Chinno_35 Cover

প্র ব ন্ধ

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতিসত্তা
সৈয়দ আজিজুল হক

ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে, আর তার চূড়ান্ত পরিণতির প্রকাশ আমরা দেখি ১৯৫২’র ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু আন্দোলন সূচিত হওয়ার একটি প্রেক্ষাপট আছে। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভারত-বিভাগের পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে একটি আলোচনা সরব হয়ে ওঠে। আর তা হলো : পশ্চিমারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে যাচ্ছে, এর প্রতিরোধ প্রয়োজন। অতএব প্রতিরোধস্বরূপ ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাব’ শিরোনামে প্রথম প্রবন্ধটি লেখেন আবদুল হক (পরবর্তীকালে ‘কলমসৈনিক’ হিসেবে খ্যাত), যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ এর ২২ ও ২৯ জুন দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে। ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক দ্বিতীয় প্রবন্ধটিও লেখেন তিনি ৩০ জুন তারিখে দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয় পাতায়। এসব প্রবন্ধে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন। ১৯৪৭ এর ২৭ জুন তারিখে সাপ্তাহিক মিল্লাত পত্রিকার এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাংলা ভাষার পক্ষ অবলম্বন করা হয়। এরপর জুলাই মাসে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন বিবৃতি প্রদান করলে রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সাংবাদিক মাহবুব জামাল জাহেদি ২০ জুলাইয়ের দৈনিক ইত্তেহাদে লেখেন ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’। জুলাই মাসের ২৭ তারিখে ড. জিয়াউদ্দিনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে দৈনিক আজাদের পাতায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধ লেখেন ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। আগস্টে পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিতর্কটি আরো ব্যাপক হয়ে ওঠে। আশ্বিন সংখ্যা (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭) সওগাত পত্রিকায় কবি ফররুখ আহমদ লেখেন ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’। সেপ্টেম্বর মাসেই তমদ্দুন মজলিস ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক পুস্তিকা প্রকাশ করে। কার্তিক মাসের (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৪৭) কৃষ্টি পত্রিকায় ড. মুহম্মদ এনামুল হক লেখেন ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু ও বাংলা’। অগ্রহায়ণ মাসের (নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৪৭) সওগাত-এ লেখেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’। পৌষ সংখ্যা (ডিসেম্বর-জানুয়ারি ১৯৪৮) সওগাত-এ ‘শিক্ষার কথা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধ লেখেন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী।

আমি এ প্রবন্ধগুলোর বক্তব্য এখানে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্লেষণ করছি না। এটুকু শুধু বলছি যে, সবাই এক সুরে কথা না-বললেও এর অধিকাংশ প্রবন্ধেই বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র বা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি যুক্তিপূর্ণভাবে উত্থাপন করা হয়। আমি প্রবন্ধগুলো প্রকাশের একটা সালতামামি এখানে উপস্থাপন করছি এটা দেখানোর জন্য যে, ১৯৪৮ এর মার্চে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ যখন ঢাকায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে প্রতিবাদের সম্মুখীন হন তার একটা প্রেক্ষাপট আমাদের সাংবাদিক-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন। হঠাৎ করে এ প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়নি। এই প্রতিবাদ কীভাবে প্রতিরোধে পরিণত হয় এবং চূড়ান্ত আন্দোলনে পরিণতি লাভ করে সে-ইতিহাস অনেক লম্বা। এ প্রবন্ধের ছোট পরিসরে তা বর্ণনা করা সম্ভব না। এখানে শুধু বলব, কতিপয় ছাত্রের তাৎক্ষণিক সাহসী প্রতিবাদ পরবর্তী চার বছরে ক্রমে ক্রমে সমগ্র ছাত্রসমাজের ন্যায়সংগত দাবি সম্বলিত প্রতিরোধযুদ্ধে রূপ নেয় এবং তার সঙ্গে একটি ভূখ-ের সমগ্র জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন বিজড়িত হয়ে পড়লে তারাও এই প্রতিরোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়ে।

এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এটা সম্ভব হলো? কেবল ভাষার দাবিতে কীভাবে এত বড়ো একটা রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংঘটিত হতে পারল? কীভাবে তা একটা ভূখ-ের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলল? সর্বোপরি প্রশ্ন হলো, একটি নতুন দেশের জন্য যে সংগ্রাম চলল সাত বছর ধরে সেই দেশটির যাত্রা শুরু হতে না হতেই তার নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে সেই দেশের বৃহদংশ কেন বেঁকে বসল? তার চেয়েও বড়ো কথা, যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশটির সৃষ্টি হলো, শুরুর এই আন্দোলনই চলে গেল আদর্শগতভাবে তার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে? এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই নিহিত রয়েছে আজকের প্রবন্ধের শিরোনামের মূলকথা।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২— চার বছরের আন্দোলন। ১৯৪৭ এর জুন থেকে লেখালেখির ইতিহাসকে গণনায় নিলে যুক্ত হবে প্রস্তুতির আরো আট মাস। পুরো এই সময় জুড়ে সাংবাদিক-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের যুক্তিসিদ্ধ লেখালেখির পাশাপাশি আন্দোলন অব্যাহত ছিল। এবং শেষ পর্যন্ত একটি দাবিতে তা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল; তা হলো: বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি। এই দাবি ও আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করলে প্রথমেই আমরা এর গণতান্ত্রিক চরিত্রটি অনুধাবন করতে পারি। সে-সময় পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে বাংলাভাষী জনসংখ্যা ছিল ৫৪ শতাংশের বেশি। এর নিকটতম ছিল : পাঞ্জাবি ২৮.৪, উর্দুভাষী ৭.২, পশতু ৭.১ আর সিন্ধি ৫.৮ (যোগফল ১০০-এর বেশি হবে, কেননা অনেকে দ্বিভাষী বলে উল্লেখ করেছিলেন)। সুতরাং রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বা রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে বাংলাভাষীদেরই অগ্রগামী থাকার কথা ছিল। কিন্তু তা যে হয়নি, সমগ্র ঘটনাধারাই তার প্রমাণ। বাংলারই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা ছিল। অথচ সেরকম দাবিও করা হয়নি। দাবি করা হয়েছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। এতেই বোঝা যায়, বাংলাভাষীদের মানসিকতা ছিল কত গণতান্ত্রিক, সহিষ্ণু ও পরিমিতিবোধসম্পন্ন। এই গণতান্ত্রিক মানসিকতার বিপরীতে অবাঙালি প্রতিপক্ষের কাছ থেকে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও আধিপত্যমূলক মানসিকতা। সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতকে গুরুত্ব না-দেওয়ার, বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করার মনোভাবও ছিল প্রকাশ্য ও প্রবল। অন্যদিকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার যুক্তির পেছনে ধর্মীয় বোধকে যুক্ত করা হয়েছিল, যা যথার্থ ছিল না। উর্দুকে ইসলামি ভাষা বলাটা ছিল একেবারেই অবান্তর। পশ্চিমা নেতৃত্ব উর্দুর বিপরীতে বাংলাকে সংস্কৃতঘেঁষা বলে এর সঙ্গে হিন্দুত্বের সম্পর্ক আবিষ্কারের যে প্রয়াস পায় তাও ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবজ্ঞামিশ্রিত।

দ্বিজাতিতত্ত্বের কৌশলের মতো এবারও তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে জয়ী হওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু পূর্ববাংলার বাঙালিরা ভাষার প্রশ্নে পশ্চিমাদের আধিপত্যমূলক এসব কৌশল সহজেই অনুধাবন করে সূচনালগ্নেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তারা উপলব্ধি করে যে, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে তারা অর্থনৈতিক, শিক্ষা, এমনকি সাহিত্য-সংস্কৃতির দিক থেকেও দীর্ঘমেয়াদি পশ্চাৎপদতার মধ্যে গিয়ে পড়বে, যেটা ব্রিটিশরা ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে ঘটিয়েছিল। সুতরাং এই প্রশ্নে সরব হতে তাদের কালক্ষেপ করতে হয়নি। এখানে বলা প্রয়োজন, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় পশ্চাৎপদতা থেকে যে মুক্তি কামনা করেছিল, সেক্ষেত্রে পশ্চিমাদের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের চিন্তার একটা বড়ো ধরনের পার্থক্য ছিল। তারাও দুশো বছরের অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা ও সামাজিক গ্লানি থেকে মুক্তি চেয়েছিল এবং ভেবেছিল সর্বভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সে-মুক্তি সম্ভব নয়, সেজন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, কিন্তু তাদের কাছে পশ্চিমাদের মতো ধর্মীয় বিষয়টি প্রধান ছিল না। প্রধান যে ছিল না তার বড়ো প্রমাণ ধর্মের নামে উর্দুকে তারা রাষ্ট্রভাষা মানতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, তারা দ্রুতই উপলব্ধি করেছিল যে, রাষ্টভাষার কূটচক্রে ফেলে এই ভূখ-ের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে এমন পঙ্গু করে ফেলা হবে যে, তারা রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক সবদিক থেকেই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশক্তির দুশো বছরের নিপীড়নের ইতিহাসটি তাদের মনে জ্বলজ্বল করছিল বলেই তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যতের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি। তারা অনুমান করতে পেরেছিল, একই রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে থাকা সত্ত্বেও ভাষার প্রশ্নে তারা হয়ে পড়বে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। এবং যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে ভাষা নিয়ে তাতে পশ্চাৎপদ বাঙালি আরো পশ্চাৎপদতার তিমিরেই নিক্ষিপ্ত হবে। সুতরাং ধর্ম এক্ষেত্রে কোনো বিবেচনা হয়েই দাঁড়ায়নি, জাতীয় ইহজাগতিক বিকাশের প্রশ্নটিই ছিল মুখ্য।

তৃতীয়ত, বাংলা ভাষার শক্তি সম্পর্কে বাঙালির মনে আত্মবিশ্বাস ছিল দৃঢ়। এটি কোনো কৃত্রিম ভাষা নয়, এর রয়েছে একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য, হাজার বছরের দীপ্ত পদচারণা। এই ভাষার রয়েছে উন্নত সাহিত্য, এই ভাষার কবি পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। সুতরাং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বাঙালিদের গর্বের মধ্যে ছিল না কোনো অহেতুক ভাবাবেগ, ছিল যুক্তিসিদ্ধ প্রেমাবেগ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তুলনায় তারা উর্দু ভাষা ও সাহিত্যকে যে কম গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছে তাতেও ছিল না কোনো বিদ্বেষ বা তথ্যহীন অযৌক্তিক সুবিধা লাভের সাময়িক প্রয়াস। বরং এর মধ্যে ছিল তাদের ধর্মনিরপেক্ষ বিজ্ঞানবুদ্ধিরই জীবন্ময় যুক্তিপরায়ণতা।

চতুর্থত, শুধু সাহিত্য নয়, ভাষা বিকাশের পথ রুদ্ধ হলে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বিকাশের পথও বাধাগ্রস্ত হবে এমন চিন্তাও তখন সক্রিয় ছিল। এমন উদ্বেগও একেবারে অযৌক্তিক বা অবাস্তব ছিল না। দুই অঞ্চলের সংস্কৃতির ভিন্নতার বা সংস্কৃতিভাবনার ভিন্নতার বিষয়টিও ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল। পশ্চিমাদের মধ্যে একটি ধনাঢ্য এলিট শ্রেণি ছিল, তারা তাদের আভিজাত্যের সংস্কৃতি নিয়ে ছিল গর্বিত ও উদ্ধত। পক্ষান্তরে বাংলার এ অংশ লোকসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। পশ্চিমা এলিটদের পক্ষে বাংলার লোকসংস্কৃতির সৌন্দর্যকে অনুভব করার সামর্থ্য ছিল না। সুতরাং ক্ষমতাসীনদের ভিন্নতর সংস্কৃতি, এলিট মানসিকতা, বাংলার সংস্কৃতির উন্নত রূপকে উপলব্ধি করার ব্যর্থতা প্রভৃতিও রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত বিতর্কে বিবেচ্য ছিল।

এভাবে দেখা যায়, শুধু রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য। সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতিসহ একটি মানবগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালির মর্যাদা, সর্বোপরি বাঙালির সমগ্র ভবিষ্যতের বিষয়টিও এই রাষ্ট্রভাষা-চিন্তার অন্তর্গত হয়ে পড়েছিল। চার বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসব চিন্তা ক্রমশ পরিপক্ব হয়ে বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছিল। বলা যায়, ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক প্রশ্ন কীভাবে একটি জাতিসত্তা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করল? সেটাই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর এর উত্তর সন্ধানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক সত্য।

১৯৪৭ এর আগস্টে ভারতবর্ষ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করল। ভারতবর্ষের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠনের দাবির কারণেই ভারতবিভক্তি ঘটল, এটাই অনস্বীকার্য এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের দাবি উত্থাপনের পেছনে কত শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য, কত অবমাননা, চাপাকান্না আর অশ্রু লুকিয়ে ছিল তা আর ইতিহাস মনে রাখেনি। কারণ জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে যে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে তাতে নি¤œবর্গের কণ্ঠ উচ্চকিত হওয়ার সুযোগ থাকেনি। আরেকটি বাস্তবতা হলো, ভারতবিভক্তির পাশাপাশি বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ বিভক্ত হয়ে পড়ল। আর এই প্রদেশবিভক্তি যে রক্তক্ষয় ও উন্মুলিত হওয়ার যন্ত্রণা সৃষ্টি করল তা ভারত-বিভক্তির চেয়েও কোটিগুণ মর্মান্তিক বেদনার কারণ হয়েছে। কার দোষে এটা ঘটল সে-বিচারে আমরা যাব না। আমরা শুধু এ কথাই বলব, ভারতভাগ ও বাংলাভাগ একই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অনিবার্য ফল নয়। সর্বভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে মুক্তি সুদুর্লভ ভেবে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্ন যারা দেখেছিল, বাংলাভাগ তাদের কাম্যও ছিল না, প্রত্যাশা ও প্রয়োজনও ছিল না। এ ব্যাপারে জয়া চ্যাটার্জির বেঙ্গল ডিভাইডেড বইটি পাঠের অনুরোধ করব। যেভাবেই হোক বাংলা ভাগ হলো। অবিভক্ত বাংলার ৭৭ হাজার ৫২১ বর্গমাইলের মধ্যে ৫৪ হাজার বর্গমাইল নিয়ে পূর্ব অংশে একটি নতুন ভূখ-ের যাত্রা শুরু হলো। আয়তনের মতো জনসংখ্যার দিক থেকেও দুই-তৃতীয়াংশ পড়ল পূর্বভাগে। জনতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এ ভাগ সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত, কেবল রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত। কিন্তু যা ঘটে গেল, তা যত অনাকাক্সিক্ষত ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হোক, তার বাস্তবতাকে তো আর অস্বীকার করা যায়নি। আর ওই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এ ভূখ-ের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দিকে যদি তাকাই তাহলে এমন কিছু সত্যের সন্ধান আমরা পাই যার মধ্যে পরবর্তী পরিবর্তনের ধারার বেগবানতা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

প্রথমত, রাঢ় বাংলার রুক্ষতা শুষ্কতা কাঠিন্যের চেয়ে এ অঞ্চলের মাটি তুলনামূলকভাবে নরম, কোমল, পলিমাটিতে গড়া; এ অংশ অনেক বেশি নদীবিধৌত, অনেক বেশি নদীভাঙনাক্রান্ত, এখানকার প্রকৃতির রং অনেক বেশি নীলাভ সবুজে মাখামাখি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালামের পর্যবেক্ষণে, নদীই বাংলাদেশের বড়ো সম্পদ।

দ্বিতীয়ত, উচ্চকোটির এলিট আর্যরা এ অঞ্চলকে বসবাসের যোগ্য বিবেচনা করেনি। এ অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনার্য, ব্রাত্য ও নি¤œবর্গীয়দের বসতি। গঙ্গার মূল প্রবাহ হওয়া সত্ত্বেও কেন এ অঞ্চলে এসে তা পদ্মা নাম ধারণ করল, একই প্রবাহ হওয়া সত্ত্বেও কেন গঙ্গাজলের পবিত্রতা পদ্মার জল ধারণ করতে ব্যর্থ হলো, অথচ শাখানদী ভাগীরথী সেই পবিত্রতার উত্তরাধিকার বহন করতে পারল, তার ইতিহাস ঘাঁটলেই আর্য-অনার্যের বিভেদ ও বৈষম্যটি স্পষ্ট হবে। গঙ্গার সঙ্গে শিবের আর পদ্মার সঙ্গে মনসার মিথের সম্পর্কসূত্রেও এই অবজ্ঞার বিষয়টি স্পষ্ট। এটা বিশ শতকের মামলা না, ১৯৪৭ এর তো নয়ই, এটা এদেশে আর্য আগমনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। প্রশ্ন হতে পারে, এসব কাসুঁন্দি তাহলে কেন ঘাঁটছি? ঘাঁটছি এজন্য যে, এর মধ্যে অনেক সত্য নিহিত। এই সত্য অনুধাবন করতে পারলে আমরা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উত্থিত বাঙালি জাতিসত্তার মর্ম ও তাৎপর্য সহজে অনুধাবন করতে পারব।

তৃতীয়ত, বাংলার এ অংশের এই অনার্য ব্রাত্য মনটি এ অঞ্চলের প্রকৃতির মতোই নরম কোমল, শাস্ত্রের কাঠিন্য তার চরিত্রানুগ নয়। বারবার সে ধর্মান্তরিত হয়েছে। সর্বশেষ, এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ যে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছে তার পেছনেও রয়েছে সুফিবাদের শাস্ত্রীয় বন্ধনমুক্ত উদার মনোভঙ্গির এক বিপুল প্রভাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার স্বাধীনতাকামী জীবনাকাক্সক্ষা। পালযুগে কৈবর্তবিদ্রোহ দেখেছি, মধ্যযুগের ইতিহাসে বারো ভূঁইয়াদের বিদ্রোহ অক্ষয় হয়ে আছে। চির-অবহেলিত এ অঞ্চলের মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার, অধিকাংশই গরিব চাষি। সর্বশেষ ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে মহাজনি শোষণ যুক্ত হয়ে তাদের দারিদ্র্যময় জীবনকে অধঃপতনের শেষ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। এ থেকে তারা মুক্তি চেয়েছে।

চতুর্থত, প্রাচীন বাংলার জনপদসমূহ যেসব নামে পরিচিত ছিল তার মধ্যে ‘বঙ্গ’ ছিল এক বৃহৎ জনপদ। এর পুরোটাই এই ভূখ-ের অন্তর্ভুক্ত। এখানে আরো রয়েছে বরেন্দ্র, পু-্রবর্ধন, গৌড়ের অংশবিশেষ ও সমতট। বঙ্গ থেকেই বাঙ্গাল, বাঙ্গালি, বাঙালি। অনার্য এই দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাংলাভাষী পশ্চিমাংশের আর্য আভিজাত্য দ্বারা ব্রাত্য বাঙ্গাল বলে বরাবর তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছে। আর ১৯৪৭-উত্তরকালে পশ্চিমাদের দ্বারা হিন্দুসংস্কৃতি মিশ্রিত এবং খাঁটি মুসলিম নয় এই অভিযোগে অবজ্ঞার শিকার হয়েছে। অবজ্ঞা আর অবহেলার শিকার হলে কী হবে দুই পশ্চিমেরই আভিজাত্যের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে সে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে জাগ্রত হয়ে তার এই ব্রাত্য বাঙালি সত্তা নিয়ে গর্ব বোধ করেছে, এই ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি সত্তার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছে তার সকল শক্তি ও সৌন্দর্যের উপাদান। আর্থিকভাবে দরিদ্র হলে কী হবে তার মধ্যেই রয়েছে সর্বমানবিক এক উন্নত সংস্কৃতি, রয়েছে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে আতিথেয়তার এক পরম গুণ, সত্য ও কল্যাণের উপাদানবিশিষ্ট সবকিছুকে গ্রহণ করার এক উদার মনোভঙ্গি, রয়েছে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বিবেচনায় সকলের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনের এক সহজাত বৈশিষ্ট্য। এ ভূখ-ের লোকসংস্কৃতির মধ্যেই এই উদার মানবিক ধর্মনিরপেক্ষ উপাদানগুলো সহজলভ্য।

এখন আসি, জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রসঙ্গে। দ্বিজাতিতত্ত্ব যে তত্ত্ব হিসেবে ভুল তা ব্যাখ্যা না করলেও চলে। ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে যে জাতি নির্ণয় হয় না তা সর্বজনবিদিত। তাহলে প্রশ্ন থাকে যে, এই ভুলের পেছনে বাঙালি মুসলমান কেন ও কীভাবে এতটা ঐক্যবদ্ধ হলো? আসল কথা হলো, ধর্মের মধ্যে সে মুক্তি খোঁজেনি, মুক্তি খুঁজেছে অর্থনৈতিক শোষণ-বৈষম্য ও বঞ্চনা থেকে, দারিদ্র্যের অধঃপতন থেকে। সেক্ষেত্রে সে ভেবেছে, তার এই দারিদ্র্য ও অধঃপতনের জন্য যারা দায়ী যেহেতু সর্বভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোয় তারাই থাকবে সর্বেসর্বা সেহেতু বিকল্প হিসেবে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে তার মুক্তি মিলতে পারে। এ কারণেই ১৯৪৬ এর নির্বাচনে সে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেয়। এর মধ্যে ধর্মানুরাগ যে কোনো বিষয় না, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৪৭ এর আগস্টে নতুন রাষ্ট্রের যাত্রা শুরুর আগেই যখন রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক শুরু হলো, প্রতিবাদ রচিত হলো এবং ১৯৪৮ এ নিয়ে রীতিমতো আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল তখনই এ উপলব্ধি সর্বব্যাপ্ত হতে শুরু করল যে, শোষণ ও আধিপত্যের বন্ধন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায় যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামোর কথা ভাবা হয়েছিল, সে-কাঠামো আরেক বন্ধন ও আধিপত্য সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছে। সুতরাং মুক্তির নতুন চিন্তা জাগ্রত হতে শুরু করল। এই জাগরণের পথ বেয়েই সূচিত হলো আত্মআবিষ্কার ও আত্মসত্তাসন্ধানের স্পৃহা। এভাবেই স্ফুরণ ঘটল বাঙালি জাতিসত্তার। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে যা সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং মানবীয় ভাবনায় উচ্চকিত।

দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং বাঙালি জাতিসত্তা বা জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে আরো যা বলা প্রয়োজন, তা হলো : দ্বিজাতিতত্ত্বের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রসার ঘটানো হয়েছিল, অপরপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের লক্ষ্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। জাতীয়তাবাদী চেতনার নিহিতার্থ হলো, একটি সমগ্র জাতির কোনো লক্ষ্য সাধনের উদ্দেশ্যে দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে ঐকাত্ম্যবোধ সৃষ্টি। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এই একাত্মতার জাগরণ ঘটেছিল। এর মধ্য দিয়ে এ ভূখ-ের জনগণ একটি জাতিচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল এবং সকল সংকীর্ণতা পরিহার করে, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সকলের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়েছিল। বাঙালি জাতিসত্তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এই অসাম্প্রদায়িকতার বীজ, সেকথা আগেই বলেছি।

জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। যদিও আমরা জানি যে, রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমের বিপক্ষে ছিলেন, তিনি ছিলেন প্যাট্রিয়টিজমের পক্ষে। তাহলে আমরা কেন জাতীয়তাবাদ নিয়ে এই গর্ব করছি? রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজম বলতে যা বুঝিয়েছেন, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উত্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ তা নয়। এই জাতীয়তাবাদ প্যাট্রিয়টিজমে পরিপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ যে ন্যাশনালিজমের নিন্দা করেছেন, তার অর্থ অতিরিক্ত জাতিপ্রেম বা জাত্যাভিমান, যা অপর জাতির প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা অপর জাতির ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠতে চায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ কর্তৃত্বপরায়ণতার বিরুদ্ধে এক মস্ত প্রতিবাদ, একটি জনগোষ্ঠীর ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় শুধু উন্মুখ। বরং ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ জাতিসত্তার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার সঙ্গে আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিক বক্তব্য এখানে উদ্ধার করতে পারি। তিনি বলেছেন, ৎধপব-এর মিশ্রণ ঘটলেও জাতি গঠন  বাধাগ্রস্ত হয় না; ইওরোপের বিভিন্ন জাতির ক্ষেত্রে এটা লক্ষ করা গেছে। দ্বিতীয়ত, ভাষার ঐক্য জাতীয় ঐক্যবন্ধনে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এক ভাষা নিয়েও দুই জাতি গঠিত হওয়া সম্ভব; ইংল্যান্ড ও ইউএসএ তার প্রমাণ। তৃতীয়ত, জাতিগঠনে ধর্মমতের ঐক্যও অপরিহার্য নয়। একই ধর্মমতের লোক বিভিন্ন জাতিতে ছড়িয়ে রয়েছে; এর উদাহরণ প্রচুর। চতুর্থত, ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সীমাবিভাগ নেশনের ভিন্নতাসাধনের একটা প্রধান হেতু হলেও মানবেতিহাসে প্রাকৃতিক সীমাই চূড়ান্ত নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘…  জনসম্প্রদায় বলিতে যে পবিত্র পদার্থকে বুঝি, মনুষ্যই তাহার শ্রেষ্ঠ উপকরণ, সুগভীর ঐতিহাসিক মন্থনজাত নেশন একটি মানসিক পদার্থ, তাহা একটি মানসিক পরিবার … নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। … একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর-একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা— যে অখ- উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা। … অতীতের গৌরবময় স্মৃতি এবং সেই স্মৃতির অনুরূপ ভবিষ্যতের আদর্শ— একত্রে দুঃখ পাওয়া, আনন্দ করা, আশা করা— এইগুলিই আসল জিনিস … অতীতে সকলে মিলিয়া ত্যাগদুঃখ-স্বীকার এবং পুনর্বার সেইজন্য সকলে মিলিয়া প্রস্তুত থাকিবার ভাব হইতে জনসাধারণকে যে একটি একীভূত নিবিড় অভিব্যক্তি দান করে তাহাই নেশন।’

রবীন্দ্রনাথের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা সৃষ্টির বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ভূখ-ের মানুষের একই গৌরবময় প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, একই ত্যাগদুঃখ-স্বীকারের অতীত অভিজ্ঞতা, একত্রবাসের পারস্পরিক সম্মতি, হস্তগত অখ- উত্তরাধিকারকে রক্ষা করার সদিচ্ছা, সকলের সম্মিলিত সংগ্রামের আদর্শ প্রভৃতিই তাদের একটা মানসিক পরিবারের সজীব সত্তায় পরিণত করে জাতিরূপ দেয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উত্থিত বাঙালি জাতিসত্তার চেতনা একুশের যে সংস্কৃতির জন্ম দিল তা সর্বাংশে ধর্মনিরপেক্ষ, সমগ্র উপমহাদেশেই এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আবার একুশের চেতনার পথ বেয়েই আমরা ক্রমশ পৌঁছে গেলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, যা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনকে করে তুলল অনিবার্য। সুতরাং বাঙালি জাতিসত্তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে, তার অসাম্প্রদায়িকতা ও ব্রাত্য-নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর ঔদার্যসমেত, গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

[১৫ জানুয়ারি ২০১৮ ঢাকার বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষদিনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে প্রবন্ধটি পঠিত]

***********************************************

ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন

ড. বি. আর. আম্বেদকর
সনৎকুমার নস্কর

ভারতীয় সমাজ-কাঠামোয় বর্ণাশ্রমপ্রথা তথা জাতপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। জাত-ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল এদেশে নর্ডিক গোষ্ঠীর মানুষ আর্যভাষাভাষীদের অনুপ্রবেশের পর। ঐতিহাসিকরা তার আনুমানিক সময়কাল ধরেছেন খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ। এ ব্যবস্থা এমন এক বিষবৃক্ষের বীজ বপন করেছিল যা আজ বৃহৎ মহীরুহে পরিণত। এই বিষবৃক্ষের ফল কী তা যেমন দলিত-নায়ক ড.বি.আর আম্বেদকর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে গেছেন, আমরা দলিতসমাজের মানুষেরা, ভারতীয় সমাজে বসবাস করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি। জাতব্যবস্থা হল এমন একটি ব্যবস্থা যার সাহায্যে সামাজিক একটি শ্রেণি আর শ্রেণিকে দাবিয়ে রাখবার কৌশল রচনা করতে পারে। এর বাহ্যিক লক্ষণ অস্পৃশ্যতা এবং অন্তর্লক্ষণ বংশগত কুলবৃত্তিতে আবদ্ধ রেখে অর্থনৈতিক শোষণ এবং সামাজিক অবমাননার পথটিকে সুগম করা। ভারতীয় সামাজিক প্রগতির প্রধান প্রতিবন্ধক হল এই ব্যবস্থা; অথচ এদেশের রাষ্ট্রনায়করা যুগে যুগে এই ব্যবস্থার স্বপক্ষে সওয়াল করে এসেছেন, একে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন।

জাতিভেদ ব্যবস্থা ভারতীয় হিন্দুসমাজে ঠিক কীভাবে উদ্ভূত হয়েছিল আজ তা বলা মুশকিল। তবে ঐতিহাসিক ও সমাজতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এদেশে প্রবেশকারী আর্যদের সঙ্গে ভারতের মূলনিবাসী প্রাগার্যগোষ্ঠীর সংঘর্ষ ও আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল। আর্য ও মূলনিবাসীদের যুদ্ধে কৌশলী আর্যরাই বিজয়ী হয় এবং তারা নিজেদের বিধিবিধান বিজিতদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়। আর্থ-সামাজিক এক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণাশ্রমধর্ম এভাবেই সারা ভারতে প্রসার লাভ করে এবং বিগত সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে এটাই হয়ে ওঠে শূদ্র ও দলিত শোষণের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। আর্যরচিত সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ঋগে¦দের ধর্মের বুজরুকির অংশটুকু বাদ দিলে যেটা পড়ে থাকে সেটা হল অন্যকে দাবিয়ে রাখার নির্লব্ধ আকাক্সক্ষা। এই গ্রন্থে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি মন্ত্র বা স্ত্রোত্র আছে যেখানে তারা বিজিতদের সব কিছু অধিকার করার প্রার্থনা জানিয়েছে তাদের উপাস্য ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, সবিতা (সূর্য) প্রমুখ দেবতার কাছে। অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করে তাকে দমিয়ে রাখা এবং নিজস্ব সংস্কৃতিকে সেরা বলে প্রচার করার যে হীন চক্রান্ত ও মনোবৃত্তি, তা যে আর্যসংস্কৃতির রক্তের মধ্যেই আছে, সেটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন প্রখ্যাত প্রতœতত্ত্ববিদ ভি.গর্ডন চাইল্ড। তিনি ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দি এরিয়ানস্’ গ্রন্থে আর্যদের এই কুকীর্তির কথা সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন। জানিয়েছিলেন যে, আর্যরা মূলত বর্বর। তারা পৃথিবীর যেখানেই উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেখানকার স্থানীয় উন্নত সভ্যতাকে ধ্বংস করে নিজেদের বিভেদমূলক সংস্কৃতির বীজ বপন করেছে। এর পিছনে কাজ করেছে তাদের নির্লব্ধ স্বজাত্যবোধের অহমিকা। ভারতেও বর্ণগর্বী আর্যরা নেমেছিল বিধ্বংসী খেলায়। যুদ্ধে পরাজিত প্রাগার্যদের তারা হত্যা করেছিল। কিছু মূলনিবাসী নিজেদের বাসস্থান ত্যাগ করে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। এরা আর্যদের চোখে চিহ্নিত হয়েছে ‘দস্যু’ নামে। মহাকাব্যে, পুরাণে এদের পরিচয় দৈত্য, অসুর, রাক্ষস। বাকি বিজিতদের দাস বানিয়ে তাদেরকে নিজেদের কাজে লাগিয়েছিল অস্ত্র বলে বলীয়ান আর্যরা এবং তাদেরকে বাধ্য করেছিল বৈদিক বিধিবিধান অনুসারে চলতে। এই বিধানের মধ্যে বর্ণাশ্রমধর্ম অন্যতম, যার কুফল সম্বন্ধে বাবাসাহেব আম্বেদকর বলেছেন, চতুবর্ণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জাতব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা ধূর্ত, লোভী ও কৌশলী ব্রাহ্মণদের সৃষ্টি এবং এটি হিন্দুদের অধঃপতনের মূল কারণ। জাতব্যবস্থা একটি ভয়ঙ্কর রাক্ষস। ভারতীয় সমাজদেহের রক্ষশোষণ করাই যার কাজ। একে খতম না করা পর্যন্ত কোনো প্রকার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন ফলপ্রসূ হতে পারে না। জাতব্যবস্থাকে ব্রাহ্মরা এমনভাবে গড়ে তুলেছে যাতে তারা সকলের প্রভু হয়ে উঠেছে। এটি একটি জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কাররূপে সকলের মনের মধ্যে বদ্ধমূল করে দেবার চেষ্টা করেছে তারা, যার থেকে বেরুবার কথা কেউ কোনদিন ভাবতেই পারবে না। এই ব্যবস্থা ব্রাহ্মণ্যবাদকে পুষ্ট করেছে, যে মতাদর্শ ভারতের জাতীয় সংহতির অন্তরায়। ব্রাহ্মণ্যবাদ আজ কেবল ব্রাহ্মণসমাজের মধ্যেই সীমিত হয়ে নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও স্মৃতি সংহিতার মাধ্যমে তথাকথিত হিন্দুদের ঘরে ঘরে। ধর্ম, পুণ্য, পরকাল, পূজাপার্বণ, জন্ম-মৃত্যু-বিবাহকেন্দ্রিক নানা আচার-আচরণের নামে আজ তা পলে পলে হিন্দুদেরকে শোষণ করছে। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের তিন প্রধান স্তম্ভÑ অসাম্য, বিভেদ ও শোষণ। ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে সৃষ্টি করেছে দেবদেবীদের। সেই কল্পিত দেবতাদের মূর্তিকে সাক্ষীগোপাল করে দাঁড় করিয়ে রেখে তারা শোষণ করছে ধর্মভীরু মানুষদের। এই ব্রাহ্মণ্যবাদই গড়ে তুলেছে আজ সারা ভারতে হিন্দু-সা¤্রাজ্যবাদ।

হিন্দু হিপোক্রাসি এই সা¤্রাজ্যবাদকে টিকিয়ে রাখার মূল রহস্য। ব্রাহ্মণ্যবাদ দাঁড়িয়ে আছে নির্ভেজাল ভ-ামির ওপর। ভ- তো সেই যার বাইরেটা একরকম, আর ভেতরটা একদম অন্য ধরনের। ভ-রা মুখের ওপর মুখোশ পরে আসল রূপ ঢাকতে। লোকে বাইরের চেহারাটা দেখতে পায়, ভেতরটার আর হদিস পায় না। হিন্দুধর্ম তার ভড়ং দিয়ে বাজার মাত করেছে। আসলে সে হল একটি আস্ত মাকাল ফল। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, আপনি হিন্দু হয়ে হিন্দুধর্মের এত বদনাম করছেন! মশাই, তার ভ-ামিটা দেখলেন কোথায়? একটা ধর্মকে বোঝা কি এতই সোজা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তত্ত্ব ও প্রয়োগের দৃষ্টান্তে দেবার চেষ্টা করি। হিন্দুধর্ম যখন ‘হিন্দুধর্ম’ এই নামটাই ধারণ করেনি, তখন সে বৈদিক ধর্ম নামে পরিচিত ছিল। বেদে কিছু দেবতার উল্লেখ আছে যাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখ্য সূর্য, ইন্দ্র, বরুণ, মরুৎ, পর্জন্য, অগ্নি, সোম ইত্যাদি। দেবীদের মধ্যে রয়েছেন পৃথিবী, রাত্রি, ঊষা, সরস্বতী (নদী) প্রমুখ। এরা সবাই মূর্তিবিহীন। কেবল মন্ত্রেই উপাসিত হত। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, এঁরা সবাই এক-একটি প্রাকৃতিক বস্তু বা শক্তির প্রতীক কিংবা আধার। কোনো না কোনো ভৌম উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এঁদের কল্পনা। বেদের কালে মানুষ প্রকৃতির উপাসক ছিল। পরে এইসব দেবতা মিলে-মিশে এক হয়ে গেল উপনিষদ-কথিক ব্রহ্মের সঙ্গে। ব্রহ্মবিৎ ঋষি ব্রহ্মকে দেখলেন একটি ‘আইডিয়া’ হিসেবে। জগতের সব কিছুর মধ্যে উপলব্ধি করলেন ব্রহ্মকে; বললেন ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’। একথা বলার তাৎপর্য এই যে কোনো বস্তুতেই কোনো ইতরবিশেষ নেই, কেননা বস্তুগুলি এক ব্রহ্মেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপের প্রকাশ। ছোটো-বড়ো, কুৎসিত-সুন্দর, জড়-জীব, নারী-পুরুষ, ব্রাহ্মণ-শূদ্রের মধ্যে কোনো ভেদ নেইÑ ব্রহ্মতত্ত্ব এই সাম্যবাদী দর্শন প্রচার করল। ব্রহ্ম নির্বিশেষ, নির্গুন, নিঃশক্তিক ও নিরাকার একথা বলে বোঝানো হল যে, ব্রহ্মা-ের সকল বস্তুই সমান, এগুলি এক ব্রহ্মের বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকাশ। প্রশ্ন এখানেই, তত্ত্বত মানুষের সঙ্গে মানুষের কোনো পার্থক্য নেই, তবুও সামাজিক ক্ষেত্রে সেই ব্যবধান প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। একে ভ-ামি ছাড়া আর কি বলা যাবে?

মানুষের সমাজে বর্ণগত ভেদের কথা প্রথম প্রচার করতে শুরু করল ঋগে¦দ যা আর্যদের আদিতম ও মহান গ্রন্থ বলে স্বীকৃত। এ গ্রন্থের দশম ম-লে ‘পুরুষসূক্ত’ নামে একটি সূক্ত আছে। তাতে এক ব্রহ্মপুরুষ কল্পিত, যার মুখ হাত উরু এবং পা থেকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্ররা জন্মেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে এবং উৎপত্তি অনুসারে বর্ণগুলির সামাজিক ভূমিকা নির্ধারিত হয়েছে। মিথ্যাচারের এই প্রথম সূচনা। একে বলিষ্ঠ যুক্তি দিয়ে ধূলিসাৎ করেছেন বৌদ্ধ ও জৈন লেখকরা। অশ্বঘোষ তাঁর ‘বঙ্গচ্ছেদিকা’ ও সরহপাদ তাঁর ‘অদ্বয়বজ্র টীকা’য় এই ভ-ামির বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করেছেন। যে পুরাণ ব্রাহ্মণসমাজের সৃষ্টি তাতেও আছে বর্ণভেদের বিরুদ্ধে জেহাদ। ভবিষ্যপুরাণ লিখেছে : ব্রাহ্মণমাত্রেই গাত্রবর্ণে জ্যোৎ¯œার মতো ধবল নয়, আর শূদ্ররাও অঙ্গারের মতো কৃষ্ণবর্ণের নয়। যদি চারটি বর্ণই এক বিরাট পুরুষের শরীর থেকে উদ্ভূত হয়ে থাকে, তাহলে তার সন্তানদের মধ্যে বাহ্যিক আকৃতিতে পার্থক্য দেখা দেবে কেন? মহাভারতকারের মতে, যদি গাত্রধর্ম দেখে জাতিনিরূপণ করতে হয়, তাহলে সব জাতিই বর্ণসংকর। হিন্দুধর্ম শিখিয়েছে যত্র জীব তত্র শিব। কথাটা যে কেবল কথার কথা তা প্রতিনিয়ত টের পাওয়া যায়। মুখে বলি, ব্রহ্ম সব কিছুকে আচ্ছাদন করে আছে, অথচ কার্যক্ষেত্রে শুচি-মুচি ভেদ করি। মানুষ মানুষকে ছুঁলে নাকি অপবিত্র হয়। এমনকি কোনো কোনো বর্ণের ছায়া মাড়ানোও নাকি ব্রাহ্মণের পক্ষে পাপ। গঙ্গাজলে ¯œান করে শুদ্ধ হতে হয়। মানুষকে, মানবতাকে ঘৃণা ও অপমান করার এর চেয়ে কৌশলী উপায় আর কী হতে পারে?

ব্রাহ্মণ্যধর্মের একটা শক্ত খুঁটি যেমন বেদ-পুরাণ, অন্যটি তেমনি স্মৃতিশাস্ত্র। হিন্দুর, হিন্দুত্বকে টিকিয়ে রাখতে স্মৃতিশাস্ত্রগুলি তার রক্ষাকবচ। এখানে বর্ণশোষণের ও শূদ্র শাসনের চমৎকার সব ব্যবস্থাপত্র দেওয়া রয়েছে। স্মৃতির মধ্যে মনুস্মৃতি তথা মনুসংহিতাই প্রধান। মনুর আসল নাম সুমতি ভার্গব। ইনি রাজা পুষ্যমিত্র শুঙ্গের শাসনকালে (১৭০খ্রি.পূ.-১৫০খ্রি.পূ.) আবির্ভূত হয়ে সমাজ-শাসনের নামে শূদ্রদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছিলেন। পুষ্যমিত্র ছিলেন বর্ণে ব্রাহ্মণ ও শেষ মৌর্য স¤্রাট বৃহদ্রথের সেনাপতি। ব্রাহ্মণের পেশা ত্যাগ করে ক্ষত্রিয়ের পেশা নিয়েছিলেন। এরপর সুযোগ বুঝে প্রভুকে কৌশলে হত্যা করে মগধের সিংহাসন ছিনিয়ে নেন। ইনি রাজা হয়ে প্রত্যক্ষ ঘোষণা করেছিলেন, কোনো বৌদ্ধকে কেউ হত্যা করলে হত্যাকারী ১০০ স্বর্ণমুদ্রা পাবে। এঁরই শাসনকালে মনু তাঁর স্মৃতিশাস্ত্রে শূদ্রদের সম্পর্কে যেসব বিধান দিয়েছেন তা নারকীয়তার চূড়ান্ত সীমা স্পর্শ করেছে। কয়েকটি বিধান একটু উল্লেখ করি :

১.            শূদ্রের নামের প্রথম অংশটি হবে ঘৃণাব্যঞ্জক এবং দ্বিতীয় অংশটি হবে দাসত্বব্যঞ্জক।

২.           অন্ত্যজ ব্যক্তি যদি কোনো অঙ্গের দ্বারা উচ্চবর্ণকে আঘাত করে তাহলে তার সেই অঙ্গ ছেদন করতে হবে।

৩.           শূদ্র যদি শ্রেষ্ঠতর বর্ণের সঙ্গে একাসনে বসতে ইচ্ছে করে তাহলে তার কোমরে ও নিতম্বে লোহা পুড়িয়ে ছ্যাঁকার দাগ দিয়ে দেশ থেকে নির্বাসন দিতে হবে।

৪.           শূদ্র ক্রীত হোক আর অক্রীতই হোক ব্রাহ্মণ তাকে ধরে দাসত্বে নিযুক্ত করবেন, কেননা ব্রাহ্মণের দাসত্ব করার জন্যই ঈশ্বর তাঁকে সৃষ্টি করেছেন।

৫.           শূদ্র যদি কোনো দ্রব্য বা ধন উপার্জন করে ব্রাহ্মণ তা অসংকোচে কেড়ে নেবে, কেননা শূদ্রের ধনে নিজস্ব কোনো অধিকার নেই।

৬.           যে অখাদ্য খেলে ব্রাহ্মণের পাপ হয়, তা গ্রহণ করলে শূদ্রের পাপ হয় না। যেহেতু তার কোনো ধর্মসংস্কার নেই তাই তার ধর্মে কোনো অধিকারও নেই।

৭.           শূদ্রদের সেবার বিনিময়ে ব্রাহ্মণ প্রভু তাঁর খাদ্যের উচ্ছিষ্টাংশ, তাঁর পুরনো পরিধেয় বস্ত্র, শস্যের পরিত্যক্ত অংশ শূদ্রকে দেবেন। সেই তার জীবন ধারণের উপায়।

বোঝাই যায়, এই অমানবিক, অগণতান্ত্রিক অনুশাসনসমূহ ভারতের মূলনিবাসীদের জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদেরকে পশুস্তরে নামিয়ে দিয়েছে। এভাবেই যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে পড়েছে ভারতের অগণিত শূদ্ররা। আসলে এটা তাদের নিজের দোষে পিছিয়ে পড়া নয়, কৌশল করে পিছিয়ে রাখা। অথচ মহান (!) হিন্দুশাস্ত্র নানাভাবে প্রচার করেছে যে জড়ে-জীবে নেই, জীবে-জড়ে ভেদ নেই, নারী-পুরুষে ভেদ নেই, ব্রাহ্মণ-শূদ্রে ভেদ নেই। এর চেয়ে বড়ো ভ-ামি আর কী হতে পারে!

হিপোক্রিট হিন্দুধর্মের আর এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি অবতারবাদ। এই ইজম্-এ কোনো ব্যক্তি-বিশেষকে ঈশ্বরের সমতুল করে তোলা হয়। মানুষের ওপর এমন দেবত্ব আরোপ করা একধরণের ধর্মীয় অপরাধ। মানুষ যা পারে তা হল প্রবল অনুশীলনের দ্বারা বিপুল ক্ষমতাকে অধিকার। অবতারবাদ তাকে স্বীকার করে না, সে মনে করে কোনো অলৌকিক শক্তি মানুষকে দেবতা করে তোলেÑ যা বাস্তবত ভুল। এটা প্রচার করে ব্রাহ্মণ্যবাদ সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের আত্মবিশ্বাসকে খর্ব করেছে, তাদের দুর্বলতার সূত্রে হীনমন্যতাবোধকে জাগিয়ে তুলেছে। আর এই সুযোগে অলৌকিকত্বের ওপর বিশ্বাসকে পাকা করে তুলেছে।

এই ভ- হিন্দুধর্ম ও শোষণপটু ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর প্রাচীনকাল থেকে উঠতে শুরু করেছিল। ভারতে বস্তুবাদী সংস্কৃতি তার মিথ্যাচারপূর্ণ ভাববাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। বস্তুবাদী সংহতির একটি সুব্যবস্থিত রূপ হিসেবে দেখা দেয় চার্বাক দর্শন। এই দর্শনের মূল স্থপতি হলেন বৃহস্পতি। এই মতই প্রথম বলল : স্বর্গ বলে কিছু নেই, চরম মুক্তি বলতে কিছু নেই। পাপ-পুণ্যের ধারণা বুজরুকি। আত্মার অস্তিত্ব মিথ্যা। বেদ অভ্রান্ত নয়। কিছু ভস্মীভূত হবার পর আর কি তা ফিরে আসে? ব্রাহ্মণরা নিজেদের জীবিকা অর্জনের জন্য আজগুবি অনেক কিছুই বানিয়েছে যেগুলি অলীক। [চার্বাক মতের প্রতিধ্বনি মেলে রামায়ণে জাবালির বক্তব্যে, মহাভারতের শান্তি ও শাল্য পর্বে। গৌতম বুদ্ধের আগে আজীবিকদের পাওয়া যাচ্ছে, যাঁরা বস্তুবাদের প্রচারক। এঁদের নেতা ছিলেন মক্খালি গোসাল। এই ধর্মের] আর এক প্রবক্তা অজিতকেশ কম্বলিন। আর আদি বস্তুবাদীদের অন্যতম ছিলেন পুরান কাশ্যপ।

একদল গবেষকের মতে, ভারতে জাতি-বর্ণব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল প্রাক্-সামন্তবাদী শ্রম বিভাজনের অঙ্গ হিসেবে। সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছিল যজমানী ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থার মূল কথা হল ব্রাহ্মণ কোনো উৎপাদনে অংশগ্রহণ করবে না, কিন্তু সমাজে যারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। দানগ্রহণ তেমনি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ব্রাহ্মণ উৎপাদক না হয়ে কেবল উপভোক্তার ভূমিকায় উপস্থিত। ব্রাহ্মণ রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে দানের মহিমা প্রদর্শিত হয়েছে, কেননা শহরগুলো সামাজিক সম্পদ সংগ্রহ ও বণ্টনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পর ব্রাহ্মণরা শহরবাসী নাগরিকদের দানের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় তৃতীয়-চতুর্থ শতক থেকে শহরগুলো তাদের গুরুত্ব হারাতে শুরু করলে এই যজমানী ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে থাকে। তখন ব্রাহ্মণরা জ্যোতিষচর্চা, বেদপাঠ, মূর্তিপূজা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা অর্জনের পথ বেছে নিতে থাকে। পুরাণগুলো এর সাক্ষ্য দেয়। পঞ্চম শতকের শেষ দিক থেকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে জমিদার শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে থাকেন। তাঁরা হয়ে ওঠেন দানব্যবস্থার অন্যতম ধারক। ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তি দানের মাধ্যমে তাঁরা পুরোহিতকুলের অশন-বসনের যোগান দিতে থাকেন। ব্রাহ্মণরাও কৌশলে দানের সঙ্গে যুক্ত করলেন পুণ্যের ধারণা। যিনি যত দান করতে সমর্থ, তাঁর পুণ্যের পরিমাণও তত বেশি এবং পাপের পরিমাণ হ্রাস করতে চাইলে অধিক দান ভিন্ন গতি নেই।

এই তথ্যগুলির সমাবেশের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন হিন্দু ব্রাহ্মণ্যধর্মের মুখোশটাকে চেনাতে চাইছি, তেমনি কীভাবে সেই আবরণ টেনে ছিঁড়ে ফেলে এর বিকল্পে মানবতাবাদী দর্শনের উত্থান ঘটেছিল, সেটিও দেখাতে চাইছি। প্রাচীন ভারতে মানবতাবাদের কণ্ঠস্বর প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল গৌতম বুদ্ধের বাণীতে। গৌতম বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক, প্রচারক। তিনি বৌদ্ধসংঘে জাতিভেদ মানতেন না। তিনি নিজে ক্ষত্রিয় সন্তান হয়েও শূদ্রদের মানব অস্তিত্ব স্বীকার করেছিলেন। শূদ্রশোষণকে তিনি অন্যায় বলে মনে করতেন। হিন্দুশাস্ত্র যেভাবে শূদ্রদের কাছ থেকে জন্মগত অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে, তিনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। গৌতমবুদ্ধের কার্যকলাপ ও জীবনদর্শন ছিল বৈদিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা চ্যালেঞ্জ। তিনি ছিলেন প্রখর যুক্তিবাদী, সবকিছুকে কার্য-কারণ সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করার পক্ষপাতী। তাই সর্বত্র আজগুবি ও অলৌকিকতাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। বৌদ্ধধর্মে বৈদিক যাগযজ্ঞ ও যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা আছে। গৌতম ধর্মের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন নি। কিন্তু আত্মার মুক্তি কিংবা পশুবলিকে ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য বলে স্বীকার করেন নি। তাই নিষ্ঠুর বলিপ্রথা, অযথা আত্মনিগ্রহের কোনো স্থান নেই বৌদ্ধধর্মে। গৌতমবুদ্ধ শাস্ত্রের চেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যক্তির আত্মসংযম ও আত্মিক উন্নতিকে। হিংসার বিরুদ্ধে অহিংসার মন্ত্র দিয়েই তিনি জয় করতে চেয়েছেন সমগ্র বিশে^র হৃদয়। ব্রাহ্মণরা যে শিক্ষাকে সুবিধাপ্রাপ্ত মুষ্ঠিমেয় মানুষের বিশেষণাধিকার রূপে রক্ষা করতে চেয়েছিল, গৌতমবুদ্ধ তাকে সবার সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষালাভের অধিকার সবার আছে। বাঁচার জন্য প্রয়োজন যেমন খাদ্যের, তেমনি শিক্ষারও। তিনি জন্মকে নয়, যোগ্যতা দিয়েই মানুষকে মাপার মানদ- গড়তে চেয়েছিলেন। তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল প্রজ্ঞা, মৈত্রী ও করুণার বাণী দিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্মের হিংসা ও রক্ত¯্রােতকে থামানো। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম গণনায়ক এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকও। তাঁর ধর্মই প্রথম দেশের বাইরে বিশ^-পরিক্রমায় বেরিয়েছিল।

প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ছাড়া আর একটি ধর্মমতের উদ্ভব হয়, সেটি জৈনধর্ম। উৎপত্তিকালের বিচারে এটি বৌদ্ধমতেরও আগে। মানুষকে ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়াই ছিল এ মতের লক্ষ্য। জৈনদর্শনও জাতিভেদ মানে না। এরা স্বীকার করে যে, মানুষ জন্মগতভাবে সমান। এ ধর্ম মূলত অহিংসা ও অপরিগ্রহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। মহাবীর ছিলেন এই ধর্মমতের প্রধান ধারক। তিনি ত্যাগ, অহিংসা আর প্রেমকে আশ্রয় করতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন সকল মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ। তিনি মনে করতেন, আত্মসংযমের সাহায্যে সংসারের দুঃখ-দৈন্য আর পরিতাপ থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ আনন্দের অধিকারী হতে পারে।

দ্বাদশ শতকে দক্ষিণ ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন বাসব। ইনি ছিলেন মহীশূরের মানুষ। তাঁর পিতা মুদিরাজা একজন ব্রাহ্মণ নেতা ছিলেন। ব্রাহ্মণসন্তান হওয়া সত্ত্বেও বাসব উদ্ভাবিত লিঙ্গায়েত মত সনাতনী হিন্দুবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ হিসেবে দেখা দেয়। [লিঙ্গায়েত ধর্মে বিশ্বাসীরা গলায় সুতো দিয়ে লিঙ্গের একটি প্রতিরূপ ঝুলিয়ে রাখত। উত্তর কর্ণাটক ছিল এ আন্দোলনের সূতিকাগার। এ অঞ্চলে তখন অসংখ্য] মানুষ দৈহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে বেঁচে ছিল।

তাদের সামাজিক মর্যাদা বলতে কিছুই ছিল না। অন্যদিকে ছিল উচ্চবিত্ত ও রাজকীয় শক্তির প্রাধান্য। সেই ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে শক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল বাসবের এই ধর্মান্দোলন। বাসব বেদ, ব্রাহ্মণের কর্তৃত্ব, তীর্থদর্শনের পুণ্য, অস্পৃশ্যতা কিছুই মানেন নি। জন্মগত বংশে তাঁর বিশ^াস ছিল না; মানুষকে মূল্যায়ন করতেন কর্ম দিয়ে। এই ধর্মের ভক্তের কোনো জাতি নেই। তাই ধোপা, নাপিত, মাঝি, দর্জি, ছুতোর, কাঠুরে, ধানকুটুনি, তেলি, অস্পৃশ্যÑসবারই স্থান ছিল সমান। এই ধর্মান্দোলন অস্পৃশ্যতা, পুনর্জন্ম ও জাতি-বিভাজনকে অস্বীকার করেছিল এবং স্পর্শদোষকে একটি সামাজিক ব্যাধি বলে গণ্য করেছিল।

মধ্যযুগের ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলনের জননায়ক সন্তদের আবির্ভাব ঘটে। দক্ষিণ ভারত থেকে এই আন্দোলনের সূচনা। এই আন্দোলনের মূল কথা হল প্রেম। এ প্রেম মূলত ঈশ^রের প্রতি নিবেদিত, পরে তা মানুষের মধ্যে অনুভূত। ভক্তিবাদীদের দর্শন হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মগ্রন্থ, অবতারবাদ, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি ব্রাহ্মণ্যধর্মের অসার অংশগুলিকে বর্জন করেছে। মধ্যযুগে সন্তসাধকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সুপরিচিত ছিলেন কবীর। কবীরের দোহা থেকে জানা যায়, তাঁর পিতা ছিলেন নাথপন্থী। এমন পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন যেখানে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মিলন ঘটেছিল। কবীরের গুরু ছিলেন রামানন্দ। যিনি ধর্মভেদ-জাতিভেদ মানতেন না। কবীর বৃত্তিতে ছিলেন জোলা বা তাঁতি। তিনি সুফিমতও স্বীকার করেছিলেন। কবীর তাঁর দোহায় বারবার রাম এর নাম উল্লেখ করলেও ইনি বিষ্ণুর ত্রেতাযুগীয় অবতার নন, ইনি হলেন সর্বশক্তিমান ঈশ^র-পরম সত্তা। আচার ভিত্তিক ধর্মের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করেছিলেন কবীর। উৎঘাটন করেছিলেন হিন্দু মুসলমানের পুরোহিত ও মৌলবীতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতা। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম ছিল কঠোর। তিনি বর্ণব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন, কশাঘাত করেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদের ভ-ামির। দ্বিজকুলের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে নস্যাৎ করতে গিয়ে ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, ‘গলায় পৈতে (দড়ি) ধারণ করলে যদি কেউ দ্বিজ হয়, তাহলে কুয়ো থেকে জল তোলা বালতিতে যে সর্বক্ষণ দড়ি পরানো থাকে, সে দ্বিজ নয় কেন?’ বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণ হচ্ছে গর্দভের মতো। পিঠে বইয়ের বোঝা নিয়ে তীর্থস্থানে যায়। গৃহস্থের কাছে যায় দানের আশায়। গাধাও বরং ব্রাহ্মণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কারণ গাধা নিজে বোঝা বয়ে অন্ন উপার্জন করে।’ কবীরের মহত্তম দান বোধহয় এটাই যে, তিনি একদিকে যেমন ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বর্জন করেছেন, অপরদিকে ধর্মব্যবসায়ীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। দেবমন্দিরের যে দরজা নি¤œবর্ণের মানুষের কাছে রুদ্ধ ছিল, তিনি ভক্তির পথে তাদের মনে শক্তি যুগিয়েছিলেন। কবীর ছিলেন সত্যের পূজারি; দমন-পীড়ন ও বিরোধিতার মুখে তিনি এক আপসহীন যোদ্ধা।

স্মরণে রাখা দরকার, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের পরিবার প্রথম থেকেই ছিলেন কবীর পন্থী। আম্বেদকরের পিতা রামজী শকপাল প্রতিদিন সকালে কবীরের ভজন গাইতেন। কবীরের ভক্তিভাব শিশু ভীমের হৃদয়কে যেমন শান্ত করেছিল, তেমনি কবীরের গানে যে সংস্কারমুক্ত স্বাধীন জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে তা ভীমরাওকে আকৃষ্ট করেছিল।

দলিত সমাজের এক বরেণ্য নেতা হিসেবে বাবাসাহেবের উঠে আসার ক্ষেত্রে আরো একজন বিশিষ্ট মানুষ তাঁর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। তিনিও জাতপাতের বিষে জর্জরিত পশ্চিম ভারতেরই মানুষ, মহারাষ্ট্রের অধিবাসী মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে। তাঁর জন্ম ১৮২৭ সালে নি¤œবর্ণের কুনাধ অর্থাৎ মালী পরিবারে। ফুলের প্রথাগত শিক্ষা তেমন ছিল না। তিনি খ্রিস্টান পাদরিদের সংস্পর্শে আসার পর ব্রাহ্মণ্যবাদের আসল চেহারা তাঁর চোখে ধরা পড়ে গিয়েছিল। এক ব্রাহ্মণ বন্ধুর বিবাহে বরযাত্রী হয়ে যাবার কালে যেভাবে উচ্চবর্ণীয়দের দ্বারা ঘৃণা ও অসম্মান প্রাপ্ত হন, তাতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে দেশ থেকে অস্পৃশ্যতাকে নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর হন। ব্রাহ্মণরা তথাকথিত শূদ্রদের কীভাবে শোষণ করে কবিতা লিখে প্রথমে তিনি তা প্রচার করেন। এরপর বিভিন্ন গদ্যরচনায় ব্রাহ্মণ্যবাদ ও জাতব্যবস্থাকে খোলাখুলি আক্রমণ করেন। ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ গোলামগিরি। এই বইটি ছিল দলিত মানুষদের পক্ষ থেকে তাঁদের আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো। প্রার্থনা-সমাজ ও আর্যসমাজ যে আসলে শূদ্র দমনের হাতিয়ার একথা বলতে তিনি দ্বিধা করেন নি। পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য ফুলে নিজে অনেকগুলি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। এ কাজে তাঁর প্রধান সহায়ক ছিলেন পত্নী সাবিত্রীবাঈ। রক্ষণশীল পিতার মতামতকে অগ্রাহ্য করে তিনি সহধর্মিনীকে নিয়ে স্বতন্ত্র জীবনযাপন করতে শুরু করেন। নিম্নবর্গের মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার সাধু প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার জন্য সাবিত্রীবাঈকে প্রকাশ্য রাজপথে লাঞ্ছিত হতে হয়, কিন্তু তাঁরা তাঁদের শিক্ষাব্রত থেকে পিছপা হন নি। ১৮৭৩ সালে ফুলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সত্যশোধক সমাজ’, যা ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ফুলে তাঁর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন সব শূদ্রদের জন্য সমান অধিকার ও সমমর্যাদা। এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল শূদ্র ও অতিশূদ্রদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রসমূহ ও পুরোহিততন্ত্রের প্রভাবের বাইরে নিয়ে আসা। মহাত্মা জ্যোতিরাও চেয়েছিলেন অস্পৃশ্য অন্ত্যজদের মানসিক ও ধর্মীয় দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে। ভারতীয় ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা ফুলেকে ‘পশ্চিম ভারতের দলিত আন্দোলনের পথিকৃৎ’ বলে অভিহিত করেছেন।

মহাত্মা ফুলের ভাবশিষ্য হিসেবে যেন মহারাষ্ট্রের দলিত আন্দোলনের অগ্রনায়করূপে আবির্ভূত হলেন ড. বি. আর. আম্বেদকর। তিনি ছিলেন আধুনিক কালের ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী, প্রভাবশালী, কর্মশীল নেতা। তাঁর অপরিসীম উদ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অসাধারণ মেধা। ডিগ্রিতে ছিলেন এম. এ., এম. এস. সি., পি. এইচ. ডি, পি. এস. সি., এল. এল. ডি., ডি. লিট। এমন গভীর জ্ঞানী ও অধীতশাস্ত্র প-িত সমকালীন ভারতবর্ষে আর কেউ ছিলেন না। গোটা পৃথিবীর নিরিখে তিনি পাঁচজন মনীষীর অন্যতম। ভীমরাওয়ের জন্ম হয়েছিল মহারাষ্ট্রের মূলনিবাসী মাহার গোষ্ঠীতে। মুচি ও মেথরবৃত্তি করত এই গোষ্ঠীর মানুষ। তাই সমাজে এরা ছিল অন্ত্যেবাসী। ভীমের পিতা রামজী সেনাবিভাগে কাজ করতেন। তাঁর অনেকগুলি সন্তান। ঘরে থাকার জায়গা হত না। ভীম রাত দুটো পর্যন্ত বিছানায় ঘুমিয়ে নিত। তারপর তাঁর বাবা ছেলেকে জাগিয়ে দিয়ে নিজেই সেই স্থানে শুয়ে পড়তেন। বাকি রাতটুকু জেগে পড়া করত ছোট্ট ভীম। খুব অল্প বয়সে ভীমের মা ভীমাবাঈ মারা যান। ভীম ও তাঁর ছোট ভাই-বোনেরা মানুষ হয় পিসি মীরাবাঈয়ের কাছে। ছোট্ট ভীমকে একদিকে যেমন দারিদ্র্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, তেমনি সহ্য করতে হয়েছে উচ্চবর্গের পীড়ন ও ঘৃণা। দুই-একটা ঘটনার কথা বলাই যায়। তখন সে সাত বছরের বালক। দাদাদের সঙ্গে চলেছে পিতার কর্মস্থল মসূরে। ট্রেন থেকে নেমে গরুর গাড়িতে উঠেছে তারা। খোশগল্প করতে করতে চলছে। হঠাৎ তাল কাটল গাড়োয়ানের হুঙ্কারে; ‘নাম গাধার বাচ্চারা! বেজন্মা, বেজাত কোথাকার! দেখে দেখে আমার গাড়িতেই উঠেছিস! অশুদ্ধ করে দিলি আমার গাড়িটা! নাম্ নাম্ শিগ্গির  নইলে মেরে পিঠ ভেঙ্গে দেব।’ একথা বলতে বলতে গাড়োয়ানটি তাদের পোঁটলা-পুঁটলি একসটকায় টেনে ফেলে দিল এবং গজরাতে গজরাতে গাড়িটাকে টেনে নিয়ে চলল পথের পাশের একটি পুকুরের দিকে। আহা! জল দিয়ে না ধুইলে শুদ্ধ হবে না যে! কেননা এরা যে মাহার! আর একদিনের ঘটনা। ভীম তখন স্কুলের ছাত্র। ক্লাসে এসেছেন অঙ্কের মাস্টার। যথারীতি রোল কল্ করে ছেলেদের অঙ্ক কষতে দিলেন। কয়েক মিনিট পর থেকে তাকে খাতা দেখাতে লাগল ছাত্ররা। সবেতেই মাথা নাড়লেন তিনি। নাঃ, কেউ অঙ্কটা ঠিক করতে পারে নি। সবশেষে গেল ভীম। খাতা দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন শিক্ষক। তারপর ডায়াসে উঠে অঙ্কটা বোর্ডে কষে সবাইকে দেখাতে বললেন। বলার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। হুড়মুড়িয়ে অধিকাংশ ছেলে ডায়াসের কোণের দিকে ছুটল। ব্যাপার কী! কিছু নয়। তাদের টিফিন বাক্সগুলো রাখা আছে কাঠের মঞ্চের একপাশে। ভীম মঞ্চে উঠলে কাঠটা অশুদ্ধ হয়ে তাদের খাবারগুলোকেও অশুদ্ধ করে ফেলবে, এই ভয়ে তারা তড়িঘড়ি মঞ্চ থেকে সেগুলো নামিয়ে নিতে ছুটেছে। কেননা ও যে মাহার, অস্পৃশ্য অচ্ছুৎ মেথরের সন্তান!

স্কুলে ছাত্র থাকাকালীন প্রতি পদে পদে ভীমকে অবজ্ঞা ও অপমানের শিকার হতে হয়েছিল। টিউবওয়েল থেকে সরাসরি জল ধরে খাওয়ার তার কোনো অধিকার ছিল না। তাই প্রবল পিপাসা পেলে সহপাঠীদের ইঙ্গিত করে বলতে হত তার হাতে জল ঢেলে দেবার কথা। কেউ দয়া পরবশ হয়ে দিলে তবেই সে তৃষ্ণা মেটাতে পারত। মাস্টারমশাইরা পারতপক্ষে তার সঙ্গে কথা বলতেন না। কেননা সে মুখ খুলতে অশুচিবাষ্প বেড়িয়ে এস স্থানটিকে অপবিত্র করে ফেলবে। তাঁর পড়াশোনা দেখিয়ে দেবার কাজ চলত লম্বা লাঠির সাহায্যে নিরাপদ দূরত্ব থেকে। শুধু এই ঘটনাগুলিই নয়, রয়েছে আরো অজ¯্র দৃষ্টান্ত যা তাঁকে মর্মমূলে বিদ্ধ করেছে। মনুবাদী ব্রাহ্মণ্যশাসিত ভারতবর্ষ তাঁকে একতিলও রেহাই দেয় নি, ক্ষমা করে নি তাঁর অস্পৃশ্যতাকেÑ যার ওপর তাঁর নিজের কোনো হাত ছিল না। একজন অন্ত্যেবাসী মুচি-মেথরের সন্তান বলে তিনি সর্বত্র ঘৃর্ণিত, পরিত্যক্ত, উপহাসিত হয়েছেন। তাঁর অসামান্য প্রতিভার দীপ্তিও জন্মের হীন পরিচিতিকে ঘোচাতে পারে নি। তাই এদেশের মাটিতে যেখানেই পড়তে গিয়েছেন, নিজের যোগ্যতায় চাকুরি করতে গিয়েছেন সর্বত্রই হয়েছেন অপমানিত, অসম্মানিত। একটা নিচুজাতের ছেলের অধীনে কাজ করতে হবে! Ñ এই উন্নাসিকতা তাঁর প্রতি মানবিক ব্যবহারে উচ্চবর্গীয়দের মধ্যে কুণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। ১৯১২ সালে আম্বেদকর যখন বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজের ছাত্র তখন ব্রাহ্মণ ক্যান্টিন পরিচালক তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে জল, চা প্রভৃতি না দিয়ে। কেননা তিনি যে অস্পৃশ্য! মুখ বুজে এ অবজ্ঞা সহ্য করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। পাশ করে বরোদা স্টেটের সরকারি বাহিনীতে যোগ দিলেন তিনি। লেফটেন্যান্টের পদ। যতই উচ্চ পদ হোক না কেন তাঁর অধস্তন উচ্চবর্গের কর্মচারীরা বিষয়টাকে সুনজরে দেখলেন না। তাঁরা নানাভাবে আম্বেদকরের সাথে দুর্ব্যবহার করতে থাকলেন, যাতে তিনি চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। হলও তাই।  বরোদার মহারাজা খুবই সদয় ছিলেন ভীমরাওয়ের প্রতি। বৃত্তি দিয়ে আমেরিকায় পাঠালেন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য। ১৯১৭-র আম্বেদকর কলম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম. এ. ও পিএইচ.ডি. করে দেশে ফিরলেন। এবার মহারাজা সয়াজিরাও গায়কোয়াড তাঁকে দিলেন মিলিটারি সেক্রেটারির পদ। কিন্তু একেবারে গোড়া থেকে আম্বেদকর যে ব্যবহার পেলেন উচ্চবর্ণীয় কর্মচারীদের কাছ থেকে তা কহতব্য নয়। বরোদা রেলস্টেশনে যাদের ওপর অভ্যর্থনার দায়িত্ব দেওয়া ছিল, সামান্য ট্রেন লেট করায় তারা একজন অস্পৃশ্য মাহারের জন্য অপেক্ষা করে নি। এরপর কাজের ক্ষেত্রে তাঁকে নানাভাবে অপদস্থ করা হতে লাগল। সেক্রেটারির মতো উচ্চপদে আসীন হওয়া সত্ত্বেও কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলত না, ফাইল চাইলে দূর থেকে তা টেবিলে নিক্ষেপ করা হত, গ্লাসে খাওয়ার জলও মিলত না। বরোদা শহরে থাকার জন্য একটা হোটেলে ঠাঁই হল না তাঁর। অচ্ছুত মাহারের ছেলেকে কে ঠাঁই দেবে? অবশেষে একটি পার্সি হোটেলে জায়গা জুটল তাঁর মিথ্যে পরিচয়ে। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি দেখা দিল শেষ অব্দি। তাঁর অফিসের এক ব্রাহ্মণ আর্দালি হোটেল মালিকের কানে তাঁর মিথ্যে জাতগত পরিচয়টি ফাঁস করে দিল। ফলে যা ঘটবার তাই ঘটল। হোটেলে রাখা তাঁর সমস্ত মালপত্র নিক্ষেপ করা হল রাস্তায় এবং আধঘণ্টার মধ্যে ঘর ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হল। অনেক কাকুতি-মিনতি করেও যখন কোনো ফল হল না, তখন রাস্তার গাছতলাতেই গিয়ে দাঁড়ালেন। মহারাজের দেওয়ান জানিয়ে দিলেন তাঁর পক্ষে বিকল্প কিছুই করা সম্ভব নয়। আম্বেদকর হাড়ে হাড়ে টের পেলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের কী মহিমা! দেশের মানুষের মনে কত গভীরে শিকড় গেড়ে বসে আছে ছুঁৎমার্গ! সেইদিনই বোধহয় তাঁর মনে সংকল্প জেগে উঠল, যে কোনো ভাবেই হোক অস্পৃশ্যতা তথা বর্ণাশ্রম প্রথাকে এদেশ থেকে হটাতেই হবে।

মিলিটারি সেক্রেটারি পদে আম্বেদকর মাত্র দুই মাস চাকরি করতে পেরেছিলেন। দুর্ব্যবহারে চাকরি ছেড়ে দেবার পর অর্থনৈতিক দিক থেকে ভীষণই অসহায় হয়ে পড়লেন তিনি। ততদিনে তিনি বিবাহ করেছেন, সন্তানও হয়েছে। অর্থনীতিতে ডি. এস. সি-এর কাজ অসমাপ্ত রেখে কলম্বিয়া থেকে ফিরেছিলেন তিনি। সেটা শেষ করার চিন্তা তাঁকে তাড়া করে ফিরতে লাগল। ভিতরে ভিতরে প্রবল অশান্তি, অস্বস্তি। এই সময়ে একজন পার্সি ভদ্রলোকের বদান্যতায় দুটো টিউশনি যোগাড় করে ফেললেন, আর স্টক ও শেয়ার ডিলারদের জন্য খুলে ফেললেন একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। বেশ চলছিল। কিন্তু আবারও বাধ সাধল তাঁর জাত পরিচয়। তিনি অস্পৃশ্য মাহার জেনে তাঁকে বয়কট করল। এরপর বোম্বের গভর্নর সিডেনহামের সুপারিশে যোগ দিলেন ‘সিডেনহাম কলেজ অফ কমার্স এন্ড ইক্নমিক্স’-এ। সেটা ১৯১৮ এর নভেম্বরে। এখানেও শুরু হল তাঁর সঙ্গে অসহযোগিতা, জাতপাত কেন্দ্রিক নির্যাতন। অধ্যাপকদের বিশ্রামকক্ষে তাঁর সঙ্গে কেউ বিশেষ কথা বলত না, তাঁর জলপানের জন্য থাকত আলাদা গ্লাস। ১৯২০-এর মার্চ অব্দি অধ্যাপনা করে তিনি বিলেতে পাড়ি দেন পড়াশোনা শেষ করতে, ফিরে আসেন ১৯২৩ সালের ৩ এপ্রিল। এবারের যাত্রায় তাঁর প্রাপ্তি লন্ডন বিশ^বিদ্যালয় থেকে এম. এস. সি. (১৯২১)। ডি. এস. সি. (১৯২৩) এবং আইনে এল. এল.বি (১৯২৩)। এবারের পাথেয় যোগান কোলাপুরের সাহু মহারাজ ও আম্বেদকরের বন্ধু নাভাল ভাথেনা। জাতপাত তথা অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আম্বেদকরের লড়াইটা শুরু হয়েছিল প্রথমবার বিলেত থেকে দেশের মাটিতে ফিরে আসার পর। বাল্য থেকে প্রথম যৌবন পর্যন্ত তিনি নীরবে সহ্য করে গিয়েছিলেন সব কিছু। তাঁর মনে হয়েছিল এসবই ভবিতব্য, অন্ত্যজদের এটা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা করতে গিয়ে তাঁর চোখ খুলে গেল। তিনি সেখানকার সমাজে মিশে বুঝলেন স্বাধীনতা কাকে বলে, জাতপাতশূন্য মুক্ত সমাজ কত উদার, বৃহৎ, প্রগতিশীল। তিনি যেন এক নতুন জীবনের সন্ধান পেলেন মুক্ত মানবতার শ্রেষ্ঠ অধিষ্ঠানভূমি আমেরিকার মধ্যে। তাঁর মধ্যে এক স্থির সংকল্পের জন্ম হল : যে কোনো মূল্যেই তিনি অস্পৃশ্যতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবেন আপন মাতৃভূমিকে।

সেই প্রচেষ্টার প্রথম পদক্ষেপ রচিত হয়েছিল ১৯১৬ সালে, আমেরিকার মাটিতে। ওই বছরের ৯ মে নৃতত্ত্ব বিভাগের একটি সেমিনারে, আম্বেদকর পাঠ করেছিলেন ‘পধংঃবং রহ ওহফরধ : ঃযবরৎ গপপযধহরংস, এবহবংরং ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ’ আম্বেদকর এখানে বর্ণসমস্যাকে বুঝতে চেয়েছেন তত্ত্ব ও বাস্তব উভয় দিক থেকেই। তিনি মনে করেন ভারতীয় হিন্দুরা তাদের বর্ণব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে একই সম্প্রদায়ভুক্ত পরিবারগুলির মধ্যে বিবাহপ্রথা চালু রেখে। আর এই বর্ণব্যবস্থার মূখ্য কারিগর হলেন মনু। মনুর প্রধান কীর্তি শূদ্রসম্প্রদায়কে এক কলমের খোঁচায় পশুর স্তরে নামিয়ে দেওয়া। এই ভাষণ সেদিন উপস্থিত সকলকেই চমৎকৃত করেছিল। কিন্তু আম্বেদকর যে শুকনো হাততালি কুড়োনোর জন্য এ প্রবন্ধ লেখেন নি, বরং এ ছিল তাঁর পরবর্তীকালের সামাজিক সংগ্রামের যোগ্য এক প্রস্তুতিÑতা ভারত ফেরার পরের কর্মসূচি থেকে প্রতিভাত হয়।

আম্বেদকর বিলেত থেকে প্রথমবার দেশে ফেরেন ১৯১৭ সালের ২১ আগস্ট। ১৯১৯-এ ভারতে আসে সাউথ বরো কমিটি, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় বিভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম, ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে শাসনতন্ত্রে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বিবেচনা করা। অস্পৃশ্য সমাজের পক্ষ থেকে ডাক পান কর্মবীর সিন্ধে এবং ড. বি. আর. আম্বেদকর। আম্বেদকর বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ-যুক্তি দিয়ে অস্পৃশ্যদের সংখ্যার অনুপাতে আইনসভায় সংরক্ষিত আসন এবং পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি তোলেন। সেই দাবি অনুযায়ী ১৯১৯-এ যে ‘ভারত শাসন আইন’ জারি হয় তাতে নির্যাতিত শ্রেণিগুলির রাজনৈতিক অধিকার সর্বপ্রথম স্বীকৃত হয়। অস্পৃশ্যদের নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে আম্বেদকর বুঝেছিলেন এককভাবে কোনো কিছুতে সফলতা আসবে না। এর জন্য চাই বলিষ্ঠ সংগঠন, চাই সেই সংগঠনের স্বাধীন মুখপাত্র। সেই উদ্দেশ্যকে সফল করতে তিনি সাহু মহারাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর পরিকল্পনার কথা বললেন। অতঃপর মহারাজার আর্থিক সহায়তায় ১৯২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আম্বেদকর সম্পাদকত্বে প্রকাশিত হয় মারাঠি পাক্ষিক ‘মূকনায়ক’। নামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যারা এতদিন সমাজে কথা বলার অধিকারী ছিল না, যারা বোবা হয়ে ছিল এ পত্রিকা যেন তাদের নায়কত্ব করবে। এর প্রথম সংখ্যাতে বাবাসাহেব লিখলেন, ‘আমি চিৎকার করে বলতে চাই, ব্রাহ্মণদের লক্ষ্য শিক্ষা ও জ্ঞানের বিস্তার নয়; বরং সেগুলোকে নিজেদের কুক্ষিগত করে তার ওপর একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করা। অব্রাহ্মণদের পিছিয়ে পড়ার কারণ তাদের শিক্ষা নেই এবং তারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। তাই আজন্ম দাসত্ব, দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা থেকে এইসব মানুষকে মুক্ত করতে, ওরা যে ভালো নেই, বঞ্চিতÑ এই বোধটা ওদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে।’ ‘মূকনায়ক’-এর প্রতিটি সংখ্যাতেই এভাবে উদ্দীপ্ত প্রবন্ধ লিখে আম্বেদকর দলিতদের উৎসায়িত করতে লাগলেন। তারা বুঝতে পারল, তাদের সার্বিক মুক্তির জন্য নিজেদের সমাজের ভিতর থেকেই এক নতুন নেতার আবির্ভাব হয়েছে। পত্রিকা প্রকাশের প্রায় দুই মাস পরে কোলাপুরের মনগাঁওতে অস্পৃশ্যদের একটি সম্মেলন আহূত হল। আম্বেদকর হলেন তার সভাপতি। এ সম্মেলনে সাহু মহারাজ স্বয়ং হাজির হয়ে জনতার উদ্দেশে বললেন, Ñআমি নিশ্চিত যে আম্বেদকর তোমাদের হাতের দীর্ঘদিনের শিকল ভেঙে ফেলবেন। তিনি যে অচিরে সর্বভারতীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্করূপে আবির্ভূত হবেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

১৯২৩-এর ৩ এপ্রিল আম্বেদকর বিদেশ থেকে দ্বিতীয়বার দেশে ফিরে আসেন। জীবিকার সংস্থান করতে তিনি এবার বোম্বে হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ দিলেন। জাতপাতের বিষ এখানেও ছিল। অন্যান্য সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে এক টেবিলে বসে চা পান করতেন না। অনেকে পরোক্ষে তাঁর ক্ষতি করতে চেষ্টা করলেও তিনি আদৌ দমে যাননি। তিনি ব্যারিস্টারির পাশাপাশি নানা জায়গায় বক্তৃতা দিতে লাগলেন, আত্মসম্মান আর অধিকারবোধে দলিত সমাজকে জাগ্রত করে তোলার জন্য। তাঁর বক্তৃতার অনেক জুড়ে থাকত অস্পৃশ্যদের ওপর প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা নানা বঞ্চনা, অত্যাচার আর অবমাননার কাহিনি। তিনি দলিতদের স্মরণ করিয়ে দিতেন খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অধিকার তাদের জন্মগত অধিকার। এই সময়ে তিনি সেই অতি বিখ্যাত রণধ্বনিটি তুলেছিলেন :  ঊফঁপধঃব, অমরঃধঃব, ঙৎমধহরুব।

অস্পৃশ্যদের নেতা হিসেবে যতই ভীমরাওয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল ততই তাঁর বিরুদ্ধপক্ষীয়রা তাঁকে কুৎসায় আক্রমণে জর্জরিত করছিল। তাঁর সংগ্রামকে সঠিক দিশা দিতে, তাঁর সংগঠনের আদর্শকে তুলে ধরতে এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে জিইয়ে রাখতে আম্বেদকর আর একটি পত্রিকা প্রকাশে তৎপর হলেন। এর ফলে ১৯২৭ সালের ৩ এপ্রিল তাঁর সম্পাদকত্বে বের হল আর একটি মারাঠি পাক্ষিক ‘বহিষ্কৃত ভারত’। এ পত্রিকাকে হাতিয়ার করে তিনি নিষ্ঠুর বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে জোরদার সংগ্রাম শুরু করলেন। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তিনি দশ হাজার অস্পৃশ্য মাহারকে নিয়ে মাহাদে চৌদারপুকুর অভিযান করেন। এই পুকুর বা জলাশয়টি ছিল উচ্চবর্গের দ্বারা সংরক্ষিত। তারা নিজেদের ছাড়া গবাদি পশুকে জল ব্যবহার করতে দিলেও অস্পৃশ্যদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু যা প্রকৃতির দান তা থেকে এভাবে কাউকে বঞ্চিত করা যায় না। তাই আম্বেদকর চৌদার পুকুর অভিযানের মধ্য দিয়ে ভাঙতে চাইলেন উচ্চবর্ণীয়দের আভিজাত্যের অহংকার ও ধর্মীয় ফতোয়া। তাঁকে পীড়িত করেছিল এই ভাবনা : যে পুকুরের জল মানবেতর প্রাণী ব্যবহার করতে পারে তাতে থাকবে না অন্ত্যজ মানুষের অধিকার! এতই ঘৃণ্য, এতই অবজ্ঞাত তারা! তাই সভাপতির ভাষণে উদ্দিপ্ত স্বরে বলেছিলেন, চৌদার পুকুরের জল এমন অমৃত নয় যে তা পান করলেই দলিতরা চিরজীবী হয়ে যাবে; কিন্তু মানুষ হিসেবে যে তাদেরও প্রকৃতিদত্ত জলে অধিকার রয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করতেই তাদের এই অভিযান। এভাবেই তিনি অস্পৃশ্যদের ভিতর জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন আত্মমর্যাদা ও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা। ১৯২৭-এর ডিসেম্বর মাসের ২৫ তারিখে আবার বাবাসাহেব সমবেত করলেন সবাইকে এবং সভামঞ্চ থেকে তোপ দাগলেন তিলক ও গান্ধির বিরুদ্ধে। বললেন যে, তিলক যদি অস্পৃশ্য সমাজে জন্মাতেন তাহলে স্বরাজের বদলে বর্ণশ্রমপ্রথার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার জিগির তুলতেন। আর গান্ধিকে খোঁচা দিয়ে বললেন, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন তিনি ভারতে এসে দলিতদের ব্যাপারে নীরব থাকেন। তাঁর মতো ভ- ও প্রতারক আর কেউ নেই। এই সম্মেলনের মঞ্চ থেকে হিন্দুত্ববাদের ভ-ামির মুখোশ খুলতে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে অগ্নিসংযোগ করেন ব্রাহ্মণ্যবাদের মুখ্য ইশতেহার ‘মনুসংহিতা’য়। যে ধর্মশাস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে অস্পৃশ্যদের সবকিছুর অধিকার, বাধ্য করেছে পশুর মতো জীবন-যাপন করতে, আম্বেদকর ও তাঁর অনুগামীরা সেই আচার ও সংস্কারের জগদ্দল সৌধ মনুস্মৃতির বহ্ন্যুৎসব করে এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে ভারতের অগনিত জল-অচল শূদ্ররা এবার জাগছে।

বাবাসাহেবের পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল, দলিতদের নিয়ে মন্দির-প্রবেশ আন্দোলন। হিন্দু মন্দিরে এতদিন অস্পৃশ্যদের প্রবেশাধিকার ছিল না, যদিও তত্ত্বে স্বীকৃত ছিল মানুষ মাত্রেই ঈশ^রের সন্তান কিন্তু ব্রাহ্মণ্য ভাবধারায় সে-পিতার মুখদর্শনের বৈধ অধিকার নেই ব্রাত্য সন্তানদের। ১৯২৭ সালের জুন মাস থেকে ১৯৩১ এর সেপ্টেম্বর অব্দি ভারতের নানা প্রান্তে তাঁর নেতৃত্বে চলল মন্দির অভিযান। বোম্বাইয়ের ঠাকুর দোয়ারার মন্দির, অমরাবতীতে অম্বা দেবীর মন্দির, পুনার পাবর্তী মন্দির, নাসিকের কলারাম মন্দির এবং কেরলের গুরুভায়া মন্দিরে শত শত অনুগামীদের নিয়ে অভিযান চালালেন। এগুলিতে প্রবেশ করে বুঝিয়ে দিলেন বর্ণবিশেষে অপবিত্রতার ধারণা কুসংস্কার মাত্র। এক শ্রেণির মানুষকে ধর্মীয়ভাবে দাবিয়ে রাখার এটা একটা কূটকৌশল।

কিন্তু ১৯৩২ সালে মন্দির আন্দোলন থেকে সরে এলেন আম্বেদকর। কেননা শেষ দিকটায় তাঁর মনে হয়েছিল, যে মানুষটি অন্ন পায় না, বস্ত্র পায় না, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, মন্দিরে প্রবেশ করে তার কোনো লাভ নেই। তার তুলনায় শিক্ষার সুযোগ লাভের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের জন্য আন্দোলন বেশি প্রয়োজন। ১৯৩১ সালে ১৪ আগস্ট তাঁর সঙ্গে গান্ধির প্রথম সাক্ষাৎ হয়। আলাপ-আলোচনায় নানান বিষয় উঠে আসে। গান্ধিজী ইতিমধ্যে শুরু করেছেন হরিজন আন্দোলন। আম্বেদকর তার ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করলেন। গান্ধি যদিও মনে করতেন অস্পৃশ্যতা হলো পাপ। কিন্তু যার থেকে এই বিষফলের জন্ম সেই বিষবৃক্ষ স্বরূপ জাতিভেদ প্রথার উচ্ছেদ তিনি কোনোদিন চান নি।

তাই আম্বেদকর গান্ধিজির মুখের ওপর স্পষ্ট বলেছিলেন, কংগ্রেস অস্পৃশ্যদের জন্য কিছুই করে নি। আর কোনো অর্থব্যয় করলেও তা জলে গেছে। কংগ্রেস আসলে তার ভোটব্যাঙ্ক গোছাতে ওই টাকা খরচ করেছে। কংগ্রেস যদি সত্যই অন্ত্যজদের সমস্যা নিয়ে ভাবত, তাহলে খদ্দর পরার মতো অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ কর্মসূচিকে বাধ্যতামূলক করত। সুতরাং হিন্দু বা কংগ্রেসের ওপর দলিত সমাজ বিশ্বাস করে না, তাদের বিশ^াস নিজেদের ওপর এবং আত্মসম্মান নিয়েই অস্পৃশ্যরা বাঁচবে, অন্যের গোলামগিরি করবে না।

১৯৩২-এর আগস্টে লন্ডনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে আম্বেদকর আহূত হন নির্যাতিত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসাবে এবং সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারায় ওই শ্রেণির জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি আদায় করে নেন। কিন্তু তিনি জানতেন না এর পরের অধ্যায়ে মোহনদাস করমচাঁদের অনশনের কুনাট্য নোংরামির কোন চূড়ান্ত সীমা স্পর্শ করবে। তাঁর ছেঁদো যুক্তি ছিল, এটা বাস্তবায়িত হলে নাকি বৃহত্তর হিন্দুসমাজে ভাঙন ধরবে। তাঁর এই অনশনের নাটক রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করেছিল। আমরণ অনশন ঘোষণার পরে পরেই প-িত মদনমোহন মালব্যের নেতৃত্বে হিন্দু নেতারা বম্বেতে একত্রে মিলিত হন, আম্বেদকরকে বোঝানোর চেষ্টা শুরু হয় এবং অবশেষে ২৪ সেপ্টেম্বর গান্ধির জীবন রক্ষার জন্য পুণাতে কমিউন্যাল অ্যওয়ার্ডের স্বার্থবিরোধী এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটিই ঐতিহাসিক পুণা প্যাক্ট, যাতে বাবাসাহেবের রাজনৈতিক স্বপ্নের সলিলসমাধি রচিত হয়। এর এক সপ্তাহ পর অস্পৃশ্যতা বিরোধী লিগের প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

ব্রাহ্মণ্যবাদের শাসন-শোষণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে ও দলিত সমাজকে পথ দেখাতে বাবাসাহেব তাঁর জীবনের অন্তিমে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত আকস্মিক কোনো ভাবনার ফল নয়। তিনি অস্পৃশ্যদের নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে বুঝেছিলেন বর্ণহিন্দু সমাজ বিবেকহীন স্বার্থপর এক গোষ্ঠী। অস্পৃশ্যদের সমস্ত দুর্দশার মূল কারণ হল হিন্দুধর্মের কিছু কূপম-ূক শিক্ষা ও নির্দেশ। মনুস্মৃতি ও বিষ্ণুপুরাণ থেকে মোট দশটি নির্দেশ উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন যে, অস্পৃশ্যদের প্রতি বর্ণগর্বীদের অমানবিক আচরণের পিছনে রয়েছে এইসব নির্দেশের প্রতি প্রবল নিষ্ঠা ও আনুগত্য। দলিতদের মারধর করতে, নির্যাতন করতে, লুটপাট করতে, হত্যা করতে উচ্চবর্ণীয়রা যে কোনো বিবেকদংশন অনুভব করে না, তার কারণ তাদের ধর্ম তাদের বলেছে যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা রক্ষা করার ক্ষেত্রে পাপ বলে কোনো কিছু নেই। অবশ্য হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে সারাজীবন লড়াই করলেও এ ধর্মের সবটাই যে খারাপ এবং পরিত্যাজ্য এমনটা মনে করতেন না আম্বেদকর। একটা সময় পর্যন্ত তিনি চেষ্টা করে গিয়েছেন এ ধর্মের সবচেয়ে নোংরা ও অমানবিক দিক অস্পৃশ্যতাকে বর্জন করে সংশুদ্ধ করে তুলতে। কিন্তু বিরুদ্ধ শক্তির কাছে শেষ অব্দি পেরে ওঠেন নি। তিনি সাদা চোখে দেখতে পেয়েছিলেন ব্রাহ্মণদের মধ্যে ব্র্যহস্পর্শের যোগ অসাম্য, বিভেদ ও শোষণ। জন্মগতভাবে মানুষে মানুষে বিভেদ গড়ে তোলাই ব্রাহ্মণ্যবাদের একমাত্র কাজ। সে সমাজে অসমতার পত্তন করেছে চাতুর্বণ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে। আর শোষণের জাঁতাকল বানিয়েছে যাগযজ্ঞ, পূজা-পার্বণ, দশবিধ সংস্কার, মন্দির, তীর্থ, গুরুবাদ ইত্যাদির মাধ্যমে। এই উপলব্ধি তাঁকে হিন্দুধর্ম পরিত্যাগে প্রণোদনা দেয়। ১৯৩৫ সালের ১৩ অক্টোবরের এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমি একজন অস্পৃশ্য হিন্দু। এই ধর্মে জন্মানোতে আমার নিজস্ব কোন হাত ছিল না। কিন্তু হিন্দুধর্মের মধ্যে অপমান আর অসম্মান নিয়ে বাস করব কি না, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আমার আছে। আমি আপনাদেরকে শপথ করে বলছি যে, আমি হিন্দু হয়ে জন্মালেও একজন হিন্দু হিসেবে মরব না।’ বাবাসাহেব তাঁর এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী করেন তাঁর প্রয়াণের প্রায় দেড় মাস আগে। ১৯৫৬ সালের ১৪ অক্টোবর নাগপুরে ভারতের তৎকালীন প্রবীণতম বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রমান মহাস্থবিরের কাছে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। পরের দিন একই দীক্ষাভূমিতে দাঁড়িয়ে আম্বেদকর পুনরায় এক লক্ষাধিক জনতাকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেন।

১৯৩৬ সালে আম্বেদকর জাতিভেদ প্রথায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী বোমাটি ফাটালেন অহহরযরষধংঃরড়হ ড়ভ ঈধংঃব গ্রন্থটি লিখে। ব্রাহ্মণ্যবাদ রাক্ষসের বিরুদ্ধে এটাই ছিল তাঁর চূড়ান্ত সারাস্বত সংগ্রাম। ১৯১৬ সাল থেকে ধাপে ধাপে তাঁর লড়াই যেন এ রচনায় তার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করল। লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে প-িত, ভাবুক, স্বপ্নদর্শী, বিচারশীল, অন্যায়ের প্রতি অসহিষ্ণু ক্রোধী একজন চিন্তাবিদকে আবিষ্কার করা যায়। প-িতপ্রবর আম্বেদকর বিপুল তথ্য ঘেঁটে দেখিয়েছিলেন যে হিন্দুধর্ম একেবারে গোড়ায় প্রচারণামূলক (মিশনারি) ধর্ম ছিল। কিন্তু, তার এই চরিত্র নষ্ট হলো জাতিভেদপ্রথা গড়ে ওঠার পর। হিন্দুধর্মের বিস্তার ঘটতে পারত ধর্মান্তীকরণের পথ খোলা থাকলে, যা ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মে রয়েছে।

কিন্তু সেই পথ রুদ্ধ করেছে জাতব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা কীভাবে বিলুপ্ত হবে তার দাওয়াইও বাতলে দিয়েছেন বাবাসাহেব বলেছেন, ‘জাতব্যবস্থা ভাঙার প্রকৃত প্রতিকার হল অসবর্ণ বিবাহ। বর্ণাশ্রম প্রথাকে ধূলিস্মাৎ করার দ্বিতীয় পন্থা হল ধর্মের প্রচলিত বিশ^াসগুলির প্রত্যাখান এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী আচার-আচরণ বর্জন। পুরোহিত সম্প্রদায় জাতব্যবস্থার ‘ঈশ^র নির্দেশিত পবিত্র ব্যবস্থা’ বলে নির্দেশ করে বাকিদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে এবং তারাও সরল বিশ^াসে পুরোহিতদের চোয়াল কাঁধে টেনে নিয়ে চলেছে। যদি এই অন্ধবিশ^াসের মূলে কুঠারাঘাত করা যায় তাহলে জাতব্যবস্থা উচ্ছিন্নমূল হবে। আর এই আন্দোলন সংঘটিত করতে হবে দলিত শূদ্রদেরকেই। আম্বেদকর এই প্রসঙ্গে সপ্তপুরুষের ঐতিহাসিক ভূমিকাও বিশ্লেষণ করেছেন। নানক, জ্ঞানদেব, তুকারাম, শ্রীচৈতন্যদেব প্রমুখরা সদাকারের ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু সদাকারের একটি অর্থ হল প্রাচীন প্রথা। যা বহুকাল ধরে চলে আসছে তাঁরা তার আনুগত্য করার কথা বলেছেন। তাঁরা নিয়মের পক্ষপাতী, নীতির পক্ষপাতী নন। তাঁরা অধ্যাত্মপথের পথিক বলে মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহারিক সম্পর্ক নয়, ভগবানের সাথে মানুষের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা একথা বলেননি যে, সব মানুষ সমান। বরং তাঁরা এই তত্ত্ব প্রচারে বেশি আগ্রহী হয়েছেন যে, ঈশ^রের কাছে সব মানুষ সমান।

যাইহোক, ১৯৩৬ সাল থেকে আম্বেদকরের রাজনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৭-এর সাধারণ নির্বাচনে লড়বার জন্য তিনি আগস্ট মাসে  ‘ওহফবঢ়বহফবহঃ খধনড়ঁৎ চধৎঃু’ নামে একটি আঞ্চলিক দল গঠন করেন। এরপর থেকে জীবনের বাকি দুই দশক ধরে তিনি ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপিত করলেন। ১৯৪২ সালে হলেন ভারতের ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের ‘লেবার মেম্বার’ তথা শ্রমমন্ত্রী। মন্ত্রীর আসনে বসে শুধু দলিতদের স্বার্থ সংরক্ষণ নয়, দেশের অগনিত শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে তিনি ৭/৮ টি শ্রম আইন চালু করেন, যার সুফল আমরা আজও ভোগ করছি। ১৯৪২-এপ্রিলে আম্বেদকর গড়ে তোলেন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘অষষ ওহফরধ ঝপযবফঁষবফ ঈধংঃব ঋবফবৎধঃরড়হ’। এই সংগঠনের তরফে ১৮ ও ১৯ জুলাই গোটা ভারত জুড়ে অস্পৃশ্য মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য একটি সম্মেলন ডাকা হয় নাগপুরে। প্রায় ৭০ হাজার প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এই সম্মেলনে দীর্ঘ বক্তৃতার উপসংহারে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছে। একনায়কতন্ত্র কোনোদিন নৈতিকতার ধার ধারে নি। তার ভিত্তি হল জাতিবর্ণের দাম্ভিকতা। এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। …ন্যায় আমাদের পক্ষে, তাই এই লড়াইয়ে পরাজয়ের কোনো কারণ দেখি না। কোনো বস্তুগত লাভ কিংবা ক্ষমতাপ্রাপ্তির জন্য এ সংগ্রাম নয়, এ লড়াইয়ের লক্ষ্য হল সার্বিক মুক্তি ও মানবিক মর্যাদাপ্রাপ্তি।’

কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, দলিতদের চেতনা জাগরণের জন্য আমাদের শোষিত ও দরিদ্রশ্রেণির শিক্ষার প্রসারকল্পে প্রথমে কিছু স্কুল ও ছাত্রাবাস স্থাপন করেন, পরে ‘চবড়ঢ়ষবং ঊফঁপধঃরড়হ ঝড়পরবঃু’র মাধ্যমে ১৯৪৫-এ বোম্বেতে সিদ্ধার্থ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজ থেকে বেরিয়ে আসা ছাত্ররাই পরে দলিত সাহিত্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তাঁর অওঝঈঋ পরাজিত হলেও যুক্ত বাংলা থেকে দলিত নেতাদের সমর্থনে তিনি গণপরিষদের সভ্য হন। ১৯৪৭-এ ভারত স্বাধীন হলে তিনি পান আইনমন্ত্রীর পদ এবং তাঁর ওপর অর্পিত হয় সংবিধান রচনার মূল ভার। এই সংবিধানে তিনি দলিত নি¤œবর্গ অনগ্রসর পিছিয়ে রাখা মানুষদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সামনের সারিতে এগিয়ে নিয়ে আসার সাধু প্রচেষ্টায় সংরক্ষণের ব্যবস্থাপত্র দেন। বস্তুত অস্পৃশ্যদের মধ্যে বাবাসাহেব ড. বি. আর আম্বেদকর ছিলেন প্রথম নেতা যিনি দলিতদের এত দিনকার সামাজিক আন্দোলনকে রাজনীতির প্রকাশ্য মঞ্চে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, অস্পৃশ্য শূদ্রদের বৈধ দাবি-দাওয়াকে জাতীয় রাজনীতির অঙ্গ করে তুলতে না পারলে দলিতদের মুক্তি নেই।

***********************************************

সোমেন চন্দ, সাজ্জাদ জহির ও প্রগতি লেখক সংঘ
সোহরাব হাসান

গেল শতকের বিশের দশকে ঢাকায় যে আধুনিক সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে ওঠে; যার একদিকে নেতৃত্ব দেন বুদ্ধদেব বসু অজিত দত্তদের প্রগতি এবং অন্যদিকে শিখা গোষ্ঠী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপাত্র ছিল শিখা। প্রগতি বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চা করে, যার সঙ্গে বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। অন্যদিকে শিখা গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য ছিল জ্ঞান ও চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করা। জীবনযাপনে সব ধরনের অন্ধত্ব থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তির নিরিখে জীবনকে দেখা। শিখার মূলমন্ত্র ছিল ‘যুক্তি যেখানে আড়ষ্ট মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক এবং তাঁদের সহযাত্রীদের নিয়ে গড়ে ওঠে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির প্রমুখ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

সে সময়ের তরুণ কবি ও বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত প্রগতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন :

ঢাকা থেকে তিরিশের প্রথম দিকে যখন ‘প্রগতি’ বেরোল তখন তার পাতায় যে সব কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে আধুনিক কবি বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। কিন্তু চল্লিশের দশকে দায়বদ্ধতা কবিতার একটি প্রধান শক্তি হওয়ায় কবিতার আধুনিকতা একটি বিশেষ মাত্রা পায়। ঢাকায় চল্লিশের দশকের শুরুতেই প্রগতি লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠিত দৃঢ়মূল হওয়ায় মতান্তর দর্শন ও সমাজচিন্তার পরিবেশে তরুণতর কবিদের রচনায় ও ধীরে ধীরে রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তন ঢাকা থেকে ১৯৪০-এ সোমেন চন্দ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ক্রান্তি’ সংকলনে যে কটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলো লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। উল্লেখ্য, তিরিশ দশকে ঢাকা থেকে পুরোপুরি নিরীক্ষাধর্মী কবিতা যে কবি লিখেছিলেন সেই কবি চল্লিশের দশকের কবিতায় পাওয়া গেল সমাজচিন্তার নতুন পরিবেশে বিষয়বস্তু আঙ্গিকের দ্রুত পরিবর্তন।১

জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখ এই সময়কার কবিতার দৃষ্টান্ত ঢাকার প্রগতি শাখার কবিদের সামনে ছিল, এ কথার উল্লেখ এ প্রসঙ্গে অপরিহার্য। ১৯৩৯ সালে সরলানন্দ সেন, অমৃত দত্তের উদ্যোগে প্রগতি লেখক সংঘের কাজ শুরু হয়। সোমেন চন্দ, রণেশ দাশগুপ্ত, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ ছিলেন এর সহযাত্রী। পরবর্তীকালে সরদার ফজলুল করিম, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত অচ্যুত গোস্বামীর সঙ্গে যুক্ত হন। এক বছরের মধ্যে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ প্রভাবশালী সংগঠনে রূপ নেয়। সোমেন চন্দের স্মৃতিচারণ করে কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত লিখেছেন :

সোমেনকে আমি জানতাম ছেলেবেলা থেকেই। কেননা ১৯৩০ পর্যন্ত একই পাড়ায় আমরা বসবাস করতাম। বড় হয়ে দুজনই লিখতে শুরু করি এবং ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। দেশ পত্রিকায় সোমেনের প্রথম ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭-এ, তখন তার বয়স ১৭ বছরের বেশি নয়। ১৯৪০-এ যখন ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং হিটলার চেকোস্লোভাকিয়া ও অন্যান্য দেশ পদানত করেছে সেই সময়ে ব্যাকল্যান্ডের পরিবর্তে আমাদের সঙ্গে আড্ডা বসতে শুরু করেছে ভিক্টোরিয়া পার্কে, অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এলাকায়। …এই সময় আমি ও সোমেন চন্দ ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সাহিত্যানুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। পুলিশের বিরূপ রিপোর্ট থাকায় দু’তিনটে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার পর আমাদের উভয়ের সঙ্গে ঢাকা বেতারের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। সোমেন চন্দের মৃত্যুর অনেক পরে অবশ্য ১৯৪৪ এ ঢাকা রেডিও কর্তৃপক্ষ আমাকে পুনরায় আহ্বান জানান এবং দেশবিভাগের পরে ও ১৯৪৯ পর্যন্ত ঢাকা বেতারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্মানজনকভাবেই বজায় ছিল।২

১৯৩৮ সালে কলকাতায় প্রগতি লেখক সংঘের সর্বভারতীয় সম্মেলন হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে এর শাখা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবেই ১৯৩৯ সালে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা স্থাপিত হয়। ইতিমধ্যে কলকাতা থেকে সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়, প্রগতি নামে একটি সংকলন। তখন রনেশ দাশগুপ্ত ঢাকা থেকেও এক ধরনের একটি সংকলন প্রকাশের প্রস্তাব করলেন। ১৯৪০ সালে প্রগতি লেখক সংঘ ঢাকার উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘ক্রান্তি।’ লেখক সূচিতে ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, সোমেন চন্দ, অচ্যুত গোস্বামী, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, সরলানন্দ সেন এবং আরও অনেকে। সংঘের পক্ষে প্রকাশক হিসেবে নাম ছাপা হয় সোমেন চন্দের। কিরণশঙ্কর সেনগুপ্তের লেখা থেকে আমরা আরও জানতে পারি :

১৯৪০ এর সন্ধ্যায় ঢাকা জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজের এসেম্বলি হলে ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের বার্ষিক প্রীতি সম্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জগতের সঙ্কট ক্রমবর্ধমান এবং আমরা প্রগতি লেখকরা লেখক, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার দিক থেকে ব্যাপক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম। ১৯৪০-এর এই সভায় সভানেতৃত্বের আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, উদ্বোধনী সঙ্গীত গেয়েছিলেন সুকুমার রায় এবং বার্ষিক কার্যবিবরণী পাঠ করেছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত।

কিরণশঙ্কর সেনগুপ্তের অভিযোগ, দীর্ঘ ১০ বছর ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও কলকাতার লেখকেরা সংঘের ইতিহাস লেখার সময় সেটি উল্লেখ করেননি। ঢাকায় মুসলমান লেখকদের মধ্যে যারা সংঘের সভায় আসতেন তাদের মধ্যে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, জুলফিকার আলী ও সরদার ফজলুল করিম উল্লেখযোগ্য।

সরদার ফজলুল করিম লিখেছেন :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া হিটলারের ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হওয়ার পরে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি যুদ্ধ সম্পর্কে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যে নীতি গ্রহণ করেছিল তাতে কমিউনিস্ট পার্টিকে ভারত সরকার আর নিষিদ্ধ রাখা আবশ্যক মনে করেনি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জার্মানি, ইতালি ও জাপান মিলে যে আন্তর্জাতিক ফ্যাসিস্ট অক্ষ শক্তি তৈরি হয়েছিল তার বিরুদ্ধে সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের নীতি ঘোষণা করেছিল। এই নীতির ব্যাপারে ভারতের কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের ভেতরে কিংবা বাইরে ফরোয়ার্ড ব্লক আর এস পি বা বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টি প্রভৃতির বিরোধিতা ছিল। …ঢাকাতে কমিউনিস্ট কর্মীদের এই ফ্যাসিবাদ বিরোধী নীতি হিন্দু ছাত্রদের মধ্যে কংগ্রেস ফরোয়ার্ড ব্লক এবং আর এস পির মহল থেকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। …চল্লিশের দশকে, বিশেষ করে ৪২ থেকে ৪৫-৪৬ সালে ছাত্র ফেডারেশনের এবং ঢাকার প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মীদের সম্পর্ক হয় মুসলিম ছাত্রদের সঙ্গে। এদের মধ্যে ছিলেন নাজমুল করিম, হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ, এ কে এম আহসান, কবীর চৌধুরী, মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ নুরউদ্দিন ও সানাউল হক।৩

সোমেন চন্দের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সরদার ফজলুল করিম লিখেছেন : ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ অসামান্য সম্ভাবনার আকর, রেল শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক তরুণ লেখক সোমেন চন্দ একটি শ্রমিক মিছিল পরিচালনাকালে প্রতিপক্ষের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। তখনো তাঁর কোনো বই বের হয়নি। মৃত্যুর পর সোমেন চন্দের গল্পগ্রন্থ সংকেত ও অন্যান্য গল্প প্রকাশিত হয়।

সরদার ফজলুল করিম দাঙ্গার পটভূমিতে অসাধারণ একটি গল্প লিখেছিলেন। যার তিন প্রধান চরিত্র অমল, তাঁর বোন সুরমা এবং ডাক্তার আজিজ। দাঙ্গায় প্রতিপক্ষের ছুরিতে আহত হয়ে অমল হাসপাতালে এলে তাঁর চিকিৎসার ভার নেন আজিজ। কিন্তু শত চেষ্টা করেও যখন অমলকে বাঁচানো গেল না তখন সুরমা একেবারেই এক হয়ে যান। নির্বান্ধব ও অসহায় সুরমাকে কীভাবে ডাক্তার আজিজ অভয় ও আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তারা উভয়ে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেটাই ছিল গল্পের পটভূমি। নানা দ্বিধা-সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত মানবতাই জয়ী হলো। সোমেন চন্দ সম্পর্কে রণেশ দাশগুপ্ত লিখেছেন :

বাংলা ছোটগল্পের জগতে চল্লিশের দশকে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন এক তরুণ লেখক-ঢাকার ছেলে সোমেন চন্দ। অবশ্য সময় পাননি তিনি তাঁর প্রতিভার পুরো পরিচয় দিতে। ২২ বছর বয়সে মৃত্যু হয়, ৮ই মার্চ ১৯৪২ সালে। জন্ম হয়েছিল নি¤œবিত্ত পরিবারে ১৯২০ সালে। ঢাকা জেলার গ্রামাঞ্চলে আর ঢাকা শহরে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল। গ্রামীণ ও নাগরিক দরিদ্র নি¤œবিত্ত মেহনতি মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন তখনই। মেট্রিক পাস করে মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে পড়া ছেড়ে  দিতে হয়েছিল।৪

সোমেন চন্দ গল্প লেখার পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার কাজ চালাতে থাকেন। ১৯৪০-’৪১ সালে ঢাকায় রেল শ্রমিক ইউনিয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কীভাবে তিনি প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত হলেন, তাও উঠে এসেছে রণেশ দাশগুপ্তের লেখায়। তাঁর ভাষায় :

রেলশ্রমিক ইউনিয়নের কাজের মধ্যেই সোমেন চন্দ শুধু যে বাস্তব জীবনের উপাদান পেয়েছিলেন তা নয়, ঢাকায় একটি সাহিত্য সংস্থার সংগঠক হিসেবে লেখার লক্ষ্যমাত্রাটা নির্ধারিত করতে পেরেছিলেন। এই সংস্থার নাম ছিল প্রগতি লেখক সংঘ। ঢাকায় এই সংঘ স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩৯ সালে সমগ্র উপমহাদেশের প্রগতি লেখক সংঘের শাখা নামে ঢাকার কয়েকজন লেখককে নিয়ে। সে সময়ে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সমস্ত প্রগতিশীল লেখক-লেখিকাই এই সংঘের লক্ষ্য ও কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিক সা¤্রাজ্যবাদ এবং তার চূড়ান্ত রূপ ফ্যাসিবাদের শোষণ থেকে মুক্তি ছিল লক্ষ্য স্বাধীনতা ও জনগণের সর্বাঙ্গীণ মুক্তি। পুরোনো ঢাকার মৈশুন্ডী এলাকায় ছিল প্রগতি পাঠাগার ছিল প্রধান কেন্দ্র। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন সতীশ পাকড়াশী, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, অমৃত কুমার দত্ত, রণেশ দাশগুপ্ত। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলন হয় গেন্ডারিয়া হাই স্কুল প্রাঙ্গণে। সভাপতিত্ব করেন কাজী আবদুল ওদুদ। আলোচক ছিলেন অচ্যুত গোস্বামী, সরলানন্দ সেন, জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত। এ ছাড়া সংগঠনের সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক বৈঠক হতো। ১৯৪০ সালে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভায় পঠিত লেখা নিয়ে ক্রান্তি নামে একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়। সোমেন চন্দ্র সংকলনের শ খানেক কপি নিয়ে কলকাতা যান। ১৯৪২ সালের সোমেনের মৃত্যুর কিছুদিন পর ইঁদুর পত্রিকায় ছাপা হলে সাহিত্য মহলে তোলপাড় হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে প্রগতিশীলরা সা¤্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে অভিহিত করে এবং এতে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। এর মধ্যে স্পেনের গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারকে হটিয়ে জেনারেল ফ্রাংকোকে ক্ষমতায় বসানো হয়। ১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলার বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করলে ভারতের প্রগতিশীলরা সোভিয়েতের পক্ষে দাঁড়ায়। তখন প্রগতি লেখক সংঘ বা তার সদস্যরা সোভিয়েতের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৪২ সালে জানুয়ারিতে ঢাকায় স্থাপিত হয় সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি। ঢাকায় একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। উদ্বোধন করেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্। সোমেন চন্দ দিনরাত পরিশ্রম করে  প্রদর্শনীটি সফল করেন। রণেশ দাশগুপ্ত সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন :

ঢাকায় আটই মার্চ একটি ফ্যাসিবাদী-বিরোধী সম্মেলন ঢাকা হয় সুতাকল শ্রমিকদের সহায়তায়। এ সম্মেলনের সূচনাতেই ফ্যাসিবাদের একদল উন্মত্ত সমর্থক এবং কিছু বিভ্রান্ত যুবক সম্মেলন প- করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তারা তখন সম্মেলনের দিকে আগতদের ওপর আক্রমণ চালাতে শুরু করে। এই সময়ে সোমেন চন্দ লাল পতাকা হাতে রেল শ্রমিকদের একটি মিছিল নিয়ে সম্মেলন মঞ্চের দিকে আসছিলেন। সম্মেলনে ওপর আক্রমণের পরিকল্পনাকারীরা এই মিছিলটির ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সোমেন চন্দকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। সোমেন চন্দ অবশ্য লাল পতাকাটিকে হাত থেকে ছাড়েন নি। এভাবেই সমাপ্ত হয় সোমেন চন্দের অক্লান্ত কর্মী ও শিল্পী জীবনের।৫

সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর ১৯৪৩ সালে সংকেত ও অন্যান্য গল্প প্রকাশ করে প্রগতি লেখক সংঘ। দ্বিতীয় বই বনস্পতি ও অন্যান্য গল্প প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। প্রখ্যাত বামপন্থী চিন্তক ও অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র সোমেনের ইঁদুর গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। লেখক সংঘ সোমেন স্মরণে প্রাচীর নামে একটি সংকলন প্রকাশ করে, যাতে প্রগতিবাদী লেখকদের লেখাই ছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত লেখক ও শিল্প সংঘ (১৯৪৪ সালে নাম পরিবর্তিত হয়।) ক্রান্তির কয়েকটি সংখ্যাও প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালের ৮ মার্চ সোমেন চন্দের  প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক অজিত গুহ। এই আন্দোলনে সত্যেন সেন যুক্ত হন এবং গণসংগীত লেখেন। সোমেন চন্দের গল্প সম্পর্কে রণেশ দাশগুপ্ত লিখেছেন :

সোমেন চন্দ তাঁর কাহিনি এবং চরিত্র নিয়েছিলেন জীবন থেকে। সুতরাং সে সময়ের তার চারপাশে ঘটনামূলক ছোটবড় সবকিছুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকত। সে সময়ে ঢাকায় একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রামে নিয়োজিত তাদের কারও কারও মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ গেড়ে বসে, এ নিয়ে সোমেনের উৎকণ্ঠার অন্ত ছিল না। ‘দাঙ্গা’ গল্পটি এই উৎকণ্ঠার ফল। নিজেকেও তিনি তার এই গল্পের বাইরে রাখেননি। তিনি যে সাইকেলে চড়ে, দাঙ্গা দুর্গত শহরে ঘুরে বন্ধু-বান্ধবদের খোঁজ নিতেন, তার মধ্য দিয়েই সরেজমিন দাঙ্গার চেহারাটা দেখেছিলেন। নায়ককেও এই সূত্রে আমরা সাইকেল আরোহীর চেহারায় পাই।

কিন্তু চারের দশকের শেষার্ধে পাকিস্তান আন্দোলন বেগবান হলে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক প্রগতিশীল লেখক ঢাকা ছেড়ে কলকাতা চলে যান। ঢাকার প্রগতি লেখক সংঘের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।

দুই.

অক্টোবর বিপ্লবের (১৯১৭) ১৮ বছর পর ১৯৩৫ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় প্রগতিশীল লেখক সংঘ বা ইন্ডিয়ান প্রগ্রেসিভ রাইটারস ইউনিয়ন। পরে এটি প্রগতি লেখক সংঘ নামে বেশি পরিচিতি পায়। সংঘের ইশতেহার রচনায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন ড. মুলক রাজ আনন্দ, ড. জ্যোতি ঘোষ, প্রমোদ সেনগুপ্ত, ড. মোহাম্মদ দীন তাসির ও সাজ্জাদ জহির। পরের বছর লক্ষেèৗতে ভারতের প্রধান প্রধান ভাষার লেখক-কবিদের নিয়ে যে সম্মেলন হয়, তাতে প্রগতি লেখক সংঘ সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। প্রথম সভাপতি হন উর্দু ও হিন্দি ভাষার প্রখ্যাত কথাশিল্পী মুনসী প্রেমচাঁদ এবং সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির। সাজ্জাদ জহির সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে তিনি সারা ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছেন; বিভিন্ন ভাষার লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। কিন্তু পাটির্র সীমাবদ্ধতা, বৃহত্তর সমাজে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ কারণে সাজ্জাদ জহিরও তার সহযাত্রীরা প্রগতি লেখক সংঘকে সব শ্রেণির লেখক-কবিদের একটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। প্রগতি লেখক সংঘের প্রধান দুই লক্ষ্য সা¤্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে স্বদেশের মুক্তি এবং শোষণ-বৈষম্যের অবসান-এর সঙ্গে সঙ্গে যারা সহমত পোষণ করতেন তাদের জন্য দরজা উন্মুক্ত রেখেছিলেন। প্রগতি লেখক সংঘের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে রামবিলাস শর্মা লিখেছেন :

সব প্রগতি লেখকদের ঐক্য এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মার্কিন যুদ্ধবাজরা এশিয়ার মাটিতে যুদ্ধ বিস্তৃত করার ভয় দেখাচ্ছে। দুর্ভিক্ষ অনাহার দেশের বিরাট অঞ্চলে ছায়া বিস্তার করছেন। প্রতিক্রিয়াশীল লেখকেরা অপেক্ষা করে আছেন কখন প্রগতি লেখকদের মধ্যে ফাটল ধরে। এই সম্মেলন হোক ঐক্যবদ্ধতার সম্মেলন এবং ঐক্যবদ্ধতা দিয়েই আমরা যথাযথ উক্তি দিতে চাই দুষ্ট লেখকদের এবং আমাদের শত্রুদের।৬

কংগ্রেস মাউন্টব্যান্টেন পরিকল্পনা (দেশভাগ) গ্রহণ করতে আমাদের সংগঠনের খুব ক্ষতি হলো। সদ্য ভারত গ্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চলে গেলেন পাকিস্তান। দাঙ্গার ফলে পাঞ্জাব ও বাংলার সংগঠন অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। সাজ্জাদ জহির প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস রোশনাই শেষ করেছেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার পংক্তি দিয়ে :

যে দাগ দাগ উজালা যে শব গজিদহ শহর (এই ক্ষতবিক্ষত আলো, এই রাত্রির মতো ভোর)।

প্রগতি লেখক সংঘের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছিল : সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ এবং মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণ চিত্রিত করার প্রয়াস তাদের প্রতিহত করা কর্তব্য। আমাদের সমিতির উদ্দেশ্য হলো রক্ষণশীলদের হাতে দীর্ঘকাল যাবৎ অবসরপ্রাপ্ত সাহিত্য ও শিল্পকে তাদের হাত থেকে মুক্ত করা এবং শিল্পকে জনগণের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে নিয়ে আসা এবং তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া, যা জীবনের সত্যকেই তুলে ধরবে এবং আমাদের প্রত্যাশিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।

চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ঘোষণাপত্রে বলা হয়, প্রগতি লেখক সংঘের এই সম্মেলন তীব্রভাবে প্রতিবাদ করছে দমন পীড়নমূলক আইনগুলো চালু করার- প্রেস আইন, কাস্টমস আইন এবং ফৌজদারি আইনের সংগঠনগুলোর, প্রতিবাদ করছে শত শত সংবাদপত্র ও পত্রিকা  প্রকাশ দাবি দাওয়ার, প্রগতি সাহিত্যকে নিষিদ্ধ করার, আরও প্রতিবাদ করছে বিদেশ থেকে বিশাল সংখ্যক বিপ্লবী সাহিত্য এ দেশে ঢুকতে না দেওয়ার বিরুদ্ধে। প্রগতি লেখক সংঘ গেল শতকের চল্লিশের দশকে সারা ভারতে নবজাগরণ তৈরি করার প্রয়াস নিয়েছিল। তারা সাহিত্যকে বৃহত্তর মানুষের জীবনের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোক্তারা সবাই বামপন্থী হলেও উদার বুর্জোয়া লেখক কবিরাও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু শিল্প-সাহিত্যের পেছনে মূল শক্তি যে রাজনীতি, সেখানেই বড় গলদ ছিল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিরোধ ও শক্তি প্রদর্শনের মহড়া বাড়তে থাকে- লেখক-শিল্পীদের একাংশ তাদের লেজুড়বৃত্তি করতে থাকে। ১৯৩৫ সালে লন্ডনে একদল প্রবাসী লেখক-কবি ও ভাবুক যখন ইন্ডিয়ান প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করলেন, তাদের সামনে দুটি স্বপ্ন ছিল। প্রথমত ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে জন্মভূমি ভারতের মুক্তি। দ্বিতীয়ত, শিল্প-সাহিত্যে বৃহত্তর জনগণকে নিয়ে আসার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সাধনাকে শাণিত করা। দেশে ফিরে তারা এক নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। একদিকে কংগ্রেস, অপরদিকে মুসলিম লীগের ভাগাভাগির রাজনীতি প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনকে একেবারে থামিয়ে দিতে না পারলেও দুর্বল করে। কংগ্রেস নেতৃত্ব বামপন্থীদের গ্রহণ করতে কিছুটা উদারতার পরিচয় দিলেও মুসলিম লীগ তাদের অচ্ছুত মনে করত।

প্রগতি লেখক সংঘের প্রধান কৃতিত্ব দ্রুততম সময়ে সারা ভারতে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া। ঢাকা থেকে পোশোয়ার বম্বে (বর্তমান মুম্বাই) থেকে দিল্লি দেশের প্রধান প্রধান শহরে প্রগতি লেখক সংঘের শাখাটা প্রতিষ্ঠিত হলো। প্রধান প্রধান ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক-কবি নাট্যকারেরা যুক্ত হলো প্রগতির লেখক সংঘের সাথে। হীরেন মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানতে পারি, ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা উদ্বোধন করতে সাজ্জাদ জহিরও এসেছিলেন। এসব শাখায় নিয়মিত সাহিত্য চর্চা হতো। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা পাঠ ও আলোচনা হতো। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকেরাও প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন; সাংগঠনিকভাবে না হলেও আকিঞ্চনভাবে। সেই সময়ে ‘কেন লিখি’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছিল; যাতে বুদ্ধদেব বসুর মতো ভিন্নধারার লেখকেরাও লিখেছিলেন। লেখক সংঘের কলকাতা সম্মেলনে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও যোগ দিয়েছিলেন। যদিও তিনি মনে করতেন সমবায় করে সাহিত্য হয় না। আর কলকাতার প্রগতি সংঘের লেখক সম্মেলন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ যে বাণী দিয়েছিলেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে। এই বাণীতে তিনি পশ্চিমের বিরুদ্ধে এশিয়ার নবজাগরণকে দেখছিলেন জনগণের জয় হিসেবে। তিনি তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের অভ্যুদয়কে অভিনন্দিত করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :

এশিয়ার পূর্ব প্রান্তে নব প্রভাতের অভ্যুদয় হলো। অনেক দিন অন্ধকারে থেকে আমরা কখনো ভাবতেই পারিনি যে দিনরাতের আবর্তন কোনো দিন আবার প্রাচ্য দিগন্তে পৌঁছাতে পারে। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখলাম যে, পূর্বতম প্রাচ্যে ক্ষুদ্রতম জাপান তার প্রবল প্রতিস্থাপক সহজেই পরাস্ত করে সভ্য সমাজের আসনে চড়ে বসল।

আর তুরস্ক সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য :

এশিয়ার পাশ্চাত্যতম ভূখ-ে দেখলাম তুর্কি- যাকে য়ুরোপ ‘ঝরপশসধহৃ’ বলে অবজ্ঞা করত, সে কী রকম প্রবল শক্তিতে অসম্মানের বাঁধন ছিন্ন করে ফেলল। য়ুরোপের প্রতিকূল মনোবৃত্তির সামনে সে আপনার জয়ধ্বনি তুলে ধরলে। এশিয়ার ভিন্ন ভিন্ন দেশে এই আত্মগৌরব লাভের দৃষ্টান্ত দেখে আমাদের দুর্গতিগ্রস্ত ইতিহাসের আওতায় আবছায়ার ভেতরে একটা আশ্বাসের আলো প্রবেশ করল। মনে হচ্ছে অসাধ্যও সাধ্য হয়। এই যে এশিয়ার আকাশের উপরে তুর্কির বিজয়পতাকা উড়ছে, সেই পতাকাকে যিনি সকল রকম ঝড়-ঝাপটার আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছেন- সেই দূরদর্শী বীর, সেই রাষ্ট্রনেতার পরলোকগত আত্মাকে প্রগতিকাক্সক্ষী আমরা অভিনন্দন জানাই। তিনি যে কেবল তুর্কিকে কাঁপিয়ে দিয়েছেন তা তো নয়, সেই শক্তিবলয়ের চক্রঘর্ঘর ভারতবষের্র ভূমিকাকেও কাঁপিয়ে তুলছে। তোমরা প্রগতি সংঘের তরুণ যাত্রী, আজ তোমাদের সম্মেলনের দিন, সমস্ত এশিয়ার সম্মুখে যিনি প্রগতি পথ উদ্ঘাটিত করেছেন, যার জয় গৌরবের ইতিহাস সমস্ত এশিয়া মহাদেশের বিজয় সূচনা করেছে, সেই মহাবীর কামালের উদ্দেশ্যে ভারতের নবযুগের অভিবাদন আমরা প্রেরণ করি।৭

প্রগতি লেখক সংঘের সূচনা পর্বের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সাজ্জাদ জহির লিখেছেন :

ড্রিমিটভের বিচার, ফরাসি শ্রমিকশ্রেণির জাগরণ, অস্ট্রিয়ায় মজদুর শ্রেণির অসফল বিপ্লব-আমাদের কাছে এ সমস্ত ঘটনা বিশাল তাৎপর্যম-িত হয়ে উঠল। শান্তি, স্বস্তি আর সুস্থিরতা যে সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘকাল ধরেই তলানিতে এসে ঠেকেছে, অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই তা প্রকাশিত হলো। আমাদের চারপাশে দেখে চলেছি মহতী দ্বন্দ্ব আর সংগ্রামের একটা দীর্ঘ পর্ব। …একটু একটু করে সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম আমরা। আমাদের মন খুঁজে চলেছিল এমন একটা দর্শন, যা কঠিন সামাজিক সমস্যাগুলোকে বুঝতে ও সমাধা করতে সাহায্য করবে আমাদের। মানবতা চিরকালের কাঙাল আর তার দৈর্ঘ্যও চিরকালীন-এ রকম একটা ধারণায় তৃপ্ত হতে পারছিলাম না আমরা। মার্ক্স ও অন্যান্য সমাজতন্ত্রীর রচনা আমরা পড়া শুরু করলাম প্রবল উৎসাহে। আমাদের পড়াশোনা যত এগোতে থাকল, ঐতিহাসিক, সামাজিক, দার্শনিক সমস্যাগুলোকে মীমাংসা করতে থাকলাম আমরা, আর ততই স্বচ্ছ হয়ে এগোতে লাগল আমাদের মন, তৃপ্ত হতে থাকল হৃদয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকে যাওয়ার পরই শুরু হলো নতুন ও সীমাহীন শিক্ষার ক্ষেত্র আমাদের পদচারণা।৮

লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে সাজ্জাদ জহির কিছুদিন প্যারিসে অবস্থান করেন। সেখানেও তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক আঁরি আঁরি বারনুসের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় সংস্কৃতির সুরক্ষায় লেখকদের বিশ্ব সম্মেলন। সেই সম্মেলনে আরও যোগ দিয়েছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, আদ্রেঁ মালরো, রোমাঁ রলাঁ, টমাস মান ও ওয়ালডো ফ্রাংকো।

এই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল জনগণ ও লেখকদের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। সেই সঙ্গে সোভিয়েত লেখকদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন যে সমাজতান্ত্রিক সমাজে লেখক ও জনগণের সম্পর্ক কত নিবিড়। সাজ্জাদ জহির ও তাঁর সহযোগীরা লন্ডনে থাকতেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার তাঁদের বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার কথা জেনে যায়। কেননা, ইতিমধ্যে প্রগতি লেখক সংঘের ইশতেহার ভারতে পাঠানো হয়েছিল। জহির জাহাজযোগে বম্বে (বর্তমান নাম মুম্বাই) অর্থাৎ স্বদেশের মাটিতে পৌঁছালেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। জহির লিখেছেন :

আমি নিজের মালপত্র জমা করে জাহাজের ফার্স্ট ক্লাস হলে এসে হাজির হলাম। সেখানে ইংরেজ পুলিশ অফিসার যাত্রীদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করে তাঁদের যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিলেন। এর মধ্যে হুথি সিং, আমার বম্বের বন্ধু সেখানে এসে হাজির। আমরা পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময়ের পর নানা কথাবার্তা বলছি, হঠাৎ লক্ষ করলাম, কিছু লোক মন দিয়ে আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছে। চেহারা দেখে বুঝলাম, ওরা সিআইডির লোক। ইংরেজ অফিসার বেশ কিছু প্রশ্ন করার পর আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। কিন্তু সিআইডিওয়ালা আমার সঙ্গে আঠার মতো আটকে রইল।

…আমার দেশে ফিরে আসার খবর বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে সা¤্রাজ্যবাদী শাসকের এই শিকারি কুকুরদের কাছে আগেভাগে পৌঁছে গিয়েছিল। ওদের সন্দেহের তালিকায় আমার নাম এই কারণে পৌঁছে গিয়েছিল যে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে প্রগতিশীল সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী শিবিরে মাঝেমধ্যে আমায় দেখা যেত। বন্ধুমহলে কখনো কখনো আমিও সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী কথাবার্তা বলতাম, যদিও এ ধরনের চিন্তা বা আবেগের মূল্য আদতে কিছুই নয়। আসল হলো কাজ, আন্দোলন, মানুষকে আন্দোলনমুখী করা, নিজে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হওয়া।৯

সাজ্জাদ জহির প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস রোশনাই বা আলো লিখেন রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায়। বাঙালি লেখক সঞ্চারী সেন সাজ্জাদ জহিরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন :

সাজ্জাদ জহির যেমন বিশ্বাস করতেন সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবনের চড়াই উৎরাই হওয়া উচিত সাহিত্যের উপজীব্য, তেমনি তাঁর জীবনযাপনও ছিল সাধারণ মানুষের মতো; তাদের মধ্যেই ছিল তাঁর বেঁচে থাকা।’ ১০

সাজ্জাদ জহির  রোশনাই-এ শুধু ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস লেখেননি। আলোকপাত করেছেন ভারত ও বিশ্ব প্রগতি আন্দোলনের ওপরও। তাঁর বিশ্লেষণ, আফগান তুর্কি ও মোগল মুসলমানেরা যখন এ দেশ আক্রমণ করে দখল করল আর এ দেশের অর্থনীতিতে কোনো বনিয়াদি পরিবর্তন ঘটল না, ওপরের অত্যাচারী মালিক গোষ্ঠী শ্রেণিতে আরও একটি নতুন গোষ্ঠী যোগ হলো। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সাম্যের বাণী, যা ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর পর অনেকটাই বদলে গিয়েছিল, যার একদিকে বাদশাহি ও তার সার্বভৌমত্ব এবং অন্যদিকে সুফিবাদ জায়গা করে নিয়েছিল, তা ভারতে পৌঁছে দেশের তৎকালীন বিশ্বাস দ্বারাও প্রভাবিত হলো।

ভারতে বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সাজ্জাদ জহির লিখেছেন :

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমাদের দেশে বড় বড় রাজনৈতিক ডামাডোল শুরু হয়েছিল। যুদ্ধের জমানায় ইংরেজ সরকার এ দেশে অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধের চোট তারা এ দেশের সম্পদ লুট করে ভরাতে চেয়েছিল। কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের দাম হঠাৎ কমিয়ে দেওয়ায় কৃষকদের আর্থিক অবস্থা ভয়ানক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এদিকে শহরের ফ্যাক্টরি, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়ানক খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে রুশ বিপ্লবের ফলে বামপন্থীদের পতন ঘটলে সারা এশিয়ায় স্বাধীনতার এক নতুন ঢেউ উঠেছিল। …‘সমাজে বুনিয়াদি পরিবর্তনের জন্য তার অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন এবং এই পরিবর্তন আনতে পারে একমাত্র সেই শ্রেণিই, যাদের এই পরিবর্তনের ফলে অবস্থার উত্তরণ হবে। সংস্কারবাদ ও ঐতিহ্যবাদ ভুল পথ। কারণ, তারা পুরোনো শাসনতন্ত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। সংস্কার ততক্ষণ পর্যন্তই গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ তা বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়। ইতিহাস থেকে আমাদের এই শিক্ষা নেওয়া উচিত যে অতীতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রতিভা, শিল্প-সাহিত্যের এ তাবৎকালের যে সম্পদ আমাদের কাছে রয়েছে, তাকে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবোধ পুঁজি হিসেবে গণ্য করে তার বৌদ্ধিক প্রয়োগ করা উচিত, আর সেটাই হলো প্রগতির মূল কাজ।১১

সাজ্জাদ জহির তাঁর লেখায় ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ব্যর্থতা ও দুর্বলতা তুলে ধরার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকারও স্বীকৃতি দিয়েছেন। কেননা ‘সমাজে সংস্কারবাদী ও রক্ষণশীল দল বরাবরই ছিল। ইংরেজদের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান ও শিখদের ক্ষেত্রকে তারা কাজে লাগাতে পারেনি। অন্যদিকে সমপ্রদায়গত বিভেদ ও বৈরিতাকে উসকে দিয়েছিল সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি।’

সাজ্জাদ জহির প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের আগের বিশ্ব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরবর্তীকালে এক নিবন্ধে লিখেছেন :

খোদ জার্মানিতেই তবু দেখা দিয়েছিল প্রথম আলোর আভা। কমিউনিস্টদের সুনামকে খতম করার জন্য হিটলার, গোরিং গোয়েবলস ও তাঁদের সাগরেদরা ষড়যন্ত্র করে আগুন ধরিয়ে দিলে রাইখস্টাগের প্রখ্যাত অট্টালিকায় (৯ মার্চ ১৯৩৬), তারপর এই দুষ্কর্ম কমিউনিস্টদের কীর্তি বলে বেশ কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতাকে পরাল হাতকড়া। অভিযুক্তদের অন্যতম ছিলেন জর্জি ড্রিমিট্রিভ। বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির এই জনপ্রিয় নেতা তখন বার্লিনে ছিলেন নির্বাসনে। তাঁর বিরুদ্ধে যখন শুনানি হলো, তখন সহসা সমস্ত পৃথিবীর চোখ লাইপৎসিগ আদালতের একটি কক্ষের দিকে নিবদ্ধ হলো। ড্রিমিট্রভের জবানি শুধু তাঁর ও আট সহযোদ্ধাকে নিরপরাধই প্রমাণ করল তা-ই নয়, জার্মান ফ্যাসিবাদকেও দাঁড় করাল একই কাঠগড়ায়।১২

তিন.

সাজ্জাদ জহিরের জন্ম ৫ নভেম্বর ১৯০৫, লক্ষেèৗতে। পড়াশোনা করেন লক্ষেèৗর সরকারি জুবিলি হাইস্কুল, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে। লন্ডনে ছাত্রাবস্থায় প্রথমে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভারতীয় ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করেন। ভারতীয় ছাত্রদের পত্রিকা ইন্ডিয়ার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ১৯২৯ সালে ইংল্যান্ডে ভারতীয় কমিউনিস্ট ছাত্রদের প্রথম গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৫ সালে লন্ডনে ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেন সাজ্জাদ জহির এবং এর ইশতেহার তৈরি করেন। ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে ভারতে ফিরে এসে সাজ্জাদ জহির এলাহাবাদ হাইর্কোটে আইন ব্যবসা শুরু করেন। কংগ্রেস রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও তিনি কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি ও কিষাণ সভার সঙ্গে যুক্ত হন। এই দুই সংগঠনের সূত্রে সাজ্জাদ কমিউনিস্ট নেতা পি সি যোশী, আর ডি ভরদ্বাজ প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত হন এবং প্রগতি লেখক সংঘ সংগঠিত করেন।

তখনো কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৪২ সালে পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে সাজ্জাদ জহির প্রকাশ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করেন এবং পার্টির কাগজ কওমি জং (জাতীয় সংগ্রাম) ও নয়া জমানা সম্পাদনারও দায়িত্ব নেন। দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত তিনি ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি ও প্রগতি লেখক সংঘের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান থেকে ভারতে ফিরে সাজ্জাদ জহির ফের প্রগতি লেখক সংঘের কাজে যুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে তাসখন্দে আফ্রো-এশিয়া লেখক সম্মেলনে যোগ দেন এবং ভারতীয় শাখার সাধারণ সম্পাদক হন। প্রগতি লেখক সংঘের সাপ্তাহিক মুখপত্র হায়াত বা জীবন সম্পাদনা করতেন। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠিত করেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার আলমা আতায় এক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে মারা যান সাজ্জাদ জহির। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই লন্ডন কি এক রাত (উপন্যাস), অঙ্গার (গল্প সংকলন), বীমার (গল্প), নক্সাল এ জিন্দা (জেল থেকে স্ত্রীর লেখা পত্রগুচ্ছ), রোশনাই, প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস, জিদানই ই হাফিজ, ফারসি কবি হাফিসের কবিতা আলোচনা সিমলা লীলস (কবিতা সংগ্রহ)। এ ছাড়া তিনি শেক্সপিয়ারের ড্যালো, ভলতেয়ারের ক্যানতিও, রাষ্ট্র, রবীন্দ্রনাথের গোড়া, খলীল জিবরানের প্রফেট গ্রন্থটি অনুবাদ করেন।

বামপন্থী লেখক রণেশ দাশগুপ্ত জেলখানায় থাকতে উর্দু শিখেছেন এবং বাংলায় ফয়েজ আহমেদসহ বেশ কয়েকজন উর্দু লেখকের রচনা অনুবাদ করেছেন। সাজ্জাদ জহির সর্ম্পকে তাঁর মূল্যায়ন :

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় ভিত্তিতে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান গঠিত হলে সেখানকার নাগরিক হওয়ার কোনো প্রশ্নই তাঁর ক্ষেত্রে ওঠেনি। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁকে পাকিস্তানে প্রবেশ করতে হলো। সদ্যগঠিত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত কমিউনিস্টদের নিয়ে যখন তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান সমেত ‘পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠিত হলো, তখন সাংঘাতিক বিপর্যয়কর ও জটিল পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা সাজ্জাদ জহিরকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। সাজ্জাদ জহির এই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তিনি বস্তুতপক্ষে আত্মগোপন করে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির হাল ধরেন। ১৯৫২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে রাওয়ালপি-ি ষড়যন্ত্র মামলায় কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও অন্যান্য কয়েকজনের সাথে রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটাবার দায়ে অভিযুক্ত এবং দ-িত হলেন। চার বছর পর জেল থেকে বেরিয়ে ভারতে এসে বিশেষভাবে প্রগতি সাহিত্য প্রসার সাধন ও শ্রমজীবীদের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন।১৩

ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৩ সাল নাগাদ ভারতের সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষা অঞ্চলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, তেলেগু, মালয়ালাম, কন্নড়া ও পাঞ্জাবি ভাষার প্রখ্যাত লেখকেরা এই আন্দোলনে যোগ দেন। দেশের ৫০টি শহরে শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯০০।

বাংলা, অন্ধ্র, কেরালা, বিহার ও উত্তর প্রদেশে সংঘ প্রাদেশিকভাবে সংগঠিত হয়েছে-প্রাদেশিক কেন্দ্রসমূহ সামগ্রিকভাবে প্রদেশের শাখাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। সাজ্জাদ জহির লিখেছেন :

আমাদের দেশে আর কোনো সংঘ নেই, যারা দেশের মূল ভাষাভাষী লেখকদের ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছে। দেশে আর কোনো সমিতি নেই, যারা একটি নির্দিষ্ট প্রগতিশীল লক্ষ্যে জনগণ এবং প্রকৃত জীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে, সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পেরেছে এবং এইভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেরা কর্মধারা বিস্তৃত করতে পেরেছে।

বঙ্গীয় প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ সম্পর্কে সংগঠনের সম্পাদক চিন্ময় সেহানবীশ লিখেছেন :

১৯৪৫ সালের মার্চের সম্মেলনের পর বঙ্গীয় প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘে বিবিধভাবে নিজের উন্নতি করেছে। যদি সব জেলা এবং স্থানীয় শাখাগুলোকে ধরা যায়, তাহলে এর সদস্যসংখ্যা এক হাজারের বেশ ওপরেই হবে-শুধু কলকাতায় সদস্যসংখ্যা পাঁচশ ছাড়িয়ে গেছে। জেলায় ১৪টি শাখা। যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, মুর্শিদাবাদ বা হাওড়ার উন্নতি হয়েছে বেশ ভালোই।১৪

প্রাদেশিক কার্যকরী সমিতির নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং আছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (যুগ্ম সম্পাদক), বিষ্ণু দে, গোপাল হালদার. স্বর্ণকোমল ভট্টাচার্য (যুগ্ম সম্পাদক) এবং হীরেন মুখোপাধ্যায়।

ইন্ডিয়ান লিটারেচার ছিল সারা ভারত প্রগতি লেখক সংঘের ত্রৈমাসিক মুখপত্র, একটিমাত্র সংখ্যাই বের হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। সম্পাদকম-লীতে বিভিন্ন ভাষার লেখকেরা ছিলেন, যথাক্রমে সুমিত্রা নন্দন পান্থ, সাজ্জাদ জহির, আহমদ আলী, কৃষণ চন্দর (হিন্দিভাষী), হীরেন মুখোপাধ্যায় (বাংলা), উমাশংকর যোশী (গুজরাটি), আনন্দ কানেকার (মারাঠি), আর পি সেতু পিল্লাই (তামিল), রমা কৃষ্ণ (তেলেগু), সি অচ্যুত মেনন (মালয়ালাম), শ্রী কান্তায়ার (কন্নড়া ), লিওনার্দ স্ফিদ এস মহ মুজফফর, রাজা রাও মুলক রাজ আনন্দ (ইংরেজি ও সাধারণ)।

সাজ্জাদ জহির যখন লন্ডনে প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠিত করছিলেন, তখন বিশ্বব্যাপী চলছিল তোলপাড়। জার্মানিতে হিটলার ও তাঁর সাগরেদরা কমিউনিস্টদের ওপর ফ্যাসিবাদী পীড়ন চালাতে থাকে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফ্রান্স, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে আন্দোলন গড়ে ওঠে। লন্ডনে ও প্যারিসে র‌্যল্ফ ফক্স, ম্যাক্সিম গোর্কি, রমাঁ রলাঁ, আদ্রেঁ মালরো, টমাস মান, ওয়ালতো ফ্রাঙ্ক, লুই আরাগঁ প্রমুখ প্রখ্যাত লেখক-কবির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। সে সময়ে লুই আঁরাগের একটি কথা দারুণভাবে জহিরকে আন্দোলিত করে। সমাজতন্ত্রের দিকে এইভাবেই কোনো লেখকের অগ্রসর ঘটা স্বাভাবিক, কিন্তু যদি তিনি তাঁর সমাজটা ভাবনার জন্য কোনো খাঁটি বৌদ্ধিক অবস্থান সুনিশ্চিত করতে না পারেন, তাহলে সংকট মুহূর্তে রক্ষণশীলতার দ্বারা তাঁর পা ছুঁতে যাওয়ার আর্শ্চযের কিছু নয়। …বছর ঘুরতেই আদ্রেঁ জিদ প্রগতিশীল লেখকদের পঙ্ক্তি থেকে সরে গেলেন।১৫ সঞ্চারী সেন লিখেছেন :

১৯৪৭ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে জড়িত থাকার পর ১৯৪৮-এ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাজ্জাদ জহির পাকিস্তানে চলে যান। সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টি অব পাকিস্তান) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের ছাত্র সংগঠন ট্রেড ইউনিয়নের দায়িত্ব সামলান। এসবই তাঁকে করতে হয় আন্ডারগ্রাউন্ড থাকাকালীন।১৬

তথ্য ও টীকা

১ ও ২     কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, চল্লিশের দশকের ঢাকা, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও সরদার ফজলুল করিম, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা

৩            সরদার ফজলুল করিম, (ওই)

৪ ও ৫    রণেশ দাশগুপ্ত, সাজ্জাদ জহির ও অন্যান্য, রণেশ দাশগুপ্ত রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।

৬            রামবিলাস শর্মা, সারা ভারত লেখক সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশনের প্রতিবেদন

৭             আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ ডিসেম্বর ১৯৩৮

৮            স্মৃতির বিহার, সাজ্জাদ জহির : অনুবাদ নীলাঞ্জন হাজরা

৯             রোশনাই : প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস এবং, এবং জলার্ক, জুলাই ডিসেম্বর ২০০৩

১০          রোশনাই : প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস এবং এবং জলার্ক, জুলাই ডিসেম্বর ২০০৩

১১           রোশনাই : প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস এবং এবং জলার্ক, জুলাই ডিসেম্বর ২০০৩

১২          রোশনাই : প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস এবং এবং জলার্ক, জুলাই ডিসেম্বর ২০০৩

১৩          সাজ্জাদ জহির প্রমুখ : এ কালের উপমহাদেশে রক্তের আখরে, রণেশ দাশগুপ্ত রচনা সমগ্র, বাংলা  একাডেমি, জুন ২০১২

১৪          প্রগতি সাহিত্য সম্মেলন,  জলার্ক এবং

১৫          স্মৃতির বিহার, সাজ্জাদ জহির : অনুবাদ নীলাঞ্জন হাজরা

১৬         সঞ্চারী সেন, রোশনাই : প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস

***********************************************

ভোরের স্বপ্নচারি কাস্তের কবি দিনেশ দাস
সুজন হাজারী

বাংলা কবিতার সাথে ঘর-বসতির বয়স বাড়ছে। প্রায় পাঁচ দশক থেকে কতদিন বিনিদ্র রাতের সাধনায় জড়িত। ইতিহাসের কালো অন্ধকারের অভ্যন্তরে একদিন মিলিয়ে যাবে জীবন। হতাশাক্রান্ত নয় চরম বাস্তব উপলব্ধির মুখোমুখি হয়ে বলছি আমাদের অবস্থান কি হবে? ভারতের পশ্চিবঙ্গের ষাটের দশকের কবি জ্যোতির্ময় দাশ তার এক লেখায় অভিমত ব্যক্ত করেছেন এতোদিন লেখালেখির নীট ফল শূন্য। মৃত্যুর পর হয়তো বন্ধু কোন সম্পাদক কালো বর্ডারে দুলাইনে শোক প্রকাশ করবেন অথবা শোকসভার স্বল্প উপস্থিতিতে এক মিনিটের নীরবতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ সমস্ত জীবনের সাধনার পরিসমাপ্তি ঘটবে। কারণ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেছেন চল্লিশের বন্দিত নন্দিত কবি দিনেশ দাসের কোন কাব্যগ্রন্থ বাজারে খুঁজে পাননি। আক্ষেপে আরো বলেছেন তার বাড়ির কাছের দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারে এমনকি কলেজ স্ট্রিটের কোন পাঠাগারেও তার বই খুঁজে পাননি। কবি দিনেশ দাসের নাম শোনেন নি বা জানেন না কবি সাহিত্যিকদের কাছে এ কথা উচ্চারণ লজ্জাজনক।

দিনেশরঞ্জন দাসের জন্ম ১৯১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার দক্ষিণ অংশের আলিপুর অঞ্চলে গোলাপনগর আদিগঙ্গা তীরে। পিতা ঋষিকেশ দাস মাতা কাত্যায়নী দেবীর প্রথম পুত্র। পৈত্রিক আদি নিবাস হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরের কাছে কাষ্টস্যাংড়া গ্রাম। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ছড়া লেখার শুরু। ১৯২৮ সালে  নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় দিনেশ দাস ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। চেতলায় তার বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী ডকের পাশে গুপ্ত রাজনৈতিক দলের বিপ্লবীদের দলে ভিড়ে যান। বিপ্লবীরা দিনে দিনে আরো সশস্ত্র হয়ে উঠেন। সশস্ত্র বিপ্লবীদের নিরস্ত্র করার জন্য হেঁটো ধুতি পরা গণতন্ত্রের লাঠি নিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী রাজনীতির মাঠে হাজির। তাঁর নির্দেশে পালিত হয় সত্যাগ্রহ। দিনেশ দাস সত্যাগ্রহ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারেননি। স্বাধীনতা আন্দোলন থমকে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলনের সুফল সশস্ত্র নাকি নিরস্ত্র কোন পথে আসবে? ধূর্ত ব্রিটিশদের কূটচালে পরের ধারাটি মুখ্য ছিল। রাজনীতিকদের ঠাঁই হলো ইতিহাসের পাতায়। সময়টা ১৯৩০ সাল— এবছর দিনেশ দাস  ম্যাট্টিক পাশ করে আশুতোষ কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে আই এ পাশ করে ১৯৩৩ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজে বি.এ. ভর্তি হন। রাজিৈতক কর্মকা-ে বেশি জড়িয়ে পড়ায় পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ১৯৩৪ সালে সাপ্তাহিক ‘দেশ’  পত্রিকায়   তাঁর প্রথম কবিতা ‘শ্রাবণে’ ছাপা হয় ও সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত ‘বঙ্গশ্রী’ মাসিক পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হতে থাকে। ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের প্রেরণায় ও তাড়নায় তার বেশ কিছু কবিতা ‘দেশ’-এ প্রকাশ হয়।‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা কবিতাটি নিচে উদ্ধৃত করা হলো :

ধ্যানমগ্ন তপস্বীর তপোভঙ্গ হ’ল আজ বহুদিন’ পর

বর্ষণের মত্ততায় রুদ্রসুরে আত্মভোলা জেগেছে শঙ্কর

দুরন্ত উল্লাসে যেন। পিঙ্গল জটার জালে নভের নীলিমা

মসীম্লান হ’য়ে আসে—লুপ্তপ্রায় হ’ল দিক—দিগন্তের সীমা

বিদ্যুতের অগ্নিসর্প ক্ষণেক্ষণে ফণা হানে জটাভার হ’তে

ধরিত্রীর অন্তরাত্মা মুহুর্মহু ত্রস্তে কাঁপে—এ বিশ্বজগতে

শুনি যেন ভারতের আর্তসুর। নৃত্য করে মত্ত নটরাজ

বজ্রের বহ্নিতে প্রলয়ের তৃতীয় নয়ন জলে জা ,

শঙ্কিত উমার চক্ষে অবিরল ঝরঝর ঝরে অশ্রুধারা

তিলার্ধ ভ্রুক্ষেপ নাই,তা-বের নটরাজ নাচে আত্মহারা (‘শ্রাবণে’)

এ সময় তিনি বঙ্গবাসী কলেজের স্বনামধন্য শিক্ষক কৈলাস বসুর কাছে কিছুদিন জার্মান ও ফরাসী ভাষা শিখেন। লুই আঁরাগ, হাইনে রাইনের কবিতা ও ইংরেজি থেকে কিছু আরবি কবিতাও অনুবাদ সাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেন। তাঁর রচিত ‘মৌমাছি’ কবিতাটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ সংকলন গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতাটি প্রতাপ ব্যানার্জী ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় অনুবাদ করেন। এভাবেই কবির সংশয়-ভীরুতা কাটিয়ে আত্মপ্রত্যয়ের উত্তরণ ঘটে। তার নিসর্গ চেতনায় জায়গা করে নেয় প্রকৃতির কীটপতঙ্গ। মৌমাছির ডানায় খুঁজে পান ফুলের গন্ধ সেখানে দেখি তার উদ্ভাস :

যেন আজ বাহিরের সমস্ত পৃথিবী সমস্ত আকাশ

আমার ঘরের মাঝে তুলে নিয়ে এল

কোথাকার ছোট্ট এক বুনো মৌমাছি। (মৌমাছি /‘কবিতা ১৩৪৩-১৩৪৮’ ১৯৪২)

রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ প্রকাশের পর এ বছরে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পুরাতনী’ প্রকাশ পেলেও তেমন প্রচার পায়নি।

সশস্ত্র আন্দোলনে ভাটা পড়ে গান্ধীর অসাড়তায়। নতুন ধারা কমিউনিজম সর্বহারা মানুষের মুক্তি সূর্য উদিত হয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ে। কমিউনিজম শব্দটিতে ছিল ব্রিটিশরাজের আতঙ্ক। এ কথা কারো মুখে উচ্চারিত হলে তার উপর পুলিশের কড়া নজরদারি চলতো। রাজচক্ষু ফাঁকি দিয়ে এ সময় খিদিরপুর ডক এলাকায় বিদেশি জাহাজে আমদানি হতো সমাজতন্ত্রের বই পত্রিকা। আলিপুরে রেড গার্ড আন্দোলনের প্রস্তুতিকালে নেতৃবৃন্দের যোগসাজোশে কবির পরিচয় ঘটে মার্কস, এঙ্গেলস, বার্ট্রান্ড রাসেল, র‌্যালফ ফক্সসহ অন্যান্য সাম্যবাদী দার্শনিকদের গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকার। কমিউনিজমের এসব বইপত্র পড়াশুনা করে কবি দিনেশ দাস কমিউনিজমে যুক্ত হয়ে যান। কবির জীবনে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়। বদলে গেল কবির জীবনদর্শন রোমান্টিসিজমের নদী পেরিয়ে ক্রমান্বয়ে কবি পৌঁছালেন বাস্তবতার আঙ্গিনায়।

এডলফ হিটলার ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর বিশ্বজুড়ে জেগে ওঠে ফ্যাসিস্টরা। ১৯৩৫-৩৬ সচেতন হয়ে ওঠেন প্রগতিশীল কবি লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীরা। ১৯৩৬ ভারতে গড়ে ওঠে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ সংগঠন। কবি দিনেশ দাস মনে-প্রাণে মিলে গেলেন তাদের সঙ্গে। দিনেশ দাসের দুচারটি করে কবিতা প্রকাশ হতে থাকে।

কমিউনিস্টরা প্রত্যক্ষ করেছেন বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের বিস্তার। বাংলা কবিতার  বিক্ষুব্ধ দশকে পদার্পণ। বিশ্বব্যাপী  যুদ্ধ, বিগ্রহ, দুর্ভিক্ষ, বুভুক্ষতা, মানুষের দুর্দশা, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা বিষবাষ্পের দাবানলে ছিন্নমূল, রক্তপাত। উদ্ভ্রান্ত যাপিত জীবনে সর্বোপরি মূল্যবোধহীনতার চরম দুর্দিন। দেশের সংস্কৃতিতে অশুভ কালোছায়ার থাবা। পৃথিবী মূল্যহীন অতৃপ্ত অন্তরাত্মা অশান্ত হৃদয় সন্দিগ্ধ মানুষের অন্তহীন বেদনা। এমনি মুহূর্তে কবি কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের শরণাপন্ন হলে তিনি তাকে উপদেশ দিলেন লড়াই ছাড়া কিছুই হবে না। দেশকে সুসংহত রাখতে হলে মিলিটারি ফ্রন্টের মতো সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের প্রয়োজন। একার দ্বারা কোনো কিছুই সম্ভব নয়।

কবি বিশ্বাস করতেন ¯্রষ্টা-শিল্পীরাই এ যুগের জাদুকর। মূলত তারা অজানাকে জানা অচেনাকে চেনার সীমায় এনে আমাদের চেতনার দিগন্ত উন্মোচন ও প্রসারিত করেন। কবি তার শব্দে, শিল্পী তার রেখায়, ঔপন্যাসিক কথায়, গায়ক সুরে, ভাস্কর গড়নে, নর্তক সঞ্চরণে, অভিনেতা অভিব্যক্তিতে। শুধু ব্যক্তি বা সমাজ মানসের মগ্ন চৈতন্যে অনুপ্রবেশ করে অন্তর্লোক পরিবর্তন সক্ষম। মনলোকের পরিবর্তনই হল শ্রেণির রূপান্তর। শ্রেণি রূপান্তর সভ্যতার শেষ কথা নয়। মানুষের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকাটাই সংস্কৃতি। সুন্দর জীবন-যাপনের মধ্যেই প্রকৃত সভ্যতা আর সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে।

১৯৩৫ সালে পিতৃ-আদেশে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির জন্য কার্শিয়াং-এ খয়াবাড়ি চা-বাগানের ম্যানেজারের ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে উত্তরবঙ্গে যান। চা-বাগানের শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা তাঁকে বিচলিত ও পীড়িত করে। কবি বছরখানেক থাকার পরেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়। এর পরে বছরখানেক নিরুদ্দেশ থাকেন অজ্ঞাতবাসে। তখন দেশে সাম্যবাদের আন্দোলনের কাল। জগৎ জীবন মানুষ প্রকৃতি আন্দোলন বিভিন্ন দিক থেকে কবিচিত্ত উদ্বেলিত। সুখে-দুঃখে, আনন্দে-ক্রোধে, ঘৃণায়-হতাশায়-কামনার সমন্বয়ে কবিতা লেখার অভিমুখীতার দিক বদল ঘটল। ১৯৩৬-৩৭ সালে লেখা হল সাড়া জাগানো ‘লালমেঘ’, ‘ব্ল্যাকআউট’, ‘১৯৩৭’, ‘বামপন্থী’, ‘হাতুড়ি’, ‘কাস্তে’ কবিতা। কবির স্বীকারোক্তিতে ‘কাস্তে’ ১৯৩৬ সালে রচিত হলেও দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকে।

রাজরোষের ভয়ে কেউ ঝুঁকি নিতে চায়নি এমনকি দলীয় কাগজ ‘অগ্রগতি’ও না। জীবনে কবি প্রথম আঘাত পেলেন। তিনি ধনুর্ভাঙ্গা পণ করলেন ‘কাস্তে’ কোথাও প্রকাশিত হবে, না হয় তিনি আর কলম ধরবেন না। কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন কবি। চার বছর পর তিনি স্কটিস কলেজে ফিরে এসে বি. এ. পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলেন। ১৯৩৮-এ কবি অরুণ মিত্রের উদ্যোগে হঠাৎ ‘আনন্দবাজার’ শারদীয় সংখ্যায় ‘কাস্তে’ কবিতাটি ছাপা হয়। অরুণ মিত্র ওই পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। কবিতাটি প্রকাশের সাথে সাথেই সুধীমহলের দৃষ্টি কাড়ে। অগ্রজ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও কবি বিষ্ণু দে ‘এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে’ উদ্ধৃতি দিয়ে কবি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় দুটি কবিতা লেখেন। কবিমহলে সাড়া পড়ে যায়। অগ্রজ কবির অনুসরণে কবি কিরণশংকর সেনগুপ্ত, সুখেন সেন প্রমুখ তরুণ কবিরাও ওই ছত্রটিকে শিরোনাম করে লেখেন। শুধু তাই নয় কথা সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ও এ নামে একটি ছোটগল্প প্রকাশ করেন ‘অলকা’ পত্রিকায়। কবিতাটির ইংরেজি ও হিন্দি অনুবাদ হয়। ‘কাস্তে’ কবিতা শুধু কবির জীবনে নয় বাংলা সাহিত্যেরও একটি ঘটনায় পর্যবশিত হয়। কবি দিনেশ দাস কবি সাহিত্যিক মহলে ‘কাস্তে’ কবি নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করে আমৃত্যু তিনি এই অভিধায় অভিষিক্ত ছিলেন। বিখ্যাত সেই কবিতা :

বেয়নেট হ’ক যত ধারালো

কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু,

শেল্ আর বোম্ হ’ক ভারালো

কাস্তেটা শান দিও বন্ধু।

বাঁকানো চাঁদের সাদা ফালিটি

তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?

চাঁদের শতক আজ নহে তো

এ-যুগের চাঁদ হ’ল কাস্তে।

লেহা আর ইস্পাতে দুনিয়া

যারা কাল করেছিল পূর্ণ,

কামানে কামানে ঠোকাঠুকিতে

নিজেরাই চূর্ণ-বিচূর্ণ।

চূর্ণ এ লৌহের পৃথিবী

তোমাদের রক্ত সমুদ্রে

ক্ষয়িত গলিত মাটিতে

মাটির-মাটির যুগ উর্ধ্বে।

দিগন্তে মৃত্তিকা ঘনায়ে

আসে ওই চেয়ে দেখ বন্ধু

কাস্তেটা রেখেছ কি শানায়ে

এ মাটির কাস্তেটা বন্ধু!।  (কাস্তে/ সংবর্ত)

সাড়া জাগানো ‘এ-যুগের চাঁদ হ’ল কাস্তে’ পঙ্ক্তি রচনার পরে আরেক কবিতায় চাঁদের উপমায় কবি চমৎকারিত্ব দেখিয়েছেন :

দুধের বাটির মত টলটলে আকাশের চাঁদ ওঠে

আশা, শান্তি, অনন্ত আলোর।

দুনিয়াজুড়ে সা¤্রাজ্যবাদের বিস্ফোরিত রক্তচক্ষু ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান সাহিত্য সমাজকে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উদ্বুদ্ধ কবি দিনেশ দাস সেই সাহিত্য সমাজে নিজেকে যুক্ত করে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তিনি নিজে বলেছেন জার্মান ফ্যাসিবাদের শক্তি যত তীব্রই হোক না কেন কাস্তে, হাতুড়ি অর্থাৎ জনগণের শক্তির কাছে তা তুচ্ছ।

চাঁদকে নিয়ে রোমান্টিক ভাবালুতার পরিবর্তে প্রতীক হিসাবে বামের কবিরা কল্পনা করেছেন। চাঁদ সম্পর্কে তাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এর পথিকৃৎ হলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। চাঁদকে নিয়ে বৈপ্লবিক উপলব্ধি প্রকাশ অতুলনীয় :

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

এখানে রোমান্টিসিজমের ধারণা পাল্টিয়ে চাঁদকে আকাশ থেকে নামিয়ে বাস্তবের রুক্ষ্ম মাটিতে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। তিরিশের অন্যতম কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘ধূসর পা-ুলিপি’ (১৯৩৬) কাব্যে ‘মেঠো চাঁদ’ নামের কবিতায় চাঁদের উপমা আনলেন এভাবে :

কাস্তের মতো বাঁকা, চোখা—

চেয়ে আছে- এমনি সে তাকায়েছে কতরাত—

নাই লেখাজোখা।

অথবা আষাঢ় ১৩৩৫ এ ‘প্রগতি’তে প্রকাশিত ‘সহজ’ নামের কবিতায় দেখি চাঁদের রূপ :

কিংবা যে আকাশে

কাস্তের মত বাঁকা চাঁদ।

জেগে ওঠে-ডুবে যায়

-তোমার প্রাণের সাধ

তাহাদের পরে।

তিরিশের আরেক মহোত্তম কবি বিষ্ণু দে ‘বৈকালি’ (পূর্বলেখ কাব্যে) শুরুতেই লিখলেন :

আকাশে উঠল ওকি কাস্তে চাঁদ

এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে।

অথবা

হৃদয়ে হাতুড়ি ঠোকে প্রেম, ওঠে চাঁদ

এ যুগের বাঁকা চাঁদ কাস্তে।

সমালোচক জগদীশ ভট্টাচার্য এক আলোচনায় তার মত প্রকাশ করেছেন সাহিত্য স¤্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে বর্ণনা এরকম : ‘কাপ্তেন টমাসের সৈন্যদল চাষার কাস্তের নিকট শস্যের মত কর্তিত হইতে লাগিল’। এ তুলনা কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কি?

দিনেশ দাসের ‘কাস্তে’ আবিষ্কারে উদ্ভাসিত শক্তিতে প্রণোদনায় চাঁদের যথার্থ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতে পুলিশি তল্লাসী হয় এবং তাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চের দপ্তরে আটক রাখা হয়।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন কবি দিনেশ দাস ঢাকার (রমনার) বাংলার কৃষিবিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টর রায়সাহেব যামিনীকুমার বিশ্বাসের তৃতীয় মেয়ে শ্রীমতি মণিকার সাথে পরিণয়ে আবদ্ধ হন। কবি তিন সন্তানের পিতা। প্রথম পুত্র কবি শান্তনু দাস ‘গঙ্গোত্রী’ নামের সাহিত্য পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করছেন। দ্বিতীয় পুত্র ভারবি দাস গীটার ও পিয়ানো অ্যাকোভিয়ানিস্ট, একমাত্র কন্যা জোনাকি বর্তমানে কারনার এক বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ। এবারও স্পেশাল পুলিশের নজর পড়লো তার উপর। বাড়িঘরে খানা-তল্লাশের নামে ভাঙচুর তছনছ করা হলো। তাকে আটক থাকতে হলো ইলিসিয়াম রো-তে (বর্তমানে লর্ড সিংহ রোড) ইংরেজি কাগজে বড় বড় অক্ষরে ডাবল হেডিং লেখা হয়েছিল সংবাদ : ‘এন ইট্টিগ্যু এগাইনস্ট দি কিং অব ইংল্যান্ড’।

১৯৪১ সালে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের উদ্যোগে ‘পূর্বাশা’ প্রকাশনী দিনেশ দাসের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা : ১৩৪২-১৩৪৮’ বের করে। ‘কবিতা’ পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু বইটির সমালোচনায় নিয়ে লিখলেন : ‘এই ছোট বইটি পড়ে আমাদের মনের ভাব অনেকটা এক চামচে পরিজ খাবার পর অলিভর টুইস্টের মতো হয়েছে, সেই বিখ্যাত বালকের মতো আমরাও বলছি, আরো চাই।’ ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় কবির গতিবিধি কিছুটা অবাধ হয়। গান্ধীর ‘ভারত ছাড়’, নেতাজির ‘আজাদ হিন্দ ফৌজে’র সংগ্রামে ভারত মহাসাগরে নৌবিদ্রোহ চাঙ্গা হতে থাকে। এ সময় তিনি কলকাতার ন্যাশনাল বাংকে চাকরিরত। ব্যাংক বীমা ইউনিয়ন পুঁজিবাদের বিপক্ষে সোচ্চার। কবি সংগঠনে জড়িত থাকার কারণে তিনি-সহ নরেন্দ্রনাথ মিত্র চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। যোগ দেন ‘দৈনিক কৃষক’ পত্রিকার বার্তা বিভাগে। পরে ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে কবি কিছুদিন চলচ্চিত্রে গীতিকার ও সহকারি পরিচালকের কাজ করেছেন। এরপর, হাওড়া জেলার দেউলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এক বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ফিরে অসেন কলকাতায় চেতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক পদে। ১৯৪২ এ প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় কাব্য— ‘ভুখ মিছিল’ :

       এই আকাশ স্তব্ধ নীল

              কোনখানেই

                     যুদ্ধ নেই

         হেথা আকাশ রুক্ষ নীল

     নি¤েœ ভিড় ভ্রষ্টনীড় মৌনমুক ভুখ মিছিল।

     এখানে নেই টুকরো দূর-দিগন্তের

                     জ্বলন্ত

     এখানে নেই আগুন-ফুল সে-বৃন্তের

                     ফলন্ত

               হেথা আকাশ শুষ্ক নীল

      নি¤েœ ভিড় ভ্রষ্টনীড় মৌনমুক ভুখ মিছিল।

                   কোনখানেই

                      যুদ্ধ নেই

                তবু হাওয়ায় কিসের সুর

                      আহত আর মুমূর্ষুর

                            বিষণœ

                অন্ন নেই পণ্য নেই বিপন্ন।

      আকাশে দাগ কোথাও নেই কঙ্কালের কলঙ্কের

                        অসংখ্যের

                   খোলো নয়ন হে অন্ধ

      এখানে আজ ঘোরানো সেই মহাসমর কবন্ধ?

                    এই দারুণ ক্রন্দনেই

                     যুদ্ধ নেই? যুদ্ধ নেই?

                     তবু আকাশ স্তব্ধ নীল

      নি¤েœ ভিড় ভ্রষ্টনীড় মৌনমুক ভুখ মিছিল। (ভুখ মিছিল)

মানুষ কেন অনাহারে থাকে আর থাকবে? মানবতাবাদী এ কবিকে পীড়া দেয়। শোষণ শোষকের বৈষম্য দমন পীড়ন অন্যায় অত্যাচার কবি মনে পাগলা ঘণ্টা বাজায়। কবি তাই সক্রোধ ফুঁসে ওঠেন প্রতিবাদ করেন :

আজকে আকাশ জুড়ে মহাসমরের মহামারী

এই যুদ্ধে আমরা জিতি কিংবা হারি,

এ কথা চরমতম নয়:

আজকে আমার প্রশ্ন,

কেন হবে বারবার বর্বর এই অভিনয়? (কেন যুদ্ধ)

দুটি বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্ববাসী ঐক্যমতে পৌঁছেছিল, যে আর যুদ্ধ নয়। শান্তির লক্ষ্যে মানবভ্রাতৃত্ব বন্ধনে বেঁধে গড়ে উঠেছিল জাতিসংঘ। তবু কেন ঠা-া যুদ্ধে অবিরাম প্রতিযোগিতায় আমরা অস্থির সংকটাপন্ন আতঙ্কিত। অজো যুদ্ধে উন্মত্ত ইজরাইল, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান, মিয়ানমার, প্যালেস্টাইনসহ— মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা। সত্যদ্রষ্টা একজন কবির থেকে বড় সংস্কারক কেউ না। তাই সমাধান খুঁজতে কবি সূত্র নির্ধারণ করেন এভাবে :

পৃথিবী অনেক বড়

বিজ্ঞানের তাপ নয়, আলো তুলে ধরো। (যুদ্ধ কেন)

তিনি পুঁজিবাদীদের বিপক্ষে শ্রেণিসংগ্রামের রূপকে যথার্থই চিহ্নিত করেছেন। নিচের কবিতাতে সেই রূপ দেখতে পাই :

আনল পথে আবর্জনার স্বৈরিতা

মহাপ্রভূ; সবই তোমার তৈরি তা।

দেখচি বসে দূরবীণে

তোমায় শেষে আসতে হবে

তোমার গড়া ডাস্টবিনে। (ডাস্টবিন)

১৯৫১ তে ‘দিনেশ দাসের কবিতা’ নামের সংকলন প্রকাশ হয়। সংকলনের ভূমিকায় অগ্রজ কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র লেখেন ‘বর্তমানকে প্রতিবিম্বিত করার নামে এ যুগের অধিকাংশ কবিতা বাকচাতুর্যের অর্থহীন অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছে। সেই নিস্ফল আতিশয্যের অরণ্যে দিনেশ দাসের এক একটি কবিতা বিস্তীর্ণ গভীর হ্রদের মতো।’ আধুনিকতার প্রশ্ন হতাশা প্রেরণা প্রত্যাশার প্রতিফলন তাঁর মাঝে দেখা যায়। জাত কবিতাকে আলাদা করে চেনা যায়, সেই গভীরতার ইঙ্গিত সদা লক্ষণীয়। দ্বিখ-িত ভারতের স্বাধীনতায় কবি মর্মপীড়িত :

এখানে তো শাখের করাতে

দিনগুলি কেটে যায় করাতের দাঁতে

সীমানার দাগে দাগে জমাট রক্তের দাগ—

কালনেমী করে লঙ্কাভাগ

তবু এল স্বাধীনতা দিন

উজ্জ্বল রঙিন

প্রাণের আবেগে অস্থির—

ডাক দেয় মাতা পদ্মা, পিতা সিন্ধুতীর। (পনেরই আগষ্ট ১৯৪৭)।

স্বাধীনতা পরবর্তীতে গান্ধী হত্যার মর্মবেদনা জাতির মনে বেজেছিল এই ইন্দ্রের পতন সুর যা কবিকে উদ্বেলিত করে।

এর পরের কাব্যগ্রন্থ ‘অহল্যা’ কবিবন্ধু শ্রীচিত্তরঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের উদ্যোগে প্রকাশ পায়। এতে মূলত দুধরনের কবিতা স্থান পায় যেমন আধা-নিমগ্নতা ও অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব :

জ্বলন্ত তারার মত গনগনে আঁচে

দুটি পথ পোড়ে যদি, জ্বলে দুইটি শিবির

তবু জানি অন্যপথ, হয়তো তৃতীয় পথ আছে,

তৃতীয় পৃথিবী আছে-আশা, শান্তি, সবুজ শিশির। (তৃতীয় পৃথিবী)

এ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সমকালীন কবি ও বিদগ্ধ জনের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে। জীবনানন্দ দাশ ‘অহল্যা’ পড়ে কবিকে এক চিঠিতে লেখেন ‘অহল্যাকে আপনি আধুনিক যুগের বা সনাতন পৃথিবীর মানবের ব্যথিত শিলীভূত প্রাণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে যে চেতনার পরিচয় দিয়েছেন তা অপূর্ব’। অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন, ‘অবাক মানি আমি দিনেশ বাবুর চেতনার বিস্তারে, বুদ্ধির জাগ্রত প্রসারতায়। সমসাময়িক ঘটনা এই চেতনার স্পর্শে নতুনতর অর্থদীপ্তি লাভ করেছে। দিনেশ বাবু সার্থক কবি, সার্থক তার স্বাক্ষর’। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন ‘আমি চিরদিন আপনার ভক্ত। অহল্যা সেই ভক্তি আরো বাড়িয়ে দিল। নীহার বাবুর বক্তব্য আমারও হতে পারত যদি আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়, নেহাৎ নাবালক না হত’। এর পরের কাব্য ‘কাঁচের মানুষ’ একাব্যের একটি কবিতা নিচে দেয়া হলো :

এ আবার কবি এস পড়ে অক্ষয় বটের নীচে

কী যেন প্রতীক্ষা করে কলম উঁচিয়ে,

এবার ঘটনা ঘটে;

মূল ফল গাছ মাটি হয়ে ওঠে সহসা মুখর,

¯্রষ্টার সৃষ্টির পরে

আরও এক মহা¯্রষ্টা করে চলে কঠোর সাধনা,

থরোথরো কেঁপে ওঠে নিথর পৃথিবী। (কবি)

‘দিনেশ দাসের শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘অসংগতি’, ‘সংগতি অসংগতি’, ‘রাম গেছে বনবাসে’ কাব্যগ্রন্থগুলি ধারবাহিকতা রক্ষা করে প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৭৪ সালে ‘গঙ্গোত্রী পত্রিকা’র উদ্যোগে (যার সম্পাদক কবিপুত্র শান্তনু দাস ও প্রকাশক কবির ভাগ্নে কবি বিশ্বনাথ কয়াল) কবির ‘কাস্তে’ শিরোনামের কাব্য সংকলকন প্রকাশ হয়। ১৯৮৪ তে সর্বশেষে প্রকাশ হয় ‘দিনেশ দাস : কাব্যসমগ্র’। কাব্যগ্রন্থ ক্রমানুসারে আলোচনা করতে গেলে লেখার পরিসর আরো বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে পরিসীমিত থাকায় বাঞ্ছনীয় বিবেচনায় সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হলো।

কবির লেখা লেখির হাতে খড়ির লগ্ন তিরিশে, কবি পরিচিতিতে প্রতিষ্ঠা চল্লিশের গোড়ায়। শিক্ষকতা থেকে অবসর ১৯৭৮ এ। ‘অসঙ্গতি’ কাব্যের জন্য ১৯৮১ তে নজরুল ও ‘রাম গেছে বনবাসে’র সুবাদে ১৯৮৩ তে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। লেখার শেষপ্রান্তে এসে কবির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে এসো কোরাস গাই :

তবু যেন মনে হয়, খ- জ্ঞানের ওপারে

আছে এক সূর্য ভোর-অখ- চেতনা জবা-কুসুমসঙ্কাশ

সেই মহাকাশ ছুঁয়ে আমার আকাশ।

***********************************************

নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও এবং তাঁর লেখক-মানস
এলহাম হোসেন

নন্দনতত্ত্বের নিরিখে একজন ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, তাত্ত্বিক ও শিক্ষক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রকে আফ্রিকার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও আধুনিক আফ্রিকী সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। ঔপনিবেশিক কেনিয়ার তিনটি শক্তিশালী  প্রতিষ্ঠানের পীড়নে লেখক হয়ে ওঠার তীব্র তাগিদ বোধ করেন নগুগি (গিকান্দি, ৩৯)। প্রথমত প্রোটেস্ট্যান্ট গীর্জা যা ঔপনিবেশিকতার বাতাবরণে অধুনাতন স্বরূপতা স্থানীয়দের উপর চাপানোর জোরালো প্রয়াস চালায়। দ্বিতীয়ত মিশনারী স্কুল যা স্বাক্ষরতাকে জোরালোকরণের মধ্যদিয়ে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিকে স্থানীয়দের উপর চাপিয়ে দেওয়ার নিমিত্তে সমসাময়িকত্ব ও আত্মপরিচয়ের বয়ান তৈরি করে। তৃতীয়ত গিকুয়ু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে  উদ্ধুদ্ধ স্থানীয় কেনীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত স্কুলসমূহ, যেগুলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। এরা পশ্চিমা শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিরোধী নয়, কিন্তু এগুলোর প্রভাব থেকে আফ্রিকী সংস্কৃতিকে সরিয়ে রাখার পক্ষে। নগুগি এ রকম একটি স্কুলেই শৈশবের ও তারুণ্যের পাঠ গ্রহণ করেন। তরুণ নগুগির জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিশ্রুতি ছিল স্থানীয়দের শ্রেণিবিভক্তি ও নৃগোষ্ঠী পরিচয়ের ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত করার। কিন্তু একই সাথে এরা স্থানীয়দের অনাকাক্সিক্ষত দ্বন্দ্বেও ফেলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কেনিয়ার মধ্যভাগে প্রটেস্ট্যান্টবাদ নৈতিকতাকে বুর্জোয়া সৌজন্যের সমার্থক বলে প্রচার করে। অনেকেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে খ্রিস্টতত্ত্বকে বিশ^াস করে নয়, বরং আধুনিক জীবনযাপন পদ্ধতি, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও পোশাকের ধরণ পাল্টানো সাংস্কৃতিক ভিন্নতার স্বাদ গ্রহণ করার জন্য । প্রটেস্ট্যান্ট গীর্জা এ-ও প্রচার করতো যে, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার মানে হলো আধুনিক হওয়া। কাজেই ধর্মান্তরিত হওয়ার অর্থ দাঁড়ায় নিজেরদের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে একে সেকেলে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে আধুনিকতাকে গ্রহণ করা। তবে, ঔপনিবেশিকদের তরফ থেকে স্বীকৃতি যেটুকু আসে সেটুকুও শ্রেণিবিভক্তিরই চর্চামাত্র। ধর্মান্তরিত হয়ে স্থানীয়রা হতো কোয়াজি ইউরোপীয়ান বা আধা-ইউরোপীয়। অর্থাৎ এখানেও স্থানীয়দের আত্মপরিচয় হতো বিকৃত। তবে, মজার ব্যাপার হলো, উপরোক্ত এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের কর্মতৎপরতার সমান্তরালে কিন্তু স্থানীয়দের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে উঠছিল। ঔপনিবেশিক পরিচয় কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়াকে স্থানীয়রা সঙ্গত কারণেই সন্দেহ করতে থাকে, প্রশ্ন করতে থাকে। নগুগির লেখকসত্তার জন্ম হয়েছে এই দুয়ের সংযোগস্থল থেকেই। এখানে অবস্থানের ফলে যে টানাপোড়েন তৈরি হয় নগুগির মানসভূমে, তা সেই সংস্কৃতিরই হোক, আর ভাষারই হোক অথবা আত্মপরিচয়ের, তার প্রতিফলন মূলত তার প্রথম দিকের সাহিত্যকর্মে প্রতিভাত হয়েছে। আসলে তার পুরো সাহিত্যকর্মই হয়ে উঠেছে এই টানাপোড়েন থেকে মুক্তির শক্তিশালী প্রপঞ্চ।

মুক্তি ও স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে সাহিত্য। কেনিয়া স্বাধীন হওয়ার পরও যখন এর স্বাধীনতা সবার বা কমপক্ষে অধিকাংশের না হয়ে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হয় বা তাদের ভাগ্য খুলে দেয়, তখন নগুগির সাহিত্যকর্ম বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে গর্জন করতে থাকে। স্বাধীনতার পরও উঁচু-নীচু ধরনের তীব্র সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, বর্ণবিভক্তি ও পুঁজিবাদী শাসক কর্তৃক দেশের সম্পদ কুক্ষিগতকরণ কেনিয়ার স্বাধীনতাকে সংকটে ফেলে দেয়। একটু পিছনে গেলে, কেনিয়া যখন ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ ছিঁড়ে একটি স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্র হয়ে ওঠার সংগ্রামে লিপ্ত, নগুগি তখন সেই প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। ফলশ্রুতিতে, কেনিয়ার স্বাধীনতার পূর্বেই ১৯৬২ সালে উগান্ডায় তার প্রথম নাটক দি ব্ল্যাক হারমিট উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে ইতিহাস-সচেতন সাহিত্যিক হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। কেনিয়া তখনও স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এটি ইংরেজিতে লেখা প্রথম পূর্ব-আফ্রিকী নাটক। একথা তো সত্য, জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি গোত্রবাদ থেকে জাতীয়তাবাদে উত্তোরণের পরিক্রমায় সংকটে পড়ে। দোদুল্যমানতা পেয়ে বসে তাঁকে । এই নাটকের মূল চরিত্র রেমি তেমনই এক ব্যক্তি যে এই সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলার তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর ভার বইতে না পেরে বনে চলে গেছে। দরবেশ বনে গেছে। এই অভিজ্ঞতা নগুগিরও। তবে রেমির মতো সমাজ ত্যাগ করে তিনি হারমিট বা দরবেশ বনে যান না। সমাজ থেকে বিচ্যুতও হন না। বরং সমাজের ভেতরে থেকেই হয়ে ওঠেন যোদ্ধা। এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য।

নগুগি একজন যোদ্ধা। তার এই যুদ্ধ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে উপনিবেশবাদ যখন সা¤্রাজ্যবাদে পরিণত হয়, তখনও নগুগির যুদ্ধ চলছে চামড়ার রং বদলানো ঘরের শত্রুর বিরুদ্ধে। মাতৃভূমির মাটি ও মানুষের সাথে ওতপ্রোত সম্পর্কই তাঁকে এই অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তার লেখার পুরোটা জুড়েই রাজনৈতিক প্রবঞ্চণা ও শ্রেণিবৈষম্যের শিকার গরীব, সুবিধাবঞ্চিত, জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত কৃষক ও গ্রামীণ মানুষেরা বিদ্যমান। তাই যাঁরা এই শ্রেণির মানুষকে পাশ কাটিয়ে সাহিত্য রচনা করছেন বলে তার মনে হয়, নগুগি তাঁদেরকেও ছেড়ে কথা বলেন না। ওলে সোয়িংকাকেও ছাড়েন না। তার নিজের জবানিতে :

ঝড়ুরহশধ’ং মড়ড়ফ সধহ রং ঃযব ঁহপড়ৎৎঁঢ়ঃবফ রহফরারফঁধষ. ঐরং ষরনবৎধষ যঁসধহরংস ষবধফং যরস ঃড় ধফসরৎব ধহ রহফরারফঁধষ’ং ষড়হব ধপঃ ড়ভ পড়ঁৎধমব, ধহফ ঃযঁং ড়ভঃবহ যব রমহড়ৎবং ঃযব পৎবধঃরাব ংঃৎঁমমষব ড়ভ ঃযব সধংংবং. ঞযব ড়ৎফরহধৎু ঢ়বড়ঢ়ষব, ঃযব ড়িৎশবৎং ধহফ ঢ়বধংধহঃং, রহ যরং ঢ়ষধুং ৎবসধরহ ঢ়ধংংরাব ধিঃপযবৎং ড়হ ঃযব ংযড়ৎব ড়ৎ ঢ়রঃরভঁষ পড়সবফরধহং ড়হ ঃযব ৎড়ধফ. (নগুগি, ৬৯)

যাঁরা আফ্রিকার বাস্তবতা নিয়ে লিখছেন না তাঁদের ব্যাপারে নগুগি আক্ষেপ করেছেন। তিনি আফ্রিকার বাস্তবতার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘…আফ্রিকার বাস্তবতা হল এর শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ দারিদ্র-সীমার নীচে বাস করেৃ(অনু)’ (নগুগি, ২৫)। কাজেই, নগুগি হলেন জনতার লোক, জনতার লেখক। এই জনতার লোক এবং জনতার লেখক হয়ে ওঠার স্পৃহা তিনি পেয়েছেন তীব্র জাতীয়তাবাদের ও বোধের মধ্যে।

কালচারাল ন্যাশনালিজম বা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের জোরালো বোধের জায়গা থেকেই একটা জাতির মধ্যে তার ইতিহাস এবং মানসকে বিকৃতির ও পরাধীনতার করাল থাবা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। ঔপনিবেশিকেরা তাদের আগমনের সাথে সাথে স্থানীয়দের দুর্বলতার সুযোগে নিজেদের জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চা শুরু করে। নিজেদের মত করে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করে স্থানীয়দের দমন-পীড়ন করে। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ একজন লেখকের কাজ এখানেই। এই কাজটি হলো— তার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাধারণ জনতাকে পরাধীনতার অর্গল ভেঙ্গে বের করে আনা। এই কাজটিকে নাইজেরীয় লেখক আচেবে অবশ্য ‘প্রায়শ্চিত্তকরণ’ বা ‘অ্যাক্ট অব এ্যাটনমেন্ট’ বলেছেন (অগুদে, ১)। তবে কী দোষটা নিজেরই? কারণ, প্রায়শ্চিত্ত তো সাধারণত নিজের দোষেই করতে হয়। নগুগির কাজ কি তাহলে প্রায়শ্চিত্তকরণ, না-কি এডওয়ার্ড সাঈদের ভাষায়, ‘জবংঃড়ৎরহম ঃযব রসঢ়ৎরংড়হবফ পড়সসঁহরঃু ঃড় রঃংবষভ’ বা রুদ্ধ জাতিকে মুক্তকরণ (অগুদে, ১)— স্পষ্টত এই দুই-ই করেন নগুগি। তার লেখার ভাঁজে ভাঁজে আত্ম-সমালোচনার শ্লেষাত্মক বয়ান নিহিত। আবার একই সাথে ঔপনিবেশিকদের ও স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ার স্থানীয় শাসকদের নিপীড়নের নির্মম কলা-ক্রিয়ার জাঁতাকল থেকে কেনিয়া তথা আফ্রিকার ইতিহাস ও মানসকে মুক্ত করার প্রশ্নাতীত সাহসী ও সক্রিয় প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয় তার প্রতিটি লেখার বুননে। ভাষাতাত্ত্বিক সস্যুর প্রবর্তিত দুটি শব্দ ব্যবহার করে বলা যায়— কেনিয়া তথা আফ্রিকার সার্বিক পরিস্থিতি ও সমাজ-বাস্তবতা যদি ‘ঝরমহরভরবফ’ হয়, তবে নগুগির টেক্সটগুলো ঝরমহরভরবৎ’-আর এজন্যই তার টেক্সটগুলোর পঠন-পাঠনের সাথে আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, সময়, ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি ইত্যাদি উপসর্গ অপরিহার্যরূপেই গেঁথে যায়। এ কথার সত্যতা পাওয়া যায় নগুগির জবানিতেই। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ঝবপৎবঃ খরাবং ধহফ ঙঃযবৎ ঝঃড়ৎরবং (১৯৭৫) গ্রন্থের ভূমিকায় নগুগি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘গু ৎিরঃরহম রং ৎবধষষু ধহ ধঃঃবসঢ়ঃ ঃড় ঁহফবৎংঃধহফ সু ংবষভ ধহফ সু ংরঃঁধঃরড়হ রহ ংড়পরবঃু ধহফ যরংঃড়ৎু.’ নিউ হিস্টোরিসিস্ট প্রেক্ষিতে দেখলে, নগুগির টেক্টগুলোর কোটেক্সট হলো সেগুলোর কনটেক্সট বা ঐতিহাসিক বাস্তবতাসমূহ। তবে নগুগি ইতিহাসবেত্তাও নন। তিনি সাহিত্যিক। তাই কনটেক্সট  ও টেক্সট  যে সূক্ষ্ম জায়গায় এসে মিলিত হয় সেই সন্ধিস্থলেই তিনি সক্রিয়। কিভাবে এই দুয়ের সন্ধি ঘটেছে তা নগুগির শৈশবের বেড়ে ওঠার দিনগুলোর দিকে দৃকপাত করলেই অনুমান করা যায়। নগুগির জন্ম গ্রামে। তার বাবার চার স্ত্রী। তিনি কৃষক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তার নিজের জমি নাই। তিনি বর্গাচাষী। পক্ষান্তরে, গ্রামের কোলঘেঁষে অবস্থিত ঔপনিবেশিকদের বসতভূমি। সবুজে ঠাসা। তারাই জমির মালিক। যার জমির মালিক হওয়ার কথা সে এখন বর্গাচাষী। আর বহিরাগতরা মালিক সেজে বসে আছে। এই বৈপরীত্য নগুগির কল্পনাকে নাড়া দেয় তীব্রভাবে। এটা ঔপনিবেশিক আর ঔপনিবেশিতের মধ্যকার চলতে থাকা সংগ্রামের রূপকালঙ্কার হিসেবে নগুগির লেখক মানসে ধরা দেয়। এখান থেকেই তার লেখকসত্তার স্ফুরণ ঘটে।

আসলে যে কোনো বড় লেখকই নিজেকে এমন এক জায়গায় স্থাপন করেন যেখানে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনটি সামাজিক অবস্থার সাথে তাঁকে বোঝাপড়া করতে হয় (গিকান্দি ১৩)। প্রথমত তার আত্মনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা ও সাধারণের প্রতি অঙ্গীকারের মধ্যকার ফারাকের সাথে। দ্বিতীয়ত ইতিহাসের দুর্বোধ্যতা ও অপ্রাসঙ্গিকতার সাথে যার মধ্য থেকে তার লেখনীর উদ্গীরণ হয়। আর তৃতীয়ত বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্ব ও শ্রেণিভিত্তিক সমাজ-বাস্তবতার টানাপোড়েনের সাথে। নগুগির লেখক হয়ে ওঠার নানান পর্যায় পর্যালোচনা করলে এই বিষয়টির স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায়। লেখক-বৃত্তির এক পর্যায়ে খ্রিস্টধর্ম ও খ্রিস্টনাম বর্জন করে মার্কসীয় মতাদর্শের গ্রহণ এবং নিজস্ব শিল্প, সংস্কৃতি ও ভাষার ব্যাপারে তার অবস্থান উপর্যুক্ত উপসর্গগুলোর সাথে বোঝাপড়ারই ফল। নগুগির উপলব্ধি, ধর্মের বাড়াবাড়ি এবং ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি অনম্যতা ও অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি করে। এই চিত্র তিনি অংকন করেছেন তার চবঃধষং ড়ভ ইষড়ড়ফ  উপন্যাসে মি: মুনিরার চরিত্রের মধ্য দিয়ে অংকন করেছেন। তার অসহিসঞ্চু হয়ে ওঠা ও শেষ পর্যন্ত ওয়ানজার গণিকালয়ে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করার প্রণোদনা সে তার গোঁড়া, অনম্য ও অন্ধ ধর্মবিশ^াসের কাছ থেকেই পেয়েছে। নগুগি লক্ষ করেছেন, ধর্মের প্রপঞ্চ ভিন্ন মতের প্রতি সাধারণত সুনম্য নয়। কখনও কখনও অসহিষ্ণুও বটে। তাই এটির শাসকের হাতে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। দৃষ্টান্তও আছে অনেক। আর ভাষার ব্যাপারটাও তো একই রকম। ফানো তার ইষধপশ ঝশরহ ডযরঃব গধংশং গ্রন্থে  দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তো ঘোষণাই করেছেন, ভিন্ন কোনো জাতির ভাষা গ্রহণ করার অর্থ হলো সেই জাতির সংস্কৃতিকেই গ্রহণ করা (বোয়েহমার ১৯৭) । সাংস্কৃতিক সা¤্রাজ্যবাদের বিশ^-বাস্তবতায় তো এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। স্পষ্টতই এই পর্যালোচনাই নগুগিকে ধর্ম ও ভাষার ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি হয়ে ওঠেন আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠস্বর।

কেনিয়া তথা আফ্রিকার কণ্ঠস্বর বলা হোক, বা বাকি বিশ্বের কাছে আফ্রিকী সংস্কৃতির দূতই বলা হোক— তাঁকে যে অভিধাতেই ডাকা হোক না কেন- কোনোটাই তার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন নয়। তার নিজেরই উপন্যাস মাটিগারি এর নায়ক মাটিগারির মতই সারাটা জীবন তিনি খুঁজে ফিরছেন স্বাধীন মাতৃভূমি কেনিয়ার আনাচে-কানাচে ‘ন্যায়’ আর ‘সত্যকে’। এই নিরলস খোঁজ তাঁকে তৃপ্ত করেনি; বরং করেছে আরও সাহসী, আরও কৌতূহলী, করে তুলেছে সন্দিহান উত্তর-ঔপনিবেশিক স্বদেশের কপট ও ঔপনিবেশিক-মনস্তত্ত্বের উত্তরাধিকারী শাসকদের ব্যাপারে। ফলে, এদের রোষানলে পড়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে। এখনও নির্বাসনেই। কিন্তু তার লেখনি তার দেশকে, মহাদেশকে, গোটা বিশ্বকেই করে রেখেছে আচ্ছন্ন। নান্দনিক সততা, সত্য-উচ্চারণ, আত্ম-পরিচয় অন্বেষণের নিরলস অভিযান ও নিখাঁদ দেশপ্রেম তার লেখনীকে পরিণত করেছে অনির্বাণ বহ্নিশিখায়, পাঠকের কাছে চিরন্তন প্রেরণার উৎসে।

এ কথাতো সবারই জানা, পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ লেখক কখনই বুর্জোয়াদের মত শাসক গোষ্ঠীর পকেটে ঢুকে পড়েন না, পদলেহন করেন না। নিজ দেশ, মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে, সত্য-উচ্চারণ বা সত্য-ভাষণের কারণে শাসকগোষ্ঠী তাকে প্রতিপক্ষ না ভাবলেও সন্দেহ করে। প্রতিপক্ষও গণ্য করে হয়তোবা যখন দেখে, লেখক তার আপোষহীন কলমের খোঁচায় আপামর জনগণকে করে তুলছেন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে সচেতন। তখন শাসকগোষ্ঠী ¯œায়ুচাপে ভোগে এবং লেখকের কণ্ঠরোধ করতে চায়, তার কলম ছিনিয়ে নিতে চায়। উপায় হিসেবে বেছে নেয়- লেখককে গরাদে পুরা বা দেশছাড়া করা। নগুগি এই দুয়েরই শিকার।

১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কেনিয়া স্বাধীন হয়। স্বাধীনচেতা নগুগি, যিনি ফানোর মার্কসবাদী চেতনার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত, দেখেন স্থানিক ভূগোলটি ঔপনিবেশিক আধিপত্যমুক্ত হলেও এর মনস্তত্বের পুরোটা জুড়ে তখনও ঔপানিবেশকদের হেজেমনি বা আধিপত্যই বিরাজমান। ভাষা ও ভাবনাতে কেনিয়া পুরোদস্তর তখনও ঔপানিবেশকতার জোয়ালের নীচে হাঁশ-পাঁশ করছে। রাজনীতিবিদরা ঔপনিবেশিকদের ফেলে যাওয়া এজেন্ডাগুলোর বাস্তবায়নে গলদঘর্ম। ভোটে কারচুপি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি কেনিয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। নগুগির মনে হয়েছে, এজন্য তো কেনীয়রা মাও মাও বিদ্রোহ করেনি।

নগুগির বড় ভাইও মাও মাও বিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। নগুগির মা-ও নিপীড়নের স্বীকার হয়েছেন। মাও মাও বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ শাসিত কেনিয়ায় ১৯৫২ সালে। কিন্তু ১৯৫৬ সালের ২১ শে অক্টোবরে বিদ্রোহী নেতা দেদনে কিমাথির গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটে। ফলাফল হল ব্যর্থতা। মাও মাও শব্দের আক্ষরিক অর্থ : ‘বেরিয়ে যাও,’ ‘বেরিয়ে যাও’। কিন্তু মাও বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ শাসকদের তখন পরাস্ত করতে পারেনি। এর জন্য অবশ্য অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভেদ ও সর্বোপরি ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ বা ভাগ কর শাসন কর— কৌশলই দায়ী। বিশ্বের যে কোনো বিদ্রোহের মতই মাও মাও বিদ্রোহের জন্ম হয়েছিল তীব্র অসন্তোষ থেকে, যার উৎস ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের নিষ্ঠুর শোষণ, শাসন, দমন, নিপীড়ন ও প্রবঞ্চনা। বাহ্যত : মাও মাও বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে কেনিয়ার স্বাধীনতার ক্ষেত্র তৈরিতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৩৮ সালে জন্ম নেয়া নগুগি ১৯৫০ এর দশকে, যখন মাও মাও বিদ্রোহ চলছে, তখন তিনি তার কৈশোর অতিক্রম করছেন। কাজেই, এই বিদ্রোহের ঘটনা তার কিশোর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তার লেখকসত্তার মধ্যে প্রতিবাদী মনোভাবের বীজ বপন করে। পরবর্তীতে মার্কসবাদ, শ্রেণিসচেতনতার ভাষা ও ভাবাদর্শিক সংগ্রাম তার কেনিয়ার বাস্তবতাকে ধারণ ও উপলব্ধি করার মজবুত ভিত্তি তৈরি করে।

নিজের দেশে পরবাসী হয়ে থাকার চাইতে বড় যাতনা আর কী-ই বা হতে পারে? বহিরাগতরা এসে স্থানীয়দের শেকড় উপড়ে ফেলার যে অপচেষ্টা ও নির্যাতন চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ চেষ্টা— এসবই নগুগিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরিস্থিতির ভেতরে থেকে এবং পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি পর্যালোচনা করেছেন ঔপনিবেশিক এবং স্থানীয়দের অসম ও বৈরী সম্পর্ক। তার এই উপলব্ধির অন্যতম আখ্যান হলো তার প্রথম উপন্যাস ডববঢ় ঘড়ঃ, ঈযরষফ (১৯৬৪)। তখন তিনি উগান্ডার ম্যাকারেরে বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। এটি প্রকাশ করেন ইংরেজি ভাষায়। মাও মাও বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও কেনীয়দের স্বাধীনতা যুদ্ধ এটিই। কেনীয়রা কী চরম মূল্যের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে- তার মর্মস্পর্শী চিত্রায়ণ দেখা যায় এই উপন্যাসে। আজিকুয়ু বা গিকুয়ু সমাজ তখন ল-ভ-। ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক ঘোষিত জরুরি অবস্থা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ, রাগ ও বিশৃংখলা আরও দেয় বাড়িয়ে। শুধু স্থানীয় নয়, ঔপনিবেশিকদের অবস্থাও হয়ে ওঠে সঙ্গীন। ঔপনিবেশিক ভূপতি হাউল্যান্ডসের চরিত্রের মধ্যদিয়ে তুলে ধরা হয়েছে তাদের দখলদারিত্বের অসহনীয় পরিস্থিতির চিত্র। আবার নগোথোর গোছানো ও আদর্শ পরিবারের ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাওয়ার মধ্যদিয়ে স্থানীয়দের শিকড়ছিন্ন হওয়ার চিত্রও অংকিত হয়েছে। জেকোবোর পরিণতির মধ্যদিয়ে স্থানীয় স্বাধীনতা-বিরোধীদের জটিল মনস্তত্ত্বের চিত্রও ফুটে উঠেছে। নজোরোজ আর ময়িহাকির চরিত্র তুলে ধরেছে যুদ্ধ কীভাবে শিশুদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে- তার চিত্র।

একটা যুদ্ধ অনেক কারণেই ব্যর্থ হতে পারে। যুদ্ধে যার নেতৃত্বের জায়গায় থাকার কথা সে যদি পরিবারের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যকে স্বাধীনতা অর্জনের মতো বড় উদ্দেশ্যের সাথে মিলিয়ে ফেলে, তবে সে তার সাথে সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামকেও দুর্বল করে দেয়। নগোথো তেমনই এক চরিত্র যার নৈতিক দোদুল্যমানতা মাও মাও বিদ্রোহের অন্যতম দুর্বলতাকেই প্রতীয়মান করে তোলে। আবার যুদ্ধ যদি হয় সন্ত্রাসনির্ভর, নীতি, আদর্শ ও দর্শন যদি হারিয়ে যায়, তবে তা মানুষকে সংঘবদ্ধ না করে করে দেয় নিঃসঙ্গ। এটাও যুদ্ধের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ। এই সত্যগুলোর আত্মসমালোচকের অবস্থান থেকে বিশ্লেষণী চিত্রায়ণ পাওয়া যায় নগুগির ডববঢ় ঘড়ঃ, ঈযরষফ  বা কেঁদো না, বাছা উপন্যাসে। এছাড়া ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তার ঞযব জরাবৎ ইবঃবিবহ আক্ষরিক অর্থেই তুলে ধরেছে কিভাবে ঔপনিবেশিকতার খর¯্রােতা নদী খ্রিস্টধর্মের উল্লম্ফনে উদ্বেলিত হয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে দিচ্ছে এবং কিভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে দি¦ধার বীজ বপন করে চলেছে।

কিন্তু ১৯৮০ সালে কেনিয়ার স্থানীয় গিকুয়ু ভাষায় রচিত প্রথম উপন্যাস ঈধরঃধধহর সঁঃযধৎধনধ-ওহর বা উবারষ ড়হ ঃযব ঈৎড়ংং  প্রকাশিত হয়। ইংরেজিতে শুরু করলেও নগুগি কেন গিকুয়ু ভাষায় ফিরে আসেন, তার পেছনে কিছু রাজনৈতিক পরিস্থিতি জড়িত। তবে এ-কথা সত্য, গিকুয়ু ভাষার ব্যবহার নগুগিকে কেনিয়ার আপামর জনতা, কৃষক ও শ্রমিকদের সাথে ওতপ্রোত সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করেছে জোরালোভাবে। তিনি তো শাসিতের  লেখকই হতে চান। শাসকের তোষণ তো তার মানস ও মননে একেবারেই নেই। তখন তো শাসকের ভাষাই ছিল ইংরেজি। আর শাসিতের অন্যতম প্রধান ভাষা হলো গিকুয়ু। ইংরেজি ভাষা ছেড়ে গিকুয়ুতে আসার পেছনে এক বড় ঘটনা  আছে নগুগির জীবনে। তবে তার পূর্বে বলা দরকার, কিভাবে তার লেখক-মানস তৈরি হলো— তা নিয়ে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের অন্যায় ও অসম নীতির অপরিহার্য পরিণতিই হলো মাও মাও বিদ্রোহ। মাও মাও বিদ্রোহের শুরু থেকেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী। নগুগির মা তিন মাস জেল খাটেন, নিপীড়িত হন। ঘর-বাড়ি হয় তছনছ। সরকারি হিসেবে ১২ হাজার, তবে বেসরকারি হিসেবে ২০ হাজারেরও বেশী মানুষ নিহত হয়। যেহেতু ঔপনিবেশিকদের স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের মাধ্যম তখন ইংরেজি, তাই নগুগি ইংরেজি ভাষা রপ্ত করে ফেলেন। পরে উগান্ডার ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে চলে যান ইংল্যান্ডের লিড্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই তিনি পরিচিত হন ফ্রাঞ্জ ফানোর বিখ্যাত বই ঞযব ডৎবঃপযবফ ড়ভ ঃযব ঊধৎঃয  এর সাথে । সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আগে যে রাজনৈতিক মুক্তি দরকার— তা তিনি ফানোর এই বই থেকে জানলেন। এরপর তার উপর প্রভাব ফেলে কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলের মতাদর্শ। নগুগির মানস-কাঠামো শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে শুরু করে। জীবিকা উপার্জনের জন্য ঝঁহফধু চড়ংঃ, উধরষু ঘধঃরড়হ এবং ঝঁহফধু ঘধঃরড়হ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতে থাকেন ১৯৬০ এর দশকের প্রথম দিকে। এই সময়েই অর্থাৎ ১৯৬৩ সালের ১২ই ডিসেম্বরে কেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। স্বভাবতই নগুগি ভেবেছিলেন, এই স্বাধীনতা অবশ্যই কেনিয়ার আত্ম-পরিচয় প্রতিষ্ঠা ও তাকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। কিন্তু দেশের সব মানুষের মতোই খুব শীঘ্রই তিনি হতাশ হলেন যখন দেখলেন, ঔপনিবেশিকদের প্রেতাত্মারা আমলাতন্ত্রের ছকে এখনও চালিত করছে স্থানীয় শাসকগোষ্ঠীকে। মাতৃভাষা গিকুয়ুতে লিখতে শুরু করলেন। নগুগি ওয়া মিরিকে সাথে নিয়ে লিখেও ফেলেন ১৯৭৭ এ তার নাটক ও ডরষষ গধৎৎু ডযবহ ও ডধহঃ, যার গিকুয়ু নাম নগাহিকা নদিন্দা। কিন্তু বাধার সম্মুখীন হলেন শাসকশ্রেণির পক্ষ থেকে। এ বছরই তাঁকে কেনীয় সরকার বন্দি করে। এক বছর জেলে ফেলে রাখে। তাঁকে কখনও বলা হয়নি— কী নির্দিষ্ট কারণে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়। তবে একথা তো সত্য, নাটককে শাসকশ্রেণি খুব ভয় পায়। নাটক যতটা গণতান্ত্রিক ভাবধারার শক্তিশালী মাধ্যম, সাহিত্যের অন্যান্য শাখা ততটা নয়। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নৈতিক উত্থান-পতনের ব্যাপারগুলোর প্রতি নাটক যতটা দ্রুততার সাথে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং মানুষকে এর সাথে যুক্ত করে, সাহিত্যের অন্যান্য শাখাগুলো এ ব্যাপারে ততটা ক্ষীপ্র নয়। কবিতার ব্যঞ্জনাময় শব্দগুলোর মোচড় ভেদ করে এর ঝাঁঝ সাধারণ জনতার নাকে পৌঁছতে অনেক সময় লাগে। আবার কখনও কখনও পৌঁছেও না। নাটক বিপ্লব বা আন্দোলনের হাতিয়ার বলে শাসকরা একে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সও নানা সময়, নানা পর্যায়ে নাটকের উপর নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। যা হোক, এক বছরের বন্দিদশাতেই নগুগি মনস্থির করেন, তিনি আর ইংরেজি ভাষায় লিখবেন না। ফলশ্রুতিতে কারাগারে বসেই টয়লেট পেপারে লিখে ফেলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ঈধরঃধধহর সঁঃযধৎধনধ-ওহর গিকুুয়ু ভাষায়। এর ইংরেজি নাম উবারষ ড়হ ঃযব ঈৎড়ংং. এর ইংরেজি তর্জমা নগুগি নিজেই করেন কারাগার থেকে বের হবার পরের দুই বছরে। এর ক্যানভাসের পুরোটা জুড়ে তুলে ধরেন সাধারণ মানুষের উপর সমাজপতিদের রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নের নির্মম চিত্র।

পুঁজিবাদের ভূত এবং পশ্চিমা সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপসর্গগুলো কিভাবে স্থানীয় স্বাধীনতাত্তোর কেনীয়দের অস্তিত্ব ও মানসকাঠামোকে বিপর্যস্ত করে তুলছে-তার দরদী চিত্রায়ণ নগুগি করেছেন এই উপন্যাসের ওয়ারিঙ্গা না¤œী এক নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। গ্রাম ছেড়ে রাজধানী শহর নাইরোবীতে আসে ওয়ারিঙ্গা ভাগ্যান্বেষণে। পদে পদে হয় প্রতারিত। আর এই প্রতারকদের দলে আছে অফিসের বস থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী পর্যন্ত। কেউ আমলা, কেউ পুঁজিওয়ালা। এই দুয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা সব সময়ের। পুঁজির প্রতিযোগিতায় নৈতিক স্খলনের মহোৎসব কেনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মহামারী আকারে। এই স্খলন কী কারণ, না-কী ফল? না-কী কেবলই উপসর্গ? এই প্রশ্ন, এই আশংকাই দানা বেঁধেছে সৈ¦রশাসনের ভারে পিষ্ঠ সব কেনীয়ের মনে। আর নগুগি এরই সাহিত্যরূপ দিয়েছেন এই উপন্যাসে। উল্লিখিত উপন্যাসের শিরোনাম নির্ধারণে নগুগি অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ক্রসে তো থাকার কথা পরিত্রাতার, যিশুর কিন্তু নগুগি সেখানে দেখছেন ডেভিল বা শয়তানকে। ধর্ম সুনম্যতার বাণী প্রচার করে। কিন্তু এর অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার ও অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি অমানবিক অনম্যতায় মানবতাকেই যে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, তার সাহসী উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে এই উপন্যাসের শিরোনামে।

তবে নগুগি তার লেখক-বৃত্তির শুরুতে ইংরেজিকে বেছে নিয়েছিলেন লেখার মাধ্যম হিসেবে। সম্ভবত ব্যাপক পরিসীমার পাঠকের কাছে পৌঁছার জন্যই। একথা আগেও বলা হয়েছে, ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি রচনা করেন ডববঢ় ঘড়ঃ, ঈযরষফ. উপন্যাসটি তার নিজেরই জীবনঘনিষ্ঠ। কেনিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক শোষণ-বঞ্চনার চিত্র এতে প্রাধান্য পেয়েছে। এর প্রধান চারটি চরিত্রের কর্মকা- কেনিয়ার জরুরি অবস্থার সময়কার নিষ্ঠুরতার চিত্র উপস্থাপন করে। উপন্যাসটি তার খ্রিস্ট নাম জেম্স নগুগি নিয়েই প্রকাশিত হয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত অ এৎধরহ ড়ভ ডযবধঃ উপন্যাসে তিনি ‘জেমস’ নামটি বর্জন করে শুধু নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও লেখেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে নাইরোবিতে অনুষ্ঠেয় পূর্ব-আফ্রিকী প্রেসবিটেরীয় গীর্জার পঞ্চম সাধারণ সম্মেলনে নগুগি বক্তব্য শুরু করেন এই বলে, ‘আমি গীর্জার লোক নই। এমনকি আমি খ্রিস্টানও নই।’ যাই হোক, যখন উপন্যাসটি লেখা হয় তখন তিনি লিড্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এটিও মাও বিদ্রোহের প্রেক্ষপটে রচিত এবং যে পরিস্থিতিগুলো কেনিয়াকে স্বাধীনতার দিকে চালিত করেছিল তার সাহিত্যিক-উপস্থাপনায় সমৃদ্ধ। একটা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিড়ম্বিত ও বাধাগ্রস্ত হয় বহিরাগতদের দ্বারা। তার চাইতেও বেশি বিড়ম্বিত হয় নিজ দেশের সেইসব লোকের দ্বারা যারা বহিরাগত শোষকদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এরা যখন পদ-পদবীর লোভে ওদের এজেন্ট বা আহিলকার হিসেবে কাজ করে, তখন তা শুধু দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথকে দূরহ-ই করে তোলে না, সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীনতা অর্জিত হলেও তাকে বার বার বিপন্ন করে তোলে। অ এৎধরহ ড়ভ ডযবধঃ উপন্যাসে গিকোনীয় মামবিকে বিয়ে করে। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়ার কারণে জেলে যায়। ছয় বছর পর জেল থেকে ফিরে এসে দেখে, তার স্ত্রী যার সন্তানের জন্ম দিয়েছে, সে তারই প্রতিদ্বন্দ¦ী, ঔপনিবেশিক শাসকদের নিয়োজিত স্বদেশী গ্রামপ্রধান কারান্জা। বিশ^াসঘাতকের আর এক প্রজন্ম অংকুরিত হয়েছে যা কালক্রমে বিষবৃক্ষে পরিণত হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই সময় তার প্রবন্ধ-সংকলন ঐড়সবপড়সরহম প্রকাশিত হয় যা ঞযব জরাবৎ ইবঃবিবহ, ডববঢ় ঘড়ঃ, ঈযরষফ  ও অ এৎধরহ ড়ভ ডযবধঃ এ অংকিত কল্পজগতের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৬৮ সালে নগুগি শুরু করলেন এক সাহসী অভিযান। তখন তিনি নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্ট্রাক্টও বা শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত। তার দুজন সহকর্মী- তাবান লো লিয়ং এবং ওয়ার আনিয়াম্বাকে সাথে নিয়ে অভিযানে নামলেন। এই অভিযান ইংরেজি সাহিত্য বিভাগ নামে যে বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু ছিল, এর স্থলে নগুগি চাইলেন আফ্রিকী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ চালু করতে। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ ঔপনিবেশিকদের হেজিমনি বা প্রভুত্বচর্চার এক শক্তিশালী অ্যাপারেটাস বা যন্ত্র। এর পাঠ্যক্রমের কেন্দ্র দখল করে আছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদেও বই, দর্শন ও জ্ঞানতত্ত্ব। আফ্রিকীদের মেধা ও মননের কেন্দ্র দখল করে আছে। উদ্দেশ্য একটাই— নিজেরা কেন্দ্রে থেকে আফ্রিকীদের প্রান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া। আফ্রিকীদের ভাষা, মনন ও সাহিত্যকে প্রান্তিকতায় আটকে ফেলা। এটি ঔপনিবেশিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা। নক্রুমার ভাষায়, এটিই নিও-এম্পেরিয়ালিজম বা নব্য সা¤্রাজ্যবাদ। একটা জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে খামচে ধরে শ্বাসরোধ করে রাখতে পারলে তার পরিচয় বিকৃত বা সবিশেষ বিলোপ সাধন করার জন্য আর তেমন কিছু করারই তো দরকার নেই। কেনীয়রা বিদ্রোহ করেছে, সংগ্রাম করেছে, নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়েছে তো এই আত্ম-পরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে গিয়েই। আর নগুগি ইংরেজি বিভাগকে এই আতœ-পরিচয় অপহরণের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করলেন। পুঁজিবাদী সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তো অন্যতম স্টেট অ্যাপারেটাস যার ব্যবহার করে মানুষকে আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য করা যায়। লুই আলথুসারের আইডিয়োলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাসের ধারণাও তো তাই বলে। হেজেমনি বা আধিপত্য চর্চার অস্ত্র তো আইডিয়োলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাসগুলোই। যা হোক, শেষ পর্যন্ত নগুগির চেষ্টা সফল হলো এবং তিনি আফ্রিকী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হলেন। এরপর এক বছরের জন্য ইলিনয়েস এর ইভান্সটনে নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৭১ সালে নাইরোবির বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ফিরে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দেন।

এতসব প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সমান্তরালে তার লেখনি চলতে থাকে। নগুগির লেখকসত্তার গতিপ্রাপ্তি ঘটেছে কার্ল মার্কস, ফ্রান্জ ফানো, জার্মান নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেখ্ট ও আইরিশ-ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক রবার্ট ট্রেসেলের রচনার সান্নিধ্যে এসে। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধ্বে ওঠার জন্য যে নন্দন-ভাবনা ও মানস-কাঠামো দরকার, তার রসদ নগুগি এঁদের কাছ থেকে আহরণ করেছেন। এরূপ মানস-কাঠামো গঠন সহজসাধ্য কাজ নয়। অনেকেই সন্ধি করে ফেলেন তাঁদের প্রাপ্তির আকাক্সক্ষার সাথে। তাঁদের ভূমিকাও সে কারণে হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু এক্ষেত্রে লেখক হিসেবে নগুগির অবস্থান সত্যিই স্বতন্ত্র। তাই তাঁকে উপলব্ধি করার জন্য পাঠকেরও বিশেষ মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় কেনিয়ার ঐতিহাসিক বাস্তবতা জানারও।

নগুগি ইতিহাসেরই সন্তান। কিন্তু তার আপত্তি হলো সেখানে যেখানে তিনি দেখছেন, তার ইতিহাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে বহিরাগত ঔপনিবেশিকরা। তারা তাদের গল্প তৈরি করে স্থানীয়দের উপড় চাপিয়ে দিচ্ছে। আর তাদের প্রপঞ্চ বা বয়ানের বাঁধাছকে আফ্রিকাকে বেঁধে ফেলতে চাচ্ছে। এই বাঁধাছক থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয়কে উদ্ধার করার জন্য দরকার সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের, যার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি নগুগিকে সরবরাহ করেছিল ফানো ও মার্কসবাদ। তার প্রথম দিকের উপন্যাসগুলোতে ‘তিনি লোহার শিকলে বাঁধা উপনিবেশের রক্তঝরা চেহারা আমাদের সামনে তুলে ধরেন। বিশাল কালো কেনিয়ার সারা দেহ থেকে সহ¯্রমুখে রক্তের ¯্রােত বইছে, কিন্তু কেনিয়া লড়ছে মরিয়া লড়াই-শেষ রক্তবিন্দুটি পর্যন্ত আগে থেকে বিলিয়ে দেয়া আছে তার।’ পরবর্তী সময়ের উপন্যাসগুলোতে স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা-পরবর্তী কেনীয় বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। এখনও তিনি যা রচনা করছেন, তাতে কেনিয়ার নয়া-উপনিবেশবাদের সমস্যা ও মনস্তত্ত্বের দ্বন্দ্ব, হতাশা ও ক্ষোভের চিত্র অংকিত হয়েছে।

নগুগি শেকড় অন্বেষী লেখক। তিনি জানেন, কেনীয়দের পরিচয় ও উপলব্ধির বীজ লুক্কায়িত আছে তাঁদের মৌখিক বা কথ্যসাহিত্যের মধ্যে কারণ, এটি পারস্পরিক যোগাযোগ, মূল্যবোধ, দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির ধারক-বাহক। একটা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাষা, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধাঁ, গীত-গান, রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান ইত্যাদির সবকিছুই কথ্যসাহিত্যের সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর অলিখিত কিন্তু সবার মুখে মুখে ফেরা প্রাণবন্ত, সক্রিয় ও বিশ^স্ত ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রামাণিক দলিল। নগুগির উবারষ ড়হ ঃযব ঈৎড়ংং উপন্যাসের বর্ণনার ধারায় স্পষ্টই ধরা পড়ে আফ্রিকী কথ্যসাহিত্যের বর্ণনারীতি। এটি রচনায় গিকুয়ু ভাষার ব্যবহারও তার শেকড় আঁকড়ে থাকার  প্রচেষ্টাকেই প্রকাশ করে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে, নগুগির গিকুয়ু ভাষায় লেখা রচনাসমূহ এখন কেনিয়ার বিভিন্ন স্থানে পাঠকেরা উচ্চৈঃস্বরে বার বার পড়ে উপভোগ করেন। তার নগাহিকা নদিন্দা নাটকটি তো গিকুয়ুতেই রচিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়। এই নাটকে অভিনয়ের সাথে কামিরুথু গ্রামের অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত কৃষকদেরকেও তিনি যুক্ত করেছিলেন। এটি অবশ্যই যুগান্তকারী এইজন্য যে, তিনি সাহিত্যের সাথে সবাইকে যুক্ত করে এর গণতান্ত্রিকায়ন করেছেন। এটি তো তৎকালীন কেনিয়ায় প্রচলিত স্বৈরশাসনের বাইনারী অপোজিশনও বটে। আর এখানেই শাসকগোষ্ঠীর ভয় ছিল। ভয়টা হলো যে, তিনি সাধারণ মানুষকে তাদেরই ভাষায় তাদের শিকড়ের কাছে এনে আত্মপরিচয় অন্বেষণে উদ্ধুদ্ধ করছেন, যা হয়তো এক সময় তাদেরকে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিকভাবে সচেতন করে তুলবে। ফলে, তারা এক সময় স্থানীয় কপট শাসকদের মুখোমুখি দাঁড়াবে; ঔপনিবেশিকদের যে ভূত চেপে বসে আছে তাদের শাসকদের কাঁধে, তাকে তাড়িয়ে দেবে। এই ভয়েই তারা নগুগির কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল, ভাষাও কেড়ে নিতে চেয়েছিল। জেলে পুরেছিল। কিন্তু সফল হয় নি।

বরং নগুগি একে একে সৃষ্টি করে চলেছেন তার অজড়, অমোঘ উপন্যাসসমূহ। অ এৎধরহ ড়ভ ডযবধঃ, চবঃধষং ড়ভ ইষড়ড়ফ, ডরুধৎফ ড়ভ ঃযব ঈৎড়ি তার ধ্রুপদী সৃষ্টি। উপন্যাসগুলোর প্রত্যেকটিতেই কেনিয়ার চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বর্ণিত হয়েছে যেখানে চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, পারস্পরিক সন্দেহ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিত্যনৈমিত্তিক উপসর্গে পরিণত হয়েছে। আর শাসকদের সাথে সাধারণ জনতার দূরত্ব যোজন যোজন বেড়েছে। স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ার আর্থ-সামাজিক সংস্কারে শাসকরা অনুসরণ করেছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের ব্যবস্থাপত্র। জনতার অন্তর-নিঃসৃত ভাবনাগুলোতে কৃত্রিমতার শৃঙ্খল আরোপ করতে শাসকদের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় ঔপনিবেশিকদের ভাষা। কিন্তু নগুগি এই শৃঙ্খল পড়বেন কেন? তিনি লেখেন প্রথমে গিকুয়ুতে। তারপর নিজেই করেন ইংরেজিতে অনুবাদ। উদ্দেশ্য বিশ^কে শোনানো নিজেদের কথা। তিনি গল্প বলেন, গল্প বুনেন। গল্পকথন তার কাছে এক শক্তিশালী অস্ত্র। এই অস্ত্র সব সময় গর্জন করতে থাকে তাদের বিরুদ্ধে যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে, সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে, আর প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপরতা চালায়।

১৯৮২ সালে নগুগি দেশ ছাড়েন। যদিও তখন কেনিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, তবুও সেই বছরেই ভোটে কেনিয়া একক রাজনৈতিক দল শাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়! এই বছরই বিমান বাহিনীর কতিপয় অফিসার এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়। নগুগি তখন নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিচ্ছেন। পরে এই লেকচারগুলো Decolonising the Mind: The politics of Language in African Literature  শিরোনামে প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে নগুগির বিশদ চিন্তা— ভাবনা এই বইয়ে প্রকাশ পায়। এই বছরই নগুগি ঘোষণা দেন, তিনি আর ইংরেজিতে লিখবেন না। যারা আফ্রিকী ভাষায় লেখেন ও ভাষাতাত্ত্বি¡ক সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আফ্রিকী সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা করছেন নগুগি এই বইটি তাদেরই উৎসর্গ করেন। এরপর তিনটি শিশুতোষ লেখেন গিকুয়ু ভাষায়। ডৎরঃরহম অমধরহংঃ ঘবড়পড়ষড়হরধষরংস নামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেন ১৯৮৬ সালে। গিকুয়ু ভাষায় তার দ্বিতীয় উপন্যাস গধঃরমধৎর সধ ঘলরৎঁঁহমর প্রকাশিত হয় এই বছরই যা ১৯৮৯ সালে তিনি নিজেই ইংরেজিতে তর্জমা করেন। ততোদিনে কেনিয়া তার স্বাধীনতার প্রায় ত্রিশ বছর অতিক্রম করেছে। কিন্তু লক্ষণীয় উন্নতি সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটে নি। যা কিছু উন্নতি তার পুরোটাই হয়েছে শাসকদের। কেনীয় সরকার বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং প্রায় দশ বছর এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। তবুও নগুগি নীতি বিসর্জন দিয়ে শোষক ও শাসকদের সাথে আপোষ করার পাত্র নন। এরপর গিকুয়ু ভাষায় রচিত গঁৎড়মর কধমড়মড় উপন্যাসের ইংরেজি সংস্করণ ডরুধৎফ ড়ভ ঃযব ঈৎড়ি প্রকাশ করেন ২০০৬ সালে, যেখানে যাদু-বাস্তবতার কৌশল ব্যবহার করে রাজনৈতিক কপটতার তীব্র এবং সাহসী ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। এই উপন্যাসে তার ধারালো ও রসালো ব্যঙ্গাত্মক গল্পকথনরীতি একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে তার সত্য-উচ্চারণের মধ্য দিয়ে।

আগেই বলা হয়েছে, নগুগি ইতিহাসের সন্তান। কোনো ইতিহাস? পশ্চিমা  বা পশ্চিমাদের শিক্ষায় শিক্ষিত ইতিহাসবিদদের বর্ণিত ইতিহাস? এরা তো ইতিহাস বর্ণনা করে না, নিজেদের মতো করে তৈরি করে। তাদের কল্পনার ও দীর্ঘ শেকড় গজানো প্রেজুডিস বা হীন্মন্যতার রঙ-তুলিতে আফ্রিকা চিত্রিত হয় অসভ্য, বর্বর ও অপাঙক্তেয়রূপে। এই ইতিহাসের কুশীলবরা হলো তথা কথিত সাদা চামড়ার সাহেবরা যারা এক হাতে বাইবেল আরেক হাতে তলোয়ার নিয়ে স্থানীয়দের সভ্য বানানোর (তাঁদের ভাষায়) মিশন বা কর্মযজ্ঞ সাধনের উদ্দেশ্যে আফ্রিকায় এসেছে। স্থানীয়দের হাতে বাইবেল তুলে দিয়েছে। ছিনিয়ে নিয়েছে এদের জমি।  নিজেদের লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া ও দাস ব্যবসাকে জায়েজ করার জন্য বিশে^র কাছে যে ইতিহাস এঁরা পেশ করে তা স্থানীয়দেরকে সভ্যতাহীন, পরিচয়হীন হিসেবে উপস্থাপন করে। এঁদের বর্ণিত ইতিহাসের পাতায় সাবালটার্ন বা উপনিবেশিত মানুষের কোনো ঠাঁই নাই। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও কৃষকরা এখানে প্রান্তিক অবস্থানে, কোণঠাসা। এদের ভাষা পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের কথার কচকচানিতে হারিয়ে গেছে। নগুগি এঁদেরই ইতিহাস পুনরুদ্ধার করার জন্য লেখেন। আবার উত্তর-ঔপনিবেশিককালে ঔপনিবেশিকদের আজ্ঞাবাহী স্থানীয় শাসক ও অভিজাতগণও নিজেদেরকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে রাখে। কিন্তু নগুগি তো জনতার লোক। তিনি জনতার দুর্ভোগের চিত্র আঁকেন, তাদের সহিষ্ণুতা, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রশস্তি গেয়ে যান। এরাই তো ইতিহাসের ¯্রষ্টা। রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতগণ এদের ভূমিকা গৌণ করে দেখায়; এদেরকে খলনায়কের ভূমিকায় রেখে নিজেরা নায়ক সাজে। নগুগি এদেরই ইতিহাস পুনরুদ্ধারের তাগিদ নিয়ে লেখনী চালিয়ে যান। জেমস ওগুদের মতে, ‘Ngugi, therefore, seeks to intervene and to salvage the history of the subaltern from the ruins of colonial plunder. নগুগির মতে, সাহিত্য হলো সম্মিলিত উদ্যোগ যা তুলে ধরে পরিবেশের সাথে মানুষের সংগ্রামের চিত্র (গিকান্দি, ১১)। আর একজন দায়বদ্ধ সাহিত্যিকের কাজ হলো নিরন্তরভাবে এই চিত্র এঁকে যাওয়া। এই কাজে তাকে শক্তি যোগায় এক বিশেষ শিল্পী-স¦াতন্ত্র্য ও স্বাধীন আত্মনিষ্ঠতা যা ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য-পরম্পরা বা মোড়লীপনা মানে না, বরং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

তবে নগুগির উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ধারণার মধ্যে দ্বান্দ্বিকতার বিষয়টিও বিদ্যমান। তিনি যেমন উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার শিকড় অন্বেষণের জন্য বিপ্লবের কথা বলেন এবং এ ব্যাপারে ভাববিলাসী আশাবাদে তার লেখাকে স্পন্দিত করেন, ঠিক একইভাবে তার কল্পজগতের পুরো আকাশ জুড়ে বেদনা ও হতাশার মেঘও জমে থাকে। এই বৈপরীত্য সাহিত্যসমালোচকদের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। কেউ কেউ একে তার লেখার দুর্বলতা হিসেবেও চিহ্নিত করেন। আবার কমনওয়েলথ লেখক, যারা নিজ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন, তারা একধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে থাকেন। এটি হোমি ভাভার মতে, ‘ইন বিটুইন্নেস’। এই টানাপোড়েন আত্মপরিচয়ের বা আইডেনটিটির। এর কারণ হলো, এঁরা ভিনদেশের কালচার বা সংস্কৃতিতে পুরোপুরিভাবে সংশ্লেষিত হতে পারেন না, আবার ফিরে এলেও  নিজদেশের সংস্কৃতিকে সেই অবস্থায় পান না যে অবস্থায় একে ছেড়ে গেছেন বা ফিরে পেতে চান। নিজদেশে পরবাসী বনে যান। এই অবস্থা তাঁদের মনস্তত্ত্বে পরিচয়-সংকট তৈরি করে। নগুগি দেশ ছেড়েছেন সেই ১৯৮২ সালে। এখনও আমেরিকায় থাকছেন। নিজদেশ কেনিয়ায় ফিরে আসার হয়তো ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু পারেন নি। স্বদেশে হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন। তার পরিবার হেনস্তার শিকার হয়েছে। এই পরিস্থিতি কী তার মধ্যে শিকড়হীনতাবোধ তৈরি করে? এটি কী তার স্বদেশ, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভাবনাকে বি-উপনিবেশিকরণের যে প্রেষণা তিনি বোধ করেন, তাকে দুর্বল করে দেয়? নগুগি-পাঠের সময় এই প্রশ্নটিও আমাদের সামনে চলে আসে।

সবশেষে, নগুগির উপন্যাস, ছোটগল্প বা বক্তৃতা— যার কথাই বলা হোক না কেন, তার সাথে রাজনৈতিক অনুষঙ্গগুলো স্পষ্টতই জড়িয়ে গেছে। তিনি লেখক, তাই তার দায়িত্ব সমাজের নাড়ী টিপে দেখা, রোগ নির্ণয় করা এবং রোগ সারানোর পথও নির্দেশ করা। কিন্তু সমাজের রোগ সারানোর জন্য যে ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করতে হয় বা লেখকের পরামর্শ বাস্তবায়নের জন্য যে কর্মসাধন করতে হয়, তা লেখকের হাতে থাকে না, থাকে রাজনীতিবিদদের হাতে কারণ, তারা সমাজের ইধংব বা ভিত্তিমূলে অবস্থান করেন। উৎপাদনযন্ত্র তাঁদের মুঠোবন্দি। তাই সমাজের পরিকাঠামোও এঁরাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এঁরা বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদী। তাই এগুলোর বাস্তবায়ন এঁদের নিজেদের স্বার্থবিরোধী তো হবেই। কাজেই, এঁরা শোষণের পথ বেছে নেন। পীড়নের পথ বেছে নেন। নগুগির যুদ্ধটা এঁদের বিরুদ্ধেই। এই যুদ্ধের অস্ত্র হলো তার ক্ষুরধার লেখনী। তিনি লিখছেন অবিচল, লিখেও যাবেন— এটিই মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

সহায়ক গ্রন্থ

(১)

Gale Contextual Encyclopedia of World Literature. Vol. 3

(২)        Ogude, James, Ngugi’s Novels and African History. London : Pluto Press, 1999. Print.

(৩)         নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও, ‘স্যাটায়ার ইন নাইজেরিয়া’, পিটার্স, কসমো এ্যন্ড মুনরো, ডোনাল্ড (সম্পাদনা), প্রটেস্ট এন্ড কনফ্লিক্ট ইন আফ্রিকান লিটারেচার, হানিম্যান, লন্ডন, ১৯৬৯, পৃ. ৬৯।

(৪)         নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও, হোমকামিং, ইবাদান, ১৯৭২।

(৫)        Wastberg, Per(ed.). The Writer in Modern Africa, African-Scandinavian Writers’ Conference, Stockholm, Uppsala, 1968. Print.

(৬)         শামীম ম-ল, কেঁদো না, বাছা (অনু), ঢাকা : প্রকৃতি, ২০১৪।

(৭)         নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও, সিক্রেট লাইভস এন্ড আদার স্টোরিজ, লন্ডন : হ্যানিম্যান, ১৯৭৫।

(৮)         সিমন গিকান্দি, নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গ’ও, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, কেমব্রিজ, ২০০০।

(৯)   Boehmer, Elleke. Colonial and Postcolonial Literature. London : Oxford University Press, 2005

***********************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা