67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

নি য় মি ত বি ভা গ

অনুবাদ

চারটি অনুবাদ কবিতা
মাহবুব অনিন্দ্য

জোসেফ ব্রডস্কি

[ইয়োসেফ আলেকজান্দ্রায়োভিচ ব্রডস্কি নিজের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে নিপীড়নের শিকার হলেও পশ্চিমা সাহিত্যসমাজ তাকে উৎকৃষ্ট কবির স্বীকৃতি দিয়েছিল। লেখালেখির শুরু থেকেই তার কবিতা ছিল বিদ্রুপ, হাস্যরস ও স্বাধীন-সত্তার প্রকাশ। তার লেখা সোভিয়েত কর্তৃপক্ষকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। এছাড়া ইহুদি হওয়ার কারণেও নিগৃহিত হন তিনি। প্যারাসাইট আখ্যা দিয়ে তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়। সেই বিচারের নথি পাচার করে পশ্চিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ব্রডস্কি। তদন্তকারীদের প্রশ্নে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে উত্তর দেন, আদর্শের কথা বলেন।

ব্রডস্কিকে সোভিয়েতের একটি মানসিক হাসপাতালে বন্দী করে রাখা হয়। অরখানগেল্কস নামে আর্কটিক লেবার ক্যাম্পেও পাঁচ বছর থাকতে হয় তাকে। পরে ইউরোপ ও আমেরিকার সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের ক্ষোভের মুখে মুক্তি পেলেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ১৯৭২ সালে আমেরিকার মিশিগানে আশ্রয় পান ব্রডস্কি এবং ডব্লিউ. এইচ. অডেনের সহযোগিতায় অ্যান আর্বারে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে থিতু হন। এখানে তিনি পান পোয়েট-ইন-রেসিডেন্সের সম্মান। এরপরে তিনি নিউইয়র্কের কুইন্স কলেজ ও ম্যাসাচুসেটসের মাউন্ট হোলিওক কলেজসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। ব্রডস্কি লিখতেন মূলত রুশ ভাষায় এবং নিজের লেখা অনুবাদ করতেন ইংরেজিতে। লেখার বিষয়বস্তু ছিল নির্বাসন ও ফেলে আসা জীবন। পশ্চিমা সমাজে তার পরিচিতি জোসেফ ব্রডস্কি নামে।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। ১৯৪০ সালের ২৪ মে সোভিয়েত রাশিয়ার লেনিনগ্রাদে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, মৃত্যু ১৯৯৫ সালে নিউইয়র্কে। আ পার্ট অব স্পিচ (১৯৭৭), টু ইউরানিয়া (১৯৮৮), সো ফোর্থ (১৯৯৬) ও নেটিভিটি পোয়েমস (২০০১) তার উল্লেখযোগ্য কবিতাকর্ম।]

১লা জানুয়ারি ১৯৬৫

বুজুর্গ লোকের সামনে নিজের নাম ভুলে যাই

মাথার ওপর জ্বলে না আর কোনো নক্ষত্র

ঝড়ের সুউচ্চ গর্জনকেও মনে হতে থাকে

নরম আর মিহিন কোনো সুরের মতো।

ক্লান্ত চোখ থেকে ছায়া নেমে আসে

বিধ্বস্ত মোমের পাশে নিঃসঙ্গতা গুমরে মরে

এখানে পঞ্জিকা ধরে নেমে আসে রাত

যতক্ষণ-না মোমের মহিমা ফুরায়।

কারা নিয়ে আসে বিষাদের চাবি?

এই সুর আমার দীর্ঘকালের চেনা

আবার একই আওয়াজ হচ্ছে, হোক—

এই সুর বাজতে থাকুক আজ রাত থেকে

আমার মৃত্যুর মুহূর্তগুলোতেও।

যেন চোখ ও ঠোঁটের মহত্ত্ব ফুটে ওঠে।

এভাবে কখনো আকাশে পৌঁছে যায়

আমাদের সকল গান ও গরিমা।

আমার পা থেকে মোজা আলগা হয়ে যায়

এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া কী হতে পারে!

এই বয়সে সেইন্ট নিকোলাসও আমার

ওপর আস্থা রাখতেন না কিছুতে;

অসাধারণ কিছু করার উপযুক্ত সময় এখন নয়

তবু হঠাৎ স্বর্গীয় আলোর দিকে

চোখ তুলে বুঝতে পারি এই জীবন

আসলে এক পরিপূর্ণ আশীর্বাদ।

মেরি অলিভার

[মেরি অলিভারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লেভল্যান্ডে, ম্যাপল হাইটসে। জায়গাটি ছিল আধা-গ্রামীণ। তার বাবা এডওয়ার্ড উইলিয়াম ছিলেন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক এবং ক্লেভল্যান্ড পাবলিক স্কুলের অ্যাথলেটিক-প্রশিক্ষক। ছোটবেলায় মেরি বাড়ির বাইরে প্রচুর সময় কাটাতেন, পছন্দ করতেন হাঁটতে ও পড়তে। ১৯৯২ সালে ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মেরি তার ক্লেভল্যান্ডের জীবন সম্পর্কে বলেন, ‘এটি ছিল প্রায় চারণভূমির মতো, খুবই সুন্দর একটি এলাকা। কেন জানি না এর প্রতি একটা টান অনুভব করতাম, এই সংযোগ ছিল একেবারে প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে, সামাজিকতার সঙ্গে নয়। ক্লেভল্যান্ড ছিল আমার কাছে পরিবারের বাইরে আরেকটা পরিবার।’

১৪ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন মেরি। ম্যাপল হাইটস হাইস্কুল থেকে গ্রাজুয়েশন করেন, পরে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ভাসার কলেজে পড়ালেখা করেন কিন্তু কোনো একাডেমিক ডিগ্রি নেননি।

২০১২ সালে তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, ২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। নাইট ট্রাভেলার্স (১৯৭৮), স্লিপিং ইন দ্য ফরেস্ট (১৯৭৮), টুয়েলভ মুনস (১৯৭৯), হাউজ অব লাইট (১৯৯০), দ্য ল্যান্ড অ্যান্ড দ্য ক্লাউড (২০০০), ডগ সংস (২০১৩) তার উল্লেখযোগ্য কবিতাকর্ম।]

স্বপ্নের বাড়ি

এই পৃথিবী যতটা কিনতে বলে তাতে করে

অবিশ্বাস্যরকমের অনেককিছু আমাদের প্রয়োজন।

আমার এত জামাকাপড়, বাতি, প্লেট ও পেপারক্লিপ

আছে এবং প্রয়োজনের চেয়ে এতটাই বেশি আছে

যে, মরে যাবার আগে এগুলো শেষ করা সম্ভব নয়

আমি তো সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে থাকতে চাই

কোনো কাঠ, প্লাস্টিক বা ফাইবার আমার চাই না

মন চায়, একদিন চলে যাই এতসব বিকিকিনির

জায়গা ছেড়ে দূরে কোথাও; সুন্দর ধরণীকে

বুকে নিয়ে, একা…

জিওভান্নি বিয়াঙ্কোনি

[জিওভান্নি বিয়াঙ্কোনি একজন সুইস-ইতালীয় কবি, শিল্পী ও নৃতাত্ত্বিক। তার জন্ম ১৮৯১ সালের ২২ মার্চ। জন্মস্থান সুইজারল্যান্ডের তিসিনো ক্যান্টনের অন্তর্গত লোকার্নো ডিস্ট্রিক্টের মিনোসিওতে। ইনি খ্যাতিমান লেখক পিয়েরো বিয়াঙ্কোনির বড়ভাই। বাবা-মায়ের নাম যথাক্রমে আলেহান্দ্রো ও মার্গারিতা রাসকোনি। পূর্ব সুইজারল্যান্ডের সান গল শহরের বিশ্ববিদ্যালয় ও জার্মানির স্টুটগার্ডের স্টেট একাডেমি অব ফাইন আর্টস থেকে জিওভান্নি বিয়াঙ্কোনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালের ০৭ মার্চ মিনোসিওতেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য বইপত্রের মধ্যে আছে ভাল্ ভার্জাসা (১৯৬৬), তিসিনো রুরালে (১৯৭১), তুতে লে পোয়েজি (১৯৭২), লেগ্নি আ ভার্সি (১৯৭৮) ইত্যাদি।]

বিশ্রামাগার

কতক বৃৃদ্ধ মানুষ দেয়ালে হেলান দিয়ে

রোদের মধ্যে বসে আছে, বেঞ্চিতে।

তাদের ধূসর চুল, ময়লা জামাকাপড় আর

মুখে দারিদ্রের ছাপ, করুণ দৃৃষ্টিতে ওরা দেখছে

মেইন রোডের ব্যস্ত জীবন আর ট্রেনের আসা-যাওয়া

এই ধূলিমলিন ও পরাস্ত বৃদ্ধদের তাকানোর ভঙ্গি

দেখে মনে হয় অচল লাইনের ওপরে গতিহীন

পড়ে আছে কিছু রেল ইঞ্জিন।

ফারজানে খোজান্দি

[ফারজানে খোজান্দি বর্তমানে পারস্য (ফারসি ও তাজিক) অঞ্চলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তার জন্ম তাজিকিস্তানের খোজান্দ প্রদেশে, ১৯৬৪ সালে। আফগানিস্তান ও ইরানে তার বিপুল অনুরাগী রয়েছে এবং এই অঞ্চলের জীবিত লেখকদের মধ্যে তাকে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার প্রচুর আনন্দদায়ী ও কৌতুকপূর্ণ কবিতা পারস্য সাহিত্যের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। ফারজানে খোজান্দির কবিতা একইসাথে লিরিক্যাল ও রোমান্টিক ন্যারেটিভ ধারার। আনএন্ডিং সিগ (২০০৭), ফারজানে খোজান্দি পোয়েমস (২০০৮) তার উল্লেখযোগ্য কবিতার কাজ।]

বংশীবাদক

আসল বাজারটা কোথায়?

আমি চোখভর্তি করুণা কিনতে চাই

আমার আত্মাকে ঢাকতে চাই অতিরঞ্জনে

এক ব্যবসায়ী আমাকে আকাক্সক্ষার শহর

থেকে এনে দেন বিস্তৃত ঠোঁটের রঙ

কিন্তু খোজান্দের বাজারে মানুষের মুখগুলো

কেমন টক, কথাগুলো গরম আর আমি

তাবরিজের সুন্দর মিষ্টির জন্য অপেক্ষা করি

কোথায় সেই আসল বাজার?

বংশীবাদক আমাকে বলেন:

তোমার ঠাট্টা-তামাশা সয়ে আসা কান

নিয়ে চলে এসো আর শোনো আলো

কীরকম প্রার্থনা করছে অন্ধকারের কাছে

অল্পবিস্তর লজ্জা পেয়ে আসা তোমার চোখ

খুলে দ্যাখো সত্যের কেমন আলো।

আসল বাজারটা কোথায়?

ওখানে বংশীবাদক থাকেন

আর তার পুরোনো কাপড়ের টুপি

আমাকে আকর্ষণ করে।

ওই টুপিতে কোনো মুক্তার দানা নেই

আমি অশ্রুফোঁটার ভেতর দামি জহরত—

আমাকে যেতেই হবে তার কাছে।

************************************************

বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে চিহ্নের আলাপচারিতা

১৬ জানুয়ারি ২০১৯ ঢাকায় মিরপুরের রূপনগর আবাসনে কথা হয় বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে। গল্পকার পাভেল চৌধুরী, চিহ্নকর্মী নিখিলেশ রনি ও চিহ্নসম্পাদক শহীদ ইকবাল এই আলাপের সূত্রপাত করেন। তারপর প্রশ্নোত্তরের ভেতর দিয়ে চলে আড্ডার— অনেকটা সময়। সে আলাপের সম্পাদিত অংশ পাঠকদের জন্য মুদ্রিত হলো।

চিহ্ন : এখন যেটা শুনি, চায়নাতে যেটা হয়, ওরা তো পড়াশুনা— সবকিছু ৎবমঁষধঃব করে, সব নিয়ন্ত্রণ করে এবং সব রেকর্ডও হয়ে যায় নাকি! আপনি যদি একটা বই কেনেন, কী জাতীয় বই আপনি কিনছেন— সেটাও নাকি তারা রেকর্ড করে! তাহলে— এ অবস্থা তো আরো ভয়ংকর!

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। সে তো ভয়ংকর! ওটা তো সোস্যালিজম না। ওটা সোস্যালিজমের ঘাড়ে চড়া এ সমস্ত কিছু। ক্রুশ্চেভ(Khrushchev) [Nikita Sergeyevich Khrushchev (1894-1971)] যে সোস্যালিজমের ঘাড়ে চড়েছিল তারপর থেকে তো নামানো যায়নি তাঁকে!

চিহ্ন : যা হোক, আপনি তো সংস্কৃতি নামে একটা পত্রিকা করেন— এখনও সেটা চলছে, পঁয়তাল্লিশ বছর হচ্ছে। তো আপনার পত্রিকা করার অভিজ্ঞতাটা স্যর কেমন? আপনি না-থাকলে এটা কি চলবে আদৌও কিংবা আপনার পরে যারা আসবেন তারা কি চালাবে এটা? কিংবা সংস্কৃতির যে কোয়ালিটি-গুণ-মান— এটাতে তো কোনো বিজ্ঞাপন নেই; সব তাত্ত্বিক লেখালেখি। এসব লেখালেখিও তো আজকাল তেমন একটা হচ্ছে না— আর লিখবেই বা কারা? লেখার তো বেশ সংকট ! আমাদের জিজ্ঞাসা আসলে— এখন লেখার সংকট, না পাঠকের সংকট, না পত্রিকা করার জন্য যে মানসিকতা সেটার সংকট? নাকি আসলে কোনো সংকট নেই?

বদরুদ্দীন উমর : পত্রিকার তো এখানে কমতি নেই, পত্রিকা তো অনেক দেখি! সংস্কৃতি যখন বের করেছিলাম, তখন আমরা পরিষ্কার বলেছিলাম যে, এখানে আমরা কিছু তাত্ত্বিক আলোচনা করতে চাই। এখানে রাজনৈতিকভাবে ’৭১ সালের পরে ’৭২ সালের ডিজাস্টারের পর সেখানে আমি পার্টিতে যে কাজ করতাম, সে পার্টিতে তাদের লাইনের কারণে ডিসেম্বরেই ইস্তাফা দিয়েছিলাম। তারপরে তখন কিছু বক্তব্য জনগণের কাছে, কর্মীদের কাছে উপস্থিত করার দরকার ছিল বলে মনে করেছিলাম। সেটা তো একটা পত্রিকা ছাড়া সম্ভব না! সেই জন্যেই সংস্কৃতি বের করা হয়েছিল তখন। সংস্কৃতি যখন বের করেছিলাম, তখন আমরা সাড়ে বারশ কপি, না কত কপি ছাপতাম। তখন আমি কোনো সংগঠনের সাথে আর জড়িত থাকিনি। সংস্কৃতিতে কোনো বিজ্ঞাপনও ছাপত না। সংস্কৃতি যা বিক্রি হতো এবং মোটামুটি চলে যেত। কিন্তু পরের দিকে যখন সংস্কৃতি বন্ধ হলো, তখন বোধহয় দুই-তিন হাজার টাকা ধার ছিল। তাছাড়া সংস্কৃতি মোটামুটি চলে এসেছে। সংস্কৃতির ৮ সংখ্যার পর ’৭৪ সালের ডিসেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান সমস্ত পত্র-পত্রিকা ব্যান্ড করে দিল, তখন সংস্কৃতিও বন্ধ হয়ে গেল। তারপর সংস্কৃতি আমরা বের করেছিলাম দ্বিতীয় পর্যায়ে বোধহয় ১৯৮০ সালে মাসিক পত্রিকা হিসেবে। এবং মাসিক পত্রিকা হলেও প্রথম প্রথম মাসেই বের হত, পরে দেখা যাচ্ছে মাসিক পত্রিকা হিসাবে বের হচ্ছে না। দুই-তিন সংখ্যা এক সঙ্গে বের হচ্ছে। এভাবে করতে করতে একটা পর্যায়ে এসে বন্ধই হয়ে গেল! তারপরে প্রায় নব্বুয়ের কাছাকাছি এসে আবার আমরা সংস্কৃতি বের করলাম। এরকম কয়েক পর্যায়ে সংস্কৃতি বেরিয়েছে। মধ্যে মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু চলেছে আর কি। তবে এখন আমরা ’১৬ সালের মে মাস থেকে পত্রিকাটা বের করছি— এটা বলা চলে প্রায় নিয়মিতভাবে প্রত্যেক মাসেই বের হচ্ছে। এবং এখানে কোনো বিজ্ঞাপন নাই। একটাই বিজ্ঞাপন এখন পাওয়া যায় মাত্র আর কোনো বিজ্ঞাপন সেই কিছুদিন হতে পাওয়া যাওয়া, আগে পাওয়া যাওয়া নেই। তো এই বিজ্ঞাপন সামান্য পাওয়া যায়, অতি সামান্য। এটা বিক্রি হয়, বিক্রি থেকে যেটা হয়, সেটাতে আমাদের চলে যায়, আমাদের কোনো ঘাটতি হয় না। তার কারণ আগে এই পর্যায়ে সংস্কৃতি বের করার আগে সংগঠনের মধ্যে বিক্রি করেও পয়সা ঠিক পাওয়া যেত না। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে আমি খুব কড়া হাতে জিনিসটা নিয়েছি এবং এমনভাবে এইটা চালানো হয়, যাতে সংগঠনের মধ্যেই এটা মূলত বিক্রি হয়, সংগঠনের লোকেরাই মূলত বিক্রি করে এবং এই টাকা আমাদের হাতে আসে। রিয়ালাইজেশন বলা চলে খুব ভালো। তার ফলে আমাদের খরচ-টরচ উঠে যায় আর একটা জিনিস হয় যে, এখানে কোনো স্টাব্লিশমেন্ট কস্ট নাই। এখানে লেখকদেরকে কোনো টাকা দিতে পারা যায় না। এইসব জিনিস আছে বলে সংস্কৃতি চলে। যদি লেখকদেরকে টাকা দিতে হতো— এখানে যদি তার একটা আলাদা স্টাব্লিশমেন্ট থাকত, তাহলে তো এই পত্রিকা বের করা কিছুতেই সম্ভব হতো না।

চিহ্ন : এ পত্রিকার লেখক মূলত কারা?

বদরুদ্দীন উমর : লেখক মূলত— যারা রাজনৈতিক ব্যক্তি তারাই। তার বাইরেও কিছু লোক থাকে কখনো কখনো, কিন্তু বেশিরভাগই তো লেখকের একটা সংকট এখানে আছে।

চিহ্ন : তো সংস্কৃতি কী স্যর আপনার ড্রিমটাকে ধরতে পারছে? আপনি যে চিন্তাটা করেন, দেশ-জাতি-রাষ্ট্র নিয়ে— সেটা কী সংস্কৃতি বহন করতে পারছে? মানে অনেকদিন ধরেই তো চলছে…

বদরুদ্দীন উমর : সংস্কৃতি তো আমরা চালাই। কাজেই আমরা গ্রহণ করবো না কেন? আমাদের পত্রিকা, আমরা যদি সেটা গ্রহণ না-করি, তাহলে চলবে কি করে।

চিহ্ন : আরেকটি স্যর যেটি বিষয় আমরা তো ছাত্রজীবন থেকেই একটা বই সব সময়ই পড়ি— পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি। তিন খ-ে বেরিয়েছে, তো এইটা স্যর আপনি যখন লিখতে শুরু করেন কিংবা লেখার জায়গাটা কী রকম?

বদরুদ্দীন উমর : ভাষা আন্দোলনের বই আমি তো আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা করে লিখতে আরম্ভ করিনি। আমাদেরই এক আত্মীয়, আমার চেয়ে অনেক ছোট— আমাকে বলল যে, আপনি ভাষা আন্দোলনের ওপরে একটা বই লেখেন। আমি তখন এমনি কাজ করছিলাম— এটা ছিল ১৯৬৪-৬৫ সাল হবে মনে হয়। আমি তখন পূর্বপাকিস্তানের যে রাজনৈতিক ইতিহাস— এইটার সমসাময়িক ইতিহাসের ওপরে কিছু লিখব বলে ভেবেছিলাম এবং আমি কিছু তথ্যও সংগ্রহ করছিলাম সেই সময়ে। আমাকে তখন সে বলল যে, এরকম আপনি ভাষা আন্দোলনের ওপরে একটা আলাদা লেখা লেখেন না ক্যান। তখন আমি ঠিক করলাম যে, হ্যাঁ ঠিক আছে ভাষা আন্দোলনের ওপরে একটা লিখব। ভাষা আন্দোলনের ওপরে লিখতে গেলে  তো পূর্বপাকিস্তানের ইতিহাসের ওপরেও লেখা হয়। আমি যখন প্রথম চিন্তা করলাম, তখন মনে করেছিলাম, হয়তো শতখানেক পৃষ্ঠার একটা বই হবে আর কি। তারপরে যখন কাজ করতে শুরু করি, তখন আমি দেখলাম যে, না, ভাষা আন্দোলনকে যেভাবে স্বাতন্ত্র্য হিসেবে রাজনৈতিক মহলে বর্ণনা করা হয়— একটা ছাত্র আন্দোলন হিসাবে, এটা মোটেই একটা ছাত্র আন্দোলন ছিল না। প্রথম দিকে ৪৮ সালে ছাত্ররা— ছাত্র-বুদ্ধিজীবীরা প্রথম আন্দোলনটার একটা সূত্রপাত করেছিল ঠিক-ই এবং ১৯৫২ সালে এসে সেই আন্দোলন তো বাংলাদেশে— সেটা ধরো যে, এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা স্বাধীকার আন্দোলনের একটা অংশ হিসাবে এখানে দেখা দিল। তো এই যে লেখার কাজ, এইটা শুরু করার পর দেখা গেল যে, এটার শুধু ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবেই দেখার কোনো প্রশ্ন নেই। বিশেষত বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারির যে ঘটনা ঘটেছিল এবং তারপর সারা দেশময় যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, একটা অভ্যুত্থানের মত হয়েছিল— এইটা আমাকে আমাকে এটা ভিন্ন চিন্তার দিকে ঠেলে দেয় এবং ভেবেছিলাম যে, এটার একটা ব্যাখ্যা থাকা দরকার। যেমন ৪৮ সালে যখন আন্দোলন হয়, তখন ঢাকা শহরের পুরনো বাসিন্দারা এটাতে বিরোধী ছিল। তারা ছাত্রদের দিকে তেড়ে আসতো, মার দিতো। অথচ বায়ান্ন সালে দেখা যায় যে, ছাত্ররা আন্দোলনটা আরম্ভ করলেও ঢাকারা স্থানীয় ব্যক্তিরাই মূল আন্দোলনটা করেছিল অনেক, ব্যাপকভাবে সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল, এমনকি গ্রামাঞ্চলেরও। খুলনার একটা গ্রাম— ওইটার নাম আমি ভুলে যাচ্ছি এখন, সেই গ্রামে (মোরেলগঞ্জে) তখন রিলিফের কাজ হচ্ছিল, টেস্ট রিলিফ-এর উদ্দেশ্যে দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকদেরকে মাটি কাটার কাজ দিয়েছিল, সেই শ্রমিকরা— মাটিকাটা শ্রমিকরা পর্যন্ত ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপরে গুলি হয়েছে শুনে এবং কয়েকজন ছাত্র নিহত হয়েছে শুনে তারা ওখানে সেই কাজ বাদ দিয়েছিল সেদিন। এটাকে কর্মবিরতি বা ধর্মঘট যা-ই বলেন— তো এই যে একটা ডিফেরেন্স, এই ডিফেরেন্সটা ৪৮ সাল থেকে ৫২ সালের মধ্যে। এইটা কি কারণে হলো? আমার চিন্তা হলো। সেটা দেখা দরকার মনে করলাম। আমি সেটা দেখতে গিয়ে যে সমস্ত তথ্য পেলাম বা যে সমস্ত বিষয়ে আমি ঘাটাঘাটি করলাম, তার থেকে দেখলাম যে, না, এই বইটার স্কোপ অনেক বেশি, এটার রেঞ্জ অনেক বেশি। এবং এটা ঠিকমতোভাবে উপস্থাপিত করতে গেলে ছোটখাটর মধ্যে করতে যাওয়া ঠিক হবে না। যদিও পরবর্তীকালে ছোট করতে বলাতে ছোটদের জন্য আমি আশির দিকে লিখেছিলাম আমাদের ভাষার লড়াই। সেটা তো একটা বাচ্চাদের জন্য বা ছোটদের জন্য বলেছিল বলে লিখেছিলাম। আসল কাজটা করতে গেলে অত সহজে হবে না।

চিহ্ন : হুমায়ুন আজাদ তাঁর একটা ইন্টারভিউ-এ বলেছিলেন যে, ভাষা আন্দোলন নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের বইটা তো আসলে একটা ‘উপন্যাসে’র মত।

বদরুদ্দীন উমর : উপন্যাসের মত তো অনেক কিছুই হয়। আত্মজীবনীও তো একটা উপন্যাস।

চিহ্ন : হ্যাঁ। উপন্যাসের মত মানে, উনি পজেটিভ অর্থেই বলেছেন।

বদরুদ্দীন উমর : উপন্যাসে মত মানে হচ্ছে যে, এটা খুব তাড়িয়ে নিয়ে যায়, টেনে নিয়ে যায়।

চিহ্ন : একটা ইন্টেনসিভ দলিল সমাজের এবং আমাদের বাঙালি…

বদরুদ্দীন উমর : এখন যে থিয়োরিটিক্যালি খুবই ইকুইপ্ট তার কাছে মার্কসের ক্যাপিটাল একটা উপন্যাসের মত মনে হবে। আসলে বুঝতে হবে, যদি বুঝতে পারে, তাহলে সেটা যে কোনো বই-ই আসলে মানুষকে টানে। উপন্যাসের কথা বলা হয় এ জন্যই যে, গল্প টেনে যায়— সেজন্যে গল্প-উপন্যাসের কথা বলা হয়। প্রত্যেকটা বিষয়ই যদি কারো ইন্টারেস্ট থাকে, তাহলে সেই ইন্টারেস্টের ওপরে যে বই, সেটা তাকে ঠিক টেনে নিয়ে যাবে এবং সেটা বলতে পারেন যে, এটা একটা উপন্যাসের মত। যেমন এক জাপানি প্রফেসর আমার আত্মজীবনীটা পড়েছেন চার খ-ে বাংলাতেই। আব্বা (আবুল হাশিম)’র ওপর তিনি একটা বই লিখেছেন, দিল্লি থেকে বেরিয়েছে। আমার বইটাও তিনি বাংলাতেই পড়েছেন। পড়ে বইটার মধ্যেই তিনি লিখেছেন যে, এ আত্মজীবনীটা আসলে হচ্ছে—It should be ranged as a long novel. যাই হোক ভাষা আন্দোলনে ঘুরে যাই আর কি…

চিহ্ন : স্যর আপনার বাবার কোনো স্মৃতি আমরা একটু জানতে চাচ্ছি…।

বদরুদ্দীন উমর : আপনি এখানে ডাইভারশন করবেন না। তার কারণ এখানে ভাষা আন্দোলনের ওপর কথা হচ্ছে। পরে ওটা জিজ্ঞেস করবেন। তো যেটা হচ্ছে যে, এইটা লিখতে গিয়ে একটা জিনিস আমি খুব লক্ষ করলাম যে, তখন বাংলাদেশে খাদ্যাভাব দেখা গিয়েছিল ৪৭ সাল থেকেই। আমার দ্বিতীয় খ-ে এই কৃষকদের অবস্থার ওপরে— খাদ্যাভাব ইত্যাদি নিয়ে তিনশো পৃষ্টা লিখেছি। তো প্রথম খ- যখন লিখি, তখন মনে করেছিলাম একশো পৃষ্ঠা হবে। শেষে দেখলাম সেটা চারশো মত ভলিয়ম হলো, তখন তার ভূমিকাতে আমি লিখেছিলাম, এটাতো শেষ হলো না, আরেকটা খ- লিখতে হবে। কিন্তু তারপরেও দেখলাম যে দুই খ-েও শেষ হয় না সেটা। পরে সেটা তিন খ- করতে হলো। দুই খ-ে শেষ হয় না মানে— দুই খ-ের কাজ করতে গিয়ে যেটা দেখলাম, সেখানে কৃষকদের অবস্থার ওপরে যদি না লিখি, তাহলে কিন্তু এই কাজ মোটেই ঠিক হবে না। কারণ, ব্যাপকভাবে যে বাংলাদেশে— তখন পূর্বপাকিস্তানে অর্থাৎ পূর্ববাংলায় যে আন্দোলন হয়েছিল, এইটা হতে পারত না, যদি খাদ্যাভাবটা না-হতো। খাদ্যাভাবই মুসলিম লীগকে কিন্তু শেষ করেছিল। জনগণ আশা করেছিল, তারা খাওয়া-পরা পাবে, ছেলে-পেলের শিক্ষার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু পায়নি! কাজেই ব্যাপকভাবে জনগণের মধ্যে একটা হতাশা তৈরি হয়েছিল এবং যে জন্যে ঊনপঞ্চাশ সালে দেখা গেল যে, মুসলিম লীগ টাঙ্গাইলের ইলেকশনে শামসুল হকের কাছে হেরে গেছে! এটা তো অনেক আগেই— ভাষা আন্দোলনের অনেক আগেই এই অবস্থা হয়েছিল মুসলিম লীগের! খুবই আশ্চর্যের কথা, মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যেই এ অবস্থা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তো সেইখানে আমি দেখলাম যে, দুর্ভিক্ষের যে একটা অবস্থা— (দুর্ভিক্ষের অবস্থার ওপরেও একটা চ্যাপটার আছে আমার সেইখানে) এত ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল— বিশেষত রংপুরে-খুলনায়। খুলনার ওপরে অনেক বিস্তারিত বিবরণ আছে এখানে, অন্য জায়গায় সিলেটের— তো এইটা সমস্ত পরিস্থিতিকে খুব বড় রকমভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনগণকে বিক্ষুদ্ধ করেছিল। এই সমস্তরই বহিঃপ্রকাশ ভাষা আন্দোলনের মধ্যে ঘটেছিল। তা না-হলে কটা ছাত্র মেরে দিল, গুলি করল— আরো ঘটনা ঘটেছে তেমন কিছু তো হয়নি! সে তো জেলের মধ্যে খাপরা ওয়ার্ডে আনোয়ারকে গুলি করেছিল। তো এই হত্যাকা-ের পরে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল, এটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি দেখলাম যে, এইটার রেঞ্জ খুব বেশি। যদিও সময়ের রেঞ্জটা কম, কিন্তু এর আদল-আসল কন্টেন্টের দিক থেকে এটার রেঞ্জ খুব বেশি। সেই ভাবেই করতে গিয়ে আমার এটা তিন খ- হলো।

চিহ্ন : তো আসলে আমাদের  স্যর— আজকের যে রাজনৈতিক অবস্থা এবং সেখানে বায়ান্ন-আটান্ন…

বদরুদ্দীন উমর : সেখানে আরেকটা জিনিস বলে রাখি— এটা দুর্ভিক্ষ সম্বন্ধে, দুর্ভিক্ষের যে রাজনৈতিক পরিণতি বা ফলাফল; এইটার ওপরে আমাদের দেশে তো কোনো স্টাডি হয়নি! দুর্ভিক্ষের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এঙ্গেলস প্রথম লিখেছিলেন The Peasant War in Germany তে এবং পরে লেলিনও এটা The Development of Capitalism in Russia তে এটা উল্লেখ করেছেন। দুর্ভিক্ষ হলে একটা দেশে কিন্তু Peasant-এ revolt হয়ে থাকে, Peasant এর raising হয়ে থাকে, এটা সাধারণত সব দেশে— সব দেশ নির্বিশেষে হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও যেমন ছিয়াত্তরে মন্বন্তর হয়েছিল, তারপর দেখা যাবে যে কৃষক অভ্যুত্থান হয়েছিল। তারপর ইংরেজরা কিছু জবভড়ৎস করতে বাধ্য হয়েছিল। এইখানে যেমন তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল, তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল দুর্ভিক্ষের পরে। তেতাল্লিশ সালে দুর্ভিক্ষ হলো, তারপর দেখা যাবে ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ-আটচল্লিশের সময় তেভাগা আন্দোলন হলো। বাংলাদেশে যেমন দেখা যাবে, পরের দিকে চুয়াত্তর সালে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তো এইটাই বলছিলাম যে, ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে যেটা করলাম যে, দুর্ভিক্ষের যে প্রভাব— এইটা রাজনীতিতে যেভাবে পড়ে— ওই সাতচল্লিশ থেকে দুর্ভিক্ষ একটানাভাবে এইখানে হয়েছিল, খালি পঞ্চাশ সাল বাদ দিয়ে। তো সেই দুর্ভিক্ষ মানুষকে, কৃষকদেরকে ব্যাপকভাবে বিক্ষুদ্ধ করেছিল, শহরের জনগণকেও বিক্ষুদ্ধ করেছিল। তাদের খাবারের দাম বেড়ে গিয়েছিল, যারা নির্দিষ্ট বেতনভোগী— যারা চাকরি-বাকরি করে নিদিষ্ট ইনকাম করত, তাদেরও যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। তারপরে ছিল রাজনৈতিক নির্যাতন, নানাভাবে ধর-পাকড়, সংবাদপত্রের ওপর নির্যাতন— অনেক কিছুই আছে যা আমি বর্ণনা করেছি। তাহলে সেইটা থেকেই কাজটা করতে হয়েছে, এজন্যেই এইটা ছাড়া কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত একটা উপস্থাপনা বা ভাষা আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করার কোনো উপায় নেই। এইটাকে শুধু ছাত্রদের আন্দোলন বললে চলবে না।

চিহ্ন : আমাদের রাজনীতিতে একটা মুখরোচক যে ব্যাপার, বায়ান্ন থেকে একাত্তর— ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত যেভাবে হয়েছিল, সেটা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে শেষ হয়েছে— যেমন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির কথাটাও এখানে অনেকেই বলছে নানাভাবে। তো মুক্তিযুদ্ধ কি আসলে সেই রকম একটা কিছু?

বদরুদ্দীন উমর : এটা হচ্ছে— হিস্টোরিক্যাল চবৎংঢ়বপঃরাব থেকে, হিস্ট্রির দিক থেকে বলতে গেলে এটা ংঃঁঢ়রফ চিন্তা। কেননা একটা আন্দোলন— ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তো ভাষা আন্দোলন কিসের থেকে হয়েছিল? আমাদের দেশে সাতচল্লিশ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে যে আন্দোলন চলে এসেছে, সেই ধারাবাহিক আন্দোলনের একটা পর্যায়ই ছিল ভাষা আন্দোলন। এইটার থেকে একাত্তর সালের স্বাধীনতা আন্দোলন হয়েছে, এটা বলা মোটেই ঠিক না। এখানে একটা প্রতিরোধ সাতচল্লিশ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছে। কেননা আগে যে দ্বন্দ্বটা ছিল হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব, সাতচল্লিশ সালের পরে সেটা দেখা গেল যে পূর্বপাকিস্তান-পশ্চিম-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব, উর্দু-বাংলা দ্বন্দ্ব, বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্ব নতুনভাবে দেখা দিল। রাইওটও নতুনভাবে দেখা গেল। প্রথম দিকে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হতো, ষাট সালের শেষের দিকে এসে দেখা গেল বিহারি-বাঙালি রাইওট হচ্ছে। কাজেই সমস্ত ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল।

চিহ্ন : এখানে যখন ভাষা আন্দোলন হলো, তখন তো আপনি ঢাকাতেই ছিলেন?

বদরুদ্দীন উমর : না। আটচল্লিশ সালেও ছিলাম না। আমরা তো পঞ্চাশ সালে এসেছি।

চিহ্ন : ভাষা আন্দোলনে আপনার কোনো ভূমিকা ছিল কী না?

বদরুদ্দীন উমর : না। ভাষা আন্দোলনে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না, সেটা আমি সব সময়ই বলেছি। এখানে যেমন মিথ্যা করে অনেকে বলে, সে ভাষা সৈনিক আর ভাষার নেতৃত্ব দিয়েছিল! সব আজগুবি লোকগুলো বেরাচ্ছে এখন মিথ্যা কথা বলে! অনেকেই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজের কথা বলে! আমি সব সময় বলে এসেছি যে, আমি ভাষা আন্দোলনের কোনো নেতা তো নয়ই, এমনকি কর্মীও ছিলাম না। আমি ভাষা আন্দোলনের একটা অংশগ্রহণকারী ছিলাম, যেরকম ছিল শত শত ছাত্র, সাধারণ ছাত্রর অন্তর্গত। তবে ভাষা আন্দোলন যখন হচ্ছে, তখন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় থাকতাম। কাজেই প্রত্যেকটা ঘটনা যা ঘটেছে, তার প্রত্যক্ষদর্শী। এইটা আমাকে লেখার সময় অনেক কাজে দিয়েছে, অনেকের ভূমিকা সেটা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রেও এটা আমার কাজে এসেছে।

চিহ্ন : আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে, ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেমন এখন রাজনৈতিকভাবে নানান ধরনের প্রচার চলছে, নানান কথাই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বলা হচ্ছে, তো এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর কোন বক্তব্যটা আপনার মনে হয়?

বদরুদ্দীন উমর : সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য হচ্ছে যে, শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। এটা একটা ভুয়ো কথা সম্পূর্ণভাবে। শেখ মুজিবের সময়— ভাষা আন্দোলনের সময় আটচল্লিশ সালে উনি এখানে এসেছিলেন। উনি তো থাকতেন কলকাতায়। উনি তো ঢাকায় রাজনীতি করেননি। উনি তো কলকাতায় রাজনীতি করেছেন। ফরিদপুর থেকে ওদিকে কলকাতায় গিয়ে রাজনীতি করেছেন। এইখানে এসে উনাকে একটা নিজের অবস্থান তৈরি করতে সময় লেগেছিল। আটচল্লিশ সালে যখন উনি এলেন, তখন তো নেতা-ফেতা কিছু ছিলেন না। কলকাতার একজন পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী তখন ছিলেন এবং সেই সময় যে শতশত ছাত্র  যোগ দিয়েছিল, অনেককে গ্রেফতার করেছিল, তার মধ্যে উনিও গ্রেফতার হয়ে ছিলেন। তার মানে এটা নয় যে, তিনি একটা নেতৃস্থানীয় লোক ছিলেন। তারপরে যে একটা বলা হয় যে, চুক্তি যখন হলো নাজিমুদ্দিনের সাথে, সেই চুক্তি তাকে দেখানোর জন্য জেলে গিয়েছিল। তাকে দেখানোর জন্য যায়নি। জেলে কামরুদ্দিন সাহেব গিয়েছিলেন, তোয়াহা ছিলেন, অন্যরাও জেলের মধ্যে ছিল। কোনো একটা ব্যক্তিকে দেখাতে যায়নি তারা ওখানে, কমিটির কিছু মেম্বররা ছিল, অন্যরা ছিল, তাদেরকে সেটা দেখাতে গিয়েছিল। কিন্তু সব বলা হয় যে, শেখ মুজিবকে দেখাতে গিয়েছিল। তারপরে শেখ মুজিব নিজেও মিথ্যা করে টেলিভিশনে— আমি নিজেও শুনেছি উনাকে বলতে, তিনি হাসপাতালের গবাক্ষ থেকে বাথরুমের ওইখান থেকে চিরকুট ছুঁড়ে ছুঁড়ে আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। বায়ান্ন সালে এই আওয়ামীলীগের অবস্থাই কি ছিল, আর উনার অবস্থাই বা কি ছিল— উনি যাতে করে ভাষা আন্দোলন পরিচালনা করতে পারেন? এ্যাবসার্ড কথা! তাছাড়া ভাষা আন্দোলন দ্বিতীয় পর্যায়ে— যেটা একদম একুশে ফেব্রুয়ারির আগে, যেটা কুড়ি তারিখে, একুশ তারিখের যে সভা-ধর্মঘট সব নিষিদ্ধ করেছিল, তখন তো উনি ঢাকাতে ছিলেনই না। ১৭ তারিখে উনাকে ফরিদপুর জেলে ট্রান্সফার করা হয়েছিল ঢাকা থেকে। উনি তো সে সময় ফরিদপুর জেলে ছিলেন। ফরিদপুর জেল থেকে— অন্য কথা বাদ দিয়েও কিভাবে তিনি কমনিকেট করতেন? ওইখান থেকে তখন তিনি পায়রা উড়াতেন, না কি করতেন? তখনকার দিনে মোবাইল ছিল না, সেখানে জেলের টেলিফোন কি উনাকে ব্যবহার করতে দিত নাকি? তো কিভাবে তিনি এই কাজ করলেন? এ বিষয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং কথা আমাকে বলেছিলেন সত্য মৈত্র। সে সময় সত্য মৈত্রও ফরিদপুর জেলে ছিলেন, যাইহোক সে কথা বাদ দেন। কিন্তু তারপরেই ঘটনা আরেকটা ঘটল— ধরুন যে, একুশে ফেব্রুয়ারির পর কদিন আন্দোলন তো হলো। তারপরেই সরকার তো নেতাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করল। কমিটি অব এ্যাকশনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করল। তারপরে তারা ধরা পড়ল। কিন্তু শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিল জেল থেকে ২৭শে ফেব্রুয়ারি। ফরিদপুর— এখানে বলা হয় যে, তিনি তখন ভাষা আন্দোলনের জন্য অনশন করছিলেন। একদম বাজে কথা! উনি এবং বরিশালের মহিউদ্দিন নিজেদের মুক্তির জন্যে অনশন করছিলেন। ১৭ তারিখে এখান থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং ১৭ তারিখের দশদিন পরে ফরিদপুর জেল থেকে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। যখন চারিদিকে ধর-পাকড় হচ্ছে নেতাদেরকে, উনি যদি নেতা হতেন, ভাষা আন্দোলনের নেতা যদি হতেন, যে অন্য নেতাদেরকে যে ধর-পাকড় হচ্ছে, সেইখানে উনাকে ২৭ তারিখে ছেড়ে দিল— এটা কি রকম কথা হলো? তারপর ২৭ তারিখে ছেড়ে দেবার পর, উনি ঢাকায় না এসে টুঙ্গিপাড়ায় উনার গ্রামে— সেই টুঙ্গিপাড়ায় চলে গেলেন। এইখানে যখন এপ্রিল মাসে কনভেনশন হলো, একটা ন্যাশনাল কনভেনশন হয়েছিল, আতাউর রহমান সাহেব প্রিসাইড করেছিলেন, আমরাও ছিলাম সবাই সেটাতে, তখন সে এপ্রিল মাসে ২৭ শে ফেব্রুয়ারি তাকে ছাড়ার পর তিনি ঢাকাতে এলেন। তো এইসব বাজে কথা যত রকম প্রচার করা হচ্ছে এবং এইটা তো আর বেশি অন্যভাবে বলতে পারে না এখন। আমাকে একজন বলেছিলেন যে, আপনি ভাষা আন্দোলনের বইটা লিখে ভালো করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষা আন্দোলনের কোনো ফ্যাক্টর ছিলেন না, এটা আপনি স্টাব্লিশ করেছেন। সেইটা করেছি। তাহলে টেক্সটবুকে, আমার কি হাত টেক্সটবুকে— সেখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ভাষা আন্দোলন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে হয়েছিল। এখন কি করবেন? শেখ মুজিব নিজে বাহাত্তর সালে একবার বলল, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শেখ মুজিব তার ভাষা আন্দোলনের ওপরে, তার ভূমিকার ওপরে আলোচনা করবেন। আমি তো উৎসাহী হলাম শোনার জন্যে যে, দেখি কি বলে! তো সেখানে কে জি মুস্তাফা ইন্টারভিউ করছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। আর শেখ মুজিবুর রহমান বলছেন যে, ঐ চিরকুট দিয়ে দিয়ে তিনি করেছিলেন। তারপরে জিজ্ঞাসা করছেন যে, কি ভাই কে জি, আমি ঠিক বলছি তো? কে জি বলল, হ্যাঁ মুজিব ভাই, আপনি ঠিক-ই বলছেন। এই ইন্টারভিউ-এর কিছুদিন পরে কে জি মোস্তফা ইরাকের আম্বাসেডর হয়ে চলে গেলন।

চিহ্ন : আপনিও তো ইন্টারভিউ করেছিলেন শেখ মুজিব কে?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। শেখ মুজিবকে আমি ইন্টারভিউ করি, তাকে আমি নাস্তানাবুদই করেছিলাম বলা চলে! আমার সাথে তো ছেলেবেলা থেকে জানাশোনা, আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল, আমাদের গ্রামেও গেছে। কজেই ওটা একটা অন্য লেভেলের সম্পর্ক ছিল। তো যাই হোক আমি উনাকে একদিন ফোন করলাম যে, আমি আপনাকে একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তো বললেন ঠিক আছে, এসো তুমি সকাল সাতটার সময়। সকাল সাতটার সময় গেলাম। সেটা ছিল ঊনসত্তর সাল। অনেক লোক সেখানে ভিড় করা। তারপর আমি গেলাম। আমাকে নিয়ে ঘরের মধ্যে বসালো দরজা-জানালা একদম বন্ধ করে দিয়ে। তা সেখানে নানারকম কথা, তারপর উনি আমাকে বলতে চেষ্টা করলেন, চিন্তা করেন যে— আটচল্লিশ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়। আমি বললাম যে, আটচল্লিশ সালে তো আপনি কিছুই ছিলেন না। আটচল্লিশ সালের ভাষা আন্দোলনে আপনার কিছুই ভূমিকা ছিল না। আপনি তো স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি অব অ্যাকশনের মেম্বরও ছিলেন না। তারপরে এখানে জিন্নাহ সাহেব যখন এসেছিলেন, তখন জিন্নাহ সাহেবের সাথে ছাত্রলীগের যে সমস্ত নেতা আলাপ করতে চেয়েছিলেন— ছাত্রলীগের যে ডেডিকেশন জিন্নাহ সাহেবের সাথে দেখা করেছিলেন, তার মধ্যে তো আপনি ছিলেন না। তখন আমাকে বলে যে, হ্যাঁ আমি ছিলাম না, তবে আমি তাজউদ্দিন আর নজরুল ইসলামকে দিয়েছিলাম। আমি বললাম যে তাজউদ্দিন, নজরুল ইসলাম ছিলেন, কিন্তু আপনি ছিলেন না। তো পরে আমি একথা তাজউদ্দিন, নজরুল ইসলামকে বলাতে ইসলাম বললেন যে, ‘উনি এসব কথা বলেই থাকেন এরকমভাবে’। আর তাজউদ্দিন খুব মুখ খারাপ করে একটা গাল দিয়েছিলেন! যেটা আমি এখানে বলতে চাই না। তারপরে বললাম যে, জিন্নাহ সাহেবের সাথে দুবার দেখা হয়েছিল, ছাত্রলীগের ডেডিকেশন এবং স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি অব অ্যাকশনের সময়, কোনোটাতেই তো আপনি ছিলেন না। এই সব চিকন কথার পরে উনি বুঝতে পারলেন যে, উনি আমাকে যেভাবে এসব বলতে চাইছেন সেগুলো চলবে না। আমার কাছে চলবে না সেটা আলাদা, কিন্তু চালিয়ে তো দিলেন জাতির কাছে! কারণ, আমার ওপর কোনো হাত নাই, কিন্তু জাতির ওপর হাত আছে তো! কোনো আড়াল চলবে না, এগুলো লিখতে হবে, যদি সাহস থাকে।

চিহ্ন : না আপনি যা বলছেন, তা অবিকৃত ছাপা হবে। কার্যত তিনি কোনো লিডার তাহলে ছিলেন না? ৬ দফা কিংবা ঊনসত্তর এই যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে— আমরা প্রকৃত জিনিসটা জানতে চাই আসলে। ৬ দফা যে দিলেন উনি?

বদরুদ্দীন উমর : শোনেন, প্রকৃত জিনিস হচ্ছে আপনি দেখবেন বাংলাদেশের তিনটে বড় আন্দোলন হয়েছে, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তর সালের আন্দোলন এবং একাত্তর সালের লড়াই। এর কোনোটতেই শেখ মুজিব ছিলেন না। কোনোটাতেই তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তার ঐ আন্দোলনের কোনো অভিজ্ঞতা নাই।

চিহ্ন : তাহলে লিডার হলো কী করে?

বদরুদ্দীন উমর : এটাই তো একটা প্যাঁচের ব্যাপার! (হাসি) এইখানে প্যাঁচ— প্যাঁচাল যতরকম কথা বলেন আর কি, যে ধান্ধাবাজি, ফেরেববাজি সব এইখানে আছে। একটা লোক এখন কেরানি থেকে কিভাবে কোটিপতি হয়ে যায় বলেন তো? তো সেই কেরানিতুল্য একটা অবদান রেখে, কোটি কোটি টাকার মালিকতুল্য রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করেছে। এইটার কারণ আমি বলব, প্রথমত একটা কথা হচ্ছে, কমিউনিস্টদের ইডিয়োসির জন্য, কমিউনিস্টদের ব্যর্থতার জন্য, এই আওয়ামীলীগের ওঠার মস্ত বড় কারণ আছে। কেননা, ন্যাশনাল যে দ্বন্দ্ব, জাতীয় দ্বন্দ্ব যেটা, এটা ছিল পাকিস্তানের সাথে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে এবং ন্যাশনাল লিবারেশনের যে একটা সমস্যা ছিল, এটা তো কমিউনিস্টরা ধরতে পারে নাই। ক্লাস স্ট্রাগলের কথা তারা বলত, শ্রেণিসংগ্রাম— এখানে যে জাতীয় নিপীড়ন হচ্ছে, জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে কিন্তু কমিউনিস্টরা কোনো সময়ই খাড়া হয়নি। খুব স্টপিড একটা লাইন ছিল তাদের এবং আসলে এটা করতে গিয়ে তাদের না-হল জাতীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, না-হল এখানে শ্রেণিসংগ্রাম। কিন্তু মুজিবুর রহমান প্রকৃতপক্ষে জাতীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে সেইভাবে না-দাঁড়ালেও এবং জনগণের পক্ষে না-দাঁড়ালেও যে বুর্জোয়া শ্রেণি সাতচল্লিশ সালের পরে পাকিস্তানের তৈরি করেছিল, তার মধ্যে পূর্ববাংলার যে ছোট বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল, তার পক্ষে দাঁড়িয়ে এখানে একটা আওয়াজ তুলেছিলেন। এবং সেটা আপতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল যে, এটা একটা জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, সেই কাজটা তিনি করেছিলেন। শেখ মুজিবের সেক্ষেত্রে কমনসেন্স কমিউনিস্টদের থেকে অনেক বেশি ছিল। একটা লোক কেনো অত ওপরে ওঠেছিল, এটাও একটু বোঝা দরকার। কতকগুলো ঢ়ৎধপঃরপধষ স্লোগান, কতকগুলো ংঃৎধঃবমরপ স্লোগান সেটাও শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিল। জনগণের পাল্স কমিউনিস্টদের থেকে শেখ মুজিবুর রহমান অনেক বেশি বুঝতেন, এটা স্বীকার করতে হবে।

চিহ্ন : এটাই তার লিডারশিপের কারণ?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। তার লিডারশিপের অন্যতম কারণ।

চিহ্ন : কিন্তু মাওলানা ভাসানীও তো তখন ছিলেন?

বদরুদ্দীন উমর : শেখ মুজিবের মধ্যে যে পাওয়ারের ক্রেজ সেইটা মাওলানার মধ্যে সেইভাবে ছিল না।

চিহ্ন : কিন্তু এগুলোর মধ্যে কী মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের একটা কিছু পাওয়া, কিছু চাওয়ার ব্যাপার ছিল? ব্যাপারটা তো থাকেই।

বদরুদ্দীন উমর : এটা মধ্যবিত্ত মুসলিমকে দোষ করে লাভ নাই। এখানে প্রগতিশীলতার লক্ষণ হচ্ছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথা বলা সবসময়। আসলে সেটা না, মধ্যবিত্তের নিজস্ব কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে, তা ইউরোপ-আমেরিকা-ভারত-পাকিস্তান যেখানেরই হোক। এখানে তখন বাঙালি-মুসলমানদের মধ্যে যে নতুন মধ্যবিত্ত তৈরি হয়েছিল, সেই মধ্যবিত্ত সম্পর্কে আমি বলব, এখনকার মধ্যবিত্তের চেয়ে অনেক ভালো ছিল। তাদের মধ্যে একটা জাতীয়তাবোধ ছিল, তাদের মধ্যে স্বাধীনতার ব্যাপার ছিল, একটা দেশপ্রেম ছিল, এখন সেটা অনুপস্থিতিই বলা চলে এখানে।

চিহ্ন : এই পরিবর্তনটা হলো কীভাবে?

বদরুদ্দীন উমর : কোনটা?

চিহ্ন : এই পরিবর্তনটা?

বদরুদ্দীন উমর : এই পরিবর্তন হয়েছে, এর ওপর আমি অনেক লিখেছি এবং আমি একবার বিস্তারিতভাবে সেদিন— কিছুদিন আগে, শরীফ সাহেবের [আহমদ শরীফ] ওপর একটা— ঐ যে স্মারক বক্তৃতা হয়, সেখানে আমি বলেছি কীভাবে এখানে ব্যবসায়ী বুর্জোয়ারা ক্ষমতা দখল করল। এবং আমি গতকাল যুগান্তর-এ একটা লেখা দিয়েছি। লেখাটার হেডিং ছিল, ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়ী বুর্জোয়াদের ভূমিকা’। তবে যুগান্তর-এ যেসব অর্ধশিক্ষিত লোকরা আছে, তারা ‘ব্যবসায়ী’ শব্দটা কেটে দিয়েছে! কেটে তারা লিখেছে, ‘বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের ভূমিকা’! এর ফলে এর অর্থ যে পুরো পাল্টে গেল! ভেতরে যে লেখা হয়েছে, একটাকে ‘লিটল থিরোরিটিক্যাল পিস’ও বলা চলে। এই যে গতকাল যেটা আমি যুগান্তর-এ লিখেছি, পারলে পড়ে নিও। সেখানে তারা এইভাবে হস্তক্ষেপ করছে! এইখানে এই যে একটা শ্রেণি সৃষ্টি হলো— বুর্জোয়া শ্রেণি, ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণি, এটা একাত্তর সালেই হয়েছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখন লোকে হাসিনাকে গাল দিচ্ছে, অমুককে গাল দিচ্ছে, ব্যাংক লুট হচ্ছে ইত্যাদি। আমরাও সব বলছি, কিন্তু আমার সাথে অন্যলোকদের তফাত হচ্ছে, আমি ব্যাখ্যাসহ এই কথাটা বলি। আমি এই যুগান্তর-এর এক জায়গায় বলেছি যে, এখানে আওয়ামীলীগকে দোষারোপ করে এইভাবে বোঝা যাবে না! কেননা, এখানে তারা আসলে শ্রেণির প্রশ্নটাকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এটা করছে। আওয়ামীলীগ কার প্রতিনিধিত্ব করে? বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়ী বুর্জোয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তাদের ক্ষমতা এখানে একদম শীর্ষদেশে আছে। এবং এই ব্যবসায়ী বুর্জোয়ারা বিএনপি’র মধ্যেও আছে, জাতীয় পার্টির মধ্যেও আছে, জামায়াত ইসলামীর মধ্যেও আছে, আওয়ামীলীগের মধ্যেও আছে। কিন্তু আওয়ামীলীগকেই তারা এখন নিজেদের মূল ধারক-বাহক হিসেবে অবলম্বন করছে। এবং হাসিনা যা করছে, তার পিছনে শ্রেণিগতভাবে রয়েছে ব্যবসায়ী বুর্জোয়ারা।

চিহ্ন : এখানে অন্য একটা জিনিস সেটা হচ্ছে যে, আপনার এই কথাগুলো অনেকেই বলছে যে, এটা তো আসলে একটু এন্টি-লিবারেশন কিংবা এন্টি-বাংলাদেশ চিন্তার দিকে চলে যাচ্ছে, আপনি যখন এই কথাগুলো বলছেন!

বদরুদ্দীন উমর : তারা জানে? কাকে জাতীয় লিবারেশন বলে, আর কাকে এন্টি-লিবারেশন বলে তারা জানে, যারা এই কথা বলে?

চিহ্ন : এখন জামায়াত-বিএনপি’র যে রাজনীতি, তারাও তো এইভাবে আওয়ামীলীগের বিরোধীতা করছে।

বদরুদ্দীন উমর : (একটু রেগে) আরে আওয়ামীলীগের বিরোধী কথা আমি বলি মানে? ‘হাসিনা ভাত খায়’—এটা জামায়াতে ইসলামির লোক বলে। আমি যদি বলি, ‘হাসিনা ভাত খায়’, তাহলে কী আমি জামায়াতে ইসলাম হয়ে গেলাম নাকি? এটা একটা মহাকথা। একই কথা, একই দোষের জন্যে যদি তাকে দোষারোপ করে জামায়াতে ইসলামি এবং আমি, তাহলে তো তার দোষটা মাফ হয়ে গেল না? কথা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলাম কি বলছে, না-বলছে সেটা বলতে হবে কেনো? আমি একটা লোক, আমার একটা পরিচয় আছে, আমি কাউকে তেল মারতে যাই না, আমি করো পুরস্কার খাইনি কখনও। আমি কি বলছি, সেটা ওসঢ়ড়ৎঃধহঃ শুধু। কাজেই কথা হচ্ছে যে, আমি কি বলছি শুধু তাই না, আমি কি যুক্তি দিচ্ছি, আমার মত লোকরা কি বলছে, সেটা হচ্ছে ওসঢ়ড়ৎঃধহঃ, শুধু আমিই না। কাজেই কথা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলাম কি বলছে, তারা হাসিনাকে সমালোচনা করছে এবং আমি সমালোচনা করছি। কাজেই আমি জামায়াতে ইসলামি? এটাতো আওয়ামী কালচার!

চিহ্ন : আপনার যে রাজনৈতিক জোট, ভাবনা-চিন্তার যে জোট যেটা, সে জোটটা স্টাব্লিশ করছে না, কিংবা সেখানে লোকজন কি আছে? তারা কি কাজ করতে চাইছে? যেমন আপনি যে কথাগুলো বলছেন, তারাও তো এর অনুসারী?

বদরুদ্দীন উমর : (একটু রেগে) আমি যদি আপনাকে কাজ করতে বলি, আপনি করবেন? আপনি যে বলছেন এই কথা, বাংলাদেশের যে অবস্থা সেটা বুঝতে হবে। আমাকে অনেকে বলে যে, আপনি তো এখন বুড়া হয়ে মরতে চললেন, আপনি তো এখনো ছাড়লেন না! আপনি তো ম্যাগনেট যেভাবে আকৃষ্ট করে লোহাকে, সেভাবে আকৃষ্ট করতে পারলেন না? তো আমার জবাব হচ্ছে যে, ম্যাগনেট তো দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার, ম্যাগনেট তো লোহাকে আকৃষ্ট করে, ইট বা কাঠকে তো আকৃষ্ট করে না! ম্যাগনেট তো আপনাকেও আকৃষ্ট করবে না! কাজেই কথা হচ্ছে যে, দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। এখন বাংলাদেশে চিন্তার কাঠামো, চিন্তার স্তর যদি কাঠের মত হয়ে থাকে, তো সেখানে আমি লোহার মত কথা বললে, ম্যাগনেটের মত কথা বললে— লেলিনের বাপেরও ক্ষমতা ছিল না যে, আজকের বাংলাদেশে যে জনগণ  তৈরি হয়েছে, তাদেরকে পরিবর্তন করা! এখানে আপনি দেখেন, ছাত্রদের কত বড় ঐতিহ্য ছিল আন্দোলনের! বাহাত্তর সালের পর থেকে কি হয়েছে, কি অবস্থা ছাত্রদের। কাজেই কথা হচ্ছে, সমাজের অবস্থাটা বুঝতে হবে। এটা আমি খুলনার এক বক্তৃতায় বলেছিলাম, অনেকবারই বলেছি। তবে খুলনার বক্তৃতায় প্রথমে বলেছিলাম যে, আমরা যে এইখানে মিটিং করেছি— বক্তৃতায় এত কম লোক রয়েছে, এটা আমাদের কোনো ব্যর্থতা না, এটা জনগণের ব্যর্থতা! তার কারণ, তাদের কথা যেখানে বলা হচ্ছে, সেইখানে তারা আমাদের কথা শুনছে না, কিন্তু খালেদা জিয়া বা হাসিনা গেলে সেখানে লাখে লাখে চলে যাচ্ছে। তো এটা তো আমার ব্যর্থতা নয়, এটা জনগণের নিজেরই ব্যর্থতা! তার কারণ, জনগণের যে দুশমন, তারা তারই পেছনে ঘুরছে। আর এখানে যেটা হয়েছে— সবাই ‘ইয়া নাফছি’, ‘ইয়া নাফছি’, ‘আমার পকেটের কি অবস্থা’, ‘আমার পকেটের কি অবস্থা’, ‘আমার কি হবে’, ‘আমার কি হবে’— সমাজে এটা চালু হয়েছে, সেখানে আমার জোট বা আমি তো কিছু করতে পারব না! কেউ তো খোদা না যে, সমাজের এই পরিস্থিতিকে, সমাজের এই নিয়ম-কানুনগুলোকে, এই অবস্থাকে একটা ঝা-া ঘুরিয়ে দিলেই হয়ে যাবে! হয়ে যাবে না। কারণ, সেখানে পরিস্থিতি আছে একটা। কেন এখানে এটা হলো না? কেন এখানে এই নির্বাচনটা করতে পারল? এই যে নির্বাচনটা এইভাবে করতে পারল! এটা কি? এটার কি অবস্থা? এখানে যেটা হয়েছে, আওয়ামীলীগ তো আর কোনো ঙৎমধহরুধঃরড়হ নাই। টোটাল একটা ঈড়হংড়ষরফধঃরড়হ, যেখানে আওয়ামীলীগ পুলিশকে তার অঙ্গসংগঠন হিসেবে ব্যবহার করছে, নির্বাচন কমিশনারকে তার চাকর হিসাবে ব্যবহার করছে, যেখানে আদালতকে তার পায়ের নিচে ফেলেছে, যেখানে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরা পা চাটছে!

চিহ্ন : সর্বস্তরে তো চাকর পাওয়াও যাচ্ছে! আইন-শাসন-বিচার— রাষ্ট্রের সবব্যবস্থায়ই তো চাকররা আছে!

বদরুদ্দীন উমর : আমি তো সেটাই বলছি, সর্বস্তরেই। এই যেখানে অবস্থা!

চিহ্ন : তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কীভাবে?

বদরুদ্দীন উমর : পরিবর্তনটা আসবে, আপনি নামেন রাস্তায়। আপনি নামবেন? কথা হচ্ছে যে, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শুধু এটা বললেই হবে না যে, কেন এটা আপনি পারছেন না। আমি তো খেটে মরছি, আমি তো জীবনে কোনো টাকা-পয়সা বাড়াতে চাইনি, নিজেও কোনো কিছু করতে চাইনি। এখন আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, কিন্তু নিজে খুব সেফ থাকছেন, এই হচ্ছে অবস্থা! শুধু আপনার জন্য আমি বলছি না, আপনি কিছু মনে করবেন না। এটা হচ্ছে দেশের সাধারণ অবস্থা। যে কাউকে কাজ করতে বললে তো কাজে নামবে না। ছাত্ররা যেখানে আগে আন্দোলন করত, প্রগতিশীল আন্দোলন করত, সেখানে আজকে তারা পকেট মারছে, কমিশন খাচ্ছে, গু-ামী করছে, রাহাজানি করছে, রেপ করছে! চিন্তা করে দেখেন, আগেকার দিনে ছাত্ররা কখনো রেপ করেছে, শুনেছেন কোনো কেস? পূর্ববাংলায়— একাত্তর সালের আগে আমি তো শুনিনি কোনো ছাত্র ইউনিভার্সিটিতে কোনো জায়গায় রেপ করেছে, রেপের কোনো কেস হয়েছে! এই তো বাংলাদেশের অবস্থা! এমন কেন হয়েছে? এটার দায়ী তো আওয়ামীলীগ বা একটা দল হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমান একজন ব্যক্তি হিসাবে করেনি। তাহলে এ শ্রেণির চরিত্রটা কি?

চিহ্ন : তারা তো বলছে যে, একুশ বছর তারা ক্ষমতায়  ছিল না, সেই সময় এসব তৈরি হয়েছে।

বদরুদ্দীন উমর : একুশ বছর ছিল না বলে এসব তৈরি হয়েছে? কিন্তু মুজিবুর রহমান মারা পড়ল কেন সাড়ে তিন বছর পর? তখন তো জামায়াত ইসলাম উঠতে পারেনি, এখানে বিএনপিও ছিল না, অন্য কেউ-ই ছিল না। যে রিসিপশন মুজিবুর রহমানকে দেয়া হয়েছিল জানুয়ারির ১০ তারিখে, সেরকম তো গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ কাউকে দেয়া হয়নি। তারপরে সাড়ে তিন বছর পরে তাকে যখন গুলি করল, রাস্তায় লোকে এসে মিষ্টি খেল! এটা তাজউদ্দীনের মেয়েও তার বইতে লিখেছে, আমি নিজেও দেখেছি, সেটা বাদ দেন। তাজউদ্দীন চাকরকে পাঠালেন রাস্তায় খবর নিতে, চাকর এসে বলছে যে, ওখানে মিষ্টি বিলি করছে। তো এই অবস্থা তৈরি হলো। এটাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না, আমি সেটাকে ব্যাখ্যা করেছি। আর কেউ ব্যাখ্যা করেনি এই সাড়ে তিন বছরের মধ্যে, কেন শেখ মুজিবের এই অবস্থা হলো। মেরে ফেলতে পারে, যেকোন লোককেই মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু মেরে ফেলার পর রাস্তায় লোকে মিষ্টি বিলি করবে, আর একটা লোকও রাস্তায় আওয়ামীলীগের পক্ষে দাঁড়ায় না! তাঁকে তো আওয়ামীলীগের লোকে মেরেছিল। সামরিক বাহিনীর কয়েকটা লোককে সুদ্ধ নিয়ে আওয়ামীলীগের নেতারা সেখানে গিয়ে মন্ত্রী হয়েছিল। ঐ ওরাই আবার মন্ত্রীত্ব গঠন করেছিল। এটা তো কোনো কমিউনিস্ট, কোনো প্রগতিশীল লোক তাকে মারতে যায় নি, তাদের নিজেদের মধ্যের লোকই তাকে চক্রান্ত করে মারতে গেছে। তাকে কি তিয়াত্তর সালে মারতে পারত, এমন কি চুয়াত্তর সালেও মারতে পারত, কিন্তু এমন কি করল যে পচাঁত্তর সালে এসে মারল?

চিহ্ন : কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, সেভেন্টি ফাইভে যারা মারল, তারা মুক্তিযুদ্ধের ব্যর্থ শক্তিটাই, তারাই ক্ষমতায় আসল ঐ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। তো ক্ষমতায় আসবে না কেন।

চিহ্ন : তারপর একুশ বছর তো তারাই শাসন করেছে, তারা এই সন্ত্রাস, লুটপাট, ছাত্রদের…

বদরুদ্দীন উমর : আপনি কি— ওহ ভধরৎ রিঃয ভঁষষ ভরৎসহবংং বলতে পারেন যে, জিয়াউর রহমান এটা করেছিল, এমনকি এরশাদও তা করেছিল। আপনি বলতে পারবেন না। আপনাকে তথ্যের ওপর নির্ভর করে যেতে হবে।

চিহ্ন : একাত্তর সালের এই ঘটনা— তারপরে ইত্যাদি, সেটা তো একটা হয়েছে ইতিহাস বিকৃতি! তারপর নানান রকম ভ্রান্ত উপস্থাপনা— এগুলোও তো হয়েছে! আমরা আজকে যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, পৌঁছেছি, এইখান থেকে আসলে উদ্ধারের কী উপায়?

বদরুদ্দীন উমর : উদ্ধারের ব্যাপার, সেইটা এইভাবে চলে আসা ঠিক না তো। তুমি অন্য জিনিস জিজ্ঞাস করছ এইখানে, ওইটা উদ্ধারের ব্যাপার কী সেটা? উদ্ধারের ব্যাপার লড়তে হবে। লড়াই ছাড়া তো কোনো কিছু হবে না, পুরো শ্রেণিটাকে সমূলে উৎখাত— (ঘড়ঃযরহম ড়ভ ঃযব ঝড়পরধষ জবাড়ষঁঃরড়হ) এটা দিয়ে কোনো সংস্কার সম্ভব না। বাংলাদেশ যে অবস্থায় চলে গেছে, তাতে তো সংস্কারের দ্বারা কিছু করা সম্ভব নয়। এটা একবারে, পুরো জিনিসটাকে, আপ টু ডেট করতে পারবে ঝড়পরধষ জবাড়ষঁঃরড়হ-এর মাধ্যমে। তার জন্যে কাজ করতে হবে। এটা আপাতত মনে হতে পারে যে, অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু একটা জিনিস বাংলাদেশে বিশেষত্ব আছে যে, কতকগুলো ডেভলাপমেন্ট হয়, দ্রুত ডেভলাপমেন্ট হয়, কতকগুলো পুঞ্জীভূত হয়— কতগুলো আপরাইজিং এজন্যেই হয়েছে। তো এখানে এই জিনিসটা ছাড়া তো এমনি হবে না। তার জন্য ঝঃৎঁমমষব করতে হবে, রুখে দাঁড়াতে হবে এইখানে। কখন হবে এগ্জ্যাক্ট, কী মোমেন্টে হবে— এটা তো বলতে পারা যায় না। লোকের মনে একটা ক্ষোভ আছে, বিক্ষোভ আছে— এই যে নির্বাচন হয়ে গেল, সেটাতে একটা রোষ আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে যে, অরগানাইজেশন ছাড়া কিছু শূন্য জনগণ, শূন্য আমি (এটা গতকালও লিখেছি)— অরগানাইজেশন ছাড়া জনগণ হচ্ছে শূন্য; তার মধ্যে যত রাগ, যত ক্রোধ, যত বিক্ষোভ-ক্ষোভ থাক, কোনো কাজে আসতে পারে না, কিছুই করতে পারে না। দেশে কোনো অরগানাইজেশন নেই, কোনো একটা অরগানাইজেশনের চিন্তাও নেই, অরগানাইজেশন করতে গেলেই তখন লোকে নিজের কথা ভাবে— ‘আমার কী হবে’! তো সেই অবস্থায় চলছে।

চিহ্ন : সে রকম লিডারশিপও তৈরি হয় নি।

বদরুদ্দীন উমর : লিডারশিপটা কোথায়? লিডারশিপটা আপনার বেজ থেকে ওঠবে, কিন্তু যেখানে পিপলের এই অবস্থা, সেখানে আপনি লিডার কোথা থেকে পাবেন? আর লিডার দুই-চারটা থাকলেও তার ডাকে কে আসে? কে আসবে? ডাকলেই চলে আসবে, লিডার ডাকলেই! লিডার তো এমনি ইয়ের থেকে গজায় না।

চিহ্ন : না। এখন গ্রাম-গঞ্জের মানুষ বা কৃষক শ্রমিক জনতা কার পেছনে যাবে? কাকে লক্ষ্য করে যাবে?

বদরুদ্দীন উমর : সেরকম নাই। কার পেছনে যাবে সেরকম নাই। তাছাড়া আর একটা কথা— ঐ কৃষক, যে নিপীড়িত হচ্ছে, তাকে যদি বলা যায় যে, কোনো পলিটিক্যাল অরগানাইজেশনের কাজ করতে, সে বলবে যে, না আমি পারব না। এটা করতে গেলে আমার অসুবিধা হবে। এই যখন অবস্থা, তখন এর মধ্যে থেকে তো কোনো নেতা ম্যাজিক করতে পারে না! লেলিন থাকলে কী করত? লেলিন কোনো ম্যাজিক দেখাত? ডধং যব ধ সধমরপরধহ?

চিহ্ন : এখানে অরগানাইজেশন— নরমালি আমরা যে ধরনের অরগানাইজেশন দেখা…

বদরুদ্দীন উমর : এই সময়টায় অরগানাইজেশন হবে না কেন, এ সময় অন্যান্য রাশিয়াতে কি কম নির্যাতন ছিল নাকি। সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড যে মুভমেন্ট যেটা, সে মুভমেন্ট ডেভলাপ করার কথা। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্টে যাওয়ার মত লোকজন তো কেউ নাই! লোকজন যদি না-রাজি হয়, লোকজনের যদি অবস্থা হয়— খালি ‘ইয়া নাফসি’, ‘ইয়া নাফসি’, ‘আমার কী হবে’,‘আমার পকেট কী হবে’, ‘আমি কী সুন্দরী মেয়ের বিয়ে করব’, ‘বিদেশে যাব’। এই যে ইয়াং জেনারেশনের এই যদি চিন্তা হয়, তাহলে কী হবে সেখানে! সেটা বললাম তো আগে বাংলাদেশে ছাত্রদের, তরুণদের একটা ঐতিহ্য ছিল আন্দোলনের। একাত্তর সালের পর থেকে কী হয়েছে, এখানে কী অবস্থা?

চিহ্ন : এইখানে কী আপনার আন্ডারগ্রাউন্ড অরগানাইজেশন ডেভলাপ হওয়ার মতো পরিস্থিতি আছে কি না?

বদরুদ্দীন উমর : পরিস্থিতি তো আছে, পরিস্থিতি আছে মানে হতে পারে, সেখানে পিপলের মধ্যে একটা সার্পোট রয়েছে। মেইন প্রবলেম হয়েছে ‘মিডল ক্লাস’। কৃষক বা শ্রমিক আমাদের দেশে— যে অশিক্ষা ইত্যাদি তারা নিজেরা নিজে থেকে ওঠে করতে পারে না! এটা লেলিন আলোচনা করেছেন ডযধঃ ওং ঃড় ইব উড়হব?-এ। সেখানে মিডল ক্লাস থেকে ভেঙ্গে লোকজনকে যেতে হবে— এমনি সাধারণ কথায় যাকে ‘ডিক্লাসড হওয়া’ ইত্যাদি বলে। সেরকম মিডল ক্লাস থেকে যদি ভেঙ্গে না আসে— মিডল ক্লাসই এখানকার সবচেয়ে কাউন্টেবলেরই অনুসারে একটা সোস্যাল একটা ফোর্স হিসাবে কাজ করছে। সেখান থেকে কোনো লোক নেমে এসে পিপলের মধ্যে কাজ করতে যাবে, সেখানে মুভমেন্ট গড়ে তুলবে, সেরকম লোক নাই। গেলে পরে— এখন অনেক জায়গায় মুভমেন্ট কী হচ্ছে না? গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে মুভমেন্ট হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে সেরকম মুভমেন্ট হলে করা যায়। কিন্তু মিডলক্লাসের থেকে এরকম কোনো লোকজন সেখানে যাচ্ছে না কাজ করতে, যারা তাদেরকে প্রপারলি অরগানাইজড করতে পারে। তাদের টার্গেটগুলোও তো রং— খালি! তারা শুধু মজুরির জন্য লড়াই করছে। শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়নের— তোমার কি বলে, এদিকে আপোয়েন্টমেন্ট লেটার নাই, তোমার ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নাই, আর খালি মজুরির জন্য শুধু— আসলে মজুরির জন্য আন্দোলন হয়। মজুরির জন্য আন্দোলন তো অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু শুধু মজুরির জন্য আন্দোলন দিয়ে তো হবে না। কথাটা হচ্ছে— তাই এখানে মিডল ক্লাসের থেকে লোকজন— মিডল ক্লাসটাই সবচেয়ে একটা রিয়্যকশনারি, একটা ‘পড়ঁহঃবৎ-ৎবাড়ষঁঃরড়হধৎু ভড়ৎপব’ হিসাবে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। এজন্যে তাকে অঃঃধপশ করবে কী করে?

চিহ্ন : ট্রেড ইউনিয়নও স্যর ধ্বংস হয়ে গেছে!  ট্রেড ইউনিয়ন যেটা বাংলাদেশে সেটাও তো নেই?

বদরুদ্দীন উমর : ট্রেড ইউনিয়ন বাংলাদেশে! বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়ন বলে আর কিছু থাকেই নি। শেখ মুজিব প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন শেষ করে দিয়েছে মেরে একদম, তারপরে আর কোনো ট্রেড ইউনিয়নই দাঁড়ায়নি।

চিহ্ন : তবে এখন স্যর একটি জিনিস— আমাদের যেটা মনে হয়, যে সমস্ত শিল্প কল-কারখানা ছিল— পেপারমিল, জুটমিল সেগুলো তো সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে, সব ব্যক্তি মালিকানা সব জিনিস চলছে?

বদরুদ্দীন উমর : এইটা হয়েছে— যাতে যে কি বলে, নিও-লিবারালিজম যেটা বলে, তার ফল এইটা হচ্ছে। তার উদ্দেশ্যই তাই যে প্রত্যেকটা সে তো প্রাইভেট সরকারি মালিকানায় সম্পত্তি রেখে, কলকারখানা রেখে তো সে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারে না। তাকে সেটা প্রাইভেটাইজ করতে হবে।

চিহ্ন : এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো— যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, স্যর আপনি সিক্সটি নাইনে হয়তো ছেড়ে চলে আসছেন রাজশাহী, তো সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আস্তে আস্তে কিন্তু কর্পোরেট কী করে হবে বা তাতে করে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রও থাকছে না। চরিত্র যেটা আমরা বলি— স্বাধীনচিন্তা, মুক্তচিন্তা, কথা বলার যে সাহস বা শক্তি এটা তো একটা কালচারাল বিউটি।

বদরুদ্দীন উমর : এটা— জিনিসটা তো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যায় না। কীভাবে এই ক্যাপিটালিজমের— কোন জায়গায় এসেছে, কী হয়েছে কর্পোরেট হাউজগুলো, কী করছে এইখানে। এইখানে তো কোনো ন্যাশনাল ক্যাপিটাল বলে যে জিনিসটা ছিল, আগে যেভাবে ছিল, এখন তো ন্যাশনাল ক্যাপিটাল সেভাবে নাই। ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি বলে যেটা ছিল, এখন নাই। এই যে একটা চশমা, এখন আমি ব্যবহার করছি, এর কাচটা তৈরি হয়েছে এক জায়গায়। এটা তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়, এটা শুধু তৈরি গেছে। তিনটা দেশে তিনটা তৈরি হয়ে গেছে, তারপর এক জায়গায়। এটাতো নাই যে, একটা কারখানায় এক সাথে তৈরি হবে। কাজেই কথা হচ্ছে প্রত্যেকটা জিনিসই— এই যে একটা ঘড়ি আছে, একটা ঘড়ি পাঁচটা দেশে তৈরি হচ্ছে। পাঁচটা দেশে পাঁচটা নানা রকম পার্টস তৈরি হয়ে তারপর আপনি এই ঘড়িটা পাচ্ছেন। এই যে অবস্থা তার ধারাবাহিকতায় এইখানে আপনার প্রাইভেটাইজেশন, এটা অব্যর্থক, এটা এই জিনিসিটা তারা যেটা করছে নিজের দেশের থেকে ইন্ডাস্ট্রি তুলে নিয়ে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বাইরে নিয়ে গিয়ে এটা তো স্ট্রেট সেক্টরে করতে পারে না, এটা প্রাইভেট সেক্টরে করছে। সেজন্যে প্রাইভেটাইজেশন হচ্ছে সব জায়গায়। প্রাইভেটাইজেশন করে এখানে তারা এখানে কর্পোরেট হাউজগুলো ইন্টারেস্ট পাচ্ছে। যে জন্য প্রাইভেট, প্রাইভেটাইজ করা সমস্ত।

চিহ্ন : তো এটা তো বিশ্বব্যাপী চলছে এখন?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ বিশ্বব্যাপীই চলছে।

চিহ্ন : তাহলে আপনি যে বললেন যে, মিডল ক্লাসকে ডিক্লাস করা, তাহলে এইটা তো এই সারা পৃথিবীতেই এই রকম চলছে, কিন্তু কোথাও তো…।

বদরুদ্দীন উমর : সারা পৃথিবীতেই হচ্ছে ক্যাপিটালিজম ক্রাইসেস এটা যেটা করছে এটা তার কোনো শক্তির থেকে করছে না। এগুলো সব তার দুর্বলতার দিক আর কি, তার একদম ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় এসে এই কাজ করছে দুনিয়াতে। এই জন্যে আমেরিকার ডিক্লাইনকে কেউ অস্বীকার করতে পারে যে আমেরিকা এখন ডিক্লাইন হচ্ছে। আমেরিকা যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় আছে এখন?

চিহ্ন : না ।

বদরুদ্দীন উমর : তাহলে পুরো ক্যাপিটালিজমের মধ্যে শান্তি আছে? ক্যাপিটালিজমের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চোর-ডাকাতি (ডযধঃ রং যধঢ়ঢ়বহরহম রহ ঃযব ড়িৎষফ?) এটার বিরুদ্ধে তো প্রতিবাদ আছে, আন্দোলন আছে, এখন যে লেভেলে আছে, সেটা পরে এটা উচ্চতর লেভেলে ওঠতে বাধ্য এবং ভিতরের ইন্টারনাল যে সমস্ত গ-গোল— ইন্টারনাল গ-গোলও তাদেরকে ভেতর থেকে ভেঙ্গে দিচ্ছে।

চিহ্ন : দেশে দেশে তাহলে সব রাষ্ট্রই, বা সব সরকারই তাহলে এরকমই?

বদরুদ্দীন উমর : মূলত তাই-ই। কোথায়ও কম-বেশি। আজকেই কলকাতা থেকে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন, ওখানকার অবস্থা বলছিলেন। ওখানকার অবস্থা আর এখানকার অবস্থা মূলত একই, খালি ডিগ্রীর তফাৎ। ওখানে যেটা ওয়ান ডিগ্রী আছে, এখানে সেটা ফাইভ ডিগ্রী আছে।

চিহ্ন : আচ্ছা, বাংলাদেশে চধঃৎরড়ঃরপ কোনো বুর্জোয়া দল— দেশপ্রেমিক কোনো বুর্জোয়া দল কি গঠন হতে পারে বা কোনো সম্ভাবনা আছে?

বদরুদ্দীন উমর : দেশপ্রেমিক হবে না কেন? দেশপ্রেমিক বুর্জোয়া যেটা, সি. পি. বি. (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি) আছে বা এ ধরনের কোনো অন্য অরগানাইজেশন আছে; এগুলো তো কোনো কাজের না, এগুলো তো প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, এগুলো কোনো কাজের না। সি. পি. বি.কে উচ্ছেদ করে দিয়ে বাকশাল ঢুকেছিল। তারপরে মুজিবুর রহমান মারা যাবার পরে তারা আবার জিয়াউর রহমানের সময় এসে বাকশালের গর্ভ থেকে সহোদর ভাই বেরলো, সি. পি. বি. আর আওয়ালীগ। একই গর্ভ থেকে তো তাদের জন্ম।

চিহ্ন : জিয়াউর রহমান তো সমর্থন করল?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ।

চিহ্ন : রাজনৈতিক কথা— যেটি বিষয় সেটি হচ্ছে যে, আপনি তো ঐ একটু পিছনের সেটা হচ্ছে যে সিক্সটি নাইনে রাজশাহী ছেড়ে চলে আসলেন ঢাকায়, তারপরে কী কোনো চাকরিতে ছিলেন আপনি?

বদরুদ্দীন উমর : না। চাকুরিতে যাই নি। সেটারও একটা কাহিনি বলি। আমি আমার জীবনী লিখেছি, এটা আমার তৃতীয় খ-ে আছে। চাকরিতে যাব না ঠিক করেছিলাম। একদিন রাজ্জাক সাহেব এসে বললেন, আপনি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে আপনি রিডারের কাজ করেন। আমি বললাম বলেন কী, আমি রিডার হব ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে? আরে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি একটা, রাজনীতি করছি এখানে। তো রাজ্জাক সাহেব তো লেগে থাকলেন, কিছুতেই ছাড়েন না। উনি শেষে বললেন যে, না কিছুই করতে হবে না, দরখাস্তও করতে হবে না, ইন্টারভিউও করতে হবে না, কিছুই করতে হবে না । ইট উইল বি অফার টু ইউ। এটা আপনি একসেপ্ট করলে আপনার চাকরি হবে। আর চাকরি ছাড়ার কথা যেহেতেু ছেড়ে এসেছেন বলছেন, রাজনীতি করেন। আমি বললাম, না আমি ফুল তো রাজনীতি করব। তাহলে সেটা যদি দেখেন যে অসুবিধা হচ্ছে, চাকরি ছেড়ে দিতে অসুবিধা কি? চাকরি করেন, আবার ছেড়ে দেবেন তখন। আচ্ছা, এই হলো গল্প। তারপর রেজিস্ট্রার অফিস থেকে আমার কাছে খালি একটা বায়োডাটা চেয়ে পাঠাল। সে বায়োডাটাটা আমি পাঠিয়ে দিলাম। তারপরে রাজ্জাক সাহেব ঐদিন বললেন যে, এটা একাডেমিক কাউন্সিলে পাশ হয়ে গেছে। তারপর সিন্ডিকেট না কি বলে? তারপরে রাজ্জাক সাহেবের আর কথা নাই। কিছু কথা শোনা যায় না। এমন সময় ড. মোশাররফ হোসেনের কাছে শুনলাম কাহিনি যে, মোজাফ্ফর সাহেব শেখ মুজিবের কাছে গেছেন ওখানে, ইউনিভার্সিটির ব্যাপারে কিছু আলাপ-আলোচনা করার জন্য। তখন শেখ মুজিব মোজাফ্ফর সাহেবকে জিজ্ঞাস করেছে যে, আপনি কি উমরকে চাকরি দিচ্ছেন? আপনি চাকরি দিচ্ছেন শুনলাম? এমনভাবে জিজ্ঞাস করলেন যে, মোজাফ্ফর সাহেব প্রায় পায়খানা করে দেবার মতো অবস্থা আর কি! ভয়ের চোটে মোজাফ্ফর সাহেব বললেন যে, না না স্যর, উনি তো হোল্ড টাইম একজন পলিটিশিয়ান, উনাকে কি করে চাকরি দেয়া যেতে পারে, এ কথা তো ঠিক না তো। তো শেখ মুজিব তো আসল ব্যাপারটা বুঝেই নিল যে, মিথ্যা কথা বলছে। তারপরে মোজাফ্ফর সাহেব ফিরে গিয়ে একাডেমিক কাউন্সিলে যে রেজুলেশন ছিল, সেই রেজুলেশনটাকে পিস করে ফেলে দিলেন। এ সম্বন্ধে রাজ্জাক সাহেব আমাকে আর কিছুই বলেন নি। পরে আমি রাজ্জাক সাহেবকে জিজ্ঞাস করেছিলাম যে, ‘স্যর, আমি তো শুনলাম এইটা’। তো রাজ্জাক সাহেব বললেন যে, ‘কই আমি তো কিছুই জানি না’। আমি তো সারপ্রাইজড রাজ্জাক সাহেবের জবাবে যে রাজ্জাক সাহেব এত করে-টরে এসে তারপর কিছু জানলেন না, এটা আবার কি রকম হলো! তো এই হলো আমার চাকরির ইতিহাস।

চিহ্ন : তারপর তো রাজনীতিতে থেকে গেলেন? এখনও আছেন।

বদরুদ্দীন উমর : থেকে গেলেন মানে রাজনীতির কারণেই এসেছিলাম তো। আর আমি হঠাৎ করে তো আসিনি আমি আমার আত্মজীবনীতেও লিখেছি এবং জীবনেও আমার হচ্ছে হঠাৎ করে আমি কোনো কাজ করিনি। এই যে ৫ম খ-ে বা শেষ খ-ের ভূমিকাতেও লিখেছি যে, হঠাৎ করে আমি কোনো কাজ করিনি। আমি রাজনীতি করব, এটা আমি অক্সফোর্ডেই ঠিক করেছিলাম। রাজনীতি করব এবং তারপর রাজশাহীতে কিছুদিন মাস্টারি করব, তারপর আমি রাজনীতি করব, তারপর ঘটনাচক্রে সরকারের সাথে আমার গোলমাল লেগে গেল,  তারপর সিক্সটি এইটে আমি তখন চাকরি ছেড়ে দিলাম ডিসগাস্ট হয়ে। কিন্তু আমি চাকরি ছাড়ব, রাজনীতি করব, এটা আমি অনেক আগেই ঠিক করেছিলাম, কিন্তু আমি হঠাৎ করে জ্যাম্প এটা করতে চাই নি। ধীরে ধীরে চৎবধঢ়ৎবফ নু ঃযব ংবষভ-ভড়ৎ-ফবধঃয। আমার লেখাটেখা তো আরম্ভ হয়ে গেছে তেষট্টি সাল থেকে। আর লেখাতে আমাদের যে রোল, পার্টিকুলার আমার যে ভূমিকা পাকিস্তান আমলে, সিক্সটিজের দিকে, কে তার খবর রাখে? আরে বাবা আসল কালচারাল কাজ, থিয়োরিটিক্যাল কাজ, তাত্ত্বিকভাবে কাজ, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কাজ, কে করেছে? আর এই সমস্ত বড় বড় অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা কোথায় ছিলেন তখন? কী করেছিলেন তারা? পরে বড় বড় যে পা-া, বুদ্ধিজীবী এসব দেখা যায়, তারা কোথায় ছিল? রাজশাহী ইউনিভার্সিতেই বরং কিছু শিক্ষক ছিল, যারা এটাকে একজিস্ট করেছিল। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তখন কেউ ছিলই না, সেটা রাজশাহী ইউনিভার্সিটির একটা ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল বলা চলে, আমাদের সময়টা।

চিহ্ন : মৌলবাদি রিস্টাব্লিস কী শেখ মুজিবুর রহমান করেছিল?

বদরুদ্দীন উমর : করেনি, কাকে শাস্তি দিয়েছিল? তাদেরকে তো ছেড়ে দিয়েছিল! তারপরে যারা আসল ক্রিমিনাল ছিল, তাদেরকে ছেড়ে দিল না? ১৯৫ জন যে আর্মি অফিসার তাদেরকে ছেড়ে দিল। তার সবচেয়ে কেলেঙ্কারি কাজ ভুট্টোকে নিয়ে আসা। ভুট্টো ছিল সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল, সিভিল ক্রিমিনাল একাত্তর সালের। কুলদীপ নায়ার পরে একটা ইন্টারভিউ করে তাকে— আমি তো এসব কথা অনেক লিখেছি বইতে, অন্য জায়গাতেও লিখেছি। এসব কেলেঙ্কোরি তিনি করলেন! যেখানে ভুট্টোকে ডেকে জবপবঢ়ঃরড়হ দেয়া হলো ইত্যাদি, সেখানে আওয়ামীলীগের কী মোরাল জাস্টিবিলিটি থাকতে পারে? এদের শাস্তি হওয়া দরকার ছিল, কিন্তু আওয়ামীলীগের কি বেসিক থাকতে পারে, মোরাল কি বেসিক থাকতে পারে। যেখানে শেখ মুজিব নিজেই এদেরকে মাফ করে দিয়ে চলে গেছে, ভুট্টোকে নিয়ে এসে জবপবঢ়ঃরড়হ দিয়েছে এখানে। আমার প্রিয় বন্ধু বলে গালে চুমু খাওয়া!

চিহ্ন : জিয়াউর রহমান সম্পর্কে একটা বড় অভিযোগ, আপনার আফটার সেভেন্টি ফাইভে জামায়াত ইসলামীকে ৎবযধনরষরঃধঃব করা। সে অভিযোগটা—

বদরুদ্দীন উমর : শেখ মুজিব বিবৃতি দিয়ে সেখানে বলেছিলেন, তাদেরকে দেশ গড়ার কাজে আহ্বান করেছিল। তো জিয়াউর রহমান সেই কাজটাই করল। দেশ গড়ার কাজে আহ্বান করলে তো তাদেরকে রাজনীতি করতে দিতে হবে, তাদেরকে পার্টি করতে দিতে হবে। এইটার ধারাবাহিকতা আছে তো। আসলে লোক ঝপরবহঃরভরপধষষু এগুলো অহধষুংরং করে না। ঝপরবহঃরভরপধষষু ফলোআপ সব মতলববাজি! কোনোটা বললে মতলব হাসিল হবে, এইটাই হলো তাদের বক্তব্য। ইতিহাসকে তো ইতিহাস হিসাবে দেখা হয় না। তথ্যকে হত্যা করা হয়, মিথ্যা তথ্য ঢোকানো হয়, ‘হারামজাদা তথ্য’ ঢোকানো হয়!

চিহ্ন : ‘হারামজাদা তথ্য’ এই জিনিসটা একটু ব্যাখ্যা করেন।

বদরুদ্দীন উমর : উদোরপি-ি বুধোর ঘাড়ে! হারামজাদা মানে তো তাই। (হাসি) উদোরপি-ি বুধোর ঘাড়ে, হারামজাদা মানে তাই না? যে কাজ যে করেনি, তাকে সেই কাজ সে করেছে বলা; যে কাজ সে করেছে, সে কাজ থেকে বাতিল, তাকে রেহাই দেয়া, এসব করেছে। আমরা যে চুয়াত্তর সালে ‘আইন সাহায্য কমিটি’ করেছিলাম, ‘মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটি’। আমি এটা মূলত অরগানাইজ করেছিলাম, আমার সাথে অনেকে ছিল, মওদুদ ছিল, এনায়েতউল্লাহ ছিল, সিকান্দার আবু জাফর ছিল—  এদেরকে একবার ইনভলভড্ করেছিলাম। এই যে আওয়ামীলীগের যে অত্যাচার-নির্যাতন, তার বিরুদ্ধে আমরা আইন সাহায্য কমিটি করেছিলাম, কেস করেছিলাম, কেসে জিতেও ছিলাম। কাজেই কথা হচ্ছে, সে সময় জাসদের কেসও আমরা করেছিলাম, শাজাহানের কেস— শাজাহানের খুন! শাজাহান নামে জাসদের একজন কর্মীকে খুন করেছিল। এই শান্তি সেনের স্ত্রী অরুণা সেন, তাদের ওপর কি অত্যাচার করেছিল। অরুণা সেনের একটা স্টেস্টমেন্ট আমরা সংস্কৃতিতে ছেপেছিলাম উনি বেরিয়ে আসার পর। ঝুলিয়ে রাখত উলঙ্গ করে, চেইন টাঙ্গিয়ে রাখত ঐ ক্যাম্পগুলোতে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পগুলোতে। ওরে বাপরে! যে অত্যাচার করেছিল, এমনিই তো সাড়ে তিন বছর একবারে উৎখাত হয়ে গেল, এটা তো এমনিতে হয়নি! ঐ লোক কোনো জায়গায় ছিল তার জনপ্রিয়তা, আর কোনো জায়গায় পড়লো এসে! এগুলো তো ব্যাখ্যা করতে হবে, এগুলো আওয়ামীলীগারদেরকেও ব্যাখ্যা করতে হবে, কী জন্যে এটা হলো? কতকগুলো বেঈমান এটা করেছিল বললে তো চলবে না! ব্যাখ্যা করবে কে?

চিহ্ন : জনপ্রিয়তা তবে বাস্তবত ছিল?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ বাস্তবত ছিল। অবশ্যই ছিল। শেখ মুজিব দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা যে বললাম যে, লোকে মনে করেছিল যে, না সে ন্যাশনাল লিবারেশনের জন্যই দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ছে, সেটার ওপরে বেজ করেই তো তার জনপ্রিয়তা। এবং সাঙ্ঘাতিক জনপ্রিয় ছিল তার। (যে বললাম শেখ মুজিব ১০ই জানুয়ারি) তার যে জনপ্রিয়তা ছিল, গান্ধী, জিন্নাহ, নেহেরু, পাটেল কারো থেকে কম ছিল না। মানুষ তো তাকে দিয়েছিল, দুই হাতে দিয়েছিল। সাড়ে তিন বছরের শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর আওয়ামীলীগের একটা লোক বেরিয়ে আসেনি! একটা পোস্টার দেয়নি, একটা চিকা দেয়নি, কোনো মিছিল হয়নি, কোনো মিটিং হয়নি! এমনকি রক্ষীবাহিনী পর্যন্ত কোথায় গায়েব হয়ে গেল! তো এজন্য ব্যাখা করতে হবে। এগুলো নিয়ে তো কেউ কশ্চিনও করে না, কেউ ব্যাখ্যাও করে না। এদেশে তো ইতিহাস বলে কিছু নাই! আমার একটা বই আছে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা বলে, তাতে আমি এ বিষয়ে লিখেছি। কেউ পড়ে-টড়ে তো না। অনেকে বই নিয়ে রাখে, কিন্তু পড়ে না! কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে ‘সোনার জলে দাগ পড়ে না কেউ খোলে না পাতা/ অস্বাদিত মধু যেন যুথি অনাঘ্রাতা’ —এই বেশির ভাগ বই-ই তাই। লাইব্রেরির বই অনেকে কিনে নিয়ে যায়, লাইব্রেরি কেনে, কিনে রেখে দেয়! ভাষা আন্দোলনের বই আমার কটা লোক পড়েছে, কটা লোক বলতে পারে যে, প্রথম খ- থেকে শেষ খ- বা তিন খ- সে পুরো পড়েছে? চিহ্ন : সবটা পড়িনি।

বদরুদ্দীন উমর : এইতো বলছি, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কেউ পড়েনি, খাবলে খাবলে হয়তো কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু পড়েছে। এভাবে তো পড়া হয় না, আসল স্কলারশিপ তো অন্যরকম।

চিহ্ন : আপনি শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে আসলেন, তাহলে এই পঞ্চাশ বছর প্রায় রাজনীতির বয়স, তো এটার এচিভমেন্টটা কী?

বদরুদ্দীন উমর : রাজনীতিতে এসেও আমি শিক্ষকতার কাজই করেছি, তারপরে এসে আমি একশটার ওপর বই লিখেছি। অন্যভাবে শিক্ষকতা করেছি, কর্মীদের সাথে আলোচনা করেছি। বইপত্র লিখে আমি মানুষকে চেষ্টা করেছি, যতটা আমার দিক থেকে দেওয়ার ততটা। নিজে পড়াশুনার চেষ্টা করেছি, আমি যে কাজগুলো করেছি, তার মধ্যে অনেকগুলো তো গবেষণামূলক কাজও আছে। এই গবেষণামূলক কাজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকরা লাইব্রেরির মধ্যে ঢুকে বসে নিশ্চিতভাবে করে। আমি তো দৌড়াতে দৌড়াতে করেছি, আমাকে সমস্ত তথ্য নিজে থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। সংগ্রহ করা তথ্যের ওপর আমি ভাষা আন্দোলনের বই লিখিনি। রাজ্জাক সাহেব বলেছিলেন, বইটার আসল ইম্পোর্টেন্ট দিক হল যে, মেথডোলোজি পদ্ধতি— কী মেথড আমি এখানে ব্যবহার করেছি।

চিহ্ন : লেখালেখির মধ্য দিয়েই রাজনীতিটা ছিল?

বদরুদ্দীন উমর : লেখালেখির মধ্যে দিয়ে না, আমি লিখেছি, আমার এই পঞ্চম খ-েও লিখেছি, অনেক জায়গায় লিখেছি যে, ‘আমি লিখছি অনেক, কিন্তু আমি কোনো সাহিত্যিক নই’। সাহিত্যচর্চার জন্য আমি লিখিনি, আমি যা কিছু লিখেছি সমস্ত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রয়োজনে লিখেছি।

চিহ্ন : অনেকেই বলে যে, আপনি বামপন্থা তাত্ত্বিক। আপনি কিভাবে নেন এই কথাটাকে?

বদরুদ্দীন উমর : না, তাত্ত্বিক তো বটেই। আর বামপন্থি যে অর্থে এখানে…

চিহ্ন : তাহলে তত্ত্ব এবং প্রয়োগ এটার কী কোনো ফারাক আছে?

বদরুদ্দীন উমর : প্রয়োগ করার জন্য আমি কি কাজ করেছি, পঞ্চম খ-ে বর্ণনা করেছি কি কাজ করেছি আমি। কিন্তু বললাম তো যে, দেশের যে অবস্থা হয়ে আছে, এইখানে তো আমি ম্যাজিক দেখাতে পারি না! কথা হচ্ছে যে, একটা দেশে যদি ভাল সুশাসন থাকে, সুব্যবস্থা থাকে, সুবিচার থাকে, ভালো ব্যবস্থা থাকে, সেই দেশ খারাপ লোকও ভালো করে, একটা খারাপ চরিত্রকেও ভালো চরিত্র রূপান্তরিত করে। আর একটা দেশ যদি খারাপ হয় বাংলাদেশের মত, তাহলে ভালো লোককেও তারা খারাপ করে দেবে, তাই তো আমি দেখেছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যেও, সহকর্মীদের মধ্যেও যারা ছিল, তাদের চরিত্র কী বাংলাদেশ হওয়ার আগের মত যা ছিল, পরে তাই ছিল? নাহ্! আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেককেই নষ্ট হতে দেখেছি, ভালো মানুষ সব নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি, আমাদের অরগানাইজেশনের লোকজন এসেছে, তাদের দেখেছি পরে বদমায়েশে টার্ন আউট করেছে! একটা দেশের যেখানে খারাপ হয়ে গেছে সবকিছু, সেখানে আপনি খালি দেখবেন যে, ভালো মানুষ খারাপ হয়ে যাচ্ছে, খারাপ মানুষ ভালো হচ্ছে আপনি দেখেছেন? ভালো মানুষ খারাপ হয়ে গেছে এরকম অজ¯্র পাবেন আপনি, আপনার নিজের অভিজ্ঞতাতেই পাবেন ভালো মানুষ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

চিহ্ন : তো একটা দেশ খারাপ হয়ে গেল কেন, সেটাও তো স্যর একটা প্রশ্ন? আপনার চোখের সামনেই তো সেটা ঘটল।

বদরুদ্দীন উমর : খারাপ হয়ে গেল কেন, এ ব্যাপারে আমি অজ¯্র লিখেছি, আপনি কিছু পড়েন নি, আমি কী করতে পারি। আমি অজ¯্র লিখেছি, আর কেউ লেখেনি, আমি লিখেছি যে, কেন এটা হয়েছে। কেউ না-পড়লে আমি কী করতে পারি!

চিহ্ন : কেউ কী লিখেনি, শুধু আপনিই লিখেছেন?

বদরুদ্দীন উমর : লিখেছে অনেকেই, কিন্তু যেভাবে লেখা দরকার, মার্কসিস্ট হিসাবে সেভাবে কেউ লেখেনি, এটা আমি বলব। অন্য লোকরা কিছু করেনি, আমিই সব করেছি, এটা আমি বলছি না। কিন্তু যেভাবে, সঠিকভাবে করা দরকার, মার্কসীয় পদ্ধতিতে করা দরকার বলে আমি মনে করি, সেরকম এ্যনালাইসিস আর কেউ করেছে বলে আমি জানি না আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে! অত অহমিকা, অত উদ্ধত আমার নাই যে, আমিই খালি এই ব্যপারে চিন্তা করেছি বা কাজ করেছি। আমি কেবল সঠিকভাবে এইটা করতে চেষ্টা করেছি।

চিহ্ন : আর একটা কথা স্যর, সেটা হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও কৃষক নিয়ে যে আপনি বলেছিলেন, সেই কৃষক এখনও তো ওভাবেই আছে, ওভাবেই শোষিত হচ্ছে?

বদরুদ্দীন উমর : তাই আবার থাকে নাকি? আপনি তেভাগা আন্দোলনের সময় কৃষককে তেভাগা দিতে হবে বলে আন্দোলনের যেভাবে নামিয়েছিলেন, এখন পারবেন? তেভাগার কথা বললে, এখন শুনবে নাকি? পুরো গ্রামের স্ট্রাকচার ইমপ্লয়মেন্ট থেকে আরম্ভ করে গ্রামের যে ব্রেকডাউন হয়ে গেছে, পুরো সমাজটা ভেঙ্গে গেছে যেভাবে, এটা কি সেই পয়তাল্লিশ সালের মত এখনও আছে নাকি? ফিউডালিজম— যে ফিউডালিজমের কথা বলা হয়, এখানে ফিউডালিজম ওইভাবে আছে নাকি? ফিউডালিজম ভ্যালুর মধ্যে আছে, চিন্তা-চেতনার মধ্যে আছে, সংস্কৃতির মধ্যে পাওয়ারফুলি আছে, কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে কি আছে? আছে রেশ আছে তা খুব উইক!

চিহ্ন : আচ্ছা, বলছি এখন কী সেইভাবে কৃষক আন্দোলন সম্ভব?

বদরুদ্দীন উমর : কৃষক আন্দোলন সম্ভব না। এখন তো গ্রামাঞ্চলে শুধু কৃষক নেই, গ্রামঞ্চলে আন্দোলন সম্ভব কি না তাই বল, শুধু চবধংধহঃ সড়াবসবহঃ এখানে হবে না। কারণ, চবধংধহঃ সড়াবসবহঃ হয় সেখানেই যেখানে শুধু চবধংধহঃ-ই থাকে। আর এখানে তো কোথায় কতরকম স্ট্রাকচারাল চেইঞ্জ হয়েছে, কতরকম ইমপ্লয়মেন্ট তৈরি হয়েছে, ইটের ভাটা, মুরগির খামার, গরুর খামার, বিদ্যুৎ মেশিন তৈরির মেরামতের কারখানা— এখানে তোমার বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে, সেখানে নির্মাণ-শ্রমিক এবং কতরকমভাবে যে এখানে হয়েছে…।

চিহ্ন : ভূমি মালিকানার একধরনের পরিবর্তন এসেছে…

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। কৃষক আছে সেখানে, কাজেই আগে যেভাবে কৃষক আন্দোলনের চিন্তা করা হতো, এখন তো সেইভাবে চিন্তা করলে হবে না, আমরা সেইভাবে চিন্তাও করি না। এখন লোক অনেক বেশি পলিটিসাইড হয়েছে। এখন পুলিশ— পুলিশ এখন যে রকম ফ্যাক্টর, গ্রামে এখন যারা আওয়ামীলীগের নেতা বা স্থানীয় যারা প্রশাসক, ইউনিয়ন কাউন্সিলে নির্বাচিত হচ্ছে যারা, এরা হচ্ছে একটা টার্গেট গ্রামাঞ্চলের, অরগানাইজড্ করতে পারলে এদের বিরুদ্ধে আগে ‘বদমাস’ বলা যেত, চেনাতো যে এইগুলো বদলোক, সেই গ্রামের দিকে বয়রা হচ্ছে বদলোক আসলে। এখন আপনার যে মহাজোটের ঋণ দিচ্ছে, তার চেয়ে আওয়ামীলীগের স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বরদেরকে অনেক বেশি বড় বদলোক বলে মনে করা লাগবে।

চিহ্ন : কিন্তু শোষণের চিত্রটা তো আছেই ব্যাপকভাবে?

বদরুদ্দীন উমর : শোষণের চিত্র আছে, কিন্তু শোষণের ধরণ তো অনেক পাল্টেছে। একেবারেই পাল্টে গেছে তা নয়, আগেকার শোষণের ব্যবস্থাও আছে এখানে, একেকটা লোক মনে করে— বামপন্থি নেতা, যেমন টিপু বিশ্বাস— টিপু বিশ্বাস মনে করেন এখনও বাংলাদেশে সামন্তবাদ প্রথা আছে। তিনি মনে করেন চীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; ভারত যে একটা ঊসঢ়বৎড়ৎ পড়ঁহঃৎু, এটা তিনি মনে করেন না। তার কারণ এইসব মনে করার তো কোনো ঔষুধ নাই, চিকিৎসা নাই তো কোনো। (হাসি) এখন কী করব, কিন্তু তারাও আছেন ফিল্ডে এবং টিপু বিশ্বাসেরও গুণ আছে। টিপু বিশ্বাস অন্য সি. পি. বি.তে যেটা করে, যারা ক্ষমতায় আছে, তাদের সাথে লাইন লাগিয়ে সুবিধাবাদ করা, এ করা, তা করা, এটা তো টিপু বিশ্বাস করছেন না।

চিহ্ন : স্যর এখন কী লিখছেন?

বদরুদ্দীন উমর : এখন আর কী লিখব…।

চিহ্ন : মানে লেখালেখি তো আছে, নিশ্চয়ই চলছে

বদরুদ্দীন উমর : লেখালেখি তো চলছে, ঐযে বললাম কিছুই তো পড়েন না, সেজন্য কি করব আর আমি! কি লেখালেখি করছি, সেটার তো কিছুই পড়েন না! লেখালেখি নিয়মিতভাবেই করে থাকি, সংস্কৃতিও পড়েন না নিশ্চয়ই?

চিহ্ন : না সংস্কৃতি পড়ছি।

বদরুদ্দীন উমর : তবে সংস্কৃতি যদি পড়ে থাকেন, তাহলে লেখালেখি করি সংস্কৃতিতে সপ্তাহে দৈনিক কাগজগুলোতে লেখালেখি করি। এছাড়াও লেখালেখি করি।

চিহ্ন : যুগান্তর-এ লিখছেন?

বদরুদ্দীন উমর : সমকালেও লিখতাম, তাদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি। তারা নানারকম হস্তক্ষেপ, এটা-সেটা নানারকম! যুগান্তরেও হস্তক্ষেপ করে, সেটা সামান্য। তো লেখালেখি চলছে, তবে পরিমাণগতভাবে কমে গেছে। কাজ কমে গেছে। আগের মত অত কাজ করতে পারি না। এখন দিনে হয়তো চার-পাঁচ ঘণ্টা পড়াশুনা-পড়ালেখা চলে। পড়াও একটা বড় অংশ।

চিহ্ন : আমাদের দেশে যে পলিটিকাল রাজনীতি— অর্থাৎ রাজনীতি যারা করে, তাদের মধ্যে যারা একটু ডেভোলাপড্, তারা রাজনৈতিক বইপত্রই পড়ে, মানে যতটুকু পড়ে, রাজনৈতিক বইপত্রই পড়ে। কিন্তু রাজনীতি যারা করে, তাদের জন্য সাহিত্য পড়া জরুরি কি না?

বদরুদ্দীন উমর : সাহিত্য পড়া জরুরি মানে, সাহিত্য পড়া জরুরি, ইতিহাস পড়া জরুরি। ইতিহাস যদি একজন না-জানে, সাহিত্য যদি একজন চর্চা না-করে। আমরা তো  উপন্যাস ধরো পড়ে থাকি…

চিহ্ন : আপনার মধ্যে বাংলাদেশের কোনো সাহিত্যিকের প্রভাব আছে বলে আপনি মনে করেন? যে তার লেখা আপনার ভালো লাগে?

বদরুদ্দীন উমর : সেটা তো আমি বলতে পারব না। সেটা তোমাদেরকেই বলতে হবে।

চিহ্ন : না, আপনি কাকে পছন্দ করেন? মানে বাংলাদেশের লেখা?

বদরুদ্দীন উমর : বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে শওকত আলীকে আমি মনে করি খুব ইমপর্টেন্ট। ইলিয়াস ইমপর্টেন্ট। দুজন খুব ইমপর্টেন্ট।

চিহ্ন : আপনার ওপর প্রভাব আছে, আপনার চিন্তা-ভাবনার ওপর প্রভাব আছে এরকম কোনো সাহিত্যিক?

বদরুদ্দীন উমর : না। আমার চিন্তা-ভাবনার ওপর প্রভাব আছে, এরকম কোনো সাহিত্যিক নেই, এইটা আমি সবসময়ই বলি। অনেকে আমাকে বলেছে, কে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে বা কিসের দ্বারা আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন? আমি বলি যে, না, এরকম আমার কেউ নাই। কোনো একজনই আমাকে অনুপ্রাণিত করেনি, বরং অনুপ্রাণিত করেছে অনেক লোকই, অনেক লোকের দ্বারাই আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি, অনেক পড়াশুনা করে আমি বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়েছি। কোনো একটা লোক আমাকে প্রভাবিত করেছে বা কোনো একটা বই আমাকে প্রভাবিত করেছে, যার ফলে আমি— আমি হয়েছি এমনটা বলা যাবে না।

চিহ্ন : আপনার বাবা তো প্রভাবিত করেছে?

বদরুদ্দীন উমর : না, আমার বাবার প্রভাবের মধ্যেও না, তার ছাতার তলায় তো অল্পদিনই ছিলাম। ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময় সেই ছাতা বন্ধ করতাম আর খুলতাম। তারপরে ইউনিভার্সিটি ছাড়া তো আর খুলিনি।

চিহ্ন : এখন তো রবীন্দ্রনাথের একটা প্রচার-প্রচারণা  খুব ব্যাপকভাবে চলে। এখন এই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার যে…

বদরুদ্দীন উমর : রবীন্দ্রনাথকে মনে করি, তিনি একজন দেশপ্রমিক ছিলেন, একজন লিবারাল বুর্জোয়া ছিলেন এবং তাঁর মধ্যে সদিচ্ছার অভাব ছিল না। কিন্তু নিজে তাঁর শ্রেণির কারাগারে আবদ্ধ ছিলেন। এটা তিনি নিজেই বলেছেন। বলছেন যে, একবার গ্রামাঞ্চলে শিলাইদহতে কৃষকদেরকে জড়ো করে বললেন যে, কো-অপেরেটিভ করার কথা ইত্যাদি ভালো করে বুঝালেন। তারা অনেকটা বুঝল, অনেকটা বুঝল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলল, তাহলে কিন্তু আমরা তো নিজে লেখাপড়া জানি না, কিছুই না, আমাদেরকে করবে কে? তখন রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে, আমি তো তাদেরকে বলতে পারলাম না যে, আমি করব, আমার যে সীমাবদ্ধতা কিন্তু উনি বিষয়টা বুঝতেন যে কো-অপরেটিভ দরকার। রাশিয়া ঘুরে এসে রাশিয়ার কৃষকদের ওপরে যে কথাগুলি লিখেছেন, তার থেকে আমি কলকাতার এক বক্তৃতায়— ওনার দেড়শতম জন্মবার্ষিকীতে কলকাতায় বলেছিলাম তাঁর ইউনিভার্সালিজমের কথা এবং সেখানে রাশিয়ার চিঠিকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করেছিলাম, রাশিয়ার চিঠিকে এবং কৃষকদের অবস্থা দেখে তিনি দেশের কৃষকদের অবস্থা এবং ঐখানের কৃষকদের অবস্থা তুলনা করে— তাঁর মধ্যে যে একটা দরদী-মন ছিল, সেটা তো অস্বীকার করার কিছু নাই। কিন্তু নিজেকে আবার তিনি বলেছেন, একজন জাত বুর্জোয়া। বুর্জোয়া ছিলেন, এটা ভুললে চলবে না যে তিনি একজন জমিদার ছিলেন, তিনি একজন বুর্জোয়া ছিলেন। তাঁকে যদি এখন চারু মজুমদার ভাবা যায়, এটা তো স্টুপিডি ছাড়া আর কিছু নয়! তিনি যা ছিলেন তার মধ্যেই তাঁকে বিচার করতে হবে।

চিহ্ন : আপনি তো নজরুল ইসলাম সম্পর্কেও ভালো প্রবন্ধ লিখেছেন, ঐযে ‘নজরুল অহিফেন’

বদরুদ্দীন উমর : ও ‘নজরুল অহিফেন’! সেটা নজরুল ইসলামকে ব্যবহার করেছে কিভাবে, সেইটা আর কি। মুসলমান বলে তাকে একটা উপস্থিত করার চেষ্টা আর কি। সে অনেক আগে রাজশাহী থাকতে। আপনি খুব চিন্তা-ভাবনা করে আমাকে ইন্টারভিউ করতে আসেন নি কিন্তু? কী কী প্রশ্ন আপনি ঠিক মেথডিকালি করবেন?

চিহ্ন : একটা রিটেন আমরা নিয়ে আসব কিন্তু সেটা…

বদরুদ্দীন উমর : না, রিটেন নিয়ে আসা ওইরকম না, সেটা তো উত্তর দিতে গেলে হবে না। কতকগুলো পয়েন্টে, এই জিনিসগুলো পরপর জিজ্ঞেস করবেন আর কি, এরকম জিনিস থাকলে সুবিধা হতো আর কি।

চিহ্ন : সেটা হতো…

বদরুদ্দীন উমর : কমিউনিস্টদের এখানে যে ভূমিকা, এটা তো ডিসগ্রেসফুল একটা ভূমিকা। একাত্তর সালের যে ভূমিকা তাদের, এর ওপর তো আমার একটা বই আছে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং কমিউনিস্টদের একটা সুযোগ ছিল সেখানে টেকওভার করার। সেই সময় ন্যাশনাল লিবারেশন স্ট্রাগলটাকে নিয়ে যাবার একটা সুযোগ-সুবিধা ছিল, কিন্তু ইডিয়টরা কিছুই বুঝত না, মূর্খ ছিল এবং খালি চীন কী বলছে, রাশিয়া কী বলছে এদিকে তাকিয়ে থাকত আর কি এবং কোনোরকম কমনসেন্স ছিল না। এইখানকার কমিউনিস্টদের একটা মস্ত বড়-ই হচ্ছে কমনসেন্সের অভাব একদম! সামনে যেটা দেখছে, সেটা না, সামনে একটা বিড়াল দেখছে, কিন্তু চীন যদি বলে যে, না, এটা কুকুর, বলবে হ্যাঁ এটা কুকুর-ই বটে। এই করে তো এখানে সর্বনাশ করেছে লেফটিস্টরা আর এখানে যারা কমিউনিস্টরা ছিল, তাদের লেখাপড়া ছিল না। কমিউনিস্টদেরও কোনো লেখাপড়া নেই! এখানে কমিউনিস্ট নেতা দেখেছি, তাদেরও কোনো লেখাপড়া নেই, তাদের মার্কসিস্ট লিটারেচারও পড়া নাই ভালো করে, আর অন্য পড়া তো দূরের কথা! ইতিহাস পড়া নেই, ইকোনোমিক্স পড়া নেই, তাদের হিস্ট্রি পড়া নেই, তো কি করবেন!

চিহ্ন : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট কারা ছিল, ঐ ষাটে রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী…

বদরুদ্দীন উমর : এগুলো তো কিছু না, এগুলো তো কোনো সময় আমরা মনে করিনি যে, এরা কমিউনিস্ট কিছু একটা— এগুলো বাজে দালাল ছিল, বুর্জোয়া ছোকরা সব! এগুলো যা ছিল, এখন যা দেখছেন, এটা আসলে তখন যা ছিল, সেটাই সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এইটা পরিণত হয়েছে।

চিহ্ন : তাহলে কী জাসদ যারা ছিল তারা— হক, তোয়াহা কিংবা…

বদরুদ্দীন উমর : না, হক, তোয়াহাকে আমি মেননের সাথে তুলনা করব কেন?

চিহ্ন : না কারা ছিল কমিউনিস্ট? মানে…

বদরুদ্দীন উমর : কমিউনিস্ট তখন এরা ছোকরা ছিল, এরা তো ছাত্র রাজনীতি করত ষাটের দশকে, আসল লোক তো যারা রাজনীতিতে ছিল, তারা হচ্ছে তো তোয়হা, আবদুল হক, সুবন্ত দস্তিদার, মণি সিং ইত্যাদি।

চিহ্ন : ফরহাদ তো পরে আসল?

বদরুদ্দীন উমর : ফরহাদ অনেক পরে আসল। ফরহাদ থেকে ডি-জেনারেশন— এখান থেকে পুরো অন্যরকম একটা ইয়ে…

চিহ্ন : কিন্তু মনি সিং কিছু করতে পারলেন না তো? মনি সিংদের তো…

বদরুদ্দীন উমর : না, মনি সিংহের সেরকম কোনো যোগ্যতা ছিল না। মনি সিংহ অনেকটা প্রপাগ্যান্ডার ওপরে চলেছেন, একটা ভালো ফ্যামিলি থেকে উনি এসেছিলেন রাজনীতি করতে। তারপরে তার তো লেখাপড়া বিশেষ ছিল না। লেখাপড়া বলব না, পড়াশুনা যাকে বলে— পড়াশুনা ছিল না এবং সেরকম কোনো যোগ্যতাও ছিল না। খুবই আনফরচুনেট আমি এখানে যারা ছিলেন পার্টিশনের আগে কমিউনিস্টরা, তাদেরকে তো দেখিনি, যারা ছিল সাতচল্লিশ সালের পরে থেকে গিয়েছিল এইখানে, তাদেরকেই মোটমুটিভাবে কয়েকজন বাদে প্রায় সকলের সাথেই পরিচয় হয়েছিল আমার। কারো দ্বারা আমি ইমপ্রেস্ট হইনি।

চিহ্ন : কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেও কী স্যর এরকম-ই ছিল?

বদরুদ্দীন উমর : পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া জানা লোক ছিল অনেক। লেখাপড়া জানা লোক ছিল যারা এখান থেকে গিয়েছিল, কিন্তু লেখাপড়া হলেই তো হবে না শুধু, আপনার পুরো দৃষ্টিভঙ্গি অন্যরকম হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে কি, আমার বর্ধমানেই তো ছিল। বর্ধমানে যারা ছিল, তারাই তো পশ্চিমবঙ্গে বড় নেতা হয়েছিল পরে, আমি ছেলেবেলা থেকে তাদেরকে দেখেছি। তাদের লেখাপড়া কত ছিল, তাদের পড়াশুনার চর্চা ছিল, তাদের চরিত্রবল ছিল কত, তারা পার্টির টাকা-পয়সা বাঁচানোর জন্য কি চেষ্টাই না করত! এখন কিছু করতে গেলে, আগে টাকা ফেল, তারপরে কাজ করব। একজন হোলটাইমার হতে গেলে— হোলটাইমারের নিয়ম হচ্ছে একজন পার্টিতে কাজ করতে করতে তার যদি স্বভাবটা প্রয়োজন হয় পার্টির সে আর কিছু করতে পারছে না, তার সংসার চালানোর জন্য তাকে ডধমব দিতে হবে, তাকে মজুরি দিতে হবে। আর এখন হচ্ছে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হোলটাইমার হবে, আগে সে হোলটাইমার তার কাজকর্ম কিছু না-করে বলবে যে, আমাকে এত টাকা যদি দাও আমি কাজ করব হোলটাইমারের মাসে এত টাকা!

চিহ্ন : না কিন্তু ঐ নব্বুইয়ে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফল করল, এইটা বলা হচ্ছে আর কি তাহলে আগের দিকে স্ট্যালিন, ক্রুশ্চেভ এদের যে দীর্ঘ একটা সময়, গোটা বিশ্বব্যাপী যে কমিউনিস্ট আন্দোলন, সে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতে কী স্যর এ ফল টা যে বাংলাদেশে কোনো কমিউনিস্ট লিডারশিপ তৈরি হলো না, কিংবা এরকম কিছু?

বদরুদ্দীন উমর : না না ওইটার সাথে তুলনা করতে হবে কেন, এখানে নিজেই বাংলাদেশের নিজের থেকেই।

চিহ্ন : এখন এম.এন. রায়, মোজাফ্ফর আহমদের পরে বাংলাদেশে…

বদরুদ্দীন উমর : এম.এন. রায় ইন্ডিয়া আসার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে চলে গিয়েছিলেন, তো দীর্ঘদিন আমেরিকায় ছিলেন, রাশিয়া ছিলেন, জার্মানীতে ছিলেন, এখানে ছিলেন। উনি তো পরে ১৯২৯ সালের পরে আর কোনো ঐভাবে আর মার্কসিস্ট থাকেননি। পরে উনি তো কংগ্রেসের মধ্যেও ছিলেন, উনি বেরিয়ে এসে র‌্যাডিকাল হিউমানিস পার্টি করলেন এবং এক ধরনের এন্টি-কমিউনিস্টে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু এম. এন. রায় সম্পর্কে বলব যে, এম. এন. রায়ের চেয়ে ইন্টালেকচুয়ালি ধনষব কোনো লোক ইন্ডিয়ান কমিউনিস্ট পার্টিতে আসে নি। উনি যদি ঠিক সৎ পথে থাকতেন, তাহলে একটা ইয়ে হত, তার সে যোগ্যতা ছিল।

চিহ্ন : কিন্তু এই কমিউনিস্টদের— এইটা কী স্যর আসলে সোভিয়েত ইউনিয়নে যেহেতু রাইজ করল না, সেই জন্য কী এই ব্যর্থতাটা এই দিকেও এসেছে, না এই রকম কোনোকিছু?

বদরুদ্দীন উমর : না, এখানে নিজের ভেতরে না-থাকলে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে হঠাৎ করে এসে লাভ নাই, নিজেদের মধ্যেই এই সমস্ত ছিল। এটা আমি অনেক আলোচনা করেছি, কেন ইন্ডিয়াতে হলো না, কেন ইন্ডিয়াতে রেভুলেশনটা হলো না, এর ওপর আমি অনেক আলোচনা করেছি। মুশকিল হচ্ছে, এটা পড়ার লোক নাই তো কেউ! আমি লিখেছি অনেক এসব বিষয়ে, এমন সমস্যা নাই যেগুলো ধরে লিখিনি বলা চলে। এই যে আমি একশ’র ওপর লিখেছি, কোনো আজে-বাজে লিখিনি, একবারে যেটা প্রয়োজনীয় জিনিস সেসব বই লিখেছি। কলকাতায় আমি একটা ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারে বক্তৃতা করেছিলাম ইন্ডিয়ার ওপরে একটা সাউথ-এশিয়ান কনফারেন্সে, সেখানে বাংলাদেশে এবং ইন্ডিয়াতে কেন রেভুলেশন হলো না এ বিষয়ে। আমার একটা বই আছে, গরংপবষষধহবড়ঁং-ৎিরঃরহম বলে, তাতে ‘লেফটিন বাংলাদেশ’ বলে একটা লেখা আছে, তাতেও আমি ঐ একই বক্তৃতা উল্লেখ করেছি।

চিহ্ন : আপনার যে রচনাবলি তার মধ্যে তো এই বইটা আছে?

বদরুদ্দীন উমর : সমগ্র রচনাবলি এখনও হয়নি তো!

চিহ্ন : যেটা হচ্ছে আর কি?

বদরুদ্দীন উমর : এখনও বেরয় নি। একটাও বেরয় নি। চোর-বদমাশ, ঐ যে ‘শ্রাবণ’-এর রাবীন আহসান, সে তো তিনটা বের করে ফেল করে গেল। এখন একজন বের করছে, সে তো পঁচিশ ভলিয়ম না, ত্রিশ ভলিয়ম বের করবে।

চিহ্ন : কারা করবে এটা?

বদরুদ্দীন উমর : এই এখানে ‘বাঙালা গবেষণা’ বলে একটা প্রকাশনা সংস্থা আছে, তারা করছে।

চিহ্ন : শ্রাবণ যে করতে শুরু করল?

বদরুদ্দীন উমর : চোর এটা, বদমাশ! সে তো এখন আওয়ামীলীগের হাসিনার জীবনী নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গাড়ি করে। তারপর সে তৌফিক এলাহীর বই বের করে, ঐযে বললাম না, ‘নষ্ট হয়ে যাওয়া ভালো, আর ভালো লোক নষ্ট হয়ে যাওয়া’। ভালো লোক মানে— সে একরকম ছিল, সে বরিশালের এক ছোকরা ছিল, ছোট ছিল, সেখান থেকে তুলে এনে কাসেম তাকে নিয়ে এসছিল এখানে, আমাদের অফিসে পড়ে থাকত, সেইখান থেকে তার উৎপত্তি-জন্ম, আমার কাছে সে অনেকভাবে ঋণী! বেঈমানি করেছিল শুধু আমার সাথে না, অরগানাইজেশনের সাথেই বেঈমানি করে চলে গেল। চোখের ওপর কত লোককে যে খারাপ হয়ে যেতে দেখলাম, তার ঠিক নেই!

চিহ্ন : স্যর আপনার এখানে স্ট্যালিনের ছবি দেখছি?

বদরুদ্দীন উমর : আপনার কী অসুবিধা করছে তাতে?

চিহ্ন : না স্যর, এর সম্পর্কে আপনার পার্সেপশনটা কী?

বদরুদ্দীন উমর : না না, এই প্রশ্ন আমাকে প্রথম করেছিল এক আমেরিকান, আমি তখন নারিন্দায় থাকতাম। এক আমেরিকান এসেছে আমার সাথে দেখা করতে, এই ছবিটা তখনও টাঙানো ছিল, আমাকে দেখে বলল, এখানে স্ট্যালিনের ছবি দেখছি? আমি বললাম, ‘ণবং, নবপধঁংব ধ নুমড়হব’ তখন তিনি বললেন, ‘ইউ এ্যান্ড বাই আর ম্যান হু কিলড বিলিয়ন ম্যান জো পিপল’। আমি বললাম, ‘ইউ সি আই অ্যাম ফার লেসন মান দ্যা স্ট্যালিন ফোরটি ফাইভ এ্যান্ড হিজ পজিশন আই উড এ কিলড এ লার্জার নাম্বার অব পিপল’। স্ট্যালিন যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে তৈরি করল, এত বড় একটা দেশ, তাকে খুনি-বদমাশ তারপরে এরকম সোস্যালিস্ট কনস্ট্রাক্টশন করল, একা দাঁড়িয়ে ঊসঢ়বৎড়ৎদের বিরুদ্ধে একটা দেশে। সে লোকটা চোর-ডাকাত-বদমাশ-খুনি! ঐ লোক যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোথা থেকে কোথায় তুলে নিয়ে গেছে, একদম সেই লোক এই রকম ছিল।

চিহ্ন : না, সাধারণত লেলিনের ছবি কিংবা লেলিন তো তার আগে কিন্তু লেলিন তারপরে আরো যারা যারা আছে, কিন্তু আপনি শুধু স্ট্যালিনের রেখেছেন সেই জন্য বললাম।

বদরুদ্দীন উমর : আপনার চোখ খারাপ হয়ে গেছে নাকি? পাশে ওখানে লেলিনের ছবি আছে।

চিহ্ন : না… ছোট্ট করে রেখেছেন তো!

বদরুদ্দীন উমর : ছোট ছোট মানে? আমাকে যে যেরকম দিয়েছে, আমি তো আর কিনতে যাইনি, আমাকে দুজন দিয়েছে। এইটা একজন দিয়েছে আর ঐটা একজন দিয়েছে, টাঙিয়ে রেখেছি ওখানে।

চিহ্ন : আপনার মার্কস, এঙ্গেলস, লেলিন— তিনটা আছে, কিন্তু ছোট! স্ট্যালিন বড় হয়ে গেছে…

বদরুদ্দীন উমর : ছবিটা বড় মানে, সেইটা বড় নয়। এটা আমার দাদুর ছবি আছে আরো বড়। তার মানে দাদুকে কি আমি লেলিন, স্ট্যালিনের চেয়ে বড় বলব?

চিহ্ন : না, এটা হয়তো পারিবারিক কারণে বড় হয়ে গেছে।

বদরুদ্দীন উমর : ওটা লোকের সৌজন্যের কারণে হয়েছে। ঐযে বললাম, একজন ঐটা দিয়েছে আর একজন এইটা দিয়েছে। আর স্ট্যালিনে এত অসুবিধা কি? স্ট্যালিন ওয়াজ এ গ্রেটম্যান। স্ট্যালিন যদি না-থাকত, তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে কিছু থাকতই না লেলিন মরে যাবার পরে। ধ াবৎু মৎবধঃসধহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে জয় করেছিল, এত অসুবিধা, একটা কমপ্লিটলি ব্যাকওয়ার্ড দেশ, সেই দেশকে কোথায় তুলে নিয়ে গেছে সেই ইংল্যান্ড-আমেরিকাকে হারিয়ে দিয়ে সোভিয়েত জার্মানিকে কনফোর্ড করেছিল। তারাই তো বার্লিন দখল করেছিল প্রথমে গিয়ে মেরে একদম— সোভিয়েত ইউনিয়নকে কি ধ্বংস করেছিল তখন ষাট লক্ষ লোক মেরে ফেলেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের।

চিহ্ন : রুশ সাহিত্য তো পড়েছেন? লাগে কেমন রুশ সাহিত্য?

বদরুদ্দীন উমর : আপনি প্রথম প্রশ্নটা করেছিলেন পড়েছেন কি না? মোটামুটি পড়েছি ক্লাসিক্যাল রুশ লিটারেচার পড়েছি।

চিহ্ন : দস্তয়ভস্কি, টলস্টয় এসব? পুশকিনের কবিতা আপনার পছন্দের?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ হ্যাঁ পুশকিনের কবিতা পড়েছি।

চিহ্ন : এদিকে মায়াকোভস্কি?

বদরুদ্দীন উমর : মায়াকোভস্কি আছে আমার কাছে। মায়াকোভস্কির একটা লম্বা কবিতা আছে পড়েছেন? লেলিনের ওপরে দীর্ঘকবিতা একটা মায়াকোভস্কির। লেলিনকে একবার জিজ্ঞাস করেছিল যে মায়াকোভস্কির কথা, লেলিন বলেছিলেন যে, ‘ইয়েস, বাট রিড পুশকিন’।

চিহ্ন : তো রাশিয়াতে যে বিপ্লব হলো তার একটা, মানে রাশিয়ার যে সাহিত্য সেইটা খুব…

বদরুদ্দীন উমর : না না, সে সোসাইটিটার কত ভেতর থেকে যে কত ক্লাস জন্ম হলো— মিডল ক্লাস, সেটা যে কত গধঃঁৎব ছিল, সেটা তো তার থেকে বোঝা যায়। আমাদের দেশের এখানে, লিটারেচার যে আছে, এই লিটারেচার কি সবই অভার রেটেডে? সাহিত্যিকরা— যারা গল্প লেখেন, তারা কি সব অভার রেটেড লেখেন? তিলকে তাল করে এখানে দেখান হয়! যখন ছাত্র ছিলাম সলিমুল্লাহ হলের এক বক্তৃতায় জোতির্ময় গুহঠাকুরতা বলেছিলেন, ‘যেখানে চন্দ্র সূর্য নেই, সেখানে জোনাকি আমাদের সম্বল’। এই গত মাসে আমি দুটো আফগান নভেল পড়েছি, তোমরা পড়ে থাকতে পারো, একটা হচ্ছে— ঞযব করঃব জঁহহবৎ (২০০৩), আরেকটা হচ্ছে— অ ঞযড়ঁংধহফ ঝঢ়ষবহফরফ ঝঁহং (২০০৭); যা আফগান-আমেরিকান লেখক কযধষবফ ঐড়ংংবরহর-এর লেখা। গধৎাবষড়ঁং গল্প আর কি! আমাদের এই দেশের কোনো লোক আছে, লিখেছে কোনো তাত্ত্বিক উপন্যাস, কিছু করতে পারবে? এখানকার লেখকরা উপন্যাস লিখতে জানে না, লিখতে গিয়ে আত্মজীবনী  না কি লেখে, লিখতে গিয়ে কি লিখে তার ঠিক নাই! এরকম লোকের অভাব নাই!

চিহ্ন : আমার মনে হয়, বিশেষ করে এখানকার, তরুণ লেখক যাদেরকে বলা হয়, সে তরুণ লেখকদের অবস্থা দেখি সবচেয়ে খারাপ!

বদরুদ্দীন উমর : এখানে ‘তরুণ’ অর্থে কাঁচা লিখতে হবে। আর কিছু আছে ‘কাছাখোলা’ লেখক। না, এখানে একচুয়ালি এত আন্দোলন হয়েছে, এ হয়েছে-তা হয়েছে, খালি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর শওকত আলী ছাড়া আর এরকম তো কেউ লেখে নি! এই যে এখানকার পলিটিক্যাল মুভমেন্ট যেগুলো হয়েছে, সেটা তো লেখে নি! এই যে আমার ছাত্র আছে, হাসান আজিজুল হক, এতো সেদিন বক্তৃতা দিয়েছে একটা, এতে আমি গিয়েছিলাম। যাই না এমনি, ও ছাত্র বলে, ও আমাকে ধরেছিল যাওয়ার জন্য, তাই গিয়েছিলাম ওখানে। একটা সাহিত্যিকের সমাজ, সামাজিক দায়িত্ব লিখেছে, যা হোক। ওর লেখার ডিটোরেট উবঃড়ৎরড়ৎধঃব করে গেছে… অনেক লেখা তার চিন্তাধারার পরিবর্তনের সাথে সাথে। কিন্তু যাই হোক এগুলো তো সাহিত্যিকের সামাজিক দায়িত্ব? সামাজিক দায়িত্ব কি পালন করছে? পালন করলে হাসিনাকে তো জেতার পরে কনগ্রাচুলেট করত না! হাসিনাকে জেতার পরে যে কনগ্রাচুলেট করেছে, সে সাহিত্যিকের মধ্যে সমাজ চেতনার কি পাওয়া গেল! (হাসতে হাসতে) আমি তো ওকে বললাম! ও আত্মজীবনী লিখেছে চার খ-ে বলল। আমি দুটো খ- পড়েছি। আমি সেদিনও তাকে— এর আগে রাজশাহীর বাড়িতে বলেছিলাম, তখন সেটা সে বেশ ভালোভাবেই নিয়েছিল মনে হয়, সনৎ (সনৎকুমার সাহা)ও ছিল। কিন্তু এই সেদিন আবার বললাম, তখন দেখলাম একটু ক্ষুণœ হলো। আমি বললাম, তৃতীয়-চতুর্থ খ- পড়ি নাই, আমাকে পাঠিয়ে দিও। প্রথম দুটো হচ্ছে কিছু কিছু তোমার ঘটনা মনে আছে, সেই ঘটনা নিয়ে তুমি উপন্যাস লিখেছ এবং তোমার ওটা আত্মজীবনী হয়নি। প্রথম খ-টা তো আত্মজীবনী হতেই পারে না! অসম্ভব! আত্মজীবনীর ধারে-কাছেই নাই। সে একটা শিশু, তিন-চার-পাঁচ বছর বয়সে তার বর্ণনার শেষ নাই। গাছের পাতা পড়ছে, ভারি বৃষ্টি হচ্ছে, অমুক-তমুক ইত্যাদি। এটা কোনো আত্মজীবনী হয়েছে? আর ওর তো ছাত্র অবস্থাতেও ছিল একটু পরিশ্রমের অভাব। এবং উপন্যাস তো লিখতে পারল না। ওর প্রথম উপন্যাস, ঐযে আগুনপাখি লেখা দেখে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। আমি কয়েকটা কিনে কলকাতাতেও দিয়েছিলাম, খুব খুশি হয়েছিলাম। সেটা মোটামুটি একটা জায়গায় আছে, কিন্তু তারপরে আর কিছু হয় নি। তারপরে যেটা লিখেছে ধরো সাবিত্রী উপাখ্যান। পড়েছেন?

চিহ্ন : হ্যাঁ।

বদরুদ্দীন উমর : না কি?

চিহ্ন : হ্যাঁ পড়েছি।

বদরুদ্দীন উমর : সেটাতে যে চরিত্রটা আছে, এটা কি কোনো চরিত্র হলো? একটা মেয়ে— তার কোনো সেন্স অব অনার নাই, অ্যানিবডি এ- এভরিবডি তাকে রেপিং করছে, এটা একটা কোনো চরিত্র হলো?

চিহ্ন : হ্যাঁ, যেখানে যাচ্ছে সেখানে সে রেপ্ড হচ্ছে।

বদরুদ্দীন উমর : ডযধঃ শরহফ ড়ভ পযধৎধপঃবৎ যধাব ুড়ঁ ঢ়ৎড়ফঁপব, ুড়ঁ ংবব? কি চরিত্র ঢ়ৎড়ফঁপব করলে তুমি এখানে? এই যে অ ঞযড়ঁংধহফ ঝঢ়ষবহফরফ ঝঁহং তাতে দুটো মেয়ের কথা আছে। দুটো মেয়ে হচ্ছে চৎরহপরঢ়ধষ পযধৎধপঃবৎ। সেখানে সেই মেয়েদের চরিত্র যদি দেখ, তো কি লেখা যুক্ত হবে। আর এইখানে আমার হাসান আজিজুল হক সাবিত্রী উপাখ্যান লিখেছে এমন একটা মেয়েকে নিয়ে, যার কোনো সেন্স অব অনার নাই, যার মধ্যে কোনো সেন্স অব রেজিসটেন্স নাই, যার কোনোরকম কোনো পজেটিভ কিছু নাই! সী ইজ অ্যালাও অ্যানিবডি উইদাউট রেজিসটেন্স টু রেপড হার, অ্যানিবডি কামিং এ- রেপিং হার। এখান থেকে ওখান, ওখান থেকে ওখান, ওখান থেকে ওইখান।

চিহ্ন : বর্ণনার ডিটেইলনেস…

বদরুদ্দীন উমর : আর আমি তো— আই বিকেম সিক, বইটা পড়ে! রেপের যে ইয়েগুলো, আই বিকেম সিক! এখন কি করা যাবে?

চিহ্ন : সাহিত্যের, মানে সাহিত্যের যে ক্যারেক্টারগুলো আছে, সেগুলো সম্পর্কে আপনার সেন্স খুব উন্নত আর কি। যেমন আপনি বললেন যে, সাবিত্রীর কথা, সে রেপড হচ্ছে, তার কোনো রেজিসটেন্সি নাই বা একটা ক্যারেক্টারের যে সম্ভাবনার যে জায়গাগুলো থাকে সেগুলোও কিছু নাই। এমনি একটা মনে হচ্ছে যে…

বদরুদ্দীন উমর : আমি আপনাকে সাজেস্ট করি আপনি ঐ বই পড়–ন।

চিহ্ন : আমি পড়েছি।

বদরুদ্দীন উমর : না না কযধষবফ ঐড়ংংবরহর-এর অ ঞযড়ঁংধহফ ঝঢ়ষবহফরফ ঝঁহং বইটা পড়েন। সেখানে মেয়েদের ক্যারেক্টারটা দেখেন আপনি, আফগান মেয়েদের। এই যুদ্ধের মধ্যে তার মনে হবে কি? আর আপনি এই বইটা পড়েন, তাকে হাউ ডু ইউ রেটিং। তাকে আপনি কি রেটিং করবেন আর এইখানে হাসানের উপন্যাসে কি রেটিং করবেন? বঙ্কিমচন্দ্রের বইয়ের মধ্যেও তো অনেক মেয়ের ক্যারেক্টার আছে, কতকখানি ক্যারেক্টার দেখেন, কত রকম!

চিহ্ন : কৃষ্ণকান্তের উইল, বিষবৃক্ষ— এগুলোনের মধ্যেও তো আছে।

বদরুদ্দীন উমর : তারপর যে সৌন্দর্য আছে কতখানি। বঙ্কিমচন্দ্র এক একজনের সৌন্দর্যের যে বর্ণনা দিয়েছেন— তিলোত্তমা, আয়েশা, দেবী চৌধুরানী, মতিবিবি— কীসব রূপের বর্ণনা করছেন! তারপর তাদের চরিত্রিক দৃঢ়তা, আত্মসম্মানবোধ! তাঁর রজনী যদি দেখেন আপনি!

চিহ্ন : এমনি বাংলা ভাষার রাইটাদের… ওই বঙ্গের কেউ… আপনার দৃষ্টিতে আছে?

বদরুদ্দীন উমর : আমার ওই রকম কোনো পড়াশুনা নাই। ওই বাংলার যে খুব রিসেন্ট, একদম খুব রিসেন্ট যে লেখক যারা, তাদের বই আমি সেরকম পড়েছি বলে মনে হয় না, খুব কম।

চিহ্ন : একটু আগে স্যর সিক্সটিজের দিকের?

বদরুদ্দীন উমর : সিক্সটিজের দিকের— সেখানে মনে পড়ছে না এরকম ঠিক। কার কার লেখা পড়েছি, কিছুই যে পড়িনি তা না, তারাশঙ্কর পর্যন্ত পড়া আছে আর কি। তারাশঙ্কর কেউ পড়ে না তো এখন! অথচ তারাশঙ্কর পড়া উচিত। তারাশঙ্কর বাংলার ভাঙনের সময় একটা বইয়ের মধ্যে যা আপনি পাবেন। এটা তো অন্য কোথায়ও পাবেন না। তারাশঙ্কর প্রত্যেকেরই পড়া উচিত। গণদেবতা, ধাত্রী দেবতা, কালিন্দী, হাসুলী বাঁকের উপকথা, তারপর তোমার জলসাঘর— এই সবের মধ্যেই তো তুমি পাচ্ছ একবারে। তারপর তোমার…

চিহ্ন : হাসুলী বাঁকের উপকথা বা কবি।

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ কবি আর ঐ সাওতাল বিদ্রোহের ওপর একটা আছে পড়েছেন? সাওতাল বিদ্রোহের ওপরে তারাশঙ্করের অরণ্যবহ্নি।

চিহ্ন : হ্যাঁ অরণ্যবহ্নি।

বদরুদ্দীন উমর : তো অরণ্যবহ্নি একটা অসুবিধা হচ্ছে, উনি তো ভাল করে বীরভূমের সব জানতেন…

চিহ্ন : ওটা শেষদিকের লেখা।

বদরুদ্দীন উমর : ওটায় ঠু মাচ ধর্ম। ঠু মাচ ধর্ম নিয়ে এসেছেন আর কি। ঠু মাচ ধর্ম— ওরকম ধর্ম আনা ঠিক হয়নি। ঁহৎবধষরংঃরপ!

চিহ্ন : আমাদের বাংলা সাহিত্যের তিরিশের দশকের লেখক যারা, তাঁদের?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের লেখা আমার পড়া আছে।

চিহ্ন : কিন্তু ওদের লেখাতে আমরা কিন্তু তখনকার যে বাংলা, যে পরিবেশ-পরিস্থিতি সেইটার চিত্র খুব একটা পাই না।

বদরুদ্দীন উমর : না, তারাশঙ্করের মধ্যেই পাওয়া যায়।

চিহ্ন : কিন্তু তখন যে ব্রিটিশ-বিরোধী একটা মুভমেন্ট হচ্ছিল এইখানে যে ব্যাপকহারে, তারাশঙ্কর কি এইখানে এই যে ধরেন…

বদরুদ্দীন উমর : তারাশঙ্করের মূল জিনিস হচ্ছে, সোসাইটির ভাঙন দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর নাগরিকের ওপর লেখা বই— মন্বন্তর। পড়েছো মন্বন্তর?

চিহ্ন : হ্যাঁ।

বদরুদ্দীন উমর : মন্বন্তরে তো অনেক কিছু আছে।

চিহ্ন : দুর্ভিক্ষের একটা বিষয় আছে।

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ, তারাশঙ্করের পঁচিশ ভলিয়ম-ই আমার কাছে আছে।

চিহ্ন : আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়?

বদরুদ্দীন উমর : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো সেখানে হচ্ছে যে, এনাদার লোক যাকে বলা দরকার। এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্বন্ধে যেটা বলা হয় যে, প্রথম বইটা কি যেন, আবার একেবরে প্রথম বইও না। পদ্মা নদীর মাঝি আর পুতুল নাচের ইতিকথা যে আর্টিস্টিক ইয়ে আর কি। পরবর্তী বইয়ে পাওয়া যায় না, তিনি কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়ার ফলে ইত্যাদি… এটা হচ্ছে ননসেন্স একটা। এগুলো ননসেন্সিক্যাল কথাবার্তা, এটা আসলে ডিপেন্ড করে একটা লোকের শক্তির ওপরে। তাঁর শক্তি ছিল লিখেছিল, এখন একটা লোক যদি লিখতে যায় ইয়ের ওপরে— কি বলে তোমার, এ সামাজিক ইয়ের ওপরে লিখতে যায়, তাহলে সেটা তো তার শক্তির ওপরে নির্ভর করবে। একজন যদি শক্তিশালী লেখক হয়, তাহলে সে বিষয়ে, যে বিষয়ে তিনি লিখছে, সেটা সে ভালোভাবে লিখতে পারবে। যদি না-হয়, তাহলে লিখতে পারবে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে জনগণের ওপরে লিখতে গিয়ে তার শিল্পক্ষমতা কমে গেল, এটা তো এ্যাবসার্ড না।

চিহ্ন : আমার কাছে যেটা অবাক লাগে যে, এরা কেউ রাষ্ট্র নিয়ে ভাবে নি! দুজনেই— মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন আর তারাশঙ্কর বলেন। বঙ্কিমচন্দ্র রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেছেন, কিন্তু এরা তো কেউ করেনি।

বদরুদ্দীন উমর : বঙ্কিমচন্দ্রের মত প্রতিভাশালী লোক হয় নি।

চিহ্ন : আউটস্টান্ডিং প্রতিভা।

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ, আউটস্ট্যান্ডিং প্রতিভা।

চিহ্ন : কিভাবে রাষ্ট্রটা দেখিয়েছেন সে, যে কোনো রাষ্ট্রের ভেতরে আছে সে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ দিকের লেখাগুলো যেমন— শহরতলি কিংবা চতুষ্কোণ কিংবা পরের যে লেখাগুলো শহরবাসের ইতিকথা বা ইতিকথার পরের কথা …

বদরুদ্দীন উমর : শহরবাসের ইতিকথা আমি পড়ি নাই, শহরতলীটা আমি পড়েছি। তবে তাঁর গল্পের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে, ছোট বকুলপুরের যাত্রী, ওইটা দারুণ গল্প। তবে আর তো কেউ পড়ে না এখন, কেউ জানেও না নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় একজন খুব শক্তিশালী ছোটগল্প লেখক ছিলেন, দারুণ শক্তিশালী। কেউ পড়েই না এখন, জানেই না! যেমন একজন আছেন সুবোধ ঘোষ।

চিহ্ন : বাংলা সাহিত্যে এত শক্তিশালী রাইটাররা ওইপাশে হয়েছে, আমাদের দেশ কিন্তু সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে…

বদরুদ্দীন উমর : অনেক পিছনে। এইখানে যা আছে, এদের যে কোয়ালিটি, যেটা লেখার কোয়ালিটি— এই যে হুমায়ূন আহমেদ, যে লেখা হয়। হুমায়ূন আহমেদের লেখার মধ্যে যেটা হচ্ছে তার মধ্যে তো কোনো সিরিয়াস ব্যাপার কিছুই নাই, লঘু ব্যাপার ইত্যাদি চাটনী-চানাচুরে ভরপুর! কিন্তু তার মধ্যে শক্তি ছিল। তার মত কথক কিন্তু শরৎবাবুর পরে আর আসেওনি, আমি লিখেওছি। কিন্তু সে সেটা টাকার জন্যে লেখে— এমন কথা সে পরিষ্কার বলত, ‘আমি টাকার জন্য লিখি’। আর বঙ্কিমবাবু বলেছিলেন, ‘অর্থের জন্য কদাচ লিখিও না’। ‘অর্থের জন্য কদাচ লিখিও না’— মানে লিখে টাকা নাও, কিন্তু টাকার জন্য লিখ না। মানে উনি বলতেন লিখে টাকা নাও, আমিও বলি যে, হ্যাঁ আমরা লিখে টাকা নিই, কিন্তু টাকার জন্য লিখি না।

চিহ্ন : আমাদের ভাষা আন্দোলন কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো উপন্যাস লেখা হলো না…

বদরুদ্দীন উমর : কিচ্ছু হলো না! কিছু হলো না। যেগুলো হয়, সেগুলো খুব জোলো ব্যাপার, আপনার সেলিনা হোসেন আমার প্রথম খ-টা পড়ে একটা উপন্যাস লিখেছে সে। সে লিখেছেও, আমার প্রথম খ-টা পড়ে সে উপন্যাসটা লিখেছে। একবারে জোলো জিনিস— সাহিত্যের ওপরে। তো এখানকার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে, সাহিত্য-সমালোচকের অভাব! সেটা এরা করতে পারত— সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী করতে পারত, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী করতে পারত আরও কমপিটেন্টলি,— তারা তো সেভাবে করে নি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তো যেসব জিনিস জানেন না, সেইসব জিনিসের ওপর লেখার একটা প্রবল— মানে তাড়না তার আছে আর কি। মার্কসসিজম সম্পর্কে কিছুই জানেন না, কিন্তু মার্কসিস্ট হিসাবে উনি নিজেকে ইয়ে করার জন্য চেষ্টা করে। জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে কিছ্ইু জানে না, অথচ জাতীয়তাবাদের ওপর এতবড় একটা বই লিখেছে! কিন্তু লিটারেরি ক্রিটিসিজমের দিকে যদি উনি যেত, তাহলে সেটা কিন্তু উপকার হতো দেশের। যেমন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বই, চিলেকোঠার সেপাই। চিলেকোঠার সেপাই যেভাবে আলোচনা করা উচিত ছিল সব খালি হই হই হই করে শেষ। আমি একটা কথা বলেছি ওই ‘তৃণমূলে’ বেরিয়েছিল—

চিহ্ন : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা বেরিয়ে ছিল উনার মৃত্যুর পর পরই।?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। তাতে আমি বলেছিলাম যে, ওর যে চিলেকোঠার সেপাই বই, এইটা উপন্যাসটার সাথে বইটার নামের কোনো সঙ্গতি নাই। আসল যেসব জিনিস বিবরণ যেসব দিয়েছে যেসব ইমপর্টেন্ট ব্যাপার হলো তার চাইতে ‘চিলেকোঠার সেপাই’টার সেরকম গুরুত্ব কিছুই নাই অথচ বইটার নাম হলো চিলেকোঠার সেপাই!

চিহ্ন  : না এইটা ওসমান নামের যে চরিত্রটা আছে ওইটাকে ধরে করেছে আর কি।

বদরুদ্দীন উমর : ওসমান বলে হ্যাঁ। ওসমান যে ওই চিলেকোঠার…

চিহ্ন : চিলেকোঠায় যে থাকত।

বদরুদ্দীন উমর : না সেটাকে ধরে তো আর কিছু হয় নি! গ্রামাঞ্চলে যা হচ্ছে, সেটাকে আমি মনে করি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বইটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে বিষয়ে কেউই লেখেনি সাধারণত গ্রামাঞ্চলে যে আন্দোলন হচ্ছে তার ওপরে। সেটার সাথে তো চিলেকোঠার সেপাইয়ের (ওসমানের) কোনো সম্পর্কই নাই, কিছুই নাই।

চিহ্ন : তবে আমি একটা জিনিস দেখেছি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে যত কথা বলা হয়, এখন তো সব থেকে বেশি কথা বলা হয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে। তাঁর পাঠক সবচেয়ে কম এবং আমি জানি— লিখেছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে কিন্তু পড়েনি এটা খারাপ ব্যাপার— মরে গেল আর লিখলো আমি একদম প্রমাণ করে দিতে পারবো যে সে পড়েনি। পড়েই নি। না পড়ে বিশাল লেখা লিখে দিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ওপরে…

বদরুদ্দীন উমর : একটা লেখার সম্বন্ধে বলতে— যে হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে, আমি এটা বলতাম তো বরাবরই সেটা তার ভালোর জন্যই বলতাম, আমি তাকে কোনো ইয়ে করিনি। সে একজন যাকে বলে খুবই ট্যালেন্টটেড রাইটার এত কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু হুমায়ূন এক জায়গায় বলেছে যে, কোনো জায়গায় যেন বলেছে, আমার দুর্নাম, উনি এ সমস্ত কথা বলেন, আমার বই তো লাখ লাখ বিক্রি হয়, কিন্তু উনার বই তো কীটে খায়, পোকামাকড়ে খায়। তা আমি বললাম যে, তাহলে বলতে হবে পোকা-মাকড়ের ইন্টেলিজেন্ট লেভেল উনার পাঠকদের থেকে অনেক বেশি। উনার বই খায়, আর আমার বই পোকা-মাকড়ে খায়। ইন্টারেস্টিং কত কিছু ব্যাপার আছে দুনিয়াতে। তবে ওর একটা জিনিস ছিল, ও ছোট ভাইটার মতো (মুহম্মদ জাফর ইকবাল) এত ধান্দাবাজ ছিল না। সে টাকার জন্য লিখতো, লিখতো ভালোই, লেখার হাত ছিল, এটা একটা গুণ, এরকম কথক পাওয়া যায় না। আমি ওর সাত-আটটা বই পড়েছি।

চিহ্ন : উনি যেসব ওপেনিয়নগুলো পাস করতেন, যেটা পলিটিক্যাল হোক, যাই হোক সেসব ওপেনিয়নগুলো উনি উনার বিশ্বাস থেকে বলতেন, কোনোরকম ধান্দা নিয়ে বলতেন না এবং গদ্যটা খুব স্মার্ট। স্মার্ট গদ্য।

বদরুদ্দীন উমর : সৈয়দ শামসুল হক একটা লোক, স্টাব্লিশমেন্টের দ্বারা একদম পাম্প করে ওপরে তোলা! তারপরে তোমার এই লোকটার একটা লেখাও আমি পড়িনি। কি বলে মিলন (ইমদাদুল হক মিলন) বলে একটা লোক, আচ্ছা— সাম্প্রতিক দেশকালের একটা স্পেশাল ইস্যুতে ওর একটা ছোটগল্প পড়লাম। ছি! ছি! একেবারে থার্ড ক্লাস! এটা কোনো গল্প হলো, একটা কিছু হলো? ছি! ছি! আমি ওটা পড়ে বললাম, পড়িনি ভালোই হয়েছে। ওয়েস্ট করতাম তার চেয়ে দুনিয়ায় অনেক ভালো উপন্যাস, অন্য বড় বড় উপন্যাস আছে।

চিহ্ন : অথচ এরাই বাংলাদেশের লিডিং রাইটার এবং সব থেকে পপুলারও তো। আনিসুল হক কি পরিমাণ পপুলার? এগুলো তো কাগজের জোরে! প্রচার সেভাবে পাচ্ছে।

বদরুদ্দীন উমর : এখানে লেখক হতে গেলে কোনো কষ্ট করতে হয় না। অথচ পরিশ্রম ছাড়া দুনিয়ায় কিছু হয়? তুমি পড়ালেখা করবা না, কিছু না কিছুই করবে না।

চিহ্ন : আপনার এই দীর্ঘজীবন, এই জীবন সম্পর্কে আপনার একটা মূল্যায়ন বলেন?

বদরুদ্দীন উমর : আমার মূল্যায়নের বইটা পড়ে দেখো, আমার একটা কথাই আমি বলি, ‘হ্যাভ লিড এ লাইফ দ্যাট আই ওয়ান্ট টু ডিড ইটস দ্যাটস অল’। আমি পঞ্চম খ-েই বলেছি যে আমার ইচ্ছা যে, পঞ্চম বের হয়ে যাবার পরে প্রথম খ- থেকে পঞ্চম খ- পর্যন্ত একবার বসে একবারে একটানা পড়ব। পড়ে দেখব, জীবনটা কেমন কাটল আর কি আমার!

চিহ্ন : না তবে আপনার পঞ্চম খ-ের যে শেষ, সেইখানে একটু হতাশার মতো লাগে বইটা পড়লে।

বদরুদ্দীন উমর : হতাশার মতো না, হতাশা ঠিক না। সেটা আমি বলেছি যে, আমার জীবদ্দশায় কিছু হলো না, কিন্তু এটা ভূমিকাতেও আমি বলেছি। মুখবন্ধে বলেছি যে, বাংলাদেশে তো পরিবর্তন হতেই হবে, এটির কোনো পরিবর্তন নাই। এই দুনিয়ার অবস্থাও এরকম থাকবে না, যদি প্রকৃতি ধ্বংস না করে দেয় মানুষকে। ইতিহাস যদি চলে, তাহলে এই ক্যাপিটালিজমের ফল এবং ইত্যাদি। এই আমেরিকা ধ্বসে পড়বে তো, আর আমেরিকাটা ধ্বসে পড়লেই দুনিয়াময় একটা অন্য অবস্থা তৈরি হবে।

চিহ্ন : কিন্তু এখন চায়নার যে ধরনের আগ্রাসী যে একটা অবস্থা আমরা দেখছি। আমেরিকা ধ্বসে পড়লেই তো চায়না সামনে? তখন তো চায়না আরো ভয়ংকর হবে?

বদরুদ্দীন উমর : ভয়ংকর তো বটেই। প্রথমত ওদের স্ট্রাটেজি হচ্ছে, কোনোরকম দখলদারি, শক্তি প্রয়োগ এসব কিচ্ছু না। ইকোনোমিক, ফিনান্সিয়াল কন্ট্রোলের মধ্যে দিয়ে তারা এটা করছে আর কি। ভীষণ আগ্রাসী এটা তো একটা ‘মাড টাউট দ্যা ওয়ার্ল্ড’ আর কি। না, করলে তারা যে একেবারে সাকসেস্ফুল হবে, সেটা নয়। মানুষের রেজিসটেন্স একটা জায়গা হয় তো সেটা চায়না কি করবে আর আমেরিকা কি করবে? কিউবার মতো একটা ছোট জায়গায় কিভাবে টিকে ছিল। আর কিভাবে টিকে আছে, সোজা কথা কিউবার ওইখানে টিকে থাকা সোজা কথা এটা?

চিহ্ন : তো ক্যাস্ত্র এর জন্য দায়ী।

বদরুদ্দীন উমর : শুধু ক্যাস্ত্র তো না। পুরো সিচুয়েশন রয়েছে— কতকগুলো ছিল সেখানে, তার মধ্যে ক্যাস্ত্র তো ছিলই। ক্যাস্ত্র ছিল, চে ছিল, ক্যাস্ত্র মূলত ছিল, ক্যাস্ত্র সেখানে যেভাবে ধরে থেকেছে, যেভাবে লড়াই করেছে, যেভাবে ইয়ে চেঞ্জ করেছে, প্রয়োজনের সাথে তাল রেখে চলেছে, কাজ কিভাবে করতে হবে সেটা বুঝেছে, সর্বোপরি হচ্ছে— ‘কমিটেড টু দি কজ’। চুরি-ডাকাতি নাই, কিছু নাই, বাদরামি নাই নানারকম, এদিক-ওদিক তাকানো নাই, এরকম লিডারশিপ।

চিহ্ন : দারুণ লিডারশিপ! মানে নিজের মত করে। স্যর এইটা হয়তো আপনি এমনি বলবেন বাংলাদেশে যে উগ্র-মৌলবাদের একটা উত্থান লক্ষ করছি। সেটা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তো আছেই তো সেটা আরো বাড়ছে।

বদরুদ্দীন উমর : আমি বলব যে, বাংলাদেশে উগ্র-মৌলবাদের উত্থানের চেয়ে উগ্র-জাতীয়বাদের উত্থান হচ্ছে সব থেকে মারাত্মক! এইটা দেশের যত ক্ষতি করেছে, যেটার আওয়ামীলীগ হচ্ছে ধারক-বাহক, এটা আরো মারাত্মক। জামায়াত ইসলামীর যে উগ্রধর্মীয় ইয়ে তাতে কি প্রভাব দেশে পড়ছে? কি ক্ষতি করেছে? কতখানি করতে পারছে? দেশের অবস্থা এরকম নাই যে, জামায়াত ইসলামীর খপ্পরে পড়ে লোকে চলে যাবে। খপ্পরে পড়ে নেই, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদ যেটা, তার খপ্পরে পড়ে এখানকার সমস্ত মধ্যশ্রেণি সেই জালে আটকা পড়েছে। আমি যেটাকে আরো শত গুণে, সহ¯্রগুণে বিপজ্জনক মনে করি, আপনি এটা লিখতে পারেন। পযধাঁরহরংস যাকে বলে। পযধাঁরহরংস থেকে যে ঋধংপরংস সেটা আর কি।

চিহ্ন : কিন্তু এর জন্য কি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাটাও দায়ী না? তিন ধরনের, চার ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে?

বদরুদ্দীন উমর : সেটা কে ভাই শোভিনিস্টরাই তো করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থা উল্টো বললে হবে না তো— শোভিনিস্টরাই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। আর এখন চালু করেছে শিক্ষা ব্যবস্থায় আপনার যে সিলেবাস তৈরি করেছে, আপনার যে স্কুলের সিলেবাস, সেটা শফি— মাওলানা শফি তৈরি করেছে। সিলেবাস তো তৈরি করে শফির কাছে পাঠিয়েছিল (হাসবেন না) শফির কাছে পাঠিয়েছিল। শফি দেখে যত রকম ইসলাম-বিরোধী ইত্যাদি সব কেটে-কুটে দিয়ে বলেছে, এই রকম সিলেবাস হতে হবে। আমাকে মোফাজ বলছিল, মোফাজ তো এসিসট্যান্ট সেক্রেটারি। সে বলল যে, স্যর বিশ্বাস করবেন না একবারে মাওলানা শফি যেভাবে কেটে-কুটে সিলেবাসটা তৈরি করে দিয়েছে, এগজাক্টলি সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে প্রাথমিক মাধ্যমিক পর্যায়ে। এখন চিন্তা করে দেখুন, এইখানে কোথায় আপনি পাবেন। এখানে উগ্র-জাতীয়তাবাদের সাথে উগ্র ধর্মীয় বন্ধুত্ব হয়েছে, একটা শাদী হয়েছে, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। হয়ে যা প্রডিউস করছে, সেটাই আপনারা দেখছেন চারিদিকে। এটাকে বার্স্টাড ইতিহাস বলতে পারেন, এই মিলনটাকে।

চিহ্ন : তবে একটা জিনিস কি স্যর ঐযে আপনি অনেক আগে একবার লিখেছিলেন সংস্কৃতিতে যে, ইন্ডিয়াতে যে পরিস্থিতি আসছে, এটা এখন ইন্ডিয়াতে হয় সামরিক বাহিনী বা সামরিক হস্তক্ষেপ হবে, এটা ধরে রাখার কোনো পরিস্থিতি নেই।

বদরুদ্দীন উমর : না, সেইটা আমার কিছুটা একসেসিভ হলেও জেনারলি এটা কারেক্ট। কারণ— ইন্ডিয়া ইজ আনডার মিলিটারি রুল ইন কাশ্মীর, ইন্ডিয়া ইজ আনডার মিলিটারি রুল ইন দি নর্থ ইন্ডিয়া স্টার স্ট্রিট। এবং সমস্ত জায়গাতে যেটা হচ্ছে, যে আর্মির যে রোল— এটা আর্মি কিন্তু এখন শক্তিশালী হচ্ছে। তবে ইন্ডিয়াতে কতকগুলো নিয়ম করেছে যে, এক্্রটেনশন বলে কিছু নেই। এখানে যেমন আর্মির এক্্রটেনশন দেয়, এ করে, তা করে; ওখানে ওসব কিছু নাই, অনেক প্রিপারেশন নিয়েছে। কিন্তু ওখানে আর্মির রুল তো চলছেই— ইন্ডিয়া ইজ আনডার আর্মি রুল ইন কাশ্মীর, এইখানে, এইসব জায়গায়। কাজেই ইন্ডিয়াতে আর্মির টেক ওভার করার সম্ভাবনা আমি বলেছিলাম এজন্যেই, যেটা ওয়ান পার্টি রুলটা ভেঙ্গে কোয়ালিশন পার্টি হলো, কোয়ালিশন পার্টির মধ্যে যে সমস্ত ক্রাইসিস দেখা দিচ্ছে এর কারণেই। কিন্তু ইন্ডিয়াতে প্রত্যেকটা প্রসেসই খুব স্লোলি যায়, খুব স্লোলি, সেই জন্যে আমি বলেছিলাম যে, বাংলাদেশ হচ্ছে একটা ছাগল, পাকিস্তান হচ্ছে একটা গরু আর ইন্ডিয়া হচ্ছে একটা হাতি। এইভাবে পরিবর্তন তাদের ষড়হমবারঃু, তাদের যে প্রগ্রেস, যেটা তোমার ডিজেনারেশনের ডিটোরেশনের যে রেট, এটা এইভাবেই ড্রিল করে ইন্ডিয়া অনেক সময় নিচ্ছে। এবং পশ্চিমবঙ্গ আজকে যে জায়গায় চলে গেছে এই জায়গায় তো ছিল না। এখন তো পশ্চিমবঙ্গের এইখানকার সাথে অনেক মিল আছে। দেরিতে হচ্ছে এখনও পর্যন্ত, ডিগ্রির অভাব আছে। এখানে যেটা অনেক বেশি ডিগ্রিতে হচ্ছে, ওখানে কম ডিগ্রিতে হচ্ছে, অন্য জায়গাতেও হচ্ছে। কিন্তু ঐটাকে বলতে পারো, আই ওয়াজ রং, তবে কতদিনের মধ্যে হবে এটা একদম বলা যায় না, এটা নাও হতে পারে। সিভিল এ্যাডমিনিস্ট্রেশনই মিলিটারিকে ব্যবহার করতে পারে, যেরকম এখানে করছে আর কি! এখানে যদিও মিলিটারি চুপ হয়ে গেছে শতভাগ, ইন্ডিয়াতে হয় নি সেটা। কিন্তু মিলিটারি ডিকটেড করতে পারে, এমন অবস্থা হতে পারে যে, মিলিটারি উইল ডিকটেড দ্যা সিভিল গভর্নমেন্ট। সে অবস্থা ইন্ডিয়াতে হতে পারে। হতে পারে না, এরকম বলা যায় না। কারণ, আসলে ওয়ান পার্টি রুলটা টু পার্টির মধ্যে কমপিটিশন হচ্ছে— এই জিনিসটা ইন্ডিয়া থেকে ওঠে গেছে। নাই। এটা একটা ক্রাইসিস, পলিটিক্যাল ক্রাইসিস ইন্ডিয়ার জন্যে। ভারত প্রসঙ্গে বলে একটা বই লিখেছি আমি, বেরবে এই চার-পাঁচ দিনে মধ্যেই। ইন্ডিয়ার ওপরে আর্টিকেলগুলো সব সংস্কৃতিতে যা ছিল এবং এখানে যা ছিল, তা দিয়েছি। তবে সবগুলো নাই। যখন যেগুলো জোগাড় করেছি, যেগুলো পাচ্ছি, সেগুলো দিয়েছি।

চিহ্ন : স্যর এখন একটা জিনিস আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রযুক্তির একটা তা-ব চলছে আর কি, এটা কি আমাদের লেখাপড়ার জায়গাগুলোকে অনেকটা শিথিল করে দিচ্ছে না!

বদরুদ্দীন উমর : প্রযুক্তির তা-ব তো আপনি বন্ধ করতে পারবেন না। সায়েন্সের এ্যাডভান্সমেন্ট, সোসাইটির এ্যাডভান্সমেন্ট সাথে সাথে প্রযুক্তির রেভুলেশনাইজড হয়ে যাবে। আপনি একবারে সে মানুষের ইতিহাসের প্রথম থেকেই দেখা যাচ্ছে সেটা। প্রযুক্তি কন্টিনিয়াসলি রেভুলেশনাইজড হচ্ছে এবং এর সোস্যাল যে ডেভলপমেন্টটা তার সাথে এডজ্যাস্ট। আমাদের এইখানে হচ্ছে কি আমাদের সোসাইটি যত না ডেভলাপড করছে, এই টেকনোলজিক্যাল কতকগুলো জিনিস, তারও এ্যাডভান্সড কতকগুলো জিনিস চলে আসছে এইখানে। চলে এসে একটা কনফিউশন, একটা প্রবলেম, ক্রাইসিস তৈরি করছে। কিন্তু প্রযুক্তিকে তো আপনি স্টপ করতে পারেন না, প্রযুক্তির যেমন ভালো দিক আছে, প্রযুক্তির তেমনি খারাপ দিক আছে সব জিনিসের মতই।

চিহ্ন : কিন্তু আমরা কি এই প্রযুক্তিটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম এইরকম একটা ফেসবুক…

বদরুদ্দীন উমর : সেইটাই তো আমি বলছি যে, একটা ব্যাকওয়ার্ড জায়গায় প্রযুক্তিটা এ্যাডভান্স সোস্যাইটির প্রযুক্তি আপনার এইখানে চলে এসেছে, চলে এসে এই প্রবলেম ক্রিয়েট করেছে, নানারকম প্রবলেম ক্রিয়েট করেছে।

চিহ্ন : তো এখান থেকে তো মুক্তিও নাই আসলে, থাকবেই যেটা আসার, সেটা তো আসবেই?

বদরুদ্দীন উমর : থাকবেই এটা আপনার সোস্যাইটি ডেভলাপ্ড করলে তখন এটাকে এপ্রোভ করে নিবে। এখন তো এই যে আপনার যাকে বলে কি বলে কম্পিউটার— এই কম্পিউটারের যুগে প্রবেশ করার পরেই যে ফাস্ট টেকনোলজিক্যাল ডেভলাপমেন্ট যে আপনার হচ্ছে এ একবারে চিন্তার বাইরে। এবং দ্রুত যেটা হচ্ছে স্প্রিডও খুব সাংঘাতিক।

চিহ্ন : হ্যাঁ এবং একের পর এক ভার্সান বেরিয়েই যাচ্ছে সবসময়ই। এবং সেটা সবার হাতে হাতে চলে আসছে আর কি এবং কোনোটা তো স্থির না। আপনাকে স্থির থাকতে দেবে না, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ঐযে স্যর যেটা বলছিলেন যে, লেখাপড়ার জায়গাটা কমে যাচ্ছে এবং এসবেরও একটা কারণ আসলে— তার কারণ অনেক জিনিস সামনে।

বদরুদ্দীন উমর : লেখাপড়ার জায়গা পড়ে যাচ্ছে সেটা তো একটা পড়হংঢ়রৎধঃড়ৎরধষ ঘটনা। পড়ে যাচ্ছে যেটা আপনি তো দেখতে পাচ্ছেন না। করঃংপয ঢ়ড়ষরপু আপনাকে গাইড করছে, যার ফলে ছেলেরা এর মধ্যে এই জিনিসটা হচ্ছে, সমাজের মধ্যে এই জিনিসটা হচ্ছে— ওঃ যধং নবরহম ড়ৎমধহরংবফ ধষংড়। আর এইখানে কম্পিউটার-ফম্পিউটার এনে— এটা দেখি ছাত্রদের— এখন তো ছাত্ররা যে কোনো জিনিস কম্পিউটারে পড়তে পারে। কম্পিউটারে কি পড়বে, কম্পিউটারের সামনে বসে মানুষ কোনো ডাস ক্যাপিটাল পড়বে, কি একটা বড় নভেল পড়বে, এর একটা ংঃৎধরহ আছে না? বই মানুষ যেভাবে বসে পড়তে পারে, কম্পিউটারে সেভাবে সম্ভব না। প্রিন্টের বেটার কিছু নাই, বিকল্প নাই কিছু। কম্পিউটারের একটা সুবিধা হচ্ছে যে, তুমি যে কোন জিনিস যে কোন জায়গায় নামিয়ে নিতে পার। আমি যেমন এখানে দরকার হলে হাসিবকে বা অমুককে বা তমুককে আমার ছেলেকে ফোন করে বলি, এটা বের করে দাও। এই যে যেমন কালকে যেমন হাসিবকে আমি ফোন করে বললাম, বলতো ম্যাগনাকার্টা তো আরলি থার্টি সেঞ্চুরিতে হয়েছিল, একটু দেখে দাও তো তুমি বীধপঃ সালটা কত ছিল? ঠিক আছে— ১২১৫, বের করে দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সেটা বের করে দিল। এই যে জিনিসগুলো ধফাধহঃধমব হয়েছে, এই যে উপন্যাসটার কথা বললাম তুমি তোমার কম্পিউটারে নামিয়ে নিতে পার, পড়ে দেখবে ঞযব করঃব জঁহহবৎ কিংবা অ ঞযড়ঁংধহফ ঝঢ়ষবহফরফ ঝঁহং বা আফগান নভেলগুলো। তুমি দেখবে নভেলগুলো একদম নামিয়ে নিতে পার, ডউনলোড করতে পার, প্রিন্ট আউট করে নিতে পার। এই যে সুবিধাগুলো হয়েছে, একটা গান শোনো। আমি অনিকেত’র দাওয়াতে গত বছর কলকাতায় গিয়েছিলাম। তো যে বাড়িতে ছিলাম ঐ বাড়িতে রাত্রের বেলা গল্প করতে করতে একটা গানের কথা মনে পড়ল, অনেকদিন আগের কানন দেবীর গাওয়া বিদ্যাপতির গান, ‘অঙ্গনে আওয়ব যব রসিয়া, পলটি চলব হাম ঈষত হাসিয়া’, তো ভদ্রলোক কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা বের করে দিলেন, আমি গান শুনলাম কানন দেবীর কণ্ঠে। এই যে জিনিসটা আর কি টেকনোলজিক্যাল ডেভোলাপমেন্ট। একদিন রাজশাহী যাচ্ছিলাম লেনিন বলে একটা ছেলের সাথে, হ্যান্ডেলের (এ. ঋ. ঐধবহফবষ) ইউরোপিয়ান মিউজিকের কথা হচ্ছিল সেখানে, বললাম যে, হান্ডেলেন একটা ওয়াটার মিউজিক আছে দেখ তো একটু, তো বের করে ফেলল ওয়াটার মিউজিক। নামিয়ে ফেলল ওয়াটার মিউজিকটা। শুনলাম। তো এই যে একটা আশ্চর্য জিনিস, কিন্তু কথা হচ্ছে, এটা তো পজেটিভ দিক। নেগেটিভ দিক হচ্ছে যে, এগুলো দিয়ে অনবরত ফেসবুক-টেসবুক চালাচ্ছে, বাচ্চারা সব পড়ে আছে অনবরত! তারপরেও ফেসবুকের অনেক পজেটিভ দিক আছে।

চিহ্ন : টুয়েন্টি-ফোর আওয়ারস একটা জায়গায় দাঁড়ালে, দশটা ছেলে দাঁড়ালে সব ওইটা নিয়েই ব্যস্ত! বলছি যে, হিরোইনের মত-ই ক্ষতিকারক বিষয় এটা।

বদরুদ্দীন উমর : নানারকমভাবে, কত রকম একটা জিনিস! বোঝা গেল যে আপনি এত কষ্ট করে ইন্টারভিউ করতে এসেছেন, নঁঃ ুড়ঁ ফড়বং হড়ঃ যধাব ধহু যড়সব-ড়িৎশ সু ফবধৎ! (সহাস্যে)

চিহ্ন : আপনার বাবার একটা প্রভাব তো আছে। আপনার বাবা সেই সময়ে মুসলিম সমাজের একজন ঢ়ৎড়মৎবংংরাব মানুষ ছিলেন।

বদরুদ্দীন উমর : ঢ়ৎড়মৎবংংরাব, তাঁর মধ্যে ৎবধপঃরড়হধৎু জিনিসও ছিল। তাঁর মধ্যে একটা ভীষণ পড়হঃৎধফরপঃরড়হ ছিল। আমার ধারণা ছিল— এক সময় বলেছিলাম যে আপনি নাস্তিক, একসময় তাঁর এই ঃবহফবহপু আবার ধর্মের ঃবহফবহপু; এগুলো করেছিলেন। ঐব ধিং হড়ঃ ধ ৎবষরমরড়ঁং সধহ রহ ধহু ংবহংব, ঐব ধিং হড়ঃ ধ ঢ়ৎধপঃরপরহম সঁংষরস. নামাজ পড়া, রোজা রাখা, হজ করা, কোরবানি দেয়া, এসব করতেন না। আমরা কখনো কোরবানি দেই নি। তিনি একজন খুব ঃধষবহঃবফ লোক ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যব ধিং ধ াবৎু ঃধষবহঃবফ সধহ, যব ধিং ধ মৎবধঃ ড়ৎমধহরুবৎ. শেখ মুজিবুর রহমান তো আত্মজীবনীতেও লিখেছেন— ড়ৎমধহরুধঃরড়হ শিখেছেন উনার কাছে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, উনি একটা মস্ত বড় ক্ষতি করেছিলেন, মুসলিমলীগের মধ্যে ইসলাম এনে। ঢ়ৎড়মৎবংংরাব ছেলেরা তখন দলে দলে মুসলিমলীগে আসতে লাগল; তাদেরকে তিনি সব ওংষধসরপ ঝড়পরধষরংস, অনেক সব বোঝাতে থাকলেন। এর ফলে, যাদের কমিউনিস্ট পার্টিতে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তারা কিন্তু মুসলিমলীগের কাঠামোর মধ্যেই থেকে গেল। এটা একটা ক্ষতি হয়েছে। ঐ সময়ে তিনি এটা যদি না-করতেন, তাহলে ঐ সময়ে ছেলেরা কমিউনিস্ট পার্টিতে চলে আসত; যারা পড়াশোনা করা লোক, ঃধষবহঃবফ লোক, সেটা কিন্তু হলো না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, উনি কখনো নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিছু করেননি, যেটা করেছেন সেটা একটা চিন্তা থেকে করেছেন সবসময়ই। সেদিক থেকে একটা যড়হবংঃু ছিল। যেটা ভালো মনে করেছেন, সেটা করেছেন।

চিহ্ন : সেই সময়ে একজন মুসলিম পযধৎধপঃবৎ হিসেবে খুব উজ্জ্বল মানুষ একজন।

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ, তাঁর তুল্য ঃধষবহঃবফ লোক ছিল না।

চিহ্ন : তিনি যে পূর্ব-পাকিস্তানে চলে আসলেন, এর পেছনের কারণটা কি?

বদরুদ্দীন উমর : সেটা আমি আমার প্রথম খ-ে বলেছি। ওঃ ধিং ধ সরংঃধশবং, এটা আমি এখনো মনে করি যে, উনার চলে আসাটা। আমাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর, উনার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যেও পরিবর্তন দেখা গেল। একটা ঁঢ়ংবঃঃরহম ব্যাপার হয়ে গেল আরকি! ঐটা যদি আর ১৫-২০ বা ৩০ দিন ভধপব করা যেত; তাহলে কিন্তু আর আসার দরকার হতো না। এমন একটা পরিস্থিতি দাঁড়াল— যে উনি ভীষণরকম ফরংঃঁৎনবফ হয়ে গেলেন।

চিহ্ন : উনি কি মনে করেছিলেন যে আসাটা ভুল হয়েছে?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ, উনি মনে করতেন। পরে, শেষের দিকে উনি মনে করতেন আসা ভুল হয়েছে।

চিহ্ন : আপনি কি মনে করেন?

বদরুদ্দীন উমর : আমি মনে করি এটা ভুল। আমি বরাবরই বলে এসেছি— এটা ভুল ছিল। তখন তো আমার বয়স অল্প ছিল; চলে আসার দরকার আমি মনে করিনি। কিন্তু, মনে হয়েছিল, ঠিক আছে— যাওয়া হচ্ছে, যাওয়া হোক। পরে, আমি মনে করেছি— উনার আসাটা ভুল ছিল। আর এখানে তো অনেক দুর্দশা— এখানে উনি অনেকভাবে অপমানিত হয়েছেন, অনেক দুঃখ-কষ্ট পেয়েছেন, অনেক আর্থিক কষ্ট পেয়েছেন। জেলেও গিয়েছেন; অন্ধ লোক একটা, তাঁকে ১৬ মাস জেলে রেখে দিয়েছিল। চোখে দেখতে পেতেন না।

চিহ্ন : সেটা তো ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ।

চিহ্ন : কিন্তু, আপনি যদি এই দেশে না-আসতেন, বা আপনার বাবা যদি না-আসতেন— তাহলে আজকে আপনার যে এত লেখালেখি, এত চর্চা; সেটা কি ওদেশে থাকলে হতো?

বদরুদ্দীন উমর : সেটা তো আলাদা কথা। আমি মনে করি, ওখানে বসে স্কুল মাস্টারি করলেও ঠিক ছিল। আর, আমাদের ভধসরষু তো একটা রাজনৈতিক ভধসরষু ছিল। আমরা বসে থাকতাম না তো! এইখানে এসে তো আমরা রাজনীতি শিখিনি, আমরা ঐখানে শিখেছি রাজনীতি। আমাদের পুরো ভধসরষু একটা রাজনৈতিক ভধসরষু ছিল। কাজেই ওখনে থেকে তো বসে থাকতাম না, বরং করতাম একটা কিছু।

চিহ্ন : না, লেখালেখির একটা যন্ত্রণাও তো আছে?

বদরুদ্দীন উমর : সেটা তো আমি করলেও পারতাম, না-করলেও পারতাম। আমার ক্ষমতা যদি থাকে, তাহলে যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়তাম, সেখানেও হতো। ঐখানে থাকলে আমি এখানে যা হয়েছি, সেইটাই হতাম কিনা; সেটা বীধপঃষু বলা যাবে না।

চিহ্ন : আপনার দাদার পর্বটা যদি বলতেন?

বদরুদ্দীন উমর : আমার দাদাও একজন ঢ়ড়ষরঃরপধষ লোক ছিলেন। এবং, খুব অল্প বয়সে— ঐব ধিং ধষংড় ধ াবৎু ঃধষবহঃবফ সধহ. উনি ৩০ বছর বয়সেই কংগ্রেস সেন্ট্রাল ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার ছিলেন, ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ কমিটির মেম্বার ছিলেন। ১৯০৫ সালে, বেঙ্গল পার্টিশনের সময় বড় নেতা ছিলেন। পরের দিকে উনারও আর সেই অবস্থা থাকেনি; নানারকম ভুল-ভ্রান্তির ফলে।

চিহ্ন : মুসলিম লীগ কি আসলে ভুল-ভ্রান্তির ভেতর দিয়েই চলেছে?

বদরুদ্দীন উমর : আমার দাদা তো মুসলিমলীগ করতেন না, ঐব ধিং ধ ঈড়হমৎবংং সধহ. আমার দাদা মুসলিমলীগ করতেন না, উনি কংগ্রেসের লোক ছিলেন।

চিহ্ন : ভারত ভাগকে আপনি কীভাবে দেখেন?

বদরুদ্দীন উমর : এই প্রশ্নটা করবেন না। এইটা এমন একটা বড় প্রশ্ন— ভারত ভাগ নিয়ে কী বলব আমি! এখানে এক কথায় ভারত ভাগ নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করা যায়? ঞযরং রং হড়ঃ ধ য়ঁবংঃরড়হ সু ফবধৎ.

চিহ্ন : নানাজন তো নানাভাবে দেখেন বিষয়টা! অনেকেই যন্ত্রণাবোধ করেন।

বদরুদ্দীন উমর : আমিও যন্ত্রণা পাই, ভারত ভাগের। আমি এখনো ভারতে যাই, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াই। সেসব লোকজনও নাই; তাদের নাতি-পুতিরা আছে। সেখানে গাছপালা আছে, রাস্তা আছে— বর্ধমানে, আমার গ্রামে ঘুরে বেড়াই। এখনো আমি যাই। একদম গ্রাম পর্যন্ত যাই। আমার যন্ত্রণা আছে। যদিও আমি আঠারো বছর বয়সে এখানে এসেছি। সবারই এটা হয় না, একেক জনের হয়, আমার হয়।

চিহ্ন : সবার মধ্যেই একটা যন্ত্রণা আছে!

বদরুদ্দীন উমর : যারা ঁঢ়মৎধফবফ হয়ে এসেছে, তাদের মাঝে এটা বেশি পাওয়া যায়। আবার অনেকে মধ্যে নেই। আমার ফ্যামিলির তো অনেকেই এসেছে— সবারই যে আমার মত হচ্ছে, তা তো না। আর, ওখানে আমাদের যে ভধসরষু ছিল, যে ংঃধঃঁং ছিল— তাতে তো আমি পড়ে থাকতাম না।

চিহ্ন : পড়ে থাকাটা একটু কেমন হয়ে গেল! (সহাস্যে) তবে, ইন্ডিয়াতে আপনাকে যেভাবে ৎবংঢ়বপঃ করেছে, বাংলাদেশ সেভাবে করতে পারেনি।

বদরুদ্দীন উমর : না, না। গত সতেরো সালের নভেম্বরে কলকাতায় গিয়েছিলাম; অনিকেত’র এডিটর ছিল— ‘দীপঙ্কর চক্রবর্তী মেমোরিয়াল লেকচারে’। সেখানে রামমোহন হলে লেকচার ছিল; রামমোহন হল লধস ঢ়ধপশবফ। অথচ, এইখানে কোনো জায়গায় আমি গেলে লোকজন আসে? লোকজন দেখি না তো বিশেষ। একদম লধস ঢ়ধপশবফ ছিল।

চিহ্ন : এখানেও একসময় হতো। আমরা যে রাজশাহীতে আপনাকে নিয়ে সেই ১৯৭৮-৭৯ সালের অনুষ্ঠানগুলো করতাম, কত লোক! কিন্তু, এখন আর তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায় না!

বদরুদ্দীন উমর : ইন্ডিয়াতে আমার যে অবস্থাটা আরকি, চেনে না কে আমাকে ইন্ডিয়াতে? লেফ্ট সার্কেলে আমাকে চেনে না কে? লেফ্ট সার্কেলের বাইরেও যে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আছে, সেখানেও আমার ব্যাপক পরিচিতি আছে। ওখানে একটা ধপপবঢ়ঃধনরষরঃু আছে, যে ধপপবঢ়ঃধনরষরঃু এখানে নেই। আমি এখানে বলেছি, আমার এই মুখবন্ধে; আমি যে সঠিকভাবে কাজ করেছি তার একটা বড় প্রমাণ, এখানে জনগণের শত্রু যে বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতায় আছে তাদের সমর্থক লেখক-সাহিত্যিকদের উদাসীনতা, আমাকে উপেক্ষা করা। যেটাকে মার্কস বলেছেন— শরষষরহম নু ংরষবহপব. সেটা এখানে ঘটেছে। এত লোকের ওপরে কাগজে লেখা বের হয়, আমার ওপরে কি কোনো লেখা দেখেছেন কোনো সময়? কসম করে বলতে পারেন যে দেখেছেন? অথচ কত লোকের জন্মদিন, এটা সেটা হয়— আমার জন্মদিন কখনো দেখেছেন? কদাচিৎ হয়তো কয়েক বছর পর ভুল-ভ্রান্তিতে কেউ একটা কিছু লিখল। কিন্তু, এই যে জন্মদিনের পর জন্মদিন— অমুকের জন্মদিন, অমুক কবির জন্মদিন; কবির নামও শুনি নি কোনোদিন!

চিহ্ন : সেজন্য তো আপনার কোনো আক্ষেপের প্রশ্নই আসে না?

বদরুদ্দীন উমর : আক্ষেপের কথা বলছি না; আমি বরঞ্চ উল্টো বলছি— ওঃ ঢ়ৎড়াবং ঃযব ঃরসব পড়ৎৎবপঃ. আমার আক্ষেপের কিছু নাই। ঃযরং রং ধ ভধপঃ— আক্ষেপের একটা আছে যে, এই দেশে এমন কোনো লোক নাই যারা একটা ঢ়ৎড়ঢ়বৎ সমালোচনা করতে পারে, বা ধংংবংংসবহঃ করতে পারে বা কিছু লিখতে পারে! যেটা আমি পেয়েছি, সেটা হচ্ছে গালাগালি। আমি বদমায়েশ, আমি কাউকে সহ্য করতে পারি না, আমার মেজাজ খারাপ …!

চিহ্ন : এজেন্ট? সি. আই. এ-র এজেন্ট?

বদরুদ্দীন উমর : সি. আই. এ-র এজেন্ট; এটা তো পরের দিকে আর বলত না। প্রথম দিকে এমন কেউ নেই যে আমাকে বলেনি— এই যে মেননরা, রনোরা। রনো এজন্য আমার কাছে একবার মাফ চাইতেও এসেছিল। আমি বইতে লিখেছি, তৃতীয় খ-ে আছে। রনো একবার এসে আমার কাছে মাফ চেয়েছিল।

চিহ্ন : এখন কিছুটা বলে পাকিস্তানের এজেন্ট আরকি!

বদরুদ্দীন উমর : সেটা বলুক। এদের তো এইসব বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ, আমি যা বলছি, আমি যা করছি তার ধারে কাছে যাওয়ার ক্ষমতা এদের নাই। সেটা খ-ন করার ক্ষমতা এদের নাই।

চিহ্ন : এই জিনিসগুলো বলতে বলতে এমন একটা জায়গায় চলে গেছে নতুনরা তো কিছুই জানে না?

বদরুদ্দীন উমর : না, না— এরা কিছুই জানে না। এরা তো ইন্ডিয়ার হিস্ট্রিও কিছু জানে না, পাকিস্তানের হিস্ট্রিও কিছু জানে না, বাংলাদেশ আমলের প্রথম দিকে কি হয়েছে তাও জানে না। আর, ইতিহাসের সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নাই। ইতিহাসের ছাত্ররাও ইতিহাস কিচ্ছু জানে না!

চিহ্ন : ইতিহাস তো পাল্টিয়ে দিল?

বদরুদ্দীন উমর : ইতিহাস আগেকার দিনে পড়ত, ইতিহাসের ছাত্র হবে এমন নয়। স্কুল পর্যন্ত যেহেতু ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়ান হতো, এরকম মোটা বই; প্রাচীন কাল থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত। এখন তো এসব কিছুই নেই। যদি জিজ্ঞাসা করা যায়— মোঘল বাদশাহ কারা ছিল? কে কার বাপ, কে কার দাদু, নাতি-পুতি কিছুই বলতে পারবে না!

চিহ্ন : ইন্ডয়াতেও তো এটা হচ্ছে, মোদি এসে তো ওদেরও ইতিহাস…

বদরুদ্দীন উমর : rulling class এর সকলেই তাই করে, প্রত্যেক rulling ক্লাসই তাই করবে! আমরা এলে আমরাও তাই করব।

বদরুদ্দীন উমরের লেখালেখি

                সাম্প্রদায়িকতা

                প্রকাশিকা ॥ হামিদা হোসেন, জনমৈত্রী পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ৭ নম্বর রাস্তা, ৫০৯ নম্বর বাড়ি ॥ ঢাকা। প্রথম প্রকাশ ॥ এপ্রিল ১৯৬৬ ।

                সংস্কৃতির সংকট

                প্রকাশক ॥ মাওলা ব্রাদার্স, প্রথম প্রকাশ॥ অক্টোবর ১৯৬৭, তৃতীয় মুদ্রণ ॥ ১৯৭৪, মাওলা ব্রাদার্স এর পক্ষে আহমেদ মাহফুজুল হক; ৮২ আর, এম, দাস  রোড, সুত্রাপুর, ঢাকা-১ ।

                সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা

                প্রকাশক ॥ চিত্তরঞ্জন সাহা, মুক্তধারা, [স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ], ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১, বাংলাদেশ, তৃতীয় প্রকাশ ॥ অক্টোবর ১৯৮০, ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা -১, বাংলাদেশ।

                পূর্ব বাংলা ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি [প্রথম খ-]

                একমাত্র পরিবেশক ॥ মাওলা ব্রাদার্স, বাংলাবাজার, ঢাকা-১। প্রথম প্রকাশ ॥  নভেম্বর ১৯৭০। প্রকাশক ॥ আহমেদ আতিকুল মাওলা ও আবু নাহিদ। গ্রন্থনা ॥ ১৬, রজনী চৌধুরী রোড, ঢাকা-৪। মুদ্রাকর ॥ এ আর, খান, ইডেন প্রেস, ৪২/এ, হাটখোলা রোড, ঢাকা-৩।

                চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙালাদেশের কৃষক

                প্রকাশক ॥ আহমুদুল হক, মাওলা ব্রাদার্স, ৩৯ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০, ফোন ৭১১৯৪৬৩, কম্পোজ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ১৪ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, ঢাকা-১০০০, পঞ্চম  মুদ্রণ ॥ শ্রাবণ ১৪১০, আগস্ট ২০০৩, চতুর্থ মুদ্রণ ॥ জুন ১৯৯৮, মুদ্রণ ॥ বসুন্ধরা প্রেস আ্যন্ড পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ২০/২ টিপু সুলতান রোড, ঢাকা-১০০০।

                পূর্ব বাঙলার সংস্কৃতির সংকট

                মূল রচনা ॥ বদরুদ্দীন উমর, সম্পাদনা ॥ জিয়াদ আলী, নবজাতক প্রকাশন ॥ ৬ এন্টনীবাগান লেন, কলিকাতা-৯, প্রথম প্রকাশ ॥ ১০ ই জুন, ১৯৭১, প্রকাশক ॥ মজহারুল ইসলাম ৬ এন্টনীবাগান লেন, কলিকাতা-৯ মুদ্রক ॥ শ্রী সুনীলকৃষ্ণ পোদ্দার, ১২১ রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট, কলিকাতা-৪।

POLITICS AND SOCIETY IN EAST PAKISTAN AND BANGLADESH

        First published: February, Nineteen Seventy four. Published by Ahmed Mahfuzul Haq on behalf on m/s Mowla brothers 39, Bangla Bazar, Dacca-1, Printed by Nurul Haque, Modern Type Founders, Printers & Publishers Ltd., 244, Nawabpur Road, Dacca-1, Cover design by Qayyum Chowdhury.

                ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ

                একক পরিবেশনাায় ॥ মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা-১, প্রথম প্রকাশ ॥ জুলাই ঊনিশশো চুয়াত্তর। প্রকাশনায় ॥ সুবর্ণ প্রকাশন ২৮ টিপু সুলতান রোড, ঢাকা-১। মুদ্রণ ॥ নুরুল হুদা, পূর্ব প্রেস ৫২, শুকলাল দাস লেন, ঢাকা-এক।

                যুুদ্ধোত্তর  বাংলাদেশ

                প্রথম প্রকাশ ॥ মাচর্ ১৯৭৫, দ্বিতীয় প্রকাশ ॥ জুলাই ১৯৭৮, তৃতীয় প্রকাশ ॥ অক্টোবর ১৯৮২, মুক্তধারা ৭১৫, প্রকাশক ॥ চিত্তরঞ্জন সাহা, মুক্তধারা, [স্বঃ পুথিঘর লিঃ], ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১, বাংলাদেশ, মুদ্রাকর ॥ প্রভাংশুরঞ্জন সাহা, ঢাকা প্রেস, ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১, বাংলাদেশ।

                পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি [দ্বিতীয় খ-]

                প্রথম প্রকাশ ॥ আশ্বিন, তেরোশ বিরাশি। প্রকাশক ॥ আহমেদ মাহফুজুল হক। মাওলা ব্রাদার্স ৩৯, বাংলাবাজার, ঢাকা-এক । মুদ্রাকর ॥ এম, আলম, ৪২/এ হাটখোলা রোড, ঢাকা-৩।

                বাঙালাদেশে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সমস্যা

BANGLADESHE CUMMUNIST ANDOLANER SHAMASHYA (problems of Communist Movement in Bangladesh). First Published: January Nineteen Seventy six. Published by A.M Haq of Mowla Brothers. 39 Bangla Bazar. Dacca- One. Printer: Lalan Prokashoni 262, Bangshal Road, Dacca-One. Cover design: Qayyum Chowdhury Price Taka fourteen only

        Imparalism and general crises of the Boureoisie in Bangladesh

                First Published: September, 1979, Published by A. Kabir Khan, Progoti Prokashani 39  Distillery Road, Dacca-4 Printed by Darul Islam, Bani Mudran, 38 Banianagar , Dacca-1 Distributed by Nawroze Kitabistan, 46 Bangla Bazar & 142, Govt. New Market, Dacca.

                যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ

                প্রথম প্রকাশ ॥ নভেম্বর ১৯৭৬ , প্রকাশকপ ॥ চিত্তরঞ্জন সাহা,  মুক্তধারা, [স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ], ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১, বাংলাদেশ  মুদ্রাকর ॥ প্রভাংশুরঞ্জন সাহা, ঢাকা প্রেস, ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১ বাংলাদেশ , আলভী।

                ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

BHASHA ANDOLAN O ANYA PRASANGA (a collection of Articles on Language Movement) By Badruddin Umar, First Edition: Falgun 1386 B.S and 21st Fubruary 1980  . Published by Bohi Ghar,110-286, Bipani Bitan, Chattagong, Bangladesh. Cover designed by Quayam Chowdury.

        TOWARDS THE EMERGENCY RULE IN BANGLADESH

        Published by Chittraranja Saha, Muktadhara, [Prop. Puthighar Ltd.], 74 Farsganj, Dhaka-1, Bangladesh.Printer: P. Saha, Dhaka  Press, 74   Farasganj, Dhaka-1, Bangladesh.  First Edition: August, 1980.

                [An Article on Language Movement for Juvenile] Published by Shishu Sahitya Bitan,  Feringhee Bazar, Chittagong, Banglades. Cover deisgn: Qayyum Chowdhury. Fist Edition: Baishakh, 1387 B.S Second Edition: Magh 1395.

                পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

প্রথম প্রকাশ ॥ ৯ জানুয়ারী ১৯৮২, প্রকাশক ॥ প্রসূন বসু, নবপএ প্রকাশন ॥ ৮, পটুয়াটোলা লেন, কলিকাতা-৭০০০০৯, মুদ্রক: নিউ এজ প্রিন্টার্স, ৫৯, পটুয়াটোলা লেন, কলিকাতা-৭০০০০৯।

                বাঙলাদেশে মার্কসবাদ

                প্রথম সংস্করণ ॥ জৈষ্ঠ ১৩৮৯ , প্রকাশক ॥ বইঘর, ১১০-২৮৬, বিপনি বিতান, চট্টগ্রাম, মুদ্রণে ॥ দি আর্ট প্রেস, ৮, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, চট্টগ্রাম ।

                বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির চালচিত্র

                প্রথম প্রকাশ ॥ অগ্রহায়ন ১৩৮৯, ডিসেম্বর ১৯৮২, প্রকাশক ॥ ঢাকা -১২, ১৬ নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-৫ মুদ্রাকর ॥ আলহাজ্ব মো: সুলতান উদ্দিন ভূঁইয়া, মডেল প্রিন্টার্স,৩৯ বাংলাবাজার, ঢাকা-১২, ১৬ নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-৫।

                ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন

                চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট, কলকাতা ৭০০০০৭৩ ইযধৎধঃরধ ঔধঃরধ ধহফড়ষধহ নু ইঅউজটউউওঘ টগঅজ  প্রথম প্রকাশ ॥ ডিসেম্বর, ১৯৮৪,পৌষ,১৩৯১, প্রকাশক ॥ শিবব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট  লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট, কলকাতা ৭০০০০৭৩।

                ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল [প্রথম খ-]

                বাংলা একাডেমি ॥ ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ॥ বাংলা একাডেমির ত্রিশতম প্রতিষ্ঠা দিবস, ১৭ অগ্রহায়ন, ৩ ডিসেম্বর ১৯৮৪, বা/এ ১৫৩৫, ঢকা।

                পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি [তৃতীয় খ-]

                চটজইঅ-ইঅঘএখঅজ ইঐঅঝঐঅ অঘউঙখঅঘ ঙ ঞঅঞকঅখওঘ জঅঔঘওঞও নু ইধফৎঁফফরহ টসধৎ, চঁনষরংযবফ নু ইড়র এযধৎ. ঋরৎংঃ ঊফরঃরড়হ: ৯ঃয চযধষমঁহ ১৩৯১ ই.ঝ.২১ংঃ ঋবনৎঁধৎু, ১৯৮৫.

                বাঙলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কয়েকটি দিক

                প্রকাশক ॥ চিত্তরঞ্জন সাহা, মুক্তধারা [স্বঃ পুঁথিঘর লিঃ] ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৮।

                মার্কসীয় দর্শন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

                প্রগতি প্রকাশনী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, মার্চ ১৯৮৫, প্রকাশক ॥ গোলাম ফারুক, প্রগতি প্রকাশনী, ১৪৪ ঢাকা নিউমার্কেট, ঢাকা।

                ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল [দ্বিতীয় খ-]

                বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ॥ শ্রাবণ ১৩৯২, জুলাই ১৯৮৫, বা/এ, ঢাকা।

                বাঙলাদেশের কৃষক ও কৃষক আন্দোলন

                প্রশথম প্রকাশ ॥  সেপ্টেম্বর ১৯৮৫, প্রকাশক ॥ কবীর খান, প্রগতি প্রকাশনী , ১৪৪, ঢাকা নিউ মার্কেট, ঢাকা।

                মার্কসীয় দর্শন ও সংস্কৃতি

MARXITO DARSHAN O SANSKRITI

        A collection essays on art and culture by Badaruddin Umar

                প্রকাশক ॥ শিবব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্টিট, কলকাতা ৭০০  ০৭৩। প্রথম প্রকাশ ॥ মে ১৯৮৬, জৈষ্ঠ্য ১৩৯৩, দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণ ॥ আগস্ট ২০০৮, ভাদ্র ১৪১৫।

GENEAL GRISIS OF THE BOURGEOISIE IN BANGLADESH

        First Edition: August 1986, Shraban 1393 Publisher : Papyrus Prajashanee, 92 Arambagh, Dhaka, Printer: Mothar Hossain, Payrus Press: 159 Arambagh, Dhaka-2, Cover Designe: Mamunur Rashid.

        POLITICS AND SOCIETY IN BANGLADESH

        First Published: January, 1987, Published by Ahmed Mahfuzul Haq from Subarna 150 Dhaka Stadium (ist Floor) Dhaka 2. Bangladesh. Cover design & processed by Mamunur Rashid, Printed at Haroon Printers Ltd. 2 Nawab Street. Wari, Dhaka 2.

                বাঙলাদেশে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ধারা

                বর্ণ-বিচিত্রা ॥ ৬৭, প্যারীদাস রোড, ঢাকা ১১০০, প্রথম প্রকাশ ॥ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ প্রকাশক ॥ মোঃ রহমান খান, ২  শ্রীশ দাস লেন, ঢাকা-১১০০।

                বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি

                প্রথম প্রকাশ ॥ নভেম্বর, ১৯৮৭, অগ্রহায়ণ ১৩৯৪, দ্বিতীয় প্রকাশ ॥ চলন্তিকা শ্রাবণ সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৬, অক্ষর বিন্যাস ইনোভেট, ১০১/এ, (২য় তলা), আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা। প্রকাশক ॥ শ্রাবণ, ১৩২, আজিজ সুপার মর্কেট (২য় তলা), শাহবাগ ঢাকা।

                বাঙলাদেশের মধ্যবিত্ত ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি

                ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৮৯। প্রকাশক ॥ মোহাম্মদ গোলাম আলী, প্রথম প্রকাশ ॥ বইমেলা ১৩৯৫॥ ১৩৫/৩ আরামবাগ, ঢাকা-১০০০

                বাঙলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার

                প্রকাশক ॥ মোহাম্মদ গোলাম আলী, পল্লব পাবলিশার্স, ৩১ মিরপুর রোড, ঢাকা-১২০৫, প্রকাশকাল ॥ আগস্ট ১৯৮৯, পরিবেশক ॥ বাংলাদেশ বুক হাউস, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা- ১১০০॥

                পাশ্চদপদ দেশে গণতন্ত্রের সমস্যা

                প্রকাশক ॥ প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা, ৪৬/২ মেহেন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০ থেকে এফ. রহমান কর্তৃক প্রকাশিত। প্রথম প্রকাশ ॥ গ্রন্থমেলা ১৯৯০।

                বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব

                প্রকাশক ॥ প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা, ৪৬/২ মেহেন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০ এফ. রহমান কর্তৃক প্রকাশিত। প্রথম প্রকাশ ॥ গ্রন্থমেলা ১৯৯০।

                প্রসঙ্গ : রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ

                চজঅঝঅঘএঅ : জটঝঝওঅ ঙ চটজইঅ ঊটজঙচঊ

                অ ঈড়ষষবপঃরড়হ ড়ভ বংংধুং ড়হ ৎবপবহঃ ঢ়ড়ষরঃরপধষ পযধহমবং রহ জঁংংরধ ্ ঊধংঃ ঊঁৎড়ঢ়ব

                বামপন্থী মহলে অনৈক্য ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী ঐক্য প্রসঙ্গে

                প্রকাশক ॥ মোহাম্মদ গোলাম আলী, পল্লব পাবলিশার্স, ৬৪/৫ লেক সার্কাস, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫, প্রকাশকাল ॥ বাংলাদেশ বুক হাউস, ৩৮/৪ বাংলাবাজার (২য় তলা), ঢাকা-১১০০, আর কে বুকস, ৩১২ গভ, নিউ মার্কেট, ঢাকা- ১২০৫।

                নব্বুই-এর নাগরিক বুর্জোয়া অভ্যুত্থান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

                প্রকাশ কাল ॥ মাঘ ১৩৯৭, ফেব্রুয়ারী ১৯৯২, প্রকাশক ॥ মোশারফ উদ্দিন ভূঁইয়া, চলন্তিকা বই ঘর, ১৪, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                প্রতিবিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

                প্রকাশক ॥ মোহাম্মদ গোলাম আলী, পল্লব পাবলিশার্স. ৬৪/৫ লেক সার্কাস, প্রকাশকাল ॥  বইমেলা ৯২, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫।

                নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ ১

                প্রশক প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩। প্রকাশক ॥ আহমেদ মাহফুজুল হক, সুবর্ণ ১৫০ ঢাকা ১০০০।

THE INDIAN NATIONAL MOVEMENT

        Raha Ram Mohan Roy Memorial Lectures

        Translated by Azizul Islam

        he University Press Limited, Re Crescent Building, 114 Motijheel C.A, P.O. Box 2611, Dhaka 1000, Bangladesh.

                First Bengali Edition 1984, Published by Chiraita Prokashan, Pvt. Ltd. First English Edition 1993.

                ধর্ম রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা১

                প্রথম সংস্করণ ॥ আগস্ট, ১৯৯৩, শ্রাবণ ১৪০০০, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত, দ্বিতীয় সংস্করণ ॥ জুন, ২০০০, জৈষ্ঠ্য, ১৪০৭, প্রকাশক ॥ শিবব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা ৭০০  ০৭৩।

                বাঙলাদেশে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য

                প্রথম প্রকাশ ॥ জানুয়ারী ’৯৪, পোর্ট্রেট ॥ আসমা নাজ, সার্বিক সহযোগিতায় ॥ ফারুক আহমেদ, ঢাকা।

                মুক্তি কোন্ পথে?

                প্রথম প্রকাশ ॥ ১লা ফেব্রুয়ারী ১৯৯৪, প্রকাশক ।্ আহমেদ মাহফুজল হক, সবর্ণ ১৫০ ঢাকা ১০০০।

                বাঙলাদেশে গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী বইমেলা ১৯৯৪, প্রকাশক ॥ আহমেদ মাহমুদুল হক, বাংলাবাজার, ঢকা-১১০০।

                ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৪, ফাল্গুন ১৪০০, প্রকাশক ॥ মফিদুল হক, ৫ পুরান পল্টন, ঢাকা-১০০০।

                বাঙলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি

                প্রকাশক ॥ কমল কান্তি দাস, মোরশেদ আলম, প্রথম প্রকাশ ॥ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, ভাদ্র ১৪০০। ৬৭ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                সা¤্রাজ্যবাদের নোতুন বিশ্বব্যবস্থা

                প্রকাশক ॥ কমল কান্তি দাস, মোরশেদ আলম, প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ’৯৫, ৬৭, প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                সামরিক শাসন ও বাঙলাদেশের রাজনীতি

                প্রথম সংস্করণ ॥ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৫, প্রকাশক ॥ কে. এম ফিরোজ খান, ৬৭ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                নির্বাচিত বক্তৃতা

                প্রথম প্রকাশ ॥ বইমেলা ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬, প্রকাশক ॥ আমিনুল ইসলাম, ২৫৪ নবাবপুর রোড, ঢাকা-১১০০।

                একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙলাদেশে কমিউনিষ্টদের রাজনৈতিক ভূমিকা

                প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস, মোরশোদ আলম, প্রথম প্রকাশ ॥ এপ্রিল ১৯৯৬, ৬৭, প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                আমদের সময়কার জীবন

                প্রথম প্রকাশ ॥ ১৯৯৬, দ্বিতীয় সংস্করণ ॥ বইমেলা ২০০৫, প্রকাশক ॥ আমিনুল ইসলাম, ২৫৪ নবাবপুর রোড, ঢাকা-১১০০।

                জনগণের হাতে ক্ষমতা : নির্বাচন না অভ্যুত্থান?

                প্রথম সংস্করণ ॥ ২৫ জৈষ্ঠ্য ১৪০৩, ৭ই জুন ১৯৯৬, প্রকাশক ॥ সংস্কৃতি প্রকাশনী এর পক্ষে ফিরোজ আহসান, ৬৮/২, পুরানা পল্টন, ঢকা-১০০০।

                বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির দুই রূপ

                প্রথম প্রকাশ ॥ বইমেলা ১৯৯৭, প্রকাশক ॥ মোঃ আফসারুল হুদা, আফসার ব্রাদার্স, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা- ১১০০।

                বাঙলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি

                প্রথম প্রকাশ ॥ বইমেলা, ফেব্রুয়ারী ১৯৯৭, প্রকাশক ॥ মোঃ আফসারুল হুদা, আফসার, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                সা¤্রাজ্যবাদ ও বিশ্ব পরিস্থিতি

                প্রকাশক ॥ আবুল কালাম আজাদ, প্রথম প্রকাশ ॥ ডিসেম্বর ১৯৯৮, ৩৮/২, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                দ্বিতীয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাঙলাদেশ

                প্রকাশক ॥ আবুল কালাম আজাদ, প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, ৩৮/২ক, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের পথে

                প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস, প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ২০০০, ২ শ্রীশদাস লেন, ঢাকা-১১০০।

                নির্বাচিত প্রবন্ধ

                প্রথম প্রকাশ ॥ একুশে বইমেলা ২০০০, প্রকাশক ॥ মাজহারুল ইসলাম, ৩৮/২-ক, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                খঅঘএটঅএঊ গঙঠঊগঊঘঞ ওঘ ঊঅঝঞ ইঊঘএঅখ

                উধঃব ড়ভ চঁনষরপধঃরড়হ: ঔঁহব ২০০০, ঈড়ঢ়ুৎরমযঃ: ঝঁৎধরুধ ঐধহধস.  ৬৭ চুধৎর উধং জড়ধফ, উযধশধ-১১০০.

                বাঙলাদেশে ফ্যাসিবাদ

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ২০০১, প্রকাশক ॥ মাসুকুল ইসলাম মাসুক, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                সাক্ষাৎকার

                প্রকাশক ॥ মোঃ আরিফুর রহমান নাইম, প্রকাশকাল ॥ ফাল্গুন ১৪০৭, ফেব্রুয়ারী ২০০১, ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ২০০১, প্রকাশক ॥ শ্রাবণ প্রকাশনী, ১৩২, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাক।

                জনগণের সংগ্রামের পথ জনগণের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল প্রসঙ্গে

                প্রথম প্রকাশ ॥ নভেম্বর ২০০২, প্রকাশক ॥ কাশবন প্রকাশনী, ১ নং ভেতবাড়ি লেন, নবাবপুর, ঢাকা। ২৮ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

                বাঙলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র

                বর্ণবিন্যাস ॥ রুক্কু শাহ্, প্রকাশকাল ॥ জুন ২০০৩, ৬৭ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                সংসদীয় রাজনীতি : জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

                প্রকাশক : মোঃ মঞ্জুর হোসেন,  প্রথম প্রকাশ ॥ অক্টোবর ২০০৩, ৩৮ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                প্যালেস্টাইন আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ

                প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস ও মোরশেদ আলম,  প্রথম প্রকাশ ॥ জানুয়ারি ২০০৪, ৬৭ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                আমার জীবন [১৯৩১-১৯৫০, প্রথম খ-]

                প্রকাশক ॥ সাহিত্যিকা, প্রকাশ কাল ॥ অক্টোবর ২০০৪, ৬৭ প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                ঞঐঊ ঊগঊজএঊঘঈঊ ঙঋ ইঅঘএখঅউঊঝঐ ১

                ঈখঅঝঝ ঝঞজটএএখঊঝ ওঘ ঊঅঝঞ চঅকওঝঞঅঘ (১৯৪৭-১৯৫৮)

                ঙঢঋঙজউ টঘওঠঊজঝওঞণ চজঊঝঝ,

                ঋরৎংঃ চঁনষরংযবফ : ২০০৪.

                গণআদালত : অসমাপ্ত মুক্তি সংগ্রামের জের

                প্রকাশক ॥ মেহেরুননেসা মীরা, প্রথম প্রকাশ ॥ আগস্ট ২০০৫, ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                শতাব্দীর শুরুতে বাঙলাদেশে চিত্র

                প্রকাশ কাল ॥ ফেব্রুয়ারী ২০০৬, প্রকাশক ॥ মেহেরুননেসা মীরা, ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                বাঙলাদেশে ইতিহাসচর্চা

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬, প্রকাশক ॥ শ্রাবণ ১৩২, আজিজ সুপার মর্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

                মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের জয় পরাজয়

                প্রকাশকাল ॥ একুশে বইমেলা ২০০৬, প্রকাশক ॥ শেখ জাহাঙ্গীর ইউসুফ, ২১/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

THE EMERGENCE OF BANGLADESH 2

        VOL. 2: RISE OF BENGLADESH NATIONALISM (1958-1971) OXFORD UNIVERSITY PRESS,

        First Published : 2006.

                দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ

                প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০০৭, প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস, ৬৭ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                ২০০৬ সালের শেষে

                প্রকাশকাল ॥ ফেব্রুয়ারী ২০০৭, প্রকাশক ॥ ইবরাহীম খলিল (পারভেজ) ১৪৩৮ দক্ষিণ দনিয়া, ঢাকা-১২৩৬।

                মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সা¤্রাজ্যবাদী তৎপরতা

                প্রথম প্রকাশ ॥ মাঘ ১৪১৩, ফেব্রুয়ারী ২০০৭, প্রকাশক ॥ মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন, ৩৭/১ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                বাঙলাদেশে মোল্লাদের জঙ্গী তৎপরতা

                প্রকাশকাল ॥ একুশে বইমেলা ২০০৭, প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস, ৬৭ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                আমার জীবন [১৯৫০-১৯৬৮, দ্বিতীয় খ-]

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ২০০৮, প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস, ৬৭ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০।

                বাঙলাদেশের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ

                প্রকাশক ॥ আফসারুল হুদা, প্রথম প্রকাশ ॥ ১লা বৈশাখ ১৪১৫, এপ্রিল ২০০৮, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                বাঙলাদেশে সংসদীয় রাজনীতির চিত্র

                প্রকাশক ॥ সমীরকুমার দাস, প্রকাশকাল ॥ এপ্রিল ২০০৮, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা- ১১০০।

                দেশ ও জনগণের অর্থনৈতিক জীবন

                প্রকাশকাল ॥ একুশে বইমেলা, ২০০৯, প্রকাশক ॥ আফসারুল হুদা, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাঙলাদেশ

                প্রকাশকাল ॥ একুশে বইমেলা, ২০০৯, প্রকাশক ॥ আফসারুল হুদা, ৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

                নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ ২

                প্রথম প্রকাশ ॥ এপ্রিল ২০০৯, প্রকাশ ॥ রেহানা হক, ১৫০ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, ঢাকা-১০০০।

                আমার জীবন [১৯৬৮-১৯৭১, তৃতীয় খ-]

                প্রথম প্রকাশ ॥ জুন ২০০৯, প্রকাশক ॥ কমলকান্তি দাস, ৬৭ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১০০০।

                পরিবেশ বিপর্যায়ের পথে বাঙলাদেশ

                প্রকাশক ॥ রবীন আহসান, প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১৩২ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০।

                কার দিন বদল হলো

                প্রকাশক ॥ আফসারুল হুদা, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০।

                স্ট্যালিন প্রসঙ্গে

                প্রথম প্রকাশ ॥ ফেব্রুয়ারী ১৯৯০, প্রকাশক ॥ ফিরোজ আহসান, ২৪/৩ চামেলীবাগ, ঢাকা- ১২১৭।

                পার্বত্য চট্টগ্রাম : নিপীড়ন ও সংগ্রাম

                প্রথম প্রকাশ ॥ বৈশাখ ১৪০৪, মে ১৯৯৭, প্রকাশক ॥ সংস্কৃতি প্রকাশনীর পক্ষে ফিরোজ আহসান, ৬৮/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

                নারী প্রশ্ন প্রসঙ্গে

                প্রথম প্রকাশ ॥ আশ্বিন ১৪১০/ অক্টোবর ২০০৩, প্রকাশক ॥ শ্রাবণ প্রকাশনী, ১৩২ আজিজ সুপার মর্কেট, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০।

সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

১৯৩১ :  জন্ম ২০ ডিসেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহর। পিতা : আবুল হাশিম, অখ- ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক; মাতা- মেহেরবানু বেগম।

১৯৪১ :  স্কুলে ভর্তি।

১৯৪৫ : প্রথম তৎকালীন পূর্ববাংলায় বেড়াতে আসা ও এ অঞ্চলের গ্রাম-নদী –নালার সঙ্গে পরিচয়। ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও-এ মুসলিম লীগের নির্বাচনী সভায় যোগদান, মিল্লাত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম রচনা ‘বিদেশীরা প্রভুত্ব করিবে কেন?’

১৯৪৬ : ১৬ আগস্ট কলকাতায় ময়দানে পিতার সঙ্গে মুসলিম লীগের বিশাল জনসভায় যোগদান। এই কলকাতার অভাবিতপূর্ব রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু। সাধারণ নির্বাচন ও মুসলিম লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ। দিল্লীতে এ উপলক্ষে ৭ থেকে ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পিতার সঙ্গে যোগদান।

১৯৪৭ :  ফেব্রুয়ারি মাসে ডাকঘর নাটকে অমলের ভূমিকায় অভিনয়। পিতার সঙ্গে কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসুর বাসায় গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ।

১৯৪৮ : বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস। বর্ধমান রাজ কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি।

১৯৫১ :  ১২ এপ্রিল দেশত্যাগ করে ঢাকায় আগমন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস।

১৯৫২ : ফেব্রুয়ারি মাসে রচনা করেন ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ নামক পুস্তিকা। এটি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক দশ হাজার কপি ছাপা হয়। আন্দোলনের সময় এটি মাইকে পড়া হতো। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা ও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে পুরো সময় সক্রিয় অংশগ্রহণ।

১৯৫৩ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে দর্শনে অনার্স।

১৯৫৪ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি বিভাগে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকতা।

১৯৫৫ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রহংঃরঃঁঃব ড়ভ যঁসধহ ৎবষধঃরড়হএ গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগদান। প্রথম শ্রেণীতে দর্শনে এমএ।

১৯৫৬ : ১ নভেম্বর দর্শনের লেকচারার হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজে যোগদান।

১৯৫৭ :                 ১ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে যোগদান।

১৯৫৮ : বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে কলকাতা, বেনারস, লক্ষেèৗ, আগ্রা, দিল্লী, লাহোর, পেশোয়ার শিক্ষা সফর।

১৯৫৯ : চাচাত বোন সুরাইয়া হানম- এর সঙ্গে বিবাহ ৭ জুন। পাকিস্তান গভর্নমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে অক্্রফোর্ডে পড়াশোনা। বিষয় দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি। ইংরেজিতে চচঊ। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে অক্্রফোর্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা ২৮ সেপ্টম্বর ।

১৯৬০ : ইউরোপ ভ্রমন। প্রথম সন্তান মসিহা আখতার বানু ফালুদা’র জন্ম।

১৯৬১ : অক্্রফোর্ডের কুইন্স কলেজ থেকে দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতিতে ডিগ্রীলাভ। ৬ আগস্ট অক্্রফোর্ড থেকে দেশে ফেরা। সেপ্টম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজে যোগদান।

১৯৬২ : ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সন্তান সোহেলের জন্ম।

১৯৬৩ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠা।

১৯৬৪ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠা। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সোশ্যাল ওয়ার্ক কলেজেরও প্রতিষ্ঠাতা।

                ১৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় কন্যাসারাহ আখতার বানুর জন্ম।

                পূর্বমেঘ পত্রিকায় ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশের ফলে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি।

১৯৬৫ : লাহোরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান।

১৯৬৬ :                সাম্প্রদায়িকতা গ্রন্থ প্রকাশিত হলে সাংস্কৃতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শাসকশ্রেণী পাকিস্তান বিরোধিতার জন্যে বদরুদ্দীন উমরের উপর ক্ষিপ্ত হয়।

                বাংলা একাডেমীতে ২০ মে অনুষ্ঠিত আহমেদুর রহমান স্মরণসভায় ‘বাঙাালী সংস্কৃতির সঙ্কট’ প্রবন্ধ পাঠ। এটাই ছিল তাঁর ঢাকায় প্রথম বক্তৃতা।

১৯৬৭ : খাজা শাহাবুদ্দীন ও পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী কর্ম তৎপরতার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর। ভাষা আন্দোলন বিজয়ের বই লেখার পরিকল্পনা। ঢাকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী সভায় ‘অসবৎরপধ’ং ভৎববফড়স ভরমযঃং রহ ারবঃহধস’ প্রবন্ধ পাঠ।

১৯৬৮ :                অক্টোবরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত গোর্কিও জন্মশতবার্ষিকী সভায় বক্তৃতা। লেখালেখির কারণে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের ক্রমাগত চাপ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর শামসুল হক বিরক্ত হলে বদরুদ্দীন উমরকে কিছুদিন লেখালেখি বন্ধ করার অনুরোধ করেন। ফলে অক্টোবর মাসে ভিসির হাতে অধ্যাপনায় ইস্তফাপত্র প্রদান। ৩১ ডিসেম্বর অধ্যাপনার মেয়াদ শেষ করে ঢাকায় আগমন।

১৯৬৯ : পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেলিনবাদী) তে এপ্রিল মাসে যোগদান। প্রাথমিক অবস্থায় রাজশাহীতে পার্টির শাখা গঠনের চেষ্টা।

                ভাষা আন্দোলন বিষয়ক ইতিহাস লেখার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শেখ নজরুল ইসলাম প্রমুখ নেতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ।

১৯৭০ :  ৮ই ফেব্রুয়ারি পার্টির পত্রিকা গণশক্তি প্রকাশ ও সম্পাদনা।

১৯৭১ :  মার্চের শেষ দিকে পার্টির দুজন বিশিষ্ট কর্মীর সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে গিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা। এ প্রতিজ্ঞা অনুসারে মুক্তিসংগ্রামের উদ্দেশ্যে অ্যামুনিশন, থ্রি নট থ্রি চাইনিজ রাইফেল ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ত্যাগ। এ সময় বিশেষ করে দক্ষিণ বাংলার গ্রাম-গঞ্জ পায়ে হেঁটে, কিছু পথ নৌকায় করে, প্রতি মুহূর্তে জীবনের ঝুকি নিয়ে জনসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করার প্রয়াস চালান।

                ডিসেম্বর মাসে পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেলিনবাদী) থেকে পদত্যাগ।

১৯৭৩ : বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখান।

১৯৭৪ : সংস্কৃতি পত্রিকা প্রকাশ সম্পাদনা। কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ।

১৯৭৮ : বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলনে যোগদান।

১৯৭৯ : বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন  ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলনে যোগদান।

১৯৮১ :  বাঙলাদেশ লেখক শিবির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।

১৯৮৪ : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজা রাম মোহন রায় স্মারক বক্তৃতা প্রদান।

১৯৮৭ : গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট গঠনে নেতৃত্ব প্রদান।

                অক্্রফোর্ডে কুইন এলিজাবেথ হ্্াউজে বক্তৃতা। ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা। বিখ্যাত মার্কসীয় অর্থনীতিবিদ আর্নেস্ট ম্যান্ডেলের সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা।

১৯৮৮ : হাইডেলবার্গ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা।

                আর্নেস্ট ম্যান্ডেলের সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা।

১৯৮৯ : কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে বক্তৃতা।

১৯৯০ : আলবেনিয়া সফর

১৯৯২ : একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে ভূমিকা পালন।

১৯৯৪ : যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ফোবানা সম্মেলনে যোগদান। লন্ডন স্কুল অব অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ এ বক্তৃতা। ব্রাসেলসে আর্নেস্ট ম্যান্ডেলের সাথে ৩য় বার সাক্ষাৎ ও আলোচনা।

১৯৯৫ : নিউইয়র্কে বেঙ্গল কনফারেন্সে যোগদান। অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদে সিপিআই (এম-এল) জনশক্তি আহুত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান।

১৯৯৮ : দিল্লীতে অমিয়া এন্ড বি জি রাও স্মারক বক্তৃতা প্রদান।

২০০১ : বিহারের পাটনায় সিপিআই (এম এল)লিবারেশন –এর কংগ্রেসে যোগদান।

২০০২ : পশ্চিমবঙ্গের পানিহাটিতে বেগম রোকেয়ার সমাধিস্থান চিহ্নিতকরণ উপলক্ষে বক্তৃতা প্রদান ও ফলক উন্মোচন।

২০০৩ : জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল গঠন, সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।

২০০৪ : মুম্বাইতে আন্তর্জাতিক সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী সম্মেলন ‘মুম্বাইরেজিসটেন্স ২০০৪’ উদ্বোধন।

২০০৫ : অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রীতে সিপিআই (এম-এল) জনশক্তি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান।

২০০৯ : ফ্যাসিবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।

২০১১ :  জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠনে নেতৃত্ব দান।

************************************************

প্রাণজি বসাকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মোস্তাক আহমেদ

…মানবিক চেতনাবোধ ছাপিয়ে এখন ধর্মের নামে আমরাই নিজেদের কাছে নিয়ত সন্দিহান হয়ে উঠছি।…

[সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি প্রাণজি বসাক। প্রায় কুড়িটি কাব্যগ্রন্থের জনক তিনি। কবিতার পাশাপাশি অল্পবিস্তর গদ্যেও তাঁর অনিয়মিত যাতায়াত। ব্যস্ততম পেশার মধ্যে কবিতা তাঁর কাছে জায়মান অক্সিজেন। বাংলা ছেড়ে দূরে অবস্থান করেও নিজ ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তিনি যে দায়বদ্ধতার ছাপ রেখে চলেছেন তা সমস্ত প্রশংসার উর্দ্ধে। দিল্লি প্রবাসী এই মানুষটির সঙ্গে আমার আলাপ বাংলাদেশে। রাজশাহীতে ‘কবিকুঞ্জ’-এর জীবনানন্দ মেলায়। এমন সহজ সরল প্রতিভাবান মানুষটির সাক্ষাৎ পেয়ে আমি মুগ্ধ। অল্প দিনের আলাপ কোথাও এক বন্ধুতার দাবি জানায়। আরও গভীরভাবে মানুষটিকে জানতে ইচ্ছে করে। ছুঁতে ইচ্ছে করে কবির ভেতরের বোধকে। সেভাবেই আড্ডায় বসে পড়া। গল্পে গল্পে কথায় কথায় এক রূপকথা উঠে আসে। উঠে আসে আড়ালের নির্মেদ গল্প, শূন্য থেকে আকাশ ছোঁয়ার ইতিহাস। তারই খ- খ- কিছু চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরা হল।]

মোস্তাক আহমেদ : কবিতা পড়তে পড়তে কবি সম্পর্কে ঔৎসুক্য তৈরি হয়। জানতে ইচ্ছে করে কবির ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কথা। কেমন ছিল আপনার জন্ম, বাল্য, কৈশোর… কাদের সংস্পর্শে আপনার বড়ো হয়ে ওঠা?

প্রাণজি বসাক : ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কথা বলতে গেলে তো একটা উপন্যাস হয়ে যাবে। দেশভাগের ফলে বাবা-মা এপার ওপার হয়েছিলেন, বাস্তুহারা জীবন। তাঁত ফ্যাক্টরিতে শিশু শ্রমিক ‘ঝ’  মার্কা একটা বিস্কুট পেতাম কাজ শেষে, তার প্রতি ভীষণ লোভ ছিল। ভাবতে অবাক লাগে বা এখন অবিশ্বাস্য বলে মনে হয় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ বছর বয়সে ভর্তি হবার আগেই আমি ঐ তাঁত ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। তারপর সকাল বিকালে করতাম। ক্লাস ফাইভে শহরের বড়ো স্কুলে ভর্তি হলে সে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এবং তারপর থেকে গ্র্যাজুয়েশন করা পর্যন্ত আমি সগৌরবে একজন বিড়ি শ্রমিক। এরকমই ছিল আমার বাল্য, কৈশোর। তারপর গো-পালন, ঘাস কাটা, মাছ ধারা, চাষবাস সমস্ত কাজই করতে হয়েছে এবং সমস্ত কাজের মধ্যে আমি একটা ছন্দ খুঁজে পেতাম, যা আমার মধ্যে অজান্তে কবি প্রতিভার উন্মেষ ঘটায়। আর এভাবেই দারিদ্র্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে বড়ো হলাম। বাকি কথা অন্য কোথাও বলা যাবে।

মোস্তাক আহমেদ : কবে থাকে লেখালেখি শুরু? এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট অনুপ্রেরণার কথা মনে পড়ে। বিশেষ কোনো ঘটনা বা কোনো ব্যক্তি…

প্রাণজি বসাক : কাগজে কলমে কবে থেকে লেখালেখি শুরু এখন আর তা মনে করা মুশকিল বৈকি। তবে পত্র-পত্রিকায় ছাপা বেশ পরে শুরু হয়েছে। ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দটির অর্থই এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। গ্রাম্য প্রকৃতি পরিবেশ এবং তার সঙ্গে জড়িত দারিদ্র্য আমার অনুপ্রেরণা। প্রতিটি ঋতু আমি উপভোগ করেছি নানাবিধ কাজের মাধ্যমে। অবশ্যই তা সাংসারিক প্রয়োজনে, অর্থ উপার্জনের প্রেক্ষিতে।

পাড়াতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়, সেখানে ঘণ্টা তিনেকের পড়াশোনা — প্রতিদিন সমবেতভাবে নামতা পড়া। বিদ্যালয়ের টিনের ঘর। বেড়া নেই। একদিন  পরীক্ষা চলছিল। হঠাৎ পাড়াতুত এক দাদা বিদ্যালয় কক্ষের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন — ‘তুই বড়ো হয়ে কবি হবি’। কবি হয়েছি কিনা জানিনা, তবে কথাটি চিরস্থায়ী হয়ে আছে এবং কবিতার সাথে জীবন যাপনে আছি হয়তো ওনারই  আর্শীবাদে।

বহু ঘটনা আমার কবিতার উপজীব্য। নানান অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতাই কবিতার অনুপ্রেরণা। বহু গোপন উপলব্ধি যা জীবনে কোনোদিন মুখে উচ্চারিত হবে  হবে না তা কবিতায় অনায়াসে তুলে আনতে পারি, যা আমাকে বিস্মিত করে। বহু সাধারণ মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, যা কবিতায় এসেছে বা আসে বারবার। আসলে মানুষের কথা বলবো বলেই আমার এই কবিতা-সাধনা।

মোস্তাক আহমেদ : প্রথম লেখার স্মৃতি মনে পড়ে? প্রথম কবিতা? প্রথম গ্রন্থ? কেমন ছিল তখনকার অনুভূতি?

প্রাণজি বসাক : শ্রদ্ধেয় জীবন দে ‘ঝড় তুফান’ পত্রিকার সম্পাদক। উনি আর একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ‘তুফান এক্সপ্রেস’। ততদিনে আমি চাকরিসূত্রে দিল্লি পৌঁছে গেছি (১৯৮০)। একদিন নির্জন নিস্তব্ধ দুপুর বেলায় আমার খাতায় নজর রাখলেন জীবন দে। তিনিই প্রথম প্রকাশ করলেন কবিতা, পরে গল্প এবং অন্যান্য লেখালেখি। বিশেষ কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হল। বিশাখা। জীবন দে ছাপলেন — শ্রী বিশাখা ব্যবহার করে। একবার ত্রিশ টাকার মানি-অর্ডার এলে ডাকপিয়ন কিছুতেই আমাকে টাকা দিতে চাইছিল না। জীবন দে প্রায় প্রতি সংখ্যাতেই আমার লেখা রাখতেন। সবই ডাকযোগে পাঠানো। প্রায় বারো বছর চাকরির ডিউটিতে সারা ভারত ঘুরতে থাকি। পোস্টাল ঠিকানা দিল্লি।

১৯৯১ এর শেষ নাগাদ জলপাইগুড়ি গেলাম পোস্টিং নিয়ে। সেখানে প্রকাশ পেল আমার প্রথম কবিতার বই ‘জল টানে…./… টানে কবিতা’ (১৯৯২)। ঘরোয়া  পরিবেশ ছোট্টো একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ পেয়েছিল বইটি। ড. বরেন রায় একটি মূল্যবান মুখবদ্ধ লিখেছিলেন।

প্রসঙ্গত বলি জীবন দে আমার প্রচুর চিঠি লিখতেন। বেশিরভাগ চিঠিতে তিনি রাজনৈতিক জীবনের নানান কথা লিখতেন। তাঁর চিঠিপত্র নিয়ে একবার ‘অবরোধবাসিনী’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা করি দিল্লি থেকে। ওনার কাছে তিনশো কপি পাঠাই। খুব খুশি হয়েছিলেন সংখ্যাটি হাতে পেয়ে।

মোস্তাক আহমেদ :  আপনার পেশার সঙ্গে লেখালেখির কোনো বিরোধ তৈরি হয়নি? কিভাবে সেসব মিলিয়েছেন একবিন্দুতে? নাকি বিরোধ ক্ষতি করেছে লেখার পরিমাণ ও মনকে?

প্রাণজি বসাক : বাংলা ভাষায় কবিতা লেখা পেশা হিসেবে নেওয়া কি সম্ভব! তা স্বপ্নেও কোনো কবি বিশ্বাস করতে পারে বলে আমার জানা নেই। কারো সুবিশাল জমিদারিত্ব থাকলেও সম্ভবপর কিনা, ভাববার বিষয়। আজকালকার নেতারাও পারবেন কিনা সন্দেহ থেকেই যায়। অতএব জীবনধারণের জন্য একটা জুতসই পেশা থাকা চাই। প্রাথমিক কর্ম হল ওই পেশা — তারপর কবিতা লেখার শখ মেটানো।

মোটামুটি বলতে পারি চার বছর বয়স থেকে শিশুশ্রমিক তাঁত ফ্যাক্টরিতে। এগারো বছর বয়স থেকে একটানা বিড়ি শ্রমিক— বি.এস.সি. পাস করা অবধি। চাকরি জীবনের প্রথম চার বছর আধা-সামরিক বাহিনিতে সৈনিক। কঠোর ট্রেনিং শেষে সেখানে এসে দাঁড়ালাম — তা শুধুই সংসার পালন। রাতের ডিউটিতে হাজার লক্ষ তারাদের সাথে কথা হত। তারা কি কবিতার কথা বলতো — হয়তো বলতো। তারপর একজন অডিটর হিসেবে সরকারি অফিসে শুল্ক কাজে। পাশে কবিতা থাকত নিশ্চয়ই। না হলে পাগল হয়ে যেতাম বৈকি। কবিতা কখন জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। তাহলে পেশার সাথে লেখার বিরোধ থাকল কোথায়। পারিমাণ হয়তো হেরফের হবে। আর মান। সে তো যার যার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। আমার যদি প্রয়োজনীয় মানের সাহিত্য রচনার ক্ষমতা না থাকে তাহলে মানুষ সময়ের সাথে এমনিই ভুলে যাবে।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার জীবনের সিংহভাগ কেটেছে বাংলার বাইরে। অথচ সারাটা জীবন বাংলাতেই সাহিত্যচর্চা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে লেখার এই মনন একাকীত্বে কখনও টাল খায়নি? ক্রমাগত লেখালেখি বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনোরকম সমস্যা হয় না?

প্রাণজি বসাক : আমার জীবনটাকে তিন ভাগে ভাগ করলে মাত্র এক ভাগ কেটেছে উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জেলার মহুকুমা শহরের গা ঘেঁষা এক গ্রামে। বাকি দু-ভাগই তথাকথিত বাংলার বাইরে। বাংলা ভাষা আমার মাতৃভাষা — এ ভাষাতেই আমার লেখালেখি। হিন্দি বলয়ে বসবাস করলেও তা শেখা হয়নি। ইংরেজিকে আমি অফিসের ভাষা মনে করি। বহুবার ইংরেজি সাহিত্য পড়ার চেষ্টা করেছি তবে প্রাণ বা রস  পায়নি। কবিত্বে একাকীত্ব অলংকার। প্রায় ৫-৬ বছর আমি দিল্লির স্থানীয় আসরগুলোতে অংশগ্রহণ করি না বলে আমার নাম হল— ‘একা এক কবি’। দেখলাম একাকীত্ব বোধ কবিতার আয়োজনে অনুঘটকের মতো সৃষ্টিতে মগ্ন থাকতে সহায়ক। তবে  তাঁ গত দশ বছরে বহুবার বাংলাদেশ গিয়েছি নানান কবিতা উৎসবে এবং কখন কেন জানি না সেই একাকীত্ব বোধটা অনেকখানি কেটে গেল। ভীষণ টানে আমায়। কেউ ডাকলেই চলে যাই। তাই মনে হয়। দীর্ঘদিন  বাংলার বাইরে থাকলেও বাংলাতে সাহিত্যচর্চা কোনো অসুবিধা হয়নি। আপনাদের ভালোবাসায় টাল খাওয়া থেকে বেঁচে আছি এবং থাকবো। বার বার ঠিকানা বদল হওয়ায় যোগাযোগ বিঘিœত হয়েছে, নিজস্ব ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ঠিকমতো গুছিয়ে রাখতে পারিনি। তবুও প্রচুর বাংলা বই আমার সংগ্রহে আছে সেগুলোর ভেতরে যখনি থাকি, মনে হয় আমি বাংলাতেই আছি।

মোস্তাক আহমেদ :  জীবনের নানা সময়ে বিভিন্ন পত্রিকা আপনি সম্পাদনা করেছেন। পত্রিকা প্রকাশের অভিজ্ঞতাটা ঠিক কীরকম? এই পত্রিকা প্রকাশ কেন? একটা নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম খোঁজার চেষ্টা? এটাও কী কোনো ধারনের আত্মসংকট?

প্রাণজি বসাক : হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন যে জীবনের নানা সময়ে দু-চারটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে বা সুযোগ এসেছে। কোনো প্ল্যাটফর্ম খোঁজার চেষ্টা নয়। সময়ের প্রয়োজনে কাঁধে নিয়েছিলাম সেসব দায়িত্ব। আত্মসংকট থেকে তো নয়ই, বরং আত্মবিশ্বাসে পত্রিকার সঙ্গে যাপনে মিশতে চেয়েছি। খুব গভীর না হলেও জীবনের সে অভিজ্ঞতা সমানও নয়।

দিল্লির ঈডঈ (ঈবহঃৎবষ ডধঃবৎ ঈড়সসরংংরড়হ) এর জক চঁৎধস, ঝবধি ইযধাধহ এ কর্মরত ছিলেন প্রচুর বাঙালি। অফিসার থেকে শুরু করে নিচু তলা পর্যন্ত যাঁরা ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে এখানে পোস্টিং। তাঁদেরই প্রচেষ্টায় তৈরি হয় ‘অনুরণ’ বলে একটি সংস্থা। সমাজ কল্যাণমূলক নানান কর্মকা-ের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত। শুরু করা হয় সাহিত্যচর্চা বিভাগ। প্রধান সম্পাদক ছিলেন প্রসিদ্ধ শিল্পী নন্দদুলাল কু-ু। আমার কাঁধে পড়ল সম্পাদনার মূল কাজ। প্রথমে হাতে লিখে, তারপর সাউক্লোটাইল ফরম্যাট, তারপর প্রিন্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালিরা অবসর গ্রহণ করলেন, আর ‘অনুরণ’-এরও রিটায়ারমেন্ট হল। আমার ঝুলিতে এল সম্পাদনার অভিজ্ঞতা। লেখাতে তার প্রভাব এল।

বছর দুয়েকেরও কিছু কম সময়ের জন্য পোস্টিং-এ এলাম জলপাইগুড়িতে। আমার তখন ছদ্মনাম চলছে। বিশাখা। ড. আনন্দ গোপাল ঘোষ একদিন আমার বাসায় একটি ছোট্টো চিরকুট পাঠালেন তাতে ‘অবরোধবাসিনী’ শব্দটি উল্লেখ ছিল। বেগম রোকেয়া একটি উপন্যাসের নাম। পরে বললেন জলপাইগুড়িতে এমন কোনো লিট ম্যাগ নেই যেটি মেয়েদের লেখালেখি নিয়ে মূলত কাজ করবে। কাজেই একটি কাগজ হোক ঐ নামে। ব্যাস শুরু হল কাজ এবং চলল। তবে ‘অবরোধবাসিনী’ আমার পিছু ছাড়েনি বহু বছর। দিল্লি ফিরে এসেও অনিয়মিত চলছিল।

পেশার কারণে ১৯৯৪-১৯৯৮ পর্যন্ত অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগরে পোস্টিং হল। আমার কোয়ার্টারে মাসান্তিক আসর শুরু হল। কবিতা, গল্পপাঠ, এবং গান, গানের তালে তালে নাচ। তাহলে কাগজ বাকি থাকে কেন। শুরু করলাম ‘অরুণদীপ’। সম্ভাবত ‘অরুণদীপই’ হল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম লিট. ম্যাগ সমগ্র অরুণাচল প্রদেশে। ইটানগরে একটি পানের দোকানে রেখেছিলাম শ-খানেক কপি তা সাত দিনেই শেষ। কিন্তু অঘটন ঘটল, চাকরি বাঁচানোর দায়ে ‘অরুণদীপ’ আর প্রকাশ করতে সাহস হল না। বাঙালি আর বাংলা ভাষাচর্চার ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হল।

‘দিল্লি হাটার্স কবিতা সংকলন’-এর সম্পাদনা করতে গিয়ে তিক্ত-মিষ্ট দুই অভিজ্ঞতা প্রচুর পরিমাণে জমল। সম্পাদকীয় লেখা নিয়ে প্রচুর মতবিনিময়, বাগবিত-া চলতে থাকে। একসময় আমি তা লিখে খামে বন্ধ করে রাখি। মোটামুটি ২০০০ সাল থেকে ২০১০ অবধি দিল্লি হাটুরেদের এক এক ফর্মা কবিতা নিয়ে একটা যৌথ প্রয়াস। এটার মূল দায়িত্ব ছিল আমার। কলকাতায় ভাষাবিদ কলিম খান প্রকাশের দায়িত্ব নেন। শেষমেষ সহজ হল না সম্পাদনার কাজটি। নিজেরাই নিজেদের মধ্যে নানাভাবে জড়িয়ে পড়লাম। তবে কাজটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লিতে বাংলা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে এক একটি বিশেষ সময়ের দলিল। ভবিষ্যৎ গবেষকদের ক্ষেত্রে সংকলনটি বিশেষ আকর হয়ে উঠবে বলে মনে হয়।

মোস্তাক আহমেদ : ‘দিল্লি হাটার্স’-এর সঙ্গে আপনার সংযোগ, বিচ্ছেদ এই ব্যাপারগুলো ঠিক কীরকম? আপনার সাহিত্য জীবনে দিল্লি এর ভূমিকাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? কী অবস্থা  এখন ‘দিল্লি হাটার্স’ এর?

প্রাণজি বসাক : এ হেন প্রশ্নের উত্তর বিশেষ কারণে আমি যতটা সম্ভব সংক্ষেপে দিতে চাই। ‘দিল্লি হাটার্স’ এখন আমার কাছে ইতিহাস। সংযোগ নয়, জন্মলগ্ন থেকে আমি তার ধারক বাহক। আমার আইআইটি কোয়ার্টারে মাসের শেষ শনিবার বসত সাহিত্য আসর। প্রতি সপ্তাহে আড্ডা বসানোর তাগিদে খুঁজে বার করা হল দিল্লিহাট। প্রথমে শুক্রবার সন্ধ্যায়, পরে শরিবারে বিকেলে শুরু হয় আমাদের আড্ডা কাম সাহিত্যপাঠ হাটবন্ধুমালা। দিল্লিহাটে বসা হয় বলে আমাদের নামকরণ হয় ‘দিল্লি হাটার্স’। ততদিনে আমাদের অন্নপ্রাসন হয়ে গেছে— হাঁটি হাঁটি পা পা। পত্রিকা/কাগজ বার করতে হবে, থাকল ওই নামই। প্রথম সংখ্যা সমবেত সমবায় সম্পাদকহীন। দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে সম্পাদকের নাম রাখা হল।

আড্ডার যখন বয়স পাঁচ বছর, ততদিনে আমাদের ভাষাচর্চা, স্টাইল বরন-ধারণ একটা আন্দোলন গোছের হয়ে উঠেছে এবং আমাদের লেখালেখি উপস্থাপনা অন্য ধারায় চিহ্নিত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের প্রয়াসধারা। তুমুল আড্ডায় তখন ধুন্ধুমার কা-। — কেউ কাউকে ছাড়বার নয়। বাইরের সাহিত্যরসিক বন্ধুজনের সমাগম হল। সারাদিনব্যাপী সাহিত্য আসর হল বিভিন্ন জায়গায় তিনবার।

ন-বছরের মাথায় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সংকলন বের করবার। সম্পাদনার দায়িত্ব ন্যস্ত হল আমার উপর। ‘দিল্লি হাটার্স’ ‘কবিতা সংকলন’ বের হল ২০০৯ সালে।  প্রচুর আলোচনা হল। ছড়িয়ে পড়ল দেশের নানা প্রান্তে। এমনকি বিদেশেও। বাংলাদেশে নিয়ে গেলাম, পরিচয় করানো হল দিল্লির বাংলা সাহিত্যচর্চার বিষয়টি। দশ বছরে সংঘ ভাঙে। সে নিয়ম এসে পড়ল আমার চৌকাঠে। এক বিশেষ বিশ্বাস নিয়ে আমি নিজেই সরে এলাম। সরে আছি এখনও। তবে প্রচুর প্রশ্নের উত্তর এখনও দিতে হয়। দিই।

‘দিল্লি হাটার্স’ আমার সাহিত্য জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান চিহ্নিত সময়। সেখান থেকে সরে এসে মূলধারায় সহজ সরল ভাষায় মানুষের কথা কবিতায় বলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সময় বিচার করবে এ সবের পরম্পরা এবং প্রকৃত ইতিহাস।

মোস্তাক আহমেদ :  আপনার দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যে সম্পর্ক তা যদি একটু আমাদেরকে জানান… আপনার নিজস্ব লেখালেখিতে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?

প্রাণজি বসাক : আমার অধিকাংশ লেখাই লিট. ম্যাগে প্রকাশিত। আমি মূলত লিট. ম্যাগের কবি। যদিও উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রচুর লেখা প্রকাশ পেয়েছে। তার কিছু লেখা বাদ দিলে প্রায় সবই লিট. ম্যাগ প্রকাশিত — ভারত, বাংলাদেশ বা অন্যান্য দেশ থেকে। কাজেই একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যারা লেখা চেয়ে নেয় তাদের আগে দিই। আবার কোনো গ্রামগঞ্জের লিট. ম্যাগ রেরুনোর খবর পেলাম  তো  আমি যোগাযোগ করে উৎসাহ দিই এবং লেখা পাঠাই। তবে এখন সম্পাদকেরা পয়সা খরচ করে দিল্লিতে কাগজ পাঠাতে চান না — এটা একটা সমস্যা। কোনো সমাধান আছে কিনা জানি না।

লিটল ম্যাগাজিন না থাকলে হয়তো আমার এতটা কবিতা লেখা হত না। ভালো লাগে যাঁরা যতœ সহকারে লিট. ম্যাগ বাঁচিয়ে রাখেন। তাঁদের ধন্যবাদ জানাই। তবে একটা ব্যবসা শুরু হয়ে গেছে যা বেশ ক্ষতিকারক। কিছু অসাধু সম্পাদকও রয়েছেন এবং রাজত্ব চালাচ্ছেন। আমি স্বাভাবিক ভাবেই  লিট. ম্যাগে লিখতে ভালোবাসি।

মোস্তাক আহমেদ : দিল্লিতে সামগ্রিক লেখার পরিবেশ কেমন? মূলত বাংলা সাহিত্য চর্চার পরিসর আদৌ কি আশাব্যঞ্জক?

প্রাণজি বসাক : সামগ্রিক লেখার একটা পরিবেশ দিল্লিতে নিশ্চয়ই আছে — বিভিন্ন ভাষাভাষির সাহিত্যকর্মীরা এখানে আছেন, সৃষ্টিতে মগ্ন রয়েছেন। তবে পরিবেশ কে কীভাবে গড়ে তুলছেন, সামগ্রিকভাবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা তা বিশ্লেষণের বিষয়। দিল্লিতে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দুর পাশাপাশি বাংলা, তামিল, তেলেগু  মালায়লাম, ইত্যাদি ভাষার সাহিত্যিকরা রয়েছেন।

এই প্রথম সেদিন আকাশবাণী দিল্লি আমাদের তিন কবির কবিতা এবং বাংলা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র নিয়ে আলাপ আলোচনা রেকর্ড করল এক ঘন্টা ধরে। তাঁদেরও সেই একই প্রশ্ন দিল্লিতে বাংলা সাহিত্যচর্চার গতিপ্রকৃতি, কবি হিসাবে আমাদের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি। বাংলা ভাষাচর্চা ক্রমে কমে যাচ্ছে। সামগ্রিক পরিবেশ বাংলা কবিতাচর্চার অনুকূলে নয়। যে প্রাকৃতিক পরিবেশ দুই বাংলায় প্রবাহিত তা থেকে এখানকার পরিবেশ বেশ ভিন্ন, এখানে বাঙালি জীবনে আবেগপ্রবণতাও কম। তবে বাঙালির উপস্থিতি ক্রমবর্ধমান। কেউ কেউ দাবি করেন ১৫-১৭ লক্ষ বাঙালি এখন দিল্লি এবং ঘঈজ-এ বসবাস করে। এখানে কোনো বাংলা দৈনিক নেই, কোনো ভালো মানের লিট. ম্যাগ নেই। বাংলা সাহিত্যচর্চায় প্রজন্ম তৈরি হয়নি। কাজেই তথাকথিত পরিসর আদৌ আশা বহন করে না। ছোটোখাটো সাহিত্য আড্ডাগুলো খানিকটা অক্সিজেন দিয়ে চলছে। বড়ো কোনো সাহিত্য বা বাংলা কবিতা উৎসব হয় না। বেঙ্গল এসোসিয়েশন আয়োজিত বাংলা বইমেলায় নির্জন দুপুরে দিল্লির কবিদের কবিতা পাঠের আসর বসে। আমরা আশায় আবিষ্ট হয়ে বসে থাকি।

মোস্তাক আহমেদ : কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প, রম্যরচনা লিখেছেন? কেন এই গদ্য রচনা? কবিতা কি ভাবনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে যথেষ্ট নয়?

প্রাণজি বসাক : একসময় একটা সময়ে সত্যি কবিতার পাশাপাশি অনেক ছোটোগল্প লিখেছি। তা বিশেষভাবে গদ্যরচনা বা ভাবনা প্রকাশের মাধ্যমে হিসাবে নয়। কোনো কোনো গল্প জীবনের অভিজ্ঞতাপ্রসূত। লিট. ম্যাগ সম্পাদকের চাহিদা মেটাতেও অনেক গল্প লেখা হয়েছে। নানা রকমের বিষয় উঠে এসেছে গল্পে। এরকম ছোটোগল্পের সংকলন — ‘ভাঙা তরঙ্গ’। এখন আর আলাদা করে গল্প লেখা হয় না, গদ্য হয় না, আমার কবিতাতেই এসে যায় উপাখ্যানমালা — সংক্ষেপে, ভিন্ন মাত্রায়।

আর রম্যরচনা লিখেছি এক অন্য তাগিদে। বেশ মজা ও আনন্দ ছিল সে সব লেখায়। সাহিত্য আসরে কখনও গল্পকার গল্প পড়া শুরু করলে বোরিং লাগত। ভাবতাম রম্যরচনা। এরকম নির্বাক বোর হয়ে বসে থাকার চেয়ে খানিক হাসির খোরাক আনতে হবে আসরে। শুরু করলাম রম্যরচনা লিখতে। বেশ মজা হল। শ্রোতা অপেক্ষা করত কখন রম্যরচনা পাঠ হবে। এরই মধ্যে আকাশবাণী শিলিগুড়ি ডাক দিল তাদের ‘চিত্রবিচিত্র’ প্রোগ্রামে রম্যরচনা পাঠ করতে। তারা বিষয় দিতেন লিখতে। সে বিষয়ে লিখে নিয়ে গেলে রেকর্ড করা হত। এইভাবে অনেক রম্যরচনা লেখা হল — সেগুলোর একটা বই আছে আমার। নাম ‘রম্য মালঞ্চ’।

হ্যাঁ, তা পনেরো বছরের উপর হল শুধু কবিতায় মগ্ন হয়ে আছি। খুব সহজ সরল ভাষায় কবিতায় গল্প তুলে আনার চেষ্টা করি।

মোস্তাক আহমেদ : সাধারণভাবে কবিরা যখন গদ্য বা গল্প লেখেন তখন তা এক আলাদা মাত্রা পায়। এ ক্ষেত্রে আপনার ভাবনাটা যদি একটু বলেন…

প্রাণজি বসাক : এটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। কবিদের গদ্য আর গদ্য লিখিয়েদের গদ্যের মধ্যে প্রকৃতভাবে ডিমার্কেশন আছে কি নেই তা ভাববার বিষয়। সময় নিয়ে আলোচনা হোক। মানুষে মানুষে তফাৎ যখন, তখন ভাবনার তফাৎ হবেই। কবিদের ভাবনা কবিতার ভাবনা বেশ পরিশ্রুত শুদ্ধ। গল্পের গভীরতা আর কবিতার গভীরতা এক স্তরের নয়। কাজেই কবিদের গদ্যে ভিন্ন স্বাদ আসাটা হয়তো স্বাভাবিক। কোনো কোনো সময়ে তা একটা অন্য মাত্রা নিয়ে আসে। অনেক কবিরাও লিখে চলেছেন অসংখ্য গল্প বা ঢাউস উপন্যাস।

মোস্তাক আহমেদ :  শিশু-কিশোর সাহিত্যের প্রতি আপনার আগ্রহ একটু বিশেষ রকমের… ধারাবাহিকভাবে ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’-এ আপনি শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন… এই সযতœ আগ্রহের কারণ কী? লেখাগুলো গ্রন্থাকারে বেরোলো না কেন?

প্রাণজি বাসাক : সে এক ভিন্ন গল্প। তখন জলপাইগুড়িতে থাকি। সাহিত্যমহলে যাতায়াত করি। মাঝে মাঝে শিলিগুড়ি যাই দলবল বেঁধে কবিতা পড়তে। এমনকি শিলিগুড়ির সাহিত্য আসর জলপাইগুড়ির দল না এলে শুরুই হতো না।

একবার শিলিগুড়ি থেকে ফিরছি পড়ন্ত বিকেলে। জলপাইগুড়ি ঢোকার মুখে কোনো একটি ছোট্টো দোকানের পাশে একটি সাইনবোর্ড নজরে পড়ল, তাতে লেখা ‘এখানে হাড়ের গুঁড়ো পাওয়া যায়’। এই নিয়ে একটা হালকা রসের গল্প লিখলাম ‘ছোট্টো মামা ব্যবসা’। এক শনিবারের পাতায় উত্তরবঙ্গ সংবাদে সেটি বেরুলো। খুব আনন্দ এবং উৎসাহ পেলাম। সেটি পড়ে ড. বিজয় ভূষণ রায় আদেশ দিলেন, আরেকটি লেখো। লিখলাম উত্তরবঙ্গ সংবাদ আবার শনিবারের পাতায় ছাপালো। এইভাবে চলতে থাকলো। চরিত্র এক তবে প্রতিটি গল্প স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র।

যতদূর মনে পড়ে বছর চারেক ধরে গল্পগুলো বেরিয়েছে। কিশোর সাহিত্য বটে, তবে সবাই পড়তে পারেন। বই আকারে সেগুলো বের করা হয়নি এখনও। প্রকাশকের খোঁজে আছি। একটা ভয় কাজ করে সবসময়, প্রকাশকের খপ্পরে পড়ে না যাই। দিল্লি থেকে যোগাযোগ করাটাই বেশ মুসকিল যে! ছবিসহ বই করলে বেশ ভালো হতে পারে। উপাদেয় হবে।

এছাড়া আরো কিছু কিশোর গল্প আছে সেগুলোও নানান পত্রিকায় বেরুনোর পর আর বই করা হয়নি। বারবার ঠিকানা পরিবর্তনে তার অনেকটাই নষ্ট হবার পথে।

মোস্তাক আহমেদ : শিল্পের অন্য ধারাগুলির অভিঘাত এবং আশ্রয় আপনার লেখালেখিকে কীভাবে প্রভাবিত করে? এক মাধ্যম থেকে আর এক মাধ্যমে সরে সরে যেতে  ইচ্ছে করে না?

প্রাণজি বসাক : বলতে দ্বিধা নেই, কবিতা নিয়ে এমন জড়িয়ে আছি যে, অন্য মাধ্যম চিন্তায় আসে না। সরে যাওয়ার অভিপ্রায় নেই। একসময় আর্ট শো দেখতে যেতাম এবং কোনো একটি ছবির পাশে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতাম। ছবিটাই অনেকসময় কবিতা মনে হত। তাই বলে ছবি আঁকতে যাওয়া — ভাবতে পারিনি। বিশ্বকবি ৬৩ বছর বয়সে ছবি আঁকা শুরু করেন। আসলে তিনি পারতেন, আমরা পারি না। অতি উৎসাহে দু-একবার গ্রাম্য নাটকে প্রবেশ করেছি মাত্র। ওটাও আসে না। সিনেমা দেখি না বহুকাল। বহু কবি শুনেছি সিনেমা দেখে কবিতা লেখেন। হতে পারে চিন্তার অভিব্যক্তি। তবে দৃশ্য প্রচুর প্রভাব ফেলে। খ- খ- দৃশ্য কবিতায় প্রচুর প্রতিভাত হয়। পাঠক যত সে দৃশ্য নিজেরাও দেখতে পায় ততই আগ্রহ বাড়ে, আবিষ্ট হয়।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি বহু মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, বহু দেশ, বহু ভাষা, নানা সংস্কৃতি, বিচিত্র শিল্প… সেসব কীভাবে আপনাকে প্রভাবিত করে?

প্রাণজি বসাক : নিশ্চই নিশ্চয়ই প্রভাবিত করে। এখন জারিত হয় ভাবনাসমূহ। অরুণাচলে থাকার সুবাদে এবং বার বার নর্থ ইস্টে যাওয়ার কারণে ওখানকার পরিবেশ এবং প্রকৃতি আমাকে প্রভাবিত করেছে। ভার্জিনিটি (প্রকৃতির) থাক এটাই কাম্য — কিন্তু আমরা যে মারাত্মক ধ্বংসকামী। প্রকৃতি ধ্বংসের সাথে সাথে ধ্বংস হচ্ছে নানান সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্প এবং সেই সাথে মমত্ববোধ। যা আর কোনোদিন ফেরবার নয়। নদীর জল বয়ে গেল — তা গেল এ জীবন থেকে। বহুমানুষ, মানুষের সারল্য, সহজ জীবন-যাপন পরম্পরা, আচার-বিচার ইত্যাদি আমার চিন্তাকে প্রভাবিত করে। সভ্যতা, উন্নতি, পরিবর্তন, সহজলভ্যতা সমাজকে কোথায় যে দাঁড় করাচ্ছে তা ভাবতে কষ্ট হয়।

এই হালফিলে এক বছর থাকলাম জম্মুতে। যে এলাকায় মানুষজনের সাথে থাকলাম তারা কাশ্মীর থেকে আসা। আমরা যেমন পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছি। এবার একটি কবিতার বই বেরুলো। তার প্রায় সব কবিতাই জম্মুতে বসে লেখা। অনেক কিছুই দেখলাম, জানলাম, প্রভাবিত হলাম। প্রতিদিনের পথে তাওবি নদী চোখে পড়ত। কথা হত নদীর সাথে। সেসব খ- কথালাপ কবিতায় আছে।

প্রায় চারশো একরের পাহাড়ি ক্যাম্পাসের জঙ্গলে লাগল আগুন। দাবানল। কী ভয়ংকর হতে পারে পাহাড়ি আগুন তা প্রত্যক্ষ করলাম এবং অসহায় হয়ে দেখলাম শুধু। কোনো ক্ষমতা নেই তার পথ রুখে দাঁড়াবার। এসব ঘটনা আমাকে আজান্তে প্রভাবিত করে— এসে পড়ে কবিতার পঙক্তিতে।

মোস্তাক আহমেদ : প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব কিছু জীবনদর্শন থাকে, থাকাটাই খুব স্বাভাবিক। আর কবি সাহিত্যিকেরা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি দেখেন। আপনার জীবনদর্শনের ভিত্তি ঠিক কীরকম?

প্রাণজি বসাক : জীবনের স্বরূপ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বোধ ও ধারণা আমার কেমন হবে বা একজন কবির কী হওয়া উচিত তা নিয়ে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। একজনে জীবন বৃত্তান্ত দিয়ে হয়তো জীবন জিজ্ঞাসায় পৌঁছানো যেতে পারে। তা দিয়ে সহজে জীবনদর্শনের ভিত্তিতে কতটা পৌঁছানো সম্ভব এ প্রশ্ন থেকেই যায়। জীবনপ্রবাহে ভাসমান বহু কৌতূহল, প্রশ্ন বা অনুসন্ধান পর্যাপ্ত উত্তর ব্যতিরেকে বইতে থাকে। আপমর জনতা এমনই প্রবহমানতায় বিশ্বাসী। সেদিক থেকে আমি জীবনের বহু ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হওয়ায় জীবনদর্শনের তথাকথিত ভিত্তি খানিকটা অন্য ধরনের হাতে বাধ্য। আমার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী এক শিক্ষিত মহিলা একবার হরিদ্বারে প্রবাহিত গঙ্গার ধারে বসে একটি প্রশ্ন করেছিলেন— জীবনের অর্থ কী? সে সময় এক যুবক হিসেবে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। আমাকে শূন্য দিয়েছিলেন। আবার উত্তরের অপেক্ষায় সময় ব্যয় না করে বেশ সুন্দর করে অনেক কথা বলেছিলেন, যা শুনে আমাকে বহু বিনিদ্র রজনী পার করতে হয়েছে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কে যে ভিত তার উপর নির্ভর করে একজন মানুষের জীবনদর্শনের ভিত্তি। মানুষের কথা বলবো বলেই কবিতায় পথ চলা। নিজের জীবনদর্শনের সাথে মিলিয়ে নিতে চাই সমস্ত কাছের মানুষের জীবনপ্রবাহ— মানব কল্যাণমুখী চেতনাবোধ যেন ছড়িয়ে পড়ে কবিতার শরীরে শরীরে।

মোস্তাক আহমেদ :  যে কোনো সৃজনশীল লেখার ক্ষেত্রে তত্ত্ব ও তথ্য কতটা জরুরি বলে মনে হয়? কতটা অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি? আদৌ কী এগুলো ভাববার দরকার আছে?

প্রাণজি বসাক : সঠিক প্রয়োগ হল মূলমন্ত্র। জীবনদায়ী ওষুধ থেকে রান্নার তেল মশলা প্রয়োগ সবসময়ই সঠিক মাত্রায় হওয়া প্রয়োজন, না হলে সব বিগড়ে যায়। তাই সৃজনশীল লেখায় যা কিছুই প্রয়োগ করা হবে তা সঠিক মাত্রায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। তত্ত্ব ও তথ্য ব্যবহার নির্ভর করবে লেখার বিষয় ও ভাবনার উপর।

অভিজ্ঞতা স্মৃতিকোঠায় গচ্ছিত থাকে। তাকে মাঝে মাঝে লেখায় এনে পরিমার্জিত করে পরিবেশন করা সৃজনশীল লেখকের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। কাজেই ভাববার প্রয়াস সবসময় রয়েছে। কোনো তত্ত্ব ধরে নিয়ে বসে কবিতা লেখা সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। আর তথ্যের রসটুকু কবি কীভাবে কবিতায় আলংকৃত করবেন তা তাঁর উপর নির্ভরশীল।

মোস্তাক আহমেদ : বয়স ৬৫-এর কাছাকাছি এসে আজকের ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার বোধ আপনাকে কীভাবে ভাবায়? লেখালেখিতে তার প্রভাব কতখানি?

প্রাণজি বসাক : আজকের ভারতবর্ষে ধর্ম ও ধর্মের চিন্তন অন্য মাত্রা পেয়েছে যা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। দু-চার কথায় বা বাক্যে এই বিষয়ে বিশ্লেষণ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে লেখালেখি জীবনের প্রথম থেকেই একটু আলাদা চিন্তনে থেকেছি। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা পড়লেই বুঝতে পারবেন যে আমার কাছে ধর্ম হল মানবতা। মানবিক চেতনাবোধ জাগ্রত করতে যদি ধর্মীয় অনুশাসন সহায়ক হয়, তবে সেটুকু মানা উচিত, যাতে সার্বিক মানবজাতির উন্নতিসসাধন হয়। ধর্মীয় সংস্কার বা কুসংস্কার যা মানবজাতির উন্নতিসাধনে ব্যর্থ তাকে নস্যাৎ করাই শ্রেয়, এমনটি আমি মনে করি। যেমন আমি মনে করি, একজন কবিকে প্রথমেই সৎ এবং নিষ্ঠাবান হতে হবে। সততা এবং বিশ্বাস পরিচয়পত্রের মতো সঙ্গে থাকুক। মানবিক চেতনাবোধ ছাপিয়ে এখন ধর্মের নামে আমরাই নিজেদের কাছে নিয়ত সন্দিহান হয়ে উঠছি।

একপ্রকারের আধ্যাত্মিকবোধ সব মানুষকেই পরিশুদ্ধ করে। সে হাওয়া বাতাসের মতোই সর্বত্র আছে। শ্বাসপ্রক্রিয়ায় আমরা জীবন্ত আছি অথচ অদৃশ্য, তাকে তো মন্দির মসজিদের আওতায় বন্দি রাখা অসাধ্য। তেমনি আধ্যাত্মিকবোধ চিরন্তন সত্য, সব মানুষেই বর্তমান। তার প্রভাবে মানবিক চেতনা মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হোক। মানুষের উন্নতির লক্ষ্যই হোক একমাত্র ধর্ম। আমরা মূল পথ থেকে বাই-পাস নিতে নিতে বাইলেন হয়ে পথভ্রান্ত হয়ে পড়েছি।

একটা বেদনাবোধ কবিতা-শিশিরবিন্দু হয়ে ঝরে পড়ে। পরিশুদ্ধ আধ্যাত্মিকবোধ নিশ্চয়ই কবিতাকে একটা বিশেষ মার্গে নিয়ে যায়।

মোস্তাক আহমেদ : যদিও জানি এটা বলা খুবই কঠিন, তবু জানতে ইচ্ছে করছে আপনার বিচারে আপনার কোন গ্রন্থটি শ্রেষ্ঠ? কিংবা আপনার দুর্বলতা কোন গ্রন্থের প্রতি বেশি? সেই গ্রন্থ নিয়ে আপনার মতামত জানতে পারলে ভালো লাগত…

প্রাণজি বসাক :  শ্রেষ্ঠ আর দুর্বলতা — তাও আবার নিজের কাব্যগ্রন্থের প্রতি। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি কবিতাকেই মনে হয় সৃষ্টিতে মহান। অথচ পর মুহূর্ত থেকে একটা খুঁতখুঁত ভাব— যেনো হয়নি, আর একটু পরিমার্জন জরুরি। তেমনি কাব্যগ্রন্থগুলিও। যে বার যে বইটি বেরুলো মনে হল এটিই সর্বোত্তম। আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। তবুও আপনার জানার আগ্রহে আমিও ভাবতে বসি।

‘সামুদ্রিক মায়ানাচ’ (২০০৭)-এ প্রকাশ পায় প্রায় চার বছরের লেখার ফসল। তখন দিল্লিহাটের আড্ডার তুমুল পর্যায়। ভাষার সংকরায়ণ, উত্তর আধুনিকতার ধারাবাহিকতা সম্পৃক্ত কাব্যগ্রন্থটি আদৃত হল। মনে মনে ভাবলাম, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ। মোহ কাটল। মূলধারার লেখায় মন মেজাজ কলম ফিরে গেল। মানুষের কথা বলার সহজতম গূঢ় সত্যটি খুঁজে বের করতে আপ্রাণ চেষ্টা চলতে থাকে। ছোটো ছোটো কবিতা নিয়ে বের হল ‘দেখি এক অন্য মানুষ’। বইটির প্রতি খানিক দুর্বলতা রয়েছে। বইটিতে মাত্র বারোটি শব্দের একটি কবিতা আছে। এক সমালোচক এক প্যারাগ্রাফ লিখে ফেললেন। কবিতীর্থ থেকে বের হল ‘চিহ্নিত ছায়া আর শব’। বলাবলি হয় শ্রেষ্ঠ বই। মানতে চাইলাম। তারপর ‘আর ফিরি না রূপনগর’ আমার দুর্বলতায় জেঁকে বসল। প্রতিটি মানুষের জীবন যেন যাযাবর জীবন, রূপ থেকে অরূপ— এও এক যাত্রা। বিশেষ ঘোরের মধ্যে লেখা ১৩২টি তিন লাইনের শ্লোক নিয়ে বই ‘১৬ই এপ্রিল : একান্তে’ আমাকে জাপটে ধরে রেখেছে। আদম প্রকাশ করল আমার ‘ঘুমের অক্ষর’ (২০১৬)। বহু পাঠক প্রশংসা করলো। আদম অবশ্য কিছুই করলো না প্রকাশক হিসাবে। আর এখন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘আত্মজ মায়াজাল’ মনে হয় শ্রেষ্ঠ। মণিরুল যতœসহ প্রকাশ করেছেন, সঙ্গে কমলেশ দাশগুপ্ত-কৃত অসাধারণ প্রচ্ছদ। আমার বিচারে আপাতত এরকমটাই মনে হচ্ছে। তবে এও তো সাময়িক। সময় বলবে শেষ কথা।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। লেখার পুরস্কার কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? আপনার কী মনে হয়? পুরস্কার নিয়ে আবার যেভাবে চারদিকে বির্তক ওঠে…

প্রাণজি বসাক : একটা ছোট্টো গল্প শোনাই, সত্য ঘটনা, একবার চড়বঃৎু ঈষঁন ড়ভ ওহফরধ-র কবিতা আসবে কবিতা পড়তে ওহফরধ ঐধনরঃধষ ঈবহঃৎব-এ গেছি। সময়ের খানিক আগেই পৌঁছে গেছি এবং একজন মানুষের সাথে পরিচয় হল। তিনি হলেন চৎড়ভ. ঝ.ঝ. ঘড়ড়ৎ, তখনকার ঠরপব চৎবংরফবহঃ. ঝধযরঃুধ অশধফবসর। কথায় কথায় বলে ফেললাম ঝরৎ, রঃ রং বধংু ঃড় মবঃ ঘড়নবষ চৎরুব ঃযবহ অহু অশধফবসর। তিনি খুব কম কথা বলেন। বললেন, ‘পুত্তর তু মেরা অফিস আনা’। মাস কয়েক পর একদিন গেলাম। অনেক কথা হল। মুখে কিছু বললেন না, তবে ভাবভঙ্গিতে খানিক বোঝালেন আমার কথার যথার্থ্য। তার কয়েকমাস পরই তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন। আর দেখাই হল না।

লেখার সাথে পুরস্কারের কোনো যোগ আছে বলে আমি মনে করি না। পুরস্কার পাবার কথা মাথায় রেখে কেউ লেখালেখি করেন না, কাজেই তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে হ্যাঁ, কম যোগ্যতার কেউ পেয়ে গেলে তখন মনে লাগে বেশ।

আবার অনেকেই আছেন পুরস্কার বড়ো করে দেখেন, তাঁরা হয়তো সে লোভে অনেক সময় ভুল পথে বির্তকে জড়িয়ে পড়েন। যে দু-চারটি পুরস্কার আমার ভাগ্যে জুটেছে তা আমার কাছে গর্বের। কখনও কোনো লেখা পুরস্কার পাবে বলে লিখি না। এই আপনারা আমাকে নিয়ে এই কাজটি করছেন— এটাই আমার কাছে বড়ো পুরস্কার। ব্যক্তিগতভাবে আমার আপনার পরিচয় এই তো  সেদিনের।

মোস্তাক আহমেদ :  কী লিখছেন এখন? আর পড়াশুনা?

প্রাণজি বসাক : কিছুই না । এত গরম যে মগজ বিগড়ে যায়। উষ্ণ পরিবেশে কাতর ক্লান্ত। তবুও লেখার তাগিদ জীবনকে তাগাদা দেয়। দিল্লির ঘূর্ণাবর্তে আছে চক্রাকারে আউটার রিং রোড — প্রায় ৫০ কি. মি. সে রাস্তা। মুদ্রিকা নামে চক্রকারে বাস উঞঈ চালায়। আমি একটি কবিতা লিখছি— ‘অথআউটার রিং রোড’। প্রায় ৬০০ লাইন লেখা হয়েছে। তার মধ্যে ৪০০ লাইন পত্রিকায় বেরিয়েছে। আমার ধারণা এটি হাজার তিনেক লাইন হবে। তারপর বই। গোপন কথা বলে দিলাম।

আর পড়াশুনা! এই ৬৪ বছর বয়সে এসে আবার রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু করলাম। বৈশাখ মাসে ‘চোখের বালি’ পড়লাম। প্রায় প্রকাশের ১১৮ বছর পর। এখন ওনার চিঠিপত্র পড়ছি। বাকি জীবনে ওঁর সৃষ্টির কিয়দংশই হয়তো আর পড়তে পারবো।

মোস্তাক আহমেদ : যে লিখতে চেয়েছিলেন অথচ এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি — যে আক্ষেপ এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় — যে স্বপ্ন এখনও ঘুম ভাঙিয়ে দেয়…

প্রাণজি বসাক : আত্মজৈবনিক একটি উপন্যাস লেখার অভিপ্রায় বহুদিনের। সাত পা এগোই তো দশ পা পিছোই— এমন চলছে। জানি না কবে লিখতে পারবো বা আদৌ হবে কি না। সময় হয়তো ডাক দেবে কোনো সময়। লেখক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন বললেন, ‘প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটা উপন্যাস আছে। শুধু গুছিয়ে লিখে ফেলা’। আমার জীবনের সেই না লেখা উপন্যাস আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, স্বপ্নে আসে জড়িয়ে ধরে আর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

জুন ২০১৯

প্রাণজি বসাকের লেখালেখি

কাব্যগ্রন্থ

জল টানে……./…..টানে কবিতা

প্রথম প্রকাশ জন্মষ্টমী ১৩৯৯, আগষ্ট ১৯৯২। প্রকাশনা : উত্তর সরণি সাহিত্য চক্র, পাহাড়ীপাড়া, জলপাইগুড়ি। প্রকাশক : উল্লেখ নাই। মুদ্রক : প্রযতেœ কনক চক্রবর্তী, অলিভ প্রিন্টিং ওয়ার্কস, বাটিয়া বিল্ডিং, জলপাইগুড়ি। উৎসর্গ ; বাবা-মাকে। প্রচ্ছদ : গৌরাঙ্গ বসাক। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৪৪। ওঝইঘ : উল্লেখ নেই। মূল্য : সাত টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : করুণাকান্ত বসাক।

একা একা একাকী

প্রথম প্রকাশ : কলকাতা বইমেলা, জানুয়ারি ১৯৯৮। প্রকাশনা : পদ্ম-গঙ্গা পাবলিকেশন, ভিআইপি নগর, তিলজলা, কলকাতা ৩৯। প্রকাশক : শ্রীমতী শ্যামলী মহাপাত্র। মুদ্রক : মধুমঙ্গল পাঁজা, নিউ সুধীর নারায়ণী প্রেস, ১৬ আর্কাস লেন, কলকাতা ৭। উৎসর্গ: শ্রদ্ধেয় জীবন দে কে। প্রচ্ছদ : কৌশিক বিশ্বাস। মাপ : ২১পস দ্ধ ১৪ পস।  বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ : ৮১-৮৬৯৭৭-২২-৮। মূল্য : ৩০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক।

এবং আগুনের খেলা

প্রথম প্রকাশ : বৈশাখ ১৪০৯, মে ২০০২। প্রকাশনা : অনুরণ, এফে ৭/বি.ডি.ডি.এ ফ্ল্যাট, মনিরকা, ন দিল্লি ৬৭। প্রকাশক : শ্রী নন্দদুলাল কু-ু। বর্ণবিন্যাস এবং মুদ্রণ : এম. আর. প্রিন্টার্স, বি ১৯, আদিত্য কমপ্লেক্স, ন দিল্লি ৪৬। উৎসর্গ : আগুন-কে। প্রচ্ছদ : নেই। মাপ : ২১পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ১৬। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য: দশ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

ঢেউ ঘুম এবং

প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৪০৯, জানুয়ারি ২০০৩। রচনাকাল : ১৯৯৮-২০০১। প্রকাশনা : অনুরণ, এফ-৭/ বি.ডি.ডি.এ. ফ্ল্যাট, মুনিরকা, ন দিল্লি ৬৭। প্রকাশক : উল্লেখ নেই্। বর্ণ বিন্যাস ও মুদ্রণ : এম.আর প্রিন্টার্স, বি ১৯. আদিত্য কমার্শিয়্যাল কমপ্লেক্স, নাঙ্গাল রায়া, ন. দিল্লি ৪৬। উৎসর্গ : শ্রী গৌরাঙ্গ বসাক/ ও/ শ্রীমতী মিনতি বসাক /শ্রদ্ধাস্পদেসু। প্রচ্ছদ : শুভদ্বীপ বসাক। মাপ : ১৭.৫পস দ্ধ ৯.৫ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৫৬। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ২০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

সামুদ্রিক মায়ানাচ

প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৪১৩, ফেব্রুয়ারি ২০০৭। রচনাকাল : ২০০৩-২০০৬। প্রকাশনা : দিল্লি হাটার্স. সি-৪৮৯, সরিতা বিহার, নতুন দিল্লি ১১০০৭৬। প্রকাশক : দীপঙ্কর দত্ত। মুদ্রণ : গীতা প্রিন্টার্স, ৫১এ, ঝামাপুকুর লেন, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : মিনতি দাস/শেফলী ভট্টচার্য/ মিতালি বসাক প্রিয়জনেষু। প্রচ্ছদ পরিকল্পনা : দ্বীপঙ্কর দত্ত। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৫০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

খ-যুদ্ধের গ্যালারি

বইটির কোনো কপি পাওয়া না যাওয়ায় কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব হল না।

দেখি এক অন্য মানুষ

প্রথম প্রকাশ : ২০১১ জানুয়ারি বইমেলা। প্রকাশনা : এখন বাংলা কবিতার কাগজ, ৬৫ দেশবন্ধুনগর, জলপাইগুড়ি ৭৩৫১০১। প্রকাশক : উল্লেখ নেই।  অক্ষর বিন্যাস : গ্র্যাফিব অফসেট, বাবুপাড়া, জলপাইগুড়ি। মুদ্রণ ও বাঁধাই : জয়শ্রী প্রেস, ৯১/১বি বৈঠকখানা রোড, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : অমিতাভ মৈত্র /বন্ধুবরেষু/কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক। প্রচ্ছদ ভাবনা : অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। মাপ : ২১পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৩০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

টহলপর্ব

প্রথম প্রকাশ : ২০১২ জানুয়ারি বইমেলা। প্রকাশনা : এখন বাংলা কবিতার কাগজ, ৬৫, দেশবন্ধু, জলপাইগুড়ি ৭৩৫১০১। প্রকাশক : উল্লেখ নেই।  অক্ষরবিন্যাস : দি ইউনাইটেড প্রেস, জলপাইগুড়ি। মুদ্রণ ও বাঁধাই : জয়শ্রী প্রেস, ৯১/১বি বৈঠকখানা রোড, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : শ্রী স্বপন কুমার চৌধুরী/ এবং /শ্রীমতী মায়া চৌধুরী/ জমসেদপুর। প্রচ্ছদ ভাবনা : অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। মাপ : ২১ পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা: ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৪০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

পীবর ঘোড়া আর দুঃসাহস

প্রথম প্রকাশ : গ্রীষ্ম ১৪১৯। প্রকাশনা: দিল্লি হাটার্স. সি-৪৮৯, সরিতা বিহার, নতুন দিল্লি ১১০০৭৬। প্রকাশক : দীলিপ ফৌজদার। মুদ্রণ : ইলেক্ট্রা ফটোস্টেট, হজখাস, নতুন দিল্লি ১৬। উৎসর্গ : অগ্রজ লেখিকা/নন্দিতা রায়। প্রচ্ছদ : রজনীশ অগ্রয়াল। মাপ : ২১পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ১৬। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ২০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

চিহ্নিত ছায়া আর শব

প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৪১৯, জানুয়ারি ২০১৩। প্রকাশনা : কবিতীর্থ, ৫০/৩, কবিতীর্থ সরণি, কলকাতা ২৩। প্রকাশক : উৎপল ভট্টাচার্য। বর্ণবিন্যাস : অন্নপূর্ণা লেজার হাউস, ১৩/১, বলাই সিংহ লেন কলকাতা ৯। মুদ্রণ : ডিডি এন্টারপ্রাইজ, ৬৫, সীতারাম ঘোষ ষ্ট্রিট, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : শুভ্রদীপ /এষা / স্নেহাস্পদেষু। প্রচ্ছদ: প্রবীর সেন। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ : ৯৭৮-৮১-৯২১০৮৮-৩-৪। মূল্য : ৭৫ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : উল্লেখ নেই।

১৬ এপ্রিল : একান্তে

প্রথম প্রকাশ: মাঘ ১৪২০, বইমেলা ২০১৪। প্রকাশনা : লাবণ্য প্রকাশনী, ১৫৭ মেইন রোড (ওয়েস্ট), নিউ ব্যারাকপুর, কলকাতা ১৩১। প্রকাশক : তপন কুমার দে। বর্ণসংস্থাপক : রবি ডট কম, পশ্চিম মেদিনিপুর। মুদ্রণ : স্টারলইন ১৯/এইচ/এইচ/১২এ গোয়াবাগান ষ্ট্রিট কলকাতা ৬। উৎসর্গ : যাঁরা প্রেরণায় নক্তন্দিব এই যাপন/শ্রী নীহাররঞ্জন গুহ/শ্রদ্ধাস্পদেষু। প্রচ্ছদ পরিকল্পনা : রেজ ডট কম। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৪৮। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৬০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

আর ফিরি না রূপনগর

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৪, বইমেলা। প্রকাশনা : এখন বাংলা কবিতার কাগজ, ৬৫, দেশবন্ধুনগর, জলপাইগুড়ি ৭৩৫১০১। প্রকাশক : প্রবীর রায় ও অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। অক্ষর বিন্যাস : সঞ্জয়কুমার দাস। মুদ্রণ ও বাঁধাই : জয়শ্রী প্রেস ৯১/১বি বৈঠকখনা রোড কলকাতা ৯। উৎসর্গ : শুক্লা গাঙ্গুলী/মনপোড়া/প্রিয়জনেষু। প্রচ্ছদ: অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। পেছনের ছবি : সম্রাট মুখোপাধ্যায়। মাপ : ২১ পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৫৬। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৫০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক।

রাতের হাওয়া টানে

প্রথম প্রকাশ : আগরতলা বইমেলা, মার্চ ২০১৪। প্রকাশনা : প্রান্তর প্রিন্টার্স এ্যান্ড পাববিলশার্স প্রাঃ লিঃ, কর্ণেল বাড়ি, কৃষ্ণনগর, আগরতলা ৭৯৯০০১। প্রকাশক : শ্রীমতী সাধনা গুহ। অক্ষর বিন্যাস : অরূপ দেবনাথ। মুদ্রক : প্রাণ্কর প্রিন্টার্স এ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কর্ণেল বাড়ি, কৃষ্ণনগর, আগরতলা ৭৯৯০০১। উৎসর্গ : অসিতকুমার চক্রবর্তী/ প্রিয়বাল্যবন্ধুজনেষু। প্রচ্ছদ : অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। মাপ : ২২ পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৭৫ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

অস্বাক্ষরিত গোপন চুক্তি

প্রথম প্রকাশ : কলকাতা বইমেলা জানুয়ারি ২০১৬। প্রকাশনা : পাঠক, ৩৬এ কলেজ বোড কলকাতা ৫৬। মুদ্রক: নিউ রেনবো ল্যামিনেশন, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : ঞড় ঝয, ঘধনধশ ঈযধহফ ঈযধঁযধহ ্ উৎ. শধষুধহ কৎ. ইযধঃঃধপযধৎলবব বন্ধুবরেষু। প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৮০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক।

মালসায় রেখেছ কার মুখ

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি, ২০১৬ বইমেলা। প্রকাশনা : এখন বাংলা কবিতার কাগজ, ৬৫, দেশবন্ধুনগর জলপাইগুড়ি ৭৩৫১০১। প্রকাশক : প্রবীর রায় ও অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। অক্ষর বিন্যাস : সঞ্জয়কুমার দাস। মুদ্রণ ও বাঁধাই : জয়শ্রী প্রেস ৯১/১বি বৈঠকখানা রোড, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : নির্মল বসাক/কবি ও সম্পাদক (ইন্দ্রাণী, কলকাতা)/শ্রদ্ধাস্পদেষু। প্রচ্ছদ : অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। মাপ : ২১পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৫৬। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৫০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক।

ঘুমের অক্ষর

প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০১৬। প্রকাশনা : আদম, স্টেশন অ্যাপ্রোচ রোড, কৃষ্ণনগর, নদীয়া ৭৪১১০১। বর্ণসংস্থাপক : মুদ্রাকর, ১৮এ রাধানাথ মল্লিক লেন কলকাতা ১২। মুদ্রক : নিউ রেনবো ল্যামিনেশন, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : রবীন্দ্র গুহ। প্রচ্ছদ: পার্থপ্রতিম দাস। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৮০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

পুনরায় জ্বলে না পোড়াকাঠ

প্রথম প্রকাশ : কলকাতা বইমেলা ২০১৭। প্রকাশনা :  আন্তর্জাতিক প্রকাশন, ২৩ ডা. কার্তিক বোস ষ্ট্রিট, কলকাতা ৯। প্রকাশ : আশীষ দত্ত। অক্ষর বিন্যাস : অরুণ চক্রবর্ত্তী। মুদ্রক: এস.ডি.প্রিন্টিং ওয়াকর্স, ৩৬ পটলডাঙ্গা ষ্ট্রিট, কলকাতা ৯। উৎসর্গ : বিকাশ বিশ্বাস/ সম্পাদক, উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস, দিল্লি/শ্রদ্ধাস্পদেষু। প্রচ্ছদ : রবি শেখর পাল। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ৮০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : আন্তর্জাতিক প্রকাশন।

আত্মজ মায়াজাল

প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯। প্রকাশনা : খড়িমাটি কদম মোবারক লেইন, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। প্রকাশক : উল্লেখ নেই। মুদ্রণ: দি নিপুণ প্রিন্টার্স, চট্টগ্রাম। উৎসর্গ : রতন কুমার ঘোষ/মিতা ঘোষ/বন্ধুবরেষু। প্রচ্ছদ : কমলেশ দাশগুপ্ত। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪ পস। বোর্ড বাঁধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ১২০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : কবি।

জলছবি নাভিপদ্মে

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৯। প্রকাশনা : কবিতিকা, রাঙামাটি পশ্চিম মেদিনিপুর ৭২১১০২। প্রকাশক: কমলেশ নন্দ। মুদ্রক : ডি.ডি. অ্যান্ড কোঃ সীতারাম ঘোষ ষ্ট্রিট কলকাতা ৯। উৎসর্গ : প্রিয় কবি সুনীল মাজি/বন্ধুবরেষু। প্রচ্ছদ : কমলেশ নন্দ। মাপ : ২২পস দ্ধ ১৪পস। বোর্ড বাধাই। পৃষ্ঠা : ৬৪। ওঝইঘ: ৯৭৮-৯৩-৮৭৬০২-৮৪-৭। মূল্য : ১২৫ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক।

গল্পগ্রন্থ :

রম্য মালঞ্চ

প্রথম প্রকাশ : কলকাতা বইমেলা জানুয়ারি ২০১৮। প্রকাশনা : পদ্ম গঙ্গা পাবলিকেশন, ভিআইপি নগর তিলজলা কলকাতা ৩৯। প্রকাশক : শ্রীমতী শ্যামলী মহাপাত্র। মুদ্রক : মধুমঙ্গল পাঁজা, নিউ সুধীর নারায়ণী প্রেস, ১৬ মার্কাস লেন, কলকাতা ৭। উৎসর্গ : ডাঃ বিজয় ভূষণ রায়/ও/ড. আনন্দগোপাল ঘোষকে। প্রচ্ছদ : কৌশিক বিশ্বাস। মাপ : ২১পস দ্ধ ১৪ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৯৬। ওঝইঘ : ৮১-৮৬৯৭৭-১৫-৫। মূল্য : ৩০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক।

ভাঙ্গা তরঙ্গ

প্রথম প্রকাশ : জুলাই ২০০০, রথ যাত্রা ১৪০৭। প্রকাশনা :  মৌ পাবলিকেশন, আর জেড ১০৫৮, মেন সাগরপুর, নতুন দিল্লি ৪৬। প্রকাশক: উদয়শংকর দাশ। মুদ্রণ : ও অক্ষর বিন্যাস : এম. আর. প্রিন্টার্স, বি ১৯, আদিত্য কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নতুন দিল্লি ৪৬। উৎসর্গ : প্রিয়বন্ধু প্রবীর শীল। প্রচ্ছদ : নন্দদুলাল কু-ু। মাপ : ১৮পস দ্ধ ১২ পস। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৩২। ওঝইঘ উল্লেখ নেই। মূল্য : ১০ টাকা। গ্রন্থস্বত্ব : মিতালি বসাক।

[তথ্যসংগ্রহ জুন ২০১৯ পর্যন্ত]

প্রাণজি বসাকের জীবনপঞ্জি

১৯৫৫

২জুলাই জন্ম। আসল নাম প্রাণ গোবিন্দ বসাক। ছদ্মনাম: প্রাণজি বসাক, শ্রী বিশাখা, বিশাখা বসাক। পৈত্রিক স্থান : আধুনা বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার মাটিকাটা পলশা কয়ড়া গ্রাম। মাতা : রাধারানী বসাক। পিতা: মতিলাল বসাক। পিতা ছিলেন সৎ, ধর্মপ্রাণ মানুষ। খোল বাদক। পিতা তাঁর কবিতায় অন্যতম প্রেরণা।

১৯৭২

হায়ার সেকে-ারি পাশ। তুফানগঞ্জ এন.এন.এম. হাই স্কুল। পড়াশোনা আর বিড়ি শ্রমিকের কাজ পাশাপাশি চলছিল।

১৯৭৬

বিজ্ঞানে স্নাতক। আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল কলেজ, কোচবিহার।

১৯৭৭

আধাসামরিক বাহিনিতে সৈনিক। আট মাসের বেসিক ট্রেনিং জীবন বদলে দিয়েছে। এই সময় আসাম অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়, ঘনজঙ্গল দেখার সুযোগ আসে। একবার বাঘের পেটে যেতে যেতে জীবন ফিরে পাওয়া। জঙ্গল সারভাইভালের নানান পন্থা শেখা হয়। প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

১৯৮০

কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটে চাকরি পেয়ে দিল্লি আসা। ছদ্মনামে লেখালেখি প্রকাশ পেতে থাকে। জে. এন. ইউ. ও আই.আই.টির মাঝে বসতি জিয়াসরাইতে দশ বছরের বেশি থাকা। বাংলা সাহিত্যকেন্দ্রিক নানারকম অনুষ্ঠানে যোগদান ও মনোনিবেশ করা।

১৯৮৪

মাতৃবিয়োগ।

১৯৮৮

ভারত সরকারের সাব অর্ডিনেট একাউন্টস সার্ভিস  পরীক্ষা পাশ এবং পদোন্নতি।

১৯৮৯

পিতৃবিয়োগ। বিয়ের মাত্র কয়েকদিন আগেই এমন ঘটনার জন্য বিয়ে স্থগিত।

১৯৯০

বিবাহ। শিলিগুড়িতে। স্ত্রী : মিতালি বসাক।

১৯৯১

ডেপুটেশনে পোস্টে জলপাইগুড়ি আসা। সাহিত্য মহলের সাথে যোগাযোগ। পুত্র শুভ্রদীপের জন্ম। ‘অবরোধবাসিনী’ পত্রিকা প্রকাশ। আকাশবাণী শিলিগুড়ির ‘চিত্রবিচিত্র’ সাপ্তাহিক প্রোগ্রাম কয়েকবার রম্যরচনা পাঠ। পরে বই আকারে প্রকাশ। বিভিন্ন সাহিত্য আসরে যোগদান।

১৯৯৩

দিল্লি ফিরে আসা।

১৯৯৪

ডেপুটেশন পোস্টে অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগর থাকা। ‘অরুণদীপ’ পত্রিকা প্রকাশ। কন্যা এষার জন্ম।

১৯৯৯

দিল্লি অফিসে ফিরে আসা। আর. কে. পুরমের বাসায় অনিয়মিতভাবে সাহিত্য আসর শুরু করা। ‘দূরের খেয়া’ আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে কানপুরে যোগদান।

২০০০

চাকরি বদল। আইআইটি দিল্লিতে নতুন চাকরিতে নিযুক্তি। বাসা বদল করে ক্যাম্পাসে আসা। বছরের শেষ নাগাদ প্রতি সপ্তাহের শেষ শুক্রবার দিল্লি হাটে কবিতা আড্ডা শুরু।

২০০৬

গ.ই.অ. ডিগ্রি লাভ। বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি হিসাবে আর্ন্তজাতিক বাংলা কবিতা উৎসব (কলকাতা) যোগদান।

২০০৭

বিশ্ববাংলা কবিতা উৎসব (হালদিয়া) যোগদান।

২০০৮

বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্থা, ভিলাই দুর্গ, মধ্যবলয় পত্রিকার রজতজয়ন্তীতে আয়োজিত নিখিল ভারত বাংলা কবিতা উৎসব সংবর্ধনা প্রাপ্তি। সারা ভারত বাংলা কবিতা উৎসব (জমশেদপুর) যোগদান।

২০০৯

জাতীয় কবিতা পরিষদ, ঢাকা বাংলাদেশ আয়োজিত কবিতা উৎসবে কবিতা পাঠ। বাংলাদেশ টেলিভিশন-এর বিশেষ অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ ও আলোচনা। আন্দভমানের জওহরলাল নেহারু রাজকীয় মহাবিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে অনুষ্ঠানিক আলোচনা। দিল্লি হাটার্স কবিতা সংকলন সম্পাদনা। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান প্রাপ্তি।

২০১০

বাংলা সাহিত্যে উৎসব, টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ-এ যোগদান। বাংলা কবিতা উৎসব, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ-এ যোগদান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধ-জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের সাহিত্য আকাদেমির অংশগ্রহণ। বাংলা কবিতা উৎসব, কক্সবাজার, বাংলাদেশ-এ যোগদান।

২০১১

বাংলাদেশে রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগদান্ দিল্লিতে সাহিত্যের সার্ক ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ।

২০১২

বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্য নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে অনুষ্ঠানিক আলোচনা।

২০১৩

আর্ন্তজাতিক কবিতা উৎসবে নরওয়ের আসলোতে অংশগ্রহণ। এই প্রথমবার ইউরোপ ভ্রমণ ভায়া হেলসিঙ্কি।

২০১৫

আইআইটি দিল্লি জয়েন্ট রেজিস্টার পদ থেকে অবসর গ্রহণ। ঢাকা বাংলাদেশে কবিতার শান্তি যাত্রায় যোগদান। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা হলে আয়োজিত সারা ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ। রূপসী বাংলা আর্ন্তজাতিক পুরস্কার প্রপ্তি।

২০১৬

আর্ন্তজাতিক কবিতা উৎসবে নরওয়ের অসলোতে পুনরায় অংশগ্রহণ। প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করার সৌভাগ্য। দ্বিতীয়বার ইউরোপ ভ্রমণ। বায়া ইস্তানবুল। বনানী পুরস্কার প্রাপ্তি।

২০১৮

এক বছর আইআইটি জম্মুতে চাকরি। পুনরায় জ্বলে না পোড়াকাঠ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য শৃন্বন্ত সারস্বত সম্মান প্রাপ্তি।

২০১৯

বর্তমান

নতুন দিল্লির AICTE- তে Consultant পদে বহাল।

গ্রন্থনা : মোস্তাক আহমেদ

************************************************

বিধান চন্দ্র দাস
…………………
সাহিত্য ও বিজ্ঞান : দোঁহে অভেদ

১.     সাহিত্য ও বিজ্ঞান: পরস্পরের বন্ধু, না শত্রু?

সাহিত্য ও বিজ্ঞান: এরা কী পরস্পরের বন্ধু, না শত্রু?  না কি সম্পর্কটা শত্রুরও না, আবার বন্ধুরও না। সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আছে। একদল বলেন,  সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা। মাঝে মধ্যে যে সম্পর্ক দেখা যায় তা কাকতালীয়। আর অন্য দলের মত হচ্ছে- সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানীদের কাজের অন্তর্নিহিত দর্শন একই। পার্থক্য শুধুই প্রকাশে। সন্দেহ নেই যে, এই দু-দলের কাছেই রয়েছে অজ¯্র যুক্তি ও বিশ্বসেরা ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি।

কিছু সাহিত্যিক বলেন, বিজ্ঞানীর দৃষ্টি নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। সামগ্রিকতা কিংবা বহুমাত্রিকতা সেখানে অনুপস্থিত। আবার কিছু বিজ্ঞানী বলেন, সাহিত্যিক কল্পনার ফানুসে বিচরণশীল। বাস্তব থেকে দূরে তার অবস্থান। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যান্টর বিজ্ঞানী ও কবিদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ে এ ধরনের একটি বিবরণ তুলে ধরেছেন (ঈধহঃড়ৎ, ২০০৪)। তিনি বলেছেন, বিজ্ঞানী ও কবির মাঝে সফল সমঝোতা হওয়া প্রায় অসম্ভব।

অনেক সময় কিছু কালজয়ী সাহিত্যিক বিজ্ঞানীদের প্রতি নির্দয় মন্তব্য করেছেন। রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ব্লেক (১৭৫৭-১৮২৭) বিজ্ঞানকে বস্তুর সামগ্রিক সৌন্দর্য ধ্বংসকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বৈজ্ঞানিক বিভাজন প্রক্রিয়ায় মানবিক অর্থ ও সর্বোপরি আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বিনষ্ট হয় বলে তিনি তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন (Mock on, Mock on Voltaire, Rousseau) (Cantor, 2004) । কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০) বিজ্ঞানীদের প্রতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা সদয় হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টেনেছেন কবিদের পক্ষেই (ঔবভভৎবু, ১৯৬৭)। আসলে, তাঁর জীবদ্দশায় বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও তার অভিঘাতে বিপর্যস্ত প্রকৃতি- এই বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ জন্যই ১৭৯৮ সালে তাঁর লেখা, ‘ঞযব ঞধনষবং ঞঁৎহবফ’-এর সেই বিখ্যাত লাইন ‘ডব সঁৎফবৎ ঃড় ফরংংবপঃ’ ও শেষ স্তবকে ‘ঊহড়ঁময ড়ভ ঝপরবহপব’ বিজ্ঞানীদের প্রতি কিছুটা শ্লেষ ঝরে পড়েছে।

রোমান্টিক কবি জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) আইজাক নিউটনকে (১৬৪৩-১৭২৭)   রঙধনুর সৌন্দর্য বিনাশকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ নিউটন আলোক সূত্রের (প্রিজম) সাহায্যে রঙধনু তৈরি বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন (ঐধুফড়হ, ১৯২৯)। কিটসের মতো আরো অনেকে বহু বছর পর্যন্ত বিশ্বের কাব্যময় জগতকে ধ্বংস করার জন্য নিউটনকে দায়ী করেছেন। আসলে তাঁরা বিজ্ঞানকে প্রকৃতির রহস্যঘেরা অপার মনোমুগ্ধকর বস্তুগুলোর রহস্য উন্মোচনের জন্য দায়ী করতে চেয়েছেন। তবে একথাও সত্য যে, নিউটনের সময় কিংবা নিউটন-উত্তর যুগে অনেকে শুধুমাত্র ধর্মীয় কিংবা ‘ক্যালকুলাস আবিষ্কর্তা’ বিতর্কজনিত (লিবনিজ-নিউটন ক্যালকুলাস আবিষ্কর্তা বিতর্ক) (ডযরঃবংরফব, ১৯৬৭, ১৯৭০) কারণে নিউটনবিরোধী হয়ে তাঁর আবিষ্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন (ঙ’ঈড়হহড়ৎ ্ জড়নবৎঃংড়হ, ২০১২)।

সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার এই বিতর্ক এখনও বহমান। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মূল্যায়নে এখনও সর্বজনস্বীকৃত কোনো রায় তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ইন্টারনেটে ‘বিজ্ঞানের চেয়ে সাহিত্যকে আমরা কী বেশি মূল্য দেব?’ এ ধরনের একটি মতামত জরিপের  ফলাফলে দেখা গেছে যে, ‘হাঁ’ অর্থাৎ সাহিত্যের পক্ষে ৪৫% ও ‘না’ অর্থাৎ বিজ্ঞানের পক্ষে ৫৫% ভোট পড়েছে (উবনধঃব.ড়ৎম.ড়ঢ়রহরড়হং, ২০১৯)। অবশ্য, এ ধরনের একটি অ্যাকাডেমিক বিষয়ের বিতর্কে সাধারণের মতামত যাচাই কতটা গ্রহণযোগ্য সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের তুলনামূলক মূল্যায়নে আমাদের বর্তমান একুশ শতকের সমাজও যে বিভক্ত সেই চরম সত্যটি এই জরিপের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। কাজেই সেই হিসেবে, সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে সাহিত্য সভায় ও বিজ্ঞান সভায় আরো আলোচনা ও বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের বাস্তবতায়।

২.   সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানীর মাঝে সত্যিই কী যোজনব্যাপী দূরত্ব?

২.১ পাশ্চত্য কবি,সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানীদের ভাবনা

আসলেই কী সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানীর মাঝে যোজনব্যাপী দূরত্ব বিরাজমান? উনিশ শতকের বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী টি.এইচ. হাক্সলি (১৮২৫-১৮৯৫) কিন্তু তা মনে করেন না। ১৮৬০ সালে একটি নৈশভোজ বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞান ও সাহিত্য দুটি ভিন্ন জিনিস নয়, বরং একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ (Science and literature are not two things, but two sides of one thing (Ohrem, 2017)

সর্বকালের অন্যতম বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন প্রকৃত শিল্প ও প্রকৃত বিজ্ঞানের পিছনে এক অভিন্ন বোধাতিত আবেগ কাজ করে বলে উল্লেখ করেছেন (ঊরহংঃবরহ, ১৯৩৫ধ)। কবি হিসেবে আইনস্টাইন পরিচিত না হলেও তাঁর কিন্তু ৪০০ এর মতো কবিতা এ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়েছে (ঋৎধহশব, ২০১৮)। তাঁর পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের খসড়া মার্জিনে ছোট ছোট অনেক কবিতা পাওয়া গেছে। সাহিত্যের সাথে বিজ্ঞানের কোনো দূরত্ব আছে বলে তিনি কখনই মনে করেননি।  আইনস্টাইন সারা জীবন ধরে যে অসংখ্য লেখা (প্রবন্ধ, চিঠি, ডায়েরি ইত্যাদি) লিখেছেন তার সাহিত্যমূল্যও কম নয়। ইঁৎপয (২০১৯) খুব মজা করে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা সম্পর্কে বিখ্যাত একটি উক্তিকে সাজিয়েছেন এভাবে:

‘সুন্দরী রমনীর পাশে, ঘণ্টাখানেক বসে

মনে হবে এক মিনিট

উত্তপ্ত স্টোভ লাল    বসলে সেথা ক্ষণকাল

মনে হবে ষাট মিনিট’

Sit next to a pretty girl for an hour,

it seems like a minute.

Sit on a red-hot stove for a minute,

it seems like an hour.

That’s relativity!

আইনস্টাইন বিশুদ্ধ গণিতচর্চাকে যুক্তিনির্ভর ধারণাসঞ্জাত কবিতা বলে উল্লেখ করেছেন। নিউয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তাঁর এক লেখায় বিখ্যাত গণিতবিদ প্রফেসর এমি নোয়েথার (১৮৮২-১৯৩৫)-এর প্রশংসা করতে যেয়ে তিনি লেখেন, ‘চঁৎব সধঃযবসধঃরপং রং, রহ রঃং ধিু, ঃযব ঢ়ড়বঃৎু ড়ভ ষড়মরপধষ রফবধং’ (ঊরহংঃবরহ, ১৯৩৫ন)।

পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারসহ (১৯৬৫) বহু পুরস্কার ও সম্মানের অধিকারী প্রফেসর ড. রিচার্ড ফিলিপস ফ্যম্যান (১৯১৮-১৯৮৮) মৃত্যুর কয়েক বছর আগে, ১৯৮১ সালে বিবিসি-র সাক্ষাতকারে একটি মজার ঘটনা বলেছিলেন। তাঁর এক চিত্রশিল্পী বন্ধু একদিন একটি ফুল হাতে নিয়ে বললেন, ‘দেখো, কতো সুন্দর এই ফুল।’ আমি তার সাথে একমত হলাম। পরক্ষণেই সে বললো, ‘আমি একজন শিল্পী হিসেবে বুঝতে পারি যে, ফুলটি কতো সুন্দর। কিন্তু তুমি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে একে শুধু ছিঁড়ে-ফুঁড়ে বিচার করবে। ফলে, এটি একটি নীরস ফুল হয়ে তোমার কাছে দেখা দেবে।’ বন্ধুটির মাথায় সমস্যা আছে বুঝতে পারলাম। আসলে, ফুলটিকে সে যেমন সুন্দর দেখছে, অন্যদের মতো আমিও তাই দেখছি। হয়তো, আমার কাছে চিত্রশিল্পী বন্ধুর মতো বিষয়টি তেমন পরিশ্রুত নান্দনিকভাবে ফুটে উঠছে না। তবে, এ কথা ঠিক যে, আমি তার চাইতেও বিষয়টির গভীর সৌন্দর্য উপলব্ধি করছি। আমার কল্পনায় ফুলটির কোষ, রঙ ও অন্তস্থ জটিল ক্রিয়া-বিক্রিয়া অতি সুন্দর হয়ে দেখা দিচ্ছে। ফুলটির রঙ পতঙ্গদের আকর্ষণ করছে। তার অর্থ কী এই যে, ফুলটির পরাগায়ণ ঘটাতে পতঙ্গদের আকর্ষণ করার জন্যই এই রঙ। পতঙ্গরা কী রঙ দেখতে পায়? তাহলে কী নি¤œ-পর্যায়ের প্রাণীতে নান্দনিক দৃষ্টি বর্তমান? ক্রমাগত উত্থিত রহস্য আর প্রকোপন ভরা প্রশ্ন যোগ হতেই থাকে। আমি জানিনা ফুলের সৌন্দর্য উপলব্ধিতে এই প্রশ্নগুলো অবান্তর হয় কী করে (ঐরমমরহং, ১৯১৩)। এই ঘটনা বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী ডকিন্স তাঁর লেখা একটি গ্রন্থেও আংশিক বর্ণনা করেছেন (উধশিরহং,১৯৯৮)।

হিটলারের গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা ও ১৯৮১ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রোল্ড হপম্যান (জ. ১৯৩৭) কবি হিসেবেও পরিচিত। কবিতা লিখে পুরষ্কারও পেয়েছেন। ২০০৪ সালে নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কবিতা লেখেন কেন?’ তাঁর উত্তর ছিলো, ‘স্বল্প পরিসরে আমি আমার প্রগাঢ় আবেগ ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কবিতা ছাড়া অন্য উপায়ে প্রকাশ করতে পারি না।’ একজন পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীর মুখে এ এক চমকপ্রদ কথা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, আবেগ আর পর্যবেক্ষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। তবে রোল্ড হপম্যান সেই সাক্ষাতকারে তিনি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সাহিত্যিক জ্ঞান কোনোটিকেই ছোট করেননি (ঞযব ঝঢ়বপঃৎঁস, ২০০৪)।

বহু বছর আগে গ্যেটে (ঔড়যধহহ ডড়ষভমধহম াড়হ এড়বঃযব, ১৭৪৯-১৮৩২) বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তু প্রকাশের ক্ষেত্রে ভিন্ন একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞানে সেই ব্যক্তি উপযুক্ত যিনি প্রকৃতি ও তাঁর মনের আকাশচুিম্ব চাহিদার তুলনায় তাঁর রচনা ও নকশায় অপূর্ণতা দেখাতে পারেন’ (ঈধহঃড়ৎ, ২০০৪)। গ্যেটে হচ্ছেন সর্বকালের অন্যতম প্রতিভাবান ব্যক্তি। তিনি নিজের মধ্যে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের সংযোগ সমানভাবে ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন (ঈধহঃড়ৎ, ২০০৪)। তাঁর ‘ডরষযবষস গবরংঃবৎ’ ও ‘ঋধঁংঃ’ যেভাবে বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মকা-েও বিজ্ঞান হয়েছে ঋদ্ধ। একজন সফল উদ্ভিদবিজ্ঞানী, তুলনামূলক অঙ্গসংস্থানবিদ্যার জনক ও মানবদেহে নতুন একটি অস্থির আবিষ্কারক (ইন্টার ম্যাক্সিলারি অস্থি) হিসেবে বিজ্ঞানে গ্যেটের অবদান তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মতো চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর মতো প্রতিভাবানের এই কথা সাধারণ বিজ্ঞানী কিংবা সাহিত্যিকদের বেলায় প্রয়োগ না করাই ভালো (ঈধহঃড়ৎ, ২০০৪)।

২.২ অখ- বাংলায় সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চার মেলবন্ধন

২.২.১ প্রাক-রবীন্দ্র যুগ

২.২.১.১ উইলিয়ম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪)

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব পর্বে অখ- বাংলায় প্রধানত শ্রীরামপুর মিশন (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮০০), হিন্দু কলেজ (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮১৭), কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮১৭), সংস্কৃত কলেজ (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮২৪) ও কলিকাতা মেডিকেল কলেজ (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৩৫)-কে ঘিরেই সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চার মেলবন্ধন ঘটেছিল। এইসব প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বাংলা গদ্য রচনা শৈলী তৈরিতে ও একই সাথে বিজ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখেন। এঁদের মধ্যে উইলিয়ম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪)-র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইংল্যন্ডের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির প্রতিনিধি হিসেবে উইলিয়ম কেরি বিশিষ্ট চিকিৎসক ড. জন টমাসের সাথে সপরিবারে কোলকাতায় আসেন ১১ নভেম্বর ১৭৯৩ সালে। কোলকাতার অদূরে ড্যানিশদের অধিকারে থাকা শ্রীরামপুর নামক জায়গায় ১০ জানুয়ারি ১৮০০ সালে তিনি অন্যদের নিয়ে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন (ইধহফুড়ঢ়ধফযুধু, ২০০১)। মিশন প্রতিষ্ঠার পরের বছরই (৪ মে ১৮০১) তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বাংলাসহ স্থানীয় ভাষা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। এই কলেজ থেকেই তিনি ‘কথোপকথন’ (১৮০১) ও ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২) প্রকাশ করেন।

মূলত খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে উইলিয়ম কেরি এদেশে এলেও তিনি তাঁর কাজ শুধুমাত্র ধর্মপ্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। বরং যতটা না তিনি ধর্মপ্রচার করেছেন— তার থেকে বহুগুণ বেশি কাজ করেছেন, সেই গোড়ার দিকের বাংলা ভাষা উন্নয়নে, বিদ্যালয় তৈরি ও শিক্ষা প্রসারে, বিজ্ঞানচর্চার কাজে, অনুবাদে, সংবাদপত্রসহ অন্যান্য প্রকাশনায়, উদ্ভিদ উদ্যান তৈরিতে, নারী শিক্ষায়, সতীদাহ প্রথা নিবারণসহ এদেশের কুসংস্কার দূরীকরণে ও বৈজ্ঞানিক সংগঠনের উন্নতিমূলক কাজে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়: ‘বিদ্যাসাগর তখনও জন্মাননি। রামমোহন প্রস্তুতিপর্বে। বাংলা ভাষা শিখে গদ্য রচনা করলেন এক ইয়োরোপীয় মিশনারি ‘উইলিয়ম কেরি’। (গঙ্গোপাধ্যায়, ২০১১)।

শ্রীরামপুর মিশন তৈরির আগে মালদহের মদনাবাটিতে থাকার সময়ে কেরি তাঁর চারপাশের প্রাণী ও উদ্ভিদ যেভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন— তা বিস্ময়কর! স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, মাছ থেকে শুরু করে প্রজাপতি, বিটল, বিছা, ফড়িং, কাঁকড়াসহ অসংখ্য প্রাণী ও গাছপালার তুলনামূলক বিবরণ তাঁর সেই সময়ের প্রেরিত চিঠিপত্রে পাওয়া যায়। বিখ্যাত উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাসবিদ ড. রক্সবার্গের সাথেও তিনি কাজ করেছেন। শ্রীরামপুরেই প্রায় পাঁচ একর জায়গার উপর তিনি একটি উদ্ভিদ উদ্যানও গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে ভারত ও ভারতবর্ষের বাইরের বহু গাছ এনে লাগিয়েছিলেন। কেরি কৃষিবিজ্ঞান সংক্রান্ত কাজও করেছিলেন (ঝসরঃয, ১৮৮৫)। প্রথাগতভাবে কেরির কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ডিগ্রি না থাকলেও তিনি বহু বৈজ্ঞানিক সমিতি ও সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৮২০ সালে কেরি ভারতের কৃষি ও উদ্যানসমূহের উন্নতির জন্য এ্যগ্রিকালচারাল অ্যান্ড হর্টিকালচারাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮২০ সালের মধ্যে কেরি প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশন থেকে ভাষাশিক্ষা, ব্যাকরণ, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের ২৭টি বই মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ‘পদার্থবিদ্যাসার’ (১৮২৫), ‘জ্যোতির্বিদ্যা’ (১৮৩০), ‘কিমিয়াবিদ্যাসার’ (১৮৩৪) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (রায়, ১৯৮৮)। ১৮১৮ সালে উইলিয়ম কেরি, জেসুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়ম ওয়ার্ড শ্রীরামপুর মিশনের অবিসংবাদিত ‘ত্রয়ী’ শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন। এপ্রিল ১৮১৮ সাল থেকে শ্রীরামপুর মিশন বাংলা ভাষায় প্রথম মাসিক সাময়িকপত্র ‘দিগদর্শন’ প্রকাশ করতে শুরু করে। এই সাময়িকপত্রে অন্যান্য বিষয়সহ বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়েও বিভিন্ন লেখা প্রকাশ করা হতো।

সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, অখ- বাংলা তথা ভারতবর্ষে সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চার মেলবন্ধন সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিতটি রচনা করেছিল শ্রীরামপুর মিশন। আর এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন একজন ইংরেজ, উইলিয়ম কেরি।

২.২.১.২ রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)

উইলিয়ম কেরির পরে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনের কাজে রাজা রামমোহন রায়ের নাম (১৭৭২-১৮৩৩) সর্ব প্রথমেই চলে আসে। রামমোহন প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যারিস্টোটলের যুক্তিবিদ্যা ও ইউক্লিডের মূলনীতিসমূহের সাথে পরিচিত হন। ফলে তিনি কিছুটা সমালোচনামূলক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আত্মস্থ করেন। দেশীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজা রামমোহন রায় বিজ্ঞানগ্রন্থ রচনা শুরু করেন। ইংরেজি-বাংলা দ্বৈত ভাষায় তিনি ‘জ্যাগ্রাহী’ নামে একটি ভূগোল বই লিখে ১১ই সেপ্টেম্বর ১৮২০ তারিখের পূর্বে কোলকাতা স্কুল বুক সোসাইটির কাছে তা ছাপার জন্য জমা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া রামমোহন জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যামিতির উপরেও দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, রাজা রামমোহন রায় রচিত তিনটি বিজ্ঞান পুস্তকের কোনোটিই আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৮২১ সাল থেকে রামমোহনের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষায় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সংবাদ কৌমুদী’ প্রকাশিত হতে শুরু করে। এই পত্রিকায় বিজ্ঞান সংবাদ ও বিজ্ঞান আলোচনা প্রায়ই ছাপা হতো। বাংলা, সংস্কৃত, আরবি-ফার্সি, হিন্দি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় তাঁর লেখা গ্রন্থসহ অন্যান্য রচনার সংখ্যা শতাধিক (ঘোষ, ১৯৭৩)। এইসব লেখা বিচার বিশ্লেষণ করলে রামমোহনের মধ্যে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়।

২.২.১.৩ অন্যান্য

প্রাক-রবীন্দ্র যুগে অখ- বাংলায় মননে, লেখায় ও কর্মে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের যুগলবন্দীতে অন্যান্য আর যে কয়জন বাঙালির নাম ভাস্বর হয়ে আছে তার মধ্যে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮১৩-১৮৮৫), অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬), রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২২-১৮৭১), ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৯৪) ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) উল্লেখযোগ্য। এঁদের প্রত্যেকেই সাহিত্য ও বিজ্ঞান রচনায় আগ্রহ ও পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন। এইসব কীর্তিমান মানুষের রচনা পড়লে মনে হয় যে, তাঁরা সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মধ্যে অভেদ সম্পর্কজনিত বিশ্বাসের দ্বারা তাড়িত হয়ে সৃষ্টির বিশাল কর্মকা-ে নিয়োজিত ছিলেন।

২.২.২ রবীন্দ্র যুগ (১৮৬১-১৯৪১)

রবীন্দ্র ভাবনার অন্যতম উজ্জ্বল একটি দিক বিজ্ঞান। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম। অন্তত তাঁর কবিতা, সঙ্গীত, গল্প কিংবা অন্যান্য প্রবন্ধের তুলনায়। বৈজ্ঞানিক বলতে সাধারণত যা বুঝায় রবীন্দ্রনাথ তা ছিলেন না। কিন্তু বিজ্ঞানে তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। মূলত একজন কবি হয়েও রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা ছিল ব্যাপক। বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই আগ্রহ ও পড়াশোনা তাঁর নিজের কথায়, ‘অন্ধবিশ্বাসের মূঢ়তার প্রতি অশ্রদ্ধা… বুদ্ধির উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে’ তাঁকে রক্ষা করেছে। ‘কবিত্বের এলাকায় কল্পনার মহলে’ কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করেনি (ঠাকুর, ১৯৩৭)। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান রবীন্দ্রনাথের কল্পনার দিগন্ত করেছে বিস্তৃত, বৈচিত্র্যময়। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ সংক্ষিপ্ত কথায় শুধু বিবরণই দেয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রচনা হচ্ছে কাব্য, যার মধ্যে তাঁর সমস্ত বোধ বিশ্বাস কল্পনা উপলব্ধি আর বিস্ময় এক হয়ে মিলেছে (গোস্বামী, ১৯৬১)। কখনও তাঁর উপমা বিবর্তনবাদকে আশ্রয় করেছে। আবার কখনও নক্ষত্রবিজ্ঞান কিংবা সৃষ্টিতত্ত্বকে। ভূতত্ত্ব, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের প্রধান প্রায় সব শাখাকে তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেছেন তাঁর উপমার কাজে।

ভবিষ্যৎ-এর বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতেও রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ছিল প্রবল। সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের উৎসাহদান থেকে শুরু করে ভারতবাসীকে বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য তিনি ছিলেন তৎপর। সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে হলে বিজ্ঞান যে অপরিহার্য, তা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। আবার বিজ্ঞান যে লোভের ইন্ধন হয়ে মানব সভ্যতার ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে সে ব্যাপারেও উচ্চারণ করেছেন সতর্কবাণী।

২.২.২.১ বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠা ও প্রেরণা

রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ সন্তানদের বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরির ব্যাপারে তৎপর ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথের নিজেরও বিজ্ঞানের নানা বিষয় সম্পর্কে পড়াশোনা ছিল। ১৮৯৩ সালে পার্কস্ট্রিটের বাড়িতে থাকার সময় বাড়ির ছেলেমেয়েদের কাছে জ্যোর্তিবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, জীববিজ্ঞান ও নৃতত্ত্ব গল্পাকারে তুলে ধরতেন (গোস্বামী, ১৯৬১)। নর্মাল স্কুলের নীলকমল ঘোষালের কাছে রবীন্দ্রনাথ অন্যান্য বিষয়সহ পড়তেন পদার্থবিদ্যা, গণিত, জ্যামিতি, ভূগোল ও প্রাণিবৃত্তান্ত। অন্য আরও একজন শিক্ষকের কাছে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞান শিখতেন। দ্বিতীয় এই শিক্ষকের শেখানোর আকর্ষণীয় পদ্ধতি রবীন্দ্রনাথের শিশুমনে গভীর রেখাপাত করে। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়:

… বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না। আমার বয়স বোধ করি তখন নয়-দশ বছর; মাঝে মাঝে রবিবারে আসতেন সীতানাথ দত্ত [ঘোষ] মহাশয়। …বিজ্ঞানের অতি সাধারণ দুই-একটি তত্ত্ব যখন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতেন আমার মন বিস্ফারিত হয়ে যেত (ঠাকুর, ১৯৩৭) ।

…এই শিক্ষাটি আমার কাছে বিশেষ ঔৎসুক্যজনক ছিল। জ্বাল দিবার সময় তাপসংযোগে পাত্রের নীচের জল পাতলা হইয়া উপরে উঠে, উপরের ভারী জল নীচে নামিতে থাকে, এবং এজন্যই জল টগবগ করে— ইহাই তিনি যেদিন কাচপাত্রে জলে কাঠের গুঁড়া দিয়া আগুনে চড়াইয়া প্রত্যক্ষ দেখাইয়া দিলেন সেদিন মনের মধ্যে যে কিরূপ বিস্ময় অনুভব করেছিলাম তাহা আজও স্পষ্ট মনে আছে। দুধের মধ্যে জল জিনিসটা যে একটা স্বতন্ত্র বস্তু, জ্বাল দিলে সেটা বাষ্প আকারে মুক্তিলাভ করে বলিয়া দুধ গাঢ় হয়, এ কথাটিও যেদিন স্পষ্ট বুঝিলাম সেদিনও ভারি আনন্দ হইয়াছিল (জীবনস্মৃতি, ১৯১২)।

ঠাকুরবাড়ির সন্তানদের অস্থিবিদ্যা শেখানোর জন্য ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলের এক ছাত্রকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। মানুষের একটি কঙ্কাল শোবার ঘরে রাখা ছিল হাড় গোড় চেনা ও ভয় ভাঙানোর জন্য। রবীন্দ্রনাথ মাত্র নয় বছর বয়সে পাকা মেঝের উপর ধুলো-বালি জমিয়ে তার মধ্যে আতার বিচি ফেলে নিয়মিত জল ঢেলে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন— সেখানে আতা গাছ হয় কি না। আর একবার মনসাসিজের আঠা মাখিয়ে আমের আঁটি থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে গাছ ও ফল হয় কি না তারও পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। পৃথিবীর তলদেশ দেখার জন্য একটার পর একটা বাঁশ পোঁতার পরিকল্পনা তাঁর শিশু মনে প্রায়ই উঁকি দিত। আকাশের নীল গোলকটি ধরার জন্য সিঁড়ির পর সিঁড়ি তৈরির চিন্তাও তাঁর মাথায় আসতো। আবার যেদিন গৃহশিক্ষকের কাছে শুনলেন যে সিঁড়ির পর সিঁড়ি করেও নীল গোলকের সন্ধান কোনদিনই পাওয়া যাবে না সেদিন কিন্তু শিশু রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। (জীবনস্মৃতি, ১৯১২)।

প্রকৃতি ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি তৈরি হয়েছিল ছোটকাল থেকেই। হয়তো তা তৈরি হয় অনেকেরই। কিন্তু সেই ছোটকালেই তার সহজ শিল্পময় উপস্থাপন কজন করতে পারেন? নর্মাল স্কুলের হেডমাস্টার সাতকড়ি দত্ত দুলাইন কবিতা (রবিকরে জ্বালাতন আছিল সবাই/ বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই) লিখে রবীন্দ্রনাথকে বাকীটা লিখতে বললে তিনি যা লিখেছিলেন (মীনগণ হীন হয়ে ছিল সরোবরে/ এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে) তা তো রীতিমতো একজন প্রাণিবিজ্ঞানীর পরিপক্ব চিন্তার বর্হিপ্রকাশ ছাড়া কিছু ভাবা যায় না।

বারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সাথে হাতে-কলমে পরিচিত হন। পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথই তাঁকে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেন। হিমালয়ের চাম্বা উপত্যকার (ড্যালহৌসি, হিমাচল প্রদেশ) উপরে সন্ধ্যাকাশে গ্রহ, নক্ষত্র ও তাদের পারষ্পরিক দূরত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে পিতা দেবেন্দ্রনাথই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। জ্যোর্তিবিজ্ঞানের এই শিক্ষায় রবীন্দ্রনাথ এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, তিনি পিতৃদেবের সেই কথাগুলো নিজের ভাষায় সাজিয়ে নিয়ে জীবনের প্রথম ধারাবাহিক রচনা শুরু করেন (ঠাকুর, ১৯৩৭)।

সেই সময়ে খাঁচায় পশুপাখি পোষা প্রায় ঘরে ঘরেই প্রচলিত ছিল। রবীন্দ্রনাথের বাড়িতেও ছিল নানাপ্রকার পাখি। বালক রবীন্দ্রনাথ ব্যাপারটি মোটেও পছন্দ করতেন না। একবার বৌদি কাদম্বরী দেবীর (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী) শখ হলো খাঁচায় কাঠবেড়ালি পোষার। রবীন্দ্রনাথ আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু বালকের সে আপত্তি শোনা হয়নি। পরে রবীন্দ্রনাথ বেশ খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে কাঠবেড়ালি দুটো মুক্ত করে দিয়েছিলেন। পশুপাখিকে খাঁচায় আটকানো যে গর্হিত কাজ— এই বোধটি রবীন্দ্রনাথের বালক বয়সেই তৈরি হয়েছিল।

বালক রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আরও একটি আচরণ সে সময় লক্ষ করা গিয়েছিল। সেটি হচ্ছে বিজ্ঞানের  কোনো তথ্য কোথাও শুনতে পেলে তা সবাইকে শোনানো। নর্মাল স্কুলে বালক রবীন্দ্রনাথ একদিন শুনলেন যে ‘সূর্য পৃথিবী থেকে চোদ্দ লক্ষ গুণ বড়’। এই সংবাদ মায়ের সান্ধ্যকালীন আসরে খুবই বিস্ময়ের সাথে বালক রবীন্দ্রনাথ পরিবেশন করেছিলেন। নিজের জানা কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য অন্য সবাইকে জানানোর এই ইচ্ছা রবীন্দ্রনাথকে বিজ্ঞান লেখায় উৎসাহ জুগিয়েছিল। ছেলেবেলার এসব ঘটনা রবীন্দ্রনাথের মনোজগতে একটা স্থায়ী ছাপ তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে সেই ছাপ ভিন্ন ভিন্ন আকার ও ধারায় তাঁর রচনার উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিয়েছে।

বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় বিষয় ছিল জ্যোর্তিবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান। জীবনস্মৃতির পা-ুলিপিতে তিনি লিখেছিলেন:

সদরস্ট্রিটের বাসের সঙ্গে আমার আর-একটা কথা মনে আসে। এই সময়ে বিজ্ঞান পড়িবার জন্য আমার অত্যন্ত একটা আগ্রহ উপস্থিত হইয়াছিল। তখন হক্সলির রচনা হইতে জীবতত্ত্ব ও লক্ইয়ার নিউকম্ব/নিউকোম্বস্ প্রভৃতির গ্রন্থ হইতে জ্যোর্তিবিদ্যা নিবিষ্টচিত্তে পাঠ করিতাম। জীবতত্ত্ব ও জ্যোতিষ্কতত্ত্ব আমার কাছে অত্যন্ত উপাদেয় বোধ হইত। (জীবনস্মৃতি, ১৯১২)

এই গ্রন্থগুলো ছাড়াও জ্যোর্তিবিজ্ঞান সম্পর্কিত স্যার রবার্ট বল, ফ্লামবিয়ঁ ও প্রক্টরের গ্রন্থসমূহ তিনি পাঠ করেছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথ অন্যত্র উল্লেখ করেছেন (ঠাকুর, ১৯৩৭)।

২.২.২.২  রবীন্দ্রজীবনে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রভাব

রবীন্দ্রনাথের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আশি বছরে (১৮৬১-১৯৪১) ও রবীন্দ্র জন্ম পূর্ববর্তী ১০০ বছরে (১৭৬১-১৮৬০) বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রায় দেড়শো যুগান্তকারী আবিষ্কার সংঘটিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ এসব আবিষ্কার সম্পর্কে অবগত ছিলেন। বিশেষ করে জ্যোর্তিবিজ্ঞান (ইউরেনাস-১৭৮১, নেপচুন-১৮৪৬, ব্লাক-হোল-১৯১৬, প্লুটো-১৯৩০), আপেক্ষিকবাদ (১৯১৬), বিগ-ব্যং তত্ত্ব (১৯২৭), বিবর্তনবাদ (১৮৫৯), পরমাণু বিজ্ঞান (পরমাণুর মডেল-১৮৮৯, ১৯১১, ১৯১৩, ১৯২৫; ইলেকট্রন-১৯০৬, নিউট্রন-১৯৩২) ও ভূবিজ্ঞান (মহিসঞ্চালন তত্ত্ব- ১৯০৮)-এর আবিষ্কারসমূহ রবীন্দ্রনাথের মনোজগতকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য সাধনার পথে বিজ্ঞানকে অচ্ছুত মনে করেননি। তাকে ভালবেসেছিলেন। আর সেই ভালবাসা গড়ে উঠেছিল তাঁর পিতা, গৃহশিক্ষক, বিজ্ঞানীবন্ধুমহল, পূর্বসূরিদের রচনা এবং সর্বোপরি তাঁর জন্মপূর্ববর্তী এবং জন্মের পরে ৭-৮ দশকের যুগান্তকারী আবিষ্কারসমূহ দ্বারা।

২.২.২.৩ রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানগ্রন্থ: বিশ্বপরিচয়

সমগ্র রবীন্দ্র রচনাবলির মধ্যে একমাত্র ‘বিশ্বপরিচয়’ বিজ্ঞান বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবন সায়াহ্নে (সাতাত্তর বছর বয়সে) রচনা করেন। এই গ্রন্থরচনার উদ্দেশ্য, তাঁর নিজের ভাষাতে:

শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভা-ারে না হোক, বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা আবশ্যক। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সেই প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা স্বীকার করলে তাতে অগৌরব নেই। সেই দায়িত্ব নিয়েই আমি এ কাজ শুরু করেছি। (বিশ্ব-পরিচয়, ১৯৩৭)

‘বিজ্ঞানের আবহাওয়া সম্বন্ধে আমাদের দেশের লোকের মনটা চন্দ্রালোকের মতই। যতটা সাধ্য, হাওয়া খেলিয়ে দেবার ইচ্ছা অনেকদিন থেকেই মনে ছিল।’ (বিশ্ব-পরিচয়, ১৯৩৭)।

পাঁচটি অধ্যায় (পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, গ্রহলোক, ভূলোক) ও উপসংহার নিয়ে বিশ্বপরিচয় গ্রন্থটি রচিত। অধ্যায়গুলো এমন নয় যে, ভাব, কল্পনা কিংবা অনুবাদ করেই এগুলো লেখা যায়। পরস্পরবিরোধী অসংখ্য জটিল তথ্যের বিশ্লেষণ ও সে সবের শৃঙ্খলিত উপস্থাপন সত্যিই এক দুরূহ কাজ। প্রয়োজন সূক্ষ্ম বিচার শক্তির। সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ও জ্ঞান ছাড়া এ ধরনের গ্রন্থ রচনা অসম্ভব।

প্রথম অধ্যায়টিতেই (পরমাণুলোক) এর সাক্ষ্য মেলে। পরমাণুর বিষয় নিয়ে সেই সময়ে (১৯৩৭) লিখতে হলে জন ডালটন (১৭৬৬-১৮৪৪) থেকে শুরু করে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড (১৮৭১-১৯৩৭) হয়ে স্যার জেমস চাডউইক (১৮৯১-১৯৭৪)-এর নিউট্রনের আবিষ্কার (১৯৩২) পর্যন্ত পড়াশোনার প্রয়োজন ছিল। রবীন্দ্রনাথ সে পড়াশোনা করেছিলেন। শুধু তাই না, ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে স্যার জেমস চাডউইক (১৮৯১-১৯৭৪)-এর ১৯৩৭ সালের পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সমসাময়িক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কতটা আন্তরিক ছিলেন তারই প্রমাণ মেলে এই দৃষ্টান্তে।

বিজ্ঞান বিষয়বস্তুর কত গভীরে রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করতে পেরেছিলেন তা এই গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘নক্ষত্রলোক’  থেকে একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। গ্রাভিটেসনকে মহাকর্ষ বললে সাধারণের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সেই কারণে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘গ্রাভিটেসন না ব’লে ভারাবর্তন নাম দিলে গোল চুকে যায়।’

‘নক্ষত্রলোক’, ‘সৌরজগৎ’ ও ‘গ্রহলোক’ এই তিনটি অধ্যায় রবীন্দ্রনাথ চার্লস মেসিয়ার (১৭৩০-১৮১৭) থেকে শুরু করে ওয়ালটার বেড (১৮৯৩-১৯৬০) সহ ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত বিকশিত জ্যোর্তিবিজ্ঞানের ধারণাগুলোকে মাথায় নিয়েই রচনা করেছেন। ‘ভূলোক’ অধ্যায়টি ভূতত্ত্ব ও প্রাণের সৃষ্টি সম্পর্কিত। পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ও তার বৈচিত্র্যময় বিকাশ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ চার্লস আর. ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২), জে.বি.এস.হলডেন (১৮৯২-১৯৬৪) ও এ.আই. ওপারিন (১৮৯৪-১৯৮০)-এর তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। হলডেন ও ওপারিন দুজনেই প্রায় একই সময়ে স্বতন্ত্রভাবে পৃথিবীতে প্রাণসৃষ্টি সম্পর্কে একই তত্ত্ব দিয়েছিলেন।

সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের সব মতই যে অভ্রান্ত নয় সে কথা রবীন্দ্রনাথ এই গ্রন্থে বলেছেন।  তৃতীয় অধ্যায় ‘সৌরজগৎ’-এর মধ্যে সৌরজগৎ সৃষ্টি সম্পর্কে নতুন মতবাদ উল্লেখ করতে যেয়ে তিনি উপদেশ দিয়েছেন, ‘এ কথা মনে রেখো এ-সকল আন্দাজি মতকে নিশ্চিত প্রমাণের মধ্যে ধরে নেওয়া চলবে না।’

বিশ্বপরিচয় গ্রন্থের উপসংহারে রবীন্দ্রনাথ কতকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন:

যে কোষ পাক যন্ত্রের, তার কাজ এক রকমের, যে কোষ মস্তিষ্কের, তার কাজ একেবারেই অন্য রকমের। অথচ জীবাণুকোষগুলি মূলে একই। এদের দূরূহ কাজের ভাগ-বাঁটোয়ারা হল কোন হুকুমে এবং এদের বিচিত্র কাজের মিলন ঘটিয়ে স্বাস্থ্য নামে একটা সামঞ্জস্য সাধন করল কিসে। …আত্মরক্ষা ও বংশরক্ষার জটিল প্রয়াস গোড়াতেই এদের উপর ভর করল কোথা থেকে।

এর উত্তর আজও অজানা। ‘আন্তর্জাতিক মানব জেনম প্রকল্প’ ও প্রাইভেট কোম্পানি ‘সেলেরা জেনোমিক্স’ (ঈবষবৎধ এবহড়সরপং) ২০০১ সালে মানবদেহের গোপন ও জটিল সংকেতলিপি উদ্ধার করার এত বছর পরেও।

বিশ্বপরিচয় গ্রন্থের ভাষা বাংলায় বিজ্ঞান রচনার একটি মাইল ফলক। গ্রন্থের জটিল বিষয়সসমূহ আটপৌরে শব্দ, ছোট ছোট বাক্য আর চমকপ্রদ উদাহরণ সাধারণ পাঠককেও কাছে টেনে নেয়। দু-একটি উদাহরণ :

‘…আলো যে ডাকের পেয়াদার মতো খবর পিঠে করে নিয়ে দৌঁড়ে চলে, বিজ্ঞানের এই একটা মস্ত আবিষ্কার।’

‘মনে করা যাক, মাটির ঘরের এক অংশ তৈরি খাঁটি মাটি দিয়ে, আর এক অংশ মাটিতে গোবর মিলিয়ে।’

‘এই জুড়ি নক্ষত্র হল কী ক’রে তা নিয়ে আলাদা আলাদা মত শুনি। কেউ কেউ বলেন এর মূলে আছে দস্যুবৃত্তি। অর্থাৎ জোর যার মুলুক তার নীতি অনুসারে একটা তারা আর-একটাকে বন্দী ক’রে আপন সঙ্গী ক’রে রেখেছে।’

‘দুধের সর ঠা-া হতে হতে যেমন কুঁচকিয়ে যায়, পৃথিবীর উপরকার স্তর ঠা-া হতে হতে তেমনি কুঁচকিয়ে যেতে লাগল।’

বাংলাভাষায় বিজ্ঞান রচনার এই যে আকর্ষণীয় শৈলী— তার স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথই। তাঁর আগে কোনো বিজ্ঞান লেখক বাংলাভাষায় এভাবে বিজ্ঞান রচনা করেননি। যদিও রবীন্দ্রজন্মের ৪৪ বছর আগে (১৮১৭) বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনা শুরু হয়েছিল (ভট্টাচার্য, ১৯৮১)। রবীন্দ্রনাথের পরেও বিজ্ঞান রচনার ভাষা খুব বেশি যে এগিয়েছে তাও বলা যাবে না।

২.২.২.৪ রবীন্দ্রকাব্যে বিজ্ঞান

রবীন্দ্রকাব্যের অসংখ্য জায়গায় বিজ্ঞানের নানা শাখার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। জ্যোর্তিবিজ্ঞান, ভূ-বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের বহু বিষয় তাঁর কবিতা ও গানে ধরা পড়ে। কখনও প্রকটভাবে আবার কখনও প্রচ্ছন্নভাবে। ‘তারকার আত্মহত্যা’ (সন্ধ্যাসংগীত), ‘সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়’ (প্রভাতসংগীত), সৃষ্টিরহস্য (মহুয়া), তেজ (বনবাণী), অতীতের ছায়া (বীথিকা), আদিতম (বীথিকা) প্রভৃতি কবিতাগুলোর অনেক জায়গায় জ্যোর্তিবিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়।

জীবনের প্রথমদিকে রচিত (১৮৮৩) ‘সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন :

বাষ্পে বাষ্পে করে ছুটাছটি,

বাষ্পে বাষ্পে করে আলিঙ্গন।…

জ্বলিছে দ্বিগুণ অগ্নিরাশি

আঁধার হতেছে চুর চুর।

অগ্নিময় মিলন হইতে

জন্মিতেছে আগ্নেয় সন্তান,

অন্ধকার শূন্যমরুমাঝে

শত শত অগ্নিপরিবার

দিশে দিশে করিছে ভ্রমণ।…

থেমে এল প্রচ- কল্লোল,

নিবে এল জ্বলন্ত উল্লাস,

গ্রহগণ নিজ অশ্রুজলে

নিবাইল নিজের হুতাশ।

জগতের বাঁধিল সমাজ,

জগতের বাঁধিল সংসার,..

জগত হইল পরিবার।

কত চন্দ্র কত সূর্য কত গ্রহ তারা…

ভ্রমে সবে নিজ নিজ পথে…

তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে সৌরজগত সম্পর্কিত সেই সময় পর্যন্ত (১৮৮৩) আবি®কৃত তথ্যগুলো রবীন্দ্রচিন্তায় উজ্জ্বল ছিল। ‘সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়’ কবিতায় কেপলার (১৫৩১-১৬৩০)-এর সূত্র, নিউটন (১৬৪২-১৭২৭)-এর মহাকর্ষতত্ত্ব, ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) ও ল্যাপল্যাস (১৭৪৯-১৮২৭)-এর নীহারিকাবাদ থেকে শুরু করে মঙ্গলের চাঁদ ডেইমস আবিষ্কৃত হওয়া পর্যন্ত (১৮৭৭) জ্যোর্তিবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো খুবই প্রকটভাবে ফুঠে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কবিতার মাঝেও জ্যোর্তিবিজ্ঞানের দেখা পাওয়া যায়। যেমন: সৃষ্টির প্রথম বাণী তুমি, হে আলোক (তেজ: ‘বনবাণী’), ‘অন্তহীন কাল আর অসীম গগন/ নিদ্রাহীন আলো (সৃষ্টিরহস্য : ‘মহুয়া’), পুরাতন ছায়াপথে নতুন তারার মতো/ উজ্জ্বলি উঠিছে কত/ কত তার নিভাইছ একেবারে/ যুগান্তের অশান্ত ফুৎকারে। (অতীতের ছায়া : ‘বীথিকা’),  ভেদ করি ঝঞ্ঝার আলোড়ন/ ছেদ করি বাষ্পের আবরণ/ চুম্বিল ধরাতল যে আলোক (আদিতম : ‘বীথিকা’), … যেথা স্বর্ণলেখা/ জগতের প্রাতঃকালে দিয়েছিল দেখা/ আদি অন্ধকার মাঝে, … (৮০: ‘নৈবেদ্য’) প্রভৃতি।

তিনি যখন লেখেন : ‘…লক্ষ লক্ষ যোজন দূর হইতে লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে অনন্ত অন্ধকারের পথে যাত্রা করে একটি তারার আলো এই পৃথিবীতে এসে পোঁছোয়…’ (ছিন্নপত্র ৫২, ১৮৯২); কিংবা ‘প্রথমে সৌরজগৎ একটি বাষ্পচক্র ছিল মাত্র, পরে তাহা হইতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হইয়া গ্রহ উপগ্রহ সকল সৃজিত হইল’ (কাব্যের অবস্থা পরিবর্তন, ১৮৮১) তখন জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সেই সময়কার ধারণা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে জ্ঞাত ছিলেন তা মনে করিয়ে দেয়।

জীবনের শেষ দিকে এসেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় বিজ্ঞানকে বাদ দিতে পারেন নি। ১৯৩৮ সালে ‘আফ্রিকা’ কবিতায় তিনি লিখলেন:

উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে

স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে

নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত,

তাঁর সেই ঘন ঘন মাথা-নাড়ার দিনে

রুদ্র সমুদ্রের বাহু

প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে

ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে আফ্রিকা

[‘আফ্রিকা’: পত্রপুট]

এই কবিতায় আলফ্রেড ওয়েগনার (১৮৮০-১৯৩০)-এর ‘মহীসঞ্চালন তত্ত্ব’ (১৯১৫, ১৯২৪) অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী বর্তমান মহাদেশগুলো একসময় একইসাথে লাগানো ছিল। কালক্রমে তা পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়। সে অনুসারে আফ্রিকা মহাদেশ একসময় ভারতীয় ভূখ-ের সাথে সংযুক্ত ছিল। কালক্রমে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ থাকার কারণেই এ ধরনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে নিজের সাহিত্য রচনার বিষয়বস্তু করতে পেরেছিলেন।

১৯১৬ সালে চূড়ান্ত হওয়া আপেক্ষিকবাদ রবীন্দ্রমানসে বিশেষ অভিঘাত তৈরি করেছিল। মোট ৪ বার তাঁর আইনস্টাইনের সাথে দেখা হয়। রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইন কথোপকথন ‘নিউয়র্ক টাইমস’ (১৯৩০) ও ‘এশিয়া ম্যাগাজিন’ (১৯৩১) প্রকাশ করে। এই কথোপকথনে দুজনেই তাঁদের নিজস্ব দর্শনের মাধ্যমে জগতকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীত ও দর্শনের নির্যাসভরা শব্দ ও বাক্যের বিনিময়ে তাঁরা দুজনেই পৌঁছুতে চেয়েছেন পরম সত্যে। আইনস্টাইনের জামাতা ও আইনস্টাইনের অন্যতম জীবনীকার ড. দিমিত্রি ম্যারিঅনফের ভাষায়, ‘তাঁদের দুজনের সাক্ষাত ছিলো খুবই আকর্ষণীয়। একজন ছিলেন ঠাকুর, বিজ্ঞানীর মাথা নিয়ে একজন কবি। আর অপরজন ছিলেন আইনস্টাইন, কবির মাথা নিয়ে একজন বিজ্ঞানী। তাঁরা একে অপরকে মতামত গ্রহণে চাপ দিচ্ছেলেন না। এই দুই নক্ষত্রের আলাপচারিতায় আমি ছিলাম শুধুই একজন পর্যবেক্ষক’। এ ধরনের মন্তব্য রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইন প্রত্যেকের মধ্যে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের দ্বৈতসত্তার বিষয়টি নির্দেশ করে। প্রকৃতপক্ষে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের সংশ্লেষিত রূপ রবীন্দ্রদর্শনকে করেছিল মহিমান্বিত।

২.২.৩ রবীন্দ্র যুগে সাহিত্যপ্রেমী অন্যান্য বিজ্ঞানী

রবীন্দ্র যুগে ভারতীয় বিজ্ঞানী বিশেষ করে জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭: বিদ্যুৎ-চৌম্বক তরঙ্গ, জীব এবং জড়ের সাড়া), প্রফুল্লচন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪: মারকিউরাস নাইট্রাইট) ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪: বসু-আইনস্টাইন সংখ্যাতত্ত্ব)-র  নাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর বাঙালি এই তিন বিজ্ঞানী প্রত্যেকেরই ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর বোধ। এঁরা সবাই বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ঘোরতর সমর্থক ছিলেন। সব থেকে মজার ব্যাপার— জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায় দুজনই বিখ্যাত বিজ্ঞানী হয়েও বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন। বিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথের সাথে ছিল তাঁদের আত্মার যোগাযোগ।

জগদীশচন্দ্র বসু ১৯১১ সালের বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনীর ময়মনসিংহ অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে ‘বিজ্ঞানে সাহিত্য’ সম্পর্কে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক কতটা যে প্রয়োজনীয় তা তিনি তুলে ধরেছিলেন এভাবে (বসু, ১৯২১):

পাশ্চত্য দেশে জ্ঞানরাজ্যে এখন ভেদবুদ্ধির অত্যন্ত প্রচলন হইয়াছে। যেখানে জ্ঞানের প্রত্যেক শাখা-প্রশাখা নিজেকে স্বতন্ত্র রাখিবার জন্যই বিশেষ আয়োজন করিয়াছে। তাহার ফলে নিজেকে এক করিয়া জানিবার চেষ্টা এখন লুপ্তপ্রায় হইয়াছে। জ্ঞান-সাধনার প্রথমাবস্থায় এরূপ জাতিভেদ প্রথায় উপকার করে, তাহাতে উপকরণ সংগ্রহ করা এবং তাহাকে সজ্জিত করিবার সুবিধা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি কেবল এই প্রথাকেই অনুসরণ করি তাহা হইলে সত্যের পূর্ণমূর্তি প্রত্যক্ষ করা ঘটিয়া উঠে না। কেবল সাধনাই চলিতে থাকে, সিদ্ধির দর্শন পাই না।

অপর দিকে, বহুর মধ্যে এক যাহাতে হারাইয়া না যায়, ভারতবর্ষ সেই দিকে সর্বদা লক্ষ্য রাখিয়াছে। সেই চিরকালের সাধনার ফলে আমরা এককে দেখিতে পাই, আমাদের মনে সে সম্বন্ধে কোনো প্রবল বাধা ঘটে না।

আমি অনুভব করিতেছি, আমাদের সাহিত্য সম্মিলনের ব্যাপারে স্বভাবতই এই ঐক্যবোধ কাজ করিয়াছে। আমরা এই সম্মিলনের প্রথম হইতেই সাহিত্যের সীমা নির্ণয় করিয়া তাহার অধিকারের দ্বার সংকীর্ণ করিতে মনেও করি নাই। পরন্তু, আমরা তাহার অধিকারকে সহজেই প্রসারিত করিয়া দিবার দিকেই চলিয়াছি।

ফলত জ্ঞান অন্বেষণে আমরা অজ্ঞাতসারে এক সর্বব্যাপী একতার দিকে অগ্রসর হইতেছি। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিজেদের এক বৃহৎ পরিচয় জানিবার উৎসুক হইয়াছি। আমরা কি চাহিতেছি, কি ভাবিতেছি, কি পরীক্ষা করিতেছি, তাহা এক স্থানে দেখিলে আপনাকে প্রকৃতরূপে দেখিতে পাইব। সেইজন্য আমাদের দেশে আজ যে কেহ গান করিতেছে, ধ্যান করিতেছে, অন্বেষণ করিতেছে, তাঁহাদের সকলকেই এই সাহিত্য-সম্মিলনে সমবেত করিবার আহ্বান প্রেরিত হইয়াছে।

এমন প্রাঞ্জল ভাষায়, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সুরে, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন কেন জরুরি তার ব্যাখ্যা জগদীশচন্দ্র বসুর মতো বিজ্ঞানীর পক্ষেই করা সম্ভব। জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর ‘কবিতা ও বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে আরো নির্দিষ্ট করে, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের পথ ভিন্ন হলেও উভয়েরই লক্ষ্য সত্যে উপনীত হওয়া বলে মত দিয়েছেন (বসু, ১৯২১):

সকল পথই যেখানে একত্রে মিলিয়াছে সেইখানেই পূর্ণ সত্য। সত্য খ- খ- হইয়া আপনার মধ্যে অসংখ্য বিরোধ ঘটাইয়া অবস্থিত নহে।…বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভুতি অনির্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে।

বাংলাসাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানেরও জনক জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর ‘পলাতক তুফান’ কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক গল্প এখনও পাঠককে আকর্ষণ করে।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিজ্ঞান সাধনার পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অনেকগুলো বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। এসব লেখার সাহিত্যমূল্য অসাধারণ। ‘বাংলার মননশীল সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বাংলার প্রবন্ধ সাহিত্যকে তিনি বহু বিচিত্র্য ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ করেছেন।’ আর সেই কারণেই বঙ্গীয় বিদগ্ধ সমাজ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে তিন বার (১৯৩১-১৯৩৪) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে সভাপতির আসনে বসিয়েছেন (চক্রবর্তী, ১৯৯৮)। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় সাহিত্যকে বিজ্ঞান সাধনার পথে অন্তরায় ভাবেন নি। বিজ্ঞান আর সাহিত্যের দ্বিত্বগুণে তাঁর প্রতিভা হয়েছে দীপ্ত। সত্যানুসন্ধানের পথকে করেছে আলোকময়।

বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু শৈশব থেকেই সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শনে অনুরক্ত ছিলেন। শিশুকালেই তিনি হাতে লেখা মাসিকপত্র , ‘মণীষা’-র সম্পাদক হয়েছিলেন (ভট্টাচার্য, ১৯৬৪)।  সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য বিজ্ঞান বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রথম বাংলা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। প্রবন্ধটির নাম ছিলো, ‘বিজ্ঞানের সঙ্কট’ (বসু, ১৯৩১)।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ব্যাপারে তাঁর প্রচেষ্টা প্রবাদপ্রতিম। সত্যেন্দ্রনাথ বসু একবার বলেছিলেন যে, ‘যাঁরা বলেন বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না অথবা বিজ্ঞান বোঝেন না’। তাঁর  নেতৃত্বে কলকাতয় ১৯৪৮সালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদের মুখপাত্র হিসাবে বাংলা ভাষার বিজ্ঞান পত্রিকা ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’-এ কেবলমাত্র মৌলিক গবেষণা নিবন্ধ নিয়ে ‘রাজশেখর বসু সংখ্যা’ প্রকাশ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের মৌল নিবন্ধ রচনা সম্ভব।

বিজ্ঞান গবেষণা যেমন তাঁর কাছে ছিলো প্রিয় তেমনি কাব্য, শিল্প-কলা, সঙ্গীতেও তিনি ছিলেন প্রবল উৎসাহী। বিশ্বভারতীর উপাচার্য (১৯৫৬-১৯৬০) হিসেবে কাজ করার সময় এর প্রমাণ মেলে (খাস্তগীর, ১৯৬৪)। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ভালো এ¯্রাজও বাজাতেন। বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্য সত্যেন্দ্রনাথের জীবনে একাকার হয়ে তাঁকে করে তুলেছিল একনিষ্ঠ সত্যান্বেষী।

রবীন্দ্রযুগে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (১৮৬৪-১৯১৯), জগদানন্দ রায় (১৮৬৯-১৯৩৩), রাজশেখর বসু (১৮৮০-১৯৬০), সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩), মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩-১৯৫৬), প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ (১৮৯৩-১৯৭২) সহ আরো অনেকেই একই সাথে সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এঁদের অনেকেরই জীবন ও দর্শনে সাহিত্য ও বিজ্ঞান নামক দুটি ¯্রােতধারা এক হয়ে মিশে গেছে।

২.২.৪ রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে সাহিত্যপ্রেমী বিজ্ঞানী

রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে বিশেষ করে পশ্চিম বাংলা, পূর্ব-পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে যাঁরা একই সাথে বিজ্ঞান ও সাহিত্য রচনায় সুনাম অর্জন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রয়াত গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৯৫-১৯৮১), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), কুদরাত-এ-খুদা (১৯০০-১৯৭৭), মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (১৯১৫-১৯৯৩), জহুরুল হক (১৯২৩-১৯৯৮), আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১৯৩০-১৯৯৮) প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বিগত কয়েক দশকে অনেকেই আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান গবেষণা করলেও তাঁদের অধিকাংশই উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচনা করেন নি। আবার অনেকেই উন্নতমানের সাহিত্য রচনা করলেও বিজ্ঞান গবেষণায় তাঁদের অবদান অতি সামান্য। তবে, একথা ঠিক যে, বর্তমানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে কয়েকজনের নাম একই সাথে সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী হিসেবে লেখার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে অবশ্য গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। কর্পোরেট, ডিজিটাল ও প্রপাগান্ডার ব্যূহ থেকে বের হয়ে নির্মোহভাবে তালিকাটা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. উপসংহার

মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই জীবন ধারণ, জীবন-যাপন কিংবা শখের জন্য মানুষের বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজন হয়। একই সাথে দৈনন্দিন ঘটনা প্রবাহে শারীরবৃত্তীয় কারণেই  প্রকাশিত হয় মানুষের আবেগ। দলবদ্ধ সেই সমাজে এক বা একাধিক ব্যক্তির বিশেষ ধরনের আবেগ অন্যদের নাড়া দেয়।  ক্রমে তা সেই দল বা গোষ্ঠীর স্মৃতিতে হয় মুদ্রিত। সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। এভাবেই সেই আদিম যুগেই একই মানুষের মধ্যে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের দ্বৈত সত্তা জন্ম নেয়। সঞ্চালিত হয় এই জিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।  সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে তা বিকশিত হতে থাকে। তৈরি হয় অ্যারিস্টটল, ওমর খৈয়াম কিংবা বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের মতো বিচিত্র প্রতিভাধর সব মানুষ। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে যাঁদের কীর্তি হয়েছে কালজয়ী।

তাই সভ্যতার প্রাক-উদ্ভাস মুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত সাহিত্যের সাথে বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব যৌক্তিক কারণেই চিহ্নিত করা যায় না। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের লক্ষ্য আর গন্তব্য অভেদ। সত্য ও সুন্দর। পার্থক্য শুধু প্রকাশ মাধ্যম।

বাংলা তথ্যসূত্র

খাস্তগীর, সতীশরঞ্জন (১৯৬৪): আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। জ্ঞান ও বিজ্ঞান, ১৭: ২-৬।

গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল (২০১১): প্রবন্ধ ১, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ নভেম্বর।

গোস্বামী, পরিমল (১৯৬১): রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞান, রবীন্দ্রায়ণ, সম্পাদিত গ্রন্থ (শ্রী পুলিনবিহরী সেন), দ্বিতীয় খ-।

ঘোষ, অজিতকুমার (১৯৭৩): রামমোহন রচনাবলী। হরফ প্রকাশনী, কলকাতা। ১-৭৪৫।

চক্রবর্তী, কমল (১৯৯৮): সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রফুল্লচন্দ্র. প্রফুল্লচন্দ্র রায় (জীবনী গ্রন্থ: সম্পাদক- সালাম আজাদ), পৃ. ১০৯-১১১।

জীবনস্মৃতি (১৯১২): বিশ্বভারতী।

ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৯৩৭): বিশ্বপরিচয়, বিশ্বভারতী-গ্রন্থালয়।

বসু, সত্যেন্দ্রনাথ (১৯৩১): বিজ্ঞানের সঙ্কট। পরিচয়, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, পৃ. ?।

বসু, জগদীশচন্দ্র (১৯২১): অব্যক্ত। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। পৃ. ১৬০।

ভট্টাচার্য, গিরিজাপতি (১৯৬৪): সত্যেন্দ্র জয়ন্তী। জ্ঞান ও বিজ্ঞান, ১৭: ৭-১৩।

ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব  (১৯৮১): বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্যদ। ১-৫০৮।

রায়, তাপস কুমার (১৯৮৮): বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের অনুশীলন ও সাহিত্যে তার প্রভাব। পিএইচ.ডি. অভিসন্দর্ভ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত। পৃ. ১-৫৭৯।

ইংরেজি তথ্যসূত্র

Bandyopadhyay, B. (2001). A critical enquiry into the contribution of Serampore Mission towards vernacular education in Bengal. Ph.D. Thesis submitted to the University of Calcutta. 1-277.

Burch, M.R. (2019): Albert Einstein Poetry and Quotes. Relativity and the “Physics” of Love.The HyperTexts.Online Poetry Journal.http://www.thehypertexts.com/Albert%20Einstein%20Poet%20Poetry%20Poems%20Pictures%20Bio.htm (Retrieved 8 March 2019).

Cantor, P.A. (2004): The Scientist and the Poet,” The New Atlantis, Number 4, pp. 75-85.

Dawkins, C.R. (1998): Unweaving the Rainbow: Science, Delusion and the Appetite for Wonder. Houghton Mifflin.1-336.

Debate.org.opinions (2019): Should we value literature more than science? https://www.debate.org/opinions/should-we-value-literature-more-than-science (Retrived on 8 March 2019).

Einstein, A. (1935a): The World as I See It. Translated from the German by A. Harris. John Lane, The Bodley Head (London).

Einstein, A.(1935b): Emmy Noether. New York Times. 5 May 1935.

Franke, N.P. (2018): Albert Einstein as a poet – a lecture.  October 10, 2018. Auckland University, Pat Hanan Room, Arts 2 Building 18 Symonds Street Auckland, Auckland, 1010 New Zealand. http://www.aucklandgoethesociety.org/events/2018/9/17/albert-einstein-as-a-poet-dr-norman-p-franke (Retrived on 8 March 2019).

Haydon, B. (1929): Chapter XVII 1816–1817″.  In: Alexander P. D. Penrose. The Autobiography and Memoirs of Benjamin Robert Haydon ,1786–1846.

Higgins, C. (1913): Richard Feynman’s “Ode to the Flower”. http://mentalfloss.com/article/32133/richard-feynmans-ode-flower. (Retrived on 8 March 2019).

Jeffrey, L.N. (1967): Wordsworth and Science.The South Central Bulletin.Vol. 27, No. 4, pp. 16-22 .

O’Connor, J.J. & Robertson, E.F. (2012): Newton Poetry. http://www-history.mcs.st-andrews.ac.uk/HistTopics/Newton_poetry.html (Retrived on 8 March 2019).

Ohrem, D. (2017): Scientific Americans: The Making of Popular Science and Evolution in Early-Twentieth-Century U.S. Literature and Culture by John Bruni (review).” Configurations, vol. 25 no. 2, pp. 253-256.

Smith, G. (1885): The Life of William Carey: Shoemaker and Missionary. John Murray, Albemarle Street, London.

The Spectrum (2004): Perspective on a Nobel Lariate’s World balanced between Chemistry, Poetry and Philosophy. An Interview with Roald Hoffmann. Vol 17 (4): 1-8.

Whiteside, D.T. (ed.) (1967): The Mathematical Papers of Isaac Newton (Volume 1), (Cambridge University Press, 1967), part 7 “The October 1666 Tract on Fluxions”, at page 400, in 2008 reprint.

Whiteside, D.T. (1970).The mathematical principles underlying Newton’s Principia Mathematica.Journal for the History of Astronomy. 1 (2): 116–138.

************************************************

কী লিখি

কেন লিখি

১৫

কেন লিখি
শিবনারায়ণ রায়

এখন থেকে ছাপ্পান্ন বছর আগে ১৯৪৪-এ হিরণকুমার সান্যাল এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যুক্ত সম্পাদনায় ‘কেন লিখি’ নামে চৌষট্টি পৃষ্ঠার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময়ে দুজন সম্পাদকই ছিলেন কমিউনিস্ট। সান্যাল মশাই প্রয়াত, সুভাষ কমিউনিস্ট দল এবং সম্ভবত মত থেকেও সরে এসেছেন। সুভাষ এখন বইটির নতুন সংস্করণে লেখবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চল্লিশের দশক থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার প্রীতির সম্পর্ক। তাঁর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সংক্ষেপে আমার বক্তব্য পেশ করি।

যে লেখকদের লিখেই জীবিকা অর্জন করতে হয় পাঠক এবং প্রকাশকের রুচি অথবা দাবি তাঁরা অগ্রাহ্য করতে পারেন না। আমি পেশাদার লেখক নই, লিখে জীবিকা উপার্জন করি না, জীবনে একবার বছর দুই অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে দিয়ে একটি পত্রিকায় নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে ইংরেজিতে লেখার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেই দু’বছরেই বুঝতে পারি লেখাকে জীবিকা করা আমার ধাতে পোষাবে না। তারপর নানা রকমের আকর্ষণীয় আমন্ত্রণ সত্ত্বেও লেখাকে জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করিনি। লিখি নিজের খুশি মাফিক, জীবিকার জন্য অধ্যাপনার পথ বেছে নিয়েছি। পেশাদার নই বটে, কিন্তু লিখেছি তো নিতান্ত কম নয়। সেই ছাত্র বয়স থেকে লিখছি, এবং অসংকলিত বিস্তর লেখার কথা বাদ দিলেও আমার ইংরেজি এবং বাংলায় লেখা বইয়ের সংখ্যা অন্তত দু’কুড়ি হবে। সুতরাং এ প্রশ্ন খুবই সঙ্গত কেন লিখেছি? কী লিখেছি?

প্রথমেই স্বীকার করব যে পরিবারে আমি জন্মেছি এবং যে পারিবারিক পরিবেশে আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তাতে বই পড়ার মতোই লেখাটাও আমাদের জীবনে প্রায় ডাল ভাতের সামিল ছিল। আমার বাবা ছিলেন বিদ্যাভূষণ শাস্ত্রী, সংস্কৃতের জগতে তাঁর বাস, প্রাচীন ভাষা সাহিত্য ইতিহাস ব্যাকরণ সম্পর্কিত বেশ কিছু মূল্যবান বই লিখেছেন, এক সময়ে প-িত মহলে যাদের যথেষ্ট কদর ছিল। দাদা চর্চা করেছেন প্রাকৃত, বৌদ্ধ ধর্ম এবং প্রতœতত্ত্ব নিয়ে। দুই দিদির মধ্যে একজনের বিষয় দর্শন, অন্যজনের সংস্কৃত। মা’র ভাষাজ্ঞান বাংলাতেই সীমাবদ্ধ বটে, কিন্তু কাশীরাম দাস থেকে মানকুমারী বসু তাঁর মুখস্থ, নিজেও বিস্তর কবিতা লিখেছেন। (যদিও প্রকাশের কথা কখনও তাঁর মনে আসেনি।) সুতরাং আমিও যে লিখব এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু ‘কেন’ কথাটার মধ্যে উদ্দেশ্যের প্রশ্নও নিহিত থাকে। অবশ্য লেখক যে সব সময়ে উদ্দেশ্য-সচেতন হয়ে লেখেন এ কথা বলা চলে না। পি-ার লিখেছিলেন, কবিরা যে কী লেখেন এবং কেন লেখেন তা তাঁরা নিজেরাই জানেন না। আর এই কারণে প্লেটো কবিদের তাঁর আদর্শ রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। অবশ্য সব কবি অথবা সব কবিতা সম্পর্কে এ কথা খাটে না—বিশেষ করে ঘোষণামূলক কবিতার উদ্দেশ্য কবিরা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন। তবু বহু সার্থক কবিতারই কোনও সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আমাদের গোচরে আসে না। স্বয়ং কবিকে তাঁর নিজের কবিতা ব্যাখ্যা করতে বললে তিনি বিপদে পড়েন। রবীন্দ্রনাথকে অনেকবারই এই অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।

আমি নিজেও জীবনে অল্পস্বল্প কবিতা লিখেছি, কয়েকটি কবিতার বইও ছাপা হয়েছে, কিন্তু কেন লিখেছি, বা তাদের পিছনে কোনও উদ্দেশ্য ছিল কিনা, এ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারব না। তবে বাঙালি পাঠকের কাছে আমার পরিচয় মুখ্যত প্রাবন্ধিক হিসেবে, এবং প্রবন্ধ আটঘাট বেঁধেই লিখতে হয়। অর্থাৎ সেখানে উদ্দেশ্যের প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।

নিজের প্রবন্ধ নিয়ে কিছুটা নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে গেলে দেখতে পাই সেখানে উদ্দেশ্য মুখ্যত একটাই, কিন্তু তাদের ধারা অন্তত দুটি। আমি যে জগতে জন্মেছি, যে সমাজে বাস করি, যে ভাষা ব্যবহার করি, যে সাহিত্য পাঠ করি, তার মধ্যে বিস্তর নিকৃষ্ট উপাদান এবং গভীর ত্রুটি আমাকে ক্রমাগত পীড়া দেয়। এই সব ত্রুটি, স্খলন, হীনতার অপসারণ প্রচেষ্টা আমার করণীয় বলে মনে হয় এবং আমার প্রবন্ধে সেই চেষ্টা আকার পায়। আমাদের জীবনযাত্রার, সমাজব্যবস্থার, ধ্যানধারণার, ভাষা এবং সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন আমার প্রবন্ধ-রচনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এই চেষ্টা দুটি প্রধান ধারায় প্রবাহমান। সংক্ষেপে তাদের কথা জানাই।

আমাদের সমাজব্যবস্থা এবং তার পেছনে যে জীবনদর্শন সক্রিয় তা যে কত গভীরভাবে মনুষ্যত্ব-বিরোধী খুব অল্প বয়সেই নিজের অভিজ্ঞতার সূূত্রে সে বিষয়ে সচেতন হই। এই চেতনা প্রথম যৌবনে প্রবলতর হয় রাসেল, মার্ক্স এবং ফ্রয়েডের রচনাবলী পড়ে। যে জগতে আমার বাস সেখানে প্রায় সর্বত্র দেখতে পাই একদিকে কায়ক্লেশে অর্ধাহারে অনাহারে বহু মানুষের টিকে থাকবার দুর্মর প্রয়াশ, অন্যদিকে কিছু বিত্তবান মানুষের অপর্যাপ্ত ভোগবিলাস এবং সম্পদের অপচয়। একদিকে জমিজমা কলকারখানার মালিক, সরকারি আমলা পুলিশ, নানা সূত্রে অত্যাচার; অন্যদিকে অসহায়, নিরীহ, দরিদ্র, দুর্বল বহু মানুষের মুখ বুজে এই অত্যাচার সহ্য করা। দেখি পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের দুরাবস্থা অন্তহীন। দেখি দীর্ঘ দিনের নিষ্পেষণে, দারিদ্র্যে, শিক্ষাহীনতায় কীভাবে অধিকাংশ মানুষ আত্মপ্রত্যয়হীন, দৈবনির্ভর, যুক্তিবিমুখ, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। আর তারই সঙ্গে লক্ষ করি যারা শিক্ষিত, এই অসম ব্যবস্থায় যারা নানা রকম সুযোগ সুবিধার অধিকারী, যাদের কর্তব্য ছিল এই ব্যবস্থার কুৎসিৎ স্বরূপ উদ্ঘাটন করে সাধারণ মানুষের মনে সামাজিক রূপান্তরের অভীপ্সাকে জাগিয়ে তোলা, সেই বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর অনেকেই কীভাবে নানা চতুর উপায়ে এই ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগী। এইসব দেখেশুনে অল্প বয়সেই মনস্থির করি আমার কলম এই অসাম্য, অন্যায়, অত্যাচার এবং সবকিছু মুখ বুজে সয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে লেখায় নিয়োজিত হবে। কোনও রাজনৈতিক দলের সততায় আমার আস্থা নেই—তাদের একমাত্র সাধনা ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতা লাভের আগে অথবা পরে কোনও সময়েই তারা ন্যায়নীতির নির্দেশ গ্রাহ্য করে না। সুতরাং কোনও দলের অনুগত না হয়ে আমি নিজের যুক্তিনির্ভর এবং বিবেকচালিত ভাবনাচিন্তা নিজের মতো ভাবেই লিখেছি। শুধু বর্তমান সমাজব্যবস্থা এবং তাকে ধারণ করে আছে যে দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি তাকেই নানা দিক থেকে সমালোচনা করিনি; তার বিকল্পরূপে কোন ধরনের সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভবপর তাও শব্দ দিয়ে আঁকবার চেষ্টা করেছি। আমার মৌমাছিতন্ত্র; গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়; ¯্রােতের বিরুদ্ধে; রেনেসাঁস ইত্যাদি বইতে এবং রচনায় আমার চিন্তার এই ধারাটির কিছুটা পরিচয় মিলবে। আমার এই র‌্যাডিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি একসময়ে যেমন আমাকে কার্ল মার্কসের রচনাবলীর প্রতি আকৃষ্ট করেছিলো, পরবর্তীকালে তেমনই মানবেন্দ্রনাথ রায়ের চিন্তাও আমার ওপরে প্রভাব ফেলে। কিন্তু ক্রমেই আমার চিন্তা নিজস্বতা অর্জনের দিকে চলেছে—আমার সদ্য প্রকাশিত অ ঘবি জবহধরংংধহপব কেতাবটিতে তার কিছু আভাস আছে। আমি নিজেকে মার্ক্সপন্থী বা মানবেন্দ্র-অনুগামী মনে করি না।

কিন্তু আমার মূল উদ্দেশ্য—সংস্কারের, রূপান্তরের, সর্বসাধারণের জীবনে ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রকর্ষ অর্জনের ও প্রতিষ্ঠার—দ্বিতীয় আরেকটি ধারাতেও প্রবাহিত। শিশুকাল থেকেই আমার মন সাহিত্যপাঠের দ্বারা পুষ্ট হয়েছে। আমার ধারণা, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন তার ভাষা এবং ইতিহাসের সব চাইতে বড় বিপ্লব ঘটে অক্ষর বা বর্ণমালার উদ্ভাবনের ফলে। ভাষা মানুষকে মুক্তি দেয় নির্দিষ্ট বিশেষ থেকে অফুরন্ত নির্বিশেষে, আর সেই নির্বিশেষ থেকেই উদ্ভূত হয় বিজ্ঞান এবং শিল্পকলা। অক্ষরের সূত্রে মানুষ দেশকালকে জয় করে, অমরত্ব অর্জনের চাবিকাঠি খুঁজে পায়। প্রাণীমাত্রই মৃত্যুর অধীন; তবু প্রাণী অমরত্ব খোঁজে সঙ্গমসূত্রে বীজের বপনে; ব্যক্তি মরে কিন্তু প্রজাতি অনেক ক্ষেত্রেই টিকে থাকে। মানুষও অমরত্বের জন্য নির্ভর করে অন্য প্রাণীর মতো জননকোষের ওপরে—কিন্তু অন্য প্রাণীদের তুলনায় তার একান্ত স্বকীয় আর একটি চাবিও আছে। পৃথিবী থেকে মনুষ্য সভ্যতার বিলোপ না ঘটা পর্যন্ত সৎসাহিত্য অমর। কয়েক বছর আগে লাইপৎজিগের একটি মাটির টালিতে উৎকীর্ণ একটি কবিতা পড়ে গভীরভাবে বিচলিত হয়েছিলাম। কবিতাটি সম্ভবত ২৩৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত। কবির নাম লেখা নেই, বিষয় দেবী ইশ্তারের বিলাপ, কবিতাটি কিছুতেই ভুলতে পারি না, শেষ পর্যন্ত দুঃসাহসে ভর করে বাংলায় তার একটি ভাবানুবাদ করি (এটি আমার কাব্যগ্রন্থ ‘রূপান্তরে’ সংকলিত হয়েছে)। হয়তো এটিই সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনতম কবিতা—প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পেরিয়ে এক অপরিচিত সুমেরীয় কবি এসে হাত ধরেছেন একজন বাঙালি সহৃদয় পাঠকের।

এই ভাবেই আজো আমরা গভীরভাবে প্রাণিত হই যখন পড়ি সফক্লিস অথবা কালিদাস, দান্তে অথবা লিপো, বাসো কিংবা গোয়েটে, গালিব অথবা রবীন্দ্রনাথ। আমরা নিজেরা অমরত্ব অর্জন করতে না পরলেও এই সব ক্লাসিকস-এর অন্তরঙ্গ আবেদন আমাদের সচেতন করে তোলে মানুষের ভাষা এবং অনুভূতি, ভাবনা এবং কল্পনা জীবনকে কতখানি সমৃদ্ধ করতে সক্ষম সে বিষয়ে। অমরত্বের স্বাদ, যা বহুজনের উপভোগের দ্বারা খর্বিত হয় না, যা ভূগোল এবং সময়ের ব্যবধান অতিক্রম করে দূর দেশ এবং ভবিষ্যৎ কালেও পৌঁছাতে পারে, সৎসাহিত্য তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটায়।

এখন আমরা প্রবন্ধাদির একটি ধারা যেমন সমাজের সমালোচনা, বিশ্লেষণ এবং রূপান্তরের উদ্দেশ্যে বহমান, অন্য ধারাটি তেমনই ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে উৎকর্ষের সাধনায় নিয়োজিত। পশ্চিমী সাহিত্য নিয়ে যখন আলোচনা করি তখন মুখ্যত আমার বিচার্য হয় কীভাবে নিজের জীবনে বিষপান করেও মহৎ-সাহিত্যিক তাঁর অভিজ্ঞতাকে অমরত্ব দান করেন, অথবা কী কী কারণে কোনও ভাষায় তথা সাহিত্যে আপজাত্য ঘটে। আমার প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থে (প্রেক্ষিত, ১৯৪৫) এই আপজাত্যের হেতু বিশ্লেষণ ছিল। কবির নির্বাসন বইটিতে আমি সাহিত্যে মহত্ত্বের সূত্র নির্ণয় করবার চেষ্টা করি; কিন্তু গোয়েটের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনার সূত্রে বাঙ্গালি মহাকবির কিছু গভীর ত্রুটির উল্লেখ করবার ফলে অধিকাংশ বাঙালি পাঠক আমার প্রতি বিরূপ হন। বস্তুত দীর্ঘ দিন যাবৎ লিখলেও আমি কোনওদিনই জনপ্রিয় লেখক নই। আমি কখনও শাস্ত্র অথবা জনমতের অনুসরণ করি না; আমি অধিকাংশ সময়েই নিজের যুক্তি, অভিজ্ঞতা, বিবেক বুদ্ধির নির্দেশ অনুযায়ী যা লিখি তা ¯্রােতের বিরুদ্ধে যায়। এ দেশের পরম্পরানির্ভর, পরমুখাপেক্ষী, যুক্তিবিমুখ অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষের ঘোলাটে ভাবনা চিন্তা, তামসিক আচার আচরণ, গড্ডল জীবনযাত্রা, নিকৃষ্ট সাহিত্যরুচি আমাকে কিশোর বয়স থেকেই ক্লিষ্ট করেছে। তা সত্ত্বেও আমি গত প্রায় পঞ্চাশ/ষাট বছর ধরে অপরিসীম ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ে চেষ্টা করে আসছি যাতে বাংলা ভাষার ত্রুটি এবং দুর্বলতা হ্রাস পায়—বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা গদ্যের ভাষাকে যে উঁচু তারে বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন বাংলা গদ্যেও মান যেন অন্তত সেখান থেকে স্খলিত না হয়, এই ভাষা যেন আরও সবল, সমৃদ্ধ, প্রকাশক্ষম হয়ে ওঠে। এবং আমার বিশ্বাস ভাষার সমৃদ্ধায়নের সঙ্গে সমাজসংস্কৃতির বিকাশের অচ্ছেদ্য যোগ আছে।

মুশকিল হল যেমন ব্যক্তি এবং সমাজের জীবন তেমনই ভাষা এবং সাহিত্যের বিকাশও নিয়ত অনুশীলন সাপেক্ষ। কোনও কিছুই ঠিক এক জায়গায় স্থির নেই, ভাঙন এবং মৃত্যু অস্তিত্বে অনিবার্য। কিন্তু আমরা বাঁচতে চাই, সুস্থ ভাবে, মাথা উঁচু করে, সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার সূত্রে, স্বাধীন আত্মপ্রকাশের অধিকার ব্যক্তিজীবনে ভোগ করে। তার জন্য চাই নিরন্তর প্রয়াস, সমস্যার সমাধানে বুদ্ধির প্রয়োগ, জ্ঞানের চর্চা, পারস্পরিক সহযোগ এবং সৌহার্দ্য। আমি কেন লিখি? লিখি একদিকে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির গলদ উদঘাটন করে তার বিরুদ্ধে অত্যাচারিত স্ত্রীপুরুষের মনে ব্যাপক বিপ্লবের ইচ্ছাকে জাগ্রত এবং প্রবলতর করতে; অন্যদিকে যে ভাষা এবং সাহিত্যের সূত্রে মানুষের মন অমৃতের স্বাদ পায় তাকে বলিষ্ঠ, গতিশীল, সমৃদ্ধতর করতে। এই চেষ্টার পথে আমার নিজের ভাষায় ধাপে ধাপে পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সে আরেক কাহিনী।

মোদ্দা আমি জানিয়ে যেতে চাই যে আটাত্তর বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও আমি এখনও পুরোপুরি নাস্তিক, যুক্তিবাদী, এবং ত্রুটিশীল এই মনুষ্যপ্রজাতির অপরিসীম সৃজন সম্ভাবনায় বিশ্বাসী। আমি জীবনে কখনও শক্তিমান বা বিত্তবানের কাছে মাথা নত করিনি, যাতে মানুষকে স্তোক দেওয়া যায় এমন কোনও কথা লিখিনি বা বলিনি, জনপ্রিয়তা, সামাজিক সম্মান বা পুরস্কার ইত্যাদির চাইতে নিজের বক্তব্যে এবং জীবনে সততাকে অনেক বেশি মূল্য দিয়েছি। শুনেছি অনেকেই আমাকে অংহকারী বলেন। আমি অহংকারী, কারণ স্বার্থসিদ্ধির জন্য কখনও আমি কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রফা করিনি, প্রকাশক-সম্পাদক-পাঠক কারও মন যোগানোর আদৌ চেষ্টা করিনি। চিন্তায়, জীবনযাত্রায় এবং আমার সমস্ত লেখায় আমি সততাকে সর্বোর্ধ্ব মূল্য দিয়েছি। আমি পেশাদার নই প্রত্যয়ী লেখক। সাধ এবং সাধ্যের মিলন ঘটাতে না পারলেও সর্বোদয়ী উৎকর্ষের অনুসন্ধান আমার জীবন এবং সাহিত্যকর্মের আদ্যন্ত প্রেরণা। আমি অহংকারী বটে, কিন্তু নিজের চারধারে কখনো কোনো দেয়াল গড়িনি। তাই নানা-দেশে কালে আমার সুহৃদ্বৃন্দ আজও বিকীর্যমান। অপরপক্ষে গভীর সংকটের দিনে যেমন অহংকার আমাকে শক্তি যুগিয়েছে, নানা প্রলোভনের হাত থেকে অহংকার আমাকে তেমনই রক্ষা করেছে। আমার অস্মিতাকে আমি বহু বাধাবিপত্তি সংকট সত্ত্বেও কখনও খর্ব হতে দিই নি। আমার আশা মৃত্যু পর্যন্ত লেখক, শিক্ষক এবং মানুষ হিসেবে এই অহংকার যেন বজায় রাখতে পারি।

[[উৎস : সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত কেন লিখি (১৯৯৯) গ্রন্থে সংকলিত]

************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা