67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

ক্রো ড় প ত্র ২ ন ন ফি ক শ ন

 [পুনঃপাঠ]   

বাংলা প্রবন্ধ পরিচয়
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

বাংলা গদ্যের জন্মবৃত্তান্ত বেশ কিছু দিক থেকেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসছে। ইদানিং কেউ কেউ বলছেন, গদ্যের দেখা এর আগেও মিলেছে। এই গদ্য ব্যবসায়িক প্রয়োজনে লিখিত ব্যবহারিক গদ্য। যাঁরা লিখেছিলেন, কিছু জরুরি সংবাদ যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যেই লিখেছিলেন, কোনরূপ সাহিত্যিক অভিপ্রায় থেকে নয়। গদ্যের এই নমুনাগুলি অবিষ্কৃত হওয়ায় আমরা উপকৃত হয়েছি। এতদিন আমরা জানতাম, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প-িতেরা সবাই মিলে যে গদ্য গড়েছিলেন তাকে মনের সাধ মিটিয়ে সংস্কৃতের অলংকারে সাজিয়েছিলেন। বাঙালির মুখের ভাষাকে তাঁরা একবারেই অবজ্ঞা করেছিলেন, এতটাই, যে গদ্যকে আবার মুখের ভাষার কাছাকাছি আনতে, বা অন্ততঃ গদ্যের চলনে মুখের ভাষার ক্যেডেন্স্ বা ঢেউ জাগাতে পরবর্তী সাত পুরুষ গলদঘর্ম হয়েছে। আদি গদ্য লেখকরা কেবল সংস্কৃতের ভা-ার থেকে শব্দই লুট করেন নি, প্রচলিত শব্দ, প্রয়োজনীয় শব্দ ঝেটিয়ে বিদায় করেছিলেন, সাহিত্যাংগনের পবিত্রতা রক্ষা করতে। তাঁরা গ্রহণে ছিলেন উদার, বর্জনে নিষ্ঠুর। তাঁরা শুধু দেশী আকাড়া শব্দই বিদায় করেন নি। তাবৎ যাবনিক শব্দ, —আরবী, ফার্সী— তাঁদের কাছে মুহূর্তে অপাংক্তেয় হয়ে গিয়েছিল। ফলে এতদিনকার বাংলা ভাষায় কয়েক শতাব্দী ধরে যে মিশ্রসংস্কৃতির ছাপ পড়েছিল, এবং ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই পড়েছিল, সেটা হঠাৎ করেই মুছে গেল। সতের আঠারো শতকের কারবারী বা সওদাগরী বাংলার নমুনা যা কিছুদিন আগে ড. আনিসুজ্জামান উদ্ধার করেছেন বিলেতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পুঁথিপত্রের মহাফেজখানা থেকে, তা বাংলা গদ্যের জন্ম তারিখ হয়তো পিছিয়ে দেবে না। তবে বাংলা ভাষার সাবেক চেহারাটা কেমন ছিল, প-িতকুলের হাতে না পড়লে বাংলা গদ্য কোন পথ ধরত, এ বিষয়ে স্পষ্টতার ধারণা দেবে নিশ্চয়ই। বাংলা পদ্যের পয়ার ও ত্রিপদীর মধ্যেও আমরা প্রচলিত গদ্যের খবর যে পাই না তা নয়:

                                অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনীর তীরে

                                পার কর বলিয়া ডাকিলা  পাটিনীরে।

                                সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটিনী

                                ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি।

প-িতকুলের কাছে আমাদের ঋণ তবুও খাটো করা যাবে না। এরাই প্রথম বাংলা গদ্যকে ভদ্র সমাজে ঠাঁই দিয়েছিলেন। তাঁদের হাতে বাংলা গদ্যের হাতেখড়ি হয়েছিল এবং তাঁদেরই একজন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র তাঁদের অস্পষ্ট উদ্যমকে অতি শীঘ্র একটি স্পষ্টতার পথে পৌঁছে দিয়ে তাঁদের সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে গেলেন।

‘বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন।’ এই একটি বাক্যে রবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্যের ধারায় বিদ্যাসাগরের জায়গা নির্দেশ করে গেছেন, অসংশয়িত ভাবে। ‘তৎপূর্বে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথমে বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ভাষা যে কেবল ভাবের একটা আধারমাত্র নহে, তাহার মধ্যে যেন তেন প্রকারের কতকগুলো বক্তব্য বিষয় পুরিয়া দিলেই যে কর্তব্য সমাপন হয় না, বিদ্যাসাগর দৃষ্টান্ত দ্বারা তাহাই প্রমাণ করিয়াছিলেন।’

বিদ্যাসাগরকে রবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্যের জনক বলেননি, বাংলা গদ্যের ‘প্রথম যথার্থ শিল্পী বলেছেন।’ বাংলা ভাষাকে পূর্ব-প্রচলিত অনাবশ্যক সমাসাড়ম্বর হইতে মুক্ত করিয়া তাহার পদগুলির মধ্যে অংশযোজনার সুনিয়ম স্থাপন করিয়া, বিদ্যাসাগর যে বাংলা গদ্যকে কেবল মাত্র সর্বপ্রকার ব্যবহারযোগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন তাহা নহে। তিনি তাহাকে শোভন করিবার জন্যও সর্বদা সচেষ্টা ছিলেন। গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনিসামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, তাহার গতির মধ্যে একটি অনতিলক্ষ ছন্দঃস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য ও সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। গ্রাম্য পা-িত্য এবং গ্রাম্য বর্বরতা উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্র সভার উপযোগী আর্য্য ভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন। তৎপূর্বে বাংলা গদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষা গঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্প প্রতিভা ও সৃষ্টি ক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়।’

‘চারিত্রপূজায়’ ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ শিরোনামের এই প্রবন্ধে বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকৃতি রবীন্দ্রনাথের আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল না। মুখ্য বিষয় ছিল তার চরিত্রমাহাত্ম্য প্রকাশ করা। জীবনশিল্পী বিদ্যাসাগরই এই প্রবন্ধে সমধিক গুরুত্ব পেয়েছেন, গদ্যশিল্পী ঈশ্বরচন্দ্র নন। গদ্যশিল্পীর কৃতিত্ব অংশত তাঁর নিজের সৃষ্টির মধ্যে, মূলতঃ অন্যের ব্যবহারোপযোগী একটি মাধ্যম সৃষ্টির মধ্যে, এই কথাটা স্পষ্ট ভাবেই বলা হয়েছে। তাঁর সৃষ্ট এই মাধ্যমের প্রথম ব্যাপক ও পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। গ্রাম্যতামুক্ত, শ্রোভন, নমনীয় ও অনতিলক্ষ্য ছন্দ স্পন্দিত গদ্য বঙ্কিমের হাতে বিচিত্র বিন্যাসে বিকশিত হল। বাংলা গদ্য নিশ্চিত ভাবেই একটা মানের দেখা পেল, যে মানদ-ে পরবর্তীকালের গদ্যের গুণাগুণ বিচার করা যায়।

১৮০০ সালের পূর্বে যে গদ্যের অস্তিত্বই ছিল না, উনিশ শতকের মধ্যকাল পর্যন্ত মোটামুটি পঞ্চাশ বৎসর সময় লেগেছিল তাকে স্বকীয় স্বভাবে স্থিত হতে। পরবর্তী পঞ্চাশ বৎসরে, মোটামুটি হিসাবে, বাংলা গদ্যের বিস্ময়কর বিকাশ একটি বিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক ঘটনা নয়। উনিশ শতকীয় যে- সার্বিক জাগরণকে বাংলার রেনেসাঁস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, গদ্য সেই রেনেসাঁসের সহযাত্রী। ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার ক্ষেত্রে এই অর্ধ শতকে বাংলার মনীষা নিজেকে প্রকাশ করেছে। এর সবটাই বাংলা ভাষার নয়, ইংরেজীতেও উল্লেখযোগ্য ভাবে, তবে বাংলার হিস্যাও কম ছিল না। বাংলা একটি উদীয়মান জাতির ব্যাপক ব্যবহারিক প্রয়োজন সিদ্ধির উপযোগী ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠে। এই সময়কালে রচিত প্রবন্ধ সাহিত্যে বাঙালীর এই মানসযাত্রার পরিচয় ধরা পড়েছে।

উনিশ শতকীয় গদ্যের পরিণত রূপ ঐ শতকের ও পূর্ববর্তী শতকের ইংরেজী গদ্যের কাছে বিপুল পরিমাণে ঋণী। ঐ শতকের উচ্চ শিক্ষিতেরা কি পরিমাণ আগ্রহের সঙ্গে ইংরেজীর চর্চা করেছিলেন, সে বিষয়ে বলার দরকার নেই। প্রথমদিকে এই আগ্রহের সঙ্গে মিশে ছিল বাংলার প্রতি অবজ্ঞা। এই অবজ্ঞা ও অবহেলা থেকে বাংলা চর্চার দিক মুখ ফিরিয়েছিলেন যাঁরা, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের অগ্রগণ্য। বঙ্গদর্শনের ‘পত্রসূচনা’ একটি ঐতিহাসিক দলিল। বাঙালীর পক্ষে বাংলা চর্চা কেন অবশ্যপালনীয় কর্তব্য এ বিষয়ে বঙ্কিম শেষ কথা বলে গিয়েছেন।

বঙ্কিম শুধু উপদেশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন নি। তাঁর দৃষ্টান্তই বরং বেশী কার্যকর হয়েছিল। তিনি একই সঙ্গে বাংলা গদ্যের উপন্যাসধর্মী ও প্রবন্ধধর্মী রূপ প্রতিষ্ঠা করে যান। পৃথিবীর অপরাপর সাহিত্যে সবক্ষেত্রে এটা হয়নি। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে হয়নি। দুই গদ্যের চরিত্র আলাদা। গল্পাশ্রয়ী গদ্যের কাজ গল্পকে এগিয়ে নেওয়া এবং গল্পের পরিপোষক স্থান কাল পাত্রকে পরিস্ফুট করা। অপর গদ্যের কাজ নন-ফিকশনাল গদ্যের কাজ— চিন্তাকে সুবিন্যস্ত করে তাকে পরিণতির পথে পৌঁছে দেওয়া। গল্পের গদ্যেও চিন্তার সুযোগ আছে, যেমন চিন্তার গদ্যে আছে কল্পনার সুযোগ।

তবে গদ্যের প্রকৃতিভেদে এদের ভূমিকার তারতম্য ঘটে যায়। এবং যিনি গল্পের গদ্যে হাত পাকিয়েছেন, চিন্তার গদ্যেও তিনি সমান দক্ষতা দেখাবেন, সকলের বেলায় এটা দেখা যায় না। এর বিপরীত কথাটাও সমান ভাবে সত্য। বঙ্কিমের বড়ো কৃতিত্ব, উপন্যাসের গদ্যে কল্পনার এবং প্রবন্ধের গদ্যে চিন্তার সৌন্দর্য ও শক্তির যে পরিচয় তিনি দিয়েছেন, এবং উভয় ক্ষেত্রে দুই গদ্যের ভিন্ন চরিত্র রক্ষায় তাঁর যে দৃঢ়তা আমরা দেখেছি, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা বেশী নেই। এদিক দিয়ে তিনি পথিকৃৎ।

উনিশ শতকীয় বাংলা সাহিত্যে নৈতিকতার ও উচ্চমার্গীয় আদর্শের ছাপ স্পষ্ট। যাঁরাই কলম ধরেছিলেন, প্রায় সকলেই ছিলেন এই আদর্শে আস্থাপরায়ণ। এ যুগের প্রবন্ধেও লেগেছে এই উচ্চ চিন্তা ও আদর্শের ছোঁয়া। প্রবন্ধের আঁটোসাটো গড়ন ও বিষয়বস্তুর প্রতি অখন্ড মনোযোগ তাঁদের এই বক্তব্যপ্রধান, নৈতিকতাবাদী মানস গঠনের স্বাভাবিক ফল। প্রবন্ধের কাজের চেহারাটাই তাঁরা দেখেছিলেন, তার ছুটির চেহারা নয়। যাঁরা একই সঙ্গে দুই চেহারাই দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবার আগে নাম করতে হয় বঙ্কিমের অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্রের। যে প্রবন্ধ লেখকের মনের অবসর মুহূর্তের সৃষ্টি, ‘পালামৌ’ প্রবন্ধ গুচ্ছের মধ্যে আমরা সেই মনটাকে দেখি। এ শতকের যাঁরা প্রবন্ধকার, তাঁরা সবাই তাঁদের ঘরোয়া মনের কক্ষটি তালাবদ্ধ করে, বৈঠকী আসরটিকে সযতেœ আড়াল করে, তাঁদের আপিস কামরায় সজ্জিত বেশে দেখা দিয়েছেন। গুরুত্ব দিয়েছেন বিষয়কে, আড়াল করেছেন নিজেকে, নিজের ব্যক্তিসত্তাকে।

উনিশ শতকীয় বাংলা প্রবন্ধের এই প্রকৃতি। গদ্য লেখকেরা মনে হয় আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন ইংরেজী প্রবন্ধের জনসন-বার্ক-মেকলে-মিল বেনথামের ধারাকে। কার্লাইল-আরনল্ড-রাস্কিন-হাক্সলী-লেজলী স্টিফেন প্রমুখ লেখক সদা-জাগ্রত ছিলেন শিক্ষিত বাঙালী চেতনায়। এদের প্রত্যেকের গদ্য ভঙ্গীতে অবশ্যই বিশিষ্টতা ছিল। বক্তব্যেও ছিল, কিন্তু একটি জায়গায় মিল ছিল সকল গরমিলকে ডিঙিয়ে ঃ তাঁরা সবাই ছিলেন চিন্তাবিদ। তাঁরা আরাধ্য করেছিলেন হয় সত্য বা স্বদেশ বা অন্য কোনও আদর্শকে। তাঁদের দু’শ পৃষ্ঠার বইও প্রবন্ধ, দু’পৃষ্ঠার লেখাও প্রবন্ধ। এসে (বংংধু) শব্দটির ফরাসী ব্যঞ্জনা ইংলিশ চ্যানেল একেবারেই অতিক্রম করেনি, তা নয়। না হলে প্রবন্ধের চার্লস ল্যাম্ব-ডি কুইন্সী ধারার সৃষ্টি হতো না। কিন্তু শব্দটিকে বেকন শুরুতেই ইংলিশ বুট পরিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে গটমট করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া যত সহজ হল দিনের শেষে সন্ধ্যাবেলার নাচের আসরে যাওয়া ঠিক ততোটাই অসম্ভব হয়ে পড়ল। ইংরেজী প্রবন্ধের পিতামহ লর্ড বেকন সম্বন্ধে যাতে কেউ ভুল বুঝে না বসেন, সেজন্য বলতে হয়, তাঁর হাতের সবুট প্রবন্ধ নাচের আসরে না গেলেও নিজেই নিজের চমক সৃষ্টি করেছিল ও পথিকের দৃষ্টি কেড়েছিল। বেকন তাকে বিশ্রাম দেননি, তাঁকে প্রবল বেগে সিদ্ধান্তের দিকে ছুটিয়েছিলেন। কিন্তু সে তার চলার পথে পাথুরে রাস্তায় বিদ্যুৎ ছিটিয়েছিল। পিতামহের এই হাকিমী মেজাজ বংশধরেরা প্রায় সবাই বর্জন করলেও — ব্যতিক্রম হিসেবে কেবল ডঃ জনসনের কথাই মনে পড়ছে — এর প্রভাব পুরোপুরি উবে যায়নি। শতকের শেষ দিকেই যিনি আসর জমালেন — অ্যাডিসন — তিনিই প্রকৃত প্রস্তাবে প্রবন্ধের জগতে বৈঠকী আঁমেজ সৃষ্টি করলেন।

বঙ্কিমও হাকিমী করেছিলেন তবে তিনি ছিলেন ছোট হাকিম, সমাজের সাধারণ মানুষের কাছাকাছি। কোর্ট থেকে বাড়ী ফিরে যথাশীঘ্র হাকিমী লেবাস খুলেই তিনি স্বস্তি পেয়েছেন, ও প্রবন্ধের কলম হাতে নিয়েছেন, বুঝতে পারা যায়। তাঁর হাকিমী অভ্যাসের মধ্যে কেবল একটি বস্তু প্রবন্ধে ঢুকেছিল — চিন্তার পরিচ্ছন্নতা, বা যুক্তির পারম্পর্য। এটি বাঙালী চরিত্রের প্রধান গুণ নয়, প্রবন্ধ রচনায় সিদ্ধির একমাত্র শর্তও নয়। কারণ প্রবন্ধ আর যাই হোক, যুক্তিতর্ক সিদ্ধান্তের নফরদারী করে না। প্রয়োজন মতো ওই পদ্ধতিকে ব্যবহার যদিবা করে, কিন্তু ওই পদ্ধতির বাইরেও তার স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। বেশীরভাগ প্রবন্ধ কিছুই প্রমাণ করে না। বঙ্কিমও কোন কিছু প্রমাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন না,  তবে তার খেয়ালী রচনাও শেষ পর্যন্ত খেয়ালী নয়। তাঁর প্রগলভতাও বলগা ছাড়া নয়। রাসটা তাঁর হাতেই থাকে।

‘এসে’ শব্দটার মধ্যে একটা বিনয় আছে। ভাবটা এই আমি কিছুু বলব, বলার চেষ্টা করব, তবে আপনারা আমার সঙ্গে একমত হবেন, তা নাও হতে পারে। প্রবন্ধ শব্দটার মধ্যে এই বিনয় নেই। বরং যা বলব ভয়ানকভাবে গুছিয়ে বলব, এমন একটা অঙ্গীকার দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু নামে কিছু এসে যায় না। ইংরেজ দার্শনিক তাঁর দেড়শ পৃষ্ঠায় আটোসাঁটো যুক্তি নির্ভর রচনাকেও অক্লেশে ‘এসে’ বলে চালিয়ে দিয়েছেন। আবার নামে প্রবন্ধ বলেই বাঙালী প্রবন্ধকার ঘাবড়ে যাননি, তাঁর ঢিলে ঢালা লেখাও প্রবন্ধ নামেই চলেছে।

ফলে, পাঠকেরা ‘প্রবন্ধ’ বলতে প্রায় সংজ্ঞার অতীত বিচিত্র স্বভাবের, ছোট বড়ো মাঝারি নানা মাপের গদ্য রচনা, যা গল্প নয়, সম্পাদকীয় নয়, উপ-সম্পাদকীয় নয়, প্রেমপত্র নয়, অর্থাৎ এক কথায় যেখানে লেখক কিছু নিজস্ব চিন্তা প্রকাশ করছেন, কখনো তথ্য প্রমাণের সাহায্য নিয়ে, কখনো এ‘সব ছাড়াই- এই ব্যাপক পরিধির অন্তর্গত এক সঙ্গে অনেক কিছু বুঝে আসছেন। ‘প্রবন্ধ’ একটা ‘জেনেরিক’ বা বর্গীয় ভাব প্রকাশক শব্দ বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই বর্গের মধ্যে রবীন্দ্র-রচনার য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র থেকে শব্দতত্ত্ব, জীবনস্মৃতি, বিশ্বপরিচয় সবই অনায়াসে আশ্রয় পেতে পারে, ও পেয়ে যায়।

এ থেকে ধারণা হতে পারে, প্রবন্ধের কোন নির্দিষ্ট সাহিত্যরূপ নেই। ‘নন-ফিকশনাল’ গদ্য মাত্রেই প্রবন্ধ, যদি তার মধ্যে সাহিত্যগুণ থাকে, শুধু যদি তা তুচ্ছতা প্রাত্যহিকতা ও সাংবাদিকতার উপরে উঠতে পারে। বলাবাহুল্য, প্রবন্ধ সম্বন্ধে এই ধারণা বহুল-সমর্থিত।

তবু অস্বীকার করা যায় না, ‘এসে, ও ‘প্রবন্ধ’ এই দুটি শব্দের মধ্যে অনেকেই এমন কিছু দেখেছেন, যা একটু বেশী স্পষ্ট, একটু বেশী নির্দিষ্ট। উপন্যাসের মধ্যেও ছোটগল্পের উপাদান থাকতে পারে বা দুটি একটি ছোট গল্প জায়গাও পেতে পারে। তবু উপন্যাস উপন্যাসই, ছোটগল্প ছোট গল্পই। বড়ো মাপের গদ্য রচনার মধ্যে তেমনি প্রবন্ধের মাল-মসলা থাকতে পারে, মেজাজও থাকা অসম্ভব নয়, তবু প্রবন্ধ বলতে আমরা সচরাচর একটা বই মাপের গদ্য রচনা নয়, একেবারে এক বৈঠকে  পড়ে ফেলা যায়, পরিমিত মাপের তেমন লেখাই বুঝে থাকি। ছোট মাপের লেখাও যদি স্পষ্টতঃই বিষয়াশ্রয়ী হয়, যেখানে লেখকের উপস্থিতি একেবারেই গৌণ, তাহলে সেই লেখাও প্রবন্ধের দাবী নিয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে সম্ভবতঃ প্রথম সারিতে নয়। প্রথম সারি সেই লেখার জন্যই নির্দিষ্ট যেখানে প্রবন্ধ দেখা দেয় গদ্য রচনা হিসেবে তার আপন দাবীতে, আত্মপরিচয়ে। বিষয়ের গুরুত্ব, যুক্তির যথার্থতা, সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা কোন কিছুর উপরই প্রবন্ধের শেষ মূল্যায়ন নির্ভর করে না। যেসব ক্ষেত্রে প্রবন্ধের এই ‘অটনমি’ আমরা দেখব, সেখানেই প্রবন্ধকে তার শুদ্ধ পরিচয়ে চিনব।

মনে রাখতে হবে কোন আলোচনাই শূন্যের উপর দাঁড়াতে পারে না, প্রবন্ধও বিষয়-মুক্ত নির্বিশেষ কিছু নয়। প্রবন্ধ নামে পরিচিত পনের আনা কেন, সাড়ে পনের আনা রচনাই কমবেশী বিষয়-নির্ভর। তবে নির্ভরতা যতো কম স্বাধীনতা যতো বেশী, শুদ্ধ প্রবন্ধের সম্ভাবনা ততো উজ্জ্বল। অনেকে এই ধরনের প্রবন্ধকে ‘ব্যক্তিগত প্রবন্ধ’ নাম দিয়ে থাকেন। প্রবন্ধের মধ্যে লেখকের ‘আমিত্ব’ যখন বড়ো বেশী সোচ্চার, তখন তাকে এই নাম অবশ্যই দেওয়া চলে। তবে আমিত্ব যখন আবহাওয়ার মতো প্রবন্ধকে ঘিরে থাকে, তার বেশী নিজেকে জাহির করে না, তখন এই বিশেষণের প্রয়োজন নেই।

উনিশ শতকের বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের ধারা অনুসরণ করলে আমরা শুদ্ধতা ও স্বাধীনতার দিকে একটা অনিশ্চিত যাত্রা দেখতে পাই। বেশীর ভাগ প্রবন্ধই, বিশেষতঃ প্রাথমিক পর্যায়ে, আত্মপরিচয়-সচেতন নয়। প্রবন্ধকার শুধু যে বিষয়কেই অবলম্বন করেছেন, তাই নয়, বিষয়ের বৈচিত্র্যও তাঁর চেতনায় ধরা দিচ্ছে না। প্রবন্ধকার যেন এক ছোট চেনা জগতের পরিচিত পথ ধরে চলতে অভ্যস্ত। অচেনা পথ অজানা জগৎ তাঁর নয়। প্রবন্ধ সাহিত্যের সীমানা, সম্ভাবনা, শর্তাবলী কিছুই তার জানা নেই। প্রথম দিক জানা না থাকলেও, অবিলম্বেই জানা হয়ে গেল। অন্যভাবে বলা যায়, প্রথম দিকে প্রবন্ধের সাহিত্যরূপ তাঁদের নাড়া দেয়নি, ঐ পথে ডাকেনি। বিদ্যাসাগরের মতো প-িত ব্যক্তি ইউরোপীয় ধারার প্রবন্ধের খবর জানতেন না, একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে ওদিকে তাঁর ও তাঁর মতো অনেকেরই মনোযোগ পড়েনি। মনোযোগ যাদের পড়ছিল— সঞ্জীবচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, তাঁরাই প্রথম এবং এই শতকেই ব্যক্তিকতার চিহ্ন আঁকা সরস সকৌতুক সামাজিক প্রবন্ধ রচনা করলেন। তাঁরা যে ধারার সূত্রপাত করলেন, বিংশ শতকে এসে তার বিপুল বিস্তার ঘটেছে। প্রবন্ধ নিশ্চিতভাবেই আত্মপরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রবন্ধের মধ্যে আমরা প্রায়শঃই প্রবন্ধকারের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। তবে সত্য কথা এই যে উনিশ শতকেই প্রবন্ধের এই পরিণতির সূচনা আমরা দেখতে পাই। এবং সৃষ্টিধর্মী লেখকেরা এই সূচনাপর্বের প্রথম কারিগর।

বিংশ শতকে এসে, প্রবন্ধের এই শিল্পিত রূপ আরও বিচিত্র বেশে দেখা দিয়েছে। উনিশ শতকীয় প্রবন্ধের একটি অতিরিক্ত মূল্য ও অতিরিক্ত আকর্ষণ এখানেই যে আমরা এর মধ্যে যুগপৎ ঐ শতকের মানস, ও বাংলা গদ্যের বিকাশ দেখতে পাই। আমাদের ঐতিহ্যের ধারা অনুসরণ করতে পারি। আমাদের পূর্বপুরুষের মনের খবর পাই। আমরা উপলব্ধি করতে পারি পূর্বপুরুষের সঙ্গে উত্তরপুরুষের সম্পর্ক কোথায়, এবং তফাৎ-ই বা কোথায়। পূর্বপুরুষেরা বাংলা গদ্যকে তৈরি অবস্থায় পাননি, এবং তাকে সবাই মিলে সযতেœ গড়েছিলেন। শক্ত কাঠামোর উপর তাঁরা এই ক্লাসিক্যাল গদ্যের পত্তন করেছিলেন।…

[বাংলা প্রবন্ধ পরিচয়, ভূমিকাংশ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, মাঘ ১৩৯২]

***************************************

রচনা-সাহিত্যের স্বরূপ-লক্ষণ
শশিভূষণ দাশগুপ্ত

প্রায় সকল জাতীয় সাহিত্যেরই গুণ-কর্ম-বিভাগ অনুয়ায়ী একটা আত্মাপরিচয় আছে; কিন্তু রচনা-সাহিত্য যেন একেবারে জাতিগোত্রহীন। বিতর্কাত্মক হইলেও কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস প্রভৃতির আমরা একটা লাক্ষণিক পরিচয় ঠিক করিয়া লইয়াছি, কিন্তু রচনা-সাহিত্য বলতে সাহিত্যের ‘মায় চ-ীপাঠ ইস্তক জুতাসেলাই’ কিছুই বাদ পড়ে না। গুরুগম্ভীর দার্শনিক তত্ত্বালোচনা, দুর্দান্ত ঐতিহাসিক গবেষণা, রাজনৈতিক মসীযুদ্ধ আর সমাজনৈতিক ঘোঁট, সাহিত্যিক বিতর্ক এবং সমালোচনা, আর গদ্যছন্দে লেখকের, আত্মপ্রকাশ, ইহাদের সকলকেই আমরা ‘রচনা-সাহিত্যের’ শ্রীক্ষেত্রে আনিয়া একেবারে এক করিয়া দিয়াছি। মোটের উপরে গল্প, উপন্যাস এবং নাটক ব্যতীত গদ্যরীতিতে আর যাহা কিছু লিখিত হয় তাহাই ‘রচনা-সাহিত্য’ নামে অভিহিত।

কিন্তু আমরা জানি, যাহা কিছু লেখা হয় তাহাই সাহিত্য নহে — সাহিত্য এক প্রকারের ‘বিশেষ লেখা’; সুতরাং যে সকল লেখার গুরু-গাম্ভীর্য এবং রাশভারিত্ব দেখিয়া আমরা সাগ্রহে এবং সসম্মানে তাহাদিগকে সাহিত্যের আসরে আভিজাত্যের উচ্চ আসন দেই, অনেক স্থলে তাহাদের উচ্চস্থান অনেকখানি অবিচারলদ্ধ। হাইকোর্টের বিচারপতির ধার এবং ভার দুই-ই আছে, কিন্তু শুধু সেই বিচারপতিত্বের ধার-ভার লইয়াই যদি তিনি তাঁহার প্রিয়জনদের নিকট প্রিয় হইবার দাবি পেশ করেন তবে আপত্তির সম্ভাবনা অনেক। সাহিত্য মুখ্যতঃ হৃদয়ের জগৎ, বুদ্ধির জগৎ নহে। সা¯প্রতিক প্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে নূতন শাণ-দেওয়া ঝকঝকে বুদ্ধি তাহার দন্তরুচি-কৌমুদী বিকাশপূর্বক মানষের হৃদয় নামক একটি ‘প্যানপেনে’ জিনিসের প্রতি যতই অবজ্ঞার ধূলি নিক্ষেপ করুক না কেন, মানুষের বুকের ভিতর হইতে হৃদয় জিনিসটিকে এখন পর্যন্তও তুলিয়া ফেলা সম্ভব হয় নাই; এবং বুদ্ধির চো-ঝলসানো হিরন্ময় রাশ্মিসমূহকে একটু সংহত করিতে পারিলেই দেখিতে পাইব, সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা আজিও হৃদয়ের ক্ষেত্রে।

ধার-ভারের কদর এবং আদর বুদ্ধির কাছে,—হৃদয় যাহা চায় তাহা যে কি তাহা স্পষ্ট করিয়া না বলিতে পারিলেও এইটুকু বলা যায়,—তাহা সংসারের এই ধার-ভারের অতিরিক্ত কিছু। বুদ্ধির গ্রহণ-প্রণালী এবং হৃদয়ের গ্রহণ-প্রণালীর ভিতরেও একটা তফাত আছে। বুদ্ধি যাহাকে গ্রহণ করে তাহা হইতে নিজেকে রাখে সে পৃথক করিয়া; কিন্তু হৃদয় যাহাকে গ্রহণ করে সেখানে গ্রাহ্য এবং গ্রাহকের ভিতর কোথাও নাই এতটুকু ব্যবধান,—যাহাকে পাইতে হইবে তাহার সাহিত সম্পূর্ণরূপে মিলিত হইয়া—তাহার সাহিত সর্বাংশে এক হইয়া হৃদয় তাহাকে গ্রহণ করে। বিষয়ের সহিত সৌন্দর্যে-প্রেমে একেবারে এক হইয়া যে গ্রহণ, তাহাই যথার্থ সাহিত্যের গ্রহণ।

রচনা-সাহিত্যের স্বরূপ আলোচনা প্রসঙ্গে এই সকল কথা বলিবার কারণ এই আমরা সাধারণতঃ উৎকৃষ্ট রচনা-সাহিত্য বলিয়া যে সকল লেখার সমাদর করি সেগুলি হয়ত উৎকৃষ্ট, কিন্তু সাহিত্য নয়। প্রতœতাত্ত্বিক অনুসব্ধিৎসা, দার্শনিক গবেষণা, বৈজ্ঞানিক আবিস্কার অতি মূল্যবান, সুতরাং শ্রদ্ধার বস্তু সন্দেহ নাই; কিন্তু আমাদের সমস্ত রকমের মূল্যবোধের ভিতরে শুধু যে একটা পরিমাণগত ভেদ নহে, একটা যে প্রকারগত ভেদও রহিয়াছে সেই কথাটা আমরা অনেক সময় ভুলিয়া যাই। এই ভুলের জন্যই আমরা প্রতœতাত্ত্বিক মূল্য দার্শনিক মূল্য বা বৈজ্ঞানিক মূল্য এবং সাহিত্যিক মূল্য যে একই জাতীয় মূল্য নয় এ সত্যটি সন্বন্ধেও সচেতন থাকি না। রচনা-সাহিত্যের ভিতরে আমরা সাধারণতঃ ভাল বলি সেইগুলিকে যেখানে কোন লেখা তত্ত্ব, তথ্য এবং যুক্তিতর্কের নিখুঁত সমাবেশে একেবারে জমজমাট হইয়া উঠিয়াছে। তত্ত্ব, তথ্য এবং যুক্তিতর্কের নিপুণ সমাবেশে একটা লেখা অতি মূল্যবান হইয়া উঠিতে পারে সন্দেহ নাই; কিন্তু সেই মূল্যের সহিত সাহিত্যের মূল্যের একটা আশমান-জমিন তফাত থাকিতে পারে।

আমাদের বাস্তব জীবনে দেখিতে পাই, আমাদের দৈহিক অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলি এবং আমাদের মানসিক বৃক্তিগুলির প্রত্যেকটির একটি একটি ভিন্ন ধর্ম রহিয়াছে; কিন্তু এই ধর্মবৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও তাহাদের সকলের ভিতর আবার একটু সূক্ষ্ম অন্বয়ও রহিয়াছে, যে অন্তর্নিহিত অন্বয়ের ফলে সকল দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং মানসিক বৃত্তিগুলি তাহাদের বিশিষ্ট ধর্মগুলি পালন করিয়া পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িতেছে না, বা পরস্পর বিরোধী হইয়া উঠিতেছে না; তাহাদের পরস্পরের ভিতরে এই গভীর অন্বয় আছে বলিয়াই সকলের কাজের ফলে আমাদের দেহ-মন একটা অখ- বিকাশের পথে ধাবিত হইতেছে। আমাদের স্থুল অঙ্গ এবং বৃত্তিগুলির ভিতরেই শুধু নহে—আমাদের সূক্ষ্ম অঙ্গ এবং বৃত্তিগুলির ভিতরেও রহিয়াছে এই জাতীয় একটা গভীর অন্বয়; আমাদের বৃদ্ধিবৃত্তি এবং হৃদয়বৃত্তি তাহাদের স্বাতন্ত্র্য এবং স্বগুণ রক্ষা করিয়াও তাই পরস্পরে গভীর ভাবে অন্বিত। আমাদের জীবনের সমগ্রতা জুড়িয়া যে ব্যাপক সংগঠনপদ্ধতি রহিয়াছে তাহার ভিতর হৃদয় এবং মস্তকের মধ্যে কোনও বিরোধ তো নাই-ই, তাহারা পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ। এইজন্যই সাহিত্যের ক্ষেত্রেও আমাদের বুদ্ধির উপাদান ও রসের উপাদানের ভিতরে আছে একটা গভীর অন্বয়। এই অন্বয়ের ফলেই আমরা কাগজে কলমে যেমন করিয়া আমাদের বিভিন্ন মূল্যবোধগুলির ভিতরে পার্থক্যের রেখা টানিতে পারি, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাহা কখনই পারি না। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আমাদের এই সকল মূল্যবোধ একে অন্যের সহিত অচ্ছেদ্যভাবে এবং অনেক সময় অলক্ষ্য-ভাবে তাল পাকাইয়া থাকে, —তাহাদের ভিতরে কোনও একটিকে চিনতে পারি সাধারণতঃ তাহাদের প্রাধান্য দেখিয়া। আমাদের সাহিত্যের আদালতে যত বিচার-বিভ্রাট ঘটি তাহার মূল কারণ এই মূল্যবোধের অসাবধান বিভ্রম। আদিযুগ হইতে আজ পর্যন্ত কামায়ন হইতে রসায়ন—সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই সকলেরই যে অবাধ প্রবেশাধিকার তাহার কারণও অনেকখানি ইহাই। কাম আমাদিগকে আনন্দ দেয়, জ্ঞান আমাদিগকে আনন্দ দেয় — সাহিত্যও আমাদিগকে আনন্দ দেয় — জীবনের বৃহত্তর পরিধিতে ইহাদের সকলেরই রহিয়াছে প্রয়োজন, তাই তাহাদের  প্রত্যেকেরই রহিয়াছে একটা বিশিষ্ট্য মূল্য; কিন্তু এই বিভিন্নজাতীয় আনন্দবোধ এবং মূল্যবোধের ভিতরে যে একটা প্রকারগত ভেদ রহিয়াছে তাহাকে আবিস্কার এবং অনুভব না করিতে পারিলে আমরা সাহিত্যের বিচারে কোনদিনই নির্ভূল হইতে পারিব না।

সুতরাং রচনা-সাহিত্যের স্বরূপ নির্ণয় করিতে গিয়া প্রথমে আমাদের দৃষ্টি ফিরাইতে হয় গোটাকয়েক গোড়ার কথার দিকে। ভাল রচনা-সাহিত্য কাহাকে বলে তাহা জানিতে গেলে প্রথমে স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে  হয় সাহিত্য কাহাকে বলে। আমার বিশ্বাস, রচনা-সাহিত্য কি তাহা যে আমরা স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে পারি না তাহার কারণ সাহিত্য কি তাহাই আমরা স্পষ্ট করিয়া বুঝি না। সাহিত্যের স্বরূপ লক্ষণ সম্বন্ধে একটা অষ্পষ্ট ধারণা লইয়া যে কারণে সাহিত্যের শ্রীক্ষেত্রে আমরা ‘বার-জাতের’ অবাধ মেলা বসাই সেই কারণেই রচনা-সাহিত্যের নামে কোন গদ্যলেখাকে যে না চালান যায় তাহাই  আমরা দিশা করিয়া উঠিতে পারি না।

এই প্রসঙ্গে আর একটি জিনিস লক্ষণীয়। আমাদের ভিতরে সাধারণতঃ একটা ধারণা দেয়া যায় যে, রচনাসাহিত্যের স্বরূপধর্ম এবং কাব্য-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতির স্বরূপ-ধর্মের ভিতরে একটা মৌলিক পার্থক্য রহিয়াছে। আমাদের এই ভুল ধারণার মূল কারণ, আমরা রচনা-সাহিত্যের সত্যকার সীমানাকে প্রায় কখনই নির্দিষ্ট করিয়া লই না; তাহার ফলে বহু অ-সাহিত্যও রচনা-সাহিত্যের নাম লইয়া রচনা-সাহিত্যেরই স্বরূপ-বৈলক্ষণ্য জন্মাইয়া থাকে। আসলে সাহিত্য হিসেবে রচনা-সাহিত্য কাব্য-কবিতা, উপন্যাস-নাটক প্রভৃতির ভিতরে কোথাও কোন মৌলিক পার্থক্য নাই। তাহাদের বিভিন্ন রূপের পশ্চাতে লুকাইয়া আছে একই স্বরূপ। সাহিত্যের স্বরূপ-লক্ষণের দিকে আমরা যদি দৃষ্টিপাত করি তবে দেখিতে পাইব, যে স্বরূপ-ধর্মের জন্য একটি ক্ষুদ্র গীতি-কবিতা সাহিত্যপদবাচ্য, মৌলিক  সেই ধর্মের জন্যই একখানি উপন্যাস বা নাটক সাহিত্যপদবাচ্য এবং সেই স্বরূপ-ধর্মের জন্য একটি ভাল গদ্য-রচনাও সাহিত্যপদবাচ্য। আকারগত পার্থক্যকেই আমরা সাধারণঃ স্বরূপগত ভেদ বলিয়া ভুল করি। গদ্য-সাহিত্য ও পদ্য-সাহিত্যের ভিতরে একটা মৌলিক পার্থক্য চিরাচরিতভাবে স্বীকৃতি হইয়া আসিতেছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কবি ও লেখক এ বিষয়ে তাঁহাদের আপত্তি জানাইয়া রাখিয়াছেন বটে, তথাপি মোটের উপর এ ভেদটিকে আমরা স্বীকার করিয়াই আসিতেছি। অবশ্য উপর উপর বিচার করলে এই জাতীয় একটি ভেদরেখাকে আমরা একেবারে অস্বীকার করিতে পারি না, কিন্তু সাহিত্যের অর্ন্তনিহিত স্বরূপ-লক্ষণের ভিতরে গভীরভাবে প্রবেশ করিলে এই ভেদরেখা একটু একটু করিয়া কখন যে মিলইয়া যায় তাহা বুঝিয়া ওঠা যায় না। আমরা ভবিষ্যতে যখন এ বিষয় লইয়া আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করিব তখন দেখিতে পাইব, সাহিত্যের ইতিহাস যত ক্রমাবর্তিত হইতেছে গদ্য-রচনা, ও পদ্য-রচনার ভিতরকার আমাদের এই কাল্পনিক ভেদরেখা ততই অষ্পষ্ট হইয়া মিলইয়া যাইতেছে। বর্তমান যুগে যত কাব্য-কবিতা রচিত হইতেছে এবং গদ্য-রচনা লেখা হইতেছে তাহাদিগকে পাশাপাশি রাখিয়া বিচার করিলে দেখিতে পাইব,—নদী আপনার সীমা অতিক্রম করিয়া শ্যামল মাঠের ভিতরে অনেকখানি ছাড়াইয়া পড়িয়াছে, আবার চড়ার রূপ ধারণ করিয়া শ্যামল মাঠ নদীর অনেকখানি জুড়িয়া বসিয়া আছে।

সেইজন্যই বলিতেছিলাম যে, যে-কোন আকারের সাহিত্যই কোন না কেন, তাহার স্বরূপ-ধর্ম আবিস্কার করিতে হইলে আগে সাহিত্যের স্বরূপ-ধর্ম সম্বন্ধেই সুষ্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। সাহিত্যের এই স্বরূপ-ধর্ম আবিস্কার করিতে গিয়া আমি এখানে বিতর্কাত্মক মতামতের মহাভারত সঙ্কলন করিত চাহি না। শুধু দুই-একটি মৌলিক কথারই আলোচনা করিতে  চাই।

সাহিত্যের স্বরূপ-লক্ষণ সম্বন্ধে আলোচনা করিতে গিয়া একদল প্রাচীন আলঙ্কারিক বলিয়াছেন যে, ধ্বনিই হইতেছে কাব্যের বা সাহিত্যের আত্মা।১ এই ধ্বনির স্বরূপ কি? সে আমাদের বক্তব্যকে সর্বদাই অতিক্রম করিয়া যাইতে  চায়। আমরা যাহা কিছু বলি — যাহা কিছু লিখি, তাহার মূখ্যার্থকে ধ্বনি শুধু অতিক্রম করিয়াই যায় না — আমাদের বক্তব্যকে সে গৌণ করিয়া দিয়া প্রধান করিয়া তোলে একটা অকথিত মাধুর্য এবং মহিমাকে। একটু নিবিষ্ট মনে চিন্তা করিলেই দেখিতে পাইব, আমাদের যাহা কিছু সাহিত্য-সৃষ্টি তাহার স্বরূপ-ধর্মই এই যে, সে আমাদের বাচ্যার্থকে সর্বদাই অতিক্রম করিয়া চলিয়া গিয়াছে অনেক দূরে — অনেক গভীরে। আমাদের সমস্ত বলার ভিতরে বলাগুলি যে কখন কোথায় পিছনে পড়িয়া রহিয়াছে — তাহার ভিতর দিয়া আভাসে-ইঙ্গিতে ফুটিয়া উঠিয়াছে কত না-বলা কথা। না-বলা যে কথাটা ধ্বনিতে হইয়া মুখ্য হইয়া দাঁড়ায়, তাহাই সাহিত্যের লক্ষ্য, বলা কথাগুলি যেন উপলক্ষ্য মাত্র।২

আমাদের রচনা-সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিলে দেখিতে পাইব, একটু গভীর এবং ব্যাপক অর্থে এই ধ্বনিই সত্যিকার রচনা-সাহিত্যের প্রাণবস্তু। আমাদের কোন লেখার ভিতরে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধান হইয়া উঠিবে কতগুলি তত্ত্ব বা তথ্য, আমাদের মন যতক্ষণ প্রধানভাবে আকৃষ্ট হইবে যে সকল যুক্তিতর্কের অবতারণা করা হইয়াছে তাহার নৈয়ায়িক যাথার্থ্য, সারবত্তা এবং সূক্ষ্মত্বের প্রতি, — ততক্ষণ পর্যন্ত তাহাকে আমরা খাঁটি রচনা-সাহিত্য বলিব না। সে লেখার ভিতরে আমরা লাভ করি যে সংবাদ, যে  জ্ঞান, চিন্তার যে প্রসারক্ষেত্র তাহা আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে বটে, কিন্তু আমাদের সাহিত্যিক মনের সেখানে গভীর তৃপ্তি নাই। এই সকল তত্ত্ব, তথ্য বা যুক্তিতর্ক যে কখনও সাহিত্যের সামগ্রী হইয়া উঠিতে পারে না এমন কথা বলা যায় না; তাহাদিগকে সাহিত্যের সামগ্রী হইয়া উঠিতে হইলে ত্হাাদিগকে নিজেদের একেবারে গৌণ করিয়া দিতে হইবে, — প্রধান করিয়া তুলিতে হইবে এই সকল তত্ত্ব, তথ্য, পা-িত্য-যুক্তিকের্কর অতিরিক্ত আর একটা জিনিসকে — তাহাদের ভিতরে বাচ্যার্থের অতিরিক্ত থাকিতে হইবে একটি ধ্বনি। জগতের শ্রেষ্ঠ রচনা-সাহিত্যের ইতিহাস খুঁজিয়া দেখিলে আমরা দেখিতে পাইব, শ্রেষ্ঠ রচনাকারগণের ভিতরে অনেক চিন্তাশীল মনীষী ছিলেন; কিন্তু এই চিন্তাশীল প-িত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ রচনাকারগণের মধ্যে তথাকথিত অপ-িতের সংখ্যাই ছিল বেশি। আর যে সকল প-িতগণের রচনা সাহিত্য হিসাবে শ্রেষ্ঠ বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছে, তাঁহাদের রচনার ভিতরে তাঁহাদের পা-িত্য বা চিন্তাশীলতাই প্রধান হইয়া ওঠে নাই,— প্রধান হইয়া উঠিয়াছে পা-িত্য এবং চিন্তাশীলতার অতিরিক্ত আর একটি জিনিস। একটি প্রতœতাত্ত্বিক রচনা, একটি দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক রচনা এবং একটি যথার্থ সাহিত্যিক রচনার ভিতরে আমরা সর্বদা এই পার্থক্য লক্ষ্য করিতে পারি যে, পূর্বোক্ত লেখক যাহা লেখেন তাঁহাদের লেখা সেই লেখার অতিরিক্ত আর কিছুই বলে না। প্রতœতাত্ত্বিক যদি দুর্গম পাহাড়ের গাত্র পরীক্ষা করিয়া, অথবা ভূপ্রোথিত প্রাচীন ভাগ্নাবশেষের আবিস্কার করিয়া অথবা হাজার হাজার বছরের কোনও দলিল-দস্তাবেজ খুঁজিয়া পাতিয়া কোনও নূতন তথ্যের সন্ধান  পাইয়া থাকেন, তবে তাঁহার লেখর ভিতরে এই সন্ধানের সুষ্ঠুতম পরিচয়ই  হইয়া উঠিবে প্রধান, — তদতিরিক্ত কিছু যদি তাঁহার লেখায় থাকে প্রতœতাত্ত্বিক রচনা হিসাবে তাহা গুণের না হইয়া দোষের হইয়া থাকে। ঐতিহাসিক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সকলের ক্ষেত্রেই একই এক কথা। তাঁহারা যে তথ্য বা তত্ত্বের পরিবেশন করেন সেইখানেই তাঁহাদের কাজ নিঃশেষে ফুরাইয়া যায়। কিন্তু সাহিত্যিকের ধর্ম শুধু এইটুকু নহে, তিনি যদি প্রতœতত্ত্ব ইতিহাস, দর্শন বা বিজ্ঞানকে অবলম্বন করিয়া কোন রচনা লেখেন, সেখানে বলার কথাকে তিনি জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে অনেকখানি ছাড়াইয়া গিয়াছেন এবং তিনি যতখানি ছাড়াইয়া যাইতে পারিয়াছেন সাহিত্য হিসাবে তাঁহার রচনা ততখানি সার্থক হইয়া উঠিয়াছে।

কিন্তু আমরা সাহিত্যের ভিতরে কথাবস্তু বা বিষয়বস্তু অতিরিক্ত যে একটি ধ্বনির কথা বলিলাম, সেই ধ্বনিরই বা স্বরূপ কি? সাহিত্যে লেখক বা কবি সর্বদা বাচ্যার্থকে ছাড়াইয়া যান কিসের আয়োজনে? সহজ কথায় বলিতে গেলে, এ আয়োজন আনন্দের আয়োজন, অলঙ্কারিকেরা যাহার নাম দিয়াছেন রস। আলঙ্কারিকেরা তাই বলিয়াছেন যে, রসধ্বনি হইল যর্থাথ ধ্বনি এবং এই রসধ্বনিই সাহিত্যেও আত্মা। অতিপুরাতন কথা হইলেও ঘুরিয়া ফিরিয়া সেই ‘রসাত্মকং বাক্যম্’ — এই সংজ্ঞাতে আসিয়াই পৌঁছিতে হয়। সাহিত্য সর্বদাই তাহার বক্তব্যকে ছাড়াইয়া যায় এই রসের পরিবেশনের জন্য। সাহিত্যে কথাবস্তু বা বিষয়বস্তুর তাই কোথাও কোন স্বতন্ত্র মাহাত্ম নাই, — তাহার সকল মাহাত্ম রস পর্যবসানতায়।

আমরা শুধু সাহিত্য নয়, আমাদের জগৎ এবং জীবনের দিকে ফিরিয়া তাকাইলেও এই সত্যকে আবিস্কার করিতে পারিব। কোন বস্তু বা ঘটনার রসসত্তা তাহার প্রাতিভাসিক বহিঃসত্তাকে সর্বদাই বহু দূরে ছাড়াইয়া যায়। যে বস্তু বা যে ঘটনা আমাদের মনের কাছে তাহার বাহিরের রূপটিকে লইয়াই প্রধান হইয়া উঠিতে চায় তাহাকে আমরা আদর করিয়া ডাকিয়া আনিয়া বহু কাজে লাগাই, কিন্তু তাহাকে লইয়া রসের কারবার চলে না, আর যে বস্তু বা ঘটনা আমাদের কাছে আসিয়া দেখা দেয়, তাহার রসমূর্তিতে একটু চাহিয়া দেখিলে দেখিতে পাইব তাহার বাহিরের রূপ তলাইয়া পড়িয়াছে কতদূরে —অনেকখানিই স্মৃতিমাত্র রূপে সে হয়ত অবস্থান করিতেছে যবনিকার অন্তরালে, নিজের বহিমূর্তিকে অপ্রধান করিয়া আড়ালে ঢাকিয়া রাখিয়া ভাবনার অনুরণনে সে দূরে দূরে ছাড়ইয়া দেয় অন্তরের সুগন্ধ।

রচনাকেও যথার্থ সাহিত্য হইতে হইলে তাহার ভিতরে চাই এই রসধ্বনি; অর্থাৎ সে তাহার বক্তব্যকে  অনেকখানি ছাড়াইয়া যাইবে এবং তাহা রসের আয়োজনে। এ জাতীয় রচনা দুর্লভ, সাহিত্যের ক্ষেত্রের সার্থক রচনা-সাহিত্যও তাই একান্ত দুর্লভ। সার্থক রচনা-সাহিত্যের বিরলতার অন্যান্য সব কারণের ভিতরে একটি সাধারণ কারণ এই যে, চিরাচরিত ভাবে আমরা সাহিত্য গদ্যের ব্যবহারক্ষেত্র অনেকখানি সীমাবদ্ধ করিয়া দিয়াছি। যেখানে বক্তব্যকেই বড় করিয়া তুলিবার প্রয়োজন সাধারণতঃ শুধু সেই সব ক্ষেত্রেই আমরা গদ্যের ব্যবহার করি ; বাচ্যাতিরিক্ত সৌন্দর্য-মাধুর্য প্রকাশের জন্য, বা এক কথায় রসপরিবেশনের জন্য আমরা সাধারণতঃ কাব্য-কবিতারই আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকি।গদ্যকে আমরা সাধারণতঃ একটা কাটাছাটা আপিসওয়ালা কেজো পুরুষের রূপ দিয়া লইয়াছি। কিন্তু ছন্দ না দিয়াও নিছক গদ্যেই যে নিছক কবিতাও রচনা করা যায় এ বিশ্বাস এবং অভ্যাসটি আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে অপেক্ষাকৃত আধুনিক। আমরা পূর্বেই আভাস দিয়াছি এবং পরে আরও বিশদভাবে দেখিতে পাইব যে একজন রচনাকারও মূলতঃ একজন কবি, এবং সত্যিকারের একটি সাহিত্যিক রচনা ব্যাপক অর্থে একটি গদ্য-কবিতা। আমাদের একটা সাধারণ ধারণা এই যে, সাহিত্য সৃষ্টির ভিতরে সবচেয়ে সহজ জিনিস এই রচনা-সাহিত্য ; কিন্তু শুনিলে হয়ত অনেকেরই অদ্ভুত লাগিবে যে রচনা সাহিত্য-সৃষ্টির ভিতরে সবচেয়ে কঠিন এবং সাহিত্যের ইতিহাসে এই জাতীয় সাহিত্যেরই নমুনা পাওয়া যায় সব চেয়ে কম।৩ আমাদের প্রচলিত বিশ্বাসের কারণ পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি, রচনা-সাহিত্যের সুষ্পষ্ট সংজ্ঞা এবং সঠিক ক্ষেত্র সন্বন্ধে আমরা কোনও দিনই অবহিত নই। বহু যুগ ধরিয়া রচনা-সাহিত্যের শিরোনামা লইয়া এত হরেক রকমের লেখা প্রচলিত রহিয়াছে যে, তাহার ভিতর হইতে সাহিত্য এবং অসাহিত্য ভাগ করিয়া লওয়া দায়। মোটের উপর সুবিশুদ্ধ ভাষার যুক্তিতর্ক সমন্বিত হইয়া যাহা প্রকাশিত হয় তাহার উপরেই আমরা অসতর্ক ভাবে রচনা-সাহিত্যের লেবেল আঁটিয়া দিয়া আসিতেছি।

আমি এখানে ‘রচনা’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করিয়াছি। ইংরেজিতে যাকে (ঊংংধু খরঃবৎধঃঁৎব) বলা হয়, সেই অর্থে আমি রচনা-সাহিত্য’ শব্দটির প্রয়োগ করিয়াছি। এই অর্থে আমরা বাঙলায় রচনা, প্রবন্ধ নিবন্ধ, সন্দর্ভ প্রভৃতি কতগুলি নাম তাহাদের নিজস্ব অর্থবৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করিয়া প্রয়োগ করিয়া থাকি। কিন্তু নাম ব্যবহারের এই অসতর্কতা আমাদের অনেক ভুল ধারণার মূলীভূত কারণ। পাশ্চাত্ত্য দার্শনিক বেকন আমাদের এই ভাষা ব্যবহারের শিথিলতাকে (ওফড়ষ ড়ভ ঃযব গধৎশবঃ) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তাঁহার মতে জগতের বহু দার্শনিক সিদ্ধান্তের ভ্রান্তির মূলে রহিয়াছে ভাষা প্রয়োগের ভুল। সুতরাং ইংরেজি ঊংংধু শব্দটির সমার্থক হিসাবে আমরা যে শব্দগুলির ব্যবহার করি তাহার সুস্পষ্ট অর্থ সম্বন্ধে একটু আলোচনা হওয়া দরকার।

আমরা ঊংংধু শব্দের অর্থে বাঙলায় যে শব্দটির খুব বেশী ব্যবহার করি সে শব্দটি হইতেছে প্রবন্ধ; কিন্তু ঊংংধু শব্দটি এবং প্রবন্ধ শব্দটি ঠিক সমার্থক নহে। প্রবন্ধ শব্দটি প্রকৃতি প্রত্যয়গত অর্থ হইতেছে ‘প্রকৃষ্ট বন্ধন’। কোনও একটি প্রকৃষ্ট বন্ধন যুক্ত রচনাকেই প্রবন্ধ বলা হইয়া থাকে। প্রবন্ধ পদ্য রচনাও হইতে পারে। এই প্রকৃষ্ট বন্ধন নানা প্রকারের হইতে পারে। ছন্দের বন্ধন হইতে পারে, সর্গ-অধ্যায়াদির বন্ধন হইতে পারে, বিষয়বস্তুর অঙ্গাঙ্গিসন্বন্ধস্বরূপ-বন্ধন হইতে পারে, বর্ণনার পারস্পর্য রূপ বন্ধন হইতে পারে — আবার বহুবাক্যাদির ভিতরকার যুক্তিতর্কেও নৈয়ায়িক অন্বয়রূপ বন্ধনও হইতে পারে। এইরূপ বিভিন্ন প্রকারের বন্ধনের দ্বারা সুসংবদ্ধ গদ্য পদ্য সমস্ত রচনাকেই সংস্কৃত আলঙ্কারিকগণ প্রবন্ধ আখ্যা প্রদান করিয়াছেন। এই অর্থে রামায়ণ, মহাভারত, মালতীমাধব, রতœাবলী প্রভৃতি সকল কাব্য-রচনাকেই প্রবন্ধ বলা হইতেছে।৪ বিভিন্ন প্রকারে গ্রথিত সাহিত্য যেমন প্রবন্ধ শব্দের দ্বারা উপলক্ষিত হইয়াছে, রচনা-বৈশিষ্ট্য বা গ্রন্থন-বৈশিষ্ট্যকেও প্রবন্ধ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। শব্দগত, অর্থগত, বর্ণনাগত, ঘটনা-সন্নিবেশগত যে যে বিশিষ্ট ধর্মের দ্বারা বিভিন্ন জাতীয় সাহিত্য উপলক্ষিত হয় সাধারণ ভাবে সেই সকল বিশিষ্ট ধর্মসমষ্টিকেই সেই সেই জাতীয় সাহিত্যের প্রবন্ধ বলা যাইতে পারে। যেমন নাটকের ভাষা-ব্যবহার, রীতি-ব্যবহার, তাহার পঞ্চসন্ধি-সমন্বিত গর্ভ-গর্ভাঙ্কে বিভক্ত গঠন-রীতি —তাহার সমগ্র আঙ্গিক প্রভৃতি লইয়া যে একটি রচনা-বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে, আমরা তাহারই নাম দিতে পারি নাট্য প্রবন্ধ। একখানি নাটকের ভিতরে তাহার ভাষা, ভাব, গঠন-রীতি, ঘটনা-সন্নিবেশ প্রভৃতি সকলের ভিতরেই থাকা চাই একটি সূক্ষ্ম সঙ্গতি, —এই অন্বয় বা সঙ্গতিকেই বলা যাইতে পারে প্রবন্ধৌচিত্য।৫ ‘বক্রোক্তি-জীবিত’ কার কুন্তক তাঁহার গ্রন্থের চতুর্থ উন্মেষে ‘প্রবন্ধ-বক্রতা’ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছেন। সেখানে তিনি বলিয়াছেন যে, ইতিহাসাদিতে বর্ণিত একই ঘটনা বা একই নায়ক-নায়িকা বিভিন্ন প্রবন্ধে প্রবন্ধৌচিত্যবশে এবং নব নব চারুত্ব এবং রস সস্পাদনের সৌকর্যার্থে কবি প্রতিভার দ্বারা বিভিন্নরূপে বর্ণিত হইয়া থাকে। এ সকল ক্ষেত্রে সুপ্রসিদ্ধ ইতিবৃত্তাদির যে রূপান্তর তাহা প্রবন্ধাদির দোষের কারণ হয় না, তাহার প্রবন্ধের বক্রতা বা বৈচিত্র্য জনিত চারুতাই বৃদ্ধি করে।৬

প্রবন্ধ রচনার ভিতরে তাহার প্রত্যেকটি উপাদান এবং অংশ পরস্পরের সহিত এমন ভাবে অন্বিত বলিয়া এবং এই সকল পৃথক পৃথক উপাদান এবং অংশ আবার সমগ্রকাব্যের সহিত অন্বিত বলিয়া সমগ্র প্রবন্ধটির কাছে তাহার সকল অংশ ও উপাদান আত্মসমর্পণ করে। সকল জুড়িয়া একটা বিশেষ প্রবাহ বা পরিণতিই প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য। এইজন্য প্রবন্ধের অন্তর্গত বিশেষ কোন অংশ যদি নীরসেও হয় তবে সেই অংশকে আমরা পৃথক ভাবে বিচার করিয়া অকাব্য বলিয়া বিবেচনা করি না; কারণ সে ক্ষেত্রে সমগ্র প্রবন্ধের রসের দ্বারাই সেও কাব্যপদবাচ্য হইয়া ওঠে।৭

একটু লক্ষ্য করিলে দেখিতে পাইব, প্রাচীন সংস্কৃত কাব্য-নাটকাদির এই প্রবন্ধ-লক্ষণের সহিত এরিস্টটল-বর্ণিত কাব্যনাটকাদির লক্ষণের বেশ মিল রহিয়াছে। তিনিও সমগ্র কাব্যের ভিতরে একটা দৃঢ় ঐক্য — প্রত্যেক অংশের পরস্পরের সহিত এবং সকল জুড়িয়া মূলের সহিত অন্বয় এবং মূল আখ্যান-বস্তু এবং মূল রসের ভিতরে সকল অংশের আত্মনিমজ্জনের কথা বলিয়া গিয়াছেন।

সাহিত্য-সৃষ্টির ভিতরে সর্বভাবে এবং সুষ্ঠুরূপে আন্বিত এইরূপ প্রবন্ধ দুর্লভ। রাজশেখর তাঁহার ‘কাব্য মীমাংসা’ গ্রন্থে বলিয়াছেন —

                মুক্তকে কবয়োহনন্তাঃ সঙ্ঘাতে কবয় ঃ শতম॥

                মহাপ্রবন্ধে তু কবিরেকো দ্বৌ দুর্লভাস্ত্রয়ঃ (১০অঃ)

অর্থাৎ মুক্তক বা ইতিবৃত্ত রচনায় কবি অনন্ত, সঙ্ঘাতে অর্থাৎ প্রবন্ধ রচনায় কবি শতাধিক পাওয়া যায় না; আর মহাপ্রবন্ধে কবি একটি দুইটিই পাওয়া যায়, তিনটি দুর্লভ। এই প্রসঙ্গে রাজশেখর আরও বলিয়াছেন যে ‘অনুজি¥তার্থ সম্বন্ধ’ ত্বই প্রবন্ধের প্রধান লক্ষণ। ‘অনুজি¥ত’ শব্দের অর্থ অপরিত্যক্ত ;  অর্থ-সম্বন্ধ কোনও রূপে পরিত্যক্ত বা ব্যাহত হয় নাই, এইরূপ রচনাকেই প্রবন্ধ বলা যাইতে পারে। রাজশেখর বলেন যে স্বেচ্ছামত রচিত সঙ্গতিরহিত অসমঞ্জস বাক্যসমূহকে প্রকীর্ণ বলা যাইতে পারে; কিন্তু অনুজি¥তার্থসম্বন্ধ প্রবন্ধ দুর্লভ। —

                বহ্বপি স্বেচ্ছায়া কামং প্রকীর্ণমভিধীয়তে।

                অনুজি¥তার্থসম্বন্ধো প্রবন্ধো দুরুদাহরঃ (১০ অধ্যায়)

রীতি সম্বন্ধে বিশেষরূপে চিন্তা করিয়া, গুণসমূহের কথা বিশেষভাবে গণনা করিয়া, শব্দার্থ সমূহে অবগাহন করিয়া এবং সুভাষিত মুদ্রার যথাযথ অনুসরণ করিয়াই নিবন্ধ বা প্রবন্ধ রচনায় প্রযতœ করা উচিত ; নতুবা এলোমেলো কতকগুলি রচনা দ্বারা প্রবন্ধ রচনা হয় না। এই জাতীয় রচনা যে খুব কষ্টকর তাহার প্রধান কারণ এই, সঙ্গতি বা অন্বয়রহিত বহু কথা বলিতে বা রচনা করিতে মানুষের কোন ক্লেশ নাই; কিন্তু অর্থবৎ অথচ বিচিত্র রকমের কথা সাধারণ মানুষের খুববেশী যোগায় না। আলঙ্কারিকগণ ‘মহাবাক্য’ শব্দটিকেও অনেক সময়ে প্রবন্ধ শব্দের সমর্থক হিসাবে ব্যবহার করিয়াছেন। পরস্পরে গভীর ভাবে অন্বিত বাক্য সমুচ্চয়কে ‘মহাবাক্য’ বলে। এই অর্থে সমগ্র মহাভারতখানিকে একটি ‘মহাবাক্য’; বলা যাইতে পারে।

সংস্কৃতে ‘প্রবন্ধ’ শব্দের ব্যবহার সাহিত্যের ক্ষেত্রে বন্ধ ছি না; অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার রহিয়াছে। তথ্য, যুক্তি ও সিদ্ধান্তের পরস্পর অন্বয়ের দ্বারা প্রকৃষ্টরূপ বদ্ধ লেখাকেও প্রবন্ধ বলা হইয়াছে। সাহিত্যের ক্ষেত্রেই হোক বা দর্শনাদির ক্ষেত্রেই হোক আমরা মোটের উপর দেখিতে পাই, কোন রচনার সকল অংশ ও উপাদান যখন কোনও একটা প্রকৃষ্ট বন্ধনের ভিতর দিয়া পরস্পর অন্বিত হইয়াছে এবং একটা সমগ্রতা লাভ করিয়াছে, তখনই তাহা প্রবন্ধ আখ্যা লাভ করিয়াছে। পূর্বেই আমরা দেখিয়াছি যে, খাঁটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বন্ধন বহু রকমের হইতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রে তথ্যের সহিত তথ্যের পরস্পর অন্বয় এবং পারস্পর্য যুক্তির সহিত যুক্তির অন্বয়  এবং পরস্পর্য — এবং তথ্য ও যুক্তির পরস্পর অন্বয় — এবং সকল জুড়িয়া শেষ পর্যন্ত একটি সুসঙ্গত সিদ্ধান্তে গমন — ইহাই প্রবন্ধের বিশিষ্ট লক্ষণ।

‘নিবন্ধ’ শব্দটি সাধারণতঃ সংস্কৃত অলঙ্কার-গ্রন্থে বন্ধনযুক্ত রচনা অর্থেই গ্রহণ করা হয়; এই সাধারণ অর্থে প্রবন্ধ এবং নিবন্ধ শব্দ দুইটি অনেকে ক্ষেত্রে সমার্থক রূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। ‘গীতশব্দরতœকরে’ নিবন্ধ শব্দের অর্থে বলা হইয়াছে — ‘নিতরাং বন্ধঃ তালরায়াদিসহিতবন্ধনং যত্র।’ গ্রন্থের বৃত্তি বা টীকাবিশেষ অর্থেও নিবন্ধ শব্দের ব্যবহার রহিয়াছে; বিশেষভাবে কোন কোন স্মৃতিগ্রন্থ সম্বন্ধীয় রচনা নামে খ্যাত।

‘সন্দর্ভ’ শব্দটি সমপূর্বক দৃভ ধাতু হইতে নিস্পন্ন। দৃভ ধাতুর অর্থ গ্রন্থন, রচনা, সংগ্রহ, পরস্পর অন্বিত করিয়া সাজান। সম্যকরূপে গ্রন্থন, রচনা বা গ্রহণ এই অর্থেই সন্দর্ভ শব্দটি সাধারণতঃ ব্যবহৃত হইয়া থাকে। শব্দের সহিত শব্দের, অর্থের সহিত অর্থের, এবং শব্দের সহিত অর্থের সাম্যক প্রকারে গ্রথিত হওয়াকেই সন্দর্ভ বলা যায়। এই অর্থে সন্দর্ভ শব্দ এবন্ধ ও নিবন্ধ শব্দের অনেকখানি সমার্থক। হেমচন্দ্র সন্দর্ভশব্দ সম্বন্ধে বলিয়াছেন, — ‘সন্দর্ভ’ রসনা গ্রস্ফঃ শ্রন্থনং সমাঃ।’ প্রবন্ধ ও নিবন্ধের ন্যায় পরস্পরের গূঢ়ান্বয়ই সন্দর্ভেরও বৈশিষ্ট। এইজন্যই অসঙ্গত বা অসমঞ্জস ক্রমরহিত বাক্য বা রচনাকে আমরা সন্দর্ভ-বিরুদ্ধ’ বাক্য বা রচনা বলি; অন্যদিকে নিয়মিত ক্রমযুক্ত পরস্পর অন্বিত বাক্য বা রচনাকে আমরা ‘সন্দর্ভ-শুদ্ধ’ বাক্য বা রচনা বলি। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও দর্শন সম্বন্ধে জীব গোস্বামীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ষটসন্দর্ভ’ নামে খ্যাত। গ্রন্থরম্ভে জীব গোস্বামী বলিয়াছেন যে, এই সম্বন্ধে প্রাচীন একখানি গ্রন্থ ক্রান্তব্যুৎক্রান্তখ-িত হইয়াছিল; তাহারই পর্যায় বিশেষরূপে আলোচনা করিয়া তিনি এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন— এই ক্রমযুক্ত সুসংবদ্ধ রচনাকেই তিনি সন্দর্ভ আখ্যা প্রদান করিয়াছেন।৮  এই প্রসঙ্গে টীকাকার বলদেব বিদ্যাভূষণ বলিয়াছেন :

                গূঢ়র্থশ্য প্রকাশশ্চ সরোক্তিঃ শ্রেষ্ঠত তথা

                নানার্থবত্ত্বং বেদ্যত্বং সন্দর্ভঃ কথ্যতে বুধৈঃ

গূঢ়ার্থের প্রকাশ, সরোক্তি, শ্রেষ্ঠতা, নানার্থবত্ত্ব এবং বেদ্যত্ব — এই সকল লক্ষণ যুক্ত রচনা প-িতগণ কর্তৃক সন্দর্ভ বলিয়া কথিত হয়। গূঢ়ার্থ অর্থে সন্দর্ভ শব্দের ব্যবহার ‘চৈতন্য-ভাগবতে’ও পাওয়া যায় :

                সঘনে ঢুলায় শির নাঢ়া নাঢ়া বোলে।

                নাঢ়ার সন্দর্ভ কেহ না বুঝে সকলে।

                আবার—দ্বার দিয়া কীর্ত্তনের সন্দর্ভ জানিল।৯

‘রচনা’ শব্দটি সাধারণতঃ নির্মাণ সৃষ্টি গঠন, গ্রন্থন, গুষ্ফন, ভূষণ, স্থাপন, সন্নিবেশ, বিন্যাস প্রভৃতি অর্থে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। গদ্য-পদ্যময় যে কোনও সাহিত্যিক সৃষ্টিকে রচনা বলা যাইতে পারে। ‘অলঙ্কার-কৌস্তুভে’ কবি কর্ণপুর বলিয়াছেন — ‘অসাধারণ চমৎকারকারিণী রচনা হি নির্মিতিঃ।’ —অর্থাৎ আসাধারণ চমৎকারকারিণী রচনাই নির্মিতি। আলঙ্কারিক গ্রন্থে সাধারণ কাব্য-নির্মাণ অর্থেই রচনা শব্দের ব্যবহার বহুলভাবে পাওয়া গেলেও রচনা শব্দটির একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহারও পাওয়া যায়। শব্দের সুষ্ঠু বিন্যাসকেই অনেক স্থলে রচনা  শব্দের দ্বারা বোঝান হইয়াছে। শব্দবিন্যাস বা শব্দগ্রন্থন-পরিপাট্য, পদযোজনা, রীতি প্রভৃতি বিশেষ অর্থেও রচনা শব্দের যথেষ্ট ব্যবহার পাওয়া যায়।

পূর্বেই বলিয়াছি আমরা গদ্যময় সাহিত্যিক লেখা বুঝাইতে খুব ব্যাপকভাবে বাঙলায় প্রবন্ধ, নিবন্ধ সন্দর্ভ এবং রচনা শব্দ প্রায় সমার্থকরূপেই ব্যবহার করিয়া থাকি। ইহার ভিতরে সাহিত্যিক মহলে ‘প্রবন্ধ’ এবং শিক্ষার্থী মহলে ‘রচনা’ শব্দটির ব্যবহার বেশী। হিন্দীতে এই অর্থে ‘প্রবন্ধ’ এবং ‘সন্দর্ভ’ শব্দের ব্যবহার থাকিলেও ‘নিবন্ধ’ এবং লেখা কথা দুইটির ব্যবহার বেশী প্রচলিত।

ওড়িয়ায় ‘প্রবন্ধ’ এবং আসামীয়াতে ‘রচনা’ শব্দের অধিক প্রচলন দৃষ্ট হয়। প্রবন্ধজাতীয় লেখা বাঙলা-সাহিত্যে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম হইতে আরম্ভ হইয়াছে; উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই জাতীয় লেখা বুঝাইতে ‘প্রবন্ধ’ শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায় না। প্রথমে এই জাতীয় লেখা বুঝাইতে ‘প্রস্তাব’ শব্দটির খুব প্রচলন ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ হইতে প্রবন্ধ কথাটির বহুল প্রচার আরম্ভ হয়। রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রভৃতি সে যুগের লেখকগণ নিজেদের ছোট বড় সকল লেখকেই ‘প্রস্তাব’ নামে অভিহিত করতেন। অক্ষয় দত্তের ‘চারুপাঠে’ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রচনাগুলিকেও লেখক ক্ষুদ্র প্রস্তাব নামে অভিহিত করিয়াছেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায় প্রবন্ধ কথাটির ব্যবহার করিলেও ‘প্রস্তাব’ কথাটিরও ব্যবহার করিয়াছেন ; বঙ্কিমচন্দ্রও প্রবন্ধ এবং প্রস্তাব দুইটি শব্দই ব্যবহার করিয়াছেন।

মধ্যযুগের বাঙলায় কোনও এক প্রকারের প্রকৃষ্ট বন্ধন এই অর্থে প্রবন্ধ শব্দটি ব্যবহার কাব্য-কবিতার ক্ষেত্রে বহু পাওয়া যায়। যেমন ‘পয়ায়-প্রবন্ধ’, ‘লাচারী-প্রবন্ধ’, ‘পাঁচালী-প্রবন্ধ’ প্রভৃতি। এখানে বিশেষ ছন্দোব্যবহার এবং কাব্যরচনার ঢঙ এই অর্থে প্রবন্ধ শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলায় প্রবন্ধ শব্দটির ব্যবহার সাহিত্যের কলা-কৌশল বা রচনা-কৌশল, বা কাব্যরচনার নানাবিধ প্রকার বুঝাইতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, — সাধারণ ভাবে কোনও কাজের ছাঁদ, প্রকার, উপায়, কৌশল, চেষ্টা, আরম্ভ প্রভৃতি বুঝাইতেও প্রবন্ধ শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায়।১০ উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রবন্ধ শব্দটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটা যোগরূঢ় অর্থে ব্যবহৃত হইতে লাগিল। ইহার ব্যবহার গদ্যের ক্ষেত্রে সঙ্কুচিত হইল। তথ্যের অম্বয় এবং যুক্তিতর্কের ক্রমসংবদ্ধতার ভিতর দিয়া যে সকল গদ্য লেখা একটা প্রকৃষ্ট বন্ধন লাভ করিল তাহাকেই আমরা নাম দিলাম প্রবন্ধ। ইংরেজিতে যে জাতীয় লেখাকে ঞৎবধঃরংব, উরংপড়ঁৎংব বা উরংংবৎঃধঃরড়হ বলে আমাদের উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের প্রস্থাব বা প্রবন্ধ তাহাই।

আমরা প্রবন্ধ শব্দের অর্থ ও ব্যবহার লইয়া যত আলোচনা করিয়াছি তাহার সকলের ভিতরেই এই একটি মূল লক্ষণ পাইয়াছি যে, তাহার সকল উপাদান ও অংশ পরস্পর অদ্ধিত এবং ক্রমবদ্ধ এবং তাহারার সমস্ত জুড়িয়া একটি রসের পরিণতি বা নৈয়ায়িক চিন্তাপ্রসূত সিদ্ধান্তের পরিণতি লাভ করে। আমাদের বাঙলা প্রবন্ধ-সাহিত্যে রসের পরিণতি অপ্রধান, — সিদ্ধান্তের পরিণতিই মুখ্যবস্তু। সকল প্রবন্ধের ক্ষেত্রেই ছোট বড় হোক আমাদের একটি প্রতিপাদ্য থাকে। তথ্যপ্রমাণের যথাযথ সমাবেশে, ভাবে ভাষায়, চিন্তার প্রাখর্যে, সমন্বয়ে এবং  পরিচ্ছন্নতায় সেই প্রতিপাদ্যকে প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। এই প্রতিপাদ্য বস্তু প্রতœতাত্ত্বিক হইতে পারে, ঐতিহাসিক হইতে পারে, ভৌগলিক হইতে পারে, ধর্ম, রাষ্ট্র, সমাজ, সাহিত্য প্রভৃতি কিছু হইতেই তাহার বাধা নাই। হৃদয়গ্রাহী ভাষা ও রীতিতে যিনি তাঁহার প্রতিপাদ্যকে যতখানি সুস্পষ্টরূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিবেন তিনিই তত বড় প্রবন্ধ লেখক। প্রবন্ধের শ্রেষ্ঠত্ব নিকৃষ্টত্ব বিচারে রসধ্বনির প্রশ্ন একান্তই গৌণ, অনেক স্থলে সেটা প্রবন্ধের দৌর্বল্যরূপেই স্বীকৃত ; বুদ্ধিলভ্য সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্থানে-অস্থানে হৃদয়ের প্রবেশাধিকার দিয়া বক্তব্যকে দুর্বল করিয়া কিছুই লাভ নাই। এই সকল কারণেই আমাদের প্রবন্ধ সাহিত্য বলিতে ‘মায় চ-ীপাঠ ইস্তক জুতা সেলাই’ কিছুই বাদ পড়ে নাই, এবং এই জন্যই পূর্বেই বলিয়াছি যে প্রবন্ধ সাহিত্য বলিয়া আমরা আমাদের সাহিত্যে যাহাদের বিশিষ্ট স্থান দেই. তাহা হয়ত অনেক ক্ষেত্রেই উৎকৃষ্ট বটে, কিন্তু সাহিত্যে নহে।

পূর্বেই বলিয়াছি, নিবন্ধ ও সন্দর্ভ কথা দুইটি আমাদের আধুনিক বাঙলায় পূর্বব্যাখ্যাত প্রবন্ধ শব্দেরই সমার্থকরূপে ব্যবহৃত হয়। তবে সন্দর্ভ কথাটির ‘সংগ্রহ’ অর্থে ব্যবহার আমাদের সাহিত্যে রহিয়াছে, — যেমন, ‘সাহিত্য-সন্দর্ভ’ রচনা-সন্দর্ভ প্রভৃতি। ‘নিবন্ধ’ শব্দটিকে আমরা দীর্ঘ প্রস্তাব বা দীর্ঘ প্রবন্ধ অর্থেই ব্যবহার করি। ভবিষ্যতে আমরা আমাদের আলোচনায় এই অর্থেই শব্দটিকে ব্যবহার করিব।

রচনা শব্দটি আমাদের বাঙলায় সংস্কৃতের ন্যায়ই এখনও ব্যাপক অর্থেই ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে। মাল্য-রচনা, ভূষণ-রচনা, শয্যা-রচনা, হইতে কবিতা, উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ রচনা আমাদেরই সবই চলে। কিন্তু রচনা শব্দটির  এই ব্যাপক প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে রচনা শব্দটিরও একটি যোগরূঢ় অর্থ নির্দিষ্ট হইল। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ হইতে ভাষার পরিপাট্যে, ভাবের গাম্ভীর্যে এবং সঙ্গতিতে এবং চিন্তার পরিচ্ছন্নতায় সাজাইয়া গুছাইয়া যে সব গদ্য লেখা হইত বিশেষ করিয়া তাহাদিহকেই আমরা রচনা নাম দিতাম। পূর্বেই বলিয়াছি ইংরেজি (ঊংংধু) শব্দের প্রতিশব্দ রূপে স্কুলপাঠ্য পুস্তকে এবং শিক্ষার্থিম-লেই এই শব্দটির ব্যবহার বেশী। বাংলায় ইংরেজি (ঊংংধু)  শব্দের প্রতিশব্দরূপে যে কয়েকটি শব্দ প্রচলিত আছে তাহার ভিতরে রচনা শব্দের প্রয়োগই আমরা সৃষ্ঠুতম বলিয়া বিবেচনা করি। এইজন্যই আমরা আমাদের আলোচনায় ইচ্ছাপূর্বক রচনা কথাটি ব্যবহার করিতেছি। পূর্বেই বলিয়াছি যে, নাটক, গল্প, উপন্যাস ব্যতীত সকল গদ্য লেখাই সাহিত্য নহে, — সাহিত্য একরূপ বিশেষ লেখা — সেই বিশেষত্বম-িত গদ্য লেখাকেই রচনা নাম দেয়া যাইতে পারে। আমাদের রচনা শব্দটিকে বাছিয়া লইবার কারণ এই, — সাহিত্য — সে যে প্রকারেরই হোক না কেন — একটা সৃষ্টি বা নির্মিতি ; কোন সৃষ্ট ব্যাপার না হইলে কোন লেখাই কখনও সাত্যি পদবাচ্য হইতে পারে না। রচনা শব্দটির ভিতরে একটা সৃষ্টির কথা অনুস্যূত হইয়া আছে ; রচনা বলিয়া সাহিত্যের শ্রেণিটির ভিতরেও যে একটা অসাধারণ চমৎকারিণী নির্মিতি রহিয়াছে, ঐ শব্দটির ভিতরেই তাহার বেশ একটা ইঙ্গিত আছে। এখানেই আমরা প্রবন্ধ-সাহিত্য এবং রচনা-সাহিত্যের ভিতরে একটা ভেদরেখা টানিতে চাই। প্রবন্ধ সাহিত্যিক সৃষ্টি নহে, রচনা সাহিত্যিক সৃষ্টি। ইংরেজি ঊংংধু এবং ঞৎবধঃরংব, উরংপড়ঁৎংব উরংংবৎঃধঃরড়হ শব্দের ভিতরে যে তফাত রচনা এবং প্রবন্ধের ভিতরে আমরা সেই তফাত কল্পনা করিতে পারি। অবশ্য আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, প্রবন্ধ এবং রচনা আমাদের সাহিত্যে প্রায় সমার্থকশব্দরূপেই প্রচলিত, সুতরাং তাহাদের ভিতরে যে পার্থক্যের কথা এখানে বালিতেছি তাহা ঐতিহাসিক নহে, — তাহা অনেকখানিই অর্থগত। তবে এই অর্থগত ভেদকে অবলম্বন করিয়া আমরা প্রবন্ধ এবং রচনার ভিতরকার এই প্রভেদকে যদি এখন হইতে মানিয়া লই, তাহা হইলে একটি সাহিত্যিক শ্রেণি হিসাবে রচনা-সাহিত্যের সংজ্ঞা এবং পরিধি আমাদের নিকট সুষ্টষ্ট হইয়া উঠিতে পারে।

বাঙলা রচনা-সাহিত্যের জন্ম ও পরিপুষ্টি উনবিংশ শতাব্দীতে; আর আমাদের উনবিংশ শতাব্দীর বাঙলা সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল অনেকখানি ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে। সুতরাং আমাদের রচনা-সাহিত্যের আলোচনায় ইংরেজি রচনা-সাহিত্যের সহিত ঘনিষ্ঠ যোগ রক্ষা করিয়া চলা উচিত।

ইংরেজি সাহিত্যে ঊংংধু শব্দটি সাহিত্যিক রচনা অর্থেই ব্যবহৃত হইলেও এবং ঊংংধু ও ঞৎবধঃরংব বা উরংপড়ঁৎংব এর  ভিতরে একটা তফাত  করা হইলেও ঊংংধু শব্দটিও ইংরেজিতে অতি ব্যাপকভাবে এবং অসাবধানে ব্যবহৃত হইতে দেখা যায়। ল্যাম্বের রচনাকেও ঊংংধু বলা হয়, বেকনের রচনাকেও ঊংংধু বলা হয়, — আবার লকের দার্শনিক তথ্য ও যুক্তিতর্কসমন্বিত সুদীর্ঘ গ্রন্থকেও ঊংংধু ড়হ ঐঁসধহ টহফবৎংঃধহফরহম বলা হয়। খাঁটি সাহিত্যিক অর্থে, একটি বিশেষ জাতীয় সাহিত্য রচনা অর্থে, ঊংংধু শব্দটির ব্যবহার প্রথম দেখা যায় ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে ফরাসী লেখক মনটেইনের (গড়হঃধরমহব) লেখায়। ঊংংধু শব্দটির মূলতঃ একটি ফরাসী শব্দ; ফরাসী হইতেই ইহার সাধারণ ঞৎরধষ বা পরীক্ষা অর্থে এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ অর্থে গ্রহণ করা হইয়াছে। ১৫৮০ খ্রীস্টাব্দে মনটেইনের ঊংংধরবং প্রকাশিত হয়। এখানে মনটেইন ঊংংধু শব্দটিকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটা নূতন জাতীয় সাহিত্য-সৃষ্টির চেষ্টা (অঃঃবসঢ়ঃ) বা এই ক্ষেত্রে একটা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ (ঊীঢ়বৎরসবহঃ) এই অর্থে ব্যবহার করিয়াছেন। সাহিত্যের একটি জাতি অর্থে ঊংংধু শব্দটি স্কটল্যা-ের ষষ্ট জেমসই (ঔধসবং ঠ১) প্রথমে ইংরেজিতে ব্যবহার করেন;  বেকনই এই শব্দটিকে একটি বিশেষ জাতীয় সাহিত্যিক রচনা অর্থে গ্রহণ এবং প্রচলন করেন এবং মানটেইনের আদর্শে তিনিই সর্বপ্রথম ইংরেজিতে রচনাসাহিত্যের স্রষ্টা। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম হইতেই ঊংংধু শব্দটি তাহার সাধারণ এবং বিশেষ অর্থে ইংরেজি অভিধানগুলিতে গৃহীত হইয়াছে।১১

মন্টেইন যে জাতীয় সাহিত্যিক রচনাকে তাঁহার স্বাভবিক বিনয়বশত শুধুমাত্র একটা সাহিত্যিক প্রচেষ্টা বা পরীক্ষা আখ্যা দিয়াছিলেন, কিছুদিনের ভিতরেই সেই জাতীয় রচনা একটি বিশেষ জাতীয় সাহিত্যিক সৃষ্টি বলিয়া স্বীকৃত হইল, এবং ইহারও যে একটা স্বতন্ত্র স্বরূপধর্ম রহিয়াছে তাহা সাহিত্যিকগণে দৃষ্টি এড়াইল না। পূর্বেই বলিয়াছি যে রচনা-সাহিত্যের ভিতরে এবং কাব্য-কবিতা, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতির ভিতরে কোন বিজাতীয় ভেদ নাই; তবে সজাতীয় ভেদ অবশ্যই রহিয়াছে। এই সজাতীয় ভেদের ভিতর দিয়াই বিভিন্ন জাতীয় সাহিত্যিক সৃষ্টির ভিতরে একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য জাগিয়াছে। এখন আমরা রচনা-সাহিত্যের এই বিশিষ্ট ধর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করিব।

‘রচনা’ শব্দটি সম্বন্ধে আলোচনার সময়েই বলা হইয়াছে যে রচনা-সাহিত্যের একটি মৌলিক লক্ষণ এই, ইহা একটি সাহিত্যিক সৃষ্টি এবং এই জন্যই এই জাতীয় লেখার ‘রচনা’ নামটিই উপযুক্ততম নাম। সাধারণ সাহিত্য হিসাবে রচনা-সাহিত্যও তাহার বাচ্যার্থকে সর্বদাই ছাড়াইয়া যায় একটা রসের প্রয়োজনে। এই সাহিত্যের রস সর্বদাই একটা সৃষ্টি প্রসূত রস। জ্ঞান-আহরণে আমাদের আত্মপ্রসাদ সুতরাং আনন্দ রহিয়াছে; আমাদের চিন্তা-শক্তির আলোড়নজনিত আমাদের একটা আনন্দ রহিয়াছে; কিন্তু এই সকল আনন্দ হইতে সাহিত্যের রসের একটা পার্থক্য এইখানে করা যায় যে, আমাদের সাহিত্যের আনন্দ সাহিত্য-স্রষ্টার পক্ষে একটা নিজস্ব সৃষ্টির আনন্দ এবং পাঠকের পক্ষে ইহা একটা সৃষ্টির ভিতর হইতে অমৃতের নির্যাস। এই জন্য প্রচীন আলঙ্কারিকেরা কবিকে বা সাহিত্যিককে প্রজাপতি  এই আখ্যা দান করিয়াছেন :

                অপারে কাব্যসংসারে কবিরেব প্রজাপতি

আদিকবি প্রজাপতি ব্রহ্মা এই সৃষ্টির কাব্যখানি রচনা করিয়াছিলেন। সেই বিরাট কাব্যের এখান হইতে সেখান হইতে টুকরা টুকরা গ্রহণ করিয়া কবিরূপ দ্বিতীয় প্রজাপতি ব্রহ্মা তাঁহার কাব্যে বিশ্ব সৃষ্টিকে আবার নূতন করিয়া গড়িয়া লন। প্রত্যেক কবি বা সাহিত্যিকেরই বিশ্বসৃষ্টিকে দেখিবার জন্য একটি বিশেষ চোখ এবং গ্রহণ করিবার জন্য একটি বিশেষ মন আছে। এই বিশেষ চোখ ও মনের সমাবেশে তাহার ভিতরে গড়িয়া ওঠে একটি বিশেষ রুচি; সাহিত্যিকের সেই রুচি অনুসারে বিশ্বসৃষ্টি পরিবর্তিত হইয়া  একটি বিশেষ রূপান্তর গ্রহণ করে। এই রূপান্তরিত জগৎকেই সাহিত্যিক তাঁহার প্রতিভাবলে সৃষ্টি করিয়া লন তাহার সাহিত্য— এইজন্য তাঁহার সৃষ্টি বিশ্বসৃষ্টি হইতে হইয়া ওঠে নূতন। ‘কাব্যপ্রকাশ’কার মম্মট ভট্ট ‘প্রজাপতি ব্রহ্মা’ হইতে ‘কবি প্রজাপতি’র একটি বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করিয়াছেন। ‘প্রজাপতি ব্রহ্মার সকল সৃষ্টি নিয়তিকৃত নিয়মের দ্বারা সর্বদা পরিচালিত, কিন্ত ‘কবি প্রজাপতির যে ‘হলাদৈকময়ী’ ‘নবরসরুচিরা’ নির্মিতি তাহা ‘নিয়তিকৃতনিয়মরহিতা’ এবং ‘অনন্যপরতন্ত্রা’।১২

রচনা-সাহিত্যকে প্রথমে বাহির হইতে যতই এলোমেলো মনে হোক না কেন,— মূলতঃ তাহার ভিতরেও আমরা দেখিতে পাই জগতের প্রতি এবং জীবনের প্রতি একটি বিশেষ দৃষ্টি এবং তাহারই ফলে সেও হইয়া ওঠে এক জাতীয় সৃষ্টি। এই সৃষ্টি-লক্ষণটি বর্তমান থাকিলে এবং বাচ্যাতিরিক্ত একটা রস পরিবেশনের চেষ্টা থাকিলে যে কোন বিষয়বন্তু লইয়াই রচনা সাহিত্য গড়িয়া উঠিতে পারে। একটি ঐতিহাসিক লেখার ভিতর দিয়া যদি সন তারিখগুলিই পাগড়িওয়ালা বল্লমধারীর ন্যায় সজোরে মাথা নাড়া দিয়া ওঠে, তবে তাহাকে ইতিহাসের খেতাবই দিব, সাহিত্য বলিব না; কিন্তু সেখানে ইে সকল সন তারিখ এবং তৎকালে অনুষ্ঠিত ঘটনা, সেই ঘটনায় বিজড়িত দেশ কাল পাত্র প্রভৃতি সমগ্র উপাদানকে গ্রহণ করিয়া কোন ইতিহাসের ঘটনাকেই আবার অনেকখানি নূতন করিয়া সৃষ্টি করিয়া জ্ঞান-বৃদ্ধির চেষ্টা অপেক্ষা রসপরিবেশনের চেষ্টাকেই বড় করিয়া তোলা হয়, তখন তাহাকে রচনা-সাহিত্য আখ্যা দিতে আমাদের কোনও আপত্তি নই। এইরূপে কোনও লেখা রাজনীতি, সামাজনীতি বা ধর্মনীতি সম্বলিতই হোক অথবা দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক প্রভৃতি কোন গুরু বিষয়কে লইয়াই হোক — অথবা আকাশসঞ্চয়ী পাখীর ন্যায় কল্পনার  লঘুপক্ষে-ভরকারী কতকগুলি একান্ত অলস মুহূর্ত লইয়াই হোক — সব জিনিসই রচনা-সাহিত্য হইয়া উঠিতে পারে, যদি সে নুতন সৃষ্টির ভিতর দিয়া পাঠকের মনে একটা রসের অনুভুতি জাগাইয়া তুলিতে পারে। পূর্বেই বলিয়াছি, এই সৃজন ও আনন্দ পরিবেশন ব্যতীত সকল লেখাই প্রবন্ধ হইয়া যায়, রচনা হইয়া ওঠে না। সাহিত্যের সমালোচনাও সাধারণতঃ এই প্রবন্ধেরই অন্তর্গত; কিন্তু যিনি সত্যিকারের সাহিত্যিক তিনি সাহিত্যিক সমালোচনার নামে শুধু তথ্য এবং তত্ত্ব পরিবেশন করিয়া কিছুতেই সুখী হইতে পারে না। তাঁহার অন্তর্নিহিত সৃজনী-প্রতিভা তাঁহার তথ্যের ও তত্ত্বের ভিতরে নূতন রক্তমাংসের জোগান দিয়া তাহাতে নূতন প্রাণের সঞ্চার করে; সাহিত্যিক সমালোচনাও তখন হইয়া ওঠে সাহিত্যিক সৃষ্টি, — সেই জাতীয় সাহিত্যিক সমালোচনাকেই শুধু আমরা রচনা সাহিত্য বলিয়া স্বীকার করিয়া লইতে পারি।

রচনা-সাহিত্যের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট ইহার ভিতরকার ব্যক্তি-প্রাধান্য। সাহিত্যের ইতিহাসে রচনা-সাহিত্যের আর্বিভাব অনেক পরবর্তী কালে এবং ইহার স্ফুরণ আরও পরবর্তী কালে। আমাদের বাঙলা-সাহিত্যে ত সত্যকারের রচনা-সাহিত্যের যুগ উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ হইতে আরম্ভ। সুতরাং আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে রচনা-সাহিত্য একেবারেই আধুনিক, এবং এই করণেই ইহার ভিতরে আধুনিক সাহিত্যের লক্ষণগুলির সম্যক স্ফুরণই অত্যন্ত স্বাভাবিক।

আধুনিক সাহিত্যের একটা সব চেয়ে বড় কথা ব্যক্তিবাদের প্রাধান্য। আধুনিক যুগটা শুধু ব্যক্তি-স্বাধীনতার যুগ নহে, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠার যুগ। সাহিত্যের আদিযুগ এবং মধ্যযুগ কাটিয়া গিয়া কবে হইতে আধুনিক যুগ আরম্ভ হইয়াছে তাহার খোঁজ লইতে গেলে আমরা দেখিতে পাইব, যেদিন হইতে সাহিত্য সৃষ্টি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সাহিত্য-সৃষ্টার ব্যক্তি পুরুষেরই প্রকাশরূপে দেখা দিতে লগিল, সেই দিন হইতেই আধুনিক যুগ-পত্তন। আজকালকার কাব্য-কবিতাই যে শুধু ব্যক্তিবাদের উপরে প্রতিষ্ঠিত তাহা নহে, ব্যক্তিবাদই আজকালকার সব জাতীয় সাহিত্য-সৃষ্টির প্রধান সুর। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা নাটককেই সর্বাপেক্ষা অধিক বস্তুনিষ্ঠ বলিয়া এতদিন জানিতাম,— কিন্তু সেই নটকও এখন অনেকখানি প্রত্যক্ষভাবেই বহির্ঘটনা ও চরিত্রে রূপায়িত নাট্যকারের ব্যক্তিসত্তারই স্পন্দন-রূপ গ্রহণ  করিতেছে।

অবশ্য সৃষ্টির ভিতর দিয়া লেখক এবং পাঠকের ভিতর যে একটা রসের যোগ —একটা হৃদয়ের সংবাদ তাহা সকল সাহিত্যেরই মূল ধর্ম। একের রস-প্রেরণা এবং অন্যের রসাস্বাদের ভিতর দিয়া জাগিয়া ওঠে কবি-হৃদয়ের সাহিত সম-বাসনা-বাসিত সহৃদয় পাঠকের হৃদয়ের নিব্ড়ি যোগ, এই জন্যেই সাহিত্য ‘সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী’। তথ্য, তত্ত্ব ও পা-িত্যের ভিতর দিয়া  একের সহিত অপরের বুদ্ধির যোগ ঘটিতে পারে, হৃদয়ের যোগ ঘটে না, তাই তাহারা সাহিত্যের উপাদান নয়; রসের যোগেই ঘটে হৃদয়-সংযোগ, হৃদয়-সংযোগে জাগে দুইটি হৃদয়ের রস সংবাদ —এই হৃদয়ের সংবাদই সাহিত্যের ‘সাহিত্য’। প্রাচীনরা অবশ্য শব্দের সহিত শব্দের সাহিত্য বা সঙ্গতি, অর্থের সাহিত অর্থের সাহিত্য এবং শব্দের সহিত অর্থের সাহিত্য এবং সমগ্র বাচ্যবাচক জুড়িয়া যে একটা সূক্ষ্ম সঙ্গতি বা ঔচিত্য ইহাকেই ‘সাহিত্য’ বলিতেন। আধুনিক কাকেল রবীন্দ্রনাথ এই সাহিত্য কথাটিকে আরও একটি ব্যাপক অর্থে গ্রহণ এবং ব্যাখ্যা করিয়াছেন। হৃদয়-সংবাদের ভিতর দিয়া লেখক এবং পাঠকের যে অন্তরঙ্গ যোগ তাহাকেই তিনি বলিয়াছেন সাহিত্য। ‘সে যে কেবল ভাবে ভাবে ভাষায় ভাষায় গ্রন্থে গ্রন্থে মিলন তাহা নহে — মানুষের সাহিত মানুষের, অতীতের সহিত বর্তমানের, দূরের সহিত নিকটের অত্যন্ত অন্তরঙ্গ যোগসাধন সাহিত্য ব্যতীত আর কিছু দ্বারাই সম্ভাপর নহে।’ (সাহিত্য পৃঃ ১০৬)।

এই হৃদয়-সংবাদ ব্যতীত যখন সাহিত্য হয় না, তখন সকল যুগের সাহিত্যের ভিতরেই যে সাহিত্যকার এবং পাঠকের ভিতর একটা হৃদয়-বিনিময় রহিয়াছে তাহা বলাই বাহুল; কিন্তু প্রাচীন এবং মধ্যযুগের সাহিত্যে এই হৃদয়ের সংবাদটা অনেকখানি ছিল পরোক্ষ। লেখক তাঁহার রসানুভূতিকে তাঁহার বর্ণিত বিষয়বস্তুর ভিতরেই ছড়াইয়া দিয়া নিজেকে যথাসম্ভব ঢাকিয়া রাখিতেন যবনিকার অন্তরালে, পাঠকের প্রত্যক্ষ কারবার ছিল কাব্যবর্ণিত বিষয়বস্তুর সহিত। কিন্তু লেখক এবং পাঠকের মধ্যবর্তী এই যবনিকাটি সাহিত্যের ইতিহাসের আবর্তনের সহিত সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর রূপ ধারণ করিয়া এখন প্রায় অদৃশ্য হইয়া যাইতে বসিয়াছে; এখন তাই লেখক এবং পাঠকের হৃদয়-সংবাদ অনেকখানি প্রত্যক্ষ; আর এই প্রত্যক্ষ হৃদয় সংবাদ স্পষ্টতম হইয়া উঠিতেছে পদ্যে লিরিক কবিতায় এবং গদ্যে রচনা-সাহিত্যে। এই জন্যই ‘রচনা কে অনেকে নাম দিয়াছেন গদ্য লিরিক।

রচনা-সাহিত্য তাই লেখকের একান্তই নিজস্ব কথা; সে যতখানি লেখকের নিজস্ব ততখানি সে সার্থক। তাঁহার জীবনের খুঁটি-নাটি হইতে আরম্ভ করিয়া অন্তরের অন্তস্তলে নিহিত সকল গভীর কথাকে মিলাইয়া অকপটে যখন তিনি তাঁহার লেখার ভিতর দিয়া নিজেকে প্রকাশ করিয়া তুলিতে পারিবেন — জীবন্ত এবং প্রত্যক্ষ করিয়া তুলিতে পারিবেন পাঠকের নিকটে সকল দোষে-গুণে ম-িত তাঁহার ভিতরকার মানুষটিকে, সেই লেখাই হইবে যথার্থ রচনা।

আমরা রচনার ভিতর দিয়া শুধু কতগুলি সর্বজনীন এবং সর্বকালিক কথা শুনিতে চাই না, — এখানে আমরা পাইতে চাই একটি বিশেষ সময়ে একটি বিশেষ মানুষকে। তাঁহাকে যে খুব বড় হইয়াই দেখা দিতে হইবে আমাদের দাবি সেরূপ নয়, আমাদের দাবি তাঁহাকে আকৃত্রিমরূপে দেখা দিতে হইবে — তাঁহাকে তাঁহার রচনার ভিতর দিয়া আমাদের ‘আপনার লোক’ হইতে হইবে।

সাধারণতঃ আমাদের রচনা-সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা এই যে, উহা এক প্রকারের সাধারণ বক্তৃতা-মঞ্চের বক্তৃতা। পাঠকগণ যেন হাজার হাজার শ্রোতার ন্যায় দল বাঁধিয়া ঠেলাঠেলি করিয়া ভিড় করিয়া আছে, — লেখক যেন অতি উচ্চমঞ্চ হইতে নিতান্ত কৃপাপরবশ হইয়া গুরুগম্ভীর স্বরে সকলের উপযোগী করিয়া মূল্যবান বাক্য বর্ষণ করিতেছেন। কিন্তু রচনা সাহিত্যের একটি অতি উচচস্তরে উন্নীত হয় তাহার প্রকৃতি আলোচনা করিলে দেখিতে  পাইব, তাহা এইরূপ বারোয়ারী জিনিস নহে, তাহা একান্ত নিভৃতে লেখক এবং পাঠক হৃদয়-সংবাদ।১৩ পাঠক যেন রচনা পড়িতে পড়িতে এ কথা কখনও মনে না করে যে, ইহা শুধু তাহার জন্য লেখা হয় নাই — যে অগণিত ভিড়ের দিকে তাকাইয়া এগুলি লেখা হইয়াছে যে তাহার ভিতরে নগণ্য একজন মাত্র; পরন্তু সে যেন সর্বদার জন্য এই কথাটিই অনুভব করে যে, লেখক যাহা কিছু বলিতেছেন তাহা শুধু তাহার মুখ তাকাইয়া তাহার জন্যই বলিতেছেন। অন্তরঙ্গ বন্ধু যেমন করিয়া একটি পরম মুহূর্তে নিভৃতি নির্জনে অপর বন্ধর নিকট নিজের অন্তরের সঞ্চিত সুখদুঃখ, আশা-নিরাশার কথাগুলি অকপটে ব্যক্ত করিয়া দেয়, যেমন করিয়া হৃদয়ের নিভৃততম কক্ষের দুয়ারও উদঘাটিত করিয়া দেয়, রচনাকারও তেমনি করিয়া পাঠকের নিকটে আপনার হৃদয়কে উম্মুক্ত করিয়া দেন। রচনার ভিতর দিয়া লেখক এবং পাঠকের ভিতরকার এই যে পরম অন্তরঙ্গ যোগ, ইহা ব্যতীত রচনা সত্যকারের সাহিত্যই হইয়া  উঠিতে পারে না। রচনার প্রধান উপাদানই এই হৃদয়ের সংবাদ। তথ্য ও তত্ত্ব ও পা-িত্যের চাপে এই হৃদয়ের সংবাদটি ব্যাহত হইবারই সম্ভাবনা, — এই জন্যই এই সকল জিনিস সর্বদা রচনার রসের পরিপুরক না হইয়া বরঞ্চ সময়ে সময়ে রস-ভঙ্গেরই কারণ হইয়া থাকে।

ইউরোপীয় রচনা-সাহিত্যের জনক মনটেইনও তাঁহার রচনা-গ্রন্থের ভূমিকা রচনার ভিতরে লেখকের অকপট আত্মপ্রকাশই রড় করিয়া দেখিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, — ‘পাঠক, তোমার  জন্য একখানি অকপট গ্রন্থ রহিয়াছে ; প্রারম্ভেই এই গ্রন্থ তোমাকে সাবধান করিয়া দিতেছে যে, এ গ্রন্থের পরিকল্পনার ভিতরে আমি একটা পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছুই সাধন করিতে চাই না। আমার দান বা আমার গৌরবের কথা আমি কিছুই ভবি নাই।… আমি ইহাকে আমার আত্মীয় এবং বন্ধুগণের একটি বিশেষ প্রয়োজনের জন্য উৎসর্গ করিয়াছি ; ইহার ফলে, আমাকে তাহারা হারাইবার পরেও (আমাকে তাহারা শীঘ্রই নিশ্চয়ই হারাইবে) ইহার ভিতরে (অর্থাৎ আমার গ্রন্থের ভিতরে) আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং রুচি-মর্জির কতকগুলি দিক পুনরুদ্ধার করিতে পারিবে; এই উপায়ে তাহারা আমার সম্বন্ধে তাহাদের যে জ্ঞান ছিল তাহা সমগ্রভাবে এবং আরও  জীবন্তভাবে রক্ষা কবিতে পারিবে। …আমি চাই, যতœচেষ্টা এবং কৃত্রিমতা ব্যতীত আমি আমার নিজের সত্যকার সাদাসিধা এবং সাধারণ আচার-ব্যবহারের ভিতর দিয়ে যেরূপ প্রতিভাত হই, সকলে আমাকে আমার রচনার ভিতরে যেন ঠিক সেইরূপই দেখিতে পায়; কারণ এখানে আমি নিজেকেই নিজে অঙ্কিত করিতেছি। বাস্তব জীবনের মত করিয়াই আমার দোষগুলি যেন সেখানে পঠিত হয়, আমার সকল অপূর্ণতাও যেন সেইভাবে পঠিত হয়, এবং জনসাধারণের শ্রদ্ধা আমাকে যে স্বাভাবিক রূপ দান করিয়াছে, আমার সেই রূপই যেন পঠিত হয়। …হে পাঠক, এইরূপে আমার পুস্তকের বিষয়বস্তু আমিই’।১৪

মনটেইন এই স্বীকারোক্তিতে রচনার আসল রূপটিই প্রকাশিত হইয়াছে। উত্তম রচনার ভিতরে লেখক পাঠককে অতি অন্তরঙ্গ বন্ধুর ন্যায় ডাকিয়া বলেন, — ইহার ভিতরে আমি আমার মনের কথাগুলিকেই অনাড়ম্বরে খানিকটা আগোছালভাবে খুলিয়া বলিয়াছি, — তাহার ভিতর দিয়া তুমি সন্ধান পাইবে ভালোতে-মন্দতে, দোষে-গুণে মিশ্রিত আমার নিরাবরণ এবং নিরাভরণ প্রাণ—পুরুষের — এই নিবিড় পরিচয়ের ভিতর দিয়া যে উভয় হৃদয়ের সৌহার্দ্যরে বন্ধন, ইহাই এখানে পরম লাভ। রচনা-সাহিত্যের বিষয়বস্তু যাহাই হোক, — সে আত্ম-জীবনীই হোক, অথবা ভ্রমণ-কাহিনীই হোক, জীবনের কোন তুচ্ছ ক্ষুদ্র ঘটনার বিবৃতিই হোক, অথবা সাহিত্যিক সমালোচনা, সামাজিক সমস্য বা ধর্ম-ইতিহাস প্রভৃতি কিছু হোক, —লেখার ভিতর দিয়া লেখক-হৃদয়ের একটা অকৃত্রিম স্পর্শ চাই ; নতুবা সে লবণহীন ব্যঞ্জন।

সর্বজাতীয় সাহিত্যের একটা প্রধান লক্ষণ এই যে, তাহার বিষয়বস্তু প্রতিভা- স্পর্শে সর্বদাই একটা সাধারণীকৃত রূপ পরিগ্রহ করে। এই সাধারণী-কৃতির ভিতর দিয়াই লেখক এবং পাঠকচিত্তের সংবাদ সম্ভব হইয়া ওঠে। রচনার প্রধান বিষয়বস্তু ‘আমি’ সর্বদাই এইরূপ একটা সাধারণীকৃত রূপে আসিয়া দেখা দেয়; তখন যে কারণে সাধারণ মানব চরিত্র আমাদের কাছে অতিশয় কৌতূহলের বস্তু হইয়া ওঠে, সেই কারণেই নানারূপ দোষ-গুণ এবং উৎকেন্দ্রিকতা লইয়াই লেখক পাঠকের নিকট একটি রহস্য ও কৌতূহলের প্রতীক হইয়া থাকেন। তখন আমরা দেশকালের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন একটি বিশেষ ব্যক্তি-সত্তাকে জানিবার জন্যই উৎসুক হইয়া উঠি না; সেই বিশেষ ব্যক্তি-সত্তাটি তখন সাধারণ মানবচরিত্রেরই একটি কৌতূহলময় বিশেষ রূপ বলিয়া এই সাধারণীকৃত রূপেই লেখক আমাদের মন প্রীতি ও কৌতূহল ভরিয়া দেন।

এই প্রসঙ্গে আমাদের আরও মনে রাখা উচিত যে রচনার ভিতর দিয়া লেখকের যে আত্মপ্রকাশ ইহা সাহিত্যের বেদীতে বা গদিতে উদগ্র ‘অহং’-এর প্রতিষ্ঠা নহে! আমরা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দেখিতে পাই, যেখানেই কোন ‘অহং’ তাহার উদগ্রমূর্তি লাইয়া আমাদের নিকটে নিজেকে জাহির করিতে আসে, আমরা হয় করি তাহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, নতুবা করি তাহাকে অবজ্ঞা এবং উপেক্ষা; কিন্তু সেই ‘অহং’কেই আমরা আদর করিয়া বরণ করিয়া লই আমাদের হৃদয়ক্ষেত্রে যখন সে আমাদের নিকটে আসে একান্ত আত্মীয়বেশে — সহৃদয় বন্ধুর বেশে। রচনার ভিতরে রহিয়াছে আত্মনিবেদন, আত্মম্ভরিতা নহে। অনুরাগে, সারল্যে, অকপটতায় এবং অমায়িকতায় লেখক এখানে হইয়া ওঠেন স্নিগ্ধ প্রীতিভাজন। রচনার একটা প্রধান গুণ তাই গভীর সহানুভূতি। লেখক অনতিদূরে একটি অভ্রভেদী মূর্তির মতন দাঁড়াইয়া অবজ্ঞা এবং তাচ্ছিল্যভরে ডাকিয়া কথা বলেন না, — আমাদের সমস্তরে দাঁড়াইয়া কানের কাছে মুখ রাখিয়া মনের কথা খুলিয়া বলেন। রচনার ভিতর দিয়া লেখক হয়ত কোনও যুগের সমাজ, সাহিত্য নীতি, ধর্ম প্রভৃতির সমালোচনা করিতে পারেন, বিদ্রƒপও করিতে পারেন, কিন্তু সব জিনিসই তিক্ত হইয়া যায় যদি ইহাদের পিছনে না থাকে লেখকের সহবেদনশীল চিত্ত।

আর রচনার ভিতর যে লেখকের আত্মপ্রকাশ তাহার ভিতর যেমন উগ্রতা নাই, — তেমন কোন জোর-জবরদস্তিও নাই। লেখক স্বভাবতঃ বিনয়ী, নম্র,—প্রখর আলোকে নিজেকে স্পষ্ট করিয়া জাহির করিতে সঙ্কুচিত; তাঁহার হৃদয় স্পর্শ তাঁহার সমগ্র লেখার ভিতর ছড়াইয়া থাকে পাথরের ফাটলের মাঝে মাঝে সোনার রেখার মত; বিষয়বস্তুর বর্ণনায়, — এখানে সেখানে দু-একটি ‘মন্তব্যে’, — তাঁহার প্রকাশভঙ্গিতে, বচন-বিন্যাসে, হাস্যে পরিহাসে, সমস্তের ভিতর দিয়া তাঁহার অন্তর্নিবাসী পুরুষটি যেন নিজেকে নানা ভাবে ছড়াইয়া দেয় — সেই ছড়ান পুরুষটিকে পাঠক আবার একস্থ করিয়া লয় তাহার মনের ভিতরে।

এইজন্য দেখিতে পাই ইংরেজি সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ রচনাকাররূপে খ্যাত ল্যাম্ব। বেকন হইতেও ল্যাম্বকে অনেকেই উচ্চ আসন দান করেন। বেকন চিন্তাশীল, প্রাজ্ঞ, সহৃদয়ও বটেন, — কিন্তু ল্যাম্বের ন্যায় ‘আপন জন’ নহেন। কারলাইল, ইয়ারসন প্রভৃতি মনীষী — শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি,— কিন্তু কাহাকেও ল্যাম্বর মতন এতখানি আপন করিয়া লইতে পারা যায় না। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দিতেও ইংরেজি সাহিত্যে অনেক সার্থক রচনাকার হইয়াছেন বা হইতেছেন, — কিন্তু তাঁহাদের ভিতরেও মাঝে মাঝে বেশ চিন্তার প্যাঁচ পোঁছ এবং বুদ্ধি ঝাঁজ দেখিতে পাওয়া যায় — কিন্তু এই সব বিতৃষ্ণার কারণ ল্যাম্বের ভিতরে কিছুই নাই —  তাই তিনি সর্বাপেক্ষা সার্থক রচনাকার।

সাধারণভাবে বলিতে গেলে জগতে এবং জীবনে এমন কোন বিষয় নাই যাহা লইয়া রচনা-সাহিত্য গড়িয়া উঠিতে না পারে; কিন্তু ভাল রচনা-সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য মানুষের জীবনের সঞ্চয় — যাহাকে আমরা বলি তাহার অভিজ্ঞাতা এবং প্রজ্ঞা। জগৎ এবং জীবন হইতে লেখক সঞ্চয় করিয়াছেন বহু কথা, বহু রতœ; জীবনের এই পুঁজি লইয়া লেখক আপনাতে আপনি কিছুতেই স্থির থাকিতে পারেন না, — আপন জনকে ডাকিয়া শুনাইতে ইচ্ছা করে; তখন একটি কোনও বিশেষ বিষয়বস্তুকে উপলক্ষ্য মাত্র করিয়া লেখক নিঃশেষে বিলাইয়া দেন তাঁহার সকল পুঁজি পাটা। আসল কথা, রচনার শ্রেষ্ঠ উপাদান সুখ-দুঃখ আশা নিরাশায় ভরা জীবনের বহুবিচিত্র রহস্যময় স্মৃতি। কোনও এক ভাবঘন প্রশান্ত মুহূর্তে আমরা কোনও একটি বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করিয়া ডুবিয়া যাই আমাদের হৃদয়ের অতল তলে, — সেই স্মৃতির দেশে, সেখান হইতে আহরণ করি সপ্তরঙের মণি-মাণিক্য; বাহিরে আনিয়া তাহাদিগকে যত টুকরা টুকরা করিয় ভঙ্গিয়া দেখিতে চাই, ততই ঠিকরাইয়া পড়ে সুকুমার বর্ণবৈচিত্র্য, তাহার লইয়াই অপরূপ এবং অমূল্য হইয়া ওঠে আমাদের রচনা। অন্তরের গভীর দেশে মাঝে মাঝে এইরূপ আত্ম-নিমজ্জন এবং সেখান হইতে জীবনের সকল পুঁজি হইতে বাছিয়া বাছিয়া কয়েকটি মণি মাণিক্য আনিয়া একান্ত আপনার জনকে নিভৃতে উপহার দান — ইহাই সত্যকারের রচনা।১৫ জীবনের অভিজ্ঞতাকে আমরা রঙিন করিয়া লই আমাদের কল্পনা দ্বারা — প্রজ্ঞার প্রাখর্যকে কমনীয় করিয়া লই হাস্যের স্নিগ্ধতা দ্বারা — সমালোচনাকে সরস করিয়া তুলি সহানুভূতিতে। এই অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সহিত কল্পনা হাস্য এবং সহানুভূতি মিশ্রিত আমাদের রচনা হইয়া ওঠে পরম আস্বাদ্য।

কিন্তু এই সকল জাতীয় উপাদানের ভিতরে থাকা চাই একটা হৃদয়ের সারল্য — একটা আন্তরিকতা; কারণ, আন্তরিকতা সর্বপ্রকার সাহিত্যেরই একটা গোড়ার কথা। মানুষের আনন্দ আমাদের হৃদয়ে আনন্দের উদ্রেক করে না, মানুষের বেদনা আমাদের অশ্রু আকর্ষণ করে না, মানুষের হাসি আমাদিগকে সরস করে না যতক্ষণ না সেই আনন্দ, সেই বেদনা, সেই অশ্রুর ভিতরে স্পষ্ট হইয়া ওঠে একটি গভীর আন্তরিকতা। মানুনেষর দুর্লভ গুণগুলির ভিতর প্রধান গুণ এই আন্তরিকতা এবং ইহাই খাঁটি রচনা-সাহিত্যের দুর্লভতার একটি প্রধান কারণ। অন্য জাতীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই অকৃত্রিম সরল প্রাণের অভাবকে আমরা খানিকটা হয়ত ভরাট করিয়া তুলিতে চেষ্টা করিতে পারি ছন্দোবদ্ধ, ভাষার চাতুর্য, নানাপ্রকার কলাকৌশলের দ্বারা — যদিও সে ক্ষেত্রেও আমরা প্রায়ই লাভ করি ব্যর্থতা; কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে রচনা স্বভাবতই নিরাভরণ — অলঙ্কার প্রাচুর্য তাহার পক্ষে কুৎসিত, ছলাকলা নিন্দার্হ, বাহ্যাড়ম্বর এবং চাতুর্য অশ্রদ্ধেয়; সুতরাং এই সকলের অভাবকে রচনায় ভরিয়া তুলিতে হয় একমাত্র প্রাণের দানে — হৃদয়ের অকৃত্রিমতায় এবং গভীরতায়। ভারতচন্দ্র আর কিছু পারুন আর না পারুন, ছন্দ, শব্দালঙ্কার এবং অর্থালঙ্কার লাইয়া জাদু খেলিয়া একেবারে ভেল্কি লাগাইয়া দিয়াছেন, এবং তাহা দ্বারা কবিখ্যাতিও তাঁহার লাভ হইয়াছে ; কিন্তু রচনা-ক্ষেত্রে সেই কৌশল অবলম্বন করিয়া মেকলে সাহেব বেশীক্ষণ আসর জমাইতে পারেন নাই, তাঁহাকে পিছনে পড়িয়া যাইতে হইতেছে; ল্যাম্ব এই আন্তরিকতার পরিচয় দিতে পারিয়াছিলেন সবচেয়ে বেশী, এই করণেই তাঁহার রচনার ভাষাগত এবং রীতিগত প্রাচীনগন্ধিতা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে তিনিই রহিয়া গেলেন রাজা।

ভাল রচনার ভিতরে সর্বদাই একটা ঘরোয়া আবেষ্টনী রহিয়াছে। শুধু ঘরোয়া ভাব নহে, রচনার ভিতরে আর একটা রহিয়াছে এলোমেলো ভাব, কিছুই যেন খুব সর্তর্কে এবং সযতেœ সাজানো-গুছানো নহে। ইহার কারণ এই, ঘরোয়া জীবনের যে এলোমেলো রূপ তাহাই আমাদের সত্যকারের রূপ, আর সভার মাঝখানে আমাদের যে সাজানো গুছানো সভ্যরূপ ওটা অনেক ক্ষেত্রেই একটা কৃত্রিম আরোপিত রূপ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ভিতরে সাধারণতঃ এই একটা দ্বৈতরূপ রহিয়াছে: যতক্ষণ ঘরে থাকি ততক্ষণ স্বমূর্তিতে ঠিক ‘আমি’ থাকি, — তখন আর সর্বদার জন্য সাজিয়া-গুজিয়া বসিয়া থাক না, রীতিমাফিক চলাফেরা করি না, ওজন মাপিয়া মিহিচালে কথা বলি না, সময় মাপিয়া ভালবাসি না, ঠোঁট চাপিয়া নিঃশব্দে হাসি না, — তখন আকৃত্রিম নিরাভরণ রূপে, বেকায়দামাফিক সহজ চালচলনে, মনখোলা কথায়, বেহিসাব স্নেহপ্রীতিতে, প্রাণভরা উচ্চ হাসিতে একটা রক্তমাংসের সজীব মানুষ হইয়া উঠি। আর যখন ঘর ছাড়িয়া বাহির হই, তখন হয় বলি ব্যবসায়ের লাভলোকসানের কথা, না হয় মাতি অন্য আরও পাঁচ রকমের বিরাট বিরাট সমস্যায়, তখন ভাষা ব্যবহার করি অনেক সময়ই মনের ভাব অপ্রকাশ রাখিতে, — বক্র হাসিতে প্রকাশ পায় দুর্বোধ্য ক্রৌর্য, — নিয়মমাফিক চালচলন, কাজকর্ম সকলের ভিতর দিয়া নিরন্তর চলিতে থাকে আমাদের ‘আমি’র আসল রূপটি ঢাকিয়া রাখিবার চেষ্টা। প্রবন্ধের ভিতরে এই ঘরোয়া ভাব নাই, সেখানে শুধু জ্ঞানী গুণী সভ্যলোকের বড় বড় সভা-সমিতির ব্যাপার; এই সিভা-সমিতির আইন-কানুন ভঙ্গ করিয়া প্রবন্ধের ভিতরে যতখানি আসিয়া পড়িতে পারে এই ঘরোয়া ভাব ততই সে যায় রূপান্তরিত হইয়া, ততখানিই সে হইয়া ওঠে রচনার নিকট আত্মীয়। প্রবন্ধ মানুষের কথাকে এবং মানুষের সেই কথার ভিতর দিয়া মানুষের অন্তর রূপকে যতখানি পারে বাঁধিতে চায় রীতি-নীতি আইন-কানুন যুক্তিতর্কের বেড়াজাল-রূপ প্রকৃষ্ট বন্ধনে; রচনা মানুষের কথাকে— তথা মানুষের আন্তর রূপটিকে ততখনি দিতে চায় মুক্তি — আযতœগ্রথিত সহজ জীবনযাত্রার পথে। আমাদের বক্তৃতার ভাষা — আমাদের কাজের কথার ভাষা প্রতিপদে সংলগ্ন, — তাহার ভিতর দিয়া আমাদের সহজতম প্রকাশ নাই; কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন ঘরোয়া জীবনের কথা অনেক ক্ষেত্রে অসংলগ্ন; আমরা আমাদের প্রিয়তম বন্ধুর সহিত নিরালায় বসিয়া কথা বলি অনেকখানি অসংলগ্ন ভাষায়; — অসংবদ্ধ রীতিতে এবং স্খলিত-‘ন্যায়ে’; কিন্তু মজা এই — এইখানে আমাদের আসল সত্তাটির পরিচয় মেলে সবচেয়ে বেশী। ঘরোয়া জীবনের কথা যতই আপাত-অসংলগ্ন হোক না কেন, তাহা একেবারে অন্বয়-বিহীন এবং অর্থবিহীন প্রলাপ উক্তি নহে, — তাহারা সকলে একটি গভীর অন্বয় বিবৃত হইয়া থাকে আমাদের ব্যক্তি-পুরুষের স্পন্দনে, সেই গভীর অন্বয় আপাত-চপল কথাকে দান করে গভীর অর্থ, — উহা জীবনেরই মর্মার্থ।

রচনার মূল কেন্দ্র থাকে লেখকের একটি বিশেষ মানসিক অবস্থানের ভিতরে — ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘মুড’ (গড়ড়ফ); আর একটু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নামিয়া তাহার নাম দেওয়া যাইতে পারে আমাদের মেজাজ-মর্জি। ভালভাবে রচনা আপাততঃ যত স্ফলিতবদ্ধ এলোমেলো বলিয়া মনে হয়, একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করিলে সেরূপ মনে হইবে না। রচনার ভিতর সাধারণতঃ একটা ভাবদৃষ্টির সন্ধান পাওয়া যায় — তাহাই সহজ গতিতে আঁকা-বাঁকা হইয়া গড়াইয়া পড়া এবং ছড়াইয়া-পড়া চিন্তা ও বাক্যের ধারাগুলিকে একটা সংহতি দান করে, — আর এই সংহতিই রচনা-সাহিত্যকে দান করে তাহার উপর উপর ভাসমান অর্থ হইতে একটি গভীরতর অর্থ।

কিন্তু রচনা পশ্চাতে লিরিক কবিতার ন্যায় একটি ভাবদৃষ্টি বর্তমান থাকিলেও উভয়ের ভিতর একটু তফাত রহিয়াছে। রচনার ভাবদৃষ্টি লিরিক কবিতার ভাবদৃষ্টির ন্যায় সংহত এবং একাগ্র নহে। লিরিক কবিতার ভাব অনির্বচনীয়তা-হেতু সঙ্গীতাশ্রয়ী রচনার ভাব ভাবনাশ্রয়ী। এক্ষেত্রে অবশ্য উভয়ের আয়তনের প্রশ্নকেও বাদ দেওয়া যায় না। লিরিক কবিতা এবং রচনার সার্ধমা এবং পার্থক্য সম্বন্ধে পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের রচনা-সাহিত্যের আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করিব — সুতরাং এবিষয়ে বর্তমানে আর বিশদ আলোচনায় প্রবৃত্ত হইব না।

রচনার ক্ষেত্রে লিরিক কবিতার ক্ষেত্র অপেক্ষা প্রসঙ্গচ্যুতি অনেক বেশী। লেখক যেন পথ চলিতে চলিতে এদিকে সেদিকে তাকাইয়া প্রসঙ্গের ভিতর প্রসঙ্গান্তরের সমাবেশ করিয়া অনবধানে পদক্ষেপ করিতেছেন; কিন্তু চলিতে চলিতে মোহ ও কৌতূহলবশতঃ এপথে সেপথে ঢুকিয়া পড়িয়া লেখকের যতই প্রসঙ্গচ্যুতি ঘটুক না কেন, তিনি ঘুরিয়া ফিরিয়া আসিয়া আবার ঠিক পথেই অগ্রসর হন, — মোহ ও কৌতূহল তাঁহাকে কোন দিনই একেবারে দিগভ্রান্ত করিয়া তুলিতে পারে না।

রচনার অন্তর্নিহিত ভাবদৃষ্টির এই আপেক্ষিক অসংহতির জন্য এবং রচনার প্রকাশভঙ্গির আপাত-অসংলগ্ন রূপের জন্যই বোধহয় ডক্টর জনসন এই শ্রেণির লেখাকে ‘একরাশ অজীর্ণ কথা’ আখ্যা প্রদান করিয়াছেন। রচনার ভিতরে কোন মূল ভাবদৃষ্টি আদৌ থাকে কিনা সে বিষয়ে আরও অনেক সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। হরেক রকমের রচনার ভিতরে এই ভাবদৃষ্টিটি যে সর্বত্র স্পষ্ট নয়, একথা স্বীকার করিলেও রচনার ভিতরে কোন ভাবদৃষ্টি থাকে না এবং থাকিবার প্রয়োজনও করে না এ জাতীয় মতকে স্বীকার করিতে আপত্তি আছে। আদৌ কোন ভাবদৃষ্টি না থাকিলে শুধু অলস মুহূর্তের কতকগুলি অসংলগ্ন কথা জড় করিলেই খাঁটি রচনা গড়িয়া উঠিতে পারে না। এইজন্যই সুবিন্যস্ত, যুক্তিতর্ক ও সিদ্ধান্তসমন্বিত কতকগুলি জ্ঞানগর্ভ কথাও যেমন ভাল রচনা হইয়া উঠিতে পারে না, কোনও ভাবদৃষ্টিহীন নিছক ঘরোয়াভাবে বলা কতকগুলি এলোমেলো বর্ণনা বা আত্ম-বিবৃতিও তেমনি উৎকৃষ্ট রচনা বলিয়া স্বীকৃত হইতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ এই শ্রেণির রচনার নাম দিয়াছেন, ‘বাজে কথা’; শ্রীযুক্ত প্রমথ চৌধুরী ইহার নাম দিয়াছেন ‘খেয়াল খাতা’; আমরা পরবর্তীকালে দেখিতে পাইব, এই ‘বাজে কথা’ এবং ‘খেয়াল খাতা’র স্বরূপ বর্ণনা করিতে গিয়া রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী পূর্বালোচিত রচনা-ধর্মেরই বিদগ্ধোচিত নিপুণ বর্ণনা করিয়াছেন।

প্রায় সব জাতীয় রচনা-সাহিত্যের ভিতরে প্রকৃতিতেই একটা অসম্পূর্ণতা রহিয়া গিয়াছে। মনটেইন এই জাতীয় লেখার যখন নামকরণ করিলেন তখন এই অসম্পূর্ণতার কথাও বোধ হয় তাঁহার মনে ছিল; কারণ আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি যে, কথাটির ভিতরে একটা ‘প্রচেষ্টা’র ভাবই নিহিত রহিয়াছে — ইহা সুসস্পন্ন সর্বঙ্গসুন্দর কোন লেখা নহে — একটা পরীক্ষা-মূলক চেষ্টা মাত্র।১৬ মনটেইনের পরবর্তীকালের লেখকগণের হাতেও রচনার এই অসম্পূর্ণ রূপটি রক্ষিত হইয়াছে; অর্থাৎ এরিস্টটল যেমন বলিয়াছিলেন যে, সাহিত্যে বর্ণিত বিষয়বস্তুর একটি আদি, মধ্য ও অন্ত থাকিতে হইবে, রচনার ভিতরে আমরা তেমন করিয়া কোন কিছুরই আদি, মধ্য এবং অন্তকে স্পষ্ট করিয়া পাই না। কিন্তু আদি মধ্য এবং অন্তয়ক্ত অতি সুসংবদ্ধ এবং সুসম্পন্ন লেখা না হইলেও রচনা যে কোনও খাপছাড়া প্রলাপ নয়, একথা বলিয়া দেওয়া বোধহয় বাহুল্য মাত্র।

খাঁটি রচনার এই অসম্পূর্ণ প্রকৃতির এবং পূর্ববর্ণিত ঘরোয়া আবেষ্টনীর সহিত তাহার আরও একটা সাধারণ প্রকৃতি আমরা লক্ষ্য করিতে পারি;  তাহা এই যে রচনার ক্ষেত্রে আমরা কখনই যেন তেমন গুরুগম্ভীর নই, — ইহার সর্বত্রই রহিয়াছে একটা হাল্কা মনের অনাড়ম্বর প্রকাশ। ইহার ভিতরে এক রকমের একটা পল্লবগ্রাহিতা রহিয়াছে, আর মজা এই যে, এই পল্লবগ্রাহিতা অন্যক্ষেত্রে যতই দোষের হোক রচনার ক্ষেত্রে সে যেন আনিয়া দেয় একটা অভিনব চারুত্ব। ইহার কারণ এই মনে হয় যে, আমাদের জীবনের গুরুগম্ভীর দিকটার ভিতরেই সর্বদা উজ্জ্বল হইয়া ওঠে জীবনের সব সত্য, সৌন্দর্য ও মাধুর্য এ ধারণা হয়ত ঠিক নহে। সে সত্যের একটা সহজ অনাড়ম্বর প্রকাশ রচনার হাল্কা চালে — কল্পনার লঘুপক্ষে তাহার গতি। জীবনের সত্য এখানে সর্বদা ভয়ানক ভাবে ‘গহ্বরেষ্ঠ’ হইয়া ওঠে না — লঘু নির্মল আনন্দের ছোঁওয়া লাগিয়া সত্য এখানে কমনীয় এবং সহজগ্রাহ্য হইয়া ওঠে। রচনার পূর্ববর্ণিত ঘরোয়া আবেষ্টনীর ভিতরই রহিয়াছে তাহার এই হাল্কা চালের দ্যোতনা। রচনার বিষয়বস্ত অথবা তাহার কোন একটা বিশেষ দিক লইয়া আমরা কখনই বিচার, চিন্তা বা গবেষণা করিতে বসি না; কোনও একবস্তুতে বা একচিন্তায় আমাদের মনেকে গভীর ভাবে নিবিষ্ট না করিয়া আমরা যেন লঘু মনের খুশিতে চলমান বস্তুপ্রবাহকে বা জীবনপ্রবাহের দিকে তাকাইতে তাকাইতে চলি।১৭

আমাদের বাঙলা সাহিত্যে অবশ্য এই হাল্কা চালের  রচনা কম, — ভাবস্থ রচনাই বেশী; পাশ্চাত্ত্য আদর্শে এই হাল্কাচালটি কিন্তু খাঁটি রচনার অপরিহার্য ধর্ম, এইজন্য গভীর চিন্তাশীল লেখাকে আজকালকার দিনে পাশ্চাত্ত্য আদর্শে খাঁটি রচনা বলিয়াই স্বীকার করা হয় না। ইংরেজী রচনাকরগণের নামের তালিকা হইতে বেকনের নামটিও বাতিল হইবার উপক্রম হইয়াছে। কিন্তু আমাদের পরবর্তী ঐতিহাসিক আলোচনায় আমরা দেখিতে পাইব, বাঙলা রচনা-সাহিত্য এক্ষেত্রে পাশ্চাত্ত্য রচনা-সাহিত্যের আদর্শকে অবলম্বন করিয়াই গড়িয়া ওঠে নাই, এক্ষেত্রে বাঙলা সাহিত্যের স্বাধীন ইতিহাসের ভিতর তাহার স্বধর্ম রহিয়াছে। এই ইতিহাসের আলোচনায় আমরা দেখিতে পাইব, কল্পনার লঘুপক্ষে বিহারজনিত রচনা অপেক্ষা ভাবস্থ ভাবনা অবলম্বনে লিখিত রচনাই আমাদের বেশি। জীবনের পথে লঘুদৃষ্টিতে তাকাইতে তাকাইতে যে মাধুকরী, তাহা রইয়া আমাদের রচনা গড়িয়া ওঠে নাই, — রচনা সেখানে খাঁটি সাহিত্যিক রচনা হইয়া উঠিয়াছে সেখানে সাধারণতঃ বিষয়ের সহিত লেখকের একটা গভীর ‘তন্ময়তা’ রহিয়াছে; লেখকের যে আত্মপ্রকাশ তাহা এই ‘তন্ময়তা’র ভিতর দিয়া। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার বহু রচনায় পাশ্চাত্ত্য আদর্শ এবং রীতি গ্রহণ করিলেও দেখিতে পাইব, সেখানে তাঁহার রচনা জমিয়া উঠিয়াছে সেখানেই তিনি ধীরে ধীরে তন্ময় হইয়া আসিয়াছেন। আমাদের রচনাকারগণ এই তন্ময়তা-লদ্ধ ভাবকেই ভাবনার ভিতর দিয়া বিকীর্ণ করিয়া গিয়াছেন, এবং তাহার ভিতর দিয়া নিজেকেও বিকীর্ণ করিয়া গিয়াছেন। ইউরোপীয় সমালোচকগণের ভিতরও আজকাল কেহ কেহ এই ভাবনিষ্ঠাকেই রচনার অপরিহার্য ধর্ম বলিয়া স্বীকার করিতেছেন।১৮

লিরিক-ধর্মক্রান্ত বলিয়া রচনার আয়তন স্বভাবতই স্বল্পপরিসরের হয়। মনের ছোট্ট খুশি বা ছোট্ট বেদনা লইয়া আমরা মহাভারত রচনা করিতে পরি না; তাহা করিতে চেষ্টা করিলে একদিকে তাহার ভিতর আসিয়া পড়িবে চিন্তা, যুক্তি ও তর্কের আধিক্য — অন্যদিকে আসিয়া পড়িতে চাহিবে কৃত্রিমতা এবং কৃত্রিমতা ঢাকিয়া রাখিবার জন্য একটা ক্লিষ্টতা। জীবনের তুচ্ছ ক্ষুদ্র বিষয়গুলিকেও রসঘন করিয়া তুলিতে হইলে বহুক্ষণ বসিয়া তাহাকে ইনাইয়া-বিনাইয়া বলিবার অবসর নাই, কারণ তাহা করিলে মন বক্তব্যের অনর্থক বিস্তারহেতু বিরস এবং ভারাক্রান্ত হইয়া ওঠে। রচনা-সাহিত্যের ভিতরে সর্বদাই তাই পরিধির একটা পরিমিতি রহিয়াছে। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে আয়তন কিছু দীর্ঘতর হয়; সে ক্ষেত্রেও সাহিত্যিক প্রবন্ধের একটা সম্পূর্ণ পরিমিতি থাকা উচিত, নতুবা একখানি দীর্ঘ গ্রন্থ হইতে প্রবন্ধকে আমরা পৃথক করিতে পারি না। প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও তাহার নাতিদীর্ঘত্ব তাহার সাহিত্যগুণেরই পরিপোষক।

ভাল রচনার গঠনরীতি কিরূপ হওয়া  উচিত এ বিষয়ে উপদেশের অন্ত নাই। কি-রকম বিশিষ্ট রীতি এবং সালঙ্কার ওজস্বিনী ভাষা প্রয়োগ করিতে হইবে, তথ্য এবং যুক্তিতর্ক-পরস্পরাকে কি-ভাবে সাজাইয়া গুছাইয়া মূল সিদ্ধান্তে আসিয়া পৌঁছিতে হইবে, এ বিষয়ে পাঠশালার গুরুমহাশয় হইতে আরম্ভ করিয়া কেহই কিছু কম ওয়াকিফহাল নহেন। কিন্তু আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি, সত্যকারের রচনাসহিত্য কোনও নৈয়ায়িক পন্থায় কোন সিদ্ধন্তে উপনীত হয় না, সুতরাং রচনা গঠনরীতি সম্পর্কে আশৈশব যে সকল উপদেশ-বাহুল্যদ্বারা আমাদের মস্তিস্ক ভারাক্রান্ত তাহার খুব অল্প অংশই খাঁটি রচনা-সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সে সকলের দ্বারা আমরা পরীক্ষার খাতায় এবং সাময়িক পত্রে যাহা কিছু রচনা করি তাহা সকলেই প্রবন্ধ জাতীয়। আমরা দেখিয়াছি, রচনা-সাহিত্যের কাজ নিকটতম বন্ধুর মত হৃদয়ের কোমল গভীর নিভৃত কোণটিকে পাঠকের নিকটে একান্ত অসঙ্কোচ উন্মুক্ত করিয়া ধরা; আর সাহিত্যের বাহিরের রূপটি যখন তাহার ভাবধর্মের বাহন, তখন রচনার শ্রেষ্ঠ গঠনরীতি খোলা মনে কথা বলিবার রীতি। ইউরোপীয় রচনা-সাহিত্যে তাই কথোপকথনের রীতিকেই শ্রেষ্ঠ রচনারীতি বলিয়া স্বীকার করা হইয়াছে। এই খোলামনে কথা বলিবার ভিতরে কোথাও কোন শক্ত বাঁধন নাই; মন হাস্যে পরিহাসে, বেদনায় অশ্রুতে, আত্মনিমজ্জনের গভীরতায় নিজেকে যেমন করিয়া একান্ত সহজভাবে প্রকাশ করে, ভাল রচনা-সাহিত্যের প্রকাশধর্মও তাহাই। তবে পূর্বেই বলিয়াছি, এত এলোমেলো আলাপ-প্রলাপ, হাসি-উচ্ছ্বাস, — নৈরাস্য-বেদনা, গাম্বীর্য-চপলতা — ইহারা একেবারেই ছন্নছাড়া, খাপছাড়া নহে, ইহাদের সকলের পশ্চাতে থাকে একটা বিশেষ মানসিক অবস্থান, একটা বিশেষ ভাবদৃষ্টি — যে সকল আপাতবিচ্ছিন্ন উপাদানগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করিয়া তোলে একটা ঐক্যের বন্ধনে।

রচনা-সাহিত্য আর এক প্রকার সাহিত্যের সহিত অতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্বন্ধযুক্ত — ইহা পাত্র-সাহিত্য। বাঙলা সাহিত্যে অবশ্য বিশুদ্ধ পাত্র-সাহিত্যের পরিমাণ এত কম যে, তাহাকে এক পৃথক শ্রেণিভুক্ত না করিয়া রচনা-সাহিত্যের অন্তর্গত করিয়াই আলোচনা করা যাইতে পারে। রচনা সাহিত্যের আকৃতি এবং প্রকৃতি সম্বন্ধে উপর যত আলোচনা হইয়াছে তাহা হইতেই পত্র-সাহিত্যের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠতা বোঝা  যাইবে; এই ঘনিষ্ঠতার জন্যই পৃথিবীর অন্যান্য সাহিত্যে পত্র-সাহিত্য অনেক স্থানে উৎকৃষ্ট রচনা-সাহিত্য বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। আমরা যখন পত্র লিখি তখন তাহার পাঠকরূপে সমগ্র বিশ্ববাসী আমাদের মনে জাগিয়া ওঠে না: আমরা পত্র লিখি একজনের মুখ স্মরণ করিয়া — সে আমাদের একান্ত প্রিয়জন। সেই একান্ত প্রিয়জনে নিকট কি লিখি?  লিখি মনের কথা, — জগৎ হইতে এবং জীবন হইতে যতটুকু রতœ সংগৃহীত হইয়া রহিয়াছে অন্তরের গভীরে, একটু একটু করিয়া সেখানে ডুবিয়া গিয়া আহরণ করি সেই রতœ — তাহাই আনিয়া নিঃশেষে আবার উপহার দেই প্রিয়জনকে। যাহা কিছু সেখানে লিখি তাহা সম্পূর্ণই আমার কথা, অন্যান্য যত বস্তুর কথা বা ঘটনার কথা সেখানে লিখি তাহা উপলক্ষ্য মাত্র — লক্ষ্য আমার মনের প্রকাশ — আমার সমগ্র ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ। নিজেকে কোথাও বাদ-সাদ দিয়া, কাটিয়া-ছাঁটিয়া, ঢাকিয়া-চাপিয়া, সাজাইয়া-গুছাইয়া বলিবার কোন প্রয়োজনই বোধ করি না; নির্ভয়ে, অসঙ্কোচে অকুণ্ঠিত চিত্তে নিজেকে প্রকাশ করি, লিপির প্রতি ছত্রে ছত্রে ফুটিয়া ওঠে এক হৃদয়েরে সহিত অন্য হৃদয়ের নিবিড় যোগ। বহু দূর দেশ-দেশান্তর হইতে হয়ত প্রিয়জনকে পত্র লিখিতেছি — লিখিতেছি  কত দেশের কথা, — তাহার প্রাকৃতিক এবং ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা — সে দেশের লোকজন, আচার-ব্যবহার, সামাজ-শিক্ষা, রাষ্ট্র-ধর্মের কথা — কিন্তু তাহাদিগকে কখনই শুধু সংবাদের মত করিয়া লিখি না, — তাহার সকলের ভিতরে মিলাইয়া মিশাইয়া দিই আপনাকে।

পত্র লেখার রীতি কি? গুরু-গম্ভীর চাল — না সালঙ্কার এবং সাড়ম্বর ভাষা,— না সুচতুর বাক্য-বিন্যাস? ইহার কিছুই নহে। নিজেকে একেবারে একটা রক্তমাংসের গোটা মানুষরূপে প্রকাশ করা। ইহার ভিতরে থাকিতে পারে আপাত-অসংলগ্নতা — মাঝে মাঝে প্রসঙ্গচ্যুতি — কিন্তু অকৃত্রিম প্রীতিতে, হাস্যে-পরিহাস্যে, দুঃখে-বেদনায়, আলাপে-উচ্ছ্বাসে সমস্ত লেখা যে জীবন্ত হইয়া ওঠে; এই রীতিই রচনার উত্তম রীতি।

হৃদয়ের আকৃত্রিমতাই রচনার ন্যায় পত্র-সাহিত্যেরও প্রাণবস্তু, এবং এই জন্যই জগতের সাহিত্যে খাঁটি রচনা-সাহিত্য যেরূপ বিরল, খাঁটি পত্র-সাহিত্যও সেইরূপ বিরল। পূর্বেই বলিয়াছি, জীবন যেটা আমাদের দুর্লভ বস্তু তাহা পা-িত্য নহে, চাতুর্যে নহে — উহা বিশুদ্ধ আন্তরিকতা।

তথ্যপঞ্জি

১.            প্রাচীনেরা যে ব্যাপক অর্থে ‘কাব্য’ শব্দের ব্যবহার করিতেন, সেই ব্যাপক অর্থে আমারা আজকাল ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যবহার করি; আমি তাই প্রাচীনিতের ‘কাব্য’ শব্দের পরিবর্তে বর্তমানে প্রচলিত এই ‘সাহিত্য’ শব্দটিই ব্যবহার করিব।

২.           দ্রষ্টব্য : এই লেখকের ‘সাহিত্য স্বরূপ’ তৃতীয় সংস্করণ  পৃঃ ৯৯-১০৩

৩.          It is Strange that  the essays . which at first sight looks the easiest and most natural thing in the world to write, has so seldom achieved excellence. Yet it is am indisputble fact that the grea essayist like the greatest letter-writer, is rare even than the great poet) গ্রন্থের রবার্ট লি- লিখিত ভূমিকা

৪.           প্রবন্ধে যথা মহাভারতে শান্তঃ, রামায়ণে করুণঃ, মালতীমাধবরতœাবল্যাদৌ শৃঙ্গারঃ। এবমন্যব — সাহিত্যাদর্পণ, চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

৫.           যেমন সাধারণ আলঙ্কারিক নিয়ম এই যে, রৌদ্ররসের প্রকাশের জন্য দীর্ঘ সমাসযুক্ত শব্দের ব্যবহার করা সঙ্গত, কিন্তু নাটকে রৌদ্ররসের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসমাসযুক্ত শব্দের ব্যবহার করা উচিত নহে; কারণ তাহা দ্বারা অভিনয়ের প্রতিকুলতা সাধন হয়; সুতরাং প্রবন্ধৌচিত্য হেতু এখানে রৌদ্ররসেও  অনাতিদীর্ঘ সমাসবদ্ধ শব্দের ব্যবহারই সঙ্গত। এইরূপ প্রবন্ধৌচিত্য হেতু আখ্যায়িকার শৃঙ্গারসের বর্ণনায়ও মসৃণবর্ণের ব্যবহার নিষিদ্ধ — কথা সাহিত্যে রৌদ্ররসেও অত্যন্ত উদ্ধত বর্ণনাদির ব্যবহার নিষিদ্ধ।

৬.           যেমন ভট্টনারায়ণের ‘বেণি সংহার’ এবং ভবভুতির ‘উত্তররামচরিত’ যথাক্রমে মহাভারত এবং রামায়ণ হইতে গৃহীত হইয়াছে, কিন্তু উভয় গ্রন্থের প্রবন্ধের বক্রতা বা বৈচিত্র্যজনিত চারুত্বের অনুরোধে ইতিবৃত্তকে রূপান্তরিত করা হইয়াছে; মূশল রসও পরিবর্তিত করা হইয়াছে; মহাভারত এবং রামায়ণের মূল রস ‘শান্ত ’রস, কিন্তু ‘বেণীসংহারের মূলরস ‘বীররস’ এবং ‘উত্তররামচরিতে’র ‘করুণ’ রস।

৭.           রসবৎপদ্যন্তর্গতপদানামিব পদ্যরসেন প্রবন্ধরসেনৈব তেষাং রসবত্তাঙ্গীকারাৎ। — সাহিত্য-দর্শন প্রথম পরিচ্ছেদ

৮.           তন্যাদ্যং গ্রন্থনালেখং ক্রান্তব্যুৎক্রান্তখ-িতম। পর্যালোচোখ পর্যায়ং কৃত্বা লিখতি জীবকঃ।

                শ্রীভাগবতসন্দর্ভং সন্দর্ভং রশ্মি লেকিতুম্

                ভত্ত্বসন্দর্ভ ৫,৭

৯.           দ্রঃ —জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙাগালা অভিধান

১০.এ সব কাজের আক্ষ্মে জর্ণিএ প্রবন্ধ    শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, তাম্বুলখ-

যতেক প্রবন্ধ সব জানহ আপণে  ঐ

কভো কেহো না কৈল যেন রস প্রবন্ধে।     ঐ— রাধাবিরহ

                সুন্দরি কানু মিলন ভে। ল ভঙ্গ

নিশি পাতি কাঁতি                               মলিন অব হেরিয়া

                টুটল সব পরবন্ধ।              গোবিন্দ  দাস।

দ্বিজকুল শবদ কতহুঁ পারবন্দ                       পদকল্পতরু—৩০৬

হাট করি পরবন্ধ রাজা হৈলা নিত্যানন্দ ইত্যাদি      ঐ ২৩১৩

                                (এখানে অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান অর্থে)

রাধা কর ধরি                       সুঘড়-শিরোমণি

                নাচত কহই প্রবন্ধে যে।                   ঐ ১০৭২

আজ্ঞা মালা পাঞা মোর হইল আনন্দ       চৈতন্য-চরিতামৃত

তাঁহাই গ্রন্থের তবে করিল প্রবন্ধ   আদি লিলা, ৮ম পরিচ্ছদ।

এখানে ‘আরম্ভ’ অর্থে; প্রবন্ধ’ স্থলে ‘আরম্ভ’ এই পাঠান্তরও পাওয়া যায়।)

১১.         বিভিন্নযুগের অভিধান Essay শব্দটি অর্থের জন্য ডাবলিউ. এল. ম্যাকডোনালড লিখিত — ‘বিগিনিঙ্গ অফ দিন ইঙ্গলিস এসেস (Beginning of the English essay ) গ্রন্থখনি দ্রষ্টব্য।

১২.         নিয়তিকৃতনিয়মরগিতাং হলাদৈকময়ীমনন্যপরতস্ত্রপ।

                নবরসরুচিয়াং নির্মিতিমাদধতী ভারতী কবের্জয়তি।

  1. Most of us think of the ideal essay as a kind of private rather than of public talk. The talk of the critics is usually as public as if they were addressing us from a platform _  wjI
  2. Reder thou hast here an honest book : it doth at the cutset fore warn thee that, in contriving the same I have proposted to myself no other than a domestic and private end. I have had no condsideration at all either to my service or to my glory… I have dedicated it to the particular commodity of my kinsfolk and friednds, so that, having lost me (which they must do shortly), they may therein recover some traits of my conditions and humours, and by that means preserve whole, and more lifelike, the knowledge they had of me… I desire therein to be viewed as I appear in mine own genuine, simple and ordinary manner, without study and artifice: for it is myself I paint: my defects are therein to be read to the life, and my imperfections and my natural form, so far as public reverence hath permitted me… Thus, reader, myself am the matter of my book.”
  3. তুলণীয় “As to what makes a good essay , I do not think any one ever has discovered, or will discover, the recipe. It is a kind of lucky dip into expericence or into fantasy_often into both. The ordinary essayist dips again and seldorn brings up anything worn showing to his neighbours, Lamb dipped again and almost invariably came back with a parcel of treasure”ÑwjI|
  4. Etymologically the word essay indicates somting tentative, so that there is a justification for the conception of incompleteness and went of system’  (The English Essey and Essayists) হিউ ওয়কার
  5. “It is the humour of Essays……. rather to glance at all things with running couceit to insist on any.” টিউভিল(Tuvil)

18. The comparison makes us suspect that the art of writing has for backbone some fierce attachment tjo an idea. It is on the back of a idea, something believed in with conviction or seen with precision and thus compelling words to its shape, that the divine company which includes Lamb and Bacon, and Mr. Beerbohm and Hudson, and Vernon Lee and Mr. Conard, and Leslie Stephen and Butler and Walter Pater reaches the further shore.”

[উৎস : বাঙলা সাহিত্যের একদিক (রচনা-সাহিত্য), ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানী. ৬ষ্ঠ মুদ্রণ, ১৯৯৩ কলকাতা]

***************************************

লেখকের সংগ্রাম
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

“আর-সমস্ত শিল্পকলার তুলনায় সাহিত্যই তো এ পর্যন্ত ভবিষ্যতের ভরসা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। সাহিত্যের ইতিহাস এক হিসেব সেন্সরকর্তার বিপক্ষে গ্রন্থের জয়ভাষ্য, ক্ষমতাপ্রাপ্তের বিরুদ্ধে কবির জয়লাভের বৃত্তান্ত। একটু ঘুরিয়ে বলতে গেলে সাহিত্যের সঙ্গে যুক্তাত্ম মানুষ এতদিন জেনেছে, সমসময় তাকে যতই আবর্জনায় নির্জিত করুক, ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ তার হাতে। তাই তো সিলোন মোরাভিয়া কিংবা ব্রেশ্ট ও ডাবলিন ফ্যাসিস্টদের চেয়েও দীর্ঘায়ু হতে পেরেছেন, ব্যাবলে বা ম্যান্ডলস্টম স্ট্যালিনতন্ত্র আতিক্রম করেও টিকে থাকতে পারলেন, সময়কালের শিকার হওয়া সত্ত্বও উত্তরকালে উত্তরণের মর্যাদায়। সাহিত্যের নিশ্বাস ধরে রাখবার শক্তি বিপুল। সময়ের ওপর প্রস্বর স্থাপনে অদ্বিতীয় তার ভূমিকা। হয়তো অনেক দশক পরে শব্দ ও বাক্যের প্রতিধ্বনি, কবিতা ও তার মর্মবাণী সক্রিয় হতে পেরেছে, এমন কি হয়তো বা কয়েক শতক পরেও তার বিকাশ ঘটেছে। সময়ের থেকে এগিয়ে যাবার এই স্বতঃসিদ্ধ দরিদ্র কবিদের এনে দিয়েছে অমিত সম্পদ। তাদের জেলখানায় পুরে পিটিয়ে মেরে ফেলে কিংবা নির্বাসনে পাঠানোর রেওয়াজ যেমন আগেও ছিল এখনও তেমনি দুনিয়া জুড়ে প্রচলিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি বই এবং তার শব্দ এ যাবৎ জিতে গিয়েছে। এটাই ছিল আজ অবধি, অথবা যথার্থ বললে, গতকাল পর্যন্ত বিধান। কেন-না মানুষের আতঙ্কসঞ্চারী ভবিষ্যতের সঙ্কট প্রকট হয়েও ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের অমরতার পুরাণ নিছক অনৃত উচ্চাশায় আজ অবসিত। এরই মধ্যে তো ছুড়ে-দেওয়া-দামের কবিতার কথা নিয়ে বলাবলি শুরু হয়ে গেছে। বই, মানুষের চিরকালের ধন, আজ তেমনি বড়ো-জোর পরিহার্য একটি বোতলের সঙ্গে তুলনীয়। যে নিয়তি মানুষকে আত্মধ্বংসের সামর্থে জুগিয়ে দিল, সে-ই এখন রাত ঘনিয়ে আসার আগেই মানুষের চৈতন্যকে অন্ধকারে মজিয়ে দিয়েছে, নিবিয়ে দিতে পেরেছে আগামী প্রতুষ্যের সুস্বপ্ন। এখন এর্নস্ট ব্লখের দোহাই দিয়ে ভরসা-ই মূল্যবোধ ইত্যাদি প্রজন্ম পরিহাস ছাড়া আর কী। মানুষ কি আর কোনোদিন স্বকপোলকপ্লিত এই বিপর্যয় থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে তার বিপজ্জনক ধ্বংসাত্মক উদ্ভাবনাগুলি খারিজ করে দিতে পরেবে? পারবে কি পারস্পরের প্রতি আত্মত্যাগের নজির দিতে, ধর্ষিত নিসর্গপ্রকৃতির যেটুকু অবশিষ্ট : রয়ে গেছে তাকে শুশ্রƒষা দিয়ে বাঁচাতে?। শেষ প্রশ্ন, আমরা যেটা পেরে উঠতাম সেটা কি অসম্ভব : এ ওকে আহার্য জোগানো, যেন পরিশেষে ক্ষুধা নামক, উপসর্গটি একটি উপকথার মতো অলীক হয়ে যেতে পারে, অথবা ‘একদা একরকম ছিল’ এ ধরনের কোনো শয়তানী রূপকথায় মিলিয়ে যায়? এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া আমারও সাধ্যাতীত। তবু আমি আমার এই একাকার অসহায়ত্বের ভিতরে একটা কথা ঠাহর করে নিতে পারি, এই মর্তগ্রহের অতিথি হিসেবে প্রশ্নের সদুত্তর দেওয়াই আমাদের অন্যতম কাজ, আমাদের ভবিষ্যৎ, তখনই সম্ভাব্য হয়ে উঠবে, আমরা যখন পরস্পরের মন থেকে ভয় দূর করে দেব, এমনকি নিরস্ত্রীকরণের চূড়ান্ত চাহিদায় এ ওর কাছে একেবারে নগ্ন হয়ে যেতে  পারব।”

রোমে আত্মনিও-ফেলট্রিনেনি পুরস্কার নিতে গিয়ে গ্যুন্টার গ্রাস (জ. ১৯২৭) মন্ত্রাচ্ছন্নের মতো এসব কথা বলে চলেছিলেন। টোমাস মান, ইগর ষ্ট্রাভিনস্কি, হেনরি মুর, জর্জ ব্রাক, অডেন এবং আরও কোনো কোনো শিল্পীমনীষী নোবেল প্রাইজের প্রতিস্পর্ধী এই পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। যতদূর জানি, তাঁদের কারও ভাষণই এই মর্মে ভাবিকথনের এমন কোনো উৎকণ্ঠা উচ্চারিত হয়নি। গ্রাসের কথা শুনতে শুনতে আমার স্বভাবতই ভারতীয় অনিবারণীয় প্রবর্তনায়, আমাদের রবীন্দ্রনাথের কথা মনে হচ্ছিল। প্রান্তিক, কালান্তর, সভ্যতার সঙ্কট। এবং আরও অসংখ্য রবীন্দ্রিক মন্ত্রচূর্ণ। সেই কারণেই, এবং মিতাক্ষরলেখে অনিপুণ আমার আলস্যের দরুন, গ্যুন্টার গ্রাসের দীর্ঘায়ত কথিকার সব কথা আমি টুকে নিতে পারছিলাম না। নিজেকে বুঝ দিচ্ছিলাম, তাতে কিছু আসে যায় না, আসল কথা, এমন একজন মানুষ দৃপ্ত অপ্রতিভতায় আমাকে দীপিত করেছিলেন যিনি ‘দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে’ তাদেরই একজন, যিনি রবীন্দ্রনাথকে একবিন্দু বুঝতে না পেরেও তাঁরই একজন উত্তরসাধক এবং আমাদের এই দীনাতিদীন সংক্রান্তি সময়ের সতীর্থ। এ-প্রসঙ্গে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, গ্রাসের সংগ্রামের প্রণালী প্রচুর পালটে গিয়েছে।

‘টিনড্রাম’ (উরব ইষবপযঃৎড়সসবষ/১৯৫৯) শীর্ষক স্যাটায়ারিক মহাকাব্য লিখে গ্রাস একদিন যে বিপুল তরঙ্গ তুলেছিলেন, তার আবর্ত এখনও মিলিয়ে যায়নি। বিশ্বের অন্তত কুড়িটি ভাষায় অনূদিত হয়ে এ বই অধিকাংশতই সেসব ক্ষেত্রে কথাশিল্পের আবহমান ধারা নতুন শর্তে আক্রান্ত করেছে। জার্মানির যুদ্ধোত্তর সাহিত্যে এই গ্রন্থ সম্ভবত সবচেয়ে বৈপ্লবিক ও উদ্দীপক। ১.৫ মিলিয়নেরও  ঢের বেশি বিক্রয়সংখ্যা কোনো বড়ো কথা নয়। বইটি সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহবিহীন অজস্র মানুষের বোধের জানালা খুলে দিয়েছে। কী করে যে এটা সম্ভব হল, আমাদের পক্ষে তার কোনো সহজ ব্যাখ্যা প্রাপনীয় নয়। কেনোনা ভাষাশিল্পের দিক থেকে এখানে যেসব দুরূহ কারুকাজ রয়ে গিয়েছে, কথাকথিত প্রাকৃত পাঠকের কাছে তাদের পর্যাপ্তি রীতিমতো বিরক্তিকর হতে পারত। মগ্নচৈতন্যের যোগসাজসও তেমনি এ গ্রন্থের একটি ঐশ্বর্য। তবু অদীক্ষিত পড়–য়ারাও এই সমস্ত দুরবগাহ জটিলতাকে ভালোবেসেছেন। তার কারণ কি এই যে অস্কার নামক নায়কচরিত্রে আমরা জ্ঞানদুষিত কলি যুগের পক্ষে মানানসই এক বামন অবতারকে দেখতে পাই যে জ্ঞানপাপীদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা ঢেঁঢরা পিটিয়ে ফাঁস করে দিতে চাইছে? তিন বছর বয়সেই তার বাড়নের শেষ এবং তখন থেকেই যে তার বাধ্যযন্ত্রের কাজে বিশ্বস্ত। এই বাজনার মাধ্যমেই পুরাঘটিত বা ঘটমান সময়কে সে তার চেতনায় টেনে আনে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের তৈরি পৃথিবীটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এই ছবিটি কে ভুলতে পারে, অস্কার যখন ভালজ নাচের ছন্দ বাজিয়ে নাৎসি যুদ্ধবাজদের সাময়িক প্রচারসভায় অনুশীলনী তাল তছনছ করে দেয়। আর প- হয়ে যায় তাদের সমাবেশ। গ্যুন্টার গ্রাস অস্কারের মতো এরকম শিল্পনিপুণভাবেই নরপিশাচদের আয়োজন প- করে দিতে চেয়েছিলেন। বছর কয়েক আগে যখন শ্ল্যোনডর্ফ উপন্যাসটির ফিল্মভাষ্য তুলতে ডানজিগে যান, গ্রাসও গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। তখন তাঁর হাবভাব অনেক বদলে গেছে। নিজের সৃষ্টিকাজ নিয়ে ততটা সুনিশ্চিতবোধ করতে আর পারছেন না তিনি, যদিচ ঘরে-ঘরে ও বিদ্যালয়ে তাঁর রচনা ধ্রুপদী হয়েও জনপ্রিয়তায় তখন তুঙ্গে। এই সময় থেকেই, অথবা একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, রোমে প্রদত্ত ভাষণটির পূর্বেই তিনি সাহিত্য রচনায় আমোঘতা বিষয়ে তেমন আর উদ্গ্রীব নন, যতটা আণবিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে। এর ভিতর তাঁর বন্ধু উকিল ব্রান্টের সমাজবাদী-গণতন্ত্রী দল ক্রমশ প্রতিপত্তি খোয়াতে থকে, রক্ষণশীল সরকারের প্রতিষ্ঠা হয়, জার্মানিতেও জনশক্তির অসহযোগ তুচ্ছ করে মার্কিন মারণাস্ত্রের ঘাঁটিগুলি বিষবাস্প ছড়ায়, তার প্রতিবাদে আক্ষরিক অর্থেই সবুজদের অভিযান শুরু হয়ে যায়। গ্যুন্টার গ্রাস প্রকৃতি ও পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য এদের প্রতি এখন নিবিড় স্নেহশীল হয়ে উঠেছেন। এই মুহূর্তে তিনি যে লিখলেন না তা আদৌ নয়, কিন্তু তিনি আগের চেয়েও কম লিখেছেন, অথবা আরও কোনও আয়তনিক রচনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তাঁর আঁকা ছবিগুলি হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে আরও আত্মপ্রতিকৃতিধর্মী।

গ্রাসের মতোই প্রগতিপ্রিয় হাইনরীশ ব্যোল (জ. ১৯১৭) নোবেল পুরস্কার পাবার পরেও স্থানীয় প্রতিক্রিয়াগ্রস্থ লোকজন যাঁকে তেমন সইতে পারেনি। ‘ইনি গল্প বলতে পারেন, লিখতে পারেন না’ এই অপবাদ প্রতি শিবিরের সমালোচকেরা এখনও অকাতরে ছিটিয়ে যান। বড়ো লেখক কে, এই মানদ- বোধহয় এখনও চূড়ান্তভাবে ঠিক হয়নি। কিন্তু বড়ো মানুষ বলতে ঠিক কী বোঝায়, সেকথা ব্যোলের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন সকলেই একবাক্যে কবুল করবেন। তুখোড় বাগ্মিতা তাঁর কোনোদিনই দখলে ছিল না, কোথাও কোনো আনাচার ঘটলে ছুটে গিয়ে তার প্রতিকার করতে গিয়ে প্রথমে যেসব কথা বলেন সেগুলি আর্তনাদের মতো, কখনও শিশুবচনের মতোই অস্ফুট। লিখতে বসে বাকরীতি বা বানান বিষয়ে তাঁর স্ত্রীকে প্রশ্নের পর প্রশ্নে জর্জরিত করতে জানেন এই বিনীত বিবেকবান মানুষটি। দেখলে মনে হবে এত যতোমতো নিরীহ মানুষ অযথা কেন চতুর্দিকের সংস্কারকার্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখবার পরিশ্রম করছেন। তাঁর গৃহচিকিৎসকরা তো তাঁকে নিয়ে দারুণ শঙ্কিত। কিন্তু হাইনরীশ ব্যোলের দুরারোগ্য জ্যোর্তিময় ব্যাধিই হল সত্য কথা উচ্চারণের প্রবণতা। সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে প্রচারমাধ্যমগুলির অস্বস্তির শেষ নেই। ক-দিন আগেই শ্রোতাদের অনুরোধে বাভারিয়ার একটি বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার আয়োজিত হয়েছিল বটে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে উদ্যোক্তরা অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে দেন, কেন-না, ব্যোলের কথাবার্তা বেবলগা হয়ে উঠতে পারে। ব্যোল কখন কী বলতে গিয়ে কী বলে বসবেন, কখন নিঃশর্ত রাজনৈতিক মতামত ব্যক্ত করবেন, বেতার বিভাগ তো তার দায়িত্ব নিতে পারবেন না। অনম্য এই লেখক তখন আধা সরকারি ওই অস্পষ্ট আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে আমাদের জানালেন, ‘সাহিত্য কোনোদিনই নির্দলীয় নয়। এমন কি  যে সাহিত্য প্রচলিত ব্যবস্থার অপ্রতিহত গুণকীর্তনে মাতে, রূপান্তরে যার অরুচি, প্রথাশ্রিত, তার একরকম দলীয়তা আছে। দ্যাখো, গটফ্রীড বেনকে। এই কবি আদৌ জগৎটাকে বদলাতে চাননি, কিন্তু কেমন আচ্ছা করেই না দুনিয়াটাকে তিনি পালটে দিয়েছেন। সুনীতি ও রাজনীতি, সুনীতি ও বাণিজ্য-এদের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ নেই একথা যদি মানো, তাহলে তোমাকে আগে অন্তত একটা ব্যাপার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে; সুনীতি নিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যাক। তা নইলে এমন একটা সমাজ জন্ম নেবে যা দ্বিধাবিভক্তদের প্রদর্শনী।’

সুনীতির চেয়েও সত্য বড়ো, কেন-না প্রথমোক্ত প্রমূল্যটি প্রায়শই ‘আদর্শবাদী’ শিবিরগুলির প্রিয় বর্গে পরিণত হয়ে প্রতিপক্ষকে লুপ্ত করে দিতে চায়। নাৎসি যুগের জার্মানিতে এটা হয়েছে, সামব্রত চেকোশ্লোভাকিয়ার মতো পুব মহলের দেশেও যে এই মুহূর্তে তেমনটা ঘটছে না একথা, সত্যের সৌজন্যে, অস্বীকার করা মুশকিল। আদর্শপ্রিয় রাষ্ট্রযন্ত্রের কবলে এখানে সবচেয়ে অবমানিত বোধহয় বুদ্ধিজীবী ও ভাবুকেরা। এঁদেরই একজন, পাভেল কোহুৎ, সংবেদনশীল হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে স্বীকৃত। সম্প্রতি তিনি ব্যোলকে ভক্তি ভালোবাসায় লেখা খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন, ‘মানবপন্থী আপনি,যাঁর হাতে কোনো ক্ষমতা না থাকলেও সর্বদাই কাঁধে দায়িত্ব, যিনি সমীক্ষণে জাগ্রত সংশয়জাগর আপনার বিবেক যার অভাবে, আমরা ভালো করেই জানি, ভালো-মন্দ, সাদা-কালোর তফাৎ বিষয়ে পাগলামির শামিল হয়ে ওঠে মানুষ।’ এই নির্ধারণ অভ্রান্ত। তাঁর লেখকজীবনের প্রথম থেকেই ব্যোল স্বযাচিত এই্ দায় অঙ্গীকার করে নিয়েছেন, আদর্শধ্বজ সেইসব একনায়কত্বের। বিরুদ্ধে লড়বেন যারা মানুষকে পুতুল বানায়। হিটলারও তো আদর্শের নামেই মানবশক্তিকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং কথায় কথায় তাঁকে আক্রমণ করা ব্যোলের ধর্ম। ব্যোল তাঁর নখাগ্র পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ,তাই সেই ধর্মপ্রাণতার গরজেই নিজেকে একরঙা ভালোমানুষ বানানোয় তাঁর প্রবলতম আপত্তি। ফলত, ব্যোল নিজে ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও ক্যাথলিক চার্চের দ-মু-ের কর্তারা আজ তাঁকে আদৌ ভালো চোখে দ্যাখেন না। সেন্সরপ্রিয় সোভিয়েট কর্তৃপক্ষকেও সোলঝেনিৎসিনের স্বদেশমৃত্তিকা থেকে চ্যুত হবার পর হাইনরীশ ব্যোল বারংবার একথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সাদা-কালো, ভালো-মন্দ মতবাদ-প্রাণধর্মের ভিতরে আরোপিত বিভাজন উচিত কাজ নয়। ভাবতে ভালো লাগে, রাশিয়ার শাসকেরা তাঁর এই অকপট তিরস্কার প্রসন্নচিত্তেই শুনেছেন। সোলঝেনিৎসিনের দেশে ফেরার পথ সমৃণ না হলেও রাশিয়ার ব্যোলের শেষতম বইটি সরকারের অনুমোদনে অনূদিত ও প্রচারিত হতে পেরেছে। লেলিনগ্রাদ সালিটিকভ্ গ্রন্থাগার (কমপক্ষে ২২ মিলিয়ন গ্রন্থসংখ্যা)— বিদেশী সমকালীন সাহিত্য পর্যায়ে হাইনরীশ ব্যোলকে প্রায় চূড়ান্ত সম্মান দিয়েছে। তাঁর পাশে আছেন একই গরিমায়, আরও তিনজন বরেণ্য : হোমিংওয়ে, ফকনার, রেমার্কে। এইখানেই তাঁর জিৎ, অর্থাৎ তাঁর শুভভাবনার জয়। এই কারণেই মার্কিন কর্তৃসংস্থা কিংবা নাটো কর্তাভজারা ব্যোলের ওপর বিরূপাক্ষ, এঁদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা, এই বৃদ্ধটি রাশিয়ার দালাল।

আসলে প্রজ্ঞাপ্রবীণ মানুষটি ব্যক্তির মর্যাদা বজায় রাখার সংগ্রামে মগ্ন। ‘কোথায় ছিলে তুমি আদম’ (ডযড় ধিৎংঃ ফঁ, অফধস/ ১৯৫১) রচনা থেকেই ব্যক্তিমানুষের স্পর্শকাতর পৌরুষেয়তা রূপ দিতে তিনি ব্যগ্র। মূলত নটি ছোটোগল্পের সংগ্রহ, লেখকের সংজ্ঞায়নে উপন্যাস, ওই রচনায় সূত্রধারের মতো ঘুরে ঘুরে এসেছে এক সৈনিক ও স্থপতি, ফাইনহাল্স। কখনো নায়ক, কখনো বা পার্শ¦চরিত্র হয়ে সে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। কখনোই জারি করে না সুযোগী কোনো ফতোয়া, শুধু চিনিয়ে দেয় স্থান কাল নির্ভর মানবনিয়তি।

ফাইনহাল্সের বৈশিষ্ট্যই হল এই যে তার মুখের ওপরে চারপাশের ছায়া এসে পড়ে, আর সেই পরিপার্শ্বের দর্পণেই নিজের অস্তিত্ববিবেককে সে যাচাই করে নিতে চায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সর্বনাশা মন্ত্রণায় ফাইনহালসের সেই অšে¦ষণা চুরমার করে যেতে  থাকে। এই বইটির ঘটনাটি যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে উত্তর বলকান অঞ্চল। রুমানিয়া থেকে জনকয়েক সৈন্য ও অফিসার কীভাবে হঠে আসতে থাকে, তার বৃত্তান্ত এখানে এমন ধারাভাষ্যময় যে পড়তে-পড়তে মনে হয় মানুষের পায়ের তলার মাটি একটু-একটু করে সরিয়ে নিচ্ছে মানুষের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী; যুদ্ধ। ফিরে আসবার সময় সবাই যে অসুখে আক্রান্ত হয় তার নামও ‘যুদ্ধ’। ফাইনহাল্স যখন তার মা-বাবার ভিটের দোরগোড়ায় প্রায় পৌছে গিয়েছে এমন সময় আচমকা হাতবোমা ফেটে তার মৃত্যু। উপন্যাসের একটি দৃশ্যে যুদ্ধযুগে মানুষের সম্পর্কের অনিশ্চয়তা মূর্ত হয়ে উঠেছে। পুরুষের কাছ থেকে নারী ‘চুম্বন কেন’ এই প্রশ্ন মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেই, সেখানে দ্রুত একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে দেয়। তার বিষাদকে পুরুষটি টলিয়ে দিতে পারে না, কেন-না কান্নাকে তার ভয়। ‘ভালোবাসাকে আমার ভয়’ বলে ওঠে মেয়েটি। ‘কেন’, পুরুষের এই কমনীয় প্রতিপ্রশ্নে মেয়েটি উত্তর দেয় ‘ভালোবাসা নেই, যদি থাকে তাহলে কয়েকটি মুহূর্তেই সে আবদ্ধ।’ কিছুক্ষণ পরেই সূত্রধার বলে ওঠেন। ‘ছেলেটি হয়তো নাছোড় হয়ে আরেকটু জেদ দেখাতে পারত, তার কাছে ধরে রাখবার জন্য আরও একটু জোর খাটাতে পারত, কিন্তু মানুষ তো মানুষের ওপর জোর খাটাতে পারে না, মানুষ মানুষের জন্য যদি কিছু করতে পারে তা হলো এই যে হনন। ওই একমাত্র বলপ্রয়োগই মানুষের সাধ্য। বাঁচার জন্য মানুষ আদৌ জোর করতে পারে না, ভালোবাসার সৌজনেও নয়, কেননা তার কোনো অর্থই নেই। মানুষের উপর একমাত্র মালিকানা মৃত্যুর।

ব্যোলের পরবর্তী অসংখ্য রচনায় আস্তে আস্তে অবশ্যই মৃত্যুর মুঠি শিথিল হয়ে এসেছে, যেমন গ্রাসের ‘টিনড্রাম’এর উত্তরকালীন অনেক স্মরণীয় কবিতা কথাশিল্প যুদ্ধের অন্ধ দাপটে ক্ষীয়মান। তবু সাতচল্লিশ – গোষ্ঠীর অগ্রণী এই দুই লেখক আমাদের বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন মানুষ একবার যুদ্ধ বাধানোর কলকব্জা আয়ত্ত করে নিতে শিখলে তার মতো মারাত্মক কেউ নয়। অতএব যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাই সমকালীন লেখকের একমাত্র কাজ। ‘নীল আরোহী’ (উবৎ নষধঁব জবরঃবৎ) যেমন আধুনিক চিত্রকলায় অভিব্যক্তিবাদের বলিষ্ঠ আন্দোলন, সাহিত্যের ক্ষেত্রে সাতচল্লিশ-গোষ্ঠীও তেমনি। এঁরা প্রতিপন্ন করেছেন যাকে আমরা ‘যুদ্ধোত্তর সাহিত্য’ (ঘধপযশৎরবমংষরঃবৎধঃঁৎ) বলি, তার মধ্যে অবকীর্ণ হয়ে আছে যুদ্ধের জীবাণু, তৃতীয় মহাযুদ্ধের অবচেতন প্রস্তুতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে মোকাবিলা করার অনর্পিত মানসিকতা।

এর ফলে অবশ্যই সাহিত্য উদ্দেশ্যবাদের উপসর্গ পুরোপুরি এড়াতে পারে না। অন্তত জার্মান সাহিত্য পারেনি। তার পরতে-পরতে এখনও মিশে আছে যুদ্ধের ভুক্তভোগীর যন্ত্রণা এবং প্রত্যক্ষদর্শীর দায়। তাই সাহিত্যসাধক এখন  পর্যন্ত শুদ্ধ সাংকেতিকতায় স্বপ্নপ্রয়াণ খোঁজেন না, তাঁকে সাংবাদিকদের ভূমিকা নিতে হয়। এই প্রবণতা বোধহয় সবচেয়ে উগ্র হয়ে দেখা দেয় প্রোটেস্টান্টপন্থী রোলফ হোখহুথের (১৯৩১) জীবন ও সৃষ্টিতে। তাঁর ‘প্রতিনিধি (উবৎ ঝঃবষষাবৎঃৎবঃবৎ /১৯৬৩) নাটকটির বিষয়ে আজ শুধু আমাদের দেশের বিদগ্ধ পুঁথিপড়–য়ারাই নন, প্রতিটি নাট্যপ্রেমী সহৃদয়জন অবহিত। ইহুদি-সংহারের নান্দনিক প্রতিশোধকল্পেই এই নাটকটি লেখা হয়েছিল। হিটলারের বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে এর্নস্ট ফন হাইৎসেকার ভ্যাটিকান গিয়েছিলেন। ১৯৪৩-এ উর্ধ্বতন ফ্যাসিস্ট মহাকরণে তিনি একটি চিঠিতে লেখেন : ‘পোপ যদিও কথোপকথনের এক একটা জায়গায় বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন, রোম থেকে ইহুদিদের চালান করে দেওয়ার বিরুদ্ধে তেমন কোনো উচ্চারিত প্রতিক্রিয়া দেখাননি।’ রোলফ হোখহুথ সেই চিঠি পড়ে নিজের কাছে এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেন, ‘কী করে সমস্ত খ্রিস্টানদের মুখ্যপ্রতিভু হয়েও বিশ্ববিদিত এই নববিতাড়ন বিষয়ে’ এরকম উদাসীন আচরণ করতে পারলেন? হোখহুথের সৃষ্টির প্রক্রিয়া এই প্রশ্নের প্রহারেই আলোড়িত হয়ে উঠল, উন্মাদের আগ্রহে খুঁজে বেড়ালেন জীবনী-স্মৃতিবৃত্ত-দিনপঞ্জি-পত্রধারা-বৃত্তান্ত। ১৯৫৯-এ রোমে গিয়ে তিন মাস তন্ন তন্ন করে পড়লেন একরাশ উৎস-দলিল। ভ্যাটিকানের জঙ্গি মোহান্তেরা যে তাঁর গবেষণাকাজ খুব একটা প্রশ্রয়ের চোখে দেখেছিলেন, তার কোনো নজির আমরা পাইনি। কিন্তু বার্লিনে নাট্যগুরু এরহিন পিসকাটোরের পরিচালনায় ১৯৬৬, ২০ ফেব্রুয়ারি এই নাটক মঞ্চস্থ হবার পর চার্চ ও রক্ষণশীল খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রীরা নাট্যকারের নিন্দায় কেমন মাত্র ভুলে গিয়েছিলেন, সেই তথ্য সবারই জানা। পিসকাটোর বা হোখহুথ, কেউই সেদিন বিচলিত হননি। শুধু তাই নয়, দস্যি ছেলে একবার পাড়াপড়শির কাছে বিখ্যাত হলে যেমন নানাভাবে কৃতকর্মের পুনরাবৃত্তি করে বেড়ায়, রোলফও সেদিন থেকে সেরকমই নেশায় মেতে উঠেছেন। তাঁর সাহিত্যকাজই হয়ে উঠেছে সমাজের আবর্জনা দূর করা। যাঁরা কখনও নাৎসি ছিলেন অথবা কোনো-না কোনো ভাবে সেই কলঙ্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের স্বস্তি কেড়ে নেওয়াই তাঁর সংগ্রাম। এই প্রসঙ্গে ফিলবিঙার-হোখহুথের দ্বৈরথের কথা অনেকেই হয়তো জানে না। ১৯৭৮-এ তাঁদের মনান্তর এতদূরই গড়ায় যে বাদেন-ভ্যুরটেমবার্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসন ফিলবিঙারকে ছেড়ে দিতে হয়। হোখহুথ ওইসময় তাঁর ‘আইনবিশারদ’ (ঔঁৎরংঃবহ) নাটকে খোলসা করে দেন যুদ্ধের অন্তিম পর্যায়েও সৈন্য ও নৌবিভাগের বিচারক হিসেবে ফিলবিঙার কোনো এক দৃপ্ত আইন অমান্যকারীর মৃত্যুদ-ের জন্য দায়ী ছিলেন। ব্যস এই তো যথেষ্ট। হোখহুথকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হল না। তাঁর মনস্কামনা অচিরেই চরিতার্থ হল। তিনি নিজেও মামলা-মোকদ্দমা রুজু ও দায়েরের ব্যাপরে কম যান না। মানহানির অজুহাতে অভিযুক্ত হয়ে তিনি যখন আদালতে হাজির হলেন, মনে হল মানবিকতার সুভদ্র প্রতিনিধি হয়ে উপস্থিত হয়েছেন। আদালতে ঢুকেই মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাডভোকেট যোসেফ আউগস্টাইনের সঙ্গে এমন সানন্দ করমর্দন করলেন যে, আদালতের দর্শকেরা হতভম্ব হয়ে গেল। তাহলে কি তিনি রফানিস্পত্তির রাস্তায় চললেন! না হোখহুথ তেমন কাপুরুষ কখনোই নন। পরক্ষণেই তিনি উগরে দিতে থাকলেন আগুন। প্রতিপক্ষ এতই বিমূঢ় হয়ে গেল যে আউগস্টাইন, ঝানু আইনজ্ঞ, বিচারকদের আক্রমণ করে বলতে থাকলেন ‘এই দুর্দশায় পড়ব, ঠিক জানতাম। আপনাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, আপনারা আদৌ যেন যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আসলে আপনারা তো বটেই শতকরা পঁচানব্বই ভাগ লোকই তখন হিটলারের পিছন-পিছন মোহগ্রস্তের মতো ছুটে গিয়েছ্ েপ্রশীয় কর্তব্যস্পৃহাও তাদের মধ্যে কাজ করেছে ঠিকই। তবু ভেবে দেখুন, আজ যদি আবার ওরকম পরিস্থিতি ঘটে, আপনারাই কি হাইল হিটলার জয়ধ্বনি করতে করতে তাঁর ডাকে সাড়া দিতেন না? বলা বাহুল্য কোনো বিচারকই তাঁর সম্বন্ধ্যে প্রকাশ্য নিন্দামন্দ পছন্দ করেন না। ১৯৭৮-এর ১৩ই জুলাই জার্মানির বিচারবিভাগের একটি তীর্থঙ্কর দিন। সেদিন বিচারকেরা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যৎপরোনাস্ত রুষ্ট হয়ে চূড়ান্ত রায় দেবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, আদালতের লোকেরা হিটলারের কুশপুুতুল চিরদিনের জন্য পুড়িয়ে ফেলবার জন্য বদ্ধ পরিকর হয়ে উঠেছিল, এমনকি জনকয়েক ভেটেরান হিটলারবাদী আউগস্টাইনকে শাস্তি দেবার বাসনায় চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছিলেন। প্রাক্তন সেনাধক্ষ্য  ইয়াউখ আউগস্টাইনকে শুধুমাত্র তথ্যবিকৃতির জের তুলে আক্রমণ করেই নিরস্ত হলেন না, কবির মতো বলতে থাকলেন। ‘তখন যদি ফিলবিঙার আরও একটু মমতায় কর্তব্যশৈথিল্যের প্রমাণ দিতেন, গায়ে-গতরে এতটুকু চিড় পড়ত না তাঁর, গ্রোগার বলে অভিযুক্ত আসামী আজও মানুষের  হয়ে মানুষের কাছে বেঁচে থাকতে পারত। হোখহুথ মোকদ্দমায় জিতলেন, ফিলবিঙার দল ও সরকারের নেতৃত্ব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলেন। হোখহুথের এই জয় মানুষ না লেখকের, বলা মুশকিল। কিন্তু তাঁর এই ধরনের একগুয়েমি তাঁকে এমনকি ইয়োরোপীয় পূর্বাঞ্চলের উপেক্ষিত প্রগতিশিল্পীদের আদর্শপ্রতিম করে তুলেছে। পোল্যান্ডের আন্দ্রে ওয়াইদার মতো চলচিত্র পরিচালকও আজ সময়োচিত ছবি তুলবার আগে হোখহুথের রচনার দ্বারস্থ হতে চান, এটা কোনো উপেক্ষিত তথ্য নয়। হোখহুথ তাঁর এই সত্যপ্রিয়তার কাঠামো ও প্রতিমা অক্ষুণœ রাখবার জন্য আজ যেন একটু বেশি পরিমাণেই তৎপর  হয়ে পড়েছেন। আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টকে হত্যা করার একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে তিনি এরই মধ্যে একটি অপনাট্য ফেঁদেছেন বলে শুনলাম। সম্প্রতি আয়ার্ল্যান্ডে অভিনয়ের মুহূর্তে নাকি দস্তুর মতো মার্কিনবিরোধী রসজ্ঞেরাও তাকে খারিজ দিয়েছেন। এতেও হোখহুথ দমে যাবার পাত্র নন, তাঁর আনন্দ অনুবাদে, বিশ্বের কত ভাষায় তাঁর কাজ ভাষান্তরিত হয়েছে তারই হালফিল পরিসংখ্যান, তাঁর অহংকার প্রতিবাদে, স্বৈরতন্ত্র বলে ধারণাটি প্রত্যুত্তরে কথা বুনে যাওয়ার ক্ষমতা।

এই পর্বাঙ্গের প্রতিষ্ঠিত এবং স্ফুটোন্মুখ জার্মান ভাষাশিল্পীরা হোখহুথের সাদামাঠা রচনারীতির পরিপন্থী হয়েও একই অর্থে সংগ্রামী। এদের মধ্যে পুরোধা পুরুষ নিঃসন্দেহে সিগফ্রীড লেনৎস্ (জ. ১৯২৬)। যখন এই বিনীত প্রতিবেদন লিখছি, জার্মানিতে জনপ্রিয়তম হয়ে উঠেছে তাঁর উপন্যাস ‘একটি যুদ্ধের শেষ’ (ঊরহ কৎরবমংবহফব)। এর বিষয় হোখহুথের দ্বারা প্রাণিত। ঘটনাটি মে, ১৯৪৫ : জলগর্ভে লুপ্ত বোমার সন্ধানে এক জাহাজ ডেনমার্কের বন্দর থেকে লিবাউ অভিমুখী। অধিনায়কের নির্দেশ, যারা যুদ্ধ করতে গিয়ে জখম হয়েছে, সবাইকে জাহাজে তুলে নিয়ে নিরাপত্তায় আনতে হবে। এই অনুজ্ঞার পিছনে কী-মতলব কাজ করছে কেউ জানে না, যেহেতু সবাই জানে যুদ্ধে আহত সৈনিকেরা সকলেই জীবন্মৃত, এরা কোনোদিনই আরোগ্যের উপকূলে পৌঁছাতে পারবে না। এমন সময় জাহাজে ওয়ারলেস মারফৎ সঙ্কেত আসে, ফ্রীডবুর্গ নামক সর্বাধ্যক্ষ যুদ্ধবিরতির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দিয়েছেন। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ। তবু জাহজের অধিনায়ক একরোখা, তাঁর নির্দেশিত মৃত্যুর পথে নৌবহরের প্রতিটি নাবিক এবং সারেঙকে এগিয়ে যেতে হবে। একযোগে নৌবহরের প্রত্যেকটি সৈন্য বেঁকে বসে। জাহজচালক বলে ওঠে : ‘আদেশ তখনই মানতে পারি, যখন তার মানেটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হুকুমের মধ্যেও দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে  তো’। এই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় সমবেত প্রত্যুত্থান। অধিনায়কের জুলুম অগ্রাহ্য করে জাহাজ ফিরে আসে তার যাত্রারম্ভের বন্দরে। যুদ্ধ তখন শেষ, সমর্পণ সম্পূর্ণ, কিন্তু তাহলে হবে কী, যুদ্ধের আদালতের ন্যায়-অন্যায় নিয়মবিধি তখনও অনপনেয়। নাবিক-আদালতের ‘এক ভয়ংকর বিচারক’— অবিকল হোখহুথের ফিলবিঙার নাটক ‘আইনবিশারদের’ ধরনে — নৌ-ফৌজের প্রধান বিদ্রোহীকে মৃত্যুদ-ের শামিল করে তোলে। এক সারেঙ তাকে চিরায়ত বিবেকের ভাষায় শুধরে বলে ওঠে তার এক সারেঙ : ‘ এ কি পাগলামি, এ কেমনতরো অসভ্যতা— যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে।’ তাকে চিরায়ত বিবেকের ভাষায় শুধরে বলে ওঠে তার এক স্যাঙাৎ : ‘দূর বোকা কোথাকার’, ‘এ যুদ্ধ কখনও কি ফুরিয়ে যেতে পারে নাকি! আমরা যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেম, তাদের পক্ষে, তাদের কাছে, যুদ্ধ ব্যাপারটা কখনোই নিঃশেষিত হতে পারে না’।

কর্তৃপক্ষের আজ্ঞাবহন ও ঐশ্বরিক দায়িত্ববোধের মধ্যে স্পন্দমান সম্পর্ক নিয়ে এই ধরনের ভাবনাচিন্তা এখানে, এখনও শব্দ নিয়ে ব্রতী ভাবুকদের মধ্যে প্রগাঢ়। তাঁদের রচনা চিরকালের দরবারে উক্তীর্ণ হবে কি না, সেটা আমার জানা নেই। শুধু এটুকুই একজন নশ্বরের স্বাভিমানে বলতে পারি, ন্যায়যুদ্ধই মানুষ এবং লেখকের একমাত্র আশ্রয়।

[উৎস : গদ্যসমগ্র : ২, প্রতিভাস, ২০০৯, কলকাতা]

***************************************

উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বাংলাভাষার ব্যাকরণের বই প্রথম লেখেন হলহেড নামে এক ইংরেজ। না, বাঙালি জন্য নয়, ইংরেজদের জন্য। তিনি লিখেছেন, ‘I might observe that Bengal is at present in the state of Greece before the time of Thucidides; when poetry was the only style to which authors applied themselves, and studied prose was utterly unknown. Letters of business, petitions, public notifications, and all such other conerns of common life are necessarily, and of course, written without measure or rhythm I might almost have added without measure or rhythm I might almost have added without Grammar. But all the compilations dedicated to Religion, to History and to Morality, and all such works as are intended to survive the composer, are invariably written in verse and it is probable no other style will ever be adopted.’ (A Grammar of the Bengal Language). এটি লেখা হয় ১৭৭৮ এ। না, তার আগে গদ্য ছিল না। লিখিত ব্যাকরণও ছিল না। তবে অলিখিত ব্যাকরণ নিশ্চিয়ই ছিল। সামাজিক ব্যাকরণ। তারপর গদ্য এসেছে, এবং অন্যসব ব্যাকরণের মত গদ্যের ব্যাকরণও সমাজই তৈরী করে— আপন, হয়তো গোপন, হাতে।

আসলে বাংলা গদ্যের শুরু ঊনবিংশ শতাব্দীতে; তার আগে দলিল-দস্তাবেজ ও চিঠিপত্রের ভাষা ছিল, কিন্তু সত্যকার গদ্য ছিল না। শুরুতে শব্দ ছিল, এবং সেই সঙ্গে লিখিত না হোক অলিখিত এক ধরণের ব্যাকরণও ছিল বৈকি। গদ্যের শব্দসম্পদ ক্রমশ বেড়েছে, ব্যাকরণের শৃঙ্খলা সেই সঙ্গে স্পষ্টতর হয়েছে। পেছনে ছিল সমাজঃ একদিকে শব্দ, শব্দের অন্বয়, বাক্যের গঠন, তার ছন্দস্পন্দন; অন্যদিকে শব্দ-ব্যবহারকারীর অর্থাৎ লেখকের মন ও মানসিকতা, চিন্তা ও চেতনা, অনুভব, অভিজ্ঞতা, এমন-কি কল্পনাও-সমস্ত কিছুর পেছনে সমাজ কাজ করে গেছে— গোপনে তো বটেই, প্রকাশ্যেও। কি নিয়ে গদ্য লেখা হবে বা হবে না, কতদূর সে যাবে কিম্বা যাবে না— এসব অপরিহার্য প্রশ্নের মীমাংসা করবার দায়িত্ব সমাজই রেখেছে, নিজের কাছে। সমাজটা অবশ্যই কলকাতার। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা বিচিত্র কোলাহলের শহর। উচ্ছৃঙ্খলতা সেখানে উদ্যমের সহগামী। বিপুল তার আয়োজন, প্রচ- তার আর্কষণ। বৃটিশ সা¤্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তর শহর হিসাবে গড়ে উঠছে তখন সে-মহোৎসাহে। একটি সামন্তবাদী, কৃষিনির্ভর মূলত স্বয়ংসম্পূর্ণ-গ্রাম-নিয়ে-গঠিত, এবং সেই অর্থে সুনিদিষ্ট অবয়বহীন ভূখ-ে কলকাতার অবস্থান একাধারে পুঁজিবাদের প্রতিনিধি ও পরিপোষক হিসেবে। কলকাতা সাহেব-শাসিত, হাতে যাদের পয়সার চাবিকাঠি, উন্নত যারা সভ্যতায়, তারা ভাষা এনেছে ইংরেজ, যন্ত্র এনেছে নানারকমের, আরো এনেছে কৌশল বহুবিধ। এই কলকাতা, স্বভাবতই, গ্রাম বাংলা থেকে মানুষদের টেনে নিয়ে এল। এবং যে-একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠল কলকাতায়-সাহেবদের ঠিক নীচে, কৃষককুলের ঠিক ওপরে— সেই শ্রেণীর চিন্তা-চেতনায়, উদ্যম-পরিকল্পনায় অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হল, উৎপন্ন হল এক ধরণের সৃষ্টিশীলতা। এই যে সাড়া একে কেউ বলেছেন নবজাগরণ, কেউ-বা আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে নাম দিয়েছেন নবজীবন। কারো মতে এ হচ্ছে নবযুগ, কারো দৃষ্টিতে বিপ্লব। এমন-কি মার্কসবাদীদের পক্ষেও এক রেনেসান্স বলা কঠিন হয় নি।১ অত্যুৎসাহী ‘জাতীয়তাবাদী’ ঐতিহাসিক বলেছেন এটি ঠিক রেনেসান্স নয়, রেনেসান্সের চেয়েও বড় কিছু।২

একে অবশ্য রেনেসান্স বলাটাই ভ্রান্ত ছিল। বলা যে হয়েছে সে খানিকটা আত্মসন্তোষে, খানিকটা অনুকরণে, কিছুটা কৃতজ্ঞতায়। কেউ কেউ পরে বলেছেন যে, আগে যে রেনেসান্স বলেছিলেন সেটা ছিল অতিকথা (মিথ)।৩ ইউরোপীয় রেনেসান্সের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্যটি বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়। ইউরোপীয় রেনেসান্স একটি প্রধান স্তম্ভ ছিল স্বাধীনতা। পরাধীন দেশে সত্যকার রেনেসান্স আসবে কি করে? মীর মশাররফ হোসেন অবশ্যি একদা আশাচ্ছালে বলেছিলেন ‘জগৎ পরাধীন, মন স্বাধীন’ (‘গো-জীবন’, প্রথম প্রস্তাব); কিন্তু মনের সেই স্বাধীনতা কি সম্ভব ছিল পরাধীন দেশে? ওই যে হন্তদন্ত রেনেসান্স খোঁজা এও তো সেই পরাধীনতারই লক্ষণ। পরাধীন বাংলাদেশে সে-দিন যে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি ও চেতনার বিকাশ ঘটেছিল সেটি মুৎসুদ্দী শ্রেণীর জাতীয়তাবাদ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তো নয়ই, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার লক্ষ্য ছিল না ইংরেজ বিতাড়ন। বরঞ্চ ইংরেজকে রাষ্ট্রনৈতিক কর্তৃত্বের দড়িটা সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে তারই ছত্রছায়ায় তথাকথিত সমাজকে কোনমতে রক্ষা করা যায় কি না সেটাই ছিল চেষ্টা। অর্থনৈতিক পরাধীনতা ক্রমশ সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছিল; এদেশে যাতে পুঁজিবাদী বিকাশের সমস্ত পথ-ঘাট বন্ধ হয়ে যায় তার জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে প্রায়-চিরস্থায়ী আয়োজন করা হয়ে গিয়েছিল। দেশীয় কুটীর শিল্পের মূলোৎপাটনের কাজ চলছিল অব্যাহত বিক্রমে। উদ্বৃত্ত পুঁজি যাতে শিল্পে কিছুতেই না এসে কৃষিতে চলে যায় তারও ব্যবস্থা করা হয়েছিল বৈকি। এদশকে উৎপাদিত পণ্যের বাজার এবং কাঁচামাল ও খনিজ পদার্থ সরবরাহের উৎসে পরিণত করা হচ্ছিল সুপরিকল্পিত পন্থায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসমস্ত কর্মকা-ের কোনটাই রেনেসান্সের মিত্র নয়, ঘোরতর শত্রু। ইউরোপীয় রেনেসান্স সামন্তবাদের নিগড় ভেঙ্গে পেরে পুঁজিবাদের বিকাশকে ত্বরান্বিত করার কাজে নিয়োজিত ছিল। পরাধীন বাংলাদেশে তথাকথিত রেনেসান্সের ধান্দা ছিল সম্পূনণ ভিন্ন ধাঁচের। শুধু তাই নয় বঙ্গদেশীয় রেনেসান্স ইউরোপীয় রেনেসান্সের যে একটি অর্থনৈতিক  ভিত্ ছিল তাকে যে কেবল উপেক্ষা করেছে তাই নয়, সেই ভিত্কে বাদ দিয়েই উপরের কাঠামো তৈরী সম্ভব মনে করেছে।

দ্বিতীয় কথা, রেনেসান্স ইউরোপে এনেছিল ইহজাগতিকতার এক নতুন ও বৈপ্লবিক মূল্যবোধ। ঈশ্বরমুখাপেক্ষিতার স্থলে স্থাপিত হল মানব-স্বীকৃতি। আমাদের ‘রেনেসান্স’ কিন্তু ও-মুখো হতে ভয় পেয়েছে, ধর্মের সাথে কোথাও কোথাও সে আপোস করল, আবার কোথাও বা ধর্মের প্ররোচনায় পথ হারিয়ে চলে গেল হিন্দু-পুনর্জাগরণবাদে। ইহজাগতিকতার স্রোতকে প্রবল করতে ব্যর্থ হয়ে এই রেনেসান্স বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখার একটি উদ্যোগে পরিণত হল; এমন-কি এরই একটি ধারা জন্ম দিল নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতার। এদিকে দিয়ে, এবং সাধারণভাবে স্বাভাবিক প্রবণতার দিক থেকে, এই আন্দোলন ছিল  জনজীবনবিচ্ছিন্ন। এই ছদ্ম-রেনেসান্স নিজের অজান্তে আসলে কাজ করছিল প্রকৃত রেনেসান্সকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। বুঝি বা ঘা দিচ্ছিল গোড়া পেঁচিয়ে।

এ নিয়ে অবশ্য কোন তর্ক নেই যে, ইংরেজের শাসন-ক্ষমতা লাভ কেবলমাত্র ক্ষমতার হস্তান্তর ছিল না, ছিল না রাজার বদল— এই শাসন প্রভাব ফেলেছিল দেশের প্রায় সর্বক্ষেত্রে। ইংরেজ এল একটি অগ্রসর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক শক্তির প্রতিভূ হয়ে। অস্তমিত হল মুর্শিদাবাদ, জেগে উঠল কলকাতা। গেল ফার্সী, এলো ইংরেজী। এলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত; সুচিরকালের জন্য কৃষক হারাল জমিতে তার স্বত্বস্বামিত্ব। ইংরেজ শোষণ করে জমিদারকে, জমিদার শোষণ করে কৃষকের কাঁধে তাই বিরাট ও ভারী এক বোঝা। তাছাড়া, জমিদার তো একা নয়, তার আছে বহুবিধ মধ্যস্বত্ত্বভোগকারী ফেউ। এই বোঝা পিঠে বয়ে নিষ্প্রাণ কৃষক ভূমি ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে কি করে? কোন জোরে? না উঠে দাঁড়াতে সে পারেনি। সেদিন নয় কোনদিনই নয়। ইংরেজ প্রশাসন মস্ত এক জাল ফেলল সমস্তটা দেশ জুড়ে; ক্রমে ক্রমে এল রেল, ডাক ও তার; স্থাপিত হল প্রশাসনের কেন্দ্র; বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে হজম না করুক কব্জা করল কেন্দ্রীয় শাসন। এসে গেল ইংরেজী শিক্ষা, যায় সাহায্যে গেঁথে তোলা গেল মেকলে-কথিত আরেক সা¤্রাজ্য-আইনের ও সাহিত্যের শিল্পরুচিত ও নৈতিকতার। যে বছর সিপাহী বিদ্রোহ তার চরম রূপ লাভ করে ঠিক সেই ১৮৫৭তেই যে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ঘটনা আকস্মিক নয়। এর পেছনে ইংরেজ শাসনের ভিত্টিকে পোক্ত করার ইচ্ছা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত ছিল। চেহারায় যতই নিরীহ হোক, রাজনৈতিক সা¤্রাজ্যের চেয়ে এই সা¤্রাজ্যটি কম ক্ষতিকর নয়; অন্তত অর্থনৈতিক শোষণের ঘনিষ্ঠ সহযোগীতো বটেই, এবং নিরীহমুখে অনেক বেশী দীর্ঘস্থায়ী। তৈরী হল ইংরেজের তাঁবেদার একটি শ্রেণী, ফলে ফেঁপে উঠল যারা জমিদারী-ব্যবসায়ে, বেনিয়াদারিতে, চাকরীতে ও নানাবিধ পেশায়।

এই যে নতুন শ্রেণী, ঘাঁটি যার কলকাতায়, তার হাতে অভূতপূর্ব এক সাহিত্য সৃষ্ট হয়েছে। এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটি ঘটল গদ্যই। ইংরেজ আসার আগে এদেশে কবিতা ছিল, সেই কবিতার সাত-আটশ’ বছরের একটা ইতিহাস ছিল; কিন্তু গদ্য ছিল না। দলিল-দস্তাবেজে ও চিঠিপত্রে যে-ভাষা ব্যবহার করা হত, সে-ভাষাকে যথার্থ গদ্য বলার কোন উপায় ছিল না। না, গদ্য ছিল না, এমন-কি চিত্রার্পিত ভাষায় রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ‘গদ্যবোধশক্তি’৪, তাও ছিল না। সম্ভব ছিল না থাকা। গদ্যের জন্য যে ব্যাপক ও বিচিত্র যোগাযোগ, আদান-প্রদান, তর্ক-বিতর্ক প্রয়োজন, আবশ্যক যে সামাজিকতা তা ছিল না বৃটিশ-পূর্ব বাংলাদেশে। কবিতার বিদ্যমানতা সম্ভব ছিল, কবিতা গদ্যের তুলনায় কম সমাজমুখাপেক্ষী; কবিতা একা একা লেখা গেলেও যেতে পারে, গদ্য জনসমাগম চায়।

নাগরিক মধ্যবিত্ত তার বিকাশের ধাপে ধাপে শিক্ষালাভ করেছিল— ইংরেজী শিক্ষা। আর সঙ্গে ইংরেজের অনুকরণ, ভেতরের চাপ ও বিকল্প সাংস্কৃতিক প্রকাশ-মাধ্যমের অভাব-এই তিন কারণে সে পেল সাহিত্যকে উচ্চমূল্য দেবার প্ররোচনা। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘বাঙ্গালা সাহিত্য বাঙ্গালার ভরসা’ (‘নব্য লেখকদের প্রতি নিবেদন’)। পরে বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইংরাজ এবং ইংরাজের আইন চিরস্থায়ী নহে; কিন্তু যিনি আমাদের মাতৃভাষাকে সর্বপ্রকার ভাবপ্রকাশের অনুকূল করিয়া গিয়াছেন তিনি এই হতভাগ্য দরিদ্র দেশকে একটি অমূল্য চিরসম্পদ দান করিয়াছেন। তিনি স্থায়ী জাতীয় উন্নতির একমাত্র মূল উপায় স্থাপন করিয়া গিয়াছেন।’৫ বলাবাহুল্য, এসমস্ত বক্তব্য সে-কালের একক নয়, পরের কালেও উঠেছে সমান ধ্বনি। সাহিত্যই সংস্কৃতির সর্বপ্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাহিত্যের তুলনায় না এগিয়েছে সঙ্গীত না চিত্রকলা। অথবা স্থাপত্য।

ব্যতিক্রমী বিদ্যাসাগরও কি এই সুদৃঢ় মত প্রকাশ করেন নি যে, উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টিই হবে শিক্ষাবিস্তারব্রতীদের প্রথম কর্তব্য?

বস্তুত, শিক্ষা ও সাহিত্যের সাহিত্য উভয়ে মিলে একটি অভিন্ন কর্তব্য পালন করবে বলে আশা করেছিলেন বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর। ব্যবধানের ভেতরেও সেখানে এক তাঁরা। উভয়ই মনে করতেন যে, সমাজ-উন্নয়নের একটি অত্যন্ত প্রাথমিক শর্ত হবে সমাজের বিভিন্ন অংশকে একতাবদ্ধ করা। বঙ্কিম তাঁর বাংলায় লেখা তো বটেই, একটি ইংরেজী প্রবন্ধেও সাহিত্যের এই বিশেষ ভূমিকার কথা বিশেষভাবেই উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু সাহিত্যের পক্ষে কি আদৌ সম্ভবপর ছিল এই ঐক্য আনায়ন করা? কেমন করে সম্ভব হবে? দেশের অধিকাংশ লোক অশিক্ষিত, সাহিত্য তাদের কাছে নীহারিকার চেয়েও দূরবর্তী। তাছাড়া, সাহিত্য নিজেও চেয়েছে কি ধনী নির্ধনের পরিখাটাকে ভরাট করে দিতে? চায়নি, চাইবার কথাও নয়, কেননা সাহিত্য সেই শ্রেণীর মানুষের সৃষ্টি যাদের সমষ্টিগত স্বার্থের অনিবার্য প্ররোচনা হল বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাটাকে অক্ষুণœ রাখা, দরিদ্রকে আরো দরিদ্র, ধনীকে আরো ধনী করা। এই বৈষম্য বজায় রেখে আর যা-ই হোক ঐক্য সম্ভব নয়, সামঞ্জস্যও অসম্ভব; সম্ভব কেবল দুর্বলের আত্মসর্মপণ— প্রবলের কাছে। এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে হলেও এই অভীপ্সারই পূরণ করতে চেয়েছে সাহিত্যের মূল ধারা।

মানুষের কাছে যাবে— সাহিত্যের এই অভিপ্রায়টা কিন্তু তাই বলে একেবারে মিথ্যা ছিল না। এই প্রেরণাতেই তো ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রধান প্রধান গদ্য লেখকরা প্রায় সকলেই কোনো-না-কোনভাবে সাময়িক পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। রামমোহন, বঙ্কিম, অক্ষয়কুমার, ভূদেব ও প্যারীচাঁদ প্রত্যক্ষভাবেই পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন; বিদ্যাসাগরও সংযুক্ত ছিলেন পত্রিকার সঙ্গে। মানুষের মঙ্গল চেয়েছেন। কিন্তু কোন মানুষ? না সকল মানুষ নয়; সকল মানুষের সঙ্গে তাঁদের যোগ ছিল না, সম্ভব ছিল না যোগ রাখা, তাঁরা ছিলেন আত্মীয়দের জন্যই— মূলত; এবং অন্য মানুষের কাছে, সাধারণ মানুষের কাছে, যে যেতে চেয়েছেন সেটা ভালোবাসায় নয়, কিছুটা করুণায়, কিছুটা বুঝি আত্মপ্রেমে। আত্মপ্রেম এই দিক থেকে যে, ইংরেজদের হাতে অপমানের ক্ষেত্রে দেশের মানুষই ছিল শেষ অবলম্বন। পরবর্তীকালে রাজনীতিতেও এটা ঘটেছে— নেতারা জনতার কাছে এসেছেন, জনতার স্বার্থে নয়, নিজেদের স্বার্থে।

কিন্তু ভুললে চলবে না যে, হট্টগোলের সেই অভিনব শহরে মাথা ঠিক রাখার কাজটা নিতান্ত সহজ ছিল না। একদিকে ছিল সাহেবীয়ানার টান; একবারে ছিন্নমূল করে ভাসিয়ে নিতে যেতে পারত মানুষকে, যায় নি যে তাও নয়, প্রতিভাবিহীন ও দেশপ্রেমবর্জিত অনেক মাইকেল মধূসদন তাঁর আগেও ছিলেন, পরেও ছিলেন; প্রতিভা না-থাকলে একজন মাইকেল কি হন তা তাদেরকে দেখলে বোঝা যেত। তাদেরকে ভিক্ষুক বললে অপ্রিয় কথা বলা হয়, কিন্তু মিথ্যা বলা হয় না।

ঠিক তার বিপরীতে ছিল গ্রাম্য বর্বরতা। সে বস্তু কেমন ছিল তার ছবি ওই গদ্যেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে পাচ্ছি আমরা। গদ্যের একটি বড় দায়িত্ব সমাজের ছবিকে পরিস্ফুট করা। গদ্য ব্যর্থ হয় নি সেখানে; ছবি দিয়েছে, এবং সেই যে-ছবি দেওয়া তার মধ্যে সমাজের সমলোচনাও ছিল বৈকি। যেমন ভবানীচরণের সেই পরিচিত লেখায় :

ধন্য ধন্য ধর্মাবতার ধর্মপ্রবর্ত্তক দুষ্টনিবারক সৎ-প্রজাপালক সদ্বিবেচক ইংরেজ কোম্পানী বাহাদুর অধিক ধনী হওনের অনেক পন্থা কারিয়াছেন এই কলিকাতা নামক মহানগর আধুনিক কাল্পিনিক বাবুদিগের পিতা কিম্বা ভ্রাতা আসিয়া স্বর্ণকার বর্ণকার কর্মকার চর্ম্মকার চটকার পটকার মঠকার বেতনোপভুক হইয়া কিম্বা রাজের সমাজের কাঠের খাটের মাঠের সরদারী চৌকিদারী জুয়াচুরী পোদ্দারী করিয়া অথবা অগম্যাগমন মিথ্যাবচন পরকীয়া রমণী সংঘটনকামি ভাঁড়ামি রাস্তাবন্দ দাস্য দৌত্য গীতবাদ্য তৎপর হইয়া কিম্বা পৌরহিত্য ভিক্ষাপুত্র শুরু-শিষ্যভাবে কিম্বা কিঞ্চিৎ অর্থ-সঙ্গতি করিয়া কোম্পানির কাগজ কিম্বা জমিদারী ক্রয়াধীন বহুতম দিবাবসানে অধিকতর ধনাঢ্য হইয়াছেন। (‘নববাবু বিলাস’)

ভাষা যতিবিহীন, যেন তার মাত্রা নেই, স্থিতি নেই; উপজীব্য মাত্রাজ্ঞানহীন, স্থিতিবিহীন, অতিবিশৃঙ্খল জীবন থেকেই যেন ভাষা সংগ্রহ করেছে আপন ছন্দস্পন্দন, এবং সেই সঙ্গে পারলে দু’ঘা বসিয়ে দেবে এমন ইচ্ছা যে কাজ করেনি তাও বলার উপায় রাখে নি। কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নক্সা যে ছবি দিচ্ছে তা এ ছবির নিকট আত্মীয় বটে। কালীপ্রসন্নে অবশ্য যতিচিহ্ন এসে গেছে, বোঝা যাচ্ছে একটা মাত্রাজ্ঞান আত্মপ্রকাশেচ্ছুক। যেমন :

অনেক পাড়াগাঁয়ে জমিদার ও রাজারা মধ্যে মধ্যে কলিকাতায় পদার্পণ করে থাকেন। নেজামত আদালতে নম্বরওয়ারী ও মোৎফরেক্কার তদবীর কত্তে হলে ভবানীপুরেই বাসায় ঠিকানা হয়। কলিকাতার হাওয়া পাড়াগাঁয়ের পক্ষে বড় গরম। পূর্বে পাড়াগাঁয়ে কলিকাতায় এলে লোনা লাগত, এখন লোনা লাগার বদলে আরো একটি বড় জিনিস লেগে থাকে— অনেকে তার দরুণ একেবারে আঁতকে পড়েন— ঘাঘিচোরের পাল্লায় পড়ে সর্ব্বস্বান্ত হয়ে বাড়ি যেতে হয়। পাড়াগাঁয়ে দুই এক জন জমিদার প্রায় বারোমাস এখানেই কাটান। দুপুর বেলা ফেটিং গাড়ি চড়া, পাঁচালি বা চ-ীর গানের ছেলেদের মতন চেহারা, মাথায় ক্রেপের চাদর জড়ানো, জন দশবারো মোসাহেব সঙ্গে, বা জানের ভেড়য়ার মত পোশাক, গলায় মুক্তার মালা— দেখলেই চেনা যায়, ইনি একজন বনগাঁর শিয়াল রাজা, বুদ্ধিতে কাশ্মীরী গাধার বেহদ্দ-বিদ্যায় মূর্তিমান মা! বিসর্জ্জন, বারোয়ারি খ্যামটা নাচ আর ঝুমুরের প্রধান ভক্ত— মধ্যে মধ্যে খুনীর মামলার গ্রেপ্তারী ও মহাজন ডিগ্রির দরুণ গা ঢাকা দেন। রবিবার, পান-পর্বন, বিসর্জ্জন আর ¯œানযাত্রায় সেজেগুঁজে গাড়ি চড়ে বেড়ান (হুতোম প্যাঁচার নক্সা, কলকাতায় চড়ক পার্বন’)।

হুতোমের স্বচ্ছ দৃষ্টি এরা ফাঁকি দেবে এমন উপায় নেই। পশু এরা। রুচি নেই, বোধশক্তিও নেই। ওদিকে আবার নাচা আছে হুজুগে। বিরোধিতা করে রিফর্মেশনের, গমন করে পতিতালয়ে। মাইকেল মধুসূদনের একেই কি বলে সভ্যতার বুড়ো কর্তা যে আক্ষেপ করে বলে, ‘কলকাতা মহাপাপ নগর-কলির রাজধানী এখানে কি কোন ভদ্রলোকের বাস করা উচিৎ?’ সে-বক্তব্য কোনো একজন পিতার নয়, অনেক নষ্ট বেটার বাপেরই।

এই কলকাতা কিপলিঙ-বর্ণিত পযধহপব-ফরৎবপঃবফ, পযধহপব-বৎবপঃবফ/ খধরফ ধহফ নঁরষঃ/ ঙহ ঃযব ংরষঃ নয়; পযধহপব নয়; ইতিহাসই ¯্রষ্টা এর; ইতিহাসই নিয়ন্তা, আর যতই ষধরফ ধহফ নঁরষঃ ড়হ ঃযব ংরষঃ হোক না কেন, এক শক্ত শহর। তবে নোঙরা বটে, বদমায়েশীর আখড়া, অপচয়ী ও ঠকচাচাদের লীলাক্ষেত্র।

কলকাতা মানুষ টানে। যে যেমন পারে ছুটে আসে। পিতার হাত ধরে, হাঁটতে হাঁটতে, মাইল পোস্টার লেখা দেখে দেখে ইংরেজী শিখতে শিখতে চলে আসেন বীরসিংহের বিদ্যাসাগর; আসে রামমাণিক্যও, দীনবন্ধু মিত্রের সেই ঐতিহাসিক বাঙ্গাল, যাকে আসতে হয় বিক্রমপুর থেকে, ঘর-বাড়ী ফেলে, খাল-বিল-নদী সাঁতরে, তবু আসতেই হয়, উপায় থাকেনা না-এসে। রামমাণিক্যের আক্ষেপটা যে আন্তরিক সে-বিষয়ে সন্দেহ কী! ‘মাগীবাড়ি গেচি, মাগুরি চিকোন ধুতি পরাইচি, গোরার বাড়ীর বিস্কুট বক্কোন-বান্ডিল খাইচি— এতো কর‌্যাও কলতাত্তার মত হবার পারলাম না, তবে এ পাপ দেহতে কাজ কি, আমি জলে জাপ্ দিই, আমারে হাঙ্গোরে কুম্বিরে বক্কোন করুক…’ (সধবার একাদশী, দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক)। কলকাতা আদর্শ জীবনের একটি তালিকা দিল এই বাঙ্গাল। কিন্তু সে তো একা নয়, তার ভাষা কেবল বিক্রমপুরের নয়, মফস্বলের; তাদের সকলের প্রতিনিধি সে-যাদের একমাত্র ধ্যান কলিকাত্তিয়া হওয়া। কলকাতায় থেকে মাইকেল বিলাতের জন্য বিলাপ করতেন, মফস্বলের মাইকেলদের বিলাপ কলকাতা নিয়েই— কলকাতাই বিলাত তাদের। সকল মফস্বলীয়ই যে কলকাত্তিয়া হতে চায় তা অবশ্য নয়— চায় না নিশ্চয় দরিদ্র কৃষক; কিন্তু সঙ্গতিবান মাত্রেই চায়, তা যতই বাঙ্গাল হোক। রামমাণিক্য অবশ্য আদৌ দরিদ্র নয়।

সন্দেহ কী যে, এই যে যাঁরা কলকাতার মাতাল, বাটপার, মনুষ্যদেহী পশুদের ছবি উপহার দিচ্ছেন— কি রুচিতে কি চিন্তাচেতনায় এঁরা উপজীব্য মূর্তিগুলোর তুলনায় অনেক উঁচুতে। এঁরা ঠিক রেখেছেন মাথা, ভেসে যাননি সেসব সাহেবী ¯্রােতে, ডুব দেননি তেমনি গ্রাম্য গড্ডলিকায়। এঁরা ইংরেজী-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী, এঁরাই ভদ্রলোক। এবং এই  নীতিটি কিন্তু তখনি, এঁদের লেখার গদ্যচর্চার ভেতর দিয়েই, স্বীকৃতি ও ভিত্তি পেয়ে যাচ্ছে যে, এঁরা ধনীদের দিকে তাকাবেন বটে, ব্যঙ্গ করবার জন্য হলেও; কিন্তু গরীবের দিকে তাকাবেন না— ব্যতিক্রম ভিন্ন। ডি, এইচ, লরেন্স যথার্থই বলেছিলেন যে, ব্যঙ্গও এক ধরণের সমবেদনা বটে; ঘৃণা-ভালোবাসায় পারস্পরিক শত্রুতা আছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার আদত বৈরীত্য ঘৃণার সঙ্গে নয়, উপেক্ষার সঙ্গেই। দরিদ্রজনে উপেক্ষা কারো -এই সাহিত্যিক নীতি সমাজনীতিরই প্রতিফলন।

ভদ্রলোকদেরই একদল মাথা ঠিক রাখতে পারেন নি অন্যদিক দিয়ে, তাঁরা গেছেন সাহেব হয়ে— যে কথা আগে উল্লেখ করেছি। পরিহাস করে হুতোম জানাচ্ছেন যে, এঁরা ‘টেবিলে খান, কমোডে… এবং কাগজে… মোছেন’ (‘কলকাতার চড়কপার্বন’)। উদ্ধৃতির শূন্যস্থান দু’টিতে কালীপ্রসন্ন এমন দু’টি শব্দ এত অনায়াসে উচ্চারণ করেছেন যে শুনলে আজকের দিনেও লোমহর্ষক ঠেকে। সাহেবদের অনুকরণ ভদ্রলোক মাত্রেই করেন, কিন্তু ঐ টেবিলে খাওয়া এবং কমোডে কাগজে তদ্পরবর্তী ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করা এ নিতান্তই বাড়াবাড়ি ঠেকেছে সেদিনকার মানদ-ে; ভদ্রলোকেরা তখনও যথেষ্ট ভদ্র হয়ে ওঠেন নি।

ভদ্রলোকদের জাত-পরিচয়টা কি? একটা পরিচয় অবশ্যই এই যে, তাঁরা ইংরেজী শিক্ষিত, উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সম্পর্ক বিযুক্ত, এবং তার ফলে জনজীবন-বিছিন্ন। আরেকটি পরিচয়, রুচির ব্যাপারে তাঁরা মোটামুটি নিরাপোস ও আত্মসচেতন, যার পরিচয় ওপরের উদ্ধতিগুলোতে প্রাপ্য। যে কোন প্রকার ‘চরম’ পন্থার বিরোধী তাঁরা। একেবারে ইংরেজ হয়ে যাবেন না, আবার চলে যে যাবেন পুরোপুরি গ্রামে তাও কখনো নয়। অবিশ্য চরমপন্থী হয়ে যদি বেছে নিতেই হয় দু’টির মধ্যে একটিকে তাহলে সাহেবদের পক্ষেই যাবেন, কৃষকের পক্ষকে পদাঘাত করে। মুৎসুদ্দী ভদ্রলোকত্বের এই ঐতিহাসিক বিধিলিপি সেদিন নীরবে তৈরী হচ্ছিল— বৈকি— অমোঘ নিয়মে।

নিজেদের মধ্যে ভদ্রলোকেরা এক ধরণের সামাজিকতা গড়ে তুলেছেন। তাকে বলতে পারি আত্মীয়তাও। রামমোহন তো তা-ই বলতেন; স্বগোত্রীয়দের নিয়ে যে সভা গড়েছিলেন তিনি কলকাতায় আসার পরপরই, ১৮১৫ তে, তার নাম দিয়েছিলেন অন্যকিছু নয় ‘আত্মীয় সভাই। পরে অক্ষয়কুমার দত্তও গড়েছিলেন আরেক ‘আত্মীয় সভা’। রক্তের আত্মীয়তা  নয়, তবে শ্রেণীর আত্মীয়তা।

ভদ্রলোকেরা আত্মীয় খুঁজেছিলেন; এবং বাংলা গদ্য এই নতুন আত্মীয়তাবন্ধনেরই প্রতিলিপি বটে। ভদ্রলোক সমাজের রুচি, আত্মসচেতনতা, কোথাও কোথাও নিরাপোসমনস্কতা, আবার কোথাও বা আত্মসমর্পণে সক্ষমতা— সমস্ত কিছু থেকে ছন্দস্পন্দন সংগ্রহ করে, সঞ্চয় করে ধ্বনি, সংগ্রহ করে পথনির্দেশ, তবেই গদ্য এগিয়েছে, এবং আবার প্রতিফলিতও করেছে ওই সমাজেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত বাঙালী শিক্ষায় ও সাহিত্যে প্রায় সমান সমান আস্থা রাখতেন। সেই আস্থা গদ্যকে নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়েছে।

ভরসা করে, সাহসে ও অভিমানে, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিদেশী শাসনামলে যদি এমন কোনো জিনিসের সৃষ্টি হইয়া থাকে যাহা লইয়া বাঙালী যথার্থ গৌরব করিতে পারে, তাহা বাংলা সাহিত্য। তাহার একটা প্রধান কারণ, সাহিত্য সরকারের নেমক খায় নাই।’৭ খায় নি কি? সাহিত্য না খাক, সাহিত্যিকরা তো বিলক্ষণ খেয়েছেন। না-খেয়ে গত্যন্তর ছিল কি? অন্য কোনো নুনের সরবরাহ তো ছিল না বাজারে। হ্যাঁ খেয়েছেন, এবং সাধারণভাবে বলতে গেলে খাওয়ার পরে নিমক-হারামি যে করেছেন এমন অপবাদ তাঁদের সস্পর্কে দেওয়া খুবই কঠিন। সাহিত্যের স্বাদে তাই নুন লেগেছে, ইংরেজের গুণের নুন।

গদ্য তৈরী হল ইংরেজ আসার পরেই। সজনীকান্ত দাস মিথ্যে বলেন নি, ‘সমুদ্রপারের সওদাগর ও পাদরিদের আগমনে কবিতা-প্রবণ বাংলাদেশে যে আলোড়ন উপস্থিত হয়, তাহার ফলেই সত্যকার বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ, এবং বাঙালীর আত্মচেতনা উদ্বুদ্ধ হইয়া তাহার পরিণতি।’৮ (‘বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইহাই ইতিহাস’)। বলাই বাহুল্য, এই যে ইতিহাস সৃষ্টি, এর একটি উপাদান ছাপাখানা। ছাপাখানা এদেশের ইংরেজই আনে। মোঘল রাজা-বাদশারা বিলাসদ্রব্য ঠিকই চিনতেন, কিন্তু ছাপাখানা চিনতেন না। জনশিক্ষা নিয়ে ভাববার দায় তাঁদের আদৌ ছিল না। ফলে ইংলন্ডে যে ছাপাখানা প্রচলন হয় ১৪৭৭ সালে ভারতবর্ষে এসে নামতে তার সময় লাগল কাঁটায় কাঁটায় তিনশ’ বছর। এ অঞ্চলে প্রথম ছাপাখানা স্থাপিত হল ১৭৭৮-এ; অন্য কোথাও নয়, ঐ কলকাতাতেই। আর এই ছাপাখানায় প্রথম যে বইটি ছাপা হল সেটি একটি ব্যাকরণ, হলহেড সাহেবের পূর্বোল্লিখিত অ এৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব ইবহমধষ খধহমঁধমব (১৭৭৮); ইংরেজীতে লেখা বাংলা ব্যাকরণ৯ ইংরেজের ছাপাখানায়, ইংরেজী ভাষায়, ইংরেজের হাতে লেখা বাংলা ব্যাকরণ। ছাপা হল ইংরেজের প্রয়োজনে। উদ্দেশ্য ছিল ভাষাকে বোঝা ক্ষেত্রে প্রয়োজন ব্যবসায়ের জন্য, এবং ধর্ম প্রচারের জন্যও।১০ রাষ্ট্র ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রথমে ইংরেজের হাতে, তারপরে ইংরেজাশ্রিতদের হাতে। ভাষার ব্যাকরণের পেছনে ছিল রাজনীতির ব্যাকরণ।

প্রচ্ছন্ন সেই ব্যাকরণই আসল নিয়ন্তা— অনেক কিছুর সঙ্গে বাংলা ব্যাকরণেও। কেমন করে এলো ঐ নিয়ন্ত্রণ? এলো ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্য দিয়ে, নুনের সম্পর্ক ধরে। এই শ্রেণীটি ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতার দ্বারা সৃষ্ট। না এর জগৎ ছিল স্বাধীন, না এর মন। ইংরেজকে বাদ দিয়ে এই শ্রেণীর অস্তিত্বই কল্পনা করা কঠিন।

গদ্যের আগে পদ্য ঠিকই ছিল। ছিল পয়ার। পয়ারের একটা ছন্দে গদ্যভঙ্গি আছে, কিন্তু সেটা ভঙ্গির শুধু, বস্তু নয়। তার দুলকি চাল একটি আপাত সন্তুষ্ট, অনেকটা নিশ্চিত সমাজের মুখচ্ছবি। পদে পদে বাধা দিয়েছে সে গদ্যের বিকাশকে, যেমন কি না মধ্যবিত্ত বাধা দেয় সামাজিক বিপ্লবকে উভয় ক্ষেত্রেই আশ্বাস থাকে অগ্রগতির সঙ্গে সহযোগিতার, ভাব করা হয় দায়িত্ব স্বীয় স্কন্ধে তুলে নেবার, কিন্তু  ভেতরে ভেতরে কাজ চলে শত্রুতার, টেনে ধরে রাখা হয় রাশ। তবু পয়ার ভেঙ্গে একদিন গদ্য এলো। এলো বটে কিন্তু তার পায়ে দেখা গেল শৃঙ্খল। কিসের? না, শ্রেণী-শাসনের, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের শ্রেণী-স্বার্থের।

এই শ্রেণীর সামাজিক আত্মীয়তা কার সঙ্গে? স্বভাবতই কিছুটা ইংরেজদের সঙ্গে। এক সময়ে ওঠাবসা পর্যন্ত ছিল; নিজেদের বসবাস ঘরে যতই হাসিঠাট্টা করুক না কেন, ইংরেজরা রামমোহনের বাড়িতে বাইজীর নাচ দেখতে এসেছে ঠিকই, এবং কালীঘাটেও পাঠিয়েছে সিধা। একেবারেই নগণ্য-সংখ্যক লোক বাদ দিয়ে বাদবাকি সবাই কৃষক ছিল সে-কালে, এবং সেই বিপুল জনস্রোতের সঙ্গে মধ্যবিত্তের আত্মীয়তা ছিল না; সম্ভব ছিল না আত্মীয়তা থাকা, মুসলমান কৃষকের সাথে তো প্রশ্নই ওঠে না, হিন্দু কৃষকের সাথেও তো নয়। যেন ভিন্ন গ্রহের অন্যকোন জীব তারা। অত্যন্ত ওপরের লোক যারা— অর্থাৎ উচ্চবিত্ত— তাদের সাথেও আত্মীয়তাটা ছিল ক্ষীণ। মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমশঃ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, বিস্তৃত হচ্ছিল, পরিধিতে আত্মীয়তার বিস্তারও ছিল অতটাই। গদ্য লেখকরা এই আত্মীয়তাবন্ধনের মুখপাত্র।

জনজীবনবিচ্ছিন্নতার ব্যাপারে অসচেতন ছিলেন কি গদ্যলেখকরা? না, ছিলেন না। ‘বঙ্গদর্শনে’র সেই ঐতিহাসিক পত্রসূচনায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘প্রধান কথা এই যে, এ ক্ষণে  আমাদিগের ভিতরে উচ্চশ্রেণী এবং নি¤œশ্রেণীর লোকের মধ্যে পরস্পর সহৃদয়তার বিন্দুমাত্রই নাই। উচ্চশ্রেণীর কৃতবিদ্য লোকেরা মূর্খ দরিদ্র লোকদিগের কোন দুঃখে দুঃখী নহেন। মূর্খ দরিদ্ররা ধনবান এবং কৃতবিদ্যদিগের কোন সুখে সুখী নহে। এই সহৃদয়তার অভাবই দেশোন্নতির পক্ষে সম্প্রতি প্রধান প্রতিবন্ধক।’ ঘটনা সত্য; ঘটনা নিয়ে দুঃখবোধও মিথ্যা নয়। নি¤œশ্রেণীর লোকের জন্য অনুভূতি ছিল, সহৃদয়তা ছিল। তবে তা গভীর নয়, শ্রেণীস্বার্থকে বিসর্জন দেবার মত প্রবল নয়; শ্রেণীর সীমা মেনে নিয়ে তবেই দুঃখ, যে-দুঃখের যথার্থ নাম করুণা। উপরের উদ্বৃতিইতো বলে দিচ্ছে দুঃখবোধের অবিশুদ্ধতার কথা। শুধু ধনবানেরাই যে কেবল অপরাধী তাতো নয়, ধনহীনেরাও সমান পাপী, বঙ্কিম বলেছেন। দরিদ্ররা ধনীদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেন সমান তারা পরস্পরের। কিন্তু তবু দেখা যাচ্ছে তফাৎ আছে, ভাষা বলে দিচ্ছে তফাতের কথা। ধনীরা ‘দুঃখী নহেন’; আর দরিদ্ররাও? তারা ‘সুখী নহে’। ওই যে ‘ন’ এর হেরফের, ‘নহেন’, ও ‘নহে’র ব্যবধান সেটা তো উড়িয়ে দেবার মত নয়— কেননা এ হচ্ছে শ্রেণীগত ব্যবধানেরই অনাত্মসচেতন স্মারকচিহ্ন। শিরস্ত্রাণ ধনীরই জোটে, দরিদ্রের নয়।

ব্যবধান আসলে ধনী ও দরিদ্রেরই; তবে  হ্যাঁ, ধনীর সঙ্গে কৃতবিদ্য এবং দরিদ্রের সঙ্গে মূর্খকে যোগ করেছেন বঙ্কিম। এই যোগে আপত্তির কিছু নেই, কেননা ধনীরাই কৃতবিদ্য হয়, এবং বিপরীত পক্ষে, দরিদ্ররাই মূর্খ থাকে। তবে এই যে কৃতবিদ্য ও মূর্খকে দুই বিপরীত শ্রেণীতে ভাগ করে দেওয়া, এটাও একটা প্রবণতা বটে। ভদ্রলোকেরা ভাবেন, তখনও ভাবতে ভালোবাসতেন এখনোও ভাবতে ইচ্ছা রাখেন যে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবধান নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরিখ হচ্ছে শিক্ষা। কিন্তু প্রশ্নতো থাকেই যে, মূর্খ ধনী এবং শিক্ষিত দরিদ্র -এই দু’জনের মধ্যে কার শক্তি অধিক? শিক্ষিত অশিক্ষিত পার্থক্য নিশ্চয়ই একটা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় ও প্রাথমিক পার্থক্য হচ্ছে ধনীর সঙ্গে নির্ধনের।

সহৃদয়তা কি সবার ছিল? না, ছিল না। অনেকেই হৃদয়ের অনুশীলন করেন নি, যদিও চর্চা করেছেন বুদ্ধির। রামমোহন অসামান্য তাঁর সংবেদনশীলতার জন্য নয়, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির জন্যই। এমনকি অক্ষয় কুমার দত্তও তাই। হৃদয় প্রায়শ বুভুক্ষু থাকত, উপযুক্ত খাদ্যের অভাবে। এই হৃদয়ের আবেষ্টনী থেকে কৃষক থাকে অনেক দূরে। আত্মসচেতন হৃদয় ইংরেজকে হৃদয়হীন বলে চিনেও চিনতে চায় না— কেবলি ভয় পায় চিনতে। হৃদয়ানুশীলনের এই সমস্যা গদ্যেরও সমস্যা বটে।

হৃদয় নানাভাবেই চাপা থাকত। ভদ্রতা জিনিসটাই চাপাচাপিতে ভরপুর। নবীন সেনের আত্মজীবনীতে যে একটি ঘটনার উল্লেখ আছে সেটি নিশ্চয়ই কোনো একক অভিজ্ঞতা ছিল না। ঘটনাটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। যুবক রবীন্দ্রনাথ রাণাঘাটে এসেছিলেন পারিবারিক কাজে। কবি নবীন সেন তখন সেখানকার ভারপ্রাপ্ত মহকুমা প্রশাসক। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তুলেছেন স্বগৃহে; নবীন সেন লিখেছেন, রাত্রি বেলার কথা। ‘টেবিল’ পানাহার বড় আনন্দের সহিত চলিতে লাগিল। রবিবাবুর মার্জ্জিত সোনার চশমা, মার্জ্জিত রুচি, মার্জ্জিত ঈষৎ হাসি, সমস্তদিন ঠাকুরবাড়ীর ওজনমাপা চাপা কথা, চাপা হাসি ও চাপা শিষ্টাচারে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া আসিয়াছিল। আমি আর পারিলাম না। সুরাদেবীও পরিমিত শিষ্টাচার বন্ধন কিছু শিথিল করিয়াছিলেন। আমি বলিলাম, ‘রবিবাবু! সমস্তদিন আপনার চাপা কথা ও চাপা হাসিতে বড় জ্বালাতন হয়েছি। আমি আর ওজন ঠিক রাখতে পারছি না। দোহাই আপনার, একবার আমাদের মত প্রাণ খুলিয়া কথা বলুন।’১১ তিনি এবার খুব হাসিলেন। হৃদয়কে এমন ভাবে চেপে বেঁধে রাখাটাই নিয়ম বটে, তাকেই বলে ভদ্রতা। ‘প্রাণ খুলিয়া কথা বলা’ নিষিদ্ধ-প্রায়শ প্রাণ সাধারণত প্রকাশ পায় না; পায় যখন তখন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শুরুতে অবশ্য এই চাপাচাপিটা তেমন অভ্যাস হয়ে যায় নি, আদি গদ্যে তাই ক্রোধ কিছু পাই, খোলামেলা শব্দও দেখি এখানে সেখানে চলাফেরা করছে, ‘উৎকট’ ব্যঙ্গরচনাও দুর্বল নয়, কিন্তু পরে রবীন্দ্রনাথে এসে যে-শিষ্টাচারে নবীন সেন একদা পীড়িত হয়েছিলেন বলেছেন সেটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে; তখন প্রতিবাদকারী নবীন সেনরাও আর প্রতিবাদ করার সাহস রাখেন নি। ওজন ঠিক রেখেছেন। সমাজে মধ্যবিত্ত শক্ত করেছে আপন অবস্থান, সংস্কৃতিতে ঘটেছে তার শ্রেণীশাসনের অবিচল প্রতিষ্ঠা। গড়ে উঠেছে রুচি।

বুভুক্ষু হৃদয় মানুষের স্পর্শ চাইত নিশ্চয়ই, কিন্তু পেত না। ইংরেজের স্পর্শ উষ্ণ নয়, সুলভও নয়। কৃষক সে তো অনেক দূরে। ইংরেজের না হোক, ইংরেজীর স্পর্শের ছাপ বাংলা গদ্যে দেদীপ্যমান। গদ্যের কমা, সেমিকলন, বিস্ময়বোধকও উদ্ধৃতি-চিহ্ন-এসব ইংরেজী থেকেই এসেছে। অর্থাৎ গতিবিধির নিয়ন্ত্রণের ভার অলক্ষ্যে ইংরেজীই। শব্দসম্ভার, বাগবিধি, এবং বাক্য গঠনের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যও ইংরেজীর সাথে যোগাযোগ না-ঘটলে কিছুতেই আসতে পারত না। বিপরীতপক্ষে, এই গদ্য সচেতনভাবেই চেষ্টা করেছে জনজীবন থেকে নিজেকে দূরে রাখতে। সাধুভাষা জনমানুষের ভাষা নয়, কারোরই ভাষা নয় আসলে। তবু এই কৃত্রিম ভাষাই চালু থেকেছে, চলিত ভাষা চলেনি, অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনে যা গ্রাহ্য ছিল আনুষ্ঠানিক গদ্যে তা ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। কলকাতা যেমন একটি কৃত্রিম শহর, কৃত্রিম যেমন তার মধ্যবিত্ত, কলকাতার মধ্যবিত্তসৃষ্ট গদ্যও তেমনি একটি কৃত্রিম ভাষা। চলিত ভাষা সহজে চলে নি, তাকে সাহিত্য-গ্রাহ্য করতে সময় লেগেছে দীর্ঘ।

কিন্তু নবীন সেন-বর্ণিত ওই যে সুরাপানের শরণাপন্ন হবার ঘটনা সেও চাপাচাপির ফল বটে— প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া। এইখানেই যা একটু স্বাধীনতা, এই সুরাপানে, এই মাতলামিতে। অতিরিক্ত মদ্য পানাসক্তরাই বুঝি ছিলেন যথার্থরূপে স্বাধীন—  যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

তবে মদ সেকালে অনেকেই খেতেন। শিবনাথ শাস্ত্রী জানাচ্ছেন যে, ‘হিন্দু কলেজের ষোল-সতের বৎসরের বালকেরা সুরাপান করা শ্লাঘার বিষয় মনে করিত।’১২ তা বালকদের ব্যাপারটা না হয় বোঝা যায়, তারা অনুকরণ করছিল ইংরজদের, হয়তো করছিল বিদ্রোহও, নিশ্চয়ই বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল বীরত্বের। ব্যাহতবীরত্বের অসুস্থ আত্মপ্রকাশ। বালকদের ব্যাপারটা বোঝা গেল, কিন্তু গণ্য, মান্য ও বরেণ্যদের অনেকেই যে মদ খেতেন সেও তো মিথ্যা নয়। নীবন সেন তো জানালেনই খবর যে, ‘টেবিলে’ রবীন্দ্রনাথও ছিলেন। প্রাতস্মরণীয় রামমোহন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, দেবতুল্য রামতনু লাহিড়ী, মহাপ্রাণ হরিশচন্দ্র, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, এঁরা কেউই বাদ ছিলেন না। সুরাপান নিবারণীর কাজ যে মস্ত একটা সামাজিক কৃতিত্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে-খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু ব্যাখ্যা কি? কেন এই আসক্তি? একটি ব্যাখ্যা ইংরেজের অনুকরণ; অন্যটি, নবীন সেনের বক্তব্য সাক্ষী, নিষ্পিষ্ট হৃদয়কে মুক্তিদান। দুঃসাহস অন্য কোথাও তেমন দেখানো সম্ভব হয় নি, এখানে দেখানো হয়েছে পরোপুরি; যেন ক্ষতিপূরণও এক প্রকারের। চল্লিশের পর বঙ্কিমচন্দ্র মদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে অন্য এক সুরায় বিলক্ষণ আগ্রহ জন্মাতে শুরু করেছে তাঁর— ধর্মের সুরায়। শেষ জীবনে বঙ্কিমচন্দ্র এই মদে যে কি গভীরভাবে নিমজ্জিত ছিলেন তার প্রমান তাঁর কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব ও শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা গ্রন্থ, এবং তৎসহ ‘প্রচার’ পত্রিকা। ধর্মকে আফিম বলেছেন মার্কসবাদীরা, তা আফিম হিসেবে তাকে কাজ করতে যে দেখা যায় নি তা নয়; কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে আফিম নয় কেবল, মদ হিসেবেও কর্তব্যরত দেখি তাকে। আধ্যাত্মিক মদ্যপান জাগতিক গ্লানির চমৎকার ক্ষতিপূরণ। এই ক্ষতিপূরণের আসর ক্ষতি যা হবার হয়েছে ইহজাগতিকতার, তথা সমষ্টিগত অগ্রগতির। লাভ যা হয়েছে তা সামন্তবাদের।

কথাটা এই যে, হৃদয় বড় অসুবিধায় ছিল, গদ্য তাকে মুক্তি দিতে পারে নি, কেননা গদ্য নিজেও ছিল বন্দী, ওই শ্রেণীর-প্রহরায়। পরিখা, দেওয়াল, দারোয়ান, সব কিছুই নিয়োজিত ছিল গদ্যকে শাসন করার কাজে।

[কিয়দংশ]

তথ্যনির্দেশ

১. যেমন, প্রয়াত সুশোভন সরকার বলেছেন।

২. যেমন, স্যার যদুনাথ সরকারের সেই আত্মসন্তুষ্ট উক্তি :  It was truly a Renaissance, wider, deeper, and more revolutionary than that of Europe after the fall of Constantinople. Bengal had been despised and thrown into a corner in the Vedic age as the land birds (and not of men), in the epic age as outside the regions hallowed by the wandering feet of the Pandav brothers, and in the Mughal times as `a hell well-stocked with bread. `but now under the impact of the British civilization it became a path finder and light bringer to the rest of India. পলাশীর যুদ্ধের সেই বিশেষ সময়টিকে তিনি বলেছেন, it was the beginning, slow and unperceived, of a glorious dawn, the like of which the history of the world has not seen elsewhere. (Histrory of Bengal, vol. II 2nd edn, 1972), p. 498 স্মরণীয় যে এটি লেখা হয়েছে ১৯৪৭ এ।

৩. যেমন, বিনয় ঘোষের মত-পরিবর্তন; দেখুন, ‘বাংলার নবজাগৃতি’ (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭০)। ভিন্ন উল্লেখ না থাকলে সকল গ্রন্থের প্রকাশ-স্থান কলকাতা বোঝাবে)।

৪. ‘বাংলার জাতীয় সাহিত্য’, ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ অষ্টম খ-, ৪২০।

৫. ‘আধুনিক সাহিত্য বঙ্কিমচন্দ্র’, র.র, নবম খ-, পৃ. ৪০৯।

৬. সংস্কৃত কলেজের সম্ভাব্য পাঠ্যসূচী বিষয়ে বিদ্যাসাগরের বক্তব্য ছিল The creation of an enlightened Bengali literature should be the first object of those who are entrusted with the superintendence of education in Bengal.

উদ্ধৃত, বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ (১৯৭৩), পৃ. ৫১৬।

৭. ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা, র. র, তৃতীয় খ-, পৃ. ৬১৮।

৮. ‘বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস’, (চিরায়ত, ১৯৭৪), পৃ. ২।

৯. কাগজের কথাটাও উল্লেখযোগ্য; ছাপার কাগজও বিদেশ থেকেই এসেছে।

১০. তথ্যের জন্য দেখুন সবিতা চট্টোপাধ্যায়, ‘বাঙলা সাহিত্যে ইউরোপীয় লেখক’, (১৯৭২)।

১১. ‘নবীনচন্দ্র রচনাবলী’, ‘আমার জীবন’, তৃতীয় খ-, (১৯৫৯ সং), পৃ. ৬৫।

১২. ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন সমাজ’, (নিউ এজ, ১৯৫৭), পৃ. ১৫৭।

[উৎস : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, জুন ২০০৩ সংস্করণ]

***************************************

শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ
হুমায়ুন আজাদ

আধুনিক শিল্পকলার সূচনা-দশকগুলোতে এ-অভিনবজাতকের মুখোমুখি অত্যন্ত অসহায় বোধ করে প্রথাগত শিল্পকলাভ্যস্ত জনগণ, যেনো তাদের চোখের সামনে হঠাৎ হাজির হয়েছে এক দুরূহ-দুর্বোধ্য-অভাবিত স্ফিংস, যার কবিতা দুরূহ, সঙ্গীত দুর্জ্ঞেয়, চিত্রকলা দুর্বোধ্য। এতোদিন তারা কবিতা-সঙ্গীত-চিত্রকলার মতো ব্যাপারগুলো সম্ভোগ ক’রে এসেছে বেশ আরামে; কেউ কোন বাধা দেয় নি। কিন্তু আধুনিক শিল্পকলা নিজের আর সম্ভোগলিপ্সু জনগণের মধ্যে তুলে দেয় এক নিষ্ঠুর দেয়াল, যার নাম দুরূহতা। সাধারণ সম্ভোগীরা আধুনিক শিল্পকলার উদ্ধত দুরূহতায় প্রথমে অসহায়-আক্রান্ত-বিব্রত বোধ করে, পরে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। কেননা এ শিল্পকলা তাদের বোধ-বোধি-মেধা-অনুভূতিকে যারপরনাই অপমান করেছে। আধুনিক শিল্পকলার উন্মেষবিকাশের দশকগুলোতে যখন নতুন দেবতারা সৃষ্টি করে চলেছিলেন তাদের নতুন স্বর্গনরক, আর তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল সাধারণ শিল্পসম্ভোগীরা, তখন আধুনিক চিত্রকলার চারিত্র্য— তার দুুরূহতার ব্যাকরণ— ব্যাখ্যা ক’রে এক অনন্য অতুলনীয় দীর্ঘ রচনা লিখেছিলেন স্পেনীয় দার্শনিক-সমালোচক হোসে অর্তেগা ঈ গাসেৎ। তাঁর রচনাটি আজও অপরিচিত বাঙলা ভাষাঅঞ্চলে, অন্তত আমি যতটা জানি ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’ নামী ওই রচনাটি আজও অনুবাদিত হয় নি বাঙলা ভাষায়; এমনকি আধুনিক শিল্পকলার দুরূহতা সম্পর্কে গাসেতের ব্যাখ্যাও চোখে পড়ে নি বাংলা ভাষায় লেখা কোনো রচনায়। ছ-দশক আগে প্রকাশিত গাসেতের রচনাটির সাথে পরিচয় না থাকা দুর্ভাগ্যের কথা। খুব ভালো হতো যদি এ-দীর্ঘ রচনাটির একটি বিশ^স্ত অনুবাদ প্রকাশ করা যেতো, কিন্তু সে উদ্যোমের বিশেষ অভাব আমার। তাই এখানে আমি অর্তেগার বক্তব্য-ব্যাখ্যার সারাংশ লিপিবদ্ধ ক’রেই তৃপ্তি পেতে চাই। এ-সারাংশও হবে আমার রুচি অনুসারী, হয়তো অর্তেগার ব্যক্তিগতভাবে প্রিয় অনেক অংশ বাদ প’ড়ে যাবে, এবং কোথাও কোথাও প্রবল হয়ে উঠবে আমার নিজেরই ব্যাখ্যা। তাই এটিকে মনে করা যেতে পারে অর্তেগাভিত্তিক একটি নতুন রচনা বলে।

সব রকমের আধুনিক শিল্পকলাই অজনপ্রিয়। আধুনিক কবিতা বা নাটক বা সঙ্গীত বা চিত্রকলা বা শিল্পকলার অন্য যে-কোন শাখার কথাই ধরা যাক না কেনো, দেখা যাবে এরা অজনপ্রিয়। এদের জনপ্রিয়তা কোন আকস্মিক ঘটনা নয় বরং তা অবধারিত এবং নিয়তিবশত। কেউ কেউ হয়তো বলবেন যে শিল্পকলার জগতে যে-কোন নবাগতকেই যাপন করতে হয় একটা সঙ্গরোধতার কাল। এ-প্রসঙ্গে অনেকেরই মনে পড়বে এরনানিকে ঘিরে কলহের কথা, রোম্যানটিসিজমের উদ্ভববিকাশের সময়ের নানা গোলযোগের কাহিনী। তবে আজকালকার শিল্পকলার অজনপ্রিয়তা ভিন্ন রকমের। কী জনপ্রিয় আর কী অজনপ্রিয় তার মাঝে একটা স্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করা দরকার। একটা নতুন রচনা বা শিল্প-রীতি জনপ্রিয়তা আয় করতে সাধারনত কিছু সময় নিয়ে থাকে। এ-সময়ে এটা জনপ্রিয় নয়, তবে একে অজনপ্রিয়ও বলা চলে না। রোম্যানটিসিজমের উদ্ভব ও বিকাশের সময়ের পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি বিরাজ করছে আজকাল। রোম্যানটিসিজম বেশ তাড়াতাড়িই জয় করে নিয়েছিলো জনগণকে, যাদের কাছে পুরোনো ধ্রুপদী শিল্পকলা কখনোই কোনো আবেদন জাগাতে পারে নি। রোম্যানটিসিজমের শত্রুরা ছিল মুষ্টিমেয়। মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কারের পর প্রথম বহুসংস্করণ জুটেছিল রোম্যানটিকদের ভাগ্যেই। রোম্যানটিসিজম ছিলো জনপ্রিয় শিল্পরীতির আদিরূপ। রোম্যানটিসিজম, গণতন্ত্রের প্রথম সন্তান, জনতা বা জনগণের ¯েœহ-আদর পেয়েছে ভালোভাবেই।

অন্যদিকে আধুনিক শিল্পকলা জনতা বা জনম-লিকে সব সময়ই পাবে বিরোধীরূপে। কারণ, তা অনিবার্যভাবেই অজনপ্রিয়, উপরন্তু তা জনপ্রিয়তাবৈরী। আধুনিক যে-কোনো শিল্পসৃষ্টিই সাধারণ জনম-লির মনে জন্ম দেয় এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া। এ-শিল্পকলা জনম-লিকে ভাগ ক’রে দেয় দু-গোত্রে; পাওয়া যায় একটি ক্ষুদ্র গোত্র, যা গঠিত মুষ্টিমেয় অনুরাগীতে, এবং একটি বড়ো গোত্র, যাতে যূথবদ্ধ শত্রুতাপরায়ণ সংখ্যাগরিষ্ঠরা। তাই এ-শিল্পকলা কাজ করে এক সামাজিক অনুঘটকের মতো, যা নিরাবয়ব নিরাকার অসংখ্যকে বিভক্ত করে দুটি পৃথক মানবগোত্রে। তবে কী সে-সূত্র বা নীতি, যা এ-দুটি পরস্পরবৈরী গোত্রের জননী? প্রতিটি শিল্পসৃষ্টিই জাগায় মতপার্থক্য; কেউ কেউ তা পছন্দ করে, কেউ কেউ করে না। কেউ কেউ বেশি পছন্দ করে, কেউ কেউ কম। তবে এমন মতপার্থক্যের মূলে কোনো নীতি বা সূত্র নেই, বিভিন্ন ব্যক্তির আকস্মিক রুচি অনুসারে কোনো শিল্পকর্ম পছন্দ হয় বা হয় না। কিন্তু আধুনিক শিল্পকলার ব্যাপারে যে-গোত্রভাগ ঘটে, তা ব্যক্তিগত রুচিভিন্নতার থেকে অনেক গভীরস্তরীয় ব্যাপার। এমন নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা তরুণদের শিল্পকলা পছন্দ করে না, আর সংখ্যালঘিষ্ঠরা পছন্দ করে। আসল ব্যাপার হচ্ছে অধিকাংশ মানুষ, জনম-লি এ-শিল্পকলা বুঝতে পারে না। সমস্যাটি বোঝা ও না-বোঝার; ব্যক্তিগত বা গোত্রগত রুচি বা নীতির নয়। উগোর এরনানির বিরুদ্ধে যারা হৈচৈ করেছিলো, তারা নাটকটি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলো, এবং পেরেছিলো ব’লেই তারা অপছন্দ করেছিলো নাটকটিকে।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আধুনিক শিল্পকলার যে-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি চোখে পড়ে সহজে, তা হচ্ছে এ-শিল্পকলা জনগণকে ভাগ ক’রে দেয় দু’ভাগে। একভাগ বুঝতে পারে এ-শিল্পকলা, আরেকভাগ বুঝতে পারে না। এর মানে একটি গোত্রের রয়েছে এমন শক্তি, যা অন্য গোত্রটির নেই। তাই তারা মানবপ্রজাতির দুটি ভিন্ন উপগোত্র। আধুনিক শিল্পকলার লক্ষ্য রোম্যানটিসিজমের মতো সমগ্র জনম-লি নয়; বরং বিশেষ শক্তিসম্পন্ন সংখ্যালঘু একটি গোত্রকে লক্ষ্যে রেখেই সৃষ্টি করা হয় আধুনিক কবিতা বা নাটক বা চিত্রকলা। তাই এ শিল্পকলার প্রতি রুষ্ট হয়ে ওঠে জনম-লি। যখন কেউ কোনো একটি শিল্পকর্ম বুঝতে পারে, বুঝেসুঝে অপছন্দ করে, তখন সে নিজেকে উন্নততর বোধ করে শিল্পকর্মটি ও তার ¯্রষ্টার থেকে। তাই তার ক্রোধ জাগার কোনো কারণই ঘটে না। কিন্তু যখন সে শুধু বুঝতে না পারার জন্যই অপছন্দ করে কোনো শিল্পসৃষ্টিকে, তখন সে অপমানিত বোধ করে গোপনে; তখন তার মনে জন্ম নেয় হীনম্মন্যতা, আর ওই হীনম্মন্যতাবোধটুকু লুকোনোর জন্য সে ব্যবহার করে তার ক্রোধকে। একজন বন্দে আলী মিয়ার রচনাকে হয়তো অপছন্দ করে অনেকেই, কেননা তারা ওই রচনা ভালোভাবেই বুঝতে পারে, এবং বুঝতে পারে যে ওই রচনা তুচ্ছ। এতে পাঠক সহজেই একরকম আত্মতৃপ্তি বোধ করে, নিজেকে অধিকতর প্রতিভাবান গণ্য করে ওই লেখকের চেয়ে; কেননা ইচ্ছে করলে তারাও ওই সহজে ওই রচনার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু লিখতে পারতো। কিন্তু একজন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মুখোমুখি পাঠকের এমন তৃপ্তির অবকাশ ঘটে না। পাঠক তাঁর মুখোমুখি নিজেকে বোধ করে অসহায় ও সামান্য, যেনো তার মস্তিষ্কের কোনো অংশ রয়ে গেছে এখনো অবিকশিত। তখন একরকম হীনতাবোধ দ্বারা আক্রান্ত হয় সে, এবং ক্রমশ সুধীন্দ্রনাথকে গণ্য করতে থাকে নিজের শত্রু ব’লে। আধুনিক শিল্পকলা অধিকাংশ মানুষকে বুঝতে বাধ্য করে তারা কী, অর্থাৎ তারা নিখাদ সাধারণ মানুষ— এমন একধরণের প্রাণী, যারা শিল্পকলার মন্ত্র অনুধাবনের শক্তিরহিত, বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের কাছে যারা অন্ধ ও বধির। কিন্তু জনগণ কেনো সহ্য করবে এমন অপমান, যারা শতবর্ষ ধ’রে লাভ ক’রে আসছে নানারকম স্তব আর স্তুতি? তারা তো শতবর্ষ ধরে শাসন করে আসছে সবকিছু, আর এখন বহিষ্কৃত হবে সে-অধিকার থেকে? তাই জনগণ বোধ করতে থাকে যে এ-নতুন শিল্পকলা, যা সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ানুভূতিসম্পন্ন একটি ক্ষুদ্র গোত্রের শিল্পকলা, মানুষ হিসেবে তাদের অধিকারকেই বিপন্ন ক’রে তুলেছে। তাই যেখানেই একটু আত্মপ্রকাশ করে নতুন শিল্পকলা, সেখানেই শোনা যায় জনম-লির কোলাহল-চিৎকার।

আধুনিক শিল্পকলা যে আপামর সাধারণ উপভোগ করতে পারে না এতে বোঝা যায় যে এর প্রেরণাপুঞ্জ সর্বজনীনভাবে মানবিক নয়। সকলের জন্যে এ-শিল্প নয়, বরং একটি বিশেষ গোত্রের জন্যে। এ-গোত্রটি উৎকৃষ্টতর নাও হতে পারে, তবে সুস্পষ্টভাবে স্বতন্ত্র। একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার ক’রে নেয়া দরকার। নান্দনিক সুখানুভূতি বা আনন্দ বলতে কী বুঝে থাকে অধিকাংশ মানুষ? যখন তারা কোনো একটি শিল্পকর্ম, কবিতা বা গ্রন্থ বা নাট্যাভিনয় ‘পছন্দ’ করে, তখন কী ঘটে তাদের চিত্তে? এর উত্তর কঠিন নয়, বরং বেশ সহজ। সাধারণ জনম-লি কোনো নাটক বা উপন্যাস তখনি পছন্দ করে, যখন ওই নাটকে বা উপন্যাসে উপস্থাপিত মানবিক নিয়তি আকর্ষণ করে তাদের। যখন পাত্রপাত্রীদের প্রেম-ঘৃণা, আনন্দ-বেদনা তাদের চিত্তকে আলোড়িত করে এবং তারা নিজেরা তাতে এমনভাবে অংশ নেয় যেনো ওই সব ঘটনা সত্যিকার বাস্তব জীবনে ঘটেছে। তখনই তারা কোনো নাটক বা উপন্যাসকে ‘ভালো’ বলে, যখন তাদের কাছে এমন প্রতিভাস সৃষ্টি হয় যে ওই নরনারীরা বাস্তবেরই পাত্রপাত্রী। কবিতায় তারা খোঁজে কবির আড়ালে আছে যে-ব্যক্তিটি, তার ব্যক্তিগত বেদনা ও সংরাগ। সে-সব চিত্রকলা পছন্দ করে তারা, যাতে তারা পায় এমন সব নরনারীর প্রতিকৃতি, যাদের সাক্ষাৎ পেলে বাস্তব জীবনে তারা আনন্দ পেতো। তাই অধিকাংশ মানুষ নান্দনিক সুখানুভূতি বলতে বোঝে চিত্তের এমন এক অবস্থা, যা তাদের প্রাত্যহিত আচরণের সাথে অভিন্ন। শিল্পকলায় তারা খুঁজে ফেরে বাস্তব জীবনকেই— বাস্তব জীবনের সুখদুঃখ, আনন্দবেদনা, ভাবাবেগ-ভাবালুতা। অর্থাৎ যার প্রতি তাদের সমস্ত মানসিক সক্রিয়তা চালিত হয়, তা দৈনন্দিন জীবনের সাথে অভিন্ন। তা হচ্ছে মানুষ ও তাদের সংরাগ। শিল্পকলা তাদের কাছে এমন এক সামগ্রী, যা তাদের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেয় আকর্ষণীয় মানবিক ক্রিয়াকলাপের সাথে। কিন্তু যে শিল্পকলায় প্রাধান্য ছড়াতে থাকে নান্দনিক উপাদানরাশি, অন্তর্হিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের উপভোগ্য ব্যাপারস্যাপার, অমনি অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে তারা, এবং বিমূঢ় হয়ে পড়ে কিছু বুঝতে না পেরে। যেহেতু তারা ব্যবহারিক প্রবণতা ছাড়া আর কিছুই চর্চা করে নি, তাই সে-শিল্পধর্ম, যা তাদের ভাবাবেগ-ভাবালুতা জাগিয়ে তোলে না, তাতে তারা খেই হারিয়ে ফেলে। অধিকাংশ মানুষ গ্রন্থেও পাত্রপাত্রীদের বেদনায় অশ্রুভারাতুর হ’তে ভালোবাসে আর সুখ পায়, এবং পাত্রপাত্রীদের আনন্দে হয়ে ওঠে উল্লসিত। তবে এ-আনন্দবেদনা প্রকৃত শৈল্পিক সুখানুভূতি থেকে অত্যন্ত পৃথক। শিল্পকলার মানবিক উপাদানে আবিষ্ট থাকা অসমঞ্জস প্রকৃত নান্দনিক আনন্দানুভূতির সাথে। তাই অধিকাংশ মানুষ নান্দনিক সুখানুভূতি উপভোগে ব্যর্থ হয়, আনন্দ আহরণ করে শুধু মানবিক উপাদানের ভাবাবেগ থেকে। জনপ্রিয় উপন্যাস বা নাটক বা কবিতায় তারা মানবিক উপাদানের স্বাদ পায় প্রাণ ভ’রে, আর শিল্পকলা উপভোগের নামে ভোগ করে শুধু স্বল্পমূল্য আবেগ।

এখানে রয়েছে একটি সহজ-সরল দৃকসমস্যা। কোনো কিছু দেখার জন্যে বিশেষভাবে পাত করতে হয় আমাদের দৃষ্টি। ঠিক মতো দৃষ্টিপাত না করলে বস্তুটি হয়তো দেখা যাবে অস্পষ্টভাবে বা দেখাই যাবে না। ধরা যাক কাচের জানালার ভেতর দিয়ে দেখা কোনো বাগানের কথা। বাগানটি দেখার জন্যে চোখ এমনভাবে ফেলতে হবে, যাতে জানালার ভেতর দিয়ে দৃষ্টিরশ্মি অবলীয়ায় চলে যেতে পারে, এবং অবিলম্বে গিয়ে পড়ে বাগানের লতাগুল্ম পুষ্পরাশির ওপর। যেহেতু বাগানটিকে দেখতে চাই এবং আমাদের চোখ নিপতিত ওটিরই ওপর, তাই আমরা জানালাটিকে দেখি না। জানালার ভেতর দিয়ে দেখি বাগানটিকে। তবে ইচ্ছে করলে আমরা বাগানটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারি, দৃষ্টি ফেলতে ও দেখতে পারি জানালাটিকে। তখন আমাদের চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যায় বাগানটি; শুধু জানালার কাচে লেগে থাকে বাগানের উদ্ভিদ-পুষ্পের অস্বচ্ছ বর্ণালি। তাই বাগান আর জানালা দেখা দুটি ভিন্ন ব্যাপার; কারণ তাতে দরকার দৃষ্টির দু-রকম বিন্যাস। একইভাবে যখন কেউ কোনো শিল্পকর্মে শুধু দেখতে চায় জন ও মেরি বা ট্রিস্টান ও ইজোলডের হৃদয়-মন-অভিভূত করা ভাগ্য, তখন সে এমনভাবে তার দৃষ্টি বিন্যস্ত করে যে তার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যায় শিল্পকর্মটি। তার মন দখল ক’রে থাকে শুধু ওই পাত্রপাত্রীদের আনন্দবেদনা। ট্রিস্টানের বেদনা যতোটুকু সত্য বা বাস্তব ব’লে মনে হয় তার কাছে, শুধু সেইটুকু তার মনে জাগিয়ে তোলে আলোড়ন। কিন্তু কোনো শিল্পকর্ম ততোটুকুই শৈল্পিক, তার যতোটুকু অ-বাস্তব বা অ-সত্য। টিশিয়ানের আঁকা অশ^ারোহী পঞ্চম চার্লসের চিত্রটি উপভোগ করতে হ’লে আমাদের ভুলে যেতে হবে যে ওটি পঞ্চম চার্লসের চিত্র। এটিকে মনে করতে হবে একটি প্রতিকৃতি বা চিত্র অর্থাৎ সৃষ্টি সামগ্রী। চিত্রিত ব্যক্তি ও তার চিত্র দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিশ। আমরা এ-দুটির যে-কোনো একটির প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে পারি। যদি ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণ বোধ করি, তাহলে আমরা জীবন যাপন করি তারই সাথে, আর যদি আকৃষ্ট হই চিত্রটিরই প্রতি, তাহলে আমরা অবলোকন করি একটি শিল্পকর্ম। বেশি লোক বাগানকে এড়িয়ে জানালার ওপর নিবদ্ধ করতে পারে না তাদের দৃষ্টি, অর্থাৎ তারা শিল্পকে দেখতে পায় না। তার বদলে তারা এর ভেতর দিয়ে সরাসরি তাকায় এবং শিল্পকর্মটির মানবিক উপাদানে জড়িয়ে পড়ে। যখন তাদের ওই মানবিক উপাদানটুকু বাদ দিয়ে শিল্পকলার ওপর চোখ ফেলতে বলা হয়, তারা জানায় যে অমন কিছু দেখতে পায় না তারা। সত্যিই তারা দেখতে পায় না; কারণ তার সবটাই শৈল্পিক স্বচ্ছতা— যা দেখা যায় না; কারণ তার ভেতর দিয়ে দৃষ্টি অন্যত্র চ’লে যায়— এবং বিষয়বস্তুহীন।

সারা উনিশশতক ভ’রে শিল্পীরা এগিয়েছিলেন অবিশুদ্ধ রীতিতে। তাঁরা শিল্পকর্মে নান্দনিক উপাদান কমিয়ে এনেছিলেন চরমভাবে, এবং মানবিক উপাদানে ভরিয়ে দিয়েছিলেন তার সবটা। এ-অর্থে উনিশশতকের সমস্ত স্বাভাবিক শিল্পকলাই বাস্তবধর্মী। বিটোফেন ও হ্বাগনার বাস্তবধর্মী, আর শাতোব্রায়াঁ ও জোলাও তাই। এ-ধরনের রচনা শুধু অংশত শিল্পকর্ম বা শৈল্পিক বস্তু। এগুলো ভোগ করার জন্যে খাঁটি শৈল্পিক সংবেদনশীলতার দরকার হয় না; যা দরকার, তা হচ্ছে মানবিক সংবেদনশীলতা ও আমাদের প্রতিবেশীদের সুখদুঃখে সহানুভূতি জানানোর ইচ্ছে। তাই উনিশশতকী শিল্পকলা জনপ্রিয় হয়েছিলো, তা তৈরি হয়েছিল জনম-লির জন্যে। তা যতখানি জীবনখ- ছিলো, ততোখানি শিল্পকলা ছিলো না। মনে রাখা ভালো যদি কোনো কালে দেখা দেয় দু-ধরণের শিল্পকলা, যার একটি সংখ্যালঘুদের অপরটি সংখ্যাগুরুদের জন্যে, তাহলে সংখ্যাগুরুদের জন্যে রচিত শিল্পকলাকে অবশ্যই হতে হবে বাস্তবধর্মী। এখানে প্রশ্ন উঠবে— বিশুদ্ধ শিল্পকলা কি সম্ভব? হয়তো সম্ভব নয়। তবে বিশুদ্ধ শিল্পকলা যদি অসম্ভবও হয়, তাহলেও একটি প্রবণতা থাকতে পারে, যার লক্ষ্য শিল্পকলার বিশুদ্ধিসাধন। এ-প্রবণতা ক্রমিকভাবে কমিয়ে আনে শিল্পকলায় মানবিক উপাদানের প্রাধান্য। অথচ রোম্যানটিক ও প্রাকৃতবাদী শিল্পকলায় ছিলো মানবিক উপাদানেরই প্রাবল্য-প্রাধান্য। এ-প্রক্রিয়ায় এমন হ’তে পারে যে শিল্পকলা থেকে মানবিক আধেয় এতো কমে যেতে পারে যে তা আর চোখেই পড়বে না। এর ফলে জন্ম নিতে পারে এমন শিল্পকলা, যা বোধগম্য শুধু সেই স্বল্পসংখ্যকের কাছে, যারা শৈল্পিক সংবেদনশীলতাঋদ্ধ। এ-শিল্পকলা জনম-লির জন্যে নয়, শিল্পীদের জন্যে।

এভাবেই আধুনিক শিল্পকলা জনসাধারণকে ভাগ করে দেয় দু-শ্রেণীতে— যারা এ-শিল্পকলা বোঝে ও যারা বোঝে না; অর্থাৎ যারা শিল্পী ও যারা শিল্পী নয়। নতুন শিল্পকলা শৈল্পিক শিল্পকলা। এর প্রশংসা আর পুরোনো শিল্পকলার নিন্দে করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি চাই শুধু তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে। নতুন শিল্পকলা এখন একটি বিশ^জনীন ব্যাপার। এর ¯্রষ্টারা বুঝতে পেরেছেন যে প্রথাগত শিল্পকলা তাঁদের জন্য নয়। উপরন্তু তাঁরা বিরক্ত প্রথাগত শিল্পকলার প্রতি। এ-তরুণ শিল্পীদের আমরা খুন করতে পারি বা পারি অনুধাবনের চেষ্টা করতে। যেই আমরা তাঁদের বোঝার বা অনুধাবনের উদ্যোগ নিই, তখন ধরা পড়ে যে তাঁরা পোষেন এক সুস্পষ্ট, সুসমঞ্জস্য ও যৌক্তিক শিল্পবোধ। শিল্পকলার পুনরাবৃত্তির কোনো মূল্য নেই। প্রতিটি শৈল্পিক ধারা একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন কোনো পুরোনো ধারা নিঃশেষ হয়ে যায় তখন নতুন ধারার উদ্ভবকে ভাগ্য বলেই মানা উচিত। আধুনিক শিল্পকলার বিশ্লেষণ করলে ধরা পড়ে যে এর একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়া।

এখন একটু প্রপঞ্চবিজ্ঞান চর্চা করতে চাই। মনে করা যাক একজন বিখ্যাত ব্যক্তি মারা যাচ্ছেন। তাঁর পাশে বসে আছেন তাঁর শোকাতুরা স্ত্রী, আর একজন চিকিৎসক পরীক্ষা করছেন নাড়ি। এছাড়াও আছেন আরো দু-ব্যক্তি: পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্যে সেখানে উপস্থিত একজন সংবাদদাতা, এবং আকস্মিকভাবে সেখানে উপস্থিত রয়েছেন একজন চিত্রকর। তাঁরা চারজন— স্ত্রী, চিকিৎসক, সংবাদদাতা, চিত্রকর— দেখছেন একই ঘটনা, তবু একই ঘটনা তাঁদের নাড়া দিচ্ছে বিভিন্নভাবে। শোকাতুরা বিহ্বল স্ত্রীর কাছে এ-ঘটনার, বিখ্যাত ব্যক্তিটির মৃত্যুর, যে-তাৎপর্য, তার সাথে সামান্যই মিল আছে চিত্রকরের কাছে প্রতিভাত তাৎপর্যের। স্ত্রী ঘটনাটিকে দেখছেন ব্যক্তিকভাবে আর চিত্রকর দেখেছেন নৈর্ব্যক্তিকভাবে। তাঁদের দৃষ্টি এতো ভিন্ন যে সন্দেহ হতে পারে তাঁরা দুজন একই ঘটনাস্থলে উপস্থিত কি না। তাই একই বাস্তবতা বা সত্য বিভিন্ন বাস্তবতা বা সত্যে বিশ্লিষ্ট হয়ে যেতে পারে যখন তার প্রতি তাকানো হয় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই মনে প্রশ্ন জাগে— এসব বাস্তবতার মধ্যে কোনটিকে গ্রহণ করবো সত্য ও প্রামাণিক ব’লে? এর উত্তর হবে স্বেচ্ছাচারী। নিজনিজ খেয়াল অনুসারেই আমরা কোন একটিকে সত্য ব’লে মেনে নেবো। এ-বাস্তবতারাশি সমতুল্য; তবে এদের প্রতিটি প্রকৃত বা প্রামাণিক বিশেষ বিশেষ দৃষ্টিকোণের নিকট। কথিত বিখ্যাত ব্যক্তিটির মৃত্যুশয্যায় চারজন ব্যক্তি চার দৃষ্টিকোণ নিয়ে উপস্থিত। তাঁদের চারজনের দৃষ্টিকোণের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার জন্যে প্রয়োগ করতে পারি একটি মানদ-। তা হচ্ছে মৃত্যুর ঘটনাটির সাথে তাঁদের আবেগিক দূরত্বের মাত্রা। ওই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ও তাঁর শোকাতুরা স্ত্রীর মধ্যে কোনো আবেগিক দূরত্ব নেই,— ঘটনাটি তাঁকে এতটা পীড়ন করেছে, তাঁর মনকে এতটা নিমগ্ন করে রাখছে ঘটনার মধ্যে যে তিনি অভিন্ন হয়ে উঠেছেন মৃত্যুপথযাত্রীর সাথে। তিনি ওই ঘটনার অংশ। কোনো কিছু দেখতে হ’লে তাঁর থেকে দর্শককে থাকতে হবে একটু দূরে। কিন্তু এখানে স্ত্রী ঘটনা থেকে দূরস্থিত নন;— তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত নন, তিনি অবস্থিত ঘটনার অভ্যন্তরে। তাই তিনি ঘটনাটি দেখছেন না; তিনি ‘যাপন’ করছেন ঘটনাটি।

চিকিৎসক অবস্থিত বেশ খানিকটা দূরে। তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি ওই শোকভারাতুর মহিলার মতো ঘটনার অংশ হয়ে পড়েন নি। তবে চিকিৎসক হিশেবে দায়িত্ব পালনের জন্যে, আপন পেশার মহিমা রক্ষার জন্যে তিনিও কিছু পরিমাণে অংশ নেন ওই ঘটনায়। তিনি ওই ঘটনায় হৃদয়াবেগের সাথে জড়িত নন, তবে পেশাগতভাবে জড়িত। তিনিও কিছুটা ‘যাপন’ করেন ওই ঘটনা, তবে আবেগ নয়, পেশাগতভাবে। সাংবাদিকটির দিকে তাকালে দেখি তিনি সুদূরে অবস্থিত ওই বিয়োগান্তক ঘটনা থেকে। তাঁর মনে কোনো আবেগ নেই। সাংবাদিক এ-ঘটনাস্থলে কোনো মানবিক উৎসাহে নয়, পেশাগত কারণেই হাজির হয়েছেন ঘটনাস্থলে। তবে চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য আছে। চিকিৎসকের পেশা চিকিৎসকের ঘটনার অংশ হ’তে বাধ্য করে, আর সাংবাদিকের পেশা সাংবাদিককে বাধ্য করে দূরে থাকতে, পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিতে। তাঁর কাছে এটি একটি ঘটনামাত্র, যা সম্পর্কে তিনি পত্রিকায় প্রকাশ করবেন একটি প্রতিবেদন। ঘটনায় তিনি আবেগিক অংশ নেন না, আবেগগতভাবে মুক্ত তিনি; ঘটনাস্থলে তিনি একজন বহিরস্থিত। তিনি ঘটনাটি ‘যাপন’ করেন না, পর্যবেক্ষণ করেন। তবে পাঠকের মনে কিছুটা আবেগবেদনা সঞ্চারিত সংক্রামিত ক’রে দেয়ার বাসনা আছে তাঁর মনে। তিনি পাঠকদের আকৃষ্ট, আলোড়িত, এমনকি অশ্রুভারাতুরও ক’রে দিতে চান যেনো তাঁরা একজন প্রিয়জনের বিয়োগবেদনা বোধ করতে পারে। হোরেসের বিখ্যাত পরামর্শটি  তাঁর জানা যে কাউকে কাঁদাতে হলে প্রথমে নিজে কাঁদতে হবে। তাই সাংবাদিক আবেগাভিনয় করেন এ আশায় যে এতে তাঁর প্রতিবেদন সাহিত্যরসসমৃদ্ধ হবে। যদিও তিনি ঘটনাটি ‘যাপন’ করেন না, তবুও তিনি ভান করেন ঘটনাটি ‘যাপনের’।

চিত্রকর ওই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তিনি ওই ঘটনা থেকে যেনো শতক্রোশ দূরবর্তী। ঘটনার আবেগ তাঁকে আলোড়িত করে না, তিনি একজন নিরাসক্ত-নৈর্ব্যক্তিক দর্শক। ঘটনার বিয়োগান্তক আন্তর তাৎপর্য তাঁর চোখে পড়ে না; তাঁর সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ শুধুমাত্র দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তুরাশির ওপর— বর্ণ, আলো ও ছায়ার ওপর। তাই চিত্রকর ওই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও ঘটনা থেকে তিনি সবচেয়ে দূরবর্তী ও সবচেয়ে কম আবেগে আলোড়িত।

ওপরে চেষ্টা করা হয়েছে বাস্তবতা ও আমাদের মধ্যে দূরত্ব নির্ণয়ের। আবেগগতভাবে কোনো ঘটনায় আমরা যতোটা অংশ নিই ততোটা অংশ হয়ে পড়ি ঘটনার, আর যতটা দূরে থাকি আবেগগতভাবে ততোটাই নিজেদের মুক্ত ক’রে নিই ঘটনা থেকে। তখন আমাদের কাছে বাস্তব ঘটনাটি হয়ে ওঠে পর্যবেক্ষণের বস্তু। এর একদিকে আছে বাস্তব জগৎ— ব্যক্তি, বস্তু, পরিস্থিতি, অর্থাৎ যাপিত বাস্তবতা, আর অন্যদিকে রয়েছে পর্যবেক্ষিত বাস্তবতা। বিভিন্ন ধরণের বাস্তবতার মূলে রয়েছে যাপিত বাস্তবতা; অন্যান্য বাস্তবতা এ-যাপিত বাস্তবতা থেকে উৎসারিত। যাপিত বাস্তবতার সাথে যদি পরিচয় না থাকতো তাহলে তার কোনো বর্ণনা বা প্রতিকৃতিই বোধগম্য হতো না আমাদের। যে-চিত্রে বা কবিতায় যাপিত বাস্তবতার সামান্য চিহ্নও নেই, তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অবোধ্য ও অর্থহীন। তাই বাস্তবতার মাত্রারাশির মধ্যে যাপিত বাস্তবতাই প্রধান, আর একেই আমরা গণ্য করি ‘বাস্তবতা’ রূপে। যাপিত বাস্তবতাকে মানবিক বাস্তবতাও বলা যায়। যে-চিত্রকর নৈর্ব্যক্তিকভাবে মৃত্যুদৃশ্য দেখেন, তাঁকে ‘অমানবিক’ বলে মনে হবে।

আধুনিক চিত্রকলা বিস্ময়কর দ্রুততায় এগিয়ে চলেছে বিভিন্ন পথে, তবে তার রয়েছে এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আধুনিক চিত্রকলায় প্রধান হয়ে উঠেছে এক নতুন শৈল্পিক সংবেদনশীলতা। যখন আধুনিক চিত্রকলার সবচেয়ে সাধারণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে উদ্যোগী হই, তখন দেখতে পাই যে এতে বড়ো হয়ে উঠেছে বিমানবিকীকরণপ্রবণতা। ১৮৬০-এর একটি চিত্রের দিকে তাকালে ধরা পড়ে যে চিত্রকর চিত্রটিতে আঁকা বস্তুসমূহকে এমনভাবে উপস্থাপিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন যাতে তা অবিকল তেমন থাকে, যেমন ছিল যাপিত বা মানবিক বাস্তবতায়। অর্থাৎ তিনি চেষ্টা করেছেন অবিকল সাদৃশ্য প্রতিষ্ঠার। ওই চিত্রের মানুষ, গৃহ, পাহাড় মুহূর্তের মধ্যে চেনা যায়, অনেক দিনের বান্ধব তারা আমাদের। কিন্তু একটি আধুনিক চিত্রে ওগুলোকে চিনতে কষ্ট হয়। আধুনিক শিল্পী বাস্তবকে অবিকল আঁকতে পারেন নি ব’লে যে এমন হয়, তা নয়, বরং এমন হয় কারণ তিনি যাত্রা করেছেন বাস্তবের বিপরীত অভিমুখে। বাস্তবের দিকে যাওয়ার বদলে যাচ্ছেন তিনি বাস্তবের বিপরীতে। তিনি বাস্তবকে ভাঙছেন, চুরমার করছেন তার মানবিক উপাদান, করছেন বাস্তবের বিমানবিকীকরণ। প্রথাগত চিত্রকলায় উপস্থাপিত অনেক কিছুর সাথেই কাল্পনিক সম্পর্ক পাতাতে পারি আমরা, প্রেমে পড়তে পারি কারো কারো; কিন্তু আধুনিক চিত্রে কারো সাথে এমন সম্পর্ক পাতানো অসম্ভব। কারণ আধুনিক শিল্পী তাদের সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন ক’রে এনেছেন যাপিক বাস্তবতা থেকে, তাই তাদের আশ্রয় ক’রে আমরা কিছুতেই পৌঁছাতে পারি না চেনাজানা প্রাত্যহিক মানবিক জীবনে। আধুনিক শিল্পী আমাদের বন্দী করেন এক দুর্বোধ্য বিশ^লোকে, যেখানে ছড়িয়ে আছে এমন সব বস্তুরাজি, যাদের সাথে মানবিক যোগাযোগ অকল্পনীয়। তাই তাদের সাথে গড়ে তুলতে হয় যোগাযোগের ভিন্ন রীতি, যা বস্তুর সাথে আমাদের প্রথাগত সম্পর্করীতি থেকে আপাদশির ভিন্ন। এই যে নতুন জীবন-রীতি, যাতে লুপ্ত হয়ে যায় স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত জীবন, তাকে বলা যেতে পারে শিল্পবোধ ও শিল্পসম্ভোগ। এ-জীবনে যে আবেগ ও সংরাগ নেই, তা নয়, তবে এ-আবেগ ও সংরাগ আমাদের মানবিক জীবনের আবেগ-সংরাগ থেকে ভিন্ন। এ-অতিবস্তুরাশি আমাদের আন্তর শিল্পীর মনে জাগায় দ্বিতীয় একধরণের সংরাগ। ওগুলোই বিশেষভাবে নান্দনিক আবেগঅনুভূতি।

কেউ কেউ পারেন এ-ফলাফল লাভের সহজ উপায় তো মানবিক রূপ-আকার-আকৃতি— মানুষ, গৃহ, পাহাড়, অরণ্য প্রভৃতি একেবারে বাদ দেয়া, এবং এর বদলে গ’ড়ে তোলা সম্পূর্ণরূপে অভিনব মৌলিক আকার-আকৃতি-রূপ। কিন্তু তা সম্ভব নয়। এমনকি চরম বিমূর্ততম রেখায়ও লেগে থাকে কোনো-না-কোনো স্বাভাবিক আকার-আকৃতির ইশারা। তাছাড়া আধুনিক শিল্পকলা যে অমানবিক, তা শুধু এ-কারণে নয় যে এতে কোনো মানবিক উপাদান নেই, বরং এ-কারণে যে এটি এক সুস্পষ্ট বিমানবিকীকরণ ক্রিয়া। শিল্পী মানুষ, পাহাড়, গৃহ থেকে একেবারে ভিন্ন কিছু আঁকছেন বা আঁকবেন, এটা বড়ো কথা নয়, কথা হচ্ছে তিনি আঁকছেন এমন মানুষ, যার সাথে মানুষের সাদৃশ্য যথাসম্ভব স্বল্প, আঁকছেন এমন গৃহ বা পাহাড়, যাদের সাথে বাস্তব গৃহ বা পাহাড়ের রয়েছে ক্ষীণতর সাদৃশ্য। আধুনিক শিল্পী মানবিক উপাদানের ওপর এমন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ক’রেই আহরণ করেন নান্দনিক সুখানুভূতি। অনেকের কাছে মনে হ’তে পারে যে বাস্তবতাকে এমনভাবে জয় করা বেশ সহজ, কিন্তু আসলে তা নয়। সম্পূর্ণ নিরর্থক ছবি আঁকা বা কথা বলা কঠিন কাজ নয়; আসত্তিহীন শব্দ ও এলোমেলো রেখা সাজালেই তা হ’তে পারে। কিন্তু এমন কিছু সৃষ্টি করা, যা ‘প্রকৃতি’র নকল নয় অথচ বহন করে তার সারসত্তা, তার জন্যে দরকার প্রতিভা।

উনিশশতকের অনুগ্রহ পাওয়া শিল্পকলা সব সময়ই ধারণ করেছে যাপিত বাস্তবতার এমন একটি শাঁস, যা কাজ করেছে নান্দনিক সুখানুভূতির মূলরূপে। অধিকাংশ মানুষের কাছে মানবিক উপাদান উপভোগ করাই হচ্ছে নান্দনিক সুখানুভূতি। তাদের কাছে শিল্পকলা হচ্ছে প্রতিফলিত জীবন, বিশেষ মেজাজে প্রকৃতিকে দেখা বা মানবভাগ্যের উপস্থাপন। কিন্তু নবশিল্পীরা বিশ^াস করেন এর বিপরীতে। যাপিত বাস্তবকে উপভোগ করা প্রকৃত শিল্পসম্ভোগ নয়; তা একরকম প্রতারণা, অথচ উনিশশতক তার মাঝেই ঘোরাফেরা করেছে। শিল্পকলার সমস্ত মহৎ যুগই চেষ্টা করেছে যাতে তাদের শিল্পসৃষ্টি মানবিক উপাদানকে ঘিরেই আবর্তিত না হয়। আধুনিক শিল্পীরা ওই জীবন ছেড়ে চলেছেন শিল্পের মহিমাম-িত সরণীতে। আর এ-জন্যেই তাঁরা ভাঙছেন বাস্তবকে, এবং চালাচ্ছেন বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়া।

আধুনিক সম্প্রদায় নিষিদ্ধ ক’রে দিয়েছেন শিল্পকলায় মানবিক উপাদানের অনুপ্রবেশ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বস্তুরাশিতে গ’ড়ে ওঠা মানবিক সৃষ্টি করে তিন স্তরের এক স্তরক্রম। প্রথমে আছে মানুষের জগৎ; তারপর সপ্রাণ বস্তুরাশির জগৎ; আর তৃতীয়ত রয়েছে অজৈব বস্তুরাশি। এ-স্তরক্রমে যা যতো ওপরে আধুনিক শিল্পকলা তাকে ততো নিষিদ্ধ মনে করে। তাই প্রথম স্তরটি, অর্থাৎ মানুষের জগৎটিকে তাঁরা এড়িয়ে চলেন সবচেয়ে বেশি; কারণ তা সবচেয়ে মানবিক। এ-ব্যাপারটি সঙ্গীত ও কবিতায় চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে। বিটোফেন থেকে হ্বাগনার পর্যন্ত সঙ্গীত প্রধানত ব্যাপৃত ছিলো ব্যক্তিক আবেগানুভূতির উৎসারণে। সুরকার ধ্বনির মহাকাঠামোতে পরিবেশন করতেন আত্মজীবনী। শিল্পকলা, কম-বেশি, ছিলো স্বীকারোক্তি। সংস্পর্শ-সংক্রমণ ছাড়া শিল্পভোগের আর কোনো উপায় ছিলো না তখন। ‘সঙ্গীতে সংরাগরাশি সম্ভোগ করে নিজেদের’, ঘোষণা করেছিলেন নিটশে। ট্রিস্টান ও ইজোল্ড-এ হ্বাগনার ঢেলে দিয়েছিলেন মাথিলডা হ্বেসেনডংকের সাথে তাঁর ব্যভিচারকে। এ সঙ্গীত উপভোগ করার জন্যে আমরাও কতিপয় ঘণ্টার জন্যে হয়ে উঠি অস্পষ্টভাবে ব্যভিচারী। ওই সঙ্গীত আমাদের কাঁদায়, কাঁপায়, ইন্দ্রিয়াতুরভাবে বিগলিত করে। বিটোফেন থেকে হ্বাগনার পর্যন্ত সব সঙ্গীতই মেলোড্রামা। কিন্তু একে প্রতারণা ব’লে মনে হয় আধুনিক শিল্পীর কাছে। কারণ এটা সুযোগ নেয় মানুষের সে-সহজাত মহৎ দুর্বলতার, যা মানুষের মধ্যে সংক্রামিত করে তার প্রতিবেশীর আনন্দবেদনাকে। হাসি ও অশ্রু, নান্দনিকভাবে, প্রতারক। সৌন্দর্য কখনো বিষণœ বা প্রসন্ন স্থিতহাসির অধিক ইশারা করে না।

নান্দনিক সুখানুভূতি হওয়া উচিত দৃষ্টিসুখানুভূতি। সুখানুভূতি হ’তে পারে অন্ধ বা দৃষ্টিসম্পন্ন। মাতালের সুখ অন্ধ। তার সুখের মূলে আছে মদ্য, কিন্তু এর কোনো উদ্দেশ্য বা প্রেরণা নেই। যে লোক কোনো বাজি জেতে, সেও সুখী, কিন্তু কিছুটা ভিন্নভাবে। সে কোনো কিছু পাবে ব’লে সুখী। কিন্তু বাজিজয়ী জানে তার সুখের কারণ। সে জানে এমন কিছু ঘটেছে, যা সুখকর। কোনো ঘটনা যখন যান্ত্রিক না হয়ে মানসিক হয়ে উঠতে চায়, তখন তার থাকা দরকার এ-বোধ, এ-উদ্দেশ্য। রোম্যানটিক শিল্পকলায় উপভোগীরা শিল্পকর্মটি উপভোগ না ক’রে উপভোগ করে তাদের আবেগপুঞ্জ, ওই শিল্পকর্মটি হচ্ছে তাদের আনন্দেও অ্যালকোহল। শিল্পকলা যখন কেবল যাপিত বাস্তবতারই সমাবেশ হবে, তখন এমন হবেই। যাপিত বাস্তবতার শক্তি এতো বেশি যে তা শিল্পের সৌন্দর্য ভোগে বাধা দেয়।

দেখার জন্যে দূরত্ব দরকার। প্রতিটি শিল্পকলা ব্যবহার করে একটি যাদুবাতি, যা তার বিষয়বস্তুকে দূেের সরিয়ে নেয় ও রূপান্তরিত করে। তার পর্দায় বিরাজ করে তারা সুদূর, অগম্য বিশে^ও অধিবাসীর মতো, পরম দূরত্বে। যখন তা না ঘটে তখন আমরা অভিভূত হই এক কিম্ভূত বিহ্বলতায়,— বুঝে উঠতে পারি না ওই বস্তুরাশি ‘যাপন’ করবো, না ‘পর্যবেক্ষণ’ করবো। এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ে মাদাম তুসোর মোমের পুতুলগুলোর কথা। ওগুলো মনে জাগায় একরকম অদ্ভুত অস্বস্তি। ওগুলো যে অস্বস্তি জাগায়, তার কারণ ওগুলো বাধা দেয় ওগুলো সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিতে। ওগুলোকে সজীব প্রাণী মনে করার সাথে সাথে ওগুলো রটিয়ে দেয় তাদের গোপন কথা। আবার পুতুল হিশেবে গণ্য করার সাথে সাথে ওগুলো যেনো প্রতিবাদী শ^াস ফেলতে থাকে। পরিশেষে ওই সবগুলো ক্লান্ত, অসুস্থ করে আমাদের। নতুন সংবেদনশীলতা শিল্পকলায় মানবিক উপাদানের প্রাধান্যকে ততোটা অরুচিকর মনে করে যেমন অরুচিকর অনুভূতি জাগে সংস্কৃত মানুষের মনে মাদাম তুসোর মোমের পুতুল দেখে। জীবন ও শিল্পকে মিশ্রিত হ’তে দেখা খুবই বিরক্তকর।

হ্বাগনারে মেলোড্রামা হয়ে ওঠে শিখরস্পর্শী। তাই তাঁর পর দেখা দেয় এক মৌল পরিবর্তন। সঙ্গীতকে ব্যক্তিক আবেগানুভূতি থেকে মুক্তি দেয়ার দরকার হয়ে পড়ে। প্রয়োজন পড়ে তার বিশুদ্ধিকরণ। দেবুস্সি তাই করেন। তাঁর কারণেই এখন মূর্ছা আর অশ্রু ছাড়া প্রশান্তভাবে সঙ্গীত শোনা সম্ভব হয়ে উঠেছে। দেবুস্সি সম্পন্ন করেছেন সঙ্গীতের বিমানবিকীকরণ, তাই তিনি সূচনা করেছেন সঙ্গীতকলার নবযুগ।

একই ঘটনা ঘটেছে কবিতায়। কবিতাকেও মুক্ত করতে হয়েছে সব দায় থেকে। মানবিক উপাদানে বোঝাই হয়ে হাওয়া ক’মে-যাওয়া বেলুনের মতো কবিতা গড়াচ্ছিলো, ঢুঁ খাচ্ছিলো গাছ আর গৃহচূড়োয়। এখানে মালার্মে দেখা দেন ত্রাতারূপে। তিনি গীতকিবিতাকে ফিরিয়ে দেন তার স্বর্গীয় গুণ ও উড়ালের শক্তি। সম্ভবত তিনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন নি, তবে তিনিই এর সূচনাকারী। রোম্যানটিক শতকে কবিতার কী ছিলো? কবিরা আমাদের জানতেন তাঁদের উচ্চমধ্যবিত্ত ব্যক্তিক আবেগরাশি; তাঁদের প্রধান-অপ্রধান বেদনাপুঞ্জ, কামনাবাসনা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ^াস। তাঁদের দৈনন্দিন সত্তাকে প্রবল ক’রে তোলাই ছিলো তাঁদের অভিলাষ। তাঁরা চাইতেন খুব মানবিক হ’তে।

আধুনিক কবি চান শুধুমাত্র কবি হ’তে। সমস্ত নতুন শিল্পকলাই বিশ^াসী স্বায়ত্তশাসনে, সুনির্দিষ্ট সীমানায়। তাঁর কাছে জীবন এক জিনিশ শিল্পকলা অন্য জিনিশ, তাই তিনি দুটিকে পৃথক রাখারই পক্ষপাতী। যেখানে ব্যক্তি মানুষটির শেষ সেখানেই শুরু কবির। ব্যক্তির নিয়তি হচ্ছে মানবিক জীবন যাপন করা, আর কবির নিয়তি যা অস্তিত্বহীন, তা উদ্ভাবন করা। কবি জগৎকে ঋদ্ধ করেন বাস্তবতার সাথে তাঁর কল্পনাপ্রতিভার মহাদেশ যোগ ক’রে।

উনিশশতকে মালার্মেই প্রথম কবি, যিনি হ’তে চেয়েছিলেন আর কিছু নন, শুধুই কবি। তিনি বর্জন করেছিলেন, তাঁর নিজের ভাষায়, ‘প্রকৃতিদত্ত উপাদানরাশি’ এবং রচনা করেছিলেন ক্ষুদ্র গীতিময় একগুচ্ছ বস্তু, যা মানবিক প্রাণী ও পুষ্প থেকে ভিন্ন। তাঁর কবিতা ‘অনুভবের’ জন্য নয়। এ-কবিতায় যেহেতু নেই কোনো মানবিক উপাদান, তাই এর আবেগ অনুভবের কোনো সূত্রও নেই এতে। কবিকে তিনি মুক্ত করেছেন পেছনের ব্যক্তিটি থেকে। যে-দিকে তাকাই সে-দিকেই দেখতে পাই মানবিকতা থেকে পলায়ন। বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার কৌশল নানাবিধ। মালার্মের কৌশল থেকে আজকালকার কৌশল অনেক ভিন্ন। তবে আধুনিক সঙ্গীত যেমন শুরু হয়েছে দেবুস্সি থেকে, তেমনি সমস্ত আধুনিক কবিতা এগিয়ে চলেছে মালার্মের নির্দেশিত পথ ধ’রেই। এখন কবিতা হয়ে উঠেছে  রূপকের উচ্চতর বীহগণিত।

আধুনিক কবিতা রূপকখচিত, আর রূপকই হচ্ছে বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার প্রধান অস্ত্র। রূপকই সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে ফলবান সম্ভাবনার এলাকা। আমাদের আর সমস্ত শক্তি সীমাবদ্ধ ক’রে রাখে আমাদের বাস্তব জগতে, যা কিছু আছে তারই মাঝে। আমরা বড়োজোড় পারি বিভিন্ন বস্তুকে মেলাতে বা ভাঙতে। শুধু রূপকই দিতে পারে মুক্তি। বাস্তবের মাঝে রূপক সৃষ্টি করতে পারে কাল্পনিক শিখর, ভাসমান দীপপুঞ্জ। তবে রূপক বিমানবিকীকরণের বড়ো অস্্রত হ’লেও এটিই একমাত্র নয়। আরো বহু আছে। প্রেক্ষাপট বদলে দিয়ে সহজেই এ-কাজ করা যায়। প্রাত্যহিক জীবনে সব কিছুই আমরা বিন্যস্ত দেখি এক স্বাভাবিক ক্রমে, সুনির্দিষ্ট স্তরক্রমে। কিছু কিছু জিনিশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিছু কিছু জিনিশ  কিছুটা কম গুরুত্বপূর্ণ, আর কিছু জিনিস একেবারেই তুচ্ছ। বিমানবিকীকরণের জন্যে বস্তুরাজির স্বাভাবিক স্বভাব বদলানোর দরকার নেই। শুধু মূল্যবিন্যাস বদলে দিয়ে এমন শিল্প সৃষ্টি সম্ভব, যাতে জীবনের তুচ্ছ ব্যাপারগুলো মহাআকার ধ’রে আবির্ভূত হয়।

এখানেই খুঁজে পাই আধুনিক শিল্পকলার দুটি আপাতবিষম রীতির মধ্যে— রূপকের, পরাবাস্তবতা ও অববাস্তবতার মধ্যে সম্পর্কের সূত্র। এরা উভয়েই পরিতৃপ্ত করে বাস্তবকে এড়ানোর আকাঙক্ষা। কাব্যিক ঊর্ধ্বলোকে উড়াল না দিয়ে শিল্পকলা ডুব দিতে পারে স্বাভাবিক প্রেক্ষাপটের নি¤œতলে। জীবনে যে-সব জিনিশ থাকে আমাদের চোখের আড়ালে, সেগুলোকে বড়ো ক’রে তুলে সাধন করা যায় শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ।

নিজ অধিকারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ক’রে রূপক এখন কমবেশি প্রধান ভূমিকা নিচ্ছে কবিতাসৃষ্টিতে। অর্থাৎ নান্দনিক লক্ষ্য বদলে গেছে, তা চলছে এখন বিপরীত অভিমুখে। আগে বাস্তবতাকে সাজিয়েগুছিয়ে দেয়া হতো রূপকালঙ্কারে, আর এখনকার প্রবণতা হচ্ছে কবিতাবহির্ভূতকে বা বাস্তবকে পরিত্যাগ করা। রূপককেই ‘বাস্তবায়িত’ করা, তাকেই কবিতায় পরিণত করা এখনকার লক্ষ্য। নান্দনিক প্রক্রিয়ার এ-উৎক্রম শুধু রূপকের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এ-উৎক্রম ছড়ানো আধুনিক শিল্পকলার সমস্ত কলাপ্রকৌশলেই।

আমাদের মন ও বস্তুর মধ্যে সম্পর্ক এখানে যে আমরা বস্তুসমূহকে ভাবি ও তাদের সম্বন্ধে ধারণা সৃষ্টি করি। বাস্তবতার ততোটুকুই আয়ত্তে আমাদের তার যতোটুকু সম্পর্কে আমরা ভাবনাধারণা তৈরি করতে সক্ষম হই। এ-ভাবনাধারণাগুলো মিনারের মতো, যেখান থেকে আমরা দেখি বিশ^কে। প্রতিটি নতুন ভাবনাধারণা, গ্যেটে বলেছেন, নতুন বিকশিত প্রত্যঙ্গের মতো। ভাবনাধারণা দিয়ে আমরা দেখি বিশ^জগৎকে, কিন্তু মনের স্বভাব হচ্ছে যে ভাবনাধারণাগুলো দেখতে পাই না আমরা। যেমন চোখ দেখার সময় দেখতে পায় না নিজেকে। বলতে পারি, চিন্তা হচ্ছে ভাবনাধারণার সাহায্যে বাস্তবকে আয়ত্ত করার প্রচেষ্টা। তবে এক ধ্রুব দূরত্ব বিরাজ করে ভাবনা ও বস্তুর মধ্যে। বস্তু সব সময়ই তার সম্পর্কিত ধারণার পাত্রটিকে ভ’রে দিয়ে উপচে পড়ে, কারণ বস্তুটি তার সম্পর্কিত ভাবনাধারণা থেকে বেশ কিছু, অন্য কিছু। তাই ভাবনাধারণা থেকে যায় এমন এক মাচানের মতো যার সাহায্যে আমরা পৌঁছোতে চাই বাস্তবতায়। তবুও আমাদের স্বভাব হচ্ছে আমরা যাকে বাস্তবতা ভাবি তাকেই বাস্তবতা ব’লে গণ্য করি, এবং ভাবনাকে বস্তু ব’লে মেনে নিই। বাস্তবতার জন্যে আকুলতা আমাদের নিয়ে যায় বাস্তবতার এক আদর্শায়িতরূপে। এই হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। এখন যদি বদলে দিই এ-প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অভিমুখ, তাকে ক’রে তুলি বিপরীতমুখি, বাস্তবের দিকে পিঠ ফিরিয়ে ভাবনাধারণাগুলোকে সজীব ক’রে তুলি ভাবনাধারণারূপেই, অর্থাৎ যদি আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বাস্তবায়িত’ করে তুলতে চাই আমাদের ভাবনাধারণাগুলোকে, তাহলে আমরা সম্পন্ন করি সেগুলোর বিমানবিকীকরণ ও বিবাস্তবায়ন। কারণ ভাবনাধারণা স্বাভাবিকই অবাস্তব। তাদের বাস্তব রূপে গ্রহণ করা একরকম আদর্শায়ন, অসত্যায়ন। অভিব্যক্তিবাদ, ঘনক্ষেত্রবাদ প্রভৃতি বাস্তবায়িত করতে চায় ভাবনাধারণাকে। এ-শিল্পীরা বস্তুর ছবি না এঁকে আঁকেন ভাবনাচিন্তার চিত্র। তাঁরা বাহ্যজগতের দিকে চোখ বন্ধ ক’রে দৃষ্টি স্থিরনিবদ্ধ করেন অন্তর্লোকের মন্ময় চিত্রপুঞ্জের ওপর।

কেনো এ-বিমানবিকীকরণ? কেনো এ-বিরাগ মানবিক উপাদানের প্রতি? অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রপঞ্চের মতো এরও মূলে রয়েছে নানা জটিল কারণ। তার সবগুলো বর্ণনা খুবই দুরূহ ও অসম্ভব। এর একটি কারণ প্রথাগত শিল্পকলার সাথে নতুন শিল্পীর সংঘর্ষ। নতুন প্রতিভার চিত্রে এতদিন চলে-আসা শিল্পকলা ধনাত্মক বা ঋণাত্মক প্রতিক্রিয়া। তিনি খাপ খাওয়াতে পারেন অতীতের সাথে, মনে করতে পারেন অতীত তাঁর ঐতিহ্য, এবং তার উৎকর্ষসাধনে আত্মনিয়োগ করতে পারেন তিনি। বা হ’তে পারেন তিনি অতীতের প্রতি বিরূপ, প্রথাগত প্রতিষ্ঠিত গৃহীত শিল্পকলার প্রতি তাঁর থাকতে পারে স্বতঃস্ফূর্ত বিরাগ। অতীত-অনুরাগী শিল্পী খুশি থাকবেন প্রথাগত আধারআধেয় নিয়েই পুনরাবৃত্তি করবেন তিনি কতিপয় পবিত্র রীতির, আর অতীতবিমুখ শিল্পী প্রথাগত ঐতিহ্য থেকে শুধুমাত্র সরেই যাবেন না, সাথে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করবেন কালপরম্পরায় মানবীয় আদর্শের প্রতি তাঁর প্রতিবাদ। কোনো কালের শিল্পকলা যদি গ’েড় ওঠে তার আগের কোনো কালের শিল্পকলার ওপর ভিত্তি ক’রে, তবে তা বুঝতে বিশেষ কষ্ট হয় না, বেশ সহজেই তা বোধগম্য হয়। কিন্তু অতীতের ঋণাত্মক প্রভাব বুঝতে, বিশেষ একটি শিল্পরীতি যে গ’ড়ে উঠেছে প্রথাগত রীতির সাথে সচেতন বিরোধীতায়, তা বোঝার জন্য দরকার বিশেষ উদ্যম। আধুনিক শিল্পকলার অনেক কিছুই জন্মেছে অতীতের, রোম্যানটিসিজমের ঋণাত্মক প্রভাবে। বদলেয়ার কালো ভেনাসের স্তব করেছেন, কারণ প্রথাগতটি শাদা। তখন থেকেই শিল্পকলা প্রথাগত খাত থেকে দূরে স’রে আসতে শুরু করে এবং এখন পুরোপুরি জন্ম নিয়েছে এমন এক শিল্পকলা, যা অতীতের বিরোধিতায় মুখর। এর কারণ খুবই সহজ। অতীতের ভার এখন বড়ো বেশি হয়ে পড়েছে, এতে রুদ্ধ হয়ে পড়েছে সমকালীন অনুপ্রেরণা। অন্যভাবে বলা যায়, প্রথাগত প্রণালিরাশি বাধা দেয় শিল্পী ও তাঁর চারপাশের জগতের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগে। এমন ক্ষেত্রে দুটি ব্যাপার ঘটতে পারে। অতীত শ^াসরোধ করতে পারে নতুন সৃষ্টিপ্রতিভার, যেমন ঘটেছে মিশরে, বাইজানটিয়ামে, এবং সাধারণভাবে প্রাচ্যে। বা ধীরে ধীরে নতুন সৃষ্টিপ্রতিভা নিজেকে মুক্ত করতে পারে অতীতের ঘাতক হাত থেকে, এবং বিকশিত করতে পারে নতুন শিল্পকলার পর্ব। এটা ঘটেছে ইউরোপে। ইউরোপ চিরকালই ভবিষ্যমুখি, আর প্রাচ্য আক্রান্ত এক অসংশোধনীয় প্রথাবাদে।

বিমানবিকীকরণ ও মানবিক উপাদানে বিরাগের মূলে বিশেষভাবেই রয়েছে বাস্তবতার প্রথাগত ভাষ্যের প্রতি বিরূপতা। আক্রমণের তীব্রতা ততো বেশি হয় লক্ষ্যস্থল হয় যতো সন্নিকট। উনিশশতকই আমাদের সবচেয়ে বেশি সন্নিকট, তাই উনিশশতকি রীতিনীতির প্রতি বিরাগবিরূপতা আধুনিক শিল্পকলায় সবচেয়ে প্রবল। অন্যদিকে আধুনিক সংবেদনশীলতা স্থানকালগতভাবে দূরস্থিত শিল্পের প্রতি পোষে সন্দেহজনক উৎসাহ। আদিমতা বা প্রাগৈতিহাসিকতার প্রতি আগ্রহ তার প্রবল। আসলে আদিম শিল্পের শৈল্পিক উৎকর্ষে মুগ্ধ নন আধুনিক শিল্পীরা, তাঁরা আকৃষ্ট ওই শিল্পকলার ঐতিহ্যহীনতার প্রতি। ঐতিহ্য, আধুনিক শিল্পীর কাছে, একটি অশ্লীল শব্দ।

অর্তেগা ঈ গাসেতের প্রবন্ধটি বেরোনোর পর কেটে গেছে ছটি দশক, এবং এ গ্রহের পুবেপশ্চিমে নতুন কাল সৃষ্টি ক’রে বিকশিত হয়ে গেছে আধুনিক শিল্পকলা— কবিতা, উপন্যাস, সঙ্গীত, চিত্রকলা প্রভৃতি। এখন জেগে উঠছে প্রতিক্রিয়া, এবং আবার মানবিক উপাদানরাশি— বস্তু, মানুষ, মানুষের কামনা-বাসনা-আবেগ— দেয়াল ভেঙে ঢুকছে শিল্পকলায়। বাঙলায় আধুনিকতা এসেছিলো একসময়, এখন চলছে তার বিদায়ের পালা। বাঙলা সাহিত্য সব সময়ই সাধারণত বোঝাই থেকেছে মানবিক উপাদানে, এবং এর দিকে তাকালে বারবার মনে হয় এ যতোখানি জীবনসৃষ্টি, ততোখানি শিল্পসৃষ্টি নয়। এখানে জীবনের প্রাবাল্য খুবই বেশি। মানবিক উপাদান এখানে এতো সস্তা ও সুলভ যে দু-হাতে ছানতে কে উৎসাহ বোধ করবে না! তাই এ-সাহিত্য মানবিক উপাদানে অনেক সময় এতোটা বোঝাই হয়ে ওঠে যে সমস্ত ব্যাপারটিকে মনে হয় ঘিনঘিনে, যদিও সাধারণ উপভোগীরা ভালোবাসেন ওই মানবিক নোংরার মধ্যে ডুবে থাকতেই। বাঙলা সাহিত্য ভাবালুতাপ্রাণ। ভাবালুতাই শিল্পকলা ব’লে গণ্য এখানে। আমাদের দুটি নোংরা শব্দ ‘সুখ দুঃখ’। মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে রয়েছে একটি দুরারোগ্য দাদ, যা চুলকালে পাওয়া যায় বিশেষ আনন্দ। ওই দাদটির নাম ‘সুখদুঃখ’। যে-লেখক বাঙালিচিত্তের ওই দাদটি চুলকোনোর যতো বেশি প্রতিভা রাখেন, তিনিই ততো বেশি আদরণীয়। তিরিশের দশকে কবিতায়, ও কিছুটা গদ্যে, এসেছিলো আধুনিকতা, এখন পুনরায় ফিরে যাচ্ছে অনাধুনিকতায়। এটা স্বাভাবিক। দীর্ঘকাল ধ’রে একই রকম চলতে পারে না। তাছাড়া জীবন শিল্পসাহিত্যে উপস্থাপিত করা সহজ। যে-কোনো নির্বোধ আবেগ-বেদনা-অশ্রুচাপকে পরিবেশন করতে পারে শিল্পকলার ছদ্মবেশে, আর তাতে মানবিক সহানুভূতিবশত আলোড়িত হয়ে উঠতে পারে উপভোগীরা। তাই হচ্ছে এখন বাঙলা গদ্যেপদ্যে— ¯্রষ্টা শিল্পকলাঅন্ধ, উপভোগী শিল্পকলাঅন্ধ, অন্ধকারে দু-অন্ধ সৃষ্টি ও সম্ভোগ ক’রে চলেছে অশিল্প।

[উৎস : অধুনা, প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ১৯৮৬ ॥ শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা : ১৯৮৮]

***************************************

আহমদ ছফার ট্রাউয়ারস্পিয়েল
সলিমুল্লাহ খান

কার সাধ্য আমাকে ঠেকায়?
আমার সাধনায় ফুল ধরছে, ফল ফলছে
আহমদ ছফা (২০১০: ১৬৫)

জীবনের একপ্রান্তে পৌঁছিয়া আহমদ ছফা ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ (১৯৯৯) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছিলেন। পরের বছর প্রকাশিত ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামধেয় সংকলনটি যদি আমলে না আনি তো বলিতে হইবে ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ আহমদ ছফার সর্বশেষ কবিতার বই। এই বইয়ে ‘কবি ও স¤্রাট’ নামে একটি কবিতা আছে। আজিকার এই নিবন্ধে এই কবিতাটি প্রসঙ্গে দুইটি কথা বলিতে চাই।

তাহার আগে কবিতা প্রসঙ্গে আহমদ ছফার একটি কৈফিয়ত শুনিয়া লইব। ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামক সংকলনের ভূমিকা উপলক্ষে তিনি একটা জিজ্ঞাসা পেশ করিয়াছিলেন, ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি যখন নিজেকে প্রশ্ন করি— আমি কি কবি? আমি কি উপন্যাস লেখক, প্রবন্ধকার, ছোটগল্প লেখক অথবা অনুবাদক কিংবা শিশু সাহিত্যিক?’ এই জিজ্ঞাসার যে উত্তর তিনি দিয়াছিলেন তাহাও শুনিবার মতো : ‘আমার পক্ষে কোন কিছুই হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। একটা গভীর অতৃপ্তিবোধ এবং দহনবেদনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।’ আহমদ ছফার এই উত্তরের মধ্যে সৌজন্যের প্রকাশ শতকরা একশ ভাগ আছে। তারপরও মনে হয় সৌজন্যই শেষ কথা নয়। অবশ্য অধিক কিছু আছে কিনা সে কথা বলা অপরের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ বইয়ে ‘কবিতার দোকান’ নামে একটি কবিতাও আছে। ঐ কবিতাটি শেষ হইয়াছে একটি চরণে : ‘আমার সাধনায় ফুল ধরছে, ফল ফলছে।’ আমার ধারণা ‘কবি ও স¤্রাট’ কবিতাটিকে এই সাধনার ফুল কিংবা ফলজ্ঞানে গ্রহণ করার সুযোগও আছে।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যাঁহারা কবিতায় প্রতিপত্তি লাভ ও প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন তাঁহারা আহমদ ছফার সাধনাকে মোটের ওপর অগ্রাহ্য করিতে না পারিলেও তাঁহার কবিতা মোটেই গ্রাহ্য করেন নাই। সে স্বাধীনতা তাঁহাদের অবশ্যই আছে। কিন্তু এ দেশের যে সকল মানুষ মনে করেন আহমদ ছফার সাধনাকে অস্বীকার করা মানে এই জাতির সংস্কৃতির সহিত বিশ্বাসঘাতকতা আমিও তাহাদের মধ্যেই পড়ি। কথাটা সরাসরিই জিজ্ঞাসা করিতে চাই : আহমদ ছফাকে কি কবি-পরিচয়েও অস্বীকার করা যায়? জিজ্ঞাসাটির উত্তর তিনি নিজে দিয়াছেন এইভাবে : ‘কবিতা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু। কিন্তু অনবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখার অভ্যাসটি আমার দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কৈফিয়তস্বরূপ আমি একটা কথাই বলতে পারি, জীবনের দায় কবিতার দায়ের চাইতে অনেক বেশি নিষ্ঠুর। শুধু কবিতা নয়, সে সমস্ত রচনাকে সাহিত্যপদবাচ্য লেখা হিশেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা সম্ভব তার বাইরেও অনেক ধরনের লেখা আমার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে। কখনো সামাজিক দায়িত্ববোধের তাগিদ, কখনো একটি নতুন বিষয়ের প্রতি অধিকার প্রসারিত করার প্রয়াস কিংবা কখনো ভেতরের তাপচাপের কারণে নতুন নতুন বিষয়ের ওপর আমাকে মনোনিবেশ করতে হয়েছে।’

একটা কথাও এখানে অসত্য বলেন নাই আহমদ ছফা। প্রমাণ তাঁহার ‘কবি ও স¤্রাট’ নামক কবিতা বা কাব্যনাটিকা। এই কবিতাটির বিষয়বস্তু সামান্যই— দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর সংকট। দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসে ইংরেজি অষ্টাদশ শতাব্দী সচরাচর একটি ক্রান্তিকাল বলিয়া গণ্য হয়। একদা ইতিহাস ব্যবসায়ী ও অন্যান্য বৃত্তিধারী প-িতেরা বলিতেন এই শতাব্দীটা ছিল মোগল সা¤্রাজ্যের পতনের যুগ। কিছুদিন হইল প-িতদের মতও বদলাইতেছে। অনেকেই বলিতেছেন, এই যুগটা তো নিতান্ত পতনের যুগ ছিল না, ভারতবর্ষের নানান দিকে তখন নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্কুরও গজাইয়া উঠিতেছিল। নতুন নতুন রাষ্ট্র গড়িয়া ওঠার একটা তাৎপর্য তো ইহাও হইতে পারে যে এই মহাদেশে নতুন নতুন জাতিও তখন গড়িয়া উঠিতেছিল।

কিন্তু মানুষ যাহা ভাবে বিধাতা তাহা নাও তো করিতে পারেন। সকলেই জানেন, অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ এই দুই শতাব্দীতেই আমাদের এই মহাদেশ জাতীয় স্বাধীনতা পুরাপুরি হারাইয়াছিল। ভারতবর্ষের নানান প্রান্তে নানান জাতি গড়িয়া উঠিবার পথে সেদিন প্রতিবন্ধকতা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল এয়ুরোপিয়া নানা জাতির হাতে— শেষ বিচারে ইংরেজ জাতির কামানের আঘাতে— এই মহাদেশের সকল জাতির পরাজয়। এই পরাজিতদের মধ্যে প্রধান বলিয়া যে শক্তিকে গণনা করা হয় তাহার পরিচয় সে যুগের অবনতিশীল মোগল সা¤্রাজ্য। একটা কথা ভুলিয়া গেলে চলে না। খোদ মোগল সা¤্রাজ্যের গর্ভেই সেদিন জাগিয়া উঠিতেছিল নতুন নতুন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। এই ঘটনারই একটা আলামত ছিল খোদ মোগল রাজদরবারের ভাষা ফারসির জায়গায় উত্তর ভারতের সর্বত্র উর্দু কিংবা যাহাকে বলে বা হিন্দুস্তানি ভাষা তাহার বিকাশ।

এই নিবন্ধের অল্প জায়গার মধ্যে এই বিষয়টির উপর পূর্ণ সুবিচার করা যাইবে না। তবে যে বিষয়টি জানা না থাকিলে আহমদ ছফার কবিতাটির মূল্য নিরূপণ করা কঠিন তাহা এই রকম। ‘কবি ও স¤্রাট’ কবিতার নায়ক দুইজন : একনায়ক অবনতিশীল দিল্লি সা¤্রাজ্যের স¤্রাট আর অন্যজনের নাম সে যুগের শ্রেষ্ঠ কবি মোহাম্মদ তকি মির— যিনি শুদ্ধমাত্র ‘মির’ নামেই অধিক পরিচিত। এই মিরের নাম ধরিয়াই পরের যুগের কবি মির্জা আসাদুল্লাহ খান ওরফে গালিব একদা লিখিয়াছিলেন, ‘গালিব, উর্দু কবিতার একমাত্র ওস্তাদ তুমি নও, লোকে বলে আগের জমানায় মির বলিয়া একজনও ছিল কিন্তু।’ [রেখতা কে তুমহি উস্তাদ নাহি হো গালিব, কেহতে হ্যায় আগলে জমানে মে কোই মির বিহ্ থা]

আহমদ ছফার কবিতার ঘটনাটি— আগেই বলিয়াছি— সামান্য। দরবারের রাজনীতি ও কবির হেনস্তা। এই ঘটনা অসামান্য হইয়া ওঠে যখন আমরা তাহাকে ইতিহাসের দীঘল পটভূমিতে দেখিতে পারি। মির তকি মিরকে স¤্রাট দরবারে ডাকাইয়া আনিয়াছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। এই সকল অভিযোগের মধ্যে আছে গঞ্জিকাসেবন হইতে শুরু করিয়া যুবকের ধর্মকর্মে মতিহরণ পর্যন্ত। অভিযোগের ফিরিস্তি অনুসারে এমনকি কুমারির সতীত্বনাশের কারণও তাঁহার কবিতায় পাওয়া যায়। খোদ স¤্রাট তাহার কিছু উচ্চারণ করিতে কসুর করেন নাই:

… অহরহ গাঁজাচ-ু খাও, শরাব

খানায় করো নরক গুলজার, রে-িবাড়ি করো

তুমি নিত্য গতায়াত। সবচেয়ে আপত্তির প্রত্যহ দিচ্ছ

ছেড়ে লাউডগা সাপের মতো অবাধ্য কবিতা।

হৃদয়ের বোঁটা ধরে টান দেয় এ রকম ফলাযুক্ত তীর।

তোমার শব্দের বিষ, উপমাঝঙ্কার কেড়ে নিচ্ছে

যুবকের ধর্মকর্মে মতি। নারীরা নিষিদ্ধ চিজ

বেশি ভালবাসে, তাই সবাই আশঙ্কা করে

তাবত শরিফগৃহে অগ্নিকা- হবে।

ইতিহাসে যে কবি মির (১৭২২-১৮১০) তকি মির নামে পরিচিত তাঁহার সহিত আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) নিজেকে একসারিতে দাঁড় করাইয়া দেখিতেছেন কিনা সে প্রশ্ন আমার মনে জাগিয়াছে। কথাটা আরও একভাবে ভাবা যায়— অষ্টাদশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার সহিত বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সংকটকে কোন এক জায়গায় তিনি হয়তো তুলনা করিতেছেন। পাঠিকা এই প্রশ্নটাকেই আমার প্রথম প্রস্তাব বলিয়া ধরিয়া লইতে পারিবেন। আমার প্রস্তাব ‘কবি ও সম্রাট’ একটি রূপক কবিতা যেখানে আহমদ ছফা একটি পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যের মুখোমুখি একটি উদয়নরত নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাব্য নৈতিক ভিত্তির অনুসন্ধান করিয়াছেন।

আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব, এই কবিতায় আধুনিক কবিতার গর্ভসঞ্চারের সকল লক্ষণ হাজির আছে। আধুনিক নায়কের নিয়তি স্বর্গের দেবতারা পূর্ব হইতে নিরূপণ করিয়া রাখেন নাই। এই নিয়তির ¯্রষ্টা একালের ইতিহাস নিজেই। এই নিয়তির নামই জার্মান ভাষার প-িতেরা রাখিয়াছিলেন ট্রাউয়ারস্পিয়েল (ঞৎধঁবৎংঢ়রবষ)। এই কবিতার একমাত্র নায়ক কবি নহেন, সম্রাটও সমান নায়ক মর্যাদার দাবিদার। সমজদার পাঠিকা দেখিবেন, আহমদ ছফার সম্রাট কোনদিকেই কবির চেয়ে কম নহেন। স¤্রাটের দ্বিতীয় অভিযোগেই তাহার প্রমাণ মিলিতেছে :

মির তকি মির, তুমি কবি

আশা করি অনুভবে বুঝে নিতে পারো।

তোমার তাবত কালো জ্বলে ওঠে আরো কালো হয়ে

উচ্চারিত কথার আলোকে। নারী ও পুরুষের

মনের গোপন ঘরে যেই সব বিস্ফোরক দাহ্যবস্তু থাকে

চকিতে চকমকি ঠুকে লাগাও আগুন

যার তেজে আনন্দে কুমারি করে সতীত্বকে খুন।

তুমি স্থির হয়ে একদ- থাক না কোথাও।

নগরে বন্দরে তুলে তীব্র সংবেদন ছুটে যাও

দেশ থেকে দেশান্তরে অশান্ত ঘূর্ণির মতো

যেন এক জ্যান্ত মহামারি।

সম্রাটের আরো অভিযোগ আছে। তাহাদের মধ্যে আছে ধর্ম-ব্যবসায়ীদের তাপ ও চাপ দুইটাই। এখানে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সংঘাতের কথাই স¤্রাটের উদ্বেগ আকারে হাজির হইয়াছে। স¤্রাটের ইচ্ছাই সার্বভৌম— কথাটা প্রকৃত প্রস্তাবে কথার কথামাত্র বলিয়া প্রমাণিত হইতেছে। খোদ স¤্রাট বলিতেছেন :

ভেবে দেখো, আমাকে ফেলেছো তুমি কেমন মুশকিলে!

মোল্লারা তোমার নামে জুড়েছে চিৎকার,

কাটামু-ু দাবি করে, তা নইলে ধর্ম নাকি

যাবে রসাতলে। সবকটা ধর্মস্থানে

বর্শার ফলার মতো ধারালো চকচকে প্রতিবাদ

উঠছে জেগে। সবাই সম্রাটের কাছে চায়

যোগ্য প্রতিকার— প্রজাদের ধর্মরক্ষা সম্রাটের

কাজ, অতয়েব সব দায় সম্রাটে বর্তায়।

এই সকল অভিযোগ সত্ত্বেও স¤্রাট শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন তিনি নিজেও মির তকি মিরের একজন ভক্ত পাঠক। তিনি কবির কল্যাণই কামনা করেন। সর্বোপরি কামনা করেন নিজের সা¤্রাজ্যের স্থিতিও। তাই শাস্তির পরিবর্তে কবিকে একটি পুরস্কারই দিতে চাহিলেন তিনি। বলিলেন :

মির তকি মির, অধিকন্তু বাক্যব্যয়

নেই প্রয়োজন। তোমাকে দাওয়াত করি

চলে এসো দরবারের শান্ত ছায়াতলে।

দরবারই প্রকৃষ্ট স্থান, সমস্ত গুণের ঘটে

সম্যক বিকাশ, পায় সমাদর। এই হিন্দুস্তানে

যেইখানে যত ক্ষমতার বিস্ফোরণ ঘটে—

ধর্মতত্ত্ব শিল্পকলা অথবা বিজ্ঞান—

সম্রাটের উৎস থেকে সমস্ত সম্ভবে।

এই আকস্মিক আমন্ত্রণে দরবারের কায়েমমোকাম রাজকবি, রাজকীয় ভাঁড় ও অন্যান্য লোকজন প্রমাদ গণিতে শুরু করেন। শুদ্ধমাত্র তাঁহাদের ঈর্ষা ও চক্রান্তের কারণেই নহে, নিজের স্বভাববশতও কবি মির তকি মির রাজদরবারে সুস্থ বোধ করিতে পারেন না। তিনি রাজদরবারে যোগদানের এই সনির্বন্ধ অনুরোধ— এই রাজকীয় দাওয়াত— কবুল করিতে পারিলেন না। তাঁহার অস্বীকৃতির একটি কারণ এইভাবে বয়ান করিয়াছেন আহমদ ছফা :

আমি তো দেহাতি লোক

সর্বক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি, এমন তৌফিক নেই

অক্ষমতা ঢাকি। বুলিতে মাটির গন্ধ, লেবাসে

মিসকিন, ভাঙ্গাচোরা মানুষের সঙ্গে কাটে দিন।

ঝলমলে দরবার কক্ষে যারা আসে যারা যায়

দিব্যকান্তি দিব্যদেহধারী, অশেষ আশিসপ্রাপ্ত

তেজবীর্য ঐশ্বর্যের অংশ অপহারী।

আমি তো সামান্য লোক ঘুরি পথেঘাটে

খুঁজে পাই আপনারে মানুষের হাটে।

যেন নবীন জান্নাতখ- বাদশাহর দরবার

ধুলিমাখা দুচরণস্পর্শে হবে কলঙ্কিত

রক্তবর্ণ গালিচার পাড়। মহামান্য বাদশাহ সালামত

ফিরে যাই নিজ বাসে— চাই এজাজত।

দিল্লীশ্বর মোগল স¤্রাট কবিকে তারপরও ঢের বুঝাইয়া সুজাইয়া দেখিলেন, দরবারে আসিয়া আশ্রয় লইবার অনুরোধ করিতে থাকিলেন, কিন্তু কবি কিছুতেই সে অনুজ্ঞা রাখিবেন না। কবির জন্য রাজদরবারে মাথা গুঁজিয়া থাকাটা আত্মহত্যার শামিল। এই কবিতার মধ্যে বিধৃত শিল্প ও রাষ্ট্রের— কবির হৃদয়ধর্ম ও স¤্রাটের রাজধর্মের অন্তর্গত বিরোধটি এই সত্যে ধরা পড়িয়াছে। এই বিরোধ কবির পক্ষে ধরা পড়িয়াছে দুই শব্দে। কবি কি চাহেন? স্বাধীনতা কিংবা নিরাপত্তা। সমস্যার মধ্যে একটাই : কবির জন্য নিরাপত্তার অপর নাম মৃত্যু। কবি যদি স্বাধীনতা চাহিবেন তো পাইবেন মৃত্যু, এই মৃত্যুর অপর নাম ‘নিরাপত্তা’। আর যদি তিনি চাহেন নিরাপত্তা, তাহা তো পাইবেনই। এই নিরাপত্তার অপর নাম তো— একটু আগেই বলিলাম— আর কিছু নয়, মৃত্যু। কবি বলেন :

সুখ নয় স্বর্গ নয় জগতপ্রাণের মাঝে ঢেলে দেবো প্রাণ।

আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্যশক্তি

আমারে চালায়, ক্ষিপ্রবেগে অর্ধেক অস্তিত্ব যেন

কেড়ে নিয়ে যায়। স¤্রাট সংকটত্রাতা— সবিনয়ে

রাখি নিবেদন, সমীচীন নয় পিঞ্জিরায়

বন্দি করা কাননের পাখি।

মন্দভাগ্য কবির পক্ষে রাজদরবারের এহেন সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ গ্রহণ করাটা কেন সম্ভব হইল না— সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন জাগিতেছে। কবি নিজেই বলিতেছেন, ‘আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্যশক্তি আমারে চালায়’। এই অদৃশ্যশক্তিই কবিত্বের গোড়ার কথা। কবিত্ব— সোজা কথায়— কবির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মির তকি মিরের জবানে উত্তরটা এই রূপ ধরিয়াছে :

জাঁহাপনা, খোদাবন্দ বাদশাহ মেহেরবান

আমার জিন্দেগি হোক আপনার খেদমতে কুরবান।

সম্রাটের আমন্ত্রণ সম্মানের উত্তরীয় হয়ে

সর্বাঙ্গ আবৃত করে রয়েছে জড়িয়ে।

আমি হই তেমন এক মন্দভাগ্য লোক

শিরোপা সম্মান আর উচ্চতর মহত্ত্বগৌরব

যার হৃদয়ধর্মের কাছে মানে পরাভব। সম্বল

হৃদয়মাত্র, নিবেদন তাই টুটাফাটা প্রাণ নিয়ে

অভ্যস্ত জীবনে আমি ফিরে যেতে চাই।

কবি যাহা বলিয়াছেন তাহার সারনাম ‘হৃদয়ধর্ম’। আর এই হৃদয়ধর্মই কবিকে চালায়। সত্যের মধ্যে, এই হৃদয়ধর্ম কবির অপর— এক্ষণে তাহা পরমের রূপ ধরিয়াছে। ইহার জবাবে স¤্রাট যাহা বলিয়াছেন তাহা অনেকটা জার্মান তত্ত্বকার হেগেলের কথার সহিত মিলিয়া যায়। গ্রিক পুরাকথার আলোকে ট্রাজেডি বলিতে যাহা বুঝাইত তাহা ছিল অনেকটা এই রকমই। যেখানে দুই প্রবল পরাক্রম পরস্পর মুখোমুখি, সেখানে দুই শক্তিকেই সমান বিক্রমশীল ধরিয়া লইতে হয় সেখানে সংঘাত অনিবার্য। স¤্রাট বলিতেছেন কবির হৃদয়ধর্মের সহিত রাষ্ট্রের রাজধর্মের বিরোধ ক্ষমাহীন।

মির তকি মির, তোমার হৃদয়ধর্ম—

স¤্রাটেরও রাজধর্ম আছে। দুই ধর্ম পরস্পর মুখোমুখি

পথে দাঁড়িয়েছে। স¤্রাট হৃদয়ধনে ভাগ্যবান

নন, স¤্রাটকে চালায় কানুন।

গ্রিক পুরাকথার নিরিখে যাহাকে আমরা ট্রাজেডি বলিয়া জানি তাহার একটা বিশিষ্ট গুণ আছে। সেখানে দেব-দেবতার লীলা বিরাজ করে। শুদ্ধমাত্র বিরাজই করে না, তাঁহাদের হস্তক্ষেপে পৃথিবীচারী নরনারীর, নায়ক-নায়িকার দান উল্টাইয়া যায়। গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক-নায়িকা— একপ্রকার বলা যাইতে পারে— তাঁহাদের যাহা কিছু আছে তাহা লইয়াই দেবতার বিধানের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া যায়। তাঁহারা ভাঙ্গিলেও ভাঙ্গিতে পারেন, কিন্তু কদাচ মচকাইতে চাহেন না। খোদ এয়দিপাস কিংবা তাঁহার কন্যা আন্তিগোনের কথাই ধরি না কেন। তাঁহারা ভাঙ্গিয়াছেন, কিন্তু মচকান নাই। এয়দিপাস যে তাঁহার পিতাকে খুন করিলেন, মাতাকে দয়িতাস্বরূপ কবুল করিলেন তাহা তো দেবতারাই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। তিনি দ- পাইয়াছেন, কিন্তু সে দ- মাথা পাতিয়া লয়েন নাই। নিজে দোষী— একথা কদাচ কবুল করেন নাই।

একই কথা আন্তিগোনের বিষয়েও বলা যায়। আন্তিগোনে লড়িয়াছেন মাত্র একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। তাঁহার লড়াই গোটা গ্রিক জাহানের বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে। এতকাল ধরিয়া যে বিধিকে আমরা ‘নিয়তি’ (অর্থাৎ নিয়তি) বলিয়া আসিতেছি আন্তিগোনে— মাত্র একজন মানুষ— তাহাতে যতি বা ছেদ টানিয়াছেন। গ্রিক ট্রাজেডির এই বিশেষ গুণ অনুসারে মানুষ প্রয়োজনে দেবতার সম্মুখে দাঁড়ায়। সে ভাঙ্গে কিন্তু মচকায় না। এই নীতির নামই বাসনা। বাসনার মৃত্যু নাই। বাসনা পরম।

আধুনিক জমানার গোড়ায়— বিশেষ এয়ুরোপ মহাদেশে— ট্রাজেডির রূপান্তর ঘটিয়াছে। জন্মিয়াছে ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’ বা ‘দুঃখের দিনের পালা’। এয়দিপাসের সহিত কেহ যদি শেক্সপিয়র প্রণীত ‘হ্যামলেট’ তুলনায় সমালোচনা করেন দেখিবেন ট্রাজেডি আর ট্রাউয়ারস্পিয়েলের পার্থক্যটা কোথায়। মানুষের বাসনা মাত্রেরই তাহার পরের— অর্থাৎ শেষ বিচারে পরমের বাসনা। মানবজাতির ইতিহাসে পরমের নিকটতম তুলনা তাহার ভাষা। বাসনা এই ভাষার মধ্যেই ধরা পড়িয়াছে।

আহমদ ছফার ‘কবি ও স¤্রাট’— কবির নিজের ভাষায়— নাট্য সংলাপ বিশেষ। ইহার সহিত তুলনা করিবার মত কীর্তি বাংলা ভাষায় বিশেষ নাই। তাই আমাদের অপোগ- কবিতা ব্যবসায়ীরা যে ইহার তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে পারেন নাই তাহাতে বিস্মিত হইবার হেতুও নাই। ইংরেজি পদকর্তা শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাট্য সংলাপের সহিত ইহার তুলনা করা চলে। নায়ক হ্যামলেটের সহিত নায়ক এয়দিপাসের প্রভেদ আছে। এই প্রভেদই ট্রাজেডির সহিত ট্রাউয়ারস্পিয়েলের প্রভেদ। এয়দিপাসকে চালাইয়াছিল দেবতার ইচ্ছা বা নিয়তি আর হ্যামলেটকে চালাইতেছিল তাঁহার হৃদয়ধর্ম বা বাসনা।

আহমদ ছফার মির হ্যামলেটের সহিত তুলনীয় এক চরিত্র। হ্যামলেটের দ্বিধা তো জগদ্বিখ্যাত। মিরের দ্বিধাবিভক্তি অবশ্য অন্যরকম। আহমদ ছফার নাট্য সংলাপটির নামেই প্রকাশ ইহার নায়ক দুইজন : কবি ও স¤্রাট। আসলে কবি ও স¤্রাট মোটেও দুইজন নহেন— এই দুইজন একই মিরের দুই রকম প্রকাশ বৈ নয়। ট্রাউয়ারস্পিয়েলের নায়কেরা এই দ্বিধার মূর্তিস্বরূপ। আহমদ ছফা মিরকে যেমন কবি ও স¤্রাট আকারে দ্বিধাবিভক্ত করিয়াছেন তেমনি নিজের জীবনপাত্রের মধ্যেও মিরের পদার্থ ঢালিয়া দিয়াছেন। এইভাবে ‘কবি ও স¤্রাট’ আহমদ ছফার অ্যালেগরি বা পরকথায় পরিণতি মানিয়াছে।

আহমদ ছফার কবিতা পড়িবার উপক্রমণিকা আকারে যে তিনটি প্রস্তাব এখানে পেশ করিয়াছি তাহার মূলসূত্র আমি জার্মান প-িত বাহ্ল্টার বেনিয়ামিন ও ফরাসি শিক্ষক জাক লাকাঁর লেখায় পাইয়াছি। আহমদ ছফার ট্রাউয়ারস্পিয়েল বা দুঃখের দিনের পালার শেষ এখনও হয় নাই। এখনও প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ রহিয়াছে।

দোহাই

১.            আহমদ ছফা, ‘কবি ও স¤্রাট’, আহমদ ছফার কবিতা (ঢাকা : শ্রীপ্রকাশ, ২০০০), পৃ. ১২-৩৫

২.           আহমদ ছফা, ‘কবিতার দোকান’, আহমদ ছফার কবিতাসমগ্র, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০১০), পৃ. ১৫৯-১৬৫

  1. Walter Benjamin, The Origin of German Tragic Drama, John Osborne, trans., reprint (London : Verso, 2003)
  2. Saifuddin Ahmad, Bas ke samjhe hain isko sare ‘awam: The Emergence of Urdu Literary Culture in North India, Social Scientist, vol. 42, no. 3/4 (March-April 2014), pp. 3-23
  3. Fritz Lehman, Urdu Literature and Mughal Decline, Mahfil, vol. 6, no. 2/3, (1970), pp. 125-131
  4. Muhammad Sadiq, A History of Urdu Literature, 2nd ed. (Delhi: Oxford University Press, 1995)

***************************************

মেঘনাদবধ কাব্য
জুলফিকার মতিন

১. বাংলা সাহিত্যে  মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্থায়িত্বই বলি, আর চিরায়ত্বই বলি, তা নিয়ে, বোধ করি, কোন প্রশ্ন-ব্যাকুলতার অবকাশ নেই। তবে এই স্থায়িত্ব কিংবা চিরায়ত্বের ভিত্তি কি? তার ধরন-ধারণই বা কি রকম, তা নিয়ে সবার উপলব্ধিজাত ব্যাখ্যা যে একই হবে, তাও নয়। এমনটি যে কারণে ঘটে, তা হল, প্রত্যেক কবি-লেখকেরই একটি অবস্থানগত প্রেক্ষিত থাকে। তার সামাজিক-পারিবারিক সংস্কৃতি, তার ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার, তার সময়ের চাহিদা, সর্বোপরি তার নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সমীকরণ— ¬এসব তো রয়েছেই, আবার এগুলোর সঙ্গে থাকে নিজস্ব উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের রূপায়ণ। উল্টো দিকে তার যারা পাঠক, তারাও নিজেদের অবস্থান থেকেই, ঐ একই ফ্যাক্টরগুলোর ভেতর দিয়েই কবি-লেখককে চিনতে চান। বৈশিষ্ট্যগুলোকে সনাক্ত করেন। আসলে নিজের মনের রঙে রাঙিয়ে নেয়াটাই সেখানে হয়ে ওঠে বড়। এক দিকে এই বিষয়টা যেমন ব্যক্তিগত হতে পারে, তেমনই তা হতে পারে প্রজন্মগত। উৎপাদন ব্যবস্থার নিরিখে শিল্প-সভ্যতার যে মাত্রা অর্জিত হয়, তাই নির্দিষ্ট করে দেয় মানুষের রুচির ধরন— তার চোখের আদল কিংবা উপলব্ধির স্তর। তার অধিকার বোধ, সাবসিসটেন্সের সীমারেখা, সুখ-দুঃখ— ভোগবিলাসের প্রাচুর্য-অপ্রাচুর্য, এমন কি নৈতিকতার ক্ষেত্রকেও বেঁধে দেয় তা। স্বপ্ন-কল্পনার যে পঙ্খীরাজ ঘোড়া, তার মুখেও এ ভাবেই পরানো থাকে লাগাম।

এ কারণে মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্থায়িত্ব বা চিরায়ত্বের ভিত্তিটাকে প্রথমেই একটু উলটে-পালটে দেখা যেতে পারে। তাঁর কর্ম তথা সাহিত্য জীবন প্রসারিত হয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে। সে সময়ে শুধু বাঙালী জীবন নয়, গোটা ভারতবর্ষীয় জীবনই একটি নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার মুখোমুখী এসে দাঁড়ায়। এই নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার নাম দেয়া হয়েছে ধনতান্ত্রিক। ঔপনিবেশিকতার ভেতর দিয়ে তার সূচনা। ইউরোপবাসী ইংরেজেরাই তার নিমিত্ত। স্মরণ করা যেতে পারে, তাদের পূর্বেও অনেক বহিরাগত এসেছে এ দেশে। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতির মুসলমানদের আগমন, স্থায়ী বসবাস এবং শাসন, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত অধ্যায়। এর ফলে নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সৃষ্টি, ধর্ম পালনে নতুন ধারার প্রত্যক্ষতা, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং খাদ্যাভ্যাস—পোষাক-আসাকসহ তৈরী হয়েছে জীবন যাপনের স্বতন্ত্র পরিপ্রেক্ষিত। উন্নত না বলে, বরং বলা যেতে পারে, অধিকতর ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ব্যবহারও হয়েছে তাদের দ্বারা। এ সব সত্ত্বেও সম্পদের সৃষ্টি কিংবা আহরণের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো হয়নি সম্ভব। সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা তাদের সময় যেমন লক্ষ করা যায়, অনুরূপভাবে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিতান্ত্রিক ক্ষমতা ধারণই ছিল অবধারিত। ধর্মীয় অনুশাসন ও অদৃষ্টবাদী চেতনাই ছিল সমাজ-মানসের মূল বৈশিষ্ট্য। একেবারে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসেই এ সবের পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠতে থাকে। অবশ্য এর সূচনা ঘটেছিল বাণিজ্য ব্যাপদেশে ইংরেজসহ ইউরোপীয় কয়েকটি জাতি, যেমন, পর্তুগীজ-ফরাসীদের, ভারতবর্ষে আগমনের ভেতর দিয়ে। ততদিনে ইউরোপে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির শুরু হয়েছে জয়জয়কার। অভাবিত শিল্পোন্নয়নের কারণে কাঁচামাল সংগ্রহ ও উদ্বৃত্ত শিল্পপণ্যের বাজারজাতকরণের প্রশ্ন থেকে এসেছে বহির্বাণিজ্যের তাকিদ। ভারতবর্ষে তাদের আসাটা ছিল তার ফলাফল। বাজার সংরক্ষণের জন্য ভূমি দখল করাটাও হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক আবশ্যিক শর্ত। ভারতবর্ষে ইংরেজদের সা¤্রাজ্য স্থাপনের, এটাকেই বলা যেতে পারে, মূল কারণ। এটা নিয়ে ইংরেজ ও ফরাসীদের মধ্যে যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল, তাও ঐতিহাসিকভাবে সত্য। বিস্তৃতভাবে সেসব বর্ণনা করার সুযোগ এখানে নেই। তবে এটা মনে করা অনাবশ্যক নয় যে, ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাসিমের পরাজয়ের পর লর্ড ক্লাইভ, তিনি অবশ্য তখনও লর্ড হননি, তাকে গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল ভারতবর্ষে বাণিজ্যের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। এই বাণিজ্যিক কোম্পানীর বোর্ড অব ডিরেক্টরেরাই ভারত শাসন করেছে প্রায় একশ বছর— সিপাহী বিদ্রোহ দমন করা পর্যন্ত।

১.১. এ প্রসঙ্গে আর যে কথাটি বলা দরকার, তা হল, পরাজয় মীর কাসিমেরই বলি আর সিরাজদ্দৌলারই বলি আর টিপু সুলতানেরই বলি, প্রকৃতপক্ষে এ দেশে ইংরেজদের সা¤্রাজ্য সংস্থাপন ছিল উন্নততর উৎপাদন ব্যবস্থার বিজয়। এই উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল, পূর্বেই বলেছি, ধনতান্ত্রিক। আর বিকাশের সময় তার প্রগতিশীলতাকে কার্ল মার্কস পর্যন্ত অস্বীকার  করেননি। এ বিষয়টাকে, বোধ করি, এ ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তা হল, ঔপনিবেশিক শোষণই ছিল ইংরেজ রাজত্বের মূল কথা। কিন্তু এটাকে নিরুপদ্রব করার প্রয়োজনেই তারা এমন একটি শ্রেণী তৈরী করতে চেয়েছিল, যারা রঙ ও রক্তে হবে ভারতীয়, কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষা ও রুচিতে ইউরোপীয় এবং তারা শাসক ও শাসিতদের মধ্যে কাজ করবে সেতুবন্ধ হিসেবে। অঘোষিতভাবে যা চলে আসছিল, ১৮৩৫ সালে নতুন শিক্ষা নীতি প্রবর্তনের ভেতর দিয়ে লর্ড মেকলের ঘোষণাও ছিল অবিকল তাই। তবে অংশতঃ এটা হলেও, ইংরেজী ভাষাবাহিত শিক্ষা গ্রহণের ফলে জগত ও জীবন সম্পর্কে নতুন বোধের যে তাৎপর্য, তা অবিদিত থাকেনি। রেনেসাঁর দ্বারা ইউরোপীয় জীবনে যা ঘটেছিল, তারই প্রভাব একইভাবে অনুভূত হতে থাকে এ দেশের মানুষের মনেও। এ ভাবেই, ঔপনিবেশিক হলেও, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারা নতুন সভ্যতার অংশীদার হবার সুযোগ আসে। এর ফলে মানস জগতে যে পরিবর্তন সূচিত হয়, তাতে পূর্বতন বিশ্বাস ও সংস্কারের বলয়ে আবদ্ধ থাকাটা অযৌক্তিক হয়ে পড়ে। প্রধানতঃ ইহজাগতিকতা, মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদিতার বোধগুলিই এ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গ্রহণ করে কার্যকর ভূমিকা। ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’— এই বাণী লোকজীবনে প্রচারিত থাকলেও প্রচলিত সমাজে ছিল না তার কোন বাস্তব প্রয়োগ। পেশাভিত্তিক বর্ণ বিভাগ জন্মগত হয়ে সৃষ্টি করে রেখেছিল শ্রেণীভেদের। কৌলীন্য ও  অস্পৃশতা— এ দুটো জিনিস অনুসরণ করা হত প্রবলভাবে। কিন্তু ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থাতে কর্মসংস্থানের যে পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি হল, সেখানে জন্মের আশীর্বাদ কিংবা অভিশাপ নয়, মেধা ও যোগ্যতাই হল মাপকাঠি। এর ফলে সামাজিক অবস্থানের গুরুত্ব নির্ধারিত হতে থাকল ভিন্নভাবে। বাঙালী হিন্দু সমাজ শাস্ত্রীয় অনুশাসনের যে বেড়াজাল দিয়ে ঘেরা ছিল, সেখানেও মানবিকতার বিষয়গুলিই বড় হয়ে দেখা দিল। বিশেষ করে সতীদাহপ্রথা রদ (১৮২৯)  ও বিধবাবিবাহ প্রবর্তন আইন (১৮৫৬)— এ সময়ের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পরবর্তী সময়ে বাঙালী মুসলমান সমাজেও একইভাবে ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজের এক দল ছাত্র, যারা ইতিহাসে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে বিখ্যাত, তারা এ ব্যাপারে এতটাই উগ্র হয়ে পড়েছিলেন যে স্বধর্মীয় অনুশাসন ও নিজেদের সামাজিক আচরণকে অস্বীকার করেছিলেন তীব্রভাবে। তাদের এই কর্মকা- সর্বক্ষেত্রে, হয়ত, যথার্থ ও যথোচিত ছিল না, কিন্তু পর্বতের মতো অনড় জড়দ্গবকে নাড়াতে গেলে, গায়ে হাত বুলানো নয়, লাথি মারাটাই আবশ্যক, সে কথাটা, বোধ করি না বললেও চলে। বস্তুতঃ মানস জগতের এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে একটি আলোকপ্রাপ্ত জীবন গড়ার বাসনাই ছিল প্রতিফলিত। রাজা রামমোহন রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখের কাজ করবার জায়গাটাও ছিল সেখানে।

১.২. এগুলি তো গেল মানসিক জাঢ্যতা, অমানবিকতা, সংস্কারাচ্ছন্নতা দূরীকরণের বিষয়। কিন্তু এর সাথে সাথে এমন কিছু নতুন বোধেরও আহরণ শুরু হয় তখন তখনই, যার ধারাবাহিকতা এখনও পর্যন্ত প্রবহমান আছে। যেমন স্বদেশপ্রেম। জন্মভূমিই বলি আর মাতৃভূমিই বলি, তার সাথে যে কোন মানুষের সম্পর্কই অঙ্গাঙ্গী। কিন্তু কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতার কারণে এই স্বদেশপ্রেমের প্রকাশ ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে খুব কি দেখা গেছে? এমন কথাও শোনা যায়, বাংলার নবাব— সিরাজদ্দৌলা যুদ্ধ করছেন ইংরেজদের সাথে। আর তাঁর দেশের কৃষকেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছে! নিজের দেশ সম্পর্কে স্পষ্ট বোধ থাকলে তো দেশের নবাবের প্রতি অনুরাগ জন্মাবে? প্রাচীন যুগই বলি আর মধ্যযুগই বলি, রাষ্ট্রকে নিজের বলে ভাবার কোন অবকাশ কি তার শাসকেরা তৈরী করতে পেরেছেন? না, কেবল তলোয়ার ঘুরিয়ে উচিৎ শিক্ষা(!) দেবার কাজটাই তারা করতেন? রাজা, রাজদরবার, রাজধানী— আর এসবের সাথে তাদের কি সম্পর্ক,— এগুলি নিয়ে চিন্তা করাটাও খুব জরুরী ছিল বলে মনে হয় না। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হত, আর উলুখাগড়া তারা— প্রাণ যেত। বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এসেই, বোধ করি,  জাতিত্বের ভিন্নতা— সংস্কৃতির ভিন্নতা — এসবের ভেতর দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জাগরণ ঘটে। জাতীয়তাবোধের স্ফুরণ হয়। আর তা থেকেই তারা যে পরাধীন, সেটা হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ। আর কথাটা এ ভাবে বললে কেমন শোনাবে জানি না, সিরাজদ্দৌলাও হয়ে ওঠেন বাংলার নবাব! এ ছাড়া, বহির্জগতের সাথে যোগাযোগ বিস্তৃত করতে থাকে মনের দিগন্ত। সাতসমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে জাতিচ্যূত হবার ঝুঁকি নিতেও থাকে না কোন দ্বিধা। সুতরাং মানস জগতের এই যে পরিবর্তন, তাকে আখ্যায়িত করা যায় ভাববিপ্লব বলে।

এর পাশাপাশি বস্তুজগতের পরিবর্তনটা হতে থাকে দৃশ্যমান। রেলের প্রচলন—টেলিগ্রাফের ব্যবহার জয় করতে শেখায় দূরত্বকে। মুদ্রণ যন্ত্রের দ্বারা বইপুস্তক—পত্রপত্রিকার প্রকাশ হয় নিয়মিত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, কোর্ট-কাচারী স্থাপন, হাসপাতালের ব্যবস্থা কিংবা এই রকম আরও আরও নানাবিধ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জীবন-যাত্রাকে উন্নীত করে নতুন মাত্রায়। সভা-সমিতি করা কিংবা দল বেঁধে পিটিসান লেখা বাদ যায় না কোন কিছুই। রবীন্দ্রনাথের ‘দেশের উন্নতি’ কিংবা ‘বঙ্গবীর’ কবিতা পড়া থাকলে, আর বেশী কিছু বলা লাগবে না, বোধ হয়। গ্রামকেন্দ্রিক একান্নবর্তী পরিবারের মায়া কাটিয়ে শহরাভিমুখী মানুষের মিছিলও হতে থাকে বেগবান। উকিল-মোক্তার, ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট-কেরাণী-পিয়ন, দোকানদার, মাস্টার, ছাত্র, কবি, লেখক, নানা ধরনের চাকুরীজীবীদের সেই মহামেলায় টাউট-বাটপার-পকেটমারও পেশা বেছে নেয় নিজেদের মতো করে।

মাইকেল মধুসূদনের জন্ম (১৮২৪)-এর অন্ততঃ বছর দশেক আগে রাজা রামমোহন রায় কলিকাতাতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সূত্রে স্থাপন করেন আত্মীয় সভা। এই আত্মীয় সভা আসলে ছিল ব্রা‏হ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। হিন্দু সমাজের পৌত্তলিকতাকে বর্জন করে নিরাকার  একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রচলন সূচিত হয় এই ব্রাহ্ম ধর্ম আন্দোলনের দ্বারা। এর ফলে চিত্ত ও চিন্তার মুক্তি যেভাবে ঘটে, তাতে বাঙালী মননে তার অর্জন হয় সূদূরপ্রসারী। ঊনবিংশ এমন কি বিংশ শতাব্দীর যে সব বাঙালীদের নিয়ে গর্ব করা হয়, তাদের অধিকাংশই এসেছেন এই ব্রাহ্ম  সমাজ থেকে। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবারও তার অন্তর্ভুক্ত। বাদ যান না সত্যজিৎ রায়েরাও। জীবনানন্দ দাশও তাই। ইয়ং বেঙ্গলীদেরও অনেকে স্থিত হয়ে এক সময় যোগ দিয়েছিলেন তাতে। রবীন্দ্রনাথের কথা মতো বিশ্বকর্মা বাঙালীর বদলে ‘হঠাৎ’ যাকে মানুষরূপে ‘গড়িয়া’ ফেলেছিলেন, সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ধর্ম নিয়ে এমনিতেই তেমন কোন উৎসাহ ছিল মনে হয় না। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীটা ছিল নিরঙ্কুশভাবে মানবিক। ব্রাহ্ম সমাজের কর্মকা- তাঁর সেই ক্ষেত্রটাকেই বিকশিত করতে প্রাণশক্তি জুগিয়েছে, এমনটা ভাবাই যৌক্তিক। মানুষ তো অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক হয়েছে তার তার চিন্তার প্রসার ও বুদ্ধি বিকাশের দ্বারা। আর ব্রাহ্ম সমাজের মানুষেরাই বাঙালী জীবনে কাজ করেছেন তার পথিকৃৎ হিসেবে। এটা ঠিক যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রথম যৌবনে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ধর্ম যে তাঁরও মুখ্য ছিল না, সেটাও কি কম সত্য? তবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠবার পথে সে সময়ের এই পরিপ্রেক্ষিতটুকুর অবদান, বোধ করি, অস্বীকার করা যায় না।

এ কথা ঠিক যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম-গ্রহণ করার পূর্ব থেকেই চিন্তা-জগতে স্পষ্টতা পেতে থাকে পরিবর্তনের রূপরেখা। আর এই পরিবর্তনের একটা অবশ্যম্ভাবী ফলাফল ছিল সংস্কার মুক্তির আন্দোলন। সংস্কার মুক্তির এই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই, পক্ষে হোক আর  বিপক্ষে হোক, সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও তা যোগ করে এক নতুন মাত্রা। সমকালীন সমাজ সংলগ্নতাই ছিল তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ বি পড়ে বিবি সেজে বিলেতী বোল কবেই কবে জাতীয় কথা লিখলেও কিংবা মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ভারত-শাসন-ভার নেয়াতে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত উল্লসিত হলেও, তাঁর বিদেশের ঠাকুর ফেলে স্বদেশের কুকুর ভজাটাকেও নিতে হবে হিসেবের মধ্যে। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দশক থেকে তার তীব্রতাও পরিদৃষ্টমান। বিধবা বিবাহের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে, বিশেষ করে, নাটক ও প্রহসনগুলির উল্লেখ করা যেতে পারে। প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮)-ও এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মাইকেল মধুসূদন দত্তও এই সময়টাতেই ফিরে আসেন মাদ্রাজ থেকে কলিকাতাতে।

তাঁর জীবনকালের ভেতরেই আর একটি প্রয়োজনীয় বিষয় হল, স্বদেশপ্রেমের চেতনা থেকেই দেশীয় মানস সম্পদের অনুসন্ধান। অতীতই ছিল এই জাতীয় মানস সম্পদের ভিত্তি। সন্দেহ নেই, ধর্মীয় বিবেচনার দিক থেকেই হিন্দু সমাজের ছিল সংস্কৃত ভাষার উত্তরাধিকার। আর সংস্কৃত ভাষা যে কতকটা সম্পদশালী, তাও বোঝা যেতে থাকে এই অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে। বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদ কিংবা এই জাতীয় গ্রন্থগুলির আবেদন এক রকম। কিন্তু রামায়ণ-মহাভারত কিংবা কালিদাস-ভবভূতি-বাণভট্ট প্রমুখের সৃষ্টি তো অন্য জিনিস। তবে আকার কিংবা প্রকৃতি — যার যাই হোক, নবলব্ধ মানস চেতনাতে আবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল তার সংযোগ সাধন। আর এটাও সত্য যে সেগুলিকে যুগোপযোগী না করতে পারলে সম্ভব নয় এই সংযোগ সাধনের। নতুন চিন্তাই বলি আর নতুন সভ্যতাই বলি, তা সব সময়ই পুরানো চিন্তা আর সভ্যতাকে গ্রাস করে। বিজয়ী জাতি বিজিতের আগা-পাস্তলা পারে পালটে দিতে। কিন্তু পুরানো চিন্তা কিংবা সভ্যতার যদি অন্তর্নিহিত শক্তি থাকে, আর সেটাকে যদি কাঠামোগতভাবে আঁকড়ে ধরে না থেকে রি-ইনোভেট করার তাগিদটা ভেতর থেকে এসে যায়, তবে তা হয়ে উঠতে পারে আরও তাৎপর্যময়। খুব বেশী দিনের কথা নয়, আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে এটা দেখা গেছে যে আরবীয়দের দ্বারা পদানত হলেও, পারসিকেরা নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে সমর্থ হয়েছিল ধরে রাখতে। কেবল ধরে রাখা নয়, প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল বিজয়ীদের ভাষা-সংস্কৃতির ওপরেও। ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্যে অনার্য সভ্যতা সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। তখনকার কলিকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ইংরেজী শিক্ষিত বাঙালীরা অনেকটা ধর্মপ্রচারকের মতোই মনোনিবেশ করেছিলেন এই কাজে। তবে এটাও সত্য যে, এই অনুসন্ধানের কাজটা শুরু করেছিলেন ইংরেজ প-িতেরা। উইলিয়াম জোন্স কিংবা ম্যাক্সমুলার সাহেবরাই ছিলেন এর পথপ্রদর্শক। রবীন্দ্রনাথের ‘বঙ্গবীর’ কবিতাতেই তো আছে, যদিও তির্যক ভাবে, ‘মোক্ষমুলার বলেছে আর্য, তাই শুনে মোরা ছেড়েছি কার্য’। কেবল মানস সম্পদের অনুসন্ধান নয়, অতীত ইতিহাসের পুনর্নিমাণ প্রয়াসও পরিলক্ষিত হয় বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি থেকে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবৎকালেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫), ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে। থেমে থাকেন না একটা লিখেই। বাঙ্গালীর ইতিহাস নেই বলে দুঃখ করে লিখে ফেলেন ইতিহাসও। মাইকেলেরও পুরাণ-ইতিহাস নির্ভর কাহিনী নিয়ে লেখাগুলি নিজেদের এই পুনরাবিষ্কারেরই পথপ্রদর্শক।

১.৩. খোদ বৃটেনে রাজতন্ত্র জারী থাকলেও সেখানে পার্লামেন্টের শাসনই ছিল কার্যকর। এর ফলে গণতন্ত্রের প্রচলন নিশ্চিত করতে থাকে ব্যক্তি-অধিকার। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও নৈর্ব্যক্তিক আইন প্রয়োগ হয়ে দাঁড়াতে থাকে মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক। সিপাহী বিদ্রোহের সময় তো মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলিকাতাতেই ছিলেন। সেখানকার ইংরেজী শিক্ষিত মানুষেরা সাধারণভাবে এই বিদ্রোহের  প্রতি অনুকূল মনোভাব প্রদর্শন করেননি বলে অভিযোগও রয়েছে। এটা কতটা ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতির জন্য, তা বলা মুশকিল। এর প্রধান কারণ, তারা আর সিপাহীদের অরাজক রাজত্বে ফিরে যেতে চায়নি। বৌদ্ধিক অনুশীলন ও কর্মকা-ের তাৎপর্য সমষ্টিগত জীবনে এভাবেই প্রতিফলিত হতে শুরু করে। চেতনার ভিত্তিটা পালটে যাওয়াটাই এর হেতু। কেন না, এটা দেখা যায় যে, সিপাহী বিদ্রোহের অল্প পরেই সংগঠিত নীলচাষীদের বিদ্রোহে ঐ ইংরেজী শিক্ষিত মানুষেরাই সমর্থন জুগিয়েছিল। তখনকার কলিকাতাকেন্দ্রিক পত্র-পত্রিকাতে তার বিবরণও রয়েছে। সরকারী চাকুরীজীবী দীনবন্ধু মিত্র লিখেছিলেন নীলদর্পণ নাটক। এ দেশে যারা বাম আন্দোলনের প্রবক্তা, তারাও এটাকে অভিহিত করেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম গণনাটক বলে। আবার নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজী অনুবাদক হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামও অসমর্থিত নয়।

প্রকৃতপক্ষে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নীল বিদ্রোহের প্রতি ইংরেজী শিক্ষিত মানুষদের সমর্থনের ভেতর দিয়ে যে ধারার সৃষ্টি হয়, তারই পরিণতি ঘটে বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদী শাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভে। এই ধারাটা ছিল জনসমর্থন অর্জনের ধারা। এবং সেটা আসতে থাকে নিয়মতান্ত্রিক পথে। সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত ইংরেজ বিরোধিতা ছিল সশস্ত্র। রাজা-বাদশাহ-সামন্ত ভূস্বামীরাই ছিল তার নায়ক। কিন্তু পূর্বেই বলেছি, দেশ ও তার শাসনকর্তাদের সাথে জনমানুষের সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। এ কারণে দেশপ্রেমের চেতনা দানা বাঁধতে পারেনি। কিন্তু নিরস্ত্র মানুষের ঐক্যবোধের ফসল যে অস্ত্রের চেয়েও অধিকতর শক্তিশালী, তখন থেকে শুরু হয় তারই কার্যকারিকতা। সভা-সমিতি স্থাপন করে পরস্পর পরস্পরের কাছে আসা এবং নিজেদেরকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়াটা এসে স্থিত হয় রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে। আর এ ভাবেই সাধারণ মানুষের সংযুক্তি ঘটতে থাকে জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার বেদীমূলে। বিষয়টাকে, বোধ করি স্পষ্ট করা যায় আরও এ ভাবে, তা হল, ইংরেজদের আগমনের পর থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রে এ দেশে একটা শ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে, যাদেরকে গড় হিসেবে দালাল-মুৎসুদ্দী রূপে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তারা হতে থাকে প্রভূত পরিমাণে কাঁচা টাকার মালিক। এই টাকার একটা উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ঘটে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)-এর মধ্য দিয়ে। তবে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির কারণে উৎপাদনমুখী শিল্পে তার ব্যবহার নিষিদ্ধই থেকে যায়। সুতরাং দেশীয় পুঁজি বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে পড়ে সংকুচিত। এ কারণে যে অসন্তোষের বিস্তার ঘটে, তার তীব্রতা অনুভূত হতে থাকে ঊনবিংশ শতাব্দীরই মধ্যভাগ থেকে। মধুসূদনের তখন যৌবনকাল। দেশীয় পুঁজি বিকাশের সমস্যা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে দেশীয়দের অংশগ্রহণ— এই দুটো বিষয়ই জন্ম দিতে থাকে ইংরেজ তথা সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধিতার। এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে অ্যাড্রেস করার জন্যই বৃটিশেরা ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা (১৮৮৫)-র ক্ষেত্রে পালন করে গুরুর ভূমিকা। পরবর্তীতে ঐ সা¤্রাজ্যবাদী স্বার্থেই জনগণকে বিভাজিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি স্থাপন করে মুসলিম লীগ (১৯০৬) গঠনের মাধ্যমে। ইতিহাসে যাকে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ দুটো ঘটনাই অবশ্য মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু-পরবর্তী কালের। কিন্তু তাঁর জীবিত থাকার সময়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার একটা যোগফল তো বটে। এ প্রসঙ্গে, বোধ করি, আর একটি কথা বলে নেয়া ভাল, তা হল, শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস আর ইংরেজদের মুরুব্বী ধরে থাকেনি। বরং বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধিতাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। পক্ষান্তরে বৃটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি’-রই সম্প্রসারণ ঘটে মুসলিম লীগের মাধ্যমে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র পাকিস্তান (১৯৪৭) প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে।

এখন কথা হল, ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে এ দেশীয় জীবনে ভাব ও বস্তু জগতে যে পরিবর্তন ঘটে, তার ফলে সৃষ্টি হয় এক সুদূরপ্রসারী মানস সম্পদের। চিন্তা ও কল্পনার ক্ষেত্রে অভাবনীয় উৎকর্ষের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাও তুলনারহিত। মানবতাবাদী জীবন দর্শন এবং তার বাস্তব ও প্রতীকী উপস্থাপনা খুলে দেয় চিত্তমুক্তির এক নতুন দিগন্ত। রোমান্টিকতা ও সৌন্দর্যসৃষ্টির প্রবহমানতা জন্ম দেয় বিমুগ্ধ বিস্ময়ের। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো আছেনই, এ রকম আরও আরও সৃজনশীল মানুষের নামের তালিকা কতটা দীর্ঘ, তা কমবেশী সবারই জানা। আর তাঁরা  অংশ হয়ে আছেন ইতিহাসের। আপাতদৃষ্টিতে এবং সম্ভবত, সংকীর্ণ অর্থে, তারা হতে পারেন বাঙালী হিন্দু কিংবা ব্রাহ্ম। কিন্তু এই পরিবর্তনটা শুধু তাদের মধ্যেই আসেনি। বাঙালী মুসলমানদের ক্ষেত্রেও তা সমভাবে প্রযোজ্য। গড় হিসেবে, হয়ত, তারা সময়ের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। এবং তার বাস্তব কারণ নির্দেশ করাও খুবই সহজ। তা নিয়ে অবশ্যি বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। তবে একটা তথ্য, বোধ করি, দেয়া যেতে পারে, তা হল, মাইকেলের জীবৎকালের মধ্যেই লেখক হিসেবে মীর মশাররফ হোসেনের আবির্ভাব ঘটেছিল রতœবতী (১৮৬৯) লিখে।

১.৪. ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলের এই পরিবর্তনকে, সাধারণভাবে, নবজাগরণ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এই নবজাগরণকে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে চলমান ইউরোপীয় রেনেসাঁর পরম্পরা হিসেবে গণ্য করার লোকেরও অভাব নেই। এরই সমার্থকরূপে অন্য একটি শব্দ— আধুনিকতার প্রয়োগও সুলভগোচর। এভাবে ভাবার পাল্লাটা ভারী হলেও কূটাভাসও রয়েছে তাতে। আর আমি বিষয়টাকে উপস্থাপন করছি এ জন্যই যে, এই কূটাভাসকে সামনে নিয়ে এসে এর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না দিতে পারলে, শুধু মাইকেল মধুসুদন দত্ত কেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর সমস্ত লোকই, যাদেরকে আমরা প্রাতঃস্মরণীয় বলে পাঠ্যতালিকাভুক্ত পর্যন্ত করে রেখেছি, নড়বড়ে হয়ে যায় তাদের সবারই অবস্থান।

এটা ঠিক যে, এই পরিবর্তনের মূলমন্ত্র— ভাবগতই বলি আর বস্তুগতই বলি, আমাদের দেশীয় সমাজের আত্যন্তিক চাহিদা থেকে, অর্থাৎ একবারে ভেতর থেকে উত্থিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বলা যায়, যে প্রাণচঞ্চলতা নিয়ে কলম্বস পাল তোলা জাহাজে করে আটলান্টিক পাড়ি দিতে মনস্থ করেছিলেন, সেই তীব্রতা আমাদের নবজাগরণ কিংবা রেনেসাঁ কিংবা আধুনিকতা বোধের মধ্যে ছিল না। সা¤্রাজ্যবাদী শাসনের অবস্যুট হিসেবেই এই শিক্ষার বিস্তার ঘটেছিল। শিল্পবিপ্লবের সময় মুনাফার দিকে তাকিয়েই ইংল্যান্ডে শ্রমিকের স্বাস্থ্যরক্ষা ও শিক্ষাদানের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল, যাতে তারা পণ্য তৈরীর কাজটা ভালভাবে করতে পারে। শাসনকার্যের জন্য ভারতবর্ষেও সে রকম জনহিতকর উদ্যোগ নেয়া বিধেয় বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। সুতরাং প্রাথমিকভাবে এটা আরোপিত ছিল, তা নিয়েও কোন বিতর্কের সুযোগ নেই। সুতরাং নবজাগরণ কিংবা রেনেসাঁ কিংবা আধুনিকতা,— সবই তো দাঁড়ায় একটা ফালতু ঘটনা হয়ে!

কিন্তু ব্যাপারটাকে শুধু এভাবে ছেড়ে দিলেই কি চলবে? আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা কি বলে? সেই আদিকাল থেকেই মানুষের অগ্রগতির ধারা পরিবর্তনের নিয়মে আবদ্ধ। কথায় আছে না, ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘোরে না? গতযুগও ফিরে আসে না। বিশ্বনিয়মের এই অমোঘতা সম্পর্কে অজ্ঞতাই কোন কোন শাস্ত্রশাসিত ধর্মের আদিরূপে ফিরে যাওয়ার বাসনাকে করে তুলেছে সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগের কারখানায়। কাজেই, সমাজ প্রবাহের এই চলিঞ্চুতার কারণেই পরিবর্তন একটা স্বাভাবিক বিষয়। আবার এই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সব কালেই দেখা গেছে, কোন একটি বিশেষ সময়ে উৎপাদনের ধরন, ধনবণ্টন, সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস, সমাজ দর্শন কিংবা নৈতিকতার সীমারেখা তার আওতায় থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য হয়ে পড়ে অমানবিক ও নিবর্তনমূলক। কায়েমী স্বার্থের যে উলঙ্গ প্রকাশ ঘটে, তাতে সংখ্যালঘিষ্ঠ একটি সুবিধাভোগী শ্রেণীর আধিপত্যকেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। তবে এই প্রক্রিয়াও যে চিরস্থায়ী নয়, অতীতের দিকে তাকালেই তা প্রতীয়মান হতে পারে। যখন এই অমানবিকতা কিংবা নিবর্তন অসহনীয়তার পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয়, তখনই সমাজে নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটে, তা বিদূরিত করার। এটা যেন অনেকটা সাইকোলিক অর্ডার। তবে প্রশ্ন হল, আমাদের দেশীয় সমাজে এই পরিবর্তনের নিমিত্ত কি ছিল? সমাজ মানসের ভেতর থেকে উঠে আসা আত্যন্তিক তাকিদ যে নয়, সে কথাটা তো আগেই বলেছি। কিন্তু এই পরিবর্তন প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তার উত্তর কি নেতিবাচক হতে পারে? অবশ্যই না। শাস্ত্রশাসিত অনুদার অমানবিক কূপম-ুক বর্ণবাদী হিন্দু সমাজ কিংবা অতীতচারী স্বপ্নাচ্ছন্ন শ্রেষ্ঠত্বগর্বী শিক্ষাবিমুখ মুসলমান সমাজ— কোনটাই কি মানব-মুক্তির পক্ষে ছিল? তারপরও নতুন সভ্যতার যে প্রাণস্পর্ধা, তা নিয়তির মতই অলঙ্ঘনীয় হয়ে ওঠে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ, যেগুলি ইংরেজ ও আর ইউরোপীয় জাতিগুলির অধীনস্থ হয়নি, তারাও কি এই পরিবর্তনের মুখোমুখী দাঁড়ায়নি? সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে এটা তো পরিষ্কার যে বিশ্ব এখন ধনতান্ত্রিক বিশ্বপুঁজির আওতাধীন হয়ে রয়েছে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিও রয়েছে তার গ্রাসের মুখে। শোষণের কলকব্জাকে সে এতটাই পারঙ্গম করে তুলেছে যে, যা তাকে সত্যিকার অর্থেই পরিণত করেছে দানবে। কিন্তু এটাও তো মিথ্যা নয় যে, বিকাশের যুগে সামন্তবাদী ধর্মান্ধ সমাজে মানবিকতা কিংবা ব্যক্তির মুক্তি কিংবা পার্থিবতা কিংবা গণতন্ত্র ইত্যাদি যা তার পটভূমি হিসেবে কাজে করেছে, তা কখনই মূল্যহীন হতে পারে না। আসলে ঔপনিবেশিকতা কিংবা শোষণবাদী ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির মোকাবেলা করেও ঐ পরিপ্রেক্ষিতটুকু অর্জনটাই, বোধ করি, আমাদের জীবনের বড় সত্য। ইংরেজরা  পথটা দেখিয়েছে, বাঙ্গালীরা শুধু সে পথে হাঁটেনি, পথটাকেও করে নিয়েছে নিজের। প্রাচীন ভারতীয় শিল্প-সাহিত্যকে করে নিয়েছে নিজের প্রাণশক্তির আধার রূপে। আর উনিশ শতকের যেসব পথিকেরা সেই দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত  তাদেরই অন্যতম। তাই আমি বলি, নবজাগরণ কিংবা রেনেসাঁ — এ সব শব্দের নিরর্থক অর্থ খুঁজতে গিয়ে পা-িত্যের বিস্তার দেখিয়ে অ্যাকাডেমিক এক্সারসাইজ করে সময় নষ্ট করার কোন দরকার নেই। বরং বাঙ্গালী জীবনে পজিটিভ যা কিছু ঘটেছিল, তা নিয়ে কথা বলাই ভাল। আরও একটা জিনিস মনে রাখা দরকার যে মানব জীবনপ্রবাহের একটা প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সময়ের হেরফেরে তার প্রতিবিম্বন ঘটে। মানুষের মেধা কিংবা বুদ্ধির অনুশীলনের ভেতর দিয়ে তার বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বস্তুতঃ তাই হয়েছিল। এটাকে প্রত্যাখ্যানের কোন সুযোগ আছে কি?

আরও লক্ষ করতে হবে সা¤্রাজ্যবাদী আমলের এই বিষয়গুলি নিয়ে কথা উঠছে কখন? যখন আমরা রয়েছি নয়া-উপনিবেশবাদের উদ্যত থাবার মুখে। সা¤্রাজ্যবাদের মূল চেহারা ছিল ভূমির দখল। সেটা ছিল দৃশ্যমান বিষয়। নয়া উপনিবেশবাদে রয়েছে পুঁজির শাসন। সেটা আপাতঃদৃষ্টিতে অদৃশ্য। ভূমি দখলে রাখার জন্য আগে কামান-বন্দুক উঁচিয়ে রাখতে হত। সেটা ছিল অঞ্চল বিশেষের মামলা। এখন আর তার দরকার পড়ে না। খালি চোখে দেখা যায় না—এমন শিকল পরিয়ে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়েছে সারা পৃথিবী, যা আরও বেশী ভয়ানক। একটির সাথে গেঁথে রাখা হয়েছে আরেকটিকে। একটিতে টান পড়লেই অন্যগুলো কেঁপে ওঠে ঝনঝন করে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলো যখন হাতছাড়া হয়ে গেছে, তখন নতুন তত্ত্বের বাজারজাত করণও হয়ে পড়েছে তাদের জন্য আবশ্যকীয়। এসব তত্ত্বের মধ্যে যেমন উত্তর আধুনিকতার কথাটি বিশেষভাবে বলা যেতে পারে। চারদিকে এই তত্ত্ব যতই ভাঙুক-চুরুক, কিন্তু ভাঙা-চোরাটা নতুন কোন সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি? এক সময় নজরুল তাঁর কবিতায় বলেছিলেন, ‘ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর সৃষ্টির নব পূর্ণিমা’ (রক্তাম্বরধারিণী মা)। তাদের এই ধ্বংস-বিশৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে বাস্তবতার প্রতিলিপি হয়ত তৈরী হচ্ছে, কিন্তু তা থেকে পজিটিভ কোন বিষয় বেরিয়ে আসছে না। ডিফিটিজম সহানুভূতির জিনিস হতে পারে, তবে তাকে হিরোইক বলা যায় না। নারীবাদের যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, তা তো একটি অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপার। একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে এ ব্যাপারে বাণী বিতরণ করে এমনিতেই খুব সুফল আসবে বলে মনে হয় না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলিকে রঙিন চশমা দিয়ে বার বার দেখাতে বাহদুরীই বা আছে কি? পৃথিবীতে, নর বলি, নারী বলি, প্রধান সমস্যা তো উৎপাদন ব্যবস্থার। সম্পদ সৃষ্টি আর তার বণ্টনটাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে বস্তুজগতে তার অবস্থান,— তার মানসিক বৈশিষ্ট্যের ধরন, — তার সংস্কৃতির মাত্রা। সুতরাং সরাসরি তা নিয়ে কথা না বলে তার পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ প্রদক্ষিণ করাটাই তো বিপদজনক। তাতে অপব্যাখ্যার ফানুসে ফানুসে সত্যতাটাই যাবে হারিয়ে। আধুনিকতা যে ঔপনিবেশিক তত্ত্ব, তা তো শেখাচ্ছেন নিও-কলোনীয়ালিজমের তাত্ত্বিকেরা। পার্থক্যটা, বোধ করি এই, আধুনিকতাতে মানবমুক্তির কথাটা যেভাবে এসেছে, উত্তর আধুনিকতাতে সেভাবেই রয়েছে বিশৃঙ্খলার। কোনটা শ্রেয়? আর আধুনিকতাকে যদি শ্রেয় না মানি, তবে, এত দিন পরে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জায়গা হবে কোথায়? শিল্প-সাহিত্যের আবেদন তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতগুলো কি— যা তাঁকে অমরতা এনে দিয়েছে, — তার ভিত্তিটাকেই বা কিভাবে সনাক্ত করা যাবে?

এর উত্তরটা, বোধ করি, এ রকম হতে পারে। তা হল, বিশেষ কালের গর্ভে সৃষ্টি হতে পারে শিল্প-সাহিত্যের, সেখানে কাজ করতে পারে সৃজন-কর্তার মাস্টার মাই-। কিন্তু তা তো মানুষের জীবন বিযুক্ত নয়। এই মানুষও আবার তার সময় ও সংস্কৃতির বাইরে নয়। সেই সময় ও সংস্কৃতির একটা ধরন আছে। সেটা গড়ে ওঠে দেশ-কাল-পাত্রের নিরিখে। এগুলি কোন সার্বজনীন বিষয় নয়। কিন্তু তার চেহারা যেমনই হোক, চুল কোঁকড়ানো হোক আর নিপাট হোক, রঙ কালো হোক আর পীত-সাদা-বাদামী-হলুদ হোক, থাক তারতম্য দাঁত কিংবা চোয়ালে-কপালে, কিন্তু রক্তের রঙ তো লাল। তেমনই মানবিক প্রবৃত্তিগত ব্যাপারটা? আছে কি সেখানে কোন প্রভেদ? মায়া-মমতা, প্রেম-ভালবাসা, করুণা-সেবাপরায়ণতা, বিনয়, আনন্দ, কৃতজ্ঞতাবোধ, বাৎসল্য ইত্যাদি যেমন রয়েছে, তেমনই তার পাল্টা বিষয়গুলো— ঘৃণা, জান্তবতা, জিঘাংসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা, বিষণœতা, সন্দেহ, অহংকার, বিশ্বাসঘাতকতা— এ সবেরও কোন অভাব নেই। মানুষ দেবতা কিংবা শয়তান নয়। তাই তার মহিমা কিংবা পদস্খলন অবস্থান করে থাকে পাশাপাশি। মুহূর্তের মধ্যে সে যেমন উদ্দীপিত হতে পারে মহৎ দায়িত্ববোধে, তেমনই তার পাশবিকতার প্রকাশও দেখা যেতে পারে যত্রতত্র। খ্রীষ্ট-পূর্ব যুগের সক্রেটিসও যা দেখেছেন, এত কাল পরেও এর কোন ব্যতিক্রম হয়নি। সুতরাং সময় ও সংস্কৃতি পালটে যায়, কিন্তু মানুষের এই প্রবৃত্তিজাত বিষয়গুলোর প্রবহমানতা চলতেই থাকে।

প্রায় আড়াই/তিন হাজার বছর আগেকার মহাকাব্যগুলিই, বোধ করি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মানুষ যা কিছু উন্নতি করেছে, তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবহারে। এ ক্ষেত্রেও বরং এটা বলা যায়, তখনকার মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল, বিজ্ঞানবুদ্ধির বিকাশের দ্বারা এখনকার মানুষেরা তার বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে। রাবণ আকাশ পথে সীতাকে নিয়ে গিয়েছিল, — এটা তো আসলে বর্তমানের প্লেনের কাজ। যেসব মারণাস্ত্রের ব্যবহার কুরুক্ষেত্রে হয়েছিল, ধনী দেশের সমর পুঙ্গবেরা এখন তাই বানাচ্ছে। কিন্তু প্রবৃত্তিজাত বিষয়গুলি? নরনারীর সম্পর্ক— প্রেমজ ও দৈহিক, আনন্দ ও বিষাদের কারণগুলি, ত্যাগের মহৎ-ময়তা, লোভ ও লালসার পরাকাষ্ঠা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রতি নিষ্ঠা, গুপ্তহত্যা-ষড়যন্ত্র — কি নেই সেখানে? আরও আছে প্রবৃত্তিজাত ঐ বিষয়গুলির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের ক্ষেত্রে সমাজ ও ধর্মের অনুশাসনের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে প্রচলিত নৈতিক মূল্যবোধের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে অবিরাম আত্মার ক্ষরণ ঘটানো। মানুষের এই ক্ষরিত রূপের উপস্থাপনাই শিল্প-সাহিত্যের মৌলিক কাজ। কিভাবে এগুলি বলা হবে, তার নেই কোন নির্দিষ্ট ব্যাকরণ। কবিতা-গল্প-নাটক-উপন্যাস ইত্যাদির ভেতর দিয়ে যে আঙ্গিকগত বিভিন্নতা তাই তার প্রমাণ। বাকী থাকে রস-নিষ্পত্তি। সন্দেহ নেই এই রসই হল শিল্প সৃষ্টির গহীন-গহীনতম প্রদেশে লুকিয়ে রাখা প্রাণ-ভোমরা। যা শেষ পর্যন্ত পাঠকের অন্তর রাজ্যে ব্যঞ্জনাময় হয়ে সাজিয়ে দেয় সৌন্দর্যের পশরা। এ জন্যই সীতা, দ্রৌপদী, সরমা, উত্তরা, সুভদ্রা, হেলেন, অ্যা-্রােম্যাকি, পেনিলোপী— এরা কিংবা কর্ণ, অর্জুন, হেক্টর, একিলিস, ইউলিসিস, লক্ষ্মণ, অভিমন্যু— এদের কাউকেই অচেনা মনে হয় না আমাদের কাছে। আর মহাকাব্যে তো মানব চরিত্রের মিছিল। তাদের সবাইকে চিনেও নেয়া যায় আলাদা আলাদা করে। বরং লাভ হয় এই যে মেলে তাতে কিছু জ্ঞানের হদিসও। তৎকালীন মানুষের জীবন যাপন ও জীবিকার সংগ্রাম— অনুক্ত থাকে না তাও। সে কালের মানুষদের জীবন প্রবাহের সামগ্রিক রূপ— তাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক করণীয় ও অকরণীয় বিষয়গুলি সম্পর্কেও পাওয়া যায় স্পষ্ট ধারণা। আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, পোষাক-পরিচ্ছদ, উৎসবাদি— এ রকম যাবতীয় জিনিসের সঙ্গে হয় পরিচয়। এখন তো, প্রায় কথায় কথায়, জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালার উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই মহাকাব্যগুলিতে শিশু-নারী-দূত — এরা তো অবাধ্য ছিলই, যুদ্ধরত যোদ্ধারা কাকে কিভাবে আঘাত করতে পারবে না কিংবা এক জনের দ্বারা আরেক জনকে হত্যা করা যাবে না, তাও ছিল নীতি হিসেবে অলঙ্ঘনীয়। এ সবের পাশাপাশি, মানবিক প্রবৃত্তির উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে অলৌকিক ঘটনাগুলোকেও যেভাবে রসসিক্ত করা হয়েছে, তাও মনে হয়, আমাদের লৌকিক জীবনেরই অঙ্গীভূত। তা বিশ্বাসযোগ্যতার দাড়িপাল্লাতে ওজন করার ব্যাপার নয়, বরং কল্পনাশক্তিকেই উল্লসিত করে তোলে। এ কারণেই,  এত সময় পার হলে গেলেও, এগুলির আবেদন কমেনি। বরং পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে চলছে তার পুনর্মূল্যায়নের কাজ। আর শুধু ঐ মহাকাব্যগুলি নয়, তারও পরবর্তীকালে রচিত সাহিত্যের চিরায়ত্ব সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়।

কাজেই, প্রায় দেড় শত বৎসর পার হয়ে গেলেও, মানবিক প্রবৃত্তিজাত বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের সৃষ্টিকর্মের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে দেখতে হবে। বিশেষভাবে এই কথাটি বলার উদ্দেশ্য হল, সাহিত্যের মাধ্যম ভাষা। এই ভাষা প্রথমত মানুষের মনোভাব প্রকাশের মৌলিক অবলম্বন। আবার এটাও সত্য যে, মনোভাবের প্রকাশ ঘটে তার অবস্থানগত পরিপ্রেক্ষিত থেকে। এই অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটে নতুন চিন্তার উদ্ভাবন ও বস্তুগত বিবর্তনের ফলে। এ কারণে তার মনোভাব প্রকাশের ক্ষেত্রও যায় বদলে। নতুন নতুন শব্দই বলি আর পরিভাষাই বলি, ব্যবহৃত হতে থাকে তাও। ভাষারীতিতেও আসে নতুন রূপ। সাহিত্যের ভাষাও গড়ে ওঠে তারই আদলে। মাইকেল নিজেও যেমন তৈরী করেছেন ভাষার এক ভিন্ন রূপ। কিন্তু ভাষা তো সেখানেই থেমে থাকেনি। কাব্যের ছন্দের বেলাতেও একইভাবে চিন্তা করা যায়। ভাব প্রকাশের প্রবহমানতার প্রয়োজনে তিনি সৃষ্টি করেছেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ। সন্দেহ নেই, সেটা ছিল তার মৌলিকতার স্মারক। যুগধমের্র অনিবার্যতা থেকে পরবর্তী কবিরাও যে ছন্দের ভাঙচুর করছেন না, তা তো নয়। সুতরাং তাঁর ভাষা কিংবা অমিত্রাক্ষর ছন্দ বিবেচিত হয়ে আছে কাব্যের ইতিহাসে মাইলস্টোনরূপে। কিন্তু মানুষের আত্মার ক্ষরণের যে প্রবহমানতা, তা তো চিরসত্য। তারই মানদ-ে, যেমন আর সবার হয়, তাঁরও সৃষ্টির বৈভব পরিমাপ করা ছাড়া, গত্যন্তর আছে কি? এবং বলা যায়, এই মানদ-েই তার সৃষ্টি অবিনাশী। কালের অবক্ষয় তা পারবে না গ্রাস করতে।

অন্যদিকে ঔপনিবেশিক কালের তাঁর এই সৃষ্টির অভিনবত্বকে আধুনিক বলে আখ্যায়িত করা হয়, এটাও কোন সময়ের হিসাবের ব্যাপার নয়। বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আমরা আধুনিক  হয়ে গিয়েছিলাম। তা এখন আর নেই, সে জন্য আমরা উত্তর ঔপনিবেশিকতার মধ্যে রয়েছি কিংবা কালের বিচারে উত্তর আধুনিক হয়ে গেছি, এ প্রস্তাবনাও একটি সরল হিসাবের ফল। পূর্বেই বলেছি, উত্তর ঔপনিবেশিকতার যে তত্ত্বটির কথা বলা হচ্ছে, তা নয়া উপনিবেশবাদের একটি চাতুর্যপূর্ণ ফাঁদ। বরং শোষণের প্রক্রিয়াটাকে আরও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনটা কি নয় যে, আধুনিকতার ভেতর দিয়ে মানবমুক্তির যে উপাদানগুলি অর্জিত হয়েছিল, তা বিসর্জন দেবার কথাটাই বলা হচ্ছে উত্তর আধুনিকতার ঢাক বাজিয়ে? ঊনবিংশ শতাব্দীর আধুনিক চেতনার প্রতিক্রিয়ায় বুদ্ধদেব বসুরা তার একটি নতুন চেহারা দেবার প্রয়াস পেয়েছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালে। ব্যক্তিবিচ্ছিন্নতা, হতাশা, নৈরাজ্য, মানসিক উদ্বাস্তুতা, অবক্ষয় ইত্যাদিই ছিল তার বৈশিষ্ট্য নির্দেশক। অনেকে এটাকে বলেছিলেন অত্যাধুনিকতা। সেটাই কি এখন উত্তর আধুনিকতা হয়ে গেছে? আমার কথা হল, শিল্প-সাহিত্যের জন্যই হোক, আর যার জন্যই হোক, মানুষের অধিকার আর তার চিৎ-প্রকর্ষের সঙ্গে যা যুক্ত নয়, তা শুধুমাত্র কেতাবী বিষয়ই হয়ে থাকে, কখনই মৃত্তিকা সংলগ্নতা পায় না। মানুষেরও ধ্যেয় হয় না। আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত মানব বিচ্ছিন্ন নন বলেই, তাঁর শিকড়ও হয়ে আছে মৃত্তিকা প্রোথিত। দেশজ আলো হাওয়ায় তাঁর কর্ষণও থাকবে না থেমে কখনও। এ জন্য অবশ্য দরকারও নেই তাঁকে ‘শ্রীমধুসূদন’ বানানোর। তাঁর অমরতার কারণও এখানেই।

২. মেঘনাদবধ কাব্য-এর সর্গ সংখ্যা নয়। পাঁচ সর্গ সম্বলিত প্রথম খ- প্রকাশিত হয়েছিল, ১২৬৭ বঙ্গাব্দের ২২ শে পৌষ (১৮৬১ সালের ৪ঠা জানুয়ারী)। সে সময় পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১৩১। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত মধুসূদন-গ্রন্থাবলীর পঞ্চম মুদ্রণ ১৩৬৫-এর ভূমিকা থেকে জানা যায়, উক্ত প্রথম খ-ের প্রথম সংস্করণের সম্পূর্ণাঙ্গ পুস্তক সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সেখানে উৎসর্গপত্র— যা ‘মঙ্গলাচরণ’ রূপে ছাপা হয়েছিল, তাতে দেয়া ঐ তারিখটিই প্রকাশকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গতঃ একটি কথা বলে নেয়া ভাল, তা হল, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যয়, যোগীন্দ্রনাথ বসু, নরেন্দ্রনাথ সোম, রেভারে- কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখেরা মাইকেলের জীবন কিংবা গ্রন্থাদি সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছেন, তার প্রমাণাদি প্রাইমারী সোর্স থেকে বিবেচনা করার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, ভূদেব মুখোপাধ্যায়— এঁরা তাঁর সহপাঠী ছিলেন। তাঁরাও মাইকেল সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। এ ছাড়া, মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজেও শিল্পসৃষ্টি নিয়ে নানাজনের কাছে নানা চিঠিপত্র লিখেছেন। এসব থেকে যে তথ্যাদি পাওয়া যায়, সেগুলি সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে। তবে,  সাধারণভাবে, ধরেই নেয় যায়, পরবর্তীকালের যারা মাইকেলকে নিয়ে কাজ করেছেন, তারা ওগুলিকেই প্রাইমারী সোর্স হিসেবে গণ্য করেছেন। আরও তথ্যাদি যদি থেকে থাকে, তা বিনষ্টির স্বীকার হয়েছে কালের। কাকতালীয়ভাবে হয়ত পাওয়া যেতে পারে, তবে তারও কোন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বাকী থাকে কল্প-কাহিনী রচনা করা। তা-ও যে কেউ করছেন না, তাই বা বলি কি করে?

অবশিষ্ট চার সর্গ নিয়ে ঐ ১৮৬১ সালেই মেঘনাদবধ কাব্য-এর দ্বিতীয় খ- প্রকাশিত হয়। নির্দিষ্ট তারিখ না পাওয়া গেলেও আখ্যানপত্রে বঙ্গাব্দ ‘সন ১২৬৮ সাল’-এর উল্লেখ আছে। প্রথম খ-ের প্রথম সংস্করণ মুদ্রিত হয়েছিল জানুয়ারীতে। তার অব্যবহিত পর থেকে বঙ্গাব্দ ১২৬৮ সালের শেষাবধি ধরলেও ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দের প্রথমার্ধের ভেতরেই দ্বিতীয় খ-ের প্রথম সংস্করণ বেরিয়ে গিয়েছিল। কলিকাতার ‘শ্রীঈশ্বরচন্দ্রবসু কোং বহুবাজারাস্থিত ১৮২ সংখ্যক/ ভবনে/ স্টানহোপ যন্ত্রে যন্ত্রিত’।

১৮৬৯ সালের ২০শে জুলাই প্রথম বারের মতো প্রথম খ- ও দ্বিতীয় খ- একত্রে ষষ্ঠ সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয়। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৩২০। মধুসূদনের জীবিতকালে প্রকাশিত আর কোন সংস্করণের সন্ধান পাওয়া যায় না বলে এটাকেই শেষ সংস্করণ রূপে ধরা হয়। তৎপূর্বে বাংলা সাহিত্যের আরেক মহাকাব্যকার হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বঙ্গাব্দ ১২৬৯-এ প্রথম খ-ের ও বঙ্গাব্দ ১২৭০-এ দ্বিতীয় খ-ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণে প্রথম খ-ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ?+১৫১; দ্বিতীয় খ-ের ১২৮। প্রথম খ-ের দ্বিতীয় সংস্করণে হেমচন্দ্রের ‘মুখবন্ধে’র তারিখ ছিল ১০ই শ্রাবণ, ১২৬৯।  এই ‘মুখবন্ধ’টির শেষে ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতাটি মুদ্রণ করা হয়েছিল। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১৮৬২ সালের ৯ই জুন তারিখে ‘ক্যা-িয়া’ জাহাজ যোগে মাইকেল মধুসূদন ইউরোপ যাত্রা করেন। সঙ্গত ভাবেই এই সংস্করণগুলি প্রকাশের সময় তিনি বিদেশে। তবে এখানে আর একটি বিষয়ও প্রশ্ন সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হল, উৎসর্গপত্র— ‘মঙ্গলাচরণে’র পরিবর্তিত তারিখ— ‘২৫শে ভাদ্র, সন ১২৬৯’। কি ভাবে এটি হয়েছে, কিংবা এটি মুদ্রণজনিত প্রমাদ কিনা, সম্ভবতঃ, এতদিন পরে তা নির্ধারণ করা যাবে না। ধরে নেয়া যায়, মাইকেলের  অনুপস্থিতির কারণেই আর দীর্ঘদিন কাব্যটির কোন নতুন সংস্করণ বের হয় নাই। ১৮৬৭ সালে তাঁর প্রত্যাগমনের পর ঐ সালেরই ২১শে আগষ্ট প্রথম খ-ের তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৪৮; ৩রা ডিসেম্বর চতুর্থ সংস্করণ, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৭২ ও ১৮৬৯ সালের ১৬ই মার্চ পঞ্চম সংস্করণ, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৭২, প্রকাশ পায়। প্রথম খ-ের চতুর্থ সংস্করণ থেকে হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের ‘মুখবন্ধ’টি আমূল পরিবর্তিত হয়ে ‘ভূমিকা’ নামে প্রকাশিত হয়। তারিখ ছিল ১৩ই আশ্বিন, ১২৭৪ সাল (২৮শে সেপ্টেম্বর, ১৮৬৭)। দ্বিতীয় খ-ের কোন তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সংস্করণ হয়েছিল বলে জানা যায় না।

প্রকাশের সময় মেঘনাদবধ কাব্যটি উৎসর্গিত হয়েছিল রাজা দিগম্বর মিত্রের নামে। প্রথম সংস্করণের প্রথম খ-ে ‘মঙ্গলাচরণ’ শিরোনামে উৎসর্গপত্রটি ছিল  নি¤œরূপ :

                                                                                মঙ্গলাচরণ।

                                বন্দনীয় শ্রীযুক্ত দিগম্বর মিত্র মহাশয়,  বন্দনীয়বরেষু।

আর্য্য,— আপনি শৈশবকাল অবধি আমার প্রতি যেরূপ অকৃত্রিম ¯েœহভাব প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন, এবং স্বদেশীয় সাহিত্যশাস্ত্রের অনুশীলন বিষয়ে আমাকে যেরূপ উৎসাহ প্রদান করিয়া থাকেন, বোধ হয়, এ অভিনব কাব্যকুসুম তাহার যথোপযুক্ত উপহার নহে। তবুও আমি আপনার উদারতা ও অমায়িকতার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহস পূর্ব্বক ইহাকে আপনার শ্রীচরণে সমর্পণ করিতেছি। ¯েœহের চক্ষে কোন বস্তুই সৌন্দর্যবিহীন দেখায় না।

যখন আমি ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ নামক কাব্য প্রথম প্রচার করি, তখন আমার এমন প্রত্যাশা ছিল না, যে এ অমিত্রাক্ষর ছন্দ এ দেশে ত্বরায় আদরণীয় হইয়া উঠিবেক। কিন্তু এখন সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয়ই নাই। এ বীজ অবসরকালেই সৎক্ষেত্রে সংরোপিত হইয়াছে। বীরকেশরী মেঘনাদ সুরসুন্দরী তিলোত্তমার ন্যায়, প-িতম-লীর মধ্যে সমাদৃত হইলে, আমি এ পরিশ্রম সফল বোধ করিব— ইতি।

কলিকাতা                                                 দাস শ্রী মাইকেল মধুসূদন দত্ত

                ২২শে পৌষ, সন ১২৬৭ সাল

বলা হয়েছে, রাজা দিগম্বর মিত্র প্রথম সংস্করণের ব্যয় ভার বহন করেন, এ কারণে মাইকেল মধুসূদন এই কাব্যটি তাকে উৎসর্গ করেছিলেন। তবে তিনি দেশে ফিরে আসার পর তৃতীয় সংস্করণ থেকে ‘মঙ্গলাচরণ’ বর্জিত হয়। ইউরোপ প্রবাসকালে রাজা দিগম্বর মিত্রের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতিই এর কারণ বলে অনেকে মনে করেন। তবে এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি করা যেতে পারে, তা হল, রাজা দিগম্বর মিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিষয়ে তিনি প্রশংসাসূচক যে মনোভাব পোষণ করেছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের নিরিখে তার মূল্যায়ন করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত? তবে যেহেতু তাঁর জীবৎকালেই এটি বর্জিত হয়েছে, এ কারণে, এত দিন পর যে কোন সম্পাদিত সংস্করণে তা মুদ্রণের কোন সুযোগ নেই। এ জন্য শুধু তথ্য হিসেবে তা উল্লেখ করা হল।

মেঘনাদবধ কাব্যটির প্রথম খ- প্রকাশের পর কলিকাতার বিদ্যোৎসাহিনী সভা মূলতঃ কালীপ্রসন্ন সিংহের উদ্যোগে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ‘রৌপ্যময় পাত্র’ প্রদানের জন্য একটি ‘উপহার অর্পণ উৎসব’-এর আয়োজন করে। এ উপলক্ষে রচিত অভিনন্দনপত্র তখনকার সারস্বত সমাজের শিল্প-সাহিত্য রুচির এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অভিনন্দনপত্রটি ছিল নি¤œরূপ :

এড্রেস।— মান্যবর শ্রীল মাইকেল মধুসূদন দত্ত মহাশয় সমীপেষু।

                কলিকাতার বিদ্যোৎসাহিনী সভার সবিনয় সাদর সম্ভাষণ নিবেদনমিদং।

যে প্রকারে হউক বাঙ্গালা ভাষার উন্নতিকল্পে কায়মনোবাক্যে যতœ করাই আমাদের উচিত, কর্তব্য, অভিপ্রেত ও উদ্দেশ্য। প্রায় ছয় বর্ষ অতীত হইল বিদ্যোৎসাহিনী সভা সংস্থাপিত হইয়াছে এবং ইহার স্থাপনকর্তা তাহার সংস্থাপনের উদ্দেশ্যে যে কতদূর কৃতকার্য হইয়াছেন তাহা সাধারণ সমুদয় সহৃদয় সমাজের অগোচর নাই। আপনি বাঙ্গালা ভাষায় যে অনুপম অভূতপূর্ব অমিত্রাক্ষর কবিতা লিখিয়াছেন, তাহা সহৃদয় সমাজে অতীব আদৃত হইয়াছে, এমন কি আমরা পূর্বে স্বপ্নেও এরূপ বিবেচনা করি নাই যে কালে বাঙ্গালা ভাষায় এতাদৃশ কবিতা আবির্ভূত হইয়া বঙ্গদেশের মুখ উজ্জ্বল করিবে। আপনি বাংলা ভাষার আদি কবি বলিয়া পরিগণিত হইলেন, আপনি বাঙ্গালা ভাষাকে অনুত্তম অলঙ্কারে অলঙ্গকৃত করিলেন, আপনা হইতে একটি নতুন সাহিত্য বাঙ্গালা ভাষায় আবির্ভূত হইল, তজ্জন্য আমরা আপনাকে সহ¯্র ধন্যবাদের সহিত বিদ্যোৎসাহিনী সভাসংস্থাপক প্রদত্ত রৌপ্যময় পাত্র প্রদান করিতেছি। আপনি যে অলোকসামান্য কার্য করিয়াছেন তৎপক্ষে এই উপহার অতীব সামান্য। পৃথিবীম-লে যতদিন যেখানে বাঙ্গালা ভাষা প্রচলিত থাকিবেক তদ্দেশবাসী জনগণকে চিরজীবন আপনার নিকট কৃতজ্ঞতা পাশে বদ্ধ থাকিতে হইবেক, বঙ্গবাসীগণ অনেকে এক্ষণেও আপনার সম্পূর্ণ মূল্য বিবেচনা করিতে পারে নাই কিন্তু, যখন তাহারা সমুচিতরূপে আপনার অলৌকিক কার্য বিবেচনায় সক্ষম হইবেন, তখন আপনার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশে ক্রুটি করিবেন না। আজি আমরা যেমন আপনাকে প্রতিষ্ঠা করিয়া আপনার সহবাস লাভ করিয়া আপনা আপনি ধন্য ও কৃতার্থস্মন্য হইলাম, হয়ত সেদিন তাঁহারা আপনার অদর্শনজনিত দুঃসহ শোকসাগরে নিমগ্ন হইবেন। কিন্তু যদিচ আপনি সে সময় বর্তমান না থাকুন বাঙ্গালা ভাষা যতদিন পৃথিবীম-লে প্রচারিত থাকিবে ততদিন আমরা আপনার সহবাস সুখে পরিতৃপ্ত হইতে পারিব সন্দেহ নাই। এক্ষণে আমরা বিনীত ভাবে প্রার্থনা করি আপনি উত্তরোত্তর বাঙ্গালা ভাষার উন্নতিকল্পে আরও যতœবান হউন। আপনা কর্তৃক যেন ভাবী বঙ্গসন্তানগণ নিজ দুখিনী জননীর অবিরল বিগলিত অশ্রুজল মার্জনে সক্ষম হন। তাঁহাদিগের দ্বারা যেন বঙ্গভাষাকে আর ইংরেজী ভাষা সপতœীর পদাবনত হইয়া চিরসন্তাপে কালাতিপাত করিতে না হয়। প্রত্যুত আমরা আপনাকে এই সামান্য উপহার অর্পণ উৎসবে যে এ সকল মহোদয়গণের সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি ইহাতে তাহাদিগের নিকট চিরবাধিত রহিলাম, তাঁহারা কেবল আপনার গুণে আকৃষ্ট ও আমাদের উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া এ স্থানে উপস্থিত হইয়াছেন। জগদীশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি তাহারা যেন জীবনের বিশেষ ভাগ গুণগ্রহণে বিনিয়োগ করেন।

কলিকাতা                                          বিদ্যোৎসাহিনী সভার সভ্যবর্গণাম্।

বিদ্যোৎসাহিনী সভা

২ ফাল্গুন ১৭৮২ শকাব্দ।

এই অভিন্দনপত্রটি ১৮৬১ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারী ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকাতে মুদ্রিত হয়েছিল। বিদ্যোৎসাহিনী সভার সভ্যগণ যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের শিল্পসৃষ্টি-মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিশয় দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন, তা এই অভিনন্দন পত্রটির কনটেন্ট থেকেই বোঝা যায়।

নিছক প্রশংসা-বাক্য, যা সাধারণতঃ বিনয়বশতঃ আলঙ্কারিক প্রয়োগ দ্বারা সৌকর্যম-িত করা হয়, বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের অমরতা তা মিথ্যা প্রমাণ করেছে। এটা বিদ্যোৎসাহিনী সভার সভ্যদেরও বিশেষ কৃতিত্ব যে তা সনাক্ত করার মত বিচারবুদ্ধির অধিকারী তারা ছিলেন। এটাও লক্ষ করার বিষয় যে তারা মাইকেলের কাছে বাংলা ভাষার উত্তরোত্তর উন্নতি প্রত্যাশা করেছিলেন। আর এটা করেছিলেন এ জন্যই যে ভাষার উন্নতির ভেতর দিয়ে ‘আপনা কর্তৃক যেন ভাবী বঙ্গসন্তানগণ নিজ দুখিনী জননী’ অর্থাৎ স্বদেশের ‘অবিরল বিগলিত অশ্রুজল’ মার্জনা করার অর্থাৎ তার সুখী-সমৃদ্ধ চেহারা নিশ্চিত করতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এর মানে হল, ভাষার উন্নতির সাথে দেশের উন্নতিকেও তারা দেখেছিলেন এক করে। এ থেকে, বোঝা যায়, তারা কতটা ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা ছিলেন, কিংবা ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা না হলেও, রোপন করেছিলেন প্রত্যাশাবোধের বীজ। মাইকেল যে ভাষার অর্গল খুলে দিয়েছিলেন, তাতে শুধু দুখিনী জননীর অবিরত বিগলিত অশ্রুজলেরই মোচন হয়নি, অধিকন্তু, পরবর্তীকালে, তিনি নিজেও যা দেখে যেতে পারেননি, তা হল, সেই ভাষাকে কেন্দ্র করেই জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটা ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে ‘নিজ দুখিনী জননী’কে শৃঙ্খল মুক্ত করে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঙালীর আত্মপ্রতিষ্ঠা।

২.১. এটা বোধ হয়, অবিসম্বাদিতরূপে প্রতিষ্ঠিত যে বাংলা সাহিত্যে সনেট কিংবা ট্রাজিক নাটক সৃষ্টিতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পথপ্রদর্শনা ও অর্জন বিস্ময়কর হলেও তাঁর খ্যাতির প্রশ্নাতীত কারণ হল মেঘনাদবধ কাব্য। তবে এই মেঘনাদবধ কাব্য পর্যন্ত পৌঁছাতে তিনি কতটা পথ কি ভাবে ভেঙেছেন কিংবা কি ভাবে তার পূর্বভূমিকা তৈরী হয়েছে, তার একটা জরীপ করাটাও প্রাসঙ্গিক। এটা করতে গেলে, যেটা পাওয়া যায়, তা হল, মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশের আগে তাঁর মুদ্রিত গ্রন্থগুলি :

                                ক) শর্মিষ্ঠা নাটক — ১৮৫৯

                                খ) একেই বলে সভ্যতা? — ১৮৬০

                                গ) বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ — ১৮৬০

                                ঘ) পদ্মাবতী নাটক — ১৮৬০

                                ঙ) তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য — ১৮৬০

এই তালিকা থেকে দেখা যায়, প্রকাশিত পাঁচটি গ্রন্থের চারটিই নাটক ও প্রহসন। মাদ্রাজ থেকে কলিকাতা প্রত্যাবর্তনের পর বেলগাছিয়া নাট্যশালার সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ঘটে। কিন্তু ‘অলীক কুনাট্য রঙ্গে’ রাঢ়-বঙ্গের লোকের মজ্জমানতা ‘নিরখিয়া’ তিনি তা সহ্য করতে না পেরে মনোনিবেশ করেন নাট্যরচনাতে। ১৮৫৯ সালের মধ্যভাগে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের মহড়ার সময় ব্লাঙ্কভার্সের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর মনে সচেতনতা আসে। বলা যায়, ইংরেজী ভাষার এই ব্লাঙ্কভার্সের নিরীক্ষাই অমিত্রাক্ষর ছন্দ রূপে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ই বাংলা ভাষায় তাঁর প্রথম কাহিনীকাব্য রচনার সূচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশের বছর আর যে গ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়, তার একটি হল, ব্রজাঙ্গনা কাব্য—যেখানে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহৃত হয়নি। আরেকটি কৃষ্ণকুমারী নাটক। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে ধারণা করা হয় ১৮৬২ সালে প্রকাশিত বীরাঙ্গনা কাব্যের রচনাও শুরু হয়েছিল ১৮৬১ সালের শেষ অর্ধে।

তবে যেটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়, তা হল, কিশোর বয়সেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষার নয়, হতে চেয়েছিলেন ইংরেজী ভাষার কবি। আর কবি হওয়াটা যে অসীম প্রতিভাসম্পন্ন মানুষদেরই সাজে, সে বিষয়ে একটা অহমিকা বোধই কাজ করত তার মনে। এমন একটা কথাও প্রচলিত যে তিনি বলতেন, সেক্সপীয়ার চাইলে নিউটন হতে পারতেন, কিন্তু নিউটনের পক্ষে সেক্সপীয়ার হওয়া সম্ভব ছিল না। সুতরাং কবিরা যে বৈজ্ঞানিকদের চেয়েও অধিকতর প্রতিভাশালী, তা ছিল তাঁর বিশ্বাসেরই অঙ্গীভূত। কল্পনা করার চেয়ে বড় শক্তি মানুষের নেই, খোদ আইনস্টাইনও বলেছেন এ কথা। এটা ধরে নিলে, কল্পনা প্রবণতা যে কবিদেরই মৌলিক গুণ, তাও অস্বীকার করার কিছু নেই। বস্তুবিশ্বকে কল্পনার রঙে রাঙাতে গেলে বিশেষ প্রতিভার অনিবার্যতাও প্রয়োজন। আর বৈজ্ঞানিকদের কাজ হল, বস্তুবিশ্বের উন্নততর রূপ নির্মাণকে বাস্তবগ্রাহ্যতা দেয়া। এখানেও তারাও কল্পনার কাছে ঋণী। যেটাকে ইনোভেশন বলা হয়, সৃজনশীলতার সেই ক্ষমতা অবশ্য বৈজ্ঞানিকদেরও আছে। কিন্তু এই ইনোভেশনের ভিত্তি বস্তুকেন্দ্রিকতা। সেটার প্রয়োগ, বোধ হয়, এ কারণেই দায়হীন নয়। ‘দায়হীন নয়’ বলছি এ কারণেই যে, কবিরা যেমন অবারিত কল্পনার মুক্তপক্ষ বিস্তার করে থাকেন, সেখানে বৈজ্ঞানিকদের এগোতে হয় হাইপোথেটিকালি কোন কিছু ধরে নিয়ে। যা হোক, এটা কোন তর্ক অথবা কুতর্কের বিষয় নয়। মাইকেলের কিশোর মনে এই বিষয়টির অবতারণা হয়েছিল বলে সেটাকে কিছুটা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ করে তোলার এই চেষ্টা।

১৮৩৩ থেকে ১৮৪৩ সালে ধর্মান্তরিত হবার পূর্ব পর্যন্ত মাইকেল হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন। বাঙালীর চিন্তাজগতে নতুন প্রেক্ষিত সৃষ্টিতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রথম দিকে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের অতিরিক্ত পাশ্চাত্য জীবনপ্রীতি হিন্দু সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি ঘোরতর অনাস্থা প্রদর্শন করলেও তাদের চিন্তার প্রাগ্রসরতা মেধা ও মননের ক্ষেত্রে সূচিত করে এক বৈপ্লবিক তাৎপর্যের। মাইকেল যখন ছাত্র হয়ে আসেন, ততদিনে হেনরী ভিভিয়ান ডিরোজিও কলেজ থেকে বিতাড়িত হলেও, কাপ্তেন রিচার্ডসনসহ রিজ, হালফোর্ড, ক্লিন্ট-এর মতো খ্যাতনামা অধ্যাপকগণ তথায় ছিলেন। রামচন্দ্র মিত্র কিংবা রামতনু লাহিড়ীরা নি¤œশ্রেণীতে শিক্ষা দান করতেন। সুতরাং তখনকার সুপ্রসিদ্ধ শিক্ষকদের কাছে তিনি লেখাপড়া করেছেন, এটিও একটি উল্লেখ করার বিষয়।

তাঁর কাব্যপ্রতিভার স্ফুরণও ঘটে এখানেই। ইংরেজী সাহিত্যপ্রীতিই ছিল তার ভিত্তি। কবিতা লেখাও শুরু করেন ইংরেজীতে। বেঙ্গল স্পেক্টেটর, লিটারেরী গ্লিনার, ক্যালকাটা লিটারেরী গেজেট, লিটারেরী ব্লজম, কমেট প্রভৃতি পত্রিকাতে প্রকাশিত হত এসব কবিতা। এগুলো যে কোন ধরনের খ-কবিতাই হোক না কেন,— সনেট কিংবা ভার্স, লিরিকধর্মীতাই ছিল তার মূল সূর। এটা ঠিক যে ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাবেই তখন বাংলা ভাষাতেও শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে পালাবদল ঘটা শুরু হয়েছে। চর্যাপদের ধর্মীয় সঙ্গীতগুলি কিংবা বৈষ্ণব পদাবলীর কথা বাদ দিলে কাহিনীকাব্য রচনাই ছিল মূলধারা। ভারতচন্দ্র পর্যন্ত তার প্রবহমানতা লক্ষ করা যায়। কবিওয়ালা-তর্জাওয়ালাদের দ্বারা শিকড়প্রোথিত সৃষ্টির উদাহরণও রয়েছে। কিন্তু একান্তভাবেই সাবজেক্টিভ— যা গীতিকবিতার মূলধর্ম, তা পাওয়া যেতে থাকে ঐ সময় থেকেই।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের খ-কবিতাও প্রতিনিধিত্ব করে তারই। এটা আসলে তখনকার ব্যক্তিমুক্তির যে বোধ সমাজ মানসে গ্রথিত হচ্ছিল, তাকেই করে তোলে পরিদৃশ্যমান। কাজেই, এটা মেনে নেয়া, বোধ হয়, অযৌক্তিক নয় যে, ইংরেজী ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করলেও একজন বঙ্গসন্তান হিসেবে তখনকার পরিবর্তিত ভাবাদর্শের সামগ্রিক রূপের মধ্যেই মাইকেল লালিত হয়েছিলেন। তা ছাড়া, বয়ঃসন্ধিকালে পুরুষের কাছে রমণীবিস্ময়ও একটা বড় জিনিস। এ বয়সে অবজেক্টলেস প্রেমের কবিতা লেখাটাও হাতেখড়ি নেয়ার মতো। মাইকেলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুধু নামগুলি লক্ষ করুন — ‘মাই ফ- সুইট ব্লু-আইড লেডী’, ‘টু এ লেডী’, ‘টু অ্যানাদার লেডী’, ‘অন হিয়ারিং এ লেডী সিং’, ‘অন এ ফেডেড লিলি গিভেন টু দি অথার বাই এ লেডী’, ‘আই লাভড দি’। সে সময় প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাও তিনি লিখেছেন, যেমন, ‘দি ফরচুনেট রেইনি ডে’, ‘এ স্টর্ম নাইট’, ‘টু এ স্টার ডিউরিং এ ক্লাউডি নাইট’। তাঁর সনেট রচনারও সূত্রপাত ঘটেছে তখন তখনই, যেমন, ‘সনেট অব ফিউচারিটি’, ‘কমপোজড ডিউরিং ইন মনিং ওয়াক’, ‘কমপোজড ডিউরিং ইন ইভিনিং ওয়াক’ ইত্যাদি। ‘দি হেভেনলি বল’সহ আরও কয়েকটি কবিতা উৎসর্গিত হয় গৌরদাস বসাকের উদ্দেশ্যে। পাওয়া যায় ‘দি অপ্সরী’ ও ‘কিং পুরুস’ নামে দুটি দীর্ঘকবিতাও। মাদ্রাজ প্রবাসকালে তাঁর দুটো উল্লেখযোগ্য রচনা হল, ‘ভিশনস অব দি পাষ্ট’। খ্রীস্টিয় বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা। অন্যটি ‘ক্যাপটিভ লেডী’। পূর্বে রচিত দীর্ঘকবিতা ‘দি অপ্সরী’ ও ‘কিং পুরুস’-এর মতো ‘ক্যাপটিভ লেডীতে’ও দেশীয় ইতিহাস ও পুরাণের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে কালী, রুদ্র, লক্ষ্মীদেবী, অগ্নিদেব, সরস্বতী দেবী— উপস্থিতি রয়েছে এদের। কাজেই, বাংলা ভাষায় লেখা শুরু করার পরই মাইকেল দেশীয় ইতিহাস ও পুরাণ অবলম্বন করেছেন, এমন কথা বলা যায় না। সে সময়ে, সুলতানা রিজিয়া, যাকে ভারতের প্রথম সা¤্রাজ্ঞী বলা হয়, তাঁকে নিয়ে একটা ইংরেজী নাটকও লিখেছেন— ‘রিজিয়া : এমপ্রেস অব ই-ি’।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখক জীবনের ফরমেটিভ স্টেজে আরও একটি ব্যাপার ঘটেছিল। তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার ভূমিকার যে অনিবার্যতা, তখন থেকেই তার উপস্থিতি লক্ষ্যগোচর হতে থাকে। মাদ্রাজে অবস্থানকালে এ সব অনেক পত্রপত্রিকার সাথেই তিনি জড়িত ছিলেন। মাদ্রাজ সার্কুলেটার অ্যা- ক্রনিকল, অ্যাথেনিয়াম, স্পেক্টেটর প্রভৃতির সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাওয়া যায়। মাদ্রাজের একমাত্র দৈনিক স্পেক্টেটরের সহসম্পাদনাও করেছেন। অ্যাথেনিয়ামের সম্পাদকও ছিলেন কিছুকাল। এ ছাড়া, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিন্দু ক্রনিকল-এরও সম্পাদক ছিলেন। কাজেই, সাংবাদিকতাও তাঁর জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অংশ। কবি-সাহিত্যিকদের সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত থাকা কিংবা সেখানে চাকুরী করা এখন আর নতুন কিছু নয়। এখানেও দেখা যায়, মাইকেল কাজ করেছেন পথপ্রদর্শক হিসেবে। তবে সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত সৃজনশীলতা নয়, বস্তুবাদিতা আর মননশীলতা। সমকালীন জীবন, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি কিংবা সংস্কৃতিকে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে তার যৌক্তিক ও শ্রেয়তার পর্যবেক্ষণ করাটাই তার উদ্দিষ্ট। মাইকেলের এই বিচেনাগুলি কেমন ছিল অথবা এর ভেতর দিয়ে তাঁর মননশীল চিন্তার প্রকাশ কিভাবে ঘটেছে, আজ তা, বুঝি, উদ্ধারের কোন উপায় নাই। শোনা যায়, কলিকাতার ‘হরকরা’ পত্রিকায় কোন কোন রচনা পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। সেগুলি পাওয়া গেলেও শুধুমাত্র তার ভিত্তিতে মাইকেলের চিন্তার জগৎকে সনাক্ত করা দুঃসাধ্য।

মাদ্রাজ গমনের পূর্বে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মানস গঠন ও প্রবণতা বিষয়ে আর যে তথ্যটি পাওয়া যায়, তা হল, ধর্মান্তরিত হবার পর তাঁর আর সুযোগ ছিল না হিন্দু কলেজে পড়ার। তাঁকে ভর্তি হতে হয়েছিল খ্রীষ্টান ছাত্রদের অধ্যয়ন স্থল বিশপস কলেজে। এখানেই তাঁর প্রাচীন ভাষা, যেমন গ্রীক, ল্যাটিন, হিব্রু শেখার সুযোগ আসে। এটাই, বলা যেতে পারে, তাঁর ক্লাসিক শিল্পচেতনার ভিত্তি। মেঘনাদবধ কাব্যে যার প্রকাশ ঘটেছে স্বতোৎসারিতভাবে। অন্যদিকে তাঁর প্রতিবাদী মনের একটি পরিচয়ও স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে সেখানে। সেটা হল, মানবতাবাদী চিন্তার যে ধ্বজা ইংরেজেরা বহন করে নিয়ে এসেছিল এ দেশে, কিন্তু বাস্তবতঃ তার প্রয়োগটা ছিল না যথাযথ। তারা নিজেরা ছিল হোয়াইট, আর তাদের কাছে দেশীয় লোকেরা ছিল নেটিভ। দেশীয় খ্রীষ্টান, যারা, সাধারণভাবে পরিচিত ছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলে, তাদেরকেও মনে করত না সমপর্যায়ভুক্ত। বিশপস কলেজেও ইউরোপীয় খ্রীস্টান ছাত্র ও দেশীয় খ্রীস্টান ছাত্রদের দেখা হত না এক করে। এর ফলে এক বৈষম্যমূলক আচরণের স্বীকার হতে হত তাদেরকে। মাইকেল মধুসূদন মেনে নিতে পারেননি এই বৈষম্যকে। খাবার টেবিলে গ্লাস ভেঙে কিংবা নানা রঙের পোষাক পরে তিনি যেভাবে প্রতিবাদ মুখর হন, তাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিলেন সেখানকার নানা অগণতান্ত্রিক বিধান রদ করতে। এ থেকে তিনি নিজে যে কতটা মানবিক ও স্বাধীনচেতা ছিলেন, তা বোঝা যায়। তাঁর রচিত শিল্পসাহিত্যেও এ মনোভাবের প্রকাশ নিত্যগোচর।

এবার একটু কেতাবী কথায় আসি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধকে বলা হয়ে থাকে বাংলা সাহিত্যের নির্মাণ যুগ। শেষ অর্ধ সৃষ্টি যুগ। নির্মাণ ও সৃষ্টি— এ দুটো শব্দের অর্থ এক রকম হলেও তাৎপর্য ভিন্ন বলে বিবেচনা করা হয়। উপাদানাদি দিয়ে কোন কিছুকে বানানোকে যদি নির্মাণ বলি, তবে, তাতে কল্পনার রঙ ছড়ানোটাই মর্যাদা পায় সৃষ্টির। এ কারণেই ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যেহেতু সৃজনশীল সাহিত্যের উৎকর্ষ আসেনি, তাই সেটা হয়ে গেছে নির্মাণ। আর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তার বিকাশ লক্ষ্যযোগ্য মাত্রাই যে কেবল পেয়েছে, তাই নয়, তাতে আসতে থাকে ভরা জোয়ার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাহিত্যিক গদ্য, আলালের ঘরের দুলালের সমাজ-সংলগ্নতা, বিহারীলালের গীতিকবিতা, দীনবন্ধু মিত্রের নীল-দর্পণ, বঙ্কিমের উপন্যাস ইত্যাদি থেকে যার গতিধারায় প্লাবিত হতে থাকেন রবীন্দ্রনাথও। তবে সৃষ্টির এই উন্মেষের সাবালকত্বের কথা যদি স্থির করতে হয়, তবে তার সবটুকু কৃতিত্ব অবশ্যই মাইকেল মধুসূদন দত্তের।

২.২. মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম ও প্রধান খ্যাতি মহাকাব্য হিসেবে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য— উভয় সাহিত্যেই শিল্প-তাত্ত্বিকেরা শিল্পাঙ্গিক রূপে মহাকাব্যের স্থানও নির্ধারণ করে রেখেছেন। প্রাচ্য মহাকাব্যের প্রতিশব্দ হিসেবে পাশ্চাত্যের এপিক শব্দের ব্যবহারও করা হয়ে থাকে। প্রাচীনকালের রামায়ণ-মহাভারত কিংবা ইলিয়াড-অডেসী বাল্মিকী-ব্যাস-হোমারের নামে চালু থাকলেও তার প্রামাণিকতা নির্ধারণ সত্যই দুরূহ। এ কারণেই এগুলিকে বলা হয়ে থাকে জাত মহাকাব্য। এ বাদে পৃথিবীর সব মহাকাব্যই নির্দিষ্ট কোন মাষ্টার-মাই-ের কাজ। কাজেই তার ভাগটা করা হয়েছে সাহিত্যিক মহাকাব্যরূপে। মেঘনাদবধ কাব্যকেও এ রকমই একটি মহাকাব্যরূপে আখ্যায়িত করা যায়।

তবে এটি মহাকাব্য কি না, তা নিয়ে কূটাভাসও রয়েছে। শিল্প-তাত্ত্বিকেরা গড় মানুষের জন্য অনেক সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যের বয়ান দিয়েছেন। যেমন কবিতা কি? কিংবা তা লিখতে কি কি থাকতে হয়?— এইসব আর কি? মহাকাব্য নিয়েও তেমন দেখা যায়। আমাদের দেশে, বিশেষ করে, সাহিত্যদর্পণে বিশ্বনাথ, কি হলে মহাকাব্য হবে, তার একটি তালিকা প্রদান করেছেন । বিশ্বনাথের এই তালিকাকে সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা বিবেচনাও করে থাকেন বেশ গুরুত্বের সাথে। সর্গ সংখ্যা সস্পর্কে তিনি বলেছেন, তা হবে অষ্টাধিক। সেখানে মেঘনাদবধ কাব্যের সর্গ সংখ্যা নয়। সুতরাং সংখ্যার বিচারে এটি উৎরেও যায় মহাকাব্য হিসেবে।

কাহিনীর অকুস্থল হিসেবে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল কিংবা ভৌগলিক কিংবা প্রাকৃতিক যে বিস্তারের কথা আছে, তারও অভাব নেই এতে। কিন্তু যারা এটিকে মহাকাব্য বলতে চান না, তাদের মূল আপত্তি রস নিয়ে। অন্যান্য রসের সংমিশ্রণ  এতে থাকলেও বীররসই হবে মহাকাব্যের প্রধান, সে মতই  নিদান হেঁকেছেন বিশ্বনাথ। মাইকেলও ঘোষণা দিয়েছেন, ‘গাইব মা, বীররসে ভাসি মহাগীত’। কিন্তু চিতার অগ্নিতে ভস্মরাশি হয়ে যাওয়া মেঘনাদ, প্রমীলাসহ, — হৃদয়কে শোক ভারাক্রান্ত করে সঞ্চার ঘটায় করুণ রসেরই। কাজেই, ঢাল-তলোয়ার-কামান বন্দুক, যাই বলি না কেন, তার মানে হল শক্তি প্রদর্শন ও পরিণামে সেই শক্তিরই জয়, যার ভেতর দিয়ে ফুটে উঠবে বীরত্বেরই জয়গাথা, তারই প্রকাশ ঘটাতে হবে মহাকাব্যে, ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম। ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ কিংবা মহাভারতের পরিণতিতেও তাই লক্ষ্যগোচর। যেমন রামের পতœী উদ্ধার অথবা পা-বদের সিংহাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু এ প্রশ্ন কি করা যেতে পারে যে, উপসংহারও কি তাই? যদি তাই হয়, তবে রামের পতœী বিসর্জন কিংবা পা-বদের মহাপ্রস্থানে গমনই বা কি জন্যে? কৃষ্ণদের মুষলপর্বের কথা না হয় বাদই দিলাম। ইলিয়াডে হেক্টরবধ একটি মর্মান্তিক ঘটনা, কিন্তু একিলিসদের জন্য তা বীরত্বের। তবে এই সব বীরত্ব কোন কাজে আসেনি। হেলেনকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতে হয়েছে কাঠের ঘোড়া বানিয়ে, প্রতারণা করেই। যুদ্ধ অবসানে অডেসিয়াস তো বীরত্বের গৌরব নিয়ে দেশেই ফিরতে পারেনি। আগামেমনানের কি দশা দাঁড়াল বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীর হাতে? সবচেয়ে বড় কথা, একিলিস, যাকে অনেকেই ইলিয়াড কাব্যের নায়ক মনে করে থাকেন, তার মৃত্যু কি করুণ রসে কম সিক্ত করে?

আবার মেঘনাদবধ কাব্যের শুরুতে মাইকেল বীররসের কথা বললেও ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে এপ্রিল তারিখে রাজনারায়ণ বসুকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন, ‘অই ওণ্ট ট্রাবল মাই রীডারস উইথ বীরা রস’। ঐ চিঠিতে তিনি চেয়েছিলেন মেঘনাদের মৃত্যুকেও ‘সেলিব্রেট’ করতে। এ কথা বলার ভেতর দিয়ে তিনি কি এই মৃত্যুর একটা মহিমান্বিত রূপের কথাটাই তুলে এনেছিলেন? রাজনারায়ণ বসু তাঁকে ‘ন্যাশনাল এপিক’ লেখার জন্য একটি বিষয়ও দিয়েছিলেন— সিংহল বিজয়। বাঙালীর শৌর্যবীর্যের পরিচয় তখনও তো ভালমত জানা যায়নি। থাকার মধ্যে ছিল, জনশ্রুতি আকারে, বিজয় সিংহের সিংহল দেশ অধিকারের ঘটনা। হয়ত সেটাকেই জাতীয় গৌরবের বিষয় ভেবে তিনি ওটা প্রোপোজ করেছিলেন। সে সম্পর্কে ঐ একই চিঠিতেই তিনি অপারগতার কথাটি বলছেন এইভাবে— ‘বাট আই ডোণ্ট থিংক আই হ্যাভ অজ ইয়েট অ্যাকুয়ার্ড এ সাফিসিয়েণ্ট মাস্টারী ওভার দি ‘আর্ট অব পোয়েট্রী’। মাইকেলের এই চিঠি থেকে এটা কি মনে করা যেতে পারে যে, তাঁর রামায়ণ-মহাভারতের মতো এপিক অর্থাৎ মহাকাব্য লেখার মনোবাঞ্ছা ছিল না।

তবে সেটা থাকুক আর নাই থাকুক, এটা তো মনে রাখতে যে বাংলা সাহিত্যের তখন যা চলছে, তা হল ক্রান্তিকাল। উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া গেছে কাহিনীকবিতার ধারা। তবে এই কাহিনীকবিতার নিদর্শন হিসেবে যে গ্রন্থগুলির উল্লেখ আমরা হরহামেশাই করে থাকি, সাধারণভাবে তার সবগুলিই ছিল প্রায় দুষ্প্রাপ্য। অন্ততঃ ইংরেজ মিশনারী সাহেবদের মুদ্রণযন্ত্র আনা ও পঞ্চানন কর্মকারের ছেনির আঘাতে বাংলা লেটার (অক্ষর) না বানানো পর্যন্ত। এ থেকে ইংরেজী শিক্ষিত মানুষেরা, যারা নতুন ধারার বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির পথ প্রদর্শক, তারা যে মধ্যযুগে রচিত নানা গ্রন্থাদির সাথে পরিচিত ছিলেন, তা ধরে নেয়া যায় না। কোন গ্রন্থ ছিল গোশালাতে বা এইরকম নানা জায়গায় লোকচক্ষুর অগোচরেই। মাইকেল নিজেও লিখিত বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ দেখে যেতে পারেননি, যা জনসমক্ষে এসেছে তাঁর মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে। চর্যাপদ অবশ্য কাহিনীকবিতা নয়, শুধু উদাহরণরূপে এর উল্লেখ করা হল।

সুতরাং সে সময় মধ্যযুগের এই কাহিনীকাব্যের ধারা, যেমন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য কিংবা মঙ্গলকাব্য কিংবা লায়লীমজনু কিংবা আরাকান রাজসভার রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান— এগুলির সাথে পরিচিত হবার ব্যাপার যেমন ছিল, তেমনই ছিল আঙ্গিকগত বিষয় নিয়ে অসচেতনতা। কাহিনী থাকলেই তা কেন মহাকাব্য হবে না, সেটাও, বোধ করি, ছিল অজানা। কেন না, এপিক অব আর্ট অথবা লিটারেরী এপিকের তেমন কোন উদাহরণও ছিল না সামনে। শুধু বাংলা কেন, সংস্কৃত সাহিত্যের যে মহৎ ও সমৃদ্ধ ভা-ার, সেখানেও অবস্থা তথৈবচ। কালিদাসের খ্যাতি মহাকবিরূপে, কিন্তু তারও রঘুবংশ কাব্য— সমুদ্রগুপ্তের মতো স¤্রাটের বিজয়কাহিনী যে কাব্যের বিষয়বস্তু, অর্থাৎ শৌর্য-বীর্যের বর্ণনাই যার উদ্দিষ্ট, তাকেও কেউ কখনও এপিক অব আর্ট বলেছেন কি না, আমার তো জানা নেই। তবে দেশীয় এপিক অব আর্টের ব্যাপারটা এ রকম হলেও, ইউরোপীয় উদাহরণগুলি ছিল মাইকেলের সুপরিচিত। হোমার, দান্তে কিংবা টাসো, মিল্টন— এঁরা তো আছেনই, পাশাপাশি বায়রন ছিলেন তার আদর্শ পুরুষ।

ধর্মীয় সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে যাবার কারণেই, বোধ করি, কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা কাশীদাসী মহাভারতের পঠন বাঙালী হিন্দু পরিবারগুলোতে আগ্রহ ও ভক্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাইকেল নিজেও, মাদ্রাজ প্রবাস কালে, হতে পারে, ভারতের তদানীন্তন শিক্ষা সচিব বেথুন সাহেবের বাংলা ভাষাতে লেখার পরামর্শ মোতাবেক, গৌরদাস বসাকের কাছে কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারতের শ্রীরামপুর সংস্করণ চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। মেঘনাদবধ কাব্যের কাহিনীও তিনি নিয়েছিলেন রামায়ণ থেকে।

শুধু মেঘনাদবধ কাব্য নয়, তাঁর আরও আরও সৃষ্টির উৎসও ভারতীয় পুরাণ। এ প্রসঙ্গে ১৮৬০ সালে রাজনারায়ণ বসুকে লেখা একটি চিঠি থেকে সরাসরি মাইকেলের বক্তব্য জেনে নেয়া যেতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, ‘আই মাস্ট টেল ইউ, মাই ডিয়ার ফেলো, দ্যাট দো, অ্যাজ এ জলি ক্রিশ্চিয়ান ইয়ুথ, আই ডোন্ট কেয়ার এ পিন’স হীড ফর হিন্দুইজম, আই লাভ দি গ্রা- মিথোলজি অব আওয়ার অ্যানসেস্টার’। আর ভালবাসার কারণ ছিল, ‘ইট ইজ ফুল অব পোয়েট্রি’। আবার এ চিঠিতে, বোধ করি, নিজের কথাটাও বলেছিলেন এ ভাবে, ‘এ ফেলো উইথ অ্যান ইনভেনটিভ হেড ক্যান ম্যানুফ্যাকচার দি মোস্ট বিউটিফুল থিংকস আউট অব ইট’। এবং মাইকেলের এই পুরাণ-প্রীতি কেবল ভারতীয় হয়ে থাকেনি, হয়ে পড়ে পাশ্চাত্য নির্ভরও। এটার একটা কারণ হতে পারে তাঁর মনোগঠনের ক্লাসিক উপাদান। মেঘনাদবধ কাব্যেও রয়েছে তার পরিচয়। এভাবে বাংলা সাহিত্যে তিনি যে নতুন রক্তের সঞ্চালন ঘটান, তাতে তার অবয়ব প্রথম বারের মত আন্তর্জাতিক সুবাস দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। এটা ঠিক যে, মধ্যযুগেও বিদেশী ভাষা থেকে অনুবাদ হয়েছে, পারসিক কিংবা আরবীয় কাহিনীর প্রবেশ ঘটেছে, কিন্তু উপাদানাদি আত্মস্থ করে তাকে যুগোপযোগী করার ভেতর দিয়ে সৃজনশীলতার প্রকাশ দেখা যায়নি। কাজেই, বলা যায়, জাত মহাকাব্যের কাহিনীর একটি অংশকে এ কাব্যে তিনি যে রূপ দিয়েছেন, সেটা একান্তভাবেই তাঁর কাব্যিক বিবেচনার ফসল।

তা ছাড়া, ছকে ফেলে গঠন-সৌকর্য কিংবা রসের বিচার করাটা কতটা যুক্তি-সঙ্গত, সে প্রশ্নই থেকেই যায়। আগে যেমন ভাষা, পরে ব্যাকরণ, শিল্প-সাহিত্যে তেমনই আগে সৃষ্টি, তারপর তো তার ধরন-ধারণ বেঁধে দেয়ার ব্যাপার। এখানে প্রত্যেকটা সৃষ্টিই স্বতন্ত্র। তাকে কোন গড় হিসাবের মধ্যে টেনে আনা যায় না। আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য আমরা একেকটা নাম দিয়েছি, যেমন কাব্য, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি। হ্যাঁ, কাব্য যখন মহাকাব্য হয়ে যায়, তখন মহা শব্দের অর্থের একটা বোঝা তার ঘাড়ে এসে চাপেও বটে! সেটা তার বিস্তার, বিশালত্ব, গভীরতা, সমগ্রতা কিংবা অনুপুঙ্খতা। এসব কিছুই কিন্তু উপলব্ধির একটা স্তর নির্দেশ করে থাকে। আর এই হিসেবেই, বলা যেতে পারে এটা মহাকাব্য হয়ে যায়। সেখানে এই ছন্দ ব্যবহার না করে ওই ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে কেন, সর্গ কিংবা পর্ব সংখ্যা এতটা না হয়ে অতটা হল কেন? পূর্ববর্তী সর্গে কিংবা পর্বে পরবর্তী সর্গের/পর্বের পূর্বাভাস নেই কেন? এই রস না এসে ওই রস এসেছে কেন? ভাষাই বা এমন হল কেন? — এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আসলেই অর্থহীন। ভাষা বলি আর ছন্দ বলি, রস বলি আর সর্গ বলি— সবই বিষয়ের অনুবর্তী। যার যেমন প্রতিভা, সেই প্রতিভার ক্ষমতার মাপকাঠিতেই সৃষ্টি হয় সৌন্দর্যের।

এরপরও কাব্য থেকে মহাকাব্য কেন হল, কিংবা যদি কাহিনীই থাকে, তবে তা কাহিনীকাব্য নয় কেন, বোধ করি, তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। শিল্প-সাহিত্য যেমন ব্যক্তিগত মানস সম্পদ, তেমনই তা একটি জনগোষ্ঠীর বহুবাচনিকতাকেও ধারণ করে। এভাবেই তা হয়ে যায় জাতীয় জীবনের চিত্রলিপি। এতে প্রতিবিম্বিত হয় তার সমষ্টিগত আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীকী উপস্থাপনা। ব্যষ্টির এই ধারণাটাই নির্ধারণ করে দেয় শিল্পরূপের স্তর। সার্বজনীনতা পেলেও, সাধারণতঃ দেখা যায়, কাহিনীকাব্যের ভেতর দিয়ে হয় না সেই বোধের পরিস্ফুটন। তার নায়কেরা কিংবা অন্যান্য চরিত্রেরা হয়ে ওঠে না জনগোষ্ঠী কিংবা জাতীয় জীবনের প্রতিনিধি। মেঘনাদবধ কাব্যের কিছু সময় আগে লেখা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮)— এ রকমই একটি কাহিনীকাব্য। স্বাদেশিকতার বোধ ও পরাধীনতার চেতনা তখন জাতীয় মানসে অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। এই কাহিনীকাব্যের ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে/ দাসত্ব শৃংখল কে পরিবে পায় হে’— তো খুবই বিখ্যাত গান। আক্রমণকারীর হাত থেকে স্বদেশভূমিকে রক্ষা করার বিষয়টিও রয়েছে এতে। তৎসত্ত্বেও ক্যানভাসের যে বিশালতা ও লিপিকুশলতার যে ওজস্বিতা মহাকাব্য ধারণ করে, এতে তার সীমাবদ্ধতাও পরিষ্কার। তাই ঊনবিংশ শতাব্দীর সে সময়ের এই পরিপ্রেক্ষিতটুকুর সাথে বাড়তি ঐ উপাদানগুলির সংযোজন থেকেই  মেঘনাদবধ কাব্য কেন মহাকাব্য হয়ে উঠেছে, তার উত্তরটা পাওয়া সহজ হয়ে পড়ে। মধুসূদন রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার কথাটা বলেননি, রাক্ষসদের হলেও, তাদের স্বদেশকে শত্রুমুক্ত দেখতে চেয়েছেন। ধর্ম সংস্থাপন নয়, স্বাধীনতাকে উত্তুঙ্গ রাখাটাই তাঁর মূল প্রতিপাদ্য। বৃটিশদের সাথে ভারতীয় প্রাগ্রসর শ্রেণীর মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়ে গেছে, নিজেদের পাওনার জায়গাটাতে দাঁড়াতে গিয়ে পরিণত হতে হচ্ছে ট্রাজিক হিরোতে। রাবণ তো এ রকমই একটি ট্রাজিক হিরো। তাঁর আগের দীনবন্ধুর নীলদর্পণের নরনারীর ক্ষেত্রেও তার অন্যথা নেই। পরের বঙ্কিমের উপন্যাসগুলিতে তো আরও বড় হয়েছে ট্রাজেডির এই তালিকা। বিষাদ সিন্ধুতেই বা হয়েছে কি? কাজেই মহাকাব্য তাত্ত্বিকদের আরেকটি ছবক হল, জাতীয় জীবনের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে নায়কের আত্মপ্রতিষ্ঠাও জরুরী। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা যে এটা পারমিট করেনি, ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপট কি জাতীয় জীবনে ছিল না? মধুসূদনের ‘ফেভারিট’ মেঘনাদের আত্মবিসর্জন, বরং, তীব্র করে তুলেছে আত্মপ্রতিষ্ঠারই আকাক্সক্ষা। এ ধরনের পরাজয় তো পরাজয় নয়, বরং বার বার পরাজয়ের ভেতর দিয়ে ফিরে ফিরে আসে জাতীয় আকাক্সক্ষারই প্রকাশ। আর এ রকম সংশ্লিষ্টতার ফলেই তা পরিণত হয় মহাকাব্যে। মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যও এভাবেই হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাকাব্য। আসলে সে সময়টাই ছিল বাঙালীর আত্মবিকাশের। নবলব্ধ জীবন চেতনার অভিঘাতে নতুন জীবনরূপ নির্মাণের জোয়ার তাকে এনে দিয়েছে ভাবপ্লাবনের উচ্ছ্বসিত জলরাশিতে। তার পলিতে আবৃত হওয়া স্বপ্ন-কল্পনাতে ঘটেছে জাতীয় আত্মপ্রতিষ্ঠারই অঙ্কুরোদগম। তারই প্রতিরূপ মূর্ত হয়ে ধরা পড়েছে বলেই এটা মহাকাব্য।

২.৩. এটা ঠিক যে, শিল্পসাহিত্যের বিকাশই বলি, আর তার বিবর্তনই বলি, কিংবা নতুন রূপের সৃষ্টিই বলি, সম্ভবপর হয়, সমাজমানসের চাহিদা থেকেই।  একেক সময়ের একেক সমাজের এক এক রকম ফ্রেম থাকে। সামাজিক মানুষের চাহিদাও তৈরী হয় সেই ফ্রেমেরই আকারে। আবার সেই চাহিদার প্রকাশটাও শিল্পসাহিত্যে ঘটে সে মত। আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে যেটা দেখা যায়, তা হল, পরিবার-গোষ্ঠী-সম্প্রদায় কিংবা রাষ্ট্র, যার কথাই বলি না কেন, সব কিছুরই সূচনা ও বিকাশ ঘটেছে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকেই। প্রধানতঃ বৈরী প্রকৃতি ও অধিকতর বলশালী জন্তুর হাত থেকে বাঁচার জন্য সংঘবদ্ধ হবার যে মৌলিক প্রয়োজন, তা যেমন তাকে বাধ্য করেছে এক অপরের কাছে বোধগম্য করে তোলার অর্থাৎ ভাষা ব্যবহারের, তেমনই ভাবে গড়ে তুলতে হয়েছে পরিবার-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়, যা তাকে পরিণত করেছে সমাজবদ্ধ জীবে। বলা যেতে পারে, এটা তার এক ধরনের বন্দীত্ব। আর তা এই অর্থেই যে নিজের অধিকার সংরক্ষণ করার স্বার্থেই তা তাকে অন্যের অধিকার হরণ করার সুযোগ দিয়েছে বন্ধ করে। ছাড়তে হয়েছে যেমন নিজের অনেক কিছু, তেমনই ভাবে গ্রহণও করতে হয়েছে অন্যের অনেক কিছু। একই সাথে নিজের অসহায়তার কারণেই আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে অলৌকিক শক্তির কাছে। এ সবই সম্ভবপর হয়েছে তার অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে। মঙ্গলামঙ্গল কিংবা কল্যাণ-অকল্যাণ কিংবা ঔচিত্য-অনৈচিত্য বোধের বা এই রকম আরও অনেক করণীয়-অকরণীয় বিষয়ের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক কিংবা শাস্ত্রের বিধান- যাকে সাধারণভাবে নৈতিকতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। রক্ত-মাংসের জীব হিসেবে মানুষের প্রবৃত্তিগত উপাদানগুলিকেও তুলে দেয়া হয়েছে পাপ-পুণ্যের বাটখারায়। সুতরাং এ রকম একটি নৈতিকতা অনুশাসিত প্রেক্ষাপটে কিংবা অলঙ্ঘনীয় শাস্ত্রবিধানের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে ব্যক্তি-মানুষের নিজের বলতে তো আর কিছু থাকে কি? নিজের ভাল লাগার কথাটিও, তাই, বলতে হয়েছে অপরের মুখ দিয়ে। শিল্প-সাহিত্যে তার প্রকাশও ঘটেছে একবারেই অবজেকটিভ হয়ে। অথেনটিকই বলি আর লিটারেরীই বলি, প্রাচীনকালের মহাকাব্যগুলি হল তারই প্রদর্শনী। ইউরোপে আদর করে তার নাম দেয়া হয়েছে ক্লাসিক। আমাদের এখানেও আমরা তার পরিভাষা বানিয়েছি চিরায়ত।

এই প্রদর্শনীর প্রথম যে ব্যতিক্রম কিংবা পরিবর্তন, তাও শুরু হয় ঐ ইউরোপ থেকেই। আর সেটা ঘটতে থাকে উৎপাদন ব্যবস্থার নতুন ধারা সংগঠনের সূত্রে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যক্তির মুক্তির প্রণোদনাতে। তখন ধনতন্ত্রের যেমন প্রগতিশীলতা ছিল, তা থেকে উপজাত ব্যক্তিতান্ত্রিকতারও ছিল সামাজিক উপযোগিতা। প্রকৃতপক্ষে তারই প্রভাবে শিল্প-সাহিত্য বর্ণিল হয়ে ওঠে পালাবদল ঘটিয়ে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বালসুলভ উচ্ছ্বাস যেমন নিয়ে আসে অপার বিস্ময়, তেমনই ভাবে বস্তুবিশ্বকে অতিক্রম করে বিরতিহীন প্রয়াস চলে অন্তর্জগতে নতুন ভুবন সৃষ্টির। এটাকেই নাম দেয়া হয়েছে রোমান্টিকতা। পাঠ্য বইয়েও সগর্বে প্রচার করা হয়েছে, ক্লাসিক যুগের শেষ, রোমান্টিক যুগের শুরু।

আমাদের দেশে বাংলা সাহিত্যে ঘটনাটা অবশ্য সে ভাবে ঘটেনি। ইউরোপে যে সাহিত্যকে আদর্শ ধরে ক্লাসিক যুগের কথা বলা হয়েছে, এখানে নেই তেমন নিদর্শন। তারও চেয়ে বড় কথা, উৎপাদন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অপূর্ণাঙ্গতা থাকলেও তখনকার ইংরেজী শিক্ষিত সারস্বত সমাজকে গ্রীক-ল্যাটিন শিল্প-সাহিত্যকে যেমন হজম করতে হয়েছে, অনুরূপভাবে ইউরোপীয় রেনেসাঁর মন্ত্রও জপতে হয়েছে একই সাথে। রুশো-ভলটেয়ার-অগাষ্ট কোঁতে— জন স্টুয়ার্ট মিলেরা যেভাবে এসেছেন, সেক্সপীয়ার-মিল্টন-বায়রন-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-শেলী-কীটসেরাও এসেছেন তেমনই ভাবে। তবে যে ভাবেই দেখি না কেন, ইংরেজী সাহিত্যের বহু চর্চিত রোমান্টিক ধারাই নতুন বাংলা কবিতা সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা পালন করে। আরও পরে এই প্রায় মৃতধারাকে রবীন্দ্রনাথ যাকে ভারতীয় উপাদানে সমৃদ্ধ করে ঐশ্বর্যময় করে তোলেন। কাজেই, আমার এত কথা বলার উদ্দেশ্য হল, যে উচ্চাভিলাষ নিয়ে মাইকেল মেঘনাদবধ কাব্যে নতুন কাব্যাঙ্গিক সৃষ্টি করেন, তা যুগের বিপরীত ¯্রােতে হাঁটারই সামিল। তাঁকে অনুসরণ করে আর যাঁরা মহাকাব্য লিখেছিলেন, যেমন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, কায়কোবাদ— তাঁরাও যে এমন কিছু সফলতা দেখিয়েছেন, তাও তো নয়।

৩. মেঘনাদবধ কাব্যের কাহিনীর উৎস রামায়ণ। রামায়ণকারের উদ্দেশ্য ছিল রামচন্দ্রের জয়গাথা বর্ণনা করা। পক্ষান্তরে মাইকেল মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু করে তুলেছেন রাবণ কর্তৃক রামচন্দ্রের আক্রমণ প্রতিহত-প্রচেষ্টা। সুতরাং, রামচন্দ্রের পতœী উদ্ধারের জন্য অভিযান নয়, তার বিরুদ্ধে রাবণের প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই এখানে প্রধান। এটা ঠিক যে, রামায়ণকার একটি নৈতিক বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছেন। তা হল, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য। পাশাপাশি, ভগ্নী শূর্পনখার অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য রাবণ কর্তৃক সীতা-অপহরণ, সেটিও একটি অনৈতিক ব্যাপার। কিন্তু তখনকার দিনের রুচি ও সংস্কৃতি অনুযায়ী রাবণের এই কাজকে জাস্টিফাই করা যেতে পারে। খুনকা বদলা খুন কিংবা দাঁতের বদলে দাঁত— এ রকম সরল সমীকরণ হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। তবে আমার মনে হয়, এভাবে নৈতিকতা ও অনৈতিকতার বিচার করাটা একটা বিচ্ছিন্ন বিষয়। কেননা, রাম ও রাবণের সীতা-সংক্রান্ত এই সংঘাতের ভেতর দিয়ে রামায়ণকারের যে অ্যাটিচ্যুড প্রতিফলিত হয়েছে, সেটিই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা দেখতে গেলে রামায়ণ-রচনাকালের সমাজ প্রবণতার দিকটিই আগে বিবেচ্য। কিন্তু কথা হল, রামায়ণ রচনার কোন নির্দিষ্ট সময় আমাদের সামনে আছে কি? খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে আরো এক হাজার বছর পেছনেও নিয়ে যেতে চান অনেকে। এর সঙ্গে এটিও একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয় যে রামায়ণই বলি আর মহাভারতই বলি— সবই আর্যদের অবদান। তা হলে ভারতবর্ষে আর্যরা কবে এসেছিল? এই আর্যদেরই আরেক মহৎ সৃষ্টি বেদ। ১৯০৭ সালে এশিয়া মাইনরে বোঘাজকোই নামক স্থানে আবিষ্কৃত মাটির ফলকে যে লিপি পাওয়া গেছে, তা খ্রীষ্টপূর্ব ১৪০০শ বছর আগের লেখা বলা হয়েছে। আর সেই হিসাবে বেদ-রচনার শুরু কিছুতেই ঐ সময়ের পরে হতে পারে না বলে সিদ্ধান্তও দেয়া হয়েছে। আবার আসার সঙ্গে সঙ্গেই তো আর আর্যরা বেদ রচনার সূত্রপাত ঘটায়নি। তারা ছিল যাযাবর জাতি। এ দেশে এসে কৃষিকাজ আয়ত্ত করার ভেতর দিয়েই তারা গড়ে তোলে স্থায়ী বসতি। এভাবে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যে সুস্থিরতার সৃষ্টি হয়, তাই পরবর্তীকালে জন্ম দেয় নতুন সমাজ কাঠামোর— নতুন সভ্যতার। বলাই বাহুল্য, এর জন্য ঘটেছে দীর্ঘ সময়ের অতিপাত। তা ছাড়া, রামায়ণ-মহাভারতে যে কাহিনী বলা হয়েছে, তা তো, রাজা-রাজ্য-রাজনীতির। রাজার ক্ষমতা ধারণ কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজটিও তো হতে হয়েছে। কেননা ও দুটি মহাকাব্যে কল্পনার যতই বিস্তার ঘটানো হোক, তার কিছু বাস্তব অস্থিকংকালও তো আবশ্যক। এ কারণে অনেকেই হয়ত, রামায়ণের রচনাকাল একটা মাঝামাঝি সময়ে নিয়ে এসে খ্রীষ্টপূর্ব অষ্টম-নবম শতাব্দী বলেছেন। তবে এ বিষয়টাকে যে ভাবেই দেখা হোক না কেন, আদিতে যে রামায়ণ লিখিত হয়েছিল, সময় প্রবাহের সাথে সাথে তারও বিস্তার ঘটেছে। প্রক্ষিপ্ত অংশের সংযোজন কবে শেষ হয়েছে, সন-তারিখ দিয়ে তাও নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বেদ রচনা শেষ হবার পরই যে রামায়ণ লেখা শুরু হয়েছিল, তাও তো ধরে নেয়া যায় না। কেন না,  চারটি বেদও লেখা হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। এ বিষয়ে একটি ভাষাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণও রয়েছে। ইন্দোইউরোপীয় মূল ভাষা থেকে আর্যরা ভারতবর্ষে আসার পর তার বিবর্তন ঘটে আর্যভাষায়। এই আর্যভাষার আবার তিনটি স্তরের কথা বলা হয়েছে — প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা, মধ্যভারতীয় আর্যভাষা ও আধুনিক ভারতীয় আর্যভাষা। একটি মত এ রকম যে বেদগুলি রচিত হয়েছিল প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষায়, ব্রা‏হ্মণগুলি মধ্যভারতীয় আর্যভাষায় আর উপনিষদগুলি আধুনিক ভারতীয় আর্যভাষায়। এর সঙ্গে আরেকটি ব্যাপারও রয়েছে। লোকায়ত ভাষার সংমিশ্রণ থেকে রক্ষা করার জন্য পাণিনি খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে প্রণয়ন করেন অষ্টাধ্যয়ী— যা লিখিত সংস্কৃত ভাষার নিয়মকানুন। এর পাশাপাশি আরেকটি যে তথ্য পাওয়া যায়, তা হল, বেদের চারটি ভাগ — সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। কোথাও আবার দুটো প্রধান ভাগের কথা বলা হয়েছে,— সংহিতা ও ব্রাহ্মণ। এখানে ব্রাহ্মণগুলি তিনটি ভাগে বিভক্ত — শুদ্ধ ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। আর উপনিষদগুলিকে বলা হয় বেদান্ত। এখানে আরেকেটি যে বিষয় লক্ষ করার আছে, তা হল, বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদ এক জিনিস, আর পুরাণ অন্য জিনিস। বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদের পাশাপাশি পুরাণগুলি এসেছে। এদের সংখ্যাও কম নয়— ন্যূনধিক আঠার। পৌরণিক সাহিত্য হিসেবেই এদের পরিচয়। নামকরণের দিকে খেয়াল করলেই এগুলির বিষয়বস্তু সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে। যেমন ব্রহ্মপুরাণ, পদ্মপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ, নারদীয়পুরাণ, মার্কে-েয় পুরাণ, অগ্নিপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ, বরাহপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, বামনপুরাণ, কর্মপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, গরুড়পুরাণ, ব্রহ্মা-পুরাণ ইত্যাদি। রচনার সন-তারিখের ব্যাপারে গোলমাল থাকলেও এগুলির ভেতরে লোকজীবনের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা দ্বারা ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক কাল— যা খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রীকবীর আলেকজা-ারের প্রত্যাগমনের পর মৌর্যরাজবংশের প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছে, তা তার পূর্বকালের বলে ধরে নেয়া যায়। এটাও বোঝা যায়, আর্যরা যে কৃষিসমাজের সূচনা করেছিল, তা কেবলমাত্র সীমাবদ্ধ পর্যায়ে ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তার বিস্তার ও বৈভব বিস্তৃত ভূমিদখল থেকে শুরু করে রাজ্যস্থাপন, রাজধানী নির্মাণ, মন্ত্রী-আমত্য-রাজসভাসদ প্রতিপালন, সেনাপতি-সৈন্যদল বানানোসহ বিলাস-বিনোদনেরও নিমিত্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ ততদিনে রাজন্যপ্রথা চালু হয়ে গিয়েছে। তা রক্ষার জন্য বর্ণভেদপ্রথা সৃষ্টি করে সৃষ্টি করা হয়েছে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ও।

সুতরাং সময়টা নির্দিষ্ট করে পাওয়া না গেলেও সমাজবিন্যাসের চেহারা, নানা পেশার মানুষের উপস্থিতি, নানাবিধ করণীয়-অকরণীয় বিষয়, উৎপাদন ব্যবস্থার খুটিনাটি, রাজনীতি, বিদ্যাচর্চা, বিলাস-বিনোদন, যুদ্ধের রীতিনীতি অর্থাৎ জীবনযাত্রার ধরন— যা সব পাওয়া যাচ্ছে, তাই হতে পারে মুখ্য বিষয়। আরও যেটা পরিষ্কার, তা হল, ততদিনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পত্তন নিরুপদ্রব হয়েছে। অন্যান্য লক্ষণের সাথে নারীর দৈহিক শুচিতা অর্থাৎ যৌন বিষয়ে একচারিতাকে গণ্য করা হয়েছে এই সমাজের ভিত্তি হিসেবে। দেবতারা যাই করুন, অহল্যার অভিশাপগ্রস্ত না হওয়া ছাড়া উপায় নাই। কিন্তু আবার সীতার যৌনশুচিতা রক্ষা করতেই হবে, এ জন্য রাবণকে শাপগ্রস্ত করে রাখা হয়েছে আগে থেকেই। রম্ভাকে ধর্ষণ করার অপরাধে তাকে অভিশাপ দেয়া হয়েছিল, কোন স্ত্রীলোকের প্রতি বলপ্রয়োগ করলেই তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু অনিবার্য। সুতরাং সীতার সম্মতির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া রাবণের সামনে আর কোন পথও ছিল না খোলা। সুতরাং দৈহিক শুচিতা বিনষ্টের যে অপবাদ, তা একান্তভাবেই সীতার ওপরেই এসে বর্তায়। অর্থাৎ তার সম্মতি ছিল বলেই রাবণের পক্ষে এই অকাজ করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য যৌনশুচিতা যে অটুট রয়েছে, তার পরীক্ষাও তাকেই দিতে হয়েছে। সে পরীক্ষায় তার উত্তীর্ণ হওয়াটাই তাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে পরিণত করেছে সতী নারী হিসেবে।

রামায়ণ কাহিনীতে রাম মানুষ আর রাবণ রাক্ষস। মেঘনাদবধ কাব্যেও রাম মানুষই আছেন, আর রাবণও রাক্ষস। পৌরাণিক কাহিনী থেকে যেটা জানা যায়, তা হল, ব্র‏হ্মার মন থেকে জাত পুত্র অর্থাৎ মানসপুত্র থেকেই মানব জাতির জন্ম। এই মানসপুত্ররা সাধারণভাবে প্রজাপতি নামে পরিচিত। তাদের সংখ্যা দশ কিংবা সাত। দশজনের মধ্যে আছেন, মারিচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ, প্রচেতা, দক্ষ, ভৃগু এবং নারদ। অন্য সাতজন প্রজাপতি সপ্তর্ষি নামে পরিচিত। শতপথব্রাহ্মণে তাদের নাম বলা হয়েছে গৌতম, ভরদ্বাজ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বশিষ্ঠ, কশ্যপ এবং অত্রি। আরও যেটা জানা যায়, তা হল, এদের মধ্যে প্রজাপতি ঋষি কশ্যপ দক্ষের তের কন্যাকে বিবাহ করেন। এই ত্রয়োদশ কন্যা থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির তেরটি জাতির সৃষ্টি হয়। যেমন অদিতি হতে দেবগণ, দিতি হতে দৈত্যগণ, দনু হতে দানবগণ, কাষ্ঠা হতে অশ্বাদি, অরিষ্ঠা হতে গন্ধর্বগণ, সুরসা হতে রাক্ষসকুল, ইক্ষা হতে বৃক্ষ-উদ্ভিদসমূহ, মুনি হতে অপ্সরাগণ, ক্রোধবসা হতে পিশাচকুল, তা¤্রা হতে পক্ষীসমূহ, সুরভি হতে গো-মহিষাদি, সরমা হতে শ্বাপদাদি এবং তিমি হতে জলজন্তুসমূহ ইত্যাদি। এটি অবশ্য একটি কাহিনী। এ রকম আরও অনেক কাহিনী অন্যান্য পুরাণেও নানাভাবে পাওয়া যায়। যেমন রাক্ষসদের উৎপত্তি সম্পর্কে আরেকটি মত হল, ব্রহ্মা জল সৃষ্টি করার পর প্রাণীকুল সৃষ্টি করে তাদেরকে সেই জল রক্ষা করার নির্দেশ দেন। একদল প্রাণী, যারা বলল, রক্ষামাঃ, —আমরা রক্ষা করব, তারা হল রাক্ষস। আর যারা বলল, যক্ষামাঃ,— আমরা পূজা করব, তারা হল যক্ষ। এ থেকে মনে করা যেতে পারে, সৃষ্টির সময় তারা এমন কোন ভয়ংকর জীব ছিল না। আবার বিষ্ণুপুরাণে দেখা যায়, রাক্ষসদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। একটা শ্রেণী পূজাঅর্চনা নিয়ে থাকে। আরেক শ্রেণী অত্যন্ত শক্তিশালী, তারা দেবতাদের শত্রু। আর তৃতীয় শ্রেণীভুক্তরাই হল বিপজ্জনক। নিষিদ্ধ স্থানে ভ্রমণ করা, যজ্ঞ নষ্ট করা, শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়ানো, মানুষদের ভক্ষণ করা ইত্যাদি তাদের কাজ। রাবণ এই শ্রেণীর। তারও জন্মের বিবরণে দেখা যায়, মাতা কৈকসী (অন্য নাম নিকষা) রাক্ষসী হলেও পিতা ব্রহ্মার পুত্র পুলস্ত,— তৎপুত্র বিশ্রবা মুনি। বিশ্রবার সঙ্গে কৈকসীর যে বিবাহ, তারও কারণ হল, কৈকসীর পিতা সুমালী চেয়েছিলেন তার কন্যার গর্ভে এমন পুত্রের জন্ম হোক, যে বিষ্ণুকে দমন করতে সক্ষম হবে। তবে মুনিপুত্র হলেও দারুণ প্রদোষকালে কৈকসীর স্বামী সহবাসের কারণে সে ক্রূরকর্মা হয়ে জন্মগ্রহণ করে। আমি বিশেষভাবে এ সবের উল্লেখ করছি এ কারণেই যে, মানব জাতির বিবর্তন নিয়ে বৈজ্ঞানিক যে নিরীক্ষা অর্থাৎ যেটাকে নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন বলা যেতে পারে, তাতে বিদ্যমান নৃগোষ্ঠীকে নানা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। জীন কিংবা অন্যান্য বায়োলজিক্যাল উপাদানগুলি তো রয়েছেই, তার সাথে বিশেষ বিশেষ ভৌগলিক অবস্থান ও তার প্রাকৃতিক প্রবণতা যে মানুষের দেহগঠনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, তাও আজ আর প্রশ্নের কোন বিষয় নয়। তা ছাড়া, নানা নৃগোষ্ঠীর মিশ্রণও দীর্ঘ দীর্ঘদিন ধরে সূচনা করেছে নানা পরিবর্তনের। এই ভারতবর্ষেই আর্যবসতির পূর্বে যারা ছিল, তাদের ইতিহাস নির্দিষ্ট করে আজকে আর জানার উপায় আছে কি? ফসিল কিংবা প্রতœতাত্ত্বিক উপাদানের বিনষ্টি তো কালেরই ধর্ম। যা পাওয়া যায়, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যে বৈজ্ঞানিক মেথড, তাও যে কতটা অভ্রান্ত, তার নিশ্চয়তাই বা কতটুকু? পুরাণ তো ইতিহাস নয়। কিন্তু কোন না কোন বাস্তব অস্থি-কংকালের ওপর ভিত্তি করে যে তা গড়ে উঠেছে, যৌক্তিকভাবে তাও কি অস্বীকার করা যায়। সত্য নয়, এটা জেনেও এক ঘুমন্ত বিশ্বাসের বোধ বহন করে ঐ সত্য ভেবেই। বস্তুবিশ্বের বাইরে মনোজগতে তার অধিষ্ঠান ঈশ্বরের মতোই নিয়ত। এটা ঠিক যে, অভিজ্ঞতার রক্ত-মাংসেই মানুষ তার কল্পনার সম্প্রসারণ ঘটায়। লৌকিক—অলৌকিক — যাই হোক না কেন, তার পেছনে কাজ করে ওটাই। প্রকৃতির কার্যকারণ সম্পর্ক বিষয়ে মানুষ এখন সচেতন হলেও, সব কিছুই যে তার বিজ্ঞানবুদ্ধির আয়ত্তে এসেছে, তাও তো নয়। এখনও অনেক কিছুই তার কাছে রহস্যময় — মিস্টিক। ঘটনা যখন এমন, তা হলে, আড়াই হাজার/ তিন হাজার মানুষের অবস্থা যে কি, তা তো সহজেই অনুমেয়। কাজেই পুরাণগুলি যারা রচনা করেছেন, লোকাতীতের ওপর তাদের নির্ভরতা কতটা বেশী, তা কি বলে দেবার? তদুপরি বেদই বলি আর ব্রাহ্মণ-উপনিষদই বলি, কিংবা পুরাণের কথাই বলি, সবই তো ছিল শ্রুতির বিষয়। মুখস্থ রাখা আর বর্ণনা করা। এভাবেই এগুলি পরিবেশিত হয়েছে শ্রোতাদের সামনে। এ কারণে এগুলিকে শ্রুতিও বলা হয়। সময় প্রবাহের সাথে সাথে কাহিনীর নানা পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজনও হয়েছে এ কারণে।

কাজেই, যাদেরকে মানুষ বলা হয়েছে, কিংবা দেব-দানব-রাক্ষস-গন্ধর্ব-অপ্সরা, এমনকি শ্বাপদ-পিশাচ-পক্ষী ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেন, তারা যে ব্যাপক ভাবে মানব প্রজাতিরই ভিন্ন ভিন্ন নাম, এ রকম অনুমান করা কতটা অসঙ্গত হতে পারে? মানব সমাজ বিকাশের একটা পর্যায়ে জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের পরিচয়কে আলাদা আলাদা রূপে প্রকাশ করার জন্য নানা নামকরণ করেছে। এ ধরণের আইডেন্টিটিকে টোটেম হিসেবে আমরা মেনেও নিয়েছি। তবে আদিম ভারতবর্ষীয় সমাজের চেহারাটা কেমন ছিল কিংবা তার ধারাবাহিক রূপটাই বা কেমন, এ নিয়ে আমাদের কৌতুহলও যে প্রবল, তাও কিন্তু মনে হয় না। বল প্রয়োগ করে নিজেরা নিজেদের মাংস খাওয়া কিংবা প্রস্তর ছুঁড়ে পশুভক্ষণের কালে পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের বিচ্ছিন্নতার ব্যাপারটি নিয়েও সংশয়ের কিছু নেই। প্রজনন ক্রিয়ারও অব্যাহত রূপ পরিদৃশ্যমান। পরবর্তীকালে সমষ্টি জীবন গড়ে উঠলে প্রজনন ক্রিয়ার পাশাপাশি সন্তানের পরিচয় নির্ধারণও ক্রমশঃ অনিবার্য হয়ে উঠতে থাকে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এই অনিবার্যতারই ফলাফল। এর ফলে যেটা অনুমান করা যায়, তা হল, পিতাকে ঘিরেই সূচনা ঘটে পরিবারের। এই রকম একাধিক পরিবার মিলে বিকশিত হতে থাকে গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়। ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের ব্যাপারটিও এসে পড়ে এভাবেই। এই প্রক্রিয়া আসলেই ছিল দীর্ঘ— দীর্ঘ সময়ের।

রামায়ণ—মহাভারত যখন লেখা হয়, সেটা ছিল কলিযুগ। চার যুগের এটা হল শেষ যুগ। বলা হয়েছে, ১২০০ দিব্য বৎসর অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার লাখ বৎসর এর বিস্তার। শুরু হয়েছে খ্রীস্টপূর্ব প্রায় তিনহাজার বছর আাগে। এটা আসলে অধর্মের যুগ। অন্য তিনটি যুগ হল সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর। চারটি যুগের মধ্যে সত্যযুগই প্রথম এবং পাপশূন্য। এ যুগে মানুষের পরমায়ু লক্ষ বছর। দ্বিতীয় যুগ ত্রেতা। ত্রেতাযুগে পুণ্য ত্রিপাদ ও পাপ এক পাদ। এ যুগের বিস্তার ছিল প্রায় তের লক্ষ বছর। মানুষ বাঁচত দশ হাজার বছর। তৃতীয় দ্বাপর যুগে পাপ-পুণ্য অর্ধাঅর্ধি। মানুষের আয়ু ছিল হাজার বছর।

যুগবিভাগের এই হিসাবটা সে সময়ে কি ভাবে করা হয়েছিল, কিংবা বৎসর গণনার মানদ- কি ছিল, তার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা মুশকিল। তবে গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন-পরিভ্রমণ কৌতুহলী মানুষের কাছে একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে, সেটা অনুমান করা দুঃসাধ্য নয়। সৌরজগতের ধারণা ও তা থেকে আ‎িহ্নক গতি ও বার্ষিক গতির হিসাবটা অনেক পরবর্তীকালের। তবে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে বর্তমান সময়ে মানুষের যে পরিচিতি, তা প্রথম সম্পূর্ণতা লাভ করে কোন সময়, সেটা নিয়ে, বোধহয়, বিতর্কের খুব কিছু নেই। প্রস্তর যুগে এসেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। এরপর কাল প্রবাহের ধারায় অভিজ্ঞতার নিরিখেই বুদ্ধি বিকাশের নানা স্তর পরিলক্ষিত হতে থাকে। বুদ্ধির এই বিকাশ থেমে নেই। ধরে নেয়া যায়, মানব প্রজাতি যতদিন না ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, ততদিন বুদ্ধি বিকাশের এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

আধুনিক মানুষ তার বিজ্ঞানবুদ্ধির দ্বারা এ রকম একটি মত গড়ে তুলেছে যে, অন্ততঃ দশ লক্ষ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষেরা, আকার-প্রকার যে রকমই হোক, এ পৃথিবীতে চলাফেরা শুরু করেছে। এটাকে বলা হচ্ছে প্লাওসিন যুগ। আর প্লাইস্টোসিন যুগে, হোমো সেপিয়েন্স যারা অর্থাৎ যাদের মধ্যে মানবিক বুদ্ধির বিকাশ ঘটেছে, তাদের আবির্ভাব হয়েছে চল্লিশ হাজার বছর আগে। আমরা যাকে পুরাতন প্রস্তর যুগ অর্থাৎ প্যালিওলিথিক এজ বলি, তা শেষ হয়েছে আজ থেকে ন্যূনধিক দশ হাজার বছর পূর্বে। তখন থেকে খ্রীস্টাব্দ গণনা শুরু হবার আগ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এসেছে নিওলিথিক এজ, তা¤্র যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ — এই সব। এর অর্থ হল, মানুষের বিজ্ঞানবুদ্ধিরও সম্প্রসারণ ঘটেছে কত দ্রুত। এর কারণ হল, জীবন-সংগ্রামের প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার করে হাতিয়ার সৃষ্টির পরিমাণ গেছে বেড়ে। কল্পনাশক্তিও বেড়েছে নানাবিধ অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে। যৌক্তিকভাবেই এই কল্পনাশক্তির সাহায্যেই পৃথিবী সৃষ্টি, মানুষ সৃষ্টি, এবং প্রকৃতিরাজ্যে এই মানুষের অসহায়তা ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে অলৌকিক শক্তির উপস্থিতি অঙ্গীভূত হয়েছে তার বিশ্বাসের। জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ও নির্বিঘœতার জন্য ঐ অলৌকিক শক্তির কর্মকা-ই বিবেচিত হয়েছে অমোঘ বলে। মঙ্গলামঙ্গলের ধারণা থেকে ঐ শক্তিকে খুশী করার বিষয়টিও এসেছে অনিবার্যভাবে। ঐ শক্তিকে সাকার দেয়ার প্রয়োজনীতাই সূচনা ঘটিয়েছে পৌত্তলিকতার। কি করলে দেবতা প্রসন্ন হবেন আর না করলে কি বিপদ হবে, তাই বেঁধে দিয়েছে পাপ-পুণ্যের সীমারেখা। এই পাপ-পুণ্যের বিষয়টি মানুষের জীবনের জন্য এক টোটাল ফ্যাক্টর। ইহলৌকিক জগতে যেমন তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে কল্যাণ ও অকল্যাণ, তেমনই ভাবে পরলোকে পাওয়া স্বর্গ ও নরকও নির্ভর করছে তার ওপর। পৃথিবীকে পাপশূন্য করার জন্য পৌত্তলিক সমাজে যেমন অবতারেরা এসেছে,  নিরাকার  একেশ্বরবাদী জনগোষ্ঠীর কাছেও একইভাবে এসেছেন নবী-পয়গম্বরেরা। এমন নবী-পয়গম্বরদের সংখ্যাও কি কম?— এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আবার অলৌকিকতার কারণে ব্যাপারটা যে কেবল একভাবে ঘটেছে, তাই নয়। পরিবার সমাজে মানুষকে গোষ্ঠীবদ্ধ করে রাখার জন্য— ঐক্য অটুট রাখার জন্য তৈরী করা হয়েছে পার্সোনালিটি কাল্ট। প্রবল পরাক্রান্ত গোষ্ঠীপতি, যিনি বাঘ-ছাগলকে একই ঘাটে জল খাওয়াতেন কিংবা যার প্রতি প্রত্যেকের আনুগত্য ছিল প্রশ্নহীন, মৃত্যুর পরও তাকে সামনে রেখে নিজেদের সংহতি ধরে রাখার প্রয়াসও হয়ে পড়ত বিকল্পহীন। এ থেকে তাদেরকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করাটাও ছিল খুবই স্বাভাবিক কর্তব্যকর্ম। ভারতীয় পুরাণের অনেক দেবতাই যে এভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা বলাটা, বোধ করি, অযৌক্তিক নয়। এক সময়, ভারতের তেত্রিশ কোটি মানুষের জন্য তেত্রিশ কোটি দেবতার কথা বলা হত। এটা চিন্তা করে দেখতে তো অসুবিধা নাই যে, অঞ্চল বিশেষে এক এক জনসম্প্রদায়ের জন্য কেন এত ভিন্ন ভিন্ন দেবতা। আবার এ ভাবে ভাবলে, তার একটি উত্তরও বোধকরি, পাওয়া যায়। সর্বোপরি যেটা দেখা যায়, তা হল,  মানুষের জীবনযাপনের কাঠামো — পরিবার, সমাজ, গোষ্ঠী, এমন কি রাষ্ট্র ব্যবস্থ্ার সঙ্গে ওসবের মাখামাখিও ঘটেছে অদ্ভুতভাবে।

আরও একটি বিষয়ও লক্ষ করার মত। বিভিন্ন অঞ্চলের দেবদেবীদের, নামকরণের ক্ষেত্রে ভিন্নতা যাই থাক, তাদের কাজের ধরন কিন্তু একই রকম। কেউ সৃষ্টি করছে, কেউ বজ্র-বিদ্যুতের দ্বারা ভীতির সৃষ্টি করছে, কেউ বুদ্ধির পরিচর্যা করছে, কেউ ধনসম্পদের মালিক হয়ে রয়েছে। কেউ পালন করছে। কেউ জান কেড়ে নিচ্ছে। কেউ শাসন করছে সমুদ্রকে। এর মানে হল, যা কিছু মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, এই সব দেবদেবীরা হল তারই অধিকর্তা। ভারত, গ্রীস কিংবা পারস্যের প্রাচীন সমাজে এ ভাবেই দেবদেবীদের উদ্ভবের একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের সাকারত্ব ভারতের হিন্দু সমাজের জন্য তো বড় বৈশিষ্ট্য। আবার নিরাকার একেশ্বরবাদী ধর্মেও আকারবিহীন অনেক দেবদূতেরাও একই রকম কর্ম সম্পাদন করে থাকে। যেমন গ্যাব্রিয়েল আকাশী বাণীর বাহক কিংবা মাইকেল মেঘবৃষ্টির নিয়ন্ত্রক কিংবা আর আজরাইলের কাজ হল জানকবচ। পাপ-পুণ্যে ফিরিস্তা লেখার ক্ষেত্রেও তা দেখা যায়। এ ধরনের সমিলতার ফলে এটা স্পষ্টই বোঝা যায় যে দেবদেবী সংক্রান্ত এই ধারণাগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্থানের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীতে নানাভাবে পরিভ্রমণ করেছে। পুরাণই বলি আর ঐতিহ্যই বলি আধুনিক মানসেও তার উপস্থিতি ধরা পড়ছে নানা ডাইমেনশনে। মেঘনাদবধ কাব্যও হয়ে রয়েছে এই মীথেরই অংশ।

তবে এটাও ঠিক যে এসব বিষয়ে একবারে নির্দিষ্ট করে সব কথা বলা যাচ্ছে, তাও নয়। সময় গণনাও যে একবারে নির্ভুল হচ্ছে, তারও কোন গ্যারান্টি নেই। আদিম মানুষ থেকে শুরু করে তাদের অস্থি-কঙ্কাল কিম্বা জীবাশ্ম-ফসিল পরীক্ষা করে অথবা তাদের ব্যবহার্য হাতিয়ারের ধরন দেখে সভ্যতার স্তর নির্ধারণ ও সময় নির্দেশ যেভাবে করা হচ্ছে, তাতে যৌক্তিক বিষয়টাও প্রণিধানযোগ্য। ভারতীয় পুরাণে চার যুগের ক্ষেত্রে যে সময় উল্লেখ করা হয়েছে, তার সাথে এগুলিকে মেলানোও যায় না। হয়ত এটাও ঠিক, যে কালে এই সময় গণনা করা হয়েছে, তখন এখনকার এত বৈজ্ঞানিক রীতি-পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হয়নি। আবার কালে কালে মানব সমাজের বিবর্তনের ধারাটিও করে তোলা হয়েছে অলৌকিক শক্তির মহিমা দ্বারা পরি¯্রুত। দেব হোক, দানব হোক, মানব হোক, গন্ধর্ব-রাক্ষস — যাই হোক, পুরাণ কিম্বা রামায়ণ-মহাভারতের চরিত্রগুলিই, বোধকরি, আমার এ কথার বড় প্রমাণ। চতুর্থ যুগ কলিযুগে লেখা হলেও, পুরাণ অনুযায়ী রামচন্দ্র ছিলেন দ্বিতীয় যুগ ত্রেতাযুগের রাজা। রামায়ণকারের একটা উদ্দেশ্য ছিল, বোধকরি, ‘অধর্মের যুগ’ কলিযুগে নতুন করে ধর্মের প্রতিষ্ঠা ঘটানো। এ জন্য তিনি এমন একটি আদর্শ চরিত্রের সন্ধান করছিলেন, যিনি নিজের চারিত্রিক বলে ও কর্মকা-ের দ্বারা এই কাজটি করতে সক্ষম হবেন। রাজশেখর বসুর সারানুবাদিত রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী, নারদ, যাকে ত্রিলোকজ্ঞ বেদজ্ঞ তপস্বী প-িতশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পৃথিবীতে কে আছেন, যিনি ধর্মজ্ঞ, গুণবান, বীর্যবান, সত্যবাদী ও দৃঢ়ব্রত; যিনি সচ্চরিত্র, কৃতজ্ঞ, হিতকারী, কর্তব্যপালনসক্ষম; যিনি জিতক্রোধ, আত্মসংযমী ও অসূয়াশূন্য। আবার একই সঙ্গে যিনি কান্তিমান ও প্রিয়দর্শন। তার উত্তরে নারদ এমন একজনের কথা বলেছিলেন, যার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুষম ও সুবিন্যস্ত, বাহু আজানুলম্বিত, মস্তক ও ললাট সুগঠিত; তার স্কন্দদেশ স্থুল, গ্রীবা কম্বুতুল্য রেখান্বিত, হনু সুস্পষ্ট ও বক্ষ বিশাল; তিনি আরিগণের দময়িতা; সংযতচিত্ত, মহাবীর, ধীরস্বভাব, জিতেন্দ্রিয়, বুদ্ধিমান, রাজনীতিজ্ঞ, বাগ্মী ও শত্রুনাশক, আয়তনেত্র, প্রভাবশালী, লক্ষ্মীবান ও শুভলক্ষণযুক্ত— এই রকম মানবচরিত্রে যত গুণ সংযোজন করা সম্ভব, সবই রয়েছে সেখানে। আর এমন সর্বগুণসম্পন্ন মানুষ ছিলেন রামচন্দ্র, যাকে রণস্থলে রুষ্ট দেখলে দেবতারাও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন।

ধর্মপ্রতিষ্ঠার এই উচ্চাভিলাষ যে রামচন্দ্র পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা তো বোঝাই যায় আজকের ভারতেও ‘রামরাজ্য’ স্থাপনের আকাক্সক্ষার ভেতর দিয়ে। সুশাসনই তার ভিত্তি, কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টিও তার সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত করা হচ্ছে, তাতে অন্যদের কাছে মনে হতে পারে তা কেবল হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপার। যা হোক, আসলে এটা ছিল গল্পের ভেতর দিয়ে নৈতিকতার শিক্ষা দেবার প্রক্রিয়া। প্রায় সব ধর্মগ্রন্থেই দেখা যায়, নানা গল্পের অবতারণা।  আগে তো আর এখনকার মতো রাজার অভিপ্রায় অনুযায়ী কিংবা পার্লামেন্ট বসিয়ে আইন করে ছড়ি ঘোরানোর কোন ব্যাপার ছিল না, মানসিক পরিশোধনই ছিল মূল লক্ষ্য। আসলে মানুষের সমাজ তো পরস্পরের প্রতি পরস্পরের আস্থা স্থাপনের। ধর্মপ্রচারের জন্য বলপ্রয়োগের কথাটা যেমন কেউ ভাবেনি, তেমনই অন্যান্য নৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও সেটা ছিল বর্জনীয়। অনুরূপভাবে রামায়ণকারও চেয়েছিলেন রামচন্দ্রের মতো একজন আদর্শ রাজাকে সামনে নিয়ে এসে একটা উদাহরণ দাঁড় করানো। আধুনিককালেও কিন্তু তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বরং বলা যেতে পারে, পুরাণের কাল থেকেই তার ধারাবাহিকতার শুরু। বিশেষ করে বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদী আমলে এমনটি তো হরহামেশাই ঘটেছে। ‘বাঙালী’ বঙ্কিমচন্দ্র এ দেশে তেমন খুঁজে না পেয়ে রাজপুতানা থেকে নিয়ে এলেন তলোয়ার ঘোরানোর সব মহাবীর। ইসমাইল হোসেন শিরাজীর মতো লেখক, যিনি বাংলাকেই ‘বাঙালী মুসলমান’-এর মাতৃভাষা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনিও গিয়ে দ্বারস্থ হলেন মোঘল-পাঠানদের। সিরাজউদ্দৌলা কিংবা মীর কাশিম অবশ্য বাংলারই নবাব ছিলেন, কিন্তু তাঁদেরকে জাতীয়তাবাদের প্রতীক করে তোলাটা এই মানসিক প্রবণতারই ফল।

তবে আয়রনিটা হল, রামায়ণকারের উদ্দেশ্য এ রকম ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য ধাবিত হলেও তাঁর মহাকাব্যের মূল বিষয়বস্তু হল মানবীয় প্রবৃত্তিসঞ্জাত। একজন নারীকে ঘিরে পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিরন্তন দ্বন্দ্ব। তার নানা আদল আছে— নানা উপলক্ষ্য-অছিলা আছে, কিন্তু সীতাহরণ ও তার বিসর্জনই এখানে হয়ে রয়েছে মুখ্য। রামায়ণ পড়ার সময় ধর্মাবেগকে আলাদা করে নিলে রক্তমাংসের মানুষের ক্ষরণটাই এখানে প্রধান।

এই রামায়ণ-কাহিনীকে মাইকেল মধুসূদন যখন মেঘনাদবধ কাব্যের উৎস হিসেবে গ্রহণ করলেন, ততদিনে গঙ্গার জল পদ্মার হয়ে মেঘনায় মিশে যেতে শুরু করেছে। অর্থাৎ সময়ের দিক থেকে তার ফারাক না হলেও প্রায় আড়াই হাজার বছরের। তখন হিন্দু সমাজ একদিকে যেমন প্রগতিপন্থার ধাক্কায় রক্ষণশীলতার বর্মে আবদ্ধ থাকতে চাচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপন্থাই হয়ে উঠছে গ্রহণীয় অবলম্বন। মাইকেল মধুসূদন নিজেও হয়ে গেছেন ধর্মান্তরিত। এত দিন তো কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রতি ভক্তিআপ্লুত নেশা ইংরেজী শিক্ষার ছবক না নেওয়া বাঙালী হিন্দু জনগোষ্ঠীর হৃদয় জুড়ে ছিল, সেখানে পরিবর্তনের নিমিত্ত হিসেবে পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণের বিকল্প কিছু পাওয়ারও ছিল না। আর তার অনুরাগী পাঠক মাইকেল মধুসূদন হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াডকে যে বিশেষভাবে বেছে নিয়েছিলেন, মেঘনাদবধ কাব্যের পরিকল্পনাই তার বড় প্রমাণ। সাধারণভাবে পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবের বিষয়টি এবং তার উপাদানাদির উপস্থিতি এতে রয়েছে। যেমন, দ্বিতীয় সর্গে জিউস ও হেরার অনুকরণে শিব ও দুর্গার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিংবা কৈলাস ও অলিম্পাসের সগোত্রতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটাও লক্ষ করার বিষয় যে ভারতীয় মহাকাব্যই হোক আর কাহিনীকাব্যই হোক, প্রায় ক্ষেত্রেই দেবদেবীরা মানব-মানবী হয়েই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে মনসাদেবী। কিন্তু ইলিয়াডে দেবদেবীরা দেবদেবী থেকেই মানুষের মতো সক্রিয়তা প্রদর্শন করতে কোন কুণ্ঠাবোধ করেননি। মেঘনাদবধ কাব্যে দেবদেবীদের যে সক্রিয় আচরণ প্রত্যক্ষ করা যায়, তা নিঃসন্দেহে ইলিয়াডেরই প্রভাবজাত। পঞ্চম সর্গে ইন্দ্রজিত ও প্রমীলার নিদ্রাভঙ্গের বর্ণনা প্যারাডাইস লস্ট-এ ঈভের ঘুম ভাঙানোর অনুরূপ। অষ্টম সর্গের প্রেতপুরীও দান্তের কাছ থেকে নেয়া। তবে এগুলি যে মাইকেল খুঁজে খুঁজে বের করে নিয়েছেন, তা বোধ হয় নয়। তাঁর পাঠের ভা-ার এত ব্যাপক ছিল, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা প্রায়োগিক সিদ্ধতা লাভ করেছে। উপমা প্রয়োগের বেলাতেও পুরাণের চরিত্র ও বিষয়ের উদাহরণ সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। এ রকম অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা মাইকেল-পরবর্তী কালের কবি নজরুলের মধ্যেও দেখা যায়। কিন্তু এগুলি তো বাহ্য বিষয়। পাশাপাশি মেঘনাদবধ কাব্যের মর্মগত মেসেজটার জন্য, বুঝি, ইলিয়াডের দ্বারস্থ হওয়া ভিন্ন অন্য কোন বিকল্প নেই। ‘অনিচ্ছুক’ সীতাহরণ আর ‘ইচ্ছুক’ হেলেনের ট্রয় গমন— দুটো ঘটনাই রামায়ণ আর ইলিয়াডের যুদ্ধের মূল কারণ। যুদ্ধকালে এই দুই নারীর মানসিকতাও ভিন্ন রকম। রামায়ণে সন্ত্রস্ত সীতা রাবণের হাত থেকে নিজের দৈহিক দুর্গতি রক্ষা করার জন্য বদ্ধপরিকর। মেঘনাদবধ কাব্যেও তাই। ইলিয়াডে হেলেন ট্রয়বাসীদের দুর্দশার জন্য নিজেকে দায়ী করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা প্যারিসকে আলিঙ্গনাবদ্ধ তো করেইনি, উপরন্তু তিরস্কার পর্যন্ত করেছে। স্বামী ও তার পরিজনদেরকে পরিত্যাগ করার জন্য অনুতাপবোধও লক্ষ করা গেছে তার মধ্যে। তবে ইলিয়াডে হেলেনের মানসিক সংকটাপন্নতা যেমন অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের বিষয় হয়নি, রামায়ণ কিংবা মেঘনাদবধ কাব্যেও তেমনই সীতার অসহায়তা প্রধান হয়ে ওঠেনি। তবে রামায়ণকারের সাথে কখনও হেক্টরের পরিচয় যে হয়নি, সেটা, বোধ করি, যতটা নিশ্চিত হয়ে বলা যায়, ততটাই নিশ্চিত হওয়া যায়, তার প্রতি মাইকেল মধুসূদনের যাবতীয় মনোযোগের কথাটি ভেবে। যুদ্ধে হেক্টরের বীরত্ব, তৎপর বীরোচিত মৃত্যু ও মৃতদেহের অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা এবং তার লাশ ফিরে পাবার জন্য পিতা প্রিয়ামের মর্মস্পর্শী ভূমিকা আর সর্বশেষে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বর্ণনা, নিশ্চয়ই মাইকেল মধুসূদনের আবেগের স্থানটি দখল করে রেখেছিল। তারই একটি, অবিকল না হলেও, প্রতিরূপ খুঁজে পেয়েছিলেন রাবণপুত্র মেঘনাদের ভেতর। এ কারণেই, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসার মতো একটি মীথ মাইকেল সম্পর্কে তৈরী করা হলেও কিংবা ভারতীয় উৎসে প্রত্যাবর্তন তাঁকে অনেকের কাছে ‘শ্রীমধুসূদন’-এ পরিণত করলেও, আমার কিন্তু তা মনে হয় না। একজন পাশ্চাত্য বীরই বলি, আর গ্রীক বীরই বলি, তাকে আদর্শ করে পাঠক-রুচিকে নতুন করে গড়ে দেবার প্রেরণাই কাজ করেছে তাঁর মনে। আর সেটা করতে গিয়েই প্রয়োজন পড়েছে একটি শত্রুবেষ্টিত দেশের। প্রয়োজন পড়েছে দেশটিকে হানাদার বাহিনীর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার। আবার এই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সে সময়টাও ছিল এই ভাবনাকে সম্প্রসারিত করার অনুকূলে। ব্যবসাবাণিজ্য সূত্রে ইংরেজ সংশ্লিষ্টতায় এ দেশে যে ধনিক শ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে, তার একটা রফা হয় ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত বন্দোবস্তের দ্বারা অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরী করে। কিন্তু জমি তো বস্তুবিশ্বের উপাদান। তা তো ইলাস্টিক নয় যে টানলেই বড় হতে থাকবে। সুতরাং মূলধন  বিনিয়োগ করে অর্থ বাড়ানোর যে প্রক্রিয়া, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির কারণে সে সুযোগ হয়ে থাকতে থাকে সুদূরপরাহত। এ জন্য যে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে থাকা প্রয়োজন, সেই বোধ থেকেই সূচনা ঘটে ইংরেজ বিরোধিতার। নীলবিদ্রোহের কথাটি তো আগেই বলেছি। মেঘনাদবধ কাব্য রচনা শুরু করার পূর্বেই গ্রামবাংলার একটা বিরাট এলাকায় সূচনা ঘটেছে তার। কলকাতায় অবস্থানরত ইংরেজী শিক্ষিত বাঙালী সমাজের একটি অংশ সমর্থনও জানিয়েছে তাতে। পত্র-পত্রিকাও পালন করে চলেছে সরব ভূমিকা। এ পরিস্থিতিতে ‘বিদেশী’ রামচন্দ্রের সিংহল আক্রমণের সাথে ‘বিদেশী’ ইংরেজদের ভারত আগ্রাসন— দুটোর মধ্যে আর পার্থক্য কোথায়? কাহিনীর এই ছকটাই যথাযথ বলে গ্রহণ করতে কোন অসুবিধা আছে কি? সীতা অপহরণের জন্য রাবণকে চিত্রাঙ্গদা ধিক্কার জানায় বটে, কিন্তু তা যে কেবলই একটা নাটকীয় এফেক্ট আনার জন্য, মেঘনাদবধ কাব্যের উপসংহার থেকে এর বেশী ভাবাও যায় না। সুতরাং হেক্টরের বীর চরিত্রকে মেঘনাদে প্রতিস্থাপন করার বিষয়টিকেই বিবেচনা করা যায় মুখ্য বলে। মাইকেল মধুসূদন মেঘনাদকে বলেছেন তাঁর মানস সন্তান, আসলে আমার মনে হয়, হেক্টরই ছিল তা। না হলে আরও পরে নতুন করে গদ্যে ‘হেক্টর-বধ’ রচনা করবেন কেন? অসমাপ্ত আকারে তা প্রকাশইবা (১৮৭১) করবেন কেন? আর একটি কথাও বলা যেতে পারে, তা হল, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোদ্ধা-চরিত্রের প্রতি নিঃসন্দেহে মাইকেল মধুসূদনের একটা পক্ষপাতিত্ব ছিল। মাদ্রাজ অবস্থানকালে দিল্লীর সা¤্রাজ্ঞী রিজিয়া (১৮৪৯—৫০)কে নিয়ে কেবল ইংরেজীতে একটি কাব্যনাটক লিখেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি, পরবর্তী সময় কলকাতায় এসে বাংলাতেও  আবার তা লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন (১৮৬০)। মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা চরিত্রটি সৃষ্টি করার সময়, মনে হয়, মাইকেল রিজিয়ার কথাটিও মাথায় রেখেছিলেন।

৩.১. আসলে সাহিত্য-শিল্পের ব্যাখ্যা কখনও স্ট্রেট-ওয়ে হয় না। দাড়িপাল্লায় তা তুলে দেয়ারও ব্যাপার নয়। নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নটাও বাহুল্য। প্রবৃত্তিগত বিষয়টাও তার ধার ধারে না। সমাজের শৃঙ্খলারক্ষার জন্য কিছু মূল্যবোধের পরিচর্যা অত্যাবশ্যকীয় হলেও, শিল্পে তার পৌনঃপুনিক উপস্থাপন কখনই অনির্বচনীয়তার স্বাদ এনে দিতে পারে না। অস্বস্তিবোধেরও একটা অবকাশ থাকে। সবকিছুই যদি মীমাংসিত হয়ে যায়, তবে তা নিয়ে কৌতুহলেরই বা থাকে কি? প্রেমে এবং যুদ্ধে, আমরা বলি, সব কিছুই জায়েজ। শ্যামাও তো তাই করেছিল। প্রেমের মূল্য দেবার জন্য একজন প্রাণ দিল। বজ্রসেনেরও তো উচিত ছিল সেই প্রেমের মূল্য দিয়ে শ্যামাকেই গ্রহণ করা। আবার এ বোধও তো তার প্রখর, ‘ক্ষমিবে না, ক্ষমিবে না, আমার এই ক্ষমাহীনতা’। কিন্তু শুধু নৈতিকতার কারণে বজ্রসেন যে এটা করেছে, তাও তো মনে হয় না। এবার উল্টো দিক থেকে আরেকটি ব্যাপার দেখা যেতে পারে, তা হল, রোহিণী ও কুন্দনন্দিনীকে মেরে বঙ্কিম নীতির কাছে শিল্পের বারোটা বাজিয়েছেন, অভিযোগের এই বয়ান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক সাহেবেরা অহরহ করে থাকেন। কুন্দনন্দিনী নগেন্দ্রনাথের সংসার তো পাতাই ছিল, তাকে বাঁচিয়ে রেখে কিংবা রোহিণী গোবিন্দলালের মিলন ঘটিয়ে মানে বিবাহ দিয়ে দুচারটে সন্তান উৎপাদনের ব্যবস্থা করে দিয়ে সুখে-শান্তিতে রাখলেই বা শিল্পের এমন কি মহত্ব প্রকাশ পেত? আবার বলুন তো, অচলা কোথায় গেল, তার কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা বের করাটা কি একান্তই আবশ্যক? সুতরাং অনির্দেশ্যতাই বলি, আর মীমাংসাহীনতাই বলি, তাকে ঘিরে আনুভূতিক যে উত্তরহীন অনুসন্ধান চিরজাগরূক থাকে, সেটাই শিল্পের প্রাণময়তা।

মেঘনাদবধ কাব্যে রাবণের সীতাহরণও এরকমই একটি অমীমাংসিত বিষয়। কিন্তু এই সীতাহরণের সাথেই জড়িয়ে আছে এ কাব্যের ঘটনাক্রম ও রসনিষ্পত্তি। রামায়ণে অপহৃত সীতার সতীত্বের প্রশ্নটি বার বার পরীক্ষিত হয়েছে। তার কারণ, বল সেখানে রামচন্দ্রের কোর্টে। সতীত্ব বলতে সেখানে বোঝানোও হয়েছে তার যৌন লাঞ্ছনা। সে সময়ে সতীত্বের মাপকাঠিও ছিল তাই। দায়হীন বলপূর্বক যৌন লাঞ্ছনার জন্য এখনও যেখানে নারীকে বহুভোগ্যা মনে করে পরিত্যাগ করা হয়, সেখানে তৎকালে এটা তো ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মেঘনাদবধ কাব্যের শুরুতেই সীতা হরণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে রাবণকে। তার উল্লেখ আছে পরবর্তী সময়েও। সীতা অপহৃত হয়েছিল বলেই তো রামচন্দ্রের লঙ্কা আক্রমণ। রাবণ যদি সীতাকে অপহরণ না করত, তবে তো প্রয়োজনই হত না এই যুদ্ধের। রাবণের দেশপ্রেম, কর্তব্য সচেতনতা, সন্তান বাৎসল্য, প্রজারঞ্জন —এ সব ঠিকই আছে। তার দেবদ্বিজে ভক্তি, বীরত্ব, সাহসিকতা— তুলনা নাই তারও। একটু অন্য ভাবে কথাটা আপনারা বিবেচনা করে দেখতে পারেন কি না, সেজন্যই বলছি। সমাজে তখন নারীর অবস্থান কেমন ছিল? তার মর্যাদাই বা কি? দশরথের তিন পত্নীর গর্ভস্থ সন্তানদের কথাটা আমরা জানি। কিন্তু তার তিন শতেরও বেশী পত্নীর  খবর জানা আছে কজনের? বসুন্ধরা যেখানে বীরভোগ্যা, নারী তো সেখানে ছার! তাও যদি রাবণের সীতা হরণ নিছক কামপ্রবৃত্তিবশতঃ হত। সে তো তার ভগ্নীর অপমানের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। এখন যদি বলেন, রামায়ণকার এই ঘটনার ভেতর দিয়ে একটা উপলক্ষ্য তৈরী করেছিলেন, তবে এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে, এ রকম নানা উপলক্ষ্য তৈরী করাটাই, লেখকের যেটা মূল শক্তি, কল্পনা, তার কাজ। ঘটনা ইনভেন্ট করা ও তদনুযায়ী পরিস্থিতি সৃষ্টি করাটা প্রতিভারও পরিচায়ক। একটি ঘটনাই জন্ম দেয় আরেকটি ঘটনার। তা হয় প্রতিক্রিয়াজাত। আর এভাবেই ঘটনাক্রম কাহিনীকে পৌঁছে দেয় পরিসমাপ্তিতে। আর ঘটনা তো ঘটনাই। নীতি-নৈতিকতার শাসনে তাকে বেঁধেও রাখা যায় না। বরং, ঘটনা নৈতিক অনৈতিক, যাই হোক, তার সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করাই হল লেখকের কাজ। পাপ-পুণ্যের বিচার করা নয়, তার স্বরূপ উপস্থাপনটা কিভাবে হয়েছে, সেটাই দেখার। সাহিত্যে আমরা কি চাই? পুণ্যপ্রভাবিত ও একই সঙ্গে পাপপ্ররোচিত সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকা রক্তমাংসের মানুষ, মহৎ কর্তব্য সম্পাদন কিংবা পদস্খলন যার জন্য মুহূর্তের ব্যাপার। সে তো ফেরেশতাও নয়, শয়তানও নয় যে অহর্নিশি একই কাজ করবে। সে ধরনের চরিত্র কখনও আকর্ষণীয়ও হয় না। মেঘনাদবধ বধ কাব্যের কয়েক বছর আগে লেখা প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলালের কথা-ই ধরুন। দুর্জন চরিত্র মতিলালই কি পাঠকের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু নয়? সুতরাং পরস্ত্রী হরণ যদি পাপ হয়, তবে রাবণ সেটা করেছে। সেটাই তার কর্মফল। আর এই কর্মের ফলভোগ তাকে করতে হয়েছে, অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির কথা বাদই দিলাম, প্রিয়পুত্রের মৃত্যুযাতনা সহ্য করার ভেতর দিয়ে। কিন্তু তার এই মৃত্যুযাতনা ভোগই পাঠকের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছে নিরন্তর ব্যঞ্জনার— যা এনে দেয় অনির্বচনীয়তা। ট্রাজেডিতে মহৎ মানুষের পতনের কথাটি বলা হয়। পাঠকও এই পতনকে মেনে নিতে পারে না বলেই তার হৃদয়ক্ষরণ এক সময় সাবলিমিটিকে ধারণ করে। রাবণের বেলাতেও তাই। করুণা কিংবা সহানুভূতি নয়, মহত্ববোধের শাশ্বত উপলব্ধিই তাকে ঘিরে স্থির হয়ে থাকে। সুতরাং এ কথাটি, বোধহয় বলা যায়, মাইকেল রাবণের সীতাহরণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিদিত থেকেও, রক্তমাংসের মানুষের মতই, তার হৃদয়ক্ষরণকে করে তুলেছেন মহিমাময়। অলঙ্কৃত করেছেন আভিজাত্যে। এর ভেতর দিয়েই ফুটে উঠেছে তাঁর শিল্পের অবিনাশী রূপ।

৪. বলা হয়, ট্রয়ের যুদ্ধ চলেছিল দশ বছর। তার পরিসমাপ্তিও হয়েছিল, আগে তো বলেছি প্রতারণা, অনেকে তাকে চাতুর্যও বলে, তার ভেতর দিয়ে। কিন্তু ইলিয়াডের ব্যাপ্তি সে তুলনায় অনেক কম। মেধনাদবধ কাব্যেও রামের লঙ্কা প্রবেশ থেকে জের টানা হয়নি। চলমান যুদ্ধের এক পর্যায়ে, এক রকম নাটকীয়তা অর্থাৎ আকস্মিক দুঃসংবাদ দিয়েই তার শুরু। তারপর নয়টি সর্গ জুড়ে ঘটনাক্রমের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে সামগ্রিকতাবোধের একটা অভাব পাঠকের মনে উদিত হতে পারে। কিন্তু সেটাকে মাইকেলের দুর্বলতা মনে করারও কোন কারণ নেই। কেন না, যারা রামায়ণ পড়েননি, কাহিনীর পূর্বাপর বিষয় নিয়ে কোন সস্পূর্ণতা পাওয়া গেল না, তাদেরও এমন মনে হয় না। বিশেষ করে চতুর্থ সর্গে যুদ্ধের পটভূমিকাটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সব কাহিনীতেই ক্রিয়া ও তার প্রতিক্রিয়া —পরস্পর মুখোমুখী হয়ে আদর্শগত, ভাবগত কিংবা ঘটনাগত দ্বন্দ্বের যে চিত্রপট গড়ে তোলে, তাই নদীর ¯্রােতের মত তাকে নিয়ে যায় মহাসাগরে। মেঘনাদবধ কাব্যের গঠন প্রক্রিয়াতেও রয়েছে দুটো পক্ষ। এই দুই পক্ষের প্রতিই সুবিচার করারও একটা দায় লেখকের থাকে। মেঘনাদকে সৈনাপত্যে বরণ যেমন একটি অনিবার্য ঘটনা, অনুরূপভাবে প্রতিপক্ষের উদ্যোগ আয়োজনেরও তো ব্যাপার রয়েছে। কাহিনীকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেভাবেই। তবে অভিনবত্বও রয়েছে প্রমীলা চরিত্রের সৃষ্টি করে। তার সাথে বৃহত্তর সমাজমানস পরিবর্তনেরও একটা যোগ রয়েছে। দেশপ্রেমের ব্যাপারটা তখন যেমন যুগাভিসারী হয়ে উঠেছিল, নারীর ব্যক্তিত্ব প্রকাশের বিষয়টিও তার সাথে সংশ্লিষ্ট। আবার শক্তিশেলে লক্ষ্মণ আহত হবার পর প্রেতপুরীতে নিয়ে যাওয়া তখনকার মানসসংস্কারেই ফলাফল। অনেকেরই আক্ষেপ থাকতে পারে যে ষষ্ঠ সর্গে মেঘনাদের মৃত্যুর ভেতর দিয়েই কাহিনীর শেষ হয়ে যাবার কথা ছিল, বড়জোর তার সৎকারের বর্ণনাই প্রাসঙ্গিক হতে পারত, কিন্তু সেটা হলে, মনে হয়, সামগ্রিকতাবোধের সংকট তীব্র হয়ে ধরা পড়ত। জীবনে উত্থান-পতন আছে, জয়-পরাজয় আছে, মৃত্যুর বিনাশী রূপেরও একটা মহৎময়তা রয়েছে, কিন্তু ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে তাকে যথোচিত করে প্রকাশ করার প্রশ্নটিও এখানে জরুরী। সপ্তম ও অষ্টম সর্গে সেই রূপটিই প্রকাশিত হয়েছে মাত্র।

৪.১. মেঘনাদবধ কাব্যকে নিয়ে আরও কিছু বিষয় ছাত্রপাঠ্য করে তোলা হয়েছে। যেমন, নায়ক-প্রতিনায়ক কিংবা বীররস না করুণরস, যার কথা আগেও বলেছি,— এই সব আর কি? এখন কথা হল, ব্যাকরণ পড়ে যেমন মানুষ ভাষা শেখে না, একইভাবে বিশ্বনাথ বা দ-ীর ছবক মেনে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো যায় না। সংস্কৃত সাহিত্যের আলংকারিকেরা তো এমন কথাও বলেছেন বলে শুনেছি যে, কাব্য রচনার জন্য কবি কেমন বাড়ীতে বসবাস করবে, সুযোগ-সুবিধাই বা সেখনে কি থাকবে? অর্থাৎ বিষয়টা কি এমন দাঁড়াচ্ছে না যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও রকম হলে, ভাব যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে আসবে। কিন্তু ঘটনা তো আর সে রকম নয়। সৃষ্ট কোন জিনিসের উপাদান বা বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করা যেতে পারে। ফরমায়েস দিলে তা কষ্টকল্পিত ছাড়া অন্য কিছু হবে না। সুতরাং যে যে বিষয়গুলি অনিবার্যভাবেই প্রতিভার অঙ্গীভূত, তা নিয়ে অহেতুক জ্ঞানের দৌড় প্রদর্শন করার কোন দরকার আছে কি? শেষ পর্যন্ত তা পাঠকের মনের কাছে কতটা আবেদনের সৃষ্টি করতে পারছে, সেটাই মুখ্য। রাম-রাবণ কিংবা মেঘনাদ-লক্ষ্মণ, যিনিই হন, এরা তো জীবনেরই একটা প্রতীকী রূপ। প্রমীলা-সীতা-মন্দোদরীরাও তাই। তাদের এই প্রতীকায়িত ছবির ভেতর দিয়ে জীবনের যে প্রকাশ ঘটছে, তা যেমন শান্ত-মধুর, অন্যদিকে তেমনই তা তরঙ্গায়িত—অস্থির। আর এসব কিছু মিলেমিশে মনের যে ব্যাপ্তি ঘটায়, তা এক সময় স্থির হয়ে থাকে একটা বিন্দুতে। এর ভেতর দিয়ে চিত্তের যে জাগরণ ঘটে, তাকে কি কোন বিশেষ বর্ণ দিয়ে সনাক্ত করা যায়? কিংবা অমিত্রাক্ষর ছন্দের কথাটা? ছন্দ তো কবিতার একটা ফাংশনাল বিষয়। এক সময় তো মানুষের মনের এই সৌন্দর্য সৃষ্টিকে স্মৃতি ও শ্রুতির সাহায্যে ধরে রাখা হত। লব ও কুশকে বাল্মিকী মুনি রামায়ণ গান মুখস্থই করিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবেই তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়েছে। সব সাহিত্যের ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে। ছন্দেরও প্রয়োজন ছিল এ কারণেই। তার সাঙ্গীতিক মূর্চ্ছনা হৃদয়ে যে ধ্বনিতরঙ্গের জন্ম দিত, তাই, মনে রাখরার কাজটাকেও করে দিত সহজ। আর এটাকে ভাবের শৃংখল বলে ভাববারও কিছু ছিল না। কাজেই শুধুমাত্র ভাবপ্রবাহকে বাধামুক্ত করার জন্য মাইকেল যে অক্ষরের মিত্রতাকে বর্জন করেছেন, আমার কিন্তু মনে হয় না। ইংরেজী ব্লাঙ্ক ভার্সের একটা মডেল তাঁর সামনে ছিল, নতুন করে সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রয়োজনে, হতে পারে, তিনি তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কিংবা এটাকে পালাবদলের অনিবার্য উদ্ভাবন হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। কবিওয়ালা-তরজাওয়ালাদের হাত থেকে তিনি বাংলা কবিতাকে বাঁচিয়েছেন বলে এতে আত্মপ্রসাদ পাবারও তেমন কিছু নেই। এক অমোঘ পরিবর্তনশীলতার রূপটাই মাইকেলের যুগোপযোগী উদ্ভাবনে পূর্ণতা পেয়েছে।

তবে এটাও ঠিক যে, মাইকেল মধুসূদন না নিজে, না তার সৃষ্টিকে নিয়তি শাসনের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। সবক্ষেত্রেই নিয়তি যেন দুর্ভাগ্যেরই প্রতিরূপ। এ সমাজে সাক্সেসফুল মানুষ হবার সবই তো তাঁর ছিল। সচরাচর বাঙালীদের যেটা হয় না, সেই কালারফুল জীবনের অভিপ্রকাশও তাঁর মধ্যে ঘটেছে বার বার। তবে তাঁর এই নিয়তি, ঘরসংসারের বাস্তবতায় হয়ত অব্যাখ্যাত নয়। তার কার্যকারণ সম্পর্কও অনির্ণিত থাকে না। কিন্তু তার সৃষ্টি? সেখানেও তিনি নিয়তিকেই মেনেছেন। মানুষের পৌরুষ, তার বীর্য, তার পরাক্রম, — এ সবকে নিয়তির প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলার ভেতর দিয়ে অপৌরুষেয় শক্তির মহিমাকে তুলে ধরার বিকল্প কিছু, বোধ করি, তাঁর কাছে ছিল না। বিনাশের ভেতর দিয়েও জীবনের যে গৌরব অবিনাশী হয়ে থাকে, মেঘনাদবধ কাব্যেও হয়নি তার অন্যথা।

***************************************

স্মরণ

গিরিশ কারনাড (১৯৩৮-২০১৯)

এই জুনের দশ তারিখে চলে গেলেন গিরিশ কারনাড। দেশ তাঁর মহারাষ্ট্র, জন্মেছিলেন ঔপনিবেশিক ভারতের বিকাশমান বাণিজ্যনগর মুম্বাইতে, পার্টিশনের এক দশক পূর্বে। বহু পরিচয়ে ঋদ্ধ গিরিশ, নাট্যকার-অভিনেতা; সাহিত্যের জগৎ থেকে থিয়েটার ও বলিউডপাড়া; সর্বক্ষেত্রেই ছিল তাঁর প্রতিভাম-িত বিচরণ। লাভ করেছেন অসংখ্য পদক-পুরস্কার, বিশ^বিদ্যালয়ের ডিগ্রি। শিল্পীর মেরুদ-হীনতা, কানে তুলো এঁটে কাঁচঘরের পুতুল হয়ে থাকা ভারি অপছন্দ ছিল তাঁর, এখানেই তিনি তুলনারহিত, স্বকীয় এবং দ্রোহকণ্ঠী; নিজের অকুণ্ঠিত পরিচয় ঘোষণা করতেন ‘আরবান নকশাল’ বলে। যুবক হতে আরম্ভ করে পরিণত প্রবীণ; এই অসম ব্যবস্থায় আমরা আজীবন তাঁকে পেয়েছি অক্লান্ত প্রতিবাদীরূপে- রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকায়েমী, ক্ষমতাজর্জর চরিত্রের বিপরীতে যিনি সর্বদা দ-ায়মান। এই মোহরিক্ত, বিরল ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে আমাদের শোকার্ত হৃদয়ের প্রণতি…

***************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা