব কষ্ট করে বড় জোর ফয়েজি রচিত কবিতার তিনটি পদ পর্যন্ত পড়তে পেরেছিলেন। তিনি দ্রুত প্রচার বেদী থেকে নিচে নেমে আসেন এবং ইমাম হাফিজ মুহাম্মদ আমিনকে প্রার্থনা পরিচালনার অনুরোধ করেন।

স¤্রাটকে মুজতাহিদ ঘোষণা করে একটি সম্মিলিত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে উলামাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় মুবারক বিজয়ী হন। (ঘোষণাপত্রে) স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে মুখদুম-উল-মুলক, কাজী খান বাজাখশি, কাজী জালাল-উদ্-দীন মুলতানি, সদর-ই-জাহান মুফতি এবং শেখ মুবারকের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এখানে আমাদের মূল প্রসঙ্গে মাহজার এবং তার বৈধতা ও কূটনৈতিক প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে সার্বিক আলোচনায় প্রবেশ করার প্রয়োজন নেই।৭৪  এতদ্সত্ত্বেও এটা গুরুত্বপূর্ণ যে আবুল ফজল দলিলের পা-ুলিপি দেন নি এবং এ দলিল প্রস্তুতকরণে মুবারকের ভূমিকাকেও তুলে ধরেন নি। মাহজার দরবারের বিরুদ্ধে বিশাল বিস্তৃত অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, কুচক্রি দলই এটা তৈরির জন্য দায়ী ছিল। আত্মজীবনীতে দলিল উদ্ধৃত করে আবুল ফজল তার পিতৃ-বিরোধী অনুভূতির সংযোগ ঘটাতে চান নি।

২. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

তিনটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নির্দেশের সাহায্যে আবুল ফজলের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে :

১.            সকল মানুষ ভাই ভাই।

২.           হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য আছে।

৩.           ধর্মীয় বিভেদ দ্বারা সমাজের মৌলিক সমপ্রকৃতিকে বিভাজিত করা উচিত নয়।

আবুল ফজল বিশ্বাস করতেন যে বংশবৃত্তান্তে গৌরব বোধ করা এক ধরনের বিফল দাম্ভিকতা ছাড়া কিছুই নয়। তিনি ‘আইন-ই-আকবরি’তে উল্লেখ করেন, ‘বংশ কৌলিন্যে বড়াই করা শূন্য হস্তে পূর্ব-পূরুষদের কঙ্কাল নিয়ে বাণিজ্য করার সমান, যা অজ্ঞানতাকেই প্রশ্রয় দেয় এবং যা নির্বোধের মতো অন্যের মেধাকেও বিফল করে, যে তার নিজের দোষ ত্রুটি সম্পর্কে অন্ধ। বিষয়টি স্পর্শ করার বা এমন অলস বড়াইকে প্রশ্রয় দেবার ইচ্ছে আমার নেই। এ রকম অপদেবতা অধ্যুষিত জঙ্গলাকীর্ণ ঊষর প্রান্তরে বহিরস্থ পৃথিবীতে আমি বংশ-বৃত্তান্তের আবাদ করতে চাই না, যা যে কোনোভাবে প্রগতিকে প্রতিহত করতে সক্ষম কিন্তু যাতে অন্তঃস্থ আত্মার কোনো উপকারই নেই।’৭৫

একই চেতনার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে তিনি উঁচু-নিচুর মধ্যে বিশেষত্ব নির্দেশের অন্তঃসারশূন্যতাকে প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সকল মানুষ আদি পিতা আদমের সন্তান।’৭৬

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আবুল ফজল শ্রেণিহীন সমাজে বিশ্বাসী ছিলেন অথবা তিনি বৌদ্ধিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ দ্বারা উৎপন্ন ঔদ্ধত্য থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন। তার অবস্থানগত দিকে তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত এবং অনেক বিষয়েই তার মনোভাব ছিল অভিজাত শ্রেণির মতো। মূলত তিনি সমাজের সনাতন শ্রেণিকরণের প্রতিই অনুগত ছিলেন যেমনটি পারস্যের অভিজাতদের মধ্যে দেখা যায়। সম্ভবত তিনি বিশেষভাবে ‘আখলাক-ই-জালালি’র প্রখ্যাত লেখক জালাল-উদ-দিন দাউওয়ানি’র (৯০৮/১৫০২) দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।৭৭

সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের মৌলভিত্তিই এ বিষয়ে আলোচনার প্রথম প্রসঙ্গ। প্লেটো মানুষকে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং লোহার অধিকারী হিসেবে বিভাজিত করেছেন। জালাল-উদ-দিন দাউওয়ানি মানবদেহ নিঃসৃত চারটি রস বা উপাদানের ভিত্তিতে তার শ্রেণিবন্যাস করেছেন। ‘যেভাবে দৈহিক প্রকৃতির ভারসাম্য ঘটে’ দাউওয়ানি লেখেন, ‘চারটি উপাদানের পারস্পারিক মিশ্রণ ও সমন্বয় দ্বারা তৈরি রাজনৈতিক ভারসাম্যই চারটি শ্রেণির আন্তঃযোগাযোগের কারণ। অধিকন্তু মানুষ মানুষের সমমানসিকতা দ্বারা যে সব সংগঠন গড়ে তোলে, এ সমস্ত উপাদানের যে কোনো একটির যথাযথ পরিমাণগত ভারসাম্যের অভাব তাকে বিচ্ছিন্ন ও বিলুপ্ত করে ফেলে। তেমনি রাষ্ট্রেও যে কোনো একটি শ্রেণির অন্য তিনটি শ্রেণির উপর প্রভাব বিস্তার পুরো ভারসাম্যকে উল্টিয়ে ফেলে এবং সকল সন্ধিকে ধ্বংস করে দেয়।’৭৮ এই শ্রেণিবিন্যাস ইউনানি চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তৈরি।

দেউয়ানির শ্রেণিবিন্যাসের মৌলভিত্তিটি আবুল ফজল গ্রহণ করেছিলেন। প্লেটো সমাজকে বিভাজিত করেছিলেন :

১.  অভিভাবক বা সৈনিক

২.  শাসক বা চাকুরিজীবী শ্রেণি, এবং

৩.  কৃষি, বাণিজ্য ও কারখানা শ্রমিক ।

এই তিন ভাগে। দাউয়ানি এবং আবুল ফজল উভয়ের প্রদত্ত তালিকা থেকে এটা নিশ্চিত যে তারা প্লেটোর তৃতীয় শ্রেণিকে দুটি উপবিভাগ : ১. নির্মাতা এবং ব্যবসায়ী, ২. কৃষক এবং শ্রমিকে বিভক্ত করেছিলেন। এই সকল ধারণা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে আবুল ফজল সমাজের নি¤েœাক্ত শ্রেণিবিন্যাস করেছেন।

১. সৈনিক অথবা অস্ত্রধারী গোষ্ঠী। দাউওয়ানির তালিকায় তাদেরকে দ্বিতীয় স্থান দেয়া হয়েছিল, কিন্তু আবুল ফজল তাদের প্রথম স্থান দিয়েছেন। আবুল ফজলের ভাষায় তারা হলো রাষ্ট্রের আলোক শিখার মতো। তুচ্ছ বস্তু, বিদ্রোহের আবর্জনা ও শত্রুতাকে নিঃশেষ করে আবেগ-বুদ্ধি দ্বারা তারা পরিচালিত, কিন্তু তবুও এই অশান্তির পৃথিবীতে অবশিষ্ট প্রদীপটুকু তারাই প্রজ্জ্বলিত রাখে।

২. দার্শনিক, চিকিৎসক, গণিত বিশারদ, জ্যামিতি বিশারদ এবং জ্যোতির্বিদ-এর মতো বিজ্ঞজন জলের সদৃশ। দাউয়ানি তাদেরকে তার তালিকায় শীর্ষে স্থান দিয়ে ছিলেন, কিন্তু আবুল ফজল তাদের জন্য দ্বিতীয় স্থান নির্দেশ করেছেন। তাদের লেখনি ও পা-িত্য থেকে পৃথিবীর গতির মধ্যে একটি নদীর আবির্ভাব ঘটে ; সৃষ্টিশীলতার বাগান তা থেকে জলসেচ গ্রহণ করে লাভ করে এক অদ্ভুত সজীবতা।

৩. নির্মাতা এবং ব্যবসায়ী। তারা বাতাসের স্থান অধিকার করে আছে। তাদের শ্রম ও পরিভ্রমণ দ্বারা আল্লা প্রদত্ত দ্রব্য সামগ্রী সর্বজনীনতা লাভ করে এবং পরিতৃপ্তির সুবাতাস জীবনবৃক্ষের পুষ্টি বিধান করে।

৪. কৃষক এবং শ্রমিক। তাদেরকে ভূমির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাদের প্রচেষ্টা দ্বারা জীবনের পণ্য দ্রব্য, পরিশুদ্ধতা ও শক্তি অর্জন করে এবং তাদের কর্ম থেকেই সুখের ধারা প্রবাহিত হয়। দাউয়ানি এবং আবুল ফজল উভয়েই তাদের শ্রেণিকরণে এদেরকে চতুর্থ স্থান দিয়েছেন। দাউয়ানি এবং আবুল ফজল উভয়েই বিশ্বাস করতেন যে একজন রাজার অবশ্য কর্তব্য এদের প্রত্যেককে তার উপযুক্ত স্থানে রাখা এবং উপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সামর্থকে একতাবদ্ধ করা, যে কারণে অন্যদের জন্য পৃথিবী জাঁক জমকপূর্ণ হয়।৭৯

আবুল ফজল রাষ্ট্রে অভিজাতদের ভূমিকার উপর প্রচ- গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি রাজার প্রতি তাদের অটল আনুগত্যের উপর ভীষণ জোর দিয়েছেন এবং শাসককে তাদের কল্যাণ দেখা শোনা করতে বলেছেন। এই শ্রেণিকরণে উচ্চ শ্রেণির শ্রেষ্ঠত্বের একটি পরোক্ষ পরামর্শ আছে, কিন্তু আবুল ফজলের মানবতাবাদের গভীর চেতনা এবং তার ন্যায়বিচার বোধ শরিফ এবং রাজিল বিষয়ক আলোচনার অনুভূতিকে প্রতিরোধ করেছে, যা যে কেউ জিয়াউদ্দিন বারানি’র ‘ফতোয়া-ই-জাহানদারি’র মধ্যে খুঁজে পায়।

আবুল ফজলের বিবেচনায় ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্রক্ষমতার মূল খুঁটি। ‘যখন আল্লাহ পছন্দসই কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করে’ তিনি লেখেন, ‘তিনি তাকে দূরদর্শিতাপূর্ণ করেন, বিশাল ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের অমূল্য রতœ দিয়ে উন্নীত করেন, যাতে তিনি পারিবারিক বন্ধু ও অপরিচিতদের মধ্যে সমান ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন।’৮০ অন্য স্থানে আবুল ফজল উল্লেখ করেছেন যে ন্যায়বিচারই রাজ্যের শান্তি ও সমৃদ্ধির উপায়।৮১ খান-ই-খানান এর নিকট এক পত্রে আবুল ফজল বলেন যে আকবরের শাসন কালের উন্নয়ন স¤্রাট কর্তৃক আরোপিত পঞ্চম নীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত — যা ছিল জনগণের উপর ন্যায়বিচার করা।

আবুল ফজলের ‘সবার জন্য শান্তি’ ধারণাটিও তার ন্যায্যবিচার বোধ থেকে উদ্ভূত। তিনি বলেন যে, সমগ্র সৃষ্টির সঙ্গে কেবলমাত্র দুই ধরনের সম্পর্ক হতে পারে, একটি হলো ভালোবাসার সম্পর্ক এবং অন্যটি শান্তির সম্পর্ক।৮২ ন্যায়বিচারের জন্য সামাজিক উত্তেজনাসমূহের সতর্ক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন যাতে বিরোধের কারণগুলোকে সর্বনি¤œ মাত্রায় নামিয়ে আনা যায়।

‘হিন্দুস্তানের মানবগোত্র বিজ্ঞান’৮৩ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে আবুল ফজল ভারতের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার ভুল বোঝাবুঝি ও কলহ বিবাদের নানা রকম কারণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তার মতানুসারে সামাজিক উত্তেজনার কারণ সাতটি।

প্রথমত : ভাষাসমূহের বৈচিত্র্য এবং পারস্পারিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল আশঙ্কা এবং এভাবে অসৎ-ইচ্ছাশক্তির সূত্রপাত ঘটে ও বিরোধের ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়।

দ্বিতীয়ত : দূরত্ব যা হিন্দুস্তানের জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে অন্যান্য জাতির বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিবর্গ থেকে আলাদা করে রাখে, যারা সচরাচর পরস্পর সাক্ষাৎ করতে অক্ষম। যদিও কোন সুযোগ তাদেরকে কখনও একত্রিত করে, একজন যোগ্য দোভাষীর অভাব তখন বাস্তব সম্মত কাক্সিক্ষত ফলাফল ব্যাহত করে। একজন বিদগ্ধ ভাষাতাত্ত্বিক যিনি বিভিন্ন জাতি ও প্রতিযোগীর মধ্যে প্রাঞ্জল, কার্যকর ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে বিজ্ঞানের জটিলতা, দর্শনের দুর্বোধ্য গবেষণা প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দানে সক্ষম এমন ব্যক্তি অত্যন্ত বিরল। এমনকি বর্তমান সময় যখন, স¤্রাটের বিদ্যোৎসাহী এবং মেধানুরাগের মাধ্যমে সকল দেশের প-িতবর্গ সমবেত হয়েছেন এবং সম্মিলিত শক্তিতে সত্য লাভের চেষ্টায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন, সেখানেও এমন দক্ষ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। জ্ঞানপিপাসু এমন ব্যক্তিবর্গ সত্যিই বিরল যারা তাদের স্বদেশ ত্যাগ করেছে, গ্রহণ করেছে ভ্রমণের অভিনবত্বকে এবং কঠোর পরিশ্রম ও অবিরাম সাধনার দ্বারা বিভিন্ন ভাষা আয়ত্ব করার জন্য তাদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছে। আনুশিরওয়ান-এর মতো একজন অনুসন্ধানী প্রয়োজন, যিনি স¤্রাটের পার্থিব আত্মম্ভরিতার মধ্যেও জ্ঞানের রতœ সন্ধান করেন এবং বুজুর্গ মিহির-এর মতো একজন মন্ত্রী যিনি তার পরামর্শদাতাদের মতো পরশ্রীকাতরতা মুক্ত, রাজা ও মন্ত্রী উভয়ে সম্মিলিতভাবে চিকিৎসক বারজাউয়াইহ্-এর মতো অপূর্ব ও ন্যায়পরায়ণ এবং বুদ্ধিদীপ্ত সহযোগী আবিষ্কার করবেন, এবং তারপর পর্যাপ্ত অর্থসহ সওদাগরের ছদ্মবেশে বাণিজ্যিক পূঁজি দ্বারা সুসজ্জিতভাবে তাকে হিন্দুস্তান প্রেরণ করবেন। তিনি অবশ্যই স্বোপার্জিত জ্ঞানের উপর আগ্রহ অর্জন করবে এবং পুনরায় এই প-িত ব্যক্তি তার কর্মচারিদের উপস্থিতি অনুপস্থিতির মধ্যে কোনো বিশেষত্ব আরোপ না করে তার অনুসন্ধানে অধ্যবসায়ী হবে এবং তার খোলামেলা ব্যবহার ও স্বর্ণ উপহার প্রদানের মাধ্যমে তার মনোবাঞ্ছা পূরণে সফল হবে। অথবা বাস্তবতা তুমতুম-এর মতো একজন অক্লান্ত এবং অত্যুচ্চ বুদ্ধিজীবীকে দাবি করবে, যিনি স্বর্গীয় দার্শনিক প্লেটোর নির্দেশাবলি সংগ্রহের জন্য হিন্দুস্তান থেকে গ্রিক গমন করেন এবং ভ্রমণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রসহ তার ক্যারাভ্যানের মাশুল প্রদান করেন। যিনি সমুদ্র ও মরুভূমির বিপদসমূহ মোকাবেলা করার জন্য নিজেকে নিযুক্ত করেন এবং জ্ঞানের সহজ সরল চিকিৎসা দ্বারা তিনি তার আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে আত্মার ভারসাম্যকে বজায় রাখেন। অথবা বাল্খের আবু মাশার-এর মতো শক্তিশালী মন ও শরীরের অধিকারী গভীর বিদ্যানুরাগী যিনি নির্বাসন বরণ করে স্বদেশ-বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্বাভাবিক কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে খোরাসান থেকে ভারত পরিভ্রমণ করেন ও বেনারসে এক সম্দ্ধৃ জ্ঞান-ভা-ার গড়ে তোলেন এবং ঐশ্বর্যের উপহার হিসেবে তা তার নিজ দেশের  জ্ঞানীদের জন্য বহন করে নিয়ে যান।

তৃতীয়ত : দৈহিক পরমানন্দের মধ্যে মানুষের আত্মবিলীন ঘটা। কোনো বিষয়ে সৌন্দর্যের অভাব বিবেচনা না করা মানুষকে তার অস্তিত্বের বাইরে নিক্ষেপ করে এজন্য সে স্বোপার্জিত বা উৎপাদিত উপভোগের মূল্য সম্পর্কে চিন্তিত হয় না। বিদেশী নাগরিকের নিকট শোনা কথা থেকে নীতি কাহিনি পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যন্ত তাদের সূক্ষ্ম সমালোচনা মুখরতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এবং যতটা সম্ভব তাদের নৈতিক বিকৃতির জন্য তারা কোনো বিষয়ে গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করে, সে কারণে  এই প্রতারণাপূর্ণ পৃথিবীর ঝকমকানি তাদের চোখের উপর অজ্ঞতার আবরণ ফেলে দেয়। তাদের অবশ্যম্ভাবী অবস্থা কী হবে এবং কীভাবে দয়া তাদের জন্য তত্ত্বাবধানের বাতি জ্বালাবে?

চতুর্থত : আলস্য। মানুষ ভবিষ্যতে কোন কিছু লাভ করার সুযোগের চেয়ে হাতের কাছে যা প্রস্তুত তাকেই অধিক মূল্যবান মনে করে এবং সহজে তা পাওয়ার চেষ্টা করে। তারা গভীর অনুসন্ধানের যন্ত্রণা গ্রহণ করে না বরং ভাসা ভাসা ধারণাতেই সন্তুষ্ট থাকে। জ্ঞানের গভীর অন্তর্দেশে প্রবেশের উদ্দেশ্যে তারা এক ইঞ্চিও অগ্রসর হবে না। তিনিই জ্ঞানের একমাত্র সত্য ভাষ্যকার যিনি অর্থের গুপ্ত সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ সমাপ্তির পূর্বে নিজেকে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নির্ভীক আকাক্সক্ষার মাধ্যমে গবেষণার ভয়ঙ্কর ভীতিপ্রদ বন্য ভূমিতে তার পা রাখেন এবং কঠোর পরিশ্রমকে ভয় না করে, নিজের সাধ্যের শক্তি দ্বারা পথপরিক্রমার অসংখ্য বাধাকে অতিক্রম করে টিকে থাকে এবং চির অটল সঙ্কল্পকে  কাঁধে নিয়ে তার উচ্চাকাক্সক্ষার গন্তব্যে পৌঁছায়।

পঞ্চমত : অনমনীয় প্রথার প্রবল অনাদর বাত্যাপ্রবাহ এবং জ্ঞান প্রদীপের ¤্রয়িমান শিখা। স্মরণাতীত কাল থেকে অনুসন্ধানের চর্চা ছিল সীমাবদ্ধ এবং প্রশ্ন করা ও তদন্ত করাকে বিবেচনা করা হতো নাস্তিকতার পূর্বাভাস হিসেবে। পিতা, পরিচালক, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু অথবা প্রতিবেশী থেকে যা কিছু গ্রহণ করা হতো, তাকে বিধাতার দান হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং রাজনৈতিক ব্যাপারে অসন্তুষ্ট একজন ব্যক্তিকে অধার্মিক বা নাস্তিক বলে তীব্র ভর্ৎসনা করা হতো। যদিও তাদের প্রজন্মের বুদ্ধিমানদের মধ্যে কিছু সংখ্যক অন্যদের মধ্যে এই প্রক্রিয়ার মূর্খতা স্বীকার করতো। এখনও তাদের নিজেদের মধ্যে বাস্তব সম্মত বিধিমালায় তারা এক পাও কি অগ্রসর হবে না!

ষষ্ঠত : বিদ্বেষের ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবিস্তার এবং নির্যাতনের বিপর্যয় কিছু একান্ত নিবেদিত অনুসন্ধানকারীকে তাদের ব্যক্তিগত মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য সহানুভূতিশীল চেতনায় বন্ধুত্বপূর্ণ সমাবেশে একতাবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রেখে ছিল। বিজ্ঞ জনগোষ্ঠীর বন্ধনকে নির্ভুল ন্যায়বিচারের মানদ-ে যাচাই করে পক্ষপাতহীন তত্ত্বাবধানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিচ্ছেদ থেকে রক্ষা করার জন্যই সত্য ও অসত্যকে পৃথক করা যেতে পারে। এমনকি শুধু রাজারা তাদের বাধ্যবাধকতার অসচেতনতায় তাদেরকে অগ্রাহ্য করেছে। ঔদ্ধত্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থপরতার হস্তক্ষেপে সামাজিক মেলামেশার অনুষ্ঠানাদি নানারকম বিহ্বলতার দ্বারা প- হয়েছে। কিছু লোক নিরবতার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন; অন্যরা ভাষার মারপ্যাচের মধ্যে আত্মরক্ষার কৌশল খুঁজেছেন; যদিও অন্যরা পুনরায় নানা রকম উক্তি দ্বারা নিজেদেরকে মুক্ত রেখেছেন। যদি অস্থায়ী শাসকেরা এ বিষয়ে আগ্রহী হতেন এবং মানুষের আশঙ্কাকে শান্ত করতেন তা হলে নিশ্চিতভাবেই অনেক আলোকিত ব্যক্তি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় শান্ত মনে তাদের বাস্তব অনুভূতিকে ব্যক্ত করতেন। শাহজাদাদের অনীহায় প্রতিটি সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসে হয়ে পড়ে অত্যন্ত গোঁড়া এবং এভাবে মতবিরোধ প্রচ- আকার ধারণ করে। প্রত্যেকের তার নিজের মতামতকে একমাত্র সত্য মনে করা, তাকে ঈশ্বরের অন্যান্য আরাধনাকারীর নির্যাতনে নিযুক্ত করে রক্তপাত ঘটানো এবং অন্যের মতবাদকে ধ্বংস করাই ধর্মীয় গোঁড়ামীর প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে । যখন মনের চোখ সত্য দৃষ্টি লাভ করে তখন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই এই হযবরল করণের প্রচ- কলরোল থেকে নিজেকে মুক্ত করা এবং অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেয়ে বরং তার নিজের উৎকণ্ঠাসমূহে মনোযোগী হওয়া উচিত। এ রকম অশোভন মতভেদের মধ্যে ডুবে থাকায় মূল উদ্দেশ্যই এক পাশে পড়ে থাকে এবং যুক্তি প্রমাণ হয় উপেক্ষিত। যদি কোনো শত্রুর মতবাদও ভালো হয় তাহলে কেন সেই মতবাদের অধ্যাপকদের রক্তে হাত রঞ্জিত হবে? এমনকি যেখানে এটা অন্য রকম, সেখানেও সমাজের মূর্খতার জন্য পীড়াভোগকারীকে সমবেদনা জ্ঞাপন করা উচিত, তার সঙ্গে শত্রুতা না করে বা তার রক্তপাত না ঘটিয়ে।

সপ্তমত : জঘন্য ব্যক্তিদের নীতিবর্জিত উন্নতি লাভ যারা পুণ্য ও সত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রতারণাপূর্ণভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। এভাবে তারা অত্যন্ত ক্ষতি করে এবং স্বীকৃতির অভাবে যথার্থ সত্য অজানা থেকে যায়।

আবুল ফজলের এই সাতটি পর্যবেক্ষণকে যথার্থ সমাজ কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করলে সমাজ সম্পর্কে তার ধারণাটি উদ্ঘাটিত হয় এবং ত্রুটিসমূহ যা সুস্থপথে এর বিকাশকে ব্যাহত করে। এখানে আবুল ফজল একজন পরিচ্ছন্ন মস্তিষ্কের সমাজ চিন্তক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন যিনি :

মানুষের সম্প্রদায় বিভক্তির জন্য যন্ত্রণা ভোগ করেন, এবং উপলব্ধি করেন পরিষ্কারভাবে প্রত্যেকের ক্ষত এবং দুর্বলতা, সাধ্যমতো শক্ত মুঠিতে আঘাত করেন সঠিক জায়গাটিতে  এবং বলেন এখানে তোমার কেবলই নিরন্তর কষ্ট!

ভারতের সামাজিক অস্থিরতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণে আবুল ফজল হিন্দু ও মুসলমানদের মৌলিক সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি সেই সময়ের ইতিহাসকে ভারতীয় অবকাঠামোর প্রেক্ষিতে সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষণ করেন এবং তার মনন অনুসারে ভারতীয় ইতিহাসের ঐক্যবদ্ধতা ও প্রবহমানতার স্বরূপ উপলব্ধি করেন। তিনি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করতেন যে, হিন্দু দর্শন এবং ধর্ম, শিক্ষা এবং সাহিত্য, প্রথা এবং পার্বনসমূহ উপলব্ধি ছাড়া ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মূলধারাকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তিনি তার মহাভারতের ভূমিকায় ভিন্ন ধর্মমতবাদী ও বিশ্বাসীদের ধর্মীয় চিন্তা ও মতবাদ পাঠ করার সামাজিক প্রয়োজনীয়তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই তিনি তার ‘আইন-ই-আকবরি’তে হিন্দু মতবাদ সম্পর্কে বিস্তৃত ও অনুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন। জারেটের ভাষায়, ‘সকল কালের জন্য কেলাসিত এবং সংক্ষিপ্ত দলিল এই ‘হিন্দু-শিক্ষা’র জগৎ এবং পাশাপাশি এর পরিসংখ্যানগত উপযোগিতা, ব্রহ্ম-বিজ্ঞানের বহুশাখায় এর উল্লেখ প্রশংসনীয় গবেষণা গ্রন্থের মতো কাজ করে এবং আদব-কায়দা, বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং দেশজ মতবাদ যা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই এখনও প্রচলিত আছে এবং বহুদিন জনপ্রিয়ভাবে এসবের প্রভাব প্রবহমান থাকবে।৮৪

আবুল ফজল সর্ব অবস্থাতেই ছিলেন গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে, কারণ গোঁড়ামী সঠিক পথে সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এটা তার রচনা থেকে প্রকাশ পায় যে, দুটি কারণে আবুল ফজল মতান্ধতার সমালোচনা করতেন; প্রথমত : এটা (মতান্ধতা) সবদিক দিয়ে শৃঙ্খল আরোপের মাধ্যমে মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করে এবং দ্বিতীয়ত : এটা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

চেতনায় এই আদর্শ ধারণের জন্যই আবুল ফজল ‘আইন-ই-আকবরি’র চতুর্থ খ-ে কাশ্মিরের ব্রাহ্মণদের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ব্রাহ্মণরা হলেন কাশ্মিরের শ্রেষ্ঠ লোক। যদিও তারা এখনও তাদেরকে অন্ধবিশ্বাসের বেড়ি থেকে মুক্ত করতে পারে নি এবং প্রথার প্রতি অনুগত। তারা অধিকন্তু ভান ছাড়াই ঈশ্বরের আরাধনা করে। তারা অন্য ধর্মের লোকদের প্রতি কোনোভাবে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে না। তারা ফল গাছের আবাদ করে এবং স্বজাতীয়দের কল্যাণে অংশ গ্রহণ করে।’৮৫

মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি সামাজিক কল্যাণের জন্য কাজ করে এটা দেখার জন্য আবুল ফজল উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং এজন্য যখন তিনি দেখলেন কাশ্মিরের ব্রাহ্মণেরা ফলের গাছ আবাদ করে মানবসেবা করছে তখন তিনি তাদের জন্য প্রশংসার পারিশ্রমিক না দিয়ে পারেন নি।

আবুল ফজল আকবরের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরীক্ষাধর্মিতার প্রশংসা করেছেন কারণ সেগুলো তার সর্বধর্ম সমন্বয়ের মৌল চেতনা থেকে উদ্ভূত। ‘আইন’-৭৭ যেখানে আকবরকে জনসাধারণের পরিচালক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে তিনি একটি প্রশ্ন করেছেন যার মধ্যে থেকে তার চিন্তার মৌল প্রত্যয়টি বেরিয়ে আসে — ‘কিন্তু মানুষের ধর্মীয় ও বৈশ্বিক অভিপ্রায়ের কি কোন সাধারণ পটভূমি নাই? সকল স্থানেই কি একই পরমানন্দকর সৌন্দর্য নাই, যার আলোকচ্ছটা এ রকম হাজারো লুকায়িত স্থান থেকে সম্মুখে বেরিয়ে আসে? উদার হৃদয় বাস্তবিকই এমন গালিচা আল্লাহ্ যা ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং এর রং সমূহ অত্যন্ত সুন্দর যা তিনি দান করেছেন।’৮৬

এটা মোটেই গুরুত্বহীন ছিল না যে , আকবরের শাসনামলের সকল কবি যাদেরকে আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরি’তে উল্লেখ করেছেন এবং যাদের কবিতা সেখানে উদ্ধৃত করেছেন তারা সকলেই ছিলেন মুক্তচিন্তার অধিকারী এবং সকলেই সর্বসঙ্কীর্ণতামুক্ত ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাস করতেন।৮৭

আবুল ফজল ‘দাসত্ব’ এই ধারণাকে অপছন্দ করতেন। কোন দাস না থাকার জন্য তিনি ভারতীয় সমাজের প্রশংসা করেছেন।৮৮ যদিও তিনি তার এ পর্যবেক্ষণে ভারতের বিভিন্ন বর্ণের অবস্থানের বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন।

আবুল ফজল আকবরের যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রীতদাসকরণ বিলুপ্তি সম্পর্কিত আইনের প্রশংসা করেন। একমাত্র অপরাধীই শাস্তির যোগ্য এই দৃঢ় প্রত্যয়ের দ্বারাই তিনি তার যুক্তিকে অগ্রসর করে নেন। ‘যদি স্বামী ঔদ্ধত্যের পথ বেছে নেয়, তিনি মন্তব্য করেন, ‘তা হলে এটা কীভাবে স্ত্রীদের ত্রুটি হিসেবে গণ্য হবে, এবং পিতা যদি বিরোধের পথকে অবলম্বন করে তা হলে সন্তানের দোষ কী?’৮৯ রাজকীয় আইনের অনুপুঙ্খ তুলে ধরে তিনি বিশ্লেষণ করেন, ‘মহামান্য শাহানশাহ্র একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ আশীর্বাদ যা এ বছরের শুভলক্ষণকে প্রকাশ করে তা হলো ক্রীতদাস করণ প্রথার বিলুপ্তি। বিজয়ী সৈন্যরা যারা ভারতের বিশাল অঞ্চলে এসেছিল তারা ভারতীয় জনসাধারণের স্ত্রী, সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়কে এদের খেয়াল খুশি মতো অত্যাচার করার জন্য ব্যবহার করতো। মহামান্য শাহানশাহ্ তার ঈশ্বর আরাধনার স্বীকৃতির মাধ্যমে এবং তার প্রচ- দূরদৃষ্টি ও সঠিক চিন্তনের দ্বারা আদেশ দেন যে, তার শাসন এলাকার কোন অংশে বিজয়ী সেনাবাহিনীর কোন সৈন্য এরকম আচার আচরণ করবে না। যদিও বিরাট সংখ্যক বর্বর স্বভাবের লোক, যারা, পৃথিবী তাদের দৃঢ়তাকে একটি গৌরবের বিষয়ে পরিণত করবে এ বিষয়ে অজ্ঞ থেকে যুদ্ধ করতে সম্মুখে এগিয়ে আসে, এবং যখন তারা প্রতিদিন প্রসারমান সা¤্রাজ্যের স¤্রাটের গুণের কাছে পরাজিত হয়, তখনও তাদের পরিবারবর্গকে বিশ্ববিজয়ী সেনাবাহিনীদের প্রচ- আক্রমণ থেকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। ছোট-বড় কোন সৈন্যই তাদেরকে ক্রীতদাসে পরিণত করতে পারবে না। তাদেরকে তাদের বাড়ি ও আত্মীয়দের কাছে মুক্তভাবে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এটা সম্ভব হবার সর্বোত্তম কারণ ছিল মহামান্য শাহানশাহ্ এ বিষয়ে তার মনোযোগ দিয়েছিলেন। যদিও বন্দিত্ব, হত্যা অথবা উদ্ধতদের বাধা দেওয়া এবং একগুঁয়ে জেদীদের শাস্তি দেওয়া সা¤্রাজ্যের সংগ্রামেরই অংশ। মহিলাদের শাস্তি প্রদান এবং নিষ্পাপ শিশুদের অবাধ্যদের মতো শাস্তি প্রদান যদিও ন্যায়বিচারের অনুশাসনের বহির্ভূত তবুও এই বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারকম-লী ও প্রবর্তনকারীরা ছিলেন একমত।’

নারীদের প্রকৃতি ও শ্রেণি সম্পর্কে আবুল ফজল একটি বড় অধ্যায় বর্ণনা করেছেন।৯০ এই সমস্ত বর্ণনা থেকে নারী বিষয়ে আবুল ফজলের নিজস্ব মনোভাব সম্পর্কে প্রকৃতপক্ষে কোনো ধারণা গড়ে তোলা কঠিন। বিবাহ, বালিকাদের বয়স, সতী প্রভৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অনেক বিষয়েই তিনি আকবরের মতামতকে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এটা বলা যায় না যে এগুলো ঠিক আবুল ফজলেরও অভিমত ছিল।৯১ প্রমত্ততা সৃষ্টিকারী পানীয় নিয়ন্ত্রণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, বল প্রয়োগ দ্বারা সতী হতে বাধ্য করা প্রভৃতি সম্পর্কে আকবরের অনেক সংস্কারের কথা আবুল ফজল উল্লেখ করেছেন এবং মনে হয় এ সমস্ত ব্যাপারে তিনি আকবরের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত ছিলেন।

দরিদ্র জনসাধারণকে অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান সম্পর্কে আবুল ফজলের অভিপ্রায় বোঝার জন্য ‘আইন-ই-আকবরি’র ১৫, ১৬, ১৭ এবং ১৯  সংখ্যক আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ আইনে তিনি ‘মুসাদাত’ বা কর্মকর্তাদের ঋণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আইন ১৬ তে অনুদান প্রদানের মৌলভিত্তি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তী আইনে বলা হয়েছে ভিক্ষা সম্পর্কে, যেখানে ১৯ আইন ‘সুয়োরঘোল’ মঞ্জুরীর নীতিমালা প্রদান করে। তিনি নি¤œলিখিত চার শ্রেণির লোকের কথা উল্লেখ করেছেন যাদেরকে ‘সুয়োরঘোল’-এর জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে :

১.            জ্ঞানের অন্বেষণে যারা সকল প্রকার বৃত্তিকে পরিহার করেছে এবং সত্য জ্ঞান অনুসন্ধানে সময়ের দিন-রাত্রির বিভেদ ভুলে গেছে।

২.           যারা কঠোর পরিশ্রম ও আত্মসংযম সাধনা করে এবং মানুষের সমাজকে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ করেছে।

৩.           যারা দুর্বল ও দরিদ্র।

৪.           ভদ্র বংশের সম্মানিত জ্ঞান পিপাসু লোক যারা কোনো বৃত্তি গ্রহণের মাধ্যমে জীবন ধারণ করতে অক্ষম।৯২

এই প্রসঙ্গে তিনি উৎকোচ গ্রহণের গুরুতর সামাজিক সংশ্লেষের কথা উল্লেখ করেন এবং পূর্ববর্তী সদরদের তাদের অসততার জন্যে সমালোচনা করেন। ‘সুয়োরঘোল’ সম্পর্কে তার সকল আলোচনা এই প্রত্যয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, দরিদ্র অবশ্যই সাহায্য পাবে কিন্তু সমাজকল্যাণের অভিপ্রায়ে প্রণীত কোন বিধানের মূল্য ও কার্যকারিতা নষ্টের জন্য কোনোক্রমেই স্বজনপ্রিয়তা এবং উৎকোচ আদান প্রদানকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।

আবুল ফজলের সমাজ ভাবনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ— যাকে উপেক্ষা করা যায় না— তার সকল সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে যা উঁকি মারে, তা হলো —সমাজের কল্যাণ ও জনসাধারণের ভালোর জন্য একটি যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের ভূমিকার উপর তার গভীর আস্থা। যেখানেই তিনি আকবরের বিভিন্ন প্রশাসনিক বিধিমালার উল্লেখ করেছেন, সেখানেই তিনি শান্ত কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাদের সামাজিক গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন।

৩. ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

আকবর বলতেন, ‘বহিরাঙ্গিক প্রার্থনা যাকে তারা একটি নতুন স্বর্গীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায়, এটা আসলে তন্দ্রাচ্ছন্নদের জাগানোর জন্য, অন্যথায় আল্লার প্রশংসা মূলত হৃদয় থেকে আসে শরীর থেকে নয়।’৯৩ আবুল ফজল এই মন্তব্যের কার্যকারিতার উপর পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন। ‘মোনাজাত’ থেকে বোঝা যায় আবুল ফজল একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান বিশুদ্ধ ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু বহিরাঙ্গিক রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে ধর্ম তার কাছে ছিল একটি অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার ব্যাপার।

আবুল ফজলের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে তার সমসাময়িক ব্যক্তিরা ভুল বুঝেছিলেন এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। এজন্যই উত্তরপুরুষদের জন্য এটি একটি স্ববিরোধী বিষয়ে পরিণত হয়। ‘মা’আসির-উল-উমারা’ গ্রন্থের লেখক মন্তব্য করেন :

এমনকি এটা দাবি করা হয় যে, আবুল ফজল ছিলেন একজন অবিশ্বাসী। অনেকে বলেন, তিনি ছিলেন একজন হিন্দু অথবা অগ্নিউপাসক, অথবা একজন মুক্ত চিন্তার মানুষ, অনেকে আবার আরো অনেক দূর অগ্রসর হন এবং তাকে বলেন নাস্তিক, কিন্তু অন্যরা আরো একটু বেশি সম্ভাব্য মন্তব্য করেন যখন তারা তাকে অভিহিত করেন একজন ‘সর্বেশ্বরবাদী’ হিসেবে যিনি অন্যান্য সুফির মতো নিজেকে রাসুলের বিধানের ঊর্ধ্বে মনে করেন।৯৪

কিন্তু কোনো সুফিই যার আধ্যাত্মিক যোগ্যতা যাই হোক না কেন কখনোই রাসুলের বিধানের উপরে স্থান লাভের চিন্তা করতে পারে না। এই রকম দাবি নতুন মতবাদ প্রবর্তন অথবা মতভ্রষ্ঠতার পর্যয়ে পড়ে যা কোনো অর্থেই আধ্যাত্মিক মতবাদ বা আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অবশ্যই খারাপ কিংবা খামখেয়ালি উন্মাদগ্রস্ত ব্যক্তি এবং ‘মাজজুব’রা কোনো নিয়মের অধীন ছিল না এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের উপর শরীয়তি আইন প্রয়োগ করা হয় নি। আবুল ফজলের ধর্মীয় মতবাদ সম্পর্কে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা এসেছে খাজা বাকি বিল্লাহর পুত্র খাজা উবায়দুল্লাহর নিকট থেকে। তার গ্রন্থের একটি পুরো অধ্যায় বর্ণনা করা হয়েছে প্রচলিত ধর্মমত বিরোধী ও ধর্মত্যাগীদের নিয়ে এবং তিনি আবুল ফজলকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যিনি অধঃপতনে গিয়েছেন। তার মতানুসারে শরিফ আসুলি, আবুল ফজলের মনের উপরে যিনি গভীর প্রভাব বিস্তার করেন, তিনিই আবুল ফজলকে একজন প্রচলিত ধর্মমত বিরোধীতে পরিণত করেন।৯৫

আবুল ফজলের ধর্মীয় অবস্থানের এরকম ভিন্নমুখী মূল্যায়নের বেশিরভাগ কারণ ছিল বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যার দ্বারা তার সমসাময়িকরা তাকে বিচার করেছিল।

আবুল ফজলের ধর্মীয় মতবাদের বেশিরভাগই ছিল ধর্ম সম্পর্কে তার স্বাধীন অধ্যয়ন এবং উলামাদের গোঁড়া প্রবণতার প্রতিফল ও প্রতিক্রিয়ায় তৈরি। তিনি নিজেকে কখনোই সেই সমস্ত সমসাময়িক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হতে সাহায্য করেন নি যা গতানুগতিক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে কাজ করতো। আকবরের উদার ধর্মীয় মতবাদ তাকে প্রভাবিত করেছিল, বিপরীতে তিনিও আবুল ফজলের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই বিভিন্ন রকম প্রভাবের মধ্যে কোনটি দ্বারা তার সার্বিক চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়েছিল তা নির্ণয় করা কঠিন, কিন্তু ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলি সম্পর্কে তার মতামত বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

আবুল ফজল তার পনের বছর বয়স থেকে গ্রিক চিন্তাধারা এবং অতীন্দ্রিয়বাদসহ মুসলিম ধর্মীয় শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ও গোঁড়া বিশ্লেষণে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি ব্যাপক অধ্যয়ন, গভীর ধ্যান এবং ধর্মীয় প্রশ্নের মুক্ত আলোচনায় নিজেকে নিমগ্ন করেন।৯৬

আবুল ফজল তার ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়ের কঠোর পরিশ্রমের কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন :

দর্শনের সত্য এবং মতবাদের সূক্ষ্মতা এখন সহজ হয়ে এলো, এবং যা কিছু আমি পড়ছি তার চেয়ে যে বই আমি ইতোপূর্বে দেখি নি তাই আমাকে একটি স্বচ্ছ অন্তর্দৃষ্টি দান করলো। যদিও আমার একটি বিশেষ উপহার ছিল যা পবিত্রতার সিংহাসন থেকে আমার উপর বর্ষিত হয়েছিল, আমার শ্রদ্ধেয় পিতার উৎসাহ এবং তার নির্মাণ আমাকে বিজ্ঞানের সকল শাখার প্রয়োজনীয় উপাদান স্মরণে রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছে, একই সঙ্গে এই শৃঙ্খলের অখ- বহমানতা ছিল একটি প্রচ- সাহায্য এবং যা ছিল আমার আলোকময়তার প্রধান কারণ। দশ বছর যাবত আমি রাত এবং দিন, শিক্ষাদান এবং শিক্ষা গ্রহণের মধ্যে কোনো  বিশেষত্ব আরোপ করি নি, পরিতৃপ্তি এবং আকাক্সক্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য করি নি, একাকীত্ব এবং সমাজমগ্নতার মধ্যে কোনো পার্থক্য করি নি, এমনকি আমার আনন্দ থেকে বেদনাকে পৃথক করারও শক্তি ছিল না। প্রমাণের প্রতিশ্রুতি এবং জ্ঞানের বন্ধন ছাড়া আমি আর কোনো কিছুরই সারবত্তা স্বীকার করতাম না। আমার বিশ্বাসের উপর যাদের সহানুভূতি ছিল তারা দুই এবং কখনও কখনও তিন দিন আমার খাদ্য গ্রহণ ছাড়া অতিবাহিত হওয়া, এবং আমার ঐ অধ্যয়নশীল আত্মার খাদ্যের জন্য কোনো স্পৃহাও ছিল না দেখে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়তো এবং মারাত্মকভাবে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতো।৯৭

এই জ্ঞানলিপ্সু চেতনা তাকে ধ্রুপদী রচনাসমূহের অনুসন্ধানী অধ্যয়নের দিকে চালিত করেছে—আবুল ফজল নিজে বলেছেন, ‘বিশ বছর বয়সে আমার স্বাধীনতার সুসংবাদ আমার কাছে পৌঁছে।৯৮ আকবরনামায় তিনি লিখেছেন :

এক সময় আমার হৃদয় ক্যাথে দেশের মঞ্চসমূহে  ধাবিত হয়েছিল, এবং এক সময় তা লেবানন পর্বতের যোগীদের প্রতি অনুরাগ বোধ করে। কোনো কোনো সময় তিব্বতের লামাদের সঙ্গে আলাপ করবার বাসনা আমার শান্তিকে ভঙ্গ করে এবং মাঝে মাঝে পর্তুগালের প্রতি সহানুভূতি যেন আমাকে আমার পরিচ্ছদ ধরে টানতো। কখনো কখনো পারস্যের সন্তদের সঙ্গে সম্মেলন এবং ‘জিন্দা বেস্তা’র পবিত্র জ্ঞান আমাকে আমার প্রশান্তির মধ্য থেকে লুন্ঠন করে নিত, যে কারণে আমার আত্মা আমার মাতৃভূমির ‘আরবাব-ই-সাহ’ এবং ‘আসহাব-ই-সুকর’ উভয়ের সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।৯৯

সমসাময়িক কিছু ভাবান্দোলনও আবুল ফজলের মনের উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছিল। মাহদাবি, শাত্তারি এবং নুকতাউই আন্দোলন তার ধর্মীয় চিন্তাধারাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। এই তিনটি আন্দোলনই গুরুত্বপূর্ণভাবে ছিল ধর্মের মর্ম এবং ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ও আচার সর্বস্ব অভিব্যক্তির প্রতিফল। যদিও ‘নুকতাউই’ আন্দোলনের কিছু উপাদান যা জনসাধারণের বিশ্বাসের বিরোধী ছিল এবং সেগুলোকে নিশ্চিতভাবেই প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী মতবাদ হিসেবেই বিবেচনা করা হোত। বাদাউনি বলেন, একদা আবুল ফজল তাকে বলেন যে তিনি মাঝে মাঝে প্রচলিত মতবাদের বিরোধীদের জগত পরিভ্রমণ করতে চান। বাদাউনি প্রতি উত্তরে বলেন, তিনি যদি ‘নিকাহ’র সঙ্গে তার সম্পর্ক ছেদ করেন তা হলে তিনি এই পর্যটনে সত্যিকারের আনন্দ পাবেন।১০০ বিভিন্ন প্রকার ধর্মীয় মতবাদ ও প্রবণতা যেগুলো ভারতে বিকাশ লাভ করেছিল তার উল্লেখ করে, বাদাউনি তার সমাজতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টির ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। তিনি লেখেন, ‘যদিও হিন্দুস্তান একটি বিশাল দেশ যেখানে অবাধ আচরণ করার মুক্ত অঞ্চল আছে, এবং ্েকউই অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামায় না, অতএব প্রত্যেকেই যা খুশি তা করতে পারে।’১০১ এটা ছিল মুক্তচিন্তা এবং অবাধ কর্মের এমন একটি পরিবেশ যা আবুল ফজলকে তার মতবাদ ও আদর্শ অবলম্বনে উৎসাহিত করেছিল।

¯্রষ্টা সম্পর্কে ধারণা

‘মোনাজাত’ থেকে ¯্রষ্টা (পরম বাস্তবতা) সম্পর্কে আবুল ফজলের বিশ্বাস সম্বন্ধে জানা যায়। তার নিকট ঈশ্বর হলেন ¯্রষ্টা এবং সকল সৃষ্টির একমাত্র কারণ, সকল কিছুর প্রধান পরিচালক এবং অসীম জ্ঞানী। তিনি স্বয়ম্ভু, সর্বজ্ঞাতা ও সর্বশক্তিমান। তিনি সত্যিকার কর্তা এবং প্রয়োজনীয় সত্তা। তিনিই পরমাত্মা।১০২

আবুল ফজল বিশ্বাস করতেন যে, ‘ঐশ্বরিক বাস্তবতা’ উপলব্ধি মানুষের ক্ষমতার বাইরে। তার ‘মোনাজাত’-এ তিনি লেখেন : ‘জনমানবহীন পিপাসার্ত মরুভূমিতে প্রতিষ্ঠিত সূর্যকে উপলব্ধি করার জন্য দুর্ঘটনাবশত ছুড়ে দেওয়া একটি পরমাণু কণার কী ক্ষমতা আছে? স্বীকৃত উচ্চতায় পৌঁছানোর কী ক্ষমতা আছে তার?’১০৩

¯্রষ্টা সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞানলাভ এমন কিছু যা মানুষের ক্ষমতার নাগালের বাইরে, তাই এটাকে বাতিল করে, আবুল ফজল সর্বদা সর্বশক্তিমানের নিকট থেকে ঐশ্বরিক আলো এবং উদ্দীপনা লাভের জন্য প্রার্থনা করতেন। তার ‘মোনাজাত’ -এ তিনি প্রার্থনা করেছেন, ‘শুধু অবগুন্ঠনে আবৃত করার জন্য বা বিচ্ছিন্ন করার জন্যই তুমি আমাদেরকে আত্মার নির্জন বাসস্থান থেকে আনো নি, যেটা ছিল অসংখ্য আত্মার বসবাসের এক শান্তির নীড়, যা একটি শব্দের খনি এবং দৃষ্টি-ঘর, তোমার নিজ সৌষ্ঠবের দর্পণ। চিন্তার সমস্ত আবেগকে অজ্ঞতা ও অন্ধত্বের যন্ত্র না বানিয়ে জ্ঞান এবং বিচক্ষণতার ভা-ারে পরিণত করে দাও।’১০৪

‘পরম সত্তা’কে অনুধাবন করায় মানুষের অসহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন,‘সৃষ্টি কখনও ¯্রষ্টা সম্পর্কে এমন জ্ঞান লাভ করতে পারে না, যা তার রহস্যময়তার মহিমাকীর্তনের বিরল বিষয়ের বিশাল ভা-ারের উপলব্ধির ক্ষেত্রে কেবল মাত্র দু’একটি পদক্ষেপ বাড়াতে পারে। অজ্ঞদের মতো আমার বিধান তা অনুমোদন করে না, মহিমান্বিত ¯্রষ্টার প্রশংসিত দরবারে আমাকে শব্দ ও অভিনব উক্তির দ্বারা প্রবেশ করতে হবে, নানা রকম রূপক এবং ঐতিহ্যম-িত বিশিষ্টার্থক শব্দমালা ধার করার মাধ্যমেই তাঁকে উপলব্ধি করতে হবে।’১০৫ এই মন্তব্য থেকে বলা যায়, আবুল ফজল তার প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ ক্ষমতার বদলে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা কীর্তনে তার বাকপটুতার অসহায়তাকেই উপলব্ধি করেছেন।

আবুল ফজল বিশ্বাস করতেন ¯্রষ্টা পুরোপুরিই এই পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বহিরাঙ্গিকভাবে পরিবর্তনের যে কার্যকারণ সম্পর্কে সকল অস্তিত্ববান পদার্থ আবদ্ধ তার থেকে মুক্ত। ¯্রষ্টা এক এবং অসীম সত্তা এবং অন্যরা হলো সৃষ্টি এবং সসীম সত্তা। মানুষ ও ¯্রষ্টার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক হতে পারে না কেবলমাত্র তাঁর বশ্যতা ছাড়া।

তার গভীর ভক্তি অনুরাগের জন্যই তাকে বলা হতো আবুল ওয়াহদাত। তিনি লেখেন, ‘যদিও মুবারকের পুত্র বর্তমান সময়ের একটি বিরক্তিকর বিষয় এবং মানুষের জন্য হুমকি স্বরূপ এবং ভালোবাসা ও ঘৃণার বিবাদ স্বরূপ তার প্রতিও মানুষের শ্রদ্ধার আলো জ্বলে উঠেছে। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনাকারীরা যারা সত্যের সন্ধান করে তারা তাকে ‘আবুল ওয়াহদাত’ নাম দিয়েছে এবং তাকে পরম দাতার একজন নিবেদিত দাস হিসেবে গণনা করে।’১০৬

স্মিত তাকে একজন সুফি হিসেবে বিবেচনা করে মন্তব্য করেছেন, ‘আবুল ফজল এক ধরনের সুফি বা অতীন্দ্রিয়বাদী বিজ্ঞ মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন, যিনি কখনোই ইসলামের উদার কাঠামোটিকে অন্তর থেকে পরিত্যাগ করেন নি।’১০৭ কিন্তু যেখানে আবুল ফজলের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার শিকড় সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর অনুরাগের মধ্যে  প্রোথিত সেখানে ‘সুফিবাদ’ এই অভিধাটি তার কাছে কখনোই রুচিকর মনে হয় নি এবং তিনি তখন নিজের জন্য আরো মহত্তর উচ্চতর উত্তর বিচারের বিবেচনা করেছেন। ‘তাসাউফ’ অভিধাটিকে তার জন্য যদি একটি বৃহত্তর অর্থে ব্যবহার করা যায় তা হলে তার মোক্ষলাভের একটি ব্যবহারিক অর্থ পাওয়া যায়। তিনি একজন সুফি না আলোকদাতা, একজন দার্শনিক না অ্যারিস্টটলের অনুগামী এ বিষয়ে তিনি নিজেও সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। তিনি বলেন,‘এটা তাদের কাছে গুপ্ত রেখ না, যাদের এই সূক্ষ্ম বোধ আছে যে একজন মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য এবং অতি মহিমান্বিত রূপ হলো সত্তার জ্ঞান, যা ¯্রষ্টা আরোপিত চেতনা। অমূল্য রতন (¯্রষ্টা) অনুসন্ধানকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত, একদল সরাসরি কাশফ এবং শাহুদ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত (সরাসরি ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এবং সত্তার চেতনা)। অন্যদল যুক্তির উপর নির্ভরশীল। যদি প্রথম দল নবীর উপর বিশ্বাসী হয় তা হলে তাদেরকে বলা যায় ‘সুফি’ অন্যথায় বলা যায় ‘আলোকদাতা’। যদি পরবর্তী দল নবীতে বিশ্বাসী হয় তা হলে তাদেরকে বলা যায় দার্শনিক অন্যথায় বলা যায় অ্যারিস্টটলের অনুগামী। হে সৃষ্টিকর্তা যে কোনো একটিতে আমাকে পরিচালিত কর যেটিতে তুমি ইচ্ছা কর।’১০৮

স্বর্গীয় সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্ব ও মহিমার নিকট তিনি নিজেকে এত দুর্বল ও অক্ষম হিসেবে আবিষ্কার করেন যে, অন্যান্য লেখকের মতো বিখ্যাত সাধু-সন্ত এবং অতীন্দ্রিয়বাদ বিশারদদের কাছে সাধারণ অথবা বিশেষ সন্তোষসহ আকবরনামাকে অলঙ্কৃত করা তার জন্য ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব। যারা তার লেখায় নবীকে প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকা সম্পর্কে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি যুক্তি প্রমাণ দ্বারা তাদের সবারই সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। যাহোক তার সন্দেহ দূর করার চেষ্টাহীন যুক্তিগুলো সম্ভবত ছিল তার সমালোচকদের জন্য, এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে নবী সম্পর্কে কোনো প্রতিকূল অনুভূতি দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত ছিলেন না।

কখনো কখনো পার্থিব বিষয় দ্বারা তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার জন্য আবুল ফজল গভীর অনুতাপ ব্যক্ত করেছেন এবং জ্ঞান ও সম্পদের বশ্যতার জন্য নিজেকে তীব্র তিরস্কার করেছেন।১০৯ সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার প্রগাঢ় আস্থা ছিল এবং যারা আন্তরিকভাবে ‘তাঁর’ (সৃষ্টিকর্তার) জন্য আকুল আকাক্সক্ষা অনুভব করতো তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে থাকার কথা তিনি ঘোষণা করেন, যদিও তার সত্তার গূঢ়তা এক অপরিজ্ঞাত রহস্যে আবৃত। তার মহত্ত্ব এবং শক্তি সর্বত্র প্রতীয়মান। তিনি খান-ই-খানানকে লেখেন, ‘¯্রষ্টা তোমার সঙ্গে আছেন তার অর্থ এটা নয় যে তুমি তাঁর জ্ঞানের পরিসীমার মধ্যে পৌঁছে গেছো, বরং এই অর্থে যে তুমি তাঁর ইচ্ছের মধ্যে প্রবেশের অভিপ্রায় পোষণ করো অথবা তাতে অটল থাকতে চাও।’১১০

ধর্মের আধ্যাত্মিক দিকের উপর গুরুত্ব

আবুল ফজল বিশ্বাস করতেন যে আনুষ্ঠানিক ধর্ম এবং এর আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আনুগত্য মানুষকে মুক্তির দিকে চালিত করে না। যথার্থ উন্নতির জন্য অন্তর্জীবনের পুনর্গঠন এবং পরিশুদ্ধি প্রয়োজন। এই কারণেই তিনি গোঁড়া ধর্মতাত্ত্বিকদের দেওয়া ধর্মের আচারসর্বস্ব ব্যাখ্যাকে ঘৃণা করতেন। তিনি নামাজ রোজাকে বলতেন শারীরিক এবাদত। তিনি ঐ সমস্ত মুসলমানদের নিন্দা করতেন যারা শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের আচারসর্বস্ব ধর্ম পালন করে। তিনি প্রায়ই বলতেন ধর্মকথার বিশুদ্ধ পুনরাবৃত্তি কোনো ধর্ম না।১১১ তার ‘মোনাজাত’- এ তিনি বলেন, ‘মাটির কা’বা শুধু একটি স্থানে কিন্তু হৃদয়ের কিবলা সর্বত্র।’১১২

যারা শুধু স্বর্গ পাওয়ার আকুল আকাক্সক্ষা নিয়ে প্রার্থনা করে তাদের কর্মকা-ের মতো আবুল ফজল ‘দেয়া-নেয়া’র মতবাদকে অনুমোদন করতেন না। তিনি ¯্রষ্টার নিকট প্রার্থনা করেন, ‘হে সর্বজ্ঞ এবং সবকিছুর দ্রষ্টা! যদিও তোমার দৃষ্টিগোচর স্বর্গ নরক সম্পর্কে মতবাদের ভিন্নতা আছে, তবুও সকলেই প্রকৃত স্বর্গ ও নরক সম্পর্কে একমত। তুমি আমার চোখের সামনে থেকে উভয়কেই নিশ্চিহ্ন করে দাও এবং এই অক্ষম হৃদয়টিকে লাভ লোকসানের বাণিজ্য থেকে মুক্ত করে দাও।’১১৩

মানবতার সেবায় ধর্ম

আবুল ফজল ধর্মকে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষের সেবা হিসেবে। কাশিম খানকে লেখা শেখ আলা-উ’দ-দৌলা সিমনানি’র একখানা চিঠির একটি উদাহরণকে উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করে তিনি এই ধারণার বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘শেখ যিনি তার পরবর্তী জীবনে একজন বিখ্যাত সুফিতে পরিণত হন তিনি তার প্রথম জীবনে মন্ত্রী ছিলেন। তিনি চল্লিশ বছর প্রার্থনা, গভীর ধ্যান এবং উপবাসের মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। তার জীবনের শেষের দিকে একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, শেষ বিচারের দিন উপস্থিত এবং সৃষ্টিকর্তা তাকে আদেশ করলেন তার প্রার্থনা এবং অনাড়ম্বরতাকে নিক্তির এক পাল্লায় রাখতে এবং তুল্যমূল্য হিসেবে তার মন্ত্রীত্বের সময়ের এক বৃদ্ধা রমনীর বিরোধ মীমাংসাকারী প্রশংসিত হৃদয়কে অন্য পাল্লায় রাখতে। যখন ওজন দেওয়া হলো দেখা গেলো নিক্তির অপর পাল্লাই ঝুঁকে পড়েছে।’১১৪

ভিন্ন ধর্মসমূহের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

ভিন্ন বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি আবুল ফজলের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত উদার এবং সংকীর্ণতামুক্ত। তিনি বলেন, ‘ধার্মিক এবং ন্যায়পরায়ণ কেউই কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি স্বর্গীয় মহানুভবতাকে সীমাবদ্ধ করে এবং তাদেরকে সকল কলুষতা থেকে বিশুদ্ধ রেখে আত্মসমর্পণের সিংহাসনে বসাতে পারে না।’১১৫ তিনি বিভিন্ন ধর্মের  উপাসনালয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। কাশ্মিরের একটি মন্দিরের জন্য রচিত নি¤েœাক্ত শিলালিপিই ধর্ম সম্পর্কে তার বৈশ্বিক-উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশদভাবে তুলে ধরে :

হে ঈশ্বর প্রতিটি মন্দিরে আমি দেখি মানুষ তোমাকে চায় এবং প্রতিটি ভাষায় আমি শুনতে পাই মানুষ তোমার প্রশংসা করে। বহুঈশ্বরবাদ এবং ইসলাম তোমাকে অনুভব করে । প্রতিটি ধর্ম বলে,‘তুমি এক, কেউ তোমার সমান নয়।

মসজিদে মানুষ বিড় বিড় করে তোমার পবিত্র প্রার্থনা জানায় এবং চার্চে তোমার প্রতি ভালোবাসা থেকেই মানুষ ঘণ্টা বাজায়। মাঝে মাঝে আমি খ্রিস্টানদের আশ্রমে যাই। মাঝে মাঝে মসজিদে। কিন্তু সে একমাত্র তুমি যাকে আমি মন্দির থেকে মন্দিরে খুঁজে ফিরি। অবিশ্বাসী না মৌলবাদী এই ভেদাভেদের কোনো সম্পর্ক নেই এমনকি তাদের জন্যও নয় যারা তোমার সত্যের অনেক পেছনে পড়ে আছে। অবিশ্বাসীর জন্য যেমন অবিশ্বাস এবং মৌলবাদীর জন্য যেমন ধর্ম, তেমনি ‘আতার’  -এর জন্য ¯্রষ্টার একবিন্দু ভালোবাসা।১১৬

এই মন্দির হিন্দুস্তানের একেশ্বরবাদীদের হৃদয়কে, বিশেষ করে তাঁর সেই সমস্ত আরাধনাকারী যারা কাশ্মির প্রদেশে বসবাস করে তাদেরকে একত্রিত করার জন্য নির্মিত হয়েছে : রাজসিংহাসন এবং রাজমুকুটের অধীশ্বর সৃষ্টির আলোক বর্তিকা, শাহ আকবর, যার মধ্যে রয়েছে সপ্তধাতুর ক্ষমতা এবং চার উপাদানের যথার্থ মিশ্রণ তার নির্দেশে।১১৭

যদি কেউ অসৎ অভিপ্রায়ে এই মন্দির ধ্বংস করে তাহলে তার উচিত নিজের ইবাদতের স্থানকে আগে ধ্বংস করা; এবং যদি আমরা হৃদয়ের নির্দেশকে অনুসরণ করি, আমরা অবশ্যই বিপদে-আপদে সকল মানুষের সঙ্গে অটল থাকবো, কিন্তু আমরা যদি বাইরের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো বর্তমানের সব কিছুই একদিন ধ্বংস হবে। হে ঈশ্বর, তোমার সকল কর্ম এবং অভিপ্রায়ই যথার্থ এবং তুমিই ন্যায়বিচারক। হে প্রভু, তুমিই জানো রাজার জন্য কোন অভিপ্রায় সর্বোত্তম এবং কার্যকর এবং কোন অভিপ্রায় একজন রাজার থাকা উচিত।১১৮

সবার জন্য শান্তি

সহনশীলতা এবং সর্বজনীনতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আবুল ফজলের ‘সবার জন্য শান্তি’ মতবাদের উদ্ভব। খান-ই-খানানকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন,‘আমি নিজের সম্পর্কে কী কৈফিয়ত দেবো? নিয়ন্ত্রক সত্তা মনের শান্ত অবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রামে রত। সহজাত অন্ধত্বের কারণে দৃশ্যমান দুর্দশার বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক আত্মা বিলাপ করছে। আমি যেভাবে ‘সবার জন্য শান্তি’ আন্দোলনে লড়ছি তাতে আশা করি শোককে প্রতিহত করে শুভকে অর্জন করতে সক্ষম হবো।’১১৯

আকবরনামাতে তিনি ‘সবার জন্য শান্তি’র একটি নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বার বার আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে, বহির্গত এবং অন্তর্গতভাবে এটি একটি অত্যন্ত মহৎ সংগ্রাম। তিনি অনুধাবন করেছেন যে এই নীতির মধ্যেই বিচক্ষণতার মূল নিহিত। তিনি সমাজের একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র পরিচালনায় এটিকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছেন। খান-ই-খানানকে তিনি এক চিঠিতে বলেন,‘আকবরের শাসনামলের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল তার ন্যায়বিচার এবং ‘সবার জন্য শান্তি’ এই চেতনা। আরো অগ্রসর হয়ে তিনি খান-ই-খানানকে উপদেশ দেন,‘সেই সমস্ত জনগণ যারা নিজের থেকে ভিন্নতর প্রথা অনুসরণ করে তাদেরকে অবজ্ঞা অথবা শত্রুতার দৃষ্টিতে দেখো না।’১২০

আকবরের পক্ষ থেকে শাহ আব্বাস সাফাউইকে লেখা এক পত্রে একটি বড় অংশ জুড়ে আবুল ফজল ‘সুলহ-ই-কুল’-এর নীতি নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি লেখেন :

এটাকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে, স্বর্গীয় মহানুভবতা প্রত্যেকটি ধর্মমতের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট এবং ‘সবার জন্য শান্তি’ এই সর্বজনীন বাচনিক ফুল বাগানে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অবশ্যই সর্বোচ্চ প্রয়াস চালাতে হবে। একজনের সৌভাগ্যের বিকাশকে অবশ্যই সর্বদা উদার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করতে হবে, কারণ সৃষ্টিকর্তা সকল সত্তা এবং মানুষের জন্য অতিশয় দানশীল। সুতরাং এটাই সেই রাজন্যবর্গের জন্য মানানসই, যারা সেই সৃষ্টিকর্তার ছায়া স্বরূপ, তাদের এই নীতি বর্জন করা উচিত নয়। যেহেতু ¯্রষ্টা সকল মানুষের শৃঙখলা এবং অভিভাবকত্বের জন্য তাদেরকে সর্বোচ্চ আদেশ প্রদান করেছেন সে জন্য তারা প্রত্যেক গোত্রের সম্মান এবং খ্যাতির তদারকি করতে পারে। প্রতিটি গোত্রের অবস্থান দুইভাবে একজনের অধীনে আসে। যদি এটা সততার মাধ্যমে হয়, সে ক্ষেত্রে একজন এটা থেকে নির্দেশনা কামনা করে এবং এর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। অথবা যদি এটি অসত্য বা অন্যায়ভাবে হয় তাহলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক এবং অজ্ঞতার ব্যধি স্বরূপ যন্ত্রণাদায়ক করুণাকর মহানুভবতার বিষয় এবং যা কঠোরতা ও নিন্দার জন্য নয়। সবাইকে অবশ্যই উদার সহনশীলতার চর্চাসহ অনুসন্ধানী হতে হবে যাতে আধ্যাত্মিকতার সুবিশাল পরিসর এবং পার্থিব ব্যাপারসমূহের উপর থেকে সকল অবগুন্ঠনের ছদ্মবেশ অপসারিত হয়। আর তখনই জীবন এবং ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে।১২১

সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাশক্তির নিকট আত্মসমর্পণ

সৃষ্টিকর্তার  ইচ্ছের নিকট আত্মসমর্পণ সম্পর্কে আবুল ফজলের মনোভাব এমন ছিল যে তিনি এটাকে মানবীয় সুখের চাবিকাঠি মনে করতেন। তার পত্রাবলির একটিতে তিনি খায়ের কে লেখেন :

প্রতিটি মানুষের জন্য দুইটি বিকল্প আছে এবং এমন কেউ নেই যে তাদের সাথে জড়িত নয়। একটি হলো ¯্রষ্টার ইচ্ছের কাছে আত্মসমর্পণ, যে তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন। অন্যটি হলো তুমি তাঁর সামনে চোখ বন্ধ করে রাখবে এবং তোমার সাফল্যের জন্য বস্তুগত ও নৈমিত্তিক পারিপার্শ্বিকতার উপর নির্ভর করা। প্রথমটি দুর্দশা এবং দুঃখকে দূরীভূত করে, সান্ত¦না দেয় এবং পরিতৃপ্তি আনয়ন করে। অন্য মনোভাবটি দুর্দশা ও দুুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। সেই একমাত্র ভাগ্যবান যে প্রথমটির জন্য সংগ্রাম করে।১২২

আবুল ফজলের ধর্মীয় চেতনার এক বিরাট অংশ তার নিজের মানসিক সুবিবেচনা এবং অতিশয় গোঁড়া ব্যক্তিদের আচার আচরণের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফল। এটাও বলা যায় যে, এই সমস্ত ধারণার বেশিরভাগেরই মূল প্রাচীন মুসলিম অতীন্দ্রিয়বাদীদের শিক্ষার মধ্যে  প্রোথিত। যখন তিনি ধর্মকে মানুষের সেবা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, তখন তিনি এমন কথা বলেন যা তার শতবর্ষ পূর্বে শেখ নিজাম-উদ্-দীন আউলিয়া বলে গেছেন। শেখের অভিমত অনুসারে, অবিমিশ্র আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা বা উপবাস পালন করার চেয়ে মানুষের সেবা করার মূল্য অনেক বেশি।১২৩

আবুল ফজল তার লেখায় শেখ শরাফ-উদ্-দিন ইয়াহহিয়া মনিরি, আলা উদ্- দৌলা সিমনানি, রুমি, জামি এবং হাফিজের মতো অন্যান্য অতীন্দ্রিয়বাদীর নাম উল্লেখ করেছেন। দার্শনিক অনুসন্ধান, জীবনের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং ধর্মের এক গভীরতর বোধ আবুল ফজলকে হাফিজের বিশ্বাসের দিকে ধাবিত করেছে। আবুল ফজল লেখেন : হাফিজ যদি তোমার আরাধ্যকে অর্জন করতে চাও তবে উঁচু নিচু নির্বিশেষে সবার জন্য শান্তি এই মতবাদে সামিল হও। মুসলিমকে শুভেচ্ছা জানাও ‘আল্লা আল্লা’ বলে এবং হিন্দুকে বল ‘রাম রাম’।

আবুল ফজল এবং দ্বীন-ই-ইলাহী

আবুল ফজল দ্বীন-ই-ইলাহীর একজন অতিশয় আকুল ভক্ত ছিলেন। বাদাউনি তাকে ‘মুজতাহিদ-ই-দ্বীন উয়া মাযহাব-ই-নও’ (নতুন বিশ্বাসের ব্যাখ্যাদাতা ও বর্ণনাকারী) বলে আখ্যায়িত করেছেন।১২৪ বিদ্বৎজনেরা আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র নানা রকম ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। স্মিথ এটাকে দেখেছেন,‘অনিয়ন্ত্রিত স্বৈরাচারিতার অস্বাভাবিক ফসল’ এবং ‘আকবরের নির্বুদ্ধিতার স্মৃতিফলক’১২৫ হিসেবে। তারা চাঁদ ঘোষণা করেন, আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী কোনো স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্ন খেয়াল ছিল না, বরং ভারতের বুকের মধ্যে যে উত্তাল তরঙ্গময় শক্তি ছিল তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।১২৬ পরম প্রতিকূল এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভন নোয়ের, এস.আর.শর্মা এবং এম.এন.রায় চৌধুরীর মতো বিদ্বৎজনেরা আকবরের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির একটি অথবা অপরটির প্রশস্তি দিয়ে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ সম্পর্কে অন্যরা কে কী অভিমত পোষণ করেন সেটি আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়, ধর্মীয়চেতনা ও আচার আচরণের ক্ষেত্রে আকবরের দুঃসাহসিক অভিযান সম্পর্কে আবুল ফজলের ভাবনা কী সেটিই বিবেচ্য।

আকবরের ধর্মীয় নিরীক্ষাধর্মিতা মূল্যায়নের ভূমিকা আবুল ফজল শুরু করেছেন একটি প্রশ্নের মাধ্যমে : ‘কিন্তু ধর্মীয় এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের অভিপ্রায়ের কি কোন সাধারণ পটভূমি নেই?’ এই প্রশ্নের জবাব থেকে আকবরের ধর্মীয় মনোভাবের  সমস্যা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির মূলসূত্রটি পাওয়া যায়। তিনি মন্তব্য করেন :

যদি কখনো কোনো সৌভাগ্যবান পরিস্থিতিতে এমন সময় আসে যে একটি জাতি বুঝতে শেখে কীভাবে সত্যিকারের প্রার্থনা করতে হবে, জনগণ স্বাভাবিকভাবেই তখন তাদের রাজার দিকে তাকাবে, তার সুউচ্চ অবস্থানের জন্য যা সে অধিকার করে আছে এবং যথারীতি তাকেই তাদের আধ্যাত্মিক নেতা বানাতে চাইবে।১২৭

চিন্তার এই অবকাঠামোর মধ্যে আবর্তিত হয়েই তিনি আকবরের ধর্মীয়নীতির মূল্যায়ন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি নি¤œলিখিত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন:

১. ‘(মহামান্য রাজা) এখন জাতির আধ্যাত্মিক পরিচালক এবং এই দায়িত্ব পালনকে (তিনি) সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার উপায় হিসেবে দেখেন।’

২. ‘যে সমস্ত মানুষ শিষ্য হবার ইচ্ছে পোষণ করবে রাজা তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখবেন, সকল জাতির মানুষ, যুবক এবং বৃদ্ধ, বন্ধু এবং অপরিচিত, দূরের এবং কাছের, যারা রাজার নিকট ব্রত গ্রহণকে তাদের সকল সঙ্কট সমাধানের উপায় হিসেবে মনে করে এবং তাদের আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য উপাসনা করে।’

নবদীক্ষিতদের প্রবেশের জন্য রাজা অতিমাত্রায় কঠোরতা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করবেন না; সকল শ্রেণির বহু সহস্র মানুষ, যারা তাদের কাঁধ থেকে পুরোনো বিশ্বাসের আবরণ ছুড়ে ফেলেছে এবং নতুন বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছে তাদের সকল কৃপা লাভের উপায় হিসেবে।’

আবুল ফজল অতঃপর নতুন ধর্মে দীক্ষা লাভের প্রণালী সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। দীক্ষা প্রার্থী পাগড়ী নিয়ে মহামান্য রাজার পায়ের উপর তার মাথা রাখবে, রাজা তাকে সোজা করে উঠিয়ে তার মাথায় পাগড়ী পরিয়ে দেবেন। এরপর নবদীক্ষিতকে আকবর শাস্ট (‘মহান নাম’ এবং ‘আল্লাহু আকবর’ খোদাই করা একটি অঙ্গুরি) দান করবেন। ধর্মটির অধ্যাদেশসমূহের কিছু উল্লেখ করা হলো :

১.            সভ্যরা একজন অপরজনকে আল্লাহু আকবর বলে শুভেচ্ছা জানাবে, অপরজন জাল্লাজালালাহু বলে তার জবাব দেবে।

২.           একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাকে স্মরণ করে সাধারণতঃ যে ভোজের আয়াজন করা হয় তার পরিবর্তে প্রত্যেক সভ্যকে তার জীবনকালেই খাদ্য বিতরণের জন্য আদেশ করা হয়।

৩.           প্রত্যেক সভ্য তার জন্মবার্ষিকীতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

৪.           সভ্যদেরকে মাংস ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকার জন্য আদেশ করা হয়। তারা কসাই, জেলে এবং পাখি শিকারীদের সঙ্গে এক পাত্র ব্যবহার করবে না।

৫.           সভ্যরা গর্ভবতী, বৃদ্ধা এবং বন্ধ্যা রমনীর সঙ্গে সহবাস করবে না ; রজোদর্শনারম্ভের কম বয়সী বালিকার সঙ্গেও নয়।১২৮

‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র এই বর্ণনা-সংক্ষিপ্ততা উত্ত্যক্তকর। আবুল ফজল এর অধিক বিশ্লেষণে অগ্রসর হন নি। কেন? তিনি নিজে এ বিষয়ে সচেতন ভাবেই একটি মন্তব্য করে পাঠকের কৌতূহলকে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। ‘আমার মনের আবিষ্ট অবস্থা কি পর্যাপ্ত অবসর অনুমোদন করে, এবং আমার জন্য কি আর এক পর্ব জীবন মঞ্জুর হবে, আমার ইচ্ছা এই বিষয়ের উপর পৃথিবীর কাছে একটি পৃথক গ্রন্থ উপস্থাপন করা।’১২৯

বাদাউনি ধর্মটির বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু তার শত্রুতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বর্ণনা এতো রঞ্জিত যে তার মতামত থেকে সত্যকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিকূল প্রতিক্রিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবুল ফজল সচেতনভাবে গোপন রেখেছেন যার প্রভাবকে অতি সহজে অগ্রাহ্য করা যায় না। ‘যে সমস্ত মানুষ শিষ্য হবার ইচ্ছাপোষণ করবে রাজা তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখবেন’— এই অভিমতটি একটি ব্যাখ্যা দাবি করে। যার একটি অত্যন্ত দুর্বল জবাব দেবার চেষ্টা হয়েছে এই বলে যে আকবরের ধর্মীয় নেতৃত্ব মহৎ ও সাধারণ মানুষের জন্য ছিল।

আবুল ফজলের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মতামত ব্যক্ত করা দুরূহ। তার রচনাবলি থেকে যে অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে তা বিভিন্ন রকম। আকবরনামা এবং ‘আইন’ এক ধরনের অনুভূতি জ্ঞাপন করে, ‘ইনশা’  জ্ঞাপন করে অন্যটি।  ‘মোনাজাত’ প্রগাঢ়ভাবে তার ধার্মিক সত্তাকে প্রকাশ করে। আবদুল কাদির তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির নিন্দা করেন। অন্য দিকে ফরিদ বাক্কারি পরিপূর্ণভাবে ভিন্ন চিত্রকে হাজির করেন। সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় সৃষ্টিকর্তার উপর আবুল ফজলের দৃঢ় এবং অবিচলিত আস্থা ছিল। তিনি সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন, যেমন করেছেন আচারনিষ্ঠ শাস্ত্রজ্ঞদের মতামতের এবং ইজতিহাদের এই ধরনের চেতনা যার মধ্যে আকবরকে খুশি করার ইচ্ছা, পার্থিব এবং অশোভন অভিপ্রায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা তাকে মুসলিম সমাজের মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে নিপতিত করে।

৪. সমাজের উপর প্রভাব

আবুল ফজলের ছিল এমন একটি অনুসন্ধিৎসু মন যা কোনো কিছুর গতানুগতিক বিশ্লেষেণে সন্তুষ্ট থাকতো না। যখনই কোন সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি এর গভীরে প্রবেশ করতেন এবং দার্শনিক ও প্রায়োগিকভাবে তার বিশ্লেষণ করতেন। ভারতের ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় পরিস্থিতিই ছিল তার চিন্তার জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। এই প্রতিকূলতা তার চেতনাকে কীভাবে বিকশিত করে তার সৃষ্টিকর্মের বিচার ও মূল্যায়নের প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

ভারতের ধর্ম ও ভাষাসমূহের বহুমুখিতা যেমন শাসকদের জন্য তেমনি সমাজতাত্ত্বিকদের জন্যও একটি সুদূরপ্রসারী সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আবুল ফজলের বিশ্লেষণ তাকে এই দিকে চালিত করে যে, বিভিন্ন ধর্মের ও সামাজিক পটভূমির মানুষের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান এবং সত্য কোনো একটি বিশেষ দল, গোষ্ঠী, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র বিষয় নয় — এই চেতনার উপর গভীর আস্থাই সমাজের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক নিশ্চিত করতে পারে। যদিও আবুল ফজল মানুষকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করার সমাজিক শ্রেণীকরণের সনাতনী প্রবণতা থেকে কখনো বেরিয়ে আসতে পারেন নি, তবুও এক গভীর মানবিকতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থাপনাকে তিনি বরদাস্ত করেন নি। ‘ফতোয়া-ই-জাহানদারি’তে জিয়া-উদ্-দিন বারানি’র কুসংস্কার তাকে যে পথে চালিত করেছে আবুল ফজল কখনোই তার চিন্তাধারাকে সে পথে পরিচালিত হতে দেন নি। বারানি’র নিকট জন্মই হলো মহত্বের মূল ভিত্তি এবং তিনি কঠোরভাবে ‘শরিফ’ এবং ‘রাযিল’-এ বিশ্বাস করতেন। আবুল ফজলের বিবেচনায় বংশ গৌরব এক ধরনের মূল্যহীন দাম্ভিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আলঙ্কারিক ভাষায় লেখা ‘আইন-ই-আকবরি’র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি বারানি’র এই ধারণাকে ‘পূর্ব পুরুষের কঙ্কাল নিয়ে বাণিজ্য করা’ বলে নাকচ করে দেন।

আবুল ফজল ন্যায়বিচার ও সততার উপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং চেয়েছেন শাসকেরা এটাকে উৎসাহিত করুক এবং জনসাধারণের মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার জন্য এর পরম মূল্য অনুধাবন করুক। আকবরের পক্ষ থেকে শাহ আব্বাসকে লেখা এক পত্রে তিনি ন্যায়বিচারকেই বিবেচনা করেছেন কার্যকর প্রশাসনের মৌলিক ভিত্তি হিসেব। আকবরের অনানুষ্ঠানিক সচিব হিসেবে এবং গুরুত্বপূর্ণ প-িত ব্যক্তি হিসেবে যে সমস্ত মহৎ লোকের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল এবং আকবরের পারিষদ— যারা প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদের সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদানের অনেক সুযোগ তিনি পেয়েছেন। মাঝে মাঝে তিনি তার ধারণাকে ব্যক্ত করার জন্য কার্যকর ক্ষুদ্র সত্য কাহিনিকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতেন। খান-ই-খানানকে এক পত্রে তিনি শেখ ‘আলা-উদ্-দৌলা সিমনানি’র স্বপ্নকে উদ্ধৃত করেন যাতে ন্যায়বিচার ও সততার একটি কর্ম তার সারা জীবনের প্রার্থনা এবং প্রায়শ্চিত্তকে অতিক্রম করে যায়।

আবুল ফজল বিশ্বাস করতেন যে, ধর্মের উদ্দেশ্য হলো অন্তর্জগতের পরিশুদ্ধিকরণ। কোনো একটি নির্দিষ্ট মতবাদ এবং অভ্যাসের প্রতি একনিষ্ঠ আচরণগত আনুগত্য ধর্মের সত্যিকারের চেতনার পরিপন্থী। এমন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি যার সঙ্গে আবুল ফজল একমত পোষণ করতেন না তাও সহানুভূতির সঙ্গে শ্রবণ ও বোঝার জন্য তিনি প্রস্তুত থাকতেন। তিনি মনে করতেন এরকম একটি মনোভাবই সমাজের অস্থিরতা দূর করতে পারে। এই চেতনাধারাই কালের অপরিহার্য দাবিতে তাকে তার ‘সুলহ-ই-কুল’ (সবার জন্য শান্তি) মতবাদ প্রচারে উদ্বুদ্ধ করে। এই নীতিই ছিল তার সকল ক্রিয়াকর্মের মূল ভিত্তি। তিনি শাহ আব্বাসকে তার রাজ্যে দৃঢ় ও সতর্কতার সঙ্গে এই নীতি অনুসরণ করার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছেন। একইভাবে তিনি ধর্মীয় ব্যাপারে সহনশীল হবার জন্য স্পেনের শাসনকর্তাকে উপদেশ দিয়েছেন। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ/এপ্রিল মাসে, যখন আকবর স্পেনের দ্বিতীয় ফিলিপের জন্য একটি পত্র তৈরি করতে বলেছিলেন, তখন আবুল ফজল ধর্মীয় ব্যাপারে সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তার অসম্মতির কথা ব্যক্ত করেন এবং গর্বের সাথে সহনশীল পরিবেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে আকবরের ধর্মীয় আলাপচারিতার উল্লেখ করেন :

তার (আবুল ফজলের) যুগের উপর আবুল ফজলের প্রভাব ছিল অপরিমেয়, তিনি রাজদরবারে প্রবেশ মুহূর্ত থেকে দায়িত্বের প্রতি একটি সার্বভৌম সত্য উপলব্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন, ইসলামসহ মিশ্র-জাতিসমূহকে সার্থকতার সঙ্গে শাসন করার সমস্যা, কিছু ভিন্ন দেশসমূহে যা সমাধান করতে হতো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে যার অনিবার্য ফল ছিল সহনশীলতার নীতি।১৩০

সকল সামাজিক বিষয়ে আবুল ফজলের সর্বজনীন ধারণা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করতে পারতো যদি তিনি রাজদরবারের ধারাভাষ্যকার না হতেন। গোলামের ন্যায় মুখাপেক্ষিতা, তোষামোদ এবং রাজার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আনুগত্য তার নৈতিক প্রেরণাদানের প্রভাবকে মারাত্মকভাবে খর্ব করেছে। জীবনের আদর্শ হিসেবে যে সমস্ত নীতির তিনি উপস্থাপক তার জীবন ছিল সে সবের সম্পূর্ণ বিপরীত। সমস্ত সামাজিক এবং ধর্মীয় জিঞ্জির থেকে মুক্তির যে সুপারিশ আবুল ফজল করেছেন সে সবের দাবিদার একটি সত্তা তার সকল ইচ্ছাকে আকবরের ইচ্ছার অধীন করতে পারেন না। বুদ্ধির মুক্তির একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবক্তা হিসেবে আবুল ফজল নৈতিকভাবে ছিলেন আকবরের চেতনার মধ্যে বন্দী। জাগতিক উচ্চাকাক্সক্ষার নিকট তিনি তার বৌদ্ধিক ঔদ্ধত্যের অহংকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন।

তথ্যপঞ্জি

  1. A’in-i-Akbari, Blochmann, Vol. I, preface, p. 1.
  2. A’in-i-Akbari, Text, Vol. II, p. 259, Jerrett, Vol. III, p. 419.
  3. Gaushi Shattari, Gulzar-E-Abrar, Rotograph of MS in British Museum, Department of History, Aligarh, Urdu translation by Fazl Ahmad, Agra. P. 225.
  4. A’in-i-Akbari, Vol. II, p. 260, Jerrett, Vol. III, p. 420.
  5. †`Lyb : Sheikh Abdul Haqq Muhaddis Dehlavi, Akhbar–ul-Akhyar, pp. 280-281.
  6. A’in-i-Akbari, Blochmann, Vol. I, preface, p. XXVII.
  7. Akbar Namah, Vol. I, p. 399, footnote 5
  8. A’in-i-Akbari, II, p. 279, Jerrett, III, p. 440; Insha, III, p. 342
  9. A’in-i-Akbari, II, p. 263, Jerrett, III, p. 424; Insha, III, p. 342. GUv ejv `yiƒn †h Aveyj dRj mZ¨NUbvi Dci wbf©i K‡i bv wK m¤ªvU‡K Lywk Kivi AwfcÖv‡q GB wee„wZi Dci †Rvi w`‡qwQ‡jb †h ïiæ †_‡KB Zvi cwievi AvdMvb‡`i we‡kl K‡i †ki Lvui ˆeifvevcbœ wQj|
  10. Sudhakar Diwedi Dadu Dayal Ki Bani, Introduction.
  11. Dadu Dayal Ki Bani, p. 95
  12. Muluk Das Ki Bani, p. 22 as coted by Dr. Tara Chand, p. 190
  13. Influence of Islam on Indian Culture, p. 165
  14. History of the Arabs, p. 248
  15.  †RŠb cy‡ii mvC` gynv¤§‡`i cÖ_g Rxeb m¤ú‡K© Rvb‡Z †`Lyb; Bandazi Miyan Wali, Insaf Namah, Hydarabad, 1368 A.H. gvn`x Ges gvn`xev` m¤ú‡K© Rvb‡Z †`Lyb; Abdul Qadir Badauni, Najat-u’r-Rashid. MS Habib Ganj Collection of Aligarh Muslim University, Muntakhab-ut-Tawarikh. Vol. III. pp. 74-77; Abul Kalam Azad, Tazkirah, Lahore edition, pp.59-107. Encyclopaedia of Islam, Vol. III, pp. 111-115; Medieval India Quarterly, V0l. I, Mahdi Movement in India, pp.10-25
  16. Muntakhab-ut-Tawarikh, 1, p.402.  Badauni calls him a Mahdavi in his Najat-u’r-Rashid (MS).
  17. Akhbar-ul-Akhyar, p. 195
  18. Muntakhab-ut-Tawarikh, vol. 3, p. 4-5
  19. A. Nizami : “The Shattari Saints and their attitude towards the State” in Medieval India Quarterly, oct, 1959, p. 59
  20. Tuzuk-i-Jahangiri, Text, p. 358
  21. Iqbal Namah-i-Jahangiri, Newal Kishore, vol.1, p. 149
  22. Gulzar-i-Abrar, Rotograph.
  23. Akbar Namah, Vol. II, p. 135
  24. Muntakhab-ut-Tawarikh, vol. 2, p. 34
  25. Iqbal-Namah, vol. 2, p. 114, Akbar Namah, Vol. II, p. 135
  26. Sadiq Kiya, Nuqtqwiyan-ya-Pusik haniyan, pp12-73, 126
  27. Ma’asir-u’l-Umara, vol. 3, p. 285. Under the account of Mir. Sharif Amuli.
  28. Tarikh –i-`Alam’ Ara-i-Abbasi, Vol. II, p. 326
  29. Mablagh u’r-Rijal (MS) See also Ma’asir-u’l-Umara, Vol. II, P. 217, Wherein Jahangir is reported to have said that Abul Fazl had impressed on the mind of his father that Quran was authored by the prophet. (g~j MÖš’, c„.15, Drm wb‡`©k : 4)
  30. Muntakhab-ut-Tawarikh, vol. III, P. 205
  31. Muntakhab-ut-Tawarikh, vol. III, P. 205
  32. Muntakhab-ut-Tawarikh, Text, III PP.205-206 Eng Tr. W. Haig vol. III, P. 285
  33. Muntakhab-ut-Tawarikh, vol. III, P. 379
  34. See Appendix `A’
  35. Akbar Namah, III, P. 643; Bev. III, P. 958
  36. A’in-i-Akbari, II, P. 265; Jerrett, III, P. 428
  37. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. III P. 74; Haig, P. 119
  38. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 312
  39. Mablagh u’r-Rijal (MS)
  40. Muntakhab-ut-Tawarikh, vol. III, P. 75
  41. Muntakhab-ut-Tawarikh, Eng Tr. W. Haig vol. III, PP. 118-119
  42. Akbar Namah, Vol. II, P. 376; Beveridge, Vol. II, P. 545
  43. A’in-i-Akbari, Vol. II, P. 277; Jerrett, III, P. 443
  44. A’in-i-Akbari, Vol. II, P. 271; Jerrett, III, P. 444
  45. A’in-i-Akbari, Vol. II, Blochmann Vol. I, P. XXXIV
  46. A’in-i-Akbari, Vol. II, Blochmann Vol. I, P. XXXIV
  47. Akbar Namah, Vol. II, P. 387; Beveridge, II, P. 566
  48. Akbar Namah, Vol. III, P. 84; Beveridge, III, PP. 116-117; Insha, III
  49. A’in-i-Akbari, II, P. 266; Jerrett, III, P. 439
  50. Muntakhab-ut-Tawarikh, II, P. 199; Lowe, P. 201
  51. A’in-i-Akbari, II, P. 269; Jerrett, III, P. 433; Insha, III, P. 331
  52. A’in-i-Akbari, Vol. II, P. 272; Jerrett, Vol. III, P. 437; Insha, Vol. III, P. 335
  53. A’in-i-Akbari, Vol. II, PP. 272-273; Jerrett, Vol. III, P. 437; Insha, Vol. III, P. 335
  54. A’in-i-Akbari, Vol. II, P. 274; Jerrett, Vol. III, P. 440
  55. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 199
  56. Akbar Namah, Vol. III, P. 119
  57. Akbar Namah, Vol. III, P. 144; Beveridge, Vol. III, P.161
  58. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 201
  59. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, PP.203-4
  60. Akbar Namah, Vol. II, P. 389
  61. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 198; Lowe, Vol. II, P. 201
  62. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 162; Lowe, Vol. II, P. 270
  63. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 204; Lowe, Vol. II, P. 206
  64. Akbar Namah, Vol. II, P. 389; Beveridge, Vol. II, P.569
  65. Akbar Namah, Vol. III, P. 390; Beveridge, Vol. III, P.570
  66. A’in-i-Akbari, Blochmann, V ?, PP. 537-538
  67. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. II, P. 261; Lowe, Vol. II, P. 268-269
  68. Commentary,P. 49
  69. Commentary,PP. 54-55
  70. Commentary,P. 51
  71. Commentary,P. 56-57
  72. Smith, Akbar the Great Mogul, P.167
  73. Muntakhab-ut-Tawarikh, Vol. III, P.331; Haig Vol. III, P. 131
  74. gvnRvi m¤ú‡K© we¯ÍvwiZ aviYvi Rb¨ †`Lyb :Nurul Hasan, `The Mahzar of Akbar’s Reign’, Journal 0f U.P. Historical Society, Vol. XVI, See also, J.R.A.S.,October 1924, P. 591, elseq; F.W. Beckler’s article: P. S. Tripathi, Some Aspects of Muslim Administration, P. 156, elseq : Rafat Bilgrami’s article in Islamic Culture, July197
  75. A’in-i-Akbari, Vol. III,Jarrett, P. 472
  76. A’in-i-Akbari, Vol. III,Jarrett, P. 179
  77. MÖš’wU GKwU f~wgKvmn wZbwU Aa¨v‡q wef³| Aa¨vq¸‡jv n‡jv : 1. Ethics Proper 2. Government of the family 3. Government of the city.
  78. Akhlaq-i-Jalali, P. 138, W.F. Thomson’s translation, Practical Philosophy of the Muhammedan People, London 1839, P. 388
  79. A’in-i-Akbari, Vol. I, Blochmann, P. 4
  80. Akbar Namah, Vol. II, P. 173, Bev. Vol. II, P. 268
  81. Akbar Namah, Vol. III, P. 463
  82. Insha, Vol. II, P. 100
  83. A’in-i-Akbari, Vol. III, Jarrett and Sarker, PP. 3-9
  84. A’in-i-Akbari, Jarrett, Vol. III, P. IX
  85. A’in-i-Akbari, Vol. I, Blochmann, Int. P. IV
  86. A’in-i-Akbari, Vol. I, Blochmann, Int. P. IV footnote
  87. GLv‡b dviwm D×…wZ e¨eüZ n‡q‡Q| †`Lyb: g~j MÖš’: c„: 37, Drm wb‡`©k: 1
  88. A’in-i-Akbari, III, Jarrett, P. 9
  89. Akbar Namah, Vol. II, P. 159-160, Tr. 246-247
  90. A’in-i-Akbari, III, Jarrett, PP. 257-259
  91. A’in-i-Akbari, III, PP. 448-449
  92. A’in-i-Akbari, Blochmann, P. 271
  93. A’in-i-Akbari, V. III, Book V, Saying His Majesty, Jarrett, P. 425
  94. Ma’asir-ul-Umara, Vol. II, P. 618

95 Mablagh u’r-Rijal (MS). Ruqqa’t-i-Abul Fazl contain eleven letters addressed to Sharif Amuli.

  • Of Islam, New ed. Vol. I
  • A’in-i-Akbari, Jarrett, Vol. III, P. 515
  • A’in-i-Akbari, Jarrett, Vol. III, P. 516
  • Akbar Namah, Vol. III, P. 84, Beveridge, Tr. P. 17
  • Muntakhab-u’t-Tawarikh, II, P. 262
  • Ibid, II, P. 246
  • Medieval India Quarterly, Vol. I, No: 3-4, P. 119
  • Medieval India Quarterly, Vol. I, P. 1-2
  • Akbar Namah, Vol. I, PP. 2-4, Beveridge I, P. 13
  • A’in-i-Akbari, Vol. II, P.203, Jarrett and Sarker III, PP. 523-524
  • Akber the Great Mogul, P. 310
  • Insha, Vol. III, P. 227
  • Insha, III, P. 223
  • Ibid, II, P. 149
  • Akbar Namah, Vol. III, P. 255, Beveridge Vol. III, P. 269
  • Medieval India Quarterly, Vol. I, No: 3-4, P. 120
  • Munajat, P. 10
  • Insha, Vol. II, P. 180
  • Insha, Vol. III, P. 226

116   The translation by Blochmann is defective. The word `Attar in the original refers to the great mystic poet of the 12th centure, Shaikh Farid u’d din `Attar and should  not be literally translated. Correct translation of the verse should be `Heresy to the heretic and religion to the orthodox, an atom of divine love for the heart of `Attar’.

  • Akbar is the Insan-i-Kamil, or Perfect man.
  • A’in-i-Akbari, Vol. I, Blochmann, P. Iiv, Iv

119 Insha, Vol. III, P. 126

  • Insha, Vol. II, P. 100

121 Akbar Namah, Text, Vol. III, P. 659, Beveridge, Vol. III, P. 1012

  • Insha, III, P. 174
  • Faw’ud-ul-Fa’od, PP. 13-14, Siyar-u’l Auliya, P. 411
  • Muntakhab-ut-Tawarikh, II, P. 203
  • A’in-i-Akbari, P.171 (91/71?)
  • Influence of Islam on Indian Culture, P. 165
  • A’in-i-Akbari, P.172
  • A’in-i-Akbari, PP. 175-176
  • A’in-i-Akbari, P.175
  • A’in-i-Akbari, Vol. I, Blocmann, P. III

***********************************************

জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

কী লিখি

কেন লিখি

১৩

কি করে লেখক হলাম
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

আমার গল্প লেখার ইতিহাস বলব, কিন্তু কি ইতিহাস বলব? পেছনের দিকে তাকিয়ে যখন নিজের বিচিত্র স্বপ্নাতুর কৈশোর জীবনটাকে দেখতে পাই, তখন গল্প লেখার ব্যাপারটা নিজের কাছেই যেমন আকস্মিক, তেমনি বিস্ময়কর মনে হয়। বাবা ছিলেন পুলিশের দারোগা, আজ নয়, ত্রিশ থেকে বিশ বছর আগে এবং সে সময়ে ওই সম্প্রদায়টার সঙ্গে যাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল, সে দেবীটি আর যিনিই হোন তিনি যে সরস্বতী নন সে সম্বন্ধে বোধহয় সাক্ষী প্রমাণ দরকার হবে না। শুনেছি সে যুগে বেশি পড়াশোনা বা ভালো ইংরেজী লেখার ক্ষমতাটা পুলিশ বিভাগে অযোগ্যতার নিদর্শন হিসাবে গৃহীত হ’ত।

কিন্তু বাবা ছিলেন আশ্চর্য ব্যতিক্রম। কলেজে পড়াশুনো করেছিলেন, ভালো ছাত্র হিসাবে খ্যাতিও তাঁর ছিল। মনে পড়ছে ত্রিশ মাইল দূর থেকে ডাকাতের আস্তানায় রেইড করে তিনি ফিরে আসছেন— মাঠের ওপারে সাদা আরবী ঘোড়াটার ওপরে দেখা যাচ্ছে ইউনিফর্ম পরা উজ্জ্বল গৌরবর্ণ একটি পুরো পাঁচ হাত মানুষ। সহিস ছুটে এসে ঘোড়া ধরল, জিনের ওপর থেকে সোজা লাফিয়ে নামলেন মাটিতে। কপালে ঘামের বিন্দু, সারা গায়ে উত্তর বাংলার লাল ধুলো। কিন্তু ঘোড়া থেকে নেমেই তাঁর প্রথম প্রশ্ন : নতুন বইগুলোর ভি-পি এসেছে?

বাবার চমৎকার লাইব্রেরী ছিল, মাসে মাসে বই আসত, বাংলাদেশের যতরকম দৈনিক, সাপ্তাহিক আর মাসিক পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন তিনি। শুধু গ্রহাক ছিলেন না- একনিষ্ঠ পাঠকও ছিলেন। আমাদের মতো ছোটদের জন্য আসত অধুনালুপ্ত খোকাখুকু, সন্দেশ, মৌচাক, শিশুসাথী। আজও আমার ভাবতে আশ্চর্য লাগে এই লোকটি কেমন করে পুলিশের চাকরিতে সুনাম অর্জন করেছিলেন। পড়াশুনো ছাড়া কোন নেশা ছিল না, পান-তামাক অস্পৃশ্য বোধ করতেন এবং স্টুয়ার্ট মিল থেকে মিলটন, শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের নির্ভুল উদ্ধৃতি মৃত্যুর আগেও তাঁর মুখ থেকে শুনেছি।

সাহিত্য সম্বন্ধে আমার যা কিছু আসক্তি বা অনুরক্তি— একান্তভাবে বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। ফলে, বর্ণপরিচয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অকাল পক্কতাও অর্জন করেছিলাম কিছুটা। খোকাখুকুর পাতায় আর মন বসত না, চুরি করে ভারতবর্ষের পাতা থেকে পড়তাম ‘শ্রীকান্তের ভ্রমণ কাহিনী’  (গোড়াতে বইটার ওই নামই ছিল), দেশবন্ধু দাশের নারায়ণ কাগজ থেকে পড়াতাম ‘স্বামী’। কতটুকু বুঝতাম; ঠিক জানি না— কিন্তু আশ্চর্য দোলা লাগত মনে। এখন শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠছে উত্তর বাংলার একটা নগণ্য গ্রাম। আমাদের বাসার সামনে রক্তমঞ্জরীতে কৃষ্ণচূড়ার কুঞ্জটা আকুল হয়ে আছে— তার ওপারে বয়ে যাচ্ছে আত্রাইয়ের নীল ধারা। তারও ওপারে গ্রাম ছাড়া রাঙ্গা মাটির পথ— ঘন বাঁশ আর আখের বনের ভেতর দিয়ে কোথায় যে দিকচিহ্নহীন দিগন্তে মিলিয়ে গেছে জানতাম না। আর সেই আশ্চর্য্য পটভূমিতে এই আশ্চর্য্য লেখাগুলো আমাকে যেন আচ্ছন্ন করে রাখত। মনে হত ওই অজানা পথটা আর এই লেখাগুলোর মধ্যে কী যেন নিবিড় একটা সাদৃশ্য আছে।

প্রথম যখন লিখতে শুরু করি, তখন আমরা মোটামুটিভাবে স্থায়ী বাস্তু বেঁধেছি দিনাজপুরে এসে। ইস্কুলের ছাত্র এবং নীচু ক্লাসের ছাত্র। প্রথম সাহিত্যিকের আসক্তি জ্যামিতিক নিয়মে কাব্য-চর্চার ওপরে গিয়েই পড়ল।

আমি চিরকাল নিরালা মানুষ—কবিতা লেখায় হাত দিয়ে নিজেকে যেন আরো বেশি সংকুচিত করে ফেললাম। লেখা সম্বন্ধে যেমন সংশয় ছিল, তেমনি ছিল লজ্জা। অপরা বোধ তো ছিলই। চোরের মতো লিখতাম— ছিঁড়ে ফেলতাম সঙ্গে সঙ্গেই। নিজের লেখার প্রতি একবিন্দু দরদ ছিল না— ভাগ্যক্রম সেটা আজও নেই।

নিভৃত সাধনার জন্যে নিভৃত জায়গা দরকার। কোথায় পাওয়া যায় সেটা? খুঁজতে খুঁজতে চমৎকার একটা জায়গা বের করলাম— সে রকম সাহিত্য সাধনার রাজাসন পৃথিবীতে কারো জন্যে জুটেছে বলে আমি জানি না।

বাড়ীর একপাশের বারান্দায় ভাঙাচুরো কাঠ-কুটরো আর কেরোসিন কাঠের প্যাকিং বাক্সের একটা স্তুপ ছিল। শুধু স্তুপ বললে কম হয়, সেটা প্রায় ছাদ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিল। তার নীচে বাগান থেকে সংগৃহীত কাঁঠালের একটি পিরামিড, তা থেকে নিঃসারিত হ’ত অপূর্ব সুরভি। বাক্সগুলোর তলায় ইঁদুর স্বেচ্ছাসুখে বিচরণ করত, শব্দে আর গন্ধে বেশ মনোরম একটি পারিপার্শ্বিক যে সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে আর সন্দেহ কী? আমি খাতা আর কালি-কলম নিয়ে সেই স্তুপ শিখরে আরোহণ করলাম। বাড়ীর লোকের নজর সহজে পড়ত না, যদি হঠাৎ কেউ দেখে ফেলত অনুমান করত কাঁঠাল খাচ্ছি। কাঁঠাল সম্পর্কে বাড়ির কারু কার্পণ্য ছিল না এবং ম্যালেরিয়া আর পেটের অসুখে ছেলেবেলায় এত ভুগতে হয়েছিল যে সকলে আমাকে ঈশ্বরের করুণার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু কাঁঠালের চাইতেও উঁচুদরের রসের সন্ধান পেয়েছি তখন। কেরোসিন কাঠের বাক্সে গলা অবধি ডুবিয়ে দিয়ে বেদব্যাসের কলম চলছে। কবিতা, গান, রাজকুমার মেঘেন্দ্রজিতের সঙ্গে রাজকন্যা সুবর্ণার প্রেম ও মহাযুদ্ধমুলক মহাকাব্য, একলব্যের গুরুভক্তি অবলম্বনে জ্বালাময়ী নাটক— তার খানিকটা গৈরীশী ছন্দে। নিজে পড়ি, নিজে ছিঁড়ি, আবার নতুন করে লিখি। রবিনসন ক্রুশোর মতো নিজের আর্বিভূত জগতে সীমা সংকীর্ণ হয়ে সৃষ্টি এবং বিনাশের আনন্দ একাধারে উপভোগ করে যাই।

এরমধ্যে আনন্দ লহরী সিরিজের কতকগুলো রোমাঞ্চকর বই পড়ে ফেলেছিলাম। মাথার মধ্যে ক্রাইম নভেল একটা নতুন উদ্দীপনা এনে দিলে। আমার একক সাহিত্য সংসার থেকে এবারে একটি সচিত্র কাগজ বের করলাম, তার নাম ছিল বোধহয় চিত্র-বৈচিত্র্য, কোয়ার্টার ফুলস্ক্যাপ সাইজের আট পৃষ্ঠা— আমিই একাধারে সম্পাদক, শিল্পী, লেখক, মুদ্রাকর ও পাঠক। তিনটি কবিতা, সম্পাদকীয় এবং রহস্যরোমাঞ্চিত একটি উপন্যাস— প্রথম কিস্তিতেই দুটো ভয়াবহ নরহত্যা ঘটিয়ে দিয়েছিলাম, এই আমার প্রথম গল্প বা উপন্যাস।

আমাদের দিনাজপুরের সেই বাড়িতে— যেখান ঘন হয়ে আমের ছায়া পড়েছে, খিড়কির ওপার থেকে আসছে বাতাবী ফুলের মিষ্টি গন্ধ, উঠানে সারি সারি বোয়ামে ছত্রিশ রকমের আচার রোদে শুকোচ্ছে, ইঁদারার পাশে কানে রূপোর মস্ত মস্ত গয়না পরা সাঁওতাল ঝি বুধনি বিকৃত মুখে বাসন মাজছে এবং বাইরে দাদার ঘর থেকে আসছে সঙ্গীত সাধনার কর্ণভেদী কোলাহল, সেই সাধারণ, অতি সাধারণ বাঙালি গৃহস্থের বাড়িতে প্যাকিং বাক্সর দুরারোহ পর্বত শিখরে বসে আমি ফুলস্ক্যাপ কাগজের আড়াই পৃষ্ঠায় বন্দুক, বোমা, গুপ্তগৃহ আর নৃশংস হত্যাকা- নিয়ে ব্যতিব্যস্ত— ভাবতে পারেন! কিন্তু আমি লিখেই চলেছি— ‘কার সাধ্য রোধে মোর গতি।’

এমন সময় একদিন ধরা পড়ে গেলাম। রিপনের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ স্বর্গীয় রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষের একমাত্র ছেলে সুধীন ঘোষ- ডাক নাম বেস্ত— ছিল আমার অন্যতম খেলার সঙ্গী। একদিন সে আমাকে ডাকতে এল মার্বেল খেলবার জন্য। বললে, চল।

আমি বললাম, না আমি গল্প লিখছি।

— গল্প! — সুধীন তো স্তম্ভিত। ঘটনাটা কিছুক্ষণ সে বিশ্বাসই করতে পারে না। বললে, কই দেখি গল্প!

আমি তাকে চিত্র-বৈচিত্র্য থেকে উপন্যাসটা এক কিস্তি পড়ে শোনালাম। মুহূর্তে উড়ঁনঃরহম ঞযড়সধং-এর  একি পরিবর্তন! দেখি সুধীনর চোখ মুখ আগ্রহে জ্বলছে, মার্বেল খেলার প্রসঙ্গ ভুলেই গেছে সে। সাগ্রহে বললে, তারপর, তারপর?

সম্পাদকীয় গাম্ভীর্য নিয়ে বললাম, পরের সংখ্যায় বেরুবে।

সুধীন বললে, তোর কাগজের বার্ষিক চাঁদা কত?

বললাম, নিয়মাবলী কাগজের পাতাতেই দেওয়া আছে। বিজ্ঞাপন এক পৃষ্ঠা দু’আনা, আধ পৃষ্ঠা এক আনা, বার্ষিক মূল্য সডাক চার পয়সা।

সুধীন তৎক্ষণাৎ প্যান্টের পকেটে হাত পুরে বেস্টলীনের হা-ীভাজা খাওয়ার জন্য সঞ্চিত একটা এক আনি বার করে বললে, আমি গ্রাহক হবো।

তারপর থেকে কাগজ বেড়ে গেল। হস্তযন্ত্র থেকে দু’কপি কাগজ মুদ্রিত হতে লাগল। কিন্তু রহস্যোপন্যাসটা আমার গ্রাহককে পাগল করে দিয়েছিল। তিনদিন পরে এসে বললে, না, বড্ড বেশি দেরি হচ্ছে। তোর কাগজকে সাপ্তাহিক করে দে।

আমি তখন নতুন উৎসাহে দৈনিক দু’সংখ্যা করে বার করতে পারি— সাপ্তাহিক তো কী কথা। আমার প্রথম ভক্ত পাঠকের অনুরোধ উপেক্ষা করা গেল না। চিত্র-বৈচিত্র্য সাপ্তাহিক হল।

কাগজ কতদিন চলেছিল কিংবা উপন্যাস শেষ হয়েছিল কিনা মনে নেই। কিন্তু সুধীন একদিন কলকাতায় চলে এল, বাবার কাছে থেকে লেখাপড়া শিখবে। সেইসঙ্গেই বোধ হয় কাগজ আর উপন্যাস বন্ধ হয়ে গেল। তারপর আর সুধীনের সঙ্গে দেখা হয়নি— খবরের কাগজের স্পোর্টসম্যান সুধীনের মৃত্যুর খবরও পড়েছি অনেকিদন পরে। কিন্তু আমার সেই প্রথম পাঠকটিকে আজও ভুলিনি— ভুলতেও পারব না কোনদিন। জীবনে বহু বন্ধু পেয়েছি— আমার লেখা ভালবাসেন এমন দু’চারজনও হয়তো আছেন, কিন্তু বাল্য জীবনের সেই মুগ্ধ ভক্তটিকে আর খুঁজে পাবো না কখনো। আজ এই উপলক্ষ্যে লোকান্তরিত আমার বাল্যবন্ধুটিকে অন্তরের প্রগাঢ় কৃতজ্ঞতা জানাবার সৌভাগ্য লাভে কৃতার্থ বোধ করছি।

দিন কাটতে লাগল। কবিখ্যাতি তখন কিছুটা পাড়ার ছেলেদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। কবিতার পর কবিতা জন্মলাভ করছে— ভরে উঠছে খাতার পর খাতা। বড় জামাইবাবু, শ্রীযুক্ত শরৎ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে উৎসাহিত আর অনুপ্রাণিত করছেন। বেশ আছি।

এসময় দ্বিতীয় গল্পের আবির্ভাব। দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল এম ই স্কুলের একটি ক্লাশে অঙ্ক কষানো হচ্ছে। ক্লাস নিচ্ছেন বাঘা মাস্টার গোপী রায়— একাধারে অঙ্ক এবং ড্রিল মাস্টার, নামজাদা খেলোয়াড়, প্রহারে প্রচ-, ছাত্ররাজ্যের বিভীষিকা!

অঙ্কে আমি অনবদ্য ছাত্র ছিলাম না। তবু কেন জানি না— গোপীবাবু আমাকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। হয়তো একান্ত ক্ষীণজীবী বলেই আমার গায়ে হাত তোলাটা পুরুষ ব্যাঘ্রের আত্মসম্মানে বাধত। সহপাঠী মেজ ছিল ক্লাসের এবং অঙ্কের সেরা ছাত্র— তার খাতা থেকেই হোম টাস্ক টুকে নিয়ে দিনগত পাপক্ষয় চলত।

গোপীবাবুর পিরিয়ডে পেছন বেঞ্চে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ব্ল্যাকবোর্ড থেকে অঙ্ক টুকবার নাম করে হোম-টাক্সের খাতায় একদিন রামপ্রসাদের মতো গল্প লিখে ফেললাম। পাশে বসে ছিল নরেশ চক্রবর্তী— ন্যাড়া মাথা, কানে আংটি। অঙ্কে সে আমার মতই প-িত। সে বোধ হয গোলাপ ফুল আঁকবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু হয়ে উঠেছিল কোলা ব্যাঙ। হঠাৎ দেখি ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে সে বিমুগ্ধ মনে গল্প পড়ছে।

ক্লাস শেষ হল। নরেশ বলল, অতি চমৎকার গল্পটা তোর। আমাকে দে, বাঁধিয়ে রাখব। চমৎকার গল্পকে কি হাতছাড়া করা যায়? দিলাম না। বাড়ীতে নিয়ে এসে ছোট বোনদের সংগ্রহ করে গল্প শোনাতে লেগে গেলাম।

বেশ করুণ গল্প। নামটা মনে আছে : ‘পাশাপাশি’। ফুলস্ক্যাপ কাগজের তিনপৃষ্ঠা। বিষয়বস্তু হচ্ছে পাশাপাশি দুটি বাড়ীতে একটি বড়লোক আর একটিতে দীন দরিদ্র পরিবার বাস করে। একদিন বর্ষার সন্ধ্যায় বড়লোকের বাড়ীতে যখন টী-পার্ট চলেছে তখন গরিবের ছেলেটি বিনা চিকিৎসায় মারা গেল।

ছোট বোনদের চোখ যখন ছলছল করবার উপক্রম, এমন সময় একটা বিরাট অট্টহাসি এবং ছন্দপতন। কখন যে পিসতুতো ভাই ফুচুদা— অর্থাৎ মহেন্দ্রবাবু এসে জুটেছেন টেরও পাইনি। সাহেবী মেজাজের লোকটি, দার্জিলিং-এ বাস। সুট পরে থাকনে এবং মুখে জ্বলন্ত সিগারেট।

গল্পের মধ্যে এক জায়গায় ছিল মাংসের কচুরি খাওয়ার কথা। শুনে ফুচুদার হাসি আর থামে না। মাংসের কচুরি! তাও কি হয় ? ননসেন্স অ্যান্ড অ্যাবসার্ড। রাবিশ।

মাংসের কচুরি কখনও আমি খাইনি—নামটা কোথাও শুনে থাকব। কাজেই আমি দমে গেলাম— নিদারুণ দমে গেলাম। মনে হল এমন ছল করা গল্পটা নিতান্তই প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাতা বগলে করে পালিয়ে গেলাম।— লেখাটাকে কুটি কুটি করে উড়িয়ে দিলাম হাওয়ায়। অপমানে সেদিন চোখ দিয়ে জলও পড়েছিল।

আমি জানি মাংসের কচুরি হয় এবং ভালোও হয়। আপনাদের আশীর্বাদে গৃহিনী মাংসের কচুরি তৈরী করে অনেকবার খাইয়েছেন এবং আমি হঠাৎ বিপতœীক না হলে আরও খাওয়াবেন। কিন্তু সেদিনকার সেই শক আমার গল্প রচনার উৎস মুখে পাথর চাপা দিয়ে দিলে। গল্প লিখতে বসলেই ওয়ার্ডসওয়ার্থেল ঙসরহড়ঁং ৎড়পশ-এর মতো মাংসের কচুরী দুঃস্বপ্ন হয়ে আসে। সুতরাং অব্যাপারেষু মনে করে ও পথ ছেড়ে দিলাম।

কবিতা লিখেই চলেছি। ‘মাস-পয়লা’ পত্রিকায় ছোটদের বিভাগে কবিতা লিখে পুরস্কার পেলাম। বুক ফুলে গেল। আস্তে আস্তে বয়স বাড়ল, ম্যাট্টিকুলেশন পাশ করলাম। সাপ্তাহিক দেশ পত্রের পাথায় আমার কাব্য প্রলাপগুলো সাদরে পত্রস্থ হতে লাগল। দেশর তৎকালীন সহ-সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়— বাংলা সাহিত্য সংসারে টহরাবৎংধষ পবিত্রদা—আমাকে নানারকম উৎসাহ দিতে লাগলেন। তাঁর ¯েœহের ঋণ আমার এ জীবনে অপরিশোধ্য।

বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আই-এ পড়ছি তখন। পবিত্রদার পত্রাঘাত এল : গল্প লেখো।

গল্প লিখব— কিন্তু কি লিখি। কিছুদিন আগে ফরিদপুরে থাকবার সময়ে কিছু কিছু গল্প চর্চা করেছিলাম, কিন্তু সেগুলো নিতান্তই গ-ীবদ্ধ শৃঙ্খলিত দেশমাতা সম্পর্কে জ্বালাময়ী রচনা। পবিত্রদার পত্রে বিব্রত হয়ে পড়লাম।

সেই সময়ে বাংলা সাহিত্য জগতে যে সব লেখা আমার প্রাণ মন কেড়ে নিয়েছিল সেগুলি অচিন্ত্যকুমারের গল্প, তারাশঙ্করের বিচিত্র একটি ফ্যান্টার্স্টিক রচনা— নাম বোধ হয় ‘খড়গ’, মনোজ বসুর বন-মর্মর এবং নবাগত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা। শেষোক্ত লেখাটি ভারতবর্ষে ক্রম প্রকাশ্য ছিল। মপাসাঁ আর বালজাকের গল্পও তখন গিলতে শুরু করেছি। আমার অতি প্রিয় এই সমস্ত লেখকের সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে দেশর পাতায় আমার প্রথম গল্প ছাপা হয়ে বেরুল: ‘নিশীথের মায়া’। আমার বয়স তখন সতেরো থেকে আঠারোর মধ্যে। বয়স সুলভ রোম্যান্টিকতার মায়াময় স্বপ্নময় অতীতের মধ্যে তলিয়ে গিয়ে গল্প আকারে একটি ফ্যান্টাসি খাড়া করে তুলেছিলাম।

পবিত্রদা খুশি হলেন। গল্পের জোয়ার এলো— কবিতাকে ভুলে গেলাম। দেশ থেকে বিচিত্রা, বিচিত্রা থেকে শনিবারের চিঠি— তারপর এখানে ওখানে। শুভার্থী পেলাম শনিগ্রহের সজনীদাকে, বিচিত্রার উপেন গঙ্গোপাধ্যায়কে। নিজের খেয়ালের খুশিতে লিখে চললাম।

কোনো খ্যাতির আকর্ষণ আমাকে কখনো প্রলুদ্ধ করেনি — আমার লেখা কে কীভাবে গ্রহণ করেছেন, সে কথা ভাবিওনি কোনোদিন। নিজের আনন্দে লিখেছি, কাগজে বেরিয়েছে— যখন মূল্যহীন মনে হয়েছে তখন তাকে আর স্বীকার করিনি। আমার বহু লেখাকেই আমি এইভাবে বিস্মৃতির বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছি— শুধু জানি: ফুরায় যা দেরে ফুরাতে।

এরই ধারা আজো চলছে। আমার লেখা যাঁরা ভালোবাসেন, এর পরের কথা তাঁরা জানেন।

এই তো আমার গল্প রচনার পেছনের ইতিহাস। অনেক ছোটো খাটো সুখ-দুঃখ, ঘাত-সংঘাত হয়তো এর সঙ্গে মিলে রয়েছে — যার কথা আজ আর মনে করতে পারি না। কিন্তু এ ইতিহাস অত্যন্ত সহজ — অত্যন্ত সাধারণ। আমার পরিচয় যদি আপনাদের কাছে কিছু দেবার থাকে, তা হলে সে আমার জীবনে নয় আমার গল্পে।

গল্প লিখি — উপন্যাসেও হাত দিয়েছি। তার কতটুকু দাম— জানি না। অত্যন্ত পরীক্ষিত শক্তি, যা করতে চাই, কিছুই করতে পারি না হয়তো। কিন্তু ব্যর্থতার জন্যে এতটুকু ক্ষোভ করি না। নিজের সীমানা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত থেকে কবিগুরুর ভাষায় আমারও এই সান্ত¦না :

‘আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস।

জানি কাল সিন্ধু তীরে

নিয়ত তরঙ্গাঘাতে দিনে দিবে লুপ্ত করি।

…এ বিশ্বেরে ভালো বাসিয়াছি

এ ভালোবাসাই সত্য এ জন্মের দান।

বিদায় নেবার কালে

এ সত্য অম্লান হয়ে মৃত্যুরে করিবে অস্বীকার।’

[২৫ শে নভেম্বর, ১৯৬৫; আকাশবাণীতে পঠিত]

[‘কি করে লেখক হলাম’ শিরোনামে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচনাবলীতে প্রকাশিত]

***********************************************

শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্টিফেন হকিং : মহাবিশ্বের এক নিশ্চল পরিব্রাজক
নাজমুল হাসান পলক

কবিতা ও বিজ্ঞান নিয়ে বলতে গিয়ে জগদীশচন্দ্র বসু জানিয়েছিলেন— ‘কবি এই বিশ্বজগতে তাঁহার হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়া একটি অপরূপকে দেখিতে পান, তাহাকেই তিনি রূপের মধ্যে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন। অন্যের দেখা যেখানে ফুরাইয়া যায় সেখানেও তাঁহার ভাবের দৃষ্টি অবরূদ্ধ হয় না। সেই অপরূপ দেশের বার্তা তাঁহার কাব্যের ছন্দে ছন্দে নানা আভাসে বাজিয়া উঠিতে থাকে। বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে, কিন্তু কবিত্ব-সাধনার সহিত তাঁহার সাধনার ঐক্য আছে। দৃষ্টির আলোক যেখানে শেষ হইয়া যায় সেখানেও তিনি আলোকের অনুসরণ করিতে থাকেন, শ্রুতির শক্তি যেখানে সুরের শেষ সীমায় পৌঁছায় সেখান হইতেও তিনি কম্পমান বাণী আহরণ করিয়া আনেন।’ তাঁর কথাপ্রান্ত ধরেই আমরা বলতে পারি— একজন বিজ্ঞানী কাজ সমাপ্ত করেন যেখানে, আরেক বিজ্ঞানীর কাজের আরম্ভটা সেখান থেকেই। সদ্য প্রয়াত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন উইলিয়াম হকিং কথাগুলির এক চমৎকার উদাহরণ। মহাবিস্ফোরণের মতো কৃষ্ণগহ্বরের যে ধারণা, সেটি বেড়িয়ে এসেছিল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকেই। তাকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছেন হকিং। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা থেকে কৃষ্ণগহ্বর ধারণার যে অগ্রগতি; তাতে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। যে সময়টাতে হকিংয়ের জন্ম। কৃষ্ণগহ্বর, শিশু মহাবিশ্ব ও অন্যান্য রচনায় হকিং নিজেই জানিয়েছেন সেসব দিনের কথা— ‘আমার বাবা-মা যদিও লন্ডনে থাকতেন, তবু আমার জন্ম হয়েছিল অক্সফোর্ডে। তার কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্মানোর পক্ষে অক্সফোর্ড জায়গাটা ভাল ছিল। জার্মানদের সঙ্গে একটা চুক্তি ছিল; তারা অক্সফোর্ডে কিংবা ক্যামব্রিজে বোমাবর্ষণ করবে না, তার বদলে ব্রিটিশরাও হাইডেলবার্গ এবং গটিংগেনে বোমাবর্ষণ করবে না। খুব দুঃখের কথা, অনেকটা সুসভ্য এই ব্যবস্থা অন্য শহরগুলিতে বিস্তৃত করা যায়নি।’ হকিংয়ের মা-বাবা ছিলেন অক্সফোর্ডের ছাত্র। বাবা ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ¯œাতক। তিনি সারাজীবন এ বিদ্যারই অনুশীলন করেছিলেন; এমনকি হকিং যখন নিরাময়অযোগ্য রোগে আক্রান্ত হন, তখন তাঁর বাবাও হকিংয়ের চিকিৎসকদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর মা ইসাবেলা প্রথমজীবনে ট্যাক্স ইন্সপেক্টরের চাকুরি করতেন। পরবর্তীতে যোগ দেন সেক্রেটারির কাজে। স্টিফেন হকিংয়ের ছেলেবেলা কেটেছে উত্তর লন্ডনের হাইগেটে। এখানেই জন্ম হয় তাঁর তিন ভাই-বোনের। হকিংয়ের বয়স আড়াই বছর হতে না হতেই তাঁর বাবা-মা তাঁকে নিয়ে হাজির হন হাইগেটের নার্সারি স্কুল বায়রন হাউসে। নিজের স্কুল সম্পর্কে হকিং জানাচ্ছেন— ‘এখানকার [অর্থাৎ হাইগেট অঞ্চলের] সমস্ত বাবা-মা-ই তাঁদের ছেলেমেয়েদের বায়রন হাউসে পাঠাতেন। সেই সময়কার মান অনুসারে স্কুলটা ছিল খুবই প্রগতিশীল। আমার মনে পড়ে, বাবা-মার কাছে আমি নালিশ করতাম স্কুলে আমাকে কিছু শেখায় না। তখনকার প্রচলিত পদ্ধতি ছিল জোর করে ছাত্রদের শেখানো। এ-পদ্ধতিতে তাঁরা বিশ্বাস করতেন না। তার বদলে আশা করা হতো, ছাত্ররা বুঝতে পারবে না যে তারা শিখেছে কিন্তু তারা পড়তে শিখে যাবে অজান্তে। শেষ পর্যন্ত আমি পড়া শিখেছিলাম কিন্তু আট বছর বয়সে। বয়সটা একটু বেশিই হয়েছিল। আমার বোন ফিলিপ্পাকে শেখানো হয়েছিল প্রচলিত পদ্ধতিতে। সে চার বছর বয়সেই পড়তে পারত। নিঃসন্দেহে তার বুদ্ধি ছিল আমার চাইতে বেশি।’ ১৯৫০ সালে বাবার কর্মস্থল বদলি হলে হকিংকে ভর্তি করানো হয় অ্যালবান্সে একটি মেয়েদের স্কুলে। সেখানে দশ বছর অব্দি ছেলেরাও পড়তে পারতো। এরপর তাঁকে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করানো হয়; সেখান থেকেই তিনি ইলেভেন ক্লাস পরীক্ষা দেন। ভাল ফলের কারণে এরপর তিনি বিনা বেতনে পাঠের সুযোগ পান সেন্ট অ্যালবান্সে। এই স্কুলের বন্ধুদের সম্পর্কে হকিং লিখেছেন— ‘আমার ছ-সাতজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তাদের অধিকাংশের সঙ্গে আমার এখনো যোগাযোগ আছে। আমরা খুব দীর্ঘ আলোচনায় মগ্ন থাকতাম।’ স্কুলের পড়া শেষ করার পর স্টিফেন হকিং সতেরো বছর বয়সে অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি পেয়ে অক্সফোর্ডের তিন বছরের পড়া শেষ করেন তিনি। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট স্টিফেন হকিং পা রাখেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। অক্সফোর্ড পরিত্যাগ করে তাঁর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গমনের অন্যতম কারণ ছিল— অক্সফোর্ডে পছন্দের বিষয় মহাবিশ্বতত্ত্ব নিয়ে কেউ গবেষণা করতেন না। তখনকার দিনের ইংল্যান্ডের সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোর্তিবজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল ছিলেন ক্যামব্রিজে; হকিংয়ের ইচ্ছে ছিল তাঁর সঙ্গে গবেষণার কাজ করার। কিন্তু, হকিংয়ের জন্য নিযুক্ত করা হয় আরেক প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডেনিস উইলিয়াম সিয়ামাকে। এ সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য হকিংকে আইনস্টাইনের ‘ব্যাপক আপেক্ষিকতাবাদ’ নিয়ে চর্চা করতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে স্টিফেন হকিংয়ের পিএইচ.ডি. অভিসন্দর্ভ প্রকাশিত হয় Properties of expending univers শিরোনামে। এখানে তিনি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের তাৎপর্য ও ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেন। পিএইচ.ডি. অধ্যয়নকালেই হকিং গনভিল ও কোয়াস কলেজে রিসার্চ ফেলোশিপের জন্য আবেদন করেন। কারণ, বান্ধবী জেনকে বিয়ে করতে হলে তাঁর একটি চাকুরি প্রয়োজন ছিল। হকিংয়ের এ আবেদনের জন্য সুপারিশ করেছিলেন তাঁর সুপারভাইজার ড. সিয়ামা ও প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ হারম্যান বন্ডিং। ফলে, ১৯৬৫ সালে হকিং ফেলোশিপটি অর্জন করেন এবং বান্ধবী জেনের সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ হন। তাঁর এ ফেলোশিপ আমৃত্যু অব্যাহত ছিল। অক্সফোর্ডে থাকাকালীনই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁর চলাফেরা ভারি কঠিন হয়ে পড়ছে, জুতার ফিতে বাঁধতে অসুবিধা চচ্ছে, মাঝে মাঝে মনে হতো পায়ের নিচের দিকটা খুলে পড়ে যাচ্ছে; আবার কখনো মাতালের মতো কথাগুলো সব জড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, কিছুই হয়নি এমন ভাব করে তিনি সবকিছু উড়িয়ে দিতেন। ক্যামব্রিজে আসার পর তাঁর রোগটি ধরা পড়ে। সে বছর বড়দিনের ছুটিতে তিনি সেন্ট অ্যালবান্সে বাবা-মায়ের নিকট হাজির হলে সন্তানের অসুস্থতা দেখে তাঁরা হকিংকে হাজির করেন পারিবারিক চিকিৎসকের নিকট। তিনি পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ কাউকে দেখানোর। এরপর তাঁর রোগ নির্ণয় করা হয়। ইংল্যান্ডে রোগটি পরিচিত এ.এল.এস. (Amyothropic lateral sclerocis) বা (Motor Neoron Disease) নামে। এই রোগটি তাঁকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে খুব দুঃখজনকভাবে। তবে, অসুস্থতাকে অগ্রাহ্য করে তিনি নিজের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ সাল অব্দি স্টিফেন হকিং কাজ করেছেন মূলত কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে, এ বিষয়ে স্মৃতিতে তাঁর বক্তব্য— ‘১৯৭০ সালে আমার মেয়ে লুসির জন্মের কয়েকদিন পর এক রাত্রে কৃষ্ণগহ্বরের কথা ভাবছিলাম। তখন আমি বুঝতে পারলাম, আমি আর পেনরোজ অনন্যতা প্রমাণ করার জন্য যে প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছি সেগুলি কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে ঘটনা দিগন্তের এলাকা অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বরের সীমানা কালে কালে হ্রাস পেতে পারে না এবং দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের পর তারা সংযুক্ত হয়ে যদি একটি কৃষ্ণগহ্বর গঠন করে, তাহলে অন্তিম গহ্বরের দিগন্ত প্রাথমিক কৃষ্ণগহ্বরগুলির দিগন্তের এলাকার (ধৎবধ) চেয়ে বেশি হবে। সংঘর্ষে কতটা শক্তি বিচ্ছুরিত হবে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ সীমা এর ফলে তৈরি হলো। আমি এতই উত্তেজিত হয়েছিলাম যে, সে-রাত্রে বিশেষ ঘুমোতে পারিনি।’ ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত হকিং নিজেই তাঁর প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারতেন, স্ত্রীর সাহায্যে। ১৯৮০ সালের পর থেকে তাঁর দৈহিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১৯৮৫ সালের পর থেকে তাঁকে চব্বিশ ঘণ্টাই নার্সের প্রযতেœ থাকতে হয়। পরে, তাঁর বাকশক্তি পুরোপুরি রহিত হয়ে গেলে তিনি নিজের মতামত প্রকাশ করতেন ইকোয়ালাইজার কম্পিউটারের সাহায্যে। ক্যামব্রিজ অ্যাডাপ্টিভটিভ কমিউনিকেশনের ডেভিড মেনস হকিংয়ের হুইল চেয়ারে একটি ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও বাক্য-সংশ্লেষক লাগিয়ে দেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হকিং মিনিটে ১৫ টির মতো শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন। অদম্য মনোবলের কারণে তিনি এর মাধ্যমেই নিজের লেখালেখি ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে পারেন অনায়াসে। হকিংয়ের লেখা A Brief History of Time- এর আরো কিছু সহজ ও অনুসরণমূলক বই তিনি রচনা করেছিলেন, যেগু (১৯৮৮) কোন কল্পকাহিনী নয়, খাঁটি বিজ্ঞানের বই; অথচ এর জনপ্রিয়তার তুলনা চলতে পারে একমাত্র যেকান ধ্রুপদী সাহিত্যকর্মের সাথেই। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হবার পর বইটি নিউইয়র্ক টাইমস-এর সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় ছিল সাঁইত্রিশ সপ্তাহ। বিশ্বের অধিকাংশ ভাষায় এ বইটির অনূবাদ প্রকাশিত হয়েছে। হকিংয়ের নিজের ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞানের এমন একটি জনপ্রিয় বই লেখার, যা পাঠে বিজ্ঞানের আপাত জটিল পথ না মাড়িয়ে মানুষ সহজেই বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পারে। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন— ‘মহাবিশ্বের ক্রিয়াপ্রণালি সম্পর্কে সবাই জানতে উৎসুক, এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু বেশিরভাগ লোকই গাণিতিক সমীকরণ বুঝতে পারেন না— ব্যক্তিগতভাবে আমিও সমীকরণগুলির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করি না। অংশত এর কারণ, আমার পক্ষে সমীকরণ লেখা শক্ত কিন্তু আসল কারণ হলো সমীকরণ সম্পর্কে আমার স্বজ্ঞাবোধ (Intuitive feeling)  ছিল না। …আমার আশা ছিল গত পঁচিশ বছরে পদার্থবিদ্যায় যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে সে-সম্পর্কে উত্তেজনা এবং কৃতিত্ববোধের অংশীদার সবাই হতে পারবে।’ পরবর্তীকালে A Brief History of Time- এর আরো কিছু সহজ ও অনুসরণমূলক বই তিনি রচনা করেছিলেন, যেগুলোর মাঝে— ইলাসট্রেটেড ব্রিফ হিস্ট্রি, ব্রিফার হিস্ট্রি উল্লেখ্য। এছাড়া স্টিফেন হকিং লিখিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির মাঝে রয়েছে— দ্য লার্জ স্কেল স্ট্রাকচার অব স্পেস-টাইম, নেচার অব দ্য স্পেস এন্ড টাইম, দ্য ফিউচার অব স্পেসটাইম, দ্য গ্রান্ড ডিজাইন, দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল, ব্ল্যাক হোলস অ্যান্ড বেবি ইউনিভার্স অ্যান্ড আদার এসেজ, দ্য ইলাসস্ট্রেটেড অন দ্য সোল্ডার অব জায়ান্ট, মাই ব্রিফ হিস্ট্রি ইত্যাদি। স্টিফেন হকিং ১৯৭৯ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রের লুকেশিয়ান প্রফেসর পদে যোগ দেন; আমৃত্যু তিনি এ পদে কর্মরত ছিলেন। স্টিফেন হকিং ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ ভোরে ক্যামব্রিজে নিজের বাসায় প্রয়াত হন। গ্যালিলিও, স্যার আইজ্যাক নিউটন ও আলবার্ট আইনস্টাইনের পর তিনি ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে বিজ্ঞানের সেই বরপুত্র; যিনি একাধারে তুমুল জনপ্রিয় ও মানুষকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সীমাহীন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও নিজের অদম্য মানসিক স্পৃহা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে তিনি যে মহান কীর্তি রেখে গেছেন, তা তাঁকে চিরকাল মানুষের হৃদয়ে নায়কের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে রাখবে।

***********************************************

বই আলোচনা

খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে : অর্ন্তদাহ উন্মাদনার আখ্যান
মাসুদ মুস্তাফিজ

বাংলাসাহিত্যে উপন্যাসের সূত্রপাত অনেক পুরানো। তবে ইতিহাসটা পুরনো নয়— এর পদধ্বনি শোনা যায় আনুমানিক ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে। যখন সামন্তবাদ ভেঙে পড়ছিলো সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনাতেই এবং গড়ে উঠেছিলো পুঁজিবাদ। পরে অবশ্য সেই পুঁজিবাদের ভেতর নতুন উপাদানের জন্য পথ প্রশস্ত হলে উপন্যাসেই তার সাক্ষী  হয়ে থাকলো— এভাবেই উপন্যাসের সূত্রপাত।  তবে উদ্ভবের মূল থিমটা পুঁজিবাদের ভেতর থেকেই। কিন্তু বিশেষ অঞ্চলের কিংবা কোনো উপভাষাকে প্রধান্য দিয়ে আর প্রত্যক্ষ ঘটনা উপজীব্য করে একটি উপন্যাস রচিত হওয়া নিঃসন্দেহে খুব কঠিন ব্যাপার। আযাদ কালাম দুটো উপন্যাস, একটি গল্পগ্রন্থ এবং একটি কাব্যগ্রন্থের জনক। প্রথম উপন্যাস বিরুদ্ধ ¯্রােতে একা, এরপর তার একটি সফল উপন্যাস অমর একুশে বইমেলা ২০১৮-এ যুক্ত প্রকাশন খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে বের করেছে। বাংলা কথাসাহিত্যে উপমহাদেশের শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর দিনাজপুরি আখ্যানে এলাকার ভাষাপ্রধান উপন্যাস নাঢ়াই এবং পাপড়ি রহমানের সম্পূর্ণ দিনাজপুরের আঞ্চলিকতার রূপায়ন পালাটিয়া উপন্যাসের পর আযাদ কালামের খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে সাহিত্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা লক্ষ করি বাংলা কথাসাহিত্যে দিনাজপুরি উপভাষার সাহিত্য মোটেই চোখে পড়ে না। এ উপন্যাসের  বিশেষ করে— রক্তমাংসচামড়ায় সাজানো স্কেলিটন, নিরুদ্দেশ কেন নিরুদ্দেশ নয়, নৈঃশব্দ্য যখন শব্দকে খায়, নিজের অতীত, ভাবনার জালে প্যাঁচিয়ে যায় রাতের নীরবতা, একফোঁটা তরল আঁধার, লালসালুর মজিদ ‘কাথা কহেচে দাড়িৎ হাত বুলেই’, বৈশিষ্ট্যহীন ক্লান্তিকর উদয়াস্ত এবং সর্বশেষ খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত উপশিরোনামগুলো পাঠককে দারুণভাবে টানে— উপন্যাসের কাঠামোকে আরেক শৈল্পিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই উপন্যাসে লেখকের রোমান্টিক আবহের উপন্যাস রচনার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। উপন্যাসে কাহিনির প্রেক্ষাপটে প্রেমতাড়না থাকলেও মূলত আশির দশকের ছাত্র আন্দোলনে রাজশাহী মেডিক্যাল ছাত্র জামিল আক্তার রতনের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, সমাজের অবক্ষয়, তারুণ্যের মনোবিবর্তন ও বৈকল্যের চরম উন্মাদনা আর অন্তর্দাহের পটভূমি এঁকেছেন আযাদ কালাম। এই উপন্যাসের সবচেয়ে চমকলাগা দিক হলো বত্রিশটি উপ-শিরোনামে বিভক্ত এবং মোট ছয়টি পর্বে বিন্যন্ত। যে কোনো ঋজুতাকে পাশ কাটিয়ে আর ক্লান্তি আক্রান্ত না হয়ে একটানা পড়ে যাবার উপন্যাস। এই উপন্যাসে কিছু আঞ্চলিক শ্রুতি অর্থবহ বাক্যে লোকবিশ্বাসের পুরোনো ভারতীয় মিথের ব্যবহার আধুনিক যন্ত্রশাসিত সমাজকে আঘাত করে। এরকম সফল উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন : ‘পাপ ঠেকিলে বাড়িৎ আগুন ধরে। গেরামৎ ধর্ম-সমাজ সব সময়েই বড়, গায়ৎ আছে ধুলা পেটগুনা ফুলা, হাত্তিক ঠেলা যায় কিন্তুক কার্তিক ঠেলা যায় না এবং ছাই চাপা আগুনৎ বাতইস দুয়ার দশা।’

আযাদ কালামের এ উপন্যাসের কাহিনি কোনো কষ্টকল্পনা বা ইউটোপিয়া নয়— সরাসরি বাস্তব, লেখকের জীবন্ত অনুভূতির প্রকাশ। আমরা জানি ল্যাতিন আমেরিকার অরণ্যসভ্যতা ‘এক শত বছরের নিঃসঙ্গতা’ ছিলো, অজানা ছিলো, অজ্ঞেয় ছিলো, ছিলো রহস্যময় ও দুর্বোধ্য। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এই বিপন্ন সভ্যতাকে, ভাষাকে, সংস্কৃতিকে অসাধারণ প্রতিভাবলে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ প্রয়াসের সূত্রপাতও  এই উপন্যাসে নাড়া দিয়ে যায়।

এবার দেখা যাক বিশিষ্ট মলাটশিল্পি মোমিন উদ্দীন খালেদের নান্দনিক মলাটের ভেতর কী আছে! কোন উন্মাদনা? কোন অন্তর্দাহ লুকোনো আছে এই ১৩৪ পৃষ্ঠার মধ্যে! রাসেল-শিলা-সাহেদ-করুণার যাপিত জীবনের স্বল্পকালীন কাহিনি বর্ণনায় লেখক তার রেখার গাঁথুনিতে কোন শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তার অভিনব গল্প বলার ভঙ্গি এবং ধারা সাধারণত দেখা যায় না। লেখক এখানে দিনাজপুর-বিরলের ভাষাকে তার কাহিনির বয়ানে শুরুতেই উপন্যাসের ভাষা করে তোলেন। আসলে লেখক পাঠককে ঘটনার পরিস্থিতি বোঝাতে এই বিরলের ভাষা ব্যবহার করে লেখক-পাঠকের মেলবন্ধন তৈরি করতে চেয়েছেন— পাঠককে যুক্ত করে বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন। সমকালীক রাজনীতির বলির পাঠা স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থার শিকার হয়ে কীভাবে শিক্ষাজীবন বিপন্ন করে তার বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। তার রচনাশৈলিতে গ্রামের পরিতর্বনের নির্মল ছবি এঁকে দিনবদলের হাওয়া— কূপম-ূকতা, অপরাধ আর বিচারহীনতার নিদারূণচিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। শিলার রঙিন স্বপ্ন এক নিমিশেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়েই তাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়। উপন্যাসে শিলা নামক চরিত্রটি যৌন নিপীড়নের শিকার শত শত নারীর প্রতীক যা খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে উপন্যাসের করুণ পরিণতির প্রতীক হয়ে আছে। দেখা যায় করুণা-রাসেলের পবিত্র ভালোবাসাও এই কূপম-ূকতার কাছে হার মেনে গেছে। ঘটনার এক পর্যায়ে ট্রেনে হঠাৎ দেখা চেনা-জানার পূর্বতা থেকে রাসেলের প্রতি করুণার প্রবল টান-ভালোবাসা কেনো জানি তাদের চট্টগ্রামের বাসায় ওঠা কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেকে। তবে করুণার অপরিসীম পরিবর্তন শহুরে ধনির দুলালীর জীবনচরিত্রের বাস্তব রূপায়ণ পরিশেষে বাস্তব হয়ে যায়। আবার প্রেমহীন শারীরিক ভালোবাসা শহুরে আধুনিক করুণাকে তার কথার শৈলিতে ঠিকই তুলে এনেছেন। করুণা-রাসেলের প্রেম, সম্পর্ক নিয়ে গ্রামের ধর্মান্ধদের শালিসিতে ডাক্তারের ছেলের পিতা হাজি সাহেবকে ঈর্ষান্বিত করে তোলে— দেখা যায় একহাত নেয়া এবং পরশ্রীকাতর শকৎ দেউনিয়ার মনোবাঞ্ছনা প-ের ভেতর দিয়ে চরম হতাশার মাঝে এক চিলতে আশার রোদ ঝিলিক দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু তা ধোপে টিকেনি। শেষে ধর্ষণের শিকার শিলার আত্মহত্যা, বোনের ধর্ষণকারিকে হত্যা করে সাহেদের কারাদ- প্রাপ্ত হওয়া। উপন্যাসের শ্রেণিবিচারে এই বিয়োগান্তক উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য বলে ধরে নেয়া যায়। দীর্ঘ কাহিনির বাঁকে বাঁকে মনে হয় কথাশিল্পী সামাজিক মূল্যবোধের নিদারুণ চিত্র— অবক্ষয়ের দিকে অঙ্গুলি দেখিয়েছেন। খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে সময়ের চালচিত্রে গুরুত্ববহ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস। উপন্যাসের অনিবার্যতাকে মান্য করে বহির্শোষণের চিত্রাবলির দর্শন শুদ্ধতার খাতিরে আলোচনার বাতাবরণ চারটি পর্বে বিভক্ত করেছি—

প্রেম যেখানে স্বপ্নাগুনের নির্ব্যাজ দাগ অনিকেত ¯্রােত রচনা করে

কাহিনির বয়ানে উপন্যাসে জটিল শব্দের মাখামাখি নেই— নেই সাহেবি চলিতরীতির পুরোনো ব্যঞ্জনা সৃষ্টির প্রয়াস বরং আঞ্চলিক উপভাষার মাত্রাদানের নতুন সৃষ্টির স্বাক্ষর চোখে পড়ে। ফালতু শব্দ-বাক্যকে অস্বীকার করে অপরিহার্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে গল্পের কাহিনি গতি পেয়েছে। উদাসীন কিংবা অনিকেত দাঁড়ি-মু-ু ছেঁটে ছড়ানো ছিটানো প্রসঙ্গ কীভাবে স্থির সত্তার বিকিরণে নতুনধারায় কথাকারের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ইমেজ তৈরি হয় তা মনের গহন আকাশে ভেসে ওঠে। কথাকারের পেছনে ছুটতে-এর উত্তর খুঁজতে ঐ বাঁশিওলার বাস্তবিক বিপর্যয় আমাদের রাষ্ট্র-সমাজকে শাসন করে। আর আমাদের রাষ্ট্রের মন-জীবন দারুণভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। মানুষের প্রবৃত্তি প্রত্যহিক স্পৃহার স্তরগুলো ধূসর এবং অবসন্ন হয়ে যাচ্ছে। সেই অবসাদের গ্রন্থিরতার টুকরো টুকরো পিপাসা থেকে প্রলাপের ঘোর চারিত হচ্ছে সমস্ত সম্পর্কের, বেঁচে থাকার আর কাহিনির ভেতর। মানুষের পৃথিবী পতিত জমি। জীবন এখানে মৃত্যুর নামান্তর। কোনো ইতিহাস নেই। সময়ও অর্থহীন। সংগ্রামের কোনো অর্থ হয় না। এই মৃত্যুর মাঝে জেগে উঠতে চাওয়ার কী ব্যতিক্রম থাকতে পারে? লেখক এখানে চরমসংকটাপন্নকে বলতে চেয়েছেন। একটা এলোমেলো পরিস্থিতির নিদারুণ চিত্রপট এঁকেছেন খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে ভিন্নধারার উপন্যাসের ভেতর। সর্পিল। ক্লান্ত। বিবর্ণ। রহস্য।

হাবৃত্তের প্রণয়কাতরতায় ডোবানো মানবিক সংরাগ

আধুনিক উপন্যাসের অনুষঙ্গ হিশেবে এখন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-দর্শন আর এনালাইটেনমেন্টের আলোক-প্রভাবে প্রভাবিত। বলাবাহুল্য সেই আবেশ ও প্রভাব বাংলা উপন্যাসে সঞ্চারিত হয়েছিলো ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবমুক্ত হবার পর আমাদের ঔপনিবেশিক শাসনের দৌলতে। প্রযুক্তির্চচার ধারাকে বেগবান করতে উপন্যাসের ভুমিকা অতুলনীয়। এই মর্মগতভাবে হায়ারার্কিমূলক; বিখ-ীভবন আর বিভেদীকরণ যার মূল ভিত্তি ছিলো। দেখা গেলো দেহ ও চৈতন্যের মধ্যে হায়ারার্কি করা হলো, চৈতন্যকে স্থান দেয়া হলো দেহ-র ওপরে। এভাবেই এই উপন্যাসে প্রকারান্তরে উচ্চতর অবস্থানে আসন দেয়া যেতে পারে— বুদ্ধিবৃদ্ধিক চর্চার কারণে। অপরাপর বৃত্তি, যেমন স্বজ্ঞা, প্রেম, ভক্তি, ভালোবাসা— এদেরকে এই উপন্যাসের কাহিনিতে করা হলো অধস্তন। এখানে র‌্যাশনালিজমের জয়জয়কার। এ দর্শন সম্প্রসারিত হয়ে ফলিত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে এদেশের স্ট্রিম। এবার সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে এনালাইটেনমেন্ট যদি মানুষের সিস্টেমকেই মানুষ বানাতে পারে না। লেখক তার বয়ানে চালচিত্রে শহরমুখি এই অবারিত জন¯্রােত, যাকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বোবাকালা ঠাউরে নিয়েছে নিজেদের শ্রেয়ত্ববোধের অধিকার। তারা নেহাতই বোবাকালা নয় যেনো টের পাইয়ে দিলো কর্পোরেট তৎপরতাসমূহ।

প্রমিতবাংলা চরিত্র থেকে মুক্তি পাইল

বিশেষ করে কাহিনির ভাষা কখন থেকে প্রমিত বাংলার রূপ পরিবর্তন করে মানুষের ভাষায় স্থান পেলো তার ইতিহাস আমরা টানছি না— মুখের ভাষা কীভাবে লেখকের বর্ণনার ভাষাতে চরিত্রবান হইল তা এই লেখকের বয়ানভঙ্গিতে লক্ষ করি। এহেন বয়ানবঙ্গির কারণেই উপন্যাসটি পাঠপ্রিয়তা লাভ করে। আমরা ভাষার বেলায় ভদ্দরলোকের রক্ষণশীল আর গরিবের বা অঞ্চলের রক্ষণশীল ভাষার পার্থক্য করে থাকি। তবে গরিবের ভাষায় গালি আর বুলির বিশেষ ফারাক দেখি না। ভাষায় এই ফারাক রক্ষণশীল ভদ্দরলোকের। এই উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ একটি বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। বিশেষত চরিত্রের সামাজিক অবস্থান ও পরিচিতি বলে দেয়, তারা এরকম ভাষাতেই কথা বলবে। কিন্তু পাঠক হিশেবে আমাকে কোথাও হোঁচট খেতে হয়নি। আর এজন্য একই পাত্র-পাত্রির মুখে মিশ্র আঞ্চলিক ভাষা শুনতে হয়েছে। এই উপন্যাসে লেখকের মৌল প্রবণতা এভাবে দারুণভাবে টের পাওয়া যায়।

স্বপ্নের সুতোর বন্ধনে না বাঁধিয়া জীবনের সমাচার তর্জমা হইল

আযাদ কালামের উপন্যাসের ভাষা বিষয়বস্তু অনুগামী। লেখক ব্যক্তিপ্রেমের অচরিতার্থকে বলতে গিয়ে জাতীয় জীবনের অচরিতার্থকেই তুলে এনেছেন অভিজ্ঞতাপ্রসূত নিজস্ব-দৃষ্টি ভঙ্গি দিয়ে। শিলার ধর্ষণ-আত্মহনন, কূপম-ূকতা আর বিচারহীনতার ফাঁকে একটা ম্যাসেজ দিতে চেয়েছেন। দেখা গেছে এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ— এ সব যদি হয় গল্পের মাংস, তবে তার অস্থি হলো অরাজকতা, সন্ত্রাস আর প্রেমের মিলনে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসের শরীর। রাজনৈতিক অস্থিরতা-সামাজিক অস্থৈর্য ব্যক্তি জীবনের চেয়ে জাতীয় জীবন অনেক বড় বেশি— এ কথা স্বীকার করে কাহিনি এগিয়েছে। লেখক আযাদ কালাম এসব প্রত্যক্ষ করেছেন স্বয়ং, এরই প্রতিফলন ঘটেছে খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে উপন্যাসে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর অপমৃত্যু বা হত্যাযজ্ঞকে তৎকালিন রাজনীতির সাক্ষ্য বহন করে।

প্রথাবিরোধী কিংবা ভিন্নধারা প্রকরণে উপন্যাসসাহিত্য যদিও তেমন এগুতে পারেনি— এ কথা ঠিক কিন্তু সস্তা জনপ্রিয়তা বেড়েছে বাজারের পণ্যের মতো। এই সস্তা পাঠকপ্রিয়তা থেকে আযাদ কালাম সরে দাঁড়িয়েছেন, তার উপন্যাসকে আলাদা করতে চেয়েছেন। তার গল্পের ঢঙ-রঙ এবং শৈলি নতুন ভাবধারার দিকে ইঙ্গিত বহন করে। বলতে হয় ইলিয়াসের সর্তক বাণীর মতো— রুদ্ধশ্বাসে শুদ্ধতার আশ্রয়ে সাহিত্যচর্চা হোক আরো সৃজনশীল এবং মানবিকশিক্ষাচেতনায়  মানুষের অন্তর্গতবোধের জায়গাটির পরিবর্তন আসুক এ প্রত্যাশা করতেই পারি। কথাশিল্পী আযাদ কালাম এই মূল্যবোধে উচ্চতর সৃজনশীলধারায় অনেকদূর এগিয়েছেন— আশা করি আরো নান্দনিক ও শৈল্পিক বাতাস তাকে নাড়িয়ে দেবে। অনুভূতিপ্রবণ সুগভীর ভাবাবেগ চিন্তার শৈল্পিক মননশীলচেতনাকে উপন্যাসিক যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তাকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। উপন্যাসের বিনির্মাণ ভাবনায় বাস্তবঘটনার রূপায়ণ ভাবনাপিপাসু এক পাঠকশ্রেণির দ্বার উন্মোচন করবে খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে সুখপাঠ্য উপন্যাসটি। মনন, চৈতন্যের মুগ্ধতার আবেশে রাষ্ট্রের অসঙ্গতির অতীন্দ্রিয়ে ধাবিত হয়ে গতিদান করেছে আযাদ কালামের অন্তর্দাহ-দর্শন অর্জিত এই সফল উপন্যাসটি।

[আযাদ কালাম ॥ খুব ক্ষতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, যুক্ত প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৮]

***********************************************

ময়ুখ চৌধুরীর পিরামিড সংসার
মির্জা আব্দুল্লাহ

দক্ষিণ আমেরিকার চিনচরোদের ‘মমি’ তৈরির ইতিহাস সর্বপ্রাচীন হলেও, ‘মমি’ শব্দটির উচ্চারণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন মিশরের কথা। মনে করিয়ে দেয় মিশরের মরুভূমি, পিরামিড, ফারাও ইত্যাদি প্রসঙ্গ। প্রাচীন মিশরীয়দের মতো চিনচরোরাও বিশ্বাস করতো, মৃত্যুতেই জীবনের শেষ নয়। আছে আরও এক জীবন। স্থান ও কালের বিশাল ব্যবধান সত্ত্বেও মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিশেষ এই বিশ্বাস থেকেই চিলি, পেরু, মেক্সিকো, মিশর, চীনসহ পৃথিবীর আরও কিছু অঞ্চলের প্রাচীন মানুষেরা মৃতদেহকে পরিণত করেছে ‘মমি’তে। তারা আত্মার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাস করতো। তাদের বিশ্বাস ছিলো, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে জীবনে তারা প্রবেশ করবে, সে জীবনের জন্য মৃতদেহকে রাখতে হবে যথাসম্ভব অবিকৃত। এই চিন্তা থেকেই ‘মমি’ সংস্কৃতির উদ্ভব। তাই ‘মমি’ হলো বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সংরক্ষণ। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনকে নির্বিঘœ ও উপভোগ্য করবার  জন্য ‘মমি’র পাশে তাঁরা নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী, ধন-সম্পদ ইত্যাদি রেখে দিতো। অবশ্য এ কাজের গুরুত্ব নির্ভর করতো ব্যক্তির মর্যাদার উপর। ব্যক্তি যত গুরুত্বপূর্ণ হবে, তার আয়োজনও হবে ততো বিশাল। ফারাওদের সমাধিতে নানারকমের প্রতীক, দেয়ালে খোদাইকৃত ছবি, ভিন্নজগতে ভ্রমণের তথ্য, নতুন জীবনের জন্য আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ দেয়া থাকতো। এমনকি দাসদাসীকেও ‘মমি’র পাশে সমাধিস্থ করে রাখা হতো। অবশ্য, ফারাওদের ক্ষেত্রেই শুধু এতোকিছু সম্ভব হয়েছে; সবার ক্ষেত্রে নয়। যেমন চিনচরোরা যেহেতু প্রধানত ছিল মৎস্যজীবী, তারা ‘মমি’র সাথে তাই দিয়ে দিতো মৎস্য শিকারের নানান উপকরণ। একান্ত সামর্থহীন মানুষেরা মৃতদেহের পাশে কিছু খাদ্যদ্রব্য অন্তত রেখে দিতো। আর ‘পিরামিড’ হলো ‘মমি’র সমাধিক্ষেত্র। বলা যায়— মৃতের আত্মার ঘর। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো, এই ঘরে আত্মা নানারূপে এবং নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। তাঁদের বিশ্বাসে, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে এই পিরামিডের ভিতরেই চলতে থাকে আরেকটি জীবন— আরেকটি সংসার। এ যেন পিরামিড সংসার। কবি ময়ুখ চৌধুরীর (জ. ১৯৫০) প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘পিরামিড সংসার’ (২০১৭)। পিরামিডের মূল বিষয় হলো ‘মমি’। মূলত ‘মমি’র জন্যই ‘পিরামিড’ ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা। তাই ‘পিরামিড সংসার’-র উৎসর্গ পত্রেও এসেছে ‘মমি’ প্রসঙ্গ : ‘এই যুগে মমিরাও চলাফেরা করে,/ এই সব মমিদের মন/ কাটা পড়া ঘুড়ির মতন’। যেন প্রাচীনকালের ‘মমি’ আর এ যুগের মানুষেরা মূলত একই বস্তু। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, এ কালের মানুষেরা শারীরিক চলিষ্ণুতার সক্ষমতায় সে যুগের ‘মমি’দের নিষ্প্রাণ জড়ত্ব থেকে মুক্ত হয়ে গেছে।

পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর প্রভাবে, মানুষের মনে আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি কখনোবা নতুন করে উদিত হয়েছে মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের চিন্তা, যা থেকে উদ্ভব ঘটেছে মমি-সংস্কৃতির। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা মানুষের এতদ্বিষয়ক চিন্তা ও চিন্তার অন্তর্লীন জটিলতার কোনো সুরাহা করতে পেরেছে কি? তাতো পারেনি। উপরন্তু, কয়েক হাজার বছরের ব্যবধান মানুষের ইহলৌকিক জীবনবাস্তবতাকে নিয়ে গেছে একক-অন্ধকার ‘মমি’র জীবনে— ‘সমস্ত দিনের শেষে জামা কাপড়ের ভাঁজ থেকে/ নিজেকে আলগা করে দেখি/ খুব একা।/ পাথরে শ্যাওলার মত পড়ে আছে মন/ পিরামিড সংসারে বেঁচে আছি মমির মতন।’ [নাম কবিতা, ‘পিরামিড সংসার’] সময় মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কেন সে পারছে না এই আত্মঘাতিমূলক অবস্থা থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে? কারণ কি এই যে, ‘প্রেম’ ও ‘মৃত্যু’র যথাক্রমে আকাক্সক্ষা ও ভীতি আর এসবের রহস্য ও ব্যর্থতা থেকে মানুষ আজও বের হয়ে আসতে পারেনি?— ‘আগুনের ছোঁয়া পেলে কাদামাটি লাল হয়ে যায়,/ পোড়া বুকে-টবে-ফুল ফোটে, লাল/আগুনের বোন যদি ছোঁয়/মমি হয়, পচন ধরে না/বেঁচেও থাকে না’। [স্পর্শপরম্পরা]

জীবনকে ভালোবেসে মানুষ মৃত্যুচিন্তা ও মৃত্যুপরবর্তী জীবনের চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে তো পারেনি, বরং উল্টোটা হয়েছে। ধর্ম তাকে একটি ধারণা দেয়, ধারণা পায় সে নিজের ভিতর থেকেও। এসব ধারণা এবং তৎজাত বিশ্বাস ও ভাবনা নির্বিশেষ মানুষকে নিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেনি। মানুষের উল্লিখিত চেতনার ভিতর সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলোর আন্তঃসম্পর্কের স্বরূপ ও প্রত্যেকের স্বতন্ত্র স্বভাব ব্যক্তিমানুষকে ভিতরে ভিতরে অস্বস্তি করে রেখেছে। একজন আধুনিক মানুষ, যিনি গুচ্ছ গুচ্ছ চেতনার ধারক, তাঁর সামগ্রিক চৈতন্য ও জীবনবাস্তবতার সংঘাত, তাকে শুধু মানুষ-সমাজ-প্রকৃতি-ঈশ্বর ইত্যাদি থেকেই দূরে ঠেলে দেয়নি, নিজের কাছ থেকেও তাকে অনেকখানি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এরূপ পরিস্থিতিতে একজন কবি, যিনি অবিরাম নিজেকে খুঁজছেন, বহির্জীবন ও অন্তর্জগতের দ্বন্দ্ব তাঁকে করে দিতে পারে টুকরো টুকরো। তিনি ভাবতেই পারেন— ‘পড়ে আছি কতকাল/খ- খ- এখানে ওখানে।’ [পুরোনো জামা] একজন সৃষ্টিশীল মানুষের চেতনায় জীবনের এসব দ্বান্দ্বিক উপাদানগুলো কী সাংঘাতিক নৈঃসঙ্গ্য ও বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি করতে পারে, এ কাব্যের কবিচেতনার স্বরূপ অনুসন্ধানে তার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

‘পিরামিড সংসার’এ কবি নিজের পরিচয় ও স্বভাব এবং বিশ্বপ্রকৃতির সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার ব্যাখ্যায় বারবার উদ্ভিদবিদ্যাকে সহায় কিংবা আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আমরা জানি, ইতঃপূর্বে ময়ুখ চৌধুরী প্রাণিবিদ্যাকেও কবিতায় প্রতিপাদ্য করেছেন। এ কাব্যের কবিচেতনায় বিচ্ছিন্নতার বোধ হয়ে উঠেছে আধুনিক জীবনের অনিবার্য নিয়তি। এ কাব্যে উল্লিখিত বোধকে ধারণ করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রচুর সংখ্যক পঙক্তি। এই বোধের ভিতরেই আমরা কবিচেতনার মৌল উপাদানগুলোর কিঞ্চিৎ সাক্ষাৎ পাবো বলে আশা করছি।

‘কপিলাবস্তুবাদ’ এ কাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। গুরুত্বপূর্ণ এ অর্থে যে, এখানে কবি নিজের সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। ‘বস্তুবাদী মন/ কপিলাবস্তুর মেঘে ভেঙে পড়ে বৃষ্টির মতন’— কবি বস্তুবাদী সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কপিলাবস্তু কী জিনিস? আর এর মেঘে তিনি বৃষ্টির মতন ভেঙ্গেইবা পড়ছেন কেন? আদ্যন্ত কবিতাপাঠ আমাদের এ ধারণাই দেয় যে, ‘কপিলাবাস্তু’ থেকে ‘কপিলাবস্তু’ বা ‘কপিলাবস্তুবাদ’ শব্দটি নির্মিত হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের কপিলাবাস্তু নগরীর রাজা শুদ্বোধন এর পুত্রই ‘সিদ্ধার্থ’ বা ‘গৌতম বুদ্ধ’। কবির মনের আকাশে কপিলাবস্তুর মেঘের আনাগোনা, এর জমাটবদ্ধ রূপ ও বৃষ্টি মতন ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ার চিত্রকল্পটি গৌতম বুদ্ধের দর্শনের কথাই আমাদের সামনে নিয়ে আসে। সমস্যা হলো, কবি ‘বস্তুবাদী’, কিন্তু বুদ্ধদেব তা নন; বরং মানুষকে তিনি মেটেরিয়ালিস্ট হতে বারণ করেছেন। এই বিপরীত চিন্তা কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ বুদ্ধের উল্লিখিত বক্তব্য কবি এখানে ধারণ বা প্রকাশ করেননি। দুঃখময় জীবনের যে উপলব্ধি সিদ্ধার্থকে গৌতম বুদ্ধ করেছে, যে দুঃখের কারণ অনুসন্ধান ও দুঃখ নিরসনের উপায় খুঁজতে খুঁজতে তিনি ভগবান হয়ে উঠেছেন, সেসব দুঃখময় তত্ত্বকথাই এখানে মেঘের মতো জমাট বেঁধেছে কবির মনের আকাশে। অর্থাৎ বৌদ্ধধর্মের ‘দুঃখবাদ’ই এখানে কপিলাবস্তুবাদ’ (শব্দটি কি হতে পারতো ‘কপিলাবাস্তুবাদ’?)। এ কবিতায় এক মুহুর্তের এক চিত্রকল্পে কবি নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলেন : ‘যখন আমার কক্ষে নিকোটিন মেঘ বাঁধা পড়ে/ যখন মাথার মধ্যে পাঁচটি মাকড়সা বোনে জাল,/ তখন এই পৃথিবীর অনাবিল কক্ষপথে হরিণেরা ঘোরে।’ আপন কক্ষে সিগারেট হাতে গভীর তন্ময়তার ভিতরে বস্তুবাদী কবির চিন্তার দ্বন্দ্ব কোথায়? ধারণা করি এই মগ্নতার ভিতরে রয়েছে— জীবনজগতে ‘শান্তি’র অবিশ্রাম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা এবং তৎজাত অশান্তি ও যাতনা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় অনুসন্ধান। নির্বাণলাভের লক্ষ্যে কীরূপে জীবনের সর্ববন্ধন থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব? ‘মার্বেল পাথরদানি থেকে/ কোথায় সফেদ শান্তি উড়ে যায়— কোন ঠিকানায়?’—এ প্রশ্ন যেমন এখানে উচ্চারিত হয়েছে; তেমনি এ জগৎ-সংসারের সর্ববিধ বন্ধনসমূহের অন্তঃসারশূন্যতাও এখানে প্রকটিত হয়েছে। পাশাপাশি, সামগ্রিক বন্ধনমুক্তির জন্য তাঁর প্রাণসত্তার অস্থির হাহাকারও এখানে ধ্বনিত হয়েছে। অবশ্য তা হয়েছে অত্যন্ত শান্তভঙ্গিতে : ‘চন্দনজলের ফোঁটা আধফোটা কার্পাসের বীজে/ সংসারের কাদামাটি—/ মাকড়সার খাদ্য হয় নিজে,/… সংসার সনেটে বাঁধা গেরুয়া পোশাকপরা হরিণের চোখে/বন্দী সব শিলালিপি সমস্ত বাঁধন খুলে উড়ে যেতে চায়।/কপিলাবস্তুর মেঘ বালিশের তুলা হয়ে নির্জন শয্যায়।’

‘চট্টগ্রাম’ ময়ুখ চৌধুরীর নিজস্ব শহর। এ শহরেই তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন গোটা জীবন। ‘পিরামিড সংসার’ কাব্যের একটি বিশেষত্ব হলো, এখানে কবি তাঁর কৈশোর-যৌবনের কিছু বন্ধু-বান্ধব ও তৎকালীন চট্টগ্রাম শহরকে নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ স্মৃতিকাতর হয়ে উঠেছেন। এ প্রসঙ্গে উত্থিত হয়েছে কিছু বুক মোচড়ানো দীর্ঘশ্বাস : ‘কে যেন বর্ষার মেঘ জমা রেখে গিয়েছিল পুরাতন বইয়ের পাতায়/ এখনও ঘরের মধ্যে বৃষ্টির মতন নামে মশারির ঘুম,/ ব্যঞ্জনবর্ণের শেষে চন্দ্রবিন্দু জেগে থাকে খোলা জানালায়।/…চলে গিয়েছিলে তুমি নীলচক্ষু ঢেউয়ের ফেনায়/ তবু কেন ফিরে এসে পুরোনো দু’আনি খোঁজো সিকি মমতায়!’ [পাথরঘাটার পদ্য] ‘ঘরদোর’ কবিতায় সুবাসিত হয়েছে বাল্যবন্ধুর জন্য নিবিড় মমতা, যে নেই এখন। বন্ধুর নিরাশ্রয় নিঃসঙ্গ ও বিশৃঙ্খল জীবনচিত্র আঁকতে গিয়ে কবি বলেন : ‘তোর জন্যে পথ চেয়ে থাকে/ বিছানাবালিশ, কাঁথা, আধ-খাওয়া জলের গেলাস।/ বোতামেরও ঘর থাকে, তোর/ ঘরদোর হলো না কিছুই।’ তবে কি তাঁর বন্ধু ভিন্ন কোনো চোখে দেখতে পাচ্ছে— প্রথাগত মানবসংসারে মানুষের নিরর্থক ঝুলে থাকা? দৃশ্যে বা অদৃশ্যে সংসার থেকে মানুষের ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়তে থাকার মতো প্রাকৃতিক বাস্তবতা? এরূপ চিন্তা চূড়ান্তে পৌঁছে গেছে ‘এবং মিলন চৌধুরী’ কবিতায়। বিগত বন্ধুকে নিয়ে তাঁর কাতরতা এখানে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎকে একাকার করে দিয়েছে। ‘দ্য মিথ অব মধুবালা’য় ময়ুখ চৌধুরী জানান, ‘মধুবালা’ মানবজন্মকে ভালোবেসে ‘মর্ত্যমানবীর ছদ্মবেশে’ নেমে এসেছিলেন এক ভুল পৃথিবীতে। তাঁর খোঁজে নীলিমার নক্ষত্রমালা জোনাকীর ছদ্মবেশে আজও পৃথিবীর অন্ধকারে ঘোরে-ফেরে। এখানে মধুবালা কোনো পার্থিব রমণী নন, ‘জ্যোতির কন্যা’; ঘুমভাঙ্গা পৃথিবীর ‘শুকতারা’। তাঁর উপস্থিতি অন্ধকে চক্ষুষ্মান করে, মৃতরা চোখ মেলে তাকায় আর জীবিতরা তো ‘অনাদি রহস্যময় সৌন্দর্যের অন্তহীন খোঁজে’ চোখ বুজে ধ্যানে চলে যায়। সুতরাং এই ‘জ্যোতির কন্যা’র জন্য কবির কাতরতাও তীব্র : ‘যখন কামিনী হয়ে প্রস্ফুটিত হলে তুমি নির্জন মহলে/রাত্রিজাগা ঘড়ির মতন—/তেমনি আছ আজও,/এখনও হৃৎপি-ে বসে ধমনীর প্রতি শব্দে বাজো।’ কবি তাঁর বর্তমানকে অতীত দিয়ে পরীক্ষা করেছেন আর সিদ্ধান্তে এসেছেন, ‘রূপ আর সুন্দরতা এক কথা নয়’। এখন রূপসীরা রঙের জৌলুস মেখে হয়ে উঠেছে ‘সাবানের মোড়ক’; ‘উন্মোচন’ শেষ হলে, যার অনিবার্য পরিণাম ‘ক্ষয়’। কবির সমকালে সৌন্দর্যের নামে চলছে ‘শরীর প্রদর্শনী’। তাই চারিদিকে শুধু ‘আগ্রাসী মাংসের ক্ষুধা, শীৎকারের ধ্বনি’। এসব শব্দদৃশ্যে কবির মনে ‘জ্বালা ধরে’, ‘জমে ওঠে লালা’। অতঃপর তিনি পবিত্র হয়ে ওঠেন, যখন দেখতে পান ‘মধুবালা’কে। শিল্প-সৌন্দর্যের মনোভূমে তাই কবি আনন্দের সাথে ধরে রেখেছেন মধুবালার পবিত্রস্মৃতি : ‘তুমিও মৃত্যুকে ভালোবেসে/ চলে গেলে, রেখে গেলে পূজনীয় স্মৃতির সম্ভার।/—তুমি নাই, তাই আরও বেশি/ বিশুদ্ধ স্মৃতির প্রতিবেশী।’

‘পিরামিড সংসার’এ ময়ুখ চৌধুরী ‘ক্রমশ লজ্জাবতী’ শিরোনামে একটি সিরিজ কবিতা রেখেছেন। ‘লজ্জাবতী’ একটি ফুল, যে সামান্য ছোঁয়ায় লজ্জায় মরে যেতে চায়। তবু ‘বেগুনি রঙের শিহরণে’ সে ‘কাঁটার প্রহরী’ নিয়ে জেগে থাকে প্রহরের পর প্রহর। কেন জেগে থাকে? সুযোগ পেলে কেউ লজ্জা দেবে বলে? না। বরং লজ্জা পাওয়ার জন্যে। সে চায়, কেউ তাকে ছুঁয়ে দিক : ‘ছোঁয়াটুকু সরে গেলে দাউ দাউ জ্বলে ওঠে আরও,/ চাপাকন্ঠে বলে— ‘সকল আগুনে হাত পোড়ে না তো!/—ছুঁয়ে দেখতে পারো।’ [ক্রমশ লজ্জাবতী ১] ‘কাটার ব্যবস্থাপনা’ যথাযথ থাকা সত্ত্বেও কবি জানান, ছুঁয়ে দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত ‘আঙুলেরা সরীসৃপ’ হয়ে ওঠতে পারে। সুতরাং পরিণামও হতে পারে ভয়াবহ। এর জন্য পরবর্তীতে কবিকে দায়ী করা যাবে না : ‘পরিণাম কী আছে কী নেই/ অন্ধকারে সব একাকার।/ এরপর জানতে চেয়ো না-/ ভোরের শিশিরে ভেজা নিহত আঙুলগুলো কার?’ [ক্রমশ লজ্জাবতী ২] এরপর এই পুষ্পরূপি লজ্জাহীনাকে আমরা দেখতেও পাই এবং তা পাই স্নানঘরে। শরীরের অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে সে এখন প্রহর গুনছে আর কামনা করছে শারীরিক সঙ্গ : ‘রাত্রির বাকল খুলে স্নানঘরে দাঁড়ালে যখন/ জলের সংস্পর্শে তুমি পল্লবিত আগুনের শিখা।/…ঘুমহীন শরীরের গলিত বাসনা-/আরেকবার ছুঁয়ে দাও, এর পর কখনো এসো না।’ [ক্রমশ লজ্জাবতী ৩] ‘লজ্জাবতী’ স্পর্শ চেয়েছে; যদিও কবি জানেন, স্পর্শ কখনোই স্পর্শ হয়ে ওঠে না, যদি না পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়। কবি আরও জানান, শারীরিক বিচ্ছেদ ছোঁয়া বা স্পর্শ রচনা করতে পারলেও, এই স্পর্শকে স্থায়িত্ব দেয়ার জন্য শেষতক চির বিচ্ছেদ, এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও যেতে হতে পারে : ‘তারপরও আলগা হতে হবে। তা না হলে স্পর্শ হবে কেন?/ বেগুনি রঙের রশ্মি বলেছে নিশ্চয়/ মৃত্যু ছাড়া কোনো ছোঁয়া চিরস্থায়ী নয়’। [ক্রমশ লজ্জাবতী ৪]  এই বিচ্ছেদ বা মৃত্যুতেই নিহিত রয়েছে ময়ুখ চৌধুরীর প্রেমের সারকথা।

‘পিরমিড সংসার’ কাব্যের দুটি কবিতায় কবি গণিকার জীবনচিত্র এঁকেছেন। এ শ্রেণির মানুষগুলোর আর্থ-সামাজিক জীবনবাস্তবতার স্বরূপ বিশ্লেষণ এই মুহুর্তে আমার আলোচ্য নয়। রূপ-যৌবনকে যারা জীবিকার একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, নারীদেহ বিষয়ক সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও এসব বক্তব্যের প্রচলিত অর্থগুলোকে যারা নিজেদের জীবনে নিরর্থক করে তুলেছে, কবি দেখিয়েছেন, তাদেরও থাকতে পারে একটি থরোথরো প্রেমিক-সত্তা। সেই সত্তার স্বরূপ এখানে তিনি উদ্ঘাটন করে দেখিয়েছেন। মানুষের হৃদয়ের প্রেম ও এ প্রেমের বিশুদ্ধতা-পবিত্রতায় বেশ্যার বিনষ্ট শরীরের মালিন্য, আমরা এখানে দেখেছি, আঁচড়টুকু পর্যন্ত কাটতে পারেনি। ‘প্রেম’, ‘শরীর’, ‘মন’  ইত্যাদির সাপেক্ষতা ও নিরপেক্ষতার বোধ এখানে ভেঙ্গেচুরে গেছে। ‘নষ্ট মেয়ে কবিতাও মন দিয়ে থাকে’ কবিতাটি চর্যাপদের শব্দ ও ভাষাভঙ্গিতে শুরু করে ময়ুখ চৌধুরী একজন গণিকাকে ‘কবিতা’য় প্রতীকায়িত করেছেন। রেললাইনের দুপাশের বস্তির আশেপাশে আলো-অন্ধকারে এরা সাপের মতন ফনা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। খদ্দের এলে ‘শাদা কাগজের মতো ভাঁজ খুলে শুয়ে পড়ে দেহ,/সেখানে লিখিত হয় আদিম কবিতা।’ তারপর ‘ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মুখ’,‘তৃপ্তকাম দেহ’ নিয়ে ফিরে গেলে, ‘পাটির ওপর থেকে নেমে আসে কাব্যের শরীর’। এভাবেই ‘কবিতা’ নাম্মী স্বৈরিণী ‘সমস্ত তরঙ্গ তার মেলে দেয় যার তার কাছে’। আরেক রূপোপজীবিনী ‘ছহি বারাঙ্গনাকাব্য’ কবিতায় সেই খদ্দেরের প্রেম-প্রত্যাশী, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা যার তীব্র। ‘শ্রেণিদ্বন্দ্ব’ সচেতন সেই ‘অন্য কিসিমের পোলা’ রেগে গেলে বলে— ‘পাহাড় মুতলেই নাকি নদী হয়, ধুতুরা ফুলের গর্তে বিষ,/আসমানি চান্দের পেটে হারামির বাচ্চা দেখা যায়,/ ভদ্রমহিলাও চায় মনে মনে গু-াপাখি মারে যেন শিশ।/ ঘর থাকে ঘরে আর ঘরণি যে কোনখানে থাকে!/ স্বামীরে জড়ায়া বুকে অন্য পুরুষের ছবি আঁকে।’ স্বৈরিণী তার এমন দুর্গতির জীবনেও এরূপ উদ্ভট এক মানুষের প্রেমের জন্য পাগলপারা। মেয়েটি তার (ছেলেটির) কথা শুনে আর মনে মনে জাল বুনে। জালের ভিতরে ঘাই মারে ‘দূরের বেগানা মাছ’ আর সে থরথর করে কাঁপে। ‘শিমু’ নাম্মী এই স্বৈরিণীও বুঝতে পারে— শরীরই মানুষের সব নয়। এ কাব্যের শেষ কবিতায় [মৃত্যুদৃশ্য] কবি দাবী করেছেন, মৃত্যুর পরে পৃথিবী ও এর মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক নিঃশেষ হয়ে যাবে না। এর জন্য যে সক্ষমতা বা শক্তি, তা তিনি অর্জন করেছেন ভালোবাসার কাছ থেকে। তাঁর বিশ্বাস, শরীর পচে গলে যেতে পারে; ভালোবাসা তাঁকে ঠিকই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে। প্রেম তাঁকে মৃত্যুর পরেও অমর করে রাখবে : ‘তখন আমি জানতে চাইবো তার কথা/ যে আমার পাশে শুয়ে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।/…তোমরা তাকে দেখতে পাচ্ছ—/ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যে আমার মরদেহ দেখতে আসেনি?/ আমি আজও জীবিত—/ তার চোখে!’ অর্থাৎ ভালোবাসার চোখে প্রকৃতি কখনো মৃত্যু আঁকতে পারে না। সমস্ত ধ্বংসের পরেও তাই প্রেম অক্ষত থাকে— থাকে অবিনশ্বর। আমার মনে হয় না, এ বক্তব্য শুধু ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’ পঙক্তিটির অর্থদ্যোতক। ‘পিরামিড সংসার’ পদবন্ধের অর্থের ভিতরেও উল্লিখিত বক্তব্যের অর্থ নিহিত থাকতে পারে।

[ময়ুখ চৌধুরী ॥ পিরামিড সংসার, বাতিঘর, চট্টগ্রাম, ২০১৭]

***********************************************

ধা রা বা হি ক  র চ না

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব
সংগীতের সমাজতত্ত্ব ৮
মুহাম্মদ হাসান ইমাম

……………………………………………………………………….

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ্য করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। চিহ্নসম্পাদক]

Lawrence kramer,

Musical meaning,

Toward Critical history,

University Of Californiya press, londn, 2002

আজকের দিনে সংগীত সম্পর্কীয় চিন্তার মুখ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে সংগীতের অর্থ। সংগীতের কোন অর্থ আছে কিনা, থাকলে তা কি বা কাদের জন্য। সংগীতের অর্থ ও ব্যক্তিক বিষয়ীনিষ্ঠতা, সামাজিক জীবন এবং সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের সম্পর্ক এখানে চলে আসে। এসব প্রশ্ন আমাদের অনুভূতি ও বিভিন্ন বিতর্কের অনুপ্রেরণা দেয়। যার ফলে সংগীতের অর্থকে নতুনভাবে আদ্যপান্ত যাচাই করার সময় এসেছে। আর এই আলোচনায় কি ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে এবং কিভাবে তাদের উত্তর প্রদান করা হচ্ছে দুটোই দেখার বিষয়। সংগীতের স্বাভাবিক ইতিহাস জুড়ে অর্থকে শক্তিশালী অপেক্ষক বিবেচনা করা যায়। এবং সংগীত কোথায়, কিভাবে, কখন শ্রুত হলো তার পেছনে সংগীতের অর্থ একটি অনিবার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

ক্স            রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন ইউরোপীয় শিল্পীরা নিজেদের জন্য গায়, আর ভারতীয় শিল্পীরা শ্রোতাদের জন্য সংগীত পরিবেশন করেন। ক্র্যামার কিছুটা এই অর্থেই ইউরোপীয় সংগীত শিল্পকে আত্মমুখীন শিল্প বলেছেন। সামাজিক অনুষ্ঠান নাটক বা প্রথা পার্বনের উদ্দেশ্যে সংগীতের ব্যবহার অনেক কম। ইউরোপের বাইরে সংগীতের চরিত্র ও ধারণা সময়ের সাথে সাথে শ্রোতার অনুকূলে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ইউরোপের আত্মমুখীনতার সাংগীতিক অর্থ যে আত্মতুষ্টিমূলক অভিধা ধারণ করে তা সংগীতকে একটি আদর্শায়িত, ঐক্যবদ্ধ ধারণা ও কতিপয় ব্যতিক্রম প্রদান করেছে যা নতুনের আবির্ভাবকে আত্মমুখীন নন্দনবোধের তাড়না প্রতিরোধ করে এসেছে। এর একটি সুবিধাজনক দিক হলো সংগীত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রদান করেছে। এছাড়া সংগীতকে একটি স্বয়ম্ভূ শিল্প হিসেবে দেখার চেষ্টা চলেছে। তবে সংগীতকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে ভাষা, চিত্রকল্প ও অন্যান্য বিষয়ের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা চলেছে। তবে সংগীতের এই অচলায়তনও সংকলন ও শ্রবণের ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা নিয়ে বিতর্ক নয়। বরং বিতর্ক শুরু হয়েছে আমাদের সংগীত শ্রবণ প্রবণতা নিয়ে তবে সংগীত সংকলন ও শ্রবণ উভয় নিয়েই বিতর্ক রয়েছে।

ক্স            পশ্চিমা  বিশ্বের সংগীতের পরিবর্তনের ধারা লক্ষ করলে যা চোখে পড়ে তা হলো সংগীতের অর্থ সংগীতের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করার প্রবণতা এসেছে অর্থাৎ সংগীতের অর্থ বোঝার ব্যাপারটি সংগীত দিয়েই বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক ধরনের সংগীতের বিরোধপূর্ণ ধারা ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তিত হয়ে এই প্রবণতায় পর্যবসিত হয়েছে। অর্থাৎ স্বয়ম্ভূ সংগীতের উপস্থাপনা বিশ্বজনীনতা সংগীতের স্ব-উপস্থিতি এবং সংগীতের স্ব-মহিমা গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন কালের সংগীতের গণ ও বিভক্তি স্বকীয়তা এবং বিশেষ অর্থের বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিও গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চস্তরের সংগীত উচ্চস্তরের পরিপ্রেক্ষিতকে আধুনিক পশ্চিমা সংগীতে গুণগতভাবে বিবেচনা করা হয়। এখানে সংগীতটি কিভাবে শ্রবণ করা হলো সেটি গৌণ বিষয় থেকে যায়। সংগীতের বিভিন্ন ধারার বৈপরীত্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বাছ-বিচার করা হয়না। সংগীতের মধ্যে আবেদনের প্রকাশ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করে। শ্রোতাদের কাছে বিশেষ ধারার সংগীত বিশেষ ঐতিহাসিক কাঠামোয় কতটা প্রকাশিত হচ্ছে এবং সংকলিত হচ্ছে সেটি বড় কথা। সংগীতের নিজস্বতা ও এ বিষয়ে যাবতীয় আকস্মিকতার সম্মিলন ত্রুটিহীনভাবে দেখা হয়। এখানে সুষ্ঠুতা বা চতুরতা এমনকি লিখিত বা অলিখিত ব্যপারগুলো যেমন সক্রিয় বিবেচনার দাবি রাখে না। সাম্প্রতিককালে সংগীত সম্পাদনের ক্ষেত্রে গায়কের অঙ্গসঞ্চালনও দৈহিক ভাষার বিরাট সম্মিলন লক্ষ করা যায় একে সেদেশের শ্রোতারা তাদের সামাজিক জীবনের অন্তরঙ্গতা ও দেহ ভাষা দিয়ে সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে। অঙ্গসঞ্চালন ও দেহভাষার ক্ষেত্রে তারা অনেক সময় আচার প্রত্যক্ষণের শ্লীলতাকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সংগীত সম্পাদনের ক্ষেত্রে গায়কসত্তার এই অতিরিক্ত সম্ভারকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। কখনো কখনো ব্যক্তির সাহসিকতা, ভালবাসার ক্ষুধার্ততা ব্যথা ও লিপ্সা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে লক্ষ করা যায়। এতে করে আমরা গায়কের উপলদ্ধি বলেই মেনে নিই। সামাজিক কোন ন্যায়বোধ বিবেচ্য হয়না। মোটকথা সংগীত সাধনের ক্ষেত্রে গীতিকার বা গায়ক যে অর্থ প্রকাশ করে সেটি চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা হয়।

ক্স            সংগীত আমাদেরকে নিকটবর্তী করে যা অন্য কোন মাধ্যম সে অর্থে পারেনা। আধুনিক পশ্চিমা সংগীত গভীরতা ও উচ্চতার মধ্য দিয়ে সচরাচর আমাদেরকে নিকটবর্তী করে। যাকে তত্ত্ববিদরা সাবজেক্টিভিটির ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নির্মাণ বলেছেন।১

  • 1The claim here is that both of these association are grounded in the iconic relationship- part symbol, part homology- between the purely musical and musically meaningful on, the one hand, and the purely existential and contingently realized on the other. Posing the question of musical meaning, and above all posing it in and through music, in the lived experience of works, styles, and performance, has given music of many kinds a substantial share in the diverse, conflicted formation of subjectivity in the modern era.

ক্স            সাবজেক্টিভিটির ক্রিয়াশীলতা সত্ত্বেও আমরা শুদ্ধ ও ফলিত সংগীতের বিরোধপূর্ণ আবহে উত্তীর্ণ হতে পারে নি। একদিকে সংগীত বাতাবরণ সৃষ্টি করছে, আমাদেরকে সহচর্য দিচ্ছে, কাহিনী দিচ্ছে সক্রিয়তা ও নিস্ক্রিয়তা দিচ্ছে, খাবার ও পানীয় দিচ্ছে এমনকি যৌনতা ও মৃত্যু দিচ্ছে। অন্যদিকে যাদেরকে কাছে টানছে বা যাদের সাথে মিশ্রিত হচ্ছে তারা সংগীতকে সম্পূর্ণভাবে প্রলুব্ধ করতে পারেনা। সুতরাং সংগীত যাদেরকে নেয় তাদেরকে যেমন দূরে রাখে সেরকম তারাও সংগীতের মর্মমূলে আসতে পারে না আর সে কারণেই সংগীত নিজস্ব গুণেই অস্তিত্বমান।সংগীত আমাদের ইন্দ্রিয়ে ও স্মরণে ভাস্বর থাকে। সংগীতের এই সীমাহীন বিয়োজন প্রবণতাকে বলা হয় ‘প্যারাডাইম অব অটোনমি’। এটি শুধু বর্তমান শিল্পের বৈশিষ্ট্যের মতই নয় বরং বিষয়ী হিসেবে গড়ে ওঠার ধরনও বটে। একারণেই সম্ভবত প্রথাগত সংগীত শ্রবণী আমাদেরকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে এবং স্পর্শ করে। এই অর্থে এই সংগীতকে আত্ম-আন্দোলিত এজেন্সী বলা যেতে পারে। Musical affect, expression, and association become pure forms of self-apprehension; music is known by and valued for its “transcendence” of any specific meanings ascribed to it; identity seeks to become substance in music, even though music, being more event than substance, continually eludes this desire in the act of granting it.২তবে সংগীত যেহেতু সার্বিক স্বায়ত্তশাসন নিয়েও সামাজিক সম্পর্কের নিয়ন্তা সেরকম শ্রোতারাও সংগীতের অর্থকে সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোকেই দেখে থাকে। সংগীতকে সামাজিকভাবে অর্পিত অর্থ প্রদানের মাধ্যমে আমরা সংগীতের সমাজ সম্ভাব্যতাকে প্রাণবন্ত করি। দৃষ্টিগ্রাহ্য বাচনিক বা আচরণগত, যাই হোক না কেন সংগীতকে আমরা স্বীকৃতি দিয়ে থাকি।

ক্স            গত দুইশতক ব্যাপী সংগীতের স্বায়ত্তভুবন ও সহযোগী ভুবন (কন্টিনজেন্সি) সংগীতের বোধনকে সংজ্ঞায়িত করে আসছে। স্বায়ত্তভুবন মূলত উত্তমর্ণ বিবেচিত হয়ে আসছে। অর্থাৎ সংগীতকে সংগীত হিসেবেই আমাদের বোঝা প্রয়োজন। যদি আমরা সংগীতের স্বায়ত্তভুবনকে অন্য কিছু বলার ক্ষমতা মনে করি। সংগীত অন্যকিছুর বা পরিস্থিতির অধীনস্ত নয়। সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক  জৈবনিক, যৌন এবং অন্যকিছুর শরণাপন্ন ভাবার অর্থ একে ‘কার্টুনিস্ট’ বাস্তবতার শামিল করা। জ্ঞান ও অর্থকরণ পরিস্থিতিকে ব্যক্তিগত অনুভূতি দিয়ে ব্যাখ্যা করার অর্থ দাঁড়ায় পারিপার্শ্বিকভাবে সংগীতের স্বায়ত্তভুবনের অধীনস্ত করা। শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়তো এই ব্যাপারটি সত্য, সংগীতের মতাদর্শগত ঐতিহাসিক ও ক্রিয়াগত বিষয়ের গুরুত্ব তার স্বায়ত্তভুবনকে আক্রান্ত করতে পারে এমনটা লেখক বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন,

  • , I want to take autonomy seriously by finding us indispensable place in the network of indispensably contingent practices.3

 

David Beard and Kenneth Gloag,

Musicology: The Key Concepts,

Routledge, London. 2000

ক্স            সংগীত ও সংগীতবিজ্ঞান দুটি আলাদা বিষয় এবং দুটি আলাদা প্রত্যয়। সংগীত একটি ব্যবহারিক কর্মকা- যার নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে কিন্তু সংগীতবিজ্ঞান সংগীত সম্পর্কে অনুসন্ধান বিশ্লেষণ এবং পঠন পাঠনের প্রক্রিয়া, সংগীতবিজ্ঞান তার নিজস্ব প্রত্যয়ের মাধ্যমে নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে সংগীত নিয়ে আলোচনা করে। সুতরাং সংগীতবিজ্ঞানকে বলা যায় সংগীত নির্ভর একটি অনুধ্যায়। সংগীতের ইতিহাস যেমন বিস্তৃত সংগীতবিজ্ঞানের ইতিহাস সে রকম স্বল্পদিনের। সংগীতবিজ্ঞানের স্থান সংগীত রচনা ও সংগীত সম্পাদনের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। শিল্পরূপে সংগীত এবং এই শিল্পের পরিপ্রেক্ষিত সংগীতের তাত্ত্বিক ধারণা এবং সমালোচনামূলক অনুধ্যানে আগ্রহী। সংগীত সংকলকরা তাদের সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভাবিত থাকেন এবং তাদের এই সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া অন্যদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে। তবে সংগীতকারদের সম্পর্কে এমন অনুধান ও আন্তঃক্রিয়া সংগীতবিজ্ঞানে যথেষ্টভাবে এবং যথার্থভাবে উঠে আসে না। সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে সংগীত ও সংগীতকারের অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার ধারণা লাভ করা যেতে পারে। যে প্রেক্ষাপটে সংগীতকার ও সংকলকরা তাদের সৃষ্টি হিসেবে সংগীত উপহার দেন সৃষ্টিশীল পারিপার্শ্বিকতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিম-ল অনুধাবণের ও বিশ্লেষণের যথেষ্ট দাবিদার। This broad conception of musicology is incontrast to the narrower focus of specific aspects of musicological activity.4

ক্স            সংগীতবিজ্ঞানে প্রথম প্রবন্ধকার এ্যাডলার সংগীতের ঐতিহাসিকও সংস্থানিক মাত্রাগত দিকে ব্যবধান প্রদর্শন করেন। ঐতিহাসিক দিকটি দেশকাল পর্যায়ভেদে সংগীতের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে আর অন্যদিকে সংস্থানিক দিকটি সংগীতের অন্তঃর্নিহিত গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যাবলি তুলে ধরে যেমন- সমিল ও সমতা। এ্যাডলারের পরে সংগীততাত্ত্বিক কর্মকা- এই বিভাজন অনুসরণ করে এসেছে। সংস্থানিক বিভাগ সংগীত বিশ্লেষণ এবং হারমান টোনালিটি ও ফর্ম সম্পর্কিত তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর অভ্যুদয় জন্ম দেয়। এ্যাডলারের বক্তব্য কিছুটা আধাবৈজ্ঞানিক ছিলো একারণেই যে সে সংগীতের বিবর্তনে যৌক্তিকীকরণ (ৎধঃরড়হধষরুধঃরড়হ) ও প্রত্যক্ষবাদের (চড়ংরঃরারংস) অনুপ্রবেশ ঘটান এছাড়া সংগীতবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিত বিচারে সাধারণভাবে বস্তুনিষ্ঠতার প্রয়োগ করেন। বর্তমান লেখক এ্যাডলারের বিভাজনকে আরো বিস্তৃত করে লোকসংগীতবিজ্ঞান, জ্যাজ এবং জনপ্রিয় সংগীত সংগীতের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেন। বর্তমানে অবশ্য সমগ্র সংগীতভুবনই সংগীতবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে।

ক্স            সংগীতবিজ্ঞানের একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক বিবরণ হতে পারে সংগীতের স্বভাব বিষয়বস্তু ক্রিয়া যা প্রাচীন গ্রীসে উৎপত্তি লাভ করে। পরবর্তীতে সংগীত সম্পর্কীয় রচনা মধ্যযুগে ও রেঁনেসার সময় দেখা যায়। আঠারো শতকের দীপ্তিযুগে জ্ঞানের যৌক্তিকতার উপর গুরুত্ব দেয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্সে সংগীতের মর্যাদা ও অবস্থান অন্তর্ভুক্ত হয়। আঠারো শতকের চিন্তা-ভাবনা পরবর্তীতে সংগীতের প্রকৃতি নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়কে দার্শনিক অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত করে। ঊনিশ শতকের রোমান্টিসিজম ইতিহাসবাদ ও নন্দনতত্ত্বকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করে। রোমান্টিসিজম সাংগীতিক উপলদ্ধির সাহিত্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক অনুধ্যানকে উচ্চকিত করে। বিশ শতকের শুরুতে আধুনিককতাবাদ সংগীতের দূরবর্তী বিশ্লেষণের বিকাশ যেমন ঘটিয়েছে তেমন বিভ্রমও সাধিত করেছে। তবে বলা হয়ে থাকে আধুনিকতাবাদ সংগীতবিজ্ঞানের সুষ্ঠু পঠনপাঠনকে যৌক্তিক রূপ ধরার চেষ্টা করে।

ক্স            উপর্যুক্ত ঐতিহাসিক বিকাশ একটি একরৈখিক বর্ণনা। স্তর থেকে স্তরে উত্তরণের প্রগতি এখানে ধরা পড়েছে এ্যাডলারকে আশ্রয় করে। এই ঐতিহাসিক বিকাশ ডিকন্সট্রাকশনের জন্য পরিপক্ব। এই ঐতিহাসিক বর্ণনা তথ্যসমৃদ্ধ হলেও তা অতি সারল্য ও উত্থান-পতনের বর্ণনা দেয় না। এবং সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যকে চিহ্নিত করে না। বরং জটিল পরিক্ষেপ তুলে ধরে। সাময়িককালের সংগীতবিজ্ঞান নিজস্ব প্রত্যয় সহযোগে পাঠককে আরো সূক্ষ্মদর্শী ধারণা দিতে পারে। গ্লোগ আমাদের সাংগীতিক অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের আলোচনা তুলে ধরেন। যেখানে সংগীত এবং সংগীতিবিজ্ঞান উভয়ই প্রতিফলিত হয়েছে। সুতরাং জ্যাজ এর প্রসঙ্গ অথবা জনপ্রিয় সংগীতের বিভিন্নতা পশ্চিমা শিল্পে ও সংগীতের ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেয়। বিথোভেন, বার্ট হুইসেল (ইরৎঃ ডরংঃষব), কোলট্রেন (ঈড়ষঃৎধহব), বিল ফ্রিসেল (ইরষষ ঋৎরংংবষষ)এবং কর্নারশপের মতো বিখ্যাত সংগীতকারদের মধ্যে তেমন বিরোধিতা বা সংঘাত লক্ষ করা যায় না। বার্থ, দেরিদা, ডালহস এবং কারম্যানের আলোচনাকেও এখানে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যেহেতু গ্রন্থ সাংগীতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহের বিভিন্নতাকে তুলে ধরে তাই এদের অন্তর্গত সামঞ্জস্য প্রাধান্য পেয়েছে। অনেক সাম্প্রতিক প্রত্যয় যেমন উত্তর-কাঠামোবাদ ও উত্তর-আধুনিকতাবাদ দেরীতে হলেও সংগীতবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকে সমৃদ্ধ করেছে।

ক্স            কনসেপ্ট ও কনটেক্সট-এর মধ্যে পার্থক্যজনিত সমস্যা রয়েছে। স্টাইল যেমন সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণে সংগীতবিজ্ঞানের ডিসেকোর্সের আলোচনায় এসেছে এবং পরিমাপক হিসেবে সংগীতবিজ্ঞানের অনুসন্ধানে সাহায্য করেছে। স্টাইল বা সংগীত শৈলী একটি ভিন্নতর অনুশীলন যা স্তর ভিত্তিক সংগীত ইতিহাসের আলোচনা থেকে ভিন্ন। ধ্রুপদী অথবা বারক স্টাইল বিশেষ কনটেক্সটকে অনুধাবনের চেষ্টা করে। সে কারণে গ্লোগের আলোচনায় অপরিহার্য প্রত্যয়সমূহের ব্যবহার রয়েছে। সমসাময়িককালের সংগীতবিজ্ঞানের আলোচনায় যথেষ্ট উপযোগী অংশ হিসেবে এসেছে। গ্লোগ বলেন, Musicology has undergone dramatic changes since the 1980s. In writing this book we became highly aware of a before and after effect, in which a certain, shift in musicological discourse became a recurrent feature. We try to avoid this as a recurrent model and perhaps also to avoid the temptation to over-interpret or over-dramatize this situation. Nevertheless, the essential fact is that what constitutes musicology now is very different from how it might have looked in the 1960s or 1970s. It is also important to reflect upon the fact that these shifts occur in parallel with the broadening of musical repertories that are seen as being available for musicology. But what came before and what came after? What is the dividing line, and is it real or imaginary? কারম্যান তাঁর গ্রন্থে সংগীতবিজ্ঞানের বিভাজনের নতুন রূপরেখা প্রদান করেছেন। এখানে তিনি ফর্মালিজম ও পজিটিভিজম সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং সংগীতবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে এদের অবদান সংজ্ঞায়িত করেন। কারমান তার আরেকটি প্রবন্ধে সংগীতবিজ্ঞানের বিশ্লেষণের সমস্যা, মতাদর্শগত প্রকৃতি এবং বিশ্লেষণ ও অর্গানিসিজমের সম্পর্ককে ‘রুলিং ইডিওলজি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।৫ সাংগীতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অতি মানবিকতাকে কারমান অগ্রাহ্য করেছেন তবে কারমানের লেখাগুলো পরবর্তীতে সংগীতবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে এবং নব্য সংগীতবিজ্ঞানের উৎপত্তি ঘটায়। পরিশেষে গ্লোগ বলেন যে, সংগীতবিজ্ঞান সূক্ষ্মদর্শী এবং অপ্রত্যক্ষবাদী বিজ্ঞান যা ইন্টারপিটিশনের উপর বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই বিজ্ঞান আন্তঃশাস্ত্রীয়। সংগীতবিজ্ঞানকে বিভিন্ন ধরনের সংগীত নিয়ে গবেষণা করতে হবে এবং তার জন্য প্রয়োগযোগ্য নতুন নতুন প্রত্যয়ের বিকাশ সাধন করতে হবে যাতে করে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানটি দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে।

ক্স            সংগীতকে পরম বা অনপেক্ষ হিসেবে চিন্তা করার প্রবণতা রোমান্টিসিজম থেকে আজ পর্যন্ত সমানতালে চলছে। সংগীতের সামাজিকতার বিপরীতে একটি স্বয়ম্ভূসত্তা হিসেবে সংগীতকে চিহ্নিত করার প্রবণতা দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সংগীতবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রকট। দার্শনিক হার্ভার ও সমালোচক হফম্যান ঊনিশ শতকের রোমান্টিসিজমের সময় সংগীতের এই অ্যাবসলুট শব্দটি প্রথম চয়ন করেন। পরবর্তীতে রিচার্ড ওয়েগনার দর্শন শাস্ত্রে ও সংগীতে এর প্রয়োগ শক্তিশালী করেন। অবশ্য তিনি যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে শব্দটির প্রয়োগ দেখান কারণ যন্ত্রসংগীত নিজের ছাড়া আর কারো সাথে সম্পৃক্ত নয়। যন্ত্রসংগীতকে অনেক সময় বর্ণনাধর্মী সংগীতের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে বলে মনে করা হয়। ভিয়েনা সার্কেলের দর্শনবিদ এডুয়ার্ড হ্যান্সলিক ওয়েগনারের সংগীত বহির্ভূত মাত্রাকে আক্রমণ করেন যদিও বিশুদ্ধ অনপেক্ষ সংগীতের ধারণা ছাড়া নান্দনিক অটোনমি এবং সংগীতের ফর্মালিস্ট বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। রোমান্টিসিজমের প্রেক্ষাপটে হফম্যান বিথোভেনের যন্ত্রসংগীতের ধারণা তুলে ধরেন,When music is spoken of as an independent art the term can properly apply only to instrumental music, which scorns all aid, all admixture of other arts, and gives pure expression to its own particular nature. It is the most romantic of all arts- one might say the only one that is purely romantic.6

ক্স            স্বাধীন শিল্পের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই সংগীতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় এবং যন্ত্রসংগীত ও নন্দনতত্ত্বে তা অত্যধিক মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়। ওয়েগনারের মতে, অ্যাবসলুট সংগীতের ধারণা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তিনি নিজে গীতিনাটকের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিবেচনা করেন যেখানে সংগীত এবং সংগীত বহির্ভূত বিষয়ের বা জগতের চূড়ান্ত সম্মিলন লক্ষ করা যায়। তবে বিথোভেনের নবম সিম্ফনির প্রেক্ষাপটে ওয়েগনার তার ধারণা কিছুটা পরিবর্তন করেন। এক সময় তিনি বলতে বাধ্য হন যে অ্যাবসলুট সংগীতের সীমানা ভেঙ্গে পড়ছে। বিথোভেনের নবম সিম্ফনিটি পাঠ ও কণ্ঠের আশ্রয় নিলে ওয়েগনার সংগীত ও ভাষার সংশ্লেষণ মডেল তুলে ধরতে উৎসাহ বোধ করেন। ওয়েগনার যেসব বিষয়ের অনুপস্থিতির জন্য সংগীতের অ্যাবসলুট ভাবার অবকাশ পেয়েছিলেন কিন্তু অ্যাবসলুট সংগীতের সমর্থকরা এসব বিষয়ের অনুপস্থিতিকেই অ্যাবসলুট সংগীতের শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করলেন। জর্মন সংগীতবিজ্ঞানী কার্ল ডালহাউস অ্যাবসলুট সংগীত সম্পর্কে বলেন, The idea of ‘absolute music’-as we may henceforth call independent instrumental music … consists of the conviction that instrumental music purely and clearly expresses the true nature of music by the very lack of concept, object, and purpose.7.৭ বিভিন্ন বাধা ও বিতর্ক সত্ত্বেও ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ও অ্যাবসলুট সংগীতের ধারণা জর্মন সংগীত সংস্কৃতিতে তার অবস্থানটিকে রাখে তবে এই প্যারাডাইম নতুন ধরণের ব্যাখ্যাকে গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে। অ্যাবসলুট সংগীতের ধারণা পরবর্তীতে আধুনিকতার উপরেও বর্তায়। বিশেষত নন্দনতত্ত্বের বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে।

ক্স            নন্দনতত্ত্ব একটি সাধারণ প্রত্যয় যা সংগীতসহ বিভিন্ন শিল্পের দার্শনিক অনুধ্যায়। সংগীতের নন্দনতত্ত্ব মৌলিক বিষয় সম্পর্কে কতগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করে, যেমন সংগীতের প্রকৃতি কি, সংগীত বলেতে কি বুঝায়, সংগীত সম্পর্কে ব্যক্তির অবস্থান ও বিশ্বাস নন্দনতত্ত্বের মধ্যে পড়ে। কোন নির্দিষ্ট বিশ্বাস ও ধারণার আলোকে সংগীতকে অনুধাবণ করতে গেলে মতাদর্শের প্রভাব এসে পড়ে যেমন মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্ব সংগীতের প্রকৃতি সম্পর্কে দার্শনিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিরীক্ষার ইতিহাস অবশ্যই দীর্ঘ। প্লেটো ও এ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে বোমগার্টেন পর্যন্ত বিস্তৃত। নন্দনতত্ত্ব প্রকারান্তরে আমাদের শিল্প দর্শন শিল্প পঠন ও শিল্পশ্রুতিকে সম্পৃক্ত করে। সেদিক থেকে বিবেচনা  করলে নন্দনতত্ত্ব ইন্টারপিটিশনের পর্যায়ে পড়ে। এর অর্থ হলো যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের পার্থক্যকে প্রয়োগ করা। সংগীতবিজ্ঞানী ওয়েন বোমান বলেন, Kant explores the distinctive characteristics and grounds for judgement of beauty from four perspective, or four ‘moments’ : their quality, their quantity, their relation, and their modality. The quality of aesthetic judgements is he says, disinterested. Their quantity is, though conceptless, universal. Their relation is purposive (while strictly speaking, purposeless). Ant their modality is exemplary.৮ নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে পূর্ব ধারণা একটি ভ্রমাত্মক প্রচেষ্টা কোন শিল্পকে দেখা বা শোনার আগেই ভালো মন্দের ধারণা গ্রহণ করা এবং দেখা বা শোনার পরে তা প্রয়োগ করা মোটেও নন্দনতাত্ত্বিক অভীক্ষা নয়। এছাড়া নন্দনতাত্ত্বিক বিচার ব্যক্তিগত না হয়ে সামাজিকভাবে স্থাপিত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার করা। কান্টের মতে শিল্প বিশ্বজনীন হতে পরে যার অর্থ হলো শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষণ নয় বরং সাধারণ ও সমষ্টিগত অনুধাবন। সুতরাং সর্বজনীন সৌন্দর্যের ধারণা বিষয়টির বিচারবোধকে পেরিয়ে যায়। তবে সর্বজনীনতার কান্টীয় যুক্তি প্রেক্ষাপটে বলা যায় শিল্প একটি সামাজিক প্রত্যয়। শিল্পীর অভিজ্ঞতা ব্যতীত যেমন শিল্প বাস্তব হতে পারে না তেমনি নান্দনিক বিচারবোধও দেশ-কালের ঊর্ধ্বে নয়। যে সংগীত যে কালে, যে দেশে, যে শিল্পীর সৃষ্টি তাকে বিচার করার সময় শ্রোতাকেও শিল্পীর উপলদ্ধির সাথে একাত্ম হতে হয়। সুতরাং অ্যাবসলুট শিল্প বলতে যে স্বয়ম্ভূ শিল্পের কথা ভাবা হয় তার সমাজ-বিচ্যুতি ততটা গ্রহণযোগ্য। এভাবে প্রতিটি শিল্পের আলাদা আলাদা বিচার করলে শিল্পীর উপলদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও প্রকাশের মধ্যে যেমন সমাজের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়- সেটি নন্দনতত্ত্বের বিচারেও শিল্প সামাজিক ও বাস্তবিক তাৎপর্য বরণ করে।

ক্স            সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্ত অল্টারিটি বা বিকল্প ধারণার ব্যবহার করেন। অল্টারিটি মূলত বিভিন্নতা ও বৈসাদৃশ্য বুঝায়। হেগেলের আইডেনটিটির বিপরীতে ভিন্নতার ধারণা সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধারা সৃষ্টি করে। রেস, এথনিসিটি, জেন্ডার, ক্লাস ইত্যাদি শব্দগুলো বৈসাদৃশ্য বোঝার ক্ষেত্রে অনেক বেশী প্রায়োগিক। ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী গ্রামসী সাবলটার্ন গ্রুপ বলতে প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যশীল বুর্জোয়া গোষ্ঠীর বিপরীতে অবস্থিত নিম্নবর্গের ধারণাকে তুলে ধরেন। সংগীতবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অল্টারনিটির ধারণায় লোকসংগীতবিজ্ঞানকে অপশ্চিমা সংগীতের ধারণাকে তুলে ধরতে ব্যবহার করেন। বোলম্যান এ প্রসঙ্গে বলেন, Insisted that the hermeneutic [see hermeneutics] potential of a music must lie in that music’s uniqueness, in its bearing no relation whatsoever to any other music, least of all to western music …. A canonic reversal therefore occurred, in which the true music of the other was Western art music… This was less a matter of rebelling against the canon of Western art music than of tuning to the rather more numerous and more enticing canons of non-Western music.9.৯

মিউজিকোলজি থেকে এথনোমিউজিকোলজির ধারণা ক্রমান্বয়ে আমাদেরকে সংগীতের সমাজ সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে অবহিত করছে। সাংগীতিক অটোনমি একটি বুর্জোয়া কনসেপ্ট। সে অর্থে এখানে সংগীত সম্ভোগকারীরা এবং সংগীতের দার্শনিক বিশ্লেষকরা সমাজের উপরের শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে লোকসংগীতের সংকলক ধারক বাহক শ্রোতা সাধারণ মানুষ সুতরাং সংগীতের সাথে মানুষের সম্পর্ক বা সংগীতের সামাজিক নির্মাণকে সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। একইভাবে সাবল্টার্ন স্টাডিজ সমাজের বৃহৎ পরিসর ইতিহাস ও অন্যান্য ডিসকোর্সকে যতটা গুরুত্ব দেয় নিম্নবর্গের ইতিহাস ক্ষুদ্র পরিসরে উচ্চ মহলের ইতিহাস চেতনাকে পরিবর্তন করার মত শক্তিশালী উপাদান তুলে ধরতে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নীল চাষ, মশলা চাষ, তাঁত শিল্প, কৃষক বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ যে সত্যগুলো তুলে ধরে তা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ও দুর্দশাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিভাত করে। এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আধ্যাত্মিকতা বিরাজমান তার স্বরূপ নিজস্ব ভাষা ও গায়কীর মাধ্যমে ভিন্নভাবে ভাবসংগীতে, বাউলসংগীতে ও ভক্তিসংগীতে প্রকাশ পায়। এসব সংগীতের দর্শন, যন্ত্রী ও সুর পশ্চিমা যাজকসংগীত বা রাজা-বাদশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট রাগ-রাগিণীর সাথে মেলে না। রবীন্দ্রনাথ একসময় বলেছিলেন আমার গান সব মানুষের জন্য গায়ন-সম্ভব, শুধু শুদ্ধতাই কাম্য। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের এমন আধুনিকতা শাস্ত্রসংগীত বিশারদরা ভালো চোখে দেখেননি। পশ্চিমা সোনাটাধর্মী সংগীত ধ্রুপদী সংগীতের প্রায় বিপরীত পর্যায়ে নেমে এসেছিলো। স্ত্রীলৈঙ্গিক সংগীতের সাথে পুরুষলৈঙ্গিক সংগীতের ব্যবধান এসময় প্রকটভাবে ধরা পড়ে। উপর্যুক্ত বোলম্যানের উদ্ধৃতির আলোকে বলা যায় সংগীত নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা কিভাবে ক্রিয়াশীল ছিলো। রেসিজম, কলোনিয়ালিজম ও সেক্সিজম একটি একক সম্মিলিত প্রয়াস হিসেবে গণ্য করা যায় যা অন্যদের খাটো করতে চেষ্টিত ছিলো। ব্রিটিশ সংগীতবিজ্ঞানী রিচার্ড মিডলটন জনপ্রিয় সংগীতকে পশ্চিমা ধ্রুপদী সংগীতের বিপরীত প্রচেষ্টা হিসেবে পর্যবেক্ষণ করেন। মিডলটন অভিজাত সংগীতের পাশাপাশি নিম্নবর্গের কৃষ্ণসংগীতকে মিশ্রিত করার কথা বলেন। তিনি ওয়েগনারের বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন যে সামাজিকভাবে বহির্ভূত মানুষের সংগীত ও ভাষা প্রতিষ্ঠিত ধ্রুপদী সংগীতকলার বিরুদ্ধাচারণ করে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, মুর্শিদী, মারফতি, ভক্তি, বাউল, বৈষ্ণব গানকে অবজ্ঞা করে এদেশের সংগীতবিজ্ঞান সম্ভব নয় বা সংগীতবিজ্ঞানের অগ্রসরতা সম্ভব নয়।

ক্স            সংগীতবিজ্ঞানের আরেকটি শাখা হলো সংগীত বিশ্লেষণ যা সংগীত কর্মের অন্তঃস্থিত সংবদ্ধতা দেখার চেষ্টা করে। এটি সংগীতকে একটি টেক্সট বা স্কেচ অথবা স্বরলিপি হিসেবে দেখে। এক্ষত্রে তারা সংগীতের এসব বিষয়বস্তুকে ‘অটোনমাস অবজেক্ট’ হিসেবে দেখে। বিশ্লেষকরা সংগীতের মতাদর্শগত দিককে উন্মোচন করতে চায়। এটি অবশ্য সংগীতের কাঠামোগত দিকের মধ্যে একটি উপাদান হিসেবে বিবেচ্য হয়। এসব উপাদান অবশ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করে অন্য সংগীত অথবা অন্য সংগীতের সাথে তুলনামূলকভাবে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে সংগীত বিশ্লেষণের জন্য মূল্যায়ন ও বাছাইকরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সংগীত বিশ্লেষণ প্রত্যয়টি সংগীতের কাঠামোগত সাযুজ্যের খোঁজ করে। কিন্তু এমন প্রচেষ্টা দারুণভাবে বিশ্লেষক ও অবিশ্লেষকদের দিক থেকে সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সংগীত বিশ্লেষণের বিকাশকে আঠারো শতকে দর্শনবিদদের চিন্তা দারুণভাবে উদ্দীপিত করে। লর্ড স্যাফ্টসবারি সংগীত অনুশীলনকে দারুণ মূল্যবান মনে করেছেন। অন্যদিকে আলেকজান্ডার বোমগার্টেন বিশ্লেষণের মধ্যে নন্দনতাত্ত্বিক ধারণাকে বিকশিত করেন। বর্তমান বহু ধরনের সংগীত বিশ্লেষণ দেখা যায় যারা পরস্পর আলাদা। সরল মাত্রায় বিশ্লেষণ কিছু শব্দের বা প্রতীকের ব্যবহার করেন যা সংগীতের উপাদান আলোচনায় ও বর্ণনায় সাহায্য করে। এগুলো সংগীতের হারমনি স্কেল এবং মেট্রিক স্কিম বলা যেতে পারে। আঠারা শতক থেকে স্বরলিপিভিত্তিক বিশ্লেষণের যে ধারা চলে আসছে এবং রোমান ধারায় কোর্ড চিহ্নিতকরণের প্রচেষ্টা চলছে তা আঠারোশো সতেরো থেকে আঠারোশো একুশ সালের মধ্যে প্রকাশিত গড ফ্রাইট ওয়েবার বিস্তৃতভাবে গ্রন্থভুক্ত করেন। সংগীতের ফর্ম, স্টাইল এবং জানরাকে আশ্রয় করে বিশ্লেষণের ধারাও গড়ে উঠেছে। তবে এসব বিশ্লেষণের কৌশল মূলত টেকিনিক্যাল প্রকৃতির। বাখের জীবনী অবশ্য স্টাইল ভিত্তিক অধ্যয়ন ও শ্রেণী বিভাজনের সূচনা করে। পরবর্তীতে বাখের প্রতীকী বিশ্লেষণ করা হয়। ভাষাতাত্ত্বিকতত্ত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণের পদ্ধতি অবশ্য সংগীতের অর্থের উপর গুরুতা¡রোপ করে। এক সময় সংগীত বিশ্লেষণে ন্যারাটিভ তত্ত্ব ব্যবহার চলে আসে। সার্বিকভাবে লক্ষ করলে এটি প্রতীয়মান হয়ে যে সংগীতের বিমূর্ত বিশ্লেষণ ধীরে ধীরে সামাজিক সাংস্কৃতিক ওঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। পার্কার ও অ্যাবেট সুন্দরভাবে বলেছেন যে, সংগীতকে যদি নিছক একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হয় তবে তা অনেকটা অর্থ-বিযুক্ত অনুবাদের পর্যায়ে পড়ে। সংগীতকে স্বরলিপির ঊর্ধ্বে বিশ্লেষণ করতে পারলে আমরা অবশ্যই শাব্দিক আচ্ছাদনের গভীরে যেতে পারবো।১০ আসলে সংগীত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার  জন্য সংগীত, সংগীততত্ত্ব নন্দনতত্ত্ব ও ইতিহাসের আন্তঃক্রিয়া জানা দরকার। এইখানে আমরা বলতে পারি যে সংগীতের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন তার সামাজিক উৎপত্তিগত মূল্যায়নের দিকে আমাদেরকে তাড়িত করবে। আর এটিও সত্য যে বিশ্লেষণের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় থেকে করা হয়েছে। এবং সে কারণে সে সময়ের সার্বিক সাংস্কৃতিক পরিম-লের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছে। ঊনিশ ও বিশ শতকে বিশ্লেষণে সংগীতের ভাষার জৈবিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আসলে আধা-বৈজ্ঞানিক পরিমাপণ পদ্ধতি সংগীত বিশ্লেষণে যতটা এসেছে তা তৎকালীন প্রত্যক্ষবাদী (পজিটিভিজম) দৃষ্টিকোণ ধারণ করে। বর্তমানে এমন ধারণা তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়। মার্কিন সংগীতবিজ্ঞানী কফি আগুয়ু মনে করেন সংগীতের টেক্সট নিয়ে বেশী মাতামাতি করা ঠিক নয়। সংগীতবিজ্ঞানের মত একটি বহুবিধায়ক শাস্ত্রের ক্ষেত্রে কিছু পরিসর থাকা প্রয়োজন যাতে নুতন বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক ডিসকোর্সের উদয় হতে পারে। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের মতে সংগীত বিশ্লেষণ মডেলসমূহ অনেক ধরনের মোটিফ ও তার বিস্তার, অংশ ও সমগ্র, সাযুজ্য এবং অসাযুজ্যের দ্বন্দ্ব কাজ করেছে। গ্লোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন,

  • However, some musicologists have argued that analy sis of popular music, as well as analysis of film and television music, requires new approaches rather than methods developed for analysing concert music. However, it is hare, at the intersection between traditional models of analysis and forms of musical expression, which have previously been considered the property of cultural and social studies, that analysis holds some of the most significant and exciting potential.11

ক্স            সংগীতের স্বায়ত্তভুবনের ধারণাসংগীতের অর্থের ধারণার বিপরীতে নির্মিত হয়েছে। স্বায়ত্বভুবনের ধারণা ‘ফর্মালিজমের’ সাথে সম্পৃক্ত। স্বায়ত্তুভুবনের অর্থ সংগীত একটি আলাদা এবং স্বনির্মিত নির্মাণ। কান্ট প্রদত্ত স্বায়ত্তভুবনের ধারণা সংগীতও নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে এমন বক্তব্যকেই শক্তিশালী করে যে এসব বিষয় স্বাধীন। কোন কিছুর সাথে এদের মেলানো ঠিক না। কান্ট একথাও বলেন যে, শিল্পকর্মের উদ্দেশ্য হল উদ্দেশ্যহীন। অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায় এরা আত্মমুখীন। সংগীতের ক্ষেত্রে আত্মভুবনের প্রয়োগ এতটাই বিস্তৃত হয়েছিলো যে যান্ত্রিক সংগীত ভাষার সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন মনে করা হয়। আঠারো শতকে সংগীতের এই স্বাধীনসত্তা লিখিত শব্দ এবং সামাজিক ক্রিয়াকে অস্বীকার করে। শব্দ ও ভাষা থেকে আলাদা হওয়ার ব্যাপারটি জর্মান দর্শনবিদ হেগেলকেও উৎসাহিত করে। আত্মনির্ভরশীল সংগীতের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন,

  • , Accompanimental music exists to express something outside itself. Its expression relates to something that does not belong to music as such but to an alien art : poetry. Now if music is intended to be purely musical, it must eschew and eradicate this alien element. Only then can it fully liberate itsself from the constraints of verbal precision.12

ক্স            কান্টের উদ্দেশ্যহীন বা ক্রিয়াহীন সংগীতের ধারণা ঊনিশ শতকে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ এবং রোমন্টিসিজমের দৃষ্টিকোণকে প্রভাবিত করে। এবং ঊনিশ জুড়েই এরকম ধারার প্রবণতা চলতে থাকে। হ্যান্সলিক তার ঙহ ঃযব গঁংরপধষষু ইবধঁঃরভঁষগ্রন্থে ১৮৫৪ সালে লেখেন, ওভ হড়ি বি ধংশ যিধঃ রঃ রং ঃযধঃ ংযড়ঁষফ নব বীঢ়ৎবংংবফ নু সবধহং ড়ভ ঃযরং ঃড়হব-সধঃবৎরধষ, ঃযব ধহংবিৎরং সঁংরপধষ রফবধং. ইঁঃ ধ সঁংরপধষ রফবধ নৎড়ঁমযঃ রহঃড় পড়সঢ়ষবঃব সধহরভবংঃধঃরড়হ রহ ধঢ়ঢ়বধৎধহপব রং ধষৎবধফু ংবষভ-ংঁনংরংঃবহঃ নবধঁঃু; রঃ রং ধহ বহফ রহ রঃংবষভ, ধহফ রঃ রং রহ হড় ধিু ঢ়ৎরসধৎরষু ধ সবফরঁস ড়ৎ সধঃবৎরধষ ভড়ৎ ঃযব ৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ ড়ভ ভববষরহমং ড়ৎ পড়হপবঢ়ঃরড়হং. ঞযব পড়হঃবহঃ ড়ভ সঁংরপ রং ঃড়হধষষু সড়ারহম ভড়ৎসং.১৩সুতরাং সংগীত এক অভ্যন্তরীণ জগৎ যা কারো মুখোপেক্ষী নয় যা নিজেকে ছাড়া অন্য কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে না। সংগীতের এমনতর ধারণা একেবারে যে প্রতিবাদহীন ছিলো তা বলা যাবে না। আধুনিকতাবাদের নন্দনতত্ত্ব সংগীতের স্বভুবনকে গ্রহণ করেছে বা স্বীকৃতি দিয়েছে। স্কোয়েনবার্গ, স্ট্রাভিন্স্কি এবং আধুনিকতাবাদীর সংগীত চিন্তা দারুণভাবে সমালোচিত হয় বিশেষত অ্যাডর্নোর মাধ্যমে। অ্যাডর্নো মনে করেন সংগীত এবং তার ভুবন দুটি সমান্তরাল ভুবন নয়। সাংগীতিক বিষয়বস্তু, এবং উপকরণ শাশ্বত বিরোধিতা নির্দেশ করে। সাংগীতিক স্বাায়ত্তভুবন সত্যিকার অর্থে বিথোভেন এর সংগীতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় বলে অ্যাডর্নো মনে করেন। তিনি আরো মনে করেন সংগীত নান্দনিক স্বায়ত্তভুবনকে সংরক্ষণ করে। এর মধ্য দিয়ে বাস্তব জগতের সংরক্ষণ সম্পন্ন হয়। সাংগীতিক আধুনিকতাবাদের ভেতর সাংগীতিক স্বায়ত্তভুবনের বিষয়টি তার জটিল ও শিলাময় রূপকে প্রতিভাত করে। অ্যাডর্নোর মতে এটি শুরু হয়েছিলো বিথোভেনের কর্ম থেকে। সংগীতের স্বায়ত্তভুবনকে অস্বীকার না করেও বলা যায় এটি তার পরিপ্রেক্ষিতকে অস্বীকার করে না। বর্তমানে সংগীতের স্বায়ত্তভুবনকে কঠিন সূক্ষ্মতার বিচারে আংশিকভাবে স্বীকার করা হয়। কারণ, নব্য সংগীতবিজ্ঞান সংগীতকে তার পরিপ্রেক্ষিত ও অর্থের সমন্বয়েই জানতে চায়। এবং নব্য সংগীবিজ্ঞান সংগীতের অস্তিত্বকে মতাদর্শগত নিজস্বতায় আবিষ্কার করতে চায়।

ক্স            আভাঁ-গার্দ শব্দটির অর্থ অগ্রসর প্রগতিশীল এবং সৃষ্টিমুখী প্রবণতা হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি সাধারণভাবে স্বায়ত্তভূবন, এক্সপেরিমেন্টালিজম ও উদ্ভাবন বুঝানো হয় যা অবশ্যই সনাতন ধারার বিরুদ্ধগামী। শিল্পীর মানসিক প্রক্রিয়ার উপর আভাঁ-গার্দের মনোযোগে সর্বোপরি লক্ষ করা যায়। ঊনিশ শতকের শুরু থেকে শিল্পে এবং সংগীতের ক্ষেত্রে বিশেষ করে শুম্যান, ওয়েগনার ও নব্য জর্মন স্কুলের সময় হতে এদের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। বিশ শতকে ফিউচারিজম, দাদাইজম এবং সুররিয়ালিজমের ক্ষেত্রে ঊনিশশো বিশের দশক থেকে ঊনিশশো পঞ্চাশের দশকের মধ্যে ইন্ট্রিগাল সিরিয়ালিজম (সংগীত) ও মার্কিন বিমূর্ত এক্সপ্রেসনিজম (চিত্রকলা) আভাঁ-গার্দের বিশ শতকীয় সংজ্ঞা ও অর্থ প্রদান করে। জর্মন ক্রিটিক্যাল থিওরিস্ট পিটার বার্গার এক্ষেত্রে তত্ত্বায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন (১৯৮৪)। বার্গার মনে করেন শিল্পীরা যত বেশী স্বায়ত্তভুবন সৃষ্টি করতে পেরেছে, সামাজিক নিস্ক্রিয়তার স্বীকার হয়েছে এবং ফলত হতাশ হয়েছে, ততবেশি সমাজ ও শিল্পের মধ্যে সংঘাত বেড়ে চলেছে। অবশ্য আভাঁ-গার্দ শিল্প অনেক ক্ষেত্রে প্রদত্ত স্বায়ত্তভুবনকে সামাজিক বিচ্ছিন্নবোধের আলোকে মূল্যায়ন করেন না, বরং এরকমটি মনে করেন যে সমাজ তাদেরকে স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। তবে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে আভাঁ-গার্দ ইতিহাসের বিষয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিশ শতকের শেষার্ধে উত্তরাধুনিকতাবাদী যারা স্টাইলের বহুত্ববাদী শিল্পীসমাজ ও আভাঁ-গার্দের এই পরিণতিকে সমর্থন করেন। আলরিচ ডিবেলিয়াস, রেজিনাল্ড, ব্রিন্ডল, গিয়ানমারিও কোরিও এবং পল গ্রিফিথ্স প্রমূখ সংগীতবিজ্ঞানীরা মনে করেন ১৯৪৫ সালের পর সংগীতে আভাঁ-গার্দ অনুশীলন প্রভূত অবদান রেখেছে। এদের মধ্যে অনেকে মনে করেন বিজ্ঞানের সাথে সাথে আজকের দিনে সংগীতের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। এধরনের বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠতা, প্রগতি, বিমূর্ততা এবং স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন কারণ বুর্জোয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে এর জন্য লড়তে হয়েছে। কিছু সংগীতবিজ্ঞানী মনে করেন সংগীতে সংগীত বহির্ভূত বিষয় না আনাই শ্রেয়। কিন্তু আভাঁ-গার্দ অনুসারিরা মনে করেন প্রকাশোন্মুখ সামাজিক, রাজনৈতিক তথা মানবিক দিকসমূহ সংগীতে আসা উচিৎ। একে বুদ্ধিজীবীবিরোধী বলার কোন অবকাশ নেই। ম্যাককারি মনে করেন আভাঁ-গার্দ বিরোধিতা গ্রহণযোগ্য নয়। অ্যাডর্নোর মাস কালচার (সধংং পঁষঃঁৎব) এবং আভাঁ-গার্দকে স্বায়ত্তভুবনের অর্থে পাত্তা দেয়ার কোন কারণ নেই। তিনি বরং অনুসন্ধানের নতুন উপায় আবিষ্কারের দিকে নজর দিতে বলেন। যেমন, মিসজিনি এবং হোমোফোবিয়া কেনো আভাঁ-গার্দ সংগীতে এতোটা প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া আভাঁ-গার্দকে কেন্দ্র করে সম্প্রদায় ও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা ও তাদের সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে।

ক্স            বিয়ার্ড ও গ্লোগের আলোচনায় সামাজিক প্রত্যয়টির মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি মনে করেন মার্ক্সীয় ধারণাটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনমনীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে নিয়ামকবাদী। সংগীতবিজ্ঞানে শ্রেণীর ধারণা অনুপস্থিত নয়। উচ্চ শিক্ষা জ্ঞানের ক্ষেত্রে অধিগম্যতা এবং ক্ষমতার আসন বিন্যাসের প্রশ্নে শ্রেণীভিত্তিক আলোচনা চলে আসে। শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও শ্রেণীগত ব্যবধান লক্ষ করা যায়। অনেকে বর্তমানে জনপ্রিয় সংগীতের ক্ষেত্রে অধিকতর সমতা খুঁজে পান অর্থাৎ অন্যান্য সংগীতের চেয়ে জনপ্রিয় সংগীতে সাধারণ মানুষের অধিগম্যতা অধিক লক্ষণীয়। কর্মজীবি যুব সমাজের সম্মিলনে আজকের গড়ে ওঠা রক সংগীত অনেক বেশী জনপ্রিয় এবং কালচার ইন্ডাস্ট্রির বেড়াজালে আবদ্ধ নয়। ব্রিটিশ সংগীতবিজ্ঞানী মিডলটন একইভবে উল্লেখ করেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে রক সংগীতের প্রাবল্যে পপ কালচার আবির্ভূত হয়। তার মতে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন লক্ষ করলে দেখা যায় প্রথমে বুর্জোয়া বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রেণী সংগ্রামের সূচনা হয়। বুর্জোয়া বিপ্লবের ফলে সংগীতসহ সংগীতের নানা উপকরণ ও কর্মকা- শাসক শ্রেণীর প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায় সুতরাং এই সময় বুর্জোয়ারাই আধিপত্যশীল শ্রেণী হিসেবে সংস্কৃতি জগতে ক্রিয়াশীল থাকে। সংগীত সমাজে কি ভূমিকা পালন করবে এবং কোন শ্রেণীর কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য হবে সে সংক্রান্ত একটি শ্রেণী সংগ্রাম ভেতরে ভেতরে কাজ করছিলো। সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন, পাব, স্কুল এবং রাস্তা যেমন সংগীতের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হত অন্যদিকে অর্কেস্ট্রা অপেরা ও পিয়ানো সংগীত সংগীতের ক্ষেত্রে এই সংগ্রাম রোমান্টিসিজম কালেও লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮৯০ এর দশকে ‘মাস কালচার’ একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করে। এ সময় একচেটিয়া পুঁজিবাদের সূচনাও লক্ষ করা যায়। তবে মাস কালচারের সূচনা অধিকতর সমতাভিত্তিক শ্রেণী সম্পর্ক গড়ে তোলে সুতরাং সংগীত ক্রমাগত সাধারণের আওতার মধ্যে চলে আসে। অ্যাডর্নোর মতে মাস কালচার মতাদর্শগত দিক থেকে প্রলেতারিয়েতদের মধ্যে সমতা নিয়ে আসে। তবে ইতালীয় মার্কবাদী গ্রামসির হেজিমনি প্রত্যয়টির সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আধিপত্যশীল শ্রেণীর ক্ষমতার বলয়ে চলে আসে। এবং শ্রেণীসংগ্রামকে স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে আধিপত্যশীল শ্রেণী চতুরতার সাথে শ্রেণীসংগ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে সংগীত ও সংগীত শ্রোতা সমান্তরাল গতিতে ঐতিহাসিকভাবে লক্ষণীয় নয়। কর্মজীবি মানুষের প্রিয় সংগীত বুর্জোয়া বিনোদনের সমান্তরালও নয় সুতরাং সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে শ্রেণীভুক্ত মানুষ তাদের পছন্দসহ সংগীতকে বেছে নেয়ার চেষ্টা করেছে। সংগীতের স্বায়ত্তভূবন এখন অবশ্যই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য।

ক্স            উইলিয়াম হ্যান্সলিকের মতে, সামাজিক প্রত্যয় ও সাংগীতিক বিষয়বস্তু সম্পর্ক রয়েছে বিশেষত সংগীত বা শ্রবণের বিভাজন করতে গেলে আমাদের তিনটি বিষয় দেখতে হয় যেমন, (ক) এরকম রূপরেখার প্রেক্ষাপটে শ্রবণকারী নিজেদেরকে প্রস্তুত করে; (খ) সংগীত বুঝার প্রণালী এবং (গ) প্রত্যাশার বিষয়াবলী। সংগীতের শ্রেণীবিভাজন করতে গেলে শ্রোতার শ্রেণীবিভাজন চলে আসে এবং সেক্ষেত্রে সংগীতের প্রেক্ষাপটকে ছোট করা যায় না। সুতরাং সংগীত শ্রোতা ও পরিপ্রেক্ষিত এই তিনটির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কই সংগীতের ঐতিহাসিক পরম্পরা নির্মাণ করেছে সুতরাং সংগীতের সমাজ সংলগ্নতাকে কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন ভাবা যায় না। উত্তরাধুনিকতাবাদীদের মতে, বিশ্বায়নের এ যুগে আমাদের সামাজিক জীবনও পুনর্নির্মিত হচ্ছে যেখানে অর্থনীতি রাজনীতি এবং সংস্কৃতি পরস্পরকে প্রভাবান্বিত করছে। সুতরাং এটি পরিষ্কার যে সংগীত শুধু সমাজের সৃষ্টি নয় সমাজকেও সংগীত নানাভাবে সৃষ্টি করেছে। জাতীয় ও অর্থনৈতিক বাজারের পরস্পর নির্ভরতা সংগীত ও সংগীত শ্রবণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। যার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো এমটিভি এবং অ্যাংলো-আমেরিকান পপ সংগীত। মতাদর্শ আমাদের বিশ্বাস ও কার্যক্রমের একটি শক্তিশালী নিয়ামক সংস্কৃতি বা সংগীত অবশ্যই এই বিশ্বাস বা মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটায়। আবার গ্রহীতা হিসেবে মানুষও তার মতাদর্শ কর্তৃক পরিচালিত হয়। সে কারণে আজকের সংগীতবিজ্ঞান মানুষের মতাদর্শকে সংগীত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। কারমানের মতে, ‘

  • from the standpoint of the ruling ideology, analysis exists for the purpose of demonstrating organicism, and organicism exists for the purpose of validating a certain body of works of art’.14

ক্স            জ্যাজ সংগীত সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি যতটা না প্রত্যয় নির্ভর তার চেয়ে বেশী প্রেক্ষাপট সমৃদ্ধ। বিশ শতকের শুরু থেকেই জ্যাজের উত্থান। আলোচনা করতে গিয়ে এর বহুবিধ পরিপ্রেক্ষিতকে তুলে ধরা হয়েছে। জ্যাজ বিশেষজ্ঞ এ্যালিন শিপটন বলেন সানফ্রান্সিসকোতে ১৯১৩ সনে জ্যাজ শব্দটি প্রথম ছাপা হয় যা নিত্যগীত সমৃদ্ধ একটি উচ্চকণ্ঠের সংগীত ধারার বর্ণনা দেয়। সংগীতের সাথে নৃত্যের সংমিশ্রণ একথাই বলে যে সংগীত সামাজিক এবং বিনোদনমূলক সংস্কৃতির অংশ। এছাড়াও জ্যাজ একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংগীত প্রবণতাকে ধারণ করে যা আফ্রো-মার্কিন সংস্কৃতির পরিম-ল থেকে উঠে এসেছে। এছাড়া বর্ণ বৈষম্যের ধারণাও উৎপত্তিগতভাবে জ্যাজ সংগীতের সাথে সংমিশ্রিত। শ্বেতাঙ্গরা ‘অন্যের’ সংগীত মনে করতেন। যদিও কৃষ্ণাঙ্গরা মনে করতেন এটি শ্বেতাঙ্গদের সাথে মিলনের সূত্র হিসেবে কাজ করবে।এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন  জাগে যে, যেসংগীতকে অনেকেই স্বায়ত্তভুবন ভেবে এসেছেন যার প্রেক্ষাপটকে অবমূল্যায়ন করেছেন জ্যাজ বা জনপ্রিয় সংগীতের ক্ষেত্রে এসে দেখা যাচ্ছে পরিপ্রেক্ষিত অনেক বেশী গুরুত্ব বহন করছে। তাহলে কি আমরা এই সিদ্ধান্তে যাব যে ধ্রুপদী সংগীত সামজের উচ্চ মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি স্বায়ত্তভুবন তৈরী করতে পেরেছিলো যার সাথে সামাজিক বাস্তবতার অনুসংগের বা বস্তুর কোন সম্পর্ক ছিলো না অন্যদিকে যত বেশী জনপ্রিয় সংগীতের প্রসার হয়েছে লোকসংগীতের সম্প্রসারণ হয়েছে সমাজের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন জাতের সংগীতের মূল্যায়ন শুরু হয়েছে তত বেশি সামাজিক বাস্তবতার খোঁজ মিলেছে।

ক্স            সংগীতের মধ্যে ভূদৃশ্যের প্রতিফলন ঘটেছে। শিল্পী ও সংগীত-সংকলক দারুণভাবে এই ভূদৃশ্য দ্বারা অভিভূত হন। অনেক শিল্পী রাজপথের ছবি এঁকেছেন, অনেকে রাজপথের কথা সংগীতে বলেছেন, অথবা রাজপথে সংগীত রচনা করেছেন। সে কারণে রাস্তার কোণ, উদ্যান, সেতু প্রভৃতি সংগীতের মধ্যে এসেছে। এখানেও আমরা প্রেক্ষাপটকে সংগীত সংকলনের উপাদান হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। সংগীত ভাষার মধ্য দিয়েই অভিব্যক্ত হয়। আর সংগীতবিজ্ঞান লিখিত শব্দের রূপ ছাড়া কিছুই নয়। সংগীতের মধ্যে ভাষা সুরেলা রূপ লাভ করে,দীর্ঘায়িত হয়, অথবা সংক্ষিপ্ত হয়। তবে ভাষা ও সংগীতের গভীরতর সম্পর্ক এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে জানা যায় না। এটি কল্পনা করে নেয়া যায় যে, ভাষা যেমন টুকরো টুকরো শব্দকণা, বাক্য ও বাক্যমালাসহ বিভিন্ন শৈলী লাভ করেছে, বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তেমন ভাষার সাথেই সহজাত সংগীতের রূপতত্ত্বও কণা থেকে বাক্যময়তায় এবং ছান্দসিক ও মনোহারি রূপায়ণে প্রলম্বিত হয়েছে। এমন ধারণা অলীক ভাবার কিছু নেই। প্রাচীন গ্রিসের সংগীতে, কাব্যে, ও বক্তৃতায় প্রতীক, প্রতিমা, উৎপ্রেক্ষা, অলংকার লক্ষ করে বিস্মিত হতে হয় যে, ভাষা কতটা সময়ে এই মাধুর্য আয়ত্ত করেছে। ভাষার পাশাপাশি সংগীতের বিবর্তন একইভাবে কাব্যিক ও শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় সাহিত্যের আদিরূপ ছন্দময় ও কাব্যিক। গদ্যের আগমন সাহিত্যের ক্ষেত্রে ঊনিশ শতকের শুরুতে এসে পাওয়া যায়। ম্যাটহেসন বলেন, ‘Oratorical terms disposition, elaborating and ornamentation as the basis of the structuring of melody.15

ক্স            মার্কস্ শিল্পকলা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিয়ে যেতে পারেননি। তবে বস্তুগত ও মৌলিক কাঠামো যে উপরিকাঠামোর সঞ্চালক হিসেবে কাজ করে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ইঙ্গিত শিল্পকলার স্বায়ত্তভুবনের দাবীকে আঘাত করেছে। সাংস্কৃতিক পরিম-ল মতাদর্শিক গুণাগুণ বিচ্ছিন্ন নয় বরং বিশেষ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা ‘ভধষংব পড়হংপরড়ঁংহবংং’কে সুদুঢ় করে। রুশ মার্কস্বাদ একটি দাপ্তরিক কাঠিন্য প্রদান  করে যার বিরুদ্ধে বেশ সংখ্যক মার্ক্সিস্ট বিশ শতক ধরে লড়েছেন এবং সংস্কৃতি ও সমাজের সম্পর্কেও সৃজনশীল ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। পশ্চিমা মার্ক্সবাদ বলতে সে কারণে সোভিয়েত মার্কস্বাদের থেকে আলাদামার্কস্বাদ বোঝায় যা স্বাধীন ও সঠিক মার্কস্ীয় বক্তব্যেও অনুধাবন বলে মনে করা হয়। হাঙ্গেরীয় মার্কস্বাদী গিওর্গে লুকাস  ঊনিশ শতকের উপন্যাস নিয়ে কাজ করলেও সেগুলোকে সংগীতের ধারায় ফেলা যায় না। তবে সাম্প্রতিককালে উত্তরাধুনিক বলয়ে সংগীতের পণ্যায়ন ও বিশ্ব পুঁজিবাদের হেজিমোনীয় ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

ক্স            সংগীতকে এর শক্তিশালী প্রকাশক্ষমতা ও  চরিত্রের আলোকে বর্ণনা করা হয় যা এর অর্থের ইঙ্গিত দেয় অথবা সংগীত কোনো অর্থ বহন করে কিনা সে কথাও বলে। সংগীতের সমস্ত ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্ব সংগীতকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে গেছে। অবশেষে রোমান্টিসিজম সংগীতের বিষয়ীমূলক প্রকাশ শক্তিকে এর সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করে। হ্যান্সলিক সংগীতের আলোচনায় সংগীত-বহির্ভূত বিষয়ে গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করলেও আদতে তিনিও সংগীতকে একটি ’ফরমাল অটোনমাস ফোর্স’ হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন। সম্প্রতি এ্যাডওয়ার্ড কুন বলেন, সংগীতের ফর্মাল ও এক্সপ্রোসিভ ধারণার মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। সংগীতের অর্থ সম্পর্কে ক্র্যামারের বক্তব্য আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি।

ক্স            সংগীতের স্বায়ত্তভুবনকে সংস্থিত করার জন্যে উপমার সাহায্য নেয়া হয়। যেমন বলা হয়েছে, সংগীত নিজস্ব গুণে বিষাদ হতে পারে না। আমরা যখন বিষাদ বলে তাকে গুণান্বিত করি তখনই তা বিষাদ হয়ে দাঁড়ায়। নোয়ামি কামিং সংগীতের ক্ষেত্রে মেটাফরকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন ‘অ ঢ়ৎড়লবপঃরড়হ ড়হঃড় ংড়ঁহফ ড়ভ ধংঢ়বপঃ ড়ভ ড়ঁৎ ড়হি সবহঃধষরঃু’১৬ সম্প্রতি সংগীত বিজ্ঞানে মেটাফোরকে ঐতিহাসিকভাবে আরো গভীরতর দৃষ্টিতে জানার চেষ্টা করছে।

ক্স            আধুনিকতাবাদ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন অর্থ বহন করে এটি যেমন একটি ঐতিহাসিক যুগের ইঙ্গিত দেয় সে রূপ বিশেষ কোন সংগীত-সংকলকের কাজকে নির্দেশ করে। তবে ঊনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ্ব শতকের শুরু পর্যন্ত আধুনিকতাবাদের ব্যাপক বিকাশ লক্ষ করা যায় সংগীতবিজ্ঞানের উন্মেষ ও আধুনিকতাবাদের একটি দিক যখন তার নির্দিষ্ট একটি শাস্ত্র হিসেবে গণ্য হতে থাকে। আধুনিকতাবাদের শুরু এবং শেষ নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্বই সেসময়ের মানুষের কাছে আধুনিক বলে বিবেচিত হয় তবে আধুনিকতা সব সময়ই উচ্চতর পর্যায় বা নতুনত্বের ধারণা বা প্রগতিকে বুঝায়। তবে আধুনিকতাবাদ শুধু সাম্প্রতিক হলেই হবে না তাকে অবশ্যই প্রগতিশীল হতে হবে। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস তাদের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে ১৮৪৮ সালের প্যারিস বিপ্লবকে প্রগতিশীল অভ্যুত্থান বলে উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতের ধারণা, ইতিহাসের অনিবার্যতা এবং ক্ষমতার দ্বান্দ্বিকতা আধুনিকতাবাদের মধ্যে ঐক্যবন্ধ হয়েছে বলে মনে করা হয়। সাহিত্য শিল্পকলায় এভাবেই আধুনিকতার ধারণা এসেছে। ওয়েগনার আধুনিক সংগীতের ক্ষেত্রে এক স্বনামধন্য নাম মনে করা হয়। তবে শিল্প সাহিত্য ও সংগীতের ক্ষেত্রে বিকল্প বাস্তবতার প্রক্ষালন বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে তাই আমরা সমাজতাত্ত্বি¡কভাবে যত বেশি সংগীতের সমাজ সংলগ্নতাকে খুঁজি না কেনো তাত্ত্বিকভাবে একে সমাজবিচ্যুত অথবা বিকল্প সামাজিক ধারণার প্রসূন হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অ্যাডর্নোর বক্তব্যটুকু স্মরণযোগ্য : It is precisely this drive towards autonomy that allows the art work to become critical, constructing a distance that allows for reflection (see critical theory). Of course, this process is never complete or fully formed and according to Adorno, there is a process of mediation between work and world through which art not only reflects society but also opposes it, not only converges with society but also diverges from it.অ্যাডর্নোর এই বক্তব্যটি প্রত্যাশিতই নয় বরং উৎসাহব্যাঞ্জক। শিল্পকলা ও সংগীতের সমাজ সংলগ্নতাকে অ্যাডর্নো দ্বৈতরূপে ব্যাখ্যা করেন। সামাজিক উপাদানকে সংগীত অর্থবহভাবে সংকলিত করতে পারে। আবার বিক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরতে পারে। সংগীতের এই ভূমিকাকে ন্যারোটোলজিক্যাল ভাবকে প্রকাশ করার সামর্থ্য বলা যেতে পারে। আর এটি আমরা স্বতত দেখে এসেছি যে আমাদের মানস বাস্তবতার প্রকৃত নির্মাতা, বাস্তব যতই বাস্তব হোক না কেনো তাকে মন কিভাবে রূপায়িত করেছে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অবভাসতত্ব এই বিষয়টিকেই আরো গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে আমরা জর্জ হার্বাট মিড ও হুসার্লের বক্তব্য আলোচনা করবো।

ক্স            নব্য সংগীতবিজ্ঞান শুরু থেকেই একটি সুসংহত আন্দোলন ছিল এমন নয়। বরং বলা যায় এটি ছিল ব্যক্তি ও তাদের ধারণার অসংগত সমাহার। ১৯৮০ দশক থেকে বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংগীত বিজ্ঞানের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। এ সময় থেকে অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সাধারণভাবে গৃহীত ধারণা এবং বারবার উত্থাপিত হয়েছে এবং সমস্যাদির উপর বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে প্রত্যক্ষবাদ ও সংগীতের স্বায়ত্তভুবনের ধারণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংগীতবিজ্ঞান বহির্ভূত শাস্ত্র যেমন, মানবিকী ও সামাজিক বিজ্ঞানের প্রত্যয় সমন্বয়ে সংগীতবিজ্ঞানের নতুন রূপরেখা প্রণয়নের তাগিত দেন। নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি শাস্ত্রের অনেক মৌলিক ধারণাকে তারা পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করেন এক্ষেত্রে মিশেল ফুকোর জ্ঞানের ইতিহাস বিশেষ গুরুত্ব পায় এবং সবিশেষ উত্তরাধুনিকতাবাদের বলয়ে অনুপ্রবেশ ঘটে। মতান্তর থাকা সত্ত্বেও নব্য সংগীতবিজ্ঞানের গবেষণা এগিয়ে যায়। ক্রামারের প্রবন্ধ ‘ঞযব সঁংরপড়ষড়মু ড়ভ ঃযব ভঁঃঁৎব’১৮ এমনি একটি বিষয় যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হতে দেখা যায় ক্রামার তার প্রবন্ধে ঊনিশ শতকের সংগীত ও সাহিত্যের উপর আলোকপাত করেন এবং বিশেষভাবে তিনি শিল্পকর্মের ব্যক্তিক অর্থকরণ বা বিষয়ীমূলক বিশ্লেষণের উপর গুরুত্ব দেন। এই পর্যায়টিকে আমরা উত্তর-কাঠামোবাদের সূচনা বলতে পারি। সংগীতের প্রেক্ষাপট পঠনের জন্য ক্রামার এবং তার অনুসারিদের ভাষা, স্টাইল ও জানরার উপর গুরুত্ব প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে টমলিসন উল্লেখ করেন যে, Instead of postmodern doubt, play, and a problematizing of the communicative relation, Kramer offers a too-familiar modernist mastery … a postmodern musicology will be characterized most distinctively by its insistent questioning of its own methods and practices.19

ক্স            বলে রাখা ভাল যে সংগীতের ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেকেই ইতিহাসবাদের (যরংঃড়ৎরপরংস)শিকার হোন। বিশেষত ঊনিশ ও বিশ শতকে নবজাগরণের বিপরীতে এই ধরণের মানুষের ঐতিহাসিক আত্ম-উন্নয়নের ধারা দেখা যায়। যেমন, ইমানুয়েল কান্ট ও হেগেলসহ আরো অনেকের লেখাই ইতিহাসবাদের শিকার হয়। কান্ট বলেন, The history of human race as a whole can be regarded as the realization of a hidden plan of nature to bring about … [a] perfect political constitution.2

ক্স            হেগেল বিশ্বাস করতেন ‘ডড়ৎষফ-যরংঃড়ৎরপধষ রহফরারফঁধষং’বিশ্ব ইতিহাসের নিয়ন্তা তিনি এ প্রসঙ্গে একটি মডেল দাঁড় করান যার অর্থ হলো ইতিহাসের সাথে মানুষের যৌক্তিকতার সম্বন্ধ রয়েছে। ইতিহাস এক চলমান প্রক্রিয়া যার মধ্যে পুরাতন উপাদানসমূহ বর্তমানেও সক্রিয় থাকে। হিউবার্ট প্যারি, বাধষঁধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ধৎঃ ড়ভ ঃযব সঁংরপ (১৮৯৩) শীর্ষক গ্রন্থের মধ্য দিয়ে সংগীত ইতিহাসের ক্ষেত্রে ইতিহাসবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে এখানে ইতিহাসকে বর্তমানের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় না। অন্যদিকে হিস্টিওগ্রাফি হলো ইতিহাস লেখার দৃষ্টিভঙ্গি। সংগীতের ইতিহাস হিস্টিওগ্রাফি দ্বারাও আক্রান্ত হয়। একারণেই মনে করা হয় প্রত্যেকটি বিষয় ঐতিহাসিক ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। সে কারণেই ইতিহাস একটি ভিন্নতর ইতিহাস হতেই পারে। কিন্তু দিপ্তীযুগের শিক্ষা এরকম ছিলো না।

ক্স

  • The Enlightenment concern with progress provided a model for the writing of music’s history. With several histories published in the late eighteenth century, including Burney’s A General History of Music (Burney 1957), reflecting recurrent issues of historiography such as continuity between past and present, per iodization and the classification of style. National identity, and the role of music in its formation, also became a significant factor in music historiography, particularly during the nineteenth century.21

ক্স            সংগীতের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অনেক বিষয় শাস্ত্র সম্মত হলেও সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে যে বন্ধনটি সব ক্ষেত্রে স্বীকৃত হতে দেখা যায় সংগীতের ইতিহাসের ক্ষেত্রে সেটি করতে দেখা যায় না। সংগীতকে সবসময়ই বিমূর্ত সামাজিক প্রেক্ষাপটহীন ও স্বায়ত্তভুবনের আলোকে দেখা হয়েছে যার কারণে সংগীতের নৃতাত্ত্বিক উদ্ভাবন নিয়ে তেমন ভাবনা লক্ষ করা যায় না।

ক্স            সংগীতকে জীবদেহের (ড়ৎমধহরংস)সাথেও তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বেশকিছু অংশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সমন্বয় একটি সম্পূর্ণ বিষয়কে গঠন করে। জীববিজ্ঞানের এই ধারণাটি সংগীতের ক্ষেত্রে প্রয়োগের অর্থ হলো সংগীতের প্রতিটি অংশ পরস্পর নির্ভরশীল এবং সমন্বিত। এ সামগ্রিক রূপকে আমরা সে কারণে অংশসমূহের সমন্বয় বলতে পারি।

ক্স            হেগেল বলেছেন,If the work is a genuine work of art, the more exact the detail the greater the unity of the whole’. ’. হেগেলের এ সম্পর্কীয় ধারণা শুধু সংগীত বা শিল্প নয় বিশ্ব সম্পর্কেই প্রযোজ্য। তিনি বিশ্বব্রহ্মা-কে অ্যাবসলুট অর্থে প্রত্যক্ষ  করেন যার মধ্যে অংশসমূহ নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছে। অবশ্য সংগীতবিজ্ঞানীরাও সংগীতকে অংশ ও সমগ্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তবে এখানেও আমরা সংগীতের উপাদান হিসেবে অংশসমূহের সমাজ সম্পৃক্ততা সম্পর্কে।

Richard James Burgess

The History of Music Production,

Oxford University Press, 2014

kã Abyave‡bi e¨vcv‡i ejv n‡q‡Q :We don’t know when human first made music or what inspired them to do so, although there are many theories. Elements of music-particularly melody and rhythm in the sounds other creatures make, and that we generate-surround us as we move through our environment. And there are other natural sounds such as the wind, waves, thunder, and so forth. Most sounds comprise complex harmonics or overtones and the harmonic series- the order in which these naturally occur- is a mathematical reality, a physical truth or law of the universe.22 As far back as the sixth century BCE, Pythagoras (ca. 570-495 BCE) had described the mathematical relationship between the length of a stretched string and the period of its vibration when plucked. He determined the simple mathematical ratio that form the octave, perfect fifth, perfect fourth, and the whole tone. From these calculations he arrived at the circle of fifth that, with a small adjustment known as the Pythagorean comma, gets us to the modern tempered scale. Aristottle (384-322 BCE) understood that “Sound is a particular movement of air”, and Greek Philosopher Chrysippus (ca. 280-207 BCE) and Boethius (ca, 480-524 CE) speculated that sound is a wave phenomenon.23

Nils L. Wallin, Bjorn Merker, and Steven Brown.

The Origins of Music

MIT PRESS, New York, 2001

ওয়ালিন এবং অন্যান্যরা প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন সংগীত কি এবং এর বিবর্তনমূলক উৎপত্তি বলতে কি বুঝায়? সংগীত কিসের জন্য এবং কেন সব মানবীয় সংস্কৃতি একে ধারণ করে? সংস্কৃতি নির্বিশেষে সংগীতের এবং সংগীতাচরণের কোনো বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্য আছে কিনা? বার্লিন স্কুল কম্পারেটিভ মিউজিকোলজির সদস্যদের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রসমূহে এ ধরণের প্রশ্ন বারবার উঠেছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে কার্ল স্টাম্প, রবার্ট, ল্যাক, এ্যারিক ভন বোস্টেল, অটো আব্রাহাম, কুর্ট স্যাক্স, এবং মাবিয়াস স্লাইডার প্রমুখেরা এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ১৯৪০ এর দশকে সংগীতের এই বিবর্তনমূলক অনুসন্ধান কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অখ্যাত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এদেরকে লড়তে হয়। এবং যুদ্ধত্তোরকালে মার্কিন সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীদের সাথেও লড়তে হয়। দুটি প্রভাবই ছিলো বিপ্লব বিরোধী এবং জীবতাত্ত্বিক বিশ্বজনীন চিন্তার বিপক্ষে। সংগীতবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এরা বিবর্তনমূলক এপ্রোচের বিরোধিতা করে আসছিলেন। এদের কারণেই মানববিজ্ঞান ও সংগীতবিজ্ঞানে একটি বিশ্বজনীন তত্ত্ব প্রদানের ইচ্ছা ম্রিয়মান হয়ে আসে। তবে মানবীয় বিবর্তনের পাশাপাশি সংগীত ও সংগীত আচরণের বিবর্তন অবশ্যই জানা উচিৎ। তিনদিক থেকে সংগীত মানবীয় ইমেজ ও মানবীয় ইতিহাস সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভে সাহায্য করতে পারে। এক সংগীত একটি বিশ্বজনীন বহুক্রিয়ামূলক সাংস্কৃতিক আচরণ এবং কোনো ধরণের মানবীয় বিবর্তন সংগীত ও নৃত্যের বিবর্তন জানা ব্যতীত সম্পূর্ণ হয়না। একটু লক্ষ করলেই আমরা দেখতে পাই কোনো ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সম্যক রূপ নৃত্য ও গীতের অনুপস্থিতিতে সামাজিক আচরণ প্রতিভাত হয়না। শিকার, পশুপালন, গল্পবলা, খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া, প্রার্থনা ধ্যান এসব কিছুর মধ্যেই কোনো না কোনোভাবে সংগীত ও নৃত্য লক্ষ করা যায়। সুতরাং সংগীতের উৎপত্তি মানবীয় সংস্কৃতির বিবর্তনমূলক পরিস্ফুটনকে স্পষ্ট করে। মানবীয় সংস্কৃতির একটি প্রধান বাহক হিসেবেও সংগীত ও নৃত্যকে অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতে হয়। দ্বিতীয়ত ভাষার বিবর্তনকে এখন মানবীয় বিবর্তনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যেহেতু সংগীত ভাষার সাথে সম্পৃক্ত সে কারণে এটিও মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ভাষা ও সংগীতের বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মিল পাওয়া যাবে। সুতরাং মানবীয় কণ্ঠস্বর, হোমিনীড মস্তিষ্কের বিকাশ মানবীয় মস্তিষ্কের অমিল চিন্তামূলক ক্রিয়ার সামঞ্জস্যতা, শব্দবিন্যাসের বিবর্তন। প্রতিটি আচরণের বিবর্তন, বহু ধরণের নিউরোকগনিটিক মেকানিজম সংগীত এবং ভাষার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রক্রিয়াশীল তৃতীয়ত সংগীত মানবীয় স্থানান্তর ও সাংস্কৃতিক সংযোগের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক অবদান রাখতে পারে। একইভাবে জীন এবং ভাষা মানবীয় স্থানান্তরের ব্যাপারে তথ্য প্রদান করতে পারে। সুতরাং মানবীয় বিবর্তনের সহগামী সংগীতের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। সংগীত অনেক স্থায়ীভাবে সাংস্কৃতিক সংযোগের তথ্য সংরক্ষণ করে যেক্ষেত্রে ভাষা অতটা সক্ষম নয় ভাষা সাধারণত সাংস্কৃতিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপিত হয় ফলে সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণসমূহ ধরে রাখতে পারে না। সংক্ষেপে বলা যায় সংগীতের বিশ্বজনীনতা ও বহুক্রিয়াশীলতা, সংগীত ও ভাষার বিবর্তনের গভীর সম্পর্ক, এবং সাংস্কৃতিক আন্তঃক্রিয়ার ধরন সম্পর্কে সংগীতের আলোকপাত করার সক্ষমতা বিবর্তনমূলক সংগীতবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন এবং মানবীয় বিবর্তনের সহযোগী হিসেবে মোটেও তাচ্ছিল্য করা যায়না। জীবসংগীতবিজ্ঞান (ইরড়সঁংরপড়ষড়মু)একটি নতুন শাস্ত্র হিসেবে সংগীতের উৎপত্তি এবং মানুষের উৎপত্তি একই যাত্রা থেকে শুরু করে। Evolutionary musicology deals with the evolutionary origins of music, both in terms of a comparative approach to vocal communication in animals and in terms of an evolutionary psychological approach to the emergence of music in the hominid line. Neuromusicology deals with the nature and evolution of the neural and cognitive mechanisms involved in musical production and perception, as well as with ontogenetic development of musical capacity and musical behavior from the fetal stage through to old age. Comparative musicology deals with the diverse functional roles and use of music in all human cultures, including the contexts and contents of musical rituals, the advantages and costs of music making, and the comparative features of musical systems, forms, and performance styles throughout the world.24 এই গবেষণা এলাকাটি মিউজিক্যাল ইউনিভার্সালসের অবহেলিত ধারণাটি পুনরুদ্ধার করেই ক্ষান্ত হয়নি সাম্প্রতিক ডারউইনির নৃবিজ্ঞান, বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞান, জিন-কালচারের সহবিবর্তনতত্ত্বের সুবিধাগুলো গ্রহণ করেছে। জীবসংগীতবিজ্ঞানকে সম্পূর্ণতাদানের জন্য এই তিনটি প্রধান শাখার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক অবদান রয়েছে। যাকে অনেক সময় ফলিত জীবসংগীতবিজ্ঞান বলা হয়ে থাকে। সংগীতের বহুবিধ ব্যবহারকে এই বিজ্ঞান জনপ্রিয় করে তোলে। ওয়ালিন ও অন্যান্যরা তাদের গ্রন্থে জীবসংগীতবিজ্ঞানের বিবর্তনমূলক ধারাটি তুলে ধরে। এটি জনান্তিকে জানিয়ে রাখা ভালো যে সংগীতকে ঐকান্তিকভাবে গ্রহণ করা উচিৎ যা মানবীয় স্বভাব, মানবীয় বিবর্তন, এবং মানবীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাস  জানার জন্য দরকার।

ক্স            শুধু পশু-পাখির সংগীতের সাথে নয় মানবীয় ভাষার সাথেও সংগীতের সম্পর্ক রয়েছে সে কারণে জেনেটিক তাৎপর্য ও বিবর্তনমূলক মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য এই দুই কণ্ঠ মিশ্রিত যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম দিক। সংগীত-ভাষা সম্পর্কটি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ভবিষ্যতে হয়তোবা সংগীতমনোবিজ্ঞান স্বরভঙ্গি, ধ্বনিতত্ত্ব এবং জীবসংগীতবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে স্থান পাবে। সংগীত ও ভাষার সাথে নৃত্যেরও সহ-সংস্রব খুঁজে পেয়েছেন আমাদের পূর্বসূরী তত্ত্ববিদেরা। যেমন স্পেনসার (১৮৫৭) সংগীতকে আবেগময় উচ্চকণ্ঠ প্রবণতা বলে মনে করেছেন। অপরদিকে ডারউইন মনে করেন সংগীত অন্তরাগত প্রণয়প্রার্থনার মধুরতর প্রকাশ যা আমাদের পাশবিক পূর্বপুরুষদের মধ্যে দেখা যেত। এবং এ অবস্থা থেকেই ভাষার উৎপত্তি হয়। রিচার্ড ওয়েগনার (১৮৫২) বিশ্বাস করেন যে ভাষা ও সংগীত সাধারণ উৎস থেকেই উৎসারিত যাকে বলা যায় কথ্য-সংগীত। তবে একথা ঠিক ভবিষ্যতে ভাষার বিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনায় সংগীত অবধারিতভাবে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া আরো পাঁচটি বিষয় এর সাথে জড়িত বলে মনে করা যেতে পারে। যেমন : ক) মানুষের কথা বলার বিষয়টি কণ্ঠ-বিস্তারের বিষয়, খ) মানবীয় সেরিব্রাল কর্টেক্স বা মস্তিষ্ক পূর্ববর্তী হোমিনীড স্তরের চেয়ে অনেক বেশী বিস্তার লাভ করে। এর পেছনে আমাদের ভাষায় অভিব্যক্তির ক্ষমতা বিশেষ ভূমিকা রাখে। সংগীত ও ভাষার সম্পর্ক দারুণভাবে কণ্ঠস্বর ও মস্তিষ্কের ক্রিয়াগত সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল, গ) ভাষা বিবর্তনের কাঠামো আচরণতত্ত্ব এবং কণ্ঠস্বরতত্ত্বের বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। এর একটি অপরটিকে সাহায্য অথবা প্রতিস্থাপিত করতে পারে, ঘ) ভাষা বিবর্তনের ক্রিয়াগতদিক শুধুমাত্র ব্যক্তিক পর্যায়ের যোগাযোগ ক্ষমতার নির্দেশ করেনা বরং দলীয় ক্রিয়াকর্ম ও সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার সক্ষমতাকেও নির্দেশ করে, ঙ) যদিও সংগীতের কোনো জীবাশ্ম রূপ পাওয়া যায়না এবং সাড়ে তিন হাজার বছর আগে সুমেরীয় সাংগীতিক নোটেশন ছাড়া আর কোন প্রাচীন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো চুয়াল্লিশ হাজার বছর আগের বাঁশি আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া যায় যন্ত্রসংগীতের আবির্ভাব অনেক প্রাচীন।২৫

ক্স            ওয়ালিনের মতে, অনেক ধরনের ক্রিয়ার মধ্যে পশু-পাখিদের গৃহপালনের উদ্দেশ্য এবং তাদের যৌনক্রিয়া পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সংগীত বিবর্তিত হয়। আবার কারো কারো মতে, পরস্পরকে আকর্ষণের ক্ষেত্রে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে সংগীতের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের সংগীত প্রবণতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সংগীতের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সময় নির্ধারক বস্তুর সংযোগ যেমন ড্রামবিট বা তালের সাথে গান গাওয়া। আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পিচের ভিত্তিতে শ্রবণ উদ্দীপকের প্রণোদনা লাভ করা। একে অ্যাবসলুট পিচ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে সব মানুষ সব ক্ষেত্রে অ্যাবসলুট পিচ আয়ত্ত করতে পারে না। বিশেষ বয়সে যেমন তিন থেকে ছয় বয়সের মধ্যে পিচ আয়ত্ত করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করেন অ্যাবসলুট পিচ অনেকটাই জেনেটিকভাবে মানুষের মধ্যে আসে। সবিশেষ মিউজিক্যাল ইউনিভার্সাল বিবর্তনমূলক সংগীতবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ দিক Regarding the common viewpoint in musicology that maintains that the search for musical universals is a fruitless endeavor not (merely) because the enterprise is marred by Biological determinism but because there are no universals to be found, it is critical to emphasize Bruno Nettl’s important point …  that universals need not apply to all music. Certainly a feature that is found in three out of four musical styles in the world is of great interest to anyone studying the evolution of music.26 ওয়ালিন ও অন্যান্যদের মতে বিবর্তনমূলক সংগীতবিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলোকে এম্পিরিক্যাল টেকনিক হিসেবে গণ্য করা যায়। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে বিভিন্ন ধরণের প্রাণীর গানগুলোর তুলনামূলক বিচার সংগীতের বিবর্তনমূলক উৎপত্তির অসাধারণ পরিচয় দিতে পারে। তাছাড়া দৈহিক নৃবিজ্ঞান ও সাংগীতিক পুরাতত্ত্ব এই বিবর্তনকে অনেক ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করতে পারে। সংগীত-ভাষা তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং তার কিছু পরিচয় আমরা পেয়েছি। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। মস্তিষ্কের ইমেজিং এখন অনেক উন্নতি লাভ করেছে। সুতরাং সংগীতের আকর্ষণ, সংগীত সম্পাদন এবং সংগীতের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দিক সম্পর্কে মস্তিষ্কের ইমেজিং থেকে জানা যেতে পারে। বলাবাহুল্য যে তুলনামূলক সংগীতবিজ্ঞান বিবর্তনমূলক সংগীতবিজ্ঞানের আবির্ভাবে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন লোক-সংগীতবিজ্ঞান সংগীতের মূলকে জানার জন্য অনেকভাবে সাহায্য করতে পারে। ডারউইনীও নৃবিজ্ঞান যেমন বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞান অনেক নতুন ধরনের বিবর্তনমূলক মডেল আবিষ্কারে সাহায্য করতে পারে। তবে এ ধরনের মডেল কাজে লাগানোর জন্য আন্তঃসাংস্কৃতিক এ্যাপ্রোচ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। যে বিষয়গুলোর তুলনা করা যেতে পারে সেগুলোর মধ্যে নিচের পাঁচটি বিষয় অবশ্যই বিবেচ্য।

ক্স            কোন বিশেষ বিশেষ সংস্কৃতি সংগীতজ্ঞকে নির্বাচন করা এবং তার বয়স ও লিঙ্গ নির্ধারণ করা।

ক্স            সংগীত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিত ও আধেয় বিষয়  জানা।

ক্স            সংগীত অনুষ্ঠানের ও সংগীত সম্পাদনের সামাজিক আয়োজন।

ক্স            সামাজিক আয়োজনের সাংগীতিক প্রতিফলক।

ক্স            প্রজন্ম পরম্পরায় সংগীত ও সাংগীতিক জ্ঞানের।

তথ্যপঞ্জি

১.

Kramer, Lawrence 2002.  Musical Meaning: Toward Critical History, University of California Press, London, p 3

  1. Kramer 2002. Ibid, p. 4
  2. Kramer 2002. Ibid, p. 5
  3. Beard, David and Gloag, Kenneth, 2005. Musicology: The Key Concepts, Routledge, London. 2000, p. 1
  4. Kerman, 1985, 1994 `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth 2005. Musicology, p. 2
  5. Kerman, 1985, 1994 `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth 2005. Musicology, p. 2
  6. Kerman, 1985, 1994 `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth. 2005. Musicology, p. 2
  7. Bohlman, 1998,`ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth2005, Musicology, 4
  8. Bohlman 1992, `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth 2005. Musicology, p. 7
  9. Beard, David and Gloag, Kenneth, 2005. Musicology, p. 9
  10. Beard, David and Gloag, Kenneth, Musicology, p. 12
  11. Huray and Day 1981, `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth, 2005. Musicology, p. 15
  12. Beard, David and Gloag, Kenneth, 2005, Musicology, p. 16
  13. Kerman 1994, `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth, 2005, Musicology, p. 67
  14. Ibid.
  15. Cumming, N. 1994. ‘Metaphor in Roger Scuton’s Aesthetics of Music’ in A. Pople (ed.), Theory, Analysis and Meaning in Music, Cambridge University Press, Cambridge, 1994, p. 28
  16. Paddison, 1993, `ªóe¨ in Beard, David and Gloag Kenneth, 2005.  Musicology, p. 83
  17. Kramer 1992 `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth, 2005. Musicology, p. 83
  18. Tomlinson, 1993, `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth 2005. Musicology, p 92
  19. McCarney 2000, `ªóe¨ Beard, David and Gloag, Kenneth 2005. Musicology, p. 60
  20. Beard, D and Gloag, K. p.2
  21. Burgess, R. J. 2014. The History of Music Production, Oxford University Press, Oxford, p.2
  22. Pierce, Allan D. 2013. “The Wave Theory of Sound”, excerpts from chap. 1 of Acoustics : An Introduction to its Physical

Principles and Applications, the Acoustical Society of America; Accessed August 31. 2013.

  1. Wallin, N. L. 1991. Biomusicology: Neurophsiological, Neurophysiological and Evolutionary Perspectives on the Origins and

Purposes of Music, Pendragon Press, New York,

  1. Wallin, N. L. et al.2001.The Origin of Music, MIT Press, New York,
    p. 10
  2. `ªóe¨: Boyd, R and Richerson, P. 1985. Culture and the Evolutionary Process, University of Chicago Press, Chicago, and Durham,
  3. H.1991.Coevolution: Genes, Culture and Human Diversity, Stanford University Press.

***********************************************

আত্মকথা ……………………………………….

হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)

লেখক হোসেনউদ্দীন হোসেন। একাত্তরের রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। থাকেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগর গ্রামে। লেখালেখি তার প্যাশন। তিনখ-ের বাংলার বিদ্রোহ কিংবা রণাঙ্গণে একাত্তর নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতাড়িত গ্রন্থ ছাড়াও লিখেছেন কবি আহসান হাবীব বা টলস্তয়-ভলতেয়ারের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুণী লেখকদের নিয়ে নানা আয়তনের গ্রন্থ। ভ্রমণপিয়াসী এ লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি তার কাছে স্মৃতিমুদ্রার এক এপিক আখ্যান। প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, স্বার্থত্যাগী, নিরহংকারী এ মানুষটির গল্প-উপন্যাস-কবিতার হাতও প্রশংসিত। এই দুর্মুখ সমাজে ব্যতিক্রমী এ মানুষটি এখন প্রায়— আনন্দময়রূপে ‘একা’। তাঁর জীবন-অধ্যায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার যে সুলুকসন্ধান তিনি এ অংশে ধারাবাহিকরূপে শুরু করেছেন তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্মকে অনেককিছু জানতে ও বুঝতে শেখাবে। অভিনন্দন এ গুণী লেখককে। (সম্পা.)

ধুলায় ধূসর-৩

সমগ্র তল্লাট জুড়ে কয়েক দিন থেকে চলছে ঢোল সহরত। রাজার পাইক-পেয়াদারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঢোল বাজিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে— ‘মুলুকের প্রজাবৃন্দকে কোম্পানি সরকারের হুকুম মোতাবেক যুদ্ধের ব্যয় বাবদ যে কর ধার্য করা হয়েছে, তা রাজ বাহাদুরের কাছারিতে গিয়ে জমা দেওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিচ্ছে। কোনো প্রজা যদি কর জমা না দেয় তাহলে সেই প্রজাকে রাজোদ্রোহী বলে সাব্যস্ত করা হবে।’

হাতির ওপর সওয়ার হয়ে ঘোষক চুঙো ফুঁকে ফুঁকে বিশেষ বিশেষ চকে গিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে। রাজার হাতি দেখার জন্য চকে চকে প্রজাদের ভীড়। যেখানেই এলান দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই প্রচুর প্রজা সমাগম।

একদিকে চলছে হাতি দেখা— আর একদিকে চলছে পরস্পরের সঙ্গে কথা চালাচালি।

— হচ্ছেডা কী?

— যা হবার তাই হতেছে।

— এক এক সময় এক এক রকমের ফন্নি।

— কত রকমের কর যে দিতি হচ্ছে, দিতি দিতি শেষ হয়ে যাচ্ছি।

— যুদ্ধ হতেছে, তারও দিতি হবে কর। মাথার খুলিতে কিছুই ঢুকতেছে না।

— এখন এই কর দেব কনতে?

মাথায় হাত দিয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে ভাবতে লাগলো। না দিতে পারলে তো কল্লা থাকবে না। সেইভাবে হুশিয়ারী করে দিচ্ছে ঘোষক।

কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে তা কেউ জানেনা। নানারকম খবর কানে আসতে লাগলো। বাতাসে ভেসে আসছে গুজব। কলকাতা ব্যারাকপুর থেকে বিদ্রোহী সেপাইরা নাকি বন্দুক ঘাড়ে করে কোতল করতে করতে দামামা বাজিয়ে যশোহরের দিকে আসছে। তারাও নাকি চুঙোফুকে ঘোষণা করছে, সাহেবদের দালালদের খতম করো, এংরেজদের কোতল করো, যারা ওদের গাড়িঘোড়া দিয়ে সাহায্য করছে, তাদেরও খতম করো, গোরা সৈন্যদের যারা খাদ্য জোগান দিচ্ছে, তাদেরকে জবাই করো, হুকুমত কায়েম করো, জঙ্গে সেপাই আদমিদের সাহায্য করো, দুশমনের বিরুদ্ধে জঙ্গে নামো, মুলুকের জওয়ানরা, হুশিয়ার, হুশিয়ার …। দারুণ একটা হুলস্থুল ব্যাপার। কোথায় যে কি ঘটনা ঘটছে, এলাকার চাষাভুষোরা তা আন্দাজ করতে পারেনা। এর মধ্যদিয়ে রাজার হস্তির পিঠে সওয়ার হয়ে রাজার পাইক-পেয়াদারা রাজার আদেশ ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে— হুশিয়ার, সাবধান, কোম্পানি সরকার বাহাদুরের হুকুমতের বিরুদ্ধে গেলেই বিপদ, হুশিয়ার, সাবধান।

প্রজারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এদিকে ওদিকে ছুটাছুটি করতে লাগলো। গৃহস্থ চাষীরা ভয়ে বীতগ্রস্ত। না জানি নসিবে কী আছে লেখা। একটা শ্বাসরুদ্ধকার পরিস্থিতি। মাথাটা হীম হয়ে আসছে। শরীরে রক্ত চলাচল প্রায় বন্ধ। খাওয়া নেই। ঘুম নেই। দারুণ একটা অস্থিরতা। একটা অশান্তি। পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস। একটা ভয়ঙ্কর ঝড়ো হাওয়ার ঘুরপাক দেখা দিচ্ছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ হচ্ছে প্রজার সঙ্গে রাজার যুদ্ধ। উলুখড় বিপন্ন। দেহের রক্ত শুকিয়ে যাবার মত হয়েছে।

তুবন সাহেবও মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে লাগলেন। বারাসাতেও না কি ওলটপালট অবস্থা দেখা দিয়েছে। কামান-বন্দুক ঘাড়ে করে গোরা সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করতে করতে যশোহরের দিকে আসছে। বারাসাত তো বেশি দূর নয়। দু’দিনের রাস্তা মাত্র। ইচ্ছে করলেই একদিনেই যশোহরে আসত পারে। মধ্যিখানে গোবরডাঙ্গা আর বনগাঁ। কতটুকুইবা দূরত্ব। তুবন সাহেব ভাবতে লাগলেন। প্রতিদিন এলাকার লোক এসে তার বৈঠকঘরে ভীড় জমাচ্ছে। সকলের মুখে একইরকম প্রশ্ন, গোরা সৈন্যরা যদি এসেই পড়ে, তবে আমাগের অবস্থা হবেনে কী?

আবস্থা কী হবেনে, তা কেউ বলতেও পারেনা। যুদ্ধ মানে তো ধ্বংস। মানুষকে কচু-কাটা করে মেরে ফেলা। লুটপাট। নারী ধর্ষণ। ঘরবাড়ি ভাঙচুর। গবাদিপশু জবাই করে ভক্ষণ। ক্ষেত-খামারের ফসল ডলাই-মলাই করে দেওয়া মানুষের মু-ু তলোয়ার দিয়ে কাটা। গৃহবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া। একটা বিভীষিকা। তুবন সাহেব তার বাবার কাছ থেকে বর্গীর হামলার কথা শুনেছিলো। প্রতি বছর শীতকালে বর্গীরা ঘোড়া দাবড়িয়ে এইসব অঞ্চল দখল করে লুটপাট করে নিয়ে যেত। মুহূর্তেই শ্মশানে পরিণত হতো এক একটা লোকালয়। পঙ্গপালের মত ছুটে এসে লুটপাট করে আবার মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যেত। এটা ছিল একটা লোমহর্ষ ঘটনা। ‘ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে। গাঙশালিকে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কি সে?’ এবারও দেখছি সেইরকম একটা অবস্থা। ক্ষিপ্ত সেপাইরা এসে যদি লোকালয়ে হামলা করে, তখন হবেনে কী? তা সে দেশি সেপাইরা হোক কিংবা এংরেজ সেপাইরা হোক, ঠেকাবেনে কেডা? বাংলা বিহার উড়িষ্যা জুড়ে চলেছিল ভাষ্কর প-িতের লুটপাট। বর্ধমানের রাজা পর্যন্ত সেদিন ভয়ে পালিয়ে যশোহরের নলডাঙ্গায় এসে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। এটা তো গল্পকাহিনী নয়। সত্য ঘটনা। এবারও মনে হচ্ছে তেমনি একটা আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে দেশি সেপাইরা— অন্যদিকে গোরা সেপাইরা। যারা আসুক না কেনো, কচুকাটা করে ছেড়ে দিবেনে। কোনদিকে যাওয়া যায়— এই নিয়ে সমস্যায় আছেন তুবন সাহেব। কপালে যদি গেরো থাকে তবে যা হয় একটা হবেই। রাজার হুকুম, অমান্য করার কারো ক্ষমতা নেই। এংরেজরাও মারমার কাটকাট বলে তাবড়ানো শুরু করেছে।

যুদ্ধ করের ব্যাপারে পরিবার প্রতি ধার্য করা হয়েছে তিন আনা দুই পয়সা। চাষাভুষোদের হাতে নগদ পয়সা নেই। মহাজনরা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। সস্তায় খরিদ শস্য বেচে দিচ্ছে চাষারা। আড়তদাররা চুটিয়ে খরিদ করছে। ওজনেও ফাঁকি। ঘড়েল মহাজনরা মাথায় পাগড়ি বেঁধে টাকার থলি নিয়ে তেজারতি করে মুনাফা লুটছে। চাষীরা নিরুপায় হয়ে ঋণ নিচ্ছে এবং শস্য বেচছে। এই ব্যবস্থা হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠেনি। অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, উপোসী রাইয়তদের উপর খাজনার গুরুভার ছিল। সেটাকে কাজে লাগিয়ে সুদখোর মহাজন এবং তহসিলদাররা চাষাদের বস্তুঋণ দিয়ে ‘সাহায্য’ করত, সেটার বাবদ তারা সুদ নিত বার্ষিক ৫০ শতাংশ হারে। কাজেই চাষারা অর্থনৈতিকভাবে ছিল মহাজনী পুঁজির দাস।

সর্বক্ষেত্রেই চলছে জোরজবরদস্তিমূলক কর্মকা-। অর্থ কামাই হয়ে উঠেছে একমাত্র লক্ষ্য। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি এবং এদেশের বড় ব্যাপারী আর মহাজনি পুঁজির মধ্যে মজবুত আর্থিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল— মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের আগরওয়ালাদের সঙ্গে। অন্যান্য হিন্দুস্তানী মহাজনরাও একই পথ অনুসরণ করেছিল। এ সম্পর্কে রেভারেন্ড ফিলিপ এ্যান্ডারসন উল্লেখ করেছেন যে, ‘য়ূরোপীয়দের কুপ্রভাব পড়েছিল ভারতের মানুষের উপর। স্থানীয় অধিবাসীদের সামনে ধূর্তামি, সন্ধিগ্ধভাব আর বাধিত করতে না রাজি হবার আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল য়ূরোপীয়রাই। য়ূরোপীয়রা ভারতে প্রথম প্রথম বসতি করার সময়ে নেটিভরা খুবই সশ্রদ্ধ ছিল তাদের প্রতি, তাদেরকে নেটিভরা নিজেদের মত নিরীহ মনে করত, কিন্তু তারপর থেকে য়ূরোপীয়দের দৃষ্টান্ত অনুসারে তারা হয়ে উঠেছে খুবই ধূর্ত এবং হুশিয়ার (ঞযব ঊহমষরংয রহ ডবংঃবৎহ ওহফরধ, চয. অহফবৎংড়হ, লন্ডন, ১৮৫৬, পৃ. ২৭০-৩৮৯)।’

কোম্পানির কর্মচারিরা ঘুষ নিত হামেশা। বিশেষত যুদ্ধের সময়েই তারা আরো বর্বর হয়ে উঠত। এন্ডারসন লিখেছেন : ‘দুর্নীতিপরায়ণ হওয়া আর অন্যান্যকে দুর্নীতিপরায়ণ করাটা ছিল কেতামাফিক— (ঐ, পৃ. ৩৩৯-৩৪০)।’

টি. সাইডেনহামও একই বিবরণ দিয়েছেন। ১৮১৩ সালে একটা পার্লামেন্টারি কমিটিতে তিনি বলেছিলেন যে, ‘বিদেশে বল প্রয়োগ করার প্রবণতা অন্য যে কোনো জাতির চেয়ে ইংরেজদেরই বেশি, আর এটা ভারতের বেলায় যথার্থ তাতে তিনি নিশ্চিত— এমন মন্তব্য করার সঙ্গত কারণ ছিল— (গরহঁঃবং ড়ভ ঊারফবহপবব, পৃ. ৬০১)।’

পি. স্পেয়ারের ঞযব ঘধনড়ভং গ্রন্থে ভারতে বৃটিশ সমাজের জীবন যাত্রার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘তাঁরা ছিলেন একদল সদ্বিবেচনাহীন ভাগ্যান্বেষী, যারা বেরোয় পয়সা করা আর ভোগতৃষ্ণার টানে, আর তারা হয়ে দাঁড়ালো পূর্ণাঙ্গ শাসক অভিজাত বর্গ, যারা এক হয়েছিল জাতিগত শ্রেষ্ঠতা আর কপট নৈতিকতাবোধের সূত্রে। ভারতের প্রজাদের প্রতি তাদের মনুষ্যোচিত আচরণের ন্যায় গন্ধও লোপ পেয়ে যায় ক্রমে ক্রমে, সেটার জায়গায় আসে বিজেতার শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা। দেশীয় জমিদার শ্রেণীর ইংরেজ প্রভুদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে এমন কোন হীনকর্ম নেই যে, করত না। তারা ছিলেন ইংরেজদের একান্ত বশংবদ। দেশের প্রতি এবং দেশের জনগণের প্রতি তাদের সামান্যতম সহানুভূতি ও কর্তব্যবোধ ছিল না। ইংরেজরা যেভাবে লুটতরাজ করত, তেমনিভাবে তারাও শোষণ ও লুটতরাজ করত। বল প্রয়োগ আর জবর দখল করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। উনিশ শতকের ৩য় দশকে এর মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। দেশাত্মবোধ বলে কোনো চেতনা তাদের মধ্যে ছিলনা। ভারতীয় বণিক আর নিয়ামক শ্রেণীগুলি অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করত কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য অভিপ্রায় তাদের ছিলনা। নিজেদের আধিপত্য কায়েম করে ইংরেজরা কোনো রকমে স্থানীয় স্বশাসনের প্রতিষ্ঠা ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। বরং ইংরেজরা জমিদার শ্রেণীকে জমির মালিকানা স্বত্ব দিয়ে ভূস্বামী অংশগুলোর পরে দেশ শাসনে, বিশেষত শহরগুলোর পরিচালনে অংশ গ্রহণের দাবি করার ভিত্তি সৃষ্টি করেছিল। লর্ড কর্নওয়ালিশ জমিদার শ্রেণীকে এমন একটি উচ্চতর স্থানে তুলে দিয়েছিলেন যে, যে মর্যাদা য়ূরোপীয় ভূস্বামীরা লাভ করেছিলেন দশম এবং একাদশ শতকে। এই স্বত্ব ছিল পুরুষানুক্রমিক। ১৭৯০ সালে যদিও কোম্পানি হাটে-বাজারে কর আদায় প্রথা বাতিল করে দেয় কিন্তু তা নামে মাত্র। এতদসত্ত্বেও জমিদাররা ১৮৩৯ সালে, এমনকি অষ্টম দশকের গোড়ার দিকে, আরো অনেক রকমের কর আদায় করেছিল ভূমিকর আদায়ের পরেও। দেশীয় রাজাও জমিদাররা ছিলেন পুরোপুরি কোম্পানি সরকারের পক্ষে। বিদ্রোহ ও বিপ্লবকে তারা কোনোভাবেই সমর্থন করেননি। ইংরেজ দাসত্বকে অবনত মস্তকে তারা গ্রহণ করেছিল। ইংরেজ ভারত দখলের পরিণতি নিয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিলনা। প্রতিবছর এদেশ থেকে ২০-৩০ লক্ষ পাউন্ড স্টার্লিং লুট করে তারা নিয়ে যেত নিজেদের দেশে। একটা বৃটিশ সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ১৭৯৭ থেকে ১৮০১ সালে বাংলায় স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে পরিচলনে ছিল প্রায় ১৬ কোটি টাকা। বৃটিশ দখলের ক্রিয়াফল ছিল জমিদার আর মহাজনদের চেয়ে বণিকদের স্বার্থক্ষেত্রেই বেশি। অর্থনীতি, সম্পতি আর প্রশাসনে বৈদেশিক রাজনীতিক নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে দেশটির সম্পদ লুট করে নেওয়ার ব্যবস্থা তারা চালু রেখেছিল।

দফায় দফায় নানা রকম করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কর্মজীবী শ্রেণীর ঘাড়ে। কৃষক এবং অন্যান্য উৎপাদক শ্রেণী কর দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল। এই কর আদায়ের জন্য তাগিদ দেওয়ার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় ম-লদের উপর। এই দায়িত্ব হেরফের হলে ম-লদেরকেও হেনস্তা করা হতো। বাধ্য হয়ে ম-লরা এলাকার অধিবাসীদের উপর চাপ সৃষ্টি করত।

সমস্ত দেশজুড়ে চলছিল একটা অরাজকতা। ঔপনিবেশিক শোষণের দাপটে কৃষক এবং অন্যান্য উৎপাদক শ্রেণীর মেরুদ- একেবারে ভেঙে পড়েছিল। দেশীয় সিপাহীরা যে কারণে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। বিদ্রোহীদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তা ছিল অভিজাত শ্রেণীর সঙ্গে অনভিজাত শ্রেণরি স্বার্থের দ্বন্দ্ব। ইংরেজ-সৃষ্ট নতুন জমিদার গোষ্ঠীর ইংরেজ-বিরোধী হওয়ার কোনো হেতু ছিলনা। তারা বিদ্রোহের প্রাথমিক কাল থেকেই ইংরেজের পক্ষ গ্রহণ করে। এ সম্পর্কে গোবিন্স তাঁর অহ অপপড়ঁহঃ ড়ভ ঃযব গঁঃরহরবং রহ ড়ঁফযধ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইংরেজ শাসনের দুশমন জমিদাররা নহে— কৃষকরা। শাসকগণ নির্ভুলভাবেই কৃষক সম্প্রদায়কে দুশমন বলে সনাক্ত করে। জমিদাররা সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থ বশত এবং ইংরেজ শাসনের এই দুশমনদের অর্থাৎ জনসাধারণ বা কৃষক সম্প্রদায়ের ভয়েই শেষ পর্যন্ত জনগণের এই বৈপ্লবিক লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে ইংরেজ শাসকগণের পক্ষাবলম্বন  করে তাদের সহযোগিতা ও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে।

১৮৫৮ খ্রিস্টব্দের মার্চ মাসে লর্ড ক্যানিং ঘোষণা করেন যে, সকল জমিদার এবং তালুকদারদের জমিদারি ও তালুকদারি বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই ঘোষণার কারণে অনেকেই বিদ্রোহে অংশ গ্রহণ করে। সেনাপতি আউটরাম লর্ড ক্যানিং ঘোষণাটি বাতিল করার জন্য পরামর্শ দিলে লর্ডক্যানিং ঘোষণাটি বাতিল করার পরপরই জমিদার ও তালুকদারগণ ইংরেজের পক্ষে সহায়ক শক্তি হিসেবে দাঁড়ায় এবং তাদেরকে খুশী করার জন্য অধিক জমি প্রদান করে পুরস্কৃত করে।

ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণী ছিল পুরোপুরি ইংরেজদের আর একটি সহায়ক শক্তি। তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করে।

এই বিদ্রোহকালে ইংরেজদের আরো একটি সহায়ক শক্তি ছিল ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তারা ছিলেন ইংরেজ শাসনের পক্ষপাতী। এরা অকুণ্ঠ-চিত্তে ইংরেজের প্রশংসা করতেন। এই শ্রেণীটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এল. নর্টন নামক একজন ইংরেজ সাহেব। তিনি তার ঞড়ঢ়রপং ভড়ৎ ওহফরধহ ঝঃধঃবংসধহ গ্রন্থে ভারতীয় ইংরেজি শিক্ষিতদের কর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লর্ড সভায় আলগ্র্যনভিল উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন যে—

শিক্ষিত (ইংরেজি শিক্ষিত) ভারতীয়গণ এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করিনি। তারা উৎসাহের সঙ্গে বিরোধিতা করেছে। সংকটের প্রারম্ভকাল থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা বৃটিশদের পক্ষে ছিলেন এবং শুধু তাই নয়— বিশ্বস্থতা ও আনুগত্য প্রমাণ করেছেন (ফেব্রুয়ারি ১৯, ১৮৫৮ ওহ ৎবঢ়ষু ঃড় ঃযব পযধৎমবং ড়ভ ঃযব ঢ়ৎবংরফবহঃ ড়ভ ঃযব ইড়ধৎফ ড়ভ পড়হভড়ৎঃ, ঢ়ধৎষধসবহঃধৎু উবনধঃবং, ৩ৎফ ংবৎরবং ঙঢখ. ঠওওও, ১৮৫৮, চ. ১৭২৮-২৯)।

সুবিধাবাদী শ্রেণীর অসহযোগিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বিদ্রোহের অনল চরম একটা পর্যায়ে এসেও নির্বাপিত হয়ে যায়। কৃষকরা এই বিদ্রোহকালে নীলকরদের নীল চাষ করাও বন্ধ করে দেয়। কোথায় কোথায়ও নীলকুঠিয়ালরা ভয়ে ভীত হয়ে নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের ব্যবসাও এক রকম অচল হয়ে পড়ে। কোনো কোনো কুঠিবাড়ি কৃষকরা আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে। নীলকর সাহেবরা যে অর্থ ব্যয় করে নীল চাষ করেছিল সেই নীল গাছ কাটার সময়েই তারা ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল।

মেকেঞ্জি সাহেবও মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। রাজা বরদাকান্ত তার পাইক পেয়াদা পাঠিয়ে সাহেবের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলেন। বিদ্রোহকালে নীলের চাষে ভাটা পড়েছিল। অধিকাংশ কৃষক নীল চাষ না করায় উৎপাদন প্রায় শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। নীল কুঠিতে পাহারাদারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। বলাতো যায়না, যে কোনো সময়ে কুঠির দুর্বৃত্তরা এসে হামলা করতে পারে।

তুবন সাহেব কর্মচারি না হলেও— তিনি সাহেবের ছিলেন বিশ্বস্ত লোক। গ্রামের লোকেরা ছিল তুবন সাহেবের অনুগত। তুবন সাহেবই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। একটা কিছু ঘটনা ঘটলেই তুবন সাহেবকে ডাকতেন মেকেঞ্জি সাহেব। দুজন বসে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। তাতে হালকা হয়ে যেত মাথাটা। বিশেষ করে দুর্ভাবনা মুক্ত হতেন সাহেব।

তুবন সাহেব ছিলেন ঠা-া মেজাজের লোক। কখনো উত্তেজনা প্রকাশ করতেন না। বেশি কথাও বলতেন না। বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং জবাব দিতেন।

বলতেন, গুজবে কান দিবেন না সাহেব। আমি যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ নিশ্চিন্তে থাকুন। কোনো ক্ষতি যাতে না হয়, সেটা আমি দেখব। আপনিও এখন আমার গ্রামের লোক। কাউকে হুুজ্জতি করতে দেবনা।

— হ্যাঁ, আমিতো আপনার গ্রামের একজন লোক। সাহেব হাসতেন।

— এই জন্যেই তো আপনাকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।

— হ্যাঁ, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি মোড়ল।

— কোথাও এখন শান্তি নেই। একটু সাবধানে চলাফেরা করুন।

— হ্যাঁ মোড়ল, সাবধানে চলাফেরা করছি। আসলে আমরা সকলেই একটা ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে আছি।

মেকেঞ্জি সাহেব নিরাপদ অবস্থার মধ্যে থাকলেও বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, তা ছিল ভয়ঙ্কর। বিভিন্ন জেলা, মহকুমা, নগর ও গ্রাম ছিল অশান্ত। দেশের বর্তমান অবস্থা এমনই ভয়ঙ্কর যে সাধারণ জনগণ একটা হতাশার মধ্যে কাল কাটাচ্ছে। বহুলোক অনাহারে রয়েছে। মরবার আগে তারা একটা কিছু করতে চায়। কিছু একটা করার জন্যে তারা মারমুখি হয়ে উঠেছে। এই একটা কিছুর অর্থ হলো হিংসাত্মক কার্যকলাপ। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করে লুকিয়ে রেখেছে। প্রয়োজন হলেই সাহেবদের উপর হামলা চালাবে। সরকার ও ইংরেজের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ। দেশের মধ্যে নি¤œশ্রেণীর লোকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাপিয়ে পড়লে, ঠেকানোর কোনো উপায় নেই।

মেকেঞ্জি সাহেব সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতেন। একটু এদিক-ওদিক হলেই সুনিশ্চিত মৃত্যু। তাই তুবন সাহেবকে অহরহ নিজের কুঠিতে ডেকে এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করতেন। তুবন সাহেব কখনো বিশ্বাসভঙ্গ করেননি। জানমালের নিরাপত্তার জন্যে গ্রামের জনগণকে নিয়ে রাতের বেলা গ্রামপ্রহরা দেবার বন্দোবস্ত করেছিলেন। বাইরে থেকে নবাগত কোনো অপরিচিত লোক এলে তাদের গতিবিধি ও উদ্দেশ্য নিয়ে তথ্য তালাশ করার ব্যবস্থা করেন। এই কারণে তার এলাকাটি ছিল শান্ত। এবং কোনো সাধারণ মানুষ সরকার দ্বারা হয়রানির শিকার হোক, এটা তিনি কামনা করতেন না।

বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর বিভিন্ন এলাকার লোক-জন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লো। যারা বিপ্লবের পক্ষে ছিলনা তারা সব উল্লসিত হয়ে উঠলো। শত্রুতাবশত অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ জানিয়ে তারা হয়রানি সৃষ্টি করতে লাগলো। পাইক-পেয়াদা এসে ধরপাকড় করতে লাগলো। আবার অশান্ত হয়ে উঠলো পুরোটা অঞ্চল।

নীলকর সাহেবরাও লোক-লশ্কর নিয়ে গিয়ে নীল চাষের জন্য তাগিদ দিতে শুরু করলো। প্রায় দু’বছর তারা ব্যবসা করতে পারিনি। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য চাষাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। প্রকাশ্য জানিয়ে দিলো এই ক্ষতির জন্য চাষারাই দায়ী।

চাষারা এমনিতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। দেয়ালে পিঠ ঠেকে আছে তাদের। এই অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুললো চাষারা। নীলচাষ করা বন্ধ করে দিল এলাকার নির্যাতিত জনগণ। দিকে দিকে জোট বেধে আওয়াজ তুললো, ‘হয় মরব, তবুও আমারা নীলের চাষ করব না।’

আবার একটা বিদ্রোহের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো। একটা বিদ্রোহ সামাল দিতেনা দিতেই আরেকটা বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সরকার সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানানো হচ্ছে যে, বিদ্যমান পরিস্থিতি আবার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কর্তৃপক্ষ ও অভিজাত শ্রেণীর কিছুই করণীয় থাকবেনা। আশঙ্কা করা যাচ্ছে যে, পাতার উপর অসংখ্য জলবিন্দুর মত দেশের সবস্থানের ছোট ছোট দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিনামে বড় দলে রূপান্তর লাভ করবে। দেশের দুষ্টপ্রকৃতির লোকেরা একত্রিত হওয়ার পর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে আর একটা অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করছে।

১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে শাসক গোষ্ঠী আতঙ্কিত হয়েছিল। পরপর দুটি গণ বিদ্রোহের আঘাতে ইংরেজ শাসনের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। ভারত সা¤্রাজ্য রক্ষার স্বার্থে ইংল্যান্ডের রাজার শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে গ্রহণ করলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে। এমতাবস্থায় বাংলায় কৃষক বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিলে বাংলাদেশ শাসন করা ইংল্যান্ডের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। নীল বিদ্রোহের এই সংকটকালে বড় লাট ক্যানিংয়ের কণ্ঠ থেকে যে আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছিল— তা ছিল এই—

নীল চাষীদের বর্তমান বিদ্রোহের বিষয় শুনে আমি এক সপ্তাহকাল উৎকণ্ঠর মধ্যে ছিলাম। দিল্লির সিপাহী বিদ্রোহের সময়ও আমি অত উৎকণ্ঠিত ছিলাম না। আমি সকল সময় ভেবেছি যে, কোনো নির্বোধ নীলকর যদি ভয়ে বা ক্রোধবশত একটিও গুলী ছোঁড়ে, তবে সেই মুহূর্তে দক্ষিণ বঙ্গের সকল কুঠিতে আগুন জ্বলে উঠবে (ঊ. ইঁপশষধহফ, ইবহমধষ ঁহফবহ খঞ. এড়াবৎহড়ৎড়. ঠড়ষ-১, চ. ১৯২)।

লর্ড ক্যানিং যে আশঙ্কা করেছিলেন, সেই আশঙ্কা অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। চাষীরা নীল চাষ করবে না বলে ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও নীলকর সাহেবরা বলপূর্বক নীল চাষ করার জন্য বাধ্য করতে লাগলো। বারাসাতের ম্যাজিস্ট্রেট এ্যাসলি ইডেন গোলযোগের সূচনালগ্নে কর্তৃপক্ষের নিকট জানালেন যে—

জমির মালিক প্রজারা— নীলকর সাহেবদের সেই জমি জোরপূর্বক দখল করার কোনো আইনগত অধিকার নেই। নীলকররা জোরজুলুম যেখানে করবে, ম্যাজিস্ট্রেটগণ সেখানে প্রজার স্বত্ব রক্ষা করতে বাধ্য (যশোহর খুলনার ইতিহাস, ২য় খ-, পৃ. ৭৭৭)।

ইডেন সাহেব বাংলা ভাষায় একটি ইস্তেহার প্রকাশ করে কৃষকদের জানিয়ে দেন যে নীল উৎপাদনের জন্য চুক্তি করা বা না করা প্রজাদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

নদীয়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেট হার্সেল সাহেবও একই ঘোষণা জারি করেন। এরপর প্রজারা দলবদ্ধ হয়ে নীলের চাষ বন্ধ করে দেয়। যশোহরের কাঠগড়া কনসার্নের কৃষকরা প্রথমে শুরু করে নীল চাষ বন্ধের কাজ।

এই সময় কৃষক বিদ্রোহের আলামত উপলব্ধি করে ‘ক্যালকাটা রিভয়্যু পত্রিকা’য় একটি প্রতিবেদন পত্রস্থ হয়—

বাংলার গ্রামবাসীদের মধ্যে অভাবনীয় এক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা নিজেদেরকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যে প্রজারা ছিল আমাদের ক্রীতদাসের মত কিংবা যাদেরকে আমরা ভূমিদাস হিসেবে গণ্য করতাম অথবা রুশ দেশের ভূমিদাসের মত ব্যবহার করতাম, জমিদার ও নীলকরদের হুকুমের দাস হিসেবে পরিগণিত করতাম, অবশেষে তারাই জেগে উঠেছে, করিৎকর্মা হয়ে উঠেছে এবং প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তারা কারো দাস নয়, তারা স্বাধীন। বর্তমান গ্রামের জনসাধারণ নীল চাষ বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তার ফলে যে বিস্ফোরণ দেখা দিয়েছে, তা বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ কল্পনাও করতে পারেনা (ঈধষপঁঃঃধ জবারব,ি ঔঁহব, ১৮৬০, চ. ৩৫৫)।

প্রত্যেকটি কনসানের অধীন গ্রামের রাইয়তরা নীলকরদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলো। গ্রামে গ্রামে সংগ্রাম-পরিষদ গঠিত হলো। কৃষকদের ধর-পাকড় করে জেল-হাজতে পাঠানো হলো। অবশেষে নিরুপায় হয়ে ১৮৬০ খ্রিস্টব্দের মার্চ মাসে নীলকর সাহেবরা ছোটলাট সাহেবের দরবারে একটি স্মারকলিপি পেশ করে জানালো :

কৃষকগণ জোটবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। তাদের দ্বারা নীলের চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। মফঃস্ফলের আদালতগুলিতে কোন রাইয়তের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছেনা। কারণ আমাদের অভিযোগ সাক্ষীর অভাবে প্রমাণ করতে পারছি না। এমনকি আমাদের কর্মচারীগণ পর্যন্ত আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে সাহস করেনা। রাইয়তগণ বর্তমান ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। এই সকল দুর্বৃত্তগণ যে কোন মুহূর্তেই আমাদের উপর হামলা চালিয়ে আমাদের জান মালের ক্ষতি সাধন করতে প্রস্তুত। প্রতিদিন তারা আমাদের কুঠি ও বীজের গোলা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টায় আছে। আমাদের অধিকাংশ চাকর-চাকরানী ওদের ভয়ে ভীত হয়ে আমাদের ত্যাগ করে ভেগে গিয়েছে। রাইয়তগণ তাদেরকে হুমকি দিয়ে জানিয়েছে যে আমাদের সঙ্গে থাকলে তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা তাদের গৃহবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। নিকটবর্তী হাটে বাজারে গিয়ে কেউ খাদ্যদ্রব্য খরিদ করতে পারছে না। সমগ্র জেলায় বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে (ঐরহফঁ চধঃৎরড়ঃ, ১৭ঃয গধৎপয, ১৮৬০)।

চাষীরা প্রথমে শুরু করেছিল সাহেবদের কর্মচারী ও দালালদের সঙ্গে সম্পর্কছেদ। যারা সাহেবদের সাহায্য ও সহযোগিতা করত তাদেরকে একঘরে করে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। এই একঘরে ব্যবস্থার অর্থ হলো সামন্ততান্ত্রিক সমাজবিধি অনুসারে এক রকমের কঠিন সাজা। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাকে পঙ্গু করে রাখা। কথাবার্ত, ভাববিনিময়, কেনাবেচা, আত্মীয়তা, চলাফেরা কোনোটাই তার সঙ্গে করা ছিল নিষেধ। জনগণ যে পথে চলাফেরা করে থাকে, সেই পথটাও ব্যবহার করার তার অধিকার ছিল না। হাটে-বাজারে তার নিকট নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেউ বেচতো না। এই সামাজিক বিধি ভাঙার যিনি চেষ্টা করতেন, তিনিও বিধি মোতাবেক অপরাধি হিসেবে চিহ্নিত হতেন।

সাহেবরাও তেমনি একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন। কর্মচারীরাও বিপদ বুঝে তাদের পরিত্যাগ করে গ্রাম সমাজের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।

এই বিপদ থেকে রেহাই পাবার জন্যে মেকেঞ্জি সাহেব তুবন সাহেবের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তিনি ছাপছুপ বলেছিলেন, এই বিধি অমান্য করার অর্থ হলো সমাজকে অস্বীকার করা। যেহেতু তিনি সমাজের একজন মোড়ল, সেই হেতু এই বিধি লঙ্ঘন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ভালো হোক, মন্দ হোক, এই সামাজিক বিধি অস্বীকার করার শক্তি তার নেই।

চাষীদের বিদ্রোহ করার পক্ষে তুবন সাহেব জোরালো সমর্থন দেন। তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা তিনি জানতেন। কোনো রকম মরে বেঁচে আছে চাষীরা। চাষী মানে হলো যার জমি আছে এবং লাঙল-গরু আছে। সাহেব এবং জমিদাররা শোষণ করেছে চাষীদের হাতে পায়ে দড়িদড়া বেঁধে। নিজের চোখেই এই দৃশ্য দেখেছেন তুবন সাহেব। চাষীরা যদি না বাঁচে, তবে এই সমাজটাও বাঁচবে না। তিনি সোজাসুজি মেকেঞ্জি সাহেবকে বলেছিলেন, যদি আপনি কৃষকদের উপর নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে জুলুম করেন, তবে আপনিও শেষ হয়ে যাবেন। কোনো চাষীর উপর অবিচার ও অত্যাচার করবেন না। যদি তা না করেন, তবে আপনার উপর কেউ হামলা করবে না এবং ‘একঘরে’ হয়েও থাকবেন না আপনি। এইটুকু আশ্বাস আমি আপনাকে দিতে পারি।

মেকেঞ্জি সাহেব ছিলেন একগুঁয়ে লোক। তিনি নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্যকিছু করতেন না। তুবন সাহেবের কথা শুনে তিনি হ্যাঁ-ও বলেননি না-ও বলেননি। শুধুমাত্র বলেছিলেন যে, আমাদের ব্যবসাটা লাটে উঠে গেল। দুই বছর কোনোকিচ্ছু করতে পারিনি।

তুবন সাহেব জবাব দিয়েছিলেন, গ্রামের রাইয়তরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত সঠিক হোক কিংবা বেঠিক হোক, আমাদের মেনে চলতে হয়— তা না হলে আমরাও সমাজচ্যুত হয়ে যাব, সমাজচ্যুত হওয়া মানে সমাজের বাইরে অবস্থান নেওয়া। এটা একটা ভঙ্কর ব্যাপার।

সাহেব ঝিমমেরে বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। তার মাথায় তখন কোনো কিছু কাজ করছিল না। বিশাল একটা কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। সেই কারখানাটা অচল হয়ে গেল। রাতদিন বহু শ্রমিক কারখানায় এসে কাজ করত। বর্তমান কেউ এসে সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে কাজে যোগদান করছে না। দারুন একটা সঙ্কটের মধ্যে সময় কাটছে।

দিনটা এইভাবেই চলছিল। বাইরে থেকে নানারকম সংবাদ আসছে। মোল্লাহাটির কুঠির সহকারী ম্যানেজার ক্যাম্বেল সাহেবকে মারপিট করা হয়েছে, মাঠের মধ্যে পাওয়া গেছে তাকে অধমৃত অবস্থায়। এক এক দিন এক একটা সংবাদ আসতে লাগলো। লোমহর্ষক সংবাদ। খাঁজুরা কুঠি লুট করা হয়েছে। আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে নীলবীজের গোলা। লোকনাথপুরের কুঠিতে হামলা হয়েছে। চাঁদপুরের গোলদার কুঠিতেও আগুন লাগানো হয়েছে। সাহেবের লোক-লশ্কর মোকাবেলা না করে রাতের অন্ধকারে লাপাতা হয়ে গেছে। সমগ্র নদীয়া ও যশোহর জেলার রাইয়তগণ ভয়ঙ্কর মূর্তিধারণ করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অন্যান্য কুঠিগুলিতে হামলা করার জন্য পায়তারা করছে।

মেকেঞ্জি সাহেব প্রতিদিনের সংবাদ শুনছেন এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। মাথাটা বিগড়ে যাওয়ার মত হয়েছে। ঘনঘন তুবন সাহেবকে ডাকতে লাগলেন তিনি।

তুবন সাহেব কুঠিতে যান না। গৃহে বসে লোক মারফত পরামর্শ দেন।

কলকাতায় চলে যান সাহেব, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। এই বিপদ থেকে আমি আপনাকে রক্ষা করতে পারব না। যতটুকু সংবাদ পাচ্ছি, এখনো এই অঞ্চলের রাইয়তগণ শান্ত আছে, কখন যে অশান্ত হয়ে হামলা চালাবে, এটা আমি বলতে পারব না। তবে জানতে পেরেছি, আপনার রাজগঞ্জের কর্মচারীগণের মনের অবস্থা ভালো নয়। তারা নাকি ভেগে যাওয়ার মনস্ত করেছে।

সাহেবের সদর কুঠি থেকে দেশীয় কর্মচারীগণ সাহেবকে না জানিয়ে ভেগে যেতে লাগলো। তারাও বিপদগ্রস্ত। কেবলমাত্র জঙ্গলমহল থেকে আমদানী করা ২০ জন বুনো মানুষ এখনো সাহেবের কুঠির পাহারা দিয়ে চলেছে। তাদেরও মনের অবস্থা ভালো নয়। হাতে বল্লম নিয়ে কুঠিরের সদর দরোজায় মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো চাঞ্চল্য নেই। ¯্রফে যেন কয়েকটা মাটির মূর্তি। দারুণ একটা আতঙ্ক। প্রতিদিন আতঙ্ক আরো বাড়ছে। সাহেব হতভম্বের মত কুঠিরের মধ্যে বসে থাকেন। কুঠিরের পশ্চাদে কপোতাক্ষ। সেখানে কয়েকটা বড় বজরা বাঁধা রয়েছে। নদের পানি তীর পর্যন্ত টহলমেরে দাঁড়িয়ে আছে। টলমল করছে কপোতাক্ষের কালো পানি। কী যে দবরব ছিল এই কুঠিতে। সেই কুঠি আজ নিস্তব্ধ। জনমানুষের চলাচল নেই। ক্রমান্বয়ে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। দারুণ একটা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বুকের মধ্যে চেপে বসে আছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই হতাশা বাড়ছে।

মেকেঞ্জি সাহেব ভেঙে পড়ার মানুষ ছিলেন না। একটা কিছু ঘটলেই মুখ থুবড়ে পড়তেন না। মোকাবেলা করার শক্তি আর সাহস তার ছিল। মহাবিদ্রোহের কালে দাপটের সঙ্গে এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সঙ্গে লোক-লশ্কর ছিল। পাইক বরকন্দাজ ছিল। বেপরোয়া ঘুরে বেড়িয়েছেন। এত বড় একটা মহাবিদ্রোহ হয়ে গেল, সেই মহাবিদ্রোহ তাকে এতটুকু দুর্বল করতে পারেনি। ভেবেছিলেন, বিদ্রোহকালে যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিটা এবার পুষিয়ে নেবেন। মানসিক একটা আনন্দের মধ্যে ছিলেন মেকেঞ্জি সাহেব। সেইভাবে মাঠেও নেমেছিলেন। মাঠেই নেমে বুঝলেন, চারদিকে একটা থমথমে ভাব। চাষারা নীলের বদলে পাট বুনছে। একজন কৃষকের ভূইঁয়ে গিয়ে দাঁড়ালে গ্রামের অন্যান্য রাইয়তরা হৈ চৈ করে ছুটে আসে। দলবদ্ধ হয়ে হুঙ্কার দিয়ে প্রতিবাদ করছে, নীল নয়— পাটের আবাদ করব। কোনো চুক্তিটুক্তি মানিনে— মানবেও না। জীবন দেব, তবুও নীলের চাষ করব না।

একগুঁয়ে মেকেঞ্জি সাহেব প্রথম দিকে প্রতিহত করার জন্য ঠেঙাড়ে বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। ঠেঙাড়েরা চাষাদের প্রতিরোধের মুখে টিকতে পারেনি। মারখেয়ে পিছু হঁঁটে এসেছিলো। প্রতিটি গ্রামের রাইয়তরা এখন সঙ্ঘবদ্ধ। গ্রামের সীমানায় ঢুকলে টিন বাজিয়ে হল্লা করলেই চারপাশের গ্রাম থেকে শ’ শ’ কৃষক পঙ্গপালের মত ছুটে আসে।

বাজারেও এখন অস্বাভাবিকভাবে পাটের দাম বেড়েছে। নীলের চাষ এখন অলাভজনক। এতকাল নীল চাষ করেও গেরস্থরা অভাব ঘুচাতে পারিনি। ভাগ্যের কোনো বদল ঘটেনি। অভাব আর অভাব। কষ্টের পর কষ্ট। দেনার দায়ে শরীর দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। মার-গুতোন আর নির্যাতন-শোষণ। একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে চাষাদের। এবার চাষারা হুঙ্কার দিয়ে আওয়াজ তুলেছে, জান দেব— তবু নীল চাষ করব না।

বিজুলিয়া কুঠির খবর শুনে শিউরে উঠলেন মেকেঞ্জি সাহেব। ড্যাম্বেল সাহেবের অবস্থা শোচনীয়। তার অত্যাচার আর দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে জবাব দিয়েছে কৃষকরা। মরে গিয়েও সাহেব কোনোরকম বেঁচে আছেন। তার সীমাহীন অত্যাচার ও দাম্ভিকতা এমনই ছিল যে, তার নাম শুনলে গ্রামের রাইয়তরা কাঁপতো। সেই সাহেবকে ক্ষিপ্ত জনগণ উত্তম মাধ্যম ধোলাই দিয়ে ধরাশায়ী করে মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

খবরটা শুনেই চমকে উঠলেন মেকেঞ্জি সাহেব। আবার কী আর একটা বিপদ দেখা দিচ্ছে? খবরটা দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কোট-কাছারিতে গিয়েও লাভ নেই। সাক্ষীর অভাব। তবুও সাহেবরা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। নীলকর সাহেবদের একটা সংগঠন ছিল। সেই সংগঠনটির নাম ‘ওহফরধহ ংড়পরবঃু ড়ভ ঃযব ইবহমধষ’. এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক বঙ্গীয় সরকারের সেক্রেটারীকে লিখিতভাবে জানালেন, ‘আমার মন্তব্য এই যে, নি¤œ বঙ্গে একটা সাধারণ বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে।’ সেক্রেটারী এই দরখাস্তের উপর সুপারিশ করে লিখলেন : ‘সরকারের সাহায্য ছাড়া চাষীদের মনে যে ক্ষুব্ধভাব দেখা দিয়েছে তা দমন করা নীলকরদের ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে’ (ঐরহফঁ চধঃৎরড়ঃ, ১৭ঃয  গধৎপয, ১৮৬৬)।

চৌগাছা গ্রামের বিষ্ণু চরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস নীল কুঠির দেওয়ান ছিলেন। তারাও চাকরি ছেড়ে দিয়ে চাষাদের পক্ষ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন। চাষীরা দ্বিগুণ উৎসাহে আরো জোটবদ্ধ হতে লাগলো।

তুবন সাহেবেরও এলাকার চাষীরা জোটবদ্ধ হয়েছে। তিনিও পক্ষ নিয়েছেন চাষাদের। তুবন সাহেব বললেন, ‘পরিস্থিতি যা-ই হোক, আরো শক্তি জোরালো করা দরকার। এই যে জাগরণ, এই জাগরণ আরো তুঙ্গে তুলতে হবে। মেকেঞ্জি সাহেব এখন ঝিমমেরে বসে আছেন। লোক-লশ্করের সংখ্যাও কমে এসেছে। একেবারে ভেঙে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে।’

চাষীরা দুর্বল ছিল। এখন অনেকটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মাঠের দিকে তাকালেই দেখা যায় অবাক কা-। গাতা করে কাজ করছে চাষীরা। মাঠে শুধু ধান আর পাট। সবুজ হয়ে উঠেছে মাঠের পর মাঠ। চাষীরা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কোনো কিছু পরোয়া করছে না। তুবন সাহেবও দশ বিঘে জমিতে পাট বুনেছেন। জন-মাইনদাররা মাথা উঁচু করে কাজ করছে। নিজেই হেঁটে হেঁটে তদারকি করছেন ক্ষেত-খামার। বোশেখের বাতাসের ঢেউয়ে পাটের সবুজ চারাগুলো দোল খাচ্ছে। কোথাও নীলের আবাদ নেই। চাষীরা বুক ফুলিয়ে কাজ করছে। দারুণ একটা খুশির ব্যাপর।

গ্রামের উত্তরে বিশাল মাঠ। সেই মাঠের মধ্যে গোচারণ ভূমি। তৃণভোজী গরু-ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। রাখালেরা ডাংগুলি খেলছে। মাঝে মাঝে হল্লা করছে। বাতাসে ভাসছে সেই হল্লা। গ্রামের দক্ষিণে কপোতাক্ষ নদের ওপারেও চাষীরা দলবদ্ধ হয়ে চাষ করছে। ধান পাটের আবাদ। কারোর জোর-জুলুম নেই। মুক্তমনে কেউ কেউ গলা ছেড়ে দিয়ে গান গাইছে। মনে হচ্ছে, এতকাল রাইয়তরা যেন কয়েদখানায় ছিল। কোনো সুখ-শান্তি ছিল না। পুরো সমাজটাই একটা ঘেরা-টোপের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। হাতে-পায়ে বেড়ি দেওয়া ছিল। নিজেরাই এবার জোট বেঁধে ঘেরা-টোপ এবং কয়েদখানা ভেঙে মুক্ত আকাশের তলে সমাবেত হয়েছে।

তুবন সাহেব একদিন মোড়ল-মাতব্বরদের ডেকে গ্রামসভা করলেন। বললেন, হিন্দু-মুসলমান নিয়ে আমাদের এই গ্রাম। আমাদের এই গ্রামের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা কোনোদিন রাজা-বাদশা-নবাবের মুখাপেক্ষী ছিলাম না। কোনো সরকার আমাদেরকে কখনো কোনো কালে সাহায্য করেনি। আমরাও কখনো ভিক্ষুকের মত হাতপেতে সরকারের দরবারে কোনো কিছু ভিক্ষাও চাইনি। বরং আমরাই সরকারের সেরেস্তাখানায় খাজনা ও কর দিয়ে সরকারকে সাহায্য করেছি। নিজেদের গ্রামের প্রয়োজনে যা কিছু করার সবই আমরা করেছি। হিন্দুরা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে দেবালয় তৈরি করেছে, মুসলমানরা তৈরি করেছে মসজিদ। সকলেই মিলে আমরা গ্রাম তৈরি করেছি। কখনো কারোর সঙ্গে বিরোধ ঘটেনি। সমাজে যখন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তখন আমরা গ্রামের মোড়লরা সেই সমস্যার সমাধান করেছি। সমাজের নিয়ম-কানুন-বিধি সমাজের সকলের জন্যই ছিল প্রযোজ্য। গ্রাম রক্ষার দায়িত্ব ছিল সমাজের। এ ব্যাপারে বাইরের কোনো শক্তির কাছে আমরা মাথানত করিনি। আমাদের গ্রাম আমরাই গড়েছি এবং রক্ষা করেছি। আমি গোপন একটা সংবাদ পেয়েছি যে সাহেবরা গ্রামে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী আমদানী করছে। তারা দু’মুখো নীতি গ্রহণ করেছে। হামলাও চালাবে এবং মামলাও চালাবে। বরকন্দাজ দিয়ে ধরপাকড়ের ব্যবস্থা করবে। গ্রামের মাথামাথা লোকগুলোকে গারদে ঢুকোবে। রাইয়তদের শায়েস্তা করার যত রকম কলাকৌশল আছে, কোনোটাই বাদ দেবেনা। অর্থাৎ গ্রাম-সমাজটা একেবারে ভেঙে তছনছ করে দেওয়ার মতলব এঁটেছে। এখন তোমরা কি করতে চাও?

মোড়লের কথা শুনে সকলেই তাজ্জব বনে গেল। এসব সংবাদ তাদের জানার কথা নয়।

মোড়ল বললেন, তোমরা কি মার খেতে চাও?

সকলেই বললো, না, না, না।

— তোমরা কি সমাজটা ভেঙে দিতে চাও?

সকলেই বললো, না, না, না—

— গ্রামরক্ষা করতে কি চাও?

— হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ—

ভোলানাথ বিশ্বাস বললো, আমারা গ্রামও রক্ষা করতে চাই এবং সমাজও রক্ষা করতে চাই।

বাসুদেব দত্ত বললো, আমরা যত রাইয়ত আছি, সকলেই লড়াই করে বাঁচতে চাই।

মোড়ল বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি।

সমুদয় লোক মোড়লের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মোড়ল অল্প বয়সেই কুস্তিখেলা শিখেছেন, লাঠিখেলা শিখেছেন, জঙ্গলে গিয়ে পশুশিকার করেছেন। এখনো বাহুতে প্রচুর কুয়ত রয়েছে। বুকটা যেমন উঁচু তেমন চওড়া। ষাঁড়ের মত চওড়া ঘাড়। মুখে খাটো দাড়ি। নাকের নিচেই পুরু গোপ। কানের লতির নিচু পর্যন্ত জুলফি। চোখ দুটো ডাগর ডাগর। বলিষ্ঠ দেহ। কোমর মেদহীন। মস্তক খাড়া। ঋজু।

বললেন, যারা লাঠিখেলা জানো, কুস্তিখেলা জানো, তীর ছুঁড়তে জানো, বল্লম ছুঁড়তে জানো তাদের নিয়ে আমি কসরত করতে চাই।

সমুদয় লোক হুঙ্কার দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, সেই ব্যবস্থা করেন মোড়ল। আমরা গ্রামের সন্তান, গ্রামের মান বাঁচাবো।

মোড়ল ডান হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে হুঙ্কার করলেন, কাল থেকে সনাতনের আম বাগানে কসরত শুরু করতে চাই।

পরদিন বিকেল বেলা সনাতন বাগের আমবাগনে শতাধিক জোয়ান নিয়ে লাঠিখেলা, সড়কিখেলা, কুস্তিখেলা, বল্লমখেলার চর্চা শুরু হয়ে গেল। জোয়ানরা হুঙ্কার দিয়ে গ্রামটা জাগিয়ে দিল। গ্রামের অনেকের বাড়িতে ছিল ঢাল। ঢালি পাড়া থেকে ছুটে এলো ঢালিরা। বাজনদার পাড়া থেকে ঢোল নিয়ে সমবেত হলো ঢুলিরা। লাঠি হাতে উদ্দাম হয়ে নাচতে লাগলো লাঠিয়ালরা। সড়কি আর বল্লম নিয়ে ঢাকের বাড়ির তালে তালে ঘুরে ঘুরে পায়তারা করতে লাগলো জোয়ান জোয়ান যুবকরা। কেউ লাঠিখেলা করছে। কেউ করছে সড়কি আর বল্লম খেলা।

তুবন মোড়ল কয়েকটি দলে যুবকদেরকে ভাগ করলেন। এক একটি দলের একজন করে সর্দার বানালেন। প্রতিদিন বিকেল বেলা স্বেচ্ছায় যুবকরা আম বাগানে জড়ো হতে লাগলো। প্রতিদিন খেলোয়াড় সংখ্যা বাড়ছে। উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। দারুণ একটা ব্যাপার।

কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেল আশেপাশের গ্রামগুলো থেকেও যুবকরা এসে বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করছে। বিষয়টি মোড়লকে আনন্দময় করে তুললো। এর আগে এইসব গ্রামের রাইয়তদের মনে সুখ আর শান্তি ছিলনা। সমস্ত গ্রামগুলো ছিল প্রাণহীন এবং অসাড়। কোনো আনন্দ-ফূর্তি ছিল না। পূজা পার্বণে, ঈদ-উৎসবে, টাকাওয়ালাদের ছিল প্রভাব। গ্রামগুলি ছিল জমিদার মহাজনদের শোষণের উৎস। এইসকল মহাজন জমিদার তালুকদাররা বড় বড় শহরের বাসিন্দা ছিলেন। হিন্দু জমিদার মহাজন তালুকদারদের গ্রামে পদার্পণ ঘটতো বছরে একবার দুর্গা পূজা উৎসবে। মুসলমান খানদানীরা আসতেন ইদুল ফিতর আর ইদুল আজহা আদায় করার উপলক্ষে। সধারণ জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিলনা। বিশেষ একটা দূরত্ব নিয়ে চলাফেরা এবং হাঁটাহাঁটি করতেন। নায়েব-গোমস্তারা পাইক-পেয়াদা পাঠিয়ে  জমিদারের কাছারী বাড়িতে রাইয়তদের ডেকে এনে নানারকম কর আদায় করতেন। শোষণ নির্যাতনে রাইয়তদের জীবন ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। এরপরেও নীলকর সাহেবদের ছিল বাড়াবাড়ি নিষ্পেষণ আর জুলুম।

এখন সেইসব গ্রামের রাইয়তরা জেগে উঠেছে। অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। একটা কিছু তারা করতে চায়। মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। লড়াই ছাড়া উপায় নেই। বাঁশের লাঠি, সড়কি, বল্লম হলো তাদের প্রতিরোধ-যুদ্ধের হাতিয়ার।

শ’ শ’ মানুষ বাঁশ কাটছে। লাঠি বানাচ্ছে। তেল মাখাচ্ছে। কামারের দোকানে গিয়ে বল্লম বানাচ্ছে। সড়কি বানাচ্ছে। সনাতনের বিশাল আমবাগানে এসে হল্লা করে কসরত করছে। যোদ্ধা হতে চায়।

দিগরের গ্রামগুলোও সাহেবদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামেও আগুন জ্বলে উঠছে। এক গ্রামে হামলা হলে অন্য গ্রামের রাইয়তরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ করার জন্যে এগিয়ে আসছে। প্রতিটি গ্রাম থেকে রাইয়তরা রণধ্বনি তুলেছে— জান দোব, তবুও নীল বুনবনা। হামলা হলে— হামলা করব। পাল্টা এবার প্রতিশোধ নোব। শুধু এই অঞ্চলে নয়— অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা দিয়েছিল একই রকম তোড়জোড়। পলুয়া মাগুরার জমিদার শিশির কুমার ঘোষ রাইয়তদের পক্ষালম্বন করলেন। রাইয়তদের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এ গ্রাম-সে গ্রাম ঘুরতে লাগলেন। সংবাদপত্রে তিনি নীলকরদের অত্যাচার এবং শোষণের বিবরণ প্রকাশ করতেন। ওই সময় বিদ্রোহী রাইয়তরা যে সংগ্রামী কৌশল গ্রহণ করে সে সম্পর্কে অনাথ নাথ বসু লিখিত মহাত্মা শিশির কুমার ঘোষ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়—

লাঠিয়ালগণের (নীলকরের লাঠিয়ালগণের) হস্ত হইতে আত্মরক্ষার জন্য কৃষকগণ এক অপূর্ব কৌশল আবিষ্কার করিয়াছিল। প্রত্যেক পল্লীর প্রান্তে তাহার একটি করিয়া দুন্দুভি রাখিয়াছিল যখন লাঠিয়ালগণ গ্রাম আক্রমণ করিবার উপক্রম করিত, কৃষকগণ তখন দুন্দুভি-ধ্বনি দ্বারা পরবর্তী গ্রামে রাইয়তগণের বিপদের সংবাদ জ্ঞাপন করিলেই তাহারা আসিয়া দলবদ্ধ হইত। এইরূপে অতি অল্পসময়ের মধ্যেই চারিপাঁচখানি গ্রামের লোক একত্র হইয়া নীলকর সাহেবদিগের লাঠিয়ালগণের সহিত তুমুল সংগ্রামে ব্যাপৃত হইত— (শ্রী অনাথ নাথ বসু : মহাত্মা শিশির কুমার ঘোষ, পৃ. ৩৬)

মহাত্মা শিশির কুমার ঘোষকে তুবন সাহেব ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। তাঁর গ্রাম থেকে পলুয়া মাগুরা গ্রামটি বেশি দূরে নয়— গ্রামটির দূরত্ব মাত্র চার মাইল। শিশির বাবুর জমিদারীর এলাকার জমিগুলিও নীলকর সাহেবদের নীল আবাদের আওতায় ছিল। তিনি তার গ্রাম— পলুয়া মাগুরা থেকে ‘অমৃতময়ী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। পরবর্তীকালে পত্রিকাটির নাম বদল করে যে দৈনিক পত্রিকাটি দেশীয় ভাষায় প্রকাশ করেন, তার নাম রাখেন— ‘দৈনিক অমৃতবাজার’। সরকার দেশীয় ভাষায় পত্রিকা সম্পাদনা নিষিদ্ধ করলে, শিশির বাবু কলকাতায় চলে যান এবং ‘দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা’ ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন।

শিশির বাবুর গ্রামটি তুবন সাহেবের গ্রামের পশ্চিমাঞ্চলে। গ্রামটি কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী। তার এলাকার কৃষকরা ছিলো আরো বিক্ষুব্ধ।

তুবন সাহেবের সঙ্গে আরো দু’জন কৃষক বিদ্রোহী নেতার পরিচয় ঘটে। একজনের নাম বিঞ্চুচরণ বিশ্বাস এবং অন্যজনের নাম দিগম্বর বিশ্বাস। উভয়েই ছিলেন আপন ভ্রাতা। সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন—

বিশ্বাসদের (অর্থাৎ বিদ্রোহের প্রধান নায়কদ্বয়— চৌগাছা গ্রামের বিষ্ণুচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাস) কিছু সঙ্গতি ছিল; যাহা ছিল সবই এই আন্দোলনে ব্যয় করিলেন। প্রজার জোট ভাঙিবার জন্য নীলকরের ক্ষেপিয়া গেল। বিশ্বাসেরা বরিশাল হইতে লাঠিয়াল আনিলেন। দেশের লোককে লাঠি ধরাইলেন, বঙ্গের মানসম্মান রক্ষার উপাদানরূপে লাঠি আবার উঠিল (সতীশচন্দ্র মিত্র : যশোহর-খুলনার ইতিহাস, ২য় খ-, পৃ. ৭৭৮)।

বিশ্বাস ভ্রাতৃদ্বয় সম্পর্কে শিশির কুমার ঘোষ লিখেছেন—

বিষ্ণুচরণ ও দিগম্বর কার্যে ইস্তফা দিয়া প্রজার পক্ষে দ-ায়মান হইলেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া প্রকৃত অবস্থা বুঝাইয়া দিয়া প্রজাদের উদ্রিক্ত করিয়া তুলিলেন। প্রজার জোট ভাঙিবার জন্য নীলকরেরা ক্ষেপিয়া গেল। বিশ্বাসেরা বরিশাল হইতে লাঠিয়াল আনাইলেন। দেশের লোককে লাঠি ধরাইলেন। বঙ্গের মান-সম্মান রক্ষার উপাদান রূপে লাঠি আবার উঠিল। নীলকরের হাজার লোক আসিয়া বিষ্ণু চরণের বিদ্রোহী গ্রাম আক্রমণ করিল, কত রক্তপাত হইল, কিন্তু বিশ্বাসদিগকে ধরিতে পারিলনা। তাহারা রাত্রির অন্ধকারে গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে ঘুরিতেন, গ্রামের পর গ্রাম জাগাইতে লাগিলেন। রাইয়তেরা কেহ নীল বুনিল না, দেড় বৎসরের মধ্যে কাঠগড়া কনসার্ন বন্ধ হইয়া গেল, আর খুলিল না। নিঃস্ব প্রজার নামে নালিশ হইলে বিশ্বাসগণ দুইজনে তাহার জরিমানা বা দাদনের টাকা এবং মোকদ্দমা খরচ দিতেন, কেহ জেলে গেলে তাহার পরিবার পালন করিতেন। এইরূপে তাহারা সর্বস্বান্ত হইলেন। হিসাব করিয়া দেখিলেন তাহাদের সর্বস্ব সতেরো হাজার টাকা সামান্য বটে, কিন্তু টাকার অনুপাতে অনুষ্ঠিত কার্যের মূল্য অনেক বেশী— (ঝরংরৎ কঁসবৎ মযড়ংব : অ ঝঃড়ৎু ড়ভ ঢ়ধঃৎরড়ঃরংস রহ ইবহমধষ (চরপঃঁৎব ড়ভ ওহফরধহ ষরভব)।

সে আমলে লড়াই হয়েছিল, কত লোক স্থানে হত এবং আহত হয়েছিল, এতথ্য সংগ্রহ করা আজ সম্ভব নয়। যতটুকু জানা যায়, সেইসব রাইয়তদের যন্ত্রণা, কষ্ট ও মৃত্যু সফল হয়েছিল। যশোহরে আর একটি নীলকুঠি ছিল মোল্লাহাটিতে। মোল্লাহাটি সম্পর্কে পরবর্তীকালে একটি প্রবাদ বচন তৈরি হয়— ‘মোল্লাহাটির লম্বা লাঠি, রইল সব হুদোর আঁটি, কলকাতার বাবু ভেয়ে, এলোসব বজরা চেপে লড়াই দেখবে বলে।’

তুবন সাহেবেরও কৃতকর্ম কম ছিল না। তিনি তার গ্রামে এবং অঞ্চলে শুধু লেঠেল বাহিনী গঠন করেননি, গঠন করেছিলেন সড়কি-বাহিনী ও বল্লম-বাহিনী। আশেপাশের গ্রামের রাইয়তরা তার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এক গ্রামের সঙ্গে অপর গ্রামের গভীর সংযোগ-ব্যবস্থা তুবন সাহেবই করেছিলেন। মোল্লাহাটির অত্যাচারী সাহেবের দম্ভ ও অহঙ্কার রাইয়তরা তাদের লাঠির মাধ্যমে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছিলেন। প্রজারা আগে থেকেই চাষ বন্ধ করে দিয়েছিল। এটা কম বীরত্ব ছিলনা। সিপাহী বিদ্রোহের কালে বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা বিদ্রোহীদের কর্মকা-ের সমর্থক ছিলেন না। নীল বিদ্রোহের কালে মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা রাইয়তদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ না করলেও আইনগত ও নৈতিকগতভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং মনোবল জোগায়েছেন। সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে সেইসব মহৎ ব্যক্তিদের সম্পর্কে লিখেছেন—

এই সময় বিষ্ণু চরণের মত দেশ-মাতৃকার আরও কত সুসন্তান জাগরিত হইয়া দেশময় তুমুল আন্দোলন উপস্থিত করিয়াছিল। উহাদের সকলের কথা জানিনা, যাঁহাদের কথা জানি তন্মধ্যে পলুয়া মাগুরার শিশির কুমার ঘোষ, সাধুহাটির জমিদার মথুরানাথ আচর্য, চ-িপুরের জমিদার শ্রী হরি রায় প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর সংগ্রাম ক্ষেত্র হইতে দূরে থাকিয়া লেখনীয় সাহায্যে দীনহীন প্রজাদের বন্ধু হইয়াছিলেন চৌবেড়িয়ার ‘নীলদর্পণ’ প্রণেতা দীনবন্ধু মিত্র এবং কলকাতার ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এর সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় (সতীশচন্দ্র মিত্র : যশোহর-খুলনার ইতিহাস, পৃ. ৭৭৯)

‘বঙ্কিমজীবনী’ লেখক শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিষ্ণু চরণ ও দিগম্বর বিশ্বাস সম্পর্কে লিখেছেন—

কত ওয়াট্ টিলর, হ্যামডেন, ওয়াশিংটন নিরন্তর বাংলায় জন্মগ্রহণ করিতেছেন— ক্ষুদ্র বনফুলের মত মনুষ্য নয়নান্তরালে ফুটিয়া ঝটিকাঘাতে ছিন্নভিন্ন হইতেছে, আমরা তাহা দেখিয়াও দেখিনা— আমরা তাহার চিত্র তুলিয়া রাখি না; কেননা আমরা ইতিহাস লিখিতে জানিনা— সবে চিত্র আঁকিতে শিখিতেছি, …বাঙালি মারখাইয়া অবশেষে মরিবার জন্য বুক বাঁধিয়া দাঁড়াইল। একখানি ক্ষুদ্র গ্রামের দুইজন সামান্য প্রজা বিষ্ণুচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাস। এই দুই স্বার্থত্যাগী মহাপুরুষ বাংলার নিঃস্ব সহায়শূন্য প্রজাদের এক প্রাণে বাঁধল— সিপাহী-বিদ্রোহের সদ্য নির্বাপিত আগুনের ভস্মরাশি লইয়া গ্রামে গ্রামে ছড়াইতে লাগিল— (শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : বঙ্কিমজীবনী, পৃ. ১২২)।

সিপাহী-বিদ্রোহের পরে এটা ছিল একটা বড় রকমের অভ্যুত্থান। এই বিদ্রোহ আকস্মিকভাবে গজিয়ে ওঠেনি। দীর্ঘকাল থেকে ধূমায়িত হতে হতে অগ্নিপ্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে। ১৮৫৯ সালের মধ্যভাগ থেকে নীলবিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। নীলকুঠিয়ালদের অত্যাচারে কৃষকরা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। নীলচাষ বন্ধ করে দেয় এবং নীলকুঠিগুলির উপর আক্রমণ করে। এই বিদ্রোহ ছিল ভয়ঙ্কর। ভারতের ইংরেজগণ বিপন্ন হয়ে ইংলন্ডের রাজদরবারে বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য আকুল আবেদন জানায়।

১৮৬০ সালে জুলাই মাসে বৃটিশ জমিদার ও বণিক সমিতির সভাপতি ম্যাকিন্টে ইংলন্ডের ভারত সচিব চার্লস উডকে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে জানান—

গ্রামাঞ্চলে বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হয়েছে। রাইয়তরা ঋণ গ্রহণের চুক্তিপত্র মানছেনা। মহাজন ও ইংরেজ মালিকদের দেশ থেকে খেদাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এদেশ থেকে সকল য়ূরোপীয়দের বিতাড়ন করে তাদের হৃত সম্পত্তি দখল করার পায়তারা করছে এবং য়ূরোপীয়দের নিকট থেকে যে ঋণ গ্রহণ করেছিল তা ফেরত দিতে অস্বীকার করছে (নীলবিদ্রোহ, পৃ. ৪৭)।

বিদ্রোহের এই বিবরণ শিশির কুমার ঘোষের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। তিনি ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাতেন। ১৮৬০ সালে ৫ই জুলাই তিনি একটি প্রতিবেনে লিখেছেন—

নীলকর কেনির লোকেরা একজন চাষীকে অপহরণ করেছে— এই সংবাদটি শুনামাত্র সাতাশখানি গ্রামের কৃষকরা কেনির কুঠিরে যাতায়াত করা বন্ধ করে দিলো। বিজলিয়া কুঠির ওকান সাহেব কতিপয় গ্রামের ম-লদের গ্রেফতার করে তাদেরকে নীলচাষের চুক্তিনামায় স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করলো। তারা গ্রামে ফিরে গিয়ে সকল চাষীকে একত্রিত করে এবং কুঠির আমিন এবং তাগিদারদের মারতে মারতে গ্রাম থেকে বের করে দিলো। অবশেষে গ্রামের কৃষকগণ তাদের নিজস্ব অধিকার বজায় রাখার জন্য চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ২০ শে জুন, মল্লিকপুরে মীরগঞ্জের কুঠিয়াল জন ম্যাকার্থের দলের সঙ্গে কৃষকদের একটা বড় রকমের সংঘর্ষ হয়েছে।

শিশির কুমার ঘোষের আর একটি প্রতিবেদনে জানা যায় যে, ২০ শে জুলাই মল্লিকপুরের কৃষক পাঁচু শেখকে নীলকরের ২৫ জন লাঠিয়াল ধরে আনতে গেলে তাদের সাথে ২৫ জন কৃষকের এক সংঘর্ষ হয়। উভয় তরফের বহু লোক আহত হয় এবং পাঁচু শেখ লাঠির আঘাতে মারা যায়। ৮ই আগস্টের একটি প্রতিবেদনে শিশির কুমার ঘোষ লিখেছেন—

যশোহরের রায়তগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। … সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্র ছালকোপা, বিজলিয়া, রামনগর প্রভৃতি স্থানের কুঠিগুলি। হাজার হাজার কৃষক নীলকুঠিয়ালদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। জোরপূর্বক ফসল তুলে নেওয়ার জন্য নীলকরগণ রিভলবার, গুলী-বারুদ ও লাঠিয়াল জোগাড় করছে। গ্রামের কৃষকগণও লাঠি ও বল্লম জোগাড় করছে। তাদের প্রতিজ্ঞা এই যে, ফসলের মূল্য না পেলে তারা কোনোক্রমেই ফসল তুলে নিয়ে যেতে দেবে না।

তুবন সাহেবও তার এলাকায় কৃষকদের নিয়ে একইরকম শক্ত একটা ঘাঁটি করেছিলেন। এলাকার গ্রামগুলো ছিল অত্যন্ত সতর্কাবস্থায়। মাঝে মাঝে দু’একটি গ্রামে কুঠিয়ালদের লাঠি বাহিনীর সঙ্গে রাইয়তদের গোলমালও হয়েছে কিন্তু আহত ও নিহত হয়নি কেউ। মেকেঞ্জি সাহেব ছিলেন বিশেষ একটা সুযোগের অপেক্ষায়। রাজশক্তির উপর তিনি ছিলেন নির্ভরশীল। অন্যান্য কুঠিয়ালরা যখন মারদাঙ্গা প্রবণতা নিয়ে রাইয়তদের শায়েস্তা করতে তৎপর ছিলেন, তখন মেকেঞ্জি সাহেবও করেছিলেন রাইয়তদের উপর একই পদ্ধতিতে হামলা চালানোর চেষ্টা। তার পোষ্য লাঠিয়াল বাহিনীর সর্দার ছিলেন আজিবর সর্দার। তিনি এতকাল যে কর্মটি দুঃসাহসের সঙ্গে করেছেন, তার পশ্চাদে ছিল তুবন সাহেবের প্রভাব। আজিবর সর্দার তুবন সাহেবকে ওস্তাদ বলে মান্য করতেন। সাহেবের হুকুমে কোথাও কিছু কুকর্ম করতে গেলে ওস্তাদের পায়ে হাত দিয়ে অনুমতি নিতেন। মাস কয়েক আগেও একদিন ভোরবেলা আজিবর সর্দার তার গৃহবাড়িতে এসেছিলেন।

— ওস্তাদ সেলাম।

— তোমাকেও সেলাম।

— সাহেবের হুকুম, মারদাঙ্গা করতে হবে। দু’একটা মু-ুও ধড় থেকে ফেলে দিতে হবে।

তুবন সাহেব হাসলেন। হো হো করে হাসলেন। কি কও ব্যাটা?

— হাসবেন না ওস্তাদ, কি করব বলেন?

— যাদের উপর হামলা করবি, তারাও তো এরকম মু-ু কাটতে পারে। পুরোপুরি এলাকাটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। হামলা করলে, পাল্টা হামলা হবে। শুধু এই এলাকা নয়— সর্বত্রই চলছে তোড়জোড়। হুহু করে আগুন জ্বলবে।

আজিবর সর্দার চমকে উঠলো।

— তাহলে কি করব ওস্তাদ?

— যে গ্রামেই যাবি, সেই গ্রামগুলোর মানুষ এখন ক্ষিপ্ত।

— আমি আপনার হুকুম ছাড়া কোথাও যাবোনা ওস্তাদ।

— যদি তাই হয়, তবে নকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যা— দেশের লোকের বিরুদ্ধে বেঈমানি করে লাভ হবে না। নকরি ছেড়ে দে—

— ঠিক আছে ওস্তাদ, আপনার কথায় শিরোধার্য।

আজিবর সর্দার কুঠিয়ালের সেরেস্তায় গিয়ে ইস্তফা দিয়ে সেই দিনই লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। সাহেবের বল-ভরসা ছিল আজিবর সর্দার। লেঠেল বলে তাকে অনেকেই মান্যগন্য করত। শুধু তাই নয়— গায়ে- গতরেও ছিল তার শক্তি। গাছের বড় বড় ডাল ভেঙে সে ধিনধিন করে নাচানাচি করত। ওস্তাদ বলে তুবন সাহেবকে সে পিতার মত শ্রদ্ধাভক্তি করত। বড়ই ওস্তাদভক্ত ছিল সে। হঠাৎ কোথায় যে আজিবর সর্দার চলে গেল, সাহেবও জানতে পারলেননা।

এক এক করে সবাই পালিয়ে গেছে। বহিলারা বহুকাল থেকে কারখানায় কাজ করত। এখন কাজও নেই, হাত-পা গোটো করে তারা বেকার বসে আছে। সাহেবের মানসিক অবস্থা খারাপ। অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিশাল একটা অঞ্চল জুড়ে ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তি। রাইয়তরা ছিল তার অধীনের গোলাম। সেই রাইয়তরা মারদাঙ্গা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। হামলা-মামলা করে কয়েদ ঘরেও ঢুকিয়েছে। তবুও রাইয়তদের দমন করতে পারিনি। যতই দিন যাচ্ছে, ততই তারা উগ্র হয়ে উঠছে। গ্রামের চাষাভুষো লোকেরা যে এরকম বেপরোয়া হয়ে উঠবে, মেকেঞ্জি সাহেবের মাথায় কখনো এই চিন্তা ঢুকিনি।

মেম সাহেবাও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। গৃহের নফররা পর্যন্ত গোপনে পালিয়ে যাচ্ছে। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ করে উধাও। এটা যে একটা বিপদের আলামত, মেম সাহেবাও বুঝে ফেলেছেন। দারুণ একটা মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে লাগলেন মেম সাহেবা।

মেকেঞ্জি সাহেব ছিলেন অস্থিরচিত্ত মানুষ। কোনো সমস্যা হলে, অস্থিরতা প্রকাশ করতেন। এই ব্যাপারে কি যে করবেন, সুস্থির কোনো পরিকল্পনা তার মাথায় ছিলনা। একটার পর একটা সঙ্কট। বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন রকম খবর আসছিল। খবরগুলো মাথা ঘুলিয়ে দিচ্ছিল। কোনো কুঠিয়ালের নিরাপত্তা ছিল না। কারো কারো কুঠিতে রাইয়তরা অগ্নিসংযোগ করেছে। পাহারাদার, লোক-লশকর, লেঠেল বাহিনী এবং বন্দুকধারীরা প্রতিরোধ করতে পারিনি। শ’ শ’ গ্রামের ক্ষুব্ধ রাইয়তরা একত্রিত হয়ে লড়াইয়ে নেমেছে। রাইয়তরা যখন দলবদ্ধ হয়ে হামলা চালাচ্ছে— তখন এই হামলা ঠেকানোর শক্তি কতটুকু?

মেম সাহেবা বললেন, বিপদ মাথায় করে এখানে থাকার কোনো যুক্তি নেই। আমাকে কলকাতায় তুমি রেখে এসো।

মেকেঞ্জি সাহেব ঝিম্মেরে বসে রইলেন। জবাব দিলেন না। বিষয়টি তার কাছে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। এর মানে এই যে, নেটিভ রাইয়তদের নিকট আত্মসমর্পণ করা। এটা একটা ইংরেজদের জন্য সম্মান হানিকর ঘটনা।

মেম সাহেবা বললেন, সিপাহী বিদ্রোহ কালে অনেক ইংরেজ রমণী, কিশোর-কিশোরী এবং অনেক জেন্টলম্যানকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের গৃহবাড়ি পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, এই যে ঘটনা, তারচেয়েও ভয়াবহ ও নির্মম। আমাদের অসতর্কতার কারণে আমাদেরও কপালে আছে নির্মম পরিণতি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মেম সাহেবা।

সাহেব মেম সাহেবার মুখের দিকে তাকালেন। কয়েকদিনের মধ্যে চোখ দুটো গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে মেম সাহেবার। পা-ুর ও বিবর্ণ হয়েছে চেহারাটা। আরো অস্থির হয়ে উঠলেন মেকেঞ্জি সাহেব। অবশেষে নিরুপায় হয়ে কয়েকদিন পর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলেন।

এই কৃষক বিদ্রোহ ছিল ভয়ঙ্কর। এই বিদ্রোহ সম্পর্কে শিশির কুমার ঘোষ ‘অমৃতবাজার পত্রিকায়’ একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেন—

এই বিদ্রোহে বঙ্গদেশের পঞ্চাশ লক্ষ কৃষক যে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিল তাহার দৃষ্টান্ত জগতের ইতিহাসে বিরল। যে সকল কৃষককে জেলখানায় আটক করিয়া রাখা হইয়াছিল এমনকি তাহারাও নীলের চাষ করিতে সম্মত হয় নাই, যদিও তাহাদের সরকারিভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল যে, তাহাদিগকে জেল হইতে মুক্তিদান করা হইবে, তাহাদের গৃহ প্রভৃতি যাহা নীলকরগণ ধ্বংস করিয়া ফেলিয়াছিল, তাহা নির্মাণ করিয়া দেওয়া হইবে এবং তাহাদের স্ত্রী পুত্র পরিবারদের, যাহারা ভিখারী হইয়া দেশময় ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, আবার ফিরাইয়া আনিয়া দেওয়া হইবে (নীল বিদ্রোহ, পৃ. ৮৯)।

এই বিদ্রোহে কৃষকরা বিজয়ী হয়েছিল। সরকার বিদ্রোহের আগুন নেভানোর জন্য ১৮৬০ সালে ৩১ শে মার্চ তদন্ত করার জন্য ‘নীল কমিশন’ গঠন করেন। কমিশন নীলকরগণের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহের প্রমাণ পেয়ে বলতে বাধ্য হন, ‘নীল কুঠিয়ালদের ব্যবসা পদ্ধতি উদ্দেশ্যত পাপজনক, কার্যত ক্ষতিকারক এবং মূলত ভ্রমসঙ্কুল (ঞযব যিড়ষব ংুংঃবস রং ারপরড়ঁং রহ ঃযবড়ৎু, রহলঁৎরড়ঁং ধহফ ৎধফরপধষষু ঁহংড়ঁহফ)।’

এই তদন্ত প্রতিবেদন সম্বন্ধে তৎকালীন বাংলার ছোট লাট যে মন্তব্য করেন, তা এই :

বাংলার প্রজা ক্রীতদাস নয়, বরং তারা প্রকৃত জমির স্বত্ত্বাধিকারী। তাদের পক্ষে এই হেন ক্ষতির বিরোধী হওয়া স্বাভাবিক। যেটা ক্ষতিকর, সেটা করাতে হলে অত্যাচার অবশ্যম্ভাবী। এই অত্যাচারের আতিশয্যই নীল বপনে প্রজার আপত্তির প্রধান কারণ (হেমপ্রসাদ ঘোষ লিখিত ‘নীলদর্পনে’র ভূমিকা)।

সরকার একটা ইস্তেহার প্রকাশ করে প্রচার করে যে, সরকার নীল চাষের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। অন্য ফসলের মত নীল চাষ করা বা না করা প্রজার নিজের ইচ্ছাধীন, আইন অমান্য করে অত্যাচার করা কিংবা অশান্তি সৃষ্টি হলে নীলকুঠিয়াল বা বিদ্রোহী প্রজা কঠোর শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে নতুন আইন তৈরি হয় এবং বিচারের সুবিধার্থে স্থানে স্থানে মহকুমা স্থাপিত হয়।

বিদ্রোহ চলেছিল দু’বছর। এই দু’বছরের মধ্যে যশোহর নদীয়া এবং অন্যান্য জেলার কোনো স্থানে রাইয়তরা নীল চাষ করেনি। নীলের চাষ ইচ্ছাধীন হওয়ায় নীল কুঠিয়ালদের উগ্রমূর্তি শান্তভাব ধারণ করে। বহু কুঠিয়াল কারবার বন্ধ করে দেন।

হেনরী মেকেঞ্জি সাহেবও কুঠিয়াল ত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। আর কখনো তিনি পরিত্যক্ত স্থানে ফিরে আসেননি। স্থানটি দীর্ঘকাল পতিত থাকায় ক্রমান্বয়ে জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

***********************************************

শেষ পাতার আহ্বান

রোদ এসেছে সোনার জাদুকর …

এ এক নতুন আড্ডা। কৃষাণ-কৃষাণীর আড্ডা। শ্রমী মানুষের সমাবেশ, তেপান্তরের মাঠে। রোদ তাদের অঙ্গে। ফলে ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন/কে কার অলংকার’। ওই মাঠের জীবনে ‘সোনার জাদুকর’ সোনা ফলায়। মন তাদের নিষ্পাপ, নির্লোভ দোষে তারা এ সমাজে গুণের কদরে দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু সারল্যে আর গরিমা তো তারাই— এ সোনার বাংলায়, সোনার কাঠি তাদের। লিখুন এদেশের ক্ষেতমজুর জাদুকরদের নিয়ে আপনার স্বপ্ন-ভাবনা।

***********************************************

মাসুম মুনাওয়ার
মুক্তির চিন্তা ও একজন কৃষকের গল্প

ফজরের আজানের সাথে সাথেই ঘুম ভাঙে আবদুস সামাদের। নামাজটা পড়েই যান গোয়াল ঘরে। গরুগুলোকে বের করে গোছালী ঘরে রাখেন। তারপর এক মুষ্টি চাল মুখে দিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে বের হন চাষের উদ্দেশে। প্রতিদিনের মতই সকালে তিনি হাল চাষ করেন। তারপর অন্য সব কাজ।

গ্রামের অন্য সকল কৃষক থেকে জমির প্রতি, মাঠের প্রতি তার ভালোবাসা ও প্রেম একটু অন্যরকম। তিনি প্রেমিকার মতো ভালোবাসেন জমিকে। আদরে সোহাগে আগলে রাখেন চাষের জমি আপন বউয়ের মত। দিন যায় ধান ক্ষেতে, পাট ক্ষেতে। দিন শেষে ঘরে আসেন। সারাদিনের ঘটনাগুলো খেতে খেতে বলেন প্রাণপ্রিয় বউকে। বউ আগ্রহ নিয়ে শুনেন। এভাবে কাটালেন ৪৩ বছরের সংসার। ঝগড়া-বিবাদ-ভালোবাসার সংসার।

দুপুরে প্রচ- রোদে ফিরে আসেন বাড়ি। বিশ্রাম করেন। বিশ্রামের ফাঁকে ফাঁকে জমে উঠে খেয়াল-খুশির নানান আলাপ। সেই আলাপে উঠে আসে তার ভিন্ন দৃষ্টির কৃষি আলোচনা। কেউ কেউ বুঝে মাথা নাড়ান আর কেউ কেউ তন্ময় হয়ে শুনেন। গ্রামের অন্য সকলের জমির থেকে তার ক্ষেতে পাট, ধান ও সবজি বেশিই হয়। সেই জন্যে গ্রামের অন্য কৃষকেরা প্রায়ই তার নিকট আসে। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দেন।

বিশ্রামের ফাঁকে করেন নিজের গল্প। করেন নানা-নানী, দাদা-দাদীর গল্প। বিভিন্ন গাল-গল্পে মেতে উঠে তার বিশ্রামের আসর। তিনি তার মধ্যমণি। এভাবেই হয়ে উঠেন গ্রামের সকলের প্রিয়। জমতে থাকে তার নিকট আসা মানুষের জীবন। একজন কৃষক দেখেন সমাজ পাল্টানোর স্বপ্ন। সমাজকে আমাদেরই ধরে রাখতে হবে। আমাদেরই পাল্টাতে হবে সমাজের রোগ। এভাবেই বলতে থাকেন। শুনতে থাকে নানান বয়সি মানুষ। নিজ গ্রাম, পাশের গ্রাম ও দূর থেকেও আসেন অনেকেই। আলাপের ফাঁকে ফাঁকে চলে খাওয়া-দাওয়া। পানেই খুশি থাকেন সবাই। মাঝে মাঝে চলে চা। আর গল্প করেন। গল্প শেষ হলে আবার কাজে যান।

তার নিকট আসে ছোটরাও। তাদের সাথেও খাতির জমান। খাতিরে খাতিরে ছোটদের সাথে জুড়েন তার যৌবনের গল্প। কোথায় কি হতো সেই গল্পই করেন বেশি। বাউল গান, জারি গান, গাজী-কালুর কিচ্ছা, পুঁথি পাঠ, কবিয়াল গান থেকে গীত, সব। সবই গুছিয়ে নিজের চাষাবাদের মতই যতœ করেই পাতেন এই সব আলাপ। মাঝে মাঝে উঠে আসে ঘোড়াদৌড়, নৌকা বাইচ ও হাডুডু থেকে কুস্তি খেলার আলাপ। সেই সব রঙিন দিন।

আমি ছোট থেকেই ছিলাম দুষ্ট। অনেক দুষ্ট। গ্রামের অনেক বন্ধুর সাথেই মারামারি করা ছিলো আমার নিত্যদিনের কাজ। একদিন তাঁর হাতে খেলাম ধরা। ভাবলাম এই বুঝি উনি আমাকে মারলেন। কিন্তু না উনি আমাকে মারলেন না। আদর করে বললেন চলো তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো। আমার তখনো বোঝার বয়স হয় নি। বললাম যাবো না। ভয় পেলাম। উনি বুঝালেন— তোমাদের মামা বাড়ি যাবো। সেখানে বাউল গান আছে। তুমি চল মামা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসবে।

আমি রাজি হয়ে গেলাম। মাকে বলে একটা রঙিন শার্ট পরে রওনা দিলাম তার সাথে। যাচ্ছি আমরা দুজন। গ্রামের মাথায় দেখা ছোট চাচার সাথে। চাচা বললেন কই যাও? আমি ভয় পেয়ে চুপ মারলাম। আমার ছোট চাচাকে (বাবার আপন ভাই) উনি বোঝালেন। ওকে নিয়ে যাচ্ছি বাউল গানের আসরে। আর কি করার। চাচা আর কিছুই বললেন না। আমরা গেলাম। গ্রাম ভেঙে মানুষ রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে বাউল গান দেখতে। আমিও যাচ্ছি। আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা।

সেই দিন সেই আসরে এসেছিলেন বাউল শিল্পী সালাম সরকার ও সুনীল সরকার। আমি তো বাচ্চা মানুষ, লম্বায় খাটো। পড়ি ক্লাস ফোরে। ফলে বাউল গান আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। উনি আমাকে কাঁধে নিলেন। আমি প্রায় চার ঘণ্টা তার কাঁধে চড়েই বাউল গান দেখেছি। এরপর নানু বাড়ি খেয়ে চলে আসলাম। তারপর আর কোনো দিনই আমি উনার সাথে বাউল গান দেখতে যাতে পারিনি। সুযোগ হয়নি।

তবে আজকে মনে হয় সেই দিনের সেই বাউল গানের আসর আমার জীবনের চিন্তাকে পাল্টে দিয়েছে। আমি বাড়ি এসেই রাতে পড়তে বসলাম। খুব ক্লান্ত। বসেই ঘুম আসলো চোখে। আমি ঘুমিয়ে গেলাম। পর দিন মা বললেন রাতে ঘুমে কি বকছিলি? আমি অবাক হলাম। এখন বুঝি আমি সেই গানই গাইছিলাম ঘুমের ঘোরে।

যার কথা বলছি উনি আমার বাবার চাচাতো ভাই। আমার চাচা। প্রিয় ছমেদ চাচা। গ্রামে সামাদকে উচ্চারণ করে ছমেদ। পরদিন সকালে আমি আবার গেলাম চাচার কাছে। উনি বললেন— কী? আমি বললাম গান লিখছি। উনি বললেন, ‘তাই?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। তিনি গানটি দেখলেন। হাসলেন। বললেন, ‘যাও, আরো লিখে নিয়ে এসো।’ আমার হয়তো সেইগুলো কোনো গানই ছিলো না। কিন্তু লেখালেখির শুরুটা সেখান থেকেই। তারপর জীবনে যেখানে যত বাউল গান হয়েছে আমি কোনোটাই বাড়ি থাকাকালীন মিস করিনি। বিখ্যাত বাউল শিল্পী মমতাজের গানও আমি লাইভে তখনই শুনেছি।

আজকে ছমেদ চাচা বেঁচে নেই। উনি হার্ট এট্যাক করে মারা গেছেন কিছু দিন আগে। আমার খুব কষ্ট হয়েছে। চাচা যেদিন মারা গেলেন সেই দিন আমি বাগেরহাট, খাজা খান জাহান আলীর দরবারে। বাবা ফোন করে বললেন— ‘ছমেদ ভাই আর নেই।’ আমি আর কিছুই বলতে পারিনি। চুপ করে ছিলাম। বাড়ি থেকে অনেক দূরে থাকায় আমি আর তাঁকে দেখতে যেতে পারিনি। পরে বাড়ি গিয়ে উনার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চেয়েছি। চাচা আমাকে মাফ করে দিও।

তোমার নিকট থেকে আমার জীবনে অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, যুক্তি ও প্রেম। তৈরি হয়েছে কৃষক ও কৃষির প্রতি আগ্রহ। বাউল গানসহ বাঙালির সকল সংস্কৃতির প্রতি জানার ইচ্ছেটাও তোমার থেকেই পেয়েছি। তুমি শুধু একজন কৃষকই ছিলে না। তুমি ছিলে কৃষক ও চিন্তক। যে গ্রামের অন্য সকলের থেকে সমাজ নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে। সমাজকে পরিবর্তন করার প্রবল ইচ্ছে তোমার ছিলো। কৃষি নিয়ে ছিলো স্বপ্ন। তুমি চাইতে কৃত্রিম চাষাবাদ মানুষ না করুক। বরং বাঙালির যে কৃষি ঐতিহ্য মানুষ তা যথাযথ জানুক, মানুক ও পালন করুক। এই ছিলো তাঁর স্বপ্ন। তাতে কৃষক ও কৃষির উন্নতি হবে বলেই তিনি মনে করতেন। তুমি সেই পথেই সারা জীবন হেঁটেছো। জীবনের শেষ অবধি তুমি ছিলে বিপ্লবে অনড়। তোমার পথে হাঁটছে ভাটি বাংলার অনেকেই।

আজ তুমি নেই। গ্রামটাও আমার ফাঁকা লাগে। বাড়ি গেলে আমার মোটেও ভালো লাগে না। যখন ভাবি তুমি বারান্দার চেয়ারে বসা থাকবে না তখন বুকটা হা হা করে উঠে। ভাবি কার সাথে আমি উকিল মুন্সীর গান নিয়ে কথা বলবো? কে আমাকে করিমের গানের সবক শিখাবে? তার থেকেই আমি উকিল, হাসন ও করিমের গানের মানবতাবাদী পাঠ পেয়েছি। তাকে দেখতে পাবো না এই ভয়ে বাড়ি যাই না।

কয়েক দিন আগে মা অসুস্থ ছিলেন। বাড়ি গেলাম। বাড়িতে ঢুকার আগেই মসজিদের সামনে তোমার কবর। দেখেই বুকটা ধুক ধুক করে উঠলো। চাচা তুমি কী আমাকে শুনতে পাচ্ছো?

দেখ তোমার এই ছোট ছেলেটা আজকে কবিতা লিখে, গান লিখে, গল্প লিখে। তোমার মত সে সাচ্চা কৃষক হতে পারে নি। কিন্তু তোমার ভিতরের চিন্তা তাকে তাড়া করে। সে তোমার চিন্তাকে বয়ে চলেছে। আরেকটা কথা চাচা— কবিতা আমি সেই ক্লাস ফোর থেকেই শুরু করেছি। দুটো বইও আমার বের হয়েছে। কিন্তু সাহস করে তোমাকে কখনো শুনানো হয়নি। যদি ভুল হয় সেই ভয়ে। আমি ভালো লিখতে পারি না। তোমার মতো এতটা মানবতাবাদী হতেও পারি না। তবে তোমাকে ভেবে একটা আপসোস হয়— হায় আমি যদি তোমার মতো একজন কৃষক হতে পারতাম? যে আধুনিক সময়েও কৃত্রিম সার ব্যবহার না করে, কোনো রাসায়নিক বিষ ব্যবহার না করে পাট, ধান, সবজি চাষ করবে। যে লালন ও পালন করবে বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

চেষ্টা থাকবে জীবনভর। দোয়া করো আমার জন্যে, আমাদের জন্যে। যেন আমরা বাঙালি হতে পারি তোমার মতো।

***********************************************

হুসাইন হানিফ

সমস্বরে গান গাওয়ার দিন আসার আগে পরে

নিজেকে নিদারুণ নিঃসঙ্গ মনে করার কালে হঠাৎ একদিন বগুড়া থেকে ছেড়ে আসা ফুলবাড়িগামী বাসে বসে বগুড়া-গাইবান্ধা-দিনাজপুরের আকুল করা বাংলা মায়ের খেটে খাওয়া সোনার ছেলেদের সবুজ শ্যামল ফসলের মাঠ দেখতে দেখতে আবিষ্কার করি—  আমরা কেউ একা নই; একা নই কারণ, আমরা কেউ উলঙ্গ নই; উলঙ্গ নই অর্থাৎ আমাদের গায়ে পোশাক আছে, পোশাক আছে মানে এটা বানাতে সুতা লেগেছে, অনেক শ্রম লেগেছে; অর্থাৎ এর পেছনে কারিগর আছে; কারিগর থাকা মানে তার স্পর্শ আমাদের গায়ে থাকা; তার সেই স্পর্শ ছাড়া তার সেই পরিশ্রম ছাড়া আমাদের স্বাভাবিক জীবন উলঙ্গ; অর্থাৎ তারা তাদের শ্রম দিয়ে স্পর্শ দিয়ে আমাদেরকে ঢেকে রেখেছে প্রতিটা মুহূর্ত।

আমরা কেউ একা নই; একা নই কারণ আমরা কেউ অভুক্ত নই; অভুক্ত না থাকার মানে আমরা নিয়ত খাদ্য গ্রহণ করি; খাদ্য গ্রহণ করা মানে কারও সাহায্য নেওয়া; কেননা খাদ্যটার খাদ্য হয়ে ওঠার পেছনে আছে অনেক হাত, হাত থাকা মানে অনেক লোকের উপস্থিতি; সেই উপস্থিতির বিদ্যমানতা আমাদেরকে এক অদৃশ্য সুতায় বেঁধে রাখে, আলাদা হতে দেয় না, আমরা আলাদা হতে পারি না; অতএব আমরা আলাদা কেউ নই।

এভাবে আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহার্য প্রতিটা জিনিস— সে লেখার কলম থেকে নিয়ে অক্ষরের চাবি পর্যন্ত— লাখো লাখো লোকের উপস্থিতি হয়ে আমাদেরকে হরদম বৃত্তের ভেতর বন্দি করে রাখে পৃথক হতে দেয় না; অথচ আমরা ভান করি যে আমরা অনেক একা, আমরা কেউ কারোর নই; অথচ ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’, প্রত্যেকেই অবনত অন্যের সাহায্য কাছে; আমরা বড় দুর্বল আর অসহায়— এই চেতনাটা আমাদের ভেতর থাকা অত্যন্ত জরুরি।

অথচ এটুকু ভাবার পর নতুন ভাবনার জন্য কিংবা সামান্য বিরতিতে ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করতে গিয়ে চোখে পড়ে নিজের সমস্ত স্বপ্ন মরে যেতে দেখে জমিতে গিয়ে বিষ গলায় ঢেলে প্রাণ দেয়া কৃষকের মুখে তাচ্ছিল্য ধরে রাখা ছবি; পত্রিকার পাতায় চোখ পড়লে জ¦লজ¦ল করে প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে লেখা কৃষকের রক্তলেখা করুণ বাঁকা বাঁকা সুইসাইড নোট; টিভিতে প্রচারিত হয় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কৃষকের ঋণভারে গাছের ডালে ঝুলে যাওয়া, সমাজকে ভেংচিরত বীভৎস লাশ— তখন আমরা ভাবিত হই, এবং পেছন ফিরে তাকাবার ফুরসত পাই, আর এই মীমাংসায় পৌঁছি— নিজের সমস্তটা দিয়ে যে কৃষক আমাদের সাহায্য করে বেঁচে থাকতে, তার পরিবর্তে আমরা তাকে মরে যেতে সাহায্য করি অনায়াসে; অদ্ভুত এই প্রতিদানই যে এখন কৃষকের প্রাপ্য তা বুঝতে মহাপ-িত হওয়ার প্রয়োজন নেই; দরকার শুধু অক্ষরজ্ঞান থাকা আর নিয়মিত পত্রিকায় চোখ রাখা; দেখে যাওয়া কৃষিপ্রধান এই দেশের পণ্যের সঠিক মূল্য না পাওয়া হাহাকারে উন্মূল চারপাশ, অনুভব করা জমির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কৃষকের ঘামের পরিশ্রমের গন্ধে ভরে যাওয়া বাতাস; দুই পা ফেলা ঘর থেকে বের হয়ে দিগন্তজোড়া বিস্তৃত ধান আর পাট আর গম আর মরিচ আর সরিষা আর ভুট্টার ফসলের মাঠে; হেঁটে যাওয়া ‘ছায়া সুশীতল, মায়া সুনিবিড়’ জনপদগুলোর নিচে বাস করা আপাত শান্ত কৃষকের ঘরে ঘরে; জেনে নেয়া এইসব গ্রামে মানুষের মতোই দেখতে কিছু জান্তব মোড়লদের, যারা ধারের বদলে কড়া সুদে ঋণ দিয়ে আত্মহত্যার পথ সুগম করে দেয়, সেবার নামে ব্যবসায়ী পোশাকিপ্রতিষ্ঠান— ভদ্র সেজে কাজ করে শয়তানের, কৃষককে উদ্বাস্তু হতে করে উৎসাহিত।

বিরতির জন্য বাস থেমে গেলে পথক্লান্ত যাত্রীরা নেমে যাবার পর পাশে বসা সহযাত্রী পূর্বপুরুষের পরম আয়েসে আর নরম তৃপ্তিতে তিলে ভাজা সামান্য নই আর বাদাম ভাজা খাওয়া দেখে আবার ভাবতে ভালো লাগে— কী সীমাহীন সারল্যে একজন কৃষক নিজের সমস্ত কিছু বাজি রেখে ফসল ফলায় ভরসায় বিশ^াসে; অথচ কত ভয়, কত খরা, কত বৃষ্টি; অথচ কত পোকা, কত মাকড়, কত জীবজন্তু; কত শিলা, কত বজ্র, কত কুয়াশা— অথচ; অথচ কত খরচ, কত পরিশ্রম, কত ঘাম ঝরানো;— তবু বীজ বপণ, তবু চারা রোপণ, তবু অপেক্ষা; তবু সেচন, তবু যতন, তবু বুক বাঁধা; তবু বর্ধন, তবু বর্ষণ, তবু ঘরে ফেরা; তবু পক্বন, তবু কর্তন, তবু ফল পাওয়া; এই এত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরও যখন কৃষক ন্যায্য মূল্য পায় না, রাস্তায় সোনার ফসল ছড়িয়ে, হাটেবাজারে পণ্য ফেলে রেখে, নিজের সমস্ত সাধ-আহ্লাদ পরিশ্রম ঘাম স্বপ্ন প্রেম আস্তাকুঁড়ে যেতে দেখে বসে পড়ে মাথায় হাত দিয়ে, মুখ কালো করে বাড়ি ফেরে হাটে যাওয়ার আগে আবদার জানানো সন্তানের জন্য সাধের জিলাপি আর গজা ছাড়া, ছিঁড়তে ছিঁড়তে ত্যানা হয়ে যাওয়া শাড়ি পরা বউয়ের জন্য একটা নতুন শাড়ি ব্যতিরেকে, সন্তানের পড়ার খরচ না দিতে পারায় আবারো মিথ্যা প্রবোধ দিতে দিতে, হোটেলে তিন মাস অন্তে নিজে একপ্লেট গরুর মাংস দিয়ে ভাত না খেয়ে, তখন খুব স্বাভাবিক কারণে বিবেকের দংশন তীব্র হয়ে উঠলে নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু গেঁথে নিয়ে গালি দিতে থাকি এই সব নিষ্ঠুর সভ্যতাকে, যাবতীয় সম্পদ করায়ত্ত করে রাখা দানবদেরকে, হাত নিশপিশ করে শ্রেণিশত্রুদের খতম করতে, আর তখন ক্ষেপে গিয়ে চিক্কুর দিতে ইচ্ছে করে— ‘আবার তোরা মানুষ হ, আবার তোরা মানুষ হ’।

মিথ্যা ক্ষোভে রেগে গিয়ে নিজের অক্ষমতাকে ঢেকে রেখে অন্যকে মানুষ বানানোর এই প্রক্রিয়ায় মনে পড়ে নিজের পূর্বের পুরুষ চৌদ্দ নয় আটাশ জনই কৃষক; তারা উত্তরাধিকারীসূত্রে পেয়েছে লাঙল, কাঁচি, পাঁচন; এই সব সরঞ্জামাদি নিয়ে তারা পার করেছে একেকটা আস্ত মানবজনম; অথচ তারা চাইলে যেকোন পেশা বেছে নিতে পারতেন; হতে পারতেন সমাজের আরো সব পেশাজীবী, হতে পারতেন ব্যবসায়ী— সেই সুযোগ তাদের ছিল; বাজারের সবচে বড় দোকান ছেড়ে দিয়ে আমার বাবা আবার জমিতে সবুজ ফসল ফলানোর জন্য হাতে তুলে নিয়েছিলেন বীজ;— এ তার নেশা, এ তার অহংকার।

এখনো পায়ে কাদা লেগে থাকা এই আমাদের পূবের পুরুষদের পথকে অবহেলার চোখে না দেখে সেই পথকে আরো প্রশস্ত করতে পারি, তাদের মুখে ফিরিয়ে দিতে পারি একটু টুকরো অমলিন বিনয়ী হাসি; তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ফসল ফলানোর আধুনিক সরঞ্জামাদি তুলে দিয়ে, কৃষিবিজ্ঞানের মদদে জন্ম নেয়া ভালো বীজের পদ্ধতির সন্ধান দিয়ে আমরা তাদেরকে নিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারি; আর শুধু ভালো ফলন হলেই হবে না, তার ন্যায্যমূল্য থাকতে হবে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরকেই;— তারাই উন্নয়নের মূল, শেকড়; তাদের ছাড়া উন্নয়নের আশা করা বৃথা।

আর এর জন্য অবশ্যই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে; এগিয়ে আসতে হবে ব্যক্তিকে, প্রতিষ্ঠানকে; সরকার এগিয়ে আসবে তার বাজেট নিয়ে, ক্ষমতা নিয়ে, মূল্যের ন্যায্যতা নিশ্চিত করে, বিভিন্নভাবে উৎসাহ জুগিয়ে: যোগ্য পরিশ্রমী ভালো ফসল উৎপাদনকারী কৃষককে সম্মান দিয়ে, পুরস্কার দিয়ে; ব্যক্তি এগিয়ে আসবে তার শ্রম নিয়ে, জ্ঞান নিয়ে, পরামর্শ নিয়ে, সহানুভবতা নিয়ে; প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে তার কৌশল নিয়ে, বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে, কৃষককে কম সুদে ঋণ দিয়ে, কিংবা বিনা সুদে ধার দিয়ে— এভাবেই যার যার অবস্থান থেকে তাদেরকে নিজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, মানবতার খাতিরে এগিয়ে আসতেই হবে।

তারপর হয়তো একদিন আমরা উন্নয়নের ঘোড়া হাঁকিয়ে, দেশ মাটি আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে, মাটির কাছে, মানুষের কাছে, দেশের কাছে, মায়ের কাছে এই বাংলার এই নদী-বন-বাতাস-পশু-পাখি-নিসর্গের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠতে পারব— ‘আমারা সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’…

***********************************************

মুহিম মনির

শস্যচাষীর স্বপ্নের তেপান্তরে

তুমি যেমন মাটিতে নাঙল চষো, ঊর্বর জমিনে বুনে যাও শস্যের বীজ, স্বর্ণশস্যে সাজিয়ে তোল নিরাভরণ মাঠকে; জানো, আমিও তেমনই স্বপ্নবীজ বুনে যাই লেখার খাতায়। এভাবেই একসময় অক্ষরে অক্ষরে অঙ্কুরিত হয় আমার শিল্পসন্তানরা। অনেকটা মটরশুঁটি আর ছোলাবাদামের অঙ্কুরোদ্গমের মতো। হয়তো এ-কারণে আমাকেও ‘চাষী’ বলেন অনেকে; বলেন, ‘শব্দচাষী।’ যদিও ভড়ংয়ের পর্দায় আড়াল করতে চাই চাষাত্মীয় পরিচয়টা; তবুও নিজেকে ‘শব্দচাষী’ ভাবতে ভালো লাগে। বলতে ভালো লাগে তার থেকে বেশি। কেমন একটা গর্ব গর্ব অনুভব দোল খায় মনে। বুকের ছাতিও ফুলে ওঠে সে-দোলায়।

তবে হ্যাঁ, যখন একা থাকি; আনমনে ভাবি তোমার কথা বাড়ির কথা, ঘরের কথা, ফসলী মাঠের কথা, তখন খনার কথাটাও খুব উঁকি দেয় মনে। কী সুন্দর কথা ‘চাষী আর চষা মাটি/ এ দু’য়ে হয় দেশ খাঁটি।’ কিন্তু এ তো কাব্য বলেই কদর পায় কিছুটা। বাস্তবে একআধুলি সমাদরও কি জোটে চাষাদের? তাদেরকে এতটুকু ভালো কথা বলে কেউ? তোমাদের ঘাম সেচে গজানো শস্যে উদর পূর্তি করে ফূর্তি করি আমরা। আর দিনশেষে সেই তোমাদের ভাগ্যেই কিনা জোটে উন্নাসিকতা। তবু আজও আদিখ্যেতা দেখাই। এখনও মাঝেমাঝে গাই কৃষিগান। যান্ত্রিক ভোকালে মঞ্চস্থও হয় কোনো কোনো কনসার্টে। তখন কলরোল তুলে সেসব শুনি আর হাততালি দিই। মাঝে মধ্যে তুমিও কি শোন না কিছুটা, দেখ না কোনো রঙিন পর্দায়?

হ্যাঁ, সেই দিনগুলোয় আমি তুমি আমরা গান শুনতাম। কাদাজল থেকে উঠে এসে, গামছাবাঁধা রুটি খুলে, জমির আইলে খেতে বসতে তুমি (আমিও খেতাম কখনোসখনো)। আর শুনতে থাকতাম রেডিওতে বেজে চলা গান। জারিসারি ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি কিংবা কোনো আধুনিক গানের আসর। তুমিও গলা ছেড়ে গাইতে দু’একদিন। তোমার ভাঙা গলা শুনে কেমন জানি হাসি পেত আমার। আর তেমনই কোনো একদিন তুমি বলেছিলে,

হাসছিস কেনে?

এমনি।

ওওও গানের লাইন উল্টাপাল্টা হইয়া যাইছে তাই? তো কহা তো, তোরঘে বইয়ে কিরিষককে লিয়্যা যে পইদ্যটা আছে ওইট্যা মুখস্থ কহা তো, শুনি।

কহব?

কহা। ভুল হইলে কিন্তু…।

কিন্তু ভুল হয় না আমার। কিংবা ভুল হয়; অথচ তুমি টের পাও না। হয়তো এ কারণেই উচ্চৈঃস্বরে শোনাতে থাকি রাজিয়া খাতুন চৌধুরানীর ‘চাষী’ কবিতাটা

‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,

দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।

দধীচি কি তাহার চেয়ে সাধক ছিল বড়?

পুণ্য অত হবে নাক সব করিলে জড়।

মুক্তিকামী মহাসাধক মুক্ত করে দেশ,

সবারই সে অন্ন জোগায় নাইক গর্ব লেশ…।’

শুনতে শুনতে তোমার চোখ ছলছল করত কিনা, সে আমি দেখিনি। তবে কেন জানি সেদিনের পরে প্রায়ই তুমি শুনতে চাইতে ঐ কবিতাটা। সে-দিনগুলোয় ভাবতাম, তুমি হয়তো পড়া ধরছ। স্কুলে যাবার আগে বই খুলেছি কিনা, তা দেখে নিতে চাইছ। কিন্তু এখন বুঝি, ঠিক কেনই-বা বারবার শুনতে চাইতে। কবি যে সে-কবিতায় চাষীদের নিয়ে দু’টো ভালো কথা বলেছেন, সে-কারণেই শুনতে চাইতে তুমি। ঠিক না?

আর যেদিন থেকে এটি বুঝতে পারলাম, টের পেলাম, মাঠের শ্রমিকটিও শুনতে চায় তাঁর স্তবগান, শুনে একটু সুখ পেতে চায় ঠিক সেদিন থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমিও কবিতা লিখব। চাষীদের নিয়ে লিখব; লিখব মজুর-মুটে-কুলিদের নিয়ে। আর তাই লাঙলের মতো করে কলম চালালাম খাতায়। চেষ্টা করলাম তোমাকে নিয়ে, তোমাদেরকে নিয়ে কিছু লিখতে। কিন্তু… কিন্তু ততদিনে তো চলে এসেছি মাঠ ছেড়ে। বহুদিন আর রেডিও শুনি না। আইলকাদায় হাঁটা হয় না আজ কতদিন!

আর এদিকে, এই ব্যস্ত শহরে, আমার কর্ণকুহরে বেজে উঠেছে নগরবাজনা। অচেনা বিদেশিনীর কোমল স্বরে কাতর হয়ে উঠেছি আমি। আর অজান্তেই আটকা পড়েছি শহুরে যানজটে। তবু দু-চোখে যখন ভেসে ওঠে সেই জো¯œাাস্নাত ধানশীষ, তখন আবার সেই শালিক ফিঙে, সেই লক্ষ্মীপেঁচা ডাকে আমাকে। কনক্রিটের খাঁচায় অবরুদ্ধ কান্নারা সোরগোল তোলে তখন। অন্তরাত্মায় বারেবারে বাজে, ‘এবার ফেরাও মোরে’, শস্যচাষীর স্বপ্নের তেপান্তরে।

***********************************************

মিরান শাহ

সন্তান

‘এবার হচ্ছে না যে চাচা।’

‘একটু দ্যাখ না বাপ, নইলে বিপদে পড়ে যাবো’— মকবুল হোসেন আকুতি জানায়,‘পুবপাড়ার ওইদিকে তোমাদের যে জমিগুলান আছে ওইখান থেকে হইলেও…’

‘আপনি বুঝতে পারছেন নাচাচা’, হাতের মোবাইল ফোনটির স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকে কথাটা বলে মামুন; রিভলিং চেয়ারটা এদিক-ওদিক দোলায়, তাতে একই সঙ্গে তৃপ্তিকর এবং নাবোধক ভঙ্গি।

‘গতবারের মত এবার আর ভাগ কম দেবো না বাপ’, মকবুল হোসেন মরিয়া চেষ্টা চালায়।

‘উউ..’ফোন থেকে মাথা তোলে মামুন, আগের কথাটা শুনতে পায়নি।

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কথাটা আবার বলে মকবুল হোসেন।

মামুন এপাশ-ওপাশ মাথা দোলায়। ওদিকে বাইরের দোকান ঘর থেকে হইচই এর শব্দ শুনে ফোনের দিকে তাকায় মামুন, একটা উইকেট পড়ে গেছে, মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। বাইরের দোকানঘরটায় বসে অন্যদের সঙ্গে টিভিতেখেলা দেখছিলো সেও। মকবুল হোসেন প্রায় একঘণ্টা ধরে বসেছিলো তার সঙ্গে কথা বলার  জন্য, প্রথমে মামুন ভেবেছিলো একসময় বিরক্ত হয়ে চলে যাবে লোকটা। কিন্তু একটু পরপরই ডাকছিলো লোকটা; ‘ও বাপ, একটু কথা ছিলো।’

বিড়বিড় করে লোকটাকে একটা খারাপ গালি দিয়ে উঠে দাঁড়ায় মামুন, তারপর দোকান ঘর সংলগ্ন অফিস ঘরটায় আসে।বাজারের এই দোকানটায় তার সারের ব্যবসা। অনেকখানি জায়গা নিয়ে দোকানটা, মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় আজ অনেক লোকজন ভিড় করে বসে খেলা দেখছে, বেশিরভাগই উঠতি যুবক।

ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের খেলা হচ্ছে আজ। আজকে বাজিটা অনেক বেশি ধরা হয়ে গেছে। গত কয়েকটা ম্যাচ পাকিস্তান বেশ সুবিধেজনক অবস্থায় আছে। তাই আজ অনেকের থেকেই টাকা নিয়েছে সে। বিলাস হোটলের সাবের ইন্ডিয়ার পক্ষে দিয়ে গেছে ৫ হাজার, বাবু ড্রাগ স্টোরের রফিক দিয়েছে ৮ হাজার এবং দুহাজার, একহাজারের বাজিগুলোও নিয়েছে আজ। সবমিলিয়ে হাজার বিশেক টাকা বাজি ধরেছে আজ। গত ম্যাচে বেশি কিছু আসেনি; বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে কেউ বাংলাদেশের হয়ে বাজি ধরতেই চাইছিলো না। তাই অফার দিতে হয়েছিলো, একশোতে দুশো। বাংলাদেশ সমর্থক একশো দিলে তাকে দিতে হবে দুশো। ম্যাচটা জিতেছে, কিন্তু তেমন কিছু হাতে আসেনি।

সামনে বসা লোকটার জন্য খেলার কিছুটা অংশ দেখা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে বলে ক্রমশ একটা রাগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে।

মকবুল হোসেন একজন ভাগচাষী, এরকম কিছু ভাগচাষী প্রায় রোজই তার কাছে আসে। তাদের অনেক জমি বর্গা দেয়া আছে।বিনিময়ে ফসলের অর্ধেক ভাগ দিয়ে যায়।

মকবুল হোসেন আবার বলে, ‘গতবার তোমার চাচীর খুব অসুখ করেছিলো বাপ, অষুধ কিনতে ম্যালা টাকা গেছে। এজন্যই গতবার ফসলের ভাগ কম দিয়েছি, তোমার আব্বা জানে ব্যাপারটা।’

মামুন উসখুশ করে ওঠে, ‘চাচা, আপনি দুটা দিন পর আসেন, আমি আব্বার সঙ্গে কথা বলে জানাবো।’

মকবুল হোসেন অনেকটা স্বস্তি বোধ করে। একেবারে না করে দিতে ধরেও ব্যাপারটা বিবেচনায় রাখছে এটাই অনেক।

‘এখন তাহলে যাই বাপ।’

‘আচ্ছা,যান।’

অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খেলায় মনোযোগ দেয় মামুন। মনে একটা খেয়াল আসে ওর। পাকিস্তান যদি আজ জিততে পারে তাহলে লোকটাকে জমি বর্গা দেবে ও।

মকবুল হোসেন ধীরপায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, দোকানে ভিড় করে বসে থাকা ছেলেগুলো থেকে থেকেই ‘পাকিস্তান’,‘পাকিস্তান’— বলে চিৎকার করছে।

স্কুলের গেটে ঢোকার মুখে শায়লা বানু দারোয়ানের মুখে খবরটা পেলেন। অর্ক ক্লাসের এক ছেলের সঙ্গে মারামারি করেছে, নাক দিয়ে রক্ত ঝরেছে। কথাটা শুনে আতকে উঠলেন শায়লা বানু, দারোয়ান তার ভয় পাওয়া চেহারা দেখে আশ্বাস দিলো, তেমন খারাপ কিছু হয়নি, শুধু খানিকটা রক্ত ঝরেছে।

রক্ত ঝরেছে! কথাটা শায়লা বানুর শরীর ও মনের ভেতর আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।তার বাচ্চা ছেলেটার শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে!

অর্কটা এমনিতেই রোগা, খেতে চায়না। এটা খাবেনা, ওটা খাবে না। সকল প্রকার খাবারেই তার অনীহা, শুধু আইসক্রিম আর চকোলেট বাদে। তার রোগা ছেলেটার শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে!

স্কুল ছুটি দেবার এখনও আধঘন্টা বাকি। সচরাচর এ সময়টা শায়লা বানু স্কুলের ভিতরে অবিভাবকদের জন্য রাখা জায়গাটায় বসে অপেক্ষা করেন। আজ আর অপেক্ষা করা সম্ভব হলো না, তার শরীরের ভেতর কেমন কেমন করছে, তিনি দারোয়ানকে দিয়ে অর্ককে ডাকিয়ে আনলেন।

অর্ক ভয়ে জড়সড় হয়ে মায়ের কাছে এলো। মাকে ভীষণ ভয় করে ওর, খেতে না চাইলে মা খুব রাগ করেন।

অর্কর মুখটা আলগোছে দুহাতে ধরে দেখতে লাগলেন তিনি, নাকের কাছে এখনও খানিকটা রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে মুখটা মুছিয়ে দিলেন।

‘কে মেরেছে আমার আব্বু সোনাটাকে?’

মায়ের আদুরে গলায় অর্কর ভয় কেটে যায়। চটপট বলে ওঠে, ‘আমাকে খারাপ গালি দিয়েছে, এজন্য একটা ঘুষি মেরেছি, ভালো করি নি আম্মু!’

‘হ্যাঁ, ভালো করেছো, এখন রিকশায় ওঠো।’ একটা রিকশা থামিয়ে অর্ককে নিয়ে উঠে পড়েলন শায়লা বানু।

‘তোমার আব্বুকে বলো না’ রিকশায় বসে বললেন শায়লা বানু। অর্ক মাথা নেড়ে সায় জানালো।

একটা কোনো ডিসপেনসারি তে নেমে ওষুধ নেবেন  অর্কর জন্য, তারপর কিছু কেনাকাটা করে বাসায় ফিরবেন। অর্কর ঘটনাটা ওর বাবাকে বলা যাবেনা, সে জানতে পারলে হয়তো স্কুলে চলে আসবে সেই ছেলেটাকে দেখে নিতে। বাচ্চাদের ও ভীষণ ভালোবাসে।

আজ ভোরবেলাতেই বেশ রোদ উঠেছে, ঝলমল করে হাসছে যেনো প্রকৃতি।

মকবুল হোসেনের স্ত্রী জোবেদা খাতুন ভোরে উঠেই চুলোয় তরকারি চাপিয়েছিলেন, গতদিন ঝোপঝাড় থেকে খুজে আনা কচুশাক আর তার ডাটা।

গতরাতের পান্তাভাতের সঙ্গে গরম গরম কচুশাক খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন মকবুল হোসেন। বারান্দায় রাখা কোদাল আর বাশের টুকরি টা কাধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন,অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।

কয়েকটা দিন প্রাক্তন চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে ধর্ণা দিয়েছেন মকবুল হোসেন। চেয়ারম্যান সাহেব তাকে পেয়ে অনেকগুলো কথা বললেন।

‘বুঝলা মিয়া, এইবার গাঁয়ের  লোকেরাই আমাকে ভোট দেয়নি।’

মকবুল হোসেনের সামনে তখন পাঁচ/ছয় প্রকারের নাস্তা, তিনি আপেলের একটা টুকরা মুখে পুরে বললেন, ‘আমি ভোট দিয়েছিলাম।’

‘তা তোমার ওপর সে বিশ্বাস আছে মিয়া, এবার আপন জনেরাই নেমকহারামি করেছে,যাইহোক, মামুন বলেছে তুমি দোকানে গিয়েছিলে।’

‘আপনার ওপরই তো ভরসা করে আছি চেয়ারম্যান সাহেব।’

‘তোমার বড়ছেলের ব্যবসা কেমন চলছে?’

‘ভালোই চলছে শুনেছি’, মকবুল হোসেন একটা খেজুর মুখে পুরে উত্তর দিলেন।

‘বউটা নাকি হারামি শুনলাম, তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?’

মকবুল হোসেন উত্তর দেবার আগেই চেয়ারম্যান সাহেব আবার প্রশ্ন করলেন, ‘ছেলেটা কোনো খরচ দেয় না? পাশের পাড়াতেই তো থাকে।

মকবুল হোসেন চুপচাপ খেজুর চিবুতে লাগলেন।

প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবার বললেন,‘মামুন কে বলে দিয়েছি, পুবপাড়ার জমিটা তোমাকে দেবে। এবার ভাগ ঠিকমত দিও।’

মকবুল হোসেন আনন্দে আপ্লুত হয়ে গেলেন। আনন্দের আতিশয্যে সমবয়সী প্রাক্তন চেয়ারম্যানের পা ছুঁয়ে ছালাম করে বসলেন।

দুপুর অবধি জমি কোপালেন মকবুল হোসেন।দুপুরের দিকে জোবেদা খাতুন পুটুলি বেধে খাবার নিয়ে আসলেন। খাবার খেয়ে আবার কোপাতে লেগে গেলেন তিনি।

ঘটনাটা ঘটলো শেষ বিকেলের দিকে। তখন সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে। একটু পর বাড়ির পথ ধরবেন ভাবছেন, হঠাৎ মাথাটার মধ্যে কেমন করে উঠলো। কিছু বুঝে উঠবার আগেই একটু আগে কোপানো জমির মধ্যে ঝুপ করে পড়ে গেলেন মকবুল হোসেন। তখনও কিছু লোক কাজ করছিলো আশেপাশের জমিতে। তারাই পৌঁছে দিয়ে গেলো বাড়িতে।

ঘরে একটা হারিকেন জ্বলছে, ঘষাকাচ ভেদ করে আলো বেরিয়েছে ঘোলা হয়ে। পুরো ঘরটাকে আলোকিত করতে পারেনি। মকবুল হোসেনের বিছানার  নিচে রাখা হয়েছে হারিকেনটা। শিয়রের কাছে বসে আছে তার বড়ছেলে জামাল হোসেন। তার বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, খবরটা পেয়ে বাবাকে এসেছেন জামাল হোসেন। সামনে রাখা প্যাকেটে কিছু ফলমুল।

‘এখন কেমন বোধ করছেন আব্বা?’

মকবুল হোসেন বালিশটা একটু উচু করে আধশোয়া হলেন, ‘ভালো।’

‘ডাক্তার দেখেছে?’

‘নিমাই ডাক্তার এসেছিলো।’

‘আপনি চাইলে আমি আপনাকে শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে পারি।’

‘সে প্রয়োজন হবে না।’

জোবেদা খাতুন এসময় হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। একহাতে চায়ের কাপ, অন্যহাতে অর্ক কে ধরে আছেন। অর্ক তার বাবার ন্যাওটা। জামাল হোসেন ছেলেকে প্রায় সময়ই সঙ্গে রাখেন। দাদা বাড়ি আসার কথা শুনে অর্কও নেচে উঠেছিলো। দাদি তাকে খুব আদর করেন।

ছেলের হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে অর্ককে কোলে তুলে নিলেন জোবেদা খাতুন, ‘বউমা কেমন আছে?’ ছেলেকে প্রশ্নটা করলেন তিনি।

‘ভালো।’বউয়ের কথায় জামাল হোসেনের মনে পড়লো শায়লা একটা প্রস্তাব দিতে বলেছে আব্বা-আম্মাকে। কথাটা কেমন করে তুলবেন ভেবে পেলেন না কিছুতেই।

‘শফিকের এসেছে?’ মকবুল হোসেন জানতে চাইলেন।

‘না আব্বা, ও তো বছরে দুবার আসে বাড়িতে জানেনই’, শফিক জামাল হোসেনের বড় ছেলে, ‘ইউনিভার্সিটি ছুটি হলে তবে আসবে। ছেলেটা বাইরে থেকে থেকে কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে। বড্ড চিন্তা হয়।’

বলে চুপ করে গেলেন জামাল হোসেন। শায়লার কথাটা কিভাবে তুলবেন ভাবছেন। কোনো কুলকিনারা দেখছেন না, কিভাবে কথাটা তোলা যায়।

‘ব্যবসা পাতি কেমন চলছে?’ মকবুল হোসেন জানতে চান।

‘চলছে ভালোই, তবে ইদানীং একটু সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

‘কি সমস্যা?’

‘সমস্যাটা আব্বা ব্যবসা সংক্রান্ত নয়, আপনার বউমা আর ভাড়া বাড়িতে থাকতে চায় না। নিজেদের একটা বাড়ি বানাতে চায়। বাড়ি বানাবার জন্য টাকাপয়সাও রাখা হচ্ছে অনেকদিন ধরে।’

‘তাহলে সমস্যা কোথায়?’ অর্ককে আদর করতে করতে জানতে চান জোবেদা খাতুন।

‘না মানে, সমস্যা তেমন নয়…

বাকি কথাটা বলতে গিয়ে কোথাও আটকে গেলো যেনো। জামাল হোসেন উঠে দাড়ালেন,‘আজ যাই মা, আব্বার কিছু লাগলে জানাইও।’

এবছর শীতটা যেনো বড্ড বেশি পড়েছে। প্রতিবছরই তাই মনে হয় মকবুল হোসেনের। গায়ের সোয়েটারটায় একটা হুড আছে, সেটা মাথার উপর তুলে দিলেন কাঁপা কাঁপা হাতে, ছেলের বউ দিলো আজ সোয়েটারটা,শ্বাশুড়ির জন্যও একটা দিয়েছে।  আজ বেশ একটা খাওয়া দাওয়াও হলো ছেলের বাড়িতে। অনেক দিন যান না ছেলের বাড়িতে। শফিক ছুটি পেয়ে বাড়িতে এসেছে,তাই জামাল হোসেন আব্বা-মাকে ডেকেছিলো বাড়িতে। জোবেদা খাতুন অসুস্থ, বাতের ব্যথাটা বড্ড ভোগাচ্ছে তাকে। আজকাল হাঁটাচলা করতে ভীষণ কষ্ট হয়।  তাই মকবুল হোসেন একাই গিয়েছিলেন। ফেরবার সময় শায়লা সোয়েটার দুটো হাতে দিলেন, ‘আব্বা, শীত বেশ পড়েছে। এ দুটো রাখুন।’

মকবুল হোসেন হাত বাড়িয়ে নিলেন।

শায়লা রাস্তায় খানিকটা এগিয়ে দিতে এসে খানিকটা ইতস্তত করে বললেন, ‘একটা কথা ছিলো আপনার সঙ্গে।’

মকবুল হোসেন বিস্মিত হলেন, শায়লা তাদের সঙ্গে দুবছর হলো কথা বলেনি। শেষবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার আগে অত্যন্ত কটু ভাষায় তাকে ও জোবেদা খাতুনকে গালিগালাজও করেছিলো। আজ কত সুন্দর মিষ্টি গলায় কথা বলছে। মানুষের বোধহয় একই সঙ্গে অনেক গুলো চেহারা থাকে।

শায়লা উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন,‘আব্বা, আপনার ছেলে একটা কথা বলতে চায় আপনাকে, সে সংকোচ করছে, তাই আমিই বলছি। আমরা একটা বাড়ি বানাবার চিন্তা করছি। বোঝেনই তো ছেলেগুলো বড় হচ্ছে, ভাড়া বাড়িতে আর কদিন থাকা যায়।’

‘হু’ মকবুল হোসেন  মাথা ঝাঁকালেন।

শায়লা আবার বলতে লাগলেন, ‘আপনাদের বাড়িটা তো পড় পড়, অনেকখানি জায়গাও আছে, আমরা ভাবছিলাম ওই বাড়িটা ভেঙ্গে ওখানে বাড়িটা বানানো যায়। আপনি আর আম্মাকেও ভাঙ্গা বাড়িতে আর থাকতে হয় না তাহলে, আমাদের সঙ্গেই থাকলেন। এই বয়সে ছেলের সেবা পাওয়ারও তো অধিকার আছে আপনাদের।’

মকবুল হোসেন কে চুপ করে থাকতে দেখে শায়লা বানু খুশি হলেন, ‘আম্মার সঙ্গে কথা বলে আসবো।’

মকবুল হোসেন ধীরপায়ে চলে আসেন, বড্ড অন্ধকার চারদিকে। অন্ধকার যেনো কালি লেপে দিয়েছে রাস্তাঘাটে। আসার পথে বাজার পড়ে মধ্যিখানে। সেখানে এসে দাড়িয়ে গেলেন মকবুল হোসেন। ওইতো মামুনদের দোকানটা। গতবার ফসলের ভাগ ঠিকঠাকই দিয়েছেন তিনি। এবারও নিশ্চয় জমিটা পাওয়া যাবে।

বুড়িটা বাতের ব্যথায় বড্ড ভুগছে। যাবার পথে দুডোজ ওষুধ নিতে হবে। কুঁজো ঘাড় নিয়ে এগিয়ে যান মকবুল হোসেন।

***********************************************

রায়হান উদ্দিন নোমান

সৌন্দর্যের সতীচ্ছেদ

বর্ষীয়ান বৃদ্ধ ছফদর আলী তার বাড়ির কাঠের তৈরি বাংলাঘরের বারান্দায় পাতা লম্বা টুলের একমাথায় বসে পিতলের হুকা টানতে টানতে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন বাহির বাড়ি লাগোয়া পুকুরের শাপলা গাছের দিকে। গাছাই আছে শুধু, ফুল নেই। আগে ফুল হত কিন্তু বছর খানেক আগে তার সদ্য মাস্টার’স পাশ ছোট ছেলে যখন ‘এত বড় পুকুর ফেলে রেখে লাভ কী?’ এই অজুহাত তুলে মাছ চাষের পরিকল্পনা হাতে নিল তখন থেকেই একে একে শাপলা গাছের গোছাগুলো অদৃশ্য হতে লাগল। অথচ পাশের বাড়ির হযরত আলীর কাছ থেকে দেড় কাটা জমি বেশি দিয়ে ‘এওয়াজ পাল্টা’ করে পুকুরটি কাটিয়েছিলেন শুধুমাত্র শখের বশে। বাড়ির সামনে ঘাটবাঁধানো, চারদিকে পাড়ে খেজুর, নারকেল সুপারীর সারি আর মাঝখানে শাপলা ফুলের সৌন্দর্য্যম-িত পুকুরের টলমলে পানির দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার আনন্দই স্বর্গতুল্য। কিন্তু জনসংখ্যার আধিক্য, দূষিত পরিবেশ, দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো, পুঁজিবাদের বিকৃত সংস্করণের প্রয়োগ প্রভৃতির প্রভাবে, ‘মনস্তাত্ত্বিক আনন্দ কর ধ্বংস, সৌন্দর্য্যবিহীন উৎপাদনই মূখ্য উদ্দেশ্য’ এই যুক্তির কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এক সময়কার দাপুটে ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়্যারম্যান ছফদর আলী। উৎপাদন কোন অংশে কম করেন নি তিনি তবে তার আনন্দ অনেকাংশেই উৎপাদনের সমকক্ষ ছিল। এককেজি ওজনের পাঙ্গাস মাছের বদলে এই পুকুর থেকেই যখন যৌবনে তার হাত থেকে ছিপ ভেঙে সারা পুকুরের জলে আলোড়ন তুলত সাড়ে চার কেজি ওজনের রুই মাছ তখনকার উল্লাস, উচ্ছ্বাস, একট্রাক পাঙ্গাসেও এখনকার দিনে চোখে পড়ে না। হৈ-হুল্লোড় করে একসাথে ছ-সাতজন ঝাঁপিয়ে পড়ত মাছটাকে ধরার জন্যে। আর জাল ফেললে তো কথাই নেই, গ্রামের সমস্ত মানুষের ঢল ভেঙে পড়ত চারদিকের পাড়ে।

বৃদ্ধাবস্থায় স্মৃতিচারণ মানবমনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ছফদর আলীর স্মৃতিচারণতায় ছেদ পড়ল সুফিয়া বেগমের ডাকে। সুফিয়া বেগম তার চতুর্থ স্ত্রী। ঔপনিবেশিক আমলে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ার দরুণ মহকুমা শহরের মেয়ে বিয়ে করে পুরোপুরি কৃষক বনে গিয়েছিলেন তিনি। শহর আর গ্রামের ‘কৃষি’ নামক অসামঞ্জস্যতার ফলস্বরূপ মহকুমার মেয়ে আর টিকল না। এর পরের জন সাড়া দিলেন ‘ওলাবিবি’-র ডাকে। তৃতীয়জন আচমকাই শয্যাশায়ী হয়ে কবিরাজ ডাকার আগেই নিঃশব্দে পাড়ি জমান। স্বভাবচরিত্র নিঙ্কলুষিত হওয়ায় প-িতের মেয়ে সুফিয়া বেগমকে পালকি করে ঘরে তোলেন ছফদর আলী। তার গর্ভেই ছফদর আলীর ঔরসাজাত চার ছেলে, দুই মেয়ে। সুফিয়া বেগম এসেছেন পান নিয়ে। হামানদিস্তায় পেষানো পান মুখে পুরে ইশারায় সুফিয়া বেগমকে বসতে বললেন তিনি। সুফিয়া বেগম স্বামীর কথার অবাধ্য হলেন না, কখনই যে হন নি। হঠাৎ ছফদর আলী জিজ্ঞেস করলেন,

‘আইচ্ছ্যা বৌ, তোমার কি পুঙ্কুনি কাডনের কতা মনে আছে?’

‘কী যে কইন্যা আমনে? মনে আছে, বেবাক কতায়ই মনে আছে?’

‘কাডনের সময় ডেগ-পাতিল, বৈডা আবিজাবি পাইতাছিলাম আর তুমি কইতাছিলা আরও কাডেন তইলে স্বর্ণের ডেগ পাইবেন। হা, হা, হা, কী বেক্কল আছিলা তুমি?’

‘যাইন! সারাডাজীবন এইডা লইয়া শরম দিছেন আমারে, হেই সময় না অয় ছোড আছিলাম, কততাই বুজ্জিনা।’

‘আইচ্ছ্যা বাদ দেও, শাপলাগুলি কী সুন্দর আছিন! শাপলাগুলি না উডাইলে কী অমুন ক্ষতি অইত?’

‘শাপলা থাকলে বেলে মাছ অয়না এল্লেইগ্যা আলমে (ছোটছেলে) তুইল্লা লাইছে।’

আগেও ত শাপলা আছিন, তহন কী মাছ অইছে না?

‘অইছে কিন্তুক মনে অয় কম।’

‘হ কইছে তুমারে? বড় বন্যার সময় দেখছ না কত মাছ ভাইস্যা গেল গা?’

সুফিয়া বেগম নিরুত্তর হয়ে গেলেন কারণ ছফদর আলী ভুল বলেননি। কিন্তু ছফদর আলীর মনোজগত ঘুরে গেল। ওই এক বন্যা থেকেই তার অধোগতি শুরু। একের পর এক ঘটনাক্রমে তার দাপট আস্তে আস্তে মিইয়ে যেতে শুরু করেছিল। বন্যার সময় তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়্যারম্যান। এত পানি হয়েছিল যে মানুষ থাকার জায়গা নেই, ঘরবাড়ি, পথঘাট সব ডুবন্ত, সমস্ত ফসলের মাঠ, সমস্ত জলাশয়ের মাছ গেছে ভেসে। কারও ঘরে খাবার নেই, গবাদিপশু সব নিরুদ্দেশ, চারিদিকে হাহাকার। এমতাবস্থায় সবাই এসে শরণাপন্ন হল চেয়্যারম্যানের কাছে। ছফদর আলী বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের সমস্ত সঞ্চয় ভুখা মানুষের তরে অকাতরে বিলিয়ে দিলেন। বন্যা শেষ হলে মানুষের হাহাকার আরও তীব্র হল। যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন, প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন দ্রব্যাদির অপ্রতুলতায় জনজীবন বিপর্যস্ত। এমন দূরাবস্থাতেও কৃষকেরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন মাঠে। কারণ বন্যা হয়েছে, জমিতে নতুন পলি পড়েছে, এবার ফসল হবে বাম্পার। কিন্তু বাধ সাধল বীজ, বন্যায় যে সব বীজতলা একেবারে পচে গেছে। ছফদর আলী ধরনা দিতে লাগলেন উপজেলা কৃষি অফিসে। কৃষি অফিসে ঘুরতে ঘুরতে চারদিন পর কৃষি অফিসারের মতলব বুঝতে পারলেন ছফদর আলী। ঘুষ চায় শালা, তাও দেয়া যেত কিন্তু বন্যা পরবর্তী অবস্থায় যে কারও হাতেই টাকা নেই তা বলাই বাহুল্য। উপায়ান্তর না দেখে ছফদর আলী জমি বন্ধক রেখে সুদের উপর ঋণ নিলেন। নতুন উদ্যমে দুচোখ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ফসলের মাঠে, সেবার ফলনও হল বাম্পার।

ছফদর আলীর গোলাঘর কানায় কানায় পূর্ণ। পূর্ণতার দেয়ালে অপূর্ণতার কারুকাজ প্রকৃতি নিপুণ শিল্পীর মতই দক্ষ হাতে করে। ছফদর আলীর বেলায়ও ব্যতিক্রম ঘটল না। কোন এক অমাবস্যার রাতে তার বড় মেয়ে তারই গড়া জামে মসজিদের ইমাম-এর সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়ল। রাগে-ক্ষোভে, লজ্জায়-অপমানে ছফদর আলী দিশেহারা। স্বেচ্ছায় গিয়ে ইউনিয়ন বোর্ডে ইস্তফা দিয়ে আসলেন। নিস্তব্ধ হয়ে ধ্যান-জ্ঞান পুরোপুরি নিবেশ করলেন কৃষিতে। কিন্তু তবুও সালিশ-বৈঠকে, এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সভায়, বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে ছফদর আলীর উপস্থিতি এলাকাবাসীর একান্ত কাম্য। অজপাড়াগায়ের নিরক্ষর চাষাগুলো তখনও যে সভ্যতার আতিশায্যে নিমকহারামী শিখতে পারে নি। প্রথম প্রথম বাধ সাধলেও পরে আর পারেন নি। জন¯্রােতে কি আর কখনও কোন আপত্তি টেকে? জনতা কী জিনিস ছফদর আলী তা খুব ভালোভাবেই জানেন। দুই দুই বার ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচনে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট এ সমস্ত ছাড়াই পাশ করেছেন তিনি। উন্মত্ত জনতা তাকে ঘাড়ে করে মিছিল করতে করতে বিজয়োৎসব করেছিল। আজও তার শয়নকক্ষের দরজার পেছনে তার প্রথম ইলেকশানের নিদর্শনস্বরূপ বোতল মার্কা পোস্টার শোভা পায়। ওই সমস্ত তার জীবনের যৌবনময় সোনালী অধ্যায়, থাক সে কথা। ছফদর আলী সুফিয়া বেগমকে কল্কের আগুন আনতে বললেন। সুফিয়া বেগম স্বামীর কথার অবাধ্য হলেন না, কখনই যে হননি। সুফিয়া বেগম অদৃশ্য হতেই ছফদর আলী আবার স্মৃতিতে ডুব দিলেন। কত রকম আশাই না করেছিলেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে! স্বপ্ন দেখেছিলেন মেয়েদেরকে ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিয়ে ছেলেগুলোকে মাটির কাছাকাছি রাখবেন। তারা চাষ-বাস করবে, এলাকার প্রতিনিধিত্ব করবে, জনহিতকর সমস্ত কাজে নেতৃত্ব দিবে এসব পরিকল্পনাই ছিল তার মনে।

এরূপ উদ্দেশ্যের জন্যেই ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের উদাসীন। তবে লোকে বলে ভিন্ন কথা, তারা বলে অনগ্রসর সমাজের অগ্রগতির পেছনে ছুটতে গিয়েই ছেলেমেয়েদের বেশি দূর পর্যন্ত পড়াতে পারেন নি ছফদর আলী। তা না হলে কী করে এতলোক চেয়্যারম্যান বাড়িতে জায়গীর থেকে জজ-ব্যারিস্টার হল? এমন প্রশ্নের উত্তর ছফদর আলী বরাবরই এড়িয়ে গেছেন।  বড় মেয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর পরের বছরেই বড় ছেলেকে বিয়ে করিয়ে ঘরে নতুন বউ আনলেন আর ঠিক করে রাখলেন ছোট মেয়ের বিয়ে দিবেন মহাধুমবাম করে। ঐ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে লাগলেন। এর মধ্যেই নতুন বউ এর প্রভাবে সাংসারিক হয়ে যাওয়া ছেলের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পেলেন। সে তার আলাদা সংসার চায়, আলাদা পুঁজি চায় সর্বোপরি সে আলাদা স্বপ্ন চায়। ছফদর আলী মনঃক্ষুণœ হলেও ছেলের স্বপ্নকে অগ্রাহ্য করলেন না। জমিজমা ভাগ করে একভাগ বড় ছেলেকে দিয়ে আবার তিনি ঝাপিয়ে পড়লেন ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের টুকরোগুলো জোড়া লাগাতে। ভেঙে ছড়িয়ে যাওয়া স্বপ্নটুকরোগুলো খুঁজে পেতে কম বেগ পোহাতে হয়নি ছফদর আলীকে। তবে সবগুলো টুকরোই খুঁজে পেয়েছিলেন আর যখনই টুকরোগুলো জোড়া দিতে দিতে পূর্ণস্বপ্নের অবয়ব দৃশ্যমান হচ্ছিল তখনই আবার প্রকৃতির রুদ্র খেয়াল। প্রমত্ত দমকা হাওয়ায় স্বপ্নটুকরোগুলো আবার দিগি¦দিক ছড়িয়ে গেল। তার মেজ ছেলে আচমকা সপ্তমশ্রেণী পড়য়া এক মেয়েকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব ভাটা কেটে গেলে প্রচ- হুঙ্কার দিলেও দিনকতক পরে তার হিতাকাক্সক্ষীদের বারংবার সবিনয় অনুরোধের ফলশ্রুতিতে অবশেষে মেনে নিলেন হতবিহবল ছফদর আলী। হতবিহ্বলতা কেটে যেতেই ছফদর আলীর মন ক্ষোভে বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠল। তার সমস্ত স্বপ্নেই যে প্রকৃতি বাধ সাধে! বিক্ষিপ্ত মনে তিনি মনস্থির করলেন আর স্বপ্নের টুকরো জোড়া দিতে যাবেন না, পুরো স্বপ্নটাকে চটের ব্যাগে করে হাট থেকে কিনে নিয়ে আসবেন। পরিকল্পনামাফিক বেশিকিছু জমি তিনি বিক্রি করে দিয়ে মহাধুমধামে ছোট মেয়ের বিয়ের আয়োজন করলেন। আজও ওই বিয়ের কথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ত্রিকালদর্শী বুড়োরাও বলে এমন আয়োজন বাপের জন্মে দেখেনি। টানা তিনদিন ধরে সমগ্র এলাকা ভোজ উৎসবে মেতে ছিল। বৈচিত্র্যময় সজ্জায় সজ্জিত বরযাত্রীর নৌবহর অদৃশ্য হতেই সকলের অলক্ষ্যে দু’ফোটা অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন ছফদর আলী। এত ঘটনাবহুল দিনগুলোতেও তার ফসল উৎপাদনে কিছুমাত্র ব্যাঘাত ঘটেনি। কর্ষিত জমির বুক চিরে বের হওয়া শষ্যদানাগুলো নিজস্ব গতিতেই জমা হচ্ছিল ছফদর আলীর গোলাঘরে। কিছুদিন বাদেই তার বড় ছেলে চাষ-বাস ছেড়ে কিছু জমি বন্ধক রেখে ব্যবসায় মনোনিবেশ করল। দ্বিতীয়জনেরও কৃষিকাজে তেমন আগ্রহ নেই। ক্রোধে উন্মত্ত ছফদর আলী সেজো ছেলেকে ও বিয়ে করিয়ে মেজো আর সেজো এই দুজনকে জমিজমা ভাগ করে আলাদা করে দিলেন। ছোটটাকে পারেননি শুধুমাত্র তখনও হাফপ্যান্ট ছাড়তে পারেনি বলে। ছোট ছেলে আর দুই মেয়ের প্রাদ্য অংশটুকু হাতে রেখে ছফদর আলী অবাক দৃষ্টিতে দেখলেন কেমন করে তারই চোখের সামনে তার সমস্ত সম্পত্তি বিশ্লিষ্ট হয়ে গেল উৎপাদকে বিশ্লেষণের মত। ফুঁ দিতে দিতে নারকেলের ছোবড়ার আগুন নিয়ে সুফিয়া বেগম এলে ছফদর আলী জিজ্ঞেস করলেন,

‘আইচ্ছ্যা বৌ, এই পাঙ্গাসগুলি বেচার উপযুক্ত অইতে কয়দিন লাগে তুমি জান?’

‘আলমেত কইছে তিনমাস বেলে লাগে, হাছা-মিছা কইতারিনা।’

কি কত বৌ! মাত্তক তিনমাস! আঙ্গর বেলাত কাতলা মাছই খাওনের উপযুক্ত অইতে এক-দেড় বছর লাগবে। আর এই পাঙ্গাস মাওক তিনমাস?’ হুকোটা সাজিয়ে দিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে সুফিয়া বেগম বললেন, ‘অইত না? দেহেন না পুস্কুনি কি সোন্দর কইরা পরিষ্কার কইরা পানিত চুন দিছে? আরও কত বস্তা বস্তা বইরা খাওন-মাওন আনছে, এইত্তা কাওন বেলে মাছের লাইগ্যাওই বানায়! জীবনে হুনছি না মাছের লাইগ্যাও বেলে আলেদা খাওন আছে!’

‘দুনিয়া অনেক আওগ্যাইয়া গ্যাছেগা বৌ, দেহ না অক্কনে ইরিধান অয়, ক্ষেতের মইদ্যে মাইনষে পোহের অষুদ দেয়, সার দেয়। মেগ না অইলে সেলু ইন্জিনদা পানি দেয়, হুনচি অনে বেলে বন্যা অইলেও ধান নষ্ট অয় না। মাইনষে কততা যে বাইর করছে!’

বলতে বলতে ছফদর আলী চোখের সামনে চিত্রকল্প তৈরী করেন। দেশের কোন জমি অনাবাদি রইবে না, সব জলাশয়ে মাছচাষ হবে, প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে গৃহপালিত পশু-পাখির খামার হবে, আহা! কী দেশটাই না হবে তখন! কোন মানুষই আর কখনও খাদ্যকষ্টে থাকবে না, ইন্ডিয়ান ডাল-পেঁয়াজ আর আনতে হবে না উল্টো আমরাই ওদের দিব। বিজ্ঞানের কল্যাণে আর মানুষের পরিশ্রমে, আবহমান বাংলায় আবার ফিরে আসবে তার স্বর্ণোজ্জ্বল রূপ, ‘গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ।’ অগণিত পাঙ্গাসের হা করা মুখ স্বপ্নহারা ছফদর আলী-কে আপাতত সেই সোনার বাংলার স্বপ্নই দেখায়। মোহ ভাঙলে ছফদর আলী স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘শাপলাগুলির লাইগ্যা তুমার মন খুউব কান্দে, না?’ সুফিয়া বেগম নিরুত্তর হয়ে উদাস দৃষ্টিতে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ছফদর আলী তার কাঁধে সুফিয়া বেগমকে মাথা রাখতে বলেন। সুফিয়া বেগম স্বামীর কথার অবাধ্য হলেন না, কখনই যে হননি।

***********************************************

আরিফ তুরহান

সবুজে জমা সোনালী রোদের জীবন

ভোরের রোদ তখনো ধানের উপরে মাথা পেতে শোয় নি; নির্মোক কুসুমের রক্তাক্ত প্রতিভাস লৌকিক দানবের স্নিগ্ধ আগমন ঘোষণা করছে। ঘাসের ঠোঁটে মুক্তোর মতো জড়িয়ে থাকা শিশির যেন স্বচ্ছ নীল-আকাশের দেয়া অর্বুদ চুম্বন। সূর্যের সোনালী রোদ আস্তে আস্তে জমে যাচ্ছে দিক থেকে দিগন্তের শস্যে। মৃদু বাতাস তার অর্ধনগ্ন শরীর ছুয়ে যাচ্ছে অসন্তর্পণে। ভরা ভাদরে যৌবন মাথায় কয়েকটি তালগাছ গায়ে বাতাস মেখে সশব্দে হাসছে। তার কম্পমান ছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখছি আমার পরিচিত লাল রক্ত প্রাণবন্ত সবুজ সাগরে লীন হয়ে যেতে, উন্মাদ প্রকৃতির অনুদার্য খেলায় তাল দিয়ে দিয়ে কৃচ্ছসাধনে প্রবৃত্ত প্রকৃতির সন্তানদের। সবুজ জীবন রোপনের সময় হঠাৎ করে সুর করে একসঙ্গে গেয়ে ওঠা ওদের কোনো গান তাদেরই প্রবাহিত হয়ে যাওয়া জীবনের কোরাসের মত ঝঙ্কার তোলে। যে পর্বতপ্রমাণ গাভী সবুজের টানে উদ্দাম নৃত্য করতে করতে আমার চার বছরের চোখকে ভয়ে সন্ত্রস্ত করে দৌড়ে গিয়েছিলো সে ভয় আজ বিস্ময় হয়ে মিশে গেছে অবচেতন স্মৃতির কোঠরে।

সর্ষের হলদে ফুলে যখন দুধের মত সাদা চাঁদের আলোয় লুটোপুটি খায় তখন রতন, গায়ত্রী পরামানিকেরা সেই মহাজাগতিক অতিপ্রাকৃত দৃশ্যে চোখ জুড়ানোর আগেই পৃথিবীর রক্তের মত কালো অন্ধকার এসে তাদের অবচেতন করে ফেলে। প্রকৃতি এই কঠিন শিল্পীদের দিয়ে নিজেকে অলঙ্কৃত করে তাদের সম্মোহিত করে রাখে নিবিড়ভাবে। এ-যেনো শিল্পীকে দিয়ে নিজের পোশাক গড়িয়ে শিল্পীর অন্ধদ-। পৃথিবীর জরায়ুতে কাদামাখা গায়ে সোনার দানার মতো ধান রেখে এসে মোস্তফা নকশি কাঁথায় শরীর প্যাঁচিয়ে নীরব দেহে পড়ে থাকে। মেঘেদের সঙ্গমে টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা তার স্বপ্নের মতো চোখ জুড়ে নামে। কাথার নকশার মতো কাচা আঙিনায় আনাড়ির পোঁচের মতো ছাপ রেখে স্বপ্ন নিয়ে বর্ষার জল চলে যায় অজানায়। আধার আকাশের উজ্জ্বল তারা পুবে অস্ত যাওয়ার পূর্বেই আবার তাদের ঢেকে দেয় কালো কুয়াশার মত মেঘ; শঙ্কায় ভাঙা ঘুমে নৈঃশব্দ্য কাটিয়ে বৃষ্টির বিলাপ আধবোজা চোখে আবার আনে নতুন রঙিন স্বপ্ন, তারপর চলে নতুন করে অবচেতন স্বপ্নের অনুরণন, সারা শরীরকে ঘুমিয়ে মস্তিষ্কের জাগ্রত কোষের পুলকিত আলাপ সঞ্চারিত হয় না দেখা স্নায়ু বেয়ে। গোবরলেপা উঠোনে সোনার স্তূপের মতো পড়ে থাকা ধানে সূর্য ওম দেয়; সে সোনার কণাগুলো থেকে ঠিকরে বেরুনো তপ্ত গন্ধ বুকে এসে লাগে। দেহের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে ঢোকে সে অলৌকিক স্পর্শ। সবুজ পাতার ছাতা মাথায় যখন পাখিরা মাঠের দিকে চেয়ে থাকে, বিনতির যৌবন ভিজে যায় প্রকৃতির লোলুপ বৃষ্টির ছোঁয়ায়। মেঘেদের রমণরস তার উত্তপ্ত অঙ্গ শীতল করে অপার সৌন্দর্যে। আপন শরীরের মত পৃথিবীর গন্ধ ভেসে আসে বৃষ্টিবিলাসে। অতিকায় ড্রামে ছন্দ তুলে যখন সোনা ঝরানো হয়, ঝকঝকে রোদ পাতার ফাক গলে এসে ঝরানো সোনার গায়ে লেপ্টে থেকে নৃত্য করে। রৌদ্র-ছায়ার মায়া ছড়ানো সে উঠোনে বিনতির কাজ বেড়ে যায় চিরায়ত প্রস্তুত কলের মতো। হলুদ সূর্যের সোনালী রোদ যেন জমে জমে তৈরি হয়েছে সোনার কণার মতো ধান। বিনতির বালার রঙ মিশে গেছে সে অলৌকিক অলঙ্কারে। তাদের ব্যস্ততাই জীবনের পলাতক বিনোদন। উঠোনে ছড়ানো থাকে সোনালী স্বপ্নের স্তূপ। যে-স্তূপ আবর্তিত হয় তাদের অনাকাক্সিক্ষত আটপৌরে জীবন ঘিরে। মোস্তফার অনন্তকালের খড় মাড়াই চলে কখনো জেগে কখনো স্বপ্নে। বৃত্তাকারে ঘোরা তার আদুরে বৃদ্ধ ষাঁড়ের সাথে তার বাঁধা স্বপ্নও ঘোরে অবিরত, অজানা অপরিচ্ছন্ন প্রণয়ের দুর্বিপাকে। মৃত স্বপ্নের মতো এককটি খড় তার কঙ্কালের আঘাতে মোস্তফার হাঁটু পর্যন্ত চামড়া খুবলে নিচ্ছে শত কোটি বিভৎস দাঁতে। ষাঁড়ের পিছু পিছু তার দুপা চলতে থাকে অনাবশ্যক গতিতে। আবীর নামা গোধূলিতে তার মুখে সূর্যের শেষ আলো নামে বুকের দুঃখকে ফুটিয়ে তুলতে। পাখির ঘুমের মতো অন্ধকার নামে গাছের নিঃশব্দ শাখা বেয়ে। রাতের অন্ধকারে তার বেয়ে নামে রঙিন কোলাহল। দুঃস্বপ্নের প্রমত্ত আনন্দ চোখ ভরে তোলে কয়েকটা মৌলিক রঙের বৈজ্ঞানিক কারসাজি। বিদেশি ক্লাবের ভেঁপু আধা-পাকা ঘরের নির্ভার নিরবতা ভেঙে মহাজাগতিক শৃঙ্গার শব্দ নিয়ে শবণে প্রবেশ করে। কোনো অব্যক্ত অনুভূতি তাদের শরীর বেয়ে ওঠে। সবাই দিনের শেষে আপন নেশায় বুঁদ হতে থাকলে জাগতিক দানবের মতো উঠোনে আসে চিরায়ত দৈন্য। সমস্ত রঙ আর রঙিন স্বপ্নকে সে কাটতে থাকে অবিরত অসংখ্য ধারালো নখ আর পৌরাণিক বিভৎস দাঁত দিয়ে। যেখানে কখনো বর্ষার জল দিয়েছিলো আনাড়ির মতো সৌন্দর্যের পোঁচ, অথবা গোবর লেপানো হয়েছিলো কোমল হাতের কারুকাজে, কিংবা সোনার স্তূপের স্বর্ণদানার মতো ছিটেছিলো গর্ভবতী মাঠের শস্য, সেখানে কঠিন মাটির ওপর নগ্নপায়ের অপরিচিত ছাপ গেঁথে থাকে। অদ্ভুতভাবে হারিয়ে যায় জীবনের সকল রঙ। কোথাও হয়তো বা থাকে সে রঙগুলো, কিন্তু গায়ত্রী রতন বা মোস্তফা তার দেখা কখনো পায় না। একবার তার দেখা পাওয়ার জন্য অবিরাম নাভিঃশ্বাস ফেলে ছুটে চলে অগণিত সহ¯্র বছর পৃথিবীর বুক চিড়ে। কিন্তু তার দেখা তারা কেউ কি পাবে? তাদের সহজ সরল মাঠের গল্পগুলোর আনন্দ অগোচরে চুরি হয়ে যায়, বিমূর্ত স্বপ্নেরা ভয়ঙ্কর করোটি নিয়ে ডুবে যায় পুরাতন কাদার ভেতর। যেখান থেকে আবার কাদামাটি সোনার সঙ্গমে নতুন সবুজ স্বপ্ন মাথা তুলে দাঁড়াবে, চারদিক রঙিন করে নিজে রঙ হারিয়ে ডুবে যাবে পুরাতন কাদায়; সাধের করোটিতে লেগে থাকবে নিঃশেষ আনন্দ আর বিমূর্ত স্বপ্নের রঙ। তাদের পথ চলা কেউ কোনোদিন থামাতে আসবে না। কেউ জানবে না কোনোদিন তাদের মিলিয়ে যাওয়া রঙের খবর। মোস্তফার অলীর আকাক্সক্ষা আজ ধুলিমাখা পথের ধারে পড়ে থাকা বাঁকানো লোহার সাথে জড়িয়ে থাকে। যে বাতাস তার বুকের সাথে বাড়ি খেয়ে নতুন নতুন ক্ষণস্থায়ী সুর তুলতো, সেখানে শুধু মোটরের শব্দ আর্তনাদের মতো তাকে চমকে তোলে। আবার হয়তো প্রণয়ীর টানে ফিরে যাবে পরিচিত সবুজের কাছে। তাকে ঘিরে ধরবে অজ¯্র স্বপ্নের রঙ। পরিচিত দুঃখে চেনা সুখ পাবে। কিন্তু তখনো গোধূলির সৌন্দর্য তাকে স্পর্শ করবে না। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তার গভীর ঘুম ভাঙাবে না। উঠোনে ছিটানো সোনালী রঙ কেউ খুঁজে দিবে না। অজ¯্র অপরিচিত কঙ্কাল একসময় তাঁকে নিতে আসবে ক্ষয়ে যাওয়া মাটির গহ্বর থেকে। অন্য কোনো মোস্তফা রতন গায়ত্রীর ঘামে ভিজে উঠবে পুরাতন স্বপ্নের রঙ। সবুজ ধানের ভিতর জন্মাবে মূর্ত চাঁদের আলোর মতো কাঁচা দুধ। যেগুলোতে এসে আবার জমে যাবে সূর্যের সোনালী রোদ। তার রঙ ছড়িয়ে দিবে সবুজ মাঠের কোলাহলে।

***********************************************

সুবিদ সাপেক্ষ

মা-বাবা-অন্ধকার-নদী ও খোকা

তখনো চাকলির বিলের চুয়াদিঘির উঁচু আইলে কলমির আড়ালে উদাসি দুপুরে বসে বারবার শিশ্নের অদ্ভুত পরিবর্তনের মাহাত্ম্য বুঝে ওঠা হয় নি। কিংবা ভেড়া-বকরীর পালের রাখাল হয়ে মাথায় গামছা বেঁধে হাতে চিক্কন লাঠি নিয়ে বড়চুয়ার সবচাইতে উঁচু আইলটায় দাঁড়িয়ে চারপাশের শ্যামলা গ্রামগুলোর তাল-সুপারির উঁচু উঁচু গাছগুলোর সাথেও পরিচয় হয় নি। তারও খানিকটা আগে নরম নরম হাত-পা-চোখে-মনে যখন বিস্ময়ের মাতামাতি সেরকমই এক সন্ধ্যাবেলায় মা পড়াতে বসেছেন উনুনের আগুন উস্কে দেওয়া, পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া এক খাটো লাঠি নিয়ে। ‘ও আব্বা, পড়িস না কে? পড়্ পড়্ আর খানিক বাদে তোর নিংগি মাছের ঝোল দিয়ে গরম ভাত! তাড়াতাড়ি পড়্।’ গনগনে আকাশের বহু তারার নিচে মায়ের শাসনের উনুনের পাশে জলচৌকি পেতে খোকা পড়ছে— ‘মা যদি হও রাজি, বড় হলে আমি হবো খেয়া ঘাটের মাঝি’। ‘ও আব্বা, তুই মাঝি হবি! মাঝি হলে হামাক যে কেউ গায়োত নাগ্যায় নয়। তুই ম্যাজিসটের হোস। ম্যাজিসটের হলে তোর সাতে অনেক পুলিশ থাকপে। তখন তোর বাপোক আর কেউ মারবের আসপের নয়।’ আকাশের গনগনে তারাগুলো তখন আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উনুনের গনগনে আগুনের তাপে মায়ের মুখের মতো। আরো জোরে জোরে পড়ে খোকা। বাবা আমজাদ হোসেন বসে বসে ছেলেকে হাতপাখায় বাতাস করছিলো। এবার আস্তে আস্তে উঠে বাড়ির পেছনের দিকে চলে যায়। আবার খানিকপরে এসে চুপচাপ ছেলের পাশে বসে। ততক্ষণে ছেলের রবীন্দ্রনাথের ‘মাঝি’ কবিতা মুখস্ত হয়ে গেছে। গরম ভাত আর শিং মাছ খাইতে খাইতে আমজাদ হোসেন ছেলেকে বলে, ‘ও আব্বা, কালকে আন্ধার থাকতে নদীত মাছোত যামো।’ খোকার সে কি আনন্দ! অন্ধকার থাকতে মাছ ধরতে গেলে খোকার খুব খুব ভয় লাগে, তখন বাবার লম্বাটে দীর্ঘদেহ দেখে ভয় খানিকটা কেটে যায়। যদিও খোকা বুঝতে পারে বাবাও খোকার ওপর একটু একটু ভরসা রাখে। খোকা-বাবা আর ভয় পাওয়া-না পাওয়া। ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে এক হাতে জাল কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছে বাবা আর অন্য হাতে খোকা, খোকার হাতে খলই। ভেজা, পিছলে, উঁচু ঘাসের নিচে জমে থাকা পানি পেরিয়ে নদীর দিকে এগিয়ে যায় খোকা-বাবা। চারদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর কতসব জীবের কত বিচিত্র শব্দ! বিচিত্র কথা! খোকা বিস্ময়ের চোখে অন্ধকারে হাঁটে। ভয়ার্ত শব্দ শুনতে শুনতে হাঁটে। রাতজাগা পাখির ভয়ার্ত ক্যাক ক্যাক শব্দ শুনতে শুনতে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায় খোকা-বাবা। ‘ও আব্বা, দেখছিস কী সত পড়চে নদীত! কালা কালা পানাগুলো কী জোড়ে জোড়ে যায়, দেখচিস! মাথা ঝুকিয়ে খোকা দেখে পানাগুলো কেমন নাচতে নাচতে যাচ্ছে। আবার কলকল শব্দ আসছে নানা দিক হতে। খোকার বিস্ময় কাটে না। ‘ও আব্বা, এত্তি চুপ করি বসি থাক।’ খোকা খলই সামনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকে। আমজাদ হোসেন পাড় বেয়ে খানিকটা হেঁটে যায় সামনের দিকে। এবার ঝুপ করে শব্দ হয়। কাছা মেরে আমজাদ হোসেন নদীতে নামে, কুলি করে। আর আস্তে আস্তে জাল টানতে টানতে খোকার দিকে এগিয়ে আসে। খোকা বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা জাল টেনে উপরে তোলে, খোকা মাছ ধরে। আস্তে আস্তে সবকিছু ফরসা হতে থাকে। খোকা পুব আকাশে দেখে লাল লাল মেঘ আর নীল নীল ফরসা আকাশ। খোকা তাকিয়ে থাকে। ‘ও আব্বা, কী দেকিস, এখন সূয্যি উটপে। ও আব্বা, দেখ বউমাছ উটছে। নাল সেন্দুরের মদ্দি দেখ ডোরা ডোরা দাগ। গত্ত করি বত্তে থো। বাড়িত নিয়ে যায়্যা বোতলোত থুস।’ খলসে, পুটি, চিরেতি, বালিয়ে, গোলসা টেগনা, খোরকাটি, নয়া মাছের পোনা দিয়ে ভরে যায় খোকার হাতের খোলই। ‘ও আব্বা, চল এবার বাড়িত যাই, সক্কাল সক্কাল তুই পড়তে না বসলি তোর মা আবার তোকে মারবি। খোকা পড়তে বসে। কবিতা পড়ে, ‘মা যদি হও রাজি, বড় হলে আমি হবো খেয়া ঘাটের মাঝি’। মা আবার খোকার পাশে এসে বলে, ‘ও আব্বা, আন্ধার আইতোত মাছ ধরতে তোর ভয় নাগে না?’ খোকা মার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাকায়…

***********************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা