হাসান আজিজুল হকের একক বাচন

চিহ্নের সঙ্গে
হাসান আজিজুল হকের একক বাচন

চিহ্ন : আমাদের এবারের শিরোনাম : ‘কথাশিল্পের ভাষা’। আপনার-তো বহু-বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের বলুন, এখন ফিকশনের যে-অবস্থা, আদৌ কি কিছু দাঁড়াচ্ছে? ‘গল্প’ সম্পর্কে আমাদের দেশের সামগ্রিক যে-অবস্থা সেখানে গল্পকারদের যে-ভাষা, আসলেই কি কার্যকর কিছু হচ্ছে? হাসান আজিজুল হক : এ-প্রশ্নের জবাব-তো খুব বিস্তৃত হবে। এক-রৈখিক জবাব কোনো অবস্থাতেই দেওয়া যায় না। পৃথিবীতে কোনো কিছুই সম্পূর্ণ পজেটিভ নেই আবার সম্পূর্ণ নেগেটিভও নেই। আমরা এ-কালের মানুষ। আমরা বিশ শতকের মানুষ। আমরা একুশ শতকে ঢুকে পড়েছি। ফিকশনের কথা বলছো! এর বিরাট একটা ইতিহাস ও ঐতিহ্য পেছনে পড়ে আছে। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য যে-জাতির থাকে, সে-জাতির জেনারেশনের পর জেনারেশন শিক্ষা-দীক্ষায়, আচারে-আচরণে সেটা আয়ত্ত করে ফেলে। আলাদা চেষ্টা করতে হয় না। দুর্ভাগ্য আমাদের, এখানে এ-জিনিসটা হয় না। এই জিনসটা না হওয়ার কারণে বড় অদ্ভুত ও অসমান ব্যাপার এখানে হতে থাকে। যেমন ধরো অনেকে পরিষ্কারই বলে অমুক মফস্বলের লেখক, মফস্বলের লেখা। জিনিসটা শুনতে খুব খারাপ লাগে কিন্তু কথাটা-তো কিছুটা ঠিক। আলো যে সব-জায়গায় সমানভাবে ছড়ায় না, কথাটা-তো ঠিক। আলো যদি সব-জায়গায় সমানভাবে না ছড়ায় (আলো বলতে আমি বিরহ বুঝছি, বৈষিয়তা বুঝছি, শিক্ষা বুঝছি, দৈনন্দিন জীবন-যাপনের স্বাচ্ছন্দের তারতম্য বুঝছি), তবে কেমন করে হবে? এর ফলটা হচ্ছে, তৈরিও হয় নানা-পদের জিনিস। বলতে পারবো না এটা সর্বনিম্ন, এর চেয়ে নিম্ন আর হবে না। কিংবা এর চেয়ে বড়ো আর হবে না। দুটোর একটা হয়তো বলা যেতো। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা বলা যায় না। সেটাই-তো মুশকিল। আমাদের এখানে ভাগ অনেকগুলো। প্রথম-কথা হলো, বাংলা সাহিত্য যেমনই হোক না কেনো বিশ্বসাহিত্যের সাথে তুল্য। এটা আমি বিশ্বাস করি। তোমরা কি মনে করো জানি না। এটাও ঠিক আমরা যাদের লেখা পড়ে বড়ো হয়েছি তাদের চেয়ে আমাদের চোখ আরো নানাদিকে প্রসারিত হচ্ছে। আমরা আগে হয়তো পড়েছি, বড়ো জোর বৃটিশ উপন্যাস, বৃটিশদের সাথে অন্যান্য যারা যুক্ত সেসব পড়েছি। কিন্তু আজকে আমরা মোটামুটিভাবে আফ্রিকান, ল্যাটিন আমেরিকা, ইটালিয়ান সবগুলো সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা পাচ্ছি। পাওয়াটা উচিত। এই ধারণা পাওয়া সত্ত্বেও আমি যা লিখব আর তুলনাটা পাশাপাশি এসে যাবেই। কারণ, তোমার ভেতরে যে-চেতনা রয়েছে, সে-চেতনা তোমার পরিমাপক। কোনো জিনিস যতোটুকু ততোটুকুই-তো মাপবে। গণ্ডি যদি ধরি ‘বাংলা সাহিত্য’, তাহলে একভাবে কথা বলতে হবে। গণ্ডি যদি ধরি ‘বিশ্ব-সাহিত্য’, তাহলে আরেকভাবে কথা বলতে হবে। গণ্ডি যদি ধরি ‘বিশ শতক’, তাহলে এক-রকম, যদি ধরি ‘একুশ-শতক’ তাহলে আরেক-রকম। নানা-রকমের হিসাব আছে। তুমি যদি সংক্ষিপ্তভাবে প্রশ্নটা করে থাকো, ‘স্যার এতো কথার দরকার নেই, সাধারণভাবে বলুন’, তাহলে বলাটা একটু কঠিন হবে। তহলে হবে কি, সন্তুষ্টির জায়গা নেই, গড়-পরতা সব-ক্ষেত্রেই; যেমন রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সবক্ষেত্রে একটা ক্ষয় হচ্ছে বা একটা বিষণœ দরিদ্র-অবস্থা দাঁড়িয়েছে। সে-কারণে সাহিত্যও খানিকটা ক্ষয়ে গেছে। এর মধ্যে আবার  সাহিত্যের হিসেব আলাদা। হঠাৎ করে সাহিত্যে বড়-প্রতিভা দেখা দেয়। সেটা সব-সাহিত্যে হয়। তেমনি আমাদের সাহিত্যেও হয়তো কিছু বড়ো লেখক জন্মে গেছে। আমি যদি ‘রাইট ফর’ ১৯৪৭ ধরি তাহলে বলবো যে, ৪০-এ যে-ফিকশনটা ছিলো সেই ফিকশনের সাথে তুলনীয় ফিকশন আমাদের এখানে পরবর্তীকালে কি হয়েছে? জোর করে বলতে গেলে তুমি হয়তো বলবে, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহকে কি আপনি বাদ দিয়ে দিচ্ছেন? ঠিক আছে, বহু পর্বত-শৃঙ্গের মধ্যে একটা পর্বত-শৃঙ্গ মাথা উঁচু করে আছে সেটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ৪০-এর দশকের লেখক, পরবর্তীকালে ৬০-এর দশকের লেখকের মধ্যে এককভাবে মাথা উঁচু করে আছে। কিন্তু পাশে তৃণ, ঘাস, এতো জমেছে যে সেগুলো না হলেই ভালো হতো। ঝেটিয়ে বিদায় দিলেই ভালো হতো। কিন্তু তখন যারা করেছিলো অত্যন্ত চেষ্টার সাথে করেছিলো, কারণ তখন একটা নতুন অনুপ্রেরণা। নতুন অনুপ্রেরণা কিন্তু খুবই দ্বিধাবিভক্ত অনুপ্রেরণা। একটা অনুপ্রেরণা হলোনতুন দেশ, স্বাধীন দেশ; আরেকটা হলো, পাকিস্তান আছে, মুসলমান আছে। মুসলমানদের মধ্যে যারা বাঙালি তাদের জন্য সেই যুগটা যেমন হতাশার তেমনি প্রেরণারও বটে। তার মধ্যে ভাষা-আন্দোলন এলো। বোঝা যায় একটা শ্রেণী উন্মুখ হয়ে আছে উঠবে বলে। তাদের মধ্যে যাবতীয় পজিটিভ লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে। এখানে বিরাট একটা ইনটেলিকচুয়াল, বিদ্বান, মনীষী-সমাজ যেটা ছিল সেটা মোটামুটিভাবে অনুপস্থিত হয়ে গেলো। খুব আকস্মিকভাবে। সেই ইতিহাস আমি লিখেছি। ৪৭-এর পরে তখন এক বিরাট শূণ্য জায়গা, একি কাণ্ড!
সেই নাইন্টিন সেঞ্চুরিতে পূর্ববাংলার মানুষ পাট বিক্রি করে বড়লোক হয়েছে। অশিক্ষিত মানুষ। তার সব পায়রা নাচানোর জন্যে, মদ খাওয়ার জন্য, মেয়ে মানুষ উপভোগ করার জন্যে কলকাতায় আসতো। থাকতো। বাঙ্গাল মানুষ-তো উড়ন্ত এক জন্তু। বাঙাল বড়ো অদ্ভুত। সে-মনোভাব অল্প-বিস্তর রয়ে গেছে। আজকে আবার যখন ঐ-অবস্থা হলো, তখন দেখলো যে, একটা ‘ফ্রি-ডাউনফল’ হয়েছে। কিন্তু সেই ‘ডাউন’-এ কারা থাকবে খেলবে তাদের উপস্থিতির ঠিক নেই। এখন খুব সহজে যেটা ধরে মানুষ, আমাদের এখানে‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’। কাজেই যে-মুহূর্তেই আমরা উন্নতির কথা ভাবি আমরা প্রথমে লেখাপড়ার কথা ভাবি। আর-তো উন্নতির আপাতত কোনো চান্স নেই। এখন এই যুগে লেখাপড়ার গুরুত্ব আর ফিফটির গোড়ার দিকের লেখাপড়ার গুরুত্ব মোটেই এক নয়। তখন সংখ্যাও কম, গুণে-মানে দরকারও ছিল অনেক বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিলো। অনেক রকমের ব্যাপার ছিলো। তখন সেই ভাষা আন্দোলনের মুহূর্তে বাঙালিত্ব-মূলক ভাষা, সংস্কৃতি এটা অবলম্বন করে এ-দেশে আবার নতুন একটা জাগরণ হলো। আর সেই জাগরণের বিরুদ্ধশক্তি যেটা, সেটা সমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলো। আমরা মোটামুটি বিজয়ী হয়েছি। ৫২ সালের দিকে তাকালে মনে হয়, একটা অনুপ্রেরণা এসে গেছে। পাকিস্তান সমর্থন নয়, কিন্তু একটা দেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করে তার একটা স্বতন্ত্র সত্তা দেখা দেয়। স্বতন্ত্র সত্তা দেখা দেওয়ার পর সে কি করবে সেটা মোটামুটিভাবে তৈরী হয়ে গেছে। সে-জন্য ৫২ সালটাকে আমি ল্যান্ডমার্ক বলি। ৫২ সালের উপর সরাসরি সাহিত্য খুব কম। নেই বললেই চলে। আমি দু-একটা সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখেছি ঐ-যারা ছিলো হাসান হাফিজুর রহমানের আটটা কি নয়টা গল্প আর কয়টা কবিতা! তারপর আমি বাংলা একাডেমিতে নতুন করে করলাম, আমার সম্পাদনায় বেরুলো। আমি লিখিয়ে নিলাম। তখন-তো আর প্রত্যক্ষদর্শী নেই। তখন আর একুশে ফেব্র“য়ারি নিয়ে লেখার লেখক নেই। সে-কারণে, লোক দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হলো। ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশটা গল্প বেরুলো। এখন-তো আর কেউ ভাষা-আন্দোলন নিয়ে লিখবে না। আর কিছু হবেও না। তাছাড়া তার ইমপ্যাক্টও চলে গেছে। যদি বলি পাঁচের দশকটা নিদারুণ-নিপীড়নের মধ্যে থাকার কারণে প্রতিবাদের জায়গাটা খুব সবল ছিলো, এই কথাটা ঠিক। দুরকমই হয়। কিন্তু, পরে কিছুই করা যায় নি, সব মরে গেছে, অথবা মুমূর্ষু। আর তারা যে উঠে দাঁড়ায়। পাঁচের দশকে আমাদেরকে মুমূর্ষু করে ফেলার চেষ্টা হয়েছিলো। পাঁচের দশকের আমরা যারা তরুণ-যুবক, আমরা খুব ভালো করে জানি এ-দেশটাকে নিজের মনে করার কোনো কারণ ছিলো না। কারণ উপস্থিতিই-তো আলাদা। তুমি একটা দোকানে যাচ্ছো‘কিয়া ভাই?’ একটা জুতোর দোকানে যাচ্ছে‘এ লি যে, এ লি যে।’ চারিপাশে কি-রকম একটা আবহাওয়া! আবার আমি যেহেতু ভিন্ন রাজনীতি করা লোক, সে-কারণে একটা প্রত্যক্ষ নিগ্রহের স্বীকার হয়েছিলাম। একেবারে শারীরিক থেকে শুরু করে যা তোমরা কল্পনা করতে পারবে না। তার মানে যেমন ডিপ্রেশন ছিল, রাজনৈতিক দুর্বলতা ছিলো। রাজনীতিতে সরকার পিছিয়ে ছিলো, এখনো তাই। আমাদের এখানে পিছিয়ে আছে যেসব সম্প্রদায় তার মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষাহীন-অনগ্রসর হচ্ছে রাজনীতিবিদরা। এবং যে-আদর্শটা অবলম্বন করে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছে, পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছে, পাকিস্তান হওয়ার পরও যারা যারা জীবিত ছিলো, তাদের মধ্যে একেকটা জ্যান্টস ছিলো। শেখ মুজিব তখনো তরুণ এবং প্রায় একক একজন নেতা। তার মাথার উপরে একটা লোক বসে আছে সোহরাওয়ার্দী। উনি পূণ-বিকাশও দেখতে পাচ্ছেন না, শাসন-দূরদর্শিতাও তৈরী হচ্ছে না। সে-ভদ্রলোক বাংলা বেশি জানে না। তার শিক্ষা-দীক্ষা ইউরোপীয় ধরনের। সে-তো দেশটার কিছুই বুঝবে না। বোঝেও নি। তারপর শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, সে-তো বুড়ো হাতি। (রাজার বুড়ো হাতি হাঁটছে আর ঢং ঢং করে শব্দ হচ্ছে।) ওরা বুড়ো হাতি হয়ে গিয়েছিলো। ওদের দিয়ে আর তেমন কিছু হওয়ার ছিলো না। আর বাকি যারা পণ্ডিত ছিল, পণ্ডিতরা দুরকম কাজ করেএকদিকে আমাদেরকে অনেক কিছু দেয়, অন্যদিকে অনেক কিছু পণ্ড করে দেয়। সবমিলিয়ে পাঁচের দশকে খুব ডিপ্রেসিং ছিল। সাহিত্যেও তার ছাপ পড়ে গেছে। সেই কারণে পাঁচের দশকটা কেনো যে এইরকম আকারে রয়ে গেলো আমরা কারণ খুঁজে পাই না। পাঁচের দশকে একটাও ভালো লেখা খুঁজে পাচ্ছিই না প্রায়। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্ তখন আর দেশে নেই। আবু ইসহাক একটা বই লিখে আর লিখেন নি। সূর্য দীঘল বাড়ি সেটাও-তো প্রায় চারের দশকের। ৪৮ সালে বেরুলো লালসালু। কামুকে আমরা বিখ্যাত বলি বটে। তার বই বেরিয়েছে অনেক পরে। প্লেগ বেরিয়েছে পরে। অন্যান্যগুলো-তো ইংরেজি হয়েছে ষাটের দশকে। কামু দ্বারা প্রভাবিত এসব বাজে কথা বলে কোনো লাভ নেই। উনি ওই-রকমই লিখতেন। মাঝে কিছু কবি আত্মপ্রকাশ করলেন, শামসুর রাহমানের মতো কবি। এখানে একটু হাত ধরাধরি আছে। কবিতার ক্ষেত্রে হাত ধরাধরি হয়। অর্থাৎ তিরিশের কবি একটা গ্র“প। তাদের মধ্যে কতোগুলো কমন ফিচারস আছে। ‘আধুনিক কবিতা’ বলে একটা বই রচনা করা যায়। আধুনিক কবিতায় ইউরোপিয়ান মিথলজি দ্বারা তারা সৃষ্টিকর্মকে নানাভাবে উৎসাহিত করে। যেমন আমাদের পঞ্চ-কবি বলে থাকি। কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করি, কথাসাহিত্যে এ-জিনিসটা এলো না কেনো একেবারেই। কেনো বিভূতিভূষণ এ-পথে হাঁটলেন না? মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় এ-পথে হাঁটলেন না কেনো? একই সাহিত্য, অথচ তার কবিতা-শাখা হঠাৎ একটা আন্তর্জাতিক মানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আর কথাসাহিত্যে আন্তর্জাতিক মানে-তো বলতে পারছোই না, সেই সেকেলে আমাদের বাঙালি নির্ধন গরিব, আচ্ছা এর কারণ কী। আমি কিন্তু অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু এর কোনো জবাব পাই নি। তাহলে কবিতাকে কি বলবো ঠুনকো বা চাপানো ছিলো। তিরিশের দশকের যে অমিয়ভূষণ, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে। সেই-সময়েই লিখা পথের পাঁচালি, সেই-সময়েই লিখা পদ্মা নদীর মাঝি, এদেরকে কেউ আধুনিক বলে না, আর কবিগুলো সব হয়ে গেলো অত্যাধুনিক। বেশিরভাগ ইংরেজিতে কথা বলেছে। দার্জিলিং চা খাচ্ছে। সে-প্রভাবটা কেনো সাহিত্যে? কয়েকজন কবির উপরের ঢেউটা কিন্তু সাহিত্যের উপর নয়। ফলে আজকে এদের আধুনিকতা ফিকে, ফেল করে গেছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ কিন্তু ফেল করে নি। ঐ-সময়টাতে বাদুলে পোকার কিছু উড়েছিল। ঐ তিরিশের দশকেই জনসংখ্যার অবস্থা খুব খারাপ। আমাদের রাজনীতির আবস্থাও খুব খারাপ। সাম্প্রদায়িকতার দেখা তখনও সেইভাবে দেয় নি। ৩৫ সালে কংগ্রেসে মুসলিম লীগ জয়েন করার আগে ঠিক ওই রকম হয় নি। বিশের দশকে দুএকটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছিল তারপর আর তেমন কিছু নয়। কিন্তু এই নতুন ফিচারগুলি সেই সঙ্গে কৃষকদের একটা দুর্বিষহ অবস্থা। তার জন্য একের পর এক কৃষক-সমিতি হচ্ছে, আন্দোলনগুলো ঘটেছে। তিরিশের দশকে এগুলো খুব সাংঘাতিক হচ্ছে। তার ছাপ হাঁসুলি বাঁকের উপকথায় আছে। আর জঙ্গলে পড়ে থাকলে হবে না। এইবারে আমাকে রেলে গিয়ে কাজ করতে হবে। নতুন যুগ সাড়া দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের কবিতা তাদের ব্যাক-সাইডটা আমাদের দিকে এক্সপোজ করে রেখে দিয়েছে। আমি মাঝে মাঝে খারাপ কথা বলে ফেলি, কিন্তু কি করবো বলো? ইউরোপে একটা সাংস্কৃতিক সমতা পাওয়া যায়। আমাদের এখানে সেটা গড়ে উঠে নি। যদিও পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতার পূর্বকাল পর্যন্ত এক-ধরনের অখণ্ডতা ছিলো-তো, এখন আলাদা হয়ে গেছে! এরচেয়ে বেশি কথা বলতে গেলে সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ উঠে যাবে। সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ তুলতে দোষ কিছু নেই। কারণটা খুজলেই হয় যে, কেনো সাম্প্রদায়িকতা দেখা দিল? কারণ, শাসক যখন শাসিতের মধ্যে পড়ে গেলো তখন সেই শাসিতের মধ্যে উন্নতি করলো। কিন্তু কোনো? শাসকদের যারা উত্তরাধিকার তারা হলো না কেন। মনে হয় না? মুসলিমেরাও-তো ছিল। দীর্ঘকাল। পাঁচশ, ছয়শ বছর। মুসলমানরাও-তো ক্ষমতায় ছিল। তারপর কি হলো হঠাৎ? একেবারে, ‘তোমারে বোধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’, প্রায় সে-রকম। মারব ইংরেজকে কিন্তু ইংরেজদের দ্বারাই। মুসলমানদের সে-জিনিসটা হলো না। সেটা কি অহংকার? সেটা কি জাতিগর্ব? কি সেটা? আই ফেইলড টু এক্সপ্লেইন। কেনো এটা হলো, এ-রকম একটা পরিস্থিতিতে সাহিত্যের আধুনিকতা বিচার করাটা খুবই মুশকিল। আবার যে-গদ্য সাহিত্য তৈরী হচ্ছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথকে সাধারণ হিসেবে ধরা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ আছেন তো। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র তার পরবর্তী সাহিত্যিক এক অর্থে বিশ্ব-সাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয় নয় কেনো?  ঐ-সময় যা যা তৈরী হয়েছিলো তা-তো আমরা দেখেছি। ঐ-সময় হয়তো ডিকিন্স, থ্যাকার, হার্ডলি লিখছেন। কি তফাৎ? মূল তফাৎ কি হচ্ছে? একটা তফাৎ হচ্ছে, সমগ্র জাতির ঐতিহ্য পার্ট বাই পার্ট ভাগ হয়ে গেছে। কারণ, সমস্ত দেশ অনেক আগে স্বাধীন হয়েছে। রক্তপাত লড়াই অনেক বেশি করতে হচ্ছে। ওরা নিম্নতম একটা জায়গায় সমতা এনেছেন। কিন্তু ডিকেন্স হাতে নিলে সাধরণ পাঠকরা মুখিয়ে থাকে যে, কখন কপার কিল্ডের পরবর্তী অংশটা আমেরিকাতে পৌঁছাবে? অনেকটা আমাদের হুমায়ূন আহমেদের মতো। একেবারে পতাকা নিয়ে, ‘ডোরাকে মারা চলবে না, ডোরাকে মারা চলবে না। বাঁচিয়ে দিতে হবে।’ একেকটা চরিত্র এ-রকম! তাহলে ধরো, যাকে এ্যাড্রেস করতে হয় লেখকদেরকে সেটা বিরাট, মানে মোড়লের কাছাকাছি। আর উপনিবেশ স্থাপনের ফলে ভাষাটার চলন এতো বেশি বেড়ে গেলো। আমরাও সেসব লেখা পড়তে পারছি। আর পড়লেই তার প্রভাব হবে। প্রভাব পড়লে তার ব্যবহার হবে। এগুলো তখন আমাদের হয়ে গেলো। আর ইউরোপে সেটা ছিল আগে থেকে। এই গল্পটা আমি অনেকের কাছে করেছি। আমাকে একজন রাশিয়ান বলেছিলেনদস্তয়ভস্কি ছাপা হবে কি করে। আমাদের এখানে দশ কোটি লোক সব স্বাক্ষর। বই-ই লেখে কতো! বই জমা দেয় এবং স্ট্যান্ডার্ড বই। সেগুলোই রাখার জায়গা নেই। এতো বেশি! তোমরা যা বই লেখো তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। এই বইগুলোর পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হয়। কেউ তো প্রাইভেটলি বের করতে পারে না। সেই জন্য তো অনেক সময় ফেলেও দিতে হয়। আর হয়তো প্রকাশের মুখই দেখবে না। যদি আমি একটা কপিও খুঁজে পাই। টলস্তয়ের ওয়ার এন্ড পিস পাওয়া যাচ্ছে প্রত্যেককে দোকানে লাইন দিতে হবে। তখন টলস্তয় ছাপতে ছাপতে শেষ। আর বের করতে পারবে না। পরিস্থিতি কি রকম তাহলে দেখো। আমাদের কিন্তু মোটেই তা না। হাসান আজিজুল হক, কে, কে লোকটা? অনেকে হয়তো পেলোই না খুঁজে। তাহলে বার্নাড শ-র মতো বলতে হয় : ‘হড়ঃ ঃড় শহড়ি সব, ংযড়ংি ুড়ঁৎংবষভ ঁহশহড়হি’। আমি কে এটা যদি তুমি না জানো, তার থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, তুমি কিচ্ছু না। আমাদের অবস্থা তাই হয়েছে। বলতে হয় আমি অমুক। তাহলে এই সাহিত্যের পাঠক নেই। অথচ বই বের হচ্ছে। তাহলে পাঠক সীমিত, কম। দুর্ভাগ্যের কথা, বলতে গেলে যারা লেখক, তারাই পাঠক। আমি-তো মনে করি, আমাদের এখন এমন হয়েছে, বান্ধবিকে গান শোনাতে ডাকতে হবে সতীশকে। ‘ও মোর কানাই তোরে জানাই মোর দুঃখ’। কবির কবিতা লিখে ডাকতে হয় কবিকে। কিন্তু কেউ কোনোদিন বলে নি পড়ে কি বুঝলাম, কি পড়লি, কি করলি তুই? এতো কথা তোমাদের বললাম তো, সবগুলি একটু একটু করে কনট্রিবিউট করছে আমার এই কথাগুলোতে। তাহলে আজকের পৃথিবীতে আমাদের যা লেখা হচ্ছে তার বেশিরভাগই সম্ভবত যথেষ্ট মানসম্পন্ন নয় এবং সাহিত্য যখন টেকসই জিনিস দেয়, তখন এক রকম দেয়। সাহিত্য একটা অদ্ভুত ব্যাপার! সিল্কের মতো, যতো কাঁচবে ততো সোনার মতো ঝকঝকে হবে। আমাদের ঠিক উল্টোটা হচ্ছে। হচ্ছে, চকমক করে উঠছে চারিপাশে, তারপরেই বিস্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছে। হুমায়ূন সম্পর্কে কি আলাদা কথা বলব। একই কথা। দাঁড়িয়ে রয়েছে উত্তুঙ্গ মাথা তুলে এরকম ওয়ার্কস খুব কমই আছে। যা কমে যায় তার সঙ্গে উল্লেখ করতে গেলে ব্যতিক্রমের কথা বলতে হয়। এতোটা দুর্দশাজনক একটা ছবি তুলে ধরছি বলে বলতে পারো, ‘আমরা কি কিছু করতে পারি নি স্বাধীনতার পরে? তখন বলতে হয়, করেছো বইকি। একেবারে যে করো নি তা নয়। ষাটের দশকে লড়াই করেছো, কিছু কাজ হয়েছিলো। পাঁচের দশকে লড়াই করেছিলে, কিছু কাজ হয়েছিলো। সবসময় লেখাতে সামাজিক লড়াই দেখাবে তা-তো নয়। সাংস্কৃতিক লড়াইও বটে। আমাদের বিরোধী দেশ যতো বেশি লড়াই ও ততো বেশি। যতো বলছে রবীন্দ্রনাথ গাইবে না, ততো গাইবে। যতো বলছে মুসলিম কবি নাও, ততো পাঁচজন বিখ্যাত বিখ্যাত কবিকে নিয়ে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠান হচ্ছে। যা বলছে তার উল্টো করছে। অথচ মার্শাল ল চলছে, তরুণদের মধ্যেও তাই, আমাদের মধ্যেও তাই। আমরা কারো কথা শুনবো না। তবে আমি অতিক্ষুদ্র প্রাণী। আমি রাজশাহীতে ধূলার পোকার মতো ধূলায় লুকিয়ে থাকি। আমি কিছুই দাবি করবো না। আমি কিছু প্রভাব-বিস্তারও করতে পারি নি। আমি অশিক্ষিত, ব্রাত্য, সত্যিকথা বলছি। আমার বহুত কম পড়াশুনা ছিল তৎকালে। আজকে আমার পড়াশুনা অতোটা কম নেই। কিছু বিখ্যাত জিনিস পড়া ছিল তৎকালে। এছাড়া বলার মতো কিছু নেই। বাংলা ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ পর্যন্ত তারপর বাংলা ছোটগল্প আর কি লেটেস্ট বলতে পারবো না। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প কতোটা এগিয়েছে আমার কোনো ধারণা ছিল না। এটা আমি বলি, কিন্তু লোকজন বিশ্বাস করে না। কিন্তু কথাটা সত্য। কম পড়েছি। পরে পড়েছি অনেক। ডিটেইলে পড়েছি। ভালো করে পড়েছি। তবে দেরিতে পড়েছি। এই সময়টাতে এগুলো যদি হয় নিজে থেকে এগুতে হবে। আমার আর কোনো উপায় নেই। তাই বাধ্য হয়েই আমার যে ইমেজ-স্টিম আছে, তাই চালায়, আমি আর কি করবো। আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ষাটের দশকে গল্প-টল্প লিখি নি। আধুনিক হবার চেষ্টাও নেই আবার বিখ্যাত লোকদের মতো গল্প লিখে বিখ্যাত হবার চেষ্টাও নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক অবস্থার কারণে কোনোটাই আমার ছিলো না। এমন নয় ঢাকায় থাকলে আমি হয়তো এ-রকমই হতাম, কিন্তু আমি যে ঢাকায় থাকি নি এখন হিসেব করে দেখলে দেখি, সেটা আমার জন্য একটা আর্শিবাদ। কারণ আমি ঐ-সমস্ত উটকো আধুনিকতার ঝামেলায় পড়ি নি। লিখেছি একটু আধটু। কিন্তু আমি ওদের মতো করে লিখি নি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যখন কণ্ঠস্বর বের করলো তখন নানা  নেগেটিভ লেখা চারিপাশে, কণ্ঠস্বর-এ আমার বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আমার মতো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কখনো আমাকে বলেও নি, ‘আপনি এ-রকম লিখছেন কেনো? ঢাকায় গেলে আমাকে সন্দীপণের চিঠি পত্র দেখাতো। ওদের পাগলামির খবর দিতো। আমি মজাই পেতাম। তার বেশি আর কিছু না। আমি তখন তাকিয়ে দেখলাম সমস্ত দেশটার দিকে।  কাজেই আমি যদি ঐতিহ্যকে পিছিয়ে দিয়ে থাকি তাহলে বল, তাহলে আমাদের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতি, তারাশঙ্কর কিংবা শরৎচন্দ্রের নিম্নবিত্ত মানুষ, কিংবা রবীন্দ্রনাথের অনেক নিম্নবিত্ত মানুষ এই জায়গাতে  আমার চোখটা চলে গেলো। আর পশ্চিমবঙ্গে এই রকম একটা আবওহাওয়ার মধ্যেই-তো ছিলাম। তখন তো বুদ্ধি জ্ঞান হয় নি। তখন-তো কার্যকারণসূত্র টের পাই নি। পাকিস্তানের সব শোষণ-তো আলাদাভাবে টের পাই নি। মারগুলো-তো তখন পিঠে এসে দমাদম লাগছে। পাঁচের দশকের মার ষাটের দশকে মনে থাকবে না? প্রচণ্ড লাগছে আর কি। আর সেই-সময় মনে হচ্ছে একদম রাখা যাবে না। তখন স্লোগান-মূলক সাহিত্য সেটা খুব সম্ভাবনাময়। আমার সেটা হয়েছে কি-না জানি না। দুটা গল্পে সেটা করেছি স্লোগান-মূলক। আমার তখন আর বিষয়ের অভাব হলো না। আমার তখন আর মনে হলো না আধুনিক সাহিত্য ওরা যা লিখছে তা দেখে লিখি। কিছু করতে হলো না। প্রথম গল্প ‘শকুন’। ব্যক্তিগত, বালক জীবনের একটা ঘটনা। তারপর ‘তৃষ্ণা’। এ-রকম একটা বালককে দেখেছিলাম। কোন গল্পটা না! একেবারে ডিরেক্ট ফ্রম এক্সপেরিয়েন্স। ও যধাব ফবংবৎরনব ড়হষু সু বীঢ়বৎরবহপব। আর আমি নিজে কিছু করি নি। আমি দূরে ছিলাম। কিন্তু লক্ষ্য করছি আবদুল মান্নান সৈয়দ, তার পপুলারিটি, তার সাহিত্যের সুনাম। আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনে কখনো স্বীকৃতিই দেয় নি যে, আমি একজন লেখক। এ-রকম অনেক হয়েছে। পুরোনো-কালের ঐ-গ্রামের বিষয় নিয়ে লেখে। সেই ধারণাটাই ছিলো। আমার কপাল ভালো তোমরা এখন অন্য কথা বলছো। ঐ-ধারণা আমার নিজেরও ছিলো, তাই লোকজনেরও ছিলো। এ-সময় আহমদ ছফা লিখছে ‘সূর্য তুমি সাক্ষী’। আরও দুএকজন লিখছে। আর বুড়োদের মধ্যে সেই পুরানো হাড়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, কাঁদো নদী কাঁদো, চাঁদের  অমাবস্যা। আর-তো তেমন কেউ নেই, আর কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক এরা এসে গেলেন। আর অনেকে পিছিয়ে গেলেন যেমন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত আলি, এঁরা তেমন কিছু করলেন না। পরবর্তীকালে ষাটের দশকে আবার নতুন করে জেগে উঠলেন। পাঁচের দশকে সাহিত্য অন্তত একটু জামা কাপড় বদলালো। আর কবিতায় যে-উগ্রতা তিরিশের দশকে শুরু হয়েছিলো তাই পঞ্চাশে ছিল এবং ষাটে দেখা গেল। তখন বোদলেয়ারের চাইতে বুদ্ধদেব বসু বেশি বিখ্যাত। কারণ বোদলেয়ার অনুবাদ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। এমন নানা-রকম ব্যাপার-স্যাপার। আমরা এসব পড়ছি। উদ্ভাবিত হচ্ছি। কিন্তু অভিভূত হবার ব্যাপারটা আমার জীবনে ঘটে নি। এখনো আমি সহজে অভিভূত হই না। সে-জন্যই তোমার এ-প্রশ্নের এতোবড় করে জাবাব দিলাম। আজকে মনে হয়, যে-ব্যতিক্রমগুলি বাদ দিলে আমাদের সাহিত্যের শাখাগুলি যে জোর পাচ্ছে তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। যতো দিন যাচ্ছে জোর যেনো ততোই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তারুণ্য যেনো আরো ক্ষীণ হয়ে আসছে। তরুণের  গলা আর সেভাবে শোনা যাচ্ছে না।
এর কারণ সামগ্রিকভাবে শিক্ষা। সংস্কৃতি ও শিক্ষা। শরৎচন্দ্রের এতো পাঠক ছিল, এখন আর হয় না। তার কারণ শুরুটা দেখেছে-তো ৪৭-এ। তারপরে এই সাম্প্রতিক-বিশ্ব। তারপর আমাদের এই লেখাপড়া তারপর পাকিস্তানের ছেড়ে চলে যাওয়া। ফলে আমরা যে একটা জাতি সুবিকশিত হব সেটার কোনো সুযোগ হলো না। একাত্তর সালের পরে না রইল আদর্শ, না রইল কিছু। দোষারোপ-তো সাহিত্যের হল। ধরে চাপকানো উচিত রাজনীতিবিদদের। তারা শুধু খেয়েছে, তারা কিছু করে নি। তা না হলে এ-রকম হবে কেনো, তারা যদি কিছু করেই থাকবে তাহলে জাতির জনককে মেরে ফেললো কেনো?। চার নেতার মৃত্যু ঘটে কেনো? সব ঠিক মতো যদি চলতো তাহলে তাজউদ্দীন আর শেখ মুজিবের মধ্যে ফারাক তৈরী হলো কেনো? সব যদি ঠিকভাবে চলবেই তাহলে বাকশাল হলো কেনো?
যা হোক, দুটি কারণে আমার কথা বলা অনেকটা মুশকিল। এক. আমার বয়স হয়েছে, আমার আর তেমন দেবার কিছু নেই। কাজেই বেশি বকবক করাটা আমার উচিত নয়। যেটিই তোমাকে বলছিলাম। কবিতার ক্ষেত্রে সেটা এ-রকম হচ্ছে কেনো? আমি ভাবার চেষ্টা করি। সে-রকম আমাদের নয় কেনো। শামসুর রাহমান বড়ো কবি। পরবর্তীতে উনি যেটা করেছিলেন সেটা একটা ভালো জিনিস। সাধারণ মানুষকে এ্যাপিল করতে পারা! এমন জিনিসগুলো নিয়ে খুব হৃদয়দ্রাবক লেখা লিখেছিলেন। ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘আসাদের শার্ট’ ইত্যাদি। তিনি পুরো সেন্টিমেন্টটা ধরতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর যেটা বিশেষভাবে বিকশিত হয়ে উঠল। কবিতা শক্তির জায়গা থেকে হিসেব করলে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভূত কবিতা শক্তি যা তিনি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। বিষয়বস্তু অনেক-সময় আমি বুঝতে পারি না। আল মাহমুদও কিছু দেশজ উপাদান ও সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন। সেই জায়গা থেকে বলতে গেলে সেই পুরোনো নামই করতে হয়। আবুবকর সিদ্দিক বা আমরা যারা অবসিত তাদের নামই করতে হয়। কিন্তু এটা-তো কোনো কাজের কথা হলো না। আবার পৃথিবীর দিকে যদি তাকিয়ে দেখি কবিতা এমনিই কেমন যেনো মার খেয়ে গেছে। তার বাস্তব কারণ প্রযুক্তি। এই আলোচনা এখানে থাক। ভীষণ লম্বা হয়ে যাবে। এর কারণ কি। মানুষের যে জীবন-যাপনটা স্বাভাবিক সেখানে যখন ভীষণ পরিবর্তন ঘটে তখন মানুষটাকে এক-রকম বদলের দিকে তাড়ায় আরকি। যে-অবসর, যে-শান্তি, যে-কর্মকোলাহলহীনতা তারপর জীবন ধারণের স্বাভাবিকত্ব, চিরাচরিত অভ্যাস থেকে সরে যাবার পরে প্রযুক্তি একেবারে আমাদেরকে টেনে অন্য দিকে নিয়ে গেছে। এর থেকে মনে হয়েছে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ বাড়ে নি বরং কমেছে। যোগাযোগ যদি কমেই থাকে, মানুষ মানুষকে অনুভব করবে কী জন্য? আবেগগুলো কাজই বা করবে কেনো? ধরো ইউরোপে নারী এতো সুলভ, সেখানে একটা শেলী আর পাওয়া যাবে না, আমাদের এখানেও প্রায় সে-রকম জায়গায় চলে এসেছে। কাজেই কবিতার যেটা জায়গা আমার-তো ধারণা ইনটিলেক্ট ছাড়া কিছুই তৈরী হয় না, কিন্তু তার মূল উপাদান হলো গভীর অনুভব এবং উপলব্ধি। এবং সেটা কোহেরেন্টলি হওয়া দরকার। সেটা যদি কোহেরেন্টলি প্রকাশ না পায় তাহলে কিন্তু সেটা কবিতা হবে না। রবীন্দ্রনাথও অনেক চেষ্টা করেছেন কিছু আবোল-তাবোল কবিতা লিখতে। কিন্তু আমি দেখেছি অর্থ নেই, অথচ দারুণ! এখন সে-রকমটাও তো হলো না। খুব গম্ভীর কবিতা সব। তাও-তো বুঝতে পারি না।  অতোটা কিসের প্রেম? কি লেখে? প্রেমটা-তো আমি ভালো বুঝতে পারি না। প্রেম আর সেক্স এর মধ্যে পার্থক্য কি আমি ভালো বুঝতে পারি না। একটারে ছাড়া আরেকটা আদৌ সম্ভব কি-না তাও বুঝতে পারি না। যা বুঝি না তা নিয়ে অনর্থ মাথা ঘামাতে চাই না। কবিতা মানেই ‘তুমি’ আছে। ‘তুমি পাশে থাকলে’, ‘তুমি চুল এলিয়ে দিলে’, ‘তুমি বারান্দায় বসে থাকলে’, ‘তুমি গান করলে’ এই-সব, অন্য-কোনো বিষয় নিয়ে লেখে না। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তবু তো উপদ্রুত উপকূল নিয়ে লিখেছিল। আবুল হাসানও-তো ‘পাতাকুড়ানি মেয়ে’ লিখেছিল, আল মাহমুদও ‘নদীর মতো বল কন্যা কবুল কবুল’দারুণ সমস্ত কবিতা। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী ছিলেন তো। এদের চেয়ে খারাপ কবিতা লিখবো না, বড় লিখব তা কথা নয়। আলাদা কবিতা লিখবো। তো আলাদা কই? হচ্ছে কোথায়? কবিতা লেখা বা পাড়ার দিকে আমি যাই নি। কিন্তু জায়গাটা-তো বুঝতে পারি, কবিতা আমাদের কোন জায়গাটা দখল করে রয়েছে? টের পাই, নিজের লেখা থেকে-তো আমার একটা ধারণা আছে, কাউকে বলি বা না বলি। সেজন্য আমি বলি যে, কবিতা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তাই বলে কবিতা সম্পর্কে বলতে আমি একফোটাও ভয় পাই না। কেননা কবিতা-তো কারো পৈতৃক জিনিস না। আমার অধিকার আছে, আমি গান শুনে কি অনুভব করব। বলতে পারো, আপনি তাল বুঝেন নি, লয় বুঝেন নি, এ-ছাড়াও যা বুঝেছি তাও আমার বলার অধিকার আছে। কবিতা সম্পর্কে সে-কথা বলব, দেখো মাঝে-মাঝে পড়ি। উল্লেখ করার মতো কবি, করলে আমি করতে পারবো দশ-পনেরো জনের কথা। কিন্তু বলে লাভ কি। এরা এ-রকমই সব। খুব-তো অসাধারণ কিছু নয়। আর গল্প! এটা উঠে গোলো না-কি। সারা পৃথিবীতেই আর গল্প দেখি না। এই ল্যাটিন আমেরিকান, এরা তবু গল্পের নাম করে ছোট-উপন্যাস বা অনেক কিছু করেছে। কিন্তু এখানে আর তেমন গল্প দেখি না। কাজেই এ-শাখাটাও চলতে চলতে মৃত হয়ে পড়েছে। তারপর এক-বছর দেখেছি উপন্যাস, উপন্যাস জীবন্ত। তার কারণ হচ্ছে উপন্যাস একটা কাজ করতে পারতো, এর হাতির মতো ধারণ শক্তি, সেই কারণেই প্রচুর আবর্জনা তৈরী হয়ে যায়। আমি একেকজনকে বলি, ভাই তিন কেজি মাংস খেয়ে শরীর শক্তিশালি রাখা ভালো, না-কি আড়াই-মন ঘাস খেয়ে শরীর হাতির মতো করা ভালো?
কবিতা আর গল্প প্রায় শুকনো স্রোত। উপন্যাসটা কিন্তু অনেক বেশি হচ্ছে। যান্ত্রিক-জীবনের উপলব্ধি উপন্যাসের ধারণ-ক্ষমতা বেশি। ঐ-যে বললাম উপন্যাসের ধারণ ক্ষমতা হাতির মতো। প্রচুর খেতে পারে কিন্তু সেটা হয়তো অসাঢ়। কোনো লাভ হয় না, তার চেয়ে দশ কেজি মাংস খেয়ে একটা সিংহ অনেক ভালো থাকে। ঐ-ভাবে যদি তুলনা করি তাহলে বলব আমাদের খড়-বিচালি বেশি। প্রচুর খড়-বিচালি। তারমধ্যে কিছু কিছু পাওয়া যাবে অমূল্য রতœ। আমাদের এখানে উপন্যাসটা অন্য দুই শাখার চেয়ে একটু পপুলার হয়েছে। পপুলার হওয়ার কারণ হুমায়ূনের মতো লেখক বা জাফর ইকবালের মতো লেখক। আমার যা মনে হয়, আমার নিজের লেখা বেশির ভাগ লোকই পড়ে না, কিন্তু আমার সাথে কথা বলতে চলে আসে। কিছুই পড়ে না। না পড়ে কথা বলতে আসাটা আমাকে অপমান করার সামিল। এ আবার কি কথা! সাংবাদিকরা কিছুই পড়ে না, উপন্যাসই পড়ে না। ট্রেনে বাসে বিক্রি হওয়া সস্তা বইগুলোও বিক্রি হয় না। এদের পাঠাভ্যাসই নেই। আমাদের এখানে পড়ার প্রবণতা বাস্তব কারণে কমেছে আবার আমাদের জাতীয় কারণে কমেছে। আমাদের জাতি যা দরকার তা না করে, যা দরকার নয় তাই করে। খারাপের দিকেই যাচ্ছে। নিজের কথাই বলি। আমার স্মৃতিকথা ৩য় খণ্ড যখন পড়বে তখন কিন্তু তুমি পাবে আমার কৈশোর বেলা, খুঁজে বেড়ানো আর লেখাপড়া। তুমি একটু অবাকই হবে। এতো বিষয়ে আগ্রহ কী করে! এসব-তো স্বাভাবিক গল্প। এতো আগ্রহ কেনো? আমি এখানে লিখেছি রবীন্দ্রনাথের গল্প কখন পড়েছি। কিন্তু এতো জেনুইন, একটাও বাজে কথা ভেবে লিখতে হচ্ছে না। কারণ আমার স্পষ্ট গল্পগুলোর লাইন বাই লাইন মনে রয়েছে। শেষ মনে রয়েছে। এমনভাবে পড়েছি। গেল কোথায় সেই পড়াটা ছেলেমেয়েদের।
একটা হচ্ছে যে পেট, বাবা, ওর উপরে কোনো কথা চলবে না, সেটা চালাতেই হবে। চাকরি বাকরির এই অবস্থা। ভালো এডুকেশন নিয়েও কিছুই হয় না। প্রযুক্তিও একটা কারণ। প্রযুক্তির কোনটা আমি নেবো কোনটা না, তা-ও তো বুঝতে হবে! আমি হিসেব করে দেখেছি, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ-বিজ্ঞান, সাহিত্য এইগুলোই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। বিজ্ঞানের যে-অংশটাকে নলেজ বলা চলে সেটা তো নেই। তাহলে কেমন করে কি হবে? এই পরিস্থিতিতে পড়ে দেখা যাচ্ছে, একটা দুইটা উপন্যাস হচ্ছে। এটা ব্যতিক্রমই বলব। কিংবা উপন্যাসের ক্ষেত্রে হয়তো এটাই হয়ে থাকে। নাইনটিন সেঞ্চুরির একটা নতুন উত্থান-তো উপন্যাস।
আমি অতোটা হতাশ নই। এখন কিন্তু একটা বিষয় ভালো হয়েছে। সেটা হলো প্রবন্ধ-সাহিত্য। তার মানে প্রবন্ধে কিন্তু জ্ঞান, পাঠ সবকিছুর পরিচয় থাকে। প্রবন্ধটা একটু উন্নত মানের হচ্ছে। কিন্তু প্রবন্ধের মান উন্নত হলে ক্রিয়েটিভের মান উন্নত হবে এটা-তো সংযুক্ত নয়। হতাশ হয়ো না। কারণ একজন শহীদুল জহির-কে যখন পেয়েছিলে, একজন মাহমুদুল হককে যখন পেয়েছিলে। এখন যারা লিখছে, যতো পুরানো ঢঙেরই হোক, তবু-তো লিখছে। আমার ধারণা মানুষ ব্যাক করবে একদিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের জেনারেশনের নাম ছিলো ‘লস্ট জেনারেশন’। সেখানেও হ্যাভেনের মতো শিল্পি তৈরি হয়েছিলো। এই সময় কবিরা ছিল, পেইন্টাররা ছিল, লস্ট জেনারেশনের। লস্ট জেনারেশনের যে সৃষ্টি পরবর্তীকালে আর তাও নেই।
এখন নতুন একটা ছেলে দেখবে কি করে? সে জানে না তো লিখবে কি করে। অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত যে গোল্ডেন এ+ পেয়ে পাস করে এসেছে। তাকে যদি বলি, ‘আমি এস.এস.সি তে গোল্ডেন এ+ পেয়েছি’-এর ইংরেজী বলো। সে বলতে পারছে না। তার মানে তাকে শেখানো হয় নি। তাহলে কি করতে হবে? সম্পূর্ণটাকেই ঢেলে আবার নতুন করে করতে হবে। তার মানে সমাজটার এই গড়ন রাখা যাবে না। যতোক্ষণ পৃথিবীতে মুনাফা ও পণ্য আছে ততোক্ষণ প্রযুক্তি থাকবে। সেদিন দেখলাম যে, এক ভদ্রলোক বলছেন যে, এটা তো মানব-স্পর্শ মুক্ত সভ্যতা! ধ্বংস আরম্ভ হয়েছে। উইজডমের সাথে নলেজের এমন ব্যাপক বিচ্ছেদ ঘটে গেছে যে, এখন সবকিছু ইনফরমেশন ও নলেজ হয়ে গেছে। কিন্তু ঐহ্যিক বিষয় থেকে কখনো জ্ঞান জন্মায় না। যদি জন্মাতো তাহলে সমস্যা ছিলো না।
আমি বললে-তো উপদেশের মতো শোনাবে। প্রত্যেকটা মানুষকে নিজের জীবনের কাজ বেছে নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, এটা করার জন্য আমার জন্ম হয়েছে। এর থেকে উচ্চতর কিছু করতে হবে। লেখার বিষয়টা যদি ঐ-ভাবে গ্রহণ করা না যায় তাহলে কখনো উন্নতি করতে পারবে না। আমি ঢাকাতে থাকি অতএব আমি অনেক বেটার লিখি। কিংবা এতো লোক আমাকে প্রশংসা করল আমার মতো বড় লেখক আর নেই। এটা কোনোই হেল্প করবে না। কোনো কিছুতেই হেল্প করবে না যতোক্ষণ পর্যন্ত না একজন লেখক মনে করবে যে, আমি লেখক। সেইটা আমার একমাত্র অবধারিত নিয়তি। আর কিছু করার নেই। আমি আজকাল লোকজনদের বলি আমার সাথে পলিটিক্স নিয়ে আলোচনা করবে না।
প্রথম থেকেই মনে হয়েছে আমার কিছু হওয়ার নেই। কিন্তু প্রফেসন-তো একটা থাকতে হবে। লেখকের জন্য সবচাইতে কাছাকাছি প্রফেশান হচ্ছে টিচিং, আর সবচাইতে দূরের প্রশাসন। তখনকার যে ঈঝচ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এগুলোর  ক্রেজ ছিল, তা আমাকে স্পর্শও করে নি। তাই মনে হলো, আমি যে-করে হোক মাস্টার হব। তখন মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়েরই মাস্টার হব। পাস করার পর থেকে তেরো বছর বিভিন্ন কলেজে, ইনক্লুড স্কুল। কিন্তু ঠিক ছিল আমার লেখালেখিটা। লেখালেখিটা কেনো? কারণ, আমি যা জেনেছি তার ভাগ আমি সবাইকে দেবো।
চিন্তার ফ্যাকালটিটার এখন কোনো নারিশমেন্ট হচ্ছে না। এই ফ্যাকালটিটা, আমাদের যতো-রকম ফ্যাকালটি আছে তার মধ্যে ইনটোলিকচুয়ালিটির কোনো নারিশমেন্ট হচ্ছে না। প্লেটো বলেছেন তিনটি মূল ফ্যাকালটি আছে। একটা হচ্ছে পিওর র‌্যাশনাল ফ্যাকালটি। মানুষের সঙ্গে এর মৃত্যু হয় না। সেটা অমর জিনিস। আর একটা হচ্ছে আমাদের মহৎ-প্রবৃত্তি। মহৎ-প্রবৃত্তিগুলো সারাজীবন মহত্ব, দয়া, মায়া ইত্যাদি দেখায়। দেহের সঙ্গে থাকে। আর একটা হচ্ছে নিম্নতম-প্রবৃত্তি। নিম্নতম প্রবৃত্তিগুলোর জন্য মানুষ পাগল হয়, কামড়া-কামড়ি করে, লোভ, লালসা যাবতীয় কিছু করে। এটা-তো একদম দেহ থাকা না থাকার সাথে সম্পর্কিত। দেহ নেই-তো এগুলোও নেই। এভাবে যদি তুমি দেখ, একটা মানুষের ভাগ যদি করো, একটা মানুষের মূল পরিচয় হলো তার ইনটেলিকচুয়লিটি, যেটা র‌্যাশনাল বষবসবহঃ। সেটার-তো নারিশ করতে হবে। সেই নারিশমেন্ট-এর কোনো ব্যবস্থা নেই।  আমাদের চিরকাল বলে এসেছে, ‘তোমরাও কর, তোমাদেরও এ-রকম হবে’! আমি এ-রকমই বলি, বললে উপদেশ হয়, কিন্তু আমি এসব মানি। লেখক হওয়া, আর-তো কিছু হওয়ার নেই, তা বললে-তো হবে না। লেখক হবো, সম্মানের অধিকারী হবো, ক্ষমতার অধিকারী হবো, টাকা-পয়সার অধিকারী হবো, সব হতে চাইলে-তো হবে না। তাহলে-তো আমাকে আগেই ঠিক করতে হতো যে, এ-পথ তো আমার নয়। এই জিনিসটা ভালো করে মাথায় নিয়ে প্রত্যেককে বলি যে, দেখো এটা একটা এক্সক্লুসিভ ট্যুর। পজিশন। নড়বার চড়বার অলটারনেটিভ নেই। এটা একক একটা জিনিস। সেটা ছিল। তা নইলে স্কুলে মাস্টারি করে, আট-আনা থেকে একটাকা পারিশ্রমিক, দিন পাঁচটা সাতটা গল্প লিখি, একটা চটের থলিতে ভরে অফিসে অফিসে যাচ্ছি আর মুচকি মুচকি হাসছি আর ভাবছি এইটাই-তো আমাদের একমাত্র ঔষধ। আর কোনো কাজ নেই। একটা সাইডে থাকতে হবে। লেখা, আর জার্নালিজম অনেকটা কাছাকাছি, টিচিংও অনেকটা কাছাকাছি, তাছাড়া কোনো প্রফেশনই নেই। এক্সক্লুসিভ রাইটার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কোনো প্রফেশান ছিল না। তারাশঙ্কর কোনো চাকরি বাকরি করেন নি। আমি দেখছি যদি লেগে থাকা যায়, এ-কথা ঠিক যে, ঠকতে হয় না। আমি যে এই পজিশনটা বলছি, যে-রকম আদর্শের সঙ্গে যাচ্ছি কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এটাকে কেউ-তো অনুসরণ করে না।
লেখালেখির ব্যাপারে আমার মনে হয় কোনো একটা জায়গা অব্যাখ্যাত থেকে যায়। ব্যাখ্যা করা যাবে না। তোমার এ-প্রশ্নটার উত্তরে বলতে হয়, আমি প্রত্যেকটা গল্প লেখার সময় তীব্রভাবে সচেতন হয়ে অন্য গল্প থেকে আলাদা একটা ভাষা ব্যবহার করতে বসলাম, এ-রকমটা করে হয় না। আরেকটা কথা, আমার মনে হয়, রিপিটেশন জিনিসটা বিরক্তিকর। একজনের রিপিট করা, একই কথা, রিপিট করা বিরক্তিকর। অবার একই অনুভব বারবার চালানো সেটাও বিরক্তিকর। আমি যখনই কোনো গল্প লিখতে বসি, আমি ভাবি যে, এটা-তো অমুক গল্পের মতো করে লেখার দরকার নেই। আমার সব গল্পের ভাষা একভাবে তৈরী নয়। কেনো নয়? আমি কি ইচ্ছে করে এ-রকম ভাষা লিখেছি। ইচ্ছে করে একটা দুটি গল্প আমি ভাষার উপর জোর দিয়ে লিখেছি। সেটার জন্য আমি অনুতপ্ত। না করাই উচিত ছিল। সেটা হচ্ছে, ‘জীবন ঘষে আগুন’। এখানে ইচ্ছে করে ভাষাটাকে নিয়ে কাজ করা আছে। তাছাড়া ভাষাকে নিয়ে আমি বিশেষ করে গুরুত্ব দিই নি। মনে করেছি যে, আমি যা করতে চেয়েছি সেইটার বাহন হবে ভাষা। তাই না? কয়লা নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রেন দরকার। কয়লা নিয়ে যাওয়ার জন্য যদি গরুর গাড়ি খোঁজো তাহলে হবে না। সেইটা ভাবতে হবে। গল্পটা লিখব, বহন করবে-তো ভাষা। কেমন ভাষায় তাহলে আমি লিখব? নৌকো না-কি উড়োজাহাজ? কিসে গতি আসবে। আর রিপিটেশন করবো না। নিজেকে রিপিট করবো না। আর রিপিট না করা মানেই হচ্ছে আমি বাধ্য হয়ে চিন্তার ধাঁচই গড়ে তুলবো। প্রথম বাক্যই আলাদা হয়ে যাবে। প্রথম বাক্য নিয়ে আমি একটু ভাবি। ভেবে মনে করি ও-বাবা এতো সমরেশ বসুর চা-এর স্টল হয়ে গেলো। না এটাতো চলবে না। এ-রকম ভেবেছি, ফলে উৎকৃষ্ট হয়েছে, লোকে বলে। যেমন ‘আত্মজা একটি করবী গাছ’ আমি তিন-চার চার লিখলাম, তারপর প্রিন্ট আনার পর এতোই বিশ্রী লাগলো! কতোবার পড়ি, হঠাৎ আমার মধ্যে একটা বোধ জাগ্রত হলো। ‘এখন শীতকাল’ এইটা দিয়েই শুরু হলো।
দেখ, একেকটা মানুষের একেকটা অনুভূতি। কারো লম্বা গল্প শুনতে ভালো লাগে, কেউ লম্বা গল্প শুরু করলে মনে হয় কখন ছাড়বে-রে বাবা। আমার ঠিক এ-রকমই। এটা আমার ধরণ হয়ে গেছে। বাক্য নিয়ে আমি খেলা করি না, আমি বলি যে, ভাষা নিয়ে লেস মনোযোগ দাও। এতো ভাষার সৌকর্য দরকার নেই। যদি কৃত্রিম লেখক হতে না চাও তাহলে ভাষার অতো সৌকর্য দেখিও না। ভাষাটাকে চলতে দাও তার মতো।
ভাষাকে এমন করে আমি ব্যবহার করতে চাইছি যাতে ম্যাক্সিমাম ফল তার কাছ থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু নতুন ধাঁচ বা নতুন কিছু করার চেষ্টা করার দরকার নেই। আর বাংলা ভাষার শব্দের প্রাচুর্যও-তো আছে। সেটা কেউ ব্যবহার করে না। সেটা করতে পারলে খুব ভালো। এই আমার এখানে একটা পাণ্ডুলিপির প্র“ফ আছে, এখানে লেখা আছে, ‘স্যার ইয়োলো কালি দিয়ে দাগ দেয়া জায়গাগুলো বিশেষভাবে লক্ষ করবেন। আমি লক্ষ করে দেখলাম যে, সে-রকম যদি দশটা জায়গা থাকে তার মধ্যে আটটা আমারটাই ঠিক। ওরা ওটা বুঝতে পারে নি।
পুরোনো বই কিনতে গেলাম, প্রত্যেক পাতায় পাতায় ছেড়া, যেখানে-সেখানে মন্তব্য লেখা। কোনোটা পেন্সিলে, কোনোটা কলমে, কোনোটা-বা কার্বন পেন্সিলে। সেই জায়গাগুলো ধেবড়ে গেছে। কার্বন পেন্সিলে লেখা জায়গাগুলো ধেবড়ে গেছে। লিখেছি, ওরা বুঝতে পারে নি। আমি লিখে দিলাম, ঠিক আছে। এমন হয়, শব্দ-তো নিজস্ব। দুম বললে দুম বুঝায় না। ধ্বনিই আমাকে বলে দেয় যে, এর অর্থ কি। ধেবড়ে গেছে বললে বোঝা যায় যে, ধ্যাবড়ানো বা নষ্ট হয়ে গেছে।  আমি এরকম অনেক কথা ব্যবহার করেছি। বিশেষ করে আমি যখন সুযোগ পাই, মানুষের কাছে, মানুষের মধ্যে কথা বলার, তখন আমি খুবই মনোযোগের সাথে লক্ষ করি। সে-জন্য মুখে বলতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। মুখে কথা বলাও যেমন লেখাও তেমন। তফাৎ হয় না খুব একটা। কোনো কোনো মানুষ একটু বেশি বুঝলে-তো ঠকবে। বেশি গ্রাম্য, বেশি গ্রামীণ শব্দ, আমি ইচ্ছে করে বললেও বুঝবে কি? যেমন ধরো, খুব ঝগরাটে দুই বোন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে, হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে। খুব তাল দিচ্ছে। যাচ্ছেতাই মুখ খারাপ করে গাল দিচ্ছে। হঠাৎ একজন গাল দিয়ে যাচ্ছে, আরেকজন চুপ করে আছে। আসলে চুপ করে নেই, সে আঁচলটা পেতে আছে। গাল দেয়া হলে, এবার
উপন্যাস বরাবরই লিখতে চেয়েছি। কিন্তু লেখা তেমন আর হলো না। এটাও একটা যুক্তিসঙ্গত কথা, লিখতে চাই কিন্তু অতো লিখার সময় পাই না। আর বললাম, রিপিটেশন করবো না। এই বয়সেও রিপিটেশন করবো না। বয়স বেশি হলে মানুষ বেশি কথা বলে, আমি তা বলতে চাই না। অন্তত লেখাতে নিশ্চয়ই না। আমার অদ্ভুত লাগে, কয়েকজন বড় লেখক আমাকে টানে না। বড়ই বিশিষ্ট ভাষা, ঐ ভাষাটা প্রাণহীন মনে হয়। আর্টিফিসিয়াল মনে হয়।
জ্যোতিপ্রকাশের গল্পÑ অসাধারণ সব গল্প। কিন্তু বেশি যতœ হয়েছে। এতোটা যতœ ভালো না। আমার মনে হয় একটু এলোমেলো থাকা ভালো। কারণ আমি যতোদূর জানি, রুশ-ভাষা তো জানি না, কিন্তু মন্তব্য করতে শুনেছি যে, তলস্তয়-এর ভাষা ভেরি ব্যাড। ব্যাড হোক আর যাই হোক, ওয়ার এ্যান্ড পিস আর পৃথিবীতে লেখা সম্ভব হবে না। তারপর দস্তয়ভস্কি, অতিকথন, দারিদ্র্যের জন্য। বড় ভাই তার ঘাড়ে সংসার ফেলে দিয়ে কেটে পড়ল। তখন-তো ড়িৎফ ধরে-ধরে পয়সা। ফলে, ইনফ্লেটেড করে দেয়। তারাশঙ্কর ইনফ্লেটেড, কিন্তু মানিক বন্দোপাধ্যায় তা নয়। মনে হয় যেনো কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে। একেকজনের একেক রকম অদ্ভুত স্টাইল আছে।
আসলে আমার ধারণা বেসিক্যালি বদলায় নি। যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে ক্রমাগত নতুন নতুন জিনিস জড়ো হয়েছে। আরেকটা জিনিস, আমার মনে হয় আমার পড়াশুনা করাটা উপকারে এসেছে। বিশেষ করে উপন্যাসিকের পক্ষে সবকিছু খুব ভালো করে জানা দরকার। অর্থনীতি না জানলে একালে উপন্যাস লেখা উচিত না। রাজনীতি না বুঝলে একালে উপন্যাস লেখা উচিত না। এগুলো যদি তুমি ধরতে পারো তাহলে মনে হবে কি সমাজটা তোমার কাছে অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে। এজন্য আমার পড়াটা আমি বহাল রেখেছি। এখনো আমি বিভিন্ন দার্শনিক যারা আছেন তাদের বই পড়ার চেষ্টা করি। ইচ্ছে করে যে লিখি তাদের পক্ষে-বিপক্ষে কিন্তু এতো সময় আমার নেই। এখন আমি বসে বসে পোস্টমর্ডানিজমের উপর একটা লেখা লিখতে যাবো, না, সে আলাদা জগৎ, তা করতে গেলে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে করতে হবে, এভাবে হয় না। প্লে¬ন কথা প্লেনভাবে লিখব, এই। মা যে ভাষাতে কথা বলতো, ‘আমার যখন ল বছর বয়েস তখন আমার ভাই হলো আমার মা তাকে আর আমাকে ল বছর রেখে মরে গেলো। ভাই তখন ছোট। আমারই উপর এসে পড়ল। আমি তখন কাকালে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ভাই কিরমে কিরমে আমার কাকালের পুটলি হয়ে গেলো।’ চললো-তো চললো। ব্যাস। তারপর মা বলে ব্যাডা হচ্ছে? হ্যাঁ হ্যাঁ হচ্ছে হচ্ছে, তুমি বলো। মা দুটো তিনটা কথার পরেই একটা কথা বলে যে মরে যাওয়া লাগবে। তারপরে বাপ ছিল, আরো বিয়ে করলে, তিনটা ছেলে হলো তারপর বাপ আমার মরে গেলো। তারপর একটা ছোট ভাই হলো। ছোট ভাইটা বেশি বড়ো হলো না। তারপর সে মরে গেলো। মরে গেলো ক্যান, মানুষের-তো মৃত্যুই অধিক। মানুষের জীবনের সবটাই-তো মৃত্যু। সেটা একটা স্টাইকের পয়েন্ট। মানুষের মরে যাওয়াটা। মানুষ একবার মরে না হাজার হাজার বার মরে। আকস্মিকভাবে এই চিন্তাগুলো দেখা যায়। আমি আগে যে চিন্তা করি নি। আকস্মিকভাবে এ-চিন্তা দেখা যায়, মনে হয় সামথিং বিস্ময়কর। এটা কেনো মনে হচ্ছে। আমি সর্ব বিষয়ে খুব ছেলেমানুষ। তুমি চিন্তা করতে পারবে না। বলবে স্যার আপনি ছেলেমানুষের মতো কাজও করেন? হ্যাঁ, আমি করি। আমি এখনও বাচ্চাদের বই পড়ি। এখনো পর্যন্ত সিরিয়ালগুলো দেখি। সিরিয়াল দেখে আবার রিঅ্যাকশানও হয়। ও মবঃ বহাড়ষাবফবেশ ভালোই। আমার কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায়। তারপর তোমরা যে এলে এটা ‘ওয়ান অব দা প্লি¬েসন্ট ডেইজ অব মাই লাইফ।’
যা হোক, আমি লেখার সবটুকু দায়িত্ব পালন করতে পারি নি। আমি যদি শতশত বছর বেঁচে থাকি তাহলেও এ-কথা মনে হবে যে, শেষ করা গেলো না। এতো অন্তহীন কাজ আছে। আমি যা করেছি তার সব ভালো করতে পারি নি, সে-ক্ষেত্রে বলি, আমি সবচাইতে কম পড়ি আমার নিজের প্রকাশিত রচনা। কারণ আমার নিজের প্রকাশিত রচনা আমার কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুব দুর্বল মনে হয়। খুব কমন বলবো না। আমি যে খুব বিরাট কিছু করতে পেরেছি তা মনে হয় না। আর আমি কালকে দেখি, পৃথিবী দেখি, সভ্যতা দেখি। তারপর মনে হয় যে, কোনো কিছুই কারো নতুন করে জানার নেই, জানানোরও নেই। সবাই সবকিছুই জানে। আলাদা কি? আলাদা ব্যক্তি হিসেবে জন্মেছে। এই জন্যই আলাদা। তোমার একটা আলাদা কনসাস আছে। কেউ যদি বলে, সারাজীবন আপনার কী ক্ষোভ থেকে গেলো, না-কি আপনি সন্তুষ্ট থাকলেন? আমি কি বলি, কাজটা করেছি। ১০০ ভাগ সন্তুষ্ট নই, কিন্তু সন্তুষ্ট মোটামুটি থাকতে পেরেছি। বললাম তো, দুইশো বছর বাঁচলে আরো লিখতাম। সে-রকম জিনিসও আছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস যোগ হচ্ছে-তো। বদলাচ্ছে না-তো। কোনো কিছুই-তো বদলে ফেলি না। ঠিক আছে আমি এগুলো ভুলে গেলাম তা-তো হয় না। তাই সেই দিক থেকে আমার অসন্তুষ্টিও নেই, অতিসন্তুষ্টিও নেই। আমার খ্যাতির প্রতি মোহও নেই। অতিমোহ নেই। বরং উল্টোটা। তুমি কি টাকা দিয়ে আমাকে কিনবে না-কি, এটা আমার মুখে আগেই চলে আসে। আমি তো মাস্টার হয়েছিলাম এজন্য যে, প্রত্যেকটা বিষয়ে আমি ধনংড়ষঁঃব ভৎববফড়স ভোগ করবো। যেটা একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই পারে। কারো কথা তাকে শুনতে হয় না। লেখক হওয়ার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা। আমাদের মতো একটা বিশ্রী-সমাজে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো পেতে পারে। প্রত্যেক দিন জবাবদিহি করতে হয় না।
আমার লেখায় টুইস্ট নেই। প্লেন। রবীন্দ্রনাথও কিন্তু টুইস্ট-ফুইস্ট বা বিস্ময়কর কিছু পারতেন না। ‘পোষ্টমাষ্টার’ গল্প চিনতে পারো। একেবারে কোনোটাই টুইস্ট প্রয়োগ করার কিছু নেই। কিংবা অবাক করে দিল, মারল চাবুক, চমকে উঠল বানর, এটা কি বলল এ-রকম চমক নেই। চেখবের গল্পগুলোতেও খুব চমক নেই। এ-ধরনের চমক ও হেনরির গল্পে আছে, মোঁপাসার গল্পে আছে। খুব বেশি আছে। কিছু-তো নতুন দিতে হবে। তা না হলে কি করে হবে। তা না হলে পড়বে কি করে? পড়তে একটা আগ্রহ তৈরী-তো হতে হবে।
আমার গল্পে আমি ইচ্ছে করে-তো কিছু করি নি। সাহিত্য-পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় তিনবার ঐ-একই প্রশ্ন ওটার একটা বিশেষ মূল্য আছে। মানুষ যে সম্পূর্ণ অমানুষ হয়ে যায় না, যেতে পারে না। চরম অমানুষ হওয়ার পরও অত্যন্ত তিক্ত, বুড়ো কানতেছে। আবার শেষ অংশ স্বাভাবিক বলে মনে হয় কারণ, তার পয়সা নেই বলে সে ওখানে যেতেও পারছে না। তারপরে কে কাঁদছে? তুমি কাঁদছো? এটা আমি বলছি, আসলে কে কাঁদছে? আমি কার কান্নার কথা বলছি? আশেপাশে শব্দ-টব্দ যা কিছু হয়, তা কট্রিবিউট করে কি? খুব বিশ্রী করে মুখ খারাপ করছে, মাগি চুপ কর। মুগরিগুলো একসাথে কক কক করে উঠলো, এগুলো কিছুই না। এগুলো এ-রকম হলো কেনো? শেষটা এরকম বিজবিজে করে ফেলা আরকি। আমি-তো ঐ রকম গল্প লিখি না। একেবারে বাক্য খুব করে রচনা করে বিত্তান্ত লিখি না। আমার মনে হয় যে, সব জিনিস এক সঙ্গে ফ্লো করব। এটা তাই। একটা গল্পে ঘটনাও বলতে চাই নি, ঐ-ঘটনার সঙ্গে পরিচিতি পৃথিবীটার, ন্যাচারটার অলটার, যে সংসারগুলো সবটাই মুখ্য হতে থাকুক। চলমান থাকুক। এটা আমার ইচ্ছা ছিল। এমন ইচ্ছা আমার এখনও আছে। এই যে ছবি দেখি না? বাংলা ছবি আমরা দেখতে পারি না, তার একমাত্র কারণ ধীর-গতি। এতো ধীর-গতি। অসম্ভব! সহ্য করাই যায় না। আমার কোনোকিছু গল্পটল্প বলতে গেলে, সরাসরি কটাকট কথা বলি। সেটা এই ট্রাডিশনে নেই। কটাকট কথা বলা নেই। নিম্নকণ্ঠে গভীর কথা বলা প্রায় নেই। সিরিয়াল-তো খুব পিছিয়ে আছে? বাংলাদেশের বাংলা সিনেমাও পিছিয়ে আছে?
অনেক দিন বাচলে আরো অনেক কাজ করা যেতো। তবে সুনির্দিষ্ট কোন প্লান নেই। কান্টের উপর বই লিখতে চেয়েছি। লোকের বই পড়ে আমার এতো অতৃপ্তি হয়, ধুর ওরা কিছু লিখতে পারে না। তাই, কান্টের উপর আমিই লিখতে চেয়েছি। সক্রেটিসের উপর লিখেছি। কান্টের উপরও লিখতাম। কিন্তু সময় নেই। পোস্টমর্ডানিজম নিয়ে যে এতো মাথা-ঘামাচ্ছি তাই নিয়ে একটা বড় লেখা লিখার ইচ্ছা ছিল। মৌলিক। এগুলো এখন আর করার সময় নেই। বাংলা ভাষা নিয়ে একটা কাজ আমি ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে যখন পড়াচ্ছিলাম তখন করেছিলাম সেইটার একটুখানি বেরিয়েছে এক জায়গায়। একবিংশতে ছাপা হয়েছে। ঐটার একটা পুরো বই বের করতে চাই। এ-রকম আরও কিছু-কিছু কাজ অসম্পূর্ণই থেকে যায়। আমাদের লাইফটা ল্যাতা-জোবড়া হয়ে গেছে। কৃষকের বাড়িতে ধান হওয়ার সময়, এখানে ধানের আটি ওখানে খড়, এখানে বিছানো, ওখানে শোবার ঘরের কাছে চলে গেছে, তো ওরা বলে ল্যাতা-জোবড়া হয়ে মিশে গেছে। লাইফও তাই। একেবারে হিসেব করে, এক দুই করে ‘এই অংক মিলে গেল, আমি মরে গেলাম’। এভাবে-তো হয় না!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা