বাউলা ঝড়ে উদাস পথিক

সেই আমার হৃদয় মাঝে প্রথম শ্রাবণ-ছন্দ

কী ছিলো না এই গ্রামে! মোহন, জসিম, বাঁধন, কুসুম, নার্গিস, বাদল এক বয়সী সব বাধ না মানা দামাল-দস্যুর দল। আসমানের সপ্ততারকাগুচ্ছ যেনো। এদের সাথে মিশতে পারায় এক ধরনের আনন্দ ছিলো, গর্ব ছিলো। এক সাথে দল বেঁধে কেমন করে সারা গাঁ উথালি-পাথালি করে বেড়ানো। স্কুল পালিয়ে গিয়ে মৌচাকে ঢিল ছোঁড়া, রাতে মুরগী চুরি করে পিকনিক। রাস্তায় কোনো দাদা বা নানা বা ইয়ার্কি-সম্পর্কিত কারোর সাথে দেখা হলে তো মহাবিপদ তার। একদম বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! মন্দিরে ঢাক-ঢোল-কাসা ছিলো। সন্ধ্যায় ছিলো বাড়ি বাড়ি সঙ্খ আর হুলুধ্বনি। আর ছিলো মসজিদের মিনারে সাইফুল ভাইয়ের সুমিষ্ট কণ্ঠের মাগরিবের আযান। সমস্ত কলতানকে ভেদ করে মিলিয়ে যাওয়া সুর-তরঙ্গ। কী ধ্বনি! প্রায় প্রতি মাসেই পুজো-পার্বণ ছিলো, উন্মাদ নৃত্য ছিলো—মজা ছিলো। পুজোর সময় ঘুম ছিলো না। কতো রাত পর্যন্ত জেগে জেগে থাকা, মণ্ডপ সাজানো, পাল কাকার মূর্তি-গড়া দেখা। পুজো ঈদ মিলে একাকার হয়ে যেতো। কোনো তফাৎ ছিলো না কারো মনে। কোনো কোনোদিন মসজিদে শিরনি-সেমাই হতো। বিলানোর দায়িত্ব ওদের হাতে। ওরা দায়িত্ব নিতো বা দায়িত্ব দিতে বাধ্য হতো যেনো ইমাম সাহেব। অথবা ওদের চেহারার একটা সুমূল্যায়ন ছিলো।

কিন্তু, এদের ওই একটাই কাজ—সারাক্ষণ কোন খুড়োর গাছে পেয়ারা কোন দাদুর গাছে আম বা কাঁঠাল পেকেছে এইসব খুঁজে বেড়ানো। বেলা আধঘড়ি হোক, মাথার উপর টনটনে সূর্য থাকুক কোনো কিছুই মানা মানি নেই। বিকাল হলেই কু-কু-কু ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তো সারা গ্রামে। দুই জন এক হলেই শুরু। ডাক দিয়ে যাওয়া হতো যেনো কোনো যুদ্ধে। ভাবী কাকীরা আঙিনার বেড়া ফাঁক করে উকি মেরে দেখতো যুবক দলকে। কী পুলকে তারা হাসতো যে! আহা সেই শুকলার মাঠ! রাস্তার পাশে নিচু জমিতে দাগ টেনে কাটা হতো নুনদাঁড়ি, নুন-গাতির কোট। গোল্লাচ্ছুট, কানামাছি, গবোর চটপটি—খেলার কি কোনো শেষ ছিলো! আবার সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়া দল বেঁধে। কোন্ দিদি পিঠা বানায় ভালো, কার বাড়ি আজ মুরগী কাটা হয়েছে সব যেনো ওদের নখ-দর্পণে ছিলো। শুধু রান্না হওয়ার অপেক্ষা। তারপর ব্যস্। একসাথে সাত আটজন হামলে পড়া। মিনিটেই হাড়ি শেষ। ‘পিঠেগুলি হেবি মজার, দিদি ভালো থাকো।’ আর কি! বিরক্ত দিদির না হেসে উপায় আছে? সেলিমের কাছ থেকে এসব কথা আমি শুনি। আমাদের ক্লাসের সেলিম ওদের দলের মানুষ। বয়স আমাদের সবার থেকে একটু বেশি। শরীর স্বাস্থ্যও আমাদের থেকে উন্নত। সুঠাম দেহ, মারামারি মুখ, সোজা-খাড়া চুল। কিন্তু চোখে একটা মায়া মায়া ভাব আছে যেনো। ও গল্প করে আর হাসে। আমার চোখ তখন কিছু বলতে চায় সেলিমকে। হয়তো বলতে চায়—আমারে তুমাগে দলে নিবা। আমি যাবো। মুখে কোনো কথা আমি বলি না। বলতে পারি না। কারণ আমি জানি, বললেও সেলিম নেবে না। এ কথা ও অনেকদিন বলেছে, ‘তোর মতো পুচকে ছাওয়ালেরে দিয়ে চলবে না। তুরা তো বইয়ের পুকা। তুগে দিয়ে শুদু বই কাটা অবে।’ কোনোদিন সাহস পাই নি বলার।

মধ্য রাতে বাঁশি ছিলো অহিদুল ভাইয়ের ঠোঁটে, তার সে কী সুর! অহিদুল ভাইও ওদের দলের একজন—আমার স্বপ্নের পুরুষ। ঠিক বুঝতে পারতাম শুকলার মাঠের মাঝখান থেকে সুর ভেসে আসছে। যখনই ঘুমের সময় হতো তখনই শুরু হতো সুর, আমি উঠে বসতাম বিছানায়। মাঠের শুরু থেকে বাড়ি পর্যন্ত কয়েক সারি আম জাম কাঁঠাল আর সুপারির গাছ। সে সকল বাধা উপেক্ষা করে সে সুর চলে আসতো আমার কাছে। শুধু আমারই কাছে যেনো। আমি উঠে ঘরের পেছনে পুকুর ঘাটে গিয়ে শুনি। প্রায় প্রতিদিনই শুনি। একদিন জানতে পারি বাঁশির সুর শুধু আমার কানে যায় না। শুধু আমারই ভালো লাগে না। বড়ো আপারও ভালো লাগে। ‘আমি কেমন করে পত্র লিখি গো’– এই ছিলো সেদিনের বাঁশি। বাঁশি শেষে হঠাৎ কাঁঠাল গাছটার তলে আবিষ্কার করলাম আপাকে। আপা আমাকে বলল, ‘তুই এখানে ক্যান্ রে’। বললাম, ‘বাঁশি অহিদুল ভাই বাজায়, না আপা?’

পাড়ার সব বয়সী মেয়েরা অহিদুলের গানের জন্য পাগল ছিলো। কী সে সুর! তার গানের কণ্ঠও বেজায় মনকাড়া। ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি আরো কতো গান! শুক্লপক্ষের প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের আঙিনায় আসর বসতো। গানের আসর। গানের নায়ক অহিদুল ভাই। যেদিন অহিদুল ভাই আমাদের বাড়িতে আসতো সেদিন পড়ার মাথায় পা। মেঝো কাকী, রিজি আপু, জরিন দিদি সবাই আসতো গান শুনতে। মাঝে মধ্যে তাবাচ্ছুমও আসতো রিজি আপুর সাথে। জোসনা জোসনা রাত। বিছানো নারিকেলের পাতার উপর চুপটি মেরে বসে গান শোনা। মায়ের অনুপস্থিতিতে মাঝে মাঝে অহিদুল ভাই কাকীমার সাথে কী যেনো বলে হেসে কুটিকুটি হতো। তার হাসি কী! গম্ভীর কলস থেকে বের হতো মনে হয়। অহিদুল ভাইয়ের কথা শুনে আমি হাসতাম সলজ্জে। আবার গান ধরতো ভাই। একের পর এক গান। মা বলতো এবার এটা গাও, এবার ওটা। এভাবে চলতো অনেকক্ষণ। আমি হয়তো কোনোদিন মায়ের আদেশে ঘুমাতে চলে গেছি। বাবা হয়তো কোনোদিন রাতে তাড়াতাড়ি ফিরেছেন। তিনিও যোগ দিয়েছেন গান শোনায়। আমি শুনে চলেছি ঘরে বসে। আর ভালোবেসে চলেছি সেই সুর, সেই গান, সেই মানুষকে। প্রাণের পরম জনকে। শ্রীকান্তের পাঠ হয় আরও অনেক পরে। তখন থেকে কেনো জানি আরও বেশি করে অনুভব করতে থাকি তাকে। বালক শ্রীকান্তের প্রাণপ্রতিম যেনো ঘর-ছাড়া বিবাগী-বাউল ইন্দ্র। অহিদুল ভাই কি জানে আমি তাকে গোপনে এতো ভালোবাসি? আমি চাই তার বাঁশি বাজানোর সময় পাশে বসে থাকি। তাকে পাহারা দেই। তার যেনো কোনো ভয় না করে। বড়ো আপাকে কখনও গানের আসরে দেখি না। বড়ো আপা এমনিতেই লুকোচুরি স্বভাবের। অহিদুল ভাই আসলে আরো বেশি লুকিয়ে রাখতে চায় নিজেকে। বড়ো আপা হয়তো তখন বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি খায়। নইলে হয়তো কোনো এক নতুন জগত নিয়ে আসে তার লম্ব দৃষ্টিতে। গান চলে। আমি ভাবি—অহিদুল ভাইকে একদিন বাড়িতেই বাঁশি বাজাতে বলবো। জানি না তখন বড়ো আপা কী ভাবছে…

তোমার রঙে রাঙিয়ে নিলাম ছবির ক্যানভাসটুকু

এক সময় ছিলো, বাবা রোজ রোজ যাত্রার রিহার্সাল দিয়ে দেরি করে বাড়ি ফিরতেন। আর রোজ মা বাবাকে বকতেন। কোনোদিন খাবার থাকতো, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। কোনোদিন না খেয়েই ঘুমাতেন। আমার যেনো ঘুম না ভাঙে সে জন্য চুপিচুপি মশারি টেনে পাশে শুয়ে পড়তেন। তারপর এক গাল বিড়ি-নিঃশ্বাস। পাশে মায়ের বকুনিতে আগেই ঘুম ভেঙে যায়। বাবাকে তাই রোজ একটি প্রশ্ন করার সুযোগ পেতাম– ‘বাবা খাইছো?’ বাবাও রোজ রোজ একই উত্তর দিতেন– ‘হ্যাঁ বাজান খাইছি, তুমি খাইছো?’ বাবার কথা শুনেই বুঝতে পারতাম কোন্-দিন বাবা খেয়েছেন, কোন্-দিন খান নি। পাশে মা একাধারে বকে চলতেন ‘হ হ যাত্রাই যানো উনার সংসার, ঘর। নিজির তো খাওয়া লাগে না, আমাগে কথাও তাই ভাবে না পোড়া কপাল আমার, এমন মানষির হাতে আল্লা আমারে ফেলাইছে। পোড়া কপাল, যাত্রা আমার সতীন অলো।’ হ্যাঁ, সত্যিই তাই যেনো—মায়ের সতীন ছিলো যাত্রা। বাবার সাথে আমাকেও নিয়ে যেতেন মাঝে মাঝে। তিনি যখন রিহার্সালে থাকতেন আমি দেখে অবাক হতাম। বাবার এমন চিকনা পাতলা দেহাবয়ব! অথচ কী সুন্দর রাজার প্রধান সেনাপতির পদে অভিনয় করে চলতেন। কয়েক মিনিটের জন্য আমি ভুলেই যেতাম উনি আমার বাবা—আমরা এক বিছানায় ঘুমিয়ে থাকি রাতে। বাবা যখন এক নিঃশ্বাসে কাপা কাপা কণ্ঠে ডায়ালগ থ্রো করতেন, বীরদর্পে রাজাকে বাঁচাতে একের পর এক শত্রু নিধন করে এগিয়ে চলতেন, আর রাজা বাবাকে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানাতো। আমার বুক ফেঁপে যেতো নিঃশ্বাসে। নিঃশ্বাস ছাড়তাম গোপনে—কেউ যেনো টের না পায়। কিন্তু বুকটা ফাঁপাই থাকতো, কমতো না। মঞ্চে মাঝে মাঝে বিলাসি পিসি এসে কীসব বলতে বলতে বাবাকে জড়িয়ে ধরতেন। আর বাবা কেনো জানি কান্নায় অশ্রু ঝরাতেন। আমার তখন ভীষণ লজ্জা লাগতো। মুখ লাল করে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম। বাবাকে প্রথমে চিনতে না পারলেও বিলাসি পিসিকে চিনতে ভুল হতো না। উনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। বাবার সাথে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কথা বলতেন হয়তো অভিনয় নিয়ে। বিলাসি পিসি মাঝে মাঝে মায়ের সাথেও কথা বলতেন রান্নাঘরে। মা-ও পিসিকে খুব ভালোবাসতেন। তবে মায়ের ঐ একটাই কথা ‘তুমার দাদারে এট্টু বুঝাও বিলাসি। ও যে একদম ঘর ছাড়া অয়ে গেলো!’ পিসিও মাকে কথা দিতেন ‘ঠিক আছে বৌদি।

আমি দেখবুনে।’ পিসির যে কী মোহনীয় কণ্ঠ! উনি বাড়িতে এলে আমি সারাক্ষণ তাঁর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, উনার কণ্ঠ শোনার জন্য। বাবাকে উনি অর্জুনদাদা বলে ডাকতেন। আমি একদিন পিসিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘পিসি, আমার বাবার নাম তো লতিফ, তুমি বাবাকে অর্জুনদাদা বলো কেনো?’ পিসি বলেছিলেন ‘ও তুমি বুঝবে না বাবলু।’ আমাকে আদর করে পিসি বাবলু বলে ডাকতেন। রিহার্সাল করতে করতে বাবা এমন ভুলোমন হয়ে যেতেন যে, আমি ছোট্ট বাচ্চাটি সাথে এসেছি তাও ভুলে যেতেন। কোনোদিন হয়তো মা গিয়ে আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসতেন। যেদিন মা যেতেন না সেদিন হয়তো রিহার্সাল ঘরের এক কোণে ঘুমিয়ে রয়েছি, আর বাবা আমাকে রেখে বাড়ি চলে গেছেন। গভীর রাতে বাবার সাথে মা বকতে বকতে এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন।

সকালে আমাকে বাবা হাতে হাতে যাত্রার রোল শেখাতেন। বাবা চেয়েছিলেন আমি একদিন পাক্কা যাত্রার অভিনেতা হবো। এই তো আমার বাবা। আমার প্রথম শিক্ষক।

ফুলগুলি মোর কুড়িয়ে পাওয়া, এই তো পূজার ফুল

শেফালিদি আমার খুব প্রিয় ছিলো। স্কুলে গান গাইতো, নাচতো। স্বাধীনতা দিবসে স্কুলে ব্রতচারী নৃত্য করতো বিকালে। আমাকে খুব ভালোবাসতো শেফালিদি। ২৬ মার্চ আসলে আমি কোনো সময়ই তার পিছু ছাড়তাম না। বলতাম, ‘শেফালিদি, কখন যাবা স্বাধীনতায়?’—বার বার একই প্রশ্ন করতাম আর শেফালিদি একই উত্তর দিতো‘—এই কাজটা শেষ করেই যাবো, দাঁড়া।’ কী জানি কারণে গ্রামবাসী শেফালিদির সাথে আমার যাওয়াটা ভালো চোখে দেখতো না। কেনো যে তারা এটা ভালোভাবে নিতো না তা ভাবতে যাই নি কখনও। আমি শুধু চিনতে শুরু করেছি শেফালিদিকে, তার গলা আর গানকে। লাঠি খেলায় দিদির কোনো তুলনা ছিলো না। মাঠভরা দর্শকের চোখ ঐ একজনের দিকেই থাকতো—শেফালিদি, হলদে শাড়ি, লম্বা চুল। সবাই বলাবলি করতো এই যে হলুদ শাড়ি পরা এই মেয়েটা ভালো খেলছে। সেখানে হয়তো তার পরিচয় নিয়েও কথা হতো। কোন গ্রামের কোন ঘরের মেয়ে, বাপের নাম কী ইত্যাদি। তাদের কথা শুনে মনে হতো দিদিকে তাদের এতো পছন্দ হয়েছে যে তারা তাদের ছেলের সাথে দিদির বিয়ের পয়গাম পাঠিয়ে তবে ক্ষান্ত দেবে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কোনোদিন তার বিয়ের পয়গাম নিয়ে কোনো ঘটক আজও আসে নি। ব্রতচারি নাচে দিদি ছিলো রাণী। প্রজাপতি নাচে দিদিকে দুইদিকে অন্যরা শাড়ি ঘিরে ধরতো—আমি উচ্ছ্বাসিত নয়নে চেয়ে থাকতাম। শাড়িগুলো এমন দুলতো যে মনে হতো দিদি সত্যিই কোনো রংবাহারি প্রজাপতি হয়ে গেছে। কি যে চমৎকার দেখাতো! ওদিকে মাইকের চোঙ থেকে ভেসে আসতো বজলু স্যারের কণ্ঠ— ‘পিয়ারী পিয়ারী সাথী হও ঝিলমিল কিছু নাও’। অনেক রাত পর্যন্ত শেফালি দি’র সাথে ঘুরতাম। কতো মানুষ তাকে কতো কিছু কিনে দিয়ে যেতো তার ইয়াত্তা নেই। সমস্তই জমা হতো আমার হাতে। স্টেজে দিদির আধিপত্ত একচ্ছত্র। গান, নাচ, কবিতা প্রত্যেক বিষয়ে দিদির অংশগ্রহণ ছিলো।

রাতে দিদির সাথে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বলতাম, ‘দিদি, উরা তোমার কি অয়?’ ‘কারা রে?’ দিদির প্রশ্ন শুনে আবার বলতাম, ‘যারা তুমারে এসব কিনে দেলো?’ হাসি হাসি মুখ নিয়ে দিদি বলতো, ‘কিচ্ছু না।’ ‘তালি এতো কিছু কিনে দেলো যে তুমারে?’ দিদি যেনো আমার কথা শুনতে পাই নি। দিদি হাসতে থাকে। আমি বলি, ‘দিদি, তুমার বিয়ে অবে কবে?’ অমনি দিদির মুখ মলিন হয়ে যায়। বলে, ‘আমারে খিডা বিয়ে করবে রে পাগল।’ ‘কেনো? তুমারে বিয়ে করবে না কেনো? তালি এতো মানুষ এতো কিছু কিনে দেলো যে?’ দিদি বলে, ‘আরো বড়ো হ, তালি বুঝবি।’ ‘না, আমি জানি, উরা তুমারে বিয়ে করবে, তুমার বিয়ে হলি আমি কিন্তু তুমার সাথে যাবো। আমারে নিবা কও?’ দিদি অমনি আমাকে ধরে কপাল গাল ঠোঁট ভিজিয়ে দেয় চুমুতে। মাথাটি তার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। হাত থেকে সমস্ত পত্তি ছড়িয়ে যায় রাস্তায়। বিকাল থেকে রাত ন’টা অব্দি দোলায় দোলায় যতো ঘর্মাক্ত ক্লান্তি জমা হয়েছিলো যে ভাঁজে, আমার নাক গিয়ে পৌঁছায় ঠিক সেইখানে। ঈষদোষ্ণ গন্ধ আমার নাসিকামূল ভেদ করে যেনো ফুসফুসে চলে যায়। তারপর সমস্ত শরীর।

আমার গান যখন শুনবে, তখন…

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পর্কে তখনও আমার কোনো ধারণা হয় নি। জানতে পারি নি, নারীদের ঠোঁটের ও চোখের জাদু বৃত্তান্ত। তবু কেনো জানি তাবাচ্ছুমকে নিয়ে ছবি আঁকতাম মনে মনে। সংসার সংসার খেলা। যদিও সংসার মানে কি— জানতাম না। শুধু আমি আয় রোজগার করবো, বাজার করবো, বাহির সামলাবো আর ও রান্না করবে— ভেতর সামলাবে, এই সব। সংসার মানে আর একটা জিনিস বুঝতাম সারাদিন দুজনের খুনসুটি লেগে থাকা আর রাতে একসাথে পাশাপাশি ঘুমানো। ওই ঘুমানো পর্যন্তই, বেশি কিছু নয়। দেখে দেখে শিখেছি— বাবা-মাকে, চাচা-চাচিকে, বড়ো ভাই-ভাবীকে। জানতাম ওরা স্বামী-স্ত্রী। ওদের মধ্যে সংসার আছে। বাবা-মা, চাচা-চাচি, ভাই-ভাবী রাতে পাশাপাশি ঘুমায়। তাবাচ্ছুমের সাথে রাতে ঘুমানোর কথা ভাবতাম কল্পনার জগতে। আর কথা সাজাতাম। বেকার তো শুয়ে থাকা যায় না! কথা সাজাতাম— কি কথা বলবো। বাড়ির পাশেই বিস্তির্ণ মাঠ। শুকলার মাঠ। তার পাশ দিয়ে রাস্তা বয়ে গেছে। নতুন মাটি তুলেছে রাস্তায়। রাস্তার সেই ঢালু দিয়ে দৌড়ে নেমেছি। আর মনে মনে কল্পনা করেছি সামনেই বোধ হয় তাবাচ্ছুম দাঁড়িয়ে আমার জন্য। শুক্রবার বিকালে বিটিভিতে সিনেমা দেখা তখন আমাদের একমাত্র বিনোদন। বিনোদন শুধু বিনোদন নয়। তার কল্যাণে অনেক অঙ্গ-ভঙ্গিমা শিখে নিয়েছি। নায়কের সাথে নায়িকার দেখা হলে হাত দুখানি যে আবেদনে সামনে থাকে, তেমনিভাবে হাত উঠিয়ে ঢালু থেকে দৌড় দিতাম। আবার ওঠা, আবার দৌড়ে নামা।

শুধু তাই না। রাতে তাবাচ্ছুমকে পাশে ভেবে নিয়ে ঘুমিয়েছিও। শ্রাবণের রাত। ছম ছম বৃষ্টি পড়ছে মাটির টালি-ছাউনি চালে। বৃষ্টি অঝরে ঝরেই চলেছে। ঈষৎ শীতে কাথাটা টেনে নিয়েছি, তখনও আমি স্বপ্নে বিভোর। ভীষণ বৃষ্টি। দুজনে হাত ধরাধরি করে ছুটছি। অনেক অনেক দূরে। একা একা এতো দূরে আসার সাহস আমার নেই। কিন্তু আজ কোন খেয়ালে চলে এসেছি। তাবাচ্ছুম পাশে থাকলে আরো আরো দূরে চলে যেতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কারণ আমি জেনে গেছি ও আমাকে ঠিক ঠিক বাড়ি পৌঁছে দেবে। আমার থেকে গ্রামকে গ্রাম ওর বেশি জানা। বয়সটাও হয়তো একটু বেশিই হবে। আমার চেয়ে শারীরিক অবয়বে একটু বাড়ন্ত যেনো। ক্লাস থ্রিতে এসে ভর্তি হয়েছে অল্পদিন আগে। সবার সাথে ভাব হওয়ার আগেই আমার সাথে খাতির জমে গেছে। আমাদের বাড়িতে আসে প্রায়ই। মায়ের সাথে বেশি খাতির। আমিও যাই ওদের বাড়িতে। তাই নিয়ে বন্ধুদের কতো শেষ বিদ্রুপ। আমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। অনেক বড়ো ক্লাসের ভাইরা এসে ওর কথা জানতে চায়। আমার কদর বাড়ে। আমি ওর সকল খবর দিয়ে দিই। সকল আসা যাওয়া, সকল ভালো লাগা জেনে যায় সবাই। থেকে যায় শুধু তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে খোলা মাঠে দৌড়ানো। সাদা সাদা একাকার পানিতে থপাস থপাস করে পা ফেলা। মাঝে মধ্যে ভেজা অথচ শক্ত মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া আর খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়া। মাটি খুঁড়ে কুয়ো বানানো। কোমর পানিতে নেমে বুড়বুড়ি হাওয়ায় প্যান্ট ফোলানো। দুজনের প্যান্ট ফুলে উঠলে হাঁটু ভাজ করে কিছুক্ষণ জলে ভাসতে থাকি। রাজ হাঁসের মতো। জলের উপরে ওর ফুলে ওঠা শ্যালোয়ার ঠিক পাশের জমিতে জেগে থাকা দুটি ঘাসের ঢিবির মতো। তার ঠিক উপরে আরো দুটি ছোট্ট ঢিবি ভেজা কামিজের নিচে। সেদিকে দেখে জলের নীচে তার আর আমার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য কল্পনা করি। এরই মধ্যে পানিতে সহচরীর অজান্তে বৃষ্টির গরম জলে আরো কিছু কুসুম-গরম জল মিশিয়ে দিই। তখন আরো বেশি করে হাসি। যেনো ও বুঝতে না পারে কিছু। মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে পাশে শুয়ে থাকা দাদীমার একলা বকুনিতে। তখনও বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। ঝম ঝম আওয়াজ মাথার উপরে। শো শো শব্দ উঠানে গাছের ডালে। বিছানাটা ভেজা ছপছপে। চালের টালি একটা ভাঙা ছিলো। বাবার মেরামত করার কথা ছিলো। করেননি বোধ হয়। দেখি আমি উলঙ্গ হয়ে আছি। একটু আগেও প্যান্ট পরা ছিলাম। তাবাচ্ছুম আমার সাথে ছিলো। উলঙ্গ অবস্থায় কোনো মেয়েকে পাশে কল্পনা করতে ভীষণ লজ্জা লাগে।

তবু ওকে সে জগত থেকে মুক্তি দিতে পারি না। হঠাৎ হঠাৎ তাবাচ্ছুমকে দেখে চমকে উঠি। বিদ্যুৎ শিহরণের মতো। কথা বলতে গিয়ে থেমে যাই। ও-ই এসে প্রথম কথা বলে। হাসাহাসি হয়। তারপর হাত ধরা-ধরি করে ছুট দিই। শ্যামা ঘাসগুলো পায়ের তলে মুড়িয়ে পড়ে। পেছনে এসে তাবাচ্ছুম সেগুলো সোজা করে দেয়। আবার দৌড়াই। বইচি গাছ আমাদের উদ্দেশ্য। কামিজের কুচি ভর্তি করে পাকা কালো কুচকুচে বইচি পাড়ি। খোলা মাঠে খেজুর গাছের সারি যেখানে ঘনছায়া সৃষ্টি করেছে সেই আইলে বসি। দুজনে বইচি ফল খাই। কথা হয়– কাল সকাল সকাল স্কুলে যাবো।

একদিন শীতের সন্ধ্যায় দাদীমা হঠাৎই যেনো সবজান্তা-বুড়ি বনে গেলো। সবার বয়স শুনে বলে দিতে লাগলো— কার জোড় দুনিয়ায় এসেছে, আর কার আসে নি। আমার বয়স ১০। আমার জোড় আসেনি। তাবাচ্ছুমের বয়স ১০, ওর জোড় এসেছে। অদ্ভুত। ব্যাচ্, তাবাচ্ছুমের জোড় আমি নই। বাদ গেলো আমার কল্পনার জগত থেকে। তবু ‘ক্যান, দাদীমা, আমার বয়েসও ১০ তাবাচ্ছুমিরও ১০, ওর জোড় হলি আমার অবে না ক্যান্?’ দাদীমা উত্তর দেয়, ‘বড়ো হ সেখন বুঝবি…’

ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…

আমি বড়ো হয়েছি। সেই পুচকে আমি বড়ো হয়েছি। সেলিমের থেকেও অনেক বড়ো। বয়সও ওদের থেকে অনেক বেশি। ওদের মতো দস্যিপনা করতে না পেরেই ওদের বয়স ছাড়িয়ে গেছি। শহরে কারা যেনো কি একটা নিয়ে গণ্ডগোল করেছে। আমাদের কান পর্যন্ত সে খবর আসে না। ওসব বড়োদের ব্যাপার। তারপর থেকে একে অপরের মুখ দেখাদেখি নেই। থেমে গেলো সেলিমদের সেই মজা-মস্তি, দল বেঁধে পাড়া মাতামাতি। সেলিম এখন নসিমন চালায়, মোহন নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করে, জসিম ঢাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আর বাঁধন মোড়ে দোকান দিয়েছে। এতো কিছু দেখতে দেখতে আমি বড়ো হয়েছি। বড়ো আপার বিয়ে হলো। শুকলার মাঠে গভীর রাতে অহিদুল ভাইয়ের বাঁশি থেমে গেলো। জোসনা রাতে বাড়ির আঙিনায় গানের আসর ভঙ্গ হলো। আহা, অহিদুল ভাই, পরম-পুরুষ, তুমি জানতেই পারলে না শুধু বড়ো আপা নয়, আমিও কতো ভালোবেসেছিলাম তোমাকে? সেই যে গ্রাম ছাড়লে আর এলে না! যদি সেদিন জানতাম, আমি ছোট বলে বড়ো আপার বিয়ের ব্যাপারে আমার কথা অগ্রাহ্য, তাহলে আমি বড়ো হয়েই জন্মানোর কামনা করতাম।

কিন্তু এখন আমি বড়ো। বাবা বলে, ‘তুই যথেষ্ট বড়ো হয়েছিস, একটু আয় রোজগার কর, আর কতোকাল বসে বসে থাকবি?’ আমি যাত্রার অভিনেতা হতে পারিনি। তবু অভিনয় করে যাচ্ছি নিরন্তর। বাবার মতো প্রধান সেনাপতি হয়ে রাজার কল্যাণে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। বাবার রাজ্যের রাজা কৃতজ্ঞ ছিলো। আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করি তার মালিক আমাকে কুর্নিশ করে না।

আমি বড়ো হয়েছি। শেফালি দিদিকে ধিক্কার শুনতে শুনতে গ্রামছাড়া হতে দেখে বড়ো হয়েছি। শুনেছি শহরে কোন দোকানে নাকি কাজ করে শেফালি দিদি। শহরে গেলেই একবার সেনাবাজার, একবার বউ-বাজার, একবার নিউ মার্কেট, ঘুরে ঘুরে দেখি। কোনো বাজারে তাকে খুঁজে পাই না। জানি না কোন্ পুরোনো বাজারে তুমি দোকানদারী করো! দিদি, তুমি কি আমাকে খোঁজো কোনো দিন!

তাবাচ্ছুমের বিয়ে হয়ে গেলো এক ব্যাংকারের সাথে। পর পর দুই বছরে দুটি বাচ্চা হলো। ওদের সংসার এখন ফুটফুটে। তখন আমি মাত্র ১৫তে। আজ যখন অফিস থেকে ফিরছিলাম ইচ্ছে করছিলো ওদের বাড়িতে একবার যাই। দেখে আসি ওর ফুটফুটে সংসার। বাড়ির গেট থেকে ফিরে আসতে হলো। সেই শ্যামা ঘাসের মাঠ পেরিয়ে বইচি খাওয়ার দিন, সেই কোমর পানিতে রাজ হাঁসের মতো ভেসে থাকার দিন কী আর আছে!

হ্যাঁ, এখন আমি যথেষ্ট বড়ো। আমি বুঝতে শিখেছি কেনো বিলাসী পিসি বাবাকে অর্জুন দা বলে ডাকতো। আর যে মা গান শোনার জন্য অহিদুল ভাইকে রোজ খবর পাঠাতো সেই মা কেনো যাত্রায় গেলে বাবাকে বকতেন। আহা রে যাত্রাপালা! গাঁয়ের যাত্রা আজ থেমে গেছে। মাতব্বরেরা বিলাসী পিসিকে কতো রকম গালি দিয়ে গ্রামছাড়া করলো! বাবাকে শাসিয়ে গেলো। আমার চোখের সামনে, বাবা স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আর কোনোদিন তাঁর যাত্রায় অভিনয় করা হয়নি। কার জন্য কেনো কিভাবে ক্রমে ধ্বংস হলো আমাদের লোক-উৎসব—আমি সব জেনে গেছি। শুধু বুঝতে পারি নি দাদীমার কথা। দাদীমা মারা গেলো! কাকে গিয়ে বলবো— ‘দেখো, আমার বয়স এখন ২৫। এখনও আমার জোড়া আসে নি দুনিয়ায়। বাঁশবাগানে, যেখানে দাদীমা ঘুমিয়ে আছে, সেখান থেকে হয়তো অস্ফূট স্বরে বার্তা আসে— ‘হ্যাঁরে, তোর জোড় দুনিয়ায় আয়ছে রে। সে আসলো, তাইতো আমার চলে আসতি অলো। তুই তারে খুঁজে নে। এমনি এমনিই সে কি তোর ঘরে চলে আসবে রে বুদ্ধু!’

আমি সে বার্তা শুনতে পাই না…


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা