পাঠ : চিহ্ন ¬২৭

পরিবর্তনই সাহিত্যের ধারা। সংখ্যা তেরো পর্যন্ত ছোটকাগজের মেজাজ তারপর এখন পর্যন্ত সাহিত্যের কাগজ-মেজাজে প্রকাশ পাচ্ছে চিহ্ন। পরিবর্তন, পরিবর্ধনে হয়তো বেশি সময় অতিবাহিত হয় নি তবে এই পনের বছরে সাতাশটি সংখ্যার প্রকাশ সাহিত্যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা হয়তো সময়ই বিচার করবে। ধারাবাহিক বিভাগ, পাশাপাশি পঁচিশ সংখ্যা থেকে বিশেষ বিষয়ের উপর সাজানো হচ্ছে চিহ্ন। ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’ আর এবার অর্থাৎ সাতাশে এসে ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ হাতে পেয়ে অবাকই হতে হয় যেমনটা অবাক করে চিহ্নর প্রতিটি সংখ্যা। অন্যান্যের মতো এবারো আছে বিশেষ গল্প ফিচার ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’ সাথে নিয়মিত বিভাগÑ‘কী লিখি কেনো লিখি’, তিন গল্প, গুণীজনস্মরণ এবং অন্যান্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টার বিভাগসমূহ। পত্রিকাটির খণ্ডবিভাগের প্রথম খণ্ডটুকু উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত কবি আবুল হোসেনকে আর দ্বিতীয় খণ্ডাংশ উৎসর্গিত হয়েছে বিরল উজ্জ্বল বাতিঘর সরদার ফজলুল করিমের নামে। সম্পাদকীয়তে আগামী সংখ্যার কবিতার আহ্বান ও শেষ পাতার সংবাদÑ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…’ হয়তো বিশেষ একটি সংখ্যার ইঙ্গিত অথবা পরিবর্তনের আশ^াস দেয়।
বড়োদের বেড়ে ওঠা কিংবা তাদের কিশোরবেলার স্মৃতিকে সাহিত্যিক রূপ দিয়ে সাজানো ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’। আলফ্রেড খোকন, অলোক বিশ^াস, সৈয়দ তৌফিক জুহুরী, মর্মরিত ঊষাপুরুষ, নূর-ই আলম সিদ্দিকী, মৌসুমী জাহান নিশাÑস্মৃতিকাতরতায় হয়তো কখনো প্রথম ভালোবাসা অথবা ছুঁইছুঁই রিরংসা অথবা পাখি হত্যায় হৃদয়কাঁপার মতোই আনন্দের বেশি অংশ জুড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন। মনের আক্ষেপ সমবয়সী বন্ধু না পাওয়ার। আর পাবেই বা কেমনে? যদি বোধের শুরু হয় বই পড়ার অভ্যাস দিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা যা নিজের জীবনকে বদলে দিয়েছে। কাদা মাখামাখিতে বেড়ে ওঠার মাঝেও কারো হৃদয়ের কোণার দুঃখ হয়তো মনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। নতুবা কখনো তা চোখের কোণায় জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। একাকীত্বই হয়তো অনেকের জীবনের সঙ্গী হয়, আর নব্বই দশকে হয়তো একাই বাস করতে হচ্ছে ছোট্ট ক্লাসেÑমহাভারতের অর্জুনকে উপস্থাপন করার কারণে। মৃত্যু; যদি তা স্বেচ্ছায় হয়, তার কারণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো অনেকেই প্রেফার করে, অনেকেই ঘেন্না করে, তবে ওই যে ওই ছেলেটাÑযার মনের সামান্য ইচ্ছা, যদি পূর্ণ না হয় তবে? মরণকামীদের দল অবশ্যই সংগঠিত হবে। নিরাশা নয় ভরসা নিয়ে। এমনই ভরসায় কল্পরথের লাগাম ধরে হয়তো কবিই হয়ে ওঠে অনেকেই কিংবা উপন্যাসের চরিত্রে নানা এ্যাঙ্গেল থেকে নিজেকে মেলাবার চেষ্টা চলে এই অংশে। বড়োদের কাছে নস্টালজিয়া শুনতে হয়তো রূপকথার কথাই মনে পড়ে যায়। তবে এই অংশে প্রণোদিত হবার আকাক্সক্ষা বড্ড বেশি।
এই যে এতো লেখা-লেখি এটা কেনো? লেখক কি নিজের কথাই লেখেন না কি নিজের অভিজ্ঞতার কথা কলম-খাতায় উঠিয়ে আনেন। নাকি লেখার জন্য ভেতরের কোনো সত্তা এসে যাতনার সৃষ্টি করে? শেষমেষ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লিখতে বসে যাওয়া। লেখা হয়ে যাবার পর যদি তা ভালো না লাগে অথবা কেউ প্রশংসা না করে তাতে ক্ষতি থাকে না। যদি কেউ অনুপস্থিতিতে অথবা উপস্থিতিতে প্রশংসা করে বসেন তা ফুয়েলের কাজ করে। কথাশিল্পী আবুবকর সিদ্দিকীর কাছে এমনই ফুয়েল পেয়ে যান নূরুননবী শান্ত। লেখা ছাড়তে পারেন নি তিনি। লিখছেন, লিখবেন। কী লিখছেন, কেনো লিখছেন তা হয়তো তিনি জানেন না, কিন্তু যা তিনি লিখছেন তা তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছে।
বাংলা সাহিত্যের পরিক্রমায় ‘নিম সাহিত্য’ সাহিত্যের আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। বারীন ঘোষালের উপস্থাপনায় উঠে আসে রবীন্দ্র গুহ। রবীন্দ্র গুহ জন্মগ্রহণ করেন বরিশালে ১৯৪৩ সালে। তবে ১৯৭০-এ দূর্গাপুরে তিনি আরো কয়েকজনকে পেয়ে যান, যাঁদের দ্বারা উত্থান ঘটে নিম সাহিত্যের। নিম সাহিত্যের ভাবনা-ভবিষ্যৎ নিয়ে পথ চলা শুরু হলেও তা অতি অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। তার আগের হাংরির রেশ তারা ধারণ হয়তো করে নি তবে কমিটমেন্ট ছিলো দৃঢ়। আত্মপ্রতিষ্ঠা নয় বরং সাহিতকে নতুন মাত্রা উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ছিলো রবীন্দ্র গুহর। নিমরা টেনশন পোষে, স্ত্রীর সাথে বিছানায় হয়তো অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে তবে স্ত্রীকে বুঝতে দেয় না, গল্পের নীচে আগুনের তাপ দেয়, তারা সমাজের মাথা হতে চায় তবে মাথায় বসতে চায় না, যৌনতাকে তারা আদর বলে না, রাজা ও প্রজার ক্ষুধা তাদের কাছে সমান, অলস সময় কাটানোতে এদের এ্যালার্জি, নার্সিসাস-কমপ্লেক্সকে তারা পজেটিভ করে দেখে। নিম সাহিত্য ম্যানিফেস্টোÑ১৯৭০ ঈড়সসবহঃ ধং ঃড়ফধু’ং ৎবষবাধহপব-
Ñ সাহিত্য অভিজ্ঞতার ফল নয়, অবিকৃত অভিজ্ঞতাই সাহিত্য
Ñ জীবনের কোনো ব্যথা নেই, কার্যকারণের ভবিষ্যৎ নেই
Ñ শিল্পহীনতার থেকে বন্ধনহীনতার দিকে
Ñ বোধের মূলে নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করুন
Ñ ব্যক্তিগত বিস্ফোরণ চাই, সূর্যের দিকে সরাসরি তাকান।
রবীন্দ্র গুহ অথবা নিম সাহিত্যের সমৃদ্ধ উপস্থাপন করেছেন বারীন ঘোষাল। চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। যদিও নিম সাহিত্য তিন/চার মাসের বেশি টেকে নি তবুও সাহিত্য গদ্যের গতিদানে সময় ও সাহিত্যটি গুরুত্বের দাবি রাখে ।
রকিবুল হাসানের তিতাস-এর শেকড় ও কারুণ্যশ্র“তি সাদামাটা ধারাবাহিক উপস্থাপন। বয়ে যাওয়া নদীর ধর্ম। বহমান অঞ্চলের রাণি হয়ে থাকে নদী। যেমনটা তিতাস। ধারণ করে যাপিত জীবনের চিত্র; মুর্শিদি, বাউল, মারফতি, পদ্মাপুরাণ, পুঁথি; গ্রামবাংলার প্রেম, রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিবতার গণ্ডি না পেরোনোর বার্তা, নদী ভাঙনের দুর্দশা। বাসন্তীরও সারাজীবনের পরিক্রমা মূলত তিতাসের মতোই। হয়তো ভালোবাসা সে পায়, মানসিক তৃপ্তির অনুভব তার জাগে তবে তা অন্যের প্রয়োজনে। নিজেকে অন্যের করে বিলিয়ে দিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রবন্ধটির শেষের বার্তায় হতবাকই হতে হয়।
নিঃসঙ্গতার কবি ও কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুকে ‘বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য: ভাষার ভেলায় ভাসাই তরী’ আত্মপক্ষ সমর্পণ করে তারেক রেজা নানা যুক্তির মুনসিয়ানা দেখিয়েছেন। যদিও দশভূজার শক্তি ছিলো এক হাতেই তবুও বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তুলনীয় নন। তবে কবিতার জগত তাঁকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। কিন্তু অনেক গদ্য কবিতার চেয়ে বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য উচ্চমান ধারণ করে তারেক রেজার মত তেমনই। তিনি আশিস কুমার দে’র ‘আবর্ষক গদ্যশৈলী : অব্যর্থ তীরন্দাজ’ গৌতম কুমার দাসের বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি’ বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ প্রবহমানতা, গদ্যে ইংরেজি পদান্বয়ের প্রভাব, বিশেষ যুক্তির প্রভাব এবং গদ্যভাষার নবীনতাÑপ্রভাবগুলোর উপস্থিতি তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তার কথাসাহিত্যে যে বুদ্ধদেব বসুরই জীবন-ছাপ প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট তার উল্লেখ করেছেন। তবে উদাহরণস্বরূপ ড্যাস (Ñ) এর ব্যবহারের কথা তুলে এনেছেন। গদ্যে কি পদ্যে বুদ্ধদেব বসুর রাসায়নিক বিশেষণ তাঁকে মহিমান্বিত করে।
সজল বিশ^াস, সোলায়মান সুমন ও মূর্তালা রামাতের ‘শর্ষে ফুল ও কর্পোরেট ভালোবাসা’, ‘দলিত চাঁদ’ ‘একদিন রক্তের দিন’ গল্প তিনটিতে ইনার ইমোশন ও ভালোলাগার বিষয় থাকলেও গদ্যের ভাষা কিংবা কাহিনি তেমনটা আন্দোলিত করে না। তবে ভাবনার জায়গার স্থিতি কিংবা একই বই বিশেষ কাউকে উৎসর্গ করার আনন্দ, কিংবা তোরাবের মৃত্যু, বা মতির হাতেই মতির মায়ের স্বেচ্ছামৃত্যুর কারণটা কেবল হৃদয় দিয়েই অনুভব করার বিষয়।
এ পর্বে সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যশিল্পী-সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকীর স্মরণে তাঁরই সাথে কবিতাকথনের সাক্ষাৎকারটি পুনঃপত্রস্থ হয়েছে। কথা বলেছেন কবিতার আত্মা ও শরীর নিয়ে। কবিতার শব্দ নির্বাচন, মেনে অথবা না মেনে কিংবা অবচেতনায় ছন্দের ব্যবহার, বিশ^ামিত্রের ধ্যান ভাঙাতে মেনকার দেহ-ভাঙ সেটা প্রথম নৃত্য তবে মনোমুগ্ধকর। কবিতা তেমনি। আজন্ম মনোমুগ্ধকর। তবে অনূদিত কবিতা নিয়ে তাঁর আপত্তি অথবা কবিতার মূল ইমোশনের অগ্রিম বিপত্তি ঘটার ব্যপারে তিনি সন্দিহান। মূল ইমোশনের জায়গা রক্ষা করা কতোটা শক্ত এ ব্যপারে বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে অনুবাদের ঝঞ্ঝার কথা তুলে ধরেছেন।
‘একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন’ স্মরণে কামরুল ইসলাম একজন মাঝি নয় পাঞ্জেরিকেই তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সাতাশ বছর একবিংশ লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে অতিক্রম করেছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের তত্ত্বাবধানে। ছোটকাগজের নানামুখী বিতর্ক চক্রের বাইরে এসে একবিংশ পত্রিকাটিকে সাহিত্যের পত্রিকা ভেবে তার মান নির্ণয়ই করার চেষ্টা এখানে করা হয়েছে। কবিতা, কবিতাভাবনায় তরুণদের যোগ করা; তবে পরবর্তীতে তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করে। যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে কখনো সময়, কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রিকা হয়েছে একবিংশ। এই প্রাণপুরুষ শেষজীবন কাটান নিঃসঙ্গতায়। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছেন। গিয়েছেনও আমাদের ছেড়ে তবে সাহিত্য-সময় তাকে ছাড়ে নি।
‘ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স’ সরোজিনী সাহু অনুবাদ করেছেন মাহবুব অনিন্দ্য। ব্যতিক্রমী নারীবাদী লেখিকা সরোজিনী সাহু। অনুবাদে আক্ষরিকতার ভীতি থাকলেও তা কাটিয়ে অনুবাদের নির্যাস দিতে সক্ষম হয়েছেন অনুবাদক। তবে সরোজিনী সাহুর লেখায় খাপছাড়া বিষয়টি কিছুটা লক্ষণীয়। হয়তো তা প্রবন্ধের অনুবাদ সে কারণে এমনটা। নারীরা আজন্ম ব্যবহৃত হচ্ছে পুরুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসেবে। সরোজিনী সাহু তাঁর লেখনীতে নারীর স্বাধীনতা এবং তাঁর চরিত্রগুলোকে স্বাধীন করে দেখানোর চেষ্টায় সফল হয়েছেন। যা নারীদের মনোজগতের চেতনার জাগরণ ঘটাতে সক্ষম।
চিহ্নর ধারাবাহিক বিভাগগুলোর মধ্যে ‘রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাÑ ১১’ শিরোনামে এসেছে স্বননÑ একটি আবৃত্তি নির্ভর সংগঠন। তবে চিহ্ন কি কেবল রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্যের ধারাবাহিক উপস্থাপন করবে নাকি দেশের অন্যান্য যারা বা যে সংগঠনগুলো শিল্পে-সাহিত্যে শ্রম বিনিয়োগ করছে তাদের নিয়েও কাজ করবে? এ জিজ্ঞাসাটি থেকেই যায়।
মুহাম্মদ হাসান ইমাম সমাজবিজ্ঞানের মানুষ। সমাজবিজ্ঞানের কগনিশন তত্ত্বকে প্রভাবক করে মানুষ তার দ্বারা কীভাবে আবর্তিত হয় অথবা মানুষের লাজুক ও চঞ্চল হবার প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী কুলি, পিয়াগেট ও মিডের গবেষণার বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেছেন। মানুষের সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক এবং যাবতীয় পারিপার্শ্বিকতার কারণে মেয়ে ও ছেলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন। আর মনোবিজ্ঞানের নানারকম টার্মের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মিথ থেকে বেরুতে যেমন একই ধারণা ৪৬ প্রজন্মকে লালন করতে হবে তেমনই আমাদের এই প্রক্রিয়াটি থেকে বের হতে সময় লাগবে। লেখাটি ধারাবাহিক। অপেক্ষায় থাকা যায় পরবর্তী সংখ্যার জন্যÑনতুন কোনো সমাজতত্ত্বের জন্য।
চিহ্ন-২৭ এর বিশেষ ক্রোড়পত্রে বিশেষ ভাবনা ছিলো ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ নিয়ে। বাংলা সাহিত্যে ভাষার মোড় নেবার ক্ষেত্রে সবুজপত্রের ভূমিকা উজ্জ্বল। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে ( ১৩২১-এর ২৫শে বৈশাখ) সাহিত্যের আর এক গতির জন্ম নেয় সবুজপত্র। বর্তমানে দাঁড়িয়ে পেছনে একশ বছরের ব্যবধান লক্ষণীয় তবে এই একশ বছরে আমরা বিচ্ছিন্ন হই নি সাহিত্য থেকে আরেকভাবে বললে হয়তো এভাবে বলতে হবে যে, সবুজপত্রের ভাষা থেকে আমরা বেরুতে পারি নি। রবীন্দ্রনাথের গদ্যে চলিত প্রমিত ভাষার প্রবেশ বলি আর অন্যান্যদের কলমে বাতাস লেগে এক বাঁকে চলার কথাই যদি বলি তাহলে কিন্তু সমস্ত প্রশংসা সবুজপত্রেরই প্রাপ্য। চলিত ভাষাই চলছে বর্তমান সাহিত্যে। প্রমথ চৌধুরীকে নানাভাবে অনেকেই সম্পাদনায় সাহায্য করেছেন। তবে হতাশার কথা সবুজপত্রকালীন লেখা পাওয়া বা চলিত ভাষায় লেখার লেখক তেমন পাওয়া যায় না। গেলেও বর্তমানে কিন্তু পরিস্থিতি আরও বিপরীত। ঐ সব সংখ্যার কথা যে সব সংখ্যায় মূলত সম্পাদকীয় ব্যতীত সমস্ত লেখাই রবীন্দ্রনাথের, অথবা সম্পাদক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলে সংখ্যাগুলোর উপযোগ কিন্তু আজও ফুরায় নি। কিন্তু অনেকেই লিখেছেন সে সময়ে। সংকটের কথা তুলে ধরতে উদাহরণটি দেয়া মাত্র। নন্দলাল বসুর তালপাতার প্রচ্ছদটি এখনো চিরসবুজের বিজয় কেতনের সিম্বল বহন করে।
প্রাতিষ্ঠানিক কথা। সাহিত্যে একশ বছর হয়তো তেমন সময় নয়। ফল ভোগের ব্যাপারটি হয়তো আরও পরের বিবেচ্য বিষয়। তবে সবুজপত্রকে সবার নমস্কার জানানোই (সবুজপত্রবিষয়ক মতামতধর্মী লেখাগুলোতে) কী দায়িত্ব? আর যাঁরা বলতে চাইলেনও তাঁরা কিছু জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিয়ে কলম থামালেন। একটি ভাষার পরিবর্তন হলোÑতা কি নিয়ম মেনে? অবশ্যই। সেটাই প্রমাণ করেছে সবুজপত্র। তবে সে নিয়মগুলো আসলে কী? ভবিষ্যৎ! একশো বছরের পরিবর্তন কতোটা। সেটা হয়তো সাহিত্যের সময়ই বিবেচনা করবে। তবে যা বর্তমানে হচ্ছে তার সঠিক প্রভাব প্রয়োগ কী ঘটছে? নাকি অন্য কোনো দিকে চলে যাচ্ছে? উত্তর মেলে নি।
রাজধর্ম থেকে গণধর্মে নেমে আসা ভাষা তেরোটি বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে। আমরা উপকৃত সবুজপত্র-এ প্রকাশিত লেখার তালিকার মাধ্যমে।
নিয়মিত-অনিয়মিত বিভাগ, ধারাবাহিক বিভাগ, বিশেষ বিভাগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে চিহ্ন। হয়তো এটাই তার বৈশিষ্ট্য রূপ নিতে যাচ্ছে। ভিন্ন ভাবনার মিশেল হয়তো পাঠককে সমৃদ্ধ করে। তবে বিশেষের প্রতি নজর সবার ‘বিশেষ’ই থাকে সেই কারণেই সে বিষয়ের প্রাচুর্য অনুমেয় হয়। চিহ্ন কবিতার অনুপস্থিতি টিপ ছাড়া প্রিয়তমার মতোই মনে হয়। যদিও পরবর্তী বিষয়টি কবি ও কবিতা বলেই ঘোষিত। সাহিত্যের প্রয়োজনে যে বিষয়গুলো এসেছে তা হয়তো কিছুটা পরিপাটের প্রয়োজন ছিলো। গল্প মন মাতাতে না পারলেও প্রবন্ধগুলো ছিলো বেশ সময়োপযোগী। স্মরণে এসেছেন যাঁরা তাঁদের প্রণিপাত। যাঁরা জীবন থেকে তিল তিল করে সময় ও শ্রম বাঁচিয়ে ডিপোজিট করেছেন সাহিত্যে। চিহ্ন তেমনই ডিপোজিটর। সাহিত্যের সময়, শ্রম, মেধার ডিপোজিটর।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা