বিশেষ রচনা

images

ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স

images1
______________________________________
সরোজিনী সাহু
______________

অনুবাদ: মাহবুব অনিন্দ্য
________________________

সরোজিনী সাহু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নারীবাদী লেখিকা। kindle ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে ভারতে ২৫ ব্যতিক্রমী নারীর একজন। জন্ম ১৯৫৬ সালে ভারতের ওডিশা রাজ্যে। লেখেন ওড়িয়া ও ইংরেজিতে। তার গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধের বিষয়বস্তু মোটা দাগে নারীÑ নারীর জীবন, যন্ত্রণা ও নানাবিধ জটিলতা। গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৭। ইংরেজিতে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে একটি উপন্যাস ও দুটি গল্প-সংকলন। কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি ফিচারভিত্তিক ইংরেজি জার্নাল ইন্ডিয়ান এজ এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। নিয়মিত ব্লগ লেখেন। তার লেখা এরমধ্যে পাঠকসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অনূদিত হয়েছে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায়। লেখালেখির জন্য ওডিশা সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসহ অর্জন করেছন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। এই লেখাটি Indian Feminism and Sexuality Discourse প্রবন্ধের বাংলা রূপান্তর।

১৯০১, ফুল ফোটে, ঝরে

১৯০১ সালে বস্তারের (বর্তমানে ছত্তিশগড়) এক খ্রিস্টান পরিবারে তার জন্ম। পরে তিনি কটক মেডিকেল স্কুলে পড়ালেখা করেন এবং সেখান থেকেই অর্জন করেন এলএমপি ডিগ্রি। সেই সময়েই তিনি কটক রেডক্রসের সুপারিনটেনড্যান্ট হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। এসময় পিতার বয়সী এক লোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে তার স্ত্রী কর্তৃক হাতেনাতে ধরা পড়েন। তাদের মধ্যে গভীর শারীরিক সম্পর্ক ছিল, কিন্তু প্রেমিকটি মনেপ্রাণে চাইতেন যোগ্যতম কোনো ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে হোক।
১৯২১ থেকে ১৯২৭, এই ছয়-সাত বছরে তিনি বেশ কিছু লেখালেখি করেন। ওড়িয়া ভাষায় অঞ্জলি ও অর্চনা সহ কয়েকটি কবিতার বই এবং ভারতী ও পরশমনি নামে উপন্যাস বের হয় তার। লেখার মাধ্যমে তিনি প্রতিবাদ করেছেন পর্দাপ্রথা, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও নারীর প্রতি সকল বৈষম্যের। পাশাপাশি কথা বলেছেন নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও বিধবা বিবাহের পক্ষে। রেডক্রসে তার পরামর্শক-প্রেমিকটির সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় তিনি দিল্লিতে বসবাসরত এক অখ্যাত ডাক্তার তথা ভণ্ডলোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অচেনা এই ডাক্তারের সাথে বিয়ের বিরোধিতা করেন প্রেমিকটি। তাতে কাজ হয়নি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি আর্যসমাজের সভ্য হন এবং অচেনা সেই ডাক্তার লোকটিকে বিয়ে করেন। তারপর দিল্লির চাঁদনিচক এলাকায় ক্লিনিক খুলে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। ওড়িয়া ভাষায় লেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হিন্দিতেও লিখতে শুরু করেন তিনি। বরমাল্য নামে হিন্দি কবিতার সংকলন বের হয় তার। পাশাপাশি মহাবীর, জীবন ও নারী ভারতীর মতো কয়েকটি হিন্দি সাময়িকপত্রের সম্পাদক হন। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারশ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পান। একজন নারীর জন্য সেই সময়ে এটি ছিল দুর্লভ স্বীকৃতি।
কিন্তু তার বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না মোটেও। স্বামী তাকে ব্যবহার করেছিল উপার্জনের উৎস হিসেবে। প্রতিরোধের চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। রোগে-শোকে, মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। তার করুণ জীবন ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক জিনেন্দ্রকুমার রচনা করেন কল্যাণী উপন্যাস।
তার নাম কুন্তলা কুমারী সাবাত। ওড়িয়া সাহিত্যের বহুদর্শী এক লেখিকা। তার বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর জীবন সুখের ছিলো না। প্রেম, যৌনতা, অত্যাচার, প্রতারণা তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিলো। সামন্ততান্ত্রিক ভারতে পুরুষ-আধিপত্যশীল সমাজের অনেক আঘাত সয়েছেন নীরবে। সাহিত্যে প্রকাশ করেননি তেমন কিছুই। যৌনতা কিংবা জীবন-যন্ত্রণার কোন বয়ান আমরা পাই না তার কবিতায়। বরং যৌন অভিপ্রকাশের ওপরে এক ধরনের সুফি আদর্শ বা আধ্যাত্মিকতার প্রলেপ দিয়ে সবসময় গোপন করতে চেয়েছেন বেদনা-জর্জর জীবন-অভিজ্ঞতার সব করুণ আখ্যান। এই প্রবণতা স্থায়ী হয়েছিল অনেক বছর, এমনকি পোস্ট-কলোনিয়াল যুগ শুরুর পরে কয়েক দশক পর্যন্ত। এই যুগে নারী-কবিতাকাররা তাদের ভালবাসার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন ভক্তিমূলক কবিতার ফরম্যাটে।

১৯১৪, গোপন দুঃখ

১৯৩০ সালে ১৬ বছর বয়সী ভারতীয় এক বালিকার সাথে রোমানিয়ার এক তরুণের সক্ষাৎ হয়। দুজনে প্রেমে পড়ে। তরুণটি এসেছিল ভারতীয় দর্শনের ওপর পড়ালেখা করতে, মেয়েটি ছিলো তার শিক্ষকের কন্যা। এই সম্পর্ক তারা গোপন রাখতে পারেননি, অল্পদিনের মধ্যেই অভিভাবকেরা বিষয়টি জেনে যায়। তরুণটিকে শিক্ষকের বাড়ি থেকে চলে যেতে এবং আর কখনোই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ না করতে বলা হয়। পরবর্তীতে সেই তরুণ পরিচিতি পান বিশ্বখ্যাত দার্শনিক হিসেবে। লেখেন একটি আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ১৯৩৩ সালে রোমানিয়ায় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি লেখা হয়েছিল বিশেষ করে একটি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য। পরে তা দেদার বিক্রি হয় এবং লেখকের জন্য বিপুল অর্থ ও খ্যাতি বয়ে আনে। উপন্যাসটি তখন ইতালিয়ান, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।
পরে বিশ বছর বয়সে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়, সন্তানও হয় দুটি। এরপর তিনি লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন, প্রকাশ করতে থাকেন কবিতা ও গদ্যের বইপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর বেশ কয়েকটি বই লেখেন তিনি। তবে ১৯৭৪ সালের আগে তেমন বিখ্যাত হতে পারেননি।
১৯৩৮ কিংবা ১৯৩৯ সালে তার পিতার ইউরোপ ভ্রমণের পরেই কেবল তিনি রোমানিয়ায় প্রকাশিত উপন্যাসটি সম্পর্কে জানতে পারেন। এও জানতে পারেন সেটি তাকেই উৎসর্গ করে লেখা হয়েছে। ১৯৭২ সালের দিকে লেখকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোলকাতায় এলে অবশেষে তিনি বুঝতে পারেন যে বইটিতে তাদের দুজনের যৌন সম্পর্কের বর্ণনা করা হয়েছে। পরে এক বন্ধুকে দিয়ে উপন্যাসটি ফরাসি থেকে অনুবাদ করিয়ে নেন। উপন্যাসের বর্ণনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। ১৯৭৩ সালের তিনি আমেরিকায় যান একটি সেমিনারে রবীন্দ্রনাথের ওপর বক্তৃতা দিতে। ৪৩ বছর পর লেখকের সাথে আবার সাক্ষাৎ হয় তার, ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে কথা বলেন তিনি। আর এই বলে সতর্ক করে দেন যে, বইটি কখনও ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়ে থাকলে লেখকের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করতে পারেন। লেখক তাকে নিশ্চিত করেন যে, উপন্যাসটি তিনি ইংরেজিতে প্রকাশ করেননি বা করবেন না। সম্ভবত লেখককে তিনি বিশ্বাস করেননি, চেপে রাখতে পারেননি নিজের মর্মবেদনা ও দুঃখের কথা। দুঃখ ছিলো এই যে, তার ভালোবাসাকে অসত্য ও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপর তিনি নিজে একটা উপন্যাস লেখেন। তার মৃত্যুর পরে ১৯৭৪ সালে আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস রোমানিয়ান ও ভারতীয় উপন্যাস দুটির একটি যুক্ত ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে। এতে উঠে আসে দুজনের সম্পর্কের খোলামেলা বর্ণনা। উপন্যাসটিতে তিনি তুলে ধরেছেন এক ভারতীয় মেয়ে কিভাবে পশ্চিমা এক তরুণের প্রেমে পড়ে যায় তার বয়ান। শরীরী সম্পর্কের চেয়ে আবেগের কথাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এখানে।
রোমানিয়ার সেই লেখকের নাম মির্চা এলিয়াদ আর ভারতীয় মেয়েটির নাম মৈত্রেয়ী দেবী। রোমানিয়ার উপন্যাসটির ইংরেজি নাম বেঙ্গল নাইটস আর ভারতীয় উপন্যাসটির নাম ইট ভাজ নট ডাই। উপন্যাস দুটি বাংলায় যথাক্রমে লা নুই বেঙ্গলি ও ন হন্যতে নামে অনূদিত হয়েছে, সেকথা আমাদের অনেকেরই অজানা নয়।

১৯১৯, লাভ স্টোরি

মৈত্রেয়ী-কাহিনীর ছয় বছর পরে পাঞ্জাবের অল্পবয়সী এক নারী-কবি বিয়ে করেন এক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদককে। শৈশব থেকে পরিচয় ছিলো দুজনের। বিয়ে করে নাম পাল্টে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে উপন্যাস, ছোটগল্প ও কবিতা মিলিয়ে তিনি ৭০টির মতো বই লেখেন। ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি যে ২১ ব্যক্তিকে ফেলো নির্বাচন করে তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। এছাড়া পদ্মবিভূষণ, জ্ঞানপীঠ ও পদ্মশ্রী প্রভৃতি পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে। দিল্লি, জবলপুর ও বিশ^ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯১৯ সালে গুজরানওয়ালায় (বর্তমানে এটি পাকিস্তানে পড়েছে) জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার একমাত্র ছেলে একাধারে স্কুল শিক্ষক, কবি ও একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। ৪০ বছর বয়সে তিনি উর্দু ভাষার এক কবির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এজন্য ত্যাগ করেন স্বামীকে। কিন্তু সেই কবি তাকে বিয়ে করেননি। তার জীবনে নতুন এক নারীর আগমন ঘটেছিল। পরে তিনি এক চিত্রশিল্পীর সাথে জড়িত হন এবং জীবনের বাকি ৪০ বছর তার সাথেই কাটিয়ে দেন। তার বেশিরভাগ বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকেন এই শিল্পী। বাকি জীবনে দুজন প্রেমিকের সাথেই সমানতালে নির্বিঘেœ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এই লেখিকার নাম অমৃতা প্রীতম।  ২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর মারা যান তিনি। তার দুই প্রেমিক ছিলেন ইমরোজ ও সাহির লুধিয়ানভি। অমৃতা-ইমরোজের কাহিনী নিয়ে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া প্রকাশ করে উমা ত্রিলকের লেখা অমৃতা-ইমরোজ: আ লাভ স্টোরি।

১৯৩৪, খোলা হাওয়া

মৈত্রেয়ী-ইলিয়াদ প্রেম-রোমান্সের চার বছর পরে কেরালায় জন্ম নেয় এক মেয়ে। সেই শহরে কাটে তার শৈশব। ১৭ বছর বয়স থেকে সে ইংরেজি ও মালয়ালম ভাষায় লিখতে শুরু করে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার চেয়ে ১৫ বছর বেশি বয়সী এক লোকের সাথে বিয়ে হয় মেয়েটির। বিয়ের এক বছর পরেই জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান।
শীঘ্র তার লেখায় এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। তার লেখা হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক আখ্যান। জীবনের দুর্গতি ও টিনেজ বয়স থেকে শুরু হওয়া মানসিক আঘাতের কথা তিনি গোপন রাখতে পারেননি। লেখিকা হিসেবে তিনিই প্রথম নিজের যৌন আকাক্সক্ষার খোলামেলা বর্ণনা তুলে ধরেছেন এবং সেগুলো নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা করেছেন। নিজের সমকামী সম্পর্ক, স্বামীর সমকাম-প্রবণতা এমনকি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কথাও গোপন রাখেননি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, সেই স্বামী সবসময় সমর্থন দিয়ে গেছেন তার লেখার।
বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ মাই স্টোরিতে তিনি লিখেছেন, “আমার মানসিক বৈকল্যের দিনগুলোতে আমার স্বামী ও আমার মধ্যে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় যা ছিলো একান্ত শরীরী… সে আমাকে গরম পানিতে গোসল করিয়ে দিতো তারপর ছেলেদের পোশাক পরিয়ে তার কোলে বসাতো, আর আদর করে ‘মাই লিটল ডার্লিং বয়’ বলে ডাকতো… আমি প্রকৃতিগতভাবে লাজুক ছিলাম…। কিন্তু অসুস্থতার সময়ে জীবনে প্রথমবারের মতো সব বিসর্জন দিয়েছি। সেই প্রথম বুঝতে পারি বিছানায় নিজেকে কিভাবে পুরোপুরি সমর্পণ করতে হয়।”
অনেক সাক্ষাৎকারে লেখালেখির ক্ষেত্রে স্বামীর সমর্থনের প্রশংসা করলেও মাই স্টোরিতে তিনি বলেন যে, স্বামী তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন এজন্য যে, তার লেখালেখি ছিলো স্বামীর উপার্জনের উৎস। দীর্ঘ অসুখে ভুগে তার স্বামী মারা যান। পরে তিনি রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হন। এক মুসলমান তরুণকে বিয়ে করতে ৬৫ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হন তিনি। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার পরে তিনি যুক্তি দেখান, বিশ্বে নারীর জন্য সবচেয়ে সুন্দর পোশাক হচ্ছে পর্দা। নিরাপত্তার বোধ থেকে তখন সার্বক্ষণিক তিনি পর্দা পরতেন। ধর্মান্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, জীবনভর তিনি একাকীত্ব বোধ করতেন। রাতে ঘুমোতেন বালিশ বুকে নিয়ে। কিন্তু এখন আর তিনি একা বোধ করেন না। ইসলাম তাকে সঙ্গ দেয়। তার মতে, পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা নারীকে ভালোবাসা ও সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু ২০০৬ সালে কোচিতে একটি প্রকাশনা উৎসবে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ধর্মান্তরিত হবার জন্যে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং তিনি তার মুসলিম বন্ধুদের প্রতারণাপূর্ণ আচরণে বিভ্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া দাবি করেন যে, তার কয়েক লাখ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, বইপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রসহ সমস্ত সম্পদ মুসলমানরা লুট করেছে।
তার নাম কমলা দাস, মাধবকুট্টি অথবা কমলা সুরাইয়া। ১৯৮৫ সালে মার্গারেট আর্চনার, ডরিস লেসিং ও নাদিন গার্ডিমারের সাথে নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার নাম ওঠে। শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পাননি। তবে এশিয়ান পোয়েট্রি প্রাইজ, কেন্ট অ্যাওয়ার্ড, এশিয়ান ওয়ার্ল্ড প্রাইজ, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। ৩১ মে ২০০৯ পুনেতে তার জীবনাবসান হয়।

ঔপনিবেশিক চোখে যৌনতার ভূমিকা

গত শতকের এই চার নারীবাদী লেখিকা নিজেদের আলাদা আলাদা চরিত্র সত্ত্বেও নারীর পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। লেখালেখির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতন্ত্র মূল্যবোধ। অনেক সময় হয়ত সেগুলোককে মনে হয়েছে বিভ্রান্তিকর, বৈপরীত্যমূলক। এদের লেখা পড়ে কেউ হয়ত বলতে পারেন যে, সামগ্রিক অর্থে নারীত্ব এক ধরনের তত্ত্বগত মিথ যা অতীন্দ্রিয় উপায়ে নারীর বহুমাত্রিক মিথের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এই প্রতিযুক্তি খারিজ করে দেবার উপায় নেই। কিন্তু একজন নারী হিসেবে (নারীবাদী হিসেবে নয়) সব ধরনের পরিস্থিতিকে আমি নিজের জন্য সত্য বলে উপলব্ধি করি। কোনোদিন হয়ত আমিও মৈত্রেয়ী, কমলা, অমৃতা বা কমলা হতে পারতাম। মৈত্রেয়ী কেন কমলার মতো হলো না অথবা কমলা কেন কুন্তলার মতো হয়নি, কেন মৈত্রেয়ী ইলিয়াদের সাথে তার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেনি, কমলা যেমনটা পেরেছে-এ ধরনের যুক্তিগুলোতে সুশৃঙ্খল চিন্তার ছাপ নেই।
আমার মতে, কুন্তুলা থেকে কমলা পর্যন্ত নারীমনের যে রূপান্তর তার কারণ হচ্ছে ভারতে নারীবাদের বিকাশ। ভারতীয় নারীবাদের কারণ ও অভিপ্রকাশের জায়গাটি পশ্চিমা দুনিয়ার নারীবাদী অভিপ্রকাশের চেয়ে আলাদা। পশ্চিমের উপনেবিশপূর্ব সামাজিক কাঠামো এবং নারীর যে ভূমিকা দেখা গিয়েছিলো সেটি তাত্ত্বিকভাবে নারীবাদে রূপলাভ করে এবং তা কোনো অর্থেই ব্যক্তিক ব্যাপার ছিলো না, ছিলো অনেক বেশি সমাজতাত্ত্বিক ব্যাপার। নারী জনগোষ্ঠীকে দেখা হতো পুরুষ জনগোষ্ঠীর সমকক্ষ হিসেবে। কিন্তু নারীর ব্যক্তিসত্তা সামন্তযুগের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতোই পিউরিটান ছিল। উপনিবেশপূর্ব ভারতীয় সমাজে পুরুষেরা বহুবিবাহ করতে পারত। এমনকি ভারতের অনেক পুরুষ বুদ্ধিজীবী, লেখক ও রাজনীতিবিদ পর্যন্ত প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আরেকটি বিয়ে করেছেন। কিন্তু এমন একটিও উদাহরণ নেই যে, বিধবা হবার পরে কোনো নারী সেই সময়ে আবার বিয়ে করতে পেরেছেন। ব্রিটিশ শাসনের সেই যুগে যদিও বিধবা বিবাহের আইনি বৈধতা ছিলো। নারীদের শিক্ষা দেওয়া হয় বিসর্জনের দেবী হতে, সিমোন দ্য ব্যুভোয়াঁ তার দ্য সেকেন্ড সেক্স বইতে যেমনটা লিখেছেন, নারীদের মা, মাটি, মাতৃভূমি, কুমারি, প্রকৃতি প্রভৃতি মিথ বা কল্পিত আদর্শের ফাঁদে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে উধাও হয় তাদের ব্যক্তিসত্তা ও স্বতন্ত্র অবস্থান। উপনিবেশপূর্ব নারীবাদীরা তাই লেখেন ‘সংসারে নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য’ অথবা ‘ভারতীয় পুরাণে কিংবদন্তী নারী’ জাতীয় রচনা। আধিপত্যশীল পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতাদর্শই সেখানে উঠে আসে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘নারীত্বে’র ধারণা পুনর্নিমাণের জন্য এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রূপলাভ করে এবং এতেও ব্যক্তিক নারীবাদকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়। কুন্তলা এবং মৈত্রেয়ী সেই উপনিবেশ-পূর্ব সমাজেরই উপজাত।
বর্তমানে ভারতে সবচেয়ে বৃহৎ ও মূলধারার নারী সংগঠন হচ্ছে অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্স। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একটি অঙ্গ সংগঠন হিসেবে বহুস্তর বিশিষ্ট এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে। আন্দোলনের অঞ্চলগত বৈচিত্র ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্থাটি সবসময় সচেষ্ট থেকেছে। কোলকাতায় মৈত্রেয়ী-ইলিয়াদ সাক্ষাতের এক বছর পরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯৩১ সালে করাচি প্রস্তাব পাস করে। স্বাধীন ভারতের রূপরেখা হিসেবে ‘স্বরাজ’ ঘোষণা করা হয়। এতেও নারী-অধিকারের বিষয়টি খুবই সীমিত আকারে উল্লে¬খ ছিলো। স্বরাজ-এর একটি ধারায় নারী অধিকার সুরক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয় শ্রমিক অধিকারের অংশ হিসেবে!
উপনিবেশ-পূর্ব ভারতের তুলনায় উপনিবেশ-উত্তর ভারতের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অনেক ভিন্ন। এ সময় নারী-শিক্ষার বিপুল বিস্তার ঘটতে থাকে। যে বাইনারিগুলো জেন্ডারভাবনার আধিপত্যশীল দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল, তাকে ভেঙেচুরে নতুন রূপ দেয় বৈষম্যমূলক পিতৃতান্ত্রিক পরিবার-কাঠামো: বয়স, সামাজিক মর্যাদা, পুরুষের সাথে সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে পিতৃতান্ত্রিক আরও কিছু ব্যবস্থা যেমন যৌতুক, জাতিভেদ, রক্তসম্পর্ক, গোষ্ঠী, গ্রাম, বাজার ও রাষ্ট্র প্রভৃতি। এই পিতৃতান্ত্রিক প্রতিবেশ ‘নারীসত্তা’র অধিকারের প্রশ্নকে ‘বিরোধিতা’ হিসেবে বিবেচনা করে। কমলা দাস ও অমৃতা প্রীতমকে আমি সমর্থন করি আর সেজন্যেই এই লেখা। অনেক তাত্ত্বিক আছেন যারা সবসময় চেষ্টা করেন নারীবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যৌনতার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করতে। আদতে যা কখনো হতে পারে না। তাদের সংজ্ঞায়িত নারীবাদে পুরুষ-আধিপত্যবাদী মতাদর্শ প্রতিরোধের কোনো ধারণা নেই। তারা মনে করে যে, এ ধরনের আধিপত্যবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে যৌনতার কোন ভূমিকা থাকতে পারে না। বিশ শতকের উপনিবেশিক ভারতে নারীদের লেখালেখি যদি হয় সামাজিক উত্তরাধিকার-পরম্পরা ও স্বতন্ত্র ভারতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা, উপনিবেশ-উত্তর ভারতে নারীবাদী তর্কবিতর্ক হয়েছে নারী-যৌনতাবাদীদের চর্চিত পথেই।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা