সামন্ত পরবর্তী পুঁজিতান্ত্রিক চেতনাধারায় সাহিত্য

প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত সভ্যতার দুটি ধারা বহমান রয়েছে। এই দুটি সভ্যতার মধ্যে একটির নাম গ্রীসীয় সভ্যতা এবং অপরটির নাম কার্থেজীয় সভ্যতা। দুটি সভ্যতা প্রচীন ও সমৃদ্ধশালী। গ্রীসীয় সভ্যতার উৎপত্তি হয়েছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞান-পাণ্ডিত্য-দর্শন ও সাহিত্য-চারুকলার ভিত্তিতে। এবং কার্থেজীয় সভ্যতার ভিত নির্মিত হয়েছিলো ব্যাবসা বাণিজ্যের উৎকর্ষের ভিত্তিতে।

দুটি সভ্যতার রূপ, আকৃতি এবং প্রকৃতি দু’রকমের। এবং দুটিরই রয়েছে ভিন্ন তাৎপর্য। গ্রীসীয় সভ্যতায় ছিলো আত্মা ও মননের বিকাশ সাধনের কর্ষণ। কার্থেজীয় সভ্যতায় ছিলো জাগতিক জীবনে অর্থনৈতিক বিকাশের চর্চা।

গ্রীস যখন উন্নতির মধ্য গগনে ছিলো, তখন সে চিত্তেরই ঐশ্বর্য দিয়েছে, কামনা বা লালসার আভাস থাকলেও তা ছিলো অতি নগণ্য। ঐশ্বর্য বলতে বোঝায় তার মূলধনের ব্যাপ্তি। সেই ঐশ্বর্য ছিলো গ্রীসীয় সাহিত্যে। কালে কালে গ্রীসীয় ঐশ্বর্য ম্লান হয়ে গিয়েছিলো কার্থেজীয় বণিক সভ্যতার দাপটে। সেই বণিক সভ্যতার দাপট আজও অব্যাহত রয়েছে। চিত্তবৃত্তির জায়গা আজ দখল করে নিয়েছে বাণিজ্যবৃত্তি।

চিত্তবৃত্তির কখনও মৃত্যু ঘটেনি। তার প্রকাশের পরিমাণ তার নিজের মধ্যেই। সে নিত্তনৈমিত্তিকের আশু প্রয়োজনের ক্ষুদ্র সীমায় নিঃশেষিত হতে হতে মিলিয়ে যায় না। সে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলে শাল-তমালেরই মত, তার কাছ থেকে দ্রুত ফসল ফলিয়ে নিয়ে তাকে কুড়াল দিয়ে কেটে বাতিল করা হয় না। সে বরং আরো বিচিত্র ফুলে ফলে ডালে ডালে, ভাবের এবং রূপের সমন্বয়ে, সমগ্রতায় নিজের অস্তিত্বের চরম গৌরবের কথা স্থায়ী কালের বৃহৎক্ষেত্রে ঘোষণা দিয়ে থাকে।

মানুষ ভাষাযোগে তার প্রয়োগসীমা অনেক দূরে ছড়িয়ে দিয়েছে। সন্ধান ও যুক্তির আলোকে তথ্যগত সংবাদ সে পরিণত করেছে বিজ্ঞানে। এই বিজ্ঞান তার প্রাত্যহিক ব্যক্তিগত বন্ধনকে দিয়েছে ঘুচিয়ে। যে জগতে মানুষের অস্তিত্ব, সেই অস্তিত্বের অনুভবে মানুষ বিরাট জ্ঞানের জগত রচনা করেছে। বিশ্ব জগতে মানুষের যে অস্তিত্বের উপলব্ধি ইন্দ্রিয়বোধের মাধ্যমে, সেইটিই জ্ঞানের মাধ্যমে অধিকার করে নিয়েছে সকল দেশের সকল কালের মানুষের বুদ্ধি। ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে মানুষের আর কষ্ট করতে হয়নি। সে তার সকল উপলব্ধি ও চিন্তার ক্ষেত্রে চাষ দিয়ে উৎকর্ষ সাধন করেছে— ভাষার দিয়েছে উদবেগের প্রবর্তনা, ছন্দ এবং সুরও যোগ করেছে তাতে। ব্যক্তিগত বেদনাকে সে ফুটিয়ে তুলেছে বিশ্বজনীনরূপে। সে পরস্পরের মধ্যে মনের মিলনও ঘটিয়েছে। সেই মিলনই হচ্ছে সাহিত্যের মাধ্যমে মিলন। মানুষ বিশ্ব প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। মানব সংসারে বাস্তব ঘটনাবলীর সঙ্গে মানুষের মনের সক্রিয় সম্পর্ক রয়েছে। ঘটনা যখন বাস্তবের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে কল্পনার বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরিত হয় তখনই মানুষের মনের কাছে সাহিত্য হয় বিশুদ্ধ ও বাধা-বন্ধনহীন। মানব জীবনে অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন সংঘটিত হয়ে চলেছে। এই ঘটনাগুলির মধ্যে কোনো ঐক্য নেই— এবং একটির সঙ্গে আর একটির কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ বাস্তব জগতকে চোখের দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করলেও— তার আর একটা দৃষ্টি রয়েছে। সে দৃষ্টি হলো কল্পনার দৃষ্টি। এই কল্পনার দৃষ্টি সব ঘটনার মধ্যে ঐক্যকে সন্ধান করে। মানুষের মন যখন কল্পনার দৃষ্টিতে জীবনের অসংলগ্ন ঘটনাকে ঐক্যে স্থাপন করে, তখন বিষয়টি হয়ে ওঠে বিশেষ তাৎপর্য। এই বিশেষ তাৎপর্য যখন সমগ্র হয়ে ওঠে তখনই সাহিত্যের দেখা সম্ভব হয়।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষের সাথে চলছে মানুষের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য দিয়ে মানুষ তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে চলেছে মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্দ জ্ঞান দ্বারা তার মনের মধ্যেই গড়ে তুলেছে আর একটি জগতÑ সেই জগতের নাম মানস জগত। মানুষ তার অভিজ্ঞতার জগতে প্রকাশ বৈচিত্রবান মানুষের নৈকট্য কামনা করে এসেছে চিরকাল। মানুষের এই কামনা মানুষের মনের গভীরে চিরকাল প্রবল হয়ে রয়েছে।

মানুষ এই বিশ্ব সংসাররেক দুইভাবে ভোগ করছে। একদল মানুষ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ভোগ করছে বিশ্বের যাবতীয় সহায় সম্পদ, অন্য আর একদল মানুষ ভোগ করছে তার বিপুল ভাব সম্পদকে। সাহিত্যে রয়েছে সেই চিরকালের ভাব সম্পদ।

মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই প্রকৃতিকে ব্যবহার করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলো। এই আবিষ্কারের মধ্যেও ছিলো একটা চেতনা। যেদিন থেকে মানুষ তার জীবনযাত্রার প্রয়োজনে শুধুমাত্র রিপুর তাড়নাকে প্রাধান্য দিয়েছে। সেইদিন থেকে সেই মানুষ তার চারদিকে নিরন্ধ্র দেয়াল তুলে চৈতন্যকেও সঙ্গী করে রেখেছে। চৈতন্য যার বন্দী, বিশ্বের সঙ্গে, জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে, দর্শনের সঙ্গে এবং সাহিত্যলাভের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ গড়ে ওঠেনি। কারণ তার রয়েছে বিপুল বাধা— তার রয়েছে কল্পনা দৃষ্টির অন্ধতা।

জ্ঞানের পথ এবং ভাবের পথ উন্মুক্ত। যে মানুষের মুক্ত স্বরূপ নেই, সে মানুষ কখনও অপ্রয়োজনের আয়োজনে তার আত্মসম্মানবোধের ঘোষনা দিতে পারে না। অপ্রয়োজনের আয়োজন হলো বিশ্বের সাথে যোগ; কল্পনার যোগ। এই যোগের মধ্যে কোনো কাম নেই— রয়েছে নিষ্কাম সম্বন্ধ। এই সম্বন্ধের মধ্যে রয়েছে যে চাওয়া সে চাওয়া হলো একান্ত আবশ্যিকতার থেকে মুক্তি।

যারা বৈষয়িক মানুষ— তারা জগত সংসারকে আবশ্যিক বলে গ্রহণ করে এসেছে। বস্তু জগতের কর্মকাণ্ড নিয়েই তারা ব্যস্ত। তারা সম্পূর্ণ পৃথক মানুষ। তাদের চাওয়া ভিন্ন। এই চাওয়ার মধ্যে কবি, সাহিত্যিক এবং শিল্পীর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। মানব সমাজে একান্ত আবশ্যিকতা থেকে মুক্তিলাভের জন্য মানুষ যে নিষ্কাম সম্বন্ধের কথা স্বীকার করে, সেই স্বীকারের কথাটাই তুলে ধরেন কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী। সে নিজেকে মিলিয়ে নেয় অপনার চারিদিকের সঙ্গে— মিলিয়ে নেয় ভাবরসের মাধ্যমে বিশ্বকে এবং মানুষকে।

বিশ্বজগত মানুষের কাছে বিশুদ্ধ প্রাকৃতিকতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেও মানুষ কখনও প্রাকৃতিক হয়ে ওঠেনি— কারণ তার মধ্যে রয়েছে মন। এই মন সে বিভিন্নভাবে বিভিন্নক্ষেত্রে তার প্রয়োজনে অহরহ কাজে লাগায়। বিশ্বের প্রত্যেক বস্তুর সঙ্গে মানুষের মনেরও একটা সামঞ্জস্য রয়েছে।

মানুষ প্রকৃতির মধ্যে বাস করলেও সে প্রকৃতির অধীন নয়। নিজের মতো করে মানুষ পৃথিবী গড়ে তুলেছে। মানুষের গড়া এই পৃথিবীটাকে মানুষই নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ জগতটাকে মানুষ গড়ে নিয়েছে মানুষের ভাবানুষঙ্গে।

প্রচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক পৃথিবীকে মানুষ তার নিজের বুদ্ধি ও পেশা দ্বারা আপন ইচ্ছানুসারে গড়ে তোলার সাধনা করে এসেছে। পৃথিবীকে নিজের মতো করে গড়তে গিয়ে মানুষ রপ্ত করেছে নানা রকম কলাকৌশল। পৃথিবীর কাছ থেকেই সে গ্রহণ করেছে উপকরণ। গ্রহণ করেছে শক্তি। এই উপকরণকে কাজে লাগিয়ে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। জল-স্থল, আকাশেও আজ মানুষের ঘটেছে ইচ্ছার বিজয়। অর্থাৎ মানুষ সব কিছুরই নৈকট্য লাভ করেছে। সে দূরকে করেছে নিকট। এই নৈকট্য কিসের নৈকট্য? সাহিত্য যে নৈকট্যের কথা বলছে, বিশ্বের সঙ্গে মিলনের কথা বলছে, এ নৈকট্য সে নৈকট্য নয়।

মানুষ বস্তুজগতের উপর নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর চেষ্টা করলেও মানুষের অন্তরজগতের মান বাড়েনি। যতই মানুষ আত্মিক উন্নতির চরম শিখরে উঠছে, ততোই মানুষের অন্তরের জগত হয়ে উঠছে শূন্য। ব্যবহারিক জগত নির্মাণ করতে গিয়ে মানুষের অন্তরজগত হয়ে উঠেছে অন্তসারশূন্য। একথা সত্য যে মানুষ তার আশ্চর্য কর্মশক্তি দিয়ে শ্রমের মাধ্যমে পৃথিবীকে নির্মাণ করেছে এবং গড়ে তুলেছে সমাজ রাষ্ট্র ও সা¤্রাজ্য। এইগুলি গড়তে গিয়ে মানুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়েছে। সামাজিক সংগঠনও হয়েছে বহুস্তরে বিভক্ত। মানুষই সৃষ্টি করেছে মানুষের মধ্যে প্যাট্রিশিয়ান, যোদ্ধা, প্লিবিয়ান ও ক্রীতদাস। ভূতপূর্ব ঐতিহাসিক যুগেও ছিলো সমাজে বিভিন্ন বর্গের এমনি একটা জটিল বিন্যাস। এক শ্রেণী থেকে আর এক শ্রেণীর জন্ম হয়েছে। সমাজেও ঘটেছে নব নব রূপান্তর। সৃষ্টি হয়েছে শ্রেণীর অভ্যন্তরে শ্রেণীর স্তরভেদ। এর মূলে রয়েছে দুটি জিনিস। তা হলো মুনাফা ও কর্তৃত্ব।

মানুষ যেদিন থেকে ব্যাবসা বাণিজ্য করতে শিখেছে, সেইদিন থেকে তার মনে জেগে উঠেছে মুনাফা। মুনাফা অর্জন করতে গিয়ে কর্তৃত্বের লোভও তার মনে দেখা দিয়েছে। এভাবে মধ্যযুগে ভূমিদাসের অভ্যন্তর থেকে প্রথম শহরগুলিতে উদ্ভব হয় স্বাধীন নাগরিকদের।

স্বাধীন নাগরিকেরা নদীপথে এবং সমুদ্রপথে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ব্যবসা ও বাণিজ্যবৃত্তির প্রচলন শুরু করে। যেদিন মানুষ নৌপথে আমেরিকা আবিষ্কার ও আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করার সুযোগ লাভ করে, সেদিন থেকে উঠতি বুর্জোয়াদের চোখের সামনে খুলে যায় নতুন এক দিগন্ত। বাণিজ্যের মাধ্যমে বণিকরা দখল করে নেয় পূর্বভারত ও চীনের বাজার। আমেরিকাকে করে উপনিবেশ। একদিকে চলে উপনিবেশ গড়ার কাজ। অন্যদিকে বাণিজ্য ও বিনিময় ব্যবস্থার তথা সাধারণভাবে পণ্যের প্রসার বাণিজ্যে নৌযাত্রায় শিল্পে দান করে অভূতপূর্ব একটা উদ্যোগ।

ক্রমান্বয়ে বিশ্ববাজার সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং তার সঙ্গে চাহিদাও বাড়তে থাকে। অতঃপর বাষ্প ও কলের যন্ত্রে বিপ্লবী পরির্বন ঘটে শিল্প উৎপাদন ক্ষেত্রে। হস্তশিল্পের পরিবর্তে গড়ে ওঠে আধুনিক শিল্প। অর্থাৎ নৌপথ আবিষ্কারের ফলে বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠা লাভ করে আধুনিক শিল্পে। এই বাজারের ফলে বাণিজ্য, নৌযাত্রা ও স্থলপথে যেগাযোগের প্রভূত বিকাশ ঘটে। সে বিকাশ আবার প্রভাবিত করছে শিল্প প্রসারকে এবং অনুপাতে শিল্প, বাণিজ্য নৌযাত্রা ও রেলপপথের প্রসার, সেই অনুপাতেই বিকশিত হয়েছে বুর্জোয়া, বাড়িয়ে তুলেছে তার পুঁজি, মধ্যযুগ থেকে আগত সমস্ত শ্রেণীকেই ঠেলে দিয়েছে তার পেছনে। বিকাশের পথে বুর্জোয়া শ্রেণী প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সমানে চলেছে সে শ্রেণীর রাজনৈতিক অগ্রগতি। যে বুর্জোয়ারা ছিলো একদিন সামন্ত প্রভুদের আমলে নিষ্পেষিত শ্রেণী, মধ্যযুগে তারাই সামন্ত মনিব ও প্রভুদের কাছ থেকে স্থানীয় স্বশাসন ও রাজনৈতিক অধিকার আদায় করে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করে তৃতীয়মণ্ডলী। হস্তশিল্প পদ্ধতির প্রকৃত পর্বে যারা আধা সামন্ততান্ত্রিক অভিজাতবর্গকে দাবিয়ে রেখেছিলো, সেই বুর্জোয়া শ্রেণী অবশেষে আধুনিক যন্ত্রশিল্প ও বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের জন্য পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। সামন্তসমাজের মধ্যে যেসব বিচিত্র বন্ধন ছিলো, তা বুর্জোয়ারাই নির্মমভাবে ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এরাই মানুষের সঙ্গে মানুষের অনাবৃত স্বার্থের বন্ধনকে ধ্বংস করে দিয়ে নগত টাকার বন্ধনকে কার্যকরী করে তোলে। এরাই নষ্ট করে দেয় ধর্মীয় উন্মাদনা, শৌর্যবৃত্তির উৎসাহ এবং কুপমণ্ডুক ভাবালুতা। লোকের ব্যক্তিমূল্যকে এরাই পরিবর্তন করে বিনিময় মূলে। অগনিত অনস্বীকার্য সনদবদ্ধ স্বাধীনতার স্থানে এরা এনে খাড়া করেÑ একটি মাত্র নির্বিচার স্বাধীনতাÑ যার নাম অবাধ বাণিজ্য। এই অবাধ বাণিজ্যিক বৃত্তির মধ্যে রয়েছে নগ্ন নির্লজ্জ এবং সাক্ষাৎ পাশবিক শোষণ।

মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোকে এযাবৎকাল সম্মান করে এসেছে এরা তার মাহাত্মকে ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইনজীবী, পুরোহিত, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী— সকলেই এরা পরিনত করেছে তাদের মজুরীভোগী শ্রমিকে। ফলে সাহিত্য যেভাবে বিশ্বের সঙ্গে এবং মানুষের মনের সঙ্গে মিলন ঘটাতে চেয়েছিলো, সেই মিলন বুর্জোয়া সভ্যতায় কখনো সম্ভব হয়নি। বুর্জোয়া সমাজে যে সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে— এই সংস্কৃতির মূল দর্শন হলো বৈষয়িক। শ্রেণীগতভাবে বৈষয়িক উন্নয়নের পারস্পারিক প্রতিযোগিতায় মানুষের চিত্তের অপমৃত্যু ঘটেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন এসেছে তা হলো মানুষের বিপুল আশাবাদী মনোভাবের নৈরাশ্যে রূপান্তর। শুধু তাই নয়— মানুষ পরস্পরের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ জন্ম থেকেই একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। সেই বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটেছে। এই বুর্জোয়া যুগে মানুষের সব চাইতে বড়ো ভাবনা মানুষের কল্যাণ নিয়ে, মানুষের সুখ শান্তি নিয়ে এবং তার কর্মপদ্ধতি নিয়ে। কিভাবে মানুষ তার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখবে এই নিয়ে তার ভাবনা।

বর্তমান বুর্জোয়া সংস্কৃতির মান নিয়েও নানা রকম প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মানুষ কি প্রথম শ্রেণীর শিক্ষাকে বর্জন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং চিন্তা ধারার অনুসরণ করছে? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন এলিয়ট। হ্যাঁ, নিশ্চতভাবে বলা যায় যে বর্তমান যুগ— অবনতির যুগ। পূর্বের তুলনায় সাংস্কৃতিক মানের দারুণ অবনতি ঘটেছে এবং মানুষের যাবতীয় ক্রিয়াকর্মে এই অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শুধু এলিয়ট নয়— ইউজিন ও নীল-এর মন্তব্য: সব মানুষকে এই আধুনিক যুগের পীড়ায় ভুগতে হবে। ভুগবেন লেখক, চিত্রকর, গায়ক, স্থপতি, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ প্রমুখ মৌলিকগুণসম্পন্ন সকলেই।

লয়েড মরিস বলেছেন যে এই পীড়ার সৃষ্টি হয়েছে প্রাচীন ঈশ্বরের মৃত্যুতে, এতদস্থলে নতুন ঈশ্বরের প্রতিষ্ঠায় এবং সর্বোপরি বিজ্ঞান ও বস্তুবাদের ব্যর্থতার ফলে।

তারা আরো বলেছেন যে মানুষকে এমন এক সমাজে বাস করতে হবে, যে সমাজে যৌন কুরুচিপূর্ণ প্রেমের কাহিনি রচয়িতাকে দেওয়া হবে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার। যে চলচ্চিত্রের তীব্র প্রতিযোগিতায় ব্রডওয়ে নাট্যমঞ্চের হবে পরাজয়। আবার চলচ্চিত্রের পরাজয় হবে টেলিভিশনের কাছে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের শ্রেষ্ঠ শিল্পীর সম্মান পাবে নির্লজ্জ ভাঁড় এবং ওই সমাজে কাব্যের থাকবে না বিন্দুমাত্র কদর।

বুর্জোয়া সংস্কৃতি যুগের এই অভিযোগটাকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্যরকমভাবে বলা যেতে পারে: বৃহদাকার উৎপাদন ব্যবস্থার যুগে মানুষ উৎকৃষ্ট মোটরগাড়ী এবং নাইলন বস্ত্র পেয়েছে বটে কিন্তু বিদ্যাবুদ্ধির ক্ষেত্রে শিক্ষার মান নেমে গেছে অনেক নিচুতে। একথা অনস্বীকার্য যে বুর্জোয়া শ্রেণী বিশ্ববাজারকে কাজে লাগাতে গিয়ে প্রতিটি দেশেরই উৎপাদন ও উপভোগে একটা বিশ্বজনীন চরিত্র দান করেছে। প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষুব্ধ করে তারা শিল্পের পায়ের তলা থেকে কেড়ে নিয়েছে সেই জাতীয় ভূমিটুকু, যার উপর শিল্প আগে দাঁড়িয়েছিলো। সাবেকী জাতীয় শিল্পেরও এভাবে ধ্বংসপ্রাপ্তি ঘটেছে। এদের স্থান দখল করে নিয়েছে এমন এক নতুন নতুন শিল্প যার প্রচলন সকল সভ্য জাতির পক্ষেই মরা বাঁচার সামিল। এমন শিল্প যা শুধু দেশীয় কাঁচামাল নয়— দূর অঞ্চল থেকে আনা কাঁচামালে কাজ করছে; এমন শিল্প যার উৎপাদন শুধু স্বদেশে নয় পৃথিবীর সর্ব অঞ্চলেই ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশজ উৎপন্নে যা মিটতো, তেমন সব পুরাতন চাহিদার পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে নতুন চাহিদা, যা মেটাতে দরকার সুদূর দেশ-বিদেশ ও নানা আবহাওয়ায় উৎপন্ন। পূর্বেকার স্থানীয় ও জাতীয় বিচ্ছিন্নতা ও স্বপর্যাপ্তির বদলে ঘটছে সর্বক্ষেত্রেই লেনদেন, জাতিসমূহের বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা। বৈষয়িক উৎপাদনে যেমন তেমনই মনীষার ক্ষেত্রেও। এক একটা জাতির মানসিক সৃষ্টি হয়ে পড়ছে সকলের সম্পত্তি। জাতিগত একপেশেমি ও সঙ্কির্ণচিত্ততা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অসংখ্য জাতীয় বা স্থানীয় সাহিত্য থেকে জেগে উঠেছে একটা বিশ্ব সাহিত্য। এই অভিযোগ যেমন সত্য তেমন গুরুতর। তবুও আমরা এই অভিযোগের ভিত্তিতে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে কতকগুলি বিষয় বিবেচনা করছি। বিবেচনাসমূহ হলো এই:

প্রথম মহাযুদ্ধের আগে সাহিত্যক্ষেত্রে নতুন সুরী ও সংস্কারকদের মধ্যে তেমন কোনো নৈরাশ্য দেখা যায়নি। বরং তার উল্টোটাই লক্ষ্যগোচর হয়েছে। ওই সময়টুকু চলছিলো শিল্পের ক্ষেত্রে ‘ইমেজিজম’, ‘পোস্ট ইম্প্রেশনইজম’, ‘কিউবিজম’ ও ‘রিয়েলিজম’ থেকে শুরু করে ‘সোস্যালিজম’ ‘কম্যুনিজম’ ইত্যাদি উদারপন্থী মতবাদ নিয়ে আন্দোলন।

আলফ্রেড স্টিগলিজ তখন আধুনিক শিল্পের বৈশিষ্ট্য প্রচার করছিলেন এবং শ্রমিক আন্দোলন চলছিলো বিভিন্ন দেশে। ফ্রয়েড ডেল এবং রবীন্দ্রনাথ করছিলেন সাহিত্যের মুক্তি সাধনা। সবারই চোখে মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলো প্রগতিবাদের বিজয় সমৃদ্ধ এক স্বর্ণোজ্জ্বল স্বপ্ন। পরিতাপের বিষয় এই যে, মহাযুদ্ধের ডঙ্কাধ্বনি বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বর্ণোজ্জ্বল স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। প্রগতির রথচক্র পিছিয়ে যায় হাজার বছর পেছনে। মানুষের মনোভাবে আসে বিরাট এক পরিবর্তন।

সাহিত্যিকেরা সাহিত্যকর্মে বিষয় হিসেবে তুলে ধরলেন সমসাময়িক সমাজের হীনতা ও নির্মমতাকে। চারদিকে ধ্বনিত হলো নৈরাশ্যের সুর। অনেকের রচনায় ফুটে উঠেছিলো নোংরামী ও ভাবপ্রবনতার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা। সে ঘৃণার উৎস ক্রোধ নয়— উৎস নৈরাশ্য। কেউ কেউ শিল্প-সাহিত্যে সামাজিক অনাচারের মুখোশ খুলে ধরেছিলেন।

সেই সময়কার নৈরাশ্যময় পরিবেশেও দেখা গেছে যে সাহিত্য ও শিল্প রাজনীতি ও ব্যবসায়ীদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। ঊনিশশো দশ সালে শিল্পের যে ধারা প্রচলিত হয়, সেই ধারার পরিবর্তে এই সময় নতুন আর একটি ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। সাহিত্যে সচেতনতার অর্থই তখন হয়ে ওঠে জীবনের প্রকৃতি ও পৃথিবীর গতি সম্পর্কে একটা উৎসাহহীনতা। সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যবোধ তখন সকলের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব ছিলো না। এই পরিবেশটা স্থায়িত্ব লাভ করে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। ১৯৩০ সালের পর আর একটি ভাবাবেগ সাহিত্য ও শিল্পক্ষেত্রে প্রবেশ করে। অর্থনীতিতে তখন ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। আকাশে বাতাশে ধ্বনিত হচ্ছে বিপ্লবের বাণী। পৃথিবীর সবদেশের সাহিত্যিকেরা পুঁজিবাদের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কলম ধরলেন। নৈরাশ্যের পরিবর্তে সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে তুলে ধরা হলো সংগ্রামের সুর।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই সাহিত্যে চিত্রিত করলেন সৈনিকদের নিষ্ঠুরতার বিজয়। আবার সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দেখা দিলো নৈরাশ্য।

১৯৪৮ সালে এ সম্পর্কে ডব্লিউ. এইচ. অডেন মন্তব্য করেছেন: ‘সমসাময়িক ঔপন্যাসিকগণকে যদি বলা হয় যে, তারা দুই মহাযুদ্ধের অন্তর্বর্তী কালের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচনা করেছেন, তাহলে তারা একটা বিশ্রী অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়বেন। কারণ য়্যূরোপ থেকে ফিরে আসার পর আমার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, এরকম বাজে সাহিত্য আর কোনো কালে কেউ রচনা করেননি। য়্যূরোপে যে সকল জাতি সবচেয়ে বেশী আশাবাদী, সবচেয়ে বেশী সংহতি সম্পন্ন এবং সবচেয়ে বেশী স্বাধীন বলে সারা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে, সেইসব জাতি কি করে দেশের বুদ্ধিজীবী নাগরিকদের রচনার মধ্যে নিজেদেরকে দুর্বল ও অসহায় রূপে চিত্রিত দেখতে পারে, তা ভেবে আমার বিস্ময়ের অবধি থাকে না। বহু উপন্যাসে দেখা যায়, নায়কের না আছে কোনো সম্ভ্রম, না আছে কোনো ঐতিহ্য। উপন্যাসের নায়কেরা প্রলভনের কাছ এত সহজে হার মানে যে, তারা যে প্রলুব্ধ হয়েছে এ কথাও বুঝতে পারা যায় না। আবার কোনো কোনো নায়ক চরিত্র সার্থক হয়েছে বলে মনে হলেও তারা সৌভাগ্যের নিষ্ক্রিয় অধিকারী বলেই পরিচিতি পায়। আবার এমন নায়ক চরিত্রও সৃষ্টি হচ্ছে, যার একমাত্র গুণ হলো সকল দুঃখ যন্ত্রণা নরীবে সহ্য করার ক্ষমতা। ঔপন্যাসিকেরা কি তাহলে মান্ধাতা আমলের সৃষ্টি আদর্শ অনুসরণ করে চলেছেন? আজকাল উপন্যাসের চাহিদা হ্রাসের অন্যতম কারণ কি তা হলে এই যে, আজকালকার পাঠকদের চিন্তাধারা লেখকদের চিন্তাধারার চেয়ে বেশী অগ্রগামী? অনেক লেখকের ধারণা যে, ভালো উপন্যাস সৃষ্টি করা খুবই কঠিন। এই ধারণার ফলেই কি ঔপন্যাসিকরা পাঠকদের কাছে তাদের বক্তব্য পৌঁছে দেবার কৌশলের দিকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছেন? আজকাল ঔপন্যাসিকদের মধ্যে একটা পরাজয়ের মনোভাব সংক্রমিত হয়েছে। এরই ফলে কি তারা সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নৈরাশ্য পোষণ করছেন?


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা