পাঠ : চিহ্ন ¬২৭ সম্পাদক : শহীদ ইকবাল : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদকের সাথে পরিচয়ের আগেই তার পাঠক নির্বাচনের তালিকায় আমি প্রথম সংখ্যা থেকেই অন্তর্ভুক্ত। যুগ পেরিয়ে শৈশব অতিক্রান্ত কৈশরে পত্রিকায় সংখ্যার টগবগে প্রাণোচ্ছল চিহ্ন এখন ২৭তম যুবক সাব্বাশ চিহ্ন। সাহিত্য মাঠের দৌড়ের প্রতিযোগিতায় যে বয়সে কৃতিত্ব সাফল্য ঈর্ষা জাগায় নিঃসন্দেহ তথাস্থানে আসন পেয়েছে নাকি নিয়েছে চিহ্ন। প্রশ্ন থেকে কিউরিসিটি নিয়ে একটু পা বাড়াতে প্রণোদনা মনে শক্তি যোগায়, সাহস বাড়ায়। ভূমিকার গৌড়চন্দ্রিকায় চিহ্ন পাঠের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খোলার ইচ্ছায় আমি মুর্খ কলম ধরেছি।
চিহ্নকে ওজনের দাঁড়িপাল্লায় মাপতে নয়। এর প্রয়াসের জাস্ট পাঠ প্রতিক্রিয়া। চিহ্নর আছে গদ্যনির্ভর বিশেষত্ব সৃষ্টিশীল আলাদা উদ্দেশ্য বা লক্ষ। দৌড়চ্ছে একটানা গতিতে। লেখক হয়ে কেউ জন্মে না। লেখক হতে হয় ত্যাগের মহিমায়, একনিষ্ঠ সাধনায়। অভিজ্ঞতার আলোকসম্পাতে সততাকে ধারণ করে। চিহ্নর লেখক বানানোর প্রচেষ্টা ধারাবাহিক প্রয়াস অব্যাহত। তরুণেরা চিহ্নের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সফলতা তাকে কতটা তৃপ্ত করেছে জানিনা। পাঠক হিসাবে অতৃপ্তি থাকছে। এ দেশে গদ্য লেখকের আকাল রয়েছে জানি। প্রশ্ন এসে জাপটে ধরে চিহ্ন পেরেছে কি সে আকাল তাড়াতে? কল্পনায় আমি মহাশূন্যে ভ্রমণ করি। আকাশে মেঘ ছুঁই। নক্ষত্র ফুল কুড়িয়ে এনে যৌনাবেদনময়ী পছন্দের সেলিব্রেটির হাতে তুলে দেই। স্বপ্নের বাসরে ঘুমহীন রাত কাটে। সাহিত্য সাধনা, চর্চা যাই বলি সবই অজানাকে আবিষ্কারের রহস্য। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার রাজকুমার। স্বপ্নের দেবীকে ধরতে পারলে রাজ্যপাঠ ও রাজকুমারি দখলসহ সুপারহিরো হালের মুম্বাইয়ের আইকন শাহরুখ খান। শ্রমসাধনার সাফল্য লাভেই আসে সার্থকতা। সময়ের ব্যবধানে দূরত্ব নিকটে আসে। চিহ্ন আমাদের কত নিকটে এসেছে, না কি আসতে চায় না। আন্তরিকতায় তাকে টেনে নিই কাছে। কাছে টানলেও দূরত্ব কমে না, কবি আর কবিতার সাথে। গদ্যের মাঠ চষে ফসল ফলিয়ে মেটাতে পারি না চিহ্নর ক্ষুধা। যুবকের দেহপুষ্টিতে চাই একই খাবার তা কী করে হয়। ভাতের সাথে মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি, ফল, মিষ্টান্ন, দই, টক, তেঁতো না হলে সুষম খাদ্য বিলাস পরিপূর্ণ হয় না। পরিবেশকের পরিবেশনের গুণেও আহারে পরিতৃপ্তি আনে। সম্পাদক তো পরিবেশক। পাতে যা পড়বে সব চেটে মুছে খাবো নুলো হাতে, এমন দায়বব্ধতা কিম্বা বাধ্যবাধকতা নিশ্চয় পাঠকের বর্তায় না। পাঠকেরও স্বাধীনতা অবশ্যই স্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে অবশ্য হাঁড়ি-চাটা প্রাণীরা ব্যতিক্রম।
চিহ্নর ঘোষণা উজানের টানে । ব্যতিক্রম দেখলাম ২৭-তম সংখ্যায়। চিহ্ন ¯্রােতে ভেসে গেল ভাটিতে। আজ হতে শতবর্ষের অতীতে কার যেন সবুজ সংকেতে। উনিশের সাহিত্যাঙ্গনে মেলে ধরা ছাতা সবুজপত্র যার ছায়াতলে ছিল বিশ্বকবির এতচ্ছত্র আধিপত্য অবাধ বিচরণ। মাসিক সবুজপত্রর শততম স্মরণে যাকে চিহ্ন-এ সনাক্ত করা হয়েছে ‘ক্রোড়পত্র’ অভিধায়। এতে দু‘বাংলার প্রবন্ধকারের অলোচনায় পরিব্যাপ্ত হয়েছে সবুজপত্র। বিশেষকরে মিথুন ব্যানার্জীর প্রবন্ধে সবুজপত্রের ভাষারীতি প্রসঙ্গে জটিলতা পরিষ্কার হয়েছে। সংক্ষেপে বলা চলে এই শতকে কথ্যরীতিতে বা চলিত ভাষায় গদ্য রচনার প্রাধান্য বিস্তারে প্রমথ চৌধুরী অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আধুনিকতার জয়গান উচ্চকিত এক কথায় যাকে বলা যায় ‘উই শ্যাল ওভার কাম’। রঘুনাথ ভট্টাচার্য তাঁর প্রবন্ধে সবুজপত্রের লেখকদের পরিচয় তাদের সাহিত্যচিন্তা ও লেখা সম্পর্কিত আলোচক সমালোচকের মতামত সবুজপত্রের প্রকাশিত লেখার সূচিক্রম তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। এছাড়াও তার লেখায় সুবজ পত্রে প্রকাশিত লেখায় সাহিত্য তত্ত্বের দ্বিত্ব মতবাদ। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ নাকি ‘জীবনের জন্য শিল্প’ সর্ম্পকিত সবুজপত্রের অবস্থান ও সম্পাদকের ভূমিকা তুলে এনেছেন। তার এ প্রয়াস চিহ্ন পাঠকদের সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে। এ সম্পর্কে ভারতের প্রখ্যাত চলচিত্রকার ঋত্বিক ঘটক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অল আর্ট এক্সপ্রেশন্স সুড বি গেয়ার্ড টুওয়ার্ডস্ বেটার মেন্টস অব ম্যান ফর ম্যান’।
সবুজপত্রের প্রকাশের কুশীলবদের উদ্যোগ ও তার বাস্তবায়ন সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্য পত্রিকার উল্লেখ বা সে সব পত্রিকার সাথে সবুজপত্রের তুলনামূলক আলোচনায় সবুজপত্রের গৌরবদীপ্ত ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পত্রিকার প্রথম বর্ষের প্রকাশনাসহ উল্লেখ যোগ্য সংখ্যাগুলোর আলোকপাত সবুজপত্রকে চেনা জানা ও বুঝার ক্ষেত্রকে সহায়ক করে তুলেছে যা পাঠক মাত্রই ঋণী হয়ে থাকবে। ক্রোড়পত্রের মূল প্রাবন্ধিকদের আরেকজন জোতির্ময় ঘোষ তাঁর লেখায় সবুজপত্র ও সম্পাদকের সাথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততা সহযোগিতা ভূমিকা অবদান কিম্বা সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান তৈরিতে ইউরোপীয় সাহিত্যের সমন্বয় সাধন কতটা জরুরি ছিল। এ নিয়ে সবুজপত্রের করণীয় বিষয়াদি বিস্তারিত তুলে এনে সে সময়ের বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা সাহিত্য প্রবেশের সূচনাপর্বে সবুজের অভিযান চালিয়েছেন। তিনি তার প্রবন্ধের সংশ্লিষ্ট সবুজ পত্রের সব সংখ্যার লেখক সূচি পরিবেশন করে সাহিত্য গবেষকদের চূড়ান্ত সহায়কের ভূমিকা পালন করেছেন।
ক্রোড়পত্র আলোচনায় সম্পাদকের লেখাটি খুবই প্রাসঙ্গিক হলেও তা পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে যথেষ্ট নয়। ক্রোড়পত্রাংশে অভিমত প্রকাশকদের তালিকা না বাড়িয়ে অন্যতর হতে পারতো। যেমন সবুজপত্রের উল্লেখযোগ্য সম্পাদকীয় প্রকাশিত যুগান্তকারী কোন লেখার পুনঃমুদ্রণ। তাহলে সবুজপত্রের শতবর্ষ উদযাপনের মূল্যায়ন ও সাহিত্যের ইতিহাস সার্বিক বিবেচনায় সম্পূর্ণতা পেতো বলে মুর্খের লব্ধবিশ্বাস।
চিহ্ন-২৭তম সংখ্যার প্রতিক্রিয়ায় পাঠক্রমণিকা অনুসরণ করলে এ নিয়ে চিহ্ন সমান আরেকটি পত্রিকা জন্মাবে অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি ভিন্ন একটি গ্রন্থ রচনা সম্ভব হবে। এই বাগড়ম্বরতা ছেড়ে পাঠক্রমে আমার ভালোলাগা উল্লেখিত অংশের আলোকপাত করছি মাত্র। চিহ্ন-এ প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধে প্রথমটি আমার একান্ত শ্রদ্ধেয় ভারতের বিশিষ্ট কবি গবেষক সাহিত্য তাত্ত্বিক বারীন ঘোষালের। আমি ভারতের অজন্তা ইলোরা দেখেছি বারীনদাকে দেখি নি। বিখ্যাত কৌরব পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশের সুবাদে দু‘যুগ নিয়মিত পত্র যোগাযোগ টেলিফোনে (এক দু‘দিন) কথা হয়েছে বারীনদার সঙ্গে। বারীনদা এখন কৌরব সম্পাদনা (অন্যের কাছে শোনা) ছেড়েছেন । তাঁর কাছে পাওয়া ই-মেইল টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ। এখন তার ¯েœহ সান্নিধ্য থেকে বঞ্ছিত। চিহ্ন-এ প্রকাশিত বারীনদার লেখা পড়ে আমি অজন্তা ইলোরা দর্শনের আস্বাদন পেয়েছি। অনুধাবন করেছি অভিনিবেশ মনোযোগে। এ লেখায় তিনি গদ্যভাঙার গদ্য রচনা করেছেন যা ক্লাসিক বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রবন্ধ পড়ে যেমন আমি গদ্যের মহাপর্বের পাঠ নিয়েছি । প্রচলিত ধারা থেকে গদ্যসাহিত্য রূপান্তরে আলাদা মাত্রা নির্মাণে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে প্রবন্ধটি সে স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর লেখার উপপাদ্য ও যথোচিত। প্রকৃত একজন কবির সাক্ষাৎকারে তার সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটন করে সঠিক মূল্যায়ন বাংলা ভাষার সমস্ত পাঠকের কাছে তুলে ধরা এক অসাধারণ আবিষ্কার। বারীনদা কবি রবীন্দ্র গুহকে চয়েস করে তিনি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিকতা নির্ণয় করেছেন নিঃস্বার্থে। এখানে তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতার বিচরণভূমিতে সন্দেহাতীতভাবে মহাজ্ঞানীর পরিচয় দিয়েছেন। এমন একটি যুগান্তকাররী লেখা উপহার দিয়ে চিহ্ন বারীন ঘোষালের প্রবন্ধের মাধ্যমে কবি রবীন্দ্র গুহকে জানার সুযোগ করে দেয়ার জন্য পাঠকের অভিনন্দনে অভিসিক্ত হবে তা বলাই বাহুল্য। বারীনদা ও রবীন্দ্র গুহ পরষ্পরের পরিপূরক হয়েছেন। কবি ও গদ্য শিল্পী হিসাবে আন্তরিক সততার উচ্চাসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন। সততার গুণে গুণান্নিত হওয়া কবি লেখকদের জন্য অপরিহার্য। বারীনদা রবীন্দ্র গুহকে নিয়ে এ লেখায় ফুল মার্ক পেয়েছেন। অ্যাবস্যালুটলি হান্ড্রেডে হান্ড্রেড। প্রচলিত গদ্যরচনার রীতি ভেঙে আধুনিক গদ্য নির্মাণের অভিযাত্রা প্রবর্তন করে নতুন ধারার দিক নিদর্শন করে সাহিত্য দিগন্তে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা রাখলেন তা আমাদের বিশাল অর্জন। চিহ্নর এ সংখ্যার এটি সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজন। বারীন‘দা আপনাকে আমার স্যালুট জানাচ্ছি। রকিবুল হাসান অদ্বৈত্ব মল্ল বর্মণের তিতাসের শেকড় সন্ধানে নেমে ঝিনুক কুড়িয়েছেন মাত্র। ঝিনুকের খোলসে ভরা মুক্তা যতটা আহরণ করেছেন তার‘চে ভাসিয়েছেন তিতাসের ¯্রােতে। লেখক এখানে উপন্যাসের চরিত্র উদ্ধৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ঔপন্যাসিকের দ্রোহের মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য দেয়া অপরিহার্য ছিল। অদ্বৈত্বর তিতাসে শ্রেণি-চেতনার বিষয়টি ঘনিষ্ঠতার সাথে জড়িত। এ ছাড়াও লেখকের অনুধাবনে সক্ষমতা প্রকাশে নিস্পৃহ রয়েছেন এ প্রশ্ন আমার বোধগম্যতার অতীত। অদ্বৈত্ব মল্ল বর্মণ নিজের উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন তিতাসের তীরে রাজা বাদশার ইতিহাস নেই। স¤্রাট সামন্ত প্রভুর ইতিবৃত্ত নেই। বাবু বণিকের ইতিকথা নেই। যা আছে তা মানুষের ইতিহাস। আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে রাজ-রাজরাদের বিলাসী জীবন ও নৃশংসতার যে কাহিনি বর্ণিত তা মূলত ইতিহাস নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো মানুষের জীবন সংগ্রাম ও তা বিবরণ। মহামতি কার্ল মার্কস যে বলেছেন মানুষের ইতিহাস মূলত শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। এই সত্যেই শিল্পিত প্রয়াস অদ্বৈত্বর তিতাস একটি নদীর নাম।
শেষ প্রবন্ধে তারেক রেজা তিরিশের ইনটেলেকচুয়াল কবি নামে খ্যাত বুদ্ধদেব বসুর কথা সাহিত্য নিয়ে বড় লেখাটি লিখেছেন। বুদ্ধদেব ইউরোপীয় সাহিত্য প্রভাবিত বাংলা সাহিত্যে সমন্বয়কারী প্রতিভাবান বুদ্ধিদীপ্ত কবি। শক্তিমান সব্যসাচী লেখক বুদ্ধদেব তার লেখনিতে সে স্বাক্ষর রেখেছেন। কবিসত্তার আধারে লেখক বুদ্ধদেব প্রজ্জ্বলিত দেদীপ্যমান। তারেক একথা স্বীকার করেছেন তার প্রবন্ধে। তদুপরি তার প্রবন্ধে গদ্য লেখক বুদ্ধদেবকে আবিষ্কারে প্রয়াস দেখিয়েছেন। কবি বুদ্ধদেব বসু সে লেখায় অনুপস্থিত। এখানে খণ্ডিত বুদ্ধদেব বসু উপস্থিত। প্রথমে বুদ্ধদেব বসু একজন কবি তারপর লেখক এভাবে তাকে মূল্যায়নের মানদণ্ডে মূল্যায়িত করাই শ্রেয়। প্রবন্ধকার উপন্যাসিক বুদ্ধদেবের উপন্যাস গল্প নাটক ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’ বুদ্ধদেব রচিত গ্রন্থের উল্লেখের মাধ্যমে। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের পাত্র-পাত্রীর আলোচনায় যে বিশ্লেষণ করেছেন তাতেও সম্পূর্ণতা আসে নি। বুদ্ধদেব মনস্তাত্ত্বিক মনের কারবারি। ফ্রয়েডিয় দর্শনের নিরিখে উপভোগী বা ভোগবাদী জীবনের প্রতি আকৃষ্ট। তাই তাঁর কথাসাহিত্যের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে আত্মকেন্দ্রিকতার প্রাধান্য লক্ষণীয়। বুদ্ধদেবের চিন্তাচেতনায় মননে-মানসে পাশ্চাত্য সাহিত্যের ধ্যান-ধারণার বাইরে সামগ্রিকতার অবকাশ ছিল না। এখানে তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বুদ্ধদেব বসু ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী বলেই মনে হয়। বুদ্ধদেব বসু তার লেখনির যাদুস্পর্শে পাঠককে সম্মোহিত করলেও গণমানুষের কাতারে সামিল হতে পারেন নি। যেমনটা হতে পেরেছিলেন তার সমসাময়িক অন্যতম কবি বিষ্ণু দে। বুদ্ধদেব জন্মদেশ থেকে নির্বাসিত বলেই দেশমাতৃকার টান দেশমানুষের ভালোবাসা প্রেমে ছিলেন নিঃস্পৃহ বিমুখ। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ছিলেন অতিশয় বিমুখ। বুদ্ধদেবের লেখায় আমিও ভীষণ আকৃষ্ট। কিন্তু তার দেশপ্রেম ও মানবীয় প্রেমে অনীহা দেখে ছিটকে পড়ি নক্ষত্রলোক থেকে গ্রহলোকে। তবুও এ কথা অনস্বীকার্য তিরিশের আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশ ও উন্নয়নে তিনি অন্যতম পুরোধা। এ কবি উনিশ শতকের সব‘চে প্রভাবশালী আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ডের (পুরোনাম এজরা ওয়েস্টন লসিম পাউন্ড) ইমেজিস্ট আন্দোলনের ম্যানুফেস্টো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইমেজিস্ট আন্দোলন সে সময় বিশ্বকবিতার আধুনিকায়নে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল এজরা পাউন্ডের নেতৃত্বে। আধুনিক কবিতার অগ্রযাত্রায় তিনি ছিলেন ইউরোপ আমেরিকার সমন্বয়কারী কবি ব্যক্তিত্ব। পাউন্ড ইমেজিস্ট আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছিলেন মূলত চীনের ক্লাসিকাল কবিতা ও জাপানের হাইকু নামের কবিতার দ্বৈতসত্ত্বা থেকে। ১৯১২-১৭ সাল পর্যন্ত ইংলিশ ও আমেরিকার সাহিত্যে এ আন্দোলন বিকশিত ছিল। ইমেজিস্ট কবিতা সম্পর্কে ইমেজিস্ট পত্রিকার সম্পাদক এমি নাওয়েল ঝড়সব ওসধমরংঃ ঢ়ড়বঃং কবিতা সংকলনের ভূমিকায় লিখেছেন মুক্তভাবে যে কোন বিষয়কে বেছে নেওয়া নিজস্ব ছন্দ নির্মাণ সাধারণ কথ্যভাষার ব্যবহার একটি ইমেজের উপস্থিতি যা হবে স্পষ্টঘন এবং গতানুগতিক কাব্য উপকরণ ও কাব্য নির্মাণ কৌশলকে পরিহার করা। পাউন্ডের একটি ইমেজিস্ট কবিতার উদাহরণ ওহ ধ ংঃধঃরড়হ ড়ভ গবঃৎড় নামের কবিতাটি হলো ঞযব ধঢ়ঢ়ধৎধঃরড়হ রহ ঃযব ভধপবং ড়ভ ঃযব পৎড়ফি চবঃধষং ড়হ ধ বিঃ নষধপ নড়ঁময কবিতাটি প্রকাশিত হ্যারিয়েট মনরোর পোয়েট্রি পত্রিকায় ১৯১৩ এপ্রিল সংখ্যায়। বুদ্ধদেব বসু নিজে ভালো কবিতা লিখতে পারেন নি সমালোচকরা বলেন। তিনি কোন ভালো কবিতা না লিখলেও ছিলেন কবিতার শিক্ষক। বুদ্ধদেব আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দকে খাঁটি আধুনিক কবি স্বীকৃতি দিয়ে সে প্রমাণ রেখেছেন।
মগজের কারফিউ ভাঙ্গার অভিযাত্রী চিহ্ন তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। অকাল মৃত্যুর অনাকাক্সিক্ষত আঘাতে হানা দেয় নি পাঠকের বুকে। এজন্য চিহ্নস্বাদে ভক্তরা স্বস্তিতে ফ্রেশ অক্সিজেন নিয়ে শ্বাসে-প্রশ্বাসে সাহিত্য ক্ষুধা মেটায়। চিহ্ন স্বাতন্ত্র্যিক ধারায় শুরুর পর থেকে ধাপে ধাপে উপরে উঠছে। আঙ্গিক-সৌষ্ঠব থেকে পরিসরে বিস্তৃতি ও বৈচিত্র আনয়নে সচেষ্ট। বেশকিছুদিন আগে থেকে চিহ্ন পলিসি পাল্টেছে। কোন একটা আবেগাশ্রিত ইস্যু নিয়ে লেখার প্রয়াস পরিলক্ষিত। ফলিত ফসল কতটা সাহিত্য আবেগের সঙ্গে খেয়ালীপনার সম্পর্ক বিজড়িত। আবেগের খনিতে উৎপাদিত খেয়াল বশে রচিত লেখা আর যাই হোক গুণমান সম্পন্ন সাহিত্য নয়। আবেগ উজ্জীবিতকরণের জ্বালানি মাত্র। এসব লেখায় সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ক্ষুধা মেটে না, মিটবে না। চিহ্নসাহিত্য ভাণ্ডারে কতটা রসদ জোটাতে সক্ষম হয়েছে ভবিষ্যৎ সে বিচার করবে। তবে এতটা বলা চলে চিহ্ন প্রয়াস সাহিত্যের সে উপত্যকায় পৌঁছে নি। ক্ষুদ্রজ্ঞানে আমি অধম প্রশ্নবিদ্ধ। এ প্রয়াস কি চিহ্নর মগজের কারফিউ ভাঙার অঙ্গীকার! আলোচ্য সংখার বিষয় ছিল ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’। এ সংখ্যার দলে ভিড়েছেন আটজন। লেখকদের বেশিরভাগ যে আনন্দে আন্দোলিত কৈশর বা কৈশরোত্তীর্ণ অবৈধ নারী প্রসঙ্গ স্মৃতিচারণের দিনলিপি নিছক কল্পনাপ্রসূত রচনায় ভরা। এ শিরোনামের তালিকাভুক্তির মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু অলোক বিশ্বাস, অনুপম মুখোপাধ্যায়, নূর-ই আলম সিদ্দিকী। আনন্দে আন্দোলনের প্রসঙ্গের লেখায় উল্লিখিতরা কেবল সফলতার সাথে উতরে গেছেন বলে বোধদয় হয়েছে।
স্মরণ অধ্যায়ে সন্নিবেশিত প্রয়াত দু‘জন কবি ও সম্পাদকের মধ্যে ফারুক সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকার পড়ে ব্যক্তিগতভাবে মনোবেদনা থেকে স্বস্তি পেয়েছি। ফারুক ভাইয়ের সাথে সু-সম্পর্ক ছাড়াও পেশাগত জীবনে দু‘জনে একই পেশার। একই স্থানে দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। একস্থানে থাকাকালে অফিস শেষে তার চেম্বারে বসে প্রতিদিন আড্ডা হতো। ভারতের হাওয়া-৬৯ পত্রিকায় আমার একটি কবিতা পুনঃপ্রকাশ করে ফুটেজ লিখেছিলেন কবির সাথে যোগযোগ সম্ভব না হওয়ায় তার প্রতিনিধিত্বশীল কবিতাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। ফারুক ভাই ফুজেট মন্তব্যে খুব খুশি হয়েছিলেন। তার বাসায় গেলে সংগ্রহ করা হাওয়া পত্রিকা আমাকে দেখিয়েছিলেন। ফারুক ভাই ভাব গম্ভীর ও ব্যক্তিত্বশীল রাশভারি মানুষ ছিলেন। এজন্য ভুল ব্যাখ্যায় অনেকেই তাঁকে অহঙ্কারী বানাতেন। তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য না পেলে তাঁকে ভুল বোঝার অবকাশ থেকে যায়। জয়পুরহাট থাকার সময় বিপ্রতীকর জন্য ভারতীয় লেখক কবিদের লেখা পাওয়ার আগ্রহের কথা জানালে আমি বারীনদা‘র কাছ থেকে একটি গদ্য এনে দিয়েছিলাম। বারীন ঘোষালের লেখা পেয়ে বিস্মিত ও খুশি হয়েছিলেন তিনি। কাজে-কর্মে বগুড়া গেলে তিনি অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর সাথে দেখা করা ছিল আমার রুটিন ওয়ার্ক। ফারুক ভাইকে নিয়ে বেশি কিছু লেখার অবকাশ কম। তার সম্পাদিত বিপ্রতীক বাংলা সাহিত্যের ছোট কাগজের ইতিহাসে মাইলস্টোন হিসাবে চিহ্নিত। ফারুক ভাই কবি হিসাবে যত না খ্যাতিমান তার অধিক বিপ্রতীক সম্পাদক হিসেবে। তিনি সম্পাদনায় ছিলেন সম্পাদকের সম্পাদক।
দ্বিতীয় আলোচিত কবি-সম্পাদক আশির দশকের খোন্দকার আশরাফ হোসেন। বয়সে না মানালেও তিনি নিজেকে আশির কবি দাবি করেছেন। মূলত আশরাফের সত্তরের কবি তালিকাভুক্ত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। স্বেচ্ছায় তিনি আশিতে অবস্থান নেওয়ার কারণ দশক শীর্ষে নিজের অবস্থান থেকে মোড়লীপনা করা। তাঁর সম্পাদিত একবিংশর প্রশংসা পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই গানের কথা স্মরণে আসে। ‘তোমার পূজার ছলে আমি তোমায় ভুলে ছিনু’। আলোচ্য প্রবন্ধের একবিংশর অতি প্রশংসার আড়ালে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে টেনেটুনে বের করা কষ্টসাধ্য। ছোটকাগজের ভাণ্ডারে একবিংশর অন্তর্ভুক্তি ও ভূমিকা অবদান যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে যা অনস্বীকার্য। একবিংশ হাতে নিয়ে আশরাফ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অনেকরদূর অগ্রসর হয়েছেন। একবিংশ ঢাকা কলকাতার স্টারদের আনুকুল্য লাভে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে এর (রাজধানীর) বাইরে সে ফোকাস পড়ে নি বলেই কেন্দ্রাভিক সাহিত্যের কারিগররা যেমন উপকৃত হয়েছেন তেমনি একবিংশর লেখার সুযোগ থেকে উপেক্ষিত বঞ্চিতদের পাল্লা ভারি হয়েছে। একজন সৎ সাহিত্য সম্পাদকের কাছে যা ছিল অপ্রত্যাশিত। একবিংশ হাতে থাকায় তার মুরিদ সাগরেদের অভাব হয় নি। কবিগোত্রের সামিলে আছি তাই সকণ্ঠে বলছি জয় হউক খোন্দকার আশরাফ হোসেনের। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। তিন গল্পকারের গল্পে ন্যূনতম স্বাদ বা তৃপ্তি মিটে নি। এরকম গল্প লিখে গল্পকারের তালিকা বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব গল্প নিয়ে আলোচনা করে পাঠক ঠকানোর ভাঁড়ামো না করাই উত্তম।
নারীবাদী লেখিকা সরোজনী সাহুর লেখার অনুবাদ মনে হয় নি, মনে হয়েছে এটি কোন মৌলিক লেখা। এ অনুবাদক তাঁর সক্ষমতা ও সাফল্যের প্রমাণ রেখেছেন। একজন সুফল অনুবাদক হিসাবে তার এবং দুর্লভ লেখা উপহার দেয়ার জন্য সম্পাদক প্রশংসার দাবিদার। নিয়মিত বিভাগ যথারীতি। সমাজ গবেষক মুহম্মদ হাসান ইমামকে সাধারণ পাঠকের কাছে যেতে হলে সরল ও প্রাঞ্জল ভাষারীতি রপ্ত করতে হবে। লজ্জাবিষয়ক প্রবন্ধটি বোদ্ধা পাঠক ব্যতীত সাধারণ পাঠকের বোধগম্যের অতীত বলে বিবেচিত হয়।
উৎসর্গের সূচিতে আছেন ল্যাটিন আমোরিকার গার্বিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম ও কবি আবুল হোসেন। শ্রদ্ধার স্মরণে দু‘জনের ছবি পত্রিকায় ছাপা হলেও মার্কেজের ছবি না থাকার কোন ব্যাখ্যা নেই। চিহ্নমেলা ও পুরস্কার প্রবর্তনে পত্রিকার আলাদা ইমেজ গড়েছে। পুরস্কার নিয়ে নানা বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। চিহ্ন সে প্রভাব থেকে মুক্ত থাকুক এ প্রত্যাশা করেও চিহ্নর অগ্রযাত্রা সাফল্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক এ হোক আমাদের একান্ত কামনা।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা