ময়ুখ চৌধুরীর লেখা

ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা

পদ্মাবর্তী
[চিহ্ন পত্রিকার উৎসবে আমন্ত্রণ-প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত]

এতো যদি রূপবতী,  মোহরের মোহে
কী করে এসেছ ফেলে তাকে আরাকানে!
এমন নির্মম প্রেমে শুকপাখি উড়ে গেছে দূরে,

এখন অসুখী পাখি বারবার উত্তরে টানে
নতুন চরের বার্তা বয়ে আনে ঘুমের কাদায়।
যদিও নিবাস
মুল¬ক ফতোয়াবাদ আলাওলদিঘির কাছেই,
পদ্মাবতী দূরে থাক, পদ্মানদী আজও দেখি নাই।

এখনও পদ্মার জলে কথা বলে মাটির কলস,
পিপাসাকাতর চক্ষু বারবার উড়ে যেতে চায়
এখনও পদ্মার ঢেউয়ে তরণী মাতাল হয়, পড়ে থাকে শঙ্খের চরায়।

এখনও আগের মতো ইলিশের আঁশে নাকি জ্বলে ওঠে রাতের আকাশ?
এখনও জলের মধ্যে ভাসে নাকি চাঁদের কুসুম?
বিপদজনক বাঁকে পলির লাবণ্যে নাকি পদ্য লেখে পাখির পালক?

উড়াল ব্রিজের আগে উড়ে যাচ্ছে দুচোখের ঘুম,
ফিরে এলে জেনে নেবো ইলিশের গায়ে কেন
মাৎসর্যের পরাজিত গোলাপী আভাস?
তারও আগে জানা দরকার-
পুণ্ড্রবর্ধনের রাজ্যে পুনর্জন্ম কে নিল আবার!

ময়ুখ চৌধুরীর বিশেষ গদ্য

লিটল-মেঘচর্চা

১.
দুঃখিত, শহীদ ইকবাল,―পারলাম না। মনোমতো দূরে থাকা, কথামতো চলনসই একটা গদ্যও দাঁড় করাতে পারলাম না। বিশ্বাস করুন, প্রতিদিন চারপাঁচ ঘণ্টা বসে থেকেছি। ছটফট করেছি কিছু একটা চিন্তা করে যেই মাত্র কলম হাতে নেই, অমনি চিন্তাটা ভেঙে যায়―এক টুকরো, দুই টুকরো, তিন টুকরো। আটদশ লাইন লেখার পর হুট করে অন্য প্রসঙ্গ চলে আসে। এই করতে করতে কয়েকটা প্রসঙ্গে জট পাকিয়ে যায়। অনেকটা, একই স্থানে রাজনীতিজীবীদের সমাবেশ পাল্টা-সমাবেশের মতো ব্যাপার। মেজাজ আরও খারাপ হয়ে যায়। আমার বিষয়ভাবনা আয়নার ভাঙা কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়া রেখার মতো―অস্পষ্ট হয়ে যায়। যে প্রসঙ্গ উল্কার মতো জ্বলে উঠেছিল, পর মুহূর্তেই তা ছাই।

২.
এই যে অপারগতা, অক্ষমতার এই জ্বালা, এই ব্যর্থতা―কবিতার জন্যে যদি হতো, আমার খারাপ লাগতো না। আমি বারবার বলতে চেয়েছি, আমি কবিতা লিখতে চাই―কবিতা। সেই ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও আমার নমস্য।―যাকে ভালোবাসি, তার কাছে পরাজয় বলে কিছু নেই।
তবু মাঝে মধ্যে অন্য কিছু বিষয়, ভিন্ন কিছু ব্যাপার উপদ্রব করে। আমার হাত ধরে টানাটানি করে। কবিতায় মনোযোগ দেব বলে, আগন্তুক বিষয়গুলোকে যথাসাধ্য সন্তুষ্ট করে বিদায় করতে চাই।

৩.
ইদানীং লক্ষ করছি, সাহিত্যমুখী নিবন্ধ লিখতে বসলেও অনাকাক্সিক্ষত কিছু বিষয় আমাকে বিরক্ত করে। ওদের লক্ষ্যই বোধ করি আমাকে চটানো। আমি বুঝি না, রাজার বাড়ির মশা তাড়াবার জন্যে জনগণকে বিব্রত করার কী মানে আছে! যার যার কাজ সে করবে; নিজের কাজ ফেলে অন্যের কাজ সে কেন করতে যাবে? সে নিজেই যখন গাইতে পারে, অন্যের গানে তবলচি হতে যাবে কেন? এইসব ন্যায্য প্রশ্ন আমাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। মাথা ঠিক রাখতে পারি না।

৪.
আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, খুব কৌশলে লেখা না দেওয়ার অজুহাত খাড়া করতে চাইছি। হয়তো তাই। এবার পাল্টা একটা প্রশ্ন করি―আমার লেখা ছেপে আপনার কী লাভ? অন্যদের দেখাদেখি রাজনীতির ডিলারশিপ নিলেই তো পারতেন, দুটো পয়সা তো আসতো। এখানে তো কেবল লোকসান, নানা রকমের লোকসান। উত্তরে আপনি সুন্দর করে হাসবেন; বলবেন―‘প্রেম, নিছক সাহিত্য প্রেম।’ কিন্তু মনে রাখবেন, লাইলিমজনু-মার্কা বিনে পয়সার প্রেমের যুগ শেষ। সাহিত্য প্রেম বলুন আর দেশপ্রেম বলুন―সব নগদ। দেবেন আর নেবেন। কর্পোরেট পুঁজিবাদের প্রতাপে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রই যেখানে দোকানদারির নামান্তর, সেখানে মনীষা আর মননশীলতার কী মূল্য! বুদ্ধিজীবীরাই যেখানে গাড়ি-বাড়ি-ক্ষমতার পেছনে ছুটছেন, সেখানে আপনি কিনা আশ্চর্যবোধক ‘চিহ্ন’-এ পড়ে আছেন।
কথাগুলো এ জন্যই বলছি, এ লাইনের পুরোনো পোড়খাওয়া মানুষ আমি। আমার সঙ্গে যারা লেখালেখি শুরু করেছিল, তাদের অনেকেই ক্রমে ক্রমে বাস্তববুদ্ধির পরিচয় দিতে পেরেছে। ফলত তাদের বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে। যার পৈতৃক ভিটে মাটিও নেই, ছেলেমেয়ের আবদার মেটাবার সামর্থ্যও নেই; সেখানে দশবারোটা কবিতার খাতা ক্ষতিপূরণ হিসেবে কতোখানি গ্রহণযোগ্যতা রাখে?

৫.
১৯৬৮ সাল। তখন কলেজে পড়ি। আমার সহপাঠী, যারা মাঝারি মানের, তারাও ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার লক্ষ্যে সায়েন্স পড়ছে। লেখালেখি করবো বলে আমি নিলাম আর্টস্। মিডিয়াম নিলাম তাও বাংলা। জাতীয়তাবাদী আবেগ আর কাকে বলে!
শেষটুকু দেখার জন্যে শুরু করে দিলাম আত্মক্ষয়। রোখ চাপলো― সাহিত্যপত্রিকা বের করবো। কয়েকজন বন্ধুও জুটে গেল। বেশ তৃপ্তির সঙ্গেই নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করলাম―মননশীল তরুণগোষ্ঠি। পত্রিকার নাম হবে ‘প্রতীতি’। এটুকু করেই মনে হয়েছিল, বিরাট কিছু করে ফেলেছি। উৎসাহ আর উদ্দীপনার তোড়ে আসল ধাক্কা সামাল দেওয়ার কথা মাথায় আসেনি।―টাকা আসবে কোত্থেকে? লেখা পাবো কী করে?―সবে মাত্র ধোঁয়া দেখছি, অগ্নিকুণ্ড দেখা তখনও বাকি।
অভিযানমূলক মনোভাব নিয়ে রাস্তায় নামলাম। দোকানের সামনে, অফিসের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম উন্নতমানের ভিখারির মতো।
―‘কী চাই?’
―‘বিজ্ঞাপন’
―‘আমরা বিজ্ঞাপন দিই না।’
―‘এই যে, এই ম্যাগাজিনে দিয়েছেন।’
―‘ঢাকায় যাও। এগুলো হেডঅফিস থেকে দেওয়া হয়।’
কাপড়ের দোকানের আবার হেডঅফিস! কী জানি, থাকলেও থাকতে পারে। এরপর আরেক দোকান। আবার অন্য দোকান। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকেল। কোথায় সদরঘাট, কোথায় অক্সিজেন। হাঁটছি তো হাঁটছি। আমাদের লজ্জাহীন অভিযাত্রা অদম্য হয়ে উঠেছে।
‘বাবারা, এসব বাদ দিয়ে লেখাপড়া করো।বাবা-মা’র মুখ উজ্জ্বল করো।’ বিজ্ঞাপন না দিলেও, তাঁর দেওয়া মূল্যবান উপদেশ মনে রাখার মতো।
ব্যবসাসফল, সুশোভন, পরিশীলিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহযোগিতা আশা করাটা অন্যায় নয়। কিন্তু তাদের কাছ থেকেই শুনতে হয়েছে বিশ্রী মন্তব্য। আমাদের এইসব ‘ধান্দাবাজি’র উদ্দেশ্য নাকি হোটেলে বসে বিরিয়ানি খাওয়া আর মৌজ করা।
সাহিত্যের মতো বায়বীয় বিষয়ের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক না থাকলে দোষ দেওয়া যায় না, তারাই আমাদের অবাক করে দিয়েছিল। চারচারটা বিজ্ঞাপন পেয়েছিলাম নাটবল্টু-হাতুড়ি পেরেকের দোকান থেকে। সংস্কৃতি বিষয়ে লেকচার দেওয়া ভদ্রলোক মুদ্রিত বিজ্ঞাপনের টাকা শেষ পর্যন্ত দেননি, অথচ লৌহ-সামগ্রীওয়ালারা ঠিকই কথা রেখেছে। যারা লোহার কারবার করে, কেবল তাদের মনেই জং ধরে,―এই কথা অন্তত আমি বিশ্বাস করবো না। এবার মজার একটা বিজ্ঞাপনের কথা বলি, যেটার দাতা টেইলারিংশপের এক কর্ণধার। তিনি প্রতিশ্র“তি মোতাবেক টাকা দিলেন না। তাঁর বক্তব্য―কোনো এক সময় যদি শার্ট সেলাই করি, সেলাইয়ের টাকা দিতে হবে না। এরকম অদ্ভুত চুক্তির জন্যে হলেও আমাদের লিটলম্যাগচর্চা স্মরণীয় হতে থাকবে।

৬.
বিজ্ঞাপন যোগাড়ের মতো, লেখা যোগাড় করাও যে কঠিন কাজ―যথাসময়ে টের পেলাম। প্রথম ধাক্কাটা খেলাম বড়ো ভাইয়ের বন্ধুর কাছে।―‘বাসায় কেন আসবে? বাসায় আমি যাকে তাকে সময় দিই না।’ ওই এক কথাতেই অন্য অনেকের কাছে যাওয়ার আশা ছেড়ে দিলাম।
অতঃপর, পাতাভরানোর প্রধান দায়িত্ব বর্তালো আমার ঘাড়ে। মনোটাইপে চার ফর্মা―সে কি চাট্টিখানি কথা! সামনে পেছনে বাদ দিলেন। থাকছে আটচল্লিশ পৃষ্ঠা।
মূর্খতা যে মানুষকে সাহসী হতে শেখায়, হাতেনাতে তার প্রমাণ দিলাম। ঘনবদ্ধ, সতের পৃষ্ঠা দীর্ঘ এক প্রবন্ধ ফেঁদে বসলাম। লোমহর্ষক শিরোনাম― ‘বাংলাভাষা ও তার আনুষঙ্গিক সমস্যা’।
পরবর্তীকালে (১৯৭৩) ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ভাষাচিন্তাবিদদের তালিকায় আমার নাম দেখে একই সঙ্গে লজ্জিত ও পুলকিত হয়েছিলাম। যাই হোক, ‘আনুষঙ্গিক সমস্যা’র পড়েও আরও একত্রিশ পৃষ্ঠা সমস্যা রয়ে গেল। লিখলাম গল্প, ছাপলাম অন্যের নামে। যে কয়টা লেখা পেয়েছি, তাতেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় ভিন্ন কারিগরি অবলম্বন করলাম। ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতিচিন্তা’―এই শিরোনামের আওতায় ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, শহীদুল্লা কায়সার, আহমদ শরীফের রচনাংশ একত্র করে মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে পেরেছিলাম। বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-জাতীয়তা-অসাম্প্রদায়িকতা-প্রগতিশীলতার সমন্বয়ে পাতাভরানোর সমস্যা থেকে সেদিন উদ্ধার পেয়েছিলাম।
প্রচ্ছদ আঁকাতে গেলে টাকা লাগে। এই দুর্বহ সংবাদ পাওয়া মাত্রই আমার অঙ্কনপ্রতিভা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। ভাষাআন্দোলনের চেতনাকে উপজীব্য করে এঁকে ফেললাম প্রচ্ছদ। চালাকি করে দশ টাকার ব্লককে তিনভাগ করেছিলাম। আজকের বিচারেও প্রচ্ছদটা মানসম্মত বলে অনেকে মনে করেন।

৭.
বোকা মানুষের একটা সুবিধা এই যে, তাকে কেউ বোকা বানাতে পারে না। তার আগেই সে বোকামি করে বসে। প্রেসের পাওনা চুকাতে গিয়ে সেটাও টের পেয়েছি। লিটলম্যাগকর্মী হিশেবে আপনি কিংবা আর কেউ কি ভাবতে পারেন―সেদিন আমি কতো কপির প্রিন্ট-অর্ডার দিয়েছিলাম?―পাক্কা আড়াই হাজার। এডিশনাল চার্জ বাদ দিলেও কাগজ-মলাট-বাঁধাই খরচ তো হবেই। কী আবেগে হিসেবটা তখন মাথার আশেপাশেও ছিল না।
বিজ্ঞাপনবাবদ শ’চারেক টাকা পেয়েছিলাম। তখনও দিল্লি হনুস্ত দূর! এবার? দয়ার্দ্র পরীক্ষকগণের বদান্যতায় প্রতিটি পর্যায়ে পাওয়া বৃত্তির টাকাগুলো জমিয়েছিলাম। টাকা তো নয়, যেন আমার কলজেটাই নামিয়ে রাখতে হয়েছিল ম্যানেজারের টেবিলে। তাতেও হলো না। শেষ পর্যন্ত, মৌখিক মুচলেকা দিয়ে সেই যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলাম।
বিজ্ঞাপনের জন্য মাসব্যাপী মাইলকে মাইল ঘোরাঘুরি না করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যদি ভিক্ষাও করতাম, সম্ভবত তার চেয়ে বেশি রোজগার হতো।
এই পর্যন্ত যা কিছু ঘটলো, সামগ্রিকভাবে সেটাকে সাহিত্যের শিক্ষা বলেই গণ্য করি। যার ফলে, ওটাই ছিল মননশীল তরুণগোষ্ঠির অদ্বিতীয় সাহিত্য পত্রিকা।


স্বাধীনতার পরে প্রচুর প্রচুর সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতে থাকলো। আড়ালে থেকে সম্পাদকের চেয়েও বেশি কাজ করে দিয়েছি। কিন্তু, ম্যানেজারের টেবিলের সামনে আর যাইনি।
আমি সরে গেলে কী হবে, কালে কালে অদম্য তরুণেরা আসতে থাকবে। ছোটকাগজের মধ্য দিয়ে বড় মনের পরিচয় দিতে থাকবে তারা। আমার জানা মতে, প্রতিটি জেলাশহরে, এমনকি মফস্বলে, ছোটকাগজের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল তখন। ১৯৭২ সালে লেখার নামে আমার ৮৩টা ছাইভস্ম প্রকাশিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৭০টাই ছিল এখান থেকে প্রকাশিত খুদেপত্রিকায়। পরের বছরের প্রকাশনাও প্রায় সমপরিমাণ। জোর গলায় বলতে পারি, আমার কাছে লেখা চাইতে এসে কোনো তরুণ খালি হাতে ফেরত যায়নি।―অন্যদের লেখাও যোগাড় করে দিয়েছি। কেননা, আমার স্পষ্ট মনে ছিল―বিজ্ঞাপন চাইতে গিয়ে কটূক্তি শুনেছি, কিন্তু লেখা চাইতে গিয়ে তার চেয়েও বেশি অপমানিত হয়েছিলাম।


এখনকার অবস্থা কী―আমার সঠিক জানা নেই। যেদিকেই তাকাই, দোকান আর দোকান। বিচিত্রবিধ খাওয়াদাওয়ার দোকান, বিলাসী পোশাকআশাকের দোকান, রাত্রিযাপনের দোকান, শিক্ষা ও ডিগ্রির দোকান, মানবতার নামে চিকিৎসা-বিক্রির দোকান, অলংকারপাতির দোকান, চেহারা ও শরীর ঘষামাজা করে চৌম্বকশক্তি যোজনার দোকান, উন্নতমানের মহিলা নাপিতের দোকান, গোপনীয় শরীরচর্চা দেখার দোকান,―আরও কতো কী। সোজা কথা, আমাদের শহরগুলো এখন দোকানদারের শহর। দশবিশটা লিটলম্যাগাজিনকে অর্থানুকূল্য দেওয়া এদের জন্য কোনো ব্যাপারই না। তবুও তারা তা করে না।
তারা বিজ্ঞাপন দেয় না, কিন্তু ঠিকই চাঁদা দেয়। যারা বলেছিল লিটলম্যাগাজিন বের করা মানে ‘ধান্দাবাজি’, তারাই এখন প্রকৃত ধান্দাবাজদের তোয়াজ করে। মাসে মাসে কিংবা সপ্তায় সপ্তায় গালকাটা ‘অমুক’কে বিশ হাজার, ফেনসিডিল ‘তমুক’কে দশ হাজার করে দিতে তারা কার্পণ্য করে না। আধাবয়সী সন্ত্রাসীকে ‘ভাই’ বলে ডাকে। ফোন করে―‘কী ভাই, ছোটখাটো ব্যবসা করি বলে আমাদের ভালোমন্দ খবরটুকু নেবেন না? আসেন-না, একটু চা-টা খেয়ে যাবেন।’ অপর প্রান্ত থেকে জবাব আসে―‘স্যরি চাচা, এখন তো পারছি না। কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা আছে। আমি না হয় টোকন আর ছোট বাবুলকে পাঠাচ্ছি।’
যারা আরও বড় মাপের ব্যবসায়ী, তাদের প্যাকেট আরও উঁচু জায়গায় চলে যায়। বড় বড় কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দেওয়ার নামে  ‘প্রেশার-গ্র“প’কে ঠাণ্ডা রাখে। তারা হাতির খোরাক যোগায়, কিন্তু পিঁপড়েকে একদানা চিনি দেয় না।
মার্কেন্টাইল কালচারের অনুকূলে বড় বড় কোম্পানিগুলোর গরম গরম নিশ্বাস। তারা তেলা মাথায় তেল দেয়, তেলতেলে ফ্যাশন-শো হলে তো কথাই নেই। গোলাপ-প্রদর্শনী তো বটে, এমনকি ‘কুত্তা-প্রদর্শনী’ও যাতে লাস্যময়ী হয়, এ জন্য তারা আর্থিক বদান্যতার পরিচয় দিতে প্রস্তুত। প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি, লক্ষ লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপন খুদকুঁড়ার ছিটানো হচ্ছে। তবে,  জায়গা মতো পণ্যের প্রচারার্থে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, এটা সদাসত্য নয়। নিজেদের ক্ষতি এড়ানোর জন্যও বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে থাকে। কালোবাজারি কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ ঢাকা দেওয়ার জন্যও বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। মেয়েদের সামনে রেখে পিকনিকের চাঁদা চাইতে গেলেও পাওয়া যায়।
মননচর্চার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমাদের সমাজ কতো কৃপণ!―আমরা কতো গরিব।

১০
প্রাচীন শাস্ত্রে আত্মার আবরণরূপে যে পাঁচটি কোষের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে আনন্দময় কোষের স্থান সর্বোচ্চ। এই যুগে এসে আনন্দ আর বিনোদনের পার্থক্যটুকু আমরা গুলিয়ে ফেলেছি। নিছক বিনোদন শুধু ইন্দ্রিয়-নির্ভর নয়, ইন্দ্রিয়সর্বস্বও বটে। আনন্দ হচ্ছে উপলব্ধির বিশুদ্ধ পরিণাম।
রেস্টলিং দেখার জন্য চোখ থাকলেই হয়, কিন্তু দাবাখেলা দেখার জন্য শুধু চোখ থাকলে হয় না। তেমনি, সুস্মিতা সেন আর বনলতা সেন যে এক জিনিস নয়, সেটা বুঝবার জন্য দরকার মননশীলতা, উপলব্ধির প্রগাঢ়তা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ঐ জায়গাটুকুতে মর্চে ধরেছে।
ভোগবাদী সংস্কৃতি সারা বিশ্বসমাজকে খেয়ে ফেলছে। ভোগ করা সহজ, উপভোগ করা কঠিন,―স্থূল বিনোদনের বাজারমূল্য তাই দিনকেদিন বেড়ে চলেছে। সহজে আমোদিত হতে চাওয়া দোষের ব্যাপার নয়। তবে, উন্নততর আনন্দধর্মকে অবহেলা করা দোষের। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের তালিম দিয়েছে―কষ্ট করে ডাব পেড়ে খাওয়ার চেয়ে কোল্ডড্রিংক্স্ খাওয়া বেটার।―তাই কি? কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞান তো উল্টোদিকেই রায় দিচ্ছে।
পণ্যসংস্কৃতির কারবারিরা যে বলয় সৃষ্টি করেছে, সেই বলয় থেকে পরিযায়ী পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে মননশীলতার সাদা পৃষ্ঠাগুলো। মাঝেমধ্যে ভাবি, অন্ধের দেশে আমরা আয়না ফেরি করে বেড়াচ্ছি না তো?

১ জানুয়ারি ২০১৪


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা