বিচিত্র সমাজতত্ত্ব লজ্জার সমাজতত্ত্ব

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব লজ্জার সমাজতত্ত্ব

 

 

[মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক বিষয়ের মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যাপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো।– সম্পাদক]

It highlight she most valuable core of all people who desperately want acceptance, respect and love from other which continually fearing rejection and negative of self. (Scott 2007:5)

Shy people, you might think, can be identified by this visible discomfort in social situations and their inability (or it is unwillingness?) to interact with other people. (Scott 2007:1)

The Oxford English Dictionary (2005) defined shyness as being Easily frightened away; difficult of approach owing to timidity, caution or destruct underlines  the point that this is a society oriented state of mind (cited in Scott 2007:1)
লজ্জাশীলতার সমাজতত্ত্ব লজ্জার মনকেন্দ্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী তত্ত্ব ও প্রয়োগের চেয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের উপর গুরুত্ব দিতে চায়। আমরা লাজুকতাকে ব্যক্তিক সমস্যা হিসেবে দেখে একে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখতে চাই। ম্যাক্রো পর্যায়ের রুটিন আন্তঃক্রিয়ার বদলে ম্যক্রো পর্যায়ের সামাজিক স্থিতির সাথে মিলাতে চাই।
মনোবিজ্ঞানে যেসব অনুমানের উপর নির্ভর করে লজ্জা নিয়ে গবেষণা করা যায়। সেগুলো হলো লজ্জা নিতান্তই একটি মানসিক ধর্ম যা নিয়ে একজন ব্যক্তির যখন তার মধ্যে কিছু দর্শনযোগ্য প্রলক্ষণ দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যক্তির প্রলক্ষণ, আচরণগত দক্ষতার অভাব বা ভ্রান্তিমূলক প্রজ্ঞার বিষয়গুলো জরুরি বিবেচিত হওয়ায় লজ্জাকে একটি ব্যক্তিক আচরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ও সংশোধনের চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আর এমন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে লজ্জার সামাজিক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনাকে সামাজিকভাবে দেখার উৎসাহ জোগায় না। আরেকটি ব্যাপার হলো মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এমন অনুমান খুবই স্বাভাবিক যে ‘লাজুক’ এবং ‘লাজুক-নয়’ এ’দুয়ে বিভক্ত করার প্রবণতা। এক্ষেত্রে তাঁরা বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপক স্কেল ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া, অন্যান্য কৌশলসমূহও যথেষ্ট উন্নত।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বলে মনে করেন। যাকম্যানের নাটকীয়তা তত্ত্বটি প্রয়োগ করে স্কট দেখাতে চেয়েছেন কখন আমরা লাজুক-ভূমিকা গ্রহণে আগ্রহী হই এবং কখন হই না। আমরা বিশ্বাস করি যে লজ্জাশীলতা একটি অপ্রত্যাশিত ও নেতিবাচক দিক যা পরিহার করে চলা উচিত। ব্যক্তির হতাশা, মনোমালিন্য ও অতিমাত্রায় আত্মমুখীনতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেগুলোকে সমস্যা হিসেবে বিবেচিত করে এর সামাজিক দায়কে জানার চেষ্টা করা। শুধুমাত্র ব্যক্তি প্রকৃতি (nurture), লালনপালন (nurture) ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে জ্ঞাত হওয়াই তো আমাদের শেষ লক্ষ হতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও তত্ত্বে লজ্জাশীলতা একটি অন্তর্গত গুণাগুণ হিসেবে বিবেচিত হলেও এমন কথাও তাঁরা বলেছেন যে, এটি একটি আয়ত্তকৃত বা শিক্ষণকৃত অভ্যেস যার জন্য বিশেষ পরিবেশ দায়ী। হতে পারে বাবা-মার ভূমিকা এর জন্য দায়ী। যেমন, আমাদের দেশে মেয়েদেরকে লজ্জাশীল ও নমনীয় হবার উপদেশ ছোটবেলা থেকে দেয়া হলেও ছেলেদের দেয়া হয় না। বরং ছেলেরা বেশি বেশি মিশুক হোক, বহির্মুখি হোক, কিছুটা ডানপিটে হোক এমনটিও আশা করা হয়। স্বাভাবিকভাবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে স্কুল জীবনে, খেলার মাঠে, পারিবারিক আয়োজন-উৎসবে, এমনকি নিজের জন্মদিনেও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের এই মনোভাব ও আচরণ ক্রমাগতভাবে স্থায়িত্ব লাভ করে।
সামাজিক কগনিশন তত্ত্ব এখন মনোবিজ্ঞানে বেশ শক্তিশালী ধারা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ ধরনের অভিগম মনে করে লজ্জা পাওয়ার পেছনে অন্যদের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে দেখতে চায় মুখোমুখি সম্পর্ক ও আন্তঃক্রিয়া কিভাবে আমাদের আত্মপরিচয় নির্মাণে সহায়তা করে বা করে না। ‘আত্মপরিবীক্ষণ’ ও ‘আত্মসচেতন আবেগ’ মনোবিজ্ঞানীদের কগনিটিভ তত্ত্বে দুটি বিশেষ আবিষ্কার যা লজ্জাশীল ব্যক্তিকে সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার ক্ষেত্রে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সর্বোপরি মনোবিজ্ঞানের সামাজিক কগনিটিভ তত্ত্ব ব্যক্তিমানসকে লজ্জা উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্র মনে করে। যারা লাজুক তারা স্বাভাবিক কগনিটিভ স্টাইলের একটি ভ্রমাত্মক ধারা যা সামাজিক পরিস্থিতিতে সহায়তা পায়। এতে করে সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি দেখা যায়। অন্য গবেষকদের মতে এটি অদ্ভুত এক আত্মকেন্দ্রিক দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়। লজ্জাকাতর ব্যক্তিবর্গের ধোয়াশে আচরণ, অপদস্তমন্যতা, সামাজিক প্রস্থান, এবং দক্ষতার দুর্বিসহ নি¤œগামিতাকে প্রতিভাত করে। অনেকে নিজের ও অন্যের যাবতীয় করুণ অভিজ্ঞতা, নেতিবাচক অনুভূতি ও অবাস্তব কম্পনাকে একীভূত করে সামাজিক ভীতির অচলায়তন সৃষ্টি করে। এমনও দেখা যায় এসব লাজুক ব্যক্তিত্ব নিজের অন্তরালে রাখার জন্য অনাকর্ষণীয় পোষাক পরিধান করে, ছদ্মবেশ ধারণ করে অথবা লুক্কায়িত থাকে। আত্ম-উপস্থাপনার কোন সুযোগ গ্রহণ না করে বরং তা থেকে পলায়নপর থাকে। অনেকে নিজের ব্যর্থতার জন্য অপরকে অথবা বাইরের পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দাঁড় করায়। অথচ যারা লাজুক নয় তাদের মধ্যে এমনটি দেখা যায় না। বরং অনেকে অনেক বেশি সপ্রতিভ ও আত্মপরিবেশ ব্যবস্থাপনায় পরিপক্বতার পরিচয় দেয়।
প্রায় ১০০ বৎসরের বেশি সময় আগে থেকে এ ব্যাপারে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী কুলি, পিয়াগেট ও মিডের নাম এ প্রসঙ্গে করা যায়। মিডের অহম সংক্রান্ত গবেষণা ও লেখার মূল্য এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে তার একটি বড় কারণ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের গোড়ায় সমাজের ভূমিকাকে তুলে ধরা। তাদের আলোচনা মূলত আন্তঃক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। পরবর্তীতে সখ্য সম্পর্কের উপর আলোচনা হয় যা আজও শিশুদের উপর পরিচালিত গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সে সময়ের শিশুদের উপর গবেষণায় তাদের সামাজিক অংশগ্রহণ গুরুত্ব পায় কারণ, দেখা যায় সবাই সমান অংশগ্রহণে পারদর্শী বা ইচ্ছুক নয়। স্বাভাবিকভাবেই ক্রমান্বয়ে বেশ কিছু শব্দের সন্নিবেশ ঘটে যেগুলো যেমন আলাদা অর্থ বহন করে তেমন সমার্থকও বটে। যেমন, নিঃসঙ্গ খেলা, সামাজিক খেলা, সামাজিক ক্ষেত্রে প্রত্যাহারমূলক আচরণ, অনিয়োজিত থাকা, দর্শক-মনোভাবাপন্নতা, লাজুক শিশু, সমস্যাআক্রান্ত শিশু, ভীতু চরিত্র, নেতিবাচক আত্মমূল্যায়ন, নির্জনতা অবসন্নমন্যতা, বন্ধ বিসর্জন প্রভৃতি। তবে লজ্জাশীলতার এই যে মাত্রা ও অর্থের ভার প্রত্যয়গত জটিলতা সৃষ্টি করাটাই স্বাভাবিক। বিশেষত গবেষণায় প্রত্যয়গত পরিচ্ছন্নতাই অপরিহার্য। ব্যক্তির প্রলক্ষণ, প্রেষণাগত প্রক্রিয়া, ও পর্যবেক্ষণমূলক আচরণ নির্দেশ করে এমন শব্দসমূহের সংমিশ্রণ গবেষণার জন্য উপযোগী নয়। রুবিন ও কপলান (২০১০) একাকিত্বের সাথে সম্পর্কিত ও ব্যবহৃত শব্দসমূহ হতে পারে একটি শ্রেণীবিন্যাস করেছেন যা নিঃসন্দেহে আমাদের অভিধার ব্যাপকতা নির্দেশ করে। যেমন, একাকিত্বের কারণ এতে এমন শব্দগুলো হলো: সক্রিয় একাকিত্ব, নিষ্ক্রিয় প্রত্যাহার, সাথীদের পরিত্যাগ, সাথীদের অবহেলা, সাথীদের বর্জন, সামাজিক প্রত্যাহার; আপত্তি, লজ্জা ও উৎকণ্ঠার সাথে জড়িত শব্দসমূহ: (ক) আচরণগত আপত্তি, সামাজিক আপত্তি; (খ) নিচু মাত্রার অভিগম, সংঘাতপূর্ণ লজ্জা, ভীতিপূর্ণ লজ্জা, আত্মসচেতন লজ্জা, সামাজিক ভীতি, শ্লথ-অভিগম; (গ) উৎকণ্ঠিত প্রত্যাহার, উৎকণ্ঠিত নিঃসঙ্গতা, রিটিসেন্স, সামাজিক উৎকণ্ঠা, সামাজিক পরিহার, সামাজিক ভীতি, সমস্যা। নিঃসঙ্গ শব্দাবলী: অন্তর্মুখি, নিঃসঙ্গ নিষ্ক্রিয়, কম সামাজিক, সামাজিকতায় অনাগ্রহ, কম অসামাজিক ভাবনা এখানে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শব্দগুলো ব্যক্তি থেকে সমাজলগ্নতার দিকে তাড়িত হয়েছে। যাহোক মনোবিজ্ঞানী রুবিন ও কপলান এক্ষেত্রে সংখ্যা কমিয়ে পরস্পর সম্পৃক্ততা পরিহারের উপরই গুরুত্ব দিয়েছেন।
আন্তঃক্রিয়াবাদী সমাজতাত্ত্বিক পরিক্ষেপ মনে করে যে লজ্জাশীল মন একটি সামাজিক নির্মাণ। যদিও মনোবিজ্ঞানীরা দাবী করেছেন কিছুটা হলেও লজ্জামনস্কতা অন্তর্গত এবং জন্মগত যা শিশুকাল থেকেই পর্যবেক্ষণযোগ্য। যদিও লজ্জাবোধের প্রজ্ঞাগত, আবেগগত ও আরচণগত উপাদানা রয়েছে এবং সে কারণে এই ব্যক্তিগত বিষয়টি মনোবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু। তবে সামাজিক পরিস্থিতি ও তার ফলশ্র“তি অনেক সময় লজ্জাবোধ লালিত ও স্থায়ী করে। বলা হয়েছে Insofar as shyness is a socially oriented state of mind, we can only understand and interpret the meaning of these thoughts and feelings in relation to our perceptions of other and our awareness of the social rules governing interaction (Scott 2007:8).

লজ্জাকে একটি সচেতন আত্মপরিচয়মূলক (আইডেন্টিটি) ক্রিয়া মনে করা যায় যা কল্পিত দর্শক-শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে সম্পাদন করা হয়। এখানে নিজের ভাবমূর্তি সম্পর্কে একটি স্বনির্মিত অবয়ব ধরে নেয়া হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ভাবমূর্তির অপূর্ণতাকে মেনে নেয়া হয়। একজন লাজুক ব্যক্তি সচেতন থাকে যে তার আচরণের সামাজিক প্রতিক্রিয়া আছে। সে কারণেই সমাজ-সচেতন লাজুক সত্তার অন্তর্নিহিত দিকটি সমাজবিজ্ঞানীরা জানতে চায়। তার দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ সম্পর্কে যে প্রেষণা ও অর্থ ধারণ করা হয় তা অত্যন্ত মূল্যবান। সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাস ও অনুমান এবং এরকম বিশ্বাস ও অনুমানের বিকাশ কেন হয় তা জানা জরুরি। তারা যেভাবে দায় সম্পন্ন করতে চায় বা তা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কিভাবে মূল্যায়িত হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর আমরা যারা তার আন্তঃক্রিয়ার অসম্পূর্ণতাকে আবিষ্কার করি এবং তার স্বাভাবিক আচরণে বাধার সৃষ্টি করি সেটিও দেখা দরকার। তাছাড়া, লাজুক আইডেন্টিটি যদি দীর্ঘদিনের আন্তঃক্রিয়ার ফসল হয় তবে যে সমস্ত ব্যক্তি এই আন্তঃক্রিয়ায় নিয়োজিত ছিল বা আছে তাদের অধ্যয়ন জরুরি। লাজুক ব্যক্তিরা তাদের সামাজিক দক্ষতার অভাবের দিকটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ। তাঁরা প্রত্যক্ষ করতে পারে যে কিভাবে অন্যেরা তাকে প্রত্যক্ষ করছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সামাজিকভাবে নির্মিত লাজুক আইডেন্টিটির অস্তিত্ব লক্ষণীয়। আমরা কিছু আদর্শ-মূল্যবোধ-প্রথানিষ্ট চরিত্রকে স্বাভাবিক এবং তা থেকে স্বভাবকে লাজুক বলতে আগ্রহী। আমরা তাদের মনের খবর রাখিনা তার নয়; কিন্তু সামাজিক জগতে তারা কিভাবে আচরণ করছে সেটিই মূল পর্যবেক্ষণের ব্যাপার হয়েছে। যেমন, মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তি যতটা যতœ ও সহানুভূতি সমাজের কাছে প্রত্যাশা করতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি অপদস্থ করা আমাদের একধরনের মজা করার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ কোন্ সমাজে কোন্ কালে কে লাজুক হিসেবে পরিগণিত হলো তা সংস্কৃতিগতভাবে নির্ধারিত হয়। অপরদিকে লাজুক ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করতে পারবেন সমাজ তাকে কিভাবে দেখছে। তারা সহজেই বোঝে যে তাদের সংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-লাজুকদের চেয়ে কম। এবং তাদের মূল সমস্যা হলো তারা ভয় পায়, অন্তর্মুখি এবং একাকী।

লজ্জাশীলতার সাথে জেন্ডারের সম্পর্ক সাংস্কৃতিকভাবে সম্পর্কিত। অনেক দেশে একেক সময় নারীদের একেকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাহীনতা, সম্পদহীনতা, নির্যাতন, হেয় প্রতিপন্নকরণ, অবরুদ্ধকরণ, পর্দা, শারীরিক দুর্বল ভাবা, সন্তান উৎপাদনের নামে ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে ধাবমান করা, চিকিৎসাহীনতা, নিরক্ষর রাখা, জনসমক্ষে আসতে না দেয়া, রাজনীতি থেকে দূরে রাখা, অধঃস্তনতা প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা যায়। ‘আর লজ্জা নারীর ভূষণ’ Ñ এ প্রবাদটিতো আমাদের মতো দেশে আপ্তবাক্যের মতো মনে করা হয়। কি ধর্মীয়, কি সামাজিক, কি পারিবারিক, কি রাষ্ট্রীয়, কি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারীর অনুপস্থিতি ও লজ্জাশীলতাজনিত কারণে নীরবতা পালন করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নারীকণ্ঠ বাড়ির বাইরে শোনা না যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। সুতরাং পুরুষ ছেলেদের লজ্জা ও সংকোচ কিছুটা গণ্য করা হলেও কন্যা শিশুদের এমন স্বভাব অনেকটা গুণের মধ্যেই পড়ে। পিতার অবর্তমানে কন্যারা সম্পত্তির প্রশ্নে চুপ থাকবে এটিই বাঞ্ছনীয়। বিবাহিত বোনেরা ভাইয়ের কাছে পিতার সম্পত্তির অংশ দাবি করবে এটা আকাক্সিক্ষত নয়। ভাই যেখানে নেই সেখানে বোন পিতাকে জীবিতকালে সম্পত্তি লিখে দিতে বললে পিতা নারাজ হয়ে থাকেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাই ভর্তি হবার অনুপ্রেরণা পেলেও বোন ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও অনুপ্রাণিত হয় না। এমন হাজারো দৃষ্টান্ত আমরা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করছি। এসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনাপত্তি নিঃসন্দেহে মেয়েদের অগ্রসরতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লজ্জাশীলতা এসব অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির সহজাত গুণ না হয়ে সামাজিকভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।
সুতরাং লাজুক আইডেন্টিটিকে শুধু নিষ্ক্রিয় কার্যসম্পাদনকারী হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত নয়। তারা বাস্তব দর্শক-শ্রোতামণ্ডলীর সামনে সচেতনভাবে কৌশলসহ আত্মরক্ষায় নামে বা নামার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখন তার মনে দর্শক-শ্রোতাদের মূল্যায়নের ধরনটি যথেষ্ট মনে থাকে এবং সে কারণে তার উপস্থিতি একটি সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সম্পন্ন হয়। সে শুধু ভূমিকা গ্রহণ করে না; নিজস্ব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভূমিকা তৈরি করে। সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে বিষয়টি অনুধাবনের অনেক অবকাশ রয়েছে।
[চলবে]


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা