চিহ্নপত্রিকা-২৫

উম্মে মুসলিমা
কী লিখি কেন লিখি

লিখি তো হাবিজাবি। বড় বড় কবি সাহিত্যিকদের লেখা পড়ে নিজেরগুলো জোলো মনে হয়। কবিতা লিখতে গিয়ে কেবল অন্ত্যমিল চলে আসে। আর অন্ত্যমিল এলে কিছুতেই পুরোনো ধাঁচ এড়াতে পারি না। কবিতা শেষ করে আনলে মন খুঁতখুঁত করে। মনে হয় এরকমটা তো চাইনি। আবার অন্ত্যমিলহীনগুলোর ছন্দও তেমন খেলে না। কবিবন্ধুরা বলেন একেক কবির একেক ধারা। আপনি আপনার মতোই লিখুন না। যেমন ধরা যাক ‘অতলার্চনা’ কবিতাটার খানিকটা :

অতল অতল বলে কাঁদে মন অগভীরে বাস
চেনামুখ ঘষে ঘষে বিমূর্ত শিল্প নামাস।
অতল অতল বলে কাঁদে মন অগভীরে বাস
স্মৃতির মিছরি মুখে পিপীলিকা পলকে পালাস
অতল অতল বলে কাঁদে মন অগভীরে বাস
চোখে খেলে নোনাজল বুকে জাগে সাগর বিলাস
অতল অতল বলে কাঁদে মন অগভীরে বাস
রোমশ বুকের বন, হীরে খুঁজে বেতফল পাস।

এটাকে আর কীভাবে দাঁড় করানো যেত? এটা কি অমিত্রাক্ষরে এমন ঢেউ তুলতো? কিন্তু তারপরেও বলতে চাই যাজ্জতা গভীরতা পায় না। একসময় ঠিক করলাম ‘দুত্তোরি আর কবিতাই লিখবো না’। আবার জানালার পর্দা উড়লে গভীর রাতে পুর্ণিমা ঘরের মেঝেয় জোৎস্নার দুধ ঢেলে দিয়ে যায়। ঝর্ণাকলমে দুধ ভরে চিঠি লিখতো সে একজন কৈশোরে। সবাই ঘুমালে মোম জ্বালিয়ে জোৎস্নার মতোই নরোম আগুনের গায়ে তা মেলে ধরলে লেখাগুলো দৃশ্যমান হতো। এই যে জোৎস্না… দুধ… চিঠি… ফিরে যাওয়া, খাতায় উঠে না এলেও যতক্ষণ আনমনা করে ততক্ষণ তো আমি কবি? হয়তোবা এরকম কবি সংসারের রাসভারি কঠিন মানুষটিও। তার হিসেবের খাতায় একমন চাল, দুটো ইলিশ, একডজন পাতিলেবু, তিন আঁিট সজনের ডাঁটা… ব্যস্্, থেমে গেল কলমটা। সেই কবে গ্রামে একদিন পাশের বাড়ির লাবণ্যময়ী নতুন বউয়ের হাতে এক আঁটি তুলে দিতে গেলে চাঁপাকলির মতো তার আঙুল ছুঁয়ে ফেলে সারারাত ঘুমাতে পারে নি। বউটাকে তার স্বামী শহরে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার দিন হিসেববাবু তার মায়ের পায়ের ওপর সেই চাঁপাকলি পড়তে দেখেছিল মুহূর্তের জন্য। তারপর তার অনেকদিন কিছু ভালো লাগে নি। চাঁপাকলি তার হলে কী ক্ষতি ছিল? তো হিসেবের খাতা… সজনের ডাঁটা… চাঁপাকলি, কবিতা এসবেরই পরম্পরা। যাদের হিসেব মেলেনা তারা কবিতার ছন্দ মেলায়। কোন দৃশ্য কবিকে কবিতা লেখায় তার কোনো ব্যকরণ নেই। যেমন এই কবিতাটা :

 গুম্ফগুণকাব্য
হাসলে আপনাকে বেশ লাগে
এ হয়তো ওষ্ঠ ঢেকে দেয়া গুম্ফরাজির গুণ
গুম্ফের গুণ অথবা গুণের গুম্ফ যাহোক একটা কিছু
আচ্ছা আপনার প্রেমিকারা যখন আপনাকে চুমো খায়
ধরুন এমন কোনদিন হলো যে ওদের নাকের মধ্যে
আপনার গুম্ফশূঁড় ঢুকে গেল
চূড়ান্ত আশ্লেষে সে মুহূর্তে দিল এক দমকা হাঁচি
আাপনার ছড়ানো শ্মশ্রƒতে ছড়িয়ে পড়লো নিষ্ঠিবনের কুচি
আপনার উপচানো আবেগ, ঝড়ো শরীর একনিমেষে জমাট বরফ
তখন কি আপনার সব জঞ্জাল কামিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়?
না কি আয়নায় দাঁড়িয়ে
পলকে ফিরে যান আমেরিকায়জ্জকোনো এক শীতের দিনে
আপনার শ্মশ্রƒরাজিতে ঝরে পড়া গুড়ো বরফের স্মৃতিমেদুরতায়?
ওদিকে ভাবমূর্তি হারিয়ে প্রেমিকা
সোফায় বসে লজ্জায় কাচুমাচু
আর আপনি ভাবছেন তুলোর মতো তুষারপাতের
অনির্বচনীয় আনন্দ নিয়ে
নিদেনপক্ষে একটা কবিতাতো লিখে ফেলা যায়।

তবুও কবিতা আমাকে লেখায়। এমন কিছু বিস্তারিত অনুভূতি যাকে বিস্তৃত করলে কবিমানসে ঠাঁই পাওয়া যায় না সে রকম ভাব উঠলে না লিখে পারি না। সবটা বলতে পারি কাব্যিক পরিসরে তা-ও না। তবে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা থাকে। ভাষার ভারে দুর্বোধ্য ব্যবধান গড়তে মন চাই না। কিংবা হতে পারে এ আমার ধরন। কবিতা লেখার আরও একটি উদ্দেশ্য ছাপার অক্ষরে নিজের সৃষ্টি অবলোকন। প্রকাশ না করার অন্তর্মুখীনতা একবারে নেই। প্রশংসা-সমালোচনা দুই-ই ব্যাপকভাবে চাই। বেদনার দানা বেদানার মতো জমা হলে ফেটে পড়তে চায়। সে দানা কখনও পুষ্ট কখনও অরসালো।
লেখালেখির আর একটি ভালোবাসার ক্ষেত্র প্রবন্ধ। নারীদের আবহমান বঞ্চনার কথা লিখতে কেবল কবিতার কাছে হাত পাতলে নারীর সাথে অবিচার হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেন ‘একতারা কি একটি তারে গানের বেদন বইতে পারে?’ নারীশোষণের ইতিহাস এতোটাই সীমাহীন যে তার দিনলিপি, ঘটনা, গল্প কবিতার একতারায় বাঁধা অভাবনীয়। নিজে বেড়ে উঠেছি গ্রামীণ পরিবেশে। মা-চাচী-বড় বোন, ভাতৃবধূদের দমিত হতে দেখেছি পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার নারী-পুরুষদের দ্বারা। কেন কেবল মেয়ে জন্ম দেয়ার জন্য আমার মা আদর-অধিকার বঞ্চিত হলেন? কেন যৌতুকের সব দাবি পুরণ না হওয়াতে আমার বড়বোনকে তার  বিয়ের পর পনের বছর দেখতে পাই নি? মেয়েদের এতো লেখাপড়া শিখিয়ে বাজে খরচ করার জন্য কেন আমার পিতাকে গঞ্জনা সইতে হয়েছে? এসব সামাজিক প্রথা আরোপিত মিথ্যে বানেয়াট মনে হয়েছে অনেক ছোটবেলায়। এ প্রথার আরও অনেক নিষ্ঠুর খড়্গের নিচে আজও নারীরা চলাফেরা করছেন। শহুরে নারীরাও ভিন্নধারার প্রথায় নিষ্পেষিত। ধারা ভিন্ন তন্ত্র অভিন্ন। একধরনের দায়বদ্ধতা তৈরী হয়। মুঠি উঁচু করে শামিল হতে পারি না প্রতিবাদী সভা-মিছিলে।  প্রতিবাদটুকু পৌঁছে দিতে ইচ্ছে করে শোষক-শোষিতের মননের দুয়ারে। সমব্যথী-সমমনাদের অব্যক্ত উচ্চারণ মিশে যায় আমার প্রকাশিত অক্ষরে। অনেকে বলেন শিল্পের জন্য শিল্প, অনেকে বলেন শিল্প-সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে না। আমি এর বিপক্ষে। একটি রচনা, একটি চলচ্চিত্র, এমনকি একটি কবিতা সমস্যাপীড়িত মানুষের মনোবিজ্ঞানীর কাছে যাওয়ার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। মানুষের আচরণ পরিবর্তনের জন্যও সাহিত্য কাজ করে যায় অলক্ষ্যে। আর মানুষ পরিবর্তীত হলে সমাজ পাল্টাবে। নারী পাবেন পুরুষের সমান অধিকারজ্জতা নয়। নারী পাবেন মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা। নারী পাবেন নারীর মর্যাদা। কারণ নারীর অন্তর্নিহিত শক্তিকে সম্মান না করতে পারলে সে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর একটি হয়ে টিকে থাকতে হবে। নারীর শক্তি নিয়ে নোবেল লরিয়েট মো-ইয়ানের সাথে আমি একদম একমত। তিনি বলেন :
সবার আগে বলা দরকার আমি নারীদের পছন্দ করি এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমি মনে করি তারা মহান। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং কষ্টসহিষ্ণুতা পুরুষমানুষের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা যখন বড় দুর্যোগের মুখোমুখি হই নারী তা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেজ্জকারণ তাদের সে সামর্থ আছে, তারা সন্তান ধারণ করে। এই সত্যটি নারীকে যে শক্তি দেয় তা আমরা অনুমানও করতে পারি না। আমার বইতে আমি নিজেকে নারীর অবস্থানে রেখে দেখার চেষ্টা করি এবং পৃথিবীটাকে নারীর দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।
সবচে বেশি ভালোলাগার জায়গাটা আমার দখল করে আছে ছোটগল্প। এখানেও শতভাগ সফল তা বলা যাবে না। আমি জাকির তালুকদার, অদিতি ফাল্গুনী, মাহবুব মোর্শেদ, চঞ্চল আশরাফ, মনিরা কায়েস, মঞ্জু সরকার, শাহাদুজ্জামান, রফিকুর রশীদ, শাহনাজ মুন্নী, রাশিদা সুলতানা, প্রশান্ত মৃধা, সাদ কামালী, নাসিমা আনিস, মাসুদা ভাট্টি, পাপড়ি রহমান, সালমা বাণী … এদের ছোটগল্প মুগ্ধ বিস্ময়ে পড়ে ফেলি। ওদিকে হাসান আজিজুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, প্রয়াত শহীদুল জহির, মশিউল আলম আমার প্রিয় গল্পকার। আমার অবস্থা ঐ কবিতা লেখার মতোই। মনে হয় ওদেরগুলো অনেক উচুঁমাপের, আমারগুলো বালখিল্য।
গল্প কেন লিখি এর যুক্তি কবিতা লেখা যুক্তির মতো বিমূর্ত নয়। গ্রামে বেড়ে ওঠার কারণে আমার প্রায় গল্পই গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা। আমি এখানে স্বচ্ছন্দ। তবে ঘুরেফিরে গল্পের কাহিনীগুলো নারীর বঞ্চনার কাহিনীতেই পর্যবসিত হয়। গ্রামীণ নারীকে কাছ থেকে দেখার কারণে কাহিনীতে তাদের জীবন্ত করে তোলা সহজ হয়। একেক নারীর জীবন একেকটা ইতিহাস। বঞ্চনা এক, আলেখ্য ভিন্ন। আমি বুকের মধ্যে তাদের ধারণ করতে পারি। আবহমানের সে নারীর সকলেই যেন হয়ে উঠি আমিই। উত্তমপুরুষে লেখা আমার প্রিয় আঙ্গিক। তবে এর হ্যাপাও অনেক। বলি :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘নষ্টনীড়’কে অনেকেই ভাবেন এতে বুঝি রবীন্দ্রনাথ ও তার বৌঠানের জীবনের একটি অধ্যায় বিধৃত হয়েছে। অনেকে বলেন রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশাতে তাঁর বৌদির সাথে তাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্কের জনশ্র“তিতে অস্বস্তিবোধ করায় এহেন গল্পের অবতারণা করেছিলেনজ্জযাতে পাঠককুলের ভ্রান্তি অবমোচন হয় যে বৌদির সাথে তাঁর সম্পর্কের সীমা কতখানি বদ্ধ ছিল। ‘নষ্টনীড়’ রচনার আগেই তাঁর বৌঠান আফিমসেবনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের বিবাহে আত্মাভিমানী হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন বলেও কথিত আছে। এসব গুজবের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার মানসেই রবীন্দ্রনাথ ‘নষ্টনীড়’ রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন বলেও অনেকের ধারণা। ‘নষ্টনীড়’-এর নায়ক (যদি তিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই হয়ে থাকেন) বৌদি চারুলতাকে নির্দোষ বন্ধু হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। অপরিপক্ক বৌদির দুর্বলতার দায়ভার অনবিমিশ্রকারী অপূর্ব কেন বহন করতে যাবে?
‘মোনালিসা’কে নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই। কয়েক বছর পরপরই মোনালিসার নতুন নতুন স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়। কেউ বলেন মোনালিসা অমুক জমিদারের সহধর্মিনী ছিলেন, কেউ বলেন দা ভিঞ্চির দয়িতা, কেউ বলেন তার রক্ষিতা, আবার চিত্রবোদ্ধারা কেউ বলেন মোনালিসা-টিসার কল্পকাহিনী ওসব ফালতু বাগাড়ম্বর, মোনালিসা স্বয়ং লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। অনেক জ্যামিতি, অনেক গ্রাফিক্স, অনেক ত্রিকোণমিতি, অনেক অংক কষে বার করা সম্ভব হয়েছে দা ভিঞ্চি আর মোনালিসা অভিন্ন। গবেষণা থেমে নেই। কে জানে কদিন পর গবেষকরা না বলেই বসেন আরে মোনালিসা তো দা ভিঞ্চির সৎ মা ছিলেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ‘নীরা’কে নিয়েও কৌতূহলী পাঠক লেখককে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পিছপা হন নি। লেখক মৃদু হেসেছেন। কিছু বলেন নি।
‘শ্রীকান্ত’ শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কে রাজলক্ষ্মী, কে অন্নদা, কে কমললতা এ নিয়ে জীবদ্দশাতেও শরৎবাবুকে যেমন প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয়েছে তেমনি তাঁর মৃত্যুর এতদিন বাদেও রাজলক্ষ্মী অন্নদা কমললতার উত্তরপুরুষের পরিচয়ে কতোজন যে ফায়দা লুটতে চেয়েছেন তার হিসেব নেই। একবার নাকি এক পাগল শরৎভক্ত ইন্দ্রনাথের বংশধরদের খোঁজার জন্য রীতিমতো অভিযানে বের হয়েছিলেন। উত্তমপুরুষে লেখা গল্প-উপন্যাস নিয়ে সাহিত্যিকদের কম ঝামেলা পোহাতে হয় না। চার্লস ডিকেন্স উত্তমপুরুষে ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ লিখে রীতিমতো সমালোচনা আর কৌতূহলের শিকার হয়েছিলেন। উত্তমপুরুষে লেখা গল্পকার ঔপন্যাসিকদের ভারি জ্বালা!
জীবনানন্দের ‘বনলতা’ কে ছিলেন তা নিয়ে অনেক গবেষণা। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে জীবনানন্দের কাকাতো বোন শোভনাই ছিলেন আসলে কবির বনলতা সেন। কবি ইংরেজিতে যে দিনলিপি লিখতেন সেই ‘লিটারেরি নোটস’-এ ‘ওয়াই’ হিসেবে যাকে ছদ্মনামে চিহ্নিত করেছেন তিনিই বনলতা সেনজ্জগবেষণা করে বের করেছেন জীবনানন্দের রচনাবলীর গবেষক শ্রী ভূমেন্দ্র গুহ। চার্লস ডিকেন্স-এর ডেভিড কপারফিল্ড, সমারসেট মম-এর অভ্ হিউম্যান বন্ডেজ, জেমস জয়েস-এর এ প্রোট্রেট অভ্ দি আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং ম্যান, আনের্স্ট হেমিংওয়ের এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস্, সিলভিয়া পাথের দি বেল জার ইত্যাদিকে লেখকদের আত্মজীবনী হিসেবে পাঠ করে পাঠক আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন কিন্তু একমাত্র ‘আমার ছেলেবেলা’, ‘আমার মেয়েবেলা’, ‘আত্মজীবনী’ বা ‘জীবনচরিত’ এ ধরনের বই (এগুলো উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত নয়) ব্যতীত উত্তমপুরুষে লেখা কোন উপন্যাসকে স্বয়ং লেখকও আত্মজীবনী বলেন না। এমন কি মৈত্রেয়ী দেবীও মুখ ফুটে স্বীকার করে যান নি ‘ন হন্যতে’ তার আত্মজীবনী।
উত্তমপুরুষে লেখা উপন্যাস পড়ে যদি পাঠক ঔপন্যাসিকের কোষ্ঠি-বিচার করতে বসেন বা সেখান থেকে উদাহরণ টেনে লেখকের ব্যক্তিজীবন আক্রমণ বা আলোকিত করার চেষ্টা করেন সেটা কি ঔপন্যাসিকের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নয়?
এদিক থেকে কবিরা বরং নিরাপদ। কবিরা উত্তমপুরুষ ব্যতিরেকে অন্যের মুখ দিয়ে কবিতা লিখতে পারেন না। ‘আমি’ ‘আমি’ করে না লিখলেও পাঠক বুঝে নেন কবিতায় কবির একান্ত ব্যক্তি অনুভূতিই প্রকাশিত। অনুভূতির নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপন কবিতাকে ঋদ্ধ করলেও কবিতাটি যে অন্য কারো ভাব ব্যক্ত করছে না তা নির্বোধ পাঠকও বোঝেন। হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে বৈষ্ণব পদাবলীতে বিদ্যাপতি রাধার আনন্দ-বেদনা তুলে ধরলেন কী করে? সে প্রশ্নের উত্তর তো রবীন্দ্রনাথ নিজেই দিয়েছেন :

        সত্য করে কহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি
কোথা হতে পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি
বিরহতাড়িত …
কিংবা ‘মানসী’ কবিতায় :
শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী
পুরুষ গড়ছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি
আপন অন্তর হতে। বসি কবিগণ
সোনার উপমা সূত্রে বুনিছে বসন

অপরের ব্যথা যে ধারণ করে সে ব্যথা তার নিজের ব্যথার সাথে একই মোহনায় মিলিত না হলে তার প্রকাশেও গলতি থেকে যায়। বৈষ্ণব কবি এ ধরিত্রীর মানবীকে দেখেছেন, মানবীর কামনা-বাসনায় রাধাকে বিধৌত করেছেন বলেই রাধা দেবী হয়েও সেই উপেক্ষিতা প্রবঞ্চিতা গাঁয়ের অবুঝ বালা। আর বৈষ্ণব কবি পুরুষ হয়েও মরমী বলেই নারী-পুরুষ উভয়ের বেদনাকেই ধরতে পেরেছেন। না হলে রাধার মুখ দিয়ে কৃষ্ণের উদ্দেশে কী করে বলেনজ্জ‘আমি হইব নন্দের নন্দন, তুমি হইয়ো রাধা’। তবে কবিতাতেও যখন কারো নাম ব্যবহৃত হয় তখন পাঠকের স্বাভাবিক কৌতূহলী মন বাস্তব হাতড়ে সে নামের চরিত্রদের খুঁজে পেতে আগ্রহী হয়। কবিরা বেশিরভাগই ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। জীবনানন্দই বনলতা ছাড়াও একাধিক নারীর নামে কবিতা লিখেছেন যেমন : সুরঞ্জনা, শঙ্খমালা, সুচেতনা, সুদর্শনা, সবিতা, শ্যামলী। সমালোচক বা পাঠকরা কেউ কিন্তু এঁদের কাউকে হণ্যে হয়ে অন্বেষণে নামেন নি। বিপত্তি ঐ একটিইজ্জতা হচ্ছে নাটোর। কবি যদি কোন কবিতায় ‘নাটোরের বনলতা সেন’এর মতো লিখতেন বরিশালের শ্যামলী, কলকাতার সবিতা বা ডিব্র“গড়ের সুদর্শনা তাহলে বোধহয় এতদিনে এসব নামের মেয়েদের দুর্গতির আর সীমা থাকতো না। বনলতা সেন কবিতাটির আলোচনায় কোন কোন সমালোচক বনলতাকে একটি প্রতীক হিসেবেও কল্পনা করেছেন। তারা বলেন বনলতা আসলে কোন মানবী নয়; সে প্রকৃতিরই একটি অংশ। কবি বনের লতার মতো কোমল, শ্যামল, বাঁধনোদ্যত সবুজে বাঁধা পড়তে চাচ্ছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মাকিদ হায়দাররাও তাদের কবিতায় কিছু বিশেষ নামের প্রতি পক্ষপাতগ্রস্থ।
মানুষ স্বভাবজাতভাবেই কৌতূহলী। সভ্য-পরিশীলিত-সুশিক্ষিত মানুষ কৌতূহল দমনের প্রচেষ্টা চালালেও পরচর্চা দেশে-বিদেশে সমানভাবে আদরণীয়। কেবল কবি-সাহিত্যিকই এর শিকার তা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রেই তাদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে শঙ্কিত। রাজা, রাণী, রাজকন্যা, রাজপুত্র, বিশ্বসুন্দরী, বিশ্বধনী, মাফিয়া, বীর, সন্ত্রাসী, রাষ্ট্রনায়ক, চিত্রনায়ক, গায়ক, শিল্পী, আবিষ্কারক, খেলোয়ার, পদকপ্রাপ্তজ্জযারা সংবাদমাধ্যমের প্রধান লক্ষবস্তু তাদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে কতো আলোচনা, কতো কেচ্ছা, কতো গসিপ। প্রিন্সেস ডায়ানাকে শেষপর্যন্ত সাংবাদিকদের কৌতূহলে পর্যুদস্ত হয়ে প্রাণ দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। মেরিলিন মনরো, প্রেসিডেন্ট কেনেডি, উত্তম, সুচিত্রা এমনকি সদ্যপ্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্যের ভাণ্ডার উম্মোচিত হচ্ছে।
অন্যান্য খ্যাতিমানদের তুলনায় কবি-সাহিত্যেকেরা একটু আলাদা। এমন কিছু প্রচারবিমুখ কবি-সাহিত্যিক আছেন যাদের উত্তমপুরুষে লিখিত রচনা ছাড়া তাদের ব্যক্তিজীবন উদ্ধার করা কঠিন। কিন্তু যা বলতে চাইছি তা হলো জানপ্রাণ দিয়ে কেন খুঁজতেই হবে কে ছিলেন জীবনানন্দের বনলতা সেন? ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক গোপালচন্দ্র রায়কে জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘বনলতা সেন’ হাতে তুলে দিলে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন ‘দাদা, আপনি যে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন, এই বনলতা সেনটা কে? এই নামে সত্যি আপনার পরিচিতা কেউ ছিল নাকি?’ জীবনানন্দ দাশ নাকি কেবল মিটিমিটি হেসেছিলেন, কোন উত্তর দেননি। কী করে দেবেন? বনলতা কি আর সত্যিই কোন একজন? তাঁর উপন্যাসে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন : ‘কিশোরবেলায় যে-কালো মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোন এক বসন্তের ভোরে, বিশ বছর আগে যে আমাদেরই আঙিনার নিকটবর্তিনী ছিল…। বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললে সে…। তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর তাকে আর আমি দেখিনি।’ এ বনলতাকে কি আসলেই কোন বাস্তব নারী বলে বোধ হচ্ছে? আবার ‘ঝরাপলক’-এর কল্যাণীয়াসু, বেবি-শোভনা-ওয়াই-শচী-মনিয়া-বনলতা-রমা-শান্তিজ্জএই সকলের সমন্বয়ই কি একজন সম্পূর্ণ বনলতা সেন নন? লাবণ্যের ছিটেফোঁটাও তো থাকতে পারে বনলতার লাবণ্যে।
একজন প্রতিশ্র“তিশীল কবি (নারী) কে তো বিয়ের পর কবিতা লেখাই ছেড়ে দিতে হয়েছিল। কেন? না তার কবিতার অন্তর্নিহিত ‘তুমি’টা কে এ প্রশ্নের উত্তরে তার স্বামী ভদ্রলোক ক্রমাগত সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকায় শেষ পর্যন্ত সংসারজীবন কাব্যজীবনের অধিক বিবেচনায় এনে কবি তার কাব্যবিষয়ের প্রধান উপজীব্য একজন বিমূর্ত মানুষকে মানে মানে বিদায় দিয়ে স্বনির্মিত কেকের ওপর ক্রিম চেরির পংক্তি রচনায় মনোনিবেশ করছিলেন।
এমনও দেখা গেছে কোন নাট্যকার বা ঔপন্যাসিক তার দীর্ঘ রচনার একটি অংশের উপজীব্য হিসেবে তারই দেখা কোন জীবিত বিখ্যাত মানুষের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা তার কোন চরিত্রের মাঝে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু কাহিনীর প্রয়োজনে ঐ উল্লে¬খযোগ্য ঘটনাটিকে শেষের দিকে অন্যভাবে আনতে হয়েছে, যা বিখ্যাত মানুষটির জীবনের ঘটনার সাথে খাপে খাপে মিলে যায় নি বা বিতর্কিত হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। রচনাটি প্রকাশের পর কারো মুখে শুনে বা নিজে পড়ে সেই খ্যাতিমান মানুষটি তো মহাক্ষাপ্পা। তিনি যা নন লেখক কেন তাকে সেভাবে উপস্থাপিত করবেন? সমাজে তার মান-সম্মান ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। তিনি লেখকের বিরুদ্ধে মানহানীর মামলা করবেন ইত্যাদি। কিন্তু একথা তো সত্যি যে, লেখকের নিজের চোখে দেখা বা অভিজ্ঞতা থেকে যে বর্ণনা তার লেখায় উঠে আসে তা কল্পনার কাছ থেকে ধার করার চাইতে অনেক বেশি বাস্তব আর প্রাণস্পর্শী হয়? তাইতো মণীষীরা বলেন ‘ইতিহাসে সাল আর নাম বাদে সব মিথ্যে, উপন্যাসে ঠিক তার উল্টোটা’। অনেক সাহিত্যিক উত্তমপুরুষে লিখতে সংকোচবোধ করেন এই ভেবে যে পরিচিত আত্মীয়স্বজনরা না আবার ভেবে বসেন উপন্যাস বা গল্পটি তারই জীবনকাহিনী। উত্তমপুরুষ একটা পদ্ধতি বৈ আর কিছু নয়। তৃতীয়পুরুষেও নিজের জীবনকথা লেখা যায়। কিন্তু বিষয়বস্তুকে পাঠকের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য উত্তমপুরুষ নিঃসন্দেহে সেরা পদ্ধতি। তা বলে সাহিত্যের চরিত্রদের বাইরে টেনে বের করে তাদের পোস্ট মর্টেম করতে হবেজ্জএ খুব শুভ লক্ষণ নয়। তবে এসব বিতর্ক থেকে ‘ব্রেন স্টর্মিং’ হলে সমালোচনা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে পারে কিন্তু শিল্পের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে শিল্পীকে ঘেরাও করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বন্ধ করা উচিৎ।
‘কবি তব মনোভূমি, রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য যেন’। কবি-সাহিত্যকরা অপরের বেদনা নিজের করে তুলতে পারে বলেই তো তারা নিরেটদের চেয়ে আলাদা। গল্প লিখতে গেলে যদি কোন চরিত্রকে প্রতিনিধিত্ব না করতে পারি তো কীসের যোগ্যতায় লেখালেখি? আর ‘আমি’ হয়ে উঠলে গ্রামের ব্যক্তহীনা সকিনার ব্যথা পাঠকদের গভীরে প্রোথিত হতে সময় লাগবে? ‘ছোট প্রাণ ছোট কথা, ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা’র একজীবনে চাক্ষুষ-শ্রবণ-পাঠ্য ঘটনাপুঞ্জির তো অভাব নেই। অভাব যা তা সময়েরও না। পর্যাপ্ত যা তা হলো গড়িমসি, অলসতা। দার্শনিক কিয়ের্কেগার্ড-এর বাণী ‘অলসতা তো খারাপ নয়ই বরং একমাত্র ভালো’জ্জশিরোধার্য করে অসাধারণ উপজীব্য মাথায় নিয়ে ঘুরি। বেলাও পড়ে আসছে। কবে লিখবো?
তবে রবীন্দ্রনাথের মতো অর্ধনারীশ্বর হয়ে উঠতে না পারলে পরিপূর্ণ বা সার্থক গল্পকার হিসেবে দাবি নিতান্তই উচ্চাকাক্সক্ষা। নারী বলে কেবল নারীর বেদনা আঁকবো, পুরুষ পড়েও পুরুষ আঁকতে পারবো নাজ্জএ খামতিটুকু পুষিয়ে নিতে না পারা অব্দি স্বস্তি পাইনে।

হোসেনউদ্দীন হোসেন
সাহিত্যের সত্য ॥ রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য ও সত্য সম্পর্কে একটি আলোচনায় অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, চিরন্তনের তিনটি স্বরূপ- সত্যম, জ্ঞান এবং অনন্তম। এই তিনটি স্বরূপকে আশ্রয় করে মানব অস্তিত্ব তিনটি রূপে প্রকাশিত। তিনটি রূপ হলো-ক) আমরা আছি, খ) আমরা জানি ও গ) আমরা প্রকাশ করি। মানুষের এই তিনটি দিক নিয়েই একটি অখণ্ড সত্য। এটা হল একটা দর্শন তত্ত্ব। এই দর্শনের মধ্যে রয়েছে মানব অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ। ব্রহ্মের সত্য স্বরূপের একটি দিক হল-আমি আছি; তার জ্ঞান স্বরূপের আর একটি দিক হল-আমি জানি, এবং ব্রহ্মের অন্তস্বরূপের মধ্যে রয়েছে তৃতীয় দিকটি-আমি প্রকাশ করি। মানুষ এই তিনটি সত্য নিয়ে জীবনধারণ করছে। জীবনধারনের মূলে রয়েছে জীবনকে আনন্দময় করে তোলা। সংসারে দুঃখ-কষ্ট আছে, শোকও বেদনা আছে-তবুও মানুষ এই সংসারকে নরককুণ্ড বলে অভিহিত করে না। বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা নয়। জীবনের জন্য এমন কি  আছে যে, মানুষ তার অস্তিত্বকে কখনো ছোট করে দেখে না।
রবীন্দ্রনাথ এই সত্য উপলব্ধি করেছেন মানুষের জীবনযাপন নিরীক্ষণ করে। তিনি উচ্চবিত্তদের জীবনযাপন যেমন উপলব্ধি করেছেন, তেমনি নিম্নবিত্তদেরও জীবনযাপন উপলব্ধি করেছেন। শ্রমজীবী মানুষকেও তিনি খাটো করে দেখেন নি। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ছিল এমন তীক্ষè যে, কোনো কিছু তার চোখ থেকে এড়িয়ে যায় নি। যারা উদয়াস্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে, তাদের জীবনযাপনের মধ্যেও তিনি উপলব্ধি করেছেন এক ধরনের আনন্দ প্রকাশ :
টিটাগড়ের পাটকলের কারখানায় যে মজুরেরা খেটে মরে তারা মজুরি পায়, কিন্তু তাদের হৃদয়ের জন্যে তো কারো মাথা ব্যথা নেই। তাতে তো কল বেশ ভালই চলে। যে মালিকেরা শতকরা ৪০০ টাকা হারে মুনাফা নিয়ে থাকে তার তো মনোহরনের জন্য এক পয়সাও অপব্যয় করে না, কিন্তু জগতেতো দেখেছি, সেই মনোহরনের আয়োজনের অন্ত নেই। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, এ কেবল ভোগদেবের মুগ্ধবোধের সূত্রজাল নয়, এযে দেখি কাব্য। অর্থাৎ দেখছি, ব্যাকরনটা রয়েছে দাসীর মতো পিছনে, আর রসের লক্ষী রয়েছেন সামনেই। তা হলে কি এর প্রকাশের মধ্যে দণ্ডির দণ্ডই রয়েছে, না রয়েছে কবির আনন্দ?
এই মন্তব্যের মধ্যেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের মানুষ সম্পর্কে ধারণা। দুঃখ, যন্ত্রনা ও শোক থাকলেও মানুষের বেঁচে থাকার মধ্যে রয়েছে একটা আনন্দ। মানুষের ব্যক্তি রূপটি হচ্ছে তার নিজস্ব, সেটা তার নিজের মধ্যেই একান্ত আবদ্ধ। সে নিজেকে নিজের মধ্যে প্রকাশ করতে পারে না। যখন তার পরিচয় কেউ জিজ্ঞাসা করবে, তখনই একটা বড় সত্যের দ্বারা সে নিজের তথ্যগত পরিচয় দেবে-আমি অমুক। এই অমুক কথাটা সত্যের উপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হচ্ছে যে, তথ্য যাকে অবলম্বন করে আছে, সেটাই হচ্ছে সত্য।
সাহিত্যের কাজ তথ্যকে নিয়ে নয় তথ্যের পাত্রকে নির্ভর করে যে সত্য-তাকে নিয়েই। চিরকাল মানুষ এই সত্যের স্বাদ গ্রহণ করেছে। স্বাদ হচ্ছে একের স্বাদ, অসীমের স্বাদ। ব্যক্তি মানুষ ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ব্যাপক থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি মানুষ, এটা হল তার অসীমের অভিমুখী কথা; এখানে ‘আমি মানুষ’ বিরাট একের সঙ্গে যুক্ত। কেননা, সত্যের পূর্ণরূপ যখন আমরা দেখি তখন তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্বন্ধের দ্বারা আকৃষ্ট হই না-সত্যগত সম্বন্ধের দ্বারা আকৃষ্ট হই।
সাহিত্যশিল্পে কোন বস্তু যে সত্য তা নির্ণয় হয় রসের মাধ্যমে। এই কারণে রসের ভূমিকা এখানে বিরাট এবং ব্যাপক। বস্তু যদি এমন একটি রূপরেখায় গীতের সুষমাযুক্ত ঐক্য লাভ করে, যাতে করে মানুষের চিত্ত আনন্দের মূল্যে তাকে সত্য বলে স্বীকার করে, তা’হলেই তার পরিচয় সম্পূর্ন হয়। তা যদি না হয়, অথচ যদি তথ্য হিসাবে সে বস্তু একেবারে নিখুঁত হয়, তাহলে অরসিক তাকে বরমাল্য দিলেও রসজ্ঞ তাকে বর্জন করেন।
রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে স্পষ্টই বলেছেন যে, রূপের মহলে রসের সত্যকে প্রকাশ করতে গেলে তথ্যের দাস্খত থেকে মুক্তি নিতে হয়। রসবস্তু এবং তথ্যবস্তু ভিন্ন। তথ্যজগতের আলোকরশ্মি যেখানে এসে দেয়ালে বাঁধা পড়ে, রসজগতের আলোকরশ্মি সেই দেয়াল অনায়াসে অতিক্রম করতে পারে। সাহিত্যের যেমন রসবস্তু আছে-তেমনি আছে সুন্দরের বিস্তীর্ন ক্ষেত্র। সাহিত্য সুন্দর হয়ে ওঠে রস আছে বলেই। এই রস বস্তুটি নিয়েই রবীন্দ্রনাথের আমলে তার সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে নানাজনে নানারকম প্রশ্ন তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এর জবাবে শুধু বলেছিলেন : ‘দাড়িপাল্লায় চড়াইয়া রস জিনিসটার বস্তু পরিমাণ করা যায় না এ কথা সত্য, কিন্তু রসপদার্থ কোন একটা বস্তুকে আশ্রয় করিয়াতো প্রকাশ পায়। সেইখানেই আমরা বাস্তবতার বিচার করিবার সুযোগ পাইয়া থাকি। নিশ্চয়ই রসের একটা আধার আছে। সেটা মাপকাঠির আয়ত্তাধীন সন্দেহ নাই। কিন্তু সেইটাই বস্তুপিণ্ড ওজন করিয়া কি সাহিত্যের দর যাচাই হয়।’ উপরিউক্ত সাহিত্য বিচারকদের মতে বাস্তবতা জিনিসটা কী, তার একটা সূত্র রবীন্দ্রনাথ ধরতে পেরেছিলেন। তারা বাস্তবতা বলতে বুঝতে চেয়েছেন যে রচনার তথ্য সামগ্রী থাকা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনার মধ্যে তারা কেবলমাত্র বাস্তবতার একটু উপকরণ খুঁজে পেয়েছিলেন ‘গোরা’ উপন্যাসে।
‘গোরা’ উপন্যাসে কী বস্তু আছে তা সবচেয়ে কম বুঝতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি লোকমুখে শুনেছিলেন যে, প্রচলিত হিন্দুয়ানির ভালো ব্যাখ্যা ওই উপন্যাসটিতে আছে। এর থেকে তিনি আন্দাজ করে নিয়েছিলেন ওটাই একটা সাহিত্য সমালোচকদের ধারণা মতে বাস্তবতার লক্ষণ।
উল্লেখ্য যে, তৎকালে সারা ভারতবর্ষে হিন্দু তার হিন্দুত্ব নিয়ে ভয়ঙ্করভাবে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। বিশ্ব রচনায় এই হিন্দুত্বই বিধাতার চরম কীর্তি। এটাই ছিল তাদের একমাত্র প্রমান করার উন্মাদনা। এই ধর্মীয় উন্মাদনা ‘গোরা’ উপন্যাসে তুলে ধরেছিলেন বলেই ‘গোরার’ মধ্যে সাহিত্য সমালোচকরা বাস্তবতার লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস রচনার পশ্চাতে হিন্দুর হিন্দুত্বকে বড় করে তুলে ধরার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু সমালোচকরা সেইটিকেই বড় করে দেখেছেন এবং বাস্তবধর্মী বলে আখ্যায়িত করেছেন। আসলে এই উপন্যাসে সত্যের চেয়ে তথ্যকে তারা প্রাধান্য দিয়েছেন অতিশয়। যার ফলে সাহিত্যের জন্য যে সত্য, সেই সত্য তাদের উপলব্ধিতে ধরা পড়ে নি। খামাখা সাহিত্য সমালোচনার নামে সাহিত্যকে বিচার না করে সামাজিকভাবে বিচার সৃষ্টি করে তর্ক তুলেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে বলেছিলেন :
সেটা ছিল সামাজিক বাস্তবতার তর্ক-যদি প্রতিকার করিতে পারো, করিয়া দাও, কাহারও আপত্তি হইবে না। তানসেন তাই বলিয়া মেঠোসুর তৈরি করিতে বসিবেন না। তাহার সৃষ্টি আনন্দের সৃষ্টি, সে যাহা তাহাই, আর কোন মতলবে সে আর কিছু হইতে পারেই না। যাহারা রসপিপাসু তাহারা যতœ করিয়া শিক্ষা করিয়া সেই ধ্র“পদগুলির নিগুঢ় মধু কোষের মধ্যে প্রবেশ করিবে। অবশ্য লোক সাধারণ যতক্ষণ সেই মধু কোষের পথ না জানিবে ততক্ষণ তানসেনের গান তাহাদের কাছে সম্পূর্ন অবাস্তব, এই কথা মানিতেই হইবে। তাই বলিতেছিলাম, কোথায় কোন বস্তুর খোঁজ করিতে হইবে, কেমন করিয়া খোঁজ করিতে হইবে, কে তাহার খোঁজ পাইবার অধিকারী, সেটাতো নিজের খেয়ালমত এক কথায় প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায় না।
তিনি আরো বলেছেন যে উপলব্ধিই হচ্ছে সাহিত্যের একমাত্র অবলম্বন। কবি যদি একটা  বেদনাময় চৈতন্য নিয়ে জন্মে থাকেন, যদি তিনি নিজের প্রকৃতি নিয়ে বিশ্ব প্রকৃতি ও মানব প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তা করে থাকেন, যদি শিক্ষা অভ্যাস প্রথা শাস্ত্র প্রভৃতি জড় আবরণের ভিতর দিয়ে কেবলমাত্র দশের নিয়মে তিনি বিশ্বের সঙ্গে ব্যবহার না করেন, তবে তিনি নিখিলের সংশ্রবে যা অনুভব করবেন, তার একান্ত বাস্তবতা সম্বন্ধে তার মনে কোনও সন্দেহ থাকবে না। রবীন্দ্রনাথের এই ধারণাটা ছিল দার্শনিক। তিনি সাহিত্যের বস্তুকে হাটের বস্তু বলে মনে করেন নি। সাহিত্যের বস্তু হাটের পণ্যের মতো দাড়িপাল্লায় মেপে দরাদরি করার জিনিস নয়। তিনি এ সম্পর্কে স্পষ্টই বলেছেন :
বাস্তবের হট্টগোল নিয়ে যারা মেতে থাকেন তাদের কাব্য হবে হাটের কাব্য। যারা প্রকৃতই কবি তাদের অন্তরের মধ্যে ধ্র“ব আদর্শ রয়েছে, সে আদর্শ হিন্দুর নয়-মুসলমানের নয়-এমনকি লোকহিত্যের ও একাডেমিক আদর্শ নয়।
সাহিত্যের সত্য হচ্ছে অনির্বচনীয় ও আনন্দময়। সাহিত্যের বাস্তবতার মধ্যে সাহিত্যিকের নিজের যে প্রমাণ, তিনি জানেন, বিশ্বের মধ্যেই সেই প্রমাণ রয়েছে। সেই প্রমানের অনুভূতি সকলেরই থাকে না-যার থাকে না তার কাছে মিথ্যাটা মিথ্যা। যে লোক চোখ বুজে থাকে তার কাছে আলো যেমন মিথ্যে-এটাও তেমনি মিথ্যে। তথ্যের গণ্ডি থেকে মানুষ যখন সত্যের অসীমতায় প্রবেশ করে, তখন তার মূল্যও পরিবর্তন হয়ে যায়। তুচ্ছ জিনিস হয়ে ওঠে অমূল্য। তখন সেই জিনিস আর তুচ্ছ থাকে না। রূপান্তরিত হয় একটি অখণ্ড সত্যে। এই অখণ্ড সত্যের ক্ষয় নেই। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :
শুধু কেবল মানুষ কেন, অজীব সামগ্রীকে যখন আমরা কাব্য কলার রথে তুলে তথ্য সীমার বাইরে নিয়ে যাই তখন সত্যের মূল্যে মূল্যবান হয়ে ওঠে। কলকাতায় আমার এক কাঠা জমির দাম পাঁচ দশ হাজার টাকা হতে পারে, কিন্তু সত্যের রাজত্বে সেই দামকে আমরা দাম বলে মানিনে-সে দাম সেখানে টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে যায়। বৈষয়িক মূল্য সেখানে পরিহাসের দ্বারা অপমানিত। নিজলোকে রসলোকে তথ্য বন্ধন থেকে মানুষের এই যে মুক্তি, একি কম মুক্তি। এই মুক্তির কথা আপনাকে আপনি স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য মানুষ গান গেয়েছে; ছবি এঁকেছে, আপন সত্য ঐশ্বর্যকে হাটবাজার থেকে বাঁচিয়ে এনে সুন্দরের নিত্য ভাণ্ডারে সাজিয়ে রেখেছে; তার নি-কড়িয়া ধনকে নি-কড়িয়া বাঁশীর সুরে গেঁথে রেখেছে। আপনাকে আপনি বারবার বলেছে ঐ আনন্দলোকেই তোমার সত্য প্রকাশ।
রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তা বৈষয়িক লোকের চিন্তা নয়-তার চিন্তা ভাবলোকের। একমাত্র ভাবুক মানুষ ছাড়া-তার বক্তব্য বুঝা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তিনিই বুঝেছিলেন যে সঙ্গীত কোন একটি রাগিনীতে যতই রমনীয় ও সম্পূর্ণরূপ গ্রহণ করুক না কেন, সাধারণ ভাষায় এবং বাহিরের দিক থেকে অসীম বলা যায় না। রূপের সীমা আছে। কিন্তু রূপ যখন সেই সীমামাত্রকে দেখায় তখন সত্যকে দেখায় না। তার সীমাই যখন প্রদীপের মতো অসীমের আলো জ্বালিয়ে ধরে তখনই সত্য প্রকাশ পায়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালীন পৃথিবীর যন্ত্রসভ্যতার যন্ত্রনা দেখে গভীরভাবে আঁতকে উঠেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে এই দানবিক সভ্যতা পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে কলুষময় করে তুলেছে। কারখানা ঘরের চোঙাগুলোকে ধূমকেতুর ধ্বজ-দণ্ড বানিয়ে আলোকের আঙিনায় কালি লেপে দিচ্ছে, সে বে-আব্র“ সভ্যতা বেহায়া হয়ে, আজ দেশে-বিদেশে আপন দল জমিয়ে ঢাক বাজিয়ে বেড়াচ্ছে। নিউইয়র্ক থেকে টোকিওর ঘাটে ঘাটে। ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে তার উদ্ধত যন্ত্রগুলো উৎকট শৃঙ্গ ধ্বনি দ্বারা সৃষ্টির মঙ্গল শঙ্খধ্বনিকে ব্যঙ্গ করছে। উলঙ্গ শক্তির এই দৃপ্ত আত্মম্ভরিতা আপন কলুষ কুৎসিত মুষ্ঠিতে অমৃতলোকের সম্মান লুট করে নিচ্ছে।
মানব জগতের এই চরম বিপর্যয় দেখে রবীন্দ্রনাথ সেদিন বলেছিলেন যে এই সভ্যতা মানবিক নয়। এই সভ্যতা মানুষকে মজুর বানাচ্ছে। মিস্ত্রি বানাচ্ছে, মহাজন বানাচ্ছে, লোভ দেখিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে খাটো করছে। মানুষ নির্মান করছে ব্যবসার প্রয়োজনে। এই নির্মাণের পশ্চাদে আত্মার প্রেরণা নেই। ব্যবসার প্রয়োজন যখন অত্যন্ত বেশি হয়ে ওঠে, তখন আত্মার বাণী নিভৃতে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সবকিছু তখন হয়ে যায় হাটের পণ্য।
সাহিত্য সৃষ্টি হয় আত্মার প্রেরণায়। এটা হলো দিব্যধামের সাধনার বস্তু। সাহিত্যের কর্ম হল এই যে, সাহিত্য দিব্যধামের পথের চিহ্ন কখনো মুছে দেয় না এবং সাহিত্যের সৃষ্টি সম্পদকে হাটের পণ্যেও রূপান্তরিত করে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্বন্ধ, বাইরের প্রকৃতির তথ্য রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে তাকে আত্মার চরম সম্বন্ধে নিয়ে যাওয়াই হল তার প্রধানতম কাজ।
এই সম্বন্ধ সৌন্দর্যের সম্বন্ধ, মঙ্গলের সম্বন্ধ, প্রীতির সম্বন্ধ এবং মহামিলনের সম্বন্ধ।

কাক্সিক্ষতা নিসর্গ
বৈদিক সমাজে নারী

বৈদিক যুগ বলতে যে যুগে বৈদিক সাহিত্য রচিত হয়েছিল সেই যুগকে বুঝতে হবে। বৈদিক সাহিত্য প্রধানত সংহিতা, ব্রহ্মন, আরণ্যক, উপনিষদ ও সূত্রসাহিত্য অর্থাৎ, শ্রৌত, গৃহ্য, ধর্মসূত্রকেই প্রধানত বুঝানো হয়ে থাকে। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ ঋকবেদকে খৃষ্টাব্দ দ্বাদশ শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দীর শেষ বা নবম শতাব্দীর সূচনায় রচনা বলে মনে করেন। যক্তু ও সামবেদ খৃষ্টপূর্ব নবম থেকে সপ্তম শতকের। অর্থববেদ এর প্রধানতম অংশ ও এই সময়ে রচিত; পরাতন অংশ এবং উপনিষদগুলো খৃষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতকের রচনা। সূত্রসাহিত্য সম্ভবত খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে রচিত। তাহলে খৃষ্টীয় দ্বাদশ থেকে খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে এই দেড় হাজারের বেশি কিছু সময়ের সাহিত্যে সমাজের যে চিত্র পাওয়া যায় তার মধ্যেই খুঁজতে হবে নারীর স্থান। তবে, শেষ হাজারখানেক বছরের ইতিহাসে সাহিত্য ছাড়াও অন্য উৎস আছে যেমন, প্রতœতত্ত্ব। শিলালিপি, তাম্রশাসন, দুটি মহাকাব্য, প্রথম যুগের পুরান, বৌদ্ধ সাহিত্য ইত্যাদি।
যাযাবর পশুচারী আর্যরা ভারতে এল, যখন এখানে সিন্ধু সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার জনগণ ছিল নগর সভ্যতার অধিবাসী এবং এটা ছিল তাম্র-প্রস্তর যুগের সভ্যতা। বৈদিক আর্যদের সাথে সাথে ভারতবর্ষে শুরু হয় লোহার ব্যবহার। ইন্দ্র, যিনি ছিলেন আর্যদলের সেনাপতি, তিনি অনার্যদের পরাজিত করলেন তার বজ্র দ্বারা যা ছিল লৌহ ফলকযুক্ত। যার সামনে দাঁড়াতে পারেনি অনার্যদের নরম ধাতুর অস্ত্র। আর্যদের ছিল ঘোড়ায় টানা রথ যা অনার্যদের হাতির মত দ্রুতগামী নয়। অনার্য সিন্ধু সভ্যতার সাথে মধ্য এশিয়ার যে বানিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, ভারতে আর্য আগমনের সাথে সাথেই তা ছিন্ন হয়ে যায়।
যাযাবর পশুপালনকারী আর্যরা ক্রমান্বয়ে অধিকার করে নেয় সমগ্র উত্তর ভারত। অনার্যদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ও প্রতিবেশীত্বের মধ্য দিয়ে আর্যরা শেখে কৃষিকাজ এবং যাযাবর থেকে গ্রামীণ মানুষ হয়ে ওঠে। তারা পোড়া ইট দিয়ে ঘরবাড়ি প্রস্তুত করে এবং স্থায়ীভাবে এক স্থানে বাস করতে থাকে। যাযাবর আর্যদের সমাজ সংস্থান ছিল গোষ্ঠী (ঞৎরনব) ও কৌমে (ঈষধংং) বিভক্ত। আর্যদের এই সমাজ ভাঙ্গতে থাকে তারা কৃষিজীবি হয়ে ওঠার পর থেকে। ক্রমে ক্রমে ‘কুল’ এর পরিবর্তন ঘটে অর্থাৎ একটি বাড়িতে তিন চার পুরুষের বৃহৎ পরিবার। তারপর আসে যৌথ পরিবার। সম্পর্ক ধরে দুই তিন পুরুষের পরিবার সবশেষে একক পরিবার ও এক পুরুষের সংসার। এসবের সাথে উৎপাদন ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক ছিল। কিন্তু, পরিণতির দিক দিয়ে সমাজে ঘটছিল নারীর স্থানের অনিবার্য অবনমন। উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছিল। গৃহকর্মে নারীর ভূমিকা, দায়িত্ব ও পরিশ্রম থাকলেও তাকে অন্যের দ্বারা ভরনীয়া, স্বামীর অন্নে প্রতিপালিত আখ্যা দেয়া হত। ‘ভৃত্য’ ও ‘ভার্য্য’ শব্দ দুটির বুৎপত্তিগত অর্থ একই। নারীকে ভার্য্য বলে আখ্যায়িত করা হত। যার অর্থ অন্যের দ্বারা ভরনীয়া। স্ত্রী স্বয়ং অন্ন উৎপাদন করেন না। তাই সে ভরনীয়া।
বৈদিক যুগের শেষদিকে যখন বৈদেশিক আক্রমণ দেখা দেয় তখন নারী হরণ ও বর্নসংকরের আশংকায় নারীকে ঠেলে দেয়া হয় অন্তঃপুরে। তখন থেকে নারী অনেক বেশি অসূর্যম্পশ্যা হয়ে উঠেছিল। ঘরে ও বাইরে যখন কোন বিপত্তি দেখা দেয় তখনই তার মূল্যটা দিতে হয়েছিল নারীকে। নারীর ক্ষেত্রে তা কেন এবং কেমন করে ঘটল তাই এখন আলোচনা করা হবে।
ঋগে¦দ হল বৈদিত সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ। এখানে, সরাসরি নারীর স্থান সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। কিন্তু, নানা বর্ণনা ও উপমা থেকে নারীর স্থান সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ঋগে¦দের রচনার কয়েকটি স্থান আছে। তার প্রথম স্তরের মন্ত্রগুলোতে নারী অপেক্ষাকৃত স্বাধীনচারিনী। দেবী ঊষা কোন মন্ত্রে সূর্যের বধূ, কোথাও মাতা, কোথাও কন্যা; রচয়িতাদের কল্পনার প্রকারভেদে। অগ্নি যেমন পবিত্র, তেমনি স্বামীর দ্বারা সম্মানিত বধূ। দেখা যাচ্ছে দেবতার আনন্দ এবং মানবীর শুচিতা। এ যুগে নারী তার জীবনসঙ্গী নিজেই বেছে নেয়। বহুবার একটি উপমা পাওয়া যায় উপাসক তাঁর দেবতার কাছে আসছেন। যেমন করে কোন পুরুষ তার কাম্য নারীর কাছে আসেন।
ঋকবেদে অবৈধ প্রণয় নিয়ে ঋষির কোন কুণ্ঠা নেই। অনাদিকাল থেকেই তা সকল সমাজে বিদ্যমান। তাই তা যেন সর্বজন স্বীকৃত একটি সামাজিক বিষয়। অসংখ্য দৃষ্টান্তে নারী ও পুরুষের প্রেম অসংকোচে উল্লেখিত হয়েছে।
নারীর ইচ্ছা বা অনিচ্ছাক্রমে নারীহরণের কথা ও ঋকবেদে পাওয়া যায়। দুরুমিত্রের কন্যাকে বিমদ হরণ করেছেন।
বিবাহে কন্যাপণের কথাও জানা যায়। পুরুষের বহুপতœীত্বের কথা কখনো স্পষ্ট, কখনো বা গৌণভাবে। কন্যার শরীরে ক্রটি থাকলে বরপণের কথা আছে একাধিকবার। কুমারী কন্যার কথা আছে একাধিকবার। যারা বাপের বাড়িতেই বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হয় তাদের বলা হত অমাজুরা, কুলঙ্গা, বৃদ্ধকুমারী বা জরৎকুমারী। পরবর্তীকালে, বিবাহ যেমন নারীর পক্ষে বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিল ঋকবেদ এর যুগে তা নেই। ঋকবেদে সহমরণ এর কোন উল্লেখ নেই। বিধবা বেঁচে থাকত। কখনো দেবর এর সাথে তার বিবাহ দেয়া হত আবার। কখনোবা, বিয়েই হত না।
বিধবার বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেয়া হত না। চিতায় পোড়ানো হত না ধর্ম বা সমাজের দোহাই দিয়ে। অনার্য প্রভাবেই হোক বা সামাজিক বিবর্তনের ফলেই হোক প্রথম সহমরণের কথা উল্লেখিত হয়েছে অথর্ববেদে। বিধবা বেঁচে থাকলেও সব সময় তাঁর জীবন সুখের হত না। তবে, এ যুগে নারীর বহু বিবাহের কথাও শোনা যায়। প্রসঙ্গত কোন নারীর পক্ষে দশটি স্বামী গ্রহণের স্বীকৃতিও এতে আছে।
ঋজুর্বেদের যুগেই সর্বপ্রথম আর্য-অনার্য সংমিশ্রণ স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে সাহিত্যে। ততদিনে আর্যরা গ্রামীণ ও কৃষিজীবি। তারা পোড়া ইটের ঘরবাড়ি তৈরী করছে। জনপদ, গ্রাম বা শহরে বাস করছে। আর্যরা নানা বৃত্তি অবলম্বন করেছে। সমাজে জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাহির্বাণিজ্য শুরু হয়েছে এবং ধনসম্পত্তিও বেড়েছে। এই সময়কালে শোনা যায়, দীক্ষার দিনেও পরস্ত্রীর সাহচর্য নিষিদ্ধ ছিল না এবং গণিকাগমনের জন্য দীক্ষার দিনে কোন প্রায়শ্চিত্ত ছিল না। যজ্ঞের সময় পতœী পাশে থাকতেন নিস্ত্রিয়ভাবে। ধর্মাচরণে নারীর কোন স্বাতন্ত্র্য ছিল না।
গৃহকর্ম ভিন্ন কোন বৃত্তি নারীর ছিল না। দুই একটি কাজের মধ্যে রয়েছে পশম পাকানো ও বোনা। অন্যান্য কাজের সাথেই এটি করতে হত। নারী শিক্ষার প্রসঙ্গে দেখি ব্রহ্মচর্য। যা বেদ অধ্যয়নের প্রবেশদ্বার, তা বহু প্রাচীন যুগেই নারীর জন্য নিষিদ্ধ ছিল। অতএব, শিক্ষা লাভের পথ তার রুদ্ধ। অথর্ববেদে বলা হয়েছে ব্রহ্মচর্য দ্বারা নারী স্বামী লাভ করেন, মনে হয় এই ব্রহ্মচর্য কোন ব্রত এর মত কিছু। স্বামী লাভই যার উদ্দেশ্য। ঋকবেদে কিছু ঋষিকার নাম পাই, হয়ত তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন। যেমন : বিশ্বধারা, ঘোষা, অপালা ও গোধা। নারী শিক্ষার সুযোগ ছিল ব্যতিক্রম। নারী শিক্ষার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছিল তা শাস্ত্রের দিকে তাকালে বুঝা যায়। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যের যুগ থেকে শিক্ষিত নারী সংখ্যা গুটিকয়েক। ক্রমে যে অবস্থা দাঁড়ালো তাতে গণিকা ছাড়া শিক্ষাতে আর কোন নারীর অধিকার ছিল না। অনুমিত হয় যে, সঙ্গীত নৃত্য ও চিত্রশিল্পে কিছু কিছু কুমারীর অধিকার ছিল। কিন্তু, অন্যান্য বিদ্যা থেকে তারা সাধারণভাবে বঞ্চিতই ছিল, কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল। বৃহদারণ্যক উপনিষদে পণ্ডিত কন্যা পাবার জন্য পিতামাতার আচরনীয় অনুষ্ঠানের কথাও আছে। কিন্তু, সেটা ব্যতিক্রমই।
৪ পুরুষের বহুবিবাহ ঋকবেদ এর যুগ থেকেই চলে এসেছিল। তেমনি নারীরও বহুপতিত্বে অধিকার ছিল। পুরুষের বহু পতœীগ্রহণের অনেক নিদর্শণ পাওয়া যায়। রাজাদের বৈধ পতœী চারজন তো থাকতেনই। এছাড়া, বহু উপপতœী থাকতেন রাজ অন্তঃপুরে। মৈত্রায়নী সংহিতায় দেখা যায় মনুর দশটি ও চন্দ্রের সাতাশজন স্ত্রী ছিল।
সপত বিনাশের জন্য, স্বামীর একনিষ্ট প্রেম পাবার জন্য ও স্বামীকে বশীভূত করার জন্য বহুতর মন্ত্র দেখতে পাওয়া যায় ঋকবেদ ও অথর্ববেদ। এই বিপদ ছিল সেদিনের নারীর নিকট ভয়াবহ এবং সর্বনাশা।
ঋকবেদে যোদ্ধা নারী মুদগলিনী, বিশৃঙ্খলা রধ্রিমতী, শশায়সীর কথা উল্লেখিত হয়েছে৫ যাঁদের কেউ যুদ্ধে আহত। কেউবা বিজয়িনী। ঋকবেদ এর প্রথম যুগের পরে সমাজ জীবনে নারীর আর কোন ভূমিকা রইল না।
স্ত্রীর প্রধান পরিচয় হল সে সন্তানের জননী এবং তার প্রধান কর্তব্য হল পুত্র সন্তান জন্ম দেয়া। নিঃসন্তান বধূকে বিবাহের দশ বছর পর ত্যাগ করা যায়। যে শুধু কন্যা সন্তান জন্ম দেয় তাকে বারো বছর পর। মৃৎবৎসাকে পনের বছর পর এবং কলহপরায়নাকে তৎক্ষনাৎ ত্যাগ করা যায় (বৌধায়ন ধর্মসূত্র ও মনুসংহিতা)। পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারলে স্ত্রীকে ত্যাগ করা হত (শতপথ ব্রাহ্মণ)। অপুত্রক পতœী পরিত্যাক্তা এবং পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারলে স্বামী আবার বিবাহ করতে পারবে।
বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রে উল্লিখিত হয়েছে যে, নারীকে কৌমারে রক্ষা করবেন পিতা। যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্ররা, নারী-স্বাধীনতায় যোগ্য নয়।
মহাকাব্য ও পুরানে নারী ও সম্পত্তির এক সাথে উল্লেখ করে বারবার বলা হয়েছে উভয়ের সুরক্ষা অত্যাবশ্যক। এটি রাজার প্রধান কর্তব্য বলে বিবেচিত হত।
অনেক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রাচীন যুগে নারী ও সম্পত্তির প্রশ্নটি পুরুষের মনকে উদ্বিগ্ন করে রাখত। মনে করা হত যে, সমাজের সব সংঘাতের মূলে রয়েছে এই দুটি।
সংঘাত নির্মূল করা ও সামাজিক ঐক্য বিধানে অনেক নৈতিক সূত্রের উল্লেখ আছে, যেখানে পরস্ত্রী ও পরসম্পত্তি স্পর্শ করা উচিত নয় এ কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। অপরের পতœীর প্রতি দৃষ্টিদানকে প্রভূত পরিমান নিন্দা করা হয়েছে।
কোন কোন ক্ষেত্রে নারীকে পশুর সমপর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে। অগ্নিপুরাণ অনুসারে নারী ও পশুকে বন্ধক হিসেবে রাখা যেত। তার প্রাথমিক মূল্যের সাত ভাগের এক ভাগ সুদ হিসেবে ধরা হত।
যেহেতু অনেক সূত্রে নারী ও সম্পত্তিকে সমপর্যায়ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- তাই এতে সন্দেহ নেই যে, নারীকেও এক প্রকার সম্পত্তি মনে করা হত। সমাজে সে স্বীয় ইচ্ছানুসারে চলতে পারত না ও তাকে সম্পত্তির মত ঋণ হিসেবে প্রদান করা যেত।
ধর্মসূত্র, স্মৃতি, পুরাণ ও জ্যোতিষশাস্ত্রে শূদ্র ও নারীসহ উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়।
নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নারী ও শূদ্রের জীবনের মূল্য সমান বলে মনে করা হত। অগ্নি পুরাণে বলা হয়েছে নারী হত্যাকারীকে শূদ্র হত্যার প্রায়শ্চিত্ত করতে হত। গীতার মতো রচনাতেও নারী, শূদ্র ও বৈশ্যকে একই শ্রেণীতে রাখা হয়েছে।
শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে  প্রব্রজ্যা শিক্ষা দেয়ার সময় শিক্ষক নারী, শূদ্র ও কৃষ্ণবর্ণের পক্ষী দেখতে নিষেধ করতেন। কেননা তারা অসত্য। বৌধায়ন ধর্মসূত্র অনুসারে সাফল্য অর্জনের জন্য ব্রত পালন করছে এমন ব্রহ্মচারীর নারী ও শূদ্রের সাথে কথা বলা উচিত নয়। মনুস্মৃতি অনুসারে নারী ও শূদ্রকে মূর্খ মনে করা হত ও তাদের সাথে সম্যক ছিল পরিতাজ্য।
তাহলে প্রশ্ন হল বৈদিক ভারত কী চোখে দেখেছিল নারীকে? নারীকে যথেচ্ছ শাসন ও ভোগ করার অধিকার পুরুষকে দিয়েছে শাস্ত্র। কিন্তু, সে প্রেক্ষিতে দায়িত্ব নেহাৎই নগণ্য। নারীর প্রধান সংজ্ঞা ছিল দুইটি-পুত্র সন্তানের জননী এবং ভোগ্য বস্তু। নারীর ভোগরূপ শাস্ত্রকাররা বারবার উল্লেখ করেছেন অকুণ্ঠভাবে। তাই নারী দক্ষিণার তালিকায় স্থান পায়। যজ্ঞের সময় নারীকে দক্ষিণা হিসেবে বিবেচনা করা হত।
ঐতরেয় ব্রাহ্মণে কন্যাকে বলা হয়েছে অভিশাপ। তাই সন্তান সম্ভবা নারীর একটি আবশ্যিক অনুষ্ঠান হল পুংসবন, যার উদ্দেশ্য হল যাতে গর্ভস্থ সন্তানটি পুরুষ হয়। হৃদয় দিয়ে নারীকে প্রার্থনা করা উচিত নয়, কিন্তু যথেচ্ছ ভোগ করতে কোন বাধা নেই।
পরবর্তী সাহিত্য যে নারীকে ভোগবস্তু ও পণ্যদ্রব্য বলতে সাহস করেছে তার জোরটা যুগিয়েছে বৈদিক সাহিত্যই।
বৈদিক ভারতবর্ষে নারীর কোন মর্যাদা ছিল না, মানুষ বলে কোন স্বীকৃতিই ছিল না তার। বৈদিক যুগে নারী স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত ছিল এ কথা বলে শুধু সত্যের অপলাপ হয়। কোন প্রাচীন সভ্যতাতেই নারীর মর্যাদা ছিল না। নারী এ শতাব্দীতেই প্রথম অধিকার সচেতন হয়েছে। আগে সে অত্যাচারিতা বন্দিনীই ছিল।

তথ্যনির্দেশ
১. সুকুমারী ভট্টাচার্য, “বৈদিক সমাজে নারীর স্থান”, প্রাচীন ভারত : সমাজ ও সাহিত্য (আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা), পৃ. ২৭
২. রামশরন শর্মা, “সতীদাহ প্রথার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট”, প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস (ওরিয়েন্ট লংম্যান), পৃ. ৮১
৩. রনবীর চক্রবর্তী, “ভারত ইতিহাসে বৈদিক যুগ”, ভারত ইতিহাসের আদিপর্ব, (কলকাতা : ওরিয়েন্ট লংম্যান), পৃ. ১১৭
৪. রামশরণ শর্মা, “বিবাহের প্রকারভেদ ও প্রথার উপর বর্ণের প্রভাব”, প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস (কলকাতা : ওরিয়েন্ট লংম্যান), পৃ. ৭০
৫. সুকুমারী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত, পৃ ৩৩
৬. রামশরণ শর্মা, “পুরাণ ও মহাকাব্যে নারী ও সম্পত্তির সহ উল্লেখ”, প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস (কলকাতা : ওরিয়েন্ট লংম্যান), পৃ. ৫৬-৫৭
৭. রনবীর চক্রবর্তী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১৯

সুবীর সরকার
চিহ্নমেলা : অনবদ্য এক অর্জন

মানসিক প্রস্তুতি চলছিল প্রায় দেড় বছর পূর্ব থেকেই। বাংলাদেশে আমার কবিবন্ধু মাসুদার রহমানের কাছ থেকে আমি প্রথম শহীদ ইকবাল সম্পাদিত চিহ্নপত্রিকা ও চিহ্ন-প্রকাশিত বইপত্রগুলোর খবর জানতে পারি ২০১১-এর মধ্যভাগে। তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়। ইতোমধ্যে বন্ধু, কবি  পাবলো শাহী যশোর থেকে ডাকযোগে আমাকে পাঠান চিহ্নর একটি সংখ্যা। পত্রিকা পড়ার পর আমি চমকিত ও মুগ্ধ হই। একেবারে ভিন্ন ধারার পত্রিকা। ভাবনাবিশ্বকে আলোড়িত করে। ইতোমধ্যে মাসুদারের সৌজন্যে শহীদ ইকবাল, রহমান রাজু, সৈকত আরেফিনদের সাথে দূরাভাষে কথা বিনিময় হতে থাকে নিয়মিত। ফেসবুকেও। জানতে পারি, ২০১৩ তে বৃহৎ পরিসরে আয়োজিত হতে চলেছে ‘চিহ্নমেলা : এপার বাঙলা ওপার বাঙলা’। এবং অনিবার্যভাবেই আমাকে জড়িয়ে পড়তে হয়, হারিয়ে যেতে হয় হালকাসব মেঘের ভিতরে। ২০১২-তে জানুয়ারি মাসে আমি বাংলাদেশে যাই। সেখানে কবি-দম্পতি রিষিণ পরিমল ও সরিফা সালেয়া ডিনার রংপুরের বাসগৃহে শহীদ ইকবালসহ চিহ্নপরিবারের এক ঝাঁক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার ও সহযাত্রী নাট্যজন দীপায়ন ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎ ও ভাববিনিময় ঘটে। রংপুরের এক অতিথিশালায় জমে ওঠে আমাদের নৈশ বিনিময় সভা। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা। ফেব্র“য়ারি ২০১২-তে আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী আসি কবি শিমুল মাহমুদ ও কবি মাসুদার রহমানের চিহ্নপ্রকাশিত দুটি কবিতার বই (আবহাওয়াবিদগণ জানেন ও উত্তরবঙ্গ সিরিজ)-এর চিহ্নআয়োজিত বই প্রকাশ অনুষ্ঠান ও বিনিময় সভার অংশ হতে। সঙ্গী সেই নাট্যজন দীপায়ন। প্রচুর আড্ডা, বিনিময়, চিন্তাস্রোতের উজানভাটি এবং চমৎকার ব্যক্তিত্ব শহীদ ইকবালের বাসার দাওয়াতÑসব মিলিয়ে পূর্ণ হয়ে দেশে ফিরে আসা।

খ.
একসময় জেনে যাই চিহ্নমেলার আয়োজনের তারিখ নির্ধারিত হয়ে গেছে। ২০১৩-এর ১৩ ও ১৪ মার্চ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এপার বাঙলার দায়িত্বের বড় অংশ বন্ধু মাসুদারের কাঁধে। ২০১২-এর সেপ্টেম্বর মাসে আমি আবার বাংলাদেশে যাই। মাসুদারের বাড়িতে মাসুদারের কাছ থেকে পেয়ে যাই শহীদ ইকবালের অসামান্য বইÑ ‘বিশ শতকের রূপকথার নায়কেরা’; দেশে ফিরে একটানা যা আমাকে পড়ে ফেলতে হয়েছিল। শহীদ ভাই কেবল একজন অসামান্য সংগঠকই নন, দুরন্ত একজন লেখকও বটে। কথাবার্তা চলতে থাকে। প্রস্তুতি পর্বও। দুতরফেই জেগে থাকে কেমন এক তাড়নাজাত উত্তেজনাও।

গ.
আমান্ত্রণ চলে আসে। ভিসাও হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে সংশয়, সংকট তৈরি হতে থাকে। আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যত সমস্যাই আসুক; আমি যাবোই যাবো। খারাপ লাগছিল, কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, এত দীর্ঘ শ্রমনিষ্ঠায় শহীদ ভাইয়ের যে আয়োজন সংগঠিত করেছেন তা যেন বৃথা না যায়। অবশেষে ১০ মার্চ, ২০১৩ তারিখ আমি সীমান্ত অতিক্রম করে রংপুর পৌঁছে যাই। কবিদম্পতি রিষিণ পরিমল ও ডিনা আপার আতিথ্যে। পরদিন রংপুরে কবি শৈলেন বর্মার বাসায় আড্ডা ও মধ্যাহ্নভোজ সারি। এরপর বন্ধু মাসুদারের বাসার উদ্দেশে রওনা দিই। মাসুদার খুব উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছিল ভারতীয় অতিথিরা শেষপর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে কি-না তাই নিয়ে। পরদিন আমি ও মাসুদার হিলি সীমান্তে পৌঁছে যাই, কবি প্রশান্ত গুহ মজুমদার ও গল্পকার, চিত্রশিল্পী তানিয়া গুহ মজুমদারকে পার করার জন্য। সন্ধ্যোবেলায় পৌঁছে গেলেন কবি উমাপদ কর, কবি সূরয দাস ও রূপম গুহ মজুমদার। সবার ঠিকানা মাসুদার ও সুমাত্রা রহমানের সেনপাড়ার আমোদিত বাড়ি। গানে গল্পে ভ্রমণে হরেক খাদ্যদ্রব্যসমাহারে সে এক জমজমাট উপাখ্যান। ইতোমধ্যে কবি গৌতম গুহ রায় ও কবি শৌভিক দে সরকার ভারত থেকে পৌঁছে গেছেন সরাসরি রাজশাহী।

ঘ.
১৩ র্মাচ সকালে মাসুদারের নেতৃত্বে আমরা (আমি, উমা দা, প্রশান্ত দা, তানিয়া বৌদি, সুরয, রূপম প্রমুখ) পৌঁছে গেলাম পাঁচবিবি স্টেশনে। ওখান থেকে রাজশাহীর ট্রেন ধরা হল। জয়পুরহাট ও নাটোর থেকে অনেক কবি-গল্পকার-সম্পাদক আমাদের সাথে যোগ দিলেন। বাংলাদেশের অনবদ্য প্রকৃতির ভেতর সে এক গতজন্মের  জন্মান্তরবাহিত রেলভ্রমণ। যা সারাজীবন তাড়া করে ফিরবে আমাকে। দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে গেলাম। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনপর্ব এবং পদযাত্রা ততক্ষণে অবশ্য শেষ হয়ে গেছে। আমি ও আমরা তুমুল ডুবে গেলাম উৎসবের নকশাদার বর্ণিল পুষ্করিনীর গভীরে। ১৩ ও ১৪ দুদিনই অংশ নিয়েছি কবিতাপাঠ, আড্ডা ও আলোচনাচক্রে। এপার বাংলা, ওপার বাংলা দুবাংলাতেই সাহিত্যের মাধ্যম বাংলাভাষা এবং দুবাংলাতেই কেন্দ্রাভিমুখীন সাংস্কৃতিক বিনিময় নয়; সর্বাপেক্ষা জরুরী প্রান্তের সঙ্গে প্রান্তের বিনিময় ও মেলবন্ধনÑ এমতো আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। দুদিনই ছিল আবহমান বাংলার লোকসঙ্গীত পরিবেশনা। চিহ্নপুরস্কার, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হকের বক্তব্য ঋদ্ধ করেছে। দুবাংলার অসংখ্য ছোটকাগজের আগমন ঘটেছে, চারপাশে উপচানো শব্দপ্রেমিক শব্দচাষীর দল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যমনস্ক ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে সুসংগঠিত এই চিহ্নমেলা আমাকে নতুন উদ্যম ও প্রাণ জুগিয়েছে। ১৩-রাতে পৌঁছে গেছেন ‘কবিতা ক্যাম্পাস’-এর অলোক বিশ্বাস, রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়। কতজনের সাথে আড্ডা হয়েছে, মতবিনিময়, বির্তক, স্বপ্নবিষয়ক পরিকল্পনা রচিত হয়েছে যার কোনও ইয়ত্তা নেই। আলাদা করে কোনও নামোল্লেখ করলাম না। পরিশেষে এটুকুই অনিবার্যভাবে বলি যে  ‘চিহ্নমেলা’ আমার সামান্য জীবনের অসামান্য অর্জন। সাবাশ বাংলাদেশ।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা