মহানগরে গঙ্গা ফড়িং থাকতে নেই

কী এক উদ্বেল বেদনায় মাখামাখি হয়ে সে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ায়। রাতের গর্ভ  থেকে চৌদ্দতলা ভবনটি তাকে অনেকটা উগড়ে দেয়। ঝিমধরা শরীর নিয়ে শিরিন সুলতানা বীথি ভবনটির পদপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে। হাঁপ ধরে যাওয়া বুকের ভেতর টেনে টেনে বাতাস নিতে থাকে। এভাবে অনেকক্ষণ। যেন সহস্র বছর ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার একটু একটু করে ডিজলভ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে কমলাখসি ভোরের ভেতর। ঘুমভাঙা রিকশাগুলো এগিয়ে চলছে, সারারাতের ক্লান্তি শেষে ঘুমাতে চলছে কিছু রিকশা। ট্রাকের কর্কশ শব্দ, রাজপথের কালো পিচ মাড়িয়ে, রাস্তার বুকে দাগ টেনে ভারি যানবাহন আসছে, যাচ্ছে— যেন এক পরাবাস্তব নগর! এ নগরী কি কখনো ঘুমায় না! তার মতো! নির্ঘুম রাত কাটানো এ নগরীর বোধহয় নেশা!

সে যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছতে আরো খানিকটা সময় লাগবে। হাতের রোমও ঠিকমতো দেখা যায় না এখানে। এমন আলো-অন্ধকার ভোরের ভেতর মিশে যেতে থাকে অনেক মানুষের পদশব্দ, নিঃশ্বাস পতনের শব্দ। তবু, কেমন যেন নিস্তব্ধতার মিহি ঘ্রাণ! এ নিস্তব্ধতার ভোরের, এ ঘ্রাণ ভোরের একান্ত। অনিকেত এই আলো যখন রাত্রি আর দিনের মাঝে জায়গা করে নেয়, তখন এরকম আলো-গন্ধময় সুর ওঠে প্রকৃতিতে। সেই আলো-গন্ধ-সুরের মাঝে ডুবে যেতে যেতে সে বুঝে যায় একটু পরই জমে উঠবে হাট; মহানগরের বৃহৎ হাট। শিরিন বলে, সেন্টার অব দ্য সিটি, হার্ট অব দ্য কান্ট্রি। সে বলে, এখানের দিন রাত্রিগুলো গভীরভাবে না দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না জীবনের এডাপটেশন ক্ষমতা কতো! বাঁশের ছোট্ট ধামার মাঝে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে বেঁচে থাকার কী আনন্দ তা ওই মানুষটি ছাড়া অন্য কেউ অনুভব করতে পারবে না!

এতোক্ষণে ঘুমের জন্য শরীর ভাঁজ হয়ে আসতে থাকে শিরিনের। বাসায় ফেরার জন্য অপেক্ষারত সে। মাথায় তখনও, সূর্য দীঘল বাড়ি, আতিয়া মহল। অ্যামবুশ, গোলা-বারুদ, রক্ত-মাংসপি- আর অসহায় মানুষের ভয়ার্ত চাহনি, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সারারাত ধরে দুর্ধর্ষ অ্যাকশন মুভির ট্রেইলার, না কি পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি দেখে ফেলেছে এতোক্ষণে তা সে মনে করতে পারে না। সব মুছে দিচ্ছে মস্তিষ্ক। যেমন করে প্রতিদিন তার মাথা ইরেজ করে দেয়, তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার জন্য সমস্ত আয়োজন কেমন করে বিছিয়ে রেখেছে প্রতিপক্ষ। দিনের পর দিন ঈর্ষার বিষাক্ত ছোবল, অশ্লীল প্রতিযোগিতা। এসব কি তাকে স্পর্শ করতে পারে! পারে না। করেও না। তাকে স্পর্শ করে না বিদ্রুপের হাসি, তাকে স্পর্শ করে না জঙ্গি, কাউন্টার টেরোরিজম, অপারেশন টোয়ালাইট, অপারেশন সাউথ প’র মতো শব্দগুলো। যেন বহুদূর থেকে শব্দগুলোকে দেখতে থাকে সে, নিতান্ত আগন্তুকের মতো। হ্যাঁ সে ভুলে যাচ্ছে… ভুলে যাচ্ছে- প্রতিঘণ্টার সংবাদ বুলেটিনের স্টিং- যা প্রতিঘণ্টায় তার মাথায় হাতুরী দিয়ে আঘাত করে। ওই তো ভেজা হাওয়ার ঘ্রাণ ঢুকে যাচ্ছে তার বুকের ভেতর। গ্রামের গন্ধমাখা সবজি হাটে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পায় শৈশবের মটরশুঁটি ক্ষেতে হুটোপুটি দৃশ্য, তার ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় পায় কাঁচা মরিচের ঘ্রাণ। আহা জীবন! প্রদীপ্ত উল্লাসে বেঁচে থাকো তুমি! মানবের রক্তবিন্দুতে আরো নির্মোহ, আরো নির্লোভ হও। জিঘাংসার লালসা থেকে বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে এসো আলোয়, আলোয়। গঙ্গা ফড়িংয়ের মতো নেচে ওঠো। গঙ্গা ফড়িং!

হঠাৎ তার গঙ্গা ফড়িংয়ের কথা মনে পড়ল কেন? ও হ্যাঁ, গঙ্গা ফড়িংটিকে কাল সে দেখেছিল তাদের প্রতিষ্ঠানের আটতলায়। একবার এ দেয়াল আরেকবার ও দেয়ালে বসতে চাইছে। কোথাও স্থিত হতে পারছে না। অজানা-অচেনা জগতে এসে রীতিমতো ভয়ার্ত হয়ে গেছে পতঙ্গটি। সবুজ ধানের ক্ষেত, কলাপাতার মসৃণ শরীর রেখে ফড়িংটি কেমন করে এই ইস্পাতের নগরীতে চলে এলো!

ও ফড়িং! তুমি কতোদূর থেকে এখানে আসছ? এই ইট-পাথরের নিষ্ঠুর জগতে এসে পড়েছ তা কি তুমি জানো? কেমন করে এলে তুমি? সব্জির ঘিরানে কখন যে ট্রাকে উঠে পড়েছ তা বুঝতে পারো নাই, না! এখানে আসার আগে কোথায় ছিলে তুমি! মটর ক্ষেত, ঘাসের সবুজ জমিন, নাকি সরিষা ক্ষেতে! তুমি কি জানো না, এই ইট-পাথরের নগরে তুমি বাঁচতে পারো না। এখানে তোমার মতো ঘাস ফড়িংয়ের বাঁচবার পথ নেই!

শিরিন সুলতানা একটি লাঠির ডগায় করে ফড়িংটিকে পাতাবাহারের ঝোঁপে বসিয়ে দিয়েছিল। ফড়িংটির কথা মনে হতেই তার মন বিষাদে ভরে যায়। সে যখন মন খারাপ গলাধঃকরণ করতে ব্যস্ত তখনই কণ্ঠস্বরটি শুনতে পায়। ইলিয়াস ভাই!

মুহূর্তে সমস্ত দৃশ্য ফ্রিজ হয়ে যায়। একটি দৃশ্য রেখে বাকি দৃশ্য ফেড আউট হতে থাকে স্ক্রীন থেকে। সমস্ত শব্দের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কেবল একটি শব্দই বাতাসে ভাসতে থাকে। ইলিয়াস ভাই!

যেন ‘ইলিয়াস ভাই’ এক মহানায়কের নাম। যেন ‘ইলিয়াস ভাই’ নামে একটিই মানুষ বাস করে সমস্ত পৃথিবীতে। যেন পৃথিবীর আদি মানবটির নাম ‘ইলিয়াস ভাই’- যে নাম এই মাত্র উচ্চারিত হলো একটি নারী কণ্ঠে। এবং নিঃসন্দেহে সেই নারীটিও পৃথিবীর আদি মানবী- যে আকুল হয়ে খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া মহানায়ক ‘ইলিয়াস ভাই’কে। সেই কণ্ঠস্বরের মাঝে অসহায়ত্ব, প্রেম, নির্ভরতা— সব যেন জড়াজড়ি করে আছে। তখনও কণ্ঠস্বরের মালিককে দেখতে পায়নি শিরিন। এমন মোহন ধ্বনি কেবল চলচ্চিত্রইে সম্ভব। এতো সুরেলা এতো সুমধুর কণ্ঠস্বর হতে পারে কোনো মানবীর! শিরিনের জানা ছিল না। শিরিন শব্দের উৎসের দিকে ফেরে। তার অনতিদূরে একটি রিকশায় এক অনিন্দ্য রূপসী নারীকে দেখা যায়। হাতের আঙুলগুলো ভ্যানিটি ব্যাগের ওপর ঘুরছে। তার পোশাক, তার জুতো, তার ব্যাগ কোথাও এতটুকু বৈসাদৃশ্য নেই। নেই ছন্দপতন। হ্যাঁ, হতে পারে! এই নারীর কণ্ঠস্বরই এমন হতে পারে!

শিরিন অপেক্ষা করতে থাকে। ‘ইলিয়াস ভাই’ এখন কোথায়! নিশ্চয়ই শব্দের আশেপাশেই আছে। কী করবে সে! শব্দের মালিকের দিকে দৃষ্টি ফেরাবে, নাকি যেমন ছিল তেমনি থাকবে। ‘ইলিয়াস ভাই’ কি শব্দের উৎসের দিকে ধীর বিক্ষেপে এগুনোর আগে নিজেকে একটু গুছিয়ে নেবে! কী জানি!

অবশেষে ‘ইলিয়াস ভাই’ নামক ব্যক্তিটি এসে রিকশার হাতলে হাত রাখে। মেয়েটির ঠোঁটে একচিলতে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। রিকশা চলতে শুরু করে। ওই তো রিকশাটি মিলিয়ে যাচ্ছে পথের শেষের দিকে…

হঠাৎই শিরিন বুঝে ফেলে নারীটি অন্ধ। হায় ঈশ্বর নারীটি অন্ধ! ওই বিশাল অট্টালিকায় সে কী করছিল? ওটা তো একটা তিন তারকা হোটেল! তরুণীটি কি এখানে নিয়মিত আসে? আর তাকে ওই ‘ইলিয়াস ভাই’ নিয়ে আসে, নিয়ে যায়! এতোদিন সে ওই নারীটিকে দেখেনি কেন? সে কি আপরো আগে চলে যায়! আজ কি ‘ইলিয়াস ভাই’য়ের আসতে দেরি হয়ে গেছিল? নাকি ওই অপূর্ব সুন্দরী নারীর সামনে দাঁড়াতে কুণ্ঠা বোধ করছিল? মেয়েটি যেভাবে হাসল, তাতে কি ‘ইলিয়াস ভাই’য়ের সন্দেহ জাগে সে আসলেই অন্ধ কী না। তার কী মনে হয়, হয়ত মেয়েটি দেখতে পায়, না দেখার ভান করে। নইলে এতো গুছিয়ে পরিপাটি হয়ে সে কীভাবে চলে! এটি দেখার জন্যই কি ’ইলিয়াস ভাই’ দেরি করছিল!

মেয়েটি যেন কী বলছিল? কী হইল ‘ইলিয়াস ভাই’, রিক্সা চালাও, বেলা উইঠা ফরশা হইয়া গেল, বাড়ি ফিরা আমারে তো একটু ঘুমাইতে হইব? অমন কইরা মুখের দিকে চাইয়া রইছ ক্যান? তুমার কি মনে হয়, অন্ধ না আমি!

শিরিন আপা, গাড়ি রেডি চলেন।

বাস্তবে ফিরে সে নিজেকে টেনে তোলে গাড়িতে। তার মতো সামান্য সংবাদ করণিকের জীবনে এরকম দৃশ্য দেখা সম্ভব হতেই পারে। শিরিন সুলতানা বাড়ি ফিরে ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে যেতেও দেখে ওই মুখ, শুনতে পায় ওই কণ্ঠস্বর… এমন মানব জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা, মন রে কৃষি কাজ জানো না…

পিতার পিছু পিছু পুত্রী হাঁটছে, আর গাইছে। তাদের পদপ্রান্তে বিস্তীর্ণ মটর ক্ষেত, সরিষা ক্ষেত। গাঁয়ের নদীটিকে পেছনে ফেলে তারা এগোয়। আগে আগে পিতা আর তার পিছু পিছু পুত্রী। পরম নির্ভরতা, পরম নিশ্চিন্ত সে পথচলা

আরো আগে

আরো আগে

আরো আগে…

কোনো এক শীতের ভোরে জন্ম হয় ফুটফুটে এক শিশুর। ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। শিমফুলের ওপর শিশিরকণা ঝিকমিক করছে। সেই দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে করিম বয়াতি কন্যার নাম রাখলেন নিহারবালা।

তো নিহারবালা বড়ো হয়।

ধীরে ধীরে সে রূপে গুণে দশ গেরামের মেয়েদের ছাড়িয়ে যায়। রূপের ছটায় গ্রাম আলো করে রাখে। বংশাই নদীর পাড়ের কাউলজানী গ্রামের নিহারবালা গান করে। বিয়ার গীত, হলুদের গীত, পূজার কীর্তন। করিম বয়াতি নিজেই স্বীকার করে, তার কন্যার গলায় কীর্তন ভালো খেলে, যা সে পারে না। কিন্তু খুঁত একটাই নিহারবালার। জন্মান্ধ। কিন্তু কী করে যেন সে বুঝে যায় কোনটি পিতার পদশব্দ, কোনটি অন্য কারো। কোনটি ধানের গন্ধ, কোনটি লাউ-পাতার গন্ধ। শিমফুল, গাঁদাফুল, গন্ধরাজ, টগর, বেলি, এমনকি কোনটি কচুরিপাতাসমেত চলমান জলের গন্ধ তাও বুঝতে পারে সে। পারস্যের অন্ধ চিত্রকরদের মতো নিখুঁত নিপুণতায় নিহারবালা জীবনের ছাপচিত্র আঁকে।

ওই তো রিকশাটা এগিয়ে যাচ্ছে..

কাঁচামরিচ

ধইন্যাপাতা

পেঁয়াজ

মানুষের গায়ের গন্ধ!

কাদার গন্ধ!

মাছের গন্ধ!

সামনে ডোবা নিশ্চয়ই

বাবা! আমার হাতটা ধরো। পা আটকাইয়া গেছে। বাবা! কই গ্যালা? বাবা, আমি কিছু  দেখতে পারতেছি না। আমার ডর লাগতাছে বাবা।

‘বাবা! আমি কেমন করে বাড়ি ফিরব! আমার হাতটা ধরুন বাবা! আমার ভয় করছে!’

শিরিন সুলতানা ধরমড় করে বিছানায় ওঠে বসে। বাবা!

এতোদিন পর বাবা কোথা থেকে এলো? কই ২৫ বছরে একবারও তো এমন স্বপ্ন সে দেখেনি। স্বপ্ন কেন চোখের দেখাও দেখেনি। একই শহরে পিতা-কন্যার বসবাস তবুও। বাবারা কি এমনই হয়! নিহারবালার বাবা নাকি শহরের মাঝে নিহারবালার হাত ছেড়ে দিয়েছিল! হাত যে ছেড়ে দিয়েছিল সে কথা করিম বয়াতি নিজেই বলেছে সবাইকে। ঘোর পাগল হয়ে গেছিল সে।

নিহারবালা অন্ধ!

সে? সে তো অন্ধ নয়! তবে কেন বাবা তার হাত ছেড়ে দিল!

গরীব ঘরে জন্ম নেয়া তাহলে অপরাধ। নারী হয়ে জন্ম নেয়াও বোধ হয়!

শিরিন সুলতানা বীথির মাথাটি ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

তবু, নিজেকে প্রস্তুত করে জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ধীরে ধীরে ভুলে যায়, তারও বাবা ছিলো। বাবা তাকে বংশাইয়ের জলে সাঁতার শিখিয়েছিল। ভাগ্যিস পিতা! আপনি শিখিয়েছিলেন, কেমন করে ভেসে থাকতে হয়। না হলে এই জীবনের মহাসাগরে সে কি ভেসে থাকতে পারত! এতো এতো সংবাদেও মহাসাগরে সে তো ডুবে যেত।

সড়ক দুর্ঘটনায় নারীর মৃত্যু।

শিশু সুমাইয়া কোথায়? তাকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে না!

পাচার হওয়া ১২ নারী দেশে ফিরে এসেছে।

ডাস্টবিনে মুখ থুবরে পড়ে থাকা কন্যা শিশু। কুকুরে অর্ধেক নাক কামড়ে নিয়েছে। …আর মর্গে ডোমের কাছে অন্ধ নারীর লাশ বিক্রি করতে যেয়ে আটক হয়েছে এক রিকশাওয়ালা…


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা