শ্র দ্ধা ঞ্জ লি

শহীদ কাদরী ১৯৪২-২০১৬

পঞ্চাশ-উত্তর কবিতায় আধুনিকতা ও নাগরিক জীবনবোধের সংযোগ ঘটিয়ে শহীদ কাদরীর আত্মপ্রকাশ। জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৪২, মৃত্যু ২৭ আগস্ট ২০১৬। পুরোদস্তুর নাগরিক প্রতিপাদ্য, প্রকাশে তিনি আধুনিকতম ও নিঃশর্তরকম নান্দনিকও। বুদ্ধদেব বসু যেমনটা বলেন : ‘এই ‘জীবনে’ (বা সমাজে) কবির আর স্থান নেই; একা সে, উদ্বাস্তু, স্থিতিহীন; এখন সে সার্থক হ’তে পারে শুধু নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরভাবে প্রতিবার শক্তিকে দাঁড় করিয়ে।’ এ সত্যটি শহীদ কাদরীর জীবনানুষঙ্গ। একপ্রকার ক্ষিণœতার কালে কবি আত্মবিবৃতিময় বা আত্মস্বীকারোক্তিপ্রবণ হয়ে তৈরি করে চলেন নবতর ধ্বনিতরঙ্গ। স্মরণে নিই, উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও কোন ক্রন্দন নেই (১৯৭৮) কাব্যগ্রন্থ, পরে বেরোয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯)। এর মধ্যে প্রথমটি বইঘর, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত। এসব লেখা আর গ্রন্থ-প্রকাশে একপ্রকার ব্যবধান পরিলক্ষিত। মনন ও বুদ্ধিনির্ভর শহীদ কাদরী। বর্ণনায় নয়, চিত্রকল্প-চারণে কাব্যচতুষ্টয়ের ১৪২ টি কবিতায় একটি নিরঙ্কুশ নাগরিক চেতনা উদ্যাপন করেছেন তিনি। তাইতো অমোঘ আজ্ঞায় পুনরুক্তি করে সংকোচহীন বলা যায় : ‘লেখার সংখ্যা সামান্য হলেও কবিতায় বাঙ্ময় জীবনদর্শন অসামান্য এবং সম্পূর্ণ, দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট ও নিঃসংশয়, পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ম ও সূক্ষ্ম, প্রকাশ অনবদ্য ও মেদহীন। তাঁর কবিতার অন্তর্গত যাবতীয় বোধ দেশকালের সীমানাকে ডিঙিয়ে আধুনিকতার নির্মাল্য হয়ে উঠেছে।’ এ লক্ষ্যে সদ্যপ্রয়াত কবিকে চিরস্মরণে অভিনন্দিত করি।

———————————————————————————-

সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬)

তিনি চলে গেলেন। চিরনিয়মে। বলা যায় আমাদের জানিয়েই প্রায়। কিন্তু রেখে গেলেন বাংলার মাঠ-প্রান্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মজিবর-নূরলদীন আর প্রান্তিক মানুষের নায়কদের— তাঁর কথায় যিনি ‘গণনায়ক’, আর সম্ভাবনার এই চিরসবুজ প্রজন্মকে। মূলত তিনি কবি। তাইতো কবিতাশিল্পকেই নানা অঙ্গে ঘটিয়েছেন তুমুল সম্প্রসারণ। এবং তা হয়ে উঠেছে চিরনন্দিত শিল্প। তাঁর কবিতা-যাপন শুরু হয় গত শতকের পঞ্চাশের শেষে। জন্ম তার ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর। নিবাস বাংলাদেশের উত্তর-বাংলার কুড়িগ্রাম জেলায়। সাহিত্যে তিনি সব্যসাচী খ্যাতি পান সাহিত্যের সর্বাঙ্গিকে অবাধ হওয়ার কারণে। কবিতা, কাব্যনাট্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, কলাম, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ নিয়ে আমাদের সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ তাস বের হয় ১৯৫৪ সালে। এরপর ১৯৫৯-এ লেখেন দেয়ালের দেশ উপন্যাস। তবে কাব্যগ্রন্থ বুনোবৃষ্টির গানও প্রায় ওই সময়েই প্রকাশ পায়। সবকিছু মধ্যে তাঁর মাস্টারপীস কাব্যনাট্যসংগ্রহ (১৯৯১)— যেখানে রয়েছে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬) ও নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২) গ্রন্থ দুটি। তিনি আমেরিকান ঔপন্যাসিক সল বেলোর Henderson the Rain King (১৯৫৯) অনুবাদ করেন শ্রাবণ রাজা (১৯৬৯) নামে। এটি একটি অসামান্য কাজ। এ ছাড়া উর্দু কবিতা, স্পেনিশ কবিতার প্রাঞ্জল অনুবাদও রয়েছে। কলাম হৃৎকলমের টানের কথা আমরা সবাই জানি। যেমনটা আগেই বলেছি, কাব্যনাটক তাঁর সবচেয়ে প্রশংসিত শিল্পকর্ম কিন্তু খেলারাম খেলে যা (১৯৭৩), নীলদংশন (১৯৮১), নিষিদ্ধ লোবান (১৯৮১), রক্তগোলাপ (১৯৮১), মহাশূন্যে পরান মাস্টার (১৯৯০), আয়না বিবির পালা (১৯৯০) প্রভৃতিও জনপ্রিয় রচনা। আরও অনেক আছে। তবে বাংলাদেশের কবিতায় পরানের গহীন ভিতরে (১৯৮১) সনেটগুচ্ছ এবং বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা (১৯৮১)ও অসম্ভব আকর্ষণীয় রচনা। যেটি বিশেষ ভাষায় উদ্যত এবং আবৃত্তিতেও সুখকর-সমৃদ্ধিজ্ঞাপক। এই নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর মৃত্যুতে আমরা শোকহত, অভিভাকহীন। অপূরণীয় ক্ষতি।

———————————————————————————-


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা