বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

ধা রা বা হি ক   র চ না             

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

সংগীতের সমাজতত্ত্ব-৩

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

————————————————————————————-

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ্য করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। — চিহ্ন সম্পাদক]

হার্বাট স্পেনসার (১৮২০-১৯০৩)

ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে বিবর্তন তত্ত্বের প্রাধান্য লক্ষণীয়। ডারউইনের ঞযব ঙৎরমরহ ড়ভ ঝঢ়বপরবং প্রকাশিত হলো ১৮৫৯ সালে। জীব-জগতের বিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর এই তত্ত্ব প্রচলিত সমস্ত জ্ঞানের ধারণা বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসলো। হার্বাট স্পেনসার তার বিবর্তনবাদের দ্বারা প্রভাবিত কিনা সে প্রশ্নে না গিয়েও এ ধারণা করা সম্ভব যে, স্পেন্সারের চিন্তা সামজিক বিবর্তনবাদের সূচনা করে। তিনি বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কারকে সংযুক্ত করে ক্রমান্বয়ে সামাজিক বিকাশের তত্ত্ব প্রদান করেন।  এক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে অগ্রগণ্য। তাঁর গ্রন্থসমূহের মধ্যে দেখা যায় দশ ভলিউমের System of Synthetic Philosophy (1862-1896) (১৮৬২-১৮৯৬)।  এছাড়াও তিনি লেখেন Social Statics (১৮৫১), Principle of  Sociology (১৮৬১)  Study of Sociology (১৮৭৩), এবং Facts and Comments (1902)|

বস্তুর বিকাশ ও বিনাশের উত্তর তিনি খুঁজে পান পদার্থবিজ্ঞানের যে তিনটি সূত্রের মাঝে, তারই আলোকে তিনি প্রয়াসী হন সমাজ বিবর্তনের প্রক্রিয়া উপস্থাপনে। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র হচ্ছে : (ক) বস্তুর অবিনাশিতা (indestructibility of matter); (খ) গতির অবিচ্ছেদ্যতা (continuity of motion); (গ) শক্তির অক্ষুণতা (persistence of force)। স্পেনসারের মতে এ তিনটি মৌলিক সূত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে :

১) শক্তিসমূহের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বিরাজমান থাকে, কেননা শক্তির উদ্ভবের জন্য যেমন অস্তিত্বশীল বস্তুর প্রয়োজন, সেরূপ শক্তি কখনো অস্তিত্বহীনরূপে বিনষ্ট হয় না।

২) শক্তির রূপান্তর ঘটে মাত্র, কিন্তু বিলুপ্তি ঘটে না।

৩) বস্তুর গতি প্রতিবন্ধকতার পথ পরিহারে সক্রিয় থাকে।

৪) গতির মাঝে এক অদৃশ্য দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল থাকে, যা তাদের মধ্যকার শৃঙ্খলা সুসংহত রাখে।

স্পেনসার সমাজ বিকাশের কতগুলো ধাপ উল্লেখ করেছেন যা তাঁর সামাজিক ডারউইনবাদ বোঝার জন্য জরুরি। যেমন :

১. পরিধির বিস্তার : প্রথমে মানুষের ভুবন ছিল নিজেকে কেন্দ্র করে। ক্রমান্বয়ে এই আত্মকেন্দ্রিক জগৎ বিস্তারলাভ করে। ধীরে ধীরে পত্তন ঘটায় জনবসতির, গোষ্ঠী চেতনার, গোত্র চেতনার এবং জাতীয়তাবোধের, রাষ্ট্রের এবং বিশ্বভাতৃত্বের।

২. সংবদ্ধতা : বৈসাদৃশ্য ধীরে ধীরে পরিবৃদ্ধি ও সংবদ্ধতা বয়ে আনে। আদিম যাযাবর গোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্ধন তেমন ছিল না। পরে বিক্ষিপ্ত গোষ্ঠীসমূহ একত্রিত হয়ে সংবদ্ধ গোত্রে পরিণত হলো, রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটলো এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠলো। এভাবেই পারষ্পরিক নিরাপত্তার বেষ্টনী, পারষ্পরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক বন্ধন সার্বিকভাবে সংবদ্ধতার সৃষ্টি করলো।

৩. সুনির্দিষ্টতা : খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতি থেকে খাদ্য উৎপাদনের অর্থনীতিতে উত্থান ঘটে। মানুষ যাযাবরী মনোবৃত্তি পরিত্যাগ করে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। ধীরে ধীরে প্রতিটি সমাজ সুস্থির ও সুনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। অস্পষ্ট বিধি-বিধানের মধ্য থেকে বের হয়ে এসে আইনের আশ্রয় নেয়। যদিও আইন প্রণয়নের আগে দীর্ঘ দিন ‘প্রথা’ চালু ছিল। এখনও আইনের পাশাপাশি ‘প্রথা’র প্রচলন দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। এই স্বরূপে অধিষ্ঠিত হওয়াকেই সুনির্দিষ্টতা বলা হয়েছে।

৪. বহুরূপতা : বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তির সাথে সাথে জীবন যাপনের ও পেশাগত জীবনের বিভিন্নতা আসে। এই বহুরূপতা তাত্ত্বিকভাবে বিশৃঙ্খল ধারণা দিলেও আদতে তা সমাজের স্বার্থকেই কাজ করে।

বস্তু, গতি, ও শক্তির সমন্বয়ে সৃষ্ট বস্তু জগতের মতো উপরিউক্ত ধারণাগুলো অতিক্রমণের মধ্য দিয়ে সমাজ সাদৃশ্যের বিলুপ্তি ঘটায়  উপাদানসমুহের পরিবৃদ্ধি ঘটায়  বিভিন্ন উপাদানসমুহের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অর্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি করে  এতে করে অন্তর্গত শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য শক্তিশালী হয়। যেমন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী, শ্রেণী, নিজস্ব কার্যকলাপ সম্পাদনে ও সার্বিক ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, স্পেনসারের মতে, এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে একত্রকরণ (integration),পৃথকীকরণ (differentiation)), নিয়মানুগ নিয়ন্ত্রণ (determination)  বলা যায়।

সংগীত সম্পর্কীয় তার চিন্তা ও রচনা সংক্ষিপ্ত হলেও তাৎপর্যহীন নয়। Undoubtedly, Spencer’s major sociological interests in music were its origin,… and its evolution since its origin. Both were to prove to be influential. Spencer’s 1857 essay on the origin of music also initiated a debate that is not unimportant in the history of aesthetics, for its claims were, as we shall see, inly countered by, amongst others, Darwin, Edmund Gurney, Ernest Newman and Richard Wallaschek.[i]

দি ইকোনমিষ্ট পত্রিকায় কাজ করবার সময় তিনি অপেরা, প্রদর্শনী ও কনসার্টগুলোতে যেতেন এবং বলতে গেলে এসময়েই সংগীত সম্পর্কে তার আগ্রহ জন্মায়। এসময় তিনি লেখক হিসেবেও নিজেকে তৈরি করার সুযোগ খোঁজেন। সংগীতের প্রশ্নে যদিও তার আগ্রহ আনুষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা থেকে উদ্বুদ্ধ নয়, বরং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে পরিপুষ্ট। সুতরাং সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পেনসার খুব গভীরে যাবার সুযোগ পাননি। তবে বিষয়গুলি সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্দীপনাময় বক্তব্য রাখেন। যেমন, সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি Fraser’s Magazine[ii]– -এ নিয়মিত লেখালেখি করেন। এছাড়া, ফ্যাক্টস এন্ড কমেন্টস গ্রন্থেও কিছু প্রান্তিক মন্তব্য করেন। ১৮৫৭ সালের Fraser’s Magazine[iii]– রচনায় তিনি এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সংগীত উৎপত্তিগতভাবে এবং স্বকীয়ভাবে কন্ঠ-নিঃসৃত এবং সেকারণেই স্বরযন্ত্রের ব্যবহার এখানে অত্যন্ত মৌলিক অবদান রাখে।  তিনি বলেন, Vocal sounds are produced by the agency of certain muscles. These muscles, in common with those of the body at large, are excited to contraction by measurable and painful feelings. And therefore it is that feelings demonstrate themselves in sounds as well as in movement.[iv]

স্পেন্সারের কাছে কন্ঠের বৈচিত্র্য হলো অনুভূতির পার্থক্যের শারীরিক ফলাফল। সুতরাং মৌখিক অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই মানসিক ও মাংসপেশীর উদ্দীপনার মধ্যকার সম্পর্ক জানতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি কন্ঠস্বরকে গুণাগুণ, উচ্চগ্রাম-লঘুগ্রাম, বিরতি এবং পরিবর্তনের হার হিসেবে পার্থক্য করেছেন। পরবর্তীকালে স্পেনসার মনে করেন, সংগীতের উৎপত্তি সংক্রান্ত তত্ত্ব প্রদানের মতো যথেষ্ঠ উপাত্ত তার কাছে আছে। তিনি মনে করেন Vocal peculiarities which indicate excited feelings are those which especially distinguished song from ordinary speech. Every one of the alterations of voice which we have found to be a physiological result of pain or pleasure is carried to an extreme in vocal music.[i]

এই ‘এক্সট্রিম ফিলিংস’র ভুমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, In respect allied of loudness, timbre, pitch, intervals, and rate of variation, song employs and exaggerates the natural language of the emotions; it arises from a systematic combination of those vocal peculiarities which are physiological effects of acute pleasure and pain.[ii]  পরবর্তীতে স্পেনসার তার এধরনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, উচ্চকিত উচ্চারণ থেকেই সংগীতের জন্ম। তিনি বলেন, The whole argument of the essay is to show that it from this emotional element of speech that music is evolved.[iii] Spencer would say that the creative energy of the primitive man is paralled with the noisy activity of children and animas, and with the instinctive habit people have of humming or singing when at work. It is “the raised feeling” that “prompts vocal movements of any and every kind, just as, when very strong, it promts irregular dancing about”.[iv]

স্পেনসার একথাও বলেন যে, কন্ঠসংগীত আবেগাপ্লুত বক্তব্যের চেয়ে আলাদা। এটি ক্রমবিকশিত ও সন্তর্পনে বিকশিত। তবে কিছুটা হেয়ালীপূর্ণ হয়ে দাড়ায় যখন স্পেনসার আবার বলেন, সংগীত আবেগাপ্লুত মানবীয় কন্ঠস্বরে ধ্বনির পর্দার পরিবর্তন আনা (modulation)থেকে উত্থিত। অফার অবশ্য স্পেন্সারের প্রথম লেখাটি আরো গভীরভাবে বিবেচনার যুক্তি দেখান। তিনি বলেন, সংগীত বিশেষভাবে একটি মানবীয় প্রপঞ্চ। স্পেন্সারের বক্তব্য এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, That music is a product of civilization is manifest: for though some of the lowest savages have their dance-chants, these are of a kind scarcely to be signified by the title musical: at most they supply but the vaguest rudiment of music properly so called.[v]

ডারউইন এবং গারনি’র বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্পেনসার বিস্তৃতভাবে সংগীতের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার বিবর্তনতত্ত্বের আলোকে সংগীতের সাধারণ বিবর্তন সূত্রকে ক্রমাগত বৈসাদৃশ্যের দিকে ধাবমান। আবেগ সাধারণত মাংসপেশী সংকোচন ঘটায়। এটি শ্বাসক্রিয়া ও স্বরযন্ত্রের সংকোচনও ঘটায়। এভাবে আবেগÑ সঞ্চারিত শব্দের উচ্চারণ স্বরযন্ত্র ও কন্ঠসংগীকে বিশিষ্টতা প্রদান করে। বিবর্তনের ধারা যেহেতু সরল থেকে জটিলতার দিকে ধাবমান এবং সমসত্ততা (homogeneity) থেকে অসমসত্ততা (heterogeneity) দিকে ধাবমান, সেকারণে আদিম বাদ্যসংগীত থেকে আজকের সংগীত অনেক সূক্ষ্ম ও  বৈচিত্র্যপূর্ণ। এসময় ডারউইন সংগীত সম্পর্কে তার বক্তব্য উত্থাপন করে আসছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে সংগীতের পেছনে ক্রিয়াশীল আবেগকে সাধারণ না বলে যৌনতাধর্মী বলছেন। অবশ্য স্পেনসার পাশবিক ইন্দ্রীয়জ শব্দ থেকে মানবীয় আবেগ-নিসৃত শব্দকে আলাদা করতে গিয়ে ডারউইনের এমন সাধারণ মত গ্রহণ করতে পারেননি।

সংগীতের সাথে সাথে হারমোনি সম্পর্কেও তিনি আলোকপাত করেন। তার মতে হারমোনি বিবর্তনের ফলাফল নয়। আবেগের প্রাকৃতিক ভাষার সঙ্গে একে সংযুক্ত করা ঠিক হবে না। হারমনির মধ্যে একাধিক সুরের সংমিশ্রণ ঘটে। সুতরাং, একে মেলোডির বিবর্তিত ফলাফল বলা যায় না। বিবর্তনের প্রতিটি ধারার মধ্যে অতিক্রমনের সুনির্দিষ্ট স্তর থাকে। হারমোনি পর্যবেক্ষণ করলে তার বিবর্তনের কোন স্তর-অতিক্রমণের ধারা লক্ষ করা যায় না। মেলোডির সাথে হারমোনিকে তাই এক করে ভাবার তেমন কোনো কারণ নেই।

সংগীতের ক্রিয়া এবং শতাব্দিব্যাপী এর প্রবণতা এবং সংগীত সংকলনের সমালোচনাও স্পেন্সারের আলোচনায় এসেছে। সংগীতের ক্রিয়া বলতে তিনি সংগীত-নিসৃত আনন্দের গভীরে প্রবেশ করেন। সাধারণভাবে সংগীত আমাদের বক্তব্যকে আশ্রয় করে আবেগকে ত্বরান্বিত করে। সেদিক থেকে সংগীতকে সমবেদনার আধার বলা যায়। সংগীতকে তিনি শিল্পের অত্যুঙ্গমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করেন, যে পর্যায়ে শিল্পের অন্যান্য শাখার উত্থান সম্ভব হয়নি। তার মতে, The primary purpose of music is neither instruction nor culture but pleasure; and this is an all-sufficient purpose.[vi]

তিনি সংগীতের অনেকগুলো বিভক্তির উল্লেখ করেন। যেমন, কন্ঠ সংগীত, যন্ত্র সংগীত এবং কন্ঠ সংগীতের অনুবিভাগ (চ্যান্ট, মোটেট, এবং এনথেম)। এখানে উল্লেখ্য যে, বিবর্তন হলো বস্তুর সংহতি এবং একই সাথে গতির স্তিমিতি; এসময় বস্তু আপেক্ষিকভাবে অনির্দিষ্ট, অসংবদ্ধ, ও সমসত্ততা থেকে অপেক্ষাকৃত সুনির্দিষ্ট, সুসংবদ্ধ অসমসত্ততার দিকে অগ্রসরমান; এই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি গতিরও একটি সমান্তরাল রূপান্তর ঘটে। [Evolution is an integration of matter and concomitant dissipation of motion; during which the matter passes from a relatively indefinite, incoherent homogeneity to a relatively definite, coherent, hitaroginity; and during which the retained motion undergoes a parallel transformation.][vii]

সংগীত সমালোচনার ক্ষেত্রে স্পেন্সারের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ববাহী। যদিও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পত্রিকার জন্য সে অপেরা ও সংগীতায়োজনসমূহে উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু অতিমাত্রায় প্রত্যক্ষবাদী দর্শন, বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা ও নিজস্ব ভাষাশৈলীর কারণে সে সব সমালোচনাসমূহ তেমন সমাদর পায়নি। এসব কারণে স্পেন্সারের সংগীত সমালোচনা সংগীতায়োজনসমূহের সরলীকৃত সমাজপাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জনৈক উইলিয়াম জেমস তার সংগীত সমালোচনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন : In all his dealings with the art products of mankind he manifests the same curious dryness and mechanical literality of judgement.[viii]

আসলে ঊনিশ শতকে বিবর্তনবাদী চিন্তা তিনভাবে সংগীতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করে। এর একটি হলো সংগীত সংকলকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা, সংগীতের বিকাশে বিবর্তনধারার ব্যাখ্যা এবং সংগীতের প্রশ্নে স্পেনসারীয় বিবর্তনবাদের প্রভাব। বৃটেনের সংগীতের বিকাশের ঐতিহাসিকতার বিচারে স্পেন্সারের প্রভাব নিঃসন্দেহে ব্যাপক। তবে অন্যান্য লেখকদের প্রভাব স্পেন্সারের তত্ত্বকে অনেকটা খাটো করে দেয়। ১৮৭০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে স্পেন্সারের বিবর্তন তত্ত্ব যথেষ্ট উচ্চতা অর্জন করে। কিন্তু পরবর্তীতে তা ক্রমাগত নিম্নগামী হতে থাকে। পরবর্তীতে অনেক তাত্ত্বিক আসেন যাদের অবদান নিঃসন্দেহে স্পেন্সারের তুলনায় সুসংহত। যেমন, ঞযব ঊাড়ষঁঃরড়হ ড়ভ ঃযব অৎঃ ড়ভ গঁংরপ এমন একটি গ্রন্থ যা ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং এই গ্রন্থে প্যারি যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেন। প্যারি তার গ্রন্থে স্পেন্সারের সংগীত বিষয়ক বিবর্তন তত্ত্বের আলোচনা করেন। তিনি বলেন, স্পেন্সারের প্রগতি ও বিবর্তন সম্পর্কীয় তত্ত্ব সংগীতের ইতিহাসকারদের কিছুটা সমাধান দিলেও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হবার মতো যথেষ্ট যুক্তি সেখানে ছিল না।

তিনি সরাসরি স্পেন্সারের এমন ধারণা নাকচ করে দেন যে, সংগীত উজ্জীবিত বক্তব্য থেকে উৎসারিত। তিনি অবশ্য মনে করেন বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে সংগীতকে একটি জীবদেহ হিসেবে ভাবতে হবে। তিনি স্পেন্সারের বিবর্তনবাদের সরলতা থেকে জটিলতার দিকে অগ্রসর হবার বিষয়টি প্রশংসা সহকারে উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, অপরিপক্ব অবস্থায় কোনো জিনিস সমধর্মী হয় এবং ক্রমাগত বৈচিত্র্য ও নির্দিষ্টতার দিকে অগ্রসর হয়। সুতরাং সংগীতও সেরকম ক্রমাগত বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত হয়েছে, কিন্তু সাথে সাথে নিজ নিজ শাখায় সংগীত সুনির্দিষ্ট ও সংহত হয়েছে। সংক্ষেপে প্যারির মূল্যায়নকে এভাবে উল্লেখ করা যায় যে,

১. সংগীত অন্যান্য জীবদেহের মতোই নিজেকে সৃষ্টি করে, ২. সংগীতের অন্তর্নিহিত বিভিন্ন ধারাগুলো প্রথমে সংবদ্ধ থাকে, ৩. এই সংবদ্ধ বা একত্রিত রূপকে অবিকশিত সমধর্মিতা বলা যায়, ৪. প্রগতিশীল বিবর্তন

সংগীতসহ সমস্ত শিল্পকলাকে ধীরে ধীরে সুনির্দিষ্ট ও পরিচ্ছন্ন রূপ প্রদান করে। পার্সি কার্টার বাক তার ঞযব ঝপড়ঢ়ব ড়ভ গঁংরপ (১৯২৪) গ্রন্থে বলেন, ডারউইন যেখানে শিল্পের উৎপত্তির সাথে যৌনতাকে সংশ্লিষ্ট করেছেন, স্পেনসার সেখানে বাক্যের স্বতঃস্ফুর্ত নতুনতর পুনরুৎপাদনকে দায়ী করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হার্বাট স্পেনসারের সংগীত বিষয়ক চিন্তাধারা প্রসঙ্গে তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন – ‘হার্বাট স্পেন্সরের একটা লেখার মধ্যে পড়িয়াছিলাম যে, সচরাচর কথার মধ্যে যেখানে একটু হৃদয়াবেগের সঞ্চার হয় সেখানে আপনিই কিছু না কিছু সুর লাগিয়া যায়। বস্তুত, রাগ দুঃখ আনন্দ বিষ্ময় আমরা কেবলমাত্র কথা দিয়া প্রকাশ করি না, কথার সঙ্গে সুর থাকে। এই কথাবার্তার আনুষাঙ্গিক সুরটারই উৎকর্ষসাধন করিয়া মানুষ সংগীত পাইয়াছে। স্পেন্সরের এই কথাটা মনে লাগিয়াছিল। ভাবিয়াছিলাম এই মত অনুসারে আগাগোড়া সুর করিয়া নানা ভাবকে গানের ভিতর দিয়া প্রকাশ করিয়া অভিনয় করিয়া গেলে চলিবে না কেন। আমাদের দেশে কথকতায় কতকটা এই চেষ্টা আছে; তাহাতে বাক্য মাঝে মাঝে সুরকে আশ্রয় করে, অথচ তাহা তালমানসংগত রীতিমত সংগীত নহে। ছন্দ হিসাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ যেমন, গান হিসাবে এও সেইরূপ; ইহাতে তালের কড়াক্কড় বাঁধন নাই, একটা লয়ের মাত্রা আছে; ইহার একমাত্র উদ্দেশ্য, কথার ভিতরকার ভাবাবেগকে পরিস্ফুট করিয়া তোলা, কোনো বিশেষ রাগিনী বা তালকে বিশুদ্ধ করিয়া প্রকাশ করা নহে।’

১) মহাযুদ্ধদ্বয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে স্পেন্সার ও অন্য লেখকদের সংগীত সম্পর্কীয় উৎপত্তিতত্ত্ব প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে তাদের আলোচনা সংগীতবিষয়ক অনুসন্ধিৎসাকে উৎসাহিত করেছে নিঃসন্দেহে।

২) পঞ্চাশের দশকে এমন ধারণা পোষণ করা হয় যে, সংগীত বিবর্তিত হয়নি বরং মানুষ বিভিন্ন ধরনের সংগীত তৈরী করেছে।

৩) তবে সমাজবিজ্ঞানে সংগীতের বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা আজও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়।

৪) হারমোনির উৎপত্তি সংক্রান্ত স্পেন্সারের ধারণা তার সংগীতের উৎপত্তিসংক্রান্ত বিবর্তন তত্ত্বকে খাটো করেছে।

৫) স্পেন্সারের বক্তব্য সংগীতের সমাজতত্ত্ব ও সংগীতের জীবতত্ত্বের মধ্যে একধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, যার কারণে কন্ঠস্বরের জীবতাত্ত্বিক বিকাশ ও সংস্কৃতিগত উৎকর্ষ অস্পষ্টতার দোষে দুষ্ট হয়েছে।

৬) তবে কেউ কেউ মনে করেন কন্ঠস্বরের বিকাশের ব্যাপারটি মূলতঃ ভাষা ও শারীরতত্ত্ব ও পদাথবিজ্ঞানের বিষয়। শিল্পের এখানে তেমন কোন ভূমিকা নেই।

৭) সংগীতের উৎপত্তিকে সমাজতাত্ত্বিকভাবে বিচার করার ক্ষেত্রে সামাজিক বিভিন্ন উপাদানকে সন্নিহিত করার প্রশ্নে স্পেনসার সরলীকরণের আশ্রয় নেন। সে কারণে স্পেন্সারের শিল্প বিষয়ক রচনা একপেশে, শুষ্ক ও যান্ত্রিক হয়ে দাড়িয়েছে।

৮) ‘মানবিক সংগীত’ প্রত্যয়টি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অন্য ধরনের সংগীতের অস্তিত্বের দিকে ইংগিত করা হয়েছে। এমন ধারণা বা ইংগিত স্পেন্সারের বক্তব্যকে জটিল করে। বরং সংগীত বলতে এমন ধারণাই যুক্তিযুক্ত : By ‘music’, we always understand a musical composition or at least its reproduction, that is to say, a consciously designed and constructed work of art.[i] But more than that, he [Spencer] he extended its meaning and application beyond the ream of the organic to all aspects of nature, from the formation of crystals to the birth of stars. Indeed, Darwin himself called Spencer “the great expounder of of the principle of Evolution”[ii] “Relational” and “Sensational” are the terms he (Spencer) uses whenever music is his subject. The sentaional is the purely tonal—the impression made by the sounds as sounds. The relational is the impression made by the composition itself. All Spencer’s complaints and adverse criticisms appear to arise from his objection to the relational being predominant among musicians.

কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩)

মার্কসীয় চিন্তা ও তত্ত্ব শুরু থেকেই সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে একত্রে বিবেচনায় এনেছে। সে কারণেই সংস্কৃতিমনা যে কোন লেখক বা পাঠককে মার্কসীয় বীক্ষণ আকর্ষণ করে। মার্কসের মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর ভিত্তিতে সমাজকাঠামোর বিচার শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, আইন, মতাদর্শ বিষয়ক যাবতীয় চিন্তন ক্ষমতাকে উপরিকাঠামোর ভেতর ফেলেছে। মৌল কাঠামো মূলত উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সমাজের ভিত্তিভূমি। এই ভিত্তিভূমির সাথে উপরি-কাঠামোর সম্পর্ক তাঁর আলোচনায় চমকপ্রদ এক দিকদর্শন প্রদান করে। যে কারণে, সম্ভবত সমাজদর্শনের আলোচনায় মার্কস চির-অপরিত্যাজ্য এক চিন্তাধারার সূচনা করেছে। উপরিকাঠামো এমনটাই আদর্শিক পরিকাঠামো সৃষ্টি করে বা সৃষ্টি হয় যা মৌল কাঠামোকে স্থিরতা দেবার জন্য সবসময়ই সাহায্য করে। তবে এই সহযোগিতার মধ্যেও এক ধরনের দ্বন্দ্বের উপস্থিতি তিনি আবিষ্কার করেন। যার ফলে মৌলকাঠামোর পরিবর্তন উপরিকাঠামোয় গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর মৌলকাঠামোর মধ্যে উৎপাদন শক্তির বিকাশ উৎপাদন সম্পর্ককে পুনর্বিন্যস্ত করে। যার কারণে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।

সামাজিক বিবর্তনে মৌলকাঠামো বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উপরিকাঠামোর মধ্যেও পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তন কতটা ব্যাপক ও শ্রেণীচরিত্র-নির্ভর তা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও মার্কসের কাছে উপরিকাঠামো সমাজের অভিজন শ্রেণী হাতিয়ার হিসেবেই গণ্য হয়। যে হাতিয়ার অভিজন শ্রেণী সমাজ-শাসনে ও অর্থনৈতিক শোষণে ব্যবহার করে।

এ পর্যায়ে এসে, একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তা হলো, শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের মতো বিষয়গুলো আদৌ কোনো স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও স্বয়ম্ভরতা উপভোগ করে কিনা। এক্ষণে একটি বক্তব্য স্মরণযোগ্য, Marx’s analyses of the commodity and modes of production forms a crucial basis of much recent critical theory, yet music scholars who have increasingly taken an interest in that theory as a means of exploring the cultural role of music at worked with Marx’s ideas primarily in derivative forms. Studies of art music in particular ab retained a humanist suspicion of materialist treatment. But if Marxist perspectives have rarely found their way into music studies, music, too, has figured only marginally in Marxist socialist analyses, even though the first work explicitly linking music and political economy comes from an economist.[i]

তবে একথা সত্য যে মার্কসের আলোচনায় সরাসরি সংগীত সম্পর্কে বিশ্লেষণ পাওয়া না গেলেও তার দর্শন এতটাই সূক্ষèদর্শী যে শিল্পকলার বিশ্লেষণের জন্য একটি পরিক্ষেপ লাভ করা এখানে সম্ভব। উল্লেখ্য যে, অনেকের প্রত্যক্ষ সংগীত বিষয়ক আলোচনা পাওয়া যায় কিন্তু একটি সামগ্রিক পরিক্ষেপ পাওয়া দুষ্কর; সেখানে মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষায় পরিক্ষেপ থেকে অগ্রসর হলে সংগীতের উপর আলোকপাত করা কঠিন হয় না। উপরের উদ্ধৃতির মধ্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে।

Marx and Music (2002)গ্রন্থটির উপযোগিতা সম্পর্কে এর সম্পাদক কোরেশী বলেছেন যে, এ গ্রন্থ সংগীতের মধ্যে সামাজিক, অথবা সামাজিকের মধ্যে সংগীতকে আবিষ্কারের সহায়ক হবে। আজকের দিনে পশ্চিমা সংগীত-বিজ্ঞানীদের মধ্যে জেন্ডার, নরগোষ্ঠী ও শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত করে সাংগীতিক পাণ্ডিত্য বিশ্লেষণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিক ভাবে এধরনের বিশ্লেষণ সংগীতের উপর বিশ্ব পুঁজিবাদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিস্তারকে পরিস্ফুটিত করেছে। কোরেশী তার সম্পাদিত গ্রন্থে চারটি বিশ্লেষণী নির্দেশনার উল্লেখ করেছেন, যা মার্কসীয় সংগীত নির্দেশক অনুসন্ধানের পথ করে দিতে পারে :

১) পণ্যায়ন ও পণ্যপূজার (ফেটিসিজম) সাথে সম্পর্কিত করে সংগীত চিন্তার ভিতর থেকে ‘গবেষণা সমস্যা‘ নির্ধারণ করা।

২)  সংগীতের গীতিময়তা, কাব্যিকতা ও শৈলীপনাকে পুঁজিবাদ কর্তৃক সামাজিকভাবে মোথিত ‘গবেষণা সমস্যা’ হিসেবে দাঁড় করানো।

৩)  সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সংগীত সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ‘গবেষণা সমস্যা’ হিসেবে নির্ধারণ করা।

৪)   সংগীতবিজ্ঞান (musicology) ও সংগীত অনুশীলনের সাথে মার্কসবাদী রাষ্ট্রনীতিকে সম্পর্কিত করে গবেষণা সমস্যা প্রণয়ন।

প্রথমটির ব্যাপারে আলোচনা করতে যেয়ে ডেভিড গ্রামিট  বলেছেন, সংগীত বিষয়ে একাডেমিক মননশীলতা বলতে কি বুঝায়? সংগীতবিজ্ঞানে সংগীত কিভাবে নির্মিত তা জানা আদৌ সম্ভব কি? এ ব্যাপারে একটি উপায় হতে পারে সংগীত শ্রবণ। আসলে সংগীতবিজ্ঞান সংগীতের শ্রবণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সংগীতের অন্য দিকগুলো যেন অদেখা থেকে যায়। এক্ষেত্রে মার্কসের পণ্যের কথা বলা যায়, যা এই পণ্য তৈরীর পিছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্ককে অবগুন্ঠিত করে রাখে। সংগীতের একাডেমিক পর্যালোচনা সংগীতকে বস্তুনিষ্ঠ সত্তা হিসেবে পাণ্ডিত্যপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয় করতে যেয়ে ক্রিয়াশীল মানবীয় ও সামাজিক তাৎপর্যের কথা ভুলে যায়।

তবে মার্কসীয় প্রত্যয়, যেমন, পুনরুৎপাদন, শ্রেণী সম্পর্ক প্রভৃতি ব্যতীত সংগীতের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সংগীতবিজ্ঞানের শাস্ত্রীয় সংজ্ঞায় অনেক সময় সংগীতের বিদ্যায়তনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যেয়ে সংগীত সৃষ্টির সামাজিক উপাদানকে লঘু করতে পারে। সংগীতের মননশীল বিশ্লেষণ বিশ্লেষকের আবেগমূলক সংযুক্তি, ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ও বিষয়ীমূলক উপাদানকে প্রশ্রয় দেবে এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে বলা যায় সংগীতের সাধারণ শ্রবণ ও বিদ্যায়তনিক সমীক্ষায় নন্দনতত্ত্বকে উপেক্ষা করা যায় না। প্রকারান্তরে এরকমটি হলেই কেবল তা শ্রোতা, বোদ্ধা, শিক্ষিত এবং পরিশীলিতের পক্ষে সংগীতের সার্বিক প্রকাশযজ্ঞকে বোঝা সম্ভব।

মোটকথা সঙ্গীতকে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে বলার মধ্যে যেমন নতুনত্ব নেই, সেরকম সাংগীতিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রে, অনেক সময়, এই সামাজিকতাকে দেখতে পায় না। মার্কস তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তত্ত্বায়নে সংগীতকর্মকে সংযুক্ত করেননি।  The piano maker reproduces capital; the pianist only exchanges his labour for revenue. But doesn’t the pianist produce music and satisfy our musical car. Does he not even to certain extent produce the latter? He does indeed; his labour produces something; but that does not make it productive labour in the economic sense; …[ii]

মার্কস পণ্য এবং বিনিময়ের বিশ্লেষণের সাথে নন্দনতত্ত্বের পিছনে অপসৃয়মান সাংগীতিক কর্মকাণ্ডকে তুলনা করবার প্রবণতা তাঁর এই আলোচনায় আনবার প্রয়োজন আছে। এখানে আমরা আবার একবার দেখে নিতে পারি পণ্য বলতে মার্কস কি বুঝিয়েছেন : পণ্য হলো প্রথমত একটি বাহ্যিক বস্তু যা তার গুণাবলী দিয়ে মানুষের প্রয়োজন পরিপূরণ করে। এই প্রয়োজনের প্রকৃতি ক্ষুধা বা কল্পনা যাই হোক না কেন, তা খুব ব্যবধান বুঝায় না। তাছাড়া, কিভাবে প্রয়োজন পরিপূরণ হয়— সরাসরি পরিপোষণের উপায় বা ভোগের সামগ্রী পরোক্ষভাবে উৎপাদনের উপায় হিসেবে।

কিন্তু প্রয়োজন পরিপূরণের ক্ষেত্রে পণ্যের এই ব্যবহার মূল্য মোটকথা একটি দিক। পণ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গুণটি হলো, এটি বিমূর্ত মূল্য ধারণ করে যা অন্য পণ্যের সাথে বিনিময়ের পরিমাণের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। বিনিময় কালে গুণাত্মক মূল্য অদেখা থাকে এবং বিনিময় মূল্য আসলে সব পণ্যের সাধারণ মূল্যকে প্রতিনিধিত্ব করে। শ্রমের দ্বারা তৈরি উৎপন্ন হিসেবেই পণ্যটি প্রতিভাত হয়। কিন্তু বিনিময় মূল্য বিশেষ কোন ধরনের শ্রমকে নির্ণয় করতে পারে না, যদিও বিভিন্ন পণ্য বিভিন্ন ধরনের শ্রমে উৎপাদিত হয়। সুতরাং মূল্য নির্ধারণে মানবীয় শ্রমের বিমূর্ত রূপটি গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য বিষয়ক মার্কসের আলোচনায় গভীরভাবে যে জিনিসটি আসে তা হলো, বস্তুর মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের পুঁজিবাদী বিমূর্তায়ন। পরিমাণের বিমূর্ত শ্রম-মূল্য হিসেবে যখন পণ্যের বিনিময় ঘটে তখন সেই পণ্যের পিছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্ক প্রতিভাত হয় না।

মোটকথা, পণ্য নিজেই একটি মূল্যে পরিণত হয় না, বরং একটি ব্যবহার মূল্য বিনিময় মূল্য অর্জন করে। এ প্রসঙ্গে মার্কসের বক্তব্য : Since the producers do not come into social contact untill they exchange the products of their labour, the specific social characteristics of their private labours appear only within this exchange…. To the producers, therefore, the social relations between their private labours appear as what they are, i.e., they do not appear as direct social relations between persons in their work, but rather as material relations between persons and social relations between things.[i]

গ্রামিট পণ্যের এই চরিত্র বিষয়ক বিশ্লেষণকে আরও সম্প্রসারিত করে সংগীতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। যেহেতু সামাজিক সম্পর্কের অর্থটি পণ্যের চরিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেহেতু অর্থের (সবধহরহম) ব্যাপারটি মননশীল গভীর অনুশীলনে প্রয়োগ করা যায়। সংগীত সম্পাদনের বিষয়টি মার্কসীয় বিবেচনায় উৎপাদনী শ্রম না হলেও সমাজে মানুষ সংগীতকে পণ্যের মতই ভোগ করে আসছে। রেকর্ডকৃত সংগীততো বটেই ‘লাইভ পারফর্মার’-গণ বিভিন্ন অবস্থায় মজুরি শ্রমিক হিসেবেই কাজ করে। বেতনভোগী একাডেমিক ব্যক্তিত্ব একই কায়দায় মজুরি-গ্রহীতা। সংগীত বিষয়ক প্রকাশনা পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখার জন্য রসদ বা উপকরণ হিসেবে কাজ করে। সুতরাং, সরাসরি আর্থিক লাভ না হলেও পেশাগত স্বীকৃতির আদলে এইসব অর্জনকে ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও মননশীল উৎপাদনের চাহিদা যে সাংগীতিক বস্তুকে চায় তার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক উঠে আসে না। অর্থাৎ, যে সামাজিক সম্পর্কের মধ্য থেকে পণ্য হিসেবে সংগীতের উৎপাদন হয়, সেই পণ্যের চাহিদা থাকলেও তার পিছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্কের কোন মূল্য থাকে না। এভাবে আমরা সংগীতের সমাজিক সত্তাকে স্বীকৃতি দিতে ভুলে যাই।

যখন শ্রবণের দৃষ্টিকোণ থেকে নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয় তখন সংগীতকে আমরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলি। যেমন, বিমূর্ত সংগীতকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্থান দিয়ে থাকি এবং দক্ষতা অনুসারে অন্যগুলোকে এর পরের পর্যায়গুলোতে বিবেচনা করি। এভাবেই আমরা শিল্প থেকে শিল্পের দক্ষতা অর্জনকে নিচু স্তরে স্থান দেই। এভাবেই সমাজে সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষার্থীর মর্যাদাগত ব্যবধান স্বীকৃতি পায়। সংগীতের মূল্যায়নে শ্রবণের বহুমুখী সংযুক্তি লক্ষ করা যায়। এক অর্থে সংগীতকারের কাজÑ গুরুত্বপূর্ণ তেমন শ্রবণ ও শ্রোতৃমণ্ডলীও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামিট অবশেষে বলেন, সংগীতবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সংগীত এবং শিক্ষার্থী। যদি বলা হয় সংগীতবিজ্ঞান অবজেক্ট (সংগীত) এবং সাবজেক্ট (পরিশীলিত শ্রোতা) তৈরি করে। এভাবে সংজ্ঞায়িত করার সমস্যা হলো, বস্তুগত পণ্যের বিপরীতে সংগীতকে উপস্থাপন করা। সংগীতবিজ্ঞান উচ্চাঙ্গীয় সংগীত-সংস্কৃতিকে ব্যক্তির ভাবের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। গ্রামিট পরিশেষে বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীত বিভাগসমূহে নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগীত চর্চার ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে, যদিও সেসব বিভাগে পণ্ডিতজন ও অনুশীলনকারীদের অংশগ্রহণের দক্ষতা সমান নাও হতে পারে।

ক্লাপেনহাওয়ার  তাঁর প্রবন্ধ বলেন, ক্যাপিটাল গ্রন্থে মার্কস পুঁজিবাদে কতিপয় বিশেষ ধরনের পণ্যকে ফেটিশিজম হিসাবে উল্লেখ করেন। এটি সহজেই বোধগম্য যে, একটি পণ্যকেন্দ্রিক শাস্ত্র হিসাবে সমকালীন সংগীত-তত্ত্ব এমন কিছু প্রক্রিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যাকে মার্কসের ভাষায় ফেটিশিজম বলা যায়। সংগীতের উপর এই ফেটিশের প্রভাব মতাদর্শিক এবং মনস্তাত্ত্বিক হতে পারে। একারণে ফেটিশের প্রভাব আলোচনার জন্য সমকালীন সংগীতের মতাদর্শিক পরিবেশ জানা দরকার। সংগীতের মধ্যে একে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। মার্কস এবং ফ্রয়েড উভয়ে এই ফেটিশিজম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ক্লাপেনহাওয়ার তাঁর আলোচনা সংগীত-তত্ত্ব, পণ্য, ও ফেটিশিজমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। যেমন, কমোডিটি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি সমাজের সম্পদের মধ্যেই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় বলে মার্কস উল্লেখ করেন।

মার্কস পণ্যের দুটি ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা পুঁজিবাদী সমাজে পণ্যের প্রকৃতিকে বুঝতে সাহায্য করে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই ধরন পণ্য ভেদে সাধারণ, কিন্তু এর দুটি পরষ্পর দ্বান্দ্বিক দিক রয়েছে। প্রথম দিকটি হলো পণ্যের ব্যবহার মূল্য যা পণ্যের গুণাগুণের উপর নির্ভর করে এবং ভোগের উপযোগিতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এই গুণাগুণের উপর নির্ভরশীল। পণ্যের এই ব্যবহার মূল্য প্রাকৃতিক। তবে এটি পণ্য ও পণ্যের ক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এই সম্পর্ককে জানতে হলেও পণ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলী জানা দরকার। অনেক আলোচক ব্যবহার মূল্যের প্রাকৃতিক-ভৌত গুণাবলীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচারে পণ্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।

যাহোক, আমরা এই ‘ব্যবহার মূল্যের’ সামাজিক চরিত্র সম্পর্কে প্রথমে জানার চেষ্টা করি। প্রথমেই যা উল্লেখযোগ্য তা হলো ব্যবহার মূল্যগুণেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও ভোগ্য হয়ে থাকে। সুতরাং ব্যবহার মূল্যের উৎপাদন সমসময় পণ্যের জন্য উৎপাদন হিসেবে চিহ্নিত হয়। একটি পণ্য যখন বিভিন্ন শ্রেণীর লোক ভোগ করে তখন তা পণ্যের মধ্যে ক্রিয়াশীল সামাজিক বৈশিষ্ট্যাবলীকে দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে দেয় না। দ্বিতীয়ত, ব্যবহার মূল্য অবশ্যই এককের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়, বিশেষত, যখন তা অন্য পণ্যের সাথে বিনিময় করা হয়। দেখা যায় একই পণ্যের ব্যবহার মূল্যই সবসময় তার চাহিদা ও ব্যবহারকে নির্ধারন করে না। সুতরাং, এ অর্থে ব্যবহার মূল্য যেমন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলী ধারণ করে সেরকম সামাজিকও বটে। তবে পণ্য সমাজের মানুষকে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক প্রদান করে।

পণ্যের দ্বিতীয় যে ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো বিনিময় মূল্য। বিনিময়মূল্যের মাধ্যমেই পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয়, যেহেতু ব্যবহার মূল্য নিয়েই পণ্যের জন্ম। সুতরাং বিনিময় মূল্যকে বাজার ব্যবহার প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত মূল্য বলে ধরা যায়। (অসমাপ্ত )

টীকা ও তথ্যনির্দেশ

[1]    John Offer, “An Examination of Spencer’s Sociology of Music and its Impact on Music Historiography in Britain”, International Review of the Aesthetics and Sociology of Music, V-14, No-1 (June 1983), pp. 33-52.

[1]    October 1857.

[1]    October 1857.

[1]    Literary Style and Music, p. 49.

[1]    Ibid; p. 49.

[1]    Ibid; p. 50.

[1]    ‘On the Origin of Music’, Mind, Vol.16, 1891, pp. 535-537.

[1]    Eva Mary Grew, Herbert Spencer and Music, The Musical Quarterly, Vol. 14, No. 1 (Jan, 1928) pp. 127-142.

[1]    Literary Style and Music, Watts, London 1950, p. 68.

[1]    Herbert Spencer, ‘The purpose of art’, Facts and Comments, William and Norgate, London, 1902, pp. 31-34.

[1]    Herbart Spencer, First Principles, London; William and Norgate, 1861, p. 358.

[1]    Cited in W Elton edited, ‘Feelings’ in Aesthetics and Language, Basil Blackwell, Oxford, 1954, pp. 56-72.

[1]    Wallaschek 1891

[1]    Cited in Robert L Carneiro, The Influence of Herbert Spencer on the World of Letters, Histories of Anthropologies Annual, Vol 1, 2005, pp. 246-270.

[1]    Allali 1987, cited in R.B. Qureshi, ‘Introduction: Thinking Music Thinking Marx’, Qureshi, Music and Marx: Ideas Practice Politics, Routledge, New York, 2002, P.[GB MÖš’wU †_‡K Avgiv wek`fv‡e mvnvh¨ wb‡qwQ]

[1]    Ibid, pp. 66.

[1]    Ibid pp. 125


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা