20728100_1464956210238134_7554614045820284866_n

শ্র দ্ধা ঞ্জ লি

 

কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য (১৯৭০-২০১৭)

গত ৭ মার্চ ২০১৭ খ্রি. কলকাতার পথে ছিলাম। বেনাপোল বর্ডার পার হওয়ার আগে আমার সফরসঙ্গী বাংলাদেশের লেখক যশোরের হোসেনউদ্দীন হোসেনের বাসায় ছিল তখন রাত্রিযাপন। হঠাৎ নেট-সংবাদে ভেসে এলো কালিকাপ্রসাদের দুর্ঘটনার খবর। হুগলীর পথে শিউরিতে দুর্ঘটনার পর বর্ধমান হাসপাতালে নেওয়ার তিনি মারা গেছেন। জানা যায়, গানের দলের সবাই বেঁচে গেলেও কালিকা বাঁচেননি। অকস্মাৎ স্তম্ভিত সবকিছু! কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া খুব কঠিন হয়। গত দুতিন বছরে কালিকার গান এতো শুনেছি যে, মাটি-মানুষ-জীবন আর বঙ্গজ লোকসুরের ভা-ারে বহুমূল্য সন্ধানের এ জহুরী দল, গলা আর পা-িত্য দিয়ে আমার মতো অনেককেই মুগ্ধ করে রেখেছিল। এই মায়ার ভুবনে মানুষের মৌহুর্তিক চলে যাওয়া, খুব কষ্টের এবং বেদনারও। ওইদিন এ মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ঠিক যেমনটা—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু, চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণের মৃত্যু কিংবা বাংলাদেশের চারণ-সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দীনের মৃত্যু। কালিকাও যেন তেমনি। আমাকে নির্ঘুম করে ফেলে। যেন রাতের প্রহরায় নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। গোপনে চোখ মুছেছি, কষ্ট পেয়েছি। বুঝি অনেকদিন তাঁকে মিস করবো। এখনও প্রায়শই ইউটিউবে তার গান শুনি আর মনে মনে ভাবি—ও তো এখনও আছে—মানুষ বুঝি এভাবেই বেঁচে থাকে, মরে না কখনোও! এসব অবুঝ আবেগকে ক্রমশ সত্য দিয়ে ঢেকে দিই। সত্যকে মেনে নেই আর করে বসি এ শ্রদ্ধাতর্পণ। আমাদের সুহৃদ সাংবাদিক-বন্ধু লেখক ও গল্পকার কাজল রশিদ শাহীন খুব পরিশ্রম করে এ সাক্ষাৎকারটি চিহ্ন-পাঠকের জন্য করেছেন। সাক্ষাৎকারটির শিরোনামও তিনি দিয়েছেন। তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। [সম্পা.]

******************************************************

‘বাঙালির তীর্থ হল একুশের ঢাকা’
কাজল রশীদ শাহীন
কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য কলকাতার লোকগানের দল দোহার’র প্রতিষ্ঠাতা। তার ও তাদের যূথবদ্ধতায় দোহার বাংলা গানে গেঁড়েছে স্থায়ী এক নোঙ্গর, যা সবার কাছেই আরাধ্য। কীভাবে অর্জিত হল এই সাফল্য-সূচক? বলা-না বলা সেসব বিত্তান্তের খসড়া খতিয়ান হাজির হয়েছে এই সাক্ষাৎকারে।

দোহার’র জন্মবিত্তান্ত জানতে চাই, কখন কীভবে তার আত্মপ্রকাশ?

দোহার’র যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। ঐ বছর ৭ আগস্ট হয় আমাদের প্রথম অনুষ্ঠান। আমার বেড়ে ওঠা আসামের শিলচরে। নিজেদেরকে আমরা ‘সুরমা’ সিলেটী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বলে মনে করি। শিলচর-করিমগঞ্জে তারই একটা পরম্পরা ছিল। আমি ওখানে বড় হয়েছি। এরপর ১৯৯৪ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হয়ে কলকাতায় আসা। শিলচওে বেড়ে উঠেছি গানের-সংস্কৃতির মাঝে।

আমার বড় জ্যাঠা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছাত্র ছিলেন। আমার আরেক কাকা মুকুন্দ ভট্টাচার্য ছিলেন গণনাট্য সঙ্গীতের দক্ষ শিল্পী। আমার বাবা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় মাপের সংগঠক ছিলেন। আমার পিসি আনন্দময়ী ভট্টাচার্য সুদক্ষ সঙ্গীতশিল্পী। শিলচর সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানটা উত্তরপূর্ব ভারতের সবচেয়ে পুরনো সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ আমার বেড়ে ওঠা সঙ্গীতের মাঝে। বাড়িতে পড়তে না বসলে বকা খেতে হয়নি; কিন্তু সন্ধ্যায় তবলার রেওয়াজে না বসলে বকা খেতে হয়েছে।

আজকের কালিকাপ্রসাদের ভিত্তি তাহলে পারিবারিক বৃত্তেই রচিত হয়েছিল?

আমাদের বাড়িতে সঙ্গীতচর্চার দুটো ধারা ছিল। একটা ছিল দেশি গান, মানে কীর্তন, ভজন, মালসি গান। আর একটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, আমাদের বাড়িতে বিখ্যাত প-িতরা আসতেন। আমি যখন যাদবপুর এলাম, নব্বই দশকের শুরুতে, তখন আমার ছোটকাকা অনন্তের ‘লোকবিচিত্রা’ নামে একটি গানের দল ছিল। ওরা অল ইন্ডিয়া রেডিওর এ গ্রেড গানের দল ছিল। পরে নানা কারণে দলটি ভেঙে যায়।

ছোটকাকা আমাকে বলেছিলেন, দলটি আবার তিনি জোড়া দিয়ে কলকাতায় যেতে চান। ভারতবর্ষে সব বাঙালির জন্যে কেন্দ্রস্থল হল কলকাতা। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় বসে খবর পেলাম যে উনি মারা গেছেন। তখন সদ্য আমার এমএ শেষ হয়েছে। লোকসঙ্গীতের স্বাদ-গন্ধ-মেজাজ নষ্ট না করে মঞ্চে পরিবেশন করার উনার একটা স্বকীয় স্টাইল ছিল।

আমার তখন মনে হল, উনার তো কলকাতা এসে গান করার ইচ্ছে পূরণ হল না। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি উনার গানগুলো এখানে করতে পারি কিনা। তখন বন্ধুবান্ধব-শিক্ষক সকলকে গানগুলো শোনানোর একটা ব্যবস্থা করলাম।

এটাতে কোনো চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকি কি ছিল?

একটা চ্যালেঞ্জ তো ছিলই। তবে আমার বিশ্বাস ছিল আমি পারব। এই বিশ্বাস থেকেই আমরা কয়েকজন মিলে গানগুলো নতুন করে তুললাম। শিলচরের রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী রাজীবও ছিল আমার সঙ্গে। একজন ঢোলক আমাদের ডাকে এলেন। এখন আমাদের সঙ্গে সারিন্দা বাজান নিরঞ্জনদা’ উনি এলেন। নিরঞ্জনদা’ ট্রেনে সারিন্দা বাজাতেন। ওখান থেকে আনলাম।

একজন ফুচকা বিক্রেতা দোতারা বাজাত, ওকে আনলাম। এরপর সবাই মিলে একটা দল হিসেবে ১৯৯৯ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার স্টুডেন্টস হলে একটা গানের অনুষ্ঠান করলাম। ঐ হলটা কলকাতার সবচেয়ে সস্তা হল ছিল। ৫০০ টাকা ভাড়া। গান করার আগে আমাদের নাম কি হবে এটা নিয়ে ভাবনাই পড়ে গেলাম।

প্রথমে ভেবেছিলাম ‘লোকবিচিত্রা’ নামটাই থাক। পরে যাদবপুরের একজন মাস্টারমশাই অভীক মজুমদার আমাকে বললেন যে তোমাদের দলের নাম ‘দোহার’ রাখো। আমরা নামটি গ্রহণ করলাম। আমার মনে আছে, সেদিন গান করার আগে বলেছিলাম, এটাই আমাদের ‘দোহার’র প্রথম অনুষ্ঠান এবং এটিই শেষ অনুষ্ঠান।

কারণ কলকাতায় তখন অন্য-পেশায় থেকে গান বাজনা করা সম্ভব না। শখের গানবাজনা কলকাতায় হয় না। আমার এবং রাজিবের অন্যরকম কিছু করার ইচ্ছে ছিল। এটা আসলে আমার কাকাকে একটা ট্রিবিউট দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে করা।

তারপর অনুষ্ঠানটা শেষ হয়ে গেল, কলকাতার দূরদর্শন থেকে আমাদের ডেকে বলা হল, তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানটা কেটে ছোট করে ৪৫ মিনিটের করে দিতে।

ঐ অনুষ্ঠানের প্রথম গানটা কি ছিল মনে আছে?

হ্যাঁ। একটা বন্দনা করেছিলাম। বন্দনা দিয়ে আমরা এখনো শুরু করি যে কোনো অনুষ্ঠান। বন্দনাটা ছিল: ‘আমি বন্দনা করিয়া তোমায় ডাকি হে, আইসো বাবা গুরু মুর্শিদ, আসো হে।’ এটা আমার কাকার কাছে শেখা।

বন্দনার এই কথা ও সুর কি সংগৃহীত?

হ্যাঁ, এটা সংগৃহীত। ‘আইসো গো আমার সরস্বতী, আমার কণ্ঠে করে ভর, গানের পথ ভুলিয়া গেলে যোগায় দিবা।’ একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া ঐ অনুষ্ঠানে করা সব গানই আমার কাকার কাছ থেকে শেখা। দূরদর্শনের পর যাবদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়ররা এসে একদিন ধরল একটা গানের অনুষ্ঠান করার জন্যে। লোভটা সামলাতে পারলাম না। নিজের কলেজ, ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবির সুমন, অঞ্জন দত্ত, রশীদ খানের গান শুনেছি। সেখানে এরকম একটা সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। ওরা তিনশ’ টাকা দিয়েছিল। এটা ২০০০ সালের কথা।

তখনও কি চাকরির জন্য আকুলি-বিকুলি করা শুরু করেননি?

আমি তখন এনজিওর একটা কাজ করতাম। তবে একটা ফেলোশিপ পাওয়ার কারণে ওটা ছেড়ে দিই।

সেটা কি সঙ্গীতবিষয়ক কোনোকিছু?

সেটা মিউজিক বিষয়েই। ইউরোপে একটা শব্দবন্ধনী খুব চালু আছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সং। অর্থাৎ শিল্পায়ন হয়েছে, গ্রামীণ জীবন থেকে শিফট হয়ে ওরা কিছু গান তৈরি করেছে, যেটাকে নাম দেয়া হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সং। আমার গবেষণাটা ছিল, ইউরোপের মতো আমাদের দেশে শিল্পায়ন ঘটেনি সত্যি, কিন্তু আমাদের দেশে চা শিল্পের মতো বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে যেখানে মজুররা দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে এসে কাজ করছে।

আমার অনুসন্ধান ছিল, ঐ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কি গান তৈরি হয়েছে, সেটাকে আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সং বলতে পারব কিনা, এই বিষয়ে।

এই গবেষণা কার তত্ত্বাবধানে করলেন?

কোনো ব্যক্তির অধীনে নয়। একটা সংস্থা আছে আইএফএ (ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন ফর আর্টস), ওদের কাছে প্রজেক্ট পাঠালে সেটি মনোনীত হলে ওরা তিন বছরের একটা গ্রান্ড দেয় কাজটা করার জন্যে। এরপর আমি যে এনজিওতে কাজ করতাম, দুর্বার মহিলা সমিতি, ওরা বলল একটা অনুষ্ঠান করে দিতে। ওটা করে দিলাম। এভাবে চেনাশুনা মানুষরা ডাকলে আমরা যেতাম। এরপর যেটা হল, দূরদর্শনে একটা মর্নিং শো হত। আমাদের বাংলার প্রথম মর্নিং শো ওটা। ঘটনাচক্রে আমি যাকে বিয়ে করেছি, ঋতুচেতা গোস্বামী, ও ওটার উপস্থাপক ছিল। তখনো আমাদের বিয়ে হয়নি। ওদের যিনি ডিরেক্টর ছিলেন তিনি একদিন বললেন যে আমাদের কয়েকটা গান দিয়ে দাও আমরা রেকর্ড করব।

ওরা সেই গান প্রায়ই বাজাত। এরপর ২০০০ সালের শুরুর দিকে এক ভদ্র্রলোক একদিন বাসায় ফোন করলেন। আমার তখন নিজের মোবাইল ছিল না। ভদ্রলোকের নাম বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়। উনি কনকর্ড রেকর্ডস’র মালিক। ওটা তখনকার নামকরা মিউজিক কোম্পানি। বিশ্বনাথ বাবু আমাদের নিয়ে একটা কাজ করতে চান। উনার সঙ্গে দেখা করলাম। উনি আমাদের ক্যাসেট বের করতে চান শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

আমি জানতাম, মিউজিক কোম্পানিগুলোর একটা ঝামেলা আছে। ওরা টাকা পয়সা নিয়ে ক্যাসেট বের করে দেয়। আমাদের অতো টাকা ছিল না। তাছাড়া কোনো ইচ্ছেও ছিল না। ভদ্রলোককে বললাম, দেখুন আমাদের তো অতো টাকা পয়সা নেই। এটা শুনে উনি বললেন, টাকা আপনাদের দিতে হবে না, আমিই আপনাদের দেবো।

তখন আরো ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ এই ইন্ডাস্ট্রির তেমন কিছু তো জানতাম না। ভাবলাম সাইন-টাইন দিয়ে কিছু একটা ঝামেলার মধ্যে যদি পড়ে যাই! আমি বললাম, না, ওসব দরকার নেই। আসলে আমাদের প্রস্তুতিও ছিল না। উনি বললেন যে, তুমি ভেবে বলো।

তখন অভীক দা’র কাছে গিয়ে বললাম। উনি কাজটি করার জন্যে খুব উৎসাহ দিলেন। তিনদিন পর আবার বিশ্বনাথ বাবু ফোন করলেন। উনি বললেন, শোনো তোমরা সাহস করে চলে আসো। আমি সব ব্যবস্থা করবো। টাকা পয়সা খুব বেশি দিতে পারব না।

দরকার হলে দুএকজন মিউজিশিয়ান বাইরে থেকে নিয়ে নেবে। এটা বলে উনি বললেন যে, আমার একজন অ্যারেঞ্জার আছে, উনার কাছে চলে যাও। উনি সব ব্যবস্থা করবে। আমি বললাম, না। করলে আমরা নিজেরাই সব ব্যবস্থা করবো। উনি বিখ্যাত মিউজিক অ্যারেঞ্জার, উনার কাছে আমরা নিজেদের কথাগুলো বলতে পারব না।

আমার কাছে সাউন্ডটা খুব বড় মূল্য রাখে। একজন মিউজিশিয়ানকে আমরা চিনি তার সাউন্ড দিয়ে। সলিল চৌধুরী যখন বাংলা গানে এলেন, তখন তিনি নতুন একটা সাউন্ডের জন্ম দিলেন। একইভাবে আর ডি বর্মণ একটা নতুন সাউন্ডের জন্ম দেন। এ আর রহমানের ক্ষেত্রেও আমরা একথা বলব। আমি যদি সাউন্ডহীন হয়ে যাই, তাহলে আমার আইডেনটিটি দাঁড়াবে না। যাই হোক, উনি সব মেনে নিলেন। অ্যালবামটা হল।

আপনাদের সেই প্রথম অ্যালবামের নাম কি ছিল?

বন্ধুর দেশে।

সবই কি ছিল সংগৃহীত গান?

আমরা তো সংগৃহীত গানই গাই। আমি নিজে কয়েকটা গান লিখেছি। কিন্তু দোহার থেকে করিনি।

অ্যালবামটির রেসপন্স কেমন ছিল, কোনো সাড়া ফেলতে পেরেছিল কি?

আমি রিলিজের দিনই বিশ্বনাথ বাবুকে বলেছিলাম যে, আপনি পস্তাবেন। এই ক্যাসেট লোকে কিনবে না। কেন কিনবে? আমরা কথা পাল্টাইনি, সুর পাল্টাইনি। আঞ্চলিক অনেক শব্দ বুঝবে না। উনি বললেন, ঠিক আছে, দেখি। ক্যাসেটটি বের হওয়ার পর দেখলাম বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে ডাক আসছে, অন্যান্য টেলিভিশন ডাকছে। বুঝলাম, এবার হয় দলটাকে ঠিকমতো করতে হবে, না হলে পুরো বন্ধ করতে হবে। এখন আর মাঝামাঝি কিছু করা যাবে না। ক্যাসেটের ব্যাপারটি খুব রেসিপ্রক্যাল ছিল। দেখা যাচ্ছে, কোথাও আমরা শো করছি, পরেরদিন সেখানে ক্যাসেট পৌঁছে যাচ্ছে। আবার যেখানে ক্যাসেট যাচ্ছে সেখানে শো করার জন্যে আমাদের ডাকা হচ্ছে।

শিলচর হচ্ছে দোহার জনয়িতা। আমার জানতে ইচ্ছে করছে সেই জনয়িতার কাছে দোহার গেল কবে?

আমাদের প্রথম অ্যালবামের একটা মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করেছিলাম শিলচরে। নিজেদের উদ্যোগেই করা। কারণ, গানগুলো ওখানকার, আমাদের সেন্টিমেন্ট শিলচরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ঐ সময় বাংলাদেশেও আসি। ২০০০ সালে শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে দেখা করার জন্যে প্রথম বাংলাদেশ আসা। উনার গান আমরা ছোটবেলা থেকেই শিলচরে শুনেছি।

আমার কাকার কাছে লোকসঙ্গীতের প্রথম যে গানটি শিখেছি ওটা ছিল শাহ আবদুল করিমের। গানটি ছিল ‘তোমার কি মায়া লাগে না’। কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে, এই শাহ আবদুল করিম সেই শাহ আবদুল করিম। কারণ, আমার ধারণা ছিল, যারা গান লিখেছেন তারা কেউ বেঁচে নেই। কারণ লালন বলে, হাসন বলে, রামপ্রসাদ বলে গানের মধ্যে যাদের ভণিতা পাই, তারা তো পুরানা লোক।

হঠাৎ আমরা শুনলাম, আমরা যে বলি, ‘করিম কয় তোমার কাছে মায়া যদি পাই’, এই করিম বেঁচে আছেন। তখন তার সঙ্গে দেখা করার জন্য খোঁজ লাগালাম। শুনলাম সিলেটে থাকেন। চলে এলাম বাংলাদেশ। এলাম যখন তখন ফেব্রুয়ারি মাস, ভাবলাম যে ফেব্রুয়ারির উদযাপনটা দেখে যাবো। চলে এলাম ঢাকায়। কি দেখবো জানতাম না। জানতাম যে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানে বিরাট কিছু একটা হয়।

‘একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানে বিরাট কিছু একটা হয়’—এ কথাটা আপনি কোথা থেকে কিভাবে জানলেন?

জানার একটা কারণ আছে। আমি যে শহরে থাকি, সেই শহরে ভারতবর্ষে প্রথম ভাষার জন্যে ১১জন প্রাণ দিয়েছিলেন। ফলত ৫২র ভাষা আন্দোলনের কোথাও তার একটা রেখাপাত করেছিল। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মানুষ আমাদের ওখানে গিয়ে উঠেছিলেন।

আমার কাকারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ওখানে গান গেয়ে টাকা তুলতেন। একাত্তর সালে আমার বয়স দেড় বছর। কাকা আমাকে একটা রেকর্ড প্লেয়ার বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার একপাশে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭মার্চের ভাষণ, অন্যপাশে অংশুমান রায়ের বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ বাড়ির বড়রা বলেন, মুজিবের ভাষণ শুনে নাকি আমি কেঁপে কেঁপে উঠতাম, ওটা শুনেই নাকি আমার মুখে বুলি ফুটেছে।

তারপর ঢাকায় এসে কি দেখলেন?

আমি আর আমার বন্ধু ঢাকার ফার্মগেটে এক হোটেলে উঠলাম। হোটেলের মালিক আমাদের বলল, আপনারা কি দেখবেন? আমরা বললাম একুশে ফেব্রুয়ারি। উনি বললেন, তাহলে এখনই বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তখন রাত দশটা বাজে। রাস্তায় নেমে দেখি হাজারে হাজারে মানুষ ছুটছে।

সবাই আমার ভাইয়ে রক্তে রাঙানো গাইছে। আমি বললাম কোনদিকে যাবো। উনি বললেন, রাস্তায় গেলেই সেটা বুঝতে পারবেন। আমি অনেক জায়গায় বলেছি, এখনো বলি, সব বাঙালির যদি কোনো তীর্থ হয়, সেটা একুশের ঢাকা। বাঙালি হিসেবে যদি তীর্থ করতে আসে, তাহলে তার একুশের ঢাকায় আসা উচিত।

এখন ঢাকায় আসলে কেমন মনে হয়?

না চেনার একটা সুবিধা থাকে, নিজের মতো ঘোরা যায়। কিন্তু এখন যেখানেই দাঁড়াই দু-চারটা লোক চিনে ফেলে। এর জন্যে আবার ভালোলাগাও আছে। আমি যে কাজটি করি, তার জন্যে লোকে যদি আমাকে চেনে তাহলে ভালোলাগা কাজ করা স্বাভাবিক।

দোহার কি কখনো ভাঙনের মুখে পড়েছে?

শিল্পী বের হয়ে গেছে, আবার এসেছে সেটাকে দোহার ভাঙা বলা যাবে না। ‘দোহার’র মূল হলো আমি আর রাজীব। আমাদের মধ্যে কোনো ভাঙন হলে, দোহার ভেঙে যাবে। তবে সেই সম্ভাবনা নেই এই কারণে যে, আমরা যেহেতু উত্তরপূর্ব ভারতের গান নিয়ে কাজ করি। এই অঞ্চলের মানুষ আমাদের তাদের প্রতিনিধি ভাবে।

আপনারা লালন এবং শাহ আবদুল করিমের গান করেছেন। এই দুজনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

দুজনের গানের অনেক পার্থক্য আছে। এটা বলতে হলে সঙ্গীতের তাত্ত্বিক বিষয়ের ভেতর যেতে হবে। বাউল গানের কোনো সুর হয় না। ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়ার একটা নিজস্ব ঢং আছে, বাউল গানের নিজস্ব সুরের কোনো ঢং নেই। রবীন্দ্রনাথের বাউল-আঙ্গিক গানের কথা অনেক প-িত বলেন, এটা কিন্তু ভুল বলা। বাউল-অঙ্গের দর্শন হতে পারে, সুর হতে পারে না। বাউল গানের সুরের মিল থাকে না এই কারণে যে, বাউল যে সুরটাকে গ্রহণ করে সেটা হল তার অঞ্চলের সুর। শাহ আব্দুল করিম যখন দেহতত্ত্বের পদ গাইবেন, বা দুরবীন শাহ যখন দেহতত্ত্বের পদ রচনা করবেন, তাদের সুরে ভাটিয়ালি আসবে কিন্তু লালন শাহের সুর আসবে না। কারণ ঐ সুরটা নদীয়ার সুর।

‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ এই গানগুলোর চলন হল নদীয়ার চলন। আবার আপনি ভারতবর্ষের বীরভূম অঞ্চলে গেলে দেখবেন, পূর্ণদাস বাউল, নবনী দাস বাউল (পূর্ণদাস বাউলের বাবা) এদের সুরের চলনটা আলাদা। এটা বীরভূমী চলন। এই যে সুরের আঞ্চলিকতা, এই জন্যেই বাউল পদকে লোকসঙ্গীত বলা হয়।

এখানে শাহ আব্দুল করিম একটু ব্যতিক্রম। তিনি নিজে কম্পোজার। আমার কাছে উনাকে একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে মনে হয়, উনি আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকটি গানের সুর করতেন। আর লালনের গানগুলো উনি উনার ভক্তদের বসিয়ে একটা (একই) সুরে গাইতেন। লালন পার্টিকুলারলি আলাদা করে বসে সুর করছেন, এমনটি মনে হয় ঘটেনি। তিনি গান বলতে বলতেই সুর হয়ে যেত। সেটা তার অঞ্চলের সুর।

পরবর্তীকালে তার গান মডিফাইড হয়েছে। ফরিদা পারভীনের গলায় আমরা যে গান শুনি, এটা মডিফাইড। আবুল আহসান চৌধুরীর কাছে অনেক সংগ্রহ আছে, যেমন খোদা বক্সের গান, ফরিদা পারভীনের গুরু মকসেদ আলী সাঁইয়ের গান, এদের সঙ্গে আমাদের আজকের লালন শিল্পীদের গানের ভেতর অনেক ফারাক আছে। ওরা একটা নির্দিষ্ট ঢঙে গাইতেন। লালন সাঁই কিন্তু বড় সাধক, তাঁর কাছে সুরকল্পটা বড় কথা নয়। সুর একটা তাঁর অবলম্বন মাত্র, তিনি কথাটা বলতে চান।

শাহ আবদুল করিমের কাছে বিষয়টি ফিফটি ফিফটি কাজ করেছে। তাঁর ঘরানাটা ভাটিয়ালি হলেও নানান সময়ে কাওয়ালি সুর লাগিয়ে দিয়েছেন। ‘গান গাই আমার মনরে বুঝাই’ এই গানটা আমরা যতবার শুনি, এটা ফট করে একটা সুরকার বা লোককবির কাছে, এই সুরটা বসানো কঠিন আছে। এই সুরটা বসাতে গেলে একটা কম্পোজারশিপ লাগে। হাসন রাজা কিন্তু কম্পোজার না। তার গানে যে নানারকম সুর করা, তার অধিকাংশ কিন্তু বিদিত লাল দাসের করা সুর। হাসন রাজাকে আমার জেঠুরা দেখেছেন, ও একসুরে গান গেয়ে যেতেন। ভক্তদের নিয়ে একটা বজরা ভাড়া করে উঠে যেতেন, আর গান চলত।

শাহ আব্দুল করিম বাউল কি-না এটা নিয়ে তো বিতর্ক আছে?

শাহ আব্দুল করিম নিজেও সেটা বলেছেন, তবে ব্যাঙ্গ করে। উনার সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে দু’বার। আপনাকে লোকে বাউল বলে একথা বললে উনি বলেছেন, মানুষে কয়, আমি তো কই না। কেউ পাগল কয়, কেউ বাউল কয়। আমি বলব, শাহ আব্দুল করিম বাউল ছিলেন।

বাউলদের তো একটা আলাদা জীবনযাপনের ব্যাপার থাকে, তাদের নিজস্ব কিছু রীতি-নীতি আছে, শাহ আবদুল করিমের তো সেটা ছিল না বা উনি পালন করতেন না।

এখানে একটা ব্যাপার আছে। এই জীবনযাপনের রীতি ঘরে ঘরে আলাদা হয়, অঞ্চলভেদে আলাদা হয়। কুষ্টিয়ায় আপনি বাউলের যে জীবনযাপন দেখেন বা যেভাবে তারা দীক্ষা নেন, সেটি সিলেটের বাউলের ক্ষেত্রে সেভাবে হয় না।

সিলেটের বাউলদের প্রকৃত বাউল বলা যায় কি-না?

সেটা আলাদা কথা। এই ‘প্রকৃত’ বিষয়টাকে কে সেট করবে? এটা বলা মানে তো, আমি বলতে চাচ্ছি এটা প্রকৃত আর এটা প্রকৃত না। এভাবে তো কেউ বিষয়টি সেট করেনি। আপনি যদি আবার শরীয়তী পন্থায় যান, সে তো পুরা মারফতি সাধনাকেই বাতিল করে দেবে। উনিশ শতকে বাউল ধ্বংসে ফতোয়া তো লেখা হয়েছিল।

শাহ আবদুল করিম, দূরবীন শাহ, সিতালং শাহ, আরকুম শাহ, শাহ নূর এঁরা একভাবে ঈশ্বরকে পাচ্ছেন; আর সাঁইজি, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, এঁরা আরেকভাবে পাচ্ছেন। বীরভূমে নবনী ক্ষ্যাপা, সুধীর ক্ষ্যাপা এঁরা আরেকভাবে পাচ্ছেন। এঁদের তো আসলে বলে গৌণধর্ম সম্প্রদায়। যে ধর্ম সম্প্রদায়গুলো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মতের সাথে সংঘাত করে বেঁচে আছে। এঁদের কিন্তু একটা সংঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

আর দেখুন, একটা জায়গায় তো ওঁরা একটা বৃহৎ মানুষের অংশ। এটার হয়ত কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই, কিন্তু প্রচলিত আছে যে, ঠাকুর বাড়ির জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কাঙাল হরিনাথের পক্ষ নিয়ে সাঁইজি লাঠি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। অর্থাৎ এর সত্যতা থাকুক আর নাই থাকুক, মানুষ তো নিরূপণ করছে যে, আমার সাঁইজি হলেন ‘এই’।

এভাবে কিন্তু তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। একই কথা শাহ আবদুল করিমের ক্ষেত্রেও খাটে। নইলে তার বৌ যখন মারা যায়, মৌলভীরা কেন বলছে যে, আমি তার দাফন করব না। উনি নিজেই খাটের তলায় দাফন করে দিচ্ছেন স্ত্রী সরলাকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি নামাজ পড়েন, রোজা করেন? বললেন, না।

আমি বললাম, আপনি আল্লাহকে বিশ্বাস করেন? বললেন, হ্যাঁ। তাহলে নামাজ পড়েন না যে? একথা বললে তিনি বললেন, আল্লাহ এত ছোট নাকি যে তিনি আকাশ থেকে দূরবীন দিয়ে দেখছেন আমি নামাজ পড়ছি কিনা! আল্লাহ অনেক বড় ব্যাপার। আল্লাহ (স্রষ্টা) অফিসের বস না।

আপনাকে কোন শিল্পী বা ঘরানা বেশি আলোড়িত করে?

দেখুন, আলোড়িত তো সব শিল্পীই করে। এটার নানারকম বিষয় আছে। আজ আমি যখন লালনের গান করছি, তিনি কে, কী রকম এসব আমার জানার দরকার নেই। আমি তাঁকে তার গানের ভেতর দিয়ে পাই। আমার কাছে, লালনের গানই মুখ্য, সে গৌণ। আর এটা তো সত্যি, লালনের গান ছাড়া প্রামাণ্য প্রায় কিছু নেই। যা ভাবা হয়, তার সবটাই কল্পনা। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, যে মানুষটা অক্ষর জানেন না, তিনি লিখছেন, ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’। শব্দটা পাচ্ছেন কোথা থেকে? সেই মানুষটা যে টেক্সট বানাচ্ছেন, এ তো তার শাস্ত্রের উপর শাস্ত্র পড়া। বৈষ্ণব শাস্ত্র থেকে কুরআন থেকে তুলে তুলে উদ্ধৃত করছেন। এগুলো বাদ দিন, এই যে আরশীনগর একটা শব্দ, এই শব্দটাই তো উনার জন্ম দেওয়া।

আপনার সাথে অনেক কথা হল, জানা হল। আপনাকে ধন্যবাদ।

দোহারের পক্ষ থেকে আপনাকে ও সকল বাংলা ভাষাভাষি মানুষকে আমাদের শ্রদ্ধা-স্নেহ ও ভালবাসা জানাচ্ছি।

******************************************************

 


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা