রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা-১১

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য
ও সংস্কৃতিচর্চা-১১

কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তিই দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।
-হেলাল হাফিজ
সেপ্টেম্বরের শরতের আকাশে এমনই তৃষ্ণার সন্ধান পেয়েছিলেন মনিরুজ্জামান। শব্দকে কণ্ঠে ধারণ করে আরো তৃষ্ণার্ত হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে; সময়টা ১৯৮১ সাল, ২০ সেপ্টেম্বর। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক সেই অনুষ্ঠানে সংশয়যুক্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- ‘স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল ছন্দ/ উড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল এই তার আনন্দ’ লাইন দুটো উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু মনিরুজ্জামান (প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক) ও শেরিফা নার্গিস আখতার রেখা (প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহ্বায়ক) কণ্ঠ-শানানোর যে দায়িত্ব নেন, হাসান আজিজুল হকের নাম দেয়া সেই স্বননর বয়স এখন তেত্রিশ। চিহ্নর ধারাবাহিক আয়োজনের এবারে থাকছে শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি সংগঠন স্বনন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি সংগঠন স্বনন জন্মলগ্ন থেকে উচ্চারণ, ব্যাকরণ ও আবৃত্তি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে মতিহার সবুজ প্রাঙ্গনে, কলাভবনের বিভিন্ন কক্ষে, নাজিম মাহমুদের কক্ষে, হাসান আজিজুল হকের কক্ষে ও বর্তমানে মমতাজউদ্দিন কলাভবনের ১৪০ নম্বর কক্ষ-খ্যাত ক্লাপসেবল গেটের ফাঁকা জায়গাতেই বিশোর্ধ কর্মীর মহড়া চলে দিন-দিন বিকাল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত। তবে স্টেডিয়াম মার্কেটে তাদের নিজস্ব অফিস রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প সময়ের জন্য আসা (পাঁচ বছর, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে কখনো আরো বেশি) শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ ও অডিশনের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে থাকে স্বনন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংগঠনের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে স্বননর গঠনতন্ত্র নির্মিত। ‘যতদূরে যাই/ আমরা সবাই/ স্বনন পরিবার’- এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহই স্বননর মূলমন্ত্র। যাঁদের একান্ত ভালোবাসা- অনুপ্রেরণা- পরামর্শে স্বনন শিশু থেকে বলিষ্ঠরূপে উপস্থাপিত হচ্ছে তাঁরা হলেন- নাজিম মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন, সনৎকুমার সাহা, আলী আনোয়ার, আবুবকর সিদ্দিক, গোলাম মুরশিদ, আতাউর রহমান, শহীদুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান, আব্দুল খালেক, শিশির কুমার ভট্টাচার্য, জাহেদুল হক টুকু, সুব্রত মজুমদার, ওয়াহিদুল হক, অসিত বরণ ঘোষ প্রমুখ। তবে, সার্বিক প্রেরণার মূলে কাজ করেছেন নাজিম মাহমুদ। সুধীজনদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরেও রংপুরে ও ঢাকায় স্বননর দুটি শাখা রয়েছে। চিরসবুজ স্বনন সারা বছর ধরে মতিহার চত্বরকে দিয়ে এসেছে একটি ছন্দ, লয়, নির্দিষ্ট ঘরানায় চলার গতি। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক জটিলতা তাদের কার্যক্রমে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে নি। স্বনন বর্ষাকে সম্ভাষণ জানায় শব্দে, বাসন্তি পরিবেশকে সুললিত করে কণ্ঠে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবর্ষ উদ্যাপন করে হাওয়ার অনুরণনে কিংবা তাঁরই প্রয়াণের দিনে বেদনার গুমোট পরিবেশ জানান দেয় শব্দের গুরুত্ব। এছাড়াও জাতীয় দিবসগুলোতে এবং বাঙালির একান্ত গৌরবের দিনগুলোতে স্বনন কবিতার ঝুড়ি নিয়ে বসে মতিহার চত্বরে। এ কার্যক্রমের ধারা প্রতি বছর অব্যাহত থাকে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে প্রধান আবৃত্তিকার করে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান। এরপর হাজার বছরের কবিতা, বিভিন্ন কবিকে কেন্দ্র করে (সমর সেন, আহসান হাবীব-এর প্রয়াণে, জীবনানন্দ, আবুল হাসান স্মরণ ইত্যাদি) অনুষ্ঠান, গুণিজন সংবর্ধনা, ছড়া-নাটক-গদ্য পাঠ, কর্মশালা এমইতর বিভিন্ন উপলক্ষ ও সুনির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়াও স্বনন আয়োজন করেছে আবৃত্তি অনুষ্ঠানের। এছাড়াও রবীন্দ্রসংগীত মেলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত আবৃত্তি অনুষ্ঠানে স্বননর উপস্থিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল। কবি কামাল, জয়ন্ত রায়, মাসকুর-এ-সাত্তার এবং নিশাত জাহান রানার সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বনন প্রতিনিধি দলও ১৯৮৬ সালে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে স্বনন উপস্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। জাতীয় আবৃত্তি উৎসবে স্বননর সরব উপস্থিতি চোখে পড়বার মতো। ‘রক্ত বিচ্ছুরিত সূর্য কবিতার বাংলাদেশ’- এই স্লোগানে ‘৯০-এর গণ-আন্দোলনের সমর্থন জানায় স্বনন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে নাজিম মাহমুদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরে ‘চিত্তে যবে মত্ত আশা’- স্লোগানে আবৃত্তি উপস্থাপন করে স্বনন। স্বননর প্রাণপুরুষ নাজিম মাহমুদ স্বর্গের সাথে মতিহার সবুজ চত্বরকে তুলনা করেছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত স্বননর সদস্যরা ফি-বছর তাঁর প্রয়াণের দিনে কবিতার মাধ্যমে তাঁকে এভাবেই স্মরণ করেন। ১৯৮৪ সালে বৈশাখ উদ্যাপনের মাধ্যমে প্রথম কর্মশালার আয়োজন করে স্বনন। তাছাড়া দশ বছর পূর্তি, তিন বছর পূর্তি, ছয় বছর পূর্তি, আট বছর পূর্তি, যুগ পূর্তি, ষোল বছর পূর্তি, তেইশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান ও কর্মশালাগুলোতে সৈয়দ শামসুল হক, হায়াৎ সাইফ, কবি কামাল, হাসান আজিজুল হক, আলী আনোয়ার, কামরুল হাসান, জামিল চৌধুরী, কবি পূণেন্দু পাত্রী, নাজিম মাহমুদ প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত থেকেছেন এবং তাঁদের সম্মাননা প্রদান করেছে স্বনন। ঢাকায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিল স্বনন। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২১মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ ও ‘ফাল্গুন’ উপলক্ষে ‘এতো ফুল ফোটে এতো পাখি গায়’- স্লোগানে পুরাতন ফোকলোর চত্বর বিকাল ৫.৩০টায় প্রেম, প্রকৃতি ও দেশ কবিতায় মুখরিত ছিলো। কবিতার গুরুত্ব ও ফাল্গুনের আগমন ধ্বনি উচ্চারিত হয় স্বনন শিশুদের কণ্ঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রধানতম অর্জন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’- স্লোগানে বিকাল ৪.০০ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সিকান্দার আবু জাফর, সানাউল হক প্রমুখের কবিতায় আরও একবার স্বাধীনতার গৌরব ও ত্যাগের মহিমা কীর্তনে সিক্ত হয় মঞ্চ। বাংলাদেশ ও বাঙালির উৎসবের ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ‘পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ’- স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন বিকাল ৩.৪০ টায় আমচত্বরে (কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনে) হরেক রকম কবিতার পশরায় মুখরিত হয় বৈশাখ উদ্যাপন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবর্ষ উদ্যাপনে ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা’- স্লোগানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে বিকাল ৫.০০ টায় স্মরণ করা হয় রবীন্দ্রনাথকে। স্বননর প্রাণপুরুষ নাজিম মাহমুদের প্রয়াণ দিবস ও আলী আনোয়ার স্মরণে ফি-বছরের ন্যায় ১৭ মে শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করে স্বনন। স্মরণ অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন- হাসান আজিজুল হক, বেগম হোসনে আরা, সনৎকুমার সাহা, কবি আরিফুল হক কুমার, রাশেদা খানম প্রমুখ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে অলংকৃত করেছিলেন- শিশির কুমার ভট্টাচার্য, সুব্রত মজুমদার, শুভ্রা রাণী, তাপস মজুমদার, রকিবুল হাসান রবিন, কবি কামাল প্রমুখ। যখন স্বননর এই কার্যক্রমের কথাগুলো লিখিত হচ্ছে বাহিরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, হয়তো স্বনন সদস্যরাও প্রস্তুত হচ্ছে তাদের পরবর্তী আয়োজন বৃষ্টির কবিতা নিয়ে। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিক্রমায় সংশয়, নৈরাজ্য ও হতাশা মোকাবিলা করতে প্রত্যেক সময়ে শক্তভাবে হাল ধরেছিলেন স্বননর সদস্যরা। তাছাড়াও যার ডানার তলে স্বনন শিশুরা আগলে রয়েছে তাঁরা হচ্ছেন কবি কামাল ও মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল। ঝড় কেটে গেছে, স্বনন তরী নির্বিঘেœ ভাসুক সাংস্কৃতিক সমুদ্রে…।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা