পা ঠ ক ক হে ন


সরল চিহ্নপাঠ
আযাদ কালাম
দিনাজপুর ॥ বাংলাদেশ
সাহিত্যের কাগজ নিয়ে রাজশাহীর ইতিহাস ঐশ্বর্যের দিক থেকে কম কিছু নয়। মোস্তফা নূর-উল ইসলাম ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘সুন্দরম’, ‘উত্তর মেঘ’ তো কিংবদন্তি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘আড্ডা’, ‘কবিতা সারথি’, ‘শব্দায়ন’, ‘দ্রোহী’, ‘উত্তর নক্ষত্র’, ‘সুনিকেত মল্লার’, ‘কিংশুক’, ‘বাউড়ি বাতাস’, এমন অনেক কাগজের কথা মলিন হবে না কোন দিন। হাসান আজিজুল হক করেছিলেন ‘প্রাকৃত’। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা করছেন ‘চিহ্ন’ এবং ‘নিরিখ’। অতীতের সকল মাপকাঠিকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়েছে ‘চিহ্ন’। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৭ বছরে এর ৩২টি সংখ্যা বের হয়ে গেছে। প্রকাশনার মান দেশের যে-কোনো কাগজকে টেক্কা দিয়ে টিকে থাকবার যোগ্য। ৩২তম (বর্তমান) সংখ্যার আয়তন ৪৩২ পৃষ্ঠা। প্রতিনিধিত্বশীল ষাটজনের লেখা গর্ভে ধারণ করেছে প্রকাশনাটি। নিয়মিত বিভাগ ছাড়াও হাসান আজিজুল হকের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা, সাম্প্রতিককালের ২৯টি গল্প এবং ৬টি গল্পবিষয়ক প্রবন্ধ একে বিশেষত্ব দান করেছে। ছাপা, বাঁধাই ও প্রচ্ছদে রুচির আভিজাত্য। আইয়ুব আল-আমিনের প্রচ্ছদ, শহীদ ইকবালের সম্পাদনা, ‘চিহ্ন’র দাম ১০০ টাকা।

২. আলাপচারিতার আলাপ
হাসান আজিজুল হকের সাথে আলাপচারিতা
শহীদ কাদরী ও সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুজনিত একপৃষ্ঠা করে দুটি শ্রদ্ধাঞ্জলি শুরুতে থাকলেও মূলত ‘চিহ্ন’র ৩২তম সংখ্যার ‘লিড আইটেম’ হাসান আজিজুল হকের দীর্ঘ আলাপচারিতা। দীর্ঘ বলতে ১২ পয়েন্ট টাইপের কম্পিউটার কম্পোজে ঠাসা ৩৪পৃষ্ঠা। যারা জানেন তারা নিশ্চয়ই জানেন, হাসান আজিজুর হকের আলাপচারিতার দৈর্ঘ্য এরকমই। তাঁর এমনতর দীর্ঘ প্রচুর সাক্ষাৎকার বাংলা সাহিত্যে আর কারো থাকলেও এমন বহুপঠিত নয়।

এ মুহূর্তে মনে পড়ছে, কোন একটি সাক্ষাৎকারে হাসান আজিজুল হক প্রশ্নকর্তাকে পাল্টা প্রশ্ন করছেন, যে প্রশ্নের জবাব আমি বহুবার দিয়েছি সেই একই জবাব আর কত! যে প্রশ্ন এখনো কেউ করেনি এমন প্রশ্ন করলে জবাব দিতে সুবিধে হয়। মন্তব্যটি অনুমান করতে সহায়তা করে কী পরিমাণ ইন্টারভিউ তাঁকে দিতে হয়েছে। আবার এমনও হয় প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারে—প্রশ্নকর্তা দেড়দুপৃষ্ঠার বক্তৃতাধর্মী প্রশ্নের জবাবে হাসান আজিজুল হক উত্তর দিচ্ছেন একটামাত্র বাক্য কিংবা শব্দে।

কথাসাহিত্যের যাদুকর হাসান আজিজুল হকের আলাপচারিতা যতো দীর্ঘই হোক পাঠক কখনো ক্লান্তি বা বিরক্তি বোধ করবেন না। এইসব আলাপচারিতা পাঠকের দৃষ্টি বহুদূর প্রসারিত হবার সুযোগ করে দেয়। আলাপচারিতায় ভাষা-সাহিত্য-বাঙালি সমাজ, পারিপার্শ্বিক আরো অনেক কিছুর বহু পেছনের অবস্থাটা যেমন পাওযা যায়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎটাও পাওয়া যায় ষোলআনা। বর্তমান আলাপচারিতায় দেখা যায় তিনটিমাত্র গ্রাম নিয়ে কোলকাতা শহর গড়ে উঠবার নেপথ্য কথা, বর্তমানের ঐশ্বর্যহীন শূন্যতার বিশ্লেষণ, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও প্রজন্মহীনতার হতাশাও। তবে হাসান আজিজুল হককে পাঠ করবার জন্য খানিকটা প্রস্তুতির দরকার আছে বৈকি।

আলাপচারিতার খানিকটা নমুনা দেখা যাক—প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই পৃষ্ঠা স্তুতির পর তাঁর খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বলছেন, ‘আমি কোনভাবেই যেনো এইসব কারণে ভিন্ন রকম আসক্তি, … এগুলো যেনো আমার তৈরি না হয়। আমি বলবো না যে আমার খুব খারাপ লাগে, … কিন্তু এই খারাপ লাগাটা আমাকে মাতাল করবে না, আমাকে সেই অর্থে স্থানচ্যুত করবে না। … লোকেরা যখন আমার প্রশংসা করে, ভালো বলে, তখন আমার ভালো লাগে, এটা কার না ভালো লাগে বলো? কিন্তু আমি যদি অ্যাবাভ অল—সত্যিকারের একজন খাঁটি মানুষ হই, সেটাই তো যথেষ্ট আর কিছুতো লাগে না।… আর অপরের কথা ভালো লাগুক আর মন্দ লাগুক আমি ভেসে যাচ্ছি না কোনোরকমে। আমি ঠিক করেছি আমি এইটা করবো না। শেষ জীবন পর্যন্ত আমি এইটা …’। অজস্র প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয়েছে। শুরুতেই এসেছে শৈশব। এখানে ক্ষণিক দ্বিমত হওয়ার অবকাশ আছে। শৈশব নিয়ে আত্মতুষ্টি থাকতেই পারে। কিন্তু তেমন শৈশব যার নেই সে দুর্ভাগ্যবান কেন? শৈশব প্রত্যেকের কাছেই ঐশ্বর্যম-িত। সময়ের সাথে সবকিছু পাল্টায়, প্রজন্মে প্রজন্মে তেমনি শৈশবও পাল্টাবে। এক সময় যা ছিলো আরেক সময় তা থাকবে না, এক সময় যা ছিলো না আরেক সময় তা থাকবে। আগের শৈশব আগের মতো আজকের শৈশব আজকের মতো।

তিনি বলছেন : ‘শৈশবহারা মানুষ আমার মনে হয় সত্যিকার মানুষ হতে পারে না, অসুবিধা আছে তাদের।’ কোনো মানুষ কি শৈশবহারা? শৈশব খুব প্রিয় সকলেরই।

৩. গল্পপাঠের সারল্য
হাসান আজিজুল হকের ‘ছায়াবাড়ি’ অদ্ভূত রহস্যময়। কৃষিখামারে কাজ করছে শ্রমিক। মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে ধানের বস্তা। গোলা ভরছে। খামার মালিক মির্জা গালিব লোহার চেয়ারে বসা আলো-আঁধারির সন্ধেবেলায়। হঠাৎ খামারের মাটি ভেদ করে ওঠা আলকাতরা মাখানো দেয়ালের একটি বাড়ি দেখতে পায় মির্জা। দেয়াল ভেদ করে ভেতরবাড়ি পর্যন্ত সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায় সে। দেখতে পায় বাড়ির ভেতরে এক টুকারো হিরে। আরো দেখতে পায় শ্রমিকেরা বাড়ির দেয়াল ভেদ করে অনায়াসে হেঁটে যাচ্ছে এপার-ওপার। গালিবের মনে হয় বাড়িটা ছায়া নয়, মানুষগুলিই ছায়া। এক সময় বাড়িটা নাই হয়ে যায়।

কী রহস্য এই ছায়াবাড়ির? এই বাড়ি কি বাংলাদেশ? হিরে কি বাংলাদেশের সম্পদ? কৃষিশ্রমিক বাংলার কৃষক? মির্জা গালিব তাহলে কে? বর্হিবিশ্বের কোনো ক্ষমতাধর? নাকি দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন লেখক নিজেই। রহস্য। গল্পটি মোহগ্রস্থ করে।

নাসরীন জাহানের ‘গরঠিকানিয়া’ শক্তিশালী রচনা। ভাষা-বর্ণনা, চিত্রকল্প, গতি অপূর্ব। কোথাও দুর্বোধ্যতা নেই। সরল কিন্তু চিরকালের জটিল বিষয়—ধর্ম। কাদের প্রেমে পড়ে পদ্মিনীর। বিয়ের পর পদ্মিনী হয়ে যায় আয়েশা। ছেলে আকবর। প্রেমের ফসল আকবরের মুসলমানী হবে আয়েশা-রূপি পদ্মিনী এটা সহ্য করতে পারে না। কালিমূর্তির সামনে ছেলেকে নিয়ে উপুড় হয়ে কান্নাকাটি করতে থাকা পদ্মিনীর কাছ থেকে আকবরকে কেড়ে নিয়ে ইব্রাহিমের মতো কুরবানি করে দেয় কাদের।

মায়া-মমতা নয়, স্নেহ-ভালোবাসাও নয়। প্রেমও পরাজিত হয়ে যায় ধর্মের কাছে। মানুষের কতো গভীরে প্রোথিত এই ধর্ম!

রাখাল রাহা লিখেছেন ‘একটি পুকুরের কাহিনি।’ প্রকৃতঅর্থে গল্পটি পুকুরের গল্প নয়। পুকুরের ছদ্মবেশে সমাজের গল্প, রাজনীতির গল্প, দখলের গল্প, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের গল্প। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরুর গ্রাস-আগ্রাসের গল্প। রাখাল ঝানু লেখকের মতো বহিরঙ্গে পুকুরকাটা, রাজা-বাদশা, রূপকথা, উপকথার একটি আবরণ তৈরি করে আসল বিষয়টি তুলেছেন কৌশলে। যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপভাষায় গল্পের শরীর নির্মাণ করেছেন। শেষ করেছেন প্রফুল্ল নামক একজনের বাড়িঘরের হারানো মালামাল, টিনের চালা পুকুরের পানিতে লুকিয়ে রাখা এবং প্রফুল্লর দেশান্তরি হবার মধ্য দিয়ে।

আবু হেনা মোস্তফা এনাম লিখেছেন ‘পদ্মকাঁটা’। এটা গল্প নয়, কাব্য। চরিত্র-কাহিনি ছাড়াও গল্প হতে পারে। গদ্য কিংবা কাব্য দিয়েও হতে পারে। গল্প মানে তো গল্প নয়, কাহিনিও নয়। কিন্তু পদ্মকাঁটার ছত্রে ছত্রে শুধুই কাব্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শুধুমাত্র ‘ছায়ান্ধকার’ শব্দটি দিয়ে ধারাবাহিকভাবে নয়টি পঙ্ক্তির অবতারণা। যেমন : ‘ছয়ান্ধকারে গ্রামের লোকেরা পুনরায় চিৎকার করে, … ছয়ান্ধকারের ভেতর লুব্ধ বিড়াল মাছ খেয়ে ফেলে রাখে নগ্ন কাঁটা। ছয়ান্ধকারের ভেতর পিঁপড়ের দল মুখে মুখে টেনে নিয়ে যায় মৃতের টুকরো মাংস। ছয়ান্ধকারের ভেতর গ্রামের প্রাচীন বৃদ্ধার গুণগুণ কান্নার স্বর উড়ে যায়। ছায়ান্ধকারের ভেতর কোথাও বৃক্ষের সহিষ্ণুতা, … ছয়ান্ধকারের ভেতর মঞ্জুশ্রী-জলের গভীর তলে ঘুমায় প্রৌঢ় হাড়। ছয়ান্ধকারের ভেতর ঋতুবিধূরতাময় … ছায়াধুসর আঁধারে বালিকা-কিশোরীর সন্ধানে …।’

পুরো ন’পৃষ্ঠা জুড়ে কেবলই কাব্যিক পঙক্তিমালা। এই যদি গল্প, কবিতা তবে কি?

উম্মে মুসলিমার ‘অভিজাত’ রবীন্দ্র-শরৎ যুগের কাহিনি। বাংলা সাহিত্য ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে ষাট-সত্তর বছরের উন্নয়ন। অটো-সিএনজির যুগে গোরুরগাড়ি-ঘোড়ারগাড়ি ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে কিন্তু ওসব উপযোগ হারিয়েছে শতভাগ। পাঠক আজ নিরেট কাহিনিতে নেই-ই একদম। উম্মে মুসলিমার ভাষা, কাহিনি বর্ণনা সাবলীল।

মূর্তালা রামাতের ‘ভবিষ্যতের দিকে যেতে যেতে’ চমৎকার ফ্যান্টাসি ফিকশনধর্মী রচনা। আমরা যা হতে চাই, তা হতে পারি না। আবার যা হতে চাই না জোর করে তাই বানানো হয়। একজন কবি হতে চেয়েছিলো, কিন্তু তাকে কেরানি হতে হয়েছে। তাকে বাধ্য করা হয়েছে অন্যের পছন্দ-ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলতে। শেষ পর্যন্ত একজন অপরাধীকে খুঁজে না পেয়ে তাকেই স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে সেই অপরাধী বলে। যখন সেই অপরাধীকে পাওয়া গেছে তখন বলা হয়েছে ঐ অপরাধীকে বাঁচাবার জন্য সে মিথ্যা বলেছে। দুজনকারই বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদ- কার্যকর হয়। টুকরো টুকরো লাশ গুম করা হয় পানিতে ফেলে।

পানির রাজ্যে মাছেদের লাশ খাওয়া উৎসব। ফকির শাহ্’র লাশ খেয়েছে তারা। দাদুবুড়োমাছ খেয়েছিলো ফকির শাহ্’র চোখ। সেই থেকে দাদুবুড়ো ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। নাতি-নাতনী মাছেরা দাদুর কাছে ভবিষ্যৎ শোনে। দাদুর ভবিষ্যৎ দেখার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এখন সে আরো ঐ রকম স্বপ্ন দেখা চোখ খেলে আবার দেখতে পাবে ভবিষ্যৎ। দাদু এবার কবির চোখ খাবার সুযোগ পায়। দাদু আবার ভবিষ্যৎ দেখতে শুরুকরে। নাতি-নাতনীরা আবার ভবিষ্যৎ জানতে চায়। দাদুবুড়ো বলে, হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। নাতি-নাতনীরা অস্থির হয়ে জানতে চায়, কী দেখতে পাচ্ছো? দাদুবুড়ো বলে, শুধুই অন্ধকার।

মূর্তালা এভাবেই মুগ্ধ পাঠককে শেষ অব্দি নিয়ে যায়। ফ্যান্টাসি-ফিকশন দিয়ে বলে ফেলেন বাস্তবতাকে।

নূরুন্নবী শান্ত লিখেছেন ‘কুয়াশার চাঁদ’। তিনটি চরিত্রের ত্রিভুজ পরিস্থিতি। কুয়াশার চাঁদ নেই, আছে কুয়াশার চাদর। লেখক কুয়াশাছন্ন পরিবেশ রচনা করেছেন তিনটি চরিত্রের রহস্য উন্মোচনের জন্য। কেতাব ফকির, কেতাব ফকিরের সদ্য বিয়ে করা নয়াবউ আর কেতাবের বড় ভাই সেতাব। তিনজনই নিজের স্খলন থেকে মুক্তির তাড়নায় তিস্তার পারে এসেছে প্রাণত্যাগ করবার প্রত্যয় নিয়ে। প্রথমে কেউ কাউকে দেখতে পায় না। শেষে সবাই সবাইকে দেখে ফেলে।

বিয়ের পনের দিন আগে সেতাবের বীর্য গর্ভে ধারণ করেছে নয়াবউ। কেতাবের সাথে বাসর রচিত হলে গর্ভ বৈধ হবে, কিন্তু বাসর হয় না। কেতাব প্রতারিত কাপুরুষ ভাবে নিজেকে। আত্মহত্যা এখন একমাত্র পথ। নয়াবউ পাপ বোধে জর্জরিত। তারও একই পথ। সেতাব আধপাগলা। তার শরীর কথা বলেছে। সেও আত্মহননের পথিক।

প্রথমে তাদের প্রত্যাশা ছিল কখন কুয়াশা কেটে যাবে। সবাই সবার উপস্থিতি টের পেয়ে এখন প্রার্থনা, এই কুয়াশা যেন কেটে না যায়। গতরের স্বভাব আর সমাজের স্বভাব কেউ কাউকে রেহাই দেবে না। মৃত্যুই এখন তাদের একমাত্র অবলম্বন।

কুয়াশাময় পরিবেশে চরিত্র তিনটির উপস্থাপন নান্দনিকতাময়।

শহীদ ইকবাল লিখেছেন ‘গোসাইপাড়ার এজমালি জমি’। রংপুর অঞ্চলের উপভাষায় লেখা। উপভাষায় লেখালেখি নূতন না হলেও প্রবণতাটি সম্প্রতি বেড়েছে। সত্যিকার অর্থে, উপভাষাই তো ভাষার মূল ভিত্তিভূমি। সঠিকভাবে এর প্রয়োগ ঘটলে কনটেন্টের যে মৌলিকত্ব সৃষ্টি হয় মানভাষায় তা কখনোই সম্ভব নয়। রংপুরের ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী আর সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুল হকদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগদক্ষতা এই উপভাষাকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি দান করেছে। সে অর্থে দিনাজপুরের উপভাষা শওকত আলীর হাতে কিছুটা এলেও অনালোচিত।

গোসাইপাড়ার এজমালি জমির ঘটনা আবর্তীত হয়েছে ছমির শেখের মৃত্যুরহস্যকে ঘিরে। তার তিন স্ত্রী সখিনা, মরিয়ম, জায়েদা হলেও পরবর্তী রহস্য ঘনিভূত হয় সখিনার অন্তর্ধানে। অবশেষে ছমির শেখের বাড়িভিটা এজমালি জমিতে পরিণত হয়।

কাহিনিতে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু ভাষা এবং চরিত্রের অন্তর্নিহিত টানাপোড়েন গল্পটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। উপভাষা প্রয়োগের গুরুচ-ালি সমস্যাটি প্রকটভাবে ঘটেছে। কিছু কিছু বিচ্যুতি অস্বস্তি সৃষ্টি করে। ‘এন্দুর’ বলার পরপরই ‘ইঁদুর’ বা ‘পুলুশ’ বলার পরই ‘পুলিশ’ একটু হোঁচট দেয়। ‘রাইত পার করুম’ রংপুরের ভাষা নয়। এটা হতে পারতো ‘রাইত পার করি দেইম/করমো/করিমো/করিয়া’। বিচ্যুতি সত্ত্বেও শহীদ ইকবালের উপভাষা চর্চা এবং প্রয়োগদক্ষতা মুগ্ধ করে।

এ পর্যায়ে আরো লিখেছেন : ইবাইস আমান, সৈয়দ তৌফিক জুহরী, ওয়াসিকা নুয্হাত, তাশরিক-ই হাবিব, মাসুদ পারভেজ, গত্তহর গালিব, মেহেদী ধ্রুব, ইফতেখার মাহমুদ, বিপম চাকমা, শফিক আশরাফ, শাহনাজ নাসরীন, সজল বিশ্বাস. আনিফ রুবেদ, স্বকৃত নোমান, পিন্টু রহমান, আশরাফ জুয়েল, এমরান কবির, হামিম কামাল, সবুজ ম-ল, সৈকত আরেফিন ও মর্মরিত ঊষাপুরুষ। প্রত্যেকের লেখা আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করা গেলেই ভালো ছিল। কিন্তু স্থানসংকুলান সে সুযোগ নিশ্চয়ই দেবে না। তাছাড়া জামার আয়তন শরীরের থেকে বড় হওয়াও বাঞ্ছনীয় নয়। যেগুলির ওপর যৎসামান্য আলোাকপাত হলো তাতেই ‘চিহ্ন’র গল্প-নির্বাচন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এবং এ সময়ের গল্প সাহিত্যের পালস্ অনুভব করা যাবে।

৪. প্রবন্ধপাঠের সোজাসাপ্টা
ইমতিয়ার শামীমের ‘সংকট কোনখানে’
কাহিনি দিয়ে শুরু করেছেন ইমতিয়ার শামীম। মাদ্রাসা পড়–য়া এক তরুণ কথা বলতে চায়, ঘনিষ্ঠ মত বিনিময় করতে চায় খেলালেখি নিয়ে। শামীমেরও ইচ্ছে হয় তার সাথে মেশার। বাধা হয়ে দাঁড়ায় মাদ্রাসা। ইচ্ছা এবং সুযোগ থাকার পরও নিরাপত্তাহীনতার দ্বিধা এগোতে দেয় না। বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক জঙ্গীপনার বিষয়টি জানতে হলে, এর গভীরে যেতে হলে অভিজ্ঞতার কি বিকল্প আছে? ইত্যাকার নানাবিধ কারণে একজন লেখক কাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়।

পাল্টে যায় শামীমের মত, সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতাতেও সৃজনশীলতার সক্ষমতা নিয়ে সংশয়। মানুষ ও প্রকৃতির এতো সান্নিধ্যে না এসেও কথাসাহিত্যিক তার চালচিত্র তৈরি করে ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন। চরিত্র সৃষ্টি হতে পারে এই পাওয়া না পাওয়ার অন্তর্দ্বন্দ্বের অন্তঃক্ষরণ থেকে। একটি কাহিনি লেখা যতো সহজ অর্ন্তদ্বন্দ্বের ক্ষরণ থেকে চরিত্র সৃষ্টি করে লেখাটা ততো সহজ তো নয়ই, সময় সাপেক্ষও। তিনি অনুভব করেন মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হকরা কি যন্ত্রণায় বিরলপ্রজ।

এবার হাজির করেন সুর্বোধ্য-দুর্বোধ্যতার দ্বন্দ্ব-সংকট। যিনি কাঁদাতে পারেন, হাসাতে পারেন তিনিই সফল সাহিত্যিক। যিনি কাঁদাতে গিয়েও উদ্বেগ ডেকে আনেন, নিস্পৃহতা আনেন, চিন্তিত করে তোলেন তিনি দুর্বোধ্য। তাকে একঘরে করে মেরে ফেলার মতো অপবাদ—উনি তো দুর্বোধ্য লেখেন। শামীম এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজেন—লেখা দুর্বোধ্য হওয়ার পরও যদি তাকে এড়িয়ে যাবার উপায় না থাকে, কম পাঠকপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ঈর্ষা জাগাতে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে নূতন সময় এসেছে। যে সময় নূতন ভাষা ও লেখা দাবি করছে। বেশিরভাগ মানুষ যা চিহ্নিত করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত দুর্বোধ্যতাও সংকট নয়।

আরেক সংকট হিতোপদেশ দানকারী বা শিক্ষাদানকারী সাহিত্যিকের দাপট। এর ফলে ভালো সাহিত্য মারা পড়ে। সাহিত্য শিক্ষাদানের মাধ্যম নয় কখনোই। প্রমথ চৌধুরী বহুকাল আগেই বলেছেন, সাহিত্য স্কুলমাষ্টারির ভার নেয় নি। হিতোপদেশ বা শিক্ষাদানসংকটের পাল্লায় পড়ে মারা পড়েছে আমাদের শিশুসাহিত্য। এনজিওওয়ালাদের বাজেট বাস্তবায়ন, লেখক-প্রকাশকদের বিকিকিনি বাণিজ্য আর অভিভাবকদের নির্বুদ্ধিতায় শিশুসাহিত্য এহেন সংকটে পতিত হয়েছে।

কথাসাহিত্যের এরকম অনেক সংকট এবং উত্তরণের পথ অন্বেষণ করেছেন ইমতিয়ার শামীম। শেষ করেছেন ভার্চুয়াল জগৎসৃষ্ট সংকট দিয়ে। যে জগতের প্রধান সাহিত্য স্ট্যাটাস-অনুগল্প।

প্রবন্ধটি আপাদমস্তক সুখপাঠ্য, অনবদ্য। কিন্তু অস্বস্তিকর একটি বিচ্যুতি এর অঙ্গহানী ঘটিয়েছে। হিতোপদেশ বা শিক্ষাদানকারী কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাম করে একটি উদ্ধৃতি রয়েছে যা আদৌ রবীন্দ্রনাথের নয়। ‘লোকে যদি সাহিত্য হতে শিক্ষা পেতে চেষ্টা করে তবে পেতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য শিক্ষা দেবার জন্য কোন চিন্তাই করে না। কোন দেশে সাহিত্য ইস্কুলমাস্টারির ভার নেয়নি।’ উদ্ধৃতিটা প্রমথ চৌধুরীর ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের অংশ। এখানে কিছুটা বিকৃতিও ঘটেছে। প্রমথ চৌধুরীর কথাটা এরকম—‘রামায়ণ কাব্য হিসেবে যে অমর এবং জনসাধারণ আজও যে তার শ্রবণে-পঠনে আনন্দ উপভোগ করে তার একমাত্র কারণ, আনন্দের ধর্মই এই যে তা সংক্রামক। অপরপক্ষে লাখে একজনও যে যোগাবশিষ্ঠ রামায়ণের ছায়া মাড়ান না তার কারণ, সে বস্তু লোককে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল, আনন্দ দেবার জন্য নয়। আসল কথা এই যে, সাহিত্য কস্মিন্কালেও স্কুলমাষ্টারির ভার নেয় নি।’

ইমতিয়ার শামীম অত্যন্ত সচেতন, মেধাবি এবং উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় লেখক। তার কাছে এমন বিচ্যুতি প্রত্যাশিত নয় একদমই।

হোসেনউদ্দীন হোসেনের গল্পসাহিত্য : ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও কল্পনার রূপ

গল্পলেখকের অন্তরজগৎ নিয়ে আলোকপাত করেছেন হোসেনউদ্দীন হোসেন। মনোজগতে গল্পের বীজ কিভাবে সৃষ্টি এবং অংকুরিত হয় এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি উপলব্ধির কথা বলেছেন। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, সাহিত্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড় এবং স্বতন্ত্র। রসবোধ প্রসঙ্গে বলেছেন, যার অন্তরে রসবোধ নেই তিনি দেখেন শুধু উপাদান আর প্রয়োজনের দিকটি। ফলে তার পক্ষে সাহিত্যের মূল্য নিরূপণ কষ্টসাধ্য। গল্প লেখকের মন যখন রসের অনুভূতিতে ছাপিয়ে যায় তখনই তিনি গল্প লেখেন নিত্যকালের ভাষায়। এটা জ্ঞানের ভাষা নয়, হৃদয়ের ভাষা, কল্পনার ভাষা।

ক্ষুদ্র পরিসরে আরো অনেক বলেছেন তিনি। বাস্তবের বাস্তবতা ও গল্পের বাস্তবতা প্রসঙ্গে বলেছেন—সাহিত্যের বাস্তবতা একান্তই উপলব্ধিগত। শেষ করেছেন নির্মম বাস্তবতার কথা তুলে—‘যে এগিয়ে যেতে পারবে—সে এগিয়ে যাবে—যে এগিয়ে যেতে পারবে না সে পিছিয়ে থাকবে।’

৫. পুনর্মুদ্রণের পুনর্পাঠ
পাপড়ি রহমান লিখেছেন ‘নব্বই দশকের গল্প’ আর নাসরীন জাহান ‘বাংলাদেশের গল্প : আশির দশক’। দুটি রচনারই ধরন কিংবা বৈশিষ্ট্যের কোনো ফারাক নেই। দশক ধরে ধরে প্রায় একই কথা বলেছেন দুজনে। শুধু নিজ দশকের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরে অমিল। প্রকারান্তরে যা নিজের কীর্তন গাওয়া। নাসরীনের কাছে আশির দশক, পাপড়ির কাছে নব্বই। দুজনেই কেবল দশকভিত্তিক লেখকদের নাম উল্লেখ্য করেছেন। কারো রচনা কিংবা গ্রন্থের বিশ্লেষণ নেই। ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ লেখক আবুবকর সিদ্দিক এবং আশির দশকের জাকির তালুকদারকে সযতেœ উপেক্ষা করে গেছেন। আবুবকর সিদ্দিক ও জাকির তালুকদার বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত। তার চেয়ে বড় কথা, দুজনই বাংলা কথাসাহিত্যে সত্যিকারের সুলেখক। আবুবকর সিদ্দিকের ‘জলরাক্ষস’ ও ‘খরাদাহ’ এবং জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’ ও ‘মুসলমানমঙ্গল’ কে মুছে ফেলবে?

পাপড়ি ও নাসরীনের রচনায় কয়েকটি পঙ্ক্তি হুবহু মিলে যাওয়া দেখে লাজ্জাজনকভাবে বিস্মিত হতে হয়। পাপড়ির বইটি ১৯৯২ সালে, নাসরীনেরটি ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত। পঙ্ক্তিগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে—‘যাঁদের লেখায় ছোটগল্পের ছিমছাম তনুখানি অনুপস্থিত। পূর্বসুরীদের জনপ্রিয়তার ধাঁধাঁয় অস্থির হয়ে কোনো গল্পকারই নিজেকে সেই ধারায় বিকশিত করেন নি। … পরিলক্ষিত হয়।’

একজন অন্যজনের পঙ্ক্তি বা অংশ উদ্ধৃত করতেই পারেন। কোনো শব্দ বা বাক্য কাকতালীয়ভাবে মিলেও যেতে পারে। কিন্তু কোনো উদ্ধৃতি ছাড়াই মিলে যাবে লাইনের পর লাইন এটাও সম্ভব হয়েছে এখানে।

সুশান্ত মজুমদারের সত্তর দশকের গল্প : উত্তরাধিকার ও পরিপ্রেক্ষিত

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত দশকভিত্তিক তিনখানা গল্পগ্রন্থের ভূমিকা পুণর্মুদ্রণ করেছে চিহ্ন। সুশান্ত মজুমদার লিখেছেন সত্তর দশকের ভূমিকা। তিনটির মধ্যে সত্তর দশকের মূল্যায়ন অনেকাংশে যথার্থ। লেখকদের নাম ধরে ধরে তাদের ব্যর্থতা-সফলতার কারণ উল্লেখ্য করার প্রয়াস পেয়েছেন। শুরু করেছেন দেশ বিভাগের পূর্বাপর দিয়ে। আবুল ফজল, শওকত ওসমান ও আবু ইসাহাকের বিশ্লেষণ শেষে তার মনে হয়েছে এ সময়কালের সফল গল্পকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। তাঁকে তিনি আধুনিক ছোটগল্পের সূচনাকারী বলেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের বিশ্লেষণে হাসান হাফিজুর রহমান স্মরণীয়। শওকত আলী, জহির রায়হান, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ,্ জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হুমায়ুন চৌধুরীর বিশ্লেষণ শেষে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে অধিক সাফল্য লাভের মর্যাদা দিয়েছেন। ষাটের শেষ পর্যায়ের লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ও শওকত আলীরা দ্যূতি ছড়িয়েছেন অনেক পরে।

তার মতে চল্লিশ-পঞ্চাশ ষাটের ধারাবাহিক সাফল্যের উৎকর্ষতা এসে উজ্জ্বল করে তোলে সত্তর দশককে। এ সময়ের লেখকরা মুখোমুখি হন বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের। তারা প্রত্যক্ষ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ-পরবর্তী নানান সংকট। তাদের মগজে বাসা বাঁধে অনেক স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের আশা-হতাশা। এরা আগের তুলনায় অনেক সাহসী। অনেকে আবার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠলে ও পরিস্থিতি বুঝতে না পারার কারণে চটুল গল্প লিখতে শুরু করেন। যা গল্পসাহিত্যে আগে ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সকলেই লিখেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সফল গল্প পাওয়া যায় না। বরং যুদ্ধপরবর্তী নৈরাজ্য নিয়ে সফল গল্প লিখেছেন আহমদ বশীর ও মঈনুল আহসান সারের।

সুশান্ত মজুমদার নিজস্ব ভাষাভঙ্গিমায় ক্ষুদ্র পরিসরে চল্লিশ থেকে সত্তর দশকের গল্পসাহিত্য ও গল্পকারদের যথাযথ বিশ্লেষণ করেছেন।

আবুজাফর শামসুদ্দীনের আমাদের গল্প-সাহিত্য
শিরোনাম নিয়েই প্রশ্ন। ‘আমাদের গল্প-সাহিত্য’ শিরোনাম হলেও বিষয়বস্তু মুসলিম গল্পসাহিত্য। অকপটে লেখক যা স্বীকার করে মুসলিম গল্পকারদের নিয়ে আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। সাতচল্লিশপূর্ব প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু করলেও বিভাগ-পরবর্তী মুসলিম গল্পলেখকদের সফলতা-ব্যর্থতার সালতামামীই তুলে এনেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম দিয়ে সূচনা করে মুনীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, মোস্তফা নূরউল ইসলাম, সাইয়ীদ আতীকুল্লাহ্ দিয়ে শেষ করেছেন। তিনি গল্পকারদের ব্যর্থতার সীমাও নির্ধারণ করেছেন—‘বিদ্রƒপ ও শ্লেষাতœক রচনাকে সার্থক ও আবেদনপূর্ণ করতে গেলে যে সহানুভূতিশীল মন ও পক্ষপাতহীন নির্বিকারত্ব প্রয়োজন তা অধিকাংশ মুসলিম গল্প লেখকদের রচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল।’ ব্যাখ্যা প্রদান, নিজের বক্তব্য বলা এবং মন্তব্য করা থেকে তরুণ লেখকগণ প্রায়ই বিরত থাকতে পারেন না বলে উল্লেখ করলেও সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, জহির রায়হান, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাসনাত আবদুল হাই প্রমুখের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আজ বাস্তবে রূপলাভ করেছে।

৬. কৈফিয়তের বিকল্প
জফির সেতুর কেন লিখি
একটি কবিতা লেখার পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে শুরু করেছেন জফির সেতু। বর্ণনাটা নিছক পরিস্থিতির বর্ণনা নয়, সৃষ্টিযন্ত্রণার অন্তর্বয়ন। যে সৃষ্টিযন্ত্রণার সাথে ওতোপ্রোত সৃষ্টিসুখ। সৃষ্টিশীল প্রত্যেকজনেরই এ যন্ত্রণাসুখ ভোগ-উপভোগের অভিজ্ঞতা থাকতে বাধ্য। হতে পারে পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু সুখযন্ত্রণা শতভাগ অভিন্ন।

বর্ণনার খানিকটা দেখে নেয় যাক, ‘আমি অস্থির হয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। আলো জ্বালিয়ে দিলাম। টেবিলে ঝুঁকে খাতাটি উল্টালাম। শাদা পাতায় কলম ধরলাম। মনে হলো আমার ভেতরটা গরম হয়ে গেছে। চামড়ার নিচে আগুনের ফুলকি। আমি লিখে চলেছি। অনিঃশেষ শব্দ আর চিত্রকল্প মাথায় ভর করছে। কলম দৌড়াচ্ছে। … বত্রিশ পঙ্ক্তির কবিতা শেষ হলো ঘণ্টা দেড়েকের মাথায়।’ সমাপ্তিসূচক শেষ পঙ্ক্তি ‘নস্যাৎ করি নিয়তির বশ্যতা : সকল প্রশংসা তোমার’ যখন বেরিয়ে এলো তখন মনে হলো, আহা এইবার মুক্তি, এই বুঝি শান্তি এলো জীবনে। মুহূর্তে কেটে গেল অস্থিরতা। মনে হলো আমি স্বাভাবিক হয়ে উঠছি। ’

সামনে-পিছনের বর্ণনা দীর্ঘ। কবিতা সৃষ্টির পরিস্থিতিটা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সৃষ্টির ক্ষণকে মনে করিয়ে দেয়। নজরুলের সময় কলম ব্যবহারের এমন সুবিধে ছিলো না। দোয়াতের কালিতে নিব ডুবিয়ে ডুবিয়ে একটা বা দুটা করে শব্দ লেখা যেতো। নজরুল ইসলাম নির্ঘুম রাত যাপন করে শেষরাত্রে এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেলেছিলেন কবিতাটি। ছন্দ-ভাব-গতিসহ আরো অন্যকিছুর ব্যাঘাত যাতে না ঘটে তাই কাঠপেন্সিল দিয়ে লিখেছিলেন।

জফির সেতু তার প্রতিবেশ বর্ণনা করেছেন। পরিবারের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন তার কবিসত্তা সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সততা ও আন্তরিকতায়। ‘কেন লিখি’র জবাবে বলতে চেয়েছেন—একটি মেয়ের জন্য লিখি, কাজী নজরুল হবার জন্য লিখি, সমাজ বদল এবং সমাজ সংস্কারের জন্য লিখি, দেবদূতের আহ্বানে লিখি, ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখার নেশায় লিখি, অমরত্ব লাভের আশায় লিখি—এরকম অনেক কারণ উল্লেখ করে বলছেন, আসলে এসব কোনো কিছুর জন্যই লিখি না। পাল্টা প্রশ্ন করেন, কেন বেঁচে থাকি? এই জন্য বেঁচে থাকি ভেবে মানুষ বেঁচে থাকে না। ঠিক তেমনি এই জন্য লিখি ভেবে কেউ লেখে না। কবি কবিতাযাপনের জন্যই লেখেন, উদ্দেশ্য নিয়ে লেখেন না। শিল্প কখনোই নয় উদ্দেশ্যভিত্তিক।

সেতুর বর্ণনা দিয়েই প্রসঙ্গ শেষ করা যায়Ñ‘এখন আমি সমাজ বদলের জন্য লিখি না, কাউকে মুগ্ধ করার জন্যও না। কবি হওয়ার জন্যও না। …এখন একটা কবিতা লেখা হয়ে গেলে পড়ে থাকে কম্পিউটারে মাসের পর মাস। নিজেই পড়ি মাঝেমধ্যে। মনে হয় নিজের জন্যই লিখেছি। কবিতা লেখা এখন বেঁচে থাকার শর্তে পরিণত হয়েছে। মনে হয় বেঁচে থাকতে হলে কবিতাই লিখতে হবে। আজ যদি না লিখতে পারি কাল নিশ্চয়ই লিখব। অপর মানুষ কবিত্ব অনুভব করে আমি লিখি। কিন্তু কবিতাই শর্ত। মানুষের জন্য কবিতা অপরিহার্য। কিন্তু জানি কি, কেন লিখি?

৭. প্রবন্ধপাঠের ভাঙ্গাচোরা পথঘাট
জুলফিকার মতিনের আত্মার চিৎকার
বাংলা ভাষার একালের প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে বেশ দীর্ঘ রচনা আত্মার চিৎকার। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পর জীবনানন্দ দাশ নাকি শামসুর রাহমান—বাংলা ভাষায় কে একালের প্রধান কবি? এরকম প্রসঙ্গ বিশ্লেষণের প্রয়াস চালিয়েছেন মতিন। ঐতিহাসিক-সামাজিক-ধর্মীয়-ভৌগোলিক-নন্দনতাত্ত্বিক ইত্যাকার সকল পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করেছেন। জুলফিকার মতিন সূক্ষ্মবোধসম্পন্ন লেখক। জীবনানন্দ কিংবা শামসুর রাহমান কারো প্রতি ¯ূ’ল পক্ষপাত তিনি প্রকাশ করেন নি। পাঠক দেখতে পান রচনার বিষয় শামসুর রাহমান। মৃত্যুপূর্বকাল জীবনানন্দকে কাটাতে হয়েছে জন্মস্থানের পারিপার্শ্ব ছেড়ে যা রাহমানকে করতে হয় নি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পারিপার্শ্ব সম্পৃক্ততা রাহমান যেভাবে উপলব্ধ হয়েছেন জীবনানন্দ সেভাবে হন নি। রাহমান একটি ভাষা সংগ্রাম ও একটি মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্টতা দ্বারা পুষ্ট হয়েছেন যা জীবনান্দদের নেই। ১৯৪৩ সালে প্রথম কবিতা প্রকাশের পর ১৯৬০ সালে শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। জীবনান্দদের বিড়ম্বনা আরো বেশি।

শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি বলে সীমাবদ্ধতায় বেঁধে ফেলার বিপক্ষে মতিন। তাঁর মতে সারাজীবন এই ঢাকা শহরেই কাটিয়েছেন, শুধুমাত্র এখানে বসবাসকারী মানুষজনের জীবনযাত্রার ছবি, তাদের আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-উল্লাসের চালচিত্র, পচা নর্দমার দুর্গন্ধের কথাও বলা—এ সবই কি কেবল তাঁকে নাগরিক কবি বলতে অনুপ্রাণিত করবে?

আমাদের অধিকাংশ কবি যারা খুবই প্রিয়। যাদের কথা প্রায়ই উচ্চারিত, যাদের কবি প্রতিভার সত্যি সত্যি বিকল্প নেই তারা যে বৃত্ত রচনা করে বিখ্যাত হয়েছেন—হয়ত সেই খ্যাতি হারানোর ভয়ে তার বাহিরে আর যাননি। গত পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানই বোধ হয় একমাত্র কবি, যিনি সময়ের সাথে সাথে, তার মর্মবাণীকে আত্মস্থ করে টেনে নিয়ে গেছেন তাঁর কাব্যরথকে সমাজের চাহিদা, যা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে নিয়ত পরিবর্তনশীল, সেই পরিবর্তনশীলতাকে স্বচ্ছন্দে ধারণ করেছেন।

বাংলাভাষা কিংবা বাঙালি জাতি টিকে থাকা না থাকার ওপর শামসুর রাহমানের টিকে থাকার প্রসঙ্গ তুলেছেন জুলফিকার মতিন। উদাহরণ হিসেবে হাজির করেছেন অনেক জাতি-গোষ্ঠী ও ভাষা হারিয়ে যাবার কথা। তাজা নজীর হিসেবে পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষার টিকে থাকবার সংশয় প্রকাশ করেছেন। বাঙালিরা যেভাবে অ-বাংলাভাষী দেশের নাগরিক হচ্ছে তাদের নিয়েও বাংলা ভাষার টিকে থাকার সংশয় দেখেছেন তিনি।

রচনার শেষ অংশটুকু সরাসরি তুলে ধরে প্রসঙ্গটির সমাপ্তি টানা যায়—‘একজন কবি তো স্পর্শকাতর অনুভূতিশীল মানুষ। নান্দনিকতাই বলি, সৌন্দযবোধই বলি, তার পরিচর্যা তো চলে ভাবসত্ত্বারই উন্মীলন ঘটাতে। শামসুর রাহমানেও আমরা তাই দেখেছি। এটাকেই সনাক্ত করা যায় তাঁর আত্মার চিৎকার বলে। আর আমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়িত্বই বলি, আর অমরতাই বলি, তার কারণটিও খুঁজে পেতে হবে এখান থেকেই।’

মুহাম্মদ নূরুল্লাহ্র সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও চাঁদের অমাবস্যা

সিগমন্ড ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্বে তিনটি সত্তার উপস্থিতি দেখতে পান—১. জৈবিক সত্তা বা ইদম ২. বাস্তবসত্তা বা অহম ৩. অতি অহম। এই তিনটি মানবসত্তার মাপকাঠিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসটির বিশ্লেষণ করেছেন নূরুল্লাহ্। আরেফ ও কাদের চরিত্রদ্বয় বিশ্লেষণ করে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের উপস্থিতি দেখিয়েছেন তিনি। ওয়ালীউল্লাহ্র গল্প-উপন্যাসের ব্যবচ্ছেদ শুধু ফ্রয়েড দিয়ে করলে বুুঝি সবটুকু ধরা যায় না। তার ভাষা প্রয়োগের নিজস্বতা ও দক্ষতা ছাড়াও ধর্মের (বিশেষভাবে ইসলাম ধর্মের) অপপ্রয়োগ ও ভ-ামির উন্মোচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ—যা নূরুল্লাহ্র প্রবন্ধে গুরুত্ব পায়নি।

৮. ভাষান্তরের সরলপাঠ
রায়হান রাইনের ফ্রানৎস্ কাফকার রূপক গল্প
১৯৪৮ সালে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ফ্রানৎস্ কাফকার ‘নার্সিসাসের কুয়ো : এক সত্তাশূন্য আমি’ এই রূপক গল্পটি নিয়ে ডব্লিউ. এইচ. অডেন-এর লেখাটি ভাষান্তর করেছেন রায়হান রাইন। এখানে কাকফা সম্পর্কিত বহুল আলোচিত এবং অনালোচিত প্রসঙ্গ পাঠকের সামনে এসেছে। কাফকা তার বন্ধুকে বলেছিলেন, তার কাছে রক্ষিত লেখাগুলি যেন সে ধ্বংস করে ফেলে। কারণ হিসেবে বলেন যে, ‘আমার কাছে মূল্যবান হতে পারে যদি আমি এমন কিছু লিখি যা চূড়ান্তভাবে নিখুঁত। কিন্তু কোনো লেখা যত চমৎকারই হোক নিখুঁত হতে পারে না। তাই আমি যা-কিছু লিখেছি আমার কাছে তা মূল্যহীন এবং সেসব ধ্বংস করে ফেলা উচিত।’ মন্তব্যটির ধারাবাহিকতায় আরেকটি মন্তব্য—‘লেখা প্রার্থনার একটি ধরণ।’ এবং কোনো লোকই তার প্রার্থনা যদি খাঁটি হয় তাহলে তা অন্যকে শুনতে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন না।

কাফকা সম্পকে বলা হয়, ‘যদি এমন কেউ একজন থাকেন যার সম্পর্কে বলা যায় ‘ন্যায়নিষ্ঠার জন্য ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত’ তবে তিনি কাফকা।’ কাফকার পাঠক সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘কাফকা সম্ভবত সেইসব লেখকদের একজন যিনি ভুল লোকদের দ্বারা পঠিত হবার জন্য দ-প্রাপ্ত। কাফকা পাঠ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তখনই কাফকা পড়তে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত যখন শরীর ও মন ভালো হজমশক্তিসম্পন্ন অবস্থায় থাকবে।’

কাফকা পাঠে যেমন ক্রমাগত মুগ্ধ হতে হয় কাফকা সম্পর্কিত রচনা পাঠ করলেও একইরকম মুগ্ধতা সৃষ্টি হয়। রায়হান রাইন অনূদিত বর্তমান রচনাটিও মুগ্ধকর।

৯. আর যা কিছু চিহ্নগর্ভে
নিয়মিত বিভাগে গল্প লিখেছেন, সুবিদ সাপেক্ষ, সুবন্ত যায়েদ, ও মাকছুদা ইয়াছমিন রুমকি। কবিতা লিখেছেন ময়ুখ চৌধুরী, বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, তারেক রেজা ও শামীম নওরোজ।
সাঈদ হাসান অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমানের ইংরেজি থেকে বাংলায় নাতিদীর্ঘ (১৭পৃষ্ঠা) একটি সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন। ইংরেজিতে মূল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমানের দুই সহকর্মী মাসউদ আখতার ও মুহাম্মদ তারিক-উল-ইসলাম। অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সুনামখ্যাত শিক্ষক। বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষার বহুবিদ বিষয়-আশয় এখানে আলোচিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মিউজিংস পোস্ট কলোনিজ (চিহ্ন-প্রকাশন) গ্রন্থে প্রকাশিত হলেও ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে অধ্যাপক আলীর মৃত্যু এবং তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাকে অধিকতর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ থেকে ‘চিহ্ন’ এটি পুনর্মুদ্রণ করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর এবং পুনপ্রকাশের উদ্যোগ শুধু অধ্যাপক আলীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন নয়, এটি ‘চিহ্ন’ ৩২তম প্রকাশনাকেই অলংকৃত করেছে।

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য ও সংকৃতিচর্চা ১৬’ প্রতিমা মিত্র প্রীতির এ লেখারটির সাথে শিরোনামের সম্পর্ক আবিষ্কার দুরূহ। এটি ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক ফোরাম’-এর ২৭ বছর পূর্তির সংগঠন বিবরণীর ফিরিস্তি। শুধুমাত্র শিরোনাম ছাড়া ‘চিহ্ন’র চরিত্রের সাথে এটি সঙ্গতিপূর্ণ নয় মোটেও।

বই ও পত্রিকা আলোচনা ‘চিহ্ন’র অনিবার্য উদ্যোগ। ‘বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ’ নূহ-উল আলম লেনিনের এই বইটি আলোচনা করেছেন শহীদ ইকবাল, ‘কষ্টের আধুনিক হিমাগার’ আহমেদ মেহেদী হাসান নীল-এর বইটি আলোচনা করেছেন রফিক সানি এবং ‘ডায়ালের জাদু’ মাসুদার রহমানের এই বইয়ের আলোচনা করেছেন আনন্দ কিশলয়। গ্রন্থ-নিবার্চন ও আলোচনা দুইই চমৎকার।

পত্রিকা আলোচনায় রয়েছে, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘স্পর্ধা সবসময়ে’ সম্পাদক হাবীব ইমন—আলোচনা করেছেন বিরহান্ত কৃষ্ণ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘শিল্পধাম’ সম্পাদক আবুল ফজল। এর আলোচনা করেছেন অতন্দ্র অনিঃশেষ। গাইবান্ধা থেকে প্রকাশিত ‘শব্দ’ সম্পাদক সরোজ দেব; আলোচনা করেছেন নাজমুল হাসান পলক।

‘চিহ্ন’ ৩১তম সংখ্যার পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখেছেন ঢাকা থেকে গৌরাঙ্গ মোহান্ত ও নড়াইল থেকে সদ্যসমুজ্জ্বল। সম্প্রতি প্রকাশিত বই ও পত্রিকা পরিচিতিতে আছে বরিশাল থকে প্রকাশিত ‘বুনন’, কিশোরগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘ধমনি’। বই পরিচিতিতে আছে শিমুল মাহমুদের ‘কাব্যকথা কাকবিদ্যা’, সৈয়দ তৌফিক জুহরীর ‘শওকত ওসমান : আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা’, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘শওকত ওসমান জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ’, সিরাজ সালেকীন সম্পাদিত ‘উলুখাগড়া’ এবং কাজল কাপালিকের ‘যদি একতারাটি বেজে ওঠে।’

শেষে রয়েছে দুটি ধারাবাহিক রচনা। ‘বিচিত্র সমাজতত্ত্ব, সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব-৫’ লিখেছেন মুহাম্মদ হাসান ইমাম এবং ‘সমস্ত ধূসর প্রিয়, নয়ন মেলে পর্ব’ লিখেছেন শহীদ ইকবাল। ‘চিহ্ন’র শেষপ্রান্তে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ৫০ বছরের গল্প ও গল্পকারের তালিকা। এখানে ১৫২ জন গল্পকারের নামের পাশে তাদের প্রকাশিত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

অবশ্যই প্রত্যাশা ‘চিহ্ন’ দীঘজীবী হোক। শ্রীবৃদ্ধি ও মানবৃদ্ধি হোক, আয়তন বৃদ্ধি হোক আর না হোক। যদি আর একটিও সংখ্যা প্রকাশিত না হয় ‘চিহ্ন’ তবুও বেঁচে থাকবে। ‘চিহ্ন’র জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

পাঠক কহেন…
চিহ্নপাঠ
তৃপ্তি সান্ত্রা
মালদহ ॥ পশ্চিমবঙ্গ ॥ ভারত
২০১৭ মার্চ ১৯ থেকে ৩০ বাংলাদেশ পর্বে অনেক প্রাপ্তির মধ্যে একটা বড় প্রাপ্তি রাজশাহী থেকে প্রকাশিত চিহ্ন পত্রিকা। ফেব্রুয়ারী ২০১৭ সংখ্যাটি মূলত গল্প সংখ্যা। ক্রোড়পত্রে ‘এ সময়ের গল্প ও গল্পধারার ঐতিহ্য’-পর্বে রয়েছে আলাপচারিতা, এ সময়ের ঊনত্রিশটি গল্প, গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ ও পুনর্মুদ্রিত প্রবন্ধ।

আলাপচারিতায় হাসান আজিজুল হক সহজ করে শুনিয়েছেন তাঁর জন্মস্থান, গ্রাম, পরিবার, লেখাপড়া, সাহিত্যপ্রীতি ও দুরন্ত কৈশোর-যৌবনের কথা। হিন্দু-প্রধান গ্রামে বেড়ে উঠেছেন। সম্পূর্ণ নিরক্ষর, কেউ পাঠশালায় যেত না। সেখান থেকে বৃত্তি পেয়ে, নানারকম হাউল পেরিয়ে তিনিই প্রথম গ্রাজুয়েট, হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে। এই রাঢ় এলাকার মধ্যে তাঁর বুকের মধ্যে ঢুকে গেছিলো একটা বিশাল মাঠ। প্রচুর পোড়ো মাঠ, দীঘি, ষাটতলার মাঠ। এটা এমন যে, ‘বাড়িতে বসে থেকেও মনে হত যে বিশাল মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তো এমন দিবাস্বপ্ন নিয়ে আমার অনেক সময় কেটে যেতো।’ সাপের মাথায় পা দিয়ে, তালগাছে উঠে তালপাড়া, বাজপড়া তালগাছের মাথায় উঠে পানিতে ঝাঁপানো —একটা দুরন্ত বাল্যকাল কাটিয়েছেন। গল্প লেখার জন্য দৌড়োদেড়ি করতে হয়নি তাঁকে। তাঁর খোলামেলা স্বীকারোক্তি …‘ইন সার্চ অব স্টোরি আমি কোনদিনই নই। এখনও আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে আমি গল্প তৈরি করতে পারদর্শী নই।… আমি অভিজ্ঞতা ছাড়া লিখতেই পারিনা।’

এই অভিজ্ঞতা আসে মাটি সংলগ্নতা থেকে, জীবন সংলগ্নতা থেকে। তার ভা-ার এখনো এমন ভরপুর যে তিনি এখনো গল্প, নভেলের পাশাপাশি ছোটদের জন্য লিখতে চান। … ‘যদি জীবনের স্বাদটা না থাকতো তাহলে এখনো বোধহয় পারতাম না। বাঁচার যে স্বাদ এটা যতোক্ষণ না মানুষের যায় ততোক্ষণ পর্যন্ত সে এ্যাকটিভ থাকে।’ পুরো কথোপকথনে হাসান আজিজুল হকের সজীবতা, ধার- সাহিত্য নিয়ে খোলামেলা ধারালো বক্তব্যকে প্রশ্নে প্রশ্নে উস্কে দিয়েছে চিহ্ন পত্রিকা। গল্প লিখতে লিখতে প্রবন্ধ লেখা, চিন্তাশীল কথা বলতে বলতে কালচার-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা, রাজনৈতিক দায়িত্ব এবং অনুবাদ… অর্থাৎ লেখা; আবহমান জার্নির মধ্যে রয়েছেন, এ্যাকটিভ রয়েছেন আটাত্তর বছর বয়সের এই যুবক। প্রত্যেক লেখকের কাছে শিক্ষনীয় তার এই জার্নি। চিহ্নর একটি মূল্যবান সংগ্রহ এই আলাপচারিতা।

ক্রোড়পত্রের গল্প ও গল্পের কথা বলার আগে আর একটি সাক্ষাৎকারের কথা বলি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমানের ইংরেজীতে দেওয়া সাক্ষাৎকারের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে, ‘বাংলাদেশের ইংরেজী শিক্ষা শিরোনামে।’ বৃটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা পেয়েছি তাদেরই পাঠক্রম আর তাদেরই নাম দেওয়া ডিগ্রি। এই পাঠক্রম থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে বলা হয়, ‘শিক্ষার মানের ক্রম-অবনমন ঘটছে। সারা পৃথিবীজুড়ে এই অবনমন ঘটছে। বর্তমানের মতো আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যেও ভাষার প্রচলন নাও থাকতে পারে। কারণ নতুন সুপার পাওয়ার রূপে চলে আসছে চীন। উত্তর উপনিবেশ ধারণায় বৃটিশ সা¤্রাজ্যেও অন্যান্য উপহার—যেমন সরকারি চাকরি, রেল ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থার মতো ইংরেজী শিক্ষারও একটি অন্ধকার দিক আছে —স্থানীয় ব্যবস্থার ভালো দিকগুলোর অনেকখানি ধ্বংস ও বিনষ্ট হয়ে গেছে এই শিক্ষায়। এই প্রেক্ষাপটে ইংরেজী সাহিত্যের চেয়ে ইংরেজী ভাষা শিক্ষাই বেশি যৌক্তিক : কেননা, তার মতে ভাষাটির কিছু ব্যবহারের দিক আছে, যা সাহিত্যেও নেই। ইংরেজী সাহিত্য পঠনের ক্ষেত্রে সিলেবাসে মূল ক্লাসিক ইংরেজী সাহিত্য পাঠ বাধ্যতামূলক করার পক্ষে প্রফেসর আলী আরিফুর রেহমান। সেই সঙ্গে তার দেশে অথবা পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে যা কিছু ইংরেজীতে লেখা হয়েছে সবকিছুই ইংরেজী শিক্ষার পাঠক্রমের মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলেছেন আধুনিক প্রযুক্তির গুণগ্রাহী প্রফেসর আলী। মনে করতেন যে, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের মতো পশ্চাৎপদ তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকের জন্যও সর্বশেষ সংস্করণের ল্যাপটপের মালিকানা নয়, বরং সকালের নাস্তার টেবিলের একটি গরম রুটির ব্যবস্থাই হবে বিলাসীতা। আমজনতার চক্ষুদানের প্রয়োজনেই—‘চারশত বছর ধরে যে সমস্ত লেখা ও দলিলাদি সমাধিস্ত হয়ে আছে তাদেরকে আলোর মুখ দেখান’। তরুণ শিক্ষকদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন অধ্যাপক আলী। নতুন চিন্তার দ্বার খুলে দেয় তার সাক্ষাৎকার। সাইদ হাসানের অনুবাদ চমৎকার ঝরঝরে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা নানা রকম—কেউ সাহিত্যে অতিবাস্তবতা-রক্তারক্তি – হানাহানি দেখতে চান না। কেউ চান কাঁদবার শক্তি। কেউ মনে করেন আনন্দ আর ভালো মানুষীর শিক্ষাই যদি লেখায় না থাকে, তবে সে কেমন লেখক! যিনি কাঁদাতে পারেন, হাসাতে পারেন তিনিই সফল সাহিত্যিক; আর যিনি হাসাতে কাঁদাতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত উদ্বেগ ডেকে আনেন, নিস্পৃহতা আনেন, চিন্তিত করে তোলেন—তিনি দুর্বোধ্য কথাসাহিত্যিক। কুকুরকে মারার আগে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার মতো একজন সাহিত্যিককেও একঘরে করে ফেলার জন্য প্রথমেই যে অপবাদটা দেওয়া হয়, তা হলো উনি তো দুর্বোধ্য লেখেন। “সংকট কোনখানে” প্রবন্ধে ইমতিয়ার শামীম খুব চমৎকারভাবে অতীত থেকে বর্তমান কর্পোরেট জগতে কথাসাহিত্যের সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন। গল্পবিষয়ক প্রবন্ধ বিভাগে অধিকাংশ লেখা পুর্নমুদ্রিত—সত্তর, আশি ও নব্বুইয়ের দশকের গল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন, যথাক্রমে সুশান্ত মৃধা, নাসরিন জাহান ও পাপড়ি রহমান।

জীবন বদলে যাচ্ছে। সমাজ বদলে যাচ্ছে। গল্পের চেয়ে আকর্ষণের কায়দা বদলে যাচ্ছে। পাপড়ি রহমান মনে করেছেন—‘এই ক্ষেত্রে নব্বই-এর চেহারায় প্রাণ আনতে যেন নবতর প্রেরণায় ফিজিক্যাল স্টোরির আমদানী প্রয়োজন’। ১৯৬৯ সালের আমাদের গল্পসাহিত্য প্রবন্ধে আবুজাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন—‘উল্লেখযোগ্য যে আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি এবং যন্ত্রপাতি প্রভৃতিও আমাদের গল্পে ক্বদাচিৎ দৃষ্ট হয়। বিমানপোত এমনকি সামুদ্রিক জাহাজও আমাদের গল্পের পটভূমি নয়। কিন্তু আমাদের গল্পসাহিত্যের এই গ্রাম কেন্দ্রিকতাকে নিন্দা করার কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না। আয়ত্তাধীন এবং পরিচিত উপকরণ নিয়েই তো আমরা লিখবো।’

বিশ^ায়নের ধাক্কায় পরিচিত চরাচর আয়ত্তাধীন থাকে না আমাদের। কর্পোরেট থাকার নিচে ক্রমশ বিলীয়মান গ্রামীণ সভ্যতা। লেখক পাঠক কেউই গ্রাম-কেন্দ্রিক নয়। গ্রামও সেই গ্রাম নেই। নগর মানেই শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণি নয়—সেখানে অন্য শ্রেণিগুলো আছে। শোষণ, আগ্রাসন এবং হিংসা এমন খাঁজ কাটা সেখানে ফিজিক্যাল স্টোরির আমদানি সহজ নয়।

সংকলনের উনত্রিশটি গল্প পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা-কেন্দ্রিক গল্পের মতো ঢাকা কেন্দ্রীক নয়। সূচনা গল্প ছায়াবাড়ি হাসান আজিজুল হকের এক অসামান্য নির্মাণ। সম্পন্ন গৃহস্থ মির্জা গালিব সাঁঝবেলায় মাটি থেকে ভেসে ওঠা খামার বাড়ি দেখলেন। দেখলেন ব্যস্ত মাহিন্দার, কিষাণদের, দেখলেন মরায়, লোহার সিন্দুক, কাঁঠাল কাঠের চৌকি। সারাবাড়ি জুড়ে শস্য উৎসবের ঝমঝমে ছবি। সে ছবি আকাশ-কুসুমের মতো মিলিয়ে গেলেও ভয় নেই। ‘শরীরের চামড়ার ওপরে নীল উল্কির মতো বাড়িটার ছবি তার মনে বসে গেছিলো।’ এই ছবি নিয়ে অন্ধকার মাঠে নির্ভয়ে নেমে পড়েছিলো মির্জা গালিব। ভূবনায়ন পাঠকক্রমে কৃষি অলাভজনক মৃত। মাঠের ফসল মাঠে শুকোয়, উয়ে লাগে পোকায় কাটে। এই পাঠক্রমকে ভুল প্রমাণ করতে আজিজুল হকের ছায়াবাড়ি। মুষ্টিবদ্ধ উত্তেলিত হাতের চিৎকার নেই। ভূমিহীন কৃষক নেই। সামন্ত মির্জা গালিব, তার সম্পন্ন গৃহস্থালীর ছবি এঁকেছেন লেখক তার নিজস্ব শৈলীতে। কিন্তু কিভাবে সেই বাড়িটার জেগে ওঠা আর মিলিয়ে যাওয়ার জলছবি পাঠক অনুভব করেন নিজেরও চামড়ার গভীরে। সেঁধিয়ে যান কথাকার হাসান আজিজুল হকের নিজস্ব উপনিবেশে।

সবগল্প নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। ধর্মান্তরিত মানুষ কি ভুলে যেতে পারে সংস্কার, শিল্পীসত্তা—দুইজন দুই ধর্ম নিয়ে কি এ সংসারে থাকতে পারে। বড় চমৎকার ধরেছেন নাসরিন জাহান তাঁর গরঠিকানিয়া গল্পে। রাখাল রাহার একটি পুকুরের কাহিনী আর শহীদ ইকবালের গোসাইপাড়ার এজমালি জমির মাঝে অনেক ক’টি গল্প। মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, নির্বাচনী কিসস্যা, জবাই, ধর্ষণ থেকে গ্রামের মাঠ খাওয়ার কাহিনী উঠে এসেছে এইসব কিসস্যায়। ‘যা খুশি বানিয়ে বানিয়ে ফ্যাচর ফ্যাচর নয়।’ ইফতেখার মাহমুদের গল্পের চরিত্র আজিজুল সাহেবের মতো পাঠকও জড়িয়ে যান আজ-কাল-পরশুর গল্পে। গল্পগুলির রচনাকাল উল্লেখ থাকা জরুরী ছিল। পত্রিকা শেষে বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের গল্প ও গল্পতালিকাটি মূল্যবান।

সুবন্ত যায়েদ, প্রতিমা মিত্র প্রীতি, নাজমুল হাসান পলক- আমার রাজশাহী শহরের বন্ধুরা লিখেছেন এ সংখ্যায়। চিত্তের প্রসারতা মস্তিষ্কের মুক্তি উচ্চারণ যে পত্রিকার, সেই পত্রিকার সম্পাদক শহীদ ইকবালকে আমাদের আনত অভিবাদন। বিশ^বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করে এই রকম একটি পত্রিকা প্রকাশ সত্যি অসাধারণ। জ্ঞান-প্রজ্ঞা-মননের সঙ্গে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজ-মানুষের প্রতি নিখাদ ভালবাসা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে এ কাজ অস¤ভব। পত্রিকায় স্মরণ করা হয়েছে শহীদ কাদরী ও সৈয়দ শামসুল হককে। তাঁদের উদ্দেশ্যে চমৎকার শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন পত্রিকার সম্পাদক। সব নিয়ে চিহ্ন ঋদ্ধ করেছে আমাকে, মুগ্ধ করেছে, গর্বিত করেছে।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা