মোস্তফা তারিকুল আহসান’র অনুবাদ

পাবলো নেরুদা এবং একজন স্বপ্নবাজ রমণীর গল্প
গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ*

একদিন সকাল ন’টার সময় আমরা হাভেনা রিভেরা হোটেলের টেরেসে বসে নাস্তা করছিলাম: সূর্য বেশ তাপ ছড়াচ্ছিল আর প্রচণ্ড বেগে সাগরের ঢেউ এভিনিউয়ের গাড়িগুলোকে সমুদ্র-বাঁধের দিকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে গেল। হোটেলের সামনে বা অন্যত্র পার্ক করা গাড়িগুলোরও একই হাল হলো। এটাকে প্রচণ্ড শক্তির ডিনামাইটের বিস্ফোরণ বলা যায়। প্রচণ্ড জলের তোড় আর বাতাস বিশটি ফ্লোরের লোকদের মনে রীতিমত আতঙ্ক সৃষ্টি হলো। লবি থেকে অনেক পর্যটক চেয়ারশুদ্ধ বাতাসে ছিটকে পড়লো আর শিলাবৃষ্টির দাপটে কাঁচ ভেঙ্গে অনেকে রক্তাক্ত হলো। জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব সত্যি ভয়াবহ, সমুদ্র-বাঁধ ও হোটেলের মাঝে সমস্ত জনপদ মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেল।
দমকল বাহিনীর সহায়তায় উৎফুল্ল কিউবান স্বেচ্ছাসেবকরা ছয় ঘন্টার মধ্যে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলল এবং হোটেল থেকে সাগরে যাবার গেট বন্ধ করে দিল। অন্য একটি গেট চালু করলো এবং সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এল বেশ দ্রুত। সেই সকালে দেয়ালের সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে থাকা গাড়িটি নিয়ে কেউ চিন্তিত হয় নি। কারণ সবাই ভেবেছিলো এটাও মেঝেতে পার্ক করা গাড়িগুলোর একটি। কিন্তু ক্রেন দিয়ে গাড়িটির অংশগুলো খুলে ফেললে সিট বেল্ট বাঁধা একজন মহিলাকে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে দেখা গেল। ঢেউ আর বাতাসের আঘাত ছিল নিষ্ঠুর কসাইয়ের মতোতার সব হাড়গুলো মাংস থেকে আলাদা করে ফেলেছিলো। তার মুখ বিধ্বস্ত, গোড়ালি বিচ্ছিন্ন আর পোশাক-আশাক শতচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। পান্না খচিত একটি স্বর্ণের সর্পাকৃতি আংটি ছিলো তার হাতে। পুলিশ দাবী করছিলো ভদ্রমহিলা নবনিযুক্ত পর্তুগীজ রাষ্ট্রদূতের গৃহকর্ত্রী এবং স্ত্রী। সে সপ্তাহ দুই আগে হাভানায় এসেছিলো আর আজ সকালে নতুন একটি গাড়ি চালিয়ে বাজারে যাচ্ছিলো। সংবাদপত্রে তার নাম পড়ে দৃশ্যত আমার কিছু মনে হয় নি। তবে পান্না আর সাপের আকৃতির আংটি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিলো। যাহোক, আমি ঠিক ঠাহর করতে পারি নি কোন আঙুলে সে আংটিটি পরেছিলো।
এটা ছিলো একটি মর্মান্তিক খবর। কারণ আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম এই ভেবে যে, এ সেই বিখ্যাত মহিলা কিনা, যাকে কেউ ভুলতে পারে না। আর যার প্রকৃত নাম আমরা কেউ জানতাম না। সেই মহিলাও এই রকম আংটি পরতেন হাতের তর্জনীতে। সেই সময় কোনো মহিলাই ঐ আঙুলে আংটি পরতো না। চৌত্রিশ বছর আগে ভিয়েনায় তার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো, একটি ল্যাটিন আমেরিকান সরাইখানায়, সে সজ দিয়ে সিদ্ধ পটল খাচ্ছিলো, আর মাঝে মাঝে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছিলো। আশেপাশে ল্যাটিন আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রীরা বসেছিলো। আমি সেই দিন সকালে রোম থেকে মাত্র এসেছি। আমি এখনো বন্ধুবান্ধব নিয়ে তার শোরগোলের কথা স্মরণ করতে পারি; শেয়ালের লেজের মতো পড়ে থাকা কোর্টের কলার, সাপের আকৃতির মিশরীয় আংটি। সে বিরতিহীনভাবে তীক্ষè উচ্চারণে ভুলেভালে স্পানিশে কথা বলছিলো আর আমার মনে হয়েছিলো এই দীর্ঘ কাঠের টেবিলে সে একমাত্র অস্ট্রিয়ান। কিন্তু, আমার অনুমান ছিলো ভুল; সে জন্মেছিলো কলম্বিয়ায়। অস্ট্রিয়ায় এসেছিলো যুদ্ধের মধ্যে গান ও আবৃত্তি বিষয়ে লেখাপড়া করতে, তখন সে প্রায় কিশোরী। এখন তার বয়স ত্রিশ এবং সে শরীরের দিকে খুব মনোযোগী ছিলো না। আর সে কখনোই সুন্দরী ছিলো না। ফলে বয়স হবার আগেই বুড়িয়ে গিয়েছিলো। তবে সে ছিলো চমৎকার, মানবিক আবেদনময়ী রমণী এবং অবশ্যই সম্ভ্রম জাগাতে সক্ষম।
ভিয়েনা এখনো রাজকীয় শহর। ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই শহরটি চোরাকারবারী ও গুপ্তচরদের স্বর্গে পরিণত হয়েছিলো। আমার স্বদেশী এই ফেরারী বন্ধুর জন্য এর চাইতে নিরাপদ জায়গা আমি কল্পনা করতে পারি না। সে এখনো তার নিজস্ব পরিচিতি লুকিয়ে সরাইখানার এক কোণে খেয়ে চলে। তার টেবিলের সবার জন্য সে খাবারের অর্ডার দেয়। অর্থাৎ সে রকম যথেষ্ট টাকা তার আছে। সে কখনো তার প্রকৃত নাম বলতো না। আমরা তাকে চিনতাম তার জার্মানী মিশ্রিত উচ্চারণ শুনে। ল্যাটিন আমেরিকার সব ছাত্ররা মিলে আমরা তার একটি নাম ঠিক করলাম: ফারাও ফেরিডা। আমি তাকে একদিন প্রগলভ হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কুইনডিওর ঝড়ো আবহাওয়া থেকে এতদূরে এই ভিন্ন জগতে সে কিভাবে এসেছিল। সে বিরস বদনে বলেছিল:
‘আমি আমার স্বপ্ন বিক্রি করি’।
সত্যিকার অর্থে এটাই ছিলো তার একমাত্র জীবিকা। তার জন্ম পুরনো ক্লাডাসে। বাবা ছিলেন বেশ ধনী দোকানী। এগারো ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিলো তৃতীয়। কথা বলতে শেখার পর পরই সে তাদের পরিবারের একটি রেওয়াজ তৈরি করেছিলো। প্রতিদিন নাস্তার আগে সে সবাইকে স্বপ্ন শোনাত। এ সময় বাচ্চাদের কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখার সময়। তার বয়স যখন সাত বছর, স্বেপ্ন দেখল তার একটি ভাই বন্যার তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। ওদের মা ছেলেকে আর সাঁতার কাটতে দিতো না। ব্যাপারটি ধর্মীয় কুসংস্কারের মতো। তবে, ফারাও ফেরিডা তার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত প্রচার করতেই থাকলো।
‘এই স্বপ্নের অর্থ কী’? ফারাও উত্তর দিল: ‘এর অর্থ এই নয় যে সে পানিতে ডুবতে যাচ্ছে, তবে তার মিষ্টি খাওয়া উচিত নয়।’
তার এই স্বপ্ন-ব্যাখ্যার প্রতিক্রিয়া পাঁচ বছরের ছেলেটির জীবনে মহাসমস্যা দেখা দিল। বিশেষত, ছুটির দিনেও তাকে বাইরে যেতে দিত না ওর মা। মেয়ের স্বপ্ন-ব্যাখ্যায় মা রীতিমত বিশ্বাসী ছিলেন। কঠোর হাতে ছেলেকে শাসন করতে শুরু করলেন। কিন্তু একদিন প্রথম অসতর্ক মুহূর্তে ছেলেটি একা চুপিচুপি বিষাক্ত মিঠাই খেলে ফেলল, তার শ্বাসরোধ হয়ে গেল, তাকে বাঁচানোর কোনো পথই খোলা থাকলো না।
ভিয়েনায় শীতের এক ভয়ঙ্কর সন্ধ্যায় সে প্রথম মনে করেছিলো স্বপ্ন বিক্রি করেই তাকে বেঁচে থাকতে হবে। এর আগে ফারাও কখনো তার স্বপ্ন নিয়ে এরকম ভাবে নি। সে-সময় সে কাজের সন্ধানে একটি বাড়িতে যায়। সেই বাড়িতে সে থাকতে চাইত। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল, সে কি করতে পারে? সে সত্যি করে বলেছিলো, ‘আমি স্বপ্ন দেখি’। তাকে শুধুমাত্র গৃহকত্রীকে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিলো। তাকে নির্দিষ্ট বেতনে ঐ বাড়িতে রাখা হল, বেতনের টাকা দিয়ে তার ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো মিটতো। তবে, তাকে সুন্দর একটি ঘর দেয়া হলো। তিন বেলা খাবার দেয়া হতো। বিশেষ ধরনের নাস্তা দিতো তাকে। নাস্তার সময় পরিবারের সবাই বসতো তাদের আশু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে; অর্থলগ্নীকারী বাবা, রোমান্টিক গান-পাগল আনন্দময়ী মা, নয় ও এগারো বছরের দু’জন শিশু। তারা সবাই ছিলো ধার্মিক, কাজেই তাদের মধ্যে বেশ কুসংস্কার ছিলো এবং তারা ফারাও ফেরিডাকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলো। ফেরিডার একমাত্র কাজ ছিলো তাদের দেখা স্বপ্নের অর্থ উদঘাটন করে তাদের ভাগ্য সম্পর্কে মন্তব্য করা।
তার দিন ভালোই যাচ্ছিলো। দীর্ঘদিন যাবৎ অর্থাৎ যুদ্ধের সময় পর্যন্ত। তবে যুদ্ধের সময় বাস্তবতা দুঃস্বপ্নের চেয়ে কুৎসিত হয়ে উঠলো। প্রতিদিন প্রাতঃরাশের টেবিলে সে বলতো প্রত্যেকের সেই দিন কি করা উচিত, কিভাবে করা উচিত। তার ভবিষ্যৎ বাণী পরিবারের সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠলো। পরিবারের সবচেয়ে দুঃখজনক খবরটি তার মুখ দিয়েই উচ্চারিত হলো। পরিবারের কর্তা মারা গেলেন। আমি সে সময় ভিয়েনায় ছিলাম। তাকে পরিবারের উত্তরাধিকারী করা হলো একটি মাত্র শর্তেযতদিন তার স্বপ্ন দেখা শেষ না হয়, সে পরিবারের জন্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে যাবে।
আমি ভিয়েনায় ছিলাম এক মাস। আমি আসলে অন্য ছাত্রছাত্রীদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর অপেক্ষা করছিলাম টাকার জন্য। দুঃখজনক হলো সে টাকা কখনোই আসে নি। আমাদের এই দরিদ্র-জর্জর সরাইখানায় হঠাৎ করেই ফারাও ফেরিডা হাজির হতো। ব্যাপারটা বেশ অপ্রত্যাশিত আর আমাদের কাছে ছিলো চরম পাওয়া। বিয়ারে উন্মত্ত এক রাতে সে আমার কানে ফিস ফিস করে একটা রায় শোনাল;
‘আমি শুধু তোমাকে বলতে এসেছি, কাল রাতে আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি, তুমি অবশ্যই ভিয়েনা ছেড়ে যাবে আর পাঁচ বছরের মধ্যে ফিরে আসবে না’।
তার এই স্বপ্ন-রায় এত সত্যি ছিলো যে সেই রাতের শেষ ট্রেনে আমি ভিয়েনা ছেড়ে রোমের উদ্দেশ্যে রওনা হই। তার এই কথায় আমি খুব প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলাম। এ রকম অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয় নি। আমি মনে করতাম আমি তার ক্ষমতার অন্যতম একজন সাক্ষী। আমি আজো ভিয়েনায় ফিরে যাই নি।
হাভানাতে ধ্বংসযজ্ঞ হবার আগে তাকে আমি দেখেছিলাম বার্সিলোনাতে, আকস্মিকভাবে। আমার কাছে ব্যাপারটা ছিলো দুঃখজনক। এটা ছিলো সেই দিন যেদিন গৃহযুদ্ধের পর পাবলো নেরুদা স্পেনের মাটিতে পা রেখেছিলেন। ডোলপারাইসো যাবার পথে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার মাঝখানে তিনি একটু বিরতি দিয়েছিলেন এখানে। আমরা তার সাথে একটি সকাল কাটালাম। তিনি পুরনো বইয়ের দোকানে বই খোঁজার খেলায় মেতে রইলেন। পোর্টারে এসে তিনি জীর্ণ, বাঁধাই-খোলা একটা বই কিনলেন। বইটির মূল্য বাবদ যে টাকা দিলেন সেটা তার রেঙ্গুন কনসুলেটের দু’মাসের বেতনের সমান। তিনি জনগণের ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হাতির মতো হাঁটতে শুরু করলেন শিশুর মতো উদ্দীপনা চোখে নিয়ে। প্রতিটি জিনিসের ভিতরের কারুকাজ তিনি দেখতে লাগলেন। কারণ, তার কাছে পৃথিবীটা এক আশ্চর্যজনক খেলনা আর এইসব খেলনা দিয়েই জীবনকে আবিষ্কার করতে হয়।
আমি রেনেসাঁর আলোকে উদ্দীপ্ত কোনো মানুষকে কখনো চিনতাম না। নেরুদাকে চিনলাম। তিনি ছিলেন ভোজনবিলাসী এবং তার ছিলো প্রচণ্ড হজম ক্ষমতা। এমনকি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তিনি টেবিলে বসে পড়তেন এবং খাওয়ায় সবাইকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতেন। তার স্ত্রী মাতিলদে তার গলার চারপাশে মোটা কাপড় বেঁধে রাখতেন। কাপড়ের অবস্থা দেখে মনে হবে সেটা খাবার ঘরের কোন বস্তু নয় বরং তা সেলুন থেকে আনা হয়েছে। তবে এটাই ছিলো মাতিলদার পক্ষে একমাত্র উপায়, না হলে নেরুদার সসে গোসল হয়ে যেত। সেইদিন কালডালেরাসেও নেরুদা কোনো ব্যতিক্রম করলেন না। তিনি তিনটি বড় বড় সামুদ্রিক চিংড়ি খেয়ে ফেললেন এবং সার্জনের মতো নিখুঁতভাবে চিংড়িগুলোকে টুকরো টুকরো করলেন। সবার প্লেটের দিকে তীক্ষè চোখে তাকান আর গোগ্রাসে গিলতে থাকেন, কার প্লেটে কি আছে চেখে দেখেন, সংক্রমণের কথা তার মাথায় থাকে না; গ্যালাসিয়ার জলচর প্রাণী, কান্টাব্রিয়ার ঝিনুক, অ্যালিকেন্টির চিংড়ি তিনি খেতে শুরু করেন। ফরাসীদের মতো তিনি মুখে কোনো কথা বলেন না, শুধু উপাদেয় খাবার খেতে থাকেন। এবং তিনি প্রাগৈতিহাসিক স্বার্থপর চিলিদের মতো স্বভাব অন্তরে ধারণ করতেন। হঠাৎ তিনি খাওয়া বন্ধ করলেন, এবং তার চিংড়ির পা ধরে টান দিলেন। আমাকে মৃদুস্বরে বললেন, ‘কেউ একজন আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এবং সে তাকানো বন্ধ করছে না।’
আমি তার ঘাড়ের ওপর দিকে তাকালাম। ঘটনা সত্যি। তিন টেবিল পেছনে একজন সাহসী মহিলা পুরনো-ফ্যাশনের পশমের হ্যাট, রক্তবর্ণের স্কার্ফ পরে খাচ্ছেন, খাচ্ছেন তবে খুব ধীরে এবং নেরুদার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি তাকে সহজেই চিনে ফেললাম। তাকে বেশ বয়সী মনে হলো এবং শরীরে চর্বি জমেছে অনেক। তবে সেই ফারাও ফেরিডা। তার তর্জনীতে সর্পাকৃতির আংটি। নেরুদা ও তার স্ত্রীর জাহাজেই সে নেপল্স থেকে আসছিলো। তবে, তারা কেউ কাউকে দেখতে পায় নি। আমি তাকে আমাদের টেবিলে এক কাপ কফি খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করলাম, এবং আমি তাকে কবির সামনে তার স্বপ্ন বিষয়ে কথা বলার জন্য অনুরোধ করলাম। আমি মনে করেছিলাম নেরুদা এ বিষয়ে শুনে বিস্মিত হবেন। তবে, তিনি এ বিষয়ে মনোযোগ দিলেন না। তিনি প্রথম থেকে বলে এসেছেন এরকম স্বপ্ন বা দৈব্য ব্যাপার-স্যাপারে তার কোনো বিশ্বাস নেই।
‘শুধুমাত্র কবিতারই আছে অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা’ তিনি ঘোষণা করলেন।
দুপুরের খাবার শেষে ফারাও ফেরিডা পায়চারি করতে থাকেন আমি তার পিছনে হাঁটতে শুরু করলাম। আমি মনে করেছিলাম, আমাদের পুরনো স্মৃতি একটু ঝালিয়ে নেয়া দরকার। এবং অবশ্যই আমাদের কথা কেউ শুনবে না। সে বললো, সে পর্তুগালের অপেরেটো থেকে অবসর নিয়েছে। অস্ট্রিয়ার সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। সে বাস করতো পাহাড়ের ওপারে একটি ক্যাসেলে, আর সেখান থেকে যে কেউ সাগরের ওপারে আমেরিকা দেখতে পেত। যদিও সে সরাসরি অনেক কথাই বললো না, তবে কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, স্বপ্নের পর স্বপ্ন দিয়ে সে তার ভিয়েনার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের থেকে অঢেল সম্পদ পেয়েছিলো। এটা অবশ্য আমার কাছে তেমন আশ্চর্যের কিছু মনে হয় নি। কারণ আমার কাছে মনে হতো স্বপ্ন আসলে তাঁর বেঁচে থাকার কৌশল ছাড়া কিছু নয়। এবং আমি তাকে সেরকমই বলেছিলাম।
সে অপ্রতিরোধ্যভাবে হেসে উঠলো। এবং বললো, ‘তুমি আগের মতোই পাঁজি রয়ে গেছ’। সে আর কোনো কথা বললো না। তখন দলের সবাই নেরুদার জন্য অপেক্ষা শেষ করে ফেলেছে। কারণ নেরুদা তখন তোতা পাখিদের সাথে চিলিয়ান স্ল্যাং-এ কথা বলা শেষ করেছেন। আমরা আবার সংলাপ শুরু করলাম। তবে ফারাও ফেরিডা অন্য বিষয়ে কথা বলা শুরু করলো।
সে বললো, ‘ভালো কথা, তুমি এখন ভিয়েনায় ফিরে যেতে পার’। তখনই আমার মনে হলো আমাদের পরিচয়ের তের বছর পার হয়ে গেছে।
আমি বললাম, ‘তোমার স্বপ্ন যদি মিথ্যেও হয় তবু আমি ফিরে যাবো না’।
দুপুর তিনটায় নেরুদার পবিত্র দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার সময় সেখানে উপস্থিত হতে আমি তাকে ছেড়ে এলাম। বিশাল আর প্রগাঢ় প্রস্তুতি নিয়ে তিনি আমাদের ঘরে নিদ্রায় গেলেন। জাপানের চা-পর্বের উৎসব স্মরণ করলেন। তার এই নিদ্রার জন্য বিচিত্র ব্যবস্থা করতে হলো। কয়েকটা জানালা খোলা এবং বাকীগুলো বন্ধ থাকলো, যাতে করে সঠিক মাত্রায় তাপমাত্রা ঘরে থাকে। বিভিন্ন কোণ থেকে বিশেষ ধরনের আলো ঢোকানোর ব্যবস্থা হলো এবং প্রশান্ত নীরবতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলো। নেরুদা ভালোভাবেই ঘুমিয়ে পড়লেন। আমরা অবশ্য এরকম আশা করিনি। তাকে বসার ঘরের পাওয়া গেল বেশ ফুরফুরে মেজাজে, তবে বালিশের তুলা তার ঘাড়ে লেপ্টে থাকলো।
তিনি বললেন, ‘আমি সেই মহিলাকে স্বপ্নে দেখলাম, যে স্বপ্ন দেখে’।
মাতিলদা তার কাছে স্বপ্নটি শুনতে চাইলেন। তিনি বললেন, আমি স্বপ্ন দেখলাম সে আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে’।
আমি বললাম, ব্যাপারটা বিশ্বাস করা শক্ত।
তিনি আমার দিকে নিরাশ দৃষ্টিতে তাকালেন।
‘তিনি কি এটা ইতোমধ্যেই লিখে ফেলেছেন- কে একজন বললো।
আমি বললাম, এখনও না লিখলেও, কোন সময়ে লিখে ফেলবেন। আর এটা হবে তার অন্যতম ফুলানো-ফাপানো গপ্পো’।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি জাহাজে চড়লেন। আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন, নিসঙ্গ এক টেবিলে বসে পড়লেন এবং তার সবুজ কালির কলম দিয়ে তরল কবিতা লিখতে শুরু করলেন। এই কলম দিয়ে তিনি কাউকে উৎসর্গ করা বইয়ে ফুল, মাছ ও পাখিএঁকে দিতেন। প্রথমে আমরা ফারাও ফেরিডাকে খুঁজলাম এবং তাকে টুরিস্টদের ডেকে পাওয়া গেল। সে-ও দিবানিদ্রা দিয়ে উঠেছে।
সে বললো, ‘আমি কবিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি’।
আমি থমকে উঠলাম। আমি তাকে স্বপ্নটি বলতে বললাম।
সে বললো, আমি স্বপ্ন দেখলাম তিনি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন’ আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে রেগে গেল। বললো, ‘তুমি কি আশা করেছিলে? মাঝে মাঝে আমার সব স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নের ভগ্নাংশ সত্যিকার জীবনের সাথে সম্পর্কিত থাকে না।’
আমি আর কখনো তাকে দেখি নি। তার সম্পর্কে কোনো কৌতূহলও দেখাই নি, যতদিন না পর্যন্ত সাপের মতো আংটিপরা মহিলাকে হাভানা রিভেরা ধ্বংসযজ্ঞে নিহত হওয়ার ব্যাপারটা ঘটে। এবং আমি অধৈর্য আর অস্থির হয়েছিলাম। তাই কয়েক মাস পর একটি কূটনৈতিক সংবর্ধনায় আমি পর্তুগীজ রাষ্ট্রদূতকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করে থাকতে পারি নি। রাষ্ট্রদূত তার সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ও সমীহ দেখিয়ে বলেছিলেন, কল্পনা করতে পারবেন না কী অসাধারণ ছিলেন এই মহিলা। আপনি তার সম্পর্কে একটি গল্প লিখলে আমি বাধিত হবো।’ তিনি একই সুরে তার সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন। কিন্তু ভেতরের রহস্যটা খুললেন না। সেটা বললে হয়তো আমি তার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারতাম।
আমি তাকে শেষে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘সে আসলে কি করতো’?
তিনি মোহমুগ্ধ স্বরে বললেন, কিছুই না, সে শুধু স্বপ্ন দেখতো’।

* গল্পটি মার্কেজের Strange pilgrim- গ্রন্থ থেকে অনূদিত হলো।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা