সংশয়ের সাহিত্য

লেখক : মাসুদ পারভেজ

সাহিত্য কী? এমন প্রশ্নের জবাবে হরহামেশা উত্তর পাওয়া যায় : সাহিত্য হচ্ছে মনের খোরাক। তখন আবার প্রশ্ন জাগে মন কী? এই প্রশ্নের জবাবে কতক মানুষের নাম আসে যেমন : ফ্রয়েড, লাকাঁ।  তো এখন মন নিয়ে মাতামাতি থাক। খোরাক ব্যাপারটায় আসা যাক। খোরাক ভদ্রমহলে ব্যবহৃত শব্দ না। এই শব্দখানা গাঁওগেরামে বিশেষ করে গতরখাটা/কামলাখাটা মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন : আধখোরাকি, দিনখোরাকি এইরকম। তো খোরাক শব্দটা খাবার অর্থে ব্যবহৃত হয়। খাবারের সঙ্গে ক্ষুধা জড়িত। আর ক্ষুধা ব্যাপারটার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত। আর এহেন কারবারের মধ্য দিয়া আমি সাহিত্য ভাবনা চিন্তা করি। তাই সাহিত্য আমার কাছে রাজনীতি/পলিটিক্স। আর এই পলিটিক্স মূলত ভাষা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যদিও পৃথিবীর তাবৎ কিছুর মূলে ভাষা। তো ভাষার পলিটিক্স ব্যাপারটায় চমস্কি, ফুকো, দেরিদা এহেন ব্যক্তিবর্গের নাম আর কারবার এসে হাজির হয়। এক্ষণে সেদিকেও যাওয়া আপাতত বন্ধ। সাহিত্য যেহেতু আমার কাছে রাজনীতি তাই সাহিত্যচর্চা হলো রাজনীতিচর্চা। তো ব্যাপারটা কেমন হতে পারে মানে এই রাজনীতিচর্চা? বাংলা সাহিত্যের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। ইতিহাস এ পর্যন্ত চর্যাপদকেই বাংলার প্রাচীন সাহিত্য নিদর্শন হিসেবে মানছে। তো ওইসব চর্যার একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে। বৌদ্ধ আর পাল শাসনামল এই ইতিহাসের নির্মিতি। আর বৌদ্ধ সহজিয়াদের এই সাধন সঙ্গীতের গভীরতলে নিজেদের দেশকালের পরিচয়ও আছে। যাক সেসব কথা। রাজনীতির কথায় আসা যাক। রাজনীতি ব্যাপারটার সঙ্গে একটা রাজরাজড়া ভাব আছে। আর রাজরাজড়া মানে তো সেই সামন্তকাল। আর সামন্তকাল মানে তো রাজা খুশ তো সবকুচ। অর্থাৎ রাজাকে রাজা খুশি করতে পারলে সব মিলবে। সেই সামন্ত যুগে সাহিত্যচর্চাটাও তো তাহলে একধরনের রাজনীতি যা দ্বারা রাজাকে খুশি করে উপরি পাওনা মিলে। আবার বিপরীত অবস্থাও ঘটে ফলত জান কুরবানও হয়। এসবের মধ্যে রাজা বাদশাহর পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যচর্চার নিদর্শন অনেক আছে। আর এখানেই ব্যাপারটা প্যাঁচ খায়। সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলছে বুঝা গেলো কিন্তু পৃষ্ঠপোষক কে হবে? সাহিত্য যদি রাজনীতি হয় তাহলে সাহিত্যিকের নিশ্চয়ই একটা মেনিফেস্টো থাকবে। এখানেই সবচেয়ে বড়ো বিপত্তি ঘটলো। সামন্ত যুগে সরাসরি রাজা কিংবা বাদশাহর রাজসভায় পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে রাজকবি তকমা পেয়েছেন অনেকেই। সামন্ত যুগ বিলীন হলে সময় পেরিয়ে যখন পুঁজিবাদের উত্থান হলো তখন পৃথিবীর অনেককিছুর হালহকিকত পাল্টে গেলো। পুঁজিবাদের সময়কেন্দ্রিক তিন স্তর যেমন : একচেটিয়া পুঁজিবাদ, বাজারি পুঁজিবাদ, আর সর্বশেষ বহুজাতিক পুঁজিবাদ দেখা যায়। সর্বশেষ যে স্তর বহুজাতিক পুঁজিবাদ সেই যুগের মানুষ আমি। আর এই যুগে কে হবে আমার সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক কিংবা কী হবে আমার সাহিত্যিক মেনিফেস্টো যখন বহুজাতিক পুঁজিবাদের যুগে সবকিছুই পণ্য হিসেবে দেখার প্রবণতা চালু হয়েছে। ফলত মায়ের আদর থেকে বাবার আবেগ, দেশপ্রেম থেকে শরীরীপ্রেম সবকিছুই এখন পণ্য। যেমনটা দেখা যায় টেলিভিশনে মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপণের প্রচারে দেশপ্রেমের হুড়োহুড়ি। ব্যাপারটায় নজর দেওয়া যাক। এইসব বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানি বাণিজ্য করতে আমার দেশে আসে আর বাণিজ্য করে মুনাফা নেয় তার নিজ দেশে। তো সেই বহুজাতিক কোম্পানি যখন তার পণ্যের প্রচারে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি বানায় তখন এইসব আবেগী ইতিহাস পণ্যে পরিণত হয়। মূলত তারা এইসব আবেগ ব্যবহার করে খদ্দের খোঁজে। তো সাহিত্যচর্চাটাও কি তেমন খদ্দের খোঁজা অবস্থা কি-না সেটা একটা প্রশ্ন? প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী সবুজ পত্রের মুখপত্র রচনায় উল্লেখ করেন, সভাসমিতি করে সাহিত্যচর্চা হয় না। কিন্তু বহুজাতিক পুঁজিবাদের এই যুগে সভাসমিতিই যেনো সাহিত্যচর্চার কারিগরি দায়িত্ব নিয়েছে। তো এইসব সভাসমিতি করনেঅলা কিংবা আয়োজন করনেঅলারা নিজের সাহিত্য অপেক্ষা ব্যক্তি নিজেরে জানান দিতে ব্যস্ত। আর ব্যক্তি পরিচিতির মাধ্যমে তার সাহিত্য পণ্য/প্রোডাক্ট হয়ে খদ্দেরের কাছে যাবে। এইখানে ব্যক্তিরে আর কী-বা বলা যাবে যখন সে নিজেই একটা করপোরেট প্রোডাক্টের কবলে নিজের অস্তিত্ব সংকটে দিনানিপাত করে। তো তিনি যদি সাহিত্যচর্চা করেন তাহলে সাহিত্যেরও বহুজাতিক পণ্যের মতোই প্রচার আর প্রসার আশা করেন। শিল্পকলার যেকোনো বিষয়ে যতো সহজে খদ্দেরের কাছে পরিচিত হওয়া যায় সাহিত্য তেমনটা নয়, এই ব্যাপারটা উপলব্ধির বোধ আর তখন তাদের থাকে না। ফলত তারা প্রচারকের ভূমিকায় নামে। তখন একটা প্রশ্ন খাড়া হয় যে, সাহিত্য তো নিজেই একটা মাধ্যম আর ওই মাধ্যম যখন নিজেকে প্রকাশ করার জন্য আরেক মাধ্যমের তল্পি ধরে খাড়াতে চায় সেটা পরজীবী হয়ে যায় কি-না। বিশেষ করে বইমেলাকে কেন্দ্র করে যখন বিভিন্ন টেলিভিশন আর পত্রিকায় লেখক হাজির হয়ে নিজেকে জানান দেয় তখন তার সাহিত্যটা পণ্য ছাড়া আর কিছুই হয় না, আর সে নিজেই তার পণ্যের বিজ্ঞাপণের চরিত্র কিংবা পণ্যদূত। তো প্রশ্ন জাগে সাহিত্যজগতে এটাকে স্বাভাবিক বলা যাবে কি-না? আর তখন আমার কেবলই মনে হয়, সাহিত্যচর্চা এজন্যই রাজনীতি। তখন সেই সাহিত্যিক ঠিক করবেন তার সাহিত্য নামক রাজনীতিচর্চার মেনিফেস্টো। তিনি কোথায় লিখবেন আর কোথায় লিখবেন না সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে আহমদ ছফা নামক একজন লেখকের কথা বলা যাক। যিনি কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। ব্যক্তি আহমদ ছফা সম্পর্কে যারা জানেন তারা বুঝবেন তার এই প্রত্যাখ্যানের হেতু। যখন হাল আমলে কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর দৈনিক পত্রিকার সমন্বয়ে সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয় তখন পুরস্কারপ্রাপ্তদের ভাষ্যটা এমন থাকে যে, পুরস্কারপ্রাপ্তির ফলে তার বইটা পাঠক কাটতি হবে, পাঠক বইটা সম্পর্কে জানবে। তখন বলার থাকে যে, বইয়ের ভেতরে যে উপাদান কিংবা বইটার সাহিত্যিক মান কিংবা গুণাগুণ কি একটা পুরস্কার পাওয়ার পর বেড়ে গেলো নাকি পূর্বে ঘাটতি ছিলো আর পুরস্কারের পর তা কেটে গেলো। আহমদ ছফার লেখা পুরস্কার পাওয়া কিংবা না পাওয়ার ওপর নির্ভর করে পাঠকের কাছে পরিচিতি লাভ করে নাই। আবার সকলেই আহমদ ছফা হবে এমন ভাবনাও ঠিক নয়। তো এ প্রসঙ্গে পত্রিকায় লেখা ছাপানোর ব্যাপারটাও চলে আসে। তখন কেন্দ্র আর প্রান্ত একটা জরুরি প্রশ্ন হয়ে খাড়া হয়। ঢাকাবাসী কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক যে মিডিয়া প্রসার তা রাজধানীর বাইরে মানে প্রান্তে থেকে একজন মানুষের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। যদিও বলা হয়ে থাকে ইন্টারনেটের এই আমলে কেন্দ্র-প্রান্ত বলতে আর কিছুই থাকবে না। তবে এটা গ্রহণ করার মতো কোনো ভাষ্য নয়। শ্রেণিবিভাজন কিংবা শ্রেণিবৈষম্য সমাজে জারি থাকলে কেন্দ্র আর প্রান্ত থাকবেই। তো সেই খাতিরে ঢাকাবাসী একজন মিডিয়ায় যে-ধরনের পরিচিতি পান ঢাকার বাইরে থেকে তা পাওয়া সম্ভব হয় না। আর প্রচারেই প্রসার ব্যাপারটা যখন সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও ঘটে তখন সাহিত্য অপেক্ষা সাহিত্যিকের নিজের নাম প্রচারই মুখ্য কর্ম হয়ে ওঠে। বিগত সময়ে ঢাকা শহরে দেখা গেছে প্রকাশিত বইয়ের পোস্টার দিয়ে শহরের দেয়াল ভরে দেওয়ার দৃশ্য কিংবা পকেট ক্যালেন্ডার বানিয়ে বইয়ের নাম আর লেখকের ছবি দিয়ে ফ্রি বিতরণের মচ্ছব, লেখকের জন্মদিনের শুভেচ্ছা পোস্টার সাটানোর সময় লেখকের নিজের তদারকি। মার্কেটিংয়ের এইসব করপোরেটীয় স্টাইল দেখে প্রশ্ন আসে, সাহিত্যচর্চাটা আসলে কতোটা পণ্য কিংবা সাহিত্য পণ্য হিসেবে কতোটা লাভজনক? বহুজাতিক পুঁজিবাদের এইযুগে এইসব প্রশ্নের ভীড়ে ঢাকার বাইরে আবাস নিয়ে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে আমি সংশয়ে থাকি। যদিও সাহিত্যচর্চা আমার কাছে রাজনীতি তারপরও আমার মনে হাতছানি দেয় করপোরেট পুরস্কারের চাকচিক্য, ক্যামেরার ক্লিক, মাইক্রোফোন আর পত্রিকার পাতা জুড়ে নাম। আর তেমনটা হলে চোখ বন্ধ নিজেরে প্রবোধ দিব রাজনীতিতে শেষ কথা বলে তো কিছু নেই। ফলত আজিকালি নিজেরে : জীবনযাপনে আহমদ ছফা, লেখালেখিতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বাক্য বিনিময়ে হুমায়ুন আজাদ, মিডিয়া কাভারেজে সৈয়দ হক, আর বই বেচাবিক্রির বেলায় হুমায়ূন আহমেদ হতে ইচ্ছে করে। ফলত ‘ধর্মেও আছি জিরাফেও আছি!’


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা