ষাটের দশক

 

আল মাহমুদ

সোনালী কবিন

৮.

লোবানের গন্ধে লাল চোখ দুটি খোলো রূপবতী

আমার নিঃশ্বাসে কাঁপে নক্শাকাটা বস্ত্রের দুকূল?

শরমে আনত কবে হয়েছিল বনে কপোতী?

যেন বা কাঁপছো আজ ঝড়ে পাওয়া বেতসের মূল?

বাতাসে ভেঙেছে খোঁপা, মুখ তোলো হে দেখনহাসি

তোমার টিক্লি হয়ে হৃদপিণ্ড নড়ে দুরু দুরু

মঙ্গলকুলোয় ধান্য ধরে আছে সারা গ্রামবাসী

উঠোনে বিন্নীর খই, বিছানায় আতর, অগুরু।

শুভ এই ধানদূর্বা শিরোধার্য করে মহিয়সী

আবরু আলগা করে বাঁধো ফের চুলের স্তবক,

চৌকাঠ ধরেছে এসে ননদীরা তোমার বয়সী

সমানত হয়ে শোনো সংসারের প্রথম সবক

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল

গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।

 

ষাটের দশক

 

শহীদ কাদরী

রাষ্ট্র মানেই লেফট্ রাইট লেফট্

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে স্বাধীনতা দিবসের

সাঁজোয়া বাহিনী,

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে রেসকোর্সের কাঁটাতার,

কারফিউ, ১৪৪ ধারা

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে ধাবমান খাকি

জিপের পেছনে মন্ত্রীর কালো গাড়ি,

কাঠগড়া, গরাদের সারি সারি খোপ

কাতারে কাতারে রাজবন্দী;

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় মিছিল থেকে না-ফেরা

কনিষ্ঠ সহোদরের মুখ

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় তেজগাঁ

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা,

হাসপাতালে আহত মজুরের মুখ।

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় নিষিদ্ধ প্যামফ্লেট,

গোপন ছাপাখানা, মেডিক্যাল

কলেজের মোড়ে ‘ছত্রভঙ্গ জনতা—

দুইজন নিহত, পাঁচজন আহত’— রাষ্ট্র বললেই

সারি সারি ক্যামেরাম্যান, দেয়ালে পোস্টার:

রাষ্ট্র বললেই ফুটবল ম্যাচের মাঠে

উঁচু ডায়াসে রাখা মধ্য দুপুরের

নিঃসঙ্গ মাইক্রোফোন

 

রাষ্ট্র মানেই স্ট্রাইক, মহিলা বন্ধুর সঙ্গে

এনগেজমেন্ট বাতিল,

রাষ্ট্র মানেই পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত

ব্যর্থ সেমিনার

রাষ্ট্র মানেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাওয়া

রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা

রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা মানেই

লেফ্ট্ রাইট্, লেফ্ট্ রাইট, লেফ্ট্—!

 

ষাটের দশক

 

আবুবকর সিদ্দিক

এলোমেলো পরমায়ু

সন্ধের চেয়েও ঘন মেঘ করে আসে।

আঁচলে হলুদ মুছে মেজবউ ঘরে এসে ডাকে,

ও মোহন, দ্যাখ দিকি হাটুরেরা ফিরে এলো নাকি?

 

নেই নেই পথে নেই দিগন্তেও নেই,

সড়কের সংসারে একটিও খড়কুটো নেই,

ডুবন্তের হাতনাড়া নেই জলতলে।

এইখানে ঘট ছিলো, এইখানে বাঁধাবট ছিলো।

যারা যারা ছায়াশানে পঞ্চায়েতে বসে ছিলো,

কেউ এলো না তো।

আদুল গেরস্থ সব পথে পথে ঘোরে ভিনগাঁয়ে।

 

সম্বরা দিতে গিয়ে মেজবউ আখা ভেবে মন ঠেলে দিলো,

দুয়োরে শিকল তুলে একবস্ত্রে নেমে চলে গ্যালো।

সন্ধেতারা চুরি করে তুলে নিলো তাকে,

এলোমেলো হয়ে গ্যালো গোছগাছ পরমায়ুটুকু।

 

আবছায়া ফিশ ফিশ স্বরে ডেকে বলে,

ভাঙাচুড়ি পড়ে আছে চাঁদের নিচেয়।

এ মাটিতে পথরেখা চিনবার আর কোনো ধুলোছাপ নেই,

আর কেউ নেমে গিয়ে ফিরে আসে না তো।

 

ষাটের দশক

 

ওমর আলী

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি

আইভি লতার মতো সে নাকি সরল, হাসি মাখা;

সে নাকি স্নানের পরে ভিজে চুল শুকায় রোদ্দুরে,

রূপ তার এদেশের মাটি দিয়ে যেন পটে আঁকা।

 

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো

মায়াবী উচ্ছ্বাস দুটি চোখ, তার সমস্ত শরীরে

এদেশেরই কোন এক নদীর জোয়ার বাধভাঙা;

হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে।

 

সে চায় ভালবাসার উপহার সন্তানের মুখ,

এক হাতে আঁতুড়ে শিশু, অন্য হাতে রান্নার উনুন,

সে তার সংসার খুব মনে-প্রাণে পছন্দ করেছে;

ঘরের লোকের মন্দ-আশংকায় সে বড় করুণ।

 

সাজানো-গোছানো আর সারল্যের ছবি রাশি রাশি

ফোটে তার যত্নে গড়া সংসারের আনাচে-কানাচে,

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর এ ব্যাপারে খ্যাতি;

কর্মঠ পুরুষ সেই সংসারের চতুষ্পার্শ্বে আছে।

 

ষাটের দশক

 

আবদুল মান্নান সৈয়দ

মরণের অভিজ্ঞান

সবুজ চাঁদের নিচে প’ড়ে আছে আমার শরীর।

চেতনা, তারার নিচে। আমার চীৎকার উঠে যায়

অলীক ফিটনে চ’ড়ে ঘুরে-ঘুরে আরক্ত চাকায়

নীল শূন্যে। নদীঃ আমার জীবন; বাকি সবঃ তীর।

 

প্রবেশ করেছি ধীরে মরণের ধবল প্রাসাদে—

মর্মর-পাথরে তৈরি মেঝে, ছাদ সময়ে বানানো।

মাথা ফেটে সব স্বপ্ন চূর্ণ-চূর্ণ প’ড়ে আছে যেনঃ

সবি খাবে বিশদ বিড়াল, কেবল কৃতিত্ব বাদে।

 

লুপ্ত ঐ একতান গোধূলির তাম্র অনুতাপ;

ধ’সে পড়ে স্তনের গম্বুজ; চৈতন্য, একটি তিলঃ—

নিসর্গ, রমণী, সত্তাঃ নিরর্থ পাগল অনুলাপ।

তৃণ শীর্ষে শুয়ে হিশেব করবো আজ, যায় কে-কে?—

সব নদীর উপরে ধবল-ধূসর গাঙচিল

ওড়ে মরণের, নীল নৌকোর জীবনে যায় ঠেকে ॥

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

রফিক আজাদ

পিছনে ফেলে আসি

পিছনে ফেলে আসি :

একটি বাড়ি—

নিকানো নয়, পরিত্যক্ত, ভাঙা ইটের সারি,

বয়ঃপ্রাপ্ত কিছু বৃক্ষ, শুকনো ডালপালা;

 

পিছনে ফেলে আসি :

কিশোর ঘুড়িগুলি,

আদিগন্ত দীর্ঘ হালট, শিউলি-ঝরা ভোর,

বোষ্টুমিদের নাড়–মোয়া, ঝকঝকে ঘর-দোর,

এবং তাদের মিষ্টি ঠাট্টা : ‘ওগো-হ্যাঁগো’, হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

 

পিছনে ফেলে আসি :

পায়ে-চলা পথ, রেশমি ঘাসের বন,

কয়েকটি খুব পুরনো গাছপালা,

শ্যাওলা-সবুজ জলের পুকুর,

পুকুরে সাঁতরানো বুকে

স্তব্ধ হ’য়ে থাকা

রল-উলরোল সাত-সমুদ্রের ঢেউ।

 

পিছনে ফেলে আসি :

গভীর গহন হাতি-ঘাসের বন,

চিনিচম্পা আমের দুপুর

কিংবা কোনো আকাশ-উপুড়

জলবতী মেঘের মৃদু একটানা বর্ষণ

 

পিছনে ফেলে আসি :

কুয়োর মতো গভীর দু’চোখ অশ্রুভেজা : মা;

অনাবাদি জমির মতো ধূ-ধূ দৃষ্টি : বাবা;

প্রবীণ লাঙল, বৃদ্ধ বলদ, জরাজীর্ণ বাড়ি;

কয়েকটি খুব ক্ষুধার্ত মুখ, তোবড়ান গাল, ক্লিষ্ট হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

পিছনে ফেলে আসি :

কলাগাছের ছায়ায় ওড়া অপেক্ষাতুর

একটি সবুজ শাড়ি,

‘বিদায়-বলা একটি মুখের কান্নাচাপা হাসি,

পিছনে ফেলে আসি ॥

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

মোহাম্মদ রফিক

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ঝরে পাতা শীতার্ত সন্ধ্যায়

ধুলোবালি খড় নিয়ে কিছু আলো কিছু অন্ধকার

প্রতি ঘরে-ঘরে টেমি হাওয়ার আঘাতে কেঁপে ওঠে,

 

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ভয়ার্ত বাথানে গোরু-মোষ

তীব্র শব্দে শ্বাস ফেলে চারিধারে সন্ত্রস্ত বিহ্বল

খাল বিল ছেড়ে এসে হাঁসের খোপের ধারে-ধারে

 

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে হেঁটে যায় ছাড়া আঘাটায়,

ঝোপের আড়ালে লোভে জ্বলে ওঠে দুটি তীব্র চোখ

ক্ষণিক চমকে যায় বাঁশবনে ঝুলন্ত বাদুড়,

 

হাঁটা-চলা খড়ের চালের পর অচেনা পায়ের

ঝুপঝুপ শব্দ ওঠে শ্যাওলা পচা পুকুর ঘাটায়

তেঁতুলগাছের ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে নামে

 

অকারণ; বিষ্ণুপুর জুড়ে ভয়ে ভয়ে দেহগুলি

জড়সড় পুরনো কাঁথার নীচে আবেগে নিথর

কয়েকটা কুনো ব্যঙ নড়ে ওঠে চৌকির ওপর,

 

কাছাকাছি কড়–ই গাছের ভিড়ে গোঙায় ভুতুম,

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ছম-ছম ঘুম নেমে এলে

কালকেউটে গর্ত ছেড়ে বের হয় হিংস্র ফণা মেলে।

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

আবুল হাসান

ভালো লাগছে, রহস্যপ্রবণ লাগছে

ভালো লাগছে। এতকাল পরে আজো মানুষকে ভালো লাগছে।

রহস্যপ্রবণ লাগছে।

বড় তরতাজা লাগছে। যেমন যুবতী, যেমন জরায়ু, যেমন শিশির।

 

ভালো লাগছে। ফুল ও পূর্ণিমা, পুরাতন ভালোবাসা ভালো লাগছে।

মানুষ এখন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে ফিরছে। মানুষকে ভালো লাগছে।

মানুষকে মারা আজ কোনো কঠিন ব্যাপার নয়; সব সহজ।

 

জর্জর সঙ্গম, ফুল, জন্মে জেগে ওঠা মৃত্যু, অন্ধকার। সব সহজ।

কোনোকিছু আজ আর কোনোকিছু কঠিন ব্যাপার নয়।

ভালো লাগছে। বেরিয়ে আসছে বিষ, ক্ষয়, মৃত্যু ও জরা।

ফুলের মালায় বেরিয়ে আসছে অবেলায় অজগর, ভালো লাগছে।

রহস্যপ্রবণ লাগছে।

ফুল ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে ফের বলছে ফুল ছিঁড়িও না।

কুকুরের মধ্যে ফের কুকুর বসিয়ে ফের বলে উঠছে কুকুর হইতে সাবধান!

 

ভালো লাগছে। মানুষকে ভালো লাগছে। ভালো লাগছে। সারাদিন

ভালো লাগছে। সারাদিন রহস্যপ্রবণ লাগছে, ভালো লাগছে,

ভালো লাগছে না।

 

সত্তরের দশক

 

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

খতিয়ান

হাত বাড়ালেই মুঠো ভ’রে যায় ঋনে,

অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা।

রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে,

আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা।

 

টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুরের ঘাম,

ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল,

নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম,

চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল।

 

ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে,

উড়াও নিরবে নিভৃত রুমালখানা।

পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে,

আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা—

 

টোকা দিলে ঝ’রে পড়বে পুরোনো ধুলো

চোখের কোনায় জমা এক ফোঁটা জল।

কার্পাশ ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো,

থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল।

 

জাগবে না বনভূমির সিঁথানে চাঁদ,

বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া

পড়বে না মনে, অমীমাংসিত ফাঁদ

অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া।

 

হাত বাড়ালেই মুঠো ভ’রে যায় প্রেমে,

অথচ আমার ব্যাপক বিরহ ভূমি।

ছুটে যেতে চাই— পথ যায় পায়ে থেমে,

ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নোখে তুমি।

 

সত্তরের দশক

 

আবিদ আজাদ

জন্মস্মর

স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল

 

সেই প্রথম আমি যখন আসি

পথের পাশের জিগা-গাছের ডালে তখন চড়চড় করে উঠেছিল রোদ

কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড-খণ্ড রূপালি আগুন

ঘাসে-ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য-ঝরানো গুচ্ছ-গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ

এইভাবে আমার রক্তপ্রহর শুরু হয়েছিল

সবাই উঁকি দিয়েছিল আমাকে দেখার জন্য

সেই আমার প্রথম আসার দিন

হিংস্রতা ছিল শুধু মানুষের হাতে,

ছিল শীত, ঠাণ্ডা পানি, বাঁশের ধারালো চিলতা, শুকনো খড়

আর অনন্ত মেঝে ফুঁড়ে গোঙানি—

আমার মা

স্বপ্নের ভিতর সেই প্রথম আমি মানুষের হাত ধরতে গিয়ে

স্তব্ধতার অর্থ জেনে ফেলেছিলাম,

মানুষকে আমার প্রান্তরের মতো মনে হয়েছিল—

যে রাহুভুক।

 

অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল

তিনজন বিষণ্ন অর্জুন গাছ।

সেই থেকে আমার ভিতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছি—

 

মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে?

 

সত্তরের দশক

 

ময়ুখ চৌধুরী

নৈতিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে

বাইরে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

চলো ওগুলো ঢুকিয়ে রাখি ফ্রিজে

যখন দরকার হবে তখন না হয়…

 

প্রতিদিন কেউ না কেউ দরজা খুলে নেমে যাচ্ছে নিচে।

গতকাল টমেটোর লাল মাংস ছুটে ছুটে গেছে ক্যামেরার মুখে।

আজ গাড়ির দরজার মতো খুলে যাচ্ছে ফ্রিজ,— নামছে

উপচে পড়া ফুলকপি স্বামীকে ছাড়িয়ে

মাছের সন্ত্রাসী লেজ মুড়োসহ চলে যাবে কাল

বর্ধিত সভায়

 

এইভাবে প্রতিদিন ওঠানামা করে এটা ওটা। আর, তারা

দরজায় একঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কতোদিন!

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে স্বপ্ন দেখে— রোদ আর হাওয়া।

 

অচল দ্রব্যের সঙ্গে থেকে একদিন ফ্রিজটাও অচল হয়ে যাবে।

 

সত্তরের দশক

 

দাউদ হায়দার

পথিক জন্ম যদি

মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বেদনা বেজে ওঠেÑটের পাই

গভীর যন্ত্রণা-দুঃখ! —হৃদয়ের সানুতটে সুখ নাই

কে যেন নিয়েছে প্রেম, নিশ্চিত, উদ্বেল, উত্তাল—

পথিক, তিষ্ঠ ক্ষণকাল!

মেঘ-লণ্ঠনে আলো নেই। বিদ্যুৎ আকর্ষণে

অনন্ত নক্ষত্রবীথি। রম্য নীহারিকা বিভাজনে

ঈশ্বরী যিনি, রমণীর নতজানু প্রার্থনায়

শিশুস্তন দেয়নি ফিরে; নিবেদিত দ্রাক্ষায়!

 

মনস্তাপে উৎক্ষিপ্ত বন্দনা, যদি ঝর্ণায় ক্ষীয়মাণ

তবে কেন, স্থির তাপিত মানুষ, নন্দিত বাসস্থান

ফেলে রেখে গান গায়? —দেখি, মানুষের সারা অঙ্গে

হাহাকার। —পথিক জন্ম যদি তব বঙ্গে!

 

সত্তরের দশক

 

শিহাব সরকার

ফিরে যা গ্রামে

থেকে যাবে শুধু তোর ভেজা পংক্তিমালা

সামনে রয়েছে গভীর খাদ

ওখানে কী এমন দেখিস ভাই আমার!

কোনো অনিবার্য মহান মূর্তি, তোর ভবিষ্যৎ দিন?

 

তুই ফিরে যা তোর প্রাক-পৃথিবীর গ্রামে

ওখানে বেদনা ও বিষাদের অন্য কোনো ভাষা নেই

আমাদের দ্ব্যর্থ সঙ্কেতের কুহেলিতে ডুবে মরে গেছে

তোর অনেক অনেক পূর্বসূরি

তুই ফিরে যা তোর প্রাক-পৃথিবীর গ্রামে

অন্ধকার তোর জন্য কোমল শান্তি হবে

ঠোঁট-টেপা বোনের মতো চুম্বন দেবে ভোরের সূর্য

 

তোর পংক্তিগুলো এক ধরনের অদ্ভুত অমরতা পেয়ে যেতে পারে

তুই জানতেও পারবি না, এসবের ভিতর থেকে

আমরা কীভাবে খুঁড়ে আনবো হিরণ্য ছাই, অমর হাহাকার

কী খুঁজিস তুই ঢাকা শহরে, জ্বলন্ত গোলাপ, বিদ্যুচ্চমক?

 

সত্তরের দশক

 

মাহবুব কবির

মঙ্গলের যাত্রাকালে

পৃথিবী ধ্বংসের আগে ডেরা গড়েছি মঙ্গলে।

 

মঙ্গলে যাত্রাকালে প্রভু জিজ্ঞাসিলেন,

পৃথিবীর স্মারক কী নিচ্ছো হে?

আমি বাক্স খুলে দেখলাম কবর খুঁড়ে তুলে-আনা

মায়ের দেহাবশেষ।

প্রভু ফের জিজ্ঞাসিলেন, পিতার হাড়গোড় কই?

আমি বললাম,

জন্মের পরই পিতা আমাকে প্রভুর তুষ্টিতে

বলি দিতে চেয়েছিলেন।

মা দুই স্তনের খাদে লুকিয়ে আমাকে রক্ষা করেছেন।

আমার সকল ভাইবোনকে পিতা প্রভুর উদ্দেশে

বলি দিয়েছেন।

আমি পিতাকে ঘৃণা করি।

 

এটুকু বলে পেছন ফিরে দেখি, প্রভু নেই।

দেখি, প্রভুভক্ত কুকুরটি আমার পিছু নিয়েছে।

 

আশির দশক

 

খোন্দকার আশরাফ হোসেন

প্রার্থনায় নম্র হও পাবে

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও পাবে,

কামে-ঘামে আমি নেই, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।

 

পাখিরা প্রমত্ত হলে সঙ্গিনীকে ডেকে নেয় দেহের ছায়ায়—

ছায়া নয়, রৌদ্রতাপ জ্বালবার শক্তি ধরো, কেবলি আমাকে

তপ্তজলে দগ্ধ করো, রুদ্ধ ক্রোধে দীপ্ত করো, পাবে।

পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহঙ্কার আমার কবিতা

বিষাদে বিশ্বাসে পূর্ণ হৃদয়ের জলাধারে ধরো,

আমাতে নিবদ্ধ হও পূর্ণপ্রাণ ফলবন্ত হও—

আমাকে পাবে না ফলে, পরাগ-নিষিক্ত হও, পাবে।

 

আমি তো নিষিদ্ধ প্রেম, শুদ্ধ ব্যথা, বিষাক্ত আঙুর,

আমার বিষের দানা জিভে কাটো, রক্তরস যিশুর রুধির

পান করো, নতুন দানা প্রজন্ম সাধ তুঙ্গ করো, পাবে।

আমাকে পাবে না দুঃখে, একটি হতাশা শুধু পাবে।

ছুরির ফলায় জমা একফোঁটা প্রাকৃতিক স্বেদের মতোন

তীক্ষ্ণ করো, মূর্ত করো, পাবে।

 

তেত্রিশ বছর ধরে বুকের সন্তাপ জমা সে সন্তাপ তুলে নাও চুলে,

মেঘের উড়াল-দেয়া পাখিদের ফেলে যাওয়া অবিন্যস্ত ছায়া

চোখের মণিতে গাঁথো, উড়ালে বিশ্বাসী হও পাবে।

 

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও, পাবে,

তৃপ্তির সন্ত্রাসে নয়, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা