প্র ব ন্ধ

জুলফিকার মতিন
আত্মার চিৎকার

বাংলা কবিতা-জগতে শামসুর রাহমানের স্থায়িত্ব নিয়ে, বোধ করি, কারোরই কোন সংশয় অবশিষ্ট নেই। তবে এই স্থায়িত্ব নির্ধারণের জন্য আলোচনা-সমালোচনার ক্ষেত্রে যে ধরণ-ধারণ অনুসৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বলাটা একবারে অনায্য নাও হতে পারে। শিল্প-সাহিত্য আলোচনা-সমালোচনার কিছু রীতিসিদ্ধ পদ্ধতিও ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যে ছিল না জন্যই, বোধ হয়, সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রের দ্বারস্থ আমরা যেমন হয়েছি, তেমনই ঔপনিবেশিকতার কারণে ইংরেজী সাহিত্য থেকে তার নতুন চেহারা-চরিত্র বিনির্মাণেও কোন পশ্চাদপদতা ছিল না বলে তাদের লিটারেরী ক্রিটিসিজমের মানদ- আত্মস্থ করতে আমাদের কোন দ্বিধা জাগেনি। সংস্কৃত অলঙ্কারবাদীদের কথাটা ছিল অনেকটা সোজা-সাপটা। নারী-শরীর প্রসাধিত করার মতই কবিতাতেও যেন তার অন্যথা যেন না হয়। আর শুধু কবিতা কেন, শিল্প-সাহিত্যের সবটাই তো শব্দের সমাহার। কাজেই সেটাকে যাদুময় করে তুলতে না পরলে বাজারে গিয়ে আলু-পটল কেনার ভাষার সাথে তার পার্থক্যই বা থাকল কোথায়? সুতরাং সেটা যদি না থাকে তবে ব্যবহার করতে করতে সাবান যেমন নিঃশেষিত হয়ে যায়, ভাষাও সে ভাবেই এসে ঠেকবে তলানিতে। কাজেই তাকে সাজাতে হবে মণি-মুক্তো-হেম অলঙ্কারে। তার হীরক দ্যুতি যেন অন্ধকারে জ্বলতে তাকে অহর্নিশ। কিংবা তাকে শুধু মাত্র বাচ্যার্থের ভেতর বন্দী করে রাখলে চলবে না। তার সীমা অতিক্রম করতে থাকবে অভিধেয়ার্থকে খুঁজে-পেতে। ধ্বনিবাদীরা এ ভাবেই চেয়েছেন এক রহস্যময় জগৎ খুলে দিতে। আবার কখনও ধ্যেয় করে তোলা হয়েছে বিশেষ রীতিকে। রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্প-বাকপ্রতিমা কিংবা অনুপ্রাস-উপমা— কোনটাই বা পাওয়া যায় না সেখানে! আর এসব তো করা হয়েছে আসলে রসের ভা-ারটাই যাতে হয় পরিপূর্ণ। তবে আমার বিবেচনাতে বিপদ সেখানে নয়, সমস্যা হল, তা জুটছে আপদ হয়ে। আর আপদ বিপদের গল্পটা না বললে, জিনিসটা পরিষ্কার করা যাবে না, বোধ করি। সেটা হল, কথাটা কতটা সত্য, নিশ্চয় করে বলতে পারব না, তবে যা শুনেছি, তা হল এই। একবার বঙ্কিমচন্দ্র পরীক্ষা দিচ্ছিলেন মৌখিক। হতে পারে সেটা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেসীর। ওসব হতে গেলে তো পরীক্ষা দিতেই হবে! সেখানে এক ইংরেজ সাহেব না কি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিপদ কি, আর আপদ কি? বঙ্কিমচন্দ্র তার উত্তরে এ রকম বলেছিলেন, রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে, সেটা হয় বিপদ, আর আপনি ইংরেজ সাহেব বাংলা শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করছেন, এটা হল আপদ। এখন এই সংস্কৃত সাহিত্য-সমালোচনা রীতি পাঠকদের জন্য কতটা আপদের সৃষ্টি করেছে, তা বয়ান করার জন্যই এই কথাগুলোর অবতারণা।

পাশপাশি পাশ্চাত্য সাহিত্য-সমালোচনা রীতির খোল-নলচেটাও দেখা যাক। তারা বলেছেন সাবজেক্টিভিটি আর অবজেক্টিভিটির কথা। এতে কি কিছুটা মজা পাওয়া যাচ্ছে না! কবি নিজের কথাটাই বলেন। অন্যের জবানীতে অনেক কথা বললেও তা তার নিজেরই হয়ে যায়। প্রকৃতিগত ভাবে দুটো জিনিস আলাদা হতে পারে, কিন্তু যে প্রাবৃত্তিক বিষয়গুলো তার অন্তর্গত বুননে থাকে, তা তো সার্বজনীন। সুতরাং সেখানে একটা ভেদরেখা তৈরী করে অতিরিক্ত জটিলতা আনা কি আদৌ আবশ্যক? এ ছাড়া, রিয়ালিজম, রোমান্টিসিজম, আবার ম্যাজিক রিয়ালিজম, এসব তো আছেই— এক্সপ্রেসনিজম, ইমপ্রেসনিজম, সুররিয়ালিজম, এক্সিসটেনসিয়ালিম, ডাডাইজম, মার্ক্সিজম ইত্যাদি করতে করতে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে পোষ্ট মডার্নিজমে। ইদানীং আরও আরও অনেক তত্ত্বের রপ্তানী, তারাও যেমন উদগ্রীব হয়ে করছে, আমরাও যুগোপযোগী হবার নিরন্তর সাধনায় তা নিতে কার্পণ্য করছি না। বরং তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে গর্বের ও গেীরবের। ভূখ-গত সা¤্রাজ্যবাদ চলে গেছে, সুতরাং তাদের ভাষায় এটা হল পোষ্ট-কলোনিয়াল যুগ। বিশ্বপুঁজির দাসানুদাস হয়েও আমরা তাই আনন্দে বগল বাজাচ্ছি। একদিকে আমরা যেমন নিচ্ছি মুক্তবাজার অর্থনীতির সবক, একই সাথে হয়ে পড়েছি তাত্ত্বিক আগ্রাসনেরও শিকার। এর ফলে পাঠকের জন্য যেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা হল স্বতঃস্ফূর্ততা বলে কিছু থাকছে না। কবিতাই বলি আর শিল্প-সাহিত্যই বলি, তারও একটা ভার্জিনিটি আছে। তাতে বাঁধাগ্রস্ততা আনাটাই হচ্ছে এ সবের মূল কাজ। সেটা করে দেয়া একটা ফরম্যাটের ভেতর রসানুভূতির আনন্দটাই করে দেয়া হচ্ছে বিনষ্ট। মানুষ তো আগে ভাষা আয়ত্ত করে, ব্যকরণ-এ লেখা হয় তার নিয়ম-কানুন। একজন নিরক্ষরও ভাষার ব্যবহার করে থাকে স্বচ্ছন্দে। শিল্প-সাহিত্যের রস উপভোগের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সে রকম নয় কি? শিল্প-বিচারের রীতিনীতি শিখে তার পর তার স্বাদ নিতে হবে, আসলেই মনে হয় এটা একটা বাহুল্য বিষয়।

বিপদ বোধ করি আরেকটা আছে। শিল্প-সাহিত্যের আলোচনা-সমালোচনা করাটা অনেকের কাছেই পা-িত্য প্রদর্শনের একটা বিরাট অছিলা। বিভিন্ন বিজ্ঞজনের মন্তব্য-মতামতাদি কোটেশন আকারে নিয়ে এসে নিজের পাঠ-পরিধির বিপুলতা তুলে না ধরলে যেন কিছুতেই তারা শান্তি পান না। তাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই পাঠক শিল্প-সাহিত্যের অর্থ বুঝে যাবে, সেটা মনে হয় তাদের অসহ্য। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের আকাশ দেখার লাইসেন্স না পেলে কি চলে? পাঠকদের এতটা মূর্খ ভাবার সত্যিই কোন কারণ আছে?

প্রসঙ্গতঃ একটা কথা বোধ হয় স্পষ্ট করেই বলা যায়, তা হল, সব কিছুকেই গড়পরতা দেখার প্রবণতা। যেমন নর-নারীর কিংবা যৌন কোন বিষয় এলেই ফ্রয়েড সাহেবকে টেনে নিয়ে আসা। মানব সমাজের ধারাবাহিকতাকে প্রবহমান রাখার জন্য অন্যান্য প্রাণীর মতই প্রজননই তার প্রক্রিয়া। বিপরীত লিঙ্গদ্বয়ের মিলনই এর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। অন্যান্য প্রাণী এ জন্য ব্রিডিং পিরিয়ড থাকলেও নরনারীর একটা বাড়তি সুবিধা হল যখন-তখনই ও কাজে লিপ্ত হবার ক্ষমতা। এ জন্য যেটাকে আমরা কামবাসনা বলি, তার অন্ধিসন্ধিরও কোন যেন শেষ নেই। এই সম্পর্কটার ওপরে সমাজে পরিবারে ক্রমে ক্রমে একটা নৈতিক ভিত্তিও দাঁড়িয়ে গেছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ পর্যন্ত তার একটা ধরন আমরা লক্ষ্য করি। পরবর্র্তী সময়ে পুরুষতান্ত্রিকতা শুরু হলে তার মাত্রারও বদল হতে থাকে। বিবাহ প্রথার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়াটা বর্তমানে তার একটা, বলা যেতে পারে, চূড়ান্ত পর্যায়। এর ভেতর দিয়ে কাকে বিবাহ করা যাবে আর না যাবে কিংবা কার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত আর অনুচিত, তার একটি সামাজিক অনুশাসনও কঠোর ভাবেই পালন করা হয়ে থাকে। কার্যতঃ তা আমাদের প্রবৃত্তিকেও বদলে দিয়েছে। এবং বলা যায়, অসচেতন ভাবেই আমরা তা অনুসরণও করে থাকি। কাজেই, আমাদের যৌনতারও যেমন একটি বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, অনুরূপ ভাবে কালে কালে তার বিবর্তিত চেহারা তৈরীরও কোন শেষ নেই। সামাজিক মানুষ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতাকেও একটি কালের ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ করে রাখি। আর তার বাত্যয় হলেই সেটাকে ফ্রয়েডীয় বলে বগল বাজাতে হবে, এটা কি কোন কাজের কথা হয়? কিন্তু সর্বত্রই তাই তো হচ্ছে। আর ফ্রয়েড সাহেবকে সাক্ষী মেনে তার যথার্থতা প্রমাণেও কোন কার্পণ্য করছি না। তবে এটাও তো সত্যি যে যৌন সম্পর্কের একটা স্টা-ার্ডকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর তত্ত্বকে নিয়ে এসেছেন। সেটা তো চিরকালের কিছু নয়।

আবার মার্কসেরও ঐ একই অবস্থা। শোষণই বলি আর নির্যাতনই বলি, ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবার পর, নানা মাত্রায় তার আকার-প্রকার পরিদৃষ্ট হয়ে আসছে। সম্পদ বণ্টনের বিষমতাও ঘটছে ঐ একই কারণে। তাঁর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন, সেটাকে অযৌক্তিক বলারও কিছু নাই। তবে এটাও ঠিক, তাঁর ঐ ব্যাখ্যা আসার আগেও যেটাকে শ্রেণীসংগ্রাম বলা হয়, পৃথিবীতে তাও হয়েছে সংঘটিত। অর্থাৎ হ্যাভ ও হ্যাভনটের লড়াই নতুন কিছু নয়। অত্যাচরিত ও শোষিত মানুষ দুর্বল ও অসংগঠিত হলেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার ঘটনা তো ঘটেছে। তখন তারা বিকল্পহীন ভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যে ভাবেই দেখুন না কেন, মানবাধিকার একটি মৌলিক জিনিস। এই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও মানব সমাজে নানা সময়ে নানা ভাবে এসেছে। অর্থনীতির কথাটা বলা হলেও আসলে তো তা সম্পদেরই পরিপুরক। এবং তা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু সমস্যা হল এটাকে করে তোলা হয়েছে কেতাবী। সেখানে তৈরীও করা হয়েছে মার্কসের পারসোনালিটি কাল্ট। এই সঙ্গে এটাও পরিহাসের যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বাস্তবতার সাথে কোন সম্পর্ক না রেখেই এই তত্ত্বটাকে ফ্যাসান হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে যত্রতত্র।

আমার এ সব কথাকে বাগাড়ম্বর বলেই বোধ হতে পারে। বিশেষ করে শামসুর রাহমানকে নিয়ে কিছু বলার সময় কেন এই প্রশ্নগুলোকে উত্থাপন করছি, আপত্তি উঠতে পারে সেখানেও। কেন না, এই সমস্যা তো শুধু তাঁকে নিয়ে নয়। তবে তাঁকে উপলক্ষ্য করে প্রসঙ্গটি অবতারণা করার অর্থ হল, তিনি বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। বাংলা কবিতার ইতিহাস চর্চায় পালা বদলের তিনটি সুস্পষ্ট রূপ লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু কবিতা লেখাটা কিংবা সাহিত্য করাটা কোন প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, প্রত্যেকের প্রত্যেক সৃষ্টিই মৌলিক ও স্বতন্ত্র, এ কারণে অলিম্পিকের হানড্রেড মিটার স্পিণ্টের মত স্থান নির্ধারণের কোন ব্যাপারও এখানে নেই। কিন্তু বাস্তব বিষয় হল, সব কবিই সমানে ভাবে পঠিত হন না। প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্য কিংবা রাজনীতি ও অন্যবিধ কারণেও অনেককেই সামনে ধরে রাখা হয়। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে, বিশেষ করে, নতুন একটি প্রযুক্তির দাপট শুরু হয়েছে, আমরা যাকে বলি মিডিয়া। তাকে তো আসলে শাসন করছে পুঁজি। কাকে লেখক বানাতে হবে আর কাকে লেখক বানানো যাবে না, তার সবক যে তারা দিচ্ছেন না, তাও নয়। আর পুঁজি ব্যবহারের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা। সুতরাং মুনাফাটা কি সে বেশী আসবে, সে হিসেবটা তো আছেই। বর্তমানে তার ধরনও বদলে গেছে। প্রিণ্ট মিডিয়াই আর এখন একমাত্র  মিডিয়া নয়। এক সময় তো লেখ্যরীতির প্রবর্তন হবার পর হাতে লিখে পুথি সংরক্ষণ করা হত। তারপর মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কারের পর তার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হলেও সীমাবদ্ধতা তারও ছিল। গ্রন্থ প্রকাশও এমন কোন সহজ ব্যাপার ছিল না। আপনারাই বলুন, না হলেও লেখা শুরু করার পর প্রায় দেড় যুগের মতো সময় লেগেছিল শামসুর রহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের, কেন? তাঁর তো প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল ১৯৪৩ সালে নলিনী কিশোর গুহ সম্পাদিত ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকাতে। তার পর কেটে যায় প্রায় সতের বছর। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ —‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। অনেকেই স্টাণ্টবাজি খুঁজে পেয়েছিলেন নামকরণের মধ্য দিয়ে। যা হোক সেটা তো ভিন্ন প্রসঙ্গ। এই দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর যা সব লেখালেখি, তা তো পত্রপত্রিকার পাতাতেই। আর পত্র-পত্রিকা, যেখানে গল্প-কবিতা ছাপা হত, তার সংখ্যাই বা কত কম ছিল। কাব্য সংকলনও প্রকাশিত হত না যত্রতত্র। বিভাগোত্তর কালে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নব উদ্দীপনার সূত্রপাত ঘটে। নতুন দেশ। পূর্ববঙ্গ তার একটি প্রদেশ। ঢাকা তার রাজধানী। কলিকাতা কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যচর্চাতে যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন তাদের অনেকেই এসে স্থিত হতে থাকেন এখানে। তখনকার দিনের বিখ্যাত সাহিত্য পত্র-পত্রিকা যেমন মাসিক সওগাত কিংবা মাসিক মোহাম্মদীরও স্থানান্তর ঘটে। সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমেদ, আবদুল কাদির কিংবা আহসান হাবীবের মত কবিরা— শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, কাজী আফসার উদ্দিন ও শামসুদ্দিন আবুল কালামের মতো কথাশিল্পীরাও বসবাস শুরু করেন। দেশ বিভাগ (১৯৪৭)-এর দুবছরের মধ্যেই একটি উচ্চাভিলাষী কাব্য সংকলন প্রকাশের দুঃসাহসও লক্ষ্য করা যায়। তখনকার হিসেবে তেমন প্রতিষ্ঠিত কবিদের ছাড়াই অপেক্ষাকৃত তের জন তরুণের একাধিক করে কবিতা সংকলিত হয় এতে। নাম দেয়া হয় ‘নতুন কবিতা’। এটি সম্পাদনা করেছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খান। শামসুর রাহমানের কবিতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল তাতে। এর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাঠকের দৃষ্টিসীমার মধ্যে। আর এই সংকলনের ভেতর দিয়ে, বলা যায়, কবি হিসাবে তাঁর প্রথম প্রতিষ্ঠা। এর পর তো ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারীর বিস্ফোরণ। তার পরে বছরেই  এই আত্মত্যাগের অগ্নিঝরা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে প্রকাশিত হয় হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’। তাতেও ছিল শামসুর রাহমানের কবিতা। এটি অবশ্য শুধু কাব্যসংকলন ছিল না। তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের আগের আরও দুটো প্রকাশিত কাব্য সংকলনের উল্লেখ করাটা, বোধ করি বাহুল্য হবে না। কেন না, ‘নতুন কবিতা’ তো ছিল নির্বাচিত কবিদের। আর ও দুটো কাব্যসংকলনকে মোটমুটি ভাবে প্রতিনিধিত্বমূলক করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার একটি ছিল মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্পাদিত ‘পূর্ববাংলার কবিতা (১৯৫৬)। অন্যটি আবদুর রশীদ খান ও মোহাম্মদ মামুন সম্পাদিত ‘প্রেমের কবিতা’। এ সব সংকলন যে, পাঠকদের চোখ এড়িয়ে যায় নি, সে কথাও বোধ করি বলা যেতে পারে। বলাবাহুল্য এগুলিতেও ছিল শামসুর রাহমানের কবিতা। আর এখন? প্রকাশ-মাধ্যমের সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে সব লেখা সব পাঠকের সামনে আসে না। কাজেই সব কবিই যে সার্বজনীননভাবে সমান গুরুত্ব পান কিংবা পঠিত হন, তাও নয়। তার পরও ধারাবাহিকতার পর্যায় বিবেচনা করলে একটি প্রতীকী ব্যাপার এসে যায়। সেই হিসেবে মাইকেল একটি স্তর, রবীন্দ্রনাথ আরেকটি। তৃতীয় স্তরে যার কথাটি আসে, তিনি জীবনানান্দ। বলা যায়, গত পঞ্চাশ বছর ধরে তাঁর এই ভাবমূর্তি তৈরী হয়ে চলেছে। এর মধ্যেই শামসুর রাহমানও এসে গেছেন। এখন এই প্রশ্ন করাই যেতে পারে, তিনি কি নতুন স্তরের সূচনা করেছেন, কিংবা তা করতে সক্ষম হয়েছেন?

এই প্রশ্নের জবাবটা, বোধ করি, সরাসরি দেয়া যায় না। এ বিষয়ে কোন সরল সমীকরণ করাটাও যথার্থ হবে না। কেন না, এটা ঠিক যে জীবনানন্দও বাংলা ভাষার কবি। শামসুর রাহমানও তাই। কিন্তু কথা হল, জীবনানন্দ বেঁচে-বর্তে থেকে, জীবনের প্রায় অর্ধ-শতাব্দী পার করে, প্রৌঢ় বয়সে বাংলাদেশের ভাগ দেখেছেন। আর শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা ঘটেছে যৌবনে প্রবেশ করার পর। জীবনানন্দ তার মৃত্যু-পুর্ববর্তী কাল যে দেশে কাটিয়েছেন, সেটা বাংলাভাষী অঞ্চল হলেও সাংবিধানিক ভাবে তা তাঁর জন্মভূমি ছিল না। শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে অবশ্য তা হয়নি। তিনি জন্মভূমিতেই থাকতে পেরেছিলেন। যে রাজনীতির জন্য এই ভাগাভাগি হয়েছিল, আপাতদৃষ্টিতে তো বটেই, কার্যতও তাতে দুজনের কারও কোন দায় ছিল না। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ পাকিস্তান ইস্যুতে নির্বাচন করেছিল। ইলেকটরাল কলেজ ছিল সেপারেট। জীবনানন্দের সেখানে ভোট দেবার সুযোগ ছিল না। আর শামসুর রাহমানের তো ভোটাধিকার প্রাপ্তির বয়সই হয়নি। কিন্তু কোন দায় না থাকলেও ভোগ তো করতে হয়েছে দায়ভার। দুজনকে হতে হয়েছিল দুই রাষ্ট্রের অধিবাসী। যতই বলা হোক, ‘নানানবরণ গাভীরে তার একই বরণ দুধ, জগৎ ভরমিয়া দেখলাম আমি একই মায়ের পুত’ — কিন্তু রাষ্ট্র যখন আলাদা হয়ে যায়, আলাদা হয়ে যায় তার ভাষাও। তার দর্শন, তার ফোকাস,— সভরেইনটি বলে একটা কথা আছে না? ধর্মীয় ভাগাভাগিটাই এখানে ছিল প্রধান। সাংবিধানিক ভাবে যাই থাক, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তাদের কালচারটাই হয়ে উঠবে মুখ্য — এতে আর আশ্চর্যের কি আছে? আর পাকিস্তানে আইনমন্ত্রী ‘হিন্দু’ যোগেন্দ্রনাথ ম-ল হলেও সেটকে তো বানাতে হবে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’। পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রায়শ্চিত্ত করলেও, শামসুর রাহমান নিজে তার অংশীদার হলেও, বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতটা আর এক থাকেনি দুদেশেরই বাঙালীদের জন্য। একটি দেশ, শত সীমাবদ্ধতা নিয়েও গড়ে উঠতে সচেষ্ট ছিল একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে। আর অন্য দেশে? চলেছে সামরিকতন্ত্র আর সামরিক শাসন। কাজেই, জীবনযাপন থেকে শুরু করে উৎপাদন ব্যবস্থা— সর্বত্রই তৈরী হয়েছে ভিন্নতা। চাওয়া-পাওয়ার মাত্রাও গেছে বদলে। আর ভাষা — যা জীবনের প্রকাশিত রূপেরই প্রতিচ্ছবি, তা কি থাকতে পারে এক রকম?

ব্যক্তি অনুভূতি কিংবা সমাজ মানসের গড় কিংবা রাজনৈতিক ও অন্যান্য উচ্চাভিলাষ, তাও ভিন্ন হতে বাধ্য। আবার  সমাজ অনুশাসনের শৃংখলা কিংবা নৈতিকতা-অনৈতিকতার বোধ প্রাবৃত্তিক ফরম্যাটটাকেও করে দেয় ভিন্ন। এ জন্য সাধারণ ভাবে নরনারীর সম্পর্ক ও কামবাসনার তীব্রতা যতই থাক, তার ডাইমেনসনও হয়ে যেতে পারে আলাদা। কাজেই ভিন্ন ভাষায় লেখা না হলেও — ভাষাগত কোন পার্থক্য না থাকলেও, হৃদয়ানুভূতির প্রকাশ কিংবা অভিজ্ঞতার রূপায়ণ যে একই রকম হবে, তার আশা করাই তো অন্যায়। যদিও আমরা জানি, মানবিক প্রবৃত্তিগুলো, যেমন প্রেম-ভালবাসা-মায়া-মমতা-সেবাপরায়ণতা কিংবা ঘৃণা-জিঘাংসা— অসুয়াবৃত্তিগুলো, মানুষের লাল রক্তের মতই সার্বজনীন, কিন্তু তার প্রকাশের ক্ষেত্রমূহও এ রকম বাস্তব কারণেই আলাদা হয়ে যায়। এটা যে আরও কত স্পষ্ট, তা তো বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা শঙ্খ ঘোষ, যদিও তাঁদের কবিতা নিয়ে আমরা অনেকেই বেশ গদগদ, সেই সব কবিতার সাথে এখানকার সৈয়দ শামসুল হক কিংবা হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা পাশপাশি রাখলে। সানাউল হক কিংবা বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কথা নাই বা বললাম। শামসুর রাহমানের সাথে জীবনানন্দের এ ধরনের তুলনা অবশ্য সরাসরি করা যায় না। জীবনানন্দ বেঁচে থাকতেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করলেও কবি হিসেবে তাঁর পূর্ণতা এসেছে পরে। শামসুর রাহমানের, বিশেষ করে তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাবের কথাটিও অনেকে বলে থাকেন। এ রকম প্রভাবও, আমার মনে হয়, পূর্ববর্তী অনেক কবিরই পরবর্তী কবিদের ওপর থাকে। রবীন্দ্র অনুসারী কবি বলতে যেমন আমরা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে কালিদাস রায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচীসহ অনেকইে বুঝে থাকি, কিংবা নজরুল অনুসারীর কবি বলতে যেমন বেনজীর আহমদ, মঈনুদ্দিন, আবদুল কাদির, শাহাদৎ হোসেন প্রমুখদের বলি, এখানে বিষয়টা অবশ্যই সে রকম নয়। ভাষা এক— ভৌগলিক অবস্থানও কোন পৃথক কিছু নয়,— ঐতিহ্য-ইতিহাসের ধারাবাহিকতাতেও অবগাহন একই সাথে। সুতরাং বিষয় ও ভাবে কিংবা চিত্রকল্প সৃষ্টিতে সমিলতা আসতেই পারে। তবে মোদ্দা কথা হল, ইংরেজী ভাষার সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায় বৃটিশদের রচনা থেকে আমেরিকানদের রচনা আলাদা, অষ্ট্রেলিয়ানদের যেমন আলাদা, এমন কি বংশগতভাবে অ-ইংরেজী ভাষীদের লেখা যেমন আলাদা, তেমনই বাংলাদেশের লেখকেরাও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের চেয়ে স্বতন্ত্র জগৎ নির্মাণ করে চলেছেন। এই হিসেবে জীবনানন্দ পর্যন্তও বাংলা কবিতার একটা পর্যায় যেমন সৃষ্টি হয়েছে, শামসুর রাহমানে এসে তার পালাবদলের বেলাতেও কোন অন্যাথা নেই। কাজেই, ও ভাবে মিল খুঁজে কিংবা তুলনামূলক বয়ান সৃষ্টি না করে সাহিত্যের সার্বজনীনতার বিষয়টিকেই কেবল মুখ্য করা যেতে পারে। তার কারণ, সাহিত্যই বলি আর কবিতাই বলি, তা যে দেশেরই হোক আর যে ভাষারই হোক, তাতে মানবীয় প্রবৃত্তিজাত বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে যায়। তাতে যে সৌন্দর্যের দ্যুতি স্ফুরিত হয়, তা কোন বিশেষ গ-ীর মধ্যে সীমাবদ্ধও থাকে না। শেষাবধি তা হয়ে ওঠে মানব জাতিরই মানস সম্পদ। কবে লেখা হয়েছে রামায়ণ-মহাভারত কিংবা ইলিয়াড-ওডেসী? বিশেষ কালের কিংবা বিশেষ স্থানের হলেও, এই এত দিন পরে এসেও তার রস উপভোগের কোন বাত্যয় হয় কি? হেলেন কিংবা দ্রৌপদীকে কি মনে হয় তারা অনাত্মীয়?

কথাগুলো বলছি এ জন্যই যে শামসুর রাহমানকে নিয়েও অনেক লেখালেখি হয়েছে। সে সব লেখালেখিতে তাত্ত্বিক আগ্রাসনও, বোধ করি, এমন কিছু কম হয়নি। কথাটা আবারও বলছি এ কারণে যে দীর্ঘ দিন আমরা বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিলাম। কালে কালে ভারতবর্ষে বহিরাগতরা এসেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতারও অধিকারী হয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ইসলাম ধর্মের অনুসারী বিভিন্ন জাতির মুসলমানের কথাটা বিশেষ ভাবে বলা যায়। তবে সিন্ধুদেশে মুহম্মদ বিন কাসিমের মুসলিম বিজয়ের পর  কোন দীর্ঘস্থায়ী শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ভারতবর্ষের সম্পদের একটা আকর্ষণ ছিল। সুলতান মাহমুদও, জনশ্রুতি মোতাবেক সতের বার ভারত লুণ্ঠন করেন। কিন্তু কোন স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপার তাঁরও ছিল না। দ্বাদশ শতাব্দীতে মহম্মদ ঘোরীই, বলা যায়, ভারতবর্ষে তাঁর অধিকৃত অঞ্চল শাসনের জন্য শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।  তাঁর ‘ক্রীতদাস’  কুতুব উদ্দিন আইবেককে ভার দিয়েছিলেন দিল্লী ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকা শাসনের। ঘোরীর মৃত্যু হলে কুতুব উদ্দিন শাসন কার্যে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সার্বভৌমত্বের। এ ভাবে দিল্লী থেকে মুসলিম শাসনের শুরু হলেও, শাসন কার্যে পরিবারতন্ত্রের পরিবর্তন হলেও, ধীরে ধীরে আসমুদ্র হিমাচলই তাদের শাসনভুক্ত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃটিশ অধিকার শুরু না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতারও অধিকারী ছিল তারাই। প্রায় সাতশ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন জাতির ভাগ্যন্বেষণে আসা বহিরাগত মুসলমানেরা আর ফিরে যায়নি। এ ভাবে তারা যেমন রূপান্তরিত হতে থাকে এ দেশের স্থায়ী অধিবাসীতে, অনুরূপ ভাবে স্থানীয় অধিবাসীদের ধর্মান্তর প্রক্রিয়াও চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়াতে, হয়ত কিছু, সামাজিক সমস্যাও রয়েছে, তা হল আরব-ইরান থেকে আসার অহেতুক জাত্যাভিমানের অহমিকা। তবে সেটা তো ভিন্ন জিনিস। সুতরাং ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে একদল হিন্দু যে ভাবে মুসলমানদের রহিরাগত বলে, তাদেরকে ‘যবন’ অর্থাৎ বিদেশী বিবেচনা করে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছিল, তা যে যথার্থ ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বৃটিশদের ব্যাপারটা তেমন ছিল না। কখনই তারা এ দেশকে নিজেদের মনে করেনি। এ কারণেই তাদের শাসন ছিল সা¤্রাজ্যবাদী শাসন। তাদের অধীনে ভারতবর্ষ ছিল পরাধীন। আর তাদের এই সা¤্রাজ্যবাদ ছিল ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি উপজাত। এটি আসলে ছিল নতুন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা, যার সাথে এ দেশের অধিবাসীদের পূর্ব পরিচয় ছিল না। একটি কৃষিভিত্তিক দেশে পুঁজি সংগঠনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক পরিবর্তন যে নতুন সামাজিক শ্রেণী জন্ম দিতে থাকে, তার ফলাফল তো ভিন্ন রকম হবেই। সুতরাং  এ কথা স্বীকার করে নিতে কোন দ্বিধা থাকা উচিৎ নয় যে তাদের এই ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার অবস্যুট থেকেই আমাদের দেশে যে উৎপাদন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে, তারই ধারাবাহিকতা এখনও আমরা বহন করে চলেছি। আমাদের যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, আইন-আদালতের অর্থাৎ জীবনযাপনের রাষ্ট্রীয় সব ধরনের কার্যক্রমেই তারই আদল প্রতিফলিত। ইউরোপীয় রেঁনেসা থেকে আহরিত কিছু আদর্শবাদও আমরা পেয়েছি। মৌলিক অধিকার— মানবাধিকার — এগুলো তো আছেই, — ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং আরও যত স্বাধীনতার লাইসেন্স আছে, সবই সেখান থেকে নেয়া। শিল্প-সাহিত্যের নতুন আদল, তার বিচার-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, —বাদ নেই এ সবও। আমার এত কথা বলার উদ্দেশ্য, সেখানে তাত্তিক আগ্রাসনও এ ভাবেই এসেছে। এবং এই আসাটা অব্যহতও রয়েছে। কেন না, আমাদের দেশটা এখন ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিরই সম্প্রসারিত রূপ— বিশ্বপুঁজির দ্বারা শৃংখলিত। এই কাজটা তো করা হচ্ছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই। না হলে যে ইউরোপীয় রোমান্টিকতাকে রবীন্দ্রনাথ দেশীয় ছাঁচে ফেলে নিজেদের করে দিয়েছিলেন, তাকেই অস্বীকার করার নামে প্রথম মহাযুদ্ধ পারবর্তী কালে, যাদের আমরা তিরিশের কবি বলে মালা পরিয়ে রেখেছি, তারা — ভাবখানা এই যে ‘আন্তর্জাতিক’ হয়ে পড়লেন। ঠিকই আছে, সাহিত্যেরও নেই কোন দেশ ও কালের সীমা, তার সার্বজনীন মর্মটাকে আত্মস্থ করাও একটা বড় কাজ। কিন্তু পাশ্চাত্যের ইনডাষ্ট্রিয়াল সোসাইটির ভাইসেসগুলো থেকে যা সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের এখানে যা একবারেই অনুপস্থিত, গ্রহণ করতে হবে কি তা সমাদরে? এই যে সুররিয়ালিজম, এক্সিসটেনসিয়ালিজম কিংবা ডাডাইজম-নিহিলিজম, যে সম্পর্কে আগেও কিছু বলেছি, তা, বলতে পারেন, আমাদের জন্য কোন অর্থে পজিটিভ? ঔপনিবেশিকতা তো নতুন ফর্মে এখনও আছে, সেটাকেই ঔপনিবেশিকরা উত্তর ঔপনিবেশিকতা বলে পোষ্ট মডার্নিজমের শ্লোগান তুলেছে, তারই বা বাস্তবতা কি? আমাদের দেশের একটা বড় অংশের মানুষ, প্রতীকি অর্থেও বলা যেতে পারে, এখনও মাটির সানকিতে ভাত খায়, সে দেশের রাজধানী ঢাকা শহরে বসে নিউইয়র্ক কিংবা প্যারিসের হৃদস্পন্দন কল্পনা করা যেতে পারে, কিন্তু তার বাস্তব ভিত্তি কোথায়? তাই শামসুর রাহমানকে যখন আমরা নাগরিক কবি বলি, তার অন্তর্বয়ন কি হতে পারে? আসলেই তো তাঁকে নাগরিক কবি বলাও হয়েছে। এটা ঠিক যে মধ্যযুগ পর্যন্ত রাজার বসবাস রাজধানীকে ঘিরে পল্লীজীবনকেন্দ্রিক জীবনযাত্রাতে ছেদ পড়ত। রাস্তাঘাট, বিপণীবিতান, সুরম্য অট্টালিকা, পোষাক-পরিচ্ছদের আড়ম্বর, ঢাল-তলোয়ারের মহড়া, নাট্যশালা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন, বিলাসী জীবনযাপনের ব্যবস্থা, এমন কি নৃত্য-গীত পটিয়সী গণিকাদের প্রলুব্ধকর কামকলা — এ সবই ছিল তখনকার প্রচলিত অর্থে সাধারণ মানুষের আয়ত্তাতীত। তাই বলে তা যে নগর জীবনের চালচিত্র, তা তো নয়। ইউরোপের বেলাতেও তা যে অন্য রকম ছিল, বলা যাবে না তাও ঠিক। শিল্পজাত পণ্য উৎপাদনের সূত্রে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণই সেখানে সূচনা করে নগরায়নের। নানা শ্রেণীর পেশাজীবী মানুষের ঘটতে থাকে আবির্ভাব। ভাঙতে থাকে পারিবারিক বন্ধন। সামাজিক শৃংখলাও হয়ে যেতে থাকে নড়বড়ে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় হৃস্পন্দনের দ্রুততা। আমাদের দেশেও ইউরোপীয় বিশেষ করে ইংরেজ বণিকদের ব্যবসা-ঘাঁটি ও পরবর্তীতে প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থলগুলিতে একই ব্যাপার ঘটে। কিন্তু নগরায়নের স্পিরিট কার্যকর হয় না যথার্থ ভাবে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করলেই যেমন লোকে শিক্ষিত হয় না,— ধোপদুরস্ত কাপড়চোপড় পরলেই যেমন ভদ্রলোক হওয়া যায় না, ব্যাপারটা অনেকটা সে রকমই। কাজেই পুরো ব্যাপারটাই যেন না শহর, না গ্রাম — এ রকম একটা আধা খেচড়া অবস্থা। শহরে জীবন যাত্রার উপকরণ বেড়েছে, প্রযুক্তিগত পারফেকশনও অ্যাচিভ হয়েছে। কর্মসংস্থানের তাকিদ থেকে ধেয়ে আসছে লোকে। কিন্তু নাগরিক কতটুকু হচ্ছে, সমাজতত্ত্ববিদগণ নিশ্চয়ই তার একটা পরিমাপ করতে পারবেন। নির্দিষ্ট করে ঢাকা শহরের কথাই বলি, শামসুর রাহমানও সারা জীবন এই ঢাকা শহরেই কাটিয়েছেন, কিন্তু শুদ্ধমাত্র এখানে বসবাসকারী মানুষজনের জীবন যাত্রার ছবি, তাদের আনন্দ-বেদনা, দুঃখ উল্লাসের চালচিত্র, পচা নর্দমার দুর্গন্ধের কথাও বলা, — এ সবই কি কেবল তাঁকে নাগরিক কবি বলতে অনুপ্রাণিত করবে? আমাকে ভুল বোঝার কোন অবকাশ নেই। কেন না, আমি জানি, একজনের নাগরিক কবি হওয়া, না হওয়া দিয়ে তার উৎকর্ষের বিচার হয় না। যে বিষয় নিয়েই তিনি কবিতা লিখুন, সেই বিষয়ের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তাতে কতটুকু ধরা পড়েছে, রস সৃষ্টিতে তা কতটুকু উপভোগ্য হয়েছে, সেটাই মূল। আমার বিবেচনায়, তাঁর এ জাতীয় কবিতায় যা এসেছে, তা জীবন যাত্রার ট্রান্সফরমেশনের একটা রূপ। আমাদের জীবন ভাঙ্গচুরের এটাও একটা ঐতিহাসিক পর্যায়। আমরা এটাকেও অস্বীকার করতে পারি না। কাজেই তাঁকেও অবমূল্যায়িত করার কোন সুযোগ নাই।

আরেকটি বিষয় হল, মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের নানা পর্যায় রয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যা ও নান্দনিক অনুভূতির সমবায় এই পর্যায়গুলিকে করে তুলেছে আলাদা আলাদা। ভৌগলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দেহগঠন থেকে তারতম্য ঘটেছে সাংস্কৃতিক উপাদানেরও। তবে এগুলির কোনটাই কোন স্থায়ী বিষয় নয়। বাংলা ভাষার বিকাশ, বাঙালী জনগোষ্ঠী ও তার রাষ্ট্র ব্যবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত। ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে শুধু বাঙালী নয়, পৃথিবীর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। এই স্পিরিটকে আমরা সাধারণ ভাবে বলি জাতীয়তাবাদ। গত ন্যূনধিক তিনশ বছর ধরে সারা পৃথিবীব্যাপীই এসেছে এই জোয়ার। মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ থেকে শোষণমুক্তির শ্লোগানও জাতিবর্ণধর্ম নির্বিশেষে সর্বহারা মানুষকে এখনও পর্যন্ত এর বাইরে নিয়ে যেতে পারেনি। বরং রাশিয়া-চীনসহ বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগ ঘটেছে জাতিগত ভাবেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলার জাতীয়বাদের যে ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছেন, তাও এটাকে বিনাশ করতে পারে নাই। আর এটাও বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয়তাবাদের সাথে বাঙালীর আবেগগত সম্পর্কেরও কোন তুলনা নাই। এই ইতিহাসটাও আমরা সবাই জানি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত (১৯৪৭) হবার পর বাঙালী পুঁজি বিকাশের একটা প্রশ্ন অনিবার্য ভাবেই এসে যায়। তখন নিজেদেরকে একতাবদ্ধ করার জন্য নিজস্ব সংস্কৃতির দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আর ভাষাই ছিল এই সংস্কৃতির মূল উপাদান।  সুতরাং ভাষাকে কেন্দ্র করেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বাঙালীর জাতীয়তাবাদী চেতনা। তা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের হাতিয়ার। ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িকতা থেকে নিজেকে কেবল বাঙালী বলে ভাবা নয়, ধর্মব্যাখ্যার রাজৗনতিক ব্যবহার ও তার  অপপ্রয়োগ কাটিয়ে চিন্তার মুক্তি ঘটানটাও সেখানে কাজ করে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে। শামসুর রাহমানের তো তখন, বলা যায়, যৌবনকালের শুরু। বাঙালী জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে তাতে তাঁর সংযোগ স্থাপন করাটাও তাই অস্বাভাবিক বলে ভাবার কোন কারণ নেই। তা ছাড়া, এমনিতেও, একজন কবি তার লেখার উপাদান সংগ্রহ করেন তার নিজস্ব জগৎ থেকে। জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক চেতনা, ঐতিহ্য নির্ভরতা, সামাজিক অনুশাসন ও নৈতিক দর্শন ও একই সাথে পারিবারিক উত্তরাধিকার— সবই তার মানস জগতে হয়ে থাকে বিমূর্ত। মিথোলজিকাল উপাদান যেমন সেখানে খেলা করে আলোছায়ার মতো, যুগধর্মের প্রভাবও কার্যকরী হয় সমান ভাবে। সমকালীনতা দ্বারা গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যাানের এক কাটাকুটি খেলা নিরন্তর তাকে করে রাখে আচ্ছন্ন। এটা সত্য সব কবিরই জন্য। শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। সমষ্টিগত মানুষের এক জন হিসেবে লালিত-পালিত হয়েছেন একটা বিশেষ জনগোষ্ঠীতে। তার প্রবহমান সংস্কৃতিতে তাকে অবগাহন করতে হয়েছে। তার অধিকারচ্যুতি তাঁকে যে ভাবে পীড়িত করেছে, তার স্বপ্ন ও উচ্চাভিলাষও তাঁকে উদ্দীপ্ত করেছে সমান ভাবে। অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যেমন তাঁকে আলোড়িত করেছে, ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশ নিরুপদ্রব রাখার বাসনাও থেমে থাকেনি তার সঙ্গে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিও হয়ে উঠেছে জরুরী। তিনি বন্দী শিবিরে থাকলেও তাঁর মনের এই অনির্বাণ শিখা প্রজ্জ্বলিত থেকেছে সর্বদা। একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হওয়া যে কারও জন্যেই বড় সৌভাগ্য। শামসুর রহমানও অধিকারী হয়েছেন সেই সৌভাগ্যের। তাঁর আরও সৌভাগ্য যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে তিনি অভ্যূদয় দেখেছেন এই দেশের। আবার যে আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য এত রক্তগঙ্গার প্রবাহ, তার অবমূল্যায়ন তাঁকে করেছে আহত। মৌলবাদী আক্রমণের শিকার হওয়াটাও যেন হয়েছে তাঁর নিয়তি। উদ্ভট উটের পিঠে স্বদেশ যেন না চড়ে— তিনি তাও তো চেয়েছেন। এখন কথা হল, কি রয়েছে তাঁর এই দায়বদ্ধতার পেছনে। বলতে হবে অবশ্যই তা দেশপ্রেম। একটি দেশকে নিজের বলে ভাবা। আর প্রত্যেকেই দেশকে নিজের বলে ভাবে বলেই, এটা এখন জনগণের। কনসেপ্ট হিসেবে জাতীয়বাদের মতো এই বিয়টাও নতুন। বলা যেতে পারে জাতীয়তাবাদেরই পরিপূরক। জাতির জন্য দেশ দরকার। সেই দেশের প্রতি যদি প্রেম না থাকে, তবে সেই দেশই বা টিঁকে থাকে কি করে? বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার শুরুতে অন্যান্য আইডিয়ার সাথে এটিও আহরিত হয়েছে। তাদের কাছে দেশ অবশ্য ফাদারস ল্যা- অর্থাৎ পিতৃভূমি। আমরা বলি মাদারস ল্যা- — মানে মাতৃভূমি। বামাশক্তির এই দেশে এটাই স্বাভাবিক। এক সময় তো বিষয়টা এ রকম ছিল না। রাজা-বাদশাহেরা যখন তলোয়ার ঘুরিয়ে রাষ্ট্র বানাতো, তখন তাকে নিজের বলে ভাবা যেত কি? আর ভাবলেও তা কি নিজের হত? জনশ্রুতি আছে যে পলাশীর আ¤্রকাননে নবাব সিরাজুদ্দৌলার সৈন্যরা ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, আর বাংলার কৃষকেরা তা দাঁড়িয়ে দেখছে। দেশের সঙ্গে ইমোশনাল অ্যাটাচমেণ্ট থাকলে, তা কি সম্ভব? সিরাজুদ্দৌলাই বলি আর মীর কাসিমই বলি কিংবা টিপু সুলতানের কথা নিয়ে আসি, আসলে এঁরা তো জাতীয় বীর হয়েছেন দেশপ্রেমের দীক্ষা গ্রহণের কালে। কবি-লেখকেরাই তাদের তা বানিয়েছেন। নজরুল যদি অমন করে না বলতেন :

বৃথাই গেল সিরাজ টিপু মীর কাসিমের প্রাণ বলিদান

চ-ী নিলি যোগমায়া রূপ বললে সবাই বিধির বিধান

হঠাৎ কখন উঠল ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝাঁসির রাণী

ক্ষ্যাপা মেয়ের অভিমানেও এলি না তুই মা ভবানী। (আনন্দময়ীর আগমনে)।

—তবে কি প্রতীকী অর্থে তাদের কে জাতীয় বীর বলে ধারণ করা সম্ভব হত? এই কবিতা লিখে তিনি জেলে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের নাটক বা এই রকম আরও আরও লেখাই তো জাতীয় জীবনকে করে তুলেছে প্রমূর্ত। শামসুর রাহমানও ঐ একই কাজ করেছেন। তবে একই সঙ্গে এটিও একটি স্পর্শকাতর বিষয় যে এই দেশপ্রেমকে কি আমরা অটুঁট রাখতে পারব? পাকিস্তানী আমলে যে পরিপ্রেক্ষিত জনগোষ্ঠীকে মুক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল কিংবা সামরিক শাসন ও সামরিকতন্ত্রের সময়ে দেশের কাক্সিক্ষত লক্ষ হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত কিংবা যে ভাবে পশ্চাৎমুখিতা জনমানসের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চলছিল, যা প্রকারান্তরে উজ্জীবিত করে রাখত দেশপ্রেমকেই। কিন্তু বিশ্বপুঁজির প্রত্যক্ষ মদদে ভোগবাদী সমাজ যে ভাবে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে, তাতে করে দেশপ্রেমের আবেগটাকে কি ভাবে ধরে রাখা যাবে, এটা একটা বড় সমস্যা। অন্যদিকে বাঙালী জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেসান অর্থাৎ অ-বাংলাভাষী দেশে বসবাসের ব্যাপারটাও থেমে নেই। তাই ভবিষ্যৎ কালে কবি হিসেবে শামসুর রাহমান ইতিহাসের উপকরণ হয়ে থাকবেন কি না, তা নিয়ে ভাবাটা কি  একেবারেই অযৌক্তিক?

তদুপরি প্রত্যেক ভাষারই একটা সামাজিক উপয়োগিতা আছে। এই সামাজিক উপযোগিতা তৈরী হয় সেই ভাষায় যে মানুষেরা কথা বলে, তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ; শিল্প-পণ্য উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, রাজনৈতিক গুরুত্ব ও জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের বিস্তারের ওপর ভিত্তি  করে। এক সময় যে ইংরেজী ভাষা ইংলিশ চ্যানেল পার হত না, সেই ইংরেজী ভাষা এখন দাপট দেখাচ্ছে সারা পৃথিবীময়।  বলা হত, মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বে সূর্য অস্ত যায় না, তার অর্থ এটাও ছিল যে সূর্যালোকের মতোই ইংরেজী ভাষাও সে সব জায়গায় প্রচারিত হত। এখন তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অধিকাংশ ধনী দেশ, যাদের ভাষা ইংরেজী, যাদের কাছে তাবৎ দরিদ্রই বলি আর, সম্মান দেখিয়ে উন্নয়নশীল বলি, এ রকম প্রায় সব দেশকেই ভিক্ষা করে খেতে হয়। আর ভিক্ষা করতে হলে তাদের ভাষাও তো শিখতে হবে। এ ভাবেই তারা গড়ে তুলেছে এক ভাষিক সা¤্রাজ্য। এটাও যে একটা শোষণমূলক ব্যবস্থা, তা কি বলে দেয়ার কোন ব্যাপার আছে? বাংলা ভাষা তবু তো একটা রাষ্ট্রের ভাষা। এটা সম্ভব হয়েছে বাঙালী একটি ভাষাভিত্তিক জাতি বলেই। পাশের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের কথা ভাবুন। অনেক গল্প-কবিতা উপন্যাস, সন্দেহ নেই, সেখানে লেখা হচ্ছে। কিন্তু কত দিন? অবাঙালী পুঁজির অনুপ্রবেশ সেখানে যে ভাবে ঘটছে, তাতে সেখানের বাঙালীরা তাদের মেরুদ- সোজা রাখতে পারবে কি না, সেটা তো প্রায় ফেট অ্যাকোমপ্লির মতো ব্যাপার। যা হোক, শামসুর রাহমান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে এ সব লেখা, অনেকের কাছেই বোধ হতে পারে, অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এগুলো তো সামগ্রিক ব্যাপার। ভাষা যদি জীবন্ত না থাকে, তবে কেইবা তার কবি আর কেই বা তার লেখক, সে হিসাব নেবে কে? সুতরাং এক জন কবিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, শামসুর রাহমানকেই বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাষা-পরিচর্যার ভিত্তিটাকেও নিখাদ করে তোলাটা প্রয়োজনীয় নয় কি?

কাজেই, এ সব আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে শামসুর রাহমানের কবিতার বিষয় কিংবা উপাদান-উপকরণ সম্পর্কে যাই বলি না কেন, তার বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রচলিত তাত্ত্বিক আদর্শ অনুসরণ কোন কাজের কথা নয়। কোন বিশেষ বিশেষণের মধ্যে বন্দী করে দেয়াটা তাঁর সামগ্রিক পরিচয়কেই করে তোলে বাধাগ্রস্ত। এটা ঠিক যে একজন কবি তাঁর ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলবেন, জীবনের সমকালীন প্রসঙ্গগুলিও তাতে বিমূর্ত হবে, সমাজের প্রতি-মানুষের প্রতি-জাতির প্রতি তাঁর যে দায়বদ্ধতা, তাকেও তিনি অস্বীকার করবেন না, রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রেম-ভালবাসা-ঘৃণা-জিঘাংসা প্রভৃতি মানবিক প্রবৃত্তিগুলোর রূপায়ণও সেখানে অনুচ্চারিত থাকবে না,—এক কথায় জীবনের বস্তুসত্ত্বা ও ভাবসত্ত্বা, দুয়েরই সমীকরণ ঘটবে সেখানে। কাল তার অবলম্বন, তাকে অতিক্রম করে যাওয়াটাই তার কবিত্ব। সেখানে তার আত্মার স্ফূর্তি যেমন থাকবে,ক্ষরণও একই ভাবে হবে পরিদৃশ্যমান। শামসুর রাহমানের কবিতাতে তা কি ভাবে আছে, আসলে তাই দেখার বিষয়। আর একটি কথাও প্রাসঙ্গিক যে কবিতার নানা বিষয় কিংবা তা প্রকাশের রীতি তো  একটি বস্তুগ্রাহ্য অবলম্বন। যেমন তিনি প্রেমের কবিতা লিখেছেন কি না? নরনারীর সম্পর্কের বিচিত্র মাত্রা, —অনুরাগ কিংবা বিরাগের, কি ভাবে ফুটে উঠেছে তাতে; তাদের জীবনের আদিম প্রবৃত্তি — যৌনতাকেই বা কি ভাবে দেখেছেন? মিলন কিংবা বিরহ, — কোনটা পেয়েছে স্থায়ী ভাব? নরনারীর পরস্পরের বিশ্বস্ততা কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা— কোনটাকে তাঁর মানসিক প্রবণতায় উঠেছে প্রদান হয়ে? মানবেতর প্রাণীদের কতটুকু স্থান রয়েছে সেখানে। প্রবৃত্তিগত এই বিষয়গুলি তো আছেই। এর সঙ্গে প্রকৃতির রূপায়ণই বা তাঁর জীবন চেতনার সঙ্গে কি ভাবে মিলেছে? সমভূমির এই দেশ বাংলাদেশ, — তার বিস্তৃত শস্যক্ষেত, জোৎ¯œাপ্লাবিত রজনী, মেঘভাঙা চাঁদের লুকোচুরি, প্রবাহিত নদীর ¯্রােত কিংবা মৃতনদীর জলের শীর্ণ ধারা ও বালুময় চর, আকাশ জোড়া বৃষ্টি, জলসিক্ত পুষ্পের মাধুরী, ফসল কাটা রিক্ত মাঠ, বন্যার তোড়ে ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ী— গবাদি পশু— এ সব যা আমদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তার পর তো রয়েছে আমাদের জীবন সংগ্রামের স্বেদসিক্ত চালচিত্র। ব্যক্তিক ও সমবায়ী জীবনের ঊল্লাস কিংবা হতাশা। প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তির বেদনা। সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ও উচ্চাভিলাষ। ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর রক্তঝরা পথ অতিক্রমের ভাষ্য। আর তার প্রকাশই বা ঘটেছে কি ভাবে? যে ভাষায় আমরা মনোভাব প্রকাশ করি, বাক্য তার ন্যূনতম একক। শব্দ তার উপকরণ। এই শব্দ ব্যবহার কিংবা বাক্যবিন্যাস— তাতে অভিনবত্ব কতটুকু আছে, কিংবা তৈরী করেছেন কতটা মৌলিকত্ব, আর তা করে পাঠকের কাছে অসাধারণত্ব ফুটে উঠেছে কি ভাবে?

শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে একটা কথা তো বলাই যায়, তা হল একই বৃত্তে তিনি ঘুরপাক খাননি। আমাদের অধিকাংশ কবি, যারা আমাদের খুবই প্রিয় — যাদের কথা আমরা প্রায়শই উচ্চারণ করে থাকি, — যাদের কবি প্রতিভার সত্যি সত্যি বিকল্পও নেই, তারা যে বৃত্ত রচনা করে বিখ্যাত হয়েছেন, হয়ত সেই খ্যাতির কারণ বিবেচনা করে তার বাইরে যাননি, পাছে হারিয়ে ফেলেন পাঠক প্রিয়তা। অথবা তার বাইরে যা লিখেছেন, তা শুধু লেখার জন্যই লেখা। প্রথমেই যে দুএকটি গ্রন্থ লিখে বিখ্যাত হয়েছেন, কেবলমাত্র সেখানেই রয়েছে তার মৌলিকত্ব। আমার মনে হয়, বিশেষ ভাবে লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে যারা লিখেছেন, অন্য আর যাই লিখুন, তাদের খ্যাতিটাও নির্দিষ্ট থাকে সেখানে। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানই, বোধ হয়, এক মাত্র কবি, যিনি সময়ের সাথে সাথে, তার মর্মবাণীকে আত্মস্থ করে টেনে নিয়ে গেছেন তাঁর কাব্যরথকে। কবিতাকে পরিয়েছেন পরিচ্ছেদ। সমাজের চাহিদা, যা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে নিয়ত পরিবর্তনশীল, সেই পরিবর্তশীলতাকে স্বচ্ছন্দে ধারণ করেছেন। আবার একই সাথে প্রতিক্রিয়াশীলতাকে প্রতিহত করারও কথা উচ্চারণ করেছেন মানব মুক্তির সার্বজনীনতার কথা ভেবে।

তবে আর একটি বিষয় হল, সমকালীন দায়বদ্ধতাকে সর্বকালীন দায়বদ্ধতাকে রূপান্তরিত করতে না পারলে ঘটনাটা কেবল মাত্র ঐতিহাসিক বলেই পরিগণিত হয়। নজরুলের প্রসঙ্গটি একটি কেস স্টাডি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা কিংবা তৎকালীন সামজিক, বিশেষ করে ধর্মীয় কুসংস্কার মানবিকতাকে যে ভাবে পাশবদ্ধ করে রেখেছিল, তারই শৃংখল ভাঙাটা ছিল, তাঁর কবিকর্মের প্রধান লক্ষ্য। বৃটিশ রাজত্ব এখন আর নেই। মানবিকতার বিষয়টিও যে ভাবে যৌক্তিক হয়ে সমাজ জীবনে যুক্ত হয়েছে, তাতে সেই পরিপ্রেক্ষিতও আর থাকছে না। সুতরাং নজরুলের যে কাব্যিক অর্জন, এখনকার প্রজন্মের কাছে তার তাৎপর্য কি ভাবে ধরা পড়তে পারে? এই প্রশ্নটাও এখন আমাদের সামনে যে আসছে, তাই বা অস্বীকার করা যায় কি ভাবে? শামসুর রাহমান সম্পর্কেও তো বলা যেতে পারে, বাঙালী জাতির মুক্তির সংগ্রাম তথা আত্মপ্রতিষ্ঠার যে ভাবদ্যোতনা তাঁর কাব্যে রয়েছে, বাঙালী জাতির বিকাশ ও একই সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্প্রসারণ যদি অব্যাহত না থাকে, তবে তার কবিকর্মের সজীবতা কি একই রকম থাকবে? কাজেই এক অর্থে তাঁর কবি হিসেবে বেঁচে থাকাটাও নির্ভর করছে বাঙালী জাতিরই টিঁকে থাকার ওপর। কথাটা বলছি, এ জন্যই যে বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেই ভাষাভাষী মানুষেরাও হারিয়ে গেছে ধরাপৃষ্ঠ থেকে। বাংলাভাষা কিংবা বাঙালী জাতি সম্পর্কে এতটা নেতিবাদী কথা বলাটা, আমি নিজেও সমর্থন করি না। বাস্তব অবস্থা কি দাঁড়াবে, অনেক কিছুই নির্ভর করে নানা ফ্যাক্টরের ওপর। বাংলাভাষী হয়েও পশ্চিম বঙ্গের অধিাসীরা যে রাজনৈতিক ফরম্যাটর মধ্যে রয়েছে, তাতে আশংকা জাগাটাও কি অমূলক? কিংবা বাঙালীরা যখন অ-বাংলাভাষী দেশের নাগরিক হচ্ছে, তখন নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে তারাই বা ধরে রাখতে পারবে কতটুকু? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-অষ্ট্রেলিয়ায় কিংবা অন্যত্রও বাঙালীরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে উৎসব করে বলে শুনেছি, তবে, সে সব দেশের মানবাধিকার যতই প্রবল হোক, ভিন্ন সংস্কৃতির সংখ্যাগরিষ্ঠ সেটা কত দিন সহ্য করবে, বিশ্বাস করি যে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাঙালী জাতির প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, তার স্পিরিটটা হারিয়ে যাবে না কখনও। এ ছাড়া, আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও বলে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙালীরা টিঁকিয়ে রেখেছে নিজেদের অস্তিত্ব।

আমার এত কথা বলার প্রয়োজন পড়ত না, যদি না শামসুর রাহমান হতেন আমাদের এই সময়ের প্রধান কবি। মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলেরা তো আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। জীবনানন্দের কথাটি একটু অন্য ভাবে বলা যায়। তাঁর মৃত্যুর পর যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন তিনি জীবন্ত হয়ে উঠছেন। সময়ের প্রত্যাশা মিটিয়েছেন বলেই তাঁরা যে জীবন্ত থাকছেন, তা তো নয়। তার কারণ সময় তো প্রবাহিত হয় নিরন্তর। তার মর্মবাণীতে ঘটে রূপান্তর। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই পালাবদল একান্ত ভাবেই অনিবার্য। সুতরাং তাদের এই বেঁচে থাকার ভিত্তি নিশ্চয়ই শুধু দেশ ও কালের চাহিদা পূরণ নয়। সময়ের দাবী মেটানো নয়। শাশ্বত সৌন্দর্যেরও একটা ব্যাপার এখানে আছে, যার রসউপভোগের তৃষ্ণা মানুষের চিরকালীন। তাঁদের কাব্যে তা আছে বলেই মানুষ এখনও তাঁদের কাছে যায়। বস্তুত এটাই তাঁদের অমরতার কারণ। আমার কথা হল, শামসুর রাহমানের কাব্যেও এই অমরতার কারণটিই সনাক্ত করতে হবে।

এবং সেটি যদি বিবেচনার মধ্যে আনতে হয়, তবে তিনি বহির্জগতের মুখোমুখী তাঁর অন্তর্জগৎকে কি ভাবে দাঁড় করিয়েছেন, তা দেখার বিকল্প কি কিছু আছে? আর এর অর্থ হল, তাঁর আত্মাকে তিনি  প্রকাশিত করেছেন কি ভাবে? তাঁর প্রথম যৌবনে— ‘নতুন কবিতা’র কালে অতৃপ্ত আত্মার খেদ প্রকাশ পেয়েছিল এ ভাবে :

‘আমাদের পৃথিবীতে শান্তি পলাতক’। সেই অতৃপ্তিবোধ দূর করার বিনীত বাসনা থেকেই, অনেক বছর পরে, ফিরিয়ে নিতে বলেন ‘ঘাতক কাঁটা’। এ কথা তো যে ঠিক যে, খুব সাধারণ মানুষও তার বস্তুসত্ত্বাকে ভাবসত্ত্বা দিয়ে আবীর মাখাতে চায়। আগে এক জায়গাতে মাটির সানকির কথা বলেছি না? সেই মাটির সানকি কেনার সময় নানা রকম ডিজাইনের ভেতর থেকে পছন্দ করে নেবারও একটা ব্যাপার থাকে। এর ভেতর দিয়ে আসলে তার ভাব সত্ত্বারই প্রকাশ। আর এক জন কবি তো স্পর্শকাতর অনুভূতিশীল মানুষ। নান্দনিকতাই বলি সৌন্দর্যবোধই বলি, তার পরিচর্যা তো চলে ভাবসত্ত্বারই ঊন্মীলন ঘটাতে। শামসুর রাহমানেও আমরা তাই দেখেছি। এটাকেই সনাক্ত করা যায় তাঁর আত্মার চিৎকার বলে। আর আরমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়িত্বই বলি, আর অমরতাই, বলি তার কারণটিও খুঁজে পেতে হবে এখান থেকেই।

[বানানরীতি লেখকের নিজস্ব]
বিহাস ॥ ৪ কার্তিক ॥ ১৪২৩

—————————————————

মুহম্মদ নূরুল্লাহ্
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও চাঁদের অমাবস্যা

কথাসাহিত্যে উপজীব্য কাহিনি থাকে, কিন্তু নিছক কাহিনি সাহিত্য সৃষ্টি করে না। কাহিনীটিতে যখন বাস্তব সামাজিক পটভূমিতে বাস্তব মানুষের পদচারণার শৈল্পিক বর্ণনায় জীবনের সত্য রূপের প্রতিফলন হয়, তখনই তা সাহিত্য হয়ে ওঠে। কথাসাহিত্যকরা তাঁদের সৃষ্ট চরিত্রের কথাবার্তা, ধ্যান-ধারণা, কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের মাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য ফুটিয়ে তোলেন। বাস্তব জগতের মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি না থাকলে সাহিত্যের চরিত্রের সফল রূপকার হওয়া যায় না। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণ শক্তির অধিকারই কি যথেষ্ট? চোখের দেখায় মানুষকে কতটুকু চেনা যায়? মানুষের বাহ্যরূপে কি সব সময় তাঁর সত্যরূপের প্রতিফলন ঘটে? না! অন্য মানুষ কেন, ব্যক্তি নিজেই অনেক সময় নিজেকে বুঝতে পারে না। তবে মানুষকে বুঝতে হলে, তার মনোজগৎ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেতে হলে মনোবিজ্ঞানীর চোখে তাকে বিশ্লেষণ করতে হবে। সাহিত্যিক যদি এই জ্ঞানের অধিকারী হন তাহলে তিনি তাঁর সৃষ্টিতে মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাসম্পন্ন মানুষের ছবি আঁকতে পারেন, দক্ষতার সাথে তিনি তাঁর চরিত্রগুলোর জটিল মানসিক প্রক্রিয়ার চিত্র পাঠকদের উপহার দিতে পারেন। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ এমন একটি উপন্যাস যেখানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর মনস্তত্ত্ব জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে চরিত্রগুলো সৃষ্টি করেছেন। ফ্রয়েডীর মনঃসমীক্ষণবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের মানসপট বিশ্লেষণে তাঁর সাফল্য উপন্যাসটিকে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য উপন্যাসের মর্যাদা দিয়েছে। মানুষের মন এবং মানসিক প্রক্রিয়ার যে চিত্র তিনি এঁকেছেন, মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ এবং বাস্তব।

‘চাঁদের অমাবস্যা’য় মানবমনের জটিল রহস্যের প্রকৃতি যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনা করার আগে ফ্রয়েডীর মনোবিজ্ঞানের কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা আবশ্যক। ফ্রয়েড মানুষের মনে এক নির্গুণ স্তরের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছেন। মানুষ যা কিছু করে তার সবই সচেতনভাবে করে না, মনের অচেতন অংশ নানাভাবে আমাদের ক্রিয়াকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি মানুষের ব্যক্তিত্বে তিনটি সত্তার উপস্থিতি লক্ষ্য করেন— প্রথমটি হল জৈবিক সত্তা বা ইদম (ওফ), দ্বিতীয়টি হল বাস্তব সত্তা বা অহম (ঊমড়), আর নীতি তৃতীয়টি সত্তা বা অতি অহম (ঝঁঢ়বৎবমড়)। জৈবিক সত্তার নীতি হল ভোগবাদ বা সুখবাদ; সে শুধু আনন্দ বা সুখ পেতে চায়। কিন্তু অহম বা বাস্তব সত্তার হাতে সত্যিকার কার্যকরী ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে, সে বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করে ইদম-এর চাহিদা পূরণ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। অহম আর একটা বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখে— তা হল কোন কিছু করা না কার ব্যাপারে নৈতিকসত্তার সমর্থন আছে কি না। বাস্তবতার নিরিখে কোন কিছু করার ব্যাপারে অসুবিধা যদিও নাও থাকে কিন্তু অতি অহম বা নৈতিক সত্তা যদি এর বিরোধিতা করে তাহলে তা অহম-এর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণভাবে যাকে আমরা বিবেক বলি সেই বিবেকের বিরোধিতা যত বেশী হবে অহম ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে আর এই ব্যক্তিসত্তার সংহতি ততই হুমকির সম্মুখীন হবে। এ রকম পরিস্থিতিতে অহম তার উদ্বেগমুক্তির জন্য নানা ছলনার আশ্রয় নেয়। ফ্রয়েড এগুলোর নাম দিয়েছেন প্রতিরক্ষা কৌশল (উবভবহপব সধপযধহরংস)।

ফ্রয়েড কয়েক রকমের প্রতিরক্ষা কৌশল বর্ণনা করেছেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর অনুসারীরা আরো কিছু কৌশল সনাক্ত করেছেন। বাস্তব জীবনে সকলেই এই কৌশলগুলো কিছু না কিছু ব্যবহার করে থাকে। যে কোন কারণে ব্যক্তির মনে উদ্বেগের সৃষ্টি হলে এই প্রতিরক্ষা কৌশল ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। যেমন, কোন কাজে ব্যর্থ হলে আমরা গ্লানিবোধ করে থাকি এবং এই গ্লানিবোধ আমাদের জন্য পীড়াদায়ক হয়। এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে রেহাই পাবার জন্য আমরা কিছু কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করি যাতে ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অনেক সময় অত্যন্ত যুক্তিহীনভাবে বা কষ্টকল্পিত যুক্তির সাহায্যে নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করি যে, এ রকম অবস্থায় এই ফলাফল অনিবার্য ছিল। এভাবে আমাদের অহম দুশ্চিন্তার হাত থেকে রক্ষা পায়। প্রতিরক্ষা কৌশলের আর একটা উদাহরণ দেয়া যাক। কোন ব্যক্তি হয়ত অন্য এক ব্যক্তির প্রতি শত্রুতামূলক মনোভাব পোষণ করে এবং সাথে সাথে তার অনিষ্ট কামনা করে। কিন্তু তার অতি-অহম বা বিবেক নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি এই মনোভাবে সায় দেয় না, ফলে তার অতি অহম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় সে তার প্রতিপক্ষের কিছু দোষ আবিষ্কার করার চেষ্টা করে এবং এক সময় বিশ্বাস করতে শুরু করে, ‘আসলে সেই আমার প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ করে এবং অনিষ্ট করার চেষ্টা করে।’ এভাবে ঐ ব্যক্তির প্রতি তার বিদ্বেষমূলক আচরণ আর অন্যায় বলে মনে হয় না। বিবেকের দংশন আর পীড়া দেয় না।

এবারে মূল প্রসঙ্গে যাক। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আরেফ আলী একজন নিরীহ স্বভাবের যুবক। সে একটি মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের আশ্রয়ে থেকে তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গ্রামের এক স্কুলে শিক্ষকতা করে। এক জোছনা রাতে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে আরেফ আলী ঘরের বাইরে বের হয়। প্রয়োজন শেষ হওয়ার সাথে সাথে সে ঘরে ফিরে যায় না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘চতুর্দিকে জ্যোৎ¯œার অপরূপলীলা খেলা’ দেখে। কিছুক্ষণ পর সে তার আশ্রয়দাতা পরিবারের এক রসহ্যময় মানুষ কাদেরকে দেখতে পায়। পরিবারের মুরব্বী ধর্মনিষ্ঠ দাদা সাহেবের চোখে এই মানুষটির ‘ভাবসাব সাধারণ মানুষের মত নয়। একটু দরবেশী ভাব আছে তার মধ্যে।’ কাদের অত্যন্ত দ্রুতপদে কোথায় যেন যাচ্ছে। ‘যুবক শিক্ষক’ কৌতুহলী হয়ে কাদেরকে অনুসরণ করে। কিছুদূর অনুসরণ করার পর সে তাকে হারিয়ে ফেলে। তবু সে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে এক বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে। ঘটনাক্রমে গ্রামের এক দরিদ্র মাঝির স্ত্রীর সাথে কাদেরের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। ঐ সময়ে কাদের বাঁশঝাড়ের মাঝির স্ত্রীর সঙ্গসুখ উপভোগ করছিল। মানুষের সাড়া পেয়ে দু’জনই ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে মেয়েটি চিৎকার করে উঠলে কাদের তার গলা টিপে ধরে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটি মারা যায়। এই দুর্ঘটনার পর কাদের ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। আরেফ আলী এক সময় নিহত যুবতীর লাশ দেখতে পায়। কিছুক্ষণ পর কাদের ঘটনাস্থলে ফিরে আসলে সে বুঝতে পারে যে কাদেরই এই ঘটনার জন্য দায়ী। পরদিন সে কারো কাছে ঘটনাটির কথা প্রকাশ করেনা— শুধু তাই নয় লাশটিকে নদীতে ফেলে দেবার ব্যাপারে কাদের তার সাহায্য চাইলে সে সাহায্য করে। এই খুনের ঘটনাটির কথা সে প্রকাশ করবে কিনা তা নিয়ে আরেফ আলীর মনে তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু দ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত সে পুলিশের কাছে ঘটনাটি প্রকাশ করে। সংক্ষেপে এই হল ‘চাঁদের অমাবস্যা’র কাহিনী। কিন্তু এর মূল উপজীব্য বিষয় হল প্রধান চরিত্র আরেফ আলীর মানসিক দ্বন্দ্বের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। এই দ্বন্দ্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একজন দক্ষ মনঃসমীক্ষণকারীর নৈপুণ্য নিয়ে অনায়াসে ‘যুবক শিক্ষক’ এর মনের অলিগলির অনেক রহস্য পাঠকদের সামনে অনাবৃত করেছেন। উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গি, সংলাপ ইত্যাদিতেও লেখকের মনস্তত্ত্ব-মনস্কতার ছাপ স্পষ্ট। গভীর রাতে বাঁশঝাড়ে এক যুবতী নারীর অর্ধউলঙ্গ মৃতদেহ দেখার চিত্রটি উপন্যাসে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে :

‘পায়ের উপর এক ঝলক চাঁদের আলো। শুয়েও শুয়ে নাই। তারপর কোথায় তীব্রভাবে বাঁশি বাজতে শুরু করে। যুবতী নারীর হাত-পা নড়ে না। তারপর বাঁশির আওয়াজ সুতীব্র হয়ে উঠে। অবশ্য বাঁশির আওয়াজ সে শোনেনি।’

এখানে ঘটনার বিবরণ অত্যন্ত মনস্তত্ত্বসম্মত হয়েছে। আকস্মিকভাবে একটা মৃতদেহ দেখে একজন ভাবুক হৃদয়ের নিরীহ শিক্ষিত যুবকের কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে? এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি লোপ পাওয়ারই কথা— ভুল দেখা বা শোনা যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অলীক বীক্ষণ বা ভুল প্রত্যক্ষণ বলা হয় তা মোটেই অসম্ভব নয়। অস্বাভাবিক আবেগ সৃষ্টি হওয়াও বিচিত্র নয়। তাই আরেফ আলী হয়তো ‘কাল সাদা বকরী দেখে যার শিং-দাঁত চোখ কিছুই নাই।’ তার কারণে ছোটাছুটি করতে থাকে উদভ্রান্তের মত। এক সময় সে থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে, মনে হয় সে কাঁদবে … …।’

মৃতদেহটি দেখার কিছুক্ষণ পর আরেফ আলী কাদেরকে ঘটনাক্রমে দেখতে পায়। হত্যাকা-ের আগে সে কাদেরের কথাবর্তাও শুনতে পেয়েছিল। তাই সংগত কারণেই সন্দেহ হওয়া উচিত কাদের হত্যাকারী। আরেফ আলীও বিশ্বাস করে যে কাদেরই তাকে হত্যা করেছে। তখন একজন ন্যায়বান মানুষের যা করণীয় তা হল ব্যাপারটি ফাঁস করে দেওয়া। কিন্তু এটি প্রকাশ করলে তার আশ্রয়দাতা পরিবারটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এই নির্বিঘœ নিরাপদ আশ্রয় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। ইস্কুলের চাকরিও চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার ঘটনাটি গোপন রাখাও নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তাই ঘটনাটি প্রকাশ করে দেওয়ার ব্যাপারে তার মনে তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্বের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নেয় এবং নিজের কাছে কাদেরকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করার জন্য নানা ছলনার সাহায্য নেয়। আরেফ আলীর এই দ্বন্দ্ব ও আত্মপ্রতারণার প্রকৃতিটি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ফ্রয়েডীর মনঃসমীক্ষণিক মতবাদের সাথে তা অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ। ‘চাঁদের অমাবস্যা’য় আরেফ আলীর মানসপটের যে পরিচয় পাই তাতে দেখা যায়, সে নানা রকম প্রতিরক্ষা কৌশল প্রয়োগ করে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার চেষ্টা করেছে। তার আদিসত্তা বা জৈবিক সত্তা সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা চায়। তার বিষয়ী মন বুঝে যে বড় বাড়ীর আশ্রয়ে থেকে এই শিক্ষকতা তাকে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা দিচ্ছে, অতএব এই আশ্রয় নষ্ট করা ঠিক হবে না। সে যে খুনের কথা জানে এটা প্রকাশ না করলে তার কোন ক্ষতি হবে না, সুতরাং অহেতুক নিজের ক্ষতি করার কোন অর্থ হয় না। কিন্তু তার নৈতিক সত্তা প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার অহম-এর কাছে বিবেকের নির্দেশ এক উদ্বেগের উৎস। সুতরাং সে বিশ্বাস করতে চেষ্টা করে যে কাদের দোষী নয়। তাকে নির্দোষ ভাবতে পারলে ঘটনাটি প্রকাশ করার আর প্রয়োজন পড়ে না, অহম-এর উদ্বেগেরও অবসান হয়। তাই সে প্রতিরক্ষা কৌশল তথা ছলনার আশ্রয় নেয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাহিনী বিন্যাস ও বিশ্লেষণ থেকে এই প্রতিরক্ষা কৌশলগুলো সহজেই সনাক্ত করা যায়।

গভীর রাতে মৃতদেহটি দেখার কিছুক্ষণের মধ্যেই আরেফ আলী যখন কাদেরকে ঘটনাস্থলে দেখতে পেয়েছিল তখন কিন্তু সে ঠিকই তাকে হত্যাকারী বলে সন্দেহ করেছিল। কিন্তু পরদিন সে ফাঁক খুঁজতে চেষ্টা করে এবং যেহেতু হত্যাকা-টি সে স্বচক্ষে দেখেনি তাই কাদেরকে সে নির্দোষ ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কাদের তাহলে ওখানে গিয়েছিল কেন? কারণ, কাদের দরবেশ— তার গতিবিধি বিস্ময়কর হতে পারে বৈকি! কাদেরের দরবেশী সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারলেই গভীর রাতে তার বাঁশঝাড়ের কাছে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকে না।

আরেফ আলী যখন কাদেরকে দরবেশ বলে বিশ্বাস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। পরদিন রাতে কাদের লাশটিকে সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে তার সাহায্য কামনা করে। দুই জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লাশটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এখানেও স্বাভাবিক যুক্তিবাদী মন অন্ধ হয়ে থাকে। কাদেরকে সে খুনী বলে সন্দেহ করে না, বরং লাশটি নদীতে ফেলে দেওয়ায় তাকে মহানুভব বলে ভাবে। কখনও সে মনে করে, কাদের হয়ত তাকেই হত্যাকারী বলে সন্দেহ করেছে। তার প্রতি বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবেই (যদিও গত দুই বৎসরের মধ্যে তাদের একদিনও বাক্যালাপ হয়নি) কাদের এ ব্যাপারে তাকে সহায়তা করল। কখনও সে মনে করতে থাকে, একটা নারীর মৃতদেহ নিয়ে অযথা সন্দেহের সৃষ্টি হবে এবং তাকে নিয়ে টানাটানি হবে, এই অবাঞ্ছিত অবস্থা যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য সে লাশটিকে গুম করে ফেলতে চেয়েছে। অসাধারণ মানবিক তাড়না থেকেই কাদের এ কাজ করেছে। এ সমস্ত খোঁড়া যুক্তি একসময় তার নিজের কাছেই অসার বলে মনে হয়। তখন আরেফ আলী কল্পরাজ্যের আরো গভীরে প্রবেশ করে। এক পর্যায়ে সে মনে করতে শুরু করে আসলে ঘটনাটি ঘটেইনি, পুরোটাই একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দিবালোকের মত ঘটনার সত্যতা উন্মোচিত হয়। যুবক শিক্ষক জানতে পারে যে, কাদের হত্যাকারী— কাদের নিজেই একথা ব্যক্ত করে। আরেফ আলীর কল্পরাজ্যে বিচরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

তবু কাদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করা চাই, তা না করতে পারলে আরেফ আলী নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারে না। অবলম্বন পেতে দেরী হয় না, এক সময় সে আবিষ্কার করে যে কাদের প্রেমিক ছিল। প্রেমই তাকে হত্যার পথে টেনে এনেছে। হত্যা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, আকস্মিক ভয় থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে; যুবতী নারীর প্রতি তার মায়া মমতা ছিল বলেই তাকে অপমানের হাত থেকে রক্ষার জন্য সে দেহটি সরিয়ে ফেলেছিল। মৃতদেহটি যাতে সসম্মানে বয়ে নেওয়া যায় সেজন্যই সে আর একজনের সাহায্য চেয়েছিল। এইভাবে হঠাৎ যুবক শিক্ষকের কাছে কাদের একটি দয়াশীল মহৎ মানুষ হিসেবে উদয় হয় … … । তাই কাদের হত্যাকারী না হয়ে প্রেমিক হিসেবে আবির্ভূত হয়। অবশ্য এই কৌশলও শেষ পর্যন্ত তাকে নিরুদ্বিগ্ন রাখতে পারে না। কারণ কাদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায় যে, মৃত নারীর প্রতি তার কোন প্রেম ছিল না। এমনকি এই প্রশ্নে কাদের রীতিমত বিরক্ত ও ত্রুদ্ধ হয়, তাকে পাগল ঠাওরায়। এরপর আর কাদেরকে নির্দোষ ভাবা সম্ভব হয় না। অতি-অহম বা বিবেকের নির্দেশ মান্য করে সে পুলিশের কাছে ঘটনাটি প্রকাশ করে।

উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, ‘যুবক শিক্ষক’ বেশ কিছু প্রতিরক্ষা কৌশল ব্যবহার করেছে তার অহমকে উদ্বেগমুক্ত রাখার জন্য। কোন সময় সে কল্পরাজ্যে বিচরণ করেছে, কখনও বাস্তবকে অস্বীকার করেছে আবার কখনও খোঁড়া যুক্তির আশ্রয় নিয়েছে। তার মনোজগতের এই ছলাকলাগুলোতে ফ্রয়েড বর্ণিত প্রতিরক্ষা কৌশলের বিশ্বস্ত রূপায়ণ হিসাবে লক্ষ্য করা যায়। ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এখানে অত্যন্ত সার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন। শুধু যে আরেফ আলীর চরিত্র চিত্রণেই তিনি মনস্তত্ত্ব-জ্ঞান কাজে লাগিয়েছেন তা নয়, অন্যান্য চরিত্রও এর কমবেশী প্রতিফলন দেখা যায়। প্রাসঙ্গিকভাবে উপন্যাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দাদা সাহেবের কথাও উল্লেখ করা যায়। দাদা সাহেবও কল্পরাজ্যে বিচরণ করে মনে মনে ভারমুক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ধার্মিক মন কিছুতেই কাদেরের ধর্মের প্রতি আনুগত্যহীন আচরণ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু কাদের তার শাসনের আওতার বাইরে। এ অবস্থায় কাদেরকে নিয়ে তার অশান্তির পরিসমাপ্তি ঘটে কাদেরের চরিত্রে দরবেশী আরোপ করে। এই অযৌক্তিক বিশ্বাসের ছলনা দাদা সাহেবকে শান্তি দেয়।

[উৎস : ‘সমালোচনা’, মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ (সম্পা.), ঢাকা, এপ্রিল ১৯৯০]

—————————————————————-

বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষা

আলী আরীফুর রেহমান (১৯৫০খ্রি.—২০১৩খ্রি.)

অধ্যাপক আলী আরীফুর রেহমানের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণে : মাসউদ আখতার ও মুহাম্মদ তারিক-উল-ইসলাম
অনুবাদ : সাঈদ হাসান

[ইংরেজিতে নেয়া অধ্যাপক আলী আরীফুর রেহমানের এই সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মাসউদ আখতার সম্পাদিত ও চিহ্নপ্রকাশন থেকে প্রকাশিত মিউজিংস পোস্ট কলোনিজ (২০১২) গ্রন্থে। তখন সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন অধ্যাপক আলীর দুই তরুণ সহকর্মী মাসউদ আখতার ও মুহাম্মদ তারিক-উল-ইসলাম। দুর্ভাগ্যজনক যে, বইটি প্রকাশের বছর অতিক্রান্ত সময়ে ২১ মার্চ ২০১৩খ্রি. অধ্যাপক আলী লোকান্তরিত হন। কিন্তু সমসাময়িক বাস্তবতায় এ সাক্ষাৎকারটির গুরুত্ব আলাদা বিবেচ্য বলে মনে হয়। তাই অধ্যাপক আলীর গভীর ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাকে অধিকতর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর নিমিত্তে চিহ্ন-সম্পাদক সাক্ষাৎকারটির বাংলা অনুবাদের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই ফল এ অনুবাদ। এটি বাংলা করেছেন অধ্যাপক আলীর কৃতী ছাত্র ঢাকাস্থ প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সাঈদ হাসান।]

অধ্যাপক আলী আরীফুর রেহমান বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন ১৯৭৬ সাল থেকে এবং তিনি দেশের সবচেয়ে সম্মানিত ইংরেজির অধ্যাপকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। নিজের জন্য একটা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর সমসাময়িকদের থেকে অন্তত এক ধাপ এগিয়েই ছিলেন কিন্তু তিনি সেই সকল বিরলদের মধ্যে একজন যিনি একপ্রকার ঔদাসীন্য নিয়েই এই প্রলোভনকে প্রতিহত করতে সক্ষম হন। প্রচলিত এই পথটাকে তিনি করেছিলেন প্রত্যাখ্যান।

অধ্যাপক আলী ছাত্র হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হন ১৯৬৯ সালে। একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর-পর্ব শেষ করে ‘শেক্সপিয়ার স্টাডিজ’ বিষয়ে আরও একটি মাস্টার্সের জন্য কমনওয়েলথ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যাপক আলী তাঁর পিএইচডি অভিসন্ধর্ভের জন্য জেরেমি টেইলরের লেখা হলি লিভিং-এর একটি সমালোচনা সংস্করণ তৈরি করেন। কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৪ সালে তিনি এই অভিসন্ধর্ভটি জমা দেন। ১৯৮৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুলব্রাইট রিসার্চ ফেলো হিসেবেও কাজ করেন।

অধ্যাপক আলীর চমৎকার পা-িত্য ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার প্রমাণ তার পিএইচ.ডি. অভিসন্ধর্ভের সাথে সাথে অন্য গবেষণাপত্রগুলো। সাহিত্য— বিশেষ করে তাঁর লেখা ছোটগল্পগুলো সৃজনশীল লেখনীর দক্ষতারই পরিচায়ক। খুব বেশী লেখেননি তিনি। একজন যোগ্য লেখক হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজিতে লিখতে থাকা প্রচারম্মুখ প-িতদের গোষ্ঠীতে নিজের নামখানা লেখাতে তাঁর অনীহা ছিল চিরদিনের। একজন মিতব্যায়ী লেখক হলেও পাঠক হিসেবে তিনি সর্বগ্রাসী, একজন খাঁটি চিন্তক ও দার্শনিকও বটে। জ্ঞানের বিচিত্র শাখায় তাঁর আগ্রহ আর সেই সাথে সমসাময়িক জীবন ও সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি আর রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষকও তিনি। ব্রাউনিংয়ের গ্রামারিয়ান তিনি নন। চারিদিকের বিভিন্ন বিষয়ে শিশুসুলভ কৌতূহল ছিল তাঁর। এই যেমন অধুনা প্রযুক্তিলব্ধ গ্যাজেটগুলোর কথাই ধরা যাক : বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে এদের ব্যবহার আর প্রভাব নিয়ে তিনি প্রায়ই কথা বলতেন। নিত্য নতুন প্রযুক্তি সর্ম্পকে যথেষ্ট জানাশোনা থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বস্ত গুণগ্রাহী তিনি ছিলেন না বরং তিনি মনে করতেন যে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের মত পশ্চাৎপদ তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকের জন্যও সর্বশেষ সংস্করণের ল্যাপটপের মালিকানা নয় বরং সকালের নাস্তার টেবিলে একটি গরম রুটির ব্যবস্থাই হবে বিলাসিতা।

গত শতকের চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকে, ‘মৃত নয় তবে মরণোন্মুখ’ বৃটিশ সা¤্রাজ্যের আভায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মের অংশ হিসেবে তিনি যেন তাঁর আত্মপরিচয় ও সংশ্লেষকে খুঁজে পান এক গোধূলী আবহে। ‘সম্ভবত প্রথম সারির উত্তর-উপনিবেশবাদীদের অংশ (নই)’ তিনি নন বরং ‘উপনিবেশবাদীদেরই শেষ কাতারের মানুষ’। ইংরেজি পাঠক্রম ও পাঠপদ্ধতি বিষয়ে অধ্যাপক আলীর অবস্থান যেন ক্লাসিকাল ঘরানার। যদিও তিনি স্বীকার করেন যে এই ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু শিক্ষা ধারাটির বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তার নিমিত্তে নতুন নতুন বিষয় যেমন, মিডিয়া ও কালচারাল স্টাডিজ, ট্রান্সেলেশন স্টাডিজ ইত্যাদি সংযোজনের প্রয়োজন রয়েছে এবং একই সাথে মূল পাঠক্রমে ইংরেজি সাহিত্যের সনাতনী ধারাটিকে বজায় রাখার পক্ষেই তিনি। তাঁর মতে স্নাতক পর্যায়ের যে কোনো ইংরেজি বিভাগের পাঠক্রমেই ক্ল্যাসিকাল এই ধারাটির অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক। অধ্যাপক আলীর এই সাক্ষাৎকারে ইংরেজি শিক্ষার এই ক্ষেত্রটি ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে সে বিষয়ে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী আছে— আছে দিকনির্দেশনাও।

মা.আ ও তা.ই  : আমাদের এখানে ইংরেজির উপস্থিতি শত বছরের আর সঙ্গত কারণেই ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষাকে আপনি কি হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন— ‘ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষা’ না কি ‘ইংরেজ উপায়ে শিক্ষা’?

অধ্যাপক আলী : প্রথমেই বলি, আমি কখনো সাক্ষাৎকার দিই নি আর এ বিষয়টিতে আমার মারাত্মক অস্বাচ্ছন্দ্য। আমি মনে করি বেশি বেশি সাক্ষাৎকার আপনাকে আপনি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আর সেই গুরুত্বকে জিইয়ে রাখতে গিয়ে আপনার মুখ আপনার সাথেই পাল্লা দিয়ে ছুটতে থাকে, ফলাফল অসঙ্গত বাক্যালাপ, অযাচিত মন্তব্য, ভণিতা, এমন কি তা আপনাকে এমন সব ঘটনার দিকে ঠেলে দিতে পারে যা কিনা ভবিষ্যতেও আপনাকে ভূতের মত তাড়া করে বেড়াতে পারে কিংবা আপনার সামাজিক ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করে দিতে পারে কিংবা তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু যেমন এতদিন ধরে যে আত্মসম্মান বোধকে নিজের মধ্যে লালন করে আসছিলেন তাকেই বিনষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু তবুও যেহেতু এবার আমি রাজি হয়েছি কিছু তো আমাকে বলতেই হবে।

বাংলাদেশে ‘ইংরেজি শিক্ষা’ কি ‘ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষা’, না কি ‘ইংরেজ উপায়ে শিক্ষা’? আমি বলব, অবশ্যই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষা আর বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্য আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিই এই শিক্ষাধারার প্রধান অংশ। শুধুমাত্র ইংরেজি শিক্ষাই নয় বরং আমাদের সম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থাই ইংরেজ উপায়ে গড়ে তোলা। আমাদের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, তাদের পাঠদানের বিষয়গুলো, আর সে সব বিদ্যাপীঠ  থেকে লব্ধ ডিগ্রীগুলোর নাম এসবই আমরা বৃটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমার মনে হয় সবেমাত্র আমরা পশ্চিমা এই ধারা থেকে বের হয়ে আসছি, চলার পথে পরিবর্তন নিয়ে আসছি— যদিও আমার ধারণা, আমার প্রজন্মের বেশিরভাগ শিক্ষাবিদই এই পরিবর্তনটাকে কোনো সাধারণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না বরং দেখছেন শিক্ষার মানের ক্রম-অবনমন হিসেবে। চলতি ধারণাটি হচ্ছে, যে সময়টাতে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আরো বেশি ইংরেজ অথবা পশ্চিমানুসারী ছিলাম তখন আমাদের শিক্ষার মানও আরো বেশি ভাল ছিল। অবশ্যই এতটা সরলীকরণ করা ঠিক নয়, কারণ শিক্ষার মানের অবনমন ঘটলেও তার জন্য প্রাচ্যের আর পাশ্চাত্যের, দেশি ও বিদেশি, শিক্ষাদানের এমন নানা পদ্ধতিকে দোষারোপ করা যায় না। আমার প্রজন্মের অনেকেই হয়ত আমার সাথে একমত হবেন যে শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয় বরং সমগ্র পৃথিবীতেই এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোতেও শিক্ষার মানের স্পষ্ট অবনমন ঘটেছে।

আমার মনে হয় বর্তমানের মত আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যের ভাষা হিসেবে ইংরেজির প্রচলন ভবিষ্যতে নাও থাকতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো ইতিমধ্যেই কিছু কিছু চীনা ভাষা শিখতে শুরু করে দিয়েছে। আর আমরা যদিও পশ্চিমা দেশগুলোতে আমাদের পণ্য রপ্তানী করি কিন্তু অন্যান্য দেশের মতই আমাদেরও আমদানী করতে হয় চীনের কাছ থেকেই— শীঘ্রই আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা চীনা ভাষায় প্রশিক্ষিত লোকবল চাইতে শুরু করবেন। শীঘ্রই চীন সামগ্রিকভাবেই নতুন সুপার পাওয়ারে পরিণত হতে যাচ্ছে আর বর্তমানে আমরা যে প্রয়োজনে ইংরেজি শিখি সেই একই প্রয়োজন মেটাতে অচিরেই হয়ত আমরা চীনা ভাষা শিখতে বাধ্য হব। তবে ভবিষ্যতেও আরো অনেকটা বছর ইংরেজি শিক্ষাধারা হিসেবে না হোক অন্তত ভাষা হিসেবে কোনো না কোনোভাবে আমাদের মাঝে প্রচলিত থাকবে। কারণ বাংলাদেশি জীবনযাত্রা ও ভাষার মধ্যে ইংরেজির ছোট ছোট টুকরোগুলো এমনভাবে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে যে তাদেরকে আলাদা করে বের করে নিয়ে আসা খুবই কঠিন। বিদেশি এই ভাষাটি সম্পর্কে খুব বেশী সচেতনতা ছাড়াই আমাদের দেশের সকল শ্রেণির মানুষই ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন। আসলে বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের প্রাচুর্য এতটাই যে এর আর আলাদা করে উদাহরণের প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এ ক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে পছন্দের উদাহরণ হল বাংলাদেশের বিভিন্ন ছোট ছোট দোকান, ব্যবসাস্থল আর অফিসগুলোর বিভিন্ন নাম ও সাইনবোর্ডগুলো। যদিও বেশির ভাগ নামই বাংলা অক্ষরে লেখা কিন্তু নামগুলো মূলত বর্ণান্তরিত ইংরেজি; ‘সানসাইন মেডিকেল হল’ নামটির একশত ভাগই ইংরেজি সব শব্দ দিয়ে গড়া আবার ‘উত্তরা শপিং সেন্টার’ নামটির দুই-তৃতীয়াংশই ইংরেজি, এমনই অসংখ্য নাম রয়েছে যেগুলোতে বাংলা ইংরেজি বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত রয়েছে কিন্তু খুব কম মানুষই ভাষার এমনতর মিশ্রণকে অস্বাভাবিক মনে করেন। আমাদের ভাষায় এমন সব ইংরেজি শব্দের প্রচলন রয়েছে যে তাদের পরিবর্তে ব্যবহার উপযোগী কোনো বাংলা শব্দ নেই, যেমন : অ্যাপার্টমেণ্ট বা ফ্ল্যাটের মতোন শব্দগুলো। স্বাধীনতার পর থেকেই ইংরেজি ভাষা থেকে আমদানী করা অথবা ধার করা শব্দের সংখ্যা বাড়তে থাকে যদিও একই সাথে দুইটি ভাষার ব্যবহার অর্থাৎ কোড সুইচিং এর প্রচলন দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন কেউ বাংলায় একটি বাক্য শুরু করে হয়ত ইংরেজিতে তা শেষ করতেন কিংবা তার উল্টোটা, তবে এর প্রচলন ছিল বেশ, আমার মনে হয় এখনকার দিনে খুব কম মানুষই এই কাজটি করে। পকাড সুইচিং কমে আসলেও বাংলা ভাষায় টুকরো টুকরো ইংরেজি অভিব্যক্তি, শব্দ ও বাক্যাংশের ব্যবহার বেড়েছে অনেক। আমি মনে করি মূলত আমাদের এই অঞ্চলে ভাষা হিসেবে ইংরেজির অবনমনই এর মূল কারণ। এখন কেউ কথা বলার সময় ব্যাকরণগতভাবে সঠিক একটি সম্পূর্ণ ইংরেজি বাক্যের চেয়ে কিছু ইংরেজি শব্দ বেছে নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ভাষা ও সংস্কৃতিগত পট পরিবর্তনের এই ঘটনাটি কিন্তু গবেষণার জন্য একটি আকর্ষণীয় বিষয় হতে পারে, আর আমি নিশ্চিত কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও এই বিষয়ে গবেষণার কাজটি ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন।

মা.আ ও তা.ই : ইংরেজি শিক্ষা কি এ দেশে বাংলা ভাষার প্রায় একচ্ছত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের বিপরীতে কোনো অবস্থান দাবী করতে পারে? আপনার ব্যক্তিগত জীবনে ইংরেজির ব্যবহার আর পেশাগত জীবনে এই ভাষা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা, এই দুটো বিষয়কে আপনি কিভাবে তুলনা করবেন?

অধ্যাপক আলী : এই দেশে ইংরেজি শিক্ষা কোনোভাবেই বাংলা ভাষার একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। এখানে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির কর্তৃত্ব থাকবেই কারণ বাংলাদেশ মূলত একটি একক সংস্কৃতির দেশ এবং নিশ্চিতভাবেই একক ভাষার দেশ। এখানে অনেক ভাষার মধ্যে কর্তৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বীতা নেই, যা কিনা পাকিস্তানের অংশ থাকাকালীন অবস্থায় ছিল। বাংলাদেশে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির সাথে তুলনা করলে ইংরেজি শিক্ষা অনেক বেশিই অগুরুত্বপূর্ণ। আমি বোঝাতে চাইছি যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র ইংরেজি শিক্ষার চেয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কিত যে কোনো শিক্ষাই অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজির গুরুত্ব রয়েছে ভাষা হিসেবে কারণ সব বিভাগেই শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। আমার মনে হয় মানবিকের চেয়ে বরং বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতেই ইংরেজি ভাষা জ্ঞানের প্রয়োজনটা বেশী। ইংরেজি বাদে অন্য যে কোনো বিভাগে পড়ার ক্ষেত্রে ইংরেজির জ্ঞান শুধুমাত্রই সহায়ক হিসেবে কাজ করে, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। কোনো বিজ্ঞানী বা অর্থনীতিবিদদেরই তাঁর নিজের পেশাগত জীবনের কথা মাথায় রেখে নিজ গদ্য শৈলীর উন্নতির জন্য শেক্সপিয়ার কিংবা মিল্টন পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের এখানে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইংরেজিকে আসলে এভাবেই ব্যবহার করেন; তারা ইংরেজি ভাষাটিকে সেভাবেই শেখেন যেন তারা তাদের পছন্দের ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করতে পারেন আর সেই বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ রচনা প্রস্তুত করতে পারেন। ইংরেজি শিক্ষা বলতে আমরা যা বুঝি (ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে বাদ দিয়ে) এখানে তার কোনোই প্রয়োজন নেই। আর এ কথাও বলে রাখি যে, ইংরেজির বাইরে অন্য যে কোনো বিষয়ে একখানা গবেষণাপত্র তৈরির জন্য অল্প বিস্তর ইংরেজি জানাটাই যথেষ্ট। একমাত্র কূটনীতিক ও পররাষ্ট্র অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্যই একটু উচ্চতর মাত্রার ইংরেজির প্রয়োজন হয়— যদিও আমি প্রায়ই দেখি (প্রচার মাধ্যমগুলোতে প্রচারিত সংবাদে আর কখনো কখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগের ফলে) আমাদের বেশিরভাগ কূটনীতিকই খুব অল্প পরিমাণ ইংরেজি দিয়ে বেশ ভালভাবেই পার পেয়ে যান।

আর একটি প্রশ্ন ছিল যে, আমার ব্যক্তিগত জীবন আর পেশাগত জীবনে ইংরেজির ব্যবহারের পার্থক্য কোথায়? আসলে আমি মনে করি যে, আমার ব্যক্তিগত জীবনে ইংরেজির ব্যবহারটা একটু বেশী। আমার বেশিরভাগ পাঠ ইংরেজিতে, ব্যক্তিগত চিঠিগুলোও আমি ইংরেজিতে লিখি আর এ কাজটা আমি বেশ উপভোগও করি, আর ইংরেজিতেই আমি সবচেয়ে ভাল বলি, (বাগ্মীতার কথা বলছি না বরং নিজের মনোভাব প্রকাশের কথা বলছি) যখনই কোনো কিছু বলতে গিয়ে আটকে যাই সাথে সাথেই উপযুক্ত শব্দ বা অভিব্যক্তির জন্য আমি ইংরেজির দ্বারস্থ হই, এছাড়া অন্যান্য আরো অনেক কিছুই আমি ইংরেজিতে সারতে পছন্দ করি; যেমন, চিন্তা করা, স্বপ্ন দেখা, অভিশাপ দেয়া এমনকি গালাগাল, আর আমার প্রার্থনার সবটুকু না হলেও কিছু অংশ আমি ইংরেজিতেই করি। ওহ! এছাড়া বেসুরো হলেও খুব সাহসের সাথেই আমি ইংরেজিতে গানও গাইতে পারি। ছোট এই তালিকাটিই প্রমাণ করে যে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে ইংরেজির ব্যবহারকে বেশ অনেক দূরই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি। শার্লক হোমস আর জীভস্ হয়ত পুরো ব্যাপারটিকে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যাযোগ্য ঘটনা বলেই মনে করতেন, আসলে শিক্ষাজীবনে গোড়ার দিকটায় ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে পড়াই ইংরেজি ভাষার ওপর আমার এমন নির্ভরশীলতার কারণ। তাছাড়া, ম্যাট্রিকুলেশনের আগ পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবন বারেবারেই যেমন বাধার মুখে পড়েছে, তেমনি তা ছিল বেশ বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। সারা জীবনে আমি মাত্র পাঁচ বছর স্কুলে গিয়েছি, তাও আবার কিন্ডারগার্টেনের এক বছরসহ, আর ফলাফল স্বরূপ আমার পড়াশুনার বেশির ভাগটাই হয়েছে কোনো শিক্ষক বা গৃহশিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই নিজ উদ্যোগে, নিজ বাড়িতে। আর এ ব্যবস্থা একজন বেসরকারী প্রার্থী হিসেবে ম্যাট্রিকুলেশন-এ অংশ নেওয়ার আগ পর্যন্ত চলতে থাকে। নিজ বাড়িতে স্বশিক্ষা ও স্বনির্বাচিত পাঠের যে ব্যবস্থা আমি করেছিলাম তার মাধ্যমটি ছিল ইংরেজি। আমার পারিপার্শ্বিকতা থেকেই ইংরেজি ভাষাটিকে আমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেছে নিয়েছিলাম। সামাজিক জীবনে ইংরেজির ব্যবহার বর্তমানের চেয়ে আমার শৈশব আর যৌবনেই বরং আমি বেশি হতে দেখেছি। আর এ কারণেই বলা যায়, আমার মনোজগতের অনেকটাই ইংরেজিতে গড়া। এ দলে অবশ্য আমি একা নই, আমি মনে করি পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে আমার সমসাময়িক আরো হাজার মানুষ এমন করেই চিন্তা করেন। উনিশশত চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকের প্রজন্ম হিসেবে আমরা বৃটিশ সা¤্রাজ্যের মৃত নয়, তবে মরণোন্মুখ আভায় বেড়ে উঠেছিলাম, সম্ভবত আমরা প্রথম সারির উত্তর-উপনিবেশবাদীদের অংশ নই বরং উপনিবেশবাদেরই শেষ কাতারের মানুষ।

শিক্ষায়তনে ইংরেজির ব্যবহার সম্পর্কে আমি পূর্বে যা বলেছি নিজ পেশাগত জীবনে আমার ইংরেজি ব্যবহারের ধরণ অনেকটা তেমনই; ইংরেজি ভাষাটি এক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে। ভাষাটিতে দক্ষতা যেমন আমার নির্দিষ্ট শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য সহায়ক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আমার নিযুক্তির জন্য আবশ্যক। এই ইংরেজি অবশ্য একটি বিশেষ ধরনের ইংরেজি; এ ইংরেজি হচ্ছে সাহিত্যের ইংরেজি, সাহিত্য সমালোচনার ইংরেজি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার উপযোগী ইংরেজি, শ্রেণিকক্ষ বা সাধারণের মাঝে বক্তব্যের উপযোগী ইংরেজি। একটা সময় আমি এমনতর ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনে বেশ আগ্রহী ছিলাম কিন্তু এখন আর এ বিষয়ে আমার আগ্রহ নেই। একটা সময় ছিল যখন আমি এ ধরনের ইংরেজি শিখতে আর তাতে দক্ষতা অর্জনে বেশ সচেষ্ট ছিলাম আর তার উদ্দেশ্য ছিল এম.এ আর পিএইচ.ডি.-র মত প্রথাগত য্যোগ্যতাসমূহ অর্জন, কিন্তু এখন আর এ ধরনের লেখা লিখতে বা পড়তে আমার ভাল লাগে না। যদিও একই সাথে আমি এও অনুধাবন করেছি যে একটা সময় এমন ইংরেজি শেখার জন্য আমি অনেক বেশি শ্রম দিয়ে ফেলেছিলাম, তাই এখন এ ধরনের ইংরেজির বদলে, লেখা ও শ্রেণিকক্ষের বক্তৃতা উপযোগী আরও সহজ ও সহজাত ইংরেজির ব্যবহারকে আয়ত্তে আনা আমার জন্যে বেশ পরিশ্রমসাধ্য হয়ে উঠেছে। যদিও আমি এখনো ব্যাপারটিকে আয়ত্তে আনতে পারিনি তবে কাজ কিন্তু করে যাচ্ছি।

কিন্তু যদি বলি ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবহৃত ইংরেজি আর শিক্ষকতা পেশার ইংরেজির সম্পর্ক কোথায়, তবে আমি বলব শিক্ষকতা পেশায় থাকা মানুষটি যদি তার ব্যক্তিগত জীবনেও ইংরেজির ব্যবহারে দক্ষ হন তবে তা তার পেশা জীবনের জন্য অনেক বেশীই সহায়ক হয়। কিন্তু যদি তা না হয় তবে আপনি যে ভাষায় চিন্তা করেন, আর পেশাগত জীবনে যে ভাষাটি ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে একটা ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আর এই ব্যাপারটি কখনই খুব একটা উপভোগ্য নয়।

মা.আ ও তা.ই : বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে ইংরেজি শিক্ষার কি কোনো সম্পর্ক আপনি দেখতে পান? শিক্ষায়তনের ইংরেজি শিক্ষা আর বাস্তব জীবনযাত্রার ধরনের মধ্যকার বিভাজনকে আপনি কিভাবে বিচার করবেন?

অধ্যাপক আলী : এ কথা তো সবাই বলবে যে, ইংরেজি শিক্ষার সাথে বাংলাদেশি জীবনযাত্রার মিলের দিকটা খুবই অল্প। একটা সময় ছিল যখন দৈবাৎ এমন মানুষ পাওয়া যেত যারা কিনা ইংরেজি সাহিত্যে বেশ পারদর্শী ছিলেন, আর তারা সেই সাহিত্যে পাওয়া জীবনের মত করেই তাদের জীবনযাপন করতে চাইতেন— তারা যেন জওহরলাল নেহরু আর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র মত একই সাথে দেশি জাতীয়তাবাদী আর ইংরেজ ভদ্রলোকের পরিচয়টা ধারণ করতে চাইতেন। এ দলের মানুষদের বৈশিষ্ট্যের একটি তাৎক্ষণিক তালিকা করলে দেখা যাবে যে, ধর্মের বিষয়ে তারা ছিলেন সন্দেহবাদী, রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ, আচরণে আন্তরিক, সামাজিক নৈতিকতার ক্ষেত্রে অনমনীয় আর পার্থিব সমৃদ্ধি ও পশ্চিমা সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু মানুষ ছিলেন যারা আসলে ভেতরে ভেতরে তাদের নিজেদের বিশ্বাসের এই জায়গাটি নিয়ে বেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন, এমন লোক আমি অনেক দেখেছি, এমনকি আমার আত্মীয় স্বজনের মধ্যেও দেখেছি। উপনিবেশবাদের সময়ে বেড়ে ওঠা এসব মানুষেরাই তাদের  সোপার্জিত অভ্যাসগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে একসময় তাদের সংস্কৃতির শেকড়ে ফিরে গিয়েছিলেন। আর নিজ সংস্কৃতিবিমুখ জীবনযাপনের জন্য তাদের মধ্যে পাপবোধ যেমন ছিল, তেমনি ছিল কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ আর প্রায়শ্চিত্তের আকাক্সক্ষা। মধ্যম পন্থা অনুসারী, অর্থাৎ পশ্চিমা ধারার শিক্ষা থেকে পাওয়া মূল্যবোধ আর দেশিয় সংস্কৃতির আদর্শ এই দুইটি ধারার মাঝামাঝি পথ ধরে হাঁটা মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর তাদের চলার পথটিও ছিল বেশ টালমাটাল আর অস্থির। অবশ্য আমি নিজেও এই দলের অন্তর্ভুক্ত কিনা সে বিষয়ে আমি এখনো নিশ্চিত নই।

ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রটিতে কেতাবি পড়াশোনা আর বাস্তব জীবনযাত্রার ফারাকের কথা যদি বলি, তবে বলতে হয়, এ ব্যবধান ঘোচাবার কোনো উপায় নেই। জীবাশ্ম বিজ্ঞানীর জন্য ডাইনোসর সংক্রান্ত শিক্ষা যেমন, ঠিক তেমনি ইংরেজি শিক্ষা হল একটি পেশা, জীবিকার মাধ্যম, যাপিত জীবনের সাথে এর মিল সামান্যই।

মা.আ ও তা.ই : আপনি কি মনে করেন ইংরেজি শিক্ষার এই ক্ষেত্রটি কি আমাদের দেশে কোনো প্রকারের আদর্শ কিংবা জাতীয় চেতনা গড়ে তুলতে কাজ করেছে?

অধ্যাপক আলী : সম্ভবত ঊনবিংশ শতাব্দীতে করেছিল। বৃটিশ সা¤্রাজ্যভুক্ত ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজির অন্তর্ভুক্তি এ সময়টাতেই। বৃটিশ আর ভারতীয় নির্বিশেষে ইতিহাসবিদরা মনে করেন মধ্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি শিক্ষার সূচনাই সে সময়কার মৃতপ্রায় ভারতীয় সংস্কৃতিকে নতুন নতুন চিন্তার খোরাক যুগিয়ে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। রাজা রামমোহন রায়ের রচনাসমূহ, বাংলার নবজাগরণ, ইয়ং বেঙ্গল, স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলীগড় আন্দোলন, ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের উত্থান আর তাদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশ, এ সবই ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা ‘নতুন শিক্ষা’ থেকে পাওয়া। আর সেই পথ ধরেই শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, স্বরাজ এই সকল চেতনার জাগরণ, বস্তুত তারই ফলস্বরূপ উপমহাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা দাবী ও অর্জন। মৃত ক্ল্যাসিকাল ভাষাসমূহের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচ্যের শিক্ষা তখন পশ্চাদগামীতারই অপর নাম। আর ইংরেজি শিক্ষাই যেন তখন আত্মবিশ্বাস, সমৃদ্ধি, আধুনিকতা আর স্বাধীনতার বার্তাবাহক। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে কালচারাল স্টাডিজে পাওয়া উওর-উপনিবেশবাদের ধারণা এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলে যে, উপমহাদেশকে দেয়া বৃটিশ সা¤্রাজ্যের অন্যান্য উপহার যেমন সরকারী চাকরি, রেল ব্যবস্থা ও আইন ব্যবস্থার মত ইংরেজি শিক্ষারও একটি অন্ধকার দিক আছে, যা কিনা এখানকার স্থানীয় ব্যবস্থার ভাল দিকগুলোর অনেকখানিই ধ্বংস ও বিনষ্ট করে দিয়েছে। আমাদের পূর্বসূরীরা ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে অসাড় অসাহায়ত্ব ও অবিবেচক উৎসাহ দেখিয়েছিলেন সে কথা ভেবে বর্তমানের জাতীয়তাবাদী ও অতি-জাতীয়তাবাদীরা এখন বিলাপ করেন। তারা অবশ্য এই শিক্ষা ব্যবস্থার যে অবশিষ্টাংশ এখনো চালু আছে তা পুরোপুরি তুলে দিতে চাইছেন না, বরং সে ব্যবস্থাপনার মধ্যে থেকেই সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, অর্থাৎ ইংরেজিতেই বলছেন ইংরেজির বিরুদ্ধে।

ভাষাগত জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশে উত্তর-উপনিবেশবাদের ভিত্তি। আমার মনে হয় উর্দু ভাষা আর পাকিস্তানের দ্বি-জাতিতত্ত্বের ধারণার মত করে ইংরেজিকেও আমরা আমাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধ কাতারে দাঁড় করিয়েছি। আর এসব ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই আমরা আমাদের জাতীয় চেতনাকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছি। গত ষাট-সত্তর বছর যাবৎ যখন আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের নিজস্বতাকে খুঁজে পেতে চাইছি, সে অবস্থায় ইংরেজি শিক্ষা সবসময়ই ছিল একটি ভিনদেশী বিষয়। একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার আধিপত্য আর এর সর্বগ্রাসী সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বৈধতা যেমন দিয়েছে তেমনি করেছে শক্তিশালী।

মা.আ ও তা.ই : বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের লেখকরা বেশ সফলভাবেই ইংরেজিতে লেখালেখি করছেন। অ-ইংরেজ লেখকদের মধ্যে ইংরেজির এই বিস্তৃতি, বিশ্ব ইংরেজির ধারণাকে আরো উদ্দীপ্ত করেছে। এই দৃশ্যপটে আমাদের অবস্থান কোথায়?

অধ্যাপক আলী : যদিও বিশ্ব ইংরেজির মানচিত্রে আমাদের একটা অবস্থান তৈরির জন্য দেশে অবস্থানরত উৎসাহীদের পাশাপাশি প্রবাসী শুভাকাক্সক্ষীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়েই আছি। এ কথা সত্য যে এখানে ইংরেজি পড়া হয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি বিভাগ রয়েছে, ইংরেজি শিক্ষাকে কেন্দ্র করে আমরা বিভিন্ন কনফারেন্সের আয়োজন করি, আমাদের ছোট একটি ইংরেজি সংবাদ মাধ্যম রয়েছে, আমরা কিছু কিছু ইংরেজি বইও প্রকাশ করছি, দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আমরা মাঝে মাঝে ইংরেজি ব্যবহার করি, কিন্তু সর্বোপরি এ দেশে ইংরেজির ব্যবহার খুবই সীমিত। আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, কোনো ইংরেজি প্রকাশনা, তা আমদানীকৃতই হোক অথবা স্থানীয়ভাবে প্রকাশিতই হোক, এই দেশে লাভের মুখ দেখবে না— এমনকি হ্যারি পটারের মতন নামী অভিযাত্রিকের জন্যও একথা সত্য। আবার এ কথাও সত্য যে, আমাদের দুএকজন ঔপন্যাসিক ও লেখক রয়েছেন যেমন : আবিদ খান, তাহমিমা আনাম যাঁরা কিনা ইংরেজিতে লিখছেন। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি, দেশের তুলনায় দেশের বাইরেই তাদের পাঠকের সংখ্যা বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার ইংরেজি এখনো সম্পূর্ণভাবে ভারতেরই তত্ত্বাবধায়নে রয়েছে; এখনো বাংলাদেশ যেমন এ সাহিত্যের ভোক্তা নয়, তেমনি এর উৎপাদনেও হাত পাকেনি তার। আমার মনে হয়, বর্তমানে দেশের ইংরেজির অবস্থা সম্পর্কে এটুকুই বলা যায় যে, এখানে ইংরেজি বিষয়ে পড়তে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অনেক। পেশাগত সুবিধাই (শিক্ষকতা পেশা) তাদের এমন আগ্রহের প্রাথমিক কারণ, আর দ্বিতীয় কারণটি হল হাম্বরা ভাব দেখাবার সুযোগ, কারণ চারপাশের খুব কম মানুষই ভাষাটিতে পারদর্শী। এর মানে এই নয় যে, দেশে ইংরেজির মান নিচে নেমে গিয়েছে— এখন চারিদিকে এমন অনেক তরুণেরা রয়েছেন যারা ইংরেজি বেশ ভাল বলে ও লেখে, অন্তত তাদের ঐ বয়সটাতে থাকা অবস্থায় আমি ইংরেজিকে এতটা আয়ত্তে আনতে পারিনি। বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী ইংরেজি লেখকদের ভবিষ্যৎ কি হবে তা এখনই বলাটা বেশ কঠিন। হয়ত তারা এ দেশেই তাদের পাঠকমহল খুঁজে পাবেন, অথবা হয়ত তাদের সুখ্যাতি বাইরের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে। অবশ্য বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় প্রথম ঘটনাটির চেয়ে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।

মা.আ ও তা.ই : বৃটিশ সা¤্রাজ্যের অধীনস্থ প্রাক্তন উপনিবেশ হিসেবে আমাদের দেশের ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রটি উত্তর-উপনিবেশবাদের সহায়ক অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কতটুকু ভূমিকা রাখছে?

অধ্যাপক আলী : যেহেতু উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্বে আমার তেমন দখল নেই, তাই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়ত আমি করতে পারব না। তবে প্রাক্তন উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশ হোক অথবা উপনিবেশই হোক, সব দেশেই উত্তর-উপনিবেশবাদের মূল আগ্রহ ঐ উপনিবেশবাদের ফেলে আসা চিহ্নসমূহের প্রতিই। বৃটিশরা বিদায় নেওয়ার পরেও কিভাবে খুব সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যে হলেও এখানে ইংরেজির ব্যবহার চালু থাকল, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের এত সব বিভাগের মধ্যে ইংরেজিকেই কেন অতিরিক্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়, এখনকার উত্তর-উপনিবেশবাদীরা এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে পারেন।

মা.আ ও তা.ই  : বাংলাদেশের ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে ইএলটি-র বিষয়ে যে জোর দেওয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

অধ্যাপক আলী : আমার মনে হয় আমাদের দেশে প্রেক্ষাপটে ইংরেজি সাহিত্যের চেয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা প্রদানই বেশি যৌক্তিক কেননা ভাষাটির তাও কিছু ব্যবহারিক দিক আছে যা সাহিত্যের নেই। ইংরেজি সাহিত্য পাঠ একদমই আপন আকাক্সক্ষা পূরণের বিষয়। আর অন্যদিকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার অন্তত কিছু ব্যবহারিক গুরুত্ব আছে। শুরুর দিকটায় ইএলটি থেকে আমি দূরেই থাকতাম, ইংরেজি বিভাগে এর অন্তর্ভুক্তিরও বিরোধী ছিলাম আমি, কিন্তু পরবর্তীতে আমিই ইএলটি-র পক্ষে কথা বলতে শুরু করি। আমি আশির দশকের শেষ আর নব্বই এর দশকের শুরুর দিকের কথা বলছি। তখন আমরা আমাদের বিভাগে এমন সব ছাত্র-ছাত্রী পাচ্ছিলাম যাদের ইংরেজিতে পারদর্শীতা ছিল খুবই সামান্য। যারা কিনা ইংরেজি ভাষাটিকে ভাল করে পড়তে ও বুঝতে পারত না, তাদেরকে ইংরেজি সাহিত্য পড়াবার সার্থকতা নিয়ে তখন আমি আর আমার সহকর্মীরা বেশ সন্দিহান ছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল যে, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও উপকারী হবে, তেমনি শিক্ষকদের কাছেও কাজটি হবে অর্থপূর্ণ। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় যদি ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রহণযোগ্য আর ব্যবহার উপযোগী ইংরেজি পড়তে, বলতে, আর লিখতে শেখে যা কিনা তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে একদমই পারত না, তবে তা শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী উভয়পক্ষের জন্যই হয়তো বিশেষ এক অর্জন। আর একই সাথে আমরা যদি তাদেরকে ইংরেজি সাহিত্যও পড়াতে পারতাম, তাদেরকে শেখাতে পারতাম কিভাবে বিশ্লেষণ আর সমালোচনা করতে হয়, তাদের সহজাত বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রটির উন্নতি ঘটাতে পারতাম, তাহলে ইংরেজি বিভাগের পড়াশোনা আর কেবলমাত্র আকাক্সক্ষা পূরণের বিষয় থাকত না, বরং আমরা তখন একদম সত্যিকারের শিক্ষার কাছাকাছি পৌঁছতে পারতাম। ছাত্র-ছাত্রীরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই দক্ষতা অর্জন করত যে, কী উপায়ে একটি ভাষাকে আয়ত্তে নিতে হয়, কীভাবে সংস্কৃতিজাত কোনো বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণ করতে হয় কিংবা কীভাবে সাহিত্যের টেক্সট-এর মতো কোনো মূর্তমান বিষয়ে মনোনিবেশ করতে হয়। শুধুমাত্র আনন্দের জন্য শেলী আর টেনিসন পাঠের চেয়ে এই দক্ষতা অর্জনই বরং তাদের ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের জন্য অধিক উপকারী হতে পারত।

কিন্তু আমার মনে হয়, সেই সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইংরেজি বিভাগগুলোতে যে ইএলটি প্রোগামগুলো চালু রয়েছে, অর্থাৎ তারা যে ডিগ্রীগুলো প্রদান করছে, যেসব প্রজেক্ট, সভা, আর প্রশিক্ষণের নামে যেসব উৎসবের আয়োজন করছে এসবের কোনো কিছুই খুব বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। ছাত্র-ছাত্রীদের যে এখন আগের চেয়ে আরো বেশি দক্ষতার সাথে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে অথবা তারা যে আগের তুলনায় আরো ভাল প্রক্রিয়ায় ভাষাটিকে শিখতে পারছে, আমি অন্তত সে কথা বিশ্বাস করি না, অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের বাইরের ভাষা প্রশিক্ষকদের মতামত এক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। আবার সেই সাথে এই কথাও বলতে হয় যে, বিভাগ হিসেবে ইএলটি-কে (একে আদৌ বিভাগ বলা যায় কি-না তা নিয়ে সন্দেহ আছে) কোনো লক্ষ্য অর্জনের পথ বলে মনে হয় না বরং বিভাগটির লক্ষ্য যেন তার নিজের মধ্যেই নিহিত। আমি বোঝাতে চাইছি যে, ইএলটিতে পড়াশোনা করে ভাষার শিক্ষক হবার পরিবর্তে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা বরং ইএলটি বিষয়টিরই শিক্ষক হচ্ছে, তারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে— যাতে করে তারাও আরো প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে পারে। ইএলটি একের পর এক প্রোগ্রাম আর কোর্সের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে ভাষা শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কোর্সের সংখ্যা তেমন বাড়ছে না। আশা করি এ বিষয়ে আমার ধারণা ভুল; আশা করি শুধুমাত্র সাধারণ ইংরেজি ভাষা শিক্ষা প্রদানের উপরও প্রচুর কাজ হচ্ছে যার ফল হয়ত আমি দেখি না বা সে বিষয়ে আমার ধারণা নেই। আমি এটাও আশা করি যে, একটা সময় আসবে যখন আমাদের বর্তমান সময়ের তরুণ গ্রাজুয়েটরা এই বিষয়টি নিয়ে আরো ভাল করে ভাববেন, আর এই সমস্যার সমাধান করবেন।

মা.আ ও তা.ই : অনেক দেশেরই ইংরেজি বিভাগগুলোতে, বিশেষ করে যেসব দেশ পূর্বে বৃটিশ উপনিবেশবাদের অংশ ছিল তারা এখন বৃটিশ ও আমেরিকান সাহিত্যধারাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা পাঠক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। যেমন : ভারতের কথাই ধরা যাক, তারা তাদের পাঠ্যক্রমে অ-ইংরেজ দেশগুলো থেকে আসা ইংরেজি সাহিত্যসমূহ অন্তর্ভুক্ত করছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? আর এ পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের ইংরেজি বিভাগগুলোর জন্য আপনার পরামর্শ কি?

অধ্যাপক আলী : আসলে এমন ঘটনা সত্যিই ঘটছে আর শুধুমাত্র ভারতেই নয় বরং যুক্তরাজ্য ও আমেরিকাতেও অ-ইংরেজদের লেখা ইংরেজি সাহিত্য পড়ান হচ্ছে। কিন্তু প্রথমেই বলতে হয় যে, এসব সাহিত্যকর্মের মধ্যে কয়টি আসলে অ-ইংরেজ দেশেই জন্ম লাভ করেছে সে বিষয়ে আমি সন্দিহান। এ ধরনের সাহিত্যের ধারাটাই হচ্ছে এমন যে, লেখকরা সাধারণত তাদের প্রথম লেখাটি তাদের নিজ দেশ থেকেই প্রকাশ করেন কিন্তু তারপর অন্য কোনো দেশে তাদের পরবর্তী লেখাগুলোর জন্য প্রকাশক খুঁজতে থাকেন। দক্ষিণ এশিয়ার লেখকরা তখনই নিজ দেশে পরিচিতি পান, যখন কিনা তারা কোনো ইংরেজি প্রধান দেশ বিশেষ করে ইংল্যান্ড থেকে তাদের লেখাটি প্রকাশ করতে পারেন। বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদের সময় থেকেই (এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাতে) এই প্রক্রিয়া চালু আছে— যদিও অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় প্রকাশনা-শিল্প ও পাঠকমহল এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের একদম গোড়ার দিকের সেরা লেখকরা যেমন— আর কে নারায়ণ, নীরদ চৌধুরী এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যিকরাও একই উপায় অবলম্বন করেছিলেন। (আজকাল অবশ্য এই প্রক্রিয়াতেও কিছু নতুন সংযোজন হয়েছে, এই যেমন আজকাল লেখকরাও তাদের বইয়ের পিছু পিছু লন্ডন, নিউইয়র্ক, অথবা সিডনিতে চলে যাচ্ছেন) এ কথার মানে এই নয় যে আমি পুরো বিষয়টিকে খারাপ চোখে দেখছি। সর্বোপরি সব ভাল লেখকই ভাল প্রকাশক চান, আর এখনো পশ্চিমা প্রকাশকরাই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাবার ক্ষমতা রাখে। আর লেখকরা তো স্বাভাবিকভাবেই চাইবেন প্রকাশকদের কাছাকাছি থাকতে। কিন্তু পশ্চিমেই হোক আর পূর্বেই হোক পৃথিবীর যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কি পড়ান হবে তা লেখাটি কোন দেশ থেকে প্রকাশিত হল, কোন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হল আর বিভিন্ন দেশের সাহিত্য-সংক্রান্ত নামজাদা প্রতিষ্ঠানে তার গ্রহণযোগ্যতা কেমন, এসব বিষয়ের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে। তাই অ-ইংরেজদের লেখা ইংরেজি সাহিত্য আসলে পুরোপুরি অ-ইংরেজ নয় বরং তা ইংরেজ প্রধান দেশসমূহের সাহিত্য ও প্রকাশনা দ্বারা মারাত্মকভাবেই প্রভাবিত।

আমি শেষবার কোনো বৃটিশ কিংবা আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি বেশ অনেক বছর আগে, তাই সাম্প্রতিক সময়ে সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি পড়ান হচ্ছে সে বিষয়ে এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমার জানাশোনা কম। কিন্তু আমি যতদূর জানি, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ-ইংরেজদের লেখা ইংরেজি সাহিত্য পড়ান হয়, তবে তা পড়ান হয় জাতিভিত্তিক সাহিত্যের অংশ হিসেবে— যেমন : চাইনিজ পটভূমিকে উপজীব্য করে একজন চাইনিজ-আমেরিকান মহিলার লেখা উপন্যাস কিংবা একজন ভারতীয়-আমেরিকানের লেখা দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপন্যাস ইত্যাদি। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। সত্যিকার অর্থে মনিকা আলি যুক্তরাজ্যেরই নাগরিক, কিন্তু তাঁর মায়ের বিয়েটা যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি গোষ্ঠীতে হবার কারণেই তিনি এই গোষ্ঠীর জীবনধারার সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলেন, আর এ সম্পর্কে তাঁর প্রথম বইটিতে লিখতে পেরেছিলেন। এমন আরো বলা যায় নাদিম আসলামের কথা, এই লেখক যিনি আদতে একজন পাকিস্তানি, কিন্তু নিজ জীবনের দুই-তৃতীয়াংশই কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডে। বেশ কিছুকাল আগে একজন পাকিস্তানি লেখক— যতদূর মনে হয় মোহাম্মদ হানিফ যিনি এখন ইংল্যান্ডেই থাকেন— তো একবার ইংল্যান্ড থেকে পাকিস্তানে ঘুরতে গিয়ে তিনি বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন যে, পশ্চিমে বসবাসকারী এশিয়ান লেখকদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে পশ্চিমে তাদের লেখাগুলো পড়াই হয় মূলত তাদের লেখার বিচিত্র ভীনদেশি স্বাদের জন্য। আর সে কারণেই তাদের উচিত প্রায়ই নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখানকার বিভিন্ন পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত হওয়া, তাহলে তাদের লেখাগুলো আরো বাস্তবসম্মত হবে, আর তারা তাদের লেখাগুলোর ওপর যথেষ্ট কর্তৃত্ব অর্জনেও সক্ষম হবেন। সকল জাতিভিত্তিক লেখক আবার তাদের লেখনীর বিষয়ে এতটা সৎ নন। ভি.এস. নাইপল, সালমান রুশদির মতন লেখকদের কথা যদি চিন্তা করেন তবে দেখবেন যে, তাদের বেশির ভাগ পাঠকপ্রিয় লেখাই তাদের নিজ মাতৃভূমিকে উপজীব্য করেই লেখা। আবার বলি, তারা যা করেন তা কোনোভাবেই খারাপ কিছু নয়, কারণ সাহিত্যের সাথেও ব্যবসার এক ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, আর কেউই বই লেখা ও বিক্রির এই অর্থনীতিকে উপেক্ষা করতে পারেন না। পেশায় যারা লেখক, তা তারা অধিবাসীই হোন আর অভিবাসীই হোন, সকলেই এমন বিষয়েই লিখতে চান যার পাঠক রয়েছে, যা বিক্রি হবে— আফগানিস্তান আর ইরাকে চলতে থাকা যুদ্ধ ও নিষ্ঠুরতা, ইরানে মোল্লাদের বিরুদ্ধে নারীদের প্রতিবাদ, সাম্প্রতিক সময়ে এমন বিষয়গুলোর কাটতিই মনে হচ্ছে বেশী, একসময় গান্ধীর ভারত যেমন ছিল; এ সকল বিষয়ই লেখকদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দেয় আর প্রকাশকরাও নতুন প্রকাশনার জন্য অর্থ-লগ্নির আগে লেখার মধ্যে এসব বিষয়ের উপস্থিতি খতিয়ে দেখেন। হয়ত আমি সবাইকে একই পাল্লায় মেপে ফেললাম, কিন্তু আমি আসলে বোঝাতে চাইছি যে, অ-ইংরেজদের রচিত ইংরেজি সাহিত্যের যত সব ভাগ যেমন— কমনওয়েলথ সাহিত্য, জাতিভিত্তিক সাহিত্য, এসব আসলে মূল ইংরেজি সাহিত্যের ধারা থেকে খুব বেশি আলাদা কিছু নয়। যে ভাষায় আর যে প্রক্রিয়ায় এ সাহিত্য তৈরি হচ্ছে তা আদতে— পশ্চিমা ইংরেজ প্রক্রিয়াই, আর তাই প্রশ্নাতীতভাবেই ইংরেজি বিভাগগুলোর পাঠক্রমে কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের ধারায় এদের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব।

অবশ্য, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ যদি সত্যিকার অর্থেই ইংরেজি বিভাগ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে চায় তবে তারা কখনোই তাদের পাঠক্রমে বৃটিশ সাহিত্যধারার প্রাধান্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। একটি ইংরেজি বিভাগের পাঠক্রমের কোনো অংশই ইংরেজি সাহিত্যধারার মূল ক্ল্যাসিকগুলোকে বাদ দিতে পারে না। ইংরেজি সাহিত্যধারার ক্ল্যাসিকগুলোর কথা বলতে আসলে আমি সেই রেনেসাঁর সময় থেকে শুরু করে একদম ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সময়কালে লেখা যে সমস্ত সাহিত্য বহুল পরিচিত ও পঠিত সেগুলোর কথাই বোঝাতে চাইছি। অবশ্য তাই বলে, এই সাহিত্যধারার একদম সবগুলো লেখাকেই যে এ পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তা নয়, কিন্তু যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের পাঠক্রমে এই সময়কালের প্রতিনিধিত্বকারী লেখাসমূহের অন্তর্ভুক্তি বাঞ্ছনীয়। আর এর কারণটা খুব সাধারণ— মূল ইংরেজি সাহিত্যধারার বাইরে ইংরেজি সাহিত্যের যে অস্তিত্ব, তা আসলে মূল ইংরেজি সাহিত্যধারার ওপরই নির্ভরশীল, মূল ইংরেজি সাহিত্যধারার কাছে সে ঋণী, তা গঠনের ক্ষেত্রেই হোক আর ভাষার অলংকরণের ক্ষেত্রেই হোক। সাধারণ পাঠক হয়ত অ-ইংরেজ লেখকের লেখা ইংরেজি সাহিত্য পড়ে আনন্দ পেতে পারেন, এর পেছনের ইতিহাসটা হয়ত তার জানা হবে না, কিন্তু একজন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র/ছাত্রীকে তো অবশ্যই বইটির প্রকাশনার পেছনে মূল ইংরেজি সাহিত্যধারার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের যে প্রভাব রয়েছে তা সম্পর্কে সচেতন হতেই হবে।

সম্ভবত এ প্রসঙ্গে আরো একটা বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু সে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার মত সময় ও সুযোগ এখন হয়ত আমাদের হাতে নেই। সংক্ষেপে বলা যায়, আমাদের দেশে অ-ইংরেজদের লেখা ইংরেজি লেখা যদিওবা পড়া হয়, তবুও সে বইগুলো আসলে খুব জনপ্রিয় নয়। এ দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা আসলে ইংরেজি সাহিত্যের চর্চা থেকেই দূরে সরে আসছে, আগে যে শ্রদ্ধা ও সম্মান ইংরেজি সাহিত্যকে দেখান হত তা আর নেই। পশ্চিমা সংস্কৃতি, শিল্প ও সমাজ ব্যবস্থা এসবের যে সম্মান একটা সময় আমাদের দেশে ছিল তা যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি ইংরেজি সাহিত্যের যে মর্যাদা ছিল তাও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, সাম্প্রতিক সময়ের ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকপ্রিয় কিছু বই হয়ত আমাদের দেশেও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে, কোনো প্রকার স্বত্বাধিকার ছাড়াই ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি হয়েছে, অথবা বিক্রি হয়েছে অনুবাদ হিসেবে। কিন্তু এ সময়ের বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় বইগুলোর পাঠক সংখ্যার সাথে এ বইগুলোর পাঠক সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যাবে যে, সময়ের সাথে সাথে জনপ্রিয় ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। দেশে ইংরেজি বইয়ের পাঠকের সংখ্যা যে একদমই নি¤œমুখী তার আর একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিদেশী জনপ্রিয় বইগুলোর অনূদিত হবার বিষয়টি; এর মানে হল, বেশির ভাগ মানুষই আসল লেখাটি বাদ দিয়ে তার বাংলা সংস্করণটি পড়তেই বেশি আগ্রহী; যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই অনুবাদগুলো হয়ত অনুমোদনহীন, অসম্পূর্ণ, আর ভুলে ভরা। আমাদের ক্যাম্পাসগুলোতে, ক্লাসগুলোতে ইংরেজি সাহিত্যের ক্ল্যাসিক হিসেবে পরিচিত যেমন— ডিকেন্স আর ট্রোলপ কিংবা ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও শেলির লেখাগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের খুশী করতে পারছে না, এ লেখাগুলো তাদের কাছে একঘেয়ে মনে হচ্ছে। তারা বরং বাংলা সাহিত্যের মহান লেখকদের পাশাপাশি নতুন নতুন সাহিত্যিকদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী, যারা শুধুমাত্র ইংরেজি সাহিত্য নয়, বরং সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা নিয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছে তারা অনেকেই ইংরেজি সাহিত্য পড়ছে (পরীক্ষার জন্য নয় বরং আনন্দের জন্য যে পাঠ) বাংলা অনুবাদে। আর এই ছাত্র-ছাত্রীরাই যখন ইংরেজির শিক্ষক হচ্ছেন তখন তারাও অনুবাদের কাজেই বেশি ঝুঁকে পড়ছেন। কারণ, সরাসরি বাংলা সাহিত্যে কাজ না করতে পারা দলের জন্য এ কাজটিই বরং দ্বিতীয় মর্যাদাপূর্ণ কাজ। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় বইয়ের তালিকায় এসব অনুবাদের পরই হয়ত দক্ষিণ এশিয় অথবা অ-ইংরেজ লেখকদের লেখা ইংরেজি বইগুলোর স্থান। কারণ তাদের মতে, অ-ইংরেজদের লেখা এই ইংরেজি সাহিত্যই বরং তাদের নিজেদের কথা বলে, ইংরেজদের লেখা ইংরেজি সাহিত্যের মত এ সাহিত্য তাদের কাছে একঘেয়ে নয় (যদিও আমার অভিজ্ঞতা বলে আমাদের অনেক ছাত্র-ছাত্রীই, বিশেষ করে যারা বাংলায় একটু দক্ষ তারা ইংরেজিতে লিখতে থাকা বাংলাদেশি সাহিত্যিকদের সাহিত্যিক বলেই গণ্য করতে চায় না)। তো স্থানীয় বিষয়াদির ওপর ভিত্তি করে অ-ইংরেজদের লেখা ইংরেজি লেখাসমূহের জনপ্রিয়তা আসলে সাধারণ পাঠকদের  তাদের নিজ নিজ সাহিত্য আর সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসারই প্রতিফলন। সত্যিকার অর্থে, আমি এ কথাগুলোর অবতারণা করলাম এ বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলতে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় হিসেবে একসময়কার জনপ্রিয় আর মর্যাদাপূর্ণ ইংরেজি সাহিত্যের সূর্য আজ সত্যি সত্যিই অস্তগামী। একথা হয়ত ইংল্যান্ড আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সত্য। আমার মনে পড়ে, আমি কিছুকাল আগে একজন আমেরিকান গবেষকের একটি লেখা পড়েছিলাম যার বিষয়বস্তু ছিল আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানবিক বিভাগের ও বিশেষ করে ইংরেজির ক্রম-বিলুপ্তি। যতদূর মনে পড়ে, এই গবেষক ইংরেজির ক্রম-বিলুপ্তির কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ-ইউরোপীয় আভিবাসীদের আধিক্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমেরিকাতে বসবাসকারী অ-ইউরোপীয় অভিবাসীদের একটা নতুন প্রজন্ম উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছে, আর তারা ইংরেজ ও আমেরিকান সাহিত্যকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু বলে মনে করে না। উপমহাদেশের নতুন প্রজন্মও তাদের অগ্রজদের তৈরি করা মূল্যবোধকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই নিজেদের মূল্যবোধ তৈরি করে নিচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতেও ইংরেজি বিভাগগুলোতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হবে, কিন্তু তা হবে নেহাতই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় আসনের অভাবে, কিন্তু ক্ল্যাসিক ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহের মাত্রা, ভাল লাগার পরিমাণ দিন দিন কমতেই থাকবে। এখনো হয়ত ইংরেজিকে জনপ্রিয় আর মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু আগামীতে ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজি সাহিত্য নয় বরং পেশাজীবনে বিক্রয়যোগ্য ইংরেজি ডিগ্রীর প্রতিই বেশী আগ্রহী হবে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এ ধরনের ঘটনাই আসলে সত্যিকারের উত্তর-উপনিবেশবাদ কিনা? কারণ সত্যিকার অর্থে, এই ধরনের ঘটনাই উপনিবেশবাদের ফল ও তার ধারাবাহিকতার ভিত্তিকে ভয়ংকরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশি লেখকদের ইংরেজি ভাষাতে সাহিত্যচর্চার বিষয়ে আমি যা বলছিলাম তার রেশ ধরে বলা যায়, এমনটাই স্বাভাবিক যে একসময় বাংলাদেশে ইংরেজি সাহিত্য রচনার চর্চাটা সম্ভবত একদমই বিলীন হয়ে যাবে। অবশ্য এতে করে শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ত হবে না, এর ফলে ইংরেজি সাহিত্য যা হারাবে তাই বাংলা সাহিত্য লাভ করতে শুরু করবে, তখন বাংলাদেশি ইংরেজি সাহিত্যিকদের রচিত ‘ছদ্ম সাহিত্যের’ পরিবর্তে সত্যিকারের বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ আমরা দেখতে পাব। এখন আমরা যদি আমাদের মূল আলোচনাতে ফিরে যাই, তাহলে বলতে হয় যে, আমার মনে হয়, ইংরেজি বিভাগগুলোর পাঠ্যক্রমে অ-ইংরেজদের রচিত ইংরেজি সাহিত্যসমূহ অন্তর্ভুক্ত করার কারণ হচ্ছে ক্ল্যাসিক ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের অনীহা। এ কথাই যেন প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে যে, পুরাতন আর ক্লান্তিকর ক্ল্যাসিকগুলো বাদেও ইংরেজিতে পড়বার আরো অনেক কিছু আছে। একইভাবে নতুনত্বের জন্য সত্তর আর আশির দশকে সমাজবিদ্যা ও রাজনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন তত্ত্ব উদ্ভাবনের ঘটনাও ঘটে। তবে আমার মনে হয় অ-ইংরেজদের রচিত ইংরেজি সাহিত্য মূল পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্তির এই ধারণাটি ভারতের মত দেশগুলোতে ফলপ্রসূ হবে, কারণ ভারত নিজেই এই ধরনের সাহিত্যের এক বিশাল আঁতুড়ঘর। এই ধারণাটি বাংলাদেশে কতখানি কাজ করবে সে বিষয়ে অবশ্য আমি খুব একটা নিশ্চিত নই।

অন্যদিকে, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগগুলোর পাঠক্রমের কথা যদি বলি, তবে আমি সবসময় জোর দিয়েই বলব যে, আমাদের উচিত এ সব পাঠক্রমে মূল ক্ল্যাসিক ইংরেজি সাহিত্য ধারার অধিকার সুরক্ষিত রাখা, ইংরেজি বিভাগের স্নাতক পর্যায়ের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যই মূল ক্ল্যাসিক ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ বাধ্যতামূলক করা। একই সাথে অপর ধারার ইংরেজিকে উপেক্ষা করাও উচিত হবে না; খুব সম্মানের সাথে না হোক অন্তত স্বীকৃতির খাতিরে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে তাদের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

মা.আ ও তা.ই  : ভবিষ্যতের বাংলাদেশে সামগ্রিক ইংরেজি শিক্ষা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের গতি-প্রকৃতি কি হবে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক আলী : আমার মনে হয়, আমি এতক্ষণ যা বললাম তার মধ্যেই এ প্রশ্নের উত্তরটা আছে। ইংরেজি বিভাগগুলোতে এখন যা পড়ান হয় তা হয়ত আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, আর শেষ পর্যন্ত হয়তো ইংরেজি বিভাগের অবস্থা অন্যান্য ক্ল্যাসিক যেমন— আরবি, ফারসি কিংবা পালি বিভাগের মত হতে পারে। অথবা বিভাগটি আধুনিক ভাষা বিভাগের সাথে যুক্ত হয়ে যেতে পারে, আর তখন হয়ত এখনকার মতো ভাষার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় বাদ দিয়ে এ বিভাগের শিক্ষকরা কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষাটিই শিক্ষা দিবেন। ইংরেজি বিভাগের তরুণ শিক্ষক হিসেবে আপনারা যদি এমন ভবিষ্যৎ-কল্পনায় আঁতকে ওঠেন বা হতাশ হয়ে থাকেন, তবে বিভাগটির প্রসার, প্রভাব ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির নিমিত্তে এর পাঠক্রমে বিভিন্ন তত্ত্ব ও হালের সমস্ত প্রবণতা সংযোজন করতে পারেন, যেমনটি অন্যান্য দেশের শিক্ষকরা করেছেন। বিভাগটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য যে উপায়টির কথা আমি মাঝে মাঝেই ভাবি তা হল, আমাদের দেশ অথবা পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে যা কিছু ইংরেজিতে লেখা হয়েছে সবকিছুই আমদের ইংরেজি শিক্ষার পাঠক্রমের মধ্যে নিয়ে আসা। তখন ইংরেজি শিক্ষাটি হয়ে যাবে ইউরোপিয়ানদের আগমনের পর থেকে সৃষ্ট ইংরেজি লেখাগুলো থেকে আমাদের নিজ দেশের অতীত আর বর্তমানকে পাঠ। শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি সাহিত্য ধারার মধ্যে নিজেদেরকে আবদ্ধ রাখার পরিবর্তে, হোক সে ধ্রুপদী ব্রিটিশ অথবা আমেরিকান কিংবা এ সময়ের বিশ্ব ইংরেজি সাহিত্য, তখন হয়ত আমরা আমাদের ও আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে যত গুরুত্বপূর্ণ লেখা ইংরেজিতে হয়েছে আমি বলছি সমস্ত লেখা— তার সবই আমরা পড়ব আর সেই সাথে হয়ত তাদের অনুবাদও করব। শুনতে বেশ উত্তর-উপনিবশবাদী মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই, আমি জানি, কিন্তু উত্তর-উপনিবেশবাদ আসলে হতে পারে সম্ভাব্য অনেকগুলো উপায়ের মধ্যে একটি উপায় মাত্র— সবচেয়ে স্পষ্ট ও সহজ ঐতিহাসিক একটি উপায়— চারশত বছর ধরে যে সমস্ত লেখা ও দলিলাদি সমাধিস্থ হয়ে আছে তাদেরকে আলোর মুখ দেখান। আমি কেবলমাত্র একটি সম্ভাবনার কথা বললাম, কিন্তু ভবিষ্যৎ হয়তো নিজের মত করে তার পথ খুঁজে নেবে, অথবা আপনাদের মতন আগ্রহী তরুণ শিক্ষকদের নির্দেশনায় ফলপ্রসূ কোন পথে হাঁটতে শুরু করবে।

————————————————————————–


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা