ff

সুরবালা

নদীর নাম সুরবালা।
এই নাম কোন নদীর হয়? নামটা মনে এলেই চোখে ভাসে কোনো মধ্য বয়স্ক মধ্য বা নিম্ন-বিত্ত গেরস্ত হিন্দু মহিলার ছবি। নিকানো উঠোন, উঠোনে বিরচরণরত কয়েকটা নানা রঙের মোরগ মুরগি। একপাশে গোয়াল, গোয়ালে গরু, আর এসব যাকে ঘিরে সেই উঁচু পোঠের খড় কিংবা টিনের ছাওয়া চার চালা মাটির বাড়ী। কিন্তু এসব না, নামটা নদীর, কেন কবে থেকে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না বরং এই নামের সাথে আরও একটা সর্বনাম তারা জুড়ে দেয়, ‘আমাদের’, —আমাদের সুরবালা। শুধু সুরবালা না, আমাদের সুরবালার মাছ, আমাদের সুরবালার শামুক, আামাদের সুরবালার পাখি-শাপলা-শালুক, আমাদের সুরবালায় সাঁতার কাটা আরোও, —কতো কি। যেন ‘আমাদের’ না জুড়লে সুরবালা নামটা সম্পুর্ণ হয় না।

নদীটা ছোট কিন্তু স্রোতস্বিনী। একপাড় উঁচু। সেই পাড় সংলগ্ন বিস্তৃত ভূমি, —যাকে বলে সরষেডাঙ্গার মাঠ। আর এক পাশ নীচু। বিল। বর্ষায় পানি জমে। তখন যতোদুর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। সেই সবুজ সন্নিপাতে বাতাস দোল দেয়, কখনও এলোমেলো, কখনও মৃদু। সরষেডাঙ্গার মাঠে নানা ধরনের আবাদ হয় তবে শীত মরসুমে শুধুই সরষে। সরষে ফুলের কাঁচা হলুদ রঙে তখন প্রান্তর ছেয়ে থাকে আর চোখ জ্বলে যায় তার ঝাঁঝালো গন্ধে। সরষেডাঙ্গার মাঠটা পেরোলে একটা ছোট গ্রাম। নিশ্চিন্তপুর। এই গ্রামটা এক সময় হিন্দু অধ্যুষিত ছিলো। এখন এক ঘরও হিন্দু নেই। ঐ গ্রামের কয়েকটা কাঁচা ঘরের মধ্যে দুই কামরার একটা যে দালান বাড়ী সেটাও ছিলো হিন্দুর। রঞ্জন সুড়ির। প্রচুর জমি জোতের মালিক ছিলো সে। বেশ ক’বছর হয় সে হাজারী মন্ডলের সাথে বিনিময় করে ভারতে চলে গেছে। কিন্তু এলাকায় বাড়ীটার পরিচিতি এখনও ‘সুড়ি বাড়ী’ নামে। হাজারী মন্ডল নিজেও বলে নিশ্চিন্তপুরের ঐ যে সুড়ি বাড়ী সেইটেই একনে আমার। সুড়ি বাড়ীর উচু রগে এসে পড়া সকালের শীতল রোদ শরীরে মেখে হাজারী মন্ডল হাপায় আর কাউকে দেখলে মুখ তুলে বলে— কি ফেলে আলাম গো, আহা, কি যে ফেলে আলাম।

হাজারী মন্ডলের বয়স হয়েছে, ৮০ ছাড়িয়েছে বেশ ক’বছর হলো।

নিশ্চিন্তপুর গ্রামের একপ্রান্তে কয়েক ঘর হতদরিদ্র জেলে আছে, কয়েক ঘর গেরোস্ত কৃষক, বাকী সবাই কৃষি মজুর। তাদের যে দু এক বিঘে জমি নেই তানা, নিজের বসত বাড়ীটা নিজের জমিতেই বেশীর ভাগের। সুরবালা নদীতে একটা ঘাট আছে। এপার-ওপার খেয়া নৌকা চলে, তাতে জনপ্রতি ৪ আনা পয়সা দিতে হয় পাটনিকে। আর উপজেলা শহর থেকে নৌকায় সরাসরি এই ঘাটে আসা যায়, তাতে জনপ্রতি দরকার ১ টাকা, প্রায় মিনিট ৪৫ সময় লাগে। বিলাসী মানুষরা নৌকার এই পথটাই বেছে নেয়। এই ঘাটের একপাশে গ্রামের নানা বয়সী মেয়েরা গোসল করতে এসে সময় কাটায়। মানুষের হাড়ির খবর নিয়ে আসর জমে, কখনও ছোট-খাটো বচসাও হয়। তারপাশে ছোট-বড়ো পুরুষদের স্থান। গ্রামের দূরন্ত ছেলেরা নানা ধরণের জল-প্রমোদে মেতে থাকে, তাই নিয়ে বয়স্ক পুরষদের সাথে বিরোধ হয় কিন্তু সেই বিরোধ ছেলেদের দূরন্তপনাকে ঠেকাতে পারে না। কাজেই ঘাটে দু’চারজন মানুষের দেখা প্রায় সন্ধে অব্দি কখনওবা অন্ধকার ঘোর হলেও পাওয়া যায়।

আগেই বলা হয়েছে নদীটার এক পাড় বেশ উঁচু। ঘাট থেকে পাড়ে উঠতে সাবধান হতে হয়। পা রাখতে হয় সতর্ক হয়ে। অনেক সময় পাড়ে উঠতে হাত পা সমান ভাবে ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পাড়ে উঠে মেঠো পথে একটু হাঁটলে বিরাট নিমগাছ আর সেই নিম গাছের তলায় টিনের ছাউনির একটা জরাজীর্ণ টোঙ ঘর। টোঙ ঘরের সামনে ছোটো একটু খড়ের চালা। তার নিচে কটা বেঞ্চ। এক বৃদ্ধা এখানকার সকলের চাচী সেই টোঙ ঘরে হাঁটু মুড়ে বসে থাকে। তার সামনে কাঠের চুলো, চুলোর উপর মোটা কালিপড়া একটা কেটলি। ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী চুলোয় আগুন জ্বালিয়ে চা বানিয়ে দেওয়া হয়। সেই চা উপদেয় না হোলেও ভোক্তার চাহিদা যে মেটে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সারাক্ষনই বেঞ্চের উপর দুচারজন লোক বসে থাকে, কতো রকমের আলোচনা হয়, চাচীও সেই আলোচনায় অংশ নেয়। চাচীকে সাহায্য করে ছোট একটা মেয়ে। চাচীর নাতনি। মেয়েটা ছোট থাকতে তার মা মারা যায়। কিছুদিন পর উধাও হয়ে যায় বাপও। কাজেই নানী ছাড়া নাতনির বোঝা বইবে কে? মেয়েটা চটপটে আর বুদ্ধিমান, কাজের ফাঁকে সে স্কুলে যায়। টোঙ ঘরের এক কোণে তার বইপত্র থাকে, সময় পেলে একটু পড়েও নেয়।

ডিগ্রী পাস করে রাজেক তখন সবে চাকরীতে ঢুকেছে। ছাত্র হিসেবে সে ছিলো মাঝারী গোছের। বাড়ীর অবস্থা ভাল না বলতে হবে। পাশ করার সাথে সাথেই চাকরীটা পেয়ে যাওয়ায় ভালো মন্দ বিচারের অবকাশ সে পাইনি। ‘সুখি বাংলাদেশ সংস্থা’র চাকরী। এসিসটেন্ট ফিল্ড অফিসার। মাধবগঞ্জ উপজেলায় পোস্টিং। তখন সবে উপজেলা ঘোষিত হয়েছে। উন্নয়নের কাজ, উপজেলার বিন্যাস তখনও পুরোপুরি হয়ে ওঠেনি। মানুষজনেরও সমাগম হয়নি তেমন। থানা শহর যেমন ছিলো উপজেলাও তেমন। চারটে রাস্তার মিলনাস্থলে একটা প্রাচীন অশ্বত্থ গাছকে ঘিরেই যতো শাহরিক তৎপরতা। কখনও কখনও কেউ হাঁস-মুরগী ফলমূল নিয়ে এই গাছের নীচে বসে বিক্রির জন্য, বিকেলের দিকে এক বাদামওয়ালা আসে ঠেলা গাড়ী নিয়ে। গাড়ীর উপর জলন্ত চুলোয় বাদাম ভেজে সে গরম গরম বিক্রি করে। আর এই রাস্তার আশেপাশেই দোকানপাট, —দুটো মিস্টির দোকান, সাইকেল পার্টসের দোকান একটা, সেখানে আবার ইদানিং শ্যালো মেশিনের সাধারণ কিছু পার্টসও বিক্রি হয়, কয়েকটা মুদিখানা, সেলুন, ওষুধের দোকান একটা এইসব। সকাল বিকেল দু’তিনটে বাস এই উপজেলার মোড় পেরিয়ে ভেতরের কোন প্রান্তে যাওয়া আসা করে। বাসে মানুষের ভিড় থাকে প্রচুর আর বাসের বিকট হর্ণের আওয়াজে তল্লাট কেঁপে কেঁপে ওঠে। মাঝে মধ্যে দু একটা ট্রাকও দেখা যায়। ভেতরের গ্রাম থেকে আকাশ সমান উঁচু লোড দিয়ে বিচুলি কিনে আনে। তখন বোঝা যায় কোথাও বিচুলির আকাল পড়েছে। এই মোড়ে অশ্বত্থের ঝুলে পড়া ডাল তাদের বাঁধা দেয়, তাতে ড্রাইভার হেলপারদের ব্যস্ততা বাড়ে, হৈ চৈ হয়। আর একেবারে নিয়মিত সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত এই অশ্বত্থ গাছের নীচে ছালা পেতে মালপত্র বিছিয়ে বসে থাকে একজন চর্মকার। বয়সে সে প্রাচীন তবে অননুমেয়, এই প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের মতোই। কখনও কখনও দেখা যায় কোনো কেতাদুরস্ত পুলিশ তার সামনে লোহার ফর্মার উপর এক পা তুলে সটান দাঁড়িয়ে, চর্মকার গভীর মনোযোগ-মমতায় তার জুতোয় পালিশ করতে থাকে। আর একেবারে ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত অশ্বত্থ গাছ জুড়ে নানা ধরনের পাখির ব্যস্ততা দেখা যায়। তাদের বিচিত্র কূজনে মুখরিত থাকে এলাকাটা। শীতকালে কোন কোন দিন অশ্বত্থের একেবারে মগডালে বিশাল আকৃতির দু’চারটে পরিযায়ী পাখি বসে থাকে, স্থির, সঙ্গীহীণ, যেন ধ্যান মগ্ন। তাদের দেখে মানুষের কৌতুহল বাড়ে তবে বন্দুক নিয়ে কেউ মারতে তেড়ে আসে না।

এই মোড়েই এক গলি দিয়ে একটু গেলে রাজেকের অফিস। চুন সুরকির গাঁথা সিড়ি, কয়েক ধাপ উঠে ফাঁকা প্রশস্ত বারান্দা তারপরই আলকাতরা মাখানো দুই পাল্লার ছোট দরজা। দরজার উপর সাইনবোর্ড ঝোলানো— ‘সুখি বাংলাদেশ সংস্থা’। দরজা ঠেলে ঢুকলে কাঠের টেবিল, হাতাবিহীন দু’তিনটে চেয়ার, ফাইল রাখার র‌্যাক, দেওয়ালে ঝোলান ক্যালেন্ডার, একপাশে একটা বাইসাইকেল এইসব। রাজেক যে চেয়ারটায় বসে তার পেছনে একটা তোয়ালে ঝোলান। এই ঘরের মধ্যে আর একটা দরজা দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়া যায়। সেখানে রাজেকের বস্্ অর্থাৎ উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বসেন। তার ঘরের চেহারাও একই রকম। পার্থক্য এই, তিনি যে চেয়ারটায় বসেন সেটা হাতলওয়ালা। এই অফিসে আর একজন আছে, দিনু, রাজেকের বয়সি, পিওন। তার বসার জায়গা একটা টুলের উপর। যদিও তাকে কখনও টুলের উপর বসতে দেখা যায় না। অফিসের টুকটাক কাজ করাই তার দায়িত্ব।

রাজেক অফিসে খুব একটা থাকে না। এখানে ঘন্টাখানেক থাকার পরই সাইকেল নিয়ে তাঁকে বেরিয়ে পড়তে হয়। এখানে সেখানে মানুষের কাছে যেতে হয়। তাদের বোঝাতে হয়। তাদের জন্য ঋণ বরাদ্দ করতে হয়। হাঁস-মুরগী-গরু-ছাগল এই সব পোষা যে কত লাভজনক এবং এইসব পালন করে কিভাবে অবস্থা ফেরানো যায় সে ব্যাপারে গ্রামের প্রান্তিক মানুষদের আগ্রহী করে তুলতে হয়। কাজ অন্তহীন। রাজেক উৎসাহ পায়। দেশের কাজ, দেশের মানুষের স্বাবলম্বি করে তোলা, তাদের কর্মে উদ্বুদ্ধ করা, এতো নিছক চাকরী না, রীতিমত দেশ সেবা। এই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজেক তখন পরিশ্রম করছে উদয়াস্তÍ। মানুষজনের কাছ থেকে সাড়াও পাচ্ছে ব্যাপক, তাদের উৎসাহ উদ্দিপনার কমতি দেখা যাচ্ছে না। কেবল একদিন একটু বিব্রত হয়েছিলো রাজেক। গ্রামে মিটিং চলছে । ১৫/২০ জন নানা বয়সের পুরুষ মহিলা উপস্থিত। ক্ষুদ্র ঋণ যথাযথ কাজে লাগিয়ে কিভাবে নিজের ভাগ্য ফেরানো যায়, দারীদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, এইসব বিষয় রাজেক বোঝাচ্ছিলেন, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সবাই, —হঠাৎ এক বৃদ্ধ উঠে বললো— মাষ্টের, কেনো যেন এলাকায় রাজেককে সবাই মাষ্টার বলে ডাকে। সেই মাষ্টার কখনও কারো কাছে মাষ্টের বলে উচ্চারিত হয়। রাজেক কথার মাঝখানে বৃদ্ধের এই ডাকে তার দিকে তাকালে সে বললো, —বিষয়টা মাথায় আসতিছে তাই কচ্ছি, এই যে এত খাটনি তুমরা করতিছো আমাদের অবস্থা ভালো করার জন্যি, —অবস্থা ভালো তো আমাদের হবেই, তুমার কথা মানলি ভালো হবে না কেন, কথা হলো আমাদের সবার অবস্থা ভালো হলি তুমরা যাবানি কনে? তখন তো তুমাদের আর লাগবেনে না।

রাজেক একটু থমকে গেলো। প্রশ্নটা মজার, অভিনবও। এ রকম প্রশ্ন আগে সে কখনও শোনেনি, এ রকম ভাবে ভাবেওনি। তাৎক্ষনিক জবাব দিতে পারলো না। একটু ভেবে জবাব যেটা দিলো সেটা তাঁর মনঃপুত হলো না, প্রশ্ন কর্তারও না। রাজেক আবার পুরানো প্রসঙ্গে ফিরলো, —ক্ষুদ্র ঋণের কার্যকর ব্যবহার, কিন্তু মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো।

রাতে শোবার সময় উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ আনিসুর রহমানের কাছে প্রশ্নটা সে তুললো। অফিসের দুটো ঘরের পেছনেই আর একটা ঘরে তাদের থাকা এবং খাবার ব্যবস্থা। ২টা পৃথক চৌকি, দেওয়ালে ঝোলান ২টা পৃথক হ্যাঙ্গার যাতে জামা-কাপড় ঝোলান থাকে। একটা আয়না সেটাও দেওয়ালে ঝোলান। এক কোনায় একটি টেবিল আর একটা চেয়ার। রাতে আর দুপুরে কাজের মেয়ে রান্না করে টেবিলে ঢেকে রেখে যায়, যখন যার ইচ্ছে খায় আর দুটো চৌকির নীচে দুটো টিনের বাক্স, নিজেদের ব্যক্তিগত মালামাল রাখার জন্য, —এই হচ্ছে ঘরের আসবাব। আনিসুর রহমান সন্ধেটা উৎরালেই রাতের খাবার খেয়ে নেয় তারপর মশারী টাঙিয়ে শুয়ে পড়ে। বয়স্ক বেঁটেখাটো মানুষ; পৃথুল শরীর। সব সময়ই তিনি যেন ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন। রাতে দ্রুত শুয়ে পড়েন ঠিকই কিন্তু ঘুমান দেরিতে। অনেক রাত পর্যন্ত তিনি বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন, বিচিত্র শব্দ করেন মুখ দিয়ে, যতোক্ষণ না তার নাক ডাকার শব্দ শোনা যায় ততোক্ষণ তার ঘুম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। রাজেক ঘুমায় দেরিতে। ঘরে একটাই লাইট, জ্বালানো থাকে। কোনো কোনো দিন সারারাত, তাতে আনিসুর রহমানের কোনো আপত্তি থাকে না— আপনারা ইয়ং ম্যান, রাত জাগবেন, লাইট জ্বলবে এটা তো স্বাভাবিক— সমস্যা হবে কেন!

এই চাকরীর আগে আনিসুর রহমান জেলা শহরে ‘বেঙ্গল টকিজ’ সিনেমা হলের ম্যানেজার ছিলেন। স্বপ্নের মত সেই চাকরী তাঁর মনকে এখনও আচ্ছন্ন করে আছে; আহা কি সেসব দিন। আক্ষেপের সুরে এই কথা তিনি প্রায়ই বলেন। প্রায় ১৫ বছর তিনি ম্যানেজারী করেছেন। ছোটো শহর, সিনেমা হল একটাই। এক চেটিয়া কারবার। তারপর কি হলো; কোথা থেকে এক পয়সাওয়ালা লোক এসে জুটলো। বিশাল জাকজমকপূর্ণ হল করে ফেললো কদিনের মধ্যেই, ব্যাস, মানুষজন সব ভিড়ে গেল ওদিকে। তারপরও কদিন কায়দা কৌশল করে সিনেমা চালানো হলো। বাংলা ছবির আগে একটু ইংরেজী ৩ঢ রিল জুড়ে দেওয়া হলো। —ইংরেজি ৩ঢ বোঝেন তো? আহ, মানুষ মজা পাচ্ছিলো ভালোই, তা তাতে পুলিশি হাঙ্গামা; এভাবে কদিন চলে! মান সম্মানের ব্যাপার, সমাজে ভালো মানুষও তো আছে, তাদের নিন্দেমন্দ। মালিক বললো, —এর থেকে ভুষিমালের গুদাম করলে যে ভাড়া পাবো— বসে থেকে নিশ্চিত ইনকাম, খারাপ হবে না। ১৫ দিনের নোটিশে হল উঠে গেলো— আর কি, বেকার হয়ে গেলাম।

রাজেকের প্রশ্নটা কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো না আনিসুর রহমানের মনে। বরাবরের মতো নিস্পৃহ স্বরে তিনি বললেন, এ কোনো চাকরী নারে ভাই। ফালতু। নিদেন পক্ষে পুলিশের চাকরীও একটা চাকরী। আপনার বাড়ী একটা পুলিশ যাক্ না, দেখেন— কতোবার মুখ দিয়ে স্যার স্যার বের হয়। আর আমরা? আরে মানুষ যদি আমার পেছনে না ছোটে সেটা কোনো চাকরী? আর আমরা ছুটছি মানুষের পিছনে— লোন নাও, উন্নতি করো, গরু-ছাগল পোষো, আরে উন্নতি হোক না হোক তাতে আমাদের কি? আনিসুর রহমান সাহেব রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, মশারীর ভেতর পাশ ফিরে শুয়ে বললেন; শোনেন ম্যানেজার যখন ছিলাম, ওরে শালা কতো কতো ফোন কাকুতি মিনতি— থানার দারোগা, ম্যাষ্টেট, এমপি, দেন ভাই বক্সটা একটু ম্যানেজ করে দেন, একেবারে না হলে রিয়ার সার্কেলে কটা টিকিট— তখন আমার দাম অন্যরকম। শহরের সেরা মস্তানরা এসে প্রথমে পকেটে গোল্ডলিপের প্যাকেট গুঁজে দেয়, নেবো না— তবুও, তারপর কি দেন দরবার— দেন ভাই ৫০টা টিকিট দেন, বোঝেন তো। আসলে ব্লাকে বিক্রি করে পয়সা কামাবে।

ম্যানেজার জীবনের স্মৃতি আনিসুর রহমানকে ভালো রকম আক্রমণ করে বসে। মশারির ভেতর তিনি সটান উঠে বসেন—  শোনেন শোনেন, তখন মার্শল ল’র টাইম। প্রথম প্রথম মানুষ ঘাবড়ে গেল, কি হয় না হয়, হল ফাঁকা। আমাদের তো মাথায় হাত, এতোগুলো স্টাফ, মাস পেরোলে বেতন, তা ক’দিন যেতে আবার টুকটাক লোক ভিড়তে লাগলো। তখন সাহস করে লাগালাম রাজ্জাক কবরীর একটা ছবি— কি যে নাম। আনিসুর রহমান ছবির নামটা মনে করতে একটু সময় নিলেন কিন্তু নামটা মনে করতে পারলেন না। —যাক, আর যাইকই, উপচে পড়লো মানুষ, ধুন্দুমার কান্ড, মার্শাল ল’র দম আটকানো পরিবেশ থেকে মানুষ যেন হলে এসে মুক্তি পেতে লাগলো। তিনটে শো’তেই হাউজ ফুল; টিকেট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে কতো লোক। দুর্ভিক্ষে রিলিফ দিলি যেরাম হয়— সেরাম। মালিকও খুশি, আমরাও খুশি— দু সপ্তাহ তো রমরমা চলবেই। এর মধ্যে একদিন হলো কি— ইভিনিং শো, হাউজফুল, ঘন্টাখানেক হয়েছে আর আধা ঘন্টা পরেই হাফ টাইম, অফিসে বসে আরামে সিগারেট টানছি, হন্ত দন্ত হয়ে ম্যাশিনম্যান ছুটে এলো— স্যার স্যার, ভয়ে তার চোখ ছানাবড়া, কথাও বোঝা যায় না।

মেশিং রুমে ছুটে গেলাম তার সাথে, —ওরে বাপ, ¯্রফে জমদুতের মতো এক মিলিটারী মেজর। ততোক্ষণে সিনেমা বন্ধ করা হয়েছে। দর্শকরা বুঝে উঠতে পারেনি ঘটনাটা কি— রিল কাটলো, না অন্যকিছু। আর একটু দেরী হোলেই তো হলের চেয়ার বেঞ্চ সব মুহূর্তের মধ্যে চলা কাঠ হয়ে যাবে। আমার সারা শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে, সে কি অবস্থা।

আমাকে দেখেই একেবারে বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলো মিলিটারি মেজর— স্টপ, ফাইনালি স্টপ, এই সব সিনেমা দেখিয়ে ছেলেমেয়েদের স্পয়েল্ড করা হচেছ? ব্লাডি সিভিলিয়ান। হাতে তার ছোট একটা লাঠি, মনে হলো এখনই বুঝি শপাং শপাং করে আমাকে মারা শুরু করে কিন্তু তার আগেই মাটিতে পড়ে যাই কিনা; থর থর করে আমার পা শুধু না, আস্ত ঘরটাই যেন কাঁপতে লাগলো।

আর ঠিক তখনই কি বলবোরে ভাই, একেবারে দেবদূতের মতো এক মহিলা এসে হাজির। কি তার চেহারা, পাকা বেদানার মতো রঙ, —সে বলে বোঝানো যাবে না। রাগে সেও কাঁপছে— ইউ স্টপ দ্য ফিল্ম? তীরের মতো যেন মেজরের দিকে ছুড়ে মারলো প্রশ্নটা। এবার আমার দিকে চোখ ঘুরিয়ে বললো, —এই স্টার্ট এ্যাটওয়ান্স, আমি দেখবো। আবার সে ঘুরে তাকালো মেজরের দিকে; —এই জন্যে লোকে বলে মিলিটারীর বুদ্ধি হাঁটুতে, —এসো আমার সাথে এসো, কাম অন; —একটু আগে যে ছিলো বাঘের মতো মুহূর্তের মধ্যে সে হয়ে গেলো বিড়াল। খুব মৃদু স্বরে কি যেন বলতে গেলো কিন্তু মহিলা আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠলো— স্টপ, কোনো কথা না, আমার সাথে চলে এসো। একেবারে অনুগত বিড়ালের মতো মেজর সাহেব মহিলার পেছন পেছন বেরিয়ে গেলেন। অবাককান্ড, পরে জানলাম ভদ্রমহিলা ছিলেন মেজর সাহেবের স্ত্রী। ঠান্ডা হয়ে গেল শরীর। মেশিনম্যান দ্রুত রিল চালু করলো আর ঠিক তখনই— পর্দায় রাজ্জাক দু হাত দিয়ে পাঁজা করে ধরলো কবরীকে। আহ, মুখ দিয়ে বিচিত্র এক শব্দ করলেন তিনি— সে কি সিন, দর্শকদের শিশ আর হাততালিতে মুহূর্তের মধ্যে যেন সমস্ত হলটাই আনন্দে নেচে উঠলো। বোঝেন তাহলে!

গল্প বলার আনন্দে অভিভূত আনিসুর রহমান রাজেকের সামনে এই অনির্দিষ্ট বিস্ময় ঝুলিয়ে দ্রুত শুয়ে পড়লেন আর অল্প একটু পরেই তাঁর নাক ডাকার শব্দ শোনা গেলো।

গল্পটা ভালোই, সত্যিও নিশ্চই, রাজেক ভাবলো; —বাংলাদেশটা স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মিলিটারী, পুলিশ আর আমলা এই নিয়েই এতোগুলো বছর চলে গেলো।

দুই

মাধবগঞ্জ উপজেলা থেকে সরষেডাঙ্গার ঘাট পর্যন্ত নৌকায় ১ টাকা ভাড়ায় মিনিট ৪৫ এর পথ পেরিয়ে আসতে রাজেকের প্রায় মাস ছয়েক লেগে যায়। তখন আসন্ন বিকেল। নদীতে হালকা রোদের ছোয়া। ঘাটে নেমে পাড় বেয়ে উপরে উঠে চারিদিকে চোখ মেলে তাকালে বিস্তির্ণ সরষে ফুলের কাঁচা হলুদ রঙের মাঠ তাকে অভিভূত করে ফেলে। নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হয়ে যায়— বাহ্। নিশ্চিন্তপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে সরষেডাঙ্গা মাঠের মধ্যে দিয়ে হাঁটা পথে মিনিট দশেক যেতে মাঠের মধ্যে সেই বিশাল আকাশ ছোঁয়া নিম গাছের দেখা পাওয়া যায়, যার নীচে ছোটো দোচালা টোঙ ঘরে বৃদ্ধার চা’র দোকান।

কয়েক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে রাজেক পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করলো তারপর একেবারে অপ্রত্যাশিত ভাবে পেয়ে যাওয়া নির্জনে চা পানের সুখের সুযোগ তাকে পুলকিত শুধু না রীতিমতো রোমাঞ্চিত করে তুললো। সে দু পা এগিয়ে খরিদদারদের জন্য পেতে রাখা বেঞ্চে যেয়ে বসলো।

নিমগাছ থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক, বিকেলের ভারী রোদ, উন্মুক্ত প্রান্তর, অল্প দূরে সুরবালা নদীর খাদ, বেঞ্চে চা’র আশায় বসে থাকা দু’জন ক্ষেতমজুর, চা বানানোয় ব্যস্ত ১১/১২ বছরের মেয়ে, টোঙের উপর পা গোটো করে বসে থাকা বৃদ্ধা, এ সবই যেন রাজেকের কাছে বিস্ময় আর রাজেক এদের কাছে অভিনব আগন্তুক—  এ টুকু টের পেয়ে বৃদ্ধা ক্ষারিত গলায় বললেন— ।

কনে যাবা -?

নিশ্চিন্তপুর, —রাজেকের দ্বিধান্বিত জবাব।

নিরবতার কয়েক মুহুর্ত।

নিশ্চিন্তপুর কার কাছে? বৃদ্ধার দ্বিতীয় প্রশ্ন।

এর উত্তর রাজেকের অজানা। চোখমুখে অনিশ্চিত অস্বস্তি নিয়ে সে বললো, —সে রকম কারো কাছে না, আলাপ পরিচয় করবো, আমি চাকরী করি সুখি বাংলাদেশ সংস্থায়, মানুষজনের ঋণ দেই, আপনারা কি এ সব সম্পর্কে জানেন? একটু জোরে ঘাড় নাড়লেন বৃদ্ধা। অর্থাৎ জানেন না আর তার এই জবাবের সাথে উপস্থিত সকলের সম্মতি বোঝা গেলো, অস্বস্তিটা কাটলো। বেঞ্চে বসা ক্ষেত মজুর দুজন নড়েচড়ে বসলো। দেখা গেলো চা বানানোর ফাঁকে ১১/১২ বছরের মেয়েটার কৌতুহলি চোখের দৃষ্টি এসে পড়ছে তার উপর।

চা হবে? রাজেকের এই প্রশ্নে বৃদ্ধা ঘাড় নাড়লেন।

ঘন, গাঢ়লাল গরুর দুধের চা। মেয়েটা যতেœর সাথে কাপ পিরিচ মাজছে। একহাতে কপালের চুল সরিয়ে চুলোয় ফু দিতে ধুমোয় ভরে গেলো দোচালার ছাউনির নীচেটা তারপরই গনগনিয়ে উঠলো আগুন।

ঝকঝকে পিরিচের উপর এক কাপ ঘন দুধ-চা মেয়েটা এগিয়ে দিলো রাজেকের দিকে।

রাজেক মেয়েটার দিকে তাকালো। শ্যমলা রঙ। ঘাড় অব্দি ঘন কালো চুল, নিস্তব্ধ মুখমন্ডলে গভীর কালো দুটো চোখ। সস্তা কাপড়ের ফ্রগ আর পায়জামা পরণে। ওড়না পরার প্রয়োজন তখনও হয়নি অথবা হতে পারে ঔদাসিন্যও একটা কারণ।

কি নাম? —রাজেক জিজ্ঞেস করলো।

মালতি।

কি করো?

কি করবে— একটু জোরালো গলায় বৃদ্ধা বললেন, —চা বানায় আর পড়ে নাকি; মন করলি স্কুলি যায়, যায় না।

চা এর স্বাদ অমৃতের মতো লাগলো—  এই গন্ড গ্রামে এ রকম চা— ।

সেই থেকে শুরু। নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মানুষ জনের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে রাজেকের সময় লাগলো না। মাঠের মধ্যে এই চা’র দোকান হয়ে উঠলো তার অলিখিত অফিস। ক্রমান্বয়ে নিয়মিত হয়ে উঠলো সে নিশ্চিন্তপুর গ্রামে।

এক পাক আসতি পারবেনেন? —কুলসুম ভাবি। মাঝ বয়স। গ্রামে তার প্রভাব ভালো, সাংগঠনিক ক্ষমতাও। কথাবার্তায় যুক্তিতর্কে চৌকষ। তাঁকে কেন্দ্র করেই এ অঞ্চলে মেয়েদের একটা সংগঠন গড়ে উঠেছে। বেশ কিছু ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এ অঞ্চলের অধিবাসিদের একটা বড়ো অংশ পশ্চিম বাংলা থেকে উঠে আসা। ’৬৫ এর যুদ্ধের পরই বেশী। উদ্বাস্তু মানুষরা অপেক্ষাকৃত সচেতন, সক্রিয়ও। বঞ্চনার খেদ আর প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আকাক্সক্ষা তাদের স্থানীয় মানুষদের থেকে অগ্রসর করেছে। এটাকে মানতে না পেরেই স্থানীয়রা অবজ্ঞা করে এদের বলে রিফুজি; কখনও ক্ষুব্ধ হলে প্রকাশ্যে, ক্ষেত্র বিশেষে আড়ালে।

নিশ্চিন্তপুর গ্রামে হাজারী মন্ডলের সুড়ি বাড়িতেও রাজেক মাঝে মধ্যে যায়। তাঁকে দেখে ব্যস্ত হয়ে ওঠে হাজারী মন্ডল। মুখে দাঁত নেই একটাও, শরীরে মেদও নেই। আশীতিপর শরীরের কাঠামোটা এখন আর ঋজু নেই, এলোমেলো কিছুটা বাঁকা হয়ে গেছে। দাঁতহীন মুখে একগাল হাসি ছড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে সে ফাঁকা রগের একপাশে বিছানা পেতে বসতে দেয়। বলো মাষ্টের; —এ অঞ্চলে রাজেকের ‘মাষ্টের’ নামটা এখন সার্বজনিন হয়ে গেছে; —বলো, কেমন আছো? কাজ কর্মের খবর বলো; —কিন্তু না, রাজেকের বিষয়ে শুনতে কোনই আগ্রহ নেই হাজারী মন্ডলের। আদুল শরীরের বুকের খাদে সাদা ঘন লোমগুলোর মধ্যে হাত ঘষতে ঘষতে সে বলে, —বুঝলে মাষ্টের এখেনে একটা ব্যাথা আছে । ্এখন আমার অভাব কি? গোলে গরু, পুকুরি মাছ, মাঠে ফসল, মাথায় পাকা ছাদ, নাতিপুতি, কিন্তু না, —সে আকাশের একদিকে তাকায় আর ক্রমান্বয়ে যেন আকাশের মেঘ এসে ভর করে তার মুখমন্ডলে, বুকের মধ্যে হাত ঘষতে ঘষতে সে আবার বলে, —এখেনে একটা ব্যাথা আছে, বুঝলে মাষ্টের, ব্যাথা। —মা মরে যাওয়ার সাতদিনির মাথায় বাপ মরলো। এক সন্ধেয় আমাদের সবার ডেকে বাপ কলে—  তোদের মা মরে গেলো এখন আমি কি করবো? আল্লার রহমতে কিছু করতি হলো না, সাত দিনির মাথায় শুক্রবার বাদ ফজর বাপও গেলো। তা শোনো, এই যে, বাঁশ বাগানের পাশেই আমগাছ তলে, চিনিগুড়ো আমগাছ, শুনিছি আমাদের পাঁচ পুরুষের আমগাছ, বিশাল, আকাশ ছেয়ে থাকা, তাকাও, —হাত দিয়ে সে দেখায়, —এই হচ্ছে গিয়ে মা’র কবর আর এই একেবারে গা ঘেষে বাপের; —এবার সে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকে, আবার সে বুকের মধ্যে হাত ঘষতে ঘষতে বলে, —ব্যাথা আছে বুঝলে মাষ্টের, অনেক ব্যাথা।

রাজেক শহরের মানুষ। মাধবগঞ্জ উপজেলাই তার কাছে গ্রাম। সেখানে এই সুরবালা, সরষেডাঙ্গার মাঠ, নিশ্চিন্তপুর গ্রাম, নিশ্চিন্তপুর গ্রামে পশ্চিম বাংলা থেকে উঠে আসা মানুষ, কুলসুম ভাবী, সরষেডাঙ্গার মাঠে বিশাল নিম গাছের নীচে চা’র দোকান, চা’র দোকানে কর্মরত ক্লাস নাইনের ছাত্রী সল্পবাক মালতি, নিমগাছে হরেক রকম নাম না জানা পাখির ডাক, গ্রামের নানা ধরণের মানুষ, সরল কিংবা জটিল ইত্যাদি সবকিছুই রাজেকের মনে কেমন এক বিভ্রমের সৃষ্টি করে। যতো দিন যায় ততোই যেন নিজের অজান্তেই রাজেক জড়িয়ে যায় এ সবের সাথে। নিশ্চিন্তপুর গ্রাম থেকে উত্তরে মাইল খানেক গেলে হিজলডাঙ্গা, তার পাশে শিবেনন্দপুর, পুড়োপাড়া, সূর্যদিয়া, তেলটুপি, বামনগাছি ইত্যাদি কাছে দূরের একই রকম এইসব গ্রামের সংযোগ কাচা রাস্তা দিয়ে মানুষ বেশির ভাগ চলে পা’য় হেঁটে, বাইসাইকেল চলে কম, মটর সাইকেল কালেভদ্রে দেখা যায়। মালামাল পরিবহণের জন্য গরুর গাড়ী, শুকনোর সময় অথাৎ শীত বসন্তে হয়তো মাল বোঝায় ট্রাক ছুটে যায় অফুরন্ত ধুলো আর বিকট শব্দ ছিটিয়ে, এ অঞ্চলের চিরায়ত পরিবেশে তারা ক্ষণিকের জন্য হোলেও বিঘœ সৃষ্টি করে।

অল্পদিনের মধ্যেই রাজেক এ অঞ্চলে বেশ প্রভাব ছড়িয়ে ফেলে। এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করে না— বাড়ী কনে? বরং দেখা হলে কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে বলে— মাষ্টের, কোন দিকি?

রাজেক সায় দেয়। সংস্থার অনেক টাকা এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে। ঋণের টাকায় কেনা গরু ছাগল চরিয়ে নিয়ে বেড়ায় ছেলেমেয়েরা। তাদের বাবা মায়েদেরও কখনও কখনও দেখা যায় গরু বা ছাগল নিয়ে যাচ্ছে চরাতে। সামনা সামনি পড়ে গেলে কোনো গ্রাম্য বধূ মাথার ঘোমটাটা একটু টেনে দিয়ে বলে— ও মাষ্টের দেখো দিন গরুটা কিরাম কিনেলাম আর কদিনি কিরাম হয়েছে। গরুটার সতেজ সুঠাম চেহারা দেখে রাজেক নিজের মনেও বেশ আনন্দ পায়।

সরষেডাঙ্গার মাঠের চা’র দোকানে রাজেক এখন নিয়মিত বসে যেন নৈমিত্তিক রুটিনের মতো হয়ে গেছে ব্যাপারটা। সারাদিনের কাজ শেষে বিকেল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত, কখনও কখনও সন্ধ্যের পরও তাঁকে বসতেই হয়; মালতি চা দেয়। কেবলমাত্র তার জন্য কাপের সাথে পিরিচও দেওয়া হয়। ঝকঝকে কাপ-পিরিচ, —আর সবার মধ্যে এই বিশেষ আপ্যায়নটুকু সে বেশ উপভোগ করে। মালতি এখন ক্লাস টেনে পড়ে। কিন্তু তাই দিয়ে তার বয়স অনুমান করা যাবে না। গ্রামের স্কুল, —ভর্তি হতে গেলে হেড মাষ্টার খুশি হয়। ভর্তির জন্য টাকা যা পায় পকেটে পোরে তারপর কেরানিকে ডেকে বয়স পরিমাপ করে ভর্তি করে করে নিতে বলে। কেরানি কাগজ কলম নিয়ে বয়স পরিমাপ করতে বসে। ১৫ বছর বয়সে ম্যাট্রিক দিতে হলে এখন বয়স কতো হতে হবে; জন্ম তারিখ কতো হবে— এইভাবে নতুন জন্ম তারিখ, নতুন বয়স নথিভূক্ত হয়; তাতে করে কারো প্রকৃত বয়স বেড়ে যেতে পারে, কারোবা কমেও যায়। মালিতির চুল কখন ঘাড় ছাড়িয়ে যায়, কখন সে ফ্রগ ছেড়ে কামিজ পায়জামা ধরে, কখন শরীরটা একটু ভরাট হয়, —এসব কারো নজরে আসে না। মালতি চা বানানো আর পরিবেশনে ব্যস্ত থাকে, কথা বলে কম কিন্তু চলাচল তাকানোয় যেন কতো কিছু ব্যক্ত হয় । মালতির দিকে তাকাতে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে রাজেকের ভালো লাগে, মালতিও যেন তার দিকে বিশেষভাবে চায়। এসব ভাবনায় রাজেকের অস্বস্তি হয় কিন্তু দোকানের আকার্ষণকে সে এড়াতে পারে না।

মালতির ব্যাপারে চাচীর অভিযোগের শেষ নেই। টোঙের উপর হাঁটু মুড়ে তিনি সারাক্ষণই বসে থাকেন— ও মাষ্টের, বাপু, দেখোদিনি ও কি পড়ে; সারাদিন একটু ইশকুলি যায় আর মাষ্টারের কাছে—  তাতে কি হয়? কখনও তো বই খুলতি দেখিনে!

চা বানানোর ব্যস্ততার মধ্যেই মালতি আড়চোখে নানির দিকে তাকায়। তাতেই তার বিরক্তির মাত্রাটা ধরা পড়ে।

চাচীকে খুশি করতেই যেন টোঙের একাপাশে সাজিয়ে রাখা বইগুলো থেকে রাজেক ইংরজি বইটা তুলে নেয়।

এই বলো তো এটা কি হবে?

মালতি কাছে এসে চুপচাপ দঁড়িয়ে থাকে।

কই বলো? — মালতি মাথা নাড়ে। —এইটা বলো, এটা কি?

কোনো প্রশ্নেই মালতির সাড়া পাওয়া যায় না।

রাজেক শুধু বিস্মিত না, কদিন পর যে ছাত্রী ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে তার ্এই হতবিহ্বল অবস্থায় একটু উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখন মালতির নিশ্চুপ ঠোঁটের কোনায় এক ঝলক কৌতুক খেলে যায়; —স্যারেরা বলিছে এসব লাগবে না।

মানে?

পরীক্ষার দিন বোর্ডে লিখে দেবে, তাই দেখে লিখতি হবে।

রাজেক নিশ্চুপ হয়ে যায়। সে শহরের নামি স্কুলে পড়েছে। পরীক্ষার হলে নকল হয় সে জানে, তাই বলে স্যারেরা পরীক্ষার হলে বোর্ডে লিখে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেবে এটা সে ভাবতেও পারে না।

দুপুর গড়ালে আশপাশের গ্রাম থেকে দু চারজন করে লোক আসতে শুরু করে চাচীর চা’র দোকানে। রাজেকের খোঁজে। রাজেক থাকলে ঋণ সংক্রান্ত নানা বিষয়ে তারা আলোচনা শুরু করে, না থাকলে তার অপেক্ষায় চা খায়। চাচীর বেচা বিক্রি বাড়ে।

কিন্তু চাচী খুশি হতে পারে না। আগে যারা আসতো তারা ছিলো চাচীর ঘনিষ্ঠ আপনজন, এখন যারা যাসে তারা চাচীর অপরিচিত। তাদের কাছে চাচী শুধু চা বিক্রেতা, মালতি সোমত্ত যুবতী, দোকানদার। মালতীর দিকে তারা যেভাবে তাকায় সেটা চাচীর অসহ্য লাগে। সে তাকানোয় ¯েœহ থাকে না যতোটা থাকে কাচা আসক্তি। আগে আউলা ফকির প্রায়ই আসতো। মাথা ভর্তি সাদা কালো লম্বা চুল, ঘাড়ে ঝোলা, হাতে একতারা। দোকানে বসে টুঙ টাঙ করে একতারা বাজাতো, কখনও গলা ছেড়ে গান। আউলা ফকিরের গান কখনও চাচীর চোখে পানি টেনে আনতো—  আহা, কি সব গান। বিরান বিকেলে আাউলার একতারার টুঙ টাঙ শব্দে যেন সমস্ত প্রকৃতি ঝংকার দিয়ে উঠতো। শেষবার যখন আউলা এসেছিলো, বেশ কিছুদিন আগে, চাচী বললো— আউলা, সেই গানখান গাওদিনি, সেই যে—  জীবন হলো ফালা ফালা কোথায় হবে ঠাঁই।

-কি যে বলো চাচী ওসব গান আর কতো গাবো; আউলা ফকিরের গলায় যেন বিরক্তি, নতুন গান বাধিছি শোন; টুঙ টাঙ শব্দে আউলার একতারা বেজে উঠলো যেন ভিন্ন কোন জগতে চলে যাচ্ছে আাউলা—  তারপরই তার দরাজ গলার টান; –

জীবন কি আর যায় রে হারা

জীবন নদীর ¯্রােতের ধারা

কনথে আসে, কোনঠে ধায়

সেই ধাদাতেই ঘুরছি মোরা

আমি আত্মহারা পাগলপারা

হই পাগলপারা আত্মহারা

শেষ দুই লাইন গাইবার সময় আউলার সুরের লয় দ্রুত হয়। সে বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে ওঠে তারপর একতারাটা উঁচু করে ধরে ঘুরপাক খায়, সেই সাথে বেঞ্চে বসা দু একজন ওর সাথে তাল দিতে উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। আর আসতো শ্রীনাথ। যুবক বয়স, মাথা ভর্তি কোকড়া কালো চুল। ঘাড়ে ঝোলার মধ্যে হরেক রকমের বাঁশি। সে বাঁশি বাজায়, গ্রামের হাট বাজারে বাঁশি বিক্রি করে। শ্রীনাথ জনপ্রিয়। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা তাকে দেখলে পিছু নেয়, সে বাঁশি বাজিয়ে তাদের মুগ্ধ করে।

এই চা খাবি খা— বাঁশি বাজাবিনে। —তার উপর কৃত্রিম নিষেধাজ্ঞা দেয় চাচী।

কেন চাচী? — শ্রীনাথ হাসে।

না, তোর বাঁশি থেকে কান্না আসে বুঝিস? — বলে সে শ্রীনাথের বাঁশি শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়। শ্রীনাথ হাসি মুখে— যতোকান্না ততো হাসি। আমরা এদেশে স্বর্গবাসি— সুর করে এই কথা বলে ঝোলা থেকে খুঁজে পছন্দ মতো বাঁশি বের করে— তারপর সুর তোলে। শ্রীনাথের বাঁশির সুর প্রান্তর মথিত করে, কেমন অপার্থিব হয়ে ওঠে পরিবেশ। মালতি টোঙে পা ঝুলিয়ে বসে পা দোলায়। চাচী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।

এখন তারা আর আসে না। আউলা ফকির বলেছিলো, —এখন তোমার এখেনে সেই পরিবেশ নেই গো চাচী; শুধু দেন দরবার, টাকা কড়ির হিসেব নিকেষ, এর মধ্যে গান হয়? কে শোনবে; কে বোঝবে!

কথা ঠিক, চাচীকে মানতে হয়। কিন্তু তার কি উপায়!

মন যে রাজেকের খারাপ হয় না এমন না। এ অঞ্চলে সে জনপ্রিয় মানুষ, মাষ্টের। ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের মাধ্যমে মানুষের মনে সে সুখের স্বপ্ন দেখায়, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি পালনের মধ্যে দিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপায় খোঁজে। তারপরও কখনও গ্রাহকদের কোনো প্রশ্ন, আচরণ, মন্তব্য অথবা অব্যাখ্যাত কোনো বিষয় তার মনকে বিষন্ন করে তোলে। সে তখন একাকী সুরবালার কাছে যেয়ে বসে। পাড় থেকে বেশ নীচে সুরবালার প্রবাহ। নিথর নিস্তব্ধ পরিবেশ, শুধু সুরবালার বুকজুড়ে বয়ে চলে বিরামহীন ¯্রােতের ধারা। সেই ¯্রােতের মাঝে মাঝে আবার ঘূর্ণী ওঠে, হঠাৎ দেখা যায় পানি কিছু এলাকা নিয়ে ঘুরপাক খেতে শুরু করে। তার একটা কেন্দ্র থাকে, কেন্দ্রে পানির মধ্যে একটা গহবরের সৃষ্টি হয় আর সেই গহবর প্রবল আকর্ষণে যেন সবকিছু টেনে নিতে চায় নিজের মধ্যে। কিছুক্ষণের জন্য, তারপরই আবার যাথারীতি বয়ে যায় ¯্রােত। কেন যেন শুধু ঐ দিকে তাকিয়ে থাকতেই রাজেকের ভালো লাগে। সুরবালার পাড় জুড়ে কতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কতো তার বৈচিত্র কিন্তু সে সব রাজেককে টানে না। রাজেককে টানে শুধু অবিরাম বয়ে চলা ¯্রােত, ¯্রােতের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া পানির ঘুর্র্ণী, সময় কতো যায় খেয়াল থাকে না।

সেদিন যদিও একটু ব্যতিক্রম হলো। রাজেক বসেছিলো সুরবালার পাড়ে। বিকেলের আলো ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। লাল ছায়া পড়েছে সুরবালার বয়ে চলা ¯্রােতে। কিন্তু রাজেকের মনোযোগ বাঁধা পাচ্ছিল এক অশ্রুতপূর্ব শব্দে, শব্দটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, —কোনো যান্ত্রিক শব্দ। রাজেক তার উৎসের খোঁজে তৎপর হোয়েও কোনো দিশা পাচ্ছিলো না। হঠাৎ সে দেখে একটা ছোটো নৌকা দ্রুত এগিয়ে আসছে। নৌকার গলুইয়ে হাল ধরে বসে আছে মাঝি। অচিরেই বোঝা গেলো শব্দের উৎস ঐ নৌকা। স্যালো ইঞ্জিনের মেশিঙ লাগানো হয়েছে । গলুইয়ে বসে শুধু নৌকার নিশানা ঠিক রাখলেই হচ্ছে, দাঁড় টানা বা বৈঠা বাওয়ার কশরত আর করতে হচ্ছে না।

নৌকাটা রাজেকের কাছে এলে গলুইয়ে বসা মাঝি একগাল হেসে হাত তুলে বললো—  মাষ্টের, ভালো তো?

রাজেক এ প্রশ্নের উত্তর দেবে কি দেবে না ভাবার আগেই নৌকাটা তাঁকে পেরিয়ে গোলো।

সুরবালাকে ঘিরে অনাদিকাল থেকে গড়ে ওঠা আদিম নির্জনতা, যেখানে কান পাতলে শুধু নিরন্তর ¯্রােতের ছলাচ্ছল শব্দটুকুই শোনা যেতো, সেই প্রথম নৌকায় লাগানো ইঞ্জিনের বিরামহীন শব্দ তার সবটুকুই কিছুসময়ের জন্য হলেও ছত্রখান করে দিলো।

এ অঞ্চলে কাজের অগ্রগতি খুব ভালো। আশে পাশের গ্রামগুলোতে বেশ কিছু ইউনিট গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা মানুষের মধ্যে প্রচুর উদ্দিপনা সৃষ্টি করা গেছে। তারা প্রতিনিয়ত রাজেকের সাথে যোগাযোগ রাখছে। ঋণ গ্রহণের ব্যাপারে পরামর্শ করছে, ঋণ গ্রহণও করছে আগ্রহ ভরে। ঋণ বিতরণের যে লক্ষ মাত্রা ছিলো রাজেকের জন্য সেটা সে ছাড়িয়েছে বেশ আগেই। অফিসে তার সুনাম বেড়েছে।

আপনি আসলে কি করেন? —মালতি কথা বলে কম। ওর চোখ মুখের অভিব্যাক্তি শরীরের সঞ্চালন মনের ভাবকে অনেকাংশে প্রকাশ করে দেয়।

দুপুরটা পার হোলেই চাচীর চা’র দোকানে মানুষের ভীড় বাড়তে শুরু করে। চা বানানো আর সরবরাহ করতে মালতির তৎপরতা বাড়ে। চাচী টোঙের উপর হাঁটু মুড়ে বসে থাকে। তাঁর মুখের বলিরেখাগুলো গভীর হয় আর যতো ভিড় হয় ততোই তাঁর মুখে বিরক্তির অভিব্যক্তি স্পষ্ট হতে থাকে।

রাজেকের হাতে পিরিচ সমেত চা’র কাপটা ধরিয়ে মালতি তখন উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ওর পিঠের দুই পাশে ওড়নার দুই প্রান্ত দুলে ওঠে।

আমি? —হঠাৎ মালতির প্রশ্নে অপ্রস্তুত রাজেক নিজেই যেন নিজেকে এই প্রশ্ন করে তারপর একটু সময় নিয়ে বলে, —সুখি বাংলাদেশ সংস্থার এসিসটেন্ট ফিল্ড অফিসার।

তাই! —দেরী করে না মালতি। চা’র জন্য পানি ফুটতে থাকা গনগনে চুলোর দিক থেকে ক্ষণিকের জন্য মুখ ফিরিয়ে ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপ কি কৌতুকের আভাষ রেখে বলে, —আমি ভাবলাম গরু ছাগল বেচাকেনার কারবারি।

সত্যিই কি তাই ভাবলো মালতি! আজ কতোদিন হলো এই দোকানে বসে ক্ষুদ্র ঋণ, বাংলাদেশের উন্নয়ন, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি পালন, স্বাবলম্বি হওয়া ইত্যাদি কতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, এ সবের কিছুই কি তার কানে ঢোকেনি? নাকি নিছক রাজেককে উপহাস করতেই তার এই মন্তব্য!

মানষিক চাপে পড়ে যায় রাজেক। মুহূর্তের জন্যেও এখানে বসে থাকতে মন চায় না। এখন তাঁর জায়গা সুরবালার পাড়, নিরন্তর বয়ে যাওয়া নদীর ¯্রােত।

সে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতে কেউ একজন পাশ থেকে একটা লাল নোটবুক চোখের সামনে মেলে ধরলো— মাষ্টের; একটু দেখে দেও দিন মাসিক কিস্তিগুলো ঠিকমতো জমা হলো কিনা!

রাজেকের আবার সেখানেই বসে পড়তে হলো। সুরবালার পাড়ে যেয়ে বসা হলো না।

তিন

ও মাষ্টের— কুলসুম ভাবী ডাকলো। দুপুর পার হয়েছে। রাজেক ফিরছে চাচীর চা’র দোকনের দিকে। কুলসুম ভাবী নির্জন পথের ধারে একটা ছাগলের গলায় বাঁধা দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এ অঞ্চলে প্রথম যাদের সাথে রাজেকের ঘনিষ্ঠতা কুলসুম ভাবী তাদের একজন। সেই কোনকালে তাঁর স্বামী মারা গেছে, এক ছেলে শহরে কি করে সে জানে না তারপর থেকে সে একা, ডাটো শরীর, একটু মুখরা ধরনের। তাকে নিয়ে এলাকায় কিছু বাজে কথারও প্রচলন আছে।

কুলসুম ভাবী এগিয়ে এলো রাজেকের কাছে। তারপর হাত নেড়ে জোর গলায় বললো, —তখন যে কতো কি বুঝিয়ে বাজিয়ে ঋণ দেলেন, কতোগুলোন টাকা, ছাগল কিনলাম,সত্যি কথা বলি লাভ হচ্ছিলো, তারপর যে অসুখ হয়ে ছাগল মরতি লাগলো, কতো খবর দিলাম আর আপনারে পাওয়া গেলো না। এখন আমার কিস্তির টাকা দিয়াই তো সাই— কি বেপদে ফেললেন কন দিন? —কুলসুম ভাবীর কথা বলার ভঙ্গি উত্থাপিত অভিযোগ রাজেকের ভালো লাগলো না। সেও একটু ভারী গলায় বললো; —আপনি খবর দিয়েছেন, আপনার ছাগল অসুখে মরছে জানি, কিন্তু আমি কি করবো, আমি তো ডাক্তার না।

আমি তো ডাক্তার না— এটা কোনো কতা? —মুহূর্তের মধ্যে কুলসুম ভাবীর গলা চড়ে যায়। —মানুষের অবস্থা ফিরানোর কথা বলে টাকা লোন দেবেন, মাসে মাসে সুদে-আসলে কিস্তি আদায় করবেন আর বেপদে আপদে পাশে এসে দাড়াবেন না, এতো গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়া, এখন আমার কি চালার টিন বেচে কিস্তি দিতি হবে?

প্রশ্নটা করে বটে কুলসুম ভাবী তবে রাজেকের উত্তরের অপেক্ষা করে না, দ্রুত সে হাঁটতে থাকে মাঠের দিকে, হাতে ছাগলের গলায় বাঁধা দড়ি। সাথে যেতে অনিচ্ছুক ছাগলটা তার গতিতে বাঁধার সৃষ্টি করে।

রাজেক হতভম্বের মত সেদিকে তাকিয়ে থাকে। আজ বেশ কিছুদিন হলো সে এ অঞ্চলে কাজ করছে। কাজের পরিধি বেড়েছে, তাঁর গ্রাহণযোগ্যতাও কিন্তু এ জাতীয় পরিস্থিতির সম্মুখিন সে অদ্যাবধি হয়েছে বলে মনে পড়ে না। চাচীর চা’র দোকানে যেতে মন টানলো না রাজেকের, —সে সুরবালার পাড়ের দিকে পা বাড়ালো।

তবে কুলসুম ভাবীর কথাগুলো সে মন থেকে সরাতে পারলো না কিছুতেই। প্রচ্ছন্ন কাটার মতো মনের কোথাও ঠাঁই নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি ছড়াতে লাগলো। রাতে অবসর সময় সে তাই আনিসুর রহমানের সাথে আলোচনার জন্য প্রসঙ্গটা উঠালো— আচ্ছা, আমারা যে ঋণ দিচ্ছি এই ঋণের পেছনে যদি প্রয়োজনীয় সাপোর্ট আমরা না দেই তাহলে পার্টি তো বিপদগ্রস্ত হতে পারে?

বিছানায় শোয়ার জন্য আনিসুর রহমান তখন গোছগাছ করছে। রাজেকের প্রশ্ন শুনে একটু সময় সে বিরক্ত চোখে রাজেকের দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর বললো, -এলোটমেন্টের অতোগুলো টাকা তো আপনি এক এরিয়াতেই ডিস্ট্রিবিউট করলেন, ভালো, তবে খারাপও হতি পারে। পার্টি যদি অর্গানাইজড হয়, -আনিসুর রহমানের গলার স্বরটা নরম হয়ে আসে; —বোঝেন তো, তখন থানা পুলিশ বিচার আচার— এখন যে কথা আপনি কচ্ছেন, আমার তো ভালো ঠেকতিছে না। আরে ভাই আমরা করি চাকরী, মাস অন্তে বেতন পাই ঘর-সংসার সামলাই, আপনি এর মদ্যি কি যে খুজে পালেন আল্লাহ মাবুদ জানে!

প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ হতে পারতো কিন্তু আনিসুর রহমান এর মধ্যে বিছানাটা পরিপাটি করে আয়েস করে বসে, তাঁর গলার স্বর আরও কোমল হয়ে আসে; —ভাই, আপনারে তো কইছি এ কোনো চাকরী না। ডিসি অফিসের পিওন সেখানও একটা চাকরী। মানুষ তারে গোনে, আপনারে গোনে? ম্যানেজার ছিলাম যখন বোঝলেন— অতিথী সিনেমা লাগলো আর সে কি রে ভাই, সারা শহর যেন ভেঙে পড়লো, টিকিট দেন টিকিট দেন, আর সেই যে গান, একটা মাচানের উপর দাঁড়ায়ে মাজায় কাপড় পেঁচায়ে শাবানা গাইতিছে; ও পাখি তোর চন্দনা, হাত দুখানা মেলায় দেছে আকাশের দিকি, কটা পাখি উড়তিছে, তখন তো বেলাক এন্ড হুয়াইট এর যুগ, কালার না, তাই যা সিন, আহা, দেখিছেন নাকি?

কিন্তু রাজেকের উত্তরের থেকেও স্মৃতীর সাগরে ডুব দিতেই তখন আনিসুর রহমানের আগ্রহ। তর্জনী দিয়ে নিজের মাথায় কয়েকবার টোকা দিয়ে তিনি স্মরণ করার চেষ্টা করলেন, —নায়কের নাম যেন কি ছিলো? শেষে নায়কের নাম মনে না করতে পেরে নিজের উপর বিরক্ত, কপালে কয়েকটা ভাজ ফেলে বিছানায় শুড়ে পড়লেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর নাক ডাকার শব্দ শোনা গেলো।

রাজেকের কিন্তু ঘুম এলো না। আসলে কুলসুম ভাবীর সমস্যার মধ্যেই যেন ঢুকে পড়েছে রাজেকের চাকরীর উদ্যোম, যা কিছু উৎসাহ। গভীর চিন্তায় জড়াতে থাকে সে। রাত বাড়ে, অস্বস্তিও বাড়ে। হঠাৎ সে যেন সান্ত¦নার একটা সূত্র পেয়ে যায়। আসলে কুলসুম ভাবীর সমস্যাটা তো একক। দেখতে হবে সমষ্টিক ভাবে। কারো না কারো নানা ধরণের সমস্যা তো হতেই পারে কিন্তু সামগ্রিক ভাবে বিষয়টা কি দাঁড়াচ্ছে সেটাই দেখার বিষয়। তার জন্য দরকার গবেষণা, গভীর পর্যবেক্ষণ।

বিছনা থেকে উঠে রাজেক এক গ্লাস পানি খায়। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। সারাদিন পরিশ্রম কম হয়নি; ৫/৭ মাইল হেঁটেছে, বৈঠক করেছে না হোলেও ৭/৮ জায়গায়, এখন ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে।

কদিন গেলো। কুলসুম ভাবীর সাথে রাজেকের আর দেখা হয়নি। দেখা না হওয়াটা ভালো। যার সমস্যা তার। কুলসুম ভাবী কি আর একক নাকি সমষ্টিগত এইসব বিষয় বুঝতে চাইবে। সে বুঝবে তার সমস্যা। কদিন খারাপ কেটেছে রাজেকের তারপরই প্রবল উদ্যেমে সে আবার কাজে লেগে গেছে। মাইলের পর মাইল হাঁটা, মানুষকে বোঝানো, মিটিং করা। আর কাজ অন্তে বিকেলে চাচীর দোকানে বসে চা খাওয়া, সেখানেও মানুষের সাথে আলোচনা। মাসিক কিস্তির টাকা আদায় আর মালতির তৈরী অতুলনীয় স্বাদের চা। অভ্যস্ত কাজের বাইরে একমাত্র যার প্রতি তার তুরীয় আকর্ষণকে সে উপেক্ষা করতে পারে না।

সুখের কথা এই, হেড অফিস থেকে একজন এসিসটেন্ট ইউনিট অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত সে এসে কাজে যোগদান করেনি।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও কাজ শেষে চাচীর চা’র দোকানে এসে বসেছিলো রাজেক। দুই একজন মানুষ এসে বসা শুরু করেছে। এমন সময় দেখা গেলো কয়েকজন মানুষ ছুটে যাচ্ছে সুরবালার পাড়ের দিকে। তাদের উত্তেজিত কথাবার্তা ভেসে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দোকানে যারা বসেছিলো তারাও ছুটে বেরিয়ে গেলো।

কি ব্যাপার!

মালতি কাজ ফেলে ছুটতে থাকা মানুষদের দিকে তাকিয়ে থাকলো, চাচীও তাই। বিভিন্ন দিক থেকে আরও দু’চার জনকে দৌড়ে যেতে দেখা গেলো।

চোখে মুখে বিপুল কৌতুহল নিয়ে হঠাৎ মালতি বলে বসলো, -চলেন না যাই, দেখে আসি।

তাই যাও— চাচীও বললো। তাঁর কথায় উদ্বেগ— কি জানি বাপু -কোথায় আবার কি হলো!

সুরবালার পাড়ে ততোক্ষণে বেশ মানুষের ভিড় জমে গেছে। কিছু একটা ঘিরে মানুষের জটলা। কাছে যেতে কে যেন বললো, —মাছ। কিন্তু মাছের এতো দেখার কি আছে! আরো কাছে যেতে বিষয়টা পরিস্কার হলো। রাজেক এ অঞ্চলে সম্মানিত লোক, জনপ্রিয়ও। তাকে দেখে মানুষজন ভিড় সরিয়ে জায়গা করে দিলো, সাথে মালতিরও। আসলেই মাছ, বিরাট, ২০/২২ কেজী হবে কমপক্ষে। সুরবালায় এর আগে বড়ো মাছ ধরা পড়েছে ঠিক কিন্তু এতো বড়ো মাছ কল্পনাই করা যায় নি। তাছাড়া মাছটার আকার আকৃতিও ভিন্ন। অনেকটা মৃগেল মাছের মতো, মাথাটা ছোটো, রঙ আলাদা, কালো ধরণের। থেকে থেকে বিরাট হা করে মাছটা শ্বাস নিচ্ছে।

কিভাবে ধরা হয়েছে ততোক্ষণে সে কাহিনী শেষ হয়েছে, এখন চলছে নানা ধরণের জল্পনা। এ অঞ্চলে মাছটা একেবারেই অপরিচিত। আগে এরকম মাছ কেউ কোনদিন দেখেনি। ভিড় ঠেলে কেউ একজন এগিয়ে এলো মাছটার কাছে। ভালো করে দেখে সে নিশ্চিত ভাবেই বললো; — এর নাম ব্লাক কার্প, এসেছে চীন দেশ থেকে। এই যে এতো বড়ো, বয়স বড়ো জোর ২ বছর। এ রকমই বাড় এ মাছের, শামুক খায়।

তাই হয়! -ভীড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন উড়িয়ে দিলো তার কথা। —কনে চীন দেশ আর কনে আমাদের সুরবালা।

কেন হবে না? -আর একজনের দ্বিমত শোনা গেলো। —দুনিয়ার সব নদীই আসলে সব নদীর সাথে লাগোয়া, আমাদের সুরবালা কনে কনে গিয়েছে কেউ কতি পারে?

এ ধরণের নানা কথাবার্তা শুরু হয়ে গেলো। সময় যাচ্ছে। যাদের জালে মাছটা ধরা পড়েছে তারা আর দেরি করলো না। উপজেলার বাজারে বিক্রি করার জন্য মাছটা নৌকায় তুললো। ভিড়ও কমতে শুরু করলো, অল্প সময়ের মধ্যেই একেবারে জনশূন্য হয়ে গেলো সুরবালার পাড়।

এখান থেকে তাকালে অল্প একটু দূরে সুরবালা পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে। বাঁকে তখন বিকেলের লাল সূর্য নামছে, সেখান থেকে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, সুরবালার পানিও সেখানে লাল, সেই রঙ ক্রমশ হালকা হয়ে আসন্ন সন্ধ্যার নির্জন আঁধারের আভাষ দিচ্ছে। রাজেক সুরবালার পাড় দিয়ে হাঁটছে, পাশে মালতি, কথা কারো মুখেই নেই। দুজনেই যেন অভিভূত সুরবালার সৌন্দর্যে। এই নিরবতা নির্জনতাই দুজনের অব্যক্ত ভাষা হয়ে উঠেছে। সুবালার কোথাও কোথাও নীল শাপলা, সাদা পদ্ম। আশ্চার্য, কতোদিন মন বিরূপ হলে রাজেক সুরবালার পাড়ে এসে বসেছে। সুরবালার ¯্রােতের দিকে তাকিয়ে কতো সময় গেছে তাঁর। কিন্তু এসব কিছুই তার চোখে পড়েনি। ভাসমান পদ্ম পাতার উপর দিয়ে লম্বা পা ফেলে হেঁটে বেড়াচ্ছে ডাহুক। বিকেলের গাঢ় আলোয় তাদের শরীরের নীল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে সুশৃঙ্খল ধ্যনমগ্ন বকের সারি। পানিতে দিনের শেষ খোলায় মেতে উঠেছে ভিলভিলের দল (হাঁসের বাচ্চার মতো ছোটো পাখি, চঞ্চল প্রকৃতির, খয়রি রঙ। বেশি দূরে বা উঁচুতে উড়তে পারে না। দল বেঁধে থাকে। মানুষকে তেমন ভয় পায় না, মানুষরাও এদের উত্তক্ত করে না। এদেরকে বলা হয় জলাশয়ের সৌন্দর্য। বিভিন্ন যায়গায় বিভিন্ন নামে এদের পরিচিতি)। কতোরকম পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। একটা বড়ো গাছে ঝুলে থাকা লাল নাম না জানা ফল ঠুকরে খাচ্ছে একটা হলুদ পাখি। রাজেকদের দেখে অল্প সময়ের জন্য সে খাওয়া বন্ধ করলো যেন অনুমান করতে চাইলো রাজেকদের মতলব তারপর আবার ফলটা ঠোকরানো শুরু করলো।

এই ফুলগুলোকে চেনো? -পানিতে ফুটে থাকা সাদা মেঘের টুকরোর মতো কয়েকটা ফুলের দিকে আঙ্গুল তুলে দীর্ঘক্ষণের নিরবতা ভাঙলো রাজেক।

হু, পদ্ম।

অবাক হলো রাজেক; —কাগজে পড়েছিলাম ফরিদপুরের একটা বিলেই কেবল এই সাদা পদ্ম দেখা যায় আর কোথাও না। আর এই যে নীল শাপলা এটাও কিন্তু বিরল, সুরবালায় দেখছি সবই আছে!

মৌণ বিস্ময় চোখে নিয়ে তাকালো মালতি। হঠাৎ পাখির ডানার মতো দুদিকে দু’হাত মেলে দিয়ে দ্রুত সে সুরবালার পাড় দিয়ে নেমে যেতে থাকে আর রাজেক কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝুপ্্ করে শব্দ হয় পানিতে।

মালতি; -ভয় পাওয়া গলায় চিৎকার করে ওঠে রাজেক।

সুরবালার পানিতে তখন চক্রাকার ঢেউ ক্রমশ তার পরিধি বাড়াতে থাকে আর কিছু দেখা যায় না।

কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য মাত্র, একটু দূরে হঠাৎ আচম্বিতে ভেসে ওঠে মালতি। মাথা ঝাঁকিয়ে ভেজা চুলগুলো দু’পাশে সরিয়ে রাজেকের দিকে চকিত কৌতুক চোখে তাকায় তারপর আবার ডুব, আবার ভেসে ওঠা। বৃহৎ কোনো জলচর প্রাণীর মতো পানির মধ্যে তখন মালতির অবাধ সঞ্চালন, কখনও দু হাত ঘুরিয়ে পানি ছিটায় আবার হয়তো অবলিলায় ভেসে থাকে পানির উপর।

বিস্ময়ের ঘোরে আটকা পড়ে যায় রাজেক, তার কিছু করার থাকে না। মালতি ক’টা নীল শাপলা তোলে, ক’টা সাদা পদ্ম, তারপর পাড় বেয়ে উঠে রাজেকের সামনে এসে দাঁড়ায়।

রাজেকের ঘোর আরও গভীর হয়। এ কোন মালতি! এতোদিন এতোভাবে রাজেক যাকে চেনে তার সাথে এর কোনো মিলই খুঁজে পায় না।

সমস্ত শরীরে সেটে আছে ভেজা পোষাক। মাজায় ওড়না পেঁচানো। শরীর থেকে পানি ঝরে পড়ছে তখনও। বীরাঙ্গনা যেন সে, পরিপূর্ণ নারী, বিজয় গর্বে দীপ্যমান হাসি ঠোঁটের কোণে। মাথার ভেজা বিস্তস্ত্র চুলে আটকে থাকা পানির বিন্দুতে সূর্যের সাত রঙের খেলা।

স্থির দু’টো কনীনিকায় বিজয় দিপ্তি নিয়ে সে অনেকটা সামরিক ভঙ্গিতে রাজেকের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিলো। তাতে কয়েকটা সাদা পদ্ম আর নীল শাপলা ফুল ধরা।

কিন্তু কি যে হয় রাজেকের, সে ফুল নেয় না। বরং অকস্মাৎ তার হাতটা ধরে একটু টান দিতে অপ্রস্তুত সে রাজেকের বুক সংলগ্ন হয়ে পড়ে। মুহূর্তের জন্য মাত্র। এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করতে মালতির সময় লাগেনা।

ফুলগুলো ছড়িয়ে যায় মাটিতে।

নিরাপদ দূরত্বে মূর্তির মতো সে দাঁড়িয়ে পড়ে, -আমাকে এতো বোকা ভাবলেন আপনি, এতো বোকা!

চাপা আর্তনাদের স্বর বেরিয়ে আসে মালতির গলা দিয়ে। তারপর তার অনিমিখ চোখের কোণ দিয়ে দুটো ক্ষীণ পানির ধারা কপোল বেয়ে নেমে আসতে থাকে।

বিকেলের গাঢ় ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগেও পাখির কূজনের যে প্রাবল্য ছিলো এখন নেই। রাতের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরছে তারা।

 সুরবালার পাড় জুড়ে দিন শেষের নির্জনতা ক্রমশ গভীর হচ্ছে।

ও মাষ্টের; -রাজেকের ঘোর কাটলো এই ডাকে। পাড়ের যেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিলো তার বেশ নীচে পানিতে ডুঙ্গার উপর বসে একজন জেলে মাছ ধরার কাজ করছে। বিরাট একটা কৈ মাছ হাতে তুলে সে দেখালো। —দেখিছো, কতো বড় কৈ?

মাছটা আসলেই বড়ো। এক সময় বাজারে এ রকম মাছ প্রায়ই দেখা যেতো, এখন আর দেখা যায় না।

অফিস থেকে তিন দিনের ছুটি নিলো রাজেক। মানষিকভাবে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। এ রকম একটা ঘটনা সে কিভাবে ঘটাতে পারলো এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। সে তাহলে কি? নিশ্চিন্তপুরে সে যাবে কিভাবে? মালতির সামনে! চাকরী ছেড়ে যাবার কথাও তার মনে এলো কিন্তু সেই নিশ্চিত পলায়নের পেছনে মনের জোরালো সায় পেলো না। সারাদিনই বিছানায় শুয়ে সে সময় কাটায়, উঠে দাঁড়াবার শক্তি বা উৎসাহ পায় না। বিষয়টা আনিসুর রহমান যে খেয়াল করে না এমন না। রাজেক অধস্তন হোলেও শিক্ষা-দিক্ষায় সে যে আনিসুর রহমান থেকে যোগ্য এ কথা সে মনে মনে মানে। তারপরও একদিন সন্ধ্যেয় সে রাজেকের পাশে যেয়ে বসে, রাজেকের শরীরে আলতোভাবে একটা হাত রেখে খুব দরদি সুরে বলে, —ভাইজান, কদিন ধরে যা দেখতিছি তাতে ক’টা কথা বলতি হচ্ছে। আপনারা ইয়ং মানুষ, অনেক জ্ঞান বুদ্ধি রাখেন সত্যি কিন্তু আমাদের যে অভিজ্ঞতা এটার তো একটা দাম আছে নাকি? আসলে যৌবনকালটা কিরাম জানেন— ফাঁকা কলসির মতো। কখন কোথায় ঘা লেগে যে কিভাবে বেজে উঠবে আগে থেকে বুঝা যাবে না আর একটু জোরে ঘা লাগলো তো -ফার্মেসিতে যেয়ে একমুঠো ঘুমির বড়ি কিনে খেয়ে ফেলো, না হয় দড়ি টাঙিয়ে ঝুলে পড়ো বাগানের গাছের ডালে, কড়ি কাঠে অথবা ট্রেন লাইনে মাথা পেতে দাও -ব্যাস্। মনটা শক্ত করতি হবে বোঝলেন, একটাই পথ, মন কনে কিভাবে যে কখন ফেসে যায়— আনিসুর রহমানের প্রথম দু একটা কথা ভালোই লাগছিলো তারপরই এই দার্শনিকতা এতো বিরক্তিকর আর সস্তা লাগলো যে রাজেক পাশ ফিরে শুলো।

কিছুক্ষণ বাদে আবার আনিসুর রহমানের গলা শোনা গেলো। তখন দিনের আলো শেষ হয়েছে। মৃদু লালচে বৈদ্যুতিক আলো ছড়িয়ে আছে ঘরময়। জানলা দিয়ে ঝাক্্ ঝাক্্ মশা ঢুকছে। তাদের সম্মিলিত আওয়াজ আর আক্রমণে অতিষ্ট হতে হচ্ছে রাজেককে।

পাশ ফিরেলা সে। হাতে এক কাপ চা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নতুন আনিসুর রহমানকে দেখলো রাজেক। সে উঠে চা নিলো। তারপর চুমুক দিলো তাতে। সাথে সাথে কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেলো। এই কদিনের নিরুদ্ধ নিশ্চিল জীবন এক চুমুক চা’এর স্বাদে অনেকটা যেন প্রাণ ফিরে পেল।

এই ঘটনার একদিন পরই হেড অফিসের চিঠি পাওয়া গেলো। রাজেককে বদলি করা হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার দূরবর্তী এক উপজেলায় তার কর্মস্থল। শুধু বদলি না, ছোটোখাটো একটা প্রমোশনও দেওয়া হয়েছে। এই সংবাদে রাজেক এতোদিনের আতœগ্লানিকেই শুধু ঝেড়ে ফেললো এমন না, কিছুটা কৃত্রিম হোলেও রীতিমতো প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তৎপর হতে তাঁর সময় লাগলো না।

চার

সময় চলে গেলো ¯্রােতের মতো, বছর পাঁচেক কেটে গেলো। এ এলাকাতেও রাজেক জনপ্রিয় তবে সর্বজন আদৃত ‘মাষ্টের’ না। স্যার কিংবা ভাই। আর রাজেকও এখন দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের নিরলস কর্মী না। নেহায়েৎ চাকরীজীবী। সন্ধেবেলায় সে কয়েকজন সঙ্গী জুটিয়ে তাস খেলে সময় কাটায়। দৈনিক কাগজ পেলে চাকরীর খবরেই প্রথমে নজর ফেলে। নিশ্চিন্তপুরের কথা সে ভোলেনি তবে সেইসব দিনগুলো এখন নিতান্ত ঘটনা, কাগজে লেখা বিবৃতির মতো। ঘটনার উত্তাপ মিলিয়ে গেছে অনেক আগেই।

বিপর্যয় এলো এখানেও । আবার হেড অফিসের চিঠি। মাধবগঞ্জ উপজেলায় তার বিতরণকৃত ঋণের বিরাট পরিমাণ অনাদায়ী রয়ে গেছে। সেগুলো আদায়ের উপর নির্ভর করছে তার পরবর্তী পদন্নতি। সুতরাং অবিলম্বে মাধবগঞ্জ উপজেলায় যেয়ে সেসব অনাদায়ী ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

একে হেড অফিসের নির্দেশ তারউপর যার সাথে ঝুলে আছে চাকরীর পদন্নতি। রাজেক দেরি করলো না।

এ ক’বছরে মাধবগঞ্জ উপজেলার পরিবর্তন হয়েছে আমূল। প্রথমে খোঁজ পড়লো উপজেলা মোড়ে সেই অশ্বত্থ গাছের। নেই। রাস্তাগুলো চওড়া হয়েছে। মানুষের সমাগম বেড়েছে আর ঝলমলে সব দোকনপাট। হুস্্ হাস্্ শব্দে মটর সাইকেল ছুটছে, অনেক সময় যেন পা’র উপর দিয়ে। রাজেকের অফিসটাও একেবারে বদলে গেছে। ঝকঝকে দোতালা বাড়ী। নীচে অফিস, উপরে রেস্ট হাউজ। জনবলও বেড়েছে। অফিসের কাউকেউ সে এখন চেনে না। যে একজন পিওন ছিলো, তার কথা কেউ বলতে পারলো না। সবচেয়ে দুঃখজনক সংবাদ হলো আনিসুর রহমানের মৃত্যু। হার্ট ফেল করেছিলো। চৌকির পাশে পড়ে ছিলো মৃত অবস্থায়। সকালে উদ্ধার হয়েছে। আনিসুর রহমানের জন্য মনটা বিষন্ন হয়ে গেলো রাজেকের; -বেচারা!

অফিসের রেস্ট হাউজে উঠলো রাজেক। সময় নষ্ট না করে কাগজপত্রের কাজ শুরু করে দিলো। আর কাগজ পত্রের সই-সাক্ষী-সম্পদ-সমন এ সবের মধ্যে থেকে জীবন্ত হয়ে উঠে আসতে লাগলো সেই সব দিন, -নিশ্চিন্তপুর, হিজলডাঙ্গা, তেলটুপি, মালতি, কুলসুম ভাবী, আব্দুর রব, হাজারী মন্ডল আরও কতোকি।

মটর সাইকেলের পিছনে বসিয়ে সদ্য নিয়োগ পাওয়া একজন অল্প বয়সী যুবক রাজেককে পৌঁছে দিতে চললো নিশ্চিন্তপুরের দিকে। তখন সকাল, মানুষজন কাজে বেরোচ্ছে। এ অঞ্চলের উন্নয়ণ রাজেককে অবাক করে দিলো। কিছুদিন আগে সে যখন এখানে ছিলো তখন এসব রাস্তা ছিলো মাটির। বর্ষায় কাদা যেমন থাকতো শীতে তেমন ধুলো। পরিবহণ বলতে গরুর গাড়ী, মানুষের মাথায় বা ঘাড়ে বাকে করে মালামাল বয়ে নেওয়া। রাতের জমাট অন্ধকার কেরোসিনের কুপির আলোয় যা একটু সরতো। তাও বেশীক্ষণের জন্যে না। আর এখন সেখানে চওড়া পাকা রাস্তা। উর্ধ্বশ্বাসে মটর সাইকেল ছুটে যাওয়া, ট্রাক, পিক আপ ভ্যান, মাইক্রোবাস, ট্যাক্সি ইত্যাদিও বিরল দৃষ্ট না। রাস্তার পাশে খুঁটিতে বাঁধা বিদ্যুতের তার।

মটর সাইকেল থেকে যেখানে রাজেক নামলো তার ডাইনে একটু হেঁটে গেলে নিশ্চিন্তপুর গ্রাম। সে রাস্তাও পাকা। বা’য়ে সরষেডাঙ্গার মাঠ, মাঠের ভেতর দিয়ে চিকন হাঁটাপথ, -আগে যেমন ছিলো এখনও তেমনই আছে। এই পথ ধরে কিছুদূর হাঁটলে চাচীর চা’র দোকান, মালতি, তারপর আরও কিছুদূর গেলে আমাদের সুরবালা, সুরবালার উঁচু পাড়, নিঃসীম নির্জনতা।

এখান থেকে নিশ্চিন্তপুরের সুড়ি বাড়ীর চিলেকোঠাটা দেখা যাচ্ছে। চিলেকোঠার গা বেয়ে একটা বটের চারা আকাশের দিকে মাথা তুলেছে।

একজন পথচারীর কাছ থেকে জানা গেলো হাজারী মন্ডল গত বছর মারা গেছে। তাঁর সাথে কথা বলার সময়ই আর একজন ‘মাষ্টের’ না? -বলে দৌড়িয়ে এলো তারপর তাঁকে একরকম জড়িয়ে ধরেই বললো, -এতোদিনি আমাদের কথা মনে পড়লো?

রাজেক তাকে চিনতে পারলো না কিন্তু সে যে রাজেককে ভালো মতোই চিনেছে সেটা বোঝা গেলো।

সরষেডাঙ্গার মাঠের চিকন কাচা রাস্তা দিয়ে দুজন হাঁটা শুরু করলো। আগে চাচীর দোকানে চা খাওয়া হোক তারপর কাজ কর্মের কথা তোলা যাবে। নানা কথার মধ্যে কুলসুম ভাবীর কথা উঠলো, -সে তো এখন ঢাকায়। লোকটা বললো, -কেউ বলে গার্মেন্টে কাজ করে, আবার কেউ বলে কনে গার্মেন্ট, — মেসে রান্না করে।

রাজেক একটু ধাক্কা খেলো। -আমাদের অনেক টাকা তো সে লোন নিয়েছিলো। —নিজের অজান্তেই যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো কথাটা।

মাসে মাসে কিস্তি তো দেয়, শুনিছি কিস্তির টাকা শোধ হলি আবার গ্রামে ফিরে আসবে, -সে বললো।

কুলসুম ভাবীকে কেন গ্রাম ছেড়ে যেতে হলো এ প্রশ্ন রাজেকের মনে এলো না বরং সে যে মাসে মাসে কিস্তির টাকা দেয় এই সংবাদে স্বস্তি বোধ করলো আর এ কারণেই যে ঋণ খেলপিদের তালিকায় কুলসুম ভাবীর নাম চোখে পড়েনি সেটাও সে বুঝতে পারলো।

চাচীর চা’র দোকানের কিন্তু তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়লো না। শুধু দোকানের একপাশে সুপারির কাঁধির মতো ঝুলছে ছোট বিচিত্র রঙের প্লাস্টিকের প্যাকেটে চিপস, নানা ধরণের চাটনি, শ্যাম্পু, চ্যানাচুর, টুথপেষ্ট আরো কতো কি। শ্যাম্পু আর টুথপেষ্টের প্যাকেটের উপর অল্প সময়ের জন্য হোলেও রাজেকের চোখ স্থির হলো। গ্রামের মানুষ এখন এসব ব্যবহার করে— কেন যেন এই কথা মনে এলো তার। আর চালার ঠিক মাঝ বরাবর হলদে একটা বৈদ্যুতিক বাতি। চাচী একই রকম আছে, মাথার চুলগুলো পেকে সারা হয়েছে এই যা। হাওয়ায় ক’টা চুল উড়ছে। একটা অল্প বয়সী ছেলে চা বানাচ্ছে। আর চাচীর পাশে থিতু হয়ে বসে আছে বছর দুই বয়সের একটা শিশু, স্বাস্থ্যবান। তার বিশাল দুটো চোখে বিষ্ময় আর কৌতুহল।

কারে আনিছি দেখিছো -চাচীকে উদ্দেশ্য করে বললো সাথের লোকটা । চাচী তাকালো কিন্তু তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না।

চিনতিছো না?

চাচী আবার তাকালো, এবার তাঁর ঠোঁটের কোণে একটু খানি হাসি ঝুলিয়ে সে যে চিনেছে সেটা বুঝিয়ে দিলো।

ভালো আছেন তো? -বেঞ্চের কোনে একটু জায়গা নিয়ে রাজেক বসলো।

আমাদের ভলো থাকা বাপু, -নিস্পৃহ স্বরে এই কথা বললো চাচী।

-এই মাষ্টারের জন্যি চা কর, -কাপ পিরিচ ভালো করে মেজে নে, লিকার কড়া দিবি চিনি কম, -চা তৈরীতে ব্যস্ত চেলেটাকে এই নির্দেশ দিয়ে এবার চাচী পরিপূর্ণ ভাবে রজেকের দিকে তাকালো।

আমাদের আর ভালো থাকা বাপু, -তা আবার দেখা হবে ভাবিনি— চাচীর কথার এই আন্তরিকতায় রাজেক মোহিত হয়ে গেলো।

ঝকঝকে কাপ পিরিচে চা এলো রাজেকের হাতে। আর চা’র কাপে চুমুক দিতেই স্মৃতিসিক্ত আবেগ যেন চেপে ধরলো তাকে। এতোদিনে কতো জায়গায় কতো কাপ চা খেয়েছে সে কিন্তু এ এক বিশেষ স্বাদ, দ্বিতীয়বার চা’র কাপে চুমুক দিয়ে রাজেক সেটা বিশেষ ভাবেই অনুভব করলো।

মালতিকে দেখছিনে-?

আগুনের মতো দপ্্ করে জ্বলে উঠলো চাচী। -ওর কথা তুমি বললে, ওতো কাল সাপ, ডাইনি, আমি দুধকলা দিয়ে কাল সাপ পুষেলাম বুঝলে? আমার মান খেলো, সুনমান খেলো, আমার সব খেলো; -বলে হাত দিয়ে নিজের গালের দুপাশে দু’টো চড় বসালেন তিনি। -হায় হায় কি ভুল যে করেলাম, -কি ভুল!

চাচীর এই ক্ষোভ বা আক্ষেপের পেছনে যে একটা কাহিনী বলার প্রস্তুতি সেটা বোঝা গেলো একটু পরে।

চুলো থেকে ওঠা ধোয়ায় রাজেকের চোখ জ্বলতে লাগলো।

কি করে বোঝবো; -চাচীর স্বর এখন নরম; -ভুস ভাস করে সরকারী গাড়ী নিয়ে আসে, ডিরাইভার, চাচী চাচী করে, চা খায়, টেড়ি বাগানো চুল, রঙিন চশমা, হাতে ঘড়ি, ঠাট বাটই আলাদা। তারপর একদিন মালতিরে নিয়ে উধাও, খোঁজ খোঁজ, -কদিন পর খোঁজ পাওয়া গেলো তেনারা বিয়ে করেছেন। ভালো।

কয়েক মুহুর্ত চুপ করে চাচী অপলক তাকিয়ে থাকলো রাজেকের দিকে। -শুনি, ঢাকায় গেলো। ওমা, সেখেনে নাকি তার বৌ বাচ্চা আছে। বকাবকি মারধোর, -মালতিরে নিয়ে তুললো আর এক ঘরে।

মালতি বোকা বলো, বোঝে না? —এবার চাচীর কথা ভারী হয়ে এলো।

— একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো, শুনি কে যেন ডাকতিছে— নানু, ও নানু! দরজা খুলতিই বুকির উপর ঝাপায়ে পড়লে, ঐ ছেমড়ি, তুমাগের মালতি।

এক ঝলক বিদ্যুৎ যেন খেলে গেলো চাচীর মুখের এ প্রান্ত সে প্রান্ত।

তারপর এই এক সাপ; -পাশে বসা শিশুটার উপর বাঁকা দৃষ্টি হেনে তিনি বললেন; -আমার উপর চাপায়ে দিয়ে তিনি চললেন চাকরী করতি। এক স্কুলি ঘন্টা পিটায়। সন্ধে নাগাদ ফেরে। বসো, দেখপা!

এক আমূল দীর্ঘশ্বাসে চাচীর শরীর কেঁপে উঠলো।

-সেই মালতি আর নেই, রুগা, খোংরাকাটি, আমি বলি তাও ভালো। যমের হাত থেকে যে ছাড়া পালে -তাও ভালো।

মালতির এই কাহিনী কেন যেন রাজেককে একটু বেশী মাত্রায় বিদ্ধ করলো। আর্দ্র হয়ে উঠলো মন। আর এ রকম কোনো মন খারাপ করা পরিস্থিতিতে ঠিক পাঁচ বছর আগে সুরবালার পাড়, অবিরাম বয়ে যাওয়া ¯্রােত, তাঁকে যেভাবে টানতো সে রকমই একটা পরম টান সে বোধ করতে লাগলো। মাঝের সময়টুকু নেই। এখন তার মন জুড়ে শুধুই মালতি, তার বিস্ময়াবিষ্ট বড়ো দুটো চোখ, নিস্তদ্ধ মুখ আর হঠাৎ হঠাৎ সেই মুখের উপর খেলে যাওয়া হাসির ঝলক, -দুর্নিবার ঘটনা হয়ে রাজেককে পুরোটাই অধিকার করে বসলো। মালতির জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা তাই তাঁকে শুধু হতবাক করলো না, ব্যাথিতও করে তুললো।

নিঃশব্দে উঠে রাজেক সুরবালার পাড়ের দিকে হাঁটা শুর করলো। বিকেলের ভারী রোদ ক্রমশ গুটিয়ে আসছে। সরষেডাঙ্গার দিগন্ত বিস্তারি ফাঁকা মাঠ এখন নীরব; জনশূণ্য। রাজেক সুরবলার পাশে এসে দাঁড়ালো আর চরম বিস্ময় তাঁকে যেন একরকম নিরালম্ব করে ফেললো।

সুরবালার পাড় জুড়ে এলাকার প্রভাবশালীরা মাছ চাষের জন্য ছোট বড় ঘের তৈরী করেছে। কোথায় সেই শাপলা, পদ্ম, ডিঙ্গি নৌকা, পাখি এই সব। রাতারাতি কোন মন্ত্র বলে সব এখন উধাও। ঘের গুলোর পাশ কাটিয়ে সাপের মতো এঁকে বেঁকে ক্ষীণ পানির যে ধারা বয়ে চলছে বড়ো জোর সেটাকে একটা চিকন খাল বলা যায়, -তার বেশী কিছু না।

হতভম্বের মতো রাজেক দাঁড়িয়ে থাকলো। তাঁর সামনে এখন স্রোতহীন সৌন্দর্যহীন শয্যাশায়ী কোনো মৃতপ্রায় রোগীর মতো সেই আমাদের সুরবালা।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা