সমাজতান্ত্রিক ইকনমির রূপরেখা

লেখক : আখলাকুর রহমান

 

[ড. আখলাকুর রহমান (১৯২৫-১৯৯২) অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীও। লেখাটির ভিত্তি তাঁর ‘মার্কসীয় অর্থনীতি’র একটি অংশ। লেখাটি সমকাল (ভাদ্র ১৩৮৪) সাহিত্যপত্রিকায় বেরিয়েছিলো। সেখানে এ প্রবন্ধটি পুনর্মুদ্রণের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিলো। মূলত তিনি এ প্রবন্ধটিতে মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে একপ্রকার মানবিক পর্যায়ে এনে সরল ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন। প্রবন্ধটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্যম্ভাবী। সেজন্য আমরা এটি প্রকাশ্যে আনতে চাই। এখন তো তিনি নেইও আর সমকালও একপ্রকার ইতিহাস।]

‘মার্কসীয় অর্থনীতি’র [বাংলা ভাষার ‘ইকনমিকস’ (ধনবিজ্ঞান) এবং ‘ইকনমি’ (অর্থনৈতিক ব্যবস্থা) উভয় শব্দের পরিভাষারূপে ‘অর্থনীতি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটা বিভ্রান্তিকর। লেখক গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ইংরেজী শব্দ ইকনমিকেই ব্যবহার করেছেন] মর্মকথা হচ্ছে ‘আধুনিক সমাজের গতির অর্থনৈতিক বিধি নিরুপণ করা’। মার্কসীয় বিচারে—অর্থনীতি হচ্ছে সেই বিধিসমূহের বিজ্ঞান যা মানবসমাজে জীবনধারণের বৈষয়িক উপায়সমূহের উৎপাদন ও বিনিময়কে নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কসের অর্থনীতি সম্পর্কীয় লেখা তাই প্রধানত ‘পলিটিক্যাল ইকনমির সমালোচনা’ এবং ‘ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে’ নিয়োজিত হয়। এ সব বিশ্লেষণ ‘গতির অর্থনৈতিক ধরনকে’ অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ব্যক্ত করে, সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করে, এবং সমাজতান্ত্রিক ইকনমির মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে, কিন্তু তার পূর্ণ রূপরেখা অংকন করে না। এই রূপরেখার একটা নকশা ফুটে উঠেছে মার্কসেয় বিখ্যাত ‘গোথা কর্মসূচীর সমালোচনায়’ এবং এঙ্গেলসের স্বনামধন্য পুস্তকদ্বয় ‘ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এবং ‘এন্টি ডুরিং’-এ। এসব মৌল অবদান এবং বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক ইকনমিগুলোর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ‘সমাজতান্ত্রিক ইকনমির রূপরেখা’র বিশ্লেষণই হচ্ছে বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

এরূপ একটা প্রবন্ধের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কেননা, অধিকাংশ বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদগণই সমাজতান্ত্রিক ইকনমির বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে সঠিক ধারণা রাখেন না অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার অপব্যাখ্যা করে থাকেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, বিভিন্ন দেশের সুবিধাবাদী এবং সংস্কারবাদীরা সামাজিক ন্যায়নীতির নামে গোটা কয়েক অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করে আধা-সামন্ততান্ত্রিক, অনুন্নত ধনতান্ত্রিক অথবা ফ্যাসিষ্ট সমাজব্যবস্থাকেও সমাজতন্ত্ররূপে চালিয়ে দেবার অপচেষ্টা করে থাকেন। এসব অনেক সময় জনগণ এবং সমাজতন্ত্রের সত্যিকার সমর্থকদের বিভ্রান্ত করে থাকে।

এ-কথা আজ প্রায় সর্বজনবিদিত যে, তত্ত্বগত আকারে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ছিল বিপ্লব-পূর্ব ফরাসী দার্শনিকদের মতাদর্শেরই একটা যুক্তিনিষ্ঠ সম্প্রসারণ। যে মহামানবেরা ফরাসী বিপ্লবের জন্য মানুষের মন তৈরী করেছিলেন, ‘তাঁরা নিজেরাও ছিলেন চরম বিপ্লবী’। ধর্ম, প্রকৃতিবিজ্ঞান, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান—সবকিছুই ছিল তাঁদের কঠোরতম সমালোচনার বস্তু। তাঁদের মতে, সবকিছুকেই নিজেদের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে হবে কেবল ‘যুক্তির’ মাপকাঠিতে। এই ‘যুক্তিসংগত’ সমাজ ও সরকার বাস্তবায়িত হয়েছিল ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে। বস্তুত যুক্তির সেই আদর্শ রাজত্বটা ছিল ‘বুর্জোয়ার আদর্শায়িত রাজ্য’। যুক্তির বিজয় থেকে উদ্ভূত হয় ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার শর্তাবলী; ঐতিহাসিক বিকাশের পথে সৃষ্টি হতে থাকে সর্বহারা শ্রেণি; সোচ্চার ও জোরদার হতে থাকে সাম্যের দাবী। এ দাবীর তাত্ত্বিক প্রতিসঙ্গী হিসাবে জন্মগ্রহণ করে ‘আদর্শ সামাজিক ব্যবস্থার ইউটোপীয় ছবি’—যেখানে শ্রেণিভেদের অবসান ঘটবে, প্রতিষ্ঠিত হবে জীবনের সকল উপভোগ বিবর্জিত ‘এক ধরনের স্পার্টান কমিউনিজম’। ইউটোপীয় সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন সবচেয়ে স্বনামধন্য তাঁরা হচ্ছেন ফরাসী সাঁ-সিঁমো ও শার্ল ফুরিয়ে এবং ব্রিটিশ রবার্ট ওয়েন। এদেরকে ইউটোপীয় বলা হয় এর জন্য যে, তাঁরা শ্রেণিবিরোধ ও শ্রেণিসংগ্রাম প্রভৃতি সম্বন্ধে সচেতন থেকেও ‘গতির অর্থনৈতিক ধরন’ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারেন নি। গতির অর্থনৈতিক বিধি বা নিয়ম অনুধাবন করতে সক্ষম হননি। ফলে ‘অবিকশিত অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে যা ছিল তখনো সুপ্ত তেমন সব সামাজিক সমস্যার সমাধান ইউটোপীয়রা বার করতে চাইলেন মাথা থেকে’।

যাকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করা হয় তা জন্ম নেয় মার্কস-এঙ্গেলসের সামাজিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে অর্থাৎ মার্কসবাদ থেকে। মার্কসবাদের সারকথা এই : সামাজিক উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে কতকগুলো নির্দিষ্ট পারস্পরিক সম্পর্ক, যা তাদের ইচ্ছানিরপেক্ষ। এইসব উৎপাদন-সম্পর্ক উৎপাদন শক্তিগুলোর বিকাশের স্তরের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন-সম্পর্কের সমষ্টিই সামগ্রিকভাবে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরী করে। এই অর্থনৈতিক কাঠামোই হচ্ছে সমাজের উপরি-কাঠামোর সত্যকার ভিত্তি। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক চেতনা এবং ধারণাও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বস্তুত উৎপাদন পদ্ধতিই মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রভাবিত এবং নির্ধারিত করে। বিকাশের একটা নির্দিষ্ট স্তরে বিদ্যমান উৎপাদনশক্তি এবং উৎপাদন-সম্পর্কসমূহের মধ্যে হয় বিরোধের সূত্রপাত। এবং এই বিরোধের মাধ্যমে শুরু হয় সমাজবিবর্তনের ইতিহাস। কোন সমাজব্যবস্থাই যথোপযুক্ত প্রগতিশীল উৎপাদন-শক্তিসমূহের বিকাশের পূর্বে ধ্বংস হয় না। নতুন এবং উন্নত মানের উৎপাদন-সম্পর্ক পুরাতন উৎপাদন-সম্পর্কসমূহকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পুরাতন সমাজের অভ্যন্তরে তাদের অবস্থিতির বৈষয়িক শর্তসমূহ পরিপক্ক হয়ে ওঠে। আধুনিক সমাজতন্ত্র হচ্ছে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিধান পুঁজি ও শ্রমের বিরোধের পরিণতি।

পুঁজি ও শ্রমের বিরোধ উৎপত্তি লাভ করে সমাজীকৃত উৎপাদনের সঙ্গে পুঁজিবাদী দখলের অসামঞ্জস্য থেকে। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অগ্রগতি এবং ধনতান্ত্রিক মূলধন সংবর্ধন প্রণালীর সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীভাবে যুক্ত উদ্ভাবন ও কৃৎকৌশলগত বিবর্তন সমস্ত উৎপাদনে একটা সামাজিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করে—সমগ্র উৎপাদনকে সমাজীকৃত করে তোলে। যে কোন একটা পণ্যের উৎপাদনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে অসংখ্য উৎপাদক কিন্তু উৎপন্নের মালিক থেকে যায় মুষ্টিমেয় কতিপয় লোক। উৎপাদনের লক্ষ থেকে যায় অবিরাম মুনাফা অর্জন এবং মূলধন সংবর্ধন। ধনতান্ত্রিক সম্প্রসারিত মূলধন সংবর্ধন প্রণালী জন্ম দেয় ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সংকট। যে সংকটের সত্যকার সমাধান হচ্ছে সমাজীকৃত উৎপাদন এবং ব্যক্তিগত দখলের মধ্যকার বিরোধের চিরস্থায়ী অবসান। তার একমাত্র উপায় হচ্ছে দখলের ধরনের সমাজীকরণ। তাই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে উৎপাদনের উপায়সমূহের রাষ্ট্রীয়করণ এবং সমাজতান্ত্রিক ইকনমির প্রধান ও প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উৎপাদনের উপায়সমূহের ওপর সামাজিক দখল স্থাপন। এটা ধনতান্ত্রিক পণ্যোৎপাদন উচ্ছেদ করে, উৎপাদকের ওপর উৎপন্নের আধিপত্য বিলুপ্ত করে, নৈরাজ্যময় উৎপাদনকে প্রতিস্থাপিত করে সচেতন এবং সামাজিকভাবে পরিকল্পিত উৎপাদন দ্বারা। এটা ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামের অবসান ঘটায়, মানুষকে জান্তব অবস্থান থেকে সত্যকার মানবিক অবস্থানে উত্তীর্ণ করে এবং সম্পূর্ণ সচেতনভাবে তার নিজের ইতিহাস সৃজন করতে সক্ষম করে। নিম্নের বিষয় থেকে এসব আরো পরিষ্কার হয়ে উঠবে—এটাই আমাদের ধারণা।

উৎপাদন সম্পর্ক ও সম্পত্তির মালিকানা

উৎপাদন সম্পর্ক

উৎপাদন সম্পর্ক নির্ধারিত হয় উৎপাদন-উপায়সমূহের দখলের ধরন দ্বারা। উৎপাদন-উপায়সমূহের ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করা অর্থাৎ তাদের সমাজীকরণ করা হচ্ছে সমাজতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দখলের ধরন থাকে ব্যক্তিগত। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে উৎপাদনের উপায়সমূহের সমাজীকরণ সার্বজনীন। মনে রাখতে হবে যে, সমাজতন্ত্র সম্পত্তির মালিকানা উচ্ছেদ করে না, তার ধরনকে পরিবর্তিত করে মাত্র। বুর্জোয়া মালিকানার স্থলে প্রতিস্থাপিত হয় সামাজিক মালিকানা। মার্কস ও এঙ্গেলসের কথায়—সাম্যবাদ সম্পত্তি ধ্বংস করে না, বুর্জোয়া সম্পত্তি উচ্ছেদ করে মাত্র।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে উৎপাদনের উপায়সমূহের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়। তাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় সমগ্র সমাজ তথা সকল শ্রমজীবী জনগণের স্বত্বাধিকার। ফলে এসব আর শ্রম-শোষণের যন্ত্ররূপে ব্যবহৃত হতে পারে না। এই অর্থে উৎপাদনের উপায়সমূহ আর মূলধনের ভূমিকা পালন করে না—শ্রমজীবীদের শোষণ করে না। উৎপাদনের উপায়সমূহের সমাজীকরণ মূলধন ও শ্রমের দ্বন্দ্ব বিলুপ্ত করে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক করে তোলে সাথীসুলভ, বন্ধুত্বমূলক। প্রতিযোগিতা আর বৈরিতা রূপান্তরিত হয় সমবায়ী সহযোগিতায়। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে সকল মানুষই ঐক্যবদ্ধভাবে লিপ্ত হয় উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টায়। শ্রমিক, কৃষক ও বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক স্বার্থ তাদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সমন্বয় করে। সামাজিক স্বার্থ ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সমবায়ী প্রচেষ্টা ও সাথীসুলভ আচার-ব্যবহারের আসল ভিত্তি। প্রত্যেকটা ফার্মে, বিভিন্ন ফার্মের মধ্যে এবং বিভিন্ন উৎপাদন শাখার মধ্যে এরূপ সমবায়ী সম্পর্কের বিকাশ জনগণের সৃজনী শক্তিকে উদ্ঘাটিত করে, জনগণের উৎপাদনশক্তির সীমাহীন বিকাশের দ্বার উন্মোচন করে। তাই লেনিন বলেছেন : সমবায়ীকরণই সমাজতন্ত্র।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সমাজীকৃত উৎপাদন ও দখলের ধরণের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব থাকে না। কারণ, এখানে দখলও হয়ে ওঠে সমাজীকৃত। সমাজতন্ত্র কেবল উৎপাদনের উপায়সমূহের ওপরই সামাজিক দখল কায়েম করে না, সকল শ্রমোৎপাদিত দ্রব্যের ওপরও সামাজিক দখল স্থাপন করে। সমাজতন্ত্র তাই সমাজীকৃত উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বিত করে সমাজীকৃত দখলকে। উৎপাদনের উপায়সমূহের সমাজীকরণ উৎপাদন, বিনিময় ও বণ্টনের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। বিশেষ করে শ্রমই হয়ে ওঠে বণ্টনের আসল ভিত্তি। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে শ্রম বা কাজ না করে কেউই জীবন ধারণ করতে পারে না। এখানে সকল কর্মক্ষম মানুষকেই বাধ্যতামূলকভাবে যথাসাধ্য কাজ করতে হয়। অলস, পরগাছা ও শোষকের এখানে কোন স্থান নেই। অন্যদিকে আবার সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে কাজের অভাবে কারও জীবন বিনষ্ট হতে পারে না। কেননা কাজ করার সুযোগ পাওয়া হচ্ছে সকল মানুষেরই একটা জন্মগত অধিকার। তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সকলের জন্য কর্মসংস্থান করা হচ্ছে একটা সামাজিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।

সম্পত্তির মালিকানার ধরন

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সাধারণত তিন প্রকারের সম্পত্তি অবস্থান করে : এক. রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সম্পত্তি; দুই. যৌথ এবং সমবায়ী সম্পত্তি; এবং তিন. ব্যক্তিগত সম্পত্তি। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সম্পত্তির মালিক সমগ্র জনসাধারণ। যৌথ বা সমবায়ী সম্পত্তির মালিক সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বা সমবায়ী জনগণ। বলাবাহুল্য যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক থাকে ব্যক্তিবিশেষ।

এটা সুবিদিত যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই পুঁজিপতি মালিকদের সকল প্রকার বৃহদাকার সম্পত্তির রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সাধারণত সকল জমি, খনিজ সম্পদ, বনজ সম্পদ, জলজ সম্পদ, কল-কারখানা, ব্যাংক, পরিবহন, যোগাযোগ, রাষ্ট্রীয় খামার, রাষ্ট্রীয়কৃত ব্যবসায়, রাষ্ট্রীয় ঘরবাড়ি এবং রাষ্ট্রীয় ফার্মগুলোর সকল উৎপন্ন হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শক্তির উদাহরণ।

সামাজিক ইকনমিতে কৃষক ও কুটিরশিল্পীদের ছোট ও মাঝারি ধরনের সম্পত্তিকে সমাজীকৃত করা হয় না। তারা স্বেচ্ছায় উৎপাদকের সমবায়ে সংঘবদ্ধ হয়। তাদের সম্পত্তি সমবায়ীকৃত হয়। সমবায়ীকরণই সামাজিক ইকনমির ভিত। সমবায়গুলো দ্বারা কৃষি ও শিল্পোৎপাদনে ব্যবহৃত সকল প্রকারের মেশিন ও যন্ত্রপাতি, খামার ও গৃহস্থালীর ঘর-বাড়ি, গরু-বাছুর, হাঁস-মোরগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সমবায়গুলোর সকল উৎপন্ন হচ্ছে যৌথ এবং সমবায়ী সম্পত্তির উদাহরণ।

অনেকে রাষ্ট্রীয় এবং যৌথ ও সমবায়ী সম্পত্তির মধ্যে প্রকারগত পার্থক্য আরোপ করে থাকেন। কিন্তু তা ঠিক নয়। প্রথমত, উভয় সম্পত্তিই সমাজীকৃত এবং গোষ্ঠীগত শ্রমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। দ্বিতীয়ত, উভয় সম্পত্তিতেই মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ অনুপস্থিত। তৃতীয়ত, উভয় সম্পত্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে পূর্ব-পরিকল্পিত পদ্ধতিতে শ্রমজীবী জনগণের জীবন-ধারণের মান উন্নয়ন করা। চতুর্থত, উভয় সম্পত্তিতেই বণ্টনের নীতি হচ্ছে ‘কাজের পরিমাপে ভোগ’— অর্থাৎ যেমন কাজ তেমন ফল।

উল্লেখ্য যে, প্রকারগতভাবে এক হলেও রাষ্ট্রীয়, যৌথ এবং সমবায়ী সম্পত্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হচ্ছে সামাজিক সম্পত্তি। তার ওপর সর্বসাধারণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যৌথ বা সমবায়ী সম্পত্তি গোষ্ঠী বা সমবায়বিশেষের সম্পত্তি। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর থাকে সামাজিক মালিকানা। আর যৌথ বা সমবায়ী সম্পত্তি থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর থাকে গোষ্ঠী বা সমবায়ের মালিকানা। এসব প্রভেদ বণ্টন ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও পার্থক্যের সূচনা করে। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির জন্য নিযুক্ত করা হয় সরকারী পরিচালক। আর যৌথ বা সমবায়ী সম্পত্তির পরিচালনার দায়িত্ব আরোপিত হয় গোষ্ঠী বা সমবায়গুলোর নিজেদের নির্বাচিত পরিচালকমণ্ডলীর ওপর।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে ব্যক্তিগত ভোগের জন্য উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা বহাল থাকে। অর্জিত আয়, ব্যক্তিগত সঞ্চয়, সামাজিক বাসস্থানে ব্যক্তিবিশেষের অংশ, আসবাবপত্র, পারিবারিক জীবনযাপনে ব্যবহৃত সকল প্রকার টেকসই ভোগ্যদ্রব্য প্রভৃতি হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির দৃষ্টান্ত। যৌথ খামারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকের পারিবারিক খামারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কৃষকের বাসস্থান, খামারগৃহ, গৃহপালিত পশু এবং হালের যন্ত্রপাতিও ব্যক্তিগত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। যৌথ খামারের পূর্ণতম বিকাশ এরূপ ব্যক্তিগত সম্পত্তির গুরুত্ব হ্রাস করে।

সামাজিক উৎপাদনে শ্রমের অবদানই হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎস। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে শ্রমজীবী জনগণের অভাব পরিতৃপ্ত করা হয় ক্রমবর্ধমান হারে সমাজীকৃত উৎপাদন উপায়সমূহের ভিত্তিতে। তারই ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির আয়তন বৃদ্ধি পায়। কেননা তার নিশ্চয়তা বিধান করা হয় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য শ্রমজীবীদের বৈষয়িক অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যমে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মূলধনে রূপান্তরিত হয় না, শ্রম শোষণ করতে পারে না। ব্যষ্টি বা সমষ্টির যে-কোন অকল্যাণমূলক কাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ব্যবহার এখানে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

অর্থনৈতিক বিধি

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সামাজিক উৎপাদনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বসাধারণের অভাব পরিতৃপ্ত করা। অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না, কেননা সেখানে উৎপাদনের উপায়সমূহ সমাজীকৃত, মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ বিলুপ্ত। শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক, বৈষয়িক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক অভাব পূরণ করার জন্য ক্রমবর্ধমান প্রয়াসই হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। সকল দ্রব্যই উৎপাদন করা হয় মানুষের জন্য— মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য। মানুষের অর্থনৈতিক, বৈষয়িক এবং সাংস্কৃতিক অভাব ক্রমবর্ধমান। কেবল সামাজিক উৎপাদনের অবিরাম এবং ক্রমবর্ধমান বিকাশের মাধ্যমেই তা পরিতৃপ্ত করা সম্ভব। এটাই সমাজতন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য; এটাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমির অর্থনৈতিক বিধিগুলোর মর্মবস্তু।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমি পরিচালিত হয় প্রধানত দুটো বস্তুনিষ্ঠ বা অবজেকটিভ বিধি দ্বারা : জাতীয় ইকনমির সুপরিকল্পিত ও সুষম বিকাশ এবং শ্রম বা কাজের অনুপাতে বণ্টন। এই বিধিগুলোর ভিত্তি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক; তারা বিমূর্তও নয়, স্বতঃস্ফূর্তও নয়। যেখানে মানুষ নেই, সমাজ নেই, সেখানে এসব বিধি ভিত্তিহীন, মূল্যহীন। তবুও এই বিধিগুলো অবস্থান করে মানুষের ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে; মানুষ তাদেরকে অস্বীকার করতে পারে না। ভ্রƒক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ সচেতনভাবে এসবকে নিজেদের কল্যাণার্থে নিয়োগ করতে পারে।

পূর্ব-পরিকল্পিত ও সুষম বিকাশ

সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনই হচ্ছে ধনতান্ত্রিক ইকনমির প্রধান চালিকাশক্তি। তার ভিত্তিতে যে অর্থনৈতিক বিকাশ সাধিত হয়েছে তা অবশ্যই যুগান্তকারী। কিন্তু বিকাশের ফলে উৎপাদনের চরিত্র ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে— সমাজীকৃত উৎপাদন ও ব্যক্তিগত দখলের মধ্যে— যে বিরোধ দেখা দেয় তা এমন এক আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংকটের সূচনা করে যা ধনতন্ত্র সমাধান করতে পারে না। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন প্রণোদিত ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতিতে বিরাজ করে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। লক্ষ লক্ষ লোকের সাময়িক কর্মবিচ্যুতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, ইকনমির ক্রমবর্ধমান একচেটিয়াকরণ, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং কখনো কখনো যুদ্ধ প্রভৃতির মাধ্যমে ধনতন্ত্র সাময়িকভাবে তার আভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বিনিময়ে আবার শুরু হয় ধনতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ও বিকাশ— যা পুনরায় সৃজন করে নতুন ধরনের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা এবং আভ্যন্তরীণ বিরোধ। এসবের চিরন্তন সমাধান অনিবার্যভাবে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন পরিতৃপ্ত করা, সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন নয়। সামাজিক উৎপাদন ক্ষেত্রে তাই অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার স্থান দখল করে পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলা। গোটা সামাজিক উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয় সুনির্দিষ্ট ও সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে, ব্যক্তি ও সমাজের অভাব পরিতৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে।

উৎপাদনের উপায়সমূহের সমাজীকরণ সমগ্র ইকনমিকে একটা বৃহদাকার ফার্মে রূপান্তরিত করে। উৎপাদন-উপায়সমূহের সামাজিক মালিকানা এবং উৎপাদন পরিকল্পনা অর্থনৈতিক কার্যকলাপে স্বতঃস্ফূর্ততার অবসান করে। যে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা সামাজিক ইকনমির জটিল কাঠামো গড়ে তুলেছে (যেমন, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পরিবহন ইত্যাদি) তারা যোগান ও চাহিদা, উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপন্নের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং পরস্পর নির্ভরশীল। উৎপাদনের বিভিন্ন শাখা এবং নির্দিষ্ট শাখাসমূহের বিভিন্ন প্রশাখাগুলোর সুষম বিকাশ তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমির একটা অপরিহার্য শর্ত ও বৈশিষ্ট্য।

কোন দ্রব্য কি পরিমাণে উৎপাদন করা হবে তা সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে অন্ধ বাজার— শক্তিগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে রাষ্ট্র তার পরিকল্পনা কমিশন এবং অসংখ্য পরিকল্পনা সংস্থার মাধ্যমে সকল সামাজিক প্রয়োজন এবং প্রাপ্তব্য সম্পদের একটা গ্রহণযোগ্য পরিমাপ করে; বিদ্যমান উৎপাদনশক্তিগুলোর পর্যালোচনা করে; উৎপাদনের বিদ্যমান শর্তসমূহের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে; উৎপাদন পরিকল্পনা এবং তার সহগামী অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রস্তুত করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, উৎপাদনের উপকরণ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সমন্বয় না করে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী শিল্পের একপেশে বিকাশ সমীচীন নয়। এটা উৎপাদনের দুটো বিভাগের অসমানুপাতিক বিকাশের সূত্রপাত করে। কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন উপকরণ ব্যতীত ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন অনির্দিষ্টভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে উৎপাদনের উপকরণ ব্যবহারকারী  শিল্পগুলোর পর্যাপ্ত বিকাশ ব্যতীত উৎপাদনের উপকরণ উৎপাদনকারী শিল্পগুলোর বিকাশও অসম্ভব। কোন শিল্পশাখাই বিচ্ছিন্নভাবে নিজের বিকাশকে স্থিতিশীল রাখতে পারে না।

মার্কসীয় উসুলতত্ত্ব অনুযায়ী ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বিভাগের (বিভাগ রর) তুলনায় উৎপাদনের উপকরণ উৎপাদনকারী বিভাগের (বিভাগ র) অধিকতর বিকাশ হচ্ছে সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদনের একটা আবশ্যিক শর্ত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছামত উচ্চহারে উৎপাদনের উপকরণসমূহের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব অথবা সমীচীন। কোন একটা উৎপাদন শাখার অপরিকল্পিত এবং অসমানুপাতিক বিকাশ সমাজতান্ত্রিক ইকনমির অর্থনৈতিক বিধি বিরোধী। সামাজিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভাগ  র ও রর এর বিকাশের হারে একটা সুনির্দিষ্ট অনুপাত রক্ষা করা অপরিহার্য। এটা জাতীয় ইকনমির সুষম বিকাশ এবং উৎপাদনের অবিরাম প্রবৃদ্ধির একটা আবশ্যিক শর্ত। উৎপাদন প্রণালীর বিভিন্ন শাখাসমূহের  আন্তঃসম্পর্ক  এবং পরস্পরনির্ভরশীলতা তাদের সুষম বিকাশকে অপরিহার্য করে তোলে। সমাজতান্ত্রিক ইকনমির সুপরিকল্পিত সুষম বিকাশ-বিধি এ সত্যকেই প্রতিফলিত করে।

যে অনুপাত জাতীয় ইকনমির বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে উৎপাদন উপকরণ ও ভোগ্যপণ্যের অনুপাত— বিভাগ র ও রর এর অনুপাত। কেননা, অন্য অনুপাতগুলো যেমন শিল্প ও কৃষি, উৎপাদন ও ভোগ, মূলধন সংবর্ধন ও ভোগ, আয় এবং ব্যয় প্রভৃতির মধ্যকার অনুপাতগুলো তারই ওপর নির্ভরশীল। এসব অনুপাতকে ধারাবাহিকভাবে স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে সুষম বিকাশের একটা অপরিহার্য শর্ত— সুপরিকল্পিত সমাজতান্ত্রিক ইকনমির বৈশিষ্ট্য।

সুপরিকল্পিত এবং সুষম বিকাশ-বিধির প্রয়োগ উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ও শাখায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উৎপাদন উপকরণ ও শ্রমের সঠিক বণ্টনকে সুনিশ্চিত করে, সকল উৎপাদন শাখা ও উৎপাদন সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত করে এবং উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময় বৃদ্ধির শর্তগুলো প্রতিষ্ঠিত করে।

কাজের অনুপাতে বণ্টন

বণ্টনের ধরন নির্ভর করে উৎপাদন পদ্ধতির ওপর। কেননা, বণ্টন উৎপাদন পদ্ধতিরই বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে, উৎপাদন-সম্পকর্কেই প্রতিফলিত করে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতিতে মূলধন ও জমির মালিক থাকে অ-শ্রমজীবীরা। শ্রমজীবীরা, সার্বিক অর্থে জনগণ, থাকে কেবল শ্রমশক্তির মালিক। এটাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ভোগোপকরণের ধনতান্ত্রিক বণ্টনের ধরন। আবার যেখানে উৎপাদনের উপায়সমূহ থাকে শ্রমজীবীদের দখলে সেখানে ভোগোপকরণের বণ্টনের ধরনও ভিন্নতর হতে বাধ্য। বণ্টন উৎপাদন-পদ্ধতি থেকে স্বাধীন নহে। সমাজতন্ত্র বণ্টনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর সাধারণ মালিকানা থাকা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রম একটা ব্যক্তিগত অবদানেই থেকে যায়। শ্রমজীবী সমাজকে যা দেবে, বাদ-ছাদের পর সে ঠিক ততটাই ফেরত পাবে। প্রত্যেক শ্রমজীবীর আলাদা আলাদা কাজের ঘণ্টাগুলোকে একত্র করে গঠন করা হয় সামাজিক শ্রমদিবসে তার অবদানের অংশ। সামাজিক ভোগোপকরণের ভাণ্ডার বা তহবিল থেকে সে পাবে সমান শ্রমমূল্যের ভোগ্যবস্তু। সমমূল্যের বিনিময় এখানে এটা বুঝায় যে, পণ্য বিনিময়ের একই নীতি এক্ষেত্রে বলবৎ। শুধু এটুকু নতুন যে, সাধারণত সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে কেউ নিজের শ্রম ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। অপরপক্ষে, ব্যক্তিগত ভোগোপকরণ ছাড়া আর কিছুই ব্যক্তির অধিকারে আসতে পারে না। এই ভোগোপকরণ বণ্টনের ব্যাপারেও কেবল তুল্যমূল্যের মধ্যে বিনিময়ের নীতি বহাল থাকবে : একটা বিশেষরূপের  নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের বিনিময় হবে অন্যরূপের একই পরিমাণ শ্রমের সঙ্গে।

এখানে দুটো বিষয় স্মর্তব্য : এক. শ্রম-সময় নির্ণয় করতে হবে সামাজিক শ্রমের স্থিতিকাল ও তীব্রতা দিয়ে। কেননা, বিভিন্ন শ্রমজীবীর শারীরিক ও মানসিক শক্তি বিভিন্ন থাকে। ফলে গড়পড়তা সামাজিক শ্রমের স্থিতিকাল ও তীব্রতাই হবে শ্রমসময় পরিমাপের মানদণ্ড। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সমান অধিকারমূলক বুর্জোয়া ধারণা পরিবর্তিত হয়। এখানে ‘সমান অধিকার অসমান শ্রমের জন্য অসমান অধিকার মাত্র’। এখানে শ্রেণি-বৈষম্য ওঠে যায়। কারণ সকলেই শ্রমজীবী। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তির বিশেষ বিশেষ গুণের দরুন উৎপাদন-ক্ষমতায় যে অসমতার সৃষ্টি হয়, তাকে ব্যক্তির ‘স্বাভাবিক বিশেষ অধিকার হিসেবে মৌন-স্বীকৃতি দেওয়া হয়’। অন্য কথায়, সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে শ্রমের পরিমাণ, প্রকার ও গুণের ভিত্তিতে শ্রমজীবীদের মধ্যে পারিশ্রমিকের তারতম্য বিদ্যমান থাকবে।

দুই. ভোগোপকরণ ভাণ্ডার গঠন করা হয় সামাজিক উৎপাদন থেকে কিছুটা ‘বাদছাদের’ পর। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মোট সামাজিক উৎপাদন হচ্ছে সমবায়িক শ্রমফল। গোটা সামাজিক উৎপাদনটাকে শ্রমজীবীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলে সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। সামাজিক প্রয়োজন দুই প্রকারের : ক) সামাজিক মূলধনের সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদনের জন্য আবশ্যিক ব্যয়, খ) উৎপাদনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন সব ব্যয়।

সামাজিক উৎপাদনকে কেবল অক্ষুণœ রাখলেই চলবে না, তাকে সামাজিকভাবে নির্ধারিত হারে অনবরত বৃদ্ধি করতে হবে। তার জন্যে প্রয়োজন :

প্রথমত, ব্যবহারবশত উৎপাদন উপায়ের যেটুকু ক্ষয় হয় তা পূরণ করা;

দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত হারে উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য আবশ্যকীয় উদ্বৃত্ত; এবং তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য অজানা ব্যাঘাতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসাবে একটা মজুত তহবিল।

উৎপাদনবহির্ভূত প্রয়োজনের খাতে ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে :

১) সর্ব প্রকারের প্রশাসনিক খরচ; ২) শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক জাতীয় সামাজিক প্রয়োজনসমূহ যথাযথভাবে পরিতৃপ্ত করার জন্য আবশ্যকীয় খরচ; ৩) বৃদ্ধ, অসমর্থ, এমনকি অকর্মণ্যদের অভাব মেটানোর জন্য আবশ্যকীয় খরচ।

মোট সামাজিক উৎপাদন থেকে উল্লিখিত খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তাই হচ্ছে ভোগোপকরণ ভাণ্ডার বা শুধু ভোগ্য-ভাণ্ডার, যাকে শ্রমজীবীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে প্রত্যেকের কাজ বা শ্রমের অনুপাতে। তুল্যমূল্যের নীতির ভিত্তিতে এবং শ্রমের গড়পড়তা স্থিতিকাল ও তীব্রতার পরিমাপে সমপরিমাণ শ্রম ভোগোপকরণ ভাণ্ডার থেকে পাবে সমপরিমাণ অংশ।

সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিবিশেষের সামাজিক অবস্থান ও কল্যাণ নির্ণয় করা হয় একমাত্র কাজের ভিত্তিতে। ভোগ্য-ভাণ্ডার থেকে কে কতটুকু পাবে তা নির্ধারিত হবে কাজের পরিমাণ ও গুণের মাপকাঠিতে। কাজের অনুপাতে বণ্টন তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমির একটা গুরুত্বপূর্ণ বিধি। এ বিধি উৎপাদনকে জনগণের বৈষয়িক স্বার্থের সঙ্গে সংযুক্ত করে; শ্রমের দক্ষতা ও উৎকর্ষ বৃদ্ধির প্রেরণা যোগায়; কৃৎকৌশলগত আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করে। এরূপ বণ্টন বিধির একটা শিক্ষামূলক গুরুত্ব এই যে, তা জনগণকে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা প্রদান করে, কাজকে বাধ্যতামূলক ও সার্বজনীন করে তোলে, শ্রমের ক্ষেত্রে লৌহ কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করে। এসব সামাজিক শ্রমের সৃজনী শক্তিকে অভূতপূর্বভাবে উৎসারিত করে এবং সামাজিক শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতাকে ত্বরান্বিত হারে বৃদ্ধি করে।

সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে বণ্টনকে সমীকৃত করে না। প্রথমত, সমাজতন্ত্র একটা উৎক্রমণশীল সমাজব্যবস্থা। সমাজ বিকাশের সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে জনগণের উৎপাদন-ক্ষমতা বিকাশের সেই উচ্চতম স্তরে পৌঁছাতে পারে না যেখানে প্রয়োজনের অনুপাতে ভোগ্য ভাণ্ডার বণ্টন করা সম্ভবপর। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে শ্রম কেবল জীবন ধারণের উপায় বিশেষ। এখানে ‘কর্মই জীবন’ এ সত্য বাস্তবায়িত হয় না, তার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয় মাত্র। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাংস্কৃতিক অবশেষও দীর্ঘকাল যাবৎ জনগণের বৈষয়িক স্বার্থকে সজীব রাখে। এসব কারণে শ্রম তার যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক দাবী করে। যথোপযুক্ত পারিতোষিক ব্যতীত উৎপাদনশীল শ্রমকে নিপুণতার সাথে কার্যকর করা সম্ভবপর নয়, সামাজিকভাবে সম্ভাব্য উৎকর্ষ সাধনও সম্ভবপর নয়। উৎপাদন-ক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য যেখানে বৈষয়িক উদ্দীপনা অপরিহার্য সেখানে সমীকৃত বণ্টন ও সমাজতন্ত্র পরস্পরবিরোধী। তৃতীয়ত, সমাজের সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে মানসিক ও দৈহিক, পারদর্শী ও অ-পারদর্শী শ্রমের মধ্যে প্রভেদ বিদ্যমান থাকে। পারিতোষিকের মাধ্যমে এসব তারতম্যের যথোপযুক্ত প্রতিফলন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

সমাজতন্ত্রে সাম্যের অর্থ বণ্টনের সমতা নয়, তার অর্থ হচ্ছে উৎপাদনের উপায়সমূহের ওপর সকলের সমান অধিকার; শোষণ থেকে সকল জনগণের মুক্তির সমতা; এবং কাজ করার সমান অধিকার। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষের ভোগ ও আয়ের সমতা মার্কসীয় অর্থনীতির বিরোধী।

সমাজতান্ত্রিক বিকাশের উচ্চতম স্তরে— সাম্যবাদী বা কমিউনিষ্ট সমাজব্যবস্থায়— যখন শ্রমবিভাগের কাছে ব্যক্তির দাসোচিত বশ্যতার অবসান ঘটবে; যখন দৈহিক ও মানসিক শ্রমের বৈপরীত্য বিলুপ্ত হবে; যখন শ্রম আর জীবনধারণের উপায় থাকবে না বরং জীবনেরই প্রাথমিক প্রয়োজন হয়ে উঠবে; যখন শ্রমের উৎপাদন-ক্ষমতার বিকাশ এমন স্তরে পৌঁছাবে যেখানে দুষ্প্রাপ্যতা থাকবে না; যখন প্রয়োজনীয়তার গণ্ডী ছেড়ে মানুষ ‘স্বাধীনতার’ ক্ষেত্রে উপনীত হবে— কেবল তখনেই বণ্টন তার সংকীর্ণ দিগন্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হবে, কেবল তখনই ‘প্রত্যেকে দেবে তার সাধ্য অনুসারে, প্রত্যেক পাবে তার প্রয়োজনমতো।’

শ্রমের সামাজিক বৈশিষ্ট্য

শ্রমই সমাজজীবনের ভিত্তি। কিন্তু সকল সমাজব্যবস্থায় শ্রমের বৈশিষ্ট্য এক নয়। কারণ, শ্রমের বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে উৎপাদন সম্পর্কের ওপর এবং উৎপাদন-সম্পর্কের তারতম্যই বিভিন্ন সমাজব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য সৃজন করে। তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে শ্রমের বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিকভাবেই ধনতান্ত্রিক ইকনমিতে বিদ্যমান শ্রমের বৈশিষ্ট্য থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য। সকল শোষণমূলক সমাজেই শ্রমের চরিত্র থাকে বাধ্যতামূলক; বিভিন্ন উপায়ে শ্রমিককে বাধ্যতামূলকভাবে নিযুক্ত করা হয় শোষকের জন্য সম্পদ সৃষ্টির কাজে উৎপাদক থেকে উৎপাদনের উপায়সমূহের বিচ্ছেদই বাধ্যতামূলক শ্রমের উৎস। বস্তুত উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর ব্যক্তিগত মালিকানাই বাধ্যতামূলক শ্রমের প্রধান ও প্রাথমিক কারণ। উৎপাদন-উপায়সমূহের সমাজীকরণ তাই আবশ্যিকভাবে শ্রমের বাধ্যতামূলক চরিত্র বিলুপ্ত করে; সকল জনসাধারণকে উৎপাদন-উপায়সমূহের মালিকে পর্যবসিত করে। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতেই শ্রম সর্বপ্রথমে তার স্বাধীন সত্তা লাভ করে।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মানুষ কাজ করে তার নিজের জন্য এবং সমাজের জন্য। উৎপাদন ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা নতুন উদ্ভাবন, নতুন সাফল্যই, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে, শ্রমজীবী মানুষের জীবনের মান উন্নয়নের বাহন হয়। যত বেশী উৎপাদন করা হয়, দ্রব্য ততবেশী সুলভ হয় এবং শ্রমজীবী শ্রেণি কম দরে ততবেশী দ্রব্য ভোগ করতে সক্ষম হয়।

সমাজতন্ত্রে শ্রম সম্বন্ধে মানুষের ধারণাকে আমূলভাবে পরিবর্তন করে; শ্রম সম্বন্ধে তাঁদের মনে নতুন উপলব্ধির সূচনা করে। শ্রম সেখানে সম্মান, মর্যাদা ও বীরত্বের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। ফলে শ্রমিকের সৃজনী শক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। শ্রমিকগণ নিজেরা মেশিন, যন্ত্রপাতি ও কৃৎকৌশলে বিপ্লবী উন্নয়ন সাধন করতে সক্ষম হয়। সমাজতান্ত্রিক পারিতোষিক শ্রমিকের এই সৃজনী শক্তিকে আরো বিকশিত করে; আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ব্যাপারে শ্রমিককে আরো উদ্দীপ্ত করে।

ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রম বৈশিষ্ট্যগতভাবে কষ্টদায়ক; শ্রমিকের নিজের উদ্ভাবন-প্রচেষ্টা নি¤œতম। সেখানে মেশিন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে মুখ্যত শ্রমের আপেক্ষিক শোষণ বাড়ানোর জন্য, পরিশ্রম লাঘব করার জন্য। ধনতন্ত্র কেবল মুনাফা বৃদ্ধির জন্যই স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনপ্রণালী প্রতিষ্ঠিত করে। তার বিপরীতে সমাজতন্ত্র সর্বক্ষেত্রে শ্রমের যন্ত্রপাতির অবাধ ব্যবহারকে উৎসাহিত করে পরিশ্রম লাঘব করার জন্য,

শ্রমিকের অবসরকে দীর্ঘায়িত করার জন্য, উৎপাদন ক্ষমতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রমিকের বৈষয়িক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য—শ্রমের শোষণ বৃদ্ধির জন্য। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলের উন্নয়ন ও প্রগতির উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিশ্রম হ্রাস করা, শ্রমসময়কে সংকুচিত করা এবং কাজের পরিবেশকে উন্নত ও আরামদায়ক করা।

সমাজতন্ত্র প্রত্যেককেই কাজ করার সমান অধিকার প্রদান করে। প্রত্যেকেই তার নিজের এলাকায় ও পেশায় কাজ করার সুযোগ পায়; কাজের পরিমাণ ও গুণের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পায়। সমাজতন্ত্র সুপরিকল্পিত বিকাশের মাধ্যমে প্রত্যেকটি শ্রমজীবীর জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা বিধান করে, অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব চিরস্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করে।

সমাজতন্ত্র সরাসরিভাবে শ্রমের সামাজিক বৈশিষ্ট্যকে স্বীকৃতি দান করে, সচেতন এবং সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে শ্রমকে সংগঠিত করে। ফলে জন্মলাভ করে নতুন এক সামাজিক শ্রমবিভাগ। এ শ্রমবিভাগ ধনতান্ত্রিক শ্রমবিভাগ থেকে ভিন্ন, এ জন্য যে, সমাজতন্ত্র শ্রমসহযোগিতার চরিত্র সমবায়িক। সমাজতন্ত্র উৎপাদনকারী ফার্মগুলোর বিচ্ছিন্নতা দূর করে, সকল উৎপাদন শাখা ও উৎপাদন উদ্যোগগুলোকে বিশাল জাতীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে সমন্বিত করে, সকল জনগণকে সমবায়ী শ্রমের অন্তর্ভুক্ত করে। শ্রমিক, কৃষক এবং বুদ্ধিজীবী সামগ্রিক সামাজিক শ্রমের সমন্বিত অংশে রূপান্তরিত হয়, শ্রমজীবীরা সরাসরিভাবে সামাজিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

প্রত্যেক সমাজব্যবস্থায়ই উৎপাদন সম্ভব হয় শ্রমের সহযোগিতার ভিত্তিতে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রম-সহযোগিতা এক নতুন চরিত্র ধারণ করে। কেননা এখানে শ্রম কেবল স্বাধীনই নয়, শ্রমের সহযোগিতা ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজতান্ত্রিক শ্রম সহযোগিতা প্রকাশিত হয় সমগ্র জনগণের ঐক্যবদ্ধ কর্ম-প্রচেষ্টারূপে। এরূপ কর্মপ্রচেষ্টার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রমজীবী জনগণের ক্রমবর্ধমান অভাব পরিতৃপ্তির পূর্ণতর নিশ্চয়তা প্রদান করা।

সমাজতান্ত্রিক শ্রম সহযোগিতা শ্রমিকদের মধ্যে সৃষ্টি করে এক নতুন শৃংখলা। এ শৃংখলা বিবেচনা ও নীতিজ্ঞানপ্রসূত। কেননা তা উৎপত্তি লাভ করে প্রত্যেকটি শ্রমজীবীর সাথীসুলভ আচরণ থেকে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গড়ে তোলার সুদৃঢ় এবং কঠোর সংগ্রাম থেকে। তা  সত্ত্বেও শ্রমজীবীদের পুরাতন ভাবধারা ও আচরণ অবিলম্বে সম্পূর্ণরূপে বিলোপ হয়ে যায় না। প্রকৃতপক্ষে বহুদিন যাবৎ শ্রমজীবীদের একটা অংশ পুরনো ভাবধারা ও আচার-ব্যবহার বর্জন করতে সক্ষম হয় না। এটা সমাজতান্ত্রিক শৃঙ্খলাকে সময় সময় ব্যাহত করে। তাই প্রতিক্রিয়াশীল আচার-ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবিরাম মতাদর্শগত সংগ্রাম সমাজতান্ত্রিক শ্রমশৃংখলাকে অটুট রাখার একটা অপরিহার্য শর্ত। সমাজতন্ত্র শোষক শ্রেণিগুলোকে উচ্ছেদ করে কিন্তু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শ্রেণি-বৈষম্য বিদ্যমান থাকে দীর্ঘদিন যাবৎ। কেননা, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পুরাতন ও নতুন জড়াজড়ি করে থাকে। তাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য, শোষক শ্রেণির সংস্কৃতিকে নির্মূল করার জন্য তাই সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মতাদর্শগত শ্রেণিসংগ্রাম দীর্ঘদিন যাবৎ অটুট থাকে। স্বতঃস্ফূর্ততা ও সমাজতন্ত্র পরস্পর বিরোধী।

পণ্যোৎপাদন

সমাজতন্ত্র পণ্যোৎপাদনের বিলুপ্তি ঘটায় না। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সম্পত্তির মালিকানার ধরন দীর্ঘকাল যাবৎ পণ্যোৎপাদনকে বহাল রাখে। আমরা দেখেছি যে, সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে প্রধানত দুই প্রকারের সম্পত্তি অবস্থান করে : রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এবং সমবায়ী ও যৌথ সম্পত্তি।

এই দুই প্রকারের সম্পত্তি থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের মধ্যে বিনিময় অপিরহার্য। বিনিময় তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমি এবং উৎপাদনের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে যায়। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে সামাজিক শ্রমবিভাগের চরিত্রও পণ্যোৎপাদন বহাল রাখার সহায়ক হয়। কেননা সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়ও মানসিক ও দৈহিক শ্রমের মধ্যে, পারদর্শী ও অপারদর্শী শ্রমের মধ্যে এবং শিল্প ও কৃষিশ্রমের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে সমানতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। এটা করা হয় পরোক্ষভাবে, কেবল মূল্যের মাধ্যমে।

কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে পণ্যোৎপাদনের পরিধি সংকুচিত হয়। কারণ সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রমশক্তি, জমি এবং রাষ্ট্রীয়কৃত শিল্প কারখানার (তাদের স্থির মূলধনসহ) ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। এসব পণ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। উদ্বৃত্ত মূল্যও পণ্যের তালিকা বর্হিভূত। পণ্যোৎপাদনের অন্যান্য ইকনমিক সত্তাসমূহ— পণ্য, মূদ্রা, মূল্য, দাম, মুনাফা এবং ঋণ প্রভৃতি —বিরাজ করে সত্য, কিন্তু তাদের চরিত্র বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়। পণ্যোৎপাদনের সহগামী হিসাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পণ্য-মুদ্রা সম্পর্ক বলবৎ থাকে। প্রথমত, রাষ্ট্রীয়কৃত উদ্যোগ এবং সমকামী ও যৌথ ফার্মগুলোর মধ্যে এ সম্পর্ক বিরাজ করে। রাষ্ট্রীয়কৃত শিল্প কারখানা যেসব দ্রব্য উৎপাদন করে তার একাংশ সমবায়ী ও যৌথ ফার্মসমূহ ব্যবহার করে উৎপাদনের উপায়রূপে, আরেকাংশ ব্যবহার করে ভোগ্য-দ্রব্য রূপে। সমবায়গুলো কাঁচামাল, খাদ্য এবং আরো নানা প্রকারের ভোগদ্রব্য উৎপাদন করে। কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্প কারখানাগুলো; খাদ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য ব্যবহার করে সাধারণ জনগণ। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয়কৃত ফার্ম, সমবায় এবং যৌথ ফার্মগুলো যে ভোগ্য-দ্রব্য উৎপাদন করে তাতে পণ্য-মুদ্রা সম্পর্ক পুরোপুরিভাবে বহাল থাকে। কেননা কেবল কেনা-বেচার মাধ্যমেই এসব সমগ্র জনসাধারণের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। তৃতীয়ত, সমাজীকৃত সেক্টরেও পণ্য-মুদ্রা সম্পর্ক বহাল থাকে। কারণ রাষ্ট্রীয়কৃত উদ্যোগসমূহ যে যে উৎপাদন উপায়সমূহ উৎপন্ন করে তাও উসুল হয় কেনাবেচার মাধ্যমে। চতুর্থত, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যে বহির্বাণিজ্যও পণ্য-মুদ্রা সম্পর্কে বলবৎ রাখে।

পণ্য-মুদ্রা সম্পর্ক সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মুদ্রার প্রচলনকে বলবৎ রাখে : দ্রব্যমূল্য প্রকাশিত হয় মুদ্রার মাধ্যমে; মুদ্রা তুল্য-মূল্য প্রকাশ করে এবং বিনিময়ের সাধারণ বাহন, মূল্যের পরিমাপক, সঞ্চয়ের আধার ও মূলধন সংবর্ধনের বাহনরূপে বিরাজ করতে থাকে। কিন্তু তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। যেহেতু সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মুদ্রা ব্যক্তিগত মূলধনে রূপান্তরিত হতে পারে না, সেহেতু সে আর শোষণের বাহনরূপে কাজ করতে পারে না। মুদ্রা কেবল বিনিময়, হিসাব ও নিয়ন্ত্রণের উপায়রূপে কাজ করে, সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্প্রসারণে একটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে পণ্যের দ্বিবিধ বৈশিষ্ট্য— ব্যবহার মূল্য এবং বিনিময় মূল্য— বলবৎ থকে, যদিও তাদের তাৎপর্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ধনতান্ত্রিক ইকনমিতে ব্যবহার-মূল্য উৎপাদন করা হয় উদ্বৃত্ত-মূল্য অর্জনের জন্য। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে ব্যবহার-মূল্য উৎপাদনের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্রমবর্ধমানহারে জনগণের জীবন ধারণের মান উন্নয়ন করা। কেবল ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমেই তা সম্ভব। ব্যবহার মূল্যের গুণগত উন্নয়নও তার পরিমাণগত উন্নয়নের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই দ্রব্যের গুণগত উন্নয়ন সাধন হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

পণ্য-মুদ্রা সম্পর্কের অবস্থিতির দরুণ বিনিময় মূল্যও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে দ্রব্যের স্বাভাবিক পরিমাণের (মন, টন ইত্যাদি) সঙ্গে তার মুদ্রাগত পরিমাণও ব্যবহার করা হয়। দ্রব্যের মুদ্রাগত পরিমাণ পরিমাপ করা হয় বাজার দামের ভিত্তিতে। কেননা বাজার দাম বিনিময় মূল্যেরই মুদ্রাগত প্রকাশ। বাজার দাম বিভিন্ন দ্রব্যের আপেক্ষিক প্রতুলতা নির্ণয় করে, ফলে বিনিয়োগের প্রকার, পরিমাণও দিক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। বাজার দামের সাধারণ স্তর জনগণের জীবনধারণের আসল মান নির্দেশ করে। উৎপাদন বৃদ্ধি বাজার দাম হ্রাস করে, জীবনধারণের মানকে উন্নত করে। সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা তাই বাজার দামকে, অতএব বিনিময় মূল্যকে, একটা গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর চলক বা ভেরিয়েবল হিসেবে গণ্য করে এবং ব্যবহার করে।

উল্লেখযোগ্য যে, সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে ব্যবহার-মূল্য এবং বিনিময়-মূল্যের মধ্যে কোন কলহমূলক বিরোধ থাকে না। কারণ সেখানে ব্যক্তিগত শ্রম এবং সামাজিক শ্রমের মধ্যকার বিরোধের অবসান ঘটে। তবে ব্যবহার-মূল্য ও বিনিময়-মূল্যের মধ্যে কলহমূলক বিরোধ অবস্থান করতে পারে। এ বিরোধ প্রকাশ পায় তখনই যখন দ্রব্যের দামের সঙ্গে তার গুণের মিল থাকে না, যার ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান বাজারদরে দ্রব্য অবিক্রীত থেকে যায় এবং দ্রব্য বিক্রয় করতে হয় হ্রাসকৃত দামে। কেবল সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রব্যের গুণ ও দামের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করেই এ বিরোধের উচ্ছেদ সম্ভব।

স্মর্তব্য যে, সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে পণ্য-মুদ্রা সম্পর্ক একটা নতুন চরিত্র ধারণ করে। কারণ, এখানে উৎপাদনের উপায়সমূহ সমাজীকৃত; উৎপাদন পরিচালনা করা হয় সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায়। তাই সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে বিদ্যমান পণ্য-মুদ্রা সম্পর্ক পুনর্বার ধনতান্ত্রিক পণ্যোৎপাদনে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব।

মূল্য ও মূল্যবিধি

পণ্যোৎপাদন এবং মূল্যবিধি সমগামী। তাই যতদিন পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে পণ্যোৎপাদন বিদ্যমান থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বহাল থাকবে মূল্য এবং মূল্যবিধির প্রক্রিয়াসমূহ। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতেও যে কোন দ্রব্যের মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনের সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমসময় দ্বারা। যে কোন একটা শিল্প শাখার সকল ফার্মগুলো, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, একটা দ্রব্য উৎপাদন করতে যে গড়পড়তা সময় ব্যবহার করে তাই হচ্ছে সেই দ্রব্য উৎপাদনে ব্যয়িত সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমসময়ের পরিমাণ। ধনতন্ত্রে সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমসময় নির্ধারণ করে বাজারের অন্ধ প্রক্রিয়াগুলো। সমাজতন্ত্রে তা নির্ধারিত হয় বাস্তব উৎপাদন-শর্তাবলীর ভিত্তিতে সুচিন্তিত এবং সুসমন্বিত উৎপাদন পরিকল্পনার মাধ্যমে। এ পরিকল্পনা শ্রমের উৎপাদন-ক্ষমতা বৃদ্ধির হার নির্ণয় করে, শ্রম-সময়ের ব্যয়ের পরিমাণ ও হার স্থির করে, এবং তার মাধ্যমে সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমসময়  হ্রাসের সূত্রপাত করে।

আমরা জানি যে, শ্রমের উৎপাদন-ক্ষমতা মূল্যের মান নির্ধারণ করে। উৎপাদন-ক্ষমতা যত উচ্চ হবে মূল্যের মান ততো নি¤œ হবে। তাই শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা পণ্যের মূল্য হ্রাসেরই প্রচেষ্টা। পণ্যপ্রতি কাঁচামাল, মেশিন, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য জিনিসের ব্যবহারের পরিমাণ হ্রাস করেও মূল্য কমানো যায়। কেননা তা পণ্যপ্রতি বর্তমান ও অতীত শ্রম-সময়ের ব্যবহারের পরিমাণকে হ্রাস করে। উৎপাদন ক্ষেত্রে শ্রমের উন্নত ধরনের প্রণালী এবং টেকনিক্যাল প্রগতির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারও পণ্যপ্রতি সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রম-সময়কে হ্রাস করে।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মূল্যবিধির সারবস্তু এই যে, সেখানে দ্রব্যের উৎপাদন ও বিনিময় তার মধ্যে বিধৃত সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রম-সময় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পণ্যোৎপাদন এবং মূল্যবিধি অবিচ্ছেদ্য। ধনতান্ত্রিক ইকনমিতে মূল্যবিধি বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদনে এবং উৎপাদনের বিভিন্ন শাখায় শ্রম-শক্তি, মূলধন এবং উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণসমূহের বণ্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মূল্যবিধির অনুরূপ ভূমিকা অনেকটা সীমিত। কারণ সেখানে এসব নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সংস্থাসমূহ, সমাজতান্ত্রিক সুপরিকল্পিত এবং সুষম বিকাশ-বিধির ভিত্তিতে। সমাজতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে মূল্যবিধির প্রক্রিয়ার ধরনও পরিবর্তিত হয়। একটা বহিঃশক্তিরূপে মূল্যবিধি জনগণের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে অক্ষম হয়। কিন্তু তবুও মূল্যবিধির ভূমিকা সমাজতন্ত্রে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। পরিকল্পনা নির্মাণে মূল্যবিধি অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিকল্পকগণ মূল্যবিধিকে একটা অপরিহার্য নির্দেশকরূপে ব্যবহার করে থাকেন।

মূল্যবিধি কেবল দাম গঠনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না, সে নিজেও দামের মাধ্যমেই কার্যকর হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে দাম যোগান ও চাহিদার অন্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অথবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্ধারিত হয় না। দামকে পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা হয়। সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমসময়ের ভিত্তিতে, অর্থাৎ মূল্যবিধির ভিত্তিতে, রাষ্ট্র দাম নির্ণয় করে। অন্য কথায়, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র মূল্যবিধিকে বাস্তব কাজে প্রয়োগ করে।

সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মূল্যবিধিকে প্রয়োগ করা হয় জাতীয় ইকনমির সুপরিকল্পিত এবং সুষম বিকাশের কাজে। প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্র যে কোন পণ্যের দাম তার মূল্যের সমান, মূল্য থেকে অধিক বা কম ধার্য করতে পারে; সচেতনভাবে মূল্য এবং দামের মধ্যে পার্থক্যের সূচনা করে সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদনকে ত্বরান্বিত করার জন্য শ্রম-শক্তি ও উৎপাদন-উপায়সমূহকে, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঈপ্সিত এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্থানান্তরিত করতে পারে। বাজারের অন্ধশক্তিগুলোর ওপর নির্ভর না করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাজারকে সুপরিকল্পিত উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করবে।

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র মূল্যবিধিকে শ্রমের উৎপাদনশক্তি বৃদ্ধি, উৎপাদনব্যয় হ্রাস এবং উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে সর্বদা ব্যবহার করে। সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে মূল্যবিধি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াগুলোকে আর সরাসরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্র। কিন্তু পরিকল্পনামূলক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র মূল্যবিধিকে ব্যবহার করে একটা অপরিহার্য যন্ত্ররূপে।

উপসংহার

উল্লিখিত আলোচনায় সমাজতান্ত্রিক ইকনমির একটা সঠিক এবং নিভরযোগ্য রূপরেখা বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ বর্ণনা সকল দিক থেকে সম্পূর্ণ না হলেও সমাজতান্ত্রিক ইকনমির সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহকে সামগ্রিকভাবে প্রতিফলিত করে বলে আমার বিশ্বাস। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সমাজতান্ত্রিক ইকনমির রূপরেখা বিশ্লেষণে অপ্রাসঙ্গিক নয় এমন দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্বন্ধে উপসংহারে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যকীয় বলে আমি মনে করি।

এক. নির্ভেজাল সমাজতান্ত্রিক ইকনমি রাতারাতি বা একটা পদক্ষেপে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। অন্য কথায়, সমাজতান্ত্রিক বিকাশের উচ্চতম স্তরে সমাজতান্ত্রিক ইকনমির রূপরেখা যে পূর্ণতা অর্জন করে তার বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেকটা ইকনমিকেই গোটা কয়েক উৎক্রমণশীল পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। কারণ বিভিন্ন ইকনমির বিকাশের স্তর ও ধারা অসম। আধা-সামন্ততান্ত্রিক, অনুন্নত ধনতান্ত্রিক এবং অগ্রসর ধনতান্ত্রিক ইকনমিগুলোর বিকাশের শর্তাবলী এক নয়। এ-সব ইকনমির সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ধারা বা গতিও এক এবং অভিন্ন হতে পারে না। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির উন্নতমানের অবদানের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে সমাজতন্ত্র। যে সমস্ত ইকনমিতে ধনতান্ত্রিক বিকাশ অসম্পূর্ণ এবং পশ্চাৎপদ যে সমস্ত ইকনমিকে সমাজতন্ত্রে উত্তীর্ণ করতে হয় অন্তর্বর্তীকালীন অধনতান্ত্রিক বিকাশের মাধ্যমে। এটা সময়সাপেক্ষ এবং তার বাস্তবায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে এবং পর্যায়ক্রমে। এমন কি অগ্রসর ধনতান্ত্রিক ইকনমিগুলোর সমাজতান্ত্রিক রূপায়ণও উৎক্রমণশীল হতে বাধ্য। কেননা, ধনতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তনও একটা সময়-সাপেক্ষ ব্যাপার। অধিকন্তু উৎপাদন-উপায়সমূহের ওপর থেকে ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ ও সামাজিক মালিকানার পত্তন; উৎকৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা, কৃষক এবং অন্যান্য ছোট উৎপাদকদের সমবায়ীকরণ, সমগ্র ইকনমিতে সুপরিকল্পিত এবং সুসমন্বিত বিকাশ ধারার প্রবর্তন, এবং পুরাতন শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাবধারা, মানসিকতা ও আচার-ব্যবহারের পরিবর্তনের জন্যও একটা পরিবর্তনকালের প্রয়োজন থাকে। এরূপ পরিবর্তনকালকে অবহেলা করা অসম্ভব।

দুই. ধনতান্ত্রিক ইকনমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাজতান্ত্রিক ইকনমিতে রূপান্তরিত হয় না। কেননা সমাজতান্ত্রিক ইকনমি উৎপাদনের উপায়সমূহের ওপর ব্যক্তিমালিকানা স্বীকার করে না, বরদাশত করে না মানুষের ওপর মানুষের শোষণ। সামাজিক মালিকানা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যক্তিমালিকানা থেকে উদ্ভূত হতে পারে না, মালিক এবং শোষক শ্রেণি সামাজিক মালিকানার বিরোধিতা করে, সমাজতান্ত্রিক ইকনমির বিকাশকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার জন্য সংগ্রাম করে। তাই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন প্রয়োজন হয় একটা সামাজিক বিপ্লবের, তেমনি সমাজতান্ত্রিক ইকনোমনি প্রবর্তন করার জন্য প্রয়োজন হয় একটা পরিবর্তনকালের— যার ভিতরে চলতে থাকে মুমূর্ষু ধনতন্ত্র এবং শিশু সমাজতন্ত্রের মধ্যকার সংগ্রাম। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এ সংগ্রাম পরিচালনা করে ‘সর্বহারার বিপ্লবী একনায়কত্বের’ মাধ্যমে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের স্তরের প্রেক্ষিতে, অনেক দেশে ঐ সংগ্রাম পরিচালনা করা হয় ‘শ্রমিক এবং কৃষকদের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের’ মাধ্যমে। এরূপ গণতান্ত্রিক একনায়কত্বও একটা উৎক্রমণশীল ধাপ। স্মর্তব্য যে, গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব সমাজতান্ত্রিক একনায়কত্ব নয়। লেনিনের সুস্পষ্ট অভিমত এই যে, ‘মধ্যবর্তী পর্যায়ে পুরো এক গুচ্ছ বিপ্লবী বিকাশ ছাড়া’ গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব ধনতন্ত্রের ভিত্তি নড়াতে অক্ষম থাকে। তাই সমাজতান্ত্রিক একনায়কত্ব পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক ইকনমি প্রতিষ্ঠার একটা আবশ্যিক শর্ত।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা