বিচিত্র সমাজতত্ত্ব–সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব [ধারাবাহিক]

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির বিষয়ের মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটিতে এমন বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে— যা ইতিমধ্যেই পাঠকের আগ্রহবিদুতে পরিণত হয়েছে। — চিহ্নসম্পাদক]

জর্জ সিমেল
সিমেলের প্রথম প্রকাশিত গবেষণা সংগীতের সমাজতত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্দীপনাময়। যদিও সংগীতের সমাজতত্ত্ব সম্পর্ক একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংবদ্ধ তত্ত্ব এখানে পাওয়া যায় না, কিন্তু সংগীতে তার অভিজ্ঞতা-লব্ধ গবেষণা বলতে চেষ্টা করে যে, সংগীতে কিভাবে সামাজিক অর্থ ব্যক্ত হয় এবং সমাজে সংগীতের অবস্থান ও ক্রিয়া কিভাবে চিহ্নিত করা যায়।
সিমেল ১৮৫৮ সনে জার্মানীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে তার রচনার নতুন করে মূল্যায়ন হয়েছে। তবে তাঁর প্রথম দিকের লেখাগুলোর মধ্যে মানবজীবনের শিল্পসত্তা, সংগীত ও লোকসংগীততত্ত্বের যে সম্ভার লক্ষ্য করা যায় তা এখনও যথেষ্ট মূল্যায়নের অপেক্ষা রাখে। জীবন সম্পর্কে সিমেলের শিল্পও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক দার্শনিক ভাবনা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
১৮৮২ সনে প্রকাশিত “Psycholgiche and Ethnologische e Studien iither Musik” প্রবন্ধ সংগীতের সমাজতত্ত্বের জগতে একটি উল্লেখ্যযোগ্য সংযোজন হিসেবে চিহ্নিত আছে। সিমেলের সংগীত বিষয়ক আলোচনা সমকালীন লেখকরা অবহেলা করার একটি প্রধান কারণ হলো তিনি মনে করতেন জনতাত্ত্বিক লোকসংগীতের সাথে সামাজিক গোষ্ঠী-মনস্তত্ত্বের সংযোগ রয়েছে। এছাড়া সমষ্টিগত সচেতনার ধারণা জার্মানীতে দেরিতে আসে। ১৯০৯ সালে ডব্লিউ. আই. টমাস প্রথম সিমেলের প্রসঙ্গ প্রকাশ করেন তার Seven Book for Social Order গ্রন্থে। সিমেলের আলোচনার যেটি উল্লেখযোগ্য দিক তাহলো ব্যক্তির যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সংগীতের তাৎপর্য উপস্থাপন। তিনি মানবীয় সম্পর্কের কাঠামো তৈরি ও সংগীতের গুরুত্বসহ সর্বোপরি সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিধিতে এর নান্দনিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
তিনি সংগীতকে সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করেছেন যা আবার নান্দনিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। সে কারণে সিমেলের আদি রচনা বিশেষত তাঁর প্রবন্ধটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সংগীত ও শিল্পের আওতাভুক্ত প্রথমে দেখা যাক সিমেল সংগীত সম্পর্কে কি ভাবেন। সিমেল তাঁর বক্তব্যের শুরুতে সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে ডারউইনের তত্ত্ব আলোচনা করেন। ডারউইনের মতে মানুষ বাচন ও তাল উন্নয়নের আগে কণ্ঠ-সংগীতের উন্নতি ঘটায়। সিমেল বিশ্বাস করতেন কণ্ঠ-সংগীতের বা কণ্ঠ-নিসৃত যেকোন কৌশলের শারীরিক ভত্তি কাজ করে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবেএটি যতটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃসন্দিগ্ধ হতে পারেন না। তিনি কণ্ঠের শারীরিক ভিত্তি স্বীকার করলেও কণ্ঠ-প্রতিভার ক্ষেত্রে জেনেটিক গুণাবলী স্বীকার করেনা। He views music as an acoustic medium of communication which conveys feelings of the performer. তিনি বারবার বিভিন্ন তথ্য সহকারে বুঝাতে চেয়েছেন যে, সংগীত ভাষা বিবর্তনের একটি উন্নত ধাপ যা ভাষানির্ভর যোগাযোগের বিশেষ পর্যায় নির্দেশ করে, ভাষানির্ভর যোগাযোগের উৎপত্তিকে নয়। মানুষের বাক্য বিনিময় সব সময় আবেগকে যথার্থভাবে প্রকাশ করতে পারে না। আর সেক্ষেত্রে সংগীতের প্রয়োজনীয়তা প্রতিভাত হয়। এছাড়া, ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের আবেগাপ্লুত প্রকাশ সংগীতে সম্ভব হয়েছে। মানুষের কথা থেকেই চিন্তার জন্ম আর কণ্ঠসংগীত থেকে ভাষার উৎপত্তি হয়নি। বরং বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা, শ্রুতিমাধুর্য্য ও ছন্দময়তা বৃদ্ধির পেছনে সংগীতের প্রভাব অনস্বীকার্য। সংগীত হলো যোগাযোগের মাধ্যম যার সাথে ব্যক্তির আবেগ জড়িত থাকে। স্পেনসার যেমন বলেন, Language is related to concrete throught so is music related to feelings which are somewhat less precise. The first (language) creates the second (thought) since the second created the first. সিমেল তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে প্রচুর পরিমাণ জাতিতাত্ত্বিক উপাত্ত উপস্থাপন করেন।
সিমেলের সংগীততত্ত্ব ক্রিয়াবাদী, বিবর্তনবাদী নয়। তাঁর কাছে কণ্ঠসংগীত ছন্দ-আরোপিত ও কণ্ঠস্বর-সমৃদ্ধ বক্তব্য। অন্যদিকে যন্ত্রসংগীত বা যন্ত্রের সাংগীতিক ব্যবহার হলো কণ্ঠসংগীত চর্চার বিস্তৃত রূপ। স্বাভাবিকভাবেই যন্ত্রসংগীত কণ্ঠসংগীতকে সুমধুর করে এবং শ্রুতিমধুর করে। তবে যন্ত্রসংগীতকে আবেগহীন বলা যাবে না। যা আবেগের অর্থ ও বহিঃপ্রকাশকে বাক্সময় করে, –তাকে নিছক যন্ত্রের ঝনঝনানী ভাবা ঠিক নয়। যন্ত্রসংগীত সময়ের সাথে সাথে নিজস্বতায় সমৃদ্ধ হয়েছে এবং পরিশীলনের উপযুক্ত শিল্প হিসাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যদিও যোগাযোগের ক্ষেত্রে যন্ত্রসংগীতের মূল্য রয়েছে এবং এক্ষেত্রে তার ভূমিকা অনেক অপ্রত্যক্ষ। কণ্ঠসংগীতের ভূমিকা যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক প্রত্যক্ষ। যাহোক, সিমেলের শিল্পতত্ত্ব ও সমাজকাঠামোর সম্পর্কের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত কৌশল ও বিভিন্ন সামাজিক অনুসঙ্গ যা এর সাথে জড়িত তা সমাজতাত্ত্বিক শিল্প-মূল্যায়নের জন্য জরুরী। মানুষ কিভাবে সামাজিক উদ্গাতা হিসেবে সাংগীতিক গুণাবলী ধারণ করলেন; কিভাবে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মকান্ড হিসেবে স্বীকৃত হলো এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সংগীতের আয়োজন দেখা যায় তা জানা প্রয়োজনীয়। সংগীতের সামাজিক সম্পাদন ও গ্রহণ আবার সংগীতকে আরো সংহত ও সুচারু করে।
সিমেল শেষ বয়সে শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যা তাঁর প্রথম জীবনের সংগীত বিষয়ক লেখার পরিপূরক বটে। ১৯১১ সনে প্রকাশিত গ্রন্থ (Philosophe Kulture) ও ১৯১৭ সনে লিখিত গ্রন্থটি (Grandfragen der Soziolagic) এক্ষেত্রে উল্লেখ্য। দ্বিতীয় গ্রন্থটিতে সিমেল বলেন, শিল্প তার নিজস্ব গুণেই শিল্প এবং এক্ষেত্রে শিল্পের স্বায়ত্ত্বশাসিত জগৎ আছে বলে তিনি মনে করেন। চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত শিল্প মানবীয় জীবনাশ্রয়ী হলেও জীবনমুক্ত অস্তিত্বের অধিকারী। উপকরণ হিসেবে যা গ্রহণের দরকার তা জীবন থেকে গ্রহণ করে, কিন্তু পরিণতি ও পরিপক্কতা লাভ করার সাথে সাথে তা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। জীবন থেকে শিল্প সেটুকুই গ্রহণ করে যা তার স্বভাবের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। তবে অনেকটা দুরখার মতো বলতে চেয়েছেন এই শিল্পের একটা সামাজিক পরিণতি ও প্রভাব রয়েছে। বিশেষ মানুষের কর্মকান্ডের উপর নির্ভরশীল না হয়েও সামাজিক ফলশ্রুতি বয়ে আসে। দুরখার ’সামামজিক ঘটনা’ প্রত্যয়টি এক্ষেত্রে স্মরণীয়। অন্যদিক থেকে বলা যায় শিল্পও নন্দনতত্ত্বের স্বাধীনতাকে বুঝাতে যেয়ে সিমেল কিছুটা দার্শনিকতার আলোকে শিল্পের স্বয়ম্ভু সত্তার কথা বলেছেন। তবে এটি সত্য যে শিল্পের বিচারে অগ্রসর হলে তার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে বাদ দেয়া যায় না। তাছাড়া, শিল্পের উপকরণ ও ফলাফলকে সামাজিকভাবে অনুসন্ধানের মধ্যে শিল্পের সমাজতত্ত্ব নিহিত। প্রাথমিক দিকের রচনা সংগীতের সামাজিক যোগাযোগ ক্রিয়াকে দেখার ও বোঝার চেষ্টা করে। কোন বিশেষ সংগীত অনপেক্ষ (absolutistic) আনুষঙ্গিক (referentialistic) অভিধা ব্যক্ত করে।
সিমেল আনুষঙ্গিক অর্থকেই প্রথম জীবনে গুরুত্ব দিতেন। এক্ষেত্রে সংগীত-বর্হির্ভূত জগতের ধারণা, ক্রিয়া, ও আবেগ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মধ্যেই গীতিকার ও সংগীতশিল্পী বসবাস করেন। এ বিশেষ সাংগীতিক কর্মকান্ড ও সংগীতের বিষয়বস্তু সমাজ-নির্ধারিত পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে দিয়েই পল্লবিত হয়। শেষ জীবনে সিমেল অনপেক্ষ বা সংগীতের মূলার্থ নিয়েই ব্যাপৃত থেকেছেন বেশি। সংগীতের উপাদানসমূহের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই এখানে গুরুত্ব পায় কারণ সংগীত-রচনার কাঠামো নির্মাণে এসব সম্পর্ক নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সংগীতের সংজ্ঞায় আবেগের সঞ্চারণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তাই সিমেল জানতে চান ‘সামাজিক যোগাযোগের কাঠামো’ আসলে কি?
এখানে সিমেলের আগের কথা স্মরণ করা যেতে পারে যে, যন্ত্রসংগীত, কণ্ঠসংগীতের মতো আবেদনশীল ও যথার্থ নয়। এজকোর্ন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, যদি শ্রোতামন্ডলী যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে তবে তাঁরা যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সমান মনোযোগী হবে। যেমন, সিনেমায় দৃশ্যে যন্ত্রসংগীত এমন দক্ষতার পরিচয় দেয় যে দর্শকবৃন্দ ঘটনার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। যন্ত্রসংগীত এখানে কণ্ঠসংগীতের চেয়ে কোন অংশ কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
সার্বিক বিচারে সিমেলের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো:
১) শব্দযোজনা মূলত অর্থহীন থাকে যদি না তাকে আবেগময় ভাষার জন্য শ্রোতামন্ডলী শিক্ষণ লাভ করে।
২) সংগীত মানুষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী বিভিন্ন সাংগীতিক শৈলী পছন্দ করে।
৩) বড় শিল্প হবার জন্য সংগীতকে অবশ্যই সামাজিক বা জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করতে হবে। এভাবেই তা সকলের জন্য আবেদনশীল শিল্প হয়ে উঠতে পারে।
৪) সংগীতকে তাই বলে দেশপ্রেমভিত্তিক হতেই হবে এমন নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল সমাজ সবচেয়ে সুন্দর সংগীত উপহার দিয়েছে।
৫) শিল্পীকে বড় হতে হলে তাঁকে একটি শিল্প-ঐতিহ্যের মধ্যে গড়ে উঠতে হবে যা প্রকারান্তরে তার অন্তর্গত প্রতিভার বিকাশকে সহজসাধ্য করবে।
ম্যাকস্ ওয়েবার
ওয়েবারের সংগীত বিষয়ক চিন্তা খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর Economy and Society (1921) শীর্ষক গ্রন্থে। ওয়েবার পুঁজিবাদের উৎস নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন ধর্ম, নৈতিকতা, ও কাজের যৌক্তিকীকরণ কিভাবে পুঁজিবাদী সমাজকে সম্প্রসারণ করেছে। Weber saw the rationalization of the Western cultures as the unique element that led to capitalist rise in the West. Part of this nationalization process was the growth of bureaucracies, as the increasing capitalistic division of labor compartmentalized and structured traditional organizations, like education and government, into bureaucracies. ওয়েবার মনে করেন চার্চের ক্ষেত্রে যেভাবে আমলাতন্ত্র বিকশিত হয়েছে সেভাবে অন্যত্র দেখা যায় না। রোমান ক্যাথলিক চার্চের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অত্যন্ত সত্য। চার্চের গানের একটি ব্যাপার আছে। চার্চের জন্য গানের আয়োজন, প্রস্তুতকরণ ও সদস্যদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মকানুনের মধ্যে দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চে সংগীতের নোটেশন সংরক্ষণ করা হয়। আর এই নোটেশন উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ব্যাপারটিকে ওয়েবার তার পদ্ধতিতাত্ত্বিক বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, চার্চের পুরোহিত নোটেশনের পরিশীলন ও শিক্ষাদানেই কাজটি করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এই দালিলিক প্রমিতকরণ ও যৌক্তিকীকরণকে ওয়েবার তার গবেষণামূলক ফোকাস হিসেবে গ্রহন করেন। তিনি ইউরোপকেন্দ্রিক ও আন্তঃসাংস্কৃতিক তুলনার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, সংগীতের ক্ষেত্রে যৌক্তিকীকরণ হয় এবং চার্চের বৃহত্তর আমলাতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে তা বেড়ে ওঠে।
সংগীত সম্পর্কে ওয়েবারের অনুরাগ ছিল বিচিত্র। তিনি যেমন দীর্ঘ পরিসরে সংগীতের ঐতিহাসিক বিকাশ দেখেছেন, তেমন ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব নিয়েও ভেবেছেন। ওয়েবারের সময়টি ছিল পাণ্ডিত্বের সাথে শিল্পের সংযোগের সময়। অর্থাৎ যেকোন বড় মাপের মানুষ শিল্পবোদ্ধা ও সংগীত-চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল। ওয়েবারের শিল্পবোধ ও সংগীত ভাবনা সেকারণে ঐতিহ্যলালিত ও জর্মন সংস্কৃতি-সঞ্জাত।
যৌক্তিকীকরণ ওয়েবারের সকল রচনার প্রাণপাখি। তিনি ঐতিহাসিকতার দিক থেকে বলতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন সংগীত আধুনিক সংগীতের রূপ নিয়েছে ক্রমাগত অযৌক্তিক গুণাগুণের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। কর্ডভিত্তিক হারমনির বিকাশ এই সময়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে। সংগীতকার বা শিল্পী আগে তাদের ইচ্ছামাফিক তরঙ্গ সৃষ্টি করতেন, আর বর্তমানে সুসংগঠিত, পরিমিত ও করডাল হারমনির যৌক্তিক নীতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
রোমান ক্যাথলিক যাজকতন্ত্র, মধ্যযুগের সামন্তকাঠামো, স্বরলিপি, গিল্ড কর্তৃক সংগীত যন্ত্রের উদ্ভাবন, সংগীতে সুরেলা কথ্যভাষার ব্যবহার ইত্যাদি করেছেন এগুলোর সম্পর্ক ও পারম্পর্য অনুধাবনের জন্য। সংগীতের ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে দুটি মুহূর্তের কথা গুরুত্ব সহকারে তিনি উল্লেখ করেন। আর তা হলো যন্ত্রের আবিষ্কার ও স্থায়ীভাবে একটি কারিগর শ্রেণীর উৎপত্তি এবং দ্বিতীয়ত শিল্পীর অধিষ্ঠান। কারিগর শ্রেণীর কাছ ছিল সংগীত যন্ত্রের ক্রমাগত উৎকর্ষসাধন এবং যন্ত্রীর কাজ ছিল যন্ত্রের চাহিদা ও বাজার সৃষ্টি করা। সংগীত যন্ত্রের প্রমিতকরণ ও লিখিত স্বরলিপি একটি সংগঠিত আধুনিক সমাজের যৌক্তিক কর্মকান্ড। সেই তেরো শতকেই বিভিন্ন সামন্ত সভাকেন্দ্রগুলো নতুন নতুন যন্ত্রের চাহিদা সৃষ্টি করে এবং জটিল সংগীত-উপযোগী সূক্ষ্মতা দাবি করে। এমন চাহিদা সংগীত-শিল্পী ও সংগীত সংকলকদের অনুপ্রাণিত করে।
অর্কেস্ট্রা ও তারযন্ত্রসমূহের উত্থান মধ্যযুগের পরেই সাধিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে ওয়েবার তাঁর ঐতিহাসিক যৌক্তিকীকরণের মধ্যে সংগীতকে সংযুক্ত করেন সংগীত-যন্ত্রের অর্থনৈতিক মূল্য যাচাইয়ের মাধ্যমে। বলা হয়ে থাকে, শুধু অর্থনীতি নয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, কৃৎকৌশলগত, এমন কি জলবায়ুগত ফ্যাক্টর সংগীত-যন্ত্রের যৌক্তিক উৎভাষণে যুক্ত হয়েছে। যেহেতু জলবায়ুগত কারণে ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের মানুষকে ঘরাবদ্ধ ও ঘরকেন্দ্রিক করে রেখেছিল সেকারণে পিয়ানো দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংগীতচর্চা ও মর্যাদার সূচক হিসেবে পিয়ানোকে গণ্য করা হতো। ভোগ ও উৎপাদনের পুঁজিবাদ প্রসার হওয়ার সাথে সাথে যন্ত্রচালিত পিয়ানোর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। সমস্ত পশ্চিমা দেশে এবং তাদের উপনিবেশসমূহে উনিশ শতক থেকে সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণবস্তু হিসেবে পিয়ানোর ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পিয়ানোর বিবর্তন, ব্যবহার ও বিস্তারকে ওয়েবার পুঁজিবাদী সমাজের যৌক্তিকীকরণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করেছেন।
এক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতিতাত্ত্বিক পরিমাপের গভীরতা লক্ষ্য করা যায় যা সংগীতের সমাজতত্ত্ব অধ্যয়নে অপার কৌশলিক অবদান হিসেবে অনস্বীকার্য। টারলির ভাষায়, In Weber’s case his goal was to examine music as an example of irrational culture, production being organized and made rational by the rationalization process. As a society becomes increasingly organized in a rational manner, rather than a society organized by strict kin or clan groupings, rationalized production of goods will become so prevalent that the culture itself will be produced according to rational values. টারলির মূল্যায়নে ওয়েবারের সংগীত সম্পর্কীয় বক্তব্যের আরো বিস্তারিত সমালোচনা পাওয়া যায় যা এখানে উল্লেখ না করে পারা যায় না। যেমন, ওয়েবারের পদ্ধতিকে শুধু যৌক্তিকীকরণ প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে না নিয়ে, ‘সংগীতের সত্যিকার অধ্যায়নের’ কাজে লাগানো যায়। স্বরলিপি, ছন্দ, লয়, প্রভৃতির আনুষ্ঠানিকতা সংগীতের সঞ্চরণকে স্বাধীন শিল্পের রূপ পরিগ্রহ করতে সাহায্য করে। এমন স্বমহিমা সহজেই সংগীতকে প্রকাশনের উপযুক্ত পণ্যে পরিণত করে। পুঁজিবাদে সংগীতের এই বাজারীকরণ পরবর্তীতে আরো জটিল পথ অতিক্রম করে।
টারলি মনে করেন, শিল্প ও সংস্কৃতি সমাজের শেষ প্রান্তিক উপাদান যা পুঁজিবাদী যৌক্তিকীকরণের শিকার হলো। অবশ্য বিষয়টি আরো গভীর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। কারণ সমাজতাত্ত্বিক অর্থে সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। আমাদের প্রতিটি কাজ, স্থাপনা, বিশ্বাস, আইন ও প্রথা-প্রতিষ্ঠানই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। যদিও আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে পণ্যায়ন সহজ-লক্ষণীয়, শিল্পের পণ্যায়ন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নয়। কারিগর ও শিল্পকর্ম অনেক আগে থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে আসছে। এব্যাপারে অন্যত্র ব্যাপক আলোচনার সুযোগ আসবে। কিছু ক্ষেত্রে যেমন লোকসংগীত, আধ্যাত্মিক সংগীত, ও ধর্মীয় সংগীত অনেক পরে বাজার পেয়েছে। একথাও সত্যই যে ধর্মীয় সংগীত হয়েও পশ্চিমে তা অগ্রণী পণ্যায়নের শিকার হলেও পূর্বে তেমনটি হয়তো হয়নি। কিন্তু পশ্চিমের বাইরে সংগীতের বিকাশও যে কত বিচিত্র ও চমকপ্রদ বিশেষায়ণের দৃষ্টান্ত রেখেছে তা ওয়েবারের যৌক্তিকীকরণের সমতুল্যতো বটেই, বেশি কিছুও বটে। যেমন, ভারতে সংগীত চর্চার ইতিহাস নিঃসন্দেহে দীর্ঘ ও বিচিত্র। উল্লেখ্য যে,
১) ইউরোকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পশ্চিমা পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ওয়েবারের সংগীতের সমাজতত্ত্বের প্রাথমিক ত্রুটি।
২) যৌক্তিকীকরণকে ব্যাখ্যার জন্য আমলাতন্ত্র ও সংগীতের বিকাশকে ব্যবহার করা অনেকটা মনগড়া মনে হতে পারে।
৩) চীন, জাপান, মিশর ও ভারতের মতো দেশে সংগীতের দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী বিকাশধারা ওয়েবার না দেখার চেষ্টা করেছেন।
৪) ইউরোপের বাইরের সমাজজীবনকে ও ক্ষমতার বলয়ে সংগীত ও সংগীতকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্রের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে মনে হয় ওয়েবার তাঁর তত্ত্বকে আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলেছে।
৫) হ্যাবারমাসের মতে সংগীতের প্রতীকী ব্যঞ্জনা এমন একটি উৎকর্ষ-মাত্রা লাভ করে যা সাধারণ পুঁজিবাদী যৌক্তিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
৬) হ্যাবারমাস মনে করেন সাংগীতিক স্বরলিপি ও মানুষের অন্যান্য সংগীত বিষয়ক অবদান সংগীতকে যতটা গণমাধ্যমের সাথে সস্পৃক্ত করে, পুঁজিবাদী উদ্যোগ ততটা পারেনি।
৭) হ্যাবারমাস Theory of Communicative Action প্রকাশের মাধ্যমে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, মার্কস শ্রমের উপর যেভাবে এবং যতটা গুরুত্ব আরোপ করেছেন সেভাবে মানুষের আন্তঃক্রিয়া বা ভাবনা-চিন্তার লেনদেনকে মূল্যায়ন করেননি। সেকারণে যোগাযোগমূলক ক্রিয়া নতুনভাবে মূল্যায়িত হওয়া দরকার।
৮) যৌক্তিক ক্রিয়া, স্বরলিপি, যাজকতন্ত্র ও গিল্ড পশ্চিমা সংগীতের বিকাশের প্রধান কারণ নাও হতে পারে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে নগরায়ন নাগরিক সংস্কৃতির উৎপাদনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সম্প্রদায়, গতিময়তা ও সংস্কৃতি নগরায়নকে পরিপুর্ণতা দিয়ে থাকতে পারে, যৌক্তিকীকরণ নয়। অবশ্য, নগরের বিকাশ ও নগরের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি এক অর্থে যৌক্তিকীকরণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
৯) সংগীতকারদের সম্প্রদায়, অঞ্চল, সংগীতকেন্দ্রিক ব্যবসা, সংগীতের উৎপাদন ও প্রসিদ্ধি লাভের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক পর্যায়ে জনপ্রিয়তা প্রাপ্ত বিভিন্ন সংগীত দলের বিকাশ বিশ্লেষণ করলে অনেক নতুন উপাদান খুঁজে পাওয়া যায় যা ওয়েবারের ব্যাখ্যাকে নিতান্ত ক্ষদ্রপরিসর গবেষণা হিসেবে নির্দিষ্টতা দেয়।
১০) আজকের পুঁজিবাদী সংগীত আয়োজন, উৎপাদন ও বিতরণের সাথে কতিপয় কোম্পানীর সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায়। এরা শুধু সংগীতকে পণ্যে পরিণত করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছে তাই না, শ্রোতাদের স্বাদকেও নির্মাণ করছে। সুতরাং যৌক্তিকীকরণের মাত্রা, পরিধি ও গুণাগুণ নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ এসে যাচ্ছে।
১১) ওয়েবার সমাজবিজ্ঞানী হলেও সংগীতকার ও সংগীতের উপর সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নগরায়ন, নরগোষ্ঠী, সংগঠন ও সম্প্রদায়গত কাঠামোর প্রভাব যথেষ্টভাবে আসেনি। সুতরাং সংগীতের সমাজতত্ত্ব বিবেচিত হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদানও সন্নিবেশিত হয়নি।
১২) তবে ওয়েবারের পদ্ধতিতাত্ত্বিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আজকের সংগীতভিত্তিক ব্যবসা ও তার ঐতিহাসিক প্রবণতাকে বোঝার জন্য সহায়ক হতে পারে।
যে কাঠামোগত অধিষ্ঠান সংগীত সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে তার অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ সত্যই দুরূহ ব্যাপার। ওয়েবার এ কাজে কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছেন বলা যায়। ওয়েবার সংগীতের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আজকের সমাজবিজ্ঞানীদেরকে সে কাজটি করার জন্য ওয়েবারীয় যৌক্তিকতা, পুঁজিবাদ, ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত উপাদান উৎসাহিত করতে পারে। মারটিন মনে করে অ্যাডার্নো মূলতঃ ওয়েবারের পথেই অগ্রসর হয়েছিলেন সংগীত গবেষণার ক্ষেত্রে। সার্বিক বিচারে বলা যায় ওয়েবার সংগীতের সমাজতত্ত্বের পুরোধা-পুরুষ।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা