ভাস্কর্যে আধুনিকতা [স্মরণ ॥ নভেরা আহমেদ]

ভাস্কর্যে আধুনিকতা

নভেরা অর্থ নবাগত বা নতুন জন্ম। নতুন জন্মের এই মানুষটি আনুমানিক ৮৫ বছর বয়সে গত ৭ মে ২০১৫ তারিখে মৃত্যুবরণ করেছেন। নভেরা পরিবারের আদি নিবাস চট্টগ্রামে। পিতা সৈয়দ আহমেদ সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকালীন আনুমানিক ১৯৩০ সালে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবা কলকাতায় বদলি হলে লোরেটা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পাশাপাশি নাচ, গান, ও অভিনয় শেখেন। ১৯৪৭ এ দেশ বিভাগের পর বাবার বদলি সূত্রে তাঁর পরিবার কুমিল্লায় চলে যায়। সেখানে ভিক্টরিয়া কলেজে অধ্যয়নকালীন মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর আপত্তিসত্ত্বেও এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বিয়ে হয়। আর অল্প দিনের মধ্যেই তাঁদের বিচ্ছেদও ঘটে। তিনি লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস এন্ড ক্রাফট্স- এ ভাস্কর্য শেখার জন্য ১৯৫০ সালে ভর্তি হন। এ সময় থেকে প্রত্যক্ষ ভাবে তাঁর শিল্পজগতে প্রবেশ হয়। প্রায় ৬ বছর ১৯৫০ থেকে ১৯৫৬ এর মাঝামাঝি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে শিল্পজ্ঞান আহরণ করেন। তাঁর জ্ঞান-পিপাসু মন সমৃদ্ধ হয় ভেন্টুরিনো ভেন্টুরি নামক ভাস্করের সান্নিধ্যে অনুশীলনের মাধ্যমে। অধ্যায়ন শেষ করে স্বদেশে ফিরে আসলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নকশা প্রণয়ন এবং নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয় নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমানকে। শুরু হয় শহীদ মিনারের ভিতে ম্যুরাল চিত্রাংকন। কিন্তু সামরিক শাসন জারি হলে ১৯৫৮ সালে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে কোন অজ্ঞাত কারণে শহীদ মিনারের নকশাকার হিসাবে নভেরার নাম বাদ পড়ে যায়।
নভেরা দেশে ফিরে ঢাকায় একা ফ্লাট নিয়ে থাকতেন। আত্মীয়-বন্ধু সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কাজ করতেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্য ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে সক্রিয় পর্ব। ১৯৬০ সালে ঢাকায় প্রথম একক প্রদর্শনী দিয়েই তিনি এককিত্ব জীবন থেকে বেরিয়ে আসেন। স্বাধীন জীবন ধারায় ঢাকায় থাকা কিছুটা সমস্যা হলে স্বাধীনতার আশায় পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের নিমন্ত্রণে পাকিস্তানে যান। সেখানেও ২ বছর অবস্থান করে তাঁর আশা ভঙ্গ হয়। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল জাতীয়ভাবে আয়োজন করে ‘অল পাকিস্তান পেইন্টিং এ- স্কাল্পচার’ প্রদর্শনী। ভাস্কর নভেরা আহমেদ ‘চাইল্ড ফিলোসফার’ ভাস্কর্যের জন্য শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার লাভ করেন। এই ভাস্কর্যটি ছিল একটি শিশুর আবক্ষ প্রতিকৃতি, যে শিশুর প্রতিকৃতি গড়া হয়েছিল, সে বালকশিশু নভেরার বাসায় কাজ করতো।
নিজেকে আড়াল করার দরুণ নভেরা সম্বন্ধে খুব সীমিত জানা গেছে। শৈলিগত বিচারে তাঁর সল্পসংখ্যক কাজগুলোকে প্রধানত ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়-
১. অ্যাকাডেমিক পর্ব।
২. বিমূর্ততা পর্ব।
৩. গ্রামীণ জীবন পর্ব।
অ্যাকাডেমিক পর্বে তিনি ইউরোপে শিক্ষানবীস ছিলেন। পাশ্চত্য ধারায় কাজ শেখেন ও এ ধারায় ভাস্কর্য গড়েন। স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল তার বাস্তবধর্মী মূর্তি গঠনে। এ সময়ে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ ভাস্করদের কাজ পর্যবেক্ষণ করেন।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর কাজে নতুন ধারা আসে। এদেশে ইউরোপের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অভাব তিনি উপলব্ধি করেন। যেহেতু ভাস্কর্যের গড়ন ও বিষয়শৈলি দেশীয় উপাদান ও জীবনযাত্রার উপর নির্ভর করে, তাই তিনি দেশীয় মৃত্তিকা, সিমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। শুরু হল তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায়, ভাস্কর্যে বিমূর্ততার চর্চা। পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত এমন কিছু ভাস্কর্য গড়লেন যা প্রাচ্যের ঐতিহ্য বহন করে। বিষয়কে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে রূপ দিলেন। ইতিপূর্বে পূর্ব—পশ্চিম পাকিস্তানের ভাস্কর্যে এমন আধুনিকতা কেউ আনতে পারেন নি। ফলে নভেরা হলেন বাংলার ভাস্কর শিল্পীদের পথিকৃৎ। তিনি মাঝেমাঝে মাজার ভ্রমণ করতেন। মাজারগুলোতে বাংলার মানুষের আধ্যাত্মিক ইমোশন কাজ করে। মিয়ানমারের ভ্রমণ শেষে নির্মাণ করেন পীস বা শান্তি নামক ভাস্কর্যটি। যা বুদ্ধের আসনে বসা, গড়নে নির্মিত এবং বিমূর্ত। এই ভাস্কযটি যেন শান্তির প্রতীক বহন করে।
নভেরা মাঝে—মধ্যে শহরের জীবন ছেড়ে নৌকা ভ্রমণে বের হতেন গ্রামের মানুষের সাথে জীবনযাপন করতেন। ক্ষণকালের জন্য তিনি এ মানুষদের ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতেন। তাঁর এই খেয়ালী আচরণ সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি কৃষকজীবনের গূঢ় রহস্য ও ঐতিহ্য অন্বেষণ করতেন। কারণ জীবন থেকে যা নেওয়া হয় তাই শিল্প। এমন অনেক গ্রামীণ জীবনধারাকে বিষয় করে ভাস্কর্য গড়েছেন। যেখানে জীবনের সরলতা ও প্রেম প্রকাশ পেয়েছে। এমন একটি কাজ হচ্ছে পরিবার।
এটি একটি সাধারণ পরিবারের ভাস্কর্য। চারটি ফিগারে অসাধারণ কম্পোজিশন হয়েছে। তিনটি ফিগার পরস্পর সংলগ্ন থাকা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একতা বোঝায়। সামনের ছোট ভাস্কর্যটি অন্যদের সংলগ্নতা থেকে স্বাধীন তথাপি প্রণয়ের। যেমনটা থাকে আমাদের সংসারে ছোট বাচ্চারা। এ পর্যায়ে তাঁর কাজগুলোকে আবার ২ ভাগে ভাগ করা যায়-
১. মুক্তাঙ্গনে স্থাপনের জন্য শিল্প।
২. গৃহ অভ্যন্তরে স্থাপনের জন্য শিল্প।
নভেরা আহমেদ অসাধারণ নগর ডিজাইনার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্প গুটি কয়েক মানুষের জন্য নয়, সবশ্রেণির মানুষের জন্য। তাই শিল্প, বিশেষ করে ভাস্কর্য নগরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপনের প্রয়োজন। এতে করে সাধারণ মানুষ অনায়াসে শিল্পকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করতে পারেন। শিল্পকে বুঝতে পারেন, শিল্পের সাথে একাত্ম হতে পারেন। তাঁর অনেক ভাস্কর্য এমনভাবে তৈরি যা মুক্ত আকাশের নিচে স্থাপনযোগ্য। এগুলো সাধারণত বেশ বড় আকারের। ৫ ফুট থেকে শুরু করে ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। এমন একটি ভাস্কর্য হল ‘মানুষ ও গরু’।
এই ভাস্কর্যে বামদিকে নিচে গরুর মুখ আর ডানদিকে উপরে মানুষের ফিগার কিন্তু মানুষ আর গরুর পা যেন একই। এতে প্রকাশ পায় যৌথ শ্রম। মানুষ আর গরু যেন একাকার হয়ে কাজ করে।
গৃহ অভ্যন্তরে রাখার যে ভাস্কর্য তা নিয়ে সমালোচনা অনেক কম। আনুষ্টানিকতার অভাবেই তাঁর এই জাতীয় ভাস্কর্যগুলি বিভিন্ন স্থানে আবর্জনার পাশে পড়ে আছে। মাতাবিহীন শিশুর মতো ধুকে ধুকে নষ্ট হচ্ছে। এই ভাস্কর্যগুলি তুলনামূলকভাবে ছোট। রেখার সরলতাসহ বাংলার লোকশিল্পের গড়নের প্রভাব এতে লক্ষ্য করা যায়। প্রাচ্যের সহজ সরল ভঙ্গি প্রকাশ করছে এই সব ভাস্কর্য। যাতে রং ব্যবহার করে আরো অর্থবহ করে তোলা হয়েছে। ‘মা’ ভাস্কর্যটি এই ধারার।
সিমেন্টের মতো নির্জীব পদার্থকে তিনি গড়ে তুলেছে প্রাণবন্ত করে। এখানে মাতার শিশুকে গভীর আদরে বুকে আগলে রেখেছেন। তথাপি চোখের কালো রংটি দেখে মনে হয় মা খুব শঙ্কিত তার বাচ্চাদের নিয়ে।
নভেরা ভাস্কর্য গড়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন সিমেন্ট, মার্বেলের গুড়ো, পোড়ামাটি ও কাঠ। অনেক কাজ লোহার উপর সরাসরি সিমেন্ট দিয়ে সম্পন্ন করেছেন। যেগুলো অমসৃণ হয়ে থাকে। তথাপি মসৃণতার উপর কখন কখন কৌণিক ফর্ম ব্যবহার করেছেন। যেমন- ‘কম্পোজিশন’ ভাস্কর্যটি।
তাঁর কাজে বিষয় বিন্যাসে প্রাচ্য জীবন স্থান পেলেও একটি বিশেষ দিক হল নারী। নারীকে তিনি উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে। জয়নুল আবেদিন, কামরুল ইসলামের ছবিতে নারীকে মাতা, কন্যা ও স্ত্রী হিসাবে দেখালেও নারীর কর্মময় স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব উহ্য ছিল। নভেরার নারী উপস্থাপন অন্য সবার থেকে আলাদা। তিনি নারীকে দিলেন স্বমহিমা।
নারী ও পুরুষ মিলে তিনি অসাধারণ কম্পোজিশন তৈরি করলেন। তিনি সুন্দর সুন্দর কিছু ফর্ম তৈরি করতে চাননি। তাঁর ফর্মগুলো অর্থপূর্ণ ও স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ। ‘দীর্ঘ অপেক্ষা’ ভাস্কর্যটি তারই নমুনা।
তাঁর নারীরা সুন্দরী নয়, কিন্তু শক্তিশালী ও সাহসী। তেজস্বী এই মুখখানি যেন নভেরারই পরিচয় বহন করে। বৃটেনের সমালোচক ম্যারিমারশাল নভেরার দীর্ঘ অপেক্ষা সম্বন্ধে বলেছেন- এইটি অত্যন্ত চমৎকার ও অদ্ভুত উদাহারণ যেখানে হতাশায় পিছিয়ে পড়া নারীমুক্তির পথ খুঁজছে দৃঢ়তার সাথে।
স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি আর ফেরেন নি। প্যারিসে অতিবাহিত করেছেন বাকি জীবন। নিজেকে আড়াল করেছেন পরিচিতদের থেকে। একবুক অভিমান নিয়ে নভেরা কি হারিয়ে গেলেন? অভিমান কার উপর দেশ, নাকি দেশবাসী? দেশের উপর কোন ভাস্করশিল্পীর অভিমান থাকতে পারে না। যে কোমলমাটি দিয়ে তিনি সন্তানের মতো গড়ে তুলেছেন ভাস্কর্য— সেই সন্তানের প্রতি মাতার প্রণয় কখন লঘু হয় না। যে জন্য তিনি প্যারিসে প্রবাসী জীবন অতিবাহিত করেছেন, নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন নি।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা