হায়! সেদিনের ঝড়টা কি কখনো…

দোলা বৌদির কথা মনে পড়ে আজও। দোলামনি নামের ভিনপাড়ার মেয়েটি যেদিন আমাদের দোলা বৌদি হয়ে এলো সেদিন আমরা বাড়ির সবাই দল বেঁধে দেখতে গিয়েছিলাম। বউ দেখার পর আমাদের একেক জনের একেক মন্তব্য। আমার কাছেও মন্তব্য জানতে চেয়েছিলো আমার ছোটদি। সদ্য কৈশোরের আমি তখন বুঝে কিংবা না বুঝেই মন্তব্য করেছিলাম—কি সুন্দর! ছোটদি বলেছিলো—ঝাক্কাস! আর মেজদির মন্তব্য—দোলামনি সত্যি মনে দোলা দেওয়ার মতো। মেজদির এই মন্তব্যটির সাথে একমত হলো অনেকেই। বিশেষ করে আমার পিসতুতো দাদা বিনয়। মেজদির কথাটা শুনতেই বিনয়দাও মন্তব্য করে সত্যি মনে দোলা দেওয়ার মতো। কথাটা বলেই বিনয়দা মেজদিকে কী একটা ইশারা করে। আর সেই ইশারায় মেজদি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। সুন্দর চেহারার মেজদির মুখটাকে সেদিনই প্রথম আমি বিকৃতভাবে ভ্যাংচাতে দেখি। বিনয়দার ইশারা মেজদির মুখ ভ্যাংচানো কোনটিরই মানে সেদিন বুঝিনি। এখন চেষ্টা করলে হয়তো একটা মানে দাঁড় করাতে পারবো। কিন্তু সেই চেষ্টাটা আর করা ঠিক হবে না। বিনয়দা এখন আমার মেজদির স্বামী। সেই দিনের বছর খানেক পরেই বড়দিরও আগে মেজদির বিয়ে হয়। ভালোই আছে দুজন। তবে খারাপ আছে বড়দি আর ছোটদি। মেজদির কারণে মাঝে মাঝেই কথা শুনতে হয় তাদের। অমলদা, মানে আমার বড়দির স্বামী—মুখের ভাষায় কোনো লাগাম নেই তার। গালিগালাজে চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার না করে ক্ষান্ত হয় না। পাছা থেকে শুরু করে শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যা নিয়ে গালি তৈরি বাদ যায়। সত্যিই বলছি আমার গালি শেখার হাতেখড়ি ঐ অমলদার কাছেই। বড়দিকে যখন গালিগালাজ করতো আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতাম। কোনো গালির মানে বুঝতাম আবার কোনো গালির বুঝতাম না। গালির ভাষায় কখনো কখনো লজ্জা পেতাম আবার কখনো মজা পেতাম। আমার খুব মনে পড়ে অমলদা একদিন রাগের মাথায় বড়দিকে গালিগালাজ করছিলো আর আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে তা শুনছিলাম। হঠাৎ অমলদা বলে ওঠেছিলো, ‘খানকি মাগি, মুখের উপর পেচ্ছাব করে দিলে তখন ঠেলা বুঝবি।’ আমি তখন খানকি মাগির মানে বুঝি নি। তবে মুখের পেচ্ছাব করে দেওয়ার কথা শুনে হা হা করে হেসে ওঠেছিলাম। হাসি শুনে বড়দি এসে আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি কাঁদতে শুরু করলে বড়দিই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আমার চেয়েও জোরে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করে। আমি আমার কান্না থামিয়ে বড়দির মুখের দিকে চেয়ে থাকি। আঘাত পেয়ে নয় আঘাত দিয়েও যে কেউ কাঁদতে পারে সেদিনই প্রথম দেখি আমি। তারপর বড়দির বাড়িতে যাওয়া হয় না অনেকদিন। যে বড়দি আমাকে দুই সপ্তাহ না দেখলেই খবর পাঠাতো বারবার সেই বড়দি আমাকে টানা এক বছর আর ডেকে পাঠান নি। কেনো ডেকে পাঠান নি সেটিও বুঝতে পারি নি তখন। আমার গায়ে গতরে বড় হওয়াটা মানসিক বড় হওয়ার চেয়ে অনেকটাই বেশি ছিলো। তাই অনেক কিছুই অনেক সহজেও বুঝতে পারতাম না। এর পেছনে কারণও ছিলো। ছোটবেলা থেকেই পড়–য়া ছেলে হিসেবে আমার যে খ্যাতি তা এসেছিলো সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়াশুনা করবার জন্য। খেলতেও পর্যন্ত যেতাম না আমি। বন্ধু-বান্ধব বলতে ক্লাসের সকল সহপাঠী। কেননা কারো সাথেই বিশেষ কোন সখ্যতা ছিলো না আমার। আমার বড়দা তো মাঝে মাঝেই হুঙ্কার ছাড়তেন— ‘পোয়াতিটা ঘর থেকে বারায় না ক্যান?’ পোয়াতি কী? দাদা আমাকে কেনো পোয়াতি বলতো তাও বুঝতাম না। একদিন বই ঘেঁটে পোয়াতির মানে বের করে প্রচুর কাঁদলাম। তারপর মা কাছে ডেকে বলেছিলো— ‘সারাদিন ঘরের ভিতর থাকিস তাই তোর দাদা অমন কথা বলে। একটু বাইরে যাবি, ঘুরবি, খেলবি দেখবি তখন আর বলবে না।’ তারপর থেকে হঠাৎ করেই পাল্লা দিয়ে আমার বাইরে বেরোনো শুরু হলো। যে আমি ক্লাসের বাইরে এক মুহূর্তের জন্যও বাড়ি থেকে শুধু নয় বরং ঘর থেকেও বের হতাম না, রাতে ঘুমানোর আগে কানের সাথে এলার্ম ঘড়িটা গামছা দিয়ে বেঁধে রাখতাম যাতে সময়মত উঠে পড়তে বসতে পারি সেই আমি পাল্টে গেলাম। আমার অনেক বন্ধু হলো। স্কুলের বাইরেও বাড়ির বাইরে সময় কাটানোর শুরু হলো আমার। আমার এই শুরু হওয়াতে প্রথম সহায়তা করলো বড়দি। দু-সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমাকে ডেকে পাঠাতো। বড়দির বাড়িতে যেতে আমার ভালো লাগতো না মোটেও, তবু যেতাম। কেন যেতাম বা যেতে চাইতাম খুব একটা বুঝতাম না। সেটাও একদিন বড়দা-ই বুঝিয়ে দিলেন। একদিন অমাকে নিয়ে হাাসহাসি শুরু হলো। হাসির কারণ বড়দার কথা। শুভাশিস কি আর পোয়াতি থাকতে চায় না নাকি? দাদার এই কথাটাতেও অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। তবে কষ্টটা বেশিক্ষণ টেকে নি। কেননা পরক্ষণেই মনে হয়েছিলো আমার পোয়াতি নামটা ঘুঁচেছে। মেজদির বাড়িেেত যাওয়া হতো না আমাদের কারোরই। ছোটদির বাড়ি অনেক দূর। বছরে একবারও যাওয়া হয়ে ওঠে না। দীর্ঘদিন বড়দির বাড়ি থেকে ডাক বন্ধ হয়। কিন্তু আমি ততদিনে আর ঘরে বসে থাকার পাত্রটি নেই। কারণে-অকারণে আমি বাড়ির বাইরে যাই। আমার বেশ কিছু মন্দ বন্ধুও হয়। হ্যাঁ মন্দ। ওরা টাকা বাজি রেখে মার্বেল খেলে। একজন তো আনছার বিড়ি টানে। আমাকেও বেশ কয়েকবার বিড়ি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলো, নে একটা টান দে। তিন পোয়া দুধের কাজ হবে। আমি বিড়ির বিশ্রি গন্ধটা সহ্য করতে পারি নি বলেই হয়তো টানটা দেয়া হয় নি। তা না হলে আমার নামও হয়তো হয়ে যেত বিড়িখোর শুভাশিস। আমার এই বন্ধুগুলো মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলতো তা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়তাম। আমার এই আকাশ থেকে পড়াতে তারা আমার একটা নাম দিলো—ভোদাই। এই নাম নিয়ে তুমুল গণ্ডগোল বাঁধানোর ইচ্ছে হয়েছিলো আমার। কিন্তু পারি নি। আমার বুকের পাটা ওদের সাথে লাগার মত শক্ত হয় নি তখনও। তাছাড়া ওরা যেসব কথা বলতো ওরকম কথা আমি বলতেও পারতাম না। একদিন স্কুলঘরের পেছনে আমবাগানের পাশে ওরা সবাই মার্বেল খেলছিলো। আমি ওদের বইপত্র ও ব্যাগ নিয়ে বসে ছিলাম। বসে ছিলাম না পাহারা দিচ্ছিলাম। এমন সময় দোলাবৌদি ঐ দিক দিয়ে একা একা হেঁটে যাচ্ছিলো। প্রিন্টের একটা জর্জেট শাড়ি পরনে, কপালে লাল রঙের একটা ইয়াবড় টিপ, মাঝ কপাল পর্যন্ত সিঁথির সিঁদূরে দোলা বৌদিকে লাগছিলো অপূর্ব। সেদিনও আমার বুকের থেকে সেই কথাটিই বের হয়েছিল—কী সুন্দর! আমার বন্ধুরাও দোলাবৌদিকে দেখে মুগ্ধ হলো। তবে আমার মতো ‘কী সুন্দর’ কারো মনে হলো না। আমার যে বন্ধুটা আনছার বিড়ি টানতো ওর কাছে দোলা বৌদিকে একটা মাল মনে হলো। ও তো বলেই ফেলল-মাল একটা বৌদি। বৌদিকে মাল কেনো বলেছিলো সেই মুহূর্তে সেটাও আমি বুুঝতে পারি নি। আমি যে বুঝতে পারি নি তা ওদের বুঝতেও দিলাম না। কেননা দোলা বৌদিকে কেনো মাল বলা হলো জানতে চাইলেই ওরা যে শুরুতেই আমাকে আবার ভোদাই বলবে তা আমি ততোদিনে বুঝে ফেলেছিলাম। দোলা বৌদি হাঁটতে হাঁটতেই কথাটা শুনে ফেলেছিলো। আর কথাটা শুনতেই থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের সবার দিকে তাকায়। দোলাবৌদির তাকানো দেখে ওরা সবাই দৌড়ে পালায়। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার দাঁড়িয়ে থাকা দেখে আনছার বিড়ি টানা বন্ধুটা চিৎকার করে বলেছিলো– ‘ঐ শালা ভোদাই, দাঁড়ায় আছিস ক্যান, পালা’। ওর কথা শুনে আমি বুঝতে পারি দৌড়াতে হবে। দৌড়ানো শুরু করবো এমন সময় দোলা বৌদি বলেছিলো– ‘শুভাশিস, এদিকে এসো’। আমি আর দৌড়াতে পারলাম না। ধীরে ধীরে হেঁটে দোলাবৌদির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
‘তুমি ওদের সাথে কি করো?’
‘বৌদি ওরা আমার বন্ধু।’
‘ঐ খারাপ ছেলেগুলো তোমার বন্ধু!’
দোলা বৌদির মুখে খারাপ শব্দটা শুনে আর ওদের দৌড়ে পালানোর কথা মনে পড়ে। আমি দোলাবৌদিকে আমচকা একটা প্রশ্ন করি— ‘বৌদি মাল কি খারাপ কথা?’
আমার এ কথা শুনে দোলা বৌদি প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলো তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। বলে— ‘চলো আমার সাথে।’
তারপর থেকে দোলা বৌদি আমার নতুন বন্ধু হয়ে গেল। বৌদিতো সাফ সাফ আমাকে সেদিন বলে দিয়েছিলো— ‘যদি বাইরে বের হতে ইচ্ছে হয় সোজা আমার কাছে চলে আসবে। তবু ঐ বন্ধুদের কাছে যাবে না।’ বৌদি যখন কথাটা বলেছিলো তখন কথাটাকে খুব আমলে না নিলেও বৌদির আদর আপ্যায়ন আর মজার মজার গল্পে আমলে না নিয়ে পারি নি। দোলা বৌদি শুধু দেখতেই সুন্দর না কথাও বলে সুন্দর। কথায় মুগ্ধ হওয়ার শিক্ষাটা দোলা বৌদির কাছে প্রথম শেখা আমার। সেই মুগ্ধতার টানেই রোজ বিকেল আর সন্ধ্যা কাটতে শুরু হয় দোলা বৌদির সাথে। কম দুষ্টু ছিলো না দোলা বৌদি। আমাকে মাঝে মাঝেই সন্ধ্যাবেলা পাশের বাড়ির বাঁশঝাড়ে নিয়ে যেত। আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে লটকো গাছে উঠে লটকো পাড়তো। দোলা বৌদির সাহস আর গাছে ওঠা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। আমার অবাক হয়ে যাওয়া দেখে হাসিতে লুটিয়ে পড়তো বৌদি। একদিন আমি তার হাসির কারণ জানতে চাইলে দোলা বৌদি বলে উঠেছিলো— ‘মরদ হও দেওর বাবু, আর কত কাল!’ বৌদি আমাকে মরদ হওয়ার কথা কেনো বলেছিলো তাও সেদিন বুঝতে পারি নি। মরদ মানে তো ছেলে। আর আমি তো ছেলেই। নতুন করে ছেলে হওয়ার কি আছে? আমি কি মেয়ে নাকি! আমার ভাবনার কথাটা দোলা বৌদিকে অনেকবার জিজ্ঞেস করতে চেয়েও পারি নি। হঠাৎ করেই দোলা বৌদির স্বামী কার্তিকদা চিটাগাঙ থেকে চলে আসে। একটা সোয়েটার কোম্পানিতে চাকরি করতো সে। কোনো এক কারণে চাকরিটা তার চলে যায়। কার্তিকদা আসার পর আমার দোলা বৌদির কাছে যাওয়া কমে যায়। কমে যায় বললে ভুল হবে, আমি গিয়েছিলাম কিন্তু দোলা বৌদি তেমন করে সময় না দেয়ায় ফিরে আসতাম। দোলা বৌদির আমাকে সময় না দেয়াটাতে আমি ভীষণ কষ্ট পেতে লাগলাম। কেন কষ্ট পেতাম তাও তখন বুঝতাম না। না বুঝেই কষ্ট পেতাম আমি। একদিন সেই কষ্টটা আরো দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা বেলায় দোলা বৌদির বাড়িতে গিয়ে দেখি কার্তিকদা দোলা বৌদিকে ভীষণ মারছে। একটা মানুষ একটা মানুষকে অমন করে মারতে পারে তাও জানতাম না আমি। দোলা বৌদিকে কেনো মারছে জানতে বড় ইচ্ছে করছিলো কিন্তু বৌদির মার সহ্য করতে না পেরে মুখ লুকিয়ে ফিরে আসতে থাকি। আসার সময় কার্তিকদার একটা কথা আমার কানে আসে— ‘মাগি নাঙ ধরেছিস!’ কথাটা কানে আসতেই থমকে দাঁড়াই আমি। এই কথাটা এর আগেও বেশ কয়েকবার শুনেছিলাম। অমলদা মেজদিকে নিয়ে এমন কথা বলতো। অমলদার কাছে নাঙ শব্দটা অনেকবার শুনলেও কখনো মানেটা জানতে ইচ্ছে করে নি। কিন্তু সেদিন কার্তিকদার মুখে আবার শুনে বড় ইচ্ছে করলো মানেটা জানার। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দোলা বৌদির কাছেই মানেটা শুনে নেয়ার। তবে সেটা জানতে আমার সময় লেগে গেলো অনেক দিন। কার্তিকদা চাকরি ছেড়ে আসায় বাড়ি থেকে খুব একটা বের হতো না। আর কার্তিকদা বাড়িতে থাকলে বৌদি আমার সাথে ঠিকমত কথা বলতো না। সেদিনের মারের পরে তো একেবারে না। আমি ধীরে ধীরে দোলা বৌদির বাড়িবিমুখ হতে থাকলাম। আমার সেই বন্ধুগুলোর সাথে আবার সখ্যতা হতে শুরু হতে লাগলো। হঠাৎ একদিন ঠিক সন্ধ্যায় দোলা বৌদি আমায় ডেকে পাঠায়। আমার বুকের ভিতর ততদিনে বেশ অভিমান জমে এমন হয়েছিলো যে, যতই ডাকুক আমি কিছুতেই আর তার কাছে যাবো না। কিন্তু বৌদির ডাক পেতেই মুহূর্তেই সব অভিমান কোথায় যেনো পালিয়ে গেল। আমি এক রকম ছুটেই চলে যাই বৌদির কাছে। ছুটে যাই বটে তবে বৌদির সামনে গিয়ে একেবারে থমকে দাঁড়াই। আমার মুখ কতটা গোমড়া হয়েছিলো তা বলতে পারবো না, তবে দোলা বৌদি বলেছিলো—‘কিরে মুখের মধ্যে রাজ্যের মেঘ জমায় রাখছিস কেন!’ আমি বৌদির কোনো কথার জবাব দিতে পারি নি বরং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁন্না পাচ্ছিলো আমার। কী বলবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে সেই মুহূর্তেই প্রশ্নটা করে ফেলি আমি।
‘বৌদি নাঙ কী?’
আমার এই প্রশ্নে বৌদি প্রথমে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যায়। বৌদির চোখদুটো ছলছল হয়ে ওঠে। সেই চোখ দেখে ভয় পেয়ে যাই আমি। না জানি কী ভুল প্রশ্ন করলাম। স্তব্ধতা কেটে এক সময় বৌদির ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে ওঠে। সে হাসি আমার অচেনা। দোলা বৌদির সাথে সখ্যতার কোনদিনই অমন হাসি দেখি নি আমি। বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে সেই দিন প্রথমবারের মত আমার নিজের থেকেই নিজেকে ভোদাই মনে হয়েছিলো। হয়তো সে কারণে মাথাটা নিচু করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দোলা বৌদি আমার কাছে এসে মাথাটা আলতো ছোয়ায় তুলে ধরে বলে—
‘নাঙ কী জানতে চাস?’
কথাটা বলেই দোলা বৌদি তার ঠোঁট জোড়া আমার ঠোঁটের উপর চেপে ধরে। আমি কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার শুধু তখন ছোটবেলার ললিপপ কিংবা লাঠি চকলেটের কথা মনে পড়ছিলো। স্কুলে পিটি করার সময় আরামে দাঁড়াও সোজা হও করার মতো আমার হাতদুটো তখন সামন-পেছন করছিলো। একসময় আমি বুঝতে পারছিলাম আমার শরীরে কেমন একট শিহরণ কাজ করছে। আরামে দাঁড়াও, সোজা হও করা হাতদুটো আমার অজান্তেই দোলা বৌদিকে জড়িয়ে ধরে। আমার হাতদুটো দোলা বৌদিকে জড়িয়ে ধরতে কেমন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে দোলা বৌদি। আমাদের ঔষধের দোকানের জুলফিকারকে একবার ইলেকট্রিক শক খেয়ে এমন ঝাঁকুনি খেতে দেখেছিলাম। ঝাঁকুনির সাথে সাথেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো দোলা বৌদি। দোলা বৌদির ধাক্কা সামলিয়ে কোনোরকমে নিজেকে স্থির করার পর আমি বুঝতে পারি আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে। দোলা বৌদির দিকে তাকিয়ে দেখি হাঁপানি রোগিগুলোর মত কেমন জোরে জোরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। আমি বৌদির মুখের দিকে তাকাই। চমকে উঠি। আমার শরীরের কাঁপুনি আরো বেড়ে যায়। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে দোলা বৌদি। অতোবড় চোখ আমি তার আগে দেখি নি। এমনকি কোনো মানুষের চোখ অতোবড় হতে পারে ভাবতেও পারি নি। শরীরের কাঁপুনি আর বুকে দুরুদুরু ভয় নিয়ে এক লাফে তিন কদম পেছাতে গিয়ে ধাক্কা খাই এক লোহার দরজার সাথে। ফিরে তাকিয়ে দেখি কিসের লোহার দরজা, কার্তিকদা দাঁড়িয়ে আছে। একটা মানুষের শরীর যে লোহার মত শক্ত হতে পারে সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম আমি। আজ বুঝি, আজও সেই দিনটা ঝড় হয়ে বয়ে চলেছে আমার। সেদিনের সেই ঝড়টা কি কখনো থামবে… আমার অথবা দোলাবৌদির কিংবা কার্তিকদার!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা