বিমূর্ত শিল্প : প্রারম্ভিক বিবেচনা

প্রবন্ধ

 বিমূর্ত শিল্প : প্রারম্ভিক বিবেচনা

১.

বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে বিমূর্তরীতির আবির্ভাব শিল্পজগৎকে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা দিয়েছিল। শুরুতে কেউ কেউ বিষয়টাকে ঠাট্টাবাজি, বিভ্রান্তিকর ও অর্থহীন বলে মনে করেছিলেন। এই শিল্পধারার উদ্দেশ্য নিয়ে তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল। কীভাবে এর অর্থ দাঁড় করাবেন এবং কীভাবে মূল্যায়ন করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না। বিমূর্ত শিল্পকলা ভালো না মন্দ সে সম্পর্কেও কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারছিলেন না। এমনকি আজকের দিনেও এই ধারার শিল্পকলার রস আস্বাদনের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলোই ঘুরে ফিরে আসে। শিল্পের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে অতীতে শিল্পী স্ব-উদ্যোগে, অনুরুদ্ধ হয়ে বা ফরমায়েশ পেয়ে যে ছবি আঁকতেন তা হতো দৃশ্য, মুখাবয়ব কিংবা জড়জীবন। কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে অনেক পরিবর্তন আসে যা শিল্পের চেনা আদল অনেকটাই বদলে দেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি শিল্পের উপাদান ও প্রয়োগপদ্ধতির ক্ষেত্রেও অনেক পরিবর্তন এনেছিল। ক্যামেরার আবিষ্কার চিত্রকলার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বোতামের এক ক্লিকে দৃশ্য বা মুখাবয়বের যে নিখুঁত ছবি পাওয়া যাচ্ছিল তাতে করে দীর্ঘসময় ধরে রং-তুলি ঘসে ঘসে ছবি আঁকার যে পরিশ্রম তাকে অর্থহীন মনে করতে শেখাচ্ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মানুষের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টে দিয়েছিল। ডারউইন, ফ্রয়েড, নিৎসে নতুন দর্শন ও তত্ত্ব নিয়ে উপস্থিত হলেন যা শিল্পীদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে, বিশেষ করে তার অন্তর্লীন সত্তার মাঝে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করল। ক্যান্ডিনেস্কি তাঁর On the Spiritual in Art গ্রন্থে বললেন, ‘যখন ধর্ম, বিজ্ঞান ও নৈতিকতা বড়সড় একটা ধাক্কা খায়, বাইরের সব সমর্থন ধসে পড়ার হুমকির মুখে পড়ে তখন মানুষ বাইরের জগৎ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজের ভিতরে তাকায়।’ ক্যান্ডিনেস্কিকে মানলে বিশ্বাস করতে হয় যে আধ্যাত্মিকতার সাথে বিমূর্ত চিত্রকলার একটি বিশেষ যোগসূত্র আছে। তবে তা এই বিষয়ের প্রারম্ভিক প্রসঙ্গ নয়। উনিশ শতকের শেষপাদ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিমূর্ত শিল্পকলা কীভাবে আবির্ভূত ও বিকশিত হয়েছিল এবং সেই পথপরিক্রমার মাধ্যমে আজকে কী অবয়ব লাভ করেছে তা জানা জরুরি।

সমসাময়িক শিল্পে বিমূর্ত শিল্পধারার আবির্ভাব চর্চার ধারাবাহিকতারই ফল। আজকের দিনে সব ধরনের শিল্পেই বিমূর্তায়ন একটি অতিস্বাভাবিক ঘটনা, কারণ শিল্প হলো শিল্পীর নিজস্ব প্রত্যক্ষণ ও ভাবনার ফসল। একটি বিশেষ মুহূর্তে কোনো কিছু প্রত্যক্ষ করার পর স্মৃতি থেকে তাকে পুনরুদ্ধার করতে গেলে কিছু কিছু বিষয় হারিয়ে যায় আর সেই হারানো বিষয়গুলোই বিমূর্তরূপে এসে হাজির হয়। উনিশ শতকের শুরুতে প্রভাববাদ বা অন্তর্মুদ্রাবাদ (Impressionism)—এর আবির্ভাব শিল্পজগৎকে একটা ধাক্কা দিয়েছিল। এই ধারা বিষয়বস্তুর সরাসরি উপস্থাপনার বদলে তার একটি ধারণা তুলে ধরতে প্রয়াসী ছিল। তখন সদ্য ক্যামেরা আবিষ্কারের ফলে আলোকচিত্র বিশেষ এক বিস্ময় নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হয়েছে। চেহারার অবিকল প্রতিরূপ দেখে মানুষ যারপরনাই হতবিহ্বল। তখনই সরাসরি প্রকৃতি, বাহ্যিক জগৎ বা চেহারা উপস্থাপনের বদলে দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোছায়ায় প্রকৃতির নানারূপ নানাভাবে ধরার ব্যাপারে কতিপয় শিল্পী সচেষ্ট হলেন। স্টুডিওর ভিতরে আটকে থেকে ছবি আঁকার চেয়ে বাইরে প্রকৃতির কোলে বসে প্রকৃতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরায় সচেষ্ট হলেন। খুঁটিনাটি তুলে ধরার পরিবর্তে সামগ্রিক ঐক্ষিক পরিণতির ওপর জোর দিতে তারা ছোট ও মোটা তুলির টানে পাশাপাশি মৌলিক রং স্থাপনের মাধ্যমে সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছায়া সৃষ্টি করলেন। প্রভাববাদী চিত্রী পল সেজানকে আধুনিক চিত্রকলার জনক বলা হয়। বস্তুর চাক্ষুষ প্রতিরূপকে কতকগুলি মৌলিক ফর্মে ভেঙে সেজান বিমূর্তায়নের পথে অগ্রসর হলেন।

বিংশ শতকের প্রথম ভাগে ফভইজমের উৎপত্তি হয় যা মূলত আদিম শিল্পের অন্তর্গত আফ্রিকান স্থাপত্যকলার প্রভাবজাত। এই গোষ্ঠীর প্রধান শিল্পী অঁরি মাতিস রঙের প্রাধান্য দিয়ে, বাস্তবের অনুকৃতি এড়িয়ে, আনুষঙ্গিক বস্তুপুঞ্জের সংশ্রব বাদ দিয়ে, সহজ চিত্রকল্পে বিষয়ের একটি প্রকাশভঙ্গি তুলে ধরলেন। অনুভবের ওপর নির্ভর করে তিনি রং নির্বাচন করতেন। ফভদের অনুসরণে বদলে যাওয়া পৃথিবীর উদ্বেগ ও হতাশাকে ধারণ করে জার্মানিতেও শিল্পীরা তাদের কাজে বস্তুর প্রকাশভঙ্গি তুলে ধরতে চাইলেন। ডাই ব্রুকের নামানুসারে ড্রেসডেনে প্রথম একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। আদিম শিল্পে ফভদের আগ্রহ আবিষ্কার করে এবং সেজান কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়ে পাবলো পিকাসো ও জর্জ ব্রাক শিল্পচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করলেন। তাদের সৃষ্ট ধারা ঘনকবাদ (Cubism) হিসেবে পরিচিতি লাভ করলো। ঘনকবাদ প্রধানত জ্যামিতিক ফর্মে বস্তুর আদল এবং প্রশমিত আভায় রঙের সীমিত ব্যবহারের মাধ্যমে আলোছায়া নির্মাণ করে দ্বিমাত্রিক উপরিতলে ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। ঘনকবাদের আরো উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে সংশ্লেষী ঘনকবাদে যেখানে কলাজ ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন বুনট তৈরি করা হয়। এখানে বিষয়বস্তু শিল্পীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘনকবাদে রং ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য অর্ফিক (Orphic)। ১৯১২ সালের দিকে ফরাসি কবি গিলাওমি অ্যাপোলিনেয়ার প্রথম Orphism শব্দটি ব্যবহার করেন এবং এটা ঘনকবাদের একটি ধারা যা বিশুদ্ধ বিমূর্তায়ন এবং ফভ-প্রভাবিত উজ্জ্বল রং ব্যবহারে আগ্রহী। কিন্তু এই পদটির অর্থ বেশ বিভ্রান্তিকর এবং আবির্ভাবের বেশ কিছুকাল পর্যন্ত দর্শকদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। রবার্ট ডিলাওনে’র মতো শিল্পীরা মিশেল ইউজেন শেভরিউলের বৈজ্ঞানিক বর্ণতত্ত্ব নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করার পর অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন বিমূর্ত এক চিত্রকল্প তৈরি করেন যা বিপরীতধর্মী বর্ণের ঐন্দ্রজালিক এক বৈশিষ্ট্য নির্মাণে ব্রতী ছিল।

১৯১৬ সালে জুরিখে হুগো বল কর্তৃক ‘ক্যাবারে ভলতেয়ার’ প্রতিষ্ঠিত হলে শিল্পে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে সে বিষয়ে কারো কোনো ধারণা ছিল না। এখান থেকেই দাদাবাদী শিল্পধারার উৎপত্তি হয়। এটা এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী শিল্পধারা ছিল। দাদাবাদীদের কাজ ছিল আপাত অর্থহীন ও ধ্বংসাত্মক উন্মাদনায় ভরা। প্রথাগত শিল্পমাধ্যম থেকে সরে গিয়ে শিল্পীরা শব্দ, ফটোমন্তাজ, ধারণা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিশেষ ফল লাভ করতে চেয়েছেন। এই শিল্পধারা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মার্শেল ডুশ্যাম্প বড় ভূমিকা রেখেছিলেন যিনি মনে করতেন শিল্পের নান্দনিক মূল্য হাতের দক্ষতা নয়, বরং তা মানসিক বাছবিচারের নিখাঁদ ব্যবহারিক এক বস্তু। জার্মানিতে দাদাবাদী আন্দোলন বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করেছিল। তবে যখন এর ঢেউ নিউইয়র্কে পৌঁছালো তখন তা বেশ দুর্বল। দাদাবাদের অবশেষ থেকে পরাবাস্তববাদের উৎপত্তি। ১৯২০ সালে ইয়োরোপে বিকশিত এই শিল্প-আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হলো দৃশ্যগ্রাহ্য বস্তু বা বিষয়কে অগ্রাহ্য করে অবচেতনকে সৃষ্টির উৎসরূপে ব্যবহার করা। পরাবস্তববাদী চিত্রকলা মূলত একটি উদ্ভট পরিবেশে অপ্রত্যাশিত ও অবাস্তব বিষয়কে চিত্রায়নের মাধ্যমে একটি স্বাপ্নিক আবহ তৈরি করে; এটা একটি শিল্প গতিতরঙ্গ যা স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, অবচেতন বা উদ্ভট বিষয়কে চিত্রে স্থান দেয়। এর নেতা আঁদ্রে ব্রেতোঁ সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন যে এটা একটা বিপ্লবী শিল্প আন্দোলন। দাদাবাদের মাঝ থেকেই এই আন্দোলনের সৃষ্টি এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল প্যারিস। পরে তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ইত্যাদি সব মাধ্যমেই এর প্রয়োগ শুরু হয়।

১৯৩০ সালের শেষ দিকে বিমূর্ত প্রকাশবাদের সূচনা হয়। এই শিল্পমাধ্যমে প্রকৃত দৃষ্টিগ্রাহ্য উপস্থাপনাকে খারিজ করে গুটিকয়েক চেনা প্রতিমার সাথে রং, রেখা, গঠন, আকার ও তাৎপর্য নির্মাণের ওপর অতিমাত্রায় জোর দেওয়া হয় এবং সবকিছুর ওপরে শিল্পীর আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ প্রাধান্য পায়। অবচেতন মনের অনুভূতি উপস্থাপনের পরাবাস্তববাদী ধারণা এদের প্রভাবিত করেছিল। এই ধারার শিল্পীদের জঙ্গমচিত্রী (Action Painter) ও বর্ণিল জমিন চিত্রী (Colour field Painter) ― এই দুই শ্রেণিভুক্ত করা হয়ে থাকে। জঙ্গমচিত্রকে ভঙ্গিবাদী বিমূর্তায়নও (Gestural abstraction) বলা হয়, যা একটি বিশেষ ধারার অঙ্কনশৈলী যেখানে ক্যানভাসের ওপর ফোঁটা ফোঁটা রং ফেলে বা লেপ্টে দিয়ে ছবি আঁকা হয়। সবচেয়ে খ্যাতিমান জঙ্গমচিত্রী হলেন জ্যাকসন পোলক। তাঁর কাজের ধারা পূর্ববর্তী অনেক প্রথাকে ভেঙে দিয়েছিল। এখানে শিল্পীর আবেগ তার উপস্থাপনা অপেক্ষা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোসিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বিস্ফোরণের ফলে ঘটে যাওয়া বিপর্যয় ও সামগ্রিক ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে শিল্পীরা ক্যানভাসে তাদের হতাশা, বিষাদ ও অস্বস্তি তুলে ধরেছেন।

মার্ক রোথকো, ক্লিফোর্ড স্টিল ও বার্নেট নিউম্যান বর্ণিল জমিন চিত্রকলার সূচনাকারী। জটিল ভাবনার সরল উপস্থাপনা এই ধারার চিত্রীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। বড় ক্যানভাসে রং ও সোজাসাপ্টা ফর্মে তারা তাদের অনুভূতি তুলে ধরেন। এখানে কোনো প্রকার মায়া বা বিভ্রম তুলে ধরার বদলে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে আগ্রহী। বার্নেট নিউম্যান স্বীকার করেছেন যে এই সত্য তারা অনুসন্ধান করেছেন আদিম শিল্পের মাঝে। ‘আদিম শিল্পী আমেরিকান শিল্পীর মতো বিমূর্ত আকার ব্যবহার করেছেন আচারকেন্দ্রিক ইচ্ছা থেকে এক আধিবিদ্যক অনুধাবনের লক্ষ্যে।’ (Moszynska, 2004, p.164)

বিমূর্ত প্রকাশবাদের পরবর্তী সময়ে পপ আর্ট, ন্যূনকল্পবাদ ও ধারণাবাদ নতুন শিল্পধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৫০-এর দশকে একই সাথে ব্রিটেন ও আমেরিকায় শুরু হওয়া একটি শিল্প আন্দোলন হলো পপ আর্ট যা চারুকলার প্রচলিত ঐতিহ্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় বিজ্ঞাপন, খবর, হাসির বই ইত্যাদি থেকে চিত্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে। পপ আর্টে পরিচিত পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিভিন্ন উপাদানকে বিচ্ছিন্ন করে অপ্রাসঙ্গিক সূত্রে গ্রথিত করা হয়। পপ আর্ট যতটা না এই শিল্পকে বোঝায় তার থেকে বেশি ইঙ্গিত করে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে। এই শিল্পগতিধারাও বিমূর্ত প্রকাশবাদের প্রতিক্রিয়ারূপে উদ্ভব হয়েছিল। ব্যবহৃত দৃশ্যগ্রাহ্য বস্তুপুঞ্জ ও চিত্রকল্প দাদাবাদের মতই। ন্যূনকল্পবাদে শিল্পকে ন্যূনতম কয়েকটি রং, রেখা, গঠনের ভিতর দিয়ে মৌলিক জ্যামিতিক আকারে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কোনো বস্তুকে উপস্থাপন এর উদ্দেশ্য নয়। একে হাতেখড়ি শিল্পও (ABC art) বলে। ন্যূনকল্পবাদী চিত্রকলায় ন্যূনতম উপাদান ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফললাভ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী এই শিল্পগতিধারা মূলত আমেরিকান চিত্রকলা যা ১৯৬০-৭০-এর মাঝে বিকাশ লাভ করে। এই ধারার উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা হলেন ডোনাল্ড জুদ, জন ম্যাকক্রাকেন, অ্যাগনিস মার্টিন, ড্যান ফ্ল্যাবিন, রবার্ট মরিস, ফ্রাঙ্ক স্টেলা। আধুনিকতাবাদের লঘু উপাদানের সাথে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বিমূর্ত প্রকাশবাদের বিরুদ্ধপ্রতিক্রিয়াজাত। পপ আর্ট ও ন্যূনকল্পবাদ উভয়ই উত্তরাধুনিকতাবাদের আগে শুরু হয়েছিল। বিজ্ঞাপনের চলমান চিত্রকল্প যেমন―পণ্যের নকশা ও প্রতীক এই শিল্পে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। পপের সাথে ‘অপ আর্ট’ আন্দোলনের কথাও বলা জরুরি। ভবিষ্যবাদের মতো এই শিল্পধারার শিল্পীরা তাদের কাজে এক ধরনের মায়া তৈরি করেন। জ্যামিতিক ধারায় রঙের চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহারের ভিতর দিয়ে যা দর্শককে গভীর এক ঐক্ষিক অনুভূতি দান করে। ইংরেজ চিত্রকর ব্রিজিত রেইলি তার কাজে এক ধরনের গাণিতিক বৈশিষ্ট্য আরোপের উদ্দেশ্যে ক্যানভাসে অনেক জায়গা ছেড়ে দিলেন যেখানে মনের চোখ বিচরণ করবে। বিমূর্ত প্রকাশবাদ থেকে উদ্ভূত অপ আর্ট ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক বর্ণশিল্পীদের বন্ধনহীন বিমূর্তায়নের সমগোত্রীয় চিত্রশিল্প হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শিল্পী কেনেথ নোলান্ড ও মরিস লুই এই ধারার মাধ্যমে খোলামেলা নকশা ও রৈখিক বৈশিষ্ট্য অর্জনের লক্ষ্যে চালিত হন। এতে খুব ন্যূনতম রেখার প্রয়োগ ঘটানো হয়। এ থেকেই পরবর্তীকালে ন্যূনকল্পবাদের উৎপত্তি। স্বপ্রকাশ থেকে শিল্পকে মুক্তি দিতে গিয়ে তা আরো বেশি ধারণার নিগড়ে বন্দী হয়ে পড়ল। এতে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারণাটি আবারো দৃঢ় হয়ে ওঠে। দাদাবাদী ও মার্শেল ডুশ্যাম্প একদা ঘোষণা করেছিলেন যে শিল্পীর ধারণা ও ইচ্ছা তার সৃষ্টি অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যার প্রতিফলন এই শিল্পধারায় সুস্পষ্ট।

বর্তমানে সংজ্ঞার্থ নির্ণয় জটিল হলেও শিল্প উত্তরাধুনিক পরিপ্রেক্ষিত দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছে। বিমূর্ত শিল্প বর্তমানে হাইব্রিড চিত্রকল্পের সাথে বিভিন্ন উপাদান পাশাপাশি স্থাপন করে এক ধরনের ফললাভের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। উত্তরাধুনিকতাবাদ বিমূর্তায়নের মাধ্যমে শুদ্ধতা ও আধ্যাত্মিকতায় প্রবেশের ধারণাকে দুর্বল করেছে বলে অনেকে মনে করেন। এই ধারণাকে সত্য বলে ধরে নিলে প্রশ্ন জাগে যে আজকের বিমূর্তায়নের প্রধান অনুপ্রেরণা তাহলে কী? ক্যান্ডিনেস্কি’র On the Spiritual in Art (শিল্পে আধ্যাত্মিকতা প্রসঙ্গে) প্রবন্ধ এই প্রশ্নের কিছু উত্তর দিতে পারে।

২.

আজকের দিনে যখন অনেকে শিল্পকে অর্থহীন বলে মনে করছেন তখন লিন্ডসে ও ভারগো’র মতো অনেকে শিল্পকে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি বলে মানতে নারাজ। তাদের মতে মনুষ্য আত্মার উন্নয়ন ও পরিশীলন ঘটানোর একটি ক্ষমতা শিল্পের আছে। ক্যান্ডিনেস্কি মনে করেন যে বিমূর্তয়নের ভিতর দিয়ে শিল্পের জটিলতা বাড়লেও প্রকাশভঙ্গির ক্ষেত্রে ফর্মের মান ও সংখ্যা বেড়েছে। তিনি বিমূর্তায়নের একজন পুরোগামী শিল্পী। শিল্প সমালোচক হার্বাট রীড মনে করতেন যে ক্যান্ডিনেস্কি চিত্রশিল্পীর চেয়ে বেশি কিছু ছিলেন; দার্শনিক ও স্বপ্নচারী। আধ্যাত্মিকতাকে তিনি সংজ্ঞায়িত করেছেন প্রকৃতি ও বস্তুকে অতিক্রম করে সত্তা বা আত্মার সাথে স্থাপিত সম্পর্ক হিসেবে। মাইক কিং তার Concerning the Spiritual in Twentieth-Century Art and Science প্রবন্ধে আধ্যাত্মিকতার সংজ্ঞার্থ নির্ণয়কে বেশ জটিল বিষয় বলে মত দিয়েছেন। তবে প্রসঙ্গটিকে তিনি ৩টি বিষয়ে সীমিত করেছেন: ১. ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা যেমন, খ্রীস্ট, ইসলাম, বৌদ্ধ, হিন্দু ইত্যাদি ধর্ম; ২. অতিপ্রাকৃত ঘটনাপ্রবাহ যেমন, অস্বাভাবিকতা, পুনর্জন্ম, অলোকদৃষ্টি ইত্যাদি; এবং ৩. অভিজ্ঞতা-বিশ্বাস-যুক্তি অতিক্রান্ত বিষয় যেমন, অসীম, আদি ও অন্তহীনতার সাথে সত্তার যোগসূত্র এবং মরমি সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি। কিং-এর মতে, ক্যান্ডিনেস্কি’র আধ্যাত্মিকতার ধারণা দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোত্রের। অনেক সাদৃশ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যান্ডিনেস্কি সৃষ্টি ও ধারণাকে দুটি ভাগে ভাগ করে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ১৯১১ সালে যখন ক্যান্ডিনেস্কি এই প্রবন্ধ লেখেন তখন তিনি খেয়াল করেছিলেন যে দর্শকরা কোনো শিল্পকর্ম দেখার সময় তাতে প্রকৃতির হুবহু অনুকরণ কিংবা তার কোনো বাস্তব প্রয়োজনীয়তা বা উপস্থাপিত প্রকৃতির কোনো বিশেষ ব্যাখ্যা দেখতে চান। এটাই তার মতে শিল্পের বাহ্যিক চাহিদা। ক্লেমেন্ত গ্রিনবার্গ তার Modern and Postmodern প্রবন্ধে শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করেছেন aspiration to quality, to aesthetic value and excellence for its own sake, as end in itself হিসেবে। আমেরিকার বিমূর্ত প্রকাশবাদীদের সাথে গ্রিনবার্গের সংশ্লিষ্টতা ছিল। সে কারণে তিনি ক্যান্ডিনেস্কি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করতে পেরেছেন। তবে শিল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের মত ভিন্ন। আর গ্রিনবার্গ মনে করতেন নন্দনতাত্ত্বিক ছাড়া শিল্পের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বর্ণনা করতে গিয়ে ক্যান্ডিনেস্কি বলেছেন যে এই চাহিদা ৩টি মরমি উৎস থেকে আসে:

১.        প্রত্যেক শিল্পী শিল্পের স্রষ্টা হিসেবে সেই বিষয়টি প্রকাশ করবে যা তার কাছে স্বতন্ত্রমণ্ডিত;

২.         প্রত্যেক শিল্পী তার প্রজন্মের সন্তান হিসেবে সেই সময়ের স্বতন্ত্রমণ্ডিত বিষয়কে তুলে ধরবেন;

৩.        প্রত্যেক শিল্পী শিল্পের দাস হিসেবে সাধারণভাবে শিল্পের স্বতন্ত্রমণ্ডিত বিষয়গুলো প্রকাশ করবে;

এই অভ্যন্তরীণ চাহিদার চর্চা করতে গিয়ে ক্যান্ডিনেস্কি বলেছেন যে রঙের সাথে ড্রইংয়ের সম্মিলন চিত্রে বিধৃত সঙ্গতিকে উৎকর্ষ দান করে এবং তা এমন এক রচনা স্তরে উন্নীত হয় যে তা বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে আধ্যাত্মিকচর্চার প্রয়োজনে লেগে থাকে। বিশুদ্ধ শিল্পের এই ধারণা গিলাওমি অ্যাপোলিনেয়ারের অর্ফিজমের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্যান্ডিনেস্কি আরো মনে করতেন যে একদম জড় বা নির্জীব বস্তুর মাঝে প্রাণসঞ্চার করার ক্ষমতা ছিল সেজানের। মৃত বস্তুকে তিনি অভ্যন্তরীণভাবে জীবিত করে তুলতে পারতেন। তিনি রঙের সূত্রে প্রকাশ করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। তিনি ঐক্ষিক বাস্তবতাকে বিমূর্ত শৃঙ্খলায় পাল্টে ফেলার কাজে বিংশ শতাব্দীর শিল্পীদের যোগ্য করে তোলায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ক্যান্ডিনেস্কি উপলব্ধি করেছিলেন যে সামঞ্জস্য সৃষ্টির জন্য সেজান রৈখিক ও বর্ণিল ফর্মকে পাশাপাশি স্থাপন করেছিলেন। এটাই মূল পার্থক্য।

৩.

ক্যন্ডিনেস্কি On the Spiritual in Art প্রবন্ধে রং ও ফর্মের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিষয়ে তার আস্থার কথা বলেছেন। বলেছেন কীভাবে এই দুই মৌলিক মাধ্যমের সাহায্যে শিল্পী আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছাতে পারে। ফর্ম বাহ্যিক মনে হলেও আসলে তা অভ্যন্তরীণ সারবস্তুর প্রকাশক। বাহ্যিক পৃথিবীতে অভ্যন্তরীণ সঙ্গতি বিষয়ে বলতে গিয়ে ক্যান্ডিনেস্কি পাবলো পিকাসো ও অঁরি মাতিসের উল্লেখ করেছেন যারা এই সঙ্গতি অর্জন করতে চেষ্টা চালিয়েছেন, পিকাসো ফর্ম আর মাতিস রঙের মাধ্যমে। ক্যান্ডিনেস্কি বলেছেন যে পিকাসো সবসময় স্বপ্রকাশের তাড়না অনুভব করতেন। পিকাসো নিজেই বলেছেন যে ঘনকবাদ আবিষ্কারে তার কোনো ইচ্ছাই ছিল না, তিনি শুধু নিজের মাঝে যা ছিল তাই প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। ক্যান্ডিনেস্কি আরো উল্লেখ করেছেন যে পিকাসো সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক উপাদান লাভে সচেষ্ট হয়েছেন। তিনি যৌক্তিক পথে বস্তুগত উপাদানের ধ্বংসাবশেষে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন তাকে বাদ দিয়ে নয়, তাকে নানা অংশে ভেঙে এবং ক্যানভাসে গঠনমূলকভাবে সাজিয়ে। ঘনকবাদে প্রাকৃতিক ফর্ম গঠনমূলক পরিসমাপ্তির প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই ন্যূন হয়ে পড়ে। পিকাসো সম্ভবত ক্যান্ডিনেস্কির সাথে সহমত ছিলেন যে বস্তুর একটি অভ্যন্তরীণ মূল্য আছে। বিমূর্ত বলে কিছু নেই, সবকিছুরই একটা শুরু আছে এবং তারপর বাস্তবতার চি‎হ্নগুলো মুছে গিয়ে শুধু বস্তুর ধারণাটা রয়ে যায়। এভাবেই একজন শিল্পী শুরু করেন, নিজের ভাবনা ও আবেগকে উসকে দেন। ১৯৫০ সালে উইলিয়াম রাইটের সাথে সুর মিলিয়ে আমেরিকার বিখ্যাত বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পী জ্যাকসন পোলক বলেছিলেন যে শুধুমাত্র সমসাময়িক যুগের লক্ষ্যকে প্রকাশ করা ছাড়া আধুনিক শিল্পের আর কোনো লক্ষ নেই। পোলক প্রথাগত শিল্পচর্চার রীতি ভেঙেছিলেন মেঝেতে ক্যানভাস বিছিয়ে কাঠির সাহায্যে তার ওপর ফোঁটা ফোঁটা রং ফেলে ছবি এঁকে। ক্যান্ডিনেস্কি প্রথাগত নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে যে আপত্তি জানিয়েছিলেন― এ ছিল তারই অনুসরণ। পোলক নিজেকে সবধরনের প্রচলিত রীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছিলেন। পোলক বলেছেন যে ছবিতে তিনি যা করেন তা সম্পূর্ণ অবচেতন মনে এবং সৃষ্টির মুহূর্তে তিনি পরিপূর্ণরূপে তার মাঝে উপস্থিত থাকতে চাইতেন। পোলকের এই বিষয়টিকে অনেক সমালোচক আদিম বলে উলেখ করেছেন। তারা তার ছবিকে মনস্তাত্ত্বিক বলে মনে করেন যার মাধ্যমে অস্তিত্ববহির্ভূত কোনো শক্তির আগমন ঘটে। পোলকের কাজে এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতির সম্পৃক্তিকে অস্বীকার করা যায় না।

রং নিয়ে বলতে গিয়ে ক্যান্ডিনেস্কি বলেছেন যে মানুষের ওপর রঙের একটি অবয়বগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া আছে। মাতিস কর্তৃক রঙের মুক্ত ব্যবহার শিল্পে আধ্যাত্মিকতার পথে আরো এক ধাপ উত্তরণ। ক্যান্ডিনেস্কি বলেছেন যে মাতিস তার ছবিতে রং ও ফর্মের মাধ্যমে অতিন্দ্রিয় বিষয়কে তুলে আনতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে রঙের সামঞ্জস্য ও অসঙ্গতির মাধ্যমে আনন্দদায়ক ফল লাভ হয়। তার বিশ্বাস ছিল যে রঙের প্রধান উদ্দেশ্য হলো অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের নিখুঁত প্রকাশ। মাতিস বলেছেন যে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে রঙের বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছেন, কেনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দ্বারা চালিত হন নি। মাতিস উল্লেখ করেছেন যে শরতের ছবি আঁকার জন্য কোন রং শরৎ ঋতুর সাথে মানানসই তা ভাবার প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র এই ঋতু যে অনুভূতি জাগিয়ে তোলে তার প্রেরণাতেই রঙের ব্যবহার করা হয়। ক্যান্ডিনেস্কিও রঙের বৈজ্ঞানিক ব্যবহারে অনিহা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি গ্যেটের বর্ণতত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন যা রঙের নৈতিক প্রয়োগের ওপর জোর দেয়।

আরেকজন বিমূর্ত প্রকাশবাদী মার্ক রোথকো রঙের বৈশিষ্ট্যকে ভিত্তি করে ছবি আঁকতেন। রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য সম্বলিত ক্ষেত্রের ওপর স্পষ্ট আনুভূমিক গঠনে তিনি এমন কিছু প্রকাশ করতে চাইতেন যা আলোর উৎস বা কখনো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অন্ধকার তুলে ধরে। রোথকোর চিত্রে ফর্মের বালাই নেই বলা চলে। অনেকে মনে করেন তার ছবি কোনোকিছু তুলে ধরে না। তবে তিনি এক ধরনের শীতল শূন্যতা বা অনিবার্য ধ্বংসের অনুভূতি তুলে ধরেন। তিনি বলতেন যে তিনি রং, রেখা ও ফর্মের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি শুধু মানুষের মৌলিক আবেগ প্রকাশ করতে চাইতেন। যারা তার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে অশ্র“­ ফেলে তারা সেই একই ধরনের ধর্মীয় আবেগ অনুভব করে যা তিনি ছবিটা আঁকার সময় অনুভব করেছিলেন। যদি কেউ শুধুমাত্র রং-রেখা দ্বারা আপ্লুত হন তবে তিনি নিশ্চয় কিছু হারাবেন। যদিও রঙের ব্যাপারে রোথকোর ক্যান্ডিনেস্কির মতো একই ধরনের অনুভূতি ছিল না। এটা সুস্পষ্ট যে তিনি রং ব্যবহার করেছেন অভ্যন্তরীণ বিষয়কে যুক্ত করার জন্য। রোথকো বিশ্বাস করতেন যে শিল্পের ক্ষমতা রয়েছে পৃথিবীকে পাল্টে দেওয়ার এবং এ বৈশিষ্ট্যই তিনি অর্জন করতে চেয়েছিলেন যখন ম্যানহাটনের ফোর সিজনস রেস্তোরাঁয় কাজের ফরমায়েশ পেলেন। প্রথমে তার মনে হয়েছিল যে রেস্তোরাঁর দেওয়াল তার ছবি দিয়ে সাজালে সেখানে আগত ব্যক্তিদের বিশেষ এক অনুভূতি হবে। কিন্তু পরে তার এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। একদিন সেখান থেকে বেরুনোর সময় তার মনে হলো যে যারা অনেক খরচ করে ওই রেস্তোরাঁয় খাবে তারা ভুলেও তার ছবির দিকে তাকাবে না। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিল্পের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যে মূল্য দাঁড়িয়েছিল তা এই শতকের মাঝামাঝিও প্রাসঙ্গিক। এখন প্রশ্ন হলো শিল্প আমাদের কোথায় নিয়ে আসছে। শিল্পের বাহ্যিক মূল্য কি তার আধ্যাত্মিক মূল্যকে খর্ব করছে? নাকি অভ্যন্তরীণ মূল্য বেশি করে আমাদের হৃদয় স্পর্শ করছে?

৪.

সমসাময়িক শিল্প ও আধ্যত্মিকতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইলিনর হার্টনি তার Art and Today গ্রন্থে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যে উত্তরাধুনিকতা বিমূর্তায়নের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার বিশুদ্ধতা নষ্ট কিংবা সেখানে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উত্তরাধুনিকতার বৈশিষ্ট্য জানার সাথে সাথে এই যুগের কোনো শিল্পী তার কাজে আধ্যাত্মিকতা ধারণ করেন কি না তাও জানা জরুরি।

উত্তরাধুনিকতার সংজ্ঞা নিরূপণ সহজ নয়। লাওটার্ড, বদরিলার্দ, রোলা বার্থ, জ্যাক দেরিদা, মিশেল ফুকোর মতো বহু পণ্ডিত এই সম্পর্কে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত রেখেছেন। উত্তরাধুনিকতাবাদ বৃহৎ আখ্যানের ধারণা ভেঙে দিয়ে ক্ষুদ্র আখ্যানের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। আর এইভাবে তা বাস্তবতার বিনির্মাণ করে: ‘সত্য আদতেই এক ধরনের কল্পকাহিনি, পঠন আদতেই এক ধরনের ভ্রান্ত অনুধাবন, কারণ তা কখনোই সোজাপথে যায় না, তা সবসময়ই আংশিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে এবং প্রায়ই উৎপেক্ষা ব্যবহার করে। বিমূর্ত শিল্পে আধ্যাত্মিকতার ধারণাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে কি না এ প্রশ্নে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখা দরকার যার ভালো বিশ্লেষণ রয়েছে কর্নেল ওয়েস্টের রচনায়। উত্তরাধুনিকতা কি জনপ্রিয় শিক্ষায়তনিক সংস্কৃতির উদ্ধৃতি দেয়, নাকি সংস্কৃতির ব্যাপক কোনো অর্থ। নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত ও লৈঙ্গিকসহ পরিচয়ের অন্যান্য পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য থেকে সমসাময়িক সংস্কৃতির বিভাজনগুলো এসেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে উঁচু ও নিচু শিল্প, সংস্কৃতিকে পণ্য পরিণতকরণ ও শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণের ধারণা। তাহলে এগুলো আজকের শিল্পকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আর তাই অনেকে মনে করছেন যে উত্তরাধুনিক শিল্পের পক্ষে আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য ধারণের সুযোগ কমে গেছে। এখানে বস্তুতান্ত্রিক সুযোগ আরো বেশি করে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মনে করতেন যে সমসাময়িক শিল্পে আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান আর খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজা একই কথা। আমেরিকান শিল্পী জেমস টারেল আলো ও শূন্যস্থানকে ভিত্তি করে যে শিল্প সৃষ্টি করেছেন তা দর্শকের দেহ-মন-চোখের ওপর প্রভাব ফেলে যা ফলশ্র“তিতে এক ধরনের আধ্যাত্মিক জাগরণ তৈরি করে। সমালোচক ডেবোরাহ ওয়াই একে মরমি অবস্থা থেকে বোধগম্যতা, কাব্যিক থেকে অস্তিত্ববাদী অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য মানুষের আকাক্সক্ষাকে বুঝাতে চেয়েছেন। দর্শকদের জন্য তা হবে একটি ধ্যানগ্রস্ত অবস্থা। আলো ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পী এক ধরনের অনুভূতির আবেশ তৈরি করেন। টারেল আরো যোগ করেন কীভাবে প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে স্বাদের, রং প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে শব্দের অনুভূতি তৈরি হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ক্যান্ডিনেস্কি রঙের শারিরীক ও মনঃস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বাস করতেন। টারেলের এই মতের সাথে ক্যান্ডিনেস্কির মতের মিল রয়েছে। ডোনাল্ড কাসপিট ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে বিমূর্ত শিল্প বস্তুর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যকে এড়িয়ে গিয়ে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে । দর্শকের দৃষ্টি বাস্তব থেকে সরিয়ে টারেল আমাদের এমন এক অনুভবের বাস্তবে নিয়ে যান যা বিনির্মিত বাস্তব এবং একটি উত্তরাধুনিক ধারণা। শিল্পী অ্যান হ্যামিলটনের স্থাপনা নির্ভর শিল্পকর্মে ঘরবাড়ি, কাপড়ের সামগ্রী, অক্ষর, শব্দ ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি নিজে উল্লেখ করেছেন কীভাবে তিনি সেলাইয়ের সুতো ও লাইনের সাথে লেখনীর একটি যোগসূত্র অনুভব করেন। এটা ক্যান্ডিনেস্কির ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যিনি বলেছেন যে সচেতন বা অবচেতন মনে শিল্পী ধীরে ধীরে উপাদান বা সামগ্রীর ওপর জোর দিয়ে ফেলেন, তার আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করেন, তার অভ্যন্তরীণ ও অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের সাথে একটি ভারসাম্য আবিষ্কার করেন। ক্যান্ডিনেস্কি বিশ্বাস করতেন যে শিল্পে আধ্যাত্মিকতা এক অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং টারেল সেই বিষয়টিই অর্জন করতে চেয়েছিলেন।

এভাবেই বিমূর্ত শিল্প নানা প্রভাব ধারণ করে বিকশিত হয়েছে এবং উত্তরাধুনিক যুগে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিমূর্ত শিল্প শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা, ভয় ও আতঙ্ক তুলে ধরতে থাকে। অন্তর্লীন ভাবনা হয়ে ওঠে অন্তরের চাহিদা যা ক্যান্ডিনেস্কির মতে এক আধ্যাত্মিক বক্তব্যনির্ভর শিল্প সৃষ্টি করেছে। সমসাময়িককালে শিল্প সৃষ্টি দ্রুততর হয়েছে প্রযুক্তি-নির্ভর হওয়ার ও ভোক্তাচাহিদা বাড়ার কারণে। সেই সাথে বিমূর্ত শিল্পে কোনো প্রাণ আছে কিনা তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এর কি সত্যিই কোনো অর্থ আছে? নাকি শুধু অর্থ উপার্জন ও খ্যাতি অর্জনের জন্য এর সৃষ্টি হয়েছে? কিছু শিল্প সমালোচকের মতে, শিল্পের আসলেই কোনো মূল্য নেই, তা শুধুমাত্র যোগাযোগের একটি মাধ্যম। তবে বিমূর্তায়নে আদিম প্রভাব থাকার বিষয়টি বেশ অভিনব। ঘনকবাদীরা আদিম মুখোশ থেকে, দাদাবাদীরা আদিম অর্থহীন শব্দ থেকে, পরাবাস্তববাদী ও বিমূর্ত প্রকাশবাদীরা অবচেতন মনে প্রবেশ করে আচারকেন্দ্রিক পদ্ধতি থেকে প্রকাশভঙ্গি খোঁজেন। আমরা মনে করতে পারি যে আদিম সমাজে সবকিছুই খুব মৌলিক ছিল। মানুষ অস্তিত্বের প্রয়োজনে লড়াই করেছে এবং যা দেখেছে তার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্রের ছবি আমরা দেখেছি। এই মৌলিক আদলের মাধ্যমে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রকাশ পেয়েছে। আদিম বলতে মৌলিক ও সরল বোঝানো হলেও আসল হিসেবে মূলত তার গুরুত্ব। শিল্পের মৌলিক বা আদিম ফর্ম প্রকৃত আধ্যাত্মিক অর্থ তুলে ধরে। ক্যান্ডিনেস্কি প্রায় শতবর্ষ আগে লেখা তার On the Spiritual in Art প্রবন্ধে যে বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছিলেন এই উত্তরাধুনিক যুগেও তার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। শিল্পের বাণিজ্যিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এর আধ্যাত্মিকতা প্রসঙ্গটি খানিকটা চাপা পড়ে গেলেও একেবারে শুরুত্ব হারায়নি। ডোনাল্ড কাসপিটের আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন যে মরমি অভিজ্ঞতা একটি আবেগশূন্য পৃথিবীতে আবেগতাড়িতভাবে সম্পৃক্ত থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ফাস্টফুডের মতো ফাস্টআর্ট আমাদের গ্রাস করছে, কিন্তু আমাদের চাই শ্লথশিল্প যা সময়কে ধারণ করবে যেভাবে একটি পাত্র জল ধারণ করে; শিল্প সৃষ্টি হবে প্রত্যক্ষণের বিভিন্ন পথ ধরে যেখানে শিল্পীর দক্ষতা ও অধ্যবসায় দর্শককে ভাবাবে ও অনুভব করতে শেখাবে। যে শিল্প অনুভূতিশীল নয়, দেখার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে যে কোনোরূপ বারতা দেয় না, তা আসলে সার্থক শিল্প নয়। বিমূর্ত শিল্পের সেই বৈশিষ্ট্য নেই তা নয়, তবে এই নামের ওপর ভর করে এমন কিছু সৃষ্টি হচ্ছে যা শিল্প পদবাচ্য নয়।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা