বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য : ভাষার ভেলায় ভাসাই তরী

বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের বহর দেখে বিস্ময় প্রকাশের অবকাশ আছে। তিনি দুহাতে উপন্যাস লিখেছেন_একথা বললে তাঁর উপন্যাসের সংখ্যাধিক্যের ধারণা স্পষ্ট হয় না। বোধকরি দুর্গাদেবির সুদৃষ্টি ছিল তাঁর প্রতি, তাই দশহাতের শক্তি এসে ভর করেছিল বুদ্ধদেবের এক হাতে। তাঁর কথাসাহিত্যের খোঁজখবর যতটুকু জানি, তা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব নয় যে, এমন কোন গল্প কিংবা উপন্যাস তিনি লেখেন নি, যা পাঠ করে পাঠকের মনে হতে পারে, বুদ্ধদেব তাঁর নামের প্রতি অবিচার করেছেন। নিজের লেখা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরি। নিজের কবিতার বৈষয়িক পরিমণ্ডল থেকে তিনি উপন্যাসের রসদ সংগ্রহ করেছেন, আবার উপন্যাসের ফ্রেম থেকে আলোকপ্রাপ্ত হয়ে নাটকের জন্ম দিয়েছেন। নাটক ও উপন্যাসের মনোদৈহিক রসায়ন থেকে কবিতায় ফিরেছেন_এমন দৃষ্টান্তও উল্লেখ করার মতো। কোন্ শক্তি বুদ্ধদেবকে এই বিপুলায়তন সৃজনবিশ্বের প্রতিভূ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, তার উত্তর অনুসন্ধানে অবতীর্ণ হওয়ার আগে সঙ্গ : নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের ‘রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ও গদ্য’ শীর্ষক রচনায় রবীন্দ্র-প্রতিভার স্বরূপ বিষয়ে বুদ্ধদেবের একটি মন্তব্যের উল্লেখ করতে চাই :
রবীন্দ্রনাথ গদ্য লিখেছেন কবির মতো; তাঁর গদ্যের গুণ কবিতারই গুণ; যা কবিতা আমাদের দিতে পারে, তা-ই তাঁর গদ্যের উপঢৌকন। যদি কোনো খণ্ডপ্রলয়ে তাঁর সব কবিতার বই লুপ্ত হয়ে যায়, থাকে শুধু নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, তাহলে সেই প্রবন্ধ নাটক উপন্যাস থেকেইে ভাবীকালের পাঠক বুঝে নিতে পারবে যে রবীন্দ্রনাথ এক মহাকবির নাম।
ব্যক্তিগত শিল্পবিশ্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনিও তাঁর সহযোদ্ধাদের মতো রবিরশ্মির তীক্ষèতায় অস্বস্তি বোধ করেছেন এবং রবীন্দ্রসাহিত্যে কী নেই ও সাহিত্যিক হিসেবে তাঁদের কী দেয়ার আছে সে-বিষয়ে বিস্তর বাক্য ব্যয় করেছেন। বলা যায়, তাঁরই তত্ত্বাবধানে ‘রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত’ ও ‘যুগোপযোগী’ সাহিত্যসৃজনের সংগ্রাম অব্যাহত থেকেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নে তাঁর মতো উচ্ছ্বসিত কিংবা আবেগতাড়িত পাঠক ও সমালোচক তাঁর সমকালে আর কেউ ছিলেন না। বুদ্ধদেবের মতো বিনত ভাষ্যে তাঁর স্বকালের আর কেউ বলেন নি, রবীন্দ্রনাথের জন্ম না-হলে সাহিত্যস্রষ্টা বুদ্ধদেবের অস্তিত্ব অসম্ভব ছিল। তাঁর মতো করে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে আর কেউ বলেন নি- আমার কাছে, প্রত্যেক আধুনিক বাঙালি লেখকের কাছে,- কিন্তু বিশেষ করে আমার কাছে আপনি দেবতার মতো।’ বুদ্ধদেব যে দেবতার পূজারী, তাঁর প্রতি শর্তহীন সমর্পণের নজির বুদ্ধদেবসৃষ্ট সমালোচনাসাহিত্যের নিবিড়পাঠকমাত্রই স্বীকার করবেন। সত্যি কথা বলতে কি, রবীন্দ্রনাথের প্রতি বুদ্ধদেবের ভালোবাসার গভীরতা থেকেই আমার বুদ্ধদেব-প্রেম উৎসারিত। রবীন্দ্রনাথের মতোই বুদ্ধদেব আমার কাছে দেবতা নন, তিনি মানুষজ্জবিশেষ এবং ব্যক্তিত্বচিহ্নিত সৃজনশীল মানুষ। বুদ্ধদেব আমাকে শিখিয়েছেনজ্জসাহিত্যসমালোচক যখন বিচারকের আসনে বসেন, তখনই সাহিত্যরসের প্রতি প্রবল অবিচারের উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে। সাহিত্য¯্রষ্টার প্রতি নির্মম হলে তাঁর সৃষ্টিতে নিমজ্জিত হওয়ার আগ্রহ অস্তমিত হতে থাকে এবং সাহিত্যের ফুল থেকে মধুর পরিবর্তে কেবলই বিষের উদ্গীরণ ঘটে। রবীন্দ্রনাথের দ্বারে দীনতার লেশমাত্র নেই এবং সেখান থেকে আমরা যতই গ্রহণ করি, সমৃদ্ধ রবীন্দ্রভাণ্ডার শূন্য হবে নাÑ একথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথকে পাঠ কিংবা রবীন্দ্রসাহিত্য আস্বাদনের একটি স্বাতন্ত্র্যখচিত মানদণ্ড নির্মাণ করে নিয়েছিলেন। সেই মানদণ্ডের স্বরূপ অনুধাবনের জন্য আমি উপরিউক্ত প্রবন্ধের আরো একটি অংশের প্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। একই প্রবন্ধে বুদ্ধদেব উল্লেখ করেছেন :
‘কবি রবীন্দ্রনাথ’, ‘ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ’, ‘প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ’Ñ এই বিভাগগুলি তাই স্বীকার্য হলেও শেষ পর্যন্ত উপেক্ষণীয়; অর্থাৎ তারা পরস্পরে প্রবিষ্ট, পরস্পরের উদ্দীপক ও পরিপূরক, এবং এক অখণ্ড সত্তার প্রতিরূপ। যে মৌলিক উপাদানে রবীন্দ্রনাথ গঠিত সেটা কবিত্বশক্তি, সেটাই তাঁর গদ্যরচনাকে সপ্রাণ ও সার্থক করে তুলেছে; আগুন যেমন যে-কোনো ইন্ধনে ভাস্বর, তেমনি তাঁর কবিপ্রতিভাও যে-কোনো রূপকল্পে প্রদীপ্ত।
বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়ী গুরুদেবের গতরে কত রকমের পোশাক পরিয়েছেন তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্তরাজ-ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক, আন্তর্জাতিকতার পুরোহিত, শান্তির দূত, দুর্বলের বন্ধু, শোষকের শত্র“, মানব-প্রেমিক, ঈশ্বরপ্রেমিক, পূর্ব-পশ্চিমে মিলনমন্ত্রের উদ্গাতাÑ আরো কত কি। এর সবকিছুই তিনি ছিলেন, কিন্তু বুদ্ধদেবের বিবেচনা : ‘এ-সব স্মর্তব্য হতো না যদি তিনি কবি না-হতেন, তাঁর কবিতার জন্যই তাঁর অন্য সব চেষ্টা অর্থ পেয়েছে, যেহেতু তিনি কবিতা লিখতেন তাই তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়।’ বুদ্ধদেবের সাহিত্যকর্মের পরিধি নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনীয় নয়। রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত উপরিউক্ত অভিধার অনেকগুলোই বুদ্ধদেবের ব্যক্তিগত চরিত্র ও শিল্পপরিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; তবু এই দুই শিল্প¯্রষ্টার মৌলবিন্দু চিহ্নিত করার একটা সাধারণ প্রয়াসকে আমি প্রশ্রয় দিতে চাই।
কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যবিচারে আমার আগ্রহ নেই। বিচারকের আসনকে আমি বরাবরই ভয়ের দৃষ্টিতে দেখি। কারণ সেখানে নির্দোষ ব্যক্তির সাজাপ্রাপ্তির আশঙ্কা যেমন বিদ্যমান, তেমনি দোষী ব্যক্তিকেও নির্দোষ প্রমাণের বিচিত্র আয়োজন অব্যাহত থাকে। সাহিত্যবিচারের যে-সকল নজির আমাদের সামনে উপস্থিত, তার শরণ নিলে পাঠক নিশ্চয়ই আমার বিবেচনাকে অগ্রাহ্য করবেন না। সাহিত্যিককে দণ্ড প্রদানের দায়িত্ব নিয়ে যারা বহাল তবিয়তে করে-কেটে খাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সাহিত্যবিচারের মানদণ্ড নির্বাচনে অনেক সমালোচকেরই কাণ্ডজ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটে এবং এর ফলে পরের মুখে ঝাল খেতে অভ্যস্ত পাঠকের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও উপেক্ষণীয় নয়। তবুও বলি : মানদণ্ড কেবল বিচারের ক্ষেত্রেই প্রযুক্ত হয় না, আস্বাদন কিংবা অনুধাবনের ক্ষেত্রেও আমরা বিশেষ কোন মানদণ্ডের ওপরই ভরসা করি এবং এখানেও ভুলভ্রান্তির আশঙ্কা উপস্থিত।
আগেই বলেছি, আমি বুদ্ধদেবের কথসাহিত্যের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি এবং নির্লজ্জভাবে বুদ্ধদেবের রবীন্দ্র-পাঠের মানদণ্ডকে বুদ্ধদেব-অনুধাবনে ব্যবহার করতে চাই। এই ধারের যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যাখ্যার জন্য বিস্তৃত পরিসর ব্যয় না-করে কেবল এটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করি যে, আমার বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের মতোই বুদ্ধদেবের প্রকৃত পরিচয়, তিনি কবি। শব্দনির্ভর শিল্প¯্রষ্টাদের প্রতিভার রকমফের বিষয়ে সচেতন ছিলেন তিনি, কিন্তু সকল প্রতিভার প্রাণভোমরাই যে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহামানবের কবিত্বে নিহিতÑ এ-বিষয়ে বুদ্ধদেব নিঃসন্দেহ ছিলেন। স্তেফান মালার্মের বরাত দিয়ে বুদ্ধদেব আমাদের সেই কথাই জানিয়েছেন :
কবিতা আছে ভাষার সর্বত্রÑ ছন্দ থাকলেই কবিতা থাকবেÑ সর্বত্র আছে, নেই শুধু বিজ্ঞাপন ও সংবাদপত্রে। সাহিত্যের যে বিভাগটিকে আমরা ‘গদ্য’ নাম দিয়েছি তাতেও কবিতা আছেÑমাঝে মাঝে খুব ভালো কবিতাÑ নানা রকম ছন্দে তারা রচিত। আসলে গদ্য বলে কিছু নেই : আছে বর্ণমালা, আর নানা ধরনের কবিতা, কোনোটি শিথিল, কোনোটি সংহত, কোনোটি বা একটু বেশি ছড়িয়ে-যাওয়া। যেখানে স্টাইলের দিকে প্রযতœ, সেখানেই পদবিন্যাস।
বুদ্ধদেবের অনেক গদ্যের কাব্যিক সংহতি আমাকে মুগ্ধ করে; এমন অনেক গদ্যাংশ তাঁর কথসাহিত্যের নানা স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে যা তাঁর অনেক গদ্য-কবিতার চেয়েও উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম বলে মনে হয়। আর যে ছন্দের গুণে শব্দ তার আর্থপরিধি অতিক্রম করে পাঠকের কল্পনপ্রতিভায় ভিন্নতর দ্যোতনা সঞ্চার করে, সেই ছন্দের প্রভাবেই তাঁর অনেক গদ্য বৈষয়িক পুনরাবৃত্তির একঘেয়েমিকে আড়াল করে পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহের মৌল কারণ : কবিতার মতোই তাঁর কথাসাহিত্যের পদবিন্যাসেও আমি লক্ষ করি বিপুল যতেœর ছাপ। কথাসাহিত্যের পাত্রপাত্রীদের যেহেতু সম্পূর্ণত ভাষার ওপরই নির্ভর করতে হয়; সেখানে অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বরের উঠানামা, চোখের ব্যঞ্জনা অনুপস্থিত থাকে, তাই বুদ্ধদেবের বিচারে ‘ভাষার সম্পূর্ণতা চাই সেখানে, যার জন্য লেখকের পক্ষে কলাকৌশলে নৈপুণ্য প্রয়োজন।’ বুদ্ধদেবের কলানৈপুণ্যে অনাস্থা প্রকাশের সুযোগ নেই, বরং এই নৈপুণ্য অনেক সময় এমন নিষ্ঠুর পর্যায়ে উন্নীত হয় যে, পাঠক তাঁর শিল্পিত সত্যের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। ‘আমরা আমাদের নিজেদেরই মনের কথা ভালো করে বলতে পারি না, লেখক আমাদের হয়ে তা-ই করেন এবং এইজন্যই তিনি শিল্পী নামের অধিকারী।’Ñ বুদ্ধদেবের এই বিবেচনায় আমার সম্মতি আছে; তবু এই দাবি উপস্থাপন অসঙ্গত নয় যে, আমাদের হয়ে যিনি আমাদের মনের কথাকে আমাদের উদ্দেশ্যে পরিবেশন করবেন, তাঁকে সব সময় কেবল নিজের দিকে তাকালে চলে না, পাঠকের দিকেও দৃষ্টি দিতে হয়।
একজন সাহিত্য¯্রষ্টার শিল্পকর্মের মৌল প্রবণতার অনুসন্ধান কিংবা শিল্পী হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশেষত্ব সনাক্ত করার ক্ষেত্রে ংঃুষব রং ঃযব সধহজ্জএই প্রবাদপ্রতিম উচ্চারণের প্রতি আমার পক্ষপাত স্পষ্ট। বর্তমান নিবন্ধে বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের গতি ও গভীরতা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই, এমনকি এ-কাজের যোগ্য লোকও আমি নই। তাঁর বিপুলায়তন গল্প-উপন্যাসের ভাণ্ডার থেকে শ্রেষ্ঠ রচনা কিংবা সধংঃবৎঢ়রবপব নির্বাচনের মতো অর্বাচীন প্রয়াসেও আমি বাক্য ব্যয় করতে রাজি নই। এ-কাজের উপযুক্ত ব্যক্তি নিশ্চয়ই আছেন, আমার ক্ষেত্রে কেবলই লাঠি বাজবে। লাঠালাঠির যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসে আমি বুদ্ধদেবকে স্মরণ করছি, সেখানে দেশপ্রেমের বড়ই অভাব অনুভূত হচ্ছে; এমনকি ব্যক্তিগত প্রণয়ের পৃথিবীও ব্যবসায়িক কিংবা বৈষয়িক বোধবুদ্ধির দাপটে রক্তাক্ত হচ্ছে। জন্মভূমি কিংবা স্বদেশ-বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু বড়ই নির্বিকার; স্বদেশের বন্দনা করে শিল্পসৃষ্টির প্রয়াসকে তিনি খুবই সন্দেহের চোখে দেখেছেন। কিন্তু তাঁর কথাসাহিত্যে মানব-মানবীর প্রেম নানা মাত্রায় নিরীক্ষিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাসে প্রেমের ধরনধারণ কিংবা গতিবিধি বিষয়ে কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লেখার পরও মনে হবে, খুব সামান্যই বলা হল; কিংবা মনে হতে পারে : কিছুই তো বলা হল না; অর্থাৎ এ-প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়ে এই বোধ জাগ্রত হওয়া খুবই সম্ভব যে, বুদ্ধদেবের প্রেম-সমুদ্রের কিনারে নুড়ি কুড়াতেই ‘কাগজ গেল দিস্তা দিস্তা, কলম গোটা ছয়’। তাই তাঁর কথাসাহিত্যের প্রেম-সমুদ্রে অবগাহনের প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর রচনাপুঞ্জের ভাষা অর্থাৎ শৈলি-বিষয়ে দুচারটি কথা উল্লেখ করতে চাই।
বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের ভাষিক সমৃদ্ধি আলোচনায় তাঁর গল্প ও উপন্যাসের বিষয়কে ছুটি দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ কথাসাহিত্যের বিষয়ই এর গঠনশৈলির নিয়ন্তা। যে-কোন শিল্পকর্মেই এর ¯্রষ্টার মুখচ্ছবি মুদ্রিত থাকে। কখনো কখনো মুখের গড়নটি হয়তো-বা অধরা কিংবা অস্পষ্ট মনে হতে পারে, কিন্তু মহৎ শিল্পকর্মের হৃৎপিণ্ডের ওপর নিবিড়ভাবে কান পাতলে ¯্রষ্টার পায়ের শব্দ নিশ্চয়ই শোনা যাবে। শিল্পকর্মভেদে মুখচ্ছবির দৃশ্যায়ন কিংবা অনুধাবনে যেমন ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়, তেমনি পায়ের শব্দেও থাকে নানা বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্য। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের বৈষয়িক পরিমণ্ডল এবং ব্যক্তি বুদ্ধদেবের উপস্থিতির স্বরূপ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে নৈঃসঙ্গ্যচেতনার রূপায়ণ গ্রন্থের মন্তব্য স্মরণ করা যাকজ্জবুদ্ধদেব বসু তাঁর সাহিত্যে, বিশেষত উপন্যাসে, নাগরিক মধ্যবিত্তশ্রেণীর চিত্তসঙ্কট, হার্দ্য-জটিলতা, কৈশোরক স্মৃতিমুগ্ধতা, মনোজৈবনিক কামনা-বাসনা এবং দাম্পত্য-বিচ্ছিন্নতার শিল্পরূপ নির্মাণ করেছেন। আত্মজৈবনিক উপাদানে গড়ে-ওঠা বুদ্ধদেবের উপন্যাসভুবন, বস্তুত, তাঁর ব্যক্তিচেতনারই শৈল্পিক প্রতিভাস। তাঁর কথাসাহিত্যে যে-সব নায়কের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, তাদের সকলের অবয়বেই বিম্বিত হয় ব্যক্তি-বুদ্ধদেবের ছবি, তাদের কণ্ঠে শোনা যায় বুদ্ধদেবের আত্ম-অনুভূতির স্বরগ্রাম।
সমালোচক উপরিউক্ত মন্তব্যের সারবত্তা প্রমাণের প্রয়োজনে কেবল বুদ্ধদেবের আত্মজৈবনিক উপন্যাসসমূহের ওপরই নির্ভর করেন নি, বুদ্ধদেব-বিষয়ে বিদগ্ধজনের মন্তব্যের দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বাংলা কথাসাহিত্য : প্রকরণ ও প্রবণতা গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যে যে ব্যক্তিচেতনার উদ্ভাসন ‘তা অনেক পরিমাণে লেখকের আত্মচেতনারই নামান্তর’। তিনি বুদ্ধদেবের সাড়া উপন্যাসের সাগর, যেদিন ফুটল কমলের পার্থপ্রতিম, বাসরঘরের পরাশর, একদা তুমি প্রিয়ের পলাশজ্জএই চরিত্রসমূহের মধ্যে বুদ্ধদেবের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করেছেন। গ্রন্থ মতে, এই চরিত্রসমূহের ‘যে চিন্তা মনন ও অনুভূতি’, তার মধ্য দিয়ে বুদ্ধদেবের আত্মোন্মোচন ও প্রসারণ সাধিত হয়েছে। সুকুমার সেন বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থেও বুদ্ধদেবের গল্প-উপন্যাসে লেখকের আত্মবিস্তারের প্রয়াস লক্ষ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বুদ্ধদেবের ‘অধিকাংশ রচনা আত্মস্মৃতিমূলক, অথবা তেমনই মনে হয়।…সুতরাং বুদ্ধদেব বাবুর রচনায় লোকের ভিড় নাই, মানুষের বিবিধ বৈচিত্র্যও নাই। আছে ঘুরিয়া ফিরিয়া একই ধরনের নরনারী যাঁহারা কোন না কোন সময়ে লেখকের সাক্ষাৎ সংস্পর্শে আসিয়াছিল অথবা তাঁহারা কল্পনায় উদিত হইয়াছিল। আর প্রায় সব গল্পের নায়ক লেখক নিজেই, তবে বিভিন্ন বয়সে অবস্থায় মেজাজে।’ বাংলা কথাসাহিত্য প্রসঙ্গ গ্রন্থে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বুদ্ধদেবের আমার বন্ধু উপন্যাসে লেখকের আত্মপ্রতিকৃতির প্রোজ্জ্বল প্রভাব আবিষ্কার করেছেন। মৌলিনাথ ও নিরঞ্জনের খাতা উপন্যাসেও ব্যক্তি-বুদ্ধদেবের ছায়াপাত লক্ষ করা যাবে। বিশেষ করে বুদ্ধদেব কৈশোর ও যৌবনের ঢাকাকে স্মৃতির ভেতর দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে চেয়েছেন। এই উপন্যাস দু’টি সম্পর্কে নিরঞ্জন চক্রবর্তী যথার্থই বলেছেন, বুদ্ধদেবের শৈশব-যৌবনের ‘সেই রমনা-পুরানা পল্টন-টিকাটুলির স্বপ্নময় দিনগুলি তার স্মৃতিতে অমলিনজ্জএবং সেই সকল দিনের ঘটনাপ্রবাহ সুযোগ-সুবিধা পেলেই তাঁর গল্প, উপন্যাস, এমনকি তাঁর কাব্যেও অনুপ্রবেশ করেছে।’ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ইঁফফধফবাধ ইড়ংব গ্রন্থেও আত্মজৈবনিক উপন্যাস রচনায় বুদ্ধদেবের আগ্রহ ও সক্ষমতা স্বীকৃত হয়েছে।
এ-কথা প্রমাণ করা আমার উদ্দেশ্য নয় যে, বুদ্ধদেব বসুর সমগ্র কথাসাহিত্যের প্রাণকেন্দ্রেই ব্যক্তি বুদ্ধদেব বিশাল আসন অধিকার করে আছেন। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা মাথায় রেখে আত্মবিস্তারধর্মী কিংবা আত্মপ্রতিকৃতি-আশ্রয়ী উপরিউক্ত উপন্যাসসমূহ বিবেচনা করলে স্বীকার করতেই হবে যে, নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে স্বকালের আঘাত-আশঙ্কা-সংঘাত-সমস্যাকে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেনজ্জএ-জাতীয় উপন্যাসের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু আত্মজৈবনিক উপন্যাসের যে ভাষা-ভঙ্গি তিনি রপ্ত করেছেন, তার প্রভাব তাঁর সমগ্র কথাসাহিত্যেরই সাধারণ কুললক্ষণ বলে আমি মনে করি। কেমন সেই ভাষাভঙ্গি? সেই ভাষার শক্তি কিংবা সম্ভাবনা, ব্যর্থতা কিংবা বিপর্যয়ের ধরনটিই বা কেমন? তাঁর সমগ্র কথাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণের চেষ্টা অনেকেই করেছেন এবং এই চেষ্টা ভবিষ্যতেও হয়তো অব্যাহত থাকবে। এই নিবন্ধে সেই ভঙ্গির দুএকটি দিক নিয়ে আমার বিবেচনা পাঠকের সামনে উপস্থিত করা যেতে পারে। অধিকাংশ উপন্যাসের বিস্তারিত আলোচনা এড়িয়ে কেবল দুএকটি উপন্যাসের বরাত দিয়ে বুদ্ধদেবের সমগ্র কথাসাহিত্যের ভাষিক-প্রবণতার সাধারণ কুললক্ষণ চিহ্নিত করার এই প্রয়াস হয়তো প্রক্ষিপ্ত মনে হবে। কিন্তু  আমার বিবেচনায়, একজন কথাসাহিত্যিক ভাষিক পরিচর্যার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় পাঠককে এমন এক প্রান্তে পৌঁছে দেন, যেখানে বসে ভাষার দর্পণে ¯্রষ্টার মুখচ্ছবি দেখা কিংবা ভাষিক স্পন্দনে শিল্পীর পায়ের শব্দ শোনার কাজটি অনায়াসে সম্পন্ন হতে পারে। বুদ্ধদেব তাঁর পাঠককে এমন এক ভাষাশৈলি উপহার দিয়েছেন, যার ¯্রষ্টা বুদ্ধদেব ভিন্ন আর কেউ হতে পারেন না। ব্যক্তিত্বচিহ্নিত যে ভাষার মাধ্যমে আমরা একজন প্রতিভাবান শিল্পীকে সনাক্ত করতে পারি, সেই ভাষার সাধারণ রূপ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া নিশ্চয়ই অসম্ভব নয়।
ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসুর যাত্রারম্ভ ১৯৩০ সালে, সাড়া উপন্যাস প্রকাশের মাধ্যমে। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত সর্বশেষ উপন্যাস ১৯৭২ সালের জুন মাসে প্রকাশিত রুক্মি। প্রায় চল্লিশটি উপন্যাসের মুখ দেখেছেন তিনি, মৃত্যুর পরে প্রকাশ পেয়েছে আরো দুটি উপন্যাস প্রভাত ও সন্ধ্যা (১৯৭৫) এবং এক বৃদ্ধের ডায়রি (১৯৮০)। তাঁর গল্পগ্রন্থের তালিকাও দীর্ঘ। জীবনের একটা বিশেষ পর্যায়ে তিনি লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই তাঁকে কথাসাহিত্যের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ফলে তাঁর কথাসাহিত্যের কাহিনি-বিন্যাসে বৈচিত্র্যের অভাব লক্ষ করা যাবে। কিন্তু পাঠকের কাছ থেকে তিনি কখনোই প্রত্যাখ্যাত হন নি, কারণ তিনি যা বলেন তাতে পাঠকের সম্মতি না-থাকলেও যেভাবে বলেন তার সম্মোহনকে স্বাগত জানাতে হয়। আমার বিবেচনায়, তাঁর এই সম্মোহনের মূলমন্ত্র তাঁর কবিপ্রতিভার মর্মে নিহিত। গল্প বলার এক অসাধারণ ধরন তিনি রপ্ত করেছিলেন। পাঠকের কল্পনাপ্রতিভাকে তিনি এমনভাবে জাগ্রত করেন যেন লেখকের মতোই তাঁর গল্পের পাঠকও সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনার গায়ে তিনি এমন এক কাব্যিক ব্যঞ্জনা সঞ্চার করেন যাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ঘটনার অনুরণন পাঠকচৈতন্যে অনিঃশেষ আলোড়ন তোলে; জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভাষায় বলা যেতে পারে : ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’। বুদ্ধদেব-গবেষকবৃন্দের অনেকেই বুদ্ধদেবের গদ্যশৈলিকে সূত্রবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। তরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসু : মননে অন্বেষণে গ্রন্থের ‘আকর্ষক গদ্যশৈলী : অব্যর্থ তীরন্দাজ’ শীর্ষক প্রবন্ধে আশিস্কুমার দে বুদ্ধদেবের গদ্যের তাৎপর্যপূর্ণ চারটি প্রবণতা চিহ্নিত করেছেনÑ অসাধারণ প্রবহমানতা, গদ্যে ইংরেজি পদান্বয়ের প্রভাব, বিশেষ যুক্তির প্রভাব, এবং গদ্যভাষায় নবীনতা। নতুন, অনুগ ও অনুবাদ শব্দেরা কীভাবে বুদ্ধদেবের চিন্তার অনুকূলে প্রবাহিত হয়েছে তারও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন তিনি। বিশ্বজিৎ ঘোষ এবং সিরাজ সালেকীন সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসু: জন্মশতবার্ষিক স্মরণ গ্রন্থের ‘বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে গৌতম কুমার দাসও বুদ্ধদেবের গদ্যের উপরিউক্ত প্রবণতাসমূহ বিপুল দৃষ্টান্তসমেত আলোচনা করেছেন। তিনি বুদ্ধদেবের গদ্যের বিরামচিহ্নের চরিত্র চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন, লেখকের শব্দ-সচেতনতার স্বরূপ নির্দেশের প্রয়াস পেয়েছেন, বিশেষ করে ড্যাশ(জ্জ)ব্যবহারের মাধ্যমে একাধিক সরল বাক্যকে একটি মূল বাক্যে রূপদানের বুদ্ধদেবীয় কারিশমায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কবিতায় ড্যাশের উপর্যুপরি ব্যবহারে জীবনানন্দের কবিভাষায় যেমন বিশেষ ও ব্যক্তিত্বচিহ্নিত আবহ সঞ্জারিত হয়েছে, আমার বিবেচনায় গদ্যে ড্যাশের ব্যবহারে বুদ্ধদেবের গদ্যেও ভিন্নতর আবহ সঞ্চারিত হয়েছে। বুদ্ধদেবের ড্যাশবহুল বাক্য যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তা তাঁর মূল ভাব বা চিন্তার কেন্দ্র থেকে পাঠককে বিচ্যুত করে না। বুদ্ধদেবের ‘সাবলীল, পরিশীলিত, মননশীল ও যুক্তিনির্ভর’ গদ্যরীতিতে মুগ্ধ হয়েই গৌতম কুমার দাস বুদ্ধদেবকে ‘বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বুদ্ধদেবের গদ্যের গতিময়তা বিষয়ে আরো অনেক সমালোচকের বিবেচনাই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। যেমনজ্জজলার্ক পত্রিকার বুদ্ধদেব বসুর সংখ্যায় ছন্দম চক্রবর্তী ‘আত্মজীবনীমূলক রচনা : বুদ্ধদেব বসুর গদ্যভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘গদ্যভাষা নির্মাণে তিনি ধ্র“পদীÑ চারুত্ব, প্রয়াসী, নিখুঁতত্বে বিশ্বাসী। বিশেষণ ব্যবহারে তিনি অকুণ্ঠ; উপমা বিশেষ ব্যবহার করেন না কিন্তু অনুপ্রাস ব্যবহারে অলজ্জ; তাঁর গদ্যে যতিচিহ্নের ব্যবহার অবিরল; খণ্ডবাক্যকে তিনি সাজান বিচিত্রভাবে; অবিচলিতভাবে ব্যবহার করেন একের পর এক তৃপ্তিকর এপিগ্রাম।’ একই পত্রিকায় ‘কবির প্রবন্ধ : কলকব্জার কথা’ শীর্ষক প্রবন্ধে নীলরতন সরকার লিখেছেন, ‘সাহজিকতা ও স্বাভাবিকতাভূষিত তাঁর গদ্যের মূল বৈশিষ্ট্য স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা এবং বাক্যবন্ধের ঋজুতা। যত দীর্ঘ বাক্যই তিনি রচনা করুন না কেন, অন্বিষ্ট অর্থ সর্বদা অতীব প্রখর ও পরিস্ফুট, বর্ণিত বিষয়ের সংবদ্ধতা কদাপি শিথিল হয় না।’ সমালোচকবৃন্দের এই বিবেচনারই সমর্থন মিলবে শংকরানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাঙলা গদ্য জিজ্ঞাসা গ্রন্থের ‘গদ্য, কবির গদ্য ও কয়েকজন কবি’ শীর্ষক প্রবন্ধে। শংকরানন্দ লিখেছেন, ‘বুদ্ধদেবের গদ্যে তাঁর কবিতার মতোই এমন এক আশ্চর্য সহজতা আছে যা অল্পপাঠের পরই পাঠকের মন আচ্ছন্ন করে। তাঁর পেলব শব্দের ব্যবহার, ঝরঝরে শিল্পিত ভঙ্গি সহজ আকর্ষণে পাঠককে বিমুগ্ধ করে।’ সুকুমার সেনও বুদ্ধদেবের গদ্যের নিপুণতা ও প্রবীণতায় মুগ্ধ হয়েছেন, আধুনিক সাহিত্যিকবৃন্দের মধ্যে বুদ্ধদেবকেই তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘বুদ্ধদেববাবুর গদ্যরীতি সযতœরচিত, সুমিত, পরিপাটি।’ বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠগল্পের ভূমিকায় বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন, ‘বুদ্ধদেব তাঁর শব্দে ও ভাষায় অনায়াসেই সঞ্চারিত করে দেন আপন সত্তার সৌরভ।’ তাঁর মতে, ‘ভাষার অন্তরাশ্রয়ী গতিধর্ম ও গীতিময়তা তাঁর কথাসাহিত্যের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।’ সমালোচকবৃন্দের উপরিউক্ত বিবেচনায় বুদ্ধদেবের গদ্যরীতির প্রবণতাসমূহ যথার্থরূপেই চিহ্নিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। এ-সকল প্রবণতার অনুপুঙ্খ উপস্থাপন আমার এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আগ্রহী পাঠকবৃন্দের জন্য আমাদের প্রতিভাবান শিল্পসমালোচকবৃন্দের ভাণ্ডার উন্মুক্ত আছে বলেই আমি মনে করি। আমি কেবল খোঁজ নিতে চাই, কবি বুদ্ধদেব কীভাবে কবিতার শক্তিতে ভর দিয়ে উপন্যাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে গেলেন। সেই সঙ্গে বুঝে নেয়া যেতে পারে, তাঁর উপন্যাসের যে বৈষয়িক পরিমণ্ডল, উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের মনোজগতের যে ব্যাকরণ, তাদের সম্পর্ক কিংবা সংঘর্ষের যে গতিবিধি, তাতে ঔপন্যাসিকের কবিত্বশক্তির প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের অনুকূল আবহ উপস্থিত ছিল কী না।
কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় কবিত্বের প্রভাবকে আমাদের অধিকাংশ সমালোচকই প্রশ্রয় দিয়েছেন, যার কিছু নজির ইতোমধ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমার কাছে কথাকার বুদ্ধদেব প্রথম যে মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন, সেখানেও কবি বুদ্ধদেবই আমাদের সম্পর্ক নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘আমরা তিনজন’ শীর্ষক গল্পপাঠের মাধ্যমে। এই গল্পে যে ঘটনার বিবরণ, তা গল্প হয়ে ওঠার খুবই উপযোগীজ্জএমন কথা নিশ্চয়ই বলা যাবে না। আমাদের অনেকের জীবনেই এই রকম ঘটনার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে।  তিন বন্ধুর একই সঙ্গে একই মেয়ের প্রেমে পড়ার গল্পে এমন কিছু নতুনত্ব নেই। কিন্তু বুদ্ধদেব এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের গল্পকে অনেক দূর টেনে নিয়ে গেলেন। অনেক ছোটখাটো ঘটনার মধ্য দিয়ে একজন মোনালিসার সঙ্গে তিনজনের সম্পর্ক, কিংবা সম্পর্কের স্বপ্নগুলোকে গেঁথে দিয়েছেন বুদ্ধদেব। কারো সঙ্গেই উল্লেখ করার মতো ঘনিষ্ঠতা নির্মিত হয় নি মেয়েটির। একদিন সে চলে যায় না ফেরার দেশে। মেয়েটির সেই বিদায় দৃশ্যেও লেখকের অংশগ্রহণ পূর্ণতা পায় নি, বেঁটে বলে মৃতদেহ কাঁধে নিতে পারেন নি তিনি, পিছনে পিছনে হেঁটে চলেছেন একা একা। সেই তিন বন্ধুর মধ্যেও আজ বিশাল দূরত্ব এবং সেই দূরত্বের মাত্রায়ও যথেষ্ট বৈচিত্র্য বিদ্যমান। গল্পের শেষাংশ কিংবা শ্রেষ্ঠাংশ বুদ্ধদেবের ভাষায় তুলে ধরতে চাই :
অসিত স্কুল থেকে বেরিয়ে চাকরি নিলো তিনসুকিয়ায়, ছ-মাসের মধ্যে কী একটা অসুখ ক’রে হঠাৎ মরে গেলো। হিতাংশু এম.এস.সি. পাশ ক’রে জার্মানিতে গেলো পড়তে আর ফিরল না, সেখানকারই একটা মেয়েকে বিয়ে ক’রে সংসার পাতল… আর আমিÑ আমি এখনো আছি, ঢাকায় নয়, পুরানা পল্টনে নয়, উনিশ-শো সাতাশে কি আটাশে নয়, সে-সব আজ মনে হয় স্বপ্নের মতো, …সেই বৃষ্টি, সেই রাত্রি, সেইÑ তুমি! মোনালিসা, আমি ছাড়া আর কে তোমাকে মনে রেখেছে!
আমাদের জীবনে এই রকম কত ঘটনাই তো ঘটে। তার কতটুকুই আমরা মনে রাখি। কিন্তু লেখকের মনের গভীরে মোনালিসার যে মূর্তি নির্মিত হয়েছে, সেই মোনালিসা তো কবিতার মতোই সুন্দর, মনোহর এবং মৃত্যুহীন। গল্পের শেষ বাক্যটিই যেন পুরো গল্পটির শরীরে অনিঃশেষ ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে দিল। এ কাজ কবির পক্ষেই সম্ভব। এবং কবিতাই এভাবে পাঠকের কল্পনাপ্রতিভায় সৃজনাভাস সঞ্চার করে। কবিতার সমালোচক বুদ্ধদেব বসু যে-কোন কালজয়ী কবিতায় বারবার চৌম্বক পঙ্ক্তি বা সধমরপ ষরহব অন্বেষণ করেন। তাঁর কবিতায়ও আমরা এ-রকম চৌম্বক লাইনের দেখা পাই যা পুরো কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশেষ অনুরণন ছড়িয়ে দেয়। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যেরও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবণতা বলে আমি মনে করি। স্মৃতিমগ্নতা তাঁর গল্প ও উপন্যাসের পাত্রপাত্রীকে এমনভাবে সম্মোহিত করে যেখানে বাস্তব সত্য অনায়াসে কল্পিত সত্যের কাছে প্রতিহত হয়। এই গল্পে যে ঢাকা, বিশেষ করে পুরানা পল্টনের ছবি মুদ্রিত হতে দেখি, সেই পুরানা পল্টন লেখকের শৈশবের পুরানা পল্টন। এই স্মৃতির শহর যখন তাঁর কথাসাহিত্যে কল্পনার সৌরভ ও সমৃদ্ধি নিয়ে উপস্থিত হয় তখন তা কেবল সুন্দর কিংবা মনোরমই নয়, মায়াবীও বটে। কথাসাহিত্যিক হিসেবে বস্তুনিষ্ঠ থাকার বিন্দুমাত্র প্রয়াস দেখান না তিনি। তাঁর গল্পের যে ঘটনাপ্রবাহ এর কাঠামো নির্মাণের জন্য অপরিহার্য, সেই ঘটনাপ্রবাহকে তার বেশি মূল্য দিতে তিনি নারাজ। মনোজগতের দ্বন্দ্বজটিল বাস্তবতাকেই তিনি বারবার পাঠকের সামনে নিয়ে আসেন। মিলনের গান তাঁর কণ্ঠে আমরা শুনেছি, কিন্তু আমার বিবেচনায় বিরহ, বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতার শৈল্পিক রূপায়ণেই তাঁর কৃতিত্ব চোখে পড়ার মতো। কবিতার শত্র“ ও মিত্র গ্রন্থে বুদ্ধদেব লিখেছেন, ‘আমরা পরস্পরকে যতই না ভালোবাসি, আমাদের শরীর দুটো তো আলাদা, শরীরের মধ্যে দুই জীবনও আলাদা। অত্যন্ত আপনজনকেও কোনো আসল কথা বলা যায় না, পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ একলা।’ এই একলা মানুষেরই মুহূর্মুহূ উপস্থিতিতে মুখর কিংবা মৃয়মাণ তাঁর কথাসাহিত্য। তাঁর অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসের পাত্রপাত্রিরা এই নিঃসঙ্গতা নামক ভয়ানক ব্যধিতে আক্রান্ত। ফলে তাঁদের সংলাপ, কিংবা চিন্তা¯্রােত উন্মোচনের যে ভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন, সেখানে কেবল কল্পনা ও বাস্তবের বিমিশ্রণই নয়, আলো ও অন্ধকারের পরস্পরপ্রোথিত রূপ উদ্ভাসিত হয়।
আগেই উল্লেখ করেছি, বুদ্ধদেব তাঁর কথাসাহিত্যে যে-সকল বিষয়কে প্রশ্রয় দিয়েছেন, তা নিয়ে কাব্য করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে বুদ্ধদেব মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ হতে স্বস্তি পেতেন না। সমাজ-সংসারের মাঝখানে থেকেও নিজের চারদিকে একটি অদৃশ্য দেয়াল নির্মাণ করে রাখতেন যেখানে ইচ্ছে করলেই সাধারণের প্রবেশ সম্ভব হত না। কেবল কল্পনা-নামক এক মহাশক্তিধর অনুভবকে তিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় উপহার দিয়েছেন। স্মৃতির জগতে বাস করতে করতে বাস্তবের অনেককিছুকেই তিনি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর এই জীবনবোধকে সন্তোষকুমার ঘোষ চমৎকারভাবে চিহ্নিত করেছেন। আনন্দ রায় সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসু : নানা প্রসঙ্গ গ্রন্থের ‘শীতের কাছে প্রার্থনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে সন্তোষকুমার লিখেছেন :
ভূলোক থেকে বুদ্ধদেব উড্ডীন হয়েছিলেন স্বেচ্ছায়, অথচ দ্যুলোকে উত্তীর্ণ হননি, সেই কারণেই হয়তো দ্যুলোক ভূলোক এই দুই ভুবনের মাঝখানে দুলছেন, ঝাপটাচ্ছেন অস্থির অনিশ্চিত, অশান্ত ডানা। সন্দেহ হয়, একটি স্থিতি তিনি কোথাও পান নাÑ আমরা কে-ই বা পাইÑ আজও রমনা তাঁকে পিছন থেকে টানে, পাশ্চাত্য সামনে থেকে দেয় হাতছানি, মাঝখানে আছে কলকাতা, একদা তাঁর চোখ-ধাঁধাঁনো কলকাতাÑ বলা শক্ত রক্ষিত কে কার।
বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য পাঠ করতে গেলে আবু হেনা মোস্তফা কামালের যেহেতু জন্মান্ধ কাব্যের ‘কিছুই নিজস্ব নয়’ কবিতার একটি পঙ্ক্তি খুব মনে পড়ে : ‘কেবল শূন্যতা ছাড়া শূন্যতার নেই কোনো মানে’। বুদ্ধদেবের কাছে শূন্যতা কিংবা নিঃসঙ্গতা কেবল এক বিশেষ ধরনের অনুভব নয়, শুন্যতাকে তিনি দেবতার মতো করেই পুজো করেছেন। সেই পূজার যে ফুল, তা কল্পনার মতোই সুন্দর, পবিত্র এবং প্রাণবন্ত। ‘বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যে ঢাকা শহর’ শীর্ষক একটি রচনায় আমি বুদ্ধদেবের শৈশবের ঢাকা শহরের চালচিত্র অনুধাবনের চেষ্টা করেছিলাম। সেখানে উল্লেখ করেছিলাম, ‘যৌবনের উত্তাল-উদ্বেল প্রহরগুলোকে প্রাণবন্ত করতে গিয়ে তিনি তাঁর গল্প-উপন্যাসের অনেক পাত্রপাত্রীকেই ঢাকা শহরে পাঠিয়েছেন।’ আমার মনে হয়েছে, বুদ্ধদেবের যে ঢাকা কথাসাহিত্যে মুদ্রিত হতে দেখি, তাকে বুদ্ধদেবের স্মৃতির শহর না-বলে কল্পনার শহর বলাই সঙ্গত। বাস্তবের অবিকল উপস্থাপন কথাসাহিত্যিকের কাজ নয়। রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য গ্রন্থের ‘শেষের কবিতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধদেব এ-প্রসঙ্গে লিখেছেন :
সাহিত্যকলা জীবনের অনুকরণ করে না; জীবনের একটি প্রতিরূপ ও প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি করে চলে, এ-কথা শুধু ঘটনাবিন্যাসের ক্ষেত্রে নয়, ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সত্য। জীবন ঠিক যে-রকমটি হয় না, অথচ হতে পারে, শিল্পকলা সেই সম্ভাবনার বিবরণ বলেই তার আকর্ষণ আমাদের কাছে জীবনের চেয়েও প্রবল।
সেই অর্থে কথাসাহিত্যেও আমরা এক রকম বাস্তবতারই রূপায়ণ প্রত্যাশা করি যেখানে শিল্পের বাস্তবও অপ্রতিহত থাকে। বুদ্ধদেব বসুর বাস্তবে শিল্পের অসম্মান হয়েছে একথা আমি বলছি না, কিন্তু স্বপ্ন ও কল্পনা শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকেছে। সেই স্বপ্ন ও কল্পনা তাঁর ভাষার শরীরেও যোগ করেছে বিশেষ দ্যূতি, যেখানে বারবার কবিতা নামক এক সুন্দর অনুভবের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে।
বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যে আত্মজৈবনিক অনুষঙ্গের কথা ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। এই অনুষঙ্গ তাঁর ভাষার শরীরেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য যোগ করেছে বলে আমি মনে করি। ব্যক্তিগত স্মৃতির রাজ্যে অনুপ্রবেশের আনন্দ প্রত্যেক মানুষের মনেই আবেগবিহ্বল প্রণোদনা সঞ্চার করে। এই প্রণোদনা সৃজনশীল মানুষের শিল্পকর্মেও ভাবোচ্ছলতা, অসংযতি ও অসংলগ্নতার ছাপ রেখে যায়। বুদ্ধদেবের ভাষা অলঙ্কারবহুল, বিশেষ করে বিশেষণের প্রতি তাঁর প্রবল পক্ষপাত সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ : কথসাহিত্য গ্রন্থে বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আসলে বিশেষণ ছাড়া ভাষা হয় না’। তাঁর গদ্যের চরিত্র সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে না, যদি আমরা তাঁর ব্যবহৃত বিশেষণের গতিবিধি নজরে না আনি। বিশেষণ প্রয়োগে তিনি অমিতব্যয়ী একথা সাহস করে বলা যেতে পারে, কিন্তু তাঁর বিশেষণের অসংলগ্নতাও নিশ্চয়ই পাঠকের চোখে পড়বে। উপমার প্রয়োগ করে তিনি মূলত বিশেষণের কাজটি সম্পন্ন করতে চেয়েছেন, কারণ তাঁর মতে উপমাও ‘বিস্তারিত বিশেষণ ছাড়া আর কিছু নয়।’ বিশেষণে সবিশেষ ব্যক্ত করার এই ঢঙটি পাঠকের সহ্যের সীমায় কেন আলোড়ন তোলে না তার কারণও তাঁর গদ্যভঙ্গির গতরেই মুদ্রিত থাকে। তিনি কেবল তাঁর বলার কথাটিকে পরিবেশন করেই পরিতৃপ্ত হন না, তিনি ভাব বিষয় কিংবা ব্যক্তির ভেতরে প্রবেশ করে সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখতে চান। কেবল স্পর্শের সুখটুকু নিয়ে সরে পড়তে চান না তিনি, ভেঙেচুরে দেখার জন্য দৃষ্টির যে তীক্ষèতা দরকার, তিনি বরাবরই সবকিছুর দিকে সেই দৃষ্টি প্রসারিত রাখেন। পরস্পরবিরোধী বিশেষণগুচ্ছের ব্যবহার করে তিনি বক্তব্যের স্বচ্ছতা কিংবা সুস্পষ্টতা বিধানে কতটুকু সক্ষম হয়েছেন, সে আলোচনায় আমি যাবো না, কিন্তু আলোচিত বিষয়, বা ঘটনা বা চরিত্রের সঙ্গে তাঁর আবেগবিহ্বল সংযুক্তির ব্যাপারটি বোঝা যায় :
ক. …লম্বা মেঘলা একলা দুপুর, রঙের আহ্লাদে গ’লে-যাওয়া বিকেল, আর রিমঝিম রাত্রি, আর মাঝে মাঝে মেঘ-ছেঁড়া ভিজে-ভিজে জোছনাÑএত ভালো লাগে, ভালো লাগে ব’লেই একা লাগে, আবার মানুষের সঙ্গও বেশি ভালো লাগে নাÑএইরকম একটা আবছায়ার মধ্যে তার যেন দম আটকে এলো; কলেজটা খুললে বাঁচে। (তিথিডোর)
খ. সোমেন দেখলো মীরার পিঙ্ক রঙের হাতের তেলোয় আলতা লাল ছিটে, পাশেই কালচে দাগÑ মশার থ্যাঁতলানো শব। কার রক্ত খেয়েছিলো? রংটা টকটকে তাজাÑ মীরার। (নির্জন স্বাক্ষর)
বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্যের ভাষিক শৃঙ্খলার একটি বিশেষ দিক অর্থাৎ বিশেষণ বিষয়ে উপরিউক্ত স্মারকসমূহ উপস্থাপিত হলেও তাঁর গদ্যশৈলির অন্য যে-সব বৈশিষ্ট্য আমি উল্লেখ করেছি, তারও নানা নজির উদ্ধৃতিসমূহে খুঁজে পাওয়া যাবে। দীর্ঘ বাক্যের নির্মাতা হিসেবে বুদ্ধদেবের যে বাড়াবাড়ি কিংবা মুন্সিয়ানা সমালোচকমহলে নিন্দিত কিংবা প্রশংসিত হয়েছে, তাও ওপরের উদাহরণে পরিস্ফুট।
কলকাতার যে পরিমণ্ডলে কবি ও কথাশিল্পী বুদ্ধদেব সক্রিয় ছিলেন, তাঁর উপন্যাসের পাত্রপাত্রিরাও সেই জগতেরই অগ্রসর মানুষ। তাঁরই মতো তাঁর পাত্রপাত্রিরাও রবীন্দ্রসাহিত্যের ভক্ত-পাঠক, শিল্পসাহিত্যের স্বদেশী ও বৈশ্বিক অবস্থা সম্পর্কে তারা সচেতন। তাঁর প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা ধার করেই যেন তাঁর কথাসাহিত্যের নায়ক নায়িকারা অনর্গল স্মৃতিচারণ করতে থাকে। তাঁর পাত্রপাত্রিরা তাঁরই মতো নাগরিক জীবনের নানা জটিলতায় জীর্ণ; তাঁর কথাসাহিত্যের মানুষজনেরা যৌন-জীবনের অস্থির-অশোভন কিংবা অসঙ্গত আদান-প্রদানে অকুণ্ঠ। এ-প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্য : ‘বিবাহোত্তর প্রেম এবং সে-প্রেমে যৌনতা তথা দেহচেতনার উপস্থিতির কারণে বুদ্ধদেবের নায়ক-নায়িকারা নিপতিত হয়েছে জটিল জীবনাবর্তে।’ বুদ্ধদেবের নির্জন স্বাক্ষর, শেষ পাণ্ডুলিপি, পাতাল থেকে আলাপ, রাত ভ’রে বৃষ্টি, গোলাপ কেন কালো প্রভৃতি উপন্যাসে আমরা যৌন-চেতনাশ্রয়ী মানুষের অসংলগ্ন কর্মকাণ্ডের বিস্তর প্রমাণ খুঁজে পাবো। এই বৈষয়িক পরিমণ্ডল তাঁর উপন্যাসের ভাষা-শরীরকেও প্রভাবিত করেছে। রাত ভ’রে বৃষ্টি উপন্যাস থেকে সামান্য অংশ উদ্ধৃত করা যাক :
আলো জ্বেলে দেখলুম সুন্দর একটি ছবি। মালতী ঘুমিয়ে আছে, শাড়িটা উঠে গিয়ে নিটোল একটি পা দেখা যাচ্ছে হাটু থেকে পাতা পর্যন্ত, আঁচল স’রে গিয়ে একটি স্তন সম্পূর্ণ বেরিয়ে     পড়েছেÑ সম্পূর্ণ গোল, নধর ঊর্ধ্বমুখ। একটি শ্যামবরনী ভেনাসÑ বতিচেলির সদ্যতরুণী নয়, বরং টিৎসিয়ানোর কোন ছাত্রের আঁকা পক্কযুবতি, সারা ঘুমন্ত শরীরের মধ্যে ঐ অনাবৃত স্তন যেন চোখ মেলে তাকিয়ে আছে, রূপের চেতনা ও স্পর্ধা নিয়ে, লোকেদের অভিনন্দন নেবার জন্য।
বুদ্ধদেবের পাত্রপাত্রিরা তাদের কথোপকথনে প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে; কলকাতার কথ্যভাষার বিশিষ্ট রূপটিই তাঁর প্রধানতম অবলম্বন; ক্রিয়াপদ ব্যবহারে তিনি অমিতব্যয়ী শুধু নন, বরং বলা চলে ভয়ানকভাবে সীমিত এবং তাঁর এ-প্রয়াস গদ্যের গতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর; অনেক অপ্রচলিত শব্দকে তিনি অবলীলায় বাক্যের ভেতর চালিয়ে দেন। অর্থাৎ তাঁরই চেতনার রঙে উজ্জ্বল তাঁর পাত্রপাত্রীদের মনোজগৎ, এমনকি বুদ্ধদেবের ভাষাই তাঁর কথাসাহিত্যের মানুষজনের মুখের ও মনের ভাষা। ‘রবীন্দ্রনাথের পাত্রপাত্রীরা রবীন্দ্রনাথেরই ভাষায় কথা বলে’জ্জসমালোচকবৃন্দের এই মন্তব্যের কোন সারবত্তা খুঁজে পান নি বুদ্ধদেব। তাঁর মতে, ‘সেটাকে রচনার একটা রীতি হিশেবেই মেনে নিতে হবে।’ বুদ্ধদেবের পাত্রপাত্রিদের ভাষা-প্রসঙ্গেও আমি তাঁর পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে চাই। কারণ, এটা তাঁর কথাসাহিত্যের রসাস্বাদনে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বলে মনে হয় না। ‘জিনিশটা যেহেতু রচনা, একই ব্যক্তির চিত্তের নিঃসার, তাই কোনো-একজন লেখকের সকল পাত্রপাত্রীর মুখের ভাষায় সাদৃশ্য অনিবার্য। ভেবে দেখতে গেলে, এর কোনো অন্যথা নেই।’Ñ বুদ্ধদেবের এই মন্তব্যে আমি আংশিক সমর্থন জানাতে রাজি আছি। এমন অনেক লেখকই আছেন যাঁরা নিজস্ব শ্রেণি কিংবা চৌহদ্দির বাইরে থেকেও বিচিত্র পেশা ও চরিত্রের মানুষজনকে তাঁদের কথাসাহিত্যে স্থান দেন, যারা তাদের শ্রেণি ও পেশার অনুকূলেই ভাষা ব্যবহার করে। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের মানুষজন যেহেতু তাঁরই পরিচিত পরিমণ্ডলের, তাই তাঁর এই বিবেচনা তাঁর কথাসাহিত্যের ভাষা-বিচারে পুরোপুরি প্রযুক্ত হতে পারে।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা