মাহ্ফুজ হুমায়ূন রাশেদ’র অনুবাদ

বিশ্ববিদ্যালয় : স্বচ্ছ ধারণার বিশালতা
জন হেনরি কার্ডিনাল নিউম্যান

[জন হেনরি কার্ডিনাল নিউম্যান (১৮০১-১৮৯০)। তার বাবা লন্ডনের একজন ব্যাংকার ছিলেন। আরলিং ও ট্রিনিটি (OXFORD) কলেজ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৫৮ সালে ডাবলিনের ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটিতে তিনি রেক্টর পদে নিয়োগ পান। এ পেশাই তাঁকে The Idea of a University  (১৮৫৮) বইটি লিখতে সাহায্য করে। লেখার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সুন্দর পরিচ্ছন্ন নীতির সমর্থক। বারমিংহামে ১৯৮০ সালে তার মৃত্যু হয়। ফ্রম দ্য আইডিয়া অফ এ ইউনিভার্সিটি এ প্রবন্ধটিতে মূলত একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কি সুযোগ-সুবিধা কাম্য সে বিষয়ে প্রাবন্ধিক মনোনিবেশ করেছেন। জ্ঞানের যে সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে এ প্রবন্ধে তা তর্কাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য]

জ্ঞানের মৌলিকতা নামের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করলে বিজ্ঞান ও দর্শন-এর সামষ্টিকতা পাওয়া যাবে এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। জ্ঞানের পরিস্ফুটন ধ্র“বক পর্যায় বলতে বোঝায় তার প্রয়োগ ও প্রয়োগের শৃঙ্খলতার সমস্যাগুলির পথপরিক্রমা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে পুরুষকে বোঝানোর ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট করে বলতে গেলে বিশ্লেষণধর্মী। তথ্যবহুল ও যুক্তিনির্ভর কোন কিছু, তাকে বলে জ্ঞান। জ্ঞানের বীণায় যে সুরলহরীর কলতান বাজে তার উপসুর ও মৌলিক সুরই হলো যুক্তি। মূলত যাদের প্রাথমিক সুর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আছে মূলত তারাই তার ব্যবহারকারী।
জ্ঞান যখন বিজ্ঞানের আসন পায় এবং নবতর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয় তখন তার ডালপালা শাখা-প্রশাখা মিলেই যে আনুভূমিক সরলরেখা তৈরি হয় তা শক্তির তীর্যকরশ্মি, নৈর্ব্যক্তিক, যে কোন প্রশ্নের মান অর্জনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু। শক্তির মূল তালিকায় শক্তির উৎস হিসেবেই মূল্যমান এবং জ্ঞান মূল্যবান বিশ্লেষণ-এর সংযোজন এবং এতে করে বিবেচনার বিষয়টি উপেক্ষিত নয়। জ্ঞানের ক্ষুধার্ত অবস্থায় পেটের খাবার বললে ভুল হবে। এটি জিহ্বার রসের উপাদানও। তাই একে বলা যায় উপকরণ এবং উপাদানের মনিকাঞ্চন। আমার ব্যক্তিগত অভিমতাদর্শ হল জ্ঞান শিল্পকলার দোলনাতে প্রস্ফুটিত হবার যোগ্যই নয় শুধু, সুযোগ্যও বটে। জ্ঞান যুক্তির দ্বারেও মাথা ঠুকতে পারে তখনই যখন এটি জ্ঞানের ভিত্তি থাকে আবার সমাধানের বেলায় দেখা যায় দর্শনের সূর্য-উন্মেষ। মুদ্রার একপার্শ্বে দেখা যায় জ্ঞানের কল্যাণকর চারুপাঠ অপর পার্শ্বে দেখা যায় জ্ঞানের নমনীয় সূর্যোন্মেষ পরিক্রমার পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। জ্ঞান অন্বেষণকারীর বা জ্ঞান পিপাসুদের ক্ষেত্রে এখানে লটারীর মতো সুবর্ণ সুযোগ আছে যে তা একই সাথে দ্বৈতসত্তার গণনাকে গুণতে পারে। স্বচ্ছ কাঁচপাত্রের মতোই এখন পরিষ্কার যে শিক্ষা গ্রহণের মোট দুটি পন্থা আছে। প্রথমটা দর্শনের আদলে গড় আর দ্বিতীয়টি হল যান্ত্রিকতার শব্দবিলাসিতার রূপসংকল্প স্পর্শের কলধ্বনিতে গড়া। একটি সাধারণ বা আলোচ্য অক্ষরে স্বাভাবিক নদীস্রোতের উজানের মতোই। অপরটি বিশেষ ও ধ্র“ব বা বহিরাগত খোলসের প্রলেপণ বানানো যায়। বিশেষ ও বাস্তব দিকটা উপেক্ষা করবার জো নাই। উভয়েই স্ববর্ণ না হলেও সমগোত্রীয়। কল্যাণকর, যান্ত্রিক ও পদ্ধতির ত্রি-শিল্পকলার নির্যাস বিশেষ।
প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, জ্ঞানকে আমরা কখনো কি নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি? অধ্যাত্মবাদীদের মতো শব্দের জালে সঠিকতার পরিমাপ না নিরূপণ করে বা ভণিতা না করে সরাসরি আসল বিষয়েই প্রবেশ করাই শ্রেয়।
এই পদার্থকে (নিষ্ক্রিয় বা জ্ঞান) নির্জীব সংবেদনশীল বা ধ্র“ব অনুভূতি বললে মোটেও ত্র“টি থাকবে না। পশুদের মাঝেও এটি বিদ্যমান বটে তবে তা জ্ঞানের মাঝে জ্ঞানের অন্ধকার বা জ্ঞান নামের কলঙ্ক। জ্ঞান সম্পর্কে কিছু কথা বলার অর্থ হল এই যে, আমি বুদ্ধিবৃত্তির আলোক দীপ্তি জ্বালাই। আর ঐ সকল ব্যাপারগুলোকে প্রতিসরিত করি যা বোঝার জন্য বিশেষ মননশীলতা বা স্পর্শকাতরতা বা বোধ বেশি জরুরি। বোধ নামের ইন্দ্রিয়টি কথা বলার সময় ব্যবহৃত হয়। জ্ঞানের আলো হল বস্তু সম্পর্কে আত্মদৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটানোর কাজে সহযোগিতা করা, যদিও এটি ইন্দ্রিয়ের সহযোগিতা ছাড়া অনেক কিছু বোঝানোর ক্ষেত্রে শতভাগ দাবি রাখতে পারে, দৃশ্যমান বস্তুকে যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করে, ঠিক সেভাবেই দেখা বস্তুর উপর ধারণা বা প্রকল্প আরোপের বিস্তার ঘটায়। আলোকিত চাঁদনী রাত না বলে পূর্ণিমা বললেও বেশি ভালো বুঝায় যে, পূর্ণিমা মানেই আলোর চাঁদ বা চাঁদের সাথে আলোর লুটোপুটি। বোধগম্য হবার বিষয় মূলত এ বিজ্ঞানের স্বকীয়তা এবং এটি বিজ্ঞানের মর্যাদার যথার্থতা বিশ্লেষণ করবার পূর্ব উপায়ও বটে। ক্ষমতাকে আকাক্সক্ষা ও আকাক্সক্ষাকে মূল্যমানের মানদণ্ডে স্থাপন করা মানেই জ্ঞান বা ফল নির্বিশেষে বিবেচ্য ও বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মূল্যমানের ক্ষেত্রে যাচাই যোগ্য। উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার অভিযাত্রিক হিসেবে এটি বিবেচনার কারণ। দর্শনের যৌগিকতার বিশ্লেষণে যে মৌলিকতা পাওয়া যায় তা হল দর্শনের বৈশিষ্ট্য। মূল বিষয়ে দেখা যায় যে, এ রকম জ্ঞান বাহ্যিক ঠাঁট বাজানোর বা হঠাৎ পাওয়া বিনা পরিশ্রমের লটারীর মতো ভাগ্যের কোন কিছু নয়।
আমাদের বলে যা আমরা এখন দাবি করছি তা অন্যদের মূলত আগামী দিনের জন্য তো বটেই, বই থেকে এটি পাওয়া যেতে পারে। ভুলে যাবার সহজ উপায় এটির আঁকেবাঁকে আছে। বই সহজে পাওয়ার সামগ্রী কখনও-বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার নেওয়া যায়, যা হাতে রাখা এবং বাজারে নেওয়া যায়। এটি সরল রৈখিক অর্জিত জ্ঞানসীমানা। ব্যক্তিগত সম্পদ ও আভ্যন্তরীণ বা অন্তর্নিহিত বলা যেতে পারে। ক্রমান্বয় সাধন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বলা যায় প্রথমত নির্দেশনামূলক। শিক্ষা মৌলিক বা যৌগিকতার অর্থে অতীব মূল্যবান ও মূল্যমানের শব্দ বিশেষ, মনের চিত্রপটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একটা প্রক্রিয়ার নির্দেশনা দেয়, চরিত্রের শ্রেণীকরণে দেখা যায়। এটা কিছুটা ব্যক্তিগত ও স্থায়ী। সাধারণত ধর্ম ও গুণের বিনিসুতোয় গাঁথা মালার সাথে শিক্ষার নামটিও বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। যখন এই রাস্তা তৈরি হয়ে যায় তখন জ্ঞানের যোগাযোগকেই শিক্ষা বলা হয়। লিবারাল আর দর্শন শব্দ দুটি শিক্ষার আলোকের দ্বারাই আমাদের মনের মননে ও মস্তিষ্কে ধরা দেয়।
পূর্ববর্তী উদ্ধৃত বক্তৃতার মাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে বুদ্ধি চর্চার উপর জোর দিয়েছি। দ্বিতীয় বিষয়বস্তু হলো শিক্ষা তথা বুদ্ধিবৃদ্ধি অর্জনের পদ্ধতি। যে কোন সত্যই হল জ্ঞান। প্রশিক্ষণ একটি নিয়ম সংক্রান্ত ব্যাপার। মনকে সত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রায়াগিক দিক নয় এটি। এক্ষেত্রে পৌঁছানোর পরে অনেক অনেক বই পড়া অনেক বিষয় জানার অনেক কিছু গবেষণাও করার, ক্লাস লেকচারে উপস্থিত থাকা এগুলো সবই অপর্যাপ্ত ও অপরিমেয় বটে। যে কোন বা কোন একজন লোক সবগুলোর স্বাদ-স্পর্শ পেতে পারে তবে তাকে অবশ্যই জ্ঞানের দরজায় কড়া নাড়তে হবেই। মাঝে মাঝে নিজের মুখে বলা কথাও আত্মসত্তা নাও বুূঝতে পারে।
মনের চোখে উপস্থিত যে আলোকে ঝলকানি দেখা দেয় প্রত্যক্ষ হয়ে থাকলেও উপস্থিতিকে নাও বুঝতে পারে, বিশেষ কোন বিষয়ে উপলব্ধি নাও থাকতে পারে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এটা বলা যায় যে, নিজের সম্পর্কে জানার বা আত্মবিশ্লেষণের সামর্থ বা যোগ্যতা কোনটাই তার নেই। বেশির ভাগই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝে না সত্য=পূর্ণিমা, মিথ্যা=অমাবশ্যা, তাহলে এই পূর্ণিমা ও অমাবশ্যাকে আলাদা করার ক্ষেত্রেও অনেকে ব্যর্থতার পুষ্পমাল্য বরণ করে থাকে। শাব্দিক অর্থগতভাবে বলা যায় যে, ধারণা গঠনের বিন্দুমাত্র ক্ষমতার লেশ এদের মাঝে প্রকাশিত হয় না। মননশীলতার বৈজ্ঞানিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক ফলাফলকে এটি দ্বারা স্পষ্ট করা যেতে পারে মূলত স্রোতস্বিনী নদীর প্রবাহের মতোই। বিচারের জন্য গুণ বা যোগ্যতার ক্ষেত্রপটভূমি এটি বা যোগ্যতা আর সুপরিষ্কার দৃষ্টিও বলা যায় এসব কিছু সহজাত অর্জনের ব্যাপার তো মোটেও নয়।
দেহদৃষ্টি আর উপলব্ধির ইন্দ্রিয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়, মানসিক দৃষ্টি সত্যকে দেখার স্বভাব ও নিয়মই সত্যদৃষ্টি। এই নিয়মানুবর্তিতার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বুদ্ধিবৃত্তি বিশেষ নিয়মানুবর্তিতা দ্বারা তৈরি হয় না। এ নিয়মে বুদ্ধিবৃত্তি ও নিয়মতান্ত্রিকতা লাভ করে যা যথার্থ বস্তুকে ও সর্বোচ্চ সংস্কৃতিকে বুঝতে সহযোগিতা করে থাকে আকাশে মেঘ বিদ্যুৎ শব্দ আলোর খেলার মতোই। আর এটাই হল লিবারাল এডুকেশন বা উদার শিক্ষা এবং এমন কেউ নেই যার মধ্যে এটি প্রয়োগ করে প্রবেশ অধিকার দেয়া হয় যে তার প্রতিভা হবে আদর্শ বুদ্ধিবৃত্তির নকশা, সীমারেখার চতুর্ভূজ। তবুও মনন লোক কমই আছে যারা প্রকৃত প্রশিক্ষণ সম্পর্কে ধারণা রাখে। সঠিক আদর্শ তন্ত্রমন্ত্র তৈরি করা এবং তা অনুসারে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও ছাত্র-ছাত্রীদের যোগ্যতা অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য।
উপকারী বলতে শুধু স্বাভাবিক মানদণ্ডে ভালো তাকেই বোঝায় না বরং যা ভালোর দিকে ধাবিত হচ্ছে বা ধাবিত হবে বা যা ভালোর সহায়ক তাকেই বোঝানো হয়। ভালো শুধু ভালোরই সীমারেখা নয়, ভালোর বিস্তৃত সীমারেখায় পুনরায় জন্ম নেয় এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এটিই অন্যতম বৈশিষ্ট্য যা কিনা ধ্র“বতারার মতো। নিজের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা নয়, সুন্দর ও কাক্সিক্ষত নয়, কেবল নিজের জন্য বরং তা ছাপিয়ে যায় যা বিস্তার লাভ করে বা তার গুণাবলী সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদনমুখী জিনিসটাকেই ভালো জিনিস বলা যায়। শুধুমাত্র চোখের নেশা ভালো লাগা মোহ বিশেষ নয়। এটি এমন হয় যে রুটির জন্য ভালো মোহজালে এটা শুধু আকৃষ্ট করে না বরং নিজেকে যোগ্যমুখী করে তোলে নিজের সাথেই। আমাদের এই দ্বৈত জায়গা হল প্রশংসা ও ভালোবাসার জায়গা। পরবর্তী জায়গার জন্য নির্ধারিত যে শব্দদ্বয় নির্দিষ্ট সেগুলোর একটি হল আকাক্সক্ষা অপরটি হল কৃতজ্ঞতা। একটি বড় রকমের বিস্তৃত ভালো আর অপরটি ভালোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুতরাং বলা যেতে পারে যে, উৎকৃষ্ট উপাদান হলো বুদ্ধিবৃত্তি যা কেবলমাত্র সুন্দরই নয় বরং এটা উপকারী বিশেষত প্রফেসর ও তাদের আশেপাশের বৃত্তাবর্তীয় লোকদের জন্যও বটে। বাণিজ্যিক অর্থে বা নিচু কোন অর্থে এর উপকার মানদণ্ড বিচার করা নিছক বোকামীর শেষ স্তরে পড়বে এবং ভালোর বিনাশ কারক হিসেবে কিংবা একটি আশীর্বাদ প্রার্থনারূপে উপহার শক্তি বা সম্পদ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে; অর্জনকারীদের ক্ষেত্রেও পরে তার মাধ্যমে অন্যান্য সকলের মাঝে যায়। তাই আমাদের বিশ্লেষণে লিবারাল এডুকেশনের মানদণ্ড ও সমীকরণে ভালোত্ব লাভ করলে এটা সংগত কারণেই সৌন্দর্য সীমারেখা স্পর্শ করে।
আমার মতাদর্শে বুদ্ধিভিত্তিক সংস্কৃতির সামানায় উপযোগিতার বিষয়টির অতীব জরুরী। এই নিয়মানুসারে আমরা যে বিষয়টি এড়িয়ে যাবার উপক্রম সেটা হল, ভালোকে ভালো বলার পূর্বে নির্দিষ্ট করে দেখানো বা দেখে নেওয়ার বিষয়টি। দেহ যেমন অন্য হাতের নিকট বা পরিশ্রমের জন্য কোরবানী হয়ে যেতে পারে। ঠিক সরলরেখার সমবৃত্তীয়ভাবে চাকুরীর ক্ষেত্রে শিক্ষার একই বেহাল অবস্থা দাঁড়ায় ও দাঁড়াবে আমার মতান্তরে এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক বিলাস নয় মোটেও। আবার দেহের যেমন কোন কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অসংলগ্নভাবে বিকশিত ও ব্যবহৃত হতে পারে বা বাড়তে পারে স্মৃতি বা কল্পনা বা যুক্তির তৈরির বৃত্তীয় যুক্তির ক্ষমতায়ন এর বৈষয়িক দিক নির্দেশনার আলোচ্য বিষয়টি। স্বাস্থ্যকে পরিশ্রমের পূর্ব শর্ত বলা বাঞ্ছনীয় বটে। একজন স্বাস্থ্যবান লোকের দ্বারা তাই করার সম্ভব যা একজন দুর্বল লোকের দ্বারা পূর্ণরূপে অসম্ভব। স্বাস্থ্যের যৌগিকতার মৌলিক রূপান্তর হল শক্তির মিশ্রণে প্রাণচাঞ্চল্যতা আনন্দের ফোয়ারা বাহন কর্মস্পৃহার নিয়ম, হাতে দক্ষতার বিনির্মাণ ও ক্লান্ত হলেও নিজেকে মানিয়ে নেবার প্রবণতা। তাই একইভাবে মনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য প্রফেশনাল ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের শ্রেষ্ঠ সহায়ক ও শিক্ষিত লোক তা করতে পারে যা অশিক্ষিত লোক করতে পারেনা। যে ব্যক্তিবর্গরা যুক্তি-চিন্তার আলোকে বিচার করেন তুলনা এবং পার্থক্যে পারদর্শী তারা আইনজ্ঞ, চিকিৎসক, বক্তা, রাজনীতিবিদ, জমিদার, সৈনিক ভূতত্তবিদ হতে যতটা না আগ্রহী তার চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তির তথা বুদ্ধির প্রয়োগের দ্বারা যথার্থ কাজটি চেয়ে নিতে বা বেছে নিতে সক্ষম হয়। সে সমস্ত ব্যক্তি তাদের প্রতিভার সাথে সামঞ্জস্যতার সমীকরণের নির্ভুলতার মাধ্যমেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এক্ষেত্রে মানসিক প্রকৃতি বা বিন্যাস অতীব জরুরি। সুতরাং, আমি যদি আপনাদের সামনে প্রফেশনাল অথবা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অপর্যাপ্ততার কথা আলোচনা করি তাহলে আমাকে বিশেষ বিশেষ শিক্ষার প্রতি বা শিল্পের প্রতি উদাসীন ভাবার কারণ নেই। আমার মতে এটাই যে এই নয়, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় আইন অথবা ওষধ বিজ্ঞান শিক্ষার অংশ নয় বা শিক্ষা দেয় না। বিশ্ববিদ্যালয় সকল বিষয়ে জ্ঞান দান করে কারণ সেখানে সকল বিষয় পড়ানো হয়ে থাকে। আমরা এখন বলতে দ্বিধা নেই যে, একজন আইনের শিক্ষক আরেকজন ফার্মেসীর শিক্ষক আর আরেকজন প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকের মধ্যে পার্থক্য থাকেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ও বাহিরে তা প্রদর্শনীয়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে গিয়ে স্ববিষয়ে (একটি নির্ধারিত বিষয়ে) বিশেষভাবে একক গুরুত্ব আরোপ করবে। কিন্তু পক্ষান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময়ে তাকে অনেক বেশি ও যথার্থ বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে, যখন সে সকল বিষয় পড়ে তখন তাকে মুক্তমনের মুক্তমননের মুক্তচেতনার অধিকারী হতে হয়। নিজের বিষয়টিকেও তিনি লিবারেল এডুকেশন পর্যায়ে ফেলেন।
জন লক বলেছেন, যে শিক্ষা আমাদের প্রাথমিক জ্ঞান কিছু যান্ত্রিক শিল্প ধারণা ও কিছু বস্তুবাদী বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয় না তা উপকারী নয়। আমি মনে করি বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার মাধ্যমেই সকল কাজেই শক্তি সাফল্য ও সৌভাগ্য মেলে। সমাজের কাছে কিছু কাজের জন্য এবং সর্বোপরি জগতের প্রতি কাজের জন্য আমরা দায়বদ্ধ। দার্শনিক ও লিবারাল শিক্ষা প্রণয়নই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ। যদি প্রফেশনাল দিকটি এটি উপেক্ষা করে তবে সকল নাগরিক গঠনে তা বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমার এখন বলার ইচ্ছে হল এই যে, বুদ্ধিবৃত্তি প্রশিক্ষণের বিষয়টি প্রতিটি সমাজসচেতন নাগরিক ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য মননশীলতা তৈরি করে দেয়। দার্শনিক ও পার্থিক লোকদের চিন্তাধর্ম ও চিন্তামুখীনতার মতভেদ ও মতপার্থক্য রয়েছে কেননা এদের চিন্তাধারা দুই রকম। চিন্তাধারায় মতপার্থক্য থাকতেও মতামত তৈরির প্রক্রিয়াতে সদৃশ্যপূর্ণতা দেখা যায় সাদা আকাশের মতোই। চিন্তামূলক বিষয়ের উপর একজন দার্শনিক এর যতটা প্রাধান্য আছে ঠিক ততটাই ভদ্রলোকের ব্যবসা ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই। সুতরাং বাস্তবসম্মত কিছু যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মাঝে সংযুক্ত করা যায় তাহলে নির্দ্বিধায় তা সমাজ সচেতন সুনাগরিক গঠনে সহায়তা করবেই শতভাগ সত্য। এটি হল সামাজিক জীবন সুন্দরভাবে গঠনের প্রক্রিয়া বা উপায় ও শিল্প সফল পদ্ধতি এবং ফলাফলটা হল সময়ের সাথে মানুষকে খাপ খাওয়ানোর সংযোজক সরলরেখা। এটি বিশেষ কোন পেশা নয় কিংবা মহানায়ক সুলভ কিছুর জন্মদানের মাতৃত্ব নয়। প্রতিভাবানদের কাজ মূলত কোন শিল্পের ছায়া বা আদলে নয়। মহানায়ক সুলভ যেমন মানুষেরা নিয়ম-শৃঙ্খলার মাঝে আবদ্ধ থাকলে চলে না বা চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয় যেমন অমর কবি লেখক তৈরির কারখানা নয়। কোন নেতা স্কুলের বা আদর্শের প্রতিষ্ঠাতা অথবা জাতীয় বিজেতা তৈরির স্থানও নয়। এরিস্টটল, নিউটন নেপোলিয়ন বা ওয়াশিংটন বা শেক্সপিয়রের মতো প্রতিভার জন্মদান প্রতিশ্র“তি যেমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারে না বা গড়েও ওঠে নি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এমন প্রতিভা তৈরি বা জন্ম নিতে পারেই।
আবার সমালোচক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয় যদিও এসব গুণ অর্জনের সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুটা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ সাধারণভাবে অতি সাধারণ অথচ উন্নতমানের মানুষ তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে শিক্ষার লক্ষ্যটা হয় সমাজের বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তা ও তার প্রয়োগ এর বিকাশ ঘটানোর আয়োজন। অন্য উদ্দেশ্য হল মানবমনের চর্চা বা সাধনা তথা মনোসাধনা জাতীয় চেতনার পরিশুদ্ধকরণ উৎসাহ বৃদ্ধি করে অগ্রসরতা সমকালীন, সম্প্রসারণ ও মার্জিতকরণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ, ব্যক্তিগত জীবনালেখ্য আলোচনা, বাকশক্তির পরিশুদ্ধতা অর্জন করা। এটি সেই শিক্ষা যা মানুষকে তার মতামত ও বিচার শক্তি সম্পর্কে সচেতন করে এবং বস্তুত বাস্তবতা শেখায়। এটি যুক্তির আদলে চিন্তাশক্তি বাড়ায়।
আধুনিক বস্তুকে বের করতে ও অবান্তর জিনিসকে ত্যাগ করতে শেখানোই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য। এ শিক্ষা যোগ্যতার সাথে কোন পদ বা পদাধিকার ধরে রাখতে শেখায় আর কোন বিষয় যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে সহায়তা করে। এ শিক্ষা নিজেকে অভিযোজন উপযোগী করে তোলে। অন্যকে প্রভাবিত করতে সহায়তা করে। অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে ও তার মানসিকতাকে মেনে নিতে শেখায়। অন্যের হাত ধরে চলতে শেখায়। এরূপ হয়ে ওঠার পর একজন ব্যক্তি যেকোন সমাজের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শেখায়।
সকল শ্রেণীর সাথে তার অনেক সাদৃশ্য থাকে। কখন কথা বলা প্রয়োজন আর কখন নিশ্চুপ থাকা প্রয়োজন এই শিক্ষায় থেকে তা শেখা যায় অনায়াসে রাতের নিদ্রাকালীন সময়ের মতোই সহজভাবে। সেই কথা, শোনা ও প্রশ্ন তৈরির যোগ হল বুদ্ধির দীপশিখা ও পারদর্শিতা। এইরূপ শিক্ষা এমন একজন প্রকৃত বন্ধুর কাজ যা সর্বদা নির্ভরযোগ্য। কখন সচেতন, কখন হাস্যময়ী, লাস্যময়ী আর কখন কি তা তার জানা বটে। তার যোগ্যতার পাত্রে ভরপুর সুন্দর ভঙ্গিমায় সামান্য কিছুকে Represent করা আর কাজের মাঝের অবগানের গবহঃধষ Mental Satisfaction। অপূর্ব উপহার হলো সামান্য সাহায্য করা ও ক্লান্তিতে সাহায্য করা সৌভাগ্যের চাবিকাঠি এটি। সম্পদের শিল্প, স্বাস্থ্য শিল্প, মনুষ্যত্ব শিল্প, অনুসরণ, অনুকরণ, দৃশ্যমানতা, নিশ্চিন্তকরণ শিল্প সব মিলিয়ে ত্রিমাত্রিক স্থানাঙ্ক রেখা বেঁচে থাকা, জীবন যাপন ও জীবন ধারণের শিল্পকলা।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা