ফারুক সিদ্দিকীর সঙ্গে

ফারুক সিদ্দিকীর সঙ্গে

একদিন, অনেকদিন আগে আমরা গিয়েছিলাম পুণ্ড্রনগরে, ফারুক সিদ্দিকীর বাসায়। ‘বিপ্রতীক’ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম প্রবাদপুরুষ। তখন ‘বিপ্রতীক’ তাঁর ৩৭ বছরের লালিত সন্তান। কথা বলেছিলাম সাহিত্য ও সমকালের বিভিন্ন বিষয়-আশয় নিয়ে। আড্ডামুখর এ কথোপকথনে হয়তো আরো অনেক বিষয় আমরা তাঁর কাছে জানতে পারতাম। যেটুকু সম্ভব হয় নিÑতার সব অক্ষমতা, ব্যর্থতা আমাদের। তারপরও যা কিছু জানতে পেরেছিলাম–তা-ই পত্রস্থ হয়েছিল ‘চিহ্ন’র ১৮-তম প্রকাশে। গত ২৩ এপ্রিল ২০১৪তে এই সাহিত্যশিল্পী-সম্পাদক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই সাক্ষাৎকারটির উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে পুনঃপত্রস্থ হল।

কবিতা কী কেন কীভাবে
মুখোমুখি ফারুক সিদ্দিকী ও চিহ্ন
চিহ্ন : আপনি বললেন আধুনিকতা গল্প ও উপন্যাসে একরকম হচ্ছে, কিন্তু কবিতায় সেরকম হচ্ছে না, আলাদা একটা কাঠামোয় তৈরি হচ্ছে। তাহলে কবিতার কাঠামোটা কেমন হওয়া উচিত?
ফারুক সিদ্দিকী : অবশ্যই আলাদা কাঠামো হতে হবে। তার মানে কবিতার একটা আঙ্গিক আছে, একটা ছন্দ আছে, একটা বৈশিষ্ট্য আছে, কিন্তু গল্পের তো এরকম নেই। যতদূর মনে হয় ‘ছাদ’ থেকে ‘ছন্দ’ শব্দটা এসেছে; অর্থাৎ আপনি ঘর করলেন, ছাদ নাই, বৃষ্টিতো পড়বেই। গল্প সচরাচর এক ধরনের উপকথা, কবিতা সেক্ষেত্রে মননক্রিয়া।
চিহ্ন : আপনি বলতে চাচ্ছেন কবিতারও একটা সীমা আছে…
ফারুক সিদ্দিকী : অবশ্যই, তার একটা সীমা আছে, অর্থাৎ শব্দের ভেতরেই তার একটা ব্যাপার আছে। মালার্মে সেই কথাই তো বলেছেনজ্জ‘কবিতা শব্দ দিয়েই লেখা হয়’। এবং দেরিদার প্রিয় কবি মালার্মে। খুব বেশি কবিতা বোধ হয় লেখেন নি মালার্মে। ৬০টির(!) মতো হতে পারে। poetry is written with words, not idea  একথা মালার্মে বলেন। থেমে যাওয়া গুণটি কবির থাকতে হবে; গদ্য কবিতায় বেশি প্রয়োজন।
চিহ্ন : কবিতা যদি শব্দের কারুকাজ হয়, তো অনেক সময় কি মনে হয় না এটা artificial হয়ে গেল? কারণ শব্দ বসিয়ে বসিয়ে আমরা যদি কবিতা লিখি, তাহলে নির্মাণের মতো একটা ব্যাপার হয়ে যায় না! অর্থাৎ শব্দই যদি হয় মূল, তাহলে আরোপিত ব্যাপারটা চলে আসে না; মনে হয় একটা structure-এর মধ্যে ফেলে সেখানে কিছু কিছু শব্দ বসিয়ে দেয়ালের মতো একটা কাঠামো তৈরি করা?
ফারুক সিদ্দিকী : ধৎঃরভরপরধষ হবে কেন, আরোপিত আপনি করতে যাবেন কেন! এখন যেন সহজলভ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমরা সবাই কবিতা লিখতে পারি। শব্দ নিয়ে যে আমি কথা বললাম, সেটা লৌকিক। কবিতায় শব্দতো ব্রহ্ম, ড়িৎফ রং ষড়মড়ং; কিন্তু কেবল শব্দেরও কোনো ব্যাপার নয় এটা। আমরাও কবিতা লিখতে পারিজ্জ প্রতিভার কোনো দরকার নেই জীবন-উপলব্ধির কোনো ব্যাপার নেই, লিখে গেলাম; কিন্তু স্বভাবকবি না হলে জীবন-উপলব্ধি না থাকলে সে-কবিতা বেশি দিন টেকে না, সে-কবি বেশিদিন লিখেতেও পারে না। কবিতা স্বসমুখ কোনো বিষয় নয়।
চিহ্ন : অর্থাৎ নেমে আসার ব্যাপারটা কবির মধ্যে থাকে এবং থাকা উচিত।
ফারুক চৌধুরী : নেমে আসার ব্যাপার বলে আমি মনে করি না। এখন কবিতার ভেতরে অকবিতার ভিড়টা খুব বেশি, এত বেশি যে যাচাই করা খুব মুশকিল। আমি যে কবিতার আহ্বান করি বিপ্রতীকর জন্যে, আমাকে এ পর্যন্ত দুএকজন ব্যতীত কেউ ছন্দে কবিতা দেয় নি।
চিহ্ন : আচ্ছা ছন্দে কবিতা না লেখার ব্যাপারে তারা কি কিছু বলে বা ব্যাখ্যা দিয়েছে?
ফারুক সিদ্দিকী : কোনো কথাই বলে না, এবং কবিতা পাঠানোর সময় সঙ্গে কোনো চিঠি দেয় না। ফরমায়েশি ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে, সধফব ঃড় ড়ৎফবৎ, ফলে সাধারণ কবিতায় যে গুণটি থাকা উচিত সেই সম্মোহনী শক্তিটুকু হারায়।
চিহ্ন : তারা কি ছন্দ জানেন না নাকি ছন্দ ধাড়রফ করেন?
ফারুক সিদ্দিকী : এখন এ-সম্পর্কে আমিতো কিছু বলতে পারবো না তারা জানে কী-না। তবে আমি একটা কথা মনে করি: পরিশ্রম আছে, ছন্দ অলস কবিকে পরিশ্রান্ত করে, অসম্ভব পরিশ্রান্ত করে। স্মর্তব্য একটি ভাব সব ছন্দে আসবে না, বিশেষ ছন্দেই আসে।
চিহ্ন : কিন্তু ছন্দে কি সীমাবদ্ধতা নেই, যেমন কবিতা লিখতে গিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি, অথচ ছন্দের খাতিরে শব্দগুলিকে পাল্টিয়ে ফেলতে হচ্ছে?
ফারুক সিদ্দিকী : সীমাবদ্ধতা এখানে বলা যাবে না, বলা যায় আমার বাঞ্ছিত ব্যাপারটা এখানে পাচ্ছি না। এখন সীমাবদ্ধতা যদি আপনি বলেন, তাহলে আমি বলব আপনার চিন্তাধারার মধ্যেও সীমাবদ্ধতা আছে বলেই আপনি জিনিসটা প্রকাশ করতে পারছেন না। অবশ্য ছন্দে অনেক সময় বক্তব্য বাদ যায়, এক্ষেত্রে জয়ী হওয়াই কবির প্রধান কাজ। কেননা কবিতা সবচেয়ে দুরূহ শিল্পকর্ম।
চিহ্ন : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন ছন্দটাই সধরহ, কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমি একটা কথা যেভাবে বলতে চাচ্ছি ছন্দের জন্য ঠিক সেভাবে বলতে পারছি না, অর্থাৎ ছন্দের জন্য একটা শব্দ আমি একভাবে বসাতে গিয়ে সেভাবে বসাতে পারছি না, বিকল্প-শব্দ খুঁজতে হচ্ছে, বলার মধ্যে সেই ংঢ়রৎরঃ-টা আর থাকছে না।
ফারুক সিদ্দিকী : শব্দ কখনোই আপনাকে ঢ়বৎসরংংরড়হ দেবে না যে এই শব্দই এখানে থাকল আর তুমি কোনো শব্দ নিও না; শব্দ আপনার মনের ভিতর গিয়ে ভরমযঃ করে, তার মানে এক-শব্দ বলে তুমি এ-শব্দ সরাও আমাকে নাওজ্জএগুলি শব্দেরই গুণগত ব্যাপার। তবে কিছু কিছু কবিতায় ছন্দ করতে গিয়ে শুধু ছন্দই হয়েছে কবিতা হয় নি, সেটা কবির ব্যর্থতা। নজরুল ইসলামের একটা গান আছে, ‘ভুলি কেমনে’, প্রেমের খ্যাত গান, আমি অন্য কেনো জায়গায় এমন চমৎকার কবিতা পড়ি নি, আশ্চর্য রকমেরজ্জদুই লাইন পরে মাত্রাবৃত্ত, তারপরের লাইন স্বরবৃত্ত, তারপরের লাইন মাত্রাবৃত্ত, তারপরের লাইন স্বরবৃত্ত, তারপরের লাইন মাত্রাবৃত্ত, তারপরের লাইন স্বরবৃত্ত। তো কেমন করে এটা হলো? আপনারা এখন কিন্তু বলবেন এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে, অথচ আমিতো কোথাও এমন কবিতা পড়ি নি; আসলে এটা পৎবধঃরারঃু-এর ব্যাপার, লোকটি সৃষ্টিশীল ছিলেন বলেই এরকম কাজ করতে পেরেছেন। সম্ভবত নজরুল ইসলাম এরকম কবিতা একটিই লিখেছিলেন। শুধু ছন্দ দিয়েই সার্থক কবিতা হয় না; কিন্তু একটি সার্থক কবিতার অবশেষ দেহাবরণটুকু ছন্দ। ছন্দ বাদ যাবে না তখন।
চিহ্ন : এবার এ-প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি : আচ্ছা, শব্দতো চেতনার আক্ষরিক রূপ।
ফারুক সিদ্দিকী : চেতনার আক্ষরিক রূপ নয় শুধু। চেতনার অনুসন্ধেয় উপক্রম, দহন ও ক্ষরণ থেকে উৎসারিত সেটিই হবে প্রার্থিত কবিতার শব্দ, কেবল শব্দ নয়, মালার্মের শব্দবোধ করি দহন ও ক্ষরণজাত এক ধরনের উজ্জ্বলতা, একাধারে সঙ্গীতাশ্রয়ীও। সঙ্গীতাশ্রয়ী বলেই যথাশব্দ হয় নি রবি ঠাকুরের ‘দ্বিরেফ’ শব্দটি এবং নবগোপালবাবুও সম্মতি দেন নি কিন্তু কবিগুরুও শব্দটি প্রত্যাখ্যান করেন নি। দ্বিরেফ অর্থ ভ্রমর, ছন্দে কথায় দুটির মিল আছে।
চিহ্ন : তা যদি না হয় তবে শব্দে এত কারুকাজ কেন, কারুকাজের প্রয়োজন কীসের জন্য? আমাদের চেতনার যে-নিঃসরণ সেটাইতো কবিতা; তাহলে শব্দ ছাড়া আমরা কবিতাকে কীভাবে বুঝব? আপনি যে স্বীকার করলেন কবিতার জন্য শব্দই মুখ্য, তাহলে কি চেতনার অক্ষরিক বা সাঙ্কেতিক রূপ/চিহ্নই কবিতা নয়? তবে এর সঙ্গে ধ্বনির একটা যোগসূত্র থাকবে। কারণ চেতনাটা হচ্ছে নদীর ¯্রােতের মতো; যে-নদীতে বাতাস লাগে না সে-নদীর ¯্রােত অন্তঃশীল, যখনই বাতাস লাগে তখনই ঢেউ জাগে, আর ঢেউই কিন্তু ¯্রােতের
অস্তিত্বকে প্রকাশ করে প্রমাণ করে। তো ঢেউটা হচ্ছে ধ্বনি, আর বাতাসটা হচ্ছে পরিবেশগত ও সময়গত বাস্তবতা, এবং এই বাস্তবতা অনুসারে ঢেউটা সৃষ্টি হয়, তার মানে বাতাস যেমন হবে ঢেউও তে¤িœ হবে। কিন্তু ঢেউ কখনোই ¯্রােতের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করতে পারে না, বাতাস নিজের প্রয়োজনে ¯্রােতের কাছে যায়, কিন্তু বাতাসের ছোঁয়ায় অন্তর্গত-অস্তিত্বকে প্রকাশ করবার জন্য ¯্রােত মুখিয়ে থাকে ব্যাকুল হয়ে। তো বলতে চাচ্ছি, চেতনার ভাবগত রূপ হচ্ছে ধ্বনি, আর ধ্বনির আঙ্গিক রূপ হচ্ছে শব্দ; অর্থাৎ যে-অর্থকে কেন্দ্র করে ধ্বনির সৃষ্টি সেই অর্থই জানিয়ে দেবে কোন শব্দটা বসানো সঠিক হবে এবং কোন শব্দটা কোথায় বসবেজ্জযতক্ষণ পর্যন্ত এরকম ব্যাপার না-ঘটবে ততক্ষণ পর্যন্ত কবিতা সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। তবে প্রথম/সকল কবিতাতেই যে সকলের এরূপ স্বতঃসত সামঞ্জস্য ঘটে থাকে তা নয়, যাদের ঘটে তারাতো জীবন্ত-ঈশ্বর; ধীরে ধীরে সময় নিয়ে পরমের দিকে এগুনোই স্বাভাবিক, তাতে করে কবি যে অপার্থিব নন মানুষ তা যুক্তিগ্রাহ্য বা প্রমাণিত হয়। পরমের দেখা পাওয়া যাবে কী-না বা অতদূর যাওয়া যাবে কী-না, সে-প্রশ্নতো বৈষ্ণবকবি সুফিসাধক বাউল কবিদের, চণ্ডীদাস লালন রবীন্দ্রনাথ শ্রী অরবিন্দর, বিশেষত এখনকার কবিদের নয়; তবে যাত্রা করতে হবে বৈকি, কিন্তু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নয়, শুধু পথের কর্তব্য পালন করলেই পথের শেষের কর্তব্যও পালিত হবে। তার পূর্বে অভিজ্ঞতাটা প্রয়োজন; বাহ্যবস্তু সম্পর্কে তার আকার সম্পর্কে অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে, কেননা এগুলির আনুপাতিকহারে চেতনা থেকে ধ্বনির সৃষ্টি হয় এবং ধ্বনি থেকে শব্দ চলে আসে। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দরকার অনুশীলন, সেটা পুঁথিগত বা বস্তুগত বা দৃশ্যগত যেভাবেই হোক-না কেন, তবে সামন্বিয়ক হলে পড়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গতার দিকে এগুনো যায়; এবং এই অনুশীলনই রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারকে শব্দপুঁজিতে ভরে তুলতে পারে, যেখান থেকে পৃথক পৃথক ব্যক্তি/উপলব্ধি/চাহিদা ও গভীরতা অনুপাতে শব্দ বণ্টিত হবে ধঁঃড়সধঃরপধষষু; আর যদি শব্দপুঁজি না থাকে তাহলে প্রথমত সাধারণ/তরল শব্দ ব্যবহার করতে হয় অথবা শব্দ খুঁজে খুঁজে বসাতে হয়, তখন আর চেতনার অনিবার্য প্রকাশ বা অদম্য তাড়নাপীড়নের গাম্ভীর্য থাকে না। আরেকটা কথা, যেহেতু পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে-কোনো বস্তুর গুণ-ভাব-অর্থ-বৈশিষ্ট্য মস্তিষ্কে প্রেরিত হয়, এবং খুব দ্রুত প্রেরিত-বস্তুর প্রতিক্রিয়া মস্তিষ্ক কোষের উর্বরতা অনুপাতে সম্পন্ন হয়, আমরা তখন অনুভব করতে পারি; আর অনুভবের সামষ্টিক ক্ষেত্রটাই হচ্ছে মন/সরহফ. যদিও পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বস্তুর চরিত্রগুণ মস্তিষ্কে পৌঁছায় কিন্তু মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোষের উর্বরতার সংখ্যানুপাতে প্রত্যেক ইন্দ্রিয় কার্যকরী থাকে, গণিতের ভাষায় ঢ়ৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষষ, এবং কার্যক্ষম অবস্থান থেকে প্রত্যেক ইন্দ্রিয় আলাদা আলাদাভাবে সধংংধমব পাঠায় মস্তিষ্ক-নিঃসরিত হরমোনের চরিত্রের উপর, হরমোনের চরিত্র ও মস্তিষ্ককোষের বৈশিষ্ট্য পরিচালিত হয় মনের র‌্যাঙ্ক ও সে-স্তরের কাঠামো অনুযায়ী; কিন্তু মস্তিষ্ক-কোষের সংখ্যা নির্ভরশীল জিনগত প্রকৃতিগত পরিবেশগত বাস্তবতার উপর। পূর্বেই বলেছি মন হচ্ছে সামষ্টিক ক্ষেত্র, অর্থাৎ চেতনার বসতবাড়ি।
ফারুক সিদ্দিকী : তাহলে আপনি বলছেন শব্দকে হতে হবে ধ্বনিময়? কিন্তু পুরোনো শব্দের নতুন ব্যবহারওতো হতে পারে, সেটাও কিন্তু একটা কারুকাজ। যেমন একটা উদাহরণ দিই, অত্যাধিক পুরোনো শব্দ, কিন্তু তার নতুন ব্যবহারজ্জ‘নৃত্যরতা রমণীর দেহের চিৎকার’জ্জখুব সুন্দরভাবে নৃত্যরতা রমণীর দেহের সঙ্গে ‘চিৎকার’ শব্দটা সম্পর্কিত হয়েছে, বোঝা যায় মেয়েটি কীভাবে নাচে; তাই এই শব্দ পুরোনো কিন্তু নতুন ব্যবহার। অনেক পুরোনো শব্দেরই ব্যবহার আপনাকে করতে হবে, সেটা প্রথমত জানতে হবে এবং বুঝতে হবে। অর্থাৎ মন বা চেতনার বসতবাড়ি হলে কবিতা সমুদ্ভাসিত হবে, তা নয়, সেক্ষেত্রে কাব্যদৃষ্টিও প্রয়োজন। শুধু শব্দ নয়, পুরোনো শব্দের নতুনরূপে ব্যবহার, সেখানে কবির নৈপুণ্য, তা না হলে দ্বিরেফ’র মতোই হবে।
চিহ্ন : এই যে একটার পর একটা শব্দগুলি আসছে; দেখা যাবে আগের পঙ্ক্তিতে এক ধরনের শব্দ পরের পঙ্ক্তিতে ঐ ধরনের শব্দ আসছে না, অন্যরকম শব্দ আসছে, এটা কি ধ্বনির প্রয়োজনে নয়? যেমন, নৃত্যের তাল-নাচার সময় একবার একরকম করে পা পড়ছে, পরেরবার কিন্তু ওই-পা ওই-স্থানে ওই-রকম করে আর পড়ে না, প্রয়োজনের তাগিদে পা অন্যরকম করে পড়ে বা নটী পা ফেলেন। প্রশ্ন হতে পারে পা কি নিজে থেকে ধঁঃড়সধঃরপধষষু পড়ে নাকি নটীর ইচ্ছায় পড়ে? দুটোই ঠিক; কেননা নাচের সময় নটীর চেতনা তার ভিতরে ইচ্ছে তৈরি করে, এবং ইচ্ছে/আকাক্সক্ষার পূর্ণ-প্রকাশ ঘটলে তার শরীরের ড়ৎমধহ-গুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সড়াব করে; তবে এখানে অভ্যাস/চর্চা/অনুশীলনের প্রয়োজন আছে, এর ফলে পা/হাত/শরীর যে-অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা চেতনাগত আকাক্সক্ষার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায়, তখন মনে হয় ড়ৎমধহ-গুলি যেন ধঁঃড়সধঃরপধষষু সড়াব করছে। তাহলে শব্দ কি তাই নয়? কারণ আমি যে-চেতনাগত অনুভূতিটা আমার লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করব সেটা কিন্তু আমি রহফরৎবপঃষু বলছি, মনে-মনে, একটা ংড়ঁহফ হচ্ছে আমার ভিতরে-ভিতরে কিন্তু একটা ংড়ঁহফ হবে, সেই ংড়ঁহফ টা আমরা/পাঠকরা বুঝব না; অর্থাৎ কবি যা-লেখেন ৎযুঃযস সহকারে লেখেন, ৎবমঁষধৎ ৎবপঁৎৎবহপব ড়ভ ংঃৎবংং ড়ৎ ধপপবহঃ সহকারে লেখেন।
ফারুক সিদ্দিকী : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে লেখে সে পড়ে? সর্বোপরি শব্দগুলো আসছে অর্থাৎ করোৎপন্ন চেতনায় ক্রমান্বয়ে শুদ্ধি আসেছে কি? অ্যারিস্টটল যাকে ‘ক্যাথারসিস’ বলেছিলেন।
চিহ্ন : তা হতে পারে। আমি বলতে চাচ্ছি, এই যে কবিতা আসছে, এটা হরমোনেরই খেলা, হরমোনটা কিন্তু ফরৎবপঃষু আসে না; অর্থাৎ কৃত্রিম ঝর্ণার মতো সুইচ অন করলে ঝপাৎ করে পড়ে আবার অফ করলে ফুৎ করে নিভে যায়, সে-রকম নয়। এই হরমোনের খেলা কথাটা ংপরবহপব বলে, কিন্তু আমি বলছি না যে কবিতাকে বিজ্ঞান হতে হবে। তো প্রাচীন মুনিদের মতে, বিশ্বামিত্রের ধ্যান ভাঙাতে মেনকার যে-বিচিত্রভঙ্গির অঙ্গ-সঞ্চালন সেটাই প্রথম নৃত্য, সেখান থেকেই শিল্পকলার ধারণা সৃষ্টি। এই নাচটা কিন্তু এখন বাজারে যেসব সুইচটেপা ইলেকট্রিক পুতুলগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি বারবার ঘুরে-ঘুরে একই নাচ দেখায়, সেরকম নয়; এই নাচের মধ্যে একটা চেতনাগত রহপষরহধঃরড়হ থাকে যাকে বলা যায় নবহঃ ড়ভ সরহফ, যার ফলে সঁংরপধষ সবধংঁৎব সৃষ্টি হয়; অর্থাৎ প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সড়াব করে আলাদা আলাদা প্রয়োজনে আলাদা আলাদা ভঙ্গিতে, কিন্তু প্রতিটি ভঙ্গিতে একটা সময়ের ঐক্য থাকবে, এক ভঙ্গি নির্দিষ্ট সময়ের ভিতরে আরেক ভঙ্গিতে প্রবেশ করতে নাজ্জপারলে তাল কেটে যাবে, বলা যায় প্রতিটি ভঙ্গি একটা করে ংঁন-ফরসবহঃরড়হ. কবিতায় এটাকে বলা হয় ৎযুঃযসরপ ংবহংব; এই ৎযুঃযসরপ ংবহংব-টা যে শুধু ৎযুঃযস সৃষ্টি করবে তা নয়, সৃষ্টি হবে যধসড়হরড়ঁং ভষড়ি ড়ভ াড়পধষ ংড়ঁহফং. ফলে এই নবধঃরহম ড়ভ ঃরসব বা তালজ্ঞান আসে চেতনা থেকেই। এখানে আরেকটা কথা বলি : ওই যে চঁঢ়ঢ়বঃ-ংযড়ি গুলিতে যে চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব হয়, যেমন মুস্তাফা মনোয়ারের উৎধসধঃরং চবৎংড়হধপগুলি; এগুলিতে কিন্তু সুইচটে পা পুতুলের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, যদিও পুতুলগুলি নিজেরা নাচতে পারে না কিন্তু এদের ফরৎবপঃড়ৎ আছে, আর ফরৎবপঃড়ৎ কিন্তু মঞ্চে নেই, মঞ্চে অনুপস্থিত হলেও তিনি ক্রিয়াশীল, কেননা যিনি নাচান তিনি নাচেন। ফরৎবপঃড়ৎ-এর চেতনার ভেতরে যে-নৃত্য ক্রিয়াশীল তারই প্রকাশ ঘটে দম-দেওয়া পুতুলের নাচে। তবে পুতুল এবং ফরৎবপঃড়ৎ-এর মধ্যে সত্তাগত প্রভেদ থাকায় চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব কে অনেকটা যান্ত্রিক বলে মনে হয়। ফলে নটীর নাচ আর পুতুলের নাচের মধ্যে মৌল পার্থক্য আছেজ্জনটীর নিজের চেতনা তার নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার নাচ অভিন্ন, পার্থক্য এখানেই। তবে যাকে আমরা ফরৎবপঃড়ৎ বলছি তিনি কিন্তু শুধু পরিচালক নন, মূলত শিল্পী, চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব-এ সমস্ত কৃতিত্ব তার, তিনিই মূল্যায়িত হন, পুতুলগুলির কুশলতা দেখে সবাই মুগ্ধ হলেও সবার ভিতরের চোখ থাকে মুস্তাফা মনোয়ারের দিকে। এই বঃবৎহধ বীরংঃবহপব-এর জন্যই তিনি শিল্পী। বস্তুত নটী নিজেই ¯্রষ্টা নিজেই সৃষ্টি, অর্থাৎ সৃষ্টি এবং ¯্রষ্টা এখানে অভিন্ন একদেহমনপ্রাণ, ফলে শিল্পী এখানে পূর্ণতা পায়, এখানে নটীই প্রধান ও একমাত্র, লীলা স্যামসনই শিল্পী; কিন্তু চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব-এ শিল্পী হচ্ছেন মুস্তাফা মনোয়ার।
ফারুক সিদ্দিকী : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন শব্দের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।
চিহ্ন : না, ধারাবাহিকতা না, আমরা বলতে চাচ্ছি কবি ভরৎংঃ পঙ্ক্তি শুরু করলেন ষধংঃ পঙ্ক্তিতে এসে শেষ করলেন, একটি কবিতা লেখা হলো; কিন্তু কবিতাটির প্রত্যেক পঙ্ক্তির ৎযুঃযস তো এক হবে না, এবং এই ৎযুঃযস-এর প্রয়োজনে শব্দের কারুকাজ, অর্থাৎ কোথায় শব্দ বসবে ‘নবংঃ ড়িৎফং রহ ঃযব নবংঃ ড়ৎফবৎ’-এর প্রয়োজন কিন্তু এ-কারণেই অর্থাৎ কবিতাটি যখন পাঠকের কাছে পৌঁছবে তখন কবি সামনে না-থাকলেও শব্দের কারুকাজ বা ধ্বনিব্যঞ্জনের দ্বারা কবির বক্তব্য পাঠকের বোধে কড়া নাড়বে, এভাবে কবি ৎযুঃযস-এর মাধ্যমে কবিতার গূঢ়ার্থসহ পাঠকের উপর ভর করেন, শব্দের কারুকাজ একারণেই প্রয়োজনীয়।
ফারুক সিদ্দিকী : না, কবিতো তখন ফবধফ, যখন কবিতা লেখা হয়ে গেল তখন সে ফবধফ, পাঠক তখন পুনরায় তাকে উদ্ধার করবে। কারণ কবি/লেখক কোনো সত্য উদ্ঘাটন করে নি যে তাকে জীবিত থাকতে হবে; সে এমন একটা সত্য উদ্ঘাটন করল আমরা সত্যে উপনীত হলাম, কিন্তু সেটা বাস্তবিক কোনো সত্য নয়Ñমনোগত, তাই নয় কি?
চিহ্ন : আচ্ছা প্রতীক প্রসঙ্গে বলি, প্রতীক যদি না থাকে তাহলে তো কবিতা সরল স্বীকারোক্তি হয়ে যায় বা দিনযাপনের রুটিন বা জবানবন্দির মতো হয়ে যায়। এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে তার ফবসধহফ বাংলা সাহিত্যে কতটুকু? অর্থাৎ বাংলা কবিতায় যদি প্রতীকতা না থাকে তবে দেখা যায় কবিতাটা পুরো ংঃধঃবসবহঃ হয়ে যায়।
ফারুক সিদ্দিকী : কবিতাতো একরকমভাবে হয় না, আপনি যখন যে-রকম লিখবেন, কবিতা হয়ে ওঠাটা বড় কথা, এটাই শেষ কথা। আমার মতের সঙ্গে হয়তো অনেকেই একমত হবেন যে কিছুটা স্বভাবকবিত্ব বা জন্মগতভাবে যদি কোনো অর্জন না থাকে তাহলে আমার মনে হয় কিছুটা কৃত্রিমতা সৃষ্টি হয় আবিলতার সৃষ্টি হয়; জন্মগতভাবে প্রাপ্ত যে স্বভাবকবিত্ব, আমার মনে হয় এটার কিছুটা আবশ্যকতা আছে, একে একদম উড়ে দেওয়া যায় না বানচাল করে দেওয়া যায় না।
চিহ্ন : এবার প্রসঙ্গটা বদলে নিই। অনূদিত কবিতা সম্পর্কে বলুন : বিদেশী কবিতাকে স্বদেশীকরণ করা কি যুক্তিসঙ্গত? যেমন বিষ্ণু দে এলিয়টের কবিতায় মে মাসকে ভাদ্র মাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত শেকসপীয়রের সনেটগুলিতে বাংলা মাস ব্যবহার করেন। ভাষান্তরে অন্তঃশীল বিচ্যুতি/বিভ্রাট ঘটে না? সরংঃৎধহংঃধঃরড়হ হয় না? যেমনজ্জসুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ‘নির্বাচিত ইয়েটস’ রাজু আলাউদ্দীনের ‘নির্বাচিত টেড হিউজ’ কবীর চৌধুরীর ‘কাহলীল জিব্রানের কবিতা’ শামসুর রাহমানের ‘রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা’: সৈয়দ আলী আহসানের ‘ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘এমিলি ডিকিনসনের কবিতা’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পাবলো নেরুদার কবিতা’জ্জএগুলিকে কি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় পুনঃসৃষ্টি বলা যায়? আর পুনঃসৃষ্টিতে সার্থকতা আসে? অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, অন্বিষ্ট কবির আর সব কবিতা কবিমানস সমাজ সম্পর্কে পাঠগ্রহণের পর অনুবাদককে অনুবাদকর্মে অংশগ্রহণ করাটাকে জরুরি মনে করেন? অর্থাৎ একজন কবির একটি কবিতা বা একটি কাব্যগ্রন্থ যখন আমি অনুবাদ করব তখন তার কবিমানস তার অন্যান্য কবিতা বা কোন সমাজ থেকে কোন পরিবার-পরিবেশ থেকে কোন সময়ে বেড়ে উঠেছেন কবি এসবকিছু জানা কি প্রয়োজন নয়, নাকি তার একটি কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ পেলেই হলো, শুধু ওটা পেলেই আমি অনুবাদ করতে পারি? যেমন ধরুন আপনার এই একমাত্র কাব্যগ্রন্থটি ‘স্বরচিহ্নে ফুলের শব’ এটাকে যদি আমি অনুবাদ করতে চাই তাহলে শুধুমাত্র এই বইয়ের কবিতা কটা পড়লেই কি আমি আপনার চেতনা-নিঃসরিত অনুভূতিকে ধরতে পারব? আপনার কবিমানসের সঙ্গে কিন্তু আপনার শব্দচয়ন বিষয় চিন্তনর সম্পর্ক আছে মিল আছে ধারাবাহিকতা বা নিরবচ্ছিন্নতা আছে পড়হঃরহঁরঃু বা ংঁপপবংংরড়হ আছে, যদিও সব অনুবাদকের পক্ষে কবির ফবষরপধপু ড়ভ ভববষরহম বা অনুভূতির সূক্ষ্মতা ধরা সম্ভব না কিন্তু কবির ঢ়ড়বিৎ ড়ভ ভববষরহম বা বোধশক্তিটুকুতো ধরতে পারা চাই, কেননা আমার মতে অনুবাদককে অবশ্যই কবি অথবা কবিমনের হতে হবে, সে-কারণে কবি ছাড়া কবি সম্পর্কে কবিতা সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য ফরংপড়ঁৎংব করা খুব কঠিন।
ফারুক সিদ্দিকী : শব্দ জায়গাবিশেষে একটা অর্থ বহন করে। ক্যারোলিন ব্রাউন ‘ংনড়ৎহব খবৎৎধপব’ শব্দ সম্পর্কে আবু হাসান শাহরিয়ারকে বলেছেনজ্জএটা জায়গার নাম, কোনো অশ্লীল শব্দ নয়। কবিতার অনুবাদ ব্যাপারটা প্রথমত কডওয়েলের কথাই বলতে হয়, ‘কবিতা সম্পূর্ণ অনুবাদ হয় না’। আপনি যে-কথাগুলো বললেন, এটা একটা ঈঁংঃড়স ঐড়ঁংব-এর মতো, ঈঁংঃড়স ঐড়ঁংব পার হতে গেলে যে-রকম কাজ করতে হয় অনুবাদের ক্ষেত্রেও ওরকম কাজ করতে হয়। সব কবিতার অনুবাদ যে হবে এ-প্রত্যয় আপনার না-থাকাই ভালো; কারণ যে-কবিতা আপনি অনুবাদ করতে পারছেন গ্যেটে বলেছেন সে-কবির বা মূল-কবির আবেগটা কৃত্রিম নয় স্বতঃপ্রকাশিত, সে-কারণেই অনুবাদটি কবিতা হয়ে ওঠে, যদি আবেগ কৃত্রিম হয় বা জটিলতা সৃষ্টি করে তাহলে সেখানে বাধাগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়, সে-কারণে সব কবিতা অনুবাদ হয় না, যে-কবিতার অনুবাদ সার্থক হয় বুঝতে হবে সে-কবিতা অর্থাৎ সে-কবির স্পন্দন তার আবেগ তার অনুভূতি জটিলতাহীন কৃত্রিমতাহীন স্বতোঃপ্রকাশিত।
চিহ্ন : ‘একটি কবিতা পৃথিবীতে একটি ভাষায় লিখিত হতে পারে’, কথাটা আমি বিশ্বাসও করি, কিন্তু ভাবের চেতনার যেহেতু প্রবহমানতা আছে অতএব কবিতা অনুবাদ সম্ভব, সব কবিতা নয় কিছু কবিতা অনেক কবিতা, যে-কবিতাগুলি অনুবাদ হয় না সেগুলি ‘মন্ত্র’ অথবা ‘অকবিতা’। প্রশ্ন হতে পারে ‘মন্ত্র’ কি তবে অনুবাদ হয় না; হ্যাঁ হয়, ত্রিপিটক উপনিষদ বাইবেল কোরআন লালনের গান রবীন্দ্রনাথের গান এগুলিরতো অনুবাদ হয়েছে, সেগুলির আক্ষরিক অনুবাদ ব্যর্থ অনুবাদ; মন্ত্রের একেকটি শ্লোক বা আয়াত বা ংঃধহুধ এর গভীরে অনেক অদৃশ্য/পরোক্ষ ব্যঞ্জিত অথবা ধষষঁফবফ/ংঁমমবংঃবফ বন্ধনী/নৎধশবঃ/ধষষঁঃরড়হ থাকে, আক্ষরিক অনুবাদে সেগুলি বোঝা যায় না, অধিকাংশ প্রকাশক/প্রচারকগণের নিকট থেকে আমরা অক্ষর-অনূদিত উদ্ধৃতি পাই শুধু, কিন্তু বিস্ময় এবং সত্যটা হচ্ছে: মন্ত্রের পূর্ণময়তা বা ষোলকলা বা ফরমরঃভঁষষহবংং খুব সহজেই আমাদের ারঃধষ ঢ়ৎরহপরঢ়ধষ গুলিকে অর্থাৎ শারীরিকভাবে ধঃড়সরপ নড়ফু পবষষ ও সরপৎড়ংপড়ঢ়রপ নড়ফু পবষষ এবং মানসিকভাবে অপরিমেয়রূপে ক্ষুদ্র অননুভবনীয় সত্তা বা রসঢ়ধষঢ়ধনষব ংড়ঁষ বা রহভরহরঃবংরসধষ করে, ংড়ঁষ বা বঃযবৎবধষ ংড়ঁষ গুলিকে ছুয়ে যায় অথবা সঞ্জীবিত করে ারারফষু ধহরসধঃবফ করে, আমরা বুঝতে পারি কী বলা হচ্ছে অথবা আমরা তন্ময় হয়ে যাই যাতে অর্ধেক বোঝা হয়ে যায়; একথাগুলি ংঢ়রৎরঃঁধষ/ সুংঃরপ বংংবহপব থেকে বলছি না, এগুলির মনস্তত্ত্বগত দর্শনগত বিজ্ঞানগত ব্যাখ্যা আছে। তবে আমার ভাল লাগছে আপনি বললেন ‘কবিতা স্বতঃপ্রকাশিত’, যে কথাটা আমি অনেক কথা বলেও এতক্ষণ আপনাকে বোঝাতে পারছিলাম না। এবং আমার মনে হয় ঊীরংঃবহপব ধহফ ঞযড়ঁমযঃ ধহফ ঔড়ু-ই কবিতা বলে ংঢ়ড়হঃরধয়হপড়ঁং ভষড়ি হয়, একারণে প্রাচীন মুনিরা কবিতাকে বলেছেন ‘সচ্চিদানন্দ’।
ফারুক সিদ্দিকী : ঠিকই বলেছেন আপনি। তবু কাব্যিক সম্মতি কোন বিজ্ঞান বা দার্শনিক বিশ্বাস নয়, তারতম্য আছে।
চিহ্ন : আমাদের অগ্রজ কবি/সাহিত্যিকগণ দেখা হলেই উপদেশ দিয়ে থাকেন, ভালো কথা বলেন, পড়ো; বেশিবেশি পড়ো; তো খুব ভালো কথা, পড়লে জানা যায় নিঃসন্দেহে। আরো বলেন, শুধু বাংলা বই পড়লেই চলবে না, বাইরের বইপত্র পড়তে হবে, বাইরের সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে; কিন্তু সবার পক্ষে তো আর ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সম্ভব হয় না, তারা কী করবেন; অনুবাদের ভূমি এদেশে অনুর্বর, উপযুক্ত পরিমাণে অনুবাদ না হলে বাইরের শিল্পজগৎ কীভাবে জানা সম্ভব? বিভূতিভূষণের আনুষঙ্গিক পড়ালেখা কী-ই বা ছিল, বাইরের বই-পত্র খুব একটা পড়তেন না বলাই ভালো। হয়তো সেকারণে তিনি আঙ্গিকটা কী তাই জানতেন না, শুধু এটুকু জেনেই তিনি উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন যে উপন্যাস বোধহয় এমনটাই হয়ে থাকে। তার গল্পগুলিও তাই, প্রচলিত ছোটগল্পের ধারণা সেগুলিতে নেই। তথাপি অসাধারণ সব সৃষ্টি। তবু এখন আমাদের দরকার হলো অনুবাদ, যেহেতু অনুবাদ ছাড়া বাইরের শিল্পসাহিত্য আমাদের পক্ষে জানা অসম্ভব, তো অনুবাদগুলি করবেন কারা? আর আমি হাইব্রিড-টাইমের কথা বলছি, এক্কেবারে আজকের দিনটার কথা, এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে শেষ হবে বলুন!
ফারুক সিদ্দিকী : হ্যারল্ড নার্সের কবিতাটা যে আমি অনুবাদ করেছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি এই কারণে তার আবেগটা ছিল ঘনবদ্ধ শুদ্ধ আবেগ। এই জন্য আমি অনেক চেষ্টা করে অনুবাদ করেছি, এবং খুব দ্রুত অনুবাদ হয়েছে। অনেক বড় কবিতা, কিন্তু সহজ ভাষা, দ্রুত চলমান।
চিহ্ন : হ্যাঁ কবিতাটি বেশ বড় ঝড়হম ড়ভ সুংবষভ-এর মতো। আচ্ছা আমার ভুল হলে আমাকে ধরিয়ে দিন, ধরিয়ে না-দিলে ভুলটাই আমার কাছে শুদ্ধ বলে মনে হবে, কবিতাটি নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো একদিকে আক্রমণাত্মক আরেকদিকে নিজেকে প্রকাশ।
ফারুক সিদ্দিকী : হ্যা ঠিক ধরেছেন, হ্যারল্ড নর্সের কবিতাটা ওই-ধরনেরই; হ্যারল্ড নর্স আমাদেরকে বেশি তাড়িত করত, কিন্তু তার বই পাওয়া খুব দুর্লভ।
চিহ্ন : ‘খোয়াবনামা’-অনুবাদ জটিলতা সম্পর্কে বলুন। ‘খোয়াবনামা’তে আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত ফরধষড়মঁব কীভাবে অনুবাদে উঠিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব? ইংরেজি/অন্যভাষায় অনুবাদের সময় কি সেগুলি আঞ্চলিক মাধ্যমে অনূদিত হবে নাকি চিরায়ত/ভদ্রলোকের ভাষায় অনূদিত হবে? গুন্টার গ্রাস কিন্তু এরকম একটা জটিল সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন, তিনি মনে করেন বিশ্বসাহিত্য কোনো কবিতা যদি আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত হয়, আর সেটা যদি অনুবাদ করি, তাহলে প্রয়োজন নতুন নতুন শব্দ/ভাষা তৈরি করে অনুবাদ করা, উনি একটা প্রজেক্টও হাতে নিয়েছেন। জার্মানিতে কিছু সম্প্রদায়ের মুখের ভাষা বা নি¤œবিত্ত শ্রেণির মানুষের ব্যবহৃত ভাষাকে উঠিয়ে নিয়ে আসবেন।
ফারুক সিদ্দিকী : গ্রামের কথাটা ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, তার মানে ওই-রকম ভাষাটা নাই যে-ভাষাটার মাধ্যমে অনুবাদের ভেতর দিয়ে আমরা তুলে নিয়ে আসব দলিত ভাষাটা।
চিহ্ন : এই সীমাবদ্ধতাটা বাংলা ভাষার নাকি ইংরেজি/অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষার? এখানে আবারও বলি, আমি কিন্তু বাংলা ভাষার আঞ্চলিক রূপ বা আঞ্চলিক কথ্য ভাষার অনুবাদের কথা বলছি যে সেটাকে অনুবাদ করলে অনুবাদের ভাষাও কি আঞ্চলিক কথ্য ভাষা হবে নাকি শুদ্ধ ভাষা/শিক্ষিতজনদের ভাষা হবে?
ফারুক সিদ্দিকী : সীমাবদ্ধতাটা দুই ভাষারই। যেমন শেকস্পীয়রীয় ভাষা, তাকে পড়তে গেলে নোট বই দরকার হয়। তবে ইংরেজি ভাষা অনেক সংশোধন হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু বাংলা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধতাটা বেশি, কেননা ওই রকম উত্তরাধুনিকতার ব্যাপার এখনো বাংলা ভাষায় আসে নাই, বাংলা ভাষায় ওইসব শব্দ ধরার মতো উপযোগী প্রতিশব্দ নাই। ‘হিফহফ’ নামে একটা শব্দ বেরিয়েছে ইংরেজিতে, এর বাংলা কীভাবে করবেন, এর বাংলা করতে গেলে দুই লাইনে লিখতে হবে অর্থাৎ বুঝিয়ে দিতে হবে ‘হিফহফ’ এক ধরনের উন্মাদনা, মানে ৎড়পশ-হ-ৎড়ষষ-এর মতো এক ধরনের উন্মাদনা। রক-এন-রোল-এর বাংলা করেছেন রাজশেখর বসু ‘চিৎপাত সঙ্গীত’। চড়া গলায় গান ও নাচ। বাংলা একাডেমির অভিধানে শব্দটির বাংলাকরণ করা হয় নি।
চিহ্ন : তাহলে এই-যে এত বড় সৃষ্টি ‘খোয়াবনামা’-এর কি মূলানুগ অনুবাদ হওয়া সম্ভব নয়? সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ‘লালসালু’র ইংরেজি অনুবাদটি কিন্তু কথাসাহিত্যের শিক্ষিত সমাজের। আভিধানিক ভাষাই ব্যবহৃত, খড়পধষ ষধহমঁধমব ড়ভ ফরধষবপঃ-এর ব্যবহার ঘটে নি। জসীমউদ্দীনের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এর ঊ.গ গরষভড়ৎফ-কৃত অনুবাদ ঞযব ভরবষফ ড়ভ ঃযব ঊসনৎড়রফবৎবফ ছঁরষঃ বা ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’র ঊ. চধরহঃং এবং ঙ. খড়াবষড়পশ-কৃত অনুবাদ ঞযব মুঢ়ংু যিড়ৎঢ় যদি আঞ্চলিক ভাষার টোনে লেখা হত। দীনেশচন্দ্র সেনের ঊধংঃবৎহ ইঁহমধষ ইধষষধফং-এর মূল্য বিশ্বলোকসাহিত্যে ঈর্ষণীয় কিন্তু সেগুলি আভিধানিক ভাষায় লিখিত; ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে এক বস্তু মনে হয় না।
ফারুক সিদ্দিকী : হ্যাঁ, ইংরেজি অনুবাদ হওয়া সম্ভব, তবে অনুবাদে ‘খোয়াবনামা’-এর আঞ্চলিক শব্দ আর থাকবে না। যেমন ‘তুই ক্যাঙকা আচু’ এই বাক্যটি আপনি ইংরেজিতে যড়ি ফড় ুড়ঁ ফড় দিয়ে দিলেন তাহলেই হলো। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখন অন্ধ, পনের টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন, ১৮৭৫ সালের ঘটনা, তাকে বলা হলো তুমি কবিতা লেখো, ওই সময় ইংল্যান্ড থেকে পঞ্চম এডওয়ার্ড আসলেন হেমচন্দ্র লিখলেন: রাজকুমারী ও রাণী স¤্রাট পঞ্চম এডওয়ার্টের সঙ্গে দেখা করেছেন এটা খুবই সমাজ গর্হিত নিন্দনীয় কাজ, এবং কবিতার মধ্যে দুটো শব্দ লিখলেন ‘মাগী’ ‘ভাতার’। ওখানে যেÑঅ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন, তিনি ইংরেজ, তিনি বললেন: আমিতো তোমার কবিতা কিছুই বুঝলাম না, তুমি ইংরেজিতে ঃৎধহংষধঃব করে নিয়ে এসো, হেমচন্দ্র ইংরেজি ঃৎধহংষধঃব করলেন ‘মাগী’ হয়ে গেল রিভব, ‘ভাতার’ হয়ে গেল যঁংনধহফ তখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলল ংঃৎধহমব ব্যাপার, তোমার এই কবিতা নিয়ে এরা ধ্বংস করতে যাচ্ছিল, এটাতো ভালো কবিতা হয়েছে! তাহলে বলেন কীভাবে বোঝাবেন আপনি; আঞ্চলিক ভাষার একটা দূরত্ব সব সময়ই থাকে। বাচনিক অভিব্যক্তি অনুবাদে আঞ্চলিকতায় স্তরভেদে ভিন্নরূপ নেয়, কখনও সমস্তরীয় নয়।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা