‘মনের নবাব’ সিরাজুদ্দৌলার মুখোমুখি

প্রান্তিক প্রতিভার প্রাকৃতকথন
‘মনের নবাব’ সিরাজুদ্দৌলার মুখোমুখি

[একটি সাহিত্য পত্রিকার কাজ কী? শুধুই কি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখালেখি, চিন্তন ও দর্শনকে পাঠকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া? তাহলে যারা লেখক হিসেবে অবহেলিত, প্রান্তজন, কিংবা যে সমস্ত লেখক ঠিক সেই অর্থে সার্টিফিকেটের ভারে ভারাক্রান্ত নন, তাদের লেখা কোথায় ছাপা হবে! বা তাঁরা কি একটুও স্থান পাবে না সাহিত্য পত্রিকায়! চিন্তনের এই জায়গা থেকে চিহ্ন বিগত কয়েকটি সংখ্যা থেকে এরকম প্রান্তিক লেখকদের পাঠকের সামনে আনবার চেষ্টা করছে। একজন মানুষ লেখার জন্য কাতর, অথচ সে চলতি সমাজে নামহীন গোত্রহীন। সেই নামহীন গোত্রহীনের একজন মোহাম্মদ সিরাজুদ্দৌলা, নবাব হতে পারতেন, অথবা কে জানে তিনি হয়তো নবাবই, মনের নবাব; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক এই সিরাজুদ্দৌলা, যিনি কবিতা লেখেন, গান, নাটক, উপন্যাস সবই লেখেন, তার সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ মুদ্রিত হল।]

চিহ্ন : সিরাজুদ্দৌলা আপনি কেমন আছেন?
সিরাজুদ্দৌলা : আমি ভালো আছি। আপনারা কেমন আছেন?
চিহ্ন : আমরাও ভাল আছি। এই যে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব আর আপনার দুজনের একই নাম, কখনো আপনারও কি নিজেকে ‘নবাব’ ‘নবাব’ লাগে?
সিরাজুদ্দৌলা : না ওরকম করে তো কখনো ভাবি নাই। নবাবের মত শান-শওকত তো আমার নাই। তবে আমারও মনে হয় আমিও ফকির না, আমিও নবাব, মনের নবাব। মনে মনে নবাব হতে তো পয়সা লাগে না।
চিহ্ন : বাহ! ভাল বলেছেন মনের নবাব! নিশ্চয়ই সিরাজ ভাই। আর কে বলেছে আপনার শান শওকত নাই! আপনার শান শওকত আপনার লেখা। আপনার সঙ্গে এই যে আমরা বসছি, আপনি লেখক বলেই; তো আপনার লেখক জীবন কেমন করে তৈরি হলো…
সিরাজুদ্দৌলা : আমার লেখালেখির হাতেখড়ি স্কুলে। আমাদের স্কুলে একদিন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। বিদায় অনুষ্ঠানে প্রথম পর্ব শেষে দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাইরে থেকে আগত শিল্পীরা গান করলেন, তাদের গানে উপস্থিত শ্রোতারা পুরো অনুষ্ঠানটিই মুখরিত করে তুলল। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও আগত দু-একটি গান ও নৃত্য পরিবেশন করল। অনুষ্ঠানের একেবারে শেষমুহূর্তে উপস্থাপক আমার এক সহপাঠীকে একটি কবিতা আবৃত্তি করার জন্য মাইকের সামনে আসতে বলল। কবিতাটি আমার সেই বন্ধুটির নিজের লেখা হওয়াতে সে যখন কবিতা আবৃত্তি করছিল সবাই তাকে একনজর দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠল। তখন মানুষের সেই আগ্রহ দেখে  আমার মনেও কবি হওয়ার কৌতূহল জেগে উঠল। যদি আমি কবিতা লিখতে পারি তা হলে তো লোকে আমাকেও এভাবে খুঁজবে! বলতে পারেন মানুষের নজরে পড়বার লোভ থেকেই লেখালেখি শুরু করেছিলাম।
চিহ্ন : এত আগ্রহ নিয়ে লেখালেখি শুরু করলেন, আমরা তো শুনেছি মাঝখানে লেখা ছেড়েও দিয়েছেন…
সিরাজুদ্দৌলা : লেখলেখি এখনো ভালো করে শুরুই করতে পারি নি; ছেড়ে দেয়ার প্রশ্নই উঠে না, আর লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি একথা কখনো বলি নি। হয়তো কখনো ঘুমিয়ে থাকতে পারে, তবে যে কোন সময় তো তা জেগে উঠতে পারে। তবে বাস্তব জীবনে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে, গ্রাম্য পরিবেশে সামাজিক বিভিন্ন কাজের চাপে লেখালেখির প্রতি মনোযোগী হতে পারি নি। তাছাড়া লেখালেখির বিষয়ে ইচ্ছা আবেগ থাকা সত্ত্বেও অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দেয়ার মত পেছনে তেমন কেউ ছিল না তাই এ লেখালেখিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। স্বল্প পরিসরে জীবনের গণ্ডীর মধ্যেই রয়ে গেছে। মূলত আমার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতিই লেখালেখি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
চিহ্ন : এই যে লেখালেখি ঘুমিয়েছিল বলছেন, যদ্দুর আমরা জানি এটা দীর্ঘদিনই ছিল। এই সময়টাতে কী করছিলেন? একটুও কষ্ট হয়নি? যে লিখতে পারছেন না
সিরাজুদ্দৌলা : বলেছি তো লেখালেখি ছেড়ে দেইনি! এই দীর্ঘ সময়ে লেখাপড়া করেছি, বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছি। আমি গ্রামে বাস করি তো! কৃষিকাজ করেছি, রেডিও, টিভি, টেপ রেকর্ডার, সিডি প্লে¬¬য়ার এ্যামপি¬¬ফায়ার প্রভৃতি যন্ত্রাংশ মেরামত করেছি, এমনকি নতুন এসিড ব্যাটারি বাঁধাই ও মেরামত পর্যন্ত করেছি। দর্জি মেশিন চালানো, সুতার মিস্ত্রির বিভিন্ন প্রকার হাতিয়ার চালানো, সাটারিং মিস্ত্রির হাতিয়ার চালানো ও রাজমিস্ত্রির কাজ, ভূমি জরিপের কাজ থেকে শুরু করে কন্ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের রাস্তার কাজের সাথে যুক্ত হয়ে রুলার চালিয়েছি, ট্রাক চালিয়েছি। বিভিন্ন ধরনের মাপজোকের কাজ করেছি। কাঁচামালের ব্যবসা করেছি। সংগীত বিদ্যালয়ে হারমোনিয়াম, তবলা, অল্প অল্প দোতারা, আর বাঁশি বাজিয়েছি; তেমনি বিভিন্ন সংগীত বিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ে শিক্ষাদান ও তবলা প্রশিক্ষণ কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। সুন্দর অভিনয় শিক্ষার জন্য, নাটকে সুন্দরভাবে অভিনয় করার জন্য, যাত্রামঞ্চের পরিচালকদের সহায়তা নিয়েছি। সেই সূত্রে বিভিন্ন এলাকায় নাট্যমঞ্চে এবং  দূর-দূরান্তে বিভিন্ন এলাকার যাত্রামঞ্চে অভিনয় করেছি। সংগীতের সাথে যুক্ত হয়ে পূর্বের রাজশাহী জেলার বিভিন্ন মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেছি।
আর কষ্টের কথা বলছেন, প্রতিটি কাজের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে শ্রম ও কষ্ট। কষ্ট যদি না থাকে তাহলে তৃপ্তির আনন্দটাই বৃথা। কষ্ট তো হতোই। কষ্ট না হলে কি আর ফিরে আসার কথা ভাবতাম। তবে আবারও বলছি আমার লেখালেখি কিন্তু বন্ধ হয় নি, ঘুমিয়ে ছিল।
চিহ্ন : তাহলে ঘুমিয়ে থাকার ব্যাপারটা কেমন? আপনি কি ভুলে গেছিলেন যে আপনি একজন লেখক?
সিরাজুদ্দৌলা : যা একবার মনের গভীরে আঁচড় কাটে তার দাগ কখনো মুছে যায় না, তা কি কখনো ভোলা যায়? ভুলে যাই নি যে আমি লিখতে পারি। কষ্টকর সেই মুহূর্তগুলোই এখন আনন্দ হয়ে ফিরে এসেছে। মনে হয় ওই সময়টাও আমার জীবনে দরকার ছিল। কত অভিজ্ঞতার মধ্যেই না তখন আমাকে যেতে হয়েছে। সবকিছু থেকেই আমি কিছু না কিছু শিখেছি।
চিহ্ন : কবে আপনার মনে হলো লেখালেখি আবার শুরু করা দরকার?
সিরাজুদ্দৌলা : তা প্রায় ১৫ বছর পর। সব কাজের প্রতিই যখন একটা অনীহা চলে এল তখন আমার মনে হলো আবার লেখি। সেই আবার শুরু করলাম বা আপনি যেভাবে বললেনÑজেগে উঠলাম। তবে লেখালেখি করে খুব বড় লেখক হব এরকম ভাবি নাই। মানুষ কবি বলবে এই লোভ থেকে কবিতা লেখছি। আমি যা ভাবছি তা আমার মধ্যে লুকিয়ে না রেখে একটু খোলসা করে বাইরে বের করে দিয়েছি। ভালো হলো কী মন্দ হলো সেদিকে তেমন কোনো খেয়ালই করি নাই। আমার একটা লোভ ছিল অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া….
চিহ্ন : আচ্ছা আপনার কথা আমরা বুঝতে পেরেছি। তো আবার শুরু করলেন যখন, কী লিখলেন, কবিতা না নাটক?
সিরাজুদ্দৌলা : না না। কবিতা না, নাটক না। তখন একটা গান লিখেছিলাম। গানটা লিখে সুর দিয়ে যখন আমার এক বন্ধুকে শোনালাম, সে খুব প্রশংসা করল। খুব উৎসাহিত করল। বলেছি তো প্রশংসা পাওয়ার জন্যই একদিন লেখালেখি শুরু করেছিলাম।
চিহ্ন : আপনার ঐ গানটা কি মনে আছে? শোনান না আমাদের দুএকলাইন…
সিরাজুদ্দৌলা : সেটা একটা রোমান্টিক গান ছিল। তবে কাকে মনে করে গান লিখেছিলাম তা বলব না। ঠিক আাছে গানটার প্রথম দুলাইন আপনাদের শোনাই…(গলা ছেড়ে গাইলেন)
‘জানালা খুলে দিয়ে দেখনা
আকাশে আজ মধুর জোসনা’
চিহ্ন : বাহ বেশ তো! খুব ভাল। আচ্ছা ঠিক আছে আপনার প্রেয়সীর নাম আমরা জানতে চাইব না। কিন্তু জোসনা আপনার কেমন লাগে?
সিরাজুদ্দৌলা : না না আমার প্রেয়সী না, সে আমাদের পাশের বাড়িরই একজন। বোঝেন তো ছোটবেলায় সবারই ওরকম একজন থাকে। থাক ওসব কথা। জোসনার কথা বলছেন, সত্যি কী, জোসনা আমাকে পাগল করে দেয়। জোসনা রাতে একা একা হেঁটে নদীর পাড়ে চলে যাই। অনেক রাত পর্যন্ত একা বসে থাকি। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি পৃথিবী কী সুন্দর!
চিহ্ন : হুম, পৃথিবী আসলেই সুন্দর। কিন্তু পৃথিবীতে ভয়ঙ্কর অনেক কিছুও তো আছে! আপনার জীবনে ভয়ঙ্কর কিছু নেই যা মনে দাগ কেটেছে?
সিরাজুদ্দৌলা : মৃত্যুই হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এর স্পর্শ পৃথিবীর সকল প্রাণীকেই একদিন ভোগ করতে হবে। এটা সবচেয়ে বড় সত্য। তবে ব্যক্তিগত জীবনে চলার পথে অনেক কিছুই ভয়ঙ্কর মনে হয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সময় মুক্তিযুদ্ধের কারণে যে ভয়াল পরিণতি হয়েছিল তা চোখে দেখি নি; তবে পরবর্তী সময়ে সে সকল ঘটনাবলি জেনেছি। সম্প্রতি সাভারে রানা প্ল¬¬াজার ধ্বসে যাওয়া সত্যিই হৃদয় কাঁপানো একটি মর্মান্তিক ঘটনা। এই রানা প¬¬াজার ধ্বংসাবশেষ থেকে অনেক জীবিত মানুষ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বের হয়েছে এবং অনেক জীবিত মানুষ মৃত্যুর কবলে পতিত হয়েছে। সেই লাশগুলোর গলিত, অর্ধগলিত অবস্থা টিভিতে দেখে ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু ১৭ দিন পরে সম্পূর্ণ অক্ষত ও জীবিত অবস্থায় রেশমা নামের একটি মেয়েটার উদ্ধার হওয়া আবার অনেক আনন্দও দিয়েছে।
চিহ্ন : ঠিকই বলেছেন। জীবনের একপিঠে দুঃখ, অন্যপিঠে আনন্দ। আমরা শুনেছি আপনার ঘুরে বেড়ানোর পাগলামিও আছে…ঘোরাঘুরি ব্যাপারটা যদি বলেন…
সিরাজুদ্দৌলা : আপনারা যেভাবে বলছেন, ঠিক সেরকম পাগলামি নয়। বলতে পারেন উদাসীন। পড়াশোনা করতে মনে প্রবল ইচ্ছে কিন্তু ঘরের মধ্যে বসে খালি পড়ার টেবিলে বন্দি হয়ে থাকা আমার জন্য ভীষণ কষ্টকর ছিল। বারবার মনে হত আমি ঘরে বসে আছি আর ঘরের বাইরে চলমান পৃথিবীতে সব ভাল ভাল ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সেগুলো দেখা-জানা-শোনা থেকে শুধু আমিই বঞ্চিত হচ্ছি। তাই একসময় কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু হাতে টাকা-পয়সা তো তেমন ছিল না। সাধ্যের মধ্যে যেটুকু পেরেছি ঘুরে বেরিয়েছি। আর সুর আমাকে টানতো। গভীর রাতে পড়ার টেবিলে বসে যখন পড়াশোনা করছি, এমন সময় দূর থেকে কোন বিয়ে বাড়ির মাইকে গানের সুর ভেসে আসছে, সেই সুর শুনে আমি অস্থির হয়ে যেতাম। কিন্তু তখন সুর আমাকে ঘরছাড়া করত না বরং সুরের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে আরও বেশি করে পড়ায় মনোযোগী হতে পারতাম। এমনটি প্রায়ই ঘটত।
চিহ্ন : একটু আগে বললেন জোসনা রাতে পৃথিবী আপনার কাছে সুন্দর মনে হয়। ঠিক আছে। কিন্তু আপনাকে যদি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কোনটি জিজ্ঞেস করা হয় আপনি কী বলবেন?
সিরাজুদ্দৌলা : জোসনা সুন্দর। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর আমার কাছে সত্য। যা সত্য তাই সুন্দর।
চিহ্ন : সত্য সুন্দর কেন মন হয়?
সিরাজুদ্দৌলা : আমরা সকলেই সুন্দরের পূজারী। তাই পৃথিবীর মানুষ সুন্দর ও মঙ্গল কামনা করে। অসত্য সবসময় মন্দ ও অপ্রীতিকর তাকে কখনো ভালোবাসা যায় না। সত্য দিবালোকের মত উজ্জ্বল আলোকিত দীপ্তিময়, অসত্য বা মিথ্যা রাতের গভীর অন্ধকারের মত কুৎসিত। সত্য সবসময় সুন্দর ও মধুরতম। তাই যত কষ্টই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত সত্যের বিজয় অনিবার্য। কথায় বলে শেষ ভালো যার সব ভালো তার।
চিহ্ন : আচ্ছা আপনার কাছে জীবনের কষ্টগুলো কেমন? মানে বলতে চাইছি  কষ্ট আপনি নিজে কীভাবে উপলব্ধি করেন?
সিরাজুদ্দৌলা : কষ্ট সত্যিই সবসময় বেদনাদায়ক ও অপ্রীতিকর কিন্তু যদি সে কষ্ট ন্যায় ও সত্যের জন্য হয় তা হলে সেই কষ্ট মধুর। যে কোন কাজ যখন পরিপূর্ণতা লাভ করে, তখন যে কাজ করে তার আনন্দের সীমা থাকে না; মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর অফুরন্ত সুখগুলো তার পায়ের নিচে আছড়ে পড়ে। কষ্ট আমার কাছে একধরনের অপেক্ষা। আমি সব সময়ই ভাবি এই যে কষ্ট, এটা আসলে একটা সুখেরই পূর্বলক্ষণ। তাই কষ্টে আমি ডরাই না।
চিহ্ন :  কিসে ডরান সিরাজ ভাই? মৃত্যুকে ডরান?
সিরাজুদ্দৌলা : হ্যাঁ মৃত্যু ভয়ঙ্কর। তবে, মৃত্যু আমি ভয় পাই না, মৃত্যুকে আমার কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কারণ মৃত্যুর পর জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয় আছে। হাশরের ময়দানে শেষ বিচারের হিসাব-নিকাশ ও পুলছিরাতের বিষয় নিহিত আছে। আল¬¬াহ মুমিন মুসলমানদের জন্য পুরস্কারস্বরূপ চিরকাক্সিক্ষত জান্নাত দেবেন। পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআন-এ সুরা বাকারায়’ আল্ল¬াহ বলেছেন ‘যে কেউই আল¬¬াহতে আত্মসমর্পণ করবে এবং সৎকাজ করবে জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতা তাদের সকলেরই থাকবে।’ সেখানে মানুষ অনন্তকাল বসবাস করতে পারবে। সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চিরশান্তিনিকেতন জান্নাতে অফুরন্ত সুখ-শান্তি ও প্রশান্তির নহর অজস্র ঝরনাধারায় মত জান্নাতবাসীর উপর সারাক্ষণ বইতে থাকবে। জান্নাতবাসী মনের মধ্যে যখন যা ইচ্ছা পোষণ করবে, মুহূর্তের মধ্যেই ইচ্ছাপূরণের উপকরণগুলো সামনে এসে হাজির হয়ে যাবে। জান্নাতের এই সুখ-শান্তি মৃত্যুর আগে কখনো পাওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র মৃত্যুর পরেই তা পাওয়া যাবে। তাই মৃত্যু আমার কাছে ডরানোর মত কোন বিষয় না।
চিহ্ন : তাহলে তো আমরা কোনকিছুতেই আপনাকে ভয় পাওয়াতে পারছি না। আপনি কি মানুষকে ভয় পান? না ঠিক আছে, ভয়ের ব্যাপারটা বাদ দেন, আপনি বরং মানুষ নিয়ে আপনি কী ভাবেন সেটা বলেন।
সিরাজুদ্দৌলা : না মানুষকে তো ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মানুষের চেয়ে বড় তো কেউ নাই। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আল্ল¬¬াহ মানুষকে সৃষ্টির সকল জীবের চেয়ে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাসস্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন। আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ হলো সবচেয়ে সেরা। আল্ল¬¬াহ মানুষকে যে জ্ঞানের অধিকারী করেছেন তা তিনি নিজেই দান করেছেন। ঠিক আছে, মানুষ নৃশংস হতে পারে, ঘৃণা করতে পারে, খুন করতে পারে, কিন্তু মানুষ তো ভালও বাসতে পারে। মানুষ এখনও ভালবাসতে পারে বলেই পৃথিবী সুন্দর। মানুষ মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে পারে বলেই পৃথিবীতে এখনও ফুল ফোটে। আমি ক্ষুদ্র মানুষ, বুদ্ধিও কম; তবে আমার কাছে মানুষ মানে হল পৃথিবীর প্রাণ।
চিহ্ন : আপনার অভিজ্ঞতাকে নাটকে, গানে কীভাবে কাজে লাগিয়েছেন?
সিরাজুদ্দৌলা : কী আর অভিজ্ঞতা! কত স্বপ্নই তো পূরণ হলো না জীবনে! কত কী চাওয়া পাওয়া হল না! তবু জীবনের যেটুকু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে নাটক ও গানে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। নাটকে অভিজ্ঞতাগুলো সংলাপ, চিত্র ও চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি এবং গানে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা আর্তনাদ, অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেছি। সুরের মাধ্যমে সেই আর্তনাদ হয়তো আপনাদের কাছে গান হয়ে বেজেছে।
চিহ্ন : গানের সুর-তাল আপনাকে টানে এটা আগেই বলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবে থেকে এসব করে বেড়ান?
সিরাজুদ্দৌলা : হ্যাঁ গানের সুর আমাকে টানতো ছোটবেলা থেকেই। তবে ১৯৮৯ সাল থেকে একেবারে সংগীতের সাথে জড়িয়ে পড়ি ‘কাঁটাখালি অগ্নিবীণা সংগীত বিদ্যালয়ে’র মাধ্যমে। সেখানে সংগীতের তালিম দিতেন ওস্তাদ শেখ বদিউজ্জামান। তিনি রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। ওস্তাদ শেখ বদিউজ্জামান আধুনিক ও নজরুল সংগীত পরিবেশন করতেন। তাঁর কাছে গান শিখেছি। আর তবলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি রাজশাহীর ষষ্ঠীতলা হিন্দোল সংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে। এই সংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচালক ছিলেন ওস্তাদ রবিউল ইসলাম। তিনি ছিলেন রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের সিনিয়র নিয়মিত শিল্পী। এই হিন্দোল সংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে তবলার তালিম দিতেন ওস্তাদ আব্দুল আলীম। মাঝে মধ্যে রাজশাহী বেতার কেন্দ্র এবং বাটার মোড়ে ওস্তাদ অনুপ কুমার দাস তিনি আমাকে তবলা সস্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন। অনুপ কুমার দাস ছিলেন আমার ওস্তাদের ওস্তাদ।
চিহ্ন : একটা জিনিস লিখতে শুরু করলে শেষ করেন কীভাবে? অনেকক্ষণ লিখতে লিখতে কখনো বিরক্তি আসে নি! না লিখতে ইচ্ছে করে নি?
সিরাজুদ্দৌলা : কোনো কিছু লেখার ইচ্ছা মনের মধ্যে উদয় হলেই অজানা-অচেনা অনুভূতিগুলো চারদিক থেকে আটকে ধরে। তাই যখন যেভাবে সময় পাওয়া যায়, তখনি তা পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী শুরু করি। যতক্ষণ পর্যন্ত লেখাটি শেষ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত মনে শান্তি পাই না। সারাক্ষণ অজানা-অচেনা খেয়াল পোকাগুলো স্মৃতিপটে, মনের আনাচে-কানাচে ভর করে বারবার হানা দিতে থাকে। তখন নিজেকে খুব দুর্বল মনে হয়। আবার যখন লেখাটি শেষ হয় শরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরায় প্রশান্তি সুবাতাস বইতে থাকে। নিজেকে বেশ হালকা মনে হয়।
চিহ্ন : আপনি কি মনে করেন আপনি লিখলে কারো  উপকার হবে, কারো উপকারের কথা ভেবে লিখেন Ñ নাকি নিজের আনন্দের জন্য লেখেন?
সিরাজুদ্দৌলা : আমি নাটক লিখেছি, কবিতা, গান, গল্প এমনকি উপন্যাস লেখারও চেষ্টা করেছি। আমার মনের মধ্যে একপ্রকার প্রতিযোগিতার খেয়ালপোকা হৃদয়ের গভীরে অবচেতনার অন্তরালে সবসময় ঘুরঘুর করে। আমি ভাবি মানুষের দিয়ে যা যা করা সম্ভব আমিও চেষ্টা করলে তাই করতে পারবো। আমার লেখালেখি শুধু নিজের আনন্দের জন্য না। উদেশ্য তো আছেই। আমার লেখা যদি কাউকে কোনোভাবে আকৃষ্ট করে তাহলে সেগুলো স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে মানুষের মনের ভিতর এরকম আশা তো করিই।
চিহ্ন : কিন্তু আপনার কোন বই আমরা পাই নি। বই হতে পারে এমন কোন পাণ্ডুলিপি আছে আপনার?
সিরাজুদ্দৌলা : বই পাবেন কী করে? এখনও তো কোন বই প্রকাশই করতে পারি নি। আমাদের মত লেখকদের বই কে বের করবে বলেন? শপথ নামের একটা নাটকের পাণ্ডুলিপি আছে। এই দেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপগুলো, নাটকের সংলাপ, বিভিন্ন আংশিক চিত্র ও খণ্ড চরিত্রের মধ্যেমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এখানে। আর্তনাদ নামের আরেকটি নাটকে গ্রামের প্রভাবশীল সমাজপতিরা কীভাবে কুচক্রের জাল বিস্তার করে আর সেই জালে আটকে অশিক্ষিত-হতদরিদ্র নিম্ন আয়ের কৃষকরা কীভাবে জর্জরিত হয় তার আংশিক চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। এগুলো কেমন হয়েছে তা বলতে পারব না। কিন্তু আমি লিখে আনন্দ পেয়েছি।
চিহ্ন : আপনি বিরক্ত? ঠিক আছে …আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী?
সিরাজুদ্দৌলা : (হাসি) না না কী যে বলেন, একটুও বিরক্ত হই নি। আমি সহজে বিরক্ত হই না। প্রিয় জিনিসের কথা জানতে চাইছেন তো। বই-ই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এখন এই সেমিনার লাইব্রেরিতে থাকতে থাকতে বইয়ের সঙ্গে মনে হয় একধরনের আত্মীয়তাই হয়ে গেছে। এই চাকরিটা আমার হয়তো একটা পুরস্কারই। আল্লাহ হয়তো ভেবেছেন বই ভালবাস, ঠিক আছে তাহলে বইয়ের মধ্যেই থাক। বইয়ের মধ্যেই আছি, বইয়ের সঙ্গেই থাকতে চাই।
চিহ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা