পাঠ : মাসিক কবিতাপত্র

মাসিক কবিতাপত্র আকস্মিক হাতে এলো সোনাপাড়ার কবি মাসুদারের মাধ্যমে। উনি স্কুলশিক্ষক। কবি ও কবিতাকর্মী। ধরাবাঁধা প্রচারবিমুখ। নেশাগ্রস্ত-মাতাল ভণ্ডামী বা স্টান্ট নয়, এমনি-এমনি আকস্মিকের খেলায় রত ওঁর কবিতা। সেই একদিন স্ব-দায়ে পাঠালো মাসিক কবিতাপত্র। গেরুয়া মলাটে ঠাসা লেখা, কোনো ফাঁক নেই, কৃপণের কৃপাণ; কিন্তু কাজ হয়েছে প্রচুর। তরতাজাও। নেশা হলো, কবে পাবো, মাসিকটি। পেলামও। এক, দুই, তিন…পর পর বারো পর্যন্ত, হতাশা কাটলোÑ যে ওদের প্রতিশ্র“তি পাই পাই করে শোধ করে দিয়েছে; যেমন বলা তেমন কাজ। তখন এই কমিটমেন্টের ভেতরে আমার কাগজটি হাতে নিই, কিছু অর্জন করার চেষ্টা করি, মিলিয়ে নিয়ে, ধারাবাহিকতাটুকুও দেখি, একের পর এক সংগ্রন্থন, অতঃপর বাঁধাইয়ে দিয়ে, কিছু ঔজ্জ্বল্য চিহ্নিত করা। অতঃপর আমার সহ-সম্পাদক রফিক সানিকে বলি ওটা নিয়ে আমাকে কাজ করতে হবে, কবিতাসংখ্যায়। সেমতে এই অনুসন্ধান, এবং পুরনো পড়াটাও আবার এক লহমায় ঝালিয়ে নেওয়া।
বলে নিই, এটি বেরোয় কলকাতা থেকে, সম্পাদকমণ্ডলী আছে, নির্ধারিত সম্পাদক চেখে পড়ে না, নানাঅঞ্চলের সব সম্পাদক, ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়িয়ে বাংলা কবিতার চর্চার কথা বলছেন। একবছরের প্রজেক্ট। বেরোয় প্রতি ইংরেজি মানের ১৫ তে। আমার হাতে ক্রম-সংখ্যায় মোট বারোটিই আছে। বিস্ময়কর যে, এরও বারোমাস্যায় মনের বদল ঘটেছে। কিছুই যে সর্বদা একরকম থাকে না, তাইতো প্রমাণ। একবার আমরা জলপাইগুড়িবাসী গৌতমগুহরায়-এর একটি মজার বই করি। সে বইয়ে অরুনেশ ঘোষ, ফালগুনী রায়দের মতো ‘লেফটিস্ট’ লেখকদের চিনে ফেলি। খুব পুলক হয়, আগে ওদের নাম তেমন জানতাম না। এই বইয়ে ওঁদের ডেডিকেশন আর পরিচর্যা সম্পর্কে খবর পেয়ে লজ্জায় গুটিয়ে যাই। এমনটাও ছিলÑ এ বাংলা ভাষায়, বাংলাভাষার এমন কমিটেড মানুষ, হায়! একবার পায় তারে কী! মাসিকপত্রটির ১-এ অরুণেষ ঘোষ-এর লেখা দিয়ে শুরু, অন্যরকম কবিতার ভাষা ‘মৃত্যুর আগের রাতে’। মলয় রায়চৌধুরী, শ্যামল কান্তি দাসসহ অনেকেই, আর শুরু হলো রাজীব সিংহের লেখা “ভালো আছো, নয়ের দশক”। রাজীব সিংহের জন্ম ৬৯ কিন্তু কথা বলছেন অভিজ্ঞ ভাষায়, সাহিত্য নিয়ে গালগল্প, কবিতা নিয়ে কথাবার্তা, পত্র-পত্রিকার রুচি আর দর্শন নিয়ে আলোচনা সন্নিবদ্ধ। রণজিৎ দাশ নিয়ে গৌতম গুহরায়ের লেখা। পরের সংখ্যায় “ব্লাড লিরিক” ও “ডেথ মেটাল” নামে লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরী, জীবনানন্দ নিয়ে জীবতোষ দাস, অনীক রুদ্রর অন্য ধারাবাহিক (অরুণ মিত্র নিয়ে), রাজীব সিংহের “ভালো আছো, নয়ের দশক”-এ পর্বের ব্যবচ্ছেদ ফালগুনী রায়। তৃতীয় সংখ্যায় উৎপলকুমার বসুসহ অনেক কবি (অ-কবিও আছেন নিশ্চয়), দীর্ঘ কবিতায় উৎপল ফকির (আগে চিনতাম না), বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ধারাবাহিকসমূহ। পরের সংখ্যায়ও কবিতার পাশাপাশি লেখক ধারাবাহিকে যুক্ত হয়েছেন এবং সমাসীন অনীক রুদ্র; অন্যরাও চলমান, এর পরে শূন্য দশক নিয়ে পরের সংখ্যা। ৬ সংখ্যাটি ‘বাংলা সনেট’ বিষয়ক। শুরু মধুসূদন শেষ একালের কবিবৃন্দ দিয়ে। দুটি সুন্দর গদ্য শিরোনাম ‘সনেটের কথা’ ও ‘বন্ধনেই মুক্তি’। ৮ম সংখ্যার মূলকেন্দ্র দীর্ঘকবিতা ‘অতন্দ্র বিমান’। লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য। সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে :
নানান প্রতিকূলতা ও আর্থিক সংকটে ধুকতে ধুকতে মাসিক কবিতাপত্রের ৮তম সংখ্যায় আমরা পা রাখলাম। মাসিক কবিতাপত্র এখনো পর্যন্ত প্রতি মাসের ১৫ তারিখে বের করতে পেরেছি আমরা তিন/চারজন বন্ধু নিজেদের পকেট খরচ, নেশার খরচ কাটছাঁট করে। পত্রিকার প্রথম দু-একটা সংখ্যা বেরোনোর পর আশ্চর্য, প্রায় একই কথা সাবধানবাণীর মতো বলেছিলেন, ফোনে, বাংলা কবিতার সর্বজনমান্য শ্রদ্ধেয় প্রবীন কবি থেকে সত্তর দশকের অন্যধারার প্রিয়কবি এবং দিল্লিনিবাসী প্রিয় সিনিয়র কবি ‘সাবধান। এবার কিন্তু শত্র“ বেড়ে যাবে তোমাদের। গালাগাল প্রশংসা সবই তোড়ে ধেয়ে আসবে এবার’। সন্তান যতো বড়ো হয়েছে, ততো দুশ্চিন্তা বেড়েছে আমাদের।
নবারুনের কবিতা এ সংখ্যাটিকে উচ্চতা দিতে সক্ষম হয়েছে। ৯তম তে আছে অনীক রুদ্রর পাণ্ডুলিপি, ধারাবাহিক নিয়মিত, তবে বিষয় পাল্টাচ্ছে। মার্কেজ আছেন ১০ম সংখ্যায়, ১২তম তে আছে ‘ঘরছাড়া’, সেই রাজীব সিংহের ‘ভালো আছো, নয়ের দশক?’
কবিতাপত্রের গুণ ও প্রাণ এর ধারাবাহিকসমূহ। রাজীব সিংহের টানা গদ্যটি ছাড়া অন্য অনেকেই ১২ সংখ্যার মধ্যে ধারাবাহিক গদ্য নিয়ে এসেছেন চলে গেছেন। কিন্তু কাজ রেখে গেছেন। তারা দায়িত্বশীলও বটে।
২.
কবিতাপত্র কবিতার কাগজ। কবিতা বিষয়ক গদ্যের কাগজ। লেখকগণ কবি, কবিতাই তাদের প্রাণধর্র্ম। বাংলাভাষার কবি ও কবিতার অনবদ্য একটি প্রচারপত্রের কাজ করেছে মাসিক কবিতাপত্র। বারো মাসের বারোটি সংখ্যা একঘেয়ামি নয়। আলাদা। মেজাজ ও ভঙ্গিও স্বতন্ত্র। স্বাদেও পার্থক্য বিরাজমান। অরুণেশ, প্রণবেন্দু, মলয় রায়চৌধুরী, অরুণ মিত্র, শান্তি লাহিড়ী, জয়দেব বসু, অমিতাভ দাশগুপ্ত, সিদ্ধেশ্বর সেন, ফালগুণি রায়, রবীন সুর, মণিভূষণ ভট্টাচার্য নানাভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। এঁদের কবিতাপ্রসিদ্ধি বা খ্যাতি কম নয়। প্রণবেন্দু তো শেরপা। জয় গোস্বামী লেখেন : ‘সমস্ত ভাঙনের মুখে গড়িয়ে পড়তে পড়তেও উঠে আসবার, ঘুরে দাঁড়াবার এই ইতিহাস প্রণবেন্দুর আজীবনের লেখার মধ্যে ধরা আছে। স্পষ্ট, একমুখী কোনও সরলরেখায় নয়Ñ ধরা আছে নানা উচ্চতায়, বহুবিধ অনিশ্চয়তার এপারে ওপারে… প্রণবেন্দুর কবিতা বাণী দেয় না, ভর্ৎসনা করে না, সভায় সফল হয় না, আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে ওঠে না…’ এরকম করে পাওয়া যায় না অনীক রুদ্রর লেখায়। তিনি লেখেন : ‘প্রণবেন্দু দাশগুপ্তকে কখনো রাগ, বিরক্তি বা উষ্মা প্রকাশের ব্যাপারে আমি দেখিনি। … তাঁর কবিতা নিয়ে সেভাবে কখনোই ভালোমত আলোচনা হয়নি পত্র-পত্রিকায়। তবু তিনি এক বিশিষ্ট কাব্য ব্যক্তিত্ব ও মানুষ…।’ অনীক রুদ্র অনালোকিত কবিদের ও কবিব্যক্তিত্বকে চমৎকার ইঙ্গিতে তুলে এনেছেন। জয় গোস্বামীর উদ্ধৃতি আবার দিই : নব্বুই পেরিয়েও অরুণ মিত্র লিখতে পেরেছেন প্রেমের কবিতা। লিখতে পেরেছেন স্পর্শের কথাই বলছি। শুধু নারী নয়, এই স্পর্শ বন্ধুত্বের, পাখি, পতঙ্গ গাছপালায়, রাস্তায় অচেনা শিশু, কাজের মেয়ে পিয়ারিয়া, থলে হাতে একসঙ্গে সবজিবাজারে ঘোরা মুখচেনা প্রতিবেশি, রংঝাল দেওয়া মিস্ত্রি, জুতো সারাইয়ের মুচি থেকে, নারকেল গাছে ঝুলতে থাকা ডাবের কাঁদি, পানের বরজের গাঢ় হয়ে থাকা, কচুপাতার রঙ ঠিকরে দেওয়া পর্যন্ত এই স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ত। জগৎজীবনজোড়া এক স্পর্শের কথা তাঁর কবিতায়Ñ সেটাই যাকে বলে প্যাশনÑ অথচ তার তীব্রতা লুকিয়ে আছে নীচে, যেন সেই কবিতার উপরে হাত ছোঁয়ালে বোঝা যায় তার স্পর্শের তাপ।’ অনীক রুদ্র ‘সময়ের অর্জন : সঙ্গদোষ বা গুণ পর্বে’ লিখেছেন : ‘বাংলা কবিতা নিয়ে কথা বলতে বলতে প্রায়শই তিনি ঝাক্ প্রেভের, ঝুলে সুপেরভিয়েল, লুই আরগঁ,আঁরি মিশো-তে চলে যেতেন। নাজিম হিকমত তাঁর প্রিয় কবিদের একজন। তবু অরুণদা আমার দেখা আদ্যোপান্ত এক বাঙালি যাঁর আত্মা ও শিকড় বিস্তৃত ছিল জন্মভূমির সুখ-দুঃখ-শোক-রাজনীতির ও বাস্তবতার খুঁটিনাটিতেই।… আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স, ইয়োরোপ ও লাটিন আমেরিকার কবিতার দিগন্ত খুলে দিতে পারতেন কবি অরুণ মিত্র।’ এভাবে অনীক বামপন্থী জয়দেব বসু নিয়ে বলেন : ‘টানা বছর কুড়ি জয়দেব মন দিয়ে কবিতাই চর্চা করেছেন। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মগ্রন্থও তার উৎসাহের বিষয় ছিল’। স্মৃতিচারণায় সত্তরের কবি শামশের আনোয়ার প্রসঙ্গেও বলেছেন অনীক রুদ্র। এ কবি সম্পর্কে গৌতম গুহরায়ের মন্তব্য : ষাটের যে কয়েকজন কবির উচ্চারণে বাংলাভাষার প্রাঙ্গনে অন্যরকমের ধ্বনি জাগছিল তাদের প্রধানতম এই শামশের আনোয়ার। মাত্র তিনটি কবিতার বই, ছড়ানো ছিটানো আরও কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ রেখে বিদায় নিলেন। শামশের কাব্যিক বিদায় নিলেন ঠিক নয়, এক ধরনের নির্মম আক্রমণের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ছিল তাঁর মৃত্যু। শামশের, যার প্রিয় গাণিতিক সংখ্যা… শূন্য।’ এভাবে প্রতিতুলনার বিবেচনা আমার মতেÑ রুদ্রর স্মৃতিচারণার পাশাপাশি মিলে যাক কবির ‘ক্লান্তি’ ও উৎসারিত অভিমুখÑ যা সম্পূর্ণতার পরিলেখ, সামগ্রিকতার সম্ভার। রাজীব সিংহের ধারাবহিকটি কবিতার রুচি ও নন্দন পরিচর্যার, উপভোগ্য ও আকর্ষণীয়। ধারাবাহিকগুলো কবিতাপত্রকে দিয়েছে বাড়তি মূল্য। যে বারোটি পর্বে ‘নয়ের দশক’ তৈরি হতে দেখি তাতে পশ্চিম বাংলার সামগ্রিক আর্থ-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, মনন-রুচি-মনস্বীতা, সাহিত্য আন্দোলনের অভিমুখ, লেখকগোষ্ঠী, লেখকদের দান-অবদান, বৈশ্বিক প্রতিমূর্তি দারুণ এক প্রতিচ্ছবি উৎকীর্ণÑ দু-আড়াই পৃষ্ঠা জুড়ে। স্যালুট, রাজীব সিংহকেÑ আমাদের সমৃদ্ধ করবার জন্যে। এতে নয়ের দশকের কবিতাভাষাটি চেনা যায়। এ ভাষা পশ্চিমবঙ্গের ধুলোমাটির উত্তাপে প্রতিশ্র“ত। সমাজ-রাজনীতির আন্দোলনে পুনর্গঠিত, রূপান্তরিত। লেখক বামপন্থা চেতনায় কবিমন ও সমাজের তল-খুঁত পর্যবেক্ষণ করেছেন, চেয়েছেন পরিবর্তনসূচক হিতকর কিছু, বণ্টন-বৈষম্য চিন্তায় কবির কাজ, বিপরীত-অশুভ সবকিছুর জন্য রাগী মনোভাবÑ লেখায় গড়ে ওঠে কর্পোরাল সুবিধাভোগীদের স্বরূপ, তাতে তৈরি শ্রেণিকাঠামোÑ এবং তার বিদ্রƒপের ভেতরে কবিতা ও কবিকণ্ঠÑ বিশেষ করে নব্বুই কবিতার প্রতিরোধী ভাষা, সমীর রায়, সুজন সেন, নিখিলেশ রায়, তুষার রায়, বিশ্বজিৎ পাণ্ডা প্রমুখÑ স্মৃতি-নস্ট্যালজিয়ায় ষাট-সত্তর-আশির প্রবাহ ও কর্মদ্যোগী সমগোত্রীয় কবিকুলÑ এক কথায় এটি চমৎকার সিরিজ। বাংলাদেশের বাইরের বাংলাভাষার আলাদা স্বর ও গড়ে ওঠা রাজনৈতিক কষ্ঠস্বর অবশ্যই নতুন পাঠ। এর বিস্তৃতি ও বিস্তার বাংলা কবিতাকে দিতে পারে বাড়তি উচ্চতা, এদেশের কবিরাও এর টেস্ট গ্রহণ করতে পারেন। এ দশকে শুধু কবিতা ও কবিকণ্ঠের কথাই নয় বিবরণ আছে লিটলম্যাগচর্চা ও বিভিন্ন ম্যাগের সম্পাদক, সম্পাদনাভাষ্য, প্রশ্নশীল গোষ্ঠীচেতনা, পূর্বাপর কবিদের ধারা ও প্রবাহ যাচাই প্রভৃতি। বৈশ্বিক যোগসূত্র, ভারত ও বিশ্বসমাচারের মাল-মসলা, নির্বাচিত স্টেটসম্যান মাও, লেনিন, মায়াকোভস্কি। রাজীব সিংহ মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এ সিরিজে, নিজের আবেগ ও অনুধ্যানও যুক্ত করেছেন তত্ত্বের পাশাপাশি। নীরস নয়, তথ্যকে ইতিহাস-পাঠে উন্নীত করা এবং তার বোধ ও বিশ্বাসকে অনুগত করা : ‘সভ্যতার অনিবার্য প্রভাবে মানুষের গোষ্ঠীজীবন ক্রমশঃ রূপান্তরিত হয় কলোনরি জটিল জীবনে। এই পৃথিবীর পরিমণ্ডল, তার জড় ও জীব, প্রকৃতি ও প্রাণী প্রত্যক্ষের অভিঘাতে বিক্রিয়া ঘটায় সৃজনশীল মনে। ¯্রষ্টার সূক্ষ্মতম অনুভব লিপিরূপ পেয়ে ওঠে কবিতায়, মূর্ত হয়ে ওঠে ছবিতে-গানে।…’ অনেক প্রশ্ন তুলেছেন, সাহিত্যকে ভাগ করা যায় না, কোনো দশকেও বাধা যায় না, কোনো অঞ্চল বা সীমায় বা কেন্দ্রে কুক্ষিগত করা যায় নাÑ লিটলম্যাগ এ পর্যায়ে স্বাভাবিক ভূমিকা গ্রহণ করে, তাই প্রশ্নের ভেতরেই বুঝি আমরা উত্তর পেয়ে যাই। তবে এ পর্যায়ে নব্বুইয়ের কবিতা সম্পর্কে একটি স্টেটমেন্ট উদ্ধৃত করি, যা পরবর্তী কবিতার ক্ষেত্রকেও চিহ্নিত করতে পারে : ‘নয়ের দশকের বাংলা কবিতা প্রধানত দুটি ধারার। যাঁরা এই সময়ে লিখতে এলেন, আশ্চর্য তাঁদের কবিতায় খুব সুস্পষ্ট ভেদরেখা টানা খুব সহজেই সম্ভব। ছন্দ ও প্রকরণ নিয়ে একটি ধারা, মূলতঃ নয়ের দশকের প্রথম ছয়-সাত বছরে এটিই প্রধান ¯্রােত। অন্যদিকে একটি চোরা¯্রােত, প্রথাগত ছন্দোবদ্ধতা থেকে মুক্তির আরেকটি ধারা। পরবর্তী সময়ে এটিই প্রধান ধারা হয়ে উঠবে। লক্ষ্য করা যায়, ছন্দ নিয়ে বেশ ভালো কাজ হয়েছে এ সময়ে। পূর্ববর্তী দশকে বাংলা কবিতা যেভাবে প্রথাগত ছন্দবর্জিত হয়ে ক্রমশ পাঠকবিমুখ হয়ে গেছিল, সেখান থেকে এই সময়ের কবিরা অনেক প্রস্তুত, তাঁরা প্রথা মেনেই প্রথাবিরুদ্ধ হয়েছেন। ছন্দ জেনেই তাঁরা ছন্দ ভেঙেছেন। সরে গিয়েছেন গদ্যের অমোঘ আকর্ষণে। নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও কম হয়নি এ সময়ে। লিরিক-আশ্রয়ী কবিতার পাশাপাশি অন্যধারার কবিতা, সেখানে ফর্ম-এর চেয়ে বিষয় অনেক বেশি গুরুত্ব পেলো। আবার টানা গদ্য, অক্ষরবৃত্তের ক্রম-ব্যবহার, স্বপ্নের মতো নির্মাণ আর বিনির্মাণ, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন ঐতিহ্যের সঙ্গে খুঁজেছে তার উত্তরাধিকার। পাল্টে গেল কবিতার চিরাচরিত ভাষা। পরিবর্তিত সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া, মানুষে মানুষে পালটে যাওয়া মূল্যবোধ, প্রেম, যৌনতা ও সম্পর্ক বিষয়ে নতুন নতুন ধারণা, নারী-পুরুষ-উভলিঙ্গ ও সমকামী সম্পর্ককে একই নিক্তিতে ওজন করবার নিজস্ব দর্শন ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ কবিতাকে সত্য কথা বলবার সুযোগ করে দিল।’ এইটিই সম্প্রতিক কবিতার মৌল পাটাতন। যার প্রবাহ এখন চলছে। সময়ে তারও পরিবর্তন ঘটবে, সে অপেক্ষার অনুবর্তনও পরিগৃহীত রয়েছে তার ভেতরে।
ষাটের অপরার্ধ্ব ও বাংলা কবিতার বিস্ফোরণ নিয়ে সন্দীপ দত্তের ধারাবাহিক, তত্ত্বপ্রবণ, হাংরি, শ্র“তি, ধ্বংসকালীন কবিতা আন্দোলন, প্রকল্পনা সর্বাংগীন কবিতা, থার্ড লিটারেচার আন্দোলন প্রভৃতির স্বরূপ-স্বীকৃতি ও ইতিহাস বয়ান। যশোধারা রায়চৌধুরীর মেয়েদের প্রতিবাদী কবিতা ভিন্ন তথ্যের প্রতিপাদ্য। আলাদা স্বাদের রচনা। কবিতা সিংহ, কৃষ্ণা বসু, তসলিমা নাসরীন, মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরুষতন্ত্র, মাতৃত্ব, নীতিবোধ, অধিকার নিয়ে কবিতার ব্যাখ্যাই শুধু নয় প্রতিবাদের বিস্তৃত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তিনিষ্ঠ রচনা তৈরি করেছেন যশোধারা রায়চৌধুরী।
৩.
মাসিক কবিতাপত্র প্রচুর কবিতাও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের কবিদের কবিতাও আছে। দুফর্মা-একফর্মার পাণ্ডুলিপিও ছেপেছে। নবারুল ভট্টাচার্যের আকর্ষণীয় পাণ্ডুলিপি অতন্দ্র বিমান, অনীক রুদ্রর এ পর্যন্তÑ অবশ্যই আকর্ষণীয়। আনন্দময়। ৬ষ্ঠ সংখ্যাটি সনেট নিয়ে। সনেটের আস্বাদনটুকু পূর্ণমাত্রা উজ্জীবিত এখানে। বিভিন্ন কবিদের প্রয়াসে তা হয়ে উঠেছে ভিন্নরূপে আস্বাদনযোগ্য। বিভিন্ন প্রয়াসে মাসিক কবিতাপত্র অনবদ্য ও আকর্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজ্যের কবিদের কবিতা ও কবিভাষা নিয়ে এই কবিতাপত্রটি একটি আকর্ষণীয় কাজ দাবি করতে পারে। যা বাংলাদেশের কবিদের অনুঘটকস্বরূপ। এবং প্রেরণারও। বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি অবশ্যই বাড়তি মাত্রা। আমরা নিয়মিত পেতে চাই। নিজেরা সমৃদ্ধ হতে চাই।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা