আমিন মল্লিক’র প্রবন্ধ

কবন্ধ কালের সাক্ষী জাহিদ হায়দারের কবিতা

সত্তর দশকের অন্যতম কবি জাহিদ হায়দার (জ. ১৯৬৫)। ‘স্বাগত কালের পর্যটক’ (১৯৮২) কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্যে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ‘খোলা দরোজায় দিন (১৯৮৫), ‘অগ্নিগণ সখা আমার’ (১৯৯২), ‘বলো দূত, অভিসার তিথি’ (১৯৯৬), ব‘ন্দনা করি অপেক্ষার’ (১৯৯৭), ‘রূপকথা এঁকেছিলো ক’জন’ (২০০৬) প্রভৃতি কাব্যে তাঁর কবি সত্তার বহুমুখী বিকাশ এবং কবিতার শিল্পপ্রকরণে সর্বাধিক প্রযতেœর মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্য জগতে দৃঢ় অবস্থানের প্রয়াসী হয়েছেন কবি। জাহিদ হায়দারের ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০৬) কাব্যসমগ্রের কবিতাগুলোর আলোকে বাংলা কবিতায় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে এই প্রবন্ধে আলোকপাত করা হলো।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কাব্যবৈশিষ্ট্য সত্তর দশকের কবি মানসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করলেও প্রতিষ্ঠিত অনেক কবির অনুবর্তন, অনুসরণ এবং শিল্পবোধের সব-নির্মাণ প্রত্যেক যুগেই দেখা যায়। আশির দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা স্বৈরশাসকের প্রত্যক্ষ ছোঁয়ায় লণ্ডভণ্ড এবং দলিত-মথিত হতে থাকে। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর বাঙালি প্রত্যাশিত স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, হতাশা, নৈরাশ্য, মানবতা ভূ-লুণ্ঠিত হওয়ার কারণে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে বিশৃঙ্খলা, ভয়-ভীতি, আতঙ্কের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে আসে নস্টালজিয়া, অস্তিত্ব-সংকট, বিপন্ন-মানুষ, সামরিক স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষের স্বপ্ন ‘জীবন মৃত্যুর সিম্ফনী’ প্রভৃতি।
‘সংক্রান্তি আমার জন্ম সময়’ কবি স্বীকার করে নিয়েই আত্ম-অভিজ্ঞতার নিষ্ঠুর বাস্তবতা প্রত্যক্ষ এবং নিরীক্ষণ করে উপড়ানো স্বপ্নকে বাস্তবের খামারে এনে রোপণ করেছেন। ‘ব্যাণ্ডের তালে তালে দারিদ্র্যের কুচকাওয়াজ না দেখার জন্য’, নিজেকে একটি সার্থক জাগরণের মধ্যে আশ্রয় দেবার জন্য কবি হাতে তুলে নিয়েছেন কলম। যখন প্রতিবাদী মানুষগুলোকে ধ্বংসের বাঁধ ঘিরে ধরেছে, করেছে সজীব শব। ভয়াবহ ঋণ ঘাড়ে নিয়ে ক্ষত-টাটায়, শোকে কাতরায় তবু জ্বলে ওঠে না মানুষগুলো। আদি জন্মে ভুল করে শিশু হেঁটে চলে নদীর সাথে। মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-শহীদ মিনার বাংলার মানুষ বিপুল অর্জনে অর্জন করলেও অঙ্কুরিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি স্বার্থলোভী শাসকের নিষ্ঠুর শোষণের ফলে। ‘পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার জন্য’ কবিতায় বাংলার মানুষের নিঃশেষিত স্বপ্নের হাহাকার প্রকাশ করেছেন :
মিনারেরা বিশ্বাস করে না
বাংলাদেশ বসে আছে হুইলচেয়ারে
নিচে স্বদেশ প্রেমিক জনতার ভেতর
বিশ্বাসী শব্দের অপেক্ষায়
আমাদের প্রিয় অপূর্ব স্বপ্নেরা বসে আছে হুইলচেয়ারে।
(পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার জন্য)
৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতার প্রসঙ্গ বারবার চেতনার একান্ত উদ্বোধন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কাব্য। বুদ্ধিজীবী হত্যার নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে ‘শাদা দুধ দেখে আতঙ্কে কাঁপে দেশ’ কবিতায়। ‘১৫ আগস্ট ১৯৭৫’ কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার নির্মম ভোরের মর্মস্পর্শী কাব্যিক প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে স্বাধীনতার সূর্য সামরিক অভ্যুত্থানের কালো ছায়ায় ঢেকে যায় গণমানুষের স্বপ্ন-আশা-আকাক্সক্ষা।
সামরিকজান্তার হস্তক্ষেপে শিল্প-সৌন্দর্যের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, যখন রাজনীতি, ধ্বংসময় যুদ্ধ, উদ্ভট সিনেমার সংবাদের ভিড়ে কবিতা প্রকাশিত হওয়ার জন্য স্পেস পাচ্ছে না। তখন কবি ঘোষণা করেছেন :
কোন এক ভেতর মহলে বিষণ্ন সংবাদ
কিছু শব্দ গেরিলার মতো ঢুকে গেছে প্রধান নগরে
নগরবাসীরা জেগে আছে তীব্র প্রতীক্ষায়,
শোনা গেছে
নিষেধ অমান্য করে কবি আসছে প্রধান নগরে।
(কবির প্রবেশ নিষেধ)
বাস্তবিক যা ঘটেছে তার নির্মম বর্ণনা দিতে কবি পিছপা হননি। শাসকের দাঁতল দাঁত, বিষাক্ত নখর, নিষ্ঠুর অবিবেচক বিবেকের কঠোর ব্যবহারের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলছেন ‘আমি নই শেষ মানুষ’ এবং ‘অর্জিত হলো কষ্ট’ কবিতায়।
‘পরাশক্তির জেনারেল এবং একটি পিঁপড়ে’ কবিতায় কবি বাংলাদেশের সামরিক শাসনের কলঙ্কময় ইতিহাস এবং অসহায় মানুষকে পিঁপড়ের মতো হত্যা করার দৃশ্য এবং বুভুক্ষায় মৃতপ্রায় গণতন্ত্রের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। ক্ষুধার্ত পিঁপড়ের বেশে এসেছে গণতন্ত্রপ্রত্যাশী মানুষ। সামরিক হুকুমে অস্ত্রের খোকায় ভরেছে ইতিহাস। সামরিক অভ্যুত্থানে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে দেশের নিরীহ মানুষ। লোভী রাজনীতিবিদগণ নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে গণতন্ত্রের কবর রচনায় তারাও সহযোগী ভূমিকা পালন করেছে :
কানের কাছে তাক করে সামরিক গলায় হুকুম করলেন
: পিঁপড়ে, শেষবারের মতো বলছি
বেরিয়ে এসো
না হলে এক গুলিতে মাথা উড়িয়ে দেব।
(পরাশক্তির জেনারেল এবং একটি পিঁপড়ে)
‘হেলমেট পরা ছায়া’ প্রগতিশীল মানুষকে করেছে ছায়ার মতো অনুসরণ। বাংলার মানুষের স্বপ্নের খুলিকে গুলি করে উড়িয়ে দিয়েছে। তার বিস্তারিত বিবরণ জাহিদ হায়দারের কবিতায় উজ্জ্বলভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে।
আমার স্বপ্নগুলোকে
আক্রমণ করে হেলমেট পরা ছায়া
বহুযোজন দূরে আমার শৈশব, সারল্য-আমার
তৃতীয় মানুষের সবগুলো হাত একসাথে করে
সেই দূরকে স্পর্শ করতে যেয়ে
দেখলাম তাকে রক্তাক্ত করে
পা নাচিয়ে হাসছে হেলমেট পরা ছায়া।
আমরা সময়ের সাথে মাথা নিচু করে কথা বলি,
আমার পেছন মাথা উঁচু করে কথা বলে আমার সাথে;
(হেলমেট পরা ছায়া)
বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাস মাথা উঁচু করে স্বপ্ন পূরণের মিছিলে আহবান করে। কিন্তু মানুষগুলো সহসা সন্দিহান ভবিষ্যতে কি আশা জেগে আছে? ‘শান্তি রক্ষার নামে যুদ্ধ’? সবুজ বনভূমি ধ্বংসের উল্লাস?
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার কোন নিশ্চয়তা নেই জীবনে। ‘হাজার হাজার দগদগে দুর্দশা’ আশাশুনি গ্রামের মানুষের জন্য বয়ে নিয়ে আসে এই সময়। ধুধয়ে কুঁকড়ে যাওয়া দেহ, কোঠরগত চক্ষু শুধু জ্বলে, কারণ সামরিক চোখ তাদের মনকে শাসনে রাখে। ‘পরাধীন শব্দমালা অভিধান থেকে তুলে’ দিলেও স্বাধীনতার প্রকৃত সুখের বৃষ্টি তাদের সিক্ত করতে পারেনি :
আমাদের অভিশপ্ত দিন
কষ্টের মাটি গর্ভে দেয় ঢেউ
মানুষের সংহতি ভেঙ্গে পড়ে
জীবনের আর্তনাদে বন্ধু নেই কেউ।
(কবিতার জন্য অরণ্য)
তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশ বাংলাদেশ। এদেশের মানুষের ভাগ্যাকাশে কখনো উদিত হয়নি সোনালী স্বপ্নের ভোর ‘স্বৈরশাসনের ব্যাভীচারী শাসন শোষণে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ; অভাব-অনটন। অন্ধ ভিখারী শুন্য থালা হাতে ঘুরে ফেরে দুয়ারে দুয়ারে। অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত মানুষের জীবন। তীব্র আলো চোখের উপর ধরে আলোর বর্ণনা দেবার মতো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তাদের প্রতিরোধের ভাষা। উদ্ধত রাইফেল তাক করে আছে তাদের বুকে। শরীর ছিবড়ে রক্ত ঝরে মাটিতে। ধূলো আর রক্ত ওড়ে বাংলার বাতাসে। বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা করোটি ভেদ করে ফোটে বনফুল। সেই ধ্বংসস্তূপে দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে বন্দি মানুষ শুধু চেয়ে দেখে :
তিন ভিখারী আবার থেমে পড়ে
গতির উকুন রক্ত চুয়ে খায়,
তিন ভিখারী পরস্পরে বলে
দেশ থেকে কি ভিক্ষে উঠে গেলো?
(গতিশীল একটি উন্নয়ন চিত্র)
আশাগুলো চলে যায়
আমাদের স্বপ্নের শবযাত্রায়
অদ্ভুদ এক গোলাক ধাঁধা আমাদের নিয়ে কানামাছি খেলে
হাতের চাওয়ায় বাধে শূন্যতার চড়াই উৎরাই,
পায়ের তলায় উপড়ানো জন্মের হাহাকার।
(উপড়ানো স্বপ্নের সংলাপ)
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বেড়েছে সন্ত্রাসের ত্রাস। ‘কিসের সন্ত্রাস’ কবিতায় কবি সেই বহুমুখী সন্ত্রাসের ভাজ খুলে দেখিয়েছেন। ‘চাকার সন্ত্রাস, ছিনতাই সন্ত্রাস, ফতোয়ার সন্ত্রাস, মুক্তবাজার সন্ত্রাস, কথার সন্ত্রাস’ প্রভৃতি নির্মম সন্ত্রাসের কুফল তুলে ধরেছেন।
সন্ত্রাসের ফলে অপমৃত্যুর হার আজকাল জ্যামিতিক হারে বেড়েছে না বলে কবি বলেছেন, ‘আজকাল মৃত্যু নিয়ে বেড়ে’ গেছে অনেক আলাপ/তুমি কি উঠবে বেঁচে কালকে সকালে? ‘মৃত্যুবিষয়ক আলোচনা নিষিদ্ধ’ কবিতায় কবি হরেকরকম মৃত্যুর নাম প্রকাশ করেছেন: ‘সরকারি মৃত্যু, রাজনৈতিক মৃত্যু, পরিচয়ের মৃত্যু, পারিবারিক মৃত্যু, বনভূমির মৃত্যু, খ্যাতির মৃত্যু, কথার মৃত্যু, নদীর মৃত্যু, প্রেমের মৃত্যু, দেখা হওয়ার মৃত্যু, দরজা বন্ধ-প্রবেশের মৃত্যু; চলে গেল একজন-ঠিকানার মৃত্যু, রাত্রির মৃত্যু, দিবসের মৃত্যু, চুম্বনের মৃত্যু, বিচ্ছেদের মৃত্যু, উত্থানের মৃত্যু, সমতলের মৃত্যু, হাতের উপরে হাত নিঃসাল-স্পর্শের মৃত্যু। এতসব মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে কবি ‘কেউ আছো, উত্তর দাও’ কবিতায় বলেছেন :
আচ্ছা,
আমরা কি শবযাত্রা ছাড়া
অন্য কোনো যাত্রা করব না?
বিচার বহির্ভূত এইসব হত্যা দেখেও শহরের ভদ্রলোকগণের টনক নড়ে দেয় কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। আসলে যাদের আছে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ সমাজের সেই সব উচ্চবিত্তরা কখনো আন্দোলনরত মধ্যবিত্ত-নিুবিত্ত শ্রেণীর পাশে এসে দাঁড়ায়নি।
এত খারাপের কোলাহলেও কবি উত্তরণের জন্য নবজাতকের কাছে হাজির হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশুতীর্থ’ কবিতার মতোই নবজাতকের কাছেই এর উত্তরণ প্রত্যাশা করেছেন। কোন শিশু যেমন বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না সমাজের প্রচলিত পরিবেশ তাদের তৈরি করে। তাই কবি এসব মৃত্যুর উৎসব থামিয়ে বলেছেন:
থামো, পাশের বাড়িতে একটি শিশু জন্ম হলো,
তোমাকে জানতে হবে কবরখানার ভেতর দিয়ে
হেঁটে যাবার কৌশল।
(মৃত্যু বিষয়ক আলোচনা নিষিদ্ধ)
‘আমাদের গ্রামগুলো শহরের সৎভাই’ বলেই ‘লক্ষ্মীর পা লাঙলের ফলায়’ এঁকে শুভরঞ্জন সূর্যোদয়ের আগেই চলে যায় মাঠে। তারা অল্প জমি চাষ করে, সেথায় তাদের বসবাস। বিজ্ঞান মানুষকে চাঁদে নিয়ে গেছে কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে আসেনি কলের লাঙল, চাষের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। জমি জিরাত সব দখল করে নিয়েছে সামাদ মোল্লার মতো জোতদার। উপরন্তু তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে :
মাঠভরা সর্ষে ফুলের জোস্না
কখনো দেখনি তুমি
পাকা আমনের পূর্ণিমা
কখনো জানোনি
সর্ষে ফুল আর পাকা আমনের জোস্নার গন্ধ কেমন
একবার যদি,
মাঠভরা ফসলের জোস্না দেখতে তুমি?
(তা মানুষ যেখানেই যাক)
ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধার ভানে তেমনি তারা যেখানেই যাক তাদের চাষ করে খেতে হবে। রাত্রি-দিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর তাদের স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় দু’বেলা দু’মুঠো ভাত আর বৌয়ের জন্য মোটা তাঁতের শাড়ির ব্যবস্থা করে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ছোট সুখের সংসারের। কারণ :
ক. নদীগর্ভে গ্রামগুলি বিলীন,
গোধূলি ধূসর ডাকঘর বিলীন।
গ্রামগুলি লাশ, চিঠিদের বিতরণ শেষ।…
… ইলিশের পচন পদ্মার তীর
মাছিদের গানে জেলেরা নির্বাক।
(কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে আলো)
খ. আমাদের মধ্যে আছে নদীবোধ, পাড়ভাঙা বোধ;
কারো মধ্যে কেবল আঁধার নামে জাগে দুঃখবোধ
কেউ যায় পড়শীর ঘরে দিতে পুষ্পবোধ
(বোধগুলি)
কিন্তু অপরদিকে আমাদের শোষকেরা কখনো নেয়নি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মাফিক ব্যবস্থা। তাদের আছে বাগান বাড়ি, পরিপুষ্ট ব্যাংকের ব্যালান্স, ঋণে কেনা গাড়ি আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বাগান আসছে বাড়ি ফিরে
আছে গান, ঋণে কেনা গাড়ি
আর বিয়ার মধ্যপান।
আমাদের বাবু কারকার বিবি সাথে নৌকা চড়ে মধ্যরাতে;
(অদূরে বাগান বাড়ি)
ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ শাসকের কর্ণ-কুহরে পৌঁছায় না। কারণ তোষামদকারী সভাসদ শাসকের চোখে-কর্ণে সপ্ত-পর্দা মেলে ধরে :
বললো সভাসদ : খুব ভালো, খুব ভালো
শান্তি সবদিকে
বইছে সুখধারা
সঙ্গা নেই কোনো
কোথায় সন্ত্রাস?
মিথ্যে বলে ওরা।
(আবার তোতার গল্প)
‘ভূতের নাম স্বপনকুমার’ এবং ‘অন্ধ ধাইমা’ কবিতা দু’টিতে গ্রাম-বাংলার অস্তি-সজ্জায় নিমজ্জিত কুসংস্কারকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছেন। অন্ধকার আচ্ছন্ন নিরক্ষর সমাজে জীন-ভূত ছাড়ানোর নিমিত্তে আল-খাল্লা পরা শাদা মৌলবীর ভণ্ডামী ও নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে ‘ভূতের নাম স্বপনকুমার’ কবিতায়। বিজ্ঞানের স্বর্ণ-যুগে চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি ঘটলেও কুসংস্কারাচ্ছন্ন শিক্ষার আলো বঞ্চিত গ্রামের মানুষের কাছে রোগ-ব্যাধিতে পথ্য, ডাক্তার না পেয়ে এইসব কাঠ মৌলবীদের শরণাপন্ন হয়। ধর্মের লেবাস পরে ‘অদৃশ্য দেশে ফু’ দিয়ে অনেক মেয়েকে নির্যাতনের বৈধতা আদায় করতে কসুর করে না সেই সব মৌলবী। অষ্টাদশী সরল মেয়েকে অকস্মাৎ থাপ্পড় খেতে হয়। আজও আমাদের সমাজে অষ্টাদশী স্বর্ণাকে ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজের নামে প্রতারিত হতে হয় :
অষ্টাদশী আবার চুপচাপ। ক্লান্ত চোখ। রাজ্যের ঘুম তার দুই চোখে আলখাল্লা পরা মানুষ লাল চোখ খুলে আবার মন্ত্র আওড়ায়। এবং এক লোমশ হাত কন্যার নাকের সামনে হঠাৎ তুলে ধরে আগুনের শিখা।
(‘ভূতের নাম স্বপনকুমার’)
শিশু মৃত্যুর হার এ সমাজে কম নয়। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ প্রসূতির যতœ ও পরিচর্চা সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্ধকারে বাস করে। দারিদ্র্যের কারণে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোটে না কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে তাদের গর্ভধারণ থাকে অব্যাহত। অর্থাভাবে হয়ে ওঠে না প্রসূতি মাতার চিকিৎসা। গ্রামের অন্ধ ধাইমার হাতে মৃত্যুবরণ করে অজস্র নবজাতক। পোয়াতী বৌ আঁচি ঘরে বিয়ানোর পরিবর্তে গণনা করে মৃত্যুর প্রহর :
ছ’দিন ছিল ব্যথা
কত পানি পড়া
কত গাছের রস
জন্মাতে চায়নি
ঝড়ের রাতে হলো;
অই হাতের পর গাঁয়ের চার ভাগ
কেউ বা বেশ ভালো, কেউবা বদমাশ
(অন্ধা ধাইমা)
বাঙালি জাতির ঐতিহ্য-প্রকৃতি-প্রেম মিলেমিশে চিত্রকল্প তৈরি করেছেন জাহিদ হায়দার তার কবিতায়। মহাস্থান, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, জাঞ্জিরা গ্রাম, আশাশুনি, ইছামতি প্রভৃতির মধ্যে প্রাণসঞ্চার করেছেন কবি। মানব জীবনের শাশ্বত জীবন প্রবাহে চেতন-অচেতন মনের নিগূঢ় রহস্য, জৈবিক জীবন তাড়নার অনিবার্য ভাব প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতায়।
গ্রীবার নিচে পিঠ যমুনার চর
বপন করি আমি চুমুর বীজ
ফসল গেলো তুমি নৌকা শরীর
হালের কর্ষণে জীবন-গান।
(মহাস্থানগড় যাত্রা)
প্রেমের দুর্দান্ত আবেগ সময়ের নির্মম কষাঘাতে চুপসে গেছে। হৃদয়ের উদ্বেলিত প্রেমের ডাকগুড়গুড় যেন ভূতের ঢিলের মতো এসে পড়ে হৃদয় ছাউনির চালে এসে। প্রিয়া আসবে বলবে ভালোবাসি বলাটা স্বাভাবিক; কিন্তু দু’জনে হেরে যাব বিষয় স্বাভাবিক? কবি অক্রিয় নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিমায় প্রেমের আবেগকে প্রকাশ করেছেন। ‘বলো দূত, অভিসার তিথি’ কাব্যগ্রন্থে কবি হাজির হয়েছেন একঝাঁক প্রেমিক-প্রেমিকা, তাদের দূত এবং অভিসার তিথির অনুষদ নিয়ে। কথোপকথন ভঙ্গিতে হালকা চালে, মনোভাব প্রকাশে ইঙ্গিতময়তা পাঠক চৈতন্যে সচেতনভাবেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পোশাকী প্রেমের নারীর হৃদয় আজ কাঠ। ‘যেন বোঝে না মৌলিক’, ‘অ সধফবষ ড়হ ঃযব পধঃধিষশ’, ‘ভালোবাসি ঐ মিথ্যে’, ‘টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের দাঁতগুলো’, ‘শাদা পাতার সঙ্গে একরাত্রি’, ‘দহন, নিঃসঙ্গের গান’ প্রভৃতি কবিতায় কবি প্রেমের বিচিত্র রূপ-চিত্রিত করেছেন :
ক. কোন এক রাতে
মেয়ে তোমাকেও নগ্ন হতে হবে,
এবং আনন্দেই নীল আলোর মধ্যে
নগ্ন হতে হবে নিজ হাতে
অথবা অন্য কারো হাতে।
(যেন বোঝে না মৌলিক)
খ. নারীর হৃদয়ে কাঠের কষ্ট
সবুজ পাতারা এখন মাঠ
দুষ্টু হাওয়া এক
স্তনের কাঠামোয়
সহসা পেয়ে যায় রাধার সঙ্গ।
(অ সধফবষ ড়হ ঃযব পধঃধিষশ)
গ. শাদা পাতা রাত্রি কত বলে দাও মন্ত্র তোমার,
তুমি তো সেই কুমারী যে-মেয়ের শুচির কথা
তৃষিত কবিই জানে
(শাদা পাতার সঙ্গে একরাত্রি)
গ. রাত্রিতে মাজাঘসা করে
দাঁতগুলি আনন্দে কামড়ে দেয় ঠোঁট স্তনে
শিৎকার ধ্বনি সমেত উরুতে যোনিতে শিন্নে।
(টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের দাঁতগুলি)
‘জন্মান্ধের সৌন্দর্য বর্ণনা’ কবিতায় কবি কথোপকথন ভঙ্গিতে ব্যতিক্রম প্রকরণে রবি-রূপার প্রেমের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের উত্তপ্ত সংলাপের ফুল্কি শৈল্পিক মাত্রায় প্রকাশ করেছেন। ‘পানপাতা সুখ, টিয়া পাখি নাক, সুন্দর চাঁদের মতন’ প্রভৃতি প্রচলিত উজ্জ্বল বর্ণনা থাকলেও বিক্ষিপ্ত প্রশ্নবান আর উত্তরে এসেছে নতুনত্ব। ‘গন্ধরাজ ফুল, গোলাপ, ময়ূর পালক’এর বিপরীতে উপমা হিসেবে এসেছে ‘বিষফুল রক্তকরবী’।
‘আঙুল মাথায় জড়াতে জড়াতে চুল
শুধায় যুবক
দিয়েছ চুলেতে বুঝি সুগন্ধি তেল?
হাকি একা একা হেসে গেলো
সে নারীর ঠোঁটের উপর;
: বা! কী সুন্দর চাঁদ উঠলো এখন।’…
… যেন অকস্মাৎ
যুবক কেঁপে ওঠে শীতের হাওয়ায়
নারীর শরীর থেকে সরে আসে হাত,
অনাশ্রিত আঙুল কামড়ে ধরে শূন্য করতাল।…
… হাতের আকাক্সক্ষা তোমাকে যদি পায়
আনন্দ প্রতিমা নাচে হাতের ভেতর;
(জন্মান্ধের সৌন্দর্য বর্ণনা)
‘ভালোবাসি ঐ মিথ্যে’ কাবিতায় প্রিয়ার মিথ্যা রচনকে দৃঢ় প্রত্যয়ে সমর্থন করেছেন।
বিশ্বাস করে ভেবেছি
বলবোই, আমি রাধা তার
তোমাকে ছাড়া বেড়ি নেই
তুমিই বিশ্বে বাঁচাবার।
(ভালোবাসি ঐ মিথ্যে)
গদ্য-কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই বাংলা কাব্য জগতে প্রবেশ করে। সেই থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা গদ্য কবিতা কাব্য জগতে স্বতন্ত্র আসন লাভ করে। জাহিদ হায়দারের গদ্যাত্মক গদ্য কবিতা কখনো সামাজিক বিষয়; কখনো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, কখনো রাজনৈতিক ইস্তেহার হয়ে নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিমায় মৃদু ছন্দের স্পন্দন সৃষ্টি করেছেন। ‘জীবন মৃত্যুর সিম্ফনী’, ‘ঘুম বিষয়ে গবেষণার রিপোর্ট’, জরিপ, ‘গরুর হাটে পাউডার মাখা গাভী’, ‘কথাটি কবিতার মতো’প্রভৃতি গদ্য কবিতার কবির গদ্য কবিতা রচনায় দক্ষতা ও শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষকে মাঠে, ঘাটে হত্যার চিত্র গদ্যের হালকা চালে ফুটে উঠেছে। ‘তিনজন কালো মাছি নাচিছে কথক বেচারার রক্তমাখা চোখে’… হঠাৎ পুলিশ এসে ভেঙ্গে দিলো মাছিদের নাচ’। মানুষের গতিময় জীবন সাঁকোর উপরে মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু বিবেকের কাছে প্রশ্ন হলো মানুষটি যেতে চেয়েছিল কোন পাড়ে?
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের শাসন ব্যবস্থায় সামরিক অভ্যুত্থান মানবতাকে বুটের তলায় রক্তাক্ত করেছে বারবার। বৃষ্টির শব্দের মতো গুলির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। শাসকেরা তখন নিশ্চিত মনে ঘুমায়। কিন্তু সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে ক্রমাগত বৃদ্ধি পায় ভয় আর আতঙ্ক। মৃত্যু এসে করাঘাত করে দরজায়। ‘শব্দহীন শব্দ কেবল মৃত্যুমুখী মানুষেরা শোনে।’ শ্রমজীবী মানুষের কাছে ধ্র“ব সত্য কেবল শ্রম। তাদের ‘জীবন গিয়েছে ফেঁসে বাজারের পুরাতন ঝোলার ভিতর?
‘জরিপ’ কবিতায় কবি মানব মনের নিগূঢ় রহস্য নিয়ে জরিপ করে ফলাফল প্রদান করেছেন:
“মানুষের ভেতর-গভীরে আছে নগ্নবোধ, দেখা গেছে পুরুষেরা খুব দ্রুত নগ্ন হতে চায়; নারীরা অশ্লীল গল্প বলে বেশি।
বোঝা গেছে, পশুদের হিংসা, লোভ মানুষের থেকে কম, গোলাপ আর টাকা পাশাপাশি রেখে দেখা গেছে, মানুষেরা টাকার দিক তাকায় বারবার।
বাজার জরিপে দেখা গেছে, নারীগণ ভায়াগ্রার বিপণন সমর্থন করে; আর পুরুষেরা কামসূত্র পড়েছে বেশি।…
…জরিপের ফলাফল : মানুষেরা আজও ততটা সভ্য নয়।
‘গরুর হাটে পাউডার মাখা গাভী’ কবিতায় কুরবানির হাটে টেলকম পাউডার মেখে গরুর হাটে হাজির হয়েছে মীরকাদিমের গাভী।’
গদ্য-কবিতায় শব্দ উপমা, প্রবাদ আর অলংকারের ব্যবহার কবিতার শিল্পপ্রকরণে এনেছে নতুনত্বের আভাস :
ক. দুনিয়া কো লাথ মারো দুনিয়া তুমহারী হায়।
খ. ‘দিল ওহি মেরা ফাঁসগায়ি’।
গ. পাউডার মাখা গরু হাগে সাবলীল, শব্দ করে মোতে।
ঘ. ঘুমের চেহারা কুমারীর চোখে নীল জামা পরা তরুণের চোখের মতন।
কবির প্রথম অন্বেষণ শব্দ জাহিদ হায়দার কবিতায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাছাই বাছাই কিছু শব্দকে অনিবার্যভাবে ব্যবহার করে কবিতাকে করেছে রসোত্তীর্ণ। সনাতন-গ্রামীণ শব্দের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিদেশী শব্দের। চক্ষু, ঊর্ণা, সেলোফেন (এক প্রকার স্বচ্ছ কাগজ) স্পেস, ফেস্টুন, আঁজলা, পরচা, দাগ, দাখিলা, সিম্ফনী, টুংটাং, চলিষ্ণু, ঘোড়াবিক, ঊর্মিশর্ত দ্বিধা, ঊর্মিস্বর, ঔরস, শৈলচুড়া, উল্কি, তওবা, রাজসিক, মাফিক, জিষ্ণু, আঁচি, ধাইমা, শালা, হাগা, মোতা, কলোনিয়াল, ল্যাংগোট, বুবি ট্রাপ প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার কবিকে স্বতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জ্বল করেছে। ‘হেলমেট পরা ছায়া’ যে শব্দ দিলাম রেখেছ কোথায়?’ ‘সেই সন্ধ্য সেই রাত্রি’ ‘আকাট শুভার্থী’ প্রভৃতি কবিতায় শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে কবির অভিমত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত :
ক. আত্মীয় কাকেরা হাত তুলে ডেকেছে বারবার,
শব্দে কত ব্যথা
আমি চেয়েছি কেবল অবহেলা করার যোগ্যতা।
খ. কি সম্পাদনা করো?
রাত্রি? নাকি দিন, নাকি রজনীর ভাষা?
কেয়া আজ প্রেমশব্দ। জিষ্ণু রাজনীতিশব্দ
তুমি আমি অভিধানের খণ্ডৎ
শব্দেরা উদ্বাস্তু, শব্দেরা গৃহবাসী
দুদিকেই দুঃখ রাশি রাশি।
গ. সব মানুষের থাকে যে খতিয়ান
তাদের ছিল না পরচা কোনো দাগ
ভুল রাজস্ব তোমাকে দেয়া যারা
বাচাল কোকিল প্রেমের দাখিলায়।
কবিতার নামকরণএবং কবিতায় বাংলা ইংরেজি শব্দের সার্থক ব্যবহার করে ব্যতিক্রমী কাব্য-প্রকরণের সৃষ্টি করেছেন জাহিদ হায়দার তাঁর ‘নদী বিধৌত দেশ, মানে Riverine country’ কবিতায় :
নদীতে নৌকায় একা মানুষ, মনে পড়ে

Hermann Hesse Siddhartha এখনো দেখনি?

কিছু adult. Scene  আছে
তবে Phylosophical..
বেশ কিছু কবিতায় ধুয়ার সার্থক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হিসেবী শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন, বিভিন্ন মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দ এবং গদ্য ছন্দের প্রবহমানতা এবং মুক্তক ছন্দের ব্যবহার কবিতার প্রকরণকে করেছে সমৃদ্ধ। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সার্থক ব্যবহার :
মাতালের মুখে মত্ত
বিবরের সুখ শূন্য হৃদয়ে
মরা ঘাসে করে নৃত্য।
প্রতীক এবং রূপক-সাংকেতিক ভঙ্গিতে কবিতায় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন জাহিদ হায়দার। পরাশক্তির জেনালের এবং একটি ‘পিঁপড়ে’ কবিতাটিতে একটি বাহিনীর আড়ালে অন্য একটি কাহিনীকে রূপকভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘উপড়ানো স্বপ্নের সংলাপ’ কবিতায় ‘কবর’কে বিশেষ প্রতীকে ব্যবহার করেছেন কবি।
হেঁটে যায় কবরগুলো
চোখেরা খাদ্য খোঁজে
বসে পড়ে কবরগুলো
হতাশায় ডুকরে কাঁদে।
কবি শব্দালংকার এবং অর্থালংকারের বিবিধ শ্রেণীবিভাগের সার্থক এবং শিল্পসম্মত ব্যবহার করে চমক সৃষ্টি করেছেন। এক্ষেত্রে বাংলা কাব্যে ব্যবহৃত অনেক বোধ-উপমাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। ব্যবহার করেছেন উত্তম পুরুষের।
উপামা: ক. তোমার নারীদের হৃদয়ে শুধু কাঠ
খ. আমার শরীর ভিজে যায় ইতিবাচক স্বপ্নের ঘামে
গ. মুঠিভরা শিউলী ফুলের মতো ভাতের মহিমা চাই
মৃত্যু চাই প্রতিটি অস্ত্রের
ঘ. পাখা ঝাপটায় কী ব্যর্থ আক্রোশে
চঞ্চুতে গাঁথে চৌচির শাদা মেঘ।
ইন্দ্রিয় উপামা: ক. সর্ষে ফুল আর পাকা আমনের জোস্নার গন্ধ কেমন।
খ. তুমি মেয়ে রসুন পোড়া সুগন্ধী আঁচি ঘরে
আনন্দে তা দিতে ভালোবাসো চক্ষুঅলা ডিম
অনুপ্রাস: ক. মেঘেরা মেঘের নিঃশব্দ মিছিলে
অন্ধকার করে দিলো পৃথিবী।
খ. চোখে অনন্ত অন্বেষণ
আরো হেঁটে চল ক্ষয়িষ্ণু পা।
জাহিদ হায়দারের ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করলে সময়ের সাথে সাথে তাঁর কবি মন ও মানস উত্তর উত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে গেছে একথা দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলা যায়। কখনো কখনো বিষয়বস্তু এবং প্রকরণে সাযুজ্য না হওয়ার কারণে কবিতা রসোত্তীর্ণ হয়নি মনে হলেও শিল্পসার্থক কবিতার সংখ্যাই সর্বাধিক।
জাহিদ হায়দার তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু এবং প্রকরণের ক্ষেত্রে চৌকষ মানসস্বরূপ ও মনোভঙ্গিক পরিচয় দিয়েছেন কবিতার বিষয় ‘জীবন ও জগৎ চেতনা; আত্মসমিধ ও উপজীব্য সংবিধান? ‘সত্য-অন্বেষা, বোধের গভীরতা ও ভঙ্গির বিশিষ্টতা এবং রুচি মেজাজ তথা স্টাইল-লাবণ্য’, সহজাত প্রবৃত্তির মতোই প্রকাশ পেয়েছে কবিতায়। ‘শিকড়গন্থি দেশজ ও মানবিক সংযোগ তথা আন্তরিকতা, ঐকান্তিকতা, অকৃত্রিমতা, সারল্য এবং আত্মপ্রকাশের অনিবার্যতা’ তাঁর কবিসত্তাকে করেছে উচ্চকিত। জাহিদ হায়দারের কবিতা সমাজ ও মানুষের উন্নত চাহিদা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিটিয়ে চিরন্তন শিল্প সাফল্য অর্জন করবে এটাই প্রত্যাশা।

গোলাম কিবরিয়া পিনু’র কবিতা

জলপান

ঢলাঢলি করে ঢল নামালে নদীর
জলপান করো!
কার হাত ধরো?
লাবণ্যপ্রবাহ!
নাকি শুধু দাহ!
কোন্ অনুরাগে আজ হয়েছো বধির!

টলমল ভাব নিয়ে কামার্ত শরীর
পাত্রে তলা সরু!
ভূমি আজ মরু?
পাকা জামে রস!
নাকি শুধু কষ!
কলসীতে মধু নেই– অভাব দধির!

কোন বাতাসের কোলে আজ ঢলাঢলি
রূপ রস ছাড়া কেন হও শুধু বলি!

 

আরণ্যক জ্বর

রসগর্ভ পেয়ে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে!
ধ্বনিপ্রধান ছন্দের মধ্যে দিয়ে
–শুধু যাতায়াত!
লিপিকুশলতা নেই– পর্ববিন্যাসও নেই
শুধু ডাকঘর আর আরণ্যক জ্বর
চিঠিপত্র প্রেরণের আকুলতা!

ব্যাকুলতা নিয়ে দেখি–
অলংকাশাস্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে
ধ্র“পদ সংগীত হারিয়ে যাচ্ছে
গলা ছেড়ে গান গাওয়া যাচ্ছে না
সুরজ্ঞান লুপ্ত হচ্ছে ধোঁয়ার ভেতর!
নাট্যমন্দিরের পাদপ্রদীপ কি নিভে যাবে?
তারপর কোন্ দৃশ্যপট?

 

 
মধুকোষে বরফের আস্তরণ

ফুরিয়ে গেলে যা হয়
শুধু কি ক্ষয়?
তার চেয়েও অপেক্ষা করে বিপর্যয়।

পাটিগণিতের সাহচর্যে
ডুবে যাও কি বর্জ্য?
মধুকোষে কোন্ দোষে বরফের আস্তরণ
বেদনা ও অনুতাপ নিয়ে আ-মরণ!

ভূগর্ভ খুঁড়ে বের করা যাবে কি
সেই পুরনো স্বর্ণমুদ্রা?
দা নেই–ধারও নেই, পড়ে আছো ধূলোয় বেহুদা!

ছিল দৃষ্টি আকর্ষণকারী পদ্ম ও জল
এখন তা নেই! মেঘ নেই! খরা করে টলমল!

দিশেহারা হওয়া এবং গা সওয়া
লুপ্ত লোকজ্ঞান! বনরাজ্যে এসে–
এলাকা চেনার ক্ষমতা হারিয়ে যায়;
ডিঙ্গিটা একা যায় কোনখানে ভেসে ভেসে!

হাবিব জাকারিয়া’র গল্প

নামানুষ
(সম্পূর্ণাংশে ফ্রান্ৎস কাফ্কার ছোটগল্প প্রভাবিত)

কথা.
বিবর্ণ হয়ে এসেছে ভাটিবেলার দৃশ্যপট। আরও একদিন। আশ্বিনের সূর্য নিভে আসা উনুনের শ্বাসটান শুনিয়ে মিশে গেল না-নদীর স্রোতে। সারা নদীতে তার মৃত্যুযন্ত্রণা দুলে দুলে কমলা বর্ণের সঙ্গীত শোনায়।
তখনই আচমকা ছুটে এল অন্ধকার, মৃত সূর্যের শোকে কালো বসন তার, এমনকি প্রান্তর জুড়ে ছিটানো কাজল মাখা কান্না চুইয়ে চুইয়ে ঝরে নদীর শরীরে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি খুব বিষণ্ন ছিলাম। ভাবছিলাম, আমার চতুর্দিক পুড়ে গেছে খরায়, মানুষের গলিত শবও বুঝি জলের কাছে ছুটে আসছে জলের আকৃতি পাবার লোভে। আর তাদের তৃষ্ণার্ত হাঁয়ে সেঁধে যাচ্ছে কাশবনের চিবুক পর্যন্ত জনপদ, দীঘল বালিয়াড়ি, সব। আমি নিঃসঙ্গতর হয়ে যাচ্ছিলাম, আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম– এই নৌকা, কেবল এই নৌকাই মহাবিশ্বের তুমুল অন্ধকারের মাঝে একা এক প্রাণ নিয়ে ভেসে যাচ্ছে।
না, অকস্মাৎ অন্ধকার ভীষণ প্রসন্ন আজ। সকল দৃশ্যাবলী তাই তার জিহ্বা বেয়ে কণ্ঠনালীতে হোঁচট খায়। ফিরে আসবার সময় তারা পূর্ব দিগন্ত থেকে উপড়ে আনে চাঁদ, তাদের গায়ে লেপ্টে থাকা রূপালি জ্যোৎস্না অনুপম ঝিলিক ছড়ায়।
এমন সময়, কি এক অজানা আশঙ্কায় হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম আমি, সেই কান্নায় নিথর হবার আগে পাখিরা আরেকবার কলকণ্ঠে মেতে উঠল, বায়ুর দেহ উদোম করে উড়ে গেল শব্দ বসন, আর নৈঃশব্দ সেই বসনকে ঘুড়ি ভেবে উড়িয়ে দিল আকাশে, হেসে উঠল খলখলিয়ে।
অকস্মাৎ দেখি, আমি একা নই নৌকায়, আমরা চারজন। ঐ বোবা বৃদ্ধ মাঝি এবং আমরা তিনজন। এক সুকুমার কিশোর, এক টগবগে তরুণ আর আমি, ক্রমশ জীবনের ভাটিগামী। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, চিনবার আগ্রহ বা ইচ্ছাও ছিল না, কেননা আমরা জেনে গিয়েছি এখন মৃত্যু ভিন্ন আমাদের আর কোন ভবিষ্যৎ নাই। জীবনের ঘাট থেকে আমাদের টেনে-হিঁচড়ে এই নাওয়ের অভিযাত্রী করা হয়েছে। অথচ কি এক মানবিক হিংস্রতায় আমরা ঐ শ্বেতসর্বস্ব মাঝিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম, এমনকি এখন আরও বেশি, যতক্ষণ না আমার চিৎকার উপচে গান গেয়ে প্রমাণ করে দিল সে বোবা নয়।
পদ.
জীবন একখান ছোট্ট নাও,
রৌদ্রে ঝড়ে বাইয়া যাও,
ডুবে যদি ডুবল হঠাৎ
কিছুই করার নাইরে বন্ধু
কিছুই করার নাই।
বোলাম.
বৃদ্ধ বোবা নয় জেনে আমার তরুণ সঙ্গী হঠাৎ সেই কিশোরের দিকে একপলক তাকিয়ে মাঝিকে চিৎকার করে বলে
: আমরা কি সত্যিই মরতে যাচ্ছি? (বৃদ্ধ নিশ্চুপ) কথা বলেন না কেন? বলেন, আমরা কি মরে যাচ্ছি?
বৃদ্ধ : (আপন মনে) হায়, জীবনের কি বান্ধনগো। এক নাটাইয়ে তার অযুত-নিযুত প্রাণ। এই ঘুড্ডির সুতায় তিনি নাজানি কোন মাঞ্জা দিছেন!
তরুণ : ও একটা বাচ্চা ছেলে। ওর কি দোষ। ও মরবে কেন?
কথা.
এই ‘কেন’ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে বাতাসে, আর বৃদ্ধ মাঝির হাসি বীভৎস থেকে বীভৎসতর, ভেঙে দেয় সকল জলীয় কণার অনুবিন্দু, শিশির বৃষ্টিতে ভিজে যায় আমার শরীর। কী প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমার সব জড়তা, আড়ষ্টতা চতুর্দিকে ছিটকে যেতে থাকে। আমিও চিৎকার করে, বন্ধ দু’চোখে আরও অন্ধকার সঞ্চিত করে বলিআমি বাঁচব, আমি বেঁচে আছি।
ততকথা,
সত্যিই আমি বেঁচে ছিলাম, তখনও। বোধকরি সেই ছিল অন্তিম স্বপ্ন। আমি এমনটা ভাবলাম, যখন আমার অপ্রসন্ন ঘুম ভেঙে গেল। যখন দেখলামনৌকা নেই, নদী নেই, বৃদ্ধ মাঝিও নেই। আর সত্যিই, মৃত্যু ব্যতীত আমার আর কোন ভবিষ্যৎ নেই। আতারুণ্য আমি শৈশব ও কৈশোরের মৃত্যুশোকে আর্তনাদ করেছি। আর এখন, আমি সেই শ্বেতসর্বস্ব বৃদ্ধ মাঝি, সমগ্র জীবনের মৃত্যুর জন্য আর্তনাদ করছি। এই আমার স্বপ্নের একক এবং অদ্বিতীয় ব্যাখ্যা। জানি, দ্রুত অতিক্রান্ত হচ্ছে সময়, কোন এক দেয়াল ভেঙে গেলেই মুখোমুখি আমি ও মৃত্যু।
পদ.
সময়ের চতুর্দেয়াল অকস্মাৎ ভেঙ্গে গেলে
যাপিত কাল শতমুখা অনিশ্চিতগামী…
জীবিত প্রাণ ঘনঘোর রহস্যালোকে
জানেনা নিঃশেষের অন্তগান,
তবু এই অন্তিম রাত্রিতে
সময়ের কোটিভাগ এক একটি ডিঙি নাও,
মুছে দিয়ে অতীত ভবিষ্যৎ, ছোটে অনামা আঁধারে।
কথা.
আমার ধারণা, সকলে আমাকে মৃতই বলে। যদিও কথাটি কেউ কখনও আমাকে বলে নি, তবু মানুষের চোখ আমাকে দেখে আর উদ্দীপ্ত হয় না, তাদের চোখের সামনে আমি আকৃতির বিভ্রম হয়ে থাকি। কেননা, নাট্যমঞ্চে এই যে টিলাটি দেখছেন, এ ছাড়া আমার কোন সংস্থান নাই, এই একটি তাঁবু গেড়ে আমি জীবনের প্রান্তরে ক্যাম্প ফেলে বসে আছি। আর এই দোলনা আমার নিত্যসঙ্গী। আমি কর্মী কিন্তু আমার জন্য কোন কাজ নাই। আমি ভীরু এবং কখনোই নিজেকে কোন কিছুর সামনে ঠেলে দিই না। অবশ্য আমি আমাকে আর পাঁচজনের মত তাদের সাদামাটা গোত্রেও ফেলি না। আমার কাজ না পাওয়ার পিছনে একটাই কারণ, তা হলো… কিংবা হতে পারে, এই কাজ না পাওয়ার জন্য আমার কিছু করার নাই। যাই হোক, ব্যাপারটা এই যে, আমাকে কাজের জন্য কেউ ডাকে না। অন্যদের তো তাও কেউ কেউ ডাকে। যদিও, তারা আমার মত কখনোই চেষ্টা করে না। কিংবা এমনও হতে পারে ওরা কখনও এই ডাক পাওয়ার জন্য আকর্ষণ অনুভব করে নি। অথচ আমি, অন্তত আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি, কিছুদিনতো এই আকর্ষণ আমার মধ্যে লক্ষ্য করার মত একটা বিষয় ছিল। যাই হোক, আমার পিতামহ ছিলেন জীবন বিশেষজ্ঞ। উনি বলতেন…
পদ.
একপলকের জীবন হায়রে
পিছন ফিরলে নাই,
সাঁকো পার হইতে গেলে
সামনে যাওয়া চাই।
কথা.
বৃদ্ধ বয়সে আমার পিতামহের হাতপাগুলো থাকা না থাকার অর্থ ছিল সমান। ঘরের বারান্দায় বসে উনি অবাক হয়ে আমাকে দেখতেন। শৈশব-কৈশোরে উনিই ছিলেন আমার একমাত্র বন্ধু, উত্তর কৈশোরে অজান্তে কোনদিন সুতো ছিঁড়ে গেলে আমি নই, উনি মানবেতর কিংবা মানবোর্দ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ তখন নয়, তার মৃত্যুর পর সম্পর্কটা আমাকে তৈমুর লঙের মত দানবিক ভঙ্গিতে হানা দিত।
যাই হোক, তার সেই পরিণতির প্রতি আমার অমনোযোগ আমাকে তারুণ্যে প্রবেশ করার পথে স্বপ্নালু-উচ্চাভিলাষী করে তুলেছিল। নতুবা আমার চিরজীবন বালকত্বেই শৃঙ্খলিত হয়ে যেত। পিতামহের সেই তাকিয়ে থাকার অর্থ দীর্ঘকাল পরে আমার বাবার মুখে শুনতে পাই।
ততকথা.
বাবা বলতেন, “শোন্… যে জীবন বাঁইচা গেল তোর দাদায়, যে জীবন বাঁইচা গেলাম আমি, সে জীবন আর তোর কাছে ফিরবো না। মনে কর, তোর দাদায় গেছে নলছুটা থাইকা দহগ্রাম, আমি গেলাম দহগ্রাম থাইকা ফুলেরহাট, তুই যাইবি ফুলেরহাট থাইকা যতদূর মন চায়। বুঝলি?”
বাক্যের শেষদিকে তার কণ্ঠ ভয়ঙ্কর ভৌতিক হয়ে উঠত, চতুর্দিকে রাত্রির নিস্তব্ধতা– তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতেন“যা আউগায়া যা, সামনে যা, পিছনে তাকাইসনা।”
বাবার সেই ভৌতিক মহাবাণী সেই কালের ঋতুর বাতাসে মিলে কোন পর্বতচূড়ায় তুষার সৃষ্টি করতো তা জানা আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি, সে অজানা গ্রাম আমার চেনা হয় নি।
আমার প্রয়োজন ছিল সুখী জীবন, কেবল দুটো জরুরি শব্দ। এই প্রয়োজন থেকে অকস্মাৎ জীবন সম্পর্কে একটি কবিতা আমার ভেতরে বদ্ধমূল হয়ে যায়।
পদ.
কারণ, আমরা সাদা তুষারের উপর নির্জন গাছের মত,
দেখে মনে হয় ক্লান্তভাবে শুয়ে আছি,
হয়তো আলতো একটু টোকা দিলেই গড়িয়ে যাবো।
কিন্তু না তা করা যাবে না,
কারণ মাটির গভীরে গেঁথে আছে আমাদের শিকড়,
অথচ দেখুন, এটাও নেহাতই একটা দৃশ্য।
কথা.
আপনারা বলবেন, আমি সেই পুত্র যে পিতার নির্দেশ অমান্য করেছে। এর বিপক্ষে আমার একটি যুক্তি প্রদর্শন করতে হবে। কেননা, আপনারাও বিশ্বাস করেন যে, যুক্তি দিয়ে সবকিছুই সিদ্ধ হতে পারে এবং পাল্টা যুক্তি দিতে না পারলে আপনারা নিজেদের পরাস্ত মনে করবেন। ঠিক সে কারণেই এই গল্পটি বলা।
ততকথা.
অনেকেই এই অভিযোগ করেন যে, জ্ঞানী মানুষের কথাবার্তা নিছক গল্প ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাত্যহিক জীবনে তা কোনো প্রয়োজনে আসে না, যে জীবন ঠিক আমাদের। যখন জ্ঞানী ব্যক্তি জানান ‘রাস্তা অতিক্রম কর’ এর অর্থ অন্য কিছু। বাস্তবিকই কোন রূঢ় পথের এপার থেকে ওপারে যাওয়া নয়। হয়তো এমন কিছু যা ঠিকভাবে মেনে চললে অমেয় ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া যাবে। কিংবা এমনও হতে পারে, উপকথার মত, কিছু একটা যা আমরা জানি না। এবং যেহেতু জ্ঞানী ব্যক্তিটিও সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানান না, শেষ পর্যন্ত উপদেশটি আমাদের কাছে অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা বলা যায়, নীতিবাক্য আমাদের কাছে ধারণার অতীত একটি ধারণা যা আগেও আমাদের মধ্যে ছিল। অথচ, দৈনন্দিন সংগ্রাম এর বিপরীত অন্য কোনো দিকে।
বোলাম.
ধরুন একজন মানুষ বলে উঠলেন : তাহলে তুমি কেন প্রত্যাঘাত কর? নীতিকথা অনুসৃত হলে তুমিও জ্ঞানী ব্যক্তি হয়ে যেতে বাধ্য। প্রাত্যহিক জীবনের কোন সংগ্রামই আর সংগ্রাম থাকবেনা।
অন্যজন বললেন : বাজী লড়তে পারি, এটাও একটা নীতিকথা।
প্রথমজন বললেন : তুমি জিতে গেছ।
দ্বিতীয়জন বললেন : তবে, দুর্ভাগ্যক্রমে এ জয়লাভ নীতিগল্পেই।
প্রথমজন বললেন : না, রূঢ় বাস্তবে, নীতিগল্পে তুমি হেরে গেছ।
কথা.
ফলত এই মহাপৃথিবীর পথে একজন পথিক হিসেবে মনুষ্য সভ্যতার সব কৃতকর্মের দায় আমি বহন করতে পারি না। কেননা, এসব দায় নিষ্পন্ন করার সাধ্য আমার নাই। সেজন্য কোন রাতে যখন রাস্তার উপর দিয়ে আমি হেঁটে যাই, তীব্র চাঁদের আলোয় এবং রাস্তা ক্রমশ উঁচু হয়ে যাবার কারণে যদি এসময় রাস্তায় একটা মানুষের মূর্তি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে, যদি মানুষটি ছুটতে ছুটতে আমার দিকেই এগিয়ে আসে, আমি ভুলেও কখনও তাকে ধরতে যাব না। লোকটি যদি বৃদ্ধ হয়, অত্যাচারিত হয় তবুও না। এমনকি তার পেছন পেছন অন্য একটি মানুষকে চিৎকার করতে দেখলেও না। তাকে দৌড়তে দেব।
কারণ, তখন রাত্রি এবং কোনোভাবেই আমি তাকে সাহায্য করতে পারি না। যদি জ্যোৎস্নার আলোয় আমার রাস্তা ক্রমাগত উঁচু হয়ে সামনের দিকে উঠে যায় তবু এমন ঘটা তো অস্বাভাবিক নয় যে, তারা শুধুমাত্র রোমাঞ্চের জন্যই একে অপরকে তাড়া করছে? কিংবা তারা উভয়েই কোন ব্যক্তির পিছু নিয়েছে? এমনও হতে পারে, প্রথমজন হয়তো দ্বিতীয়জন নির্দোষ তাকে খুন করার জন্য ছুটছে আর তাহলে এমন ক্ষেত্রে আইনের চোখে আপনি অপরাধী হয়ে যেতে বাধ্য। এমনও হতে পারে, ওরা কেউ কাউকে চেনে না। প্রত্যেকেই আলাদাভাবে নিজেদের বাড়ী ফিরে যাচ্ছে অথবা ওরা রাতের পাখি কিংবা প্রথমজনের হাতেই হয়তো অস্ত্র রয়েছে।
যাই হোকনা কেন, ঠিক এরকম মুহূর্তে আমার কি ক্লান্ত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক নয়? এসময় কি আমি নেশাগ্রস্ত হব না? কিন্তু আমার সৌভাগ্য, দু’জনেই আমার চোখের সামনে থেকে অপসৃত হয়ে গেছে।
ততকথা.
এই সমস্ত কারণে আমি এই টিলার উপরে দোলনায় দুলি, তাঁবুতে শুয়ে কাপড়ের বুনন লক্ষ্য করি এবং একসময় ঘুমিয়ে পড়ি, কখনো জেগে উঠি আবার অতিদ্রুত ঘুমিয়ে যাই। মাঝে মাঝে দোলনায় দুলি… দুলি।
পদ.
কয়ে আকার বর্গীয় জ.
দুলছে দেখ অকাজের কোজো,
সময়তো ভাই নেই থেমে
ছুটতে ছুটতে গেলাম ঘেমে।
কথা.
এখানেই আমার বসে থাকতে ভালো লাগে। কারণ, এই উচ্চতম টিলা থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদগুলোর মাঝে আমাদের মানচিত্রটিকে সম্পূর্ণ আবিষ্কার করা সম্ভব না হলেও, আমি পরিষ্কার দেখতে পাই। সত্যি বলছি। এমন নয় যে, এই টিলাটি সব কিছু দেখাতে পারে। তবে, আমার মতে শুধুমাত্র এই টিলা থেকেই তা দেখা সম্ভব এবং অবশ্যই এই টিলার মুখ প্রভুদের মানচিত্রের দিকে নয়।
এমনও হতে পারে, হয়তো অন্যরা এখন আমাকে ভুলে গেছে। আমি না জানতে চাইলেও, একজন একদিন এই টিলার এসে আমাকে একথা জানিয়ে গেছেন। মানচিত্রের আবরণ– আবরণ দেখে আমার এ ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে।
পদ.
নদী নালা ফসলের মাঠ শুষে
সবাই কেন্দ্রে ছুটছে, কেন্দ্রের ভূখণ্ড মহাশূন্যমুখা।
এদিকে মানচিত্রের সবুজ শাড়ী খসিয়ে নিচ্ছে প্রভু,
অবশিষ্টরা ফাটা মাটিতে পা ডুবিয়ে
তাকিয়ে আছে আকাশে।
কথা.
এই আকাশ আমার জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন ব্যাপার, এর অস্তিত্ব কখনই আমি অনুবভ
করি নি। যেখানে কোনদিন, অন্তত অবাক হওয়ার জন্যও আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় নি। ফলে আমার এখনও কেন্দ্রগামী কিংবা সেইসব পা ডুবিয়ে থাকা আকাশমুখা মানুূষগুলোর সাথে পরিচয় হওয়া সম্ভব নয়। এদের দৃষ্টি ও ঘাড় ঊর্ধ্বমুখে স্থবির হয়ে গেছে। আর আমি গেঁথে আছি সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টার পিরামিড শীর্ষে।
ততকথা.
এর মাঝে অকস্মাৎ একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখি, আমার দোলনায় বসে অন্য একটি লোক দুলছে, লোকটি আমাকে ভীষণ বিশ্রীরকমভাবে অনুকরণ করছে দেখে আমার তীব্র ঘৃণা হল। তার পোশাক, তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিমা এমনকি গোঁফের শীর্ষে যে ভাঁজটি তাও আমার মতো। লোকটি আমাদের মানচিত্র থেকে এসেছে, সম্ভবত আমার গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য, কিন্তু তাকে দেখে আমি এতটা কীটাক্রান্ত বোধ করলাম যে, সারা দেহে একটা ঘিনঘিনে কাঁপুনি নিয়ে আবার তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছি, এমন সময় সে আমাকে ডাকল। এই ডাক শুনেই আমি আবিষ্কার করলাম লোকটি সেই আকাশমুখাদেরই একজন এবং তার কণ্ঠ হুবহু আমার মত।
আমাকে ঘুরতে দেখেই সে বলে : পালাচ্ছ কেন? বসো, একসাথে দোল খাই।
আমি বসে পড়লাম। সে আমাকে অনেক প্রশ্ন করল, আমি কোন উত্তর দিলাম না।
অবশেষে আমি বললাম : সম্ভবত আপনি এখন দুঃখিত, কেননা আপনি আমাকে ডেকেছিলেন। আমি যাই।
তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম। সে আমাকে টেনে বসিয়ে দিল।
বলল : বস। জানো, আসলে এটা একটা পরীক্ষা। যিনি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেন না, তিনিই কৃতকার্য হন। বলে একবারের জন্য পেছনে না তাকিয়ে সে চলে গেল।
তারপর আর কখনও আমি তাকে দেখি নি। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, আমার ভেতরে একটা পাথর ফেটে ঝরণা বইতে শুরু করেছে, সমুদ্রের মত বিশালত্ব যার চেতনায়।
তারপর, এখনও আমি দোলনায় দুলছি। আমি কর্মী কিন্তু কর্মহীন। আমি জানি, আমার অবশ্যম্ভাবী গন্তব্য মৃত্যু।
আসলে কাজের কোন সংজ্ঞা হয় না।
বেঁচে থাকতে চাওয়াই একটা বড় কাজ। না, হয়তো ভুল বললাম।
যাই হোক, আপনারা কেউ চাইলে এই দোলনার অর্ধেকটা নিতে পারেন,
সাথে এই তাঁবুর অর্ধেক খড়ের বিছানা।
কিন্তু তা হবে না। আমি নিশ্চিত যে, মানচিত্রের বর্তমান উৎসবগুলো আপনাদের খুব পছন্দ হয়েছে। সেকারণেই নাটক শেষে, পর্দা পতনের সাথে সাথে আমাকে আপনারা উদ্ভট বলে ছুঁড়ে ফেলবেন …

মেহেদী মিলনের কবিতা

অপেক্ষা

আজ এই অসহ্য পূর্ণিমার রাতে
কালীনদের জল ছুঁয়ে বল্?
ভালবাসা কি?
ভালবাসা কি গুলশান বনানীর দালানকোঠা
নাকি মধ্য দুপুরে উড়ে যাওয়া
দুই শালিকের চার চোখ?

পদ্মা পারে যা, ঘাস ছুঁয়ে বল্
ভালবাসা কি?
ভালবাসা কি বিশ্বব্যাংক?
নাকি গাঁও গেরামের বারান্দায়
ঝরে পড়া একমুঠো চাঁদ!
ভালবাসা কি?
ভালবাসা মানে অপেক্ষা;
অপেক্ষাই ভালবাসা অপেক্ষাই জীবন।

নগর সাঁওতার গাঁয়ে

নগর সাঁওতার গাঁয়ে
কালীনদের পড়ে
একবার যদি পাইতাম তোরে
ধরায়ে ঘাড়ের গামছা-নামতাম জলে,
জল সাঁতার শেষে, তোর কাছে এসে
বসতাম ঘাসে–বলতাম চুপি চুপি
ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি।
এইসব কবিস্বপ্ন;
তবু মানুষের দাবী লয়ে বলি–
গুলশানের বাতাসে তোর মাথার একখান চুল
উড়ায়ে দিস,
ইচ্ছে করে জানতে
ভালবাসা ছাড়া খুব ভাল কি আছিস?

মোস্তফা তারিকুল আহসান’র অনুবাদ

পাবলো নেরুদা এবং একজন স্বপ্নবাজ রমণীর গল্প
গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ*

একদিন সকাল ন’টার সময় আমরা হাভেনা রিভেরা হোটেলের টেরেসে বসে নাস্তা করছিলাম: সূর্য বেশ তাপ ছড়াচ্ছিল আর প্রচণ্ড বেগে সাগরের ঢেউ এভিনিউয়ের গাড়িগুলোকে সমুদ্র-বাঁধের দিকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে গেল। হোটেলের সামনে বা অন্যত্র পার্ক করা গাড়িগুলোরও একই হাল হলো। এটাকে প্রচণ্ড শক্তির ডিনামাইটের বিস্ফোরণ বলা যায়। প্রচণ্ড জলের তোড় আর বাতাস বিশটি ফ্লোরের লোকদের মনে রীতিমত আতঙ্ক সৃষ্টি হলো। লবি থেকে অনেক পর্যটক চেয়ারশুদ্ধ বাতাসে ছিটকে পড়লো আর শিলাবৃষ্টির দাপটে কাঁচ ভেঙ্গে অনেকে রক্তাক্ত হলো। জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব সত্যি ভয়াবহ, সমুদ্র-বাঁধ ও হোটেলের মাঝে সমস্ত জনপদ মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেল।
দমকল বাহিনীর সহায়তায় উৎফুল্ল কিউবান স্বেচ্ছাসেবকরা ছয় ঘন্টার মধ্যে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলল এবং হোটেল থেকে সাগরে যাবার গেট বন্ধ করে দিল। অন্য একটি গেট চালু করলো এবং সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এল বেশ দ্রুত। সেই সকালে দেয়ালের সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে থাকা গাড়িটি নিয়ে কেউ চিন্তিত হয় নি। কারণ সবাই ভেবেছিলো এটাও মেঝেতে পার্ক করা গাড়িগুলোর একটি। কিন্তু ক্রেন দিয়ে গাড়িটির অংশগুলো খুলে ফেললে সিট বেল্ট বাঁধা একজন মহিলাকে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে দেখা গেল। ঢেউ আর বাতাসের আঘাত ছিল নিষ্ঠুর কসাইয়ের মতোতার সব হাড়গুলো মাংস থেকে আলাদা করে ফেলেছিলো। তার মুখ বিধ্বস্ত, গোড়ালি বিচ্ছিন্ন আর পোশাক-আশাক শতচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। পান্না খচিত একটি স্বর্ণের সর্পাকৃতি আংটি ছিলো তার হাতে। পুলিশ দাবী করছিলো ভদ্রমহিলা নবনিযুক্ত পর্তুগীজ রাষ্ট্রদূতের গৃহকর্ত্রী এবং স্ত্রী। সে সপ্তাহ দুই আগে হাভানায় এসেছিলো আর আজ সকালে নতুন একটি গাড়ি চালিয়ে বাজারে যাচ্ছিলো। সংবাদপত্রে তার নাম পড়ে দৃশ্যত আমার কিছু মনে হয় নি। তবে পান্না আর সাপের আকৃতির আংটি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিলো। যাহোক, আমি ঠিক ঠাহর করতে পারি নি কোন আঙুলে সে আংটিটি পরেছিলো।
এটা ছিলো একটি মর্মান্তিক খবর। কারণ আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম এই ভেবে যে, এ সেই বিখ্যাত মহিলা কিনা, যাকে কেউ ভুলতে পারে না। আর যার প্রকৃত নাম আমরা কেউ জানতাম না। সেই মহিলাও এই রকম আংটি পরতেন হাতের তর্জনীতে। সেই সময় কোনো মহিলাই ঐ আঙুলে আংটি পরতো না। চৌত্রিশ বছর আগে ভিয়েনায় তার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো, একটি ল্যাটিন আমেরিকান সরাইখানায়, সে সজ দিয়ে সিদ্ধ পটল খাচ্ছিলো, আর মাঝে মাঝে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছিলো। আশেপাশে ল্যাটিন আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রীরা বসেছিলো। আমি সেই দিন সকালে রোম থেকে মাত্র এসেছি। আমি এখনো বন্ধুবান্ধব নিয়ে তার শোরগোলের কথা স্মরণ করতে পারি; শেয়ালের লেজের মতো পড়ে থাকা কোর্টের কলার, সাপের আকৃতির মিশরীয় আংটি। সে বিরতিহীনভাবে তীক্ষè উচ্চারণে ভুলেভালে স্পানিশে কথা বলছিলো আর আমার মনে হয়েছিলো এই দীর্ঘ কাঠের টেবিলে সে একমাত্র অস্ট্রিয়ান। কিন্তু, আমার অনুমান ছিলো ভুল; সে জন্মেছিলো কলম্বিয়ায়। অস্ট্রিয়ায় এসেছিলো যুদ্ধের মধ্যে গান ও আবৃত্তি বিষয়ে লেখাপড়া করতে, তখন সে প্রায় কিশোরী। এখন তার বয়স ত্রিশ এবং সে শরীরের দিকে খুব মনোযোগী ছিলো না। আর সে কখনোই সুন্দরী ছিলো না। ফলে বয়স হবার আগেই বুড়িয়ে গিয়েছিলো। তবে সে ছিলো চমৎকার, মানবিক আবেদনময়ী রমণী এবং অবশ্যই সম্ভ্রম জাগাতে সক্ষম।
ভিয়েনা এখনো রাজকীয় শহর। ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই শহরটি চোরাকারবারী ও গুপ্তচরদের স্বর্গে পরিণত হয়েছিলো। আমার স্বদেশী এই ফেরারী বন্ধুর জন্য এর চাইতে নিরাপদ জায়গা আমি কল্পনা করতে পারি না। সে এখনো তার নিজস্ব পরিচিতি লুকিয়ে সরাইখানার এক কোণে খেয়ে চলে। তার টেবিলের সবার জন্য সে খাবারের অর্ডার দেয়। অর্থাৎ সে রকম যথেষ্ট টাকা তার আছে। সে কখনো তার প্রকৃত নাম বলতো না। আমরা তাকে চিনতাম তার জার্মানী মিশ্রিত উচ্চারণ শুনে। ল্যাটিন আমেরিকার সব ছাত্ররা মিলে আমরা তার একটি নাম ঠিক করলাম: ফারাও ফেরিডা। আমি তাকে একদিন প্রগলভ হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কুইনডিওর ঝড়ো আবহাওয়া থেকে এতদূরে এই ভিন্ন জগতে সে কিভাবে এসেছিল। সে বিরস বদনে বলেছিল:
‘আমি আমার স্বপ্ন বিক্রি করি’।
সত্যিকার অর্থে এটাই ছিলো তার একমাত্র জীবিকা। তার জন্ম পুরনো ক্লাডাসে। বাবা ছিলেন বেশ ধনী দোকানী। এগারো ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিলো তৃতীয়। কথা বলতে শেখার পর পরই সে তাদের পরিবারের একটি রেওয়াজ তৈরি করেছিলো। প্রতিদিন নাস্তার আগে সে সবাইকে স্বপ্ন শোনাত। এ সময় বাচ্চাদের কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখার সময়। তার বয়স যখন সাত বছর, স্বেপ্ন দেখল তার একটি ভাই বন্যার তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। ওদের মা ছেলেকে আর সাঁতার কাটতে দিতো না। ব্যাপারটি ধর্মীয় কুসংস্কারের মতো। তবে, ফারাও ফেরিডা তার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত প্রচার করতেই থাকলো।
‘এই স্বপ্নের অর্থ কী’? ফারাও উত্তর দিল: ‘এর অর্থ এই নয় যে সে পানিতে ডুবতে যাচ্ছে, তবে তার মিষ্টি খাওয়া উচিত নয়।’
তার এই স্বপ্ন-ব্যাখ্যার প্রতিক্রিয়া পাঁচ বছরের ছেলেটির জীবনে মহাসমস্যা দেখা দিল। বিশেষত, ছুটির দিনেও তাকে বাইরে যেতে দিত না ওর মা। মেয়ের স্বপ্ন-ব্যাখ্যায় মা রীতিমত বিশ্বাসী ছিলেন। কঠোর হাতে ছেলেকে শাসন করতে শুরু করলেন। কিন্তু একদিন প্রথম অসতর্ক মুহূর্তে ছেলেটি একা চুপিচুপি বিষাক্ত মিঠাই খেলে ফেলল, তার শ্বাসরোধ হয়ে গেল, তাকে বাঁচানোর কোনো পথই খোলা থাকলো না।
ভিয়েনায় শীতের এক ভয়ঙ্কর সন্ধ্যায় সে প্রথম মনে করেছিলো স্বপ্ন বিক্রি করেই তাকে বেঁচে থাকতে হবে। এর আগে ফারাও কখনো তার স্বপ্ন নিয়ে এরকম ভাবে নি। সে-সময় সে কাজের সন্ধানে একটি বাড়িতে যায়। সেই বাড়িতে সে থাকতে চাইত। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল, সে কি করতে পারে? সে সত্যি করে বলেছিলো, ‘আমি স্বপ্ন দেখি’। তাকে শুধুমাত্র গৃহকত্রীকে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিলো। তাকে নির্দিষ্ট বেতনে ঐ বাড়িতে রাখা হল, বেতনের টাকা দিয়ে তার ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো মিটতো। তবে, তাকে সুন্দর একটি ঘর দেয়া হলো। তিন বেলা খাবার দেয়া হতো। বিশেষ ধরনের নাস্তা দিতো তাকে। নাস্তার সময় পরিবারের সবাই বসতো তাদের আশু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে; অর্থলগ্নীকারী বাবা, রোমান্টিক গান-পাগল আনন্দময়ী মা, নয় ও এগারো বছরের দু’জন শিশু। তারা সবাই ছিলো ধার্মিক, কাজেই তাদের মধ্যে বেশ কুসংস্কার ছিলো এবং তারা ফারাও ফেরিডাকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলো। ফেরিডার একমাত্র কাজ ছিলো তাদের দেখা স্বপ্নের অর্থ উদঘাটন করে তাদের ভাগ্য সম্পর্কে মন্তব্য করা।
তার দিন ভালোই যাচ্ছিলো। দীর্ঘদিন যাবৎ অর্থাৎ যুদ্ধের সময় পর্যন্ত। তবে যুদ্ধের সময় বাস্তবতা দুঃস্বপ্নের চেয়ে কুৎসিত হয়ে উঠলো। প্রতিদিন প্রাতঃরাশের টেবিলে সে বলতো প্রত্যেকের সেই দিন কি করা উচিত, কিভাবে করা উচিত। তার ভবিষ্যৎ বাণী পরিবারের সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠলো। পরিবারের সবচেয়ে দুঃখজনক খবরটি তার মুখ দিয়েই উচ্চারিত হলো। পরিবারের কর্তা মারা গেলেন। আমি সে সময় ভিয়েনায় ছিলাম। তাকে পরিবারের উত্তরাধিকারী করা হলো একটি মাত্র শর্তেযতদিন তার স্বপ্ন দেখা শেষ না হয়, সে পরিবারের জন্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে যাবে।
আমি ভিয়েনায় ছিলাম এক মাস। আমি আসলে অন্য ছাত্রছাত্রীদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর অপেক্ষা করছিলাম টাকার জন্য। দুঃখজনক হলো সে টাকা কখনোই আসে নি। আমাদের এই দরিদ্র-জর্জর সরাইখানায় হঠাৎ করেই ফারাও ফেরিডা হাজির হতো। ব্যাপারটা বেশ অপ্রত্যাশিত আর আমাদের কাছে ছিলো চরম পাওয়া। বিয়ারে উন্মত্ত এক রাতে সে আমার কানে ফিস ফিস করে একটা রায় শোনাল;
‘আমি শুধু তোমাকে বলতে এসেছি, কাল রাতে আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি, তুমি অবশ্যই ভিয়েনা ছেড়ে যাবে আর পাঁচ বছরের মধ্যে ফিরে আসবে না’।
তার এই স্বপ্ন-রায় এত সত্যি ছিলো যে সেই রাতের শেষ ট্রেনে আমি ভিয়েনা ছেড়ে রোমের উদ্দেশ্যে রওনা হই। তার এই কথায় আমি খুব প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলাম। এ রকম অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয় নি। আমি মনে করতাম আমি তার ক্ষমতার অন্যতম একজন সাক্ষী। আমি আজো ভিয়েনায় ফিরে যাই নি।
হাভানাতে ধ্বংসযজ্ঞ হবার আগে তাকে আমি দেখেছিলাম বার্সিলোনাতে, আকস্মিকভাবে। আমার কাছে ব্যাপারটা ছিলো দুঃখজনক। এটা ছিলো সেই দিন যেদিন গৃহযুদ্ধের পর পাবলো নেরুদা স্পেনের মাটিতে পা রেখেছিলেন। ডোলপারাইসো যাবার পথে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার মাঝখানে তিনি একটু বিরতি দিয়েছিলেন এখানে। আমরা তার সাথে একটি সকাল কাটালাম। তিনি পুরনো বইয়ের দোকানে বই খোঁজার খেলায় মেতে রইলেন। পোর্টারে এসে তিনি জীর্ণ, বাঁধাই-খোলা একটা বই কিনলেন। বইটির মূল্য বাবদ যে টাকা দিলেন সেটা তার রেঙ্গুন কনসুলেটের দু’মাসের বেতনের সমান। তিনি জনগণের ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হাতির মতো হাঁটতে শুরু করলেন শিশুর মতো উদ্দীপনা চোখে নিয়ে। প্রতিটি জিনিসের ভিতরের কারুকাজ তিনি দেখতে লাগলেন। কারণ, তার কাছে পৃথিবীটা এক আশ্চর্যজনক খেলনা আর এইসব খেলনা দিয়েই জীবনকে আবিষ্কার করতে হয়।
আমি রেনেসাঁর আলোকে উদ্দীপ্ত কোনো মানুষকে কখনো চিনতাম না। নেরুদাকে চিনলাম। তিনি ছিলেন ভোজনবিলাসী এবং তার ছিলো প্রচণ্ড হজম ক্ষমতা। এমনকি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তিনি টেবিলে বসে পড়তেন এবং খাওয়ায় সবাইকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতেন। তার স্ত্রী মাতিলদে তার গলার চারপাশে মোটা কাপড় বেঁধে রাখতেন। কাপড়ের অবস্থা দেখে মনে হবে সেটা খাবার ঘরের কোন বস্তু নয় বরং তা সেলুন থেকে আনা হয়েছে। তবে এটাই ছিলো মাতিলদার পক্ষে একমাত্র উপায়, না হলে নেরুদার সসে গোসল হয়ে যেত। সেইদিন কালডালেরাসেও নেরুদা কোনো ব্যতিক্রম করলেন না। তিনি তিনটি বড় বড় সামুদ্রিক চিংড়ি খেয়ে ফেললেন এবং সার্জনের মতো নিখুঁতভাবে চিংড়িগুলোকে টুকরো টুকরো করলেন। সবার প্লেটের দিকে তীক্ষè চোখে তাকান আর গোগ্রাসে গিলতে থাকেন, কার প্লেটে কি আছে চেখে দেখেন, সংক্রমণের কথা তার মাথায় থাকে না; গ্যালাসিয়ার জলচর প্রাণী, কান্টাব্রিয়ার ঝিনুক, অ্যালিকেন্টির চিংড়ি তিনি খেতে শুরু করেন। ফরাসীদের মতো তিনি মুখে কোনো কথা বলেন না, শুধু উপাদেয় খাবার খেতে থাকেন। এবং তিনি প্রাগৈতিহাসিক স্বার্থপর চিলিদের মতো স্বভাব অন্তরে ধারণ করতেন। হঠাৎ তিনি খাওয়া বন্ধ করলেন, এবং তার চিংড়ির পা ধরে টান দিলেন। আমাকে মৃদুস্বরে বললেন, ‘কেউ একজন আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এবং সে তাকানো বন্ধ করছে না।’
আমি তার ঘাড়ের ওপর দিকে তাকালাম। ঘটনা সত্যি। তিন টেবিল পেছনে একজন সাহসী মহিলা পুরনো-ফ্যাশনের পশমের হ্যাট, রক্তবর্ণের স্কার্ফ পরে খাচ্ছেন, খাচ্ছেন তবে খুব ধীরে এবং নেরুদার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি তাকে সহজেই চিনে ফেললাম। তাকে বেশ বয়সী মনে হলো এবং শরীরে চর্বি জমেছে অনেক। তবে সেই ফারাও ফেরিডা। তার তর্জনীতে সর্পাকৃতির আংটি। নেরুদা ও তার স্ত্রীর জাহাজেই সে নেপল্স থেকে আসছিলো। তবে, তারা কেউ কাউকে দেখতে পায় নি। আমি তাকে আমাদের টেবিলে এক কাপ কফি খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করলাম, এবং আমি তাকে কবির সামনে তার স্বপ্ন বিষয়ে কথা বলার জন্য অনুরোধ করলাম। আমি মনে করেছিলাম নেরুদা এ বিষয়ে শুনে বিস্মিত হবেন। তবে, তিনি এ বিষয়ে মনোযোগ দিলেন না। তিনি প্রথম থেকে বলে এসেছেন এরকম স্বপ্ন বা দৈব্য ব্যাপার-স্যাপারে তার কোনো বিশ্বাস নেই।
‘শুধুমাত্র কবিতারই আছে অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা’ তিনি ঘোষণা করলেন।
দুপুরের খাবার শেষে ফারাও ফেরিডা পায়চারি করতে থাকেন আমি তার পিছনে হাঁটতে শুরু করলাম। আমি মনে করেছিলাম, আমাদের পুরনো স্মৃতি একটু ঝালিয়ে নেয়া দরকার। এবং অবশ্যই আমাদের কথা কেউ শুনবে না। সে বললো, সে পর্তুগালের অপেরেটো থেকে অবসর নিয়েছে। অস্ট্রিয়ার সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। সে বাস করতো পাহাড়ের ওপারে একটি ক্যাসেলে, আর সেখান থেকে যে কেউ সাগরের ওপারে আমেরিকা দেখতে পেত। যদিও সে সরাসরি অনেক কথাই বললো না, তবে কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, স্বপ্নের পর স্বপ্ন দিয়ে সে তার ভিয়েনার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের থেকে অঢেল সম্পদ পেয়েছিলো। এটা অবশ্য আমার কাছে তেমন আশ্চর্যের কিছু মনে হয় নি। কারণ আমার কাছে মনে হতো স্বপ্ন আসলে তাঁর বেঁচে থাকার কৌশল ছাড়া কিছু নয়। এবং আমি তাকে সেরকমই বলেছিলাম।
সে অপ্রতিরোধ্যভাবে হেসে উঠলো। এবং বললো, ‘তুমি আগের মতোই পাঁজি রয়ে গেছ’। সে আর কোনো কথা বললো না। তখন দলের সবাই নেরুদার জন্য অপেক্ষা শেষ করে ফেলেছে। কারণ নেরুদা তখন তোতা পাখিদের সাথে চিলিয়ান স্ল্যাং-এ কথা বলা শেষ করেছেন। আমরা আবার সংলাপ শুরু করলাম। তবে ফারাও ফেরিডা অন্য বিষয়ে কথা বলা শুরু করলো।
সে বললো, ‘ভালো কথা, তুমি এখন ভিয়েনায় ফিরে যেতে পার’। তখনই আমার মনে হলো আমাদের পরিচয়ের তের বছর পার হয়ে গেছে।
আমি বললাম, ‘তোমার স্বপ্ন যদি মিথ্যেও হয় তবু আমি ফিরে যাবো না’।
দুপুর তিনটায় নেরুদার পবিত্র দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার সময় সেখানে উপস্থিত হতে আমি তাকে ছেড়ে এলাম। বিশাল আর প্রগাঢ় প্রস্তুতি নিয়ে তিনি আমাদের ঘরে নিদ্রায় গেলেন। জাপানের চা-পর্বের উৎসব স্মরণ করলেন। তার এই নিদ্রার জন্য বিচিত্র ব্যবস্থা করতে হলো। কয়েকটা জানালা খোলা এবং বাকীগুলো বন্ধ থাকলো, যাতে করে সঠিক মাত্রায় তাপমাত্রা ঘরে থাকে। বিভিন্ন কোণ থেকে বিশেষ ধরনের আলো ঢোকানোর ব্যবস্থা হলো এবং প্রশান্ত নীরবতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলো। নেরুদা ভালোভাবেই ঘুমিয়ে পড়লেন। আমরা অবশ্য এরকম আশা করিনি। তাকে বসার ঘরের পাওয়া গেল বেশ ফুরফুরে মেজাজে, তবে বালিশের তুলা তার ঘাড়ে লেপ্টে থাকলো।
তিনি বললেন, ‘আমি সেই মহিলাকে স্বপ্নে দেখলাম, যে স্বপ্ন দেখে’।
মাতিলদা তার কাছে স্বপ্নটি শুনতে চাইলেন। তিনি বললেন, আমি স্বপ্ন দেখলাম সে আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে’।
আমি বললাম, ব্যাপারটা বিশ্বাস করা শক্ত।
তিনি আমার দিকে নিরাশ দৃষ্টিতে তাকালেন।
‘তিনি কি এটা ইতোমধ্যেই লিখে ফেলেছেন- কে একজন বললো।
আমি বললাম, এখনও না লিখলেও, কোন সময়ে লিখে ফেলবেন। আর এটা হবে তার অন্যতম ফুলানো-ফাপানো গপ্পো’।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি জাহাজে চড়লেন। আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন, নিসঙ্গ এক টেবিলে বসে পড়লেন এবং তার সবুজ কালির কলম দিয়ে তরল কবিতা লিখতে শুরু করলেন। এই কলম দিয়ে তিনি কাউকে উৎসর্গ করা বইয়ে ফুল, মাছ ও পাখিএঁকে দিতেন। প্রথমে আমরা ফারাও ফেরিডাকে খুঁজলাম এবং তাকে টুরিস্টদের ডেকে পাওয়া গেল। সে-ও দিবানিদ্রা দিয়ে উঠেছে।
সে বললো, ‘আমি কবিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি’।
আমি থমকে উঠলাম। আমি তাকে স্বপ্নটি বলতে বললাম।
সে বললো, আমি স্বপ্ন দেখলাম তিনি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন’ আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে রেগে গেল। বললো, ‘তুমি কি আশা করেছিলে? মাঝে মাঝে আমার সব স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নের ভগ্নাংশ সত্যিকার জীবনের সাথে সম্পর্কিত থাকে না।’
আমি আর কখনো তাকে দেখি নি। তার সম্পর্কে কোনো কৌতূহলও দেখাই নি, যতদিন না পর্যন্ত সাপের মতো আংটিপরা মহিলাকে হাভানা রিভেরা ধ্বংসযজ্ঞে নিহত হওয়ার ব্যাপারটা ঘটে। এবং আমি অধৈর্য আর অস্থির হয়েছিলাম। তাই কয়েক মাস পর একটি কূটনৈতিক সংবর্ধনায় আমি পর্তুগীজ রাষ্ট্রদূতকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করে থাকতে পারি নি। রাষ্ট্রদূত তার সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ও সমীহ দেখিয়ে বলেছিলেন, কল্পনা করতে পারবেন না কী অসাধারণ ছিলেন এই মহিলা। আপনি তার সম্পর্কে একটি গল্প লিখলে আমি বাধিত হবো।’ তিনি একই সুরে তার সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন। কিন্তু ভেতরের রহস্যটা খুললেন না। সেটা বললে হয়তো আমি তার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারতাম।
আমি তাকে শেষে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘সে আসলে কি করতো’?
তিনি মোহমুগ্ধ স্বরে বললেন, কিছুই না, সে শুধু স্বপ্ন দেখতো’।

* গল্পটি মার্কেজের Strange pilgrim- গ্রন্থ থেকে অনূদিত হলো।

মাহ্ফুজ হুমায়ূন রাশেদ’র অনুবাদ

বিশ্ববিদ্যালয় : স্বচ্ছ ধারণার বিশালতা
জন হেনরি কার্ডিনাল নিউম্যান

[জন হেনরি কার্ডিনাল নিউম্যান (১৮০১-১৮৯০)। তার বাবা লন্ডনের একজন ব্যাংকার ছিলেন। আরলিং ও ট্রিনিটি (OXFORD) কলেজ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৫৮ সালে ডাবলিনের ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটিতে তিনি রেক্টর পদে নিয়োগ পান। এ পেশাই তাঁকে The Idea of a University  (১৮৫৮) বইটি লিখতে সাহায্য করে। লেখার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সুন্দর পরিচ্ছন্ন নীতির সমর্থক। বারমিংহামে ১৯৮০ সালে তার মৃত্যু হয়। ফ্রম দ্য আইডিয়া অফ এ ইউনিভার্সিটি এ প্রবন্ধটিতে মূলত একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কি সুযোগ-সুবিধা কাম্য সে বিষয়ে প্রাবন্ধিক মনোনিবেশ করেছেন। জ্ঞানের যে সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে এ প্রবন্ধে তা তর্কাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য]

জ্ঞানের মৌলিকতা নামের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করলে বিজ্ঞান ও দর্শন-এর সামষ্টিকতা পাওয়া যাবে এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। জ্ঞানের পরিস্ফুটন ধ্র“বক পর্যায় বলতে বোঝায় তার প্রয়োগ ও প্রয়োগের শৃঙ্খলতার সমস্যাগুলির পথপরিক্রমা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে পুরুষকে বোঝানোর ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট করে বলতে গেলে বিশ্লেষণধর্মী। তথ্যবহুল ও যুক্তিনির্ভর কোন কিছু, তাকে বলে জ্ঞান। জ্ঞানের বীণায় যে সুরলহরীর কলতান বাজে তার উপসুর ও মৌলিক সুরই হলো যুক্তি। মূলত যাদের প্রাথমিক সুর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আছে মূলত তারাই তার ব্যবহারকারী।
জ্ঞান যখন বিজ্ঞানের আসন পায় এবং নবতর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয় তখন তার ডালপালা শাখা-প্রশাখা মিলেই যে আনুভূমিক সরলরেখা তৈরি হয় তা শক্তির তীর্যকরশ্মি, নৈর্ব্যক্তিক, যে কোন প্রশ্নের মান অর্জনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু। শক্তির মূল তালিকায় শক্তির উৎস হিসেবেই মূল্যমান এবং জ্ঞান মূল্যবান বিশ্লেষণ-এর সংযোজন এবং এতে করে বিবেচনার বিষয়টি উপেক্ষিত নয়। জ্ঞানের ক্ষুধার্ত অবস্থায় পেটের খাবার বললে ভুল হবে। এটি জিহ্বার রসের উপাদানও। তাই একে বলা যায় উপকরণ এবং উপাদানের মনিকাঞ্চন। আমার ব্যক্তিগত অভিমতাদর্শ হল জ্ঞান শিল্পকলার দোলনাতে প্রস্ফুটিত হবার যোগ্যই নয় শুধু, সুযোগ্যও বটে। জ্ঞান যুক্তির দ্বারেও মাথা ঠুকতে পারে তখনই যখন এটি জ্ঞানের ভিত্তি থাকে আবার সমাধানের বেলায় দেখা যায় দর্শনের সূর্য-উন্মেষ। মুদ্রার একপার্শ্বে দেখা যায় জ্ঞানের কল্যাণকর চারুপাঠ অপর পার্শ্বে দেখা যায় জ্ঞানের নমনীয় সূর্যোন্মেষ পরিক্রমার পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। জ্ঞান অন্বেষণকারীর বা জ্ঞান পিপাসুদের ক্ষেত্রে এখানে লটারীর মতো সুবর্ণ সুযোগ আছে যে তা একই সাথে দ্বৈতসত্তার গণনাকে গুণতে পারে। স্বচ্ছ কাঁচপাত্রের মতোই এখন পরিষ্কার যে শিক্ষা গ্রহণের মোট দুটি পন্থা আছে। প্রথমটা দর্শনের আদলে গড় আর দ্বিতীয়টি হল যান্ত্রিকতার শব্দবিলাসিতার রূপসংকল্প স্পর্শের কলধ্বনিতে গড়া। একটি সাধারণ বা আলোচ্য অক্ষরে স্বাভাবিক নদীস্রোতের উজানের মতোই। অপরটি বিশেষ ও ধ্র“ব বা বহিরাগত খোলসের প্রলেপণ বানানো যায়। বিশেষ ও বাস্তব দিকটা উপেক্ষা করবার জো নাই। উভয়েই স্ববর্ণ না হলেও সমগোত্রীয়। কল্যাণকর, যান্ত্রিক ও পদ্ধতির ত্রি-শিল্পকলার নির্যাস বিশেষ।
প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, জ্ঞানকে আমরা কখনো কি নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি? অধ্যাত্মবাদীদের মতো শব্দের জালে সঠিকতার পরিমাপ না নিরূপণ করে বা ভণিতা না করে সরাসরি আসল বিষয়েই প্রবেশ করাই শ্রেয়।
এই পদার্থকে (নিষ্ক্রিয় বা জ্ঞান) নির্জীব সংবেদনশীল বা ধ্র“ব অনুভূতি বললে মোটেও ত্র“টি থাকবে না। পশুদের মাঝেও এটি বিদ্যমান বটে তবে তা জ্ঞানের মাঝে জ্ঞানের অন্ধকার বা জ্ঞান নামের কলঙ্ক। জ্ঞান সম্পর্কে কিছু কথা বলার অর্থ হল এই যে, আমি বুদ্ধিবৃত্তির আলোক দীপ্তি জ্বালাই। আর ঐ সকল ব্যাপারগুলোকে প্রতিসরিত করি যা বোঝার জন্য বিশেষ মননশীলতা বা স্পর্শকাতরতা বা বোধ বেশি জরুরি। বোধ নামের ইন্দ্রিয়টি কথা বলার সময় ব্যবহৃত হয়। জ্ঞানের আলো হল বস্তু সম্পর্কে আত্মদৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটানোর কাজে সহযোগিতা করা, যদিও এটি ইন্দ্রিয়ের সহযোগিতা ছাড়া অনেক কিছু বোঝানোর ক্ষেত্রে শতভাগ দাবি রাখতে পারে, দৃশ্যমান বস্তুকে যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করে, ঠিক সেভাবেই দেখা বস্তুর উপর ধারণা বা প্রকল্প আরোপের বিস্তার ঘটায়। আলোকিত চাঁদনী রাত না বলে পূর্ণিমা বললেও বেশি ভালো বুঝায় যে, পূর্ণিমা মানেই আলোর চাঁদ বা চাঁদের সাথে আলোর লুটোপুটি। বোধগম্য হবার বিষয় মূলত এ বিজ্ঞানের স্বকীয়তা এবং এটি বিজ্ঞানের মর্যাদার যথার্থতা বিশ্লেষণ করবার পূর্ব উপায়ও বটে। ক্ষমতাকে আকাক্সক্ষা ও আকাক্সক্ষাকে মূল্যমানের মানদণ্ডে স্থাপন করা মানেই জ্ঞান বা ফল নির্বিশেষে বিবেচ্য ও বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মূল্যমানের ক্ষেত্রে যাচাই যোগ্য। উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার অভিযাত্রিক হিসেবে এটি বিবেচনার কারণ। দর্শনের যৌগিকতার বিশ্লেষণে যে মৌলিকতা পাওয়া যায় তা হল দর্শনের বৈশিষ্ট্য। মূল বিষয়ে দেখা যায় যে, এ রকম জ্ঞান বাহ্যিক ঠাঁট বাজানোর বা হঠাৎ পাওয়া বিনা পরিশ্রমের লটারীর মতো ভাগ্যের কোন কিছু নয়।
আমাদের বলে যা আমরা এখন দাবি করছি তা অন্যদের মূলত আগামী দিনের জন্য তো বটেই, বই থেকে এটি পাওয়া যেতে পারে। ভুলে যাবার সহজ উপায় এটির আঁকেবাঁকে আছে। বই সহজে পাওয়ার সামগ্রী কখনও-বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার নেওয়া যায়, যা হাতে রাখা এবং বাজারে নেওয়া যায়। এটি সরল রৈখিক অর্জিত জ্ঞানসীমানা। ব্যক্তিগত সম্পদ ও আভ্যন্তরীণ বা অন্তর্নিহিত বলা যেতে পারে। ক্রমান্বয় সাধন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বলা যায় প্রথমত নির্দেশনামূলক। শিক্ষা মৌলিক বা যৌগিকতার অর্থে অতীব মূল্যবান ও মূল্যমানের শব্দ বিশেষ, মনের চিত্রপটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একটা প্রক্রিয়ার নির্দেশনা দেয়, চরিত্রের শ্রেণীকরণে দেখা যায়। এটা কিছুটা ব্যক্তিগত ও স্থায়ী। সাধারণত ধর্ম ও গুণের বিনিসুতোয় গাঁথা মালার সাথে শিক্ষার নামটিও বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। যখন এই রাস্তা তৈরি হয়ে যায় তখন জ্ঞানের যোগাযোগকেই শিক্ষা বলা হয়। লিবারাল আর দর্শন শব্দ দুটি শিক্ষার আলোকের দ্বারাই আমাদের মনের মননে ও মস্তিষ্কে ধরা দেয়।
পূর্ববর্তী উদ্ধৃত বক্তৃতার মাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে বুদ্ধি চর্চার উপর জোর দিয়েছি। দ্বিতীয় বিষয়বস্তু হলো শিক্ষা তথা বুদ্ধিবৃদ্ধি অর্জনের পদ্ধতি। যে কোন সত্যই হল জ্ঞান। প্রশিক্ষণ একটি নিয়ম সংক্রান্ত ব্যাপার। মনকে সত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রায়াগিক দিক নয় এটি। এক্ষেত্রে পৌঁছানোর পরে অনেক অনেক বই পড়া অনেক বিষয় জানার অনেক কিছু গবেষণাও করার, ক্লাস লেকচারে উপস্থিত থাকা এগুলো সবই অপর্যাপ্ত ও অপরিমেয় বটে। যে কোন বা কোন একজন লোক সবগুলোর স্বাদ-স্পর্শ পেতে পারে তবে তাকে অবশ্যই জ্ঞানের দরজায় কড়া নাড়তে হবেই। মাঝে মাঝে নিজের মুখে বলা কথাও আত্মসত্তা নাও বুূঝতে পারে।
মনের চোখে উপস্থিত যে আলোকে ঝলকানি দেখা দেয় প্রত্যক্ষ হয়ে থাকলেও উপস্থিতিকে নাও বুঝতে পারে, বিশেষ কোন বিষয়ে উপলব্ধি নাও থাকতে পারে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এটা বলা যায় যে, নিজের সম্পর্কে জানার বা আত্মবিশ্লেষণের সামর্থ বা যোগ্যতা কোনটাই তার নেই। বেশির ভাগই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝে না সত্য=পূর্ণিমা, মিথ্যা=অমাবশ্যা, তাহলে এই পূর্ণিমা ও অমাবশ্যাকে আলাদা করার ক্ষেত্রেও অনেকে ব্যর্থতার পুষ্পমাল্য বরণ করে থাকে। শাব্দিক অর্থগতভাবে বলা যায় যে, ধারণা গঠনের বিন্দুমাত্র ক্ষমতার লেশ এদের মাঝে প্রকাশিত হয় না। মননশীলতার বৈজ্ঞানিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক ফলাফলকে এটি দ্বারা স্পষ্ট করা যেতে পারে মূলত স্রোতস্বিনী নদীর প্রবাহের মতোই। বিচারের জন্য গুণ বা যোগ্যতার ক্ষেত্রপটভূমি এটি বা যোগ্যতা আর সুপরিষ্কার দৃষ্টিও বলা যায় এসব কিছু সহজাত অর্জনের ব্যাপার তো মোটেও নয়।
দেহদৃষ্টি আর উপলব্ধির ইন্দ্রিয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়, মানসিক দৃষ্টি সত্যকে দেখার স্বভাব ও নিয়মই সত্যদৃষ্টি। এই নিয়মানুবর্তিতার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বুদ্ধিবৃত্তি বিশেষ নিয়মানুবর্তিতা দ্বারা তৈরি হয় না। এ নিয়মে বুদ্ধিবৃত্তি ও নিয়মতান্ত্রিকতা লাভ করে যা যথার্থ বস্তুকে ও সর্বোচ্চ সংস্কৃতিকে বুঝতে সহযোগিতা করে থাকে আকাশে মেঘ বিদ্যুৎ শব্দ আলোর খেলার মতোই। আর এটাই হল লিবারাল এডুকেশন বা উদার শিক্ষা এবং এমন কেউ নেই যার মধ্যে এটি প্রয়োগ করে প্রবেশ অধিকার দেয়া হয় যে তার প্রতিভা হবে আদর্শ বুদ্ধিবৃত্তির নকশা, সীমারেখার চতুর্ভূজ। তবুও মনন লোক কমই আছে যারা প্রকৃত প্রশিক্ষণ সম্পর্কে ধারণা রাখে। সঠিক আদর্শ তন্ত্রমন্ত্র তৈরি করা এবং তা অনুসারে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও ছাত্র-ছাত্রীদের যোগ্যতা অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য।
উপকারী বলতে শুধু স্বাভাবিক মানদণ্ডে ভালো তাকেই বোঝায় না বরং যা ভালোর দিকে ধাবিত হচ্ছে বা ধাবিত হবে বা যা ভালোর সহায়ক তাকেই বোঝানো হয়। ভালো শুধু ভালোরই সীমারেখা নয়, ভালোর বিস্তৃত সীমারেখায় পুনরায় জন্ম নেয় এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এটিই অন্যতম বৈশিষ্ট্য যা কিনা ধ্র“বতারার মতো। নিজের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা নয়, সুন্দর ও কাক্সিক্ষত নয়, কেবল নিজের জন্য বরং তা ছাপিয়ে যায় যা বিস্তার লাভ করে বা তার গুণাবলী সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদনমুখী জিনিসটাকেই ভালো জিনিস বলা যায়। শুধুমাত্র চোখের নেশা ভালো লাগা মোহ বিশেষ নয়। এটি এমন হয় যে রুটির জন্য ভালো মোহজালে এটা শুধু আকৃষ্ট করে না বরং নিজেকে যোগ্যমুখী করে তোলে নিজের সাথেই। আমাদের এই দ্বৈত জায়গা হল প্রশংসা ও ভালোবাসার জায়গা। পরবর্তী জায়গার জন্য নির্ধারিত যে শব্দদ্বয় নির্দিষ্ট সেগুলোর একটি হল আকাক্সক্ষা অপরটি হল কৃতজ্ঞতা। একটি বড় রকমের বিস্তৃত ভালো আর অপরটি ভালোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুতরাং বলা যেতে পারে যে, উৎকৃষ্ট উপাদান হলো বুদ্ধিবৃত্তি যা কেবলমাত্র সুন্দরই নয় বরং এটা উপকারী বিশেষত প্রফেসর ও তাদের আশেপাশের বৃত্তাবর্তীয় লোকদের জন্যও বটে। বাণিজ্যিক অর্থে বা নিচু কোন অর্থে এর উপকার মানদণ্ড বিচার করা নিছক বোকামীর শেষ স্তরে পড়বে এবং ভালোর বিনাশ কারক হিসেবে কিংবা একটি আশীর্বাদ প্রার্থনারূপে উপহার শক্তি বা সম্পদ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে; অর্জনকারীদের ক্ষেত্রেও পরে তার মাধ্যমে অন্যান্য সকলের মাঝে যায়। তাই আমাদের বিশ্লেষণে লিবারাল এডুকেশনের মানদণ্ড ও সমীকরণে ভালোত্ব লাভ করলে এটা সংগত কারণেই সৌন্দর্য সীমারেখা স্পর্শ করে।
আমার মতাদর্শে বুদ্ধিভিত্তিক সংস্কৃতির সামানায় উপযোগিতার বিষয়টির অতীব জরুরী। এই নিয়মানুসারে আমরা যে বিষয়টি এড়িয়ে যাবার উপক্রম সেটা হল, ভালোকে ভালো বলার পূর্বে নির্দিষ্ট করে দেখানো বা দেখে নেওয়ার বিষয়টি। দেহ যেমন অন্য হাতের নিকট বা পরিশ্রমের জন্য কোরবানী হয়ে যেতে পারে। ঠিক সরলরেখার সমবৃত্তীয়ভাবে চাকুরীর ক্ষেত্রে শিক্ষার একই বেহাল অবস্থা দাঁড়ায় ও দাঁড়াবে আমার মতান্তরে এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক বিলাস নয় মোটেও। আবার দেহের যেমন কোন কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অসংলগ্নভাবে বিকশিত ও ব্যবহৃত হতে পারে বা বাড়তে পারে স্মৃতি বা কল্পনা বা যুক্তির তৈরির বৃত্তীয় যুক্তির ক্ষমতায়ন এর বৈষয়িক দিক নির্দেশনার আলোচ্য বিষয়টি। স্বাস্থ্যকে পরিশ্রমের পূর্ব শর্ত বলা বাঞ্ছনীয় বটে। একজন স্বাস্থ্যবান লোকের দ্বারা তাই করার সম্ভব যা একজন দুর্বল লোকের দ্বারা পূর্ণরূপে অসম্ভব। স্বাস্থ্যের যৌগিকতার মৌলিক রূপান্তর হল শক্তির মিশ্রণে প্রাণচাঞ্চল্যতা আনন্দের ফোয়ারা বাহন কর্মস্পৃহার নিয়ম, হাতে দক্ষতার বিনির্মাণ ও ক্লান্ত হলেও নিজেকে মানিয়ে নেবার প্রবণতা। তাই একইভাবে মনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য প্রফেশনাল ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের শ্রেষ্ঠ সহায়ক ও শিক্ষিত লোক তা করতে পারে যা অশিক্ষিত লোক করতে পারেনা। যে ব্যক্তিবর্গরা যুক্তি-চিন্তার আলোকে বিচার করেন তুলনা এবং পার্থক্যে পারদর্শী তারা আইনজ্ঞ, চিকিৎসক, বক্তা, রাজনীতিবিদ, জমিদার, সৈনিক ভূতত্তবিদ হতে যতটা না আগ্রহী তার চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তির তথা বুদ্ধির প্রয়োগের দ্বারা যথার্থ কাজটি চেয়ে নিতে বা বেছে নিতে সক্ষম হয়। সে সমস্ত ব্যক্তি তাদের প্রতিভার সাথে সামঞ্জস্যতার সমীকরণের নির্ভুলতার মাধ্যমেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এক্ষেত্রে মানসিক প্রকৃতি বা বিন্যাস অতীব জরুরি। সুতরাং, আমি যদি আপনাদের সামনে প্রফেশনাল অথবা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অপর্যাপ্ততার কথা আলোচনা করি তাহলে আমাকে বিশেষ বিশেষ শিক্ষার প্রতি বা শিল্পের প্রতি উদাসীন ভাবার কারণ নেই। আমার মতে এটাই যে এই নয়, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় আইন অথবা ওষধ বিজ্ঞান শিক্ষার অংশ নয় বা শিক্ষা দেয় না। বিশ্ববিদ্যালয় সকল বিষয়ে জ্ঞান দান করে কারণ সেখানে সকল বিষয় পড়ানো হয়ে থাকে। আমরা এখন বলতে দ্বিধা নেই যে, একজন আইনের শিক্ষক আরেকজন ফার্মেসীর শিক্ষক আর আরেকজন প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকের মধ্যে পার্থক্য থাকেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ও বাহিরে তা প্রদর্শনীয়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে গিয়ে স্ববিষয়ে (একটি নির্ধারিত বিষয়ে) বিশেষভাবে একক গুরুত্ব আরোপ করবে। কিন্তু পক্ষান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময়ে তাকে অনেক বেশি ও যথার্থ বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে, যখন সে সকল বিষয় পড়ে তখন তাকে মুক্তমনের মুক্তমননের মুক্তচেতনার অধিকারী হতে হয়। নিজের বিষয়টিকেও তিনি লিবারেল এডুকেশন পর্যায়ে ফেলেন।
জন লক বলেছেন, যে শিক্ষা আমাদের প্রাথমিক জ্ঞান কিছু যান্ত্রিক শিল্প ধারণা ও কিছু বস্তুবাদী বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয় না তা উপকারী নয়। আমি মনে করি বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার মাধ্যমেই সকল কাজেই শক্তি সাফল্য ও সৌভাগ্য মেলে। সমাজের কাছে কিছু কাজের জন্য এবং সর্বোপরি জগতের প্রতি কাজের জন্য আমরা দায়বদ্ধ। দার্শনিক ও লিবারাল শিক্ষা প্রণয়নই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ। যদি প্রফেশনাল দিকটি এটি উপেক্ষা করে তবে সকল নাগরিক গঠনে তা বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমার এখন বলার ইচ্ছে হল এই যে, বুদ্ধিবৃত্তি প্রশিক্ষণের বিষয়টি প্রতিটি সমাজসচেতন নাগরিক ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য মননশীলতা তৈরি করে দেয়। দার্শনিক ও পার্থিক লোকদের চিন্তাধর্ম ও চিন্তামুখীনতার মতভেদ ও মতপার্থক্য রয়েছে কেননা এদের চিন্তাধারা দুই রকম। চিন্তাধারায় মতপার্থক্য থাকতেও মতামত তৈরির প্রক্রিয়াতে সদৃশ্যপূর্ণতা দেখা যায় সাদা আকাশের মতোই। চিন্তামূলক বিষয়ের উপর একজন দার্শনিক এর যতটা প্রাধান্য আছে ঠিক ততটাই ভদ্রলোকের ব্যবসা ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই। সুতরাং বাস্তবসম্মত কিছু যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মাঝে সংযুক্ত করা যায় তাহলে নির্দ্বিধায় তা সমাজ সচেতন সুনাগরিক গঠনে সহায়তা করবেই শতভাগ সত্য। এটি হল সামাজিক জীবন সুন্দরভাবে গঠনের প্রক্রিয়া বা উপায় ও শিল্প সফল পদ্ধতি এবং ফলাফলটা হল সময়ের সাথে মানুষকে খাপ খাওয়ানোর সংযোজক সরলরেখা। এটি বিশেষ কোন পেশা নয় কিংবা মহানায়ক সুলভ কিছুর জন্মদানের মাতৃত্ব নয়। প্রতিভাবানদের কাজ মূলত কোন শিল্পের ছায়া বা আদলে নয়। মহানায়ক সুলভ যেমন মানুষেরা নিয়ম-শৃঙ্খলার মাঝে আবদ্ধ থাকলে চলে না বা চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয় যেমন অমর কবি লেখক তৈরির কারখানা নয়। কোন নেতা স্কুলের বা আদর্শের প্রতিষ্ঠাতা অথবা জাতীয় বিজেতা তৈরির স্থানও নয়। এরিস্টটল, নিউটন নেপোলিয়ন বা ওয়াশিংটন বা শেক্সপিয়রের মতো প্রতিভার জন্মদান প্রতিশ্র“তি যেমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারে না বা গড়েও ওঠে নি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এমন প্রতিভা তৈরি বা জন্ম নিতে পারেই।
আবার সমালোচক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয় যদিও এসব গুণ অর্জনের সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুটা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ সাধারণভাবে অতি সাধারণ অথচ উন্নতমানের মানুষ তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে শিক্ষার লক্ষ্যটা হয় সমাজের বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তা ও তার প্রয়োগ এর বিকাশ ঘটানোর আয়োজন। অন্য উদ্দেশ্য হল মানবমনের চর্চা বা সাধনা তথা মনোসাধনা জাতীয় চেতনার পরিশুদ্ধকরণ উৎসাহ বৃদ্ধি করে অগ্রসরতা সমকালীন, সম্প্রসারণ ও মার্জিতকরণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ, ব্যক্তিগত জীবনালেখ্য আলোচনা, বাকশক্তির পরিশুদ্ধতা অর্জন করা। এটি সেই শিক্ষা যা মানুষকে তার মতামত ও বিচার শক্তি সম্পর্কে সচেতন করে এবং বস্তুত বাস্তবতা শেখায়। এটি যুক্তির আদলে চিন্তাশক্তি বাড়ায়।
আধুনিক বস্তুকে বের করতে ও অবান্তর জিনিসকে ত্যাগ করতে শেখানোই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য। এ শিক্ষা যোগ্যতার সাথে কোন পদ বা পদাধিকার ধরে রাখতে শেখায় আর কোন বিষয় যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে সহায়তা করে। এ শিক্ষা নিজেকে অভিযোজন উপযোগী করে তোলে। অন্যকে প্রভাবিত করতে সহায়তা করে। অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে ও তার মানসিকতাকে মেনে নিতে শেখায়। অন্যের হাত ধরে চলতে শেখায়। এরূপ হয়ে ওঠার পর একজন ব্যক্তি যেকোন সমাজের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শেখায়।
সকল শ্রেণীর সাথে তার অনেক সাদৃশ্য থাকে। কখন কথা বলা প্রয়োজন আর কখন নিশ্চুপ থাকা প্রয়োজন এই শিক্ষায় থেকে তা শেখা যায় অনায়াসে রাতের নিদ্রাকালীন সময়ের মতোই সহজভাবে। সেই কথা, শোনা ও প্রশ্ন তৈরির যোগ হল বুদ্ধির দীপশিখা ও পারদর্শিতা। এইরূপ শিক্ষা এমন একজন প্রকৃত বন্ধুর কাজ যা সর্বদা নির্ভরযোগ্য। কখন সচেতন, কখন হাস্যময়ী, লাস্যময়ী আর কখন কি তা তার জানা বটে। তার যোগ্যতার পাত্রে ভরপুর সুন্দর ভঙ্গিমায় সামান্য কিছুকে Represent করা আর কাজের মাঝের অবগানের গবহঃধষ Mental Satisfaction। অপূর্ব উপহার হলো সামান্য সাহায্য করা ও ক্লান্তিতে সাহায্য করা সৌভাগ্যের চাবিকাঠি এটি। সম্পদের শিল্প, স্বাস্থ্য শিল্প, মনুষ্যত্ব শিল্প, অনুসরণ, অনুকরণ, দৃশ্যমানতা, নিশ্চিন্তকরণ শিল্প সব মিলিয়ে ত্রিমাত্রিক স্থানাঙ্ক রেখা বেঁচে থাকা, জীবন যাপন ও জীবন ধারণের শিল্পকলা।

কুমার দীপ’র প্রবন্ধ

সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র : প্রতিদর্পণে চিহ্নিত রূপ

বাংলা সাহিত্যের সমালোচনামূলক গদ্যে যাঁদের কলম, এই সময়ে স্বচ্ছলতার নিরিখে অনিন্দ্য; শহীদ ইকবাল তাঁদের অন্যতম। ছোটকাগজ চিহ্ন (অতি সম্প্রতি, ১৪তম সংখ্যা থেকে এটি কেবল সাহিত্যের কাগজ) সম্পাদক, তারুণ্যদীপ্তি অধ্যাপক, মুক্তপ্রাণ ড. ইকবালের চতুর্থ গ্রন্থ সাহিত্যের চিত্র চরিত্র (বইমেলা : ২০০৭), একজন সংস্কৃতিবান বোদ্ধা পাঠকের সমাজদর্শনাশ্রয়ী নিবিড় পর্যালোচনা। মহীরূহ রবীন্দ্রনাথ থেকে মুকুলিত বিষ্ণুবিশ্বাসও তাঁর আলোচনায় সানন্দে দীপ্যমান।
যতদূর জানি, শহীদ ইকবাল রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ নন, রবীন্দ্রধ্যানে সদামগ্নও নন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথে তাঁর আকুলতা কিংবা আবিষ্টতার কমতি নেই। ‘সৃষ্টিশীল ভাবুক’-এ তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছেন, অনেকের কাছে অমার্কসীয় বলে গৃহীত, অথচ সর্বপিপাসী রবীন্দ্রনাথকে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যাঁর সৃজিত বারিবিশ্বে বাঙালির মন্ত্রমুগ্ধ অবগাহন; সেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ড. ইকবালের অভিনব উচ্চারণ, ‘রবীন্দ্রনাথ পিতৃদেবের উপনিষদ বা প্রাক্-মতাদর্শের বিশ্বে তোয়াক্কা না করে মূলত নিজের
বিশ্বাসের জ্ঞানকেই গ্রহণ করেছেন।’ অথচ আমরা তাঁকে উপনিষদের সন্তান বলেই জানি– রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞগণ তাই-ই জানিয়েছেন। কিন্তু আজকের এই সাইবার পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ কতোটা প্রাসঙ্গিক? ইকবাল বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সমকালীন বাংলাদেশে ক্রমাগত বাড়ছে এবং তাঁর উচ্চারণমন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাকে একদিকে যেমন নানাভাবে দলিত করেছে অন্যদিকে তেমনি মাটির কাছাকাছি মানুষদের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ত দান করেছে।’ বহুকথিত এই কথাটির সাথে ঈষৎ দ্বিমত পোষণের সুযোগ আছে বৈকি। কেননা, রবীন্দ্রসাহিত্যে মাটির কাছাকাটি মানুষের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ততার কমতি নেই একথা সত্য, কিন্তু উদ্দিষ্টদের রবীন্দ্রচর্চা কিংবা রবীন্দ্রজ্ঞান যেহেতু প্রশ্নাতীত নয়, সেহেতু দান করার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ হতে পারে।
আর অতুল্য অসাম্প্রদায়িক কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে শহীদ ইকবালের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ, তবে তর্কাতীত নয়; বিশেষত, প্রতিক্রিয়াশীলতার কাছে। একথা সত্য যে, নজরুলের যে চেতনা তা ভারত কিংবা পাকিস্তান (তাঁর ভাষায় ‘ফাঁকিস্তান’) নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেই প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু একথাওতো সত্য স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুলকে রাষ্ট্রায়িত করার প্রক্রিয়াটিও প্রশ্নপ্রদায়ী! অসুস্থ বধির বোবা কবিকে নাগরিকত্ব দেওয়া, টুপি পরিয়ে (টুপিত্ব আর টিকিত্ব দুটোই কবির অপছন্দ ছিলো) একুশে পদক প্রদান, কিংবা মৃত্যুর পর তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দানসুস্থ, যথার্থ নজরুলের কাছে এগুলো অকল্পিত। জীবন্মৃত বা মৃত মানুষকে নিয়ে এমন টানাটানিও যেমন অমর্যাদাপ্রসূত তেমনি এতদ্সংক্রান্ত কর্মপ্রক্রিয়াও প্রশ্নসাপেক্ষ। তবু যশীর জন্ম যেমন গো-শালে হলেও জগতে তাঁর মহত্ত্ব স্বীকৃত, তেমনি প্রদানক্রিয়া যেমনই হোত কোটি কোটি বাঙালির কাছে নজরুল প্রাসঙ্গিক আদ্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কবি রূপে গর্বিত।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতোই কংক্রিটপ্রতীম গদ্য ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা– বিরূপ বিশ্বের প্রতিবাদ’। যিনি শহীদ ইকবালের গদ্য সম্পর্কে একেবারেই অবিদিত, তাঁর কাছেও আর সন্দেহ থাকে না লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কে। নিখিল অনিত্যের কবি সুধীন দত্ত, যাঁর কবিতা পাঠের জন্য অভিধান পাশে রাখতে হয়, পাঠোত্তর ভাবনার জন্য বোদ্ধা হতে হয়, দুর্বোধ্যতার কাঠগড়ায় যাঁর কবিতা দূরপ্রাচ্য, সেই শব্দব্রহ্মা সম্পর্কে শহীদ ইকবালের মূল্যায়ন, ‘সুধীন্দ্রনাথের কাব্য জুড়ে যৌক্তিক রোমান্টিকতায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগের পরিমণ্ডল চোখে পড়ে সেখানে কাব্যের উৎপত্তি এবং উৎপত্তির পরতে যে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব কবিকে কাব্যের প্রতি অনিবার্য করে তোলে, সেটা বোঝাই সবচেয়ে বড় কাজ। বোধকরি এমনটা বুঝলে সুধীন্দ্রনাথ যেমন দুর্বোধ্য থাকবেন না তেমনি তিরিশের অন্যান্য কবিদের মাঝেও নিরর্থক হারিয়ে যাবেন না।’
জসীমউদ্দীনকে নিয়ে লেখা অনুল্লেখ্য গদ্যটির (জসীমউদ্দীন : কবি) পর পুনরায় ইকবালের প্রেক্ষণীয়তাকে চিহ্নিত করা যায় ‘সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা : বিরূপ স্বদেশের প্রসন্ন চিত্ররূপ’ পাঠে। বলতে দ্বিধা নেই, এলেখা পড়তে পড়তে আমার পূর্ব ধারণা; যাতে কেবল কথাসাহিত্যালোচনাতেই ইকবালকে স্বচ্ছন্দ জানতাম–তা পাল্টে গেল। কবি ও কবিতার আন্তর্জগতে প্রবেশের অনিরুদ্ধ অধিকার তিনি আদায় করে নিয়েছেন যেন। বিখ্যাত ‘সমকাল’ সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর সম্পর্কে শহীদ ইকবালের প্রত্যয়ী উচ্চারণ, ‘পরিকল্পিত শব্দবুনুনি নয়, নিছক উচ্চারণের অনুরাগ এবং করোটির ভেতরের অভিজ্ঞতাসজ্ঞাত অনিবার্যতা তাঁর কবিতার শ্রেয়জ্ঞান।’ গ্রন্থস্থ শেষ কবিতাগদ্য ‘আবিদ আজাদের কবিতা : সংগুপ্ত কাতরতার অবিনাশী উচ্চারণ’ আবিদের কবিতার ন্যায় মুগ্ধবৎ পড়ে ফেলা যায়। অকালপ্রয়াত আবিদ আজাদ বিষয়ে ইকবালের যথার্থ মূল্যায়ন, ‘গতানুগতিক নন আবিদ, অনেক কবির মাঝে-অনেক কবিতার তোড়ে, তুলতুলে আবেগে ভাসানো কবি নন আবিদ; আবিদ প্রেমকে অর্থহীন বা মৃত্যুকে অর্থহীন করে তুলতে পারেনকিন্তু স্পষ্ট ও পরিষ্কার-জীবন তাঁর আলেখ্য; জীবন তাঁর কাম্য-জীবনকে প্রেমী ও সুখী করে সংগুপ্ত কাতরতার পলে পলে বিশ্বাসের বাঁধনে নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠা দিতে চান এবং প্রচেষ্টায় স্পর্শ করেনও তা তিনি।’ অবশ্য আবিদকে ‘বড় কবি’ বললেও তাঁর দিকগুলোও তুলে ধরতে ভোলেননি। যেমন, ষষ্ঠ কাব্য ‘তোমার উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?’ (১৯৯৯) তে ‘নিছক প্রকৃতির তরল পিয়াসে আপ্লুত হওয়া ছাড়া’ কোনো নতুন মেসেজ নেই স্পষ্টতই বলেছেন ইকবাল।
কথাসাহিত্য বিশেষত, উপন্যাস বিষয়ক গদ্যরচনায় শহীদ ইকবাল পূর্ব পরীক্ষিত। প্রথম প্রকাশিত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৯৯)-এ তার প্রমাণ মেলে। একচল্লিশ পৃষ্ঠার গদ্য ‘শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে’ ইকবালের এম.এ ফল প্রকাশের পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছিল রাজশাহীর প্রধান দৈনিক ‘দৈনিক বার্তা’য় শুক্রবাসরীয় সাহিত্য পাতায়; ২৯ মার্চ থেকে ১৪ জুন ১৯৯৬ পরিসরে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি; সুবোধ-শ্রীকুমার থেকে কবির-সামাদীসহ অনেকেই অনেক মৌলিক কথাবার্তা বলেছেন, তাই বলে কি বলার কিছুই নেই? আছে। আছে বলেই আলোচ্য প্রবন্ধের অবতারণা। ইকবাল কেবল কাহিনী ভোজনে তৃপ্ত নন; সমাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, বুর্জোয়াবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, ইতিহাস, অর্থনীতিপ্রভৃতি সমাজবীক্ষণের আলোতে কাহিনীর কুশীলবগুলোকে ছিঁড়ে-ফুঁড়ে পরিচয় করিয়ে দেন পাঠকের সামনে। শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী থেকে সতীশ-সাবিত্রী-সকলেই শানিত ব্যবচ্ছেদে দীপ্তমান। গদ্যটির দু’একটি চরণ তুলে ধরার লোভ সংবরণ করা যায় না। যেমন, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম শতক সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘আমাদের নিদ্রার ঘোরে সাদা মেধাবীরা গড়ে দিয়েছে তাদের সভ্যতা।’
আর শরৎচন্দ্রনির্মিত চরিত্র সম্পর্কে কয়েকটি আচমৎকার উচ্চারণ–যদিও তাঁর হৃদয়বৃত্তির আতিশয্য কিংবা আবেগবহুল সমাজসংস্কার, ন্যূব্জ সমাজনীতি, দুর্বল কমিটমেন্ট নিয়ে সমালোচকদের নানা মত প্রচলিত আছে, তার সত্যতা স্কন্ধে ধারণ করেই বলব–তিনি গণতান্ত্রিক চরিত্রকে প্রমাণ করেছেন।’
শ্রীকান্ত চরিত্রাঙ্কনে লেখকের কৃতিত্বের কথা বলেছিলেন; এ প্রতিভা ‘বাংলা উপন্যাসে খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হল।’ শেষাবধি শরৎচন্দ্রকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, ‘শরৎচন্দ্র বড় মাপের সাহিত্যিক। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা উপন্যাসে অবক্ষয়ী সামন্তবাদ, ক্ষয়িষ্ণু সমাজবাস্তবতা, চলমান ব্যক্তির আত্মব্যবচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ মাত্রিকতা পায়। শরৎচন্দ্র এ সময়েরই প্রতিনিধিত্বকারী। তাঁর উপন্যাসে সমাজ এসেছে, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত নির্মিতি পেয়েছে, ব্যক্তির স্পন্দন ও চলিষ্ণুমানতা প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে, সহজেই ধরা পড়ে তাঁর এ চিত্রায়ন খণ্ড খণ্ড ছাড়া ছাড়া গোছের। সামাজিক অবয়ব অসংগঠিত, ব্যক্তি সেখানে স্থবির গতিহীন।’
বিরল কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিষয়ক গদ্যচর্চায় ড. শহীদ ইকবাল অগ্রগণ্যদের অন্যতম; ইলিয়াস স্পেশালিস্ট। তাঁর প্রথম এবং ইলিয়াস বিষয়ে বাংলার প্রথম একক গ্রন্থ কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর পাতায় পাতায় ইলিয়াসের গল্পোপন্যাস নিয়ে সূচালো ব্যবচ্ছেদের নমুনা পূর্বলক্ষিত। আলোচিতব্য চিলেকোঠার সেপাই : উপন্যাসের আঙ্গিকে ক্ষয়িষ্ণু ব্যক্তি মানুষ’ ও ‘আখতরুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা : স্বপ্নবাস্তবতার চিত্ররূপ’ গদ্যদ্বৈত্যেও মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। প্রমাণত, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রূপদক্ষ কারিগরের মতো ভাষায় সৃষ্টি করেন প্রাণনা, প্রাণসৃষ্টি এবং তাঁর গ্রন্থপরিকল্পনায় দান করেন জৈবিক জীবনায়নের অনুভূতি। আধুনিক প্রকরণের যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বসে ঊনসত্তর-সময় এবং হাজার বছরের বাঙালির প্রত্নজীবনাভিজ্ঞতা সাধ ও সাধ্যের সম্ভাব্য বাতাবরণে নির্মাণে প্রয়াস পান।’ কিংবা বাংলা সাহিত্যের অতুলনীয় উপন্যাস খেয়াবনামার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, চরিত্রসমূহের মাটিলগ্নতা, ঔপন্যাসিকের উদ্দেশ্য ও শিল্প নিপুণতা সম্পর্কে ইকবাল বলেন, ‘তাঁর কোন বিষয় উদ্দেশ্য নির্ভর না; কাহিনীর গতিময়তায় সমাজ সুন্দরের প্রেক্ষণ একটা অনিবার্য তাগিদেই যেন চলচ্চিত্রায়ন ঘটে, দৃশ্যপট বদলায়। Anti-Romantic  ভাবনায় ভাষার নিপুণ প্রয়োগে এমন পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করেন, যেখানে আগ্রাসী পুঁজিবাদে ক্লিন্ন ব্যক্তি খোলস ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে। Expressionist, Surrealist Impressionist ভাবনায়; সংক্ষুব্ধ জীবনজটিলতার মনস্তাত্ত্বিক ইমেজ ব্যাখ্যা হয়। কখনো হ্যালুসিনেশন কিংবা ইল্যুশনের আওতায় ব্যক্তিসত্তার ভিন্নস্বর বেরিয়ে আসে।’
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে, বিশেষত উপন্যাসে শওকত আলীর স্থান শীর্ষসারিতেই। ইতিহাসের এক জটিল সময়কে আরো জটিল প্রকরণে পরিস্ফুটনের যে প্রয়াস শিল্পী করেছেনতাকেই বিশেষায়িত করতে ইকবালের ‘শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন’। উপন্যাসবিষয়ক আরো দু’টি গদ্য-‘রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি : ব্যক্তি মনস্তত্বের নিরীক্ষা’ ও ‘টলস্টয়’র একটি উপন্যাস’। দুটোই সুখপাঠ্য কিন্তু দ্বিতীয়টি গ্রন্থানুসারে অনেকটা বেমানান।
‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অবাস্তব’এই অবিস্মরণীয় শ্লোগানে মুখর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পৌরহিত্যকারী, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এর প্রবাদপুরুষ কাজী আবদুল ওদুদ সম্পর্কে কাজী মোতাহার হোসেন, অন্নদাশঙ্কর রায়, আহমদ শরীফ, আবদুল হক, আনিসুজ্জামান, খোন্দকার সিরাজুল হক–এঁদের মূল্যবান রচনা রয়েছে। শহীদ ইকবালের ‘কাজী আবদুল ওদুদ : প্রসঙ্গ ও পর্যালোচনা’ আমাদেরকে আরো আধুনিকভাবে, প্রগতিশীলতার সাথে ওদুদকে অনুধাবন করতে সহায়তা করে।
একেবারে শেকড়সন্ধানী, সমাজপ্রত্যয়ী শিল্পজিজ্ঞাসামূলক অনুপম গদ্য ‘আমাদের সাহিত্যের জিজ্ঞাসা সূত্র’। সাহিত্যের যারা লেখক, পাঠকসকলকেই জানতে হবে, সাহিত্য কী? সাহিত্য কেন? একটা জাতির জন্যে সাহিত্যের স্থান কোথায়? যাচিতভাবেই ইকবাল বিশ্বাস করেন, সাহিত্যরচনার সূত্রটা আমাদের জীবনের নিরঙ্কুশ বাস্তবতা থেকেই সরাসরি উঠে আসা উচিত, আমদানিকৃত কোনো যাদুপ্রবণতা থেকে নয়। দৈনিক, মাসিক বা মেলাভিত্তিক, জনপ্রিয় বা ফরমায়েশি রচনা শিল্পসার্থকতা তো নয়ই, সমাজের জন্যও মঙ্গলার্থক নয়এ বিষয়ে ইকবাল দ্বিধাহীন। কেননা, ‘অধিকাংশগুলোরই পরিপ্রেক্ষিত নায়ক-নায়িকার শরীর-ছোঁয়া রোমান্টিক প্রেম কিংবা চুমুর গল্প। বর্তমান বেপথু আগ্রাসী ইলেকট্রনিক্স-এর সমাজে মধ্যবিত্ত পরিবারের টিন এজারদের সুড়সুড়ি দিয়ে আঠালো বিকৃত হৃদ্কম্পন ঘটিয়ে কিছু সময় সেন্সশূন্য করে রাখার প্রয়াস।’ কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রার যে জটিলতা, নৈরাশ্যবোধ কিংবা আত্মপরিচয়ের যে সংকটতারই উত্তরণে যেখানে সাহিত্যের কাছে যাওয়া, ‘সেখানে আন্তরসঞ্জাত জীবন চেতনায় শিল্পীর দৃষ্টি যদি নতুন মাত্রিকতা না পায়, অনন্ত জীবনের পথে উৎসাহ না সৃষ্টি করে, প্রকৃত সমাজস্তরের ভিত না কাঁপায়, তবে কিসের সাহিত্য, আর কিসের বা জীবনের সার্থকতা?’
বহু বছরের বহু মনীষীর চিন্তা-চৈতন্যের দ্বারা, মননের বিবর্তন ঘটেছে আমাদের। ঐতিহাসিক কিংবা ঐতিহ্যিক সব বিচারেই আমরা বাঙালি। তবুও বৈপরীত্যের বিষ ছিটাতে চায় যারা, তাদের উদ্দেশ্যে ইকবালের উক্তি, ‘যে অর্জনে অর্জিত হয়েছে আমার দেশ, ভাষা–তা আমার হৃদয় নিঃসৃতি আকুতি, সেখানে মিশে আছে আমার চৈতন্যের, প্রাণনার উৎসের ফুলেল পটভূমিসেটাই আমার জাতি পরিচয় আর বাঙালিত্ব।’
কিন্তু এ নিয়ে এতো দ্বিধা কেন এখন? হাজার বছরের অর্জনকে বা দীর্ঘ শ্রমে-ত্যাগে অর্জিত মননবৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার অর্থ কী? (মনন চিন্তার বিবর্তনবাঙালি ও বাংলাদেশ)। গ্রন্থের শেষ গদ্য ‘একবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য : বিবেচনার ইঙ্গিত-এর সূত্রবিন্দু উনবিংশ শতাব্দী; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য নিয়ে সত্যই বোধ হয় বলার সময় আসেনি। শহীদ ইকবালও স্বীকার করেন। কিন্তু হতাশাও লুকিয়ে রাখতে পারেন না। বলেন, এখনকার সাহিত্যে যা রচিত তার অধিকাংশ সত্য নয়সত্য পাই না। আমরা উদ্ধৃত পংক্তিমালা চাই যা আমাদের সত্যকে বলবে, আমাদের অন্তরের সত্যকে স্পর্শ করবে; নইলে সাহিত্যের চলে কী করে সাহিত্যই বা বলবো কাকে? তথাপি ঈষৎ বিচ্যুতি সাহিত্যের চিত্র-চরিত্রকে কিঞ্চিৎ নমিত করেছে মাঝে মধ্যে। যেমন, প্রবন্ধানুক্রমে প্রকাশকালিক কিংবা লেখাভিত্তিক কোনো ধারাবাহিকতাই সুলক্ষ নয়। উপন্যাসগদ্যে শরৎ-রবীন্দ্র-ইলিয়াস-শওকত-ইলিয়াস-টলস্টয় কোনো ক্রমিকতা বিধান করে কি? দ্বিতীয়ত, প্রায় সব গদ্যের শুরুই প্রাক্-ভূমিকা সজ্জিত; যা প্রায় একই কিংবা গতানুগতিক, কখনো বা বিরক্তি উদ্রেক করে বৈকি! ‘শতাব্দীর সমান বয়েসী সুধীন্দ্রনাথ’ কিংবা ‘উপন্যাস শিল্প সামন্তবাদ থেকে বুর্জোয়া উত্তরণের ফসল’এ জাতীয় কথামালা হাজির হয় বারবার। তৃতীয়ত, বাংলা সাহিত্য সমালোচনার অন্দরমহলে ‘টলস্টয়’র একটি উপন্যাসকে বৈমাত্রেয় মেনে নিলেও ‘থিয়েটার চর্চা এবং তার দায়বদ্ধতা’ গদ্যটি একেবারেই অনাত্মিক মনে হয়। চতুর্থত, ১৯৯৬ থেকে ২০০৫, দশ বছরব্যাপী প্রকাশিত গদ্যগুলো বৈবর্তনিক প্রক্রিয়াতে ভিন্ন ভাষা বৈশিষ্ট্যে উপস্থিত।
এতদ্সংক্রান্ত নেতিবাচকতা সত্ত্বেও সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র গভীরে অনুধ্যানের দাবি রাখে। বিশেষত, ‘মার্কসবাদী ক্রিটিসিজমকে আয়ত্ত করবার প্রাণান্ত চেষ্টা’য় নৃতাত্ত্বিক সমাজবীক্ষণের প্রেক্ষাপটে, যুক্তিপূর্ণ শিল্পপ্রেক্ষণের পূর্ণতটে, শহীদ ইকবারের গদ্য স্বচ্ছতোয়া নদীর মতো; পিয়াসী পথিক সেখানে সহজেই হতে পারে অপ্লুত, তৃপ্ত অতঃপর পরিণত। সমাজকে ধারণ করে সাহিত্য; যাকে আমরা দর্পণ বলি– সেই দর্পণেরই প্রতিদর্পণ রচনা করেন ইকবাল। তাঁর গদ্য শুকনো খটখটে নয়, রস আছে সেখানে। গদ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কবিতা, বিশেষত রবীন্দ্রকবিতার সুর, ঝংকৃত হয় কৃতবিদ্য ইকবালের কলমে। যদিও একই গ্রন্থে ভিন্ন সুরের দ্যোতনা মেলে, কিন্তু তা কেবল রচনাকালিক ব্যাবধানের কারণে। এবং এই ভিন্নতা লেখকের ক্রমবিবর্তনের পরিচায়কও। এ যদি ব্যাহত না হয়, একজন ঋদ্ধ গবেষক অধ্যাপকই শুধু নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির অবারিত এক গদ্যশিল্পীকেও শিরধি করবো নিশ্চয়।

জুলফিকার নিউটন’র অনুবাদ

ওলে সোয়িংকা : ক্যামউড অন দ্য লীভস্

[ক্যামউড অন দ্য লীভস্ (Camwood on the Leves) নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। এটি একটি বেতার নাটক। ১৯৬০ সনের নভেম্বরে লাইজেরিয়া ব্রডকাস্টিং করপোরেশন নাটকটি প্রচার করে। ১৯৭৫ সালে-তে প্রচারিত হয় বি.বি.সি. থেকে। এটি একটি বেতার নাটক হলেও মঞ্চনাটকেও রূপান্তরিত হতে পারে বলে মনে করা হয়। পশ্চিম আফ্রিকার য়ুরুবা সভ্যতার সঙ্গে পাশ্চাত্য সভ্যতার টানাপোড়েন নিয়ে গড়ে উঠেছে এ নাটক। যুক্ত হয়েছে প্যাগান ও খ্রিস্টানদের দ্বন্ধ। ঐতিহ্যের উৎসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন নাট্যকার। এ সমস্যাকে অবশ্য আড়ালে রেখে তিনি দুটি প্রজন্মের সংঘাতকে তুলে ধরেছেন। সে হিসেবে এ নাটক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
Camwood শব্দটি বেশ অপ্রচলিত। সাধারণ ইংরেজি অভিধানে নেই এ শব্দ। যাইহোক, অভিধানে এর অর্থ পাওয়া যাচ্ছে The red wood of Basita Millida imported the Gaboon used chiefly for dyeing purpose, also for violtin bowls.রঙ করার উপযোগী একধরনের গাছের রস যা বেহালার ছড় ঘষতেও লাগে। এটি একেবারেই আফ্রিকার স্থানীয় কোনো গাছের রস। আমাদের দেশেও অবশ্য এ ধরনের গাছের রস আছে। নাটকের প্রথম গানটির মধ্যে ( যা আবার শেষ গানও বটে) শব্দটি রয়েছে।
এ নাটকের লেখক ওলে সোয়িংকা আধুনিক আফ্রিকার উল্লেখযোগ্য লেখক। নাইজেরিয়ায় তাঁর জন্ম ১৯৩৪ সালে। গোড়ায় গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তিনি খ্যাতিমান নাট্যকার বলেই। তারঁ প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয় ১৯৫৯ সালে। তারপর ‘এ ড্যান্স অব দ্য ফরেস্টস’, ‘দ্য লায়ন অ্যান্ড দ্য জুয়েল’, ‘বিফোর দ্য ব্ল্যাকআউট’, ‘কংগোস হারভেস্ট’, ‘ডেথ অ্যান্ড দ্য কিংস হর্সম্যান’, প্রভৃতি নাটক তার খ্যাতিকে পৃথিবী ব্যাপী করে তুলেছে। তাঁর এ খ্যাতি তাঁকে দিয়েছে নানাধরনের পুরস্কার। অবশেষে তিনি পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার ১৯৮৬ সালে।]
চরিত্রলিপি
মোযি রেভারেন্ড এরিনযোবি: ইসোলা: মোর্যুনকে॥ মি. ওলুমোরিন।
মিসেস ওলুমোরিন। শিশুর দল, মানুষ, জনতা প্রভৃতি
ঘটনাস্থল পশ্চিম আফ্রিকার একটি ইউরোবা শহর:
‘অগবে’ গান : ১
শিশুর জন্য শোকে ‘অগবে’ তাকে মুড়ে রেখেছিল নীলে
শিশুর জন্য শোকে ‘অলকে’ ক্যামউড রঙ করেছিল মাটি
শোকার্ত বাবা পেতলের ঘণ্টা এনেছিল জোর করে
কিন্তু আমরা বাস করতে পারি না বেশি করে এসব নিয়ে
তাহলে আমরা জড়িয়ে পড়ি ঈশ্বরের সঙ্গে নিয়তির খেলায়।

(প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দে শুরু।)
মোযি : দরজা খোল! ইসোলা দরজা খোল। (দরজায় আবার ধাক্কা দেয় সে) ইসোলা, তোর মায়ের দোহাই, মিনতি করছি বাপ আমার, দরজা খুলে দে আমাকে… আমাকে কথা বলতে দে তোর সঙ্গে, দোহাই….. বাপ আমার…. দরজা খোল। (আরো মরিয়া হয়ে) ইসোলা, তোকে আমি কি করেছি? আমাকে বদ্ধ দরজার বাইরে রেখেছিস কেন? বাবা আমার, ঈশ্বরের ক্রোধ আমাদের বাড়ির ওপর নেমে আসবার আগেই খুলে দে দরজটা। (তাঁর ধাক্কা আরো মরিয়া হতে থাকে একটি শিশু কাঁদতে শুরু করে, বাচ্চাদের ক্ষীন পায়ের আওয়াজ বেশ কাছেই, তাদের একজন শিশুটিকে থামাবার চেষ্টা করছে।) ইসোলা, আমাকে কি শুনতে পাচ্ছিস না? আজকের দিনটিতে আমাকে লজ্জা দিতে চাইছিস? শোন বাপ তোর ভাই বোনগুলোর কথা ভাব…ইসোলা আমাকে দেখতে পাচ্ছিস না? আমি হাঁটু গেড়ে বসে আছি। তোর ভাই বোন সব্বাই মিলে তোকে মিনতি করছে। আমার জন্যে একটু দোহাই তোর। আমি কথা বলব ওনার সঙ্গে। তুই দরজা খোল। তোর অনুতাপ হয়নি এমন কথা ভাবতে দিস না ওনাকে। দোহাই তোর দোহাই…. দরজা খোল….
এরিনযোবি : (নিচ থেকে) কোথায় সে? মোযি? কোথায় ওটা?
মোযি : স্ স্ … বাচ্চাটাকে সরিয়ে নিয়ে যা। জলদি… পাশের ঘরে নিয়ে যা, দরজায় তালা লাগিয়ে দে…জলদি…হায় ঈশ্বর, এখন করি কি…আমি এখন কি করব? (ভারি পায়ের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে।) (মরিয়া হয়ে ফিস্ফিসে স্বরে) ইসোলা, এখনো উনি এসে পৌঁছোননি, এখনো পৌঁছোননি। এখনো আসেননি, এখনো, বাবা আমার…এখনো বেরিয়ে আসতে পারিস…কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিস… যা তোর মন চায়… আমি তোর কেনা হয়ে থাকব, শুধু দরজাটা খোল বাপ আমার…
এরিনযোবি : (উঠতে উঠতে) মোযি!
মোযি : হায় আমি শেষ হয়ে গেলাম…হে ঈশ্বর আমার শেষ।
এরিনযোবি : মোযি নিচে যাও।
মোযি : রেভারেন্ড…
এরিনযোবি : নিচে যাও, মোযি।
মোযি : রেভারেন্ড, ও তোমারই ছেলে…যাই করে থাক না কেন ও তোমারই ছেলে…
এরিনযোবি : নিচে, নিচে, নিচে যাও! বাচ্চাগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে যাও।
মোযি : ও তো একগুঁয়ে নয়, রেভারেন্ড। তুমি ভেবো না ওর অনুতাপ হয়নি। ও নিজের ঘরে বসে প্রার্থনা করছে। প্রার্থনা করছে মার্জনার জন্য। (এরিনযোবি নড়ে, পাশের ঘরটি খোলে, শিশুটির কষ্টের কান্না সহসা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। )
এরিনযোবি : নিচে যাও, তোমরা সবাই। সব্বাই মায়ের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে থাক। কারুর কোনো আওয়াজ শুনতে চাই না আমি, শুনতে পাচ্ছ তো সাফ কথা? একটু আওয়াজও নয়। (ছোটদের পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় দ্রুত। মোজি ফুঁপিয়ে যেতেই থাকে, বিড়বিড় করে বলে।)
মোযি : এ দিনটা দেখার জন্য আমি বেঁচে আছি…এ আমারই পাপের শাস্তি কিন্তু হে মহান প্রভু, আমাকে কি শাস্তি দিতে পারতে না অন্য কোনো ভাবে? আমার ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়ে নয়, হে প্রভু, আমার ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়ে নয়…(নিচে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।)
এরিনযোবি : মোযি!
মোযি : এ এক কঠিন বিচার প্রভু…আমার শক্তি নেই…সইবার শক্তি আমার নেই…আমার পাপের শাস্তি আমাকে দাও…কিন্তু এভাবে নয়, প্রভু, এভাবে নয়…
এরিনযোবি : মোযি, এমন ব্যবহার করতে তোমাকে বারণ করছি আমি…
মোযি : রেভারেন্ড, আমি দুর্বল মেয়েমানুষ, তোমার মত শক্তি আমার নেই।
এরিনযোবি : তাহলে শক্তির জন্য প্রার্থনা করো। কিন্তু আমার কানের কাছে গোঙাবে না।
মোযি : সে তোমার ছেলে, রেবারেন্ড…
এরিনযোবি : আমার ছেলে? আমি ওকে ত্যাজ্য করেছি। সে আমার ছেলে নয়… তোমারও নয়!
মোযি : না না, আমাকে দাবী জানাতে দাও। আমাকে কথা বলতে দাও ওর সঙ্গে। আমি ওর মা।
এরিনযোবি : ঈশ্বরের অসন্তোষকে তুমি ভয় পাও না? আমি বলছি, এ প্রাণীটিকে নিয়তির হাতে সমর্পণ করো।
মোযি : কেমন করে করি? না, আমি পারব না রেভারেন্ড, পারব না। ঈশ্বর দয়ালু। ও আমার ছেলে-।
এরিনযোবি : বলছি তো, ও তোমার ছেলে নয়। ওলুমোরিনের মেয়ের অসম্মান করেছে ও…আমাকে ফেলেছে লজ্জায়…ও তোমার ছেলে নয়…
মোযি : না, ও আমারই ছেলে। আমি ত্যাগ করতে পারি না ওকে। ও তোমার ছেলেও রেভারেন্ড, তুমি ত্যাজ্য করতে পার না ওকে।
এরিনযোবি : মোযি! শয়তানের ঐ সৃষ্টিটাকে যতবার নিজের ছেলে বলে ঘোষণা করছ ততবার তুমি পাপ করছ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে।
মোযি : রেভারেন্ড।
এরিনযোবি : আমার বিচারে ন্যায্যতা প্রমাণ করবার জন্য আমি সাক্ষী মানব ঈশ্বরকে। (স্তব্ধতা) নিচে যাও, মোযি। তোমার হৃদয় যদি চায় তাহলে প্রার্থনা করো ওর জন্য। কিন্তু ভয় হচ্ছে ওর উদ্ধারের আশা আর নেই।
মোযি : (আবেগমুক্ত থাকার চেষ্টা চালিয়ে) তোমার হাতেই ওকে সমর্পণ করে যাচ্ছি রেভারেন্ড, ছেড়ে যাচ্ছি ঈশ্বরেরও হাতে। রেভারেন্ড যদি দেখতে চাইতে তাহলে দেখতে ও প্রার্থনা করছে নতজানু হয়ে। ও জানে ও পাপ করেছে, ও জানে তা। তাই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে নিজের হৃদয় নরম করবার জন্য। সামান্য একটু সময় দাও ওকে, রেভারেন্ড, অল্প একটু সময়।
এরিনযোবি : আমি অপেক্ষা করছি। ঈশ্বরের বিচার দ্রুত নেমে আসে না।
মোযি : দয়ালু হও।
এরিনযোবি : ঈশ্বর দয়ালু। নিচে বাচ্চাদের কাছে যাও, তুমি। দরজায় তালা দিয়ে দাও। (মোযির ক্লান্ত পদধ্বনি সিঁড়িতে ধীরে মিলিয়ে যায়। একটি দরজা খোলে এবং বন্ধ হয় ধীরে, তালায় চাবি পড়ে। এরিনযোবি একটি চেয়ার টানে, বসে।)
এরিনযোবি : আমি অপেক্ষা করছি।
স্তব্ধতা। তারপর গান:
আমি আনন্দ পাই খামারের মানুষের মতো রাঙা আলুর টুকরোয়
আমার ভোজ ভুট্টা দিয়ে ‘সাঙ্গো’ উপাসকের মতো
আমার পিঠ শিশুটির আশ্রয় পবিত্রতম মায়ের মতো
এ শিশু তোমাকে -তোমার নিজেরই রক্ত আর মাংস
এ যমজ তোমাকে-তোমার নিজেরই রক্ত আর মাংস
এবং যমজের একটি তোমার নিজেরই রক্ত আর মাংস
(গোধূলির শব্দের সঙ্গে গান মিলিয়ে যায়। দৃশ্যান্তর। রাত-পেঁচা, ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁর আওয়াজ। দুটি মানুষ ঝোপের মধ্যে শব্দ করে চলেছে।)
মোর্যুনকে : এর চাইতে মশাল ভাল ছিল না কি? হেই? ইসোলা?
ইসোলা : অ্যাঁ, কি বলছ?
মোর্যুনকে : আমার কথা শুনছ না। আমার কথা তুমি শুনছ না।
ইসোলা : শুনছি তো!
মোর্যুনকে : না, শুনছ না। এখনো কি তোমার বাবার কথাই ভেবে যাচ্ছ? আজ যা ঘটল সেই সব?
ইসোলা : না না। সেসব মন থেকে আমি ঝেড়ে ফেলেছি। হ্যাঁ কি বলছিলে বলো।
মোর্যুনকে : বলছিলাম একটা মশাল থাকলে ভালো হত।
ইসোলা : আমি তো বরাবর লন্ঠন দিয়েই কাজ সারি।
মোর্যুনকে : কিন্তু এখন কি তুমি খুশি হওনি মশালটা আমি চুরি করে এনেছি বলে? আমার উপর রেগে গিয়েছিলে তুমি, কিন্তু এখন কি তোমার মনে হচ্ছে না ওটাই দরকারি ছিল বেশি?
ইসোলা : আমি লন্ঠনই পছন্দ করে এসেছি কেননা কাজে লাগানো যায় সহজে। যাকগে, বল তোমার কেমন লাগছে? কিছু যে বদলে গেছে লক্ষ্য করছ না?
মোর্যুনকে : কিসের বদল?
ইসোলা : মাটির দিকে তাকাও। আজ রাতে কোনো ছায়া পড়েনি আমাদের। গাছেদের ছায়া পড়েনি একটুও।
মোর্যুনকে : আহ, ছায়া আমার ভাল্লাগে না। এতে বরং ভয় করছে কম।
ইসোলা : সত্যি কথা বল। বল ভয় পেতে তুমি ভালবাসো। ভালবাসো যখন ছায়া থাকে আমাদের।
মোর্যুনকে : (হাসছে) পা-গুলো বেশ মজার। পথ চেয়ে অর্ধেক ওঠে তারা, তারপর কাঁপতে থাকে ঝোপে এসে…লাঙ্গা…লাঙ্গা…লাঙ্গা… লাঙ্গা…আগেরের মত।
ইসোলা : জোলির পা-ওয়ালা আগেরে। (মোর্যুনকে হাসে) দেখছ, তুমি নিজেই পছন্দ করছ লন্ঠন।
মোর্যুনকে : না না একটা মশাল অনেক কাণ্ডজ্ঞানের।
ইসোলা : ঠিক আছে, এই নাও একটা, বেশ বড়সড়ো। এনেছি সঙ্গে করে। ঝোলার মধ্য থেকে বার করে নাও। (শামুকদের ঘষাঘষির আওয়াজ) আর কটা আছে আমাদের?
মোর্যুনকে : না না, গুনবে না। বিমপে বলেছে শামুক গুনলে ভাগ্য খারাপ হয়।
ইসোলা : হুম, তোমার সেই আয়া। কত কথাই না বলে তোমাকে।
মোর্যুনকে : খুব জ্ঞানী মহিলাতা জানো। তার কথা মেনে চলা ভাল।
ইসোলা : বেশ ভাল কথা! মহিলাটি যদি না-ই গোনেন তাহলে আমাদের কাছে বিক্রি করেন কেমন করে?
মোর্যুনকে : আহ্-হা, তিনি বলেন বাজারে গুনলে দোষ নেই কোনো।
ইসোলা : কিন্তু শামুক যখন কুড়িয়ে বেড়ায়। এই তো পেলাম আরো দুটো…
মোর্যুনকে : আরে, মশাল বার করতেই তো বেরিয়ে এলো ওগুলো।
ইসোলা : ঠিক আছে, ঠিক আছে, মেনে নিচ্ছি আমি। ভাগ্যিস মশালটা এনেছিলে, খুব খুশি হয়েছি। তবে এটা আনা উচিত হয়নি তোমার। এটার মালিক তোমার বাবা। (ঝোপ সরানো ছাড়া অন্য কোন আওয়াজ নেই।)
মোর্যুনকে : বল।
ইসোলা : ভাবতেই পারিনি, আজ তুমি বেরিয়ে আসবে।
মোর্যুনকে : কেন পারব না?
ইসোলা : ভেবেছিলাম ভয় পাবে।
মোর্যুনকে : কিসের ভয়? ওহ্, বুঝেছি। না, আমি তৈরি হয়েই এসেছি।
ইসোলা : তৈরি? কিসের জন্য?
মোর্যুনকে : এই দেখ। আলোটা এদিকে ঘোরাও।
ইসোলা : কি এটা? একটা বোনার কাঁটা?
মোর্যুনকে : হ্যাঁ। আর একটা ছোট্ট পাথর…এই যে।
ইসোলা : কি বলতে চাইছ তুমি
মোর্যুনকে : রাতের বদ আত্মাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায়।
ইসোলা : কি বললে?
মোর্যুনকে : বিমপে বলেছে আমাকে। যখন জানল আমি পোয়াতি, এসে বলল আমি যেন একটা পাথর আর তীক্ষè কোনো জিনিস নিয়ে বেরোই। বিশেষ করে রাতের বেলা। (ইসোলা হাসিতে বিস্ফোরিত) সত্যি কিন্তু একথা। কাকাকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি, তিনিও সায় দিয়েছেন।
ইসোলা : ঠিক আছে বাবা। আমিও বরং বিমপের কাছ থেকে শিখে নেব এসব। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব বাড়ির আয়ার মধ্যে ইনিই সব চাইতে জ্ঞানী।
মোর্যুনকে : ঠিক তাই।
ইসোলা : যাই হোক, শামুকগুলোর জন্য আমার কাছ থেকে দাম নিয়েছে বড্ড বেশি…তবে এ নিয়ে কিছু বলিনি আমি। শুধু ভেবেছিলাম, বিকেলের ঐ মারদাঙ্গার পর, বেরিয়ে আসার আর সাহস পাবে না তুমি।
মোর্যুনকে : কিন্তু সত্যি বলতে এ নিয়ে মাথা ঘামাইনি আমি।
ইসোলা : ঘামাওনি। ঘামাতে হয়ওনি। শুধু খবর পেয়েছিলাম তোমার মা বাবা মোড়ল মশায়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে খুন করার ধান্দা করছেন। মোটের উপর তোমাকে তাঁরা হিসেবের মধ্যেই আনেননি। ভয় পেয়েছিলে তুমি?
মোর্যুনকে : না, বেশির ভাগ ব্যাপারই ঠিক বুঝতে পারিনি। তোমার বাবা তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন কেন?
ইসোলা : জানি না। সম্ভবত নিজেকেই জানে না তিনি। ব্যাঙের ছাতাও কিছু কুড়িয়ে নেব নাকি?
মোর্যুনকে : না…না. রাতের বেলায় নয়।
ইসোলা : কিন্তু দেখ অঢেল জন্মে আছে এখানে। দেখ দেখ, সবগুলোর দিকে তাকাও।
মোর্যুনকে : খুব ভোরে এসে কুড়িয়ে নিয়ে যাব আমরা। বিমপে বলে খুব ভোরই হল এসব কাজ করার সময়। সকাল বেলার প্রথম কাজ। তখনই ওগুলো ডাগর হয় কেননা সারারাত ধরে তারা পান করে শিশির।
ইসোলা : আচ্ছা বল তো, তোমার আয়া জানে না এমন কিছু আছে কিনা?
মোর্যুনকে অল্পই তার অজানা।
ইসোলা : আচ্ছা, শামুক শিকার নিয়ে আরো কিছু নিষেধ আছে নাকি তার?
মোর্যুনকে : মধ্যরাত হল শামুক কুড়োনোর সেরা সময়। কেননা তখনই ত বাজারে যাবার সময়।
ইসোলা : সামনের বার তাকে নিয়ে এলেই হবে, আমরা তাহলে দোষের কিছু আর করব না। (ঝোপের মধ্যে খোঁজার আওয়াজ)
মোর্যুনকে : আমার মনে হয় ইসোলা, তোমার একটা লাঠি ব্যবহার করা এখানে ভাল। হাত দিয়ে এভাবে লাঠির কাজ করে ঝোপ ঠ্যাঙানো তোমার উচিত হচ্ছে না। যদি সাপ থাকে ওর মধ্যে?
ইসোলা : সাপ তো থাকতেই পারে।
মোর্যুনকে : তবে? তোমাকে যদি কামড়ায়?
ইসোলা : কামড়াবে না।
মোর্যুনকে : তাই নাকি? তোমার বন্ধু নাকি তারা?
ইসোলা : ঠিক বন্ধু নয়। তবু কামড়াবে না। তারা জানে আমি তাদের কামড়াতে পারি আরো জোরে।
মোর্যুনকে : কিন্তু দাঁতে তো তোমার বিষ নেই। ওদের আছে।
ইসোলা : কেমন করে জানলে? আমারও তো থাকতে পারে বিষদাঁত…জানো না আমি একজন পাদ্রীর সন্তান?
মোর্যুনকে : বেশ তো, তুমি না হয় চৌকস। আমি কিন্তু সাপকে কামড়াতে পারি না। আমাকে যদি কামড়ে দেয়?
ইসোলা : ঠিক আছে, বিমপেই না হয় তোমার হয়ে কামড়ে দেবে।
মোর্যুনকে : আহা-দেখো, বিমপেকে বলে দেব তুমি পছন্দ কর না তাকে।
ইসোলা : তোমার কথা বিশ্বাসই করবে না। (সামান্য বিরতি।)
মোর্যুনকে : ব্যথা পাচ্ছ না তো?
ইসোলা : কি বললে?
মোর্যুনকে : আমার হাত তোমার পিঠে। ব্যথা লাগছে না তো?
ইসোলা : না, কেন? (মোর্যুনকে আঘাত করে তাকে)
মোর্যুনকে : এবার? ব্যথা লাগছে না এখনো?
ইসোলা : কি হল? (মের্যুনকে আঘাত করে তাকে)
মোর্যুনকে : এবার? ব্যথা লাগছে না এখনো?
ইসোলা : কি হল? (মোর্যুনকে আবার আঘাত করে তাকে? আমাকে আঘাত করা থামাও।
মোর্যুনকে : দেখছিলাম তোমার পিঠে ব্যথা লাগে কিনা। উনি কি তোমাকে মারেননি? তোমার বাবা?
ইসোলা : না।
মোর্যুনকে : সত্যি বলছ তো? তোমাকে মেরেছিলেন উনি? বাড়ি ফেরার পর কি ঘটেছিল? তোমার মা কি বলেছিলেন? তুমি কিচ্ছু বলনি আমাকে।
ইসোলা : বেশি কিছু বলার যে ছিলই না। বাড়ি ফিরলাম, আমার দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম। তারপর বাবা যখন বাড়ি ফিরলেন, জানালা দিয়ে পালিয়ে এলাম।
মোর্যুনকে : তোমার ঘর থেকে? কিন্তু সে তো দোতলায়।
ইসোলা : বাবা যে দরজা চেপে বসে রইলেন। পাহারা দিচ্ছিলেন। বাধ্য হয়ে লাফালাম জানালা ভেদ করে।
মোর্যুনকে : মরেও তো যেতে পারতে?
ইসোলা : না, পারতাম না। যাই হোক, লাফিয়ে পালিয়েছি, মরিনি।
মোর্যুনকে : কিন্তু এমনটি আর কক্ষনো কোর না। শপথ কর।
ইসোলা : ঘাবড়িও না। এমন করবার দরকার আমার আর হবে না।
মোর্যুনকে : কিন্তু উনি কি বলবেন যখন দেখবেন তুমি পালিয়েছ?
ইসোলা : মনে হয় আবার শাপমন্যি করবেন আমাকে। আবার শাপমন্যি করবেন, কেননা তাছাড়া তাঁর যে আর কিছু করবার নেই।
মোর্যুনকে : কেন? কেন করবেন? আমার বাবা মা তো শাপ দেননি আমাকে? দিয়েছেন কি? বুঝতে পারছি না। সব্বাই এমন শোরগোল করছে কেন? আর তোমার বাবা। তিনি তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে তোমাকে পিটতে চাইছেন। তোমাকে কি ঘৃণা করেন তিনি?
ইসোলা : (ব্যঙ্গ ভরে) কে জানে? …ছেড়ে দাও এসব। অনেক কুড়িয়েছি। তোমার জন্য একটা চমক জমিয়ে রেখেছি।
মোর্যুনকে : কই দেখি।
ইসোলা : অনুসরণ কর আমাকে।
মোর্যুনকে : খুব দূরে যেতে হবে।
ইসোলা : খানিকটা!
মোর্যুনকে : যদি হারিয়ে যাই আমরা?
ইসোলা : হারাব না। ভাল কথা, বিমপেকে বলো এসবের দাম আরেকটু বেশি করে ধরতে। এখন থেকে আমার টাকার দরকার আরো বেশি হবে। কিছু জিনিস জোগাড় করতে হবে আমাকে।
মোর্যুনকে : ইসোলা, তোমার জন্য কিছু নিতে দেবে না আমাকে? কক্ষনো খুঁজে পাবেন না তাঁরা। আমার বাবা টাকাপয়সা ছড়িয়ে রাখেন যেখানে সেখানে।
ইসোলা : না। বলেছি তো তোমাকে। তোমার বাপ মা’র টাকা আমি চাই না।
মোর্যুনকে : কিন্তু এ টাকা তো আমারো, তাই না? (সামান্য বিরতি) ইসোলা, তুমি আবার রাগ করলে?
ইসোলা : না। তুমি কিন্তু শপথ করেছিলে এসব কথা আর তুলবে না।
মোর্যুনকে : দু:খিত। দোহাই রাগ করো না।
ইসোলা : রাগ করিনি…চিনতে পারছ এ জায়গাটা?
মোর্যুনকে : না, একেবারেই না।
ইসোলা : এখন খুব সাবধান। আমার জামাটা খুব কষে ধরো। পথ এখানে ফুরোল।
মোর্যুনকে : কোথায় যাচ্ছি আমরা?
ইসোলা : গির্জায়। মনে পড়ছে না তোমার? গির্জার কথা!
মোর্যুনকে : গির্জা?
ইসোলা : অনেকদিন আগে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম একবার । বড় পাহাড়ের পাশে জায়গাটা। কতদিন হয়ে গেল…তখন খুব ছোট ছিলাম আমরা। আসলে তুমিই কিন্তু গির্জা নাম দিয়েছিলে ওটার।
মোর্যুনকে : একটা …পাহাড়…ওখানে?
ইসোলা : হ্যাঁ, বাঁশঝাড়ে ভরা।
মোর্যুনকে : ছোট্ট, একটা ঝোরা আছে ওখানে-তাই না?
ইসোলা : ছোট্টটি আর নেই এখন। পরিষ্কার একটা ছোট পুকুর বানিয়েছি আমি নিজে। অবশ্য এখন বলছি না, আগে দেখ।
মোর্যুনকে তুমি ঠিক জান পথ হারাইনি আমরা? কোনো পথের রেখা দেখতে পাচ্ছি না আমি।
ইসোলা : ভুল যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রেখেছি সাবধান। প্রায় এসে গেছি আমরা।
মোর্যুনকে : (উত্তেজিত) ঐ যে পাহাড়টা।
ইসোলা : হ্যাঁ, কিন্তু যেটা দেখাতে চাই তোমাকে …সেটা ওটার ওদিকে। এবার চোখ বন্ধ কর…ঠিক আছে। সব…আমি তোমাকে ধরছি সাবধানে।
মোর্যুনকে : ওহ্…
ইসোলা : ঠিক আছো তুমি। পাহাড়ের দরিপথ ভেদ করে যাচ্ছ তুমি। মনে পড়ছে তোমার?
মোর্যুনকে : মনে পড়ছে। কত ছোট ছিলাম আমরা তখন।
ইসোলা : (হাসছে) এখনো কিন্তু খুব একটা বড় নও তুমি। ভয় পেয়ো না। এমনকি আমিও উঠে যেতে পারি কিছু না ধরেই। ঠিক আছে…না, এখনো হয়নি। একটু দাঁড়াও, আলোটা জ্বালি। (দেশলাই জ্বালার আওয়াজ।) ঠিক আছে, এবার চোখ খুলতে পার।
মোর্যুনকে : ইসোলা…এটা তৈরি করেছ তুমি!
ইসোলা : দেখ…এখানে এসো…ঐ যে তোমার ছোট্ট ঝোরা। মনে পড়ছে এখন? এই যে সেই বাঁশঝাড়…এই যে এদিকে। ওখানেই আমরা পেয়েছিলাম কচ্ছপের ডিম।
মোর্যুনকে : হ্যাঁ, মনে পড়ছে। ফিরে এসে লক্ষ্য করেছিলাম কি করে বাচ্চা বেরোয় ডিম ফুটে।
ইসোলা : দেখ দেখ…তাকিয়ে দেখ…মোযি মোযি…
মোর্যুনকে : মোযি? তোমার মা এখানে নাকি? ইসোলা, ওখানে কিছু একটা আছে… কিছু একটা নড়াচড়া করছে।
ইসোলা : হ্যাঁ একটা কিছু আছে নিশ্চয়ই। ভয় দেখিয়োনা ওকে…ঐ আসছে সে..তোমার এখনো মনে আছে ওকে?
মোর্যুনকে : (উত্তেজিত) তিনি এখনো এখানে? মা…এখনো এখানে…(ক্রমশ আরো উত্তেজিত) ইসোলা, সেই একই মানুষ তাই না? সেই এক মা। বলতে চাও তিনি চলে যাননি কখনো? এই পুরোটা সময়ে?
ইসোলা : তুমি ভয় পাইয়ে দিলে, তাই আবার গর্তে ঢুকে গেলেন উনি।
মোর্যুনকে : দু:খিত, সত্যি দু:খিত। আবার কি উনি বাইরে আসবেন না?
ইসোলা : হয়ত আসবেন আরো পরে। অচেনাদের ভয় পান উনি, আর এতদিনে ভুলে গেছেন তোমাকে। এখন শুধু চেনেন আমাকে। আমার স্বর শুনলেই বেরিয়ে আসেন।
মোর্যুনকে : চেষ্টা করো তাহলে । ডাক তাঁকে, হয়ত এখন আর ভয় পাচ্ছেন না।
ইসোলা : দেখছি চেষ্টা করে। মোযি …মোযি…
মোর্যুনকে : এটাই কি তাঁর নাম?
ইসোলা : ভুলে গেছ তুমি? প্রথম যখন তাঁকে পেয়েছিলাম, এ নামই তো দিয়েছিলাম।
মোর্যুনকে : কিন্তু এ তো তোমার মায়ের নাম।
ইসোলা : মা কিছু মনে করবে না। এতে দুজনকেই মনে পড়ে আমার, দু’জনেই ঝুঁকে পড়েছে ভারে, তাদের বয়স বলতে পারি না আমি।
মোর্যুনকে : মোযি…মোযি…বেরিয়ে এসো বাইরে, আমি এসেছি। বেরিয়ে এসো, দোহাই তোমার।
ইসোলা : কাজ দিচ্ছে না।
মোর্যুনকে : ওহ্ ইসোলা, কেন তুমি আমাকে দেখালে এ জায়গাটা। এখানে আমি বাস করতে চাই। চিরকালের জন্য।
ইসোলা : এমন কাজ এখন তুমি করতে যাচ্ছ না। চলে এসো, আমাদের বাড়ি ফিরে যাবার সময় হয়েছে। শুধু ভাবছি তোমার মা হয়ত এখন তোমাকে খুঁজে মরছেন।
মোর্যুনকে : মরবেন কেন? আমার জন্য তার ভারি ভাবনা।
ইসোলা : কিন্তু এটাও তো ঠিক যে তুমি তাঁর চোখের আড়ালে যাবে না।
মোর্যুনকে : শুতে যাবার আগে আমাকে তালাবন্ধ করে রাখে আমার মা। কাজেই আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাবার কারণ তার নেই। (কুটিরের মধ্যে ঢোকে) ওটা কি?
ইসোলা : কোথায়?
মোর্যুনকে : ঐ যে। বন্দুক নাকি?
ইসোলা : সেই রকমই তো দেখাচ্ছে, নাকি? আমি জানি ওটা পুরোনো আর মরচে ধরা।
মোর্যুনকে : কোথায় পেয়েছ ওটা?
ইসোলা : মোড়ল মশাইয়ের বন্ধুক। শিকারের জন্য এটা আমার দরকার।
মোর্যুনকে : (হেসে) শামুক শিকারের জন্য?
ইসোলা : হতেও পারে। যাই বল, ঝোপের গভীরে গেলে অনেক…অনেক শিকার মেলে। মোড়লমশাই যখন শিকারে যেতেন সঙ্গে যেতাম আমি। বেশির ভাগ সময়েই পাখিশিকার। তিনি মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাণী মারা পছন্দ করতেন না।
মোর্যুনকে : কেন?
ইসোলা : ভয় পেতেন তিনি; ভাবতেন শিকারটা হয়ত রূপ নেবে মানুষের। তরুণ বয়সে তাঁর এক বন্ধু মারা পড়েছিলেন এভাবে। এ নিয়ে বলায় তাঁর ক্ষান্তি ছিল না।
মোর্যুনকে : কোন পশু তুমি মারবে?
ইসোলা : মানে, প্রথমে …ধর না, ছুঁয়ো না ওটাকে! (বন্দুকের গুলি ছোটে। মোর্যুনকের আর্তনাদ)। মোর্যুনকে। মোর্যুনকে। চিৎকার গলে মিশে যায় গানের মধ্যে।
গান: ৩
বেজায় ভারি, বেজায় ভারি এটি তোলার পক্ষে
বেজায় ভারি, বেজায় ভারি এটি তোলার পক্ষে
যদি হত আর একটু হাল্কা, আমি তাহলে বইতাম নিজেই
আর যখন এটা মনে হবে হাল্কা বলে
হাতিটা মরেছিল ঝোপের মধ্যে, পর্বতকে আমরা এনেছিলাম বাড়িতে
বুনো ষাঁড় মরেছিল ঝোপের মধ্যে, পর্বতকে আমরা এনেছিলাম বাড়িতে
ইঁদুরটা মরেছিল বাড়ির মধ্যে, পর্বতকে আমরা
নিয়েছিলাম ঝোপের মধ্যে
চিতাবাঘের চোখ, অন্ধকারে জ্বলে
চিতাবাঘের লেজ আন্দোলিত পাশে
চিতাবাঘের থাবা, দুদিকে ধারালো ক্ষুর
মদ্দা রাঙা আলুর যদি আকাল পড়ে, তাহলে ঝাঁপাতাম নরম ওল
কনে যদি পালায় তাহলে বিয়ে করব আমাদের শালীদের
ব্যাপারটা যদি বিরক্ত কর আমাদের, আমরা নতজানু হয়ে নালিশ জানাব
আর তা যদি না করে, তাহলে চালিয়ে যাব আর্তনাদ…
গালের উপর ক্ষতচিহ্ন যেন জ্বলজ্বল যাত্রাপথ
(গান মিলিয়ে গেলে গির্জার ঘণ্টায় দুটো বাজে। মোযি দোতলায় আসে। যে চেয়ারে এরিনযোবি ঘুমিয়ে পড়েছে তার হাতলে টোকা মারে।)
মোযি : রেভারেন্ড, রেভারেন্ড। বিছানায় আসবে না?
এরিনযোবি : (জাগে, চমকে ওঠে) উ-হুম্? কে? মোযি?
মোযি : অনেক দেরি হয়েছে। বিছানায় আসবে না?
এরিনযোবি : কটা বেজেছে?
মোযি : এইমাত্তর দুটো বাজল।
এরিনযোবি : দুটো? মাঝরাত পেরিয়ে গেছে? বলতে চাও আমাকে এতটা সময় ঘুমিয়ে থাকতে দিয়েছ?
মোযি : তুমি ক্লান্ত ছিলে। ভাবলাম ঘুমোলে তোমার ভালই হবে।
এরিনযোবি : ইসোলা? কোথায় সে? (দরজা খুলতে চেষ্টা করে।) ওহ্হো, মনে হচ্ছে এখনো যেন প্রার্থনা করে যাচ্ছে।
মোযি : জানি না, রেভারেন্ড, শুধু বলছি সকাল হোক। রাগ সত্ত্বেও ঘুমিয়ে পড়েছিলে তুমি। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে ইসোলাও।
এরিনযোবি : ওকে উঠতে হবে। প্রতিজ্ঞা করেছি আমার ছাদের তলায় আর একটি রাতও থাকতে পারবে না সে।
মোযি : দোহাই তোমার রেভারেন্ড, শুধু সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলছি। রাগ সত্ত্বেও ঘুমিয়ে পড়েছিলে তুমি। হয়ত ঈশ্বরের ইচ্ছাই এটা। বিচার যাতে বিলম্বিত হয়। (বিরতি)
এরিনযোবি : ঠিক আছে। তোমার এ কথা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আর একটা রাতও তার সঙ্গে এক ছাদের তলায় কাটাব না আমি।
মোযি : কোথায় যাচ্ছ
এরিনযোবি : গির্জায়। গির্জার ঘরে গিয়ে ঘুমবো। কিন্তু সূর্য ওঠার পরেও যদি বাড়িতে থাকে সে তাহলে তাকে তাড়াব চোরের মতো, ব্যভিচারী বলে।
মোযি : সঙ্গে আমিও আসব কি?
এরিনযোবি : কিসের জন্য?
মোযি : তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তোমার সব কথা মেনে চলব। কিন্তু তার আগে তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারি আমি?
এরিনযোবি : বলার মত কিছু নেই।
মোযি : কিছু সময়ের শান্তি যে আমরা পেয়েছি তার মধ্যে ঈশ্বরের হাত আমি দেখতে পাচ্ছি। যদি আমরা কথা বলতে পারি খানিক.?
এরিনযোবি : এখনো ওর হয়ে ওকালতি চালাবে?
মোযি : না, না। আমি শুধু চাইছি কিছু বোঝাপড়া। ওরা দুটিতে বড় হয়ে উঠেছে একসঙ্গে। ইসোলা আর মোর্যুনকে একই মায়ের সন্তানের মতো বেড়ে উঠেছে।
এরিনযোবি : এর থেকে কি শিক্ষা নিতে পারি আমি?
মোযি : একটু ধৈর্য ধরো রেভারেন্ড। একটু শুধু বোঝাপড়া চাইছি। ওরা একসঙ্গে খেলেছে, ঝগড়া করেছে, মারামারি করেছে। মোর্যুনকে কতবার তোমার কোলের উপর বসে থেকেছে, কত জিনিস কিনেছে তার?
এরিনযোবি : এক বছর আগে, এই বাড়িতে, ওলুমোরিন এসে নালিস জানিয়েছে ইসোলা খুশি মত তাঁর মেয়েকে নিয়ে দূরে দূরে টেনে নিয়ে গেছে। বলেছে, দুজনে নাকি সব সময়েই ঘুরে বেড়ায় গভীর বনের মধ্যে। তার ফলে আসতে পারে পাপের প্ররোচনা।
মোযি : খাঁটি কথা, খুব খাঁটি কথা, কিন্তু…
এরিনযোবি : আমি ওকে ধমকে দিইনি, সাবধান করে দিইনি? বলিনি ওর এই বাউণ্ডুলেপনা অন্যের ঘরে গিয়ে না ঢোকে? আমাকে না লজ্জায় ফেলে?
মোযি : হক কথা, কিন্তু বাচ্চাদের বন্ধুত্ব কেউ কি থামাতে পারে শুধু হুকুম করে?
এরিনযোবি : বাচ্চা? ওকে বাচ্চা বল তুমি? বাচ্চা, অথচ যৌনপাপের অপরাধী? কতবার ধমক দিয়েছি? কঠোরভাবে? ঠ্যাঙাতে ছাড়িনি কখনো। তারপরেও যখন এসব ভয়ংকর গুজব আমার কানে এসেছে, তাকে ডেকেছি, জিজ্ঞেস করেছি তাকে সতর্ক করার কথা মনে আছে কিনা। তার কাছ থেকে কথা আদায় করেছি যাতে ওলুমোরিনের মেয়ের সঙ্গে কখনো সে দেখা না করে। আমাকে কথা দিয়েছে আর ভেঙেছে। এধরনের অপরাধ…আমারই বাড়িতে, আমার নিজেরই বাড়ির মধ্যে।
মোযি : আমরা ওকে উদ্ধার করব, তাড়িয়ে দেব না লজ্জার মধ্যে।
এরিনযোবি : আমার বাড়ির মধ্যে আমি এমন কিছু হতে দিতে পারি না যা আমি অন্যকে না করার উপদেশ দিয়ে থাকি। এখন কি তবে আমি পিছিয়ে আসব যখন আমার বাড়ির একজন, তাই বা কেন, আমায় রক্তেরই একজন ঈশ্বরের বিধানকে লঙ্ঘন করেছে? তুমি কি চাও আমার মাথা নত হয়ে পড়–ক দ্বিগুণ ভাবে? (মোযি নীরব) শান্ত হও, নারী। শক্তি যখন কমে আসে, ঈশ্বরই তখন যোগান শক্তি। (তিনি সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকেন। সামনের দরজায় সহসা আঘাত। এরিনযোবি থামেন।) রাতের এসময়? কি হল? আবার কোন কৌতুক শুরু হল আমার জীবনে? (আবার ধাক্কা, আরো মরিয়া বিরতি: দৃশ্যান্তর :)
ইসোলা : খুব শস্তায় পেলে শিক্ষাটা । জানো না বন্দুক নিয়ে এমনটা কক্ষনো করতে নেই?
মোর্যুনকে : বুঝতে পারিনি ভেতরে গুলি ভরা আছে।
ইসোলা : সব সময়েই কিছু বোঝো না। তুমি কি ভাবছ তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি শুধু এভাবে মরবে বলে? খুব বেঁচে গেছ, অবশ্য আমার একটা মাত্র গুলি তাও খরচ করে ফেললে।
মোর্যুনকে : গুলি ভরে রাখা উচিত হয়নি তোমার।
ইসোলা : ভরে রাখতেই হয়। ঝোরাটার ওপারেই দানবের মত একটা সাপ বসবাস করে…ঐ ওখানে…ঐ বাঁশঝাড়ের ভেতর। মনে হয় একটা অজগর। সত্যি বিশাল বড়। যাকগে আমাকে মারতেই হবে ওটাকে। ওটাকে না মারলে এখানে বাস করা আমার পক্ষে সম্ভবই হবে না।
মোর্যুনকে : এখানেই বাস করবে নাকি তুমি?
ইসোলা : আমি এখানেই বাস করি। এটাই আমার বাড়ি।
মোর্যুনকে : এখানেই ঘুমোবে, একেবারে একা?
ইসোলা : এর আগেও এখানে বাস করেছি আমি, মাঝে মাঝেই, বাবা যখন বেরিয়ে গেছেন যজনের কাজে দূরের কোনো গির্জায়। একবার প্রায় এক সপ্তাহের মত বাইরে ছিলেন তিনি, আর আমি পুরো সময়টা কাটিয়েছিলাম এখানে। শুধু একথা ভেবে যে এরিনযোবি অসুখী রাখেন আমাকে।
মোর্যুনকে : তোমার বাবা? তাঁর ভাবনা কি তুমি একবারও থামাতে পার না?
ইসোলা : ওহ্, বাবার কথা বলিনি। অজগরটার কথা বলছিলাম। আমি ওটাকে ডাকি এরিনযোবি বলে।
মোর্যুনকে : ইসোলা, তুমি কি একটা দুর্বৃত্ত সন্তান হতে চাও।
ইসোলা : না, কিন্তু সাপটা যে দুর্বৃত্ত। কচ্ছপের ডিমগুলোর কথা মনে পড়ে? মোযি ওগুলো ফুটিয়ে সব বাচ্চা বার করত, বাচ্চাগুলো কখনো সখনো সাঁতরে চলে যেত ঝোরার ওপারে। সাপটা গিলতে পারত না ওদের, তাই সে ওগুলোকে মুখে তুলে নিয়ে পাথরে আছড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলত।
মোর্যুনকে : ওটা কি সাঁতরে চলে আসতে পারে এপারে।
ইসোলা : ঠিক জানি না। যদ্দুর দেখি বাঁশঝাড় ছেড়ে কক্ষনো বেরোয় না ওটা। তাই বন্দুকে গুলি ভরা থাকলে মনে স্বস্তি পাই।
মোর্যুনকে : ঠিক আছে, কাল কিছু বারুদ এনে দেব তোমাকে।
ইসোলা : না, বরং বিমপেকে বলো আনতে। বিমপে যে বাজারে শামুক বিক্রি করে সেখানেই পাওয়া যায় বারুদ। ওটাকে মরতেই হবে, সাপটাকে।
মোর্যুনকে : তোমার সঙ্গে আমি এখানেই থাকব, এখানেই বাস করব।
ইসোলা : না, তোমার ভালো লাগবে না। তবে যখনই তোমাকে অসুখী করে তুলবে তারা, চলে আসবে এখানে।
মোর্যুনকে : তুমি কি অসুখী?
ইসোলা : চল, এখন যাই। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকলে ভোর হয়ে যাবে। তাছাড়া আজ রাতে এখানে আমি থাকছিও না- গুলিভরা বন্দুক ছাড়া থাকা যাবেও না। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসব, তারপর চলে যাব। গির্জার চত্বরে গিয়ে ঘুমোব।
মোর্যুনকে : না, তুমি শপথ করেছিলে। শপথ করেছিলে কবরের চাতালের মধ্যখানে তুমি ঘুমোবে না। ভূতের ভয়ও কি নেই তোমার?
ইসোলা : আরে, ভূতেরা খুব ব্যস্ত মানুষ, আমার মত। আমরা কেউ কারুকে বিরক্ত করি না।
মোর্যুনকে : না, তুমি যাবে না ওখানে। যাকগে, আমি এখানেই থাকছি। একটা রাত আমাকে থাকতেই হবে। আসলে আমরা দুজনেই তো আবিষ্কার করেছিলাম জায়গাটা।
ইসোলা : না, আমরা দুজনে নয়। আমি তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম। যাকগে, সে তো অনেক দিন আগের কথা। আমরা তখন বাচ্চা ছিলাম। এই তো খানিক আগেই জায়গাটা মনেই করতে পারছিলে না তুমি। (বিরতি)
মোর্যুনকে : বিমপে বলে আমাদের দুজনের বিয়ে করে ফেলা উচিত। তোমার কি মনে হয় ঠিক বলেছে সে?
ইসোলা : কত বয়স তোমার?
মোর্যুনকে : তোমারই সমান। প্রায় পনের।
ইসোলা : যা, আমার বয়স ষোল বছর দুমাস। তা, তোমার কি মত? বিয়ে করতে চাও আমাকে?
মোর্যুনকে : এ নিয়ে ভাবিনি। তোমার কি মনে হয় আমাদের করা উচিত?
ইসোলা : আমার সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছ বলে তুমি কি অসুখী?
মোর্যুনকে : না। আসলে এটা সকলকেই ঝাঁকিয়ে দিয়ে। আর সেজন্যে তোমার বাবাও তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছেন।
ইসোলা : তুমি কি অসুখী?
মোর্যুনকে : না। না, আমি অসুখী নই। কিন্তু আমি ঘাবড়ে গেছি খানিক। আজ বিকেলে মা এ ব্যাপারে কিছু বলার আগে আমার ধারণাই ছিল না কোনো। মা আমাকে এক ঝুড়ি প্রশ্ন করার আগে আমি কিছু বুঝতেই পারিনি। তারপর আজ বিকেলে মা আবার আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার কথা।
ইসোলা : তুমি বললে নাকি যে তুমি কোনো অন্যায় করেছ?
মোর্যুনকে : না। কিন্তু তিনি তোমাকে গাল পাড়তে লাগলেন। বাবাও ভয় দেখিয়ে বললেন তোমাকে জেলে পাঠাবেন তিনি। তারপর ডেকে পাঠালেন তোমার বাবাকে। তিনি বললেন তোমাদের পরিবারকে তিনি আদালতে পাঠাবেন।
ইসোলা : তোমার বাবা প্রভাবশালী মানুষ। অনেক বন্ধু তাঁর।
মোর্যুনকে : ভয় পাচ্ছ নাকি তাঁকে?
ইসোলা : ভয়? তোমার কি মনে হচ্ছে তাঁকে আমার ভয় পাওয়া উচিত? আসলে মোড়ল মশাই-ই শক্তি জোগাচ্ছেন আমার।
মোর্যুনকে : তোমার বাবা বল, ইসোলা, তোমার বাবা।
ইসোলা : মোড়লমশাই।
মোর্যুনকে : তাঁকেই তোমার বাবা বল। যখন তুমি কঠোর হও তোমাকে ভয় লাগে আমার…এত একগুঁয়ে কেন তুমি? ইসোলা…দোহাই তোমার…এমন করো না…আমার দিকে তাকিও না ওভাবে।
ইসোলা : (স্বল্প নীরবতা) এদিকটায় এসো, মোর্যুনকে, এখানে দাঁড়াও…এখানে এ আলোর নিচে।
মোর্যুনকে : কেন? আমার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছো কেন?
ইসোলা : তোমাকে ঠিক অন্যরকম লাগছে? তুমি এখন পরিপূর্ণ নারী, এটা অনুভব করতে পারছ কি তুমি?
মোর্যুনকে : জানি না।
ইসোলা : কাছে এসো…শুনতে দাও আমাকে। এখানেই ত থাকার কথা বাচ্চাটার। (বিরতি) কেন আওয়াজ নেই।
মোর্যুনকে : আমার মা-ও শুনতে চেষ্টা করেছিলেন।
ইসোলা : (ক্ষিপ্ত) আর কখনো তাঁকে করতে দেবে না এমনটা।
মোর্যুনকে : কি হল, ইসোলা, কি ব্যাপার?
ইসোলা : দু:খিত কিছু মনে করো না। কিছু নয় এটা …তুমি বলছ তুমি থাকবে এখানে?
মোর্যুনকে : আজ রাতে আমি যাচ্ছি না। এ জায়গা ছাড়ার মত শক্তি আমার নেই। তোমার সঙ্গে থাকতেই হবে আমাকে।
ইসোলা : এটা আমার বাচ্চা। তুমি নিজেই যে এখনো বাচ্চা, তা জানো তুমি? (বিরতি)
মোর্যুনকে : ইসোলা।
ইসোলা : বল।
মোর্যুনকে : শহরের সব্বাই তোমার মিথ্যে রটাচ্ছে। বিমপেতো আমাকে বলছিল। তারা বলাবলি করছে-। তুমি নাকি ঠেঙিয়েছ তোমার বাবাকে। সারা শহরের লোক তোমাকে সমোলোচনা করছে।
ইসোলা : সত্যি কি তাকে আমি ঠেঙিয়েছি?
মোর্যুনকে : জানি না।
ইসোলা : কিন্তু তুমি তো ছিলে ওখানে; ছিলে না?
মোর্যুনকে : আমি তো পালিয়ে গিয়েছিলাম। তোমার বাবাকে আমি ভয় পেয়েছিলাম ইসোলা। কী ভয়ংকর তিনি। তিনি যখন তুলে নিলেন লাঠিটা, আমি পালিয়ে গেলাম। ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। পালিয়ে গিয়েছিলাম বিমপের কাছে।
ইসোলা : পালিয়ে গিয়েছিলাম আমিও। শুধু মনে আছে আমাকে মারবার জন্য লাঠিটা তুলতেই আমি তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেললাম সেটা। তিনি কাড়াকাড়ি করছিলেন। তারপর চলে গেলাম বাড়ি। যারা জমা হয়েছিল সেই ভিড়ের কথা মনে আছে আমার। আমি যেন কুষ্ঠ রোগী, সেভাবেই পথ করে দিয়েছিল আমার। কুঁকড়ে পালিয়ে গিয়েছিল তারা। তখনই হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলাম একঘরে হলে কেমন লাগে। আমি বাড়ি পৌঁছোনোর আগেই মা কেমন করে যেন জানতে পেরেছিলেন সব। ছান্নর মত চ্যাঁচাচ্ছিলেন তিনি, বুক চাপড়াচ্ছিলেন যেন পুরো পরিবারের উপর নেমে এসেছে একটা বিপর্যয়। বাচ্চারা সব জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়েছিল এক জায়গায়। পরস্পরকে আঁকড়ে ছিল তারা প্রচণ্ড ভয়ে। (নীরবতা)
মোর্যুনকে : রাতে কি ঠাণ্ডা পড়ে এখানে?
ইসোলা : পড়ে। তবে চাদর আছে আমার। তুমি ওটা নিতে পার। চলে এসো, এবার ঘুমোতে দাও। ক্ষিদে পেয়েছে তোমার? খাবারও আছে।
মোর্যুনকে : খাবারের দরকার নেই। তবে ঘুম পেয়েছে। এসো, দুজনে মিলে প্রার্থনা করি আমরা।
ইসোলা : তার মানে?
মোর্যুনকে : একসঙ্গে প্রার্থনা করি।
ইসোলা : হ্যাঁ, তাই তো বললে শুনলাম।
মোর্যুনকে : ঠিক আছে, আর দাঁড়িয়ে থেকো না ওখানে। আমার পাশে এসে নতজানু হয়ে বসো।
ইসোলা : না। ইচ্ছে হলে তুমি করতে পার নিজের মত।
মোর্যুনকে : কি হল? বাড়িতে কি তোমরা সবাই মিলে একসঙ্গে প্রার্থনা কর না?
ইসোলা : করি বৈকি।
মোর্যুনকে : তাহলে কি প্রার্থনা করতে চাইছ না আমার সঙ্গে?
ইসোলা : (দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ে।) আমার ঘুম পেয়েছে। খুব শিগগিরই, বুঝতে পারবে তুমি।
মোর্যুনকে : কি বুঝতে পারব?
ইসোলা : এছাড়া আমি কিছুই করি না। সারা জীবনটাই একটা দীর্ঘ প্রার্থনা, কিন্তু কার কাছে জানি না সঠিক।
মোর্যুনকে : তোমাকে বুঝতে পারি না আমি।
ইসোলা : না, তোমাকে বুঝতে হবে না। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় তোমাকে থাকতে বলি তুমি থাকবে?
মোর্যুনকে : যদি থাকতে দাও আমাকে…? কেন? আমাকে কি ফিরিয়ে দেবে?
ইসোলা : সেটা নির্ভর করছে তোমার উপর।
মোর্যুনকে : এভাবে যদি বলে চল আমি কিন্তু ভয় পাব তোমাকে।
ইসোলা : আমি ভাবলাম তুমি প্রার্থনা শুরু করতে যাচ্ছ।
মোর্যুনকে : না করব না। একা আমি প্রার্থনা করব না…ইসোলা।
ইসোলা : আবার কি হল?
মোর্যুনকে : আগেও জিজ্ঞেস করেছিলাম, উত্তর দিতে রাজি হওনি। তুমি অসুখী?
ইসোলা : না। অসুখী নই। কিন্তু আামার ইচ্ছে করে আমি যেন বিষণœ না হই। নাও, এবার ঘুমোতে যাও। (এরিনযোবির বাড়ি। প্রচণ্ড ধাক্কার আওয়াজ।)
এরিনযোবি : আহ্ থামুন না। আপনি যেই হোন না, পুরো বাড়িটাকে যে ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন। আসছি রে বাপু, আসছি (দরজা খোলেন) মিস্টার ওলুমোরিন! আরে মিসেসকেও দেখছি যে! কি ব্যাপার? আপনারা এখানে?
ওলুমোরিন : আপনার ছেলে কোথায়? আমার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না।
মিসেস ওলুমোরিন: (আর্তনাদ করে) সামনে আনুন ছেলেকে, এক্ষুনি। সব নষ্টের গোড়া সে-ই। আমার মেয়েকে কি করেছে সে?
এরিনযোবি : আমার ছেলে? সে তো বাড়ি ছেড়ে বেরোয়নি তারপর-।
মিসেস : আপনি নিজেও জড়িয়ে আছেন তার সঙ্গে, তাই না? আপনি রক্ষা করছেন তাকে। আপনার ছেলের জেলে যাওয়া আটকাতে পারবে না আর কেউ এখন।
এরিনযোবি : আমি ত্যাজ্য করেছি ওকে।
ওলুমোরিন : সেটা প্রকাশ্যে। গোপনে অন্য ব্যাপার। আমার চোখে ধুলো দিতে পারবেন না আপনি। পাদ্রীসাহেব, বহুবার বলেছি আপনার ছেলে যেন আমার মেয়ের কাছে না ঘেঁষে। তবু মেয়েটাকে আমার ফুঁসলেছে ছোঁড়া, তার পেট বানিয়ে দিয়েছে। এখন তাকে নিয়ে ভেগে পড়েছে আপনার ছেলে আর আপনি বলছেন কিচ্ছু জানেন না আপনি।
এরিনযোবি : ঈশ্বরের সামনে শপথ করে বলতে পারি এসব কাণ্ডই বাবা হিসেবে সুখকর নয় আমার কাছে। ইসোলা আমার নামের উপর লজ্জা আর অসম্মান ছাড়া কিছুই আনেনি।
মিসেস : সময় নষ্ট করছি আমরা হয়ত দুটোতেই এখানে রয়েছে আর আপনি ওদের সময় দিচ্ছেন লুকোবার পাদ্রীসাহেব, আপনার ছেলেকে ডাকুন। তাকে ডেকে পাঠাচ্ছেন না কেন? ডাকুন তাকে। ডেকে বলুন আমার মেয়েকে যেন ফেরত দেয়, আদালতে যাবার আগে।
এরিনযোবি : আসুন আমার সঙ্গে, নিজেরাই দেখুন খুঁজে। ঈশ্বর আমার সাক্ষী। আমি তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার হুকুম দিয়েছি…অস্বীকার করেছি তাকে, আমার ছেলে বলে…শয়তানের এ সন্তানটির জন্য সারাটা জীবন আমার টকে গেল…কিন্তু এ ছাড়া আর কিই বা করতে পারি আমি? (সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে তারা।)
মিসেস : সব কেত্তনই শোনা হয়ে গেছে আমার। এখন শুধু চাই মোর্যুনকেকে ফেরত। মেয়েটা আমার কি দোষ করল যে আপনার বদমাস ছেলেটার খপ্পরে পড়ল? সারাটা জীবনে মোর্যুনকে অবাধ্য হয়নি আমার…তার বাপমায়ের কাছে কক্ষনো পাপ করেনি যতক্ষণে না আপনার ছেলে এসে নষ্ট করেছে তাকে। আর এখন মেয়েটাকে আমার ভাগিয়ে নিয়ে গেছে…আপনার ছেলের আমরা কি করেছি যে সে আমাদের মেয়েটাকে ছাড়ল না? তার পছন্দসই মেয়ে তো অনেক ছিল, তার এই কি লুচ্চামির সঙ্গী হবার যোগ্য, কিন্তু আমাদের মেয়েটাকে কেন সে…(দোতলায় চাতালে পা দেন।)
এরিনযোবি : এই আমার চেয়ার। এ চেয়ারে বসেই অপেক্ষা করছিলাম কখন সে বেরিয়ে আসে তার ঘর থেকে যাতে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারি চিরকালের মতো। কথাটা যে মিথ্যে নয় আমার স্ত্রীও তার সাক্ষী দেবেন। খানিক আগে তিনি আমাকে জাগিয়ে দিয়েছেন। পাহারায় আমি ঢিলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। (দরজায় ধাক্কা দেয়।) কথা দিতে পারি আপনাদের মেয়ে এখানে ছিল না কখনো। (আবার ধাক্কা দেয়, আরো জোরে।) দরজা খোল, ইসোলা। দরজা খোল, নইলে লোক ডাকিয়ে দরজা ভাঙাব। (আবার ধাক্কা দেয়।) ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি আমি। তোর কপালে খারাপ কিছু ঘটার আগে খুলে দে দরজাটা। (নীরবতা)
মোযি : ইসোলা, আর কতক্ষণ মিনতি করব তোর কাছে? দরজা খুলে দে। (উদ্বিগ্ন স্বরে।) রেভারেন্ড, একথা বলা আমার ঠিক নয়…কোনো খারাপ চিন্তা মনে ঢুকতে দিতে নেই আমি জানি, কিন্তু রেভারেন্ড (ক্রমশ আরো উদ্বিগ্ন) ইসোলা একটু বিগড়ে যাওয়া ছেলে, কিন্তু ছ’ঘণ্টারও বেশি হয়ে গেল দরজায় তালা এঁটে বসে আছে। একটু শব্দও শোনা যাচ্ছে না।
এরিনযোবি : বাজে কথা। যখন এলাম তখনো তার আওয়াজ শুনেছি। (প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে) ইসোলা, দরজা খোল। খোল দরজাটা। কারুকে ঠকাতে পারবি না।
মোযি : রেভারেন্ড, আমরা ওকে মেরে ফেলিনি তো? আমরা হয়ত ওকে মরার দিকে ঠেলে দিয়েছি।
এরিনযোবি : (ক্ষিপ্ত) চুপ, একদম চুপ। তোমার ছেলে এমন নয় যে নিজের ক্ষতি করবে।
মিসেস : ভেঙে ফেলুন দরজা। আমি জানতে চাই কোথায় আমার মেয়ে। ওহ্, মোর্যুনকে মোর্যুনকে…(দুহাত দিয়েই ধাক্কা মারতে থাকে দরজায়।)
খুনি কোথাকার, শিগগির দরজা খোল। যে অসভ্যতা তুই করেছিস তাতে তোর উপর ঈশ্বরের অভিশাপ নেমে আসার আগেই আমার মোর্যুনকেকে ফিরিয়ে দে আমার কাছে। খোল দরজা, বলছি তোকে, দরজা খোল। মোর্যুনকে।! মোর্যুনকে! যদি ভেতরে থেকে থাকিস বেরিয়ে আয় মায়ের কাছে।
ওলুমোরিন : সোনা আমার…নিজেকে সংযত কর…দোহাই তোমার, শান্ত হও। আমরা তাকে পাবই। আমরা মেয়েটাকে পাবই, তারপর ছেলেটার হাত থেকে এ শহরকে বাঁচাব বরাবরের মত। রেভারেন্ড, এখানে অপেক্ষা করছেন কেন? দরজাটা আমাদের ভেঙে ফেলতে হবে। আপনার ছেলে যদি বেরিয়ে না আসে ভাঙতেই হবে দরজা। আপনি না ভাঙলে কাজটা করতে হবে আমাকেই।
এরিনযোবি : না, আমি নিজেই ভাঙব। এবাড়ি এখানো আমার; মিস্টার ওলুমোরিন। মোযি, চেষ্টা করে দেখবে নাকি আরেকবার?
মোযি : (নি:শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে) আমি আর কিচ্ছু পারছি না। ছেলে আর আমাকে চিনছেই না।
এরিনযোবি : তাহলে এভাবেই হোক। ওই ডাণ্ডাটা দাও আমাকে। (শাবলের আঘাতের শব্দ। তারপর কাঠ ভাঙ্গার আওয়াজ।) দেখি কোথায়…? একি, কেউ নেই!
ওলুমোরিন : পালিয়েছে নাকি?
মোযি : কোথায় পালাবে? নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করেছে। ইসোলা! ইসোলা।
এরিনযোবি : ঐ যে জানালাটা …দেখছি খোলা!
মোযি : আমরা ওকে মেরে ফেলেছি। ইসোলা, বাপ আমার…
এরিনযোবি : ঈশ্বরের দোহাই নিজের আত্মাকে যেন এতটা নষ্ট সে না করে। (দ্রুত বেরিয়ে যান ঘর থেকে) না, নিচেও নেই দেখছি।
ওলুমোরিন : নিচে নেই অবশ্যই। মাটিতে দেখা যাচ্ছে না কারুকেই। তার মানে পালিয়ে গেছে। আর পালাতে সাহায্য করেছেন আপনারাই।
মিসেস : মোর্যুনকে..আহ্, কি করেছে আমার মেয়েটিকে নিয়ে রেভারেন্ড, অন্তত এটুকু বলুন আমার মেয়েটাকে নিয়ে কী করেছে সে। কোথায় নিয়ে পালিয়েছে? মোর্যুনকে …মোর্যুনকে…(ফোঁপায়)
এরিনযোবি : কিছুই বুঝতে পারছি না। নিশ্চয়ই পালিয়েছে যখন ঘুমোচ্ছিলাম।
ওলুমোরিন : আর কিছু বলার নেই আপনার। আমার লোকজনদের গিয়ে আমি খেপিয়ে তুলছি, শহর ছেড়ে পালিয়ে যাবার আগেই ধরতে হবে তাকে। তারপর ফয়সালা হবে আইনের কাছে-অবশ্য আমার জ্ঞাতিরা তার উপর রাগ ঝাড়বার পর। এ শহরের কেউ পছন্দ করে না তাকে, তারা একবার তাকে ধরতে পারলে তারপর ঈশ্বরের দয়া-।
মোযি : কি করবেন আপনারা? পশুকে শিকার করবার মতো ছুটে যাবেন আপনারা? আমার ছেলে কখন কি করেছে আপনাদের? বলছেন, আপনাদের মেয়েকে চুরি করেছে সে। আমি বলছি, গোল্লায় পাঠিয়েছে তাকে!
ওলুমোরিন : কি বললেন? ঠিক এটাই ভেবেছিলাম যে আপনারা দুজনেই ওকে আড়াল করবেন । অথচ আজ বিকালেই ও ঠেঙিয়েছে নিজের বাবাকে। আপনার হাত থেকেই লাঠি ছিনিয়ে নিয়েই আপনাকে আঘাত করেছে।
এরিনযোবি : একথা যারা বলছে তারা পাপ করছে ওর বিরুদ্ধে..অবশ্য তার বিদ্রোহ ঈশ্বরের চোখে আমাকে আঘাত করারই সমান।
মোযি : সে করেনি, রেভারেন্ড, করেনি সে। সবাই মিলে তার পেছনে লেগেছে কেন?
এরিনযোবি : শান্ত হও মোযি!
মোযি : ছেলেটা শুধু ভুল করেছে, সবাই তাকে দানব বানাতে চাইছে কেন?
মিসেস : ভুল করেছে? কচি খোকা! আমার মেয়েটাকে প্রথমে নষ্ট করেছে, তারপর পালিয়েছে-নাকি?
মোযি : মিসেস ওলুমোরিন, আপনি তো আছেন এখানে, আপনার জ্ঞাতি গোষ্ঠীদের বলছেন না কেন তারা মিছে কথা বলছে? আপনারা জানেন আমার ছেলে নিজেকে নষ্ট করবে না এভাবে..নিজের আত্মাকে ধ্বংস করবে না কক্ষনো।
এরিনযোবি : ধ্বংস করেছে। সে কি যৌন পাপ করেনি?
মোযি : একটা শিশুর ভুল। কিন্তু সে কখনো মারেনি তার বাবাকে না, তাকে অভিশাপ দেবার দরকার নেই, তার দরকার শোধন।
এরিনযোবি : অনেক হয়েছে। ঈশ্বরের হাতেই তাকে ছেড়ে দিয়েছি আমি। গির্জায় যাচ্ছি প্রার্থনা করবার জন্য। হায়, অভিশপ্ত সেই দিন যখন এ শিশুকে গ্রহণ করেছিলাম আমার সন্তান বলে। (সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার পায়ের শব্দ। দরজা বন্ধ হবার আওয়াজ।)
ওলুমোরিন : চলো যাই। গিয়ে আমাদের লোকজনদের খেপিয়ে তুলি।
মোযি : আমার ছেলেকে যদি মারেন…যদি মারেন আমার ছেলেকে তবে প্রভু আপনাদের বিচার করবেন!
মিসেস : ও একটা বাচ্চাচোর। ছেলেধরা । আমার মেয়েকে যে কী করেছে!
মোযি : বলে দিচ্ছি, আমার ছেলেকে যেন আঘাত না করেন। ঈশ্বরের দোহাই, আমার ছেলেকে ছোঁবেন না…আহত করবেন না তাকে। তার কেশস্পর্শ করলেই স্বর্গ বিচার করবে আপনাদের। স্বর্গ বিচার করুন…যদি পাশে দাঁড়িয়েও তাকে মারধোর করতে দেখেন..স্বর্গ বিচার করুন আপনাদের -(কান্নায় ভেঙে পড়ে।)
গান : ৪
তুললাম আমি ‘গ্বেগবে’ পাতা
নইলে ভুলে যেতাম আমি
তুললাম আমি ‘তেতে’ পাতা
নইলে চাপা পড়তাম নিচে
দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, যাক আমাদের ভালোয় রেখে
চোখগুলো হোক আলোময়, তারা ভোলে না ঘর
এভাবেই চলে যায় এটা…এভাবে হোক শুভ বিদায়
এভাবেই চলে যায় এটা…এভাবে হোক শুভ বিদায়
(দৃশ্যান্তর)
মোযি : (অভিযোগের স্বরে) ইসোলা!
ইসোলা : (একটু যেন ছোট ইসোলা) মা?
মোযি : তুই আবার ঐ গানটা গাইছিস?
ইসোলা : মা?
মোযি : হ্যাঁ, ঠিক এইরকম। তার ব্যবহারটা এমনই। হঠাৎ যেন নিজেকে কালা হিসেবে দেখিস। আর তখন শুধু ‘মা’? বলছিলাম আবার তুই ঐ গানটা গাইছিস?
ইসোলা : কোন গানটা মা?
মোযি : কোন গান? কোন গানের কথা বলছি বেশ ভালোই জানিস, তোর বাবা যেটা গাইতে বারণ করে দিয়েছেন। গানটা এভাবে গাইবার জন্য কতবার তিনি শাস্তি দিয়েছেন তোকে?
ইসোলা : কিন্তু মা, বাবা তো এখন এখানে নেই।
মোযি : এটা তো আরো খারাপ। তোর বাপ দূরে থাকলে তুই যদি তাঁকে অমান্য করিস তাহলে তো তুই বেশ মন্দ ছেলে। হঠাৎ যদি ফিরে আসেন তাহলে কি হবে? এভাবে কথা বলতে লজ্জা করে না তোর?
ইসোলা : মাগো, বাবাকে আমি অমান্য করিনি গো। তিনি বলেছেন এ গানটা তিনি আর কখনো শুনতে চান না। তাই তিনি বাড়িতে থাকলে কখনো তো গাই না গানটা।
মোযি : ইসোলা! এটাই তো মন্দ ছেলের কথা । এভাবে তোকে কথা বলতে যেন আর কখনো না শুনি। শুনতে পাচ্ছিস?
ইসোলা : ঠিক আছে, মা।
মোযি : আচ্ছা ইসোলা, তোর বাবাকে কেন সব সময়েই অসন্তুষ্ট করিস? তোর উপর তিনি রেগে থাকলে আমার কত কষ্ট হয়-তুই কি দেখতে পাস না? তোকে শাস্তি দিলে? কিন্তু তাঁরও ত তোর উপর শক্ত হওয়া দরকারতুই তাঁর প্রথম সন্তান। এ কথাটা মনে রাখিস কখনো? প্রথম সন্তান। তুই পরিবারের বড়। বাবার আদলে যদি গড়ে তুলিস নিজেকে, তাহলে তোকে যারা অনুসরণ করবে তাকিয়ে থাকবে তোর দিকেই।
ইসোলা : মা-।
মোযি : তুই কি তাঁর হতাশার কারণ হতে চাস? তুই, তাঁর প্রথম সন্তান?
ইসোলা : আমি শিগগিরই ফিরে আসছি মা, আমাকে এখন একজায়গায় যেতে হবে।
মোযি : দাঁড়া। যখনই তোকে কিছু বলতে চাই অমনি পালিয়ে যেতে চেষ্টা করিস।
ইসোলা : আমাকে যেতেই হবে। গির্জার ঐকতান গানের রেয়াজে যোগ দিতে অনেকটাই দেরি করে ফেলেছি।
মোযি : গির্জার ঐকতান? বলিসনি তো কখনো তুই যোগ দিয়েছিস তাতে! কবে থেকে? তোর বাবা জানেন তো?
ইসোলা : না। বাবাকে বলব কি?
মোযি : ‘বলব কি’ মানে? কী বিদঘুটে ছেলে রে বাবা তুই? কত মাস ধরে তোর বাবা তোকে গির্জার ঐকতানে যোগ দিতে বলছেন- আর এখন তাঁর কথা মানতে রাজি হয়েছিস অথচ কিচ্ছু বলিসনি তাঁকে? তাঁকে খুশি করবার জন্য কাজটা করলি অথচ বললি না!! ওহ্, তুই তাঁকে অবাক করে দিতে চাস?
ইসোলা : কিন্তু এটা যে বাবার ঐকতান দল নয়।
মোযি : আবার একটা নতুন ছুঁতো খুঁজে বার করছিস। এসব শুনতে চাই না আমি। খালি ছুঁতো, খালি ছুঁতো। যা ভাগ। জলদি যা, নইলে দেরি হয়ে যাবে।
ইসোলা : মা, আমি গির্জায় যাচ্ছি না। আমাকে ভুল বুঝো না।
মোযি : প্রথমে বললি, যাচ্ছিস-আবার বলছিস, যাচ্ছিস না। এবার সুবোধ ছেলের মত জলদি যা তো। এ রোববারে তোকে হয়ত ঐকতান দলের সঙ্গে তাঁরা গাইতেও দিতে পারেন। এটা তোর বাবাকে কত খুশি করবে! এর ফলে হয়ত তোর ঐ পছন্দসই পৌত্তলিক গান গাওয়া বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
ইসোলা : মাগো, দুজনের কিন্তু একই ঐকতান গানের কথা ভাবছি না আমরা। আমরা এটাকে ঐকতান গান বলি শুধু মজা করে।
মোযি : ছোকরা কিসের কথা বলছে? (ইসোলা ‘এগুনগুন’ গোল শুরু করে।)
ইসোলা : থামা এ গোল। নাচও থামা। এদিকে আয়, বল কি বলতে চাইছিস? (একই ধরণের গোল, গায় ‘এগুনগুন’ গান।) ইসোলা, আয় এখানে এক্ষুনি। আহ্, ক্ষুদে শয়তান…একবার যদি ধরতে পারি তোকে…ওহ্, তুই কি চাস আমি আছাড় খাই…দাঁড়া না একবার যদি তোকে ধরি…
ইসোলা : (হাসছে, একই ধরণের ‘এগুনগুন’ স্বরে।) আইয়া মোড়লমশাই …মিসেস এরিনযোবি, ও মিসেস এরিনযোবি…ও মি ফ্’ওমোলোক্ষে লে…[মিসেস এরিনযোবি, মোড়ল মশাইয়ের বউ, তুমি ছেড়ে দেবে কি এ বেচারী বালকটিকে?]
মোযি : (ভীত চকিত ফিসফিসে স্বরে।) তুই দুষ্টু ছেলে, আমি যা ভাবছি তাই যদি হয়…
ইসোলা : চলি মা। মোড়লমশাইকে বলো আমি চলে গেছি ঐকতান গানের রেয়াজে…
মোযি : আর শয়তান ছেলে, আরো ভালো কিছু খেলা খুঁজে পাস না তুই?…কি? আয় এদিকে, ইসোলা। তোকে আমি পই পই করে বলিনি যাতে তোর বাবাকে তুই মোড়লমশাই বলে না ডাকিস। আমাকে বিরক্ত করার জন্য সব সময়েই তুই এটা করিস।
ইসোলা : কিন্তু তিনি মোড়লমশাই তো বটেই।
মোযি : এটা তুই করিস শুধু আমাকে অসুখী করার জন্য। কেন বাপ বলে ডাকিস না ওনাকে? ইসোলা, এ নতুন অভ্যাস তুই শুরু করলি কবে থেকে? তুই একটা বাচ্চা ছেলে অথচ মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখেছিস বুড়োদের মতো। বড় হলে তখন যে কি করবি!
ইসোলা : কিন্তু তিনি মোড়লমশাই তো বটেই।
মোযি : কোথাও যাস নে। যদি যাস আমি কিন্তু তোর বাবাকে বলে দেব কোথায় গিয়েছিলি তুই। শপথ করবি কি করবি না বল?
ইসোলা : কিসের শপথ বলো?
মোযি : সব সময়ে ‘বাবা’ বলবি ওঁকে, বিশেষ করে যখন কথা বলবি আমার সঙ্গে। (দরজা খোলার রুক্ষ শব্দ।)
এরিনযোবি : ইসোলা।
ইসোলা : আজ্ঞে!
এরিনযোবি : আমার লাঠিটা নিয়ে আয়। জলদি, আমার সময় নষ্ট করিস না।
ইসোলা : আজ্ঞে?
এরিনযোবি : এখানে আয় আমার কাছে। (হিঁচড়ে নিজের কাছে এনে, লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে।) তুই দু:খের সন্তান, শুনতে পাচ্ছিস? দু:খের সন্তান। তুই নষ্ট হয়ে গেছিস, শোধরানোর অতীত। আমি ভাবি এটা একটা খ্রিস্টান বাড়ি, কিন্তু তুই এটাকে করে তুলতে চাইছিস পৌত্তলিক নিবাস। আমার বাড়িতে লজ্জা বয়ে আনবি না তুই। যদি তোকে মেরেও ফেলি আমি, তবু দেখব আমার বাড়িতে লজ্জা বয়ে আনিসনি তুই। (নামিয়ে রাখে লাঠি, একটু ভারি নিশ্বাস ফেলতে থাকেন।) চোখে পানি নেই এক ফোঁটা, অ্যাঁ। তাকিয়ে দেখ ওর দিকে। কোনো ভুল নেই, আত্মাটাকে বিক্রি করে দিয়েছিস শয়তানের কাছে। তাকিয়ে দেখ ওটাকে। চোখ দুটো ওর একেবারে শুকনো…এইমাত্র যে শাস্তি পেল তার কোনোই চিহ্ন নেই। (চেঁচিয়ে) হাত তোল! (চড় মারে তাকে।) এর পরে থেকে যখন বলব হাত তোল সুবোধ ছেলের মতো হাত তুলবি সঠিক ভাবে । এবারে যাতে আরো খারাপ কিছু না ঘটে তোর কপালে-সত্যি কথা বল। মোর্যুনকেকে কি বলেছিস? কি বলেছিস তাকে?
ইসোলা : আজ্ঞে…আমি জানি না আজ্ঞে।
এরিনযোবি : মিথ্যে বলতে চাইছিস আমাকে? জিজ্ঞেস করছি, ওলুমোরিনের মেয়েকে গোপনে কি বলেছিস তুই? (নীরবতা) একগুঁয়ে হতে চাইছিস? বল কি বলেছিস তাকে? কি বলেছিস তাকে? (আবার মারতে থাকেন।) হাত নামাবি না। তুলে রাখ হাত দুটো যেখানে আছে। এবার বল, কি বলেছিস তাকে? নিজে থেকে বলবি, নাকি ঠেঙিয়ে বার করব তোর থেকে?
ইসোলা : বুঝতে পারছি না ঠিক কোন কথাটার কথা বলছেন আপনি-।
এরিনযোবি : মিথ্যেবাদী! তোর এ বাচ্চা বয়সেই পাক্কা উকিলের মতো যুক্তি বার করছিস? বলিসনি গতকাল তুই মুখোশ নাচের দলের সঙ্গে শহরে গিয়েছিলি? গিয়েছিলি, না যাসনি?
ইসোলা : (ঘাবড়ে) আজ্ঞে হ্যাঁ, বলেছিলাম ওকে।
এরিনযোবি : ঠিক আছে বলে যা। বল শুধু খেলার ছলে তুই বলেছিলি এটা, বানিয়ে বলেছিলি। তুই কখনোই যাসনি মুখোশ নাচের দলের সঙ্গে রাস্তায়।
ইসোলা : আমি…আমি ঠিক…অস্বীকার করতে চাইছি না, আজ্ঞে।
এরিনযোবি : ঠিক যেন তোরই যোগ্য কাজ! একটু আগে এ গুনগনির পোশাকে সেজে রাস্তায় নেচেছিস পৌত্তলিকের মত। বল, এটা খ্রিস্টানের বাড়ি, কি বাড়ি নয়? তোকে কি আমি বড় করে তুলিনি খ্রিস্টান হিসেবে..মোযি! মোযি!
মোযি : (নেপথ্যে) বলুন, রেভারেন্ড।
এরিনযোবি : এসো, এসে শুনে যাও তোমার পুত্রটি তোমার বাড়িতে সাম্প্রতিক কি সম্মান বয়ে এনেছে?
মোযি : কি হয়েছে, রেভারেন্ড?
এরিনযোবি : এগুনগুন…তার সাম্প্রতিক চাকরি। মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই এক ভোরে জেগে উঠে দেখব আমাদের দরজায় পশুবলি হয়েছে.. একটা কুকুরের দু-টুকরো দেহ অথবা আরো কিছু ঘৃণার দৃশ্য। তোর জন্যেই আমার বাড়ির হাল আজ এই দাঁড়িয়েছে, শয়তানের বাচ্চা! (সংলাপ সহ ঘুষি)
মোযি : ইসোলা, তুই কি জানিস না, এটা খারাপ। তুই একজন খ্রিস্টান। এ ধরনের ব্যবহার তোর বাবাকে শুধু অসন্তুষ্টই করবে!
এরিনযোবি : জানো কি, কেমন করে একথা শুনলাম আমি? ছেলেটা লজ্জাকরভাবে শুধু পালিয়েই যায়নি, গিয়ে আবার মোর্যুনকে কাছে বাহাদুরি নিয়েছে। মেয়েটা আবার বলছে ওর বাপ মাকে। আর জানোই তো ওলুমোরিন পরিবারটা কোন ধাঁচের। সকাল হবার আগেই সারা শহর জেনে যাবে কেচ্ছাটা। পাদ্রীর ছেলে পৌত্তলিকদের সঙ্গে ভিড়ে খানাপিনা করছে…(আবার মারেন) অপদার্থ ছেলে, এভাবেই তুই আমার নামের ওপর কলঙ্ক চাপাতে চাস? (মারতে থাকেন বার বার।) তাই না? তাই না? (‘তাই না’ তাই না’ ধ্বনিত হতে থাকে কিল চড়ের আওয়াজের সঙ্গে, পুনরাবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে ঘনতা বাড়তে থাকে তার। ইসোলা অস্থির হতে থাকে যাবো, মারো, গোঙ্গাতে থাকে।)
মোর্যুনকে : ইসোলা! কি হয়েছে? ইসোলা, জাগ, জেগে ওঠ ইসোলা…
ইসোলা : অ্যাঁ? কি …কে এটা?
মোর্যুনকে : আমি, আমি মোর্যুনকে। আজি জেগে উঠেছ কি এখন, ইসোলা?
ইসোলা : কি ব্যাপার? ওহ্ আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম?
মোর্যুনকে : হ্যাঁ, কিন্তু কিসের স্পপ্ন? এমন ছটফট করছিলে কেন?
ইসোলা : দু:খিত। ঘুমের ঘোরে কথা বলছিলাম নাকি আমি?
মোর্যুনকে : না। তবে উথাল-পাথাল করছিলে। গোঙাচ্ছিলেও তুমি ব্যথা করছিল নাকি তোমার?
ইসোলা : না, না। ঠিক আছি আমি। আমি দু:খিত তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম।
মোর্যুনকে : ঠিক জান, তুমি অসুস্থ নও?
ইসোলা : হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক জানি। মোর্যুনকে আমি শুধু স্বপ্ন দেখছিলাম। যাও আবার ঘুমোও গিয়ে।
মোর্যুনকে : ঠিক আছে। শুভরাত্রি, ইসোলা!
ইসোলা : শুভরাত্রি!
ইসোলা : (ঘুমের ঘোরে) কি হয়েছে মোর্যুনকে?
এরিনযোবি : মোর্যুনকে? পাগল হলি নাকি তুই? আমি ডাকলাম তোকে আর তুই উত্তর দিচ্ছিস মোর্যুনকে কে? এটা কোন ধরনের পাগলামি? ঐ মেয়েকে কি তোর মগজে পুরে রেখেছিস?
ইসোলা : (ছোট ইসোলা।) আজ্ঞে? আমি…আমি…
এরিনযোবি : ওলুমোরিনের মেয়ের ব্যাপারে তোকে কি আমি সাবধান করে দিইনি? সাবধান করে দিয়ে বলিনি কি ওর সঙ্গে তোকে যেন আর না দেখি?
ইসোলা : আজ্ঞে, হ্যাঁ।
এরিনযোবি : তাহলে তোরা দুজনে মিলে গির্জার চত্বরে আজ বিকেলে কি করছিলি? তার সঙ্গে দেখা গেছে তোকে..না, আমার কাছে মিথ্যে বলবি না তুই। তোকে দেখা গেছে ওর সঙ্গে। কি করছিলি ওকে নিয়ে? সাবধান করে বলিনি তোকে আর দেখা করবি না ওর সঙ্গে।
ইসোলা : আমরা শুধু দেখছিলাম কবরের ফলকগুলিকে।
এরিনযোবি : কবরের ফলক দেখবার জন্য গিয়েছিলি তোরা দুজনে? সতর্ক করে দিইনি উপাসনার পর গির্জার চত্বরে আর থাকবি না? ভদ্র বাড়ির ছেলে মেয়েরা উপাসনার পর সোজা ফিরে যায় যার বাড়ি, আর তোরা ঘুরে বেড়াস গির্জার চত্বরে। কবরের ফলক দেখে? (তাকে মারেন।) এই কি শিক্ষা তোকে দিয়েছি আমি? (পুনরায় মার) এভাবেই কি তোকে বড় করে তুলছি আমি? আমার প্রত্যেকটি আদর্শ যাতে তুই লঙ্ঘন করিস? কতবার বলেছি মেয়েটার কাছ থেকে তুই দূরে থাক? কতবার? বল, কতবার… কতবার…কতবার! কতবার…!কতবার! কতবার।
ইসোলা : (অস্বস্তিভরে গোঙায়। একটা আচমকা গোঙানির চিৎকার এবং সে জেগে ওঠে) মোর্যুনকে…ভাল, ওকে জাগিয়ে দিইনি। (দেশলাই ঠুকে লন্ঠন জ্বালায়)।
মোর্যুনকে : (জেগে ওঠে।) কে? ওহ, ইসোলা, কি করছ?
ইসোলা : কিছু না। শুধু একটা আলো চাইছিলাম।
মোর্যুনকে : কিসের জন্য।
ইসোলা : খারাপ খারাপ স্বপ্ন খালি। যাও ঘুমিয়ে পড়, আলোটা জ্বালা থাকলে হয়ত আমার ঘুম ভালো হবে।
মোর্যুনকে : ও হ্যাঁ, বিমপে বলে…এখন আমরা আবার ঘুমোতে যাব কি-না?
মোর্যুনকে : এটা সত্য বিমপে বলে তোমার বগলের নিচে যদি একটা টাটকা পাতা রাখতে পার অথবা পার…(সরাসরি দৃশ্যান্তর)
এরিনযোবি : ইসোলা।
ইসোলা : আজ্ঞে।
এরিনযোবি : মোযি! তুমি কোথায়? মোযি?
মোযি : (আসতে আসতে) রেভারেন্ড, কি হয়েছে? কি ঘটল?
এরিনযোবি : এ বিচারই মহৎ প্রভু ন্যস্ত করা ভাল ভেবেছেন। (ইসোলাকে মারেন।) ঈশ্বরবিহীন বালক, একটার পর একটা লজ্জা বয়ে আনছিস আমার বাড়িতে। চল দেখি (সহসা ধরে টানতেই ইসোলা পড়ে যায়।) ওঠ! হিঁচড়ে টেনে তোলেন তাকে।) ওঠ…ওঠ বলছি!
মোযি : (ভীত, আর্তনাদ করে) রেভারেন্ড, দোহাই তোমায়, দোহাই..লাথি মেরো না ওকে।
এরিনযোবি : ওঠ। আয়, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ কত ক্ষতি করেছিস তার। দেখি, মুখ তুলে তুই তাকাতে পারিস কিনা সরাসরি তার চোখের দিকে…(টানেন, প্রায় হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকেন দরজার দিকে।)
মোযি : রেভারেন্ড, দোহাই তোমার …আস্তে টান। রেভারেন্ড, দোহাই..হও, তুমি মেরে ফেলবে ওকে। রেভারেন্ড …আমিও যাব ওদের সঙ্গে…আমার মাথার ওড়না…কোথায় আমার মাথার ওড়না…(দৃশ্যান্তর। এরিনযোবি রাস্তার উপর দিয়ে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে ইসোলাকে। রাস্তায় নানাধরনের আওয়াজ-মানুষ, ছাগল, বাই-সাইকেল এবং মাঝে মাঝে মোটরের হর্নের আওয়াজ। মিশে যায় ‘ওমো যোভিয়া’-র প্রস্তাবনার সঙ্গে।)
গান : ৫
বাচ্চা আমি মিনতি করছি তোকে
মিনতি করছি তোকে
নতজানু হয়ে মিনতি করছি তোকে
মিনতি করছি তোকে
বরবটির দই নিয়ে মিনতি করছি তোকে
তৃপ্ত হ তোকে মিনতি করছি আমি
মিনতি করছি তোকে
তৃপ্ত হ তোকে মিনতি করছি আমি মিনতি করছি আমি
এরিনযোবি : নষ্ট ছেলের ক্রমোন্নতি দেখছি তোর মধ্যে…তোর জন্মের পর থেকে এটাই তোর ধরন, লক্ষভ্রষ্ট না হয়ে এ পথই অনুসরণ করছিস তুই। মুখোশ নাচে যোগ দেবার মুহূর্ত থেকেই তুই যে ভ্রষ্ট হতে শুরু করেছিস আমি জানি। আমার ছেলে …একটা এগুনগুন। পাদ্রীমহলে আমাকে হাসির খোরাক করে তুলেছিস তুই। যখন আমি পবিত্র প্রার্থনা পরিচালনা করি, প্রত্যেকটি ভালোমানুষ নিশ্চয়ই হাসতে থাকেন, বলতে থাকেন আমি কেন নিজের ছেলেকে এগুনগুন ঝড়ের মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত করে আনতে পারি না। ওহ্, গোড়া থেকেই তুই ভ্রষ্ট…মেলামেশা করিস বস্তির বাচ্চাদের সঙ্গে… গান করিস বুনোদের…রাতের বেলা বেরিয়ে যাস, কেউ জানে না ভোর হবার আগে কত ধরনের নোংরা কাজ করিস! এখন তোর সব খেল খতম… তোর পাপের হাঁড়ি সূর্য ভেঙে দিয়েছে…কি হল? এটার মানে কি? মোযি, এটার মানে কি?
মোযি : রেভারেন্ড, আমি….
এরিনযোবি : ফিরে যাও, মোযি ফিরে যাও এক্ষুনি।
মোযি : রেভারেন্ড আমার ওখানে থাকার দরকার আছে।
এরিনযোবি : তুমি সেখানেই থাকবে, যেখানে থাকবার নির্দেশ দেব আমি, বুঝলে। এখন তোমাকে মায়ের দাতাগিরি দেখাতে হবে না।
মোযি : কিন্তু রেভারেন্ড…(ভিড় জমার আওয়াজ।)
এরিনযোবি : তোমার যদি এখন দয়া দেখাতে হয়, তাহলে তার দাবীদার ঐ বেচারা মেয়েটি। তার জীবনটাই ধ্বংস হয়ে গেছে পুরোপুরি, ধ্বংস হয়েছে তোমার ছেলেকে দিয়ে। যৌনপাপীকে দয়া দেখাবার কি পাপ তা কি দেখতে পাচ্ছ না? বাড়ি যাও, মোযি..ফিরে যাও বাচ্চাগুলোর কাছে…(জনতাকে ক্রোধের স্বরে।) কি ব্যাপার? আপনাদের সকলেরই কারুর কোনো কাজ নেই? এধরনের হল্লা নাচ দেখাবার স্বাধীনতা আপনারা পেয়েছেন বলে ভাবছেন? যান, আগে নিজেদের পাপের দিকে তাকান। চলে যান, সব ভণ্ডের দল, ভেগে পড়–ন, চলে যান-। নিজেদের গোপন পাপগুলো উন্মোচিত হবার আগেই তাদের প্রচণ্ড আঘাত করুন। (তিনি চলে যেতে থাকেন। তাঁর চলে যাবার সময় ‘ওমো যোউয়ো’ গানটি শোনা যায়।) মনে হয় আপনারা অহংকারী…অহংকারী হতে ভালোবাসেন আপনারা, তাই না? বলুন তো কেন আপনারা যান মুখোশ নাচের আসরে, শুধু আপনাদের পেছনে ভিড় জোগাড় করবার জন্যই তো। চিৎকার করে গালিগালাজ করেন, ভিক্ষে করেন পয়সা। অভিশাপ দেন, চেঁচান, ঈশ্বরের মুখের উপর করেন তাঁর নিন্দা। কিন্তু সেই ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত আপনাদের আঘাত করবেনই, ধন্যবাদ দিন এখনো আঘাত দিয়ে আপনাদের মেরে ফেলেননি তিনি। (সহসা গর্জন করে) মোযি এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন ওখানে? কিসের অপেক্ষা করছ? ফিরে যাও, ফিরে যাও এক্ষুনি। বাড়ি ফিরে অপেক্ষা কর আমার জন্য। (আবার যেতে থাকেন) দুর্বল। কী দুর্বল! আমার বিপদের সময় যার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কথা…আহ্, নিজের হাতে নৈপুণ্য দেখার জন্য প্রস্তুত হও। (তাঁরা কয়েক ধাপ উপরে ওঠেন। দরজায় ধাক্কার শব্দ।) এবারে দেখব কতটা কঠিন তুমি।
মিসেস : রেভারেন্ড…আমার স্বামী অপেক্ষা করছেন। আপনি। আমার মেয়েকে কি করেছেন আপনি? ওকে ধ্বংস করেছেন, জানেন কি সেটা? ওকে ধ্বংস করেছেন।
ওলুমোরিন : ইসোলা, আমার পক্ষে দুঃখের দিন এটা। আমার মেয়ে তোর কোন ক্ষতি করেছিল যে শহরের সব মেয়ের মধ্যে তুই তাকেই তুলে নিলি?
মিসেস : মোর্যুনকে…মোর্যুনকে…
মোর্যুনকে : মা!
মিসেস : শুরু কর। বল আবার আজ সকালে কি বলেছিলি আমাকে?
মোর্যুনকে : আমি জানি না…ইসোলা…
ওলুমোরিন : ওর সঙ্গে কথা বলিস না…তোর মায়ের কথার জবাব দে।
মিসেস : ইসোলা দায়ী কি দায়ী নয়?
এরিনযোবি : অবশ্যই ইসোলা দায়ী। মনে হয় না ছোঁড়া এতটাই বখে গেছে যে সব অস্বীকার করবে।
মিসেস : তাছাড়া, আমার মেয়ে কিছু বুঝতেই পারেনি। ওকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। বিমপেকে মেয়ে তাই বলেছে। ছোঁড়া তোর সঙ্গে চালাকি করেছে, তাই না? ঠকিয়েছে তোকে। এসব বোঝার পক্ষে তুই একবারেই সরল।
ইসোলা : মিসেস ওলুমোরিন..
এরিনযোবি : চুপ! তোকে কিছু বলতে বলা হয়েছে কি?
মিসেস : দেখছেন তো রেভারেন্ড, ব্যাপারটা পরিষ্কার। আমার মেয়ে একেবারেই শিশু। কিছু সে বুঝবে কেমন করে? তার অজ্ঞানতায় পাপী সুযোগ নিয়েছে আপনার ছেলে।
ইসোলা : মিসেস ওলুমোরিন, আমার মনে হয়-
এরিনযোবি : শুনতে পাচ্ছিস না তোকে চুপ করে থাকতে বলছি আমি?
ওলুমোরিন : না না, শুনি কি বলার আছে ওর। ইসোলা, তুই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাস, তাই না? বেশ, বলতে থাক। শুনি সে কথাই যদি অস্বীকারই করতে চাস।
ইসোলা : আমি শুধু…আমি ঠিক…জিজ্ঞেস করতে চাই যদি…খানিক সময়ের জন্য মোর্যুনকের সঙ্গে কথা- (বেজায় হট্টগোল।)
ওলুমোরিন : তোর ইচ্ছে কথা বলার?
এরিনযোবি : ছোকরা পাগল হয়ে গেল নাকি?
মিসেস : ঠিক শুনছি তো আমি? ঈশ্বর সহায় হোন আমার। এরমধ্যেই কি অনেক ক্ষতি করিসনি তুই? মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে চায়!
এরিনযোবি : ইসোলা, বুদ্ধিভ্রংশ হয়নি নিশ্চয়ই?
ইসোলা : মোর্যুনকে, আমি জানতে চাই…আমাকে বলনি তুমি…সত্যি কি সন্তান হবে তোমার?
এরিনযোবি : ছেলেটার মাথা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে? ইসোলা, তোকে কি বলিনি একেবারে কথা বলবি না বাচ্চাটার সঙ্গে? সরে আয় ওর কাছ থেকে..
মিসেস : হে ভগবান, মেয়েটার হাত ধরেছে ও! দেখতে পাচ্ছেন…দেখতে পাচ্ছেন… আমি নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যাচ্ছি!
ওলুমোরিন : আমার মেয়েকে ছেড়ে দে বলছি।
ইসোলা : মোর্যুনকে, তাহলে আমার সন্তান তোমার গর্ভে, আমার নিজের সন্তান?
মিসেস : বাঁচাও! বাঁচাও! কি সাহস আমার মেয়েকে ছুঁচ্ছে। ভাগ, ভাগ, বেহায়া ছেলে। মেয়েটার থেকে দূরে দাঁড়া।
এরিনযোবি : আমার লাঠিটা নিয়ে আয়। কোথায় আমার লাঠি?
মোর্যুনকে : ছেড়ে দিন…ছেড়ে দিন ওকে। ওকে মারবেন না। ইসোলা পালিয়ে যাও।
ওলুমোরিন : আমার সামনে, আমার সামনে মেয়ের হাত ধরছে। মেয়েটাকে এতসব করার পরেও? শয়তানের নিজের বাচ্চা… শয়তানের আপন জারজ ফল!
মোর্যুনকে : পারছি না…আমি আর পারছি না…(পায়ের আওয়াজ ধাবমান।)
মিসেস : মোর্যুনকে, ফিরে আয়, ফিরে আয় এখানে। বিমপে! বিমপে! আয়াটা গেল কোথায়? বিমপে…মেয়েটাকে ফিরিয়ে আন। ফিরিয়ে আন বলছি।
ইসোলা : বাবা, আমি…
এরিনযোবি : বাবা বলে ডাকবি না আমাকে… (লাঠিটা নামিয়ে আনেন তিনি।)
ইসোলা : না!
মিসেস : বাঁচাও! বাঁচাও! ছেলেটা ওর বাপকে মারছে। বাঁচাও! পড়শীর দল! বাঁচাও!
এরিনযোবি : (কঠিনভাবে) ইসোলা।
ইসোলা : না! না! (কিছু সময়ের ধস্তাধস্তি। বেতের বাড়ির আওয়াজ। জেগে ওঠে ইসোলা, লাফিয়ে ওঠে, শ্বাস ফেলতে থাকে জোরে জোরে।)
মোর্যুনকে : ইসোলা কি ব্যাপার?
ইসোলা : মানুষটা কি আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না?
মোর্যুনকে : আবার তাঁর স্বপ্ন দেখছ? ইসোলা, ওঁকে কি তুমি ভুলতে পার না?
ইসোলা : আমাকে একা থাকতে দিচ্ছে না কেন?
মোর্যুনকে : ইসোলা! (অকস্মাৎ ভীত) কোথায় যাচ্ছ তুমি?
ইসোলা : বাইরে। চাঁদ উঠেছে।
মোর্যুনকে : থাম। আমাকে একা ফেলে যেও না এখানে।
ইসোলা : বেশ, চলে এস যদি তোমার ভাল লাগে।
মোর্যুনকে : আহ্, পূর্ণিমার চাঁদ। দেখ, দেখ…ঐ যে মোযি, চাঁদের আলোর উত্তাপ নিচ্ছে।
ইসোলা : কী শান্তিময় দেখাচ্ছে ওকে। সাবধান, ওকে চমকে দিও না।
মোর্যুনকে : ইসোলা, দেখ!
ইসোলা : কি হল?
মোর্যুনকে : বাঁশঝাড়ের পাশে…ঐ যে আবার…ইসোলা, হে ঈশ্বর, কি বিশাল ওটা…কি বিশাল..
ইসোলা : আমার বন্ধুকটা নিয়ে এসো…জলদি! ঐ ত এরিনযোবি! আজ রাতে পেড়ে ফেলবে ওটাকে। আবার পালিয়ে যাবার আগে নিয়ে এস জলদি। চট করে। (নড়া চড়ার দ্রুত আওয়াজ।)
মোর্যুনকে : এই নাও, ইসোলা। ধর যদি তোমার ফসকায়, অথবা শুধু আহত কর ওটাকে…খুব বিপদের হবে না?
ইসোলা : আমি ফসকাবো না।
মোর্যুনকে : ওহ্, কি ভয়ংকর দেখতে ওটাকে। গুলি করছ না কেন? এক্ষুনি ওটাকে মেরে ফেল ইসোলা।
ইসোলা : আমি শুধু অপেক্ষা করছি কখন মাথাটা বেরোয়। এ আলোতে ওকে নিশানা করা খুব কঠিন। চাঁদের আলো পাতার রঙের মতো এক দেখাচ্ছে। আর এভাবে এত চেঁচিও না। শুধু মাথাটার দিকে নজর রাখ, পাতাগুলো মাঝখানে।
মোর্যুনকে : ঐ তো! ঐ তো ওটা ওখানে! কি কুৎসিত দেখতে…ইসোলা। আমার ভয় করছে।
ইসোলা : আমাকে ছুঁয়ো না, আমি ফসকাবো…ঐ বেরিয়ে আসছে আবার। (বন্ধুকের ঘোড়া টেপে, শুধু খট করে একটা শব্দ হয়।)
মোর্যুনকে : কি হল? ছুটল না যে।
ইসোলা : (নিজের কপালে আঘাত করে) বোকা! বোকা! কি বোকা আমরা! এটাতে বারুদ ভরা দরকার ছিল। বন্দুকটা যখন হাতে নিয়েছিলে এটা ছুটে গিয়েছিল মনে নেই?
মোর্যুনকে : ওহ্…ওহ্ ইসোলা, খুবই দু:খিত আমি…বাস্তবিক আমি খুবই দু:খিত… কোথায় যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ তুমি?
ইসোলা : বাড়ি।
মোর্যুনকে : বাড়ি? মানে, তোমার বাবার বাড়ি?
ইসোলা : হ্যাঁ, আমাকে কিছু বারুদ আনতেই হবে। আমি জানি তিনি বারুদ রাখেন কোথায়। তারপর গুলি করব।
মোর্যুনকে : এখুনি কেন? সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে হয় না? (মেতা মেতা ল্’ওরে’ গানটি শুরু হয় এবং দৃশ্যটির শেষ পর্যন্ত প্রবাহিত হতে থাকে)
গান : ৬
বন্ধু আসছে তিনজন করে
বন্ধু আসছে তিনজন করে
প্রথমজন দিতে চাইল মাদুর ঘুমোবার জন্য
পরের জন দিতে চাইল মেঝে ঘুমোবার জন্য
তৃতীয়জন দিতে চাইল তার বক্ষ
একবারও পিটপিট করিনি আমি, গ্রহণ করলাম বক্ষ-উপহার
আমি জেনেছি নদীকে, জেনেছি আমি সমুদ্রকে
স্রোতদের পিতার পথ আমি জানি
ছোট পর্ণও বয়ে আনতে পারে মৃত্যু স্তন্তুদের উপর
একজন সোমত্ত মানুষও মরে যায় অবসাদ-ভরা শ্রমে
ইবাদানের ষড়যন্ত্র যুদ্ধকে বয়ে এনেছিল শহরে
সুন্দর পালক দিয়ে তোতা বানায় আবোল তাবোল
বন্ধুত্ব শুধু ভুলে-ভরা, শুধুই অন্ত:সারহীন।
ইসোলা : না। আজ রাতেই মারতে হবে ওটাকে। আজ রাতে। আর অপেক্ষা করতে পারছি না আমি।
মোর্যুনকে : ইসোলা, এটা বোকামি। কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাক।
ইসোলা : না, আজ রাতে। এটার জন্যই যত দু:স্বপ্ন দেখা দিচ্ছে। দেখতে পাচ্ছ না? মারতেই হবে ওটাকে।
মোর্যুনকে : অপেক্ষা কর আমার জন্য…ছেড়ে যেও না আমাকে …ইসোলা, আমাকে একা ফেলে যাও সব সময়। অপেক্ষা কর, দোহাই তোমার…
ইসোলা : ঠিক আছে, জলদি কর।
মোর্যুনকে : চলে গেছে এর মধ্যেই। সাপটা চলে গেছে। তাহলে অপেক্ষা করছ না কেন সকালের জন্য?
ইসোলা : যদি পালিয়েই থাকে তবু ঢুঁড়ে বার করব ওটাকে। আজ রাতেই ওটাকে শিকার করে ফেলতে চাইছি আমি।
মোর্যুনকে : (ব্যাকুল আর্তনাদে) ইসোলা, বড্ড দ্রুত ছুটছ তুমি। দাঁড়াও, দোহাই তোমার…অপেক্ষা কর কাল পর্যন্ত…ইসোলা, ঐ দানোটাকে আজ রাতে শিকার করতে যেতে তুমি পারো না…ইসোলা; পারতেই হবে..পারতেই হবে আমাকে, নইলে ঘুম হবে না আমার। মোড়ল মশাইয়ের ঘরে লুকিয়ে আমি ঢুকব, তারপর বারুদ হাতাব।
মোর্যুনকে : তাহলে এটা সত্যিই। বিমপে আমাকে বলেছিল তুমি বদ্ধ পাগল, একেবারে বদ্ধ পাগল। এখন বুঝতে পারছি সত্যিকথাই বলেছিল সে…তুমি পাগল, ইসোলা…তুমি পাগল হয়ে গেছ।
ইসোলা : ঐ জিনিসটা আমাকে পাক দিয়ে ঘুরলে আমি ঘুমুতে পারব না। দেখনি তুমি, আর তোমাকে দেখাতেও চাই না আমি…আরেকটা ভাঙা খোলা আমি দেখেছি ঝোরার ওপরে…পাহাড়ে আছড়ে ভেসেছে অন্যগুলি মতো…কি লাভ যদি তারা যেতে আসতে না পারে নিজেদের ইচ্ছেমতো। আজ রাতেই আমি মারব ওটাকে…(গান জোরে হয়। তারপর দৃশ্যান্তর। একটি জানলা ভাঙ্গার শব্দ।)
মোযি : কে ওখানে? কে? কে ওখানে? যেই হও না কেন, বেরিয়ে এসো, শুনতে পাচ্ছ? খিড়কির দোর দিয়ে আমায় বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকো না…আমার ছেলে এখানে নেই আর তাই তুমি হাতড়ে বেড়াতে পার সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত। সে নেই এখানে, তাই ভাগো এখান থেকে, শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে। ভাগো! শুনতে পাচ্ছ? আমি জানি ওখানে আছ তুমি। আমি কালা নই। বেরিয়ে এসো, যেই তোমাকে পাঠাক না কেন। অথবা ফিরে যেতে পার, গিয়ে বলতে পার তার মেয়েকে পাইনি আমি, আমার ছেলেকেও পাইনি আমি। যাও, গিয়ে বলো তাকে। ঈশ্বর তাকে অভিশাপ দেবে যদি আমার ছেলেকে সে ছোঁয়….(নীরবতা। ধীর পায়ের আওয়াজ দরজার কাছে, তারপর হঠাৎ দড়াম করে খুলে যায়।)
ইসোলা : মা, দোহাই তোমার…বন্ধ করো দরজাটা।
মোযি : ইসোলা! বাবা আমার, কোথায় ছিলি তুই? কি করছিলি? (ইসোলা বাক্সগুলো হাতড়ায়, খ্যাপার মতো খুঁজতে থাকে।) ওহ্, ইসোলা, আমাকে এমন ভেঙে টুকরো টুকরো করছিস কেন? তার চাইতে ঘুঁষি মেরে এক্ষুনি আমাকে মেরে ফেলছিস না কেন? আমি কি তোর মা নই? ইসোলা, মোর্যুনকে কোথায়? কোথায় হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা? ইসোলা, জবাব দিচ্ছিস না কেন? তার বাবা মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সারা শহরের লোকদের খেপিয়ে তুলেছে তোর বিরুদ্ধে। সে বলছে তুই নাকি চুরি করেছিস তার মেয়েকে…ইসোলা, তোর মায়ের কথার জবাব দে…কি করছিস তুই? ইসোলা। ওগুলো তোর বাবার জিনিস …বাপ আমার…তোকে আমরা কি করেছি? তুই যে বিপদের মধ্যে আছিস বাবা…তোকে লুকোতে হবে!
ইসোলা : আহ্…এই যে।
মোযি : কি ওটা? (ইসোলা বন্দুকটা তুলে নেয়) আরে এটা? নামিয়ে রাখ। এটা তোর বাবার বন্দুক না? (জানালা খোলা হয়) ইসোলা, চোরের মত জানালাটা ব্যবহার করবি এখন? কোথায় যাচ্ছিস তুই? না, তুই যেতে পারবি না। এখানেই থাকবি।
ইসোলা : মা, আমাকে যেতে দাও। (খানিক ধস্তাধস্তি।)
মোযি : তোকে এখানে থাকতেই হবে। তোর কি একেবারেই ভয়ডর নেই? বলছি, সারাটা শহর তোর বিপক্ষে। তারা তোকে বলছে ছেলেধরা… তার মানে জানিস তুই? ছেলেধরা। এ গল্পটাই তোর সম্পর্কে চালু করেছে ওলুমোরিন।
ইসোলা : মা, যেতে দাও আমাকে…এখানে থাকা আমার চলবে না।
মোযি : তোর মনটাকে কি আমার বিরুদ্ধে একেবারে পাথর করে রেখেছিস, তুই? বলছি তোকে, সারা শহরের সম্পত্তি এখন তোর জীবন। ছেলেধরা। তারা সবাই বলছে তুই ওলুমোরিনদের বাড়িতে গিয়ে মেয়েটাকে নষ্ট করেছিস।
ইসোলা : আমি করিনি, ব্যস ফুরিয়ে গেল।
মোযি : ফুরোল কি? তাহলে মেয়েটা কোথায়? কোথায় মেয়েটা? ইসোলা, আজ রাতে তুই কোথায় ছিলি? এমন কঠিন ব্যবহার বুড়োদেরই মানায়। বাবা আমার, তুই আমার মধ্যে ভয় ভরে দিচ্ছিস। তুই কি সত্যিই আমার ছেলে? আমি যেন তোকে আর চিনতে পারছি না।
ইসোলা : (আরো হিংস্রভাবে) মা, কি করছ তুমি? যেতে দাও আমাকে। যেতে দাও বলছি। (নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে)
মোযি : (ফোঁপায়) আমাকে মেরে ফেল। বন্দুকের আর কি কাজ? তোর বাবার ঘরে কি পাবার জন্য এসেছিস? মোর্যুনকে কোথায়? আমার বিরুদ্ধে নিজেকে এত কঠোর করে রেখেছিস কেন তুই? তোর মধ্যে কি ঘটেছে? ইসোলা? বাচ্চা বয়স থেকে তোর মধ্যে আমি কি পুষেছি যা আমি জানি না?
ইসোলা : কিছু না, কিছু না। আমাকে যেতেই হবে।
মোযি : যেতেই হবে? কোথায় যেতে হবে? এটা ছাড়া কি তোর আর কোন বাড়ি আছে? ভাবছিস বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারবি আমাকে ভয় আর প্রশ্নের মধ্যে রেখে? মোর্যুনকে কোথায়?
ইসোলা : তুমি যদি জানতে…তার নিজের বাড়িতেই।
মোযি : আমাকে মিথ্যে বলো না বাবা। এর আগে তো কখনো এমন করিসনি, মিথ্যে বলিসনি আমার কাছে।
ইসোলা : আমি ওকে নিয়ে গেছি ওখানে…এই মাত্তর। সে যেতে চায়নি কিন্তু আমি তাকে রেখে এসেছি ওখানে।
মোযি : আর ওলুমোরিন? সে কি বাড়িতে আছে? বাপ মা কি জানেন মেয়েটা তাদের ফিরেছে?
ইসোলা : তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই আমার। বাড়ির দরজাটা ছিল খোলা, জায়গাটা মনে হচ্ছিল ফাঁকা। এবার আমাকে যেতে দেবে কি?
মোযি : তারা যখন জানতে পারবে তাদের মেয়ে ফিরেছে তখন তুই যেতে পারবি যেখানে খুশি। তার আগে নয়। এখানে তোকে ওরা নিয়ে যেতে পারবে আমার মরা শরীরের উপর দিয়ে।
ইসোলা : না মা। আমাকে যেতেই হবে এখন। আমাকে এখন ছেড়ে দাও মা।
মোযি : মেয়েটাকে ফিরে পাক, তার আগে নয়।
মোর্যুনকে : (বাইরে থেকে) ইসোলা। ইসোলা।
মোযি : কে? মোর্যুনকে গলা না? (পদধ্বনি বাড়ির ভেতরে আসে।)
মোর্যুনকে : ইসোলা…তুমি ফিরে গেলে না?
মোযি : কি ব্যাপার? কোথায় ফিরে যাবি মেয়েটার জন্য?
ইসোলা : এটাই একমাত্র উপায় যাতে আমি ওকে নিয়ে ওখানে থাকতে পারি। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম আমি ফিরে যাব।
মোর্যুনকে : বাড়িটা একেবারে ফাঁকা..কেউ নেই…এমনকি বিমপেও নেই কোথাও। কেমন করে থাকি আমি? মা, সবাই মিলে কোথায় গেছে?
মোযি : তোকে খুঁজতে।
মোর্যুনকে : কত ভিড় দেখলাম…মশাল হাতে, অস্ত্র হাতে…কিছু গন্ডগোল হয়েছে নাকি?
মোযি : ওরা সবাই তোর বাবার বন্ধু….তারা বলছে আমার ছেলে তোকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। দেখতে পাচ্ছিস আমার ছেলের উপর কত ঝামেলা তুই এনেছিস?
ইসোলা : মা, ওকে দেখ-। আমি যাচ্ছি।
মোযি : না! আমি তোদের দুজনকেই লুকিয়ে রাখব বাড়ির মধ্যে। তারা আসুক, এসে এখানে তোদের খুঁজে পাক। বুঝলে মেয়ে, ওরা কিন্তু এসে তোমাকে জিজ্ঞেস করবে ইসোলা তোমাকে নষ্ট করেছে কিনা। তোমার বাপকে বলো কিছুটি করেনি ও। নাকি করেছে? তুইও কি ওকে দোষী বলবি? নাকি ওকে বাঁচাবি ওদের রক্তপিপাসার হাত থেকে?
মোর্যুনকে : আমি ইসোলার সঙ্গে যাবই, আমি যাবই… (জানালা সহজে খুলে যায়। জনতার প্রবল কোলাহল। ইসোলা লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।)
মোযি : ইসোলা! ইসোলা!…ফিরে আয়। ফিরে আয়!
স্বর : ঐ তো ছোকরা।
..ঐ ওই যে। জানালার ফোকর দিয়ে। তাড়া কর…তাড়া কর! জঙ্গলে পালিয়ে যেতে দিয়ো না ওকে। কেটে ফেল! চিরে ফেল ওকে! ঝোপের মধ্যে যেন যেতে না পারে।
ওলুমোরিন : (চেঁচিয়ে) যে ওকে ধরতে পারবে আমার বাড়িতে তার অবাধ গতি। সে যা চাইবে দিয়ে দেব।
স্বর : ওটাকে ঝোপ ঘাসের মধ্যে পালাতে দিয়ো না। কেটে টুকরো করে ফেল ওটাকে। কেটে টুকরো করে ফেল ওর যাবার আগেই লম্বাঘাসের কাছে পৌঁছে যাই।
মোযি : ওলুমোরিন..ওদের ফিরতে বলুন। ওলুমোরিন, আপনার মেয়ে এখানে নিরাপদ আর সুস্থ।
মিসেস : কি বলছেন? মোর্যুনকে?
ওলুমোরিন : মোর্যুনকে? কোথায়?
মিসেস : মোর্যুনকে…মোর্যুনকে…
মোযি : ওলুমোরিন, আপনার মানুষ কুত্তাগুলোকে ফেরত আনুন…আপনার মেয়ে এখানে, এই যে ও! আমার ছেলের ক্ষতি করার আগে আপনার খ্যাঁকশেয়াল-গুলোকে ফিরিয়ে আনুন। রেভারেন্ড! রেভারেন্ড! ওহ্…উনি তো গির্জায়। আমি নিজে গিয়ে তাঁকে ডেকে আনছি। ওলুমোরিন, আপনার মেয়েকে ফিরে পাচ্ছেন। আমার ছেলের যদি কোনো ক্ষতি হয়, আমার ছেলের যদি ক্ষতি হয়, তাহলে…তাহলে ঈশ্বর তাঁর খুশিমতো বিচার করুন। (তাঁর স্বর দূরে মিলিয়ে যায়।)
ওলুমোরিন : মোর্যুনকে, মা আমার, ভালো আছিস তো?
মিসেস : এদিকে আয়, তোকে ধরতে দে। তোর কোনো ক্ষতি করেনি তো ছেলেটা?
মোর্যুনকে : আমাকে ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও আমাকে। (প্রচণ্ড হিংস্রভাবে) আমাকে যেতে দাও, ডাইনি ডাইনি কোথাকার।
মিসেস : কি বললি?
ওলুমোরিন : কি বললি মেয়ে? এদিকে আয়, এদিকে আয় বলছি!
মিসেস : শুনলে কি বলে ডাকল আমাকে?
মোর্যুনকে : আমি ওর কাছে যাব। আমাকে ছেড়ে দাও। আমি ইসোলাকে চাই।
ওলুমোরিন : চুপ্ ।
মিসেস : ছেলেটা ওকে তুক করেছে। নিজের মধ্যে আর নেই মেয়েটা শুনছ কি বলছে মেয়ে?
ওলুমোরিন : আমার হাতে ছেড়ে দাও ওকে, তারপর ওকে শুধরে দিচ্ছি বরাবরের মতো। আহ্ আমাকে মারছে মেয়েটা! (দ্রুত পদধ্বনি মিলিয়ে যায়।)
মিসেস : থামাও! থামাও মেয়েটাকে। ওর মায়ের দোহাই হারিয়ে যাবার আগে মেয়েটাকে আটকে দাও।
ওলুমোরিন : আমাকে মেরেছে! আমাকে মারল মেয়েটা! পুরো পাগল হয়ে গেছে। থামাও… আটকাও ও মেয়েকে। কিছু মানুষ: পেয়েছি, পেয়েছি ইসোলাকে। ছোট্টো ঐ ঝোপের মধ্যে… আমরা ঘিরে ফেলেছিলাম, তাই পালাতে পারেনি।
ওলুমোরিন : আমার মেয়ে…আমার মেয়ের কি হল?
মানুষ : সবাই বলছে ওর হাতে নাকি একটা বন্দুক রয়েছে। কেউ কেউ দেখেছে। সেজন্যেই আমরা ধরে আনতে পারিনি।
ওলুমোরিন : তাহলে আগুন লাগাও ঝোপে। যাও…তোমরা মানুষ নাকি? ঝোপে আগুন লাগাও, বেরিয়ে আসুক তাপের জ্বালায়। (পদধ্বনি মিলিয়ে যায়।)
অন্য একজন : কর্তা…আপনার মেয়ে, আজ্ঞে…
ওলুমোরিন : ধরতে পারোনি তাকে? (পদধ্বনির কঠিন আওয়াজ।)
মানুষ : না, কর্তা। সেও লুকিয়েছে ঝোপে।
মিসেস : নিজেদের মানুষ বল তোমরা? তাকিয়ে দেখছ কি? মেয়েটাও যে ঝোপের মধ্যে রয়েছে ওর সঙ্গে। এখন কি করবে তুমি? কি করতে চাইছ?
এরিনযোবি : (প্রবেশ করে) কিছু না। আপনাদের আর কিছু করার নেই। (পশ্চাদ্পটে মোযির কান্না।)
ওলুমোরিন : রেভারেন্ড এরিনযোবি, আপনি ঠিক সময়ে এসেছেন।
এরিনযোবি : তাই বোধহয়। ব্যাপার কি? একজন মানুষ কি শান্তি পেতে পারে না ঈশ্বরের আবাসেও। আপনার লোকজনের চিৎকার আমাকে কালা করে দিয়েছে। তারপর আমার স্ত্রী ছুটে গিয়ে বললেন আপনার মেয়েকে আপনারা ফিরে পেয়েছেন। এর পরেও আপনারা ছুটে এসেছেন আমার ছেলের উপর প্রতিশোধ নিতে?
ওলুমোরিন : কোন্ মেয়ে? সেও পালিয়েছে ওখানে…ছেলেটার সঙ্গে…ঝোপের মধ্যে।
মোযি : মেয়েটা তো এখানেই। এ বাড়িতে। আপনাদের হাতে ওকে তুলে দিয়ে মিনতি করলাম যাতে আপনার লোকজনকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু ছেলে কোণঠাসা হয়ে রয়েছে ওখানে এখনো। আপনারা সবাই জন্তু হয়ে গেছেন।
মিসেস : আর আপনার ছেলে? আপনার ছেলে জন্মেছেই জন্তু হয়ে। ওকে কিন্তু অন্য কেউ জন্তু বানায়নি।
মোযি : আপনি কি মা নন? আমার ছেলের বিরুদ্ধে কি ঘৃণা আপনি পুষে রেখেছেন?
মিসেস : না, তা নয়। মোর্যুনকে আপনাদের বলবে সত্যি কথাটা। আমার ছেলে ওকে চুরি করেনি।
এরিনযোবি : খুব হয়েছে। ইসোলা কোথায়? এখন সে কোথায়?
মোযি : ঐ যে ওখানে। ঠিক যেখানে মানুষগুলি ভিড় করেছে।
এরিনযোবি : আপনারা থামুন। আমি ওকে বার করে আনছি। আপনাদের মেয়েকেও।
মোযি : (তার পেছনে চিৎকার করে) রেভারেন্ড, ওকে জানতে দিয়ো যে তুমিই গিয়েছ। ওর হাতে তোমার বন্দুক। জানতে দিয়ো ওর বাবা যাচ্ছেন-মৃদু গানের মধ্য দিয়ে দৃশ্যান্তর শিশুর জন্য শোকে ‘অগবে’ তাকে মুড়ে রেখেছিল নীলে শিশুর জন্য শোকে ‘অলুকে’ ক্যামউড রঙ করেছিল মাটি শোকার্ত বাবা পেতলের ঘণ্টা এনেছিল জোর করে কিন্ত আমরা বাস করতে পারি না বেশি করে এসব নিয়ে তাহলে আমরা জড়িয়ে পড়ি ঈশ্বরের সঙ্গে নিয়তির খেলায়Ñ
এরিনযোবি : (দূর থেকে) পথ ছাড়–ন। নিজেদের মান সম্মানও খুইয়েছেন আপনারা। পালান সব। যান, চলে যান এখন। নিজেদের বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করুন। আপনারা সবাই। আমি বলছি-যান আপনারা। আপনারা কি জানোয়ার যে রক্ত খাবার জন্য জিভ চাটছেন? আপনাদের মাথার উপর আমি ঈশ্বরের অভিশাপ ডেকে আনার আগেই আপনারা পালান। যান সবাই। (সকলে গজগজ করতে করতে সরে যায়।) ইসোলা, আমি যখন গির্জায় ছিলাম, তোর মা আমার কাছে গিয়েছিল, সব বলেছে। তুই পাপ করেছিস, আমি জানি…
ইসোলা : আমি পাপ করিনি।
এরিনযোবি : অনুতপ্ত হ। আমি তোর কাছে এসেছি কেননা আমিও পাপ করেছি। ঈশ্বরের কাছে হৃদয় খুলে দিয়ে জানলাম একমাত্র তিনিই ছেড়ে দিতে পারেন সন্তানদের, কিন্তু তা করেন না কখনো তিনি। আমার কি অধিকার আছে, তাঁর সামান্য সেবক, এত অহংকারী হবার? কি আমার স্বর আছে যাতে আমি তোকে গালাগাল দিতে পারি ঈশ্বরের সামনে মানুষের সামনে? আমার পাপও তখন তোর মতোই বিশাল হয়ে উঠল। বাড়ি ফিরে চল, তাঁর ক্ষমা পেতে আমায় প্রার্থনায় সাহায্য কর।
ইসোলা : এরিনযোবি আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও।
এরিনযোবি : এরিনযোবি? বাছা, এ যে তোর বাবার নাম!
ইসোলা : এরিনযোবি, আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও।
এরিনযোবি : এভাবেই কি আবার আমাকে বাইরে আটকে রাখতে চাস? দীর্ঘ রাত কেটেছে, আমার থেকে তোর কঠিন মুখ আর ফিরিয়ে নিস না। নিজের পাপের জন্য অনুতাপ কর, বাবা আবার…
ইসোলা : পাপ আমি করিনি।
এরিনযোবি : হ্যাঁ করেছিস। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে আমরা সকলেই পাপী; তাঁর দয়ার উপরেই শুধু আমাদের নির্ভর। তোর মা আমাকে ডেকে এনেছে একথা সত্যি, তিনি তোর জীবন নিয়ে ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আমি আমার উপাসনা সেজন্যে ভাঙ্গিনি। মঙ্গলময় ঈশ্বর রক্ষা করেন তাঁর সন্তানদের, তাই তোর জীবন নিয়ে কোনো ভয় ছিল না আমার। তোকে আমি তাঁর হাতেই সমর্পণ করেছি…
ইসোলা : না, ওলুমোরিনের হাতে।
এরিনযোবি : বাবা আমার। আমি তোকে ঈশ্বরের হাতেই সমর্পণ করেছি। গির্জায় গেলাম শুধু প্রার্থনা করতে যেন তোর মধ্যে দিয়েই প্রভু তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন…
ইসোলা : আর ওলুমোরিন তার নিজের ইচ্ছা…এটাকে ভুলে যেয়ো না এরিনযোবি।
এরিনযোবি : বাবা আমার, এটা কি এগুনগুন ঝোপ যার ভেতর থেকে অন্ধকারের মধ্যে তিনবার চেঁচিয়ে বললি নিজের বাবার নাম। মেয়েটাকে পাঠিয়ে দে। ওর মা-বাবা অপেক্ষা করছেন।
ইসোলা : মোর্যুনকে আমার পাশেই রয়েছে। বেঁধে রাখিনি ওকে। ওকেই বল, ওর যা ইচ্ছা তাই করুক।
এরিনযোবি : মোর্যুনকে বাড়ি ফিরে চলো। তোমার বাবা মা উদ্বিগ্ন। তাঁদের কাছে ফিরে এসো। (নীরবতা। শুধু গান শোনা যাচ্ছে।)কন্যা ফিরে এস মা বাবার কাছে। তুমি নিতান্ত শিশু, তবু বিপথে চলে গিয়েছ। তুমি বেরিয়ে এসো। আমি একা বোঝাপড়া করি আমার ছেলের বিবেকের সঙ্গে। (বিরতি। শুধু গান।) ইসোলা, তুই কি আটকে রেখেছিস ওকে?
ইসোলা : এরিনযোবি, তুমিই ওকে আটকে রেখেছ।
এরিনযোবি : আবার? বাবা আমার, আমাদের সমাজ বলে ছেলে বাবাকে নাম ধরে ডাকলে সেটা খুবই খারাপ সময়। মেয়েটাকে পাঠিয়ে দে। ওকে বল বাড়ি ফিরে যেতে।
ইসোলা : আসা আর যাওয়া তার নিজেরই ইচ্ছের উপর। আমার কাছে চাইবে না কিছু।
এরিনযোবি : মোর্যুনকে। (‘ওমো যোউয়া’ চলতে থাকে।) তাহলে আমিই আসছি, ওকে নিয়ে আসতে।
ইসোলা : (যেন গর্জন করে) আসবে না। (ঝোপের মধ্যে পায়ের শব্দ)।
এরিনযোবি : মোর্যুনকে, আমি আসছি, তোমার মা বাবার কাছে ফেরত দেব তোকে।
ইসোলা : এরিনযোবি, এসো না এখানে! ফিরে যাও তোমার গির্জায়। (ঝোপের মধ্যে দৃঢ় গতি।) তফাতে থাক এরিনযোবি, তফাতে থাক…যদি দেখা দেয় তোমার মাথা, এরিনযোবি। তোমার মাথা যদি একবারও দেখা দেয় পাতাগুলোর মধ্যে। এরিনযোবি। সে বন্দুক ছোড়ে। মোর্যুনকে আর্তনাদ করে ওঠে, কাঁদতে শুরু করে। ধেয়ে আসা পায়ের আওয়াজ ছুটছে।
ইসোলা : চুপ মেরে, চুপ…কেন, এ তো শুধু এরিনযোবি…ভয় পেয়েছ তুমি? (প্রচণ্ড আলোড়ন ঝোপের মধ্যে।)
মোযি : (চিৎকার করে) ইসোলা। ইসোলা! রেভারেন্ড! ইসোলা! তোমরা কোথায়? কোথায় তোমরা? ইসোলা! (সহসা চুপ) ন্গ্হ? রেভারেন্ড। রেভারেন্ড! রেভারেন্ড! (কান্নাায় ভেঙে পড়েন তিনি) (‘আগবে’ গান)
ইসোলা : মোযি…তুমিও? কেন, মোযি, তুমি কাঁদবে না…চুপ, মেয়েমানুষ, চুপ এখন…চুপ….চুপ…(গান জোরে হয়, পূর্ণ দমে)

গৌতম গোস্বামী’র প্রবন্ধ

ছোটকাগজের ছোট কথা

জন্মের পর স্বাধীনতার চেয়ে পরাধীনতাকেই আমরা অনেক বেশি আপন করে নিই। তাই বিষদাঁত ভাঙ্গা সাপের মত শুধু ফোঁস ফোঁস করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না। এই বাঁধন থেকে বের হওয়ার সত্যিকারের প্রচেষ্টা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রচেষ্টাতে আজকাল আমরা নার্ভাস feel করি। মেরুদণ্ডের এই ক্ষয় কোনো ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটে খাবার নয়। যা প্রয়োজন তা হল সৎ সাহস ও আত্মপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। কারণ সত্যের অঙ্গীকার গরলেও অমৃত সেবন করায়। নীল কণ্ঠের এই নীলে এক রাশি অধঃপতনের অপমৃত্যু হয়। পৃথিবী আবার হয় বসবাসযোগ্য। একখণ্ড মাটি যেমন প্রয়োজনার্থে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে ঠিক তেমনি শিল্পবোধ এর ধরন পরিবর্তিত হয় সময়ের প্রয়োজনে। ক্ষতি নেই; যদি তার উদ্দেশ্য হয় সৃষ্টির আত্মমর্যাদা লাভ। তবে মর্যাদার মানবিকতা থাকা অপরিহার্য। সাহিত্যের ক্ষেত্রে মর্যাদাবোধ সম্পন্ন সবচেয়ে ছোট অথচ জটিলতার মধ্যে জটিলতার নিরসনের একমাত্র মাধ্যম ছোটকাগজ বা little magazine সধমধুরহব। প্রসঙ্গ পুরাতন কিন্তু ভাবাচ্ছে নতুন করে। তাই এই প্রচেষ্টা ও নতুন কিছুর প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা থেকেই little magazineকে আরো একবার সামনে আনা, তার পেছনের দিকগুলোকে আরেকবার ফিরে দেখা। ছোট কাগজ বা লিটল ম্যাগাজিনের সাথে পরিচয় আছে তাদেরই যারা সাহিত্যের গভীরতায় নিমজ্জিত। একটা সময় ছিল যখন ছোট কাগজ বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত ভাবনার মোড় পরিবর্তন করেছিল। তারপর থেকে আজ অবধি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ছোটকাগজের ভূমিকা ইতিবাচক ও ফল প্রদায়ক। আমরা অনেকেই বিশ্বের চিরায়ত গ্রন্থগুলোর নাম এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করতে পারব। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যে প্রথম ছোটকাগজ, কোনটি? জিজ্ঞেস করা হলে নিঃশ্বাস বিলম্বিত হওয়াটা অবাক হবার মত কিছু নয়।

ছোট কাগজের সংজ্ঞা সংজ্ঞায়িত নয়
এক সময় মানুষ হাতে লিখত। মাধ্যম ছিল পাথর, ধাতব, গাছের পাতা, বাকল এবং সর্বশেষে অনেক সাধনার ফসল কাগজ। মূলত হাতে লেখার যুগে কোনো সাজানো গোছানো বই আকারের কিছু ছিল না এক কথায় লিটল বা বড় বা মাঝারি কোন কাগজই ছিল না। যে কোনো বই তখন ছিল প্রায় স্বর্গীয় দৈব বাণীর মত। ছাপাখানা আবিষ্কার ও তার সুসম্প্রসারণের ফল মুদ্রণ ও পুস্তক প্রকাশে অভাবনীয় সাফল্য আসে। তবে ছাপাখানার প্রাথমিক যুগে হাতে লেখা পত্রিকা বা Magazine প্রকাশিত হয়েছে প্রচুর। সত্যিকথা বলতে গেলে little magazine-এর উদ্ভব হয়েছে এক প্রকার অহং, পরম আন্তরিকতা ও দ্রোহ জাত ভাবনা হতে। যার গর্ভাশয় শিল্পের প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ হতে উৎকলিত। এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যারা ব্যবসায়িকভাবে প্রবল সবল পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি আরেকটি প্রকাশনার চেষ্টা করেন মমতার আঁধার দিয়ে। আর এখান থেকে যে আন্তরিক স্পর্ধা জন্মায় তার মলাটবদ্ধ সংকলনই little magazine। তবে একে আরেকটু বিশেষায়িত করা যায় little magazine-এর শব্দার্থতত্ত্বের ব্যাখ্যায়।
Magazine শব্দটি আমরা অনেকেই শুনে থাকব। আর যারা বাদ ছিলাম তারাও আমেরিকার আগ্রাসনের বদৌলতে সমরাস্ত্রের বিভিন্ন অংশের নাম সম্পর্কে অবগত। গধমধুরহব শব্দের আভিধানিক অর্থ বন্দুকের গুলি রাখার খাপবিশেষ কিংবা ক্যামেরা অথবা প্রজেক্টারে ফিল্ম রাখার স্থান এবং সাময়িকী। জানা যায় সাময়িকী অর্থে (জেন্টলম্যানস) ম্যগাজিন (লন্ডন ১৭৩১) এর বরেণ্য সম্পাদক এডওয়ার্ড কেভ প্রথম ম্যাগাজিন শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু এর উৎসার্থ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কেউ কেউ বলেন, নামটি এসেছে লিটল থিয়েটার থেকে আবার কেউ বলেন মার্গারেট এন্ডারসন সম্পাদিত লিটল রিভিউ (শিকাগো, ১৯৪১) থেকে।
ওয়েবস্টার থার্ড নিউ ইন্টারন্যাশনাল ডিকশনারী (১৯৭১)-এ লিটল ম্যাগাজিনের সংজ্ঞা রয়েছে এভাবে–
‘A literary use non-commercial magazine typically small in format that esp. Feautures experimental writing or other lither literay expression appealing to a relatively limited number of reders’

লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সুবিমল মিশ্র বলেন–লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে সাহিত্যের বিশেষ একটি দৃষ্টিভঙ্গি, বেপরোয়া, রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে যা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, হয়ে উঠেছে। এক কথায় আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক সমস্ত রকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে তার অবস্থান।
সন্দীপ দত্তের মত একটু আলাদা রকম। তাঁর মতে লিটল ম্যাগাজিন বিশেষ উদ্দেশ্যবাহী, সৎ সাহিত্য ভাবনায় পরিচালিত এস্ট্যাব্লিশমেন্ট বিরোধী, সমাজ সচেতন, স্বল্পবিত্ত, রুচিশীল, তরুণদের সৃজন সাহিত্যপত্র।
আর এতে করেই বোঝা যায়, লিটল ম্যাগাজিনের পথ পরিক্রমা খুব সহজ কিছু নয়। তার বাধা, বিপত্তি অগণিত। তবে যেহেতু little magazine একটি শিল্প প্রক্রিয়া তাই শিল্পের খাতিরেই এর সদর্থক অনুভবে আমরা অনুরণিত। শিল্পের চিরন্তনতা, সার্বজনীনতা, শাশ্বত মহিমাকে লিটল ম্যাগাজিন দিয়েছে চিরন্তন স্থায়িত্ব। অতএব লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে প্রকাশনার মাধ্যমে শিল্পের নির্মাণ যা আন্দোলনে বিশ্বাসী, যাতে প্রচুর গতি, সম্ভাবনা ও চেতনার নিদর্শন বিদ্যমান। যার লক্ষ্য পৃথিবীতে সত্যের অহংকার, যার প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বপ্নকে ঘিরে এবং যার দর্শন মনে প্রাণে আমৃত্যু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা।
লিটল ম্যাগাজিনের কথা মনে আসতেই সুকান্ত’র একটি কবিতা বারবার মনে পড়ে–
“আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য হয় চোখেও পড়ে না
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস।”
[দেশলাই কাঠি]
লিটল ম্যাগাজিন এই জ্বলে ওঠার বিষয়টি তাকে একটা আলাদা মর্যাদা দান করেছে। তাকে দিয়েছে অন্যন্য বৈশিষ্ট্য যে বৈশিষ্ট্যে তার দ্যুতি আলোহীনকে আলো দেয়। প্রকাশভঙ্গিতার প্রচণ্ডতা আর তীব্র গতি নিউটনের গতিসূত্রগুলোকে হার মানায়। আমাদের প্রত্যাশা হয় ভিন্ন রকম। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নতুন উপায় বাতলানোর অগ্নিস্ফূলিঙ্গ বিশেষ little magazine। বুদ্ধদেব বসু ‘সাহিত্য পত্রে’ উল্লেখ করেছেন “লিটল কেন? আকারে ছোট বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? নাকি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব কটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়। ওই ছোট বিশেষণটাতে আরো অনেকখানি অর্থ আছে। কথাটা একটা প্রতিবাদ বহুলতর প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড় বাজারে বিকোবে না, কিন্তু হয়ত কোনো একদিন এর একটি পুরনো সংখ্যার জন্য গুণী-সমাজে ঔৎসুক্য জেগে উঠবে।” সত্যি বলতে লিটল ম্যাগাজিন একটি আত্মা। আর আত্মা হচ্ছে শক্তি। শক্তির ক্ষয় বা বিনাশ নেই তাকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর করা যায় মাত্র। লিটল ম্যাগাজিনের শক্তিতেও তাই ধ্বংসের প্রতাপ কখনো আঁচ দিতে পারে নি।
ছোটকাগজ কথাটি আক্ষরিক অর্থে ছোট হলেও ভাবার্থে নয়। কারণ এই ছোটকাগজের ছোট পরিসরেই বড় লেখকের ভিত সৃষ্টি হয়েছে। আজ যাঁরা সমাজ বরেণ্য, দেশ বরেণ্য, বিশ্ব বরেণ্য তাদের অনেকের লেখক জীবন শুরু হয়েছিল ছোটকাগজের পাতায়। তবে ছোটকাগজের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানোর প্রবণতা তাদের অনেকেরই নেই বললেই চলে। তাঁরা ছোটকাগজকে ব্যবহার করেছেন উপরের সিঁড়ি হিসাবে। আর শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ সাধারণ এবং অসাধারণ মানুষই উপরে উঠলে নীচে তাকান না। সবচেয়ে বড় দুঃখের ব্যাপার যেটি সেটি হচ্ছে, যে ছোটকাগজের সাতে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও বাণিজ্যিকতা একটা সংঘাত সব সময় চলেছে এই লেখকরা সরাসরি সেই বাণিজ্যিকতার দাসত্ব করেছেন। আবার অনেকে লোকের চোখে ধূলো দিয়ে বা দেবার চেষ্টা করে ফিরে আসতে চেয়েছেন ছোট কাগজে। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত ছোটকাগজ কখনো কারো সাথে কোনো অবস্থাতেই আপস করে না। আর এই আদর্শ নিয়ে ১৮৮০ সালে ‘দি ডায়াল’ নামে প্রথম একটি ছোটকাগজ বা লিটল ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ করেছিলো। যার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ‘র‌্যালফ ওয়ান্ডো ইমারসন’ ও ‘মার্গারেট ফুলার’। প্রকৃতার্থে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটকাগজের চর্চা ও প্রসারতা শুরু হয় ১৮৮০ সালের পর ফ্রান্সে। এ সময় ফ্রান্সে প্রতীকবাদী সাহিত্যের জয়জয়কার ছিল। একই সময় যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রে রূপবাদী সাহিত্যের মুখপত্র রূপে লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব হয়। মোটামুটিভাবে এ সময়টাই লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাবের কাল। ১৯২০ সালে জার্মানীতে প্রবলভাবে শুরু হয় এর চর্চা। এ সময়ে উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে হ্যারিয়েই মনরোর ‘পোয়েট্রি’ (১৯১২), মার্গারেট ওন্ডারসনের ‘লিটলরিভিউ’ (১৯১৪-২৯), ‘ইগোইস্ট’ (১৯১৪-১৯), ‘ব্লাস্ট’ (১৯১৪-১৫), ‘ট্রানজিশান’ (১৯২৭-৩৮)।
লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে এ পত্রিকাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছে লিটল ম্যাগাজিনের প্রাথমিক ভিত্তি। আর এগুলোকে ঘিরে রয়েছে বিশ্ব বরেণ্যদের অনেকের নাম, এজরাপাউন্ড, টি এস এলিয়ট, জেমস জয়েস, হেমিংওয়ে এই কাগজগুলোতেই তাদের প্রাথমিক সময় পার করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রচণ্ড আন্তরিক হয়ে নিয়েছেন সম্পাদনার কঠিন দায়িত্ব। জয়েসের চৈতন্যপ্রবাহ রীতির প্রথম উপন্যাস ‘ইউলিসিস’ এর প্রথম এগারো অধ্যায় ছাপা হয় ‘লিটল রিভিউ’র পাতায়। এলিয়টের বিশ্ব নন্দিত ‘ওয়েস্টল্যাণ্ড’ ছাপা হয় ‘ডায়ালে’র পাতায়। ত্রিশের দশক বিশ্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতি একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। দুনিয়াব্যাপী শ্রেণিহীন মানুষের অধিকার ও সম্পদের সুষম বন্টনের বাণী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কসবাদী চেতনা। এ সময়ের সাহিত্য জারিত হয়েছে মার্কসবাদী চেতনায়। আমেরিকায় ‘পার্টিজান’ এবং ইংল্যান্ডে ‘লেফট রিভিউ’ এই চেতনাকে বহন করে। অতিক্রান্ত সময়ের প্রবাহ ও কালের চেতনাকে পরবর্তীতে সমৃদ্ধ করেছে সমালোচনা প্রধান লিটল ম্যাগাজিন। যার ভেতর উল্লেখযোগ্য ‘ক্যানিয়ন রিভিউ’ (১৯৩৯), ‘স্ক্রুটিনি’ (১৯৩২-৫৩), ‘সাউদার্ন রিভিউ’ (১৯৩৫-৪২), ‘একসেন্ট’ (১৯৪০-৬০)। পঞ্চাশের দশকের পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তৎপরতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে সাহিত্যের সুকুমার বৃত্তি। পঞ্চাশ দশক এবং পরবর্তী সময়ে সমৃদ্ধ হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা। এ সময়ের প্রধানতম কাগজগুলো হচ্ছে ‘এন্টিয়ক রিভিউ’, ‘এলিজাবেথ’, ‘প্যারিস রিভিউ’ ইত্যাদি। ষাটের দশকে বিট আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছে ‘বিটিচিউড’, ‘হউগন’ ও ‘বিগটেবস’। তবে এখানেই শেষ নয়। এর পরবর্তী সময়েও লিটল ম্যাগের চর্চা ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী লিটল ম্যাগের সাথে পাল্লা দিচ্ছে সাহিত্য সাময়িকী এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ।
দুই.
বঙ্কিমের হাতে জন্ম নেয় প্রথম সার্থক ছোটকাগজ ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২)। এর পূর্বে অবশ্য জন ক্লার্ক মার্শম্যানের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছিল ‘দিগদর্শন’ (১৮১৮)। এরপরের ইতিহাস তৈরি হয়েছে ঠাকুরবাড়িতে। ‘ভারতী’ (১৮৭৭) এবং তার পর পরই ‘হিতৈষী’ (১৮১৮), ‘সাহিত্য’ (১৮৯০), ‘হিতবাদী (১৮৯১), ‘প্রবাসী’ (১৯০১), ‘ভারতবর্ষ’ (১৯১৩)। কিন্তু এ পত্রিকাগুলো ঠিক লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র বহন করে না। তবে লিটল ম্যাগাজিন গড়ে তোলার প্রাথমিক ভিত্তি এ পত্রিকাগুলো তৈরি করে দিয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে সত্যিকারের লিটল ম্যাগাজিন তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯১৪ সালে ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। লিটল ম্যাগাজিনের চিরায়ত ঐতিহ্য প্রকাশিত হয়েছে সবুজ পত্র পত্রিকার চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সবুজের চিহ্ন সব সময় সামনের দিকে নির্দেশ করে। সবুজ তারুণ্যকে নির্দেশ করে। ঠিক এভাবেই সবুজ পত্র প্রথা বিরোধিতা ও মননশীলতার পরিচয় দিয়ে সবুজের অর্থকে সমুন্নত রেখেছিল। এরপর প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয় বাংলা সাহিত্যে। রবীন্দ্র বিরোধিতা এবং আকাশের রবি কিরণকে একটা প্রবল অথচ সৃষ্টিশীল ধাক্কা দেয়। মার্কসইজম ও মর্ডানিজম-এর যৌথ প্রযোজনা তখন বাংলা সাহিত্যের ভেতর বাহির। আধুনিকতা, আধুনিক কবিতা, আধুনিক গল্প তথা রঙ বদলের চিত্র। দিন বদলের ভাষা এবং পৃথিবীর অন্ধকার, জারত্ব নিয়ে সাহিত্যের নতুন ইমারত সৃষ্টি হয়। তৈরি হয় আধুনিকতা জারিত রবীন্দ্রদ্রোহী ‘কল্লোল’ (১৯২৩), ‘কালিকলম’ (১৯২৬), ‘প্রগতি’ (১৯২৭), ‘ধূপছায়া’ (১৯২৭), ‘পরিচয়’ (১৯৩১), ‘পূর্বাশা’ (১৯৩২), ‘কবিতা’ (১৯৩৫), ‘চতুরঙ্গ’ (১৯৩৮), ‘নিরুক্ত’ (১৯৪০), ‘একক’ (১৯৪১)। এদের ভেতর ‘প্রগতি’ ও ‘পূর্বাশা’ বাদে বাকী সবগুলো কাগজ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হত। এর সবগুলো পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রকে বহন করেছিল।
’৪৭-এর পরও লিটল ম্যাগাজিন কলকাতার বলয় ছেড়ে বের হতে পারে নি। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হল‘শতভিষা’ (১৯৫১), ‘কৃত্তিবাস’ (১৯৫৩), ‘ময়ূখ’ (১৯৫৩), ‘অনুক্ত’ (১৯৫৬) ইত্যাদি। এরপর ৬০ ও ৭০-এর দশকে আসে আন্দোলন ও সমাজ পরিবর্তনের নতুন ইঙ্গিত। সাহিত্য সমাজের বাইরের কিছু নয়। তাই সমাজ পরিবর্তনের ইঙ্গিতে সাহিত্যেও আসে নতুন মাত্রা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এ সময় শুরু হয় হাংরি জেনারেশনসহ একাধিক সাহিত্য আন্দোলন। এরই ফলশ্র“তিতে জন্ম নেয় ‘উচ্চারণ’ (১৯৬০), ‘নন্দীমুখ’ (১৯৬০), ‘এক্ষণ’ (১৯৬১), ‘শ্র“তি’ (১৯৬১), ‘কবিকণ্ঠ’ (১৯৬৩), ‘অনীক’ (১৯৬৪), ‘অনুষ্টুপ’ (১৯৬৬), ‘সাম্প্রতিক’ (১৯৬৭), ‘সারস্বত’ (১৯৬৮), ‘গঙ্গোত্রী’ (১৯৬৯)। এতো গেল ৬০-এর দশক। ৭০ তখনও জন্ম নেবার অপেক্ষায়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগগুলোর নাম হচ্ছে ‘নক্ষত্র’ (১৯৭০), ‘সত্তর দশক’ (১৯৭১), ‘বিজ্ঞাপন’ (১৯৭৪), ‘গাঙ্গেয়পত্র’ (১৯৭৪), ‘অমৃতলোক’ (১৯৭৭) ইত্যাদি। ঠিক এ সময় থেকে লিটল ম্যাগাজিনের আত্মপ্রকাশ কলকাতার সীমারেখাকে অতিক্রম করতে থাকে। লিটল ম্যাগাজিনের পৌরষদীপ্ততায় আলোকিত হয় ছোট ছোট শহরগুলো। তার আরো অনেক পরে গ্রামাঞ্চল। মুর্শিদাবাদ, ত্রিপুরা, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর প্রভৃতি অঞ্চল ভাষাকে নতুনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। ভাষার আধুনিকায়ন ও ভাষাতত্ত্বের জটিল বিষয়গুলো সামনে আসতে থাকে। শব্দার্থতত্ত্ব ও বাক্যগঠনের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল দেখা যায়। লিটল ম্যাগাজিন ও সংগঠন থেকে একটি নতুন ধারা জন্ম নেয়। আমরা তখন মর্ডানিজম হতে পোস্টমডর্নিজমের দিকে ধাবিত। লিটল ম্যাগাজিন ততদিনে তার আত্মপরিচয় সাহিত্যে সমাজে নতুন পৃথিবীর দ্বার খুলেছে। যাতে সমাজের তথা বিশ্বের সকল অসঙ্গতিকে নির্দিষ্ট করে উত্তরণের পথ দেখানো হচ্ছে।
বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস অনেক পরে। এখানকার লেখকরা তখন কলকাতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠার কাজটুকু শেষ করেছেন। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিনের তেমন কোনো ইতিহাস ছিল না। ১৯২৭-এ বুদ্ধদেব বসু কর্তৃক প্রকাশিত ‘প্রগতি’ (বুদ্ধদেব বসুর সহকারী রূপে ছিলেন অজিত দত্ত)। ১৯৩২ সালে কুমিল্লা থেকে সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ‘পূর্বাশা, এই ছিলো ’৪৭ পূর্ব বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস। ভাষাআন্দোলন পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এসে এদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা শুরু হয়। এ সময় ফজলে শাহাবুদ্দিন বের করেন ‘কবিকণ্ঠ’ এবং সিকান্দার আবু জাফর বের করেন ‘সমকাল’ (সেপ্টেম্বর ১৯৫৭)। তবে সমকালের খ্যাতি লিটল ম্যাগাজিন রূপে নয় বরং সাহিত্যপত্রিকা রূপে অনেক বেশি ছিল। ‘অগত্যা’ বের হত ফজলে লোহানীর সম্পাদনায় ৬০-এর দশকে অবশ্য ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার আসরে বিরাট রদ-বদল দেখা দেয়। এক ঝাঁক তরুণ মুখ সাহিত্য রচনার শক্ত দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তাদেরকে ঘিরে জন্ম হয় ‘স্বাক্ষর’ (১৯৬৩) পত্রিকার। অবশ্য এর পূর্বে ১৯৬২ সালে ‘বক্তব্য’ নামের আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। ’৬৪ সালে আসে বাংলাদেশের সাহিত্য ক্ষেত্রে অন্যতম পুরোধা ও সাহিত্য বিস্তারের অগ্রপথিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয় এ বাংলার অন্যতম আকর্ষণীয় লিটল ম্যাগাজিন ‘কণ্ঠস্বর’ ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘কণ্ঠস্বর’ বাংলা সাহিত্যে একটা নতুন গদ্যরীতির প্রবর্তন করেছিল। ষাট-এর দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক আরো কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে‘উত্তরণ’, ‘অধো রেখ’, ‘না’, ‘বহুবচন’, ‘আরিচা’, ‘কিছ্ধ্বুনি’, ‘রূপম’ অন্যতম।
ষাটের দশকে ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ আরো কয়েকটি জায়গায় লিটল ম্যাগাজিন চর্চা ছিল। এর মধ্যে রাজশাহীর ‘পূর্বমেঘ’ এবং বগুড়ার ‘বিপ্রতীপ’ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০-এ আব্দুল মান্নান সৈয়দ ও আবদুস সেলিম বের করেন ‘শিল্পকলা’, আহমদ আউয়াল বের করেন ‘কালস্রোত’ এবং সৈয়দ আবুল মকসুদ বের করেন ‘সময়’। আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং আবদুস সেলিম ‘চরিত্র’ নামের আরো একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিলেন। ৮০-এর দশকে শেকড় সন্ধানী লেখক ধারায় ফের তরুণ সমাজ এবং এ সময় জাদু বাস্তবতা (যার প্রবর্তক গার্সিয়া মারকেজ), কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ প্রভৃতি নতুন দর্শনের সূত্রপাত হয়। এই সূত্রে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। সে প্রবণতা হতে সৃষ্টি ‘একবিংশ’ ‘প্রান্ত’, ‘সূচক,’ ‘লিরিক’, ‘নিগর্স, ‘অনুশীলন’, ‘প্রাকৃত’ ‘শব্দ শিল্প’, ‘শিকড়’, ‘বিবর’, ‘গাণ্ডীব’, ‘ছাপাখানা’ ‘বালুচর’, ‘বজ্রকন্ঠ’, ‘চিহ্ন’, ‘প্রতিশিল্প’ প্রভৃতি। বর্তমানে সে অর্থে লিটল ম্যাগাজিন নেই বললেই চলে। কারণ যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও বাণিজ্যিক প্রচারণা থেকে লিটল ম্যাগাজিন মুক্ত ছিল তা এখন আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ এবং তা লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রকে হনন করতে উদ্যত। বরাবরই লিটল ম্যাগাজিন ছিল প্রথা বিরোধী এবং আপসকামিতার প্রভাব মুক্ত। কিন্তু অন্যায্য কর্তৃত্ব ও উন্নত দেশসমূহের আগ্রাসী মনোভাব সাহিত্যের সাহিত্যগুণকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে চায়। ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংস আন্দোলন, সন্ত্রাস বন্ধের নামে সন্ত্রাসের রুদ্রমূর্তি ধারণ, ভালোবাসার অপব্যবহার, মোহের অসাড়তা, বিবেকের সিকি দরে বিক্রি এবং আত্মশুদ্ধির অভাবে সব আজ বাণিজ্যিকিকরণ হয়ে গেছে। এই প্রণালিবদ্ধ মারীচ মায়ায় লিটল ম্যাগাজিন কোথায় দাঁড়াবে সেটাই বড় প্রশ্ন।

সহায়ক গ্রন্থ
১. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত–ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, পুনর্মুদ্রিত নতুন সংস্করণ, ২০০২।
২. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (আধুনিক যুগ)–আজহার ইসলাম। অন্যন্যা প্রকাশনী, প্রথম অনন্যা প্রকাশ ও তৃতীয় সংস্করণ–আগস্ট, ২০০১।
৩. প্রসঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন–সন্দীপ দত্ত, ১৯৯৩।
৪. উত্তর প্রজন্ম–আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১৯৯২।
৫. নিসর্গ– লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ। সম্পাদক: সরকার আশরাফ, প্রকাশ–ফেব্র“য়ারী ২০০৭।

অনীক মাহমুদের কবিতা

সুমিত্রাবন্ধন

জিজ্ঞাসা

কীভাবে তোমার কাছে যাই আর্যনারী সংহিতা,
আম্রপালী-সুজাতার মতো বুদ্ধের বিহনে রাত
সাক্ষী যতো তরুবল্লী বৈশালী বিদর্ভে সুপ্রভাত
রামশ্রেষ্ঠি ঢেকে দেবে স্বর্ণমুদ্রা অপূর্ণ পুষ্পিতা
কীভাবে তোমার কাছে যাই? করভাগে প্রণিপাত
দিবাযামে অবান্তর বাক্যালাপ সিদ্ধির সীমায়,
আর কতো বিপর্যয় লুফে নেবে খণ্ডিত নিমাই?
বিষ্ণুপ্রিয়া হতোদ্যম আশালোকে ঘাত-প্রতিঘাত।

দিন যায় রোদের বিবরে নেমে আসে সমুত্থান
নিস্তব্ধতা, ডানে ঝাড়ে ভয়ঙ্কর ক্ষুব্ধ ড্যাম্পায়ার,
সমারুঢ় নচিকেতা নুপ্ত আশা সোনালি কারার
রাহুর মতোন চাঁদে ঝুলে দোলাচল প্রতিদান;
যেতে চাই শ্যামলতা বাউকুড়ি বাতাসের মতো,
অঞ্জনের সিদ্ধিলোকে তোমাকেই ডাকি অবিরত।

 

প্রসন্নের নচিকেতা

বড় ছোট হয়ে গেছে তোমার পৃথিবী নিবারণ
এইবার রিগ্রেশন, দুঃখমোচনের সামিয়ানা
ছিঁড়ে খুঁড়ে নিজের আখেরে সাজো মগ্ন সনাতন,
হাসিনা-খালেদা মহীয়সী এই ত্যক্ত বিবিয়ানা
আপদের কষ্ট ধরে, রাত্রিদিন শঙ্খের পীড়ন
বাঙালির আকন্দ ধুন্ধল হারিয়েছে মুন্সিয়ানা–
মাকালের ওজারতি দিশে দিশে নষ্ট শিহরণ,
আবরাহা হস্তীদল বুঝে নেয় আবাবিল ডানা।

এইসব ঘাসের ঘটনা আবিদের ছিলো মনে,
ধুকে ধুকে ঝিনুকের মুুক্তো খুঁজে গেলেন হাসান
দস্তিদার আকালের মুখে হাসলেন সম্মোহনে
এবার নাচের শব্দ ঢেউ দিয়ে মনসা ভাসান;
তুমি বাছা উটকো কবির চেলা চেলা বেশি নেই,
প্রসন্নের নচিকেতা নিশ্চয় কাঁদবে অচিরেই।

 

সান্নিধ্য

আবার উড়াতে পারি লিলুয়া বাতাসে কথাচূর্ণ
স্বপ্নের চাদর গৃহস্থের ফিনফিনে উত্তরীয়
সেবাব্রতী ধুমুল দুক্ষোভে, সময়ের নাটকীয়
নান্দীপাঠ মেখে দিয়ে হৃদয়ের স্নিগ্ধ উত্তমর্ণ
চিরল সান্নিধ্য যদি চাও সুলোভনা, অধমর্ণ
পরিণাম যা-ই আসুক না কেন অনির্বচনীয়
দায় নিয়ে বুক বেঁধে দাঁড়াবেই ত্যক্ত বরণীয়
আত্মবিক্রয়ের ধারাপট হয় হোক ছেঁড়া পর্ণ।

শুধু চাই ঘনিষ্ঠ আকাশ নক্ষত্র বাতির আলো,
অরুণোদয়ের স্বপ্নভাষ্য সুহাসিনী স্নিগ্ধভোর
যদি পাই কোকিল দাপানো বাসন্তিকা বাহুডোর
সেখানেই হবো দৌবারিক মুছাতে কষ্টের কালো,
সান্নিধ্য তোমার দীপ্র শ্যামলীনা সুদূরের ছায়া,
আলোর ঝরণা ধারা সারাবেলা অর্বাচীন মায়া।

 

সাজানো পুতুল

সাজানো পুতুল যদি অপরের হাতে তুলে দিবে
নিবারণ চকোক্তির হরিদ্বার কোনখানে রবে?
কষ্টের কিরীটে ঝলমলে দীপ্তি প্রিয়ংবদা যবে
সখি-সন্তাপে চিনোবে, শকুন্তলা দুষ্মন্ত শিবে
কতোটুকু আশালতা গজাবে নিঃসঙ্গ মোহন ক্লীবে,
হরিতকী বনে কাকভোর নিমেষেই সন্ধ্যা হবে
আনন্দের নদীগুলো হলুদিয়া ঢেউ খেলে তবে
একে একে বেদনার ছায়াবৃতা সঙ্গে করে নিবে!

রাখালিয়া রাখী পরে কুঁচকন্যা কঙ্কাবতী ভোর
আঁচলের খুঁটে পুদিনা পাতার মতো বেঁধে
হয়তো সহাস্যে পাবে সোনালি দিনের আঁখিলোর,
ভাদ্রনিশীথিনী জ্যোৎস্নাধরে একা একা যাবে কেঁদে;
অনীকিনী সংঘারামে শোনা যাবে মেঘদূতী খতে
যক্ষের বিরহ ধ্বনি রামগিরি উজ্জয়িনী ব্রতে।

 

দায়বদ্ধ ভালবাসা

গলে গেলো নিভৃতির দায় নিয়ে দালির ওয়াচ,
প্রেম নয়, শ্যাম নয়, কূলের কামিনী ব্যবসায়ী
স্বার্থের শেকলে বাঁধা, লক্ষ্যাভিসারিকা স্বপ্নগাছ
কেটে তার গোড়ায় ঢালে যে কাদাজল, পরিযায়ী
পাখিদের চঞ্চুতে লেপটে নিয়ে কথার সুহাস
ওস্তাদি কায়দা মতো সাজে মননের আততায়ী
অকালে বুঝিনি শুধু নিয়তির নিম পরিহাস
হিজলের গলাজলে স্বপ্নগুলো ব্যর্থ শয্যাশায়ী।

আশালতা কী পাবে সোনালি প্রাতে দৃষ্টি দাও ভূমে,
আলোকলতার জড়িমাটা কুলবৃক্ষে ডাঁটোয়ান,
পুরাতন অতীতের গালে সুবর্ণ মায়ায় চুমে
এখনো নিপাট কোহিনূর ঝিলিকের শুদ্ধ মান,
দায়বদ্ধ ভালোবাসা ফিকে হয় দায়হীন হলে,
শুভব্রত দুঃখগুলো ঝরে পড়ে মনের অতলে।

 

দেখা

চলো যাই নিধুয়া বনের শ্যামলতা হাতে ধরি,
সেখানে বিহঙ্গ জ্যোৎস্নামুখী নিরঙ্কুশ প্রেম
চাঁদের সারল্যে জড়িয়েছে স্নিগ্ধকাম আশাবরী,
জোনাকির ঝিলিমিলি শুদ্ধতম নিকষিত হেম,
ভেতেরর বধিরতা অস্ফূট কিংখাবে সাতনরী
হারের তিলকে খোঁটা দেয় অবলীন কৃশ মেম,
ছায়াহীন অপবশে রাত্রি হয় নির্বেদসঞ্চারী
হৃদয়ের লোধ্ররেণু হয়ে ওঠে ফাঁকির টোটেম।

উদ্ভাসনে নতজানু হও! আত্মত্যাগে হও বলী!
বিবসনে প্রিয়ংবদা–সম্ভাষণে আকণ্ঠ কিন্নরী,
কপট মনের গ্লানি ধুয়ে মুছে সন্ধ্যার গোধূলি,
যদি হতে পারো তোমার নিবিদে বয়ে যাবে তরী;
আকাশ গঙ্গায় রাত্রিদিন ভাসবো সহাস্যে একা,
থাকবে তবুও প্রেমার্ত প্রতিমা না হলো যদি বা দেখা।

 

অলকানন্দিনী

ক্লান্ত রজনীর তারাগুলো আধোঘুমে মুহ্যমান,
ভাববিলাসিনী বিহঙ্গের চক্ষুদৃষ্টি ক্ষীণতর
হে আলেয়া সুহাসিনী, চেয়ে দেখো শ্বেত অশ্বযান
অবসন্ন প্রেমিকের লাশ নিয়ে করছে সফর,
বড়াব প্রমীলা তেজঃস্বিনী, তার সম্বোধি সম্মান
দানবনন্দিনী সত্তা মধু কাব্যে হয়েছে প্রখর
দুশ্চর তপস্যা পটে শুধু নেই তোমার ভাসান
আলোকিত প্রহরের গানে কখনোই হওনি মুখর।

না ঘরকা না ঘাটকা হাল্কাচালে মদির যৌবন,
আলুথালু ভালোবাসা ছাই করে উড়ালে আকাশে,
বিষে বিষে জর্জরিত তপঃক্লিষ্ট দয়িত মৌবন–
আত্মসুখকামী প্রণয়ের রঙ দিলে প্রাতঃরাশে
নিজে হলে কালনাগিনীর ক্ষোভে পেটরাবন্দিনী,
দংশনে কামিনী ব্রতে মোচনে হওনি অলকানন্দিনী।

ফারাহ ফাল্গুনী’র প্রবন্ধ

বাস্তবতার আবহে আধুনিক ছোটগল্প

সময়ে সবকিছু বদলায়। বদলায় মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সভ্যতা। মানুষের জীবন যাপনের ধরন যেমন পাল্টে গেছে তেমনি যোগ হয়েছে কত বিচিত্র সমস্যা। জীবন এত বিচিত্র যে একে একটি নির্দিষ্ট ছকে বাধা দুষ্কর। জীবনের এই বিচিত্র দিকগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে সাহিত্যের পাতায়। বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছোটগল্প। এটি যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়ও বটে। এসব গল্পে উঠে এসেছে সমাজের উচ্চশ্রেণী থেকে নিুশ্রেণী, শাসক-শোষক, বঞ্চিত মানুষ, শ্রমিক, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, জীবনের বাস্তব অবস্থা এবং অপ্রকাশিত দিকগুলো প্রতিবিম্বিত হয়ে উঠেছে।
দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আত্মজা’–গল্পটিতে দেখতে পাই একটি নারীর নীরবে, নিভৃতে অবহেলিত, উপেক্ষিত হবার চিত্র। গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পাই রানুকে। তাঁর জীবনটা ছোট ছোট ভালবাসার অনুভূতি দিয়ে সাজানো। তার ভাললাগার মাঝে একটা উন্মাদনা ছিল কিন্তু এখন সেটা থিতিয়ে আসছে সেটা হতে পারে সময়, বয়স কিংবা একঘেঁয়ে জীবন-যাপনের গ্লানি। গল্পে দেখতে পাই রানু মাঝে মাঝে ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে পানীয়ের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সে অতীত স্মৃতি হাতরিয়ে ফিরছে। একটা সময় ছিল যখন সূর্যের লাল আভা তার মনে গোধূলির রং ধরাত। বাবার সাথে বই পড়া, আকাশ দেখা; মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানি গান শোনাত বাবা। কতশত যে ভালবাসার আনন্দময় স্মৃতি। আপাদমস্তক শিল্পিত নান্দনিক এক পুরুষের ছবি ভেসে ওঠে রানুর চোখের সামনে সে তার বাবার ছবি। তার এই একাকিত্ব বাবার মৃত্যুর পর। আর তার সাথে মায়ের স্মৃতি জড়ানো দিনের কথা মনে পড়ে। মায়ের শূন্যতায় তার বুক হাহাকার করে ওঠে। আমরা শেষ পর্যন্ত দেখতে পাই বাবার উপরে রানুর যত রাগ, ক্ষোভ, অভিমান। সে মনে করে তার বাবা যদি মায়ের সব খোঁজ-খবর দেখাশুনা করতো, অসুখে ভালভাবে ডাক্তার দেখাত, মাকে সময় দিত তাহলে তার মাকে অকালে হারাতে হত না। তার মা সব অভিমান চেপে রেখে, সব কিছু মেনে নিয়ে নীরবে নিঃশেষ হয়ে যেত না।
শেষে গল্পটা খুব ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। রানুর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে–“বাবা তুমি আমার জীবনে সব থেকে প্রিয় পুরুষ। তোমাকে ভীষণ ভালবাসি আমি। মার অসুখটা হয়ত তোমার দেয়া নয় কিন্তু অবহেলাটা তোমার। মার প্রতি উদাসীনতা, অবহেলার জন্য তোমাকে আমি কিছুতেই ক্ষমতা করবো না। গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না তার। ঝাপসা দৃষ্টির সামনে এক নারীর অস্পষ্ট ছায়ামুখ ভেসে উঠে। সে মুখের সঙ্গে মিলে যায় পৃথিবীর সব অবহেলিত, উপেক্ষিত, বঞ্চিত নারীর মুখ।”
এখানে দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফলতা হচ্ছে সহজ, সরল, আর নান্দনিক বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকদের একটি বাস্তব আবহের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। আমাদের সমাজ বাস্তবতায় নারীরা সমাজে, পরিবারে, স্বামীর কাছে সর্বদাই উপেক্ষিত। নারীরা আজ তিলে তিলে শেষ হয়ে যেত না যদি তারা পরিবারে, স্বামীর কাছে ভালবাসা পেত। তাহলে রানুর মত কেউ একাকিত্বে ভুগত না।
রফিকুর রশীদ অসামান্য বর্ণনা ভঙ্গিতে–‘তবুও অরুন্ধতী’ ও ‘তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর’–গল্প লেখেন। ‘তবুও অরুন্ধতী’গল্পের নায়ক বলে গেছেন তার আত্মকথন। প্রেমের গল্পই বলতে হবে। দু’টি মনের কত স্বপ্ন বোনা, আকাশ দেখা, একসাথে পথচলা। দীর্ঘ দু’বছর তার পরিপূর্ণ প্রেমের আবেগঘন বর্ণনা। অবশেষে তাদের এই প্রেমের পরিণতি ঘটে বিয়েতে। তারপর তার সেই আবেগ, ভালবাসা, ভাললাগা আর তাকে টানে না। সবকিছু তার পীড়ন মনে হয় এখন। একমাত্র কারণ তার বেকার জীবন। বেকারত্ব কত যে দুর্বিষহ, অসহ্য, সন্দেহপ্রবণ করে তোলে নিজেকে। গল্পকার এই গল্পের মধ্যে দেখাতে চেয়েছেন যে বেকার যুবকের কাছে সবকিছু ফ্যাকাশে এবং কোন অনুভূতি তাকে স্পর্শ করে না। কিন্তু তার অরুন্ধতী মানে মৌলি সবকিছু মেনে নিয়েই চেয়েছে তাকে নিয়ে স্বপ্ন বপন করতে। এই গল্পে আর একটি বিষয় ফুটে উঠেছে সেটি হল পতীব্রতা। মেয়েরা সবকিছুর বিনিময়ে চায় স্বামীর ভালবাসা। এই গল্পের ভাষা, বর্ণনা খুব আবেগঘন এবং গোছালো। একটি মানুষের স্বপ্ন দেখা এবং সেটি ভেঙ্গে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। বেকারত্ব তাকে ব্যর্থ নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তার অপর গল্প ‘তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর’–এ পাই অতি বাস্তব একটি উদাহরণ। গল্পের শুরু নিখিলেশের ভাগ্নি হারিয়ে গেছে। অরুণিমা তার ভাগ্নি। এ তথ্যটি নিয়ে সে যখন থানায় যায় ডায়েরি করতে তখন পুলিশের দায়িত্বহীনতা ও কলুষিত চেহারা দেখে। তাকে অনেক বিশ্রী প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় এবং অনেক কথা শুনতে হয়। দারোগার সহানুভূতিশূন্য কথা, মন্তব্যে নিখিলেশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। থানা পুলিশের কাছে মানুষ কতটা অসহায় তা এখানে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে
“ক্ষোভে-দুঃখে-ক্রোধে নিখিলেশের মাথায় চুল পর্যন্ত খাড়া হয়ে ওঠে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে দারোগার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু টেবিলের উপরে পড়ে থাকে অরুণিমা সম্পর্কিত তথ্যাবলী লেখা কাগজটি”।
এরপর গল্পের মাঝামাঝি পর্যায়ে রাজনৈতিক বিষয় উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দ্বিমতের কারণে ক্ষেতের সমস্ত পাকা ধান কেটে নেয়ার কথা আমরা জানতে পারি। অরুণিমার বাবা নিত্যানন্দ বর্মণ নির্বাচনের ডামাডোলে অংশগ্রহণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য। তার আক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে নি বলে এই নির্বাচনে সে পরিপূর্ণ যুদ্ধ করবে। কিন্তু এর ফলে তাকে কঠিন খেসারত দিতে হয়েছে। সে হয়েছে নিখোঁজ। তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে ধর্ষিত হওয়ার অপমানে। ভেঙ্গে গেছে তার সোনার সংসার। গল্পের শেষের দিকে নিখিলেশের স্ত্রী সুনন্দা ও মেয়ে লোপা থানায় যায় সম্ভাব্য অরুণিমার লাশ সনাক্ত করতে। যখন দেখতে পায় লাশটি অরুণিমার নয় কিন্তু তার অন্য একটি মেয়ের তখন সুনন্দার পূর্ণ মাতৃত্ব জেগে ওঠে। সে অবাক বিস্ময়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ সে জানে নিরাপত্তাহীন সমাজে অরুণিমা কিংবা লোপারও এই অবস্থা হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটের থানা-পুলিশ, রাজনৈতিক অবস্থা, খুন, ধর্ষণ এই নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়গুলো সুনিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন গল্পকার।
মঞ্জু সরকারের ‘ডুবে যাওয়ার অপেক্ষা’–গল্পটিও বাস্তবনির্ভর একটি কাহিনী। চাকুরিতে সৎ লোকের প্রাধান্য নেই সেটিই ফুটে উঠেছে। অফিসের গোলমাল, বসের সঙ্গে বিরোধ, অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্যে মানিয়ে নিতে পারে না আবুল কালাম। সত্য কথা বলার অপরাধে অফিস তাকে বরখাস্ত করে। কিন্তু এতে এতটুকুও ভাবান্তর হয় না বরং মনে হয় সে মুক্তি পেয়েছে এই নোংরা জায়গা থেকে। মাথা গোজার ঠাঁইটুকু নিয়েই সে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে। অবশেষে সে একটা বিকল্প চাকুরির সন্ধান পায়। সম্পর্কে মামা সোলেমান সাহেবের টেক্সটাইল মিলে। সেখানেও সে আশাহত হয়। কারণ সে এলাকায় মিলটি যাতে ভালভাবে চালু করতে পারে সেজন্য কালামকে দায়িত্ব দেয় স্থানীয় মাস্তানদের খোঁজ-খবর রাখতে। কিন্তু যেদিন দেখল সেই মাস্তানরাই তার বাড়িতে এসে চাকুরি বাবদ চাঁদা দাবি করে। তখন কালাম হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ভাবে– “সত্যিই কি তবে কালামের চেয়েও এসব মাস্তানরাই তবে অধিক বিশ্বস্ত ও নিকটজন।”
আমাদের দেশে এরকম লোকের কোন মূল্যায়ন নেই। তাদের সবসময়ই অবমাননা করা হয়। অপমৃত্যু হয় সত্য, স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষার। এসবের কি অবসান হবে না কখনো? তবে আবুল কালামের পরিবারের ভার কে নেবে? তার পরিবারকে বাঁচতে হলে কোন বিবেকবান মানুষের দরকার আছে।
এরপর আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘আউলা বাতাস’–শুরু হয়েছে গ্রাম্য প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে। সহজ-সরল, রতন তরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। সে ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে। সে তার মায়ের একমাত্র অবলম্বন। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন অনেক আশা তার মায়ের। অন্যের বাড়িতে কাজ করতে করতে মা ভাবে আর তো কদিন তারপরই তো তাকে আর মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিন্তু এক আউলা বাতাস এসে সব ওলোটপালট করে দেয় রতনকে। গল্পকারের বর্ণনায়–“নির্জন বনভূূমি অধ্যুষিত এই রোদ্দুরি প্রত্যুষ হঠাৎ করে কি যেন এক রহস্যময় বার্তা নিয়ে এল রতনের কাছে। ইউ লিভ হিয়ার, বয়? লোকটা এবার প্রশ্ন করে এগিয়ে গেল রতনের কাছে। তার শরীর থেকে অপূর্ব এক ঘ্রাণ বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। সুখী মানুষের ঘ্রাণ। সুখী ও সচ্ছল মানুষের ঘ্রাণ। সুখী, সচ্ছল ও সমৃদ্ধশালী মানুষের ঘ্রাণ। বিহ্বল রতন এই ঘ্রাণ বুকে টেনে নিতেই তার ভেতরে যেন আলোড়ন শুরু হলো।” সেটা ভয়ের কি উত্তেজনার সে জানে না। লোকটা যখন চলে গেল সে তার পথের দিকে চেয়ে থাকলো। কিন্তু গরীব রতন কি করে। সে যে গ্রামে বাস করে সেখানে কোন বিদ্যুৎ, টেলিভিশন, মোটর গাড়ি, নেই কোন আধুনিকতার ছোঁয়া। সে যে গণ্ডীর মধ্যে বাস করছে তার বাইরেও যে এক বিশাল পৃথিবী আছে সেটা তার অজানা। আশার ব্যঞ্জনায় ভরে উঠতে লাগলো তার বুক। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া হয় না তার। সে কেবলি উদাস হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ যদি তাকে সেই অজানা পৃথিবীর সন্ধান দিতে পারে এই আশায়। এমন অনেক রতন আছে আমাদের সমাজে যারা সুযোগের অভাবে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়।
শিশু মনস্তত্বের সম্পূর্ণ পরিচয় ফুটে উঠেছে মাহবুব তালুকদারের–‘পাখি আমার পাখি’ গল্পটিতে। খ্যাতনামা পাখি-বিশারদ হাবীব হাসান পাখিকে খুব ভালবাসে। সে কোনভাবে মেনে নিতে পারে না পাখি শিকার করাকে। তারই মেয়ে নায়না বায়না ধরেছে তাকে পাখি কিনে দেবার জন্য। হাবীব হাসান তাতে রাজি না হলে তার স্ত্রী চায়না গিয়ে তার মেয়েকে একটি ময়না পাখি কিনে দেয়। সেই ময়না পাখিকে ঘিরেই ছোট্ট মেয়েটির কত কথা, কত আনন্দ। সারা বাড়িটাই সে মেতে রাখে। এই পাখিকে নিয়ে সে অদ্ভুত সব কথা বলে। পাখিকে ঘিরেই তার একটি চিন্তার জগত তৈরি হয়। সে তার বাবাকে বলে পাখির খাঁচার কাছে কয়েকটা টবের গাছ এনে দিতে। তার মনে হয় পাখি গাছ দেখলে আনন্দ পাবে আবার কখনো পাখির কষ্ট বোঝার চেষ্টা করে। তাই সে পাখিটিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দেয়। পাখিকে সে এত বেশি ভালবাসে যে যেন তার সাথে ময়না কথা বলে। পাখির প্রতি ভালবাসা, পাখিরা যে বন্ধ খাঁচায় থাকতে চায় না, মুক্তির আস্বাদ পেতে চায় তা এতটুকু মেয়েও বোঝে। একটি শিশু যখন একটি সুন্দর পরিবেশ পায় তার ভাবনার বিস্তার তত বেশি প্রসারিত হয় এবং উদার চিত্তের অধিকারী হয়। গল্পকার অত্যন্ত চমৎকার ভাষা-শৈলীতে নির্মাণ করেছেন এই গল্পটি। যা পাখিপ্রেমীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
সমাজ বাস্তবতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে হুমায়ূন মালিকের–‘ও এখনো যুদ্ধে’ গল্পটি। দীর্ঘ এ গল্পে আছে ইতিহাস আর তাহলো পাহাড়ি এবং সমতটিদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের ইতিহাস। যার জ্বলন্ত সাক্ষী হচ্ছে মেন্টাল হসপিটালের এক রোগী। তার যথাসাধ্য ট্রিটমেন্ট চলছে তার মাঝে সে প্রলাপ বকে যাচ্ছে–“ভাইয়ের খুনের উপরে বউরে রেফ করতে করতে আমারে নির্যাতন করতাছ নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে।” এই রোগীটি হচ্ছে প্রজ্ঞা প্রসাদ। সে তার ভাইকে হারিয়েছে, স্ত্রীকে হারিয়েছে। তার বড় ভাই উপল প্র“ পাহাড়িদের প্রত্যক্ষ ভোটে জয়ী হয়েছে। এ্যাডভোকেট উপল প্র“ যখন পাহাড়িদের পক্ষে কথা বলে তার উপর প্রেসিডেন্ট ক্ষেপে যায়। পাহাড়ি দুর্গত এলাকায় প্রেসিডেন্ট তার সফর সঙ্গীসহ পাহাড়ি সৌন্দর্য অবলোকন করে। তাদের সমস্যার কথা কানেই নেন না প্রেসিডেন্ট। এক পর্যায়ে সমতটিদের হাতে নিহত হয় উপল প্র“ তার ছোট ভাই প্রজ্ঞা প্রসাদের সামনে। এতে প্রজ্ঞা প্রসাদ পণ করে যে করেই হোক তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ সে নেবে। এর ফলে সে একটি সেনাবাহিনী গঠন করে। অবশেষে প্রজ্ঞা প্রসাদ হেরে গিয়ে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। সবকিছুর বিনিময়েও সে প্রতিশোধ নিতে পারলো না। ৩ মাস পর স্পেশাল ফোর্সের কম্বিং অপারেশনে দল সশস্ত্র জওয়ানসহ ধরা পড়ে যায়। তাকে পাঠানো হয় মেন্টাল হসপিটালে। সে মানতেই চায় না এটা মেন্টাল হসপিটাল।
“আমার যুদ্ধ শেষ হয় নাই…ও এমন এক সশস্ত্র ভঙ্গি নেয়, তরুণ সাইকিয়াট্রিস্টের মনে হয়, এস্কাল্পচার সর্বকালের সেরা মুক্তিযোদ্ধার।”
হুমায়ূন মালিক তার দীর্ঘ গল্পে খুব সুন্দরভাবে ঘটনার বর্ণনা করেছেন। যা একজন সার্থক গল্পকারের পক্ষেই সম্ভব।
শেষে বলা যায় অনেক গল্পকার আছেন যাদের গল্পের মেসেজ অনেকখানি দুর্বোধ্য থেকে যায়। তারপরও আধুনিক অনেক গল্পকারদের গল্পে সমাজের যাবতীয় সমস্যা, ব্যক্তির একাকিত্ব, অসহায় বোধ, পশুত্ব সবকিছুই অবলীলায় প্রকাশিত হয়েছে এবং বাস্তব অবস্থাগুলো এত সক্রিয়ভাবে উঠে এসেছে যে গল্পগুলো আমাদের মনে গভীর দাগ এঁকে দিয়ে যায়। শুধু বাস্তব অবস্থাই নয় গল্পের চরিত্রগুলো সমাজের নানান মানুষের প্রতিনিধি। এসব গল্পের শিল্পশক্তি বাংলা আধুনিক ছোটগল্পকে অনেক সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।

আহমেদ ইউসুফের কবিতা

বৃষ্টির নৈবেদ্য

বর্ষা আসে নাই; আমি খণ্ড খণ্ড মেঘ বৃষ্টিরূপে ঝরি
পথহীন পথে …
ঘরের চাল কি ভিজে যায় শাড়ির আঁচলে?
শাড়ির শিশির জলে তবু ভেসে যায় মানবরমণ।
তখন তো আমি পৌরাণিক চিত্রে কোনারক-অজন্তার গুহা :
ধূসরে ধূসরে সৌন্দর্যের ধূতি;
আহত সালিনী
মধুচক্রে অধিক মৌমাছি রানি
বনের মধ্যে মাংসাশী!

দ্বিধার জন্মে শিকার; বনেতেও নেই ঘাইমৃগী
তবু কেমন আমেজে ছুটে আসে মাদক মাধুর্যে
খণ্ডিত কুস্তরী
আমি তবু খণ্ড খণ্ড মেঘ তোমাকে–তোমারে
বৃষ্টির নৈবেদ্য বলে চিনি …

এলান; তামাক খেয়ে মৃত্যুকে ডরাই

যে যে মেঘ মেঘবতী নয় সে মেঘের ষোড়শী কলস ডুবিয়েছে
বোরো মওসুম রবিশস্যের ভাণ্ডার,
হাড় ও করোটির গান গেয়ে ডুবিয়েছে গবাদিপশুসহ বিকালের সোনা
অধিক ডুবেছে কবি–মেঘহীন পূর্ণস্তনী তোমার মেঘবতী মেঘে…
বসন্ত পেরিয়ে হেমন্তের রক্তরাগে…

ভেসে ওঠে মায়াবৃক্ষের শিকড়,
জেগে ওঠে অফলার মূলে জগদীশের ক্রিস্ট্যাল রিসিভার;
জাগতে জাগতে জেগে ওঠে তোমার কালো বেদেনী কেশদাম।
জেগে উঠল বুঝি তামাক দৃশ্যে হারানো প্রেমঅনল?

ফেরেনি–আসেনি–ফেরে নাই
শোকভ্রম ধূলি–
কিংবা উদিত নক্ষত্রবীথি
তবু ধূলিকে বলি, তুমিই হও মায়াবতী বৃক্ষনদী; হয়েছো নিঃশ্বাসের গন্ধমুকুল মৃগনাভী …

একদা তুলসী পাতায় বেঁধে জীবন হয়ে যাবে মদ ও তামাক
একদা লাবণ্যে ধেঁড়ে ইঁদুর অথবা দিন ও রাত্রির আবর্তন
বৃষ্টির বর্ষায় ফোটাবে ডুমুরে ফুল
একদিন এই পদ্মা-মেঘনা যৌবনও হবে করোটি ও হাড়
কখনো পাথরগুণে কষ্টি অথবা পরশ …
তবু বৃক্ষ নদী পুশ ও পর্বত সাক্ষী
সাক্ষী আসমানের তারা
সাক্ষী পৃথিবীর শেষতম পবিত্র গ্রন্থের …
বসন্ত কিংবা হেমন্তে, শীত কিংবা গ্রীষ্মে
রমণী মানে এখনো তুমি; কত রাধিকা ফুরালো …

মুদ্রারহস্য

নেচেছি মুদ্রার তালে–খালি কলসের শব্দ জনপদে জনপদে।
সূর্যাস্তের রোদ আদম ও ঈভের প্রত্ননাব্যতা খুঁজতে খুঁজতে স্থানু গন্ধমরহস্যে।
কারুন-সেকান্দার-সোলায়মান-শাদ্দাদ আজো কি মুদ্রারহস্যে খুঁজে নদী সমুদ্রের বালিকণা?
জানি তোমার আঁচল ধরে উড়ে যায় বোরো মওসুম, রবিশস্যের ভাণ্ডার।

অধিক নেচেছে মুদ্রাপশ্চিমী সুরা রহস্যে
হিমশৈলের আঘাতে তাই বুঝি ভাঙতে থাকে টাইটানিকের বিত্ত-বৈভব?
তেলরহস্যে অমীমাংসিত ত্রিখণ্ডিত সাদ্দাম বীরপুত্র ইরাক
কখনোবা মুদ্রারহস্যে মুদ্রিত আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরে শা’জাহানের তাজমহল …

উড়ে যায় প্রাণপাখি। খাঁ খাঁ ঘরদোর। বাড়ির উঠোন।
শূন্য বুঝি শীতল সবুজে খড়ের আগুন?
নিভে যায় চাঁদ; নিভে যায় সূর্য; নিভে আসে অনন্ত নক্ষত্রবীথি
তবু জ্বলতে থাকে হৃদয়রহস্যে লাল নীল পাথরে পরশ পাথর….

একদিন আনাচে কানাচে, মাঠে-ঘাটে অথবা বন্যার ধাবমান স্রোতে
চোখের জলে ফ্রেমবন্দি হয়ে নদীরহস্যে
নেমে পড়ে, নেমে যায়
বিকালের সূর্য … বর্ষার কদম্ব ফুল …

সিডরের ধূলি

ধূলিকে সিডরের নিকট পাঠাতেই ধূলি হল
মেঘনার নদী 
গঙ্গায় ফারাক্কা;
জানি অবহেলা পেতে পেতে অবহেলার অন্যনাম ভলগা হয়ে যায়
নিরন্তরে লেলিনগ্রাডে পুঁজির ঊর্ধ্বগতি …

তবু যে জ্ব্লে জ্বলে ভাবনার লোবানজ্বলে যায় প্রাণের পিদিম
যে জল পুড়ে ধূলির অনু-পরমাণু
অথবা নোনা উপকূলে লাশের পর লাশ …
সে কি তবে আলোহীন নিরাকারে বিম্বিত আঁধার?
তার কোলাহলময় নাচ শূন্য প্রণিধান …

অধিক গেয়েছে মানুষ বেদনার সাযুজ্যস্বর;
মাঠ ও ঘাটের মাঠে শুয়ে দেখেছে বুঝিবা কার্তিরে চাঁদ?
ভাবনার অষ্টকলা জাতিস্মর ভেবে
ভেবে যায় মধ্যরাতে মদ-ফেনিলের নিশিফণা …

তবু হে মুগ্ধযামিনী, দেখো, সিডরের ধূলি
পাহাড়পুর-অজন্তা-কোনারক হতে হতে
উড়ছে দুবলার চরে, উড়ে যায় উপদ্রুত শরণখোলায়…

লেজীয় সুসমাচার

কার লেজ নেই? সমুদ্র-জঙ্গলে বেদান্তের লেজ দেখি,
আর্য নাম হয়ে গেলে পরে থাকে আর্যলেজে অনার্যীয় বহ্নি,
ইলিশের পেটে দেখেছি তিমির আনাগোনা; বনসাইয়ের বন বোনে
ঘাই হরিণীর মৃগনাভী কামের ছন্দতুলে নূপুর তানে;
বিয়ারের লেজ বড় হতে হতে সভ্যতীয় লেজ
বোমাঘাতে তবে লেজের লেজত্ব বেড়ে যায় চতুর্গুণে।

গির্জায় লেজ মন্দিরে লেজ; লেজের বিস্তার দেখি মসজিদ-প্যাগোডায়
যারা কিনা পেঁচা-ভূতো চোখে দেখে ফেলে
অদ্ভুত আঁধারেও আলোর সুবর্ণ রেখা; জন্ম-অভিলাষে
পরজন্মে নিমগাছ হবার প্রার্থনা অথবা কৃষকি মাঠে
ফেনালেজে বসন্তের মাঠ অথবা নদীজন্মের আগে মেঘলা আকাশ…

তুমিও রয়েছো লেজে বাঁধা; কোনারক ইলোরা অজন্তায় অজস্র তোমার লেজত্ব
হৃদয়েতে করেছি ধারণ; আফ্রোদিতে ভেনাসের লেজত্ব মহিমা
লোক মুখে মুখে। বল কে দেখেনি হেলেন-ক্লিওপেট্রার শরাবী শরীরে মজে?

কামের লেজ তো সমুদ্র গর্জন; নিরন্তর স্নিগ্ধতার জলে
একদা রঙিন লেজ উড়ে যায় রূপের অরূপে মজে …

শিকড়

মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বে মজে শরীরের ঘ্রাণ ভেসে আসে চিদাকাশে।
ভাবিমন্দির দেহলিতে এ কার ঘ্রাণ?
মাধবের ঘাণ অনুভব করেছি অশান্ত নোনাজলে
গন্ধবতী দেহ উড়ে গেছে বসন্ত-ফাগুনে
জাফলং-এর যাদুময় দৃশ্য হাতড়ে ফিরেছি পতেঙ্গার ঘোলাজলে
তবে এ কার কামিনী ঘ্রাণ অনুভব করি জীর্ণ সাদা পৃষ্ঠে?

জোনাকঅলা দেশ তেলের গন্ধ খুঁজে হয়রান
পশ্চিমের কিউবিজমে ফানুস পাবলো পিকাসো
ভ্যানগগের সূরায় বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুম
ইলিয়ট কি তবে ডাকছে প্রত্নতত্ত্বে?

শূন্যতার ঘ্রাণে আমি অরণ্য গড়েছি
পুণ্যতায় মায়ার বাঁধন
একদা দেহের ঘ্রাণে ঘ্রাণে নোঙর ফেলেছি গ্রাম্যজলে
কোথায় এ গন্ধবতী ঘ্রাণ?

ভাঁজে ভাঁজে গন্ধ খুঁজি তোমার দেহসন্ধিতে;
তোমার শরীরও নিঃস্ব লেহনে পেষণে–
তবে কোন ঘ্রাণ ছড়ালো শরীরে?

আবার মজি ফ্রয়েডে। মনঃসমীক্ষার ফ্রে’ডি হয়ে
ফ্রে’ডির ফ্রয়ডে আমি ম’জে যাই আমার ফ্রয়েডে॥

বৃত্তসমগ্র

আত্মবৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে বন্দি নিজস্ব বৃত্তেই।
যত স্বপ্ন তত আমার কোলন সবই মরীচিকা হয়ে উড়ছে
এখন দিগন্তের পথ ও পথান্তরে।
মিথ বলে প্রত্নতত্ত্বে দেখি, চক্র আবর্তনে নদীর দু’কূল ভাঙে
জলের বিভ্রমে …
আঁকছি তোমাকে আত্মবৃত্তেজলচরে জলযান ওঠবে কি জেগে?
শূন্যের অসীম এখানে নিশানা ফেলুক যুগ্মসরলে …।

০২
গ্রাম্যধ্বনি তুলে নিজস্ব বৃত্তের বৃত্তে আরেক নিজস্ব বৃত্ত গড়ি।
যেথা তুমি কিনা উঠোনের মেয়েনদী অষ্টদশী
তীরের গর্জনে ফণার তরঙ্গধ্বনি!
প্রত্নতত্ত্ব ভুলে গ্রামীণ রমণী ….

নেপথ্যে তবু লোকের শ্লেষধ্বনিহরষে বিষাদ
তবু বৃত্ত নাচ ভেঙ্গে অসীম বৃত্তে মিশছি …

ময়না দ্বীপ

‘এসো, অন্ধকারে নামি’ বলতে বলতে নেমে যাচ্ছি অতল আঁধারে।
আশ্চর্য নিজেরা–এ অতলে এক স্বর্ণ পাখি
কণ্ঠেতে যার ঝরছে বসন্ত সঙ্গীত
কিয়দ্দূরে তার স্বর্ণালী পালক
বুঝি যেথায় বুদ্ধের নিগূঢ় নির্বাণ …
‘না, না, আরো অতল আঁধারে জীবনের সুখ।
ওই বৈদগ্ধ্য অতলে যাও’।

ডুবোরণতরী বেগে যাচ্ছি মনুষ্য জীবন।
সেখানেই বুঝি মোহনা মোহন?

বেদনা মুখস্থ মুখ–ডানা ঝাপ্টে নাই চিরায়ত চিঠি
আত্মা, তোমরা কি যাচ্ছো অতলের অতল আঁধার?

কাঁদছি মাতম বেগে …
অচেনা সুখদ সুখ পালক রহস্যে উড়ে যাচ্ছে
বিমোহভোর বাতাসে …

 

বসন্তে ফাগুন আসে

মাটির মূর্তি ভেঙ্গে পড়ে; জেগে থাকে কৃষ্ণপক্ষের স্বাতী তারা
চাকার শব্দে জাগে আদিম পাহাড়পুরের পুরান কথা
লখিন্দরের লোহার বাসর কি ভেঙ্গে যায় ফণী-মনসায়?
আজো তবু মহাস্থানগড়ের ভূমি সর্পে ভীত চাঁদ সওদাগর।

মানুষ হেঁটে হেঁটে হেঁটেছে চাঁদ-মঙ্গলের দেশ;
পাথ ফাইন্ডার ডিস্কোভারী পৌঁছে যায় শূন্য গগন;
সুপার নেটে এসে যায় বিশ্বায়ন
কবির কলম একটি আঁচড়ে আঁকে
জীবন জটিলতার সমুদ্র সংঘাত …

তবু হারি তবু জিতি তবু হৃদয়ে ঘন বেদনার সংশয়
তবু অজানা আঙুল হেলনে কাটে আমাদের অষ্টপ্রহর।

পুনশ্চ সম্পা নদী

সম্মুখে যে নদী বেজে ওঠেতার নাম রাখি বিবেকানন্দের মায়াবাদ
গৌতমবুদ্ধের হীনযান মহাযান;
যিশুর ত্রিত‘ত্ত্ববাদ রাখতে পারাতম!
তবু নির্বাণ রহস্যে এক অদৃশ্যিত নদীফোঁটা ফোঁটা জল হয়ে নাকফুল
নাকফুলই বা বলি কেমনে–সেটা হয়ে যায় মুহম্মদী স্রোতসিনী।
জানি, স্মৃতির নদীতে অসংখ্য গাঙচিল উড়ে যায় ডানা মেলে
পালক রহস্যে
জানি, রঙধনুর আবিরে মেতে ওঠা বর্ষা সন্ধ্যা আঁকে
যৌবনের ব্যথিত বেদন …
বুঝি ধূলিছাই ধূলোজল ধূলোপথ–হয়ে যাবে শীত রাত্রির উষ্ণতা!
হবে বুঝি?
তবু, কেটে যায় অনন্ত সময়–বেঠোফোনী অন্ধগীতে
চোখের পলকে
অস্তমিত কালের গৌরবে
জীবনের বোধিদ্রুমে
কে যেন পাবক শিখা জ্বেলে ডেকে যায় মদহর্ষে
রাত্রির নরকে।
কে? সে তুমি? বলে নড়ে চড়ে বসি।
পুনশ্চ সম্পা নদীতে ডুব দিয়ে খুঁজতে যাই
যে জলে আগুন জ্বলে
সে জলের ভস্মাধার॥

 

প্রার্থনার ভাষা

এ মুখ নিষ্পাপ বলতেই তুমি নীলাম্বরী মেঘ হতে হতে
গঙ্গাজল-নিরঞ্জনা নদী।
কী রূপে ভাসিব জলে?
সাঁতার বিদ্যা তো রপ্ত করি নাই অধিকন্ত নামিনি কখনো
জলের বিভ্রমে, মুখ কতটা সূর্যিত রৌদ্রে রবে দাঁড়ানো ঈশ্বর?
জানি না হে মুগ্ধরাত্রি, যামিনীভেনাস।
জেনেছি জলেও নাকি মৎস্য সম্প্রদায় সম্মিলিত সুরে ধরে
কুয়াশা সঙ্গীত
মেঘেদের গান।
মেঘ বুঝি জলেরও প্রণয়িনী?
ভাস্কর্যরূপে বেষ্টিত আধুনিক যুগনেমে যাচ্ছি জলে।
জলের ভিতর কি জলের মায়া মায়াময়রূপে অনবদ্য বৃষ্টি হবে?

অগ্নিঝরা দিন ঘরে ঘরে প্রস্ফুটিত হয়
রবীন্দ্র-নজরুলের গীতো হয়ে …

স্বপ্ন-মৃত্যু

চোখে যার পুরোনো কালের স্মৃতি; তারই তো ক্ষোভে বেঁকে আসে
মায়াবী শৈল্পিক হাসি।
হাতের অদৃশ্য যাদুতে ঝরছে বুঝি ম্যাডোনা সঙ্গীত?
হৃদয়ের রক্তে তবু নেচে ওঠে ব্রাত্যজনের বারোমাসী গীত।

মাঠে নেমে ঘাটের শূন্যতা
দু’একটা ইদুর সেজেছে বসন্ত কোকিল …

জেনে যাচ্ছি তোমার উনুনে
আমার স্বপ্নসমেত পুড়ছে পুরো পৃথিবী॥

আবুবকর সিদ্দিকের কবিতা

অঙ্গারজ্বলন

তুমি কি অশরীরী?

পেছনদুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে আছো সে কবে থেকে,
পদশব্দ পাইনি তো! নামে হিম, ঝরে পাতা।
তুমি কি অশরীরী? কোথায় ছিলে দিনভর? কেন
দ্বিধা দিবালোকে দেখা দিতে? শুনশান সন্ধে নেমে
আসবে এখুনি। আঁধারমৃত্যুর গরল জরানো
নিকষ আঁধার। নিশাচরী! রাতই তোমার তবে
পর্যটনবেলা! ভেবেছি নৈবেদ্য দেবো রক্তনালে,
পশ্চিমদিগন্ত হতে ধেয়ে আসে কালো ধূলিঝড়।
তোমার দেহের ঠাম পটভূমি সব মুছে গেছে।
শুধু ধূলোর আস্তর। আমার রৌদ্রবেলা অনেক
স্বচ্ছ ছিল! নামফলক পড়া যেত সড়কের। তুমি
কোথায় কোন্ কটোরায় লুকিয়ে ছিলে কায়াহীন?

গলিমুখে উন্মাদের অট্টহাসি। ন্যাড়া শালগাছ।
মাদীশকুনেরা লাশ ঘিরে মাথা চাপড়ায়।
অরোধ্য বমনোদ্রেক। এ সব কিসের লক্ষণ গো?
ঝেঁপে আসে কালিমেঘ। কেন ওবেলায় আসোনি যখন
দিনের আলোয় পড়া যেত প্রতিটি করের রেখা?
যারা আজন্ম ঘরউদাসী ঠাঁইনাড়া, জানতাম,
কবরের তাম্বুতেও সেবাআত্তি জোটে না তাদের।
২২.৪.২০০৭

হে সধবা!

বারাণসীধামে বিধবারা সূর্যমন্ত্র জপে ভোরে দশাশ্বমেধ ঘাটে!
তুমি কি আমাকে জপো রাতভোরের সূর্যকে সাক্ষী রেখে?
জানি তুমি এখনো সধবা। আমিষবিলাসী বটে। বিধবারা
নিষ্ঠুর নিরামিষাশী প্রাণী। কেউ কেউ ব্রত ভাঙে
হবিষ্যআড়ালে, প্রকৃত জীবনধর্মী তারা সব।
হে সধবা! চর্বচুষ্য-জপতপ সব শুধু আমার উদ্দেশে।
একটিমাত্র শর্তে আমি বর দিতে পারি আমাকে
ভজো। যেমন নিশিন্দাতরু ভজে বরুণদেবকে।
যেমন প্রেমের মড়া গাঙুড়ের ঘাটে ঘাটে স্বর্গের ইন্দ্রকে
ভজে। যেমন মৃত্যু ও মনীষার সন্তানেরা ভজে
পুনর্জন্ম প্রবাদপ্রতীম। তুমি সধবা এখনো।
হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত করে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স।
তোমার আদিত্যসত্য কোন্ মন্ত্রে সূর্যমুখী হবে,
তুমি জানো। সে তোমার পাঁজরপ্রতিমা মন্ত্রগুপ্তি।
২৪.০৫.২০০৭

 

রক্তখেলা

ঠোঁটে ঠোঁটে একদিন রক্তহোলি খেলব দুজনে,
ঠোঁটে ঠোঁটে মৃত্যুপণ রক্তাক্ত দ্বৈরথ।
গোরা চাঁদ ডুবে যাবে লজ্জাভয়সহ
শশকেরা পালাবে বিবরে,
তুমিআমি রতিরঙ্গে খুন হয়ে যাবো।
লগ্নের অপেক্ষাটুকু শুধু,
রক্তের নহর বেয়ে ভেসে চলে যাবো,
মৃত্যুখেলা খেলে খেলে ভেসে চলে যাবো।
মুখে মুখ বুকে বুক দীর্ঘ প্রাণায়াম,
আমাদের স্মরণীয় ক্ষুধিত দ্বৈরথ।
১২.৫.২০০৭

পিঁপড়েজীবন

জলের বৃত্তবন্দি পিঁপড়ে
করজোড়;
মনে হলে নিঃসঙ্গতা নিজের কাছেই
নিজে বৈরী।
জমে আছে ঢের ঢের ক্ষমাপ্রার্থনা
তোমার কাছে,
চেয়ে নেবো নতজানু হয়ে যদি
অভয় যোগাও।
ঘড়ির কাঁটার মত কাঁপে বুক
অপরাধবোধ,
উদিত সূর্যের মত কাঁপে কালচক্র,
ক্ষয়দোষ।
তুমি ভেসে যাচ্ছো দূরে ঘূর্ণীস্রোতে,
বিচ্ছিন্ন মান্দাস,
আমি জলবন্দি নিঃসঙ্গ মাস্তুল
দিকশূন্য দশা,
পারিনে তোমায় তুলে নিতে
জীবনে জীবন যোগ
এ সময়ে নয়,
পৃথিবীর মনস্তাপ বাড়ে দিনে দিনে,
আমরা কারুর জন্যে
কিছুই করতে পারিনে যে।
২৫.০৫.২০০৭

 

অলিখিত অঙ্গীকারনামা

এসো হাত ধরো
পার হও এই মরা নদী,
এ নদী ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত
ভুলে গেছে বেদিয়ার বহরভাসান।

নদী নয় এ তো
নদীর   কঙ্কাল
নদীর জলীয় মিথস্ক্রিয়া।

নিচে বালিচূর
আঁশগন্ধ বাসি
ধীবরনারীর কান্নারোল
ইলশাজালের ছেঁড়া ত্যানা

বাতাসে লবণক্ষার ঘাম
আকাশে উধাও মেঘহরকরা
ধুলট ধূসর ধূম্রজাল

যেন গোমাগোক্ষুর ঝিমায় অবসাদে
তাকিয়ো না মাথার উপর
চর্কি দিয়ে ওড়ে শঙ্খচিল
চোখ গেলে দেবে।

শক্ত করে হাত ধরে ধরে
নির্বাসন পার হয়ে এসো।
উড়ে উড়ে সঙ্গ নেয় কে ও?
বটপাতা পারিযায়ী?
ভালো থেকো সুভালাভালি।
পোড়ামাটি পাড়ি দিয়ে দিয়ে   মরা নদী ঘেঁষে এই চলা
সঙ্গে সঙ্গে থেকো ঝরা পাতা।
কোশানৌকা চোরাবালিপোঁতা   গুণ টানা রশি ধরে চলা
সঙ্গে থেকো ছিন্ন বটপাতা।

কোনো তৈজস এনো না সাথে     ওজন বাড়বে
পিছুটান পিছনেই থাক।
পা ফেলো দেখেশুনে             এ নদী
ব্যাদান মেলে শুয়ে আছে ঐ
সুন্দরের উপর তার ঈর্ষাকূটৈষা।
ছিল যৌবনবেগ     সর্বস্বান্ত অধুনা
দুহাতে কপাল চাপড়ায়
ছুঁড়ে দেয় বিষাক্ত গজব।

এসো হাত ধরো
আজ কারামোচন আমারো
ভাঙাপাঁজর কাটাকলজে জখমকিডনিএই
পুঁজিপাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে।

শিরদাঁড়া ঝুঁকে নুয়ে যাবে
গৌরবরণ চামড়া তামা হয়ে যাবে
হাঁটুর চাকতি খসে যাবে।

আকাশে উধাও মেঘপরম্পরা
এ জীবন ধোঁয়াশাকুণ্ডলী,
রোদপোড়া ভূশণ্ডির লাশ
ঝরে পড়ে বাদামী প্রান্তরে।

আর
শুয়ে শুয়ে কলিক পেনে নদী গোঙায়,
প্যারালাইজ্ড্।

ওকে ডিঙিয়ে আসার কথা
মনে নেই?
আমাদের অলিখিত অঙ্গীকারনামা
মনে নেই?
২৪.০৪.২০০৭

মনোমিতা

মন! মন আমার!
তোমার গন্তব্য যথেচ্ছ, যত্রতত্র,
দিগন্তছিলা ছিন্ন করে তুমি উড়ে যাও
পেঁজা পেঁজা নীল উৎসের খোঁজে।
আমাকেও নিয়ে চলো না এই
জটিল জাঙাল ছিন্ন করে।
তোমার স্ফুরিত ঠোঁটে এখনো পার্থিব মধু।
অমিতযৌবনা বায়ুযানী তুমি মনপবন।
আমি মৌয়ালি পর্যটনপ্রিয়।
মাথায় মঙ্গলঘট,
রোজ সন্ধ্যায় কোথায় যাও ধানীমেয়ে?
পিছুডাকে ফেরো না। কোনো পিছুটান
থাকতে নেই বীজধানের সূক্ষ্ম শিকড়ে?
তচনচ জীবনযৌবন, তবু
বয়ে যেতে চাই, উৎসর্গিতা গোমতী যেমন।
মন! তুমি প্রমীলা নাগলতা।
উৎখাত ভদ্রাসন ছাড়িয়ে খোলামকুচি মাড়িয়ে
বেয়ে যাও মৃত্যুছিলা ছিন্ন করে করে।
মন! মনোমিতা!
আমাকেও নিয়ে চলো চুম্বনের টানে।
কে যেন বসে আছে শৈশবকৈশোর থেকে!
এই লোহাপাশ আঃ!
মুক্ত করো বাঁজা শয্যার হতমান থেকে।
৬.৬.২০০৭

ঝুঁঝকোবেলা

এই দুহাজার সাতে আমি ইষ্ট খুঁজে ফিরি এখনো। সময় কি এত নয়ছয়? না হয় অঢেল আছে তোমার হে বিধায়ক! আমাকে কেন দাগা দিয়ে ঘুরিয়ে মারছ? ১৯৬০ সালসেই নওল যৌবন থেকে নাকের ডগায় নেড়ে নেড়ে মাংসটুকরো, ওঃ!, পারোও বটে তুমি! ৪৭টা কিম্মতী বছর গচ্চায় চলে গেল।

জীবনভর বাসা বুনে ছেড়েছুঁড়ে উড়ে যায় বাবুই। বলিহারি বাস্তুবোধ ওর! আমি পারিনে। চাই আষ্টেপৃষ্টে সেঁটে থাকতে, গাদ কাটা গাঁজলার মত টুসকি মেরে মুছে ফেলে দেয়। ব্যর্থতাই আঠা। ধুলোপুঁজক্লেদ ক্রিস্ট্যাল ত্রিশিরা হয়ে জমে আছে। প্রেমী মানুষের একজীবনের এই পর্যটন। কথা ছিল ধানীরঙ ভেঙে ভেঙে চলে যাবো। পায়ে পায়ে বাগড়া। অতিধূসর মফস্বল। বনপথ ব্যর্থপাড়ি শাপগ্রস্ত জ্ঞাতিসূত্রইঁদুরবন বাঁদরবন ভামবন। বাগবন গজায়নিকো আর। খোজা শতাব্দীতে দৈবে এসে পড়েছি। চলে যাচ্ছিস্বর্ণপ্রতিমা না ছুঁয়েই চলে যাচ্ছি।

এরই নাম ইষ্টদর্শন? হাঃ! জলডুবি মানুষের তেষ্টামৃত্যু। ধারা জারী করে আয়ু ছাঁটাকাটা যায় বটে। স্বর্ণকীট মথ? গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যায় চাঁদের চূড়ায়। পর্যটনের এটাই দ্বিতীয় ভাগ আসলে। প্রথম ভাগ ৯৯% কেঁচে যায়। হাত চিতিয়ে ধরে বসে আছি, উত্তানপাণি। মঙ্গলসূত্রটা ফেলে দিয়ে যাও হে বখিল নাঙ্গাবাবা! কবর উদোম হয়ে ডাক দিচ্ছে। ঝুঁঝকোবেলা। আর কবে দেবে?
১৬.৬.২০০৭