সবুজপত্রের শতবর্ষ স্মরণ (১৯১৪-২০১৪) বিশেষ ক্রোড়পত্র

ক্রোড়পত্র
সবুজপত্রর শতবর্ষস্মরণ
(১৯১৪-২০১৪)

উৎসর্গ
সরদার ফজলুল করিম
বিরল উজ্জ্বল বাতিঘর ছিলেন…
জন্ম : ১৯২৫ মৃত্যু : ২০১৪

শতবর্ষের সবুজপত্র  ।। অভিমত
সবুজপত্র ।। হাসান আজিজুল হক
সবুজপত্রের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে। এই পত্রিকা প্রকাশের পিছনে একটা নতুন ভাবনা ছিল। তার ওপর এই পত্রিকার সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী। নতুন মাত্রা তো থাকবেই। একশ বছর আগে সবুজপত্র যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে তারা যে কাজটি করতে শুরু করলেন, তখনকার বাংলা ভাষার সঙ্গে আজকের ভাষার সম্পর্ক শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ালো, সেই জায়গা থেকে আজকের ভাষা-পরিস্থিতি একটু বুঝে নেওয়া দরকার।
এখানে একটা ব্যাপার, সবুজপত্রের সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। রবীন্দ্রনাথের লেখালেখির মধ্যে পরিবর্তন এলো। সেটা কি সবুজপত্রের জন্যেই? মনে রাখতে হবে সাধুভাষাতে লেখাও সবুজপত্রে ছাপা হতো। তবু চলিত প্রমিত ভাষার চলটা সবুজপত্রেই শুরু হয়েছিল। ভাষা এমনি পাল্টায় না। এটা যান্ত্রিক কোনো বিষয় নয়। নিশ্চয়ই সমসাময়িক, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের জীবনযাত্রা, তার স্বপ্ন দেখা, বাস্তব আচরণ এগুলোও পাল্টে যাচ্ছিল বা পাল্টাতে শুরু করেছিল। কথা কঠিনই হোক বা সহজই হোক, প্রকাশটা সহজ হওয়া দরকার প্রমথ চৌধুরীই এটা প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন।
সবুজপত্রের প্রথম প্রকাশ ১৩২১-এর ২৫শে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে। আমি সবুজপত্রের বেশি কপি হাতে পাই নি। তবে সবুজপত্রের অনেক লেখা দেখেছি, প্রমথ চৌধুরীর অনেক লেখাই পড়েছি। আমার কাছে ছিলো, হয়তো এখনও আছে, বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত প্রমথ চৌধুরীর গল্প। যে সময়টার কথা বলছি সে সময়টায় পৃথিবীই ঢুকছিল এক নতুন বাস্তবতায়। বলকান রাষ্ট্রগুলির ওপর নজর পড়ল ইউরোপের প্রায় সবদেশের। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য, তুরস্ক সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লÑবিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া। সাম্রাজ্য ভেঙে না ফেললে নতুন বিশ্ব গড়ে তোলা যাচ্ছে না।
এক যুদ্ধে সেটা ঘটবার ছিলো নাÑসে জন্য আরও একটা যুদ্ধের প্রয়োজন পড়লো একুশ বছর পর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরবরা স্বাধীনতা চাইলো তুরস্ক সাম্রাজ্যে থেকে, ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়ে গেলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক হয়ে গেল ইউরোপ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পালে লাগল হাওয়া। এই সময়টাই সবুজপত্রের আত্মপ্রকাশের কাল। গতি চাই, খোলস ঝেড়ে ফেলতে চাই, পুরনোকে বিদায় করতে চাই, নতুনের আবাহন চাই। এই হলো সবুজপত্র প্রকাশের পটভূমি।
রবীন্দ্রনাথ তখন মাঝবয়সী। ১৯১৩-তে তিনি নোবেল পেলেন। গোটা বিশ্বের সামনে ভারতের বিশাল ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ। গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন শুরু, হিন্দু-মুসলমানের জন্যে সাময়িক একটা সম্প্রীতি-বন্ধন তৈরি হয়েছে। বৃটিশ বিরোধিতার জন্য পশ্চাদমুখী খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এক হয়েছে। গতি, আত্মশক্তি, দ্রোহ দেখা দিচ্ছে সমাজের মধ্যে। সাহিত্যেও তার প্রতিফলন যে পড়বে সেটা স্বাভাবিক। সবুজপত্র এই সময়কার পত্রিকা। সাহিত্যে ভাষাবদলের একটা সূত্র এখান থেকেই মেলে। রবীন্দ্রনাথও তো চলছেন গতি প্রগতির ভিতর দিয়েই। তাঁর চিন্তা প্রসারিত হচ্ছে বিশ্বের দিকে, সাহিত্যে পড়ছে তার ছাপ। প্রমথ চৌধুরী তো অসাধারণ মানুষ। বৃদ্ধিবৃত্তির চর্চায় তার মতো মানুষ দুর্লভ। তাঁকে আধুনিকতার অগ্রদূত বললে মিথ্যে বলা হয় না। সবুজপত্রে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখতেন। তখনকার বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে এঁদের পরিচয়। আধুনিক চিন্তার সঙ্গে আধুনিক ভাষা দেখা দেবে না কেন? রবীন্দ্রনাথের ভাণ্ডার অক্ষয়তাঁর প্রতিভা, তখন তো বটেই, আজও উত্তুঙ্গ। তাঁর হাতে ভাষা পেল সহজগতি, চিন্তার পরিচ্ছন্নতা, অদৃষ্টপূর্ব। কাব্যসৃষ্টিও বিশ্বমানের। কে কাকে সমৃদ্ধ করেছে বলা মুশকিল। সবুজপত্র রবীন্দ্রনাথকে, না রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রকে।
আমার মনে হয় সবুজপত্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা করতে গেলে সবুজপত্র পড়তে হবে। সত্তর, আশি বা একশ বছর পরে সবুজপত্রের ভাষার যে রীতিটা কি টিকে গেছে? এটা কি থাকবে?

ক্ষণজন্মা সবুজপত্র ।। মাহবুবুল হক
শতবর্ষ আগে বিশ শতকের গোড়ায় যে বিখ্যাত মাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পালাবদল রচনায় আসামান্য অবদান রেখেছিল তার নাম সবুজপত্র। এর সম্পাদক ছিলেন বাংলাদেশের পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী বংশের সন্তান প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে পাবনায়। কৈশোরের দিনগুলি কৃষ্ণনগরে। যৌবনে কিছুকাল ছিলেন বিলেতে তারপর কলকাতায়। আর তাঁর শেষ জীবন কেটেছে কলকাতায় ও শান্তিনিকেতনে। তিনি ছিলেন দর্শনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে। আর ব্যারিস্টারি পাস করেছিলেন বিলেত থেকে। ছাত্রাবস্থায় সখের বশে শিখেছিলেন ফরাসি ভাষা।
চিন্তা ও মননে প্রমথ চৌধুরী ছিলেন যুক্তিবাদী। সূক্ষ্ম রসবোধ, ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি, মার্জিত রুচিবোধ, নাগরিক সংস্কৃতি ইত্যাদি মানস বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত সবুজপত্রে এসব গুণের প্রতিফলন ঘটেছিল। এই পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল তরুণ লেখকদের একটি দল। তাঁরা পরিচিত হয়েছিলেন ‘সবুজপত্র গোষ্ঠী’ নামে। এঁরা ছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ, বিশ্বমুখী, বুদ্ধিবাদী, ও পরিশীলিত রুচির অধিকারী।
সবুজপত্রের লেখকরা প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে এক নতুন সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেই আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল তারুণ্য ও যৌবন। সবুজপত্রের প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ২৫এ বৈশাখ ১৩২১ বঙ্গাব্দে (৭ই মে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ)। এই সংখ্যায় সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় ‘সবুজপত্র : মুখপত্র ওঁ প্রাণায় স্বাহা’ শিরোনামে। সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী তাতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, নিছক নতুন কিছু করার তাগিদ থেকে নয়, বরং বাঙালির জীবনে যে নতুনত্ব এসে পড়েছে তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই পত্রিকাটির প্রকাশ। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালির জীবনে যে জড়তামুক্তি ঘটছে সেই ধারায় নতুন সাহিত্য সৃষ্টি সবুজপত্রের লক্ষ। সম্পাদক  লেখেন:
যে সব লেখায় নবজীবনের আদর্শ প্রতিফলিত হবে তাকেই সযতেœ সবুজপত্রাধারে রক্ষিত করা হবে। … দেশের অতীত ও বিদেশের বর্তমান, এই দুটি প্রাণশক্তির বিরোধ নয়, মিলনের উপর আমাদের সাহিত্যের ও সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আশা করি, বাঙলার পতিত জমি সেই মিলনক্ষেত্র হবে। সেই পতিত জমি আবাদ করলেই তাতে যে সাহিত্যের ফুল ফুটে উঠবে, তাই ক্রমে জীবনের ফলে পরিণত হবে। … আমাদের এই ক্ষুদ্র পত্রিকা, আশা করি, এ-বিষয়ে লেখকদের সহায়তা করবে।
তরুণ লেখকদের সবুজপত্রে সাহিত্যচর্চার আহ্বান জানিয়ে সম্পাদকীয়তে লেখা হয় : ‘আমাদের বাংলা ঘরের খিড়কি দরজার ভিতর প্রাচীন ভারতবর্ষের হাতি গলাবার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের গৌড় ভাষার মৃৎকুম্ভের মধ্যে সাত সমুদ্রকে পাত্রস্থ করতে হবে।’ পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যোগসূত্র রচনার আহ্বান জানিয়ে সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যাতেই প্রমথ চৌধুরী  লেখেন :
ইউরোপের স্পর্শে আমরা, আর কিছু না হোক, গতি লাভ করেছি, অর্থাৎ মানসিক ও ব্যবহারিক সকল প্রকার জড়তার হাত থেকে কথঞ্চিৎ মুক্তি লাভ করেছি। এই মুক্তির ভিতর যে     আনন্দ আছে সেই আনন্দ হতেই আমাদের নবসাহিত্যের সৃষ্টি। সুন্দরের আগমনে হীরা মালিনীর ভাঙা মালঞ্চে যেমন ফুল ফুটেছিল, ইউরোপের আগমনে আমাদের দেশে তেমনি সাহিত্যের ফুল ফুটেছে। তার ফল কি হবে, সে কথা না বলতে পারলেও এই ফুল ফোটা যে বন্ধ করা উচিত নয়, এই হচ্ছে আমাদের দৃঢ় ধারণা। সুতরাং যিনি পারেন, তাঁকেই আমরা ফুলের চাষ করবার উৎসাহ দেব।
প্রথম সংখ্যায় বীরবল ছদ্মনামে প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। উদ্বোধনী এ সংখ্যাটিতে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘সবুজের অভিযান’ কবিতাটি ছিল নবযাত্রার প্রেরণাদীপ্ত। ঐ সংখ্যাটিতেই প্রকাশিত হয় তাঁর আরও দুটি লেখা : ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ (প্রবন্ধ) ও ‘হালদার গোষ্ঠী’ (গল্প)।  এছাড়া ঐ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল  সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সবুজ পাতার গান’ কবিতাটি।
সবুজপত্র ছিল মূলত প্রবন্ধনির্ভর পত্রিকা। তবে বিষয়বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্যে কবিতা, গল্প, ধারাবাহিক উপন্যাস, টীকাটিপ্পনী ইত্যাদি পরিবেশিত হতো। পরে সবুজপত্রে প্রকাশিত লেখার ওপর আলোচনাও প্রকাশিত হতে থাকে। এই পত্রিকার বিশেষ কিছু লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। এতে মনোরঞ্জনমূলক কোনো ফিচার থাকত না। এমনকী কোনো বিজ্ঞাপনও ছাপা হতো না। সবুজপত্রে কখনো কোনো ছবি বা কোনো রকম অলংকরণ  মুদ্রিত হয়নি। সবুজপত্রের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী নন্দলাল বসু। প্রচ্ছদ ছিল গাঢ় সবুজ রঙের। তার ওপরে একটা সাদা তালপাতা চিত্রিত হয়েছিল। তালপাতা ছিল ভারতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক আর সবুজ পাতা ছিল নবজীবনের বাণীবাহক।
সবুজপত্র বাংলা সাহিত্যে পালাবদলের সূচনা করেছিল। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি লেখকদের মনোজগতে ইতিহাস-চেতনা ও সামাজিক নীতিবোধের যে ব্যাপক প্রকাশ ঘটেছিল সে ধারায় এনেছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন। এখানে প্রকাশিত বিভিন্ন রচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল সামাজিক নানা সংস্কার থেকে সার্বিক মানসমুক্তির আকাক্সক্ষা  এবং সেই সঙ্গে বুদ্ধিবাদিতা, যুক্তিবোধ, ও রুচিশীলতা।
সবুজপত্র ছিল যৌবন ও তারুণ্যের দীপ্তিময় পত্রিকা। এই গোষ্ঠীর প্রধান লেখক ছিলেন দুজন : প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্য লেখকদের মধ্যে ছিলেন : অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশঙ্কর রায়, সতীশচন্দ্র ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বপতি চৌধুরী, হারীতকৃষ্ণ দেব, বরদাচরণ গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বীরেশ্বর সেন ও ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী প্রমুখ।
পত্রিকাটিকে ঘিরে যে তরুণ লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তাঁদের আসর বসত প্রমথ চৌধুরীর বাড়িতে। সেই আসরে তাঁরা সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনায় মেতে উঠতেন। সেটি ছিল আধুনিক বিদ্যাচর্চার এক ধরনের ঘরোয়া আসর। সেখানে অঁরি বের্গসঁ, ম্যাকস প্ল্যাঙ্ক, বার্ট্রান্ড রাসেল, জর্জ বার্নার্ড শ, বেনেদেত্তো ক্রোচে, সিগ্মুন্ড্ ফ্রয়েড, জন য়ুং, আলফ্রেড অ্যাডলার প্রমুখ ইউরোপীয় মনীষীদের কর্ম ও অবদান নিয়ে আলোচনা হত। এইসব আলোচনার প্রভাব সবুজপত্রের লেখকদের লেখায় পড়েছিল। ফলে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য আধুনিক মননশীল ধারায় উত্তরণ ঘটেছে।
বাংলা সাহিত্যে কয়েকটি দিক থেকে সবুজপত্র সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো যুক্তিবোধ ও ইহজাগতিকতার আলোকে বিষয় বিচার, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সংস্কৃতিসাধনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান আলোচনা, আবেগমুক্ত বস্তুনিষ্ঠতা ইত্যাদি। আর অন্যদিকে সবুজপত্রের লেখকের রচনারীতির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল চলিত গদ্যরীতি ও সরল প্রকাশভঙ্গি অনুসরণ।
কেবল খাঁটি সাহিত্যচর্চাতেই সবুজপত্র সীমাবদ্ধ ছিল না। তার আলোচনার পরিমণ্ডল ছিল বহু বিস্তৃত। সাহিত্যের পাশাপাশি আধুনিকতা, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, রাষ্ট্রনীতি, প্রতœতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব¡ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রসারিত ছিল আলোচনার ক্ষেত্র। বাঙালি লেখকরা যেন চিন্তা ও মননে পাশ্চাত্যের আধুনিক লেখকদের সমপর্যায়ের হয়ে ওঠেন এই ছিল পত্রিকাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ কাজে পুরোধা ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। পত্রিকাটির মননশীলতা, বাগবৈদগ্ধ ইত্যাদি  সেকালে আকৃষ্ট করেছিল বাঙালি বিদগ্ধ ও রসগ্রাহী পাঠকদের।
সবুজপত্র সম্পাদনায় প্রমথ চৌধুরীকে সাহায্য করতেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ও সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। এই পত্রিকার অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এই পত্রিকার সঙ্গে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজভাবনামূলক কিছু প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘কালান্তর’ গ্রন্থে সংকলিত তাঁর ‘বাতায়নিকের পত্র’ প্রবন্ধটি এখানে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ‘অপরিচিতা’,
‘হৈমন্তী’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘পয়লা নম্বর’ ইত্যাদি গল্পও প্রকাশিত হয়েছিল সবুজপত্রে। এ ছাড়া এই পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাস। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মনোজগতে এবং ভাষরীতির আধুনিকতার বিকাশে সবুজপত্র বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। এটি সবুজপত্রের বিশেষ অবদান। রবীন্দ্রনাথ তাই সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর কাছে ঋণ স্বীকার করেছিলেন অকুণ্ঠভাবে। ১৯৪১ সালে প্রমথ চৌধুরীর সংবর্ধনা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘প্রমথ চৌধুরীর গল্পসংগ্রহ’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন :
প্রমথর আহ্বানমাত্রে সবুজপত্র বাহকতায় আমি তাঁর পার্শ্বে এসে দাঁড়িয়েছিলুম। প্রমথনাথ     এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনার একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। … সবুজপত্রে সাহিত্যের এই একটি নূতন ভূমিকা রচনা প্রমথর প্রধান কৃতিত্ব। আমি তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হইনি।
সুনীতিকুমারের ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সবুজপত্রে। অতুল গুপ্ত তাঁর ‘কাব্যজিজ্ঞাসা’ গ্রন্থের অলংকার বিষয়ক প্রবন্ধগুলি এখানেই প্রথম প্রকাশ করেছিলেন।
প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে সবুজপত্র বাংলা ভাষারীতিতে যে আন্দোলনের সূচনা করে তা হল চলিত ভাষারীতির একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। অমার্জিত কথ্যবুলিকে সযতেœ পরিহার করে সবুজপত্রের মাধ্যমে মার্জিত রুচিশীল পরিশীলিত চলিত রীতিতে তিনি গদ্য চর্চার আন্দোলনে ব্রতী হন। এই আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল।
সবুজপত্র ছিল ক্ষণজন্মাআক্ষরিক ও ব্যঞ্জিত এ দুঅর্থেই। এই পত্রিকা ঘিরে রবীন্দ্রনাথ অনেক ঊঁচু আশা পোষণ করেছিলেন। প্রবীণতার বর্ণহীন, নীরস মরুভূমিতে তিনি এই পত্রিকাকে মরূদ্যান বা ওয়েসিস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। সর্বব্যাপী জ্যাঠামির চাপের মধ্যেও পত্রিকাটি যেন দীর্ঘকাল সজীব থাকে সেই প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু প্রায় তেরো বছর অনিয়মিত চলার পর সবুজপত্র ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
সবুজপত্র ছিল আধুনিক চিন্তা-চেতনার মুখপত্র। তাতে সজীব চলিত ভাষা, যুক্তিনির্ভর নির্মেদ ও নিরাবেগ রচনারীতি, মননঋদ্ধ রচনা ও আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যচিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল। এ কারণে পত্রিকাটি বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় বিপিনচন্দ্র পাল পরিপুষ্ট ‘নারায়ণ পত্রিকা’ রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর চলিত ভাষা ও আধুনিক চিন্তাধারা প্রবর্তনের প্রয়াসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবে তাদের প্রচেষ্টা বিফলে যায়। ক্রমে চলিত ভাষা ও আধুনিক চিন্তাধারার ধারক সবুজপত্রের জয় হয়।

সবুজপত্র : শতবর্ষের সজীবতা ।। অনিরুদ্ধ কাহালি
অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার পরে এখন এটি প্রতিষ্ঠিত যে, কোনো অভিজাত ভাষা থেকে কিংবা কোনো কৃত্রিম বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষার জন্ম হয়নি। বাংলা ভাষার সৃষ্টি একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রাকৃত অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মুখে ব্যবহৃত ভাষা বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। যে ভাষার জন্ম রহস্যের মধ্যেই সাধারণ মানুষ এবং মুখের ভাষার সম্পর্ক আছে সেই ভাষা-আশ্রিত যে সাহিত্য সেই সাহিত্যের বাহনও হবে মুখ নিঃসৃত বাংলা ভাষাসাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনা তাই বলে। কিন্তু বাংলা গদ্যের সূচনালগ্নে তা ঘটেনি। তবে এই সূচনাকাল নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। আমরা আসলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগকেন্দ্রিক যে গদ্যচর্চা তাকেই সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছি। যদিও সে-গদ্য সাহিত্য হয়ে উঠেছে আরো পরে, তারপরেও নিঃসন্দেহে বলা যায় গদ্যসাহিত্যের মুখপাতটা সেখানেই। এগুলো সবই এখন সর্বজন স্বীকৃত প্রত্যয়।
কিন্তু যে গদ্যের চর্চা শুরু হলো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তার সঙ্গে আজকের গদ্যের পার্থক্যটা অনেক। না হওয়ারও কারণ নেই। সময়টাও মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে অনেকদুই শত বৎসরের অধিককাল। মহাকালের বিবেচনায় সময়টা হয়তো অনেক বড় নয়, কিন্তু সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাসে একেবারে কমও নয়। গদ্যের এই যে প্রবাহ সেই প্রবহমানতায় রয়েছে বহু মানুষের এবং প্রতিষ্ঠানের সচেতন বা স্বতঃস্ফূর্ত অবদান। একথাটিও সবারই জানা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল সাময়িকপত্রে। ব্যক্তি চিন্তাও সাময়িকপত্রের আশ্রয়ে ব্যষ্টির আকাক্সক্ষায় পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই ঘটনাটিই ঘটেছিল আজ থেকে শত বৎসর আগে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমী পণ্ডিত প্রমথ চৌধুরীর একই সঙ্গে শেকড়-সন্ধানী ও ভবিষ্যদ্মুখি চিন্তা স্বল্প কিছু মানুষের ঐকান্তিক সমর্থন নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ক্রমবর্ধিষ্ণু গদ্যধারাটিকে বেগবান এবং নবপল্ল¬বে সমৃদ্ধ করেছিল সবুজপত্র পত্রিকা। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখেও সবুজপত্র সম্পাদকের অনড় অবস্থান এবং রবিকবির সর্বাত্মক সমর্থন সবুজপত্রের চলার গতিকে করেছিল দৃঢ় ও অপ্রতিরোধ্য। একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বব্যাপ্ত প্রতিভা অন্যদিকে মাত্র কয়েকদিন আগে পাওয়া নবেল প্রাইজের খ্যাতি-অখ্যাতি(?) তখন ছিল সবুজপত্রের বড় পুঁজি। সাহিত্যে চলিত রীতি প্রবর্তন-প্রয়াস সবুজপত্রের মাধ্যমেই প্রথম হয়েছিল এমন নয়। তার পূর্বের ইতিহাসও একেবারে ক্ষুদ্র নয়। গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের প্রারম্ভেই প্রকাশিত মাসিক পত্রিকার (১৮৫৪) কথা অবশ্যই উল্লে¬খ করতে হয়। বিভিন্ন কারণ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলতেই পারে কেন সেই উদ্যোগ সফল হল না। চিন্তা ও বোধগত অসম্পূর্ণতা-তো থাকতেই পারে। কিন্তু ভাবনাটিকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। এর সঙ্গে পাঠক ও বুদ্ধিজীবী মহলের মানসিক প্রস্তুতির কথাও বিবেচনায় রাখা কর্তব্য। এরপর বিচ্ছিন্ন বিছিন্ন চেষ্টা কিংবা একক প্রয়াস বলাই হয়তো ভাল স্বামী বিবেকানন্দের রচনা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু পত্র-জাতীয় সৃষ্টিকর্ম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু প্রয়াস বির্তক থাকা সত্ত্বেও এ-প্রসঙ্গে উলে¬খযোগ্য। এই চিন্তার প্রথম উদ্গাতার সম্মান যদি কাউকে দিতে হয় তবে তিনি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর হওয়াই যুক্তিসঙ্গতইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত তাতে রক্ষিত হয়। কিন্তু কোনো আয়োজন ও চিন্তাই সেই কাজটি স¤পন্ন করতে পারেনি যার জন্য যুগ যুগ ধরে পাঠক তৃষ্ণার্ত ছিল নিজের অজান্তেই। ভারতচন্দ্রের পরে সার্ধশত বৎসরেরও অধিককাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল১৯১৪ সনে সবুজপত্রের আবির্ভাব পর্যন্ত। সবুজপত্র হারিয়ে যায়নি ফুরিয়েও যায়নি তার কারণ এর ভেতরের অবিনাশী প্রণোদনার জন্য। এর সংহত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ সর্বজনের প্রাণের খোরাক যোগাতে পেরেছিল। বাঙালি পাঠক নিজের রূপকে নিজের ভাষায় মূর্ত হতে দেখেছিল প্রথম এই পত্রিকার রচনাসমূহে। ফলে প্রচুর বিরোধিতার পরেও টিকে গিয়েছিল সবুজপত্র। এই সবুজপত্র টিকে গেল বা শতবর্ষ পরেও অবশ্য স্মরণীয় হয়ে রইল তা কি শুধু সাহিত্যে চলিত ভাষা প্রচলনের জন্যই। তা কিন্তু মনে হয় না। অবশ্যই চলিত ভাষা-চর্চা প্রধান কারণ, কিন্তু তার সঙ্গে আরও অনেক কারণও ছিল। আমাদের সাহিত্যে চলিত রীতির প্রয়োগ তখন হয়ে উঠেছিল সেই সময়ে অনিবার্য দাবিÑ সময়ের অন্তঃস্রোতে যেন সেই দাবি তৈরি হয়েছিল বহু যুগের বহু মানুষের সম্মিলিত আকাক্সক্ষার যোগফল হিসেবে। পক্ষ-বিপক্ষ ডামাডোলে তখন তা যত দৃশ্যমান ছিল শতবর্ষের এপার থেকে এখন তা আরো অনেক বেশি প্রয়োজনীয় ও অবশ্যম্ভাবী যে ছিল তা সহজ অনুমেয়। তাই সবুজপত্রের প্রধান অবদান হিসেবে মুখের ভাষার ব্যবহারই ইতিহাসে অক্ষয় স্বীকৃতি পেয়ে গেল।
এই মহৎ কীর্তির বাইরেও বাঙালি জীবনে সবুজপত্রের অবদান অনেক। ব্রাহ্মণ্যপ্রথার আধিপত্যে যে বর্ণ বিভাজন বাঙালি জীবনে অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছিল তা কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি সত্যি কিন্তু তার কালোস্রোত ক্ষীণকায় হলেও বহমান ছিল সর্বদাই। বর্ণবিদ্বেষ সংক্রামিত হয়েছিল ভাষা-সংস্কৃতিতেও। এটি বৈদিক যুগের সময় থেকেই অন্তঃস্রোতের মত বহমান ছিল। কিন্তু সব সময়ই শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতজনই মূলধারাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাংলা ভাষা তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিও। সবুজপত্র তার ভাষাকে সর্বজন-বোধ্য করে সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছিল। এই অসাম্প্রদায়িকতা ছিল সবুজপত্রের মৌল শক্তি। শুধু ভাষা-নির্বাচন নয় লেখার বক্তব্যে, লেখক বাছাইতে সর্বত্রই এই প্রবণতা ছিল অটুট। নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এই পত্রিকার লেখক ছিলেন। এখানে লিখেছেন শ্রীসরলা দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী, সোনামাখা দেবী, অনিন্দিতা দেবী, শ্রীইন্দিরা দেবীÑ বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নারী স্বাধীনভাবে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করছে সবুজপত্রের মত পত্রিকায় তৎকালের প্রথম সারির লেখকদের পাশাপাশি, একই সঙ্গে লিখছেন ওয়াজেদ আলি, তারিকুল আলম প্রমুখ। সময়ের বিবেচনায় এই উদারতা নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ। বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদের মধ্য দিয়ে বাঙালি জীবনে যে পরিবর্তনের হওয়া বইছিল সবুজপত্র যেন সেই চেতনারই বাহক হয়ে উঠেছিল।
সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে যে লেখক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল এবং যাঁদের কেন্দ্র করে বসত ‘সবুজ সভা’ তাঁরা সবাই জ্ঞান-বিদ্যা-পাণ্ডিত্যে বিশেষ করে মননশীলতায় ছিলেন অসাধারণ। তাঁদের মননচর্চায় নতুন পথ নির্দেশ করেছিল সবুজপত্র। সাহস করে এ-কথাটিও বলা চলে পরবর্তী সময়ে বাঙালির জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি, গবেষণা-সৃষ্টিশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এঁরাই দীর্ঘ সময় পরিস্রুত মানসিকতার লালন করেছেন এবং নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন। স্ব-স্ব যোগ্যতায় তাঁরা আলোকিত ছিলেন সত্য কিন্তু একত্র হওয়ার ফলে যে সংঘচেতনা জন্ম দিয়েছিল তা আমাদের সামগ্রিক জীবন-বিন্যাসের বাতিঘরে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এঁদের অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে যশস্বী হয়েছিলেন। নতুন লেখক-গবেষক সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সবুজপত্রের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কোনো কোনো লেখক পাণ্ডিত্যে নমস্য ছিলেন সত্য কিন্তু লেখার বেলায় বড় অনীহা ছিল তাঁদের। তাঁরা খুব বেশি লেখেননি কিন্তু যেটুকু লিখেছেন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে নব চেতনার ঔজ্জ্বল্যে।
হয়তো বলা যাবে না প্রথম, কিন্তু ধর্মের খোলস থেকে বেরিয়ে সংস্কারমুক্ত সর্বজনীন এবং শেকড়-সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে বাঙালি তথা ভারত-সংস্কৃতির রূপ-রূপান্তর অবলোকন সবুজপত্রের আরেকটি বড় কীর্তি। ইতিহাস-ধর্ম-রাষ্ট্র-দর্শন-শিক্ষা-সঙ্গীত-উৎসবসহ পারিবারিক জীবন অর্থাৎ বাঙালি জীবনের বহু প্রান্তস্পর্শী বিচার-বিবেচনা স্থান পেত সবুজপত্রে। শুধু সমালোচনা নয়, থাকত দিক্নির্দেশনাও। বয়সে তুলনামূলকভাবে প্রাজ্ঞ না হলেও চিন্তার অগ্রগামিতায় ও প্রাগ্রসর ভাবনায় সবুজপত্রের সৈনিকরা তখন সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন অনেকটাই। তাই বিরুদ্ধ সমালোচনা সবুজপত্রের কপালে কম জোটেনি। কিন্তু নতুনের আবাহনে পিছ-পা হননি তাঁরা। সমকালে সমালোচিত হলেও শতবর্ষ পরের বাঙালি হিসেবে বুঝতে সমস্যা হয় না তাঁদের চিন্তার মৌলিকতা এবং দূরদৃষ্টির প্রখরতা তখন কতটা প্রয়োজনীয় ছিল। তবে বার/তের বছরের সব সংখ্যায়ই সব রচনা থাকত তা অবশ্যই না। কখনো কখনো একটি লেখা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে একটি সংখ্যাতারপরও থেমে থাকেনি সবুজপত্র।
রবীন্দ্রনাথই যেহেতু সবুজপত্রের প্রধান লেখক, যদিও শুধু সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করলে তাঁকে খর্ব করে দেখা হয়, তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না সবুজপত্রের অনেকটা অংশ জুড়ে থাকত সাহিত্য। সাহিত্যের নানা দিকসৃষ্টিশীল সাহিত্যতো ছিলই সে-সঙ্গে ছিল সমালোচনা, গবেষণা ইত্যাদি। সাহিত্যকর্মের বিচিত্রমুখি ব্যবচ্ছেদ চলতো নানা জনের। এ-ক্ষেত্রে তিনটি প্রসঙ্গ গুরুত্ব দিয়ে বলা যায় : ক. সাহিত্যতত্ত্ব ও সৌন্দর্যতত্ত্ব বিষয়ক প্রবন্ধশুধু সৃষ্টি করা নয়, সৃষ্টির যথার্থ মান বিচারের মাপকাঠি তৈরির আকাক্সক্ষাও অভিব্যক্ত হয় এই সব লেখায়; ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রের প্রতিও গভীর অভিনিবেশ ছিল সবুজপত্রের লেখকদের; খ. তুলনামূলক সাহিত্য বিচার-পদ্ধতি বঙ্কিমচন্দ্রের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে শুরু হলেও সবুজপত্রে পাতায়ও তা গুরুত্বের সঙ্গে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ-কথা সবারই জানা তুলনামূলক পদ্ধতিতে সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী অবদান তাৎপর্যপূর্ণ; গ. অনুবাদমধ্যযুগ থেকেই আমাদের সাহিত্যে বিচিত্র ভাষা থেকে অনুবাদ শুরু হয়। পরিশীলিত ও পরিমার্জিত অনুবাদেও সবুজপত্রের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নারী-বিষয়ক চিন্তাতেও সবুজপত্রের প্রাতিস্বিকতা নিঃসন্দেহে স্মরণযোগ্য। নারী-সম্পর্কে ভারতবর্ষীয় বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে নারীর আত্মিক মুক্তির প্রসঙ্গ জোর দিয়ে প্রচার করেছিলে পত্রিকাটি। আগেই দেখেছি যে, নারী লেখকদের লেখা প্রায়শই ছাপা হয়েছে এই পত্রিকায়। অবস্থানগত কারণে, নিজস্ব পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রভাব ও সাগ্রহে অর্জিত শিক্ষা-দীক্ষার কথা বিবেচনা করে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণির কথা বাদ দিলেও আরো বেশ কয়েকজন নারী লেখকের লেখা ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন সংখ্যায়। শুধু নারী লেখকবৃন্দই নন পুরুষ লেখকরা নারীর পক্ষ হয়ে তাঁদের শৃঙ্খলমুক্তির প্রয়াস চালিয়ে ছিলেন। পুরুষ-লেখক নারীর ছদ্মনামে সমাজে নারীদের প্রকৃত অবস্থা চিত্রণেরও চেষ্টা করেছেন। ‘গৃহ-লক্ষ্মী’র মধুর সম্বোধনের কারণে এক ধরনের মায়ার জালে আবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে পুরুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিচিত্র কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণের আহ্বান ছিল নারী-বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গল্প ‘স্ত্রীর পত্র’ও প্রকাশিত হয় সবুজপত্রে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই নারী-ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর।
সবুজপত্রের বড় বিশেষত্ব হচ্ছে এর সময়-সমাজ সচেতনতা। সময় ও রাজনীতি তখন নানা যৌক্তিক কারণেই ছিল পরিবর্তমান। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি তখন আমাদের সংস্কৃতির ওপর আছড়ে পড়ার চেষ্টা করছে আর বিপরীত দিকে বিভিন্নভাবে উপনিবেশ-বিরোধী মানসিকতা তৈরি হচ্ছে ভারতবাসীর মনে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন তার প্রভাব গভীরতর হচ্ছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গের গ্রহণ-বর্জন নিয়ে চলছে দোদুল্যমানতা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তখন সুনির্দিষ্ট এজেন্ডার দিকে একাগ্র হচ্ছে। এই অবস্থার আঁচ থেকে দূরে ছিল না সবুজপত্র। সবুজপত্র গা ভাসায়নি তথাকথিত আধুনিকতার জোয়ারে আবার কট্টর পন্থা অবলম্বন করে দ্বার রুদ্ধও করে দেয়নি। তার দৃষ্টি ছিল ভারতবর্ষের দিকে। যা কিছু ভারতবাসীর জন্য ছিল সর্দ্থক তাকেই গ্রহণ করেছে সবুজপত্র; তার পক্ষেই ছিল পত্রিকাটির অবস্থান। সবুজপত্রের অন্তর্গত প্রণোদনাই ছিল তা। তার জন্য যদি কোনো বিশ্বাস ভাঙতে হয় সবুজপত্র তাতেও ভীত হয়নি। যাকে সত্য বলে জেনেছে সবুজপত্র তা জোরের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ ও ক্রমোন্নয়নে সহায়ক যে-কোনো কিছু গ্রহণের ব্যাপারে সবুজপত্রের উদারতা ছিল অসাধারণ।
এমনিভাবে আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি-ভাষা-ঐতিহ্যকে নানা দিক দিয়ে নবতর চৈতন্যের আলোকে সমৃদ্ধ করেছিল সবুজপত্র। এই পত্রিকার প্রাণপুরুষ ছিলেন প্রমথ চৌধুরী আর এর চালিকাশক্তি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই দুইজনের সঙ্গে ছিলেন আরো কয়েকজন যাঁদের চিন্তার উৎকর্ষে ভারতের ভাবজগতে নবতরঙ্গের সঞ্চার হয়েছিল। সবুজপত্র আসলে আমাদের সংস্কৃতির মূল প্রবাহকে স্পর্শ করতে পেরেছিল এবং এই প্রবাহে নতুন চিন্তা-চেতনার জলসিঞ্চন করে তাকে বেগবান করেছিল। শতবর্ষ আগের সেই মহৎ কীর্তি যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকেও কখনো ম্ল¬ান হয়নি। শতবর্ষ পরের বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাঙালির সংস্কৃতি আজও তা ধারণ করে রয়েছে প্রাণবান।

সবুজপত্রর প্রথমত্ব, প্রমথত্ব ।। মাসুদ রহমান
প্রমথ চৌধুরীর (১৮৬৮-১৯৪৬) নামের প্রথমাংশ উচ্চারণে যে ধ্বনিবিপর্যয় (metathesis) ঘটে যায় তার একটি কাব্যিক স্বীকৃতিও রয়েছে। ‘তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে’ নামীয় রফিক আজাদের সুখ্যাত প্রেমের কবিতার শুরুতে উত্তম পুরুষ (উত্তম প্রেমিক নয়, কারণ প্রেমের কথাটি কোনোদিনই সে বলে নি ভালবাসার জনকে) আত্মকথনে জানাচ্ছে কৈশোরকালের কথা : ‘তুমি যেসব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিলো। তোমার/ কথায় ছিলো গেঁয়ো টান, অনেকগুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণ:/ ‘প্রমথ চৌধুরী’কে তুমি বলতে ‘প্রথম চৌধুরী’।’ তবে সত্যিই প্রমথ চৌধুরী বাংলা ভাষাসাহিত্যের নানা প্রসঙ্গে প্রথম ব্যক্তিত্ব। যেমন, চলিতরীতির প্রবর্তনা, বাংলায় ফরাসি সাহিত্যের রূপভাবের প্রচলন প্রচেষ্টা, ‘শিল্প জীবনের জন্য বা মানুষের জন্য’Ñএই মতবাদের পরিবর্তে ‘শিল্প মানুষের জন্য’ এমন তত্ত্বের প্রচারণা ইত্যাদি। শেষোক্ত কারণে তাঁর পিতৃদত্ত প্রমথ নামটিও সার্থক; শিবপারিষদের ন্যায় আনন্দ-স্ফূর্তিই ছিল তাঁর শিল্পভাবনার ভিত্তি ও সৌধ। এসবেরই সর্বাত্মক সাক্ষ্য দেয় তাঁর মানসপুত্র সবুজপত্র। রচনাবলিতে শিল্পীব্যক্তিত্ব প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সবুজপত্র প্রমথ চৌধুরী নামক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আমাদের প্রবেশাধিকার দেয়। আমরা আজ সবুজপত্রের পাতা ওল্টাতেই বসেছি।
মুখের কথাকে সাহিত্যে ব্যবহার করা কোনো দেশেই সহজভাবে ঘটে নি। নীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী এই সবুজপত্রেই সংবাদ দিয়েছিলেন যে, সভ্যতার অন্যতম সূতিকাগার গ্রিসেও উনিশ শতকের শেষে মৌখিক ভাষায় ভ্রমণকাহিনি লিখে চংরপযধৎর নামে একজন রক্ষণশীলদের ক্ষিপ্ত করে তোলেন। তবে সেই ভাষাভঙ্গিতে উৎসাহী হয়ে একজন তো বাইবেলের অনুবাদও করে ফেলেন। আর তাতে দাঙ্গা বেঁধে যায়, একজন নিহতও হয়। বাংলাদেশে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের শেষদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহজ-বোধগম্য শব্দ প্রয়োগের কারণে ভট্টাচায্যিদের দুয়োধ্বনি শুনেছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কথ্যশব্দ ব্যবহারের জন্যে প্যারীচাঁদ মিত্রকেও বিরূপ সমালোচনা সইতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী অর্থাৎ বিংশ শতাব্দিতেও প্রমথ চৌধুরীকে চলিত ভাষারীতি প্রচলনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখে পড়তে হয়। তবে প্রমথের পথচলা ছিল অনেকটা সুসংহত ও কিছূটা দলগত। তাঁর শুধু একটি পত্রিকাই ছিল না, শক্তিশালী সাহিত্যিক গোষ্ঠিও তৈরি করে নিয়েছিলেন। সামাজিকভাবে এঁরা বেশ প্রভাবশালীই ছিলেন। উকিল-ব্যারিস্টার-রাজনীতিক তো বটেই, ভাষাবিদ অধ্যাপক থেকে খাঁটি বিজ্ঞানীও ছিলেন সবুজপত্রীদের মধ্যে। আর সবচেয়ে বড়ো প্রভাবশালী হিসেবে তো ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে রবীন্দ্রনাথ আগে কিছু পত্র-ভ্রমণসাহিত্যে চলিত রীতির ব্যবহার করলেও এবং তার তাগিদ অনুভব করলেও ঠিক সাহস করে উঠতে পারছিলেন না, সবুজপত্র যখন ‘আসরে অবতীর্ণ’ হয় তখনই তিনি এব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্ভার হন। সবুজপত্র পর্ব থেকে রবীন্দ্রনাথ চলিতরীতিকে স্থায়ীভাবে অবলম্বন করেন এবং আর চলিতভাষারীতি এক মান্যতা পায়। এখানে বলা ভাল, সবুজপত্রের সব লেখাই কিন্তু চলিতরীতিতে ছিল না। স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীর সাধুভাষায় রচিত ‘জয়দেব’ প্রবন্ধটি মুদ্রিত হতে দেখা যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথসহ আরো কারো কারো সাধুরীতির গদ্য ছাপা হয়েছে। বস্তুত আর্টের প্রশ্নটিই প্রমথের কাছে প্রধান ছিল। তবে ভাষাসাহিত্যের ইতিহাসে চলিতরীতির প্রবর্তনাই সবুজ-পত্রের প্রথম অবদান হিসেবে স্বীকৃত। অবশ্য প্রমথ চৌধুরী নিজেও মেনে নিয়েছেন পত্রিকাটি একেবারে মৌখিক ভাষার নিকটস্থ রীতি চালু করতে পারে নি। তবে সেটি যেমন পরোপুরি সম্ভব নাÑতাহলে তো আর আর্ট থাকে না, তেমনি যতটুকু সম্ভব তা-ও একযুগে ঘটে না। থাকতে হয় ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। সবুজপত্র চলিত রীতি প্রবর্তনে পথিকৃৎ, এটিও একটি পত্রিকার জন্যে কম গৌরবের কথা নয়।
যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না, তারই উপনিবেশ ছিল বাংলা-ভারত। স্বভাবতই শাসকের শিল্প-সংস্কৃতিকেই অনুকরণ-অনুসরণ করেছে শাসিতসমাজ। কিন্তু আর সব সভ্যতাসমৃদ্ধ দেশের কী অবস্থা। প্রাবাদিক উক্তি ছিল: একজন শিক্ষিত মানুষের দুটি দেশএকটি তার জন্মভূমি অপরটি ফ্রান্স। সেকালে ফ্রান্সের সাথে অপরাপর ইউরোপীয় দেশের কিংবা আমেরিকার সামাজিক জীবনের পার্থক্য প্রভূত ছিল না, কিন্তু ফ্রান্স শিল্প ভাবনা ও চর্চায় কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। নানা নিরীক্ষা ও মতবাদের মধ্য দিয়ে কঠিন বাস্তবতা যেরূপ শৈল্পিক আবরণে উপস্থাপিত হচ্ছিল ফরাসি সাহিত্যে, ‘ক্লেদজ কুসুম’ বদলেয়ারের এই কাব্যনাম হতে পারে তার শিরোনাম। পাঁড় পাঠক প্রমথ ফরাসি শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে আগেভাগেই জেনেছিলেন, প্রণয়িণী-পরিণীতা ইন্দিরা দেবীও তাঁর ফরাসীচর্চায় সহায়ক হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, প্রমথ চৌধুরীর প্রথম মুদ্রিত রচনাই ছিল ফরাসি গল্পের অনুবাদ। প্রস্পার মেরিমের ‘ফুলদানি’ নামক গল্পটি বেরিয়েছিল ‘সাহিত্য’ পত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথ ‘সাহিত্যে’র ঐ সংখ্যাটি সমালোচনা করতে যেয়ে ‘ফুলদানি’ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ …এই গল্পটি সুন্দর কিন্তু ইহা বাঙ্গালা অনুবাদের যোগ্য নহে।…সামাজিক প্রথার পার্থক্যহেতু মূল ঘটনাটি আমাদের কাছে সম্পূর্ণ মন্দই বোধ হইতে পারে।’ প্রমথের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় ‘আত্মকথায়’ : ‘…এ জাতীয় গল্প যে বঙ্গসাহিত্যে চলতে পারে না, সে কথা মানি নি। …তারপরেই আমি প্রস্পার মেরিমের ‘কার্মেন’ তর্জ্জমা করি। কিন্তু সেটি শেষ করতে পারি নি বলে প্রকাশ করি নি। কার্মেন অনুবাদের কারণ, তার বিষয়বস্তু ‘ফুলদানি’র চেয়ে ঢের বেশি অসামাজিক।’
প্রমথ চৌধুরী অবশ্য সবুজপত্র প্রকাশনাকালে অনুবাদের বদলে মৌলিক গল্প রচনায় মনোযোগী হন। ‘চার-ইয়ারি গল্পে’র সবকটিই অবশ্য পাশ্চাত্যকে পটভূমি করেছে, সে চারজনের কাহিনি সেকালের পক্ষে অসামাজিক কিনা সে প্রশ্নের চেয়ে গুরু তথ্য হলো ঘটনাচতুষ্টয় অভিনব-অভাবনীয় ছিল। ওদিকে রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রে ধারাবাহিকভাবে লিখলেন ‘চতুরঙ্গ’: এ উপন্যাসে এক প্রধান চরিত্র নাস্তিক, একজন বিয়ে করতে যায় গর্ভবতী নারীকে, আবার একজন বিধবা মিলনের আশায় অন্ধকার রাত্রে পুরুষের ঘরে প্রবেশ করে। ‘চতুরঙ্গ’ সাধুভাষায় লিখিত হলেও সবুজপত্রে পরবর্তীকালে প্রকাশিত রবীন্দ্রউপন্যাস ‘ঘরে-বাইরে’ চলিত রীতিতে রচিতসেটির অনুষঙ্গ পরকীয়া প্রেম। এসব প্রসঙ্গ ও বিবরণ ‘প্রবাসী’ পত্রিকার পক্ষে আপত্তিকর হতো বলে মনে করেন অন্নদাশঙ্কর রায়। আর রবীন্দ্রনাথের স্বীকারোক্তি : ‘প্রমথনাথ এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনার একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। প্রচলিত অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষণীর মধ্যে তা সম্ভবপর হতে পারত না। সবুজ-পত্রে সাহিত্যের এই একটি নূতন ভূমিকা রচনা প্রমথের প্রধান কৃতিত্ব। আমি তাঁর কাছে ঋণস্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হই নি।’
প্রমথ চৌধুরী ফরাসি গল্প আর অনুবাদ না করলেও সবুজপত্রে লিখেছেন ‘ফরাসী সাহিত্যের বর্ণপরিচয়’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩২৩; পূর্বে রামমোহন লাইব্রেরিতে পঠিত)। তাঁর ও অন্য সবুজপত্রীদের লেখায় ফ্রেঞ্চঅনুরাগ প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের সম্মান রক্ষার্থেও ফরাসিজাতির সাহায্য নিয়েছেন। সেসময় ‘সাহিত্য’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘নারায়ণ’ প্রভৃতি পত্রিকা নিয়মিতভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিষোদ্গার করতো। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে বিশেষভাবে দাঁড়িয়েছিল ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’ আর এই ‘সবুজ-পত্র’। পত্রিকার প্রকাশনাই তো রবীন্দ্রনাথকে যথোচিত মর্যাদায় তুলে ধরার জন্যে। নোবেলপ্রাপ্তির পর যখন রবীন্দ্রবিদূষকরা একজোট হয়, তখন রবীন্দ্রজন্মমাসে সবুজপত্রের যাত্রারম্ভ। তো যে ফরাসি সাহায্যের কথা বললাম তা হলো, ১৩২৪ এর আশ্বিন-কার্তিক সংখ্যায় ফরাসী মনীষী-সাহিত্যিক মেটারলিংক ও রোমাঁ রোলাঁর চিঠি মুদ্রণ। চিঠিদুটোতে সপ্রশংস রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ছিল।
প্রমথ চৌধুরীর ফরাসিপ্রীতি ও ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতের পরিপোষণা পরস্পর পরিপূরক। তথ্যের আকর, তত্ত্বের প্রচার, কিংবা শিক্ষার বাহন না হয়ে কীভাবে শিল্পকে শুধুই আর্ট বা শিল্প  হতে হয় তার নমুনা-নিদর্শন হিসেবে প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর পত্রিকার সৃজনীসাহিত্যসম্ভার পাঠ করা যায়। কিন্তু প্রবন্ধরাজি কি সর্বাংশে তাই। প্রমথ চৌধুরী নিজে যে লিখেছেন ‘আমাদের শিক্ষা’, ‘বাঙ্গলার ভবিষ্যৎ’, সেগুলোকে কি আর্ট হিসেবে ধরবো না? কিংবা ‘বার্ণাড শ’ সনেটে যে বললেন, ‘এ জাতে শেখাতে পারি জীবনের মর্ম/ হাতে যদি পাই আমি তোমার চাবুক।’সেকি এক ধরনের উদ্দেশ্যমূলকতা নয়?
প্রমথ চৌধুরী যে জাতিকে জীবনের মর্ম বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেই জাতির প্রশ্নে তিনি কিন্তু সেকালের অনেকের মতো বিখণ্ডিত চেতনা ধারণ করতেন না। তাই নিজে লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের ঐক্য’, ‘মোসলেম ভারত’। ছাপিয়েছেন, আবুল ফজলের পত্র, জাহাঙ্গীর বকিলের কবিতা। শিল্পী-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে ধর্ম পরিচয় বিবেচ্য কিনা তা তর্কের বিষয়, তবে সমাজ-ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিমাপকটি ধরতে হচ্ছে। জাত্যভিমানী-আত্মমগ্ন মুসলমানরা দীর্ঘদিন আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি বিমুখ-বিরূপ ছিল। অনেক বাঙালি মুসলমান যেমন বাংলা লিখতে অনিচ্ছুক ছিল, তেমনি অনেক হিন্দু বিশ্বাস করতো মুসলমানরা বাংলা লিখতে অপারগ। গদ্যে মীর মশাররফ হোসেন ও কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম এই ধারা ও ধারণার পরিবর্তন ঘটান। সবুজপত্র নতুন পথসৃষ্টিকারী ও নব পথিকের আশ্রয়স্থলও ছিল। সেকালের বিবেচনায় বাঙালি মুসলমানের বেশকিছু লেখা সবুজপত্রে স্থান পেয়েছিল। বাঙালি মুসলিম প্রবন্ধকারের মধ্যে ছিলেন, তরিকুল আলম, ওয়াজেদ আলী। কেউ বা নজরুল প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইবেন। করাচি থেকে নজরুল পারসিক কবি হাফিজের একটি রুবাইয়ের অনুবাদ ‘আশায়’ শিরোনামে পাঠিয়েছিলেন সবুজপত্রে। প্রমথ চৌধুরী সে লেখা মনোনীত করেন নি। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় কবিতাটি নিজ উদ্যোগে ‘প্রবাসী’তে পাঠান ও সেখানে সেটি ছাপা হয়। নজরুলের লেখা ছাপা না হওয়া বা সবুজপত্রের মনোনয়ন দেওয়া না দেওয়ার মধ্যে লেখক বা পত্রিকা কারো সম্পর্কেই কোনো নেতিধর্মি সিদ্ধান্তে আসা উচিত হবে না, কারণ ওদুটোর মধ্যে এমন ঘটনা-দুর্ঘটনা হামেশাই ঘটে থাকে। পবিত্র গাঙ্গুলীকে এ প্রসঙ্গে চিঠিতে নজরুল যে মন্তব্য করেছিলেন সেটিই প্রণিধানযোগ্য‘‘প্রবাসী’তে বেরিয়েছে সবুজপত্রে পাঠানো কবিতা, এতে কবিতার মর্যাদা বেড়েছে কি কমেছে, তা আমি ভাবতে পারছি না। সবুজপত্র-এর নিজস্ব আভিজাত্য থাকলেও ‘প্রবাসী’র মর্যাদা একটুকুও কম নয়। প্রচার আরও বেশী।’
হ্যাঁ, সবুজপত্রের প্রচার সীমিত ছিল, কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। মুদ্রণপ্রমাদ ছিল অত্যধিক। প্রচ্ছদের তালপাতাটি নন্দলাল বসুর আঁকা বটে, কিন্তু সেই একই চিত্র, প্রায় একইরকমের সবুজ রঙে প্রতি সংখ্যার প্রচ্ছদ একঘেয়ে এবং সেই কারণে আটপৌরে পর্যায়ে পেীঁছেছিল। বের হতো অত্যন্ত অনিয়মিতভাবে। লেখক সংখ্যাও ছিল অত্যল্প। শেষোক্ত সমস্যা হয়তো স্বাভাবিক, পত্রটির যে আদর্শ ও মান তার জন্যে বেশি বেশি লেখক পাওয়ার আশা বৃথা। ওদিকে সবুজপত্রী বলতে আমরা যাঁদেরকে জানি, তাঁরা বেশিরভাগই ব্যস্ত মানুষ, পত্রিকা প্রকাশনার দেখভাল পরের কথা নিয়মিত লেখাও তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। কাজেই সম্পাদক প্রমথ ও পৃষ্ঠপোষক রবীন্দ্রনাথকে এর পাতা ভরাতে হতো। কিছু সংখ্যায় শুধু এদুজনেরই লেখা মুদ্রিত হয়েছে। এমনকি সম্পাদকীয় ছাড়া সব লেখাই রবীন্দ্রনাথের, এমন সংখ্যাও আছে। এ নিয়ে পত্রিকা সম্পাদনায় সম্পাদকের ভূমিকা প্রশ্নে বেশ রঙ্গরসিকতাও হয়েছে সেকালের সাহিত্যিক মহলে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এবিষয়ে তাঁর অস্বস্তির কথা বলেছেন প্রমথ চৌধুরীকে।
সবুজপত্রের লেখকরাই যখন ধারাবাহিক ছিলেন না, তখন পত্রিকার উত্তরসূরির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন জাগে ; সবুজপত্র কি অনুসরিত হয়েছে? অনেকেই ‘কল্লে¬াল’-এর কথা বলে থাকেন। ‘কল্লে¬ালে’র কুশীলব, তিরিশের পাঁচকবির কেউ কেউ প্রমথ চৌধুরীকেই সাহিত্যগুরু মেনেছেন। প্রমথ চৌধুরী এই গুরুত্ব লাভ করেছিলেন প্রচলকে পেরিয়ে একটা নতুন কিছু আনার আবাহন-গীত শোনানোর কারণে। সবুজপত্র তো নবীনের প্রতি স্বাগতপত্র। সবুজপাতা মানে ফুল ও ফলের সম্ভাবনার বার্তা। পাতার সঙ্গে ফুলের কিংবা ফুলের সঙ্গে ফলের রূপে ও গুণে মোটেও সমিল থাকে না, তবু পাতা-ফুল-ফল এক ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ। এই ধারাবাহিকতা যে অস্বীকার করবে সে অজ্ঞান কিংবা অবোধ। সেকালে শুধু ‘প্রবাসী’ নয় আরো কিছুু পত্রিকার প্রচার সবুজপত্রের তুলনায় অধিক ছিল, তাদের মর্যাদাও হয়তো কম ছিল না, তবে সবুজপত্র যে আভিজাত্যে অনন্য ছিল, সেকথা তো নজরুলই জানিয়ে গেছেন। আজ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে সবুজপত্রের অভিনবত্ব বেশি করে চোখে পড়ছে।

 

প্রমথ চৌধুরীর লেখা থেকে…

বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ

নানারূপ গদ্যপদ্য লেখবার এবং ছাপবার যতটা প্রবল ঝোঁক যত বেশি লোকের মধ্যে আজকাল এ দেশে দেখা যায়, তা পূর্বে কখনো দেখা যায় নি। এমন মাস যায় না, যাতে অন্তত একখানি মাসিক পত্রের না আবির্ভাব হয়। এবং সে-সকল মাসিক পত্রে সাহিত্যের সকলরকম মালমসলার কিছু-না-কিছু নমুনা থাকেই থাকে। সুতরাং এ কথা অস্বীকার করবার জো নেই যে, বঙ্গ সাহিত্যের একটি নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছে। এই নবযুগের শিশুসাহিত্য আঁতুড়েই মরবে কিংবা তার একশো বৎসর পরমায়ু হবে সে কথা বলতে আমি অপারগ। আমার এমন কোনো বিদ্যে নেই, যার জোরে আমি পরের কুষ্ঠি কাটতে পারি। আমরা সমুদ্রপার হতে যে-সকল বিদ্যার আমদানি করেছি, সামুদ্রিক বিদ্যা তার ভিতর পড়ে না। কিন্তু এই নবসাহিত্যের বিশেষ লক্ষণগুলির বিষয় যদি আমাদের স্পষ্ট ধারণা জন্মায়, তা হলে যুগধর্মানুযায়ী সাহিত্যরচনা আমাদের পক্ষে অনেকটা সহজ হয়ে আসবে। পূর্বোক্ত কারণে, নব্য লেখকরা তাঁদের লেখায় যে হাত দেখাচ্ছেন, সেই হাত দেখবার চেষ্টা করাটা একেবারে নিষ্ফল নাও হতে পারে।

প্রথমেই চোখে পড়ে যে, এই নবসাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করছে। অতীতে অন্য দেশের ন্যায় এ দেশের সাহিত্যজগৎ যখন দু-চারজন লোকের দখলে ছিল, যখন লেখা দূরে থাক পড়বার অধিকারও সকলের ছিল না, তখন সাহিত্যরাজ্যে রাজা সামন্ত প্রভৃতি বিরাজ করতেন। এবং তাঁরা কাব্য দর্শন ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে মন্দির অট্টালিকা স্তূপ স্তম্ভ গুহা প্রভৃতি আকারে বহু চিরস্থায়ী কীর্তি রেখে গেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের দ্বারা কোনোরূপ প্রকাণ্ড কাণ্ড করে তোলা অসম্ভব এই জ্ঞানটুকু জন্মালে আমাদের কারো আর সাহিত্যে রাজা হাবার লোভ থাকবে না। এবং শব্দের কীর্তিস্তম্ভ পড়বার বৃথা চেষ্টায় আমরা দিন ও শরীর পাত করব না। এর জন্য আমাদের কোনোরূপ দুঃখ করাবার আবশ্যক নেই। বস্তুজগতের ন্যায় সাহিত্যজগতেরও প্রাচীন কীর্তিগুলি দূর থেকে দেখতে ভালো, কিন্তু নিত্যব্যবহার্য নয়।

দর্শনের কুতবমিনারে চড়লে আমাদের মাথা ঘোরে, কাব্যের তাজমহলে রাত্রিবাস করা চলে না, কেননা অত সৌন্দর্যের বুকে ঘুমিয়ে পড়া কঠিন। ধর্মের পর্বতগুহার অভ্যন্তরে খাড়া হয়ে দাঁড়ানো যায় না, আর হামাগুড়ি দিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ালেই যে কোনো আমূল্য চিন্তামণি আমাদের হাতে ঠেকতে বাধ্য এ বিশ্বাসও আমাদের চলে গেছে। পুরাকালে মানুষে যা-কিছু গড়ে গেছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সমাজ হতে আলগা করা, দু-চারজনকে বহু লোক হতে বিচ্ছিন্ন করা। অপরপক্ষে নবযুগের ধর্ম হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন করা, সমগ্র সমাজকে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করা; কাউকেও ছাড়া নয়, কাউকেও ছাড়তে দেওয়া নয়। এ পৃথিবীতে বৃহৎ না হলে যে কোনো জিনিস মহৎ হয় না, এরূপ ধারণা আমাদের নেই; সুতরাং প্রাচীন সাহিত্যের কীর্তির তুলনায় নবীন সাহিত্যের কীর্তিগুলি আকারে ছোটো হয়ে আসবে কিন্তু প্রকারে বেড়ে যাবে, আকাশ আক্রমণ না করে মাটির উপর অধিকার বিস্তার করবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কাব্যদর্শনাদি আর গাছের মতো উঁচুর দিকে ঠেলে উঠবে না, ঘাসের মতো চারি দিকে চারিয়ে যাবে। এক কথায়, বহুশক্তিশালী স্বল্পসংখ্যক লেখকের দিন চলে গিয়ে স্বল্পশক্তিশালী বহুসংখ্যক লেখকের দিন আসছে। আমাদের মনোজগতে যে নবসূর্য উদয়োন্মূখ, তার সহস্র রশ্মি অবলম্বন করে অন্তত ষষ্টিসহস্র বালখিল্য লেখক এই ভূভারতে অবতীর্ণ হবেন। এরূপ হবার কারণও সুস্পষ্ট। আজকাল আমাদের ভাববার সময় নেই, ভাববার অবসর থাকলেও লেখবার যথেষ্ট সময় নেই, লেখবার অবসর থাকলেও লিখতে শেখবার অবসর নেই; অথচ আমাদের লিখতেই হবে, নচেৎ মাসিক পত্র চলে না। এ যুগের লেখকেরা যেহেতু গ্রন্থকার নন শুধু মাসিক পত্রের পৃষ্ঠপোষক, তখন তাঁদের ঘোড়ায় চড়ে লিখতে না হলেও ঘড়ির উপর লিখতে হয়; কেননা মাসিক পত্রের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, পয়লা বেরনো। কি যে বেরল তাতে বেশি কিছু আসে-যায় না। তা ছাড়া, আমাদের সকলকেই সকল বিষয়ে লিখতে হয়। নীতির জুতোসেলাই থেকে ধর্মের চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত সকল ব্যাপারই আমাদের সমান অধিকারভুক্ত। আমাদের নবসাহিত্যে কোনোরূপ ‘শ্রমবিভাগ’ নেইতার কারণ, যে ক্ষেত্রে ‘শ্রম’ নামক মূল পদার্থেরই অভাব, সে স্থলে তার বিভাগ আর কি করে হতে পারে?

তাই আমাদের হাতে জন্মলাভ করে শুধু ছোটোগল্প, খণ্ডকাব্য, সরল বিজ্ঞান ও তরল দর্শন। দেশকালপাত্রের সমবায়ে সাহিত্য যে ক্ষুদ্রধর্মাবলম্বী হয়ে উঠেছে, তার জন্য আমার কোনো খেদ নেই। একালের রচনা ক্ষুদ্র বলে আমি দুঃখ করি নে, আমার দুঃখ যে তা যথেষ্ট ক্ষুদ্র নয়। একে স্বল্পায়তন, তার উপর লেখাটি যদি ফাঁপা হয় তা হলে সে জিনিসের আদর করা শক্ত, বাল্য গাল্যভরা হলেও চলে, কিন্তু আংটি নিরেট হওয়া চাই। লেখকরা এই সত্যটি মনে রাখলে গল্প স্বল্প হয়ে আসবে, শোক শ্লোকরূপ ধারণ করবে, বিজ্ঞান বামনরূপ ধারণ করেও ত্রিলোক অধিকার করে থাকবে, এবং দর্শন নখদর্পণে পরিণত হবে। যাঁরা মানসিক আরামের চর্চা না করে ব্যায়ামের চর্চা করেছেন, তাঁরা সকলেই জানেন যে, যে সাহিত্যে দম নেই তাতে অন্তত কস (মৎরঢ়) থাকা আবশ্যক।

বর্তমান ইউরোপের সম্যক্ পরিচয়ে এই জ্ঞান লাভ করা যায় যে, গণধর্মের প্রধান ঝোঁক হচ্ছে বৈশ্যধর্মের দিকে; এবং সেই ঝোঁকটি না সামলাতে পারলে সাহিত্যের পরিণাম অতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আমাদের এই আত্মাসর্বস্ব দেশে লেখকেরা যে বৈশ্যবৃত্তি অবলম্বন করবেন না, এ কথাও জোর করে বলা চলে না। লক্ষ্মীলাভের আশায় সরস্বতীর কপট সেবা করতে যে অনেকে প্রস্তুত, তার প্রমাণ ‘ভ্যালু পেয়ব্ল্ পোস্ট’ নিত্য ঘরে ঘরে দিচ্ছে! আমাদের নবসাহিত্যের যেন-তেন-প্রকারেণ বিকিয়ে যাবার প্রবৃত্তিটি যদি দমন করতে না পারা যায়, তা হলে বঙ্গসরস্বতীকে যে পথে দাঁড়াতে হবে সে বিষয়ে তিলমাত্রও সন্দেহ নেই। কোনো শাস্ত্রই এ কথা বলে না যে, ‘বাণিজ্যে বসতে সরস্বতী’। সাহিত্যসমাজে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার ইচ্ছে থাকলে দারিদ্র্র্যকে ভয় পেলে সে আশা সফল হবে না। সাহিত্যের বাজার-দর সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান যত বাড়বে সেইসঙ্গে তার মূল্য সম্বন্ধে জ্ঞান আমাদের লোপ পেয়ে আসবে। সুতরাং আমাদের নবসাহিত্যে লোভ নামক রিপূর অস্তিত্বের লক্ষণ আছে কি না সে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি থাকা আবশ্যক, কেননা শাস্ত্রে বলে লোভে পাপ পাপে মৃত্যু।

এ যুগের মাসিক পত্র সকল যে সচিত্র হয়ে উঠেছে, সেটি যেমন আনন্দের কথা তেমনি আশঙ্কারও কথা। ছবির প্রতি গণসমাজের যে একটি নাড়ির টান আছে, তার প্রচলিত প্রমান হচ্ছে মার্কিন সিগারেট। ঐ চিত্রের সাহচর্যেই যত অচল সিগারেট বাজারে চলে যাচ্ছে। এবং আমরা চিত্রমুগ্ধ হয়ে মহানন্দে তাম্রকুটজ্ঞানে খড়ের ধূম পান করছি। ছবি ফাউ দিয়ে মেকি মাল বাজারে কাটিয়ে দেওয়াটা আধুনিক ব্যবসার একটা প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দেশে শিশুপাঠ্য গ্রন্থাবলীতেই চিত্রের প্রথম আবির্ভাব। পুস্তিকায় এবং পত্রিকায় ছেলেভুলোনো ছবির বহুল প্রচারে চিত্রকলার যে কোনো উন্নতি হবে, সে বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ আছেকেননা সমাজে গোলাম-পাশ করে দেওয়াতেই বণিক্-বুদ্ধির সার্থকতা; কিন্তু সাহিত্যের যে অবনতি হবে, সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। নর্তকীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ সারঙ্গীর মতো, চিত্রকলার পশ্চাৎ পশ্চাৎ কাব্যকলার অনুধাবন করাতে তার পদমর্যাদা বাড়ে না। একজন যা করে অপরে তার দোষগুণ বিচার করে, এই হচ্ছে সংসারের নিয়ম। সুতরাং ছবির পাশাপাশি তার সমালোচনাও সাহিত্যে দেখা দিতে বাধ্য। এই কারণেই, যেদিন থেকে বাংলাদেশে চিত্রকলা আবার নবকলেবর ধারণ করেছে তার পরদিন থেকেই তার অনুকূল এবং প্রতিকূল সমালোচনা শুরু হয়েছে। এবং এই মতদ্বৈত থেকে সাহিত্যসমাজে একটি দলাদলির সৃষ্টি হবার উপক্রম হয়েছে। এই তর্কযুদ্ধে আমার কোনো পক্ষ অবলম্বন করবার সাহস নেই। আমার বিশ্বাস, এ দেশে এ কালের শিক্ষিত লোকদের মধ্যে চিত্রবিদ্যায় বৈদগ্ধ্য এবং আলেখ্যব্যাখ্যানে নিপুণতা অতিশয় বিরল। কারণ এ যুগের বিদ্যার মন্দিরে সুন্দরের প্রবেশ নিষেধ। তবে বঙ্গদেশের নব্যচিত্র সম্বন্ধে সচরাচর যে-সকল আপত্তি উত্থাপন করা হয়ে থাকে, সেগুলি সংগত কি অসংগত তা বিচার করবার অধিকার সকলেরই আছে; কেননা সে-সকল আপত্তি কলাজ্ঞান নয়, সাধারণ জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। যতদূর আমি জানি, নব্য চিত্রকরদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ এই যে, তাঁদের রচনায় বর্ণে বর্ণে বানান ভুল এবং রেখায় রেখায় ব্যাকরণ ভুল দৃষ্ট হয়। এ কথা সত্য কি মিথ্যা শুধু তাঁরাই বলতে পারেন, যাঁদের চিত্রকর্মের ভাষার উপর সম্পূর্ণ অধিকার জন্মেছে; কিন্তু সে ভাষায় সুপণ্ডিত ব্যক্তি বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে দেখতে পাওয়া যায় না, যদিচ ও-সকল স্থানে সমালোচকের দর্শন পাওয়া দূর্লভ নয়। আসল কথা হচ্ছে এ শ্রেণীর চিত্রসমালোচকেরা অনুকরণ অর্থে ব্যাকরণ শব্দ ব্যবহার করেন। এদের মতে ইউরোপীয় চিত্রকরেরা প্রকৃতির অনুকরণ করেন, সুতরাং সেই অনুকরণের অনুকরণ করাটাই এ দেশের চিত্রশিল্পীদের কর্তব্য। প্রকৃতি নামক বিরাট পদার্থ এবং তার অংশভূত ইউরোপ নামক ভূভাগ, এ উভয়ের প্রতি আমার যথোচিত ভক্তিশ্রদ্ধা আছে, কিন্তু তাই বলে তার অনুকরণ করাটাই যে পরমপুরুষার্থ, এ কথা আমি কিছুতেই স্বীকার করতে পারি নে। প্রকৃতির বিকৃতি ঘটানো কিংবা তার প্রতিকৃতি গড়া কলাবিদ্যার কার্য নয়কিন্তু তাকে আকৃতি দেওয়াটাই হচ্ছে আর্টের ধর্ম। পুরুষের মন প্রকৃতি-নর্তকীর মুখ দেখবার আয়না নয়। আর্টের ক্রিয়া অনুকরণ নয়, সৃষ্টি। সুতরাং বাহ্যবস্তুর মাপজোখের সঙ্গে আমাদের মানস-জাত বস্তুর মাপজোখ যে হুবহু মিলে যেতেই হবে, এমন কোনো নিয়মে আর্টকে আবদ্ধ করার অর্থ হচ্ছে প্রতিভার চরণে শিক্লি পরানো। আর্টে অবশ্য যথেচ্ছাচারিতার কোনো অবসর নেই। শিল্পীরা কলাবিদ্যার অনন্যসামান্য কঠিন বিধিনিষেধ মানতে বাধ্য, কিন্তু জ্যামিতি কিংবা গণিতশাস্ত্রের শাসন নয়। একটি উদাহরণের সাহায্যে আমার পূর্বোক্ত মতের যথার্থ্যরে প্রমাণ অতি সহজেই দেওয়া যেতে পারে। একে একে যে দুই হয় এবং একের পিঠে এক দিলে যে এগারো হয়, বৈজ্ঞানিক হিসেবে এর চাইতে খাঁটি সত্য পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। অথচ একে একে দুই না হয়েও এবং একের পিঠে একে এগারো না হয়েও ঐরূপ যোগাযোগে যে বিচিত্র নকশা হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নীচে দেওয়া যাচ্ছে

সম্ভবত আমার প্রদর্শিত যুক্তির বিরুদ্ধে কেউ এ কথা বলতে পারেন যে, ‘চিত্রে আমারা গণিতশাস্ত্রের সত্য চাই নে, কিন্তু প্রত্যক্ষ জ্ঞানের সত্য দেখতে চাই।’ প্রত্যক্ষ সত্য নিয়ে মানুষে মানুষে মতভেদ এবং কলহ যে আবহমান কাল চলে আসছে তার কারণ অন্ধের হস্তীদর্শন ন্যায়ে নির্ণীত হয়েছে। প্রকৃতির যে অংশ এবং যে ভাবটির সঙ্গে যার চোখের এবং মনের যতটুকু সম্পর্ক আছে, তিনি সেই টুকুকেই সমগ্র সত্য বলে ভুল করেন। সত্যভ্রষ্ট হলে বিজ্ঞানও হয় না আর্টও হয় না। কিন্তু বিজ্ঞানের সত্য এক, আর্টের সত্য অপর। কোনো সুন্দরীর দৈর্ঘ্য প্রস্থ এবং ওজনও যেমন এক হিসাবে সত্য, তার সৌন্দর্যও তেমনি আর-এক হিসাবে সত্য। কিন্তু সৌন্দর্য নামক সত্যটি তেমন ধরাছোঁয়ার মতো পদার্থ নয় বলে সে সম্বন্ধে কোনোরূপ অকার্ট বৈজ্ঞানিক প্রমান দেওয়া যায় না। এই সত্যটি আমরা মনে রাখলে নব্য শিল্পীর কৃশাঙ্গী মানসীকন্যাদের ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নেবার জন্য অত ব্যগ্র হতুম না এবং চিত্রের ঘোড়া ঠিক ঘোড়ার মতো নয়, এ আপত্তিও উত্থাপন করতুম না। এ কথা বলার অর্থতার অস্থিসংস্থান, পেশীর বন্ধন প্রভৃতি প্রকৃত ঘোড়ার অনুরুপ নয়। অ্যানাটমি অর্থাৎ অস্থিবিদ্যার সাহায্যে দেখানো যেতে পারে যে, চিত্রের ঘোটক গঠনে ঠিক আমাদের শকটবাহী ঘোটকের সহোদর নয় এবং উভয়কে একত্রে জুড়িতে জোতা যায় না। এ সম্বন্ধে আমার প্রথম বক্তব্য এই যে, অস্থিবিদ্যা কঙ্কালের জ্ঞানের উপর নির্ভর করে, প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপর নয়। কঙ্কালের সঙ্গে সাধারণ লোকের চাক্ষুষ পরিচয় নেই; কারণ দেহতাত্ত্বিকের জ্ঞাননেত্র যাই হোক, আমাদের চোখে প্রাণীজগৎ কঙ্কালসার নয়। সুতরাং দৃষ্টজগৎক অদৃষ্টের কষ্টিপাথরে কষে নেওয়াতে পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু রূপজ্ঞানের পরিচয় দেওয়া হয় না। দ্বিতীয় কথা এই যে, কি মানুষ কি পশু, জীবমাত্রেরই দেহযন্ত্রগঠনের একমাত্র কারণ হচ্ছে উক্ত যন্ত্রের সাহায্যে কতকগুলি ক্রিয়া সম্পাদন করা। গঠন যে ক্রিয়াসাপেক্ষ, এই হচ্ছে দেহবিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব। ঘোড়ার দেহের বিশেষ গঠনের কারণ হচ্ছে ঘোড়া তুরঙ্গম। যে ঘোড়া দৌড়বে না তার অ্যানাটমি ঠিক জীবন্ত ঘোড়ার মতো হবার কোনো বৈধ কারণ নেই। পটস্থ ঘোড়া যে তটস্থ, এ বিষয়ে বোধ হয় কোনো মতভেদ নেই। চিত্রার্পিত অশ্বের অ্যানাটমি ঠিক চড়বার কিংবা হাঁকাবার ঘোড়ার অনুরূপ করাতেই বস্তুজ্ঞানের অভাবের পরিচয় দেওয়া হয়। চলৎশক্তিরহিত অশ্ব, অর্থাৎ যাকে চাবুক মারলে ছিঁড়বে কিন্তু নড়বে না এহেন ঘোটক, অর্থহীন অনুকরণের প্রসাদেই জীবন্ত ঘোটকের অবিকল আকার ধারণ করে চিত্রকর্মে জন্মলাভ করে। এই পঞ্চভূতাত্মক পরিদৃশ্যমান জগতের অন্তরে একটি মানসপ্রসূত দৃশ্যজগৎ সৃষ্টি করাই চিত্রকলার উদ্দেশ্য, সুতরাং এ উভয়ের রচনার নিয়মের বৈচিত্র্য থাকা অবশ্যম্ভাবী। তথাকথিত নব্যচিত্র যে নির্দোষ কিংবা নির্ভুল এমন কথা আমি বলি না। যে বিদ্যা কাল জন্মগ্রহণ করেছে, আজ যে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গসকল সম্পূর্ণ আত্মবশে আসবে, এরূপ আশা করাও বৃথা। শিল্প হিসাবে তার নানা ত্র“টি থাকা কিছুই আশ্চর্যের বিষয় নয়। কোথায় কলার নিয়মের ব্যভিচার ঘটছে, সমালোচকদের তাই দেখিয়ে দেওয়া কর্তব্য। অস্থি নয় বর্ণের সংস্থানে, পেশী নয় রেখার বন্ধনে, যেখানে অসংগতি এবং শিথিলতা দেখা যায়, সেই স্থলেই সমালোচনার সার্থকতা আছে। অব্যবসায়ীর অযথা নিন্দায় চিত্রশিল্পীদের মনে শুধু বিদ্রোহীভাবের উদ্রেক করে, এবং ফলে তাঁরা নিজেদের দোষগুলিকেই গুণভ্রমে বুকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান।

আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সাহিত্য, চিত্র নয়। যেহেতু এ যুগের সাহিত্যে চিত্রসনাথ হয়ে উঠেছে, সেই কারণেই চিত্রকলার বিষয় উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছি। আমারও প্রসঙ্গ উত্থাপন করবার অপর একটি কারণ হচ্ছে এইটি দেখিয়ে দেওয়া যে, যা চিত্রকলায় দোষ বলে গণ্য তাই আবার আজকাল এ দেশে কাব্যকলায় গুণ বলে মান্য।

প্রকৃতির সহিত লেখকদের যদি কোনরূপ পরিচয় থাকত তা হলে শুধু বর্ণের সঙ্গে বর্ণের যোজনা করলেই যে বর্ণনা হয়, এ বিশ্বাস তাঁদের মনে জন্মাত না। এবং যে বস্তু কখনো তাঁদের চর্মচক্ষুর পথে উদয় হয় নি, তা অপরের মনশ্চক্ষুর সুমুখে খাড়া করে দেবার চেষ্টারূপ পণ্ডশ্রম তাঁরা করতেন না। সম্ভবত এ যুগের লেখকদের বিশ্বাস যে, ছবির বিষয় হচ্ছে দৃশ্যবস্তু আর লেখার বিষয় হচ্ছে অদৃশ্যমন। সুতরাং বাস্তবিকতা চিত্রকলায় অর্জনীয় এবং কাব্যকলায় বর্জনীয়। সাহিত্যে সেহাইকলমের কাজ করতে গিয়ে যাঁরা শুধু কলমের কালি ঝাড়েন, তাঁরাই কেবল নিজের মনকে প্রবোধ দেবার জন্য পূর্বোক্ত মিথ্যাটিকে সত্য বলে গ্রাহ্য করেন। ইন্দ্রিয়জ প্রত্যক্ষ জ্ঞানই হচ্ছে সকল জ্ঞানের মূল। বাহ্যজ্ঞানশূন্যতা অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক নয়। দূরদৃষ্টি লাভ করার অর্থ চোখে চাল্শে-ধরা নয়। দেহের নবদ্বার বন্ধ করে দিলে মনের ঘর অলৌকিক আলোকে কিংবা পারলৌকিক অন্ধকারে পূর্ণ হয়ে উঠবে, বলা কঠিন। কিন্তু সর্বলোকবিদিত সহজ সত্য এই যে, যাঁর ইন্দ্রিয় সচেতন এবং সজাগ নয় কাব্যে কৃতিত্ব লাভ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। জ্ঞানঞ্জনশলাকার অপপ্রয়োগে যাঁদের চক্ষু উন্মীলিত না হয়ে কানা হয়েছে, তাঁরাই কেবল এ সত্য মানতে নারাজ হবেন। প্রকৃতিদত্ত উপাদান নিয়েই মন বাক্যচিত্র রচনা করে। সেই উপাদান সংগ্রহ করবার, বাছাই করবার এবং ভাষায় সাকার করে তোলবার ক্ষমতার নামই কবিত্বশক্তি। বস্তুজ্ঞানের অটল ভিত্তির উপরেই কবি-কল্পনা প্রতিষ্ঠিত। মহাকবি ভাস বলেছেন যে, ‘সুনিবিষ্ট লোকের রূপ বিপর্যয়’ করা অন্ধকারের ধর্ম। সাহিত্যে ওরূপ করাতে প্রতিভার পরিচয় দেওয়া হয় না, কারণ প্রতিভার ধর্ম হচ্ছে প্রকাশ করা, অপ্রত্যক্ষকে প্রত্যক্ষ করাপ্রত্যক্ষকে অপ্রত্যক্ষ করা নয়। অলংকারশাস্ত্রে বলে অপ্রকৃত অতিপ্রকৃত এবং লৌকিক জ্ঞানবিরুদ্ধ বর্ণনা কাব্যে দোষ হিসেবে গণ্য। অবশ্য পৃথিবীতে যা সত্যই ঘটে থাকে তার যথাযথ বর্ণনাও সব সময়ে কাব্য নয়। আলংকারিকেরা উদাহরণস্বরূপ দেখান যে, ‘গৌঃ তৃণম্ অত্তি’ কথাটা সত্য হলেও ও কথা বলায় কাবিত্বশক্তির বিশেষ পরিচয় দেওয়া হয় না। তাই বলে ‘গোরুরা ফুলে ফুলে মধুপান করছে’ এরূপ কথা বলাতে কি বস্তুজ্ঞান কি রসজ্ঞান কোনোরূপ জ্ঞানের পরিচয় দেওয়া হয় না। এ স্থলে বলে রাখা আবশ্যক যে, নিজেদের সকলপ্রকার ত্র“টির জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের দায়ী করা বর্তমান ভারতবাসীদের একটা রোগের মধ্যে হয়ে পড়েছে। আমাদের বিশ্বাস, এ বিশ্ব নশ্বর এবং মায়াময় বলে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বাহ্যজগতের কোনোরূপ খোঁজখবর রাখতেন না। কিন্তু এ কথা জোর করে বলা যেতে পারে যে, তাঁরা কস্মিন্কালেও অবিদ্যাকে পরাবিদ্যা বলে ভুল করেন নি, কিংবা একলম্ফে যে মনের পূর্বোক্ত প্রথম অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়, এরূপ মতও প্রকাশ করেন নি। বরং শাস্ত্র এই সত্যেরই পরিচয় দেয় যে, অপরাবিদ্যা সম্পূর্ণ আয়ত্ত না হলে কারো পক্ষে পরাবিদ্যা লাভের অধিকার জন্মায় না, কেননা বিরাটের জ্ঞানের ক্ষেত্রেই স্বরাটের জ্ঞান অঙ্কুরিত হয়। আসল কথা হচ্ছে, মানসিক আলস্যবশতই আমরা সাহিত্যে সত্যের ছাপ দিতে অসমর্থ। আমরা যে কথায় ছবি আঁকতে পারি নে, তার একমাত্র কারণ, আমাদের চোখ ফোটবার আগে মুখ ফোটে।

এক দিকে আমরা বাহ্যবস্তুর প্রতি যেমন বিরক্ত, অপর দিকে অহং-এর প্রতি ঠিক তেমনি অনুরক্ত। আমাদের বিশ্বাস যে, আমাদের মনে যে-সকল চিন্তা ও ভাবের উদয় হয় তা এতই অপূর্ব এবং মহার্য যে, স্বজাতিকে তার ভাগ না দিলে ভারতবর্ষের আর দৈন্য ঘুচবে না। তাই আমরা অহর্নিশ কাব্যে ভাবপ্রকাশ করতে প্রস্তুত। ঐ ভাবপ্রকাশের অদম্য প্রবৃত্তিটিই আমাদের সাহিত্যে সকল অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মনোভাবের মূল্য আমার কাছে যতই বেশি হোক-না, অপরের কাছে তার যা-কিছু মূল্য, সে তার প্রকাশের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। অনেকখানি ভাব মরে একটুখানি ভাষায় পরিণত না হলে রসগ্রাহী লোকের নিকট তা মুখরোচক হয় না। এই ধারণাটি যদি আমাদের মনে স্থান পেত তা হলে আমরা সিকি পয়সার ভাবে আত্মহারা হয়ে কলার অমূল্য আত্মসংযম হতে ভ্রষ্ট হতুম না। মানুষমাত্রেরই মনে দিবারাত্র নানারূপ ভাবের উদয় এবং বিলয় হয়। এই অস্থির ভাবকে ভাষায় স্থির করার নামই হচ্ছে রচনাশক্তি। কাব্যের উদ্দেশ্য ভাব প্রকাশ করা নয়, ভাব উদ্রেক করা। কবি যদি নিজেকে বীণা হিসেবে না দেখে বাদক হিসেবে দেখেন, তাহলে পরের মনের উপর অধিপত্য লাভ করবার সম্ভাবনা তাঁর অনেক বেড়ে যায়। এবং যে মুহূর্ত থেকে কবিরা নিজেদের পরের মনোবীণার বাদক হিসেবে দেখতে শিখবেন, সেই মুহূর্ত থেকে তাঁরা বস্তুজ্ঞানের এবং কলার নিয়মের একান্ত শাসনাধীন হবার সার্থকতা বুঝতে পারবেন। তখন আর নিজের ভাববস্তুকে এমন দিব্যরতœ মনে করবেন না যে, সেটিকে আকার দেবার পরিশ্রম থেকে বিমুখ হবেন। অবলীলাক্রমে রচনা করা আর অবহেলাক্রমে রচনা করা যে এক জিনিস নয়, এ কথা গণধর্মাবলম্বীরা সহজে মানতে চান নাএই কারণেই এত কথা বলা। আমার শেষ বক্তব্য এই যে, ক্ষুদ্রত্বের মধ্যেও যে মহত্ত্ব আছে, আমাদের নিত্যপরিচিতি লৌকিক পদার্থের ভিতরেও যে অলৌকিকতা প্রচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে, তার উদ্ধারসাধন করতে হলে, অব্যক্তকে ব্যক্ত করতে হলে, সাধনার আবশ্যক; এবং সে সাধনার প্রক্রিয়া হচ্ছে দেহমনকে বাহ্যজগৎ এবং অন্তর্জগতের নিয়মাধীন করা। যাঁর চোখ নেই, তিনিই মনস্বিতালাভের জন্য অন্যমনস্কতার আশ্রয় গ্রহণ করেন। নব্য লেখকদের নিকট আমার বিনীত প্রার্থনা এই যে, তাঁরা যেন দেশী বিলাতি কোনোরূপ বুলির বশবর্তী না হয়ে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির পরিচয় লাভ করবার জন্য ব্রতী হন। তাতে পরের না হোক, অন্তত নিজের উপকার করা হবে।

 

সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরী।।৭ চিন্তকের পর্যবেক্ষণ

বাংলা সাময়িকপত্রে সবুজপত্রর অবদান

মো. হারুন-অর-রশীদ

[অধ্যাপক ও সভাপতি ॥ বাংলা বিভাগ ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে সবুজপত্রের গুরুত্ব যুগান্তকারী, ঐতিহাসিক; অপরিসীম ও অবিস্মরণীয়। উনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান, সমাজ-রাজনৈতিক-সংস্কৃতিমূলক সাময়িক পত্রপত্রিকাগুলোর গতানুগতিক বিপরীত ধারায় সবুজপত্র স্বতন্ত্র ভূমিকায় সমুজ্জ্বল। সবুজপত্র ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’ ছিল না; ছিল উজান ঠেলা উল্টো পথের পথিক। অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শগত কারণে সমকালের পত্রপত্রিকাগুলোর সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠতে হত এবং তাতে ছিনিয়ে আনতে হত বিজয়। সঙ্গত কারণেই কালগত পশ্চাৎপরতা, অনাধুনিকতা, কুসংস্কার এবং মননগত অনগ্রসরতার বিরুদ্ধে সবুজপত্র জন্মলগ্ন থেকেই ছিল দ্রোহী একক ও অনন্য বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে/তবে একলা চলরে।’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই কলির মত সড়ঃঃড় ছিল তার।

যে কোন গ্রন্থ বুঝতে হলে যেমন গ্রন্থাকারকে উপলব্ধি করা জরুরি, তেমনি পত্রপত্রিকার গুরুত্ব, তাৎপর্য মর্মার্থ ও সাহিহত্যজগতে তার অবদান অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সম্পাদকের মেধা, মনন, রুচি, বৈদগ্ধ্য, পরিচর্যা, পরিশীলন, শিক্ষা-দীক্ষা, পঠন-পাঠন ও অধীত জ্ঞানের পরিমাপ করা অত্যাবর্শক।

সবুজপত্রের সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী ছিলেন আধুনিকমনষ্ক বহুভাষাবিদ, শ্রমঘন কর্মমগ্ন ও বিচিত্র অনুষঙ্গে নিবিড় অধ্যয়নশীল, বহুমুখী প্রজ্ঞাবান বিদগ্ধ ব্যক্তি। তাঁর বৈদগ্ধ্যের স্পর্শে এবং দাঢ্যব্যক্তিত্বের গুণে সবুজপত্র সেকালের সাময়িক পত্রিকাসমূহের পংক্তিতে একটি পরিশ্র“ত, পরিশুদ্ধ ও পরিশীলিত রুচিময় ধারা সৃষ্টির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরী এক ও অভিন্ন সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর সৈন্যপত্যে সবুজপত্র বাংলা ভাষা-সাহিত্য পরিচর্চার ক্ষেত্রে প্রভূত সমুন্নতি লাভ করেছিল।

সবুজপত্রের সবচেয়ে বড় অবদান সাধুভাষারীতির নিগড় থেকে মুক্ত করে চলিত ভাষারীতির কালজয়ী যাত্রা শুরু এবং সাহিত্য-সাধনায় নবনবীনের অভিষেক, আধুনিকতার জয়ধ্বনি; জড়তার বন্ধনমুক্তি এবং প্রাঞ্জল সাবলীল বর্ণনায় রচনাসমূহ সাহিত্যগুণান্বিত, রসময় বাগবৈদগ্ধ্যে প্রসাদগুণ সম্পন্ন হয়ে ওঠার সফলতা। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘বাণীর বসতি রসনায়’।

সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যার প্রকাশকাল ২৫ বৈশাখ, ১৩২১; ৭মে ১৯১৪। এ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘সবুজের অভিযান’ কবিতা, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সবুজ পাতার গান’ কবিতা, সম্পাদকের মুখবন্ধ ও বীরবলের সবুজপত্র, রবীন্দ্রনাথের ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ প্রবন্ধ এবং ‘হালদার গোষ্ঠী’-গল্প প্রকাশিত হয়।

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের প্রভাবে ভারতবর্ষে বাঙালির মানসিক ও ব্যবহারিক জীবন থেকে জড়তা মুক্ত হওয়ার যে আনন্দময় চাঞ্চল্য শুরু হয়; শুরু হয় মুক্তির আনন্দসে আনন্দে যে ‘নবসাহিত্যে ফুল ফুটবে তাকে চাষ করাই সবুজপত্রের উদ্দেশ্য।’ এ সম্পর্কে সম্পাদকের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘যে লেখায় নবজীবনের আদর্শ প্রতিফলিত হবে তাকেই সযতেœ সবুজপত্রাধারে রক্ষিত করা হবে।’ ঘটানো হবে ‘দেশের অতীত ও বিদেশের বর্তমান এই দুইটি প্রাণশক্তির বিরোধ নয়’, মিলন। উদ্দেশ্য ঐ এক, ‘বাংলা সাহিত্য ও সমাজের ভবিষ্যৎ’ সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা। এ জন্যেই উদ্যোগী ও অকুতোভয় নবীন লেখকদের ‘আমাদের বাঙলা ঘরের খিড়কি দরজার ভিতর প্রাচীন ভারতবর্ষের হাতি গলাবার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের গৌড় ভাষার মৃৎকুম্ভের মধ্যে সাতসমুদ্রকে পার করতে হবে।’

আর তা করতে হলে, রবীন্দ্রপ্রতিভা বিচারের জন্য নয়, সবুজপত্রের চারিত্র্য নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে; ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত উপর্যুক্ত ‘সবুজের অভিযান’ কবিতার কাক্সিক্ষত অভিযাত্রীদের, যে যাই বলুক, ‘রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে’, ‘সকল তর্ক হেলায় ত্চ্ছু করে’ বেরিয়ে আসতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে ‘দুরন্ত’, ‘কাঁচা’, ‘সবুজ-নবীনদের’। ‘আধ মরাদের ‘ঘা মেরে’ তুলতে হবে বাঁচিয়ে। নবজীবনের বানডাকা বিশ্বপানে যারা তাকায় না, সেই প্রবীণ, সেই পরম পাকাদের নিরাপদ আস্তানা ‘অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়’ দস্যুর মত হানা দিয়ে তছনছ করে দিতে হবে এবং আনতে হবে তাদের আলোর ভুবনে বের করে। একই কারণে উপর্যুক্ত কবিতার অন্য একটি চরণ স্মরণ যোগ্য, ‘ঝড়ের মাতন, বিজয় কেতন নেড়ে/অট্টহাস্যে আকাশ খানা ফেড়ে,/ ভোলানাথের ঝোলা ঝুলি ঝেড়ে/ ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা/ আয় প্রমত্ত আয়রে আমার কাঁচা।’

উল্লেখ্য যে, ‘সবুজের অভিযান’, সবুজপত্র সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীর উপরিউক্ত প্রত্যাশার সমার্থক। অর্থাৎ সবুজপত্র শৃঙ্খল ভেঙে ‘পান থেকে সংস্কারের চুন’ খসানোর দৃঢ় প্রতীতিতে স্থিতধী। স্থিতধী যে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাভাষা ও ব্যাকরণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে ‘বাংলাভাষার স্বাধীন সত্তার বিকাশে সংস্কৃতভাষার প্রভাবকে অস্বীকার’ করার চেষ্টা করলে সংস্কৃত পণ্ডিত শরচ্চশাস্ত্রী তার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং শাস্ত্রী মশায়ের পক্ষাবলম্বন করে বলাই চাঁদ গোস্বামী, রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ, প্রথমনাথ তর্কভূষণ বলেন যে, ‘সংস্কৃতের বন্ধন মোচন করলে বাংলার কুফল হবে।’ এতৎপ্রেক্ষিতে সবুজপত্রের সারথী তাঁদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রত্যয়দীপ্ত দৃঢ় ভাষায় বলেন, ‘বাংলা ভাষার যে প্রকৃতি, তাতে সংস্কৃত শব্দ যত বেশি প্রবেশ করবে, ততই দোষের হবে।’ শুধু তাই নয়, ‘বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি সংস্কৃত শব্দের অধিক প্রয়োগ’শরচ্চশাস্ত্রীর এ দাবীর অযথার্থতা প্রতিপন্ন করতে প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রে প্রকাশ করেন তাঁর যুক্তি ও বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ ‘কথার কথা’। তাতে তিনি শাস্ত্রী মশায়ের যুক্তি খণ্ডন করেন এ ভাষায়, ‘ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টো চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে’। প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্র বাঙালির মুখকে কালিমালিপ্ত হতে দিতে চায় নি। তাই সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য ত্যাগ করে বাংলা ভাষাকে ভারমুক্ত, কলুষমুক্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে এবং তাতে সবুজপত্র অভাবিত পূর্ব সাফল্য লাভ করেছে। সবুজপত্রের এটিও একটি অমর কীর্তি। এর সাথে অনিবার্য সম্পক্ততা স্বীকার করতে হবে সাহিত্যচর্চায় সুনিপুণ বাগবৈদগ্ধ্য এবং উইট, স্যাটায়ার, হিউমার; পারাডক্স-এর বহুল ব্যবহার।

প্রকৃত সত্য এই যে, সবুজপত্রে প্রকাশিত ‘বীরবলের হালখাতা’য় প্রাবন্ধিকের ‘প্রথমেই চোখে পড়ে যে, এই নব সাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করেছে।’ অতএব সবুজপত্র থেকেই বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরুএ কথা অস্বীকার করার জো নেই। বরং সবুজপত্রের সারথ্যে সংস্কৃতবহুল সাধুভাষারীতি ত্যাগ করে চলিত ভাষা রীতিতে যে সাহিত্যচর্চা শুরু হয় ক্রমাগত অনুশীলনের ফলে আজ তা সর্বত্রগামী; সর্বজন স্বীকৃত। অন্যদিকে সাধুভাষারীতি ব্যবহার বিলুপ্ত প্রায়। সবুজপত্রের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের বেলায়ও সদর্থক ক্রমোৎকর্ষ লক্ষণীয়।

 

সবুজপত্রর শতবর্ষ

গাজী আজিজুর রহমান

[অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ কালিগঞ্জ কলেজ ॥ সাতক্ষীরা]

ভাষার জঙ্গমতা ছাড়া কোনো ভাষাই সুদীর্ঘকাল বেঁচে থাকে নাহিব্র“, লাতিন, সংস্কৃত, প্রকৃত, পালি, সাধু ভাষা তার উদাহরণ। যে ভাষা লোকপরম্পরা প্রসিদ্ধ, জীবনঘনিষ্ট, সৃতি এবং প্রসাদগুণমণ্ডিত সে ভাষার অপমৃত্যু ঘটে না। আজকের বাংলা ভাষার যে গতি, সংহতি, অনাড়ষ্টতা, স্বচ্ছন্দতা, সাবলীলতা এবং সর্বজনীনতা তার পনের আনা কৃতিত্ব প্রমথ চৌধুরীর। তিনিই বাংলা ভাষাকে প্রথম রঙের ব্যাভিচার থেকে, জবরজঙের দুর্ভর থেকে, হেয়ালি-কূটাভাষ-জটিলতার জাল থেকে উদ্ধার করে একটা আদর্শবাদি, অসংশয়িত, বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনধর্মী ভাষার প্রবর্তন করেন¬¬যে ভাষা রবীন্দ্রনাথও ব্যবহারে হলেন অকুণ্ঠিত, অন্যরা তো সে ভাষাতেই চিড়ে ভেজালেন। প্রমথ চৌধুরীই প্রথম দেখালেন জলরঙ বা তেলরঙ নয়, স্কেচধর্মী ছবিতেই অন্তরের প্রকাশ ঘটে সবচেয়ে বেশি, রেখাচিত্রিক ভাষাই হওয়া উচিত ভাষার অভিজ্ঞান। এসব লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য বক্ষে ধারণ করে আজ হতে শতবর্ষ পূর্বে সবুজপত্র (১৯১৪) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পালাবদলে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিলে, যে ইতিহাস অতিগুরুত্বপূর্ণ।

যে কোনো ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকী প্রকাশের পশ্চাতে একটা উদ্দেশ্য থাকেঅবশ্যই সে উদ্দেশ্য হওয়া চাই সৎ, শুদ্ধ ও পরিবর্তনমুখি। সাময়িক পত্রই পারে সমাজকে পাল্টাতে, বহু যুগের সাহিত্যধারাকে পাল্টাতে, ভাষাকে নব নব রূপে বিকশিত করতে, মানুষকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে, প্রগতিশীলতাকে মননে-চৈতণ্যে ছড়িয়ে দিতে। নবচেতনা, নতুন পথ, নতুন দিনের সকালে জেগে ওঠার জন্য সাময়িক পত্র চিরকাল অবিকল্প। প্যারিচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ শিকদার সম্পাদিত ‘মাসিক পত্রিকা’ (১৮৫৪) প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল মূলত স্ত্রী লোকদের মন-প্রাণ বিকাশের জন্য এবং আলালী ভাষারীতি অনুসৃত হওয়ার জন্য। আর বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২) প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল ‘যতদিন না সুশিক্ষিত জ্ঞানবন্ত বা বাঙালিরা বাঙ্গালা ভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, তত দিন বাঙালির উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই।’ ‘ভারতী’ (১৮৭৭) ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রতিভা বিকাশের অন্যতম বাহন। এবং নবীন লেখক সৃষ্টিসহ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করায় ‘ভারতী’র ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সাধনা (১৯৯১) ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রতিভা বিকাশের অন্যতম পরিবাহী। সবুজপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পাদকের মন্তব্য ছিল ‘আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভোরের পাখিরা যদি আমাদের প্রতিষ্ঠিত সবুজপত্রমণ্ডিত সাহিত্যের নব শাখার উপর এসে অবতীর্ণ হন তাহলে আমরা বাঙালি জাতির সবচেয়ে যে বড় অভাব, তা কতকটা দূর করতে পারব। সে অভাব হচ্ছে আমাদের মনের ও চরিত্রের অভাব কতটা, তারই জ্ঞান।’

প্রমথ চৌধুরী ছিলেন চিরসবুজের পূজারি, যৌবনে দাও রাজটিকা’র আর্চক, চির বসন্তের বন্দনাকারি। এমন মানুষের পত্রিকার নাম তো সবুজপত্র হবেই। সবুজপত্রর নাম মাহাত্ম্য নিয়ে তিনি দুটি প্রবন্ধই লিখে ফেলেছিলেন : ১. সবুজপত্রের মুখপত্র ২. সবুজপত্র। প্রবন্ধদ্বয়ে যেন সবুজের সমারোহ, বসন্তের হিল্লোল, যৌবনের জয়গান বহু বর্ণে বর্ণিল। এই ব্যক্ত সত্যকে আমরা বুঝতে পারি না, ব্যক্তকে গুপ্তধন হিসাবে আবিষ্কার করতে যেয়ে। ‘যে বর্ণ বাংলার ঔষধিতে ও বনস্পিতিতে নিত্য বিকশিত হয়ে উঠেছে, নিশ্চয় সেই একই বর্ণ আমার হৃদয়-মনকেও রাঙিয়ে রেখেছে। আমাদের বাহিরের প্রকৃতির যে রঙ, আমাদের অন্তর পুরুষেরও সেই রঙ। (সবুজপত্র)। সবুজপত্র প্রকাশের প্রথম সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩২১) তিনি যে মুখপত্র রচনা করেন তাতে লিখেছিলেন, ‘দেশের মন যাতে আর বেশি ঘুমিয়ে না পড়ে তার চেষ্টা করা এবং বাঙালীর জীবনে যে নূতনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করা সবুজপত্রের লক্ষ হবে।’ বোঝা যায় সবুজপত্র প্রকাশের সময় দেশে নব-নবীনের হাওয়া বইছিল, রবীন্দ্রনাথের হাতে সম্পন্ন হচ্ছিল রেনেসাঁর পুষ্পিত পরিণাম। কিন্তু দেশে অরাজকতাও কম ছিল না। বঙ্গভঙ্গ-উত্তর ঝড়ো বাংলা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডঙ্কা, স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনের বাতাবরণে দেশে সুস্থ চিন্তা, সুখ চিন্তার দিন যে ফুরিয়ে যাচ্ছে অনতিকাল পর ‘কল্লোল’ (১৩৩০) যুগের পদধ্বনিতে তার আভাস স্পষ্ট। যা কিছু পুরাতন, অতীত তা থেকে বেরিয়ে এসে এক নব যুগের মধ্যে অবগাহন করাই ছিল কল্লোলের অভীপ্সা। এই নব আন্দোলনকেও স্বাগত জানিয়ে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। এ তাঁর সাহস ও দ্রোহের পরিচায়ক।

সবুজপত্র চেয়েছিল দেশের ও মানুষের যৌবনকে রক্ষা করবে ‘ওঁ প্রাণায় স্বাহা’র মাধ্যমে। কমল হীরে বিদ্যা আর তার দ্যুতি হবে কালচার। সমস্ত সবুজ ও সজীবের উৎসাহস্থল হিসাবে প্রমথ চৌধুরীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটা নবীন বিদ্রোহী লেখক গোষ্ঠী। চিরনূতন রবীন্দ্রনাথসহ ইন্দিরা দেবী, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সবুজপত্রের তরুণ তুর্কি লেখক। আর ‘কল্লোল’ যৌবন ও নতুনের পূজারি ছিল বলে প্রমথ চৌধুরী সেখানে নিয়মিত লিখতেন। অর্থাৎ যেখানে যৌবন, যেখানে সজীবতা, যেখানে নবীনতা সেখানে তিনি ছিলেন তার মধ্যমণি। যার উজ্জ্বল উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন নজরুল।

প্রমথ চৌধুরী ছিলেন জীবনরসিক মানুষ, মজলিসী মানুষ, অভিজাত মানুষ, উইট ও হিউমারনিষ্ঠ মানুষ, সর্বোপরি একজন স্টাইলিস্ট মানুষ। কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ করা ছিল তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ। তিনি যে সর্বাংশে স্বতন্ত্র ছিলেন সে তাঁর গল্প, গদ্য, সনেট যাই হোক-না কেন সর্বত্র তার পরিচয় মেলে। তাঁর স্বাতন্ত্র্যের মূল স্পিরিট ছিল চলতি বাংলা ভাষাযেখানে থাকবে ভাষার শৃঙ্খলা, অশৈথল্য, অজড়তা, গতি ও দীপ্তি। সবুজপত্র ছিল তাঁর এই ভাষিক সংগ্রামের হাতিয়ার। এলিয়ট যেমন বসেছিলেন কবিতায় অপ্রয়োজনীয় একটিও বাক্য, শব্দ ও বর্ণ থাকবে না, তেমনি প্রমথ চৌধুরী তাঁর লেখা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছিলেন পুনরুক্তি, অত্যুক্তি, অস্পষ্টতা, অকারণ বিশ্লেষণ প্রয়োগের বাতুলতাসহ ভাষার সকল দুর্লক্ষণকে। এসব প্রকরণ মেনে তিনি ভাষা ও সাহিত্যচর্চা করে লাভ করেছিলেন অনন্য গদ্যশিল্পীর মর্যাদা। ভাষার নবরীতির ক্ষেত্রে বঙ্কিমী বা রবীন্দ্র ভাষার পর বীরবলী বা প্রমথীয় ভাষারীতি তাঁর অসামান্য কীর্তি। ভাষা ও সাহিত্যে নবরীতি নির্মাণে তিনি এতটাই পারঙ্গমতা অর্জন করেছিলেন যে বুদ্ধদেব বসু তাঁকে ‘লেখকদের লেখক’ এবং ভবিষ্যতের বাঙালি লেখকদের তিনি হবে অন্যতম শিক্ষক’এমন মন্তব্য করেছিলেন ‘কালের পুতুল’-এ। আমরা সাহিত্যের স্রষ্টা ও দ্রষ্টাদের নিয়ে সরব, কিন্তু যারা নির্মাতা তাদের সম্পর্কে তিনি নীরব প্রমথ চৌধুরী সে কারণে আজও এক অনালোচ্য প্রতিভা, তাঁর উজ্জ্বলতা আজও আলোকিত হল না, তাঁর আলো থেকে আলো জ্বাললো না প্রায় কেউ। কেবল ব্যতিক্রম অন্নদাশঙ্কর রায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিংবা সাগরময় ঘোষ।

প্রমথ চৌধুরীর অনন্য প্রসিদ্ধি চলতি ভাষা। তৎপূর্বে রবীন্দ্রনাথের হাতে এই ভাষার উন্মেষ ঘটেছিল তাঁর ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’, ‘ছিন্নপত্র’ ইত্যাদিতে। কিন্তু সে ভাষা যে যথেষ্ট কুলমান সম্পন্ন নয়, অনুসরণযোগ্য ও আদর্শ সাহিত্য ভাষা নয় বুঝতে পেরে সাধু ভাষায় প্রত্যাবর্তন করে লিখলেন ‘চতুরঙ্গ’, ‘জীবনস্মৃতি’ ইত্যাদি। পরে প্রমথ চৌধুরীর প্রভাবে ‘ঘরে-বাইরে’ (১৯১৬)-তে তিনি আবার চলতি ভাষায় ফিরে এলেন, আর ফিরলেন না সাধু ভাষার সমীপে।

প্রমথবাবু যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা ভাষার প্রকৃত পরিচয় হওয়া উচিত চলতি ভাষা। যে ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা, মায়ের ভাষা, প্রিয়ার ভাষা সেই ভাষাতেই রচিত হবে আমাদের সাহিত্যসবুজপত্র ছিল সেই ভাষা ও সাহিত্যের অকুস্থল। তিনি যখন এই চলতি ভাষার প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংগ্রাম করছেন তখন তার বিরুদ্ধবাদীরা গড়ে তুলতে চাইলো প্রবল প্রতিরোধ। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর বুদ্ধি, জ্ঞান ও যুক্তির কাছে তারা যে শেষাবধি পরাজিত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর-মানিক-বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়ের অধিকাংশ রচনাবলী তার প্রমাণ। অর্থাৎ আধুনিক সাহিত্য মানেই চলতি ভাষাপন্থী।

যে যুগে সবই ছিল রবীন্দ্রানুসারি, রবীন্দ্রবৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ, সে যুগে কেবল প্রমথ চৌধুরীই রবীন্দ্রসূর্যকে তাঁর শিশির কণার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন চলতি ভাষার নিগড়ে। এই যে যুক্তি-তর্কে তাঁকে বাধ্য করা, তাঁর পাশে টেনে নিয়ে আসা এবং আপন বৈশিষ্ট্যে উদ্ভাসিত হওয়া, এটাই প্রমথ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। অতঃপর নজরুল হলেন আপন স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর। প্রমথ চৌধুরীর কী কবিতা কী গদ্য সবটাই ছিল ভাবলতাহীন, আবেগহীন চিন্তাপ্রসুত নকশাধর্মী ভাস্করধর্মী রচনা। উদাহরণ তাঁর একটি সনেটের কিছু অংশ :

প্রবাসে চলিয়ে গিয়েছে রবি।

এই ফাঁকে হও            নতুন করি ॥

নূতনের আজ             জরুর বড়।

এই বুঝে           নবসাহিত্য গড় ॥

তাঁর এই রচনাশৈলীর ভিন্নতা, অভিনবত্ব এবং নুড়ি-পাথরে কাব্যরীতি রবীন্দ্র পথ থেকে বহু দূরে অবস্থিত। এ যেন গদ্যের সুরে পদ্য লেখা, পদ্যের সুরে গদ্য। এমন কাব্যরূপ আমরা লক্ষ করি গিত্তম আপোলিনের, স্তেফান মালার্মে বা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখায়। রবীন্দ্রনাথের ‘লেখন’ যেন এমন ছন্দ ও সুরে বাঁধা। সুতরাং নতুন ও প্রমথ চৌধুরী যেন একই সত্যের দুই রকম উৎসারণ। বাংলা সাধু ভাষা ও চলতি ভাষার একটা চারু-সংগ্রাম চলেছিল শতবর্ষব্যাপী। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার থেকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিচন্দ্রের তৎসম শব্দের ওস্তাদিতে, সমস্তপদ ও সন্ধিপ্রবণ দূরান্বয় সিদ্ধিতে, আলঙ্কারিক ও ধ্র“পদধর্মী সাধুরীতি একদিকে; অন্যদিকে লোকচালিত কথ্যভাষার স্বপক্ষে উইলিয়াম কেরী থেকে রামরাম বসু, প্যারীচাঁদ মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী ঘোষিত আন্দোলন যার মুখপত্র ছিল সবুজপত্র এবং প্রথম চৌধুরী ছিলেন তার সারথি। এই বহমান দুই ধারার শ্রেষ্ঠ শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। একদিকে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অন্যদিকে ‘শেষের কবিতা’ যেন খঞ্জরের শানিত দুই ধারের চকমকি শোভা। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর একাস্নীবান স্বরূপ ছিল চলতি ভাষা, এই বাণেই তিনি বধে সফল হয়েছিলেন সাধু ভাষাকে। তাই এই ভাষাতেই আমৃত্যু অনড় রইলেন ‘অটল অচল যথা’। প্রমথ চৌধুরী বার বার বলেছেন মুখের ভাষাই হওয়া উচিত সাহিত্যের ভাষা। কিন্তু তিনি যে ভাষায় লেখালেখি করেছেন তা কি সত্যি মুখের ভাষা, জনগণের ভাষা? কিছুটা কলকাতাজনের ভাষা। শুধু ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পরিবর্তন করে সাধু ভাষার পোশাক পরিবর্তন করা যায় না। সে কারণে তাঁর ভাষাকে বলা যায় সাধুগন্ধী চলতি ভাষা। শুধু তাই না কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে ভাষা সাধু ভাষা অপেক্ষা হয়ে উঠেছে দুরূহ ও কঠিন, জটিল ও জাড্য। সে কারণে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন ‘বীরবলের ভাষার তুলনায় হতোম বা বিবেকানন্দের বাংলা চলতি রীতি অনেক বেশি জীবনের নিকটবর্তী।’ স্বপক্ষে দুটি উদ্ধৃতি১. সংস্কৃতি সাহিত্যে যুবকযুবতী ব্যতীত আর কারো স্থান নাই। আমাদের কাব্যরাজ্য হচ্ছে সূর্যবংশের শেষ নৃপতি অগ্নিবর্ণের রাজ্য, এবং সে দেশ হচ্ছে অষ্টাদশবর্ষদেশীয়দের স্বদেশ। যৌবনের যে ছবি সংস্কৃত দৃশ্যকাব্যে ফুটে উঠেছে, সে হচ্ছে ভোগবিলাসের চিত্র। সংস্কৃত কাব্যজগৎ মাল্যচন্দনবনিতা দিয়ে গঠিত এবং সে জগতের বনিতাই হচ্ছে স্বর্গ, ও মাল্যচন্দন তার উপসর্গ। (যৌবনে দাও রাজটিকা)। ২. হীরেনবাবু দর্শন শব্দের এবং যোগেশবাবু বিজ্ঞান শব্দের নিরুক্তের আলোচনা করেছেন, কিন্তু যদুবাবু ইতিহাসের নিরুক্ত সম্বন্ধে নীরব।… আমার সময়ে সময়ে মনে হয় যে শাস্ত্রীমহাশয় পুরাতত্ত্বের ছলে আত্মশ্লাঘাপরায়ণ বাঙালি জাতির সঙ্গে একটা মস্ত রসিকতা করেছেন। (চুটকি)। উদ্ধৃতি দুটিতে প্রমথ চৌধুরীর ধীশক্তি, জ্ঞান-আলো-চিন্তার পরিচয় মেলে, উইট ও হিউমারও আছে, আলঙ্কারিক আয়োজনও আছে, কিন্তু ভাষা হয়ে উঠেছে সাধুগন্ধী, দ্রুপদগন্ধী, জলাবর্তগন্ধীএমন ভাষা আর যাই হোক চলতি ভাষার স্বাদ গ্রহণে অক্ষম। তাঁর প্রবন্ধ পড়তে পড়তে আমরা ভুলে যাই এটি চলতি ভাষায় লেখা। অথচ বিবেকানন্দ, রাজশেখর বসুর চলতি বাংলা পড়তে আমাদের তেমনটি মনে হয় না। এমন কি হরপ্রসাদশাস্ত্রীর সাধু বাংলা প্রমথ বাবুর চলতি বাংলা অপেক্ষা সহজ এবং বোধগম্য। সারকথা যে ভাষা রীতিতেই আমরা লিখি-না কেন সে ভাষা যদি প্রাকৃত না হয়ে কৃত্রিম হয়, কাটখোট্টা ও জবরজং হয়, তাহলে তা নন্দিত না হয়ে নিন্দিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রমথ চৌধুরীর ভাষা ইনটেলেকচুয়াল হওয়ায় এবং বাঙালি স্বভাবত ভাববেদ্য ও হৃদয়বেদ্য হওয়ার কারণে তাঁর মূলত অনুসরণযোগ্য হয়নি। তবে চলতি ভাষা প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা সবার উপরে। আর সবুজপত্র নয় বছরের সংগ্রামে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পালাবদলে যে নবদিগন্তের উন্মেষ ঘটিয়েছিল সেই সরণি ধরেই আমাদের আধুনিক সাহিত্যের গৃহপ্রবেশ। সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর সংগ্রামী ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শতবর্ষ অতিক্রান্ত এক স্মরণীয় ইতিহাস।

সবুজপত্র বাংলাসাহিত্যে ও উত্তরকালের জিজ্ঞাসা

আহমেদ মাওলা

[অধ্যাপক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়]

সাহিত্যের ঋতুবদলের ঘটনা প্রতি মাসে বা বছরে ঘটে না, ঘটা সম্ভবও নয়, কারণ, বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে না খুঁজলে এখন আর শিল্পেরকল্পতরু জন্মায় না। সমকালীন দৈনিক পত্রিকায় বুড়োদের লিটল ম্যাগাজিন মার্কা কবিতা পড়লে মনে হয়, বাংলাভাষা বুঝি কবিতা লেখার অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। চিৎকার আর চুম্বনের মধ্যে যেনো কোনো পার্থক্য নেই। অভিনবত্ব কোথায়? সবই প্রথাগত আর ফ্যাকাশে মনে হয়। এর পেছনে হয়ত সামাজিক রাজনৈতিক অনেক কারণ রয়েছে, তার চেয়ে বেশি অভাব রয়েছে ভালো রুচিশীল সাহিত্যপত্রিকা এবং একজন গুণি সম্পাদকের অনুপস্থিতি। অথচ এমন সময় ছিলো, যখন সাহিত্যপত্রিকা মানদণ্ডের মতো কাজ করতো।

বাংলা সাহিত্যপত্রিকার ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরী এবং সবুজপত্র (১৯১৪) প্রায় সমার্থক। চলতিভাষার প্রতিষ্ঠা প্রমথ চৌধুরীর মহৎ কীর্তি হলেও একমাত্র কিংবা প্রধান কীর্তি নয়। বিশশতকের প্রথম দিকে, তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্মরণীয় বিদ্রোহী। বাঙালির চিন্তার দীনতা ও দুর্বলতা এবং বাংলাগদ্যের লেখ্য ও মৌখিক ভাষার পার্থক্য; ভাবালুতা, অস্পষ্টতা, অনুরূপ ক্রিয়াপদের একঘেয়ামিযা ছিল বাংলাগদ্যের দুর্লঙ্ঘ অভিশাপ, তার বিরুদ্ধে প্রমথ চৌধুরীর ছিলো উজ্জ্বল বিদ্রোহ। সবুজপত্র কেবল বাংলা গদ্যের বাঁকবদল ঘটায়নি, একই সঙ্গে বাঙালির বোধ ও বুদ্ধিকে আলোড়িত করে সাহিত্যের ঋতুবদল ঘটিয়েছিলো। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন সাহিত্য গোষ্ঠী এবং সাহিত্যাদর্শ গড়ে ওঠে। সেই সাহিত্যগোষ্ঠীর প্রভাব ও সাহিত্যাদর্শের স্বরূপও অস্পষ্ট নয়। প্রমথ চৌধুরীর ব্রাইট স্ট্রিটের বাড়িতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে যারা আড্ডায় যোগ দিতেনমণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশঙ্কর রায়, সতীশচন্দ্র ঘটক, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বপতি চৌধুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুরেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। সবুজপত্র গোষ্ঠীর এই অভিজাত, বিদগ্ধ আড্ডা বিশশতকের বাঙালির মানসে স্থায়ী একটা প্রভাব রেখে গেছে। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমরা ও তাঁহারা’ গ্রন্থের ভূমিকায় সবুজ আড্ডা সম্পর্কে লিখেছেন : আমি যে দলে মানুষ হয়েছি তাকে ঢ়ৎধসধঃযবধহ কিংবা সবুজপত্রের দল বললেই বর্ণনা সম্পূর্ণ হয় না। কারণ আমাদের বই পড়ার অভ্যাস ও বড় বড় ব্যাপার নিয়ে তর্কপ্রবৃত্তির জন্যই প্রমথবাবু নিজের কাছে আমাদের টেনে নেন ও শিক্ষা দিয়ে সবুজপত্রের দল তৈরি করেন। সেখানে অভিব্যক্তিবাদ, নতুন ফিজিক্স, নতুন অর্থনীতি, আর নব্যদর্শন নিয়ে আলোচনা অসামাজিক বিবেচিত হত না। …কেবল বের্গসঁ, প্ল্যাঙ্ক ও রাসেল নয়, এইসঙ্গে শ’ ক্রোচে, ফ্রয়েড, য়ুং, অ্যাডলার, অয়কেন প্রমুখ ইউরোপীয় মনীষীবৃন্দের বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস বিষয়ক মননশীল আলোচনায় সবুজপত্রীরা মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন।’ (ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: ১৯৫৬, ভূমিকা; আমরা ও তাঁহারা)

সবুজপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাসাহিত্যে একটি নতুন যুগের সূচনা হলো। যে সাহিত্যাদর্শের জন্ম দিয়েছিলো সবুজপত্র স্বরূপটা আসলে কি? তা কেবল বাংলা চলতি গদ্যরীতির অনুশীলন নয়, মননশীল একটি প্রবন্ধের ধারা। যে চিন্তা কেবল সমাজকল্যাণে নিয়োজিত নয়, তার ভিত্তি হচ্ছে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির, তার লক্ষ হচ্ছে বুদ্ধির মুক্তিসবুজপত্রের প্রতিটি লেখায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রবীন্দ্র যুগের মধ্য পর্যায়ে সাহিত্যে বিদ্রোহের ঝড়ো হাওয়া নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সবুজপত্র। সাহিত্যে কথ্যভাষার ব্যবহার, দুরূহ বিষয়কে সহজ-সরল করে উপস্থিত করার প্রয়াস, বুদ্ধিপ্রবণ মননশীলতা, বিশুদ্ধ প্রজ্ঞার চর্চা, যুক্তিধর্মিতা এসবই ছিল সবুজপত্রর প্রধান বৈশিষ্ট্য। তৎকালীন সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়ে ছিলেন সবুজপত্রগোষ্ঠী। প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি শক্তিমান, বিদগ্ধ নাগরিক রুচিবান, পরিপাটি মনের প্রাবন্ধিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। সবুজপত্র প্রকাশের পূর্বের প্রবন্ধকার যেমন, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সুরেশ সমাজপতি, পাঁচকড়ি বন্ধ্যোপাধ্যায় গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী, বিপিনচন্দ্র পাল, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখের লক্ষ ছিলো দেশ-কাল-সমাজ। সবুজপত্র লেখকগোষ্ঠীর লক্ষ বিশ্বনাগরিকতা, বৈদগ্ধমার্জিত বুদ্ধির উদ্বোধন। রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রের প্রভাবের কথা স্মরণ করতে গিয়ে লিখেছেন :

আমি যখন সাময়িকপত্র চালনায় ক্লান্ত এবং বীতরাগ, তখন প্রমথ’র আহ্বানমাত্র সবুজপত্র বাহকতায় আমি তার পার্শ্বে এসে দাঁড়িয়েছিলুম। প্রমথনাথ এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনার একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। …আমি তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হইনি। (প্রমথ চৌধুরীর গল্পসংগ্রহ ভূমিকা : ১৯৪১)।

সবুজপত্র রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও ভাষারীতির আধুনিকতা বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেও সেই ঋণের কথা বার বার স্বীকার করেছেন। ‘একটা নতুন কিছু করো’ ডি. এল. রায়ের এই পরামর্শ অনুসারে প্রমথ চৌধুরী একটা নতুন মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এমন বলা যায় না। মূল উদ্দেশ্য ছিলো পরিবর্তন। সমাজে আমূল পরিবর্তন। শ্রেণিভেদ, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রশক্তির মূল উৎসের পরিবর্তন। সাহিত্যের কাজ হচ্ছে এই পরিবর্তনের কাজকে সুগম করা। ‘ওঁ প্রাণায় স্বাহা‘সবুজপত্রের মুখপত্রে’ তিনি সাহিত্যের মূল প্রকৃতির কথাটি পরিষ্কার করে বলেছেনএকথা সত্য যে, মানবজীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নাই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাক্ছল। জীবন অবলম্বন করেই সাহিত্য জন্ম ও পুষ্টি লাভ করে কিন্তু সে জীবন মানুষের দৈনিক জীবন নয়। সাহিত্য হাতে হাতে মানুষের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করে দিতে পারে না। কোনো কথায় চিঁড়ে ভেজে না, কিন্তু কোনো কোনো কথায় মন ভেজে; এবং সেই জাতির কথারই সাধারণ সংজ্ঞা হচ্ছে সাহিত্য।

সবুজপত্র সূচনা থেকে উত্তেজনার যুগ অতিক্রম করে তার প্রভাবের ফসল ফলিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে সবুজপত্রের প্রভাবের রোদ আর প্রতাপের জোছনা কেবল যুগের বুদ্বুদ মাত্র নয়। ১৯১৪, বৈশাখ ১৩২১ বঙ্গাব্দ থেকে ১৯২৮, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত মোট তের বছর সবুজপত্র প্রকাশিত হয়। এই সময় পরিসরে সাহিত্যপত্রিকার যে চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য উন্নত রুচি, বিদগ্ধ মননশীলতা ও যুক্তিধর্মিতা প্রদর্শন করে সবুজপত্র একটি মানদণ্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সবুজপত্রর এই মানদণ্ড ও প্রভাব উত্তরকালে বাংলাসাহিত্যে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী হয়নি।

সবুজপত্রর প্রভাব উত্তরকালে কেন সুদূরপ্রসারী হলো না? তার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪) কাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯) পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে সাহিত্যপত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, তার মধ্যে তিনটি ধারা লক্ষ করা যায়। এক. সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ‘সাহিত্য’ (১৮৯০) জলধর সেনের ‘ভারত বর্ষ’ (১৯১৩) চিত্তরঞ্জন দাসের ‘নারায়’ (১৯১৫) বিজয়চন্দ্র মজুমদার ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গবাণী’ (১৯২১) হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের ‘মাসিক বসুমতী’ (১৯২২)। এগুলো ছিলো রক্ষণশীল এবং রবীন্দ্র বিরোধী সাহিত্যপত্র। দুই. মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভারতী’ (১৯১৫) জগদিন্দ্রনাথ রায়ের ‘মানসী ও মর্মবাণী’ (১৯১৬) রামানন্দ চট্রোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসী’ (১৯০১) উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিচিত্রা’ (১৯২৭) এগুলো ছিলো রবীন্দ্র গুণমুগ্ধ সাহিত্য পত্রিকা। তিন. আধুনিকতার পতাকাবাহী প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র কাজী নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ (১৯২২) দীনেশরঞ্জন দাসের ‘কল্লোল’ (১৯২৩) প্রেমেন্দ্র মিত্র ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘কালিকলম’ (১৯২৬) সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’ (১৯২৭) সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ (১৯৩১)। এগুলো স্বভাবে রবীন্দ্র-বিরোধী হলেও তাদের রবীন্দ্র-বিরোধীতা আসলে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রমের চেষ্টার নামান্তর মাত্র।

রবীন্দ্র-বিরোধী এবং রবীন্দ্র-অনুরাগী, কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সবুজপত্রর ঐক্য ছিল না। কারণ, প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্র-গুণগ্রাহী কিন্তু অন্ধ রবীন্দ্র-স্তাবক ছিলেন না। ফলে সবুজপত্রে পথ ছিল বৈশ্বিক নাগরিকতা, বিদগ্ধ মননশীলতা এবং ভাষার ক্ষেত্রে চলিত গদ্যরীতির অনুসরণ। সাধু-চলিত ভাষার তর্কে সবুজপত্রর জয়ের চিহ্ন আজ বাংলাগদ্যের সারা শরীরে বিদ্যমান হলেও সবুজপত্রর সাহিত্যাদর্শ উত্তরকালে অনুসৃত হয়নি। ভারত বিভাগোত্তরকালে ঢাকা বাংলাসাহিত্যে দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠলেও সবুজপত্রর মতো একটি মাননিক সাহিত্য পত্র এবং প্রমথ চৌধুরীর মতো একজন সম্পাদক দেখা যায় নি। উদ্যোগ অনেক নেয়া হয়েছে কিন্তু সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার উদাহরণ সত্যি হৃদয় বিদারক।

সবুজপত্র : বাংলাগদ্যে বাঁক বদলের ভেলা

মাহবুব বোরহান

[অধ্যাপক ও সভাপতি ॥ বাংলা বিভাগ ॥ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ॥ ত্রিশাল ॥ ময়মনসিংহ]

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ভাষা। ভাষা মানুষের চিন্তার বাহন, ভাবপ্রকাশের মাধ্যম। আদিম মানুষের যুথবদ্ধ জীবনে ইশারা, ইঙ্গিত আর নানা রকম সাংকেতিকতার মধ্যে ভাষার পরিসর ছিল নিতান্ত সীমিত। জীবনে টিকে থাকবার অনিবার্য সংগ্রামে শ্রমকে সহজ করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় সহজাত অন্তঃপ্রেরণায় আদিম মানুষ যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমূহ উচ্চারণ করেছে সেই ধ্বনি বা ধ্বনিসমূহই আজকের আধুনিক মানুষের ব্যবহৃত সকল ভাষার উৎস। মানুষ যে দিন তার মুখের ভাষাকে কাগজ আর কালির শৃঙ্খলে আটক করে রাখবার কৌশল আবিষ্কার করলো অর্থাৎ লিখতে শিখলো সে দিন থেকেই প্রতিষ্ঠিত হলো মানব সভ্যতার উপর ভাষার সার্বভৌমত্ব। তারপর থেকে মানব ইতিহাসে ভাষা ও সভ্যতা প্রায় সমার্থক এবং ভাষা ও সভ্যতার বিকাশ সমান্তরাল। কোন জাতির ভাষার বিকাশকে ব্যতিরেকে সভ্যতার বিকাশ যেমন অসম্ভব, তেমনি কোন জাতির সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবনের মানসম্মত উন্নয়ন তথা সভ্যতার বিকাশ ছাড়া সে জাতির ভাষা-সাহিত্যের বিকাশ অকল্পনীয়।

সভ্যতার নিয়ামক লিখিত ভাষার দুইটি রূপ। গদ্য এবং পদ্য। বাংলা ভাষা সহ পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায় গদ্য অপেক্ষা পদ্যের নিদর্শনই প্রাচীনতর। কিন্তু মানুষ তার জীবনাচরণের প্রয়োজনে যে ভাষা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে, যে ভাষায় কথা বলে তা পদ্য নয় গদ্য। তা সে গদ্যের রূপ যেমনই হোক। প্রাত্যহিক আটপৌরে জীবনে যে গদ্য সে প্রতিদিন ব্যবহার করেছে সে-ই গদ্য সে মনে রাখবার, লিখে রাখবার বা সংরক্ষণ করবার প্রয়োজন বোধ করে নি। কিন্তু ছন্দবদ্ধ যে সকল পদ্য সে রচনা করেছে বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য এবং রূপের অভিনবত্বের জন্য সে তা মনে রাখবার চেষ্টা করেছে, লিখে রেখেছে অর্থাৎ সংরক্ষণ করেছে। যেমন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে আমরা যে চর্যাপদের সাক্ষাৎ পাই তা পদ্যে রচিত। চর্যাপদের কবিরা নিশ্চয়ই পদ্যে কথা বলতেন না, বলতেন গদ্যেই। কিন্তু ব্যবহৃত সে গদ্য তারা লিখে রাখেন নি। একান্ত গার্হস্থ্য জরুরি প্রয়োজনে দৈবাৎ হয়তো কিছুটা লিখতে বাধ্য হলেও তা সংরক্ষিত হয় নি। কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। তাই একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভাষার ইতিহাসে পদ্য নয় গদ্যই প্রাচীনতর। এ প্রসঙ্গে শিশিরকুমার দাশের মন্তব্য স্মরণ যোগ্য :

…এটা সত্যিই আমরা গদ্যই বলি। আর যখন লিখি তখন গদ্য বা পদ্য একটিকেই অবলম্বন করে থাকি। পদ্যের জন্ম হয়েছে গদ্যের পরে, অথচ সাহিত্যের ইতিহাস খুললে দেখি, ইতিহাসের আদি স্তরে গদ্যের নিদর্শন নেই। আমাদের ভাষার ইতিহাসেই দেখি, তার প্রথম লিখিত নিদর্শন পদ্য। আমাদের গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস যাঁরা লিখেছেন তাঁরা সবাই দেখিয়েছেন যে গত শতাব্দীর আগে গদ্যের সামান্য কিছু নমুনা আছে। সেইসব নমুনার গুরুত্ব মেনে নিয়েও স্বচ্ছন্দে বলা চলে যে আমাদের পুরোনো সাহিত্য মোটামুটি পদ্যে লেখা। অথচ গদ্য ছিল না এমন নয়। গদ্যের নমুনাগুলি না পেলেও বলতে পারি যে গদ্য ছিলই। চর্যাপদ রচয়িতারাই হোন, চণ্ডীদাস-কৃত্তিবাসই হোন, তাঁরা সবাই গদ্যই বলতেন। যেদিন থেকে বাংলা ভাষা সেদিন থেকেই বাংলা গদ্য। যেদিন থেকে ভাষা সেদিন থেকেই গদ্য।

মৌখিক গদ্য যত প্রাচীনই হোক লিখিত আকারে বাংলা গদ্য উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই সাহিত্যে তার আপন আসন অধিকার করতে থাকে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের (১৮০০-১৮৫৪) পণ্ডিতদের হাত হয়ে রামমোহন (১৭৭৪-১৮৩৩), প্যারীচাঁদ (১৮১৪-১৮৮৩), বিদ্যাসাগর (১৮২৯-১৮৯০), বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) যার শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেন। ভাষা ব্যবহারে অত্যন্ত রক্ষণশীল সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের আধিপত্যে ‘সাধুভাষা’ নামে যে গদ্যের প্রচলন সে সময় ঘটে তা ছিল একান্তই গতিহীন, নিরস এবং আড়ষ্ট। সংস্কৃতবহুল এই আড়ষ্ট গদ্যের দ্বারা প্রথম অর্গলমুক্ত করেন প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থে প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত ভাষাকে লিখিত তথা বইয়ের ভাষায় স্থান করে দেওয়ার মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় :

…সংস্কৃতপ্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্ব্বল এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল। টেকচাঁদ ঠাকুর প্রথমে এই বিষবৃক্ষের মূলে     কুঠারাঘাত করিলেন। তিনি ইংরেজিতে সুশিক্ষিত। ইংরেজিতে প্রচলিত ভাষার মহিমা দেখিয়াছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন। তিনি ভাবিলেন, বাঙ্গালার প্রচলিত ভাষাতেই বা কেন গদ্যগ্রন্থ রচিত হইবে না? যে ভাষায় সকলে কথোপকথন করে, তিনি সেই ভাষায় “আলালের ঘরের দুলাল” প্রণয়ন করিলেন। সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি। সেই দিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল।

সেই দিন থেকেই ‘সাধুভাষা এবং অপরভাষা’ দুই প্রকার ভাষায়ই গ্রন্থ ‘প্রণয়ন হইতে লাগিল’। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ভাষাকে লিখিত ভাষায় প্রয়োগকে ‘সংস্কৃত ব্যবসায়ী’রা প্রচণ্ড ঘৃণার চোখে দেখতে থাকেন এবং বাংলা গদ্য পুরোপুরি দুটি বিপরীতমুখী ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে। এক ধারায় খাঁটি সংস্কৃতবাদীরা অন্যধারায় ‘অধিকাংশ সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা’। বাংলা গদ্যের এই দ্বিমুখীবিবাদ মেটাতে এগিয়ে আসেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র। বাংলা গদ্যে ভাষা ব্যবহার বা শব্দ প্রয়োগে দ্বিধাবিভক্তির সমাধানে তিনি যে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দিলেন, তা কাল নিরপেক্ষভাবেই ভাষা ব্যবহারের এক ধ্র“পদী সূত্র হিসেবে সর্বজন মান্য হয়ে রইলো। তিনি লিখলেন :

অতএব ইহাই সিদ্ধান্ত করিতে হইতেছে যে, বিষয় অনুসারেই রচনার ভাষার উচ্চতা বা সামান্যতা নির্দ্ধারিত হওয়া উচিত। রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন, সরলতা এবং স্পষ্টতা। যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে এবং পড়িবামাত্র যাহার অর্থ বুঝা যায়, অর্থগৌরব থাকিলে তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা। তাহার পর ভাষার সৌন্দর্য্য, সরলতা এবং স্পষ্টতার সহিত সৌন্দর্য্য মিশাইতে হইবে। অনেক রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সে স্থলে সৌন্দর্য্যরে অনুরোধে শব্দের একটু অসাধারণতা সহ্য করিতে হয়। প্রথমে দেখিবে, তুমি যাহা বলিতে  চাও, কোন্ ভাষায় তাহা সর্বাপেক্ষা পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত হয়। যদি সরল প্রচলিত কথাবার্ত্তার ভাষায় তাহা সর্ব্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট এবং সুন্দর হয়, তবে কেন উচ্চভাষার আশ্রয় লইবে? যদি সে পক্ষে টেকচাঁদি বা হুতোমি ভাষায় সকলের অপেক্ষা কার্য্য সুসিদ্ধ হয়, তবে তাহাই ব্যবহার করিবে। যদি তদপেক্ষা বিদ্যাসাগর বা ভূদেববাবু প্রদর্শিত সংস্কৃতবহুল ভাষায় ভাবের অধিক স্পষ্টতা এবং সৌন্দর্য্য হয়, তবে সামান্য ভাষা ছাড়িয়া সেই ভাষার আশ্রয় লইবে। যদি তাহাতেও কার্য্য সিদ্ধ না হয়, আরও উপরে উঠিবে; প্রয়োজন হইলে তাহাতেও আপত্তি নাইনিষ্প্রয়োজনেই আপত্তি। বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবেযতটুকু বলিবার আছে, সবটুকু বলিবেতজ্জন্য ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য যে ভাষার শব্দ প্রয়োজন, তাহা গ্রহণ করিবে, অশ্লীল ভিন্ন কাহাকেও ছাড়িবে না। তার পর সেই রচনাকে সৌন্দর্য্যবিশিষ্ট করিবেকেন না, যাহা অসুন্দর, মনুষ্যচিত্তের উপরে তাহার শক্তি অল্প।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রবর্তিত উল্লিখিত বাংলা গদ্যেরই একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথের লেখক জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত, সুনির্দিষ্ট করে বললে বলা যায় ১৯১৪ সাল পর্যন্ত, অন্যভাবে বলা যায় প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র পত্রিকা প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত। শব্দ ব্যবহারে বঙ্কিমচন্দ্র কোন রক্ষণশীলতাকে প্রশ্রয় না দিলেও দীর্ঘ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত ভাবগম্ভীর সাধুরীতির গদ্যই সবুজপত্র পত্রিকা প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথসহ তাবৎ লেখক সমাজের বলতে গেলে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে দেখা যায়। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ যুক্ত চটুল গতির ‘চলিতরীতি’র গদ্যও যে সাহিত্যের বাহন হতে পারে এই চিন্তা তৎকালীন লেখককুল মেনে নিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। বাংলা গদ্যের এই অচলায়তনের উপর প্রথম আঘাত হানলেন প্রমথ চৌধুরী তাঁর সবুজপত্র পত্রিকার মাধ্যমে। সুকুমার রায়ের ভাষায়, ‘…প্রমথবাবুর সম্পাদিত সবুজপত্র প্রকাশিত হইয়া শিক্ষিত বাঙ্গালীর সাহিত্য ও সমাজ চিন্তায় মর্মান্তিক ও গতানুগতিকতার উপর প্রাণান্তিক আঘাত হানিল’। (সুকুমার সেন, ১৯৭৬: ২৪৮) সে আঘাতে তিনি অর্জন করলেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। কোলকাতাকেন্দ্রিক নাগরিক জনের ব্যবহৃত মুখের ভাষাকে তিনি সাহিত্যে স্থান দিয়ে বিপ্লব ঘটালেন বাংলা গদ্যে। প্রচলিত হলো সাহিত্যের সকল শাখায় ব্যবহার উপযোগী আধুনিক বাংলা গদ্য। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত হলেন এই রীতির দ্বারা। সবুজপত্র প্রকাশের পরে রচিত রবীন্দ্রগদ্যের প্রায় পুরোটাই বলা যায় চলিতরীতির। কবি জীবনের শেষ পর্বে রবীন্দ্রনাথ যে গদ্যকবিতা রচনা করেন একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, এই সময়ে রচিত গদ্যরচনাসমূহে মধ্য দিয়েই তার ভাষা তৈরি হতে থাকে ।

প্রশ্ন জাগে প্রমথ চৌধুরী এই অসাধ্য সাধনের সাহস এবং শক্তি কোথা থেকে অর্জন করলেন? প্রমথ চৌধুরীর বেড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত ও জ্ঞান-সাধনার সামগ্রিক পারিবারিক-আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে নিহিত আছে তাঁর এই দুর্দান্ত সাহস এবং অসাধ্য সাধনের গূঢ় রহস্য। প্রমথ চৌধুরী এই ভাষারীতি প্রবর্তনে কথ্য বাংলাকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেন যা তাঁর ছদ্মনাম ‘বীরবল’ অনুসারে বীরবলী ভাষা হিসেবে খ্যাতিলাভ করে। প্রথম পর্যায়ে সবুজপত্র তেমন সফলতা অর্জন না করলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে তা ব্যাপকভাবে খ্যাতি লাভ করে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সবুজপত্র যুগের এবং পরবর্তীকালের গদ্য নিশ্চিতভাবেই প্রমথ চৌধুরী প্রবর্তিত সাহিত্যরীতি বা সবুজপত্রের সফলতাকেই প্রমাণ করে।

আলোচনার এক পর্যায়ে আমরা প্রমথ চৌধুরীর শক্তি ও সাহসের উৎস সন্ধানে যে প্রশ্ন তুলে ছিলাম, এই পর্যায়ে তার উত্তরে এ কথা বলা বোধ হয় অমূলক হবে না যে ব্যক্তি প্রতিভা প্রমথ চৌধুরীর এই যুগান্তকারী শক্তি ও উদ্যমের প্রধান উৎস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পত্রিকাটি প্রকাশের অনুপ্রেরণা থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক লেখক হিসেবেও সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছিলেন। সুকুমার সেন যথার্থই বলেছেন, ‘সবুজপত্রের সারথি রবীন্দ্রনাথ, গাণ্ডীবী সব্যসাচী প্রমথনাথ’। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যবহৃত নতুন গদ্যরীতি থেকে সরে আসেন নি। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রগদ্যের পর্যায় বিভাজনে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য স্মরণযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘রবীন্দ্র-গদ্যরীতির প্রথম পর্ব জ্ঞানাঙ্কুর-ভারতীর যুগ (১৮৭৬-১৮৮৩), দ্বিতীয় পর্ব হিতবাদী-সাধনা-ভারতী-বঙ্গদর্শন-প্রবাসীর যুগ (১৮৮৪-১৯১৩), তৃতীয় পর্ব সবুজপত্রের যুগ (১৯১৪-১৯৪১)।’ আর আসেন নি বলেই সবুজপত্র প্রবর্তিত গদ্যরীতি বাংলা সাহিত্যে এমন স্থায়ী আসন লাভ করতে পেরেছিলো। সবুজপত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ যদি তাঁর ব্যবহৃত নতুন গদ্যরীতি থেকে সরে যেতেন তা হলে হয়তো প্রমথ চৌধুরী তথা সবুজপত্র প্রবর্তিত গদ্যরীতি বাংলা সাহিত্যে এমন স্থান অধিকার করতে পারতো না। কথাটিকে অন্যভাবে বলা যায় ভাষার মহাকারিগর রবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথের অনিবার্য বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি পুরোনো পথকে পরিহার করে নতুন পথের অভিযাত্রী হয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরী এবং সবুজপত্র সেই অভিযাত্রার উপলক্ষ মাত্র। আমরা জানি উপলক্ষকে অবলম্বন করেই প্রতিভার বিস্তার ঘটে। তাই রবীন্দ্রনাথ হয়তো বাংলা গদ্যরীতির খোলস পরিবর্তনের উপলক্ষ সন্ধানের অন্তর্গত প্রেরণা হিসেবেই ‘প্রমথ চৌধুরীকে উৎসাহিত করেছিলেন এ রকম একটি পত্রিকা প্রকাশে’।

রবীন্দ্রনাথকে প্রমথ চৌধুরীর প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে মেনে নিয়েই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সবুজপত্র পত্রিকাই বঙ্কিম-পরবর্তী বাংলা গদ্যের বাঁক পরিবর্তনের প্রধান ভেলা। বাংলা কবিতার বাঁক পরিবর্তনে পঞ্চপাণ্ডবসহ তিরিশোত্তরদের যে ভূমিকা বাংলা গদ্যের বাঁক পরিবর্তনে সবুজপত্রের সেই ভূমিকা। পার্থক্য এই, তিরিশোত্তর কবিরা কবিতার নতুন বাঁক বিন্যাসে রবীন্দ্রনাথকে সচেতনভাবে পরিহার করেছিলেন আর বাংলা গদ্যের সবুজপত্রীয় বাঁক পরিবর্তনের প্রধান পুরুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। (অবশ্য বাংলা কবিতার আধুনিক কাব্যভাষা নির্মাণের অর্থাৎ কবিতায় গদ্যরীতি প্রচলনের শক্ত ভিত্তি রবীন্দ্রনাথের হাতেই তৈরি হয়েছিলো, আর এর প্রস্তুতির কাজটি তিনি সেরেছিলেন সবুজপত্র যুগে রচিত গদ্যের মাধ্যমেবিষয়টি পৃথক গবেষণার দাবি রাখে।)

সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্যরীতির যে ধারা প্রচলিত হয়, কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাহিত্যে এই পরিবর্তনের রূপ আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হতে থাকে। বর্তমানে যা অত্যন্ত স্পষ্ট আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিককালের কোলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা গদ্য এবং ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা গদ্যের স্বাতন্ত্র্য বাংলা গদ্য সাহিত্যের নতুন বাঁক পরিবর্তনেরই স্মারক। ঢাকা কোলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা গদ্যের স্বাতন্ত্র্য মূলত দুইটি অঞ্চলের পৃথক আর্থসামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় পৃথক জীবন বাস্তবতারই অনিবার্য ফল। সমাজ ও জীবনবাস্তবতার পরিবর্তনের পথ ধরেই পরিবর্তিত হয় ভাষা। এই পরিবর্তন লেখার অনেক আগেই আসে মানুষের মুখের ভাষায়যে টি ভাষার লিখিত রূপ গদ্য ও পদ্যের বাইরে আরেক রূপ। যাকে শিশিরকুমার দাশ বলেছেন ‘বচন’। মানুষের লিখিত গদ্য যখন তার সামগ্রিক সমাজ বাস্তবতাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয় তখনই সে দ্বারস্থ হয় বচনের। বচন আর গদ্যের পারস্পরিক ঘাতপ্রতিঘতেই এগিয়ে চলে ভাষা। ভাষা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উপাদান। শিশিরকুমার দাশ যথার্থই বলেছেন :

বচন থেকে গদ্যের সৃষ্টি; কিন্তু সেই সৃষ্ট গদ্য যখন বচন থেকে ক্রমশই দূরে চলে যেতে চায়, ক্রমশই তাদের মধ্যে দেখা দেয় বিরাট ব্যবধান, তখন আবার মানুষ প্রতিবাদ করে, গদ্যকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় বচনের দিকে। বচনও গ্রহণ করছে গদ্যের কাছ থেকে, যাতে করে যেসব কাজ মানুষকে বচনের মাধ্যমে করতে হয়, তার ক্ষমতা বাড়ে। এইভাবে দেখা যাবে মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাসের একটি অংশ হল বচন ও গদ্যের টানাপোড়েনের ইতিহাস।

বাংলা ভাষার সকল বাঁক পরিবর্তন বচন ও গদ্যের এই ঘাতপ্রতিঘাতেরই যৌক্তিক পরিণতি।

 

সবুজপত্র ও প্রাথমিক গদ্যভাষা

বিলু কবীর

[গবেষক ও প্রাবন্ধিক]

মানুষটা পাবনার। জন্মেছিলেন যশোরে। ডেপুটিমেজিস্ট্রেট বাবা দুর্গাদাস চৌধুরীর সেখানে তখন পোস্টিং। জমিদার, অভিজাত। গড় মন্তব্য না হলেও এ কথা অনেক ক্ষেত্রে খাটে যে, জমিদার পুত্রদের খুব একটা প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হয় না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে প্রাচুর্যের অকল্যাণে বখে যাওয়া, অকর্মা, ভোঁতা কিছিমের হন। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর বেলায় অন্য কথা। তিনি একেবারে ‘বাপ কা বেটা’। কোলকাতা হেয়ার স্কুলে এন্ট্রাস আর সেন্ট জেভিয়ার্স-এর এফএ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে বিএ অনার্স প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। এমএ-র বেলায় ইংরেজি, এতেও যথারীতি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান! এন্ট্রাস আর এফএ-তো রেজাল্ট মনে হয় অনার্স আর এমএ-র মতো অতো ভালো নয়। কারণ তাঁর বেলায় পাশের উল্লেখই পাওয়া যায় না। বাঙালির ক্ষেত্রে এইটেই অভ্যেস। দেখবেন যে অনেকের বেলায় বলা হয় ‘সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম’ মানে স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, এক্ষেত্রে সন্দেহ করা চলে যে, উক্ত ‘সম্ভ্রান্ত’ নিয়ে প্রশ্ন আছে। পাঠক হয়তো ভাবছেন, এমন তীর্যক বিরূপাক্ষিক হেঁয়ালি কেনো করছি! করছি মান হয়ে যাচ্ছে। এই লেখার প্রধান প্রতিপাদ্য প্রমথ চৌধুরীর (বীরবল) এখানে প্রভাবক হিসাবে কাজ করছেন। কারণ বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। শানানো মেধাভিত্তিক তীর্যক কটাক্ষে বাংলা গদ্য লেখার তিনিই পথিকৃৎ। যাই হোক, ইংরেজিতে স্নাতোকোত্তর করে তিনি বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি (ব্যারিস্টারি কথাটা ভুল) পাশ করে আসেন। ব্যাবহারজীবী হিসাবে তিনি কাজ শুরু করেন কলকাতা হাইকোর্টে। কিন্তু এই কাজে তাঁর মন বসবে কেনো? মাত্র কিছুদিন। তারপর আর আদালতের বারান্দায় তাঁকে দেখা যায় নি। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি কলেজে অধ্যাপনা। সেও মাত্র কিছুদিন। বহরমপুর ও কোচবিহার কলেজে যে অধ্যক্ষের চাকুরি, তাকে তো তিনি প্রত্যাখানই করে বসলেন। শেষে ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার। সেও তাঁর খুব একটা ভালো লেগেছিলো কী? শেষ পর্যন্ত সাহিত্যচর্চায় মননিবেশ এবং পুরোপুরি আত্মনিবেদন বলতে যা বোঝায়, তাই করলেন তিনি। ইতোমধ্যে বাংলা, ফরাসি এবং ইংরেজি সাহিত্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদগ্ধ। পড়াপাগল গ্রন্থকীট প্রমথ চৌধুরী এই যে বলা যায়, এখানে-ওখানে কিছুদিন করে করে কাজে ইস্তফা দিয়ে লেখালিখিতে যোগ দিলেন, এখানটায় তিনি স্থির হতে পেরেছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। এখানেই পুঞ্জীভূত ছিল তাঁর মানসক্ষুণিœবৃত্তির ও জ্ঞানতৃষ্ণার যাবতীয় উপাচার।

প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৪২-১৯২৩) কন্যা ইন্দিরা দেবীকে (১৮৭৩-১৯৬০) বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন কাকা-শ্বশুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে সাত বছরের ছোট, অর্থাৎ একেবারে সমবয়সী। প্রমথ যে সবুজপত্র সাহিত্যপত্রিকাটি বের করতেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার একেবারে নিয়মিত লেখক। মোট একশো ছয়টি সংখ্যা বের হয়েছিলো সবুজপত্রর (১৩৩৩ সালে ভাদ্র সংখ্যাটি বোধ হয় বেরোই নি।) তো এই একশো ছয়টি সংখ্যার মধ্যে তেষট্টিটি সংখ্যাতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছিলো। এর মধ্যে কোনো কোনো সংখ্যায় তাঁর একাধিক লেখা রয়েছে (৪-৫টি পর্যন্ত)। তেষট্টিটি সংখ্যায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার পরিমাণ একশো পঁচিশটি। মানে গড়ে তিনি প্রতিটি সংখ্যায় লিখেছেন ১.১৮টি লেখা। এই হিসাব কষার পর মনে হলো তাহলে তো রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রের কেবল নিয়মিত লেখকই নন, প্রধান লেখকও বটে। তখন, আবার একটা সাহিত্য-অডিট করে দেখা গেলো, এতে তারপরে সব চেয়ে বেশি লিখেছেন তার সম্পাদক এবং ভ্রাতৃজামাতা প্রমথ চৌধুরী। সম্পাদকীয় ধরনের লেখাগুলো বাদ দিলে এতে প্রমথ চৌধুরীর স্বনামে লিখেছেন আটানব্বইটি এবং ‘বীরবল’ ছদ্মনামে লিখেছেন বায়ান্নটি, মোট মিলিয়ে একশো পঞ্চাশটি লেখা। তবুও সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে রবীন্দ্রনাথই প্রধান, যেহেতু প্রমথ চৌধুরী পৃথক পৃথক নামে লিখেছেন, সেহেতু তাঁকে আলাদা আলাদা দুটি সত্তা বিবেচনা করাই সঠিক গ্রহণযোগ্য হবে। আর একটি হিসাব হলো, সম্পাদকীয় বাদ দিয়ে সমুদয় সবুজপত্রয় প্রকাশিত মোট লেখার সংখ্যা ছয়শো ছিয়াশিটি। তার মধ্যে কাকা-শ্বশুর আর ভাইপো-জামাই-ঠাকুর ও চৌধুরীই লিখেছেন দুইশো পঁচাত্তরটি লেখা। মানে তাঁরা দুইজন মিলে লিখেছেন চল্লিশ শতাংশ রচনা। অতএব, এই জামাতাটি যে ঠাকুরের মনের মতো ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ তো থাকার কথা নয়।

অবাক হবার বিষয় হলো স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আপন আলোয় উজ্জ্বল। সেই সময়ে এমন সাহিত্যিক পাওয়া এই আমলের মতোই ভার ছিলো যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপর কমবেশি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন নি। কিন্তু ব্যক্তিত্ব এবং সাহিত্য প্রতিভার বিচার করলে অবাক বলতে হয় যে, প্রমথ চৌধুরী এক অণুও রবিঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত নন। যদিও তাঁরা বয়সের দিক দিয়ে খুব কাছাকাছি, একে অপরের সাথে সাহিত্যিক ও পারিবারিক পর্যায়ে লাগোয়া-একাকার। মানে রবিঠাকুরের থেকে দূরে থেকেও যেখানে রবিসংক্রমণে বাধ্য, সেখানে প্রমথ চৌধুরী তাঁর সাথে একেবারে মিলেমিশে থেকেও আলাদা। শুধু রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত থাকাই নয়, সেভাবে যুক্ত থেকে আলাদা একটা ‘সাহিত্যভাষা’ বা ‘গদ্যভাষা’র প্রবন্ধজগত এবং সবুজপত্রর সুবাদে সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি উল্লেখযোগ্য সফল ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর এই স্বতন্ত্র সাহিত্য-সাধনার বদৌলতে তিনি যে একটি লেখক গোষ্ঠী তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন, সেই আমলে রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে এইরকম আর একটি পৃথিবী নির্মাণ করা অবশ্যই খুব কঠিন কাজ ছিলো। হিম্মতের অনুশীলন ছিলো।

সবুজপত্র প্রমথ চৌধুরীর অনবদ্য সাহিত্যসৃষ্টি এবং এমনই সৃষ্টি যে এর মাহত্ম্য তাকেও বহুলাংশে নির্মাণ করেছে। মানে সবুজপত্র যেমন তার ¯্রষ্টার সৃষ্টি তেমনই ঐ সৃষ্টিও তার ¯্রষ্টার সৃজক। রবীন্দ্ররৌদ্রমুক্ত এবং প্রথম-আলোর উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত এই সবুজপত্র। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িককালে রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত একটি পত্রিকা দাঁড় করানো অবশ্যই কঠিন কর্মযজ্ঞ এবং বিশেষ প্রতিভা-যোগ্যতার ব্যাপার ছিল। সবুজপত্রের সুবাদে প্রমথ চৌধুরী একটি সাহিত্য-আবহ, লেখক গোষ্ঠী, রচনার ধরণ, এমনকি চলিতজবানির গদ্যের ভাবরীতি পর্যন্ত গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর লেখকদের মধ্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ছিলেন। এতে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদকীতো লিখতেনই, লিখতেন স্বনামে এবং বেনামে (বীরবল ছদ্মনামে)। এতোদিন বাংলা গদ্য সাধুভাষায় রচিত হচ্ছিল। যার মধ্যে ছিল বইয়ের-বুলির জীবনদূরত্বের দৌরাত্ম্য। সাধারণ মুখচলিত যে আটপৌরে ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, আঞ্চলিক জবান, অভিজাত্যের মুখোশমুক্ত শব্দমালা, এদিয়েও যে গদ্য রচিত হতে পারে এবং তার পাঠগতি যে তুলনায় সাবলীল-দ্রুত, ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে সেটা প্রায় ভাবাই হয়নি। কিন্তু বিষয়টি যে সম্ভব এবং তুলনায় সুন্দর, তা-ই প্রমাণ করে সবুজপত্র বা সবুজপত্রের লেখকগোষ্ঠী বা তার ¯্রষ্টা সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী। গদ্যনির্মিতিতে মৌখিক প্রকৃত ভাষা যে কতটাই লাগসই এবং গতিশীল, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন প্রমথ চেীধুরী। বলা প্রয়োজন যে, এর আগে এক্ষেত্রে সামান্য চেষ্টা চলছিল, কিন্তু তা যেনো ঠিক হালে জল পায় নি। সেইসব ব্যর্থতার গ্লানি এবং বিমুখ হওয়া সাহিত্যসুন্দরকে মৌলিকত্ব দিতে সবুজপত্র প্রভাবক হয়ে ওঠে। এর আগেও রবিঠাকুর কিছু কিছু কথা চলতিজবাবে লিখতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। তবে তাঁর গদ্যের মূল আশ্রয় ছিল সাধুভাষা। কিন্তু সবুজপত্রের প্রভাবে যখন যখন তিনি চলিত ভাষার গদ্য লেখার গতিসারল্য অনুধাবন করেন, তখন থেকে পুরোদস্তর তাঁর গদ্যের বাহন হয়ে দাঁড়ায় চলিত বা আঞ্চলিক কথ্যভাষা। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথসহ সমকালীন গদ্যকারদের চোখের সামনে থেকে সবুজপত্র বা প্রমথ চৌধুরীই সেই অবগুণ্ঠনটি সরিয়ে দেন, যার জন্য তাঁরা চলিতভাষার সরল সবল উৎসগুলোকে ঠাওর ব্যর্থ হয়েছিলেন। অতএব, আজকে এই বিপুল সম্পদশালী বাংলা গদ্যজগৎ, এই যে বিবিধ গণমাধ্যমের সাধারণ মানুষের আটপ্রহরের সহজগ্রাহ্য ভাষা, এর পটভূমি যে পত্রিকাটির ভূমিকা, সেটি হলো সবুজপত্র, যে লেখকগোষ্ঠীর অবদান সেটি হলো ‘বীরবল’।

 

সবুজপত্র : একশ বছর আগে

মাসুদ পারভেজ

[শিক্ষক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ॥ সিলেট]

সবুজপত্র প্রকাশের তারিখ দেখলে সহজে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে এর জন্ম হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকাশক কিংবা সম্পাদক এই তারিখকে বেছে নিচ্ছেন পয়মন্ত মনে করে যেহেতু বাংলা সাহিত্যের সমকালীন এক প্রভাবশালী লেখক এইদিনে জন্মগ্রহণ করেছেন। আবার লেখকের প্রতি বিনয় প্রদর্শনের জন্যেও এটা করতে পারেন। এই বিনয়টা লেখকের কৃপা পাওয়ার আশায়ও হতে পারে। এ সবই অনুমান কারণ সম্পাদক প্রথম সংখ্যার যে সম্পাদকীয় লেখেন তাতে তিনি পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য কিংবা সবুজপত্র নিয়ে তাদের স্বপ্নাকাক্সক্ষা তুলে ধরেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত উক্তি‘একটা নতুন কিছু করো’ এর মধ্য দিয়ে সবুজপত্র পত্রিকার মুখবন্ধ শুরু হলেও সম্পাদক জানান দিচ্ছেন এটাই তাদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য নয়। আরও উদ্দেশ্য আছে এবং সেটাই মুখ্য। সম্পাদক খোলাসা করে বলেছেন, সমকালীন যে সাহিত্যপত্রিকাগুলো নিজেদের ‘গুণক্রম’ করছেন তা থেকে সবুজপত্র আলাদা হবে। আরও বলা হচ্ছে‘দলবদ্ধ হয়ে আমরা সাহিত্য গড়তে পারি নে, গড়তে পারি শুধু সাহিত্য-সম্মিলন।’ বুঝা যাচ্ছে সবুজপত্র সাহিত্য গড়তে আগ্রহী সাহিত্য-সম্মিলন নয়। আর এই সাহিত্য গড়তে নতুন লেখক তৈরি করতে চেয়েছেন। তবে নতুন লেখকদের সন্ধান পেতে তাকে কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়েছে বৈ কি। তারও আগে তিনি বাংলা সাহিত্যের ‘ভোরের পাখি’ লেখকদের সবুজপত্রের ডালে বসার জন্যে আহ্বান করেছেন এবং আরও বলেছেন, আর এটা যদি সম্ভব হয় তাহলে আমাদের মন ও চরিত্রের অভাব দূর করা যাবে। সেক্ষেত্রে সম্পাদক বলেছেন‘আমরা নিত্য লেখায় ও বক্তৃতায় ‘দৈন্যকে ঐশ্বর্য্যকে বলে’, ‘জড়তাকে সাত্ত্বিকতা বলে’, ‘আলস্যকে ঔদাস্য বলে’, ‘শ্মশান-বৈরাগ্যকে ভুমানন্দ বলে’, ‘উপবাসকে উৎসব বলে’, ‘নিষ্কর্মকাকে নিষ্ক্রিয় বলে’, প্রমাণ করতে চাই।’ আমরা এসব কেন করি সেটাও তিনি বলেছেন‘ছল দুর্বলের বল। যে দুর্বল সে অপরকে প্রতারিত করে আত্মপ্রসাদের জন্ আত্মপ্রবঞ্চনার মত আত্মঘাতী জিনিস আর নেই।’

এইসব অজুহাত ঠেলে সবুজপত্র কী ধরনের সাহিত্যপত্র প্রকাশ করবে তা সম্পাদক উল্লেখ করেছেন। এই সাহিত্যের বহির্ভূত লেখা আমাদের কাগজ থেকে বহির্ভূত করবার একটি সহজ উপায় আবিষ্কার করেছি বলে, আমরা এই নতুনপত্র প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি। একটা নতুন কিছু করবার জন্য নয়, বাঙ্গালীর জীবনে যে নূতনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করবার জন্য।

প্রশ্ন জাগে বাঙালী জীবনে এই নূতনত্ব বলতে সম্পাদক কী বুঝাচ্ছেন? এই নূতনত্ব বলতে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বন্ধনকে ইঙ্গিত করেছেন।

সম্পাদকীয়তে আরও জানা যায় যে, আমাদের দেশে সাহিত্য ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গ হয়ে না ওঠাতে আমরা সবাই সাহিত্য সমাজের সখের কবির দল। আর এই সখের কবির দলের কাছে সাহিত্য কাজও নয় খেলাও নয়, শুধু অকাজ, কারণ খেলার ভিতর যে স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছন্দতা আছে, সে লেখায় তা নেইঅপরদিকে কাজের ভিতর যে যতœ ও মন আছে, তাও তাতে নেই। আর এ কারণে ‘বঙ্গসাহিত্য পুষ্পিত না হয়ে পল্লবিত হয়ে হয়ে উঠেছে।’ তার মানে দাঁড়ায় বঙ্গসাহিত্য সেই সময়েও মানের চেয়ে সংখ্যার আধিক্যর মধ্যে ছিল :

ফুলের চাষ করতে হয়, জঙ্গল আপনি হয়। অতিকায় মাসিক পত্রগুলি সংখ্যাপূরণের জন্য এই আগাছার অঙ্গীকার করতে বাধ্য, সেই কারণে আগাছার বৃদ্ধি ও প্রশ্রয় দিতেও বাধ্য। এইসব দেখে শুনে, ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে আমাদের কাগজ ক্ষুদ্র আকার ধারণ করেছে।

আর সবুজপত্রে কী ধরনের লেখা থাকবে তা নিয়ে বলেন :

স্ত্রী পাঠ্য, শিশু পাঠ্য, স্কুল পাঠ্য এবং অপাঠ্য প্রবন্ধ সকল, অনাহূত কিংবা রবাহূত হয়ে আমাদের দারস্থ হলেও আমরা তাদের স্বস্থানে প্রস্থান করতে বলতে পারব, কারণ আমাদের ঘরে স্থানাভাব। এককথায় শিক্ষাপদ প্রবন্ধ আমাদের প্রকাশ করতে হবে না। এর লাভ যে কি তিনিই বুঝতে পারবেন। তিনি জানেন যে, যে কথা একশবার বলা হয়েছে তারি পুনরাবৃত্তি করাই শিক্ষকের ধর্ম্ম ও কর্ম্ম। যে লেখায় লেখকের মনের ছাপ নেই, তা ছাপালে সাহিত্য হয় না।

তিনি লেখার জন্যে নির্দিষ্ট সীমানার কথা বলেছেন :

এই সীমানা দেশ কালের সীমানা নয় এটা আকার নির্ধারণে। সাহিত্য গড়তে কোন বাইরের নিয়ম চাইনে, চাই শুধু আত্মসংযম। লেখায় সংযত হবার একমাত্র উপায় হচ্ছে সীমার ভিতর আবদ্ধ হওয়া, আমাদের কাগজে আমরা তাই সেই সীমা নির্দিষ্ট করে দেবার চেষ্টা করব।

তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটাতে চেয়েছেন, আরও চেয়েছেন বড়কে ছোটর ভিতরে ধরে রাখতে। আমাদের বাঙ্গাল ঘরের খিড়কি দরজার ভিতর প্রাচীন ভারতবর্ষের হাতী গলাবার চেষ্টা করতে হবে, আমাদের গৌড়-ভাষার মৃৎ-কুম্ভের মধ্যে সাত সমুদ্রকে পাত্রস্থ করতে হবে। এ সাধনা অবশ্য কঠিন। কিন্তু স্বজাতির মুক্তির জন্য অপর কোনও সহজ সাধন পদ্ধতি আমাদের জানা নেই।

এসব গেল সবুজপত্র নিয়ে প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়।

লিটল ম্যাগাজিন যারা বের করেন তাদের সবার মনে এক ধরনের আশা এবং স্বপ্ন থাকে। আর এই আশায় বসত করে তাঁরা সাহিত্য ধারণ করতে চান, সাহিত্য লালন করতে চান, স্বজাতির মুক্তির আকক্সক্ষা করেন। সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে আমরা এই কথাগুলোই পাচ্ছি।

সবুজপত্র পত্রিকা প্রথম পর্যায়ে ১৩২১ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩২৯ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার ১৩৩২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয় এবং দুই বছর পর ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

আমাদের লেখার জন্যে যে চলিত গদ্যরীতি তা সবুজপত্রের দান। নতুন লেখক তৈরিতেও সবুজপত্রের ভূমিকা রয়েছে। সবুজপত্র বন্ধ হওয়ার আগে বাংলা সাহিত্যের জন্যে কিছু কাজ করে। সাহিত্য পত্র পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু সবুজপত্র নিয়ে বলেন :

… এর প্রথম দান প্রমথ চৌধুরী বা বীরবল। দ্বিতীয় দান চলিত ভাষার প্রতিষ্ঠা। তৃতীয় এবং হয়তোবা মহত্তম দান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রমথ চৌধুরী এবং রবীন্দ্রনাথ, এ দুজনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সবুজপত্রের, প্রথমজনের আত্মপ্রকাশের জন্য, দ্বিতীয় জনের নতুন হবার জন্য।…

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুন হওয়ার যে প্রসঙ্গ বুদ্ধদেব বসু তুলেছেন তা প্রথম পাঁচটি সংখ্যার দিকে চোখ রাখলে কিছুটা বুঝা যাবে। প্রথম পাঁচটি সংখ্যায় মোট লেখা ছাপানো হয় তেত্রিশটি। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছিল ষোলটি। এইসব লেখার ভাষা ভাব কিংবা ভঙ্গি কী ছিল তা পাঠক নিজেই পড়ুন তাহলে চিরসবুজ থাকবে সবুজপত্র।

 

শতবর্ষে সবুজপত্র : বিবিধ ভাবনা

মোহাম্মদ শেখ সাদী

[শিক্ষক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]

ভাষা বহতা নদীর মতো। এর নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত একটি গতিপথ রয়েছে। জোর করে কেউ সেই গতিমুখ ফেরাতে চাইলেও, এটি স্বধর্ম অনুযায়ী আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে কালের ভেলায় অনায়াসে ভেসে বেড়ায়। পরিবর্তন, পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে কালের নৌকা বেয়ে তা যেমনই হোক; টিকে থাকে আপন মহিমায়। ভাষা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলে। এটিই নিয়ম। এটিই তার প্রকৃতি। খটকা লাগতে পারে, সবুজপত্র নিয়ে লিখতে বসেকী প্রলাপ বকছি! অনেকেই মনে করেন প্রমথ চৌধুরীই কথ্যভাষারীতির প্রবর্তক। পাঠ্যসূচিভুক্ত বইপত্রেও এর সমর্থন মেলে। প্রমথ চৌধুরীর পূর্বেও যে কথ্যরীতি সাহিত্যে কথ্যরীতি প্রচলনের প্রচেষ্টা হয়েছেসে বিষয়ে খানিকটা অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। তবে প্রমথ চৌধুরীই যে এ রীতির সফল প্রণেতাসে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। যা-ই হোক, সবুজপত্র প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িক পত্র। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন ও বিকাশের ক্ষেত্রে ‘সাময়িক পত্র’ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। উনিশ শতকে সাময়িক পত্রের হাত ধরেই বাংলা গদ্যরীতি বলিষ্ঠতা অর্জন করে। ‘বঙ্গদর্শন’, ‘সাধনা’, ‘ভারতী’, ‘কল্লোল’ ও সবুজপত্র এক্ষেত্রে সবচেয়ে জ্যোতির্ময় দীপ্তি ছড়িয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবুজপত্রর ভূমিকা বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই অগ্রগণ্য। কিন্তু প্রমথ চৌধুরী যে কথ্য ভাষা-রীতিকে সাহিত্যের সুযোগ্য বাহন মনে করলেনতা কিন্তু তাঁর অভিনবত্ব নয়। তাঁর কৃতিত্ব অন্য জায়গায়। প্রমথ চৌধুরীর পূর্বেও কথ্য বা মৌখিক ভাষা-রীতিকে সাহিত্যে ব্যবহার ও প্রয়োগের প্রচেষ্টা হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভবানীচরণের ‘কলিকাতা কমলালয়’, ‘নববাবুবিলাস’ ও ‘নববিবিবিলাস’ প্রভৃতি গ্রন্থে এ রীতির সূচনা পরিলক্ষিত হয়। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলালে’ও তার প্রয়াস রয়েছে। তবে প্যারীচাঁদের চেয়ে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় খানিকটা উৎকর্ষ পরিলক্ষিত হয়। তবে যাই হোক, এদের কোন প্রচেষ্টাই সফলভাবে পথ চলতে সক্ষম হলো না। কাল-পরিক্রমায় এসব পদক্ষেপ একেবারে হারিয়ে না গেলেও, ভবিষ্যৎ পথ-নির্দেশে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। প্রমথ চৌধুরীর হাতেই বাংলা ভাষার কথ্যরীতি পেল যোগ্য মর্র্যাদা ও অন্তহীন পথ চলার প্রেরণা। মৌখিক বা কথ্য-রীতির ভাষাকে কিছুটা মার্জিততর করে, তিনিই সাহিত্যে এ রীতির সফল প্রণেতা হিশেবে আজও জয়মুকুট পরিধান করে আছেন। সুদীর্ঘকালের সংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালিমানসে সবুজপত্র যেনো এক জীয়নকাঠি। প্রমথ চৌধুরী শুধু কথ্য ভাষারীতিকেই চালু করে ক্ষান্ত হননি। তাঁর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। এই ভাষারীতি তাঁর সাহিত্যাদর্শের অবলম্বন হলো মাত্র; তিনি চমক দেখালেন অন্যত্র। তাঁর বাকভঙ্গিই সবুজপত্রের বিশেষ দিক। যেখানে তিনি চিরায়ত ভাবাবেগ ও ঐতিহ্যের বদলে বেছে নিয়েছেন বুদ্ধিবাদ ও যুক্তিবাদকে। বাঙলির ঘুমন্ত মনকে জাগ্রত করা, আর সাহিত্যে জীর্ণতা ও প্রথাবদ্ধতা দূরীকরণেই তাঁর এই সাধনা। তিনি সফলও হয়েছিলেন। তাই তাঁর এ ভাষাদর্শ ও সাহিত্যাদর্শ উপযোগিতাগুণে আজ প্রায় সকলের কাছেই আন্তরপ্রেরণারূপে কাজ করছে। ১৯১৪ সালে প্রথম প্রকাশিত সবুজপত্রে কথ্য-গদ্যরীতির পূর্ণপ্রাণ প্রতিষ্ঠা ও এতে সজীবতা দান করতে পেরেছিলেন বলেই, আজ ২০১৪ সালেও তা বিস্ময়ে ভাবছি। বাঙালি মন ও সমাজে, ভাষা ও সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী যে শৈলিগত নতুনত্বের সূচনা করলেন, তা বংলা ভাষা ও সাহিত্যে পূর্বে ছিলো না। সবুজপত্র তাই এই গৌরবের পথিকৃৎ। বাক্-চাতুর্য, মননশীলতা, যুক্তিবাদ, মুক্ত-চিন্তা-নির্ভর অসাধারণ গদ্যরীতিতে সৃষ্ট সবুজপত্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে তাই এক ব্যতিক্রমী, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী সাহিত্য পত্রিকা। সবুজপত্রর মাধ্যমে ‘বীরবলীচক্রই গড়ে ওঠেছিলো। রবীন্দ্রনাথও তাঁর গদ্যকে অধিক শাণিত করার প্রেরণা লাভ করলেন এই সময়ে। প্রমথ চৌধুরী সেই সফল ব্যক্তিত্ব, যিনি রবীন্দ্রযুগেও একটি স্বতন্ত্র যুগের প্রবর্তক। তাঁর চলিত ভাষারীতির সৌকর্য রবীন্দ্রনাথের ওপর যে কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করেছিলতাও এক বিস্ময়কর ঘটনা। বাংলা সাহিত্যচর্চা আজও তাঁর প্রদর্শিত ভাষারীতি অনুসরণ করে চলেছে। এটি এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা। তবে কেউ কেউ আশঙ্কা করেন যে, বিশ্বায়ন ও অবাধ আকাশ-সংস্কৃতির বদৌলতে পাওয়া মিশ্র প্রবণতা ও সংস্কৃতি, আমাদের ভাষার স্বকীয়তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে পারে। কারণ গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ভাষার শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলা ভাষায়এ কথা সত্যি। তবে বিভাষী কোনো শব্দ জোর করে কোনো ভাষায় যুক্ত হতে পারে বলে মনে হয় না। জীবনাচার ও সংস্কৃতিগত কারণে কোনও শব্দ আপনা-আপনি আত্তীকৃত হতে পারে। আমাদের দেশে ইলেকট্রনিক কিংবা প্রিন্টমিডিয়ায় ভাষার স্বেচ্ছাকৃত বিকৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নাটক, সিনেমাতেও এ ধরনের বিকৃতি কম বেশি লক্ষণীয়। এবং অনেক ভাষাপ্রেমিকই তাতে শঙ্কাগ্রস্ত। তবে বাংলা ভাষার যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, এর জোরেই তা টিকে থাকবে বলে অনেক ভাষাতাত্ত্বিক মনে করেন। সবুজপত্র প্রদর্শিত মার্জিত কথ্যরীতি আরেকটি চমৎকার কাজ করেছে সেটি হলোআঞ্চলিক মানভাষার প্রচলন হলো। যে মানভাষাটিকে যে-কোন অঞ্চলের মানুষই চাইলে রপ্ত করতে পারে। ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও মনোজাগতিক মুক্তি, সাহিত্যে সৃষ্টিশীলতা, আনন্দতত্ত্ব, মননশীলতা, উদারতা, যুক্তিবাদ প্রভৃতি সবুজপত্রকে যে অভিনবত্ব ও আধুনিকতা দান করেছিলো, তা আজও বাংলাভাষী ও সাহিত্যপ্রেমী মাত্রেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সবুজপত্র আজ নেই কিন্তু এটির প্রেরণা ফল্গুধারার মতো বহমান। আজও সমাজ ও সাহিত্যে যত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনই সাধিত হোক না কেন; সবুজপত্র ও তার সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী; আপন মহিমায় অনায়াসে কালের খেয়া পার হতে হতে দীপ্তি ছড়াবেন; সন্দেহ নেই।

 

দুই বাংলার ৪ প্রবন্ধকারের আলোচনা

বাংলাদেশের মিথুন ব্যানার্জী ও রঘুনাথ ভট্টাচার্য

পশ্চিমবঙ্গের কানাই সেন ও জ্যোতির্ময় ঘোষ

সবুজপত্রের সবুজ সংকেত

মিথুন ব্যানার্জী

বাংলা গদ্যের বিকাশের সঙ্গে সবুজপত্র পত্রিকার সম্পর্ক ঐতিহাসিক ঐতিহ্যিক এবং অবিচ্ছেদ্য। উনিশ শতকে সাধু-কাঠামোর যে গদ্যচর্চার সূচনা হয়েছিল তা শতকান্তরের ভিন্ন বাস্তবতায় এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। আর এই পরিবর্তনের পেছনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর প্রকাশিত সবুজপত্র পত্রিকা। বিশেষত সবুজপত্রকে ঘিরে চলতি রীতির গদ্য রচনার একটি ফরম্যাট দাঁড়িয়ে যায়, যা এখন পর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রের সূত্র ধরে নানা লেখার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন যে, সাধু রীতির পরিবর্তে চলতি রীতির ব্যবহার অনেক বেশি প্রাঞ্জল, জীবন-ঘনিষ্ঠ এবং সাবলীল। বাংলা গদ্যের চলার পথে সবুজ বাতি জ্বালিয়ে প্রমথ চৌধুরী এই পথকে নির্বিঘœ করেছেন এমন মন্তব্য এই বিষয়ে সাধারণ্যে প্রচলিত ভাবনার সঙ্গে বৈপরীত্যসূচক নয়। বাঙালি চিন্তা-মননের ঐশ্বর্যকে যে চলতি রীতি ধারণ করতে পারে এই বিশ্বাস প্রমথ চৌধুরী দৃঢ়ভাবে লালন করতেন আর একেই তিনি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন তাঁর সবুজপত্রে। বর্তমান আলোচনায় সবুজপত্রের এই সবুজ সংকেতের তাৎপর্য সমকালে বা উত্তরকালে কতটা অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছিল এবং এই সংকেত বঙ্গদেশের জনভাষার প্রেক্ষাপটে কতটা সবুজ ছিল সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।

বাংলা গদ্যচর্চার প্রথম পর্বে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্যলেখকগণ, রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ছিল। তবে প্রথমদিকের সংস্কৃত-অনুগত্য সাধুরীতির গদ্য রচনাকে প্রাঞ্জল করে তোলার তাগিদ বিদ্যাসাগর নিজেই অনুভব করেছিলেন। তাঁর গদ্যরচনায় এর প্রমাণও মেলে। তা সত্ত্বেও তাঁর গদ্যে সংস্কৃত-কাঠামোর ছাঁচটিই মুখ্যত পাওয়া যায়। একই শতকে কথ্যরীতিকে প্রাধান্য দিয়ে গদ্য রচনা করেন প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহ। আলালের ঘরে দুলাল ও হুতোম প্যাঁচার নক্্সাএই দুয়ের মধ্যে গবেষকগণের বিবেচনায় আলালি ভাষায় ঘটেছে সাধুরীতির ছাঁদের সঙ্গে কথ্যরীতির সংমিশ্রণ, অপরদিকে হুতোমি ভাষায় রয়েছে অবিমিশ্র কথ্যরীতির ঢং। এই দুই রীতি সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর মন্তব্যটিও প্রাসঙ্গিক: তাঁর বিবেচনায় এই দুই রীতি হলো ‘বাঙালির ওড়ানো বিদ্রোহের দুই লাল পতাকা’ (আমাদের ভাষা সংকট; ১৩২৯)। তবে, প্রমথ চৌধুরীর আবির্ভাবের বেশকিছু কাল আগেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল আলালি রীতি, ছিল এই রীতির প্রতি তাঁর পক্ষপাতও। বঙ্কিমচন্দ্র এ ধরনের রীতিকে স্বাগত জানালেও গদ্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি বিদ্যাসাগরীয় রীতিকে কখনোই পরিহার করেননি। তৎসম শব্দবহুল সাধুরীতিতে তিনি গদ্য রচনা করলেও প্রাধান্য দিয়েছিলেন রচনার শিল্পগুণ তথা প্রাঞ্জলতা ও অর্থব্যপ্তিকে। বঙ্কিমচন্দ্র ভাব প্রকাশের সহজতার কথাই বারবার বলতে চেয়েছেন এবং বেশিরভাগ লোকের কাছে যে ভাষা বোধগম্য তাকেই সাহিত্য রচনার উপযোগী ভাষা বলে মন্তব্য করেছেন‘না বুঝিয়া, বহি বন্ধ করিয়া, পাঠক ত্রাহি ত্রাহি করিয়া ডাকিবে, বোধ হয় এই উদ্দেশ্যে কেহ গ্রন্থ লিখে না।’ গদ্যভাষা নিয়ে বঙ্কিচন্দ্রের এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সফলভাবে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে উনিশ শতকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাধুরীতিপ্রধান বাংলা গদ্যের একটি প্রাণবন্ত রূপ সৃষ্টিতে সক্ষম হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধুরীতি যেহেতু মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি নয় তাই চলতি রীতি প্রচলনের ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগসমূহে গোড়া থেকেই ছিল তাঁর পূর্ণ সমর্থন। বলা যেতে পারে প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতি প্রচলনের বা সবুজপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আয়ুধ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সমর্থন। বিশ শতক ও সবুজপত্ররবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যশৈলীর চূড়ান্ত উৎকর্ষের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। সময়ের দাবিকে সাদরে গ্রহণ করে তিনি মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হলেন। কিন্তু এরপরও একটা বিষয় অমীমাংসিত রয়ে যায়; যে মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনায় রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ এতো জোর দিয়েছিলেন, সেই মুখের ভাষার আদর্শরূপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচিত্র ভূপ্রকৃতি আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সমগ্র বাঙালি নৃগোষ্ঠীর প্রতিদিনের কথ্যভঙ্গি কতটা বিবেচনায় এসেছিল। অর্থাৎ চলতি রীতি বলতে প্রমথ চৌধুরী যে কথ্যরূপের প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হলেন তা বঙ্গভঙ্গ রদের সূত্র ধরে পুনর্যুক্ত বঙ্গের সকল অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে কতটা সাযুজ্য রক্ষা করেছিল। এই বিষয়টির মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন।

পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রমথ চৌধুরী চেয়েছিলেন সাধু রীতির স্থলে চলতি রীতি ব্যবহারের সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করা। সাধু ও চলতি রীতি মূলত বাংলা ভাষার দুটি বাচন স্তর। এ প্রসঙ্গে সবুজপত্রে প্রমথ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাভাষা কথাটির মধ্যে দ্ব্যর্থ আছে, কেননা বাঙলাদেশে একটি নয়, দুটি ভাষার চলন রয়েছে (“বাঙালা ভাষার কুলের খবর”; ৪র্থ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, শ্রাবণ; ১৩২৪)।’ যদিও বাস্তবতা এই যে, ভাষাবৈজ্ঞানিক বিবেচনায় এ-দুটো আলাদা ভাষা নয়, বরং অভিন্ন ভাষার দুটি রূপ; যা ব্যাপকভাবে সাধু রীতি ও চলতি রীতি হিসেবে পরিচিত। সাধু রীতি একটি সংস্কৃত শব্দবহুল, সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহারের বিশেষত্বমণ্ডিত কৃত্রিম লেখ্যরূপ আর চলতি রীতি হলো নগরবাসী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের মুখের বুলি। একটি ভাষার পৃথক রূপসমূহের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক থাকে; যাকে ভাষাবিজ্ঞানের অভিধায় দ্বিবাচনিকতা বলা হয়। ভাষায় এরকম দুটি রূপ প্রচলিত থাকলে তাদের একটিকে বলা হয় উচ্চ বুলি আর আরেকটিকে বলা হয় নিম্নবুলি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গ্রিক ভাষায় এরকম দুটি রূপ প্রচলিত রয়েছে। গ্রিক ভাষার উচ্চ বুলির নাম ‘কাথারেভুসা’ আর নিম্নবুলির নাম ‘ডোমেতিকি’। এই দুটো রীতিরই সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে; রয়েছে সমাজের মধ্যে এই দুই রীতি ব্যবহারের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সাধু আর চলতি রীতির মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তা দ্বিবাচনিকতা কি-না, তা নিয়েও ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। দ্বিবাচনিকতা তত্ত্বের প্রবক্তক চালর্স ফার্গুসন বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করলেও এ বিষয়ে তাঁর অভিমত সুলভ নয়। তবে অনেক গবেষক (উদয়নারায়ণ সিংহ; ১৯৭৬, সুহাস চট্টোপাধ্যায়; ১৯৮৬, রাজীব হুমায়ুন; ১৯৮০) মনে করেন সাধু ও চলিত রীতির যে সম্পর্ক তা দ্বিবাচনিক। কিন্তু মৃণাল নাথ (১৯৯৯) এ মতের ঘোরতর বিরোধী। মৃণাল নাথ তাঁর মতের পক্ষে অনেক রকম যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে সাধু ও চলিত রীতির মধ্যে যে সম্পর্ক তা দ্বিবাচনিক নয়; কেননা, দ্বিবাচনিকতা হলো একটি সুস্থিত ভাষা-পরিস্থিতি যা টিকে থাকে শতবর্ষ, সহ¯্রবর্ষ ধরে, এতে থাকে সামাজিক স্তরবিন্যাসের নানাবিধ প্রভাব। দ্বিবাচনিকতার আরেকটি উলেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সংশ্লিষ্ট দুটো রীতির পৃথক প্রয়োগক্ষেত্র নির্ধারিত থাকবে। কিন্তু বাংলা ভাষার সাধুরীতি ও চলতিরীতির বৈশেষিক লক্ষণ হিসেবে উলিখিত বিষয়গুলোকে সমন্বিত করা বেশ মুশকিল। আবার দ্বিবাচনিকতার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অনুপুঙ্খ উপস্থিতি যদি অপরিহার্য বিবেচনা করা না হয়, সেক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ মানবভাষাই দ্বিবাচনিক এমনকি বহুবাচনিক বললেও ভুল বলা হবে না। যদি সাধুরীতি আর চলতি রীতির মধ্যকার সম্পর্ক দ্বিবাচনিক না হয় তবে, প্রশ্ন জাগে সম্পর্কটি কি বিবর্তনমূলক। অর্থাৎ, সাধুরীতিকে কালের ধারায় প্রতিস্থাপিত করেছে চলতি রীতি। এরূপ চিন্তার সমর্থন পাওয়া যাবে প্রমথ চৌধুরীর বিভিন্ন রচনাতেই। কেননা, তিনি সাধু রীতির নানা কমতির দিক দেখিয়ে একরকম একে বাতিল করেই চলতি রীতির প্রস্তাব করেছিলেন। শুধু তাই নয়, যেসব পরিবেশে সাধুরীতি ব্যবহৃত হতো তার সবগুলোতেই যে চলতি রীতি যোগ্যতর বিবেচনায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন প্রমাণ করাই ছিল তাঁর লক্ষ। যেহেতু কলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজের কাছে প্রমথ চৌধুরীর প্রস্তাবই ধীরে ধীরে গৃহীত হয়েছিল সেহেতু দুটি রীতির একত্র টিকে থাকা কাল-পরম্পরায় আর সম্ভব ছিল না। চলতি রীতির সর্বত্র ব্যবহার (আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে) ক্রমান্বয়ে অনিবার্য হয়ে উঠেছে; অপরপক্ষে সাধুরীতি ব্যবহারের দিক থেকে অনেকটাই বাক্সবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এ কারণেই সবুজপত্র পত্রিকার আর্বিভাবকাল হিসেবে ১৯১৪ বাংলা গদ্যভাষার বিকাশেও অমোচনীয় দিকচিহ্ন হয়ে রইল।

চলতি রীতির প্রবর্তন করতে গিয়ে প্রমথ চৌধুরী মূলত বাংলা ভাষার একটি ঔপভাষিক রূপকে বেছে নিয়ে তাকেই চলতি রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তবে, এই নির্বাচনের পেছনে কোনো সুসমন্বিত বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিশৃঙ্খলা সক্রিয় ছিল কি-না তা স্পষ্ট নয়। তিনি এমন একটি অঞ্চলের উপভাষাকে বেছে নিলেন যা জনতাত্ত্বিক জরিপে কিংবা ভূতাত্ত্বিক বিচারে বঙ্গদেশের একটি প্রান্তবর্তী ও ক্ষুদ্র অঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষা। এ কারণে প্রমথ চৌধুরী সাধুরীতির কৃত্রিমতা পরিহার করার লক্ষ নিয়ে, মুখের ভাষা প্রচলনের জোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও, এই ভাষাটি বঙ্গদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা না হওয়ায় একরকম কৃত্রিম হয়েই রয়ে গেল। এর প্রমাণ মেলে যখন দেখা যায় পূর্ববাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে অনেকটা দ্বিতীয় ভাষা শেখার মতো করেই প্রমিত চলতি বাংলা শিখতে হয়; কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণেরসূত্রে যে ভাষা তারা আয়ত্ত করে তা থেকে প্রমিত বাংলা ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিকভাবে তো বটেই কখনও কখনও বাক্যতাত্ত্বিক এমনকি বাগর্থতাত্ত্বিকভাবেও পৃথক। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, বাংলাভাষী বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে চলতি বাংলা তাহলে আদিতে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হতো। প্রমথ চৌধুরীর উদ্যোগে গৃহীত এই চলতি বাংলার ঔপভাষিক রূপটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, শান্তিপুর তথা ভাগীরথী নদীর উভয়তীরে বর্ধমান ও বীরভূম জেলার পূর্বে ও দক্ষিণে প্রচলিত, প্রমথ চৌধুরী এই অঞ্চলের ভাষাটিকে ‘দক্ষিণদেশী’ ভাষা হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষত এই ভাষায় কৃষ্ণনগরের উপভাষার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। প্রমথ চৌধুরী বিভিন্ন সময় নিজেকে কৃষ্ণনাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করতেন, যার ছাপ তাঁর ভাষাচিন্তায়ও পরিলক্ষিত হয়। ‘দক্ষিণদেশী’ উপভাষা ব্যতীত তিনি বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে ওই উপভাষাসমূহের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ‘পূর্ববঙ্গের লোকের মুখে স্বরবর্ণ ছড়িয়ে যায়, আর কলকাতার লোকের মুখে স্বরবর্ণ জড়িয়ে যায়। এমন কোন প্রাদেশিক ভাষা নেই যাতে অন্তত কতকগুলি কথাতেও কিছু না কিছু উচ্চারণ দোষ নেই। কম-বেশি নিয়েই আসল কথা।’ এই কম-বেশির হিসাব করতে গিয়ে তিনি নানাবিধ দিক বিচার করে ‘দক্ষিণদেশী’ উপভাষাকে বঙ্গদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ উপভাষা হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন এবং এই উপভাষাকে চলতি রীতি ও মান্যভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সবুজপত্রে। অন্যান্য উপভাষা কেন গৃহীত হবে না তার কিছু যুক্তিও প্রমথ চৌধুরী উপস্থাপন করেছেন এভাবে: ‘যাদের মুখে ঘোড়া ও গোড়া একাকার হয়ে যায়, তাদের চেয়ে যাদের মুখে ঐ শব্দ নিজ নিজ আকারে বের হয় তাদের ভাষা যে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে, এ আর কিছু আশ্চর্যের বিষয় নয়’ (“বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা” ; ১৩১৯)। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: স্বরধ্বনির জড়িয়ে যাওয়া ছড়িয়ে পড়া আর ঠিক থাকাএর মাপকাঠি প্রমথ চৌধুরী কীভাবে নিরূপণ করলেন? কেননা, অভিন্ন উচ্চারণের ভিন্নার্থক শব্দ প্রমিত চলতি বাংলাও প্রচুর আছে। তাই এই মানদণ্ডে অন্যান্য বাংলা উপভাষা থেকে কৃষ্ণনগরের ভাষাকে শ্রেষ্ঠতররূপে চিহ্নিত করার কোনো সুযোগ ছিল না। তাছাড়া, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক স্বরধ্বনি মূলত একটি মানসিক পরিমাপক; যা ভাষা থেকে ভাষায় পার্থক্য সূচিত হয়। মৌলিক স্বরধ্বনির সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা ভাষী তার নিজের ভাষায় যেটুকু মানানসই সেটা গ্রহণ করে। তাই একটি ভাষার ধ্বনিসমূহ নির্দিষ্ট করে তারপর বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়, বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে ধ্বনি নির্দিষ্ট করা হয় না। আবার প্রতিটি উপভাষায় বিশেষ কিছু ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য থাকে, যেমন অল্পপ্রাণ, মহাপ্রাণ-এর তারতম্য, উচ্চারণ স্থান ও উচ্চারণ রীতি পরিবর্তিত হওয়া, ভিন্ন কোনো সুর যুক্ত হওয়া ইত্যাদি। এই ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য উপভাষাকে স্বতন্ত্রতা দান করে। এসব কারণে ভাষা উচ্চারণেও আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এই ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এক এক উপভাষায় এক এক রকম হতেই পারে। তাই বলে এই বৈশিষ্ট্যসমূহের কারণে কোনো ভাষারূপ নিকৃষ্ট হয়ে যায় না। অন্তত ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকাণ থেকে কোনো উপভাষাকে এভাবে বিচার করা সম্ভব নয়।

উপভাষাভেদে শুধু ধ্বনির নয় শব্দেরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রায় প্রতিটি উপভাষায় বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দভাণ্ডার থাকে। প্রমথ চৌধুরী দক্ষিণবঙ্গের ভাষার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ভাষার তুলনা করতে গিয়ে কিছু শব্দের উদাহরণ দিয়েছিলেন এবং পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যেমন রাজশাহী বা পাবনা অঞ্চলের লোকজন পৈতা, চুপ করা, সকাল, শখ, কুল, পেয়ারা, তরকারি প্রভৃতি নিয়মিতভাবে ব্যবহার না করলেও তাদের কাছে এই শব্দগুলো দুর্বোধ্য নয়; কিন্তু নগুন, নন্করা, বিয়ান, হাউস, বোর, আম-সব্রি, আনাজ প্রভৃতি শব্দের অর্থ দক্ষিণদেশের অধিবাসীদের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য। তাই প্রমথ চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, দক্ষিণদেশের মুখের কথা লেখ্যভাষার পক্ষে বিশেষ উপযোগী। তাঁর প্রদত্ত উদাহরণগুলো থেকে বেশ কিছু শব্দই বাংলা ভাষীমাত্রেই পরিচিত হওয়ার কথা। তাছাড়া পরিচিতি পেলে বাকিগুলোও আর দুর্বোধ্য থাকত না। উলিখিত কয়েকটি শব্দ বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষত বিয়ান বা বিহান আর হাউস। আবার সূক্ষ¥তর বিচারে বিহান শব্দের সর্মাথক শব্দ হতে পারে ভোর বা ঊষাকাল। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তথাকথিত ‘শ্রেষ্ঠ’ ও ‘নিকৃষ্ট’ বিচারে সাধুরীতির সমর্থকদের সঙ্গে প্রমথ চৌধুরীর একপ্রকার সাদৃশ্য বর্তমান। তিনি যা জানেন বা যে ভাষাতে কথা বলেন তাকেই তিনি র্নিদ্বিধায় শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করছেন কিন্তু মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনাকে প্রাধান্য দিতে হলে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গরিষ্ঠতার কথাও ভাবা প্রয়োজন। অথচ তিনি মনে করেন: ‘স্ত্রীর ম-কারাদি প্রয়োগ করা, যাদের জঙ্গল কেটে কলকাতায় বাস সেই সকল ভদ্রলোকের মুখেই সাজে, বাঙালি ভদ্রলোকের মুখে সাজে না। এর কারণে বাংলা ভাষা কিংবা কলকাত্তাই ভাষা, এ উভয়ের কোনোটিই লেখার ভাষা হতে পারে না। আমি যে প্রাদেশিক ভাষাকে দক্ষিণদেশী ভাষা বলি, সে ভাষাই সাহিত্যের পক্ষে সম্পূর্ণরূপ উপযোগী… এবং আমার মতে, খাস-কলকাত্তাই নয়, কিন্তু কলকাতার ভদ্রসমাজের অনুকরণ করে চলাই আমাদের কর্তব্য (বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা; ১৩১৯)’। এখন প্রশ্ন হলো ভদ্র সমাজের বাইরে যাদের অবস্থান, তাদের ভাষাকে অগ্রাহ্য করে কি আদৌ কোনো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানভাষা নির্ধারণ করা সম্ভব! যারা জঙ্গল কেটে তথাকথিত ভদ্রসমাজে ঠাঁই পাওয়ার জন্য কলকাতায় বাস শুরু করলো তারাই কী উপায়ে বা কোন মাপকাঠির ভিত্তিতে অভদ্র সমাজ বলে পরিগণিত হয়? আর তাছাড়া মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনার সমস্যা মীমাংসায় সবার মুখের ভাষা বিবেচনা করেই একটি মানরূপ নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। আর সে-ক্ষেত্রে তারা ব্রাত্য কি কুলীন তা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। অথচ প্রমথ চৌধুরী প্রণীত চলতি গদ্যে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভাষার প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে, আজ এই একশ বছর পরে এই অভিযোগের দায় কেবল একা প্রমথ চৌধুরীর ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা, প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রের প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলা গদ্যের চলতি কাঠামো বিষয়ক একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই প্রস্তাবের ভালো দিক, মন্দ দিক থাকা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সময়ের সঙ্গে সেই ভাষার বিবর্তন ও বিবর্ধন নিয়ে বহুবিধ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গৃহীত হবে এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় নানাবিধ পট পরিবর্তিত হয়েছে, ভারত ভেঙেছে, পাকিস্তান হয়েছে, তার থেকে নতুন দেশ বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে অথচ জনমানুষমুখ্য কোনো ভাষা-পরিকল্পনা আজও গৃহীত হয়নি। তাই প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রের মধ্য দিয়ে যতখানি আশা জাগালেন, বাংলা ভাষার নিজস্ব^ শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করার যে সবুজ সংকেত দেখালেন তাকে সর্বাত্মকভাবে জনমানুষের ভাষায় পরিণত করার যথাযথ উদ্যোগ দেখা গেল না।

“বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা” (১৩১৯) প্রবন্ধে চলতি গদ্যরীতির বেশ কিছু গুণের কথা ব্যক্ত করেছেন প্রমথ চৌধুরী। এগুলো হলো: সরলতা, গতি ও প্রাণ। প্রকৃতপক্ষে এই গুণগুলো যেকোনো ভাষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রমথ চৌধুরীর কাছে ভাষার মূল সার্থকতা হলো এই যে : ভাষা কখনোই ভাব-প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না বরং বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে তাঁর একটি সাধারণ যুক্তি ছিল, চলতি গদ্য যতখানি সহজ বা বাংলা ভাষীদের নিকট সাবলীল সাধুরীতি তা নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাধুরীতির লেখাকে বিবেচনায় নিলে এই মন্তব্যের যথার্থতা স্বীকার করা কষ্টকর। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধুরীতির রচনা দুরূহ নয় এবং তাতে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেও কষ্ট হয় না। ফলে, সবুজপত্র আমাদের বাংলা গদ্যচর্চার ক্ষেত্রে যে সবুজ সংকেত দেখালো তার মূলকথা যদি ধরে নেওয়া হয় কেবল সাবলীলতা সঞ্চার তা হলে ভুল করা হবে। কারণ ভাবের প্রবাহমানতাই যদি অন্বিষ্ট হয় তবে সাধুরীতিতেও তা প্রকাশ করা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই বিদ্যাসগর কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যকেও এই শ্রেণিতে রাখতে হবে। এমনকি, আরও পরে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, কমলকুমার মজুমদারসহ যাঁরা সাধুরীতির প্রতি আবারও আস্থাশীল হয়েছেন তাঁদের গদ্যেও প্রবহমানতা বিদ্যমান। অথচ সেই সবুজপত্রের কাল থেকেই অনেক গদ্যশিল্পী এমন গদ্য রচনা করে আসলেন যাতে চলতি রীতির মোড়কে তৎসম শব্দবহুল সাধু রীতিরই প্রতাপ বজায় রইল। সেখানে ক্রিয়াবাচক শব্দ ও বিশেষণবাচক শব্দ ব্যতীত সমস্তজুড়েই থাকল কেবল সাধুরীতির কাঠামো। ভাষার শরীরে জুজুর ভয়ের মতো ছড়িয়ে থাকা এইসব শব্দের নামকরণ করা হলো ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী শব্দ আর এদের কাছে বিশেষ পাত্তা পেল না অনেক বেশি পরিচিত আটপৌরে শব্দসমষ্টি। যদি সংস্কৃত-উৎসজাত শব্দই এতো প্রাধান্য পায় তবে কেবল ক্রিয়া আর সর্বনাম পরিবর্তন করে চলতি বাংলা বলার যৌক্তিকতা কোথায়? এ ধরনের ভাষারীতি দেখে মোহিতলাল (দ্র. শ্যামলকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ; ১৯৫৯) মন্তব্য করেছিলেন : ‘লিখিব সাধুভাষায়, ভঙ্গিমা করিব বাংলা বুলির এবং তাহারই খাতিরে উচ্চারণ বাঁকাইয়া ক্রিয়াপদের স্থানে টক টক করিব, এ অনাচারে ভাষা পীড়িত হয়, তাহার ধ্বনিধর্ম নষ্ট হয়।’ সন্দেহ নেই, প্রমথ চৌধুরী এমনটি চাননি। ফলে সবুজপত্র যে একরকম ভাষা-বিপ্লবের সূচনা করল, তার সবুজ সংকেত অব্যাখ্যাতই রয়ে গেল ভাষা ব্যবহারকারীদের নিকট।

প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্রের সবুজ সংকেত বঙ্গদেশের জনভাষার পরিপ্রেক্ষিতে সবুজ সংকেত হয়ে থাকল কি-না তা তর্ক সাপেক্ষ বিষয় হলেও বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর অবদান অনস্বীকার্য। চলতি বাংলাকে বাঙালির আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক জীবনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা সেই কালে তো বটেই এখন পর্যন্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা গদ্যচর্চায় যাঁরা সাধুরীতিতে লেখার পক্ষে ছিলেন তাঁরা বারবারই বলার চেষ্টা করেছেন, ভাষায় মৌখিক রূপ লেখ্যরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না; আর যদি তা হয় তবে ভাষার আভিজাত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ তাঁদের মতে বাংলা ভাষা ভীষণ আটপৌরে; এ ভাষা দিয়ে সাধারণ যোগাযোগের কাজ চললেও সাহিত্য কীরূপে রচিত হতে পারে। প্রমথ চৌধুরী এই ভাবনার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত ভাষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু প্রাচীনকাল থেকেই সংস্কৃত ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা তাই সম্পর্কিত অন্যান্য ভাষার ওপর এই ভাষার প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে বাংলাসহ অন্যান্য সম্পর্কিত ভাষার স্বকীয়তা বিসর্জনের কোনো সুযোগ নেই। প্রমথ চৌধুরীর অনন্যতা এইখানে যে, তিনি বাংলা ভাষাকে আপন শক্তিতে বিকশিত হবার সম্ভাবনাকে সবুজ সংকেতের মধ্য দিয়ে পুর্নব্যক্ত করেছিলেন। তিনি সাধু ও চলতি রীতির মধ্যকার এই ব্যবহারিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। একাধিক প্রবন্ধে যুক্তিসহ তিনি উপস্থাপন করেছেন কেন চলতিরীতি ব্যহার করা উচিত এবং চলতিরীতি ব্যবহারের সঙ্গে যে সংস্কৃত ভাষার কোনো বিরোধ নেই তা-ও তিনি বিভিন্ন উদাহরণের সাহায্যে দেখিয়েছেন। প্রয়োজনে সংস্কৃত থেকে শব্দ ঋণ করার কথাও তিনি বলছেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয়: ‘আমি সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারের বিরোধী নই, শুধু ন্যূন অর্থে, অধিক অর্থে কিংবা অনর্থে বাক্যে প্রয়োগে বিরোধী। (বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা; ১৩১৯)’। আবার চলতি রীতিতে কেন গদ্য রচনা করতে হবে সে-সম্পর্কেও তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন: ‘ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে। কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়, উল্টোটা চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে (ভাষার কথা; ১৩০৯)’। যাঁরা এই কালি ছড়িয়েছেন এবং যাঁরা এই কালি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন; দু পক্ষের ভাষা ভাবনার ভিতকেই প্রমথ চৌধুরী নাড়া দিতে পেরেছিলেন। তবে, যে চলতি রীতি তাঁর প্রস্তাবসূত্রে প্রণীত হলো তাতে বৃহত্তর বাঙালির ভাষার প্রতিনিধিত্ব থাকল না। এমনকি দেশভাগের পর পূর্ববাংলায় ভাষাভিত্তিক যে স্বকীয়তা গড়ে উঠেছিল তাতেও এই অঞ্চলের জন্য একটি মান বাংলারূপ নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রমথ চৌধুরীর উদ্যোগ-সূত্রে পাওয়া সেই ‘ভদ্রজনের’ ভাষাই এদেশের কৃষক-শ্রমিক তথা জনসাধারণের ওপর আরোপিত হয়ে রইল। তারপরও প্রমথ চৌধুরীর ভাষা বিষয়ক ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত, হুমায়ুন আজাদের একটি অভিমত স্মরণ করা যেতে পারে; যার মূলকথা এই যে, বাংলা ভাষার প্রথম সফল ভাষা-পরিকল্পক প্রমথ চৌধুরী। আর এই পরিকল্পনা তিনি কার্যকর করেছেন সবুজপত্রের মাধ্যমে। নিঃসন্দেহে প্রমথ চৌধুরীর এই উদ্যোগ বাংলা ভাষার জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। প্রমথ চৌধুরী ভাষা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষায় ভাষাবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগ করেননি; যদিও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি। প্রমথের প্রস্তাবের সূত্র ধরে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এই বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার সূত্রপাত হতেই পারতো। আর তা হয়নি বলেই বাংলা ভাষা তার কাক্সিক্ষত মর্যাদা লাভে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আবারও বলতে হয়: চলিত গদ্যের বা সবুজপত্রের সবুজ সংকেত পরবর্তী প্রজন্মসমূহের কাছেও যথাযথভাবে সঞ্চালিত হয়নি। চলতি রীতিতে গদ্য রচনা করে প্রমথ চৌধুরী যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছিলেন তাকে সময়ের সাথে আরও বেশি করে জনভাষানিবিড় করা যদি সম্ভব হতো কেবল তা-হলেই বাংলা ভাষার আবেগ নয় বরং ভাষিক-উপাদানসমূহের অভিন্নতা মানুষে মানুষে অবিচ্ছেদ্য ঐক্য গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতো। তা হয়নি বলেই এখনও প্রমথ চৌধুরীর ভাষাতে বলতে হয় ‘সব ভাষার নিয়ম আছে, শুধু বাংলা ভাষায় নেই। যার যা খুশি লিখতে পারি, ভাষা বাংলা হতেই বাধ্য। বাংলা ভাষার প্রধান গুণ যে, বাঙালি কথায় লেখায় যথেচ্ছারী হতে পারে’ (আমাদের ভাষা সংকট; ১৯২২)। এই মন্তব্য যে আজও প্রাসঙ্গিক, তার প্রমাণ মিলবে ইদানীং-ব্যবহৃত কারও কারও মুখের ভাষায় এমনকি তাদের লেখার ভাষাতেও। বর্তমানে ব্যবহৃত চলতি ভাষায় জনভাষার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব হয়নি বলে ইচ্ছে মতো কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তা পাল্টে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; কেননা এটাও এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। বর্তমানে ভাষার প্রশ্নে একদল মনে করে আমার মাতৃভাষা যেটা অর্থাৎ আমি যে অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছি সেখানকার যে উপভাষা সেটাই আমি সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি, কারণ মাতৃভাষা ব্যবহার করা আমার জন্মগত অধিকার। সবাই এমনটা ভাবলে যে একটা হট্টগোল অনিবার্য তা বুঝতে কোনো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কেননা, একটি ভাষার অনেকগুলো ঔপভাষিক রূপ যেমন থাকবে, তার পাশাপাশি সর্বজনগৃহীত একটি মান্যভাষাও থাকতে হবে। তবে সেই মান্যভাষা নির্ধারিত ভূগোলসীমার সকল ঔপভাষিক রূপকে বিবেচনায় এনেই নির্ধারণ করতে হবে। এরূপ গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ প্রমথ চৌধুরী নেননি, কিন্তু ভাষারীতিকে যে যৌক্তিক কারণে পরিবর্তন করা যায়তা-তো তিনি প্রমাণ করেই দিলেন। তাঁর এই অগ্রণী ভূমিকা বাংলা ভাষার চলতি রীতিকে স্বাবলম্বী করেছে, করেছে কালজয়ী। তাই বলা যায় যে, প্রমথ চৌধুরীর উদ্যোগ ও তাঁর সবুজপত্র বাঙালিকে গদ্যচর্চার যে সবুজ সংকেত প্রদান করেছিল, তাকে আরও বেশি যুগোপযোগী এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ভাষা-পরিকল্পনা গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব; যে কাজটি আজ পর্যন্ত করে ওঠা সম্ভব হয়নি।

 

সবুজপত্রগোষ্ঠীর সাহিত্যাদর্শ

রঘুনাথ ভট্টাচার্য

 আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশে গোড়া থেকেই সাময়িকপত্র তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাময়িকপত্রের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যিক গদ্যের যথার্থ প্রতিষ্ঠা। দলিল-দস্তাবেজ বা চিঠিপত্রের মধ্যে বাংলা গদ্যের যে চেহারা, তার কোন সাহিত্যিক মহিমা ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) প্রাক্কালে সবুজপত্রের প্রকাশ ঘটে। প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র ১৩২১ সনের ২৫ বৈশাখ (১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রকাশিত হয়; এবং সর্বশেষ সংখ্যাটি বের হয় ১৩৩৪ সালের ভাদ্র মাসে। মাঝে মাঝে বিরতিসহ পত্রিকার ১০৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে জাতীয় জীবনের নানা বিপর্যয় ও আন্দোলনের ফলে বাংলার যুবচিত্ত অশান্ত ও হতাশ হয়ে ওঠেছিল। প্রচলিত মূল্যবোধ সম্পর্কে সংশয় ও জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে মনের মধ্যে। সে পটভূমিতে তারুণ্যের স্বপ্ন নিয়ে প্রকাশিত হয় মাসিক সবুজপত্র।

বাংলার সমাজের যে-অংশ সংস্কারবদ্ধ জড়তাধর্মী সুপ্তপ্রায়, সবুজপত্র সেখানে প্রবল প্রাণধর্মের স্রোত প্রবাহিত করতে চেয়েছিল। একটা নতুন কিছু করার জন্য নয়, বাঙালির জীবনে যে নতুনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করার জন্য সবুজপত্রের আবির্ভাব। এর মারফৎ সমকালীন সাহিত্যচিন্তায় ইউরোপীয় গতি, মুক্তি ও আনন্দের বাণী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। তাই ছড়িয়ে দিলেন মৃত্যুহীন যৌবনের সবুজ রঙ-জাগ্রত প্রাণের অবাধ দীপ্তি। এভাবেই সবুজপত্র আধুনিক বিশ্বের অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ও মানস-প্রবণতাকে আমাদের সমাজ ও ব্যক্তির চেতনায় সঞ্চার করার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। সবুজপত্র যথার্থ অভিনব ছিল। পত্রিকা প্রকাশে এবং অব্যাহত রাখায় সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অকুন্ঠ সহযোগিতা পেয়েছেন। সবুজপত্র পত্রিকার লক্ষ ছিল বাঙালির মনকে জাগিয়ে তোলা, পুরাতনের সংস্কার করা, সাহিত্যকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়া, এবং মানসিক যৌবন প্রতিষ্ঠা করা।

সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে একটি লেখক গোষ্ঠীও তৈরী হয়েছিল। যাঁরা পত্রিকায় মোটামুটি নিয়মিত লিখতেন এবং পত্রিকার অফিসে উপস্থিত হয়ে সাহিত্যের আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতেন, তাঁদেরকে সবুজপত্র-গোষ্ঠীর সদস্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। সেই মানদণ্ড অনুসারে প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যতীতও বার জনকে সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখক বলা যায়। তাঁরা হচ্ছেনঅতুলচন্দ্র গুপ্ত, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, কিরণশঙ্কর রায়, ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ননীমাধব চৌধুরী, প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়, বরদাচরণ গুপ্ত, সতীশচন্দ্র ঘটক, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুবোধ চট্টোপাধ্যায় ও হারিতকৃষ্ণ দেব। বাকি ছয়জন অনিয়মিতভাবে লিখতেন বিধায় তাঁদেরকে আমাদের বিবেচনায় সবুজপত্র-গোষ্ঠীর যথার্থ লেখকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।

সবুজপত্র যে বিশিষ্ট জীবনদৃষ্টি ও সাহিত্যাদর্শের ঘোষণা দিয়ে প্রকশিত হয়েছিল, এই লেখকেরা মোটামুটি সে-রঙে রঞ্জিত হয়েছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, সবুজপত্রের বিশিষ্ট লেখকেরা সাহিত্যের ভাষা-ভঙ্গী সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরী করেছিলেন। বিভিন্ন লেখকের রচনার মধ্যে উনিশ-বিশ পার্থক্য অবশ্যই ছিল; কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে তাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন নতুন সুর ও নতুন দৃষ্টি। তাঁদের বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করার প্রয়াস রয়েছে এই প্রবন্ধে। প্রমথ চৌধুরীসহ সবুজপত্রের লেখকদের সাহিত্যচিন্তা সম্পর্কে বিভিন্ন সমালোচকের অভিমত নিচে সংকলিত করা হলো :

সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত

তাঁহার মনকে আকৃষ্ট করিয়াছেন দণ্ডী বামন প্রভৃতি যাঁহারা কাব্যের আত্মা রসকে বাদ দিয়া কাব্যের শরীর রীতি ও অলংকারের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। প্রমথ চৌধুরী একজন প্রকৃত আলংকারিক।

অধীর দে

‘সাহিত্য-শিল্পাদর্শের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী কলাকৈবল্যবাদের (Art for Art’s Sake) অর্থাৎ আনন্দবাদের শ্রেষ্ঠত্বই স্বীকার করিয়াছেন।’

নীলরতন সেন

Art for Art’s Sakeমতবাদ তিনি সমর্থন করতেন। বস্তুজগতের প্রয়োজনবোধের অতিরিক্ত আনন্দদানই সাহিত্যের আদর্শনীতিগত ভাবে তিনি এ মতকে সমর্থন করেছেন।

জীবেন্দ্র সিংহরায়

হৃদয়গত আনন্দবাদের দিক থেকে তাঁর নিজের সাহিত্যই বিশ্লেষণ করা যায় না।

রথীন্দ্রনাথ রায়

প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রেরণাবাদের চেয়ে যতœকৃত কলা-কৌশলে বিশ্বাসী ছিলেন। কলাবিধির চর্চা, আঙ্গিকের পরীক্ষা নিরীক্ষা, সযতœশিল্পিত ফর্ম-নিষ্ঠা তাঁর গদ্য ও কবিতা, দ্বিবিধ রচনাতেই পরিস্ফুট।

ক্ষেত্র গুপ্ত

তাঁকে এককথায় ‘রূপবাদী’ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। ভাবের প্রকাশ নয়, ভাবের রূপ নির্মিতিই সাহিত্যিকের কর্তব্য।

অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়

চৌধুরী মহাশয় আর্টকে সব-কিছুর উপরে স্থান দিয়েছেন।

হীরণকুমার সান্যাল

বিলিতি পণ্যকে তিনি জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে পেয়েছিলেন বলেই বর্তমান বাংলা গদ্যের উপর তাঁর প্রভাব বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের ঠিক পরেই।

শুভেন্দু ঘোষ

তাঁর মনের আভিজাত্য এবং অনন্যতা শুধু গল্পে নয়, তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধেও অত্যন্ত পরিস্ফুট।

আহমদ কবির

অর্থাৎ সেই আর্টই প্রমথ চৌধুরীর অন্বিষ্ট, যে-আর্ট কোন উদ্দেশ্য সাধন করবে না, কোন শিক্ষা দেবে না, রাজনীতিতে জড়াবে না, এবং কোন লোকহিত বা পরোপকারবৃত্তি অবলম্বন করবে না।

এর বিপরীত মতও রয়েছে। প্রমথ চৌধুরী নিজেই লিখেছেন :

সুতরাং সাহিত্যচর্চ্চা আমাদের পক্ষে একটা সখ নয়, জাতীয় জীবন গঠনের সবর্ক্ষশ্রেষ্ঠ উপায়। কেননা এ ক্ষেত্রে যা কিছু গড়ে উঠবে, তার মূলে থাকবে জাতীয় আত্মা এবং জাতীয় কৃতিত্ব। …তা ছাড়া সাহিত্যের প্রধান কাজই যখন জাতীয় আত্মাকে প্রবুদ্ধ করা,তখন তার অবসর চিরকালই আছে। আমার শেষ কথা এই যে, বাংলার ভবিষ্যত ও বাঙালীর ভবিষ্যত মূলে একই বস্তু।

সবুজপত্রের তথা প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যচিন্তা সম্পর্কে সমালোচকেরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীর মত বিপরীতধর্মী বলে মনে হয়। কেউ কেউ এমনও বলেছেন যে, প্রমথ চৌধুরী আদৌ কোন নির্দিষ্ট মতে স্থির ছিলেন না। এবারের গোষ্ঠীর অন্য লেখকদের নিয়ে আলোচনা করা যায়। সংগত কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আলোচনায় আনা হয়নি। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যচিন্তা প্রসঙ্গে বিভিন্ন সমালোচকের মত নি¤œরূপ :

সুদীপ বসু

সচেতন পাঠককে প্রশ্নের তীক্ষè খোঁচায় অধিকতর সচেতন করা, কি মনে আবেগ এনে নতুন প্রশ্নোদ্রেক করা পর্যন্ত। তবু প্রমথ চৌধুরীর মতো তাঁরও প্রবন্ধের লক্ষণ যেন দাঁড়িয়েছিল বিষয়ের থেকে আঙ্গিকের প্রাধান্য।

অশোককুমার সরকার

প্রাঞ্জলতা তাঁর অন্বিষ্ট ছিল, তাই মূল বক্তব্যকে স্তর বিন্যস্ত করেই প্রকাশ করেছেন, লক্ষচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেননি। অতুলচন্দ্র গুপ্তের সাহিত্যচিন্তা প্রসঙ্গে অশোককুমার সরকার বলেন‘তাঁর গদ্য গতিশীল এবং লক্ষভেদে অব্যর্থ। তাঁর আত্মবিশ্বাস, মাত্রাজ্ঞান এবং সংযম গদ্য রচনাকে সুনিয়ন্ত্রিত করতে পেরেছে।’

এই পরিপ্রেক্ষিতে সবুজপত্রের সম্পাদক ও গোষ্ঠীর ধ্যান-ধারণা পুনরায় মূল্যায়ন করার প্রয়াস পেয়েছি এই প্রবন্ধে। সবুজপত্রে গল্প, নাটক ও কবিতা প্রকাশিত হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলো থেকেও পত্রিকার সাহিত্যাদর্শ কিছুটা জানা যায়। প্রমথ চৌধুরী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর সম্পর্কে সাতটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত হয়েছে; বিভিন্ন সমালোচনা গ্রন্থে এবং প্রবন্ধসাহিত্যের ইতিহাসেও তার উল্লেখ দেখা যায়। তবে ‘সবুজপত্র-গোষ্ঠী’ নিয়ে আলাদা ভাবে আলোচনা হয়নি। কিন্তু ‘সবুজপত্র-গোষ্ঠীর সাহিত্য-ভাবনা’ গ্রন্থটির মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে (আমার পি-এইচ.ডি অভিসন্দর্ভের পরিমার্জিত রূপ)।

প্রমথ চৌধুরী পাঠকদের ফরাসী সাহিত্য পাঠ করার জন্যে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। জাতীয় জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে কোন দ্ব্যর্থবোধকতা নেই। তাঁর মতে, ‘সাহিত্যের প্রধান কাজই যখন জাতীয় আত্মাকে প্রবুদ্ধ করা, তখন তার অবসর চিরকালই আছে। আমার শেষ কথা এই যে, বাংলার ভবিষ্যৎ ও বাঙ্গালীর ভবিষ্যৎ মূলে একই বস্তু।’ ‘সুতরাং সাহিত্যচর্চ্চা আমাদের পক্ষে একটা সখ নয়, জাতীয় জীবন গঠনের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ উপায়।’ এবং, ‘মানবজীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাক্-ছল।’ সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকেরাও এ মতের অনুসারী ছিলেন।

সেকালে সাহিত্যের ভাষা নিয়ে দুটি ধারা বর্তমান ছিল। একদল অধিকহারে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করার পক্ষপাতি ছিলেন। অন্যদল মনে করতেন বেশি বেশি করে ইংরেজি শব্দ প্রয়োগ করলে বাংলা সাহিত্য আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাবে। প্রমথ চৌধুরী এবং তাঁর অনুসারীরা দুটি মতই প্রত্যাখ্যান করে মুখের ভাষা তথা চলতি ভাষার প্রয়োগ করার পক্ষপাতি ছিলেন। চলতি রীতির পক্ষে ও সাধু রীতির বিপক্ষে তাঁরা এত বাক্য ব্যয় করেছেন যে, নতুন করে বলার কিছু নেই। সবুজপত্রের সবচেয়ে বড় অবদান সাহিত্যে চলতি রীতির প্রতিষ্ঠা করা। এই অভিমতের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে কিছু বলা প্রায় অসম্ভব। এই বিষয়ে সবুজপত্র-গোষ্ঠীর অবস্থান ও অবদান সর্বজনস্বীকৃত। সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকরা গদ্য ও প্রবন্ধে সরাসরি যা বলেছেন, আকারে-ইঙ্গিতে তারই অনুরণন বা সমর্থন রয়েছে কবিতায়ও। সবুজপত্র পত্রিকায় রস সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন ভাবেও কোন-কোন প্রবন্ধে রসের উল্লেখ ও আলোচনা রয়েছে। কিন্তু কেউ-ই সাহিত্য-বিচার করার জন্যে রস উৎপন্ন হয়েছে কিনা তা দেখার প্রয়োজন অনুভব করেন নি। প্রমথ চৌধুরী একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘কদলী বৃক্ষের অন্তরে সার নেই- আছে কেবল রস; সে কারণে আমরা যদি বঙ্গ সাহিত্যে সেই নিটোল সুগোল মসৃণ চিক্কণ নধর সরস বৃক্ষের চাষের প্রশ্রয় দিই, তাহলে বঙ্গসরস্বতীর কপালে নিশ্চয়ই শুধু কদলী ভক্ষণই লেখা আছে।’ এই উক্তি থেকে স্পষ্ট যে, ‘রস’ সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর কোন আন্তরিক অনুরাগ ছিল না। আরও স্মরণ করা যেতে পারে যে, সম্ভবত আলংকারিকদের ব্যবহৃত রস শব্দ তিনি সম্যকভাবে ব্যবহার করেন নি। তিনি ইমোশন তথা ভাবকে রসের সমার্থক ধরেছিলেন [‘অপরপক্ষে আমরা যাকে বলি রস, আর ইংরেজরা ইমোশন’] (বাংলায় ভবিষ্যৎ), কিন্তু আলংকারিকেরা ভাবকে রসের সমার্থক ধরেন নি। ভাব একটি কাঁচা মাল যা বিভাব ও অনুভাব সহযোগে রসে পরিণত হয়। অতুলচন্দ্র গুপ্ত ব্যতীত রস ও অলংকারশাস্ত্রের অন্যান্য বিষয় নিয়ে সবুজপত্রে কেউ সরাসরি আলোচনা করেন নি। বিক্ষিপ্তভাবে রসের প্রসঙ্গ ও অলংকারশাস্ত্রের ব্যবহার কোন কোন লেখায় পাওয়া যায়।

সবুজপত্রে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হচ্ছে :

১. প্রমথ চৌধুরী, অভিভাষণ (১৩২১ ফাল্গুন, ১ম বর্ষ, একাদশ সংখ্যা)।

২. প্রমথ চৌধুরী, অলঙ্কারের সূত্রপাত (১৩২২ অগ্রহায়ণ, ২য় বর্ষ, অষ্টম সংখ্যা)।

৩. প্রমথ চৌধুরী, বাংলার ভবিষ্যৎ (১৩২৪ অগ্রহায়ণ, ৪ র্থ বষর্, অষ্টম সংখ্যা)।

৪. প্রমথ চৌধুরী, রামমোহন রায় (১৩২৭ আশ্বিন, ৭ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা)।

৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাস্তব (১৩২১ শ্রাবণ, ১ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)।

৬. রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যে বাস্তবতা (১৩২১ মাঘ, ১ম বর্ষ, দশম সংখ্যা)।

৭. সুরেন্দ্রনাথ দাস গুপ্ত, অভিনবের ডায়েরী [ রসের অলৌকিকত্ব] (১৩২২ কার্তিক, ২য় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা)।

৮. ভূপেন্দ্রনাথ মৈত্র, সোদাহরণ অলঙ্কার (১৩২৩ শ্রাবণ, ৩য় বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)।

৯. জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, সাহিত্যে সমদর্শন (১৩২৯ জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়, ৮ম বর্ষ, একাদশ ও দ্বাদশ সংখ্যা)।

১০. অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কাব্য-জিজ্ঞাসা (১৩৩৩ আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক-অগ্রহায়ণ, ফাল্গুন, ৯ম বর্ষ, একাদশ, দ্বাদশ সংখ্যা, ১০ম, বর্ষ, দ্বিতীয়-তৃতীয়, ষষ্ঠ সংখ্যা)।

তালিকার দশ নম্বরটি তথা অতুলচন্দ্র গুপ্তের ‘কাব্যজিজ্ঞাসা’ এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা। সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের বিশাল অরণ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি যৌক্তিক পারম্পর্যে ও সাবলীলতায় মূলবক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। অলংকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও মন্তব্য করেছেন পত্রিকা সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী নিজেই। তাঁর চারটি প্রবন্ধের নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাইরে অন্যান্য প্রবন্ধে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মন্তব্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন লেখা থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যসমূহ সংকলন করা হয়েছে।

ক. ‘বাক্য রসাত্মক হইতে হইলে, প্রথমত, ভাব রসাত্মক হওয়া আবশ্যক; দ্বিতীয়ত, শব্দ রসাত্মক হওয়া আবশ্যক; তৃতীয়ত, এরূপভাবে প্রকাশ করা কর্তব্য যাহাতে রসাত্মক ভাব রসাত্মক শব্দের সহিত সম্পূর্ণরূপে মিশ্রিত হইতে পারে।’

খ. ‘বাঙ্গালী জাতির হৃদয়ে রস আছে, মস্তিষ্কে বল আছে।’

গ. ‘আদিরসই এ জগতে একমাত্র রস নয়, অনাদি রস বলেও একটি রস আছে; যাঁরা এ রসের রসিক তাঁদের কাছেই উপনিষদ্ হচ্ছে মানবমনের গগনচুম্বী কীর্ত্তি।’

ঘ. ‘যে রস তাঁর কাব্যের একটি বিশেষ রস সে রস এ যুগে অস্পৃশ্য। কেননা তা হচ্ছে আদিরস। উক্ত রসের শারীরিক ভাষ্য এ যুগের কাব্যে আর চলেনা, চলে শুধু দেহতত্ত্ব নামক উপবিজ্ঞানে।’

ঙ. ‘যখন কোনো জাতির অন্তরে কাব্যরস শুকিয়ে আসে তখন প্রায়ই দেখা যায় যে, সাহিত্যিকের পিত্ত সেই সঙ্গে প্রকুপিত হয়ে ওঠে; আর তখন সাহিত্য কি হওয়া উচিত তাই নিয়ে মহা বাগ্বিতণ্ডা উপস্থিত হয়।’

উদ্ধৃতিগুলো থেকে বোঝা যায়, প্রমথ চৌধুরী সব রচনায় রসকে এক অর্থে ব্যবহার করেননি; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি রসকে ভাবের প্রতিশব্দ হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রকৃত অর্থে, রস ভাব নয়, ভাবও রস নয়। মানুষের মনে ভাব থাকে, রস থাকে না। মানব মনের ৯টি স্থায়ী ভাব ও ৩১টি ব্যভিচারী অবলম্বন করে বিভাব ও অনুভাবের সাহায্যে লেখক সাহিত্যরচনা করেন। সেই সাহিত্য সহৃদয় বা বিদগ্ধ পাঠকের মনে রসের উদ্বোধন ঘটায়; পাঠশেষে সে-রস আবার মিলিয়ে যায়। অর্থাৎ ভাব মানব মনে চিরন্তন বা স্থায়ী, কিন্তু রসের স্থায়িত্ব ক্ষণিকের। রসের উদ্ভব ও বিলয় পাঠকের মনে। অতুলচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন‘কাব্যরসের আধার কাব্যও নয়, কবিও নয়, সহৃদয় কাব্যপাঠকের মন।’ অতুলচন্দ্র গুপ্তের অর্থে প্রমথ চৌধুরী রস শব্দটি প্রয়োগ করেননি। রস সম্পর্কে তাঁর ধারণা খুব স্বচ্ছ ও গভীর ছিল তা মনে হয় না।

সবুজপত্র-গোষ্ঠীর আরও দু-একজন লেখক রস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সেগুলো কৌতুকের ভঙ্গিতে। তাঁদের মনোভাব পূর্বে উদ্ধৃত প্রমথ চৌধুরীর মনোভাবেরই অনুরূপ। সবুজপত্র-গোষ্ঠীর বিশেষ বিবেচনা ছিল রচনার শৈলী ও আঙ্গিক সম্পর্কে। বক্তব্যের তুলনায় ভঙ্গিকে তাঁরা কোন ক্রমেই গুরুত্বহীন মনে করেন নি। বরং কখনো কখনো, বিশেষ করে প্রমথ চৌধুরীর লেখায় এমন বক্তব্যও পাওয়া যায়, যাতে মনে হতে পারে যে, তিনি শুধু অঙ্গসজ্জার দিকেই অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। রচনার আঙ্গিক যাতে সুন্দর, সুষ্ঠু ও সুগঠিত হয় তার প্রতি অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীরা। শব্দের ধার বৃদ্ধি করা, শব্দের নতুন তাৎপর্য আবিষ্কার করা, ভাষার কৃত্রিমতা পরিহার করা, অর্থালংকারের আতিশয্য এবং অনুপ্রাসের ঝংকার ও ভাবালুতা কমিয়ে আনা তাঁরা উন্নত সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য মনে করতেন। সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকদের সম্পর্কে প্রচলিত এই মতটি সম্পর্কে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই।

সাহিত্যের দুটি অংশবিষয় ও আঙ্গিক। দুটির যথাযথ মিলনেই একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচিত হয়। সাহিত্যরসিকেরা দুটিকে আলাদা করে দেখতে চান না, এবং এ দুয়ের মধ্যে লঘু-গুরু ভেদ করেন না। এই আদর্শ অবস্থা বাংলা সাহিত্যে সব সময় দেখা যায় নি। উনিশ শতকের লেখকেরা বেশি জোর দিয়েছিলেন বিষয়ের ওপর। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, সাহিত্যচর্চায় আঙ্গিকের দিকটি প্রায় অপাঙ্ক্তেয় হয়ে গিয়েছিল। সেই পটভূমিতে সঙ্গত কারণে, প্রমথ চৌধুরী বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন আঙ্গিকের প্রতি। আঙ্গিকের প্রতি প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীরা এত বেশি নজর দিয়েছিলেন যে, অপরটি সম্পর্কে তাঁদের চিন্তা সমালোচকদের দৃষ্টি প্রায় এড়িয়ে গেছে। তাই বলে এই গোষ্ঠী শুধু আঙ্গিক নিয়েই ব্যাপৃত ছিলেন না, বিষয়কেও তাঁরা অতীব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তাঁদের লেখা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে আমাদের মনে হয়েছে কোন-কোন সমালোচকেরা যে ভাবে তাঁদের সাহিত্যাদর্শকে নির্দেশ করেছেন, আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। আহমদ কবিরের মতটি তথা, ‘…সেই আর্টই প্রমথ চৌধুরীর অন্বিষ্ট, যে-আর্ট কোন উদ্দেশ্য সাধন করবে না, কোন শিক্ষা দেবে না, রাজনীতিতে জড়াবে না, এবং কোন লোকহিত বা পরোপকারবৃত্তি অবলম্বন করবে না।’ আমাদের প্রাপ্ত তথ্যের ও উক্তির প্রমাণে এমত গ্রহণযোগ্য নয়। তেমনি Art for Art’s Sakeপ্রসঙ্গে ভোলানাথ ঘোষ বলেছেন, একদল মনে করেন ‘শিল্পের জন্য শিল্প’। এঁরা বিশ্বাস করেন ও প্রচার করেন যে, সাহিত্য দেশ-কালের উর্ধ্বে স্থাপিত সৌন্দর্য-প্রতিমা; মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সামাজিক জীবন বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সাহিত্যের উপযোগিতা নেই। এঁরা আরো মনে করেন যে, আর্ট কখনো কারো বস্তুগত উপকারে আসে না, শিল্পী কখনও কোনো বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচার করতে বসেন না, শিল্পীর লক্ষ থাকে সার্থক সৌন্দর্য সৃষ্টির দিকে। বস্তুজগতের আড়ালে বিরাজিত সৌন্দর্য জগতকে প্রকাশ করা বা তার আলেখ্য নির্মাণই শিল্পীর প্রধান দায়িত্ব।

অন্যদিকে M.H. ABRAMS-এর A Glossary of literary Terms-এ আছে- `French writer’s developed the view that a work of art is the supreme value among human products precisely because it is self-sufficient, and has no use or moral aim outside its own being. The end of a work of art is simply to exist in its formal perfection; that is, be beautiful, and to be contemplated as an end in itself. A rallying cry of aestheticism became the phrase ‘l’ art pour l’art”- art for art’s sake.’ভোলানাথ ঘোষ এবং M.H. ABRAMS -এর বরাত দিয়ে যা বলা হয়েছে সেটাও প্রমথ চৌধুরীর অনুসৃত আদর্শের সঙ্গে মেলে না। আসলে প্রমথ চৌধুরী এবং সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকেরা উদ্দেশ্যবিহীন সাহিত্যের তথা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তত্ত্বের পক্ষে ছিলেন না। নিছক আনন্দ দেওয়াকেই তাঁরা সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করেন নি। সাহিত্যচর্চা তাঁদের কাছে সখের ব্যাপার ছিল না। সাহিত্যের কাছ থেকে তাঁরা হাতে-হাতে ফল পাবার আশা করেন নি; সাহিত্য সবার অগোচরে ধীরে-ধীরে অথচ অনিবার্যভাবে জাতি গঠন করে চলে। প্রমথ চৌধুরীর কাছে সাহিত্যচর্চা সাহিত্য সাধনার সমতুল্য ছিল।

 

শতবর্ষে সবুজপত্র : কিছু ভাব

কানাই সেন

 বিগত শতক তথা বিশ শতকের প্রথমে যথার্থ সাহিত্য পত্রমাসিক পত্র প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র। রবীন্দ্র স্নেহধন্য প্রথম চৌধুরীর সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হলেও এর প্রাণপুরুষ এবং প্রেরণা উৎস নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ। তা সত্ত্বেও এর পেছনে ছিল ‘সুকর্ষিত বিদগ্ধ মানসিকতা’র কিছু সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রাইট স্ট্রিটের বাড়িতে প্রমথ চৌধুরীর মজলিশ বসত। সে মজলিশে যাঁরা অংশ নিতেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা হলেনঅতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশংকর রায়, সতীশচন্দ্র ঘটক, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বরদাচরণ গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্ট্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এঁদের সঙ্গে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল ইন্দিরাদেবীরও। সংস্কৃতিচর্চাই ছিল এই সভার অন্যতম উদ্দেশ্য। এঁদের সংস্কৃতিচর্চা-সাহিত্যসাধনার পথ ধরে এবং অবশ্যই প্রমথ চৌধুরীর প্রযত্নে জন্ম হলো সবুজপত্রের। সবুজপত্রের প্রতিষ্ঠা এবং বিকাশের ক্ষেত্রে এই মজলিশ গোষ্ঠীর ভূমিকা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এই আসর সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এর অন্যতম প্রাণপুরুষ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন :

আমি যে দলে মানুষ হয়েছি তাকে Pramathean কিংবা ‘সবুজপত্রের দল’ বললেই বর্ণনা সম্পূর্ণ হয় না। কারণ আমাদের বই পড়ার অভ্যাস ও বড় বড় ব্যাপার নিয়ে তর্ক প্রবৃত্তির জন্যই প্রমথবাবু নিজের কাছে আমাদের টেনে নেন ও শিক্ষা দিয়ে সবুজপত্রের দল তৈরি করেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের সাতের দশকে একটি পরিশীলিত লেখক গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছিল। তারও আগে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন ‘সংবাদ প্রভাকরের’ সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। কিন্তু বিশ শতকের প্রথম পর্বের প্রমথ চৌধুরীর ব্রাইট স্ট্রিটের মসলিশের সঙ্গে এর কিছুটা চরিত্রগত পার্থক্য ছিল। সুশিক্ষিত প্রমথ চৌধুরী একটি সুশিক্ষিত লেখক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন নিজের সাহিত্য আদর্শের ভাবনায়। এবং তিনি এটা করেছিলেন সচেতনভাবে। এই লেখকগোষ্ঠীর মুখপত্র রূপেই সবুজপত্রের আত্মপ্রকাশ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে পরবর্তী সময়ে ‘কল্লোল’ পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস প্রায় একই রকম। একটি শিল্প-সাহিত্যিক গোষ্ঠীর মুখপত্র রূপেই ‘কল্লোল’ পত্রিকার প্রকাশ ঘটেছিল। এই পত্রিকা প্রকাশের সূত্রপাত ‘ফোর আর্টস্ ক্লাব’ বা ‘চতুষ্কলা সমিতির’ হাত ধরে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাবটির যাত্রা শুরু ১৯২১ সালের ৪ঠা জুন। অবশ্য এর আগে এক পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নাস্নাত পরিমণ্ডলে একটি সভায় এই ক্লাবের প্রস্তুতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দীনেশচন্দ্র দাস এবং গোকুলচন্দ্র নাগের ভাবনার ফসল এই ‘ফোর আর্টস্ ক্লাব’। ক্লাবের নামকরণ করেছিলেন গোকুলচন্দ্র। এঁরা ছাড়া সতীন্দ্র প্রসাদ সেন এবং সুনীতি দেবীরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই ক্লাবের অনুশীলনের বিষয় ছিলসাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রশিল্প ও কারুশিল্প।

প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র প্রকাশের পেছনে অনেকগুলো বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এর মধ্যে কিছু বিষয় ঐতিহাসিক, কিছু পারিপার্শ্বিক এবং কিছু ব্যক্তিগত। সুকুমার সেন ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে’ এ পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি-পর্বের পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘প্রমথনাথ চৌধুরীর গাঢ়বদ্ধ ও অগতানুগতিক পদ্য ও গদ্য রচনা পড়িয়া রবীন্দ্রনাথ স্থির করিলেন, ইহাকে অগ্রণী করিয়া বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার পথে পরিচালিত করিতে হইবে’এবং ‘এই উদ্দেশ্য লইয়া প্রমথ (নাথ) চৌধুরী সবুজপত্র বাহির করিলেন।’ এছাড়া সবুজপত্র প্রকাশনার পেছনে আরও একটা বিষয়ের ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন। সেটা হল, এর কয়েক বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গদর্শনে’র সম্পাদনা ছেড়েছেন। বিপিনচন্দ্র পালের নেতৃত্বে ‘বঙ্গদর্শনে’ রবীন্দ্রনাথের রচনা ও চিন্তার বিরুদ্ধতা শুরু হয়েছিল প্রবলভাবে। বিপিনচন্দ্রের আক্রমণের লক্ষ ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখার ভাব ও বস্তু সম্পর্কিত। তাঁর রচনা যে সর্বতোভাবেই ‘বস্তুতন্ত্রহীন’ এটা প্রতিপন্ন করার জন্য বিপিনচন্দ্র এবং তাঁর সহযোগীরা অনেকেই কম বেশী আক্রমণাত্মক হয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে‘রবীন্দ্রনাথ প্রয়োগ করিলেন আধুনিকতম অস্ত্রনির্মল বুদ্ধির, অনাবিল চিন্তার ও শাণিত বচনেরযাহা প্রতিপক্ষের বর্ম ও মর্ম ভেদ করিবে এবং সেই সঙ্গে পাঠক ও লেখক মনের জড়তা হইতে, সাহিত্য-কর্মের ধূলি-আবর্ত ও পুনরাবৃত্তির চক্র আক্রমণ হইতে মুক্ত হইবার দিশা পাইবে’ (সুকুমার সেন, বাঙ্গালী সাহিত্যের ইতিহাস)। সেনের মতে সবুজপত্র প্রকাশের এটাই হলো মুখ্য উদ্দেশ্য। এই উদ্ধৃতিটি বিশ্লেষণ করলে দুটো বিষয় সামনে আসবে। প্রথমত, বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিরোধে যে বুদ্ধি, চিন্তা ও ভাষা ব্যবহৃত হবে সেগুলো হবে নির্মল, আবিলতামুক্ত এবং তীক্ষè শাণিত। দ্বিতীয়ত, লেখক ও পাঠকের মন সন্ধান পাবে পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বল, মলিনতাহীন মুক্ত সাহিত্য-পৃথিবীর।

সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যায় সবুজপত্র নামাঙ্কিত দুটি প্রবন্ধ আছে। একটি সম্পাদকীয় যার শীর্ষনাম ‘সবুজপত্রের মুখপত্র’ এবং দ্বিতীয়টি ‘সবুজপত্র’। প্রথম প্রবন্ধটিকে সম্পাদকীয় তথা পত্রিকা প্রকাশের কারণ নির্দেশক রচনা হিসেবে ধরা যায়। ‘সবুজপত্রের মুখপত্র’ প্রবন্ধের প্রথমে প্রাণের বন্দনা আছে‘ওঁ প্রাণায় স্বাহা’। এই প্রাণ তরুণপ্রাণ, এর সাধনা যৌবনের সাধনা। প্রবন্ধের প্রথমেই তিনি বলেছেন‘স্বর্গীয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাঙালি জাতিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘একটা নতুন কিছু করো’। সেই পরামর্শ অনুসারেই যে আমরা একখানি নতুন মাসিক পত্র প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি, একথা বললে সম্পূর্ণ সত্য বলা হবে না। এ পৃথিবীটি যথেষ্ট পুরোনো, সুতরাং তাকে নিয়ে নতুন কিছু করা বড়োই কঠিন, বিশেষত এদেশে যদি বহু চেষ্টায় নতুন কিছু করে তোলা যায়, তা হয় জলবায়ুর গুণে দুদিনেই পুরোনো হয়ে যায়, নয় তো পুরাতন এসে তাকে গ্রাস করে ফেলে। এইসব দেশে শুনে এদেশে কথায় কিংবা কাজে নতুন কিছু করবার জন্য যে পরিমাণ ভরসা ও সাহস চাই তা আমাদের আছে তা বলতে পারি না।’ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে সবুজপত্র প্রকাশিত হয়েছে এটা প্রমথ চৌধুরী মেনে নেননি। এই প্রবন্ধে তিনি অকুন্ঠভাবে স্বীকার করেছেন‘তাছাড়া স্বদেশের কিংবা স্বজাতির কোনো একটি অভাব পূরণ করা, কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করা সাহিত্যের কাজও নয় ধর্মও নয়। …কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যকে অবলম্বন করাতে মনের ভিতর যে সংকীর্ণতা এসে পড়ে সাহিত্যের স্ফূর্তির পক্ষে তা অনুকূল নয়।’ তিনি বলেছেন, কাজ হচ্ছে দশে মিলে করার জিনিস, কিন্তু দলবদ্ধ হয়ে সাহিত্য গড়া সম্ভব নয়। তাঁর বিশ্বাস‘মন পদার্থটি মিলনের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে, আর বিরোধের স্পর্শে জেগে ওঠে। এবং মনের এই জাগ্রত ভাব থেকেই সকল কাব্য, সকল দর্শন, সকল বিজ্ঞানের উৎপত্তি’। পাশাপাশি নিজের সাহিত্য আদর্শ সম্পর্কেও তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন :

মানব জীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাক-ছল। জীবন অবলম্বন করেই সাহিত্য জন্ম ও পুষ্টি লাভ করে, কিন্তু সে জীবন মানুষের দৈনিক জীবন নয়। সাহিত্য হাতে হাতে মানুষের অন্ন বস্ত্রের সংস্থান করে দিতে পারে না।

বিদেশী সাহিত্যে বিদগ্ধ প্রমথ নাথ মনে করতেন ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শেই বাংলা ভাষায় নতুন সাহিত্য ভাবনায় মুক্তির ঢেউ লেগেছে। তিনি বলেছেন‘সুন্দরের আগমনে হীরা মালিনীর ভাঙা মালঞ্চে যেমন ফুল ফুটে উঠেছিল, ইউরোপের আগমনে আমাদের দেশে তেমনি সাহিত্যের ফুল ফুটে উঠেছে।’ পাশাপাশি অন্য একটি সত্যের প্রতিও তিনি সযতেœ আলোকপাত করেছেন‘ইউরোপের কাছে আমরা একটি অপূর্ব জ্ঞান লাভ করেছি। সে হচ্ছে এই যে, ভাবের বীজ যে দেশ থেকেই আনো-না কেন, দেশের মাটিতে তার চাষ করতে হবে।’ প্রথম সংখ্যার দ্বিতীয় প্রবন্ধ সবুজপত্রের শেষাংশে পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন :

আমাদের নব মন্দিরের চারদিকের অবারিত দ্বার দিয়ে প্রাণবায়ুর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের যত আলো অবাধে প্রবেশ করতে পারবে। শুধু তাই নয়, এ মন্দিরে সকল বর্ণের প্রবেশের সমান অধিকার থাকবে। ঊষার গোলাপি, আকাশের নীল, সন্ধ্যার লাল, মেঘের নীললোহিত, বিরোধালংকার- স্বরূপে সবুজপত্রের গাত্রে সংলগ্ন হয়ে তার মরকতদ্যুতি কখনো উজ্জ্বল, কখনো কোমল করে তুলবে। সে মন্দিরে স্থান হবে না কেবল শুষ্ক পত্রের’। সবুজপত্র যে সংস্কার-বদ্ধ, গতানুগতিক, মলিন-জীর্ণ সাহিত্য-আবর্ত থেকে বাংলা সাহিত্যকে উদার মুক্ত, যুক্তি বুদ্ধির নতুন উজ্জ্বল দিগন্তে মুক্তি দেবে এই প্রত্যাশা বাণী এখানে বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

নতুন পত্রিকার সবুজপত্র নামকরণ সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের মননজাত। ৫ই মার্চ ১৯১৪ সালের প্রমথ চৌধুরীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠিতে এর ইঙ্গিত রয়েছে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন‘সবুজপত্র উদ্গমের সময় হয়েছেবসন্তের হাওয়ায় সেকথা ছাপা রইল নাঅতএব সংবাদটা ছাপিয়ে দিতে দোষ নেই।’ ২৩ শে মার্চ ১৯১৪ তিনি প্রমথ চৌধুরীকে আবার লিখলেন‘আচ্ছা রাজি আছি। ১৫ ই বৈশাখেই বের করো। ইতিমধ্যে দু-একটা লেখা দিতে পারব।’ এর আগে পত্রিকাটির পরিকল্পনা লগ্নে রবীন্দ্রনাথ এর অন্য একটি নামও সম্ভবত ভেবেছিলেন। প্রমথনাথকে লেখা একটি চিঠিতে পাওয়া যায় : ‘সেই কাগজটার কথা চিন্তা কোরো, যদি সেটা বের করাই স্থির হয় তাহলে শুধু চিন্তা করলে হবে না–কিছু লিখতে শুরু করো। কাগজটার নাম যদি ‘কনিষ্ঠ’ হয় ত কি রকম হয়? আকারে ছোটবয়সেও।’

সেই সময় এবং তার আগে প্রকাশিত কোনো বাংলা মাসিক পত্রের সঙ্গে সবুজপত্রের আকৃতিগত এবং প্রকৃতিগত কোনো দিকেই মিল ছিল না। এর আকার ছিল ফুল্সক্যাপ কাগজের অর্ধেক। মলাট ছিল সবুজ রঙের। মলাটের মাঝখানে সবৃন্ত তালপাতার সিলুয়েং (Silhouette—কালো রঙে নকশা)। উদ্ধত, অদম্য, চিরহরিৎ, চিরনবীন, সরল, সবল, উদ্দণ্ড, ঊর্ধ্বাভিমুখিতার চিহ্ন এই অভিনব তালধ্বজ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু।

সুকুমার সেন বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে (পঞ্চম খণ্ড) সবুজপত্রের প্রকাশ তারিখ সম্পর্কে বলেছেন : ‘এই উদ্দেশ্য লইয়া প্রমথ (নাথ) চৌধুরী সবুজপত্র বাহির করিলেন (১৫ বৈশাখ, ১৩২১)।’ এই তারিখটি নিশ্চিতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটা সম্ভবত ছাপার ভুল। কারণ সবুজপত্রের প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় (Title Page) এর যে-প্রকাশ সময়ের উল্লেখ আছে তা হলো ২৫শে বৈশাখ ১৩২১। প্রকাশক হিসাবে কান্তিক প্রেস, ২০, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলিকাতার উল্লেখ আছে। এই সংখ্যার মূল্য চারি আনা মাত্র এবং পত্রিকার বার্ষিক মূল্যদুই টাকা ছয় আনা। ছাপা হয়েছিল কান্তিক প্রেসে; মুদ্রক শ্রী হরিচরণ মান্না এবং প্রকাশক শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ দালাল। এই তথ্য মূল Title Pageথেকে পাওয়া। বিজ্ঞাপন, ছবি সংবাদ-ফিচার এবং চটকদার, আকর্ষক বা তাৎক্ষণিক মনোরঞ্জনের বিষয় কোন কিছুই সবুজপত্রে স্থান পায়নি। সচেতনভাবেই এগুলো বর্জন করা হয়েছিল।

পত্রিকার প্রথম বর্ষের (১৩২১) ১২টি সংখ্যার রচনাগুলির চরিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে গল্প-কবিতা-ধারাবাহিক উপন্যাস-প্রবন্ধ-চিঠি-গান-নাটক-রম্য রচনা-বক্তৃতা-সম্পাদকীয় মিলিয়ে প্রথম বছরে মুদ্রিত রচনার সংখ্যা ৭২। উল্লেখ্য এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি লেখা রবীন্দ্রনাথের। এই সংখ্যা ৪০। প্রায় ৫৬ শতাংশ। প্রতিটি সংখ্যাতেই রবীন্দ্রনাথের একাধিক লেখা ছিল। সবচেয়ে কম সংখ্যক লেখা ছিল ষষ্ঠ সংখ্যায় (আশ্বিন ১৩২১)Ñ মাত্র দুটি। এবং সবচেয়ে বেশি লেখা ছিল নবম (পৌষ) ও একাদশ (ফাল্গুন) সংখ্যায় ৫টি করে। এই দুটি সংখ্যায় প্রমথ চৌধুরীর একটি করে লেখা ছাড়া বাকি সব লেখাই রবীন্দ্রনাথের। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য বছরের শেষ সংখ্যা (চৈত্র, দ্বাদশ) সব লেখাই রবীন্দ্রনাথের। বসন্তের পালার ভূমিকা আছে প্রথমে। এগুলি বসন্তের পালার গান। এরপর আছে ‘ফাল্গুনী’ নাটকের ভূমিকাদুই পৃষ্ঠা এবং শেষে আছে মূল নাটকটি। প্রমথ চৌধুরীর স্বনামে এবং বীরবল নামে লেখার সংখ্যা ১৬টি (স্বনামে ১২ এবং বীরবল নামে ৪টি)। বীরবলের মারফৎ প্রাপ্ত জনৈক বঙ্গনারীএই নামে আছে একটি লেখা (কার্ত্তিক সংখ্যা) এটি যে বীরবলেরই লেখা এতে কোন সন্দেহ নেই। এছাড়া প্রথম বছর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন দুটি কবিতাপ্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা (বৈশাখ) এবং তৃতীয় সংখ্যায় (আষাঢ়)। এছাড়া একটি করে রচনা আছে ১৩ জনের। এঁরা হলেনসর্বশ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচি, কালিপদ রায়, অজিত কুমার চক্রবর্তী, প্রফুল্ল চক্রবর্তী, বীরেন্দ্র কুমার বসু, রমাপ্রসাদ চন্দ, মহীতোষ কুমার রায় চৌধুরী, নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, সতীশচন্দ্র ঘটক, ইন্দিরা দেবী, রাধাকমল মুখোপাধ্যায় এবং সরযূবালা দাসগুপ্তা। প্রথম বছর ১২টি সংখ্যার মোট পৃষ্ঠা ৮৬৩। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের লেখা আছে ৫০৯ পৃষ্ঠা অর্থাৎ মোট পৃষ্ঠা সংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ।

রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা ও উৎসাহে এবং প্রমথ চৌধুরীর সযতœ সম্পাদনায় সবুজপত্র পত্রিকার প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ক্রান্তিলগ্ন। কারণ সবুজপত্রের মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় নতুন গদ্যরীতি প্রবর্তিত হলো। এটা ইতিহাস স্বীকৃত। এর ঐতিহাসিক মূল্য নির্দেশ প্রসঙ্গে ‘বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী’ গ্রন্থে লেখক মান্য অধ্যাপক রথীন্দ্রনাথ রায় বলেছেন‘সবুজপত্র যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর যুগের বিদ্রোহী সন্তান। তাই তার আচরণ ও বাগ-বিন্যাসেও এই বিদ্রোহের বক্র তির্যক ভঙ্গিটি স্পষ্ট রেখায় স্বাক্ষরিত।’ যদিও ইতিহাসের নিরিখে বাংলা প্রবন্ধের চর্চা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের প্রথম পর্বে রামমোহনের যুগ থেকেই। সাময়িক পত্রিকার ইতিহাস আরো পুরোনো। রামমোহনের পর বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর পার্শ্বচর মনীষীরা উনিশ শতকেই প্রবন্ধ যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁদের রচনায় গদ্যের বলিষ্ঠতা, প্রসাদগুণ এবং যুক্তি বুদ্ধির সমন্বয় ঘটেছিল। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হয়েছিল গবেষণাধর্মিতা এবং পাণ্ডিত্য। এই সময়ের প্রবন্ধে উপাদান এ বস্তু গুণের কোন অভাব ছিল না। পাশাপাশি নৈয়ায়িক মেজাজটিও ছিল লক্ষ করার মতো। তবে সে যুগের লেখকরা কি বিষয় লিখবেন তার সাধনাতেই সমস্ত শক্তি ব্যয় করেছেন। কিন্তু কেমন ভাবে লিখবেন অর্থাৎ লেখার রীতি বা স্টাইলের দিকটির চর্চা তাদের কাছে উপেক্ষিত ছিল। এখানেই উনিশ শতকের ভাষারীতি ও উপস্থাপন রীতির সঙ্গে বিশ শতকের প্রথম সাময়িক পত্রিকা সবুজপত্রের মৌল পার্থক্য। বলার বিষয় এবং বলার একেবারে নতুন স্মার্ট স্টাইল নিঃসন্দেহে সবুজপত্রের দান। বাংলা ভাষা আন্দোলনের পথ নির্দেশেই সবুজপত্রের গৌরব দীপ্ত ভূমিকা। এই পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি, তবুও এর ভূমিকা যুগান্তকারী। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল আধুনিক মনন ও বিশ শতকের নতুন জিজ্ঞাসার প্রস্তুতি আগামী যুগের বার্তাবহ হিসেবেই সবুজপত্রের অম্লান স্বীকৃতি। অধ্যাপক রথীন্দ্রনাথ রায় সবুজপত্রের আদর্শ সম্পর্কে বলেছেননব্যতন্ত্রী সাহিত্যের ঋজু গতিপথ নির্দেশই ছিল এর লক্ষ। নিত্য নতুন অভিঘাতে প্রাণচাঞ্চল্যে উদ্বোধিত আধুনিক জীবন এবং আধুনিক সাহিত্য ধর্মিতার প্রাণময় উজ্জ্বল প্রকাশই ছিল এর আদর্শ।

লোকান্তরের পূর্বে একটা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘প্রমথনাথ যে এই পত্রকে (সবুজপত্র) একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য সাধনার একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পেরেছিল।’ এই স্বীকারোক্তিতে অতিরঞ্জন নেই। কারণ চির তারুণ্যের উপাসক রবীন্দ্রনাথের ¯্রষ্টা মন এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্দীপনায়, প্রবল প্রাণাবেগে উদ্বোধিত হয়েছিল। প্রথম সংখ্যার ‘সবুজের অভিযান’ কবিতা এবং ‘হালদার গোষ্ঠী’ ছোট গল্পের মধ্যে রয়েছে নতুন জগতে পদসঞ্চারের সুস্পষ্ট ঈঙ্গিত। নারী জাগরণ তথা অন্ধ সংস্কারের কারাগার থেকে মুক্ত করে তিনি তাদের আত্ম-স্বাতন্ত্র্যের পৃথিবীতে মুক্তি দিয়ে চেয়েছিলেন। হৈমন্তী, বোষ্টমী, স্ত্রীর পত্র ইত্যাদি ছোট গল্পগুলি এর সার্থক উদাহরণ। পত্রিকার প্রথম বছরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যায় বিচ্ছিন্নভাবে ‘চতুরঙ্গ’র উপন্যাস নতুন যুগের উপন্যাস রীতির সুস্পষ্ট সূচনা করলো। দ্বিতীয় বছর প্রকাশিত ধারাবাহিক ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের ভাব ভাবনা, রচনা রীতির নতুনত্ব চলিত ভাষার সহজ স্বাচ্ছন্দ্য পাঠক দেখতে পেলেন। ‘বলাকা’র গতিবাদ ভাবনা মূলক কবিতার অনেকগুলোই প্রকাশিত হয়েছিল সবুজপত্রের পৃষ্ঠায়। মহাকবির এই উত্তরণের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল এই পত্রিকা আশ্রয় করে। সচেতনভাবে পুরোনো ভাষা কাঠামো ভেঙে বিশ্ব ভাবনা আত্মস্থ করে নির্মোহ চিন্তার আলোকে জগত ও জীবনকে যুক্তি বুদ্ধিতে বিদ্যুদ্দিপ্ত করে নতুন যুগ এবং নতুন প্রজন্মকে স্পর্শ ও প্রভাবিত করতে পেরেছিল সবুজপত্র। এই সিদ্ধির মূল রসায়ন বিশ্বনন্দিত রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বনাগরিক প্রমথ চৌধুরীর উজ্জ্বল মেলবন্ধন। এদিক থেকে সবুজপত্র একদিকে যুগের সৃষ্টি অন্যদিকে যুগ¯্রষ্টা এবং যুগান্তকারী।

সবুজপত্রের প্রথম বর্ষের ১২ সংখ্যার বিষয়সূচি ও লেখকের নাম মন্তব্যসহ নিচে দেওয়া হল, এগুলো সংগৃহীত হয়েছে মূল পত্রিকা থেকে।

এক—প্রথম সংখ্যা ২৫শে বৈশাখ ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) সবুজপত্রের মুখপত্র (সম্পাদকীয়)

খ) সবুজপত্র (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

গ) সবুজের অভিযান (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) বিবেচনা ও অবিবেচনা (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) হালদার গোষ্ঠী (ছোটগল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চ) সবুজ পাতার গান (কবিতা) শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

দুইÑদ্বিতীয় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) সাহিত্য সম্মিলন (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

খ) বাংলা ছন্দ (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) আমরা চলি সমুখ পানে (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) হৈমন্তী (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) গমনাগমন (প্রবন্ধ) শ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চ) ‘যৌবনে দাও রাজটীকা’ (প্রবন্ধ) বীরবল

‘বাংলা ছন্দ’ প্রবন্ধটি ‘কেমব্রিজের বাংলা-অধ্যাপক জি.ডি এন্ডার্সন, আই.সি.এস মহাশয়কে লিখিত পত্র হইতে অধ্যাপক মহাশয়ের অনুমতিক্রমে মুদ্রিত।’ মূলগ্রন্থে উল্লেখিত সূত্র থেকে তথ্যটি জানা গেছে।

তিন— তৃতীয় সংখ্যাআষাঢ় ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) শঙ্খ (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) আষাঢ় (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) বোষ্টমী (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) খেয়ালের জন্ম (কবিতাTerza Rime) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

ঙ) ভারতবর্ষের ঐক্য (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

চ) বর্ষার কথা (প্রবন্ধ) বীরবল

ছ) আষাঢ়ের গান (কবিতা) শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

চারÑ চতুর্থ সংখ্যাশ্রাবণ ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) সর্ব্বনেশে (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) বাস্তব (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) বাংলা ছন্দ (চিঠির আকারে প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) স্ত্রীর পত্র (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) পত্র (চিঠির আকারে লেখা) বীরবল

চ) উপমা ও অনুপ্রাস (প্রবন্ধ) শ্রী অজিত কুমার চক্রবর্তী

ছ) সহজিয়া (কবিতা) শ্রী দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচি

জ) দেবতা (কবিতা) শ্রী কালিদাস রায়

‘বাংলা ছন্দ’ রচনাটি চিঠির আকারে লেখা একটি প্রবন্ধ। লেখার ফর্ম পুরোপুরি চিঠির। লেখা হয়েছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা-অধ্যাপক শ্রীযুক্ত এন্ডার্সন সাহেবকে। সম্বোধন করা হয়েছিলপ্রিয়বরেষু এবং শেষে আছেÑভবদীয়, শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বীরবলের লেখা ‘পত্র’টির ফর্ম চিঠিরÑসম্পাদক মহাশয় সমীপেষু এভাবে শুরু হয়েছে এবং শেষে আছেÑইতি বীরবল।

পাঁচÑপঞ্চম সংখ্যাভাদ্র ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) লোকহিত (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) ভাইফোঁটা (গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) পাড়ি (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) সমাজের জীবন (প্রবন্ধ) শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী

ঙ) মন্তব্য (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

চ) অনার্য্য বাঙালী (প্রবন্ধ) বীরেন্দ্রকুমার বসু

ছ) ইউরোপে কুরুক্ষেত্র (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

‘মন্তব্য’ রচনাটি শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তীর লেখা ‘সমাজের জীবন’ রচনার সমালোচনামূলক লেখা কিংবা সম্পাদকের সংযোজন তথা এ বিষয় সম্পর্কে সম্পাদকের ভাবনা তথা মন্তব্য।

ছয়Ñষষ্ঠ সংখ্যা আশ্বিন ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) আমার জগত (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) শেষের রাত্রি (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) উত্তরাপথে রাষ্ট্রীয় ঐক্য (প্রবন্ধ) শ্রী রমাপ্রসাদ চন্দ

ঘ) সাহিত্যে আভিজাত্য (প্রবন্ধ) শ্রী মহীতোষ কুমার রায় চৌধুরী

সাতÑসপ্তম সংখ্যাকার্ত্তিক ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) সন্ধ্যার যাত্রী (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) অপরিচিতা (ছোট) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) শেষ প্রণাম (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) যৌথ পরিবার (প্রবন্ধ) শ্রী নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত

ঙ) হাসি (রম্যরচনা জাতীয় প্রবন্ধ) শ্রী সতীশ চন্দ্র ঘটক

চ) নারীর পত্র (প্রবন্ধ – চিঠির ফর্ম) জনৈক বঙ্গনারী এই নামে লেখা বীরবলের মাধ্যমে প্রাপ্ত।

ছ) নারীর পত্রের উত্তর (প্রবন্ধ জাতীয় রচনা) বীরবল

আটÑঅষ্টম সংখ্যাঅগ্রহায়ণ ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) বর্ত্তমান সভ্যতা বনাম বর্ত্তমান যুদ্ধ (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

খ) ছবি (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) জ্যাঠামশায় (চতুরঙ্গ উপন্যাসের প্রথম অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) তাজমহল (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকা (অনুবাদ) শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী

চ) তেপাটি (কবিতা) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

‘জ্যাঠামশায়’ সবুজপত্রে যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন এটি স্বতন্ত্র লেখা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তখন এর আকার ছিল ছোটগল্পের। পরবর্তীকালে চতুরঙ্গ উপন্যাসের প্রারম্ভিক অংশ হিসাবে যুক্ত হয়েছে। ইন্দিরা দেবী কর্তৃক অনূদিত ফরাসি ‘গীতাঞ্জলির ভূমিকা’ মূল ফরাসি লেখক আঁদ্রে গীদের রচনার অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের ‘তাজমহল’ কবিতাটি (১৫ই কার্তিক ১৩২১ এলাহাবাদে থাকাকালীন সময়ে কবি রচনা করেন) পরবর্তীকালে কবিতাটি ‘সাজাহান’ নামাঙ্কিত হয়েছে। এটি বলাকা কাব্যগ্রন্থের অন্যতম কবিতা।

নয়Ñনবম সংখ্যাপৌষ ১৩২১ প্রথম পর্ব

ক) চঞ্চলা (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) লড়াইয়ের মূল (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) তাজমহল (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) খৃষ্টধর্ম (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) নূতন ও পুরাতন (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

চ) শচীশ (চতুরঙ্গ উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই সংখ্যার ‘তাজমহল’ কবিতাটি পরবর্তীকালে এই নামেই সংকলিত হয়েছে। এটি রচিত হয়েছিল এলাহাবাদে অবস্থান কালে ৫ই পৌষ ১৩২১-এ। ‘খৃষ্টধর্ম’ প্রবন্ধটি খৃষ্ট জন্মদিনে শান্তিনিকেতন আশ্রমে কথিত হয়েছিল।

দশÑদশম সংখ্যামাঘ ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) মা-হারা (নাটকের আকারে রচিত) শ্রী সরযূবালা দাসগুপ্তা

খ) উপহার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) দামিনী (চতুরঙ্গ উপন্যাসের তৃতীয় অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) বিচার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) সাহিত্যে বাস্তবতা (প্রবন্ধ) শ্রী রাধাকমল মুখোপাধ্যায়

চ) বস্তুতন্ত্রতা বস্তু কি? (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

‘মা-হারা’ রচনাটির বাইরের কাঠামো নাটকের স্থান। অবস্থানÑগোলকের সীমানা। এর কুশীলবÑআমি, হৃদয়, জ্ঞান, জগৎ মাতা, জগৎ পিতা। সবুজপত্রে শ্রাবণ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘বাস্তবতা’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। এর বিষয় কাব্যে বাস্তবতা সম্পর্কিত। উল্লেখ্য এর আগে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যায় শ্রী রাধাকমল মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘লোক-শিক্ষক ও জননায়ক’, প্রমথ চৌধুরীর ‘বস্তুতন্ত্রতা বস্তু কি?’ রচনাটি শ্রী রাধাকমল মুখোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যে বাস্তবতা’ প্রবন্ধের সমালোচনামূলক রচনা।

এগারোÑএকাদশ সংখ্যাফাল্গুন ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) শ্রীবিলাস (চতুরঙ্গ উপন্যাসের চতুর্থ অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) দুই নারী (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) কর্ম্মযজ্ঞ (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) অভিভাষণ (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

ঙ) এবার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চ) আবার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘কর্ম্মযজ্ঞ’ প্রবন্ধটি হিতসাধনমণ্ডলীর প্রথম অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার সারমর্ম। ‘অভিভাষণ’ রচনাটি প্রমথ চৌধুরী পাঠ করেছিলেন উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনে। ‘এবার’ এবং ‘আবার’ কবিতা দুটি ২০শে মাঘ ১৩২১ পদ্মাতীরে অবস্থানকালে লেখা। দুটি কবিতাই বসন্ত সম্পর্কিত।

বারো–দ্বাদশসংখ্যাচৈত্র ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) বসন্তের পালার ভূমিকা (গান) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) ফাল্গুনী নাটকের ভূমিকাÑশ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) মূল ফাল্গুনী নাটকÑশ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসন্তের পালার ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন‘আর কয়েক পৃষ্ঠা পরে পাঠক ‘ফাল্গুনী’ বলিয়া একটা নাটকের ধরনের ব্যাপার দেখিতে পাইবেন। এই বসন্তের পালার গানগুলি তম্বুরার মত তাহারি মূল সুর কয়টি ধরাইয়া দিতেছে। অতএব এগুলি কানে করিয়া লইলে খেয়াল নাটকের চেহারাটি ধরিবার সুবিধা হইতে পারে।’ একদা এপ্রিলের পয়লা তারিখে কবি তার কয়েকজন বন্ধুকে হোটেলে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। ভোজটা খুব রীতিমত জমিয়াছিল। তারপরে পরিণামে যখন বিল শোধের জন্য অর্থ বাহির করিবার দরকার হইল তখন কবির আর দেখা পাওয়া গেল না। সেদিনকার এই ছিল কৌতুক। এবারকার এপ্রিলেও কৌতুকটা সেই একই, গোড়াতেই তাহা বলিয়া রাখা ভাল। সবুজ পাতার পাত পাড়িয়া যে বাসন্তিক ভোজের উদ্যোগ হইল কবি তাহাতে শেষ পর্যন্ত যোগ দিলেন, কিন্তু যখন সেই ভয়ঙ্কর পরিণামের সময়টা উপস্থিত হইবে যখন সকলে চীৎকার শব্দে অর্থ দাবী করিতে থাকিবে, ‘হে কবি, অন্যে বাক্য কবে, কিন্তু তুমি রবে নিরুত্তর।’ ভূমিকাটি নিঃসন্দেহে কৌতুককর। এই কৌতুক আবরণের পেছনে রয়েছে অন্য গভীর সত্যের ইঙ্গিত। শব্দ এবং অর্থ এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টা স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে শব্দের অর্থ বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে গভীরতম কোন তাৎপর্যে ব্যঞ্জনাগর্ভ হয়ে ওঠে সেখানে আপাত বা সাধারণ অর্থ খোঁজা নিরর্থক। সরাসরি অর্থ সন্ধানে তৎপর সমালোচকদের বক্রোক্তির সামনে তখন নিরুত্তর থাকা ছাড়া কবির গত্যন্তর থাকে না। ‘ফাল্গুনী’ বিষয়, আঙ্গিক এবং অন্তর্ভাবনার বিচারে গতানুগতিক নাট্যরীতি থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে কবি-নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ সংলাপের মালা সাজিয়েছেন বসন্তের রাশিরাশি বর্ণময় ফুলের সম্ভার থেকে। নাটকের পাত্র-পাত্রীর নাম প্রায়শই নেইচরিত্রের ব্যক্তিত্বের চেয়ে দীপ্ত যৌবনকে ব্যঞ্জিত করাই তাঁর উদ্দেশ্য। যৌবনের মৃত্যু নেই, যৌবনের লীলাতেই মেলে সত্যের সন্ধান। ‘এই তাত্ত্বিক উপলব্ধি একটি কাহিনীহীন এবং ব্যক্তি চরিত্রের সম্পর্কহীন পথ চলার সংলাপের মালায় ধরে রাখা হয়েছে। …এ নাটকের বিষয়বস্তু এই পথ চলা। বিষয় হিসেবে বিস্ময়কর সন্দেহ নেই।’ (বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস : ক্ষেত্র গুপ্ত)। যে যৌবনের বন্দনা সবুজপত্রের মূল সুর, তেমনি বিষয় উপস্থাপনের অভিনবত্ব এর আদর্শ। এই দুটি ক্ষেত্রে এ নাটকে নাট্যকার চূড়ান্ত সাফল্য দেখিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, পত্রিকার প্রথমবর্ষের ১২টি সংখ্যার পরিচয় প্রদান অংশে এবং বিভিন্ন উদ্ধৃতির বানানগুলি সবক্ষেত্রেই মূল অনুসারী।

অতিরিক্ত কিছু কথা

একশ বছর আগের সবুজপত্রর মূল সংখ্যাগুলো পাওয়া যতটা সহজ হবে মনে করেছিলাম, বাস্তবে তা হয়নি। ভারতীয় জাতীয় গ্রন্থাগার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি সংখ্যা দেখার সুযোগ হয়েছে। উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরির দুর্লভ সংগ্রহে প্রথমবর্ষের ১২টি সংখ্যা ছাড়াও পরবর্তী সময়ের বেশ কিছু সংখ্যা রয়েছে। সে কারণে প্রথম বর্ষের ১২টি সংখ্যার বিবরণ, মন্তব্যসহ তুলে ধরা সম্ভব হলো। পরবর্তী সময়ের উৎসাহী গবেষক এবং প্রবন্ধকারদের কথা মনে রেখে একাজ করেছি। প্রচ্ছদটি সাদা-কালো রঙে ছাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রচ্ছদের রঙের ব্যবহার কাল্পনিক, তবে তথ্যানুসারী। Title Page-এর প্রতিলিপি মূল সবুজপত্র প্রথম সংখ্যা থেকে পাওয়া। যাঁরা এ ব্যাপারে আমাকে উপদেশ দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন, তাঁদের নাম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করলামশ্রী প্রণবেশ চক্রবর্তী, ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক, উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরি, হুগলী; শ্রী সমীর বর্ধন, গ্রন্থাগারিক, অনন্ত দত্ত মেমোরিয়াল টাউন লাইব্রেরী, কোলকাতা; শ্রী অসীম মুখোপাধ্যায়, সহকারী, গ্রন্থাগার ও তথ্যজ্ঞাপনক আধিকারিক, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, কোলকাতা ও শ্রীমতি যূথিকা দামÑপশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কোলকাতা।

প্রসঙ্গ সবুজপত্র

জ্যোতির্ময় ঘোষ

 ‘সেই কাগজটার কথা চিন্তা করো। যদি সেটা বের করাই স্থির হয়, তাহলে শুধু চিন্তা করলেই হবে নাকিছু লিখতে শুরু করো। কাগজটার নাম যদি ‘কনিষ্ঠ’ হয় তো কী রকম হয়? আকারে ছোট-বয়সেও। শুধু কালের হিসাবে ছোট বয়স নয়, ভাবের হিসাবে।’ প্রমথ চৌধুরীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই চিঠির সঙ্গে কোনো তারিখ পাচ্ছি না। কিন্তু এই চিঠি লেখার তারিখ অন্তত ‘১৯১৪ সালের ৫ মার্চের আগে। কেননা, ৫ মার্চ তারিখেই প্রমথ চৌধুরীকে আবার লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ‘সবুজপত্র উদ্গমের সময় হয়েছেবসন্তের হাওয়ায় সে ছাপা রইল নাঅতএব সংবাদটা ছাপিয়ে দিতে দোষ নেই। আমি একটু ফাঁক পেলেই কিছু লেখার চেষ্টা করবো। বিবিকে সুরেনকেও তাড়া দিয়ো।’ এই চিঠির বাকি অংশ জুড়েও সবুজপত্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উৎকণ্ঠা ও ভবিষ্যৎ-ভাবনা তাঁর সম্পাদকের ভাবনাকেও ছাড়িয়ে গেছে, দেখা যায়। পাঁচ দিন পরে ১০ মার্চ তারিখে লেখা চিঠিতেও সবুজপত্রের প্রসঙ্গ অনুভব করা যায়। পরের চিঠি ২৩ মার্চ লেখা এবং তাতে‘আচ্ছা, রাজি আছি। ১৫ বৈশাখেই বের করো। ইতিমধ্যে দুই-একটা লেখা দিতে পারবো।’ চিঠিগুলো সব শান্তিনিকেতন থেকে লেখা। ৪ ও ১৬ এপ্রিল তারিখে লেখা চিঠি দুটিতেও সবুজপত্রের কথা। সবুজপত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ধারাবাহিক ভাবনা ছিল কতো গভীর, তার একটা কিছু পরিচয় ৪ এপ্রিলে লেখা এই পত্রাংশে পাব‘তোমরা ১৫ বৈশাখে কাগজ তো বের করছো কিন্তু, হাতে দু’তিন মারে সম্বল তো জমাওনিThink not of tomorrow টা কি সদুপদেশ?’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, অভিজ্ঞ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ এ কাজে অনভিজ্ঞ স্নেহভাজন আত্মীয়-বন্ধু প্রমথ চৌধুরীকে হাতে-কলমেই প্রায় সম্পাদনার কাজে তালিম দিয়ে চলেছেন। ১৯১৪ সালেরই ৬ জুলাই লেখা চিঠিরও অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি, যাতে স্পষ্ট হয় সবুজপত্রের রথী প্রমথ চৌধুরী হলেও সারথী ছিলেন সর্বাংশেই রবীন্দ্রনাথ। এই উদ্ধৃতি কিছুটা দীর্ঘ হলেও অত্যাবশ্যক, কেননা, সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর ফ্রেণ্ড ফিলজফার এবং গাইড কে ছিলেন, তা সাম্প্রতিক পাঠকের কাছে প্রথমেই স্পষ্ট থাকা ভালো :

অন্যান্য মাসিকে যে সমস্ত আলোচ্য প্রবন্ধ বেরোয় তার সম্বন্ধে সম্পাদকের বক্তব্য বের হলে উপকার হবে। প্রথমত যারা উৎসাহের যোগ্য সেইসব লেখকেরা পুরস্কৃত হবে, দ্বিতীয়ত, অন্যের লেখা সম্মুখে রেখে, বলবার কথাটাকে পরিষ্কার করে বলবার সুবিধা হয়। তাছাড়া আধুনিক সাহিত্যের মাঝিগিরি করতে হলে সমালোচকের হাল ধরা চাই। প্রতিমাসে সমালোচনার যোগ্য বই পাবে না। কিন্তু মাসিক পত্রের লেখাগুলোর প্রতি লক্ষ করে কিছু-না-কিছু বলবার জিনিস পাবে। বিরুদ্ধ কথাও যথোচিত শিষ্টতা রক্ষা করে কী ভাবে বলা উচিত তার একটা আদর্শ দেখবার সময় এসেছে।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্রের উপরেই ‘আধুনিক সাহিত্যের মাঝিগিরি’র গুরুতর দায়িত্ব বর্তাক। ১৯১৪ সালেরই ৮ই অক্টোবর লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ :

যে পর্যন্ত না লেখক দুটি-একটি তৈরি হয়ে ওঠে সে পর্যন্ত সবুজপত্র তোমার লেখা দিয়েই ভরতে হবে। …আমার বলবার কথা নানা রকম করে বলা হয়ে গেছে… এখন তুমি…। মানুষের চিত্তকে একজন লোক বরাবর জাগিয়ে রাখতে পারে নাসেই জাগিয়ে রাখাটাই আসল কথা, কোনো কিছু দান করার মূল্য তেমন বেশী নয়। নূতন শক্তির অভিঘাতে মানুষ জাগেপুরাতনের বাণী অতি অভ্যাসে আর মনকে ঠেলা দেয় না। …এখন আমার গাণ্ডীব তোলাবর শক্তি নেই। সেইজন্য তোমাকে আসি একটি নবীন লেখকমণ্ডলীর কেন্দ্র ও অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত দেখতে ইচ্ছা করি। এইজন্যই সবুজপত্রের প্রতি আমার যা-কিছু ঔৎসুক্যআর তাই দেহমনের বিমুখতা সত্ত্বেও যতটুকু পারি লিখছি। কিন্তু তোমার জায়গা তুমি সম্পূর্ণ জুড়ে বসোআমার যাবার সময় হলো।

সবুজপত্রএর পাতায় যে নবীন লেখকমণ্ডলী প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই লেখকগোষ্ঠী ক্রমশ গড়ে উঠেছিলো; এই মন্তব্য অতিশয়োক্তি হবে না। কয়েকটি নাম স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে এসে যায়অতুলচন্দ্র গুপ্ত, ধূর্জটিপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, কিরণশঙ্কর রায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অতীশচন্দ্র ঘটক, বরদাচরন গুপ্ত, বিশ্বপতি চৌধুরী, হারিতকৃষ্ণ দেব এবং অবশ্যই সম্পাদকপতœী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানী। কিন্তু উল্লেখ প্রয়োজন, সবুজপত্রের অধিকাংশ সংখ্যাতেই এক রবীন্দ্রনাথেরই তিনটি-চারটি, এমনকি পাঁচটি পর্যন্ত লেখা ছাপা হয়েছে। কোনো কোনো সংখ্যায় প্রায় সবগুলি রচনাই একা রবীন্দ্রনাথেরই। সবুজপত্র বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে নানা কথা বলতো।

বস্তুত স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীকেই স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হয়েছিলো :

সবুজপত্রের বিরুদ্ধে নানা বদনাম থাকা সত্ত্বেও একটি বিশেষ সুনাম আছে। জনরব যে পত্রের সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের বেনামদার। এ প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য না হলেও প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা নয়। সকলেই জানেন যে, প্রথম দুবৎসর রবীন্দ্রনাথের লেখাই ছিলÑকী ওজন কী পরিমাণে এ-পত্রের প্রধান সম্পদ। সবুজপত্র বাঙলার পাঠকসমাজে যদি কোনোরূপ প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা লাভ করে থাকে তো সে মুখ্যত তাঁর লেখার গুণে। রবীন্দ্রনাথের সাহায্য ব্যতীত আমি যে কাগজ চালাতে পারবো, এ ভরসা আমার আদপেই ছিল না। আমার ক্ষমতার সীমা আমি জানি।…

যাই হোক, ক্রমশ একটি নবীন লেখকগোষ্ঠী গড়ে ওঠায় প্রমথ চৌধুরী পত্রিকা প্রকাশ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে খুবই উপকৃত হন। সেই কৃতজ্ঞতাও তিনি যথোচিত আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, নবীন লেখকদের প্রত্যেকটি রচনা খুঁটিয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথই দিনের পর দিন প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে তাঁদের রচনার গুনাগুণ বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থাৎ সবুজপত্রের লেখকগোষ্ঠী গঠনেও রবীন্দনাথের সক্রিও ভূমিকা ছিল। কোন্ সংখায় কার-কার-কোন্-কোন্ লেখা দেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে প্রায় নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন। সবুজপত্রের প্রকাশনা যাতে নিয়মিত হয়, পত্রিকা যাতে নির্ভুল ছাপা হয়: সবদিকেই ছিল রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ সতর্ক তাড়না। ‘যত পারো নতুন লেখক টেনে নাওলিখতে লিখতে তারা তৈরি হয়ে নেবে। কাগজের আদর্শ সম্বন্ধে অত্যন্ত বেশী কড়া হলে নিষ্ফল হতে হবে’এই সতর্কবাণীও রবীন্দ্রনাথের।

সবুজপত্রের লেখকের সংখ্যা তবু খুব উল্লেখ্য হতে পারেনি। প্রায়শ রবীন্দ্রনাথ এবং সম্পাদকের লেখায় সবুজপত্র ভরিয়ে তুলতে হতো। এ সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে সজাগ করতে চেয়েছিলেন বারবার। লিখেছেন :

সবুজপত্রে কেবলমাত্র সম্পাদক এবং একটিমাত্র লেখক যদি সব কথা লেখে তবে লোকে বলবে কী? এক তো সেটা দেমাকের লক্ষণ মনে করে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকবেতারপরে হয়তো বৈচিত্রের অভাবে দুঃখবোধ করতে পারে।

ফল কথা, রবীন্দ্রনাথ গুরুর হিতৈষণা, অগ্রজের স্নেহ ও বন্ধুর সৌহার্দ্য দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীকে। সবুজপত্র নতুন সময়ের প্রয়োজনে, যুগ-পরিবর্তনের বাঁকে দেখা দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ প্রণোদনায়, ঠিক তেমনি নতুন ভাবধারা ও তার প্রকাশের নবীনতায় রুষ্ট প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ স্পষ্ট হতেও সময় লাগেনি। সবুজপত্রের বিরুদ্ধে ‘নারায়ণ’ পত্রিকার ভূমিকাও প্রসঙ্গত প্রণিধানযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই জানতেন, সবুজপত্র যে প্রগতি চিন্তার বাহন হয়ে উঠতে চাইছে, তারুণ্য ও যৌবনের জয়গাথা রচনা করতে প্রবৃত্য হয়েছে, তার ফলেই তাকে এবং পত্রিকাগোষ্ঠীকে নানা বিরুদ্ধতার ও কুৎসার সম্মুখীন হতেই হবে। তাই তিনি সবুজপত্রের দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ হতেই প্রমথ চৌধুরীকে অগ্রিম সতর্ক করে দিয়েছিলেন শুধু নয়, তাঁর মানসিক প্রস্তুতির স্বার্থেই লিখেছিলেন তাকে :

‘যৌবনে দাও রাজটিকা’ লেখাটি খুব ভালো লাগল। খুব উজ্জ্বল ও শাণিত। অবনের ভ্রমণকাহিনীটাও খুব সুন্দর হয়েছে। আমার তো বোধ হচ্ছে তোমার কাগজ এইরকমভাবে যদি বছরখানেক চলে তাহলে বাংলা সাহিত্যকে নতুন শক্তি, গতি এবং রস দিতে পারবে। সবুজপত্রের উচিত হবে খুব একচোট গাল খাওয়া। সেইটেই একটা লক্ষণ যে, ওর কথাগুলো মর্মস্থানে গিয়ে লাগছে।

আগেই বলেছি, সময়ের তাগিদ থেকেই উঠে এসেছিল সবুজপত্র। জীবনে যেমন, সাহিত্যেও তেমনি প্রত্যেকটি কালপর্যায়েই থেকে যায় প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব। যাঁরা সময়ের অগ্রবর্তী মানুষ, যেমন অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ, তাঁরই সময়ের এই চাপ, তার মাত্রা, তার তাগিদটাকে অনুধাবন করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথও তা পেরেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন। রবীন্দ্রনাথ ‘বলাকা’র গতিশীল কবিতাগুলি লিখতে আরম্ভ করেছেন। বিদেশ ঘুরে এসেছেন সদ্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির চেহারা আর চরিত্রটা তাঁর কাছে স্পষ্ট। তিনি তখন নতুন সময়ের জন্য কবিতায় যেমন ‘নতুন বিষয়’ নতুন কাব্যভাষা ও নতুন ছন্দের টান অনুভব করলেন, ‘বলাকা’র কবিতাগুলি যার প্রকাশ-প্রচেষ্টা, তেমনি অনুভব করেছিলেন : নতুন কাগজ চাই। স্বতন্ত্র চরিত্রের আর মেজাজের কাগজ। সেই প্রস্তাবেরই তাঁর প্রথম প্রস্তাবিত নাম ‘কনিষ্ঠ’, যার সম্বন্ধে লিখেছিলেন, ‘শুধু কালের হিসাবে ছোট বয়স নয়, ভাবের হিসাবেও’।

রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’র ভাব-ভাষা-ছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হবে, ক্ষয়িষ্ণু প্রচীনতার বিরুদ্ধে চলিষ্ণু উদীয়মান শক্তির, জরার বিরুদ্ধে যৌবনের, নির্বোধ গতানুগতার বিরুদ্ধে সম্মুখবর্তী প্রবহমান ধ্যানধারণার এবং অন্ধপ্রতাপমত্ততার ও স্বার্থান্ধতার বিরুদ্ধে আত্মোৎসর্গে অবিচলিত প্রেমেরই বাহন হয়ে উঠতে পেরেছিল সবুজপত্র। মিথ্যা ও ভণ্ডামীর সঙ্গে আপোষের দিন শেষ হোক, যুক্তির ও বুদ্ধির আলোয় চিনে নেওয়া যাক বন্ধু আর শত্র“র স্বরূপ, শুরু হোক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই-দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশের পরেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এই বক্তব্য খুব সোজাসুজি তুলে ধরেন নি :

মিথ্যার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে বাপুবাছা সম্বোধন করে আর চলে না। আমাদের বর্তমান সাহিত্য মানুষকে গান দেয় কারণ তাতে পৌরুষ নেইবরঞ্চ সেটা কাপুরুষেরই কাজকিন্তু যেখানে যথার্থ বীর্যের দরকারযেখানে শয়তানের সাথে লড়াই, যে শয়তানের হাজার কণ্ঠ এবং বাহু, সেখানে দেখতে পাই বড়ো বড়ো সব সাহিত্যিক গুণ্ডারা কেবল পোষা কুকুরের মতো ল্যাজ নাড়ছে আর সেই বৃদ্ধ পাপের পঙ্কিল পা আদর করে চেটে দিচ্ছে।

ভাবা যায়, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯১৪ সালেই? একই বছরের ২ আগস্ট ঘোষণা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, প্রতিক্রিয়ার শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেই জিতবে উদীয়মান নবীন চলিষ্ণু শক্তি, সবুজপত্রের প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির নামই তো ছিল : ‘সবুজের অভিযান!’ সুতরাং রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :

তার জানা আছে, কারা ‘সবুজপত্রের মাথা মুড়িয়ে খাবার চেষ্টা করবেন’ এবং ‘তোমার মুশকিল এই যে এ-ক্ষেত্রে আমার পোড়াকপালের আঁচ তোমাকে লেগেছে। সঙ্গদোষেই তুমি বিপদে পড়েছ নইলে তোমাকে এতো দুঃখ পেতে হতো না। যাই হোক, আমি নিশ্চয়ই বলে দিচ্ছি তোমার কাছে এদের হার মানতে হবে। অনেক দিন পর্যন্ত এরা বিনা বাধায় আমাদের দেশের যুবকদের বুদ্ধিকে পঙ্কিল করে তুলেছিলÑ বিধাতা বরাবর তা সইবেন কেন? দেশের যেকোনো জায়গা থেকেই কি এর ধাক্কা খাবে না? সরল মূঢ়তাকে সওয়া যায় কিন্তু বাঁকা বুদ্ধিকে প্রশ্রয় দেওয়া কিছু নয়। রণক্ষেত্রে যখন দাঁড়িয়েছ তখন যদি একা লড়তে হয তা-ও লড়তে হবে, পিছু হটলে চলবে না।

একটি দশকব্যাপী এই লড়াইটাই চালিয়েছিল সবুজপত্র, রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা ও স্ট্র্যাটেজি অবলম্বনে। সবুজপত্র জরার বিরুদ্ধে যৌবনের হয়ে যে-লড়াই চালিয়েছিল সাহিত্যে, তা কি স্তব্ধ হয়ে গেল সবুজপত্র বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে? না। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতান্ত নির্বোধ ও যান্ত্রিক হবে। লড়াইয়ের স্তর ও যাত্রা বদলের সঙ্গে সঙ্গে রথী ও হাতিয়ার বদল অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সময়েরই অনিবার্য তাড়নায়। বিষয়টি বুঝে নিতে হলে জাতীয় ও অন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে-সঙ্গে পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার হবে বাংলা সাহিত্যের সঠিক ইতিহাসবোধ এবং কালচেতনাও।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা