পাঠ : চিহ্ন –২৮

পাঠ : চিহ্ন –২৮

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার আর নিজের জিনিসকে বিশ্বমানের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ। চিহ্নও তেমন অন্তরের জিনিসকে বাইরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার আর নিজের জিনিসকে বিশ্বমানের করে তুলতে বিশাল আয়োজনে সেজেছে।
নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি কবিতার বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে চিহ্ন’র এ সংখ্যা। কবিতার মায়াময় ভুবন সৃষ্টির বদলে তথ্যের জগৎ সৃষ্টিতে সম্পাদকের আগ্রহ বেশি মনে হয়েছে। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছি, কবিতার নায়িকা হতে হলে কবিকে জানা জরুরি। তার চেয়ে বেশি জরুরি কবির সময় ও সমসাময়িক অবস্থা সম্পর্কে জানা। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিলে আয়ু বেড়ে যায় অনেক। নতুন কবিতার সংকলন যেন তেমনই মুক্ত বাতাস। নতুন কবিতার সম্পাদকীয় আমাদের সাহিত্যের জন্যও মূল্যবান এন্টিকস।
শুরুতেই পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা- এই শিরোনামের মধ্যেই রয়েছে কবিতার আবহ। এখানে আছে মহুয়ার মাতালতা। ধূপের স্নিগ্ধ পবিত্র সুগন্ধের পাশাপাশি রয়েছে কটূ-তিক্ততাও। শহীদ ইকবাল প্রবন্ধের মধ্যে তুলে ধরেছেন’৪৭ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। বলেছেন সময়ের সাথে, ঘটনার সাথে কবিদের বদলে যাওয়ার ঘটনা। চেতনার সাথে সাথে কবিদের বদলে যাওয়ার গল্প বলতে বলতে তিনি বলেছেন ইতিহাসের কথা, যার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ। আমার পরিচয় যেমন শুধু আমি নই, সে রকম কবিতার কথা বলতে গিয়ে প্রাবন্ধিককে বলতে হয়েছে ত্রিশের কথা, পঞ্চাশের কথা, ভাষা-আন্দোলনের কথা, কবিদের নাগরিক হয়ে ওঠার কথা। পেটের টানের কাছে হার মানা প্রাণের টান হয়ে উঠছিল মজবুত ও শক্তিশালী। কবিদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তাদের কথায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতেও অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়।’ পঞ্চাশের দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। সানাউল হক, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক এদের কবিতায় প্রাবন্ধিক খুঁজে পেয়েছেন জীবনের সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। এরপর শামসুর রাহমান, শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান প্রমুখের কবিতায় প্রকাশিত হয় মানবতা ও প্রগতিশীলতা। প্রকাশ পায় বাংলাদেশ হয়ে ওঠার চিত্রকল্প। কবিতার অক্ষর হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষাÑ চাবুকের আঘাত। সমস্ত দেশ জুড়ে চলতে থাকা অরাজকতা, সংক্রমিত দেশের কথা অনুভবে এনেছেন প্রাবন্ধিক। উত্তম আশা করলেও বর্তমান প্রজন্মের কবিদের নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ষাট থেকে শূন্য দশক পর্যন্ত মোট ২১ জন কবির কবিতা একসঙ্গে পড়তে পেরে সুখ অনুভব করছি। একই মালায় যেন ভিন্ন ভিন্ন ফুলের সমাহার ঘটেছে। বড়কথা হলো, এ কবিতাগুলো সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। কারণ অব্যবহিত পূর্বে শহীদ ইকবালের প্রবন্ধে বাংলাদেশের কবিতা হয়ে ওঠার যে জার্নি আমরা দেখেছি, এ কবিতাগুলো তারই উদাহরণ। যাদের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে তাদের নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এই শব্দ-সৈনিকেরা প্রতিটি দশকে রূপকথার রাজকুমার হয়ে কলমকে হাতিয়ার বানিয়ে সময় নামক ডাইনির সাথে যুদ্ধ করছেন নিরন্তর।
কবিতা প্রসঙ্গে কথা ও কবিতা শিরোনামের লেখাগুলো চমৎকার। কবি মোহাম্মদ কামালের মতে, কবিতার হাজার দুয়ার। আবার কাবতা মানে নৈঃশব্দের ঝর্ণা। কবি আরও বলেছেন, ‘একটা শব্দের ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে অনুসরণে অনেক শব্দের আকাশে ভিড়। যথার্থ শব্দই ওড়ে দাম পায়Ñবাকির ভোকাট্টাÑচির আকাশে।’ অর্থাৎ তার কাছে কবিতা মানে শব্দের ওড়াউড়ি। কবি মাসুদ খান তার কবিতাকে দেখেছেন সকল আন্দোলন চেতনার সৈনিক হিসেবে। তার গদ্যে আমরা পাই দর্শন, ভাষা ও পরম্পরার আভাস। কবি মামুন মুস্তাফার কাছে কবিতা হয়ে উঠেছে আশ্রয়স্থল। …শান্তকুঞ্জ! যেখানে সুস্থতা আছে। কবি পাবলো শাহির মনে কবিতার মানে মায়ার জগৎ অথবা মুক্তির উপায়। তাঁর কাছে কবি হয়ে ওঠেন মহাদেশ; ভুলের অর্থাৎ অভিজ্ঞতার গল্প। এছাড়াও কবি শামীম নওরোজ, কবি মাসুদার রহমান, কবি সৈকত হাবিব, কবি কুমার দীপ, কবি আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীলকে সম্পাদক হাজির করেন। তাঁরা সকলেই কবিতাকে চলন্ত জীবনের পিচ্ছল পথের সঙ্গী করেছেন। তবে সকলের লেখা আমাকে আশানুরূপ আনন্দ দিতে পারে নি। অতিরিক্ত তত্ত্বকথার ভিড়ে আসল কথাই হারিয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে।
বর্তমান সময়ে কবিতাচর্চা করছেন বা কবিতা লিখছেন এমন কিছু কবির কবিতাও এসেছে চিহ্নর এ সংখ্যায়। এদের কারো কারো কবিতা পড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার আছে। ক্ষুধার্তের মতো গ্রাস করতে থাকি কবিতাগুলো। সময়-প্রেম-প্রকৃতি সবকিছু উঠে এসেছে কবিতাগুলোতে। তবে একটা করে কবিতা পড়ে মন ভরে নি। চেনা কিছু মুখের ভিড়ে অচেনারাও হয়ে উঠেছে পরমাত্মীয়। পেয়েছি কবি খালেদ হোসাইন, কবি গাজী লতিফ, কবি শামীম রেজা, কবি আমিনুর রহমান সুলতান, কবি মোস্তাক আহমাদ দীন, কবি জাকির সেতু, কবি বীরেন মুখার্জী, কবি রকিবুল হাসান, কবি সজল সমুদ্র, কবি শামীম হোসেন, কবি বেনজামিন রিয়াজী, কবি ফজলুল হক তুহিন, কবি মাওলা প্রিন্স, কবি সৈয়দ তৌফিক জুহুরী, কবি মাহী ফ্লোরা, কবি সদ্যসমুজ্জ্বল ও কবি গোলক বিহারী পালকে। এসকল কবিতা পোকারা জীবনকে কেটে কেটে কবিতা করেন। বিভিন্ন ছোটকাগজগুলোতে যাঁরা এখন অস্তিত্বেও স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
আনন্দের পাশাপাশি উপকৃত হয়েছি সারথি কবিদের লিখিত প্রবন্ধগুলো পাঠ করে। যেখানে আমি কবিতা সম্পর্কে জেনেছি বিস্তারিত। প্রবন্ধগুলো আমার মন ও মননের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সময়ে আমরা যারা কবিতা প্রেমিক তাদের কাছে এই কবিরা শুধু কবি নন, কবিতাগুরু। তাদের কবিতা চিন্তাগুলো আমাদের কাছে প্রভাতবেলার আলোর মতো। এই কবিতাচিন্তা বিষয়ক প্রবন্ধগুলো সময়েসাক্ষী নয় শুধু, কালের প্রতিনিধিও।
চিহ্ন যথাসম্ভব সাম্প্রতিক কবির যে তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানে আমার জিজ্ঞাসা আছে; এর সম্পূর্ণতা কতটুকু? তবে কবি ও কবিতাগ্রন্থের নাম প্রকাশের প্রয়াস প্রশংসার দাবিদার। কবিতা সংখ্যা বললেও কবিতাচিন্তা বিষয়ক প্রবন্ধের ভারে এটি ভারাক্রান্ত। সম্পাদক শহীদ ইকবালের প্রার্থিত কবিতার প্রমিথিউসরা আসবে কি না জানি না। তবে কেউ না কেউ তো আসবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা মধুসূদন হয়ে; যে মানুষকে করে তুলবে দেবতা। আমি তাঁর অপেক্ষায়…
চিহ্ন এখন ক্ষরণকে ধারণ করে বিষয়ভিত্তিক আয়োজনে ব্যস্ত হলেও নিয়মিত আয়োজনের ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায় নি। চিহ্ন আপন মহিমায় উজ্জ্বল। চিহ্ন বৈজ্ঞানিক কেনো বিষয় নয়, চিহ্ন সাহিত্যপত্রিকা মাত্র। তাই অকাট্য যুক্তি-তর্কের ভারে তার শিরদাড়া বাঁকিয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। বিষয়ভিত্তিক চিহ্ন এবার চন্দন সুবাসে মুখরিত। জিয়ান রোস্টান্ডের কথার আলোকে বলতে হয়, সুগন্ধি অদৃশ্য হলেও মানুষের মনকে চমৎকারভাবে নাড়া দেয়। এ সম্পর্কে আগেও অন্তরসুখ প্রকাশ করেছি। নিয়মিত বিভাগেও আলোর ক্ষুরধারে কেটে যায় অন্ধকার। রসিক পাঠক হিসেবে পাই আনন্দ ও বোধের সমন্বয়ে সূক্ষ হৃদয়ালোড়ন। সাহিত্যের মূল্য বিচারে ওঠানামা থাকে সব সময়। এখানে এসে চিহ্ন উঠে গেছে অসম্ভব স্বাধীনভাবে।
চিহ্নর এ সংখ্যায় শেষ পাতার নিবেদন ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…। এই শিরোনামে লেখকরা লিখেছেন, জীবনের কোনো এক পিঠে ঘনকালো মেঘে যে ঝড় উঠেছিল তার গল্প। সে ঝড়ের ঝাপটা এসে লাগে চিহ্নর বুকে ও পিঠে। শামীম সাইয়িদ, আসাদ সরকার, অমিত কুমার বিশ্বাস, রফিক সানি, উমাপদ কর ও সুজন হাজারী উজাড় করে লিখেছেন তাদের গাঢ় আথবা ধূসর জীবনের গল্প। বাউল বাতাসে উড়েছে তাদের সময়। বাল্যকাল, কিশোরবেলা কিংবা যৌবনের দীপ্ততা কোনো কিছুই বাদ পড়েনি এখানে। পাঠক কহেন শিরোনামের লেখাগুলোতে উঠে এসেছে সহিত্যবোদ্ধা কিছু পাঠকের লেখা। যারা শুধু পত্রিকা হাতে পেয়ে নেড়েচেড়ে দেখেন না, মেপে দেখেন তার সাহিত্যভার। চিহ্ন তার পথ চলায় কতটুকু ভেঙেছে আবার নতুন করে কতটুকু তৈরি হয়েছে সুজন হাজারী ও দীপ্ত উদাস বলেছেন তার সবটুকু। লিখেছেন চিহ্ন সাতাশের আলোচনা ও পাঠের অনুভূতি। এ পর্বে আরও লিখেছেন চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবাল। এখানে তিনি মাসিক কবিতাপত্রের পাঠক। বলেছেন কাগজটির আঙ্গিক, গঠন ও লেখার বিষয় নিয়ে। ভৌগলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে হৃদয়ে কীভাবে স্থান দিয়েছেন এ সাহিত্য পত্রিকাটিকে, বলেছেন তার কথাও। এমনকি চিহ্ন-২৮ এর অনুপ্রেরণাও পেয়েছেন এখান থেকে। আরেকজন পাঠক চয়ন কুমার লিখেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। তিনি লিখেছেন, এ্যালবাম পত্রিকার এপিঠ ওপিঠ নিয়ে।
নিয়মিত বিভাগে প্রতি সংখ্যার মতো এ সংখ্যাতেও কী লিখি কেন লিখি শিরোনামে লিখেছেন সরকার মাসুদ। বলেছেন ৩৫ বছর ধরে কবিতার সাথে বসবাসের কথা। তিনি তার না বলা কথাগুলো বলেন কবিতায়। কবিতা হয়ে উঠেছে তার জীবনের অংশ। গদ্যেও থেমে নেই তার কলম। গদ্যের সকল শাখায় লিখে চলেছেন তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে। অনুবাদ অংশে অনূদিত হয়েছে ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও কবি কারান সিং-এর কবিতা। অনুবাদ করেছেন মাসউদ আকতার। এ সংখ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা শিরোনামে কিছু সুবাতাসের বহমানতার খবর দিয়েছেন সায়মা আলম নাজ। স্মরণ অংশে মুহম্মদ মুহসিন লিখেছেন বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরব তপন রায় চৌধুরীকে নিয়ে। তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম ও জীবনের বিতৃষ্ণাময় কিছু অধ্যায়ের কথা উঠে এসেছে এ অংশে।
ধারাবাহিক রচনা অংশে বিচিত্র সমাজতত্ত্ব সংগীতের সমাজতত্ত্ব শিরোনামে মুহাম্মদ হাসান ইমাম লিখেছেন সংগীতের কথা। সংগীত সম্পর্কে বেশ কিছু অজানা তথ্য পেয়েছি, যা আমার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে রচনাটির পূর্ণ রস গ্রহণে আমি ব্যর্থ। যতটা সুখানুভূতি নিয়ে চিহ্ন পাঠ করা আরম্ভ করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারি নি। বিষয় ও বক্তব্যে চিহ্ন আমার মতো সাধারণ পাঠকের সীমানা ছাড়িয়ে বোদ্ধা পাঠকের হাত ধরেছে। সম্পাদকের কাছে অনুরোধ রইলো বানানের প্রতি তিনি আরও যত্নশীল হবেন। বানানের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধান (প্রমিত) অনুসরণ করার আকুলতা প্রকাশ করছি।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা