48376642_10205325709779276_3902343036729819136_n

নি য় মি ত বি ভা গ

প্রবালকুমার বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মোস্তাক আহমেদ

… যে ভাষায় লিখছি, ঘুমের মধ্যেও সেই ভাষায় স্বপ্ন দেখতে হয়। আমি বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কখনো স্বপ্ন দেখিনি। ফলে ইংরেজি লেখার ইচ্ছেও হয়নি। …

[এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি প্রবালকুমার বসু। কুড়িটির উপর কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে তাঁকে স্থায়িত্বের দাবি জানাবে একথা হলফ করে বলা যায়। পাশাপাশি রয়েছে একাধিক গল্পগ্রন্থ ও প্রবন্ধগ্রন্থ। প্রকাশিত হয়েছে কাব্যনাট্যসংগ্রহ। সাহিত্য ও জীবিকার প্রয়োজনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাঁর নিত্য যাতায়াত। উদার উন্মুক্ত আলোকিত বিশ্ব মনন তাই তাঁর যাপনে সমাহিত। আলাপচারিতায় প্রবালকুমার বসু অনায়াসে প্রবালদা হয়ে ওঠেন। তাঁর আন্তরিকতা আড্ডাকে সহজ করে। কথারা দ্বিধাহীনভাবে মুখর হয়। অকারণে আবেগের ভেসে যাওয়া নেই, নেই কোনো আড়াল করবার গূঢ় প্রচেষ্টা। বরং আলাপ কেলাসিত হয়েছে প্রাজ্ঞতা আর দর্শনের রসে জারিত হয়ে।]

 

মোস্তাক আহমেদ : প্রবালদা, আমরা চেনা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। প্রথমেই শুনব আপনার জন্ম, বাল্য, কৈশোরের কথা— পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের কথা…

প্রবালকুমার বসু : আমার জন্ম কলকাতায়, শম্ভুনাথ প-িত হাসপাতালে। যৌথ পরিবার বলতে যা বোঝায়, আমার প্রথম দশ বছর বড়ো হয়ে ওঠা যৌথ পরিবারেই। আমার বাবার বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন বাবার তিন বছর বয়সের মধ্যে। আমাদের আদি বাড়ি যশোহর। ঠাকুরদা কোনো এক জমিদারি এস্টেটের নায়েব ছিলেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতায় চলে আসেন। উত্তর কলকাতায় থাকতেন, কোনো একটা এস্টেট দেখাশুনা করতেন। ঠাকুরদার নাম প্রথমনাথ বসু। ওঁর চার ছেলে, দুই মেয়ে। যশোহর থেকে কলকাতায় চলে আসার সময় বড়ো দুই পুত্র ও বড়ো এক কন্যার জন্ম হয়েছিল। এখানে আসার পর এক কন্যা ও দুই পুত্রের জন্ম। আমার বাবা ছিলেন পঞ্চম সন্তান, তাঁর কলকাতাতেই জন্ম। কখনো তাঁর যশোহর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বড়ো দুই ভাইয়ের ছোটো ভাইয়ের উপর পড়েছিল ভাইদের মানুষ করার ভার। আমার বাবা তাঁর এই দাদাকে, প্রায় পিতৃজ্ঞানে মান্য করতেন।

আমার ঠাকুরমার মৃত্যুর পর তাঁর ফেলে আসা জিনিসপত্র থেকে তিনশত টাকা উদ্ধার হয়। দক্ষিণ কলকাতায় তখন সবে বসতি হওয়া শুরু হয়েছে। ১৯৩২ সাল নাগাদ সেই তিনশ টাকা দিয়ে তিন কাঠা জমি কেনা হয়। মায়ের টাকা বলে সবভাইদের নামেই কেনা হয় জমি। সেই জমির ওপর তৈরি বাড়িতেই আমি এখনো থাকি।

আমার মামার বাড়ি মেটিয়াবুরুজে, সেটিও ছিল যৌথ পরিবার। আমার মা’র কাকা অল্পবয়সে মারা যান বলে, তাঁর ছেলেমেয়েদের বড়ো করার দায়িত্বও বর্তায় আমার দাদুর ওপর। আমার মায়েরা তিন বোন, এক ভাই। মা’র খুড়তুতো ভাইবোনেরা ছিল তিন বোন তিন ভাই। আমি দীর্ঘদিন অবধি তাদেরও আমার নিজের মাসি বা মামা বলেই জানতাম। আমার মামার বাড়ির উৎসসূত্র খুলনা জেলা। দাদু এদেশে চলে এসেছিলেন। এই যে যৌথ পরিবারে বড়ো হয়ে ওঠা এটা পরবর্তী সময়ে আমার মানসিক গঠনে প্রভান্বিত করে। আমার এক মাসির বিয়ে হয়েছিল যৌথ পরিবারে। সেখানে আমার সমবয়সী অনেক ছেলেমেয়ে ছিল। আমি প্রায় গিয়ে সেখানে থাকতাম। আমাদের সকলকে মাসির বড়ো জা এক থালায় ভাত মেখে গল্প করতে করতে এক এক জনকে এক এক গ্রাস করে খাওয়াতেন। এটা আমাকে সকলকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে শিখিয়েছে।

আমি বাবামায়ের এক সন্তান। আমার জ্যাঠামশাইয়ের ছেলেমেয়েরা আমার থেকে অনেক বড়ো। আমার কাকার ছেলেরা তখনো জন্মায়নি। সকলের কাছ থেকেই তাই সবসময় প্রশ্রয় পাই। কিন্তু বুঝতে পারি এই বাড়িতেই আমার এক অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। বাড়িতে মোড়ার উপর একটা তাকিয়া ছিল, তার ওপর আমর বসা বারণ, বিশেষ বিশেষ জিনিসে হাত দেওয়া বারণ, কেননা সেটা বিশেষ কেউ একজন ব্যবহার করতেন। বাড়িতে সবাই তাঁকে শিশিরবাবু বলতেন। তাঁর ব্যবহৃত বহু কিছু আমাদের বাড়িতে ছিল, সেইগুলো ধরা যাবে না। একটু বড়ো হলে জেনেছি শিশিরবাবুর পুরো নাম শিশিরকুমার ভাদুড়ি।

শ্রীরঙ্গম পর্ব শেষে শিশিরবাবুর বাবার ‘গ্রন্থজগৎ’ প্রকাশনাদপ্তরে সপ্তাহে দুই কি তিন দিন করে আসতেন। দশ বছর প্রায় ছায়াসঙ্গীর মতো। শিশিরকুমারের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিস আমাদের বাড়ির নিরাপদাশ্রয়ে স্থান পেয়েছিল। সেগুলোতে আমাকে হাত দিতে দেওয়া হত না।

‘গ্রন্থজগৎ’ প্রকাশনাদপ্তর সেই সময় কলকাতা শহরে একটা সংস্কৃতিকেন্দ্রের মতো হয়ে উঠেছিল। বহু তরুণ কবির প্রথম বই প্রকাশ পেত ‘গ্রন্থজগৎ’ থেকে। সংস্কৃতিজগতের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আসতেন আমাদের বাড়িতে। বাবার সঙ্গে তাঁদের বাড়িতেও আমার যাতায়াত ছিল। আমার বড়ো হয়ে ওঠা এঁদের সান্নিধ্যে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তারপদ রায়, সমরেশ বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, সাগর সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় এমন কত নাম। বাবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল যশপাল কাপুরের। ছয়ের দশকের শেষাশেষি, সাতের দশকের শুরুতে এঁকে বলা হত— ম্যান বিহাইন্ড দি থ্রোন। অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীর সময় ইনি ছিলেন দ্বিতীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব। বাবা কিন্তু রাজনীতির মানুষ ছিলেন না, যশপাল কাপুরের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে ইন্দিরা গান্ধী অবধি ওনার সহজ গতায়ত ছিল। ফলে সমাজের নানান শ্রেণির লোকজনের যাতায়াত আমাদের বাড়িতে লেগেই ছিল। এইসব দেখতে দেখতে আমার বড়ো হয়ে ওঠা।

আমি মিশনারি স্কুলে পড়তাম। সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে। ভারত স্কাউট দলে নিয়মিত সদস্য ছিলাম। সাঁতার, টেবলটেনিস, ক্রিকেট সবেতেই স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি স্তরে খেলেছি। সাঁতারে রাজ্যস্তরে পুরস্কৃতও হয়েছি। খেলাধুলো আমার ভাবনাচিন্তাকে অনেক প্রসারতা দিয়েছে।

মোস্তাক আহমেদ : লেখালেখির জগতে ঠিক কীভাবে এলেন? কবে? কোনো নির্দিষ্ট অনুপ্রেরণা?

প্রবালকুমার বসু : বাবার এক বন্ধু ছিলেন, বয়সে একটু বড়ো, পারিবারিক বন্ধুর মতোই। তিনি ছিলেন ডাক্তার, কিন্তু কোনোদিনই ডাক্তারি করেননি। করকাতায় একসময় খুব লোডশেডিং হত। সেই আমলে মোমবাতির ব্যবসা করে প্রচুর টাকা রোজগার করেছিলেন। কলকাতার আশেপাশে কোথাও মোমবাতি তৈরির কারখানা ছিল ওঁর। প্রতিদিন দু-কিলো করে মাংস কিনতেন, যদিও উনি এবং ওঁর স্ত্রী দুজনেই ছিলেন নিরামিষাশী। ওই দুই কিলো মাংস দিয়ে বেশ কয়েক রকমের মাংস রান্না করতেন, আর বাড়িতে যারাই আসত তাদের অল্প করে নানান রান্না পরিবেশন করতেন। আমাকে খুব ¯েœহ করতেন, নানান আবদারকে প্রশ্রয়ও দিতেন। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় তখন আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, দেখতে চেয়ে। ওঁর সঙ্গে দেখা করে যখন চলে আসছি, ওঁর বালিশের পাশে একটা পুরোনো পত্রিকা দেখে জানতে চেয়েছিলাম, পত্রিকাটা রেখে দেওয়ার কারণ। শীর্ণ হাতে ততোধিক জীর্ণ পত্রিকার পাতা উলটে দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই অহংকার আর তৃপ্তি নিয়ে তিনি যেন চলে যাবার জন্য এবার প্রস্তুত। এই ঘটনাটা ভীষণ নাড়া দিয়েছিল আমাকে। শুধু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লেখা প্রকাশ পেয়েছে বলে এত তৃপ্তি! আমার সেই বয়সে মনে হয়েছিল, তেমন কারো সঙ্গে যদি আমার লেখা প্রকাশ পায়, তাহলে এমন তৃপ্তি নিয়েই আমিও হয়তো আমার যাবার সময় যখন আসবে, যেতে পারব।

পিতৃদেব তখন মাসিক কবিতা পত্রিকা ‘সময়ানুগ’ সম্পাদনা করেন। বললাম লিখতে চাই, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার একটা কবিতা প্রকাশ করতে হবে। লেখা দিতে বলে অভয় দিলেন উনি। সেই আমার কাব্যপ্রয়াসের শুরু। কিন্তু যে লেখাই লিখি, পিতৃদেবকে দেখাই, হয়নি বলে বাতিল করে দেন, পুনরায় লিখতে বলেন। শেষমেষ একটা লেখা মনোনীত হলো, প্রকাশও পেল, কিন্তু পত্রিকা হাতে পেয়ে নিজের লেখার চাইতেও পাতা উলটে খুঁজতে লাগলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। লেখা কই! ফলে আবার সম্পাদকের কাছে আবদার। এবার ‘সময়ানুগ’ প্রকাশ পেল ‘প্রবাহ’ আয়োজিত সারা-বাংলা কবিসম্মেলনে। সেই সময়ে সেটাই সবচেয়ে বড়ো কবিসম্মেলন বলে ধরা হত। সর্বকনিষ্ঠ কবি হিসেবে আমাকে পড়তে ডাকা হলো। ছোটোকবিতা। যখন পড়ে বার হয়ে আসছি, আমাকে জড়িয়ে ধরলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তারপর একে একে অমিতাভ দাশগুপ্ত ও আরো অনেকে। স্কুলের গ-ি তখনো পার হইনি। মনে হলো একটা কবিতা প্রকাশ করে এত ভালোবাসা পাওয়া যায়। কবিতাই লিখব ঠিক করলাম।

মোস্তাক আহমেদ : প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের স্মৃতি মনে পড়ে? কেমন ছিল তখনকার অনুভূতি?

প্রবালকুমার বসু : প্রথম লেখা প্রকাশ তো বললাম। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ সম্পর্কে বলি, শুরুর থেকেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার অবশেসন। ব্যক্তি শক্তি, কবি শক্তি দু-জনেই। শক্তির প্রথম বইয়ের প্রকাশক দেবকুমার বসু, প্রচ্ছদশিল্পী পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রকাশনা ‘গ্রন্থজগৎ’। আমার লেখালিখির সময় ‘গ্রন্থজগৎ’ নেই, কিন্তু প্রকাশক আর প্রচ্ছদশিল্পী রয়েছেন। লেখালিখির শুরু থেকেই আমার স্বপ্ন, যদি বই কখনো বার হয় তাহলে কবি শক্তির প্রথম বইয়ের প্রকাশকই আমার বই বার করবেন আর প্রচ্ছদ করবেন তাঁর প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী।

সেই সময় শক্তি বেকবাগান অঞ্চলে থাকবেন। আমার বাড়ির থেকে খুব দূরে নয়। কলকাতায় থাকলে প্রায় দিনই কবিতা দেখতে যাই। জলপাইগুড়িতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, উনিও কখনো-সখনো এসে পড়েন জলপাইগুড়ি, আমার হস্টেলেও। তখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ি, একদিন ওঁর বাড়িতে গিয়েছি— বললেন এবার তোর একটা বই কর। ‘দেবুদা’কে বলব তোর বই করে দিতে। ‘দেবুদা’ অর্থে দেবকুমার বসু।

এর কয়েকদিন পরে পিতৃদেব একদিন বললেন, একটা পা-ুলিপি তৈরি করে শক্তিকে দেখা। শক্তি এপ্রুভ করলে বই করে দেওয়া যাবে। উদ্বেলিত হলাম ভিতরে। তাহলে আমারও বই প্রকাশ পাবে!

পা-ুলিপি তৈরি হলো। বইয়ের নাম রাখলাম ‘মানুষ শিকড়েরই মতো’। হাজির হলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। আমাকে বসিয়ে খুব যতœ করে দেখে দিলেন পা-ুলিপি। কিছু কবিতা বাদ দিলেন, কিছু কবিতা পরিমার্জনা করলেন। পা-ুলিপিতে আমার একটা কবিতা ছিল ‘তুমিই প্রথম’। ওটা কয়েকবার পড়লেন। তারপর পা-ুলিপির ওপর আমার দেওয়া নামটা কেটে লিখলেন— ‘তুমিই প্রথম’। ওটাই হলো আমার প্রথম বই। সালটা ১৯৮৩। বইটা প্রকাশ পেয়েছিল সেপ্টেম্বর মাসে। ততদিনে আমি জলপাইগুড়ির পাট শেষ করে ফিরে এসেছি কলকাতায়।

প্রথম বই হাতে পাওয়া প্রথম সন্তানের জনক হওয়ার মতোন। যেন আমি এক অনন্তপ্রবাহে উন্নীত হলাম।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার পড়াশুনা আর পেশার সঙ্গে লেখালেখির বিরোধ তৈরি হয়নি? কীভাবে সেসব মিলিয়েছেন একবিন্দুতে? নাকি বিরোধ ক্ষতি করেছে লেখার পরিমাণ ও মানকে?

প্রবালকুমার বসু : আমি যখন কবিতাই লিখব ঠিক করছি, লেখা যা প্রকাশ পাচ্ছে প্রশংসা কুড়োচ্ছে বন্ধুবান্ধবদের, বাবা একদিন বললেন শিল্পকে বেছে নিচ্ছ, কিন্তু যে সময় আসছে সেখানে ক্ষুধা-নিবৃত্তির শিল্পই সবচেয়ে বড়ো শিল্প জানবে। তার সমাধান না করতে পারলে শিল্প-সৃষ্টিতেও ছেদ পড়বে। এই কথাটা আমি তখন মেনে নিয়েছিলাম, আর এখন বিশ্বাস করি— আমার পিতৃদেব নিশ্চয়ই তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো বলেছিলেন, কিন্তু আমি তো না পারব ভিখিরি হতে, না পারব উঞ্ছবৃত্তি করতে, ফলে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থাটা মজবুত করার কথা মনে রাখলাম। আমি যে পেশাটা বেছে নিয়েছি, নিজের ইচ্ছেয় নিয়েছি, এই পেশায় প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়ে ভরা, কিন্তু বৈচিত্র্যময়। চাকরিজীবনের শুরুতে পরিভ্রমণ ছিল রাজ্যে, তারপর পূর্বাঞ্চলে, সেখান থেকে ভারতবর্ষে আর এখন প্রায় সারা-বিশ্বে। এই বৈচিত্র্যময়তাকে আমি উপভোগ করেছি। আমি জানতাম, বিশ্বাস করতাম আমিই চাকরিগতভাবে যা-ই করছি আসলে কবিতা লেখার জন্য করছি। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে চাকরি করেছি, এখনো করছি— কিন্তু মনে মনে জানি সবই তো করছি যাতে ঠিকমতো লেখালিখিটা করতে পারি। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমি ম্যানেজমেন্ট করেছি, কিন্তু বিশ্বাস করেছি এতে আমার লেখালিখির উপকার হবে, গতানুগতিকতার বাইরে আমাকে ভাবতে শেখাবে। ম্যানেজমেন্টে একটা কথা আছে— ‘ঈড়হাবৎঃ ঃযৎবধঃ রহঃড় ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃু’— আমি সেটাই বারবার বিশ্বাস করেছি, সেইরকম করার চেষ্টা করেছি। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা যাবার সময়টা বই পড়ার কাজে ব্যবহার করেছি। বিরোধ মাঝে মাঝে যে হয়নি তা নয়, সেটা সময়াভাবের। নিজের মতোন করে মানিয়ে নিয়েছি।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি বেশিরভাগ সময়েই থাকেন কলকাতা বা বাংলার বাইরে। লেখালেখি বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না?

প্রবালকুমার বসু : খুঁটিটাতো কলকাতায় বাঁধা। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স অবধি তো কলকাতাতেই থেকেছি। তারপর যে দিল্লি চলে আসা, তাও তো মাসে দু-বার কখনো তিনবার কলকাতা যাই। এই যে কলতকাতার বাইরে থাকি, একাই থাকি, আমাকে পরিসর দেয় ভাবনা-চিন্তার, লেখার। আমার যে অস্তিত্ব কলকাতায় পড়ে থাকে, একটু দূর থেকে তাকে দেখি, বুঝি।

আর এখন এই হোয়াটস্ অ্যাপ, ফেসবুকের যুগে দূরত্বটা তো একটা মানসিক অবস্থান মাত্র।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার পত্রিকা প্রকাশের অভিজ্ঞতাটা ঠিক কীরকম? এই পত্রিকা প্রকাশ কেন? আর পত্রিকা থেকে প্রকাশনী… কেন? এটা কী কোনো আত্ম-সংকট?

প্রবালকুমার বসু : নিজের বা নিজেদের (বন্ধুদের) লেখা প্রকাশের জন্য কারো দ্বারস্থ হব না, নিজেদের ভাবনা-চিন্তার জায়গাটা তুলে ধরার জন্য কোনো কম্প্রোমাইজ নয়, শুধু লেখালিখির বাইরেও আমার ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারব কাজের মাধ্যমে এই ভাবনাগুলো কাজ করেছে পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনায়। আমার বড়ো হয়ে ওঠার সময়ে যাঁদের দেখেছি তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারাপদ রায় সম্পাদনা করতেন ‘কয়েকজন’, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘কবিতা সাপ্তাহিকী’, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত ‘বিভাব’, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত ‘অলিন্দ’, আর সুনীলদার ‘কৃত্তিবাস’ তো ছিলই। আমার বাবা সম্পাদনা করতেন পাক্ষিক পত্রিকা ‘দর্শক’, পরে কবিতার কাগজ মাসিক ‘সময়ানুগ’। এঁদের বিভিন্ন আড্ডায় পত্রিকা সম্পাদনা নিয়ে কথাবার্তা হত। এই যে বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে ব্যক্তির নাম যুক্ত হওয়া— এর পিছনে একটা সৎ উদ্দেশ্যই বারবার থেকেছে। আমার ক্ষেত্রেও তাই। কোনো আত্মসংকট থেকে নয়। আমার প্রথম পত্রিকা সম্পাদনা জলপাইগুড়ি থেকে, কলেজে পড়ার সময়। ‘আলিম্পন’ ও পরে ‘শাতকর্ণি’ এই দুটো নামে পত্রিকা সম্পাদনা করি। কয়েকজন বন্ধু মিলে করেছিলাম। ওই কাগজে লিখেছেন অমিতাভ দাশগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এরকম অনেকেই। ফলে পত্রিকাটির একটা স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি হয়।

অনেক পরবর্তী সময়ে ২০০২ সালে মূলত আমার অনুপ্রেরণায় বর্ণালী রায় ‘যাপনচিত্র’ প্রকাশ ও সম্পাদনা শুরু করেন। প্রায় পনেরো বছর পর সম্পাদনার দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর। বেশির ভাগ লিটল ম্যাগাজিন যা বার হয় তা হলো সংকলন, সম্পাদনা খুব একটা থাকে না। এক্ষেত্রে সম্পাদককেও ক্রিয়েটিভ হতে হবে। ‘যাপনচিত্র’ বরাবরই সেই প্রয়াস নিয়েছে। সম্পাদকের নিজের কাছে পরিস্কার থাকা দরকার যে সে কী করতে চায়, কী তার ভাবনা। এর  মধ্য দিয়ে পত্রিকার একটা চরিত্র গড়ে ওঠে। এই ভাবনাটার অনুপস্থিতি অনেকক্ষেত্রেই চোখে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বইয়ের প্রকাশনা বেশিটাই অর্থের বিনিময়ে প্রকাশনা। অর্থাৎ লেখকেরা তাদের বই প্রকাশ ঘটান প্রকাশককে নির্ধারিত অর্থ দিয়ে। প্রকাশকই বা কী করবে? বই তো সেভাবে বিক্রি হয় না। সবাই প্রকাশক, বই বিক্রেতা হাতে গুণে কয়েকজন মাত্র। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রকাশকেরাও যে খুব সাধু তা নয়। যে কটা বই ছাপবে বলে টাকা নেয়, তত বই ছাপা হয় না। প্রকাশকের কাছ থেকে বই পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি বইয়ের প্রকাশন কলকাতায় প্রায় নেই বললেই চলে। এইসব ভাবনা থেকে ‘যাপনচিত্র’ প্রকাশনা শুরু করেন বর্ণালী। আমি কোনো দিনই প্রকাশক নই, প্রকাশনার সঙ্গে যুক্তও নই।

মোস্তাক আহমেদ : বর্তমানে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলি কী আদৌ লিটল ম্যাগাজিন? আপনার দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে লিটল ম্যাগাজিনের যে উত্থান-পতন, বিবর্তন-পরিবর্তন লক্ষ করেছেন তা যদি একটু আমাদেরকে জানান… আপনার নিজস্ব লেখালেখিতে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?

প্রবালকুমার বসু : লিটল ম্যাগাজিনের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। বুদ্ধদেব বসুর এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে লেখাও আছে। এই বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হচ্ছে লিটিল ম্যাগ প্রকাশের সময়ে মূলত অনিয়মিত। আর কোনো কিছু অনিয়মিত হলে সেটা প্রফেশনাল থাকে না। নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের লেখা প্রকাশ, একটা গোষ্ঠি গড়ে তোলার চেষ্টা। তারমধ্যেও কিছু অভিনব কাজ করা এই শর্তগুলো যেসব লিটল ম্যাগাজিন মানে, তারা অবশ্যই লিটল ম্যাগাজিন। এখন লিটল ম্যাগের প্রধান দুটো ভাগ দেখতে পাই। এক হচ্ছে গবেষণা ধর্মী, অর্থাৎ কোনো বিষয়ের ওপর। এই পর্যায়ে ভালো ভালো বেশ কয়েকটি পত্রিকা আছে। অন্যটি ক্রিয়েটিভ, অর্থাৎ এই ধরনের পত্রিকা কবিতা, গল্প বা নতুন কোনো ভাবনাকে নিয়ে প্রকাশিত হয়। বহমান ¯্রােতটা থাকে দ্বিতীয় ধরনের পত্রিকার সঙ্গেই।

আমি মূলত লিটল ম্যাগাজিনের লেখক অর্থাৎ আমার প্রকাশিত বেশিরভাগ লেখাই লিটিল ম্যাগাজিনে। হয়ত বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই তাই। আমার লেখালেখির শুরুর সময় লিটিল ম্যাগাজিনই আমাকে সবসময় প্রশ্রয় দিয়েছে, নবপর্যায়ে ‘কৃত্তিবাস’-এ আমি প্রায় সব সংখ্যাতেই লিখেছি, মূলত সুনীলদার প্রশ্রয়ে। কবিতার ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা যা করেছি সব গিয়ে সুনীলদাকে দিতাম। উনি নির্দিধায় তা প্রকাশ করেছেন ‘কৃত্তিবাস’-এ। আমি যে বাণিজ্যিক কাগজে লিখিনি তা নয়, তবে তা হাতে গোনা যায়। লিটিল ম্যাগাজিনের একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সকলের কাছে পৌঁছাতে না পারা। বাণিজ্যিক কাগজ অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। বেশি মানুষ বলেই যে ভালো পাঠক, তা নয়। তবে পরিচিতি বিস্তারে সাহায্য করে।

লিটিল ম্যাগাজিন একটা ¯্রােতের মতোন। প্রবাহ। এর উত্থান-পতন বলে কিছু হয় না। বাঙালির জীবনে দূর্গাপূজা যেমন একটা সংস্কৃতি, লিটিল ম্যাগও তাই। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন, পরিবর্ধন হতেই থাকে। যেমন এখন ওয়েব ম্যাগ বেরিয়েছে। তবে মূল চরিত্র বা ভাবনা একই রয়েছে। পরিবর্তনটা মূলত আঙ্গিকেই সীমাবদ্ধ।

মোস্তাক আহমেদ : কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখেছেন। গদ্য রচনার শুরু ঠিক কবে থেকে? কেন এই গদ্য রচনা?

প্রবালকুমার বসু : সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার আমার কবিতা পড়ে বলেছিলেন গদ্য লেখা শুরু করতে। উনি বিশ্বাস করতেন কোনো কবি গদ্য লিখলে কবিতার ভাষাতেও তিনি পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন। আমি গদ্য লেখার কথা ভাবতে শুরু করি। এটা একটা সূত্র। যা ভাবছি, যা বলতে চাইছি একসময় মনে হলো, সেটা কি অন্যভাবে বলা যায় না? সেই অন্যভাবে বলার অন্বেষণেই গদ্যের কাছে আসা। এই গদ্য ছোটগল্প। সময়টা আটের দশকের শেষ দিকে। আমার ব্যক্তিগত জীবনেও সেই সময় একটা ভাঙন শুরু হয়। আমি কবিতা লেখা থেকে গল্পে গিয়ে পড়ি। গদ্য বলতে ছোটগল্পই লিখেছি। গল্পের বাইরে গদ্য— নাটক সমালোচনা করতাম ‘দর্শক’ পত্রিকায়। সমরেশ বসুর মৃত্যুর পর ওঁর স্মরণে প্রকাশিত এক স্মরণিকায় আমাকে লিখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো সবই বিচ্ছিন্ন। যখনই প্রকাশ মাধ্যমে বৈচিত্র খুঁজেছি গল্প লিখতে চেয়েছি, নচেৎ কাব্যনাটক। আর গল্পের বাইরে গদ্য লেখার কথা ভেবেছি আরো পরে। যখন অভিজ্ঞতা ও মনন একটা রূপরেখা পাচ্ছে। আমার দেখা সাহিত্যজগৎ তখন আমার কাব্যভাবনা আসলে গদ্য লেখার সময়, ছোটোগল্পের ক্ষেত্রেও, সেই ভাবনাটাই লিখতে চেয়েছি, যা আগে ঠিক আমার মতো করে কেউ ভাবেনি।

আটের দশকের শেষ থেকে ছোটোগল্প লেখা। তিনটে বইও প্রকাশিত। কিন্তু সময়াভাবে লিখতে পারলাম কই? তবে একটা কথা, যখনই ছোটোগল্প কয়েকটি জমে গেছে, প্রকাশকের অভাব হয়নি।

মোস্তাক আহমেদ : সাধারণভাবে কবিরা যখন গদ্য বা গল্প লেখেন তখন তা এক আলাদা মাত্রা পায়। এক্ষেত্রে আপনার ভাবনাটা যদি একটু বলেন…

প্রবালকুমার বসু : কবির গদ্য বলে একটা বিষয় চালু আছে। অর্থাৎ কবি যখন গদ্য লেখেন তার ভিতরেও কবিতার আভাস থাকে কি? লেখার মধ্যে মিশে থাকে কাব্যিক-মাধুর্য? আমি এই বিশ্বাস থেকে একটু তফাতে থাকতে চেয়েছি। আমার মনে হয়েছে যে, কোনো গদ্য বা গল্প যেই লিখুন না কেন, থাকবে একটা সাবলীল গতি, যা পাঠককে আকর্ষণ করবে আর সেই গদ্যের মধ্যে মিশে থাকবে লেখকের নিজস্ব স্টাইল। গদ্য পড়ে যদি কবির গদ্য বোঝা যায় তাহলে সেটা লেখকের ক্ষতি। আমরা শঙ্খ ঘোষের গদ্য দেখেছি, এক ভিন্ন রচনারীতি, শক্তিরও দেখেছি, আবার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়েরও দেখেছি, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়েরও। আবার আলাদা মাত্রা মানে ঠিক চাঁছাছোলা গদ্যও নয়।

মোস্তাক আহমেদ : কাব্যনাট্যের ক্ষেত্রে আপনার আগ্রহ একটু বিশেষ রকমের… ‘কাব্যনাট্যসংগ্রহ’ নামে আপনার বইও বেরিয়ে গেছে… এই সযতœ আগ্রহের কারণ কী?

প্রবালকুমার বসু : যখনই মনে হয়েছে আমি যেটা বলতে চাইছি সেটা অন্য কোনো ফর্মে আরো ভালো বলা যাবে, তখন সেই ফর্মটা খোঁজার চেষ্টা করেছি। কাব্যনাট্য তেমন একটা ফর্ম। কাব্যনাটকে কবিতা আর নাটকের সমানুপাতিক সমন্বয় ঘটে। এই ফর্মটা শুরু করেন এলিয়ট। তারপর অনেকেই লিখেছেন, লোরকা লিখেছেন। আমাদের এখানেও রামবসু, বুদ্ধদেব বসু বা পঞ্চাশের অনেক কবি লিখেছেন। আমার পিতৃদেব বাংলায় প্রথম কাব্যনাটক প্রযোজনা করেন। আমি কলেজে পড়া খানিক ‘আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিষদ’ নামে একটা সংস্থা করে কাব্যনাটক প্রযোজনা করতে গিয়ে এই ফর্মের বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পাই। এই ফর্মে বাংলায় প্রায় সব প্রধান কবিই লেখার চেষ্টা করেছেন, তবু ফর্মটা জনপ্রিয় হয়নি মূলত দুটো কারণে। প্রথমত, নির্দেশকরা এগিয়ে আসেননি প্রযোজনা করতে, দ্বিতীয়ত কাব্যনাটক মূলত কবিরা লেখার দরুণ অধিক কাব্যময় হয়েছে। আমি এই প্রাসঙ্গিকতা মাথায় রেখে লেখার চেষ্টা করেছি। এর সম্ভাবনা আমাকে আকৃষ্ট করেছে ক্রমশ।

মোস্তাক আহমেদ : কিছু মৌলিক লেখার আপনি অল্পবিস্তর অনুবাদ করেছেন। আমরা আরও বেশি অনুবাদ কেন পেলাম না? পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কীরকম?

প্রবালকুমার বসু : অনুবাদ আমি প্রায় করিইনি। অথচ বাংলার প্রধান কবিরা অনুবাদের কথা বলেছেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছেন। অনুবাদে লেখার মুন্সিয়ানা আরো উন্মোচিত হয়, যেটা নিজের কাজে লাগে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, লেখা না এলে অনুবাদের কাছে আসতেন, এতে নিজের লেখার কাছে ফিরে আসা সহজ হত।

আমি অনুবাদ করিনি মূলত সময়াভাবে। ভেবেছি যে সময়টা অনুবাদ করব, সে সময়টা নিজে লিখি বা পড়ি। স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতার যে সংকলন সম্পাদনা করেছিলাম, তার কোনো কবিতা আমার অনুবাদ করা নয়, অনুবাদগুলো পরে সম্পাদনা করেছি। প্রখ্যাত মালায়ালাম কবি ও.এন.ভি. কুরুপের কিছু লেখা অনুবাদ করেছিলাম উপরোধে ঢেঁকি গিলতে হয় বলে। তাও তৃণা চক্রবর্তী আমাকে সাহায্য করেছিল।

পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক বলতে, পড়া ছাড়াও সমসাময়িক অনেক বিখ্যাত কবির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, আর সেই বন্ধুত্ব রয়েও গিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কবিতা-উৎসবে যাবার কারণেই আলাপ, আর কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব। এঁদের সঙ্গে নিয়মিত ভাবনার বা লেখার আদান-প্রদান হয়ে থাকে, এই সম্পর্ক আমাকে ঋদ্ধ করেছে, যার প্রভাব এসে পড়েছে আমার লেখায়। ২০০৫ সালে নিউজিল্যান্ড থেকে ফিরে এসে আমি এমন কাব্য ভাষায় লেখা শুরু করি, যে ভাষার সঙ্গে পাঠক পরিচিত ছিল না। এখন এরকম সুযোগ অনেকেই পান, কিন্তু যোগাযোগটা বজায় রাখতে পারেন কিনা সেটা জানা নেই। যোগাযোগটা, আদান-প্রদান খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার অনেক লেখাই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে, বেরিয়েছে গ্রন্থাকারে। সেসব লেখা বাংলার বাইরে কতটা সমাদর পেয়েছে? পাঠক-প্রতিক্রিয়া কেমন? অনুবাদগুলোর মান সম্পর্কেই বা আপনার ধারণা কেমন? সরাসরি ইংরেজিতে লিখতে ইচ্ছে হয় না?

প্রবালকুমার বসু : যখনই আমি বাংলার বাইরে পা রাখছি, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে হোক, ভারতের বাইরে হোক, আমাকে তো পৌঁছতে হবে অনুবাদের মাধ্যমে। ২০০৫ সালে আমি নিউজিল্যান্ডে আন্তর্জাতিক কবিতা-উৎসবে যাই। তার আগে সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় আমন্ত্রিত হয়ে কবিতা পড়তে গিয়েছি, সেখানে অধিকাংশ শ্রোতাই বাংলা বোঝেন না, সেখানে আমার অবলম্বন এমন একটা ভাষা যেটা আমিও বুঝি, শ্রোতারাও বোঝেন। অতএব ইংরেজিই নির্ভর। আমার প্রথম অনুবাদের বই করেছিল দিল্লির পাবলিশার্স ইউ.বি.এস.পি.ডি। এদের ভালো বিক্রির ব্যবস্থা ছিল। বাকি দুটো বই ‘যাপনচিত্র’ প্রকাশ করেছে। আমি যেখানে যেখানে যেমন পৌঁছেছি, আমার এই অনুবাদ গ্রন্থও একইভাবে পৌঁছেছে। বাংলার বাইরে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে আমার যেটুকু পরিচিতি, তা ওই অনুবাদ গ্রন্থের মাধ্যমেই। আসলে আমার মনে হয়েছে, এই অনুবাদ গ্রন্থ কোথায় পৌঁছেছে, তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এই অনুবাদগ্রন্থ বাংলার বাইরে আমার একটা পরিচিতি বহন করেছে। অনুবাদের মান, অন্তত আমার বইগুলোতে, আমার কাছে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য। যেখানে অনুবাদক আমার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন, সেখানে তো আর কোনো সংশয় রাখা অনুচিত। তবে যে-কোনো অনুবাদকেই কাটা-ছেঁড়া করা যায়, সুতরাং শ্রেষ্ঠ অনুবাদ বলে কিছু হয় না।

আমি ইংরেজিতে লিখিনি কারণ একটা ভাষার উপর যতটা দখল বা অভ্যাস থাকলে সেই ভাষায় সাহিত্য রচনা করা যায়, ততটা দখল বা অভ্যেস আমার ইংরেজি ভাষার উপর নেই। যে ভাষায় লিখছি, ঘুমের মধ্যেও সেই ভাষায় স্বপ্ন দেখতে হয়। আমি বাংলা ছাড়া অন্যকোন ভাষায় কখনো স্বপ্ন দেখিনি। ফলে ইংরেজি ভাষায় লেখার ইচ্ছেও হয়নি। তবে চারপাশ দেখে মনে হয়, ইংরেজিতে লিখলে কদর অনেক বাড়ত। বিদেশি ভাষার প্রতি মোহ আমাদের এখনো রয়েই গিয়েছে।

মোস্তাক আহমেদ : ‘জন্মবীজ’ গ্রন্থটির এ পর্যন্ত তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছে। গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনার বই বেরিয়েছে ‘জন্মবীজ : কথায় কথায়’। একটি বিশেষ গ্রন্থ নিয়ে এই বিস্তৃত-চর্চাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

প্রবালকুমার বসু : ‘জন্মবীজ’ বইটি লেখা আমার সাতাশ-আটাশ বছর বয়সে। খুব এলোমেলো জীবনযাপন করতাম তখন, একটা ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কাজ করত নিজের ভিতরে, সেই সময় আমার একটা মহাকাব্য লেখার চিন্তা মাথায় আসে। এই প্রসঙ্গে বলি, বাংলা ভাষার দীর্ঘ কবিতার সংকলনে আমার সুযোগ পাওয়া, দীর্ঘ কবিতা সম্পর্কে আমার ভাবনা-চিন্তা উস্কে দেয়, পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ কবিতা লিখতে প্ররোচিত হই। মহাকাব্যের ভাবনার পিছনে দীর্ঘ কবিতা চর্চার প্রেক্ষাপট কাজ করেছিল। আমি ভেবেছিলাম সংস্কৃত ছন্দের কাছাকাছি কোনো ছন্দে এই লেখাটা হবে, কিন্তু বিষয়-ভাবনায় লেখাটা হবে আধুনিক। লেখাটা সেভাবেই শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ যেখানে হলো সেটাই জন্মবীজ। দ্বিতীয় সংস্করণে প্রকাশ পেয়েছিল শমীকদা অর্থাৎ শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্রয়ে। বইটা পড়ে ওঁর অভিনব মনে হওয়ায় ‘দে’জ’-এ চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন পুনরায় প্রকাশের, আর তৃতীয় সংস্করণ ছিল আমার পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনে ‘যাপনচিত্র’-এর উপহার। তৃতীয় সংস্করণে আর বইটা আমার থাকেনি, বইটা সমৃদ্ধ হয়েছে শিল্পী হিরণ মিত্রের ছবিতে। কবিতাটা যেভাবে ওঁর কাছে ধরা পড়েছে সেটাই তিনি ফুটিয়েছেন রেখায়।

তরুণদের ‘জন্মবীজ’ নিয়ে আগ্রহ আমাকে অবাক করেছিল। ‘জন্মবীজ’ নিয়ে আগে দু-একটা লেখা প্রকশিত হয়েছিল, বইয়ের আলোচনা যেরকম হয়। সোমব্রত সরকার আমাকে একদিন বলল, ‘জন্মবীজ’ নিয়ে অনেকেই আগ্রহী, এর উপর একটা আলোচনার বই হতে পারে। ওর মতে এইরকম লেখা সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে নেই। মূলত ওর আগ্রহেই বইটি প্রকাশ পায়। সম্পাদনাও করে সোমব্রত। কোনো বিশেষ বই নিয়ে এই ধরনের চর্চা বইটির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। ভবিষ্যতের জন্য একটা প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়।

মোস্তাক আহমেদ : শিল্পের অন্য ধারাগুলির অভিঘাত এবং আশ্রয় আপনার লেখালেখিকে কীভাবে প্রভাবিত করে? এটা অনেকেই জানেন, আপনি ‘ক্রিয়েটিভ মিট’ নামে ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছিলেন ১৯৯৯ সালে। সেখানে কবি, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পীরা অংশগ্রহন করেছিলেন। এছাড়া চিত্রশিল্পী, কবি ও অন্যান্য চিন্তাশীল মানুষদের নিয়ে ‘কলকাতা আর্ন্তজাতিক ফাউন্ডেশন ফর আর্ট, লিটারেচার ও কালচার’ নামে ট্রাস্ট গঠনের কারিগরও আপনি।

প্রবালকুমার বসু :  কলেজে পড়ার সময় কবিতার সঙ্গে সংগীত, নৃত্য এগুলো মিলিয়ে আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিষদ নামে একটা সংগঠন তৈরি করে কবিতার ব্যালে রূপ পরিবেশন করতাম। বেশ কয়েক বছর করেছিলাম, পত্র-পত্রিকা প্রশংসাভরা আলোচনাও বেরিয়েছিল। আসলে আমার বরাবর মনে হয়েছে, একই সময়ে দাঁড়িয়ে যাঁরা বিভিন্ন শিল্পের চর্চা করেন তাঁদের কোথাও একটা আদান- প্রদান প্রয়োজন, তাতে তাঁদের শিল্পচর্চাই ঋদ্ধ হবে আরো। কলকাতায় পেইন্টাস এইটটি বলে শিল্পীদের একটা দল আছে। সেই আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে ওঁদের সঙ্গে আমার মেলামেশা। আসলে আমরা বড়ো বিচ্ছিন্নভাবে বেঁচে রয়েছি। আমরা যে যার মতোন বেঁচে রয়েছি। এই বেঁচে থাকাটা অর্থে নিজের কাজ বা সৃষ্টির মধ্যে থাকা। সেই ভাবনা থেকেই বিভিন্ন প্রয়াসে সবাইকে এক জায়গায় আনতে চেষ্টা করেছি, চেয়েছি পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান হোক। শান্তিনিকেতনে এই কাজটাই তো রবীন্দ্রনাথ তাঁর মতো করেছিলেন। কলকাতা আর্ন্তজাতিক ফাউন্ডেশন তৈরি করাও কিছুটা সেই জায়গা থেকেই। এই মেলামেশা আমাকে ভিন্নভাবে জীবনকে দেখাতে শিখিয়েছে। যার প্রভাব লেখালেখির ওপর নিশ্চিতভাবে এসেছে।

মোস্তাক আহমেদ : বহু দিকপাল কবি-সাহিত্যিকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ আপনি পেয়েছেন, সেক্ষেত্রে তাঁদের প্রভাব আপনার জীবনে কতখানি?

প্রবালকুমার বসু : তাঁদের জীবনদর্শন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে যে অবস্থা থেকে দেখেছি, সুনীলদাকে দেখেছি অন্য আর এক অবস্থান থেকে। সুনীলদার সঙ্গে সম্পর্ক আমার পরিণত বয়সে পৌঁছে। সমরেশ বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে দেখেছি আরো অল্প বয়সে। ওঁরা সবাই আমার জীবনকে ঋদ্ধ করেছেন। সুনীলদা বলতেন যদি কাউকে কিছু দিতে না পারো অন্তত সৌজন্যতাটুকু দিও। আমার যে জীবনদর্শন গড়ে উঠেছে, তা এই সকলের কাছ থেকেই একটু একটু নিয়ে। ড. দেবীপদ ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলার মাস্টারমশাই। পরে রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য হয়েছিলেন। এমন প-িত ও বিনীত ভদ্রলোক আমার জীবনে খুব কম দেখেছি। এইরকম আরেক ব্যক্তিত্ব নবেন্দু ঘোষ। আনিসুজ্জামান, আনিসদার কাছাকাছি এসে দেখলাম কী কী গুণ থাকলে একজন মানুষ উচ্চতাপ্রাপ্ত হন। অন্নদাশঙ্করের সময়ানুবর্তিতাও আমাকে শিখিয়েছে অনেকখানি। এইসবেরই অবদান রয়ে গিয়েছে এই ‘আমি’ হয়ে উঠতে। কিন্তু যাঁর প্রভাব আমার উপর সবচেয়ে বেশি তিনি আমার পিতৃদেব। যিনি বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসার চেয়ে বড়ো শক্তি আর কিছুই হয় না।

মোস্তাক আহমেদ : প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু জীবনদর্শন থাকে, থাকাটাই খুব স্বাভাবিক। আর শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি দেখেন— আপনার জীবনদর্শনের ভিত্তি ঠিক কীরকম?

প্রবালকুমার বসু : জীবনদর্শন তো এককথায় বলা যায় না। আমার লেখা আমার কাজই আমার জীবনদর্শন। একটা ছোটোগল্প বললে হয়তো বোঝানো যাবে। একবার সমুদ্রে ঝড়ে প্রচুর মাছ বালির ওপর এসে পরে। ঝড় শান্ত হতে জল সরে গেলে বেশ কিছু মাছ বালিতে আটকে পড়ে গিয়ে ছটফট করতে থাকে। একটা ছেলে সেটা দেখে একটা করে মাছ তুলে ছুঁড়ে দিতে থাকে জলে। মাছগুলো প্রাণ পেতে থাকে। একজন প্রাজ্ঞলোক সেই দৃশ্য দেখে ছেলেটিকে বলে— এত মাছ সবকটাকে তো তুমি বাঁচাতে পারবে না, এইভাবে একটা একটা করে মাছকে বাঁচিয়ে মৎসকুলের কী উপকার করবে? বৃথা সময় নষ্ট করছ। ছেলেটি বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে উত্তর দেয় মৎসকুলের সেভাবে হয়তো কোনো তারতম্য হবে না, কিন্তু যে কয়েকটা মাছকে বাঁচাতে পারছি তাদের জীবনের তো তারতম্য ঘটল। নিজের লেখালিখির বাইরে একটু পারিপার্শি¦কের জন্য ভাবা তাদের জন্য কিছু করার প্রয়াস, যা জীবনের বৃহত্তর ক্যানভাসেও একটা প্রভাব ফেলে, যত সামান্যই হোক না কেন। আর এইসবের পিছনে যে ভিত্তি তা আত্মবিশ্বাস আর মানুষকে ভালোবাসার তাগিদ।

মোস্তাক আহমেদ : যে-কোনো সৃজনশীল লেখার ক্ষেত্রে তত্ত্ব ও তথ্য থাকা কতটা জরুরি বলে মনে হয়? কতটা অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি? আদৌ কী এগুলো ভাববার দরকার আছে?

প্রবালকুমার বসু : তথ্য থাকা জরুরি বলে আমার মনে হয় না। বিশ্বসাহিত্যে তথ্যের ভারে সমৃদ্ধ বহু লেখা পাওয়া যায়। কিন্তু এতে লেখাটা মার খায় বলে মনে হয়। অতিরিক্ত তথ্যের সরবরাহ লেখার সাবলীলতার ব্যাঘাত ঘটায়। লেখার মধ্যে তথ্যেও আনয়ন লেখার কালেবর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে হয়তো, কিন্তু তাতে লেখকের কল্পনার দৈন্যতাই প্রকট হয় অধিক। আসলে সচেতন পাঠক কোনো লেখার মধ্যে দিয়ে সেই সত্যিতে পৌঁছাতে চায় যা তার অজানা তার কাছে যেন এ এক আবিষ্কার, অনুভূতির আর এক উন্মোচন। লেখার অভিজ্ঞতা, স্মৃতি একজন লেখককে মূলত চালিত করে তার কল্পলোকে পৌঁছতে। অভিজ্ঞতা বলতে এখানে আমি পড়াশুনোর অভিজ্ঞতাকে বুঝিয়েছি। তথ্যের আভাস কোনো লেখায় থাকতেই পারে, লেখাটার প্রয়োজনে, কিন্তু লেখাটার চেয়ে তথ্য বেশি কখনো নয়।

আর তত্ত্ব যতক্ষণ লেখকের দর্শন, লেখার মধ্যে তার উপস্থিতি তো থাকবেই। এইগুলো নিয়ে অবশ্যই ভাববার আছে। আমাদের সাহিত্য বা সিনেমায় ঘুরেফিরে আসে এখনো সেই মামুলি কিছু বিষয়। ঐতিহাসিক, সামাজিক আর কিছু রাজনৈতিক ভাবনার বাইরে উপন্যাস বেরোতে পারল না। আমাদের কোন এ্যাবস্ট্রাক্ট উপন্যাস নেই। বিজ্ঞান-নির্ভর উপন্যাসের চল কোথায়? কনটেন্ট ও ফর্ম অবশ্যই ভাববার প্রয়োজন আছে।

মোস্তাক আহমেদ : বয়স ৬০-এর কাছাকাছি এসে— আজকের ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার বোধ আপনাকে কীভাবে ভাবায়? লেখালেখিতে তার প্রভাব কতখানি?

প্রবালকুমার বসু : ধর্ম হচ্ছে দুর্বলের হাতিয়ার। যার আর কিছু নেই, তার ধর্ম রয়েছে গিয়ে শুধু। আধ্যাত্মিকতা একটা শক্তি। আমাদের বড়ো উদহরণ বিবেকানন্দ। ভারতবর্ষের একটা আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য আছে প্রাচীন কাল থেকে। ধর্ম অনেক নবীন যার ইতিহাস খুব সুখের নয়। ধর্ম থেকে যখন আধ্যাত্মিক শক্তি সরে যায়, তখন যে ধর্মটা পড়ে থাকে, সেই ধর্মের কথাই বলছি পৃথিবীতে ইতিহাসে এই আধ্যাত্মিকতাহীন আমার কাছে সন্দেহের উর্দ্ধে নয়। আধুনিক ভারতে, সংবিধানগতভাবে এই ধর্মকে পরিত্যাগের কথাই একভাবে বলা আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ধর্মকেই যেন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সবার উপরে। এটা আমাদের ঐতিহ্যের পরিপন্থীও।

আমাদের দেখা, অভিজ্ঞতা এগুলোই তো উঠে আসে সমকালীন সাহিত্যে। যার ফলে আমার লেখালিখিও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে একজন কবি হিসেবে আমি অনুদার দিকগুলো ব্যতিক্রম করে আলোই দেখতে চেয়েছি। আমার লেখায় সৃজন-সাহিত্য বিষয়ভিত্তিক হলে শিল্পগুন বেশিরভাগ সময়ই মার খায়।

মোস্তাক আহমেদ : যদিও জানি এটা বলা খুবই কঠিন, তবুও জানতে ইচ্ছে করছে আপনার বিচারে আপনার কোন গ্রন্থটি শ্রেষ্ঠ? কিংবা, আপনার দুর্বলতা কোন গ্রন্থের প্রতি বেশি? সেই গ্রন্থ নিয়ে আপনার মতামত জানতে পারলে ভালোলাগত…

প্রবালকুমার বসু : শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলতে কিছু হয় না। তবে দুর্বলতার কথা যদি বল, আমি ‘জন্মবীজ’ আর ‘আপনাকেই ঠিক করতে হবে গন্তব্য’ এই দুটো বইয়ের কথাই বলব। ‘জন্মবীজ’-এ এক বড় ক্যানভাস ধরতে চেয়েছি, আর অন্য বইটাতে প্রয়াস নিয়েছি প্রচলিত কাব্যভাষাকে বদলে দেবার। কি হয়েছে সেটা সময় বলবে।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি ‘গৌরী ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরস্কার’ পেয়েছেন, পেয়েছেন ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার’… লেখার ক্ষেত্রে পুরস্কার কি খুব গুরত্বপূর্ণ? আপনার কী মনে হয়? পুরস্কার নিয়ে আবার যেভাবে চারদিকে বিতর্ক ওঠে…

প্রবালকুমার বসু : পুরস্কার একটা স্পট লাইটের মতোন। যার উপর পড়ছে, বাকিদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করছে তাকে দেখার, তাকে পড়ার। একজন লেখকের ক্ষেত্রে এই পুরস্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এটা তাঁর দীর্ঘ-প্রয়াসের একটা স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি যে-কোনো সচেতন লেখককে উদ্বুদ্ধ করে আরো ভালো লিখতে। অবশ্য কারো কারো মধ্যে তৃপ্তিও আসে। তখন তার সৃজনসত্তা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। অপরদিকে যথাসময় স্বীকৃতি না পাওয়াটাও অনেক ভালো লেখককে হতাশার দিকে নিয়ে যায়। জীবনানন্দের বেলায় যা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুরস্কারটা দিচ্ছে কোন্ প্রতিষ্ঠান? সেই প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা কী? একটা সভা করে কিছু ফুল, মানপত্র, উত্তরীয় দিয়ে, ফেসবুকে সেই খবর ছড়িয়ে দিয়ে একটা পুরস্কার দেবার চল শুরু হয়েছে, যেটা বিপজ্জনক। পুরস্কারের নামে মৌরসী-পাট্টা গড়ে তোলা বা মুরব্বিয়ানা দেখানোই প্রধান। এই ধরনের পুরস্কার খেলা সাহিত্যের পরিবেশের ক্ষতি করে।

তবে যে-কোন পুরস্কার, তা যত বড়ো প্রতিষ্ঠানেরই হোক, মানুষই তো দেয়। আর মানুষের উপর চলমান সময়ের প্রভাব পড়বেই। ফলে বড়ো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারেও দেখা যাচ্ছে পক্ষপাতিত্ব, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সিদ্ধি। কিন্তু এইসব সমস্যা, যা নিয়ে বিতর্কও ওঠে, সবই যাঁরা পুরস্কার দেন তাঁদের সমস্যা। লেখকের পুরস্কার পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস হয় না।

মোস্তাক আহমেদ : কী লিখছেন এখন? আর পড়াশুনো?

প্রবালকুমার বসু : অনেকদিন দীর্ঘ কবিতা থেকে সরে আছি। আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে উপনিষদ-কে এখনকার কাব্যভাষায় লিখবো। তার একটা মানসিক প্রস্তুতি চলছে। দেখা যাক কবে শুরু করতে পারি।

আর আমার পড়াশুনো খুবই প্রয়োজনভিত্তিক। যখন যে বিষয়টা লিখব ভাবি, সেই বিষয় নিয়ে পড়াশুনো করতে থাকি। আমার আগ্রহ মূলত সংস্কৃতির ঐতিহ্য বিষয়ে। এ মুহূর্তে বাঙালি জাতির উৎপত্তি নিয়ে পড়ছি। এখন উপন্যাস পড়লে বিদেশি উপন্যাসেই ঝোঁক। তবে যাই পড়ি না কেন, কবিতা, রবীন্দ্রনাথের কিছু লেখা, গীতবিতান আমার সবসময়ের পড়ার তালিকায় থাকে।

মোস্তাক আহমেদ : যে লেখা লিখতে চেয়েছিলেন অথচ এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি— যে আক্ষেপ এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়— যে স্বপ্ন এখনও ঘুম ভাঙিয়ে দেয়…

প্রবালকুমার বসু : কিছুই তো লিখে উঠতে পারিনি। চেষ্টা করে চলেছি। কখনো উপন্যাস লেখার কথা ভাবিনি সময়াভাবে। এখন মনে হয় একটা নতুন ডিকশনে এরকম লেখা লিখব। লেখার নিরীক্ষা আমার সবসময় প্রিয়। প্রতিটি বইয়ে নিজেকে ভাঙার চেষ্টা করি। তবে মনে হয়, এখনো সেভাবে ভাঙতে পারিনি, যাতে মনে হয় সেই ভাঙা-গড়ার চেয়েও মূল্যবান। আক্ষেপ কিছু নেই, আশা আছে প্রতিবারই টপকে যেতে পারব নিজেকে।

প্রবালকুমার বসুর লেখালেখি………………………………………………..

কাব্যগ্রন্থ
তুমিই প্রথম
প্রথম প্রকাশ : ৫ আশ্বিন ১৩৯০, ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩। প্রকাশনা : বিশ্বজ্ঞান, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক দেবকুমার বসু। মুদ্রক : হরিপদ পাত্র, সত্যনারায়ণ প্রেস, ১ রমাপ্রসাদ রায় লেন কলকাতা ৬। উৎসর্গ : আমার এগিয়ে চলার পথে / সমস্ত উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা / আমার বাবা ও মা / শ্রী দেবকুমার বসু / শ্রীমতী ছন্দা বসু / শ্রীচরণেষু। প্রচ্ছদ পৃথ্বিশ গঙ্গোপাধ্যায়। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল : সাত টাকা।

ব্যক্তিগত স্মৃতিস্তম্ভের পাশে

প্রথম প্রকাশ : ২৫ বৈশাখ ১৩৯৪, ৯ মে ১৯৮৭। প্রকাশনা : বিশ্বজ্ঞান, ৯/৩ টেমার লেন কলকাতা ৯। প্রকাশক : দেবকুমার বসু। মুদ্রক : শ্রী সুনীলকুমার ম-ল, ফুল্লরা প্রিন্টার্স, ১১৭ কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিট কলকাতা ৯। উৎসর্গ : শক্তিকাকা মীণাক্ষীকাকাীমা / শ্রীচরণেষূ। প্রচ্ছদ : গণেশ বসু। মাপ ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল : দশ টাকা।

স্থায়ী আবাস অস্থায়ী ঠিকানা

প্রথম প্রকাশ : শ্রাবণ ১৩৯৬, ৯ আগস্ট ১৯৮৯। প্রকাশনা: করুণা প্রকাশনী, ১৮এ টেমার লেন কলকাতা ৯। প্রকাশক : বামচরণ মুখোপাধ্যায়। মুদ্রক : যুগলকিশোর রায়, ৫২এ কৈলাস বসু স্ট্রিট কলকাতা ৬। উৎসর্গ শ্রীলা ও স্বপনকে। প্রচ্ছদ : শ্যামল দত্তরায়। ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল : বারো টাকা।

জন্মবীজ

প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৩৯৯, ৪ ফেব্রয়ারি ১৯৯৩। রচনাকাল : ১৯৮৮। প্রকাশনা : বিশ্বজ্ঞান, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : দেবকুমার বসু। মুদ্রক : শ্রী যুগলকিশোর রায়, শ্রীসত্যনারায়ণ প্রেস, ৫২এ, কৈলাস বসু স্ট্রিট, কলকাতা ৬। উৎসর্গপত্রের লেখা : যখন যেখানে থাকি ভুলে থাকি পূর্বপরিচয় / তুমি কি আমার কেউ, আমিই তো আমার কেউ নয়। প্রচ্ছদ : উল্লেখ নেই (জানা যায়, প্রচ্ছদ করেছিলেন বিষ্ণু সামন্ত।) মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল : বিশ টাকা।

দ্বিতীয় সংস্করণ : ১ জানুয়ারি ২০০১। প্রকাশনা ও প্রকাশক : দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭৩। অক্ষরবিন্যাস: জেনেসিস, যাদবপুর, কলকাতা ৩২। মুদ্রক : হিন্দুস্থান আর্ট এনগ্রেভিং, কার্তিক বসু স্ট্রিট কলকাতা। উৎসর্গপত্রের লেখা : যখন যেখানে থাকি ভুলে থাকি পূর্বপরিচয় / তুমি কি আমার কেউ, আমিই তো আমার কেউ নয়। প্রচ্ছদ : উল্লেখ নেই (জানা যায়, প্রচ্ছদ করেছিলেন বিষ্ণু সামন্ত।) মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল : তিরিশ টাকা।

তৃতীয় সংস্করণ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০। প্রকাশনা : যাপনচিত্র, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। বর্ণবিন্যাস : বিট ব্লিটস ডিজিটাল ওয়ার্কস্টেশন, গান্ধী কলোনী, রিচেন্ট পার্ক কলকাতা ৪০। মুদ্রক : বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। উৎসর্গপত্রের লেখা : যখন যেখানে থাকি ভুলে থাকি পূর্বপরিচয় / তুমি কি আমার কেউ, আমিই তো আমার কেউ নয়। প্রচ্ছদ ও অলংকার :  হিরণ মিত্র। মাপ :  ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮০-০০-৩। মূল : ২৫০ টাকা।

যাপনচিত্র

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ১৯৯৪। প্রকাশনা : প্রমা প্রকাশনী, ৫ ওয়েস্ট রেঞ্জ, কলকাতা ১৭ এবং ৫৭ / ২ই কলেজ স্ট্রিট কলকাতা ৭৩। প্রকাশক : সুরজিৎ ঘোষ। মুদ্রক : সত্যনারায়ণ প্রেস, ১ রমাপ্রসাদ রায় লেন, কলকাতা ৯। প্রচ্ছদ ব্লক ও মুদ্রণ : মডার্ন প্রসেস, ১৩ কলেজ রোড, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : মেঘনাদ ভট্টাচার্য /শ্রদ্ধাস্পদেষু। প্রচ্ছদ : গণেশ বসু। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৫৬। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল : ষোল টাকা।

ঈশ্বরের মুখ

প্রথম প্রকাশ : পৌষ ১৪০৪,  ১ জানুয়ারি ১৯৯৮। প্রকাশনা ও মুদ্রক : প্রজ্ঞা প্রকাশনী, ৮ নরসিংহ লেন, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : শ্রী নন্দদুলাল সরকার/শ্রমতী সুধা সরকার / শ্রদ্ধদাস্পদেষু। প্রচ্ছদ : প্রভাস রায়। মাপ :  ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল : পঁচিশ টাকা।

যেমন করে গাইছে আকাশ

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০০২। প্রকাশনা : পত্রলেখা, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : গুণেন শীল। মুদ্রক : নিউ মাহালক্ষ্মী প্রিন্টাস, কলকাতা ৩৬। উৎসর্গ ; অনীক রুদ্র  অথবা অভিজিৎ ঘোষ / ও/ অশোক সোমকে। প্রচ্ছদ : প্রথাগত কোনো প্রচ্ছদ নেই কভারে কাব্যগ্রন্থ ও কবির নাম উল্লেখ আছে। মাপ :  ২২পস ঢ ১৪পস।  পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ১৬। ওঝইঘ : ৮১-৮৮২০৩-০০-৯। মূল : ৮.০০ টাকা।

মনোবাঞ্ছা একবিন্দু জল

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০০৪। রচনাকাল : ১৯৯৯-২০০৩। প্রকাশনা : প্রতিভাস, ১৮/এ, গোবিন্দ ম-ল রোড় কলকাতা ২। প্রকাশক : বীজেশ সাহা। মুদ্রক : বইপাড়া পাবলিকেশনস (প্রিন্টিং বিভাগ), ১৮/এ, গোবিন্দ ম-ল রোড কলকাতা ২। উৎসর্গ : স্বাতী কাকীমা/ও/সুনীলদা/শ্রীচরণেষু। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল : ৫০.০০ টাকা।

Of Lonely Rocks and Upright Trees (Translated from Bengali)

First Edition : 2006. Publication: USB publicshers’ Distributors Pvt Ltd, Printed by : Nutech Photolithographers, New Delhi, Dedicated to : All the trenslators of the world/whose deducated works are building bridges among different/ languages and cultures. Cover: Debu Sarkar (Based on a painting by K.C.S. panikar). Size : 22cmX14cm. Bord binsing, pages : 78. ISBN :81-7476-557-3. price : 225 INR.

(Translated by Barnali Roy, Kalyani Chose, Sanjikta Dasgupta, Zinia Mitra, Aditi Chajkraborty, Jayashree Dattaray, Debashree Dattaray, Parnab Mukherjee, Twisha Roy,  Subhransu Mitra, Hindol Bhattacharya, Rajib Chakraborty, N.G. Mikherjec, Aparna Chakraborty, Boudhayan Mukhopadhyay)

কোথা থেকে শুরু করব

প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০০৬। প্রকাশনা : পত্রলেখা, ৯/৩ টেমার লেন কলকাতা ৯। প্রকাশক : গুণেন শীল। অক্ষরবিন্যাস : ভাষাশিল্প, কলকাতা ৩৬। মুদ্রক : মিনতি প্রিন্টার্স, ১২ টেমার লেন কলকাতা ৯। উৎসর্গ : অনিসদা /অধ্যাপক আসিসুজ্জামান/ শ্রদ্ধাস্পদেষূ। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল : ৫০ টাকা।

শ্রেষ্ঠ কবিতা

প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৪১৩ জানুয়ারি, ২০০৭। প্রকাশনা : দে’জ পাবিলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭৩। প্রকাশক : সুধাংশুশেখর দে। বর্ণ-সংস্থাপনা: দিলীপ দে, লেজার অ্যান্ড গ্রাফিকস, ১৫৭ বি মসজিদবাড়ি স্ট্রিট, কলকাতা ৬। মুদ্রক : স্বপন কুমার দে, দে’জ অফসেট, ১৩ বঙ্কিম স্ট্রিট কলকাতা ৭৩। কলকাতা। ভূমিকা : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। উৎসর্গ : প্রবাহন বসু/ যদি কখনো কবিতা ভালো লাগে। প্রচ্ছদ : উল্লেখ নেই। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ১২৮। ওঝইঘ: ৮১-২৯৫-০৬৭৩-৪। মূল : ৮০ টাকা।

আপনাকেই ঠিক করতে হবে গন্তব্য

প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০০৮। প্রকাশনা ও প্রকাশক : যাপনচিত্র, ফ্ল্যাট ১২/১এ, স্টিফেন কোর্ট (তৃতীয় তল), লিফট নং ২, ১৮এ, পার্ক স্ট্রিট, কলকাতা ৭১। অক্ষরবিন্যাস : বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। মুদ্রক : বর্ণনা প্রকাশনী, ৪/১০এ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। উৎসর্গ : হিরণ-দা/হিরণ মিত্র/ শ্রদ্ধাস্পদেষূ। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল : ৬০ টাকা।

All About Umbrellas (translated from Bengali)

First Edition : 2008. Publication : Yapanchitra Books, Flat 12/A, 3rd Floor. Stephen Court. Lidt No 2, 18A park Street, Kolkata 71. Published by: Barnali Roy, Composing and Layout : Barbaba. 6/7, Bijygarh. Kolkata 32. Printing : barnana Prakashani, 4/10A, Bijygarh. Kolkata 32. Dedicated to : Sam Hamill the poet against WAR. Cover Painting : Mona Chosh, Cover Desin : Arjun Basu Roy, Size : 22cm X 14cm. Paperback. Pages : 112. ISBN :978-81-908260-0-6. Price: 150 INR.

( transalated by zinnia mitra, rajadipta roy, twisha roy, kalyani ghos, aditi chakraborty, panab mukherjee)

অধর্ম কথা

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০০৯। প্রকাশনা : আনন্দ, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : সুবীরকুমার মিত্র। মুদ্রক : বসু মুদ্রণ, ১৯এ সিকদার বাগান স্ট্রিট, কলকাতা ৪। উৎসর্গ : পরাণসখা, বন্ধু হে আমার। প্রচ্ছদ : অশোক মল্লিক। মাপ :  ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ: ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮৮০-০৭-২। মূল : ৮০ টাকা।

ভালো বলতে শিখুন

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০১১। প্রকাশনা : যাপনচিত্র, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : বর্ণালী রায়। বর্ণবিন্যাস : বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। মুদ্রক : বর্ণনা প্রকাশনী, ৪/১০এ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। উৎসর্গ : হাস্যমুখর সুস্মিতা/আর/ ইন্দ্রপূজক হিমাদ্রি’-কে। প্রচ্ছদের ছবি : সি কৃষ্ণস্বামী। প্রচ্ছদ পরিকল্পনা : অর্জুন বসুরায়। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। মূল : ৮০.০০ টাকা।

প্রেমের কবিতা

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা। প্রকাশনা : হওয়াকল, ১ নং বসুনগর, মধ্যগাম, কলকাতা ১২৯। মুদ্রক : জয়শ্রী প্রেস, বৈঠকখানা রোড, কলকাতা ৯। উৎসর্গপতত্রে লেখা : যে নদীকে কখনো জানা হয়নি/তার বিপন্ন নির্জনতাকে —। প্রচ্ছদের ছবি : সুধাংশু সরকার। প্রচ্ছদ  পরিকল্পনা : অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচ্ছদ প্রস্তুতি : বিতান চক্রবর্তী। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৭২। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল : ১০০ টাকা

নির্বাচিত দূরত্ব মেনে

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৩। প্রকাশনা : সিগনেট প্রেস, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : রাজদীপ রায়/ সোমব্রত সরকার/ দেবাশিস দাশ/ সমীপেষূ। প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৭২। ওঝইঘ :৯৭৮-৯৩-৫০৪০-২৩৮-২। মূল : ৮০ টাকা।

এই যে আমি চলেছি

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৫। প্রকাশনা : সিগনেট প্রেস, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : সুবীরকুমার মিত্র। মুদ্রক: আরুণিমা প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ৮১ সিমলা স্ট্রিট, কলকাতা ৬। উৎসর্গ : মধুপর্ণা রায়/শৌভিক কু-া। প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৫০৪০-৫০৯-৩। মূল : ১০০ টাকা

আমি তো বলতেই পারতাম

প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০১৭। প্রকাশনা : যাপনচিত্র ৯/৩  টেমার লেন কলকাতা ৯। প্রকাশক : বর্ণালী রায়। অক্ষরবিন্যাস : বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। মুদ্রক : বর্ণনা প্রকাশনী, ৪/১০এ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। উৎসর্গ : দীর্ঘসূত্রিতার সূত্র ধরে আকৃত্রিম সুহৃদ/ দেবাশিস চন্দকে। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৭২। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮০-৫৯-১। মূল : ১০০ টাকা।

নির্বাচিত কবিতা

প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর। প্রকাশনা ও প্রকাশক : জার্নিম্যান বুকস ১০/৬, ইস্টার্ন প্লাজা, সোনারগাঁও রোড, ঢাকা ১২০৫। মুদ্রক : ওয়ান স্টপ প্রিন্টাশপ, হ্যাপি হোমস, ২২/এ/৫/১, কুনিপাতা তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা ১২০৮। উৎসর্গ : আনিস দা, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান/ ও/ বৌদি, সিদ্দিকা জামান/ যাঁদের স্নেহ আমকে ক্রমাগত ঋদ্ধ করে চলে/শ্রীচরণেষু/প্রবাল। প্রচ্ছদ : শিল্পী রামানন্দের শিল্পকর্ম আবলম্বনে জার্নিম্যান। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৮৮। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৮৪-৯২৯১-৮-০। মূল : ২২০ টাকা

As I Wander Along (Translated from Benglai by Barnali Roy)

First Ddition: Kolkata Book Farir 2018. Publication: Yapanchitra Foundation, 9/3 Tamer Lane, Kolkata 9. Published by: Barnali Roy. Printion: S. P. Communication Pvt. Ltd. Kolkata9, Dedicated t: My Partner who wanders along with me. Cover Painting: Shyamal Dutta Roy. Cover Design & Book Setting: Abhijit Nath, 128 Lake Gardens, Kolkata 45, Size: 21cm × 14cm. Paperback. Pages: 96. ISBN 978-93-80980-77-5. Price: 300 INR

ভেবেছি এমনিভাবেই হয়

প্রথম প্রকাশ : পয়লা বৈশাখ ১৪২৫। প্রকাশনা : তালপাতা, অম্বা অ্যাপার্টমেন্ট এ৩৮, ভি আই পি পার্ক, কলকাতা ১০১। প্রকাশক : গৌতম সেনগুপ্ত। মুদ্রক : উল্লেখ নেই। উৎসর্গ : আলোক গোস্বামীকে। প্রচ্ছদ : উল্লেখ নেই। মাপ :  ১৮পস ঢ ১৩পস। মিডল স্টাপ্লড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ১৬। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল্য : ২০ টাকা।

গল্পগ্রন্থ

মহাভোজ

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা, জানুয়ারি ১৯৯৩। প্রকাশনা : ছন্দম প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং কোম্পানি (প্রাঃ) লিঃ, কলকাতা ৩৩। প্রকাশক : অনুরেখা চক্রবর্তী। মুদ্রক : নবজীবন প্রেস, ৬৬ গ্রে স্ট্রিট কলকাতা। উৎসর্গ : শ্রী কালাচাঁদ নাহা/ শ্রীমতী পুষ্প নাহা/ শ্রদ্ধাস্পদেষূ। প্রচ্ছদ : সুবন দাস।  মাপ :  ২২পস ঢ ১৪পস।  বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৯৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ২০ টাকা।

আমার সময় আমার গল্প

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০০৮। প্রকাশনা: পুনশ্চ, ১১৪ এন ডা, এস. সি. ব্যানার্জি রোড, কলকাতা ১০। প্রকাশক: সন্দীপ নায়ক। মুদ্রক: ডটলাইন প্রিন্ট অ্যান্ড প্রসেস, ১১৪ এন, ডা, সি, ব্যানার্জি রোড কলকাতা ১০। উৎসর্গ : মানস দে (নীলুদা)-কে/যিনি না থাকলে অনেক আকাঙ্খাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। প্রচ্ছদ: উল্লেখ নেই। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ১২০। ওঝইঘ : ৯৭৮-৮১-৭৩৩২-৫৪৩-৪। মূল্য : ৬০ টাকা

গল্পই গল্প

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১১। প্রকাশনা : কারিগরি,৩৫বি ক্যানাল ওয়েস্ট বোড, কলকাতা ৪। প্রকাশক : দেবাশিস সাউ। অক্ষরবিন্যাস : সুমুদ্রণ ৩০/বি কলেজ রো, কলকাতা ৪। মুদ্রক : সারদা প্রিন্টিং ওয়ার্কস,৭/১ গুরুদাস দত্ত গার্ডেন লেন, কলকাতা ৬৭। উৎসর্গ : কল্যাণী-দি/দিব্যেন্দু দা/ শ্রদ্ধাস্পদেষু। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : অনুপ রায়। মাপ : ২২পস ঢ ১৪পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ১২০। ওঝইঘ : ৯৭৮-৮১-৯২০৬১৩-৮-২। মূল্য : ১২০ টাকা।

Paradox of Truth (Translated from Bengali by Gini Sen)

First Edition: 2013. Publication: Yapanchitra Books, 9/3 Tamer Lane, Kolkata 9. Published by: Barnali Roy. Printed by: S.J. Perfection Printing Pvt Ltd, 128 Lake Gardens, Kolkata 45, Dedicated to: The readers who love to cross barrier of language. Cover: Hiran Mitra. Size: 18cm × 12cm. Paperback. Pages 78. ISBN: 978-93-80980-21-8. Price: 150 INR

কাব্যনাট্য

চক্রব্যুহ ও অন্যান্য কাব্যনাট্য

প্রথম প্রকাশ : কার্তিক ১৪১২, নভেম্বর ২০০৫। প্রকাশনা : প্যাপিরাস, ২ গণেন্দ্র মিত্র লেন, কলকাতা ৪। প্রকাশক : অরিজিৎ কুমার। মুদ্রক : অ্যাষ্ট্রিগ্রাফিয়া, ৪০বি প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট কলকাতা ১২। ভূমিকা : শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। উৎসর্গ : বাংলা কাব্যনাট্য প্রযোজনার পথিকৃৎ/ দেবকুমার বসু/ শ্রীচরণেষু। প্রচ্ছদ : দেবব্রত ঘোষ। মাপ : ২২পস ঢ ১২পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৭৪। ওঝইঘ : ৮১-৮১-৮১৭৫। (অসম্পূর্ণ)। মূল্য : পঞ্চাশ টাকা।

কাব্যনাট্য সংগ্রহ

প্রথম প্রকাশ : আগ্রহায়ণ, ১৪২০, ডিসেম্বর ২০১৩। প্রকাশনা : যাপনচিত্র, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : বর্ণালী রায়। বর্ণবিন্যাস ও মুদ্রণ : বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। মুখবন্ধ : আনিসুজ্জামান। উৎসর্গ : বাংলা কাব্যনাট্য প্রযোজনার পথিকৃৎ/ দেবকুমার বসু/ চিরস্মরণিয়েষু। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ২২পস ঢ ১২পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ২০০। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮০-২৩-২। মূল্য : ৩০০ টাকা।

প্রবন্ধগ্রন্থ/গদ্যগ্রন্থ

অন্ধ যত হয় তত দেখে

প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০০৭। প্রকাশনা ও প্রকাশক : যাপনচিত্র, ফ্ল্যাট ১২/১এ, স্টিফেন কোর্ট ৯তৃতীয় তল), লিফট নং ২, ১৮এ, পার্ক স্ট্রিট, কলকাতা ৭১। অক্ষরবিন্যাস : বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। মুদ্রক : বর্ণনা প্রকাশনী, ৪/১০এ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। উৎসর্গ : নির্মলকান্তি ভট্টাচার্য/ শ্রদ্ধাস্পদেষু। প্রচ্ছদ: হিরণ মিত্র। মাপ :  ১৯পস ঢ ১৩পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ১০৪। ওঝইঘ উল্লেখ নাই। মূল্য : ১০০ টাকা।

মোর ভাবনারে

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০১২। প্রকাশনা : কারিগর, ৩৫বি, ক্যানাল ওয়েস্ট রোড, কলকাতা ৪। প্রকাশক : দেবাশিস সাউ। অক্ষরবিন্যাস : কারিগর। মুদ্রক : বসু মুদ্রণ, কলকাতা ৪। উৎসর্গ : জে.পি.-দা/জগন্নাথপ্রসাদ দাস/ শ্রদ্ধাস্পদেষু। গ্রন্থপ্ররিকল্পনা ও প্রচ্ছদ : ব্ল্যাকমলাট। অলংকারণ ; সুব্রত চৌধুরী। মাপ : ২৯পস ঢ ১১পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ১৪৪। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮১৬৪০-০১-২। মূল্য : ১৮০ টাকা।

তরুণ কবির কাব্যভাষা

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০১৮। প্রকাশনা : যাপনচিত্র, ৯/৩ টেমার লেন কলকাতা ৯। প্রকাশক : বর্ণালী রায়। অক্ষরবিন্যাস ও মুদ্রণ : বর্ণনা প্রকাশনী, ৪/১এ কলকাতা ৩২। উৎসর্গ : আগামীর তরুণ কবিকে। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ১৮পস ঢ ১৩পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ১৪০। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮০-৭৬-৮। মূল্য : ২০০ টাকা।

চলতে চলতে রাষ্ট্রপতি ভবন

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০১৮। প্রকাশনা : স্রোত প্রকাশনা, হালাইমুড়া, কুমারঘাট ৭৯৯২৬৪, উনকোটি ত্রিপুরা। প্রকাশক সুমিতা পাল ধর। বর্ণবিন্যাস : রেঁনেসাঁস, ২৬ পটলডাঙ্গা স্ট্রিট, কলকাতা৯। মুদ্রক : বঙ্গবাসী লিমিটেড, ২৬ পটলডাঙ্গা স্ট্রিট কলকাতা ৯। উৎসর্গ : মা/শ্রীমতী ছন্দা বসু। প্রচ্ছদ : প্রশান্ত সরকার। মাপ :  ২২পস ঢ ১২পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৮০। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯০-৯৫-৫। মূল্য : ১৫০ টাকা।

অনূদিত গ্রন্থ

বিক্ষিপ্ত মেঘ ও অন্যান্য (মালায়লাম কবি ও এনভি কুরুপের ১৬টি কবিতার অনুবাদ)

প্রথম প্রকাশ : পচিশে বৈশাখ। প্রকাশনা : যাপনচিত্র, ৯/৩ টেমার লেন, কলকাতা ৯। প্রকাশক : বর্ণালী রায়। অক্ষরবিন্যাস ও মুদ্রণ :  বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। ভাষান্তর সহায়ক তৃণা চক্রবর্তী। উৎসর্গ : উল্লেখ নেই। প্রচ্ছদ : প্রশান্ত সরকার। মাপ : ১৮পস ঢ ১৬পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮০-৪০-৯। মূল্য : ১০০ টাকা।

সম্পাদিত গ্রন্থ

Signposts (Bengali Since Independence)

First Edition :2002. Piblication : Rupa. 7/16 Ansari Road . Daryagang. New Delhi 2. Book Desing & Typeset by : Arrt Creations, 45 Nehru Apts Kalkaji, New Delhi 19. Printed by : Rekha Printers Pvt Ltd. A 102/1. Okhla Industrial Area-phase II. New Delhi 20. Dedicated to : The readers whos interest in Bengali poetry breakes the barrier of language. Cover : Based on a painting (Titled : Night of the Merchant) by Ganesh pyne. Size : 24cm X 18cm. Board bindings. Peags : 276. ISBN : 81-7167-639-1. Price : 395INR.

অন্য আলো : যাপনচিত্র নিবাচিত প্রবন্ধ

প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০১৫। প্রকাশনা : যাপনচিত্র, ৯/৩ টেমার লেন, কলতাতা ৯। প্রকাশক : বর্ণালী রায়। বর্ণসংস্থাপন ও মুদ্রণ :  বর্ণনা, ৬/৭ বিজয়গড়, কলকাতা ৩২। উৎসর্গ : অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য। প্রচ্ছদ : হিরণ মিত্র। মাপ : ২২পস ঢ ১৫পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ২৪০। ওঝইঘ : ৯৭৮-৯৩-৮০৯৮০-৩৮-৬। মূল্য : ১০০ টাকা

প্রবালকুমার বসুর জীবনপঞ্জি………………………………………………..

১৯৬০

২১ সেপ্টেম্বর জন্ম। নাম: প্রবালকুমার বসু। জন্মস্থান : কলকাতা। মাতা : ছন্দ বসু। পিতা : দেবকুমার বসু। দেবকুমার বসু পঞ্চাশ-আশি দশকের বাংলা সংস্কৃতি জগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ির শেষ দশ বছরের আশ্রয়। বহু কবির প্রথম কবিতার বইয়ের প্রকাশক। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার তাঁদের অন্যতম। তিনিই প্রথম কাব্যনাট্য প্রযোজনা করেন। প্রথম বিদ্যাসাগর রচনাবলী চার খ-ে সম্পাদনা করেন। ছোটোবেলা থেকেই প্রবাল তাই বাড়ির পরিবেশেই পেয়েছেন সংস্কৃতি জগতের নানা মানুষের সান্নিধ্য। অভিভাবক ও বন্ধুর মতো কাছে পেয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়র সঙ্গে ঘুরেছেন জঙ্গল, পাহাড়, সমুদ্র, গ্রাম।

১৯৬৫

অ্যান্ডারসন ক্লাবে সাঁতার শিখতে ভর্তি।

১৯৭১

১১-১৩ বছর নির্দিষ্ট বয়সসীমায় বাংলা সাঁতার চাম্পিয়ন।

১৯৭৪

হোয়াইট বর্ডার ক্লাবের হয়ে কলকাতায় প্রথম ডিভিশন ক্রিকেট লীগ খেলা।

১৯৭৬

কলকাতায় ওয়াটারপোলো লীগে আংশগ্রহণ।

১৯৭৭

কলকাতায় সেন্ট লরেন্স হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিকে প্রথম ডিভিশনে ন্যাশনাল মেরিট স্কলারশিপ নিয়ে উত্তীর্ণ। স্কুল জীবনে একদিনও স্কুল কামাই করেননি।

১৯৭৮

প্রথম কবিতা প্রকাশ। ‘সময়ানুগ’ প্রত্রিকা। সম্পাদক : দেবকুমার বসু।

২৫ জুন ‘প্রবাহ’ আয়োজিত সারা বাংলা কবি সম্মেলনে অংশগ্রহন। প্রেসিডেন্সি কলেজের বেকার হলে প্রথম কবিতা পাঠ। তখন ‘প্রবাহ’ আয়োজিত সম্মেলনই ছিল বাংলায় সর্ববৃহৎ। ওই মঞ্চে ওই দিন কবিতা পাঠ করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, বিনয় মজুমদার, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

১৯৭৯

কলকাতার সেন্ট লরেন্স হাইস্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিক প্রথম ডিভিশনে উত্তীর্ণ।

১৯৮০

জানুয়ারি মাসে জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি।

‘বিশ্বজ্ঞান’ প্রকাশনী থেকে বের হয় প্রথম বাংলা সচিত্র দীর্ঘ কবিতার সংকলন ‘বাংলা দীর্ঘ কবিতা’। এই সংকলনে কবিতা প্রকাশ। পরবর্তীকালে দীর্ঘ কবিতা লেখায় অনুপ্রাণিত হওয়া।

১৯৮১

‘আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিষদ’ নামে সাংস্কৃতিক সংস্থা গঠন।

১৯৮২

‘আধুনিক সাংস্কৃতির পরিষদ’-এর উদ্যোগে কবিতার ব্যালেরূপ পরিবেশন। জীবনানন্দ দাশ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কোলাজ ও প্রবালকুমার বসুর দীর্ঘ কবিতার ব্যালে প্রদর্শন। পরবর্তী সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘একা গেলো’ ও টেবল টেনিসে কলেজ চাম্পিয়ন।

১৯৮৩

জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং -এ প্রথম ডিভিশনে উত্তীর্ণ। কলেজে প্রথম কাব্যগুন্থ ‘তুমিই প্রথম’ প্রকাশ।

টেবল টেনিসে ইউনিভার্সিটি ও ডিস্ট্রিক্ট চাম্পিয়ন।

১৯৮৬

প্রথম বিবাহ। কৈশোরের বান্ধবী। নাম : স্বাতী দাস (বসু)

১৯৮৮

প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদ।

১৯৯০

দ্বিতীয় বিবাহ। নাম : মিতা নাহা (বসু)

১৯৯৩

একমাত্র পুত্র প্রবাহনের জন্ম।

১৯৯৪

কলকাতার ওওঝডঠইগ থেকে গইঅ-তে প্রথম ডিভিশনে উত্তীর্ণ।

১৯৯৯

শিল্পী বন্ধুদের সঙ্গে পি. ই. এন-এর হয়ে দু-দিনব্যাপী ক্রিয়েটিভ ওয়ার্কশপের আয়োজন। ‘ক্রিয়েটিভ মিট’ নামে কবি চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পীদের অংশগ্রহণ।

জুন মাসে কর্মসূত্রে দিল্লিতে বদলি।

‘আরাত্রিক’ পত্রিকার কাব্যনাট্য সংখ্যার অতিথি সম্পাদনা। এখানে মন্দাক্রান্তা সেন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের অনেকে তাঁদের প্রথম কাব্যনাট্য লেখেন।

২০০০

বর্ণালী রায়ের সঙ্গে পরিচয়। পববর্তী সময়ে যাঁর সঙ্গে বহু সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

২০০২

স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলা কবিতার ইংরেজি তর্জমাতে গ্রন্থ সম্পাদনা। গ্রন্থ : ঝরমহঢ়ড়ংঃং (ইবহমধষর চড়বঃৎু ঝরহপব ওহংবঢ়বহফবহংব) এটাই ইংরেজিতে বাংলা কবিতার সর্বাধিক প্রচারিত বই।

আগস্টে কলকাতায় চাকরি নিয়ে প্রত্যাবর্তন।

‘যাপনচিত্র’ পত্রিকা প্রকাশ। সম্পাদনা : বর্ণালী রায়। মূল ভাবনা ও পরিকল্পনা : প্রবালকুমার বসু।

২০০৩

চিত্রশিল্পী, কবি নাট্যব্যক্তিত্ব ও অন্যান্য চিন্তাশীল মানুষদের নিয়ে কলকাতা আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশন ফর আর্ট লিটারেচার ও কালচার নামে ট্রাস্ট গঠন। উদ্দেশ্য কলকাতায় একটা সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলা।

২০০৪

সাহিত্য একাডেমির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুম্বাইতে সর্বভারতীয় কবিতা উৎসবে আমন্ত্রণ ও যোগদান।

সহ-সম্পাদনা করেছেন ‘কৃত্তিবাস’-এর চিত্রশিল্পীদের লেখালেখি নিয়ে বিশেষ সংখ্যার। এই সংখ্যায় প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে সম্পাদকীয় লেখা। এটি ‘কৃত্তিবাস’-এর একমাত্র সংখ্যা যেখানে দু-জন সম্পাদকীয় লিখেছেন।

২০০৫

‘যেমন করে গাইছে আকাশ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্তি। নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে তৃতীয় আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে আমন্ত্রণ ও যোগদান। বিদেশি কবিদের সঙ্গে পরিচয়, পরে যাঁদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কাব্যজীবনে এর প্রভাব বর্তমান।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ‘কৃত্তিবাস’-এর কবিতা পাঠের অয়োজন।

২০০৬

সহ-সম্পাদনা করেছেন ‘কৃত্তিবাস’-এর বিশেষ গল্প সংখ্যার। ‘কৃত্তিবাস’-এর ইতিহাসে গল্প নিয়ে মাত্র যে দুটি বিশেষ সংখ্যা হয়েছে এটি তার অন্যতম।

‘যাপনচিত্র’ পত্রিকার ইংরেজিতে বিশেষ আন্তর্জাতিক কবিতা সংখ্যার সম্পাদনা।

২০০৭

জাপানের টোকিওতে আন্তর্জাতিক হাইকু উৎসবে আমন্ত্রণ ও যোগদান।

২০০৮

১১ এপ্রিল পি. ই. এন. আয়োজিত একক কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ। লোকসখা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি কর্তৃক সংবর্ধিত হন।

২০১০

কলকাতায় চাকরির সুযোগ কমতে থাকায় আবার দিল্লি।

২০১৭

‘যাপনচিত্র’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ।

ভারতের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে ‘ডৎরঃবৎং ধহফ ধৎঃরংঃং রহ ৎবংরফবহপু ঢ়ৎড়মৎধসসব’-এর রাষ্ট্রপতিভবনে দু-সপ্তাহ থাকা। সেইসময় বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নানা ভাবনার আদান-প্রদান। রাষ্ট্রপতিভবনের কাজকর্ম জানার অভিজ্ঞতা।

২০১৮

বর্তমানে বহুজাতিক সংস্থায় উচ্চপদে দিল্লিতে কর্মরত। স্থায়ী ঠিকানা : ১৯ প-িতিয়া টেরেস, কলকাতা ২৯। মোবাইল : ৮১৩০৭৯৭৭১৯ / ৯৮৩০০২৫৪৭৮। e-mail: prabalkumar@gmail.com

 [প্রবালকুমার বসুর লেখালেখি ও জীবনপঞ্জি প্রস্তুতকরণ ও সম্পাদনা করেছেন মোস্তাক আহমেদ]

*************************************************

 

অনুবাদ

সমকালীন ভারতীয় কবিতা
মোহন রানা ও গগন গিল
অনুবাদ : মাহবুব অনিন্দ্য

মোহন রানার কবিতা

তোমার নিজের কথা
ওরা বলল : ‘পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যেয়ো না
নিজের দীর্ঘ ছায়া দেখে ভয় পেয়ে যাবে
ওখানে ডানাঅলা পাইথনের রাজত্ব
ওখানে জ্বলন্ত আগুন তার লকলকে
জিভ বের করে থুতু ছিটাচ্ছে
ওখানে তুমি রাত বা দিন
কিছুই বুঝতে পারবে না
অপেক্ষা করতে করতে
তুমি পাথরে পরিণত হবে।’
আমার কথাগুলোই যেন আমি
অন্য কারও মুখ থেকে শুনছিলাম
জীবনের পুরো একটা রিহার্সেল থাকলে
এই টেক্সট কিছুটা বদলে নিতাম
কিন্তু কিছুতে আমি নিজের থেকে
দূরে যেতে পারি না
শুধু নিজের কথার প্রতিধ্বনি শুনি :
ফিরে আসছি
দূরে যাচ্ছি
ভালোবাসি
দিনের পর দিন লিখতে পারি নি আমি
নষ্ট সময়ে বেঁচে থেকে আমিও নষ্ট হয়ে গেছি
স্থবির সময়ে আমি হয়ে গেছি অতিন্দ্রীয়
যেন আমি এক শনির চক্রে বন্দী
নিজের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে
উন্মাদপ্রায় হয়ে গেছি।

তুমিও কি শুনেছিলে?
রাতভর তোমার অস্থিরতাগুলো
লিসবনের ভেজা রাস্তায় টুপটুপ হেঁটেছিল
একটি নীরব ক্রন্দন সূর্যোদয়ে
জাগিয়ে তুলেছে আমাকে
ভোরবেলা একটি পাখির গান শুনেছি
হয়ত তাকেও জাগিয়েছে কেউ
তোমার অস্থিরতাগুলো রাতভর
না-ঘুমিয়ে হেঁটেছে আর বন্ধ চোখে
জেগে থেকেছে আমার ভেতর

মহাসাগরের সুউচ্চ তরঙ্গে একটি শব্দ
শুধু মিশে গেছে
উল্টোদিকে পাল ঘুরিয়ে
তুমিও কি সেই পাখির কণ্ঠ শুনেছিলে?

কবির নিয়তি
এমন সাদা আলোতে
তুমি ও আমি অদৃশ্য হয়ে যাই
আমরা আমাদের অদৃশ্য ব্যথা নিয়ে বাঁচি
জীবনের আনন্দ কোথায়?
তারা হারায় শূন্যতায়
ছায়া মিলিয়ে যায় সেখানে
ফর্ম হারিয়ে যায়
আমাদের কোনো আকাশ নেই
অথচ কল্পনার রাজ্যে
ওড়াউড়ি আছে
কেবল শব্দই পারে
জীবন্ত এ স্মৃতির কাছে পৌঁছাতে।
কবি ও কবিতার নিয়তি
একসাথে মিলে যায়
একটি নিঃশ্বাসে।

[মোহন রানার জন্ম ১৯৬৪ সালে, দিল্লিতে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। হিন্দিতে প্রকাশিত কবিতার বই আটটি। এর মধ্যে রয়েছে জাগাহ (১৯৯৪), য্যায়সে জনম কোই দরওয়াজা (১৯৯৭), সুবহ কি ডাক (২০০২), পথ হো যায়েগি নদী (২০০৭), ধূপ কে আন্ধেরে ম্যায় (২০০৮) ও রেত কা পুল (২০১২)। তার কবিতা অনূদিত হয়েছে স্প্যানিশ, জার্মান, ফরাসি, ইতালিয়ান, ডাচ, নরওয়েজিয়ান, মারাঠি ও নেপালি ভাষায়।

কবি ও সমালোচক নন্দকিশোর আচার্য বলেছেন, ‘নতুন প্রজন্মের হিন্দি কবিদের মধ্যে মোহন রানার কবিতা আলাদা করে চেনা যায়। তার কবিতা নির্দিষ্ট কোনো ক্যাটেগরিতে ফেলা যায় না, বিশেষ কোনো আদর্শ বা তত্ত্ব মেনেও লেখেন না তিনি। মোহন মনে করেন, কবিতা লেখার কাজ একপ্রকার চিন্তন প্রক্রিয়াই।’]

 

গগন গিলের কবিতা

শুধু একটি দিন
শুধু একটি দিনের তরে
যদি সে তোমার কথা না-ভাবে

জলের মাছ হারিয়ে ফ্যালে পথ।
নিজের কক্ষপথে ঝুলে থাকে
অসহায় সূর্য।

সময়ের অন্তঃস্থ রজ্জু
জড়িয়ে যায়
নিজেরই ঘাড়ে।

শুধু এক দিনের তরে
ভুল করে যদি
প্রদীপ জ্বালায় সে
চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে

স্বর্গের সাতজন ঋষি
রাগে ফুঁসে ওঠে

পা-ুলিপি ছিঁড়ে চিঠি
ছড়িয়ে পড়ে দিগি¦দিক

শুধু একদিনের তরে
যদি অদৃশ্য হয়ে যাও
এক অশরীরী কুয়াশায়
এক মুহূর্ত

পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত
ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকার
আর তার ভেতরে
ভরপুর লাভা¯্রােত
নিজেদের খোলের মধ্যে
পুড়ে যায় ঝিনুক
মাইলের পর মাইল

শুধু এক দিনের বিস্মরণে
এই দেহ পুড়ে হয় নীল
নিজের কামড়ে।

বাচ্চারা, বাড়ি যাও
বাচ্চারা, বাড়ি যাও
বাড়ি নেই তোমাদের?
তাহলে মায়ের পেটে ঢোকো আবার।
মায়ের পেট নেই?
তাহলে বাপের বীর্যে ঢুকে পড়ো।
বাপও নেই তোমাদের?
মায়ের জরায়ুতে যাও।
ডিম্বাশয় বন্ধ?
ছড়িয়ে পড়ো মাসিকের রক্তে।
এমনকি তার যোনিতেও
কামনা হয়ে ঢুকে যাও
তাকে মেয়ে হয়ে উঠতে দাও
বাচ্চারা, বাড়ি যাও।

[গগন গিল সমকালীন ভারতীয় কবিতায় এক উজ্জ্বল নাম। তার চারটি কবিতাসংগ্রহ ও একটি প্রবন্ধের বই রয়েছে। গিল দিল্লিতে বসবাস করেন ও ফুলটাইম লেখালেখি করেন। প্রচুর অনুবাদ করেন তিনি, বইয়ের সংখ্যা ১০টি। তার অনূদিত লেখকদের মধ্যে আছেন জিগনিউ হার্বার্ট, হরভজন সিং, সীতাকান্ত মহাপাত্র ও শীকান্ত ভার্মা।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করে গিল ১১ বছর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপ ও সানডে অবজার্ভারে। এছাড়া ১৯৯০ সালে তিনি আইওয়া ইন্ট্যারন্যাশনাল রাইটিং ফোরামে ভিজিটিং রাইটার হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৯২-৯৩ সেশনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় নিয়েম্যান ফেলো নির্বাচিত হন। কবিতায় অধিক মনোযোগী হতে পরে সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার ছেড়ে দেন তিনি।

আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় গিলের কবিতা। ২০০৬ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তার কবিতার জার্মান অনুবাদ প্রকাশ হয়। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে লেখালেখি নিয়ে অনেকগুলো ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন তিনি। প্রেম, মৃত্যু, আকাক্সক্ষা, নিঃসঙ্গতা এগুলো মোটাদাগে গিলের কবিতার বিষয়বস্তু।]

*************************************************

অনূদিত গল্প

পায়ে চলা মাছ

মূল : হুলিও কোর্তাসার

পায়ে ভর করে হাঁটতে পারা মাছ নিয়ে একসময় আমি বেশ ভাবতাম। হার্দিন দেস প্লান্তেসে বারবার ছুটে যেতাম তাদের দেখতে। অ্যাক্যুরিয়ামের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম। তারপর অবাক হয়ে তাদের থমকে থাকা কিংবা মৃদু চলাফেরা দেখতাম। আর এখন আমি নিজেই হয়ে গেছি একটা পায়ে চলা মাছ।

শীতকালীন দীর্ঘ উপাসনা শেষে বসন্তের এক সকালে প্যারিস শহরটা যখন ময়ূরের মতো পেখম মেলছিল, আমার হঠাৎ দেখা হয়েছিল পায়ে চলা মাছেদের সাথে। আমি যাচ্ছিলাম বুলেভাঁখ পোঁখ ওয়াইয়ালের দিকে। সাঁ মাখসেল আর ল্য’পিতালের সামনের রাস্তাটা নিয়েছিলাম। সবুজের মাঝখানে ধূসর রঙ দেখতেই সেখানকার সিংহদের কথা মনে পড়ল। সিংহ আর চিতাবাঘগুলো ছিল আমার বরাবরের বন্ধু। কিন্তু অ্যাক্যুরিয়ামের অন্ধকার আর স্যাঁতসেতে ঘরগুলোয় সেদিনের আগে আমি কখনো যাইনি। জালের মতো পাঁচিলটার পাশে সাইকেল রেখে আমি টিউলিপ ফুল দেখতে গিয়েছিলাম। সিংহগুলো কেন যেন মনমরা হয়ে পড়ে ছিল আর দেখতে লাগছিল কুৎসিত। আমার সাধের চিতাবাঘটাও ছিল ঘুমিয়ে। তাই বাধ্য হয়ে আমি অ্যাক্যুরিয়ামের ঘরে ঢুকে পড়লাম। সাধারণ আর আবোলতাবোল মাছগুলোর দিকে আঁড়চোখে তাকাচ্ছিলাম যতক্ষণ না আমার চোখ হুট করে আটকে গেল ওই পায়ে চলা মাছগুলোর দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে এক ঘণ্টা ধরে হা করে তাদের দেখে আমি ফিরে এলাম। কিন্তু পরেও, তাদের ছাড়া অন্য কোনো ভাবনাই কেন যেন মাথায় এল না।

সাঁন জেনিয়েভার লাইব্রেরিতে গিয়ে আমি একটা ডিকশনারি উলটালাম। দেখলাম পায়ে চলা মাছগুলো অ্যামবিসটোমা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একরকমের উভচর যাদের শুককীট অবস্থায় বড়ো বড়ো ফুলকা থাকে। তারা যে মেক্সিকো থেকে আগত তা আস্তেকদের মতো তাদের ছোট্ট আর গোলাপি মুখগুলো দেখলেই বলে দিতে পারতাম। কিংবা পানি ভরা ট্যাংকের উপরের সাইনবোর্ডটা দেখেও বলে দেয়া যেত। আমি পড়েছিলাম যে আফ্রিকায় খরার সময়ে তাদের দু’একটাকে ডাঙায় চলাফেরা করতে দেখা গেছে। পরে বর্ষাকাল এলে তারা সবসময়ের জন্য পানির তলায় আশ্রয় নেয়। আরো জেনেছিলাম যে তাদের স্প্যানিশ নাম হলো গিয়ে আহোলতে। সেখানে বলা ছিল যে মাছগুলো খাওয়া যায় আর তাদের শরীরের তেল কড লিভার তেলের মতো ব্যবহারও করা যায়। (অবশ্য আজকাল নাকি আর সেই তেলের ব্যবহার আর নেই।)

বিষয়টি যে আমার জন্য খুবই বিশেষ কিছু হয়ে উঠেছিল তা অবশ্য আমার তখন মনে হয়নি। কিন্তু হলো কী, পরের দিন আমি আবারো সোজা হার্দিন দেস প্লান্তেসে গিয়ে হাজির হলাম। তারপর প্রত্যেক সকালেই আমি সেখানে যাওয়া-আসা শুরু করলাম। কখনো কখনো সকালের পরে আবার রাতেও। অ্যাক্যুরিয়ামের দারোয়ান মুচকি হেসে আমার হাতে টিকেট ধরিয়ে দিত। পানি ভরা ট্যাংকের সামনে লোহার শিকের উপরে হেলান দিয়ে আমি ক্রমাগত মাছগুলোকে দেখতে থাকতাম। আমার চোখে ব্যাপারটা মোটেও অস্বাভাবিক লাগত না। কারণ সেদিকে তাকানোর পরে মিনিটখানেক গেলেই আমার মনে হতো আমার আর তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা যোগাযোগ আছে। যেন অসীম কালের হারিয়ে যাওয়া কোনো সম্পর্কের সুতো দুদিক থেকে টেনে টেনে আমাদের মাঝখানের দূরত্ব ঘোচাতে চাইত। সেই প্রথম দিনে তাদের দিকে তাকানোর প্রথম মুহূর্তে পানি থেকে যে এক তাল ফেনা উপরের দিকে ভেসে কাচের ঘেরাটোপের মধ্যে আটকে যেতে দেখেছিলাম, আমাকে দিনের পর দিন ওখানে ধরে রাখার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট ছিল। পায়ে চলা মাছগুলো ট্যাংকের সরু আর এবড়োথেবড়ো শ্যাওলাধরা পাথরগুলোর উপরে গাদাগাদি করে শুয়ে থাকত। (শুধু আমিই জানি যে সেটা কত সরু আর কতটা এবড়োথেবড়ো।) নয়টা মাছ সেখানে বলতে গেলে সামনেই থাকত। চাপাচাপির চোটে তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই কাচের গায়ে মাথা ঠোকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সোনালি চোখ পিটপিট করে তারা ট্যাংকের কাছে যে আসত, তার দিতে তাকাত। বিভ্রান্ত কিংবা হতবুদ্ধি আমি ওই নীরব আর স্থির প্রাণীগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার আশা নিয়ে কিছুটা লজ্জিত হয়েই ট্যাংকের মাঝখানে তাদের স্তূপের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে মনে আমি তাদের দল থেকে একজনকে একটু আলাদা করে লক্ষ করতাম। সে ডানদিকের কোণায় সেঁটে থাকত, অন্যদের থেকে খানিকটা পৃথক রাখত নিজেকে। তাই তাকে ভালোমতো দেখতে সুবিধাও হতো। তার শরীরটা ছিল ছোট্ট আর গোলাপি। (তাকে দেখে চীনে তৈরি কারুকাজওলা দুধরঙা গ্লাসের ছবি আমার চোখে ভাসত।) সে ছিল স্বচ্ছ ছোট একটা টিকটিকির মতো যার দৈর্ঘ্য হলে হবে বড়োজোর ছয় ইঞ্চি। দেখলাম তার শরীরের শেষ প্রান্তটা গিয়ে ফুরিয়েছে একটা মাছের মতো লেজে; আমাদের শরীরেও যেমন সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ থাকে নীচে। তার পিঠের উপর থেকে পিছনের দিকে চলে গেছে একটা স্বচ্ছ পাখনা, যা গিয়ে মিলেছে লেজের সঙ্গে। কিন্তু যা দেখে আমি অভিভূত হলাম, তা হলো তার পা। তার পা যেমন ছিল উভচরের পায়ের অপূর্ব আকৃতির অথচ ছোট ছোট আঙুলগুলোর মাথায় তেমনই নিখুঁত মানুষের নখের মতো নখ বসানো। আর সেসব দেখা শেষ করতেই আমি আবিষ্কার করলাম ওর চোখ-মুখ। অভিব্যক্তিহীন চেহারা, ভাষাবিহীন চোখে কোনো অনুভূতি খেলে না। সে জায়গায় আছে কেবল স্বচ্ছ সোনালিরঙা ব্রোচের মতো স্থির দুটো বৃত্ত। সে বৃত্তে জীবনের কোনো লক্ষণ নেই, আছে শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা। সেই চোখের দৃষ্টি আমার চোখে এসে মেলে, যেন তার ইচ্ছেতেই এক হয়। অপলক দৃষ্টি আবার কখনো খেই হারিয়ে সোনালি আভা খসাতে থাকে। তারপর মায়াময় কোনো ঘোরের মধ্যে আটকে যায়। দেখলাম চোখের চারপাশে সরু কালো এক বলয় গোলাপি পেশীর উপরে চোখকে খোদাই করে রেখেছে। অনেকটা ত্রিভুজের মতো গোলাপি মাথাটার দুদিকে ঢালু, দেখে মনে হলো সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যেতে থাকা কোনো পাথরের মূর্তি। ত্রিভুজাকৃতি সমতল অংশটা মুখে যেন একটা মুখোশ পরিয়ে রেখেছে। মুখোশটা দেখে মুখের আকৃতি আন্দাজ করা যায় মাত্র। কমনীয় অথচ প্রাণহীন পাথরের মতো মুখের উপরের সূক্ষ্ম ফাটলে কখনো চির ধরে কি ধরে না। মাথার দুদিকে যেখানে কিনা কান থাকার কথা, সেখানে তিনটি করে ছোট্ট পাখা। পাখাগুলো প্রবালের মতো লাল আর পালকে ঠাসা। যদ্দূর মনে হয় ওগুলো ফুলকাই হবে। আর পায়ে চলা মাছের শরীরের ওই অংশটাই কেবল নড়ে। প্রতি দশ থেকে পনেরো সেকেন্ডে পাখাগুলো এদিক-ওদিকে নড়েচড়ে আবারো শান্ত হয়ে যায়। কখনো হঠাৎ করে কোনো একটা পা নড়ে ওঠে। কুঁকড়ে থাকা আঙুলগুলোকে তখন আমি সামান্য একটু মেলতে দেখি। পরমুহূর্তেই আলতোভাবে শ্যাওলার উপরে সে পা রাখে ব্যাপারটা এমন নয় যে নড়াচড়া করতে আমাদের মোটেও  ভালো লাগে না। কিন্তু ট্যাংকটা এতই ছোটো আর তার ভেতরে এতটাই চাপাচাপি যে নিজের জায়গা থেকে সরে এদিক ওদিকে ঘোরার সুযোগ বলতে গেলে একেবারেই নেই। নড়াচড়া না করতেই সারাক্ষণ আমরা এত অন্যের মাথা বা লেজ দিয়ে গুঁতো দিচ্ছি। কখনো বেশ ঝামেলা লেগে যায়, একচোট মারামারিও বাঁধে, তারপর লড়তে লড়তে একসময় আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তখন মনে হয় খামোখা এসব ঝগড়াঝাটিতে না জড়িয়ে আমরা চুপচাপ পড়ে থাকলেই পারি।

সত্যি কথা বলতে কী, পায়ে চলা মাছদের নি—িদ্র নীরবতাই প্রথম তাদের প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করে, যার কারণে এক নজরে তাদের দেখতে আমি ট্যাংকটার দিকে হেলে পড়ি। নেশাগ্রস্তের মতো আমি তাদের মৌন ইচ্ছা বুঝতে চেষ্টা করি। বৈচিত্রহীন আর নিশ্চল শরীরে যেন ক্রমাগত তারা স্থান-কাল-পাত্রকে অগ্রাহ্য করে। পরে অবশ্য আমি আরো ভালো করে বুঝেছিলাম যে ফুলকাগুলো নাড়িয়ে কিংবা চমৎকার পাগুলো পাথরের উপরে উপর্যুপরি ঠুকে, কখনোবা অপ্রত্যাশিতভাবে সাঁতারের মতো ভঙ্গি করে (তাদের মধ্যে কেউ কেউ শরীরে ঢেউ তুলে সাঁতার কাটতে পারত) তারা আমার কাছে প্রমাণ করেছিল, যে তরলের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা স্থবির পার করে, চাইলে সেখান থেকে পালিয়েও যেতে পারে।

তবে তাদের চোখগুলোই আমাকে মুগ্ধ করেছিল সবচেয়ে বেশি। আশেপাশের ট্যাংকগুলোয় থাকা বিভিন্ন ধরনের মাছেরা মানুষের মতো আবেদন ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কেবল নানারকমের বোকামিই দেখাচ্ছিল। সে জায়গায় পায়ে চলা মাছদের চোখ যেন অন্য কোনো জীবনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল, কিংবা বলতে চাচ্ছিল জীবনকে অন্য কোনোভাবে অবলোকনের কথা। আমি ট্যাংকের কাচের উপরে আমার মুখটা ঠেসে ধরতাম (যদিও দারোয়ানটা মাঝে মধ্যে আমার দিকে তাকিয়ে গলা খাকারি দিত)। আমি আসলে তাদের চোখের মাঝখানে নিবুনিবু সোনালি বিন্দুগুলোকে আরো কাছে থেকে দেখতে চাইতাম। আমার মনে হতো গোলাপি ওই প্রাণীগুলোর মাত্রাতিরিক্ত নির্জনতা আর অকল্পনীয় ধীরগতির দূরবর্তী পৃথিবীতে প্রবেশের দরজা যেন ওটাই। তাদের মুখের ঠিক সামনে কাচের উপরে আঙুল দিয়ে টোকা দেয়ার কোনো মানেই হতো না। ওরকম করাতে তারা কেউ কখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তাদের সোনালি চোখগুলো আবছা আলোর মতো টিমটিম করে জ্বলেই গেছে শুধু। বরং তারপর তারা আমার দিকে অতল আর দুর্বোধ্য চোখে তাকিয়ে থেকেছে, যে দৃষ্টির প্রভাবে আমার মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠত।

তাদের এর চেয়ে বেশি কাছে আমি যাইনি। তার আগেই আমি জানতাম, মানে, পায়ে চলা মাছ হয়ে যাবার আগেই আমি সেটা জানতাম। তাদের কাছে সেই প্রথম দিনে প্রথমবারের মতো আসতেই আমি সেটা জেনেছিলাম। বানরের নাক-চোখ-মুখ যেমন মানুষ যা বিশ্বাস করে তার উল্টোটাও প্রমাণ করে দিতে পারে, বানররা আমাদের থেকে যত দূরে যায় ততই তা সত্য মনে হয়। মানুষের সাথে পায়ে চলা মাছের সাদৃশ্যের অভাব আমাকে যেন এটা বিশ্বাস করতে উদ্বুদ্ধ করল যে আমি সত্যি সত্যিই পায়ে চলা মাছ হয়ে পড়েছি। আর মনে হলো খামোখাই আমি এমনটা ভাবছি না। মিল বলতে গেলে শুধু তার ছোট্ট হাতগুলো, একইরকমের আঙুল, তা ছাড়া মানুষের সঙ্গে কোথাও এতটুকু মিল নেই। তবে আমার মনে হলো পায়ে চলা মাছের ছোট্ট সোনালি চোখ বসানো ত্রিভুজাকৃতি গোলাপি মাথাটাই হয়েছিল কারণ, যেটাকে কিছুতেই আমি কোনো মাছের মাথা বলে ভাবতে পারছিলাম না। কোণের মাছটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, সে আমার ভাবনা জানত। জানার কথা তার দৃষ্টিতে স্পষ্ট লেখা থাকত। তারা আসলে কিছুতেই মাছ ছিল না।

আমার মনে হলো এরকম ধরনের একটা প্রাণী নিয়ে কোনো পৌরাণিক কাহিনি থাকতেই পারে, মানে, আমি বিশ্বাস করি যে তা নিশ্চয় আছে। এরকম একটা ব্যাপার প্রাচীন কাহিনিতে থাকতেই হবে। পায়ে চলা মাছেরা একসময় মানুষ হতে শুরু করেছিল, তারপর হতে হতেও হয়নি। রহস্যময় মানবজীবন পাবার আগেই কোনো কারণে রূপান্তরের প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমি কল্পনা করতে শুরু করলাম যে তাদের বিফলতার কথা তারা জানে। তারা নিজেদের শরীরের কাছে বন্দি, নিরুপায়। তারা যেন অসীম কালের তরে গভীর এক নিস্তব্ধতায় নিমজ্জিত, চরম হতাশার কোনো ধ্যানে আবদ্ধ। ভাষাবিহীন তাদের দৃষ্টি, অভিব্যক্তিহীন নিবুনিবু চোখের চোখধাধাঁনো উজ্জ্বল সোনালি বৃত্তের আকুতি আমার ভিতরটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিত। তারা শুধু বলত— ‘বাঁচাও, রক্ষা করো আমাদের।’ আমি বিরবির করে তাদেরকে আশার কথা শোনাতাম, উপদেশ দিতাম, শিশুসুলভ স্বপ্ন দেখাতাম। নিজের জায়গায় নিথর দাঁড়িয়ে তারা আমার দিকে তাকিয়ে থাকত তো থাকতই। কেবল থেকে থেকে তাদের গোলাপি ফুলকার ছড়িয়ে থাকা ডালপালাগুলো হঠাৎ করেই শক্ত হয়ে যেত। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুকের মধ্যে বোবা কান্না অনুভব করতাম। মনে হতো তারা নিশ্চয় আমাকে লক্ষ করছে, আমার সমস্ত আগ্রহ আর শক্তিকে তাদের জীবনের দুর্বোধ্য কষ্টকে আলিঙ্গন করতে আহ্বান করছে। নিশ্চিতভাবে তারা মানুষ ছিল না, কিন্তু এর আগে আমি কখনো মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর প্রতি এত তীব্র টান অনুভব করিনি। পায়ে চলা মাছগুলো যেন অদ্ভুত এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেল, কখনো হয়ে উঠল ভয়ঙ্কর বিচারক। ওই স্বচ্ছ চোখের মধ্যে কী যে এক তুমুল বিশুদ্ধতা লুকিয়ে ছিল যে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিজেকে তুচ্ছ মনে হতে লাগল। তারা তখন তাদের জীবনকালের শূক অবস্থায়। আর শূক মানেই হলো গিয়ে ছদ্মবেশ, এমনকি কল্পিত চেহারাও। আস্তেকদের আদলের তাদের মুখের আড়ালে অভিব্যক্তি ছাড়াই দুর্দমনীয় নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠতে দেখতাম। দেখে মনে প্রশ্ন আসত, অনাদিকাল ধরে তারা কীসের প্রতীক্ষায় থাকে?

আমি তখন ভয় পেতে শুরু করলাম। ভয়টা এজন্যে নয় যে সেখানকার অন্য দর্শক কিংবা দারোয়ান হুট করে আমার খুব কাছে চলে আসবে, বরং এজন্যে যে আমার আসলে ওই পায়ে চলা মাছগুলোর সঙ্গে একা থাকাটা আর সাহসে কুলাচ্ছিল না। “কী হে, তুমি তো দেখি ওই মাছগুলোকে জ্যান্তই তোমার চোখ দিয়ে গিলে খাবে, হুম?” দারোয়ান হাসতে হাসতে বলল একদিন। সম্ভবত সে আমাকে কিছুটা পাগল ভেবেছিল। কিন্তু দারোয়ান যা মোটেও খেয়াল করেনি তা হলো, ওই মাছগুলো, ওরাই তাদের শান্ত আর সর্বগ্রাসী চোখে ধীরে ধীরে আমাকে গিলে ফেলছিল, ওই মানুষখেকো সোনালি চোখগুলো দিয়ে। অ্যাক্যুরিয়াম থেকে যে কোনো দূরত্বে থাকলেও আমি কেবল তাদেরই কথা ভাবতাম। শেষে এমন হলো যে, যত দূরেই যাই, কেবল তাদেরই ভাবনা। বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছিল যে আমি যেহেতু সেখানে প্রতিদিন উপস্থিত হই, আবার রাতের অন্ধকারেও কেবল তাদের অনঢ় অস্তিত্বের কথা ভাবি, অন্ধকারে ধীরে ধীরে একটা হাত বাড়াতে দেখি, পরমুহূর্তেই দেখি আরেকটা হাত তাকে জাপটে ধরে। তাদের চোখ হয়ত অন্ধকারেও পরিষ্কার দেখতে পায়। কারণ তাদের চোখে কোনো পরদা নেই।

যা হোক, এখন আমি জানি যে তখন ব্যাপারটা মোটেও অদ্ভুত ছিল না। এমনটা যেন হবারই ছিল। প্রতিদিন সকাল সকাল যে ট্যাংকটার উপরে প্রায় উপুড় হয়ে আমি তাদের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতাম, তার জন্য তাদের দিক থেকে পুরস্কারটা ছিল সেই কষ্টের চেয়ে বড়ো। তারা নিশ্চিত ভোগান্তির মধ্যে ছিল। আমার শরীরের প্রতিটা কণা তাদের শ্বাসরুদ্ধকর কান্নার দিকে ধাবিত হতো, যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছত ট্যাংকটার শক্ত আর অমসৃণ তলদেশে। অনমনীয় সেই তলাটাতে তারা কিছু একটার অপেক্ষায় পড়ে থাকত। যেন সুদূর কোনো অতীতে তাদের শাসন করার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে, যেন তার আগের যুগ ছিল তাদের স্বাধীনতার, সেই যুগের পৃথিবী ছিল পায়ে চলা মাছদের প্রভূত্ব চর্চার পৃথিবী। সেই ভয়াবহ আফসোস ছাড়া তাদের ওই বেদনাক্লিষ্ট পাথরের মতো নিথর অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখে অন্য কোনো ভাবনার ছায়া থাকার কথা ছিল না। তরল পরিপূর্ণ যে নরকে তাদের ঠাঁই হয়েছিল, ওই একটি বেদনার অন্তিম চিহ্ন রাখতে রাখতে সেখানে তারা তলিয়ে যেত। প্রমাণের তেমন আশা ছিল না বটে, কিন্তু আমি তাদের দেখাতে চাইতাম যে তাদের না-বলা চিন্তাধারা আমি ধরে ফেলেছি। শুধু তারা জানত আর জানতাম আমি। তাই যা ঘটেছিল তা আমাদের কারো কাছেই অস্বাভাবিক ঠেকেনি। বেমানান লাগেনি যে, অ্যাকুরিয়ামের কাচের ঘেরাটোপে আমার মুখ বরাবর চেপে বসানো, তাদের চোখের মণি আর মণির চারপাশের পৃথকরঙা ঘেরবিহীন সোনালি চোখগুলোর রহস্য পড়তে চাওয়ার আকাক্সক্ষা ক্রমাগত ধাবমান। কাচের খুব কাছে থেকে আমি পায়ে চলা মাছের স্তব্ধ মুখ দেখেছি। সেখানে বিস্ময় বা ভাবাবেগের আভাস নেই। ট্যাংকের অন্যদিকের কাচে আমি আমার নিজের চেপে রাখা মুখের প্রতিচ্ছবিও দেখেছি। দেখে তখনই জেনেছি আর চমকে সরে গেছি।

শুধু একটা ব্যাপার ছিল অদ্ভুত, তা হলো, অবলীলায় এ কথাটা আমার জানা বা বোঝা। একেবারে প্রথমবারের মতো বিষয়টা উপলব্ধি করা যে, আমার মতো একটা মানুষের চোখের সামনে তার অস্তিত্বের জীবন্ত কবর হয়ে গেল। অ্যাকুরিয়ামের বাইরে আমার মুখটা আবারো এগিয়ে এসেছিল, আমি আমার মুখের ছবির দিকে লক্ষ করেছিলাম, পায়ে চলা মাছদের মনোভাব বোঝার নিশ্চিত অনুভবে আমার ঠোঁট সামান্য কুঁচকে ছিল। আমি তখন একটা পায়ে চলা মাছ, তখনই আমি জেনেছিলাম যে আর কিছু বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি লোকটা ছিল অ্যাকুরিয়ামের বাইরে, তার চিন্তাধারা ছিল অ্যাকুরিয়ামের বাইরের মানুষের ভাবনার মতো। তাকে বুঝে নিয়ে, তাকে তার মতো থাকতে দিয়ে আমি জেনেছিলাম যে আমার দুনিয়ায় আমি এক পায়ে চলা মাছ। আর সেটা জানতে পেরে ভয়ে আমি শিউরে উঠেছি যে একটা পায়ে চলা মাছের শরীরে আমি বন্দি। আমার মানুষসুলভ চিন্তাভাবনাসমেত একটা মাছের শরীরে রূপান্তরিত হয়ে গেছি। পায়ে চলা মাছের শরীরে আমার জীবন্ত অস্তিত্বের কবর খচিত হয়েছে। বোধবুদ্ধিহীন কিছু প্রাণীর মাঝখানে অর্থহীন ভাসাভাসা চলাফেরা ছাড়া এখন আমার আর কিছু করার নেই। কিন্তু একটা পা আমার মুখের উপর আঘাত করতেই আমি ভাবনার ঘোর থেকে বেরিয়ে এলাম। ধাক্কার উৎস দেখার জন্য আমি সেদিকে সামান্য ফিরলাম, দেখলাম আমার পাশেই আরেকটা পায়ে চলা মাছ যে আমারই দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে স্পষ্ট লেখা, কোনো যোগাযোগ সম্ভব নয়, যা সে-ও জানে আর আমিও জানি। অথবা আমি নিজেও আসলে তার ভিতর থেকে কথা বলছিলাম। আমরা দুজনে মানুষের মতো করে ভাবছিলাম, যদিও আমরা অনুভূতি প্রকাশে অপারগ। আমাদের অভিব্যক্তি কেবল জাঁকজমকপূর্ণ চোখের সোনালি দীপ্তিতে সীমাবদ্ধ। আমরা কেবল অ্যাকুরিয়ামের বাইরে দাঁড়ানো কাচের গায়ে মুখ ঠেসে ধরা মানুষটার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতে পারি।

লোকটা আমাদের কাছে বারবার আসত। কিন্তু আজকাল খুব কম আসে। মাঝে মধ্যে আস্ত একটা সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, তাকে দেখি না। কাল অবশ্য তাকে দেখেছিলাম। সে আমার দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিল আর তারপর হুট করেই চলে গেল। দেখে মনে হলো আমাদের প্রতি তার সেই আগের টান আর নেই। কিংবা সে হয়তবা কেবল অভ্যাসের কারণেই ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে এসেছে। ক্রমাগত চিন্তা করে যাওয়াই যেহেতু আমার একমাত্র কাজ, তাই তাকে নিয়ে আমি অনেক কিছু ভাবি। আমার মনে হয় আমাদের দেখা হবার প্রথম থেকেই আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছিলাম। আমি জানতাম যে তার মনে আমাদেরকে ঘিরে যে রহস্যের আনাগোনা চলছে তা নিয়ে সে অন্য সমস্তকিছুর চেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু একসময় তার আর আমার মাঝখানে যোগাযোগের সেতুগুলো কেন যেন ভেঙে পড়ল। কারণ আমাকে নিয়ে ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে সে নিজেই এখন একটা পায়ে চলা মাছ। মানুষের জীবনের কাছে এখন আমি অচেনা। আমার মনে হয় একেবারে শুরুর দিকে চাইলে কোনোভাবে আমি তার কাছে ফিরে যেতে পারতাম। হ্যাঁ, কোনো না কোনোভাবে ঠিকই পারতাম। আর তার ভিতরে আমাদেরকে জানার আগ্রহটাও জারি রাখতে পারতাম। কিন্তু এখন আমি চিরতরে এক পায়ে চলা মাছ হয়ে গেছি। তবে আমি যদি কখনো মানুষের মতো চিন্তায় এতটুকু মগ্ন হই তবে সেটা কেবল এই জন্যে যে, পায়ে চলা মাছ তার পাথরের মতো গোলাপি করোটির ভিতরে ঠিক মানুষের মতোই ভাবনাচিন্তা করে। আমার বিশ্বাস প্রথম দিকে আমি যখন ওই লোকটা ছিলাম, তার সঙ্গে প্রচুর কথাবার্তা বলতে পেরেছিলাম বলেই এটা সম্ভব হলো। আর আজকে আমরা দুজনেই একা। লোকটা আর আসে না। আমি আমাকে সান্ত¡না দিই এই বলে যে সে হয়ত আমাদেরকে নিয়ে একটা গল্প লিখছে। আমি এই বিশ্বাস নিয়ে খুশি থাকি যে সে গল্পের কাহিনি সাজানোতে ব্যস্ত আছে। পায়ে চলা মাছদের সমস্ত কথা সে নিশ্চয় লিখবে।

অনুবাদ : আফসানা বেগম

*************************************************

কী লিখি
কেন লিখি
১৪

কার জন্য লিখি?
চিন্মোহন সেহানবীশ

দু-চার জন এমন একান্ত আত্মকেন্দ্রিক লেখক হয়ত বাংলাদেশেও আছেন যাঁরা এ প্রশ্নের জবাব দেবেন— ‘ও নিয়ে মাথা ঘামাই না, কেননা সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে ও কথা অবান্তর। লিখি ভরা মনে, আপন খেয়ালে।’ আর কিছু লেখক আছেন যাঁদের মাথাব্যথা অতি সংকীর্ণ এক রসিক সমজদার গোষ্ঠীর মন পাওয়া-না-পাওয়া নিয়েই। তার বাইরে বিপুল জনতার নিন্দা-প্রশংসায় তাঁদের কিছু এসে যায় না।

এ ধরনের চিন্তার মধ্যে কতটা আন্তরিকতা আছে, আপন অক্ষমতা গোপনের সাফাই কি না এগুলি— সে কথা না ভুলেও বলা চলে যে, এঁরা সমগ্র বাঙালি লেখক সমাজের মধ্যে মুষ্টিমেয়। অধিকাংশ লেখকই চান তাঁদের রচনা সবাই পড়–ক, সবাই তার তারিফ করুক। এই ইচ্ছা খুবই সুস্থ ও স্বাভাবিক। ‘যশের কাঙালি হয়ে’ ‘করতালি’ আদায়ের ফিকিরের বিরুদ্ধে আামাদের কবি বিদ্রোহ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু সে শুধু ফাঁকা ‘কথা  গাঁথার’ নিষ্ফলতার জ্বালায় জ্বলেই। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে পৌছে তিনি তাঁর ‘সুরের অপূর্ণতার’, ‘নিন্দার কথা’ অত অনায়াসেই মানতে পেরেছিলেন।

অবস্থার বিপাকে বাঙালি সাহিত্যিকের এই ব্যাপকতম পাঠকলাভের অতি সুস্থ কামনা আজ কিভাবে বিড়ম্বিত আমরা সবাই জানি। বাঙলা সাহিত্যের সম্ভাব্য পাঠক সমাজ আজ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার কৃপায় নিরক্ষর, নিঃস্ব এবং দ্বিখ-িত। দেশজোড়া নিরক্ষরতা সমুদ্রের বুকে সুশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিতদেও যে ছোট্ট দ্বীপটি কোনোগতিকে ভেসে রয়েছে আমাদের লিখিত সাহিত্যের দৌড় বড় জোর তার সীমানার মধ্যেই। তার চারদিকে ঘিরে আছে যে বিপুল নিরক্ষর ও নামমাত্র শিক্ষিতের সমুদ্র সেখানে পৌঁছতে সাহিত্যের প্রধান বাহন হল শ্রুতি। রামায়ণ, মহাভারত, পুঁথি, পাঁচালি পাঠ, কথকতা, কবিগান, যাত্রা, গম্ভীরা, তর্জা মারফতই একমাত্র  সে গণ-সম্রাটের দরবারে প্রবেশ মেলে। অথচ নির্মম ঔপনিবেশিক শোষণ ও গভীর কৃষি সংকটের দাপটে এগুলিও আজ বিবর্ণ, ¤্রয়িমান। ভূমি ব্যবস্থার আমূল ওলটপালট না ঘটিয়ে কোনো হাতুড়ে প্রক্রিয়ায় এদের পুনরুজ্জীবনও শেষ পর্যন্ত সম্ভব নয়।

বাঙালি লেখকের কাছে তাই ‘কার জন্য লিখি’— এই প্রশ্নের জবাব প্রায় বিধিনির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে বোধ হয়। অধিকাংশ কৃষক, মজুর (বাংলাদেশে এঁদের মস্ত একটা অংশ আবার হিন্দি বা অন্য ভাষাভাষী), এমন কি নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় নি¤œমধ্যবিত্তেরও একটা বড় অংশ আজ লিখিত সাহিত্যের নাগালের বাইরে। অথচ এঁদের মেহনতেই গড়ে ওঠে দেশের সম্পদ। অর্থাৎ সমাজের সৃষ্টিধরেরাই আজ বঞ্চিত মানস-সৃষ্টির প্রসাদ থেকে।

এই অমানুষিক অব্যবস্থা বিরুদ্ধে আক্ষেপ জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ— বলেছেন দেশের সম্পদ যারা সৃষ্টি করে সেই ‘সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা পালিত।… তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে— উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে।’

কিন্তু শুধু মহত্তর মানবিকতার আদর্শের দিক দিয়েই নয় এই মারাত্মক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাহিত্যিকের সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর বৈষয়িক উন্নতির প্রশ্নও সরাসরি জড়িত। কারণ নিরক্ষর দেশে লিখিত সাহিত্যের বাজার যে কত সংকীর্ণ তা এদেশের সঙ্গে পশ্চিমের দেশগুলির তুলনা করলেই ধরা পড়ে। সেই সংকীর্ণ বাজারের জন্য সাহিত্যিক পসরা সাজিয়ে জীবিকা সংস্থানের চেষ্টা যে কত দুর্ঘট, তাও বাঙালি সাহিত্যিকের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। যাঁরা সাহিত্য সৃষ্টি প্রসঙ্গে স্থ’ূল জীবিকা সংস্থানের প্রশ্নকে অবান্তর মনে করেন তাঁদের সঙ্গে ঝগড়া করে লাভ নেই— তাঁদের উপেক্ষা করাই ভালো। অন্যসব কথা বাদ দিয়ে শুধু টিকে থাকার তাগিদেই বাঙালি সাহিত্যিক চান ব্যপকতর পাঠকসমাজ।

দ্বিতীয়ত, সাহিত্যিকের দরদ সবচেয়ে যেখানে নিবিড় সেই সাহিত্যের উৎকর্ষ অপকর্ষের প্রশ্নও এই পাঠকসমস্যার সঙ্গে জড়িত। কারণ সমাজের বৈষয়িক সম্পদের ¯্রষ্টারা মানসসৃষ্টির নূন্যতম ভাগ থেকেও বঞ্চিত হন যে ব্যবস্থায় তা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিকতার উপর ভর করে যে সাহিত্য সৃষ্টি হয় তার দৌড় সীমাবদ্ধ হতে বাধ্য এবং বাস্তব সমস্য যতই ঘনীভূত হবে ততই তা আরও সীমাবদ্ধ হতে থাকবে। ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর বাঙলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম নিদর্শনগুলির দিকে আঙুল দেখিয়ে এ সত্যকে খ-ন করার চেষ্টাও ভুল হবে, কারণ সে উজ্জ্বলতায় একেবারে চোখ না ঝলসালে আমরাও ধরতে পারব তাদেরও সীমাবদ্ধতা (অবশ্য সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সত্যই তা গৌরবোজ্জ্বলও)। তৃতীয়ত, ইতিমধ্যে ধনবাদের দুনিয়াজোড়া সংকট এবং এ দেশের কৃষি সংকট আরও গভীর হয়ে দাঁড়ানোয় একদিকে যেমন বাংলা সাহিত্যের মধ্যবিত্ত পাঠকভিত্তিতে চিড় ধরেছে তেমনই আবার সমগ্রভাবে সাহিত্যের মানও যে বহুলাংশে ক্ষুণœ হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। প্রগতিশীল বাঙালি লেখকদের অভিনন্দনযোগ্য প্রচেষ্ট সত্বেও একথা সত্য কারণ আজও সমগ্র বাঙলা সাহিত্যের একটি কোনামাত্র পূরণ করছে সে সাহিত্যপ্রয়াস।

অতএব মানবিক, বৈষয়িক এবং সাহিত্যিক কারণেই বাঙালি লেখক চাই। সমাজ অচলায়তন চুরমার করে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশজোড়া নিরক্ষরতা, নিঃস্বতার মধ্যে সে ভরসা কোথায়?

একথা ঠিক যে বিদেশি সা¤্রাজ্যবাদের নাগপাশ ছিঁড়ে ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজ— অচলায়তন চুরমার করে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশজোড়া নিরক্ষরতা হটানো যাবে না আর বাঙালি সাহিত্যিকের কল্পনার দৌড়কেও ছাপিয়ে আর্বিভূত হবে না কোটি কোটি নতুন পাঠক। কিন্তু আগামী দিনের সেই অফুরন্ত সাহিত্য-তৃষ্ণার খোরাক জোগাবেন যে লেখক এখন কি তিনি যেমন লিখছেন তেমনই লিখে চলবেন আর স্বপ্ন দেখবেন ভাবী ঐশ্বর্যের? না এখন থেকেই, এখনকার প্রচ- সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকবেন আগামী দিনের জন্য?

একথা অবশ্যই মানতে হবে যে আজকের বাস্তবের সঙ্গে আগামী দিনের বাস্তবের মৌলিক তফাত ঘটবে আর তাই বাস্তবের প্রতিফলন হিসাবে আজকের সঙ্গে ভাবীদিনের সাহিত্যেরও মস্ত গরমিল থাকবে। তা ছাড়া মজুর-কিসান প্রভৃতি বর্তমান সমাজের নীচের তলার বাসিন্দাদের সঙ্গে সাহিত্যিকের পক্ষে যোগ স্থাপন করার সুযোগ সুবিধা আজকের দিনে যতটা আগামী দিনে তার থেকে অনেক বেশি জুটবে। কারণ মজুর বা কিসানের জীবনের শরিক হওয়ার পথে আজ রাষ্ট্র শক্তি থেকে আরম্ভ করে সামজিক ও শ্রেণীগত আচার পর্যন্ত নানা দিককার প্রত্যক্ষ বাধা বর্তমান, বিপ্লবের পরে যার চি‎হ্নও থাকবে না। বরং তখন রাষ্ট্রের নায়কই হবে প্রধানত মজুর ও কিসানেরা।

বিপ্লবের আগে ও পরের অবস্থার এত গরমিল সত্ত্বেও  কি পাঠক সাধারণের প্রতি কর্তব্যের দিক থেকে এই দুই যুগের মধ্যে কোনো মিল পাওয়া সম্ভব?

১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে সারা চীনের লেখক ও শিল্পীদের যে সম্মেলন হয় তার সামনে বিখ্যাত চীনা ঔপন্যাসিক মাও তুন এই প্রসঙ্গে বলেন :

‘১৯৪২ সালে প্রকাশিত কমরেড মাও-সে-তুং এর ‘সাহিত্য ও শিল্প সম্পর্কিত আলোচনা’ কুও মিন-টাং অধ্যুষিত এলাকার সাহিত্য ও শিল্পের পথনির্দেশক নীতি হওয়া উচিত ছিল। ঐ আলোচনায় কমরেড মাও সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি (ংঃধহফঢ়ড়রহঃ) ও মনোভাবের (ধঃঃরঃঁফব) সমস্যা, লেখক ও শিল্পীর যথাযথ শিক্ষার সমস্যা এবং প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পীদের যুক্তফ্রন্ট গঠনের সমস্যার কথা তুলেছিলেন। কুও মিন-টাং অধ্যুষিত এলাকার সাহিত্য জগতেও এসব সমস্যাই বর্তমান ছিল। কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে কার্যক্ষেত্রে আত্মপরীক্ষা ও আত্মসমালোচনার ব্যাপারে ‘আলোচনার’ সারতত্ত্ব কাজে লাগানো দূরে থাক ঐসব এলাকার লেখক শিল্পীরা ঐ ‘আলোচনার’ বিশদ পর্যালোচনাও করেননি। কুও মিন-টাং অধ্যুষিত এলাকার অবস্থা মুক্ত এলাকার অবস্থা থেকে আলাদা— এই অযুহাতে তাঁদের কেউ কেউ ঐ দলিলটির দিকে এক পলক তাকিয়েই তাঁর সঙ্গে  তাঁদের ‘নীতিগত মতৈক্য’ ঘোষণা করেছিলেন। অন্যেরা মুক্ত এলাকার অভিজ্ঞতার অল্পমাত্রের দোহাই পেড়ে শিল্প ও সাহিত্যের মতাদর্শ ও তত্ত্বগত সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কুও মিন— টাং অধ্যুষিত এলাকার সাহিত্য আন্দোলনের বাস্তব বিশ্লেষণ করেননি বলে তাঁরা আসলে কোনো সমস্যারই সমাধান করতে পারেননি।’ (দি পিপল্স নিউ লিটারেচার : ৫৮-৫৯ পৃ.)

আমাদের প্রগতিশীল লেখক মহলেও এই দুই রকম ভুলই দেখা যায় (অবশ্য কুও মিন-টাং রাজত্বের সঙ্গে আমাদের অবস্থার পুরোপুরি মিল খোঁজা ভুল হবে। মূল আধা-ঔপনিবেশিক, সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক ভিত্তির দিকের মিলের কথাই এখানে ধরা হচ্ছে)। আমাদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার মনোভাব অনেকের মধ্যে আছে। ১৩৫৬ সালের জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় সংখ্যায় ‘পরিচয়’-এ প্রকাশিত ‘সাহিত্য ও গণসংগ্রাম’ নামক আমার প্রবন্ধে চীনের নজির এই যান্ত্রিকভাবে টেনে লেখকদের অবিলম্বে কিসান-কর্মী বা ট্রেড ইউনিয়নিস্ট হিসাবে গণ-আন্দোলনে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল— এমনকি তার ফলে যদি সাহিত্যরচনা সাময়িকভাবে বন্ধ হয় তাতেও বিচলিত হওয়ার কারণ নেই— এমন কথাও বলা হয়েছিল।

এখানে মাও তুনের ভাষায় আমার ভুল হয়েছিল এই যে : ‘মুক্ত এলাকার অভিজ্ঞতার অংশমাত্রের দোহাই পেড়ে শিল্প ও সাহিত্যের মতাদর্শ ও তত্ত্বগত সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের চেষ্টা’ হয়েছিল— বাঙলাদেশের ‘সাহিত্য আন্দোলনের বাস্তব বিশ্লেষণ’ না করায় হাতুড়ে সমাধানই হাজির করা হয়েছিল সমস্যা সমাধানের। চীনের মুক্ত এলাকার মত অনুকূল অবস্থার নয় বাস্তবক্ষেত্রে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে বাঙালি প্রগতিশীল লেখকদের মধ্যে ক’জনের পক্ষে ওভাবে সরাসরি মজুর বা কিসান আন্দোলনের ঝাঁপ দেওয়া সম্ভব— প্রশ্ন শুধু তাই-ই  নয়। ব্যপক নিরক্ষরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবি ও তাঁদেও প্রধান মানসসৃষ্টি হিসাবে বাংলা সাহিত্যের আপেক্ষিক গুরুত্বের কথাও মনে রাখা দরকার ছিল। উল্টোদিকে চীনে ৪ঠা মে আন্দোলনের পর থেকে মোটের উপর অন্যান্য শ্রেণীর  মতো চীনা বুদ্ধিজীবীদেরও উপর মার্কসবাদী চিন্তাধারার প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবের তুলনায় আমাদের দেশে তার অনেক কম প্রভাবের কথা ভুলে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের কাছে অমন ঢালাও আবেদনও ছিল অত্যন্ত অবাস্তব এবং কার্য়ক্ষেত্রে বিভেদসৃষ্টির প্ররোচক।

কিন্তু একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের কিছু কিছু প্রগতিশীল লেখক বা শিল্পী বন্ধু আমাদেও অবস্থা চীনের ‘মুক্ত এলাকার অবস্থা থেকে আলাদা’— এই অযুহাতে মাও-সে-তুং এর দলিলটির দিকে এক পলক তাকিয়েই তার সঙ্গে তাঁদের ‘নীতিগত মতৈক্য’ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত ছিলেন। আমাদের দেশের ‘সাহিত্য ও শিল্পেরও পথনির্দেশকনীতি’ হিসাবে তাকে কার্যত মানেন নি। আর যদি মানতেন তাহলে মাও-সে-তুং এর ‘আলোচনায়’ ‘সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি (ংঃধহফঢ়ড়রহঃ) ও মনোভাবের (ধঃঃরঃঁফব) সমস্যা, লেখক ও শিল্পীদের যথাযথ শিক্ষার সমস্যা এবং প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পীদের যুক্তফ্রন্ট গঠনের সমস্যার’ যে অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা ছিল তাকে শুধু নমো নমো করেই মেনে নিতেন না— তাই নিয়ে আরও মাথা ঘামাতেন।

কারণ মাও-সে-তুং যখন বলেন যে নতুন সাহিত্যের পাঠক হবে মজুর, কিসান, সৈনিক ও মধ্যবিত্তশ্রেণী— বিশেষ করেই প্রথম তিনটি দল— তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন যে এঁদের জন্য লিখতে হলে ভালো করে এদের জানতে হবে— অভ্যস্ত মধ্যবিত্তসুলভ ধ্যান-ধারণা এবং অনুভূতির রূপান্তর ঘটিয়ে মজুর-কিসান- সৈনিকের ধ্যান-ধারণা ও অনুভূতির জগতে প্রবেশ করতে হবে। এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তরকে আমরা অনেক সময়েই খুব হালকাভাবে দেখি। তত্ত্বের দিক থেকে যিনি মার্কসবাদকে স্বীকার করেন, তিনি মনে করেন ব্যাপারটা আপনা থেকেই হবে। কিন্তু লিউ শাও-চির লেখা পড়লে বোঝা যায় যে, তিনি এই মূল দৃষ্টিভঙ্গিও রুপান্তরকে মার্কসবাদী তত্ত্ব আয়ত্ত্ব করার সমস্যা থেকে স্বতন্ত্র করে দেখেছেন যদিও অবশ্যই দুই’র সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন কথাও লিউ শাও-চি বলেছেন যে মূল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন যাঁর ঘটেনি তিনি যতবড় তীক্ষèধী সম্পন্নই হোন না কেন তত্ত্ব আয়ত্ত্ব করার ব্যপারে তাঁর গলতি থেকে যাবে— তত্ত্বকে তিনি বুঝবেন আপন ভ্রান্ত দৃষ্টির সঙ্গে মিলিয়েই। কাজেই এ আশংকার কাটান হিসাবে তত্ত্বচর্চার সঙ্গে হাতেনাতে কাজ ধরা, ‘জীবনে জীবন যোগ করার’ প্রশ্ন ওঠে— প্রশ্ন ওঠে তত্ত্বের সঙ্গে কার্যক্রমের সমন্বয়ের। এইজন্যই মাও-সে-তুং এই রূপান্তরের জন্য ‘দীর্ঘদিনের এমনকি কখনও কখনও যন্ত্রণাদায়ক অগ্নিপরীক্ষার প্রক্রিয়ার’ কথা বলেছেন।

মাও-সে-তুং তাঁর নিজের দৃষ্টান্ত ধরে দেখিয়েছেন কীভাবে তাঁর চিন্তার রূপান্তর ঘটেছিল। ছাত্রজীবনে অন্য ছাত্রদের সামনে নিজের মালপত্র কাঁধে বইতে তাঁর লজ্জা হত ভারি। হাত লাগাতে অন্য ছাত্রদের মতোই তাঁরও কুন্ঠা ছিল অপরিসীম। তাঁর মনে হত ভদ্রলোকেরাই বুঝি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, বাকি সবাই বুঝি নোংরা।

তারপর বিপ্লবের কাজে মাও-সে-তুং মজুর, কিসান ও সাধারণ সৈনিকদের সাথি হয়ে দাঁড়ালেন— একদিকে মার্কসবাদের জ্ঞানার্জন ও অন্যদিকে বিপ্লবী কার্যক্রমের মধ্যে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে তিনি বুঝতে পারলেন যে ধুলো কাদা তাঁদের কাপড়জামায় লাগলেও আসলে তার তলায় রয়েছে দুনিয়ার সব থেকে সাচ্চা, পরিষ্কার মন আর ধবধবে জামার তলায় অধিকাংশ সময়েই লুকিয়ে থাকে নোংরা, কদর্য পশু।

দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তরকে তাই হালকাভাবে দেখা চলে না— শুধু কেতাবের মধ্যে দিয়ে বা বিদগ্ধ আলাপ আলোচনা মারফতও তা ঘটানো সম্ভব নয়। যে লেখক ব্যপকসমাজ কামনা করেন তাঁকে এই রূপান্তরের জন্য প্রাণপাত করতে হবে। এই রূপান্তরিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাঁকে দেখতে হবে সাহিত্যের বিষয়বস্তুকে যে বিষয়বস্তু জীবনেরই মতো বিপুল, বিচিত্র, জটিল ও অভিনব। মজুর বা কিসানের জীবন নিয়েই যে শুধু সাহিত্য সৃষ্টি হবে তাই নয়— যদিও প্রগতিশীল লেখকের নজর ক্রমশই এইদিকে বেশি বেশি করে ঝুঁকলে তা অত্যন্ত সুস্থ ও স্বাভাবিকই হবে। কিন্তু বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন গোড়ার কথা  হলো এই রুপান্তরিত দৃষ্টি— যা  একদিকে মার্কসবাদী তত্ত্ব অর্জন ও অন্যদিকে গণজীবনের সঙ্গে সংযোগেরই ফল। বলাবাহুল্য এ সংযোগ স্থাপনের কোনো ছককাটা বাঁধাধরা রূপ নেই— আপন শক্তি সামর্থ্য সুযোগ অনুসারে প্রত্যেককেই এদিকে নজর দিতে হবে। তবে ভাবের ঘরে চুরি করলে কোনো মহৎ কার্য সম্পন্ন হবে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গি রূপান্তরের পরে লেখকের সামনে আরও একটি জটিল সমস্যা থাকে। সেটি হলো প্রকাশভঙ্গির সমস্যা। যে লেখক মজুর ও কিসানদের জন্য লিখতে চান স্বভাবতই তাঁকে উপযুক্ত প্রকাশভঙ্গি আয়ত্ব করতে হবে। ব্যাপারটা শুধু ভাষার নয়। তাছাড়া মজুরের ভাষা, কিসানের ভাষা, ধনিকের ভাষা বলে আলাদা আলাদা ভাষা নেই— ভাষা একটাই। তবে জীবনযাত্রা ধ্যান-ধারণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে প্রকাশভঙ্গির ব্যাবধান গড়ে ওঠে। স্বাভাবিক কারণেই জটিল, প্যাঁচালো প্রকাশভঙ্গি (যা অত্যন্ত সহজ শব্দ ব্যবহার সত্বেও হতে পারে) অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিতদের কাছে চলে না— তার জন্য দরকার সহজ অথচ গভীর ভাবব্যঞ্জক প্রকাশভঙ্গি। এটা একদিনে আয়ত্ব করার নয়— শধু গ্রাম্য শব্দ বা উপভাষা ব্যবহারেও তা হয় না। হয়ত প্রকাশভঙ্গির বৈশিষ্ট্য কিছুটা আঞ্চলিক বা বৃত্তিগত। যাই হোক আসলে প্রয়োজন মানুষগুলির সঙ্গে গভীর পরিচয়— তাদের শুধু কাজের মধ্যে জানা নয়, তাঁদের সংসারের মধ্যে, দুঃখকষ্ট আনন্দের মধ্যে, সংগ্রামের মধ্যে জানা।

এক্ষেত্রে অবশ্যই অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনেক অবকাশ আছে। মনে রাখতে হবে টকি-সিনেমা, রেডিও, শখের থিয়েটার মারফত পল্লীবাসীর মধ্যেও শহুরে প্রকাশভঙ্গি অনেকখানি ঢুকেছে। তাই পঞ্চাশ বছর আগে মানুষ যা ছিল আজ নিশ্চয়ই তা নেই। তবু জোর করে বলার মতো পরীক্ষালব্ধ ফল আমাদের হাতে নেই। মনে হয় রবীন্দ্রনাথের ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ বা ‘ও আমার সোনার বাংলা’ শহুরে বা গ্রাম্য মানুষ উভয়েই কান পেতে শোনেন, আপনার জিনিস মনে করেন যেমন তাঁরা মনে করেন ‘একবার বিদায় দে মা’র গান। কিন্তু বন্ধুবর শ্রীশম্ভু মিত্র যখন জীবনে প্রথম রবীন্দ্রনাথের কবিতা শোনার পর পল্লিকবি শ্রী নিবারণ প-িতের অভিভূত অবস্থার হৃদয়গ্রাহী বিবরণ দেন তখন প্রশ্ন জাগে নিবারণ বাবুর উপলব্ধির স্তর কি সাধারণ কৃষকের মতো? ঐ দৃষ্টান্তের উপর নির্ভর করে কোনো সাধারণ সিদ্ধান্তে আসা কি নিরাপদ?

প্রকাশভঙ্গিও জটিল সমস্যাকে অনেক সময় বিশেষ কোনো আঙ্গিক ব্যবহারের দ্বারা সমাধানের কথা ভাবা হয়। গ্রাম্য শব্দ বা উপভাষা ব্যবহারের ছড়াছড়ির কথা আগেই বলা হয়েছে। তেমনরই পাঁচালী বা ছড়ার ছন্দ, পয়ারের মামুলি প্রয়োগ, কবিতায় সেকেলে শব্দ ব্যবহার প্রভৃতির উল্লেখ করা যেতে পারে। কেউ কেউ ব্যপকতম আবেদনের দোহাই দিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীর বাংলাকে বরবাদ করে প্রাক্-রাবীন্দ্রিক ভাষা ব্যবহারের পক্ষপাতী, কেউবা আধুনিকতার নামে অতিরিক্ত বিদেশি শব্দ সংবলিত মোটের উপর কৃত্রিম এক ভাষা চালাতে চান।

চীনে ১৯৪০ সালে এই রকম ‘জাতীয় আঙ্গিক’ নিয়ে এক বিতর্ক চলে। কেউ কেউ জনপ্রিয়তা অর্জনের সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজেছিলেন ‘পুরানো লোককলার আঙ্গিক’ গ্রহণের ভিতরে। তাঁরা ৪ঠা মে আন্দোলনের সময় থেকে যেসব আঙ্গিকের উদ্ভব হয়েছিল তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অন্যেরা নতুন আঙ্গিকের পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে তাদের সংকীর্ণ পেটিবুর্জোয়া দৃষ্টি অক্ষুণœ রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁরা যা রক্ষা করবার জন্য কোমর বেঁধেছিলেন তা আসলে আঙ্গিক নয়, সে আঙ্গিকের পিছনকার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিষয়বস্তু। (‘দি পিপল্স  নিউ লিটারেচার’, ৫৯-৬০ পৃ.)

সাহিত্য বা শিল্পের জনপ্রিয়তা অর্জনের সমস্যাকে তাই এইভাবে আঙ্গিকের সমস্যার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। সেখানে প্রথম ও প্রধান কথা হচ্ছে লেখক বা শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর।

আমাদের মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের মজুর বা কিসানেরা একটা মতাদর্শগত বা সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে বাস করেন না। একদিকে যেমন তাঁদের উপর কবিগান, কথকতা, গম্ভীরা, ঝুমুরের ক্ষীয়মান লোককলার ধারাটি আজও কার্যকরী তেমনই আবার সিনেমা, থিয়েটার, রেডিও— ও ক্রমশও তাঁদের জগতে প্রভাব বিস্তার করছে। দুই ক্ষেত্রেই সাহিত্য বা সংস্কৃতি প্রধান বাহন হচ্ছে শ্রুতি ও দর্শন, কারণ অক্ষরের সাংকেতিকতার রহস্য দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে আজও উদ্ঘাটিত নয়।

এই হলো একদিককার বাস্তব। অন্যদিকে আছে তুলনায় মুষ্টিমেয় কমবেশি শিক্ষিতের দল কার্যত যাদের জন্যই বাংলা দেশের লেখক এ যাবতকাল সাহিত্য রচনা করে আসছেন। সেই লিখিত সাহিত্য গত দেড়শ বছরে অসামান্য বৈশিষ্ট্য ও গৌরবের অধিকারী হয়েছে। কাজেই বাঙালি মধ্যবিত্ত লেখক আপন দৃষ্টিভঙ্গিও রূপান্তর ঘটিয়ে অগণিত পাঠক সাধারণের সাদর স্বীকৃতির মধ্যে তাঁদের নবসৃষ্টির সার্থকতা খুঁজবেন তখন তাঁরাও নিশ্চয়ই একটা সাংস্কৃতিক বা সাহিত্যিক শূন্যতা থেকে শুরু করবেন না। ‘কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা অর্জন’ করে ‘কিসানের জীবনের শরিক’ হওয়ার চ্যালেঞ্জ তো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই দিয়ে গেছেন তাঁদের সামনে।

কিন্তু নিরক্ষরতার বাধা ভাঙা যাবে কি করে? পুরোপুরি ভাঙা এ ব্যবস্থার চৌহদ্দির মধ্যে অসম্ভব। কিন্তু বাঙালি লেখকের মানবিক, বৈষয়িক ও সাহিত্যিক সার্থকতার একমাত্র ধ্রুব পথ যদি হয় বর্তমান সংকীর্ণ পাঠক ম-লিকে ছাপিয়ে (তাঁদের বাদ দেওয়ার প্রশ্ন কোনোক্রমে উঠতেই পারে না) এদেশের মজুর-কিসানের মধ্যে নতুন সমজদার (অনেক সময়েই ‘পাঠক’ নন) সন্ধানে তবে সে বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা করতে হবে নানা কৌশলে।

সিনেমা আজ জনশিক্ষা বা গণসংস্কৃতির বোধকরি  সব থেকে শক্তিশালী বাহন হয়ে দাঁড়ানোর উপক্রম করছে। এ মারফত প্রগতিশীল লেখক ও গান রচয়িতা তাঁদের সৃষ্টিকে বর্তমানের থেকে অনেক ব্যপকতর সমজদারম-লীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন আনুষঙ্গিক বিপদের ঝুঁকি নিয়েই। অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও হয়ত এদিকের পথ কিছুটা আজও খোলা আছে।

কংগ্রেসি সরকারের কৃপায় রেডিওর দরজা কিন্তু প্রগতিশীলদের কাছে প্রায় বন্ধ। এ অব্যবস্থা গা-সওয়া হয়েছে বলে মেনে না নিয়ে দেশে তুমুল আন্দোলন করা উচিত একে বাতিল করার জন্য।

রঙ্গমঞ্চ মারফত লেখক আজও তাঁর স্থানটিকে ব্যপকতর সমজদারের সামনে আনতে পারেন। গণনাট্য সংঘ, বহুরূপী, লিট্ল থিয়েটার প্রভৃতি প্রগতিশীল নাট্যসম্প্রদায় মারফত এ কাজ ইতিমধ্যেই কিছুটা চলছে। গণনাট্যসংঘ লোককলার প্রচলিত রূপগুলির সাহায্যে নতুন চিন্তা পরিবেশনের যতটুকু চেষ্টা করছেন তাও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। হয়ত যাত্রার দিকে আরও বেশি নজর দিলে ব্যপকতর শ্রোতা দর্শক পাওয়া সম্ভব।

উর্দূ ও হিন্দি কবিতার জগতে ‘মুশায়রা’ ও কবি সম্মেলনের রেওয়াজ আছে। বাংলাদেশে ঐ রকম কোনো রীতি চালু নেই যদিও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি একদা জনসভায় প্রবল চাঞ্চল্যও সৃষ্টি করত। বন্ধুবর শ্রীশম্ভু মিত্র তো এখনও রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বিষ্ণু দে, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র পর্যন্ত অনেকের কবিতাই আবৃত্তি করে শ্রোতাদের উদ্বুদ্ধ করেন। অনেকে বিমল ঘোষ ও সুকান্তের কবিতা আবৃত্তি করেন জনসভায়। এই সম্ভাবনাকেই তাই পুরোপুরি কাজে লাগানো উচিত স্থায়ী রূপ দিয়ে। সুকন্ঠ আবৃত্তিকারেরাই যে শুধু কবিতা আবৃত্তি করবেন তাই নয়, কবিরাও যাতে নিজেদের কবিতা নতুন নতুন শ্রোতাদের কাছে উপস্থিত করেন তার ব্যবস্থাও করা উচিত। কারণ সে ক্ষেত্রে ক্রমশ ঐ শ্রোতাদের মুখ কবিতা রচনার সময়েও কবির চোখের সামনে ভাসবে— সম্ভব করবে নতুন ধরণের বলিষ্ঠ, প্রত্যক্ষ কবিতা। অবশ্য ‘কবিতা পড়–ন’ বলে সম্প্রতি কলকাতার রাস্তায় যে চমকপ্রদ পদ্ধতির কথা কাগজে দেখা গেল তার উদ্ভটত্বেরও কারণ হচ্ছে যাঁদের কবিতা শোনানোর চেষ্টা হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথাও উদ্যোক্তাদের ছিল না। তাই আচমকা সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কবিতা শুনিয়ে পথচারীকে শুধু হকচকিয়ে দেওয়াই গেল। দৃষ্টিভঙ্গিও রূপান্তর না ঘটলে, সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ না জাগলে এই রকমই ঘটে আর এ ধরনের প্রচেষ্টার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয় এই সিদ্ধান্ত— ‘জনগণ বেকুব ও বেরসিক।’

জেলখানায় আমরা একবার কিছু বাঙালি মজুর বন্দিদের সামনে সিমোনভের ‘রাশিয়ান কোশ্চেন’ (বাংলা তরজমার নামকরণ হয়েছে ‘সাংবাদিক’) পড়ে শুনিয়েছিলাম। অভিনয় নয়, কেবল চার পাঁচজন মিলে রেডিওতে যে ভাবে নাটক পড়ে সেই রকম এক একজন একটি চরিত্রের কথা বলেছিলেন। অবশ্য আমরা মাঝে মাঝে পড়া থামিয়ে ছোটোখাটো দুএকটা ব্যাপার ব্যাখ্যা করেছিলাম আর্ট ক্ষুণœ হওয়ার আশংকা না করেই। অর্থাৎ নাট্যসৃষ্টির জন্য ন্যূনতম মায়াজালই (রষষঁংরড়হ) বোনা হয়েছিল। তবু প্রায় ৬০ জন মজুর কান খাড়া করে তিন ঘণ্টা শুনলেন অসীম আগ্রহ নিয়েই। একদিকে পড়া শেষ না হওয়ায় বারবার আমাদের কাছে জানতে চাইলেন কাহিনীর কী পরিণতি হল— উত্তেজিত আলোচনা চালালেন নিজেদের মধ্যে এবং আমাদের কাছে প্রবল অনুযোগ জানালেন এমন ব্যবস্থা আরও না করার জন্য।

প্রগতিশীল লেখকদের মধ্যে অনেকেই আজকাল মজুর-কিসানের জীবন নিয়ে গল্প, উপন্যাস লিখছেন। মজুর কিসান শ্রোতাদের কাছেও এইভাবে শ্রীসমরেশ  বসু বা শ্রীগুণময় মান্নার মতো শক্তিশালী তরুণ লেখকরা যাতে নিজ নিজ রচনা উপস্থিত করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাতে একদিকে যেমন নিরক্ষরতার বাধা পেরিয়ে নতুন নতুন শ্রোতাদের সঙ্গে লিখিত সাহিত্যের পরিচয় ঘটানো যাবে তেমনই আবার যাঁদের জন্য লেখা তাঁদের গ্রহণ বর্জনের নিরিখে যাচাই করা যাবে নতুন সাহিত্য প্রয়াসের সত্যকার মূল্য।

*************************************************

 

জগদীশচন্দ্র বসু
…………………
বিজ্ঞানে সাহিত্য

জড় জগতে কেন্দ্র আশ্রয় করিয়া বহুবিধ গতি দেখিতে পাওয়া যায়। গ্রহগণ সূর্যের আকর্ষণ এড়াইতে পারে না। উচ্ছৃঙ্খল ধুমকেতুকেও একদিন সূর্যের দিকে ছুটিতে হয়। জড় জগত ছাড়িয়া জঙ্গম জগতে দৃষ্টিপাত করিলে তাহাদের গতিবিধি বড় অনিয়মিত বলিয়া মনে হয়। মাধ্যাকর্ষণশক্তির ছাড়াও অসংখ্য শক্তি তাহাদিগকে সর্বদা সন্তাড়িত করিতেছে। প্রতি মুহূর্তে তাহারা আহত হইতেছে এবং সেই আঘাতের গুণ ও পরিমাণ অনুসারে প্রত্যুত্তুরে তাহারা হাসিতেছে কিংবা কাঁদিতেছে। মৃদুস্পর্শ ও মৃদু আঘাত; ইহার প্রত্যুত্তুরে শারীরিক রোমাঞ্চ, উৎফুল্লভাব ও নিকটে আসিবার ইচ্ছা। কিন্তু আঘাতের মাত্রা বাড়াইলে অন্য রকমে তাহার উত্তর পাওয়া যায়। হাত বুলাইবার পরিবর্তে যেখানে লগুড়াঘাত, সেখানে রোমাঞ্চ ও উৎফুল্লতার পরিবর্তে  সন্ত্রাস ও পূর্ণমাত্রায় সংকোচ। আকর্ষণের পরিবর্তে বিকর্ষণ —সুখের পরিবর্তে দুঃখ—হাসির পরিবর্তে কান্না। জীবের গতিবিধি কেবলমাত্র বাহিরের আঘাতের দ্বারা পরিমিত হয় না। ভিতর হইতে নানাবিধ আবেগ আসিয়া বাহিরের গতিকে জটিল করিয়া রাখিয়াছে। সেই ভিতরের আবেগ কতকটা অভ্যাস, কতকটা স্বেচ্ছাকৃত। এইরূপ বহুবিধ ভিতর বাহিরের আঘাত-আবেগের দ্বারা চালিত মানুষের গতিকে নিরূপণ করিতে পারে? কিন্তু মাধ্যাকর্ষণশক্তি কেহ এড়াইতে পারেনা। সেই অদৃশ্য শক্তিবলে বহু বৎসর পরে আজ আমি আমার জন্মস্থানে উপনীত হইয়াছি। জন্মলাভ সূত্রে জন্মস্থানের যে একটা আকর্ষণ আছে তাহা স্বাভাবিক। কিন্তু আজ এই যে সভার সভাপতির আসনে আমি স্থান লইয়াছি তাহার যুক্তি একেবারে স্বতঃসিদ্ধ নহে। প্রশ্ন হইতে পারে, সাহিত্য-ক্ষেত্রে কি বিজ্ঞান সেবকের স্থান আছে? এই সাহিত্য-সম্মিলন বাঙালির মনের এক ঘনীভূত চেতনাকে বাংলাদেশের এক সীমা হইতে অন্য সীমায় বহন করিয়া লইয়া চলিয়াছে এবং সফলতার চেষ্টাকে সর্বত্র গভিরভাবে জাগাইয়া তুলিতেছে। ইহা হইতে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি, এই সম্মিলনের মধ্যে বাঙালির যে ইচ্ছা আকার ধারণ করিয়া উঠিতেছে তাহার মধ্যে কোন সংকীর্ণতা নাই। এখানে সাহিত্যকে কোনো ক্ষুদ্র কোঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয় নাই, বরং মনে করা হয় আমরা উহাকে বড় করিয়া উপলব্ধি করিবার সংকল্প করিয়াছি। আজ আমাদের পক্ষে সাহিত্য কোনো সুন্দর অলংকার মাত্র নহে—আজ আমরা আমাদের চিত্তের সমস্ত সাধনাকে সাহিত্যের নামে এক করিয়া দেখিবার জন্য উৎসুক হইয়াছি। এই সাহিত্য সম্মিলন-যজ্ঞে যাঁহাদিগকে পুরোহিতপদে বরণ করা হইয়াছে তাঁহাদের মধ্যে বৈজ্ঞানিককেও দেখিয়াছি। আমি যাঁহাকে সুহৃদ ও সহযোগী বলিয়া ¯েœহ করি এবং স্বদেশীয় বলিয়া গৌরব করিয়া থাকি, সেই আমাদের দেশমান্য আচার্য শ্রীযুক্ত প্রফুল্লচন্দ্র একদিন এই সম্মিলন-সভার প্রধান আসন অলকৃত করিয়াছেন। তাঁহাকে সমাদর করিয়া সাহিত্য-সম্মিলন  যে কেবল গুণের পূজা করিয়াছেন তাহা নহে, সাহিত্যের একটি উদার মূর্তি দেশের সম্মুখে প্রকাশ করিয়াছেন। পাশ্চাত্য দেশে জ্ঞানরাজ্যে এখন ভেদবুদ্ধির অত্যন্ত প্রচলন হইয়াছে। সেখানে জ্ঞানের প্রত্যেক শাখাপ্রশাখা স্বতন্ত্র রাখিবার জন্যই বিশেষ আয়োজন করিয়াছে; তাহার ফলে নিজেকে করিয়া জানিবার চেষ্টা এখন লুপ্তপ্রায় হইয়াছে। জ্ঞান-সাধনার প্রথমবস্থায় এরূপ জাতিভেদ প্রথার উপকার করে, তাহাতে উপকরণ সংগ্রহ করা এবং তাহাকে সজ্জিত করিবার সুবিধা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি কেবল এই প্রথাকেই অনুসরণ করি তাহা হইলে সত্যের পূর্ণমূর্তি প্রত্যক্ষ করা ঘটিয়া উঠে না; কেবল সাধনাই চলিতে থাকে, সিদ্ধির দর্শন পাই না।

অপরদিকে, বহুর মধ্যে এক যাহাতে হারাইয়া না যায়, ভারতবর্ষ সেই দিকে সর্বদা লক্ষ্য রাখিয়াছে। সেই চিরকালের সাধনার ফলে আমরা সহজেই এক-কে দেখিতে পাই, আমাদের মনে সে সম্বন্ধে কোনো প্রবল বাধা ঘটে না। আমি অনুভব করিতেছি, আমাদের সাহিত্য-সম্মিলনের ব্যাপারে স্বভাবতই এই ঐক্যবোধ কাজ করিয়াছে। আমরা এই সম্মিলনের প্রথম হইতেই সাহিত্যের সীমা নির্ণয় করিয়া তাহার অধিকারের দ¦ার সংকীর্ণ করিতে মনেও করি নাই। পরন্তু আমরা তাহার অধিকারকে সহজেই প্রসারিত করিয়া দিবার দিকেই চলিয়াছি। ফলত জ্ঞান অন্বেষণে আমরা অজ্ঞাতসারে এক সর্বব্যাপী একতার দিকে অগ্রসর হইতেছি। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিজেদের এক বৃহৎ পরিচয় জানিবার জন্য উৎসুক হইয়াছি। আমরা কি চাইতেছি, কি ভাবিতেছি, কি পরীক্ষা করিতেছি, তাহা এক স্থানে দেখিলে আপনাকে প্রকৃতরূপে দেখিতে পাইব। সেই জন্য আমাদের দেশে আজ যে কেহ গান করিতেছে, ধ্যান করিতেছে, অন্বেষণ করিতেছে, তাঁহাদের সকলকেই এই সাহিত্য-সম্মিলনে সমবেত করিবার আহ্বান প্রেরিত হইয়াছে। এই কারণে, যদিও জীবনের অধিকাংশ কাল আমি বিজ্ঞানের অনুশীলনে যাপন করিয়াছি, তথাপি সাহিত্য-সমি¥লন-সভার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিতে দ্বিধা বোধ করি নাই। কারণ আমি যাহা খুঁজিয়াছি, দেখিয়াছি, লাভ করিয়াছি, তাহাকে দেশের অন্যান্য নানা লাভের সঙ্গে সাজাইয়া ধরিবার অপেক্ষা আর কী সুখ হইতে পারে? আর এই সুযোগে আজ আমাদের দেশের সমস্ত সত্য-সাধকদের সহিত এক সভায় মিলিত হইবার অধিকার যদি লাভ করিয়া থাকি তবে তাহা অপেক্ষা আমার আনন্দ আর কী হইতে পারে?

কবিতা ও বিজ্ঞান

কবি এই বিশ্বজগতে তাঁহার হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়া একটি অরূপকে দেখিতে পান, তাহাকেই তিনি রূপের মধ্যে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন। অন্যের দেখা যেখানে ফুরাইয়া যায় সেখানেও তাঁহার ভাবের দৃষ্টি অবরুদ্ধ হয় না। সেই অপরূপ দেশের বার্তা তাঁহার কাব্যের ছন্দে ছন্দে নানা আভাসে বাজিয়া উঠিতে থাকে। বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে, কিন্তু কবিত্ব-সাধনার সহিত তাঁহার ঐক্য আছে। দৃষ্টির আলোক যেখানে শেষ হইয়া যায় সেখানেও তিনি আলোকের অনুসরণ করিতে থাকেন, শ্রুতির শক্তি যেখানে সুরের শেষ সীমায় পৌঁছায় সেখান হইতেও তিনি কম্পমান বাণী আহরণ করিয়া আনেন। প্রকাশের অতীত যে রহস্য প্রকাশের আরালে বসিয়া দিনরাত্রি কাজ করিতেছে, বৈজ্ঞানিক তাহাকেই প্রশ্ন করিয়া দুর্বোধ উত্তর বাহির করিতেছেন এবং সেই উত্তরকেই মানব-ভাষায় যথাযথ করিয়া ব্যক্ত করিতে নিযুক্ত আছেন। এই যে প্রকৃতির রহস্য-নিকেতন, ইহার নানা মহল, ইহার দ্বার অসংখ্য। প্রকৃতি বিজ্ঞানবিৎ, রাসায়নিক, জীবতত্ত্ববিৎ ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া এক এক  মহলে প্রবেশ করিয়াছেন; মনে করিয়াছেন সেই সেই মহলেই বুঝি তাহার বিশেষ স্থান, অন্য মহলে বুঝি তাহার গতিবিধি নাই। তাই জড়কে, উদ্ভিদকে, সচেতনকে তাহারা অলঙ্ঘ্যভাবে বিভক্ত করিয়াছেন। কিন্তু এই বিভাগকে দেখাই যে বৈজ্ঞানিকের দেখা, এ কথা আমি স্বীকার করি না। কক্ষে কক্ষে সুবিধার জন্য যত দেয়াল তোলাই যাক না, সকল মহলেরই এক অধিষ্ঠাতা। সকল বিজ্ঞানই পরিশেষে এই সত্যকে আবিষ্কার করিবে বলিয়া ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়া যাত্রা শুরু করিয়াছে। সকল পথই যেখানে একত্র মিলিয়াছে সেইখানেই পূর্ণ সত্য। সত্য খ- খ- হইয়া আপনার মধ্যে অসংখ্য বিরোধ ঘটাইয়া অবস্থিত নহে। সেইজন্য প্রতিদিনই দেখিতে পাই জীবতত্ত্ব, রসায়নতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, আপন আপন সীমা হারাইয়া ফেলিতেছি। বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই, কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না। কবিকে সর্বদা আত্মহারা হইতে হয়, আত্মসম্বরণ করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য। কিন্তু কবির কবিত্ব নিজের আবেগের মধ্য হইতে তো প্রমাণ বাহির করিতে পারে না! এজন্য তাঁহাকে উপমার ভাষা ব্যবহার করিতে হয়। সকল কথায় তাঁহাকে ‘যেন’ যোগ করিয়া দিতে হয়। বৈজ্ঞানিককে যে পথ অনুসরণ করিতে হয় তাহা একান্ত বন্ধুর এবং  পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের কঠোর পথে তাঁহাকে আত্মসম্বরণ করিয়া চলিতে হয়। সর্বদা তাঁহার ভাবনা, পাছে নিজের মন নিজেকে ফাঁকি দেয়। এজন্য পদে পদে মনের কথাটা বাহিরের সঙ্গে মিলাইয়া চলিতে হয়। দুই দিক হইতে যেখানে না মিলে সেখানে তিনি এক দিকের কথা কোন মতেই গ্রহণ করিতে পারেন না। ইহার পুরস্কার এই যে, তিনি যেটুকু পান তাহার চেয়ে কিছুমাত্র বেশি দাবি করিতে পারেন না বটে, কিন্তু সেটুকু তিনি নিশ্চিত রূপেই পান এবং ভাবী পাওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি কখনো কোন অংশে দুর্বল করিয়া রাখেন না। কিন্তু এমন যে কঠিন নিশ্চিতের পথ, এই পথ দিয়াও বৈজ্ঞানিক সেই অপরিসীম রহস্যের অভিমুখেই চলিয়াছেন। এমন বিস্ময়ের রাজ্যের মধ্যে দিয়া উত্তীর্ণ হইতেছেন যেখানে অদৃশ্য আলোকরশ্মির পথের সম্মুখে স্থুল পদার্থের বাধা একেবারেই শূন্য হইয়া যাইতেছে এবং যেখানে বস্তু ও শক্তি এক হইয়া দাঁড়াইতেছে। এইরূপ হঠাৎ চক্ষুর আবরণ অপসারিত হইয়া এক অচিন্ত্যনীয় রাজ্যের দৃশ্য যখন বৈজ্ঞানিককে অভিভূত করে তখন মুহূর্তে জন্য তিনিও আপনার স্বাভাবিক আত্মসম্বরণ করিতে বিস্মৃত হন এবং বলিয়া উঠেন ‘যেন নহে—এই সেই’।

অদৃশ্য আলোক

কবিতা ও বিজ্ঞানের কি ঘনিষ্ট সম্বন্ধ তাহার উদাহরণ স্বরূপ আপনাদিগকে এক অত্যাশ্চর্য অদৃশ্য জগতে প্রবেশ করিতে আহ্বান করিব। সেই অসীম রহস্যপূর্ণ জগতের এক ক্ষুদ্র কোণে আমি যাহা কতক স্পষ্ট কতক অস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করিয়াছি, কেবলমাত্র তাহার সম্বন্ধেই দুই একটা কথা বলিব। কবির চক্ষু এই বহু রঙ্গে রঞ্জিত আলোক-সমুদ্র দেখিয়াও অতৃপ্ত রহিয়াছে। এই সাতটি রঙ্গ তাহার তৃষা মিটাইতে পারে নাই। তবে কি এই দৃশ্য-আলোকের সীমা পার হইয়াও অসীম আলোকপুঞ্জ প্রসারিত রহিয়াছে? এইরূপ অচিন্ত্যনীয় অদৃশ্য আলোকের রহস্য যে আছে তাহার পথ জার্মানির অধ্যাপক হার্টজ প্রথম দেখাইয়া দেন। তড়িৎ-ঊর্মিসঞ্জাত সেই অদৃশ্য আলোকের প্রকৃতি সম্বন্ধে কতগুলি তত্ত্ব প্রেসিডেন্সি কলেজের পরীক্ষাগারে আলোচিত হইয়াছে। সময় থাকিলে দেখাইতে পারিতাম, কিরূপে অস্বচ্ছ বস্তুর আভ্যন্তরিক আণবিক সন্নিবেশ এই অদৃশ্য আলোকের দ্বারা ধরা যাইতে পারে। আপনারা আরো দেখিতেন, বস্তুর স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতা সম্বন্ধে অনেক ধারণাই ভুল। যাহা অস্বচ্ছ মনে করি তাহার ভিতর দিয়া আলো অবাধে যাইতেছে। আবার এমন অদ্ভত বস্তুও আছে যাহা এক দিক ধরিয়া দেখিলে স্বচ্ছ, অন্য দিক ধরিয়া দেখিলে অস্বচ্ছ। আরো দেখিতে পাইতেন যে, দৃশ্য আলোক যেরূপ বহুমূল্য কাচবর্তুল দ্বারা দূরে অক্ষীণভাবে প্রেরণ করা যাইতে পারে সেইরূপ মৃতবর্তুল সাহায্যে অদৃশ্য আলোকপুঞ্জও বহুদূরে প্রেরিত হয়। ফলত দৃশ্য আলোক সংহত করিবার জন্য হীরকখ-ের যেরূপ ক্ষমতা, অদৃশ্য আলোক সংহত করিবার জন্য মৃৎপি-ের ক্ষমতা তাহা অপেক্ষাও অধিক। আকাশ-সংগীতের অসংখ্য সুরসপ্তকের মধ্যে একটি সপ্তকমাত্র আমাদের দৃশ্যেন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে। সেই ক্ষুদ্র গ-িটিই আমাদের দৃশ্য-রাজ্য। অসীম জ্যোতিরাশির মধ্যে আমরা অন্ধবৎ ঘুরিতেছি। অসহ্য এই মানুষের অপূর্ণতা! কিন্তু তাহা সত্ত্বেও মানুষের মন একেবারে ভাঙ্গিয়া যায় নাই; সে অদম্য উৎসাহে নিজের অপূর্ণতার ভেলায় অজানা সমুদ্র পার হইয়া নূতন দেশের সন্ধানে ছুটিয়াছে।

বৃক্ষ জীবনের ইতিহাস

দৃশ্য আলোকের বাহিরে অদৃশ্য আলোক আছে; তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করিলে আমাদের দৃষ্টি যেমন অনন্তের মধ্যে প্রসারিত হয়, তেমনি  চেতন রাজ্যের বাহিরে যে বাক্যহীন যে বেদনা আছে তাহাকে বোধগম্য করিলে আমাদের অনুভূতি আপনার ক্ষেত্রেকে বিস্তৃত করিয়া দেখিতে পায়। সেইজন্য রুদ্রজ্যোতির রহস্যলোক হইতে এখন শ্যামল উদ্ভিদ-রাজ্যের গভীরতম নীরবতার মধ্যে আপনাদিগকে আহ্বান করিব। প্রতিদিন এই যে অতি বৃহৎ উদ্ভিদ-জগত আমাদের চক্ষুর সম্মুখে প্রসারিত, ইহাদের জীবনের সহিত কি আমাদের জীবনের কোনো সম্বন্ধ আছে? উদ্ভিদ-তত্ত্ব সম্বন্ধে অগ্রগণ্য প-িতেরা ইহাদের সঙ্গে কোনো আত্মীয়তা স্বীকার করিতে চান না। বিখ্যাত বার্ডন সেন্ডরসন বলেন যে, কেবল দুই চারি প্রকারের গাছ ছাড়া সাধারণ বৃক্ষ বাহিরের আঘাতে দৃশ্যভাবে কিংবা বৈদ্যুতিক চাঞ্চলের দ্বারা সাড়া দেয় না। আর লাজুক জাতীয় গাছ যদিও বৈদ্যুতিক সাড়া দেয় তবু সেই সাড়া জন্তুর সাড়া হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন। ফেফর প্রমুখ উদ্ভিদ-শাস্ত্রের অগ্রণী প-িতগণ একবাক্যে বলিয়াছেন যে, বৃক্ষ ¯œায়ুহীন। আমাদের ¯œায়ুসূত্র যেরূপ বাহিরের বার্তা বহন করিয়া আনে, উদ্ভিদে এরূপ কোনো সূত্র নাই। ইহা হইতে মনে হয়, পাশাপাশি যে প্রাণী ও উদ্ভিদজীবন প্রবাহিত হইতে দেখিতেছি তাহা বিভিন্ন নিয়মে পরিচালিত। উদ্ভিদ-জীবনে বিবিধ সমস্যা অত্যন্ত দুরূহ— সেই দুরূহতা ভেদ করিবার জন্য অতি সূক্ষ¥দর্শী কোনো কল এপর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। প্রধানত এজন্যই প্রত্যক্ষ পরীক্ষার পরিবর্তে অনেক স্থলে মনগড়া মতের আশ্রয় লইতে হইয়াছে। কিন্তু প্রকৃত তত্ত্ব জানিতে হইলে আমাদিগকে মতবাদ ছাড়িয়া পরীক্ষার প্রত্যক্ষ ফল পাইবার চেষ্টা করিতে হইবে। নিজের কল্পনাকে ছাড়িয়া বৃক্ষকেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে হইবে এবং কেবলমাত্র বৃক্ষের স্বহস্ত-লিখিত বিবরণই সাক্ষ্যরূপে গ্রহণ করিতে হইবে।

বৃক্ষের দৈনন্দিন ইতিহাস

বৃক্ষের আভ্যন্তরিক পরির্বতন আমরা কি করিয়া জানিব? যদি কোনো অবস্থাগুণে বৃক্ষ উত্তেজিত হয় বা অন্য কোনো কারণে বৃক্ষের অবসাদ উপস্থিত হয় তবে এই সব ভিতরের অদৃশ্য পরিবর্তন আমরা বাহির হইতে কি করিয়া বুঝিব? তাহার একমাত্র উপায়—সকল প্রকার আঘাতে গাছ যে সাড়া দেয় তাহা কোনো প্রকারে ধরিতে ও মাপিতে পারা। জীব যখন কোনো বাহিরের শক্তি দ্বারা আহত হয় তখন সে নানারূপে তাহার সাড়া দিয়া থাকে। যদি কন্ঠ থাকে তবে চিৎকার করিয়া, যদি মূক হয় তবে হাত পা নাড়িয়া। বাহিরের ধাক্কা কিংবা ‘নাড়ার’ উত্তরে ‘সাড়া’। নাড়ার পরিমাণ অনুসারে সাড়ার পরিমাণ মিলাইয়া দেখিলে আমরা জীবনের পরিমাণ মাপিয়া লইতে পারি। উত্তেজিত অবস্থায় অল্প নাড়ায় প্রকা- সাড়া পাওয়া যায়। অবসন্ন অবস্থায় অধিক নাড়ায় ক্ষীণ সাড়া। আর যখন মৃত্যু আসিয়া জীবকে পরাভূত করে তখন হঠাৎ সর্বপ্রকারের সাড়ার অবসান হয়। সুতরাং বৃক্ষের আভ্যন্তরিক অবস্থা ধরা যাইতে পারিত, যদি বৃক্ষকে দিয়া তাহার সাড়াগুলি কোনো প্ররোচনায় কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ করাইয়া লইতে পারিতাম। সেই আপাতত অসম্ভব কার্যে কোনো উপায়ে যদি সফল হইতে পারি তাহার পরে সেই নূতন লিপি এবং নূতন ভাষা আমাদিগকে শিখিয়া লইতে হইবে। নানান দেশের নানান ভাষা, সে ভাষা লিখিবার অক্ষরও নানাবিধ, তার মধ্যে আবার এক নূতন লিপি প্রচার যে একান্ত শোচনীয় তাহাতে সন্দেহ নাই। এক-লিপি সভার সভ্যগণ ইহাতে ক্ষুণœ হইবেন, কিন্তু এই সম্বন্ধে অন্য উপায় নাই। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, গাছের লেখা কতকটা দেবনাগরীর মতো—অশিক্ষিত কিংবা অধশিক্ষিতের পক্ষে একান্ত দুর্বোধ্য। সে যাহা হউক, মানস সিদ্ধির পক্ষে দুইটি প্রতিবন্ধক—প্রথমত গাছকে নিজের সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিতে সম্মত করানো, দ্বিতীয়ত গাছ ও কলের সাহায্যে তাহার সেই সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা। শিশুকে দিয়া আজ্ঞাপালন অপেক্ষাকৃত সহজ, কিন্তু গাছের নিকট হইতে উত্তর আদায়  করা অতি কঠিন সমস্যা। প্রথম এই চেষ্টা অসম্ভব বলিয়াই মনে হইত। তবে বহু বৎসরের ঘনিষ্ঠতা নিবন্ধনে তাহাদের প্রকৃতি অনেকটা বুঝিতে পারিয়াছি। এই উপলক্ষে আজ আমি সহৃদয় সভ্যসমাজের নিকট স্বীকার করিতেছি, নিরীহ গাছপালার নিকট হইতে বলপূর্বক সাক্ষ্য আদায় করিবার জন্য তাহাদের প্রকৃতি অনেক নিষ্ঠুর আচরণ করিয়াছি। এইজন্য বিচিত্র প্রকারের চিম্টি উদ্ভাবন করিয়াছি— সোজাসুজি অথবা ঘূর্ণায়মান। সূচ দিয়া বিদ্ধ করিয়াছি এবং অ্যাসিড দিয়া পোড়াইয়াছি। সে সব কথা অধিক বলিব না। তবে আজ জানি যে, এই প্রকার জবরদস্তি দ্বারা যে সাক্ষ্য আদায় করা যায় তাহার কোনো মূল্য নাই। ন্যায়পরায়ণ বিচারক এ সাক্ষ্যকে কৃত্রিম বলিয়া সন্দেহ করিতে পারেন। যদি গাছ লেখনী-যন্ত্রের সাহায্যে তাহার বিবিধ সাড়া লিপিবদ্ধ করিত তাহা হইলে বৃক্ষের প্রকৃত ইতিহাস সমুদ্ধার করা যাইতে পারিত। কিন্তু এই কথাতো দিবা-স্বপ্ন মাত্র। এইরূপ কল্পনা আমাদের জীবনের নিশ্চেষ্ট অবস্থাকে কিঞ্চিৎ ভাবাবিষ্ট করে মাত্র। ভাবুকতারতৃপ্তি সহজসাধ্য; কিন্তু অহিফেনের ন্যায় ইহা ক্রমে ক্রমে মর্মগ্রন্থি শিথিল করে। যখন স্বপ্নরাজ্য হইতে উঠিয়া কল্পনাকে কর্মে পরিণত করিতে চাই তখনই সম্মুখে দুর্ভেদ্য প্রাচীর দেখিতে পাই। প্রকৃতিদেবীর মন্দির লৌহ-অর্গলিত। সেই দ্বার ভেদ করিয়া শিশুর আব্দার এবং ক্রন্দনধ্বনি পৌঁছে না; কিন্তু যখন বহুকালের একাগ্রতাসঞ্চিত শক্তিবলে রুদ্ধ দ্বার ভাঙিয়া যায় তখনই প্রকৃতিদেবী সাধকের নিকট আবির্ভূত হন।

ভারতে অনুসন্ধানের বাধা

সর্বদা শুনিতে পাওয়া যায় যে, আমাদের দেশে যথোচিত উপকরণবিশিষ্ট পরীক্ষাগারের অভাবে অনুসন্ধান অসম্ভব। একথা যদিও অনেক পরিমাণে সত্য নহে, যদি ইহাই সত্য হইতে তাহা হইলে অন্যদেশে, যেখানে পরীক্ষাগার নির্মাণে কোটি মুদ্রা ব্যয়িত হইয়াছে, সে স্থান হইতে প্রতিদিন নূতন তত্ত্ব আবিষ্কৃত হইত। কিন্তু সেরূপ সংবাদ শোনা যাইতেছে না। আমাদের অনেক অসুবিধা আছে, অনেক প্রতিবন্ধক আছে সত্য কিন্তু পরের ঐশ্বর্যে আমাদের ঈর্ষা করিয়া কি লাভ? অবসাদ ঘচাও। দুর্বলতা পরিত্যাগ কর। মনে কর, আমরা যে অবস্থাতে পড়ি না কেন সে-ই আমাদের প্রকৃষ্ট অবস্থা। ভারতই আমাদের কর্মভূমি, এখানেই আমাদের কর্তব্য সমাধা করিতে হইবে। যে পৌরুষ হারাইয়াছে সে-ই বৃথা পরিতাপ করে। পরীক্ষাসাধনে পরীক্ষাগারের অভাব ব্যতীত আরও বিঘœ আছে। আমরা অনেক সময়ে ভুলিয়া যাই যে, প্রকৃত পরীক্ষাগার আমাদের অন্তরে। সেই অন্তরতম দেশেই অনেক পরীক্ষা পরীক্ষিত হইতেছে। অন্তর্দৃষ্টিকে উজ্জ¦ল রাখিতে সাধনার প্রয়োজন হয়। তাহা অল্পেই ম্লান হইয়া যায়। নিরাসক্ত একাগ্রতা যেখানে নাই সেখানে বাহিরের আয়োজনও কোনো কাজে লাগে না। কেবলই বাহিরের দিকে যাহাদের মন ছুটিয়া যায় সত্যকে লাভ করার চেয়ে দশজনের কাছে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য যাহারা লালায়িত হইয়া উঠে তাহারা সত্যের দর্শন পায় না। সত্যের প্রতি যাহাদের পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা নাই, ধৈর্যের সহিত তাহারা সমস্ত দুঃখ বহন করিতে পারে না; দ্রুত বেগে খ্যাতিলাভ করিবার লালসায় তাহরিা লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া যায়। এইরূপ চঞ্চলতা যাহাদের আছে, সিদ্ধির পথ তাহাদের জন্য নহে। কিন্তু সত্যকে যাহারা যথার্থ চায়, উপকরণের অভাব তাহাদের পক্ষে প্রধান অভাব নহে। কারণ দেবী সরস্বতীর যে নির্মল শ্বেতপদ্ম তাহা সোনার পদ্ম নহে, তাহা হৃদয়-পদ্ম।

গাছের লেখা

বৃক্ষের বিবিধ সাড়া লিপিবদ্ধ করিবার বিবিধ সূক্ষ¥ যন্ত্র নির্মাণের আবশ্যকতার কথা বলিতেছিলাম। দশ বৎসর আগে যাহা কল্পনা মাত্র ছিল তাহা এই কয় বৎসরের চেষ্টার পর কার্যে পরিণত হইয়াছে। সার্থকতার পূর্বে কত প্রযতœ যে ব্যর্থ হইয়াছে তাহা এখন বলিয়া লাভ নাই এবং বিভিন্ন  কলগুলির গঠনপ্রণালী বর্ণনা করিয়াও আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি করিব না। তবে ইহা বলা আবশ্যক যে, এই বিবিধ কলের সাহায্যে বৃক্ষের বহুবিধ সাড়া লিখিত হইবে। বৃক্ষের বৃদ্ধি মুহূর্তে মুহূতে নির্ণীত হইবে; তাহার স্বতঃস্পন্দন লিপিবদ্ধ হইবে এবং জীবন ও মৃত্যুরেখা তাহার আয়ু পরিমিত করিবে। এই কলের আশ্চর্য শক্তি সম্বন্ধে ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, ইহার সাহায্যে সময় গণনা এত সূক্ষ্ম হইবে যে এক সেকেন্ডের সহ¯্র ভাগের একভাগ অনায়াসে নির্ণীত হইবে। আর এক কথা শুনিয়া আপনারা প্রীত হইবেন। যে কলের নির্মাণ অন্যান্য সৌভাগ্যবান দেশেও অসম্ভব বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছে, সেই কল এদেশে আমাদের কারিকর দ্বারাই নির্মিত হইয়াছে। ইহার মনন গঠন সম্পূর্ণ এই দেশীয়। এইরূপ বহু পরীক্ষার পর বৃক্ষজীবন ও মানবীয় জীবন যে একই নিয়মে পরিচালিত তাহা প্রমাণ করিতে সমর্থ হইয়াছি। প্রায় বিশ বৎসর পূর্বে কোনো প্রবন্ধে লিখিয়াছিলাম ‘বৃক্ষেজীবন যেন মানবজীনেরই ছায়া’। কিছুূ না জানিয়াই লিখিয়াছিলাম। স্বীকার করিতে হয়, সেটা যৌবনসুলভ অতি সাহস এবং কথার উত্তেজনা মাত্র। আজ সেই লুপ্তস্মৃতি শব্দায়মান হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে এবং স্বপ্ন ও জাগরণ আজ একত্র আসিয়া মিলিত হইয়াছে।

উপসংহার

আমি সম্মিলন-সভায় কি দেখিলাম, উপসংহার কালে আপনাদিগের নিকট সেই কথা বলিব। বহুদিন পূর্বে দাক্ষিণাত্যে একবার গুহামন্দির দেখিতে গিয়াছিলাম। সেখানে এক গুহার অর্ধ অন্ধকারে বিশ্বকর্মার মূর্তি অধিষ্ঠিত দেখিলাম। সেখানে বিবিধ কারুকর তাহাদের আপন আপন কাজ করিবার নানা যন্ত্র দেবমূর্তির পদতলে রাখিয়া পূজা করিতেছে। তাহাই দেখিতে দেখিতে ক্রমে আমি বুঝিতে পারিলাম, আমাদের এই বাহুই বিশ্বকর্মার আয়ুধ। এই আয়ুধ চালনা করিয়া তিনি পৃথিবীর মৃৎপি-কে নানাপ্রকারে বৈচিত্র্যশালী করিয়া তুলিতেছেন। সেই মহাশিল্পীর আর্বিভাবের ফলেই আমাদের জড়দেহ চেতনাময় ও সৃজনশীল হইয়া উঠিয়াছে। সেই আবির্ভাবের ফলেই আমরা মন ও হস্তের দ্বারা সেই শিল্পীর নানা অভিপ্রায়কে-নানা রূপের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিতে শিখিয়াছি; কখনও শিল্পকলায়, কখনও সাহিত্য, কখনও বিজ্ঞানে। গুহামন্দিরে যে ছবিটি দেখিয়াছিলাম এখানে সভাস্থলে তাহাই আজ সজীবরূপে দেখিলাম। দেখিলাম আমাদের দেশের বিশ্বকর্মা বাঙালি চিত্তের মধ্যে যে কাজ করিতেছেন তাঁহার সেই কাজের নানা উপকরণ। কোথাও বা তাহা কবিকল্পনা, কোথাও যুক্তিবিচার, কোথাও তথ্যসংগ্রহ। আমরা সেই সমস্ত উপকরণ তাহারই সম্মুখে স্থাপিত করিয়া এখানে তাঁহার পূজা করিতে আসিয়াছি। মানবশক্তির মধ্যে এই দৈবশক্তির আবির্ভাব, ইহা আমাদের দেশের চিরকালের সংস্কার। দৈবশক্তির বলেই জগতে সৃজন ও সংহার হইতেছে। মানুষে দৈবশক্তির আর্বিভাব যদি সম্ভব হয়, তবে মনুষ সৃজন করিতেও পারে এবং সংহার করিতেও পারে। আমাদের মধ্যে যে জড়তা, যে ক্ষুদ্রতা যে ব্যর্থতা আছে তাহাকে সংহার করিবার শক্তিও আমাদের মধ্যেই রহিয়াছে। এ সমস্ত দুর্বলতার বাধা আমাদের পক্ষে কখনই চিরসত্য নহে। যাহারা অমরত্বের অধিকারী তাহারা ক্ষুদ্র হইয়া থাকিবার জন্য জন্মগ্রহণ করে নাই। সৃজন করিবার শক্তি আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। আমাদের যে জাতীয় মহত্ত্ব লুপ্তপ্রায় হইয়া আসিয়াছে তাহা এখনও আমাদের অন্তরের সেই সৃজনীশক্তির জন্য অপেক্ষা করিয়া আছে। ইচ্ছাকে জাগ্রত করিয়া তাহাকে পুনরায় সৃজন করিয়া তোলা আমাদের শক্তির মধ্যেই রহিয়াছে। আমাদের দেশের যে মহিমা একদিন অভ্রভেদ করিয়া উঠিয়াছিল তাহার উত্থানবেগ একেবারে পরিসমাপ্ত হয় নাই, পুনরায় একদিন তাহা আকাশ স্পর্শ করবেই করিবে। সেই আমাদের সৃজনশক্তিরই একটি চেষ্টা বাংলা সাহিত্য-পরিষদে আজ সফল মূর্তি ধারণ করিয়াছে। এই পরিষদকে আমরা কেবলমাত্র একটি সভাস্থল বলিয়া গণ্য করিতে পারি না; ইহার ভিত্তি কলিকাতার কোনো বিশেষ পথপার্শ্বে স্থাপিত হয় নাই এবং ইহার অট্টালিকা ইষ্টক দিয়া গ্রথিত নহে। অন্তর-দৃষ্টিতে দেখিলে দেখিতে পাইব, সাহিত্য-পরিষদ সাধকদের সম্মুখে দেব-মন্দিররূপেই বিরাজমান। ইহার ভিত্তি সমস্ত বাংলা দেশের মর্মস্থলে স্থাপিত এবং ইহার অট্টালিকা আমাদের জীবনস্তর দিয়া রচিত হইতেছে। এই মন্দিরে প্রবেশ করিবার সময় আমাদের ক্ষুদ্র আমিত্বের সর্বপ্রকার অশুচি আবরণ যেন আমরা বাহিরে পরিহার করিয়া আসি এবং আমাদের হৃদয়-উদ্যানের পবিত্রতম ফুল ও ফলগুলিকে যেন পূজার উপহার স্বরূপ দেবচরণে নিবেদন করিতে পারি!

[বঙ্গীয় সাহিত্য-সম্মিলনীর ময়মনসিংহ অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণ ১৯১১]

*************************************************

বিশেষ গদ্য

পথের শেষ কোথায়, কী আছে শেষে
দিলীপ কুমার নাথ

বঙ্গীয় রেনেসাঁর অন্যতম দিকপাল, বাংলা গদ্যরীতিতে চলিত ভাষার প্রবর্তক, প্রাবন্ধিক-কবি, ‘সবুজপত্রে’র প্রকাশক, বীরবলী ধারার জনক প্রমথ চৌধুরী তাঁর “বর্ষা” প্রবন্ধের মধ্যে বলেন : ‘আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথের একটি পুরনো গানের প্রথম ছত্রটি ঘুরে ফিরে ক্রমান্বয়ে আমার কানে আসছে- ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’, এমন দিনে যা বলা যায় তা হয়তো রবীন্দ্রনাথও আজ পর্যন্ত বলেন নি, শেক্সপিয়রও বলেন নি। বলেন যে নি, তা ভালোই করেছেন। কবি যা ব্যক্ত করেন তার ভিতর যদি এই অব্যক্তের ইঙ্গিত না থাকে, তাহলে তাঁর কবিতার ভিতর কোন mystery থাকে না, আর যে কথার ভিতর mystery নেই, তা কবিতা নয়- পদ্য হতে পারে।’ প্রমথ চৌধুরীর পবিত্র স্মৃতির প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর এই বিখ্যাত কথাটিকে একটু অন্যভাবে প্রকাশের দুঃসাহস করছি। পথের শেষ কোথায়, কি আছে শেষে? কি শেষে আছে তা রবীন্দ্রনাথও বলেননি, শেক্সপিয়রও বলেননি। জীবনের- পথের শেষ জানা থাকলে সুংঃবৎুবিহীন জীবন নেহাত গতানুগতিক ও অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়ত। রবীন্দ্রনাথ সভ্য মানুষের চিরন্তন প্রশ্নই রেখেই গেলেন, পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে। শেক্সপীয়রও তাঁর Measure for Measure বলেন,  but to die, and go we know not where/ To lie in cold obstruction and to rot গন্তব্য কোথায় কেউ তা বলেন না, অজানা এ গন্তব্য- এটুকুতেই থেমে যান।

সভ্যতার ইতিহাসে একটি পর্যায়ে এসে ভাবুক মানুষের বোধে এ প্রশ্নের উদয় হয়েছে। মানব (Homo) মহাজাতির আদি প্রজাতি হাতিয়ার প্রস্তুতকারী মানব (Homo habilis) ও পরবর্তী প্রজাতি ঋজু মানব (homo erectus) সময়কালে মানুষের মনে সে প্রশ্নের উদয় হওয়ার মতো মস্তিষ্ক ব্যবহারের অবসর সময় সৃষ্টি হয় নি এবং বৈষয়িক শর্তও পূরণ হয় নি। বুদ্ধিমান মানুষ (Homo sapiens) পৃথিবীতে অবস্থান করছে প্রায় ৩ লক্ষ বছর। কিন্তু মাত্র হাজার বারো-পনের বছর পূর্বে কৃষিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত মৃত্যু পরবর্তী জীবন, পরকাল (অভঃবৎষরভব বা ঐবৎবধভঃবৎ) নিয়ে সম্ভবত বর্তমান প্রজাতি বুদ্ধিমান মানব ভাবেওনি। এর একটি যুক্তি বিশ্লেষকগণ দেন যে তার দৃঢ় বৈষয়িক ভিত্তি আছে। বিশ-পনের লক্ষ বছর থেকে মানুষের আদি প্রজাতি ও পরবর্তী প্রজাতি ফলমূল সংগ্রহ ও শিকারের ওপর জীবন নির্বাহ করেছে। প্রধানত তাৎক্ষণিকতাই তার জীবিকার ধরণ। ভবিষ্যৎ চিন্তা মাথায় আসে না। লোকজ তন্ত্র-মন্ত্র, ওঝা, ঝাড় ফুঁক সবই ছিল। অশরীরী বিভিন্ন মৃত ও অন্যান্য আত্মার ধারণাও ছিল। সেসব আত্মাকে বিভিন্ন উদ্দেশে ব্যবহারের প্রথাও ছিল। কিন্তু সেসব তাৎক্ষণিক জাগতিক প্রয়োজনে। টিকে থাকার সংগ্রামে সমতাভিত্তিক সমাজ ছিল অপরিহার্য। কিন্তু কৃষি সমাজের উদ্ভবে বহু কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজনাতিরিক্ত উদ্বৃত্ত সৃষ্টিই প্রধানত এর পেছনে দায়ী। উদ্বৃত্ত সৃষ্টি একদিক থেকে কিছু লোককে মনোজগতে অবসর সময়ে চিন্তার অবকাশ দেয়। কৃষিতে প্রয়োজন সময়, পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা। এভাবে হয়ত মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে দেহ থেকে আলাদা আত্মার উপস্থিতির চিন্তা এসেছে। এবং দারুণ ফলপ্রসূ হয় এ ধারণা কৃষিসমাজে সৃষ্ট বৈষম্যকে ধর্মীয় আভরণে মানুষের চিন্তাজগতে বৈধতা দিতে।

পরকাল বা মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে সভ্য মানুষের যে ভাবনা তা বহুমাত্রিক। ধর্মীয়-সাহিত্যিক, নিছক ধর্মীয়, ধর্মীয়- দার্শনিক, নিছক দার্শনিক ইত্যাদি। পরকাল সম্পর্কে সুতীব্র আকুতিপূর্ণ অভিলাষ আমরা দেখি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা প্রাচীনতম টিকে থাকা মহাকাব্যের নিদর্শন মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয়- আক্কাদীয় গিলগামেশ-এ। প্রায় ৪৭০০ বছর আগে রচিত এ মহাকাব্য নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দুই তৃতীয়াংশ দেবতা ও এক তৃতীয়াংশ মানুষ গিলগামেশ, মতান্তরে উরুকের রাজা গিলগামেশ তার বন্ধু এনকিদুর মৃত্যুতে এতটাই ভেঙ্গে পড়ে যে সবার উপদেশ অগ্রাহ্য করে সে দেবলোকে অমরত্বের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বহু বাধা অতিক্রম করে সে স্বর্গের উদ্যান দিয়ে পৌঁছায় অমর মনুষ্য যুগল উটনাপিশটিম ও তার স্ত্রীর নিকট। এবং উটনাপিশটিমের নিকট থেকে জানতে পারে অমোঘ সত্য মানুষের সাধারণ ভাগ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নিরর্থক। জীবনের আনন্দ তাহলে আর থাকে না। গিলগামেশ মহাকাব্য নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একেশ্বরবাদী ইহুদি-খ্রিস্টধর্মে যে ‘নোয়ার মহাপ্লাবন’ ও নোয়ার নৌকো সম্পর্কে বলা আছে, হেসিওডের গ্রীকপুরাণ ‘থিওগোনি’তে টাইটান প্রমেথিউসের মনুষ্য পুত্র ডিউকেলিয়নের প্লাবন সম্পর্কে যা আছে তার মূল এই বহুত্ববাদী ধর্ম মেসোপটেমীয় গিলগামেশের উটনাপিশটিমের প্লাবন ও নৌকোর কাহিনী। গ্রীক পুরাণের হেডিসের নদী স্টিখের মাঝি ক্যারন গিলগামেশের স্বর্গে যাবার উটনাপিশটিম সাগরের মাঝি উরশানাবির আদলে চিত্রিত। বাইবেলের স্বর্গীয় ইডেন গার্ডেনও গিলগামেশের দেখা গার্ডেন অব প্যারাডাইস আদলে।

আত্মা-দেহ (ংড়ঁষ-নড়ফু) বা দেহ-মন (সরহফ-নড়ফু) দুয়ের দ্বৈততা (উঁধষরংস) সম্পর্কে শ্বেত ইওরোপীয় আত্মমদগর্বী, উন্নাসিকরা শ্বেতজাতিগোষ্ঠী বহির্ভূত ধ্যান-ধারণার কাছে ঋণ স্বীকারে প্রচ-ভাবে অস্বীকৃত বলে অধিকাংশই এ বিষয়ে প্লেটোর পূর্বে যেতে অনিচ্ছুক। কিন্তু আমরা খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ-পঞ্চম সহ¯্রাব্দে মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয়, আক্কাদীয়, আসিরিয় ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় এর ধারণা পাই। মৃত্যু জীবনের শেষ নয়, মৃত্যু এক রূপের আত্মা, সুমেরীয় ‘গিদিম’, ‘আক্কাদীয়’ ‘এটেমা’ বা প্রেতাত্মা। এদের স্থান মৃত্যুর পর পৃথিবীর মাটির অনতিদূরে পাতালে (ঘবঃযবৎড়িৎষফ)। চির অন্ধকার, না ফেরার দেশ এটি। এ নরক নয়। জীবনে সুকৃতি বা পাপ করার সাথে সম্পর্ক নেই। সব মানুষকেই মৃত্যুর পর এখানে আসতে হবে। খাদ্য ধূলা, পুষ্টি মাটি। প্রেতাত্মারা ক্ষুধা, তৃষ্ণা অনুভব করে। মৃত্যুরও পর শূন্য মৃতদেহ গভীর ঘুমের মধ্যে থাকে এবং মাটিতে সমাহিত করার পর যে দেহ মাটি থেকে তৈরি তা ‘আবার মাটিতে ফিরে যায়’। মানুষ সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর মাটি ও এক অমর দেবতার রক্ত দিয়ে। পরবর্তীকালে বাইবেলেও এক জায়গায় মৃত্যুকে ঘুম বলা হয়েছে এবং জেনেসিসের এক জায়গায় বলা আছে ‘তোমরা হচ্ছ ধূলা, এবং ধূলায় তোমরা ফিরে যাবে’।

সমসাময়িক নীল নদ বিধৌত মিসর সভ্যতায় চিত্রটি অতটা হতাশাব্যঞ্জক নয়। সেখানে মৃত্যুর পর আত্মার তিন পরিশীলিত রূপঃ বা (ইধ), কা (কধ) ও আখ (অশয)। বা (ইধ) ব্যক্তিগত আত্মা বা চরিত্র, দেহ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, আত্মার এই অংশ জীবিত ও মৃত উভয় বিশ্বে ভ্রমণ করে। কা (কধ) জীবন শক্তি (খরভব ভড়ৎপব) যা দেহ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং মৃত্যুর পর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আখ (অশয) বিচারের পর পুনরুত্থানের মাধ্যমে দেবতাদের সাথে অমর হয়ে পরমানন্দে বাস করে। আমরা পরবর্তী সময়ের খ্রিস্টিয় শেষ বিচার ও পুনরুত্থান, স্বর্গের ধারণা এখানে পাই। যারা পাতালের রাজা দেবতা আসুর বা ওসিরিসের বিচারে উত্তরণে ব্যর্থ হয়, তাদের পুনরুত্থান নেই, তারা পুনঃ মৃত। অনেক পরের বাইবেলের নরকের ন্যায়।

ঐতিহাসিকদের মতে সমসাময়িক বা একটু পরে ভারতে আর্য জাতির আগমন পরবর্তী যে ধর্মবিশ্বাস ও দর্শনের আমরা সাক্ষাৎ পাই, সম্ভবত প্রাচীন বিশ্বে দেহ-আত্মা সম্পর্কিত পক্ষে-বিপক্ষে গুরুগম্ভীর ও সূক্ষ্ম দার্শনিক আলোচনা সেইই প্রথম। বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, গীতা সর্বত্র আত্মাকে অমর, জন্মরহিত, নিত্য বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে গীতার এ শ্লোকটি বহুল ব্যবহৃত :

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ

নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ

অজো নিত্য শ্বাশ্বতোহয়োং পুরাণো

ন হন্যতে হন্যমান শরীরে।

এ আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। আত্মা ছিল না, বর্তমানে নেই, ভবিষ্যতেও হবে না। এ জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত ও পুরাণো। শরীরকে হত্যা করা যায়, কিন্তু আত্মাকে নয়। দেহ ও আত্মার স্পষ্ট দ্বৈততা এখানে দৃশ্যমান। বেদ যুগের প্রথমদিকেও এ ধরণের দ্বৈততার কথা আছে। বিপরীতে বেদ, কোন কোন উপনিষদে ‘সোহহম’ আমিই সে, অর্থাৎ আমি সেই পরম সত্তা, জীবাত্মা ও পরমাত্মার অভিন্নতা এমন অদ্বৈত দর্শনের কথাও আছে।

এ ভিন্নতা শর্তেও পুনর্জন্মবাদ বৈদিক ও হিন্দু আস্তিক্য দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ। অমর এ আত্মা মোক্ষ, মুক্তি, নির্বাণ বা কৈবল্য লাভ না হওয়া পর্যন্ত পুনঃ পুনঃ অন্য দেহে জন্মগ্রহণ করতেই থাকে। এ শ্লোকটিও এ সম্পর্কে বহুল প্রচলিত :

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়

নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরাণি

তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি

সংযাতি নবানি দেহী।

মানুষ যেমন জীর্ণ শীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ আত্মা জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর গ্রহণ করে।

কর্মফল অনুযায়ী জীবাত্মা স্বর্গসুখ বা নরকযন্ত্রণা ভোগ করে। কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়। নির্দিষ্ট সময় পর সে আবার পুনরায় জন্মগ্রহণ করে এবং এ সংসার চক্র মোক্ষ বা নির্বাণ প্রাপ্তি অবধি চলতেই থাকে। সুতরাং মোক্ষলাভই তার মুক্তির উপায়। এই মোক্ষলাভের পথ নিয়ে প্রাচীন ভারতীয় ষড়দর্শনেও মতদ্বৈধতা আছে। সাংখ্য, যোগ ও অদ্বৈত দর্শন অনুযায়ী এই ইহজগতে মোক্ষলাভ সম্ভব। ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা, দ্বৈত দর্শনে একমাত্র মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে মোক্ষলাভ সম্ভব বলে মত প্রকাশিত হয়েছে।

হিন্দুধর্ম থেকে উদ্ভূত বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মেও জন্মান্তরবাদ উপস্থিত। বৌদ্ধধর্মেও কর্মের দ্বারা বারবার জন্ম ও মৃত্যুচক্র মধ্য দিয়ে নির্বাণ লাভ পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু কোন চিরস্থায়ী আত্মা নেই। বুদ্ধ অনাত্মার ধারণা দেন। পুনঃ পুনঃ জন্ম দুঃখ ডেকে আনে, কিন্তু পুনর্জন্মের দুঃখ নির্বাণলাভে নিবৃতি হয়।

আর্য সভ্যতায় ধর্ম ও দর্শনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে আত্মার অমরত্ব ও আস্তিক্যবাদী দর্শনের পাশাপাশি হয়ত প্রায় একই সময়কালে আত্মার অনস্তিত্ব ও নাস্তিক্যবাদী দর্শনও বিকশিত হয়। সম্ভবত তখন পর্যন্ত অন্য কোন সভ্যতায় নাস্তিক্যবাদ ধারণা বিকশিত হয় নি। রামায়ণ রচিত হবার অনেক আগে থেকেই তা মুখে মুখে ছিল। রামায়ণে দেখা যায় বিখ্যাত জাবালা-রাম কথোপকথন। রামকে পিতৃসত্য পালনে নিরুৎসাহিত করতে ঋষি জাবালা রামকে এভাবে বোঝাতে চাইছেন যে আত্মা, পরকাল ও ঈশ্বর বলে কিছু নেই। এ জীবনের বাইরে আর কিছু নেই সুতরাং রাম অযোধ্যায় গিয়ে রাজত্ব করুন ও জীবন উপভোগ করুন। যদিও রাম উল্টো জাবালাকে আস্তিক্যবাদের পাঠ দিলেন কিন্তু সেই প্রাচীনকালে যে ভারতে কিছু মুনি ঋষিরা প্রবল আস্তিক্যবাদ, অবিনশ্বর আত্মার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ মতবাদও চিন্তাজগতে এনেছিলেন তার প্রমাণ মেলে। রামের পিতা দশরথও জাবালীর নাস্তিক্যদর্শন জেনেও তার প্রাসাদে বিজ্ঞম-লীতে স্থান দিয়েছিলেন। ভারতীয় দর্শনে নাস্তিক্যবাদের সবচেয়ে সুস্পষ্ট ধারা চার্বাক মতবাদ। বৌদ্ধ ও জৈনধর্মও নাস্তিক্যবাদী, কিন্তু সেখানে পুনর্জন্ম আছে। চার্বাকদর্শনে কোন পুনর্জন্ম নেই, আত্মার অস্তিত্ব নেই, পরকাল-স্বর্গ-নরক-ঈশ্বর নেই। ইহজগতেই সব লীলাখেলার সমাপ্তি। কৌতূহলোদ্দীপক, শ্লেষপূর্ণ, ৬০ টি শ্লোকে ক্ষেত্রবিশেষে স্থূল ইন্দ্রিয়সুখবাদী উদাহরণ দিয়ে এ দর্শন এ সব আস্তিক্য ধারণার অসারতা দেখিয়েছে। ঋণ করে ঘি খাওয়া- প্রবাদবাক্যটি চার্বাক দর্শন থেকে আগত। পুরো শ্লোকটি নিম্নরূপ :

যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ

ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ।

যতদিন বাঁচবে সুখে বাঁচবে, প্রয়োজনে ঋণ করে ঘি খাও; মৃত্যুর পর ভস্মীভূত দেহের আর পুনরাগমন নেই।

গৌতম বুদ্ধ নিরীশ্বরবাদী হলেও তিনি চার্বাক দর্শনকে সমর্থন করেননি নৈতিকতার যুক্তিতে, কারণ চার্বাক দর্শন ঘোর ইন্দ্রিয় সুখপরায়ণ দর্শন। তা সত্ত্বেও পূর্ণ নিরীশ্বরবাদী দর্শন রূপে এর গুরুত্ব প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে সর্বাপেক্ষা বেশি।

আর্যদের অপর শাখা যেটি ইরানে অবস্থান করে তাদের প্রাচীন ধর্ম জরথুস্ত্রবাদেও আত্মার প্রবল উপস্থিতি। পৃথিবী অমঙ্গল, মৃত্যুর অধিপতি আহিরমানের এলাকা। কিন্তু ঈশ্বরের ধাতুতে গড়া আত্মাকে সে ছুঁতেও পারে না। মৃত্যুর পর যখন আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যায়, তখন সে দলবল সহ দেহ অপবিত্র করে। তারপর বিভিন্ন পর্যায়ের পর আত্মার চূড়ান্ত বিচার ঈশ্বর আহুর মাজদা করবেন। ভালোদের পুনর্জীবনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী স্বর্গের জীবন ও মন্দদের চিরস্থায়ী নরকের জীবন প্রদান করবেন।

চীনা সভ্যতায় আমরা প্রথম থেকেই বস্তুতপক্ষে প্রয়োগবাদ (চৎধমসধঃরংস)ধর্মী দর্শনের সাক্ষাৎ পাই। বহিরাগত বৌদ্ধধর্ম ব্যতিরেকে আজও চীনে যে দুটি দর্শন তথা ধর্মরূপে স্বীকৃত মতবাদ পাই তা কনফুসিয়াস ও তাও (ঞধড়) মতবাদ। কনফুসিয়াস যদিও অনেকবার প্রসঙ্গক্রমে স্বর্গের উল্লেখ করেছেন, তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে পরকাল, স্বর্গ বা নরক নেই। স্বর্গ এবং নরক মানুষের বুদ্ধিতে হৃদয়ঙ্গম করা অসম্ভব এবং প্রত্যেকের উচিৎ পৃথিবীতে সৎ ও সঠিক কাজ করা। বিপরীতে তাওবাদ যদিও পরকালে বিশ্বাস করে কিন্তু পরকালের ওপর জোর না দিয়ে বর্তমান জগতকে প্রাধান্য দেয়। তাওবাদে বলা হয় যে মানবদেহ ভূত, প্রেত, দানব কর্তৃক পূর্ণ। বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে এদের তাড়াতে হয়। মৃত্যুর পর আত্মার মৃত্যু নেই। সে পুনরায় জন্মগ্রহণ করে না, অন্য জীবনে অভিগমন করে। এই জন্মান্তর ‘তাও’ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। (তুলনীয় ভারতীয় দর্শনের মোক্ষ বা নির্বাণ)। কিন্তু জোরটি ইহজাগতিকতার পর তাওবাদেও।

রেনেসাঁ যে ইউরোপকে বদলে দিল তথা ফলশ্রুতিতে পৃথিবীকে বদলে দিল, বলা হয় গ্রীক সাহিত্য ও সভ্যতা সবচেয়ে বড় প্রভাব সে রেনেসাঁয় রেখেছে। তার মধ্যে হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। যদিও হোমারের আবির্ভাব ও এ দুটি মহাকাব্যের সময় নিয়ে বিতর্ক আছে, মোটামুটিভাবে খ্রীস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীতে লিখিত বলে জানা যায়। ইলিয়াড ও ওডিসিতে হোমার যে পরকালের ধারণা দিয়েছেন তা মেসোপটেমিয় অত্যন্ত নিরানন্দ পরিবেশের মতই। হোমারের কথিত জন্মস্থানও তুরস্কের আনাতোলিয়ার সন্নিকট আইয়োনিয়ায়। চংুপযব-আত্মার গ্রীক প্রতিশব্দ মৃত্যুর পর হেডিসে চলে গিয়ে ছায়া হিসেবে অবস্থান করে, তাদের কোন ব্যক্তিত্বও নেই, কথা বলতে পারে না। জীবিতরা তাদের ভুলে গেলে ছায়ারাও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। প্রত্যেক মানুষেরই এটি সাধারণ ভাগ্য। এক শতক পর হেসিওডের ডড়ৎশং ধহফ ফধুং এ চিত্রটি একটু আশাবাদী। মুষ্টিমেয় ভাগ্যবান কিছু যেমন থিবী ও ট্রয়ের যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছে তারা মৃত্যুর পর স্বর্গীয় ভূমি ওংষব ড়ভ ইষবংঃ এ যাবে, যেখানে মৃত্যু নেই, যন্ত্রণা নেই দুঃখ নেই। ৬ষ্ঠ খ্রীস্টপূর্ব শতাব্দীতে পিথাগোরাস আত্মা ও ভৌত বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করেন। আত্মা নিজে চলাচল করতে পারে, দুটো স্থান একই সময় অবস্থান করতে পারে, ভৌত বস্তুপারে না। আত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহ বা প্রাণীতে অভিগমন করতে পারে। ভারতীয় ধারণা গ্রীসে এই প্রথম দেখা গেল।

প্লেটোর (খ্রীস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী) রচনায় সুস্পষ্ট ভাবে ভারতীয় দেহ-আত্মা ধারণার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। গ্রীসের অজ¯্র উপনিবেশ এশিয়া মাইনরের আধুনিক তুরস্কের আনাতোলিয়া উপকূল তথা তার সন্নিহিত অঞ্চলে ছিল। স্বাভাবিকভাবে ভাবের আদান প্রদান সহজে এ কারণে হয়েছে। প্লেটোর মতে আত্মা স্বর্গীয় সৃষ্টি। আত্মা অমর, চিরন্তন, সমস্ত আত্মা পূর্বে অন্যান্য দেহে ছিল। দেহের মৃত্যু আছে, সে আসে যায়। কিন্তু আত্মা অমর, মৃত্যুর পর সে অন্য দেহে প্রবেশ করে। দেহ-আত্মার দ্বৈততা প্লেটোর রচনায় গুরুত্বপূর্ণ। প্লেটো তাঁর চযধবফড় তে সক্রেটিসের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে শিষ্যদের কাছে সক্রেটিসের শেষ কথোপকথনের বরাত দিয়ে যুক্তির সাহায্যে আত্মার অমরত্বের কথা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে তাঁর জবঢ়ঁনষরপ-এ প্লেটো আত্মার ধারণা কিছুটা পরিবর্তন করেন। সেখানে তিনি আত্মাকে দুটি উপাদানে ভাগ করেন, যৌক্তিক উপাদান যা উচ্চতর বিচার (ঐরমযবৎ ৎবধংড়হ) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং অযৌক্তিক উপাদান যা জান্তব বাসনা (অহরসধষরংঃরপ ধঢ়ঢ়বঃরঃবং) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আত্মা বিশুদ্ধ বিচার (চঁৎব ৎবধংড়হ) স্তরে অবস্থান করে পুনর্জন্ম চক্র থেকে মুক্তি পেতে পারে। এ যেন ভারতীয় মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ।

প্লেটোর শিষ্য এরিস্টটল তাঁর অন্যতম প্রধান রচনা (‘চবৎর চংুপযবং’, ঙহ ঃযব ংড়ঁষ)য় আত্মা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে সব জীবন্ত সত্ত্বা, যেমন গাছপালা, প্রাণীকুল সবার আত্মা আছে। আত্মা সমস্ত জীবন্তসত্তার রূপ (ভড়ৎস) বা মূল (ঊংংবহপব)। আত্মা দেহ থেকে পৃথক কোন বস্তু নয়। জীবন্ত বস্তু জীবন্ত হয় আত্মা থাকার কারণে। আত্মা মরণশীল। দেহাতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে এপিকিউরীয় ও স্টয়েক দর্শনও আত্মার মরণশীলতার কথা বলেছে।

গ্রীক চিন্তাধারায় পরকালে পাতাল-হেডিসে যাত্রা বা হেসিওডের মতে নির্বাচিত ভাগ্যবানদের গন্তব্য স্বর্গরাজ্য ওংষব ড়ভ ইষবংঃ ধারণা মোটামুটি এপিকিউরাস (খ্রি.পূ. ৩৪১-২৭০) পর্যন্ত বহাল ছিল। যদিও তার পূর্বেই ডেমোক্রিটাস ও এটোমবাদীদের বস্তুবাদী ধারণা এসেছে। এপিকিউরীয় দর্শন যেন ভারতের চার্বাক দর্শনের প্রতিধ্বনি। মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সুখানুসন্ধান। পার্থক্য এই যে চার্বাক দর্শন যেখানে ইন্দ্রিয়সুখকে প্রাধান্য দেয়, এপিকিউরীয় দর্শন সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক সুখকে প্রাধান্য দেয়। এপিকিউরাস পরকালকে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে আত্মা ভৌত বস্তু দিয়ে তৈরী এবং দৈহিক মৃত্যুর সাথে আত্মারও মৃত্যু ঘটে। পরকাল নেই, যদিও দেবতাদের অস্তিত্ব তিনি স্বীকার করেন, তিনি বলেন যে দেবতারা পার্থিব জীবনে হস্তক্ষেপ করে না। এপিকিউরীয় দর্শন উজ্জ্বলভাবে খ্রী. পূ. ১ম শতাব্দীতে লুক্রেসিয়াস খঁপৎবঃরঁং এর ঙহ ঃযব হধঃঁৎব ড়ভ ঃযরহমং এ প্রতিফলিত। লুক্রেসিয়াসের মতে পৃথিবী এটম দিয়ে তৈরী। আত্মাও এটম ও পার্থিব বস্তু দিয়ে তৈরী। তিনি তার বইয়ের একটি অধ্যায় মৃত্যুভয় ও পরকালের অসারতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। মানবাত্মা মানুষের ন্যায় মরণশীল। মৃত্যুর পর পাতালে টহফবৎড়িৎষফ-ঐধফবং, দেবরাজ জিয়াসের ভ্রাতা হেডিসের রাজ্য যাওয়ার বিশ্বাস মানুষের দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতার মধ্যে প্রোথিত।

দুটি আব্রাহামীয় একেশ্বরবাদী ধর্ম-ইহুদিধর্ম ও খ্রীস্টধর্মে পরকাল সম্পর্কে ধারণায় মেসোপটেমিয় প্রভাব সুস্পষ্ট। প্রথম দিকে হিব্রুধর্মে বলা আছে যে আত্মা  ঘবঢ়যবঃয হচ্ছে নিঃশ্বাস। এ জীবন নিঃশ্বাস মানব ও প্রাণীদেহে ঈশ্বরের দান। দৈহিক মৃত্যুর পর আত্মাও মৃত্যুবরণ করে। ‘মৃতরা ধূলির ন্যায় এবং ধূলিতে প্রত্যাবর্তন করে। আত্মা জবঢ়যধরস ছায়া আকারে চিরঅন্ধকার ভূমি ‘শিওল’ এ ঈশ্বর থেকে পৃথক হয়ে অবস্থান করে। জীবিতরা প্রয়োজনে এ সব ছায়াকে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য আহ্বান করতে পারে। পরবর্তীতে বিশেষত ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের পর নতুন করে তারা ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করে অনন্ত জীবন, পরকালের স্বীকৃতি, পুনরুত্থান, স্বর্গ-নরক ধারণা সংযোজন করে। যদিও স্যাডুসি সম্প্রদায় পরকাল, পুনরুত্থান অস্বীকার করে, তাদের প্রভাব হ্রাস পেলে প্রতিদ্বন্দ্বী ফারিজীদের পরকাল, পুনরুত্থান, শেষ বিচার, স্বর্গ-নরক ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। পুণ্যবানেরা পুনরুত্থান ও শেষ বিচারের পর স্বর্গ এধহ ঊফবহ-ইডেন গার্ডেনে যায় এবং অভিশপ্তরা এবযবহহধ নরকে যায়। সেখানে যাদের পাপ ও পুণ্য মাত্রা সমান সমান তারা বিশুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ওপর নিচে ভাসতে থাকে। যাদের পাপের মাত্রা অপরিমার্জনীয় তারা চিরকাল গেহেনায় নরকযন্ত্রণা ভোগ করে। গেহেনাকে বলা যায় চঁৎমধঃড়ৎু সংশোধনাগার।

প্রত্যক্ষভাবে ইহুদীধর্ম থেকে উদ্ভূত খ্রীস্টধর্ম আত্মা, পুনরুত্থান, পরকাল বিষয়ে সঙ্গতভাবে ইহুদীধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। খ্রীস্টধর্মে পরকাল স্বীকৃত। মৃত্যুর পর দেহ সমাহিত বা দাহ যা করা হোক না কেন আত্মা বেঁচে থাকে। পরবর্তীতে ঈশ্বর আত্মাকে পুনর্জীবিত করেন। যীশু বলেন, আমিই পুনরুত্থান ও জীবন। যে আমাকে বিশ্বাস করবে সে বেঁচে থাকবে যদিও সে মৃত্যুবরণ করে। ‘মৃত্যুর পর ইৎবধঃয ড়ভ ষরভব জীবন নিঃশ্বাস যা ঈশ্বর জীবের নাসিকায় প্রদান করেছিলেন, তা দেহত্যাগ করে এবং আত্মা ঈশ্বরের নিকট প্রত্যাবর্তন করে। পুনরুত্থানে ঈশ্বর দেহ ও আত্মাকে আবার একত্র করেন। মানুষ আবার জীবন্ত হয়। বাইবেলে স্বর্গ ও নরকের উল্লেখ থাকলেও বর্ণনা নেই। তবে চতুর্দশ শতাব্দীতে দান্তে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি তাঁর উরারহব পড়সবফু তে মনে হয় সব পুষিয়ে দিয়েছেন। অনেকের মতে স্বর্গ ও নরক নির্দিষ্ট স্থান নয়, প্রথমটি ঈশ্বরের সাথে যুক্ত থাকা অবস্থা, দ্বিতীয়টি ঈশ্বর থেকে নির্বাসিত হওয়া। মাত্র কিছুদিন আগে ক্যাথলিকধর্মের প্রধান পোপ ফ্রান্সিস নরকের অনস্তিত্বসূচক বক্তব্য দিয়ে বিশ্বাসীদের মধ্যে নিদারুণ সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন। রোমান ক্যাথলিকরা সংশোধনাগার চঁৎমধঃড়ৎুতে বিশ্বাস করে। এখানেই মৃত্যুর পর অধিকাংশ মানুষের অবস্থান, যা পাপ স্খালন ও স্বর্গে যাবার প্রস্তুতিকালের স্থান রূপে কাজ করে।

অবশ্য আব্রাহামীয় এ ধর্ম দুটিতে পুনরুত্থান থাকলেও আত্মার পুনর্জন্ম ও জন্মান্তর নেই। যদিও এদের কোন কোন গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মান্তর স্বীকৃত। যেমন ইহুদিদের কাবালা সম্প্রদায়, খ্রিস্টানদের টহরঃু ঈযঁৎপয জন্মান্তর স্বীকার করে।

খ্রীস্টান ধর্ম প্রসারের পর থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত দুজন খুব উল্লেখযোগ্য খ্রীস্টান ধর্মযাজক তথা ধর্মবেত্তা তথা দার্শনিক, যারা তাদের সময় থেকে পরবর্তী পশ্চিমা দর্শন তথা দার্শনিকদের গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করেছেন, আধুনিক আলজেরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী সেন্ট অগাস্টিন (৩৫৪-৪৩০ খ্রিঃ) ও ইটালীয় সেন্ট এশুইনাস (১২২৫-১২৭৪ খ্রিঃ), তারাও আত্মার অমরত্ব ও দেহের সাথে তার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। সেন্ট অগাস্টিন প্লেটো ও নব্য প্লেটিয় দেহ আত্মা ধারণা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তবে প্লেটো যেখানে আত্মাকে অমর বলেছেন সেখানে অগাস্টিন তাঁর ঈরঃু ড়ভ এড়ফ এ আত্মাকে সৃষ্ট বলেছেন। তাঁর মতে দেহ ও আত্মা একটি ঐক্য (হরঃ)। আত্মা সৃষ্ট কিন্তু অপার্থিব এবং তা ঈশ্বরের প্রতিকৃতি (রসধমব) বহন করে। পা-িত্যবাদের প্রধান প্রবক্তা সেন্ট একুইনাসের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের একটি পদ্ধতি ছিল এরিস্টটলের বিভিন্ন মতবাদের সাথে খ্রিস্টিয় শিক্ষা ও চার্চের কানুনের সাযুজ্য প্রদর্শন। আত্মা বিষয়ে এরিস্টটলের ধারণার সাথে তিনি খ্রিস্টিয় ধারণা মেলাতে গিয়ে অসুবিধায় পড়েন, কারণ এরিস্টটলের মতে আত্মা মরণশীল, কিন্তু খ্রিস্টিয় শিক্ষায় আত্মা অমর। তিনি তাঁর ঝঁসসধ ঞযবড়ষড়মরপধয় দার্শনিকের (এরিস্টটলকে তিনি সর্বত্র দার্শনিক বলে উল্লেখ করেছেন) যুক্তি আংশিক গ্রহণ করেন এটি স্বীকার করে যে আত্মা দেহের রূপ (ঋড়ৎস)। তিনি চারটি যুক্তি দিয়ে পুনরুত্থানের মাধ্যমে দেহ আত্মার পুনর্মিলনের সাহায্যে আত্মার অবিনশ্বরতার খ্রিস্টিয় মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেন।

ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও তৎপরবর্তী প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় সংস্কারের ফলশ্রুতিতে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে আলোকায়ন বা যুক্তির যুগ (ঊহষরমযঃবহসবহঃ ড়ৎ অমব ড়ভ ৎবধংড়হ) এল, সেখানে দেহ-আত্মা সম্পর্ক দেহ-মন নামে শুরু হয়। দেহ মন দ্বৈততা নিয়ে গুরুগম্ভীর ও বিশদ দার্শনিক আলোচনা সূত্রপাত করেন আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের জনক বলে স্বীকৃত ফরাসী দার্শনিক— গণিতবিদ রেনে দেকার্ত (১৫৫৬-১৬৫০)। কেন তিনি দেহ মন সম্পর্ক নিয়ে লিখতে বসলেন তা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। তাঁর গবফরঃধঃরড়হং ড়হ ঋরৎংঃ চযরষড়ংড়ঢ়যু তে বলেন যে দেহ থেকে যে মন স্বতন্ত্র সত্তা তা দেখানোর কারণ ধর্মহীন লোকদের বোঝানো। এরা গাণিতিক প্রদর্শন ব্যতীত আত্মার অবিনশ্বরতা বিশ্বাস করতে চায় না। পরকালে ঈশ্বর কর্তৃক ভাল কাজের পুরস্কারের ব্যবস্থা ও মন্দ কাজের শাস্তির ভয় ব্যতিরেকে এ সব লোক  নৈতিক গুণের পথ অনুসরণ করবে না। দেকার্তের বিশ্বাস দেহ ও মন (আত্মা) সম্পর্কিত তাঁর যুক্তিগুলি এরা গ্রহণ করবে। তখন ধর্মহীন লোকেরা পরকালে আস্থা স্থাপন করবে। তাঁর বিখ্যাত তথা প্রচ- সমালোচিত উক্তি ঈড়মরঃড় বৎমড় ংঁস আমি চিন্তা করি, এজন্যই আমার অস্তিত্ব। দেহ  মনের এই দ্বৈততায় দেহ ব্যতিরেকে মনের/আত্মার অস্তিত্ব আছে। প্রায় তাঁর সমসাময়িক হল্যান্ডের স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭) হাজির করেন তাঁর অদ্বৈতবাদ (গড়হরংস)। একটু পর দার্শনিক তথা পৃথকভাবে কিন্তু একই সময়ে নিউটনের সাথে ইন্টিগ্রাল ও ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসের জনক লিবনিজও (১৬৪৬-১৭১৬) অদ্বৈতবাদ দর্শন প্রচার করেন। অনেক আগে ভারতে বৈদিক যুগ থেকে উদ্ভূত হয়ে এ তত্ত্ব আদি শঙ্করের (৮ম-৯ম শতাব্দী) বেদান্ত অদ্বৈতবাদে পূর্ণতা পায়। ব্রহ্মা-ের সমস্ত সত্তা এক মূলসত্তার (ঈশ্বর) প্রকাশ মাত্র। অন্যদিকে একই আলোকায়ন ও ভৌত বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে ইউরোপে ষোড়শ শতাব্দী থেকে জড়বাদের ধারণাও বিকশিত হতে থাকে। জড়বাদ বস্তু অতিরিক্ত কোন চেতনা, মন বা আত্মাকে স্বীকার করে না। মানুষের চেতনা বা মানসিক কার্যাবলী দৈহিক ভৌত প্রক্রিয়ার উপজাত। দেহাতিরিক্ত কোন চেতনা বা মনের অস্তিত্ব নেই। বহু পুরাতন ভারতীয় চার্বাক দর্শনও এ বক্তব্য দিয়েছিল।

দেহ-মনের দ্বৈততা বা অদ্বৈত তত্ত্বের আধুনিক ইউরোপীয় প্রবক্তারা আত্মার অবিনশ্বরতা, পরকাল সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা পোষণ করলেও মোটামুটি সবাই মনের (আত্মার) একধরণের অতীন্দ্রিয় ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু ভৌত বিজ্ঞানের ক্রমাগত উন্নতি, ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব, ¯œায়ুবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি ও সর্বশেষ পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবিষ্কার সিঙ্গুলারিটি ও বিগ ব্যাঙ তত্ত্ব অতীন্দ্রিয় মনের ধারণাকে ধূসর ও বিবর্ণ করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও পৃথিবীতে পরকাল ও আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসী মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। যদিও যে কোন পূর্ববর্তী সময়ের চাইতে পৃথিবীতে এখন পরকাল ও আত্মার/মনের স্বাধীন অস্তিত্বে আস্থাহীন ও সন্দেহবাদী মানুষের অনুপাত বেশি। যত মানুষ সত্যিকার বিজ্ঞানমনস্ক হবে ততই এ অনুপাত বাড়তে থাকবে।

কিন্তু বিশাল এ বিশ্বে অকিঞ্চিৎকর, ক্ষণস্থায়ী, অনিশ্চিত, সঙ্কটসঙ্কুল পার্থিব জীবন একধরণের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে তাকে ব্যাপৃত রাখে। একজন ¯œায়ুবিজ্ঞানী বা একজন ¯œায়ুশল্যচিকিৎসক যিনি এইমাত্র চেতনানাশক দিয়ে মস্তিষ্কের কার্যাবলী পরিবর্তন করে রোগীর মানসিক ক্ষমতাকে সাময়িক স্তব্ধ করে দিয়ে অস্ত্রোপচার করলেন, অথবা তিনি নিশ্চিত জানেন যে মস্তিস্কের বিভিন্ন অংশ মানুষের চেতনার বিশেষ বিশেষ অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ মানুষের মনন বা চিন্তাশক্তি মস্তিষ্ক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, যা মনের/আত্মার স্বাধীন সত্তাকে ভুল প্রমাণিত করে তিনিও হয়ত সন্ধ্যায় বা সকালে পিতৃপুরুষের আত্মার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করছেন। ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে/আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে’।

তবে এ প্রশ্নে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে সেইসব বিজ্ঞানী ও নিরীশ্বরবাদীরা যারা মনে করেন দেহাতিরিক্ত কোন আত্মা/মন নেই, পরকাল নেই এবং কোন অতীন্দ্রিয় সত্তাও নেই। তারা নির্ভার। কিন্তু জাগতিক সঙ্কটে তাদের নিজেদের বস্তুগত ও মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন তারা যাদের নির্দিষ্ট সৃষ্টিকর্তা বা দেবতা আছেন। পরকালে তারা কর্মফল অনুযায়ী কোথায় থাকবেন, এ অনিশ্চয়তায় ভোগেন। তবে জাগতিক সঙ্কটে বহুক্ষেত্রে তারা তাদের আরাধ্য সৃষ্টিকর্তা বা দেবতাদের ওপর অন্তত মানসিক ভারার্পণ করতে পারেন। সর্বাপেক্ষা মানসিক চাপে থাকেন যারা সন্দেহবাদী ও অজ্ঞেয়বাদী। তাদের কোথাও ভারার্পণের স্থান নেই, সব দায় দায়িত্ব নিজকে বহন করতে হয়।

আধ্যাত্মিকতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে গড়েছেন, ভেঙ্গেছেন, গড়েছেন। শুধু একটি কথা বলে শেষ করি। মৃত্যুর আড়াই মাস আগে ‘শেষ লেখা’র একটি কবিতায় বলেন ‘রূপনারাণের কূলে জেগে উঠিলাম, জানিলাম এ জগৎ স্বপ্ন নয়’। অদ্বৈতবাদের মায়াবাদকে প্রত্যাখ্যান করছেন স্পষ্টভাবে। বাস্তব এ জগত, মায়া নয়, স্বপ্ন নয়।

একই কবিতার শেষে বলেন ‘আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন, সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে, মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে। স্পষ্ট করে বলছেন সমস্ত দেনাই মৃত্যুতে সমাপ্ত। আর কারও কাছে কোন দায় থাকে না। পরকালের গুরুত্ব আর থাকে না। কিন্তু মৃত্যুর দশ দিন আগে বস্তুতঃ যখন তিনি দিন গুনছেন- ‘এখন জীবন মরণ দুদিক থেকে নেবে আমায় টানি’ সে সন্ধিক্ষণে বাস্তব এ জগতে সত্তার স্বরূপ সম্পর্কে তাঁর অনন্ত জিজ্ঞাসা রেখে গেলেন নীচে উদ্ধৃত কবিতায়। মুখচ্ছবির তরুণ বন্ধুদের জন্য পুরো কবিতাটি তুলে দিলুম :

প্রথম দিনের সূর্য

প্রশ্ন করেছিল

সত্তার নূতন আবির্ভাবে—

কে তুমি,

মেলে নি উত্তর।

বৎসর বৎসর চলে গেল,

দিবসের শেষ সূর্য

শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিমসাগরতীরে,

নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়—

কে তুমি,

পেল না উত্তর।

সুতরাং, অজ্ঞেয়বাদী ‘পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে’ এ জিজ্ঞাসা মানুষকে তাড়িত করতেই থাকবে।

*************************************************

বিশেষ রচনা

লালন ফকিরের জীবন-ভিত্তিক চিত্রনাট্য
জলের উপর পানি
না পানির উপর জল?
শাহ্যাদ ফিরদাউস

 

ভূমিকা
লালন ফকিরের জীবন নিয়ে বহু গুণীজন গবেষণা করেছেন, অনেক বই-পুস্তক লেখা হয়েছে, নাটক হয়েছে, ‘মনের মানুষ’-এর বহুকাল আগে অন্তত একটি সিনেমা হয়েছে তৎসত্ত্বেও লালনচর্চা থেমে নেই। এই মানুষটির বিচিত্র জীবন ও বিস্ময়কর অবদান নিয়ে নানাধরনের কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। স্বভাবতই এমন স্রষ্টা সম্পর্কে যে কোনও সাধারণ মানুষের মতো আমার কৌতূহল ছিল। কিন্তু কৌতূহল থাকলেও সবসময়ে সববিষয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার যাঁরা শিল্প-সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা করেন তাঁদের নানা রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তা সম্পন্ন করতে হয়। ফলে যে কাজ করার জন্য এক বছর লাগা উচিৎ সঠিক পরিকাঠামো বা আর্থিক সহযোগিতার অভাবে সে কাজ শেষ করতে আমাদের দশ বছর লাগতে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই। ঘটনাচক্রে আমি কয়েকজন বড় মাপের মানুষের জীবন নিয়ে কিছু কাজ করতে গিয়ে এ সত্য হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। যেমন, মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেব, বৌদ্ধ ধর্মদর্শন ও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অঙ্গুলিমাল, স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ বসন্ত কুমার বিশ্বাস এবং স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ। এই কজন মানুষের জীবন ও কর্মকা- নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আমার সবচুল সাদা হয়ে গেলো। তাই নতুন কোনো প্রস্তাব এলে ভয় লাগে। না, সাদা-চুল আর সাদা হবার ভয় নয়, ভয় অন্যত্র, আমি জানি, দীর্ঘ সময় ধরে পাগলের মত খাটা-খাটুনি করে প্রস্তাবিত কাজটা শেষ করার পর আমার হাতে থাকবে পেনসিল, আর কিছু নয়! তাছাড়া আর একটা বিপদ হলো, আজকাল আমাদের দেশের সবাই লেখক, সবাই পরিচালক, সবাই প্রাজ্ঞ। যে লিখতে জানে না, সে লেখক, যে গাইতে জানে না সে গায়ক, যে নাটক-সিনেমার ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে না সে বড় পরিচালক। আজকাল বিখ্যাত হওয়ার জন্য চর্চা করার দরকার পড়ে না, এখন জন্ম-প্রতিভাধর মহামানবের যুগ। সবচেয়ে ভয়ের কথা, কিছু আলগা পড়াশোনা বা চর্চার চেষ্টা করলেও যার উপলব্ধির জগৎ বলে কিছু তৈরি হয়নি, জীবন-জগৎ, সমাজ- সংসার সম্পর্কে যার স্পষ্ট ধরণা করার যোগ্যতা নেই সে যদি শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে ছড়ি ঘোরাবার সুযোগ পায় তাহলে যে কেবল অন্ধকারের জন্ম দিতে পারে, আশেপাশের মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। তাই এসব অন্ধকারের মসিহা-মহাপুরুষদের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে ইচ্ছে করে না। সত্যি কথা হলো, আমি এদের সাথে তাল মেলাবার মতো মানুষ নই।

তথাপি আগের কাজের সূত্রে আমার বিজ্ঞ বন্ধুরা কখনও কখনও অন্যান্য মহাপুরুষ বা মহীয়সী নারীদের জীবন নিয়ে লিখতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আমি তাঁদের সবিনয়ে বোঝাবার চেষ্টা করি— একজন মানুষের পক্ষে দুনিয়ার সমস্ত মহান ব্যক্তিকে ধরা সম্ভব নয়; দ্বিতীয়ত, আমি জীবনীকার নই, একজন সামান্য ঔপন্যাসিক মাত্র। অন্তরের তাগিদ ছাড়া লিখতে পারি না। তবু উপদেশ-পরামর্শ-প্রস্তাব মাঝে মাঝে আসে। এভাবেই চিত্র-পরিচালক গৌতম ঘোষ একদিন ফোন করে জানাল, আমাকে তার বিশেষ দরকার। নির্দিষ্ট দিনে দেখা হওয়ার পর সে লালন ফকিরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’-এর চিত্রনাট্য লেখার প্রস্তাব দেয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে সবিনয়ে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। সে তখন বন্ধুত্বের দাবীতে জানায় — ‘একাজ যাকে-তাকে দিয়ে হবে না, তুমি দায়িত্ব নিলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।’ সম্ভবত তার কথায় অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল; যে লেখক হিন্দু-মুসলমান এ দুটি স¯প্রদায়ের জীবনাচার ও ধর্মীয় দর্শন সম্পর্কে যথাযথ ওয়াকিবহাল নয় তার পক্ষে ‘মনের মানুষ’-এর চিত্রনাট্য লেখা অসম্ভব। তখন বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করে আমি তার অনুরোধে চিত্রনাট্য করতে রাজি হই। তারপর প্রায় তিন মাস ধরে দিনরাত একক পরিশ্রমে চিত্রনাট্য শেষ করি।

এখানে কিছু কথা সংযোজন করা দরকার। লালনের চরিত্রের প্রথম পর্বের ঘটনাগুলো প্রায় সব অতীতের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। এমনকি তাঁর সারাজীবনের ঘটনাবলীর যেটুকু আমরা জানতে পেরেছি, সেসবও পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর নয়। অনেকটাই লোকমুখে ছড়ানো কল্পকথায় অতিরঞ্জিত হয়ে নিতান্ত গল্প-কথার আকারে আমাদের কাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। তার ভেতর কতটা ইতিহাস আর কতটা গল্প সে তথ্য খুঁজে বের করা গবেষকের সাধ্যাতীত। তাছাড়া লালনের জীবনের সৃষ্টিশীল পর্ব কেটেছে প্রত্যন্ত গ্রামে। তখনকার দিনের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে বলা যায়, তিনি ও তাঁর অনুসারীদল প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে জীবন কাটিয়েছেন। তার কারণ, ধর্মীয় ভেদাভেদ তথা, জাত-পাত না  মানা, বিশেষ কোনো ধর্ম পালন না করা, প্রচলিত যৌনজীবন অস্বীকার করা, প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোকে অবজ্ঞা করে আদিম সাম্যবাদী পদ্ধতিতে যৌথজীবন চালু করা, অতিরিক্ত সঙ্গীতপ্রীতি ইত্যাদি। ফলে তিনি ও তাঁর সকল অনুগামী সমাজের মূল¯্রােতের দৃষ্টিতে ব্রাত্য বা পতিতদের দল হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। সাধারণ গৃহী-মানুষের সাথে তাঁদের সম্পর্ক ছিল ক্ষীণ।

লালনকে কেন্দ্র করে সমাজতাড়িত নিঃস্ব-নির্যাতিত-সর্বহারা কিছু মানুষ একত্র হয়ে প্রায় আদিম জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। তাদের অর্থ রোজগারের সুযোগ ছিল না, লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। এমন অনেক ‘না’-এর চাপে নারী-পুরুষ একত্রে মিলিত হলেও তারা সন্তানের জন্ম দিতে চায়নি। তাই বাউল সম্প্রদায় সন্তানহীন এমন জীবনে ইতিহাস রচনার সুযোগ নেই, নিজেদের সৃষ্টিকে ভাবীকালের জন্য সংরক্ষণ করার তাগিদ থাকার কথাও নয়। ফলে লালন ও তার সঙ্গী-সাথীদের সৃষ্টি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট তথ্য পাওয়া দুষ্কর। তাঁদের সৃষ্টিকর্মের যেটুকু মানুষের মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে গিয়ে সমকাল অতিক্রম করতে পেরেছে সেটুকুই পরবর্তীকালের গবেষকদের চেষ্টায় সংরক্ষিত হয়েছে, বাকি সব হারিয়ে গেছে। এসব কারণে লালনের গানের একাধিক পাঠ, একাধিক ভাষ্য। এমনকি তাঁর নামে চালু অথচ বক্তব্য, ভাষাভঙ্গি বা শব্দচয়ন আলাদা বলে অনেক গবেষক সেগুলি লালনের লেখা গান নয় বলে নির্দেশ করেছেন। আরও একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলা উচিৎ, লালনের গুরু সিরাজ সাঁইয়ের লেখা কোনো গান পাওয়া যায় না। তার চেয়েও একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, লালনের প্রথম জীবনের লেখা কোনো গানের অস্তিত্ব আছে বলে কারও জানা নেই। অথচ এমন একজন কালজয়ী গীতিকার-গায়ক হঠাৎ করে একদিন গায়ক-লেখক হয়ে গেলেন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। চিত্রনাট্য রচনার সময়ে এসব প্রশ্ন নিয়ে আমাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছিল। সেহেতু লালনের গুরু সিরাজ সাঁইকে যথার্থ বাউল শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তার মুখে একাধিক গান বসাতে হয়েছে। একইভাবে, লালনের প্রথম জীবনে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ বোঝাতে, আরও সহজ কথায়, লালনের চরিত্রকে যথার্থরূপে দাঁড় করাতে আমাকে গান লিখতে হয়েছে। বাউল শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তার মুখে একাধিক গান বসাতে হয়েছে। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে আমি সাতটা-আটটা গান লিখেছিলাম। গৌতম ঘোষ তার ‘মনের মানুষ’ সিনেমায় চারপাঁচটা ব্যবহার করেছে। পরবর্তীকালে আমার একটা উপন্যাসে অব্যবহৃত গানগুলি কাজে লাগিয়েছি। এখানে সবগুলি গান চিত্রনাট্য যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল সেভাবেই রাখা হয়েছে।

চিত্রনাট্য রচনার সময় আমি শুধু নাটক বা নাটকীয় ঘটনাকে প্রাধান্য দিইনি, লালনের জীবন ও তাঁর দর্শন যথাসম্ভব স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। শুধু ব্যক্তি লালন নয়, সমগ্রিকভাবে বাউল-ফকিরদের সংকট-সমস্য, তাদের বেঁচে থাকার লড়াই, সমাজের মূল¯্রােতের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠিভুক্ত নারী-পুরুষদের ভেতরকার সম্পর্ক ও সংঘাত, তাদের মনোজগতের টানা-পোড়ন থেকে শুরু করে বহির্জগতের প্রবল চাপ, সবই প্রয়োজন মতো তুলে ধরতে চেয়েছি। কিছু উদ্দেশ্যহীন বিচ্ছিন্ন মানুষ দলবদ্ধ হলেই বাউল হতে পারে না, অলিখিত বা অস্পষ্ট কিছু নীতি-নিয়মের ওপর বাউল সম্প্রদায়ের জীবন চালিত হয়। তার অর্থ, বাউল একটি সম্প্রদায়, পূর্ণ-পরিণত না হলেও একটি ধর্ম। বাউল এমন এক ধর্ম যা কোনো ধর্মকে গুরুত্ব দেয় না, জীবনের স্বাভাববিক সহজ ধর্মকে আশ্রয় করে জীবন-যাপন করার পদ্ধতির নির্দেশ দেয়। আমাদের ভালো লাগুক আর না লাগুক একথা মানতেই হবে, বাউল সম্প্রদায় প্রচলিত ধর্ম ও সামাজের বিরুদ্ধে এক প্রবল-প্রতিবাদ। লালনকে জানতে হলে বাউলদের এই প্রতিবাদের দর্শন অনুভব করতে হবে, লালনের নিজের জীবনচর্চার বৈশিষ্ট্য ও তাঁর জীবনদর্শনকে জানতে হবে। এই জানার আগ্রহ নিয়েই আমি চিত্রনাট্য রচনায় আগ্রহ দেখিয়েছিলাম। বাকি সব বাহ্য।

বাকি সব সত্যিই বাহ্য তা পরে জানা গেল। সিনেমা করার সময় নিজের লেখা হোক কি অন্যের লেখা চিত্রনাট্য হোক পরিচালককে শ্যুটিং-এর আগে অর্থাৎ ‘শ্যুটিং স্ত্রিপ্ট’ করার সময় বা শ্যুটিং করার সময় নানান বাস্তব কারণে কিছু কিছু পরিবর্তন করতে হয়। বিশেষত দৈর্ঘ্য; চিত্রনাট্য লেখার সময়ে একটু বড় করে লিখতে হয়, তার অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য হলো শ্যুটিং-এর সময় চিত্রনাট্য ছোট মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে লেখা অসম্ভব। এসব বস্তগত সমস্যার জন্য সিনেমা তৈরির সময় মূল চিত্রনাট্যের কিছুটা ওলট-পালট করা লাগে তাই মূল চিত্রনাট্য আর সেই চিত্রনাট্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমা এক নয়। অর্থাৎ কিছু পরিবর্তন অনিবার্য। তাই গৌতম ঘোষ তার সিনেমায় আমার চিত্রনাট্যের কিছু পরিবর্তন করেছে এবং পরবর্তীকালে নিজের নামে বই আকারে প্রকাশ করেছে বলে শুনেছি। তার আগে অবশ্যই মূল সিনেমার চিত্রনাট্যকার হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করেছে।

সেই যাই হোক, আমার হাতে আছে পেন্সিল, মানে এখনও আছে! মন্দ কি, লালন নিয়ে কাজ করতে করতে লালনকে তো কাছে পেলাম। আমাদের ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতা অতিক্রম করে যদি আমরা লালনের মতন মহান মানুষকে কাছে পাই সেটাই তো জীবনের এক পরম-প্রাপ্তি, বাকি সব বাহ্য।

 

চিত্রনাট্য
টাইটেল দৃশ্য
নদীর ওপারে দিগন্তরেখায় সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়। ক্যামেরা ধীরে ধীরে টিল্টডাউন করে। ঠিক যেন সূর্যের নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে একটা কালাগাছের ভেলা। ভেলার ওপরে চারিদিকে চারখানা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে, সুতির মশারি খাটিয়ে তার ভেতর একটা মৃতদেহ রেখে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রদোষকালের অস্পষ্ট আলোয় মৃতদেহ চেনা যায় না। ভেলা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে  সূর্য ক্রমশ পশ্চিম দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
টাইটেল সুপার ইম্পোজড হয়।
টাইটেল শুরু হতেই দূর থেকে শোনা যায় মাগরিবের আজানের ধ্বনি। আজান এবং টাইটেল একই সঙ্গে শেষ হয়।
টাইটেল শেষ।

দৃশ্য : এক

লোকেশান : হাউসবোট

সময় : বিকেল

নদীর জলে হাউসবোট এগিয়ে চলেছে। বোটের উপর খোলা জায়গায় দুটি চেয়ারে দুজন বসে আছেন। একজন সুদর্শন যুবক ছোট ইজিচেয়ারে বসে কিছু আঁকছেন। অপরজন বৃদ্ধ। তিনি দূরে তাকিয়ে আপনমনে কিছু ভাবছেন। তার খোলা বাবরি চুল, লম্বা কাঁচা-পাকা দাড়ি। ডানহাতে আলগোছে ধরা একটা বাঁকানো লাঠি। যুবক ছবি আঁকতে আঁকতে বৃদ্ধের মুখের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখছেন। বৃদ্ধ নির্বিকারভাবে একইরকম শূন্য দৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে রয়েছেন।

নিজের আঁকা ছবিটা কেমন হচ্ছে তা বুঝতে যুবক তার মাথাটা পিছিয়ে নিলেন। সাদা আর্ট পেপারের ওপর কলো রেখার কয়েকটা আঁচড়। তবু তার ভেতর অস্পষ্টভাবে এক বৃদ্ধ বাউলের মুখ ফুটে ওঠে। বৃদ্ধ যেন দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকালেন।

যুবক (জ্যোতি ঠাকুর)— বুঝতে পারছি, আপনার অস্বস্তি লাগছে। এই স্কেচ করার কাজটা খুব একঘেঁয়ে। অনেক সময় লাগে। ঠিক আছে, একটু বিশ্রাম নিন, পরে আবার করা যাবে।

(পজ) আচ্ছা আপনার সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানিনা। লোকে নানা কথা বলে, তার ভেতর কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে যাচাই করা কঠিন।

আপনিই বরং আপনার জীবনের কথা বলুন না, অনেক সময় তো নিজের কথা শোনাবার ইচ্ছে হয়, তাই না?

বৃদ্ধ (লালন)— আমার জীবন আর তেমন কি জীবন, এই জীবনের কথা শুনে কার কি লাভ…

জ্যোতি ঠাকুর ছবিটা এবার ডান হাতে নিয়ে বেশ একটু সরিয়ে দেখতে লাগলেন। ছবির স্কেচ থেকে মিক্স হয় নতুন দৃশ্য।

দৃশ্য : দুই (ফ্লাশব্যাক শুরু)

লোকেশান : প্রান্তর/প্রান্তরের পাশে জঙ্গল

সময় : চন্দ্রালোকিত রাত

চন্দ্রালোকিত প্রান্তর। প্রান্তরের শেষে নদী। নদীর বাঁধের উপর দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলেছে একটি সাদা ঘোড়া, ঘোড়ার সওয়ারি এক কিশোর আর একটি কিশোরী। কিশোরটিকে জড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে কিশোরী। ঘোড়াটি ছুটতে ছুটতে নদীর বাঁধ ছাড়িয়ে বিলে নামে। বিলে অল্প জল। জলের মধ্যে ছুটে চলা ঘোড়ার পায়ে বিচিত্র শব্দ নিস্তব্ধ প্রান্তরে বহুদূর থেকে শোনা যায়।

ঘোড়া ছুটতে ছুটতে জঙ্গলের কাছে এগিয়ে আসছে। জঙ্গলের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে জড় হয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসী-ফকির। তারা ঘোড়ার পায়ের শব্দে ভয় পেয়ে যে যার মতো ছিটকে আগুনের পাশ থেকে সরে যায়। তারপর সবিস্ময়ে ঘোড়ার ওপর ছুটন্ত নারী-পুরুষ দেখে জিন-ভূত ভেবে সমবেতভাবে দোয়া-মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে। সন্ন্যাসী-ফকিরের দল ভয় পেয়েছে বুঝতে পেরে কিশোরী আরো জোরে হাসতে থাকে। ততক্ষণে ঘোড়াটি জঙ্গল অতিক্রম করে ছুটতে ছুটতে দূরে চলে যায়।

দৃশ্য : তিন

লোকেশান : লালনদের পুকুরঘাট

সময় : দুপুর

পুকুরঘাটে গাঁয়ের মেয়েরা জড় হয়ে ¯œান করছে। কেউ কাপড় কাচছে, কেউ বা কোলের ছেলে বা মেয়েকে ¯œান করাচ্ছে। ওদের ভেতর লালনের স্ত্রী গোলাপিও রয়েছে। বয়স্ক মহিলাদের একজন ¯œান করতে করতে গতকাল রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে থাকে।

প্রথম মহিলা— ও কমলা, কাল রাতের বেলা নাকি কি সব কা- ঘটে গেছে!

কমলা— কি কা-? কি হলো গো?

প্রথম মহিলা— ঠাকুরদের জঙ্গলের ওদিক থেকে নাকি একটা জিন আর পরী সাদা ঘোড়ায় চেপে হাওয়ার বেগে ছুটে এয়েছে!

দ্বিতীয় মহিলা— কোথা এয়েছে?

প্রথম মহিলা— কোথায় আবার, এদিকে এই গাঁয়ে।

তৃতীয় মহিলা— কেন, এদিকে কেন জিন-পরীরা আসতে লেগেছে? খারাপ কিছু হবে না তো, রাঙাদি?

ওদের কথা শুনে গোলাপি নিজের মনে হাসতে থাকে।

কমলা— কিরে গোলাপি, তুই হাসিস কেন, আমরা তো শুনেই ভয় ভয় করছে।

চতুর্থ মহিলা— যা বলেছিস, রেতের বেলা গাঁয়ের ভেতর জিন-পরী ঘুরে বেড়ানো অমঙ্গলের কথা। কি থেকে কি হয় কেউ বলতে পারে!

গোলাপি— কি আর হবে গো কাকিমা, ওরা ওদের মতন আছে আমরা আমাদের মতোন আছি, কেউ কারো ক্ষতি না করলি হলো।

কমলা— তোর তো খুব সাহস দেখছি, রোজ রেতের বেলা ভাতার তোরে গঙ্গাজল খাওয়ায় নাকি রে?

কমলার কথা শুনে মহিলারা সবাই খিল খিল করে হেসে ওঠে।

দৃশ্য : চার

লোকেশান : গাঁয়ের পথ

সময় : বিকাল

বাড়ির উঠোন পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লালন পথে নামে। অন্যদিক থেকে তার স্ত্রী গোলাপি কলসি কাঁখে নিয়ে পুুকুর-ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লালনকে বাইরে যেতে দেখে সে চারপাশে সতর্ক নজর বুলিয়ে মৃদু হেসে কলসি বাজায়। লালন হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফেরে। দুজন চোখাচোখি হতেই গোলাপি মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে প্রশ্ন করে— কোথায় যাচ্ছো?

লালন ইঙ্গিতে জবাব দেয়, কাছেই।

লালন আপন মনে এগিয়ে যায়। দূর থেকে এক বাউল মৃদু কণ্ঠে গান করতে করতে এগিয়ে আসে।

গান—

       আমার মাত্তর দুইখান চাকার একখান গাড়ি

       তাহার উপরা বানাইছো সাঁই তিন মহলা বাড়ি

       সে গাড়ি খালে বিলে ডাঙ্গায় চলে

       দুপুর বেলা নাইবে জলে;

       ও সাঁই আমার পরম পুজ্যি গুরু গোঁসাই,

       বল, বাড়ির বোঝা গাড়ির থেকে কই নামাই?

       গাড়ি আমার বাড়ির ভারে টলমলায়

       আমি কারে ছাইড়া কারে রাখি, এখন কি উপায়!

লালন সম্মোহিতের মত গান শুনতে শুনতে বাউলের সামনে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে তাঁকে নত হয়ে প্রণাম করে বাউল হাসি মুখে লালনের মাথায় হাত রাখলেন।

দৃশ্য : পাঁচ

লোকেশান : গ্রামের পথ

সময় : একই (বিকাল)

বাউল কয়েক কদম এগিয়ে একটা আম গাছের তলায় দাঁড়ালেন, মনে মনে কিছু ভেবে কাঁধের পুটলিটা নামিয়ে বেশ আয়েশ করে পা ছাড়িয়ে বসলেন। লালন তার পেছনে আসছিল। বাউলকে বসতে দেখে সে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাউল লালনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন— কি নাম?

— লালন চন্দ্র কর।

— নামখানা তো খুব মিঠা, এমনতর নাম কখনো শুনিনি। তা বাপ, পড়ালিখা করো?

— আমরা… গরিব খুব।

— ধুর বোকা! গরিব গরিব কইতে নাই, এই দুনিয়ায় সবাই গরিব, সবাই ফকির, সবাই কাঙাল। কিন্তু তাই বুলে পড়ালিখা করবা না কেন?

— আমার বাবা নাই…

— আরে পাগল, এই দুনিয়ার সবাই এতিম, সবাই অনাথ, কারো বাপ নাই! তা বুলে তুই পড়ালিখা করবি না, একি কথা!

— সাঁই আপনার কথা বুঝতে পারিনি… এই দুনিয়ায় সবাই গরিব, সবাই কাঙাল, সবাই এতিম, সবাই অনাথ, কারো বাপ নাই!

— নারে বাপ, এই দুনিয়ায় কারো বাপ নাই! থাকলে নাই না থাকলেও নাই। যার জীবন তার। যার যার নিজের পড়া নিজেকে শিখতে হয়। নিজের জীবন নিজেকে গড়তে হয়।

— কিন্তুক সবাই কাঙাল…

— সবাই কাঙাল সবাই ফকির! দ্যাখ ব্যাটা এই দুনিয়ায় এমন কোনও রাজা-বাদশা নেই যে অন্য কারো কাছে হাত পাতে না। আর যে হাত পাতে সে তো গরিব-কাঙাল-ফকির। বুঝলি কিছু?

— কিছু কিছু… কিন্তু সাঁইজি ইশকুলে বই, শেলেট, পেনশিল খাতা এসব লাগে, মাইনে লাগে…

— তোর বাপের মাথা লাগে বদমাশ! ছোট ইশকুলে ওসব লাগতে পারে, বড় পাটশালায় ওসব ছাইপাঁশ লাগে না।

— বড় পাঠশালা কোথা, আমি তো এমন পাঠশালার নাম শুনিনি।

— এখন তো শুনলি, বড় পাঠশালা মানে সারাজগৎ, সমস্ত ব্রহ্মা-। এখন থেকে পড়া করো।

— কিন্তুক…

— কিন্তুক কিন্তুক বাদ দাও, আসল কাম করতে চাইলে দোনামনা চলবে না। বাপ আমার, ঝাঁপ দাও।

— সাঁইজি…

— কও বাপ, মনে যা আসে কয়ে ফেল।

— আপনি আমারে আর্শীব্বাদ করেন।

— না, কখনো না, তোর আর্শীব্বাদ করতে যাবো কোন দুঃখে! তবে আমি পরাণভরে শাপ দেব!

— সাপ! কি সাপ, সাপ নিয়ে কি হবে?

— মাথায় কিচ্ছু নাই, এক্কেবারে ফাঁপা, তোর মাথায় একটুক হালচাষ করা লাগবে। আরে বলদ, সাপ নয়রে সাপ নয়, তোরে আমি অভিশাপ দেব!

— কেন সাঁইজি, আমি কি আপরাধ করলাম?

— তোর অপরাধের সীমা নাই।

— আমারে ক্ষমা করেন…

— না তোর পাপের ক্ষমা নাই, তোরে আমি শাপ দিলাম— সারাজনম তোর পাড়ালিখার বোঝা বইতে হবে, পড়ালিখা ছাড়া তুই আর কিচ্ছু করতে পারবি না!

— (লালন উত্তেজিত হয়ে বাউলের পা জাড়িয়ে ধরে) এ তো আর্শীব্বাদ  দিলেন!

— (বাউল হেসে বললেন) তোর মাথা খুলতে লেগেছে!

— (পজ) সাঁইজি, একটা কথা কবো, আপনার গানের মানে কি?

— গানের মানে! আহাম্মক ছাড়া কেউ গানের মানে খোঁজে না।

— মানে?

— আবার মানে! আরে পাগল, গানের কোনও মানে নেই, যার মাথা যেমন ভারি সে তেমন ভারি ভারি মানে করে আর মনে ভাবে, আমি কত প-িত, দ্যাখো, কী একখানা মানে দাঁড় করালাম!

— তবু কিছু একটা মানে তো থাকতেই হয়…

— না, মানে থাকতে হবে না!

— সাঁইজি, আমি আপনার শিষ্য হব, আমারে মানে বলে দেন, একটু বুঝায়ে দেন।

— আমি কারো শিষ্য নই, কেউ আমার শিষ্য নয়। আমি কেবল অলখ-সাঁইয়ের গোলাম, যার হাজার নাম লক্ষ কাম, যারে দেখার লাগি জীবন দিলাম, মরণ দিলাম তবু তারে দেখতে পেলাম না, তবু তার পরশ পেলাম না।

— অলখ মানি কি?

— আবার মানে! অলখ মানে যা সলখ নয়।

— সলখ মানে…

— আবার! শোন্, এই মানে জানার বাতিক না ছাড়লে কোনদিন কিছু শিখতে পারবি না। মানে জেনে কিছু শেখা যায় না, বুকের ভেতরে নিয়ে হাজারবার নাড়াচাড়া করতে করতে শিখতে হয়। মানে জানা সোজা কাজ, যে কেউ বলে দিলেই তো জানা হয়ে গেল। কিন্তু সেই মানে যে আসল মানে তার হদিস কে দেবে? তাই তো বলি— মানের পেছনে ছুটে লাভ নেই, গানের পেছনে ছোট। (পজ) শোন, আমি যে গানটা গাইলাম তার মানে এমন কিছু কঠিন নয়, কিন্তু গানের ভেতর যে ভার আছে সে ভার বওয়া কঠিন। যে শোনে তার কাছে যেমন কঠিন, সে গায় তার কাছেও তেমন কঠিন।

— কি রকম?

— দুইখান চাকার, একখান গাড়ি— মানে দুই পা। তার ওপর তিন মহলা বাড়ি মানে পায়ের ওপর প্যাট, বুক আর মাথা। এই গানটা বেশ খানিক লম্বা, মানুষ বড় গান শুনতে চায় না। তাই ছোট করে গাই, গানের পরের ভাগে বলা আছে, তিনমহলা বাড়ির নিচের মহলে ভুষিমালের জঞ্জাল, মানে প্যাটের ভেতর যা থাকে আরকি, তারপর বলা হয়েছে, ওপর মহলে আছে খেরোর খাতার বস্তা, মানে মানুষের মাথার ভেতর যেমন পাওনা গ-ার হিসেব চলে, সেই বস্তাপচা হিসেবের কথা। তারপর বলা আছে, তার… কার?

— বলবো?

— বল্ দেখি?

— মানুষ, মানুষের।

— ঠিক ধরেছিস, এই তো তোর মাথা খুলছে। তারপর বলা হয়েছে, মানুষের বুকই আসল জায়গা, যেখানে মণি-মুক্তো সোনাদানা আছে। একটু ভালো করে খুঁজে দেখলে মণি-রতন খুঁজতে বাইরে যাওয়া লাগে না, বুক হাতড়ালেই মেলে। কিন্তুক আসল ঝামেলা হলো, মাত্তর দুইখানা চাকার উপর তিনমহলা বাড়ির বোঝা কেউ বইতে পারে না। তাই গাড়ি আমার টলমল করে, এই পড়ে কি সেই পড়ে!

দৃশ্য : ছয়

লোকেশান : গ্রামের বাঁশবাগান

সময় : দুপুর

বাঁশবাগানের ভেতর লালন বাঁশের কঞ্চি কেটে জড়ো করছে। বেশ বড়ো একটা বান্ডিল হওয়ার পর সে কঞ্চি দিয়েই কঞ্চির বান্ডিল বেঁধে মাথায় তুলে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে।

খানিকটা পথ পেরিয়ে একটা তাল পুকুরের পাড়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। পুকুরের জলে ছোট্ট শব্দ হয় এবং ঢেউ ওঠে। ওপরের গাছ থেকে কোনো ফল-পাকুড় পড়েছে অথবা জলের তলা থেকে কোনো মাছ ঘাই মেরেছে। লালন মনোযোগ সহকারে জলের ঢেউ দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে—

       ও জলে ঢেউ দিল কে?

       সে দেখতে কেমন, কেমন বরণ, কোথায় থাকে?

       সে দেখতে নারি, ছুঁইতে নারি

       শুধু তারে শুনতে পারি

       ও সাঁই, পরমপুজ্যি গুরু গোঁসাই,

       আমি তারে পরাণ ভরে দেখতে চাই।

লালন নিজের মনে একটু হেসে মাথা নড়ায়। তারপর বিড়বিড় করে বলে— হলো না ভালো হলো না।

সে আবার হাঁটতে শুরু করে।

দৃশ্য : সাত

লোকেশান : যদু পাইকের আখড়া

সময় : বিকাল

গাঁয়ের সবচেয়ে ধনী এবং অঞ্চলের নামকরা কবিরাজ, কৃষ্ণপ্রসন্ন সেনের বরকন্দাজ তথা দেহরক্ষী যদু পাইক তার শিষ্যদের লাঠিখেলা শেখাচ্ছে। শুধু লাঠি নয়, সে সড়কি, বল্লম, ছুরি, তলোয়ার, গুপ্তি ইত্যাদি সবই শেখায়। লালন পায়ে পায়ে যদুর আখড়ায় ঢুকল। তখন লাঠিখেলা চলছে। লালন একপাশে সরে গিয়ে মনোযোগ সহকারে খেলা দেখতে থাকে। খেলা শেখাতে শেখাতে যদু বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সে শিষ্যদের কোণঠাসা করে নিজেই পুরো চত্তর জুড়ে খেলা দেখাতে থাকে। কিছুক্ষণ খেলা দেখিয়ে সে হঠাৎ লালনের দিকে তাকায়। হাতের লাঠি উঁচিয়ে সে লালনের দিকে তেড়ে গিয়ে তার মাথায় আঘাত করতে উদ্যত হয়। লালন সভয়ে দুহাতে মাথা ঢেকে চিৎকার করে বসে পড়ে। যদু পাইক তখন হাসতে হাসতে লালনের ঘাড় ধরে টেনে তোলে। তারপর তাঁকে চাতালের মাঝখানে, মূল খেলার কেন্দ্রে টেনে নেয়।

যদু— ব্যাটা ভেড়ো, এই জন্যি মানুষ এসব শেখে, এসব শিখতে হয়। তবেই সাহস বাড়ে, শক্তি বাড়ে, দরকার মতো চোর-ডাকাত-বদমাশদের শায়েস্তা করা যায়, (পজ) শিখবি?

লালন— তা শেখালি শিখতি পারি!

যদু— এই তো ব্যাটাছেলের মতন কথা বললি। তোর হবে। নে, লেগে পড়, চলে আয়। নেত্য, ওরে একখানা লাঠি দে।

লালনের হাতে নেত্য লাঠি তুলে দেয়। যদু তাঁকে লাঠি খেলার প্রাথমিক সূত্রগুলো মুখে বলেই অনুশীলন শুরু করে।

কিছুক্ষণ অনুশীলনের পর লালন বেশ তাড়াতাড়ি লাঠিখেলার কলা-কৌশল রপ্ত করতে থাকে। যদু তাঁকে উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলতে বলতে সাগ্রহে শেখাতে থাকে। ক্রমশ দুজনের লাঠির গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। লাঠিখেলা জমে যায়। কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে গেছে। যদু লাঠি থামিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে— আর খেলা যাবে না। অন্ধার হয়ে গেল। কাল তোরা ঠিক সময়ে আসবি। (লালকে উদ্দেশ্য করে) কোনো কিছু শিখতে গেলে একনাগাড়ে সাধন করা লাগে। রোজ আসবি, আসবি তো?

লালন— রোজ আসবো।

দৃশ্য : আট

লোকেশান : শিবুদের বাড়ি

সময় : সন্ধ্যা

যদুর আখড়া থেকে ফেরার পথে গোলমাল-চেঁচামেচির শব্দ পেয়ে লালন বড় রাস্তা ছেড়ে গলিপথ ধরে দৌড় লাগায়। শিবুদের বাড়ির কাছে এসে দেখে, ওদের বড় ঘরে আগুন লেগেছে। পাড়াপড়শিদের অনেক জড়ো হয়েছে, কেউ কেউ কাছাকাছি পুকুর থেকে ঘটি-বাটি-কলসি হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে জল এনে ঢালছে। কিন্তু সমস্যা হলো, শিবুর মা ঘরের ভিতরে আটকা পড়ে গেছে। ঘরের দরজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ঘরের বেড়া জ্বলছে, চাল জ্বলছে। এই  পরিস্থিতিতে সে বেরিয়ে আসতে পারছে না, আবার বাইরে থেকে দাউদাউ আগুন ভেদ করে করো পক্ষে ভেতরে ঢুকে তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এটা বুঝতে পেরেই শিবুর মা প্রাণ বাঁচাতে পরিত্রাহি চিৎকার করছে। বাড়ির সামনে জড়ো হওয়া পাড়ার লোকেরা যে যার মতো জ্ঞান দিচ্ছে, আদেশ-নির্দেশ জারি করছে, কিন্তু কেউ কাজের কাজ করতে এগিয়ে আসছে না। তখন লালন হঠাৎ উঠোনে ঝুলতে থাকা একটা কাঁথা টেনে নিয়ে একদৌড়ে পুকুরের কাছে যায়, কাঁথা শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবং পরমুহূর্তেই ভেজা কাঁথাসহ ছুটতে ছুটতে ফিরে এসে এক লাফে জ্বলন্ত-আগুনের মধ্যে ঢুকে যায়। উঠোনে যারা ছিল তারা  হইহই করে ওঠে, দু-একজন তাঁকে বাঁধা দিতে এগিয়ে যায়, কিন্তু ততক্ষণে সে শিবুর মাকে ভেজা কাঁথায় জড়িয়ে পাঁজাকোলে করে বাইরে বেরিয়ে এলো। শিবুর মা বাইরে এসেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। যদিও তার কোনো ক্ষতি হয়নি।

লালনের এই অসম সাহসিকাতার জন্য সবাই তাকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে থাকে। কিন্তু সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় লজ্জা পেয়ে ঘটনার কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যায়।

দৃশ্য : নয়

লোকেশান : লালনের ঘর

সময় : রাত

গোলাপি শয্যায় যাওয়ার আগে নিজেকে যথাসম্ভব সুন্দর করে সাজিয়ে সব শেষে চুল বাঁধতে বসে। লালন বিছানায় আধ-শোয়া অবস্থায় গভীর মনোযোগ সহকারে স্ত্রীর সাজসজ্জা দেখতে থাকে।

গোলাপি— হাবার মত চোখ মোটা মোটা করে কী দ্যাখো?

লালন— তোমারে।

গোলাপি— আমারে দেখার কি আছে, আমারে তো রোজই দ্যাখো।

লালন— রোজই দেখি, কিন্তুক আরো দেখতে ইচ্ছা করে। যত দেখি, তত দেখতে ইচ্ছে করে।

গোলাপি— তুমি একখান ভ্যাদামাছ! কি কও না কও তার মাথামু-ু বুঝিনা।

লালন— ঠিক কইছ, আমি একখান ভ্যাদামাছ, তুমি একখান কাতলা মাছ। ভালো না?

কথা বলতে বলতে গোলাপি চুল বাঁধা শেষ করে বিছানায় এসে লালনের পাশে বসে। লালন তাকে জড়িয়ে নিয়ে ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকে।

গোলাপি— আমারে একখনা সত্যি কথা ক’বা?

লালন— কব, কি কথা?

গোলাপি— আমারে তোমার মনে ধরেছে?

লালন— কেন, আচকমা এই কথা কও কেন?

গোলাপি— আমার কেমন জানি ভয় ভয় করে।

লালন— কিসের ভয়?

গোলাপি— কিসের ভয় কইতে পারবো না। কিন্তুক মনে কয়, তুমারে আমি ঠিক মতো পাইনি, ঠিকমতো পাব না। এই জন্যি আমার ভয় ভয় করে।

লালন— কি কথা কও বউ। এ কথার তো আমি তল পাই না।

গোলাপি— তোমারে আমি বুঝতে পারি না, ধরতে পারি না, তুমি আমার পাশে যখন থাকো তখনও তুমারে ঠিকমত পাশে পাই না।

লালন— (হঠাৎ গানের সুরে)

        পুনা মাছে লাফ মারিছে পুকুরে

        শনিবারের বার বেলাতে, দুকুরে

        তাই ঢেউয়ের পর ঢেউ উঠিল জলে

        তাই আমার মনের পাখি বনে পালায় ছলে,

        ঢেউয়ের পর ঢেউ উঠিল জলে

        মনের পাখি বনে  পালায় কী কৌশলে!

গোলাপি লালনকে জড়িয়ে আপ্লুতকণ্ঠে বলে— তুমি কি বাউল-ফকির, কথায় কথায় গান বানাও, তুমি কে গো!

লালন— আচ্ছা বউ, ‘দুকুর’ বলে না দুপর?

গোলাপি— দুকুর… দুপর… দুপুর… আমরা গবির-গুরবো মানুষ ‘দুকুর’ কই, আর বাবুরা দুপর বলে… না, বাবুরা বলে দুপুর।

লালন— তবে তো আমার গানে দুকুর কথাটা ঠিক আছে, কি কও?

গোলাপি— ঠিকই তো আছে। তোমার গান তোমার মতন, বাবুদের গান বাবুদের মতন।

লালন তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে ঘনিষ্ঠ হতে হতে বলে— আমার বউ আমার মতন, বাবুদের বউ বাবুদের মতন।

দৃশ্য : দশ

লোকেশান : লালনদের উঠোন

সময় : সকাল

কঞ্চি দিয়ে একখানা বড় পাল্লার দরজা বানিয়ে লালন তাদের ভাঙাচোরা রান্নাঘরে লাগাতে চেষ্টা করে। লালনের মা উঠোনের একপাশে চাটাই বেছায়। তারপর ঘরের ভেতের থেকে একখানা পুরানো কাপড় এনে চাটাইয়ের উপর পেতে দেয়। এবার একটা চালের কলশি এনে কলশিটা উপুড় করে চালগুলো কাপড়ে ঢালে। তারপর চাটাই জুড়ে চালগুলো ছড়িয়ে দিয়ে রোদ খাওয়াতে থাকে। রোদের তাপে চালের ভেতর থেকে দু-একটা কালো কালো পোকা বেরিয়ে আসে। লালনের মা চাটায়ের পাশে বসে আঙুলের চাপে পোকা মারতে মারতে ‘হেই হেই’ করে পাখি তাড়ায়। গোলাপি উঠোনের এককোণে বসে একগাদা থালা-বাসন মাজতে থাকে।

পদ্মাবতী— ও লালু, একতিল পরিমাণ জমি-জিরেত নেই। অকালে তোর বাপ গেল। নিজের বাপের বাড়ি উঠলাম, তারা খেদায় দিল। পরের বাড়ি খেটেখুটে তোরে মানুষ কল্লাম; তোর বিয়ে দিলাম, পরের মেইয়ে ঘরে আনলাম। এতগুলোন মুখের দানাপানি জুগাড় করা সোজা কথা নয় রে বাপ। একটা কিছু কাম-কাজের চেষ্টা করো।

লালনে স্ত্রী বাসন মাজতে মাজতে একবার স্বামীকে দেখে একবার শাশুড়িকে দেখে তারপর মাথা নিচু করে বাসন মাজতে মাজতেই শাশুড়ির আলোচনায় যোগ দেয়।

গোলাপি— ও কি জানে মা, ও কি কাজ করবে? ও তো খালি গান বাঁধতে পারে।

লালন— গাঙ-বান্ধার চেয়ে গান-বান্ধা কঠিন কাজ।

পদ্মাবতী— কিন্তুক তাতে তো প্যাটের ভাত হয় না, বাপ। কিছু একখান পথের সন্ধান করো। লোকে কয়, আগে দানা তারপর গানা।

লালন দরজা বাঁধা শেষ করে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।

লালন— কি করি কও তো, মা। মাঠের কাজ আমার ভালো নাগে না।

পদ্মাবতী— তা কইলি কি চলে, আমরা দ্যাশের গাঁইয়ের মানুষ। এ তল্লাটে ক্ষেতির কাজ ছাড়া আর কি আছে?

লালন— আমি কারবার করবো!

গোলাপি— ওরে আমার চাঁদবণিকের নাতি, কারবার করে উলটে দেবে! ওসব তুমি কিছু বোঝো?

পদ্মাবতী হাসি লুকাতে অন্যদিকে মুখ ঘোরায়। লালন কিছুটা সংকুচিতভাবে একবার মা একবার স্ত্রীর দিকে তাকায়। ধীরে ধীরে নিজেকে কিছুটা সামলে নেয়।

লালন— দ্যাখ বউ, সব কিছু মায়ের পেট থেকে পড়েই জানা যায় না। আস্তে আস্তে জানতে লাগে, শিখতে লাগে।

গোলাপি— ট্যাকা লাগে, ট্যাঁকের জোর লাগে। তুমার তো ট্যাঁকই নাই, তুমি কি নিয়ে কারবারে নামবা?

চারিদিকে কৌতূহলি নজর বুলাতে বুলাতে যদু পাইক লালনদের উঠোনে এগিয়ে আসে।

যদুকে দেখে লালন এগিয়ে যায়।

যদু— (গাম্ভীর্য সহকারে) কি রে ব্যাটা, রাতে কি করে বেড়াস? চল্, কবিরাজ মশাই তলব করেছেন!

পদ্মাবতী— (আশঙ্কিতভাবে) কেন, কি হলো, ও কি করছে, যদু? আমরা গরিব মানুষ, কি হয়েছে?

যদু— তোমার ছেলের মাথায় নানা রকম পোকা আছে, আজ কবিরাজ মশাই ওর মাথার পোকা বের করে তবে ছাড়বেন! চল্!

গোলাপি ছুটে এসে লালনের কানে ফিস ফিস করে বলে— কি হবে গো!

লালন— যা হবে হবে, সত্যি কথা বলে দেব।

পদ্মাবতী— ও লালু, কি করেছিস, কবিরাজ মশাই তোরে কেন তলব করে? এখন কি হবে!

লালন— তুমি চুপ করো তো, যা হবার হবে!

লালন যদু পাইকের সাথে বেরিয়ে যায়। পদ্মাবতী কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কিছু ভেবে তারপর সেও ওদের পিছু নেয়।

দৃশ্য : এগারো

লোকেশান : কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্নর মহল

সময় : সকাল

কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্ন বাইরের মহলে বসে তামাক খাচ্ছেন। তাঁর কাছে কয়েকজন কর্মচারী ও দাসী-চাকর নানা কাজে ঘোরাঘুরি করছে। একটু দূরে বেশ কয়েকজন লোক কবিরাজকে রোগী দেখাতে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে বসে আছে। লালনদের ঘরে ঢুকতে দেখেই কবিরাজ অতিরিক্ত গম্ভীর মুখ করে ইঙ্গিতে লালনকে কাছে ডাকলেন। লালন তাঁর কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়।

কবিরাজ— বীণা! বীণাকে ডাকো! বীণা ওকে রাতের বেলায় চুরি করতে দেখেছে!

কয়েকজন হাঁকডাক করতেই বীণা এসে সংকুচিত-মুখে লালনের দিকে তাকায়। তারপর কবিরাজের দিকে ফিরে বলে— ও খুব ভালো গান করতি পারে।

কবিরাজ— অদ্ভুত কথা! ও গান করতি পারে কি পারে না তা কি আমি তোর কাছে জানতে চাইছি? তুই রাতের বেলা ওরে চুরি করতে দেখছিস কি না বল?

লালন— আমি চুরি করিনি, কবিরাজ মশাই, আপনার ঘোড়া ‘মানিক চাঁদ’রে নিয়ে একটু হাওয়া খেয়ে বেড়াই।

কবিরাজ— আমার ঘোড়া তুই নিয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াস! তুই আমার অনুমতি নিয়েছিস?

লালু মাথা নিচু করে থাকে।

কবিরাজ— কি রে, কথার জবাব দে! অনুমতি নিয়েছিস? (পজ) তোর সাথে আর কেউ হাওয়া খেয়ে বেড়ায়?

লালন একইভাবে মাথা নিচু করে থাকে।

কবিরাজ— অন্যের জিনিস না-কয়ে নিলে তারে কি বলে? জবাব দে!

লালন — আমি তো যেখানকার ঘোড়া আবার সেখানে বেন্ধে রেখে যাই।

কবিরাজ— তাতে তোর চুরির অপরাধ লাঘব হয় না। না-বলে যতক্ষণ নিয়ে রেখেছিস ততক্ষণ চুরি করিছিস, যতদিন ধরে করিছিস, ততদিন চুরির অপরাধ হইছে। তোর অপরাধের শেষ নেই, পরপর একই অন্যাই করে গেছিস। তোর আজ শাস্তি হবে! (পজ) তার আগে বল, তোর সাথে আর কেউ হাওয়া খেয়ে বেড়াই?

লালন— আমার বউ গোলাপি… ঘোড়ায় চড়লি আমার মনে হয়, আমি যেন রাজকুমার হয়ে গেছি, কুথায় যেন কোন্ স্বপ্নের দেশে চলে যাই, আমার তখন কিছু খেয়াল থাকে না।

কবিরাজ— বা বা বা… আমি সোনার দানার মতোন দুইশ’ মন ধান বেচে ঘোড়া কিনলাম কেন, না লালু আর তার বউ গোলাপি হাওয়া খেয়ে বেড়াবে! বাহ্ তোমার তুলনা নেই! ওরে পাঁঠা, তোর একটা রোগ হইছে, এই রোগের নাম গরিবের ঘোড়া রোগ! এই রোগের দাওয়াই দেওয়া লাগবে।

কবিরাজ হঠাৎ প্রবল কৌতূহল নিয়ে লালনের কপালের দিকে তাকালেন।

কবিরাজ— এই, এদিকে আয়, আমার কাছে আয়, তোর বাবরিচুল কপালের ওপর থেকে সরা!

লালন কিছু বুঝতে না পেরে সন্দিগ্ধভাবে কবিরাজের কাছে এগিয়ে যায়।

কবিরাজ— দেখি, ভালো করে চুল সরা, ঠিক আছে এবার হাতের চেটো দুখান আমার চোখের সামনে মেলে ধর তো দেখি (লালন দুহাত মেলে ধরে) বেশ, বেশ ঠিক আছে। এখন শোনো, তোমার দাওয়াই আপাতত লঘু। আমার একটা জামরুল গাছ ঝড়ে পড়ে গেছে, রাস্তার ওপরে, ওটা চলা করে তবে বাড়ি ফিরবা। তার আগে নয়। যাও! আর শুনে রাখো, ভবিষ্যতে কোনো দিন যদি ঘোড়া চুরি করো তো নির্ঘাত পুলিশে দেব, জেলে পছে মরবা!

কাজের লোকদের একজন একটা কুড়–ল এনে লালনের হাতে ধরে দেয়। সে কুড়–ল নিয়ে গাছ কাটতে রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়।

কবিরাজ— আর সেই আফিমখোরটা কই? মনসুর!

মনসুর মাথা নিচু করে কবিরাজের সামনে দাঁড়ায়।

কবিরাজ— ঘোড়ার যতœ করা, তার দেখভাল করা, তার খোঁজখবর করা তোর কাজ, তুই তা করিস নি। আফিম খেয়ে মৌতাত করেছিস। তোর শাস্তি হলো, তিনদিনের আফিম তোকে একদিনে খেতে হবে। এই, কে আছিস, আমার সামনে এখানে এখনই ওকে আফিম গেলা, বড়-গুলির তিন গুলি!

কবিরাজ মশাই তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মনসুর দৌড়ে গিয়ে কবিরাজের প্রিয় ঘোড়া ‘মানিকচাঁদকে’ টানতে টানতে তার সামনে আনে। তিনি ঘোড়ায় চেপে ঘোড়ার গায়ে মৃদু চাপড় মারেন। ঘোড়া হাঁটতে শুরু করে। ঠিক তখনি আড়াল থেকে পদ্মাবতী এগিয়ে এসে কবিরাজের ডান পা জড়িয়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করতে থাকে।

পদ্মাবতী— কবিরাজ মশাই, ওরে এবারকার মতো খ্যামা করে দিন, বাপ-মরা অনাথ ছেলে ওরে দয়া করেন।

কবিরাজ— আরে তুই আবার পাগলামি করতিছিস কেন, আমি কি ওরে ‘বাঁশডলাই’ দিচ্ছি না বাইন্ধে পেটাচ্ছি? শোন্ পদ্মা, ছেলেপুলে মানুষ করতে গলে একটু-আধটু শাসন করা লাগে। আমি তোর ছেলের ভালো চাই বলেই একটু শাসন করতিছি। (পজ) আর একটা কথা শোন, তোর ছেলের একটা ফাঁড়া আছে, বছর খানেকের মধ্যি খারাপ কিছু হতি পারে!

পদ্মাবতী কবিরাজের পায়ে মাথা রেখে ডুকরে ওঠে।

পদ্মাবতী— আমার একটা মাত্তর সন্তান, কবিজার মশাই ওরে বাঁচান!

কবিরাজ— আরে পাগল, বাঁচাবার মালিক আমি নই, ভগবান। তারে ডাক, তিনিই রক্ষা করবেন। (পজ) আরও একটা কথা শোন, তোর ছেলে যদি এই ফাঁড়া কেটে উঠতি পারে, তাহলি সে একটা বিরাট মাপের মানুষ হবে, দেশে-বিদেশে ওর নাম ছড়ায়ে যাবে। আমার তাই মনে হলো। আমি খুব ভালো করে ওর কপাল দেখেছি, সাধারণ লোকের অমন কপাল থাকে না রে, ওরে যতেœ রাখিস।

কবিরাজ আবার ঘোড়ার গায়ে মৃদু চাপড় মারলেন, ঘোড়া হাঁটতে শুরু করল।

দৃশ্য : বারো

লোকেশান : গাঁয়ের পথ

সময় : দুপুর

জামরুল গাছটা কাটতে কাটতে লালু প্রায় আধমরা, একটু বিশ্রাম নিতে ওই গাছের গুড়ির ওপরেই বসে পড়ে। ধুতির কোণা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঝিমোয়, তারপর আবার কুড়–ল হাতে এগিয়ে আসে। আরও কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে গাছ কাটতে থাকে। তারপর হঠাৎ বিরক্ত হয়ে কুড়–লটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁপাতে থাকে।

দূর থেকে তখন গোলাপিকে দেখা যায়। সে লালনের খাবার নিয়ে আসছে। লালন তাঁকে দেখতে পেয়ে দুপা এগিয়ে যায়। গোলাপি তার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে কেঁদে ফেলে।

গোলাপি— চুরি না ডাকাতি না খামোখা এমন শাস্তি, এর নাম বিচার!

লালন— খামোখা কেন কও, এরে কয় গরিবের ঘোড়া রোগের শাস্তি।

লালন পাশের পুকুরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফিরে এসে খাবার খেতে বসে। গোলাপি তার পাশে বসে শাড়ির আঁচল দিয়ে হাওয়া করতে থাকে। গোলাপি হাওয়া করা বন্ধ রেখে হঠাৎ উঠে গিয়ে গাছের গুড়িটায় লাথি মারে। লালন খেতে খেতে হেসে ওঠে।

লালন— কার ওপর তোমার রাগ, বউ?

গোলাপি— আমার ওপর, আমার নিজের ওপর!

লালন নিঃশব্দে হাসতে হাসতে খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে আসে। তারপর গোলাপির কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপাকণ্ঠে বলে— আমি জানি, আমার ওপর, আমার ওপর তোমার যত রাগ। তাই কি না?

গোলাপি— না, সারা দুনিয়ার উপর। (পজ) আমরা কেন এত গরিব, সেই জন্যি আমার রাগ। আমরা কেন এত দুখি, সেই জন্যি আমার রাগ।

দৃশ্য : তেরো

লোকেশান : গাঁয়ের মাঠ

সময় : রাত

গাঁয়ের মাঠে যাত্রা হবে। শৌখিন যাত্রাদলের মালিক নকুলেশ্বর পাল তার অভিনেতা কলাকুশলীদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। এখনই যাত্রা শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যে  চার-পাঁচশ দর্শক মাঠে বসে গেছে, তবু লোক আসার বিরাম নেই, চারপাশে থেকে পিলপিল করে মানুষ আসছে। আজকের পালা— গৌর-নিতাই। খুব জনপ্রিয় পালা। যেখানে যখন যে দল মঞ্চস্থ করছে তারাই সফল হচ্ছে।

খোলা মঞ্চের পেছনে কাপড় দিয়ে বাননো গ্রিনরুমে অভিনেতা-বাজনদার-কলাকুশলী সবাই তৈরি, তবু নাটক শুরু করা যাচ্ছে না। কারণ যাত্রাপালার প্রধান দুই চরিত্র, গৌর-নিতাই এর নিতাই প্রস্তুত, কিন্তু গৌর এখনো পৌঁছাতে পারেনি। নকুলেশ্বর তার বাড়িতে বার কয়েক লোক পাঠিয়েছে, কিন্তু যাকেই পাঠানো হচ্ছে সে আর ফিরে আসছে না। কি ব্যাপার বোঝার বা জানার আগেই মাঠে লোক ভর্তি, তারা চেঁচামেচি শুরু করেছে, এখনই পালা আরম্ভ না করলে ওরা পিঠের চামড়া তুলে নেবে! নকুল অবস্থা সামাল দিতে তিনজন এক্সট্রাকে মঞ্চে পাঠিয়ে তাদের অবিরাম তারস্বরে ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে’ গাইতে নির্দেশ দিল। এভাবে আরো কিছুক্ষণ চলল। দর্শককূল কৃষ্ণ-রাম নামের মাহাত্ম শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত হয়ে অভিনেতাদের মা-বাপ তুলে গালাগালি দিতে আরম্ভ করে। এভাবে আরো কিছু সময় কাটর পর এক্সট্রাদের কজন অতিরিক্ত ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে নকুলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে— দাদা আর কতক্ষণ ধরে হরে রাম হরে কৃষ্ণ চালাবো, মুখে যে গাঁজলা উঠে গেল!

নকুলেশ্বর বাঘের মত ক্ষিপ্ত হয়ে জবাব দিলো— উঠুক, গাঁজলা উঠে মরে যা! তোর মত ঘাটের মড়া মরলে কার কি ক্ষতি! কিন্তুক আমি মরলে দল বাঁচবে? ছাগল কোথাকার! যতক্ষণ গৌরিকে না পাওয়া যায়, ততক্ষণ হরে রাম চলবে, যা, মঞ্চে যা!

নকুলেশ্বর প্রায় উম্মাদের মতো ছোটাছুটি করছে, বার বার খবর নিতে চেষ্টা করছে, কিন্তু গৌরের দেখা নেই। এমন সময় একজন খবর নিয়ে এলো— গৌর দুর্দান্ত অভিনয় করবে বলে আজ সন্ধ্যা থেকে মদ খেতে শুরু করে, যারা তার খোঁজে গেছে তাদেরও খাইয়েছে, এমন অবস্থা যে কারুর দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই!

তাহলে এই মুহূর্তে কি করণীয়? নকুলেশ্বর হঠাৎ দর্শকদের দিকে ছুটে গিয়ে ‘লালু লালু’ বলে চিৎকার জুড়ে দিল। কিন্তু কমপক্ষে গোটা তিরিশেক লালু এখন দর্শকদের ভেতরে আছে, তার ভেতরে কোন্ লালুকে দরকার? অবশেষে অনেক দৌড়-ঝাঁপের পর লালনকে ধরে আনা হলো। এবং লালনকে দেখেই নকুলেশ্বর তার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লালন কিছু বুঝতে না পেরে নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিতে চেষ্টা করে।

লালন— কি করেন, কি করেন কাকা!

নকুলেশ্বর— লালন, লালু বাপ, আমায় বাঁচা!

লালন— আমি তো কিছুই বুঝতে পারতছিনা।

নকুল— কিচ্ছু বোঝার দরকার নেই। মেকাপ নাও, মঞ্চে ওঠো, তুমিই আমার আজকের গৌর!

লালন— (ছুটে পালাতে যায়, নকুল তাঁকে ধরে ফেলে) কাকা, আমি জীবনে কোনো দিন পালা করিনি…

নকুল— তাতে কি বাপ, আজকে করো, তুমি নাকি গান বাঁধতে পারো, তা মনে করো, আজ তুমি তোমার বান্ধা গান সবাইরে শোনাবা। যাও, মেকাপ নাও।

লালন— কাকা, আপনার পায়ে ধরি, (পায়ের ওপর পড়ে) আমি পারবো না।

নকুল— আমিই তোর পায়ে ধরি বাপ, আমারে আজকের মত বাঁচা— (পজ) এই! এখনো লালুর মেকাপ হলো না!

মুহূর্তের মধ্যে নকুলের চ্যালারা লালনকে চ্যাংদোলা করে মেকাপ করাতে নিয়ে গেল। তার কয়েক মুহূর্ত পরেই তাঁকে প্রায় ধাক্কা মেরে মঞ্চের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া হলো। ধাক্কাটা সত্যিই একটু বেশি জোর হয়েছে। লালন মঞ্চের ওপর হাটু মুড়ে দুহাত দিয়ে মঞ্চ ধরে নিজেকে সামলাতে থাকে। কিন্তু মাজার ব্যাপার হলো, ওর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, চৌকস অভিনেতার মতো সে অভিনয় শুরু করার আগে প্রথমে মঞ্চপ্রণাম করছে।

লালন ধীরে ধীরে মাথা তুলল, তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করতে করেত উঠে দাঁড়ালো। আস্তে করে সামনের দিকে এক পা এগিয়ে দর্শকদের দিকে তাকাল এবং অস্পষ্টস্বরে গান শুরু করলো।

ভিড়ের ভেতর গুনগুনানি হচ্ছে, গান শোনা যাচ্ছে না। তখন পেছন থেকে নকুল প্রায় চেঁচিয়ে উঠল— লালন, জোরে, চাড়ায় গাও।

লালন দর্শকদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ওপরে তাকালো ওপরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ খুব দ্রুতলয়ে গাইতে থাকে—

                আমার বাবরি চুলের তলায় থাকে তিন শিকারি

                একটা উকুন, একটা মকুন, একটা শকুন,

                আমার হৃদ-কমলের কাছেই আছে তিন ভিখারি

                একটা এঁড়ে, একটা গেঁড়ে, একটা দেঁড়ে,

                আমার দুই চরণের ঠিক উপরে তিন নিকারি

                ওদের একটা ঘাটে, একটা হাটে, একটা নাটে।

                তিন শিকারি, তিন ভিখারি, তিন নিকারি

                এই নয় জনারই মাথায় আছে পাঁচ বিকারী

                নয় আর পাঁচে চৌদ্দজনার মারকাটারি

                আমায় মারে, আমিও মরি, আমিও মারি।

লালনের গান দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয়। নকুল ছুটে এসে ওকে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন জানায়। কিন্তু লালন বিষণœভাবে মাথা নাড়াতে থাকে। কি হয়েছে বুঝতে না পেরে নকুল তাঁকে একটু আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞাস করে— কি ব্যাপার, কি সমস্যা খুলে বল।

লালন— গান ভালো হয়নি।

নকুল— বলিস কি রে, দর্শক খুশিতে পাগল হয়ে গেল আর তুই বলছিস গান ভালো হয়নি!

লালন— না, কাকা, একটু গোঁজামিল আছে, তাড়াহুড়োয় ভালো করে বাঁধতে পারিনি।

নকুল— তা বাবা, একটুখানি গোঁজামিল ছাড়া গান বাঁধাই যায় না। ওই গোঁজামিল গানের নয় রে লালু, জীবনের। ওটুকুই তুই এখন নয়, আরও কিছুকাল পরে বুঝবি। এবার নে, চল্, এরপর দুটো দৃশ্য, তারপর আবার তোর।

লালন পরের দৃশ্যের জন্য তৈরি হতে থাকে।

দৃশ্য : চৌদ্দ

লোকেশন : লালনের বাড়ি

সময় : বিকেল

লালনদের বাড়ির সামনে এসে কবিরাজ ঘোড়া থেকে নামলেন। তাঁর পেছনে যদুপাইক। যদুপাইক বাড়ির ভেতরে ঢোকার আগেই হাঁক-ডাক শুরু করে।

যদু— লালু, পদ্মাদি, তোমরা কই গো, দেখ কবিরাজ মশাই এয়েছেন।

যদু— দেখ, তোমার লালুর কপাল খুলে গেল, কবিরাজ মশাই স্বয়ং তোমার ঘরে পা রেখেছেন।

পদ্মাবতী জোড়হাত করে এক পা এগিয়ে এলো।

পদ্মাবতী— কবিরাজ মশাই, ওর অপরাধ খ্যামা করে দিন।

কবিরাজ— আরে কি মুশকিল, অপরাধ না করলি ক্ষমা করবো কি! আমি তোর গুণী ছেলেরে দেখতি এলাম।

আমার বড় বউ বললো, তোর ছেলে নাকি দারুণ গায়, নিজেই গান বান্ধে। সেদিন গৌর-নিতাই পালা ও একাই শুনলাম জমিয়ে দিয়েছে। এমন ছেলে এ অঞ্চলে আর ক’টা আছে।

পদ্মাবতী— কিন্তুক গানে তো আর প্যাট ভরে না, একটা কাম-কাজ না করলি খাবে কি?

কবিরাজ— হ্যাঁ, সেই জন্যি আমি নিজেই এলাম, শোন, আমি ওরে আমার কাজে লাগাতি চাই। আমার ঘোড়া মানিকচাঁদরে ও খুব পছন্দ করে। আমি ভাবছি, ও ঘোড়াটা দেখভাল করবে, আমার ফাইফরমাশ খাটবে, সারাবছর আমি ওর আর ওর বউয়ের খোরপোশ দেব। তুই তো টুকটাক করে চালাচ্ছিস, তো হয়ে গেল। (পজ) শোন, আমি সামনের বুধবার তীর্থে যাবো, আমার সাথে বাড়ির গিন্নিরা থাকবে, দাসী -চাকর থাকবে, যদু থাকবে, পাল্কি-কাহাররা থাকবে, আরো দুতিন জন যাবে। আমরা বড় দল বেঁধে যাচ্ছি। লালুরেও সাথে নিতে চাই। ও আমার মানিকচাঁদরে দেখবে আর আমারে গান শোনাবে। এক কাজে তিন কাজ, ওর ঘোড়া-রোগের ব্যামো ঘুচবে, তীর্থ-দর্শন হবে, আবার রোজগার হবে। লালু কি বলিস?

লালন— আমি যাবো, দ্যাশ-বিদ্যাশ দেখতি আমার ভালো লাগে।

গোলাপি— (চাপাকণ্ঠে) তো বিয়ে করা কেন, পোড়ারমুখো!

পদ্মাবতী— আমার খুব ভয় করতিছে, কবিরাজ মশাই। ওর বাপও একদিন তীর্থে যাবে বলে সেই যে গেল আর ফিরলো না। পরে শুনলাম মরে গেছে…

কবিরাজ— ওসব ভাবলি কি ছেলে মানুষ হবে, রোজগার করতি শিখবে? তার ওপর আবার বিয়ে দিয়ে দিছিস, খাবে কি? শোন, আমার সাথে যাবে, আমার সাথে থাকবে, আমার সাথেই ফিরেও আসবে, এই তো কথা, ভায়ের কি আছে? (পজ) কিরে লালু তুই কি বলিস?

লালন— আমি যাবো।

কবিরাজ— তো ধুতি-জামা থাকলি গোছায়ে রাখিস, না-থাকলি আজ সন্ধে বেলায় আমার কাছে আসিস, আমি ব্যবস্থা করে দেব। মনে রাখিস, বুধবার ঠিক ঊষালগ্নে আমরা বেরিয়ে পড়বো।

পদ্মাবতী—  কবিরাজ মশাই, গরিবের ঘরে একটু বসবেন না?

কবিরাজ— আর একদিন এসে বসে তোমার ছেলের গান শুনবো। আজ যাই, ওদিকে আবার রোগির বাড়ি যাওয়া লাগবে।

কবিরাজ তাঁর ঘোড়ায় উঠে মৃদু চাপড় দিতেই ঘোড়াটা হাঁটতে শুরু করে।

দৃশ্য : পনেরো

লোকেশান : স্বপ্নদৃশ্য

সময় : রাত

স্বপ্নের ঘোরেও লালন বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। পায়ে পায়ে অন্ধকারে এগিয়ে যায়। অন্ধকারে কিছুই ভালো করে দেখা যায়না। লালন যেন একটা কিছু খুঁজতে বাইরে বেরিয়েছে, কিন্তু বস্তুটা যে কী তা সে নিজেই জানে না। অন্ধকারে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সে নিজের মনে বিড় বিড় করে— কি যে হারিয়ে গেছে, কি খুঁজতি বাইরে এয়েছি? আরে আমি, আমি তো হারিয়ে গেছি! এ কি! এ আমি কুথায় এলাম, কুথায় যাবো, পথ কোথায়, কোনদিক পানে? আরে একি, আমি কে, আমি কে গো, আমার কি পরিচয়!

লালন নিজের মনে বিড় বিড় করতে এগিয়ে যায়। তখন হঠাৎ চারিদিক জোছনার আলোয় যেন সারা পৃথিবী ঝলমল করে ওঠে। লালন সেই অলৌকিক আলোয় প্লাবিত হতে হতে একটা দীঘির কাছে যায়। দীঘির জলের ওপর সেই টলটলে জোছনার আলো যেন কেউ প্রাণভরে মাখিয়ে রেখেছে। সেই অপরূপ জলের দিকে তাকিয়ে লালন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে পায়ে পায়ে ঘাটের কাছে যায়, একটু একটু করে জলের কাছে মুখ নামায়। নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে চেষ্টা করে। তারপর ফিসফিস করে ডাকে— লালন!

তখন যেন জলের ভেতর থেকে অস্পষ্ট জবাব এলো— আমি এখানে!

লালন— তুমি কোথায়?

জলের লালন— আমি জলে।

লালন— কেন তুমি জলে?

জলের লালন— আমার জীবন জলে গেল তাই আমিও জলে।

লালন— কেন তোমার জীবন জলে গেল?

জলের লালন— যে নিজের কথা কয় তার জীবন জলে যায়, যে পরের কথা কয়, সে সুখে কাল কাটায়।

লালন— লালন, আমার লালন!

জলের লালন— আমার কাছে এসো, জলে নামো!

লালন খুব সন্তর্পণে জলে নামে যেন জলে ঢেউ না জাগে। সে একটু করে জলের গভীরে এগিয়ে যায়। বুক সমান জলে নেমে সে ডাক দেয়— লালন!

জলের লালন— নামো, আরো নামো।

লালন আরো এগিয়ে যায়, প্রায় গলা সমান জলে দাঁড়িয়ে সে আবার ডাকে— লালন!

এবার আর কোনও সাড়া নেই। লালন তখন ক্রমশ গলা চড়িয়ে ডাকতে থাকে— লালন, লালন!

সাড়া না পেয়ে লালন যেন উন্মাদের মতো সমস্ত দীঘির জল তোলপাড় করতে করতে লালনকে খুঁজতে থাকে আর চিৎকার করে নিজেকে নিজে ডাকতে থাকে— লালন! লালন কোথায়, লালন!

(ফ্লাশব্যাক শেষ)

দৃশ্য : ষোল

লোকেশান : হাউজবোট

সময় : সন্ধ্যারাত

সন্ধ্যার অন্ধকারে নদীর জলে নৌকা চলছে। জলের ওপর বৈঠার আঘাতে মৃদু-মধুর ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ উঠছে। দূরের গাঁয়ে কোনও কোনও বাড়ির প্রদীপের আলো যেন জোনাকির মত জ্বলছে। চলন্ত নৌকার সামনে বসে জ্যোতিঠাকুর এবং লালন গল্প করছেন।

জ্যোতিঠাকুর— অসামান্য! কেউ নিজেই নিজেকে ডাকছে, এমন আশ্চার্য ঘটনার কথা আমি এখনও শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। এটা নিশ্চয় স্বপ্ন?

লালন— স্বপ্ন কিনা জানিনে, অন্য দিনের মতো পরদিনও স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, যা যা করি তাই করলাম। শুধু বউ বললো, আমার পায়ে নাকি জলকাদার হালকা দাগ ছিল। কাপড় ভেজা ভেজা ছিল…

জ্যোতি ঠাকুর— তার অর্থ স্বপ্ন নয়?

লালন— (মৃদু হেসে) জোর দিয়ে বলি কিভাবে, আমরা পাড়াগেঁয়ে মানুষ, হাতে-পায়ে জলকাদার দাগ তো সবসময় লেগেই থাকে। হাত-পায়ে জল লাগলে কাপড়ে মুছি, কাপড় ভেজা নতুন কিছু নয়।

জ্যোতি ঠাকুর— আপনি রহস্যে জট খুলতে চাইছেন না।

লালন— তা নয়, আমি সত্যিই জানিনে, মনে নেই, সেদিন রাতে সত্যি স্বপ্ন দেখেছিলাম, না কি সত্যি দীঘির জলে নেমেছিলাম। কিন্তু…

জ্যোতি ঠাকুর— কিন্তু কি বলুন না, আমি খুব কৌতূহল বোধ করছি।

লালন— আমি ঈশ্বর-স্রষ্টা-বিধাতা বলতে অন্য কিছু বুঝি না, নিজেকে বুঝি, নিজের দেহ-মন বুঝি। আমার মনে হয়, সেদিন রাতে যে পাগলকরা জোছনার আলো দেখেছিলাম সেই জোছনার আলো যে দেহের মাঝে ধারণ করতে পারে, সেই মানুষ আসল মানুষ, সেই মানুষই অলখ সাঁই, গুরু গোসাঁই, মানের মানুষ।

আমরা সবাই সেই মনের মানুষ খুঁজতে পাগল, সবাই তার দেখা চাই।

জ্যোতি ঠাকুর— তার অর্থ নিজেকে খোঁজা, নিজের অন্তরাত্মার সন্ধান করা?

লালন— নিজেকে খোঁজা মানেই তো অপরকে খোঁজা, অপরকে খোঁজা মানে সকলকে খোঁজা, সকলকে খোঁজা মানে ঈশ্বরের সন্ধান করা। আর… নিজ, অপর অন্তরাত্মা, ঈশ্বর এসব আলাদা কিছু নয়, সবই এক, অভিন্ন।

জ্যোতি ঠাকুর— মনে হয় সর্বেশ্বরবাদ, প্যানথিজম, সর্বত্র ঈশ্বর বিভাজিত, সব কিছুতেই তার আমোঘ উপস্থিতি—

এটা উপনিষদে আছে। ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ…

লালন— উপনিষদে কি আছে আমি জানিনে, আমি মুখ্যু-মানুষ। তবে এটুকু বুঝি, মনের মানুষের খোঁজা মানে ঈশ্বরের খোঁজ নয়, তার চেয়ে আরো বড়ো কিছুর সন্ধান! নিজের ভেতর, নিজের দেহের ভেতর, নিজের অন্তরের ভেতর জোছনার আলোর খোঁজ করা ঈশ্বরকে খোঁজার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ। তার চেয়ে আরো কঠিন হলো, মনের মানুষের সাক্ষাৎ।

জ্যোতি ঠাকুর— আপনার তত্ত্ব বুঝতে আমার একটু অসুবিধে হচ্ছে। একবার মনে হয় বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি, তার পরেই মনে হচ্ছে আপনি যেন আগের জায়গা থেকে সরে গেলেন।

লালন— মনের মানুষের ব্যাপারটা আসলেই তাই। এই দেখা দেয় তো আবার দেখা দেয় না।

    কে কথা কয় রে দেখা দেয় না,

    নড়ে চড়ে হাতে কাছে খুঁজলে জনম-ভর মেলে না।

জ্যোতি ঠাকুর— আমি ক্রমশ আপনার ভাবনা-চিন্তার বিষয়ে আগ্রহ বোধ করছি। আচ্ছা, এবার আপনার জীবনের পরের গল্পটা বলুন, তারপর?

দৃশ্য : সতেরো

লোকেশান : নদীর বাঁধ/হাট

সময় : বিকেল

(ফ্লাশব্যাক শুরু)

কবিরাজ তাঁর দলবলসহ নদীর বাঁধের ওপার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাছেই একটা হাঁটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ওদের দলে পাঁচজন প্রৌঢ়, বাউল দাসের স্ত্রী, দাসী বীণা এবং সহ দুজন মহিলা, দুজন বৃদ্ধ, তিনজন মালবাহক যুবক, চারজন কাহার, যদু পাইকসহ তিনজন লাঠিয়াল, লালন এবং কবিরাজ স্বয়ং। কবিরাজ দলের প্রধান। অন্য সঙ্গীরা তার আত্মীয়, বন্ধু এবং কর্মচারী। কবিরাজের স্ত্রী এবং আর একজন বয়স্ক মহিলা পালকিতে যাচ্ছে। কবিরাজের সঙ্গে তাঁর প্রিয় ঘোড়া মানিকচাঁদ রয়েছে। তিনি ক্লান্ত বোধ করলে ঘোড়ায় চাপছেন, কখনও বা বৃদ্ধদের কাউকে চাপিয়ে অন্যদের সঙ্গে নিজে হেঁটে যাচ্ছেন।

ওঁরা হাটে এসে কিছু খাবার-দাবার ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনে একটা ফাঁকা-জায়গা নির্দিষ্ট করে সেখানে রাত কাটাবার আয়োজন করলেন। কবিরাজের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তে তিনি লালনকে নিয়ে আবার হাটের ভেতর ঢুকলেন। তখন প্রায় ভাঙাহাট। সামান্য কিছু লোক এপাশ-ওপাশ থেকে কেনাবেচা শেষ করে যে যার ধামা বা ঝোলা নিয়ে ঘরে ফিরছে। কবিরাজ বয়স্ক মানুষ। তাঁর দ্রুতবেগে হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে। তিনি লালনের হাতে একটা পয়সা দিয়ে নুন আনতে পাঠিয়ে নিজে তার পেছন পেছন এগিয়ে গেলেন। লালন এক দৌড়ে একটা ছাপরা-দোকানে ঢুকল। দোকানদার নুন-মাপা শেষ করে একটা শালপাতায় মুড়ে তার হাতে দিল। ততক্ষণে কবিরাজ তাঁর ব্যক্তিগত জিনিস কিনে নুনের দোকনে এলেন। তিনি দোকানদারের দিকে এক নজর তাকিয়েই বিরক্ত হয়ে গর্জে উঠলেন।

কবিরাজ— তুমি তো আচ্ছা বেআক্কেল লোক। এই অবস্থায় হাটে এয়েছ! তোমার মুখে ‘মায়ের দয়া’ এখনও শুকায়নি। আচ্ছা লোক তো, বাজে লোক। এই লালন, নুন ফেল্, ফেলে দে!

দোকানদার— আরে মশাই, চেঁচান কেন? আমার মায়ের দয়া সেরে গেছে গো, শুকিয়ে গেছে, এখন কোন ভয় নেই।

কবিরাজ— শুকিয়ে গেছে বলেই তো ভয়। ওই শুকনো চামড়া উড়ে এসেই তো সব্বনাশ ঘটায়ে দিতে পারে। (পজ) লালন, নুন ফেলে দে!

লালন ইতস্তত করে। তার হাতের নুন হাতেই থাকে। সে একবার দোকানদারের মুখের দিকে, একবার কবিরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে ঘটনার মর্ম উদ্ধার করতে চেষ্টা করে। সে এখনও ছেলে মানুষ। বসন্ত রোগ সম্পর্কে তার বিশেষ কোন ধারণা নেই।

দোকানদার— আর কোথাও নুন পাবেন না। এই বাজারে একা আমিই নুন বেচি। মায়ের দয়া হোক না হোক আমার কাছেই আসতে হবে। ও নুন ফেলে দিলে আলুনি খেতে হবে। দ্যাশে এখন নুনের আকাল, নুনের জন্যি খুন-খারাবি, মারামারি-রাহাজনি চলছে, তা জানেন না?

কবিরাজ দোকানদারের দিকে কয়েক পলক তীব্র-দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর লালনের পিঠে খোঁচা মেরে বললেন— চল… আর উপায় কি, (চাপাকণ্ঠে) ব্যাটা খচ্চর!

দৃশ্য : আঠারো

লোকেশান : হাটের পাশে চাতাল

সময় : শেষ রাত

দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে তীর্থযাত্রীদের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। রাতের শেষ প্রহর। দূরে কোথাও মোরগ ডেকে উঠলো। দু-একটা পাখির ডাক শোনা গেল। লালনের ঘুম ভেঙে যায়। সে আস্তে আস্তে উঠে বসে, আবছা অন্ধকারে চারপাশে তাকায়। সবাই তখনও নিদ্রাময়। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাঁটতে শুরু করে। আপন মনে মাথা ঝাঁকায়, বিড় বিড় করে— ভালো লাগছে না, যাবো না, গঙ্গা-দর্শনে যাবো না। পালিয়ে যাবো। লালন সতীর্থদের ঘুমন্ত অবস্থায় শেষবার দেখে নিয়ে দ্রুত পা চালায়।

ঠিক তখন কবিরাজ ঘুম থেকে জেগে উঠে বসলেন। হাঁকডাক করে অন্যদের ঘুম থেকে জাগালেন। লালনকে দেখতে না পেয়ে বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গেলেন। এদিকে ওদিকে বেশ জোরে ডাক দিলেন— লালু, লালন, কোথায় গেলি?

লালন চলতে চলতে থমকে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে এক মুহূর্তভাবে। তারপর আবার মাথা ঝাঁকায়। নিজের মনে বলে— না গঙ্গারে আমি ছাড়তে চাইলেও গঙ্গা আমারে ছাড়বে না।

লালন আবার দলে ফিরে আসে। যাত্রার তোড়জোড় আরম্ভ হয়। কিছুক্ষণেল মধ্যেই ওরা আবার পথে নামেন।

তখনও সূর্য ওঠেনি, আবছা অন্ধকার। সামনের দিক থেকে তখন দুই ইংরেজ সাহেব আর তাদের বাঙালি পার্শ্বচরের একটা দল এগিয়ে আসছে। সাহেব দুজন ঘোড়ায় আর বাঙালি কর্মচারীরা ওদের পেছন পেছন হেঁটে আসছে। বাউল দাসদের বড়সড়ো দলটাকে দেখে সাহেব দুজন চাপাকণ্ঠে কিছু বলাবলি করে।

সাহেব— কান্ত বাবু, ওরা কে, হু আর দে, ওরা কি ডাকাইত?

কান্ত বাবু— স্যার, ওরা তীর্থযাত্রী (পজ) পিলগ্রিম।

প্রথম সাহেব— মাই গড! ফকির, সন্ন্যাসী-রিবেল। (সাহেব কোমর থেকে পিস্তল বের করে হাতে নেয়।)

কান্ত বাবু— মনে হয় না স্যার। ওদের সঙ্গে পালকি আছে, পালকিতে মেয়েরা আছে বলে মনে হয়… স্যার, ওরা ধর্ম করতে যাচ্ছে। তীর্থে যাচ্ছে। ওরা ফকির-বিদ্রোহী নয়, আই অ্যাম সিওর স্যার…

দ্বিতীয় সাহেব— আর ইউ সিওর? বাট তোমরা এত পায়াস ধর্ম ধর্ম করো, কিন্তু দেশকে ভালোবাসো না, তোমরা একটু দুষ্ট আছো, একটু বদমাইশ আছো…

কান্ত বাবু— স্যার, যা বলেছেন, ইউ আর রাইট স্যার।

প্রথম সাহেব— কেন, রইট, রাইট কেন, তুমি প্রটেস্ট করো, তুমি দেশকে ভালোবাসলে প্রটেস্ট করো।

কান্ত বাবু— (আমতা আমতা করছে) স্যার, আমরা একটু দুষ্ট আছি আমরা দেশকে—

দ্বিতীয় সাহেব— ভালোবাসো কি বাসো না, ইয়েস অর নো?

কান্ত বাবু— স্যার, আমি গরিব মানুষ…

প্রথম সাহেব— ননসেন্স। গরিব লোক দেশকে ভালোবাসবে না? তোমরা বজ্জাত আছো।

কান্ত বাবু— স্যার, আমরা একটু বজ্জাত… বাট ফকির-রিবেলরা কি দেশকে ভালোবাসে বলে মনে হয় না, স্যার?

দ্বিতীয় সাহেব— বাট দে আর রিবেল, ডাকাইত, টেররিস্ট।

কান্ত বাবু— ইয়েস স্যার, দে আর টেররিস্ট, বাট দে লাভ দেয়ার মাদারল্যান্ড।

প্রথম সাহেব— কান্ত বাবু, ইউ আর সাপেটিং দেম, ইউ আর সাপেটিং দি টেররিস্টস!

কান্ত বাবু— নো স্যার আই অ্যাম সাপোটিং ইউ, বাট এ দেশের মানুষ দেশকে ভালোবাসে কি না…

দ্বিতীয় সাহেব— ভালোবাসে? ইয়েস অর নো।

কান্ত বাবু— আই অ্যাম নট সিওর স্যার, টাইম উইল সে…

দ্বিতীয় সাহেব— ইউ আর…

কান্ত বাবু— আই অ্যাম ইওর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।

দুই সাহেব পরস্পরের দিকে তাকাল। কান্তবাবু কঠিন-মুখে একবার ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল। ততক্ষণে কবিরাজের দল সাহেবদের কাছাকাছি এসে গেছে। কবিরাজ সাহেবদের দেখে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালেন। সাহেবরা কবিরাজ এবং তার দলবলেকে তীক্ষè-দৃষ্টিতে লক্ষ করতে করতে ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল।

দৃশ্য : উনিশ

লোকেশান : পথের পাশে নাটমন্দির

সময় : দুপুর

করিবাজের দল দূরে একটা গ্রামে নাট-মন্দির দেখে সেখানেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া এবং বিশ্রামের জন্যে এগিয়ে যায়। ওরা নাট-মন্দিরের কাছে এলে মহিলারা পালকি থেকে নামে। কিছু জিনিসপত্র নামানো হয়। দু-একজন নাট-মন্দিরের ধাপিতে বসে আড়মোড়া দিয়ে শরীরের ক্লান্তি মোচনের চেষ্টা করে। কবিরাজ নাট-মন্দিরের পাশটা ভালো করে ঘুরে দেখে নিশ্চিত হলেন, এখানেই দুপুরের আহার-বিশ্রাম চলতে পারে। তিনি জলের খোঁজ নিতে অন্যদের হাঁক-ডাক করে নির্দেশ দিতে লাগলেন। নিজেও একটু এগিয়ে দেখতে চেষ্টা করেন। কম বয়সি ছেলেরা খোঁজাখুঁজি করতে করতে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কবিরাজ তার এক সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করতে তাকে ইশারায় কাছে ডাকেন। সে কবিরাজের কাছে এগিয়ে যায়।

কবিরাজ— ব্যাপারটা কি বলতো? জন-মুনিষ্যির চিহ্ন নেই! গাঁয়ের লোকজন গেল কোথায়? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

সঙ্গী— তাইতো দেখছি, কিছু ঘটল না তো?

কবিরাজ— ঘটতে কতক্ষণ, যা দিনকাল, ফকির-বিদ্রোহীরা চারিদিক তোলপাড় করে ফেলেছে…

দূর থেকে যদু পাইক ছুটে আসতে থাকে। তাকে ওভাবে আসতে দেখে কবিরাজ এবং তার সঙ্গী তার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়।

যদু পাইক— কবিরাজ মশাই তাড়াতাড়ি গোটান, বিরাট বিপদে পড়ে গেছি!

কবিরাজ— কি বিপদ, কি হলো?

যদু— ওপাশে এক সাহেব আর তিন সেপাইকে কারা যেন খুন করে রেখে গেছে।

কবিরাজ— সে কিরে! নির্ঘাত ফকির-বিদ্রোহীদের কা- এসব। এক্ষুণি পুলিশ আসবে। চল্ পালা, তাড়াতাড়ি গোটা। (পজ) আমরা বোধ করি ভুল সময়ে এসে পড়লাম।

ওরা তিনজন দ্রুত পায়ে লাশের কাছে গেল। একজন সাহেব আর তিনজন ভারতীয় সেপাইয়ের মৃতদেহ একটা ঝোঁপের আড়ালে পড়ে রয়েছে। খুব সম্ভব আজ ভোর রাতেই তাদের হত্যা করা হয়েছে।

কিছু একটা অনুমান করে লালন আড়ালে থেকে কবিরাজদের অনুসরণ করছিল। ওরা ফিরে আসতেই লালন ঝোঁপের কাছে গিয়ে লাশগুলো খুঁটিয়ে দেখল। তারপর শ্লথ পায়ে ফিরে আসতে আসতে বিড়বিড় করে— খাঁচার পাখি খাঁচা ভেঙে…

কবিরাজের দল আবার জিনিসপত্র গুছিয়ে ওই এলাকা ছেড়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে পালিয়ে যায়।

দৃশ্য : কুড়ি

লোকেশান : নওদা

সময় : বিকাল

কবিরাজের দলের সঙ্গে আরো দুটি দল যুক্ত হয়েছে। সকলে মিলে হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট নদী বা খালের পাড়ে এসে দাঁড়ায়। নদীতে হাঁটুজল। লোকজন পায়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছে। ওরা ওপারে যাওয়ার জন্যে নদীতে নামে। পুরুষদের একটা দল সবার আগে, তারপর মহিলাদের পালকি, পালকির পেছনে ঘোড়ার ওপর কবিরাজ, তার পেছনে যদু পাইক, লালন এবং বয়োবৃদ্ধরা, তাদের পেছনে পরপর অন্য দলের লোকেরা। নদীর মাঝামাঝি আসতে হঠাৎ মানিকচাঁদ বিশ্রীভাবে অতিদ্রুত পেছন ঘুরে দাঁড়ায়। কবিরাজ ঝটকা সামলাতে না পেরে জলে পড়ে গেলেন। কবিরাজ কোনো রকমে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালেন।

কবিরাজ— কি হলো রে যদু?

যদু পাইক— তাই তো, ঘোড়াটা এমন করলো কেন! দেখতো লালু?

লালন ঘোড়ার কাছেই ছিল। সে ঘোড়ার গায়ে হাত বুলাতে লাগে। তারপর আস্তে আস্তে ঘোড়াটাকে টেনে ওপরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘোড়া একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুতেই সামনে এগোতে চায় না। লালন কিছু বুঝতে না পেরে এক-পা দু-পা করে সাবধানে এগিয়ে বুঝতে চায়, জলের তলায় চোরা গর্ত আছে কি না। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ায়। পায়ের সঙ্গে নরম কিছুর ধাক্কা লেগেছে। সে নিচু হয়ে দু-হাত জলে নামায়। একটু একটু করে জলের তলা থেকে একটা য্বুতীর লাশ তুলে আনে। লাশের কোমরের সঙ্গে দড়ি দিয়ে কলসি বাঁধা।

দলের সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জলেই দাঁড়িয়ে থাকে। কবিরাজের সম্বিত ফিরতেই তিনি চাপাকণ্ঠে নির্দেশ দেন।

কবিরাজ— লাশ ফেলে দে, পালা, তাড়াতাড়ি! (পজ) কোন দ্যাশে যে আছি…

লালন একমুহূর্ত দ্বিধা করে, কবিরাজের দিকে তাকায়, যদু পাইকের দিকে তাকায়, যদু তাকে লাশ ছেড়ে দিতে ইঙ্গিত করে, সে জলের লাশ জলে ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ওরা সবাই যথাসম্ভব দ্রুত নদী পেরিয়ে ওপারে যায়।

দৃশ্য : একুশ

লোকেশান : গঙ্গার ঘাট

সময় : প্রত্যুষ

পুণ্যার্থীরা যে যার সাধ্যমতো পুণ্যার্জনের আশায় গঙ্গায় পয়সা ছুঁড়ে মারছে। কয়েকটা ভিখারি ছেলে-মেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে, কখনও জলে ডুবে হাতড়ে হাতড়ে জল কাদাসহ সে পয়সা তুলে আনছে। এভাবে পয়সা কুড়াতে গিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝে মারামারি করছে। কখনও একজন আরেক জনকে সাহায্য করছে। পুণ্যার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ মজা দেখার জন্য বেশ একটু দূরে পয়সা ছুঁড়ে ফেলছে। সেসব ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বড়ো ছেলেমেয়েরা পয়সা তুলতে জলে ডুব দিচ্ছে।

গঙ্গার ঘাটে প্রচ- ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে অজ¯্র পুণ্যার্থী গঙ্গা-¯œানের উদ্দেশ্যে এখানে জড়ো হয়েছে। এছাড়া অন্তর্জলির জন্যে বেশ কিছু অতিবৃদ্ধ মানুষকে বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছে। তাদের সঙ্গীরা বৃদ্ধের পা থেকে কোমর অবধি গঙ্গার জলে ডুবিয়ে শরীরের বাকি অর্ধেক তীরে রেখে তাদের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। এই সব দলের সঙ্গে অনেক পুরোহিত রয়েছে। তারা যেন পরস্পরকে টেক্কা দিতে তারস্বরে মন্ত্র পাঠ করছে।

ঘাটের আর এক দিকে দূরান্তের যাত্রীরা কলসি ভরে গঙ্গাজল নিচ্ছে। কাছের লোকেরা পেতল-কাঁসার ঘটিতে, কেউবা মাটির ছোট ঘড়ায় জল ভরে নিচ্ছে। এপাশেও প্রচুর ভিড়।

অন্যদিকে ¯œানার্থীরা দলে দলে পুণ্য¯œান সম্পন্ন করছে। কবিরাজের দল ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল, ¯œান করল এবং অনেকগুলো কলসিতে গঙ্গাজল ভরে নিল।

দৃশ্য : বাইশ

লোকেশান : গঙ্গাপাড়ে ছাপরা ঘর

সময় : সকাল

লালন আর যদু পুরুষদের ঘর বা মালপত্র পাহারায় রয়েছে। পাশেই মহিলাদের ঘর পাহারা দিচ্ছে বীণা আর তার সঙ্গে অন্য একজন পরিচারিকা। কবিরাজ দলবলসহ ফিরে এলে ওরা চারজন তারপর গঙ্গা¯œানে যাবে, এমন ব্যবস্থা হয়েছে।

ভোরের হালকা সূর্যের আলোয় চারিদিকে ঝিকমিক করছে। যদু পাইক ঘরের সামনে লাঠি নিয়ে পায়চারি করছে।

লালন তখনও ঘুম থেকে জাগেনি। যদু একবার আকাশের দিকে তাকায় তারপর মৃদু স্বরে লালনকে ডাকে।

যদু পাইক— কিরে লালু, ঘুম ভাঙলো, উঠে আয়।

লালন আসছে না দেখে সে ওপাশে দাঁড়ানো বীণার দিকে তাকায়।

যদু পাইক— ছোঁড়াটাকে ডাক তো বীণা, এখনো জাগেনি, কবিরাজ মশাই এসে দেখলে রাগারাগি করবে।

বীণা ঘরের ভেতর ঢোকে। আস্তে আস্তে লালনের কাছে গিয়ে তার গায়ে খোঁচা মারে।

বীণা— এই যে, ও কবিয়াল, জাগো! (পজ) এ কি, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে! (কপালে হাত দেয়) কি সব্বনাশ! তোমার যে মায়ের দয়া হয়েছে। দ্যাখ কপাল! মায়ের কোল ফাঁকা করে ছেলেটারে নিয়ে এলো, এখন কি হবে! (পজ) ও যদুদা, দেকে যাও, কি কা-!

যদু পাইক— (ঘরে ঢুকতে ঢুকতে) কি হলো?

ইতোমধ্যে কবিরাজ তার দলবল নিয়ে সাময়িক আস্তানায় ফিরে এলেন। যদু অস্থিরভাবে তার কাছে এগিয়ে গেল।

যদু পাইক— কবিরাজ মশাই বিরাট বিপদ!

কবিরাজ— কেন, কি হলো রে?

যদু পাইক— লালুর মায়ের দয়া হয়েছে। সারা-গায়ে আর পিঁপড়ে বসারও জায়গা নেই।

কবিরাজের সঙ্গী-সাথীরা যে যার মতো আহা-উহু করতে করতে ঘরের পাশ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ায়।

কবিরাজ— এখন কি করি বল তো, যদু।

যদু পাইক— তাইতো ভাবছি। একে ছাড়াও যাবেনা, সাথে নিয়ে ফেরাও যাবে না।

কবিরাজ— এক কাজ কর, আশেপাশে বদ্যি-কবিরাজ যাকে পারিস তাকে ধরে নিয়ে আয়। আমার কাছে এখন তো ওষুধ-পথ্য কিছু নেই। অবশ্যি এ রোগের ওষুধ হয় না, তবু মনের সান্ত¡না। (পজ) মহাবিপদে পড়লাম।

যদু পাইক বদ্যির খোঁজে বেরিয়ে গেল।

দৃশ্য : তেইশ

লোকেশান : গঙ্গার ঘাট

সময় : সন্ধ্যা

কবিরাজ অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। যদু পাইক গঙ্গার দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দলের বয়স্ক সদস্যরা যে যার মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। দু-একজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করছে।

কবিরাজ— বল, তোমরা বল, এখন কি করি?

রাঘব দত্ত— মনে হয় দু-এক দিনের মধ্যেই যা হবার তা হয়ে যাবে।

যদু পাইক— এসপার-ওসপার কিছু একটা না হওয়া পর্যন্ত ওকে তো এভাবে ফেলে যেতে পারি না।

বৃদ্ধ নিশিকান্ত— সে তো ঠিক কথা, যাই হোক না কেন গাঁয়ের ছেলে, জন্ম থেকে চিনি, জানি।

কবিরাজ— ঠিক, ছোঁড়াটারে বিদ্যাশ-বিভুঁয়ে এমন করে ছেড়ে যাওয়া চলে না। কিন্তু আসল কথা হলো, আজকালের মধ্যেই ওর হয়ে যাবে। আমি ওর মায়ের কাছে কি জবাব দেবো!

নিশিকান্ত— কপালের লিখন কে খ-াবে, কবিরাজ মশায়।

কবিরাজ— ঠিক কথা। ঠিক আছে, তবে এখন অন্য ব্যবস্থা করা লাগবে।

রাঘব দত্ত— কি ব্যবস্থা?

কবিরাজ— আরে মরার আগে ওর মুখে তো একটু গঙ্গাজল দেয়া দরকার। সেটাই বা কে দেবে, ওর ধারে-কাছে যাবে কে এখন? (পজ) দ্যাখ তো যদু, কাউকে পাস কিনা, দু-চার পয়সা লাগে আমি দেব।

যদু পাইক— দু-চার পয়সায় ওকাজে কেউ রাজি হবে না।

বীণা আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল, সে এবার একটু এগিয়ে এসে কবিরাজের মুখোমুখি হয়।

বীণা— ওসব পয়সার হিসেব-নিকেশ থাক। যতক্ষণ ওর শ্বাস আছে আমিই দেখভাল করবো।

কবিরাজ— তুই!

রাঘব দত্ত— বলিস কি রে? তোরও তো মায়ের দয়া হবে!

বীণা— হোক, মানুষ একবারই মরে।

দৃশ্য : চব্বিশ

লোকেশান : ছাপরা ঘর/গঙ্গার ঘাট

সময় : সকাল

ছাপরা ঘরের কাছে কবিরাজের দলের সবাই জড়ো হয়েছে। ভেতর থেকে লালনের যন্ত্রণার্ত চাপা গোঙানি শোনা যাচ্ছে। ঘরের বাইরে ওরা লালনের মৃত্যুর জন্যে যেন অধীর হয়ে আছে। কারণ লালন না-মরা পর্যন্ত ওরা বাড়ি ফিরতে পারছে না।

কবিরাজ কোমরের পেছনে হাত বেঁধে স্থির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অন্য সবাই উশখুস করছে। কারো মুখে কথা নেই। ঘরের ভেতর থেকে ক্রমশ বিদঘুটে আওয়াজ আসতে থাকে। ধীরে ধীরে আওয়াজ পালটে যায়, এখন ঘড়-ঘড় শব্দ ভেসে আসে। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ শব্দ থেমে যায়। কবিরাজ দরোজার সামনে গিয়ে উঁকি মারেন। অন্য সবাই যে যার জায়গা ছেড়ে দরোজার সামনে এসে জড়ো হয়। কয়েক মুহূর্ত চাপা উত্তেজনায় কাটে। ধীরে ধীরে, প্রায় টলতে টলতে বীণা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। দরোজায় হেলান দিয়ে সে যেন আকারণে আকাশের দিকে তাকাল।

বীণা— হা ঈশ্বর!

সবাই প্রায় একই সঙ্গে উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল— কি হলো?

বীণা— হয়ে গেছে।

বীণা কারোর দিকে না তাকিয়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। একটু একটু করে জলে নামল। হাঁটু-জল অবধি নেমে সে প্রায় আকারণে ঝাঁপ দিল। কবিরাজ জলের কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন— এই ওরে ধর, ওরে ধর। মেয়েটারে তুলে আন। ও মায়ার বন্ধনে বান্ধা পড়িছে।

বাউলের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চার কাহার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীণাকে তুলে আনে। বীণা হাত-পা শিথিল করে প্রায় মৃতের মতো পড়ে থাকে।

দৃশ্য : পঁচিশ

লোকেশান : ছাপরা ঘর

সময় : সকাল

কবিরাজ কিছুটা বিভ্রান্ত। শুধু তিনি নন, দলের সবাই কমবেশি বিভ্রান্ত এবং চিন্তাগ্রস্ত কবিরাজ সকলের দিকে একবার তাকিয়ে সিদ্ধান্ত করতে চেষ্টা করেন।

কবিরাজ— যদু গেল কোথায়?

বৃদ্ধ হারাধন— ওপাশে বসে আছে।

কবিরাজ— মহাবিপদে পড়ে গেলাম। দেহ সৎকার করতে হবে। লোক কোথায় পাব। কেউ তো এ লাশ ছুঁতে চাইবে না।

নিশিকান্ত— এ দেহ দাহ করা যাবে না। পুঁতে দিতে হবে।

রাঘব দত্ত— পুঁতে দিতে হলেও তো লোক চাই। মাটি খুঁড়তি অনেক সময় লেগে যাবে, তাছাড়া কোম্পানি বাহাদুর নাকি নতুন আইন করিছে, বাজারে-ঘাটের কাছে এসব লাশ দাহ করা যাবে না। দূরে কোনও জায়গায় দাহ করতি হবে।

কবিরাজ— দ্যাখো তো, সবাই মিলে দ্যাখো। পয়সা-কড়ি যা লাগে দেবো। হিঁদুর ঘরের ছেলে, সৎকার না-করে ছেড়ে যাওয়া যায় না। মহাপাতকীর কাজ হবে।

নিশিকান্ত— চলো দ্যাখি, পয়সা দিলি বাঘের দুধ মেলে, এ তো সামান্য ব্যাপার।

ওরা সবাই মিলে লোকের খোঁজ করতে একটু এগিয়ে যায়। তখন তিনটে ভিখারি ছলে ওদের লক্ষ করে এগিয়ে আসে। ওদের বয়স পনেরো-ষোলো বছরের মধ্যে।

প্রথম ছেলে— কিছু লাগবে বাবু?

হারাধন— লাগবে, কিন্তু তোরা কি পারবি?

দ্বিতীয় ছেলে— বলে দ্যাখেন না, আমরা পারি না এমন কোন কাজ নেই।

নিশিকান্ত— বটে! একটা মড়া আছে। পুঁতে দিতি পারবি?

তৃতীয় ছেলে— কিসের মড়া?

কবিরাজ— একটু ঝামেলার ব্যাপার আছে।

প্রথম ছেলে— খুন?

কবিরাজ— আরে ব্যাটা না, খুনটুন না মায়ের দয়া।

তৃতীয় ছেলে— ওরে বাপ, এতো খুনের চেয়ে বেশি। পারবো না।

হারাধন— আরে দ্যাখ না, তোরা যা চাস, যা পয়সা লাগে দোবো।

দ্বিতীয় ছেলে— মোটা টাকা লাগবে।

কবিরাজ— কত?

প্রথম ছেলে— জানো তো, কোম্পানির আইন, ঘাটের ধারে ওসব মড়া সৎকার করা যাবে না। ধরতে পারলে পিটিয়ে আমাদেরই মড়া বানিয়ে ছাড়বে।

কবিরাজ— ঠিক আছে একটু দূরে গিয়ে পুঁতবি। (পজ) কত লাগবে বল?

তৃতীয় ছেলে— দশ টাকা।

কবিরাজ— কি বলিস! দশ টাকায় দশ বিঘা জমি মেলে। যা ভাগ দরকার নেই।

প্রথম ছেলে— ঠিক আছে, ঠিক আছে যা ভালো মনে করেন, দেবেন। আমরা গরীব-দুঃখী বলে এমন কাজ করি, নইলে সারা মুর্শিদাবাদে একজনও এ মড়া ছোঁবে না।

নিশিকান্ত— ঠিক আছে, চল বাবারা চল। তোদের সন্তুষ্ট করে দেবো।

দ্বিতীয় ছেলে— কিন্তু একটা কথা, লাশ পোঁতা যাবে না, তাতে অনেক সময় লেগে যাবে। একটা কাজ করেন, পুরোনো মশারি থাকলি দেন, আমরা একটা কলাগাছের ভেলা বানায়ে লাশটা মশারির ভেতর ঢুকায়ে ভাসায়ে দেবো।

কবিরাজ— মশারি আছে, দিচ্ছি। যদু, মশারি আন। (পজ) ভালো বুদ্ধি হয়েছে, কয়েক মুহূর্তে কাজ শেষ হয়ে যাবে। যা বাবারা, তোরা তবে লাশের সদগতি করে পয়সা নিয়ে যাস। আমরাও পালায়ে বাঁচি। এই, তোরা গোছগাছ কর, এক্ষুণি রওনা হবো। তৈরি হও।

দৃশ্য : ছাব্বিশ

লোকেশান : লালনের বাড়ি/ভোরাই নদীর ঘাট (মন্তাজ)

সময় : সকাল/দুপুর

কবিরাজ গ্রামে ফিলে লালনের মৃত্যু সংবাদ জানায়। এমন দুঃসংবাদ শোনার পর তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াবশত পদ্মাবতী জ্ঞান হারায়। লালনের স্ত্রী ঘটনার আকস্মিকতায় পাথরের মতো প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

তারপর যথাসময়ে লালনের স্ত্রী গোলাপিকে পাড়ার বিধবা মহিলারা নদীর ঘাটে নিয়ে গেল। তার হাতের শাখা ভেঙ্গে, সিঁদুর মুছে বিধবার বেশে সাজিয়ে দিল। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই লালনের কিশোরী স্ত্রী বিধবার বেশ পরে নদীর ঘাট থেকে ঘরে ফিরে এল।

দৃশ্য : সাতাশ

লোকেশান : গঙ্গার পাড়

সময় : ঊষাকাল

তিনচারজন মহিলা ভোরবেলা নদীর ঘাটে এসে ¯œান করতে জলে নামে। তাদের ¯œানের মাঝপথে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ শুনে একজন ভয় পেয়ে চিৎকার করে জলছেড়ে ডাঙায় ওঠে। তার দেখাদেখি অন্যেরাও তাকে অনুসরণ করে। তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। ওরা চারপাশে তীক্ষè-নজর মেলে দেখতে চেষ্টা করে। নদীর জলে একটা কলাগাছের ভেলা। ভেলার ওপর মশারি খাটানো। মনে হচ্ছে তার ভেতর একটা লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে গাঁয়ের মানুষেরা সাঁপেকাটা লাশ এমন করে ভাসিয়ে দেয়। ওদের একজন একটু সাহস করে ভেলার দিকে এগিয়ে গেল। মশারির ভেতর লালনের প্রায়-নগ্ন বিকৃত শরীরটা দেখে সে পেছনে তাকায়। অন্য মহিলারা তখনও দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সময় জোলাদের বউ রাবেয়া, পাড়ায় যার ধাই হিসেবে পরিচিতি রয়েছে, সে ¯œান করতে ঘাটে আসছে। তাকে দেখে লাশের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা এগিয়ে যায়।

কুলসুম— রাবেয়াবু, একটা জোয়ান ছেলে, মনে হয় এখনও মরেনি।

জুলেখা— হ্যাঁ, গোঙানি শুনতে পাচ্ছি।

রাবেয়া— চল্, দেখি তো।

ওরা এগিয়ে চলে। রাবেয়া এবং কুলসুম সকলের আগে, অন্য সবাই ভয়ে ভয়ে ওদের অনুসরণ করছে। রাবেয়া কিছুটা দ্বিধায় সতর্ক পায়ে লালনের খুব কাছে এগিয়ে যায়। লালন মড়ার মতো পড়ে আছে। রাবেয়া তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে দেখতে থাকে। ঠিক তখন লালন খুব অস্পষ্ট শব্দে কাতরে ওঠে আহ…

রাবেয়া— এখনও বেঁচে আছে। ধর, বাড়ি নিয়ে যাই।

কুলসুম— বলিস কি, এ তো বসন্ত রুগি! এ কি বাড়ি নেয়া যায়? সারা পাড়া শুদ্ধ উজাড় হয়ে যাবে, মড়ক লেগে যাবে।

রাবেয়া— তা যাক, তাই বলে একটা জ্যান্ত-মানুষ চোখের সামনে মরে যাবে, তাই কখনও হয়? নে ধর।

এবার কুলসুম সবার আগে লালনের পায়ের দিকটা টেনে তোলে। তার দেখাদেখি অন্য সবাই এগিয়ে আসে। শুধু একজন মহিলা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। সে ছাড়া অন্য সবাই ধরাধরি করে লালনকে নদীর পাড় থেকে রাবেয়ার বাড়ির দিকে নিয়ে যায়।

দৃশ্য : আটাশ

লোকেশান : রাবেয়ার ঘর

সময় : রাত

ঘরের ভিতর একটা ছোট লম্ফ জ্বলছে। রাবেয়া আর তার স্বামী শুয়ে শুয়ে কথা বলছে। লম্ফের মৃদু আলোয় দরিদ্র পরিবারের নিতান্ত নগণ্য আসবাবপত্র চোখে পড়ে।

রাবেয়ার স্বামী— কোত্থেকে একটা বসন্তরুগি টেনে আনলে, পাড়ার লোক উল্টোপাল্টা কইছে…

রাবেয়া— ছাড়ো তো পাড়ার লোক, আমি কি পাড়ার লোকরে খাজনা দিয়ে চলি নাকি! একটা মানুষ অঘাটায় পড়ে মরে যাচ্ছে দেখে নিয়ে এলাম, এই তো ব্যাপার। এর মধ্যি আবার উল্টা-পাল্টা কথার কি আছে?

রাবেয়ার স্বামী— এ রোগ মারাত্মক ছোঁয়াচে, যদি তোর-আমার কারো হয়।

রাবেয়া— হলে হবে। মহম্মদপুরে তোতা মিয়া একখান গান লিখছে জানো—

                ‘জনম আছে হাতে লিখা, মরণ লিখা পায়।

                যার যেখানে মরণ আছে হাইটা সেথা যায়’

তোমার আমার যদি বসন্ত রোগে মরণ হবার থাকে তো হবে। ভয়ের কি আছে?

ওদের ঘরের বারান্দার এককোণে পুরোনো শাড়ি দিয়ে একটা মশারির মতন বানিয়ে লালনকে সেখানে রাখা হয়েছে।

রাবেয়াদের কথার মাঝে লালন কাতরে ওঠে। রাবেয়া বিছানা ছেড়ে লম্ফ নিয়ে তার কাছে যায়।

রাবেয়া— কি, কি হলো, পানি খাবা?

লালন— মা…

রাবেয়া— (কপালে হাত বুলায়) হ্যাঁ বাপ, আমিই তোর মা। আমার তো ছেলেপুলে নেই; আল্লা তোরে আমার কাছে পাঠাইছে। (পজ) কও বাপ, পানি খাবা?

লালন— খিদে লাগছে।

রাবেয়া— খুব ভালো কথা, খিদে লাগা মানে তুমি ভালো হয়ে যাচ্ছো। একটুখানি বোসো, আমি দুধ নিয়ে আসি।

রাবেয়া একটা পেতলের গ্লাসে দুধ নিয়ে ফিরে এসে লালনকে নিজের বুকের কাছে তুলে ধরে তাকে দুধ খাওয়াতে থাকে। রাবেয়া তাকে খাওয়াতে খাওয়াতে কথা বলে।

রাবেয়া— তোমার নাম কি বাপ, কি জাত, তুমি হিঁদু না মোসলমান?

লালন— (খাওয়া শেষ করে) জানিনে মা, মনে নেই…

রাবেয়া— যদি মোসলমান হও তো ঠিক আছে, নইলে হিঁদুর পুত হও তইলে তোমার জাত গেল বাপ।

লালন— (তন্দ্রাচ্ছন্ন কণ্ঠে) জাত কি জিনিস, মা?

দৃশ্য : উনত্রিশ

লোকেশান : রাবেয়ার বাড়ির উঠোন

সময় : সকাল

লালন এখন সুস্থ। তবে তার বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। সারা মুখে হালকা বসন্তের দাগ। তবে তার মুখ কুৎসিত বা বিকৃত হয়নি। সে বাড়ির উঠোনে বসে মাকুতে সুতো তুলছে। রাবেয়ার স্বামী মাকু ঘোরাচ্ছে।

রাবেয়ার স্বামী— পাগল, তোর নাম পরিচয় কিছুই তো বলিস না। কার ছেলে, কোন গেরামে বাড়ি, হিঁদু না মুসলমান, কিছু কও?

লালন— আমার যে কিছুই মনে পড়ে না, বাবা।

রাবেয়ার স্বামী— ব্যাটা বদমাশ, তোর সব মনে পড়ে, খাবার কথা মনে পড়ে, শোয়ার কথা মনে পড়ে, আসল জিনিসটা মনে পড়ে না!

লালন— সব যেন কেমন গুলিয়ে গেল কি যেন সব হয়ে গেল।

রাবেয়া একটা ধামায় করে কিছু চাল, কিছু আনাজ, এক ছড়া পাকা-কলা নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। সে ধামা বারান্দায় রেখে কলার ছড়াটা লালনের দিকে এগিয়ে দেয়। লালন হাতের কাজ রেখে রাবেয়ার কাছে এসে ছড়া থেকে একটা কলা ছিঁড়ে খেতে শুরু করে। রাবেয়া তীক্ষè-দৃষ্টিতে তাকে দেখতে থাকে।

রাবেয়া— পাগলা, মাসখানেক আগে তোরা বহরমপুরে গঙ্গা¯œান করতে এসেছিলি। তোর সাথে যারা ছেলো তারা তোর বসন্ত রোগ হয়েছে দেখে শ্মশান ঘাটে রেখে পালিয়ে যায়। তাইনা, ঠিক কিনা কও?

লালন— কিছু মনে পড়ে না, মা।

রাবেয়া— (একই রকম তীক্ষè-দৃষ্টিতে তাকিয়ে) তুই হিঁদুর ছেলে, ঠিক কি না কও?

লালন— (ম্লান হেসে) মা, আমার যে কিছুই মনে নাই।

রাবেয়া— দ্যাখ পাগলা এখনও সময় আছে, সত্যি কথা কও।

লালন— (হাসতে হাসতে) সময় আছে! কোথায় আছে সময়, সময় কোথায় থাকে? (পজ) আর সময় নেই, মা!

রাবেয়ার স্বামী— তার মানে কি, পাগলা, এ কথার মানে কি?

লালন— বা’জান আমি কথা কইতে পারি, মানে জানি না।

রাবেয়া— (ফুপিঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে) পাগলা, তুই ঘোর বিপদে পড়েছিস, আমারেও বিপদে ফেললি…

লালন— (ফুপিঁয়ে) আপদ বাড়ি, বিপদ ঘর, বিপদ আমার মা, আমি বিপদ নিয়ে ঘর বাঁধিছি, বিপদ বিনে চলতে পারি না।

দৃশ্য : তিরিশ

লোকেশান : গাঁয়ে চ-ীম-প

সময় : সন্ধ্যারাত

রাবেয়াদের গাঁয়ের চ-ীম-পে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কয়েকজন বাউল-ফকির জড়ো হয়েছে। কাছাকাছি এলাকায় বাজনদাররা স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের নিজস্ব ঢোল, খোল, নাল, করতাল ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হয়ে বসেছে। বিশেষ কোন পরব ছাড়াই বাউল-ফকিররা একত্র হলে ওরা এভাবে গান-বাজনায় মেতে ওঠে। সেই সঙ্গে চলে গাঁজা-ভাঙ সেবন।

বাউলরা গাঁজার কলকেতে জোর টান লাগিয়ে ধোঁয়া গিলে কাছের জনকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে গায়ক এবং বাজনদার সকলেই একটু নেশা করে চনমনে হয়। বাজনদাররা খোল-নালে চাঁটি মারতে থাকে। চারপাশে একটু করে গাঁয়ের লোকেরা জমতে শুরু করে।

পাড়ার কয়েকজন মহিলার সাথে রাবেয়া চ-ীম-পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার ঠিক পেছনে লালন। তাদের সামনে-পেছনে আরও অনেক মহিলা-পুরুষ। সবাই চ-ীম-পে গান শুনতে যাচ্ছে। ওরা ম-পে পৌঁছাবার আগেই প্রবল বাজনার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল।

লালন— কারা গাইবে মা?

রাবেয়া— খুব বড় বাউল-ফকিররা এসেছে। সবচেয়ে বড় ফকির হলো, সিরাজ সাঁই (পজ) আমার দেওর হয়। বাড়ি এখেনে না, নদিয়া, কিন্তুক মধ্যে মধ্যে এদিক আসে। আর এদিক পানে এলে আমার বাড়ি আসবেই আসবে।

লালন— সিরাজ সাঁই খুব বড় গায়ক?

কুলসুম— কি বলিস পাগলা! সিরাজ সাঁই এর নাম শুনিসনি?

লালন— না, খালা।

জোবেদা— নাম না শুনে ভালোই হলো, আজকে তার নাম গান সব শুনবি। দেখবি, কেমন জব্বর গায়।

ওরা কথা বলতে বলতে ম-পের কাছে খোলা মাঠে ভিড়ের মধ্যে জায়গা করে বসে পড়ে। বাজনদাররা দ্রুতলয়ে বাজনা বাজাচ্ছে। বাউল-ফকিররা সব উঠে দাঁড়িয়ে নাচছে। তাদের ভেতর একজন নাচতে নাচতে দর্শকদের দিকে একটুখানি এগিয়ে এল। তার চোখের উপর একখানা গামছা জড়ানো। ইচ্ছে করেই যেন সে নিজেকে দৃষ্টির আড়াল করেছে। তার মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। সে বাজনার তালে নাচতে নাচতে গান শুরু করল। গান—

জলের উপর পনি না পানির উপর জল

                (কোরাস) বল খোদা, বল খোদা, বল?

                আলীর উপর কালী

                না কালীর উপর আলী

                (কোরাস) বল খোদা, বল, খোদা বল?

                জমিন তলায় আসমান উপর

                না কি আসমান জমিন সব বরাবর

                (কোরাস) বল খোদা, বল খোদা, বল?

                হিঁদু-পোড়া শ্মশান আর মিয়া-র গোরস্থান

                কাহার থিকে কে ছোটো কও, কার কি অবস্থান

                (কোরাস) বল খোদা, বল খোদা, বল?

গান শেষ হওয়ার আগেই সিরাজ সাঁই নাচতে নাচতে চোখের ওপর থেকে গামছা সরিয়ে ঘোরাতে থাকে। লালন সবিস্ময়ে লক্ষ করে, তার বাড়ির কাছে দেখা সেই বাউলই সিরাজ সাঁই।

দৃশ্য : একত্রিশ

লোকেশান : গাঁয়ের চ-ীম-প

সময় : দিন/রাত

গানবাজনার অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শ্রোতাদর্শকরা যে যার মতো বাড়ির পথে ফিরতে থাকে। রাবেয়া লালনকে সঙ্গে নিয়ে সিরাজ সাঁই-এর কাছে এগিয়ে যায়।

রাবেয়া— চলেন ভাই, বাড়ি চলেন। খাওয়া-দাওয়া করবেন…

সিরাজ সাঁই— আরে ভাবিজান। আপনি কি গান শুনলেন?

রাবেয়া— আপনি ঘরের পাশে গান করবেন আর আমি শুনবো না, তা কি হয়? চলেন…

একজন বাউল এগিয়ে এসে ওদের আলোচনার মধ্যে কথা বলতে শুরু করে।

বাউল— ভাবি, সাঁইজির আজ রাতটা আমি নিয়া গেলাম। সক্কাল বেলা আপনার কাছে পাঠব। (পজ) আমরা আর একটুখানি সেবা করবো তো। (অট্টহাসি) তারপর খাওয়া-দাওয়া।

রাবেয়া— সে কি কথা কন, আমি তো রান্নাবাড়ি করে রাখছি…

বাউল— তাতে কি, সকালে সাঁইজি আসবে, আমিও আসবো, খাবো। (সে সিরাজ সাঁই-এর হাত ধরে টানতে থাকে।)

সিরাজ সাঁই— ভাবি, ঠিক আছে সকালেই আপনার বাড়ি আসবো। (পজ) এরা বন্ধু মানুষ, অনেকদিন পরে দেখা তো, আপনার বাড়ি তো আমারই বাড়ি, কাল সকালে আসবো, সারাদিন থাকবো, রাতে থাকবো, পরশু সকালে খাবো, দুপুরে খাবো, তারপর পালাবো। (হঠাৎ লালনের দিকে তার চোখ পড়লো) বাপধন, তোমারে যেন চিনি মনে কয়…

রাবেয়া— আমি ওরে নদীর জলে কুড়ায়ে পেলাম। আমার ছেলে।

সিরাজ সাঁই— তাই নাকি। কিন্তুক আমার মনে কয়, আমি ওরে নদীর জলে নয় ডাঙায় দেখেছি।

রাবেয়া— ওর কিছু মনে পড়ে না, খুব অসুখ ছিল তো, সব কিছু মন থেকে মুছে গেছে… না কি ইচ্ছে করেই ভুলতে চায়। ওর কি জাত, কি ধর্ম, কিচ্ছু জানি না।

সিরাজ সাঁই— দরকার নাই। জাত-ধর্মের দরকার কি, ওসব ইচ্ছে করে ভোলা ভালো। তা বাপ, ইচ্ছে করলে ভুলতে পারো, ভালো কথা, কিন্তুক ইচ্ছে হলে আবার মনে পড়বে না তো? তাইলে কিন্তুক সব মাটি।

লালন— (মৃদু হেসে) গাড়ি আমার বাড়ির ভারে টলমলায়

                                আমি কারে ছাইড়া কারে রাখি, এখন কি উপায়!

সিরাজ সাঁই— (খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরে) বাপধন, সময় বুঝে নিজেরে গোপন করা লাগে, আবার সময় কালে প্রকাশ করাও লাগে। আমি মুখ্যু-মানুষ, তুমারে শিখাবার মত জ্ঞান নাই। যা হারাইছো তা তুমার নয়, ভবিষৎ কালে যা হাতে পাইবা তাও তুমার নয়।

লালন— সাঁইজি, আমার তবে কোনটুকু, কতটুকু?

সিরাজ সাঁই— তুমার সবটুকুন, সারা দুনিয়া। যার কিছু নাই তার আছে সারাবিশ্ব ব্রহ্মা-। যে সবকিছু হারাইতে পারে, সেই তো সবকিছু পায়।

লালন— (কানের কাছে মুখ নিয়ে) সাঁইজি, আমার সবগেছে, সব! এবার নতুন কিছু পাওয়া লাগবে, আপনি আমারে নতুন কিছুর সন্ধান দেবেন?

সিরাজ সাঁই— দেব। আমার যা আছে তা তোমারে দেব। আমার কি আছে জানো? আমার আছে হাওয়ামহল, আরশিনগর, আয়নাগিরি, অলখ সাঁই, মনের মানুষ… তুই নিবি?

লালন— নেব।

সিরাজ সাঁই— তবে তৈরি থেকো, কাল জোছনারাতের আলোয় আলোয় আমরা হাওয়ামহল কিনতে যাবো।

দৃশ্য : বত্রিশ

লোকেশান : নদীর পাড়

সময় : রাত

জোছনারাতের আলোয় লালন এবং সিরাজ সাঁই রাবেয়ার গ্রাম ছেড়ে নদীর পাড় ধরে হেঁটে আসছেন। ওদের পেছনে রাবেয়া। সে ওদের পেছন পেছন ছায়ার মতো কয়েক পা এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়ায়, নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। লালন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পেছনে ফেরে, দাঁড়ায়, পায়ে পায়ে রাবেয়ার কাছে ফিরে যায়, তাকে জড়িয়ে ধরে সেও ফুঁপিয়ে ওঠে।

সিরাজ সাঁই আপনমনে হাসতে হাসতে একইভাবে হেঁটে চলেছেন। কয়েক মুহূর্ত পর লালন রাবেয়ার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দ্রুতপায়ে সিরাজ সাঁইকে অনুসরণ করে। রাবেয়া ওদের গমনপথের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে জল।

ওরা দুজন নদীর পাড় ধরে এগিয়ে চলেছেন। নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ সিরাজ সাঁই গুন গুন করে একটা গান বাঁধার চেষ্টা করতে লাগলেন।

                চক্ষুতে পনির ফান্দা

                দেখে সব অন্ধা অন্ধা

                চারিপাশে মায়ার ধান্ধা

                কোথা পাই খোদার বান্ধা

দৃশ্য : তেত্রিশ

লোকেশান : বাউল-ফকিরদের আখড়া

সময় : সকাল

নানান বয়সের বাউল, ফকির, ফকিরানি মিলে বেশ একটা বড় রকমের জটলা হয়েছে। লোকালয় থেকে একটু দূরে, ফাঁকা মাঠের ভেতর একটা বিশাল বটগাছের তলায় গোল হয়ে ওরা শুয়ে যে যার মতো সময় কাটাচ্ছে। কেউ কেউ একতারা, কেউ বা ডুগডুগি বাজিয়ে সুর ভাঁজছে। কয়েকজন ফকিরানি রান্নার আয়োজন করছে। তাদের সাহায্য করছে কয়েকজন বাউল। ওদের মধ্যে পুরুষ-নারী বা অন্য কোনও জাত-ধর্মে বাছবিচার নেই, ভেদাভেদ নেই।

সবাই স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং দলবদ্ধ। কিন্তু দলবদ্ধ হলেও যে যার ইচ্ছা মতো দল ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে, আবার ফিরে আসতে পারে। যে কোনও নতুন বাউল দলে ভিড়তে পারে, কারো ব্যাপারে কোনও বাধা নেই, আমন্ত্রণও নেই।

লালন এক পাশে বসে বাউল-ফকিরদের কা- দেখছে। সিরাজ সাঁই কয়েকজন বয়স্ক বাউলের সাথে চাপাকণ্ঠে কিছু আলোচনা করছেন। তখন এক বাউলানি লালনের কাছে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে হাসতে থাকে। লালন কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে তার দিকে থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। কিন্তু শারীরিক সৌন্দর্য এমন যে চোখ সরানো কঠিন। যেমন তার গায়ের রং তেমনি মুখশ্রী, তেমন তার দেহের গঠন। বাউলানি হাসতে হাসতে আর এক পা এগিয়ে বলল— ভেক না ধরলি ঠেক মেলে না। তোমার ভেক কোথা?

লালন— ভেক?

বাউলানি— ভেক জানো না! বেশ, বসন, গেরুয়া বসন গো, নতুন বাউল।

লালন— আমার ভেক নেই।

বাউলানি— দীক্ষা আছে।

লালন— দীক্ষা?

বাউলানি— তাও জানো না? বাউল-ফকির হবার জন্যি গুরু ধরা লাগে, গুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়া লাগে, দীক্ষা নেওয়া ছাড়া এসবে শিক্ষা মেলে না, শিক্ষা ছাড়া সিদ্ধি মেলে না।

লালন— আমি নতুন। কিচ্ছু আমার জানা হয়নি।

বাউলানি— এটা কি কথা কও, তুমি সিরাজ সাঁইয়ের চ্যালা, তবু কও কিচ্ছু জানা হয়নি। সাঁই তোমারে শেখায় নাই?

সিরাজ সাঁই অন্যদের সঙ্গে কথা শেষ করে বিশ্রাম নেওয়ার ভঙ্গিতে আধশোয়া অবস্থায় বাউলানির কথা শুনছিলেন।

এবার তিনি লালনের হয়ে বাউলানির প্রশ্নের জবাব দিলেন।

সিরাজ সাঁই— সিরাজ নিজেই কিছু শিখতে পারে নাই, তো অন্যেরে কি শেখাবে।

বাউলানি— ওসব তালের কথা ছাড়েন। আপনি ওরে শিষ্য করেন নাই কেন, দীক্ষা দেন নাই কেন? ওর চোখ-মুখ দেখে মনে কয়, ওর হবে।

সিরাজ সাঁই— আমি কাউকে দীক্ষা দিই না, কেই আমার শিষ্য নয়। সবাই আমার বন্ধু-সুজন, সবাই আমার মনের মানুষ। (পজ) তা মন্দাকিনি, তুই তো ওরে দীক্ষা দিতে পারিস, ওরে তোর শিষ্য করে নে।

বাউলানি— (হাসতে হাসতে) পাগল নাকি, ও আমার মনের মানুষ। ওরে আমি শিষ্য করবো কেন? ওরে আমি ‘বাবার পুকুরে’ সাঁতার কাটতি শেখাবো।

আশেপাশে যারা ছিলো তারা সবাই হেসে ওঠে। লালন কিছুটা অপ্রস্তত বোধ করে। বাউলানি ওকে হাত ধরে তুলে নেয়। লালন কি করবে বুঝতে না পেরে সিরাজ সাঁইয়ের দিকে তাকায়। সিরাজ সাঁই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ওরা দুজন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যায়। কয়েক পা এগিয়ে বাউলানি ফিরে তাকায়।

বাউলানি— সাঁইজি, আজকেই ওর দীক্ষা হয়ে যাক, দেরী করে লাভ কী?

সিরাজ সাঁই— হয়ে যাক, তা কে দীক্ষা দেবে?

বাউলানি— যে কেউ একজন দিলেই হয়। (পজ) আজ বিকেলে ওর দীক্ষা হবে, সবাই তৈরি থেকো।

দৃশ্য : চৌত্রিশ

লোকেশান : বাউল-ফকিরদের আখড়া

সময় : সন্ধ্যা

লালনকে গেরুয়া বসন পরিয়ে সাজিয়ে এনে গাছতলায় আসন পেতে বসানো হয়েছে। তার চারপাশে ঘিরে আছে বাউল, ফকির, বাউলানি ও ফকিরানিদের দল। যিনি ওকে দীক্ষা দেবন সেই বয়স্ক বাউলও প্রস্তত হয়ে ওর পাশে এসে বসলেন। বাউলদের নিয়ম অনুযায়ী দীক্ষাদান হলো। তারপর গুরু-শিষ্য দুজনে সকলের আড়ালে চলে গেলেন গুপ্ত-মন্ত্রণার জন্য। বেশ কিছুক্ষণ ধরে গুপ্ত-মন্ত্রণাদান চলে এবং তারপর দুজনেই বেরিয়ে আসেন। উপস্থিত সকলে তাদের স্বাগত জানায়। তারপর পান-ভোজন-নেশা এবং সবেশেষে গান-বাজনা শুরু হয়।

গান-বাজনা যখন খুব জমে উঠেছে, তখন সিরাজ সাঁই লালনকে ইশারা করে ভিড়ের বাইরে নিয়ে গেলেন।

সিরাজ সাঁই— আজ একটা কথা কইবো, একথা আর কোনদিন বলার দরকার হবে না। এখন থেকে তুমি বাউল, ফকির, বিবাগী। আর তোমার সংসার নেই, পূর্বজন্মের ধর্ম নেই, সংস্কার নেই, সত্যি কথা কইলে তোমার অতীত নেই। অতীতের টান থাকলি বাউল হওয়া যায় না। কথাটা মনে থাকবে?

লালন— মনে থাকবে।

সিরাজ সাঁই— আর একটা কথা। ভেক ধরলিই বাউল হয় না, তোমার চারপাশে যারা এখন নাচানাচি করতিছে ওরা কেউ বাউল ফকির নয়, ঢেমনা, লোচ্চা, ভিখারি, আলসে আর কামচোর অকম্মার দল। বাউল মানে সাধক, বাউলধর্ম মানে সাধনা, আত্মতত্ত্বের সাধনা, এই সাধনা অতি কঠিন, আবার খুবই সহজ। যে কঠিনেরে সহজ করে নিতে পারে এই ধর্ম তার।

লালন— আমারে একটু ভালো করে বুঝায়ে কবেন।

সিরাজ সাঁই— বুঝবার খুব বেশি কিছু নেই। চলতি চলতি চলার পথে বুঝে নিতি হবে। সেটাই সাধনা। তবে হ্যাঁ, দু-একখানা টোটকা দিতি পারি যেমন ধরো— রতির মাঝে যতি। এখানে মেয়ে মানুষ সহজে মেলে, তাই বলে ‘বাবার পুকুর’ নিয়ে সারাক্ষণ মজে থাকবা না। বাবার পুকুর কি তা বোঝো?

লালন— না

সিরাজ সাঁই— বাবার পুকুর মানে মেয়েদের যোনি।

লালন— ও, আচ্ছা…

সিরাজ সাঁই— দ্বিতীয় কথা, সন্তানের আকাক্সক্ষা যেন না থাকে। বাউলরা মায়ার বন্ধন ত্যাগ করেই তবে সাধক হয়। তৃতীয় কথা, গান-বাজনার ভেতর দিয়ে বাউল-ফকিররা সাধনা করে, কিন্তুক শুধু গান-বাজনা করাই লক্ষ্য নয়। গান হলো পথ, মার্গ, উপায়। গানের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। তাই গানই যেন লক্ষ্য না হয়ে যায়, এটা মাথায় রাখবা।

লালন— তার মানে, গান দিয়ে আমি নিজকে খুঁজবো, পথের সন্ধান করবো…

সিরাজ সাঁই— ঠিক। সেই কারণে ভালো গান বাঁধতি পারো বলে কারণে-অকারণে গান শুনায়ে লোক জমাবা, তা যেন না হয়। গানের ভেতর দিয়ে তোমার পরাণের কথা বলবা, সাধনার কথা বলবা। আর সবকথার মূলকথা, মানুষের কথা বলবা, মানুষের মানুষ হওয়ার কথা বলবা। মানুষ হওয়ার সাধনা ছাড়া মানুষের আর কোনও সাধনা নেই।

দৃশ্য : পঁয়ত্রিশ

লোকেশান : বিভিন্ন

সময় : বিভিন্ন

সিরাজ সাঁই এবং লালন বিভিন্ন আখড়া থেকে বিভিন্ন আখড়ায় ঘুরে বেড়ান। কখনও অন্যের গান শোনেন, কখনও নিজেরা গান করেন। তাদের আখড়া বদল হয়, জায়গা বদল হয়, সঙ্গী বদল হয়, কিন্তু তাঁরা দুজন এক সাথে থাকেন, এক সাথে চলেন, একই সাথে সাধনা করেন। কখনও নিজেদের মধ্যে তর্ক হয়, কখনও অন্য বাউলদের সাথে বাহাস হয়, সময় সময় গানের মাধ্যমে লড়াই বাঁধে। এভাবে পুরনো কবিয়ালদের গানের সাথে লালনের পরিচয় ঘটে। বিশেষ করে লালন কবিরের দোঁহার বিষয়ে খুবই উৎসাহী হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে সে কবিরের দোঁহা নিজেই গায়।

এমনি করে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়, সিরাজ এবং লালন দুজনের মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। সিরাজ অতিবৃদ্ধ আর লালন এখন প্রৌঢ়। একদিন রাতেরবেলা দুজন কথা বলতে বলতে সিরাজ সাঁই হঠাৎ লালনকে আলাদাভাবে চলার নির্দেশ দিলেন।

সিরাজ সাঁই— সময় বিশেষে বাউলদের দল বাঁধতে হয়, সময় বিশেষে আলাদা থাকতে হয়, কখনও বা নিজেই আখড়া গড়তে হয়। তোমার আখড়া গড়ার সময় হয়েছে, এখন গুরুর সাথে থাকা বা অন্যের আখড়ায় থাকা মানে নিজের ক্ষমতাকে অবহেলা করা। এবার যাও, বেরিয়ে পড়ো, নিজের আখড়া গড়ো।

লালন সিরাজ সাঁইয়ের নির্দেশ মতো সেই রাতেই একা একা বেরিয়ে পড়লেন। (ফ্ল্যাশব্যাক শেষ)

দৃশ্য : ছত্রিশ

লোকেশান : শিলাইদহ কুঠিবাড়ি

সময় : সকাল

শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে জ্যোতি ঠাকুর ও লালন ভেতরের বারান্দায় বসে আছেন। জ্যোতি ঠাকুরের ডান হাতের কাছে একটা ছোট টেবিল। টেবিলের ওপর লালনের অসমাপ্ত স্কেচ, খাতা-কলম এবং অন্যান্য টুকিটাকি জিনিস। তিনি টেবিলের ওপর থেকে একটা সিগারেটের টিন বের করে লালনের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।

লালন— এটা কি?

জ্যোতি ঠাকুর— সিগারেট। সাহেবদের বিড়ি বলতে পারেন। খান, ভালো।

লালন— (সিগারেট হাতে নিয়ে) জিনিসটা দেখতি বেশ ভালো।

জ্যোতি ঠাকুর নিজে সিগারেট ধরিয়ে আগুন এগিয়ে ধরলেন লালনের দিকে। লালন সিগারেট ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে টান দিলেন।

লালন— বাহ, মিষ্টি গন্ধ।

জ্যোতি ঠাকুর— আপনার জীবন সত্যিই গল্পের মতো আকর্ষণীয়। একবার মরে আবার বেঁচে উঠলেন বললে অত্যুক্তি হয় না। আপনি অনেক কিছু দেখেছেন, জেনেছেন বলেই আপনার ধ্যান-ধারণা এবং জীবনদর্শন অন্যদের থেকে আলাদা। (পজ) আচ্ছা, বাউলদের সম্পর্কে নানা কথা শুনি; এই যেমন ধরুন, তারা নাকি বীর্য-ঋতু¯্রাব খায়, পশুদের প্রক্রিয়ায় যৌন-সঙ্গম করে, এসব কি সত্যি?

লালন— সত্যি। কিন্তুক যারা এসব করে তারা যে সব বড় বড় বাউল কিম্বা সাধক এমন কথা সত্যি নয়। যোগীদের ভেতর যেমন হঠযোগী আছে, তান্ত্রিক আছে, কাপালিক আছে, ওরা যেমন শ্মশানে থাকে, মড়ার খুলি নিয়ে সাধনা করে, কেউ কেউ মড়ার মাংস খায়, মড়ার মাথার ঘিলু খায়, এই বাউলরাও তেমনি, ওরা মনে করে এভাবে সাধনা করলি মার্গ মিলে যাবে। কিন্তুক জামিদারবাবু, মড়ার মাথার খুলি কিম্বা ঋতু¯্রাব অথবা মলমূত্র খেয়েই যদি সিদ্ধিলাভ হতো তবে আর মানুষ সন্ধান-অনুসন্ধান করতো না, জ্ঞান-বিজ্ঞানে চর্চা করতো না।

জ্যোতি ঠাকুর— ঠিক বলেছেন। ওসব বিকৃতি। কিন্তু একটা কথা, বাউলরা বাউলানি নিয়ে থাকে, ফকিরা ফকিরানি সঙ্গে রাখে, তবুও তাদের সন্তান হয় না কেন?

লালন— তার কারণ তারা সন্তান চায় না।

জ্যোতি ঠাকুর— কিভাবে এটা সম্ভব?

লালন— আপনি বীর্য স্তম্ভনের কথা শুনেছেন নিশ্চয়?

জ্যোতি ঠাকুর— শুনেছি, তবে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে পারি না।

লালন— আপনি ছেলে মানুষ, যুবক, গৃহী, আপনার ওসব বোঝার দরকার নেই। শুধু শুনে রাখুন, ইচ্ছে করলি বীর্যের ব্যবহার, অপব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

জ্যোতি ঠাকুর— যাই বলুন, আপনাদের জগতটা সত্যিই রহস্যময়।

লালন— আমি বলি, আপনাদের জগতটাই রহস্যময়! কি করে আপনারা এতোটুকু জীবন নিয়ে তুষ্ট থাকেন? আমি তো ভাবতেই পারিনে, মানুষের জীবন এতো ছোট, এতো সামান্য গ-ীর মধ্যে ঘুরপাক খায়!

জ্যোতি ঠাকুর— যথার্থ বলছেন, আমরা সামান্য পরিধির মধ্যে ঘুরে মরি। অর্থ, মোহ, কাম, খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে আমাদের জীবন ব্যর্থ হয়ে কাঁদতে থাকে…

লালন— তাহলে দেখুন, আপনারা তা বুঝেও বোঝেন না, জেনেও জানতি চান না। এটাও কি কম রহস্যময়? আসলে কি জানেন, জীবন মানেই রহস্য। দুনিয়ার সবচেয়ে নির্বোধ, সবচেয়ে সরল শিশুর জীবনও অতি গভীর রহস্যে ঘেরা, যার কূল-কিনারা নেই। আমি মনে করি, আপনারা যারা গৃহী, আপনারা নিজেদের মতো করে আপনাদের জীবনের রহস্যের জট খুলতে চান, আর আমরা আমাদের মতো করে চাই। লক্ষ্য এক, পথ আলাদা।

জ্যোতি ঠাকুর— চমৎকার বললেন। (পজ) এবার আপনার জীবনের পরের ঘটনা শুনি, তারপর কি আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা হয়নি, স্ত্রী এবং মায়ের সাথে দেখা হয়নি?

জ্যোতি ঠাকুর লালনের অর্ধসমাপ্ত স্কেচ হাতে তুলে নিলেন। লালন দূরে তাকিয়ে যেন নিজের স্মৃতির ভেতরে পুনরায় প্রবেশ করলেন।

দৃশ্য : সাঁইত্রিশ (ফ্লাশব্যাক শুরু)

লোকেশান : প্রান্তর

সময় : অপরাহ্ণ

বিশাল প্রান্তরের ভেতর দিয়ে একা একা লালন হেঁটে আসছেন। আশেপাশে লোকালয় নেই, জনমানুষের চিহ্ন নেই। তিনি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে এদিকে ওদিকে দেখলেন। একটু দূরে একটা বিশাল শিমুল গাছ। তিনি গাছ লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন। গাছের কাছে গিয়ে দেখলেন, পাশে একটা বড় পুকুর বা জলা। জলার ওপর শেষ বিকেলের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। তিনি জলের মনোরম দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে গাছের ছায়ায় বসলেন। ক্লান্তি বশত চোখ বন্ধ করলেন এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন।

তন্দ্রার ঘোরে তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে প্রথম জীবনের সেই চন্দ্রালোকিত রাতে ঘোড়া ছোটাবার দৃশ্য। তরুণ লালন তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে, তাকে জাড়িয়ে ধরে খিল খিল করে হাসছে গোলাপি। বনের মধ্যে সন্ন্যাসী-ফকিরের দল ভয় পেয়ে দোয়া-মন্ত্র পাঠ করছে— ওঁ তৎসবিতুর বরেণ্যং ভর্গদেবস্যু… বালাগাল উলা বে কামালিহি…

সেই একই দোয়া-মন্ত্র বহুকাল পর আজ আবার যেন লালনের কানে বেজে উঠলো। তাঁর তন্দ্রা ভেঙে যায়। তিনি চোখ মেলে তাকালেন। এক তরুণ ফকির জলের পাশে দাঁড়িয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে করতে গান করছে। তার ভঙ্গি  দেখে মনে হয়, সে যেন জলের ভেতর থেকে গান টেনে আনছে! একটু খেয়াল করতেই বোঝা গেল, তরুণ ফকির মাহাকবি শেখ সাদীর বিশ্ববিখ্যাত ‘নাত বা বয়াত’ (হযরত মোহাম্মদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রশস্তি গাঁথা) গাইতে গাইতে সেই ছন্দে এবং সুরে নিজেই গান বাঁধার চেষ্টা করছে। লালন সবিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গান—

বালাগাল উলা বে কামালিহি

                কাশাফাদ দোজা বে জামালিহি

                হাসানুৎ জামিয়ূ খেসালিহি

                সাললু আলাইহে ওয়া আলিহি…

                ঝিলমিল দিল-দীঘি শূন্য, ইলাহি

                প্রেম-মীন দাও খোদা প্রেম যে নাহি

                বালাগাল উলা বে কামামলিহি

                পূর্ণ করো ওগো পূর্ণতা চাহি

                আমারে দাও খোদা প্রেম বাদশাহী

                কাশাফাদ দোজা বে জামালিহি…

তরুণ ফকির গান গাইতে হঠাৎ চুপ করে যায়। তারপর ঝটিতি লালনের দিকে ফিরে তাকায় এবং কোনও কথা না বলে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করে। লালন কয়েক মুহূর্ত বিমূঢ়ভাবে বসে থেকে তিনিও অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

দৃশ্য : আটত্রিশ

লোকেশান : ছেউড়িয়া/পথ

সময় : সকাল

যেন মায়ার টানেই লালন তাঁর অজ্ঞাতসারে ছেউড়িয়ায় ফিরে এলেন। আজন্ম চেনা গ্রাম যেন অনেক পাল্টে গেছে। তিনি চারদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে চললেন। দু-একজানের সাথে পথে দেখা হলেও তারা ওঁকে চিনতে পারছে না। তিনিও তাদের সাথে কথা বলতে আগ্রহ বোধ করছেন না। এভাবে পথের বাঁক ফিরতেই নিশিকান্তের সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো।

নিশিকান্ত হঠাৎ যেন চমকে দাঁড়ায়। তীক্ষè-চোখে তার দিকে তাকায় তারপর বিভ্রান্তভাবে প্রশ্ন করে— সাঁইজির বাড়ি কোথা?

লালন— বাউল-ফকিরের বাড়ি থাকে না।

নিশিকান্ত— না মানে কোথায় ছিলো? পূর্বাশ্রমের কথা জিগ্যেস করতিছি।

লালন— সন্নাসীদের পূর্বাশ্রমের কথা জিগ্যেস করতি নেই।

নিশিকান্ত— না, মানে, আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি…

লালন— তা দেখতি পারেন।

নিশিকান্ত— এদিকে কোথা যাওয়া হবে?

লালন— দেখি কোথা যাই।

লালন ওকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। নিশিকান্ত সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করে। তারপর কিছু একটা  ভেবে পায়ে পায়ে ওঁকে অনুসরণ করতে থাকে।

লালনকে তাঁর বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে দেখে নিশিকান্ত কেমন যেন হতচকিত হয়ে আশেপাশে তাকায়। তখন দূর থেকে যদু পাইককে আসতে দেখে সে প্রায় দৌড়ে তার কাছে গেল।

নিশিকান্ত— যদু শোন, অদ্ভুত কা-! ঠিক লালুর মতন দেখতি, এক বাউল, সে ওই বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

যদু— লালুর মতো দেখতি, কোন লালু?

নিশিকান্ত— আরে লালন, মাধব করের ব্যাটা।

যদু— তোমার মাথা ঠিক আছে? যত্তোসব আজগুবি কথা! আমরা যার সৎকার করে গঙ্গায় ভাসায়ে দেয়ে এলাম— সে কি ভূত হয়ে ফিরে এল নাকি!

নিশিকান্ত— আমিও তো তাই ভাবতিছি, চল্ দেখে আসি ব্যাপারটা কি।

যদু— চলো তবে লালনের ভূত দেখে আসি।

ওরা দুজন চাপাকন্ঠে আলোচনা করতে করতে লালনের পিছুু নেয়।

দৃশ্য : ঊনচল্লিশ

লোকেশান : লালনের বাড়ি

সময় : সকাল

গোলাপি পা দিয়ে মাটি পিষছে। মাঝে মাঝে জল ছিটিয়ে মাটি নরম করছে। তারপর ম- তৈরি হলে ভাঙাচোরা ঘরের দেয়াল সারাই করে নিপুণ হাতে লেপে দিচ্ছে। তার চেহারা মলিন, পরনে নোংরা সাদা থান, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা।

লালন নিঃশব্দে বাড়ির ভেতরে ঢুকে তাকে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। গোলাপি লালনকে খেয়াল করেনি, সে নিজের মনে কাজ করছে। তখন মাটির কলসিতে জল কাঁখে নিয়ে পদ্মাবতী পেছন দিক থেকে বাড়িতে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়।

পদ্মাবতী— সাঁইজি, আমরা গরিব মানুষ… তোমারে আমরা কি দেব, বাবা।

গোলাপি শাশুড়ির কথায় ফিরে তাকায় এবং লালনের সাথে চোখাচোখি হয়। সে যেন এক পলকের জন্য চমকে যায়, এক পা এগিয়ে আসে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আবার কাজে মন দেয়।

গোলাপি— ঘরে আছে ঘাসের দানা, কুটুম আসো খাবে খানা!

লালন কোনো কথা বললেন না, তিনি নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। গোলাপি কাজ করতে করতে আড়চোখে লালনকে লক্ষ করে। পদ্মাবতী জলের কলসি ঘরে রেখে আবার বাইরে বেরিয়ে লালনকে দেখে অপ্রস্তত বোধ করে।

পদ্মাবতী— তোমারে কি দেবো, কি খাওয়াবো, আমরা ভিখিরির অধম, এ ঘরে দেওয়ার মতো কিচ্ছু নেই… লালন তখনও একইভাবে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। গোলাপি এবার কিছুটা বিরক্ত হয়।

গোলাপি— তুমি কি কালা না হাবা! বুঝতে পারোনি, আমরা তোমারে খাওয়াতে পারবো না?

লালন হঠাৎ প্রায় ফিসফিস করে গেয়ে উঠলেন— ঢেউয়ের পরে ঢেউ উঠলে জলে, মনের পাখি বলে পালায় কি কৌশলে!

গোলাপি চমকে ফিরে তাকায়। কম্পিত পায়ে এগিয়ে এসে লালনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এ গান তো আর কারো জানার কথা নয়, শুধু সে আর তার মনের মানুষ লালু ছাড়া; এ গানের খবর কে জানবে, কেমন করে জানবে? এ গান তো তারই সৃষ্টি। গোলাপি গভীর দৃষ্টিতে লালনের দিকে কয়েকপলক তাকিয়ে থাকে, তারপর সে উম্মাদের মতো মাটিতে গড়িয়ে পড়ে ডুকরে উঠে বলে— তুমি কে, কোথায় ছিলে, কেন এলে…

পদ্মাবতী কিছু বুঝতে না পেরে ওদের কাছে এগিয়ে এলো। লালনকে ভালো করে দেখতে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে হঠাৎ নিঃশব্দে সেও গড়িয়ে পড়তে থাকে। পড়ার আগেই লালন তাকে ধরে ফেললেন। কোলে করে ঘরের বারান্দায় নিয়ে পরমযতেœ শুইয়ে দিলেন।

দৃশ্য : চল্লিশ

লোকেশান : লালনের বাড়ি

সময় : সকাল

পদ্মাবতী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। গোলাপি অজ্ঞান না হলেও অথর্বের মতো উঠোনেই বসে আছে। তার যেন ওঠার শক্তি নেই। ‘মৃত’ লালনকে দেখে তারা দুজনেই মানসিকভাবে চরম বিভ্রান্ত।

লালন মায়ের জ্ঞান ফেরাতে উঠোনের পাশ থেকে একটা ঘটিতে করে জল এনে তার মুখে জল ছেটায়। পদ্মাবতী চোখ মেলে চাপাকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন— এখন কি হবে?

লালন— আমি বেঁচে আছি, এখন আর তোমার চিন্তা নেই।

পদ্মাবতী— কেন তুই বেঁচে আছিস?

লালন— কি বলছো মা?

পদ্মাবতী— তুই মরে আমার যা ক্ষতি করিছিস বেঁচে ফিরে এসে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করলি!

লালন— তোমার কি হলো মা, কি সব কথা বলতিছো?

পদ্মাবতী— পেছন ঘুরে দ্যাখ…

লালন পেছনে ঘুরে তাকায়। রাস্তার পাশ থেকে উঠোনের সীমানা পর্যন্ত পা ফেলার জায়গা নেই। অজ¯্র মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ করছে।

কি করবে বা কি করা উচিৎ তা বুঝতে না পেরে লালন বারান্দা থেকে নিচে নেমে দাঁড়ালেন, ভিড়ের দিকে তাকালেন।

তখন ভিড়ের ভেতর থেকে নিশিকান্ত সামনে এগিয়ে এলো।

নিশিকান্ত— (কর্কশ-কণ্ঠে) তুমি কে? তোমার পরিচয় কি?

লালন— বাউল।

নিশিকান্ত— এখানে তোমার কি কাজ?

লালন— এখানে তোমার কি কাজ?

নিশিকান্ত— মানে! আমার গাঁয়ে আমি থাকবো, তার কি বাইরের লোককে কৈফিয়ত দেয়া লাগব নাকি?

লালন— আমার বাড়ি আমি আসবো, থাকবো, তার কৈফিয়ত নেয়ার তুমি কে?

নিশিকান্ত— তোমার বাড়ি!

লালন— হ্যাঁ, আমার বাড়ি। আমি লালন। যারে তোমরা জ্যান্ত পুড়িয়ে দিতি চাইছিলে, পারোনি, আধমরা অবস্থায় জলে ভাসায়ে দিছিলে, আমি সেই লালন, এখনো মরিনি।

রাঘব দত্ত— মিথ্যে কথা। লালুরে আমরা সৎকার করেই তবে ফিরে আসি। তুমি লালন নও, অন্য কেউ। (পজ) সত্যি কথা কও তো তোমার উদ্দেশ্য কি?

লালন— তোমরা কারো সৎকার করোনি, বসন্তরুগী বলে জ্যান্ত অবস্থায় আমারে ফেলে পালায়ে এয়েছিলে।

নিশিকান্ত— এই তোরা এই বদমায়েশ জালিয়াতরে ধরে পেটা, পেটায়ে আধমরা কর। আমরা এতগুলোন মানুষ মিথ্যে বলিছি আর উনি একা সত্যি কথা কইছে। ব্যাটা জোচ্চোর! এতকাল কোথায় ছিলে?

লালন— বাউলদের আখড়ায়। তোমরা আমারে জলে ভাসায়ে দেয়ার পর এক মোসলমান জোলাবউ আমারে নিজির ছেলের মতো সেবাযতœ করে বাঁচায়ে তুলেছিলো। তার বাড়িতে ছিলাম। সেখানে বাউল গুরু সিরাজ সাঁইয়ের দেখা পাই। তার সাথে দ্যাশ-বিদ্যাশ ঘুরি…

রাঘব দত্ত— তা যদি সত্যি হয়, তবে তো তোর জাত গেছে। তুই মোসলমানের অন্ন খাইছিস। তোর সাথে আর হিঁদুর ঘরের কি সম্পর্ক?

লালন চরম বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকান। গোলাপির দিকে তাকান। নিজের মনে কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে কিছু একটা সিদ্ধান্ত করলেন।

লালন— মা, আমি তোমাদের নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো, চলো, তৈরি হও।

পদ্মাবতী— বাবা, আমি বুড়ো মানুষ, এ দ্যাশ গাঁও ছেড়ে কোথা যাই… এ আমার বাপের গাঁও, সোয়ামির গাঁও, আমি…

লালন— তবে তুমি যাবা না?

পদ্মাবতী— আমার তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকিছে, আমি আর কুথাও যাতি চাইনে।

লালন গোলাপির কাছে এগিয়ে গেলেন। তার কাছে যেতেই সে উঠে দাঁড়ায়, মুখ নিচু করে।

লালন— বউ, আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। এতদিন পারিনি, এবার আমি তোমার দায়িত্ব নিতি চাই। (পজ) পরিষ্কার কথা কও, তুমি আমার সাথে যাবা?

গোলাপি— যাবো।

ভিড়ের ভেতর গুঞ্জন ওঠে। তখন পদ্মাবতী শান্তভাবে ওদের কাছে এগিয়ে আসে।

পদ্মাবতী— বউ, হিঁদুর ঘরের বউদের জাত-ধম্মই সব। যার জাত গেল, তার সব গেল। ও মোসলমানের অন্ন খাইছে, ওর জাত গেছে। ভেবে-চিন্তে কথা কও।

লালন— মায়ের কথা মা কইছে, তুমি আমার বউ, আমি তোমারে আমার কাছে নিয়ে যাতি চাই, এটা আমার কর্তব্য। যে দেশে জাত-ধম্ম নেই, তেমন দ্যাশে নতুন ঘর বাঁধব, চলো।

গোলাপি মাথা উঁচু করে চারপাশে তাকায়। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তার সিদ্ধান্ত জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব।

গোলাপি— (ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে) তোমার সাথে আমার এ জীবনে হলো না গো, হলো না!

গোলাপি ছুটে ঘরের পেছনে দিকে চলে যায়। লালন কয়েক মুহূর্ত বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তারপর ক্লান্ত পদক্ষেপে ভিড় কাটিয়ে পথে নামেন।

দৃশ্য : একচল্লিশ

লোকেশান : পথ

সময় : প্রদোষকাল

গ্রাম ছাড়িয়ে লালন জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে গান গাইছেন। গান—

                এই দেশেতে এই সুখ হলো আবার কেথায় যাই না জানি

                পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা জনম গেল ছেঁচতে পানি।

                কার বা আমি কে বা আমার

                আসল বস্তু ঠিক নাহি যার

                বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার

                উদয় না হয় দিনমণি…

দৃশ্য : বিয়াল্লিশ

লোকেশান : নদীর ঘাট

সময় : প্রদোষকাল

সাউন্ডট্রাকে লালনের গান বাজতে থাকে। দৃশ্য মিক্স হয়। যেখানে তাকে বিধবার বেশ পরানো হয়েছিল, সেই নদীর ঘাটে, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে, ঘন কুয়াশায় গোলাপি একটা কলসি গলায় বেঁধে জলে নামে। চারপাশে তাকায়, একবার ওপরে আকাশের দিকে তাকায় তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। কয়েক মুহূর্ত পর নিজেকে সামলে নিয়ে মন শক্ত করে জলের গভীরে নামে। কলসিতে জল ঢোকার বিদঘুটে শব্দ হতে থাকে। ধীরে ধীরে কলসিতে জল ভরে যায়, গোলাপি একটু একটু করে জলের তলায় তলিয়ে যায়। জলের উপরে বুদবুদ উঠতে থাকে, আস্তে আস্তে জলের বুদবুদ মিলিয়ে গিয়ে জল আবার শান্ত ও স্থির হয়।

দৃশ্য : তেতাল্লিশ

লোকেশান : শিমুলতলা জঙ্গল

সময় : রাত

লালন জঙ্গলের গভীরে একাকী হাঁটছেন। বিভিন্ন গাছের পাতা মুখে নিয়ে খাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিস্বাদ বলে থু থু করে ফেলে দিচ্ছেন। প্রচ- খিদের জ্বালায় আমার একটা গাছের কাছে গিয়ে কচি পাতা মুখে দেন, আবারও থু করে ফেলে দিলেন। এভাবে আরো খানিকটা হাঁটতে হাঁটতে তিনি ঘন জঙ্গলের ভেতর আবছা আলে- অন্ধকারে একটা কচি তেঁতুলগাছের কাছে এসে দাঁড়ালেন। একটা ডাল ভেঙে মুখ বিকৃত করে পাতা খেতে শুরু করেন। কিন্তু খালি পেটে টক পাত খাওয়ার পর গা গুলিয়ে ওঠে। তিনি পেট চেপে বমি করেন। তারপর ধীরপায়ে আরেকটু এগিয়ে একটা বড় আমগাছের তলায় এসে দাঁড়ন। ক্লান্তিবশত সেখানে চোখ বন্ধ করে বসে পড়েন। তাঁর বসার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, তিনি ধ্যান করছেন।

দৃশ্য : চুয়াল্লিশ (মন্তাজ)

এ পর্যন্ত তাঁর জীবনে লালন যে সমস্ত ভিন্ন ধরণের মানুষ দেখেছেন এবং যা কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন তার সবই একে একে লালনের চোখের উপর  ভেসে ওঠে।

সিরাজ সাঁইয়ের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ, নুন কেনার সময় সেই দোকানদারের বসন্ত রোগাক্রান্ত মুখ, সাহেবদের রক্তাক্ত মৃতদেহ, নদীর জলে ডুবন্ত মহিলার মৃতদেহ, যদু পাইকের সঙ্গে লাঠিখেলা, বসন্ত রোগাক্রান্ত অবস্থায় বীণার সেবা-শুশ্রুষা, নদীর ঘাটে রাবেয়ার আগমন, রাবেয়ার বাড়িতে সেবা-যতেœ সুস্থ হয়ে ওঠা, যাত্রা পালার গান গাওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুটি, মায়ের কান্নারত মুখ, স্ত্রীর শেষ সংলাপ, সিরাজ সাঁইয়ের শেষ সংলাপ ইত্যাদি বিক্ষিপ্তভাবে তার স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সবকিছু ছাপিয়ে ¯্রােতস্বিনী গঙ্গা তাঁর চেতনাকে যেন আচ্ছন্ন করে দিল। তাঁর সমগ্র স্মৃতি, ভাবনা এবং অনুধ্যান গঙ্গার উপর নিবদ্ধ হয়ে রইল। গঙ্গা যেন তার অন্তরাত্মাকে ধীরে ধীরে মানবিক ক্ষুদ্রত্ব থেকে মহত্বে রূপান্তরিত করে দিল।

দৃশ্য : পঁয়তাল্লিশ

লোকেশান : জঙ্গল

সময় : সকাল

জঙ্গলের পাশ ঘেসে একটা  ছোট নদী বয়ে গেছে। নদীর পাড়ে একটা তালের ডোঙা ভিড়িয়ে অদ্ভুতদর্শন একজন মানুষ নামল। তার মুখে ঘন চাপ দাড়ি, লম্বা চুল, চোখ লাল, হাতে একখানা আখ, কোমরে গোঁজা কাটারি। ওকে দেখে পুরো পাগল মনে হয় না, আবার পুরো স্বাভাবিকও লাগে না। সে নদী থেকে ডাঙায় উঠতে উঠতে আপনমনে গান ধরে। গান—

একবার বল দেখি মন লা ইলাহা ইল্লাল লা

                আইন ভেজিলেন রসুলুল্লা…

দূর থেকে গানের কলি শুনে লালনের ধ্যান ভেঙ্গে গেল। লালন উঠে দাঁড়ান। অভুক্ততাবশত শরীর দুর্বল লাগে। তিনি একটা শুকনো গাছের ডাল ভেঙ্গে লাঠির মতো হাতে নিয়ে এক-পা দু-পা করে এগিয়ে যান। ইতোমধ্যে  গান থেমে গেছে। হঠাৎ আশেপাশে কোথায় কে যেন হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে ওঠে— পাগলাটা গেল কোথায়? একজন কইলো জঙ্গলে এক পাগল ঢুকছে। কই, কোথায় আমার পাগল দ্যাখা দাও, দ্যাখা দাও। (লালনকে দেখে) আরে এই তো, আমি তোমারই খোঁজ করি। তা হাতে লাঠি কেন, মারবা না তো?

লালন— তোমার হতেও তো লাঠি!

আগন্তুক— (কালু মির্জা) লাঠি! আরে আমি পাগল কিন্তু সবসময় পাগল নই। তুমি তো ঘোর পাগল, ওরা তাই কইলো, তাইত একটু ডরাই।

লালন— আমি পাগল নই।

কালু মির্জা— আরে পাগল, সবপাগলই ভাবে আমি পাগল নই, আমি খুব সেয়ানা। (পজ) তোমার নাম কি ভাই?

লালন— লালন।

কালু মির্জা— হিন্দু না মোসলমান, নাম শুনে তো বুঝার উপায় নাই?

লালন— ওইটা বুঝা খুব দরকার?

কালুু মির্জা— (হেসে) আমার কোন দরকার নাই। লোকেরা জানতি চায়, তাই আমিও চাইলাম।

লালন— আচ্ছা ভাই, আমি বোবা হইলে কি করতে?

কালু মির্জা— হ্যাঁ, এইটা একখান প্রশ্ন বটে। তবে বোবা হইলেও জাত-ধর্ম খানিক পোশাক-আশাক দেখে চেনা যায়, তসবি-মালা-পৈতা দেখে চেনা যায়। তোমার কাপড় দেখে তো চেনার উপায় নাই। এটা গেরুয়া না হলদে, বাউল না ফকির বুঝতি পারি না।

লালন— ভালো কথা। হিঁদুরা গলায় মালা দেয় আর মোসলমানরা দেয় তসবি। ছুন্নত দিলে মোসলমান হয়। আর বামনের গলায় থাকে পৈতা। কিন্তু বামনিদের গলায় তো কিছু থাকে না। আর মোসলমান মেয়েদের তো ছুন্নত হয় না। তইলে কি স্ত্রীলোকের জাত ধর্ম নাই?

কালু মির্জা— ছাড়ো ওসব কথা। পাগলের কোন জাত নেই। তুমিও পাগল, আমিও পাগল, আমরা জাত খেয়ে ফেলেছি।

লালন— দোস্তো, জাত-ধর্মের কিছুই আমি বুঝিনা, বুঝতে চাইও না।

কালু মির্জা— যখন আমরে দোস্তো কইলা, তখন হাতে হাত মেলাও, বুকে বুক মেলাও। (আলিঙ্গন করে) আমার নাম সুলেমান মির্জা। এখন আর সুলেমান নই, লোকে কয় কালু মির্জা। নাও, এই লাঠিটা দুজন মিলে ভাগ করে খাই।

কালু মির্জার হাতে লাঠি নয়, একখানা মোটা আখ, দূর থেকে বোঝা যায় নি। কালু হাঁটুতে চাপ দিয়ে আখ দুটুকরো করে একটুকরো লালনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। লালন কথা না বাড়িয়ে আখ খেতে শুরু করেন।

লালন— দোস্তো, তুমি আখের রস খাইয়ে আমার খিদে বাড়িয়ে দিলে। দুদিন ধরে একটা দানাপানি পর্যন্ত খাইনি।

কালু মির্জা— সবুর করো, প্যাটের ভাত জোগাড় করা দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাম। তবে চিন্তার কিচ্ছু নাই। কালু পাগলা তুমার সাথি। খাবার ব্যবস্থা আমিই করব। (পজ) বাঁশ কাটতে পারো?

লালন— বড়ো বাঁশ কাটিনি কোনোদিন, দরকার পড়েনি। দরকার হলে করতি হবে।

কালু মির্জা— অত সোজা নয় ভাই, সবকাম শেখা লাগে। একটু একটু করে শেখা লাগে। (পজ) চলো, বনের বাঁশ কাটবো। এ বনের কেউ মালিক নাই শুনেছি। থাকলেও এ তল্লাটে তার দেখা নেই। তার মানে এখন এ বাঁশের মালিক তুমি আর আমি। আমরা বাঁশ কাটব হাঁটে যাব, বেচবো, চাল কিনবো, ফিরে আসব, রান্না করব, তারপর খাবো। তারপর আজ রাতে বিশ্রাম, কাল সকাল এই বনের মধ্যে থাকার মতো একখান ঘর বানাবো। জানো দোস্তো, আমি যখন পাগল, তখন ঘোর পাগল। আর যখন ভালো তখন খুব ভালো। আমি ঘরামি, ভালো ঘর বাঁধতে পারি। এ কাজে আমার খুুব নাম-ডাক… কিন্তু যখন পাগল হই তখন কোনও কিচ্ছুর জ্ঞান থাকে না। (পজ) চলো আখ চেবাতে চেবাতে চলো, পা চালাও।

লালন— আচ্ছা ভাই, তোমার মাজায় গোঁজা দা খানা কি কামে লাগে?

কালু মির্জা— (হাসতে হাসতে) হাতে একখানা অস্তর থাকা ভালো, মনে বল আসে। (পজ) আরে পাগল, এই দা খানা না থাকলি বাঁশ কাটতাম কি দিয়ে? (পজ) আসল কথা বলবো, আমি যখন ঘর ছাড়ি, মানে পাগল হয়ে ঘর ছাড়ি, তখন থিকে এই একখান সম্পত্তি আমার ট্যাঁকে যেমন ছিল তেমন নিয়ে বের হই। সেই দিন থিকে এইটাই আমার সাথি, আমার বন্ধু, আমার বউ!

দৃশ্য : ছেচল্লিশ

লোকেশান : গাঁয়ের পথ

সময় : সকাল

বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির মধ্যে লালন এবং কালু দুজনে মিলে আর এক বান্ডিল বাঁশ টানতে টানতে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ পথের পাশে কারো গোঙানি শোনা যায়। লালন থমকে দাঁড়ায়।

কালু মির্জা— দোস্তো, তুমি কিছু শোনো নাই। যা করতিছিলে তাই করো, হাঁটো।

লালন— কার যেন কাতরানি শুনতে পাচ্ছি…

কালুমির্জা— আরে মহামুশকিল, বললাম তো কিছু শোনো নাই।

লালন— না, না, কে যেন গোঙায়… কার যেন কাতরানি…

কালু মির্জা— এরেই কয় ধুম পাগল! ওরে মাথামোটা, কাতরানি শুনতে নাই, একবার যদি ওই জিনিস তুমার পায়ে জড়ায় তো তুমি আর হাঁটতে পারবা না। মানুষের কাতরানি বড় খারাপ জিনিস।

লালন— তা বললি চলে, কেউ বিপদে-আপদে পড়তি পারে…

কালু মির্জা— আরে, ওই কারণেই বলি, কাতরানি মানেই কারো বিপদ, আর বিপদ মানে তোমার এগিয়ে যাওয়া লাগে, আর এগিয়ে যাওয়া মানে নিজের কাজ প-। আরে ভাই তুমার বিপদে তুমি কাউরে পাশে পাও, আমার বিপদে আমি কাউরে পাশে পাই? (পজ) যত্তসব ঝামেলার আগাছা। চলো, দ্যাখ, একবার যখন শুনে ফেলেছি, তখন আর উপায় নাই।

ওর কাতরানির শব্দ লক্ষ করে এগিয়ে গিয়ে দেখে, একটা যুবক ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে। সে ওদের দেখে করুণ-কণ্ঠে মাথা তুলে বললো— কালু ভাই, আমি কাশেম। আমারে ওরা মাইরা ফেলিছে।

কালু মির্জা— আমি কালু নই, কোনো কালেই কালু ছিলাম না, আমি তোরে চিনি না।

কাশেম— কালু ভাই, আমরে বাঁচাও। মারতি মারতি ওরা আমার মাজা ভেঙ্গে দিইছে।

লালন— কেন ভাই, কারা মারলো, কি হইছে?

কাশেম— কালু ভাই সবজানে, আমি একজনের সাথে ভালোবাসা করিছি, মেয়েটা হিদুঁ, বেধবা…

কালু মির্জা— ঠিক করিছে, তোর মতন বদমাশরে এখনো বাঁচায়ে রাখিছে কেন! আরে আমার তো যুবতী বেধবা দেখলেই মন আনচান করে, ভালোবাসতি ইচ্ছে করে, তাই বলে ঝাঁপ দেবো? তুমি ঝাঁপ দিছো, মাজা ভেইঙ্গে দিছে, বেশ করিছে! (পজ) এখন কুথায় যাবি? কি করবি?

কাশেম— আমারে দূরে কোথাও নিয়ে যাও, ওরা আবার মারবে! আমারে বাঁচও।

লালন— কালুভাই, ওরে আমাদের ওখানে নিয়ে গেলি কেমন হয়?

কালু মির্জা— তোমার মু- হয়! ওরে কে দেখভাল করবে, কে খাওয়াবে? আপন পাছায় কাপড় নাই, পরের পাছা ঢাকতি যাই, মরি মরি! (পজ) এই লোচ্চা, উঠে দাঁড়াতে পারবি?

কাশেম— না, আমার সেই অবস্থা নেই।

কালু মির্জা— তো এক কাজ কর… তোর সেই রাঢ় কোথা, সে আসবে না কেটে পড়েছে?

কাশেম— আসবে কইছে। কিন্তুক কখন আসে…

কালু মির্জা— ও আসা পর্যন্ত যদি তুই টিকে যাস তো কইবি, আমরা শিমুলতলার বনে ঘর বাঁধিছি, তোরা ইচ্ছে হলি সেখানে আসতি পারিস। আমরা এখন হাঁটে যাতিছি। সন্ধ্যোর পর ফিরবো।

দৃশ্য : সাতচল্লিশ

লোকেশান : লালনদের ঘর (শিমুলতলা)

সময় : প্রদোষকাল

কালু এবং লালন হাট থেকে কিছু চাল, ডাল, আনাজপাতি এবং ওদের জঙ্গলের পাতা নতুন সংসারের জন্যে কিছু টুকিটাকি জিনিস কিনে এনেছে। লালন সেসব গোছগাছ করে ওদের নতুন বানানো ছাপরা ঘরের একপাশে রাখছেন। আর কালু মির্জা আর এক পাশে নতুন বানানো কাঁচা উনুনে রান্নার আয়োজন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ওরা দুজন দুদিকে মুখ করে মগ্ন হয়ে কাজ করছে। পাশে একটা টিমটিমে লম্ফ জ্বলছে। হঠাৎ ফোঁস করে একটা আওয়াজ হতেই কালু মির্জা পাশের লাঠিটা তুলে এক পা পিছিয়ে গর্জে ওঠে— আই, সাপ।

লালনও চমকে উঠে দাঁড়ালেন। তখন কাশেম এবং তার প্রেমিকা কমলি এগিয়ে এল।

কমলি— সাপ না, সাপ না, আমরা। আমরা এসে পড়লাম।

কালু মির্জা— বড্ড উপকার করিছো! খাবা কি? আমরা এখানে কারোর ভাত খাওয়ানোর জমিদারি পাইনি। খাবার নিজের মতোন জোগাড় করতি হবে।

কমলি— ভয় নেই। আমরা চাল-ডাল আনিছি। কিন্তু রান্না করবো কোথা?

কালু মির্জা— চাল-ডাল এই হাঁড়িতে ঢেলে দাও। যতক্ষণ নিজের হাঁড়ি না হয়, ততক্ষণ এই হাঁড়িতে রাঁধবা, খাবা।

কমলি— চাল-ডাল ধোবো কোথা? জল কই?

অসুস্থ কাশেমকে ঘরের একপাশে বসিয়ে রেখে কমলি তার কাপড়ের পুটলি থেকে চাল-ডাল বের করে কালুর দিকে এগিয়ে যায়।

কালু মির্জা— জলের আকাল। ধোঁয়া-মোছার কারবার নেই। যা আছে একসাথে হাঁড়িতে ঢালো। (পজ) একখানা বড় কলসি এখনও কিনতে পারি নি। জল রাখবো কোথায়?

কমলি— তাই বলে না-ধোঁয়া চাল খাবো!

কালু মির্জা— ওসব নখরামি ছাড়ো। ঘর নেই, বাড়ি নেই, তাড়া খেয়ে বনে-জঙ্গলে বাস করতি হচ্ছে, তার আবার বড়োলোকি দ্যাখ।

কমলি— সানকি-বাসন আছে কিছু? খাবো কিসে?

কালু মির্জা— পারলি কলাপাতা কেটে আনো নইলে হাঁড়িতে হাত ঢুকায়ে খাইতে হবে। (পজ) কিন্তু জেনে রাখো, আমি কড়া মোসলমান, ব্রাহ্মণ-কন্যার হাতে ছোঁয়া খাই না। তাইলে আমার জাত যাবে!

লালন— (মৃদু হেসে) তুমি তো ভাই সাংঘাতিক মোসলমান! হাতের বুঝি জাত থাকে? (পজ) যে জাতের ভয়ে জঙ্গলে পালাইলাম, সেই জঙ্গলেও জাত! আমি কিন্তু পতিত…

কালু মির্জা— (ধমকের সুরে) আহ্, অতো কথা কি আছে! এখন কামের সময়, হাত লাগাও।

দৃশ্য : আটচল্লিশ

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : রাত

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যে যার মতো মাটিতে শুয়ে পড়েছে। কাশেম যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে কঁকিয়ে উঠছে। কমলি তার কোমর মালিশ করতে করতে মুদু স্বরে সান্ত¡না দিচ্ছে। লালন দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে পাশ ফেরেন। কালু মির্জা হঠাৎ ফুপিয়ে কান্না শুরু করে।

লালন— কি হলো ভাই, কান্দো কেন?

কাশেম— এইটাই তো ওর পাগলামি। যখন কাঁদতে শুরু করে তখন আর থামানো যায় না। দিনভর রাতভর চলে। কোনো সময় দুতিনদিন ধরেও চলে।

লালন— সেকি! মানুষ এমন কাঁদতে পারে।

কালু মির্জা হঠাৎ গান গেয়ে ওঠে—

            রহমান রহিম আল্লা তুমি ওগো মকরউল্লা

                তুমি মক্করেতে ধরো কায়া,

                কোন আকারে কীরূপ ছায়া…

গান থামিয়ে সে আবার কাঁদতে শুরু করে।

লালন— ভাই, কষ্ট হচ্ছে, কি কষ্ট, আমারে কও, আমি তো তোমার দোস্তো, আমারে সব কইতে পারো।

কালু মির্জা— (কাঁদতে কাঁদতে) না দোস্তো, শুধু কষ্ট নয়, আমি আনন্দেতে কান্দি, কষ্টে কান্দি… কাঁন্দাই আমার সব। আমি যে কান্দা ছাড়া আর কিছুই জানি না।

কাশেম— কমলি তুই একখান গান ধর। কালু ভাই তোর গান শুনে কান্দা বন্ধ করতি পারে। গা। কমলি গান শুরু করে।

কমলি—    মা মা বলে আর ডাকব না।

            ও মা দিয়েছ দিতেছ কতই যন্ত্রণা।

                 বারে বারে ডাকি মা মা বলিয়ে

                 মা বুঝি রয়েছে চক্ষুকর্ণ খেয়ে…

কালুর কান্না থেমে গেল, কিন্তু পরিবেশ তখনও ভারি। এভাবে কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ লালন গান গেয়ে ওঠে।

লালন—    ঘরের মধ্যে ঘর বেঁধেছেন

                মনমতো মনোহরা।

                ঘরের আট কুঠুরি নয় দরোজা

                আঠার মোকাম চোদ্দো পোয়া

                দুই খুঁটিতে পাড়া সুসারা।

                ঘরের বায়ান্ন বাজার তেরপান্ন গলি

                ওই বাজারে বেচাকেনা

                করে মনচোরা…

লালনের গান শেষ হলে কমলি জিজ্ঞেস করে— সাঁই এটা কোন ফকিরের গান, আগে তো শুনিনি?

কাশেম— আমিও শুনিনি। এ গান আপনিই বান্ধিছেন, আপনি বুঝি, গান বাঁধেন?

লালন— আমি সাঁইটাই কিচ্ছু না। মুখ্যু-মানুষ। গান রচনা করতি জানি না। মাঝে-মধ্যে মনের মধ্যে কি যেন হয়, আকুলি-বিকুলি করে। পুকুরি যেমন পুনা মাছের ঝাঁক খলবল করে তেমনি আমার মনের মধ্যে গানের ঝাঁক খলবলায়।

কাশেম— আমরা তো চোখ থাকতেও অন্ধ। মনে খবর জানতি পারি না। যে মানুষ মনের খবর টের পায়, তারেই তো সাঁই কয়। আহা কি গান শোনাইলেন।

কালু মির্জা— চুপ কর চুপ কর, বে আক্কেলের দল। ‘ঘরের আট কুঠুরি নয় দরজা’ এ কথা মানে বুঝিস, এ গানের মানে বুঝলি কিছু!

লালন যেন ওদের কথা শুনতে পায়নি এমন আত্মমগ্নভাবে তিনি আবার গান ধরলেন।

                কী করি কোন পথে যাই,

                মনে কিছু ঠিক পড়ে না

                দোটানাতে ভাবছি বসে ওই ভাবনা…

দৃশ্য : ঊনপঞ্চাশ

লোকেশান : শিলাইদহ কুঠিবাাড়ি

সময় : বিকাল

কুঠিবাড়ির বারান্দায় অপরাহ্ণের মৃদু আলো এসে পড়ছে। জ্যোতি ঠাকুর লালনের কথা শুনতে শুনেতে বিষণœদৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে রয়েছেন। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতায় কেটে গেল। তারপর জ্যোতি ঠাকুর চোখ ফিরিয়ে লালনের দিকে তাকালেন।

জ্যোতি ঠাকুর— কি বিচিত্র আমাদের সমাজ, আমাদের ধর্ম। শুধু জাতপাতের ভয়ে একজন মানুষ তার ঘর-সংসার, প্রিয়জন ত্যাগ করে বিবাগী হতে বাধ্য হলো। (পজ) আপনার স্ত্রী আত্মহত্যা করার কতদিন পর আপনি সে সংবাদ পান?

লালন— পরদিন। আমি তো আমার গ্রামের কাছেই ঘোরাঘুরি করতিছিলাম। মন তখন অস্থির, কি করি কোথায় যাই, এসব ভাবতিছিলাম। তখন পথ চলতি লোকেদের আলোচনায় খবরটা কানে আসে।

জ্যোতি ঠাকুর— আর আপনার মা, তাঁর কি হলো?

লালন— মায়ের পক্ষে আর একা থাকা সম্ভব ছিল না। কিছুদিন পর সে ভেক ধারণ করে।

জ্যোতি ঠাকুর— তার মানে তিনিও বাউল…

লালন— হ্যাঁ, আমি কিছুকাল পরে তা জানতে পারি। তবে সে আমার আখড়ায় কোনো দিন আসেনি।

জ্যোতি ঠাকুর— কেন? আপনি ডাকেননি?

লালন— না। পরে আমি উপলব্ধি করি, সংসারে মায়ায় জড়িয়ে পড়লে সাধনা হয় না। সত্যিকারের বাউলদের মা-বাবা, স্ত্রী-পুত্র বলে কোন সম্বন্ধ থাকতে পারে না। তবে এটাও সত্যি, বাউল মানে তো অমানুষ নয়। আমি দূর থেকে তার খোঁজ নিতাম। মারা যাওয়ার পর বাউলমতে তার শ্রাদ্ধ-শান্তির ব্যবস্থা করি।

জ্যোতি ঠাকুর— ও প্রসঙ্গ থাক। বুঝতি পারি, আপনার বলতে কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা, আপনারা যে গান করেন, তার সঙ্গে কি রাগ-সঙ্গীতের সম্পর্ক আছে?

লালন— রাগ-সঙ্গীত ছাড়া সঙ্গীত হয় না।

জ্যোতি ঠাকুর— তার মানে আপনারা প্রত্যেকেই রীতিমত সঙ্গীতচর্চা করেন?

লালন— না রীতি মতো করি না। রীতি-নীতি নিয়ে আপনারা, মানে শিক্ষিত লোকেরা মাথা ঘামান। আমরা হেটো-মেঠোরা নিয়ম-কানুন ছাড়াই করি। তবে… একটা কথা বলবো?

জ্যোতি ঠাকুর— নিশ্চয়ই। আমি তো আপনার কথা শোনার জন্যই সবকাজ বন্ধ রেখেছি।

লালন— রাগসঙ্গীত ছাড়া কোনও সঙ্গীত হয় না, তেমনি মেঠো সঙ্গীত ছাড়া রাগসঙ্গীত হয় না।

জ্যোতি ঠাকুর— বিস্ময়ের কথা বললেন। একটু বুঝিয়ে বলুন।

লালন— বিস্ময়কর নয়, খুব সাধারণ এবং গোড়ার কথা বললাম। যতো রকম রাগ, যতো প-িত আর যতো ওস্তাদ তৈরি করেছে, সে সবের উৎস হলো গেঁও-সঙ্গীত অর্থাৎ লোকসঙ্গীত। লোকসঙ্গীত মানে কি, মাজাঘষা ছাড়াই আম-আদমির প্রাণের গান। সোজা কথা হলো, আমরা মাঠ-ঘাট, বন-বাদড়, নদী-নালা, গুহা-গহ্বর ঘেঁটে সোনা তুলে আনি। আর আপনারা, শহরে মানুষেরা সেই সোনার উপর কারিগরি করে গয়না বানান। সেই গয়না বাজরে নিয়ে লক্ষ টাকায় বেচেন, নাম কামান, দর বাড়ান, প্রাসাদ গড়েন। আর আমরা যারা সোনার আসল মালিক, তারা যেখানে ছিলাম সেখানেই থাকি। সেখানে মানে কোথায়? মাঠে-ঘাটে-জলে-ঝড়ে-জঙ্গলে। জঙ্গলেই আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই।

জ্যোতি ঠাকুর— যথার্থ বলেছেন। আপনার কথা অস্বীকার করার মতো কোন তথ্য আমার কাছে নেই। বলুন, আপনি আরো বলুন, আমি আপনার কথা শুনতে চাই, আপনাকে জানতে চাই।

দৃশ্য : পঞ্চাশ

লোকেশান : (মন্তাজ)

শিমুলতলার জঙ্গলে চারপাশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে নিপীড়িত, বঞ্চিত, সমাজচ্যুত মানুষেরা একজন দুজন করে লালনের জঙ্গলের নতুন বসতিতে আসতে থাকে। ধীরে ধীরে শিমুলতলা জঙ্গল আর জঙ্গল নেই একটা ছোট গ্রামে রূপান্তরিত হচ্ছে। কেউ কেউ সস্ত্রীক, কেউ একা, কেউ বা প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এসে ঘর বাঁধছে। যে যার সাধ্য মতন রোজগার করে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করছে। এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ বলে কিছু নেই। কেউ ইচ্ছে হলে ধর্ম পালন করে, কেউ করে না। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, এদের ধর্র্ম গান। সারাদিনের কাজকর্মের শেষে রাতের বেলায় সবাই লালনের ঘরের সামনে বড়ো উঠোনে জড়ো হয়। যার যেমন ইচ্ছা গান করে। কেউ অন্যের গান গায়। কেউ নিজে গান বাঁধে, নিজেই সুর দেয়। কেউ কেউ নিজেরাই বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে গায়কদের সাথে সঙ্গত করে। যারা একটু-আধটু লেখা-পড়া জানে, তারা নিজের এবং কখনো বা অন্যের গান লিখে রাখে। বিশেষ করে লালন যখন গান বাঁধতে বাঁধতে গায়, তখন তার ভক্তদের কেউ কেউ সে গান খাতায় লিখে রাখে। এভাবেই লালন এবং তার সঙ্গীদের জীবন সঙ্গীতকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। সঙ্গীতকে কেন্দ্র করেই যেন বাউল সম্প্রদায় তথা ধর্ম সুসংহত হতে থাকে।

দৃশ্য : একান্ন

লোকেশান : লালনের ঘর

সময় :  মধ্যরাত

লালন ঘরের ভেতর একা শুয়ে আছে। বাইরে নারীকণ্ঠের গুন গুন গান শুনে পাশে ফেরে কয়েকমুহূর্ত পর গানের পরিবর্তে ফিসফিস আওয়াজ শোনা যায়।

কমলি— (চাপাস্বরে) সাঁই!

লালন— কে?

কমলি— আমি কমলি। ঘরে আসবো?

লালন— আসো!

কমলি— (ঘরে ঢুকে লালনের পাশে বসে) সাঁই, একখানা কথা কইব?

লালন— কও!

কমলি— আপনার জীবনটাও নষ্ট হচ্ছে, আমার জীবনটাও নষ্ট হইছে। (পজ) আমরা মিলতে পারি না?

লালন— কি কইতে চাও।

কমলি— কম বয়সে স্বামী গেল, বেধবা হলাম। তারপর কশেমের সাথে ঘর বাঁধতে চাইলাম। কিন্তুক কি হলো? কাশেম অকেজো হয়ে পড়ে রইলো। এতো বছর ওরে টানলাম, মনে কয় ও আর বাঁচবে না, আর বাঁচলেই বা কি, ওর কোনো ক্ষমতা নেই। (পজ) সাঁই, আমি আপনারে চাই।

কমলি লালনের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লালন বেশ কিছুক্ষণ তাকে বুকের উপর রেখে তার মাথায়, পিঠে হাত বুলায়। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখ তুলে ধরে।

লালন— আমি তোমারে চাই না কমলি।

কমলি— কেন, কেন, আমি কি পাপ করিছি?

লালন— পাপ-পূণ্যের কথা না কমলি, চাওয়া না-চাওয়ার কথা। তুমি আমার বোনের মতন, বন্ধুর মতন তার চাইতে বেশি কোনোদিন কিছু ভাবতে পারিনি। আর পারবোও না। রাগ করো না। তুমি চিরকাল আমার বন্ধু থাকো।

কমলি— সাঁই, আমার একখান কথা জবাব দেবা? মোসলমানের সোয়ামী মরলে, খেরেস্তানের মরলে তারা দুই-তিনবার বিয়ে করলেও দোষ নেই, কিন্তুক হিঁদুর যুবতী মেয়ে বেধবা হলে তার কেন আর বিয়ে হয় না? ভগবানের এ কেমন বিচার? হিঁদুর ভগবান কেন এত নিষ্ঠুর?

লালন— ভগবানের বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই, কমলি।

কমলি— আমি অভাগী, আমার কপালে পুরুষ নাই। (পজ) আর একখান কথা কবো?

লালন— কও।

কমলি— আমি আর একজনরে মনে মনে মন দিছিলাম। তারে মুখেও সেকথা বলিছিলাম। কিন্তুক সে মানুষটার সাহস নাই, ভীতু, সে আমারে নিতে পারলো না। পিছিয়ে গেল। তুমি তারে চেনো।

লালন— কে?

কমলি— তোমার দোস্তো।

লালন— (চমকে উঠে বিছানায় বসে) বলো কি! কালু!

কমলি— হ্যাঁ, কালু।

লালন— কবে, কদ্দিন আগে?

কমলি— কাশেমের সাথে আমার ওসব কিছু ঘটার আগে।

লালন— সে তো অনেকদিন…

কমলি— রাগ করবা নাতো, খারাপ ভাববা না তো, তাইলে আর একখানা কথা কইতে পারি।

লালন— কও।

কমলি— সাঁই, মেয়ে লোকের বুকের জ্বালা তুমি বুঝবা না। (পজ) আমি কাল রাতে তার কাছে যেয়ে তারে চাইলাম।

লালন— সে কি কয়?

কমলি— আমি তো আগেই বলেছি তার সাহস নাই, সে ভীতু। আগেও যেমন ফিরায়ে দিছে, কালকেও তেমনি আমারে ফিরায়ে দিল। কিন্তু আমি মনে মনে জানি, সে আমারে চায়।

লালন— গোলমেলে কা- বাঁধিয়ে দিলে হে কমলি!

কমলি— ঠিক কয়েছ, আমি যেন শুধু গোল পাকাতেই জন্মেছিলাম। (পজ) আমার কি হবে সাঁই?

লালন— আমার জানা নাই। আমি মুখ্যু-মানুষ, দুখের ভাগ নিতে পারি, সুখ দিতে পারি না।

দৃশ্য : বাহান্ন

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : সকাল

কালু মির্জা সকাল দিয়েই খেঁপে গেছে। সে হাতের কাছে দা, কুড়–ল, লাঠিসোটা যা পেয়েছে, তাই দিয়ে পর পর ঘর ভেঙে ফেলছে। তার রুদ্র মূর্তি দেখে ধারে কাছে কেউ যাওয়ার সাহস করছেনা। ভাঙতে ভাঙতে সে দশ-বারোখানা ঘর ভেঙে ফেলার পর কুড়–ল ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করছে— আমি বানাইছি, আমিই ভাঙব, ভেঙে চুরমার করে দেবো, কার বাপের কি!

কিছুক্ষণ দম নিয়ে সে আবার ভয়ংকর চিৎকার করতে করতে ঘর ভাঙতে থাকে। লালন চিৎকার চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে এলেন। তাকে দেখে সবাই তার কাছে এগিয়ে যায়। কালু মির্জাকে নিরস্ত্র করার জন্যে অনুরোধ করে, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে।

লালন— (মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে) না, ওকে কিছু বলবো না। আমি কারুর গুরু নই। মাতব্বর নই। ওর ইচ্ছে হয়েছে ঘর ভাঙছে, আবার ইচ্ছে হলে ঘর গড়ে দেবে।

কালু ওর কথা শুনে কুড়–ল ফেলে দিয়ে এগিয়ে এলো।

কালু মির্জা— ঠিক কথা, দোস্তো, সারকথা কয়েছো। আমার ইচ্ছা হলে গড়ব, ইচ্ছে হলে ভাঙব, আমার যেমন ইচ্ছা তেমন করবো! (পজ) এইবার এই দ্যাখো, তোমাদের পেছনে লাথি মেরে (পাশে দাঁড়ানো একজনের পেছনে লাথি মেরে) আমি চলে যাচ্ছি… চলে যাচ্ছি… আর কোনো দিন ফিরবো না।

কালু মির্জা চিরকালের জন্য শিমুলতলা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

দৃশ্য : তিপান্ন

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : অপরাহ্ণ

(কালু মির্জা শিমুলতলা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সর্বহারাদের গ্রামটা যেন তার প্রধান প্রাণশক্তির কেন্দ্রকেই হারিয়ে ফেলেছে। যদিও লালনকে কেন্দ্র করেই শিমুলতলা গড়ে ওঠে তথাপি তিনি যেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরের মানুষ। সাধারণ মানুষ তার কাছে যেতে একটু দ্বিধা করে। লালন এবং অন্যদের মধ্যে যোগসূত্ররূপে এতদিন কালু মির্জাই পরোক্ষ দায়িত্ব পালন করে এসেছে। সে না থাকায় গ্রামের পরিবেশটা কিছুটা থমথমে। লালন এমনিতে স্বল্পভাষী, আত্মমগ্ন, প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ফলে তাঁকে কাছের মানুষ ভেবে জীবনের নানা সংকটে সমস্যায় পাশে পাওয়া ওদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক তেমন সময়ে দুদ্দু শাহ্ উপস্থিত হয়ে কালুর শূন্যস্থান পূরণ করে)।

কিছুকাল আগে প্রান্তরের মধ্যে, পুকুরপােেড় বসে বিশ্রামরত অবস্থায় যে ফকিরের গান শুনে লালন বিস্মিত হয়েছিলেন সে হঠাৎ এসে দাঁড়ালো শিমুলতলায়। চারপাশে তাকালো। তারপর গাঁয়ের নতুন অধিবাসী শীতলকে দেখে তার কাছে এগিয়ে গেল।

দুদ্দু শাহ্— এই তুই এখানে থাকিস?

শীতল— হ্যাঁ।

দুদ্দু শাহ্— লালন সাঁই কোথা, তার সাথে দেখা করতি চাই।

শীতল— আপনি কোথা থেকে এয়েছেন?

দুদ্দু শাহ্— তা জেনে তোর কি হবে? আদার ব্যাপারি জাহাজের খোঁজ! লালন সাঁই  আছে কি না তাই বল!

শীতল— ভেতরে আছে।

দুদ্দু শাহ্— ডাক!

শীতল— ডাকবো? উনি বোধকরি ধ্যান-জিগির করতিছেন, উনি নিজি না-বের হলি ডাকা একটু মুশকিল…

দুদ্দু শাহ্— এই বিকেল বেলা ধ্যান-জিগির করতিছেন, তা রাতের বেলা কি করেন!!! ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করতিছি। উনি বের হলি আমার কথা বলবি, বলবি যে একজন আপনার সাথে দেখা করতি অনেক দূর থেকে এয়েছে।

শীতল— ঠিক আছে, বলে দেবো, আপনি আমার ঘরে চলেন, ততক্ষণ বসবেন।

দুদ্দু শাহ— তোর নাম কি?

শীতল— শীতল পাইক।

দুদ্দু শাহ্— পাইক! তা লাঠিখেলা জানিস, না কি হাওয়ায় ঘুরায়ে শোঁ শোঁ আওয়াজ তুলেই বাহাদুরি খতম?

শীতল— তা একটু জানি।

দুদ্দু শাহ্— আমার সাথে পারবি?

শীতল— আপনার যা চোটপাট দেখতিছি তাতে বলা খুব কঠিন! তবে লড়ে দেখতি পারি।

দুদ্দু শাহ্— তা যা, দু-খান পোক্ত-লাঠি নিয়ে আয়, আজ তোর পরীক্ষা নেব!

ওরা হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের মূল কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। তখন লালন তাঁর ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটা ছোট বেতের ধামা। ধামায় মুড়ি। তিনি ঘরের সামনে জড়ো হওয়া পাখিদের সামনে মুড়ির ধামাটা রাখলেন।

শীতল— ওই যে সাঁইজি বেরিয়েছেন।

দ্দ্দুু শাহ্— (বিস্মিত) উনিই লালন,

লালন ওদের কথা শুনতে পেয়ে ফিরে তাকালেন। দুদ্দু শাহ্ তাঁর কাছে গিয়ে নত হয়ে সালাম জানায়।

দুদ্দু শাহ্— সালাম সাঁইজি। এখন বুঝলাম, আমাদের একবার মোলাকাত হয়েছিল। কিন্তু বাতচিত হয়নি। আজ একটু বাতচিত করার বাসনা নিয়ে এলাম।

লালন— আসেন ভাই। বসেন। আমি মুখ্যু-মানুষ, আমি আর কি বাতচিত… সেদিন আপনার গান শুনে আমি তাজ্জব বনে গেছিলাম। কেউ যে অমনভাবে পানির ভেতর থেকে গান টেনে আনতি পারে, আমার ধারণার বাইরে…

দুদ্দু শাহ্— ওসব ছাড়েন, আমি আর এমনকি গান বান্ধি, আপনিই এখন এ দ্যাশে গানের বাদশা। আপনার গানের বিষয়ে একটু খোঁজ-খবর নিতি চাই। আমার নাম দুদ্দু, লোকে দুদ্দু শাহ্ কয়।

লালন তাঁর দাওয়া থেকে মাদুর টেনে আনতে গেলে শীতল তাঁর হাত থেকে নিয়ে সেটা বিছিয়ে দিল। ওরা দুজন বসলেন। শীতল একটু দূরে সরে মেঝেতে বসে।

শীতল— আমি আপনার নাম শুনিছি, আপনার গানও শুনিছি, অন্য লোকের গলায়। আপনি খুব বড় কবিয়াল।

দুদ্দু শাহ্— তুই থাম! আমি কেউ না! (পজ) সাঁইজি, দু-চার খানা কথা আছে, জিগ্যেস করতি পারি?

লালন— আপনি তর্ক-বাহাস করতি এয়েছেন, আমি তা বুঝতে পারিছি! কিন্তুক ভাই, আমি তর্ক-বিতর্ক করি না।

দুদ্দু শাহ্— দু-একটা কথার জবাব তো দেবেন, তা না-হলি মানুষ মানুষের সাথে মনের ভাব বিনিময় করবে কিভাবে?

লালন— তা বলেন দেখি আপনার কি কথা শুনি।

দুদ্দু শাহ্— দেহতত্ত্ব কি?

লালন— দেহের ভেতর কি আছে তা খুঁজে দেখা।

দুদ্দু শাহ্— আত্মতত্ত্ব কি?

লালন— আত্মা কোথায় আছে, কি তার স্বরূপ, কি তার কাজ এসবের অনুসন্ধান করা।

দুদ্দু শাহ্— কিছুই পরিষ্কার হলো না। বুঝায়ে কন।

লালন— আত্মতত্ত্ব আর দেহতত্ত্ব শেষ বিচারে আলাদা কিছু নয়। আসলকথা সন্ধান, খোঁজ, তালাশ। কিসের তালাশ?

দুদ্দু শাহ্— কিসের?

লালন— জীবনের। জীবন কোথা আছে, কেমন আছে, কি তার স্বরূপ এই জানার জন্যি সন্ধান। একটা কথা আছে না, যা আছে ব্রহ্মা-ে তা আছে এই ভা-ে। তার মানে, যা বিশ্বভুবন জুড়ে ছড়ায়ে রয়েছে তার সবই এই দেহের মধ্যে পাওয়া যাবে। কথাটা আমি পুরো মানি বা না-মানি, বাউলদের খোঁজ করাটা দোষের নয়। এটাই দেহতত্ত্বের মূলকথা।

দুদ্দু শাহ্— এবার আত্মতত্ত্বের বিচার দেন।

লালন— দেহের ভেতর দিয়ে আত্মার খোঁজ করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। তাই দেহের ভেতর দিয়ে আত্মার সন্ধান করতি গেলে দেহটারে সুস্থ-সুন্দর আর পবিত্র রাখা দরকার। পবিত্র মানে কি?

অপকর্ম্ম না-করা, দেহের অপব্যবহার না-করা, অতিরিক্ত ভোগ-কাম-লালসা আর বাসনা বর্জন করা। সোজা কথায় ‘ইতোরপনা’ ছেড়ে ভদ্রভাবে জীবনের খোঁজ করা বা তার অর্থ সন্ধান করাই দেহতত্ত্ব কিম্বা আত্মতত্ত্বের সারকথা। আমার বিচার ভুল হতেও পারে ঠিক হতেও পারে, তবে এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলতি পারবো না।

দুদ্দু শাহ্— সাঁইজি, আপনি এতো সহজে এমন পরিষ্কার করে বললেন, আমি এর আগে কারো কাছে এমন বিচার পাইনি। আমি আপনার শিষ্য হতে চাই।

লালন— শিষ্য করা আমার কাজ নয়। কাউকে শিষ্য করা মানে তার সীমানা বেঁধে দেয়া, খাঁচার ভেতর বন্দি করা। শিষ্য নয়, আমি বড় জোর বন্ধু হতি পারি, পথের সাথী হতি পারি।

দুদ্দু শাহ্ লালনকে প্রণাম জানায়। তখন দূরে কোথাও সন্ধ্যার শঙ্কধ্বনি বেজে ওঠে এবং একই সাথে শোনা যায় আজান।

দৃশ্য : চুয়ান্ন

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : পূর্ণিমা রাত

শিমুলতলার নারী-পুরুষ সবাই পাশের মাঠে জড়ো হয়েছে। কেউ গান গাইছে, কেউ বাজনায় সঙ্গত করছে। মূলত কম বয়সী ছেলে-মেয়েরাই অংশ নিয়েছে। বড়রা তাদের তিনদিকে ঘিরে বসে ওদের  উৎসাহ দিচ্ছে। লালন, দুদ্দু শাহ্, মনিরুদ্দিন এবং আরো কয়েকজন নবাগত বয়স্ক নারী-পুরুষ একপাশে বসে রয়েছেন। ওদের গান-বাজনার একফাঁকে শীতল লালনের কাছে এলো।

শীতল— আমরা লাঠিখেলা জানি। খেলা দেখাবো?

লালন— দেখা।

শীতল— দুদ্দু ভাই, এক হাত হবে নাকি?

দুদ্দু শাহ্— হোক! লাঠি নিয়ে আয়।

শীতল— আমি রণপা খেলাও জানি, দেখাবো?

দুদ্দু শাহ্— আমিও একটু-আধটু জানি, কিন্তু রণপা এখেনে পাবি কোথায়?

শীতল— আমার ঘরে আছে। একখান সাথে করে এয়েছিলাম, আর তিনখান কদিন ধরে বানাইছি। এতো কষ্ট করে শিখিছি, বিদ্যাটা নষ্ট করতি মন চায় না।

লালন— জানা বিদ্যে নষ্ট করবি কেন, সব কিছুই কাজে লাগে চল, আমিও শিখবো।

শীতল— আপনি শিখবেন!

লালন— কেন, তোর অসুবিধা কি? পাগল কোথাকার! যা লাঠি-সোটা আছে, যা নিয়ে আয়। দিন-কাল ভালো না, গলার জোরের সাথে সাথে একটু হাতের জোরও দরকার।

শীতল আরো পাঁচ-ছজন ছেলে ডেকে নিয়ে তার ঘরের দিকে দৌঁড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে একগাদা লাঠি এবং চারখানা রণপা এনে মাঠে খেলা দেখাতে শুরু করে। যারা গান-বাজনা করছিলো তারাও গান ছেড়ে ওদের খেলা দেখতে থাকে। লালন নিজেও ওদের সাথে যোগ দিলেন। তিনি প্রথম জীবনে লাঠিখেলা শিখেছিলেন সেটা খানিক ঝালিয়ে নিয়ে তারপর রণপায়ে হাঁটা শিখতে চেষ্টা করতে লাগলেন। লাঠিখেলা  এবং রণপা শিখার আসর বেশ জমে উঠলো।

দৃশ্য : পঞ্চান্ন

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : সকাল

লালনের ঘরের সামনে একটা গাছের গুড়িতে কাঙাল হরিনাথ, মীর মশাররফ হোসেন, গায়িকা সর্বক্ষেপী এবং গগন হরকরা। লালন বাড়ির পাশে ক্ষেতে কাজ করছিলেন ওদের দেখে এগিয়ে এসে নমস্কার করে দাঁড়ালেন।

হরিনাথ— আপনিই লালন সাঁই?

লালন— আজ্ঞে হ্যাঁ।

হরিনাথ— আমাকে চেনেন?

লালন— আজ্ঞে না।

হরিনাথ— আমি হরিনাথ মজুমদার, লোকে কাঙাল হরিনাথ বলে। তার কারণ আমি সত্যিই কাঙাল। আমি একটা খবরের কাগজ চালাই। সেই সুবাদে দু-দশ জন আমাকে চেনে-জানে। কিন্তু সেটা কথা নয়, আমি গান ভালোবাসি। নিজে একটু-আধটু রচনাও করি। সেই কারণে আপনার কাছে এলাম। আপনার নাম আজকাল এতো শুনছি, বিভিন্ন গায়কের গলায় আপনার গান এতোবার শুনেছি যে, আপনাকে চাক্ষুষ করার লোভ সামলাতে পারলাম না… এদের সাথে আলাপ করাই, ইনি আমার তরুণ বন্ধু মীর মশাররফ হোসেন, ইতোমধ্যে ই বিখ্যাত, ভবিষ্যতে ভারতবিখ্যাত হবেন একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ইনি গায়ক গগন হরকরা, আর ইনি সর্বক্ষেপী গায়িকা। (পজ) গান শোনা যায় না?

লালন নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারপর দুদ্দুকে ইঙ্গিত করতেই সে ওদের বারান্দায় বসবার ব্যবস্থা করে অন্যদের খবর দেয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লালনের উঠোনে ভিড় জমে যায়।

লালন— আগে আপনাদের গান শুনি।

হরিনাথ— বেশ তো, সর্বক্ষেপী তুমিই শুরু করো।

সর্বক্ষেপী গান শুরু করে— হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো…

হারিনাথ লালনের কানে কানে বললেন— গানটা এই অধমের রচনা। লালন মাথা নেড়ে তাকে অভিনন্দন জানালেন। সর্বক্ষেপীর গান শেষ হতেই শ্রোতারা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। তারপর গগন হরকরা তার বিখ্যাত গান গাইতে আরম্ভ করলেন— আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে…

এবারও ¯্রােতারা আনন্দের উল্লাসে উল্লসিত হয়ে ওঠে। তারপর লালন গান ধরলেন—

                পাখি কখন জানি উড়ে যায়

                বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়…

হরিনাথ এবং তার সঙ্গীরা লালনের গান শুনে অভিভূত হলেন। তারপর গানের প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে হরিনাথ অন্য বিষয়ে কথা শুরু করলেন।

হরিনাথ— আপনি এখানে রীতিমতো একখানা গ্রাম পত্তন করেছেন, জমিদারের সাথে বন্দোবস্ত করেছেন?

লালন— আমরা ভিখারি মানুষ, কার সাথে কি বন্দোবস্ত করবো জানিনে।

হরিনাথ— এখানকার জমিদার কে তা জানেন?

লালন— শুনেছি ঠাকুরদের মহল।

হরিনাথ— ঠিক শুনেছেন। তার সাথে আর একটু শুনে রাখুন, ওরা খুব বড় মানুষ, খুব শিক্ষিত আর সম্ভ্রান্ত কিন্তু প্রজাদের খাজনা আদায়ের বিষয়ে কঠোর। তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান নয়, টাকাটাই ওদের কাছে বড়। তার মানে, ওদের সাথে একটা বোঝাপড়া না করলে যে কোনো সময় আপনাদের এখান থেকে উৎখাত করে দিতে পারে।

লালন— আমরা পথের মানুষ, দরকার হলি আবার পথেই নামবো…

হরিনাথ— একটু দৌড়-ঝাঁপ করে যদি জমিদারের সাথে একটা বোঝাপড়া করে নেওয়া যায় তাতে ক্ষতি কি? এতোগুলো মানুষ আপনাকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকতে চাইছে, ওদের যখন তখন পথে নামানো কাজের কথা নয়। আর একটা কথা, খবরের কাগজ চালাই বলে খবর রাখতে হয়, আপনারা হিন্দু-মোসলমান দুই দলকেই ইতোমধ্যে  চটিয়ে দিয়েছেন। একটু সাবধানে থাকবেন। বিশেষ করে রাতের বেলায়। আর কি বলি, মাঝে মাঝে আমার বাড়ি এলে ভালো লাগবে। একসাথে একটু গান-বাজনা করা যাবে। মনে থাকবে?

লালন— আপনার সব কথাই মনে রাখবো… আপনার বাড়ি আসবো, গান তো আমিও ভালোবাসি।

হরিনাথ এবং তাঁর সঙ্গীরা কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন। লালন তাকে বিদায় জানাতে একসাথে হেঁটে গাঁয়ের সীমানা পর্যন্ত এসে দাঁড়ালেন।

দৃশ্য : ছাপ্পান্ন

লোকেশান : নদীর পাড়ের কালীমন্দির

সময় : সন্ধ্যা

কয়েকজন সঙ্গীসহ লালন রণপা করে নদীর পাড় ধরে হেঁটে আসছেন। আকাশে বিদ্যুতের চমক, বাজের গর্জন। ওরা যথাসম্ভব দ্রুত পাঁয়ে হেঁটে চলেছেন। কিন্তু অন্ধকারে সদ্যশেখা রণপায়ে খুব বেশি গতিতে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। আর খানিকটা এগিয়ে যেতেই বৃষ্টি নামে, ঝোড়ো বাতাসের দাপট শুরু হয়। ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পেতে ওরা নদীর ধারে কালীমন্দিরের দিকে হাঁটতে থাকে। লালনদের দল কালীমন্দিরের কাছে আসতেই মন্দিরের ভেতর থেকে কয়েকজন লোক ওদের দেখেই ভয় পেয়ে ‘বাবাগো, মাগো’ বলে চিৎকার করতে করতে পালাতে থাকে। লালনদের দল হাসতে হাসতে ওদের ডেকে ফেরাতে চেষ্টা করে, কিন্তু তারা আরো বেশি ভয়ে যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়, কেউ কেউ প্রাণবাঁচাতে জলে ঝাঁপ দেয়।

সঙ্গীসহ লালন রণপা খুলে মন্দিরের ভেতর ঢোকে। ভেতরে চাঁদর-চাপা দেওয়া একটা শবদেহ। তার পাশে মাটির সরায় সাজিয়ে রাখা আতপ চাল, কলা, অন্য কিছু ফল, জবা ফুল ইত্যাদি পূজোর উপকরণ। ওরা বিশেষ কিছু ভাবনা-চিন্তা না করেই ফল খেতে শুরু করে। তখন হঠাৎ পাশ থেকে মৃতদেহ যেন কাঁকিয়ে উঠলো! এবার ওরাই ভয়ে পিছিয়ে যায়। কয়েক মুহূর্ত পর লালন কিছু একটা ভেবে নিয়ে এগিয়ে যান, মৃতদেহের ওপরে জড়ানো চাঁদর সরান। দেখা যায়, মৃত দেহ একটা নয় দুটো, একজন বৃদ্ধ একজন তরুণী, একসাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা! বৃদ্ধ সত্যিই মৃত, কিন্তু তরুণী মরেনি, সে-ই মাঝে মাঝে কাঁকিয়ে উঠছে।

লালন— দুদ্দু শাহ্ ব্যাপার বুঝলা কিছু?

দুদ্দু শাহ্— মনে কয়, সতীদাহ করতি মেয়েটারে জোর করে ভাঙ খাইয়ে বান্ধিছে, জোর করে পুড়ায়ে মারতি চাইছিলো।

শীতল— কী সব্বনাশা কা-।

লালন— সতীদাহ ব্যাপারটাই সব্বনাশা। কোম্পানির সরকার নাকি এসব বন্ধ করে দিয়েছে তাই লুকায়ে-চুরায়ে রাতের আন্ধারে ওরা মেয়েটারে নিকেশ করতি চাইছিলো।

জুড়ান— কিন্তু এরে নিয়ে এখন কি করা?

মনসুর— আমরা আর কি করতে পারি? কার বাড়ির বউ কে জানে, পরে আবার থানা-পুলিশ করতি না হয়!

শীতল— ওরে বাবা! ওসব ঝামেলা ছেড়ে বনে-জঙ্গলে ঘর বাঁধলাম একটু শান্তিতে থাকবো বলে, কিন্তুক এখানেও শান্তি নেই।

দুদ্দু শাহ্— সাঁইজি, আপনি কি কন? আমার মনে কয়, এসব ফ্যাকড়ায় না জড়ানো ভালো। আমরা বিবাগী-মানুষ, এসব আমরা সামলাতে পারবো না।

গনা— তো লাশটার কি হবে?

মনসুর— জ্যান্তটার বোঝা সামাল দিতেই হিমসিম তায় আবার মড়া!

দুদ্দু শাহ্— তো যার কপালে যা লেখা তাই হবে, আমরা এসব কিছু দেখিনি, শুনিনি, এবার ঘরে চল।

গনা— কিন্তুক লাশটা তো শেয়াল-কুকুরি খাবে, জ্যান্ত-মেয়েটারেও খাবে, নইলে কাল ভোর বেলা ওরা ফিরে এসে মেয়েটারে ওরা বাঁশপেটা করে মেরে ফেলবে। আমাদের গাঁয়ে একবার একটা এমন ঘটনা ঘটছিলো।

জুড়ান— না, লাশের সৎকার না করে ফেরা যায় না। এই মেয়েটারেও এমনভাবে ছেড়ে যাওয়া পাপ। আমরা এমন পাপ কাজ করতে পারি না।

দুদ্দু শাহ্— সাঁইজি আপনি কিছু কন?

লালন— তুমি কও।

দুদ্দু শাহ্— আমি কই, এসবে আমরা থাকতি পারি না। আমরা ভিখারি-মানুষ। ভিখারিদের সারা গায়ে দোষ, একটু এদিক-ওদিক হলেই গেরস্থ লোকেরা আমাগো সাধের শিমুলতলা জ্বালায়ে পুড়ায়ে ছারখার করে দেবে। তাই ওসব মন্দিরের ঝামেলা মন্দিরে ফেলে এখন চলেন বাড়ি যাই।

লালন— তা বেশ, তোমরা বাড়ি যাও আমি এখানে একটু বসি।

দুদ্দু শাহ্— সে কি কথা! আপনি একা রাতের বেলা এখানে থাকবেন?

লালন— হাঁ, একটু দেখতি চাই মেয়েটার পুরো জ্ঞান ফেরে কি না।

শীতল— তা হয় না, সাঁইজি, আপনারে একলা ছেড়ে রেখে আমরা যেতে পারি না।

লালন— আমি একটা জ্যান্ত-মানুষ শেয়াল-কুকুরির ভোগে ছেড়ে দিয়ে পালাতি পারি না, তাই তোমরা যাও।

দুদ্দু শাহ্— বুঝলাম, আপানি ছাড়বেন না। এই শীতল, মোয়াজ্জেম, গনা— মেয়েটার বাঁধন খোল, ধর, তোল, ওঠা! চল, ওরে নিয়ে যাই। (পজ) মনসুর, জুড়ান, লাশটা তোল, নদীর জলে ভাসায়ে দেব। পোড়ানো যাবে না। কাঠ জলে ভিজে গেছে।

ওরা মেয়েটার বাঁধন খুলে তাকে ধরে নিয়ে মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে যায়। তার যেন একটু একটু করে নেশার ঘোর কাটছে। ওদের পেছন পেছন জুড়ান আর মনসুর লাশটাকে তুলে হাঁটতে থাকে। কাছেই নদী। ওরা মৃত বৃদ্ধের লাশ নদীর জলে ভাসিয়ে দিল। তারপর মেয়েটিকে প্রায় পাঁজাকোলে করে ধরে নিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পথে এগিয়ে চললো।

দৃশ্য : সাতান্ন

লোকেশান : গাঁয়ের পথ

সময় : সকাল

খুব রোগা-পটকা এক ব্রাহ্মণ আর একজন অতিরিক্ত মোটা মৌলবি দুজন গাঁয়ের পথে হেঁটে আসছে। ওরা চাপাস্বরে কোনো বিষয়ে শলা-পরামর্শ করছে। ওদের আলোচলার বিষয় যে খুবই গোপন তা ওদের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়। মৌলবি কথা বলতে বলতে বার বার পেছন ফিরে দেখছে, কেউ আশেপাশে আছে কি না। আর বামুন সামনের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে কখনো ঘাড় নিচু করে কখনো বা ডিঙি মেরে উঁচু হয়ে দেখছে। ওদের পোশাক-আশাক দেখে বোঝা যায় যে দুজনেই যথেষ্ট অবস্থাপন্ন। বিশেষ করে মৌলবি খুব সৌখিন। তার চোখে সুরমা, কানে গোঁজা আতর মাখনো তুলো, হাতে সোনার আঙটি।

বামুন— যাই কন আর তাই কন, ওই শালা জাতখেকো বেজাতদের অনাচার আর সহ্য করা হবে না।

মৌলবি— আরে দাদা, আমিও তো তাই কই। কিন্তুক আপনি বড় তাড়াহুড়া করতিছেন। কাটাগাছ জন্মাবার পরপরই তুলে ফেলা দরকার, আমরা তা করিনি, করতে পারিনি, এখন হড়বড় করলি ঝামেলা আছে। (পজ) আপনি জানেন, এই জাতখেকোদের গাঁয়ে এখন কতো মানুষ জড় হইছে?

বামুন— তা কম করে এক দেড়শো হবে।

মৌলবি— না, মহাত্মা! আমি গোপনে লোক লাগায়ে খবর নিছি, ওরা সাড়ে তিনশো জনের ওপর জড় হইছে, আরো হচ্ছে। মানে, দিনকে দিন লাথখোরদের দল ভরি হচ্ছে। আরে মশাই, রীতিমতো একখান গেরাম গড়ে ফেলিছে সক্কলের চোখের সামনে অথচ কেউ কোনো বাঁধা দিলাম না। এখন হায় হায় করলি হবে? আস্তে আস্তে, একটু একটু করে কাটাগাছের ঝাড় নির্বংশ করতি হবে।

বামুন— আচ্ছা, কন, চলেন দেখি চৌধুরীর বাড়ি যাই, তারপর দেখা যাক ওরা সবাই কি কয়, কি পরামর্শ দেয়… আমার কি মনে হয় জানেন, ওই শালা লালন ঢ্যামনাটারে যদি সুযোগ মতো নিকেশ করে দেয়া যায় তো ওর চেলারা ভয়ে পালায়ে যাবে, দলটা ভেঙে যাবে।

মৌলবি— আপনার কথার অদ্ধেক সত্যি! অদ্ধেক… শোনেন, লালনরে মেরে দিলি ওদের দল টালমাটাল হবে ঠিকই, কিন্তুক পুরো ভাঙবে না। একখান পুরো গাঁয়ের মানুষ এক ধাক্কায় পালায়ে যাবে, মনে হয় না।

বামুন— আপনার কথা একেবারে উড়ায়ে দিতি পারতিছি না। আসল কথা কি জানেন, আমার মাথার ঠিক নেই। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, রাতের বেলা এসে লালনরে কোপায়ে শেষ করে দিয়ে যাই।

মৌলবি—  মাথা ঠা-া রাখেন দাদা, এসব ঠা-া মাথার কাজ।

বামুন— কি করে মাথা ঠা-া রাখি বলেন তো? আমার বাড়ির বউ, আমার নিজের দাদার ধম্মপতœী, তারে কি না ছলাকলা করে ওরা নষ্ট করতি দলে ভিড়ায়ে নিছে! আর মাগিও কম লোক নয়! আপনি ভাবেন তো, বামুন ঘরের বউ, বেধবা হইছিস ভালো কথা, সোয়ামির সাথে এক চিতায় এক সাথে স্বর্গে যাবি তা না বারো-ঠেঙানো বেজাত গুলোর সাথে মিশে ইজ্জত নষ্ট করতিছিস! আহা! দুঃখে, লজ্জায়, অপমানে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। আমার বংশের সম্মান ধুলোয় লুটাচ্ছে। আমি এর একটা বিহিত না হওয়া পর্যন্ত থামবো না।

মৌলবি— একটু সবুর করুন, একটু ধৈর্য ধরুন, যা হোক একটু কিছু করতে হবে।

ওরা কথা বলতে বলতে একটা ছোটো নালার কাছে এসে দাঁড়ায়। নালাটা পার হতে গেলে একটা লাফ দিতে হবে।

বামুন রোগা মানুষ, সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে লাফ মেরে নালা পার হয়। কিন্তু মৌলবির পক্ষে অত সহজে ওপারে যাওয়া সম্ভব নয়। সে কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করে অন্যদিক দিয়ে পার হতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে বিরক্তমুখে অদৃশ্য সরকারের উদ্দেশ্যে বকতে থাকে।

মৌলবি— এর নাম দ্যাশ চালানো। আরে একটা রাস্তা সারাই করার ক্ষমতা নেই, আর তারা কি দ্যাশ চালাতি সাত সাগর পাড়ি মেরে এখানে এয়েছিস! বেজাতের দল! আহাম্মকের গুষ্টি।

বামুন— একখান ছোটো মতন লাফ মারেন, অসুবিধে হবে না।

মৌলবি— ধুর মশাই! সাড়ে তিন মন ওজন নিয়ে ছোট মতন লাফ মারা যায়, বলেন, যায় কি না?

বামন— আরে মেরেই দ্যাখেন না!

মৌলবি— আচ্ছা, চেষ্টা করি। আপনি সামনে আগায়ে আসেন, যদি পড়ে যাই তয় নাকটা যেন না ভাঙে, একটু ধরবেন।

বামুন— তা কি করে হয়… আপনারে তো আমি ছুঁইতে পারিনা।

মৌলবি— মহামুশকিল! আরে আপদে-বিপদে পাশে থাকবেন না, এ কি কথা!

বামুন— আচ্ছা, ঠিক আছে, নিতান্ত-বিপদ দেখলে একটা সিদ্ধান্ত করা যাবে।

মৌলবি— সিদ্ধান্ত করবেন।

বামুন— ঠিক আছে, আগে লাফ মারেন পরে আমি দেখতিছি…

মৌলবি কিছুক্ষণ পাঁয়তারা করে একটু পিছিয়ে গিয়ে ছুটে এসে লাফ মারে, কোনোক্রমে নালা পার হয়ে বামুনের গায়ের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয়। বামুন তার ছোঁয়া বাঁচাতে লাফ মেরে এক পা পিছিয়ে গেল। তৎসত্ত্বেও মৌলবির আঙুলের মৃদু ছোঁয়া বোধহয় বামুনের গায়ে লেগেছে!

বামুন— লাগলো না তো?

মৌলবি— আরে না। আমার হাতের হাওয়ার ঘসা লাগলেও লাগতে পারে, আপনার গায়ে লাগে নাই।

বামুন— একটু আলগাভাবে লাগছে কি?

মৌলবি— না না, আপনি কুলশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, আপানার গায়ে আমি হাত দিতে পারি, তা কি সম্ভব! কইলাম না, আমার হাতে হাওয়ার ছোঁয়া লাগতে পারে, আপনার গায়ে লাগে নাই।

বামুন— আপনি ধম্মপ্রাণ মানুষ, আমিও ধম্মপ্রাণ মানুষ, সত্যি কথা কন, ছোঁয়া লাগে নাই তো?

মৌলবি— কি মুশকিল! ছোঁয়া লাগলে আপনি টের পাইতেন না।

বামুন— সে কথা ঠিক। কিন্তুক মনটা যেন কেমন করতিছে…

মৌলবি— মহাজ্বালাতনে পড়া গেল। ঠিক আছে। আপনি ধম্মপ্রাণ আমিও ধম্মপ্রাণ, আপনি আগে কন, ছোঁয়া লাগছে?

বামুন— আশা করি লাগে নাই।

মৌলবি— আরে কি মুশকিল! ঘটনাটা ঘইটা গেছে, এখন আবার আশা-নিরাশার ব্যাপার আসে কেন। পরিষ্কার কথা কন! ছোঁয়া লাগছে?

বামুন— ভগবান জানে… লাগে নাই।

মৌলবি— হ্যাঁ! এতক্ষণে জায়গা মতো আসলেন। সবকিছু তাঁর ইচ্ছা। আমার হাতও যার, আপনার গতরও তার, আমরা নিমিত্ত মাত্র। এখন মন হালকা করে চৌধুরীর বাড়ি চলেন। ওখানে আবার বড় রকমের তর্ক-বিতর্ক করার আছে। মন হালকা করেন।

দৃশ্য : আটান্ন

লোকেশান : লালনে ঘর

সময় : জোছনা রাত

লালন তাঁর ঘরে শুয়ে রয়েছেন। জোছনা রাতের আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। তাঁর ঘুম আসছে না। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। তখন দূর থেকে দুজন রমণীকে ছায়ামূতির মতো এগিয়ে আসতে দেখা যায়।

কিছুক্ষণ পর কমলির চাপা-গলার ডাক শোনা যায়। লালন সাড়া দিলেন। কমলি সেদিন শ্মশান থেকে উদ্ধারকরা সেই বউটি অর্থাৎ ভানুমতিকে নিয়ে ঘরে ঢোকে।

কমলি— সাঁই আমারে তো নিলা না। এই অভাগা মেয়েটারে তোমার কাছে রেখো। ওর সঙ্গী নেই তোমারও নেই। আর সকলের কেউ না কেউ আছে। হয় নিজির বউ নইলে অন্য লোকের বউ, হয় সোয়ামি নয় তো নাগর, সব্বাই জোড়ায় জোড়ায় আছে। শুধু তোমার কেউ নেই। দ্যাখো যদি এর সাথে জোড় বাঁধতি পারো। (পজ) ভানতি দ্যাখ সাঁইরে বশ করতি পারিস! আমি এখন তয় যাই।

কমলি বেরিয়ে গেলে লালন অন্ধকারেই ভানুমতির দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর লালন মৃদুকণ্ঠে কথা বলে।

লালন— বসো ভানতি।

ভানুমতি লালনের বিছানার এক পাশে বসে।

লালন— তোমারে কি কমলি জোর করে আমার কাছে পাঠাইছে?

ভানুমতি— জোর করবে কেন, আমার ইচ্ছা আছে বলেই আমি আসলাম।

লালন— তুমি যে এখন ভালো হয়ে গেছ, মনের জ্বালা-যন্ত্রণা যে কমছে, এইটা আমার খুব ভালো লাগতিছে।

ভানুমতি— আপনি আমারে বাঁচাইছেন। নতুন জীবন দিছেন, আপনি আমার ভগবান।

লালন— আমি বাঁচাবার কেউ না ভাই, যার বাঁচাবার সেই তোমার জীবন ফিরায়ে দিছে।

ভানুমতি— আমি সব শুনিছি। সেদিন রাত্তির বেলায় আমারে এখানে কেউ আনতি চায়নি। শুধু আপনি একা জোর করেছিলেন বলেই ওরা রাজি হয়েছিলো। তা না  হলি সেদিন আমারে শেয়াল-কুত্তায় খেয়ে ফেলতো। সাঁই আপনি আমার দেবতা… আমার পরমেশ্বর…

লালন— ওসব কথা থাক, ভানতি। ছোটো বিষয় বড়ো করে দেখতি নাই।

ভানুমতি— একখান কতা কবো?

লালন— কও।

ভানুমতি— আপনি আমারে বাঁচাইছেন। আমি তো মেরেই গেছিলাম। নতুন করে যখন জীবন দিলেন তখন আমার জীবন আমি আপনার কাছে জমা রাখতি চাই। আপনি জমা নেন।

লালন— ভানতি, আমি কারোর জীবনের দায় নেওয়ার মতো মানুষ নই। আমার অনেক সমস্যা। অনেক ঝামেলা, অনেক রকমের আপত্তি-বিপত্তি আছে। সবকথা তোমারে বুঝায়ে কইতে পারবো না। সবকথা আমি নিজেও বুঝতি পারি না। শুধু এই কথাটা বুঝি। আমার জীবন আর কারো মতন হবে না। হইতে পারে না। আমি পাতকী, মহাপাতকী।

ভানুমতি— ওকথা বলেন কেন? আপনার মতো মানুষ হয় না।

লালন— তোমার কথা যদি সত্যি হয়, তা হলি আমারে তুমি চাইতে পারো না। যার মতো মানুষ হয় না, তার কাছে কিছু চাওয়া যায় না। চাইলেও লাভ হয় না।

ভানুমতি— আপনি কি চান?

লালন— জানিনে।

ভানুমতি— আপনার দেহের খিদে নেই? আপনি রক্তের ডাক শুনেতি পান না?

লালন— তুমি খুব সুন্দর কথা বলতি পারো। ভানতি, আমার দেহের খিদে আছে, রক্তের ডাকও আছে। আমি মাঝে মাঝে সে ডাক খুব জোরে-শোরে শুনতি পাই একথা সত্যি। তবু আমি সাথি চাইনে। অন্তত এই সময়ে আমার মন ওদিকে নেই।

ভানুমতি— কেন?

লালন— আমি মায়ায় জড়াতি চাই না।

ভানুমতি— আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?

লালন— কও।

ভানুমতি— আমি মনে মনে আপনারে ভালোবেসে ফেলেছি। এই জীবন শুধু আপনারই মন দিছি। আমি আপনার বুকের ওপর শুয়ে থাকতি চাই। আপনার বুকের গান আমি বুকের গানের সাথে মিলিয়ে শুনতে চাই।

লালন ভানুমতিকে বুকে টেনে নেয়। ভানুমতি তার বুকের ওপর শুয়ে হঠাৎ প্রবলভাবে কাঁদতে শুরু করে।

লালন— কি হলো? কান্দো কেন?

ভানুমতি— কান্দি সুখে। আমি যারে ভালোবাসি তার বুকে জায়গা পাইছি। কান্দি দুঃখে, আমি যারে ভালোবাসি তারে পাইলাম না। আমার মতন অভাগী আর কে আছে?

লালন— আমরা কেউ কিছুই পাইনা। মানুষ কিছু পায় না শুধু হারায়। তার কিছুই নেই। কিন্তু হারাবার জন্য সারা বিশ্ব-ব্রহ্মা- আছে।

ভানুমতি— তা হলি মানুষ কেন বাঁচে?

লালন— হারাবার খেলা খেলতি।

ভানুমতি— তা হলি তো আমার খেলা শেষ। আমার যা হারাবার ছিলো সবই তো হারিয়েছি তায় আর কেন? এবার তো জীবনের খেলা শেষ করি দিই।

লালন— না ভানতি, তোমার আরো কিছু হারাবার আছে, তাই তোমায় বেঁচে থাকতি হবে। আমারও অনেক কিছু হারাবার বাকি আছে তাই বাঁচার সাধনা করতি হবে। ভানতি, সব কিছু হারাতে হারাতে বাঁচতে পারাই সবচেয়ে বড় রকমের বাঁচা।

দৃশ্য : ঊনষাট

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : শেষ বিকেল

ঝোঁপ-ঝাড়ের পাশ দিয়ে লালন একা হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি গভীর মনোযোগসহ গাছপালা ফুল-ফল দেখছেন। এভাবে দেখতে দেখতে একটা নাম না-জানা বুনো ফুলের গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গাছের তলা থেকে একটা ঝরে পড়া ফুল তুলে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গান ধরলেন—

লালন—    একি আজগুবি এক ফুল

                ও তার কোথায় বৃক্ষ কোথায় আছে মূল…

লালন গান করছেন, আর গনা দূরে দাঁড়িয়ে তা বিড় বিড় করে মুখস্থ রাখার চেষ্টা করছে। দুদ্দু গনাকে উৎসাহ দিচ্ছে। লালনের গান শেষ হওয়ার পর ওরা দুজন তাঁর সামনে এলো।

দুদ্দু শাহ্— সাঁইজি, আপনি গান বাঁধবেন গনা তা মুখস্থ রাখবে। আর আমি পরে তা খাতায় লিখে রাখবো।

গনা— সাঁইজি, আপনার গান আমি যা শুনেছি তা সব আমার মুখস্থ আছে।

লালন— সাবাশ! গনার তো দারুন খ্যামতা। খুব ভালো খবর। শুধু আমার গান নয়, চারপাশে যারা ভালো গান বান্ধে তাদের সবার গান মনে রাখবা, লিখে রাখবা। দুদ্দু শাহ্, তোমার নিজের গান, গগন হরকার গান, হরিনাথের গান, আরো যারা কবিয়াল-গায়ক আছে সবাইকার গান গনা মুখস্থ করে এনে তোমার কাছে এনে ফেলবে, আর তুমি তা লিখে রাখবা আর… সময় মতো হারায়ে ফেলবা!

দুদ্দু শাহ্— কি যে কন, আমি বেঁচে থাকতি তা হবে না।

লালন— দুদ্দু ভাই, আমার গান তুমি লিখে রাখলিও হারাবে, না লিখলিও হারাবে।

গনা— তা হইতে পারে না।

দুদ্দু শাহ্— ঠিক কথা, আমরা থাকতি তা হবে না।

লালন— তোমরা না থাকলি তা হবে। মোট কথা হারাবেই হারাবে।

দুদ্দু শাহ্— আমি মুখ্যু-মানুষ। কিন্তুক একটা কথা বুঝি, এই দুনিয়ায় সব হারাতি চাই, পালাতি চায়, মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাতি চায়, আর মানুষ তার সব আঁকড়ে ধরতি চায়। এই আঁকড়ে ধরার কাজটাই মানুষের কাজ, এটাই মানুষের সাধনা।

লালন— দারুণ কথা বললে দুদ্দু, তুমি সত্যিকারের সাধক।

লালন বিড় বিড় করে সুর ধরেন।

                কী করি কোন পথে যাই মনে কিছু ঠিক পড়ে না।

                দোটানাতে ভাবছি বসে। ওই ভাবনা…

দৃশ্য : ষাট

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : সকাল

লালন তার সঙ্গীদের নিয়ে নিজেদের লাগানো পানের বরজ থেকে পান তুলছেন। তখন একজন এসে খবর দেয়, পাবনা থেকে দুজন লোক এসেছে। লালন তার ঘরে ফিরে এলেন, ওদের পাশে দাওয়ায় বসলেন।

মধুসূদন— আমার নাম শ্রী মধুসূদন কর। আর ইনি আহমদ আলী। আমরা পাবনার রাধানগর থেকে এয়েছি। আপনার একটা জলসা করতি চাই। ওদিকে আপনার ভক্ত আছে। জমিদার মন্মথবাবু স্বয়ং আপনার গান শুনতে চেয়েছেন। কবে যেতে পারবেন?

লালন— আমরা বাউল-ফকির, আমাদের আবার দিনক্ষণ কি?

আহমদ আলী— সামনে পূর্ণিমার দিন?

লালন— তা যেতে পারি।

মধুসূদন— একটা কথা, কত টাকা দিতি হবে?

লালন— টাকা? টাকা দিয়ে কি হবে?

আহমদ আলী— তা বললি হয়, সবকাজের মূল্য আছে। দক্ষিণা ছাড়া মানুষকে খাটাতে নাই। আপনি নিঃসংকোচে বলুন।

লালন— আমরা ভিখারি, যা হয় দেবেন।

মধুসূদন— আপনারা কজন যাবেন?

লালন— চার-পাঁচজন যেতে পারি।

মধুসূদন— (পকেট থেকে টাকা বের করে) এই নিন, যাওয়া-আসার ভাড়া, পথ-খরচা বাবদ দশ টাকা, আর আপনার নজরানা পঞ্চাশ টাকা।

লালন— এতো কি হবে? এতো টাকা একসাথে চোখেও দেখিনি। এতো লাগবে না।

আহমদ আলী— আপনি সাধক, তাই এমন কথা বললেন। কিন্তু বাঁচতে গেলে সাধক-শিল্পীদেরও খাওয়া-পরা লাগে, টাকাটা রাখুন।

লালন— (টাকা হাতে নিয়ে) ঠিক আছে, আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবো।

মধুসূদন— বেশ তবে আমরা চলি। দূরের পথ, আগে রওনা হওয়াই ভালো।

লালন— খাওয়া-দাওয়া করে যান, বেলা কম হয়নি তো…

আহমদ আলী— আর একদিন হবে। আগে আপনারা আসুন, ভাব-ভালোবাসা হোক… চলি, প্রণাম।

লালন— আসুন।

দৃশ্য : একষট্টি

লোকেশান : রাধানগর

সময় : সন্ধ্যা

অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী কেছু নেওয়ারির বাড়ির সামনে খোলা মাঠে প্যান্ডেল সাজিয়ে গান-বাজনার আয়োজন করা হয়েছে।

সন্ধ্যার আঁধার নামতেই গাঁয়ের মানুষ আসতে শুরু করে। রাত যত বাড়ে, ভিড় তত বাড়তে থাকে। গাঁয়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও এক এক করে আসতে লাগলেন। তাদের জন্য সামনের দিকে আলাদা চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আম-জনতার বসার জন্য মাটিতে চাটাই পেতে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি থেকে মাদুর হাতে করে আনছে এবং ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ছে।

প্রথমে ওই এলাকার বাউলরা তাদের দলবল নিয়ে গান গাইতে ওঠে। গান-বাজনা আরম্ভ হয়, লালন, দুদ্দু, শীতল, মোয়াজ্জেম, গনা এবং তাদের সাথে আরো কয়েকটা নতুন ছেলে মঞ্চের পাশে বসে। লালনের জন্য অবশ্য আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে,  কিন্তু তিনি সেখানে না বসে তার দলের লোকদের পাশেই বসে পড়েন।

লালন গান শুনতে শুনতে সাধারণ কৌতূহলবশত জনতার দিকে তাকান, পেছনের দিকে নজর করেন। বিশেষ কিছু চোখে পড়ায়, তিনি দুদ্দুর কানে কানে কিছু বললেন। দুদ্দু উঠে ভিড় কাটিয়ে পেছনের দিকে যায়।

পেছনের দিকে দেখা যায়, সেই মোটা মৌলবি আর রোগা ব্রাহ্মণ কয়েকজন ষ-ামার্কা লোকের সাথে কিছু বলাবলি করছে। ষ-ালোকগুলোর হাতে পাকা বাঁশের লাঠি, কারো হাতে সড়কি, কারো হাতে রামদাঁ।

দুদ্দু ফিরে এসে লালনের কানে কানে খবরটা পৌঁছে দেয়। লালন মাথা ঝাঁকান, চিন্তিতমুখে সিদ্ধান্ত করতে চেষ্টা করেন, তারপর উঠে গিয়ে আহমদ আলীকে সামনে পেয়ে বিষয়টা তাকে জানান। সে তৎক্ষণাৎ মধুসূদন করকে ডেকে আনে। মধুসূদন অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা কেছু নেওয়ারির কাছে গিয়ে তাকে সবজানায়। ভেতরে ভেতরে তখন বেশ একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এক পর্যয়ে ওরা জমিদার মন্মথবাবুর কাছে খবর পাঠায় এবং লালনকে মঞ্চের পেছনে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়।

গানবাজনা পুরোদমে চলছে। একদলের গান শেষ হলে তারা মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছে, নতুন দল ওঠার সময় বাউলদের রীতি অনুযায়ী ‘আলেক’ শব্দটি চিৎকার করে বলতে বলতে মঞ্চে উঠছে। জনতাও একই ধ্বনির মাধ্যমে চিৎকার করে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

স্থানীয় বাউলদের গান শেষ হলে লালনের ডাক পড়ে। লালন মঞ্চে আসতেই জনতা হই হই করে তাকে স্বাগত জানায়। জনতার উল্লাস থামতেই একজন ব্রাহ্মণ মঞ্চের কাছে এগিয়ে আসে।

ব্রাহ্মণ— গান-বাজনা শুরু করার আগে লালন সাঁইরে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

জনতার গুঞ্জন থেমে যায়। এই নতুন পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। তাই সবাই উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করে। যদিও গায়ক-সাধকদের মধ্যে তর্কবিতর্ক বা শাস্ত্রের বিচার-বিবাদ নতুন কিছু নয়। দুজন বড় মাপের বাউল বা সাধক একত্র হলেই এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিন্তু এখন যা ঘটতে চলেছে তা দুই বাউলের বিতর্ক নয়, এক শাস্ত্রী আর এক বাউলের মধ্যে বিতর্ক। বিষয়টা নতুন মজার খোরাক জোগাতে পারে আন্দাজ করে জনতা সাগ্রহে অপেক্ষা করে।

লালন জবাব দেয়ার আগেই এক মৌলবি হঠাৎ প্রশ্ন করে— শাস্ত্রী মশায়ের কথার আগে আমি একখান ছোট্ট কথা জানতে চাই, লালন সাঁই হিন্দু না মোসলমান?

লালন কি বলবে মনে মনে স্থির করার আগেই আহমদ আলী মঞ্চে উঠে এলো। সে বিনীতভাবে বলে— ভাই এসব বিষয় নিয়ে গান-বাজনার পরে কথা হবে। লালনজি আজ রাতে থাকবেন, কাল দুপুর পর্যন্ত এখানে আছেন, এসব বিষয় নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। এখন গান হোক।

শাস্ত্রী মশায় তখন বেশ মেজাজ নিয়ে বলে— এসব বিষয় নিয়ে গানের আগে কথা-বার্তা কইতে দোষের কি? গান শোনার আগে কেমন মানুষের কাছ থিকে কি গান শুনতিছি তা জানা ভালো। (পজ) তা বলেন সাঁইজি, আপনার জাত কি, ধর্ম কি? পষ্ট কথা কন!

মৌলবি— আপনি নাকি নামাজ পড়েন, আবার শুনি কৃষ্ণভজনা করেন, আবার শুনি নদের নিমাই নিমাই বলে নাচানাচিও করেন, তারপর শুনি আল্লা-রসূল নিয়ে গান বান্ধেন, সত্যি করে বলেন তো আপনি কার পূজারি?

শাস্ত্রী— আপনি সত্যিকারের পূজারি না কি অনাচারি?

লালন একতারাতে হালকা সুর বাঁধতে বাঁধতে মৃদু হাসতে থাকেন। আহমদ আলী এবং মধুসূদন কর মঞ্চের পাশ থেকে ইঙ্গিতে লালনকে গান শুরু করতে বলে। লালন মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। তিনি এক পা এগিয়ে এসে মঞ্চের একেবারে প্রান্তে দাঁড়ান। তারপর একটু মাথা নিচু করে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে মাথা উঁচু করেন। ঠিক তখন একটা ঢিল উড়ে এসে তার বুকে লাগে। লালন অপ্রস্তুত হয়ে একটু পিছিয়ে যান। কিন্তু লালনকে লক্ষ্য করে পরপর ঢিল উড়ে আসতে থাকে। একটা এসে তাঁর কপালে লাগে। কপাল ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তিনি নিজেকে সামলে পরনের কাপড় দিয়ে কপাল বেঁধে মঞ্চের শেষ দিকে সরে গিয়ে একতারা শুদ্ধ দুহাত তুলে মাথা বাঁচাবার চেষ্টা করতে লাগলেন।

তখন আবার আহমদ, মধুসূদন এবং কেছু নেওয়ারি মঞ্চে উঠে উচ্ছৃঙ্খল দর্শকদের ধমকাতে থাকে। কিন্তু ঢিল ছোঁড়া বন্ধ হয় না, দু-চারখানা তাদের গায়েও লাগতে থাকে। ভীষণ বিরক্ত হয়ে কেছু প্রায়  চেঁচিয়ে ওঠে।

কেছু— এই! এসব কি হচ্ছে? তোমরা কি চাও?

ভিড়ের ভেতর থেকে একজন চেঁচিয়ে বললো— লালন শালার কি জাত?

শাস্ত্রী— আরে ভাই, মানুষকে ধমকে কি মুখ বন্ধ করা যায়? লালন সাঁই বলুক না কেন, তার জাত কি, ধর্ম কি?

মৌলবি— উনি মোসলমানদের বেইজ্জত করতিছেন, শরা-শরিয়ত মানেন না, আল্লা-রসূল মানেন না, যা ইচ্ছে তাই গেয়ে বেড়াচ্ছেন, আমরা এর বিহিত চাই, সোজা কথা!

শাস্ত্রী— ঠিক কথা। উনি মোসলমানদের ধম্ম নষ্ট করতিছেন, হিন্দুর ধম্ম-কর্ম্ম, আচার-বিচারও নষ্ট করতিছেন! আপনারা জানেন, উনি শ্মশান থিকে সতী ধরে নিয়ে নিজির কাছে রাখতিছেন! কী সাংঘাতিক কা-! আপনারা জানেন, ওনার আখড়ায় ব্রাহ্মণদের বেধবা মেয়ে ধরে নিয়ে জোর করে মোসলমানদের সাথে নিকে দিয়েছেন! আর শুনতি চান? ওনার আখড়ায় নাকি কোনো মেয়ের সন্তান হয় না, কেন হয় না? ওনাদের ওখানে পশুর মতো সহবাসের নিয়ম চালু হইছে। আর শোনবেন? ওনারা মলমূত্র খান, বীর্য খান, মেয়েদের ঋতুশ্রাব খান! ভাবতি পারেন, কত বড় অনাচার চলতিছে?

পেছন দিকে তখন প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে গেছে। একদল লোক চিৎকার করছে— মার শালাকে, কাট শালাকে! আজ এখানেই মেরে পুতে ফেল! অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, উদ্যোক্তাদের পক্ষে সামল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তারা তখন বাধ্য হয়ে লালনকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়।

ইতোমধ্যে গাঁয়ের জমিদার মন্মথবাবু খবর পেয়ে সশস্ত্র পাইক-বরকন্দাজ এবং বন্দুকধারী পুলিশ নিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হলেন। পুলিশ দেখে স্বাভাবিকভাবেই লালনের বিরুদ্ধবাদীরা আড়ালে সরে যায়। জমিদার মন্মথবাবু তখন মঞ্চে উঠে রাখঢাক না-করে দুস্কৃতীদের উদ্দেশ্যে সরাসরি হুমকি দিলেন— আর কেউ যদি টুঁ-শব্দ করে, তবে তার মাথা আস্ত রাখবো না, বলে দিলাম! লালন সাঁই হিন্দু, না মোসলমান, না খেরেস্তান, তা দিয়ে আমরা কি করবো? আমরা তার মতো এত বড় একজন সাধকরে হাতের কাছে পাইছি, তার গান শুনবো। ব্যাস। তিনি কোন বেধবার সাথে শোন, কি রকমভাবে শোন, কয়জন রাঁড় পোষেণ সে খবর নিয়ে আমরা কি করবো? তিনি হিন্দুর জাত মারেন, না কি মোসলমানদের জাত মারেন, সেই খবর কি সাধকের বিচার হয়? জাত-ধম্ম কি এমন পলকা ব্যাপার, যে ইচ্ছে করলি তা নষ্ট করা যায়? আর যদি সত্যিই তা এত হালকা-পলকা হয় তো তা উচ্ছন্নে যাক! আমরা গান-বাজনা ভালোবাসি। গান শুনতি চাই। এ্যাই, কেছু! সাঁইজিরে মঞ্চে নিয়ে আয়!

কেছু, আহমদ, মধুসূদন ও লালন এক সাথে মঞ্চে ফিরে এলেন। লালন জমিদারকে মাথা নুইয়ে নমস্কার জানিয়ে একতারায় সুর ভাঁজতে ভাঁজতে একবার পুরো মঞ্চ ঘুরলেন। জামিদারবাবু এবং অন্য সবাই মঞ্চ থেকে নেমে যায়। লালন মাথা নিচু করে দর্শকদের অভিবাদন জানিয়ে গান শুরু করেন।

লালন—    সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে

                লালন বলে জেতের কি রূপ

                দেখলাম না এ নজরে…

দৃশ্য : বাষট্টি

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : সকাল

লালন, দুদ্দ্,ু শীতল এবং অন্যরা শিমুলতলায় পৌঁছাবার মুখেই খবর পেলেন, কাল রাতে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের গোঁড়ারা মিলে শিমুলতলা জ্বালিয়ে দিয়েছে! গ্রামের অর্ধেক প্রায় নিশ্চিহ্ন। মেয়েদের মধ্যে অনেকের ইজ্জত নষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে ভানুমতির অবস্থা খারাপ। কমলি আরো কয়েকজনকে নিয়ে ঠিক সময়ে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে পেরেছিল বলে ওরা বেঁচে গেছে। ছেলেদের মধ্যে অনেকেই আহত, তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মনিরুদ্দিনের। তার বুকে মারাত্মক চোট লেগেছে। রাত থেকে এখন পর্যন্ত তার জ্ঞান ফেরেনি।

ওঁরা গ্রামে এসে দেখলেন ওদের ঘরবাড়ি, খেত-খামার সাজানো সংসার সবই তছনছ হয়ে গেছে। চারপাশে শুধু পোড়া-ভাঙা ধ্বংসের চিহ্ন।

শীতল বয়সে তরুণ। সে এসব দেখে নিজেকে সামলাতে পারে না। ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। লালন তার পিঠে হাত রেখে হাসতে হাসতে বললেন— আরে ভেড়ো, একবার ধ্বংসযজ্ঞ দেখেই কেঁদে ফেললি! আরও বহুবার এমন হবে, কিন্তু আমরা তো থামবো না। আমরা আবার গড়বো। চলো, হাত লাগাও। এখনই নতুন করে ঘর বাঁধবো। তার আগে ভানুমতীর ব্যবস্থা করো, মনিরুদ্দিনের ব্যবস্থা করো, যারা আঘাত পাইছে তাদের বের করে এক জায়গায় এনে একসাথে রেখে দেখভালের ব্যবস্থা করো। কোনো ভয় নেই, ওরা আবার আসবে, আমরা আবার বাধা দেবো!

দৃশ্য : তেষট্টি

লোকেশান : শিলাইদহ কুঠিবাড়ির ছাদ

সময় : সকাল

লালন তাঁর জীবনের গল্প শুনতে শুনতে এই পর্বে জ্যোতি ঠাকুর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধকণ্ঠে ডাকলেন— শচীনবাবু! (পজ)। এতো বড় সাহস, আমাদের জমিদারির ভেতর এমন ঘটনা ঘটতে পারে! শচীনবাবু!

লালন তাঁকে নিরন্ত করতে হাত নাড়ালেন। তারপর মুদৃ হেসে বললেন— ঘটনাটা কম করে তিরিশ বছর আগে।

জ্যোতি ঠাকুর— ও, আচ্ছা, যাই হোক ঘটনাটা মর্মান্তিক। (পজ) মানুষ কেন এতো নিষ্ঠুর, কেন এতো হিং¯্র? অবশ্য চিরকাল শিল্পী-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানীদের ওপর এমন অত্যাচার হয়েছে। বিশেষ করে যারা নতুন কথা শোনান, নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের রক্তাক্ত হতেই হয়।

লালন— তা ঠিক। তবে মাথা ফাটার পর কিম্বা গলার নলি কাটা যাওয়ার পর যে রক্ত পড়ে তার স্বাদ কেমন তা যার পড়ে শুধু সেই জানে। সবচেয়ে ভালো কি জানেন, রক্ত ঝরবেনা অথচ গান-বাজনা হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞান হবে, লোকে ধন্য ধন্য করবে, বাড়ির পর বাড়ি হবে, জুড়িগাড়ির পর জুড়িগাড়ি হবে… তাই না?

জ্যোতি ঠাকুর— আপনার বেদনার জায়গাটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এটাই ঘটে চলেছে। আপনি বোধহয় শুনেছেন, ইউরোপে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানী, যারা বিজ্ঞানের জগতকে প্রায় সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিলেন তাদেরও প্রাণ সংশয় হয়েছিলো বা হতে পারতো। তাদের আবিষ্কারের নথিপত্র বহুকাল লুকিয়ে রাখতে হয়েছিলো বা অস্বীকার করতে হয়েছিলো।

লালন— কিন্তুক এদেশের যে মানুষেরা শূন্য আবিষ্কার করেছিলেন তাঁদের প্রাণ সংশয় হয়েছিলো বলে শুনিনি। অথচ শূন্য-আবিষ্কার জগতের সেরা আবিষ্কার বললিও কম বলা হয়। আপনার ইউরোপ শূন্য না-পেলে কিন্তু এতো মাতব্বারি করতি পারতো না। আসলে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান যতো বাড়ছে, ততই তার অন্তর হিং¯্রতায় ভরে উঠছে। তার কারণ কি?

জ্যোতি ঠাকুর— কি, আপনার কি মনে হয়? স্বার্থপরতা বাড়ছে?

লালন— স্বার্থপরতা আগেও তো ছিলো, ছিলো না?

জ্যোতি ঠাকুর— স্বীকার করতেই হবে, ছিলো।

লালন— আমার মনে হয়, যাঁরা শূন্য-আবিষ্কার করেছিলেন তারা অন্তরের শূন্যতাকে অনুভব করতি পারিছিলেন। যা অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায় না তা আবিষ্কার করা যায় না।

জ্যোতি ঠাকুর— চমৎকার বলেছেন। যথার্থই তাই। আমি আপনার সঙ্গে একমত। যা উপলব্ধি করা যায় না বা কল্পনা করা যায় না, তা কারো পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব নয়।

লালন— এবার তবে আর একটা কথা বলি, যাঁর অন্তরে শূন্যতাকে অনুভব বা উপলব্ধি করিছিলেন তারা তাকে একই সাথে ধারণ করিছিলেন। অন্তরে ধারণ করতি না পারলি কল্পনা করা বা উপলব্ধি করা যায় না।

জ্যোতি ঠাকুর— অবশ্যই। আমি একমত…

লালন— তাই যদি হয় তবে একথা সত্যি, তাদের অন্তরের শূন্যতাটুকু দিয়েই তারা হিং¯্রতা ও স্বার্থপরতাকে জয় করতি পারিছিলেন।

জ্যোতি ঠাকুর— কিভাবে?

লালন— খুব সহজভাবে। শূন্য শুধু অংকে নয়, অন্তরেও জায়গা জুড়ে থাকতি পারে। অংকে তার জায়গা জুড়ে থাকার ব্যাপারটা দেখা যায়, কিন্তুক অন্তরের শূন্য দেখা যায় না। তাকে উপলব্ধি করতি হয়। উপলব্ধির ভেতর দিয়েই তার জায়গাটুকু তাকে ছেড়ে দিতি হয়। এই জায়গা ছাড়ার ব্যাপারটা খুব সহজ নয়, তার জন্য সাধনা করা লাগে। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়, শূন্যকে বা শূন্যতাকে লালন করতি হয়।

জ্যোতি ঠাকুর— বাহ্! তারপর?

লালন— লালন করতি করতি সে অন্তরে স্থায়ী আসন করে নেয়। আর যখন কারো অন্তরে শূন্য থাকে তখন সে স্বার্থপরতা আর নিজের মাঝখানটায় সেই শূন্যকে বসিয়ে দিয়ে নিজে নিরাপদ থাকতে পারে। কারণ শূন্যতা এক ধরনের অলঙ্ঘনীয় বাধা। সেই শূন্যতার বাধা পেরিয়ে কারো পক্ষেই আর স্বার্থপর বা হিং¯্র অথবা কপট কিম্বা অসৎ হওয়া সম্ভব নয়।

জ্যোতি ঠাকুর— অসাধারণ! এমন বিস্ময়কর, এমন নতুন ব্যাখ্যা আমি কারো কাছে পাইনি। আপনি শুধু গায়ক বা কবি নন, দার্শনিক। আমি যদি ভুল না করি, আপনি অবিস্মরণীয় ক্ষমতার অধিকারী। মহাকাল আপনাকে আসন ছেড়ে দিতে বাধ্য!

লালন— ছোট বিষয়কে বড় করে দেখতি নেই, আমি সামান্য মানুষ।

জ্যোতি ঠাকুর— দয়া করে আরো বলুন, আপনার জীবন যেমন নাটকীয় আপনার বোধের জগতও তেমনি বৈপ্লবিক। আমি শুনতে চাই।

দৃশ্য : চৌষট্টি

লোকেশান : কবিরাজের বাড়ি

সময় : অপরাহ্ণ

(ফ্ল্যাশব্যাক শুরু)

যদু— পাইক ও লালন কবিরাজ মশায়ের বাড়ি ঢুকছেন। ওঁরা চাপা-স্বরে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছেন।

যদু পাইক— কবিরাজ মশাই তোমারে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেছেন। আমি দুদিন পর পর তোমার গাঁয়ে যেয়ে ফিরে এয়েছি। তুমি কোথা যে গেছিলে। এই খবর দিয়ে এয়েছিলাম। কবিরাজ মশায়ের অবস্থা খুব খারাপ। এতোক্ষণ টিকে আছে কি না কে জানে।

লালন— কি হইছে?

যদু পাইক— কি আর হবে, বয়স। আরে লালু, তুই-ই বুড়িয়ে গেলি তো আর কবিরাজ! আমার গায়েও আর জোর-বল নেই, ফুরিয়ে গেছি রে লালু। (পজ) তুই বড় মানুষ হইছিস, আমি খুব খুশি হইছি… তোরে আমরা জ্যান্ত শ্মশানে ফেলে এয়েছিলাম। সে দুঃখু ভোলার না। কবিরাজ সেই জন্যি বোধ করি তোরে ডাকাডাকি করতিছে।

লালন— চলো…

ওরা কবিরাজের ঘরে ঢুকলেন। লালন কবিরাজের অবস্থা দেখে কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালেন, তারপর নিঃশব্দে তার শয্যার কাছে গেলেন।

যদু পাইক— কবিরাজ মশাই, লালু এয়েছে।

কবিরাজ— লালু কই বাবা, আমার মুখের কাছে আয়।

লালন কবিরাজের মুখোমুখি দাঁড়ালেন।

কবিরাজ— লালু, আমি তোর ওপর অবিচার করিছি। ভালো করে না-বুঝে, না-দেখে তোরে জ্যান্ত অবস্থায় পুড়ায়ে দিতি গেছলাম। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ। (লালনের হাত ধরে) আমারে ক্ষমা করা যায় বাবা?

লালন— ওসব কি কথা কন! ভুল তো মানুষেরই হয়। আপনার কোনো পাপ হয়নি। তাছাড়া আমি তো দিব্যি এতোকাল বেঁচেবর্তে আছি।

কবিরাজ— শোন, তুই ঘোড়া ভালোবাসিস, আমি জানি। আমার আগের সে ঘোড়া মরে গেছে। পরে একটা কিনিছি, এইটা আরো বড়, আরো সুন্দর, বয়সও কম। ওটা তুই নে। আমার আয়ু শেষ। আমার আর ঘোড়ার দরকার নেই।

লালন— ঘোড়া! আমি ভিখারি মানুষ, ঘোড়া পুষবো কেমন করে?

কবিরাজ— তুই ভিখারি নোস, সাধক। চারপাশে তোর নাম ছড়ায়ে গেছে। তোর নাম শুনলি লোকে কপালে হাত তুলে ঠাকুর দেবতার মতন নমস্কার করে। তোর জনম সার্থক। আমার এই সামান্য নজরানা আমি তোরে দিতি চাই। অমত করিসনে।

লালন— আপনার দান আমি মাথা পেতে নিলাম, আর্শীব্বাদ  করেন যেন মানুষের ভালোবাসা পাই। আমার আর কিছু চাই না।

কবিরাজ লালনের মাথায় কম্পিত হাত রাখলেন, তারপর অস্পষ্ট জড়ানো স্বরে বললেন, কল্যাণমস্তু, কল্যাণ হোক, শান্তি হোক শ্রী…

লালন ঘোড়ায় চেপে কবিরাজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন।

দৃশ্য : পঁয়ষট্টি

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : বিকেল

লালন, দুদ্দু, শীতল, গনা এবং আরো কয়েকজন মিলে গল্প করছিলেন। গল্পের ফাঁকে দুদ্দু একতারায় টুং-টাং আওয়াজ তুলছে। লালন নিজেও তাঁর একতারা কোলের ওপর নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। পরিবেশটা এমন যে এখনই কেউ গান শুরু করবেন।

তখন ওদের কথার মধ্যেই একটা যুবক ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, সাঁই খারাপ খবর!

লালন— কি খবর? কি খারাপ?

ছেলেটা— (মিজান) কুমারখালির হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি জ্বালায় দিতি ঠাকুর-জমিদাররা লেঠেল পাঠাইছে। হরিনাথরেও নাকি শুনলাম বেন্ধে নিয়ে গেছে।

লালন— সে কি! তুই কে, কোথায় থাকিস, এতসব জানলি কিভাবে?

মিজান— আমার নাম মিজান, হরিনাথের বাড়ির পাশে আমার বাড়ি। আপনি হরিনাথবাবুর বন্ধু লোক, আমি জানি, আপনারে হরিনাথের বাড়ি অনেকবার দেখিছি। তাই তো এ্যাদ্দুর ছুটে আসলাম।

লালন— গাঁয়ের লোকজন বাধা দেয়নি?

মিজান— কার ঘাড়ে কটা মাথা যে, জমিদারের লেঠেলের সামনে বাঁধা দিতি আসবে! একদম পুঁতে ফেলবে!

লালন— দুদ্দু, হরিনাথের এতবড় বিপদ, যাওয়া লাগে…

শীতল— কি কথা কন সাঁই। ওরা জানে মেরে দেবে।

লালন— সে কথা ঠিক। তা এখন কি করা উচিত বলে তোমরা মনে করো?

দুদ্দু— ওসব বাবুদের গোলমাল আমরা জড়াবো কেন, আমরা ভিখারি মানুষ, অপরের ভালো করতি গিয়ে শেষে নিজির বিপদ বাঁধায়ে লাভ কি?

লালন— বেশ তা তোমরা তবে এদিকটা সামলে রাখো আমি ওদিক যাই, দেখে আসি হরিনাথের কি সমস্যা।

গনা— আপনি একা?

লালন— তাতে কি?

শীতল— ওরা আপনারে কেটে ভোরাই গাঙে ভাসায়ে দেবে।

লালন— তা ভাই বন্ধুর জন্যি মাঝে মাঝে একটু ঝুঁকি নেয়া লাগে। নইলে আর বন্ধু বলি কেন?

দুদ্দু— বুঝলাম, আপনি ছাড়বেন না। বেশ, দেখা যাক, এই তোরা যদি কেউ যাওয়ার মন করিস তো চল, আমি আমার লাঠিখান নিয়ে আসি।

দুদ্দু উঠে পড়ে। লালন বাদ্যযন্ত্র ভেতরে রেখে লাঠি হাতে ফিরে আসেন। ততক্ষণে শীতল, মনসুর দুদ্দু, মোয়াজ্জেম ও জুড়ান সশস্ত্র অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। ওরা আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লেন।

দৃশ্য : ছেষট্টি

লোকেশান : হরিনাথের বাড়ি

সময় : শেষ বিকেল

হরিনাথের বাড়ির সামনে ছজন দশাসই লাঠিয়াল পাহারা দিচ্ছে। কারো কারো কোমরে ছুরি ঝুলছে। নায়েব মশাই একটা চেয়েরে বসে জমিয়ে তামাক টানছে। লালনদের দল ঢুকতেই নায়েব ভুরু কুঁচকে তাকায়। লাঠিয়ালরা শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।

নায়েব— তোরা কারা?

লালন— হুজুর, আমরা হরিনাথের বন্ধু।

নায়েব— বটে! সে তোদের পাঠিয়ে নিজে লুকিয়ে আছে, কোথায় সে?

লালন— সে আমাদের পাঠায়নি, কোথায় আছে তাও জানিনে।

নায়েব— সে পাঠায়নি তো তোরা এখানে মাথা গলাতে এলি কেন, যা পালা!

লালন— হরিনাথের নিজের জমি বলতে যেটুক ছিলো তা তো ইস্কুল গড়তে দিয়া দিছে, তার তো খাজনা-টাজনার ব্যাপার থাকার কথা নয়। তারে কেন ধরতে এয়েছেন?

নায়েব— তোরে কি কৈফিয়ৎ দিতে হবে, তুই কোথাকার মাতব্বর?

লালন— কৈফিয়ৎ না হুজুর, তার অপরাধ কি তাই জানতি চাই। আপনার বন্ধু এমন বিপদে পড়লি আপনিও জানতি চাইতেন।

নায়েব— জমিদারের কাজে বন্ধু-বান্ধব থাকলে চলে না। শোন, এই হরিনাথ কি একখানা ছাতামাথা কাগজ বের করে, তাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা নেই, আছে শুধু জমিদারের নামে কুৎসা। জমিদার নাকি প্রজাদের নিত্য অত্যাচার করে। কোথায় কোন গাঁয়ে নাকি প্রজাদের মারতে মারতে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে, কার বাড়িতে আগুন লাগিয়েছে, এইসব আজগুবি মিথ্যে কথা লিখেছে। লোকটার কী আস্পর্ধা। পূজ্যপদ দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর আমাদের জমিদার, সারাদেশের লোক যারে মাথায় করে রেখেছে, এই ব্যাটা তার নামে কলঙ্ক রটিয়ে বেড়াচ্ছে। এবার ওকে উচিত শিক্ষা দেবো!

লালন— নায়েব মশাই, দেশের রাজা কিন্তু আপনার জমিদার নয়, ইংরেজ কোম্পানি, বিচার তারা করবে। দরকারে আইন-আদালত করা যায়। কিন্তুক কারোকে জোর করে ধরে নেয়া যায় না। জমিদারের শাস্তি দেয়ার অধিকার নেই।

নায়েব— তুই আমারে আইন শেখাতে এসেছিস! এই কটা তালপাতার সেপাই নিয়ে? ভালো চাস তো পালা, নইলে সবগুলোর লাশ ফেলে দেব।

লালন— আমরা পালাতে আসিনি!

নায়েব— (উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়) কি?

লালন— এভাবে কাউকে ধরে নেওয়া যায় না, আমরা তা করতে দেবো না। তাহলে রক্তারক্তি হয়ে যাবে। আমি কই, আপনারা আদালতে যান।

নায়েব— রক্তারক্তি হয় হোক আমরা হরিনাথকে না নিয়ে যাবো না। (পজ) গুরমিত সিং!

গুরমিত— (এগিয়ে এলো) হুজুর?

নায়েব— এই বদমাশগুলোকে হঠিয়ে দে। জমিদারের লাঠিয়ালরা লাঠি বাগিয়ে এগিয়ে আসতেই লালন হাত উঁচু করে তাদের থামিয়ে দেয়। তারপর নায়েবের কাছে গিয়ে প্রস্তাব দেয়।

লালন— নায়েব মশাই, আমরা মারামারি করতে আসিনি। আমরা লাঠিয়াল কি পাইক-বরকন্দাজ নই, নিরীহ মানুষ। কিন্তুক লড়াই যখন করতেই হবে, তখন একটা কথা কই। অনেক দ্যাশে শুনিছি নিয়ম আছে, দুপক্ষের সকলে যুদ্ধ না-করে দুজন যুদ্ধ করে, দুজনের মধ্যে যে জেতে তার দল জিতে যায়। তাতে একটা সুবিধে হলো লোক মরে কম, রক্তারক্তি হয় কম।

নায়েব— তাই? এমন নিয়ম চালু আছি নাকি? বেশ, তোর কথা মানলাম। কিন্তু গুরমিতের চেহারা দেখছিস, এর সাথে লড়ার মতো তোর দলে কেউ আছে? মেরে ছাতু করে দেবে!

লালন— আমি লড়বো।

লাঠিয়ালরা সবাই হেসে উঠলো। নায়েবও মৃদু হাসে।

নায়েব— বাড়ি যা, অকালে মরে লাভ নেই, পালা।

লালন কথা না-বাড়িয়ে লাঠি বাগিয়ে ধরে। গুরমিত সিং এক চক্কর পায়তারা কষে হাঁক ছাড়ে— আ যাও! লালন এগিয়ে যাওয়ার আগেই শীতল তাকে আটকায়।

শীতল— আপনি সরেন, আমি দেখি।

লালন— পারবি? আমি বেশ কিছুদিন লাঠিখেলা শিখিছি, আমার মনে কয়, ওরে আমি সোজা করতি পারবো।

শীতল— আপনার বয়স বেশি, চট করে সামনে-পেছনে সরতি পারবেন না। আমার বয়স কম, আমি ওরে দেখে নেব।

দুদ্দু— এই ছেমড়া, তুই এখনও বাচ্চা আছিস, আমি থাকতি তোর দরকার হবে না, দাঁড়া, আমিই যাচ্ছি।

শীতল— (দুদ্দুকে সরিয়ে দেন) না, আমারে আগে যাতি দেন। আমি না-পারলি তখন আপনারা এগোবেন।

লালন— (নিচু স্বরে) শোন, যদি ওরে বাগে পাস তারে একেবারে মেরে ফেলিস না, আধমরা করে ছেড়ে দিবি। মনে রাখিস, ও খুন হয়ে গেলি ঝামেলা বাড়বে।

শীতল— ঠিক আছে, আমি খুন হলিও ওরে খুন করবো না।

মুহূর্তের মধ্যেই গুরমতি আর শীতল পরস্পরের দিকে লাঠিহাতে তেড়ে গেল। কিন্তু শীতল খানিকটা এগিয়ে ওকে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটির পর গুরমিত ক্রমশ বিরক্ত হতে থাকে। সে পেশাদার লাঠিয়াল, শক্রর সামনা-সামনি মহড়া নিতে অভ্যস্ত। শক্র এমনভাবে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে বেড়াতে পারে, এটা তার অভিজ্ঞতার বাইরে। এ পর্যন্ত দুজন একবারও কাছাকাছি হতে পারেনি, পরস্পরের লাঠির সংঘর্ষ হয়নি। গুরমতি দ্রুত হেস্তনেস্ত করার জন্য হঠাৎ প্রচ- এক লাফ মেরে শীতলের খুব কাছে চলে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে লাঠি তুলে ওর মাথায় মারে। উপস্থিত সবাই চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু যা ভাবা গেছিল তা হলো না। শীতল শেষ মুহূর্তে লাফ মেফে পাশে সরে যায়, লাঠির বাড়ি মাটিতে পড়ে গুরমিতের হাত থেকে লাঠি ছিটকে যায়। তখন এক লাফে শীতল এগিয়ে এসে পা দিয়ে ওর লাঠিটা দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজের লাঠি গুরমিতের মাথায় মারতে উদ্যত হয়। গুরমিত দু-হাতে মাথা চাপা দিয়ে ভয়ে গোঁ গোঁ করতে থাকে। আবার সবাই চোখ বন্ধ করে ফেলে।

তখন লালন চিৎকার করে ওঠে। — না!

শীতল লাঠি নামায়। গুরমিত তখনো মাথায় দুহাত চেপে বসে আছে। লালন এগিয়ে তার হাত ধরে টেনে তোলে।

লালন— নায়েব মশাই, কারা জিতেছে?

লাঠিয়ালরা সমস্বরে বলে— তোমরা।

নায়েব কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে— তোমরাই জিতে গেছ। মেনে নিলাম। আমরা চলে যাচ্ছি। তবে দাদা, তোমাদের সাথে খুব শিগগির আবার দেখা হবে!

নায়েবের দলবলসহ নায়েব মাথা নিচু করে চলে যায়। তখন বাড়ির ভেতর থেকে হরিনাথের বাড়ির লোকজন বেড়িয়ে এসে লালনের কাছে নানাভাবে কৃতজ্ঞতা স্বীকার প্রকাশ করে। লালন তাদের নিরস্ত্র করে সদলবলে বাড়ির পথ ধরেন।

দৃশ্য : সাতষট্টি

লোকেশান : শিলাইদহ কুঠিবাড়ি

সময় : শেষ বিকেল

জ্যোতি ঠাকুর লালনের স্কেচ শেষ করে নিজে একটু দূরে সরে দেখলেন। অতৃপ্তি নিয়ে মাথা ঝাঁকালেন। তারপর লালনের দিকে স্কেচটা বাড়িয়ে দিলেন।

জ্যোতি ঠাকুর— ভালো হয়নি। যা করতে চেয়েছিলাম তা পারিনি…

লালন— তা কখনো হয় না, আমরা যা করতি চাই তা পারি না। মনের ভেতর সবসময় একটা না-পারার ব্যথা কাজ করে। কাজের আগেও করে, কাজের পরেও করে। এই কাজ না-পারার ব্যথার দুঃখ থেকে কারো পরিত্রাণ নেই। (পজ) বাহ্, এই তাহলে আমি, লালন ভেড়ো! বুড়ো, কুঁজো, দেড়েল…

জ্যোতি ঠাকুর— আপনি মহিমান্বিত, বুড়ো-বৃদ্ধ নন, সমৃদ্ধ। আপনার দিকে তাকালে যেকোন মানুষ শ্রদ্ধায় মাথানত করবে।

লালন— ছোট বিষয়কে বড় করে দেখতি নেই। আমি সাধারণ মানুষ, সামান্য মানুষ…

জ্যোতি ঠাকুর— আপনি কেমন মানুষ তা চারপাশের লোকেরা জানতে শুরু করেছে, ভবিষ্যতে বহুকাল ধরে তারা আরো জনবে। আপনি আশীর্বাদ করুন যেন আমরা আপনার মতো ‘ছোট’ হয়ে উঠতে পারি।

তখন কিশোর কণ্ঠের গান শোনা যায়… চোখের আলোয় দেখেছিলাম চোখের বাহিরে…

লালন— বাহ্, মন ভরে গেল। কে গাইছে?

জ্যোতি ঠাকুর— আমার ছোটো ভাইটি, রবি। বছর দেড়েক আগে আমাদের মা গত হয়েছেন। তাকে নিয়েই লিখেছেন। তখন ওর বয়স এগারো-বারো। ওই গাইছে।

লালন— এগারো বছরের ছেলে এমন লিখেছে! ডাকেন তো, ওরে একবার মন ভরে দেখি।

জ্যোতি ঠাকুর— রবি! এদিকে শোন, দেখে যা, কে এসেছেন!

ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ দরোজার পাশে নিজেকে আর্ধেক আড়াল করে দাঁড়ালো। লালন তার কাছে এগিয়ে গেলে সে একটু একটু করে পিছিয়ে যায়। লালন হাসতে হাসতে তখন গান ধরেন—

                আমি একদিনও না দেখিলাম তারে

                বাড়ির কাছে আরশিনগর

                সেথা এক পড়শি বসত করে…

জ্যোতি ঠাকুর— কী গান শোনালেন সাঁইজি, আরশিনগর… এমন শব্দচয়ন আগে কোথাও শুনিনি। সম্ভবত এমন শব্দ-ভাষা কল্পনা করাও মানুষের সাধ্যাতীত। কেবল তিনিই পারেন, যাঁর অন্তরে সেই বিশেষ রকমের ‘শূন্যতা’ থাকে।

কিশোর রবিও লালনের গান শুনে সম্মোহিতের মতো দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলো। লালন তার কাছে এগিয়ে গেলে সে ছুটে পালায়।

জ্যোতি ঠাকুর— ও খুব লাজুক। সহজে ওকে ধরতে পারবেন না। (পজ) তারপর কি হলো, কি ঘটলো, বলুন শুনি। আপনার জীবন আমার কাছে পরম কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।

লালন— তারপরে আর বড় রকমের খুব কিছু ঘটেনি। দুটো ঘটনা বলতি পারি। একটা দুঃখের আর একটা…

(ফ্ল্যাশব্যাক শুরু)

দৃশ্য : আটষট্টি

লোকেশান : জমির খন্দকারের বাড়ি

সময় : সন্ধ্যা

লালন আর দুদ্দু কথা বলতে বলতে জমির খন্দকারের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে আসছেন। জমির ওদের দেখতে পেয়ে ডাকলেন।

জমির— সাঁইজি, গরিবের বাড়িতে একটু পায়ের ধুলো দিয়ে যান।

লালন— সালাম, আদাব… আমরা একটু বাজারের দিকে যাচ্ছি…

জমির— তা কাল সকালে যাবেন। আমরা আপনার গানের ভক্ত। আমার মেয়ে তো আপনার গান সারাক্ষণ গেয়ে বেড়ায়। ওরও একটু গানের নেশা আছে। মেয়েটা অকালে বেধবা হয়ে বাড়ি ফিরে এয়েছে। কি আর কই, যা মন চায়, তাই করুক।

লালন ও দুদ্দু জমিরের বাড়ির বারান্দায় উঠে বসলেন। জমির ভেতরে গিয়ে মেয়েকে ডেকে আনলেন। মেয়েটি স্বাস্থ্যবতী, সুদর্শনা এবং বুদ্ধিদীপ্ত-চোখের অধিকারিনী।

জমির— আমার মেয়ে, বিশোকা।

দুদ্দু— তা বোন কি, কি গান করো?

বিশোকা— যা মনে চায়। তাই।

দুদ্দু— তা বেশ তো, একখান মনের গান শোনাও।

বিশোকা— আগে আপনারা করেন, আপনারা দুজন এতো বাড় গায়ক-কবিয়াল…

দুদ্দু— না বোন, আমরা তোমার গান আগে শুনবো।

জমির— তা গা না, ওঁরাসব গুরুজন মানুষ, ওঁদের কথা শুনতি হয়। গা।

বিশোকা একটু প্রস্তুতি নিয়ে গান শুরু করে—

                সে আমার নায়েব মশাই

                শ্রীমান চিত্ত গোঁসাই

                স্বভাবে একটু কসাই

                উমেদার এলে ও ভাই

                বাঁ হাতে হাত রাখা চাই

                তবে আমার ঠিক জানা নাই

                খবর কি ঠিক মতো পাই?

                খানিক ঝুটা স্বল্প সাঁচাই

                আমি কিছু বলি না তাই

                একটুখানি দিয়েছি লাই…

দুদ্দু— বাহ্, খুব ভালো। কার রচনা?

জমির— ও নিজেই গান বানায়, নিজেই সুর করে, নিজেই গায়।

দুদ্দু— বিরাট ক্ষমতা। এ মেয়ে হেলা-ফেলার নয়।

লালন— আমি অবশ্যি গানের বিষয়টা ঠিক মতো ধরতি পারিনি। তবে তাতে কিছু আসে যায় না। গান মনে নাড়া দেয়ার কাজটাই আসল… ভালো খুব ভালো।

জমির— আমার একখান কথা আছে, বহুদিন ধরে কবো কবো করেও কইতে পারিনা। ও আমার দুখি-মেয়ে, সাঁইজি… (পজ) বিশোকা, তুই ঘরে যা।

বিশোকা ঘরে ঢুকে যায়।

জমির— সাঁইজি, আমি ওরে আপনার হাতে দিতি চাই। আপনি ওরে নেন।

লালন— আমি ভিখিরি মানুষ, বিবাগী, অনেক বয়স…

জমির— ওসব কোনো ব্যাপার না। আমার যা আছে তা ওরই। তাছাড়া আপনার সাথে ওর মনের মিল হবে। আমি জানি, আপনারা সুখী হবেন।

লালন মাথা নিচু করে ভাবতে থাকে। দুদ্দু মৃদু হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।

দুদ্দু— আপনি বিয়ের ব্যবস্থা করেন। আজ রাতেই বিয়ে হবে! লালন মুখ তুললে দুদ্দু হাসতে হাসতে বলে— সাঁইজি এখানে বসেন, আপনার যাওয়ার দরকার নেই। আমি শিমুলতলায় খবর দিয়ে আসি। দুদ্দু বেরিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের বাজনা বেজে ওঠে।

দৃশ্য : ঊনসত্তর

লোকেশান : শিমুলতলা

সময় : সকাল

অসুস্থ মনিরুদ্দিনের ঘরে অনেকে একত্র হয়েছেন। লালন তার মাথার কাছে বসে আছেন।

মনিরুদ্দিন— সাঁইজি, আমার একখান কথা আছে, এইটাই আমার জীবনের শেষ কথা।

লালন— বলো ভাই।

মনিরুদ্দিন— আমি মোসলমানের ঘরে জন্মেছি। মরার পর কবরে যাতি হবে, কিন্তুক কবরে আমার বড় ভয়। মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে।

ওর কথা শুনে দু-একজন মুখ টিপে হাসে। লালন গম্ভীর।

মনিরুদ্দিন— আমি চাই, মরার পর আমারে আপনার নদীর জলে ভাসায়ে দেবেন। অন্তত আলো-হাওয়ার মধ্যি আমার শেষ যাত্রা হোক।

লালন— সবাই শোনো, মনিরুদ্দিন একটা দামি কথা কইছে। আমরা এখানে কেউ হিন্দু-মোসলমান নই, মানুষ। মরার পর কাউরে জোর করে কবরে কিম্বা শ্মশানে চালান করার দরকার নেই। যদি কেউ মরার আগে তার শেষ ইচ্ছের কথা জানায় তবে তার ইচ্ছেমতো সৎকার করা হবে। (পজ) আমার কথা কই, মরার পর আমারে তোমরা তোমাদের ইচ্ছেমতো সৎকার করবা। চাই কবরে, চাই কি শ্মাশানে। আসল কথা, তোমাদের সবাইকার ইচ্ছে আমার ইচ্ছে। মনিরুদ্দিন, তুমি যা বললে তাই করা হবে। মরার পর তোমার দেহ নদীতে ভাসায়ে দেব।

দৃশ্য : সত্তর

লোকেশান : নদীর পাড়

সময় : শেষ বিকেল

মনিরুদ্দিনের মৃতদেহ নিয়ে শিমুলতলা গাঁয়ের প্রায় সকলে নদীর কাছে এলো। ওরা একটা ভেলায় করে নদীর জলে ভাসিয়ে দিল তার মৃতদেহ। ভেলাটা দুলতে দুলতে নদীর ¯্রােতে এগিয়ে যায়। ওরা কিছুক্ষণ ধরে সেই বিষণœ-দৃশ্য দেখতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে গাঁয়ের পথে ফিরে যায়। কিছুটা এগিয়ে আসবার পর দেয়া যায়, গগন হরকরা ও সর্বক্ষেপী ওদের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে। ওদের দেখেই লালন ভেতরের কান্না চাপতে গেয়ে উঠলেন—

                মিলন হবে কত দিনে

                আমার মনের মানুষের সনে

লালন গান ধরার সঙ্গে সঙ্গে গগন এবং সর্বক্ষেপী তার সাথে গলা মেলায়

                চাতক-প্রায় অহর্নিশি

                চেয়ে আছে কালো শশী

                হব বলে চরণ দাসী

                ও তা হয় না কপাল গুণে…

ধীরে ধীরে অন্য সবাই ওদের সাথে গলা মেলাতে শুরু করে। ওরা দল বেঁধে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যায়।

গানের সুর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। তখন মাগরিবের আজানের ধ্বনি দূর থেকে ভেসে আসে। লালনের গান এবং আজান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

 [বি. দ্র. : লেখাটি শাহ্যাদ ফিরদাউসের সৌজন্যে ও আনুকূল্যে মুদ্রিত, যদিও এটির প্রাথমিক-পর্ব কলকাতার দর্শকগোচরে এসেছিল ‘খোয়াবনামা’র পূজাবার্ষিকী ১৪২৪ সংখ্যায়। বাংলাদেশ বা অন্য অঞ্চলের পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে এটি আবার প্রকাশ করা হলো। (স.)]

                বিশেষ রচনা

লালন ফকিরের জীবন-ভিত্তিক চিত্রনাট্য

জলের উপর পানি

না পানির উপর জল?

 শাহ্যাদ ফিরদাউস

ভূমিকা

লালন ফকিরের জীবন নিয়ে বহু গুণীজন গবেষণা করেছেন, অনেক বই-পুস্তক লেখা হয়েছে, নাটক হয়েছে, ‘মনের মানুষ’-এর বহুকাল আগে অন্তত একটি সিনেমা হয়েছে তৎসত্ত্বেও লালনচর্চা থেমে নেই। এই মানুষটির বিচিত্র জীবন ও বিস্ময়কর অবদান নিয়ে নানাধরনের কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। স্বভাবতই এমন স্রষ্টা সম্পর্কে যে কোনও সাধারণ মানুষের মতো আমার কৌতূহল ছিল। কিন্তু কৌতূহল থাকলেও সবসময়ে সববিষয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার যাঁরা শিল্প-সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা করেন তাঁদের নানা রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তা সম্পন্ন করতে হয়। ফলে যে কাজ করার জন্য এক বছর লাগা উচিৎ সঠিক পরিকাঠামো বা আর্থিক সহযোগিতার অভাবে সে কাজ শেষ করতে আমাদের দশ বছর লাগতে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই। ঘটনাচক্রে আমি কয়েকজন বড় মাপের মানুষের জীবন নিয়ে কিছু কাজ করতে গিয়ে এ সত্য হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। যেমন, মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেব, বৌদ্ধ ধর্মদর্শন ও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অঙ্গুলিমাল, স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ বসন্ত কুমার বিশ্বাস এবং স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ। এই কজন মানুষের জীবন ও কর্মকা- নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আমার সবচুল সাদা হয়ে গেলো। তাই নতুন কোনো প্রস্তাব এলে ভয় লাগে। না, সাদা-চুল আর সাদা হবার ভয় নয়, ভয় অন্যত্র, আমি জানি, দীর্ঘ সময় ধরে পাগলের মত খাটা-খাটুনি করে প্রস্তাবিত কাজটা শেষ করার পর আমার হাতে থাকবে পেনসিল, আর কিছু নয়! তাছাড়া আর একটা বিপদ হলো, আজকাল আমাদের দেশের সবাই লেখক, সবাই পরিচালক, সবাই প্রাজ্ঞ। যে লিখতে জানে না, সে লেখক, যে গাইতে জানে না সে গায়ক, যে নাটক-সিনেমার ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে না সে বড় পরিচালক। আজকাল বিখ্যাত হওয়ার জন্য চর্চা করার দরকার পড়ে না, এখন জন্ম-প্রতিভাধর মহামানবের যুগ। সবচেয়ে ভয়ের কথা, কিছু আলগা পড়াশোনা বা চর্চার চেষ্টা করলেও যার উপলব্ধির জগৎ বলে কিছু তৈরি হয়নি, জীবন-জগৎ, সমাজ- সংসার সম্পর্কে যার স্পষ্ট ধরণা করার যোগ্যতা নেই সে যদি শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে ছড়ি ঘোরাবার সুযোগ পায় তাহলে যে কেবল অন্ধকারের জন্ম দিতে পারে, আশেপাশের মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। তাই এসব অন্ধকারের মসিহা-মহাপুরুষদের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে ইচ্ছে করে না। সত্যি কথা হলো, আমি এদের সাথে তাল মেলাবার মতো মানুষ নই।

তথাপি আগের কাজের সূত্রে আমার বিজ্ঞ বন্ধুরা কখনও কখনও অন্যান্য মহাপুরুষ বা মহীয়সী নারীদের জীবন নিয়ে লিখতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আমি তাঁদের সবিনয়ে বোঝাবার চেষ্টা করি— একজন মানুষের পক্ষে দুনিয়ার সমস্ত মহান ব্যক্তিকে ধরা সম্ভব নয়; দ্বিতীয়ত, আমি জীবনীকার নই, একজন সামান্য ঔপন্যাসিক মাত্র। অন্তরের তাগিদ ছাড়া লিখতে পারি না। তবু উপদেশ-পরামর্শ-প্রস্তাব মাঝে মাঝে আসে। এভাবেই চিত্র-পরিচালক গৌতম ঘোষ একদিন ফোন করে জানাল, আমাকে তার বিশেষ দরকার। নির্দিষ্ট দিনে দেখা হওয়ার পর সে লালন ফকিরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’-এর চিত্রনাট্য লেখার প্রস্তাব দেয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে সবিনয়ে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। সে তখন বন্ধুত্বের দাবীতে জানায় — ‘একাজ যাকে-তাকে দিয়ে হবে না, তুমি দায়িত্ব নিলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।’ সম্ভবত তার কথায় অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল; যে লেখক হিন্দু-মুসলমান এ দুটি স¯প্রদায়ের জীবনাচার ও ধর্মীয় দর্শন সম্পর্কে যথাযথ ওয়াকিবহাল নয় তার পক্ষে ‘মনের মানুষ’-এর চিত্রনাট্য লেখা অসম্ভব। তখন বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করে আমি তার অনুরোধে চিত্রনাট্য করতে রাজি হই। তারপর প্রায় তিন মাস ধরে দিনরাত একক পরিশ্রমে চিত্রনাট্য শেষ করি।

এখানে কিছু কথা সংযোজন করা দরকার। লালনের চরিত্রের প্রথম পর্বের ঘটনাগুলো প্রায় সব অতীতের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। এমনকি তাঁর সারাজীবনের ঘটনাবলীর যেটুকু আমরা জানতে পেরেছি, সেসবও পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর নয়। অনেকটাই লোকমুখে ছড়ানো কল্পকথায় অতিরঞ্জিত হয়ে নিতান্ত গল্প-কথার আকারে আমাদের কাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। তার ভেতর কতটা ইতিহাস আর কতটা গল্প সে তথ্য খুঁজে বের করা গবেষকের সাধ্যাতীত। তাছাড়া লালনের জীবনের সৃষ্টিশীল পর্ব কেটেছে প্রত্যন্ত গ্রামে। তখনকার দিনের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে বলা যায়, তিনি ও তাঁর অনুসারীদল প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে জীবন কাটিয়েছেন। তার কারণ, ধর্মীয় ভেদাভেদ তথা, জাত-পাত না  মানা, বিশেষ কোনো ধর্ম পালন না করা, প্রচলিত যৌনজীবন অস্বীকার করা, প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোকে অবজ্ঞা করে আদিম সাম্যবাদী পদ্ধতিতে যৌথজীবন চালু করা, অতিরিক্ত সঙ্গীতপ্রীতি ইত্যাদি। ফলে তিনি ও তাঁর সকল অনুগামী সমাজের মূল¯্রােতের দৃষ্টিতে ব্রাত্য বা পতিতদের দল হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। সাধারণ গৃহী-মানুষের সাথে তাঁদের সম্পর্ক ছিল ক্ষীণ।

লালনকে কেন্দ্র করে সমাজতাড়িত নিঃস্ব-নির্যাতিত-সর্বহারা কিছু মানুষ একত্র হয়ে প্রায় আদিম জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। তাদের অর্থ রোজগারের সুযোগ ছিল না, লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। এমন অনেক ‘না’-এর চাপে নারী-পুরুষ একত্রে মিলিত হলেও তারা সন্তানের জন্ম দিতে চায়নি। তাই বাউল সম্প্রদায় সন্তানহীন এমন জীবনে ইতিহাস রচনার সুযোগ নেই, নিজেদের সৃষ্টিকে ভাবীকালের জন্য সংরক্ষণ করার তাগিদ থাকার কথাও নয়। ফলে লালন ও তার সঙ্গী-সাথীদের সৃষ্টি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট তথ্য পাওয়া দুষ্কর। তাঁদের সৃষ্টিকর্মের যেটুকু মানুষের মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে গিয়ে সমকাল অতিক্রম করতে পেরেছে সেটুকুই পরবর্তীকালের গবেষকদের চেষ্টায় সংরক্ষিত হয়েছে, বাকি সব হারিয়ে গেছে। এসব কারণে লালনের গানের একাধিক পাঠ, একাধিক ভাষ্য। এমনকি তাঁর নামে চালু অথচ বক্তব্য, ভাষাভঙ্গি বা শব্দচয়ন আলাদা বলে অনেক গবেষক সেগুলি লালনের লেখা গান নয় বলে নির্দেশ করেছেন। আরও একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলা উচিৎ, লালনের গুরু সিরাজ সাঁইয়ের লেখা কোনো গান পাওয়া যায় না। তার চেয়েও একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, লালনের প্রথম জীবনের লেখা কোনো গানের অস্তিত্ব আছে বলে কারও জানা নেই। অথচ এমন একজন কালজয়ী গীতিকার-গায়ক হঠাৎ করে একদিন গায়ক-লেখক হয়ে গেলেন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। চিত্রনাট্য রচনার সময়ে এসব প্রশ্ন নিয়ে আমাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছিল। সেহেতু লালনের গুরু সিরাজ সাঁইকে যথার্থ বাউল শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তার মুখে একাধিক গান বসাতে হয়েছে। একইভাবে, লালনের প্রথম জীবনে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ বোঝাতে, আরও সহজ কথায়, লালনের চরিত্রকে যথার্থরূপে দাঁড় করাতে আমাকে গান লিখতে হয়েছে। বাউল শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তার মুখে একাধিক গান বসাতে হয়েছে। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে আমি সাতটা-আটটা গান লিখেছিলাম। গৌতম ঘোষ তার ‘মনের মানুষ’ সিনেমায় চারপাঁচটা ব্যবহার করেছে। পরবর্তীকালে আমার একটা উপন্যাসে অব্যবহৃত গানগুলি কাজে লাগিয়েছি। এখানে সবগুলি গান চিত্রনাট্য যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল সেভাবেই রাখা হয়েছে।

চিত্রনাট্য রচনার সময় আমি শুধু নাটক বা নাটকীয় ঘটনাকে প্রাধান্য দিইনি, লালনের জীবন ও তাঁর দর্শন যথাসম্ভব স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। শুধু ব্যক্তি লালন নয়, সমগ্রিকভাবে বাউল-ফকিরদের সংকট-সমস্য, তাদের বেঁচে থাকার লড়াই, সমাজের মূল¯্রােতের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠিভুক্ত নারী-পুরুষদের ভেতরকার সম্পর্ক ও সংঘাত, তাদের মনোজগতের টানা-পোড়ন থেকে শুরু করে বহির্জগতের প্রবল চাপ, সবই প্রয়োজন মতো তুলে ধরতে চেয়েছি। কিছু উদ্দেশ্যহীন বিচ্ছিন্ন মানুষ দলবদ্ধ হলেই বাউল হতে পারে না, অলিখিত বা অস্পষ্ট কিছু নীতি-নিয়মের ওপর বাউল সম্প্রদায়ের জীবন চালিত হয়। তার অর্থ, বাউল একটি সম্প্রদায়, পূর্ণ-পরিণত না হলেও একটি ধর্ম। বাউল এমন এক ধর্ম যা কোনো ধর্মকে গুরুত্ব দেয় না, জীবনের স্বাভাববিক সহজ ধর্মকে আশ্রয় করে জীবন-যাপন করার পদ্ধতির নির্দেশ দেয়। আমাদের ভালো লাগুক আর না লাগুক একথা মানতেই হবে, বাউল সম্প্রদায় প্রচলিত ধর্ম ও সামাজের বিরুদ্ধে এক প্রবল-প্রতিবাদ। লালনকে জানতে হলে বাউলদের এই প্রতিবাদের দর্শন অনুভব করতে হবে, লালনের নিজের জীবনচর্চার বৈশিষ্ট্য ও তাঁর জীবনদর্শনকে জানতে হবে। এই জানার আগ্রহ নিয়েই আমি চিত্রনাট্য রচনায় আগ্রহ দেখিয়েছিলাম। বাকি সব বাহ্য।

বাকি সব সত্যিই বাহ্য তা পরে জানা গেল। সিনেমা করার সময় নিজের লেখা হোক কি অন্যের লেখা চিত্রনাট্য হোক পরিচালককে শ্যুটিং-এর আগে অর্থাৎ ‘শ্যুটিং স্ত্রিপ্ট’ করার সময় বা শ্যুটিং করার সময় নানান বাস্তব কারণে কিছু কিছু পরিবর্তন করতে হয়। বিশেষত দৈর্ঘ্য; চিত্রনাট্য লেখার সময়ে একটু বড় করে লিখতে হয়, তার অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য হলো শ্যুটিং-এর সময় চিত্রনাট্য ছোট মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে লেখা অসম্ভব। এসব বস্তগত সমস্যার জন্য সিনেমা তৈরির সময় মূল চিত্রনাট্যের কিছুটা ওলট-পালট করা লাগে তাই মূল চিত্রনাট্য আর সেই চিত্রনাট্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমা এক নয়। অর্থাৎ কিছু পরিবর্তন অনিবার্য। তাই গৌতম ঘোষ তার সিনেমায় আমার চিত্রনাট্যের কিছু পরিবর্তন করেছে এবং পরবর্তীকালে নিজের নামে বই আকারে প্রকাশ করেছে বলে শুনেছি। তার আগে অবশ্যই মূল সিনেমার চিত্রনাট্যকার হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করেছে।

সেই যাই হোক, আমার হাতে আছে পেন্সিল, মানে এখনও আছে! মন্দ কি, লালন নিয়ে কাজ করতে করতে লালনকে তো কাছে পেলাম। আমাদের ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতা অতিক্রম করে যদি আমরা লালনের মতন মহান মানুষকে কাছে পাই সেটাই তো জীবনের এক পরম-প্রাপ্তি, বাকি সব বাহ্য।

চিত্রনাট্য

টাইটেল দৃশ্য

নদীর ওপারে দিগন্তরেখায় সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়। ক্যামেরা ধীরে ধীরে টিল্টডাউন করে। ঠিক যেন সূর্যের নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে একটা কালাগাছের ভেলা। ভেলার ওপরে চারিদিকে চারখানা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে, সুতির মশারি খাটিয়ে তার ভেতর একটা মৃতদেহ রেখে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রদোষকালের অস্পষ্ট আলোয় মৃতদেহ চেনা যায় না। ভেলা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে  সূর্য ক্রমশ পশ্চিম দিগন্তে মিলিয়ে গেল।

টাইটেল সুপার ইম্পোজড হয়।

টাইটেল শুরু হতেই দূর থেকে শোনা যায় মাগরিবের আজানের ধ্বনি। আজান এবং টাইটেল একই সঙ্গে শেষ হয়।

টাইটেল শেষ।

দৃশ্য : এক

লোকেশান : হাউসবোট

সময় : বিকেল

নদীর জলে হাউসবোট এগিয়ে চলেছে। বোটের উপর খোলা জায়গায় দুটি চেয়ারে দুজন বসে আছেন। একজন সুদর্শন যুবক ছোট ইজিচেয়ারে বসে কিছু আঁকছেন। অপরজন বৃদ্ধ। তিনি দূরে তাকিয়ে আপনমনে কিছু ভাবছেন। তার খোলা বাবরি চুল, লম্বা কাঁচা-পাকা দাড়ি। ডানহাতে আলগোছে ধরা একটা বাঁকানো লাঠি। যুবক ছবি আঁকতে আঁকতে বৃদ্ধের মুখের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখছেন। বৃদ্ধ নির্বিকারভাবে একইরকম শূন্য দৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে রয়েছেন।

নিজের আঁকা ছবিটা কেমন হচ্ছে তা বুঝতে যুবক তার মাথাটা পিছিয়ে নিলেন। সাদা আর্ট পেপারের ওপর কলো রেখার কয়েকটা আঁচড়। তবু তার ভেতর অস্পষ্টভাবে এক বৃদ্ধ বাউলের মুখ ফুটে ওঠে। বৃদ্ধ যেন দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকালেন।

যুবক (জ্যোতি ঠাকুর)— বুঝতে পারছি, আপনার অস্বস্তি লাগছে। এই স্কেচ করার কাজটা খুব একঘেঁয়ে। অনেক সময় লাগে। ঠিক আছে, একটু বিশ্রাম নিন, পরে আবার করা যাবে।

(পজ) আচ্ছা আপনার সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানিনা। লোকে নানা কথা বলে, তার ভেতর কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে যাচাই করা কঠিন।

আপনিই বরং আপনার জীবনের কথা বলুন না, অনেক সময় তো নিজের কথা শোনাবার ইচ্ছে হয়, তাই না?

বৃদ্ধ (লালন)— আমার জীবন আর তেমন কি জীবন, এই জীবনের কথা শুনে কার কি লাভ…

জ্যোতি ঠাকুর ছবিটা এবার ডান হাতে নিয়ে বেশ একটু সরিয়ে দেখতে লাগলেন। ছবির স্কেচ থেকে মিক্স হয় নতুন দৃশ্য।

দৃশ্য : দুই (ফ্লাশব্যাক শুরু)

লোকেশান : প্রান্তর/প্রান্তরের পাশে জঙ্গল

সময় : চন্দ্রালোকিত রাত

চন্দ্রালোকিত প্রান্তর। প্রান্তরের শেষে নদী। নদীর বাঁধের উপর দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলেছে একটি সাদা ঘোড়া, ঘোড়ার সওয়ারি এক কিশোর আর একটি কিশোরী। কিশোরটিকে জড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে কিশোরী। ঘোড়াটি ছুটতে ছুটতে নদীর বাঁধ ছাড়িয়ে বিলে নামে। বিলে অল্প জল। জলের মধ্যে ছুটে চলা ঘোড়ার পায়ে বিচিত্র শব্দ নিস্তব্ধ প্রান্তরে বহুদূর থেকে শোনা যায়।

ঘোড়া ছুটতে ছুটতে জঙ্গলের কাছে এগিয়ে আসছে। জঙ্গলের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে জড় হয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসী-ফকির। তারা ঘোড়ার পায়ের শব্দে ভয় পেয়ে যে যার মতো ছিটকে আগুনের পাশ থেকে সরে যায়। তারপর সবিস্ময়ে ঘোড়ার ওপর ছুটন্ত নারী-পুরুষ দেখে জিন-ভূত ভেবে সমবেতভাবে দোয়া-মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে। সন্ন্যাসী-ফকিরের দল ভয় পেয়েছে বুঝতে পেরে কিশোরী আরো জোরে হাসতে থাকে। ততক্ষণে ঘোড়াটি জঙ্গল অতিক্রম করে ছুটতে ছুটতে দূরে চলে যায়।

দৃশ্য : তিন

লোকেশান : লালনদের পুকুরঘাট

সময় : দুপুর

পুকুরঘাটে গাঁয়ের মেয়েরা জড় হয়ে ¯œান করছে। কেউ কাপড় কাচছে, কেউ বা কোলের ছেলে বা মেয়েকে ¯œান করাচ্ছে। ওদের ভেতর লালনের স্ত্রী গোলাপিও রয়েছে। বয়স্ক মহিলাদের একজন ¯œান করতে করতে গতকাল রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে থাকে।

প্রথম মহিলা— ও কমলা, কাল রাতের বেলা নাকি কি সব কা- ঘটে গেছে!

কমলা— কি কা-? কি হলো গো?

প্রথম মহিলা— ঠাকুরদের জঙ্গলের ওদিক থেকে নাকি একটা জিন আর পরী সাদা ঘোড়ায় চেপে হাওয়ার বেগে ছুটে এয়েছে!

দ্বিতীয় মহিলা— কোথা এয়েছে?

প্রথম মহিলা— কোথায় আবার, এদিকে এই গাঁয়ে।

তৃতীয় মহিলা— কেন, এদিকে কেন জিন-পরীরা আসতে লেগেছে? খারাপ কিছু হবে না তো, রাঙাদি?

ওদের কথা শুনে গোলাপি নিজের মনে হাসতে থাকে।

কমলা— কিরে গোলাপি, তুই হাসিস কেন, আমরা তো শুনেই ভয় ভয় করছে।

চতুর্থ মহিলা— যা বলেছিস, রেতের বেলা গাঁয়ের ভেতর জিন-পরী ঘুরে বেড়ানো অমঙ্গলের কথা। কি থেকে কি হয় কেউ বলতে পারে!

গোলাপি— কি আর হবে গো কাকিমা, ওরা ওদের মতন আছে আমরা আমাদের মতোন আছি, কেউ কারো ক্ষতি না করলি হলো।

কমলা— তোর তো খুব সাহস দেখছি, রোজ রেতের বেলা ভাতার তোরে গঙ্গাজল খাওয়ায় নাকি রে?

কমলার কথা শুনে মহিলারা সবাই খিল খিল করে হেসে ওঠে।

দৃশ্য : চার

লোকেশান : গাঁয়ের পথ

সময় : বিকাল

বাড়ির উঠোন পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লালন পথে নামে। অন্যদিক থেকে তার স্ত্রী গোলাপি কলসি কাঁখে নিয়ে পুুকুর-ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লালনকে বাইরে যেতে দেখে সে চারপাশে সতর্ক নজর বুলিয়ে মৃদু হেসে কলসি বাজায়। লালন হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফেরে। দুজন চোখাচোখি হতেই গোলাপি মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে প্রশ্ন করে— কোথায় যাচ্ছো?

লালন ইঙ্গিতে জবাব দেয়, কাছেই।

লালন আপন মনে এগিয়ে যায়। দূর থেকে এক বাউল মৃদু কণ্ঠে গান করতে করতে এগিয়ে আসে।

গান—

       আমার মাত্তর দুইখান চাকার একখান গাড়ি

       তাহার উপরা বানাইছো সাঁই তিন মহলা বাড়ি

       সে গাড়ি খালে বিলে ডাঙ্গায় চলে

       দুপুর বেলা নাইবে জলে;

       ও সাঁই আমার পরম পুজ্যি গুরু গোঁসাই,

       বল, বাড়ির বোঝা গাড়ির থেকে কই নামাই?

       গাড়ি আমার বাড়ির ভারে টলমলায়

       আমি কারে ছাইড়া কারে রাখি, এখন কি উপায়!

লালন সম্মোহিতের মত গান শুনতে শুনতে বাউলের সামনে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে তাঁকে নত হয়ে প্রণাম করে বাউল হাসি মুখে লালনের মাথায় হাত রাখলেন।

দৃশ্য : পাঁচ

লোকেশান : গ্রামের পথ

সময় : একই (বিকাল)

বাউল কয়েক কদম এগিয়ে একটা আম গাছের তলায় দাঁড়ালেন, মনে মনে কিছু ভেবে কাঁধের পুটলিটা নামিয়ে বেশ আয়েশ করে পা ছাড়িয়ে বসলেন। লালন তার পেছনে আসছিল। বাউলকে বসতে দেখে সে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাউল লালনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন— কি নাম?

— লালন চন্দ্র কর।

— নামখানা তো খুব মিঠা, এমনতর নাম কখনো শুনিনি। তা বাপ, পড়ালিখা করো?

— আমরা… গরিব খুব।

— ধুর বোকা! গরিব গরিব কইতে নাই, এই দুনিয়ায় সবাই গরিব, সবাই ফকির, সবাই কাঙাল। কিন্তু তাই বুলে পড়ালিখা করবা না কেন?

— আমার বাবা নাই…

— আরে পাগল, এই দুনিয়ার সবাই এতিম, সবাই অনাথ, কারো বাপ নাই! তা বুলে তুই পড়ালিখা করবি না, একি কথা!

— সাঁই আপনার কথা বুঝতে পারিনি… এই দুনিয়ায় সবাই গরিব, সবাই কাঙাল, সবাই এতিম, সবাই অনাথ, কারো বাপ নাই!

— নারে বাপ, এই দুনিয়ায় কারো বাপ নাই! থাকলে নাই না থাকলেও নাই। যার জীবন তার। যার যার নিজের পড়া নিজেকে শিখতে হয়। নিজের জীবন নিজেকে গড়তে হয়।

— কিন্তুক সবাই কাঙাল…

— সবাই কাঙাল সবাই ফকির! দ্যাখ ব্যাটা এই দুনিয়ায় এমন কোনও রাজা-বাদশা নেই যে অন্য কারো কাছে হাত পাতে না। আর যে হাত পাতে সে তো গরিব-কাঙাল-ফকির। বুঝলি কিছু?

— কিছু কিছু… কিন্তু সাঁইজি ইশকুলে বই, শেলেট, পেনশিল খাতা এসব লাগে, মাইনে লাগে…

— তোর বাপের মাথা লাগে বদমাশ! ছোট ইশকুলে ওসব লাগতে পারে, বড় পাটশালায় ওসব ছাইপাঁশ লাগে না।

— বড় পাঠশালা কোথা, আমি তো এমন পাঠশালার নাম শুনিনি।

— এখন তো শুনলি, বড় পাঠশালা মানে সারাজগৎ, সমস্ত ব্রহ্মা-। এখন থেকে পড়া করো।

— কিন্তুক…

— কিন্তুক কিন্তুক বাদ দাও, আসল কাম করতে চাইলে দোনামনা চলবে না। বাপ আমার, ঝাঁপ দাও।

— সাঁইজি…

— কও বাপ, মনে যা আসে কয়ে ফেল।

— আপনি আমারে আর্শীব্বাদ করেন।

— না, কখনো না, তোর আর্শীব্বাদ করতে যাবো কোন দুঃখে! তবে আমি পরাণভরে শাপ দেব!

— সাপ! কি সাপ, সাপ নিয়ে কি হবে?

— মাথায় কিচ্ছু নাই, এক্কেবারে ফাঁপা, তোর মাথায় একটুক হালচাষ করা লাগবে। আরে বলদ, সাপ নয়রে সাপ নয়, তোরে আমি অভিশাপ দেব!

— কেন সাঁইজি, আমি কি আপরাধ করলাম?

— তোর অপরাধের সীমা নাই।

— আমারে ক্ষমা করেন…

— না তোর পাপের ক্ষমা নাই, তোরে আমি শাপ দিলাম— সারাজনম তোর পাড়ালিখার বোঝা বইতে হবে, পড়ালিখা ছাড়া তুই আর কিচ্ছু করতে পারবি না!

— (লালন উত্তেজিত হয়ে বাউলের পা জাড়িয়ে ধরে) এ তো আর্শীব্বাদ  দিলেন!

— (বাউল হেসে বললেন) তোর মাথা খুলতে লেগেছে!

— (পজ) সাঁইজি, একটা কথা কবো, আপনার গানের মানে কি?

— গানের মানে! আহাম্মক ছাড়া কেউ গানের মানে খোঁজে না।

— মানে?

— আবার মানে! আরে পাগল, গানের কোনও মানে নেই, যার মাথা যেমন ভারি সে তেমন ভারি ভারি মানে করে আর মনে ভাবে, আমি কত প-িত, দ্যাখো, কী একখানা মানে দাঁড় করালাম!

— তবু কিছু একটা মানে তো থাকতেই হয়…

— না, মানে থাকতে হবে না!

— সাঁইজি, আমি আপনার শিষ্য হব, আমারে মানে বলে দেন, একটু বুঝায়ে দেন।

— আমি কারো শিষ্য নই, কেউ আমার শিষ্য নয়। আমি কেবল অলখ-সাঁইয়ের গোলাম, যার হাজার নাম লক্ষ কাম, যারে দেখার লাগি জীবন দিলাম, মরণ দিলাম তবু তারে দেখতে পেলাম না, তবু তার পরশ পেলাম না।

— অলখ মানি কি?

— আবার মানে! অলখ মানে যা সলখ নয়।

— সলখ মানে…

— আবার! শোন্, এই মানে জানার বাতিক না ছাড়লে কোনদিন কিছু শিখতে পারবি না। মানে জেনে কিছু শেখা যায় না, বুকের ভেতরে নিয়ে হাজারবার নাড়াচাড়া করতে করতে শিখতে হয়। মানে জানা সোজা কাজ, যে কেউ বলে দিলেই তো জানা হয়ে গেল। কিন্তু সেই মানে যে আসল মানে তার হদিস কে দেবে? তাই তো বলি— মানের পেছনে ছুটে লাভ নেই, গানের পেছনে ছোট। (পজ) শোন, আমি যে গানটা গাইলাম তার মানে এমন কিছু কঠিন নয়, কিন্তু গানের ভেতর যে ভার আছে সে ভার বওয়া কঠিন। যে শোনে তার কাছে যেমন কঠিন, সে গায় তার কাছেও তেমন কঠিন।

— কি রকম?

— দুইখান চাকার, একখান গাড়ি— মানে দুই পা। তার ওপর তিন মহলা বাড়ি মানে পায়ের ওপর প্যাট, বুক আর মাথা। এই গানটা বেশ খানিক লম্বা, মানুষ বড় গান শুনতে চায় না। তাই ছোট করে গাই, গানের পরের ভাগে বলা আছে, তিনমহলা বাড়ির নিচের মহলে ভুষিমালের জঞ্জাল, মানে প্যাটের ভেতর যা থাকে আরকি, তারপর বলা হয়েছে, ওপর মহলে আছে খেরোর খাতার বস্তা, মানে মানুষের মাথার ভেতর যেমন পাওনা গ-ার হিসেব চলে, সেই বস্তাপচা হিসেবের কথা। তারপর বলা আছে, তার… কার?

— বলবো?

— বল্ দেখি?

— মানুষ, মানুষের।

— ঠিক ধরেছিস, এই তো তোর মাথা খুলছে। তারপর বলা হয়েছে, মানুষের বুকই আসল জায়গা, যেখানে মণি-মুক্তো সোনাদানা আছে। একটু ভালো করে খুঁজে দেখলে মণি-রতন খুঁজতে বাইরে যাওয়া লাগে না, বুক হাতড়ালেই মেলে। কিন্তুক আসল ঝামেলা হলো, মাত্তর দুইখানা চাকার উপর তিনমহলা বাড়ির বোঝা কেউ বইতে পারে না। তাই গাড়ি আমার টলমল করে, এই পড়ে কি সেই পড়ে!

দৃশ্য : ছয়

লোকেশান : গ্রামের বাঁশবাগান

সময় : দুপুর

বাঁশবাগানের ভেতর লালন বাঁশের কঞ্চি কেটে জড়ো করছে। বেশ বড়ো একটা বান্ডিল হওয়ার পর সে কঞ্চি দিয়েই কঞ্চির বান্ডিল বেঁধে মাথায় তুলে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে।

খানিকটা পথ পেরিয়ে একটা তাল পুকুরের পাড়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। পুকুরের জলে ছোট্ট শব্দ হয় এবং ঢেউ ওঠে। ওপরের গাছ থেকে কোনো ফল-পাকুড় পড়েছে অথবা জলের তলা থেকে কোনো মাছ ঘাই মেরেছে। লালন মনোযোগ সহকারে জলের ঢেউ দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে—

       ও জলে ঢেউ দিল কে?

       সে দেখতে কেমন, কেমন বরণ, কোথায় থাকে?

       সে দেখতে নারি, ছুঁইতে নারি

       শুধু তারে শুনতে পারি

       ও সাঁই, পরমপুজ্যি গুরু গোঁসাই,

       আমি তারে পরাণ ভরে দেখতে চাই।

লালন নিজের মনে একটু হেসে মাথা নড়ায়। তারপর বিড়বিড় করে বলে— হলো না ভালো হলো না।

সে আবার হাঁটতে শুরু করে।

দৃশ্য : সাত

লোকেশান : যদু পাইকের আখড়া

সময় : বিকাল

গাঁয়ের সবচেয়ে ধনী এবং অঞ্চলের নামকরা কবিরাজ, কৃষ্ণপ্রসন্ন সেনের বরকন্দাজ তথা দেহরক্ষী যদু পাইক তার শিষ্যদের লাঠিখেলা শেখাচ্ছে। শুধু লাঠি নয়, সে সড়কি, বল্লম, ছুরি, তলোয়ার, গুপ্তি ইত্যাদি সবই শেখায়। লালন পায়ে পায়ে যদুর আখড়ায় ঢুকল। তখন লাঠিখেলা চলছে। লালন একপাশে সরে গিয়ে মনোযোগ সহকারে খেলা দেখতে থাকে। খেলা শেখাতে শেখাতে যদু বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সে শিষ্যদের কোণঠাসা করে নিজেই পুরো চত্তর জুড়ে খেলা দেখাতে থাকে। কিছুক্ষণ খেলা দেখিয়ে সে হঠাৎ লালনের দিকে তাকায়। হাতের লাঠি উঁচিয়ে সে লালনের দিকে তেড়ে গিয়ে তার মাথায় আঘাত করতে উদ্যত হয়। লালন সভয়ে দুহাতে মাথা ঢেকে চিৎকার করে বসে পড়ে। যদু পাইক তখন হাসতে হাসতে লালনের ঘাড় ধরে টেনে তোলে। তারপর তাঁকে চাতালের মাঝখানে, মূল খেলার কেন্দ্রে টেনে নেয়।

যদু— ব্যাটা ভেড়ো, এই জন্যি মানুষ এসব শেখে, এসব শিখতে হয়। তবেই সাহস বাড়ে, শক্তি বাড়ে, দরকার মতো চোর-ডাকাত-বদমাশদের শায়েস্তা করা যায়, (পজ) শিখবি?

লালন— তা শেখালি শিখতি পারি!

যদু— এই তো ব্যাটাছেলের মতন কথা বললি। তোর হবে। নে, লেগে পড়, চলে আয়। নেত্য, ওরে একখানা লাঠি দে।

লালনের হাতে নেত্য লাঠি তুলে দেয়। যদু তাঁকে লাঠি খেলার প্রাথমিক সূত্রগুলো মুখে বলেই অনুশীলন শুরু করে।

কিছুক্ষণ অনুশীলনের পর লালন বেশ তাড়াতাড়ি লাঠিখেলার কলা-কৌশল রপ্ত করতে থাকে। যদু তাঁকে উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলতে বলতে সাগ্রহে শেখাতে থাকে। ক্রমশ দুজনের লাঠির গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। লাঠিখেলা জমে যায়। কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে গেছে। যদু লাঠি থামিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে— আর খেলা যাবে না। অন্ধার হয়ে গেল। কাল তোরা ঠিক সময়ে আসবি। (লালকে উদ্দেশ্য করে) কোনো কিছু শিখতে গেলে একনাগাড়ে সাধন করা লাগে। রোজ আসবি, আসবি তো?

লালন— রোজ আসবো।

দৃশ্য : আট

লোকেশান : শিবুদের বাড়ি

সময় : সন্ধ্যা

যদুর আখড়া থেকে ফেরার পথে গোলমাল-চেঁচামেচির শব্দ পেয়ে লালন বড় রাস্তা ছেড়ে গলিপথ ধরে দৌড় লাগায়। শিবুদের বাড়ির কাছে এসে দেখে, ওদের বড় ঘরে আগুন লেগেছে। পাড়াপড়শিদের অনেক জড়ো হয়েছে, কেউ কেউ কাছাকাছি পুকুর থেকে ঘটি-বাটি-কলসি হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে জল এনে ঢালছে। কিন্তু সমস্যা হলো, শিবুর মা ঘরের ভিতরে আটকা পড়ে গেছে। ঘরের দরজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ঘরের বেড়া জ্বলছে, চাল জ্বলছে। এই  পরিস্থিতিতে সে বেরিয়ে আসতে পারছে না, আবার বাইরে থেকে দাউদাউ আগুন ভেদ করে করো পক্ষে ভেতরে ঢুকে তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এটা বুঝতে পেরেই শিবুর মা প্রাণ বাঁচাতে পরিত্রাহি চিৎকার করছে। বাড়ির সামনে জড়ো হওয়া পাড়ার লোকেরা যে যার মতো জ্ঞান দিচ্ছে, আদেশ-নির্দেশ জারি করছে, কিন্তু কেউ কাজের কাজ করতে এগিয়ে আসছে না। তখন লালন হঠাৎ উঠোনে ঝুলতে থাকা একটা কাঁথা টেনে নিয়ে একদৌড়ে পুকুরের কাছে যায়, কাঁথা শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবং পরমুহূর্তেই ভেজা কাঁথাসহ ছুটতে ছুটতে ফিরে এসে এক লাফে জ্বলন্ত-আগুনের মধ্যে ঢুকে যায়। উঠোনে যারা ছিল তারা  হইহই করে ওঠে, দু-একজন তাঁকে বাঁধা দিতে এগিয়ে যায়, কিন্তু ততক্ষণে সে শিবুর মাকে ভেজা কাঁথায় জড়িয়ে পাঁজাকোলে করে বাইরে বেরিয়ে এলো। শিবুর মা বাইরে এসেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। যদিও তার কোনো ক্ষতি হয়নি।

লালনের এই অসম সাহসিকাতার জন্য সবাই তাকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে থাকে। কিন্তু সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় লজ্জা পেয়ে ঘটনার কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যায়।

দৃশ্য : নয়

লোকেশান : লালনের ঘর

সময় : রাত

গোলাপি শয্যায় যাওয়ার আগে নিজেকে যথাসম্ভব সুন্দর করে সাজিয়ে সব শেষে চুল বাঁধতে বসে। লালন বিছানায় আধ-শোয়া অবস্থায় গভীর মনোযোগ সহকারে স্ত্রীর সাজসজ্জা দেখতে থাকে।

গোলাপি— হাবার মত চোখ মোটা মোটা করে কী দ্যাখো?

লালন— তোমারে।

গোলাপি— আমারে দেখার কি আছে, আমারে তো রোজই দ্যাখো।

লালন— রোজই দেখি, কিন্তুক আরো দেখতে ইচ্ছা করে। যত দেখি, তত দেখতে ইচ্ছে করে।

গোলাপি— তুমি একখান ভ্যাদামাছ! কি কও না কও তার মাথামু-ু বুঝিনা।

লালন— ঠিক কইছ, আমি একখান ভ্যাদামাছ, তুমি একখান কাতলা মাছ। ভালো না?

কথা বলতে বলতে গোলাপি চুল বাঁধা শেষ করে বিছানায় এসে লালনের পাশে বসে। লালন তাকে জড়িয়ে নিয়ে ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকে।

গোলাপি— আমারে একখনা সত্যি কথা ক’বা?

লালন— কব, কি কথা?

গোলাপি— আমারে তোমার মনে ধরেছে?

লালন— কেন, আচকমা এই কথা কও কেন?

গোলাপি— আমার কেমন জানি ভয় ভয় করে।

লালন— কিসের ভয়?

গোলাপি— কিসের ভয় কইতে পারবো না। কিন্তুক মনে কয়, তুমারে আমি ঠিক মতো পাইনি, ঠিকমতো পাব না। এই জন্যি আমার ভয় ভয় করে।

লালন— কি কথা কও বউ। এ কথার তো আমি তল পাই না।

গোলাপি— তোমারে আমি বুঝতে পারি না, ধরতে পারি না, তুমি আমার পাশে যখন থাকো তখনও তুমারে ঠিকমত পাশে পাই না।

লালন— (হঠাৎ গানের সুরে)

        পুনা মাছে লাফ মারিছে পুকুরে

        শনিবারের বার বেলাতে, দুকুরে

        তাই ঢেউয়ের পর ঢেউ উঠিল জলে

        তাই আমার মনের পাখি বনে পালায় ছলে,

        ঢেউয়ের পর ঢেউ উঠিল জলে

        মনের পাখি বনে  পালায় কী কৌশলে!

গোলাপি লালনকে জড়িয়ে আপ্লুতকণ্ঠে বলে— তুমি কি বাউল-ফকির, কথায় কথায় গান বানাও, তুমি কে গো!

লালন— আচ্ছা বউ, ‘দুকুর’ বলে না দুপর?

গোলাপি— দুকুর… দুপর… দুপুর… আমরা গবির-গুরবো মানুষ ‘দুকুর’ কই, আর বাবুরা দুপর বলে… না, বাবুরা বলে দুপুর।

লালন— তবে তো আমার গানে দুকুর কথাটা ঠিক আছে, কি কও?

গোলাপি— ঠিকই তো আছে। তোমার গান তোমার মতন, বাবুদের গান বাবুদের মতন।

লালন তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে ঘনিষ্ঠ হতে হতে বলে— আমার বউ আমার মতন, বাবুদের বউ বাবুদের মতন।

দৃশ্য : দশ

লোকেশান : লালনদের উঠোন

সময় : সকাল

কঞ্চি দিয়ে একখানা বড় পাল্লার দরজা বানিয়ে লালন তাদের ভাঙাচোরা রান্নাঘরে লাগাতে চেষ্টা করে। লালনের মা উঠোনের একপাশে চাটাই বেছায়। তারপর ঘরের ভেতের থেকে একখানা পুরানো কাপড় এনে চাটাইয়ের উপর পেতে দেয়। এবার একটা চালের কলশি এনে কলশিটা উপুড় করে চালগুলো কাপড়ে ঢালে। তারপর চাটাই জুড়ে চালগুলো ছড়িয়ে দিয়ে রোদ খাওয়াতে থাকে। রোদের তাপে চালের ভেতর থেকে দু-একটা কালো কালো পোকা বেরিয়ে আসে। লালনের মা চাটায়ের পাশে বসে আঙুলের চাপে পোকা মারতে মারতে ‘হেই হেই’ করে পাখি তাড়ায়। গোলাপি উঠোনের এককোণে বসে একগাদা থালা-বাসন মাজতে থাকে।

পদ্মাবতী— ও লালু, একতিল পরিমাণ জমি-জিরেত নেই। অকালে তোর বাপ গেল। নিজের বাপের বাড়ি উঠলাম, তারা খেদায় দিল। পরের বাড়ি খেটেখুটে তোরে মানুষ কল্লাম; তোর বিয়ে দিলাম, পরের মেইয়ে ঘরে আনলাম। এতগুলোন মুখের দানাপানি জুগাড় করা সোজা কথা নয় রে বাপ। একটা কিছু কাম-কাজের চেষ্টা করো।

লালনে স্ত্রী বাসন মাজতে মাজতে একবার স্বামীকে দেখে একবার শাশুড়িকে দেখে তারপর মাথা নিচু করে বাসন মাজতে মাজতেই শাশুড়ির আলোচনায় যোগ দেয়।

গোলাপি— ও কি জানে মা, ও কি কাজ করবে? ও তো খালি গান বাঁধতে পারে।

লালন— গাঙ-বান্ধার চেয়ে গান-বান্ধা কঠিন কাজ।

পদ্মাবতী— কিন্তুক তাতে তো প্যাটের ভাত হয় না, বাপ। কিছু একখান পথের সন্ধান করো। লোকে কয়, আগে দানা তারপর গানা।

লালন দরজা বাঁধা শেষ করে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।

লালন— কি করি কও তো, মা। মাঠের কাজ আমার ভালো নাগে না।

পদ্মাবতী— তা কইলি কি চলে, আমরা দ্যাশের গাঁইয়ের মানুষ। এ তল্লাটে ক্ষেতির কাজ ছাড়া আর কি আছে?

লালন— আমি কারবার করবো!

গোলাপি— ওরে আমার চাঁদবণিকের নাতি, কারবার করে উলটে দেবে! ওসব তুমি কিছু বোঝো?

পদ্মাবতী হাসি লুকাতে অন্যদিকে মুখ ঘোরায়। লালন কিছুটা সংকুচিতভাবে একবার মা একবার স্ত্রীর দিকে তাকায়। ধীরে ধীরে নিজেকে কিছুটা সামলে নেয়।

লালন— দ্যাখ বউ, সব কিছু মায়ের পেট থেকে পড়েই জানা যায় না। আস্তে আস্তে জানতে লাগে, শিখতে লাগে।

গোলাপি— ট্যাকা লাগে, ট্যাঁকের জোর লাগে। তুমার তো ট্যাঁকই নাই, তুমি কি নিয়ে কারবারে নামবা?

চারিদিকে কৌতূহলি নজর বুলাতে বুলাতে যদু পাইক লালনদের উঠোনে এগিয়ে আসে।

যদুকে দেখে লালন এগিয়ে যায়।

যদু— (গাম্ভীর্য সহকারে) কি রে ব্যাটা, রাতে কি করে বেড়াস? চল্, কবিরাজ মশাই তলব করেছেন!

পদ্মাবতী— (আশঙ্কিতভাবে) কেন, কি হলো, ও কি করছে, যদু? আমরা গরিব মানুষ, কি হয়েছে?

যদু— তোমার ছেলের মাথায় নানা রকম পোকা আছে, আজ কবিরাজ মশাই ওর মাথার পোকা বের করে তবে ছাড়বেন! চল্!

গোলাপি ছুটে এসে লালনের কানে ফিস ফিস করে বলে— কি হবে গো!

লালন— যা হবে হবে, সত্যি কথা বলে দেব।

পদ্মাবতী— ও লালু, কি করেছিস, কবিরাজ মশাই তোরে কেন তলব করে? এখন কি হবে!

লালন— তুমি চুপ করো তো, যা হবার হবে!

লালন যদু পাইকের সাথে বেরিয়ে যায়। পদ্মাবতী কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কিছু ভেবে তারপর সেও ওদের পিছু নেয়।

দৃশ্য : এগারো

লোকেশান : কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্নর মহল

সময় : সকাল

কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্ন বাইরের মহলে বসে তামাক খাচ্ছেন। তাঁর কাছে কয়েকজন কর্মচারী ও দাসী-চাকর নানা কাজে ঘোরাঘুরি করছে। একটু দূরে বেশ কয়েকজন লোক কবিরাজকে রোগী দেখাতে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে বসে আছে। লালনদের ঘরে ঢুকতে দেখেই কবিরাজ অতিরিক্ত গম্ভীর মুখ করে ইঙ্গিতে লালনকে কাছে ডাকলেন। লালন তাঁর কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়।

কবিরাজ— বীণা! বীণাকে ডাকো! বীণা ওকে রাতের বেলায় চুরি করতে দেখেছে!

কয়েকজন হাঁকডাক করতেই বীণা এসে সংকুচিত-মুখে লালনের দিকে তাকায়। তারপর কবিরাজের দিকে ফিরে বলে— ও খুব ভালো গান করতি পারে।

কবিরাজ— অদ্ভুত কথা! ও গান করতি পারে কি পারে না তা কি আমি তোর কাছে জানতে চাইছি? তুই রাতের বেলা ওরে চুরি করতে দেখছিস কি না বল?

লালন— আমি চুরি করিনি, কবিরাজ মশাই, আপনার ঘোড়া ‘মানিক চাঁদ’রে নিয়ে একটু হাওয়া খেয়ে বেড়াই।

কবিরাজ— আমার ঘোড়া তুই নিয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াস! তুই আমার অনুমতি নিয়েছিস?

লালু মাথা নিচু করে থাকে।

কবিরাজ— কি রে, কথার জবাব দে! অনুমতি নিয়েছিস? (পজ) তোর সাথে আর কেউ হাওয়া খেয়ে বেড়ায়?

লালন একইভাবে মাথা নিচু করে থাকে।

কবিরাজ— অন্যের জিনিস না-কয়ে নিলে তারে কি বলে? জবাব দে!

লালন — আমি তো যেখানকার ঘোড়া আবার সেখানে বেন্ধে রেখে যাই।

কবিরাজ— তাতে তোর চুরির অপরাধ লাঘব হয় না। না-বলে যতক্ষণ নিয়ে রেখেছিস ততক্ষণ চুরি করিছিস, যতদিন ধরে করিছিস, ততদিন চুরির অপরাধ হইছে। তোর অপরাধের শেষ নেই, পরপর একই অন্যাই করে গেছিস। তোর আজ শাস্তি হবে! (পজ) তার আগে বল, তোর সাথে আর কেউ হাওয়া খেয়ে বেড়াই?

লালন— আমার বউ গোলাপি… ঘোড়ায় চড়লি আমার মনে হয়, আমি যেন রাজকুমার হয়ে গেছি, কুথায় যেন কোন্ স্বপ্নের দেশে চলে যাই, আমার তখন কিছু খেয়াল থাকে না।

কবিরাজ— বা বা বা… আমি সোনার দানার মতোন দুইশ’ মন ধান বেচে ঘোড়া কিনলাম কেন, না লালু আর তার বউ গোলাপি হাওয়া খেয়ে বেড়াবে! বাহ্ তোমার তুলনা নেই! ওরে পাঁঠা, তোর একটা রোগ হইছে, এই রোগের নাম গরিবের ঘোড়া রোগ! এই রোগের দাওয়াই দেওয়া লাগবে।

কবিরাজ হঠাৎ প্রবল কৌতূহল নিয়ে লালনের কপালের দিকে তাকালেন।

কবিরাজ— এই, এদিকে আয়, আমার কাছে আয়, তোর বাবরিচুল কপালের ওপর থেকে সরা!

লালন কিছু বুঝতে না পেরে সন্দিগ্ধভাবে কবিরাজের কাছে এগিয়ে যায়।

কবিরাজ— দেখি, ভালো করে চুল সরা, ঠিক আছে এবার হাতের চেটো দুখান আমার চোখের সামনে মেলে ধর তো দেখি (লালন দুহাত মেলে ধরে) বেশ, বেশ ঠিক আছে। এখন শোনো, তোমার দাওয়াই আপাতত লঘু। আমার একটা জামরুল গাছ ঝড়ে পড়ে গেছে, রাস্তার ওপরে, ওটা চলা করে তবে বাড়ি ফিরবা। তার আগে নয়। যাও! আর শুনে রাখো, ভবিষ্যতে কোনো দিন যদি ঘোড়া চুরি করো তো নির্ঘাত পুলিশে দেব, জেলে পছে মরবা!

কাজের লোকদের একজন একটা কুড়–ল এনে লালনের হাতে ধরে দেয়। সে কুড়–ল নিয়ে গাছ কাটতে রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়।

কবিরাজ— আর সেই আফিমখোরটা কই? মনসুর!

মনসুর মাথা নিচু করে কবিরাজের সামনে দাঁড়ায়।

কবিরাজ— ঘোড়ার যতœ করা, তার দেখভাল করা, তার খোঁজখবর করা তোর কাজ, তুই তা করিস নি। আফিম খেয়ে মৌতাত করেছিস। তোর শাস্তি হলো, তিনদিনের আফিম তোকে একদিনে খেতে হবে। এই, কে আছিস, আমার সামনে এখানে এখনই ওকে আফিম গেলা, বড়-গুলির তিন গুলি!

কবিরাজ মশাই তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মনসুর দৌড়ে গিয়ে কবিরাজের প্রিয় ঘোড়া ‘মানিকচাঁদকে’ টানতে টানতে তার সামনে আনে। তিনি ঘোড়ায় চেপে ঘোড়ার গায়ে মৃদু চাপড় মারেন। ঘোড়া হাঁটতে শুরু করে। ঠিক তখনি আড়াল থেকে পদ্মাবতী এগিয়ে এসে কবিরাজের ডান পা জড়িয়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করতে থাকে।

পদ্মাবতী— কবিরাজ মশাই, ওরে এবারকার মতো খ্যামা করে দিন, বাপ-মরা অনাথ ছেলে ওরে দয়া করেন।

কবিরাজ— আরে তুই আবার পাগলামি করতিছিস কেন, আমি কি ওরে ‘বাঁশডলাই’ দিচ্ছি না বাইন্ধে পেটাচ্ছি? শোন্ পদ্মা, ছেলেপুলে মানুষ করতে গলে একটু-আধটু শাসন করা লাগে। আমি তোর ছেলের ভালো চাই বলেই একটু শাসন করতিছি। (পজ) আর একটা কথা শোন, তোর ছেলের একটা ফাঁড়া আছে, বছর খানেকের মধ্যি খারাপ কিছু হতি পারে!

পদ্মাবতী কবিরাজের পায়ে মাথা রেখে ডুকরে ওঠে।

পদ্মাবতী— আমার একটা মাত্তর সন্তান, কবিজার মশাই ওরে বাঁচান!

কবিরাজ— আরে পাগল, বাঁচাবার মালিক আমি নই, ভগবান। তারে ডাক, তিনিই রক্ষা করবেন। (পজ) আরও একটা কথা শোন, তোর ছেলে যদি এই ফাঁড়া কেটে উঠতি পারে, তাহলি সে একটা বিরাট মাপের মানুষ হবে, দেশে-বিদেশে ওর নাম ছড়ায়ে যাবে। আমার তাই মনে হলো। আমি খুব ভালো করে ওর কপাল দেখেছি, সাধারণ লোকের অমন কপাল থাকে না রে, ওরে যতেœ রাখিস।

কবিরাজ আবার ঘোড়ার গায়ে মৃদু চাপড় মারলেন, ঘোড়া হাঁটতে শুরু করল।

দৃশ্য : বারো

লোকেশান : গাঁয়ের পথ

সময় : দুপুর

জামরুল গাছটা কাটতে কাটতে লালু প্রায় আধমরা, একটু বিশ্রাম নিতে ওই গাছের গুড়ির ওপরেই বসে পড়ে। ধুতির কোণা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঝিমোয়, তারপর আবার কুড়–ল হাতে এগিয়ে আসে। আরও কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে গাছ কাটতে থাকে। তারপর হঠাৎ বিরক্ত হয়ে কুড়–লটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁপাতে থাকে।

দূর থেকে তখন গোলাপিকে দেখা যায়। সে লালনের খাবার নিয়ে আসছে। লালন তাঁকে দেখতে পেয়ে দুপা এগিয়ে যায়। গোলাপি তার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে কেঁদে ফেলে।

গোলাপি— চুরি না ডাকাতি না খামোখা এমন শাস্তি, এর নাম বিচার!

লালন— খামোখা কেন কও, এরে কয় গরিবের ঘোড়া রোগের শাস্তি।

লালন পাশের পুকুরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফিরে এসে খাবার খেতে বসে। গোলাপি তার পাশে বসে শাড়ির আঁচল দিয়ে হাওয়া করতে থাকে। গোলাপি হাওয়া করা বন্ধ রেখে হঠাৎ উঠে গিয়ে গাছের গুড়িটায় লাথি মারে। লালন খেতে খেতে হেসে ওঠে।

লালন— কার ওপর তোমার রাগ, বউ?

গোলাপি— আমার ওপর, আমার নিজের ওপর!

লালন নিঃশব্দে হাসতে হাসতে খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে আসে। তারপর গোলাপির কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপাকণ্ঠে বলে— আমি জানি, আমার ওপর, আমার ওপর তোমার যত রাগ। তাই কি না?

গোলাপি— না, সারা দুনিয়ার উপর। (পজ) আমরা কেন এত গরিব, সেই জন্যি আমার রাগ। আমরা কেন এত দুখি, সেই জন্যি আমার রাগ।

দৃশ্য : তেরো

লোকেশান : গাঁয়ের মাঠ

সময় : রাত

গাঁয়ের মাঠে যাত্রা হবে। শৌখিন যাত্রাদলের মালিক নকুলেশ্বর পাল তার অভিনেতা কলাকুশলীদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। এখনই যাত্রা শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যে  চার-পাঁচশ দর্শক মাঠে বসে গেছে, তবু লোক আসার বিরাম নেই, চারপাশে থেকে পিলপিল করে মানুষ আসছে। আজকের পালা— গৌর-নিতাই। খুব জনপ্রিয় পালা। যেখানে যখন যে দল মঞ্চস্থ করছে তারাই সফল হচ্ছে।

খোলা মঞ্চের পেছনে কাপড় দিয়ে বাননো গ্রিনরুমে অভিনেতা-বাজনদার-কলাকুশলী সবাই তৈরি, তবু নাটক শুরু করা যাচ্ছে না। কারণ যাত্রাপালার প্রধান দুই চরিত্র, গৌর-নিতাই এর নিতাই প্রস্তুত, কিন্তু গৌর এখনো পৌঁছাতে পারেনি। নকুলেশ্বর তার বাড়িতে বার কয়েক লোক পাঠিয়েছে, কিন্তু যাকেই পাঠানো হচ্ছে সে আর ফিরে আসছে না। কি ব্যাপার বোঝার বা জানার আগেই মাঠে লোক ভর্তি, তারা চেঁচামেচি শুরু করেছে, এখনই পালা আরম্ভ না করলে ওরা পিঠের চামড়া তুলে নেবে! নকুল অবস্থা সামাল দিতে তিনজন এক্সট্রাকে মঞ্চে পাঠিয়ে তাদের অবিরাম তারস্বরে ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে’ গাইতে নির্দেশ দিল। এভাবে আরো কিছুক্ষণ চলল। দর্শককূল কৃষ্ণ-রাম নামের মাহাত্ম শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত হয়ে অভিনেতাদের মা-বাপ তুলে গালাগালি দিতে আরম্ভ করে। এভাবে আরো কিছু সময় কাটর পর এক্সট্রাদের কজন অতিরিক্ত ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে নকুলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে— দাদা আর কতক্ষণ ধরে হরে রাম হরে কৃষ্ণ চালাবো, মুখে যে গাঁজলা উঠে গেল!

নকুলেশ্বর বাঘের মত ক্ষিপ্ত হয়ে জবাব দিলো— উঠুক, গাঁজলা উঠে মরে যা! তোর মত ঘাটের মড়া মরলে কার কি ক্ষতি! কিন্তুক আমি মরলে দল বাঁচবে? ছাগল কোথাকার! যতক্ষণ গৌরিকে না পাওয়া যায়, ততক্ষণ হরে রাম চলবে, যা, মঞ্চে যা!

নকুলেশ্বর প্রায় উম্মাদের মতো ছোটাছুটি করছে, বার বার খবর নিতে চেষ্টা করছে, কিন্তু গৌরের দেখা নেই। এমন সময় একজন খবর নিয়ে এলো— গৌর দুর্দান্ত অভিনয় করবে বলে আজ সন্ধ্যা থেকে মদ খেতে শুরু করে, যারা তার খোঁজে গেছে তাদেরও খাইয়েছে, এমন অবস্থা যে কারুর দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই!

তাহলে এই মুহূর্তে কি করণীয়? নকুলেশ্বর হঠাৎ দর্শকদের দিকে ছুটে গিয়ে ‘লালু লালু’ বলে চিৎকার জুড়ে দিল। কিন্তু কমপক্ষে গোটা তিরিশেক লালু এখন দর্শকদের ভেতরে আছে, তার ভেতরে কোন্ লালুকে দরকার? অবশেষে অনেক দৌড়-ঝাঁপের পর লালনকে ধরে আনা হলো। এবং লালনকে দেখেই নকুলেশ্বর তার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লালন কিছু বুঝতে না পেরে নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিতে চেষ্টা করে।

লালন— কি করেন, কি করেন কাকা!

নকুলেশ্বর— লালন, লালু বাপ, আমায় বাঁচা!

লালন— আমি তো কিছুই বুঝতে পারতছিনা।

নকুল— কিচ্ছু বোঝার দরকার নেই। মেকাপ নাও, মঞ্চে ওঠো, তুমিই আমার আজকের গৌর!

লালন— (ছুটে পালাতে যায়, নকুল তাঁকে ধরে ফেলে) কাকা, আমি জীবনে কোনো দিন পালা করিনি…

নকুল— তাতে কি বাপ, আজকে করো, তুমি নাকি গান বাঁধতে পারো, তা মনে করো, আজ তুমি তোমার বান্ধা গান সবাইরে শোনাবা। যাও, মেকাপ নাও।

লালন— কাকা, আপনার পায়ে ধরি, (পায়ের ওপর পড়ে) আমি পারবো না।

নকুল— আমিই তোর পায়ে ধরি বাপ, আমারে আজকের মত বাঁচা— (পজ) এই! এখনো লালুর মেকাপ হলো না!

মুহূর্তের মধ্যে নকুলের চ্যালারা লালনকে চ্যাংদোলা করে মেকাপ করাতে নিয়ে গেল। তার কয়েক মুহূর্ত পরেই তাঁকে প্রায় ধাক্কা মেরে মঞ্চের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া হলো। ধাক্কাটা সত্যিই একটু বেশি জোর হয়েছে। লালন মঞ্চের ওপর হাটু মুড়ে দুহাত দিয়ে মঞ্চ ধরে নিজেকে সামলাতে থাকে। কিন্তু মাজার ব্যাপার হলো, ওর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, চৌকস অভিনেতার মতো সে অভিনয় শুরু করার আগে প্রথমে মঞ্চপ্রণাম করছে।

লালন ধীরে ধীরে মাথা তুলল, তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করতে করেত উঠে দাঁড়ালো। আস্তে করে সামনের দিকে এক পা এগিয়ে দর্শকদের দিকে তাকাল এবং অস্পষ্টস্বরে গান শুরু করলো।

ভিড়ের ভেতর গুনগুনানি হচ্ছে, গান শোনা যাচ্ছে না। তখন পেছন থেকে নকুল প্রায় চেঁচিয়ে উঠল— লালন, জোরে, চাড়ায় গাও।

লালন দর্শকদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ওপরে তাকালো ওপরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ খুব দ্রুতলয়ে গাইতে থাকে—

                আমার বাবরি চুলের তলায় থাকে তিন শিকারি

                একটা উকুন, একটা মকুন, একটা শকুন,

                আমার হৃদ-কমলের কাছেই আছে তিন ভিখারি

                একটা এঁড়ে, একটা গেঁড়ে, একটা দেঁড়ে,

                আমার দুই চরণের ঠিক উপরে তিন নিকারি

                ওদের একটা ঘাটে, একটা হাটে, একটা নাটে।

                তিন শিকারি, তিন ভিখারি, তিন নিকারি

                এই নয় জনারই মাথায় আছে পাঁচ বিকারী

                নয় আর পাঁচে চৌদ্দজনার মারকাটারি

                আমায় মারে, আমিও মরি, আমিও মারি।

লালনের গান দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয়। নকুল ছুটে এসে ওকে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন জানায়। কিন্তু লালন বিষণœভাবে মাথা নাড়াতে থাকে। কি হয়েছে বুঝতে না পেরে নকুল তাঁকে একটু আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞাস করে— কি ব্যাপার, কি সমস্যা খুলে বল।

লালন— গান ভালো হয়নি।

নকুল— বলিস কি রে, দর্শক খুশিতে পাগল হয়ে গেল আর তুই বলছিস গান ভালো হয়নি!

লালন— না, কাকা, একটু গোঁজামিল আছে, তাড়াহুড়োয় ভালো করে বাঁধতে পারিনি।

নকুল— তা বাবা, একটুখানি গোঁজামিল ছাড়া গান বাঁধাই যায় না। ওই গোঁজামিল গানের নয় রে লালু, জীবনের। ওটুকুই তুই এখন নয়, আরও কিছুকাল পরে বুঝবি। এবার নে, চল্, এরপর দুটো দৃশ্য, তারপর আবার তোর।

লালন পরের দৃশ্যের জন্য তৈরি হতে থাকে।

দৃশ্য : চৌদ্দ

লোকেশন : লালনের বাড়ি

সময় : বিকেল

লালনদের বাড়ির সামনে এসে কবিরাজ ঘোড়া থেকে নামলেন। তাঁর পেছনে যদুপাইক। যদুপাইক বাড়ির ভেতরে ঢোকার আগেই হাঁক-ডাক শুরু করে।

যদু— লালু, পদ্মাদি, তোমরা কই গো, দেখ কবিরাজ মশাই এয়েছেন।

যদু— দেখ, তোমার লালুর কপাল খুলে গেল, কবিরাজ মশাই স্বয়ং তোমার ঘরে পা রেখেছেন।

পদ্মাবতী জোড়হাত করে এক পা এগিয়ে এলো।

পদ্মাবতী— কবিরাজ মশাই, ওর অপরাধ খ্যামা করে দিন।

কবিরাজ— আরে কি মুশকিল, অপরাধ না করলি ক্ষমা করবো কি! আমি তোর গুণী ছেলেরে দেখতি এলাম।

আমার বড় বউ বললো, তোর ছেলে নাকি দারুণ গায়, নিজেই গান বান্ধে। সেদিন গৌর-নিতাই পালা ও একাই শুনলাম জমিয়ে দিয়েছে। এমন ছেলে এ অঞ্চলে আর ক’টা আছে।

পদ্মাবতী— কিন্তুক গানে তো আর প্যাট ভরে না, একটা কাম-কাজ না করলি খাবে কি?

কবিরাজ— হ্যাঁ, সেই জন্যি আমি নিজেই এলাম, শোন, আমি ওরে আমার কাজে লাগাতি চাই। আমার ঘোড়া মানিকচাঁদরে ও খুব পছন্দ করে। আমি ভাবছি, ও ঘোড়াটা দেখভাল করবে, আমার ফাইফরমাশ খাটবে, সারাবছর আমি ওর আর ওর বউয়ের খোরপোশ দেব। তুই তো টুকটাক করে চালাচ্ছিস, তো হয়ে গেল। (পজ) শোন, আমি সামনের বুধবার তীর্থে যাবো, আমার সাথে বাড়ির গিন্নিরা থাকবে, দাসী -চাকর থাকবে, যদু থাকবে, পাল্কি-কাহাররা থাকবে, আরো দুতিন জন যাবে। আমরা বড় দল বেঁধে যাচ্ছি। লালুরেও সাথে নিতে চাই। ও আমার মানিকচাঁদরে দেখবে আর আমারে গান শোনাবে। এক কাজে তিন কাজ, ওর ঘোড়া-রোগের ব্যামো ঘুচবে, তীর্থ-দর্শন হবে, আবার রোজগার হবে। লালু কি বলিস?

লালন— আমি যাবো, দ্যাশ-বিদ্যাশ দেখতি আমার ভালো লাগে।

গোলাপি— (চাপাকণ্ঠে) তো বিয়ে করা কেন, পোড়ারমুখো!

পদ্মাবতী— আমার খুব ভয় করতিছে, কবিরাজ মশাই। ওর বাপও একদিন তীর্থে যাবে বলে সেই যে গেল আর ফিরলো না। পরে শুনলাম মরে গেছে…

কবিরাজ— ওসব ভাবলি কি ছেলে মানুষ হবে, রোজগার করতি শিখবে? তার ওপর আবার বিয়ে দিয়ে দিছিস, খাবে কি? শোন, আমার সাথে যাবে, আমার সাথে থাকবে, আমার সাথেই ফিরেও আসবে, এই তো কথা, ভায়ের কি আছে? (পজ) কিরে লালু তুই কি বলিস?

লালন— আমি যাবো।

কবিরাজ— তো ধুতি-জামা থাকলি গোছায়ে রাখিস, না-থাকলি আজ সন্ধে বেলায় আমার কাছে আসিস, আমি ব্যবস্থা করে দেব। মনে রাখিস, বুধবার ঠিক ঊষালগ্নে আমরা বেরিয়ে পড়বো।

পদ্মাবতী—  কবিরাজ মশাই, গরিবের ঘরে একটু বসবেন না?

কবিরাজ— আর একদিন এসে বসে তোমার ছেলের গান শুনবো। আজ যাই, ওদিকে আবার রোগির বাড়ি যাওয়া লাগবে।

কবিরাজ তাঁর ঘোড়ায় উঠে মৃদু চাপড় দিতেই ঘোড়াটা হাঁটতে শুরু করে।

দৃশ্য : পনেরো

লোকেশান : স্বপ্নদৃশ্য

সময় : রাত

স্বপ্নের ঘোরেও লালন বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। পায়ে পায়ে অন্ধকারে এগিয়ে যায়। অন্ধকারে কিছুই ভালো করে দেখা যায়না। লালন যেন একটা কিছু খুঁজতে বাইরে বেরিয়েছে, কিন্তু বস্তুটা যে কী তা সে নিজেই জানে না। অন্ধকারে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সে নিজের মনে বিড় বিড় করে— কি যে হারিয়ে গেছে, কি খুঁজতি বাইরে এয়েছি? আরে আমি, আমি তো হারিয়ে গেছি! এ কি! এ আমি কুথায় এলাম, কুথায় যাবো, পথ কোথায়, কোনদিক পানে? আরে একি, আমি কে, আমি কে গো, আমার কি পরিচয়!

লালন নিজের মনে বিড় বিড় করতে এগিয়ে যায়। তখন হঠাৎ চারিদিক জোছনার আলোয় যেন সারা পৃথিবী ঝলমল করে ওঠে। লালন সেই অলৌকিক আলোয় প্লাবিত হতে হতে একটা দীঘির কাছে যায়। দীঘির জলের ওপর সেই টলটলে জোছনার আলো যেন কেউ প্রাণভরে মাখিয়ে রেখেছে। সেই অপরূপ জলের দিকে তাকিয়ে লালন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে পায়ে পায়ে ঘাটের কাছে যায়, একটু একটু করে জলের কাছে মুখ নামায়। নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে চেষ্টা করে। তারপর ফিসফিস করে ডাকে— লালন!

তখন যেন জলের ভেতর থেকে অস্পষ্ট জবাব এলো— আমি এখানে!

লালন— তুমি কোথায়?

জলের লালন— আমি জলে।

লালন— কেন তুমি জলে?

জলের লালন— আমার জীবন জলে গেল তাই আমিও জলে।

লালন— কেন তোমার জীবন জলে গেল?

জলের লালন— যে নিজের কথা কয় তার জীবন জলে যায়, যে পরের কথা কয়, সে সুখে কাল কাটায়।

লালন— লালন, আমার লালন!

জলের লালন— আমার কাছে এসো, জলে নামো!

লালন খুব সন্তর্পণে জলে নামে যেন জলে ঢেউ না জাগে। সে একটু করে জলের গভীরে এগিয়ে যায়। বুক সমান জলে নেমে সে ডাক দেয়— লালন!

জলের লালন— নামো, আরো নামো।

লালন আরো এগিয়ে যায়, প্রায় গলা সমান জলে দাঁড়িয়ে সে আবার ডাকে— লালন!

এবার আর কোনও সাড়া নেই। লালন তখন ক্রমশ গলা চড়িয়ে ডাকতে থাকে— লালন, লালন!

সাড়া না পেয়ে লালন যেন উন্মাদের মতো সমস্ত দীঘির জল তোলপাড় করতে করতে লালনকে খুঁজতে থাকে আর চিৎকার করে নিজেকে নিজে ডাকতে থাকে— লালন! লালন কোথায়, লালন!

(ফ্লাশব্যাক শেষ)

দৃশ্য : ষোল

লোকেশান : হাউজবোট

সময় : সন্ধ্যারাত

সন্ধ্যার অন্ধকারে নদীর জলে নৌকা চলছে। জলের ওপর বৈঠার আঘাতে মৃদু-মধুর ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ উঠছে। দূরের গাঁয়ে কোনও কোনও বাড়ির প্রদীপের আলো যেন জোনাকির মত জ্বলছে। চলন্ত নৌকার সামনে বসে জ্যোতিঠাকুর এবং লালন গল্প করছেন।

জ্যোতিঠাকুর— অসামান্য! কেউ নিজেই নিজেকে ডাকছে, এমন আশ্চার্য ঘটনার কথা আমি এখনও শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। এটা নিশ্চয় স্বপ্ন?

লালন— স্বপ্ন কিনা জানিনে, অন্য দিনের মতো পরদিনও স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, যা যা করি তাই করলাম। শুধু বউ বললো, আমার পায়ে নাকি জলকাদার হালকা দাগ ছিল। কাপড় ভেজা ভেজা ছিল…

জ্যোতি ঠাকুর— তার অর্থ স্বপ্ন নয়?

লালন— (মৃদু হেসে) জোর দিয়ে বলি কিভাবে, আমরা পাড়াগেঁয়ে মানুষ, হাতে-পায়ে জলকাদার দাগ তো সবসময় লেগেই থাকে। হাত-পায়ে জল লাগলে কাপড়ে মুছি, কাপড় ভেজা নতুন কিছু নয়।

জ্যোতি ঠাকুর— আপনি রহস্যে জট খুলতে চাইছেন না।

লালন— তা নয়, আমি সত্যিই জানিনে, মনে নেই, সেদিন রাতে সত্যি স্বপ্ন দেখেছিলাম, না কি সত্যি দীঘির জলে নেমেছিলাম। কিন্তু…

জ্যোতি ঠাকুর— কিন্তু কি বলুন না, আমি খুব কৌতূহল বোধ করছি।

লালন— আমি ঈশ্বর-স্রষ্টা-বিধাতা বলতে অন্য কিছু বুঝি না, নিজেকে বুঝি, নিজের দেহ-মন বুঝি। আমার মনে হয়, সেদিন রাতে যে পাগলকরা জোছনার আলো দেখেছিলাম সেই জোছনার আলো যে দেহের মাঝে ধারণ করতে পারে, সেই মানুষ আসল মানুষ, সেই মানুষই অলখ সাঁই, গুরু গোসাঁই, মানের মানুষ।

আমরা সবাই সেই মনের মানুষ খুঁজতে পাগল, সবাই তার দেখা চাই।

জ্যোতি ঠাকুর— তার অর্থ নিজেকে খোঁজা, নিজের অন্তরাত্মার সন্ধান করা?

লালন— নিজেকে খোঁজা মানেই তো অপরকে খোঁজা, অপরকে খোঁজা মানে সকলকে খোঁজা, সকলকে খোঁজা মানে ঈশ্বরের সন্ধান করা। আর… নিজ, অপর অন্তরাত্মা, ঈশ্বর এসব আলাদা কিছু নয়, সবই এক, অভিন্ন।

জ্যোতি ঠাকুর— মনে হয় সর্বেশ্বরবাদ, প্যানথিজম, সর্বত্র ঈশ্বর বিভাজিত, সব কিছুতেই তার আমোঘ উপস্থিতি—

এটা উপনিষদে আছে। ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ…

লালন— উপনিষদে কি আছে আমি জানিনে, আমি মুখ্যু-মানুষ। তবে এটুকু বুঝি, মনের মানুষের খোঁজা মানে ঈশ্বরের খোঁজ নয়, তার চেয়ে আরো বড়ো কিছুর সন্ধান! নিজের ভেতর, নিজের দেহের ভেতর, নিজের অন্তরের ভেতর জোছনার আলোর খোঁজ করা ঈশ্বরকে খোঁজার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ। তার চেয়ে আরো কঠিন হলো, মনের মানুষের সাক্ষাৎ।

জ্যোতি ঠাকুর— আপনার তত্ত্ব বুঝতে আমার একটু অসুবিধে হচ্ছে। একবার মনে হয় বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি, তার পরেই মনে হচ্ছে আপনি যেন আগের জায়গা থেকে সরে গেলেন।

লালন— মনের মানুষের ব্যাপারটা আসলেই তাই। এই দেখা দেয় তো আবার দেখা দেয় না।

    কে কথা কয় রে দেখা দেয় না,

    নড়ে চড়ে হাতে কাছে খুঁজলে জনম-ভর মেলে না।

জ্যোতি ঠাকুর— আমি ক্রমশ আপনার ভাবনা-চিন্তার বিষয়ে আগ্রহ বোধ করছি। আচ্ছা, এবার আপনার জীবনের পরের গল্পটা বলুন, তারপর?

দৃশ্য : সতেরো

লোকেশান : নদীর বাঁধ/হাট

সময় : বিকেল

(ফ্লাশব্যাক শুরু)

কবিরাজ তাঁর দলবলসহ নদীর বাঁধের ওপার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাছেই একটা হাঁটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ওদের দলে পাঁচজন প্রৌঢ়, বাউল দাসের স্ত্রী, দাসী বীণা এবং সহ দুজন মহিলা, দুজন বৃদ্ধ, তিনজন মালবাহক যুবক, চারজন কাহার, যদু পাইকসহ তিনজন লাঠিয়াল, লালন এবং কবিরাজ স্বয়ং। কবিরাজ দলের প্রধান। অন্য সঙ্গীরা তার আত্মীয়, বন্ধু এবং কর্মচারী। কবিরাজের স্ত্রী এবং আর একজন বয়স্ক মহিলা পালকিতে যাচ্ছে। কবিরাজের সঙ্গে তাঁর প্রিয় ঘোড়া মানিকচাঁদ রয়েছে। তিনি ক্লান্ত বোধ করলে ঘোড়ায় চাপছেন, কখনও বা বৃদ্ধদের কাউকে চাপিয়ে অন্যদের সঙ্গে নিজে হেঁটে যাচ্ছেন।

ওঁরা হাটে এসে কিছু খাবার-দাবার ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনে একটা ফাঁকা-জায়গা নির্দিষ্ট করে সেখানে রাত কাটাবার আয়োজন করলেন। কবিরাজের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তে তিনি লালনকে নিয়ে আবার হাটের ভেতর ঢুকলেন। তখন প্রায় ভাঙাহাট। সামান্য কিছু লোক এপাশ-ওপাশ থেকে কেনাবেচা শেষ করে যে যার ধামা বা ঝোলা নিয়ে ঘরে ফিরছে। কবিরাজ বয়স্ক মানুষ। তাঁর দ্রুতবেগে হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে। তিনি লালনের হাতে একটা পয়সা দিয়ে নুন আনতে পাঠিয়ে নিজে তার পেছন পেছন এগিয়ে গেলেন। লালন এক দৌড়ে একটা ছাপরা-দোকানে ঢুকল। দোকানদার নুন-মাপা শেষ করে একটা শালপাতায় মুড়ে তার হাতে দিল। ততক্ষণে কবিরাজ তাঁর ব্যক্তিগত জিনিস কিনে নুনের দোকনে এলেন। তিনি দোকানদারের দিকে এক নজর তাকিয়েই বিরক্ত হয়ে গর্জে উঠলেন।

কবিরাজ— তুমি তো আচ্ছা বেআক্কেল লোক। এই অবস্থায় হাটে এয়েছ! তোমার মুখে ‘মায়ের দয়া’ এখনও শুকায়নি। আচ্ছা লোক তো, বাজে লোক। এই লালন, নুন ফেল্, ফেলে দে!

দোকানদার— আরে মশাই, চেঁচান কেন? আমার মায়ের দয়া সেরে গেছে গো, শুকিয়ে গেছে, এখন কোন ভয় নেই।

কবিরাজ— শুকিয়ে গেছে বলেই তো ভয়। ওই শুকনো চামড়া উড়ে এসেই তো সব্বনাশ ঘটায়ে দিতে পারে। (পজ) লালন, নুন ফেলে দে!

লালন ইতস্তত করে। তার হাতের নুন হাতেই থাকে। সে একবার দোকানদারের মুখের দিকে, একবার কবিরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে ঘটনার মর্ম উদ্ধার করতে চেষ্টা করে। সে এখনও ছেলে মানুষ। বসন্ত রোগ সম্পর্কে তার বিশেষ কোন ধারণা নেই।

দোকানদার— আর কোথাও নুন পাবেন না। এই বাজারে একা আমিই নুন বেচি। মায়ের দয়া হোক না হোক আমার কাছেই আসতে হবে। ও নুন ফেলে দিলে আলুনি খেতে হবে। দ্যাশে এখন নুনের আকাল, নুনের জন্যি খুন-খারাবি, মারামারি-রাহাজনি চলছে, তা জানেন না?

কবিরাজ দোকানদারের দিকে কয়েক পলক তীব্র-দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর লালনের পিঠে খোঁচা মেরে বললেন— চল… আর উপায় কি, (চাপাকণ্ঠে) ব্যাটা খচ্চর!

দৃশ্য : আঠারো

লোকেশান : হাটের পাশে চাতাল

সময় : শেষ রাত

দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে তীর্থযাত্রীদের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। রাতের শেষ প্রহর। দূরে কোথাও মোরগ ডেকে উঠলো। দু-একটা পাখির ডাক শোনা গেল। লালনের ঘুম ভেঙে যায়। সে আস্তে আস্তে উঠে বসে, আবছা অন্ধকারে চারপাশে তাকায়। সবাই তখনও নিদ্রাময়। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাঁটতে শুরু করে। আপন মনে মাথা ঝাঁকায়, বিড় বিড় করে— ভালো লাগছে না, যাবো না, গঙ্গা-দর্শনে যাবো না। পালিয়ে যাবো। লালন সতীর্থদের ঘুমন্ত অবস্থায় শেষবার দেখে নিয়ে দ্রুত পা চালায়।

ঠিক তখন কবিরাজ ঘুম থেকে জেগে উঠে বসলেন। হাঁকডাক করে অন্যদের ঘুম থেকে জাগালেন। লালনকে দেখতে না পেয়ে বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গেলেন। এদিকে ওদিকে বেশ জোরে ডাক দিলেন— লালু, লালন, কোথায় গেলি?

লালন চলতে চলতে থমকে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে এক মুহূর্তভাবে। তারপর আবার মাথা ঝাঁকায়। নিজের মনে বলে— না গঙ্গারে আমি ছাড়তে চাইলেও গঙ্গা আমারে ছাড়বে না।

লালন আবার দলে ফিরে আসে। যাত্রার তোড়জোড় আরম্ভ হয়। কিছুক্ষণেল মধ্যেই ওরা আবার পথে নামেন।

তখনও সূর্য ওঠেনি, আবছা অন্ধকার। সামনের দিক থেকে তখন দুই ইংরেজ সাহেব আর তাদের বাঙালি পার্শ্বচরের একটা দল এগিয়ে আসছে। সাহেব দুজন ঘোড়ায় আর বাঙালি কর্মচারীরা ওদের পেছন পেছন হেঁটে আসছে। বাউল দাসদের বড়সড়ো দলটাকে দেখে সাহেব দুজন চাপাকণ্ঠে কিছু বলাবলি করে।

সাহেব— কান্ত বাবু, ওরা কে, হু আর দে, ওরা কি ডাকাইত?

কান্ত বাবু— স্যার, ওরা তীর্থযাত্রী (পজ) পিলগ্রিম।

প্রথম সাহেব— মাই গড! ফকির, সন্ন্যাসী-রিবেল। (সাহেব কোমর থেকে পিস্তল বের করে হাতে নেয়।)

কান্ত বাবু— মনে হয় না স্যার। ওদের সঙ্গে পালকি আছে, পালকিতে মেয়েরা আছে বলে মনে হয়… স্যার, ওরা ধর্ম করতে যাচ্ছে। তীর্থে যাচ্ছে। ওরা ফকির-বিদ্রোহী নয়, আই অ্যাম সিওর স্যার…

দ্বিতীয় সাহেব— আর ইউ সিওর? বাট তোমরা এত পায়াস ধর্ম ধর্ম করো, কিন্তু দেশকে ভালোবাসো না, তোমরা একটু দুষ্ট আছো, একটু বদমাইশ আছো…

কান্ত বাবু— স্যার, যা বলেছেন, ইউ আর রাইট স্যার।

প্রথম সাহেব— কেন, রইট, রাইট কেন, তুমি প্রটেস্ট করো, তুমি দেশকে ভালোবাসলে প্রটেস্ট করো।

কান্ত বাবু— (আমতা আমতা করছে) স্যার, আমরা একটু দুষ্ট আছি আমরা দেশকে—

দ্বিতীয় সাহেব— ভালোবাসো কি বাসো না, ইয়েস অর নো?

কান্ত বাবু— স্যার, আমি গরিব মানুষ…

প্রথম সাহেব— ননসেন্স। গরিব লোক দেশকে ভালোবাসবে না? তোমরা বজ্জাত আছো।

কান্ত বাবু— স্যার, আমরা একটু বজ্জাত… বাট ফকির-রিবেলরা কি দেশকে ভালোবাসে বলে মনে হয় না, স্যার?

দ্বিতীয় সাহেব— বাট দে আর রিবেল, ডাকাইত, টেররিস্ট।

কান্ত বাবু— ইয়েস স্যার, দে আর টেররিস্ট, বাট দে লাভ দেয়ার মাদারল্যান্ড।

প্রথম সাহেব— কান্ত বাবু, ইউ আর সাপেটিং দেম, ইউ আর সাপেটিং দি টেররিস্টস!

কান্ত বাবু— নো স্যার আই অ্যাম সাপোটিং ইউ, বাট এ দেশের মানুষ দেশকে ভালোবাসে কি না…

দ্বিতীয় সাহেব— ভালোবাসে? ইয়েস অর নো।

কান্ত বাবু— আই অ্যাম নট সিওর স্যার, টাইম উইল সে…

দ্বিতীয় সাহেব— ইউ আর…

কান্ত বাবু— আই অ্যাম ইওর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।

দুই সাহেব পরস্পরের দিকে তাকাল। কান্তবাবু কঠিন-মুখে একবার ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল। ততক্ষণে কবিরাজের দল সাহেবদের কাছাকাছি এসে গেছে। কবিরাজ সাহেবদের দেখে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালেন। সাহেবরা কবিরাজ এবং তার দলবলেকে তীক্ষè-দৃষ্টিতে লক্ষ করতে করতে ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল।

দৃশ্য : উনিশ

লোকেশান : পথের পাশে নাটমন্দির

সময় : দুপুর

করিবাজের দল দূরে একটা গ্রামে নাট-মন্দির দেখে সেখানেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া এবং বিশ্রামের জন্যে এগিয়ে যায়। ওরা নাট-মন্দিরের কাছে এলে মহিলারা পালকি থেকে নামে। কিছু জিনিসপত্র নামানো হয়। দু-একজন নাট-মন্দিরের ধাপিতে বসে আড়মোড়া দিয়ে শরীরের ক্লান্তি মোচনের চেষ্টা করে। কবিরাজ নাট-মন্দিরের পাশটা ভালো করে ঘুরে দেখে নিশ্চিত হলেন, এখানেই দুপুরের আহার-বিশ্রাম চলতে পারে। তিনি জলের খোঁজ নিতে অন্যদের হাঁক-ডাক করে নির্দেশ দিতে লাগলেন। নিজেও একটু এগিয়ে দেখতে চেষ্টা করেন। কম বয়সি ছেলেরা খোঁজাখুঁজি করতে করতে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কবিরাজ তার এক সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করতে তাকে ইশারায় কাছে ডাকেন। সে কবিরাজের কাছে এগিয়ে যায়।

কবিরাজ— ব্যাপারটা কি বলতো? জন-মুনিষ্যির চিহ্ন নেই! গাঁয়ের লোকজন গেল কোথায়? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

সঙ্গী— তাইতো দেখছি, কিছু ঘটল না তো?

কবিরাজ— ঘটতে কতক্ষণ, যা দিনকাল, ফকির-বিদ্রোহীরা চারিদিক তোলপাড় করে ফেলেছে…

দূর থেকে যদু পাইক ছুটে আসতে থাকে। তাকে ওভাবে আসতে দেখে কবিরাজ এবং তার সঙ্গী তার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়।

যদু পাইক— কবিরাজ মশাই তাড়াতাড়ি গোটান, বিরাট বিপদে পড়ে গেছি!

কবিরাজ— কি বিপদ, কি হলো?

যদু— ওপাশে এক সাহেব আর তিন সেপাইকে কারা যেন খুন করে রেখে গেছে।

কবিরাজ— সে কিরে! নির্ঘাত ফকির-বিদ্রোহীদের কা- এসব। এক্ষুণি পুলিশ আসবে। চল্ পালা, তাড়াতাড়ি গোটা। (পজ) আমরা বোধ করি ভুল সময়ে এসে পড়লাম।

ওরা তিনজন দ্রুত পায়ে লাশের কাছে গেল। একজন সাহেব আর তিনজন ভারতীয় সেপাইয়ের মৃতদেহ একটা ঝোঁপের আড়ালে পড়ে রয়েছে। খুব সম্ভব আজ ভোর রাতেই তাদের হত্যা করা হয়েছে।

কিছু একটা অনুমান করে লালন আড়ালে থেকে কবিরাজদের অনুসরণ করছিল। ওরা ফিরে আসতেই লালন ঝোঁপের কাছে গিয়ে লাশগুলো খুঁটিয়ে দেখল। তারপর শ্লথ পায়ে ফিরে আসতে আসতে বিড়বিড় করে— খাঁচার পাখি খাঁচা ভেঙে…

কবিরাজের দল আবার জিনিসপত্র গুছিয়ে ওই এলাকা ছেড়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে পালিয়ে যায়।

দৃশ্য : কুড়ি

লোকেশান : নওদা

সময় : বিকাল

কবিরাজের দলের সঙ্গে আরো দুটি দল যুক্ত হয়েছে। সকলে মিলে হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট নদী বা খালের পাড়ে এসে দাঁড়ায়। নদীতে হাঁটুজল। লোকজন পায়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছে। ওরা ওপারে যাওয়ার জন্যে নদীতে নামে। পুরুষদের একটা দল সবার আগে, তারপর মহিলাদের পালকি, পালকির পেছনে ঘোড়ার ওপর কবিরাজ, তার পেছনে যদু পাইক, লালন এবং বয়োবৃদ্ধরা, তাদের পেছনে পরপর অন্য দলের লোকেরা। নদীর মাঝামাঝি আসতে হঠাৎ মানিকচাঁদ বিশ্রীভাবে অতিদ্রুত পেছন ঘুরে দাঁড়ায়। কবিরাজ ঝটকা সামলাতে না পেরে জলে পড়ে গেলেন। কবিরাজ কোনো রকমে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালেন।

কবিরাজ— কি হলো রে যদু?

যদু পাইক— তাই তো, ঘোড়াটা এমন করলো কেন! দেখতো লালু?

লালন ঘোড়ার কাছেই ছিল। সে ঘোড়ার গায়ে হাত বুলাতে লাগে। তারপর আস্তে আস্তে ঘোড়াটাকে টেনে ওপরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘোড়া একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুতেই সামনে এগোতে চায় না। লালন কিছু বুঝতে না পেরে এক-পা দু-পা করে সাবধানে এগিয়ে বুঝতে চায়, জলের তলায় চোরা গর্ত আছে কি না। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ায়। পায়ের সঙ্গে নরম কিছুর ধাক্কা লেগেছে। সে নিচু হয়ে দু-হাত জলে নামায়। একটু একটু করে জলের তলা থেকে একটা য্বুতীর লাশ তুলে আনে। লাশের কোমরের সঙ্গে দড়ি দিয়ে কলসি বাঁধা।

দলের সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জলেই দাঁড়িয়ে থাকে। কবিরাজের সম্বিত ফিরতেই তিনি চাপাকণ্ঠে নির্দেশ দেন।

কবিরাজ— লাশ ফেলে দে, পালা, তাড়াতাড়ি! (পজ) কোন দ্যাশে যে আছি…

লালন একমুহূর্ত দ্বিধা করে, কবিরাজের দিকে তাকায়, যদু পাইকের দিকে তাকায়, যদু তাকে লাশ ছেড়ে দিতে ইঙ্গিত করে, সে জলের লাশ জলে ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ওরা সবাই যথাসম্ভব দ্রুত নদী পেরিয়ে ওপারে যায়।

দৃশ্য : একুশ

লোকেশান : গঙ্গার ঘাট

সময় : প্রত্যুষ

পুণ্যার্থীরা যে যার সাধ্যমতো পুণ্যার্জনের আশায় গঙ্গায় পয়সা ছুঁড়ে মারছে। কয়েকটা ভিখারি ছেলে-মেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে, কখনও জলে ডুবে হাতড়ে হাতড়ে জল কাদাসহ সে পয়সা তুলে আনছে। এভাবে পয়সা কুড়াতে গিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝে মারামারি করছে। কখনও একজন আরেক জনকে সাহায্য করছে। পুণ্যার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ মজা দেখার জন্য বেশ একটু দূরে পয়সা ছুঁড়ে ফেলছে। সেসব ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বড়ো ছেলেমেয়েরা পয়সা তুলতে জলে ডুব দিচ্ছে।

গঙ্গার ঘাটে প্রচ- ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে অজ¯্র পুণ্যার্থী গঙ্গা-¯œানের উদ্দেশ্যে এখানে জড়ো হয়েছে। এছাড়া অন্তর্জলির জন্যে বেশ কিছু অতিবৃদ্ধ মানুষকে বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছে। তাদের সঙ্গীরা বৃদ্ধের পা থেকে কোমর অবধি গঙ্গার জলে ডুবিয়ে শরীরের বাকি অর্ধেক তীরে রেখে তাদের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। এই সব দলের সঙ্গে অনেক পুরোহিত রয়েছে। তারা যেন পরস্পরকে টেক্কা দিতে তারস্বরে মন্ত্র পাঠ করছে।

ঘাটের আর এক দিকে দূরান্তের যাত্রীরা কলসি ভরে গঙ্গাজল নিচ্ছে। কাছের লোকেরা পেতল-কাঁসার ঘটিতে, কেউবা মাটির ছোট ঘড়ায় জল ভরে নিচ্ছে। এপাশেও প্রচুর ভিড়।

অন্যদিকে ¯œানার্থীরা দলে দলে পুণ্য¯œান সম্পন্ন করছে। কবিরাজের দল ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল, ¯œান করল এবং অনেকগুলো কলসিতে গঙ্গাজল ভরে নিল।

দৃশ্য : বাইশ

লোকেশান : গঙ্গাপাড়ে ছাপরা ঘর

সময় : সকাল

লালন আর যদু পুরুষদের ঘর বা মালপত্র পাহারায় রয়েছে। পাশেই মহিলাদের ঘর পাহারা দিচ্ছে বীণা আর তার সঙ্গে অন্য একজন পরিচারিকা। কবিরাজ দলবলসহ ফিরে এলে ওরা চারজন তারপর গঙ্গা¯œানে যাবে, এমন ব্যবস্থা হয়েছে।

ভোরের হালকা সূর্যের আলোয় চারিদিকে ঝিকমিক করছে। যদু পাইক ঘরের সামনে লাঠি নিয়ে পায়চারি করছে।

লালন তখনও ঘুম থেকে জাগেনি। যদু একবার আকাশের দিকে তাকায় তারপর মৃদু স্বরে লালনকে ডাকে।

যদু পাইক— কিরে লালু, ঘুম ভাঙলো, উঠে আয়।

লালন আসছে না দেখে সে ওপাশে দাঁড়ানো বীণার দিকে তাকায়।

যদু পাইক— ছোঁড়াটাকে ডাক তো বীণা, এখনো জাগেনি, কবিরাজ মশাই এসে দেখলে রাগারাগি করবে।

বীণা ঘরের ভেতর ঢোকে। আস্তে আস্তে লালনের কাছে গিয়ে তার গায়ে খোঁচা মারে।

বীণা— এই যে, ও কবিয়াল, জাগো! (পজ) এ কি, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে! (কপালে হাত দেয়) কি সব্বনাশ! তোমার যে মায়ের দয়া হয়েছে। দ্যাখ কপাল! মায়ের কোল ফাঁকা করে ছেলেটারে নিয়ে এলো, এখন কি হবে! (পজ) ও যদুদা, দেকে যাও, কি কা-!

যদু পাইক— (ঘরে ঢুকতে ঢুকতে) কি হলো?

ইতোমধ্যে কবিরাজ তার দলবল নিয়ে সাময়িক আস্তানায় ফিরে এলেন। যদু অস্থিরভাবে তার কাছে এগিয়ে গেল।

যদু পাইক— কবিরাজ মশাই বিরাট বিপদ!

কবিরাজ— কেন, কি হলো রে?

যদু পাইক— লালুর মায়ের দয়া হয়েছে। সারা-গায়ে আর পিঁপড়ে বসারও জায়গা নেই।

কবিরাজের সঙ্গী-সাথীরা যে যার মতো আহা-উহু করতে করতে ঘরের পাশ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ায়।

কবিরাজ— এখন কি করি বল তো, যদু।

যদু পাইক— তাইতো ভাবছি। একে ছাড়াও যাবেনা, সাথে নিয়ে ফেরাও যাবে না।

কবিরাজ— এক কাজ কর, আশেপাশে বদ্যি-কবিরাজ যাকে পারিস তাকে ধরে নিয়ে আয়। আমার কাছে এখন তো ওষুধ-পথ্য কিছু নেই। অবশ্যি এ রোগের ওষুধ হয় না, তবু মনের সান্ত¡না। (পজ) মহাবিপদে পড়লাম।

যদু পাইক বদ্যির খোঁজে বেরিয়ে গেল।

দৃশ্য : তেইশ

লোকেশান : গঙ্গার ঘাট

সময় : সন্ধ্যা

কবিরাজ অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। যদু পাইক গঙ্গার দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দলের বয়স্ক সদস্যরা যে যার মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। দু-একজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করছে।

কবিরাজ— বল, তোমরা বল, এখন কি করি?

রাঘব দত্ত— মনে হয় দু-এক দিনের মধ্যেই যা হবার তা হয়ে যাবে।

যদু পাইক— এসপার-ওসপার কিছু একটা না হওয়া পর্যন্ত ওকে তো এভাবে ফেলে যেতে পারি না।

বৃদ্ধ নিশিকান্ত— সে তো ঠিক কথা, যাই হোক না কেন গাঁয়ের ছেলে, জন্ম থেকে চিনি, জানি।

কবিরাজ— ঠিক, ছোঁড়াটারে বিদ্যাশ-বিভুঁয়ে এমন করে ছেড়ে যাওয়া চলে না। কিন্তু আসল কথা হলো, আজকালের মধ্যেই ওর হয়ে যাবে। আমি ওর মায়ের কাছে কি জবাব দেবো!

নিশিকান্ত— কপালের লিখন কে খ-াবে, কবিরাজ মশায়।

কবিরাজ— ঠিক কথা। ঠিক আছে, তবে এখন অন্য ব্যবস্থা করা লাগবে।

রাঘব দত্ত— কি ব্যবস্থা?

কবিরাজ— আরে মরার আগে ওর মুখে তো একটু গঙ্গাজল দেয়া দরকার। সেটাই বা কে দেবে, ওর ধারে-কাছে যাবে কে এখন? (পজ) দ্যাখ তো যদু, কাউকে পাস কিনা, দু-চার পয়সা লাগে আমি দেব।

যদু পাইক— দু-চার পয়সায় ওকাজে কেউ রাজি হবে না।

বীণা আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল, সে এবার একটু এগিয়ে এসে কবিরাজের মুখোমুখি হয়।

বীণা— ওসব পয়সার হিসেব-নিকেশ থাক। যতক্ষণ ওর শ্বাস আছে আমিই দেখভাল করবো।

কবিরাজ— তুই!

রাঘব দত্ত— বলিস কি রে? তোরও তো মায়ের দয়া হবে!

বীণা— হোক, মানুষ একবারই মরে।

দৃশ্য : চব্বিশ

লোকেশান : ছাপরা ঘর/গঙ্গার ঘাট

সময় : সকাল

ছাপরা ঘরের কাছে কবিরাজের দলের সবাই জড়ো হয়েছে। ভেতর থেকে লালনের যন্ত্রণার্ত চাপা গোঙানি শোনা যাচ্ছে। ঘরের বাইরে ওরা লালনের মৃত্যুর জন্যে যেন অধীর হয়ে আছে। কারণ লালন না-মরা পর্যন্ত ওরা বাড়ি ফিরতে পারছে না।

কবিরাজ কোমরের পেছনে হাত বেঁধে স্থির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অন্য সবাই উশখুস করছে। কারো মুখে কথা নেই। ঘরের ভেতর থেকে ক্রমশ বিদঘুটে আওয়াজ আসতে থাকে। ধীরে ধীরে আওয়াজ পালটে যায়, এখন ঘড়-ঘড় শব্দ ভেসে আসে। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ শব্দ থেমে যায়। কবিরাজ দরোজার সামনে গিয়ে উঁকি মারেন। অন্য সবাই যে যার জায়গা ছেড়ে দরোজার সামনে এসে জড়ো হয়। কয়েক মুহূর্ত চাপা উত্তেজনায় কাটে। ধীরে ধীরে, প্রায় টলতে টলতে বীণা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। দরোজায় হেলান দিয়ে সে যেন আকারণে আকাশের দিকে তাকাল।

বীণা— হা ঈশ্বর!

সবাই প্রায় একই সঙ্গে উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল— কি হলো?

বীণা— হয়ে গেছে।

বীণা কারোর দিকে না তাকিয়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। একটু একটু করে জলে নামল। হাঁটু-জল অবধি নেমে সে প্রায় আকারণে ঝাঁপ দিল। কবিরাজ জলের কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন— এই ওরে ধর, ওরে ধর। মেয়েটারে তুলে আন। ও মায়ার বন্ধনে বান্ধা পড়িছে।

বাউলের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চার কাহার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীণাকে তুলে আনে। বীণা হাত-পা শিথিল করে প্রায় মৃতের মতো পড়ে থাকে।

দৃশ্য : পঁচিশ

লোকেশান : ছাপরা ঘর

সময় : সকাল

কবিরাজ কিছুটা বিভ্রান্ত। শুধু তিনি নন, দলের সবাই কমবেশি বিভ্রান্ত এবং চিন্তাগ্রস্ত কবিরাজ সকলের দিকে একবার তাকিয়ে সিদ্ধান্ত করতে চেষ্টা করেন।

কবিরাজ— যদু গেল কোথায়?

বৃদ্ধ হারাধন— ওপাশে বসে আছে।

কবিরাজ— মহাবিপদে পড়ে গেলাম। দেহ সৎকার করতে হবে। লোক কোথায় পাব। কেউ তো এ লাশ ছুঁতে চাইবে না।

নিশিকান্ত— এ দেহ দাহ করা যাবে না। পুঁতে দিতে হবে।

রাঘব দত্ত— পুঁতে দিতে হলেও তো লোক চাই। মাটি খুঁড়তি অনেক সময় লেগে যাবে, তাছাড়া কোম্পানি বাহাদুর নাকি নতুন আইন করিছে, বাজারে-ঘাটের কাছে এসব লাশ দাহ করা যাবে না। দূরে কোনও জায়গায় দাহ করতি হবে।

কবিরাজ— দ্যাখো তো, সবাই মিলে দ্যাখো। পয়সা-কড়ি যা লাগে দেবো। হিঁদুর ঘরের ছেলে, সৎকার না-করে ছেড়ে যাওয়া যায় না। মহাপাতকীর কাজ হবে।

নিশিকান্ত— চলো দ্যাখি, পয়সা দিলি বাঘের দুধ মেলে, এ তো সামান্য ব্যাপার।

ওরা সবাই মিলে লোকের খোঁজ করতে একটু এগিয়ে যায়। তখন তিনটে ভিখারি ছলে ওদের লক্ষ করে এগিয়ে আসে। ওদের বয়স পনেরো-ষোলো বছরের মধ্যে।

প্রথম ছেলে— কিছু লাগবে বাবু?

হারাধন— লাগবে, কিন্তু তোরা কি পারবি?

দ্বিতীয় ছেলে— বলে দ্যাখেন না, আমরা পারি না এমন কোন কাজ নেই।

নিশিকান্ত— বটে! একটা মড়া আছে। পুঁতে দিতি পারবি?

তৃতীয় ছেলে— কিসের মড়া?

কবিরাজ— একটু ঝামেলার ব্যাপার আছে।

প্রথম ছেলে— খুন?

কবিরাজ— আরে ব্যাটা না, খুনটুন না মায়ের দয়া।

তৃতীয় ছেলে— ওরে বাপ, এতো খুনের চেয়ে বেশি। পারবো না।

হারাধন— আরে দ্যাখ না, তোরা যা চাস, যা পয়সা লাগে দোবো।

দ্বিতীয় ছেলে— মোটা টাকা লাগবে।

কবিরাজ— কত?

প্রথম ছেলে— জানো তো, কোম্পানির আইন, ঘাটের ধারে ওসব মড়া সৎকার করা যাবে না। ধরতে পারলে পিটিয়ে আমাদেরই মড়া বানিয়ে ছাড়বে।

কবিরাজ— ঠিক আছে একটু দূরে গিয়ে পুঁতবি। (পজ) কত লাগবে বল?

তৃতীয় ছেলে— দশ টাকা।

কবিরাজ— কি বলিস! দশ টাকায় দশ বিঘা জমি মেলে। যা ভাগ দরকার নেই।

প্রথম ছেলে— ঠিক আছে, ঠিক আছে যা ভালো মনে করেন, দেবেন। আমরা গরীব-দুঃখী বলে এমন কাজ করি, নইলে সারা মুর্শিদাবাদে একজনও এ মড়া ছোঁবে না।

নিশিকান্ত— ঠিক আছে, চল বাবারা চল। তোদের সন্তুষ্ট করে দেবো।

দ্বিতীয় ছেলে— কিন্তু একটা কথা, লাশ পোঁতা যাবে না, তাতে অনেক সময় লেগে যাবে। একটা কাজ করেন, পুরোনো মশারি থাকলি দেন, আমরা একটা কলাগাছের ভেলা বানায়ে লাশটা মশারির ভেতর ঢুকায়ে ভাসায়ে দেবো।

কবিরাজ— মশারি আছে, দিচ্ছি। যদু, মশারি আন। (পজ) ভালো বুদ্ধি হয়েছে, কয়েক মুহূর্তে কাজ শেষ হয়ে যাবে। যা বাবারা, তোরা তবে লাশের সদগতি করে পয়সা নিয়ে যাস। আমরাও পালায়ে বাঁচি। এই, তোরা গোছগাছ কর, এক্ষুণি রওনা হবো। তৈরি হও।

দৃশ্য : ছাব্বিশ

লোকেশান : লালনের বাড়ি/ভোরাই নদীর ঘাট (মন্তাজ)

সময় : সকাল/দুপুর

কবিরাজ গ্রামে ফিলে লালনের মৃত্যু সংবাদ জানায়। এমন দুঃসংবাদ শোনার পর তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াবশত পদ্মাবতী জ্ঞান হারায়। লালনের স্ত্রী ঘটনার আকস্মিকতায় পাথরের মতো প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

তারপর যথাসময়ে লালনের স্ত্রী গোলাপিকে পাড়ার বিধবা মহিলারা নদীর ঘাটে নিয়ে গেল। তার হাতের শাখা ভেঙ্গে, সিঁদুর মুছে বিধবার বেশে সাজিয়ে দিল। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই লালনের কিশোরী স্ত্রী বিধবার বেশ পরে নদীর ঘাট থেকে ঘরে ফিরে এল।

দৃশ্য : সাতাশ

লোকেশান : গঙ্গার পাড়

সময় : ঊষাকাল

তিনচারজন মহিলা ভোরবেলা নদীর ঘাটে এসে ¯œান করতে জলে নামে। তাদের ¯œানের মাঝপথে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ শুনে একজন ভয় পেয়ে চিৎকার করে জলছেড়ে ডাঙায় ওঠে। তার দেখাদেখি অন্যেরাও তাকে অনুসরণ করে। তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। ওরা চারপাশে তীক্ষè-নজর মেলে দেখতে চেষ্টা করে। নদীর জলে একটা কলাগাছের ভেলা। ভেলার ওপর মশারি খাটানো। মনে হচ্ছে তার ভেতর একটা লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে গাঁয়ের মানুষেরা সাঁপেকাটা লাশ এমন করে ভাসিয়ে দেয়। ওদের একজন একটু সাহস করে ভেলার দিকে এগিয়ে গেল। মশারির ভেতর লালনের প্রায়-নগ্ন বিকৃত শরীরটা দেখে সে পেছনে তাকায়। অন্য মহিলারা তখনও দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সময় জোলাদের বউ রাবেয়া, পাড়ায় যার ধাই হিসেবে পরিচিতি রয়েছে, সে ¯œান করতে ঘাটে আসছে। তাকে দেখে লাশের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা এগিয়ে যায়।

কুলসুম— রাবেয়াবু, একটা জোয়ান ছেলে, মনে হয় এখনও মরেনি।

জুলেখা— হ্যাঁ, গোঙানি শুনতে পাচ্ছি।

রাবেয়া— চল্, দেখি তো।

ওরা এগিয়ে চলে। রাবেয়া এবং কুলসুম সকলের আগে, অন্য সবাই ভয়ে ভয়ে ওদের অনুসরণ করছে। রাবেয়া কিছুটা দ্বিধায় সতর্ক পায়ে লালনের খুব কাছে এগিয়ে যায়। লালন মড়ার মতো পড়ে আছে। রাবেয়া তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে দেখতে থাকে। ঠিক তখন লালন খুব অস্পষ্ট শব্দে কাতরে ওঠে আহ…

রাবেয়া— এখনও বেঁচে আছে। ধর, বাড়ি নিয়ে যাই।

কুলসুম— বলিস কি, এ তো বসন্ত রুগি! এ কি বাড়ি নেয়া যায়? সারা পাড়া শুদ্ধ উজাড় হয়ে যাবে, মড়ক লেগে যাবে।

রাবেয়া— তা যাক, তাই বলে একটা জ্যান্ত-মানুষ চোখের সামনে মরে যাবে, তাই কখনও হয়? নে ধর।

এবার কুলসুম সবার আগে লালনের পায়ের দিকটা টেনে তোলে। তার দেখাদেখি অন্য সবাই এগিয়ে আসে। শুধু একজন মহিলা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। সে ছাড়া অন্য সবাই ধরাধরি করে লালনকে নদীর পাড় থেকে রাবেয়ার বাড়ির দিকে নিয়ে যায়।

দৃশ্য : আটাশ

লোকেশান : রাবেয়ার ঘর

সময় : রাত

ঘরের ভিতর একটা ছোট লম্ফ জ্বলছে। রাবেয়া আর তার স্বামী শুয়ে শুয়ে কথা বলছে। লম্ফের মৃদু আলোয় দরিদ্র পরিবারের নিতান্ত নগণ্য আসবাবপত্র চোখে পড়ে।

রাবেয়ার স্বামী— কোত্থেকে একটা বসন্তরুগি টেনে আনলে, পাড়ার লোক উল্টোপাল্টা কইছে…

রাবেয়া— ছাড়ো তো পাড়ার লোক, আমি কি পাড়ার লোকরে খাজনা দিয়ে চলি নাকি! একটা মানুষ অঘাটায় পড়ে মরে যাচ্ছে দেখে নিয়ে এলাম, এই তো ব্যাপার। এর মধ্যি আবার উল্টা-পাল্টা কথার কি আছে?

রাবেয়ার স্বামী— এ রোগ মারাত্মক ছোঁয়াচে, যদি তোর-আমার কারো হয়।

রাবেয়া— হলে হবে। মহম্মদপুরে তোতা মিয়া একখান গান লিখছে জানো—

                ‘জনম আছে হাতে লিখা, মরণ লিখা পায়।

                যার যেখানে মরণ আছে হাইটা সেথা যায়’

তোমার আমার যদি বসন্ত রোগে মরণ হবার থাকে তো হবে। ভয়ের কি আছে?

ওদের ঘরের বারান্দার এককোণে পুরোনো শাড়ি দিয়ে একটা মশারির মতন বানিয়ে লালনকে সেখানে রাখা হয়েছে।

রাবেয়াদের কথার মাঝে লালন কাতরে ওঠে। রাবেয়া বিছানা ছেড়ে লম্ফ নিয়ে তার কাছে যায়।

রাবেয়া— কি, কি হলো, পানি খাবা?

লালন— মা…

রাবেয়া— (কপালে হাত বুলায়) হ্যাঁ বাপ, আমিই তোর মা। আমার তো ছেলেপুলে নেই; আল্লা তোরে আমার কাছে পাঠাইছে। (পজ) কও বাপ, পানি খাবা?

লালন— খিদে লাগছে।

রাবেয়া— খুব ভালো কথা, খিদে লাগা মানে তুমি ভালো হয়ে যাচ্ছো। একটুখানি বোসো, আমি দুধ নিয়ে আসি।

রাবেয়া একটা পেতলের গ্লাসে দুধ নিয়ে ফিরে এসে লালনকে নিজের বুকের কাছে তুলে ধরে তাকে দুধ খাওয়াতে থাকে। রাবেয়া তাকে খাওয়াতে খাওয়াতে কথা বলে।

রাবেয়া— তোমার নাম কি বাপ, কি জাত, তুমি হিঁদু না মোসলমান?

লালন— (খাওয়া শেষ করে) জানিনে মা, মনে নেই…

রাবেয়া— যদি মোসলমান হও তো ঠিক আছে, নইলে হিঁদুর পুত হও তইলে তোমার জাত গেল বাপ।

লালন— (তন্দ্রাচ্ছন্ন কণ্ঠে) জাত কি জিনিস, মা?

দৃশ্য : উনত্রিশ

লোকেশান : রাবেয়ার বাড়ির উঠোন

সময় : সকাল

লালন এখন সুস্থ। তবে তার বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। সারা মুখে হালকা বসন্তের দাগ। তবে তার মুখ কুৎসিত বা বিকৃত হয়নি। সে বাড়ির উঠোনে বসে মাকুতে সুতো তুলছে। রাবেয়ার স্বামী মাকু ঘোরাচ্ছে।

রাবেয়ার স্বামী— পাগল, তোর নাম পরিচয় কিছুই তো বলিস না। কার ছেলে, কোন গেরামে বাড়ি, হিঁদু না মুসলমান, কিছু কও?

লালন— আমার যে কিছুই মনে পড়ে না, বাবা।

রাবেয়ার স্বামী— ব্যাটা বদমাশ, তোর সব মনে পড়ে, খাবার কথা মনে পড়ে, শোয়ার কথা মনে পড়ে, আসল জিনিসটা মনে পড়ে না!

লালন— সব যেন কেমন গুলিয়ে গেল কি যেন সব হয়ে গেল।

রাবেয়া একটা ধামায় করে কিছু চাল, কিছু আনাজ, এক ছড়া পাকা-কলা নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। সে ধামা বারান্দায় রেখে কলার ছড়াটা লালনের দিকে এগিয়ে দেয়। লালন হাতের কাজ রেখে রাবেয়ার কাছে এসে ছড়া থেকে একটা কলা ছিঁড়ে খেতে শুরু করে। রাবেয়া তীক্ষè-দৃষ্টিতে তাকে দেখতে থাকে।

রাবেয়া— পাগলা, মাসখানেক আগে তোরা বহরমপুরে গঙ্গা¯œান করতে এসেছিলি। তোর সাথে যারা ছেলো তারা তোর বসন্ত রোগ হয়েছে দেখে শ্মশান ঘাটে রেখে পালিয়ে যায়। তাইনা, ঠিক কিনা কও?

লালন— কিছু মনে পড়ে না, মা।

রাবেয়া— (একই রকম তীক্ষè-দৃষ্টিতে তাকিয়ে) তুই হিঁদুর ছেলে, ঠিক কি না কও?

লালন— (ম্লান হেসে) মা, আমার যে কিছুই মনে নাই।

রাবেয়া— দ্যাখ পাগলা এখনও সময় আছে, সত্যি কথা কও।

লালন— (হাসতে হাসতে) সময় আছে! কোথায় আছে সময়, সময় কোথায় থাকে? (পজ) আর সময় নেই, মা!

রাবেয়ার স্বামী— তার মানে কি, পাগলা, এ কথার মানে কি?

লালন— বা’জান আমি কথা কইতে পারি, মানে জানি না।

রাবেয়া— (ফুপিঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে) পাগলা, তুই ঘোর বিপদে পড়েছিস, আমারেও বিপদে ফেললি…

লালন— (ফুপিঁয়ে) আপদ বাড়ি, বিপদ ঘর, বিপদ আমার মা, আমি বিপদ নিয়ে ঘর বাঁধিছি, বিপদ বিনে চলতে পারি না।

দৃশ্য : তিরিশ

লোকেশান : গাঁয়ে চ-ীম-প

সময় : সন্ধ্যারাত

রাবেয়াদের গাঁয়ের চ-ীম-পে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কয়েকজন বাউল-ফকির জড়ো হয়েছে। কাছাকাছি এলাকায় বাজনদাররা স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের নিজস্ব ঢোল, খোল, নাল, করতাল ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হয়ে বসেছে। বিশেষ কোন পরব ছাড়াই বাউল-ফকিররা একত্র হলে ওরা এভাবে গান-বাজনায় মেতে ওঠে। সেই সঙ্গে চলে গাঁজা-ভাঙ সেবন।

বাউলরা গাঁজার কলকেতে জোর টান লাগিয়ে ধোঁয়া গিলে কাছের জনকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে গায়ক এবং বাজনদার সকলেই একটু নেশা করে চনমনে হয়। বাজনদাররা খোল-নালে চাঁটি মারতে থাকে। চারপাশে একটু করে গাঁয়ের লোকেরা জমতে শুরু করে।

পাড়ার কয়েকজন মহিলার সাথে রাবেয়া চ-ীম-পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার ঠিক পেছনে লালন। তাদের সামনে-পেছনে আরও অনেক মহিলা-পুরুষ। সবাই চ-ীম-পে গান শুনতে যাচ্ছে। ওরা ম-পে পৌঁছাবার আগেই প্রবল বাজনার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল।

লালন— কারা গাইবে মা?

রাবেয়া— খুব বড় বাউল-ফকিররা এসেছে। সবচেয়ে বড় ফকির হলো, সিরাজ সাঁই (পজ) আমার দেওর হয়। বাড়ি এখেনে না, নদিয়া, কিন্তুক মধ্যে মধ্যে এদিক আসে। আর এদিক পানে এলে আমার বাড়ি আসবেই আসবে।

লালন— সিরাজ সাঁই খুব বড় গায়ক?

কুলসুম— কি বলিস পাগলা! সিরাজ সাঁই এর নাম শুনিসনি?

লালন— না, খালা।

জোবেদা— নাম না শুনে ভালোই হলো, আজকে তার নাম গান সব শুনবি। দেখবি, কেমন জব্বর গায়।

ওরা কথা বলতে বলতে ম-পের কাছে খোলা মাঠে ভিড়ের মধ্যে জায়গা করে বসে পড়ে। বাজনদাররা দ্রুতলয়ে বাজনা বাজাচ্ছে। বাউল-ফকিররা সব উঠে দাঁড়িয়ে নাচছে। তাদের ভেতর একজন নাচতে নাচতে দর্শকদের দিকে একটুখানি এগিয়ে এল। তার চোখের উপর একখানা গামছা জড়ানো। ইচ্ছে করেই যেন সে নিজেকে দৃষ্টির আড়াল করেছে। তার মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। সে বাজনার তালে নাচতে নাচতে গান শুরু করল। গান—

জলের উপর পনি না পানির উপর জল

                (কোরাস) বল খোদা, বল খোদা, বল?

                আলীর উপর কালী

                না কালীর উপর আলী

                (কোরাস) বল খোদা, বল, খোদা বল?

                জমিন তলায় আসমান উপর

                না কি আসমান জমিন সব বরাবর

                (কোরাস) বল খোদা, বল খোদা, বল?

                হিঁদু-পোড়া শ্মশান আর মিয়া-র গোরস্থান

                কাহার থিকে কে ছোটো কও, কার কি অবস্থান

                (কোরাস) বল খোদা, বল খোদা, বল?

গান শেষ হওয়ার আগেই সিরাজ সাঁই নাচতে নাচতে চোখের ওপর থেকে গামছা সরিয়ে ঘোরাতে থাকে। লালন সবিস্ময়ে লক্ষ করে, তার বাড়ির কাছে দেখা সেই বাউলই সিরাজ সাঁই।

দৃশ্য : একত্রিশ

লোকেশান : গাঁয়ের চ-ীম-প

সময় : দিন/রাত

গানবাজনার অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শ্রোতাদর্শকরা যে যার মতো বাড়ির পথে ফিরতে থাকে। রাবেয়া লালনকে সঙ্গে নিয়ে সিরাজ সাঁই-এর কাছে এগিয়ে যায়।

রাবেয়া— চলেন ভাই, বাড়ি চলেন। খাওয়া-দাওয়া করবেন…

সিরাজ সাঁই— আরে ভাবিজান। আপনি কি গান শুনলেন?

রাবেয়া— আপনি ঘরের পাশে গান করবেন আর আমি শুনবো না, তা কি হয়? চলেন…

একজন বাউল এগিয়ে এসে ওদের আলোচনার মধ্যে কথা বলতে শুরু করে।

বাউল— ভাবি, সাঁইজির আজ রাতটা আমি নিয়া গেলাম। সক্কাল বেলা আপনার কাছে পাঠব। (পজ) আমরা আর একটুখানি সেবা করবো তো। (অট্টহাসি) তারপর খাওয়া-দাওয়া।

রাবেয়া— সে কি কথা কন, আমি তো রান্নাবাড়ি করে রাখছি…

বাউল— তাতে কি, সকালে সাঁইজি আসবে, আমিও আসবো, খাবো। (সে সিরাজ সাঁই-এর হাত ধরে টানতে থাকে।)

সিরাজ সাঁই— ভাবি, ঠিক আছে সকালেই আপনার বাড়ি আসবো। (পজ) এরা বন্ধু মানুষ, অনেকদিন পরে দেখা তো, আপনার বাড়ি তো আমারই বাড়ি, কাল সকালে আসবো, সারাদিন থাকবো, রাতে থাকবো, পরশু সকালে খাবো, দুপুরে খাবো, তারপর পালাবো। (হঠাৎ লালনের দিকে তার চোখ পড়লো) বাপধন, তোমারে যেন চিনি মনে কয়…

রাবেয়া— আমি ওরে নদীর জলে কুড়ায়ে পেলাম। আমার ছেলে।

সিরাজ সাঁই— তাই নাকি। কিন্তুক আমার মনে কয়, আমি ওরে নদীর জলে নয় ডাঙায় দেখেছি।

রাবেয়া— ওর কিছু মনে পড়ে না, খুব অসুখ ছিল তো, সব কিছু মন থেকে মুছে গেছে… না কি ইচ্ছে করেই ভুলতে চায়। ওর কি জাত, কি ধর্ম, কিচ্ছু জানি না।

সিরাজ সাঁই— দরকার নাই। জাত-ধর্মের দরকার কি, ওসব ইচ্ছে করে ভোলা ভালো। তা বাপ, ইচ্ছে করলে ভুলতে পারো, ভালো কথা, কিন্তুক ইচ্ছে হলে আবার মনে পড়বে না তো? তাইলে কিন্তুক সব মাটি।

লালন— (মৃদু হেসে) গাড়ি আমার বাড়ির ভারে টলমলায়

                                আমি কারে ছাইড়া কারে রাখি, এখন কি উপায়!

সিরাজ সাঁই— (খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরে) বাপধন, সময় বুঝে নিজেরে গোপন করা লাগে, আবার সময় কালে প্রকাশ করাও লাগে। আমি মুখ্যু-মানুষ, তুমারে শিখাবার মত জ্ঞান নাই। যা হারাইছো তা তুমার নয়, ভবিষৎ কালে যা হাতে পাইবা তাও তুমার নয়।

লালন— সাঁইজি, আমার তবে কোনটুকু, কতটুকু?

সিরাজ সাঁই— তুমার সবটুকুন, সারা দুনিয়া। যার কিছু নাই তার আছে সারাবিশ্ব ব্রহ্মা-। যে সবকিছু হারাইতে পারে, সেই তো সবকিছু পায়।

লালন— (কানের কাছে মুখ নিয়ে) সাঁইজি, আমার সবগেছে, সব! এবার নতুন কিছু পাওয়া লাগবে, আপনি আমারে নতুন কিছুর সন্ধান দেবেন?

সিরাজ সাঁই— দেব। আমার যা আছে তা তোমারে দেব। আমার কি আছে জানো? আমার আছে হাওয়ামহল, আরশিনগর, আয়নাগিরি, অলখ সাঁই, মনের মানুষ… তুই নিবি?

লালন— নেব।

সিরাজ সাঁই— তবে তৈরি থেকো, কাল জোছনারাতের আলোয় আলোয় আমরা হাওয়ামহল কিনতে যাবো।

দৃশ্য : বত্রিশ

লোকেশান : নদীর পাড়

সময় : রাত

জোছনারাতের আলোয় লালন এবং সিরাজ সাঁই রাবেয়ার গ্রাম ছেড়ে নদীর পাড় ধরে হেঁটে আসছেন। ওদের পেছনে রাবেয়া। সে ওদের পেছন পেছন ছায়ার মতো কয়েক পা এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়ায়, নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। লালন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পেছনে ফেরে, দাঁড়ায়, পায়ে পায়ে রাবেয়ার কাছে ফিরে যায়, তাকে জড়িয়ে ধরে সেও ফুঁপিয়ে ওঠে।

সিরাজ সাঁই আপনমনে হাসতে হাসতে একইভাবে হেঁটে চলেছেন। কয়েক মুহূর্ত পর লালন রাবেয়ার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দ্রুতপায়ে সিরাজ সাঁইকে অনুসরণ করে। রাবেয়া ওদের গমনপথের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে জল।

ওরা দুজন নদীর পাড় ধরে এগিয়ে চলেছেন। নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ সিরাজ সাঁই গুন গুন করে একটা গান বাঁধার চেষ্টা করতে লাগলেন।

                চক্ষুতে পনির ফান্দা

                দেখে সব অন্ধা অন্ধা

                চারিপাশে মায়ার ধান্ধা

                কোথা পাই খোদার বান্ধা

দৃশ্য : তেত্রিশ

লোকেশান : বাউল-ফকিরদের আখড়া

সময় : সকাল

নানান বয়সের বাউল, ফকির, ফকিরানি মিলে বেশ একটা বড় রকমের জটলা হয়েছে। লোকালয় থেকে একটু দূরে, ফাঁকা মাঠের ভেতর একটা বিশাল বটগাছের তলায় গোল হয়ে ওরা শুয়ে যে যার মতো সময় কাটাচ্ছে। কেউ কেউ একতারা, কেউ বা ডুগডুগি বাজিয়ে সুর ভাঁজছে। কয়েকজন ফকিরানি রান্নার আয়োজন করছে। তাদের সাহায্য করছে কয়েকজন বাউল। ওদের মধ্যে পুরুষ-নারী বা অন্য কোনও জাত-ধর্মে বাছবিচার নেই, ভেদাভেদ নেই।

সবাই স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং দলবদ্ধ। কিন্তু দলবদ্ধ হলেও যে যার ইচ্ছা মতো দল ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে, আবার ফিরে আসতে পারে। যে কোনও নতুন বাউল দলে ভিড়তে পারে, কারো ব্যাপারে কোনও বাধা নেই, আমন্ত্রণও নেই।

লালন এক পাশে বসে বাউল-ফকিরদের কা- দেখছে। সিরাজ সাঁই কয়েকজন বয়স্ক বাউলের সাথে চাপাকণ্ঠে কিছু আলোচনা করছেন। তখন এক বাউলানি লালনের কাছে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে হাসতে থাকে। লালন কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে তার দিকে থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। কিন্তু শারীরিক সৌন্দর্য এমন যে চোখ সরানো কঠিন। যেমন তার গায়ের রং তেমনি মুখশ্রী, তেমন তার দেহের গঠন। বাউলানি হাসতে হাসতে আর এক পা এগিয়ে বলল— ভেক না ধরলি ঠেক মেলে না। তোমার ভেক কোথা?

লালন— ভেক?

বাউলানি— ভেক জানো না! বেশ, বসন, গেরুয়া বসন গো, নতুন বাউল।

লালন— আমার ভেক নেই।

বাউলানি— দীক্ষা আছে।

লালন— দীক্ষা?

বাউলানি— তাও জানো না? বাউল-ফকির হবার জন্যি গুরু ধরা লাগে, গুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়া লাগে, দীক্ষা নেওয়া ছাড়া এসবে শিক্ষা মেলে না, শিক্ষা ছাড়া সিদ্ধি মেলে না।

লালন— আমি নতুন। কিচ্ছু আমার জানা হয়নি।

বাউলানি— এটা কি কথা কও, তুমি সিরাজ সাঁইয়ের চ্যালা, তবু কও কিচ্ছু জানা হয়নি। সাঁই তোমারে শেখায় নাই?

সিরাজ সাঁই অন্যদের সঙ্গে কথা শেষ করে বিশ্রাম নেওয়ার ভঙ্গিতে আধশোয়া অবস্থায় বাউলানির কথা শুনছিলেন।

এবার তিনি লালনের হয়ে বাউলানির প্রশ্নের জবাব দিলেন।

সিরাজ সাঁই— সিরাজ নিজেই কিছু শিখতে পারে নাই, তো অন্যেরে কি শেখাবে।

বাউলানি— ওসব তালের কথা ছাড়েন। আপনি ওরে শিষ্য করেন নাই কেন, দীক্ষা দেন নাই কেন? ওর চোখ-মুখ দেখে মনে কয়, ওর হবে।

সিরাজ সাঁই— আমি কাউকে দীক্ষা দিই না, কেই আমার শিষ্য নয়। সবাই আমার বন্ধু-সুজন, সবাই আমার মনের মানুষ। (পজ) তা মন্দাকিনি, তুই তো ওরে দীক্ষা দিতে পারিস, ওরে তোর শিষ্য করে নে।

বাউলানি— (হাসতে হাসতে) পাগল নাকি, ও আমার মনের মানুষ। ওরে আমি শিষ্য করবো কেন? ওরে আমি ‘বাবার পুকুরে’ সাঁতার কাটতি শেখাবো।

আশেপাশে যারা ছিলো তারা সবাই হেসে ওঠে। লালন কিছুটা অপ্রস্তত বোধ করে। বাউলানি ওকে হাত ধরে তুলে নেয়। লালন কি করবে বুঝতে না পেরে সিরাজ সাঁইয়ের দিকে তাকায়। সিরাজ সাঁই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ওরা দুজন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যায়। কয়েক পা এগিয়ে বাউলানি ফিরে তাকায়।

বাউলানি— সাঁইজি, আজকেই ওর দীক্ষা হয়ে যাক, দেরী করে লাভ কী?

সিরাজ সাঁই— হয়ে যাক, তা কে দীক্ষা দেবে?

বাউলানি— যে কেউ একজন দিলেই হয়। (পজ) আজ বিকেলে ওর দীক্ষা হবে, সবাই তৈরি থেকো।

দৃশ্য : চৌত্রিশ

লোকেশান : বাউল-ফকিরদের আখড়া

সময় : সন্ধ্যা

লালনকে গেরুয়া বসন পরিয়ে সাজিয়ে এনে গাছতলায় আসন পেতে বসানো হয়েছে। তার চারপাশে ঘিরে আছে বাউল, ফকির, বাউলানি ও ফকিরানিদের দল। যিনি ওকে দীক্ষা দেবন সেই বয়স্ক বাউলও প্রস্তত হয়ে ওর পাশে এসে বসলেন। বাউলদের নিয়ম অনুযায়ী দীক্ষাদান হলো। তারপর গুরু-শিষ্য দুজনে সকলের আড়ালে চলে গেলেন গুপ্ত-মন্ত্রণার জন্য। বেশ কিছুক্ষণ ধরে গুপ্ত-মন্ত্রণাদান চলে এবং তারপর দুজনেই বেরিয়ে আসেন। উপস্থিত সকলে তাদের স্বাগত জানায়। তারপর পান-ভোজন-নেশা এবং সবেশেষে গান-বাজনা শুরু হয়।

গান-বাজনা যখন খুব জমে উঠেছে, তখন সিরাজ সাঁই লালনকে ইশারা করে ভিড়ের বাইরে নিয়ে গেলেন।

সিরাজ সাঁই— আজ একটা কথা কইবো, একথা আর কোনদিন বলার দরকার হবে না। এখন থেকে তুমি বাউল, ফকির, বিবাগী। আর তোমার সংসার নেই, পূর্বজন্মের ধর্ম নেই, সংস্কার নেই, সত্যি কথা কইলে তোমার অতীত নেই। অতীতের টান থাকলি বাউল হওয়া যায় না। কথাটা মনে থাকবে?

লালন— মনে থাকবে।

সিরাজ সাঁই— আর একটা কথা। ভেক ধরলিই বাউল হয় না, তোমার চারপাশে যারা এখন নাচানাচি করতিছে ওরা কেউ বাউল ফকির নয়, ঢেমনা, লোচ্চা, ভিখারি, আলসে আর কামচোর অকম্মার দল। বাউল মানে সাধক, বাউলধর্ম মানে সাধনা, আত্মতত্ত্বের সাধনা, এই সাধনা অতি কঠিন, আবার খুবই সহজ। যে কঠিনেরে সহজ করে নিতে পারে এই ধর্ম তার।

লালন— আমারে একটু ভালো করে বুঝায়ে কবেন।

সিরাজ সাঁই— বুঝবার খুব বেশি কিছু নেই। চলতি চলতি চলার পথে বুঝে নিতি হবে। সেটাই সাধনা। তবে হ্যাঁ, দু-একখানা টোটকা দিতি পারি যেমন ধরো— রতির মাঝে যতি। এখানে মেয়ে মানুষ সহজে মেলে, তাই বলে ‘বাবার পুকুর’ নিয়ে সারাক্ষণ মজে থাকবা না। বাবার পুকুর কি তা বোঝো?

লালন— না

সিরাজ সাঁই— বাবার পুকুর মানে মেয়েদের যোনি।

লালন— ও, আচ্ছা…

সিরাজ সাঁই— দ্বিতীয় কথা, সন্তানের আকাক্সক্ষা যেন না থাকে। বাউলরা মায়ার বন্ধন ত্যাগ করেই তবে সাধক হয়। তৃতীয় কথা, গান-বাজনার ভেতর দিয়ে বাউল-ফকিররা সাধনা করে, কিন্তুক শুধু গান-বাজনা করাই লক্ষ্য নয়। গান হলো পথ, মার্গ, উপায়। গানের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। তাই গানই যেন লক্ষ্য না হয়ে যায়, এটা মাথায় রাখবা।

লালন— তার মানে, গান দিয়ে আমি নিজকে খুঁজবো, পথের সন্ধান করবো…

সিরাজ সাঁই— ঠিক। সেই কারণে ভালো গান বাঁধতি পারো বলে কারণে-অকারণে গান শুনায়ে লোক জমাবা, তা যেন না হয়। গানের ভেতর দিয়ে তোমার পরাণের কথা বলবা, সাধনার কথা বলবা। আর সবকথার মূলকথা, মানুষের কথা বলবা, মানুষের মানুষ হওয়ার কথা বলবা। মানুষ হওয়ার সাধনা ছাড়া মানুষের আর কোনও সাধনা নেই।

দৃশ্য : পঁয়ত্রিশ

লোকেশান : বিভিন্ন

সময় : বিভিন্ন

সিরাজ সাঁই এবং লালন বিভিন্ন আখড়া থেকে বিভিন্ন আখড়ায় ঘুরে বেড়ান। কখনও অন্যের গান শোনেন, কখনও নিজেরা গান করেন। তাদের আখড়া বদল হয়, জায়গা বদল হয়, সঙ্গী বদল হয়, কিন্তু তাঁরা দুজন এক সাথে থাকেন, এক সাথে চলেন, একই সাথে সাধনা করেন। কখনও নিজেদের মধ্যে তর্ক হয়, কখনও অন্য বাউলদের সাথে বাহাস হয়, সময় সময় গানের মাধ্যমে লড়াই বাঁধে। এভাবে পুরনো কবিয়ালদের গানের সাথে লালনের পরিচয় ঘটে। বিশেষ করে লালন কবিরের দোঁহার বিষয়ে খুবই উৎসাহী হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে সে কবিরের দোঁহা নিজেই গায়।

এমনি করে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়, সিরাজ এবং লালন দুজনের মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। সিরাজ অতিবৃদ্ধ আর লালন এখন প্রৌঢ়। একদিন রাতেরবেলা দুজন কথা বলতে বলতে সিরাজ সাঁই হঠাৎ লালনকে আলাদাভাবে চলার নির্দেশ দিলেন।

সিরাজ সাঁই— সময় বিশেষে বাউলদের দল বাঁধতে হয়, সময় বিশেষে আলাদা থাকতে হয়, কখনও বা নিজেই আখড়া গড়তে হয়। তোমার আখড়া গড়ার সময় হয়েছে, এখন গুরুর সাথে থাকা বা অন্যের আখড়ায় থাকা মানে নিজের ক্ষমতাকে অবহেলা করা। এবার যাও, বেরিয়ে পড়ো, নিজের আখড়া গড়ো।

লালন সিরাজ সাঁইয়ের নির্দেশ মতো সেই রাতেই একা একা বেরিয়ে পড়লেন। (ফ্ল্যাশব্যাক শেষ)

দৃশ্য : ছত্রিশ

লোকেশান : শিলাইদহ কুঠিবাড়ি

সময় : সকাল

শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে জ্যোতি ঠাকুর ও লালন ভেতরের বারান্দায় বসে আছেন। জ্যোতি ঠাকুরের ডান হাতের কাছে একটা ছোট টেবিল। টেবিলের ওপর লালনের অসমাপ্ত স্কেচ, খাতা-কলম এবং অন্যান্য টুকিটাকি জিনিস। তিনি টেবিলের ওপর থেকে একটা সিগারেটের টিন বের করে লালনের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।

লালন— এটা কি?

জ্যোতি ঠাকুর— সিগারেট। সাহেবদের বিড়ি বলতে পারেন। খান, ভালো।

লালন— (সিগারেট হাতে নিয়ে) জিনিসটা দেখতি বেশ ভালো।

জ্যোতি ঠাকুর নিজে সিগারেট ধরিয়ে আগুন এগিয়ে ধরলেন লালনের দিকে। লালন সিগারেট ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে টান দিলেন।

লালন— বাহ, মিষ্টি গন্ধ।

জ্যোতি ঠাকুর— আপনার জীবন সত্যিই গল্পের মতো আকর্ষণীয়। একবার মরে আবার বেঁচে উঠলেন বললে অত্যুক্তি হয় না। আপনি অনেক কিছু দেখেছেন, জেনেছেন বলেই আপনার ধ্যান-ধারণা এবং জীবনদর্শন অন্যদের থেকে আলাদা। (পজ) আচ্ছা, বাউলদের সম্পর্কে নানা কথা শুনি; এই যেমন ধরুন, তারা নাকি বীর্য-ঋতু¯্রাব খায়, পশুদের প্রক্রিয়ায় যৌন-সঙ্গম করে, এসব কি সত্যি?

লালন— সত্যি। কিন্তুক যারা এসব করে তারা যে সব বড় বড় বাউল কিম্বা সাধক এমন কথা সত্যি নয়। যোগীদের ভেতর যেমন হঠযোগী আছে, তান্ত্রিক আছে, কাপালিক আছে, ওরা যেমন শ্মশানে থাকে, মড়ার খুলি নিয়ে সাধনা করে, কেউ কেউ মড়ার মাংস খায়, মড়ার মাথার ঘিলু খায়, এই বাউলরাও তেমনি, ওরা মনে করে এভাবে সাধনা করলি মার্গ মিলে যাবে। কিন্তুক জামিদারবাবু, মড়ার মাথার খুলি কিম্বা ঋতু¯্রাব অথবা মলমূত্র খেয়েই যদি সিদ্ধিলাভ হতো তবে আর মানুষ সন্ধান-অনুসন্ধান করতো না, জ্ঞান-বিজ্ঞানে চর্চা করতো না।

জ্যোতি ঠাকুর— ঠিক বলেছেন। ওসব বিকৃতি। কিন্তু একটা কথা, বাউলরা বাউলানি নিয়ে থাকে, ফকিরা ফকিরানি সঙ্গে রাখে, তবুও তাদের সন্তান হয় না কেন?

লালন— তার কারণ তারা সন্তান চায় না।

জ্যোতি ঠাকুর— কিভাবে এটা সম্ভব?

লালন— আপনি বীর্য স্তম্ভনের কথা শুনেছেন নিশ্চয়?

জ্যোতি ঠাকুর— শুনেছি, তবে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে পারি না।

লালন— আপনি ছেলে মানুষ, যুবক, গৃহী, আপনার ওসব বোঝার দরকার নেই। শুধু শুনে রাখুন, ইচ্ছে করলি বীর্যের ব্যবহার, অপব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

জ্যোতি ঠাকুর— যাই বলুন, আপনাদের জগতটা সত্যিই রহস্যময়।

লালন— আমি বলি, আপনাদের জগতটাই রহস্যময়! কি করে আপনারা এতোটুকু জীবন নিয়ে তুষ্ট থাকেন? আমি তো ভাবতেই পারিনে, মানুষের জীবন এতো ছোট, এতো সামান্য গ-ীর মধ্যে ঘুরপাক খায়!

জ্যোতি ঠাকুর— যথার্থ বলছেন, আমরা সামান্য পরিধির মধ্যে ঘুরে মরি। অর্থ, মোহ, কাম, খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে আমাদের জীবন ব্যর্থ হয়ে কাঁদতে থাকে…

লালন— তাহলে দেখুন, আপনারা তা বুঝেও বোঝেন না, জেনেও জানতি চান না। এটাও কি কম রহস্যময়? আসলে কি জানেন, জীবন মানেই রহস্য। দুনিয়ার সবচেয়ে নির্বোধ, সবচেয়ে সরল শিশুর জীবনও অতি গভীর রহস্যে ঘেরা, যার কূল-কিনারা নেই। আমি মনে করি, আপনারা যারা গৃহী, আপনারা নিজেদের মতো করে আপনাদের জীবনের রহস্যের জট খুলতে চান, আর আমরা আমাদের মতো করে চাই। লক্ষ্য এক, পথ আলাদা।

জ্যোতি ঠাকুর— চমৎকার বললেন। (পজ) এবার আপনার জীবনের পরের ঘটনা শুনি, তারপর কি আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা হয়নি, স্ত্রী এবং মায়ের সাথে দেখা হয়নি?

জ্যোতি ঠাকুর লালনের অর্ধসমাপ্ত স্কেচ হাতে তুলে নিলেন। লালন দূরে তাকিয়ে যেন নিজের স্মৃতির ভেতরে পুনরায় প্রবেশ করলেন।

দৃশ্য : সাঁইত্রিশ (ফ্লাশব্যাক শুরু)

লোকেশান : প্রান্তর

সময় : অপরাহ্ণ

বিশাল প্রান্তরের ভেতর দিয়ে একা একা লালন হেঁটে আসছেন। আশেপাশে লোকালয় নেই, জনমানুষের চিহ্ন নেই। তিনি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে এদিকে ওদিকে দেখলেন। একটু দূরে একটা বিশাল শিমুল গাছ। তিনি গাছ লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন। গাছের কাছে গিয়ে দেখলেন, পাশে একটা বড় পুকুর বা জলা। জলার ওপর শেষ বিকেলের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। তিনি জলের মনোরম দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে গাছের ছায়ায় বসলেন। ক্লান্তি বশত চোখ বন্ধ করলেন এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন।

তন্দ্রার ঘোরে তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে প্রথম জীবনের সেই চন্দ্রালোকিত রাতে ঘোড়া ছোটাবার দৃশ্য। তরুণ লালন তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে, তাকে জাড়িয়ে ধরে খিল খিল করে হাসছে গোলাপি। বনের মধ্যে সন্ন্যাসী-ফকিরের দল ভয় পেয়ে দোয়া-মন্ত্র পাঠ করছে— ওঁ তৎসবিতুর বরেণ্যং ভর্গদেবস্যু… বালাগাল উলা বে কামালিহি…

সেই একই দোয়া-মন্ত্র বহুকাল পর আজ আবার যেন লালনের কানে বেজে উঠলো। তাঁর তন্দ্রা ভেঙে যায়। তিনি চোখ মেলে তাকালেন। এক তরুণ ফকির জলের পাশে দাঁড়িয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে করতে গান করছে। তার ভঙ্গি  দেখে মনে হয়, সে যেন জলের ভেতর থেকে গান টেনে আনছে! একটু খেয়াল করতেই বোঝা গেল, তরুণ ফকির মাহাকবি শেখ সাদীর বিশ্ববিখ্যাত ‘নাত বা বয়াত’ (হযরত মোহাম্মদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রশস্তি গাঁথা) গাইতে গাইতে সেই ছন্দে এবং সুরে নিজেই গান বাঁধার চেষ্টা করছে। লালন সবিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গান—

বালাগাল উলা বে কামালিহি

                কাশাফাদ দোজা বে জামালিহি

                হাসানুৎ জামিয়ূ খেসালিহি

                সাললু আলাইহে ওয়া আলিহি…

                ঝিলমিল দিল-দীঘি শূন্য, ইলাহি

                প্রেম-মীন দাও খোদা প্রেম যে নাহি

                বালাগাল উলা বে কামামলিহি

                পূর্ণ করো ওগো পূর্ণতা চাহি

                আমারে দাও খোদা প্রেম বাদশাহী

                কাশাফাদ দোজা বে জামালিহি…

তরুণ ফকির গান গাইতে হঠাৎ চুপ করে যায়। তারপর ঝটিতি লালনের দিকে ফিরে তাকায় এবং কোনও কথা না বলে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করে। লালন কয়েক মুহূর্ত বিমূঢ়ভাবে বসে থেকে তিনিও অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

দৃশ্য : আটত্রিশ

লোকেশান : ছেউড়িয়া/পথ

সময় : সকাল

যেন মায়ার টানেই লালন তাঁর অজ্ঞাতসারে ছেউড়িয়ায় ফিরে এলেন। আজন্ম চেনা গ্রাম যেন অনেক পাল্টে গেছে। তিনি চারদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে চললেন। দু-একজানের সাথে পথে দেখা হলেও তারা ওঁকে চিনতে পারছে না। তিনিও তাদের সাথে কথা বলতে আগ্রহ বোধ করছেন না। এভাবে পথের বাঁক ফিরতেই নিশিকান্তের সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো।

নিশিকান্ত হঠাৎ যেন চমকে দাঁড়ায়। তীক্ষè-চোখে তার দিকে তাকায় তারপর বিভ্রান্তভাবে প্রশ্ন করে— সাঁইজির বাড়ি কোথা?

লালন— বাউল-ফকিরের বাড়ি থাকে না।

নিশিকান্ত— না মানে কোথায় ছিলো? পূর্বাশ্রমের কথা জিগ্যেস করতিছি।

লালন— সন্নাসীদের পূর্বাশ্রমের কথা জিগ্যেস করতি নেই।

নিশিকান্ত— না, মানে, আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি…

লালন— তা দেখতি পারেন।

নিশিকান্ত— এদিকে কোথা যাওয়া হবে?

লালন— দেখি কোথা যাই।

লালন ওকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। নিশিকান্ত সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করে। তারপর কিছু একটা  ভেবে পায়ে পায়ে ওঁকে অনুসরণ করতে থাকে।

লালনকে তাঁর বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে দেখে নিশিকান্ত কেমন যেন হতচকিত হয়ে আশেপাশে তাকায়। তখন দূর থেকে যদু পাইককে আসতে দেখে সে প্রায় দৌড়ে তার কাছে গেল।

নিশিকান্ত— যদু শোন, অদ্ভুত কা-! ঠিক লালুর মতন দেখতি, এক বাউল, সে ওই বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

যদু— লালুর মতো দেখতি, কোন লালু?

নিশিকান্ত— আরে লালন, মাধব করের ব্যাটা।

যদু— তোমার মাথা ঠিক আছে? যত্তোসব আজগুবি কথা! আমরা যার সৎকার করে গঙ্গায় ভাসায়ে দেয়ে এলাম— সে কি ভূত হয়ে ফিরে এল নাকি!

নিশিকান্ত— আমিও তো তাই ভাবতিছি, চল্ দেখে আসি ব্যাপারটা কি।

যদু— চলো তবে লালনের ভূত দেখে আসি।

ওরা দুজন চাপাকন্ঠে আলোচনা করতে করতে লালনের পিছুু নেয়।

দৃশ্য : ঊনচল্লিশ

লোকেশান : লালনের বাড়ি

সময় : সকাল

গোলাপি পা দিয়ে মাটি পিষছে। মাঝে মাঝে জল ছিটিয়ে মাটি নরম করছে। তারপর ম- তৈরি হলে ভাঙাচোরা ঘরের দেয়াল সারাই করে নিপুণ হাতে লেপে দিচ্ছে। তার চেহারা মলিন, পরনে নোংরা সাদা থান, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা।

লালন নিঃশব্দে বাড়ির ভেতরে ঢুকে তাকে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। গোলাপি লালনকে খেয়াল করেনি, সে নিজের মনে কাজ করছে। তখন মাটির কলসিতে জল কাঁখে নিয়ে পদ্মাবতী পেছন দিক থেকে বাড়িতে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়।

পদ্মাবতী— সাঁইজি, আমরা গরিব মানুষ… তোমারে আমরা কি দেব, বাবা।

গোলাপি শাশুড়ির কথায় ফিরে তাকায় এবং লালনের সাথে চোখাচোখি হয়। সে যেন এক পলকের জন্য চমকে যায়, এক পা এগিয়ে আসে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আবার কাজে মন দেয়।

গোলাপি— ঘরে আছে ঘাসের দানা, কুটুম আসো খাবে খানা!

লালন কোনো কথা বললেন না, তিনি নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। গোলাপি কাজ করতে করতে আড়চোখে লালনকে লক্ষ করে। পদ্মাবতী জলের কলসি ঘরে রেখে আবার বাইরে বেরিয়ে লালনকে দেখে অপ্রস্তত বোধ করে।

পদ্মাবতী— তোমারে কি দেবো, কি খাওয়াবো, আমরা ভিখিরির অধম, এ ঘরে দেওয়ার মতো কিচ্ছু নেই… লালন তখনও একইভাবে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। গোলাপি এবার কিছুটা বিরক্ত হয়।

গোলাপি— তুমি কি কালা না হাবা! বুঝতে পারোনি, আমরা তোমারে খাওয়াতে পারবো না?

লালন হঠাৎ প্রায় ফিসফিস করে গেয়ে উঠলেন— ঢেউয়ের পরে ঢেউ উঠলে জলে, মনের পাখি বলে পালায় কি কৌশলে!

গোলাপি চমকে ফিরে তাকায়। কম্পিত পায়ে এগিয়ে এসে লালনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এ গান তো আর কারো জানার কথা নয়, শুধু সে আর তার মনের মানুষ লালু ছাড়া; এ গানের খবর কে জানবে, কেমন করে জানবে? এ গান তো তারই সৃষ্টি। গোলাপি গভীর দৃষ্টিতে লালনের দিকে কয়েকপলক তাকিয়ে থাকে, তারপর সে উম্মাদের মতো মাটিতে গড়িয়ে পড়ে ডুকরে উঠে বলে— তুমি কে, কোথায় ছিলে, কেন এলে…

পদ্মাবতী কিছু বুঝতে না পেরে ওদের কাছে এগিয়ে এলো। লালনকে ভালো করে দেখতে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে হঠাৎ নিঃশব্দে সেও গড়িয়ে পড়তে থাকে। পড়ার আগেই লালন তাকে ধরে ফেললেন। কোলে করে ঘরের বারান্দায় নিয়ে পরমযতেœ শুইয়ে দিলেন।

দৃশ্য : চল্লিশ

লোকেশান : লালনের বাড়ি

সময় : সকাল

পদ্মাবতী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। গোলাপি অজ্ঞান না হলেও অথর্বের মতো উঠোনেই বসে আছে। তার যেন ওঠার শক্তি নেই। ‘মৃত’ লালনকে দেখে তারা দুজনেই মানসিকভাবে চরম বিভ্রান্ত।

লালন মায়ের জ্ঞান ফেরাতে উঠোনের পাশ থেকে একটা ঘটিতে করে জল এনে তার মুখে জল ছেটায়। পদ্মাবতী চোখ মেলে চাপাকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন— এখন কি হবে?

লালন— আমি বেঁচে আছি, এখন আর তোমার চিন্তা নেই।

পদ্মাবতী— কেন তুই বেঁচে আছিস?

লালন— কি বলছো মা?

পদ্মাবতী— তুই মরে আমার যা ক্ষতি করিছিস বেঁচে ফিরে এসে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করলি!

লালন— তোমার কি হলো মা, কি সব কথা বলতিছো?

পদ্মাবতী— পেছন ঘুরে দ্যাখ…

লালন পেছনে ঘুরে তাকায়। রাস্তার পাশ থেকে উঠোনের সীমানা পর্যন্ত পা ফেলার জায়গা নেই। অজ¯্র মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ করছে।

কি করবে বা কি করা উচিৎ তা বুঝতে না পেরে লালন বারান্দা থেকে নিচে নেমে দাঁড়ালেন, ভিড়ের দিকে তাকালেন।

তখন ভিড়ের ভেতর থেকে নিশিকান্ত সামনে এগিয়ে এলো।

নিশিকান্ত— (কর্কশ-কণ্ঠে) তুমি কে? তোমার পরিচয় কি?

লালন— বাউল।

নিশিকান্ত— এখানে তোমার কি কাজ?

লালন— এখানে তোমার কি কাজ?

নিশিকান্ত— মানে! আমার গাঁয়ে আমি থাকবো, তার কি বাইরের লোককে কৈফিয়ত দেয়া লাগব নাকি?

লালন— আমার বাড়ি আমি আসবো, থাকবো, তার কৈফিয়ত নেয়ার তুমি কে?

নিশিকান্ত— তোমার বাড়ি!

লালন— হ্যাঁ, আমার বাড়ি। আমি লালন। যারে তোমরা জ্যান্ত পুড়িয়ে দিতি চাইছিলে, পারোনি, আধমরা অবস্থায় জলে ভাসায়ে দিছিলে, আমি সেই লালন, এখনো মরিনি।

রাঘব দত্ত— মিথ্যে কথা। লালুরে আমরা সৎকার করেই তবে ফিরে আসি। তুমি লালন নও, অন্য কেউ। (পজ) সত্যি কথা কও তো তোমার উদ্দেশ্য কি?

লালন— তোমরা কারো সৎকার করোনি, বসন্তরুগী বলে জ্যান্ত অবস্থায় আমারে ফেলে পালায়ে এয়েছিলে।

নিশিকান্ত— এই তোরা এই বদমায়েশ জালিয়াতরে ধরে পেটা, পেটায়ে আধমরা কর। আমরা এতগুলোন মানুষ মিথ্যে বলিছি আর উনি একা সত্যি কথা কইছে। ব্যাটা জোচ্চোর! এতকাল কোথায় ছিলে?

লালন— বাউলদের আখড়ায়। তোমরা আমারে জলে ভাসায়ে দেয়ার পর এক মোসলমান জোলাবউ আমারে নিজির ছেলের মতো সেবাযতœ করে বাঁচায়ে তুলেছিলো। তার বাড়িতে ছিলাম। সেখানে বাউল গুরু সিরাজ সাঁইয়ের দেখা পাই। তার সাথে দ্যাশ-বিদ্যাশ ঘুরি…

রাঘব দত্ত— তা যদি সত্যি হয়, তবে তো তোর জাত গেছে। তুই মোসলমানের অন্ন খাইছিস। তোর সাথে আর হিঁদুর ঘরের কি সম্পর্ক?

লালন চরম বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকান। গোলাপির দিকে তাকান। নিজের মনে কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে কিছু একটা সিদ্ধান্ত করলেন।

লালন— মা, আমি তোমাদের নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো, চলো, তৈরি হও।

পদ্মাবতী— বাবা, আমি বুড়ো মানুষ, এ দ্যাশ গাঁও ছেড়ে কোথা যাই… এ আমার বাপের গাঁও, সোয়ামির গাঁও, আমি…

লালন— তবে তুমি যাবা না?

পদ্মাবতী— আমার তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকিছে, আমি আর কুথাও যাতি চাইনে।

লালন গোলাপির কাছে এগিয়ে গেলেন। তার কাছে যেতেই সে উঠে দাঁড়ায়, মুখ নিচু করে।

লালন— বউ, আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। এতদিন পারিনি, এবার আমি তোমার দায়িত্ব নিতি চাই। (পজ) পরিষ্কার কথা কও, তুমি আমার সাথে যাবা?

গোলাপি— যাবো।

ভিড়ের ভেতর গুঞ্জন ওঠে। তখন পদ্মাবতী শান্তভাবে ওদের কাছে এগিয়ে আসে।

পদ্মাবতী— বউ, হিঁদুর ঘরের বউদের জাত-ধম্মই সব। যার জাত গেল, তার সব গেল। ও মোসলমানের অন্ন খাইছে, ওর জাত গেছে। ভেবে-চিন্তে কথা কও।

লালন— মায়ের কথা মা কইছে, তুমি আমার বউ, আমি তোমারে আমার কাছে নিয়ে যাতি চাই, এটা আমার কর্তব্য। যে দেশে জাত-ধম্ম নেই, তেমন দ্যাশে নতুন ঘর বাঁধব, চলো।

গোলাপি মাথা উঁচু করে চারপাশে তাকায়। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তার সিদ্ধান্ত জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব।

গোলাপি— (ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে) তোমার সাথে আমার এ জীবনে হলো না গো, হলো না!

গোলাপি ছুটে ঘরের পেছনে দিকে চলে যায়। লালন কয়েক মুহূর্ত বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তারপর ক্লান্ত পদক্ষেপে ভিড় কাটিয়ে পথে নামেন।

দৃশ্য : একচল্লিশ

লোকেশান : পথ

সময় : প্রদোষকাল

গ্রাম ছাড়িয়ে লালন জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে গান গাইছেন। গান—

                এই দেশেতে এই সুখ হলো আবার কেথায় যাই না জানি