পা ঠ ক ক হে ন


সরল চিহ্নপাঠ
আযাদ কালাম
দিনাজপুর ॥ বাংলাদেশ
সাহিত্যের কাগজ নিয়ে রাজশাহীর ইতিহাস ঐশ্বর্যের দিক থেকে কম কিছু নয়। মোস্তফা নূর-উল ইসলাম ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘সুন্দরম’, ‘উত্তর মেঘ’ তো কিংবদন্তি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘আড্ডা’, ‘কবিতা সারথি’, ‘শব্দায়ন’, ‘দ্রোহী’, ‘উত্তর নক্ষত্র’, ‘সুনিকেত মল্লার’, ‘কিংশুক’, ‘বাউড়ি বাতাস’, এমন অনেক কাগজের কথা মলিন হবে না কোন দিন। হাসান আজিজুল হক করেছিলেন ‘প্রাকৃত’। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা করছেন ‘চিহ্ন’ এবং ‘নিরিখ’। অতীতের সকল মাপকাঠিকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়েছে ‘চিহ্ন’। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৭ বছরে এর ৩২টি সংখ্যা বের হয়ে গেছে। প্রকাশনার মান দেশের যে-কোনো কাগজকে টেক্কা দিয়ে টিকে থাকবার যোগ্য। ৩২তম (বর্তমান) সংখ্যার আয়তন ৪৩২ পৃষ্ঠা। প্রতিনিধিত্বশীল ষাটজনের লেখা গর্ভে ধারণ করেছে প্রকাশনাটি। নিয়মিত বিভাগ ছাড়াও হাসান আজিজুল হকের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা, সাম্প্রতিককালের ২৯টি গল্প এবং ৬টি গল্পবিষয়ক প্রবন্ধ একে বিশেষত্ব দান করেছে। ছাপা, বাঁধাই ও প্রচ্ছদে রুচির আভিজাত্য। আইয়ুব আল-আমিনের প্রচ্ছদ, শহীদ ইকবালের সম্পাদনা, ‘চিহ্ন’র দাম ১০০ টাকা।

২. আলাপচারিতার আলাপ
হাসান আজিজুল হকের সাথে আলাপচারিতা
শহীদ কাদরী ও সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুজনিত একপৃষ্ঠা করে দুটি শ্রদ্ধাঞ্জলি শুরুতে থাকলেও মূলত ‘চিহ্ন’র ৩২তম সংখ্যার ‘লিড আইটেম’ হাসান আজিজুল হকের দীর্ঘ আলাপচারিতা। দীর্ঘ বলতে ১২ পয়েন্ট টাইপের কম্পিউটার কম্পোজে ঠাসা ৩৪পৃষ্ঠা। যারা জানেন তারা নিশ্চয়ই জানেন, হাসান আজিজুর হকের আলাপচারিতার দৈর্ঘ্য এরকমই। তাঁর এমনতর দীর্ঘ প্রচুর সাক্ষাৎকার বাংলা সাহিত্যে আর কারো থাকলেও এমন বহুপঠিত নয়।

এ মুহূর্তে মনে পড়ছে, কোন একটি সাক্ষাৎকারে হাসান আজিজুল হক প্রশ্নকর্তাকে পাল্টা প্রশ্ন করছেন, যে প্রশ্নের জবাব আমি বহুবার দিয়েছি সেই একই জবাব আর কত! যে প্রশ্ন এখনো কেউ করেনি এমন প্রশ্ন করলে জবাব দিতে সুবিধে হয়। মন্তব্যটি অনুমান করতে সহায়তা করে কী পরিমাণ ইন্টারভিউ তাঁকে দিতে হয়েছে। আবার এমনও হয় প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারে—প্রশ্নকর্তা দেড়দুপৃষ্ঠার বক্তৃতাধর্মী প্রশ্নের জবাবে হাসান আজিজুল হক উত্তর দিচ্ছেন একটামাত্র বাক্য কিংবা শব্দে।

কথাসাহিত্যের যাদুকর হাসান আজিজুল হকের আলাপচারিতা যতো দীর্ঘই হোক পাঠক কখনো ক্লান্তি বা বিরক্তি বোধ করবেন না। এইসব আলাপচারিতা পাঠকের দৃষ্টি বহুদূর প্রসারিত হবার সুযোগ করে দেয়। আলাপচারিতায় ভাষা-সাহিত্য-বাঙালি সমাজ, পারিপার্শ্বিক আরো অনেক কিছুর বহু পেছনের অবস্থাটা যেমন পাওযা যায়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎটাও পাওয়া যায় ষোলআনা। বর্তমান আলাপচারিতায় দেখা যায় তিনটিমাত্র গ্রাম নিয়ে কোলকাতা শহর গড়ে উঠবার নেপথ্য কথা, বর্তমানের ঐশ্বর্যহীন শূন্যতার বিশ্লেষণ, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও প্রজন্মহীনতার হতাশাও। তবে হাসান আজিজুল হককে পাঠ করবার জন্য খানিকটা প্রস্তুতির দরকার আছে বৈকি।

আলাপচারিতার খানিকটা নমুনা দেখা যাক—প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই পৃষ্ঠা স্তুতির পর তাঁর খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বলছেন, ‘আমি কোনভাবেই যেনো এইসব কারণে ভিন্ন রকম আসক্তি, … এগুলো যেনো আমার তৈরি না হয়। আমি বলবো না যে আমার খুব খারাপ লাগে, … কিন্তু এই খারাপ লাগাটা আমাকে মাতাল করবে না, আমাকে সেই অর্থে স্থানচ্যুত করবে না। … লোকেরা যখন আমার প্রশংসা করে, ভালো বলে, তখন আমার ভালো লাগে, এটা কার না ভালো লাগে বলো? কিন্তু আমি যদি অ্যাবাভ অল—সত্যিকারের একজন খাঁটি মানুষ হই, সেটাই তো যথেষ্ট আর কিছুতো লাগে না।… আর অপরের কথা ভালো লাগুক আর মন্দ লাগুক আমি ভেসে যাচ্ছি না কোনোরকমে। আমি ঠিক করেছি আমি এইটা করবো না। শেষ জীবন পর্যন্ত আমি এইটা …’। অজস্র প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয়েছে। শুরুতেই এসেছে শৈশব। এখানে ক্ষণিক দ্বিমত হওয়ার অবকাশ আছে। শৈশব নিয়ে আত্মতুষ্টি থাকতেই পারে। কিন্তু তেমন শৈশব যার নেই সে দুর্ভাগ্যবান কেন? শৈশব প্রত্যেকের কাছেই ঐশ্বর্যম-িত। সময়ের সাথে সবকিছু পাল্টায়, প্রজন্মে প্রজন্মে তেমনি শৈশবও পাল্টাবে। এক সময় যা ছিলো আরেক সময় তা থাকবে না, এক সময় যা ছিলো না আরেক সময় তা থাকবে। আগের শৈশব আগের মতো আজকের শৈশব আজকের মতো।

তিনি বলছেন : ‘শৈশবহারা মানুষ আমার মনে হয় সত্যিকার মানুষ হতে পারে না, অসুবিধা আছে তাদের।’ কোনো মানুষ কি শৈশবহারা? শৈশব খুব প্রিয় সকলেরই।

৩. গল্পপাঠের সারল্য
হাসান আজিজুল হকের ‘ছায়াবাড়ি’ অদ্ভূত রহস্যময়। কৃষিখামারে কাজ করছে শ্রমিক। মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে ধানের বস্তা। গোলা ভরছে। খামার মালিক মির্জা গালিব লোহার চেয়ারে বসা আলো-আঁধারির সন্ধেবেলায়। হঠাৎ খামারের মাটি ভেদ করে ওঠা আলকাতরা মাখানো দেয়ালের একটি বাড়ি দেখতে পায় মির্জা। দেয়াল ভেদ করে ভেতরবাড়ি পর্যন্ত সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায় সে। দেখতে পায় বাড়ির ভেতরে এক টুকারো হিরে। আরো দেখতে পায় শ্রমিকেরা বাড়ির দেয়াল ভেদ করে অনায়াসে হেঁটে যাচ্ছে এপার-ওপার। গালিবের মনে হয় বাড়িটা ছায়া নয়, মানুষগুলিই ছায়া। এক সময় বাড়িটা নাই হয়ে যায়।

কী রহস্য এই ছায়াবাড়ির? এই বাড়ি কি বাংলাদেশ? হিরে কি বাংলাদেশের সম্পদ? কৃষিশ্রমিক বাংলার কৃষক? মির্জা গালিব তাহলে কে? বর্হিবিশ্বের কোনো ক্ষমতাধর? নাকি দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন লেখক নিজেই। রহস্য। গল্পটি মোহগ্রস্থ করে।

নাসরীন জাহানের ‘গরঠিকানিয়া’ শক্তিশালী রচনা। ভাষা-বর্ণনা, চিত্রকল্প, গতি অপূর্ব। কোথাও দুর্বোধ্যতা নেই। সরল কিন্তু চিরকালের জটিল বিষয়—ধর্ম। কাদের প্রেমে পড়ে পদ্মিনীর। বিয়ের পর পদ্মিনী হয়ে যায় আয়েশা। ছেলে আকবর। প্রেমের ফসল আকবরের মুসলমানী হবে আয়েশা-রূপি পদ্মিনী এটা সহ্য করতে পারে না। কালিমূর্তির সামনে ছেলেকে নিয়ে উপুড় হয়ে কান্নাকাটি করতে থাকা পদ্মিনীর কাছ থেকে আকবরকে কেড়ে নিয়ে ইব্রাহিমের মতো কুরবানি করে দেয় কাদের।

মায়া-মমতা নয়, স্নেহ-ভালোবাসাও নয়। প্রেমও পরাজিত হয়ে যায় ধর্মের কাছে। মানুষের কতো গভীরে প্রোথিত এই ধর্ম!

রাখাল রাহা লিখেছেন ‘একটি পুকুরের কাহিনি।’ প্রকৃতঅর্থে গল্পটি পুকুরের গল্প নয়। পুকুরের ছদ্মবেশে সমাজের গল্প, রাজনীতির গল্প, দখলের গল্প, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের গল্প। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরুর গ্রাস-আগ্রাসের গল্প। রাখাল ঝানু লেখকের মতো বহিরঙ্গে পুকুরকাটা, রাজা-বাদশা, রূপকথা, উপকথার একটি আবরণ তৈরি করে আসল বিষয়টি তুলেছেন কৌশলে। যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপভাষায় গল্পের শরীর নির্মাণ করেছেন। শেষ করেছেন প্রফুল্ল নামক একজনের বাড়িঘরের হারানো মালামাল, টিনের চালা পুকুরের পানিতে লুকিয়ে রাখা এবং প্রফুল্লর দেশান্তরি হবার মধ্য দিয়ে।

আবু হেনা মোস্তফা এনাম লিখেছেন ‘পদ্মকাঁটা’। এটা গল্প নয়, কাব্য। চরিত্র-কাহিনি ছাড়াও গল্প হতে পারে। গদ্য কিংবা কাব্য দিয়েও হতে পারে। গল্প মানে তো গল্প নয়, কাহিনিও নয়। কিন্তু পদ্মকাঁটার ছত্রে ছত্রে শুধুই কাব্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শুধুমাত্র ‘ছায়ান্ধকার’ শব্দটি দিয়ে ধারাবাহিকভাবে নয়টি পঙ্ক্তির অবতারণা। যেমন : ‘ছয়ান্ধকারে গ্রামের লোকেরা পুনরায় চিৎকার করে, … ছয়ান্ধকারের ভেতর লুব্ধ বিড়াল মাছ খেয়ে ফেলে রাখে নগ্ন কাঁটা। ছয়ান্ধকারের ভেতর পিঁপড়ের দল মুখে মুখে টেনে নিয়ে যায় মৃতের টুকরো মাংস। ছয়ান্ধকারের ভেতর গ্রামের প্রাচীন বৃদ্ধার গুণগুণ কান্নার স্বর উড়ে যায়। ছায়ান্ধকারের ভেতর কোথাও বৃক্ষের সহিষ্ণুতা, … ছয়ান্ধকারের ভেতর মঞ্জুশ্রী-জলের গভীর তলে ঘুমায় প্রৌঢ় হাড়। ছয়ান্ধকারের ভেতর ঋতুবিধূরতাময় … ছায়াধুসর আঁধারে বালিকা-কিশোরীর সন্ধানে …।’

পুরো ন’পৃষ্ঠা জুড়ে কেবলই কাব্যিক পঙক্তিমালা। এই যদি গল্প, কবিতা তবে কি?

উম্মে মুসলিমার ‘অভিজাত’ রবীন্দ্র-শরৎ যুগের কাহিনি। বাংলা সাহিত্য ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে ষাট-সত্তর বছরের উন্নয়ন। অটো-সিএনজির যুগে গোরুরগাড়ি-ঘোড়ারগাড়ি ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে কিন্তু ওসব উপযোগ হারিয়েছে শতভাগ। পাঠক আজ নিরেট কাহিনিতে নেই-ই একদম। উম্মে মুসলিমার ভাষা, কাহিনি বর্ণনা সাবলীল।

মূর্তালা রামাতের ‘ভবিষ্যতের দিকে যেতে যেতে’ চমৎকার ফ্যান্টাসি ফিকশনধর্মী রচনা। আমরা যা হতে চাই, তা হতে পারি না। আবার যা হতে চাই না জোর করে তাই বানানো হয়। একজন কবি হতে চেয়েছিলো, কিন্তু তাকে কেরানি হতে হয়েছে। তাকে বাধ্য করা হয়েছে অন্যের পছন্দ-ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলতে। শেষ পর্যন্ত একজন অপরাধীকে খুঁজে না পেয়ে তাকেই স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে সেই অপরাধী বলে। যখন সেই অপরাধীকে পাওয়া গেছে তখন বলা হয়েছে ঐ অপরাধীকে বাঁচাবার জন্য সে মিথ্যা বলেছে। দুজনকারই বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদ- কার্যকর হয়। টুকরো টুকরো লাশ গুম করা হয় পানিতে ফেলে।

পানির রাজ্যে মাছেদের লাশ খাওয়া উৎসব। ফকির শাহ্’র লাশ খেয়েছে তারা। দাদুবুড়োমাছ খেয়েছিলো ফকির শাহ্’র চোখ। সেই থেকে দাদুবুড়ো ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। নাতি-নাতনী মাছেরা দাদুর কাছে ভবিষ্যৎ শোনে। দাদুর ভবিষ্যৎ দেখার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এখন সে আরো ঐ রকম স্বপ্ন দেখা চোখ খেলে আবার দেখতে পাবে ভবিষ্যৎ। দাদু এবার কবির চোখ খাবার সুযোগ পায়। দাদু আবার ভবিষ্যৎ দেখতে শুরুকরে। নাতি-নাতনীরা আবার ভবিষ্যৎ জানতে চায়। দাদুবুড়ো বলে, হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। নাতি-নাতনীরা অস্থির হয়ে জানতে চায়, কী দেখতে পাচ্ছো? দাদুবুড়ো বলে, শুধুই অন্ধকার।

মূর্তালা এভাবেই মুগ্ধ পাঠককে শেষ অব্দি নিয়ে যায়। ফ্যান্টাসি-ফিকশন দিয়ে বলে ফেলেন বাস্তবতাকে।

নূরুন্নবী শান্ত লিখেছেন ‘কুয়াশার চাঁদ’। তিনটি চরিত্রের ত্রিভুজ পরিস্থিতি। কুয়াশার চাঁদ নেই, আছে কুয়াশার চাদর। লেখক কুয়াশাছন্ন পরিবেশ রচনা করেছেন তিনটি চরিত্রের রহস্য উন্মোচনের জন্য। কেতাব ফকির, কেতাব ফকিরের সদ্য বিয়ে করা নয়াবউ আর কেতাবের বড় ভাই সেতাব। তিনজনই নিজের স্খলন থেকে মুক্তির তাড়নায় তিস্তার পারে এসেছে প্রাণত্যাগ করবার প্রত্যয় নিয়ে। প্রথমে কেউ কাউকে দেখতে পায় না। শেষে সবাই সবাইকে দেখে ফেলে।

বিয়ের পনের দিন আগে সেতাবের বীর্য গর্ভে ধারণ করেছে নয়াবউ। কেতাবের সাথে বাসর রচিত হলে গর্ভ বৈধ হবে, কিন্তু বাসর হয় না। কেতাব প্রতারিত কাপুরুষ ভাবে নিজেকে। আত্মহত্যা এখন একমাত্র পথ। নয়াবউ পাপ বোধে জর্জরিত। তারও একই পথ। সেতাব আধপাগলা। তার শরীর কথা বলেছে। সেও আত্মহননের পথিক।

প্রথমে তাদের প্রত্যাশা ছিল কখন কুয়াশা কেটে যাবে। সবাই সবার উপস্থিতি টের পেয়ে এখন প্রার্থনা, এই কুয়াশা যেন কেটে না যায়। গতরের স্বভাব আর সমাজের স্বভাব কেউ কাউকে রেহাই দেবে না। মৃত্যুই এখন তাদের একমাত্র অবলম্বন।

কুয়াশাময় পরিবেশে চরিত্র তিনটির উপস্থাপন নান্দনিকতাময়।

শহীদ ইকবাল লিখেছেন ‘গোসাইপাড়ার এজমালি জমি’। রংপুর অঞ্চলের উপভাষায় লেখা। উপভাষায় লেখালেখি নূতন না হলেও প্রবণতাটি সম্প্রতি বেড়েছে। সত্যিকার অর্থে, উপভাষাই তো ভাষার মূল ভিত্তিভূমি। সঠিকভাবে এর প্রয়োগ ঘটলে কনটেন্টের যে মৌলিকত্ব সৃষ্টি হয় মানভাষায় তা কখনোই সম্ভব নয়। রংপুরের ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী আর সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুল হকদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগদক্ষতা এই উপভাষাকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি দান করেছে। সে অর্থে দিনাজপুরের উপভাষা শওকত আলীর হাতে কিছুটা এলেও অনালোচিত।

গোসাইপাড়ার এজমালি জমির ঘটনা আবর্তীত হয়েছে ছমির শেখের মৃত্যুরহস্যকে ঘিরে। তার তিন স্ত্রী সখিনা, মরিয়ম, জায়েদা হলেও পরবর্তী রহস্য ঘনিভূত হয় সখিনার অন্তর্ধানে। অবশেষে ছমির শেখের বাড়িভিটা এজমালি জমিতে পরিণত হয়।

কাহিনিতে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু ভাষা এবং চরিত্রের অন্তর্নিহিত টানাপোড়েন গল্পটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। উপভাষা প্রয়োগের গুরুচ-ালি সমস্যাটি প্রকটভাবে ঘটেছে। কিছু কিছু বিচ্যুতি অস্বস্তি সৃষ্টি করে। ‘এন্দুর’ বলার পরপরই ‘ইঁদুর’ বা ‘পুলুশ’ বলার পরই ‘পুলিশ’ একটু হোঁচট দেয়। ‘রাইত পার করুম’ রংপুরের ভাষা নয়। এটা হতে পারতো ‘রাইত পার করি দেইম/করমো/করিমো/করিয়া’। বিচ্যুতি সত্ত্বেও শহীদ ইকবালের উপভাষা চর্চা এবং প্রয়োগদক্ষতা মুগ্ধ করে।

এ পর্যায়ে আরো লিখেছেন : ইবাইস আমান, সৈয়দ তৌফিক জুহরী, ওয়াসিকা নুয্হাত, তাশরিক-ই হাবিব, মাসুদ পারভেজ, গত্তহর গালিব, মেহেদী ধ্রুব, ইফতেখার মাহমুদ, বিপম চাকমা, শফিক আশরাফ, শাহনাজ নাসরীন, সজল বিশ্বাস. আনিফ রুবেদ, স্বকৃত নোমান, পিন্টু রহমান, আশরাফ জুয়েল, এমরান কবির, হামিম কামাল, সবুজ ম-ল, সৈকত আরেফিন ও মর্মরিত ঊষাপুরুষ। প্রত্যেকের লেখা আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করা গেলেই ভালো ছিল। কিন্তু স্থানসংকুলান সে সুযোগ নিশ্চয়ই দেবে না। তাছাড়া জামার আয়তন শরীরের থেকে বড় হওয়াও বাঞ্ছনীয় নয়। যেগুলির ওপর যৎসামান্য আলোাকপাত হলো তাতেই ‘চিহ্ন’র গল্প-নির্বাচন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এবং এ সময়ের গল্প সাহিত্যের পালস্ অনুভব করা যাবে।

৪. প্রবন্ধপাঠের সোজাসাপ্টা
ইমতিয়ার শামীমের ‘সংকট কোনখানে’
কাহিনি দিয়ে শুরু করেছেন ইমতিয়ার শামীম। মাদ্রাসা পড়–য়া এক তরুণ কথা বলতে চায়, ঘনিষ্ঠ মত বিনিময় করতে চায় খেলালেখি নিয়ে। শামীমেরও ইচ্ছে হয় তার সাথে মেশার। বাধা হয়ে দাঁড়ায় মাদ্রাসা। ইচ্ছা এবং সুযোগ থাকার পরও নিরাপত্তাহীনতার দ্বিধা এগোতে দেয় না। বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক জঙ্গীপনার বিষয়টি জানতে হলে, এর গভীরে যেতে হলে অভিজ্ঞতার কি বিকল্প আছে? ইত্যাকার নানাবিধ কারণে একজন লেখক কাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়।

পাল্টে যায় শামীমের মত, সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতাতেও সৃজনশীলতার সক্ষমতা নিয়ে সংশয়। মানুষ ও প্রকৃতির এতো সান্নিধ্যে না এসেও কথাসাহিত্যিক তার চালচিত্র তৈরি করে ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন। চরিত্র সৃষ্টি হতে পারে এই পাওয়া না পাওয়ার অন্তর্দ্বন্দ্বের অন্তঃক্ষরণ থেকে। একটি কাহিনি লেখা যতো সহজ অর্ন্তদ্বন্দ্বের ক্ষরণ থেকে চরিত্র সৃষ্টি করে লেখাটা ততো সহজ তো নয়ই, সময় সাপেক্ষও। তিনি অনুভব করেন মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হকরা কি যন্ত্রণায় বিরলপ্রজ।

এবার হাজির করেন সুর্বোধ্য-দুর্বোধ্যতার দ্বন্দ্ব-সংকট। যিনি কাঁদাতে পারেন, হাসাতে পারেন তিনিই সফল সাহিত্যিক। যিনি কাঁদাতে গিয়েও উদ্বেগ ডেকে আনেন, নিস্পৃহতা আনেন, চিন্তিত করে তোলেন তিনি দুর্বোধ্য। তাকে একঘরে করে মেরে ফেলার মতো অপবাদ—উনি তো দুর্বোধ্য লেখেন। শামীম এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজেন—লেখা দুর্বোধ্য হওয়ার পরও যদি তাকে এড়িয়ে যাবার উপায় না থাকে, কম পাঠকপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ঈর্ষা জাগাতে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে নূতন সময় এসেছে। যে সময় নূতন ভাষা ও লেখা দাবি করছে। বেশিরভাগ মানুষ যা চিহ্নিত করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত দুর্বোধ্যতাও সংকট নয়।

আরেক সংকট হিতোপদেশ দানকারী বা শিক্ষাদানকারী সাহিত্যিকের দাপট। এর ফলে ভালো সাহিত্য মারা পড়ে। সাহিত্য শিক্ষাদানের মাধ্যম নয় কখনোই। প্রমথ চৌধুরী বহুকাল আগেই বলেছেন, সাহিত্য স্কুলমাষ্টারির ভার নেয় নি। হিতোপদেশ বা শিক্ষাদানসংকটের পাল্লায় পড়ে মারা পড়েছে আমাদের শিশুসাহিত্য। এনজিওওয়ালাদের বাজেট বাস্তবায়ন, লেখক-প্রকাশকদের বিকিকিনি বাণিজ্য আর অভিভাবকদের নির্বুদ্ধিতায় শিশুসাহিত্য এহেন সংকটে পতিত হয়েছে।

কথাসাহিত্যের এরকম অনেক সংকট এবং উত্তরণের পথ অন্বেষণ করেছেন ইমতিয়ার শামীম। শেষ করেছেন ভার্চুয়াল জগৎসৃষ্ট সংকট দিয়ে। যে জগতের প্রধান সাহিত্য স্ট্যাটাস-অনুগল্প।

প্রবন্ধটি আপাদমস্তক সুখপাঠ্য, অনবদ্য। কিন্তু অস্বস্তিকর একটি বিচ্যুতি এর অঙ্গহানী ঘটিয়েছে। হিতোপদেশ বা শিক্ষাদানকারী কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাম করে একটি উদ্ধৃতি রয়েছে যা আদৌ রবীন্দ্রনাথের নয়। ‘লোকে যদি সাহিত্য হতে শিক্ষা পেতে চেষ্টা করে তবে পেতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য শিক্ষা দেবার জন্য কোন চিন্তাই করে না। কোন দেশে সাহিত্য ইস্কুলমাস্টারির ভার নেয়নি।’ উদ্ধৃতিটা প্রমথ চৌধুরীর ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের অংশ। এখানে কিছুটা বিকৃতিও ঘটেছে। প্রমথ চৌধুরীর কথাটা এরকম—‘রামায়ণ কাব্য হিসেবে যে অমর এবং জনসাধারণ আজও যে তার শ্রবণে-পঠনে আনন্দ উপভোগ করে তার একমাত্র কারণ, আনন্দের ধর্মই এই যে তা সংক্রামক। অপরপক্ষে লাখে একজনও যে যোগাবশিষ্ঠ রামায়ণের ছায়া মাড়ান না তার কারণ, সে বস্তু লোককে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল, আনন্দ দেবার জন্য নয়। আসল কথা এই যে, সাহিত্য কস্মিন্কালেও স্কুলমাষ্টারির ভার নেয় নি।’

ইমতিয়ার শামীম অত্যন্ত সচেতন, মেধাবি এবং উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় লেখক। তার কাছে এমন বিচ্যুতি প্রত্যাশিত নয় একদমই।

হোসেনউদ্দীন হোসেনের গল্পসাহিত্য : ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও কল্পনার রূপ

গল্পলেখকের অন্তরজগৎ নিয়ে আলোকপাত করেছেন হোসেনউদ্দীন হোসেন। মনোজগতে গল্পের বীজ কিভাবে সৃষ্টি এবং অংকুরিত হয় এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি উপলব্ধির কথা বলেছেন। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, সাহিত্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড় এবং স্বতন্ত্র। রসবোধ প্রসঙ্গে বলেছেন, যার অন্তরে রসবোধ নেই তিনি দেখেন শুধু উপাদান আর প্রয়োজনের দিকটি। ফলে তার পক্ষে সাহিত্যের মূল্য নিরূপণ কষ্টসাধ্য। গল্প লেখকের মন যখন রসের অনুভূতিতে ছাপিয়ে যায় তখনই তিনি গল্প লেখেন নিত্যকালের ভাষায়। এটা জ্ঞানের ভাষা নয়, হৃদয়ের ভাষা, কল্পনার ভাষা।

ক্ষুদ্র পরিসরে আরো অনেক বলেছেন তিনি। বাস্তবের বাস্তবতা ও গল্পের বাস্তবতা প্রসঙ্গে বলেছেন—সাহিত্যের বাস্তবতা একান্তই উপলব্ধিগত। শেষ করেছেন নির্মম বাস্তবতার কথা তুলে—‘যে এগিয়ে যেতে পারবে—সে এগিয়ে যাবে—যে এগিয়ে যেতে পারবে না সে পিছিয়ে থাকবে।’

৫. পুনর্মুদ্রণের পুনর্পাঠ
পাপড়ি রহমান লিখেছেন ‘নব্বই দশকের গল্প’ আর নাসরীন জাহান ‘বাংলাদেশের গল্প : আশির দশক’। দুটি রচনারই ধরন কিংবা বৈশিষ্ট্যের কোনো ফারাক নেই। দশক ধরে ধরে প্রায় একই কথা বলেছেন দুজনে। শুধু নিজ দশকের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরে অমিল। প্রকারান্তরে যা নিজের কীর্তন গাওয়া। নাসরীনের কাছে আশির দশক, পাপড়ির কাছে নব্বই। দুজনেই কেবল দশকভিত্তিক লেখকদের নাম উল্লেখ্য করেছেন। কারো রচনা কিংবা গ্রন্থের বিশ্লেষণ নেই। ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ লেখক আবুবকর সিদ্দিক এবং আশির দশকের জাকির তালুকদারকে সযতেœ উপেক্ষা করে গেছেন। আবুবকর সিদ্দিক ও জাকির তালুকদার বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত। তার চেয়ে বড় কথা, দুজনই বাংলা কথাসাহিত্যে সত্যিকারের সুলেখক। আবুবকর সিদ্দিকের ‘জলরাক্ষস’ ও ‘খরাদাহ’ এবং জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’ ও ‘মুসলমানমঙ্গল’ কে মুছে ফেলবে?

পাপড়ি ও নাসরীনের রচনায় কয়েকটি পঙ্ক্তি হুবহু মিলে যাওয়া দেখে লাজ্জাজনকভাবে বিস্মিত হতে হয়। পাপড়ির বইটি ১৯৯২ সালে, নাসরীনেরটি ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত। পঙ্ক্তিগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে—‘যাঁদের লেখায় ছোটগল্পের ছিমছাম তনুখানি অনুপস্থিত। পূর্বসুরীদের জনপ্রিয়তার ধাঁধাঁয় অস্থির হয়ে কোনো গল্পকারই নিজেকে সেই ধারায় বিকশিত করেন নি। … পরিলক্ষিত হয়।’

একজন অন্যজনের পঙ্ক্তি বা অংশ উদ্ধৃত করতেই পারেন। কোনো শব্দ বা বাক্য কাকতালীয়ভাবে মিলেও যেতে পারে। কিন্তু কোনো উদ্ধৃতি ছাড়াই মিলে যাবে লাইনের পর লাইন এটাও সম্ভব হয়েছে এখানে।

সুশান্ত মজুমদারের সত্তর দশকের গল্প : উত্তরাধিকার ও পরিপ্রেক্ষিত

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত দশকভিত্তিক তিনখানা গল্পগ্রন্থের ভূমিকা পুণর্মুদ্রণ করেছে চিহ্ন। সুশান্ত মজুমদার লিখেছেন সত্তর দশকের ভূমিকা। তিনটির মধ্যে সত্তর দশকের মূল্যায়ন অনেকাংশে যথার্থ। লেখকদের নাম ধরে ধরে তাদের ব্যর্থতা-সফলতার কারণ উল্লেখ্য করার প্রয়াস পেয়েছেন। শুরু করেছেন দেশ বিভাগের পূর্বাপর দিয়ে। আবুল ফজল, শওকত ওসমান ও আবু ইসাহাকের বিশ্লেষণ শেষে তার মনে হয়েছে এ সময়কালের সফল গল্পকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। তাঁকে তিনি আধুনিক ছোটগল্পের সূচনাকারী বলেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের বিশ্লেষণে হাসান হাফিজুর রহমান স্মরণীয়। শওকত আলী, জহির রায়হান, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ,্ জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হুমায়ুন চৌধুরীর বিশ্লেষণ শেষে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে অধিক সাফল্য লাভের মর্যাদা দিয়েছেন। ষাটের শেষ পর্যায়ের লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ও শওকত আলীরা দ্যূতি ছড়িয়েছেন অনেক পরে।

তার মতে চল্লিশ-পঞ্চাশ ষাটের ধারাবাহিক সাফল্যের উৎকর্ষতা এসে উজ্জ্বল করে তোলে সত্তর দশককে। এ সময়ের লেখকরা মুখোমুখি হন বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের। তারা প্রত্যক্ষ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ-পরবর্তী নানান সংকট। তাদের মগজে বাসা বাঁধে অনেক স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের আশা-হতাশা। এরা আগের তুলনায় অনেক সাহসী। অনেকে আবার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠলে ও পরিস্থিতি বুঝতে না পারার কারণে চটুল গল্প লিখতে শুরু করেন। যা গল্পসাহিত্যে আগে ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সকলেই লিখেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সফল গল্প পাওয়া যায় না। বরং যুদ্ধপরবর্তী নৈরাজ্য নিয়ে সফল গল্প লিখেছেন আহমদ বশীর ও মঈনুল আহসান সারের।

সুশান্ত মজুমদার নিজস্ব ভাষাভঙ্গিমায় ক্ষুদ্র পরিসরে চল্লিশ থেকে সত্তর দশকের গল্পসাহিত্য ও গল্পকারদের যথাযথ বিশ্লেষণ করেছেন।

আবুজাফর শামসুদ্দীনের আমাদের গল্প-সাহিত্য
শিরোনাম নিয়েই প্রশ্ন। ‘আমাদের গল্প-সাহিত্য’ শিরোনাম হলেও বিষয়বস্তু মুসলিম গল্পসাহিত্য। অকপটে লেখক যা স্বীকার করে মুসলিম গল্পকারদের নিয়ে আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। সাতচল্লিশপূর্ব প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু করলেও বিভাগ-পরবর্তী মুসলিম গল্পলেখকদের সফলতা-ব্যর্থতার সালতামামীই তুলে এনেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম দিয়ে সূচনা করে মুনীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, মোস্তফা নূরউল ইসলাম, সাইয়ীদ আতীকুল্লাহ্ দিয়ে শেষ করেছেন। তিনি গল্পকারদের ব্যর্থতার সীমাও নির্ধারণ করেছেন—‘বিদ্রƒপ ও শ্লেষাতœক রচনাকে সার্থক ও আবেদনপূর্ণ করতে গেলে যে সহানুভূতিশীল মন ও পক্ষপাতহীন নির্বিকারত্ব প্রয়োজন তা অধিকাংশ মুসলিম গল্প লেখকদের রচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল।’ ব্যাখ্যা প্রদান, নিজের বক্তব্য বলা এবং মন্তব্য করা থেকে তরুণ লেখকগণ প্রায়ই বিরত থাকতে পারেন না বলে উল্লেখ করলেও সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, জহির রায়হান, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাসনাত আবদুল হাই প্রমুখের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আজ বাস্তবে রূপলাভ করেছে।

৬. কৈফিয়তের বিকল্প
জফির সেতুর কেন লিখি
একটি কবিতা লেখার পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে শুরু করেছেন জফির সেতু। বর্ণনাটা নিছক পরিস্থিতির বর্ণনা নয়, সৃষ্টিযন্ত্রণার অন্তর্বয়ন। যে সৃষ্টিযন্ত্রণার সাথে ওতোপ্রোত সৃষ্টিসুখ। সৃষ্টিশীল প্রত্যেকজনেরই এ যন্ত্রণাসুখ ভোগ-উপভোগের অভিজ্ঞতা থাকতে বাধ্য। হতে পারে পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু সুখযন্ত্রণা শতভাগ অভিন্ন।

বর্ণনার খানিকটা দেখে নেয় যাক, ‘আমি অস্থির হয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। আলো জ্বালিয়ে দিলাম। টেবিলে ঝুঁকে খাতাটি উল্টালাম। শাদা পাতায় কলম ধরলাম। মনে হলো আমার ভেতরটা গরম হয়ে গেছে। চামড়ার নিচে আগুনের ফুলকি। আমি লিখে চলেছি। অনিঃশেষ শব্দ আর চিত্রকল্প মাথায় ভর করছে। কলম দৌড়াচ্ছে। … বত্রিশ পঙ্ক্তির কবিতা শেষ হলো ঘণ্টা দেড়েকের মাথায়।’ সমাপ্তিসূচক শেষ পঙ্ক্তি ‘নস্যাৎ করি নিয়তির বশ্যতা : সকল প্রশংসা তোমার’ যখন বেরিয়ে এলো তখন মনে হলো, আহা এইবার মুক্তি, এই বুঝি শান্তি এলো জীবনে। মুহূর্তে কেটে গেল অস্থিরতা। মনে হলো আমি স্বাভাবিক হয়ে উঠছি। ’

সামনে-পিছনের বর্ণনা দীর্ঘ। কবিতা সৃষ্টির পরিস্থিতিটা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সৃষ্টির ক্ষণকে মনে করিয়ে দেয়। নজরুলের সময় কলম ব্যবহারের এমন সুবিধে ছিলো না। দোয়াতের কালিতে নিব ডুবিয়ে ডুবিয়ে একটা বা দুটা করে শব্দ লেখা যেতো। নজরুল ইসলাম নির্ঘুম রাত যাপন করে শেষরাত্রে এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেলেছিলেন কবিতাটি। ছন্দ-ভাব-গতিসহ আরো অন্যকিছুর ব্যাঘাত যাতে না ঘটে তাই কাঠপেন্সিল দিয়ে লিখেছিলেন।

জফির সেতু তার প্রতিবেশ বর্ণনা করেছেন। পরিবারের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন তার কবিসত্তা সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সততা ও আন্তরিকতায়। ‘কেন লিখি’র জবাবে বলতে চেয়েছেন—একটি মেয়ের জন্য লিখি, কাজী নজরুল হবার জন্য লিখি, সমাজ বদল এবং সমাজ সংস্কারের জন্য লিখি, দেবদূতের আহ্বানে লিখি, ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখার নেশায় লিখি, অমরত্ব লাভের আশায় লিখি—এরকম অনেক কারণ উল্লেখ করে বলছেন, আসলে এসব কোনো কিছুর জন্যই লিখি না। পাল্টা প্রশ্ন করেন, কেন বেঁচে থাকি? এই জন্য বেঁচে থাকি ভেবে মানুষ বেঁচে থাকে না। ঠিক তেমনি এই জন্য লিখি ভেবে কেউ লেখে না। কবি কবিতাযাপনের জন্যই লেখেন, উদ্দেশ্য নিয়ে লেখেন না। শিল্প কখনোই নয় উদ্দেশ্যভিত্তিক।

সেতুর বর্ণনা দিয়েই প্রসঙ্গ শেষ করা যায়Ñ‘এখন আমি সমাজ বদলের জন্য লিখি না, কাউকে মুগ্ধ করার জন্যও না। কবি হওয়ার জন্যও না। …এখন একটা কবিতা লেখা হয়ে গেলে পড়ে থাকে কম্পিউটারে মাসের পর মাস। নিজেই পড়ি মাঝেমধ্যে। মনে হয় নিজের জন্যই লিখেছি। কবিতা লেখা এখন বেঁচে থাকার শর্তে পরিণত হয়েছে। মনে হয় বেঁচে থাকতে হলে কবিতাই লিখতে হবে। আজ যদি না লিখতে পারি কাল নিশ্চয়ই লিখব। অপর মানুষ কবিত্ব অনুভব করে আমি লিখি। কিন্তু কবিতাই শর্ত। মানুষের জন্য কবিতা অপরিহার্য। কিন্তু জানি কি, কেন লিখি?

৭. প্রবন্ধপাঠের ভাঙ্গাচোরা পথঘাট
জুলফিকার মতিনের আত্মার চিৎকার
বাংলা ভাষার একালের প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে বেশ দীর্ঘ রচনা আত্মার চিৎকার। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পর জীবনানন্দ দাশ নাকি শামসুর রাহমান—বাংলা ভাষায় কে একালের প্রধান কবি? এরকম প্রসঙ্গ বিশ্লেষণের প্রয়াস চালিয়েছেন মতিন। ঐতিহাসিক-সামাজিক-ধর্মীয়-ভৌগোলিক-নন্দনতাত্ত্বিক ইত্যাকার সকল পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করেছেন। জুলফিকার মতিন সূক্ষ্মবোধসম্পন্ন লেখক। জীবনানন্দ কিংবা শামসুর রাহমান কারো প্রতি ¯ূ’ল পক্ষপাত তিনি প্রকাশ করেন নি। পাঠক দেখতে পান রচনার বিষয় শামসুর রাহমান। মৃত্যুপূর্বকাল জীবনানন্দকে কাটাতে হয়েছে জন্মস্থানের পারিপার্শ্ব ছেড়ে যা রাহমানকে করতে হয় নি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পারিপার্শ্ব সম্পৃক্ততা রাহমান যেভাবে উপলব্ধ হয়েছেন জীবনানন্দ সেভাবে হন নি। রাহমান একটি ভাষা সংগ্রাম ও একটি মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্টতা দ্বারা পুষ্ট হয়েছেন যা জীবনান্দদের নেই। ১৯৪৩ সালে প্রথম কবিতা প্রকাশের পর ১৯৬০ সালে শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। জীবনান্দদের বিড়ম্বনা আরো বেশি।

শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি বলে সীমাবদ্ধতায় বেঁধে ফেলার বিপক্ষে মতিন। তাঁর মতে সারাজীবন এই ঢাকা শহরেই কাটিয়েছেন, শুধুমাত্র এখানে বসবাসকারী মানুষজনের জীবনযাত্রার ছবি, তাদের আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-উল্লাসের চালচিত্র, পচা নর্দমার দুর্গন্ধের কথাও বলা—এ সবই কি কেবল তাঁকে নাগরিক কবি বলতে অনুপ্রাণিত করবে?

আমাদের অধিকাংশ কবি যারা খুবই প্রিয়। যাদের কথা প্রায়ই উচ্চারিত, যাদের কবি প্রতিভার সত্যি সত্যি বিকল্প নেই তারা যে বৃত্ত রচনা করে বিখ্যাত হয়েছেন—হয়ত সেই খ্যাতি হারানোর ভয়ে তার বাহিরে আর যাননি। গত পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানই বোধ হয় একমাত্র কবি, যিনি সময়ের সাথে সাথে, তার মর্মবাণীকে আত্মস্থ করে টেনে নিয়ে গেছেন তাঁর কাব্যরথকে সমাজের চাহিদা, যা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে নিয়ত পরিবর্তনশীল, সেই পরিবর্তনশীলতাকে স্বচ্ছন্দে ধারণ করেছেন।

বাংলাভাষা কিংবা বাঙালি জাতি টিকে থাকা না থাকার ওপর শামসুর রাহমানের টিকে থাকার প্রসঙ্গ তুলেছেন জুলফিকার মতিন। উদাহরণ হিসেবে হাজির করেছেন অনেক জাতি-গোষ্ঠী ও ভাষা হারিয়ে যাবার কথা। তাজা নজীর হিসেবে পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষার টিকে থাকবার সংশয় প্রকাশ করেছেন। বাঙালিরা যেভাবে অ-বাংলাভাষী দেশের নাগরিক হচ্ছে তাদের নিয়েও বাংলা ভাষার টিকে থাকার সংশয় দেখেছেন তিনি।

রচনার শেষ অংশটুকু সরাসরি তুলে ধরে প্রসঙ্গটির সমাপ্তি টানা যায়—‘একজন কবি তো স্পর্শকাতর অনুভূতিশীল মানুষ। নান্দনিকতাই বলি, সৌন্দযবোধই বলি, তার পরিচর্যা তো চলে ভাবসত্ত্বারই উন্মীলন ঘটাতে। শামসুর রাহমানেও আমরা তাই দেখেছি। এটাকেই সনাক্ত করা যায় তাঁর আত্মার চিৎকার বলে। আর আমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়িত্বই বলি, আর অমরতাই বলি, তার কারণটিও খুঁজে পেতে হবে এখান থেকেই।’

মুহাম্মদ নূরুল্লাহ্র সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও চাঁদের অমাবস্যা

সিগমন্ড ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্বে তিনটি সত্তার উপস্থিতি দেখতে পান—১. জৈবিক সত্তা বা ইদম ২. বাস্তবসত্তা বা অহম ৩. অতি অহম। এই তিনটি মানবসত্তার মাপকাঠিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসটির বিশ্লেষণ করেছেন নূরুল্লাহ্। আরেফ ও কাদের চরিত্রদ্বয় বিশ্লেষণ করে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের উপস্থিতি দেখিয়েছেন তিনি। ওয়ালীউল্লাহ্র গল্প-উপন্যাসের ব্যবচ্ছেদ শুধু ফ্রয়েড দিয়ে করলে বুুঝি সবটুকু ধরা যায় না। তার ভাষা প্রয়োগের নিজস্বতা ও দক্ষতা ছাড়াও ধর্মের (বিশেষভাবে ইসলাম ধর্মের) অপপ্রয়োগ ও ভ-ামির উন্মোচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ—যা নূরুল্লাহ্র প্রবন্ধে গুরুত্ব পায়নি।

৮. ভাষান্তরের সরলপাঠ
রায়হান রাইনের ফ্রানৎস্ কাফকার রূপক গল্প
১৯৪৮ সালে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ফ্রানৎস্ কাফকার ‘নার্সিসাসের কুয়ো : এক সত্তাশূন্য আমি’ এই রূপক গল্পটি নিয়ে ডব্লিউ. এইচ. অডেন-এর লেখাটি ভাষান্তর করেছেন রায়হান রাইন। এখানে কাকফা সম্পর্কিত বহুল আলোচিত এবং অনালোচিত প্রসঙ্গ পাঠকের সামনে এসেছে। কাফকা তার বন্ধুকে বলেছিলেন, তার কাছে রক্ষিত লেখাগুলি যেন সে ধ্বংস করে ফেলে। কারণ হিসেবে বলেন যে, ‘আমার কাছে মূল্যবান হতে পারে যদি আমি এমন কিছু লিখি যা চূড়ান্তভাবে নিখুঁত। কিন্তু কোনো লেখা যত চমৎকারই হোক নিখুঁত হতে পারে না। তাই আমি যা-কিছু লিখেছি আমার কাছে তা মূল্যহীন এবং সেসব ধ্বংস করে ফেলা উচিত।’ মন্তব্যটির ধারাবাহিকতায় আরেকটি মন্তব্য—‘লেখা প্রার্থনার একটি ধরণ।’ এবং কোনো লোকই তার প্রার্থনা যদি খাঁটি হয় তাহলে তা অন্যকে শুনতে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন না।

কাফকা সম্পকে বলা হয়, ‘যদি এমন কেউ একজন থাকেন যার সম্পর্কে বলা যায় ‘ন্যায়নিষ্ঠার জন্য ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত’ তবে তিনি কাফকা।’ কাফকার পাঠক সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘কাফকা সম্ভবত সেইসব লেখকদের একজন যিনি ভুল লোকদের দ্বারা পঠিত হবার জন্য দ-প্রাপ্ত। কাফকা পাঠ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তখনই কাফকা পড়তে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত যখন শরীর ও মন ভালো হজমশক্তিসম্পন্ন অবস্থায় থাকবে।’

কাফকা পাঠে যেমন ক্রমাগত মুগ্ধ হতে হয় কাফকা সম্পর্কিত রচনা পাঠ করলেও একইরকম মুগ্ধতা সৃষ্টি হয়। রায়হান রাইন অনূদিত বর্তমান রচনাটিও মুগ্ধকর।

৯. আর যা কিছু চিহ্নগর্ভে
নিয়মিত বিভাগে গল্প লিখেছেন, সুবিদ সাপেক্ষ, সুবন্ত যায়েদ, ও মাকছুদা ইয়াছমিন রুমকি। কবিতা লিখেছেন ময়ুখ চৌধুরী, বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, তারেক রেজা ও শামীম নওরোজ।
সাঈদ হাসান অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমানের ইংরেজি থেকে বাংলায় নাতিদীর্ঘ (১৭পৃষ্ঠা) একটি সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন। ইংরেজিতে মূল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমানের দুই সহকর্মী মাসউদ আখতার ও মুহাম্মদ তারিক-উল-ইসলাম। অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সুনামখ্যাত শিক্ষক। বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষার বহুবিদ বিষয়-আশয় এখানে আলোচিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মিউজিংস পোস্ট কলোনিজ (চিহ্ন-প্রকাশন) গ্রন্থে প্রকাশিত হলেও ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে অধ্যাপক আলীর মৃত্যু এবং তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাকে অধিকতর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ থেকে ‘চিহ্ন’ এটি পুনর্মুদ্রণ করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর এবং পুনপ্রকাশের উদ্যোগ শুধু অধ্যাপক আলীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন নয়, এটি ‘চিহ্ন’ ৩২তম প্রকাশনাকেই অলংকৃত করেছে।

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য ও সংকৃতিচর্চা ১৬’ প্রতিমা মিত্র প্রীতির এ লেখারটির সাথে শিরোনামের সম্পর্ক আবিষ্কার দুরূহ। এটি ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক ফোরাম’-এর ২৭ বছর পূর্তির সংগঠন বিবরণীর ফিরিস্তি। শুধুমাত্র শিরোনাম ছাড়া ‘চিহ্ন’র চরিত্রের সাথে এটি সঙ্গতিপূর্ণ নয় মোটেও।

বই ও পত্রিকা আলোচনা ‘চিহ্ন’র অনিবার্য উদ্যোগ। ‘বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ’ নূহ-উল আলম লেনিনের এই বইটি আলোচনা করেছেন শহীদ ইকবাল, ‘কষ্টের আধুনিক হিমাগার’ আহমেদ মেহেদী হাসান নীল-এর বইটি আলোচনা করেছেন রফিক সানি এবং ‘ডায়ালের জাদু’ মাসুদার রহমানের এই বইয়ের আলোচনা করেছেন আনন্দ কিশলয়। গ্রন্থ-নিবার্চন ও আলোচনা দুইই চমৎকার।

পত্রিকা আলোচনায় রয়েছে, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘স্পর্ধা সবসময়ে’ সম্পাদক হাবীব ইমন—আলোচনা করেছেন বিরহান্ত কৃষ্ণ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘শিল্পধাম’ সম্পাদক আবুল ফজল। এর আলোচনা করেছেন অতন্দ্র অনিঃশেষ। গাইবান্ধা থেকে প্রকাশিত ‘শব্দ’ সম্পাদক সরোজ দেব; আলোচনা করেছেন নাজমুল হাসান পলক।

‘চিহ্ন’ ৩১তম সংখ্যার পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখেছেন ঢাকা থেকে গৌরাঙ্গ মোহান্ত ও নড়াইল থেকে সদ্যসমুজ্জ্বল। সম্প্রতি প্রকাশিত বই ও পত্রিকা পরিচিতিতে আছে বরিশাল থকে প্রকাশিত ‘বুনন’, কিশোরগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘ধমনি’। বই পরিচিতিতে আছে শিমুল মাহমুদের ‘কাব্যকথা কাকবিদ্যা’, সৈয়দ তৌফিক জুহরীর ‘শওকত ওসমান : আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা’, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘শওকত ওসমান জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ’, সিরাজ সালেকীন সম্পাদিত ‘উলুখাগড়া’ এবং কাজল কাপালিকের ‘যদি একতারাটি বেজে ওঠে।’

শেষে রয়েছে দুটি ধারাবাহিক রচনা। ‘বিচিত্র সমাজতত্ত্ব, সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব-৫’ লিখেছেন মুহাম্মদ হাসান ইমাম এবং ‘সমস্ত ধূসর প্রিয়, নয়ন মেলে পর্ব’ লিখেছেন শহীদ ইকবাল। ‘চিহ্ন’র শেষপ্রান্তে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ৫০ বছরের গল্প ও গল্পকারের তালিকা। এখানে ১৫২ জন গল্পকারের নামের পাশে তাদের প্রকাশিত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

অবশ্যই প্রত্যাশা ‘চিহ্ন’ দীঘজীবী হোক। শ্রীবৃদ্ধি ও মানবৃদ্ধি হোক, আয়তন বৃদ্ধি হোক আর না হোক। যদি আর একটিও সংখ্যা প্রকাশিত না হয় ‘চিহ্ন’ তবুও বেঁচে থাকবে। ‘চিহ্ন’র জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

পাঠক কহেন…
চিহ্নপাঠ
তৃপ্তি সান্ত্রা
মালদহ ॥ পশ্চিমবঙ্গ ॥ ভারত
২০১৭ মার্চ ১৯ থেকে ৩০ বাংলাদেশ পর্বে অনেক প্রাপ্তির মধ্যে একটা বড় প্রাপ্তি রাজশাহী থেকে প্রকাশিত চিহ্ন পত্রিকা। ফেব্রুয়ারী ২০১৭ সংখ্যাটি মূলত গল্প সংখ্যা। ক্রোড়পত্রে ‘এ সময়ের গল্প ও গল্পধারার ঐতিহ্য’-পর্বে রয়েছে আলাপচারিতা, এ সময়ের ঊনত্রিশটি গল্প, গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ ও পুনর্মুদ্রিত প্রবন্ধ।

আলাপচারিতায় হাসান আজিজুল হক সহজ করে শুনিয়েছেন তাঁর জন্মস্থান, গ্রাম, পরিবার, লেখাপড়া, সাহিত্যপ্রীতি ও দুরন্ত কৈশোর-যৌবনের কথা। হিন্দু-প্রধান গ্রামে বেড়ে উঠেছেন। সম্পূর্ণ নিরক্ষর, কেউ পাঠশালায় যেত না। সেখান থেকে বৃত্তি পেয়ে, নানারকম হাউল পেরিয়ে তিনিই প্রথম গ্রাজুয়েট, হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে। এই রাঢ় এলাকার মধ্যে তাঁর বুকের মধ্যে ঢুকে গেছিলো একটা বিশাল মাঠ। প্রচুর পোড়ো মাঠ, দীঘি, ষাটতলার মাঠ। এটা এমন যে, ‘বাড়িতে বসে থেকেও মনে হত যে বিশাল মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তো এমন দিবাস্বপ্ন নিয়ে আমার অনেক সময় কেটে যেতো।’ সাপের মাথায় পা দিয়ে, তালগাছে উঠে তালপাড়া, বাজপড়া তালগাছের মাথায় উঠে পানিতে ঝাঁপানো —একটা দুরন্ত বাল্যকাল কাটিয়েছেন। গল্প লেখার জন্য দৌড়োদেড়ি করতে হয়নি তাঁকে। তাঁর খোলামেলা স্বীকারোক্তি …‘ইন সার্চ অব স্টোরি আমি কোনদিনই নই। এখনও আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে আমি গল্প তৈরি করতে পারদর্শী নই।… আমি অভিজ্ঞতা ছাড়া লিখতেই পারিনা।’

এই অভিজ্ঞতা আসে মাটি সংলগ্নতা থেকে, জীবন সংলগ্নতা থেকে। তার ভা-ার এখনো এমন ভরপুর যে তিনি এখনো গল্প, নভেলের পাশাপাশি ছোটদের জন্য লিখতে চান। … ‘যদি জীবনের স্বাদটা না থাকতো তাহলে এখনো বোধহয় পারতাম না। বাঁচার যে স্বাদ এটা যতোক্ষণ না মানুষের যায় ততোক্ষণ পর্যন্ত সে এ্যাকটিভ থাকে।’ পুরো কথোপকথনে হাসান আজিজুল হকের সজীবতা, ধার- সাহিত্য নিয়ে খোলামেলা ধারালো বক্তব্যকে প্রশ্নে প্রশ্নে উস্কে দিয়েছে চিহ্ন পত্রিকা। গল্প লিখতে লিখতে প্রবন্ধ লেখা, চিন্তাশীল কথা বলতে বলতে কালচার-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা, রাজনৈতিক দায়িত্ব এবং অনুবাদ… অর্থাৎ লেখা; আবহমান জার্নির মধ্যে রয়েছেন, এ্যাকটিভ রয়েছেন আটাত্তর বছর বয়সের এই যুবক। প্রত্যেক লেখকের কাছে শিক্ষনীয় তার এই জার্নি। চিহ্নর একটি মূল্যবান সংগ্রহ এই আলাপচারিতা।

ক্রোড়পত্রের গল্প ও গল্পের কথা বলার আগে আর একটি সাক্ষাৎকারের কথা বলি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী অধ্যাপক আলী আরিফুর রেহমানের ইংরেজীতে দেওয়া সাক্ষাৎকারের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে, ‘বাংলাদেশের ইংরেজী শিক্ষা শিরোনামে।’ বৃটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা পেয়েছি তাদেরই পাঠক্রম আর তাদেরই নাম দেওয়া ডিগ্রি। এই পাঠক্রম থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে বলা হয়, ‘শিক্ষার মানের ক্রম-অবনমন ঘটছে। সারা পৃথিবীজুড়ে এই অবনমন ঘটছে। বর্তমানের মতো আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যেও ভাষার প্রচলন নাও থাকতে পারে। কারণ নতুন সুপার পাওয়ার রূপে চলে আসছে চীন। উত্তর উপনিবেশ ধারণায় বৃটিশ সা¤্রাজ্যেও অন্যান্য উপহার—যেমন সরকারি চাকরি, রেল ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থার মতো ইংরেজী শিক্ষারও একটি অন্ধকার দিক আছে —স্থানীয় ব্যবস্থার ভালো দিকগুলোর অনেকখানি ধ্বংস ও বিনষ্ট হয়ে গেছে এই শিক্ষায়। এই প্রেক্ষাপটে ইংরেজী সাহিত্যের চেয়ে ইংরেজী ভাষা শিক্ষাই বেশি যৌক্তিক : কেননা, তার মতে ভাষাটির কিছু ব্যবহারের দিক আছে, যা সাহিত্যেও নেই। ইংরেজী সাহিত্য পঠনের ক্ষেত্রে সিলেবাসে মূল ক্লাসিক ইংরেজী সাহিত্য পাঠ বাধ্যতামূলক করার পক্ষে প্রফেসর আলী আরিফুর রেহমান। সেই সঙ্গে তার দেশে অথবা পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে যা কিছু ইংরেজীতে লেখা হয়েছে সবকিছুই ইংরেজী শিক্ষার পাঠক্রমের মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলেছেন আধুনিক প্রযুক্তির গুণগ্রাহী প্রফেসর আলী। মনে করতেন যে, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের মতো পশ্চাৎপদ তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকের জন্যও সর্বশেষ সংস্করণের ল্যাপটপের মালিকানা নয়, বরং সকালের নাস্তার টেবিলের একটি গরম রুটির ব্যবস্থাই হবে বিলাসীতা। আমজনতার চক্ষুদানের প্রয়োজনেই—‘চারশত বছর ধরে যে সমস্ত লেখা ও দলিলাদি সমাধিস্ত হয়ে আছে তাদেরকে আলোর মুখ দেখান’। তরুণ শিক্ষকদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন অধ্যাপক আলী। নতুন চিন্তার দ্বার খুলে দেয় তার সাক্ষাৎকার। সাইদ হাসানের অনুবাদ চমৎকার ঝরঝরে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা নানা রকম—কেউ সাহিত্যে অতিবাস্তবতা-রক্তারক্তি – হানাহানি দেখতে চান না। কেউ চান কাঁদবার শক্তি। কেউ মনে করেন আনন্দ আর ভালো মানুষীর শিক্ষাই যদি লেখায় না থাকে, তবে সে কেমন লেখক! যিনি কাঁদাতে পারেন, হাসাতে পারেন তিনিই সফল সাহিত্যিক; আর যিনি হাসাতে কাঁদাতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত উদ্বেগ ডেকে আনেন, নিস্পৃহতা আনেন, চিন্তিত করে তোলেন—তিনি দুর্বোধ্য কথাসাহিত্যিক। কুকুরকে মারার আগে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার মতো একজন সাহিত্যিককেও একঘরে করে ফেলার জন্য প্রথমেই যে অপবাদটা দেওয়া হয়, তা হলো উনি তো দুর্বোধ্য লেখেন। “সংকট কোনখানে” প্রবন্ধে ইমতিয়ার শামীম খুব চমৎকারভাবে অতীত থেকে বর্তমান কর্পোরেট জগতে কথাসাহিত্যের সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন। গল্পবিষয়ক প্রবন্ধ বিভাগে অধিকাংশ লেখা পুর্নমুদ্রিত—সত্তর, আশি ও নব্বুইয়ের দশকের গল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন, যথাক্রমে সুশান্ত মৃধা, নাসরিন জাহান ও পাপড়ি রহমান।

জীবন বদলে যাচ্ছে। সমাজ বদলে যাচ্ছে। গল্পের চেয়ে আকর্ষণের কায়দা বদলে যাচ্ছে। পাপড়ি রহমান মনে করেছেন—‘এই ক্ষেত্রে নব্বই-এর চেহারায় প্রাণ আনতে যেন নবতর প্রেরণায় ফিজিক্যাল স্টোরির আমদানী প্রয়োজন’। ১৯৬৯ সালের আমাদের গল্পসাহিত্য প্রবন্ধে আবুজাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন—‘উল্লেখযোগ্য যে আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি এবং যন্ত্রপাতি প্রভৃতিও আমাদের গল্পে ক্বদাচিৎ দৃষ্ট হয়। বিমানপোত এমনকি সামুদ্রিক জাহাজও আমাদের গল্পের পটভূমি নয়। কিন্তু আমাদের গল্পসাহিত্যের এই গ্রাম কেন্দ্রিকতাকে নিন্দা করার কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না। আয়ত্তাধীন এবং পরিচিত উপকরণ নিয়েই তো আমরা লিখবো।’

বিশ^ায়নের ধাক্কায় পরিচিত চরাচর আয়ত্তাধীন থাকে না আমাদের। কর্পোরেট থাকার নিচে ক্রমশ বিলীয়মান গ্রামীণ সভ্যতা। লেখক পাঠক কেউই গ্রাম-কেন্দ্রিক নয়। গ্রামও সেই গ্রাম নেই। নগর মানেই শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণি নয়—সেখানে অন্য শ্রেণিগুলো আছে। শোষণ, আগ্রাসন এবং হিংসা এমন খাঁজ কাটা সেখানে ফিজিক্যাল স্টোরির আমদানি সহজ নয়।

সংকলনের উনত্রিশটি গল্প পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা-কেন্দ্রিক গল্পের মতো ঢাকা কেন্দ্রীক নয়। সূচনা গল্প ছায়াবাড়ি হাসান আজিজুল হকের এক অসামান্য নির্মাণ। সম্পন্ন গৃহস্থ মির্জা গালিব সাঁঝবেলায় মাটি থেকে ভেসে ওঠা খামার বাড়ি দেখলেন। দেখলেন ব্যস্ত মাহিন্দার, কিষাণদের, দেখলেন মরায়, লোহার সিন্দুক, কাঁঠাল কাঠের চৌকি। সারাবাড়ি জুড়ে শস্য উৎসবের ঝমঝমে ছবি। সে ছবি আকাশ-কুসুমের মতো মিলিয়ে গেলেও ভয় নেই। ‘শরীরের চামড়ার ওপরে নীল উল্কির মতো বাড়িটার ছবি তার মনে বসে গেছিলো।’ এই ছবি নিয়ে অন্ধকার মাঠে নির্ভয়ে নেমে পড়েছিলো মির্জা গালিব। ভূবনায়ন পাঠকক্রমে কৃষি অলাভজনক মৃত। মাঠের ফসল মাঠে শুকোয়, উয়ে লাগে পোকায় কাটে। এই পাঠক্রমকে ভুল প্রমাণ করতে আজিজুল হকের ছায়াবাড়ি। মুষ্টিবদ্ধ উত্তেলিত হাতের চিৎকার নেই। ভূমিহীন কৃষক নেই। সামন্ত মির্জা গালিব, তার সম্পন্ন গৃহস্থালীর ছবি এঁকেছেন লেখক তার নিজস্ব শৈলীতে। কিন্তু কিভাবে সেই বাড়িটার জেগে ওঠা আর মিলিয়ে যাওয়ার জলছবি পাঠক অনুভব করেন নিজেরও চামড়ার গভীরে। সেঁধিয়ে যান কথাকার হাসান আজিজুল হকের নিজস্ব উপনিবেশে।

সবগল্প নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। ধর্মান্তরিত মানুষ কি ভুলে যেতে পারে সংস্কার, শিল্পীসত্তা—দুইজন দুই ধর্ম নিয়ে কি এ সংসারে থাকতে পারে। বড় চমৎকার ধরেছেন নাসরিন জাহান তাঁর গরঠিকানিয়া গল্পে। রাখাল রাহার একটি পুকুরের কাহিনী আর শহীদ ইকবালের গোসাইপাড়ার এজমালি জমির মাঝে অনেক ক’টি গল্প। মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, নির্বাচনী কিসস্যা, জবাই, ধর্ষণ থেকে গ্রামের মাঠ খাওয়ার কাহিনী উঠে এসেছে এইসব কিসস্যায়। ‘যা খুশি বানিয়ে বানিয়ে ফ্যাচর ফ্যাচর নয়।’ ইফতেখার মাহমুদের গল্পের চরিত্র আজিজুল সাহেবের মতো পাঠকও জড়িয়ে যান আজ-কাল-পরশুর গল্পে। গল্পগুলির রচনাকাল উল্লেখ থাকা জরুরী ছিল। পত্রিকা শেষে বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের গল্প ও গল্পতালিকাটি মূল্যবান।

সুবন্ত যায়েদ, প্রতিমা মিত্র প্রীতি, নাজমুল হাসান পলক- আমার রাজশাহী শহরের বন্ধুরা লিখেছেন এ সংখ্যায়। চিত্তের প্রসারতা মস্তিষ্কের মুক্তি উচ্চারণ যে পত্রিকার, সেই পত্রিকার সম্পাদক শহীদ ইকবালকে আমাদের আনত অভিবাদন। বিশ^বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করে এই রকম একটি পত্রিকা প্রকাশ সত্যি অসাধারণ। জ্ঞান-প্রজ্ঞা-মননের সঙ্গে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজ-মানুষের প্রতি নিখাদ ভালবাসা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে এ কাজ অস¤ভব। পত্রিকায় স্মরণ করা হয়েছে শহীদ কাদরী ও সৈয়দ শামসুল হককে। তাঁদের উদ্দেশ্যে চমৎকার শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন পত্রিকার সম্পাদক। সব নিয়ে চিহ্ন ঋদ্ধ করেছে আমাকে, মুগ্ধ করেছে, গর্বিত করেছে।

নির্জ্ঞান

ক্ষুধা ও শস্যের ভাষা

পড়ে আছে

আমাদের সামনে।

আমি এর মাঝামাঝি

নিরক্ষর মিশে থাকি

তারাঘাসের গায়ে।

দেয়ালে দেয়ালে

কীসব গ্রাফিত্তি;

রূপকথার হৃদয় চুরি যায়,

কোথায় যায়!

আকাশের

সাদানীল বিছানায়

মেঘের চিতারা সব

অপেক্ষায় থাকে

কখন আসবে

আগুন ;

শেখাবে তাদের

জ্বলে উঠার ব্যাকরণ;

কারক-সমাস।

পরাজিত পদাবলী-০২

অজানা লহর বাজে উঁচানিচা জখম

যায় ছেড়ে যাক সে তারই খাই কসম

দুধ কলা দিয়ে তারেই পুষেছি যখন

পায় সুখ পাক সে তারই হই আপন

বিপদ-প্রহরে তারই হাত ধরেছি যখন

দেয় ছোঁবল দিক সে বেদনার বিষ

মায়াবী ফর্দ ফেলে জ্বালাক অর্হনিশ

ভেবে নিলে নিলো সে ভাবানার ভেলা

ভাসিয়ে দিলে দিলো সে অপ-অবহেলা

ছেড়ে যায় যাক সে তারই খাই কসম

দুধ কলা দিয়ে তারেই পুষেছি যখন

পরাজিত পদাবলী-০১

অনেক আগে জলার ধারে

হিজলফুলের আভায়

টুপটুপাটুপ ঢেউয়ের উপর

খরস্রোতার লাভায়

অনেক আগে দাঁড়িয়ে ছিলাম

পক্ষপাতের বাঁধায়

মুখোমুখি হলাম যখন

হাত বাড়িয়ে দিলাম যখন

ক্লীব পাতার জরায়

অল্প হলো বায়না তখন

কল্প দেখার নেশায়

আরও আগে অনেক আগে

চুলের পাঠ চুকে দিয়ে

মাথার ওপর দিব্যি দিয়ে

ফিরতে ফিরতে ফেরার পথে

দীর্ঘশ্বাসের কাঁটায়

অনেক আগে আটকে ছিলাম

রক্তপাতের গঙ্গায়

অনেক আগে অনলরাগে

পায়রা ঠোঁটে বার্তা এলো

সত্য পাপে বিরতি হলো

অনেক বোঝাপড়ায়

এরপর এক সংসার পেলে

মনের মতো বর পেলে, বাবু পেলে

দারুণ নাট্যকলায়

আরও আগে হেমের ভেতর

রক্তজবার পাতায়

খুব সংকোচে উঠলো কেঁপে

দ্ব্যর্থ দেহের দোহাই

এরপর হয়নি কিছুই

ব্রাত্যচক্রে সয়নি কিছুই

অসম অভিধায়

অনেক আগে নম্র  মুখে

লজ্জা ভাঙার নেশায়

জল ছলোছল গালের উপর

হাত কাঁপানো দ্বিধায়

তারও আগে দাঁড়িয়ে ছিলাম

পাথরপাতের ধাঁধাঁয়

পাথরপাতের ধাঁধাঁয়, সোনা

পাথরপাতের ধাঁধাঁয় ।

হাওরে অন্ধ হাঁস

হাওরের হাহাকারে ছড়িয়ে আছে

চোখবাহিত অশ্রুকণা—

পচাধানে জড়িয়ে ধরলে পায়ের আঙুল

উন্মাদ বুক চাপড়ে অট্টহাসি দেয়।

সমূহ সোনা ডুবে গেলে জলের ভেতর—

অন্ধ হাঁস হয়ে বসে থাকতে হয়!

হাইডেল বার্গের লোককন্যা

লেটুস পাতার মতো ছড়ানো হৃদয়

আমাকে ফিয়েছো

রকেট পাতার মতো চোখের পাপড়ি

মেলে দিয়েছো আমার জন্য

স্যালমন ফিশের মতো হালকা গোলাপী ঠোঁটের

পরতে আহ্বান গোপন ছিল না।

নেকার ব্রিজের মতো দুই পাড়ের বন্ধনের হাত

স্পর্শ পেয়েছি আমার হাতে

এই হাতেই টলমলে জল ঢেলে দিয়েছো গ্লাসের পর গ্লাস

জলেই বাঁচতে শিখিয়েছো

তুলে দাওনি তোমাদের প্রিয় স্যামপ্যান

আমার জন্য কী দেবে দাও এভাবে অকপট চাওয়া তোমার।

হাইডেল বার্গের লোককন্যা

একটি কবিতা তোমার জন্য থাকবে,

ওখানে আমাকে পাবে, তোমাকেও আমি।

গ্যেটের ফাউস্ট ও আগামীর আমি

কতটুকু আর দূরের বয়ান

ফাউস্ট তবে কী তুমি সময়ের সঙ্গী।

ভেঙে চুরে দূরের সময়

গ্যোটে বিনির্মাণ করে যায়

অতীত ও বর্তমান

সময়ের ভাঙ-চুর ছাপিয়ে ফাউস্ট

তুমি আজ

তুমি আগামীর

তুমি জীবন্ত মানব।

বিশ্বগ্রাম ঘুরে ঘুরে চির নতুন সত্তায়

পৌঁছে গেছো

নরকের দহন জ্বালায় তোমাকে নিয়ে

কতই না হয়েছে পুতুল নাচ।

এখন আমিও খুঁজে পাই

আমার ভেতর

অতৃপ্ত আত্মার মুক্তি

নিজের ঘরের বাতি রেখে

পরের ঘরের জ্বালাই বাতি

বাঁচি মধুর মুহূর্ত সঙ্গে নিয়ে

সবুজের শুশ্রƒষায়…

আনপ্লাগড অ্যান্ড আনলিশড, প্রমাদসংগীত

আধা-বাস্তব আধা-ফ্যান্টাসির যুগ পেরিয়ে সম্ভবত আমরা অজান্তেই প্রবেশ করেছি এক উচ্চতর ফ্যান্টাসির যুগে। এখন, এই ক্লাইম্যাক্স পর্বে, অজ্ঞাত আরশ থেকে প্রত্যাদেশ পেয়ে—হ্যাভ আর হ্যাভ-নটস— দুই ধ্রুপদী বৈরীপক্ষ পরস্পর হাতে-হাত কাঁধে-কাঁধ রক্তহোলি জঙ্গে নেমেছে অজানা ফ্যান্টমের বিরুদ্ধে, উদ্দেশ্যবিধেয়রিক্ত, নিশানাহীন নিশানা তাক ক’রে।

বলপূর্বক-গুমের পিছে পিছে স্বেচ্ছা-গুম। উর্ধ্বকমার বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়ে বন্দুকযুদ্ধ স্বয়ং ছুটছে দিগবিদিক। অতএব, এখন, কমাযুক্ত বন্দুকযুদ্ধের পিছে পিছে, এবং পাশাপাশি, কমামুক্ত সাচ্চা বন্দুকযুদ্ধ। ধরে-আনা নিরীহ বিড়াল, নির্যাতনে উভ্রান্ত, অবলীলায় কবুল করছে ‘আমিই বাঘ’। আর সঙ্গে-সঙ্গে সেই বানোয়াট বাঘের কাহিনির পিছে পিছে সত্যিকার শ্বাপদসংগীত।

কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন যে-কোনো মামুলি কথা, যে-কোনো নির্দোষ জিজ্ঞাসাকেও মনে হবে জ্যান্ত রেটোরিকস। নকশিকাঁথার পাশে পড়ে-থাকা নিরীহ সুতাকে ভ্রম হবে সুতানলি সাপ। ছেলের হাতে-ধরা মোয়াকেও মনে হবে ‘ওরে বাপরে বাপ!’

কোনো একভাবে তো যেতেই হবে

কর্কটে, হৃৎবৈকল্যে, অচেতনে, অস্ত্রোপচারে, আত্মঘাতে, বোমায়, বজ্রাঘাতে, বলাৎকারে, উদ্বন্ধনে, আগুনে, আঘাতে, গরলে, বা দুর্বোধ্য তরলে, প্লীহাদোষে, রাজরোষে, পতনে, প্রপাতে, চাপাতিতে, ক্রসফায়ারে, বিমানধসে, দাঙ্গায়, দুর্বিপাকে, জাহাজডুবিতে, হিংস্র প্রাণীর মধ্যাহ্নভোজে, কিংবা অজানিত কোনো বদ্ধ প্রকোষ্ঠে চিরতরে আটকা প’ড়ে অনাহার-অনম্লজান দশায়, কিংবা অন্য কোনো অচিন্ত্য অচিহ্নিত পথে…

এত পথ! এত বিচিত্র উপায়! প্রস্থানচিহ্ন আঁকা যে কোন পথে!

বনের মধ্যে বসানো এক গর্জনশীল ভয়ালদর্শন যন্ত্রের সামনে

বেচারাথেরিয়ামের মতো ব’সে, তওবা করার ভঙ্গিতে

গুনগুনিয়ে ভাবছে লোকটি, মেঘলা দিবসে।

শ্র দ্ধা ঞ্জ লি

 

কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য (১৯৭০-২০১৭)

গত ৭ মার্চ ২০১৭ খ্রি. কলকাতার পথে ছিলাম। বেনাপোল বর্ডার পার হওয়ার আগে আমার সফরসঙ্গী বাংলাদেশের লেখক যশোরের হোসেনউদ্দীন হোসেনের বাসায় ছিল তখন রাত্রিযাপন। হঠাৎ নেট-সংবাদে ভেসে এলো কালিকাপ্রসাদের দুর্ঘটনার খবর। হুগলীর পথে শিউরিতে দুর্ঘটনার পর বর্ধমান হাসপাতালে নেওয়ার তিনি মারা গেছেন। জানা যায়, গানের দলের সবাই বেঁচে গেলেও কালিকা বাঁচেননি। অকস্মাৎ স্তম্ভিত সবকিছু! কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া খুব কঠিন হয়। গত দুতিন বছরে কালিকার গান এতো শুনেছি যে, মাটি-মানুষ-জীবন আর বঙ্গজ লোকসুরের ভা-ারে বহুমূল্য সন্ধানের এ জহুরী দল, গলা আর পা-িত্য দিয়ে আমার মতো অনেককেই মুগ্ধ করে রেখেছিল। এই মায়ার ভুবনে মানুষের মৌহুর্তিক চলে যাওয়া, খুব কষ্টের এবং বেদনারও। ওইদিন এ মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ঠিক যেমনটা—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু, চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণের মৃত্যু কিংবা বাংলাদেশের চারণ-সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দীনের মৃত্যু। কালিকাও যেন তেমনি। আমাকে নির্ঘুম করে ফেলে। যেন রাতের প্রহরায় নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। গোপনে চোখ মুছেছি, কষ্ট পেয়েছি। বুঝি অনেকদিন তাঁকে মিস করবো। এখনও প্রায়শই ইউটিউবে তার গান শুনি আর মনে মনে ভাবি—ও তো এখনও আছে—মানুষ বুঝি এভাবেই বেঁচে থাকে, মরে না কখনোও! এসব অবুঝ আবেগকে ক্রমশ সত্য দিয়ে ঢেকে দিই। সত্যকে মেনে নেই আর করে বসি এ শ্রদ্ধাতর্পণ। আমাদের সুহৃদ সাংবাদিক-বন্ধু লেখক ও গল্পকার কাজল রশিদ শাহীন খুব পরিশ্রম করে এ সাক্ষাৎকারটি চিহ্ন-পাঠকের জন্য করেছেন। সাক্ষাৎকারটির শিরোনামও তিনি দিয়েছেন। তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। [সম্পা.]

******************************************************

‘বাঙালির তীর্থ হল একুশের ঢাকা’
কাজল রশীদ শাহীন
কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য কলকাতার লোকগানের দল দোহার’র প্রতিষ্ঠাতা। তার ও তাদের যূথবদ্ধতায় দোহার বাংলা গানে গেঁড়েছে স্থায়ী এক নোঙ্গর, যা সবার কাছেই আরাধ্য। কীভাবে অর্জিত হল এই সাফল্য-সূচক? বলা-না বলা সেসব বিত্তান্তের খসড়া খতিয়ান হাজির হয়েছে এই সাক্ষাৎকারে।

দোহার’র জন্মবিত্তান্ত জানতে চাই, কখন কীভবে তার আত্মপ্রকাশ?

দোহার’র যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। ঐ বছর ৭ আগস্ট হয় আমাদের প্রথম অনুষ্ঠান। আমার বেড়ে ওঠা আসামের শিলচরে। নিজেদেরকে আমরা ‘সুরমা’ সিলেটী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বলে মনে করি। শিলচর-করিমগঞ্জে তারই একটা পরম্পরা ছিল। আমি ওখানে বড় হয়েছি। এরপর ১৯৯৪ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হয়ে কলকাতায় আসা। শিলচওে বেড়ে উঠেছি গানের-সংস্কৃতির মাঝে।

আমার বড় জ্যাঠা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছাত্র ছিলেন। আমার আরেক কাকা মুকুন্দ ভট্টাচার্য ছিলেন গণনাট্য সঙ্গীতের দক্ষ শিল্পী। আমার বাবা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় মাপের সংগঠক ছিলেন। আমার পিসি আনন্দময়ী ভট্টাচার্য সুদক্ষ সঙ্গীতশিল্পী। শিলচর সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানটা উত্তরপূর্ব ভারতের সবচেয়ে পুরনো সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ আমার বেড়ে ওঠা সঙ্গীতের মাঝে। বাড়িতে পড়তে না বসলে বকা খেতে হয়নি; কিন্তু সন্ধ্যায় তবলার রেওয়াজে না বসলে বকা খেতে হয়েছে।

আজকের কালিকাপ্রসাদের ভিত্তি তাহলে পারিবারিক বৃত্তেই রচিত হয়েছিল?

আমাদের বাড়িতে সঙ্গীতচর্চার দুটো ধারা ছিল। একটা ছিল দেশি গান, মানে কীর্তন, ভজন, মালসি গান। আর একটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, আমাদের বাড়িতে বিখ্যাত প-িতরা আসতেন। আমি যখন যাদবপুর এলাম, নব্বই দশকের শুরুতে, তখন আমার ছোটকাকা অনন্তের ‘লোকবিচিত্রা’ নামে একটি গানের দল ছিল। ওরা অল ইন্ডিয়া রেডিওর এ গ্রেড গানের দল ছিল। পরে নানা কারণে দলটি ভেঙে যায়।

ছোটকাকা আমাকে বলেছিলেন, দলটি আবার তিনি জোড়া দিয়ে কলকাতায় যেতে চান। ভারতবর্ষে সব বাঙালির জন্যে কেন্দ্রস্থল হল কলকাতা। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় বসে খবর পেলাম যে উনি মারা গেছেন। তখন সদ্য আমার এমএ শেষ হয়েছে। লোকসঙ্গীতের স্বাদ-গন্ধ-মেজাজ নষ্ট না করে মঞ্চে পরিবেশন করার উনার একটা স্বকীয় স্টাইল ছিল।

আমার তখন মনে হল, উনার তো কলকাতা এসে গান করার ইচ্ছে পূরণ হল না। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি উনার গানগুলো এখানে করতে পারি কিনা। তখন বন্ধুবান্ধব-শিক্ষক সকলকে গানগুলো শোনানোর একটা ব্যবস্থা করলাম।

এটাতে কোনো চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকি কি ছিল?

একটা চ্যালেঞ্জ তো ছিলই। তবে আমার বিশ্বাস ছিল আমি পারব। এই বিশ্বাস থেকেই আমরা কয়েকজন মিলে গানগুলো নতুন করে তুললাম। শিলচরের রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী রাজীবও ছিল আমার সঙ্গে। একজন ঢোলক আমাদের ডাকে এলেন। এখন আমাদের সঙ্গে সারিন্দা বাজান নিরঞ্জনদা’ উনি এলেন। নিরঞ্জনদা’ ট্রেনে সারিন্দা বাজাতেন। ওখান থেকে আনলাম।

একজন ফুচকা বিক্রেতা দোতারা বাজাত, ওকে আনলাম। এরপর সবাই মিলে একটা দল হিসেবে ১৯৯৯ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার স্টুডেন্টস হলে একটা গানের অনুষ্ঠান করলাম। ঐ হলটা কলকাতার সবচেয়ে সস্তা হল ছিল। ৫০০ টাকা ভাড়া। গান করার আগে আমাদের নাম কি হবে এটা নিয়ে ভাবনাই পড়ে গেলাম।

প্রথমে ভেবেছিলাম ‘লোকবিচিত্রা’ নামটাই থাক। পরে যাদবপুরের একজন মাস্টারমশাই অভীক মজুমদার আমাকে বললেন যে তোমাদের দলের নাম ‘দোহার’ রাখো। আমরা নামটি গ্রহণ করলাম। আমার মনে আছে, সেদিন গান করার আগে বলেছিলাম, এটাই আমাদের ‘দোহার’র প্রথম অনুষ্ঠান এবং এটিই শেষ অনুষ্ঠান।

কারণ কলকাতায় তখন অন্য-পেশায় থেকে গান বাজনা করা সম্ভব না। শখের গানবাজনা কলকাতায় হয় না। আমার এবং রাজিবের অন্যরকম কিছু করার ইচ্ছে ছিল। এটা আসলে আমার কাকাকে একটা ট্রিবিউট দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে করা।

তারপর অনুষ্ঠানটা শেষ হয়ে গেল, কলকাতার দূরদর্শন থেকে আমাদের ডেকে বলা হল, তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানটা কেটে ছোট করে ৪৫ মিনিটের করে দিতে।

ঐ অনুষ্ঠানের প্রথম গানটা কি ছিল মনে আছে?

হ্যাঁ। একটা বন্দনা করেছিলাম। বন্দনা দিয়ে আমরা এখনো শুরু করি যে কোনো অনুষ্ঠান। বন্দনাটা ছিল: ‘আমি বন্দনা করিয়া তোমায় ডাকি হে, আইসো বাবা গুরু মুর্শিদ, আসো হে।’ এটা আমার কাকার কাছে শেখা।

বন্দনার এই কথা ও সুর কি সংগৃহীত?

হ্যাঁ, এটা সংগৃহীত। ‘আইসো গো আমার সরস্বতী, আমার কণ্ঠে করে ভর, গানের পথ ভুলিয়া গেলে যোগায় দিবা।’ একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া ঐ অনুষ্ঠানে করা সব গানই আমার কাকার কাছ থেকে শেখা। দূরদর্শনের পর যাবদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়ররা এসে একদিন ধরল একটা গানের অনুষ্ঠান করার জন্যে। লোভটা সামলাতে পারলাম না। নিজের কলেজ, ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবির সুমন, অঞ্জন দত্ত, রশীদ খানের গান শুনেছি। সেখানে এরকম একটা সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। ওরা তিনশ’ টাকা দিয়েছিল। এটা ২০০০ সালের কথা।

তখনও কি চাকরির জন্য আকুলি-বিকুলি করা শুরু করেননি?

আমি তখন এনজিওর একটা কাজ করতাম। তবে একটা ফেলোশিপ পাওয়ার কারণে ওটা ছেড়ে দিই।

সেটা কি সঙ্গীতবিষয়ক কোনোকিছু?

সেটা মিউজিক বিষয়েই। ইউরোপে একটা শব্দবন্ধনী খুব চালু আছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সং। অর্থাৎ শিল্পায়ন হয়েছে, গ্রামীণ জীবন থেকে শিফট হয়ে ওরা কিছু গান তৈরি করেছে, যেটাকে নাম দেয়া হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সং। আমার গবেষণাটা ছিল, ইউরোপের মতো আমাদের দেশে শিল্পায়ন ঘটেনি সত্যি, কিন্তু আমাদের দেশে চা শিল্পের মতো বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে যেখানে মজুররা দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে এসে কাজ করছে।

আমার অনুসন্ধান ছিল, ঐ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কি গান তৈরি হয়েছে, সেটাকে আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সং বলতে পারব কিনা, এই বিষয়ে।

এই গবেষণা কার তত্ত্বাবধানে করলেন?

কোনো ব্যক্তির অধীনে নয়। একটা সংস্থা আছে আইএফএ (ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন ফর আর্টস), ওদের কাছে প্রজেক্ট পাঠালে সেটি মনোনীত হলে ওরা তিন বছরের একটা গ্রান্ড দেয় কাজটা করার জন্যে। এরপর আমি যে এনজিওতে কাজ করতাম, দুর্বার মহিলা সমিতি, ওরা বলল একটা অনুষ্ঠান করে দিতে। ওটা করে দিলাম। এভাবে চেনাশুনা মানুষরা ডাকলে আমরা যেতাম। এরপর যেটা হল, দূরদর্শনে একটা মর্নিং শো হত। আমাদের বাংলার প্রথম মর্নিং শো ওটা। ঘটনাচক্রে আমি যাকে বিয়ে করেছি, ঋতুচেতা গোস্বামী, ও ওটার উপস্থাপক ছিল। তখনো আমাদের বিয়ে হয়নি। ওদের যিনি ডিরেক্টর ছিলেন তিনি একদিন বললেন যে আমাদের কয়েকটা গান দিয়ে দাও আমরা রেকর্ড করব।

ওরা সেই গান প্রায়ই বাজাত। এরপর ২০০০ সালের শুরুর দিকে এক ভদ্র্রলোক একদিন বাসায় ফোন করলেন। আমার তখন নিজের মোবাইল ছিল না। ভদ্রলোকের নাম বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়। উনি কনকর্ড রেকর্ডস’র মালিক। ওটা তখনকার নামকরা মিউজিক কোম্পানি। বিশ্বনাথ বাবু আমাদের নিয়ে একটা কাজ করতে চান। উনার সঙ্গে দেখা করলাম। উনি আমাদের ক্যাসেট বের করতে চান শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

আমি জানতাম, মিউজিক কোম্পানিগুলোর একটা ঝামেলা আছে। ওরা টাকা পয়সা নিয়ে ক্যাসেট বের করে দেয়। আমাদের অতো টাকা ছিল না। তাছাড়া কোনো ইচ্ছেও ছিল না। ভদ্রলোককে বললাম, দেখুন আমাদের তো অতো টাকা পয়সা নেই। এটা শুনে উনি বললেন, টাকা আপনাদের দিতে হবে না, আমিই আপনাদের দেবো।

তখন আরো ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ এই ইন্ডাস্ট্রির তেমন কিছু তো জানতাম না। ভাবলাম সাইন-টাইন দিয়ে কিছু একটা ঝামেলার মধ্যে যদি পড়ে যাই! আমি বললাম, না, ওসব দরকার নেই। আসলে আমাদের প্রস্তুতিও ছিল না। উনি বললেন যে, তুমি ভেবে বলো।

তখন অভীক দা’র কাছে গিয়ে বললাম। উনি কাজটি করার জন্যে খুব উৎসাহ দিলেন। তিনদিন পর আবার বিশ্বনাথ বাবু ফোন করলেন। উনি বললেন, শোনো তোমরা সাহস করে চলে আসো। আমি সব ব্যবস্থা করবো। টাকা পয়সা খুব বেশি দিতে পারব না।

দরকার হলে দুএকজন মিউজিশিয়ান বাইরে থেকে নিয়ে নেবে। এটা বলে উনি বললেন যে, আমার একজন অ্যারেঞ্জার আছে, উনার কাছে চলে যাও। উনি সব ব্যবস্থা করবে। আমি বললাম, না। করলে আমরা নিজেরাই সব ব্যবস্থা করবো। উনি বিখ্যাত মিউজিক অ্যারেঞ্জার, উনার কাছে আমরা নিজেদের কথাগুলো বলতে পারব না।

আমার কাছে সাউন্ডটা খুব বড় মূল্য রাখে। একজন মিউজিশিয়ানকে আমরা চিনি তার সাউন্ড দিয়ে। সলিল চৌধুরী যখন বাংলা গানে এলেন, তখন তিনি নতুন একটা সাউন্ডের জন্ম দিলেন। একইভাবে আর ডি বর্মণ একটা নতুন সাউন্ডের জন্ম দেন। এ আর রহমানের ক্ষেত্রেও আমরা একথা বলব। আমি যদি সাউন্ডহীন হয়ে যাই, তাহলে আমার আইডেনটিটি দাঁড়াবে না। যাই হোক, উনি সব মেনে নিলেন। অ্যালবামটা হল।

আপনাদের সেই প্রথম অ্যালবামের নাম কি ছিল?

বন্ধুর দেশে।

সবই কি ছিল সংগৃহীত গান?

আমরা তো সংগৃহীত গানই গাই। আমি নিজে কয়েকটা গান লিখেছি। কিন্তু দোহার থেকে করিনি।

অ্যালবামটির রেসপন্স কেমন ছিল, কোনো সাড়া ফেলতে পেরেছিল কি?

আমি রিলিজের দিনই বিশ্বনাথ বাবুকে বলেছিলাম যে, আপনি পস্তাবেন। এই ক্যাসেট লোকে কিনবে না। কেন কিনবে? আমরা কথা পাল্টাইনি, সুর পাল্টাইনি। আঞ্চলিক অনেক শব্দ বুঝবে না। উনি বললেন, ঠিক আছে, দেখি। ক্যাসেটটি বের হওয়ার পর দেখলাম বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে ডাক আসছে, অন্যান্য টেলিভিশন ডাকছে। বুঝলাম, এবার হয় দলটাকে ঠিকমতো করতে হবে, না হলে পুরো বন্ধ করতে হবে। এখন আর মাঝামাঝি কিছু করা যাবে না। ক্যাসেটের ব্যাপারটি খুব রেসিপ্রক্যাল ছিল। দেখা যাচ্ছে, কোথাও আমরা শো করছি, পরেরদিন সেখানে ক্যাসেট পৌঁছে যাচ্ছে। আবার যেখানে ক্যাসেট যাচ্ছে সেখানে শো করার জন্যে আমাদের ডাকা হচ্ছে।

শিলচর হচ্ছে দোহার জনয়িতা। আমার জানতে ইচ্ছে করছে সেই জনয়িতার কাছে দোহার গেল কবে?

আমাদের প্রথম অ্যালবামের একটা মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করেছিলাম শিলচরে। নিজেদের উদ্যোগেই করা। কারণ, গানগুলো ওখানকার, আমাদের সেন্টিমেন্ট শিলচরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ঐ সময় বাংলাদেশেও আসি। ২০০০ সালে শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে দেখা করার জন্যে প্রথম বাংলাদেশ আসা। উনার গান আমরা ছোটবেলা থেকেই শিলচরে শুনেছি।

আমার কাকার কাছে লোকসঙ্গীতের প্রথম যে গানটি শিখেছি ওটা ছিল শাহ আবদুল করিমের। গানটি ছিল ‘তোমার কি মায়া লাগে না’। কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে, এই শাহ আবদুল করিম সেই শাহ আবদুল করিম। কারণ, আমার ধারণা ছিল, যারা গান লিখেছেন তারা কেউ বেঁচে নেই। কারণ লালন বলে, হাসন বলে, রামপ্রসাদ বলে গানের মধ্যে যাদের ভণিতা পাই, তারা তো পুরানা লোক।

হঠাৎ আমরা শুনলাম, আমরা যে বলি, ‘করিম কয় তোমার কাছে মায়া যদি পাই’, এই করিম বেঁচে আছেন। তখন তার সঙ্গে দেখা করার জন্য খোঁজ লাগালাম। শুনলাম সিলেটে থাকেন। চলে এলাম বাংলাদেশ। এলাম যখন তখন ফেব্রুয়ারি মাস, ভাবলাম যে ফেব্রুয়ারির উদযাপনটা দেখে যাবো। চলে এলাম ঢাকায়। কি দেখবো জানতাম না। জানতাম যে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানে বিরাট কিছু একটা হয়।

‘একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানে বিরাট কিছু একটা হয়’—এ কথাটা আপনি কোথা থেকে কিভাবে জানলেন?

জানার একটা কারণ আছে। আমি যে শহরে থাকি, সেই শহরে ভারতবর্ষে প্রথম ভাষার জন্যে ১১জন প্রাণ দিয়েছিলেন। ফলত ৫২র ভাষা আন্দোলনের কোথাও তার একটা রেখাপাত করেছিল। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মানুষ আমাদের ওখানে গিয়ে উঠেছিলেন।

আমার কাকারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ওখানে গান গেয়ে টাকা তুলতেন। একাত্তর সালে আমার বয়স দেড় বছর। কাকা আমাকে একটা রেকর্ড প্লেয়ার বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার একপাশে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭মার্চের ভাষণ, অন্যপাশে অংশুমান রায়ের বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ বাড়ির বড়রা বলেন, মুজিবের ভাষণ শুনে নাকি আমি কেঁপে কেঁপে উঠতাম, ওটা শুনেই নাকি আমার মুখে বুলি ফুটেছে।

তারপর ঢাকায় এসে কি দেখলেন?

আমি আর আমার বন্ধু ঢাকার ফার্মগেটে এক হোটেলে উঠলাম। হোটেলের মালিক আমাদের বলল, আপনারা কি দেখবেন? আমরা বললাম একুশে ফেব্রুয়ারি। উনি বললেন, তাহলে এখনই বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তখন রাত দশটা বাজে। রাস্তায় নেমে দেখি হাজারে হাজারে মানুষ ছুটছে।

সবাই আমার ভাইয়ে রক্তে রাঙানো গাইছে। আমি বললাম কোনদিকে যাবো। উনি বললেন, রাস্তায় গেলেই সেটা বুঝতে পারবেন। আমি অনেক জায়গায় বলেছি, এখনো বলি, সব বাঙালির যদি কোনো তীর্থ হয়, সেটা একুশের ঢাকা। বাঙালি হিসেবে যদি তীর্থ করতে আসে, তাহলে তার একুশের ঢাকায় আসা উচিত।

এখন ঢাকায় আসলে কেমন মনে হয়?

না চেনার একটা সুবিধা থাকে, নিজের মতো ঘোরা যায়। কিন্তু এখন যেখানেই দাঁড়াই দু-চারটা লোক চিনে ফেলে। এর জন্যে আবার ভালোলাগাও আছে। আমি যে কাজটি করি, তার জন্যে লোকে যদি আমাকে চেনে তাহলে ভালোলাগা কাজ করা স্বাভাবিক।

দোহার কি কখনো ভাঙনের মুখে পড়েছে?

শিল্পী বের হয়ে গেছে, আবার এসেছে সেটাকে দোহার ভাঙা বলা যাবে না। ‘দোহার’র মূল হলো আমি আর রাজীব। আমাদের মধ্যে কোনো ভাঙন হলে, দোহার ভেঙে যাবে। তবে সেই সম্ভাবনা নেই এই কারণে যে, আমরা যেহেতু উত্তরপূর্ব ভারতের গান নিয়ে কাজ করি। এই অঞ্চলের মানুষ আমাদের তাদের প্রতিনিধি ভাবে।

আপনারা লালন এবং শাহ আবদুল করিমের গান করেছেন। এই দুজনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

দুজনের গানের অনেক পার্থক্য আছে। এটা বলতে হলে সঙ্গীতের তাত্ত্বিক বিষয়ের ভেতর যেতে হবে। বাউল গানের কোনো সুর হয় না। ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়ার একটা নিজস্ব ঢং আছে, বাউল গানের নিজস্ব সুরের কোনো ঢং নেই। রবীন্দ্রনাথের বাউল-আঙ্গিক গানের কথা অনেক প-িত বলেন, এটা কিন্তু ভুল বলা। বাউল-অঙ্গের দর্শন হতে পারে, সুর হতে পারে না। বাউল গানের সুরের মিল থাকে না এই কারণে যে, বাউল যে সুরটাকে গ্রহণ করে সেটা হল তার অঞ্চলের সুর। শাহ আব্দুল করিম যখন দেহতত্ত্বের পদ গাইবেন, বা দুরবীন শাহ যখন দেহতত্ত্বের পদ রচনা করবেন, তাদের সুরে ভাটিয়ালি আসবে কিন্তু লালন শাহের সুর আসবে না। কারণ ঐ সুরটা নদীয়ার সুর।

‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ এই গানগুলোর চলন হল নদীয়ার চলন। আবার আপনি ভারতবর্ষের বীরভূম অঞ্চলে গেলে দেখবেন, পূর্ণদাস বাউল, নবনী দাস বাউল (পূর্ণদাস বাউলের বাবা) এদের সুরের চলনটা আলাদা। এটা বীরভূমী চলন। এই যে সুরের আঞ্চলিকতা, এই জন্যেই বাউল পদকে লোকসঙ্গীত বলা হয়।

এখানে শাহ আব্দুল করিম একটু ব্যতিক্রম। তিনি নিজে কম্পোজার। আমার কাছে উনাকে একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে মনে হয়, উনি আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকটি গানের সুর করতেন। আর লালনের গানগুলো উনি উনার ভক্তদের বসিয়ে একটা (একই) সুরে গাইতেন। লালন পার্টিকুলারলি আলাদা করে বসে সুর করছেন, এমনটি মনে হয় ঘটেনি। তিনি গান বলতে বলতেই সুর হয়ে যেত। সেটা তার অঞ্চলের সুর।

পরবর্তীকালে তার গান মডিফাইড হয়েছে। ফরিদা পারভীনের গলায় আমরা যে গান শুনি, এটা মডিফাইড। আবুল আহসান চৌধুরীর কাছে অনেক সংগ্রহ আছে, যেমন খোদা বক্সের গান, ফরিদা পারভীনের গুরু মকসেদ আলী সাঁইয়ের গান, এদের সঙ্গে আমাদের আজকের লালন শিল্পীদের গানের ভেতর অনেক ফারাক আছে। ওরা একটা নির্দিষ্ট ঢঙে গাইতেন। লালন সাঁই কিন্তু বড় সাধক, তাঁর কাছে সুরকল্পটা বড় কথা নয়। সুর একটা তাঁর অবলম্বন মাত্র, তিনি কথাটা বলতে চান।

শাহ আবদুল করিমের কাছে বিষয়টি ফিফটি ফিফটি কাজ করেছে। তাঁর ঘরানাটা ভাটিয়ালি হলেও নানান সময়ে কাওয়ালি সুর লাগিয়ে দিয়েছেন। ‘গান গাই আমার মনরে বুঝাই’ এই গানটা আমরা যতবার শুনি, এটা ফট করে একটা সুরকার বা লোককবির কাছে, এই সুরটা বসানো কঠিন আছে। এই সুরটা বসাতে গেলে একটা কম্পোজারশিপ লাগে। হাসন রাজা কিন্তু কম্পোজার না। তার গানে যে নানারকম সুর করা, তার অধিকাংশ কিন্তু বিদিত লাল দাসের করা সুর। হাসন রাজাকে আমার জেঠুরা দেখেছেন, ও একসুরে গান গেয়ে যেতেন। ভক্তদের নিয়ে একটা বজরা ভাড়া করে উঠে যেতেন, আর গান চলত।

শাহ আব্দুল করিম বাউল কি-না এটা নিয়ে তো বিতর্ক আছে?

শাহ আব্দুল করিম নিজেও সেটা বলেছেন, তবে ব্যাঙ্গ করে। উনার সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে দু’বার। আপনাকে লোকে বাউল বলে একথা বললে উনি বলেছেন, মানুষে কয়, আমি তো কই না। কেউ পাগল কয়, কেউ বাউল কয়। আমি বলব, শাহ আব্দুল করিম বাউল ছিলেন।

বাউলদের তো একটা আলাদা জীবনযাপনের ব্যাপার থাকে, তাদের নিজস্ব কিছু রীতি-নীতি আছে, শাহ আবদুল করিমের তো সেটা ছিল না বা উনি পালন করতেন না।

এখানে একটা ব্যাপার আছে। এই জীবনযাপনের রীতি ঘরে ঘরে আলাদা হয়, অঞ্চলভেদে আলাদা হয়। কুষ্টিয়ায় আপনি বাউলের যে জীবনযাপন দেখেন বা যেভাবে তারা দীক্ষা নেন, সেটি সিলেটের বাউলের ক্ষেত্রে সেভাবে হয় না।

সিলেটের বাউলদের প্রকৃত বাউল বলা যায় কি-না?

সেটা আলাদা কথা। এই ‘প্রকৃত’ বিষয়টাকে কে সেট করবে? এটা বলা মানে তো, আমি বলতে চাচ্ছি এটা প্রকৃত আর এটা প্রকৃত না। এভাবে তো কেউ বিষয়টি সেট করেনি। আপনি যদি আবার শরীয়তী পন্থায় যান, সে তো পুরা মারফতি সাধনাকেই বাতিল করে দেবে। উনিশ শতকে বাউল ধ্বংসে ফতোয়া তো লেখা হয়েছিল।

শাহ আবদুল করিম, দূরবীন শাহ, সিতালং শাহ, আরকুম শাহ, শাহ নূর এঁরা একভাবে ঈশ্বরকে পাচ্ছেন; আর সাঁইজি, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, এঁরা আরেকভাবে পাচ্ছেন। বীরভূমে নবনী ক্ষ্যাপা, সুধীর ক্ষ্যাপা এঁরা আরেকভাবে পাচ্ছেন। এঁদের তো আসলে বলে গৌণধর্ম সম্প্রদায়। যে ধর্ম সম্প্রদায়গুলো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মতের সাথে সংঘাত করে বেঁচে আছে। এঁদের কিন্তু একটা সংঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

আর দেখুন, একটা জায়গায় তো ওঁরা একটা বৃহৎ মানুষের অংশ। এটার হয়ত কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই, কিন্তু প্রচলিত আছে যে, ঠাকুর বাড়ির জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কাঙাল হরিনাথের পক্ষ নিয়ে সাঁইজি লাঠি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। অর্থাৎ এর সত্যতা থাকুক আর নাই থাকুক, মানুষ তো নিরূপণ করছে যে, আমার সাঁইজি হলেন ‘এই’।

এভাবে কিন্তু তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। একই কথা শাহ আবদুল করিমের ক্ষেত্রেও খাটে। নইলে তার বৌ যখন মারা যায়, মৌলভীরা কেন বলছে যে, আমি তার দাফন করব না। উনি নিজেই খাটের তলায় দাফন করে দিচ্ছেন স্ত্রী সরলাকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি নামাজ পড়েন, রোজা করেন? বললেন, না।

আমি বললাম, আপনি আল্লাহকে বিশ্বাস করেন? বললেন, হ্যাঁ। তাহলে নামাজ পড়েন না যে? একথা বললে তিনি বললেন, আল্লাহ এত ছোট নাকি যে তিনি আকাশ থেকে দূরবীন দিয়ে দেখছেন আমি নামাজ পড়ছি কিনা! আল্লাহ অনেক বড় ব্যাপার। আল্লাহ (স্রষ্টা) অফিসের বস না।

আপনাকে কোন শিল্পী বা ঘরানা বেশি আলোড়িত করে?

দেখুন, আলোড়িত তো সব শিল্পীই করে। এটার নানারকম বিষয় আছে। আজ আমি যখন লালনের গান করছি, তিনি কে, কী রকম এসব আমার জানার দরকার নেই। আমি তাঁকে তার গানের ভেতর দিয়ে পাই। আমার কাছে, লালনের গানই মুখ্য, সে গৌণ। আর এটা তো সত্যি, লালনের গান ছাড়া প্রামাণ্য প্রায় কিছু নেই। যা ভাবা হয়, তার সবটাই কল্পনা। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, যে মানুষটা অক্ষর জানেন না, তিনি লিখছেন, ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’। শব্দটা পাচ্ছেন কোথা থেকে? সেই মানুষটা যে টেক্সট বানাচ্ছেন, এ তো তার শাস্ত্রের উপর শাস্ত্র পড়া। বৈষ্ণব শাস্ত্র থেকে কুরআন থেকে তুলে তুলে উদ্ধৃত করছেন। এগুলো বাদ দিন, এই যে আরশীনগর একটা শব্দ, এই শব্দটাই তো উনার জন্ম দেওয়া।

আপনার সাথে অনেক কথা হল, জানা হল। আপনাকে ধন্যবাদ।

দোহারের পক্ষ থেকে আপনাকে ও সকল বাংলা ভাষাভাষি মানুষকে আমাদের শ্রদ্ধা-স্নেহ ও ভালবাসা জানাচ্ছি।

******************************************************

 

ক্রো ড় প ত্র

সাহিত্যে দর্শন দর্শনে সাহিত্য
আলাপচারিতা
হাসান আজিজুল হক
আমাদের প্রস্তাবিত ক্রোড়পত্র ‘সাহিত্যে দর্শন দর্শনে সাহিত্য’ নিয়ে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক (জ. ১৯৩৯) লিখতে চাইছিলেন। কিন্তু পরে নানা কারণে লেখার বদলে আলাপচারিতাতেই তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেন। গত ১৫ মে ২০১৭ তারিখ সন্ধ্যার পর তাঁর রাজশাহীর বাসা ‘উজানী’তে আমরা আড্ডায় মেতে উঠি। ঘনিষ্ঠ এ আড্ডায় নানারকম বিষয় উঠে আসলেও তার অংশবিশেষ চৌম্বক কিছু পাঠকের জন্য আমরা পত্রস্থ করতে সক্ষম হই। আসুন, জেনে নিই দর্শন ও সাহিত্যের ওতপ্রোত সম্পর্কের সূত্রটি :

চিহ্ন : আমরা যেটা ফিল করছি সেটা হল যে আপনি দীর্ঘদিন দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন। সক্রেটিস এবং ছোড়ানো ছিটানো দর্শনের মৌলিক চিন্তা বিভিন্ন সময় করেছেন। এখন বিষয় হচ্ছে যে আপনি তো বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি বড় ভিত্তি এবং বটবৃক্ষ। সেক্ষেত্রে সাহিত্যের ক্ষেত্রে দর্শন ও দর্শন সাহিত্য এই বিষয়টা আমাদের জানা দরকার। কারণ আজকালকার লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রচার প্রপগা-া, তারপর যে সমাজ বাস্তবতা চলছে— যেটা আমরা প্রতিনিয়ত ফেস করছি, সেখানে দর্শনের একটা বড় অভাব। আর একই সঙ্গে লেখালেখি যা চলছে তাতে দর্শন বা দার্শনিক চিন্তাভাবনাটা ততোটা প্রকাশ পাচ্ছে না। লেখালেখিতে যেন সমাজের উপরিতলটাই থাকছে— চলতি কিছু জিনিস কিংবা বলা যায় যে তারল্য কিংবা তাৎক্ষণিক যা কিছু ঘটছে সেইটারই প্রকাশ করার একটা তারল্যসূলভ চেষ্টা যেন। অর্থাৎ সাংবাদিকসুলভ সাহিত্য। সেখানে আমরা আজকাল যে আপনার গল্পে দেখছি— যেমন কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে যে পঞ্চাশটি গল্পের সংকলন বেরিয়েছে, সেখানে মোটামুটি চুম্বক সব গল্পই আছে— সেখান থেকে হাসান আজিজুল হককে পাঠ করা যায় এবং তারপর একটা ফিলোসোফিও তার মধ্যে আছে (সেটাই গোচরে-অগোচরে গল্পের মধ্যে উঠে এসেছে) সেটা আমাদের ভেতরে কাজ করে। লেখকের সাথে দার্শনিক চিন্তা এবং সত্তার একটা যোগাযোগ সংস্রব আছে, চেতন— অবচেতনভাবেই আছে। কিন্তু আমাদের স্যার, যেটা মনে হচ্ছে আজকাল লেখালেখিতে এই যে দার্শনিক মুকুর সেটা আসলে মিলছে না। দর্শন ছাড়া তো গল্প হয় না! সেটাই স্বল্প— যদি তাতে একটা নির্ধারিত দর্শন থাকে। লেখকের বক্তব্যও তা-ই! এমনটা বুঝি আজকাল নেই। সেজন্য আমরা গল্পে ঠিক— বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না, আমরা উপন্যাসেও বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না। কিংবা গল্প উপন্যাস লেখা হলেও সেইটা আমাদের মনে তেমন একটা দাগ কাটছে না কিংবা পাঠক যেটা চায় কিংবা পাঠকের যে উপলব্ধি সেই উপলব্ধিতে আঘাত বলি বা অভিঘাত বলি সেটা পাচ্ছি না। তো এই জায়গাটা— স্যার আসলে— এই বিষয়ে আমরা আপনার কাছে এসেছি, কিছ,ু নতুন-পুরোনো ব্যাপার নয়! সাহিত্যে তো দর্শনটা দরকার এখানে সেই জিনিসটা আপনার বোধ-বুদ্ধি চিন্তা— সবকিছু মিলে আমরা একটু জানতে চাই। আর বহুকাল আগে আমরা প্রথম আলোতে বোধহয় পড়েছিলাম— অনেক আগে আপনি একটা লেখা লিখেছিলেন, ‘কান্ডজ্ঞানের দর্শন’…

হা. আ. হ. : হুম হুম। আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে

চিহ্ন : সেটা আমাদের মনে আছে— পড়েছিলাম। এই কান্টকে নিয়ে, হেগেলকে নিয়ে, সক্রেটিসকে নিয়ে— আপনার চিন্তা আছে। আমাদের জন্য, ছাত্রজীবনে এসব কঠিন পাঠ ছিল। কিন্তু, আপনার কাছে তা দেখছি যে অনেকটা সহজ, সহজ করে বলা, বুঝিয়ে বলা সমাজের সাথে মিলিয়ে বলা, বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে বলা। তত্ত্বকে তত্ত্ব না রেখে, সেটাকে পিষে ফেলে জীবনের অংশ করা। আজকে বড় সাহিত্যিক হিসেবে এসব বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন। দর্শন ছাড়া তো মানুষ হয়না— লেখক তো বটেই…

হা. আ. হ. : একটু ভেতরে যাতে ঢোকা যায় এইবস্তুজগতের যেন আরো ভেতরে ঢুকতে পারা যায়…

চিহ্ন : তো এই বিষয়গুলো নিয়ে… আসলে এগুলোর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা না। জাস্ট একটা কথাবার্তা এমনি লেখার বদলে কথালোচনা আর কি!

হা. আ. হ. : হুম, ঠিক আছে। এটা করতেই পারি। এই প্রশ্নগুলো কিন্তু খুব প্রাথমিক প্রশ্ন! দর্শনের শুরু থেকে এই প্রশ্নগুলো হয়েছে। এই পৃথিবীটা কি দিয়ে তৈরী? এর আল্টিমেট ম্যাটেরিয়ালটা কি? এখন দেখো এটা বিজ্ঞানেরও প্রশ্ন। তার মানে বিজ্ঞান ও দর্শন হাতধরাধরি করে চলছে। এবং প্রথম যুগে বিজ্ঞান যখন প্রায় একেবারেই শিশু অবস্থায়, যখন দর্শনের সূত্রপাত হলো, তখন দর্শনও কিন্তু বিজ্ঞানের প্রশ্নটাই তুলেছিলো। যেমন সর্বপ্রথম দার্শনিক,আমরা যেটা পশ্চিমা দর্শনে পাই ৬২৫ খ্রি. পূর্বাব্দে (এ সময় থেলিস এর জন্ম হয়) এবং এই থেলিস একজন ‘প্রকৃতিবিদ’, জিয়োম্যাট্রিশিয়ান এবং ফিজিসিস্ট। এই সবগুলো তার মধ্যে ছিল। তখনকার দিনে তো এই ভাগগুলো ছিল না। এখন তাঁদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়, আচ্ছা তাই তো হবে। তিনিই প্রথম এই প্রশ্নটা করলেন যে বিশ্ব কি দিয়ে তৈরী? বিশ্বটা তৈরি কি দিয়ে এবং এই প্রশ্নটা তো সেই অর্থে দার্শনিক নয়। সেগুলো যদি সবকিছু দূর করে, যাই হোক না কেন! কিন্তু ‘আল্টিমেট স্টাফ’টা কি? গ্রীক দর্শনের সূত্রাপাতটাই হচ্ছে প্রায় বিজ্ঞানকে দিয়ে। এবং প্লেটো পর্যন্ত বিজ্ঞান ছিল আরকি। সক্রেটিস পর্যন্ত বিজ্ঞান ছিল। সক্রেটিসের পর থেকে মানবিক হতে শুরু করলো। তার আগে মানুষকে নিয়ে কোন কথাবার্তা পৃথিবীতে হয়নি।

এঁদের মধ্যে নাম হল থেলিস, তার আগে জেনো; তার পর এসেছে এনাক্সিমেন্ডার, তারপর আছে এনাক্সিমিডিস,  ক্রমে বারমিনাইডিস, তারপর প্রোটোগোরাস। এঁরা সকলেই কিন্তু মোটামুটিভাবে বৈজ্ঞানিক ছিল। আমার তাই মনে হয়। কারণ এঁদের ভাবনা একটাই জিনিস- সেটা হল যে পৃথিবীর একেবারে শেষ জায়গায়-কোন জায়গায় গিয়ে কী ম্যাটেরিয়ালটা পৌছাবে সেই ম্যাটেরিয়াল দিয়েই সমস্ত পৃথিবী তৈরি এবং ওয়ান ম্যাটেরিয়ালটা কি, এটা অনেকেই জানতে চেয়েছেন। তখন বিজ্ঞান যেহেতু একেবারেই অপরিণত, সেখানে জবাবগুলো শুনলে, ছেলেমানুষী মনে হবে- সেই অর্থে ছিল বলে তোমার মনে হবে না। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যাবে। থেলিস বলেছিলেন, পৃথিবীটা কী দিয়ে গঠিত? এটা আল্টিমেটলি পানি দিয়ে গঠিত। শুনে মনে হতে পারে, এর থেকে বাজে কথা আর কী হতে পারে। এটা কি করে হলো! তখন উনি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, পানিই সেই বস্তু, ওয়াটার— যা একই সাথে বায়বীয় যদি তাকে আগুন দিয়ে তাপ দেওয়া যায়, আবার ঠা-ার মধ্যে থাকলে শক্ত বা কঠিন এবং তরল তো হয়ই। আমাদের দৃশ্যমান জগতের যে ত্রিমাত্রিক চেহারা, পানি সেই চেহারাই তৈরি করে— ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ বাস্পীভূত তারপরে তরল পরে শক্ত। তাহলে আলিটিমেট স্টাফ— ‘পানি’। এরপরের দার্শনিক যারা যেমন এনাক্সিমিডিস। তাঁরা নানা রকম বিবেচনা করেছেন। কেউ বলেছেন- যেমন, হেরাক্লিটাস বলেছেন, না না এটা তো ওভাবে না। এক অর্থে ‘ফায়ার’। আসলে সবচাইতে ‘ফ্রিড’ জিনিসটা হচ্ছে গতি। ওরই বক্তব্য একই নদীতে দুবার ¯œান করা যায় না। ‘সেম রিভার ইউ ক্যাননট … টোয়াইস’— যেখানে পা দিচ্ছ তুমি সেখান থেকে সরে যাচ্ছ— তাই দার্শনিক জেনো কতোকগুলো পাজেলড দিচ্ছেন… দ্যাখো একিলিস দৌড়বিদ বলে খ্যাত। ওর চেয়ে দ্রুত কেউ দৌড়াতে পারে না। হেক্টরকে মারলো তো দৌড়ে। কচ্ছপকে যদি এগিয়ে দেওয়া যায় আর একিলিসকে দু‘পা পিছিয়ে আনা যায় তারপর যদি হুইসেল বাজিয়ে বলা হয় তোমরা যাও তাহলে কিন্তু একিলিস কচ্ছপকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। কেন? তুমি বলবে মূহুর্ত অল্প একটু সময়তো মাত্র। তাইতো? সময়টাকে ভাগকরো করতে করতে একটা জায়গা পাবে যেখানে মূহুর্তটা স্থির। আর এই স্থির জায়গাগুলো যদি যোগ করা যায় তাহলে যে জায়গাটা পাওয়া যাবে যে পুরো বিন্দু যেটা সেটাও স্থির। তাহলে ভাবগতি দেখে মনে হবে যে – দৌড়িয়ে পার হয়ে গেল! আসলে সেটা করতে পারেনি। এগেুলো হল জেনোর কতোগুলো প্রব্লেম আরকি! এগুলো আমাদের খুব ভাবিয়ে তোলে। এগুলো বলার সময় প্যারামেডাইসিস বলে একজন ছিলেন। তিনিও একই কথাই বলেছেন ভয়। আর ভয় মানে শূন্যতা। পরবর্তীতে প্লেটো যখন আসলেন তিনি বললেন, না না। শুধুমাত্র বস্তু জগতকে নিয়ে ভাবলে চলবে না। বস্তুটা জগতের একটা পার্ট। বস্তুজগতের ওপরে কর্ম করতে পারে। আবার বস্তুজগতও তার ওপর কর্ম করতে পারে। এমন একটা প্রাণী হচ্ছে মানুষ। যা প্রকৃতি থেকে তৈরি। আমাদের দেহ তো প্রকৃতি থেকে তৈরি, হ্যাঁ, এই মাটি, পানি – এসব দিয়েই দেহ গঠিত। কিন্তু আমরা আবার মাটি ও পানিকে নানারূপ আমরা দিতে পারি। এটা আমাদের মানুষের অসাধারণ একটি ক্ষমতা। তাহলে কোথা থেকে এলো এ ক্ষমতা, কোথায় থেকে পাওয়া গেল?

চিহ্ন : এর উৎসটা কোথায়?

হা. আ. হ. : খুব ছোট, এই ক্ষমতাটা কি? এইটা এরিস্টটল দেখাতে গিয়ে বলেছেন যে, অতএব আমরা দৃশ্যমান পৃথিবীতে যা দেখছি সেটা এর আসল রূপ নয়। আমরা প্রকৃত বস্তু কি জানি না, আমি বলতে পারি না আমি কী? আমি বড়জোর কি করতে পারি- আমি আমাকে জানার নাম করে মানুষের একটা কপি দেখাতে পারি। মূলটা তো একই রকম কিন্তু কপি নানা রকম করা যেতে পারে। আর্কিটাইপ যেটা। চিরকালের জন্য যেটা আছে সেটা হচ্ছে মূল। টাইপটা হচ্ছে চিরকালের! তাহলে মানুষের কি কোন টাইপ আছে? যে টাইপটা এক কিন্তু যেখান থেকে তৈরি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ। তুমি যদি পাঁচ টাকার একটা মুদ্রা বার করো তো সব মুদ্রাই তো একরকম। মুদ্রাযন্ত্র থেকেই তো বেরিয়ে আসছে। ঠিক মানুষও একইভাবে বেরিয়ে আসেছে। কিন্তু ওই মুদ্রাতেও একটার সাথে আর একটার তফাৎ চাইলেই খুঁজে পাবে। মানুষের মধ্যেও তাই। অমিল পাওয়া যাবে। আর মানুষকে আমরা সম্পূর্নরূপে কখনোই জানতে পারি না, বুঝতে পারি না, আমরা তাহলে কি করবো? আমরা তাহলে বলবো, মানুষ রিয়ালিটি নয়! এই যে পৃথিবীটা দেখছি এটাও রিয়েল নয়! আমি নিজেও রিয়েল নই! সবটাই ছায়া, ফগ!

চিহ্ন : ছায়া?

হা. আ. হ. : হ্যা,ঁ ফগ। আমরা বাস্তব দেখি না। আমরা বাস্তবের ছায়া দেখি।

চিহ্ন : তারপরে স্যার… এটা হল বস্তুর ছায়া?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, এটা বস্তুর ছায়া। তাহলে আমরা বস্তুর ছায়া দেখে বিভ্রম হচ্ছি কেন? তোমরা যখন দেখছো আমার ছায়া দেখছো অর্থাৎ মানুষ হিসেবে যে ফর্মটা আছে সেটা দেখছো। এই মানুষের ফর্মটা কিন্তু পৃথিবীর ছ‘শ কোটি মানুষের মধ্যে আছে। এই ফর্মটাকে যখন আমরা ব্যবহার করি তখন নানা রকম হয়ে যায়। কিন্তু তাদের ভেতরের মূল যে জায়গাটা সেটা কিন্তু এক। মানুষকে আনরিয়াল বলা এজন্যই— যে সে ফর্ম নয়, ফর্মেও একটা কপি মাত্র। কপি কি কখনো মূলের সাথে তুলনীয়? তাহলে আমরা রিয়েল নই, রিয়েলিটি দেখতে পাই না। রিয়েলিটি আমাদের চোখে পড়ে না। এবং এই কারণেই ফর্ম রিয়ালিটি, মেটার রিয়ালিটি নয়। মেটারটা আমাদের ভ্রম মাত্র।

চিহ্ন : ভ্রম?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ ভ্রম। বোধহয় একটা উদাহরণ দিলে খুব ভালো হত। দ্যা এক্সাম্পল অব দ্যা কেভ। একটা পাহাড়ের গুহা,পাহাড়ের গুহার সামনে একটা উঁচু রাস্তা আছে। আর ভেতরে একটা আলো জ্বলছে, কিছু লোক আছে যাদের হাত বেঁধে ঐ গুহার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তারা ঘাড় ফেরাতে পারবে না। ধরো, জন্ম থেকে তারা ঐখানে বসে রয়েছে। আর তাদের পেছনে আলো জ্বলছে, তার পেছনে বড় একটা রাস্তা আছে। এবারে রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছে তারা তো ঘাড় ফিরিয়ে তাদের দেখতে পারবে না। দেখার উপায় নেই। তাহলে কি দেখছে বলো তো! যেহেতু আলো আছে ওদের পেছনে, সুতরাং যারা সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, তারা তাদের ছায়া দেখছে। আচ্ছা, জন্ম থেকে যদি তুমি এভাবে এটাই দেখো, তাহলে ছায়াকেই তোমার মনে হবে আসল। তার মানে আসলতো তুমি কোনদিন দেখোই নি। সিমিলারটা বুঝলে! সিমিলার অব দ্যা কেভ— কিরকম? যে এরকম করে তুমি বসে আছো, পেছনে আলো। কিন্তু, তুমি কিছুই দেখতে পাচ্ছো না, শুধু ছায়া দেখতে পাচ্ছো। জন্ম থেকে তুমি এইটাই দেখছো তোমর ছায়াটাকেই মনে হবে দিস ইজ রিয়েল। রিয়েলিটি দেখা যায় না। এ জন্য তার মৃত্যু হতে পারে না, কারণ কপিটার মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু মূলটার মৃত্যু হতে পারে না

চিহ্ন : ওটা আছেই?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, তাহলে সমস্ত বাস্তব জগতটাকে এক অর্থে ছায়ার জগত, সত্যজগত নয় বলে অ্যারিস্টটল রায় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারপরও এই ছায়াদেরকেও তো চালাতে হবে। এই জন্য রাষ্ট্রের চিন্তাটা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের চিন্তা থেকে তখন তিনি আবার ওই রিপাবলিকের ধারণাটা দিয়েছেন। যে আমাদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করতে হবে। দাস শেণি আছে একটা, তারপরে বণিক শ্রেণি, আর একটা হচ্ছে যারা ওই নগরে জন্ম নিয়েছে তাদের বলা হচ্ছে প্রকৃত সিটিজেন। সেজন্য তখনকার সিটিজেনটা খুব কড়াকড়ি ছিল। এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় পালিয়ে গেলে সোজা ধরা হত নির্বাসন। এবং, সে ক্যাননট কামব্যাক। বেনিশমেন্ট খুব মারাত্মক জিনিস আরকি! অর্থাৎ তোমাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হলো, অথবা প্রায় কাছাকাছি তোমাকে নির্বাসিত করে দেওয়া হল। সিটি স্টেট তো ছোট ছোট স্টেট, খুব বড় নয়। এথেন্সও ঐ রকম ছিল। সিটি স্টেটগুলোর প্রত্যেকেরই স্বাধীন একটা ব্যাপার ছিল। ইলিয়ডের গল্প – কতোগুলো মিথটিতে এগুলো আছে। তো উনি তো এসব মিথটিথ বিশ্বাস করেননি কোনদিন। কোন এথেনা বলি বা কোন দেবী বলি বা কোনকিছুতেই বিশ্বাস করেননি। বিশ্বাস করার কোন জোর কারণ নেই। তো এইভাবে পৃথিবীটা এগুলো। ফর্মগুলো তাহলে কবে থেকে আছে? আদি-অন্তহীন অবস্থা থেকে আছে। অমুক দিন থেকে এই ফর্ম তৈরি হয়েছে মানুষের, এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কারণ ওটার তো মৃত্যু নেই— তাহলে ফর ইটারনিটি আছে, বুঝেছো! আর আমরা ফর ইটারনিটি, আমাদের সমস্ত জীবনটাই তাহলে কেটে যাচ্ছে বিভ্রমের মধ্যে। সমস্ত জীবনটাই কেটে যাচ্ছে রিয়ালিটি না জানার মধ্যে। পৃথিবীতে আসছি জ্ঞান হচ্ছে, এটা-ওটা-সেটা দেখছি, পঞ্চইন্দ্রিয় কাজ করছে, পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে বাহ্যিক জগতটাকে দেখছি। সেই জগতের ভেতরে যেটা আছে, সেটা দেখতে পাচ্ছি না। সেই জন্য নলেজ ইজ ইমপোসিবল। সেইজন্য আমরা চালিয়ে নেবো কোনরকমে রিপাবলিক দিয়ে। এবং রিপাবলিক বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন সবাই সিটিজেন নয়…

চিহ্ন : স্যার তাহলে অ্যারিস্টটলের এই যেটা। ‘বিভ্রম বলেছেন আসলে …

হা. আ. হ. : অ্যাঁ, না। প্লেটো বলেছেন এটা বিভ্রম। আর এরিস্টটল বলেছেন যে না। যদি তুমি ফর্ম ছাড়া ভাববার চেষ্টা করো, তুমি পারবে না। ফর্ম চিন্তা করতে গেলেই তোমাকে ম্যাটার চিন্তা করেতে হবে। তুমি যদি বলো ফর্ম কি? বলবে না দেখলে পারবে না। ‘উইদাউট ফর্ম ম্যাটার ডাজ নট এক্জিস্ট… মাথায় আসবে কোনদিন? ম্যাটার কোনো একটা আকার না নিয়ে থাকবে কী করে বল!

চিহ্ন : আসবে না?

হা. আ. হ. : আসবে না কোনদিন। আর ফর্ম কি ইটারন্যাল আর মেটার পরবর্তীকালীন? কোনটা আগে এসেছে, ফর্ম না মেটার? আসলে প্যারালাল। মুরগী আগে না ডিম আগে, তর্ক করে লাভ নেই। দুইটা একটা ছাড়া আর একটা কনসীভ করা যায় না। একটা বাস্তব হয়ে গেলে, আর একটা গড়ে ওঠে। রিপাবলিকে যা লিখেছেন, অ্যারিস্টিটলের পলিটিকসের প্রেরণায় এবং এটা আরো কনক্রিট, এই সব মানুষ, ফর্ম-মেটার দিয়ে। কনক্রিট এগজিসট্যান্স, তাহলে এদেরকে একসাথে থাকার জন্য সমাজ গড়তে হয়। সমাজ করতে হলে রাষ্ট্র করতে হবে এবং তখনকার যুগে রাষ্ট্র ছিল অন্যরকম। এজন্য গ্রীসে সিটি স্টেট বলে একটা কথা আছে, সবচেয়ে বড়যোদ্ধা আলেকজে-ার সেও কিন্তু একটা ছোট স্ক্রীপ্ট। সেখান থেকে গোটা পৃথিবী শিকার করেছেন। এই ছোটছোট সিটি স্টেটগুলোও ছিল স্বাধীন। এবং এশিয়া মাইনরে প্রচুর ছোটছোট দ্বীপপুঞ্চ ছিল। এবং সেই দ্বীপগুলো সব স্বাধীন। এইভাবে মানুষ তখন সভ্যজীবন কল্পনা করতো, এবং নিজেদের রিয়ালাইজট মনে করতো। গ্রীসকে যখন আলেকজেন্ডারের পতনের পর রোমানরা এসে দখল করে নিল তখনতো রোমানরা সোজা বগলদাবা করে ফেলল গ্রীসকে।

চিহ্ন : গ্রীসকে?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। তারপর থেকে ঐ যে গ্রীস পিছালো আর এগুতে পারেনি। রোমও পিছিয়েছে তবে রোম এখনও আছে, ইতালি আছে। তাদের সাম্রাজ্য তাম্রাজ্য  আর নেই? তারা যখন ওইগুলো লিখলো পুরো গ্রীকদেশের সিটিজেনের জগতটাই বিনাশ হয়ে গেল। কিন্তু তাদের চিন্তাগুলো থেকে গেল। অনেকেই বলেন হোল ইউরোপিয়ান ফিলোসোপি ইজ নাথিং বাট এ ফুটনোট’ এরিসটোটাস ফিলোসোপি। প্লেটোর দর্শনের মধ্যে যে বিশাল সম্ভাবনা আছে সেখানে ওটা হচ্ছে প্রুফ নোট।এদের থেকে সক্রেটিস এগিয়ে বলেছেন পৃথিবী কি দিয়ে তৈরি এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তার থেকে মানুষের জগতটাকে জানো। কি দিয়ে তৈরী (পাহাড় থেকে, নাকি মাটি থেকে) কিছু জানার দরকার নেই। তার থেকে (নিজেকে দেখিয়ে) এই মালটা কি তাকে দ্যাখো। নো দাইসেলফ মানে আত্মাকে জানতে হবে। তোমার মধ্যে কি কি আছে ? কোন প্রবৃত্তি আছে? কোন প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারছো না? -এগুলো। প্লেটো বলে গেছেন মহৎ প্রবৃত্তি যেগুলো আছে (দয়ামায়া) সেগুলো মানুষের মনের ক্ষেত্রে আছে এবং জৈবিক চাহিদাগুলো শরীরের ক্ষেত্রে আছে (ক্ষুধা-তৃষ্ণা)। মানুষ তাহলে এ রকম তার আত্মা অজানা।

আমাদের প্রত্যেকের ভাবনার বিষয় মানুষ এবং মানুষের সৃজন কেমন হবে ইত্যাদি। সর্বপ্রথম বাইরের জগতটাকে জানার চেষ্টা করে নিজের পকেটের ভেতরকে জানার চেষ্টা করতে হবে এবং এটাই হচ্ছে আসলজ্ঞান। আত্মজ্ঞানই আসল জ্ঞান। উইসডোম করতে গেলে নিজেকেই জানতে হবে। ওই জিনিসগুলো তাদের সব আছে, আমাদের লালনও বলতেন , তবে লালন সহজ সরল স্বরে বলেন আর ওরা কঠোর ভাবে বলেন। কাজেই সক্রেটিস বলেছেন নিজেকে পরীক্ষা করো। আর জ্ঞানের দ্বারা পরিতৃপ্ত হও, আর জ্ঞান মানে জানা। জানা কোনটা— জানা ও প্রয়োগ। জানলেই জ্ঞান নয়, তার প্রয়োগ করতে হবে। সাইকেল চালনার জ্ঞান আমার আছে কিন্তু প্রয়োগ করতে পারছি না- এটা জ্ঞান নয়। জ্ঞান ও তার প্রয়োগ একসাথে যাবে, আলাদা করা যাবে না। এজন্য আমার লেখায় বায়ুভূত কোনকিছু নেই। যতোটা যা লিখেছি কংক্রিট হিউম্যান এক্সজিস্টটেন্স এবং সেটাই। আমার বস্তু ভুল হতে পারে লোড বেশি দিতে পারি। কিন্তু ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া কোন লেখা লিখিনি। জীবন তো নিষ্ঠুর, স্ট্র্র্যাগল। এই নিষ্ঠুরতাটা আছে, আর নিষ্ঠুরতার ভেতর দয়াও আছে এজন্যই … বলেছেন ভারচু ইজ নলেজ। ‘মৃত্যুভয় নেই ’ এই জ্ঞান আমার আছে, মৃত্যু যে হবেই। তবে জ্ঞানটা সত্যি কি সত্যি না, এটা মৃত্যুকালেই বোঝা যাবে। তখন তুমি ভয় পাও কি না? জাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়ার জন্য মেটামোটা বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করলাম, কি জানতে হয় সব জানলাম। তবে চালাতে পারলে জ্ঞান আছে, না পারলে নেই। তার মানে- যে জ্ঞান প্রয়োক্ত নয়, সে জ্ঞান জ্ঞান নয়। আমরা মুলত কেউ ই জানিনা। অজ্ঞানতার তিমিরেই আমাদের জীবনটা কেটে যায়, আর সচেতনতা আছে বলেই নিজেকে জানা নিজের জীবনকে পরীক্ষা করা, বিশ্লেষণ করা আরকি! এজন্যই ‘আনএক্সামিনি লাইফ ইজ নট বিলিভাবল’। কার দ্বারা এক্সামিন করাবে? নিজের দ্বারা নিজেকে। ওখানে নো দ্যাইসেলফের মধ্যে কোন আধ্যাত্মিকতা নেই নিজেকে কংক্রিটভাবে জানো এবং এটা খুবই কঠিন। উনি (সক্রেটিস) অনেকজায়গায় প্রমাণ দিয়েছেন, এ্যাপোলোজি নামে বই লিখেছেন। তাঁকে মৃত্যুদ- দেওয়া হল এবং তার মৃত্যুদ-ের সময় সে বললো তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। কি অভিযোগ আনা হল— নাস্তিকতা, ছেলেদের মাথা খেয়েছেন। তিনি তো তখন ঘুরে বেড়াতেন মৃতদেহ পড়ে আছে, তিনি সৎকার করেছেন। তখন কিন্তু যুদ্ধ চলছিল এবং যুদ্ধে ডেডবডি ফেলে আসাটা অপমানজনক। যেমন করেই হোক ডেডবডি নিয়ে আসতে হবে।

চিহ্ন : ডেডবডি নিয়ে আসতে হবে?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ অবশ্যই। হেক্টরকে মারার পর একেলিস ডেডবডি বেঁেধ নিয়ে এসেছিল। এ ধরনের কতোগুলো ব্যাপারকে শক্ত করে দেখা হতো। সক্রেটিস তাই মনে করতেন যে, না জানলে আবার অপরাধ কি! আমার অপরাধ কি প্রমাণ করো, কি অপরাধ করেছি আমি? নাস্তিকতার? যুবকদের বিপথগামী করেছি? এসব! তিনি তাঁর এ্যাপোলোজিতে বলেছেন প্রথমে বিচারব্যবস্থা খুবই ডেমোক্রেটিক ছিল। পাঁচশ লোকের মধ্যে অর্ধেক সক্রেটিসকে নির্দোষ বললো। ও হ্যাঁ প্রথমেই তাকে বলা হল যে, তুমি দোষস্বীকার করবে কি করবেনা? তখন সক্রেটিস বলেছিলেন যে, আমি অপরাধই করিনি, তাহলে স্বীকার করবো কেন? আর হ্যাঁ ভালো কাজ করার জন্য রাষ্ট্রের উচিত আমাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। তা না করে তোমরা বলছো আমি অপরাধ করেছি। তারপরই সক্রেটিসের পক্ষের লোকজন বিরক্ত হয়ে তার বিরুদ্ধে চলে গেল। তিনি এতো একগুয়ে ছিলেন যে অপরাধ করিনি দোষস্বীকার করার প্রশ্নই আসে না। তারপর আবার তাকে বলা হল, তুমি বেছে নাও মৃত্যু অথবা জীবন। তখনও তিনি বলেছিলেন মৃত্যু-জীবন নয়, সত্য ও মিথ্যা বেছে নিতে হবে। দার্শনিকেরা এ রকম কথা বলেছেন, যা কাজে আসে তাই ঠিক। অনেকেই বলেছেন কারও অন্যায় না করে যদি মিথ্যা বললে লাভ হয় তবে মিথ্যা বলা যাবে। ডেকার্ড বলেছেন, আদি উপাদান দুটো ‘ম্যাটার’ এবং ‘মাইন্ড’। এই দুটো জিনিস দিয়ে সমস্ত বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে যদি ম্যাটারের এক্সটেনশন থাকে তাহলে বিজ্ঞান সম্ভব। ম্যাটার যদি ফ্ল্যাট হয়, তাদের এক্সটেনশন বিস্তৃতি থাকে তাহলে ম্যাটারটাকে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে। ম্যাটার স্বীকার মানে ম্যাটেরিয়ালকে স্বীকার করা।

সাইনথেটিক এ- সাবজেক্ট যে খবর দেয় প্রেডিকেট তার থেকে বেশি খবর দেবে। আর এনাথেটিক এ- সাবজেক্ট ও প্রেডিকেট সমান খবর দেবে। ফিলোসোফিতে ইন্টারশিপ পড়ানো হলে ভালো লাগবে। দরকারীও। কান্ট উল্টো দিক থেকে একই প্রশ্ন করেছেন বলেছেন, হাউ আর সিনথেটিক ডাচমেন্ট এপরাইজ পসিবল। তার মানে তিনি জানতে চাচ্ছেন জ্ঞান কিভাবে হয়। এটা নিয়ে অনেকেই তো কথা বলেছেন। লক বলেছেন, হ্যাঁ মনটা জন্মের সময থাকে সাদাকাগজ। যত বয়স হয় তত ছাপ পড়ে। যে ছাপটা পড়েনি সেইটা সে জানেও না। আমি যদি হিমালয়ে গিয়ে না থাকি তাহলে ট্যাবেলরতে হিমালয়ের ছাপ থাকবে না। মানুষের মনটা ফাঁঁকা হয়ে জন্মগ্রহন করে তারপর এই পৃথিবীতে নানা রকম ছাপ তার মধ্যে পড়ে। পঞ্চইন্দ্রিয় এই ছাপ দেয়। তুমি যদি বলো জীবনটা কিছুই নয়, প্রতিমূহূর্তে এক্সপেরিয়েন্সের স্ট্রিম বা ¯্রােত। একটা বইকে দেখে বলতে পারছো এটা বই। কিন্তু এর আলাদা আলাদা পার্টস আছে এবং এগুলো একত্রিত করেই বই। আলাদা আলাদা জিনিসগুলোকে কে একসক্সেগ করে? কিংবা কজ আর ইফেক্ট এর সম্পর্কটা কিভাবে তৈরি হয়? হিউম বলেছেন এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা, তখন প্রশ্ন হয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা হয় কিভাবে? জ্ঞান কিভাবে হয় (কাণ্টের একটা বই দেখিয়ে) এই একটা বইই যথেষ্ট। জ্ঞানের কিছু আকার আছে সেগুলো বাইরে থেকে আসে না। তিনি বলেছেন বাইরে যা দেখি নাই, তা আমার জ্ঞান নয়। বা প্লেটো বলেছেন, অস্তিত্বকার আছে, যেটা পার্টিসিপেন্ট। আমি যেটা দেখি নাই ও জ্ঞান আমার নেই তো। তাহলে প্রত্যক্ষই হচ্ছে জ্ঞান। কিন্তু কান্ট বলেছেন প্রত্যক্ষই তো জ্ঞান হতে পারে না। অনেক অপ্রত্যক্ষ জিনিসও আছে যেগুলো জ্ঞানের ভিত্তি। প্রত্যক্ষ জ্ঞান হলো কি করে, তাকে কি কি শর্ত পূরণ করতে হয়? অভিজ্ঞতা ; অভিজ্ঞতা! ভালো কথা তবে কুকুরের বেড়ালের সবারতো অভিজ্ঞতা আছে। একদিকে বাইরের জগত ইম্প্রেরেশন দিচ্ছে আর একদিকে আমার কেবল ইম্প্রেরেশনগুলোকে নানানভাবে একত্র করেছে। একত্রিত করার নানা কর্ম আছে। প্রথম কথা হলো এক্সপেরিয়েন্সের দুটো রিকন্ডিশনই হচ্ছে স্পেস এন্ড টাইম। তুমি এমন একটা ইম্প্রেরেশন লাভ করো যেটা কোন জায়গায় ঘটছে নাকি, কোন সময়ে ঘটছে না, আবার স্পেসটাও ব্যাখ্যা করতে পারবে না।একটা ফাঁকা বললে আর একটা কি? ভরাট জায়গার জিনিস সরিয়ে নিলে কি স্পেস হলো না? এ এক কঠিন ধাঁধা। কাজেই আমাদের জ্ঞান পেকে গেলেই সেই জ্ঞানটা কোন একটা স্পেসে থাকতে হবে বা কোন একটা সময়ে করতে হবে। স্পেস এবং টাইম দুটোই হচ্ছে আমাদের জ্ঞানের প্রাথমিক ফর্ম। এটাকে তিনি বলেছেন সেনসিবিলিটি। তারপর ও গুলোকে ভাগ করা ইউনিটি-রুয়ালিটি, একত্ব-দ্বিত্ব তারপর বহুত্ব, এ রকম করে বারোটা ক্যাটাগোরি আছে যেগুলো অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া যায় না। এগুলোকে আত্মার ভেতর থেকে সাপ্লাই দিতে হয়। আর এ-গুলোকেই পরিস্কার করলেন কান্ট। তখনতো আমার প্রশ্ন জেগেছিল তাহলে আমরা যে ইম্প্রেরিশন পাচ্ছি সেটা দিয়েই জ্ঞান হচ্ছে? ইম্প্রেরেশনটাকে আমি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে আমার জগত তৈরি করি। আমার একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর জগত তৈরি হয়ে গেছে, সেখানে কারো অধিকার নেই। অর্থাৎ আমরা যা দেখি এবং মনে করি সেটা ফেনামেনন ঘটনা আর এই ঘটনার ভেতরে যে কারণ আছে সেটা আমরা কখনো জাানতে চাই না। আর সেটার নাম হচ্ছে রৌমনা। রৌমনা হচ্ছে আসল রিয়ালিটি যেটা কখনো তুমি জানতে পারবে না। আর রৌমনা প্রকাশ পাবে যখন তুমি চক্ষু-কর্ণ, স্পেস, টাইম কিংবা কোন একটা জায়গায় দশটা জিনিসকে একখানে করা এগুলো হচ্ছে ক্যাটাগুরি ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং। এই ক্যাটাগুরির প্রয়োগ আর টু ক্যাটাগুরির জ্ঞান হয় না। কান্ট এটাই বুঝিয়েছেন। এগুলো এর মধ্যে পড়ে যায়। তুমি যা কিছু আলোচনা করছো তার মধ্যে এগুলো আছে। তাই তো? এর পরে তোমার পরবর্তীকালে পজিটিজম এলো, অর্থাৎ মেটাফিজিক্যাল গ্রান্ড যেটা এক্সিসটিসিজম এর মধ্যে আসে নাই। বাদ দাও। ম্যাটাফিজিকাল না ফিজিক্যাল বেয়ন্ড। ফিজিক্যাল স্পন্ডের বেয়ন্ড যেটা সেটাকে ম্যাটাফিজিক্যাল ওয়াল্ড বলে। তাহলে দরকার নেই। আর কান্ট এগিয়ে নিচ্ছে আস্তে আস্তে। বুঝতে পেরেছো, যে অভিজ্ঞতা ছাড়া সব শূন্য আরকি। অভিজ্ঞতাটা সেজন্য লাগবে। হ্যাঁ ঠিক আছে। অভিজ্ঞতাগুলো সাজিয়ে নিলে জ্ঞান। আর নোমেনা মানে কি? অভিজ্ঞতার বাইরে। জানিনা আর জানলে তুমি সেটাকে রিয়েল বলো, ঠিক আছে। আমরা কিছু রিয়ালিটি জানিনা। আমরা শুধু ছায়া জানি। সবাই এক ভাবে জানি কেন? যদি হয় এটাকে তুমিও কাঠের চেয়ার বলছো- আমিও বলছি – কেন এটা হয়, যা কিছু দেখছি আমরা পরস্পর তো দ্বিমত করছি না। কেন আমরা এ রকম করে বলছি আমরা তো আসল জানি না। তার মানে তুমি চশমার ভেতর দিয়ে নকল পৃথিবী দেখছো। দেখাটাই নকল। ধরো সবার চশমার রং নীল , তাহলে সবাই কি দেখবে একই পৃথিবী দেখবে। তার মানে সবাই নীল দেখবে। সেইটেই তাহলে সত্য। এদের সাথে তো তর্ক করে পারা যাবে না। লিগুয়াসিজম,পজিটিজম সব অভিজ্ঞার মধ্যে। অভিজ্ঞার বাইরে কিছু নেই। হতে পারে না, সম্ভব না। তারপরে এগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করা। তারপর ভিয়েনা সার্কেল বলে আট দশজনের একটা গোষ্টি আছে তারা নাম দিয়েছে লিগ্যাল পজিটিজম। রাসেল টাসেল সবাই ছিলেন- তারা জ্ঞানের ক্ষুদ্রতম অংশটাকে নির্ণন করেছেন। এই অংশটা কি? অভিজ্ঞতা; কিন্তু ক্ষুদ্রতম অংশ! এটমিক থিউরি অব নলেজ। তো এই বিষয়গুলো সাহিত্যের সাথে যুক্ত করা, মানে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। পাগলের কাজ এটা- কে করবে? কেন করবে? এগুলোতে একটু অন্তদৃষ্টি দিতে হবে খুব গভীরভাবে। টু জাজ হিউম্যান বিংস, টু জাজ দিস ওয়াল্ড।

চিহ্ন : সাহিত্যের সাথে দর্শনের রিলেশনটা তাই?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, এইটাই। তখন তোমার মানুষ আঁকতে ভুল হবে না। তখন তুমি মানুষের যে জিনিসটা দেখাবে তোমার মনে হবে যে, এভরি হিউম্যান ইজ ইউনিক। এই মধ্যবিত্ত সাহিত্য যেটা তোমরা একেবারে যেস্তাঘেচাং করে দিলে কলকাতার লেখকেরা! তাদের সাহিত্যে শুধু কলকাতার মধ্যবিত্তের খবর। তার বাইরে আর কিছু নেই, এমনটা মনে হয় না? কলকাতার মধ্যবিত্ত বাবুদের মধ্যে ডিফারেন্স থাকা সত্ত্বেও তো একটা মিল আছে। দে আর ডিফারেন্ট তারা একজনের থেকে আরেক জন আলাদা। কিন্তু কতোগুলো অদ্ভত ব্যাপারে মিল আছে, যেটা আবার অন্য এলাকার লোকদের মধ্যে নেই। তাহলে মানুষকে গুচ্ছ মানতেই হবে। কথা বলার সময় গুচ্ছ মানতে হয়। তোমাদের রংপুরে লোক যেভাবে কথা বলে, সেরকম ভাবে বগুড়ার লোক কথা বলে না। বগুড়ার লোক যেভাবে কথা বলবে কুষ্টিয়ার লোক সেভাবে কথা বলবে না। আমি যে রকম করে কথা বলছি এরকম করে রাজশাহীর লোক কথা বলবে না। সেজন্যই বলছি যে, ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ পারসোনালিটি। ল্যাঙ্গুযেজ মানুষকে তৈরি করছে কারণ ল্যাঙ্গুয়েজ ই হচ্ছে প্রকাশ। এটা কিন্তু ভাববার কথা – যেখানে ল্যাঙ্গুয়েজ পৌছায়নি সেখানে কি আছে ডিক্রিসন বলেছেন সাইলেন্স। যেখানে ল্যাঙ্গুয়েজ দাড়ানো রিক্স সেখানে সাইলেন্স আর সাইলেন্স মানে অনস্তিত্ব

চিহ্ন : না, কিন্তু ঠিক আছে স্যার..

হা. আ. হ. : এইবারে আমি লেখালেখি নিয়ে বলছি আরকি। তাহলে আমি মুলত অভিজ্ঞতার দিক থেকে লেখক। ধরো, আমি কল্পনা করে কিছু লিখি না, বানিয়ে কিছু লিখি না, যা যা কিছু লিখতে পারি, তা তা লিখছি। তখন যদি কেউ প্রশ্ন করে এর ভিত্তি কি? বলবো, এই দেখো আমার অভিজ্ঞতা।

চিহ্ন : এই যে আমরা প্রাচীন দর্শন, গ্রীক দর্শন থেকে একেবারেই বিজ্ঞান পর্যন্ত দীর্ঘ দর্শনের একটা চকিত আলোচনা শুনলাম, তো এইটা তো আপনি আপনার মতো করে ধারণ করেছেন। এটা কি আপনার লেখার মধ্যে কোন প্রভাব ফেলেছে?

হা. আ. হ. : আপত্তি করছি না, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু আমি দর্শনের প্রবন্ধ তো লিখতে বসি নাই, দর্শনের ইতিহাস লিখতে বসি নাই, আমি লিখতে বসেছি জীবন্ত মানুষকে নিয়ে। তবে হ্যা মূল তফাৎটা এই জায়গায় এভরি হিউম্যান ইজ ইন্ডিভ্যুজুয়ালি ইউনিক। এই কথাটা আমার সাহিত্য জীবনের মূল কথা। প্রত্যেকেই পরস্পর থেকে আলাদা আর যদি না থাকতো সাহিত্য থাকতো না। আমরা বলি বটে একটা শ্রেণি মধ্যবিত্ত শ্রেণি, কিন্তু সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সব মানুষগুলো কি এক রকম? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন অনেক চরিত্র এঁকেছেন সবটা কি একটা মানুষের? বলো তো কোথায় কুবের আর কোথায় হোসেন

চিহ্ন : হুম, কোনটাই একরকম না

হা. আ. হ. : অবশ্যই। আমার হাতেই ডিফারেন্ট। তাহলে মানুষ এমনিতেই বাইরে ভেরি ডিফারেন্ট। এট দ্যা সেম আর অল হিউম্যান বিং। তারা সবাই মানুষ কাজেই তাদের মধ্যে অমিল-মিল এবং সাদৃশ্য থাকবে। দুটোই এক্সজিস্ট।

চিহ্ন : স্যার এখানে আর একটা জিনিস আপনি যেটা বললেন ল্যাঙ্গুয়েজ, ল্যাঙ্গুয়েজটা ফিলোসোফিক্যাল ভিউ এ একটা পার্ট হয়তো। ধরলাম ল্যাঙ্গুয়েজটা ইম্পরট্যান্ট জিনিস এবং এই সময়টাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে অনেক ল্যাঙ্গুয়েসটিকসের চমস্কি সহ অনেক তত্ত্ব আছে। কিংবা ধরেন, স্ট্রাকচার তারপরে ডেট অব দা এটন। এটা-সেটা এগুলো লেখা হচ্ছে, মানে হচ্ছে স্যার পোস্ট মর্ডাণ কিংবা পোস্ট কলোনিয়াল – তো একধরনের ইয়ে চলছে আরকি। তারপরে পোস্ট স্ট্রাকট্রানিজম ও আছে। এখন এগুলো নিয়ে যে বিষয়টা সেটি হচ্ছে থিউরি এন্ড এ্যাপলাইজড থিউরিটা তো একধরনের দর্শন। এখন তো আপনি লেখক এবং লেখালেখিই কাজ। লেখাটাও শিল্প এবং লেখাটা এক্সপারিনিওন এবং লেখার মধ্যে আমরা যখন শকুন পড়ছি তো সেটা তো হচ্ছে আপনার একটা পারপেকশন কিংবা কাউরনিওন ইফেক্ট। এসব কিছুর মধ্যে, কোন ব্যাপার কিংবা ভলানটিয়ারি কিছু ঘটেছে কিনা, স্যার?

হা. আ. হ. : ভোলানটিয়ারি ঘটেছে কিনা?

চিহ্ন : বাস্তবে ঘটেছে কিনা?

হা. আ. হ. : ধরো ভূষণের একদিন ঠিক এ জিনিসটা আমি দেখিনি। তবে এভাবে যে মানুষকে মেরেছে পাকিস্তানিরা সেটা আমি জানি। চুক নগরের হত্যাকা- আমি জানি, সবাই জানে। সাতক্ষীরার দিকে বহু মানুষ মেরে ফেলেছে : কত? লক্ষাধিক এর কাছাকাছি। লোকগুলো পালাবে বলে একটা জায়গায় জড়ো হয়েছিল। সেই সময় তাদের হত্যা করা হয়েছে। কাজেই ভূষণের একদিন এ তুমি যেটা দ্যাখো ভূষণকে তো একা মরতে হয়নি। সে তার ছেলেকে খুঁজতে এসেছিল। সে মরলো, তার ছেলে মরলো, তারপরে দেখা গেল ওখানে কতো মানুষ ছিলো ওটা তো আর চোখের দেখা নয়।

চিহ্ন : স্যার এইখানে আমাদের আর একটু জিঙ্গাসা আছে আপনার সাথে, সেটা হচ্ছে যে-ঐ এখানে মানে কার্ল মার্কস। একটু বোধ হয় মার্কসীয় যে ফিলেসোপিটা যেমন- আমরা অনেক সময় বলি হাসান আজিজুল হকের সাহিত্য মার্কসীয় দর্শনের। কিংবা হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যের মধ্যে মার্কসীয় প্রভাব সাম্য কিংবা ডায়ালেক্ট ইত্যাদি ইত্যাদি, কিংবা প্রান্তিক মানুষ, কিংবা একটু অন্তবাসী এই ধরনের মানুষদের উনি এনেছেন বা প্রাইরোটি দিচ্ছেন। কিংবা তাদের লাইফটা তাদের মর্যদার প্রশ্নটা তাদের কাছে মূখ্য। স্যার এই জিনিসটা মার্কসীয় ফিলোসফিটা কি সত্যি আপনার কোন এ্যাসাইনমেন্ট কিনা?

হা. আ. হ. : না। আলাদা এ্যাসাইনমেন্ট নয়। আমি যা দেখেছি তার সাথে এটার মিল আছে। হিসট্রিক্যাল ম্যাটারিজমে যা বলে তার সঙ্গে এটার মিল আছে। অর্থাৎ সমাজের যে সংগঠনগুলোর সাথে, হ্যাঁ গৃহস্থালি গ্রাম। এগুলো কি করে তৈরি হয়েছে? তুমি যদি একটু হিসেব করো তাহলে তুমি সহজেই বুঝতে পারবে মানুষের মাঝে সহযোগীতাও যেমন আছে আবার স্ববিরোধীতাও আছে। মার্কস যা করেছিলেন, শ্রেণিচরিত করে উনি সব একাকার কওে দিয়েছিলেন। বড়লোক শ্রেণিরা বড়লোক শ্রেণির, তারপরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির, বুর্জোয়ারা বুর্জোয়ার এবং প্রলেতারিয়েতদের প্রলেতারিয়েত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু একটা জায়গায় তিনি যাননি সেটা হচ্ছে প্রলেতারিয়েতদের মধ্যেও যতো মানুষ আছে তারা প্রত্যেকে একজন থেকে আর একজন আলাদা। না মানে ‘প্রলেতারিয়েত, বিশ্বের প্রলেতারিয়েত এক হও ’ এটা কেমন স্লোগান হয়ে গেল না? বিশ্বের শ্রমিকগণ এক হও এসব স্লোগান হিসেবে ভাল। কেননা আন্দোলন করতে গিয়ে এসবের দরকার আছে। কিন্তু শ্রমিকগণ বলতে তো একজনকে বোঝায় না। একদম যারা ডিফারেন্ট তার মানে ওই শ্রমিকদের মধ্যেও রিএকশনারি লোক থাকতে পারে। ‘বিশ্বের শ্রমিক এক হও’-তার মধ্যে দু ‘চারটা বড়লোকও হতে পারে। এই যে জেনারেলাইজেশনের যে অসুবিধা সেটা কান্টের মধ্যেও হয়েছিল। আমি যেটা করার চেষ্টা করি সেটা হচ্ছে কংক্রিট, এক একটা লোককে ফিলোসোপিতে ধরার অসুবিধা হয়। সাহিত্যে তো ব্যক্তিটাকে উঠে আসে। হ্যাঁ জনগন ওই ভাবে আসেনা আরকি

চিহ্ন : এখানে স্যার, যেটা বিষয় সেটা হল যে, ওই আপনার ভাষার আমি আগেও বলেছিলাম যে-আপনার ভাষার মধ্যে একধরনের প্রাকটিক্যাল হওয়া বা একেকটা চরিত্রকে, একেকটা জীবন, একটু খুঁটিনানি করে দেখা। এটা আছে এবং সেটা থাকার জন্যই একটা ভিন্ন রকমের শৈলীর ব্যাপার আপনার লেখার মধ্যে আমরা পাচ্ছি। তো সেইখানে স্যার ব্যাপারটা যে মার্কসীজম, বৈষম্য, শ্রেণিশোষন- সেটা একটা ফেনোমেনা হতে পারে। কিন্তু আসলে আপনি তো অন্ধভাবে আরোপ করেননি, সেটা তো প্রশ্নই আসে না …

হা. আ. হ. : না না। আমি এইটা সত্যি তোমার সাথে একমত। লোকে যে নির্ধারন করে যে মার্কসস্টি লেখক, এই ধরনের আরকি। আসলে অনেকেই বিপ্লব বিপ্লব বলে চিল্লায় আমি আসলে সেই রকম নই, আমি একটু আলাদা অন্যরকমের।

চিহ্ন : আপনাকে তো স্যার অনেকেই বলেন বামলেখক। হাসান আজিজুল হক বামপন্থী। তিনি বামপন্থী রাজনীতিকে একধরনের সমর্থন দেন। আসলে বামপন্থী তো কিছু না, মুল কথা মানুষ।

হা. আ. হ. : মানুষ। সমাজে বাস করে তো তাই তাকে বড়লোক হয়ে বাঁচতে হয়, গরীব হয়ে বাঁচতে হয়, নানাভাবে বাঁচতে হয়। ইউ আর কনসার্ন টু দ্যা হিউম্যান বিং। আমি সেইটা মনে করি। এবং সেজন্য আমার মনে হয় যে, হিউম্যান লাইফটা ইজ বিউটিফুল। আমার কাছে ঠিক মনে হয়। খুবভাল। সেই হিউম্যান লাইফ যদি বাধাগ্রস্থ হয়। বাস্তবকারণে সেই কারণগুলোকে আমার আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে না? তখন আমার খারাপ লাগবে না? যদি শেখ হাসিনা বলেন যে, আমরা এই করছি সেই করছি, তখন আমি বলি পেটে ভাত দিলে সব দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল? আমার ছেলে লন্ডনে থাকে, ইংল্যান্ডে থাকে। তোমাদের মতো যারা সাধারণ- লেখাপড়া শেখাচ্ছো .. বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ কতোজন মানুষ থাকে? ক‘জনের ছেলে মেয়ে আসে? এই পরিসংখ্যানটা কখনো লক্ষ্য করেছো? আচ্ছা ভাত হলেই কি হয়ে গেল? অজ্ঞ-মূর্খ ভাত খাচ্ছে তার ভাত খাওয়া আর গরুর ভাত খাওয়া একই কথা। যে দেশে শিক্ষিত সচেতন মানুষ বেশি, অধিকার চেতন মানুষ বেশি, সেই দেশের জনগন একরকম করে গনতন্ত্র তৈরি করবে। আর আমাদের এখানে অন্যরকম – যেহেতু মূর্খ। কাজেই এই গনতান্ত্রিক সরকার ‘আমরা সকলের পেটে ভাত দিয়েছি বলে, বাজে কথায় আমাদের ভোলাতে পারবে না।

চিহ্ন : স্যার আপনার সারা জীবনের যে দর্শন চর্চা। দর্শনের লেখাপড়া, এবং দর্শনের শিক্ষকতা, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক- আলাপ -আলোচনা -যোগাযোগ -সেমিনার -সিম্পোজিয়াম — এটা হোক একাডেমিক বা নন একাডেমিক- সেটা আপনার লেখালেখিতে একটা বিরাট প্রভাব ফেলেছে। এবং আমরা যে হাসান আজিজুল হককে পাচ্ছি, কথাসাহিত্যিক হিসাবে, মনে হয় যে দর্শনের ভিত্তিটা পোক্ত জন্যই হয়তো এই গ্রেড মনে করছি। এটা আমাদের কথা …

হা. আ. হ. : তোমাদের হলে তো আমার বলার আর কিছু নেই; তাই না?

চিহ্ন : না স্যার, আমাদের এই ফিলিংসটার সাথে আপনি কি একমত?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। সেটা আমি একমত! কেননা আমি এর বাইরে দেখার চেষ্টা করি না। যদি লেখায় বড়লোক আসে তো বড়লোকটা যেমন তেমনী লেখার চেষ্টা করেছি। এই যে একজন বড়লোক বললো যে, তার ছেলে, তিনটা মেয়ের সাথে শুতেই পারে। ধর্ষণ করতেই পারে। দিনে দু‘লাখ টাকা করে তার হাতখরচ করতেই পারে। এরকম মানে সোয়াইন বলবো না আমি? বলো না কেন বলবো না, বলবোই তো। সেই জন্যই বলছি যা দেখছি ,শুনছি তাই আঁকছি ,লিখছি। মানুষের মাঝে সৌন্দর্যস্পৃহাও আছে তো। এই যে প্রত্যেকদিন আমার টেবিলে ফুল রেখে যায়, না রাখলেও তো পারতাম, কি ক্ষতি হতো? বকুলগুলো কুড়িয়ে আনা তারপর এর মৃদু গন্ধ-খারাপ লাগে না! সে জন্য রাখি আর এজন্য আমি আলাদা।

চিহ্ন : সেই জন্য এটা যতোটা অপ্রয়োজনিয় হোক না কেন, মানুষ-এজন্য প্রয়োজন?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। আমার চুল থাকবে আর মাথাটা আচড়ালেই দোষ, টেরি কাটলে কি দোষ! কাজেই আমি যদি একটা সৌখিন জামা পড়ি তাহলে দোষ হয়ে গেল? এগুলো কোন ব্যাপার নয়। যখন দেখবে অতিশয় গরীব মানুষ একবিঘে জমি বিক্রি করে একটা সিল্কের পাঞ্জাবী পড়ে ঘুরে বেড়ায়- আর তুমি সেটা জানতে পারলে তখন তোমার মনে হবে এই ব্যাটাকে শাস্তি দেওয়া দরকার, ধরে পেটানো দরকার। মানে এটাই হচ্ছে কা-জ্ঞান

চিহ্ন : তাহলে স্যার আমরা যারা শুধু সাহিত্যই পড়ছি হয়তো মাস্টারি করার জন্যই হোক বা ছেলে মেয়েদের নিয়ে আসা-যাওয়ার জন্যই হোক, আমাদের তো দর্শনের কা-জ্ঞান এতো প্রখর নয় কিংবা কা-জ্ঞানের বোধ যেটা অভিজ্ঞান – সেটা হয়তো আপনার মতো সার্প হবে না। এই পৃথিবীর অনেক লেখকেই দর্শন না পড়েও তার মতো করে একটা দর্শন বানিয়ে নেয়

হা. আ. হ. : নিশ্চয় নিশ্চয়ই।প্রত্যেক বড় লেখক নিজেই দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথ কান্ট পড়েছেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। কিন্তু ইশ্বরচন্দ্র যে কান্ট পড়েছেন, সেটা আমি জানি। বঙ্কিমও পড়েছেন। কান্ট না পড়–ক পজিটিভিজম পড়েছেন। কোঁৎ টোৎ এগুলো পড়েছেন। কাজেই পড়লে আমার মনে হয় লোকসান হবে না। নীরস দর্শন পড়া তো নীরসই বটে। কেবলমাত্র কার্তিক মাসে খেজুরের রস হয়। সেখানে যে পাটালী তৈরী হয়, সেটা ভাঙলে চিকচিক করবে। যেহেতু রসে পরিপূর্ণ। এ রকম পাটালীগুড় যদি লেখ তবে মন্দ হবে না। অর্থাৎ এখানে তোমার একধরনের উদ্ভাসন ঘটবে। সাহিত্য এরকম উদ্ভাসন ঘটায়। সাহিত্য দেখালো জীবন সুন্দর। সাহিত্য দেখালো জীবনকে পঙ্গু করে ফেলা যায়! সাহিত্য দেখালো তুমি আটকে থাকলে, তোমার ম্যানারিজম তৈরি না হলে, একটা গড়িয়ে না নিলে হবে না – যেটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষের দিকে হয়েছিল

চিহ্ন : হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যানারিজম।

হা. আ. হ. : প্রথম দিকে তো হয়নি! ছোট বকুলপুর আমি তো ভুলতে পারি না, এ রকম গল্প আবার ভুলতেও পারি না। ছোট বকুলপুরের যাত্রী এর মতন বা তার প্রথম যে গল্পটা!

চিহ্ন : আতসী মামী?

হা. আ. হ. : না না, তার পরের

চিহ্ন : আত্মহত্যার অধিকার?

হা. আ. হ. : না ওই যে ভিক্ষু টিকু আছে যে

চিহ্ন : প্রাগৈতেহাসিক?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। প্রাগৈতেহাসিক গল্পটা। ওটার মধ্যে কোন দর্শন নেই। নায়ক অন্ধকারের মানুষ যার ভেতরে কোন আলো নেই। এ রকম মানুষ তো আছে…

চিহ্ন : জীবনের অভিজ্ঞতাটা স্যার দরকার। যেটা আমাদের সময়ে মনে হচ্ছে ভালো লেখা হচ্ছে না, ভালো গল্প, ভালো উপন্যাসের অভাব…

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। এ গুগুলো তোমাদের বলা দরকার। দ্যাখো ফাঁকা জিনিস আওয়াজ দেয় শুধু ভরা কলসি ড্যাবড্যাব করে বাঁজে। আবার ভরা কলসির একটা ফুটো থাকে, তাহলেও জল থাকবে না বের হয়ে যাবে। তখন তুমি ভাবলে কাঁদা দিয়ে সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করবে কিন্তু জলের চাপে এটা খুলে যাবে। তবে পুটিংটা ভেতরে দিলে ঠিক থাকবে। এগুলো খুবেই কমনসেন্স। এগুলো কাউকে শেখাতে হয় না। কা-জ্ঞান এ রকমই

চিহ্ন : এখন যেটি বিষয়— আপনি তো ষাট থেকে শুরু ( ৪৭-৭১) একটা বিরাট সময় তখন আপনি লিখছেন, শওকত আলী, শওকত ওসমান, সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সার, জহির রায়হান সবাই লিখছে। এবং আপনাদের লেখালেখির যে সমৃদ্ধি – এইভাবে লেখা যায়, এভাবে চলছে। এমনকি বাঙালি মুসলমানের যে জাতিসত্ত্বার উত্থান এটাও কিন্তু ঘটে গেল প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে। সেই প্রতিকূলতাটা কিন্তু একধরনের ভালো সাহিত্য দার্শনিক চিন্তা চেতনা সমৃদ্ধ সাহিত্য কমবেশি পেয়েছি। হয়তো মানিক-তারাশঙ্কর পাইনি কিন্তু আক্তারুজ্জামন ইলিয়াসকে তো পেয়েছি। তাহলে আজকালকার প্রজন্ম আমার বয়সও তো ফিফটির কাছাকাছি-কিংবা আমার কন্টেমপোরি যারা লিখছে বা আমাদের সিনিয়র যারা ফিফটি ফাইভ বা সিক্সটি হয়েছে, একটা হিসেব তো আছে যে কি কি জিনিস আমাদের সামনে থাকবে বা আছে। এটা নতুন করে বলার দরকার নেই। হাফসেঞ্চুরী তো এনাব টাইম, এখন এটা-ওটা বলে তো লাভ নেই। যে- আমরা বুঝতে পারি নি, দেশস্বাধীন হয়নি, লেখাপড়া কমছিল, নকলবাজি হয়েছে। (হাসান আজিজুল হক- তাহলে আমরাও তো তাই) তাহলে এই কৈফিয়তটা কি স্যার? এটা কারো পক্ষে-বিপক্ষে বলা নয় স্যার কিন্তু এটা একটা পারসেপশন

হা. আ. হ. : আমারও মনে হয় এটা একটা খারাপ প্রীয়ড যাচ্ছে। বা একালের, বিশ্বসভ্যতা বা বিশ্বসাংস্কৃতিতে একটা বড় কন্ট্রিবিউশন। কবিতার যুগ প্রায় শেষ। মার্কিন কবিতা তো দেখাই যায় না। ইউরোপে অনেক কবিতা ছিল, ল্যাতিন আমেরিকায় অনেক কবিতা আছে কিন্তু গদ্য তার থেকে বেশি এগিয়েছে। এই জিনিসটা হচ্ছে কেন? তাহলে এখানে বাস্তবে সফল কে? এই বাস্তবতাকে নির্মূল করতে আমাদের ওপর প্রযুক্তির ইফেক্ট পড়বে। এটা একটা প্রযুক্তির প্রহার। প্রযুক্তি সর্বগ্রাসী এ জন্যই যে, প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয় কিন্তু প্রযুক্তি যিনি ব্যবহার করবেন তার তো নির্দিষ্ট একটা উদ্দেশ্য থাকবে যে, আমি এই কারণে ব্যবহার করছি। সারারাত আমি রাত জেগে কথা বললাম, এটা খুজলাম, ওটা খুজলাম, -মানে সবকিছু সহজ করে পেলাম। সহজ জিনিস ভালো নয় তো! সেজন্য রাজ-রাজারার জীবন খুবেই মুশকিল। রাজপুত্রদের জীবন- রূপকথা। রূপকথা না হলে দুঃখ- কষ্ট, দেখানো যাচ্ছে না, কাজেই রাক্ষস- খোক্ষস ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু মানুষকে ফেস করতে হয় রক্তাক্ত। আলালের ঘরের দুলাল হলে চলবে না। আমাদের এখনকার দিনগুলো কি সহজ হয়ে গেছে?

চিহ্ন : সেটাই স্যার যে, একটা সোসাইটি কোনদিকে যাচ্ছে, একটা ক্লাস কোনদিকে যাচ্ছে – যে ফাইভ স্টার হোটেলে দিনে দু লাখ আড়াই লাখ টাকা খরচ করছে – মানে বিকারের সর্বোচ্চ স্তর। আর একটা অংশ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে যাচ্ছে— খাবার নেই, টাকা নেই, লেখাপড়া নেই, কমন সেন্স নেই অথচ গণতন্ত্রের কথা, এই গণতন্ত্র দিয়ে আমি কি করবো? অচেতন মানুষদের নিয়ে গণতন্ত্র করে কি লাভ? কিন্তু এসব লেখকদের টাচ করছে না কেন?

হা. আ. হ. : জানিনা। তবে লেখকতো এখন নেই। গদ্য লেখক তো একেবারেই নেই। দ‘ুএকজন প্রবন্ধ লিখছে। আর উপন্যাস লিখে ক‘জন? ছোটগল্প তো গুড়িয়ে গেছে।

চিহ্ন : আপনাদের যে ডেভলোপমেন্ট, একধরনের দর্শন পড়ে আসি আর না আসি, একধরনের দার্শনিক কা-জ্ঞান তৈরি হওয়া, নিজের মধ্যে সেটা ফেস করা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশিলিত হওয়া, নিজেকে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যে অন্তরদর্শনটা নিজের মধ্যে থাকা এবং অন্যকে দেওয়া। এই যে জিনিসটা আজকাল লেখাপড়া হচ্ছে না, নাকি? সোসাইটিতে তো চরম গরপরতা, উল্টোপাল্টা চলছে সেটা তাদেরকে টাচ করছে না কেন?

হা. আ. হ. : চিন্তামূলক গদ্যে ক‘জনের নাম বলতে পারবে? বলতে গেলে ঐ আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিশেষ ব্রান্ডের বদরুদ্দিন উমর। তাঁরা তো সবাই আশি পেরিয়েছে। আমিই ছুঁই ছুঁই। তাহলে কি করা যায় বলোতো? এতোবড় গ্যাপ, চিন্তার গ্যাপ, সৃষ্টি-সৃজনের গ্যাপ, কল্পনার গ্যাপ

চিহ্ন : তাহলে কি সমাজে কথা বলার দরকার নেই? নাকি কথা বলার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে?

হা. আ. হ. : কি করবো বলো, এখন সেটাই লক্ষ্য করছি। খুব কম হচ্ছে, কেন এ রকম হচ্ছে? দু‘একজন মেয়ে ভালো লিখছে- অতিমুন, শাহাদত মল্লিক, শাহিন আকতার কিংবা পাপড়ি রহমান লেখার চেষ্টা করছে। ছেলেরা কোই? মার্সেল কোই? নাই তো…

চিহ্ন : এক্ষেত্রে স্যার যেটা আপনি বারবার বলেন নির্ভয় এবং সাহস- এটার সংকট। কিংবা কর্পোরেট পুঁজির সাথে যোগসূত্র?

হা. আ. হ. : এটা হল আসল প্রশ্ন! একবার যদি কেউ মনে করে যে শর্ট সময়ে নাম কামাবে তাহলে সর্বনাশ। কতো পদক আছে, এই পদক আছে ওই পদক আছে

চিহ্ন : তাহলে এইটাও একটা বড় সমস্যা?

হা. আ. হ. : প্রলোভনের কাছে নত স্বীকার করে না এ রকম মানুষ কম। প্রলোভনে পড়লে সব শেষ। আমি এতো বেশি পুরস্কার পেয়েছি যে তার অন্ত নেই, মাঝে মাঝে মনেই থাকে না। এটা পেয়েছি কিনা। কিন্তু কখনো মনে করিনি এগুলো আমার ডেকোরেশন।

চিহ্ন : আসলে টোটাল ব্যাপরটা যে আমাদের যে জেনারেশন (ডিজ জেনারেশন) এই জেনারেশনের মধ্যে কেউ সাহসী হয়ে উঠছে না, কেউ বুক ফুলিয়ে তাচ্ছিল্য করে নিজের সত্যটাকে বলছে না। কিংবা লেখকের যে প্যাসন এটার অভাব আছে?

হা. আ. হ. : তোমার সাথে একমত আমি

চিহ্ন : তা হবেনা কেন? বৈষম্য প্রচুর, তীব্র শোষণ চলছে

হা. আ. হ. : যদি লেখা পড়ার কথা বলো তো আরজ আলী মাতুব্বর কতোটুকু পড়ালেখা করেছে? তারাশঙ্কর মেট্রিক। কাজেই এটার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। প্রথাগত বিদ্যার সাথে তো কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে এখনকার সাকসেস কি? কাকে যেন বললাম, ছেলে মেয়ে কয়টি? বললো দুটো। একটা দুবাইয়ে একটা আমেরিকায়। তো আজকাল অনেকেই মনে করছে আমি বাঙ্গালি থাকবো কেন? আমি তো বিশ্ব নাগরিক। এই যে স্বেচ্ছায় দেশান্তরিত হওয়া, এর আগে যাদের জোর করে দেশান্তরিত করা হয়েছে তাদের দু‘জনের ফিলিংস এক নয়। স্বেচ্ছায় তো লোভে পড়ে…

চিহ্ন : হুম স্যার লোভে পড়ে মানুষ অ্যাটলান্টিক সাগর পাড়ি দিচেছ। কি প্রবণতা। এবং সহজভাবে টাকা পয়সা কারেন্সি এটা তো একটা ব্যবসা।

হা. আ. হ. : আদম ব্যাপারীতো আলাদা ব্যবসাই। অনেককে পাঠাচ্ছে কাজ দেবে বলে, টাকা নিচ্ছে (যেমন করে হোক ,জমি বিক্রি হোক আর যাই হোক দিচ্ছে) আর গিয়ে মালেশিয়ায় মরছে। ইন্দোনেশিয়ায় মরছে, ইতালী থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার চেষ্টা করে মরছে। কেবলি মৃত্যুর ¯্রােত। এতো বিনাশী অবস্থা। দর্শনশূন্য  ভূঁইফোড় জিনিস শিক্ষিতের ক্ষেত্রে তাই। আর অশিক্ষিতের ক্ষেত্রে প্রলোচিত করছে। মেয়েদের বলা হচ্ছে ভাল চাকরি পাবে সৌদি আরবে – সেখানে গিয়ে তারা ঝি-চাকর-বাদী হওয়া ছাড়া আর কিছু জুটছে না।

******************************************************

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
‘দর্শন ছাড়া সাহিত্য নেই’
যথার্থ সাহিত্য বারবার পড়া যায়, কখনোই পুরাতন হয় না। উল্টো প্রতিপাঠেই নতুন চেহারায় ধরা দেয়। এর কারণ সাহিত্যের ভেতর একটা রহস্য থাকে। রহস্যটা কী? থাকে সে কোথায়? সেসব কথা একেবারে পরিষ্কার করে বলা যাবে না, বলতে গেলে কারণের একটা ফর্দ তৈরি করতে হবে। ফর্দে উল্লেখ থাকবে লেখকের কল্পনার, তাঁর অনুভূতির, এবং তাঁর দর্শনের। কোনটা আগে, কোনটা পরে সেটার মীমাংসাও একটা সমস্যা। কারণ ওই তিনটি মিলেমিশে যায়, অভেদ্য হয়ে পড়ে। তবে এটা খুবই সত্য যে, দর্শন ছাড়া সাহিত্য নেই। সাংবাদিকতা যে সাহিত্য নয়, তার প্রমাণ কারণ ওই দর্শন। সাংবাদিকতা দর্শনকে এড়িয়ে চলে, ওদিকে দর্শনের সন্ধান না পেলে সাহিত্যের একেবারেই চলে না। তা দর্শন বলতে আমরা কী বোঝাবো? দর্শনের মূল কথাটা হচ্ছে জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা। সে ব্যাখ্যা অন্যত্রও পাওয়া যায়, কিন্তু দর্শনের ব্যাখ্যাটা আসে যুক্তির পারম্পর্যের ভেতর দিয়ে। এখানে তার আত্মীয়তা আছে বিজ্ঞানের সঙ্গে। কিন্তু বিজ্ঞান যে পরিমাণে নৈর্ব্যক্তিক দর্শন সে পরিমাণে নৈর্ব্যক্তিক নয়। দর্শনের চরিত্রটা সর্বদাই মানবিক, এবং মানুষের অমঙ্গল যদি করে ফেলে তাহলে সে মানবিকতার গুণ ও সীমা লঙ্ঘন করে না। এই মানসিকতাই সাহিত্যকে দর্শনাভিমুখী করে তোলে।

দুই

কবিতাই প্রথমে এসেছে, তার পরে দর্শনে। কিন্তু কবিতা দর্শনকে খুঁজেছে। যদিও দুয়ের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর- জন্মসময়গত যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি চরিত্রগত। কবিতার তথা সাহিত্যের উপজীব্য হচ্ছে বিশেষ; দর্শনের উপজীব্য নির্বিশেষ। তাদের অবলম্বন ভিন্ন ভিন্ন; সাহিত্য বিশ্বাস করে সংশ্লেষণে, দর্শনের আগ্রহ বিশ্লেষণে। তবু সাহিত্যের জন্য দর্শনানুসন্ধান অপরিহার্য। কেননা, মানুষের বিশেষ অনুভূতিগুলোর প্রবণতা থাকে নির্বিশেষ সাধারণীকরণের দিকে; সব সময়েই তাই দেখা যায় তারা কোনো জ্ঞানের অভিমুখে যেতে চাইছে। অন্যদিকে আবার দর্শন যদিও বিশ্লেষণধর্মী ও চিন্তানির্ভর, তথাপি দর্শন বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানের মতো খ- খ- করে অবলোকন করে না সে জীবন ও জগৎকে, সংলগ্ন ও ঐক্যবদ্ধ করতে চায়, অনেক সময় আকাক্সক্ষা রাখে সমগ্রকে ব্যাখ্যা করবে একক কোনো মানদ-ে। তবে সত্য থাকে এটা যে, দর্শনের তবু সাহিত্যকে বাদ দিলে চলে, কিন্তু সাহিত্য কখনো চলতে পারে না দর্শনকে বাদ দিয়ে।

তাই দেখি ইন্দ্রিয়সংবেদী কবি, কীটস, চরমভাবে যিনি আস্থা রেখেছিলেন ঝবহংধঃরড়হং-এ, তিনিও বারংবার বলছেন দর্শনের কথা, ভয় পাচ্ছেন চিন্তাবিহীন অনুভবকে, দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন মননশীলতার দিকে, এবং গভীরতম অনুভবশক্তির প্রকাশে সমৃদ্ধ কবিতাসমূহেও অনুপ্রাণিত দার্শনিক উক্তি করেছেন। সেটা একটা দিক। অপরদিকে এও অনিবার্য সত্য যে, কোনো মানুষই তার সমসাময়িক দার্শনিক আবহাওয়ার বাইরে নয়, লেখক তো ননই। যেমন করে প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রভাবিত করে মানুষের দৈহিক স্বাস্থ্যকে, ঠিক তেমনিভাবে দার্শনিক আবহাওয়া প্রভাব রাখে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। এই প্রভাব একজন লেখক অন্য মানুষের তুলনায় অধিক পরিমাণে গ্রহণ করেন, কেননা লেখক সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিক সংবেদশীল, গ্রহণসমর্থ। টেনিসনের ‘ইন মেমরিয়াম’ কবিতায় বিবর্তনবাদী চিন্তার উপস্থিতি কোনো গোপন ব্যাপার নয়; এই কবিতা কিন্তু লেখা হয়েছিল ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বের বই প্রকাশের নয় বছর আগে। ডারউইনের বই প্রকাশের পূর্বেই বিবর্তনবাদী চিন্তা অগ্রসর হয়ে এসে পৌঁছেছিল অগ্রসর মানুষের মনে, এবং সেই অগ্রসর চিন্তা থেকে দূরে ছিলেন না কবি টেনিসন, মূলত যিনি সৌন্দর্যপিপাসু; বিশেষ দক্ষতা যার দার্শনিক ভাবনার চঞ্চল অনুসরণের নয়, অনুভবের অচঞ্চল চিত্রায়ণে।

জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদদীন পরস্পরের সমসাময়িক। দুজনেই পূর্ববঙ্গের মানুষ, শ্যামল ও সিক্ত প্রকৃতির প্রতি দুজনেরই গভীর ভালোবাসা। কিন্তু তাদের কবিতায় সে পারস্পরিক দূরতিক্রমণীয় ব্যবধান তার কারণটা মূলত দার্শনিক। সময়কে জয় করবার প্রয়োজনে বিপন্ন জীবনানন্দ যে একটি ইতিহাস চেতনা নীরবে গড়ে তুলেছিলেন নিজের মতো করে, জসীমউদ্দীনের লেখায় তেমন কোনো দর্শনানুসন্ধান আমরা পাবো না। এখানে জীবনানন্দ বড় জসীমউদ্দীনের তুলনায়; একই সঙ্গে তিনি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও গভীর। অথবা ধরা যাক, কাজী নজরুল ইসলামের কথা। বড় মাপের কবি তিনি। কিন্তু মনে হবে কবিতায় তিনি বড়ই অগোছালো, অনেক সময় স্ববিরোধী। আসলে নজরুল ইসলামের ভেতরে ন্যায় অন্যায়ের প্রকারভেদের বোধ আছে, রয়েছে সুন্দর জীবনের জন্য আকাক্সক্ষা, আর তার বিপরীতে অসুন্দরে জন্য প্রবল ঘৃণা। দেখা যাবে প্রবহমান ঘটনা ও নির্যাতিতের দুঃখের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী। সব মিলিয়ে একটি দার্শনিকতা রয়েছে, যেমনটা আমরা পাই ইংরেজী রোমান্টিক কবিদের লেখায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে একজন কালজয়ী সাহিত্যিক সে কেবল হৃদয়গ্রাহী ও কৌতুহলোদ্দীপক গল্প বলার দরুণ নয়, আরো বড় কারণ তার দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য গভীর মমতা; এবং যে দৃষ্টিটি উল্লেখযোগ্য এই বৈশিষ্ট্যর কারণেও বটে যে, এতে একই সঙ্গে রয়েছে সামন্তবাদের প্রতি ঘৃণা ও ভালোবাসা।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে সৃজনীকল্পনা ও দার্শনিকতা একেবারে হাত ধরাধরি করে আছে। একই সঙ্গে তিনি ইহজাগতিক ও আধ্যাত্মিক। তার রচনায় রক্ত-মাংসের মানুষেরা রয়েছে, তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে। বহু বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল। সমসাময়িক জগৎ ও ঘটনা সম্পর্কে তিনি সজাগ, যেমন সচেতন তিনি অতীত ইতিহাস বিষয়ে। গতির প্রতি তার স্বাভাবিক পক্ষপাত। অন্যদিকে আবার রয়েছে তার ধর্মচেতনা। তিনি উপনিষদের উত্তরাধিকারী। ধর্ম তাকে সাম্প্রদায়িক করে নি, বরঞ্চ বাংলা সাহিত্যকে তিনি যে-পরিমাণে অসাম্প্রদায়িক করে গেছেন তার আগে তেমনটি আর কেউ করতে পারেন নি। আধ্যাত্মিকতার প্রতি তার স্বাভাবিক টান। এবং এও মোটেই তাৎপর্যহীন নয় যে, তার গান যেমন ভারতের তেমনি বাংলাদেশে জাতীয় সংগীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের বহুমুখিতা ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করে রয়েছে একটি দার্শনিকতা, যেটি ছাড়া তার সাহিত্যকে ভাবাই যায় না। রবীন্দ্রসাহিত্য অবশ্যই আদর্শ-নিরপেক্ষ নয়, রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত গভীরভাবে আদর্শবাদী।

সাহিত্যিক-শ্রেষ্ঠ শেক্সপীয়র মত-প্রচারক ছিলেন না আদৌ, কোনে বিশেষ দার্শনিক মতবাদের স্থিরপ্রতিজ্ঞ উপস্থাপকও নন তিনি; জীবনের জটিলতাকেই নাট্যায়িত করেছেন এই লেখক-নিরাসক্ত পক্ষপাতবিহীন অবস্থানে দাঁড়িয়ে। তিনি দার্শনিক নন- দান্তে নন, গ্যেটে নন, নন টলস্টয়, কিন্তু তাই বলে কি তার রচনায় জীবনের কোনো ব্যাখ্যা নেই, চিন্তা নেই গভীরতম? অবশ্যই আছে। বস্তুত শেক্সপীয়রের রচনায় অনুভূতি ও চিন্তাশক্তি—এ দুই শত্রুর মধ্যে জীবনমরণ, সামনাসামনি সমান-সমান মল্লযুদ্ধের যে চিত্র কবি-সমালোচক কোলরিজ দিয়েছেন তা অসত্য নয় মোটেই। সাদায়-কালোয় জীবন আঁকেন নি তিনি, শুভ ও অশুভ সর্বক্ষণ আছে তার লেখায়, আছে তাদের ক্ষান্তিহীন রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব।

রেনেসান্স ও রিফরমেশনের যে দার্শনিক আবহওয়ার মধ্যে শেক্সপীয়রের অবস্থান তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে; শুধু প্রতিফলিত নয়, সেই আবহাওয়া গভীরতর ও সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে তার রচনার মধ্য দিয়ে। ঈশ্বর নয়, মানুষই থাকবে বিবেচনার ও মূল্যবোধের কেন্দ্রভূমিতে-এই দর্শন রেনেসান্স শিখিয়েছে তাঁকে। মানুষের চরিত্র যে অপার বিষ্ময়ের এক রহস্যলোক, এই বোধও ওই রেনেসান্সেরই। রিফরমেশন দৃঢ়তর করেছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের এই চেতনাকে, ধর্মের ক্ষেত্রে বিবেকের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নিয়ে। সেই সঙ্গে ধর্মনিহিত মূল্যবোধকেও গ্রহণ করেছেন শেক্সপীয়র, এলিজাবেথীয় জগৎ-দৃষ্টিকেও। স্পেনীয়দের পরাজিত করে এবং নাবিকদের সাহায্যে নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করায় যে বহির্মুখী উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল সেকালে তার প্রভাও পড়েছে শেক্সপীয়রে। এক কথায় বলতে গেলে, ইহলৌকিকতার এবং জীবনকে নিরুদ্বেগে নির্দ্বিধায় গ্রহণের ফলে যে-একটি মানববাদী শক্তি তৈরি হয়েছিল, সেই শক্তিই আপন সৃজনক্ষমতা অবারিত করেছে শেক্সপীয়রের অসামান্য রচনাবলীর মধ্যে দিয়ে। শেক্সপীয়রের ব্যক্তি-মনীষাকে খাটো করার আবশ্যকতা নেই, কিন্তু তার মনীষা অবশ্যই একটি বিশেষ সামাজিক ও দার্শনিক পরিবেশের আনুকূল্যে বিকশিত হয়েছিল; সেই পরিবেশটি মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। গ্রীক নাট্যকাররাও একটি বিশেষ আবহাওয়ার মানুষ, এবং তিনজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকার যখন একই বিষয়ের ওপর তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নাটক রচনা করেন, তখন একটি বড় ও সাধারণ দার্শনিক পরিম-লের ভিতরে থেকেও তাঁদের নিজস্ব দার্শনিক অবস্থানের স্বাতন্ত্র্যকে উদ্ভাসিত করেন তাঁরা। কীটসের মধ্যে শেক্সপীয়রের গুণ ছিল। কিন্তু কীটসের তুলনায় শেক্সপীয়র যে বড় লেখক তার একমাত্র কারণ এটা নয় যে, শেক্সপীয়র দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন কীটসের তুলনায়; কারণ এটাও যে শেক্সপিয়রের দার্শনিকতা গভীরতম ছিল কীটসের অপেক্ষা। ট্র্যাজেডি গীতিকবিতার চাইতে উচ্চতর রূপকল্প- দার্শনিক গভীরতার কারণে।

মূল কথা দাঁড়ায় তাহলে এ রকম। কোন লেখকই দার্শনিক বলয়ের বাইরে নন—তখন তো ননই যখন তিনি সেই বলয়কে মান্য করেন, যেমন শেক্সপীয়র করেছেন; তখনও নন যখন তিনি তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, যেমন মাইকেল মধূসুদন করেছিলেন। মাইকেল প্রসঙ্গ এলে স্মরণ করা যায় যে, তাঁর ওপর হোমার-মিল্টনের সাহিত্যিক ও দার্শনিক প্রভাব সক্রিয় ছিল। সেই তুলনায় তার লেখায় শেক্সপীয়রের প্রভাবটা পড়েছে কম। বাংলা সাহিত্যে শেক্সপীয়রের প্রভাব গভীর নয়। শেক্্সপীয়রের মৃত্যুর এতো বছর পরেও বাংলায় তাঁর সার্থক ও যথার্থ অনুবাদ হয়নি। এর কারণ ভাষাতাত্ত্বিক তো বটেই, তার চেয়েও অধিক পরিমাণে দার্শনিক।

যে বিশেষ দার্শনিক পরিম-লে শেক্সপীয়রের অবস্থান, বাঙালীর মনন থেকে তার দুরবর্তিতা নিতান্ত সামান্য নয়। শেক্সপীয়রের দি টেমপেস্ট নাটক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, “নাটকের নামও যেমন, তাহার ভিতরকার ব্যাপারও সেইরূপ। মানুষে প্রকৃতিতে বিরোধ এবং সেই বিরোধের মূলে ক্ষমতালাভের প্রয়াস। ইহার আগাগোড়া বিক্ষোভ।” এই বিক্ষোভ পছন্দ হয় নি রবীন্দ্রনাথের। না-হওয়ার কারণটি নিছক ব্যক্তিগত নয়, ব্যক্তিগত হলেও তা সমষ্টিগত ও আদর্শিক বটে।

এই আদর্শগত কারণেই আমাদের, বাঙালীদের পক্ষপাত গীতিকবিতার প্রতি। নাটক এসেছে ধীরে ধীরে। এবং সেখানেও কমেডি প্রাধান্য পেয়েছে ট্র্যাজেডির তুলনায়। ট্র্যাজেডি চূড়ান্তরূপে ইহজাগতিক, অন্যপক্ষে বাঙালী জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মভিত্তিক ভাববাদ শিক্ষা দেয় যে, জগৎ অনিত্য, নিত্য হচ্ছে মানুষের আত্মা ও তার পরকাল। ইহকালের দুর্ভোগ চূড়ান্ত নয়, বরঞ্চ এই দুর্ভোগের পুরস্কার পাওয়া যাবে পরলোকে—এই যে ধারণা, এটি ট্র্যাজিডির জন্মবিরোধী। শুধু ভাববাদের কারণে নয়, দারিদ্র্যের কারণেও “মরলে বাঁচি”র জীবনদর্শন গড়ে উঠেছে এই দেশে। এই দর্শন ট্র্যাজেডির শক্র; ট্র্যাজেডি মরার পর বাঁচার কথা বলে না, বাঁচার মধ্যে বাঁচাকেই চরম ও চূড়ান্ত জ্ঞান করে। তপোবনে দ্বন্দ্ব নেই, কেননা সেখানে প্রতাপান্বিত অশুভ নেই। পারলৌকিক স্বর্গেও ওই একই ব্যাপার। আমাদের শুভ সংঘর্ষে যেতে চায় না অশুভের সঙ্গে, ফলে তার শক্তি কখনো যথার্থ রকমে বিকশিত ও সম্পূর্ণরূপে পরীক্ষিত হতে পারে নি। শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব নিতান্তই যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে সাহিত্যে, নিরুপায় লেখক তখন পক্ষ নেন, বিপন্ন হয়ে। অশুভ তাঁর ব্যক্তিগত শক্রতে পরিণত হয়েছে মনে হয়। তিনি সমবেদনা প্রকাশ করেন শুভের প্রতি, এমনকি অশ্রুপাতও করতে বলেন পাঠককে, যেমন শরৎচন্দ্র বলেছেন, দেবদাসের অন্তিম লাইনগুলোতে।

এই ভাববাদী ও তপোবনপ্রিয় চেতনায় ট্র্যাজেডি অনাহূত, স্বভাবতই। গিরিশ ঘোষ ম্যাকবেথ অনুবাদ করেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ওই নাটক দু-চারদিনের বেশি চলে নি, শূন্য হয়ে গেছে রঙ্গালয়, পরে যখন ‘আবু হোসেন’, এলো তখন যেন ভোজবাজি, আবার ভরে গেল আসনসমূহ। পাঠক-দর্শক হাসি চায়, পরিহাস চায়, চায় উৎফুল্লতা, চায় না দুর্ভোগ, চায় না দ্বন্দ্ব। আপন ঘরে দুর্ভোগ যার নিত্যসঙ্গী, কোন দুঃখে সে দুঃখকে খুঁজবে রঙ্গমঞ্চে। পয়সা দিয়ে?

শেক্সপীয়র অনুবাদ ব্যর্থতার ভাষাতাত্ত্বিক কারণটাও দর্শননিরপেক্ষ নয়। ভাষা ওপর থেকে আসে না, নীচের থেকেই গড়ে ওঠে; ওপর থেকে এলেও টেকে না, টেকে তা-ই যা গড়ে উঠেছে নিজের প্রয়োজনে। বাংলা বাঙালী মানুষেরই ভাষা। এই ভাষার বিজ্ঞানচর্চা ছাপ যেমন অল্প, তেমনি অল্প দর্শনচর্চার ছাপও। কারণটা অন্যকিছু নয়। সেটি হচ্ছে যে,আমাদের চেতনায় কাব্যের শান্ত ও নিরীহ কিন্তু শক্ত ও অচঞ্চল আচ্ছাদনটি ভেদ করে মননশীলতার, বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনের প্রবল ঐতিহ্য গড়ে ওঠে নি। আমাদের প্রধান গৌরব গীতিকবিতা, প্রধান অগৌরব বিজ্ঞানের ও দর্শনের অভাব। সেই গৌরব ও অগৌরবের যুগ্ম পতাকা ভাষা তার পেলবতা ও কাব্যময়তার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত আন্দোলিত করছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকালে একজন সমালোচক বলেছিলেন, বাংলা ভাষা কেবলি এলাইয়া এলাইয়া পড়ে, ধরি ধরি করিয়া তাহাকে রাখা যায় না। সে সত্য- অপ্রাণিত হয়নি অদ্যাবধি।

রবীন্দ্রনাথ ম্যাকবেথের অংশবিশেষের অনুবাদ করেছিলেন, তার গৃহ শিক্ষকের শাসনের মুখে। সে অনুবাদটি রক্ষা করার মতো আগ্রহ কবির ছিল না। সেই অনুবাদের প্রথম দৃশ্যের এই ধরনের পঙক্তি আছে, ‘পোড়ারমুখী বোল্লে রেগে ডাইনী মাগী যা তুই ভেগে।’ ওই যে শব্দ “মাগী” তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ওই পরিবেশে। বিদ্যাসাগর অনায়াসে ব্যবহার করেছেন ওই শব্দ। পরে মধ্যবিত্ত মানসের বর্জনপ্রিয়তা এইসব শব্দকে অশ্লীল জ্ঞানে জিভে কেটে পরিত্যাগ করেছে। বলা বাহুল্য, এর কারণ ভাষাতাত্ত্বিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক। এই প্রবণতা শেক্সপীয়রের নিজের কালে ছিল না এবং ছিল না বলেই তিনি তার রচনাবলী সৃষ্টি করায় অনুকূল্য পেয়েছিলেন। আমরা শেক্সপীয়রের যথেষ্ট ও যথার্থ অনুবাদ করতে পারি নি, কেননা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিধিটা এখনো বিস্তৃতির ও গভীরতার অপেক্ষায় আছে।

রবীন্দ্রনাথ অন্য সবার চেয়ে বড়; কিন্তু ভক্তিবাদের অবস্থান তাঁর সাহিত্যেও উজ্জ্বল। তাঁর বিশ্বাস ‘স্থূলত্ব বর্জন করতে করতে তপস্যার মধ্য দিয়েই মানুষই দেবতা হয়ে উঠবে’। এই বিশ্বাসে উঁচু আশাবাদ আছে, কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখবার বাস্তবিক ইচ্ছার কিছুটা অভাব রয়েছে। মানুষ মানুষই, এই সত্য এমনকি রবীন্দ্রনাথও গ্রহণ করছেন না, মানুষকে দেবতা করতে চাইছেন। তদুপরি মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ যে তপস্যার দ্বারা হয় না, হয় সংগ্রাম ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে, এই বৈজ্ঞানিক সত্যও অস্বীকৃত রয়ে যাচ্ছে। রক্ত-মাংসের মানুষ রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে উপস্থিত আছে; কিন্তু তিনি প্রধানত কবি-ই, ঠিক যে অর্থে শেক্সপীয়র প্রধানত নাট্যকার। এবং তার কবিতায় মানুষের চাইতে মনুষ্যত্ব সম্পর্কে তার ধারণাটাই বড়, দ্বন্দ্বের চাইতে অধিক মূল্যবান সমন্বয়। যে তপোবনই চাইছেন তিনি, তপস্যার জন্য। গীতাঞ্জলির সেই অসাধারণ চরণগুলো স্মরণ করা যাক, যেখানে বলেছেন তিনি যে, ঈশ্বর স্থপতি নির্মিত মন্দিরে নেই, তিনি আছেন, ‘যেথায় মাটি ভেঙ্গে করছে চাষা চাষ/ পাথর ভেঙ্গে কাটছে যেথায় পথ, কাটছে বারো মাস/ রৌদ্র জলে আছেন সবার সাথে/ ধূলা তাহার লেগেছে দুই হাতে।’ কিন্তু কর্মের এই যে জগৎ সেও তো মন্দিরই, বৃহৎ মন্দির। অথবা তপোবন একটি। শ্রমিককে শ্রমিক হিসেবে স্বীকার করেছেন না কবি, দেখছেন তাকে ঈশ্বরের প্রকাশ ভূমি হিসেবে। শ্রমিক কিন্তু নিজেকে জানে মেহনতি মানুষ বলেই; ঈশ্বর তাকে সুখ দেয় নি, মেহনত দিয়েছে, দিয়েছে অনাহার ও দারিদ্র্য। এইভাবে রবীন্দ্রনাথ বাস্তবকে কোথাও কোথাও অবাস্তব করে তুলেছেন তার আলোকসামান্য প্রতিভার জাদুকর ও গীতিময় স্পর্শে। মানুষের ধর্ম বক্তৃতাতে তিনি জ্ঞান, অনুভূতি ও কর্মের মাধ্যমে জগৎকে জানার বিষয়ে বলেছেন; বলে নিয়ে নিজের স্বাভাবিক পক্ষপাতে প্রদর্শন করেছেন অনুভূতির প্রতি। জ্ঞান ও কর্ম কম মূল্য পেয়েছে তুলনায়।

জ্ঞান ও কর্মের এই অবমূল্যায়নটা আমাদের অধিকাংশ লেখকের বেলাতেই সত্য। কল্লোল যুগের লেখকেরা হুজুগ তুলেছিলেন বিদ্রোহের। বিদ্রোহ ছিল যৌনালোচনা সম্পর্কে সামাজিক নিষেধের এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক নীতির বিরুদ্ধে, মূলত। কিন্ত সেই বিদ্রোহে বড় রকমের স্থান ছিল না জ্ঞান জগৎটাও ভাববাদী। তফাৎ এই পরিমাণে যে, কর্মের স্থলে এরা স্থাপন করেছেন আবেগকে; আবেগের কাছ থেকে এরা সেই ধরনের তৃপ্তি কামনা করেছেন ধার্মিক যা পায় ধর্মানুশীলনের মধ্যে দিয়ে। বেদের লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যখন পরমহংসের জীবনী রচনায় নিয়োজিত হন, তখন আসলে বিস্ময়ের বিশেষ কোনো কারণ থাকে না। কেননা তিনি এবং তাঁরা সকলেই ভাববাদীই ছিলেন, শুরু থেকেই; একটা ভাবের জন্য অন্য জায়গা করে দিয়েছে মাত্র, এর বেশী নয়। তবু মানতেই হবে যে বেদের জীবন থেকে পরমহংসের জীবনে চলে আসাটা জীবন সংকোচন এক প্রকারের। যেমন, রবীন্দ্রনাথের গোরার জগৎ থেকে বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে আসা উন্মুক্ত প্রান্তর থেকে সরে এসে বন্দি হওয়া ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুম তথা বন্ধ ঘরের দিকেই গোপন ও সক্রিয় পক্ষপাত অধিকাংশ ‘আধুনিক’ লেখকের। সেজন্য পরবর্তীকালে দেখি, সমরেশ বসু গঙ্গার তীর ভেঙে আহ্লাদিতচিত্তে বিবরে প্রবশে করেছেন, মধ্যবিত্ত কলকাতার। সেই একই পলায়ন, জীবন থেকে। পুঁজি হিসেবে জীবনকে সঙ্গে নেন নি, সঙ্গে নিয়েছেন জীবন সম্পর্কে খ-িত কিছু ধারণাকে। পুঁজি নিঃশেষিত হয়ে গেছে দ্রুত, তখন তাঁরা নানাবিধ উত্তেজনাকে মূলধন হিসেবে খাটাবেন ভেবেছেন তাদের লেখায়। অনেক দিক দিয়ে শরৎচন্দ্র অত্যন্ত বস্তুবাদী। কিন্তু তিনি আবার ভাববাদীও; সংস্কারে বিশ্বাস রাখেন, আস্থা রাখেন ভক্তিতে, পরিত্যাজ্যকে মোহনীয় করে তোলেন নানাভাবে। চেতনাগত পরিচয়ে তারাশঙ্কর হচ্ছেন সংশোধিত শরৎচন্দ্র।

গদ্যের অবস্থাই যদি হয় এমন তবে কবিতার পরিস্থিতি অধিকতর শোচনীয় হতে বাধ্য। হয়েছেও। সেখানে ব্যক্তির সমন্বয়বাদী ও গীতিধর্মী অনুভবই প্রধান সত্য; এবং সেই অনুভব জীবনে যেমন সাহিত্যেও তেমনি, ইন্দ্রিয়সংবেদী ও প্রগতিবিরোধী। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বন্ধুদেব বসুর মধ্যে মনে হবে দূরত্ব বিস্তর; কিন্তু দূরত্ব নেই প্রকৃত প্রস্তাবে। দুজনেই ভাবাবাদী।

ব্যতিক্রম কি নেই? আছে। বিদ্রোহ হয়েছে। বিদ্যাসাগর করেছেন বিদ্রোহ, করেছেন মধুসূদন, নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য। কিন্তু এঁদের সকলেরই পরিণতি বেশ করুণ, তাঁদের লেখা মূল ধারায় পরিণত হতে পারে নি। সমাজ, এমনকি প্রকৃতিও সহ্য করতে চায় নি তাদের দার্শনিক বিদ্রোহকে। বঙ্গভূমির মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির প্রবণতা মূলতঃ বশ্যতার, বিদ্রোহের নয়।

রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, বাঙ্গালা সাহিত্যে নারীর মর্যাাদা পুরুষের তুলানয় অধিক। তাঁর মতে, পুরুষ এখানে মহাদেবের ন্যায় নিশ্চলভাবে ধূলিয়ান এবং রমণী তাহার বক্ষের উপর জাগ্রত জীবন্তভাবে বিরাজমান। এর কারণ হিসেবে তিনি সরাসরি বলেছেন পুরুষ এদেশে অকর্মা। কিন্তু অকর্মণ্যতা একমাত্র কারণ নয়; সাহিত্যে নারীর আধিপত্যের আরো একটি কারণ বোধ করি এই যে, এ সাহিত্য অত্যন্ত কোমর, ভাবালু ও অনুভূতিপ্রবণ, এক কথায় বেশ মেয়েলি। দার্শনিক চিন্তায় তা যথেষ্ট পুষ্ট বা সমৃদ্ধ নয়। সেই অপুষ্টি ও অসমৃদ্ধি রবীন্দ্রনাথ-নির্দেশিত অকর্মণ্যতা থেকে এসেছে বললে হঠকারী কথা বলা হবে না।

তিন

বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চার সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব ছিল। ইংরেজ আমলে যেমন, পরেও তেমনি। ইংরেজের শাসনামলে মনে হয়েছিল রাষ্ট্র ভাষা সাহিত্যকে বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে। তা করেছে বটে। বাংলা গদ্যের সৃষ্টি ইংরেজ আগমনের ফল, এ-কথা ইতিহাসে লেখা আছে। যে-মধ্যবিত্ত শ্রেণী আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে অতটা এগিয়ে নিয়ে গেল তারাই বা কোথা থেকে আসতো, ইংরেজ না এলে? ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন না করলে, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে না দিলে, কেইবা পড়তো বাংলা সাহিত্য? সবই সত্য।

কিন্তু বাঙালি যে ইংরেজির চর্চা না-করে বাংলা চর্চা করলো এটা একটা রাষ্ট্রবিরোধীতা তো বটেই। বাঙালী মিশে গেল না। কেউ কেউ অবশ্য গেল, তারা যারা ইংরেজ হতে চাইলো। কিন্তু অত্যন্ত বড়মাপের বেশ কিছু মানুষ যে গেলেন না, তাঁরা যে মাতৃভাষার চর্চা করলেন সেই ঘটনা তো বলছে এ কথা যে, তাঁদের গ্রহণের অন্তরালে সুদৃঢ় একটা বর্জন কার্যকর ছিল। মধুসূদন চলে গিয়েছিলেন; তিনি সাহেব হয়েছেন, মেম সাহেব বিয়ে করেছেন, ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়েছিলেন, ইংরেজিতেই লিখবেন ঠিক করেছিলেন; কিন্তু এই যে ফিরে এলেন, হলেন বাঙালী লেখক, ওইখানেই তার আসল বিদ্রোহ, ইংরেজ হওয়ার অভিনাটকীয় বিদ্রোহের চেয়ে যা অনেক গভীর।

রাষ্ট্রভাষা ছিল ইংরেজি। বাঙালী সে ভাষার চর্চা করেছে; কিন্তু সে ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করে নি। না করে বাংলা ভাষাকেই বরঞ্চ এগিয়ে নিয়ে গেছে। স্বাধীনতার দাবি সেই সাহিত্যে এসেছে, নানান ভাবে, নানান সুরে। কিন্তু রাষ্ট্র ছিল অত্যন্ত প্রবল। তার ক্ষমতা ছিল অপরিমেয়। তার ক্ষতিকর দাপটকে যে অস্বীকার করা যাবে তা সম্ভব ছিল না। না, সাহিত্যও পারে নি অস্বীকার করতে।

রাষ্ট্রীয় দাপটে সাহিত্যের বিশেষ রকমের ক্ষতি হয়েছে দুটো। একটি সাম্প্রদায়িকতা অপরটি শ্রেণীবিভাজন। বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টান্ত সহজেই আসে। তিনি অসামান্য ছিলেন যেমন ইহজাগতিকতায়, তেমনি স্বাধীনতাপ্রিয়তায়। স্বাধীনতার পক্ষে লিখতে গিয়ে তার লেখবার ছিল না বলে আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরাণীতে শক্র হিসেবে দাঁঁড় করালেন অনুপস্থিত মুসলমানকে। সাহিত্যে ওই যে সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করলো, ওই যে নদী ঘুরে গেলো তার স্বাভাবিক ধারা থেকে ভিন্নদিকে, তার প্রভাব পরবর্তীকালে অনেক ক্ষতির কারণ হয়েছে। বাঙালীর জন্য। ১৯৪৭-এ এসে বঙ্গদেশ যে দু-টুকরো হলো তার প্রধান কারণ সাম্প্রদায়িকতা এবং সেই কারণকে সাহিত্য প্রতিহত করার ব্যাপারে সক্রিয় থাকে নি, বরঞ্চ পুষ্টই করেছে।

আর রইলো শ্রেণী। ইংরেজের রাষ্ট্র বিদ্যমান শ্রেণীবিভাজনকে আরো শক্ত করেছে। সাহিত্য তাকে ভাঙতে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয় নি। সাহিত্য রয়ে গেছে বিত্তবান শ্রেণীর সাংস্কৃতিক অঙ্গ।

তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানে আমরা বাংলা সাহিত্যের চর্চা করেছি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নয়, রাষ্ট্রীয় বৈরিতার ভেতরে। হ্যাঁ, পুরস্কার ছিল, পত্রিকা ছিল, গণমাধ্যমে প্রচার পাওয়া যেতো; কিন্তু মূল সত্যটা ছিল এই যে, ওই রাষ্ট্র বাংলা ভাষাকে রাখতে চেয়েছিল উর্দুর নীচে, ঠিক যেমন ইংরেজরা চেয়েছিল ইংরেজিই হবে প্রধান; মোগলরা চেয়েছিল ফার্সীর প্রাধান্য; আর্যরা সংস্কৃতের। দমনের ওই চেষ্টা বাঙালী মানে নি।

সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধীতা কতোটা এসেছে বা আসে নি সে-প্রশ্নটা থাকে। না, বেশি আসে নি। সাতচল্লিশের পরে আমাদের সাহিত্য ছিল কবিতাপ্রধান। আমাদের প্রধান কবিরা রাষ্ট্রের মহিমাকীর্তন করে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো গ্লানি দেখা যায় নি। ফরাসী বিপ্লব কিংবা রুশ বিপ্লবের পেছনে যেমন সাহিত্যের একটা ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পশ্চাৎভূমিতে তেমন কোনো সাহিত্যিক ঘটনা ঘটে নি।

রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিকে গভীর ও প্রবল করতে না পারা সাহিত্যের জন্য অবশ্যই একটা দুর্বলতা। সে দুর্বলতা সেদিনও ছিল, আজো রয়েছে। মানুষের জীবনের অচরিতার্থতা ও দুঃখকে (কেবল বৈষয়িক অর্থে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অনুভূতিগত অর্থেও) সাহিত্য নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে নি। সেজন্য তার স্তরটা রয়ে গেছে প্রধানত বিনোদনের। আর ওই স্তরে যেহেতু টেলিভিশন ও ইন্টানেট কাজ করছে আরো জোরেশোরে, সাহিত্য তাই নিজেকে ততটা প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারছে না, যতটা প্রয়োজনীয় হওয়ার তার নিজের জন্য তো বটেই, আমাদের সংস্কৃতির স্বাস্থ্যের জন্যও প্রয়োজনীয় ছিল।

বিষয়টা যে কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের ব্যাপার তা নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থারই ব্যাপার বটে। রাষ্ট্রগঠনে সাহিত্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে হয়তো, করেছেও কখনো কখনো; কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বন্দ্বটা একেবারেই মূলগত, এবং দার্শনিক। রাষ্ট্র হচ্ছে রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠান, চরিত্রগতভাবেই। অপরদিকে সাহিত্য চায় মুক্তি। প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের পক্ষে সাহিত্যকে তার নিজের দিকে টেনে আনবার চেষ্টা ফলকে বৃন্তচ্যুত করার সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়।

কবিতা না-লিখলেও দার্শনিক প্লেটো যে একজন কবি ছিলেন সেটা তার গদ্য রচনার পরতে পরতে প্রমাণিত। উপমায়, রূপকে, শব্দ চয়নে ওই দার্শনিক তার অন্তর্গত কবির কল্পনা ও সৌন্দর্যবৃদ্ধি, উভয়কেই ব্যবহার করে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে কবিতার গুণ ও আবেদন তিনি যে জানতেন তাতেও সন্দেহ করবার অবকাশ নেই। কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের জন্য কোনো জায়গা রাখেন নি। জায়গা রাখবেন কী, উল্টো নির্দেশ দিয়েছেন তাঁদেরকে বের করে দেওয়ার জন্য। কবিদের সম্মান দেয়া হবে, মালা ও সুগন্ধী দিয়ে তাদের সজ্জিত করা যাবে, কিন্তু তাদেরকে সবিনয়ে বলতে হবে, মহাশয়বৃন্দ, আমরা দুঃখিত, আপনাদের জন্য আমাদের রাষ্ট্রে কোনো স্থান নেই।

কেউ নেই? অভিযোগটা আপাতত এটা যে, কবিরা মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু গভীরে আরো একটা ব্যাপার রয়েছে। সেটা এই যে, কবিরা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাকে বিপন্ন করে। প্লেটোর সাম্যবাদ ফ্যাসিস্ট ধরনের; অর্থাৎ শ্রেণীবিভাজনকে মেনে নিয়ে, তবেই সাবই সমান, বিভাজনের ভেতরে সমান, ভেঙে দিয়ে নয়। সে-রাষ্ট্রে দার্শনিকেরা শাসন করবে, সৈনিকেরা করবে যুদ্ধ, শ্রমিকরা করবে উৎপাদন। এই বিভাজন কিছুতেই ভাঙা যাবে না। কাব্য তথা সাহিত্য যে গ্রহণযোগ্য নয় তার মূল কারণটা নিহিত রয়েছে না ভাঙার এই রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের ভেতরেই।

তা সাহিত্য করেটা কী? সাহিত্য মানুষের আবেগকে জাগিয়ে দেয়। মানুষকে সংবেদনশীল করে, যার ফলে মানুষ শ্রেণীবিভাজনকে ডিঙিয়ে যেতে চায়। সাহিত্য পাঠ করলে দার্শনিক হয়তো শ্রমিকের দুঃখ দেখে কাতর হবে, শ্রমিক হয়তো চাইবে সে শাসক হবে, সৈনিক হয়তো ক্ষমতার লোভে ওপরে যেতে চাইবে, কিংবা বলপ্রয়োগের জন্য নীচে; রাষ্ট্র তখন ভেঙে পড়বে, তখন ন্যায় বলে কিছু থাকবে না, অন্যায়ে ছেয়ে যাবে সমস্ত কিছু। প্লেটোর রাষ্ট্রের প্রধান কথা হলো নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখা, সেখানে তাই সাহিত্যের স্থান নেই। প্লেটোর রাষ্ট্রের জন্য সাহিত্য বিপজ্জনক, যেমন তা বিপজ্জনক ছিল হিটলারের রাষ্ট্রের জন্য।

রাষ্ট্রের অনেক কিছুই থাকে। সিপাহী, সান্ত্রী, আইন, আদালত—সবকিছুই আছে তার। বিবেক নেই? হ্যাঁ, বিবেকও আছে বইকি। সেই বিবেক হচ্ছে শাসক শ্রেণীর স্বার্থ। ‘ন্যায়’ও তাই। শাসক শ্রেণীর স্বার্থ। ওদিকে সাহিত্যের কাজটাই হলো মানুষের ভেতর যে বিবেকবান, অর্থাৎ সংবেদনশীল, মানুষটি থাকে তাকে জাগিয়ে রাখা, তাকে সতেজ করা। সাহিত্য তাই শ্রেণীবিরোধী এবং সে কারণে রাষ্ট্রবিরোধী।

প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে এন্টিগনির যে-গল্পটি আছে সেটি একটি বিদ্রোহের কাহিনী। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ। শাসনের বিরুদ্ধে বিবেকের অভ্যূত্থান। এন্টিগনি বলেছে, মৃত ভ্রাতাকে সে করব দেবে। দেবেই দেবে। কেননা, এটি তার দায়িত্বও কর্তব্য। রাষ্ট্র বলছে কবর দেওয়া যাবে না, কারণ লোকটি ছিল রাষ্ট্রদ্রোহী। এই বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মুখপাত্রটি অন্য কেউ নন, তিনি হচ্ছেন এন্টিগনিরই আপন মামা, ক্রিয়ন। কিন্তু এখানে আত্মীয়তা কাজে দেয় না। রাজা বন্দী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের শৃঙ্খলে। এন্টিগনি এগিয়ে গেল, ভাইকে কবর দিতে। রাজা ক্রিয়ন কী করলো? ভগ্নিকন্যা বিদ্রোহী এন্টিগনিকে আটক করে কবর দিয়ে দিলো,জ্যান্ত। ক্রিয়নের পুত্র এন্টিগনিকে ভালোবাসে; এনটিগনির কবরে গিয়ে সে মারা গেল, কাঁদতে কাঁদতে। কিন্তু ক্রিয়নের কিছু করার ছিল না। রাজা হয়ে তিনি বন্দী। ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় রাজা তখন রাষ্ট্রের পক্ষে এবং ব্যক্তির বিরুদ্ধে, অতি অবশ্যই; নইলে তিনি রাজা কেন?

এন্টিগনির মতো যারা বিবেকবান মানুষ, রাষ্ট্র তাদেরকে ভয় করে। আর সাহিত্যের কাজই তো হচ্ছে সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে মানুষকে বিবেকবানে পরিণত করা। সাহিত্য আনন্দ দেয় এ আমরা জানি; সাহিত্য শিক্ষা দেয় এ ও আমরা মানি; কিন্তু তবু সাহিত্য বিনোদনের বিচিত্রানুষ্ঠান নয়। যেমন নয় সে প-িতের পাঠশালা। সাহিত্যে ওই দুয়েরই ভূমিকা থাকে, বিনোদনের যেমন, তেমনি শিক্ষা। কেননা, এরা উভয়েই সাহিত্যের মূল কর্তব্যের অংশ, যেটি হলো মানুষের হৃদয়কে সংবেদনশীল করা। সাহিত্যের শিক্ষাটা কেবল মস্তিষ্কের নয়, হৃদয়েরও। হৃদয়ই হচ্ছে প্রবেশপথ; আর হৃদয়বান মানুষেরাই সহজে বিবেকবান, যেজন্য হৃদয়কে রাষ্ট্রের বড় ভয়।

রাজনৈতিকভাবে শেক্সপীয়র ছিলেন রক্ষণশীল। তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বড় শিল্পী ছিলেন বলেই শেক্সপীয়র বারবার তার নাটকে দেখিয়েছেন রাষ্ট্র কী করে ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করে। রাজপুত্র হ্যামলেট একা লড়ছেন রাজার বিরুদ্ধে। কিন্তু রাজা একা নয়, রাষ্ট্র আছে রাজার আজ্ঞাবহ রূপে দাঁড়ায়। হ্যামলেট দেখছে একই দুর্বৃত্ত যেহেতু বসে আছে সিংহাসনে, তাই সবকিছুই রওনা হয়েছে নষ্টের অভিমুখে। রাষ্ট্র বড়ই কঠিন প্রাণী।

চার

টলস্টয় (১৮২৯-১৯১০) শেক্সপীয়রকে পছন্দ করতেন না। মনে করতেন, শেক্সপীয়র রাজা বাদশাদেরই গ্রহণ করেছেন পাত্র পাত্রী হিসেবে; জনগণকে বিশেষ মর্যাদা দেন নি। তার ধারণা, শেক্সপীয়রের দেশপ্রেম ছিল সংকীর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন তো চরিত্রের অবস্থান কী তা নয়, প্রশ্ন হচ্ছে চরিত্রের মানবিক পরিচয় কী সেটা। পোশাক, কিংবা সামাজিক অথবা জাতীয় পরিচয় যাই হোক, শেক্সপীয়র দেখছেন অন্তর্গত মানুষটিকে। সেই মানুষটি রাজা নন, রাজপুত্র নন, শুধুই একজন মানুষ। ডেনমার্কের বিবেকবান রাজপুত্র হ্যামলেটের জন্য রাষ্ট্র মিত্র নয়, শক্র বটে। রাষ্ট্র তাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা কোনো অবধি রাখে না।

সাহিত্য দেশ মানে না। কাল মানেনা। রাষ্ট্র মানে না। শুধু মানেনা বললে যথেষ্ট বলা হবে না, সাহিত্য ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বটাকে তুলে ধরে। সাহিত্য স্থানবিরোধী ও কালবিরোধী যতটা নয়, রাষ্ট্রবিরোধী সে তুলনায় অনেক বেশি। কেননা, রাষ্ট্র স্থানে সত্য, কালেও সত্য।

টলস্টয়ের নিজের লেখাতেও রাষ্ট্রবিরোধিতা অত্যন্ত স্পষ্ট। স্বভাবতই। সেই অতিবৃহৎ উপন্যাস যুদ্ধ ও শান্তিতে টলস্টয় দেখাচ্ছেন, দুর্ভোগটা সাধারণ মানুষেরই। আর রাষ্ট্রনায়কেরাও সাধারণ মানুষই শেষ পর্যন্ত, যদিও তারা ভান করতে ভালোবাসে অসাধারণত্বের।

টলস্টয়ের আন্না কারেনিনার নায়ক নায়িকারা অধিকাংশই রাষ্ট্রের সেবক। আন্নার স্বামী মস্ত বড় আমলা, তার প্রেমিক সেনাবাহিনীর অফিসার। আন্নার ভাইও বড় এক সরকারি কর্মচারী। ওই সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ভেতরেই আন্নার চলাফেরা, ওঠাবসা ও জীবনযাপন। অনেক দিন দিয়েই অসাধারণ এই মেয়ে; সৌন্দর্যে ব্যক্তিত্বে, মেধায় ও আচরণে নিজের বৃত্তের সব মানুষকে ছাপিয়ে ওঠে, বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী হলো তার আন্তরিকতা। এই মানুষটিকে চরিতার্থতা দেওয়ার ক্ষমতা তার স্বামীর নেই, তার প্রেমিকেরও নেই। বেচারা আন্না বেশী বয়সী স্বামীকে ছেড়ে প্রায় সমবয়সী প্রেমিকার কাছে যায়, কিন্তু তাকে চরিতার্থ না দিলো তার আমলা স্বামী, না দিলো তার সৈনিক প্রেমিক। উভয়েই সামান্য তারা, রাষ্ট্রলালিত বুর্জোয়া স্বার্থপরতার বন্ধনে আবদ্ধ হবার কারণেই, বিশেষভবে। এ উপন্যাসে রাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক লোকেরাও রয়েছে, যদিও তারা ছায়াছায়া, খুব প্রত্যক্ষ নয়। তারা নতুন ব্যবস্থার কথা ভাবে, কমিউনিজমের কথাও তাদের চিন্তায় আসে। মোট বিষয়টা দাঁড়ায় এই যে, প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে গেছে, এটা ভেঙে পড়ছে। আন্নার মতো মানুষদের পক্ষে এখানে তাই আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকছে না। টলস্টয়ের এ উপন্যাসে আসন্ন বিপ্লবের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। রেলগাড়ির নীচে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া আন্নার সুশ্রী দেহটি যেন বলে দিচ্ছে, ওই রাষ্ট্র ও সমাজ মানুষের স্বপ্নগুলোকে ওইভাবেই কেটে টুকরো টুকরো করবে, যদি বিপরীত কিছু না ঘটে।

এক অর্থে টলস্টয় রক্ষণশীল। তিনি রক্তপাত পছন্দ করতেন না, রাষ্ট্রবিপ্লবও নয়; কিন্তু তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে রুশ বিপ্লবকে তিনি এগিয়ে আনছিলেন; বিদ্যমান রাষ্ট্রের অন্তঃসারশূন্যতা ও নিষ্ঠুরতাকে উন্মোচিত করে দিয়ে। তাঁর পক্ষে এটা করাই স্বাভাবিক ছিল; হৃদয় দিয়ে বুঝেছেন এবং অন্যের হৃদয়ে সেই বুঝটাকে সংক্রমিত করে দিয়েছেন।

আন্না কারেনিনার পরের উপন্যাস পুনরুজ্জীবন। এতে রাষ্ট্রের মুখচ্ছবি আরো প্রত্যক্ষ। কাটিউসা মাসলোভা একজন নিরপরাধ গরীব কিশোরী। সামন্ত পরিবারের যুবক নেখলিউদভ তাকে নষ্ট করলো। মাসলোভার সন্তান হবে, কিন্তু সন্তানের পিতা নেখলিউদভ তখন অনেক দূরে। সে তখন সেনাবাহিনীর নবীন অফিসার। জীবিকার জন্য মাসলোভা কাজ করে, দেহ বিক্রয় করে, জেলও খাটে। সবই ঘটে বাঁচার চেষ্টায়। আসামী হিসেবে আদালতে এসেছে মাসলোভা। অদৃষ্টের কী কৌতুকবোধ, তার বিচারে জুরিদের একজন হয়ে বসে আছে নেখলিউদভ স্বয়ং। নেখলিউদভ চিনেছে ওই মেয়েকে। তার ভেতরে পাপের বোধ জেগেছে। সে চাইলো মাসলোভাবে রক্ষা করবে; কিন্তু পারলো না। বিচারে জেল এবং নির্বাসন হয়েছিল মাসলোভার। জেলটা মওকুফ করালো নেখলিউদভ, আমলাদের কছে দেনদরবর করে; কিন্তু নির্বাসন বলবৎ রইলো।

মাসলোভা চলেছে সাইরেরিয়ায়। নেখলিউদভ চলেছে পিছু পিছু। তার পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। সে প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। সে মাফ চাইবে। মাসলোভা যদি রাজি হয় তাহলে তাকে বিয়ে করবে। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটা নেখলিউদভ করতে পারলো মাসলোভার কাছে, সাইবেরিয়ায় গিয়ে। আশা করেছিল মাসলোভা কালবিলম্ব করবে না, সম্মত হতে। কিন্তু মাসলোভা ওই প্রস্তাবে সম্মত নয়। তার প্রত্যাখানটা খুবই দৃঢ়। সে বললো, বুঝেছি সেবার আমার দেহটা ব্যবহার করেছো, এবার ব্যবহার করতে চাইছো আমার আত্মটাকে। না, তা হবে না।

আসলে মাসলোভারও পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। সেও আর আগে সেই পথহারা মেয়েটি নেই। পথের সন্ধান পেয়ে গেছে সে। সাইবেরিয়ায় তার সহবন্দীদের মধ্যে কয়েকজন ছিল রাজবন্দী। ওরা অন্য ধরনের মানুষ। এরা সংযমী, মেধাবী, এরা বই পড়ে। একজনের থলের ভেতর দেখা যায় মার্কসের পুঁজি বইটি উকি দিচ্ছে। এদেরই একজন হচ্ছে সাইমনসন। তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মাসলোভার। তারা ভালোবেসে ফেলেছে পরস্পরকে। তাদের বিয়ে হবে।

নেখলিউদভরা যতই যা করুক, তারা বন্দী বটে, রাষ্ট্রের বৃত্তের ভেতর তারা আবদ্ধ। ওই বৃত্তে কারোরই মুক্তি নেই, না নেখলিউদভের, না মাসলোভার, না সাইমনসনের। বিশেষভাবে পীড়িত হবে মাসলোভারা; একে তো নারী, তদুপরি দরিদ্র। নেখলিউদভ তাদেরকে ব্যবহার করবে নিজেদের বিশেষ প্রয়োজনে। মানুষের মুক্তির জন্য নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। যে ব্যবস্থার পক্ষে সাইমনসনেরা লড়ছে। বলা বাহুল্য, ওদের মধ্যেই লেনিন ছিলেন লুকিয়ে, যার সন্ধান টলস্টয় তখনো পান নি; পুনরুজ্জীবন উপন্যাসটি যখন তিনি লিখে শেষ করেন, ১৮৯৯ তে।

লেখক যদি রক্ষণশীলও হন তবু এটা নিশ্চয় করে বলে যাবে না যে, তাঁর লেখা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার পক্ষে যাবে। এক্ষেত্রে ব্যালজাকের (১৭৯৯-১৮৫০) কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে। ব্যলজাক রক্ষণশীল ছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতারা যথার্থই মনে করেন যে তাঁর লেখা সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী ধারাকে সাহায্য করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এমিল জোলা (১৮৪০-১৯১২) ব্যালজাকের তুলনায় অনেক বেশি প্রগতিশীল, কিন্তু এঙ্গেলস মন্তব্য করেছেন যে, একজন ব্যালজাকের যা মূল্য তা একশ’জন জোলা পরিশোধ করতে পারবে না। কেননা, ব্যালজাকের নিজের রাজনৈতিক মতবাদ যাই হোক না কেন তার সাহিত্যর বাস্তববাদিতা সামজের নিষ্ঠুরতা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে ভীষণভাবে উন্মোচিত করে দিয়েছিল।

পাঁচ

সাহিত্য ছাড়া দর্শন তাও চলতে পারে, কিন্তু দর্শন না থাকলে সাহিত্য একেবারেই অচল। সাহিত্যের লক্ষ্য থাকে কালজয়ী হওয়া, এবং কালজয়ী হতে হলে তার দরকার দার্শনিক গভীরতা। নইলে সে হালকা হয়ে ভাসবে হয়তো, তবে ভেলার মতো নয়, শুকনো পাতার মতো; এবং ডুবে যাবে অল্পকাল পরে। দর্শনে কল্পনা থাকে, থাকে দার্শনিকের অনুভূতি; কিন্তু অতিরিক্ত যা থাকে সেটাই প্রধান, তা হলো জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা আসে চিন্তার সঙ্গে কল্পনা ও অনুভূতির একত্রযাত্রায়।

একালে আমরা অনেক রকমের রচনা পাচ্ছি। কিন্তু অত্যন্ত উন্নত সাহিত্য পাওয়া যাচ্ছে না। তার বড় কারণ দর্শনে অনাগ্রহ। ঘটনাটা বিশ্বব্যাপী সত্য; বিশেষভাবে সত্য আমাদের দেশে। এমনিতেই আমাদের জ্ঞানের চর্চা সীমিত। ঠেলায় ধাক্কায় চলছে; তবে যা বিপজ্জনক তা হলো, দর্শনের বিষয়ে উৎসাহটা হ্রাস পাচ্ছে।

একটি অভিজ্ঞতার কথা দিয়ে শেষ করি। সম্প্রতি আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছি, নাম ‘দর্শনের সুখানুসন্ধান’। অন্তত দুজন বিজ্ঞ ব্যক্তি প্রবন্ধটির শিরোনামটি তাঁদের আকর্ষণ করে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু শিরোনামটি তাঁরা উভয়েই পড়েছেন অন্যভাবে; দর্শনের ‘সুখানুসন্ধান’ হিসেবে নয়, দর্শনের ‘সুখানুভূতি’ হিসেবে। সুখের সন্ধানকে সুখের অনুভূতি মনে করবার এই ব্যাপারটাকে আমার কাছে মোটেই বিস্ময়কর ঠেকে নি। ঝোঁকটা এখন অনুভূতির দিকেই, সন্ধানের দিকে নয়। জীবিকার, অর্থের, ক্ষমতার সন্ধান সবেগে চলছে; কিন্তু দার্শনিক অনুসন্ধান অপ্রচুর। বিপরীতে অনুভূতির জগৎটা বড় হচ্ছে, স্ফীত হচ্ছে। এই স্ফীতি সাহিত্যের জন্য মঙ্গলজনক নয়, সমাজের জন্যও মঙ্গলজনক নয়। আমরা কী করে এগুবো সাহিত্য ছাড়া, এবং সাহিত্য কী করে এগুবে দর্শনবিমুখ হলে?

আমরা সাহিত্য চাই; এবং সাহিত্য চায় দর্শন। সাহিত্য ছাড়া চলবে না, যেমন, সাহিত্যের পক্ষে চলা সম্ভব নয় দর্শনকে বাদ দিয়ে।

[উৎস : ‘সাহিত্যের চাহিদা’ শিরোনামে ঢাকা’র কালি ও কলম, ফাল্গুন ১৪২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত]

******************************************************

ইমানুল হক
সাহিত্যের দর্শন দর্শনের সাহিত্য
‘দর্শন’ শব্দের ১৮ টি অর্থ করেছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় : বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে : ১. দ্রষ্টা, ২. দর্শয়িতা, প্রদর্শক, বোধক ৩. অবলোকন ৪. উপলব্ধি, বোধ, জ্ঞান ৫. বুদ্ধি ৬. সাক্ষাৎকার শক্তি ৭. সাক্ষাৎকার ৮. জ্ঞানমাত্র, দর্শনোপলব্ধি ৯. স্বপ্ন ১০. প্রকাশন ১১. সমীপে আনয়ন, হাজির করা ১২. অধ্যাত্মজ্ঞান সাধন শাস্ত্র ১৩. দৃষ্টিসাধন, নেত্র ১৪. শাস্ত্র ১৫. ধর্ম ১৬. যজ্ঞ ১৭. দর্পণ ১৮. রূপ (বঙ্গীয় শব্দকোষ, পৃ. ১০৮৮) এগুলি ছাড়াও সংসদ বাঙ্গালা অভিধান জানাচ্ছে : তত্ত্বজ্ঞান, যুক্তি ও প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্র বা তত্ত্ব। আসলে দর্শন মানে শুধু দেখা নয়, ভবিষ্যৎকে দেখা। যুক্তি, তত্ত্ব, সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ, রাজনীতি, নি¤œবর্ণ, ধর্মশ্রেণি—সবকিছুকে মাথায় রেখে দেখা। তিনিই তো দার্শনিক যিনি ভবিষ্যৎকে দেখতে পান। আর সাহিত্য মানে যা সবার হিত সাধন করে। কিন্তুু সব সাহিত্য কি সবার হিতসাধন করে? না হিতসাধন লক্ষ্য? এই হিতসাধনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে—রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, ভূগোল, ধর্ম, পরিবেশ, যুক্তি, তর্ক ও জ্ঞান। কি লিখছি গুরুত্বপূর্ণ? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কেন লিখছি? সেই আদ্যিকালের প্রশ্ন : শিল্পের জন্য শিল্প, না জীবনের জন্য শিল্প? এইবার প্রশ্ন উঠবে কোন জীবন? কোন বাস্তবতা? যৌনতা কি বাস্তব নয়? পেট না তলপেট কোনটা মুখ্য হবে? ব্যক্তি না সমাজ? ব্যক্তি না সমষ্টি? সমষ্টি আবার কোন সমষ্টি? ১% ধনী ৩০% মধ্যবিত্ত, নাকি ৬৯% সুবিধাবঞ্চিত মানুষ? সাহিত্য কার জন্য লিখবেন? কিভাবে লিখবেন? সহানুভূতির জারক রসে ভোবানো তাঁর কলম! এখন কার প্রতি সহানুভুতি? তিনি শুধু মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস লিখবেন? টিন এজ মার্কা সুড়সুড়ি দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করবেন? বইমেলায় তাঁর নামে ভিড় জমে যাবে? বেস্টসেলার হবে? নাকি সময়, সমাজ, সমস্যা, সমাধান মূর্ত হবে তাঁর কলমে?

বিশশতকের শুরুতে তিনটি উপন্যাস দুনিয়াকে খুব প্রভাবিত করেছিল। এক. ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার বা মা। দুই. জেমস জয়েসের ইউলিসিস। তিন. ন্যুট হ্যামসুনের হাঙ্গার। তিনজন লেখক, তিনভাবে দেখেছেন জীবনকে। তিনটেতেই সমস্যা আছে। কে কিভাবে সমস্যাটাকে দেখেছেন, তা নির্ভর করছে লেখকের জীবনদর্শনের ওপর। ব্যক্তিপ্রেম নয়, শ্রেণিপ্রেমে উদ্বুদ্ধ গোর্কি। তাই মার পাভেল এবং তার মা পেলাগেয়া নিলোভনা সমাজ বদলের, বিপ্লবের স্বপ্নে-সংগ্রামে নিজেদের বিসর্জন দেন। ইউলিসিসর মানুষটি খোঁজে তার হারানো সত্তা, হারানো প্রেম। হাঙ্গার-র নায়ক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সাথে লড়ে। কিন্তু সে লড়াই একক। শ্রেণি-বিপ্লব, সংগ্রাম সেখানে নেই। ব্যক্তির সমস্যা, ব্যক্তির প্রেম, ব্যক্তির কাম—তাঁর উপজীব্য।

আবার বালজাক রাজতন্ত্রী লেখক। কিন্তু তাঁর লেখায় রাজতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতা। তলস্তয় ঈশ্বরবিশ্বাসী। কিন্তু তাঁর উপন্যাস সমাজ বাস্তবতায় ভরপুর। শুধু ঈশ্বর দিয়ে পরিবর্তন হবে না, বুঝতে পারেন পাঠক। এমিল জোলার রচনায় বাস্তবতা আমাদের শিকড়ের দিকে ফেরায়। বিশেষ করে জামিন্যাল। কিন্তু, তার সঙ্গে সলোকভের অ্যান্ড কোয়ায়েট ক্লোজ দ্যা ডনকে মেলানোর চেষ্টা ঠিক নয়। রাশিয়ার সোভিয়েত বিপ্লব, সেই বিপ্লবকে ঘিরে কয়েক সম্প্রদায়ে প্রতিক্রিয়া। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া, সংগ্রাম অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে এই মহাকাব্যিক উপন্যাসে। আবার, মায়াকোভেস্কিও কবিতাও সোভিয়েত, সোভিয়েত বিপ্লব ও তার পরিপার্শ্ব নিয়ে। একদল মায়াভোস্কির দেখায় ভুল খোঁজেন। কিন্তু স্তালিন তাঁর পক্ষে দাঁড়ান। তবু আত্মহত্যা করেন মায়াকোভস্কি। মায়াকোভস্কি মার্কসবাদী। তাঁর সমালোচকদের দাবী তারাও মার্কসবাদী। তবু তীব্র সমালোচনা, ঈর্ষা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে গেল। শ্রেণি রাজনীতির ভবিষ্যৎবাদী দার্শনিক বিশ্ববিখ্যাত জার্মান নাট্যকার ব্রেখট্ লিখেছিলেন, সাহিত্যের প্রতিরূপ নির্মাণেই যথেষ্ট নয়, নাট্যকারের কাজ অন্তর্গত সত্যকে ফুটিয়ে তোলা। রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন—‘সাহিত্য শুধু লেখকের নহে যাহাদের জন্য রচিত তাহাদের পরিচয়ও বহন করে।’

এখন অনেকের ঝোঁক বস্তুর প্রতিরূপ নির্মাণে। অন্তর্গত সত্যে সত্য চলে যায়  আড়ালে। কিন্তু চাইলেই কি অন্তর্গত সত্যকে লেখক আড়াল করতে পারেন? বা পারবেন? গিরিশচন্দ্র ঘোষ যখন প্রফুল্ল লিখেছেন উঠে  আসছে আধাসামন্ততান্ত্রিক, আধাপুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পণ্যায়নের রূপ। ভাই ভাইকে ঠকাচ্ছে। ব্যক্তিগত আখের গোছাতে। বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে তীব্র সওয়াল আছে গিরিশ ঘোষের নাটকে। বেসরকারি ব্যাঙ্ক ফেল করে যাচ্ছে। যোগেশের ‘সাজানো বাগান শুকিয়ে যাচ্ছে’। চরম আর্থিক সংকটে পড়ে মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়ছেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী যোগেশ। বলিদানে উঠে আসছে কন্যাপণ এর সমস্যা। বেসরকারী বিদ্যালয়গুলির অর্থগৃধœুতা, লোভ। কিন্তু, বর্তমানকালের নাটকে দুই বাংলাতেই কি এর বিরুদ্ধে স্বর আছে? বেসরকারীকরণ, কন্যাপণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবসা, সা¤্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পনের বিরুদ্ধে লড়াই ততোখানি প্রতিভাত যতখানি দাবি করছে সময়। কর্পোরেট আনুকূল্য, বিজ্ঞাপন গিলে খাচ্ছে বাংলা নাটকের শরীর। ব্যতিক্রম নেই তা নয়। কিন্তু, সত্যি কি সা¤্রাজ্যবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যতখানি সফলতা দাবি করছে সময় ও সমাজ—বাংলা সাহিত্য কি তার ধারে কাছে ঘেঁষছে? নাকি নিজেরাই আরেকটা প্রতিষ্ঠান হয়ে আরো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের তাঁবেদারীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

চলচ্চিত্র সবচেয়ে আধুনিকতম শিল্প। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে দায়বদ্ধতা শব্দটি ইদানিং অনুপস্থিত বললে কম বলা হয়। সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এবং গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তীরা যে সাহস, শক্তি ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁদের সামাজিক জীবনদর্শন থেকে তার কি দেখা মিলেছে? বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা ও জীবনকে ঘিরে তবু কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে—পশ্চিমবঙ্গে ইচ্ছা, মুক্তধারার দু-একটি ছবি বাদ দিয়ে দায়বদ্ধতার দর্শন অনুপস্থিত। সেখানে আছে প্রবলভাবে ভোগ এবং ভোগবাদ। কমিনিউজমকে প্রতিস্থাপিত করছে কনজিউমারিজম ও কমিউন্যালিজম। বিদ্বেষ এখন হাতিয়ার। তার বিরুদ্ধে দর্শনগত চিন্তাগত লড়াই কোথায়?

কর্পোরেট পুঁজির সামনে শিল্পসাহিত্য নতি স্বীকার করছে। নারী শরীর মর্দন, ¯ু’’ল দুটি বর্তুলাকার মাংসপি-, ব্যক্তিগত ঈর্ষা অসূয়া, দ্বেষ রিরংসা—সাহিত্যের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গণমানুষ সাহিত্যের কেন্দ্রে থাকছে না। মার্কেজকে নিয়ে প্রবন্ধে আদিখ্যেতা করছি, সেমিনারে লাফাচ্ছি বব ডলান নিয়ে—লেখার সময় মার্কেট নিয়ে চিন্তা। লোকে খাবে তো? বাজার—আবার কোন বাজারটা বড়? বাংলাদেশ না ভারত? ভারত না আমেরিকা? এইসব ভাবনাও চলে আসছে লেখকের প্রকৃত দর্শন চিন্তার অভাবে। ফলে মানুষের সাহিত্য খুবই কম রচিত হচ্ছে। ব্যক্তি, নায়ক বা নায়িকার বাইরে বের হতে পারছি কই?

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সাহিত্য চিন্তা আজো কুড়েকুড়ে খাচ্ছে। ত্রিকোণ বা চতুষ্কোণ শরীর, যৌনতা, রিরংসা, চাপা-ঈর্ষা, অসূয়াই হয়ে উঠছে সাহিত্যের বিষয়। এগুলো ঘটছে দর্শনের অভাবে। প্রচুর সংবাদপত্র, ফোনবুক, হোয়াটসঅ্যাপেও আজকাল সাহিত্যিকীয় ছড়াছড়ি। কিন্তু, কালজয়ী রচনা প্রায় নেই। যদিও লাইক আছে, কমেন্ট আছে, পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানি আছে, নিন্দা-মন্দও কম নেই—কিন্তু গণমানুষের, গণজীবনের, গণসংগ্রামের সাহিত্য কই? গণসংগ্রাম নেই, কিন্তু গণবিনোদন আছে। খেটে খাওয়া মানুষের দুর্দশা বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে জীবন হাঁসফাঁস। চাকরি নেই, বেকারত্ব তীব্র, আর্থিক মন্দা, ছাঁটাই, লে-অফ, লক-আউট—লেগেই আছে। ভারতে কৃষক আত্মহত্যা বাড়ছে, বাড়ছে সাম্প্রদায়িক হিংসা—নন-ইস্যু নিয়ে রাজনীতি। আসল ইস্যু এই উপমহাদেশে হারিয়ে যাচ্ছে। সংঘ, জামায়াত তালিবানরাই যেন নির্দেশ করছে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা। সাহিত্যে কিন্তু তার প্রতিফল দেখি না।

শঙ্খ ঘোষ একবার বলেছিলেন, এখনও যিনি সবচেয়ে ভাল লিখছেন তাঁর নাম জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের অপ্রকাশিত কবিতা প্রকাশ সম্পর্কে তাঁর এই মন্তব্য। আবার মোদ্দা কথা, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলা কবিতা গাড্ডায় পড়েছে। হাজার হাজার কবিতা ছাপা হচ্ছে—কিন্তু তাতে কোনও দিকনির্দেশ নেই। নানাবিধ হল্লা আছে, প্রকরণিক দক্ষতা ও নির্মাণ কৌশলের দেখানদারি আছে, কিন্তু দর্শন নেই। দর্শনহীন সাহিত্য সমাজকে অন্তঃসারশূন্য ভোগবাদী হতে আরো সাহায্য করছে।

বুর্জোয়া দর্শনে সৌন্দর্যচিন্তা খুব বড় করে দেখা হয়। ক্রিস্টোফার কডওয়েল ফার্দার স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার গ্রন্থে লিখেছেন—‘সৌন্দর্য হল বুর্জোয়ার একটা অবস্থা।’ হেগেলের পরে বুর্জোয়া দর্শনের যে অবক্ষয় দেখা যায়, প্রত্যক্ষবাদের (পজিটিভিজম) উত্থানের মধ্যেই তার প্রমাণ। বুর্জোয়ার কাছে সত্য হল প্রতিভাস (ফেনমেনন, বর্ণনার সুমিত পদ্ধতি, ইকনিমিক্যাল মেথড)। কার্যকারণতা হয়ে ওঠে প্রতিভাস সমন্ধে  চিন্তা করার জন্য বুর্জোয়ার কাছে একটা উপযোগী পন্থা। সৌন্দর্য বর্ণনার দিকে বুর্জোয়া সাহিত্যিকদের একটা প্রবল ঝোঁক আছে। আছে তীব্র রূপতৃষ্ণা। আমাদের দেশে বঙ্কিমের সাহিত্যে এই সৌন্দর্য বর্ণনা বা রূপতৃষ্ণা প্রবল।

সৌন্দর্য তৃষ্ণার হাত ধরে আসে আদিম প্রবৃত্তিকে উসকে দেওয়ার এক অবক্ষয়ী দর্শন। যাকে বুর্জোয়া, পাতি-বুর্জোয়া চিন্তক ও ধারক বাহকরা ‘সাহস’ বলে চিহ্নিত করতে চায়। যৌনতা, চুম্বন, সঙ্গম—এগুলি স¦াভাবিক জৈবিক প্রবণতা। কিন্তু, তা প্রকাশ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রকাশ্যে এসব করা যদি ভাল কাজ করা হত তাহলে কুকুর হতো শ্রেষ্ঠ সাহসী জীব। কুকুর বা সারমেয়বৃত্তিকে সাহসী হিসেবে চিহ্নিত করার এক সাহিত্যিক অবক্ষয়ী ভাবনা বা দর্শন এপার-ওপার দুপারেই প্রবল। বীনা দাস, মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, জাহানারা ইমাম, ইলা মিত্ররা এদের চোখে ‘সাহসী’ নন। এরা নন ‘মডেল’। ‘সাহসী’ বা ‘মডেল’ তারাই যারা আদিম রিপুকে উত্তেজিত করবে, এমন পোশাকে যৌনাঙ্গ, ক্লিভেজ অথবা ইত্যাদি সম্পর্কিত অঙ্গগুলিকে আভাসিত, উদ্ভাসিত অথবা প্রদর্শন করেন। এবং সেইসব ঘটনার বর্ণনা চিত্রায়িত করেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। এতো ভয়ংকর ব্যাপার। আদিমতাকে আধুনিকতা বলে চালানোর অবক্ষয়ী চেষ্টা। পোশাকের মুক্তি নয়—চিন্তার মুক্তি; আধুনিক  মানুষ পোশাক পরে সভ্য হয়েছিল। পোশাকহীনতা বা স্বল্পতা মানসিক দারিদ্র্যের লক্ষণ। আধুনিকতা তো বাইরের বিষয় নয়, মন-মনন চিন্তন-ভাবন প্রক্রিয়ার অঙ্গ।

ধর্ম একটি দর্শন হিসেবে ৫০০০ বছর উপস্থিত। সাহিত্যের একটি বড় অংশ ধর্মীয় নৈতিকতার দর্শন দ্বারা সমাচ্ছন্ন। ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র হিসেবে ধর্ম অজ্ঞাতে কাজ করে। সতীত্ব ইত্যাদির প্রশংসা তার প্রকাশক। ধর্ম কী? শুধুই আফিম? ধর্ম কি বেহেস্ত বা স্বর্গের সরণি? মার্ক্স ধর্ম প্রসঙ্গে গ্রন্থে লিখেছিলেন—‘(ধর্ম হল) একই সঙ্গে বাস্তব দুঃখকষ্টের একটা প্রকাশ এবং সেই বাস্তব দুঃখকষ্টের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ।’ মার্ক্সের একই সঙ্গে সংযোজনা : ‘ধর্ম জনগণের জন্য আফিম।’ লক্ষ্যণীয় জনগণের জন্য শব্দবন্ধটি। বিপন্ন নিরন্ন ক্ষুধার্ত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ধর্মকে আঁকড়ে ধরে সান্ত¡না খোঁজে, তার দুঃখলাঘবের চেষ্টা করে। কিন্তু তা তো সবসময় সফল হয় না। খুব সৎ লোকের সঙ্গে দেখা তার হয় না। শিকার হয় ভ-, ভেকধারী প্রতারকের। কিন্তু ধর্মীয় নৈতিকতা সাহিত্যে প্রবলভাবে জড়িয়ে থাকে। পুরুষের আর্থিক সততা আর নারীর সতীত্বে সে কারণে জোর আরোপ। চামড়ার ঘর্ষণে যে চরিত্র নির্ভর করে না—তাই চরিত্রের প্রমাণ নয়—তাকে বোঝাবে? চরিত্র মানে বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী মানুষ। চরিত্রবান সেই যে চরম বিরুদ্ধতার মুখে দাঁড়িয়েও আপন বিবেক ও নীতিবোধে অচল অটল থাকতে পারে। আহার, যৌনতৃপ্তি, গর্ভধারণ—সেই সঙ্গে জৈবিক অন্য আবেগের মতোই ধর্মকেও একটা আবেগ হিসেবে কি চিহ্নিত করা যায়? এর পক্ষে বিপক্ষে দুটো মতই প্রবল।

তবে, ধর্মীয় নৈতিকতার দর্শন সাহিত্যকে যদি প্রভাবিত করে ফেলে তা বিপজ্জনক। একধরনের সাদা পোশাক শোকের প্রতীক, অন্যের কাছে বিবাহের চিহ্ন। কারো কাছে কালো অশুভ, কারো শুভ। তবে সব ধর্মেই নারীর শারীরিক সতীত্বে ঘোর জোর। কৌমার্যে প্রবল আসক্তি। ফলে আমাদের মহাদেশীয় সাহিত্যেও খুব ঢক্কানিনাদ।

বিজ্ঞানী এবং শিল্পীর দর্শন কি এক? বিজ্ঞানী এবং শিল্পী দুজনেই আবিষ্কারক। একজন খোঁজেন বস্তুকে আর একজন বস্তুর অন্তর্গত সত্যকে। মানুষের মন-মননকে; রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, ধমর্, পরিবেশের প্রেক্ষাপটে। ১৯১০ এর ফার্মির অনু সম্পর্কিত আবিষ্কার শুধু বিজ্ঞানের জগৎটাকেই পাল্টায়নি—পাল্টে দেয় সাহিত্যের আভ্যন্তরীণ চিন্তন প্রকরণকেও। জন্ম হয় চেতনা-প্রবাহরীতি বা স্ট্রিম অব কনসাসনেস এর সাহিত্যরীতিতত্ত্ব। জেমস জয়েস কেবল নন, বাংলার অন্যতম বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লেখেন চেতনা-প্রবাহরীতিতে। অন্তঃশীলা। আসলে মন-মানসিকতা, তার জটিলতা অন্বেষণে মানব সমাজ খুবই আগ্রহী। এর সঙ্গে থাকে অবদমিত যৌনচেতনা। সামাজিক পরিবর্তন, সমাজ কাঠামো বদলের সংগ্রামে যদি মানুষ নিয়োজিত না থাকে, যদি জনকল্যাণ, জনসেবা, সমাজহিতৈষণা প্রধান না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, আত্মপরায়ণতা প্রধান হয়ে দেখা দেয়, তবে মনের জটিল গূঢ়ৈষা—আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।  সুখ-সন্ধানী মধ্যবিত্ত মানসে তাই চাপা যৌনতাকেন্দ্রিক রচনার প্রবল ও আত্যন্তিক আগ্রহ। জগদীশ গুপ্তের গল্পে তাই পাঠক মন আঁকুপাঁকু খায়। রন্্্্্জন রচনায় রবীন্দ্রজীবনের যৌনবিদূষণ খুঁজে বেড়ায় বুভুক্ষু মন নিয়ে। শরীর দেখানো, শরীর বর্ণনা ‘সাহসী’ বলে চিহ্নিত হয় । বেলেল্লাপনা, নির্লজ্জতাকে মনে হয় দারুণ কাজ। আসলে এটা দর্শনগত সমস্যা।

কেন বাঁচি, কার জন্য বাঁচি—কেন লিখি, কার জন্য, কাদের স্বার্থে লিখি? Ñএই উন্নতবোধ নেই অধিকাংশ লেখক-কবি-প্রাবন্ধিকের। বঙ্কিম সতর্ক করেছিলেন—‘কদাচ যশের জন্য লিখিবেন না’। আজকাল অধিকাংশ লেখা, পত্রিকা, সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যমের বিষয় তো আত্মপ্রচার, আত্মযশ এবং অপরের মুখ ম্লান করে দিয়ে তীব্র গোপন হিং¯্র উল্লাস উদ্যাপন।

কডওয়েল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, ইলিউশন এন্ড রিয়ালিটিতে লিখেছেন :

যে কোন বুর্জোয়া শিল্পী, যিনিই কালের প্রথাগুলিতে এক পুরুষব্যাপী সময়ের জন্যও আবদ্ধ থাকেন তিনিই হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানধর্মী (অ্যাকাডেমিক) এবং তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে নিষ্প্রাণ।

ইংরেজি কাব্যেও একই প্রবণতা বলে কডওয়েলের কঠোর মন্তব্য। বাংলা সাহিত্যেও প-িতি দেখানোর আড়ালে তাই ঘটছে। এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের নামে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও তার অন্তঃসারশূন্য স্বাধীনতার বাহ্যস্ফুরণ। ‘সামাজিক সম্পর্কহীন স্বাধীনতা যে আদৌ কোনও  স্বাধীনতাই নয়’ (কডওয়েল), এটা খেয়াল থাকে না বহু লেখক-সাংবাদিক শিল্পী ও অক্ষরকর্মীর। আত্মশ্লাঘা আছে, আত্মঅভিমান আছে, আত্মমর্যাদাবোধ নেই। তাই অনেকে মুখে বলেছেন বাংলাভাষা, বাংলাদেশ, ভাষা-জননীর কথা কিন্তু নিজের সন্তান সন্ততিকে তৈরি করছেন বিদেশে চাকরির দিকে তাকিয়ে।

বুর্জোয়া লেখকের স্বপ্ন—‘একজন মানুষ একাই জগতের সমস্ত প্রক্রিয়া সৃষ্টি করছে’ এই স্বপ্ন। সে ফাউস্ট, হ্যামলেট, রবিনসন ক্রুসো, স্যাটনন এবং প্রুফক; একাই সবকিছু (কডওয়েল)। বাজারের মাধ্যমে বৃহৎ পুঁজিপতি তার সঙ্গী পুঁজিপতিদের অবিরাম মজুরে পরিণত করে এবং আস্তে আস্তে তাকে বেতনভুক্ত কর্মচারীতে রূপান্তরিত করে। পুঁজিবাদের সেবা দাস বৃহৎ প্রতিষ্ঠানও এইভাবে লেখককে কিনে ফেলে, গিলে ফেলে, গ্রাস করে; লেখক তখন যশ, কীর্তি অর্থ ছাড়াও আপন প্রতিপত্তি বা প্রতিষ্ঠার জন্য লেখেন—বাজার কি খাবে ভেবে। তিনি ভাবেন, তিনিই এর ¯্রষ্টা। আসলে আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থাই তাঁর লেখার নিয়ামক।

কাব্যের জন্ম একসময় হয়েছিল যৌথ আবেগ এবং গোষ্ঠী উৎসবে। কডওয়েল জানাচ্ছেন—রিয়ালিটি এন্ড ইলিউশন এ এই আবেগের জন্মের আসল কারণ: ‘শত্রুকে দেখে মৃগযূথের মধ্যে ভীতি জাগার মত একটা অনপেক্ষ (আনকন্ডিশনাল)  সহজপ্রবৃত্তিগত ধরণের যৌথ আবেগ নয়, এ হল অর্থনৈতিক সংঘবদ্ধতার প্রয়োজনের দ্বারা সাপেক্ষীকৃত কোন উদ্দীপকের যৌথ আবেগ।’

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী বুর্জোয়া কবির মধ্যে একটা স্ববিরোধীতাও থাকে। একদিকে তিনি নিজেকে ভাবতে থাকেন নিঃসঙ্গ ও একাকী, অন্যদিকে বিশাল শক্তিশালী। অপর কারও কারও মধ্যে কাজ করে একটা সামাজিক বোধও। যাঁদের মধ্যে এই সামাজিক বোধ বেশি, তাঁরা চলে যান সর্বহারা শ্রেণির পক্ষে। কমিউনিস্ট ইস্তেহার এ চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিষয়টির।

সুতরাং পূর্ববর্তী যুগে যেমন অভিজাতদের একটি অংশ বুর্জোয়া শ্রেণির দিকে চলে গিয়েছিল, ঠিক তেমনই বুর্জোয়াদের একটি অংশ বিশেষত; বুর্জোয়া মতাদর্শীদের একটি অংশ এই ঐতিহাসিক গতিকে সামগ্রিক ও তত্ত্বগতভাবে  উপলব্ধি করার স্তরে নিজেদের যারা উন্নীত করেছে, তারা এখন যোগ দেয় শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে…। এইভাবে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিটাকে পরিত্যাগ করে সর্বহারা শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি তারা  গ্রহণ করে। যার মধ্যে গ্রহণ বর্জনের পালা সদা জাগ্রত থাকে তিনি কালজয়ী হন। সমাজের ৭০%এর দায় নেন। গরিব খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ তাঁর কাছে নিছক মধ্যবিত্ত ভাববিলাসের বস্তু নয়—সংগ্রামী নায়ক। কিন্তু লেখককেও তো পাতি বুর্জোয়া সমাজে বাঁচতে হয়। জীবিকা, জীবন, সম্মান, পরিতোষিক ও সাম্মানিক নিয়ে। তাই হাড্ডি খিজিররা সংখ্যায় তেমন বাড়ে না—তমিজের খোয়াব বদলে যায়। জমিলাকে সে মা ভাবে না—রমনযোগ্য নারীর মতো মনে হয় তাঁর—কারণ, লেখকের মধ্যবিত্ত মন। কৃষককে কৃষক হিসেবে বাঁচতে দিতে পারে না—চায় না। তার শুধু মধ্যবিত্তে উত্তরণ ঘটাতে চায়।

সিন্ডারেলা গল্পটির কথাই ধরা যাক। কীভাবে বদলে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের একটি কাহিনী। যার তৈরি জুতো  গিয়ে পড়ে এক মিশর রাজের কোলে। চামড়ার জুতোর অনুপম কাজে মুগ্ধ রাজা চান তার ¯্রষ্টাকে বিয়ে করতে। এই গল্পই চীনে একরকম। ইন্দোনেশিয়ায় আরেকরকম। ইংল্যান্ডের রূপ সামান্য হলেও ভিন্ন। এই গল্পটাই ফিরে আসে শেক্সপীয়রের নাটকে, কিং লিয়ারে; ট্রাজেডি হিসেবে। ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ডও যেন আরেক সিন্ডারেলার গল্প। গরিবের দুঃখের অবসানের একটা নৈতিক আগ্রহ আছে প্রায় সব গল্পেই।

সামন্ত সমাজে পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়া শ্রেণির স্বাধীনতা মানে সামন্ত শাসনের অবসান। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকরা এভাবেই ভেবেছেন। কিন্তু ভারত উপমহাদেশের সমস্যা এই, এখনও সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদ হাত ধরাধরি করে চলছে। স্বার্থগত, শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব নেই, তা নয়—কিন্তু সংস্কৃতির যে বিকশিত রূপ আমরা দেখছি—তা সামন্ত ও বুর্জোয়া  সংস্কৃতির সম্মিলিত, বিভ্রমময় রূপ। যে কোন যুগের জনগণের সংস্কৃতি আসলে শাসকের সংস্কৃতি। যদিও জনগণভাবে এটা আমাদের নিজস্ব। এই যে মায়া, এই যে বিভ্রম—এর ফলে  শিল্পী নিজেকে স্বাধীন ভাবেন। কিন্তু তিনি তো স্বাধীন নন—তার মাথায় অদৃশ্য শিকল। রাষ্ট্র, সমাজ, দল, ধর্ম, পরিবার, চাকরিদাতা, প্রশাসক, বিপণক—বাঁধা সবার কাছে কম কিংবা বেশি। এই শৃঙ্খল থেকে বের হওয়ার জন্য তীব্র আকুতিই শিল্পী ও ¯্রষ্টাকে জাগরুক রাখে। কখনও কখনও কোন নেশা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। নেশা, মদ, মদিরা ও যৌনতার মধ্যে তাকে আপাত মুক্তি খুঁজতে হয়। সঠিক দর্শনচিন্তাই তখন শিল্পী কিংবা ¯্রষ্টাকে সঠিক দিশা দেখাতে পারে।

শেক্সপিয়রর সমস্ত নায়ক যুবরাজোচিত, লিখেছেন কডওয়েল, এইকালে মানুষের আচরণের আদর্শ হল রাজকীয়তা। ‘ইংল্যান্ডে সামন্ততন্ত্রকে ভেঙে ফেলার প্রয়োজনে নিরঙ্কুশ রাজার শক্তি ও নির্মমতার দরকার ছিল’—তাই যুবরাজোচিত নির্মাণ শেক্সপিয়রের। মিল্টনকে প্রকৃত বিপ্লবী মনে হয়েছে কডওয়েলের। কারণ তিনি অন্তর দিয়ে বুঝেছিলেন আত্মিক তৃপ্তি অদ্ভূত পরাজয়ের তুলনায়… কবিতার পরিতৃপ্তিহীনতাতেই প্রমাণ।

ওয়ার্ডসওয়াথ এক বিপ্লবী আগুনে সেকা কবি। যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বমুখর ইংল্যান্ডে ও ফ্রান্সের মধ্যে বিপ্লবী ফ্রান্সের প্রতিই তার আগ্রহ। ফ্রান্সের বিপ্লবকে অভিনন্দিত করেছেন, মিলিটারি.. কবিতা লিখে প্রত্যাখ্যান করেছেন শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্ভূত অর্থগৃধœু সমাজ ও সংস্কৃতির প্রবণতাকে। টাকা টাকা টাকা এই বোধ থেকে—শ্রেণিবৈষম্যবৃদ্ধিকে মানতে পারছেন না—তার আশ্রয় হচ্ছে প্রকৃতি। ‘অ্যাঙ্কর অব মাই হাটর্’, ‘দ্য নার্স’, ‘দ্য গাইড’ বলে মনে হচ্ছে প্রকৃতিকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ চেয়েছিলেন সেই প্রকৃতি শিল্পযুগের দ্বারা কলুষিত নয়, কিন্তু তিনিও তো বেঁচেছিলেন শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্ভুত উন্নয়নের সুফল নিয়ে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ স্বাভাবিক কথোপকথনের ভাষা বেশি পছন্দ করতেন। কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষার বদলে। মিল্টন চেয়েছিলেন পিউরিটান ‘আত্মা’, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ‘সর্বেশ্বরবাদী’ প্রকৃতি।

কীটস প্রকৃতিতে ফিরে যেতে চাননি পুরোপুরি ওয়ার্ডসওয়থের মত। তিনি সবসময় পীড়িত হয়েছেন অর্থাভাবে, দারিদ্র্যে। তাঁর বিপ্লব বাস্তব থেকে পালানো। শেলি চেয়েছিলেন  সমস্ত মানবজাতির হয়ে বলতে। কিন্তু সমস্যা একটাই। সেটা হচ্ছে তাঁদের কাক্সিক্ষত বিপ্লবী শ্রেণির সমাজ ও সবর উপস্থিতি ও সক্রিয়তার অভাব। কডওয়ের চমৎকার লিখেছেন:

এযুগে বুর্জোয়া কবিদের অভিশাপ হল এটাই যে জগতের দুঃখকষ্ট, তাদের নিজেদের দুঃখকষ্ট সমেত, তাদের শান্তিতে থাকতে দেয় না, অথচ সেই কালের মেজাজ যে শ্রেণি সৃষ্টি করেছে সেই শ্রেণিকেই সমর্থন করতে বাধ্য করে।

এই সমস্যা তীব্রভাবে দেখি কবি র‌্যাঁবোর ক্ষেত্রে। গেরাউ দ্য নাইভলের মতো কোন কোন কবি ‘টাকা টাকা টাকা’—এই মনোভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু বিপ্লবী দল এবং বিপ্লবী মতাদর্শের  অভাবে বিদ্রোহেও সামিল হতে পারেন নি। ফরাসি কবি র‌্যাঁবো বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতেন। কবিতায় বহু বৈপ্লবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। কিন্তু কী হল তার শেষ পরিণতি? র‌্যালফ ফক্সের ভাষায় :

র‌্যাবো আবিসিনিয়াতে নিজেকে ন্বেচ্ছায় জীবন্ত কবরস্থ করেছেন। এক বর্বর মানব বিদ্বেষ নিয়ে তিনি মানবদেহ ও অস্ত্রাদির এবং আফ্রিকায় উৎপন্ন যাবতীয় দ্রব্যাদির এমন এক ব্যবসায়ে নেমেছেন যেগুলি বর্তমানে তারই ঘৃণার পাত্র বুর্জোয়ার লোভের বস্তু।’ (নেভেল অ্যান্ড দ্য পিপল; পৃ ৩৬)

র‌্যালফ ফক্স আরও লিখেছেন :

(চিত্রশিল্পী) গ্যঁগ্যা নির্বাসন নিয়েছেন তাহিতিতে, পলিনেশিয় আদিম সাম্যবাদীদের সংসর্গে থাকার জন্য। নিজের লতাপাতার ছাউনি তিনি সজ্জিত করেছেন মহান শিল্পকর্মে। ভ্যানগগ উন্মাদাগারে স্থান পেয়েছেন শেষ পর্যন্ত।

এমিল জোলা পেরেছিলেন যিনি কিছুটা বিশৃঙ্খলা হলেও একনিষ্ঠ প্রতিভাধর; পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন শ্রমিকশ্রেণির কাছে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যয়, আমার মতে, বাংলার প্রথম মৌলিক উপন্যাস নির্মাতা, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নভেলের বাইরে যিনি বের হতে পেরেছিলেন সক্ষমভাবে। পথের পাঁচালীতে কোন খল নায়ক নেই, নেই ত্রিকোণ প্রেম সম্পর্ক, পথের পাঁচালী আসলে বাঙালি জীবনের শ্রেষ্ট নির্মাণ। বাঙালি জীবনকে খুঁজতে হলে পথের পাঁচালীতেই খুঁজতে হবে।

বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালী লেখার কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন ‘বাংলা একদিন ফবধফ ষধহমঁধমব হইয়া যাবে, বাঙালি একদিন ফবধফ ৎধপব হইয়া যাইবে, অপু ইহাদের কথা লিখিয়া যাইবে।’ বিভূতিভূষণের মতে, সাহিত্যিকের জীবন ঐতিহাসিক ও সাংবাদিকের। আমাদের জীবনে মাও সেতুং কথিত উদ্দেশ্য আর ফলাফলের সমন্বয় ঘটাতে গেলে ঐতিহাসিক ও সাংবাদিক ভূমিকা নিতে হবে। আর মনে রাখতে হবে : ‘যেদিন থেকে মানুষজাতি শ্রেণি বিভক্ত হয়ে গেছে সেদিন থেকেই সর্বাত্মক ভালোবাসা বলে কিছু নেই।’ মাও সেতুং এটা বলে বলেছেন—‘বিশ্বজনীন ভালোবাসার প্রশংসা করে শাসকশ্রেণি। কিন্তু নিজেরাই তা বিশ্বাস করে না।’

আমাদের কালের সাহিত্যদর্শন হচ্ছে পক্ষ নিতে হবে। ১%, ৩০% অথবা ৬৯% এর পক্ষ। শোষিত, নির্যাতিত, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পক্ষ  নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। নারীর বক্ষের একতল মাংসপি-ের, উরুর ভাঁজে লুক্কায়িত বদ্বীপ গহ্বরের, রূপালী শঙ্খের, মরাল গ্রীবার, এলোকেশী তন্দ্রার বন্দনা অনেক হয়েছে—এবার শ্রেণি সমাজ ও শৃঙ্খল ছেঁড়ার লড়াইয়ে সামিল হওয়া যাক। ইতিহাস না হলে ক্ষমা করবে না। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, আধা-সামন্তবাদী, আধা পুঁজিবাদী শোষণ ও শাসন ভোগবাদী দর্শনের শৃঙ্খল ছেঁড়াই আগামীর অক্ষরকর্মীর মহত্তম সাহিত্যিক দর্শন হোক। গোর্কির কথাকে উদ্ধৃত করেছেন র‌্যালফ ফক্স নভেল অ্যান্ড দ্য পিপল গ্রন্থে। গোর্কি লিখেছেন : ‘ভাষার মূল্যবান কোষাগার খুঁজে পাওয়া যাবে সাধারণ মানুষের কথার মধ্যে, জনসাধারণের লোকগাথা এবং কাহিনীর মধ্যে। এখানেই পাওয়া যাবে ভাষা ও সাহিত্যের মহত্তম সম্পদ।’

আমাদের কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের শুধু নিছক অভিধান নির্ভর হলে চলবে না; পুঁথিপত্রে মুখ ডুবিয়ে থাকলে হবে না—যেতে হবে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকদের মধ্যে, যেতে হবে বস্তিতে, যেতে হবে মাঝি মল্লার আর নাবিকদের মাঝে।

তাদের সঙ্গে কাটাতে হবে জীবন। খেতে হবে তাদেরই খাবার। থাকতে হবে তাদের মতো করে; তাদেরই আস্তানায়। তবেই সৃষ্টি হবে মহত্তম সাহিত্যিক দর্শন ও নৈতিকতার নতুন মানদ-। গোর্কিরা এমনি এমনি তৈরি হননি। গুন্টার গ্রাস টানা দুবছর পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছিলেন দরিদ্রতম মানুষের সঙ্গে।

আমাদের সমাজের, এই উপমহাদেশের প্রধান সমস্যা চারটি: সা¤্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ এবং এদের সম্মিলিত যোগফলের সহায়তাপুষ্ট ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা। ভারতে তার অতিরিক্ত সমস্যা জাতিবাদ ও অস্পৃশ্যতা। এখন মুশকিল হচ্ছে কাব্যে, উপন্যাসে, নাটকে, চলচ্চিত্রে এর বিরুদ্ধে বাংলা সাহিত্য নেই বললেই চলে। রেগে যাবেন জানি! কিন্তু খুব কম; প্রবন্ধে আছে। হিন্দি বা উর্দু—আমাদের পছন্দের ভাষা নয়; কিন্তু সেখানে এর বিরুদ্ধে লড়াই জাগ্রত।

আমাদের এ থেকে শিখতে হবে। শুধু গোরা আর লালসালুর নাম করে তর্কে জিতলে হবে না। রবীন্দ্র-নজরুলের সময় ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা এই উপমহাদেশে এতো তীব্র ছিল না—বুর্জোয়ারা অন্তত ধর্মের হাত সেভাবে ধরেনি। কিন্তু এখন টিভি, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, অন্তর্জালে নিয়ত সেই হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধবাদী অপশক্তির প্রচার।

এই সময়ে সুবিধাবঞ্চিত, স্বল্পবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে হবে খিদের ও ভালোবাসার কোন মানচিত্র নেই। পাখি, মেঘ, হাওয়ার ভিসা লাগে না, পার্সপোট লাগে না। কোন কাঁটাতার তাদের বাঁধতে পারে না। জলকেও অবাধ হতে দাও, মনকেও। মানবতা এবং মানবিক সত্তাকেও।

******************************************************

গৌতমগুহ রায়
সময়, সমাজ ও স্বরাজ :
ব্যক্তি লেখকের চৈতন্য ও সাহিত্যের দর্শন
আমাদের নিস্তরঙ্গ আধা-মফঃস্বল শহরের এক শীত সন্ধ্যার কবিতা আড্ডা হঠাৎ তর্কমুখর উষ্ণ ছোঁয়ায় জমে উঠলো। কবিতা দর্শনের চাপে নষ্ট হয়ে যায় এই কথায় কেউ কেউ জমিয়ে দিয়েছিলেন সেই সন্ধ্যা। ভাষামুক্তি, যুক্তিমুক্তি, ইমেজমুক্তি নিয়ে ইতিপূর্বে অনেক কবিতার আসর হাততালি মুখরিত হয়েছে, কিন্তু শেষ কথা হয়ে রয়ে গেছে ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়’। আসলে মূল জায়গাটা হলো চিন্তার স্বাধীনতা। যে কোনো রকম বিধিনিষেধ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আরোপিত হয়ে যখন সে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায় তখন সেই বন্ধন অনুভব করতে পারেন একজন সংবেদনশীল সৎ লেখক, তৎক্ষণাৎ যার ভেতর এর বিরোধী প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয়। যে লেখকের ভেতর এই পর-নিয়ন্ত্রিত অবস্থার বিরুদ্ধে বিরোধিতা জন্মে না তিনি চলতি হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন নিজেকে, এদের অজান্তেই চারপাশে ক্রমশ জেগে ওঠে এক ধাতব খাঁচা। পরনিয়ন্ত্রিত এই চৌহর্দির মধ্যে বেঁচে থাকার রসদ মেলে কিন্তু মুক্তি থাকে না, সৃষ্টির উড়ান এখানে রুদ্ধ হয়ে যায়। এভাবেই চিহ্নিত হয় সৃষ্টিশীল লেখক সাহিত্যিক ও মনোরঞ্জনী সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত দর্শন। সৃষ্টিশীল সাহিত্যিকদের দর্শনটাই হয়ে ওঠে সময়-সাহিত্যের দর্শন। ব্যক্তি লেখক তাঁর লিখন কর্ম থেকে জীবনধারণের উপযোগী আর্থিক নিশ্চিন্ততা লাভের প্রশ্নে ভাবিত থাকবেন এটা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন তাঁর চিন্তার স্বাধীনতার সঙ্গে এই যাপনের সংঘাত ঘটবে তখন এই ‘বেঁচে বর্তে থাকা’য় তাঁর ভূমিকা নির্ধারণ করবে তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন। চলমান সমাজ প্রবাহের অনুভব যদি ধারণে অক্ষম হন সৃষ্টিশীল লেখক, তবে তা তাঁর ব্যর্থতা, চিত্র ও চরিত্র রূপায়ণে বর্তমান সময়ের সঙ্গে, জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থায় রোমান্টিকতার কুহুক সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু সেটা জীবন থেকে পালানোরই নামান্তর।

সময়ের দিকে পেছন ফিরে তাকালে আমরা কিছু উদাহরণ দেখতে পাবো। জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটের ¯্রষ্টাজীবনকে দুভাগে ভাগ করা যায়, প্রথম জীবনে তাঁর তরুণ মন তৎকালীন ইউরোপের রোমান্টিক আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো দারুণভাবে, লিখেছিলেন ‘তরুণ বার্থারের দুঃখ’, কিন্তু এর প্রভাব জার্মান তারুণ্যের উপর সুখকর হয় নি। উপন্যাসের ঘটনাবৃত্ত এবং চরিত্র পাঠক্রম এমন গভীর হতাশার ও নৈরাজ্যের জন্ম দেয় যে জার্মান তরুণ পাঠকদের কাছে এই উপন্যাস পাঠের পর জীবনটাই অর্থহীন মনে হতে থাকে। গ্যেটে তাঁর সৃষ্টির এই ঋণাত্মক ভূমিকা উপলব্ধি করে নিজের সাহিত্য দর্শনকে একদম বিপ্রতীপে নিয়ে যান, গ্রহণ করেন ক্লাসিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি, লেখেন কালজয়ী ক্লাসিক কাব্যনাট্য ‘ফাউস্ট’। যেখানে উচ্চারিত হয়েছে জীবনের ধ্রুব সত্য, ডি ডি কোসাম্বির অনুবাদে, ‘ঙাবৎ ধষষ  Over all the peaks is peace, in all the tree-tops can’t thou discern hardly the stir of breath; the little bird fall silent in the woods, but wait, thou too shalt soon have thy rest’,  The final rest from the long journey of a whole lifetime.। বিশ্বসাহিত্যে আমরা এমন অনেক উদাহরণই পাবো যেখানে লেখকের দর্শন, তাঁর বিবেকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে সময়ের ও অভিজ্ঞতার নিরিখে পাল্টে গেছে।

আমাদের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ আইকন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এই কথাটি খাটে। রবীন্দ্রনাথ তার কৈশোরে বড়দাদা, সেজদাদা, পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিচালিত হিন্দুমেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। হিন্দুমেলার আদর্শ বাস্তবায়নে তিনি কবিতা ও গান লিখেছিলেন, জ্যোতিদাদার নাটকের জন্য গান লিখেছিলেন। এখানে হিন্দুমেলার প্রেক্ষাপট ও দর্শনটা তুলে ধরা প্রয়োজন। হিন্দুমেলা প্রকাশ্যে হিন্দুত্ব ও হিন্দুজাতীয়তাবাদ জাগরণের মেলা। সেই মেলায় যে জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বোনা হতো তা ছিলো সম্পূর্ণতই  হিন্দু-জাতীয়তাবাদ। মেলার সম্পাদক গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মেলার দ্বিতীয় অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘এই মেলার প্রথম উদ্দেশ্য বৎসরের শেষে হিন্দুজাতিকে একত্রিত করা। যত লোকের জনতা হয় ততই ইহা হিন্দুমেলা ও ইহা হিন্দুদিগের জনতা এই মনে হইয়া হৃদয় আনন্দিত ও স্বদেশানুরাগ বর্ধিত হইয়া থাকে’ (যোগেশচন্দ্র বাগাল, হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত)। এই মেলার সাফল্যে উৎসাহিত রাজনারায়ণ বসু ১৮৬৯-এ জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা তৈরি করেন এবং সেটা শুধুই হিন্দুদের জন্য, তাঁর উক্তির উল্লেখ করা যায়, ‘খ্রিস্টান ও মুসলমানদের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন একেবারে অবান্তর এবং তাদের বাদ দিলেও জাতীয় সভার মর্যাদা ক্ষুণœ হয় না।’ এই চেতনার সংকীর্ণতাই হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপনের প্রাথমিক কাজ করেছিলো। অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ যথার্থই বলেছেন যে হিন্দুমেলা কিংবা জাতীয় সভার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে বিপুল সাহিত্য রচিত হয়েছিলো তাতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের কেবল অবনতিই হয় নি, রীতিমতো স্থায়ীভাবে বিনষ্ট করেছিলো। ১৮৭৪-এ হিন্দুমেলার সাফল্যে উৎসাহিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখে ফেললেন ‘পুরু-বিক্রম’ নাটকটি। সেখানে সরাসরি যবন বা মুসলমানের ‘নিপাত’ করার এবং ‘যবনের রক্তে ধরা হোক প্লাবমান’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর লেখেন ‘সরোজিনী’। মুসলিম বিদ্বেষ ও হিন্দুত্বের জয়গান গাওয়া সেই নাটকটির প্রুফ দেখেন বালক রবীন্দ্রনাথ। রাজপুতানীর আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়া নিয়ে জ্যোতিন্দ্রনাথের গদ্য রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগে নি, তিনি তা পাল্টে লেখেন ‘জ্বল জ্বল চিতা! দ্বিগুণ দ্বিগুণ।’ একদিকে হিন্দুমেলা অন্যদিকে জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিন্দু বীর বিক্রমের স্তব। মুসলমান-বিরোধী পালা রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলো। জীবনস্মৃতিতে তিনি হিন্দুমেলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কথা লিখেছেন। এই দর্শনের প্রভাবে ‘হিন্দুমেলার উপহার’ নামে একটি কবিতা হিন্দুমেলায় পড়েন তিনি, লেখেন যবন বিদ্বেষী ‘পৃত্থীরাজ পরাজয়’, পরবর্তীতে ‘রুদ্রচ-’ (১৮৮১)। যে সময়টা ছিলো তাঁর কথায় ‘মোটের উপর এই সময়টা আমার পক্ষে একটা উন্মাদনার’। এই রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতায় ও আন্তর্জাতিক মননে নিজেকে উত্তরণ ঘটান কৈশরের বিদ্বেষের বিভ্রান্তি থেকে ঘুরে দাঁড়ান। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখার দায়িত্ব পালনের সময় কৃষকদের দেখেন যারা ছিলেন অধিকাংশ মুসলমান, তাদের বিপন্নতা রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করেছিলো। ‘সাহা’দের হাত থেকে ‘শেখ’দের বাঁচানোর কথা বলেছিলেন। ১৮৯১-তে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাত-ধর্ম-কুলের অতিরিক্ত বাছবিচার উপশম করে প্রজাদের একাসনের ব্যবস্থা করেন। ‘সব আসন তুলে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান-ব্রাহ্মণ-চ-াল সবাইকে একই ধরণের আসনে বসার ব্যবস্থা করতে হবে।’ ১৯৩৩ এর ১৬ ডিসেম্বর পয়গম্বর দিবসের উদ্যাপনের বার্তায় লেখেন ‘জগতের যে সামান্য কয়েকটি ধর্ম আছে ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম, মহান এই ধর্মমতের অনুগামীদের দায়িত্ব তাই বিপুল। ইসলামপন্থীদের মনে রাখা দরকার, ধর্ম-বিশ্বাসের মহত্ত্ব আর গভীরতা যেন তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ওপর ছাপ রেখে যায়। আসলে এই দুভাগ দেশের অধিবাসী দুটি সম্প্রদায়ের বোঝাপড়া শুধু জাতীয় স্বার্থের  সপ্রতিভ উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না; ¯্রষ্টাদের বাণী নিঃসৃত শাশ্বত প্রেরণার ওপরও তার নির্ভরতা, সত্য ও শাশ্বতকে যাঁরা জেনেছেন ও জানিয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের ভালোবাসার পাত্র। এবং মানুষকেও তাঁরা ভালোবেসে এসেছেন।’ ১৯৩৪ এ ফতেয়াদহম উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। …আজকের এই পুণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে মুসলিম ভাইদের আমার ভক্তি উপহার অর্পণ করে উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁর আশীর্বাদ ও সান্ত¡না কামনা করি।’ রবীন্দ্রনাথের সুদীর্ঘ জীবনের শেষ ২৫ বছরে মানব ইতিহাসের বেশ কিছু বিপর্যয় ঘটে। একদিকে দুই মহাযুদ্ধ এবং বিভিন্ন দেশে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার উত্থান অন্যদিকে মানবচরিত্রের আত্মঘাতী প্রবণতা বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান চিন্তাশীল মানুষের মনেও শুভনাস্তিক্যের ভাবকে প্রবল করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ এই চিন্তা ও ঘটনার ¯্রােতের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। কবির মননে দুটি সম্পন্ন ঐতিহ্যের মিলন ঘটেছিলো। প্রথমটি ভারতীয় উপনিষদিক ঐতিহ্য, বিশ্বজগৎ কোনো কল্যাণময় উপস্থিতির বিভিন্ন প্রকাশমাত্র, অন্যটি রেনেসাঁস-উত্তর পশ্চিমের মানবতন্ত্রী ঐতিহ্য।

নির্ভীকতা ও সত্যবাদিতা লেখকের বৃত্তিগত যোগ্যতার প্রাথমিক শর্ত। এই শর্তে স্থির থাকাটা অনেক সময়ই লেখকের কাছে দুরূহ হয়ে ওঠে। প্রবল রাষ্ট্রযন্ত্র সমালোচনা সহ্য করে না, সত্যের পথে লেখককে প্রতিনিয়ত তাই আক্রমণ ও উৎপীড়নের সম্ভাবনার সঙ্গে যাপন করতে হয়। ‘তরুণদের বিদ্রোহ’তে শরৎচন্দ্র লিখেছেন : ‘সত্য-বাক্য সমাজের বিরুদ্ধে বলা যেমন কঠিন, রাজশক্তির বিরুদ্ধে বলা ততোধিক কঠিন। … ভাষা যেখানে দুর্বল শঙ্কিত, সত্য যেখানে মুখোশ না পরিয়া মুখ বাড়াইতে পারে না, যে রাজ্যে লেখকের দল এতবড় উঞ্ছবৃত্তি করতে বাধ্য হয়, সেদেশে রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি সমস্তই যদি হাত ধরাধরি করিয়া কেবল নীচের দিকেই নামিতে থাকে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কি আছে?’ লেখক তাঁর নিজস্ব দর্শনে স্থির থাকেন, তাঁর চিন্তার বা মননের স্বরাজের জন্য লড়েন তখন তাঁকে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুঝতে হয়। আমাদের দেশে যেমন সা¤্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে আদর্শবান লেখকদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখেছি, ইউরোপ, আমেরিকা বা আফ্রিকাতেও সেই প্রতিবাদী ভূমিকায় লেখকেরা থেকেছেন। ফরাসি দেশের প্রকৃতিবাদী লেখক জোলা ‘উৎবুভঁপং অভভধরৎ’-এর চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়ানো এখনও বিশ্ব-শিল্প-সংস্কৃতির জগতের মূল্যবান স্মৃতির সম্পদ হয়ে রয়েছে। রুশ দেশের প্রণম্য লেখক টলস্টয় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে গ্রাহ্য না করে শুধু মাত্র ন্যায়ের পথে থাকতে স্বৈরতন্ত্রী জারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘দুখোবর’দের আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ও তাদের দেশত্যাগে সাহায্য করেছিলেন। জারতন্ত্রে রুশ কৃষকদের নিপীড়নের কথা তিনি তুলে ধরেন তাঁর লেখায়। দুই বিশ্বযুদ্ধের অর্ন্তবর্তী সময়ে, ত্রিশের দশকে যে সকল লেখক স্পেনের গৃহযুদ্ধে গণতন্ত্রীদের পক্ষে লড়াই করে যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মদান করেছিলেন তাঁদের স্মৃতি অমলিন থেকে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে ফ্রান্সকে রক্ষা করতে সে দেশের লেখকদের প্রতিরোধের গল্প আমরা জানি। সেই যুদ্ধের অন্যতম যোদ্ধা জাঁ পল সাঁত্রে পরবর্তীতে নবতিপর বৃদ্ধ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে মার্কিন নৃসংশতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পথে নামেন। কমিউনিস্ট বিরোধী শিবিরের মানুষ হিসেবে পরিচিত বার্ট্রান্ড রাসেল মানবতার চেতনায় মার্কিন বরবরতার বিরুদ্ধে সেদিন পথে নেমেছিলেন। যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করার জন্য রোমা রোঁলাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশবাসী উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা নিগ্রহ করা হয়েছিলো। দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ড চলে গিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত এখানেই থাকেন। চিন্তার স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য এ ছিলো তাঁর স্বেচ্ছা নির্বাসন। এমন আনেক উদাহরণ আছে। জার্মানিতে নাৎসি উত্থানের সময় সে দেশের একাধিক প্রথম শ্রেণির শিল্পী, বিজ্ঞানী ও মনীষী দেশ ছেড়ে দেশান্তরে চলে যান। এজন্য তাঁদের বহু ক্লেশ সহ্য করতে হয়েছে কিন্তু হিটলারি একনায়কতন্ত্রের সামনে মাথা নামান নি। শাসকের চিন্তার দর্শনের সামনে স্বাধীনচিন্তার চর্চাকে সমর্পণ করেন নি। আইনস্টাইন, ফ্রয়েড, টমাস মান, হাইনরিখ মান, হারমান হেস এমন উদাহরণ। ইতালিতেও মুসোলিনির স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষের লেখক শিল্পীরা হয় কারারুদ্ধ হয়েছিলেন অথবা দেশ ছেড়ে ছিলেন। গ্রামচি, বেনদেত্ত ক্রোচে তাঁদের অন্যতম।

পশ্চিমী আলোকপ্রাপ্ত চেতনাই ব্যক্তির চিন্তার স্বরাজের মূল্যবোধের ধারক হয়ে ছড়িয়েছে সর্বত্র। ব্যক্তির মধ্যে যে মুক্তির স্পৃহা থাকে তার স্ফুরণ ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়, ব্যক্তির বিকাশই সর্বাধিক কল্যাণের উৎস। সব মানুষের অধিকার ও সম্মানের প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই সভ্যতা স্বীকৃত হয়, মানবতন্ত্রের এই মূল প্রত্যয়টি থেকেই মুক্তসাহিত্যের উন্মেষ। এই মানুষের স্বরাজ ও অন্ধ জাতীয়তার মধ্যে ফারাক রয়েছে। জাতীয়তাবোধে অন্ধ হয়ে অনেক সময়ই মননের স্বাধীনতাকে হত্যা করে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করা যায়।

‘ন্যাশনালিজম প্রবন্ধমালায় তিনি দেখিয়েছেন যে জাতীয়তা একদিকে মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার মনুষ্যত্বকে গ-িবদ্ধ করে, অন্যদিকে এক কাল্পনিক সমষ্টির হাতে ব্যক্তিকে বলি দিয়ে মানুষের সমস্ত সৃষ্টিশীল বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ‘..for the sake of humanity, we must stand up and give warning to all that Nationalism is a cruel epidemic of evil that is sweeping over the human world of the present age and esting into it’s moral vitality.’

জাতীয়তা মানববিরোধী হলে বিকল্প কি? ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে স্বীকার করা। মানুষের যথার্থ মুক্তি তার বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে তার মধ্যে সঙ্গতি সাধন। রবীন্দ্রনাথ সে সময় দাঁড়িয়ে অসমসাহসিকতায় এই কথা উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন যে, ‘জাতীয়তা এবং সভ্যতা পরস্পরের শত্রু’। তাঁর বিশ্বমানবতা ছিলো জাতীয় সমষ্টিবাদের আধুনিক সংস্করণ, ভিত্তি ছিলো স্বাধীনতা এবং সহযোগ। এই মুক্তবুদ্ধিকে কিন্তু সমকালের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই স্বাগত জানান নি। কিন্তু এই বিরোধকে তিনি তোয়াক্কা করেন নি। এন্ডরুজ কে ১৯২০ এর ২৫ নভেম্বর এক চিঠিতে লিখলেন : আমাদের জায়গা করতে হবে মানুষের জন্য, যে মানুষ এ যুগের অতিথি; জাত যেন তার পথ আটকে না দাঁড়ায়। লেখকের নিজস্ব দর্শনের প্রতি বিশ্বাস শক্তির এক উদাহরণ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথমদিককার চিন্তাশীল প্রবন্ধকার অক্ষয়কুমার দত্ত, মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব বস্তুজগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তিনি যখন এই মুক্তচিন্তায় আধুনিক ভাবনার অনুশীলনের কথা বলেছেন তখনও আমাদের চিন্তাজগৎ আচ্ছন্ন করেছিলো সনাতনী জীবন ও জগত- বীক্ষায়। এই মরজগৎ অশুদ্ধ ও অপবিত্র, একে পবিত্র করে শুদ্ধ করে মানুষকে মোক্ষের পথে এগোতে হবে, এই চিন্তার স্থিতাবস্থায় দাঁড়িয়ে অক্ষয়কুমার দেখান যে বাহ্য জগৎ এর রীতি নিয়মকে যথাযথভাবে জানতে হবে। তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষকে বাঁচতে হবে। এই বাঁচা হবে মানুষের বুদ্ধি ও বিচার নিয়ন্ত্রিত। বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি প্রয়োগ করে মানুষকে বাহ্যজগৎ ও মানব প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য করতে হয়। অধ্যাপক ভবতোষ দত্তের মতে, অক্ষয়কুমারের আগে এমন ভাবনা আমাদের সাহিত্যে দেখা যায় নি। অধ্যাত্ম-সুখের সন্ধান হয়েছে, কিন্তু মানব জীবনের সুখের সন্ধান হয় নি। এই চেতনা তিনি আহরণ করেছিলেন জর্জ কুম্বের বই থেকে।

চিন্তার মুক্তি, যাকে অম্লান দত্ত বলেছেন ‘মননের স্বরাজ’ তা কোনোদিনই সহজলভ্য ছিলো না। লেখক শিল্পী কলাকুশলীদের এই মননের স্বরাজ অর্জন নির্ভর করে তাঁর নিজস্ব দর্শনের ভিত্তির উপর। তিনিও সমাজবদ্ধ জীব, বহু সামাজিক বিধি ও দায় তাকে বহন করতে হয়, এই দায় মান্য না করলে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ‘বিচ্ছিন্নতা ক্লেশকর, এমনকি অনেকের পক্ষে অসহ্য। মান্যতাই সাধারণ ভাবে নিরাপদ পথ। সমাজের লিখিত ও অলিখিত বহু বিধানের বিচারশূন্য আজ্ঞাবহতাকে আর যাই বলা হোক না কেন মননের স্বরাজ বলা যাবে না।’ (অম্লান দত্ত)। লেখকের নিজস্ব দর্শন ঠিক করে দেবে তিনি কোন দিকে দাঁড়াবেন, একদিকে ঝুঁকিহীন নিরাপদ পথ, সমাজের স্বীকৃত বিধানের বিরোধিতা না করে সামাজিক ঐতিহ্যের আজ্ঞাবহ হওয়া। অন্যদিকে যারা মনে করেন সমাজের প্রচলিত ঐতিহ্যের রূপলাভ হয়েছে ক্ষমতাবানদের স্বার্থে। স্থিতাবস্থা সবসময় ক্ষমতার স্থায়িত্ব চায়, তাই স্থিতাবস্থায় বিরোধিতা না করলে ক্ষমতার পেশী নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা যাবে না। এই দুপক্ষের মাঝের বিভাজন রেখা অনেক প্রাচীনকাল থেকে বহমান, হয়তো চলবেও অনন্তকাল। যদিও বৃহত্তর অংশের সাহিত্যিক প্রচলিত বিধানের অনুগমনে অভ্যস্ত তবু কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ চিন্তার মুক্তি বা নিজস্ব উপলব্ধির মূল্যে আস্থা রেখে চলতি ¯্রােতের প্রতিকূলতায় দাঁড়াতে ভয় পান না। এদের মৌল প্রত্যয় চেতনার এক গভীরতর অন্তঃস্তলে প্রোথিত। তাঁর সৃজন-সাহিত্যের দর্শনও সেই শেকড়ের ভিত্তি থেকেই ক্রমশ বৃক্ষরূপ নেয়। এখানে স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ আসবে, ঐতিহ্য দীর্ঘ অতীতের গৌরব বহন করলেও চোখ বন্ধ করে তাকে অনুসরণ করার বিরোধিতা প্রগতিপন্থিরা করবেন এটাই স্বাভাবিক। ঐতিহ্যকে, তার মিথকল্পে হাতিয়ার করে সংস্কার বিরোধিরা আচ্ছন্নতায় ঢেকে রাখতে চান মানুষের চেতনাকে। বর্তমান উপমহাদেশেও ধর্মব্যাপারীরা এই কুহকের জালে বেঁধে ফেলতে চাইছে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতাকেও। আসল কথা মননের স্বরাজ কখনো চায় না যুক্তিহীন সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে। যুক্তির দ্বারা পরীক্ষিত না হলে কোনো প্রত্যয় আধুনিক মানুষের মননে প্রবেশাধিকার পায় না। আধুনিক মনন বলতে কেউ কেউ পশ্চিমী চিন্তাভাবনার প্রতি নিবেদিত মানুষদের চিহ্নিত করেন এবং এই চিন্তা-চেতনা স্বরাজের পথে প্রতিবন্ধক বলে উল্লেখ করেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে আমি বিশ্বাস করি না পশ্চিম মানেই প্রতিবন্ধক, দেশজ মানেই আত্মবিকাশের একমাত্র পথ।

আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মুক্ত দেশগুলো তাদের অবদমিত অতীতকে চর্চায় এনে তার অনুশীলনের উপর গুরুত্ব শুরু করেন। তাদের সামনে ঔপনিবেশিক অবদমনকে ভুলে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রধান হয়ে উঠেছিলো। চর্চায় আসে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব বা ভাবনা। ‘ঔপনিবেশিক অতীতের রহস্যঘন বিস্মরণের বিরুদ্ধে এ হ’ল এক তাত্ত্বিক প্রতিরোধ’। শুরু হলো ঔপনিবেশিক মানুষদের বিষয়ী সত্তার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আত্মপরিচিতির অনুসন্ধান ও বহুমুখী বহুবিধ চর্চা। এর ফলে গোটা বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ মানুষের অভিজ্ঞতা ও তাদের নব্যকৃষ্টির নবপাঠ প্রক্রিয়া সূচিত হলো, প্রধানত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের ফলশ্রুতিতে বিবর্তিত ঐতিহ্যের পুনচর্চাও শুরু হলো। Post Colonial discourse analyzes how the historical fact of European colonialism continnes to shape the relationship between the west and the non-west after former colonies have won their independenceÕ

চিন্তাচর্চায় ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার আলোচনা প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, ঔপনিবেশিকতা প্রথম থাবা বসায় দখলিকৃত ভূখ-ের উপর, নিজস্ব উৎপাদনী ব্যবস্থা চূর্ণ করে তা করায়ত্ত করে এগোয় অধিকৃত অংশের জনতার আত্মতার বোধকে লুপ্ত করে। (ঊঢ়রংযবসড়ষরমঁপধষ বীঢ়ষড়রঃধঃরড়হ)… সমাজের অন্তর্কাঠামো দখল নিয়ে এগোয় উপরিকাঠামোর দখল স্থায়ী করতে, সে চায় স্থানীয় সংস্কৃতিকে তাঁদের ছাঁচে ফেলে মনন-চিন্তনের এমন এক পরিকাঠামোর খাঁচা তৈরি করা, যেখানে দেশজ ভাবনা নসাৎ হয়ে যাবে। আমাদের সাহিত্য দর্শনও এই ঔপনিবেশিক সংকট আক্রান্ত হয়ে এক দোলাচলে থেকেছে, যার পরিণাম আজকের সময়েও শেকড়ের অন্বেষণের আত্মসংকট ও বিপন্নতা। আমাদের এই উপমহাদেশীয় ভূখ-ের প্রতাপী প্রভুত্ব মুক্ত হয়ে, ঔপনিবেশিক সাঁড়াশি চাপমুক্ত হয়ে স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রিত অবস্থায় মুক্তির স্বাদ নেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ থেকে মুক্তি অত সহজ হলো কই? ঔপনিবেশিক প্রভুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে যে জাতীয়তাবাদ দানা বেঁধেছিলো মুক্তির স্বাদ তার বাঁধন আলগা করে দিলো। ‘আধিপত্য দেখার অভ্যাসটা আধিপত্য করার অভ্যাসে পরিণত হলো। ক্ষমতার রাজনীতিতে দেশের মধ্যেই অজ¯্র উপনিবেশ, উচ্চবর্গের উপনিবেশ নি¤œবর্গ, উচ্চবর্ণের উপনিবেশ নিম্নবর্ণ, প্রথম লিঙ্গের উপনিবেশ দ্বিতীয় লিঙ্গ। কায়েমি স্বার্থে ক্ষমতাবানরা সবাই লুটেরা। মানুষের মনের জমিতেও তাঁরা উপনিবিষ্ট।’ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা)।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঔপনিবেশিতাবাদের অবসান যে আশাবাদের কথা বলে তাও অনেক প্রশ্নের সামনে চৌচির হয়ে যায়। কারণ, মননের গভীরে, অস্তিত্বের শেকড়ে, সংস্কৃতি-জীবন-চর্যায় ঔপনিবেশবাদ রয়ে যায়। পোস্টকলোনিয়ালিটির মধ্যে তাই রয়ে যায় এক অনিবার্য স্ববিরোধিতা, দ্বিচারিতা। একদিকে উত্তর-উপনিবেশিক বাস্তবতা ও পরিস্থিতি, বিপরীতে তার বহন করে চলা উপনিবেশিক ক্ষমতার অহংকার- তার মননে, যাপনে আবৃত, অগোচরে। জ্ঞান ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কলোনিয়াল হায়ারার্কি- দৃঢ় ঔপনিবেশিক স্তরবিন্যাস কাঠামো। গভীর থেকে গভীরতর এর বিস্তৃতি।

আজকের পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্ব মূলত পাশ্চাত্যের ক্রিটিক অব মার্ডানিটি ঘরানার দ্বারা উদ্বুদ্ধ, তবে একথা একবারেই সত্য নয় যে এদেশে চর্চিত উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্য সার্বিকভাবে পাশ্চাত্য উৎস থেকে আরোহিত। এদেশের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রায় অচর্চিত বাঙালি দার্শনিক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৯২৮-৩০ নাগাদ তিনি হুগলীতে ছাত্রদের সভায় এক বক্তৃতায় যে কথা তুলে ধরেছিলেন তা পরবর্তীতে পোস্ট-কলোনিয়াল চর্চার সূচিকথন বলা যেতে পারে। সেই সময়টাকে মনে রাখবেন, যখন এডোয়ার্ড সোঈদ বা ফুকো-চর্চায় আসেন নি। কৃষ্ণচন্দ্র বলেছিলেন : ইদানিং আমরা স্বরাজ অথবা রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলে থাকি। মানুষের উপর মানুষের প্রাধান্য সব থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় রাজনীতির ক্ষেত্রে। চিন্তার রাজ্যে এক সংস্কৃতির উপর আর-এক সংস্কৃতির আধিপত্যের আরো সূক্ষ্ম এবং তার পরিণতি আরো ভয়াবহ। তার কারণ একে সচরাচর অনুভব করা যায় না। রাজনৈতিক পরাধীনতা বলতে বোঝায় মানুষের বহিরঙ্গ জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ, যদিও ধীরে ধীরে তা চেতনার অন্তর্লোকে অনুপ্রবেশ ঘটাতে চায়; তবু যখন এ সম্বন্ধে কেউ সজ্ঞান থাকে, তখন সেই সচেতনতাই এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকে। যতোদিন একটা কোনো নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ব্যক্তির সচেতনতা থাকে ততোদিন পর্যন্ত একে প্রতিরোধ করা অথবা একে এক অবশ্যম্ভাবী অশুভ বলে মেনে নেওয়া চলে এবং তার ফলে চেতনা ততক্ষণ তা থেকে মুক্ত থাকে না। যখন এই অনুভব করার ক্ষমতাটুকু চলে যায়, তখনই শুরু হয় দাসত্ব এবং তা আবার নিবিড়তর হয় যখন অশুভকেই শুভ বলে বরণ করা হয়। সাধারণত সাংস্কৃতিক আনুগত্য একটা অবচেতন ব্যাপার। গোড়া থেকেই এর মধ্যে এক ধরনের দাসত্ব নিহিত থাকে। সাংস্কৃতিক আনুগত্যের কথা বলতে গিয়ে আমি বহিরাগত সংস্কৃতির আত্তিকরণ সম্বন্ধে কিছু বলছি না। … সাংস্কৃতিক পরাধীনতা একমাত্র তখনই হয় যখন নিজের ঐতিহ্যগত ভাবধারা এবং সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে যায় তুলনামূলক বিচার অথবা প্রতিযোগিতা ছাড়াই এবং একটা বিজাতীয় সংস্কৃতির নতুন পরিম-ল ব্যক্তিকে ভূতে পাওয়ার মতো পেয়ে বসে। এই পরাধীনতাই হল চেতনার দাসত্ব যা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুক্ত হতে পারলে মনে হয় চোখের উপর থেকে একটা আবরণ যেন সরে গেল। তখন এক নবজন্মের অভিজ্ঞতা জাগে। তাকেই বলি মননের ক্ষেত্রে স্বরাজ।’ (কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য। মননে। পৃ; ৯)।

সাংস্কৃতিক আনুগত্য, দাসত্ব ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র সেদিন যে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কথা বলেছিলেন পরবর্তীতে গ্রামশি (ওফরড়ষড়মরপধষ যবমবড়সড়হু) সেই কথাই বলেন। আমাদের ন্যুব্জ মন অবদমিত হয়ে মেনে নেয় আমাদের সংস্কৃতিহীন, অধঃপতিত, নিকৃষ্টতর, প্রাগাধুনিক, রক্ষণশীল, সেকেলে, সংকীর্ণ ও অনগ্রসর। পাশ্চাত্যের সবকিছুই অগ্রসর আধুনিক। মিশেল ফুকোও এই পশ্চিমী আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের অদৃশ্য তন্ত্রজালের উল্লেখ করেছেন। এই তন্ত্রজাল আমাদের মননে খুব নিঃশব্দে তার জাল বিস্তার করে। আধুনিকতার ডিসকোর্স আমাদের মননে আমাদের অজ্ঞাতসারে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আমরা একে আধুনিকতা বলে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করি।

চিন্তাশীল মানুষ, একজন লেখক তাঁর নিজের বিচার ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজস্ব কর্মপন্থা কি করে ঠিক করবে? এই জিজ্ঞাসার সামনে বারংবার ঠোক্কর খেয়েছে আধুনিক মনন। পাশ্চাত্য আধুনিকচর্চায় দেখা যাবে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে ১৭৮৪ তে ইমানুয়েল কান্ট একটি প্রবন্ধ লেখেন, ‘এলাইটেনমেন্ট’ বা আলোকপ্রাপ্তি। কান্টের মতে আলোকপ্রাপ্ত মানে সচেতন হয়ে অপরের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হওয়া, স্বনির্ভর হওয়া। যতক্ষণ সে স্বনির্ভর বা আলোকপ্রাপ্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ তার নিজের বিচারবুদ্ধি সক্রিয় হচ্ছে না ততক্ষণ সে অপরকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নেয়, অপরের নির্দেশ মেনে চলে। জাগতিক ব্যাপারে কোনো কিছু নিজের মতো ব্যাখা করার প্রয়োজনীয়তা সে অনুভব করে না। সে মনে করে যে ‘ধর্মগ্রন্থে সব আছে’, নিজের থেকে ন্যায় অন্যায় বিচারের চেষ্টা সে করে না। ধর্মযাজক, পুরোহিত বা নিয়ন্ত্রক যে নির্দেশ দেন বিনা বাক্য ব্যয়ে তাই সে পালন করে। তার খাওয়া-দাওয়া, পরিধান, বচন সবই সেই প্রভুর আজ্ঞায় নির্ধারিত হয়। এই ধরনের মানুষই সংখ্যায় বেশি এবং সমাজের অভিভাবকেরা সেটাই চেয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমান যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যে মানুষ, বিশেষ করে সৃজনশীল মানুষ তার স্বনির্ভরতার প্রয়োজন অনুভব করে তার জন্য সক্রিয় হলেন, নাগরিক স্বাধীনতা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো। কান্টের এই আলোচনাকে সামনে রেখে এই সময়ে দাঁড়িয়ে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (ডযধঃ রং ঊহষরমযঃবহসবহঃ) কান্টের আলোচনার নতুনত্ব কোন দিকটা সেটা তুলে ধরলেন, বললেন যে এই প্রথম একজন দার্শনিক তাঁর নিজের যুগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন, সমসাময়িক পরিবেশের ভেতর থেকে জ্ঞানচর্চার অনুকূল সামাজিক শর্তগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করলেন। ফুকোর এই মূল্যায়নকে মাথায় রেখে আমরা কান্টের ‘এনলাইটমেন্ট’- এর মূল দুটো বিষয়কে সামনে আনতে পারি, তিনি যুক্তির ব্যবহারের দুটি ক্ষেত্রকে পৃথক করে দিয়েছিলেন। একটিতে তিনি সর্বসাধারণের (পাবলিক) আলোচনায়, চিন্তায়, যুক্তি যেখানে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা বিশেষ কোনো সামাজিক অবস্থানকে পুষ্ট না করে, অন্যটি যুক্তির ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) ব্যবহার, যা ব্যক্তিগত এবং বিশেষ স্বার্থ বা অবস্থানকেই আশ্রয় করে। প্রথমক্ষেত্রে চিন্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা মোটেই কাম্য নয়। উদাহরণ দিতে গিয়ে কান্ট বলেছেন যে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতির প-িতেরা মতামত দিতেই পারেন, তাঁর সেই স্বাধীনতা আছে। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তিনি বলতে পারেন না যে আমি সরকারের রাজস্ব নীতির বিরোধী—তাই কর দেবো না। পরবর্তীকালে এই প্রাইভেট/পাবলিক মতবাদ খুব একটা গ্রহণীয় থাকে নি, তবে তাঁর অভিমতকে অস্বীকার করা যায় না- ব্যক্তি হিসেবে আমি কোনো বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের অংশ মাত্র, সমাজযন্ত্রের একটি যন্ত্রাংশ মাত্র, সেখানে আমার কাজ এই স্বীকৃত নিয়মের বশবর্তী থাকা ও মেনে চলা। কিন্তু যুক্তি ও প্রয়োগের অন্য ক্ষেত্রটিতে ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবস্থানগুলো দিয়ে আবদ্ধ নয়, যা মুক্ত ও সর্বজনীন সেটাই হলো স্বাধীন চিন্তা, জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা। ‘আলোকপ্রাপ্তি কাকে বলে?’ বলতে গিয়ে দুশো বছর বছর আগে কান্ট যা বলেছিলেন তা ছিলো বাক্স্বাধীনতা, চিন্তার মুক্তি, সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত যুক্তি নির্ভর আলোচনা ক্ষেত্র। এর কয়েক শতক পার হয়ে এসে উত্তরণ ‘আধুনিকতাবাদ’।

আধুনিকতাবাদ প্রথম সমাজ দর্শন যা সর্বস্তরের মানুষের চেতনাতেও স্বাতন্ত্র্য আর কর্তৃত্বের স্বপ্নজাল সৃষ্টি করে। আধুনিক সময়ে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রক্রিয়াই এমন যে তা কোনো সার্বভৌম প্রভুর আজ্ঞা না হয়ে প্রতিটি ব্যক্তি-বিশেষের নিজস্ব যুক্তিপ্রসূত অনুশাসন হিসেবেই কাজ করে। এক সময় যে আধুনিকতা ভারতের পরাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিলো যে এত ভারতবাসী আলোকপ্রাপ্ত হবে। সেই আধুনিকতার যুক্তিতেই একদিন আমরা শিখলাম সা¤্রাজ্যবাদ অন্যায়, স্বাধীনতা কাম্য।

সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার প্রভাবে প্রভাবিত হয় ¯্রষ্টার ব্যক্তিগত দর্শনও। নতুনভাবে ভাবা বা ভিন্নচর্চায় উৎসুক লেখক শিল্পীদের চিন্তার জগতকেও দেশ-কালের প্রবল ‘দর্শন’ এবং সমাজের ইতিহাসকে প্রভাবিত করে চালিত করে এই নিয়ন্ত্রক শক্তি। যেখানে অনেক সময়ই পরাভূত হয় ব্যক্তির ‘মননের স্বরাজ’। জাঁ পল সাঁত্রে তাঁর বিতর্কিত প্রবন্ধ ‘ÔMATERIALISM AND REVOLUTIONÕএ লিখেছেন, ‘এই ভাবে, তাদের চিন্তার জগতে শিকারী কুকুরের মত ঢুকে পড়া হয়, তাদের চিন্তা উৎসকে বিষিয়ে দেওয়া হয়। তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা দর্শনের প্রতি আনুগত্য দেখাতে তাদের বাধ্য করা হয়। এই দর্শন তারা ঘৃণা করে, তবুও নিয়মানুবর্তিতার জন্য একটা নীতিকে তাদের মেনে নিতে হয়, যে নীতি তারা বিশ্বাস করে না।’ সাঁত্রের মতে তাদের সাহায্য করার একটা রাস্তা হলো তাদের নিজেদের প্রশ্ন করা, জড়বাদ এবং বাস্তবতার উপকথা কি সত্যিই বিপ্লবের কারণের জন্য প্রয়োজনীয়?’

জড়বাদ প্রসঙ্গে আলোচনায় তিনি লিখেছেন, ‘কোঁন্তের শিষ্যরা বিনয়বশতঃ মানুষের জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এর কারণ হলো একমাত্র তার মধ্যে যুক্তি কার্যকর হতে পারে। বিজ্ঞানের সফলতা তাদের কাছে একটা বাস্তব ঘটনা ছিলো, কিন্তু সেটা ছিলো মানবীয় বাস্তবতা, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এবং মানুষের জন্য বিজ্ঞান সফল, একথা সত্য। …বিজ্ঞান তার আলোচ্য বিষয়ের জন্য নীতি ও পদ্ধতির জন্য দ্বান্দ্বিকতার বিপরীত। বিজ্ঞান যখন বিভিন্ন শক্তির কথা বলে, যে শক্তিগুলি পদার্থের একটি বিন্দুতে প্রযুক্ত হয়, তখন তার প্রথম আগ্রহ হল তাদের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করা। প্রত্যেকটি বিন্দু এমনভাবে কাজ করে, তা যেন নিত্যসঙ্গী। বিজ্ঞান যখন বিভিন্ন পদার্থের একের উপর অন্যের আকর্ষণ আলোচনা করে, তখন তা সতর্কভাবে আকর্ষণকে  বাইরের সম্বন্ধ বলে মনে করে, তাকে গতির দিক এবং বেগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়। বিজ্ঞান কখনো কখনো সংশ্লেষণ।’ বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ যখন এলোই, এই উপমহাদেশের নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী পদার্থবিদ আবদুস সালাম এর একটি কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তাজমহল ও সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল এ দুটোই স্থাপত্যকলার উজ্জ্বল নিদর্শন—একটি প্রাচ্যের অন্যটি প্রতীচ্যের। দুটি সৌধই প্রায় সমকালে নির্মিত এবং এদের দেখলে মনে হবে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে উভয় সংস্কৃতিই তুলনীয় উৎকর্ষে পৌঁছেছিলো। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে ইউরোপ বা ইংল্যান্ড পেয়েছিলো নিউটনকে, বিজ্ঞানচর্চার একটা জোয়ার এসেছিলো সে দেশসহ প্রায় গোটা ইউরোপ জুড়েই। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বিজ্ঞানের উন্মেষ শুধু রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতাই পেয়েছে এমন নয়, ব্যক্তিগতভাবে কিছু ধনবান অভিজাতও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। রয়্যাল সোসাইটি, ফ্রেঞ্চ আকাদেমী এবং অপর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একযোগে বিজ্ঞানের উন্নয়নে ব্রতী হয়েছিলেন। ভারতবর্ষে কিন্তু অনুরূপ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। উদার কলাসমূহের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অনেকেই, কিন্তু বিজ্ঞানের বেলায় কোন পৃষ্ঠপোষক পাওয়া যায়নি। এই বিজ্ঞান সংস্কৃতিই বিকাশশীলতার দিক থেকে ভারত ও ইউরোপের মাঝখানে ভেদরেখা টেনে দিয়েছিলো।’

কবিতা প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু হয়েছিলো, শেষেও কবিতার কথাই বলছি। এই সময়টা মানুষের স্মৃতিকে চটকে দেওয়ার খেলায় মত্ত। স্মৃতিহীন স্বপ্নহীন এক গতিসর্বস্বতায় মানুষ। বেনিয়াবাদের ক্লেদে তার অতীত বলে যা কিছু, স্মৃতি বলে যা কিছু, তা থেকে মুক্তির জন্য বর্তমান সর্বস্বতার এক হাউই রকেট চেপে বসেছে উত্তর-আধুনিক এই সময়। স্বপ্ন থেকে পালিয়ে যেতে যেতে সে শুনছে কানে কানে কেউ কেউ বলছে, পেছনে তাকিয়ো না, পা পিছলে যাবে, তুমি হেরে যাবে। শুধু সামনেটা দেখো, শুধু এই সময়টা নিয়ে থাকো। বোধশূন্য সংবেদনহীন এই যন্ত্র-প্রজন্মকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে পারে সাহিত্য, কবিতা। জীবনানন্দর ভাষায় : কাব্যের আকাশের ওপারে স্বাদিত, অনাস্বাদিত নক্ষত্রের মতো সব খুঁজে পায় মানুষ, যে নিয়ন্ত্রণহীনতার সাধক, যে মাথা ঝাঁকিয়ে অপছন্দকে নসাৎ করে দিয়ে চলে যেতে পারে সেখানে, যেখানে স্বপ্নের দেশে ¯স্রোত বিনা, জল বিনা/ অগণ্য নৌকা ভাসে…।

******************************************************

অনিরুদ্ধ কাহালি
সাহিত্যে দর্শন দর্শনে সাহিত্য
ব্যক্তিগত একটি স্মৃতি দিয়ে শুরু করি। যদিও এই স্মৃতিতে বিষয়ের কোনো নতুনত্ব নেই, মনে রাখার মতোও কিছু নেই। কিন্তু এই শিরোনামের সঙ্গে মিল আছে বলেই অনেক বছর পরে মনে পড়ল ঘটনাটি। চাকরি জীবনের প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির মৌখিক পরীক্ষায় সভাপতি মহোদয় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন কী করছ? বললাম পিএইচ.ডি.-এর কাজ করছি। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন পিএইচ.ডি. কী? উত্তর শুনে বললেন শিক্ষকতা কর সাহিত্য নিয়ে, গবেষণা করছ সাহিত্য-প্রসঙ্গে, এখানে দর্শনের সম্পর্ক কী? জবাব কী দিয়েছিলাম মনে নেই, তবে সভাপতি মহোদয়ের চেহারায় খুব একটা অখুশির ভাব দেখিনি। ঘটনাটার অবতারণার কারণ হয়তো এখন বোঝা যাচ্ছে। আরেকটু উল্লেখ করি, আমরা এখানে দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে কথা বলব সত্য কিন্তু দর্শনের শিকড় আসলে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। জীবনের সর্বত্রই বলা যায়, অন্যভাবে বললে আমাদের জ্ঞানকা- বা বিদ্যাশৃঙ্খলা বা শিল্প ও শিল্পতত্ত্বের সবকিছুতেই দর্শনের আধিপত্যের কথা মেনে না নিয়ে উপায় নেই। আর সাহিত্য; যে-কোনো কিছুই হতে পারে সাহিত্যের উপকরণ।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর দর্শন দিগ্দর্শন গ্রন্থের ভূমিকায় দর্শনের বিকাশ কাল চিহ্নিত করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘দর্শনের সুবর্ণ যুগ ৭০০ খৃষ্টপূর্ব থেকে শুরু করে পরবর্তী তিন চার শতাব্দী পর্যন্ত ধরা যেতে পারে; এই সময়ের মধ্যে ভারতে উপনিষদ থেকে শুরু করে বুদ্ধ পর্যন্ত, ইউরোপে থালেস থেকে শুরু করে অ্যারিস্টটলের যুগ পর্যন্ত দর্শন বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যেও এই দুই দর্শনধারা আপসে মিলিত হয়ে সমগ্র বিশ্বেরই দর্শনধারার উৎসে পরিণত হয়েছিল, আর এই উভয় ধারার প্রতিনিধি হয়ে নব্য-প্লেটোনিক দর্শন যে কিভাবে নতুন প্রগতির পথ দেখিয়েছে…।’ বিকাশ পর্বের কিছুটা আগে দর্শনের উৎপত্তির সময়কে নির্দেশ করেছেন তিনি। এখানে ভারত-প্রসঙ্গ বিবেচনা করলে লক্ষ করা যায়, দর্শনের বিকাশের একটি অবলম্বন হিসেবে হয়তো মনীষী রাহুল সাংকৃত্যায়ন উপনিষদকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমরা যদি উপনিষদকে সাহিত্যের মাপকাঠিতে বিচার করি তাহলে? উপনিষদ নিঃসন্দেহে কাব্যসুষমাম-িত রচনা। সে সূত্রে বিবেচনা করলে জন্ম-বিকাশ-সূত্রেই দর্শন ও সাহিত্যের পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে আছে।

কাছাকাছি সময়ের রচনা গীতা—শ্রীমদ্ভাগবদগীতা। জীবন-জগৎ সম্পর্কে গভীর অনুধ্যান-অভিজ্ঞান-দর্শন সমৃদ্ধ গ্রন্থ গীতা। মহাভারতের কাহিনিতে অর্জুনকে কৃষ্ণ জীবন সম্পর্কে যে উপদেশ প্রদান করেছিলেন তাই গীতা। কিন্তু গীতা কি ক্লাসিক সাহিত্যের সমপর্যায়ভুক্ত নয়? অন্যভাবে যদি দেখি, কালিদাসের মেঘদূতম। বিশ্বসাহিত্যেই যার স্থান। কিন্তু নারী-পুরুষ সম্পর্ক, প্রকৃতি ও জীবনের নিবিড়তা কিংবা অব্যক্ত অনুভূতি প্রসঙ্গে গভীর দার্শনিক বোধ প্রকাশ করে মেঘদূতম। তাহলে এই গ্রন্থের যে বিশ্ববিস্তারী গুরুত্ব তা-কি সাহিত্যের নিপুণ কলাকৌশলের জন্য, না-কি তার দর্শনিক উপলব্ধির জন্য—এমন প্রশ্ন করা যেতেই পারে।

এবার বাংলা সাহিত্যের কথায় আসি—আদিকালের শুরুতে চর্যাপদগুলো লেখা হচ্ছে কী কারণে? এখন পর্যন্ত গবেষকরা যা বলছেন তাতে বিশ্বাস করতেই হবে সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে চর্যাপদ রচিত হয়নি। ধর্মদর্শন প্রকাশই পদকর্তাদের উদ্দেশ্য ছিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহার তৃতীয় সংস্করণের (পুনর্মুদ্রণ : মাঘ ১৪১৯) ভূমিকায় পবিত্র সরকার জানাচ্ছেন, ‘চর্যাপদের লক্ষ খুব সরল,—নিজেদের দীক্ষিত গোষ্ঠীর মানুষদের এই উপধর্মের সুনির্দিষ্ট সাধনচর্যার সন্ধান দেওয়া, অন্যদের তার বাইরে রাখা।’ সে ধর্ম আসলে প্রান্তজনের ধর্ম। ফলে এ কথা বলা কি অযৌক্তিক হবে যে, চর্যাপদ আগে দর্শন তারপর সাহিত্য। তাহলে বাংলা সাহিত্য শুরু হচ্ছে দর্শনের সাহিত্য দিয়ে। জগত-জীবন আর কুশল শিল্পবিন্যাস সিদ্ধাচার্যদের দর্শনকে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করল। চর্যাপদ ছিল দিকদর্শক। সেই পথেই বাংলা সাহিত্য চলল হাজার বছর। তবে চর্যাপদে দর্শন যত তীব্র—স্পষ্ট, অন্যগুলোতে হয়তো তত নয়—কোথাও প্রত্যক্ষ, কোথাও বা রূপক-প্রতীকের আড়ালে দর্শন লুকিয়ে থাকে। কেন চর্যাকাররা সাহিত্যের আশ্রয় নিলেন? এর কারণ সবারই জানা, ভারতবর্ষে ধর্মদর্শন কিংবা শাস্ত্রকথা ছন্দোবদ্ধ-গীত আকারেই রচিত হতো। মধ্যযুগে সুফি দর্শন, বৈষ্ণব দর্শনের আধিপত্য সর্বজনবিদিত। মধ্যযুগের সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বৈষ্ণব দর্শন বা তত্ত্ব সাহিত্যের মোড়কে পরিবেশিত হচ্ছে। একই কথা বলতে হবে সুফিদের প্রসঙ্গেও। দর্শনের মাহাত্ম্য সাহিত্যের আঙ্গিকে রূপ নিতে গিয়ে তা হয়ে উঠছে হৃদয়গ্রাহী। তখন তা বিশেষ ধর্ম বা দর্শনের গ-িকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে সর্বজন আস্বাদ্য। যে কারণে, দেখা যায় বিশেষ ধর্ম বা দর্শনের অনুসারী না হয়েও সেই দর্শন ও সাহিত্যাঙ্গিক দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা সাহিত্যচর্চা করছেন। কী অসাধারণ কবি বৈষ্ণব পদকর্তারা, কিন্তু তাদের কবিতার অন্তর্নিহিত বক্তব্য তো শেষপর্যন্ত একটি দর্শনের কথাই বলে। এখানে উল্লেখ করতেই হবে বাউলদের গীতবাণীর কথা। নাথদের ধর্ম-দর্শন প্রকাশের মাধ্যমও সাহিত্য। নাথসাহিত্যই আমাদের এই ধর্ম-দর্শনের কথা জানিয়ে দেয়।

এবার মূল কথাটা একটু সরল করে বুঝে নিতে চাই, একপক্ষ সাহিত্যসৃষ্টি করতে গিয়ে দর্শনের সহায়তা নিচ্ছেন অথবা শিল্পীর অজ্ঞাতেই অবলীলায় তাঁর বোধ-বিশ্বাসের অংশ হিসেবে সাহিত্যে দর্শনের বা দর্শনের কোনো প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটছে। লেখকের দিক থেকে বিচার করলে, এখানে সাহিত্য মুখ্য আর দর্শন গৌণ। অন্যপক্ষ আসলে দর্শনচর্চা করছেন। জীবন-জগতের নানা প্রসঙ্গে তাঁদের বিশ্বাসকে ব্যক্ত করতে গিয়ে সাহিত্যের আশ্রয় নিচ্ছেন। অথবা তাঁরা যেভাবে তাঁদের দর্শনকে প্রকাশ করছেন—কৌশলগত চারুতার জন্যেই দর্শন তখন সাহিত্যে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ দর্শন ও সাহিত্যের একটা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে। বোঝার কিছু ত্রুটি তৈরি হবার সম্ভাবনা এখানে তৈরি হতে পারে, বিষয়টি এমন নয় যে, সাহিত্য মানেই দর্শন-সংশ্লিষ্ট কিংবা সমৃদ্ধ। অথবা সব দার্শনিক গ্রন্থই উৎকৃষ্ট সাহিত্য। অবশ্য এখানে একটা মান বিচারের প্রসঙ্গ থাকে সব সাহিত্যই যেমন সাহিত্য নয় আবার সব দর্শনই অনুসরণীয় নয়।

বৈষ্ণব কবিতার কথা বিবেচনা করতে গেলেই মনে পড়তে পারে ওমর খৈয়ামের কথা। জীবনের প্রতি কী গভীর বিশ্বাস খৈয়ামের! কখনো কি মনে হয় খৈয়াম কোনো স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু কি অস্বাভাবিক তাঁর রুবাইগুলো। জীবন সম্পর্কে অনুভবের, জীবনের প্রতি দুর্মর আকর্ষণের কী অনবদ্য প্রকাশ। তাঁর সময়ে খৈয়াম একজন জ্ঞানী-প-িত মানুষ ছিলেন, বিরোধিতা ছিল কিন্তু সর্বজনমান্যতাও অর্জন করেছিলেন। একজন ধ্যানী মানুষের মত তিনি বলেছেন জীবন সম্পর্কে তাঁর দর্শনের কথা :

কাল কি হবে কেউ জানে না, দেখেছ ত, হায়, বন্ধু মোর!

নগদ মধু লুঠ করে লও, মোছ মোছ অশ্রুলোর।

কিংবা স্মরণ করা যেতে পারে :

কারুর প্রাণে দুখ দিও না, করো বরং হাজার পাপ,

পরের মনে শান্তি নাশি বাড়িও না তার মনস্তাপ।

অথবা,

ছেড়ে দে তুই নীরস বাজে দর্শন শাস্ত্রপাঠ,

তার চেয়ে তুই দর্শন কর প্রিয়ার বিনোদ বেণীর ঠাট;

জীবন সম্পর্কে উপলব্ধিই তাঁকে মাতাল করেছিল, মদ খেয়ে মাতাল তিনি হতেন কি-না তাতে সন্দেহ আছে অনেকের। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ওমরের রুবাইয়াতের সবচেয়ে বড় জিনিস ওর প্রকাশের ভঙ্গি বা ঢং।’ জগৎ-জীবন বিষয়ে প্রগাঢ় উপলব্ধি প্রকাশের এই ‘ঢং’ই ওমর খৈয়ামকে উৎকৃষ্ট সাহিত্যিকের মর্যাদা দিয়েছে। জীবন সম্পর্কে এই বিশেষ বোধ দেশ-বিদেশের মানুষকে নানাভাবে আকৃষ্ট করছে। ফলে নানা ভাষাভাষী মানুষ তাঁর রুবাই অনুবাদ করছে। সঙ্গে তাঁর পরিবেশন রীতিকেও গ্রহণ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের মত মহান কবিও বিমোহিত হয়েছেন ওমর খৈয়ামের জীবনদর্শনে আর আর আকৃষ্ট হয়েছেন রুবাইগুলোর অন্তর্গত কাব্যসৌন্দর্যে।

বিল ময়ার্সের সঙ্গে মিথ সম্পর্কে জোসেফ ক্যাম্পবেলের কথোপকথনের গ্রন্থরূপ ঞযব চড়বিৎ ড়ভ গুঃয (মিথের শক্তি, অনুবাদক : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস)-এ জীবন-পরিচালনা এবং জীবনের নানা অনুষঙ্গের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মিথকেই সহায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ক্যাম্পবেল। তাঁর বক্তব্যে মনেই হয়ে আমরা মিথের রাজ্যেই বসবাস করি। মিথও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো দর্শনকে প্রকাশ করে। ফলে সেই বিবেচনায় আমরা আসলে দর্শনের জগতেই বসবাস করি। ফলে ব্যক্তিগত জীবন, সমষ্টি জীবন সর্বত্রই থাকে দর্শনের প্রভাব। প্রাজ্ঞ মানুষ তাঁর জীবনজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে দর্শনের মুখোমুখি হন। তবে খুব বিস্তৃত করে ভাবলে প্রত্যেক মানুষেরই জীবন সম্পর্কে একটি ধারণা থাকে, থাকে উদ্দেশ্য—যা তাকে পরিচালনা করে। এইটি হতে পারে তার দর্শন। অন্য কেউ তা জানতে পারে, না-ও পারে; মানতে পারে না-ও পারে। দর্শনের একটা সর্ববিস্তারী প্রবণতা আছে এবং তা অবারিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তাই ব্যক্তিগত এবং সমষ্টি জীবন থেকে শুরু করে সর্বত্রই দর্শনের প্রতিফলন ঘটতে পারে। আর এই জীবন নিয়েই তো সাহিত্য।

বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ আরজ আলী মাতুব্বর। সাধারণ কৃষক কিন্তু জ্ঞানে, পঠন-পাঠনে আর জীবনাভিজ্ঞতায় ছিলেন অনন্য। ব্যক্তিগত জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর দুর্বহ বেদনা থেকে জীবন ও জগতকে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। অনেক কষ্ট স্বীকার করে স্বশিক্ষিত হয়েছেন। তাঁর মনে জন্ম নেয়া নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লিখেছেন সত্যের সন্ধান ও সৃষ্টি-রহস্যের মত গ্রন্থ। বাঙালি পাঠকের চিন্তা ও বিশ্বাসের জগতে কুঠারাঘাত করল তাঁর এই সব গ্রন্থ। আরজ আলী মাতুব্বরকে আমরা সাহিত্যিক বলব—বললেও হয়তো বলা যায় কিন্তু তিনি দার্শনিক তো বটেই। যুক্তিবাদী দৃষ্টি দিয়ে তিনি পৃথিবীকে দেখেছেন, মানুষের অন্ধত্ব ঘোচানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের প্রান্তবাসী মানুষ হয়েও দার্শনিক প্রজ্ঞায় শিক্ষিত, আত্মগর্বী মানুষের ভাবনার জগতকে তিনি নাড়া দিয়েছেন।

স্মরণ করতে হবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র চাঁদের অমাবস্যার কথা। এখানে পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদী দর্শন নিপুণভাবে রূপ নিয়েছে উপন্যাসে। এখানে যুবক শিক্ষক আরেফ আলী একটি ঘোরতর ঘটনার ব্যাপারে দ্বিধাসংশয় কাটিয়ে পরি¯্রুত মানসিকতায় উত্তীর্ণ হয়। ব্যক্তিগত প্রভূত ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও আত্মপীড়ন ও দোদুল্যমানতা থেকে আরেফ আলী মুক্তির প্রত্যাশা করে। দায়বোধ তাকে তাড়িত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে। শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাঁর এই সদর্থক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আরেফ আলী অস্তিত্ববান হয়ে ওঠে। কিন্তু কোন দায়বোধের তাড়না সে অনুভব করে, সেটা কি ব্যক্তিগত দায়বোধ না সামাজিক দায়বোধ? এটা এক ধরনের সামাজিক দায়। কারণ আমরা জানি, সংকটাপন্ন মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে সমাজের সকলের পক্ষ থেকে সকলের মঙ্গলার্থেই তা গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে আরো উল্লেখ করা যায় শ্রাবন্তী ভৌমিকের কথা; বুদ্ধিজীবীর নোটবই গ্রন্থে একজিস্টেনসিয়ালিজম প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ‘একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত সমস্ত মানুষের পক্ষ থেকে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। যা সে নিজের জীবনে ঘটায়, তা স্পর্শ করে অন্যের জীবনকেও। অন্য একজন যে-কাজ করে, সে দায়িত্বও বর্তায় তার ওপর। এইভাবে নৈরাশ্যময়তা কাটিয়ে ব্যক্তি-মানুষের সঙ্গে সমাজের ঐক্যের কথা বলেন সার্ত্র।’ আরেফ আলী যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা আসলে তার সামাজিক সত্তারই সিদ্ধান্ত। কারণ সে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামগ্রিক কল্যাণকেই প্রাধান্য দিয়েছে। অর্থাৎ অস্তিত্ববাদী দর্শনের নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে চাঁদের অমাবস্যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচনাবলীর সম্পাদক সৈয়দ আকরম হোসেন জানিয়েছেন, ‘কামু-সার্ত্রের দর্শন স্বাভাবিকভাবে ওয়ালীউল্লাহ্কেও করেছিল প্রভাবিত। তাঁর এ-পর্বে রচিত উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪) ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮) তে সমকালীন ফরাসি-দর্শনের এবং কামু-সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের প্রভাব লক্ষণীয়।’ কোপন নদীর ধারের ছোট্ট চাঁদপারা গাঁয়ের আরেফ আলীর জীবনের এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে অসাধারণভাবে প্রবেশ করছে বহির্বিশ্বের দর্শন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যেমন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামজীবনের বাস্তবতার শিকড় ও স্পন্দনকে অনুভব করেছিলেন ঠিক একইভাবে আধুনিক ও প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে অস্তিত্ববাদে আস্থা স্থাপন রেখেছিলেন। সৌভিক রেজা ‘চাঁদের অমাবস্যা : ভিন্ন-এক অবলোকন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘এবং তিনি আর যা-ই হোক, ‘অস্তিত্ববাদ’-কে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে গ্রহণ করেননি।’ ফলে উপন্যাসটি দর্শন ও সাহিত্যের যুগলবন্দিতে পরিণত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি—মহাকবি কিন্তু তিনি কি দার্শনিক নন? এই প্রশ্নের ফয়সালা হয়েছে বহুকাল আগেই। এমন কবি বিশ্বসাহিত্যেই কম আছে যিনি প্রায় শুরু থেকেই কবিসত্তার সঙ্গে দর্শনকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। দিন যত গেছে, সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ একীভূত হয়ে উঠেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব দর্শনকে তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন শিল্পিত করেছেন, তেমনি আবার অন্য দর্শনকেও অবলীলায় সাহিত্যে ঠাঁই দিয়েছেন। তবে অবশ্যই তা নিজের মত করে। বের্গসঁর গতিতত্ত্বকে তিনি দার্শনিক ভিত্তি দিয়ে দেন তাঁর কাব্যে। বাউল দর্শনকে তাঁর গীতবাণীতে আনায়াসে ব্যবহার করেন তিনি। এমন অনেক উদাহরণই দেয়া যাবে তাঁর কাব্য ও গদ্যসাহিত্য থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তিম দশ বছরের কাব্য নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। যেখানে তাঁর কবিতা কবিতাকে অতিক্রম করে অন্য এক উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছে—এখানে কবিতার কলা-কৌশলের চেয়ে সেই উপলব্ধিটাই বড় হয়ে উঠেছে। এই উপলব্ধিই স্পর্শ করে দর্শনিক বোধকে। তাই শেষ পর্যায়ের রবীন্দ্রনাথকে আমরা দার্শনিক হিসেবেও উপলব্ধি করি, কখনো কখনো ‘ঋষি’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেও উৎসাহি হই। আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে ‘অন্তিম পর্বের দুটি কবিতা’ আলোচনাংশে আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেছেন, ‘বেদ-উপনিষদের, বাইবেলের, রুমির মস্নবীর, হাফিজের গজলের শ্রেষ্ঠ অংশ যেমন শুদ্ধ কবিতা হ’য়েও শুধু কবিতা নয়, রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের রচনার শ্রেষ্ঠ ভাগও তেমনি কবিতার চেয়ে বেশি হ’য়েও কবিতার চেয়ে কম নয়।’ এখানে ‘শুদ্ধ কবিতা হ’য়েও শুধু কবিতা নয়’ কিংবা ‘কবিতার চেয়ে বেশি হ’য়েও কবিতার চেয়ে কম নয়’ এই দুটি বক্তব্য নিদের্শ করে যে, এই পর্বের কবিতা, কবিতা হয়েও অন্য কোনো দিগন্তকে স্পর্শ করে। তা আসলে কী বা কোথায় সেটি বুঝতে কষ্ট হয় না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মহত্তম কবি যেমন তেমনি দার্শনিকও বটে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞানকে আমাদের চেতনালোকে সঞ্চার করে রবীন্দ্রসাহিত্য।

কী দিয়ে সাহিত্য দেশ-কাল অতিক্রম করে? এমন কথা আমরা অহরহই ভাবি। বিশেষ করে উপন্যাসের শিল্পত্ব নিয়ে কথা বলার সময় এই প্রসঙ্গটি বারবারই ঘুরে ফিরে আসে। আমরা যখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি তখন বলি, উপন্যাসে জীবন সম্পর্কে কোনো মহাবাণী পরিবেশিত হয়, জীবনবেদ প্রচারিত হতে হয়, স্থান ও কালাতিক্রমী কোনো বক্তব্য থাকতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ উপন্যাসটির কাহিনি, চরিত্র ইত্যাদি নিংড়ে যা পাওয়া যায়, তা সব সময়ের সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য কি-না, তাই উপন্যাসটির তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধরা যাক হেমিংওয়ের ঞযব ঙষফ গধহ ধহফ ঃযব ঝবধ-এর কথা। গত শতাব্দীর মধ্য সময়ে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি সারা বিশ্বে এই উপন্যাসকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, কেন? এর উত্তর তো একই। উপন্যাস সম্পর্কে এই কথাগুলো আসলে কীসের ইঙ্গিত করে  তা অনুমান করতে আমাদের কষ্ট হয় না। ফলে সাহিত্যের ক্লাসিক মর্যাদা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দর্শনের ভূমিকার কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। দর্শনের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কথা প্রযোজ্য। কারণ দর্শনও সাহিত্যাঙ্গিককে আশ্রয় করে জনমানুষের ভেতরে প্রবেশের অনায়াস সুযোগ করে নেয়। দর্শনের তাত্ত্বিক রূপ প্রাজ্ঞজনই অনুধাবনে সমর্থ হয় মাত্র। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দর্শনের নির্যাস সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরেই থেকে যায়। সাহিত্য সেই ঘাটতিটার অনেকাংশই পূরণ করে বলেই মনে হয়। অন্য দিকে কোনো দর্শনও কখনো কখনো দার্শনিকের উপস্থাপন কৌশলের কারণে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ থেকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের আরেকটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি, ‘গদ্য দরকার পড়লে কাব্যধর্মী হয়ে ওঠে—যেমন উপনিষদে; প্লেটো আর বের্গসঁর দর্শনে; গিবন আর মম্সনের ইতিহাসে; তুর্গেনেব্, লরেন্স আর জয়েসের উপন্যাসে; মোপাসাঁ আর রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে।’ অর্থাৎ অনেক সময়ই দর্শনও সাহিত্যকে নিজের ঘরবাড়ি বানিয়ে নেয়। আসলে সাহিত্য ও দর্শনের সম্পর্ক যথেষ্ট নিবিড়, প্রায় অচ্ছেদ্য বললেও বোধ হয় খুব বেশি বলা হয় না।

******************************************************

খোরশেদ আলম
সাহিত্যে দর্শন, দর্শনে সাহিত্য
চিহ্ন থেকে এই শিরোনামের লেখাটি লিখতে অনুরুদ্ধ হয়েছিলাম। তবে বেশ খানিকটা ঝাঁকুনি খেয়েছিলাম এজন্য যে, দর্শন এক জটিল বিষয়। দার্শনিক রচনা সাহিত্য পদবাচ্য হতে পারে কিন্তু সাহিত্য দর্শন নয়। কেননা দর্শন বিশেষ শাস্ত্রের নাম স্বয়ং যা এক পদ্ধতি, কোনো পরিণতি নয়। সাহিত্য স্বয়ং সম্পূর্ণ, তার পরিণতি সে নিজেই। একথা সত্য—সাহিত্য ও দর্শন পরস্পর-বিরুদ্ধ নয় আবার নিকট-আত্মীয়ও নয়। অন্তত শাস্ত্রীয় বিবেচনায় উভয়ের মধ্যে পার্থক্য যথেষ্ট। জ্ঞানীজন বলেন, প্রত্যেক সাহিত্যকর্মেরই একটা দর্শন থাকে। আবার দর্শন হতে পারে দেখা বা ‘প্রত্যক্ষণ’। সে-অনুযায়ী লেখক একজন পর্যবেক্ষক। এ-নেহায়েৎ-ই শব্দার্থের জটিলতা। প্রথমত আমরা মেনে নিচ্ছি যে, দর্শন তথা দার্শনিক অনুভব সাহিত্যে অন্তস্থ-প্রবাহিনী। রবীন্দ্রনাথের মতে, প্রত্যেক মানুষই সৃজনশীল। সে-অর্থে মানুষ স্বভাবশিল্পী। আবার দার্শনিকরাও বলেন, জীবনের মৌলিক বিষয়ে প্রশ্ন তোলাও দার্শনিকতা। যেমন, কীভাবে পৃথিবীতে এলাম? কী হবে মৃত্যুতে? এই কী জবাবের রহস্য-কিনারা করতে না-পারা মানুষ প্রত্যেকেই ভাবুক, প্রত্যেকেই দার্শনিক। কিন্তু আধুনিকতা প্রত্যেকটি সাবজেক্ট-ম্যাটারের ওপর এক একটি লেবেল এঁটে দেয় তথা নামজারী করে। ফলে সৃজন-অনুভব-চিন্তন যে-প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন এর উত্তরাধুনিক অধ্যাত্ম মূল্য থাকলেও প্রত্যেকটি বিষয় আধুনিকভাবে আলাদা। যে-কারণে সাহিত্যের সঙ্গেও দর্শনের হাজারটা ঐক্য থাকার পরেও নীতিশাস্ত্রীয় অর্থেই তা স্বতন্ত্র। সর্ববাদী সম্মত সত্য কীনা জানি না, সাহিত্যের কাজ মোটেও ‘দার্শনিক সত্য’ প্রতিষ্ঠা করা নয়।

সাহিত্যে দর্শন চিন্তায় এখন সাহিত্যকে না-হয় জগত-জীবন কেন্দ্রীভূত কোনো অর্থবাচকতা তৈরির মাধ্যমে দার্শনিক চিন্তন-অভিজ্ঞায় সিক্ত করা গেল, দর্শনের সাহিত্যের কী গতিক? দর্শন যদি লেখকের পর্যক্ষেণ না হয় (শাব্দিক অর্থে) তাহলে ‘দর্শনের সাহিত্য’ বলতে দার্শনিক তত্ত্ব-উদ্ভূত সাহিত্যকর্মকে বুঝব কি? নাকি খোদ সাহিত্যে কোনো দার্শনশাস্ত্র সিদ্ধ দর্শন-উপচ্ছায়া পড়েছে তা বুঝব? বিষয়গুলোর গোলমাল থেকেই নানারকম চিন্তা-প্রক্রিয়া মাথা গ-োগোল করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। তবুও চিন্তার পরত খুলে অস্বচ্ছতা থেকে কিছুটা স্বচ্ছ দুনিয়ায় আসা যায় কীনা সে-ই অভিপ্রায় বর্তমান লেখকের। এরপরও যদি কোনো দায় থাকে তবে তা শিরোনামের।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের ধর্মকে বলেছিলেন, ‘দ্য রিলিজিয়ন অব আর্টিস্ট’ তথা শিল্পীর ধর্ম। সৌন্দর্যের সঙ্গে সত্য আবিষ্কার তাঁর আরেকটি শিল্পচৈতন্য। বলাবাহুল্য, এই সত্য একধরনের দার্শনিক অভিধা। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, নজরুল-জীবনানন্দ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কীটস-কোলরিজ যে-কারো সাহিত্যে দার্শনিকতা থাকা সম্ভব। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘একদমই সম্ভব না বলার থেকে এটা বলা ভালো যে, দর্শন ছাড়া কখনোই মহৎ সাহিত্য সম্ভব না। সাহিত্যকে গভীর করতে হলে অবশ্যই সেখানে দর্শন থাকতে হবে। পৃথিবীর এমন কোনো মহৎ সাহিত্য নেই যেখানে দর্শন নেই।’ একথার সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ সীমিত। তবে তা লেখকের দিক থেকে, না পাঠকের দিক থেকেও, সেটাও পরিস্কার করার দায় থেকে যায়। কারণ রবীন্দ্রনাথ থেকে কোলরিজ যেই হোন না কেন লেখক-চৈতন্যের জায়গা থেকে প্রত্যেকেই দার্শনিক। হয়ত শাস্ত্রীয় দার্শনিক নন। কারণ দর্শনের সঙ্গে ইতোমধ্যে সাহিত্যের শাস্ত্রীয় ব্যবচ্ছেদটি ঘটে গেছে।

এখন এই শাস্ত্রীয় পার্থক্য রেখে অনুভব ও আদর্শিক অবস্থানে একজন লেখককে বিচার করাই সাহিত্যের দর্শন হতে পারে। আবার পাঠকের পক্ষ থেকে সেই সাহিত্যকে গ্রহণ করার টীকাভাষ্য রচয়িতার দ্বারস্থ পাঠককে মাত্রই সহজেই রাবীন্দ্রিক-নজরুলীয় কি জীবনানন্দীয় দর্শনকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয় না। যদিও উত্তরাধুনিক টেক্সট ও রিডিং-এর প্লুরাল অর্থ পাঠককে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখিন করতে পারে। সে-সবই সাহিত্য তৈরি বা সাহিত্য-আস্বাদের জন্য বাস্তব ঘটনা। যদিও এই বাস্তবতাটি কল্পনা-প্রসূত কখনো অভিজ্ঞতাজাত। কখনো তা কল্পনা ও অভিজ্ঞতা বা প্রত্যক্ষণের মিলিত প্রক্রিয়া। হাসান আজিজুল হক তাঁর সাহিত্যচিন্তা প্রকাশে বারবারই এই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এই অভিজ্ঞতা কখনো নিরেট কল্পনা থেকেও আসতে পারে। যেমন নি¤œবর্গের জীবন নিয়ে লেখা কোনো রচনায় পাঠক সরাসরি এই অভিজ্ঞতার শিকার হতে পারেন। আবার সৃজনশীল কল্পনার সঙ্গে নিজেকে সমীকৃত ভাবতে পারেন। এমনকি যে-নি¤œবর্গ নিয়ে সাহিত্যিক কথা বলছেন, সেই নি¤œবর্গই হয়তো ও-ভাবে জীবনকে দেখেনি যেভাবে সাহিত্যিক তাকে তুলে ধরেছেন। এমনকি পাঠকও ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার জালে তাকে বন্দি করছেন। এই বিষয়গুলো একান্তই মনস্তাত্ত্বিক, এক অর্থে দার্শনিক।

সাহিত্যের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যক্তির ইন্দ্রিয়-অনুভূতির মধ্য দিয়ে চৈতন্যকে জাগিয়ে তোলা। সাহিত্য একধরনের সৃজন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়—সেকথা রবীন্দ্রনাথ না বললেও আমরা হয়ত সহজাত চিন্তার আলোকে বুঝতে পারতাম। ব্যক্তির সত্তা থেকেই তৈরি হয় একটি স্বাধীন চৈতন্য-জগৎ। নৈতিকতা এখানে সাহিত্যের শিল্প হিসেবে গৌণ। লেখক কতটা মনোজাগতিকভাবে পাঠকে অনুপ্রবেশ করতে পারছেন এবং কতটা পারঙ্গমতার সঙ্গে সেটাই শিল্প-প্রকৌশল বা সাহিত্যিক প্রক্রিয়া, এমনকি সাহিত্য হবারও ফল। এর সঙ্গে নীতিশাস্ত্রীয় নৈতিকতার দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায় সাহিত্যের জন্য ততই মঙ্গল। এই নৈতিকতার সংজ্ঞার্থ নির্মিত হয় কোনো মতাদর্শিক পাটাতন থেকে। সাহিত্য এই বিষয়টির ঘোর বিরোধী। কারণ সাহিত্য বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে না। যে সাহিত্য যত বেশি শ্রেণিচ্যুতি ঘটাতে সক্ষম তা তত বেশি মহৎ। এ-প্রসঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ কিংবা শহীদুল জহীরের সাহিত্য স্মরণ করা যেতে পারে।

রবীন্দ্র-অর্থে সত্য আবিষ্কার সাহিত্যের কাজ। আবার এই সত্য আবিষ্কার দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক যেভাবেই হোক না কেন সাহিত্যের সঙ্গে তার বিরোধ আছে। দ্য আর্ট অব নভেল নামক বইতে মিলান কুন্ডেরা ‘ডিজঅনেস্ট লিটারেচার’ বলে একটি টার্ম ব্যবহার করেছেন। প্রথমে মনে হতে পারে তিনি বোধ হয় সাহিত্যের কোনো নৈতিক মানদ- দাঁড় করাতে চান। কিন্তু তিনি আসলে সাহিত্যে একধরনের সত্য আবিষ্কারের কথা বলেন। এই সত্য কিন্তু দার্শনিক ‘সত্য’ না। এই সত্য নতুন কিছু আবিষ্কারের বিষয়। অক্টাভিও পাজ বলেন, ‘প্রত্যেক কবিরই জন্ম হয় নিজস্ব কিছু বলবার জন্য।’ এই নিজস্ব কিছু বলার মধ্য দিয়ে সে অক্টাভিও পরিভাষায় ‘রিফিউজাল অব এ্যানচেস্টর’ তথা পূর্বজদের অস্বীকার করে। এই অস্বীকার ঠিক অকৃতজ্ঞতা নয়, নতুন কিছু সৃষ্টি-প্রণোদনা। তাই বলে নতুন বোতলে পুরনো মদ পূর্তিও নয়, শৈলীগত কারণে বিশিষ্টতা-অর্জন।

কথাসাহিত্যের বেলায় বলতে হয়—কীভাবে জীবনকে সাহিত্যে ব্যবহার করতে হবে? হুবহু জীবনতে তুলে আনা সাংবাদিকতা, সাহিত্য নয়। আবার নিছক কল্পনা-রঙে ফানুস ওড়ানোও সাহিত্য নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যেই শোনা যাক—গল্পে কল্পনা ও বাস্তবতা নিয়ে তিনি যা বলেন, ‘আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখনো ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।’ গল্পগুচ্ছে সংকলিত গল্প-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা-বর্ণন সে-বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাহিত্য-কথনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাঁর দ্বিমত হয়েছে, তবু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছিলেন, ‘পোস্ট মাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’ উইলিয়াম ফকনারও একই কথা বলেন, ‘রোজ ফর এমিলি’ নামক গল্প সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য, ‘গল্পটা কল্পনা থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা চারপাশে বিরাজমান। গল্পটা নতুন কোনো বাস্তবতার আবিষ্কারক নয়। তরুণিরা কাউকে ভালবাসার স্বপ্ন দেখে, সংসার চায়, সন্তান চায়—এটা মোটেও আমার আবিষ্কার না। তবে তার ট্রাজিক পরিণতি আমার তৈরি করা।’ বলাবাহুল্য এখানেই লেখকের শিল্প-প্রক্রিয়ার সফলতা। এভাবে গল্পটা পাঠকের হয়ে ওঠে।

দার্শনিক দেকার্ত বলেন, ‘আমাদের অন্তর্গত ধারণাসমূহ আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।’ দর্শনের এই অভিজ্ঞতা বা এক্সপেরিয়েন্সের সঙ্গে সাহিত্যের পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক দর্শনের ভিত্তি ‘রিজন’ আর সাহিত্যের ভিত্তি চৈতন্য। ‘এপিস্টমোলজি’ বা জ্ঞান অথবা জ্ঞানের ধারাবাহিক ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কচ্যুতি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। ১৯৫৮ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান ফিকশনের ক্লাসে ফকনার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমার মতে তুমি যাই অনুধাবন করতে পারো তা-ই অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এটা এমন বই এমন গল্প এবং এমন জীবন্ত যা তোমাকেও নাড়িয়ে দেয়।’ কাজেই সাহিত্যের দর্শনটা আলাদাই। কিন্তু দর্শন-শাস্ত্র সাহিত্য বা শিল্পকে তার শাস্ত্রীয় কাঠামোর আলোয় এনে বিচার করতে চেয়েছে বারবার।

ইমানুয়েল কান্ট, ফিকটে ও হেগেলের মতো বড় বড় দার্শনিক শিল্পকলা নিয়ে মতবাদ হাজির করেছেন। কান্টের নন্দন তাত্ত্বিক ধারণা—ক্রিটিক অব জাজমেন্ট নামক গ্রন্থে সৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা রুচি সংক্রান্ত যেসব অবধারণ করি সেগুলো সুন্দর ও অসুন্দরের পার্থক্য নির্দেশ করে। স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এসব অবধারণ যৌক্তিক বা বস্তুনিষ্ঠ নয়। এসব আমাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে না। আবার কোনো কিছু সম্পর্কে আমরা যেসব নৈতিক বিচার করি সেগুলোর সঙ্গেও এদের কোনো সংশ্রব নেই।’  অবশ্য ‘শিল্পকলা ও শিল্পী’ নামক অন্য একটি অধ্যায়ে কান্টের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন ‘যথার্থ কলার সঙ্গে বিশেষ উদ্দেশ্যের কোনো যোগ নেই। কলার এই দিকটি সংরক্ষণ করাতেই শিল্পীর প্রতিভা নিহিত।’ (আমিনুল ইসলাম, আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন)

কান্টের মতো ফিকটেও মনে করেন, সুন্দর বস্তু ‘উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্যবাদী’। অপ্রত্যাশিত হয়েও শিল্প আমাদের বাসনা পূরণ করে। শৈল্পিক সৃজনশীলতা নিজের জন্য কোনো লক্ষ্যের ব্যবস্থা করে না; কিন্তু তা আকাক্সক্ষার স্বাধীন উদ্দেশ্যকে পূরণ করে। তবুও তাঁর মতবাদে শিল্পীর ব্যক্তিচরিত্র প্রাধান্য পায়। যে-শিল্পী সমাজ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র নান্দনিক অনুভূতিতে পাড় মাতাল হয়ে আছেন তার সৃষ্টিকে তিনি নৈতিক সাহিত্য বলতে চাননি। অন্যদিকে হেগেল পুরো সাহিত্য-প্রক্রিয়াকেই ধর্মের প্রতিনয় ভাবতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে, ‘বিষয়ীর মাধ্যমে বিষয়ের স্বাধীন সৃষ্টির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে গিয়ে কলা শুধু পরমাত্মার ক্রিয়াপরতাই ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।’ হেগেল তাঁর নন্দনশাস্ত্র ভাবনায় প্রাচ্য, ধ্রুপদী, খ্রিস্টীয়, রোমান, গথিক নানা শিল্পকলা ও কাব্যের কথা ব্যক্ত করেন। সুচিন্তিত নানা মতামত প্রকাশ করেও তিনি সাহিত্যকে শেষ পর্যন্ত একটি উদ্দেশ্যবাদী ধরন রূপেই বিবেচনা করেছেন। যে-কারণে রোমান্টিক শিল্প সম্পর্কে ‘পরমাত্মা’, ‘বিষয়গত চিদাত্মা’ ও ‘বিষয়ী চিদাত্মা’র ব্যর্থ-সমন্বয়ের কথা তিনি তুলে ধরেন।

আমাদের বিবেচনায় প্রকৃত সাহিত্য কোনো মতবাদের ধার ধারে না। ঔপন্যাসিক সুসান সোনট্যাগ সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘একজন সিরিয়াস লেখক নিজের ছাড়া কারো মুখপাত্র নন।’ (‘প্যারিস রিভিউ’)। মিলান কুন্ডেরার অবশ্য ভিন্ন মত, ‘ঔপন্যাসিক কারো মুখপাত্র নন। এমন নিজের ভাবনারও মুখপাত্র নন।’ (দ্য আর্ট অব নভেল)। বস্তুত রাইটিং একটি স্বনিয়ন্ত্রিত শক্তি অর্জন করে। এই নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় শিল্পীর বা লেখকের হাতেও থাকে না। তবে শিল্পীভেদে সাহিত্যকরন-প্রক্রিয়ার পার্থক্যও থাকতে পারে। এই একেকটি পার্থক্যও সৃজনশীলতার একেকটি মাত্রা। পৃথিবীতে বহু ধরনের লেখক থাকেন। যেমন: কারো কারো ক্ষেত্রে আখ্যানটা আগেই তৈরি থাকে কেবল তিনি তাকে শিল্পিত ভাষিক রূপ দান করেন। কারো ভাবনা-পথ কাহিনি ও চরিত্রকে আস্তে আস্তে তৈরি করে নেয়। বায়বীয় চরিত্রগুলো বাস্তবের চরিত্রের পথনির্দেশক হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাউন্ট লিয়েফ তলস্তয় প্রথম ধারার, হারুকি মুরাকামি দ্বিতীয় ধারার। কাফকার মতো লেখকরা কেবলমাত্র ঘটনার অবভাস তৈরি করে ছেড়ে দেন, বাদবাকি নির্মাণ পাঠকের।

অবক্ষয়ী আধুনিকতা বাদ দিলে পুরো ধ্রুপদী-রোমান্টিক আবহের মধ্যে সাহিত্যকে মহত্তম উচ্চমূল্যে ধারণ করা হয়েছে। উত্তরাধুনিকতা সাহিত্যকে পরম জ্ঞানে গ্রহণ-বর্জন দুটোই করেছে। আধুনিকতায় সাহিত্যিক হয়ে উঠছিলেন কখনো জ্ঞানের কা-ারি, কখনো বিশুষ্ক সমাজ-বিচারক। কিন্তু এই ধারণাও কালে বদলে গেল। উত্তরাধুনিক বহুবিস্তারী মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য দাপট সাহিত্যের মৃত্যু ঘটাতে তৎপর হয়ে উঠল। জাতির বিবেকী মুখপাত্র রূপে পরিগণিত ডিকেন্স, দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, পামুক ব্যাপক সংখ্যক সাহিত্যিক আর গোটাসমাজের বিবেকী মুখপাত্র নন। কেননা মিডিয়ার প্রবল প্রতাপে এরমধ্যেই হলিউড বলিউড আর ডিজনিল্যান্ডের  ভৌতিক পরিসর মানুষের মনোজগত কেড়ে নিল। বিখ্যাত লেখক হোসে ওর্তেগা, জার্মান ভাবুক ভাল্টার বেনিয়ামিন, কথাশিল্পী হিসেবে রোলাঁবার্থ, গোর ভিদাল, জন বার্থ প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ লেখক উপন্যাসের সম্ভাব্য মুত্যু নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। এ-অবস্থায় সাহিত্যকে নতুন মোড় নিয়ে দাঁড়াতেই হল। কর্লোস ফুয়েন্তেস এই নতুন প্রক্রিয়ার নাম দিলেন ‘সার্বজনীন মানবিক বৈশিষ্ট্য’। যে-বৈশিষ্ট্যে সাহিত্য নতুনরূপে দাঁড়িয়ে যায়। এখানে ব্যক্তি নিজ আলোয় সাহিত্যকে চিনে নেবে। সাহিত্য সেই আলোরই যোগানদাতা। ভাল-মন্দের প্রচলিত মানদ-ের পরিবর্তে ভাল বা মন্দের এসেন্সকে সাহিত্য তুলে ধরবে। সৌন্দর্য ও কদর্য বিষয়ের উপস্থাপনায়ও একই নীতি অনুসৃত হবে।

তবে আগেই বলে নিয়েছি যে, সাহিত্য কোনো নীতিশাস্ত্রীয় মানদ- দ্বারা বিচার্য নয়। কারণ সাহিত্য দর্শনের চেয়েও সরল ও জীবনমুখি। দর্শনের জ্ঞান, জ্ঞানের ইতিহাস ও যুক্তির সিঁড়িকে উপেক্ষা করে সাহিত্য তরতর করে মানুষের মনোগহনে প্রবেশ করে। আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিক দর্শনশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ক্রমশ মানুষের জীবনকে জটিল-ভাবনা পুঞ্জের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যেখান থেকে সাহিত্যের মুক্তি প্রায় অসম্ভব। চিন্তা ও চিন্তন-প্রক্রিয়ার নতুনত্বের সঙ্গেও তাকে বারবার যুগপৎ পর্যুদস্ত ও খাপ খাওয়াতে হয়েছে। উনিশ শতকের বিধ্বংসী এক পৃথিবীর বাস্তবতা থেকে সাহিত্যকে বেছে নিতে হয়েছিল কখনো অ্যাবসার্ডিজম কখনো অস্তিত্ববাদ, মার্কসবাদ, নারীবাদ কিংবা মনোযোগ আকর্ষণী মনোবিশ্লেষণবাদ। তবে কীনা সাহিত্যে প-িত-অপ-িত, ভব্য-চাকুরিয়া কিংবা উঠতি মধ্যবিত্ত, চালচুলোহীন নি¤œবিত্ত সবারই সমান অধিকার। একথা স্মরণেও রেখেও আধুনিক-অধুনান্তিক সাহিত্যকে হতে হয়েছে কখনো কখনো মারাত্মকভাবে চিন্তাপ্রবণ। এই চিন্তাপ্রবণতা যতটা না সাহিত্যের শৈলীতে ততটাই দার্শনিক প্রশ্নে। এই প্রশ্ন একান্তই পাঠকের মনে তৈরি করে দেয়ার বিষয়। যাতে আবার পাঠক সাহিত্যচর্চা করতে করতেই পঠনের এক নিভৃত জগতে হারিয়ে পরমার্থিক চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে প্রকৃত বাস্তব ভুলতে না পারে।

তবে সাহিত্যের দার্শনিক প্রশ্ন অনেক আধুনিক-উত্তরাধুনিক সাহিত্যিকের কাছে গুরুত্ব পেলেও নিছক তত্ত্বের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ দাঁড়িয়েছেন। যেমন মিলান কুন্ডেরাই এর বড় প্রমাণ। তিনি শিল্পকে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ধারা প্রভাবিত পরবর্তীকালের সৃষ্টি বলে মানতে নারাজ। তিনি মনে করেন, উপন্যাস ফ্রয়েডের পূর্বেই ‘অচেতনতা’ নিয়ে কথা বলেছে, মার্ক্সের পূর্বেই শ্রেণিসংগ্রামের প্রসঙ্গে বলেছে, তাত্ত্বিকদের পূর্বেই তা ইন্দ্রিয় ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে ডিল করেছে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, ফ্রয়েড তাঁর ‘ইডিপাস কম্পেøক্স’-এর ধারণা পান সফোক্লিসের সাহিত্য পাঠ করে। কাজে কাজেই সাহিত্যিক একটা বিরাট সম্ভাবনাকে আগেই আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অন্যদিকে তত্ত্ব-দার্শনিকরা সেসব উপাদানকে দর্শনচর্চার অঙ্গীভূত করে সূত্রাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। ইবসেনের ডলস্ হাউসের নোরা চরিত্র নিজেই যথেষ্ট একজন প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বরকে ব্যক্ত করতে। তেমনি করে রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী, চিত্রাঙ্গদা, সোহিনী, মৃণাল প্রত্যেকটি চরিত্রকেই একেকটি উজ্জ্বল নারীমুক্তির কাঠামো বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে সাহিত্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণাই ছিল ‘সুপার পারসোনাল ম্যান’ বা ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান স্পিরিট’কে জাগিয়ে তোলা।

বাজারি সাহিত্যের তকমা আঁটা অনেকেই জনপ্রিয় বা পপ-লিট্রেচারের নাম করে সস্তা জিনিস খোঁজেন আতিপাতি করে। অনেকে মনেও করেন বিনোদন জগতে সিনেমা বা সঙ্গীতের ধারে কাছেও নেই সাহিত্যের ক্ষমতা। তাদেরকে পাওলো কোয়েলোর ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এর মতো স্বপ্নপ্রবণ রচনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে। তবে কীনা সস্তা সাহিত্যের বাজার ধরার ক্ষমতা বিস্ময়কর। একথা মেনেও বলা যেতে পারে, ভাল সাহিত্যের মানের কাছে বাজারটা আপনিই মার খায়। হেনরি ফিল্ডিং-এর ভাষায়, ‘অসৎ সঙ্গ শুধুমাত্র ব্যবহার নষ্ট করে। আর বাজে বই ব্যবহারের পাশাপাশি রুচিও নষ্ট করে দেয়।’ (‘অন রিডিং ফর এ্যামিউজমেন্ট’)। এমন রুচি নষ্টকারকের ভেষজ আজো আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসাশাস্ত্র মানুষের শরীরের ব্যাধি সারায় কিন্তু মনের ব্যাধি সারাতে ভাল পাঠের বিকল্প নেই। তাই বলে সাহিত্য আবার চিকিৎসাশাস্ত্র নয়। চিনুয়া আচেবের একটি উক্তি দিয়ে লেখাটি পরিসমাপ্ত করি।

‘প্রত্যেকে গল্প বোনে তাঁর নিজের জন্য—নিজের বেঁচে থাকাকে উপভোগ্য করে তুলতে। গল্পটা সত্য হোক মিথ্যে হোক, ভাল হোক মন্দ হোক—তার চোখ দিয়ে জগৎকে দেখবার অসম্ভব এক শক্তি নিয়ে হাজির হয়।’ (‘দ্য ট্রুথ অব ফিকশন’)

সাহিত্য তাই তাত্ত্বিক পদ্ধতি-কাঠামোর নতিজা নয়। অবশ্য একাডেমিক দর্শন একটি রীতিসিদ্ধ চিন্তন-পদ্ধতি। কাজেই একটা পার্টিকুলার সাহিত্য তা গদ্য-পদ্য যা-ই হোক না কেন তা (দর্শনশাস্ত্র অভিহিত) দর্শন নয়। আবার যাচ্ছে-তাই রকমের মনোভাব নিয়ে রচিত-পঠিত শব্দমালাও সাহিত্য নয়। নৈতিক বাধন-শাসন তার নেই, আছে কেবল ‘নিছক’ সৌন্দর্য সৃষ্টি। নিছক এজন্যই যে তা ‘উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্যবাদী’। তবে আদর্শবাদের ধোয়া তুলে সাহিত্য কখনোই মতাদর্শের খোঁয়াড়ে বন্দি করার জিনিসও নয়। সাহিত্য আপনি-উদ্ভূত, মানস-ক্রিয়ার সংযোগ-বিয়োগে নির্মিত ‘অপূর্ব নির্মাণবস্তু’ কলা, যা—সকলের হয়েও কারোরই নয়, মনের।

******************************************************

মাসুদ রহমান
লালন সাঁইয়ের সাহিত্যিক অভিজ্ঞান ও ভাবদর্শন
লোকায়ত ধর্ম মাত্রই দর্শন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ধর্মের তত্ত্ব-তথ্য, আচার-বিচার হতে অঞ্চল বিশেষে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভিতর দিয়ে কিংবা বিশেষ বিশ্বাসের লোকসাধকের পরম্পরায় যে ধর্ম বা জগৎজীবন বিষয়ক বিশ্বাস বা বিশিষ্ট ধর্মাচার গড়ে ওঠে, তা-ই লোকায়ত ধর্ম। প্রবলপ্রতিষ্ঠিত ধর্মধ্বজীরা সেসব ধর্মকে যেমন কোনো ধর্ম বলেই স্বীকার করে না, তেমনি উন্নাসিক দার্শনিকদের কেউ কেউ হয়তো সেগুলোকে খাঁটি দর্শন বলতেও নারাজ। তাই যদি লোকায়ত দর্শন বলে, একটু যেন নিম্নেতর শ্রেণিতে ফেলে দিয়ে এর দর্শনবৈশিষ্ট্য আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া যায়, তাহলে বোধ করি দার্শনিকগোষ্ঠির কেউ কেউ আপত্তি করবেন না। তা এই দৃষ্টিকোণে হলেও ফকির লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০) তথা বাউল সম্প্রদায়ের দর্শন নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা একদম কম হয়নি। এখনো সে আলোচনা যে চলমান তার ঐতিহাসিক মূল্য ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো রয়েছে। তবে আমাদের আজকের অনুসন্ধেয় শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক ও গীতিকার লালনের গানে তথা চিন্তা-চেতনায় যে দর্শন পাওয়া যায়, তার কতোটুকু দর্শনশাস্ত্রীয় প্রণালী-পথ বেয়ে আমাদের সামনে পৌঁছেছে।

দর্শন হচ্ছে, জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞান। বিস্ময়-সংশয়-সন্ধিৎসা-যুক্তি-বিচারের পথ ধরে এক অভিজ্ঞানে পৌঁছানো। বিজ্ঞান যেখানে তথ্য-প্রমাণের অভাবে নিশ্চুপ, দর্শন সেখানে যুক্তি-ধারণা নিয়ে মুখর। জগৎ-জীবনের সামান্য অংশই মানুষের অধীত, তাই বিজ্ঞানের অধিক্ষেত্রও সীমিত। কিন্তু দর্শনের চোখ অনেক; যথা: বিস্ময়, প্রশ্ন, সন্দেহ, চিন্তন প্রবণতা, যুক্তি-যাচাই, জ্ঞানানুরাগ, কল্যাণমুখিতা প্রভৃতি। এগুলোর সাহায্যে দর্শন দর্শনেন্দ্রিয়ের দিগন্ত সীমা ছাড়িয়ে অন্তহীন অসীমকেও দেখে নিতে চায়, ‘অজান খবর’ জানতে-জানাতে চায়।

লালন যে ধর্মমতে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তাকে এক যৌগদর্শন বলা চলে। প-িতদের সিদ্ধান্ত, বাউলমতাদর্শ সাংখ্য-যোগ-বৌদ্ধ-বৈষ্ণব-সুফি প্রভৃতির প্রভাবে উদ্ভূত। প্রবর্তক অনির্দিষ্ট ও শাস্ত্র অনুপস্থিতির কারণে গুরুশিষ্য পরম্পরায়, স্থানভেদে বাউল সাধনায় ভিন্নতা কিছু এসে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মোটের উপর বলা চলে, গুরুনির্দেশিত পথে দেহবাদী যুগলসাধনায় পরম সত্তাকে ধরার বাসনানির্ভর এই ধর্মীয়দর্শন। গুরুবাদী এই গুহ্য সাধকদের চলাচল ‘গভীর নির্জন পথে’। তাই তাঁদের ধর্মসংগীত চর্যাপদের মতো ‘আলোআঁধারি’ ভাষায় রচিত—সাধারণের কাছে তার মর্মোদ্ধার অনেকাংশেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু লালনের গান সে বিশিষ্টতা থেকে বেশ প্রভিন্ন। বাউলের পারিভাষিক শব্দপদের কারণে তাঁরও অনেক গানই হেঁয়ালিপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন এক অনন্য শিল্পপ্রতিভার অধিকারী, তাই তাঁর অনেক সংগীত শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে। তাঁর সুগভীর জীবনভাবনা গানগুলোকে করেছে ভাবসমৃদ্ধ। আর এই জায়গায় ধর্ম, জীবনদৃষ্টি ও সৃজনকুশলতা মিলে এক দর্শন আমরা পেয়ে যাই। আর সে দর্শনের শাস্ত্রীয় ভিত্তিও সুদৃঢ়। সেসব ভিত্তি কিছু উদাহরণযোগে আমরা দেখতে পারি।

নিঃসন্দেহে জিজ্ঞাসা থেকে দর্শনের যাত্রা শুরু। সে জিজ্ঞাসা জগৎ-জীবন নিয়ে; কীভাবে এর সৃষ্টি, কেন সৃষ্টি, সৃষ্টিকর্তা আছেন কি, থাকলে তাঁর স্বরূপ কী, আগামী দিন কী ঘটবে, মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায় আছে কিনা, খেকে থাকলে তা কীরকম ইত্যাদি। এসব জিজ্ঞাসা চিরন্তন। ধার্মিকজন এগুলোর উত্তর খুঁজে নেয় তার স্বধর্ম থেকে; কিন্তু তারপরও ধর্মবিশ্বাসী মানুষ এসব নিয়ে কমবেশি জিজ্ঞাসু হয়েছে। এই জিজ্ঞাসা তার জ্ঞান বৃদ্ধি করেছে, বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি এনেছে। তবে যেসব চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর অনির্ণেয়, সেগুলোই দর্শনশাস্ত্রকে বিস্তৃৃতি দিয়েছে। লালনকেও এমনই ‘পুরাতনী তুমি নিত্য নবীনা’ কিছু প্রশ্ন করতে শুনি। যেমন :

জগতের মূল কোথা হতে হয়/ আমি একদিন চিনলাম না তায়

কোথায় আল্লার বসতি/ কোথায় রাসুলের স্থিতি/ পবন পানির কোথা গতি/ কিসে তা জানা যায় (জগতের মূল কোথা হতে হয়/ আমি একদিন চিনলাম না তায়)

জীব মলে যায় কোনখানে

সব সৃষ্টি করল যেজন, তার সৃষ্টি কে করেছে

সৃষ্টি ছাড়া কীরূপেতে সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে

“শুনতে পাই সাধু সমাচার/ পূর্বে থাকলে পরে হয় তার/ পূর্বে না থাকিলে এবার/ তাহার কি আশায়” (পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়)

কী করিতে এলাম ভবে / কী করিতে জনম গেল (গুরুপদে মতি আমার কই হলো)

[উদ্ধৃতি-অংশে প্রথম কলি না থাকলে, তা ব্র্যাকেটে দেয়া হয়েছে]

স্মর্তব্য, লালন একজন লোককবি হয়ে এসব বিষয় ভাবছেন মধ্যযুগের উপান্তে, অথচ যার আরো অনেক পরেও রেঁনেসাস্নাত কলকাতার অনেক শিক্ষিতরাই এসব বিষয়ে নির্বিকার বা শাস্ত্র-সংস্কারবচনেই আশ্বস্ত। লালন উত্তর খুঁজতে গিয়ে নানারূপ জবাব পেয়েছেন। সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাই বলছেন, “অনেকে কয় অনেক মেতে/ ঐক্য হয় না মনের সাথে” (কোন রসে প্রেম সেধে হরি)। তাই তাঁকে একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হতে হয়—“কী হবে আমার গতি/ কতই জেনে কতই শুনে/ ঠিক পড়ে না কারো প্রতি।” তবে যে লালন একটি ধর্মমতে বিশ্বাসী ছিলেন! এমনকি সেই প্রসঙ্গেও তাঁর পর্যবেক্ষণ— “গুরুতত্ত্ব বিধি শোনা যায়/ তাও তো দেখি একরূপ সে নয়/ লালন বলে যে যা বোঝে / তাই করে॥ (আমি কী সাধনে পাই গো তারে)।” এভাবেই বিশ্বাসীর বাইরে একজন প্রশ্নশীল দার্শনিককে পাওয়া যায়।

প্লেটোর মতে বিস্ময়বোধ থেকে দর্শনের উদ্ভব। মানুষ সৃষ্টিজগতের বিশালতা-বৈচিত্র্য-রহস্য দেখে বিস্মিত। সে অনেককিছু জানতে চায়, অনেককিছুর ব্যাখ্যা চায়। সেই জানা-বোঝার আলোচনাই দর্শন। লালনের মনেও এই বিস্ময় প্রবল হয়েছে বাউলিবিশ্বাস ছাড়িয়ে। ‘হাওয়া দমে’ তারে দেখা বা ধরা যায় বলেই জেনেছেন গুরুর কাছে, কিন্তু এ মানবদেহের দিয়ে তাকিয়ে যে তাঁর বিস্ময় যায় না তা স্পষ্টত হয় যখন বলেন, “কে বানালো এমন রংমহলখানা।” ভা- বা ব্রহ্মা-ে কে একজন “নড়ে চড়ে হাতের কাছে/ খুঁজলে জনমভর মেলে না”—এসব এক বিস্ময়বিমূঢ়েরই অনুভূতি। “অমাবস্যার দিনে চন্দ্র থাকে না/ যায় কোন শহরে/ প্রতিপদে হয় সে উদয়/ দৃষ্ট হয় না কেন তারে”— তাঁর গানে গানে রয়েছে এমনি কতো সপ্রশ্ন বিস্ময়।

সন্দেহ-সংশয় দার্শনিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে একটি ধারণায় উপনীত হয় তো আরেকটি ধারণার প্রতি সন্দেহ-সংশয় পোষণ করেই। একদিকে তিনি পরমসত্তায় বিশ্বাস করছে, ‘মকরউল্লার মক্কর’ দেখে বিস্মিত আবার নিজেই কতোবার স্বীকার করেন ‘মনের ঘোর তো যায় না’। ‘কোন সাধনে পাই গো তারে’—এই সন্দেহাত্মক প্রশ্ন কতোবারই না করেছেন। এই সন্দেহের অপনোদন করতে সত্যানুসন্ধানে ছিলেন আজীবন অর্থাৎ এক অর্থে দর্শনচর্চাই করে গেছেন।

দুঃখ-হতাশাও দর্শনচিন্তার উৎপত্তির একটি কারণ বলে স্বীকৃত। গৌতম বুদ্ধ তো মানবজীবনকে অনিবার্যভাবে দুঃখময় বলে উপলব্ধি করার পরই তাঁর মতাদর্শ গঠন করেন। লালনের অনেক জ্ঞানেই জাগতিক হতাশা, ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা-ব্যর্থতার কথা রয়েছে। যেমন :

আশা পূর্ণ হলো না/ আমার মনের বেদনা।

দিনের দিন হলো আমার দিন আখেরি/ আমি ছিলাম কোথা এলাম হেথা/ (আবার) যাব কোথা সদাই তা ভাবি

এদেশে তো এ সুখ হলো/ আবার কোথা যায় না জানি।

চিরদিনে দুঃখের অনলে প্রাণ জ্বলছে আমার

তবে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, পারিবারিক অপ্রাপ্তি, সামাজিক হতাশা থেকে মুক্তিলাভের জন্যে মানুষ যে পথসন্ধান করে সে পথের আরেক নাম দর্শন। শেষ পর্যন্ত জীবন সম্পর্কে একটি সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যেই দর্শনচিন্তার সার্থকতা, হোক তা শোপেনহাওয়ারের ‘আত্মহত্যা’র পরামর্শ দেওয়ার মতো তত্ত্ব। লালন নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি—মানবজীবনেকে অমূল্য জ্ঞান করেছেন, মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।

দার্শনিকের বিচার পদ্ধতিতে কার্যকারণতত্ত্ব একটি বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়া। কার্য ও কারণ একে অন্যের পরিপূরক বা পর্যায়। লালন এ মতে বিশ্বাসী হয়ে যেসব যুক্তিবিন্যাস করেছেন সেগুলোর কয়েকটি :

তুষে যদি কেউ পাড় দেয়/ তাতে কি চাল বাহির হয় (কীর্তিকর্মার লেখাজোখা আর কি ফিরিবে)

জানো না মন শুকনা কাঠে/ কবে তার মালঞ্চ ফোটে (শুদ্ধপ্রেম না দিলে ভজে কে তারে পায়)

না জেনে করণ কারণ/ কথায় কি হবে

কথায় যদি ফলে কৃষি/ তবে বীজ কেনে রোপে॥

আসমানে বরিষণ হলে/ জল দাঁড়ায় মৃত্তিকা স্থলে (প্রেম-ইন্দ্রবারি অনুরাগ নইলে কি যাই ধরা)

কেতাবে খবর জানা যায়/ নাপাক জলে জান পয়দা হয়/ ধুলে কি তা পাক করা যায়/ আসল নাপাক যেখানে” (নাপাকে পাক হয় কেমনে)

প্রাচীন গ্রিসের সোফিস্ট দার্শনিকদের থেকেই অভিজ্ঞতা জ্ঞানলাভের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। আধুনিককালে লক, বেকন তার আধুনিকায়ন করেছেন। সত্যানুসন্ধানী হিসেবে আমরা লালনকেও অনেকসময় অভিজ্ঞতাবাদীর সুরে কথা বলতে দেখি। তাঁর বক্তব্য : “অচানক অচিনাই কখন/ জ্ঞানইন্দ্রিয় না সম্ভবে (আপনার আপনি ফানা হলে সকল যাবে জানা)।” লালনের প্রত্যক্ষবাদমূলক আরো কিছু উচ্চারণ :

গুড় বললে কি মুখ মিষ্টি হয়/ দীপ না জ্বাললে কি আঁধার যায়/ অমনি জানো হরি বলা/ হরি কি পাবে

(না জেনে করণ কারণ)

স্বপ্নে যদি রাজরাজ্য পায়/ চেতন হলে সব মিথ্যা হয় (আজ আমায় কোপিন দে গো)

ভ্রান্তিমূলক প্রত্যক্ষ নিয়ে দর্শনশাস্ত্রের বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘রজ্জুতে সর্পভ্রম’। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি এই কথাটি লালন কীরূপ নিজস্ব করে বলেছেন—“কলার ডোগায় সর্প হলো।” রজ্জুতে সর্পভ্রম হলেও সেটি আসলে সাক্ষাৎ প্রতীতি, তবে ভ্রম প্রত্যক্ষ। প্রত্যক্ষবাদের বিভ্রান্তি সম্পর্কে লালন একাধিক গানে জলে চাঁদ দেখার উপমাটি প্রয়োগ করেছেন। যথা: “জলে যেমন চাঁদ দেখা যায়/ ধরতে গেলে হাতে কে পায় (এই মানুষে সেই মানুষ আছে)”, “জলে যেমন চাঁদ দেখি/ ধরতে গেলে সকল ফাঁকি (দেখলাম সেই অধরচাঁদের অন্ত নাই)।”

লালন নির্বিচারে কোনো শাস্ত্র-সংস্কারকেই মেনে নেননি। দর্শনশাস্ত্রের বিচারবাদ দিয়ে সেসব মূল্যায়নে প্রয়াসী হয়েছেন। যেমন, প্রাচীন ভারতীয় দর্শন মোতাবেক পৃথিবী, পানি, আগুন, বাতাস ও আকাশ এই পঞ্চ উপাদানের নানা বিক্রিয়া-রূপান্তরের মধ্য দিযেই সমগ্র সৃষ্টি। মানবদেহও এই পঞ্চভূতে সৃষ্টি এবং এগুলোর মাঝেই বিলীন হয়। এখানেই লালনের বক্তব্য : “ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম/ এরা দোষী নয় দুষি আদম (জীব মলে যায় জীবান্তরে)।” জাতপাতের ভেদ প্রচারের বিরুদ্ধে তাঁর এই বিচারবোধ সত্যিই দার্শনিকসুলভ। এবিষয়ে জল-অচল অনুষঙ্গে লালনের যুক্তিপ্রদানের নমুনা নিই: “গর্তে গেলে কূপজল হয়/ গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল কয়/ মূলে এক জল,সে যে ভিন্ন নয়/ ভিন্ন জানায় পাত্র অনুসারে (সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে)।” অন্য এক গানে : “কূপজলে সে গঙ্গাজল/ পড়িলে হয় রে মিশাল/ উভয় এক ধারা (সাঁই দরবেশ যারা)।” শাস্ত্র সম্পর্কে লালনের বিচার : “যদি একই খোদার হয় রচনা/ তাতে তো ভিন্ন থাকে না/ মানুষের সকল রচনা/ তাইতে ভিন্ন হয় ( কী কালাম পাঠালেন)।”

কখনো কখনো লালনের সিদ্ধান্ত সিদ্ধার্থের মতো। বস্তুত বুদ্ধের মতবাদ ছিল খাঁটি দর্শন—নিরীশ্বরবাদী বিশ্ববিধান। সেই দর্শনকে ধর্ম বানাতে গিয়েই ঈশ্বর-আত্মার অনিবার্য আমদানি। কিন্তু লালন গৌতমের আদি অভিজ্ঞানের সুরেই বলেন:

মলে ঈশ্বর প্র্প্তা হবে কেন বলে।

সেই যে কথার পাইনে বিচার

কারো কাছে শুধালে॥

যে পঞ্চে পঞ্চভূত হয়

মলে তা যদি তাতে মিশায়

ঈশ্বর অংশ ঈশ্বরে যায়

স্বর্গ নরক কার মেলে॥

এরকম ভাবনা থেকে কখনো লালনের কণ্ঠে উপমহাদেশে চার্বাক দর্শন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ওমর খৈয়ামের মতো ইহবাদী সুর শোনা গেছে। যেমন : “মলে পাব বেহেস্তখানা/ তা শুনে আর মন মানে না/ বাকির লোভে নগদ পাওনা/ কে ছাড়ে এই ভুবনে (সহজ মানুষ ভজে দেখনা রে)॥”

এ-অঞ্চলের পৌত্তলিকতা লালনের বিচারে বাতুলতা। কলকাতায় রামমোহন রায় পৌত্তলিকতা নিয়ে ভট্টাচার্যদের সাথে গদ্যে তর্ক করেছেন —সে নবসৃষ্ট গদ্যে, স্বল্পপরিসরে— লালন গানে গানে তাঁর প্রশ্ন প্রচার করেছেন ; তিনি বলেন : “প্রতিমা গড়ায় ভাস্করে/ মন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে/ আবার গুরু বলে তারে/ এমন পাগল কে দেখেছে (শিরনি খাওয়ার লোভ যার আছে)।” আবার আরেক বৃহত্তর ধর্মসম্প্রদায় মুসলিমদের একটি আচার নিয়ে তাঁর বিচারবোধ বলছে, “কাকে শুধাব গো সে কথা কে বলবে আমায়/ পশু বধ করিলে কি খোদা খুশি হয়।” আমরা দর্শনের আরো কিছু বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ ও পরিমাপক ধরে লালনের দর্শনসম্পৃৃক্ততা দেখতে পারি।

বিজ্ঞান ও দর্শনের পার্থক্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, দর্শন নিয়তিকে বিচার করে থাকে। বিজ্ঞানীর অনুবীক্ষণ-দূরবীক্ষণে নিয়তি বলে কিছু এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি। তবে নিয়তিকে স্বীকার এবং অস্বীকার করে—এমন দুদল দার্শনিকেরই দেখা মেলে। তা যুক্তিবাদীদের মধ্যে এমন মতও আছে যে, কোনো কিছুর অস্বীকার-ঘোষণার মধ্য দিয়েও বিষয়টির অস্তিত্ব সম্বন্ধে এক ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারো কারো বর্ণনায়, নিয়তি পরাজিতের সান্ত¡না, আশাবাদীর আশ্বাসও বটে। সাধক লালন “ভাগ্যে কী আছে”, “এমন ভাগ্য আমার কি হবে”, “কীর্তিকর্মার লেখাজোখা আর কি ফিরিবে”—এরকম কথা বললেও, দার্শনিক লালন ভাগ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এই বলে: “পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়/ কর্মে লিখন কাজ করিলে/ দোষগুণ কী হয়”। আবার বলেছেন, “সকলি কপালে করে/ কপালের নাম গোপালচন্দ্র।”

ভারতীয় ধর্মদর্শনে জন্মান্তরবাদ রয়েছে অনেক জায়গা জুড়ে, প্রবলভাবে। মধ্যপ্রাচ্যীয় ধর্মগুলোতেও স্রষ্টার নিকট থেকে পৃথিবীতে আসা, মানবজন্ম শেষে পুনরুত্থান-প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সীমিত অর্থে হলেও জন্মান্তরের তত্ত্ব পাওয়া যায়। লালন এই জন্মান্তরের বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন, কথা বলেছেন অনেক গানে। যেমন : “দেখনা রে মন পুনর্জনম কোথা হতে হয়/ মরে যদি ফিরে আসে স্বর্গনরক কে বা পায়।” আরেকটি গানে বলেছেন : “মলে হয় ঈশ্বর প্রাপ্ত/ সাধু অসাধু সোমত্ত/ তবে কেনে তপজপ এত/ করবে জলেস্থলে (মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে কেন বলে)।” আবার এই জন্মের পাপপুণ্যের প্রতিফল সম্পর্কে ধর্মের যে বক্তব্য সেটিও লালনের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এভাবে : “একজনে দুই কায়া ধরে/ কেউ পাপ কেউ পুণ্যি করে/ কী হবে তার রোজহাশরে/ নিকাশের বেলায় (শুনি নবীর অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়)।”

আত্ম-অনুসন্ধিৎসা একই সঙ্গে একটি জ্ঞান বা দর্শন এবং জ্ঞানলাভের উপায়। বাউলের বিশ্বাস মানবের দেহে পরমসত্তার লীলা চরম পয়ায়ে পৌঁছে। লালন এই আত্মতত্ত্বকে বিশ্বাস করেছিলেন আপন অভিজ্ঞানে। তাই আত্মতত্ত্বের কথা তাঁর বহু গানে আন্তরঙ্গিক রাক্সময়তা লাভ করেছে। যেমন, “আপন ঘরের খবর নে না”, “আপন খবর না যদি হয়/ যার অন্ত নাই তার অন্ত কিসে পাই”, “আপনার আপনি ফানা হলে সকল  জানা যাবে”, “আমি কী জানলে সাধন সিদ্ধ হয়”, “খোদকে চিনিলে খোদা চিনি/ খোদ খোদা বলেছে আপনি/ মারন আরাফ নাফছাহু বাণী/ বোঝ কী তার মানে (কুদরতী সীমা কে জানে)”, “ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর/ যাবি কোথায়”, “আপনাকে আপনি চেনা/ সেই বটে উপাসনা” (বল কারে খূঁজিস ক্ষাপা দেশবিদেশে)—এরকম প্রচুর উদাহরণ চয়ন করা যাবে লালনের গান হতে। আত্মতত্ত্বে কথা তো সেই কবে উপনিষদে ঘোষিত হয়েছিল—‘আত্মনং বিদ্ধি’; ‘নো দাইস্লেফ’ বলে আপনাকে জানার তাগিদ দিয়েছিলেন সক্রেটিস, ‘মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’—নফস্কে জানলে রবকে জানা যায়—এমন নির্দেশনা ইসলামেও আছে। লালন যেন এসবের অনুবাদ নয়, আপন অভিজ্ঞানের কথা হিসেবেই বলেছিলেন।

আমরা এরকম বলতে চাইছি না যে, লালন সাঁই দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ নিয়েছেন এবং তারই আলোকে মত-মন্তব্য পেশ করেছেন। আমাদের বক্তব্য, চিন্তাশীলতা তাঁর মধ্যে দার্শনিক মনোভঙ্গির জন্ম দিয়েছিল। এছাড়া সেসময় ধর্মমত নিয়ে বেশ বাহাস বা বিতর্ক হতো। সেই সূত্রে তাঁর গানে যুক্তিবিন্যাস এসেছে। কিন্তু তারপরও শেষকথা হিসেবে বলবো, দার্শনিক এক স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিকূল প্রতিবেশের পরিবর্তে অনূকূল সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেন। সক্রেটিস-প্লেটো থেকে শুরু ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন দার্শনিকের নিকট থেকে যে সমাজমনস্কতা দেখছি, সমাজ বা রাষ্ট্রের গ্রঠন-প্রকৃতি নিয়ে যেসব প্রস্তাব পাচ্ছি, সবই এক কল্যাণধর্মী মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকে প্রদত্ত। শুধু টমাস মুর নয়, বহু দার্শনিকের সমাজ-রাষ্ট্রদর্শনই রাজনীতিক-সমাজপতিদের কাছে বা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছেও ‘ইউটোপিয়া’ বলেই বোধ হয়, তারপরও  জা জাঁক রুশো যে বলেছেন, দর্শনের প্রধান কাজ অসাম্য দূরীকরণের পথ বের করা—সেটিই সন্ধান করেছেন দার্শনিকেরা। লালনও তাঁদের উত্তরসূরি; ধর্ম নিয়ে ভেদাভেদ ও বাড়াবাড়ি দেখে তিনি কামনা করেছিলেন :

এমন মানবসমাজ কবে গো সৃজন হবে।

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান

জাতি গোত্র নাহি রবে ॥

লালনগান আমরা যা পেয়েছি, তার মধ্যে অবশ্য দার্শনিক ও ধার্মিক সত্তার যুগপৎ বিরোধ ও সম্মিলনও স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করা যায়। কারণ, সর্বোপরি তিনি বাউল মতাবলম্বী। তাঁর একটি বিখ্যাত গান আরেকটু মনোনিবেশ নিয়ে দেখি: ‘এমন মানব জনম কি আর হবে’ এটুকু দর্শন, ‘মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে’—ধরে নিলাম এ-ও দর্শন, তারপর ‘দেবদেবতাগণ/ করে আরাধন/ জন্ম নিতে এই মানবে’—এখানে মনবতাবাদী দর্শনের কথা যেমন আছে বটে, তবে দেবদেবতা. সাঁইয়ের অনন্তরূপ সৃষ্টি করার প্রসঙ্গ প্রচলিত ধর্মমত মাত্র।

তারপরও বলব, কার্ল মার্কস যে বলেছিলেন, দার্শনিক ভাবনার জন্যে প্রথম প্রয়োজন সাহসী মন, সে মনোভঙ্গিই লালনের বেশিরভাগ গানে লভ্য। সৃষ্টিজগৎ ও তার স্রষ্টা, ধর্ম-সংস্কার, শাস্ত্রবিচার, পাপপুণ্য, মানবআত্মা-পরমসত্তা প্রভৃতি প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য বিষয়ে তর্কবিতর্ক থাকতেই পারে—ধর্ম হিসেবেও সে তর্ক, দর্শন হিসেবেও। কিন্তু সময়ের বিবেচনায় কী সাহসী সব উচ্চারণ করে গেছেন। যখন আরো আরো কথার সাথে সাতবাজারে জাত বিকিয়ে দেওয়া কিংবা জাত হাতে পেলে আগুনে পোড়ানোর ঘোষণা দেন তখন সমাজদরদি দার্শনিকের সাহসী সত্তার পরিচয় প্রকাশিত হয়। মূলত এই কারণেই লালন আজকেও আরাধ্য। তিনি বাউলশিরোমণি, আধুনিকমানের লোককবি, একই সাথে জ্ঞানানুরাগী ও সমাজমনস্ক দার্শনিকও বটে। আমরা এখানে এই ভেবে বিস্মিত ও তৃপ্ত হতে পারি যে, দর্শন যার ইংরেজি প্রতিশব্দ ফিলোসফি বা জ্ঞানানুরাগ তা কি গভীরভাবেই নাম আমাদের এক লোকমনীষীর সত্তায় পরিব্যাপ্ত ছিল!

******************************************************

মোহাম্মদ শেখ সাদী
সাহিত্যে দর্শন, দর্শনে সাহিত্য : প্রসঙ্গ শাহ আবদুল করিম
‘দর্শন’ কথাটির সাধারণ মানে দেখা। তবে ‘দর্শন’ কথাটির তাৎপর্যগত বা নিহিতার্থ এবং দর্শনের সেই বিশেষায়িত রূপটি কীভাবে সাহিত্যে এবং দর্শনে ‘সাহিত্য’ কীভাবে অবলীলায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েÑ সেটিই আমাদের কাছে বিচার্য এবং বিবেচ্য। জীবন ও জগতকে নিয়ে বিশেষ চিন্তাধারা সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই প্রচলিত রয়েছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় সেই চিন্তা-দর্শনও নব নব রূপ পরিগ্রহ করেছে। জীবন ও জগতকে বিশেষভাবে দেখার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে অর্জন করে থাকে। তবে ব্যক্তির জীবন, সমাজ ও প্রতিবেশ থেকেই স্ব-স্ব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। জীবন ও জগতকে দেখার বিশেষ এই বীক্ষা নিয়ে কোনো সাহিত্যিক বা দার্শনিক যখন কোনো সাহিত্য বা দার্শনিক-তত্ত্ব সৃষ্টি করেন,তখন অনায়াসেই তাতে জীবন-অভিজ্ঞতার ছাপ পড়বে। সাহিত্য ও দর্শন মানবজীবনের এমনই প্রায় অভিন্ন চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্র যেখানে ব্যক্তির অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখতে পাই। আর এভাবেই সাহিত্য ও দর্শন পরস্পর সম্পর্কিত।

শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯) লোকায়ত সাধনার ধারায় একজন শক্তিমান লোকসাধক। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীণতাকে ধারণ করেও, যিনি কেবল জীবন-অভিজ্ঞতার সামর্থ্যইে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তাঁর গান এবং তাঁর জীবন-দর্শন একই সূত্রে গাঁথা। তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মের পরতে পরতে জীবন-দশনের গভীর ছাপ পরিলক্ষিত হয়। তাঁর জীবনের নির্যাসই তাঁর গান। সীমাহীন দারিদ্র্য ও প্রতিকূল সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে তিনি হয়ে ওঠেন একজন তাত্ত্বিক-দার্শনিক, একজন সুসাহিত্যিক। আমরা বাউল করিমের জীবন ও গান থেকে সাহিত্য এবং দর্শনের চমৎকার সংশ্লেষাত্মক রূপটি আবিষ্কার করতে পারি। কারণ তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মে কেবল অধ্যাত্মবাদী ভাবনাই প্রতিফলিত হয়নি; বরং প্রচলিত ধর্মাচারের বাইরে যাপিত জীবনের সাথে সম্পৃক্ত ধর্মচিন্তা অর্থাৎ অলৌকিক ধর্ম বিশ্বাসের চেয়ে লৌকিকতাকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। গুরুত্ব দিয়েছেন জীবন-বাস্তবতার ওপর। সমকাল-সংলগ্নতা, মানবমুক্তি ভাবনা, স্বদেশ ও সমাজ চেতনার গভীরতায় শাহ আবদুল করিমের স্বন্ত্র্য সহজেই চোখে পড়ে। বাউল আঙ্গিকের গানের একঘেয়েমিপূর্ণ সুরের সীমারেখা ডিঙিয়ে তিনি যে সুর-বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন, তা অতুলনীয়। হাওর-বাওর, নদী-বিধৃত বাংলার ‘ভাটি অঞ্চল’ বলে খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত দিরাই উপজেলাধীন ধল আশ্রম গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর গান গ্রামীণ ও শহুরে উভয় শ্রেণির মানুষের কাছেই সমানভাবে সমাদৃত। কেননা লোকায়ত ঐতিহ্য, সহ¯্র বছরের লালিত প্রাণের স্ফুরণ এবং আধুনিকতা তথা সমকালীনতার অপূর্ব সন্নিবেশ ঘটেছে তাঁর গানে। অত্যন্ত সহজ-সরল শব্দে-ছন্দে মানবীয় সুগভীর আবেগ-উপলব্ধির এমন সহজ প্রকাশ খুবই দুর্লভ। তিনি বাংলার চিরায়ত তত্ত্বগানকে নতুন মাত্রা দান করেছেন। পুরাণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খুব সহজ করে, সমকালীন ভাব- মাধুর্যে উপস্থাপন করেছেন:

আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা

কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া।

উল্লিখিত গানটিতে বৈষ্ণব-প্রেমতত্ত্বের আলোকে রচিত। তবু গানগুলোতে তত্ত্ব ছাড়াও সমঝদার রসিকজনেরা চিরন্তন প্রেমানুভূতি ও বিরহের রস আম্বাদন করতে পারেন।

শাহ আবদুল করিমের কবি-মানসে বৃহত্তর ভাটি অঞ্চলের জন-জীবন প্রবাহ, তাদের দুঃখ-দুর্দশা, লোকায়ত ঐতিহ্য, সমকাল-চেতনা, প্রতিবাদী চেতনা সর্বদা ক্রিয়াশীল ছিলো। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভে ব্যর্থ হন তিনি। গ্রামের একটি নৈশ বিদ্যালয়ে মাত্র ৮ দিন যাবার সুযোগ হয়েছিলো তাঁর। মাত্র ১০ বছর বয়সে মাসিক ২ টাকা বেতনে রাখালের চাকরি নেন অন্যের বাড়িতে। উন্মুক্ত উদার প্রকৃতির বুকে গরু চড়াতেন আর গান গেয়ে বেড়াতেন আপন মনে। কবি জসীম উদ্দীন যেমন তার এক অন্ধ দাদার কাছ থেকে লোককাহিনী, রূপকথা প্রভৃতি শুনে শৈশবে দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, শাহ আবদুল করিমও তেমনি তাঁর দাদার ছোট ভাইয়ের দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। গান পাগল ‘বাউল করিম’ হয়ে উঠার পেছনে এই দাদার ভূমিকা যাদু-মন্ত্রের মতো কাজ করেছে। তাঁর দাদা ছিলেন ফকির। তিনি সারিন্দা বাজিয়ে গান-টানও করতেন। তাঁর দাদার একটি গান :

ভাবিয়া দেখ মনে

মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে।

বালক করিমকে ধীরে ধীরে চিন্তক ও তাত্ত্বিকে পরিণত করে। ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’-পঙক্তিটি শৈশবে রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে ব্যাকুল করে তুলেছিলো। বালক করিমকে তেমনিভাবে আন্দোলিত করতে লাগল। তিনি বুঝে গেলেন গানই তাঁর আসল গন্তব্য। বাংলার লোকয়ত গানের ধারায় এমন গান-পাগল লোক-সাধক সত্যিই বিরল। গানকে ভালোবেসে জীবনে-সমাজে তাঁকে যেভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে; এমনটি কেউ হয়নি। তবু দারিদ্র্য আর সমাজ-ধর্মের অনুশাসন তাঁকে দমাতে পারেনি। মসজিদে, ঈদের নামাজে তাঁকে গান ছেড়ে দিতে নির্মমভাবে তিরস্কার করা হয়। গান পাগল সাধারণ মানুষ তখন তাঁর পাশে দাঁড়ায়। গানকে ভালোবাসার তীব্রতা ওঠে আসে তাঁর গানে, এটিও ব্যতিক্রমী একটি ব্যাপার। যেমন :

আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া

ভাবে করিম দীনহীন

আসবে কী সেই শুভদিন

জল ছাড়া কী বাঁচিবে মীন

ডুবলে কী ভাসে মরা।

অর্থাৎ পানি ছাড়া যেমন মাছের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, আবদুল করিমের পক্ষেও গান ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। তিনি তো মূলত বাউল গানের শিল্পী ছিলেন। সারা বাংলায় গান গেয়ে বেড়িয়েছেন মাসের পর মাস। তাঁর পীর বা মুর্শিদ ছিলেন মৌলা বক্শ। সঙ্গীতে একই গ্রামের করম উদ্দীনের কাছে তালিম নেন শুরুতে। পরে বিখ্যাত বাউল সাধক নেত্রকাণোর রশিদ উদ্দীনের কাছে উচ্চতর দীক্ষা গ্রহণ করেন। বাউলা গান আবদুল করিমকে পাগল করে তুলেছিলো। এই ধারার গানে আত্মনিবেদিত কবি গাইলেন :

মন মজালে ওরে বাউলা গান (২)

যা দিয়েছ আমায় তুমি কী দেব তার প্রতিদান

অন্তরে আসিয়া যখন দিলে তুমি ইশারা

তোমার সঙ্গ নিলাম আমি হাতে নিয়ে একতারা

মন মানে না তোমায় ছাড়া

তোমাতে সঁপিব প্রাণ॥

গানে সমর্পিত মন-প্রাণ কেবল নির্লিপ্তভাবে আত্মবিস্মৃত হয়ে রইলো না, বরং আত্মনিমগ্ন বাউল-আত্মা মরমি চেতনার মদ্যে দিয়েই সমাজমনস্ক, গণ-মানুষের শিল্পী হয়ে উঠলেন। খুব অনায়াসেই তিনি তত্ত্বগানের গ-িকে অতিক্রম করে শোষিত বঞ্চিত মানুষের ‘শান্তি বিধানের’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ধারা যাক, “মন মজালে ওরে বাউলা গান”-গানটির কথা। জনপ্রিয় এই গানটিতে শুধু বাউলাগানের প্রতি আসক্তি আর অনুরাগেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। তাঁর পূর্ববর্তী লোককবিদের মরমি চেতনার ধারাকে স্বীকার করে, শোনালেন বিস্ময়কর নতুন স্বর! তত্ত্ব গান গাইছেন তো গাইছেন, কিন্তু শেষে এসে সমকালীনতার অনুষঙ্গে অনিবার্য দাবিটি উচ্চারণ করলেন :

তত্ত্বগান গেয়ে গেলেন যারা মরমি কবি

আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি

বিপন্ন মানুষের দাবি করিম চায় শান্তি বিধান।

বিষয়-ভাবনায়, সহজ-সরল অভিব্যক্তিতে সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়তবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশে এমন সুস্পষ্ট বক্তব্য তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় সমাসীন করেছে। লালন-হাসন, মনোমোহন-রাধারমণের প্রমুখের গান তত্ত্ব গান। লালনের গানে তবু জাত-পাতের ভেদনীতি, মানবতাবাদী চেতনা রয়েছে। শাহ আবদুল করিম আরও বহুদূর হাঁটেন। শুধুমাত্র ধর্মীয় গোঁড়ামী, প্রচলিত ধর্মনীতির অসারতা, অসামপ্রদায়িকতাকেই তিনি আশ্রয় করলেন না; বরং যাপিত জীবন থেকে উৎসারিত জীবন-দর্শনকে সম্পৃক্ত করে বাউলা গানের অধ্যাত্মবাদী ধারার মধ্যে সঞ্চার করলেন সঞ্জীবনী শক্তি। সমকালীন স্বদেশ, সমাজ ও মানুষের বিবিধ ভাবনা রূপায়িত হয়েছে তাঁর রচনায়। মানুষের জীবনে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ধর্মাচার বা ধর্মচিন্তার দিকে ঝোঁকে পড়া। বাউল আঙ্গিকের লোকসাধকদের প্রায় সকলের মধ্যেই এমনটি লক্ষ্যযোগ্য। কুষ্টিয়া অঞ্চলের ‘গ্রামবার্তা’ সম্পাদক কাঙাল হরিনাথের কথা, হাসন রাজার কথা, উকিল মুন্সির কথা এক্ষেত্রে প্রতিতুলনায় এনে শাহ আবদুল করিমের স্বাতন্ত্র্য নিরূপণে প্রয়াসী হওয়া যায়। জমিদারদের প্রজা-পীড়ন, শোষণ-সম্পর্কিত সাহসী সংবাদ ছাপিয়ে কাঙাল হরিনাথ জমিদারদের রোষানলে পড়ে, মামলায় জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে আপোসহীন মনোভাব থাকা সত্ত্বেও আধ্যাত্মবাদের দিকে ঝুঁকে জীবন-যন্ত্রণার উপশম খুঁজলেন। গাইলেন :

হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল

পার কর আমারে।

জমিদারের জৌলুস আর প্রতাপ ছেড়ে হাসন রাজা নিজেকে সমর্পণ করলেন মরমিবাদে। গাইলেন, ‘ছাড়িলাম হাসনের নাওরে।’ প্রেমে মজে ঘর ছেড়ে ভাবে মজলেন উকিল মুন্সি। মসজিদে ইমমাতি আর মক্তবে পাঠদান এবং অধ্যাত্মবাদী চেতনাশ্রিত গান রচনা ও গাওয়াই সঙ্গী হলো উকিল মুন্সির। শাহ আবদুল করিম এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী উত্তরাধিকার তত্ত্বগানের চেয়েও ‘বিপন্ন মানুষের শান্তি বিধান’ তাঁর কাছে জোরালো হয়ে উঠে। তিনি হয়ে উঠেন শ্রেণি-সচেতন একজন সমাজচিন্তক। তার অবশ্য কারণও রয়েছে। কৃষি-নির্ভর জীবিকা এক ফসলি জমি, হাওর-বাওর, নদী বিধৌত নিম্নাচলের অধিবাসীদেরকে বছরে প্রায় ৭-৮ মাসই পানির মধ্যে কাজ-কর্মহীনভাবে থাকতে হয়। ফলে এই অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত অনিবার্য নিয়মেই দরিদ্র এবং দুঃখী। শাহ আবদুল করিমকে সেই নির্মম দারিদ্র্যের মধ্যেই জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এমনকি টাকার অভাবে তাঁর প্রিয় স্ত্রী সরলার চিকিৎসাও তিনি করাতে পারেন নি। বৃহত্তর হাওর অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশনার চিত্র এবং তা থেকে উত্তরণের দাবি ও স্বপ্নের কথা উঠে আসে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারে :

আপনারা আমার গাঁয়ে এসেছেন, দেখে যান এখানে, এই বিশাল ভাটি অঞ্চল জুড়েমানুষগুলো কী অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বাস করছে। যখন শহরে যাই মাঝে মাঝে, স্তম্ভিত হয়ে এই ব্যবধান লক্ষ করি। লোকে কয়, আমি নিরন্ন-দুঃস্থ মানুষের কবি। আমি আসলে তাক ধরে দুঃস্থদের জন্য কিছু লিখিনি। আমি শুধু নিজের কথা বলে যাই। ভাটি অঞ্চলের বঞ্চিত দুঃখী মানুষ আমি। আমার কথা সব হাভাতে মানুষের কথা হয়ে যায়। … দ্যাখেন তো এই অঞ্চল ঘুরে, মানুষের আয়ের কোনো উৎস আছে কি না? চারিদিকে ভাসান পানি। জলে থই থই করছে প্রতিটি বাড়ির উঠান। মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে? দিন তিন বেলা নয়; শুধু একবেলা দুমুঠো যদি খেতে না পারে, এই জন্ম কি মানুষের জন্ম? … একদা তত্ত্বের সাধনা করতাম, এখন দেখি তত্ত্ব নয়, বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।

শাহ আবদুল করিমের বাস্তব জীবনের নির্যাসই তার গানে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই দ্রোহী ও প্রতিবাদী চেতনা উচ্চকিত হয়েছে সহ¯্রধারায়। তাঁর প্রিয় শিষ্য আকবর মারা গেলে মোল্লারা তার জানাজা পড়তে দেয়নি। এই ঘটনাটি গভীরভাবে রেখাপাত করে আবদুল করিমের মনে। তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন কিন্তু ভেঙ্গে পড়েননি। এই কষ্টই তাঁকে কষ্ট জয়ের দীক্ষা দেয়। প্রাবন্ধিক যতীন সরকার তাঁর গানকে ‘দুঃখ জয়ের মূলমন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আরজ আলী মাতব্বরের মায়ের মৃত্যুর একটি ছবি তোলায়, তাঁর মায়ের জানাজা পড়েন নি মোল্লারা। এই ঘটনাই আরজ আলী মাতব্বরকে ক্রমান্বয়ে স্বশিক্ষিত দার্শনিকে পরিণত করে। আবদুল করিমের জীবনেও সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা ঘটল। নিত্যদিনের দারিদ্র্য, সমাজের বিরূপতা, ধর্মবেত্তাদের বিধি-নিষেধের বালাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, প্রচলিত শাস্ত্রাচারের বাইরে গিয়ে সুরের মাধ্যমেই তিনি ¯্রষ্টা প্রেমে বিভোর রইলেন। একই গানে সমকালীন সমাজ-মানুষের হিংসা, নিন্দাবাদ এবং সুফিবাদ ও বাউল মতের চমৎকার সন্নিবেশ সকল বিরূপতা থেকে উত্তীর্ণ হবার প্রেরণাকেই প্রতিফলিত করে :

হিংসা খোরগণ বলে দেখ,

আবদুল করিম নেশাখোর

ধর্মকর্মের ধার ধারে না,

গান বাজনাতে রয় বিভোর

মসজিদকে খোদার ঘর বলি

মন্দির ভগবানের ঘর

আসলে খোদার আরশ

হয় মমিনের অন্তর

যে করে তার নিজের খবর

আমি বলি সে চতুর

বাউল আবদুল করিম কয়

নয়ন রাখো মাশুকপুর।

‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে ‘ঈশ্বর ভদ্রপল্লী’তে থাকেন বলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে বস্তুবাদী জীবনদৃষ্টির আলোকচ্ছটায় বিমোহিত করেছিলেন পাঠককুলকে; আধুনিক সাহিত্যের পাঠক না হয়েও শাহ আবদুল করিম আরও সাহসী উচ্চরণ করেছেন তার একটি গানে :

জিজ্ঞেস করি তোমার কাছে বলো ওগো সাঁই

এ জীবনে যত দুঃখ কে দিয়াছে বলো তাই।

এই কি তোমার বিবেচনা কেউরে দিলা মাখন ছানা

কেউর মুখে অন্ন জোটে না ভাঙা ঘরে ছানি নাই

জানো শুধু ভোগ বিলাস জানে গরিবের সর্বনাশ

কেড়ে নাও শিশুর মুখের গ্রাস তোর মনে কি দয়া নাই।

পূর্বেও বলেছি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাত্মবাদের দিকে ঝুঁকে; এটাই সাধারণের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আবদুল করিমের জীবনদৃষ্টি এক্ষেত্রে বিপ্রতীপ। দুর্বিন শাহ এক্ষেত্রে অনুশোচনাগ্রস্ত :

নামাজ আমার হইল না আদায়

নামাজ আমি পড়তে পারলাম না

দারুণ খান্নাছের দায়।

কিন্তু দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট, শ্রমজীবী, অনাহারী-দুঃখী মানুষের যে ক্ষুণিœবৃত্তি নিবারণেই সময়ক্ষেপণ হয়, নামাজ পড়ার অবকাশটুকুও পান না, এমনকি বেহেশত, দোযখের স্বরূপ কল্পনাও ফুসরত পান না; দুর্বিন শাহ যে কারণে শনাক্ত করতে পারেননি, আবদুল করিম তা অব্যর্থভাবে শনাক্ত করেছেন। কারণ তিনি ভাটি অঞ্চলের গণমানুষের মর্মবেদনা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন :

বেহেস্ত ধনীর জন্য রয় গরিবের নাই অধিকার

স্বচক্ষে দেখিলাম যাহা গরিব হলে দোযখ তাহার।

গরিব হয় খোদার দুশমন, না হলে কি জ্বালাতন?

তত্ত্বগান ছাড়া ক্রমশ গণসংগীতের দিকে ঝুঁকে পড়া তাঁর কাছে কোনো ফ্যাশন ছিলো না। গণমানুষের মুক্তি কামনার সঙ্গে খুব গভীরভাবে তিনি একাত্ম হয়ে পড়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলতে থাকেন : বর্তমান আমার কাছে কোনো গৌণ বিষয় নয়। …কিন্তু আমার কান্না পায়, ভেতরে তীব্র হাহাকার অনুভব করি যখন দেখি যে চোখের সামনে অবিকল যন্ত্র হয়ে উঠল মানুষগুলো। …সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে, যখন দেখি এই যে বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতেগোনা কোটিপতি। এই যন্ত্র সভ্যতা ফলত ধনী, গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে। বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজিবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাব এবং সমাজ কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা, মূল্যবোধের সামূহিক বিপর্যয়, ভোগবাদী মানসিকতা, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প আবদুল করিমকে আবহমান লোকজীবনের অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাঙালি-সংস্কৃতির প্রতি নষ্টালজিক করে তোলে। একই সঙ্গে লোকায়ত সংস্কৃতির ধারা, সময়চেতনা, পরিবর্তনশীল সমাজ-ব্যবস্থার পটভূমিকায় ভবিতব্য নির্ধারণে এবং সংকট নিরূপণের কালজয়ী ভাষ্য :

দিন হতে দিন আসে যে কঠিন

করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম।

কিংবা,

আমার মজুর-চাষী

দেশকে যদি ভাােবাসি

সবার মুখে ফুটবে হাসি

দুঃখ যাবে দূরে।

প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও সমাজ ব্যবস্থায় বিশেষ করে অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতি চরম বিক্ষুব্ধ শাহ আবদুল করিমের সকল দরদ ও মমত্ববোধমূলক মেহনতি কৃষক-শ্রমিক, সর্বহারা-শোষিত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিতের প্রতি উচ্চকিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। শাসক-শোষকের চারিত্র্য একইরকম থেকে যায় তাঁর কাছে। দৃপ্তকণ্ঠে তাই তিনি গাইলেন গণজাগরণের গান :

রক্ত দিয়ে স্বাধীন হলেম

দুর্দশা কেন যায় না?

শোষিতগণ বেঁচে থাকুক

শোষক তাহা চয়া না।

বাউল আবদুল করিম বলে

স্বার্থপর শোষক দলে

ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে চলে

সমষ্টির গান গায় না।

ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির প্রতিই তাঁর গুরুত্ব। তাই তিনি সমাজবাদী। গণমানুষের অতি আপনজন। স্বাধীনতা সংগ্রামের যে মৌল উদ্দেশ্যÑ অর্থনৈতিক মুক্তি; তা-ই যখন অর্জিত হলো না তখন ‘স্বাধীনতা’ অর্থহীন হয়ে পড়ে তাঁর কাছে। নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশেও সাম্য দেখতে না পেয়ে, তিনি বৈষম্যমূলক নীতিকে নির্দেশ করেন কারণ হিসেবে :

চেয়েছিলাম প্রেমপ্রীতি

পেয়েছি ভয়-ভীতি

চলেছে বৈষম্যনীতি

কেউ খায়, কেউ খায় না।

তবু স্বদেশকে, স্বদেশের মানুষকে তিনি সমানভাবে ভালোবাসেন। দুঃখ-দুর্দশা, দারিদ্র্য আর ক্ষুধার বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামশীল থেকেও স্বদেশকে তিনি আমৃত্যু ভালোবেসেছেন :

আমি বাংলা মায়ের ছেলে

জীবন আমার ধন্য যে হায়

জন্ম বাংলা মায়ের কোলে।

দেশকে তিনি মা হিসেবে জ্ঞান করেন। তাই হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকল সন্তানই এক মায়ের সন্তান। সাম্প্রদায়িক ভেদ-নীতির বিপ্রতীপ অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক ভাবনার সহজ-সরল অভিব্যক্তি সুর পায় তাঁর কথায় :

এইসব নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন

কেউ হিন্দ্ ুকেউ মুসলমান

তুমি মানুষ আমিও মানুষ

সবাই এক মায়ের সন্তান।

করিমের দেহতত্ত্বের গানগুলোতে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে অনন্ত জিজ্ঞাসা উচ্চারিত হয়েছে। আবার ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুফিবাদী প্রেরণাও আছে। অবিমিশ্র বাউলদর্শন এতে নেই। যদিও তাঁর গানে ভণিতায় ‘বাউল আবদুল করিম বলে’-এই আত্মস্বীকৃত ‘বাউল’ অভিধার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। যেটি অন্য কোনো লোককবি; এমনকী বাউল পুরোধা লালন ফকিরও ব্যবহার করেন নি। এটিও স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। রূপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সমকালীনতার অনুষঙ্গ ‘গাড়ি’কেও দেহের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, মানবগাড়িতে চড়ে তিনি বন্ধুরূপী ¯্রষ্টার বাড়িতে রওনা হয়েছেন :

চড়িয়া মানব গাড়ি

যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি

মধ্য পথে ঠেকলো গাড়ি

উপায় বুদ্ধি মেলে না।

কিংবা,

আমি তোমার কলের গাড়ি

তুমি হও ড্রাইভার।

এভাবে তাঁর গানের সমৃদ্ধ ভা-ার হতে দর্শন ও সাহিত্যের সম্পূরক রূপের অজ¯্র নজির উপস্থাপনে অসম্ভব নয়। শাহ আবদুল করিমের গানকে আমরা যেমন সাহিত্যরূপে গণ্য করতে পারি, তেমনি তাতে প্রতিফলিত চিন্তাসূত্রকে দর্শনরূপেও বিবেচনা করতে পারি।

নি য় মি ত বি ভা গ

                        শে ষ পা তা র  আ হ্বা ন

আনিফ রুবেদ
আলোর জন্য সূর্য আছে, আঁধারের জন্য কোনো কুর্য নেই
জগৎ যন্ত্রণার। জগৎ আনন্দের নয়। আনন্দ হলো যন্ত্রণা থেকে ক্ষণক্ষণের বিরতিমাত্র। যেমন, অন্ধকার ধ্রুব। আলো ছড়ানোর জন্য আঁধারের প্রয়োজন আছে, আঁধার নির্গতের জন্য কোনো আঁধারের প্রয়োজন নেই। আলোর জন্য সূর্য আছে, আঁধারের জন্য কোনো কুর্য নেই। সূর্যশক্তি, সবশক্তিই শেষ হয়, হবে একদিন। অন্ধকার স্বয়ম্। অন্ধকার সয়ংসম্পূর্ণ। এর বিনাশ নেই। তেমনভাবেই, জীবের জীবনযন্ত্রণা, যাপনযন্ত্রণা ধ্রুব।

পাথর। যা থেমে আছে সবসময়, তার কি কোনো গতি নেই, যাত্রা নেই? আছে। থেমে থাকাটাই তার গতি, থেমে থেকে থেকে বিলীন হয়ে যাওয়া তার যাত্রা উদ্দেশ্য।

গ্রহ। যা চলতেই আছে সবসময়, তার কি থেমে থাকা নেই? আছে। যা চলতেই আছে, তা চলার মধ্যে স্থির হয়ে আছে। চলাটা ধ্রুব। চলতে চলতে থামাতে বিলীন হয়ে যাওয়া তার যাত্রা— উদ্দেশ্য।

এবার আমার যাত্রা। এবার আমার যাত্রাপালা। এবার আমার যাত্রাপালা সম্পর্কে বলার পালা। এ যাত্রাপালার নট হিসেবে আমি আমার কাছে কী? আমার জন্য আমার চিন্তুা কী? অন্যান্য জীব আর মানুষের জন্য আমার চিন্তার রূপটা কেমন? এসব প্রশ্নের তীর তৈরি করে নিজেকে বিদ্ধ করা যেতে পারে, চিন্তানদীর তীরে বসে।

আমার যাত্রা রবীন্দ্রনাথের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা লালনের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা মুহম্মদ বা যিশুর যাত্রা নয়। এ আমারই যাত্রা।

আমার যাত্রা চেঙ্গিস খানের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা হালাকু খানের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা বুশ বা ট্রাম্পের যাত্রা নয়। এ আমারই যাত্রা।

আমি মানুষ, এটা ভাবতে আমার বিস্ময় জাগে। বিষময় বিস্ময় জাগে। আমি পোকা নই কেন? নই কেন অন্যান্য পশু? এসব প্রশ্নে মনে বিকার তৈরি করে খালি, পূর্ণ উত্তর পাওয়া যায় না। উত্তরের খ- খ-  যা কিছু পাওয়া যায় তা আরো অসহায় করে তোলে আমাকে। অসহায়ত্ববোধ প্রচ- রোদ হয়ে, নিদারুণ আগুন হয়ে দগ্ধ করে। এসব নিরুপায়ত্ব, এসব নিরুত্তরত্ব, আরো নিরুত্তাপ করে আমাকে, বরফ করে তোলে। চুপচাপ চিৎকার করার প্ররোচনা দেয়। চিৎকার করে সবকিছুকে চুপ করে দেবার প্ররোচনা দেয়। চিৎকার করে চুপ থাকার প্ররোচনা দেয়। অস্থির হলে, স্থির হবার ইচ্ছে জাগে। স্থির হয়ে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, একটা বরফখ-ের গায়ে আগুন জ্বলছে। অথবা, একটা তীব্র অগ্নিকু- বরফ দিয়ে ঢাকা। অদ্ভূত এসব মানসিক যাত্রা। অদ্ভূত এসব শারীরিক যাত্রা। অদ্ভূত এসব মানসিক-শারীরিক যাত্রাপালা। অদ্ভূত।

মানুষ হিসেবে আমার ভাবতে খারাপ লাগে যে, পৃথিবীতে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়ের চেয়ে মেরে ফেলার উপায় বেশি। আমাকে সুস্থ রাখার উপায়ের চেয়ে, অনেক বেশি উপায় প্রস্তুত আছে আমাকে মানসিক আর শারীরিকভাবে অসুস্থ করার জন্য। ওষুধের টোটাল গুলির চেয়ে, বন্দুকের গুলির পরিমাণ বেশি জগতে। আটার চাইতে, বারুদের পরিমাণ বেশি। পরিমাণগত অর্থেই বেশি। কার্যকারীতাগত অর্থে আরো বেশি। একটা ওষুধের গুলিতে একজন মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। একটা বন্দুকের গুলিতে একসাথে দশজনকে মারা সম্ভব। এক কেজি আটাতে একজনের একদিন যেতে পারে কিন্তু এক কেজি বারুদে কয়েকশ লোককে চিরদিনের মত বিদায় দেয়া সম্ভব। আমার ভাবতে খারাপ লাগে, আমি এ পৃথিবীর বাসিন্দা।

আমার ভাবতে খারাপ লাগে, পৃথিবীতে সব নীতিমালার প্রণয়ন আর প্রয়োগ করে মাস্তান শ্রেণির কিছু মানুষ। অবশ্য তারা যেকোনো নীতির বাইরে বসবাস করে। সব দেশ এবং সমগ্র পৃথিবীর চিত্র এটা। আমার ভাবতে খারাপ লাগে, যে মানব সন্তানকে আমি জন্ম দেব সে সন্তান এসে এসবের ভেতর পড়বে। অহেতুক এক পাজলের ভেতর পড়বে।

জগৎ শুধু যন্ত্রণার নয়। জীবন বিস্ময়েরও। বিষময় বিস্ময়ের।

শিশুকালের কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ির কাছেই বন্যারক্ষা বাঁধ। তখন আমি আট-দশ বছরের মত। একা একা গিয়ে গ্রামরক্ষা বাঁধ মেরামত করতাম। সেসব কেউ করতে বলত না। এমনকি এটার তেমন কোনো দরকারও ছিল না। তারপরেও করতাম। এটা ছিল ‘মহৎ হবার সাধ জাগে’ খেলার মত। এ বাঁধ দিয়ে মানুষ হেঁটে যেত বাজার। বাজার থেকে ফিরত বাড়ি। একদিন, বাঁধ মেরামত করতে করতে দেখি, একটা সাপ কোথা থেকে বেরিয়ে একেবারে আমার সামনে প্রায় এসে পড়েছে। আমি ভয় পেয়ে যাই। ভয় পেয়ে সাপের মাঝ বরাবর কোদালের কোপ বসাই। সর্পের অর্ধেকটার যেদিকে লেজ আছে, সেদিকটা ঘুরে আমার বিপরীত দিকে পালাতে চেষ্টা করে। সর্পের অর্ধেকটার যেদিকে মুখ আছে, সেদিকটা আমার দিকে তেড়ে আসে। অর্ধসর্পের এভাবে তেড়ে আসাতে আমি আরো ভয় পাই। ভয় পেয়ে কোদালের উল্টো দিক দিয়ে সাপের মাথার উপর কষে বাড়ি বসিয়ে দিই। সাপের মাথা একেবারে থ্যাতলা হয়ে যায়। থ্যাতা মাথা নিয়ে সাপটা মরে পড়ে থাকে আমার পায়ের কাছে। বহু বছর পর এসব কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে। এসব ঘটনা, এসব দৃশ্য কেন তৈরি হয় বা হয়েছিল বুঝতে পারি না আজও।

‘নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ দিতেও আমি প্রস্তুত আছি’ একথা একদিন বলছিলাম একজনকে। সে বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তাকে বলেছিলাম— ‘প্রাণ আর জীবনের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। প্রাণ প্রকৃতি থেকে পাওয়া। জীবন হলো, আমি যেভাবে থাকি বা থাকতে চাই, যেভাবে যাপন করি বা করতে চাই। প্রাণ জীবনের একটা অংশমাত্র’।

জীবনযাত্রাকে আমার ‘লম্বা’ বা ‘দীর্ঘ’ এ জাতীয় মনে হয় না। বৃত্তাকারও মনে হয় না। আমার মনে হয়, জীবন একটা জটিল পাজলের মত। একটা গ-ির ভেতর অনেকগুলো এলোমেলো গুটি আছে। এ মেলানোটা জীবন, মেলাতে চাওয়াটা জীবন। কিন্তু এটা কখনোই মেলে না। এবং যেহেতু মেলে না সেহেতু মানুষ যন্ত্রণা পায়। আমিও কষ্ট পাই। অল্পে যারা তুষ্ট, কষ্ট যাদের কাছে মিষ্ট, তারা জীবনকে মিষ্ট বলে। আমি বলি না। আমি অল্পে তুষ্ট না, কষ্ট আমার কাছে মিষ্ট না সুতরাং জীবনকে আমি মিষ্ট বলি না। আমি অল্পে তুষ্ট না, আমি চাই পৃথিবীর সবকিছুই সুন্দর হবে, ভালো হবে। আমি অল্পে তুষ্ট না, আমি চাই পৃথিবীর সকলেই ভালো থাকবে। কিন্তু জানি, এমনটা কোনোদিনই, কোনো এক মুহূর্তের জন্যেও সম্ভব না। সুতরাং জীবনের যাত্রাকে, সবসময় চরমতম উত্তপ্ত পথে ধাবিত হওয়া বলে মনে হয়। আমি উত্তপ্ত হয়ে বসে থাকি। সুতরাং জীবনের যাত্রাকে, সবসময় চরমতম শীতল পথে ধাবিত হওয়া বলে মনে হয়। আমি শীতল হয়ে দূর্বার গতিতে ভ্রমণ করি। মানুষের জীবনে কোনো ‘জীৎ’ আছে বলে মনে করি না। জীৎ মানে উল্টোদিকে হার।

এ লেখাটা চমৎকার, সুন্দর, সুদর্শন, সুশ্রাব্য, সুত্বাচ্য, সুস্বাদুভাবে লিখব বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু তা হলো না। হয়ে গেল অমিমাংসিত সেই পাজলের মত — নাকের জায়গায় হাত, পায়ের জায়গায় কান, বুকের জায়গায় পেট। আফশোস জীবনের জন্যে। এ লেখাটার জন্যে।

তবে, মজার ব্যাপার আছে, তা হলো এটাও একটা — যাত্রা।

******************************************************

বঙ্গ রাখাল
অভিযাত্রিক জীবন আত্মবিসর্জনের শতরূপ
জীবনের প্রথম পাঠ মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি বোধহয় কেননা চলমান জীবনে আত্মজীবনের মুখোমুখি মনে পড়ে মায়ের বিবর্ণমুখচ্ছবি যা কিনা অনেকটা ভেঙ্গে পড়া আরশীর বিষাদগ্রস্ত বিশ^স্ততার রেখাচিত্র। মা, মায়ের প্রণীত জীবন আমাকে যাত্রাপথের বিদ্রোহী অভিযাত্রিক করেছে কিংবা একটুও করেনি। বাল্য বয়সে মায়ের শাড়ীর অন্তর জগতে বৃত্তাকারে লুকিয়ে লুকিয়ে শিখে গেছি আদর্শলিপির নীতিবিদ্যা আর মায়ের অধিতবিদ্যার উপমাবান্ধব কথার ব্যাখ্যায়িত বাস্তবতার প্রয়োজনীয়তা। আর বাবা, অনেকটা গান-পাগলা। গানের সুর তাকে বিমুগ্ধ করে রাখে। গ্রামীণ লোকগান যাকে বলি, গাজী, কীর্তন, এমনি কী অস্টক গানের আসরে পিতাকে বসে থাকতে দেখা গেছে। এই মৃত্যুপ্রাণ মানুষটির চতুষ্পাশের্^র সবকিছুই যেন গানকেন্দ্রিক। এই বাবাই জীবন পথের প্রথম জীবনে প্রতিস্থাপন করেছিল লালনের গান। রোপন করেছিল— এমনকি ভাবতে শিখিয়েছিল পূর্ণিমার জলেভাসা বাউলের গানের সুর-সন্ধানের নির্দিষ্ট সূচনা। তিনি আমাকে বলেছিলেন- তুমি কী লালনের মত পদ বাঁধতে পারো। না বুঝেই বলেছিলাম— পারিতো। তখনও জানি না কে এই লালন। এই বাবার কথা থেকেই এক ধরনের যন্ত্রণা আমাকে দুই এক কলম লেখার অনুপ্রেরণা জাগিয়েছিল। প্রথম জীবনে একটা সম্পাদিত গ্রন্থে আমার “চাষা” নামে একটি কবিতা প্রকাশিত এবং পরে দেখি ১০ জন কবিকে নিয়ে একটি সম্পাদিত কবিতার গ্রন্থ সম্পাদিত হবে। যেখানে কবির সমস্ত নাম, ঠিকানা এমনকি ছবি ও কবিতার পাশে প্রকাশিত হবে। সেই দিনের সেই ব্যাকুল মনকে স্থির করার জন্য মায়ের কাছে বলি। মা নিজের একমাত্র সন্তানের কবিতাগ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হবে বলে সেদিন কি-যে উৎসাহ দেখিয়েছিল তা সত্যিই আজ শুধুমাত্র স্মৃতির স্মৃতিপটে দৃশ্যমান। বাবা এই কাজে কোন আগ্রহ দেখায়নি। আমার হাতে নিজে কানের দুল দিয়ে মা বলেছিল, বাবা নাও। এটা স্বর্ণকারের কাছে রেখে এসো— পরে ছাড়িয়ে নিব। মায়ের উৎসাহেই আজ আমি যাত্রাপথের অভিযাত্রিক। মায়ের সেই দুল আর ছাড়িয়ে আনা হয় নি। তবুও মা কোনো কষ্ট পাননি। শুধু বলেছেন— আমার বাবা মানুষ হোক। গ্রন্থ বেরও হয়েছিল— ঢাকা থেকে কিন্তু আমি সেই গ্রন্থ মাকে দেখাতে পারিনি। হাতে দিয়ে বলতে পারিনি মা— এটা তোমার সেই কানের দুল। দেখো মা দেখো, এই গ্রন্থের সবচেয়ে উজ্জ্বল, দীপ্তিমান কবিতা মা এগুলো, এগুলো তোমার কানের স্বর্ণালংকার, দেখো চিক্ চিক্ করছে আর দুলছে তোমার কানের লতিতে। এভাবে শুরু হলো অভিযাত্রা। গ্রামের মঞ্চগুলোতে অভিনয় করি, নাটক লিখি, গ্রামের বাগধারা, প্রবাদ সংগ্রহ করি তবুও তৃষ্ণা মেটে না। করোটির মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে চলে। নিরব অশ্রুপাত করি আত্মঘাতী এই পথকে বেছে নেওয়ার জন্য। অবিরাম কবিতা লিখি, গবেষণার উপাদান সংগ্রহ করছি, আর দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। যে কারণে অনেকের কাছে ঘরকুনো কিংবা অকর্মা ছেলে নামে পরিচিত। কলেজের বন্ধুরা জেনে গেছে আমি কবিতা লিখি মানে খারাপ হয়ে গেছি। হয়ে গেছি নাস্তিক। আমার কথাবার্তায় নাস্তিকের গন্ধ ছোটে। আপন জনদের এই সহ¯্রবার এতো এতো কথাগুলো মনকে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। কবি নামে ডাকলে লজ্জা লাগে। এখনো কবিতায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বাদ পাই, নারীর ঘ্রাণ, প্রকৃতির জীবন্ত চিত্র দেখতে পাই। তবুও নিজেকে কবি বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি না। অনেক ক্ষতের সাক্ষী আমার কবিতা। মানবিক আর বিকৃত চরিত্রের পরিচয়বাহীর লোরিটাও কবিতা। ব্যাখ্যাহীনভাবে বলে যায় কবিতার কথা। কবিতায় জীবন। জীবন হলেও নিয়মিত লিখি না। কারণ প্রতিনিয়ত সহবাসে তৃপ্তি কম। অনেকটা বীর্য স্খলনের পর— ক্ষমতাহীন হওয়ার মত। কিন্তু কয়েকদিনের ব্যবধানে হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় নতুন উদ্যামতা আর সত্তাই বাড়িয়ে দেয় যৌথ বিশ^স্ততার বেগ যা সঞ্চারিত হয় কবিতার শরীরে। শব্দে শব্দে আমার অভিজ্ঞান তুলে ধরেছি কবিতায়। কবিতাও প্রত্যাখান করেনি আমায়। জৈবলিপ্সার সন্ধান আমাকে অনেকটা উদ্বেগ পাইয়ে দিলেও কখনো কখনো দিব্যপ্রশান্তি এনেছে কবিতায়। যাকে বলি বাড়ি, নারী, মদ, ঐশ^র্য কিংবা রাত্রিযাপনের আশ্রয়টুকুও কবিতা। কেমন করে এই কবিতার ভূত মাথায় ঢুকেছিল কারণ  অনুসন্ধানে নামলেও তথ্যের উদ্ভাবনের একটুকাল বিলম্ব করে ফেলেছি। তবুও নিগূঢ়সত্যে রূপান্তিত হয় বিরহের কাহিনি। আমার প্রপিতার মাথায়ও কবিতার পোকা ছিল অনেকটা আমারই মতো কিংবা বেশি বা কম। বোধ হয় আমার মতো কথকতায় বা জৈবমিলন তৃষ্ণা তারও ছিল এবং পূর্ব-পুরুষের এই যে শৌর্য আর সম্পর্কের জীন-গত পারম্পর্যতা তাই আমাকে যাত্রিক বানিয়েছে এবং যাত্রাপথের অক্লান্ত পথিক করেছে। এই পথ তো নয় কোন মসৃণ আমার চেহারার কাছে কখনো কখনো নিজের অসহায়তার চিত্র ধরা পড়ে। আমাকে বাস্তবতার মলিনছাপ গ্রাস করতে চায়। তবুও মর্ত্যরে পাখি হয়ে উড়ে যায় ঐ সুদূর আকাশ পানে, দীর্ঘশ্বাস জীবনেও বিম্বিত হয় কবিতার বহুমাত্রিকতা যা কি-না বিধ্বস্ত হয়ে ধরা দেয় জীবনের প্রতিকৃতি। এই অভিযাত্রিক জীবন কিংবা যাত্রার পথ বড় বেশি ক্ষুধার, বড় বেশি যন্ত্রণার যেখানে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে শুধু থাকে সময়ের বলিদান কিংবা আত্মবিসর্জনের ব্যঞ্জিত শতরূপ।

******************************************************

শিরবলী মোকতাদি
দরদভরা চোখে
হিসেবের খাতিরে অনেকগুলো বছর, কিছুটা কাল, জন্মের বিপরীতে ততোধিক মৃত্যু, সমাজ, সন্ত্রাস,স্নিধতার বিচিত্র রূপ দেখা হলো। বিন্দু-বিন্দু সময় পেরিয়ে আজ এই ভাষ্যে যা কিছুই লিখছি সেটা বর্তমানে দাঁড়িয়ে। তাহলে বিগত বিপুল এক অতীতের আততায়ী নিশ্চুপ, নিস্তব্ধে বাস করে আমার এ-মনে। সে রয়ে যায় ফোঁটায়-ফোঁটায় রক্তে মিশ্রিত হয়ে। ঘাপটি-মেরে বসে থাকে কোষের কমনীয় দ্বারে।

অতীত— কখনো আচমকা চুমুর ন্যায় লজ্জিত বালিকার খুলে যাওয়া বেণী। না-চেনা ফুলের অচেনা গন্ধের হাতছানি। অতীতে বালক ছিলাম। কিশোর হয়েছিলাম। অতীতে যুবক হতে হতে যন্ত্রণা পেয়েছিলাম। যাতনা সয়েছিলাম। জগৎকে এই ছিন্ন তো এই যুক্ত করেছিলাম। অতীত বড়োই আনন্দের, অতীত বড়োই তামসিক। অতীতের শত কোটি আঁচড়ে লিপিবদ্ধ এই দেহ-মন মগজখানি।

প্রায় প্রতিটি মানুষের ন্যায় এই দেশে আমারও গ্রাম ছিল। তথা গরীব আর গর্বিত মানুষ ছিল। মাত্রাভেদে তাদের মন, মানসিকতা, ম্যানার ছিল। যেমন ধরুণ, চৌকো-চৌকো দুএকটি মাঠ ছিল। মাঠে-মাঠে ফসলের সন্ত্রাস ছিল। অথচ চিরকালই আমি কখনো বৃত্ত, কখনো ত্রিভুজ, কখনো বা সরভুজরূপে দেখেছি সেইসব সাধের ক্ষেত্রফল।

বলি, এমনটা কেন? যে ভূমিতে, বেলে-বেলে দোআঁশ মাটিতে ফুটেছে সমূহ ঋতুর সম্ভারে বিচিত্র ফুল আর ফলের কথন; সেথা আমি কী করে দেখেছিলাম পাইন কিংবা পপির প্রতিফলন?

খুবই ছোট, ক্ষুদ্র সে সময়ে দলবেঁধে গিয়েছিতো পাঠ নিতে পাঠশালাতে। গিয়েছি বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে কুয়াশায় স্নাত হতে-হতে। গিয়েছি গর্বিত সর্ষেফুলের বিস্তারিত বুক চিড়ে মনকে অলিখিত মনের কাছে বন্ধক রেখে। গিয়েছি তপ্ত, স্মার্ট, ঝাঁঝালো লাল মরিচের বাগানের একান্ত পাশ দিয়ে। ফাগুনে-চৈত্রে কড়া-কড়া রৌদ্রের মাঝে নিজস্ব নৌকা বেয়ে। অথচ খুব মনে পড়ে সেইসব যাওয়াগুলো, ফেরাগুলো কেমন আলো-আঁধারির, অস্পষ্ট ডুবো চরের ন্যায়; হতে পারে জ্যোতস্না বাহিত মধ্যরাতের মতো মনে হতো।

হে আমার আল্লাহ রাসূল, কাব্যের কবিরাজ, হে আমার ভেষজ প-িত, ছলাকলার ঝাঁড়ফুক, হে আমার বিনিদ্র ডাক্তার! আমারে লক্ষণ দাও, লক্ষণে জ্ঞান দাও।

আমারও বন্ধু ছিল হাতেগোনা এবং সীমিত আপন। তারা সব ভাতৃসম। তাদের গণদেহে এই আমি নিজস্ব দেহখানি কত কত সম্মেলনে রেখেছি বাঁধিয়া। আমরা মাটি নিয়া, ধূলি নিয়া, কাঁদা নিয়া খেলেছি কতক। হয়তো তারা দেখে নাই। দেখেছি আমি

মাতাল করা গন্ধের কালো, ভেজা-ভেজা মাটির উপরে অবাঞ্ছিত রক্তের ছোঁয়ায় মুহূর্তে সে-মাটি মন খারাপ করা মেরুণ রঙে ডাইভার্ট হয়ে যায়। সেই তো ধূলি, আমি কেন হীরকখ- কিংবা সিলিকনে আঁকি তারে প্রভু!

প্রচলিত সমস্ত গ্রামই থাকে নদীর দুইপাড়ে। আমাদের গ্রাম নদী হতে বহুদূরে। ফলে আমি সাঁতার শিখিনি। এই গ্রাম বন্যাদূষিত নয়। তবু আমি কাল্পনিক নদীর কিনারে হেঁটেছি রাত্রি-দিন। তোমারই আলিঙ্গনে হে নদী! হে যাত্রাপথ— তোমার বাঁকে-বাঁকে কুড়িয়ে পাওয়া রেঞ্জ দিয়ে খুলেছি আমি কতনা রহস্যের বাগধারা। নিয়েছি তাদের আদরে-আপ্যায়নে। বাক্সে ভরেছি পরশ আর পশমে আবৃত করে।

সেইসব মীন, শঙ্খ-শামুকের নিঃসৃত ভাষা, গন্ধ, বাহার, কী চমক আর চটকদারি। আহা, মরি মরি!

সেইসব মাঝির মনোলোভা মাতৃভাষা। জলে-মাছে থাকতে থাকতে কেমন লোম ঝরে সারাদেহে গজে ওঠা আঁশ, আঁশটে গন্ধ। হঠাৎ নাবিক বলে ভ্রম হয় যেন।

সেকালে তুষার দেখিনি, দেখিনি পাহাড়। না খনি, না আগ্নেয়গিরি। দেখিনি সাগর, আপেলের বনে হাঁটিনি জানি। হে ভংয়কর বিদেশ! ফাঁকি দেয়া রাখালের রাজত্বমনি। তবু তুমি কী করে গেঁথেছিলে এই ধ্যানে, সেকি জামের জলসায় চুরি করে ঢুকেছিলে আঙুরের আহ্বানে? সরল গৃহিনীর ভুলে— ভুল করে জ্বলে ওঠা লেলিহান শিখায় মধ্যরাত্রির সেইসব গৃহের গর্জনে, তাপে, চিৎকার, শিৎকারে তুমি কী দিয়েছো ধরা ওগো আগ্নেয়গিরি, নির্লিপ্ত লাভা!

আমি ছোট থেকে বড়ো হই। বড়ো থেকে মাঝারিমাত্রিক। এই দেহে জাগতিক, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, কাক্সিক্ষত-অনাকাক্সিক্ষত, চাওয়া না পাওয়ার, বেদনা-সুখের, শুভ-অশুভর বেঢপ ধাক্কা এসে লাগে। সকালে-দুপুরে-গোধূলি, রাত্রিকালে।

গতকাল যে ঘুঘুর ডিম করেছি চুরি, যে চারায় মারিয়েছি দুই পা। পরদিনই বুঝি সেই ঘুঘু একটানা কী করে অভিশাপ দিচ্ছে আমায়। যন্ত্রণায় কী করে সোজা হবার অপূর্ব কৌশলে ফের উঠে দাঁড়াচ্ছে লিকলিকে ঐ লাউয়ের ডগাখানি। আমাকে আশংকায় আবৃত করে। বুঝি আমি মায়ার ছেলেখেলা। এ মায়া কোথায় ছিল? কোথা হতে লাগল এর ছটা? এত মায়া, এত প্রেম, এত মান-অভিমান, এত ঘেমে ওঠা, এতটা ফেঁড়েফেঁড়ে দেখা, বিচ্ছেদের বন্দনায় নত হওয়া। ও সময়, কোথায় লুকিয়ে ছিলে তুমি?

বড়ো মানেই বসন্ত। বড়ো মানেই বৃহৎ। বড়ো মানেই বাস্তবতা। বড়ো হচ্ছি আমি। এক-পা মাটিতে রেখে অন্য পায়ে এগিয়ে যাবার যে ধ্বনি — দেখি আমি, বাস্তবে মানি আমি। অথচ মানুষ বলে দুই পায়ে হাঁটি।

বড়ো মানেই গ্রামছাড়া। গঞ্জ ঠেলে শহরে প্রবেশ করা। বড়ো মানেই মাটি আর কংক্রিটের বোঝাপড়া। বড়ো মানেই ছোট রে ছিন্ন করা। নানান রূপ আর রসায়নের মাত্রা খুলে-খুলে দেখা। সেখানে নানান চালাকি, নানান ভদ্রতা, সেখানে হিংসা, ক্লেদ, প্রতিহিংসার পথচলা।

দেখেছি গ্রাম কী করে বিলুপ্ত হতে চায় শহরের বুকে। শহর কী করে পালাতে চায় রাজধানীর পানে। এ এক অদ্ভুত সাপলুডু খেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি ঘ্রাণ কী করে উঠছে নামছে নিত্যদিন, সকাল-বিকাল। এ দৌড়ে রাজা হতে রাজমিস্ত্রি, মাঝি হতে মহাজন, কৃষক হতে কর্পোরেট পিছিয়ে নেই কেউ। একদিকে মিডিয়ার ঝংকার অন্যদিকে মাদকের হাতছানি। একদিকে কঠিন ফাঁপর অন্যদিকে ফরিয়ার ফরমানি।

এসবই ঘটছে। ভেঙে যাচ্ছে গ্রাম। আলগা হচ্ছে শহর। স্থূল হচ্ছে প্রেম, নিভে যাচ্ছে মায়া, কায়ার কাঁপুনি। রাজা আসছে রাজা যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে রাজনীতি। শুকনো পাতার ন্যায় ফলে তো হবেই— ওহে অর্থনীতি।

ওই মানুষ। ওই ¯ স্নিগ্ধ আযান আর শঙ্খের ধ্বনি, ঐসব রাখালের মুচকি হাসির মাঝে কী ছিল অর্থ, তাহা আজও না জানি। আর কী সম্ভব হবে কোনদিন?

এই যে এতসব লিখছি, খুবই লজ্জা করে, অতীত আমাকে অঢেল দিয়েছে। বৈচিত্র্যে মোড়ানো এই দেশের অপূর্ব সব ঋতুর ক্যারিসম্যাটিক কারসাজিতে আজও আমি অন্ধ, বাকহারা হয়ে যাই। আজও আমি মুক্ত আকাশের পানে চেয়ে সদ্য তৈরি করা সেদিনের শিক্ষানবিশ ঘুড়ির সামান্য উড়েই ডিগবাজির আস্ফালন স্পষ্ট দেখতে পাই। সেই সুতো, সেই আঠার গন্ধ। চোরা শীতের মাঠে-মাঠে কুয়াশার হাহাকারে জ্যোৎ¯œায় নিজেকে দেখার আবিষ্কারের মূহুর্ত, আজও সেই নামতা পড়ার ধ্বনি— আমি না পরি ভুলিতে মহাজন। সেই পথ, সেইসব ভূতের ভাতৃভূমি। ও আমার শিমুল, ও আমার চোরকাঁটা, ভ্যাঁটফুলে নিবেদিত প্রেমের পরশখানি। ও আমার চালতা, চড়–ই, নির্বোধ শালিকের চাহনি। আমি তো ব্যাকুল গন্ধে তোমারই ওগো ছাতিম, ওগো বট। শ্যাওলায় জেগে থাকা পরী আর পেতিœর ভালোবাসায়।

তবু সে বাস্তব পিছু না ছাড়ে। আমি আরও বড়ো হই। মনে আর দেহে যন্ত্র আর যুগের ঝাপ্টা এসে লাগে। দেশ ছেড়ে এবার বিদেশ তোমারে চিনি। চিনি প্রদেশ, চিনি মহাদেশ। চিনি রীতি, ঢং আর বাহানা। ধীরে-ধীরে বিশ্বের বাঁকে-বাঁকে আমার এ-মন তোমারে ছাড়তে থাকি। তুমি বুঝতে শেখো, তুমি ভাবতে শেখো। তুমি ডুবে-ডুবে যতটাই ডুবন্ত, উড়তে-উড়তে ততটাই উড়ন্ত। তুমি কাল হতে কালান্তরে, এই আজ বর্তমানে, ফের অতীতে, মূহুর্তেই ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করি। কখনো বাস্তব কখনো বা অলীকের লক্ষ্যে গ্রহ-নক্ষত্রের নিকট আতœীয়ের আচরণে আমারে শুধাও ভবিতব্যের কথাখানি।

এ রকমই জীবনের প্রায় পূর্ণাঙ্গ চালচিত্রের অপূর্ব আখ্যান তৈরিতে যেখানে যখন যা কিছু দেখেছি, শুনেছি তখনই বিরাট এক প্রশ্নবোধকের কাছে বরাবর নত হয়েছি আমি। কেন, কোথায়, কীভাবে-দল ধেয়ে এসেছে আমারে বধ করতে। ঠা-া মাথায় অযথায় আগুন জ্বালিয়েছে তারা। আর আমি উত্তরের জন্যে শুধুই মরেছি। মেরেছি নিজেকেই বারবার।

এরে শুধাই, তারে শুধাই কেউবা হালকা  সনেহে কিছুটা পরশ দিয়ে, কেউবা ধমক আর ঠাপে তাড়িয়ে দিয়েছে যথা। অথচ দিনে-দিনে আমার প্রশ্নে বাড়ে চঞ্চলতা। আমার পাঁচ ইন্দ্রিয় পাঁচ হতে পঞ্চাশ দিকেই ছুটেছে অযথাই। জগতের বিবিধ স্বার্থকথার বিবিধ ব্যর্থতাকে কী করে সাজাই আমি, কী করে মেলে ধরি স্রোতের শর্করায়।

সেই যে আমার হারিয়ে যাওয়া পিকনিকের খাতা, সেই যে বর্ষার প্রথম পানিতে তোমাকে চেনা। এক চোখে শিউলি ফুল অন্য চোখে হাসা। কি করে ব্যক্ত করি এত গান, এত সুর এত-এত গন্ধের বৈভবে নিসর্গের কূটভাষা! উঁকিঝুঁকি দেওয়া চির রহস্যের এমন বেঢপ মুহূর্তে। ফলে, ক্রমেই কবিতায় নিয়েছি ঠাঁই। পাকে-পাকে জড়িয়ে ধরেছি তাকে। নানান সংবেদনে অন্তরঙ্গ ঘনত্বে রঙিন সুতোয় বুনতে চেয়েছি তাকে। কখনো সত্যের সাথে মিহি তুলোর ন্যায় সামান্য মিথ্যাকে জড়িয়ে। গড়তে চেয়েছি তাকে বাস্তবে, কখনো বা অদৃশ্য অলীক অন্য উপহাসে। সাজিয়ে তুলতে চেয়েছি চালতা কিংবা ভাঁটফুলের মসৃণ সুবাসে। নয়তো পাটপঁচার বিদঘুটে অবাঞ্ছিত গন্ধের সমাহারে।

কখনো সে ঝিলিক দেয় নিত্য কিরিচের মতো। কখনো বা জং-ধরা ভিখিরির থালার ন্যায় পড়ে থাকে অচেনা ধুলোয়। নানান ম্যাজিক আর মেঘ এসে ভর করে আমার এইসব কবিতার পথে। আমার দেখা, না-দেখা, বোঝা, না-বোঝার ত্রিশঙ্কু এই ভুবনে তবু সে প্রবেশ করে। কাজেই অজাত সতীনের ন্যায় সে এসে হানা দেয় রোজ। নানান উস্কানিতে, নানান মশকরাতে নিষিদ্ধ প্রলোভনে সে কেবলই ডাকে। তারে রচিতে বলে। আমি লিখি, কাটি। গ্রহণে, প্রত্যাখানে অস্থির এক ঝড় বয়ে যায় মগজে, মনে, কোষে, কণিকায়, হাড়ের অভ্যন্তরে। কখনো সে জিতে যায়। কখনো বা হারে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি সদ্য লেখা কবিতার আশেপাশে। প্রতিটি পঙ্ক্তিকে সজোরে সাপটে ধরে।

******************************************************

সানাউল্লাহ সাগর
বাঁদুরের ইশকুলে রাত আসে : আমার ইশকুলে অচল কানাকানি
সকালটা শুরু হয়েছিলো পানিহীন। এক ধরনের অপবিত্র শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে। বিহারী মালিকের বাসায় ভাড়া থাকি। মালিকের সাথে আমার দুএকবার দেখা হয়েছে হয়তো। কিন্তু না সে, না আমি, কেউ কাউকে ওভাবে চেনার চেষ্টা করিনি। কারণ আমি প্রয়োজন মনে করিনি, হয়তো সেও করেনি। অথবা আমার মতো গোবেচারা টাইপের লোক দেখে তার কোনো আগ্রহ জন্ম নেয়নি। আসলে আমার তাকে কোনো প্রয়োজন হয় না। মালিকের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করে আমার সহ-বাসিন্দারা। তবে বিহারী মালিকের কিছু প্রশংসা করা যায়। রমজান মাসে আমাদের ফ্ল্যাটে থাকা চারজন সনাতন ধর্মলম্বী আর দুজন জন্মসূত্রে মুসলমান, যারা রোজা রাখে না। তাদের জন্যও তিনি নিয়মিত ইফতার পাঠাতেন। কি বলেন! এগুলোর সাথে লেখার বা লেখক যাপনের কোনো সম্পর্ক নেই! আমি বলি আছে। এইসব নুয়ে হাঁটা প্রতিটি মুহূর্তের সাথে লেখার সম্পর্ক আছে। মানুষের মধ্যে যে মানুষ থাকে সে আনমনে ছবি আঁকতে থাকে। সে সব কিছুই অত্যন্ত নিবিড়ভাবে দেখার চেষ্টা করে, দেখে। তার চোখের খাতায় সব টুকে রাখে। তারপর সেটা ঠিক সময় লেখা জন্মাবার প্রসব বেদনা উঠলে হাজির করে। নাচতে থাকে মদ-মাতাল নদীগুলো। রাত না হলেও রাতের তারারা হাতে হাতে চলে আসে আমার চারপাশে। তাদের হাতের থাকে অনেক নদী। যারা কথা বলে অথবা বোবা পাখির চরিত্রে অভিনয় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। আর আমি! আমার বেঁচে থাকারা সেই রকম কোনো চেষ্টাই নেই! ভুল বললাম কিনা! বুঝতে পারছি না! নিজেকে আরেকবার জিজ্ঞেস করে নিই! ধুর সে তো আমার সাথে ক্ষোভে এখন আর  কোনো কথাই বলতে চাচ্ছে না। তার মধ্যেও শুরু হয়ে গেছে লুকোচুরি। ধুম করে আমি নামতে থাকি, নামতেই থাকি। কোথাও না কোথাও নেমে যাই…

লেখাটা যে অনেক সময় কেবল অজুহাত হয়ে যায় সেটা বলার এবং মেনে নেওয়ার মতো সাহস দুটোই আমার আছে। আশা করি সামনের দিনগুলোতেও থাকবে। কিন্তু অজুহাত কেনো! এই প্রশ্ন নিজেকে করলে নিজের নিজ থেকে যে জবাবগুলো আসে সেগুলো বেশ ভয়ংকর। সেইসব জবাব সবার সামনে দাঁড় করানো আসলেই অনেক কঠিন। এই কঠিন কাজটা করার সৎ সাহস সব সময় জোগার করতে পারি না বলেই মাঝে মধ্যে কিছু মিথ্যে কথা বলতে হয়। সত্যের মোড়কে মিশিয়ে দেই কিছুটা লেবু ও লবনের দোষও। কিন্তু ওই যে মেনে নেওয়া! তাকে তো মেনে নিতেই হয়। তাকে না মেনে নিয়ে কোথাও তো যাওয়া যায় না! কোথাও যে আমিহীন আমিটাকে পাঠাতে পারি না। সে সবখানেই আমির পুরোটাকে নিতে পারে না এটা সত্য করে বলতে পারি। কিন্তু অনেকটা আমিই সবখানে ঘুরেফিরে নিজের মধ্যে ঘুমাই। নিজের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে থাকি ফুটপাত, সেক্স ওয়ার্কারের মিটিমিটি চোখ, রিকশার প্যাডেলে সাধু মুখগুলোর পা।  নিজের অজান্তেই আরো অনেক কিছু ফিরে আসে। আরো অনেক কিছু ফিরতে চায়। তারা দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দেয়। তারা দেখতে চায় আমার হাতে কোনো দুঃখ আছে কিনা। হাসিগুলো কেমন করে রোদ্দুর পুষে। আমি বাঘকে কি নামে ডাকি অথবা হরতাল হলে আমার মিথ্যা বকটা ক্যামনে হাত-পা নিয়ে টুপটাপ বিষ-টি কুড়ায়। আমি কোনো ইশারা দেই না তাকে। সে দাঁড়িয়েই থাকে। তারা দাঁড়িয়েই থাকে। আমি ঘুমালে সরি, সরি আমি অন্য জলে মুখ ধুয়ে এলে সে হুড়হুড় করে এসে পড়ে। বাকী থাকে না কিছুই। খুলতে থাকে সব। আমিও খুলে যেতে থাকি। অনাবৃত সব মুখের মুখোশে আমি একা। ঠিক সকলের একটা মুখ হয়ে যাই। সবশেষে দেখি একটাই মুখ সকলের মুখে। সেই মুখটা আমার মুখ। আমার অগনিত মুখ থেকে একটা মুখ খোয়া যায়। আমি আবার ঘুমাই। আমার হাত তুলি আবার বলি, আমার একটা মুখ চাই। আমার একটা মুখ লাগবে… হারিয়ে যাওয়া মুখটা আসে না। আমি তার শোকযাপন করতে স্কেচ তৈরি করি। নকল বানাই। অবিকল তার মুখ বানাতে বানাতে ক্লান্ত হই, ঝিমিয়ে যাই। ক্লান্তির সুযোগে সে আসে। আমার কাঁধে হাত রাখে। আমি হাসতে গিয়ে কেঁদে ফেলি। কাঁদি, কাঁদতেই থাকি…

কোথাও থেকে ইশকুল আসছে ভেবে আবার কোনো দিন আমি একলা একা জঙ্গল ঘাটি। জংলি ফুলে নাক বিক্রি করে দেই। নাকহীন আমাকে পরিচিত গাছেরা ডাকে। আমি বিভেদ খুঁজি। দিক খুঁজি। কোনো ডাকে সাড়া দেই না। চুপ হয়ে মুখ ঢাকি। প্রশ্ন করি উপরে উঠতে থাকা হাওয়াকে। মৃত্যু থেকে ফিরে আসা একেকটা শব্দকে। যারা প্রতি সপ্তাহে এনজিওর মতো সুদ পূরণ করে কারো না কারো টেবিলে লড়ে যায়। আমার বিস্ময় কাটে না। দেখি তাদের চোখে বড্ড ঘুম। আমি ঘুমকাতুরে হয়ে পড়ি। আমার অনেক ঘুম দরকার আবার সেটা টের পাই। আমার ঘুমগুলো বেঁচে আছে! ভেবে আর আমার ঘুম পায় না। আমি ঘুম ডাকি… রাতের বোতলে মাথার মূর্খতা ঢেলে ছিপিটা আটকে দেই।

তারপর খেলা শুরু হয়ে যায়। চলতে থাকে খেলা… খেলা চলে আর চলে…

আমি তখনো দর্শক-বন্দি এবং এতিম দর্শক আমি। যার হারানো ছাতা খুঁজতে বিষ-টিকে খুঁজে বের করাই জীবনের একমাত্র পণ।

সকাল থেকেই কিছু নিয়মের পিছন চেটে হাঁটতে হয়। বেছে বেছে কিছু দানবের নখ না কাটার কারণ নিয়ে অযথাই গবেষণা করতে হয়। এইসব আমার কিচ্ছুই না। আমি তো সেইসব লাউ-লতার ডগা থেকে বিন্দু বিন্দু শিশির ঠোঁটে নিয়ে আরেকটি ঠোঁটের জন্য শীত খুঁজি। একটা নদী খুঁজি, ঘাস খুঁজি বুক মেলাবো বলে। সেদিনের সেই পাবলিক বাসটা, যারা শরীরে বাংলা মদের নাম লেখা ছিলো! সেই বাস থেকে তোমাদের নামগুলো মুছে নিলে একে-একে। আমি শূন্য সেই বাসটায় ঢুকে পড়লাম। তখন ড্রাইভারও এক্সিডেন্ট করার পাল্লায় দৌড়। তখন আমি যাত্রী, আমিই চালক। আমার হাতেই টিকেটের বান্ডিল। কোনো যাত্রী নেই। গাড়ী থেমে আছে। কিইবা করার আমি তো গাড়ী চালাতে জানি না। আমি গাড়ীর ছাদে উঠে যাই। মাথায় ঝালকাঠীর গামছা বেঁধে হাক দিতে থাকি, ‘কেউ কি আছো? মিয়া আমারে আরেট্টু উরফে উডাইয়্যা দিবা? আমি এট্টু আহাশ ছুঁইতে চাই।’ মেঘগুলো কাছাকাছি চলে আসে। তাদের শরীরে বরফের গন্ধ। আমার তখন কথা বলতে সুবিধে হয়। আমি ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠি। বলতে থাকি কৈ মাছের ঝোল থেকে ক্যামনে আমি নৌকা হলাম! কেমন করে চাখোর মাঝি আমার সুবেদার চাচাকে কুত্তা বলে গালি দেয়। বলতে থাকি বলতেই থাকি। বৃষ্টিরা ততক্ষণে জেনে গেছে আমি আর একা নই। মেঘের সাথে আমার জব্বর পিরিতি শুরু হয়ে গেছে।

ঘুমের ঘোরে কি যে এক সাবলীল সুর তৈরি হয়, স্বপ্নঘরে তার স্বাধীন বিচরণ। মায়াময় নর্তকীদের নিবিড় আলিঙ্গন! সকালের কোমল আলো আর মধ্যবিত্ত ব্যস্ততার যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হয় জীবনের চিত্রনাট্য। মাতাল শহর মুগ্ধ ছায়া অবৈধ হাট এইসব আমার চিরপরিচিত মানুষের চিরপরিচিত স্বর। হাঁটতে হাঁটতে মানুষ দেখি পড়তে পড়তে মানুষ দেখি অভ্যস্ত ভঙ্গিতে আন্তরিক পাঠ নেই মানুষের। সতেজ ভাবনায় অধ্যয়ন করি প্রতিটি প্রত্যন্ত বাঁক। এখানে আমার প্রতিটি নির্বাক ধ্বনি আমার প্রতিটি দৃষ্টিভ্রম আমাকে ঘুমের দরজায় স্বাগত জানায়। এই ঘুম ক্রমেই পবিত্র থেকে পবিত্র হয়ে ওঠে… যেদিন বরষা ছুঁয়ে জ্যোৎস্নায় তামাসা ভেবেছিলাম সেদিন থেকেই কি এক অসুখে ক্লান্ত পায়রা আমাকে বাগিয়ে নিলো। সকালে বেলা করে ঘুম থেকে উঠি। কাজের নামে সব অকাজে দিন চলে যায়। সূর্যের সাথে আলো পালালে নিত্যনিঃসঙ্গতা চারপাশের দেয়ালের পাছায় সুড়সুড়ি দেয়…তীব্র কামকাতর হয়ে আলোকণার যোনিতে নিদ্রিত অন্ধকার জেগে ওঠে…তখন নিজেকে মেলে দেই তারাদের মৈথুন ক্রিয়ার অভ্যন্তরে। চেনা হরফের ডানায় বিজয় শিৎকার আমাকে এলোমেলো করে দেয়। নগ্ন বৃত্তান্তে মাথার কার্নিশে হেঁটে চলে অস্থির দুনিয়া। মরুভূমির শূন্যতা আফ্রিকার বর্ণবাদ নিপীরিত মানুষের অবয়বে পুঁজি বাজারে মুদ্রিত ছবি সব জলছবি নিদ্রার বাড়িময় আমাকে খুঁজে বেড়ায়।

যেতে নাই বলে থামি না। চলি বলি অবেলার পা-ুলিপি। অক্ষরের ঋতু¯্রাবে চোখ-মুখ তলিয়ে যায়। কোনো বনলতা সেন নীরা কিংবা কখনো কখনো পরি’র মাতৃত্বে ভয় পাইয়ে দেয়। খুব ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে ভয়ে যে জীবন ফড়িঙ হতে গিয়েও শুধু মরে যাওয়া খালের জোয়ার ভাটা দেখেছে। সেই জীবনেই মায়া আসে। পুঁটি মাছের নামে কলাই ফুলের শোক হঠাৎ করেই নাকে-মুখে লেগে যায়। শৈশবে বাবা’র পিটুনির ভয়ে পাড়া দৌড়ে দুষ্টমির প-িত হওয়া হওনি নায়ক হওয়ার ইচ্ছে ছিলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে ইচ্ছে পালিয়েছে… প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করার ইচ্ছে এখনো জিইয়ে রেখেছি… কখনো বা ভুল বাক্যে কাঁটাতারে মুখ ঘষে ক্ষত বাড়াচ্ছি। এসব করে করে কি কাঁটাতারে জড়ানো সরলপ্রবণ জীবন-যাত্রাকে বৃত্ত থেকে কঠিন করে তুলছি… হয়তো হয়তো না। তবুও বেঁচে আছি বাঁচার লোভে। অদৃশ্য সন্তানের মুখে চুমু খেয়ে খেয়ে তার প্রতিচ্ছবির বৈধতা দিতে চিৎকার করছি সময়ে-অসময়ে। কেউ কি ভর্ৎসনা করছেন? করুন! নতুন পথ দেখাবেন? কি দরকার! জাগতিক অসুখ ছেড়ে পরম অসুখের অপরিমেয় সুধা পান করছি এটাই আমার স্বনির্বাাচিত সঠিক পথ…

******************************************************

মাসুদার রহমান
সোনাপাড়া টু গুরগাঁও
১.দূর গুরগাঁওয়ের চিঠি আসে সোনাপাড়ার এক বিকেলে। গুরগাঁও? সোনাপাড়া তখনো জানেনি দিল্লীমুলুকের উপকণ্ঠে হরিয়ানা প্রদেশের এক শিল্পাঞ্চল; যান্ত্রিকশহর বিখ্যাত সুজুকি মারুতি মটরগাড়ির  কারখানা অধ্যুষিত গুরগাঁও-এর কথা। উল্লিখিত চিঠির প্রেরক মাননীয় রবীন্দ্রগুহ। রবীন্দ্র গুহ; এই নামটির সঙ্গে বেশ আগেই পরিচিত হয়েছি কৌরব, কবিতা ক্যা¤পাস, শহর ইত্যাদি লিটিল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য পত্রিকা সূত্রে। এক ম্যাচাকার গদ্যভাষার উদ্ভাবক হিসেবেই জেনেছি ওঁকে।  কবিতা ক্যা¤পাসের প্রকাশনায় ওঁর হাসান তারিকের রুপালি ইলিশ কাব্যগ্রন্থ পাঠে বিস্মত হয়েছিলাম এই পত্র প্রাপ্তির অর্ধযুগ আগে। রবীন্দ্র গুহ হাসান তারিকের রুপালি ইলিশ কাব্যে লিখেছিলেন ‘সতীচ্ছদ কচি ঘাসের মতো পশুখাদ্য’— অনুভবের এমন প্রকাশ যে— শিউরে না উঠে পারি নি। বিস্ময় মুগ্ধতা জড়িয়ে যায় রবীন্দ্র গুহ ও তাঁর লেখালেখিকে ঘিরে। তাঁর নিম বেতান্ত পড়েছিলাম ওই ক্যা¤পাস সূত্রেই; তখন জেনেছি রবীন্দ্র গুহ ষাটদশকের বিখ্যাত হাংরি আন্দোলনে ছিলেন মলয় রায়চৌধুরীদের সঙ্গে। পরে সেই আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এসে তিনি নিমসাহিত্য আন্দোলন করেন। শিল্প সাহিত্য স¤পর্কিত ষাটদশকের নানা মুভমেন্টের মধ্যে নিম সাহিত্য আন্দোলন বিশেষভাবে আলোচ্য। তবে বাংলাদেশে এই মুভমেন্টটির পরিচিতি তেমনটি নেই এখনো, নেই রবীন্দ্র গুহ স¤পর্কেও যথেষ্ট জানাশোনা। অথচ এই বাংলার বরিশালে জন্ম নেওয়া কবি কথাসাহিত্যিক শ্রী গুহ ৪৭-এর দেশভাগ ও হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বলি হয়ে এক সন্ধ্যায় নিজেদের বাড়িভিটে ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিলেন। হয়ে গেলেন রিফিউজি-উদ্বাস্তু। আজ যিনি নিজেকে ছিন্নমূল বিবেচনা করেন। সে কথায় আরও কিছু পরে আসব।

২.

স্কুলবেলায় প্রায়শ বেড়াতে যেতাম পাশের রিফিউজি পাড়াতে। তখনও জানি না ‘রিফিউজি’ শব্দটি প্রকৃত অর্থে কি ঘটনা বহন করছে। জেনেছিলাম; ওইসব পাড়া বা মহল্লার লোকজনের অধিকাংশ দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা যারা সবাই মুসলমান বাঙালি। ওই মহল্লার ছেলেমেয়ে আমাদের সমবয়সী যারা আমাদের সহপাঠী আর আমাদের খেলার সাথীও তারা। কিন্তু ওদের সঙ্গে কি আমাদের কোথাও একটা পার্থক্য রয়ে গিয়েছিল? বিশেষ করে বড়দের মুখে যখন শুনতাম রিফিউজিদের স¤পর্কে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য; তখন প্রশ্নটি কেবল মনে আসতো। পার্থক্যের কারণ আমরা ছোটোদের অনুভবে আসতো না। ওইসব পাড়া থেকে আসা সহপাঠীদের, বন্ধুদের সেই অর্থে কোনো ত্রুটি নজরে ছিল না আমাদের। ৪৭-এর দেশভাগের পরে নিজ জন্মভিটা ছেড়ে আসা একদল মানুষ যারা ধর্মে মুসলিম— ভাষাসূত্রে বাঙালি— এই মাটিতে দীর্ঘ সময় বসবাস করে মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায় অতিক্রম করে আশির দশকের দোরগোড়ায় এসেও তারা যেন এখানকার স্থায়ী বসবাসকারীদের চোখে তখনো রিফিউজি। এক আলাদা কমিউনিটির মানুষ। হতে পারে তারা নিজ ধর্মকে বড় অতœ-পরিচয় মনে করে সে সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতায় দেশভাগ ও তার পরবতী সময়ে তাদের জমিজিরেত স¤পদ স¤পত্তি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেনতেন ভাবে অন্য আর এক দল মানুষ যারা একই সংকটে ভুগতে থাকা এখানকার হিন্দু বাঙালি তাদের সঙ্গে পরিবর্তন (বদল করে) করে এপারে এসেছিল আর এপারের ওইসব হিন্দু বাঙালি পরিবার পাড়ি জমিয়েছিল ওপারে। সেই ৪৭-এ পাড়ি জমানো কথাসাহিত্যিক নিম আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা রবীন্দ্র গুহের মতো। ওপারে যারা গেলেন আমাদের সেই স্বজনরা কেমন আছেন তারা? ছিন্নমূল রিফিউজি উদ্বাস্তু এইসব নামের পরিচিতি থেকে কি তারা মুক্তি পেলেন? জানি না, তবে নিজ ধর্মকে সবচেয়ে বড় আতœ-পরিচয় মনে করে যারা অন্য ধর্মের মানুষের উপর নানামাত্রিক চাপ দিতে থাকল; নিরাপত্তা প্রশ্নে অস্থির করে তুলল এবং সেসব কারণে যারা এপার ওপার করলো নিজেদের ও পরিবার পরিজন তাদের আতœ-পরিচয় যেন ধর্মের চেয়ে ছিন্নমূল হয়ে বড় বেশি প্রকাশিত হল আজও। সেই কবে এ উপমহাদেশের মানুষের পিছু লাগা এক কু-ছায়া সাম্প্রদায়িকতার এ বিভেদ যেন পিছু ছাড়ে না। তাই তো দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ে এপার ওপার করল; আজও করছে যারা তাদেরও যেন সেই স্বস্তিটি আসে না, স্থিরতা আসে না। যারা রয়ে গেলেন সংখ্যালঘু হয়ে এপারে ওপারে তাদের নিরাপত্তা যেন গভীর জলে মধ্যে ভাসমান পানাটি ঢেউয়ে কাঁপিয়ে যায় সময় সময়। সে কারণে ওপার থেকে দাঙ্গার খবর কখনো কখনো আজও ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। এমনও খবর আসে গোহত্যার প্রতিবাদে সংখ্যালঘুদের উপর নেমে আসা নানামাত্রিক বর্বরতা তার কতটা গুজব আর কতটা যেন বাস্তব! এ জাতীয় গুজবও যে সমাজ ছড়ায় বা বহন করে যে সমাজ সাম্প্রদায়িকতাকে সাংঘাতিকভাবেই ধারণ করে আছে এ কথা নিশ্চিত। আবার এপারে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথেও দেখা যায় নানা ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানি। সংখ্যালঘুদের নিয়ে চলে রাজনীতির বাজারে বেচাকেনা।

৩.

অমিতাভ পাল সম্প্রতিক বাংলাকবিতায় বাংলাদেশের কবিতা খুব বেশি পরিচিতি পাওয়া নাম নয়; এমনটি মনে হয় আমার। হতে পারে এই কবি নিভৃত প্রচার প্রচারণার বাইরে বসেই কাজ করছেন। এই কবির কবিতা কিংবা তার কাজকর্ম নিয়ে তেমন পরিচিত ছিলাম না। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কবিতা ক্যা¤পাস পত্রিকার একটি ইস্যু  বাংলাদেশের আশির দশকের কবিতা নিয়ে স¤পাদক অলোক বিশ্বাসে সঙ্গে এই ইস্যুর অতিথি স¤পাদক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আশির কবিদের অনেকের মতো অমিতাভ পালের কবিতা স¤পর্কে আমার কিছু জানাশোনা হয়; পরে আরও কিছুটা গুরুত্বে আসেন এই কবি যখন হিলি সীমান্তে ২১ ফেব্রয়ারিকে কেন্দ্র করে এপার ওপার থেকে কয়েকজন কবি লেখক আমরা একত্রিত হচ্ছিলাম জিরো-পয়েন্ট নোম্যান্স ল্যান্ডে ভাষাদিবসে আমাদের প্রাণের শ্রদ্ধার্ঘ প্রকাশে; ভাষা ও শহীদের প্রতি। কবি অমল বসু আমার জন্য হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন সদ্য প্রকাশিত ওই বাংলাদেশের আশির দশকের কবিতাসংকলনের একটি কপি। অমল বসুর সঙ্গী এক কবি অতনু গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বাংলাদেশের কবিতা স¤পর্কে খুব আবেগী কিছু কথাবার্তা বলছিলেন এবং এক সময় জানালেন কবিতা ক্যা¤পাস পত্রিকার বাংলাদেশের আশির দশক কবিতা সংখ্যায় অমিতাভ পালের সংখ্যালঘুর মেয়ে কবিতাটি স¤পর্কে। জানালেন তার ভালো লাগা ও ওই কবিতাটির বাস্তবতা। কবিতাটি তাঁকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। ওঁর মন্তব্য আমাকে পুনরায় পড়িয়ে নেয় কবিতাটি। পূর্বের পাঠ আবেদন যেন পাল্টাতে থাকে।

একটি সংখ্যালঘুর বাড়ি গোপন অসুখে ভুগছে

গর্ভসঞ্চারী মেয়ের গর্ভের শিশুর মতো

বাড়িটি লুকিয়েছিল গাছের আড়ালে

টিনের চালে কাকের নখের দাগ

পেটে মাকড়সার ডিম

দরজায় বিবর্ণ পর্দা

বহুতল বাড়িদের সাথে তুলনার দূরত্ব কমিয়ে আনতে

বাড়িটির সন্ধ্যায় টিউবলাইট জ্বলে

টিনের চালে ফুটাতে আকাশের রং লাগানো

ঝাড়বাতির বাহার

ঘূণ আক্রান্ত দেয়াল তৈলচিত্রের মতো ঝোলে

পায়ের নীচে ফাটা মেঝের কার্পেট

উদাম বাথরুমের শ্যাওলা জড়িত পিচ্ছিল ইটের উপর দাঁড়িয়ে

বাড়িটি স্বপন দেখে নীলাভ ডিমলাইটে মোড়া

শোবার ঘরের দৃশ্যপট

আয়তনের স্ক্রু লাগান ডাইনিং ¯েপস

মেঘের কার্পেট আর আদুরে সোফার বিলাস

বাড়িটিকে ক্রমাগত শীর্ণ করে

সমুদ্রতীরের নারকেল গাছের মতো জলচ্ছাসের বাতাসে

কাঁপে পাঁজরের হাড়

শান্ত শংকাকুল নিরীহ একটি বাড়ি

সংখ্যালঘুদের মেয়ের মতো খোলা দরজা দিয়ে

তাকিয়ে দেখে সামনের প্রশস্ত মাঠ

একদিন সরু গলির বিছানা হয়ে গেছে

(সংখ্যালঘুর মেয়ে/ অমিতাভ পাল)

সাম্প্রদায়িকতার বর্বরতা চাপ তাপ হিংস্রতা মানুষকে মনুষ্যত্বকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এভাবেই উৎকণ্ঠিত করে রাখে তাহলে আজও? প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত নানা ঘটনা এর সত্যতা বাস্তবতা এভাবেই কাঁপাতে থাকে বাঁশপাতা মাছের মতো গভীর জলের তলায় গিয়েও। উপমহাদেশের বাস্তবতা যেন এমনি। রমজান মাসের এক দুপুরে বন্ধু প্রণবকে বলি বড্ড খিদে, এসো কিছু খেয়ে নিই পাশের টঙের দোকানে; আতকে ওঠে যেন বন্ধুটি। সে ওই দোকানে খেতে যেতে রাজি নয়। আমি বলি লোকজন তো খাচ্ছে ওখানে, অসুবিধে কি? প্রণব জানায় রোজার মাস চলছে; তাই সেটা ঠিক হবে না। আমার বন্ধুটি অতিমাত্রায় অন্যের রোজায় ভক্তি শ্রদ্ধা ভয় নাকি সমীহবশে অভুক্ত থাকার প্রক্রিয়ায়, আমার বিরক্তি উদ্রেগ করে। অনেকেই যেখানে নিজের প্রয়োজনটি মিটিয়ে নিচ্ছে ঝামেলা ছাড়াই এবং কারও বিশ্বাসের অমর্যাদা না করেই সেখানে অসুবিধে কোথায়? আমার পিড়াপিড়িতে ও জানায় ওর এক তিক্ত অভিজ্ঞতা; কোনো এক পহেলা রমজানের। বিশেষ কারণে ঘরে সকালের-নাস্তা না সেরে বেরিয়ে আসতে হয়েছিলো ওকে এবং বেরুবার সময় ঘরে রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে একটি কমলালেবু পকেটে ভরে নিয়েছিল, ব্যাপারটি এমন; সুযোগ মতো পথেই কোথাও মুখে দেওয়া। ওর মনেই ছিল না দিনটি পহেলা রমজান। একটি বাস-স্টপেজে ও কমলা লেবুটি পকেট থেকে বের করে মাত্র খোসা ছড়াতে গেছে আর রি রি করে তেড়ে আসা মানুষজন যেন ওকে পিষে মারে। দিনটি পহেলা রমজান স্মরণে এলে ভুল হয়ে যাওয়া জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেও যেন ভুল শুধরিয়ে নেওয়া যায় না।

৪.

হাংরি আন্দোলন যুক্ত হয়ে আবার তা থেকে বেরিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দেশ ছাড়ে যাওয়া কথাসাহিত্যিক কবি রবীন্দ্র গুহ নিমসাহিত্য আন্দোলন করেন। হাংরি বা ক্ষুধা নয় তিনি বুঝেছিলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাস্তুচ্যুত একজন মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা তিক্ততায় ভরা। সেই কিশোরবেলায় এক বিকেলে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা কিশোর রবীন্দ্র গুহ জানতেন না সন্ধ্যের পরে রাত্রির কোনো একটি অংশে তাকে পরিবারের সঙ্গে চিরদিনের মতো বাস্তুচ্যুত হতে হবে। সে সময় চলছিল দাঙ্গা আর দাঙ্গা নিয়ে নানা গুজব। তাকে ঘিরেই উত্তেজনা। ধর্ম নিয়ে দুটি শিবিরে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল উপমহাদেশের মানুষকে। শ্রী গুহ বলছেন; ত্যক্ত-বিরক্ত সাহিত্য-ই নিমসাহিত্যে। তার বিখ্যাত উপন্যাস  লোহারিয়া সূর্যের সাতঘোড়া নাভিকু ঘিরে শিকঞ্জের পাখি খামোশ সবটুকু জীবনের ত্যাক্তবিরক্ত খতিয়ান। সেখানে ভাষা এলো সাংঘাতিক এক ভাঙাচুরা রূপ নিয়ে। সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে নিজ ভিটে ছেড়ে নানা জায়গা ছিন্নমূল হয়ে নানা ভাষা আর পরিবেশে মিশে যেতে যেতে তার সাহিত্যেও তার ছাপ পড়লো। এক ডায়া¯পরিক টার্ন এলো তার লেখায়। তিনি অনুভব করলেন জীবন জুড়ে খুখু যুদ্ধ, যা মহাযুদ্ধের সামিল। সত্য দুধরনের; চাপানো সত্য আর আসল সত্য। জীবন জীবিকার জন্য ঘুরেছেন নানা জায়গায় কোনো জায়গাকেই তিনি স্বদেশের মর্যাদায় নিতে পারেন নি; তার লেখা এমনি অনুভবের অনুভূতি পাই। সাম্প্রদায়িকতার বলি হয়ে কথাকার রবীন্দ্র গুহ অনুভব করেন কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বহুদূরের ভারতবর্ষ দেখার। প্রকৃতঅর্থে সাম্প্রদায়িকতায় ঢাকা কলকাতা চট্টগ্রামে তখন দূরের ভারতবর্ষের দেখা পাওয়া অনেক সহজ ছিল। আজও সহজ; খুব সহজ যখন ৪৭ ও তার পরবর্তী সময় থেকে ওপার থেকে আসা মানুষদের পাড়ায় অর্থাৎ, রিভিউজি পাড়ায় যখন যাই খুব গভীরভাবে লক্ষ করলে বুঝি এই লোকগুলোর কোথাও একটা যেন কি আছে। বিশেষ করে যারা বয়সে প্রবীণ, যাদের জন্ম ওপারেই। তারা ছেড়ে এসেছেন জন্মভিটে বাপ দাদার কবর একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে থেকে বেরিয়ে আসতে চায় দাবিয়ে রাখা বুকের অতল থেকে। তাই বেরিয়ে এলো সময়কালীন কবিদের অন্যতম জয় গোস্বামীর কবিতায়:

গরু ডাকছে, আমাদের পূরানো বাড়ির

সব গরু।

মুংলি নামে, ঘেঁটি নামে, লক্ষ্মী ও কমলা নামে

আমাদের পুরোনো বাড়ির

সব গরু,

ডাকছে,

দুশো মাইল দূর থেকে…শুধু

গরু নয়, গরুর রাখালও ডাকছে, বাড়ির মুনিষও ডাকছে,

দোহাল করিমভাই, ঘুঁটে-দেওয়া কুমারী মেয়েটা…

ডাকছে, শুধু ওরা নয়, মেয়েটার খোঁড়া বাপ, মুনিষের

ছেলেমেয়ে

রাখালের আধফোঁটা বউ…

বেড়ালের নাম মিঠু, সে-অ ডাকছে,

কুকুরের নাম ভোলা, সে-অ ডাকছে, হাঁস, মুরগি, খাল-বিল,

আমাদের রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, গাছপালা

সবাই চীৎকার করে ডাকছে ওই পঞ্চাশ বছর ও- ও-ই পঞ্চাশ

বছর দূর থেকে

গলা

চিরে যাচ্ছে,

শুনতে পাচ্ছ না?

(দেশভাগ : পঞ্চাশ বছর/ জয় গোস্বামী)

এই ডাক শুনতে পাচ্ছেন, জন্মভিটে ওপার থেকে আসা এপারে লোকজন, এপার থেকে যাওয়া ওপারে লোকজন। কিন্তু এটিও সত্য সামনে এসে নৃত্য করে সেই দুঃস্বপ্নের রাতগুলো।

******************************************************

রেজওয়ানুল হক রোমিও
মনের কোণে লুকিয়ে রাখি একলা আকাশ
হিন্দুপাড়ায় তখন ঘটা করে আরতি পালন করা হতো। আমরা মুসলমান পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে যোগ দিতাম সে উৎসবে। সবাই একত্রিত হতাম রাত কিছুটা গভীর হওয়ার সাথে সাথে। বানিয়ার মোড় পার হয়ে সামনে থাকা বাঁশ-বাগানের ভিতর দিয়ে যেতে গা ছমছম করে উঠতো। আমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সাহসী ছিলো তারা হাঁটতো রাস্তার পাশ দিয়ে। অন্ধকারে জ্বলে ওঠা দুএকটা জোনাকি এসে পড়তো আমাদের গায়ে। দারুণ মুগ্ধতা নিয়ে আমরা সেসব দেখতাম আর কখনো কখনো দুহাত দিয়ে তাদের চেপে ধরে উড়িয়ে দিতাম শূন্যে। বাঁশ-বাগান পার হয়ে আমাদের পথ মিশে যেতো বাঁকা-চাঁদের আলোয়। সে এক মোহনীয় ব্যাপার। আকাশের বুক চিরে নেমে আসা চাঁদের আলোয় সবকিছু অদ্ভুত রকম ভালো লাগতো তখন। মাঝে মাঝে দল বেঁধে ছুট দিতাম রাস্তার একপ্রান্ত হতে অন্যপ্রান্তে। এটা কোনো প্রতিযোগিতা ছিলো না, এমনটা করতাম আমরা মনের আনন্দেই। এসবের মাঝে এক ধরনের সুখ ছিলো। রাস্তায় চলতে চলতে কখনোবা মনের অজান্তেই বের হয়ে যেতো দুচারটে কবিতার লাইন। কবিতা বলতে আমাদের কাছে ছিলো রবীন্দ্র-নজরুল আর কিছুটা জীবনানন্দ দাশ। এভাবে কখন যেনো আমরা পৌঁছে যেতাম আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। রাস্তার দুপাশের দোকানে সাজিয়ে রাখা বাতাসা আর গরম গরম জিলাপির মোহনীয় গন্ধ বালক হৃদয়ে সৃষ্টি করতো দুর্নিবার আকর্ষণের। চারপাশ থেকে লোকজন এসে জমা হতো এই আয়োজনে। কেউ সবে এসেছে আর কেউবা ব্যস্ত বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য। ম-পের পাশ জুড়ে যুবকের মুখ থেকে বের হওয়া আগুনের ফুলকি আর বরুণা দিদির রাঙ্গা পায়ের অবিরাম নৃত্য মুগ্ধতার পরশ ছড়িয়ে দিতো আমাদের কল্পনার রাজ্যে। আরতি শেষে ধুম পড়ে যেতো প্রসাদ নেয়ার। ছোট ছিলাম বলে আমাদের অধিকার ছিলো সব থেকে বেশি। প্রসাদ নিয়েই এক অপরের হাতের দিকে তাকাতাম, যার ভাগে বেশি পড়তো সেদিন তার আনন্দের সীমা থাকতো না। এরপর বাড়ি ফেরার পালা। সেরাজ চাচার দোকান থেকে নিয়ে আসা দুটাকার বাতাসা কখনো কখনো সঙ্গী হয়ে যেতো পথের। দল বেঁধে ফিরে আসা বেলাল, ফিদ্দুস, রবিউল, সেরাজুলের বুকে তখন কত-শত স্বপ্নের আনাগোনা। এই পৃথিবী, আমাদের এই ছুটে চলা, বাঁকা-চাঁদের আলোয় মিশে যাওয়া গ্রামের মেঠোপথ সবকিছু  সুন্দর মনে হতো তখন। সব কিছু সুন্দর মনে হতো বরুণা দিদির মতো!

গ্রামের মিশে থাকা সবুজ প্রকৃতির মধ্যেই কেটেছে আমার দুরন্ত শৈশব। যেখানে রোদ্দুর ছিলো, ছিলো শঙ্খচিলের মিশে যাওয়া সোনালি আকাশ। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাকোয়া নদীর অবিরাম ¯্রােত আমাকে টেনে নিয়ে যেতো কোনো এক নিরুদ্দেশ যাত্রায়, যেখানে আমার আমিকে আবিষ্কার করে যেতাম প্রতিনিয়ত। নদীর পাশেই বৃটিশদের রেখে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে প্রকান্ড বটগাছ দুটি। গাছের চারপাশে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বাঙালিদের শোষণের অনেক গালগপ্প চালু আছে সাধারণ মানুষের মাঝে। আমরা তখন বৃটিশ-ইংরেজ অতসব বুঝতাম না তবে একবার দেখেছিলাম গাছের দখল নিয়ে পাশের গ্রামের সাথে কি ভয়াবহ রক্তারক্তি ব্যাপার। বালক হৃদয়ে তা নাড়া দিয়েছিলো প্রচন্ড রকম। দাদাকে বলেছিলাম, ‘বড় হলে আমিও ওরকম দুটো গাছ লাগাবো দেখিস’। এই একটি মানুষ যে আমার সকল অত্যাচার সহ্য করে যেতো নির্বিবাদে। যাতায়াতের তেমন কোনো সুব্যবস্থা ছিলো না বলে দাদাই আমাকে রোজ স্কুলে নিয়ে যেতো। রেললাইনের পাশ দিয়ে রাস্তা ছিলো বলে সাইকেল চালানোটা খুব একটা সহজ কাজ ছিলো না। তার উপরে হঠাৎ করে সাইকেল থেকে নেমে শিমুলের ডালে বসে থাকা পাখিগুলোকে দে এক ঢিল। দাদা জানতো কিছু বলে খুব একটা লাভ হবে না তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতো। আমার অন্যায় আবদারে তার এই নীরবতাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিলাম, তাই খুব বেশি অসুবিধা হতো না। দাদা আজ মৃত্যুশয্যায়। আমার স্মৃতির আকাশে মেঘগুলো আজ তাই জমে আছে বৃষ্টি হওয়ার অপেক্ষায়। প্রতি বৃহস্পতিবার বাবা বাড়ি ফিরে আসতেন। বাবার প্রতীক্ষায় তেপতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সময়গুলোকে খুব বেশি দীর্ঘ মনে হতো তখন। আমি চেয়ে থাকতাম সূর্যটার দিকে। পশ্চিম আকাশের বুকে সবটুকু আলো নিয়ে সে যখন অস্তগামী, ঠিক সেসময় দেখতাম বাবা কেমন হাসিমুখ নিয়ে হেঁটে আসছে আমার দিকে। আমার বাবা, যাঁর কাছ থেকে চিনতে শিখেছি পৃথিবীকে। অনুভব করেছি তাঁর হৃদয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার এক অসম্ভব যন্ত্রণাকে। সত্য-মিথ্যা আর ধর্ম-অধর্মের বৃত্তের বাইরে গিয়ে তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন এক অন্য পৃথিবীর গল্প যেখানে মানুষের সমর্পিত আত্মা স্থান করে নিয়েছে কিংবদন্তীর। তাই আর অন্য কোনো মহাপুরুষ সন্ধানের আবশ্যক হয়ে ওঠে নি আজ অবধি। বাবা চলে গেছেন শেষ বিকেলের সূর্যের মতোই আমাকে একা রেখে। জীবনের সকল অনুভূতির শিখা যে মানুষটি জ্বালিয়ে গেলেন সেখানে আমি আজও শুনতে পাই অস্ফুট এক বেদনার স্বর। যা আজও প্রতিনিয়ত ডেকে চলেছে আমাকে।

গ্রাম থেকে যেদিন শহরে চলে এলাম, সেদিন নতুন করে আবিষ্কার করলাম নিজেকে। এক অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে রেখেছিলো আমাকে। এ বুঝি গ্রাম্য এক ছেলের নাগরিক হওয়ার যন্ত্রনা! ইট-কাঠ-পাথরের দেয়ালে এ এক অন্য আমিকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। এখানে নেই সবুজের সেই অবারিত প্রান্তর, নেই ভোরের শিশিরের ¯িœগ্ধ সে স্পর্শ। এখানে মানুষ নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে রঙ্গীন মোড়কে। সবাই ছুটছে, অন্তহীন সে ছুটে চলা। অর্থের ইমারত গড়ে জানান দিচ্ছে নিজেকে, ভুলে যাচ্ছে আকাশের ওপারে আর এক আকাশের কথা। সেখানে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, আছে শরৎ এর শঙ্খিনী আকাশ। কতসব মিথ্যা মোহ আবিষ্ট করে রেখেছে চারপাশ। নগরের কোলাহলে ছুটছে এক-ই অপরের পাশ ঘেঁষে, তবু যেনো একটুখানি দাঁড়ানোর বিরাম নেই। আধুনিক মানুষ হওয়ার পথে তাচ্ছিল্য করছে চারপাশের প্রিয় সবকিছুকে। বিচ্ছিন্নতাকে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে সময়ের বিরুদ্ধ¯্রােতে গিয়ে। আমার এই নাগরিক জীবন আমাকে দিয়েছে ভিন্নতার স্বাদ। জীবনের বহুমাত্রিক দিকগুলোর উন্মোচন ঘটিয়ে বুঝতে শিখিয়েছে বৈরিতাকে আলিঙ্গন করে কিভাবে সামনে এগুতে হয়। আর তাই পথ চলাতে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠলেও কখনও থেমে যেতে হয় নি। সভ্যতার পাশাপাশি জীবনের এই বৈপরীত্য আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তবে মানুষের মাঝে মানবিক হওয়ার অভিনয় আমাকে কষ্ট দেয়, নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে হয় তখন। তবে এটা ঠিক মিথ্যা কথার এই লাল-নীল শহরে এসেই প্রথম ভালোবাসা পেয়েছি, প্রেমে পড়েছি তার। আগন্তুকের মতো এসেছিলো সে আমার জীবনে। প্রথম যেদিন সে আমার সামনে এসেছিলো একটা নীল শাড়ি পড়ে, সেদিন আকাশে চাঁদ ওঠে নি কিন্তু আমার কাছে তার অপূর্ণতা ছিলো না বোধ করি। সব প্রথমের প্রতি মানুষের এক মোহ থাকে। এই মোহ মানুষকে করে তোলে চরম দুঃসাহসী। জীবনে প্রথম সে দুঃসাহসের সঞ্চার হয়েছিলো সেদিন। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো সময়। স্মৃতির পাতায় সেই আধোআলো ছায়া অপেক্ষা বাড়িয়েছে চাতকের মতো। তার মৌনতা আমাকে আরও বেশি আকর্ষিত করে তুলেছে। তাকে জানতে চাওয়ার সেই ব্যাকুলতার মাঝেই ছিলো নিজেকে নতুন করে অনুসন্ধানের প্রেরণা। প্রাচীরের ওপারে লাঠি লজেন্স ছড়ানো সেই দিনগুলো সত্যি অসাধারণ ছিলো। রেললাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা রৌদ্রজ্জ্বল সেই দিন, দামিনীপাড়ার মোড়ে প্রতীক্ষারত ক্লান্ত বিকেল আর প্রথম মোবাইল ফোনের স্বাদে ডিজুইসের রাতভর অফার জুড়ে তার নির্লিপ্ত স্পর্শের মাদকতা আজও বিভোর করে রেখেছে আমাকে। তাই রাস্তার অলিতেগলিতে আমার মতো নচিকেতাদের ভিড় আজও চোখে পড়ে, মনে পড়ে রাত জেগে শোনা সেই গানের কথা, ‘হাজার এ কবিতা, বেকার এ সবিতা, তার কথা কথা কেউ বলেনা, সে প্রথম প্রেম আমার…’

এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, আমার জীবনের সব থেকে স্বর্ণালি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিক্রান্ত জীবন। ছোটবেলা থেকেই লালন করে এসেছিলাম এই স্বপ্নটাকে। বাবা একদিন বলেছিলো, ‘জীবনে যা কিছু করিস না কেনো, সেখানে যেনো তোর নিবেদন থাকে, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার প্রয়াস থাকে।’  আর তাই নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প চিন্তা আমার কাছে ছিলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি ছাত্রের মতো আমিও এখানে এসেছিলাম এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে। প্রথম যেদিন মতিহারের এই সবুজ চত্বরে পা রেখেছিলাম তা আমার স্বপ্নালু চোখকে শুধু আলোকিতই করে নি বরং সেই সাথে দিয়েছিলো নিজেকে আবিষ্কারের অফুরান বিস্ময়। এর পরতে পরতে মিশে থাকা আমাদের রাষ্ট্রিক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আমার অহংবোধে জাগিয়েছিলো নতুনত্বের মাত্রা। দিগন্ত প্রসারিত সবুজের সম্মোহনে এর বিশালতা ব্যক্তিত্ব গঠনের পাশাপাশি দিয়েছিলো অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। পাখি ডাকা ভোরের প্যারিস রোড কিংবা ফাল্গুনের আবেশ ছড়ানো মুঠো মুঠো সোনা ঝরা রোদ শিখিয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে দুহাত ভরে শিক্ষা নেয়ার।  আর এই উপলব্ধিগুলোই আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে মানব থেকে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার। শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ছাদে কাটানো এক একটি রাত আজও অমলিন হয়ে আছে স্মৃতির পাতায়। রাত জাগা পাখিদের সাথে গেয়ে ওঠা হেমন্ত মান্নাদের সেসব গান আমাদের যেনো টেনে নিয়ে যেতো কোনো এক অজানার পথে। আমরা তখন নিজেদের হারানোর এক ভয় অনুভব করতাম। পাশাপাশি চলা এতোসব প্রিয়জন একদিন হয়তো জীবনের চোরাবালিতে ডুব দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো একে অপরের থেকে। সেসব ব্যথা আমাদের গভীরভাবে ভাবাতো। আজ যেমন আমরা সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে! ছাত্ররাজনীতির সুতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয় অধিকার আদায়ের যে মন্ত্র আমাদের চেতনায় জাগ্রত করে দিয়েছে তা যেমন সময়ে সময়ে প্রতিবাদের ভাষ্য হয়ে উঠে এসেছে তেমনি আবার মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিনিয়ত করে তুলেছে আধুনিক। মুদ্রার উল্টো পিঠের সাথেও পরিচয় হয়ে গেছে এখানে। জীবনের বর্ণিল আলোকচ্ছটায় সবুজ ক্যানভাসের পাশাপাশি রৌদ্রের দারুণ মূর্তি আমার মতো তরুণদের করে তুলেছে সন্দিহান। খুব বিশ্বাস নিয়ে যাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলে চলেছি, দেখেছি স্বার্থের প্রয়োজনে তারা কিভাবে কেটে পড়ে। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ করে নিজের আশাতীত প্রেরণার পাশে দেখেছি ঘোর অমানিশা। মাঝে মাঝে নিজের কাছেই অবাক লাগে এই সব মানুষের সাথে পথ চলতে হয়, পিঠ চাপড়িয়ে জানাতে হয় শুভকামনা। তাই দিনশেষে ‘বন্ধু’ শব্দটিকে দারুণ ফ্যাকাশে মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তাই বুঝেছি, ‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে! কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে সহজ লোকের মতো!’ তাই কোনোকিছুতে আজ আর বিস্মিত হই না। এতো কিছুর পরেও দিনশেষে আমাদের কিছু বিশ্বাসের জায়গা থাকে আর তা না হলে আমি মানুষ কেনো? আমাদের ভারতবর্ষের সূচনালগ্ন থেকে শিক্ষকদের বিশেষ এক স্থান আছে। কেনোনা তারাই আমাদের পথিকৃৎ। পৃথিবীর বাইরে গিয়ে তারাই আমাদের বিশ্বকে উপহার দেন। কিন্তু সময়¯্রােতে গুরুর সেই আসনটিও আজ নড়বড়ে। জীবনের বৃহত্তর এই পরিসরে এসে দেখেছি স্বার্থের প্রয়োজনে মেধাবীদের কিভাবে ব্যবহার করছে তারা। শিক্ষকতার মহান ব্রত নিয়ে যাঁরা এসেছেন এই পেশায় তাঁরাই শিক্ষাকে করে তুলেছেন বাণিজ্যমুখী। আমাদের মহানায়কেরা আজ তাই হারিয়েছে পিতৃত্বের আসন।

সময় আজ শুদ্ধতার সন্ধানে ব্যস্ত। যুদ্ধ আজ তাই শুধু নিজের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রতিপক্ষ এখন সকল স্বৈরতান্ত্রিক স্পর্ধা। যান্ত্রিক সভ্যতার পাশ ফিরিয়ে মানুষের সফলতা আজ শুধু নতুনের নির্মাণ নয়, বরং সেখানে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে দিচ্ছে নিত্য নতুন। আকাশের দিকে তাকিয়ে যাঁরা এর বিশালতাকে স্পর্শ করার সাহস দেখিয়েছিলো একদিন, বলেছিলো নতুন পৃথিবী গড়বার কথা তাঁদের যুদ্ধে আমিও আজ সামিল হতে চাই। বলতে চাই আমিও তোমাদের-ই একজন। পৃথিবীর এই রণ নৃত্যে স্বাধীনতাটুকু আমিও পেতে চাই। ক্ষুধার যন্ত্রণায় সাতাশি কোটি নিরন্ন মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আমারও আছে। কালো চামড়ার আঁধার দিয়ে আলোকিত করতে চাই এ পৃথিবীর সকল আদিমতম ধূসরতাকে। মার্কসের আলোবর্তিকা তাই শুধু আজ মুগ্ধতা হিসেবে নয় বরং একবিংশ শতাব্দীর রূপরেখায় এর অবশ্যম্ভাবিতা আমাদের স্মরণ করতে হবে। এ সব কিছুকে জয় করতে হবে সময়ের বিরুদ্ধ¯্রােতে গিয়ে। নতুন করে শুরু করতে হবে জয়যাত্রা। সেই স্বপ্নটুকু নিয়ে এগিয়ে চলেছি নিরন্তর। চিরচেনা নদীর পাশ দিয়ে আকাশে পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে অসীমকে স্পর্শ করার যে স্পৃহা জেগেছে মনে তা আজ তা ছুঁতে চাই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে। স্বপ্নকে সত্যি করার এক দুর্লভ ক্ষমতা আছে বলেই মানুষ আজও বেঁচে আছে। আর তাই সে প্রেরণা পায় প্রকৃতির কাছ থেকে, জীবনের কাছ থেকে। ‘মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়’- এই বিশ্বাসটুকু বুকে নিয়ে তাই স্বপ্ন দেখি বিশ্বজয়ের!

******************************************************

নাজ
রঙ এর অলিতে-গলিতে
ভেজা হ্যা-মেটে এক ফোঁটা সবুজ রঙ পড়েই চারপাশে বংশবিস্তার করে নদীর মতো গতিপথ সৃষ্টি করল। আর তখনই পৃথিবী কচি কলাপাতার সাজে সেজেছিলো। প্রাণের কলাহলে বোবা মেয়েটি যেন প্রথম কথা বলতে পেরে অবাক হলো। ফুলও ফুটলো। এভাবে অনেক প্রহর চলার পর হঠাৎ দূরের তমাল গাছটায় অন্ধকার নামলো। শিল্পীর বুকে আশঙ্কা হল যে অন্ধকার যদি তাকে আমাকে গ্রাস করে। সত্যি সত্যি অন্ধকার কাছে আসতে থাকল। ত্রাস তখন ক্ষোভের সৃষ্টি হল। অন্ধকার তাকে আচ্ছাদন করলে ক্রোধ আর এক বুক শূন্যতা কাটাতে সে বাঁশি হাতে তুলে নিল। বাঁশিতে কেবলই কর্কশ শব্দ বের হয়, কোমল মিষ্টিস্বরে পঞ্চমস্বর বের হয় না। গুরু মশায় বলেন সুর থাকে আকাশে, তাকে সাধনার দ্বারা বাঁশিতে আনতে হয়। হৃদয়ের সম্পূর্ণ বাতাস দিতে হয় সাউ-হোল্ডে, তবেই তো নোটেশন হোল্ডের ছটি ছিদ্রবন্ধ থাকা সত্তেও শ্রুতিমধুর পঞ্চমস্বর বের হয়। এই স্বর বের হলে তবেই বাঁশিবাজানো সম্ভব। আর তখনই ভৈরব বাজালে ভোরের অরুণ বর্ণ আভা আসবে। শিল্পিত মন পদ্মাসনে বসে চোখ বন্ধ করে কর্কশ সুরটি বাজায় আর আকাশে কোমল সুরটি খোঁজে। কারণ, ভৈরব বাজাতে না পারলে আলো আসবে না। আলো না এলে তার ক্যানভাসের সবুজ পৃথিবী কালো হয়ে থাকবে আর পৃথিবীবাসী আলো না পাওয়ার ক্রোধে এক একজন গোখরো সাপে পরিণত হবে। গোখরোদের দ্বারা সাধনা চলে না, এরা শুধু নিজের মধ্যে ক্রোধান্বিত হয় জৈবিক চাহিদার জন্য। ক্রোধ সাধনায় সিদ্ধির চরম বাধা। তাই পুরো পৃথিবীকে শান্তির সবুজ দিতে হলে তাকে ভৈরব বাজাতেই হবে। কিন্তু পঞ্চমস্বর খুঁজে না পেলে কিভাবে সে সারগাম করবে আর কিভাবেই বা রাগ বাজাবে। বাঁশি ফোকার ফলে মাথা ঝিমঝিম করে মনে হয় সে পড়ে যাবে, পৃথিবীতে আলো আনতে পারবে না। তার ভাবনা হয় তবে কী মানুষগুলো বিপথে যাবে! পৃথিবীতে কারো কোনো লক্ষ থাকবে না, সবাই কেবল অন্ধের মতো ছুটবে! না, তা হতে পারে না, আকাশের যে স্তরে পঞ্চমস্বর থাকুক তাকে আমার কাছে আসতেই হবে। কারণ, আমি এস.এম. সুলতানের ‘যাত্রা’ ছবিটি দেখেছি। শিয়াল ডাকা গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি এই ছবিটির সঙ্গে। এ ছবিতে

ষাটটি ফিগার আছে, অথচ প্রথম দর্শনেই মনে হবে শত শত ফিগার। যারা অদম্য ইচ্ছা আর অসীম সাহস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। যাদের পেশী এবং আকার দেখে ধারণা করা যায় তারা কি পরিমাণ শক্তি ধারণ করেন। পৃথিবীর কোনো অপশক্তির নিকটে তারা মাথা নোয়াবে না। তারা এগিয়ে যায় দৃঢ়-প্রত্যয়ে। এদের এক একজনের সঙ্গে প্রতি রাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাবার্তা হতো। আর তাদের শক্তির রহস্য কি তা কিন্তু তারা আমাকে জানিয়েছে। গভীর জ্বরে আমি যখন অবচেতন থাকতাম, তখন দেখতাম আমি এস.এম.সুলতানের সঙ্গে আকাশে উড়ছি তিনি বিভিন্ন মনোরম দৃশ্য দেখাচ্ছেন আর একটা কথা বারবার বলছেন। যদি তুমি সৎ স্বপ্ন দেখ আর সেজন্য শ্রম দাও, তবে তুমি আমার ছবির চরিত্রের মতো শক্তিমান হয়ে উঠবে। যারা প্রকৃতির শাসনে চলে না, প্রকৃতিকে শাসন করে। কারণ তারাই তো ঈশ্বর! তুমিও তো ঈশ্বর, তুমি নিজেকে জানার স্বপ্ন দেখ আর সাধনা কর। পূর্বে মূনি-ঋষিরা পদ্মাসন গ্রহণ করে চোখ বন্ধ করে নিজেকে খুঁজতেন। এখন ডিজিটাল সময়ে পৃথিবী খুব অস্থির আর সহজলভ্য। তাই ওভাবে ধ্যান না করে কোনো কাজে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। তা হতে পারে রং, হতে পারে সুর বা শব্দ প্রভৃতি। সাধকরা যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বন্ধ রেখে তৃতীয় নয়ন দিয়ে আলো দেখেন! তুমিও সাধনার দ্বারা আলো আনতে পার। তখন দেখবে করুণায় মন ভরে উঠবে ক্ষোভ করার মতো কোনো প্রাণী বা বস্তু কিছুই থাকবে না। পরম শান্তি অর্জন হবে তোমার। সকল সমস্যার সমাধান হবে তুমি। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীকে তুমি ক্রোধ-মুক্ত করতে পারবে। যদি কোনো পথে যাত্রা করতেই হয় তবে আমার ‘যাত্রা’ ছবিটি দেখ। ওদের মতো বুক বাড়িয়ে মাথা উঁচিয়ে যাত্রা করো। তুমি জয়ী হবেই। তাই শিল্পীকে অসুস্থ হওয়া যাে ব না, যে পর্যন্ত না পঞ্চমস্বর খুঁজে না পাও সে পর্যন্ত ফুঁ দেওয়া বন্ধ করবে না। দেহে বাতাস যতক্ষণ আছে ততক্ষণ সে বাঁশিতে বাতাস দেবে, এই তাঁর প্রত্যয়। কর্কশ স্বরে বাঁশি বাজতে থাকে অনেক প্রহর। এক সময় পুরো শরীর অবসাদ হয়ে আসে। তখন ই মনে পড়ে জয়নুল আবেদীনের ‘সংগ্রাম’ ছবির কথা। কি অদম্য শক্তি আছে এই ছবিতে। কাদায় বসে যাওয়া একটি মালবাহী গাড়ীকে উঠানোর কি কঠিন সংগ্রাম চলছে গরুতে-মানুষে। শিল্পীকেও এমন সংগ্রাম করে যেতে হবে। আবেদীনের আরও একটি ছবি আছে ‘কালবৈশাখী’। ছবিটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তথাপি ছবিটির রয়েছে সৎ-সাহস। ‘কালবৈশাখী’ ছবিতে দুজন নারী ঝড়ের মধ্যে পথ চলছেন, তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য এই দুই নারী আর কেউ নয়। এই সমাজের প্রত্যেককেই তাই। সবাই যেন জীবনের পথ পাড়ি দিচ্ছে— এই ঝড়ের মধ্যে। তবে কি মানুষের গন্তব্য মৃত্যু? হয়তোবা তা-ই। তবে কিছু কিছু মানুষ মৃত্যুকে ছাপিয়ে উঠে তাদের কর্মের দ্বারা। যে কর্মের লক্ষ্যে পৌঁছেছে— এই কালবৈশাখী পাড়ি দিয়ে। এই ঝড় যেন ‘ফুলসিরাত’ যা পাড়ি দিতে পারলে তবে আসবে শুভদিন। যারা এই ঝড়কে ভয় পায়, পথ এগোয় না তারা হয় অকর্মক। এরা নতুন নতুন চ্যালেন্স গ্রহণে পিছপা হয়। এই ছবিতে শিল্পী দুজন পুরুষকে দিতে পারতেন। তা না করে ছবির চরিত্রে এনেছেন দুজন নারী। যা থেকে বোঝা যায় এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের পথ চলা কতো দুর্গম! পথ চলাতে সবাইকে কঠিন পথটাই পাড়ি দিতে হবে। যা সহজে পাওয়া যায় তার মূল্য নিতান্তই তুচ্ছ। শিল্পীকেও কষ্ট করেই পৃথিবীতে আলো আনতেই হবে। কালবৈশাখীর ঐ দুই নারীর মতো শিল্পীর যাত্রা। যেখানে আকাশ কালো-অন্ধকার। বাঁশির সুর পূর্বের চেয়ে কোমল হয়েছে কিন্তু সুমিষ্ট হয়নি। অন্ধকারে শো শো করে বাতাস বইছে, শিল্পী বিভোর হয়ে পঞ্চমস্বর খুঁজে ফিরছে। যেমন করে নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজে বেড়ায় তার মা। শিল্পীর বুক হাহাকার করে ওঠে, যদি না হয় পূর্ণ পরিতৃপ্ত। সহসাই রবীন্দ্রনাথ তাকে স্মরণ করে দেয় :

সন্ত্রাসের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান

সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ¤্রয়িমান-আ! আহা!

মুক্ত করো ভয়,

আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়-আ! আহা!

সে বুঝতে পারে ‘যদি না হয়…’ বলে পৃথিবীতে কোনো বাক্য থাকতে পারে না। এই বাক্যে নিজের নিজেকে অপমান করা হয়। শঙ্কা, সঙ্কট থেকে মুক্ত হতে পারলে জীবনে সব হবে আর না পারলে কিছু হবে না। ফলে শিল্পী একাগ্রচিত্তে ভাবতে থাকে— অবশ্যই হবে। সুর আমার কাছে আসতে বাধ্য। কারণ আমার বিশ্বাস সুরকে চায়। আর আমার বিশ্বাসই ‘পরম’। একে চাইলে পৃথিবীর সব সম্ভব।

মোহাবিস্ট আর্টিস্ট এক ধ্যানে বাঁশি বাজাতে থাকে। সে যেন একটি কঠিন নেশার মধ্যে প্রবেশ করেছে, ছাড়তে পারছে না। নিজের না জানতেই তার দম বেড়ে গেছে। সুর কোমল হচ্ছে, কোমল পঞ্চমসুরটি যেন তাকে জগৎ সংসরের বাহিরে নিয়ে গেছে। নিজের সুর শুনে সে নিজেই বিমোহিত। সারগাম করার সময় মনে হচ্ছিল নদীর ঢেউ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। যেন একটি নির্দিষ্ট গতিতে, যেমন করে বাতাস বয়। তার মাঝে পাখির ডাক শুরু হয়ে দূরে— হারিয়ে যায়। এমনি করে আর্টিস্টের বাঁশি বাজতে থাকে। যেন এই সুর কৃত্রিম কোনো সুর নয়। এটি প্রকৃতিরই অংশ। এক সময় দ্বিতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুর কোমল করে, সে ভৈরবের আলাপ করলো। তারপর শুরু হলো বন্দীস :

ভোরা ভায়ো চিড়িয়া বোলে বন মে

ভানু দিত ভায়ি।

পুরা বা গাগান মে।

এই বন্দীসের সুর সাজানো হলে আন্ধকার ভেদ করে একটু আালো নামলো পৃথিবীতে। সেই আালোতে শিল্পী প্রথম তার ক্যানভাসের স্বপ্নের সবুজ পৃথিবীকে দেখতে পেলো। সুর যখন আাস্তে আাস্তে বাড়তে থাকলো আালোও ফুটতে থাকলো। সে আলোতে তার সামনের শিশু গাছটি দেখতে পেলো। সুর আাকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে আার চারদিক যেন আলোকিত হচ্ছে। শিশু গাছটির পর ক্ষেত আলোময় হলো। তারপর দূরের গ্রামটি এবং সর্বশেষ তমাল গাছ আন্ধকারের গুহা থেকে বেরিয়ে এল। চারদিকে পাখিদের কন্ঠে শিল্পীর বিজয় ধ্বনি বেজে উঠল। আনন্দে সব প্রাণীরা নৃত্য করতে লাগল।

আর পৃথিবীর গোখরাগুলো মস্তক অবনত করল সুরের মহিমায়। ঐভাবেই তারা দেখলো বাঁশিওয়ালার সুরের ধরণী। যেখানে মানুষের কোনো ক্রোধ নেই, মানুষ প্রত্যেকটা প্রাণীকে সম্মান করে। সবার প্রাণ শান্ত, যেন, বৃক্ষের সমান ধৈর্য্য নিয়ে সবাই জীবনতরী পাড়ি দিচ্ছে। প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান শরীর— মানবশরীর। এই শরীরই মুক্তির দ্বার। অথচ ক্রোধ, লোভ, হিংসা প্রভৃতি মানুষকে মুক্তি থেকে আনেক দূরে রেখেছে। এই সত্য আবগত হওয়ার পর সব মানুষ সাধনার দ্বারা তাদের রিপুসমূহকে সংযত করেছে। যা সম্ভব হচ্ছে শিল্পীর ছবি আর সুরের মধ্য দিয়ে। যেন জয়নুল আবেদিনের ‘বিদ্রোহী’ ছবির গরু বাঁধন খুলে মুক্ত হয়েছে। সাথে সাথে পৃথিবীর সব বাঁধন খুলে গেছে। মুক্ত হয়েছে মানুষ, মুক্তি পেয়েছে আত্মা।

******************************************************

     অনুবাদ

ইতালো ক্যালভিনোর গল্প
নিয়ানডার্থাল মানব
অনুবাদ : মহীবুল আজিজ
[ইটালো ক্যালভিনো (১৯২৩-১৯৮৫)-ও জন্ম কিউবায় এবং মৃত্যু ইটালিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উত্তর ইটালিতে জার্মান সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তিনি। ‘অদৃশ্য শহর’, ‘শীতের রাতে যদি কোন পর্যটক’, প্রভৃতি বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর কুড়িটির মত গ্রন্থ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বর্তমান গল্পটি তাঁর ‘নিয়ানডারথাল ম্যান’ গল্পের অনুবাদ।]

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আমি কথা বলছি ডুসেলডর্ফের কাছাকাছি অপূর্ব চিত্রময় নিয়ানডার্থাল উপত্যকা থেকে। আমার চারপাশে রয়েছে চুনাপাথরের পাহাড়ের বাঁক নেওয়া নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী। আমার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রাকৃতিক গুহা এবং মানুষের তৈরি পাথরের খাদ দু’টোতেই ধাক্কা লেগে। ১৮৫৬ সালে এইসব পাথরের খাদের ওপর কাজ করবার সময় এই উপত্যকার সবচাইতে প্রাচীন মানুষদের একজনের খোঁজ মিলেছিল। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে সেই মানুষ বসতি গড়েছিল এখানে। নিয়ানডার্থাল মানব: তাকে ঐ নামে ডাকাটাই তারা স্থির করেছিল— উপত্যকাটার নামানুসারে। আমি নিয়ানডার্থালে এসেছি তার সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে। আমাদের গোটা সাক্ষাৎকারটা জুড়ে আমি তাকে ডাকবো নিয়ানডার সাহেব এই সরলীকৃত নামে। আপনারা হয়তো জেনে থাকতে পারেন যে নিয়ানডার সাহেব স্বভাবগতভাবে খানিকটা জড়তাযুক্ত, এমনকি খানিকটা বদমেজাজি-ও। এর কারণ অংশত তার বৃদ্ধ বয়স। নিজের যে-আন্তর্জাতিক খ্যাতি সে পেয়ে আসছে তার দ্বারাও তিনি বিশেষভাবে প্রভাবিত বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও আমাদের অনুষ্ঠানের জন্যে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি যথেষ্ট বিনয়ের সাথে সম্মত হয়েছেন। এই যে তিনি আসছেন তাঁর চারিত্রিক কিছুটা স্থূল ধরনের চলনভঙ্গি নিয়ে। তাঁর চোখের ভ্রƒর বিখ্যাত জ্যায়ের নিচ থেকে তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন আমাকে। এতে আমি প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে তাকে কিছুটা অবিবেচক ধরনের একটা প্রশ্ন করতে উৎসাহিত বোধ করি। করি একটা সন্দেহাতীত ঔৎসুক্য থেকে যেটা আমাদের অনেক শ্রোতাই বোধ করে থাকেন। নিয়ানডার সাহেব, আপনি কী এতটা বিখ্যাত হবেন আশা করেছিলেন? বলতে চাচ্ছি: যতদূর আমরা জানি, আপনি আপনার জীবনে উলে¬খ করবার মত কিছু করেন নি। তারপর হঠাৎ করে আপনি দেখতে পেলেন আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। আপনি এটাকে ব্যাখ্যা করবেন কীভাবে?

নিয়ানডার: সেটা আপনার কথা। আপনি কী ছিলেন সেখানে? আমি হ্যাঁ, আমি সেখানে ছিলাম। আপনি না।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক আছে, আপনি ছিলেন সেখানে। আচ্ছা, আপনার কী মনে হয় সেটাই যথেষ্ট?

নিয়ানডার: ইতোমধ্যে আমি সেখানে ছিলাম।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আমার ধারণা, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়ানডার সাহেবের অসাধারণত্ব যতটা না সেখানে থাকার মধ্যে, তার চেয়েও বেশি তার সেখানে ইতোমধ্যে থাকার মধ্যে। সেখানে থাকাটার মানে তাহলে আরও অন্য অনেক-অনেকের চেয়েও পূর্বে থাকা। পূর্ববর্তিতা একটা বৈশিষ্ট্য যেটাকে কেউ অস্বীকার করতে চাইবে না, নিয়ানডার সাহেব। যাহোক অধিক বলতে কি … এমনকি তারও পূর্বে, এ-পর্যন্ত গবেষণা থেকে যতটা জানা যায়, এবং যেমন আপনি নিজেও নিশ্চিত করলেন, তাই না নিয়ানডার সাহেব? আমরা নিদর্শন পাচ্ছি, অনেক নিদর্শন, এবং অনেক মহাদেশে, মানুষেরই, হ্যাঁ, ইতোমধ্যে মানুষ হওয়া মানুষের …

নিয়ানডার: আমার পিতা …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বেকার অতীত …

নিয়ানডার: আমার পিতামহ …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: কাজেই আপনার পূর্ববর্তিতাকে, নিয়ানডার সাহেব, আপনাকে অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়, যদিও মনে হতে পারে যে এটা একটা আপেক্ষিক পূর্ববর্তিতা: ধরা যাক যে আপনিই প্রথম …

নিয়ানডার: তবে, আপনার পূর্বে …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক বলেছেন। কিন্তু বিষয় তা নয়। আমি বলতে চাচ্ছি আপনিই প্রথম, বিশ্বাস করা হলো যে যারা পরে এসেছে তাদেরও প্রথম আপনি।

নিয়ানডার: সেটা আপনি মনে করেন। তার আগে ছিল আমার পিতা …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: কেবল তিনিই নন, কিন্তু …

নিয়ানডার: আমার পিতামহ …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আর তারও পূর্বে? এবারে মনোযোগ দিয়ে ভাবুন একটু, নিয়ানডার সাহেব, আপনার পিতামহেরও পিতামহ!

নিয়ানডার: না।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ‘না’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

নিয়ানডার: ভালুক!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ভালুক! এক টোটেম পূর্বপুরুষ! আপনারা যেমনটি শুনতে পেলেন, নিয়ানডার সাহেব মনে করেন যে তার পরিবারের বৃক্ষ শুরু হয়েছে একটা ভালুককে দিয়ে। সন্দেহ নেই, প্রাণির টোটেমকে তার গোত্রের, তার পরিবারের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল!

নিয়ানডার: আপনার পরিবারকে বোঝাচ্ছেন আপনি! প্রথমে ছিল ভালুক, তারপর ভালুক গিয়ে আমার দাদাকে খেয়ে ফেলল… তারপর এলাম আমি… তারপর আমি গেলাম এবং ভালুকটাকে হত্যা করলাম… তারপর আমি ভালুকটাকে খেয়ে ফেললাম।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেব, আপনি আমাদেরকে যে মূল্যবান তথ্য দিচ্ছেন সেটা আমাকে একটা মুহূর্ত আমাদের শ্রোতাকে ব্যাখ্যা করে বলবার সুযোগ দিন। প্রথমে এলো ভালুক! এ-কথাটা আপনি কতটা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করছেন, আদিম প্রকৃতির পূর্ববর্তিতাকে অসাধারণ স্বচ্ছতার সঙ্গে বর্ণনা করে, জীববিদ্যাগত পৃথিবীর বর্ণনা করে— যেসবকিছু পশ্চাৎপটটাকে দাঁড় করায়। ঠিক কি-না, নিয়ানডার সাহেব?, মানুষের আবির্ভাবের অংকুর-পশ্চাৎপট। আর যখন মানুষ পা রাখে, বলতে গেলে ইতিহাসের পাদপীঠে, তখনই প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সংগ্রামের মহা-অভিযানের সূচনা। যে-প্রকৃতি প্রথমে আমাদের প্রতিপক্ষ, তারপর তা কালক্রমে আমদের ইচ্ছেশক্তির বশীভূত হলো। যে-প্রক্রিয়াটা হাজার-হাজার বছর ব্যাপী বজায় থাকল সেটাকে নিয়ানডার সাহেব খুবই কুশলতার সঙ্গে ভালুক-শিকারের নাটকীয় দৃশ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করলেন। এই মিথটা প্রায় আমাদের ইতিহাসের সূচনালগ্নেরই।

নিয়ানডার: যে ছিল সে আমিই ছিলাম। আপনি না। সেখানে ছিল ভালুক। আমি যেখানে যাই ভালুক সেখানে আসে। যেখানে আমি সেখানেই আমার চারপাশে ভালুক, আমি নাই তো ভালুক নাই।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক। মনে হচ্ছে আমাদের নিয়ানডার সাহেবের মানসিক দিগন্ত পৃথিবীর সেই অংশটা ছাড়িয়ে আর বেশিদূর পৌঁছায় না, যে-অংশটার উপস্থিতি তার ইন্দ্রিয়ানুভূতির অব্যবহিত সীমানার মধ্যে। সেটাকে ছাড়িয়ে সময় এবং মহাশূন্যের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাদির কোন প্রতিনিধিত্ব সেখানে নেই। তিনি বলছেন, ভালুকটা সেখানে যেখানে আমি ভালুকটাকে দেখতে পাই, আমি না দেখতে পেলে ভালুকটা নেই। সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ চলাকালে কেউ চাইলে অবশ্যই এই সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখে সেই সীমানাকে অতিক্রম করে যায় এমন কোন প্রশ্ন করবেন না নিশ্চয়ই, আমি ঠিক বললাম তো? বিবর্তনচক্রের মধ্যকার একটা অতি প্রাথমিক স্তরের মনন-সক্ষমতা এটা…

নিয়ানডার: সেটা হলেন আপনি। কী বলছেন আপনি? আপনি কী জানেন? খাদ্য, ঠিক? একই খাদ্যের পেছনে আমি ছুটি, ভালুক ছোটে। দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম প্রাণিদের পাকড়াও করবার ক্ষেত্রে আমি-ই সেরা; বড়-বড় প্রাণিদের পাকড়াও করবার ক্ষেত্রে ভালুক সেরা। ঠিক? আর তারপর হয় ভালুক সেগুলো ছিনিয়ে নেয় আমার কাছ থেকে অথবা আমি সেগুলোকে ছিনিয়ে নেই ভালুকের কাছ থেকে। ঠিক?

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: একদম পরিষ্কার, আমি একমত, নিয়ানডার সাহেব। আর চেষ্টার প্রয়োজন নেই। এটা একটা ব্যাপার, আমরা কীভাবে বলতে পারি, দু’টো পারস্পরিক আলাদা ধরনের প্রজাতির মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। একটা হচ্ছে ‘ হোমো’-জাতির প্রজাতি এবং আরেকটা ‘অরসুস’-জাতির প্রজাতি। অথবা, বলা ভাল: যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা জীববিদ্যাগত ভারসাম্য, যদি আপনার পছন্দ হয়। টিঁকে থাকবার লড়াইয়ের নিষ্ঠুর হিং¯্রতার মাঝখানে একটা উহ্য বোঝাপড়ার ব্যাপার দাঁড়াল …

নিয়ানডার: আর তারপর, হয় ভালুকটা আামকে হত্যা করে, অথবা আমি হত্যা করি, ভালুকটাকে …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এই যে পাওয়া গেল, টিঁকে থাকবার লড়াইটা আবার ঝলকে উঠলো। সবচেয়ে ভালভাবে যে খাপ-খাওয়াতে পেরেছিল সেই জেতে, সবচেয়ে শক্তিশালী যে ঠিক সে নয়। আর,  নিয়ানডার সাহেব, তাঁর দু’টো অপেক্ষাকৃত খাটো পা সত্ত্বেও তিনি যথেষ্ট পেশল। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, আর নিয়ানডার সাহেবের প্রায় চ্যাপ্টা কপালের অবতল বাঁকা জায়গাটা সত্ত্বেও তিনি বিস্ময়কর রকমের মানসিক ধীশক্তির পরিচয় দেন… নিয়ানডার সাহেব, এখানেই আমি চাইছিলাম আপনাকে প্রশ্নটা করবার জন্যে। এমন কোন মুহূর্ত কী আপনার এসেছিল যখন আপনার মনে শঙ্কা জেগেছিল যে মানবজাতি পেছনে পড়ে যাচ্ছে? নিয়ানডার সাহেব, আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন মানে মানবজাতি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে হারিয়ে যেতে পারে?

নিয়ানডার: আমার পিতামহ… আমার পিতামহ মাটির ওপরে…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেব ফিরে যাচ্ছেন সেই অধ্যায়ে যেটির মধ্যে অবশ্যই বিদ্যমান থেকে আসছিল, ধরা যাক, তাঁর অতীতের একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতা… কিংবা বলা ভাল, আমাদের অতীতে।

নিয়ানডার: ভালুকটা মাটির ওপর… আমি ভালুকটাকে খেলাম… আমি, আপনি না।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: সঠিকভাবে বললে, আমি আরেকটা জিনিস জানতে চেয়েছিলাম। এমন মুহূর্ত কী আপনার এসেছিল যখন আপনার স্পষ্ট ধারণা হয় যে জিততে যাচ্ছে মানবজাতি-ই। এই নিশ্চয়তা যে এটা হতে যাচ্ছে ভালুক-ই যে মরে যাবে, আমরা না, কেননা, কোনকিছুই আমাদের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারবে না। নিয়ানডার সাহেব, আপনি, একদিন আমাদের কৃতজ্ঞতা  লাভ করবেন, অর্থাৎ, এক মানবতার কৃতজ্ঞতা যে-মানবতা তার বিবর্তনের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছেছে। এ-কৃতজ্ঞতা এখন আমি এই মাইক্রোফোন মারফত আপনার নিকটে প্রকাশ করছি…

নিয়ানডার: উম্ম্… আমি, যদি আমাকে চলতে হয় তো আমি চলি… যদি আমাকে থামতে হয় আমি থামি… যদি আমাকে ভালুকটাকে খেতে হয় আমি থামি এবং ভালুকটাকে খাই… খাওয়া হলে পরে আমি চলতে থাকি, ভালুকটা থেমে স্থির হয়ে গেল, মাটিতে এখানে একটা হাড়, মাটিতে ওখানে একটা হাড়… আমার পেছনে আসে অন্যরা। তারা আসে, আসে যেখানে ভালুকটা আছে সেখানে, স্থির হয়ে থেমে পড়েছিল যেখানে, অন্যরা থেমে পড়ে, তারা ভালুকটাকে খায়… আমার ছেলে একটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে, আমার আরেকটা ছেলে আরেকটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে, আমার আরও একটা ছেলে আরও একটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেব এখন আমাদের জন্যে একটি শিকারি গোত্রের মানুষদের জীবনের এক চূড়ান্ত পর্যায়ের  মুহূর্তগুলোকে জীবন্ত করে তুলছেন। এক সফল শিকারের শেষে ধর্মাচারের ভোজসভা…

নিয়ানডার: আমার শ্যালক আরেকটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে, আমার স্ত্রী আরেকটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেবের নিজের মুখের কথাই আপনারা যেমনটি শুনে থাকবেন, তাদের ধর্মাচারমূলক ভোজনে তাদেরকে মেয়েরা সহায়তা যোগাতে পারতো সবার শেষে। এ থেকে সমাজাভ্যন্তরের সামাজিক মর্যাদার একটা হদিস পাওয়া যাচ্ছে যেখানে মেয়েরা ছিল অস্বীকৃত…

নিয়ানডার: আপনি বোঝাতে চাইছেন আপনাদের মেয়েরা! প্রথমে আমি আমার স্ত্রীর নিকটে ভালুকটা নিয়ে আসি, আমার স্ত্রী আগুন জ্বালিয়ে ভালুকটাকে ঝলসায়। তারপর আমি চলে যাই কিছু তুলসি পাতা ছিঁড়ে আনবার জন্যে। তারপর তুলসি পাতা নিয়ে ফিরে এসে আমার স্ত্রীকে বলি: আচ্ছা এখন বলো, ভালুকের উরুর টুকরোটা কোথায়? আমার স্ত্রী বলে: আমি খেয়ে ফেলেছি, ঠিক আছে? তখনও পর্যন্ত সেটা কাঁচা রয়ে গেছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে, ঠিক আছে?

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেবের বর্ণনা থেকে শিকারি এবং খাদ্য-সংগ্রহকারী সম্প্রদায়ের মানুষদের সময়কার যে-ছবিটা পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে তখন নারী ও পুরুষের মধ্যে একটা কঠিন শ্রমবিভাজন ইতোমধ্যে প্রচলিত ছিল…

নিয়ানডার: তারপর আমি চলে যাই কিছু সুগন্ধি মসলার পাতা নিয়ে আসবার জন্যে। আমি ফিরে আসি সুগন্ধি মসলার পাতা নিয়ে এবং আমি জিজ্ঞ্যেস করি: আচ্ছা এখন, ভালুকের অন্য উরুর টুকরোটা কোথায়? আমার স্ত্রী বলে, আমি খেয়ে ফেলেছি, ঠিক আছে? পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে যে সেটা এরিমধ্যে পোড়া পোড়া হয়েছে কিনা, ঠিক আছে? আর আমি বলি: আচ্ছা এখন, আপনি জানেন, কে যাচ্ছে ওরেগানো’র পাতা ছিঁড়ে আনবার জন্যে, জানেন না আপনি? আমি আপনাকে বলছি, আপনি যাচ্ছেন, আপনি যাচ্ছেন ওরেগানো’র পাতা আনবার জন্যে, হ্যাঁ, আপনি যাচ্ছেন।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এই মনোরম ছোট্ট পরিবারটির বর্ণিল চিত্র থেকে আমরা নিয়ানডারথাল মানবের জীবন সম্পর্কিত অনেক নির্জলা তথ্য জড়ো করতে পারি। প্রথমত, তার আগুনের জ্ঞান এবং রান্নার ক্ষেত্রে সেটার ব্যবহার। দ্বিতীয়ত, সুগন্ধিযুক্ত ওষধি লতার পাতা সংগ্রহ করা এবং সেগুলোর ভোজন-প্রয়োগ। তৃতীয়ত, বড় আকারের ও দেহের বিভিন্ন অংশ আলাদা করে নিয়ে মাংস খাওয়া। এর জন্যে প্রয়োজন ছিল মাংস কাটবার সঠিক সরঞ্জামাদির ব্যবহার। কাজেই ফলস্বরূপ, চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালবার জন্যে একটা অত্যন্ত উন্নত পর্যায়ের সক্ষমতার প্রমাণ মিলে যায়। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের অতিথির নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলবার আছে কিনা সেটা শোনা যাক। আমি প্রশ্নটাকে এমনভাবে সূত্রবদ্ধ করবো যাতে সেটা তার উত্তরটাকে প্রভাবিত না করে। নিয়ানডার সাহেব, আপনারা আপনাদের পাথরগুলো দিয়ে, হ্যাঁ, ঐসব চমৎকার গোলাকার পাথর আপনি এত দেখতে পাচ্ছেন সেখানে, আপনারা কী কখনও চেষ্টা করে দেখেন নি, আমি জানি না, সেগুলো নিয়ে খেলাধূলা করতে, সেগুলো আসলেই শক্ত কিনা সেটা পরখ করে দেখবার জন্যে সেগুলো দিয়ে একজন আরেকজনের সঙ্গে খানিকটা লড়ালড়ি?

নিয়ানডার: পাথর সম্পর্কে আপনি কী বলছেন? আপনি কী জানেন না আপনি পাথর দিয়ে কী করেন! ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! পাথর দিয়ে আমি সেটাই করি: ঝন্ঝন্! পাথরটা আছে আপনার, ঠিক? আপনি সেটা একটা বড় পাথরের ওপর রাখেন, আপনি ঐ আরেকটা পাথর পাচ্ছেন। আপনি সেটার ওপর ঘষলেন, ধার হলো, ঝন্ঝন্। আপনি জানেন কোন জায়গাটায় আঘাত করতে হয় ধারালো? ওখানটায়! ওখানটায়ই আপনি আঘাত করেন: ঝন্ঝন্। একটা ধারালো আঘাত! করতে থাকুন! ওহো! তাতে করে আপনার আঙুলটাতে চাপ লাগলো! তারপর আপনি আঙুলটা একটু মুখে চুষে নিলেন। এরপর আপনি ওপর-নিচ করে-করে লাফাতে থাকলেন। তারপর অন্য পাথরটা আবার হাতে নিলেন আপনি। পাথরটাকে ফের বড় পাথরটার ওপর রাখলেন, ঝন্ঝন্। দেখেন, পাথরটা দুই টুকরো হয়ে গেল, একটা ভারী টুকরো আর একটা পাতলা টুকরো, একটা এভাবে বাঁকানো, আরেকটা ওভাবে বাঁকানো, যেটা ধরতে সহজ সেটা আপনি হাতে তুলে নিলেন। এভাবে, এরকম করে, আপনি আরেকটা পাথর তুলে নিলেন অন্য হাতে, ঐভাবে, ওরকম করে, আর আপনি আঘাত করলেন: ঝন্ঝন্! বুঝতে পারছেন আপনি সেখানে ঝন্ঝন্ করছেন, ঠিক সেখানে, করে যাচ্ছেন! ওহো! আপনি আপনার হাতের জায়গাটাতে ব্যাথা পেয়েছেন! তারপর আপনি আঙুলটা চুষলেন, এক পায়ের ওপর খাড়া হয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, তারপর আপনি পাথরের টুকরোটা আবার হাতে তুলে নিলেন, অন্য টুকরোটা অন্য হাতে, ঝন্ঝন্! একটা ছোট টুকরো ছিটকে এলো, ওহো! আপনার চোখের মধ্যে! আপনি আপনার হাত দিয়ে চোখ ঘষতে থাকেন, এক লাত্থি মারেন পাথরটাকে, ভারী পাথরটাকে আবার হাতে তুলে নেন, তার সঙ্গে ছোট পাথরটাকেও, ঝন্ঝন্! আপনার পাথরটা আবার টুকরো হয়ে পড়লো ঠিক নিকটেই, ঝন্ঝন্! আবারও, ঝন্ঝন! আবার আরেকটা, এবং আপনি দেখতে পেলেন যে, যেখানটাতে পাথর টুকরো হয়ে গেছে সেখানটাতে সৃষ্টি হয়েছে একটা খাঁজ— যেটা খুব সুন্দর আর সুষম, তারপর আরেকটা খাঁজ, তারপর আরও একটা খাঁজ, সেটার মত একটার পর একটা চারপাশে, আর তারপর অন্য পাশটাতেও, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন! দেখুন সেটার পারপাশটা কি সুন্দরভাবে রূপ নিচ্ছে, সূক্ষ¥ থেকে সূক্ষ¥তর, ধারালো থেকে ধারালোতর…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আমাদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ…

নিয়ানডার: …তারপর আপনি এটাকে মৃদু আঘাত করতে থাকেন, এভাবে, ঝন্ঝন! ঝন্ঝন্! এবং আপনি ছোট্ট-ছোট্ট কণার টুকরো বের করলেন, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! আপনি দেখুন এটা থেকে কিভাবে অনেক-অনেক ছোট্ট-ছোট্ট দাঁত বেরিয়ে আসে, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: হ্যাঁ, আমরা এটা বেশ ভালভাবে বুঝতে পেরেছি। আমাদের শ্রোতাদের পক্ষ থেকে আমাকে ধন্যবাদ দিতে…

নিয়ানডার: বুঝতে পেরেছেন কী? এখন আপনি এটাকে আরও একবার আঘাত করতে পারেন এখানে: ঝন্ঝন্! তারপর আবার পরবর্তীতে এটাকে আবার আঘাত করতে পারেন অন্যপাশটাতে, ঝন্ঝন্!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঝন্ঝন্, ঠিক বলেছেন, আসুন তাহলে আমরা অন্য…

নিয়ানডার: …সেভাবে আপনি এটাকে সঠিকভাবে হাতের মধ্যে ধরে রাখতে পারেন, এই পাথর, এখন এটা কাজ করছে উভয় পাশ দিয়ে, তারপর শুরু হলো আসল কাজ, কেননা আপনি আরেকটা পাথর নিলেন আর সেটা রাখলেন বড় পাথরটার ওপর, ঝন্ঝন্!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এভাবে চলতেই থাকলো, একেবারে পরিষ্কার, ব্যাপারটা হলো আপনি কীভাবে আরম্ভ করছেন। চলুন এগিয়ে যাওয়া যাক…

নিয়ানডার: আরে না, একবার যখন শুরু করেছি, আমি থামতে চাই না, মাটিতে সবসময়েই পাথর রয়েছে, যেটাকে প্রথমটা থেকে আরও ভাল মনে হয়, তাই আমি প্রথম পাথরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিই আর এই অন্যটা হাতে তুলে নিই, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! আপনার আঘাতের ফলে অনেক-অনেক উড়ন্ত টুকরো হচ্ছে। অনেকগুলো আবার এমনকি আগের চেয়ে ভাল কাজ দিচ্ছে, কাজেই আমি সে-কাজটা করেই চলেছি, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! এবং এটা দেখা যাচ্ছে যে আমি ঠিক যেমনটি চাই সবগুলো পাথর ঠিক তেমনটাই হয়ে যেতে পারে। আর যত অধিক খাঁজ আমি সৃষ্টি করি তত অধিক আরও খাঁজ আমি সৃষ্টি করতে পারি, যেখানে আমি একটা খাঁজ সৃষ্টি করেছিলাম সেখানে আমি দু’টো খাঁজ সৃষ্টি করি। তারপর এই দু’টোর প্রত্যেকটাতে আমি আরও দু’টো খাঁজের সৃষ্টি করি, আর শেষে একটা বিপুল পরিমাণ পাথর ভেঙে টুকরো-টুকরোতে পরিণত হয়। আমি এই টুকরো-টুকরো পাথরগুলোর স্তূপের ওপর হাত দিয়ে আলতো চাপড় মারতে থাকি যে-স্তূপটা এই পাশটাতে ক্রমেই বেড়ে উঠছে, কিন্তু অন্য পাশে আমার হাতে রয়ে গেছে এক বিশাল পাথরের পাহাড় যেগুলো এখনও টুকরো-টুকরো করা বাকি।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এখন নিয়ারডার সাহেব আমাদের জন্যে যে-হতাশাকর, একঘেঁয়েমিপূর্ণ কাজের বিবরণ তুলে ধরলেন…

নিয়ানডার: একঘেঁয়ে! একঘেঁয়ে হলেন আপনি! আপনি কী জানেন পাথরের গায়ে কীভাবে খাঁজ সৃষ্টি করতে হয়, আপনি, একই রকম খাঁজ, আপনি কী জানেন একঘেঁয়ে করে কীভাবে খাঁজগুলোকে সৃষ্টি করা যায়? না, কাজেই কী বলছেন আপনি? আমি জানি এসব কীভাবে করতে হয়, ঠিক! আর যখন থেকে আমি শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই আমি দেখলাম এ-কাজের জন্যে আমার আঙুল  আছে, আপনি আমার এই বুড়ো আঙুলটা দেখতে পান? এই আঙুল যেটাকে আমি এখানে রাখি এবং অন্য আঙুলগুলো আমি ওখানে রাখি আর মাঝখানে থাকে একটা পাথর, আমার হাতে, শক্ত করে ধরা যাতে গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। যখন থেকে এটা আমি দেখলাম, আমি পাথরটাকে আমার হাতের মধ্যে ধরে রাখছি আর সেটাকে আঘাত করছি, এরকম করে, কিংবা ঐরকম করে, বলা ভাল, তারপর থেকে যা-যা আমি পাথর দিয়ে করতে পারি সেসব আমি সবকিছু দিয়েই করতে পারি। শব্দ দিয়ে, যে-শব্দ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, আমি এরকম করে শব্দ করতে পারি, এ এ এ, পি পি পি, নি নি নি, কাজেই শব্দ তৈরির কাজটা আমি কখনও  বন্ধ করি না। আমি কথা বলতে শুরু করি, বলে যেতে থাকি। আমি পাথরের কাজ শুরু করি যে-পাথর আমি কাজের জন্যে ব্যবহার করতে পারি। এই ফাঁকে এ-চিন্তা আমার মনে উঁকি দেয়, চিন্তা করলে আমি সম্ভাব্য সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারি। আমার মনে ভাবনা জাগে, নানা জিনিস সম্পর্কে অন্যরা যাতে বুঝতে পারে সেরকম কিছু আমি করতে চাই। যেমন ধরা যাক, আমার মুখে লাল রঙের ডোরাকাটা দাগ এঁকে দিলাম, বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই এমনি, শুধু অন্যদের জানাবার জন্যে যে আমি আমার মুখে খানিকটা লাল রঙের ডোরাকাটা দাগ এঁকেছি। আমি ভাবি, আমার স্ত্রীকে আমি শুকরের দাঁতের একটা গলার হার বানিয়ে দেবো, বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই, শুধু লোকেদের জানানো যে আমার স্ত্রীর একটা গলার হার আছে শুকরের দাঁতের এবং আপনার স্ত্রীর সেটা নেই। আমি জানি না আপনি কী ভাবেন আপনার কী আছে যা আমার নেই। আমি যা চেয়েছি তার সবই আমি পেয়েছি। সবকিছুই যেগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে পরবর্তীতে। ইতোমধ্যে আমি করে ফেলেছি। যা-কিছু আমি বলেছিলাম, ভেবেছিলাম, বুঝিয়েছিলাম, সবই ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, যেগুলো সম্পর্কে আমি বলেছিলাম, ভেবেছিলাম এবং বুঝিয়েছিলাম। জটিলতার সমস্ত জটিলতা ইতোমধ্যেই ছিল। আমাকে শুধুমাত্র আমার এই বুড়ো আঙুলটা দিয়ে আর এই ফাঁকা মুষ্টিটা দিয়ে এই পাথরটাকে তুলে নিতে হয়। আর অন্য চারটে আঙুল পাথরটার ওপর এঁটে বসে এবং সবকিছুই সেখানে থাকে ইতোমধ্যে। অন্যরা যা পরে পায় তার সবই আমার এরিমধ্যে থাকে। সবকিছু যা অন্যেরা পরে জানতো এবং করতে পারতো তার সব আমার ইতোমধ্যেই জানা ছিল না কেননা সেটা ছিল আমারই কিন্তু এটা ‘ছিল’, কিন্তু এটা ছিল ইতোমধ্যেই, কিন্তু এটা ছিল সেখানে, অপর পক্ষে পরে অন্যরা তা পেয়েছিল এবং জেনেছিল এবং সেটা তারা করতে পারত কম থেকে আরও কম, সবসময়েই যা থাকা সম্ভব ছিল তার চেয়ে খানিকটা কম, আগে যা ছিল তার চেয়ে, যা আগে আমার ছিল, যা আগে আমি ছিলাম, আমি আসলেই ছিলাম তখন সবকিছুর মধ্যে এবং সবকিছুর জন্যে, আপনাদের মতন না, আর সবকিছুর মধ্যেই এবং সবকিছুর জন্যেই ছিল সবকিছু। এমনকি সমস্তকিছু ভুল যা পরবর্তীতে এলো তা-ও ইতোমধ্যেই ছিল সেই ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্-এর মধ্যে। কাজেই আপনি কী বলতে চান, আপনি কী ভাবেন আপনি কী, আপনি কী বোঝাতে চান এটা ভেবে যে আপনি এখানে আছেন যখন আপনি এখানে নেই, অথবা আপনি যদি এখানে থাকেনও সেটা কেবল আমি আসলেই ছিলাম বলে। এবং ভালুকটা ছিল বলে। পাথরগুলো, গলার হারগুলো এবং আঙুলের ঘাতগুলো এবং যা-কিছু আপনি হতে চান এবং তা হলো যখন সেটা সেখানে থাকে, থাকে।

******************************************************

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা-১৭
সুবিনয় শাফাত
প্রাচীন নালন্দা বা তক্ষশীলাকে সামনে রেখে আমরা একথা বলতে পারি যে, শিক্ষালয়কে আশ্রয় করে সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য কিংবা দর্শন ও সংস্কৃতির চর্চা তেমন হয় নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সাধারণত প্রথানুগ মননশীলতার চর্চা করা হয়। পদ্ধতিগত নানা উপায়ে শাণিত করা হয় শিক্ষার্থীদের মেধাকে। ঠিক এমন আইনানুগ বা বিদ্যায়তনের বাইরে জন্ম নেন শিল্পী-সাহিত্যিক বা লেখকগণ। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে এখানে প্রায় অর্ধ শতাধিক পত্র-পত্রিকার জন্ম ওই প্রাতিষ্ঠানিকতাকে ঊর্ধ্বে রেখেই। একালে সেই পত্র-পত্রিকাকে কেন্দ্র করে হাসান আজিজুল হক, মহাদেব সাহা, জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, সনৎকুমার সাহা, আবুবকর সিদ্দিক, নাজিম মাহমুদ, মোস্তাক দাউদী, মোহাম্মদ কামাল, তারিক-উল ইসলাম, আযাদ কালাম, আমিনুর রহমান সুলতান তৈরি হয়েছেন। এঁরা কেউ বিশ্ববিদ্যলয় অঙ্গণে হলেও— তার বাইরে। তবে এঁরা ঠিক প্রথানুগ তকমা নেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থেকে একপ্রকার সৃজনশীলতার চর্চা করেছেন। এঁদের সেই অবলম্বনের তীর— স্পর্ধা বা শব্দায়নের মতো পত্রিকা। এগুলো বেশিদিন টেকেনি কিন্তু ‘দাগ’ রেখে গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই বিভিন্ন সংগঠন ও বিভাগ থেকে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক উদ্যোগে প্রচুর পত্র-পত্রিকা বা পুস্তিকা-বুকলেট বেরিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিশেষ স্মর্তব্য, রাকসুর উদ্যোগে পত্রিকা প্রকাশ। রাকসু ‘হল-বার্ষিকী’ও বের করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীলতার বিকাশে রাকসুর ভূমিকা অনবদ্য। হাসান আজিজুল হক সম্পাদিত ‘প্রাকৃত’ ছেপে বেরোয় ১৯৯১ সালে। এর দুটি সংখ্যা বের হয়। দুটোই সমৃদ্ধ ছিল। প্রায় একই সময়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষক এস এম আবুবকরের নেতৃত্বে যুক্তিবাদী সমিতি গঠিত হয়। তাঁরা ফোল্ডার করে একাধিক প্রকাশনা করেন। দীর্ঘায়ু আবৃত্তি সংগঠন স্বনন বরাবরই তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বা যুগপূর্তি-দশকপূর্তিকে কেন্দ্র করে অথবা যশস্বী কারো স্মরণোৎসবকে আমলে নিয়ে পুস্তিকা বা বুকলেট বের করে। স্বনন বরাবরই সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দকে ধারণ করেছে। এবং প্রকাশনায় তাঁদের শিরোনামও নির্বাচন হয়। এসব পুস্তিকার আকর্ষক ব্যক্তি— সনৎকুমার সাহা, আলী আনোয়ার, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন প্রমুখের মননশীল গদ্য। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নাট্যদলগুলোও নানা সময়ে পুস্তিকা বের করেছে। সবগুলোর নাম উল্লেখ করা কঠিন। তবুও সাক্ষ্যাৎ পশ্চাতের কিছু পত্রিকার নমুনা নিয়ে আমাদের উদ্দিষ্ট এ পর্ব :

‘কাহ্নপা সাহিত্যচক্রে’র জন্ম ১৯৯৭ সালে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অনীক মাহমুদের নির্দেশনায় এই বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সোলায়মান সুমন ও শেখ সফিকুল ইসলামের প্রচেষ্টায় কাহ্নপা সাহিত্যচক্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে। সংগঠনটির বার্ষিক মুখপত্র রুদ্র বেরিয়েছে ছয়বার। অর্থাৎ ছয়টি সংখ্যা হয়েছে। ধ্রুব নামক সাহিত্যপত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। অনিয়মিতভাবে বের হয়েছে এর ৯টি সংখ্যা। ধ্রুবর সম্পাদকম-লীর সভাপতি অধ্যাপক অমৃতলাল বালা। ধ্রুবর সর্বশেষ সংখ্যা ২০১৩ তে বের হয়। বহতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পাঠচক্রের ছোটকাগজ। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। মেহরাজ মতিন সনির সম্পাদনায় ষান্মাসিক ৩টি সংখ্যার পরে— এখন বছরে একটি করে সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে— অনিয়মিতভাবে। বহতায় পাঠচক্রের লেখক ছাড়াও অন্য লেখকের লেখাও প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ দশম সংস্করণ ২৬ মার্চ ২০১৬র সম্পাদক নাহিদুল ইসলাম। নিরিখ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম একটি শিল্প ও সমাজ বিষয়ক সাময়িকী। ২০০৭ সালে সফিকুন্নবী সামাদী সম্পাদক ও অনুপম হাসানকে নির্বাহী সম্পাদক করে নিরিখের যাত্রা শুরু। এ সাময়িকীর নতুন-পুরাতন লেখকদের নিয়ে অনিয়মিতভাবে দশটি সংখ্যা বেরিয়েছে। তবে প্রথম সংখ্যার পর থেকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। নিরিখের সর্বশেষ সংখ্যা দশম বর্ষ প্রথম সংখ্যা বেরয় ফেব্রুয়ারী ২০১৭ তে। চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ হিসেবে ¯œানর যাত্রা ২০০৯ সালে। নিয়মিতভাবে এর ৪২টি সংখ্যা বেরিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে।

ম্যাজিক লণ্ঠন চলচ্চিত্র, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে আবির্ভুত হয় ২০১১ সালের জুলাইতে। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র চলচ্চিত্র বিষয়ক নিয়মিত কাগজ। কাজী মামুন হায়দারের সম্পাদনায় ৭ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে ষান্মাসিক ম্যাজিক লণ্ঠন। এখন পর্যন্ত এর ১৩টি সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে। পত্রিকাটির বিশেষ দিক— চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা, চলচ্চিত্রের বই আলোচনা, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, নিউমিডিয়াসহ থাকে বাংলা ও বিদেশি মিডিয়া জগতের বিখ্যাত কোন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার। এবং প্রতি বছর ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’র আয়োজন করে। ইতিমধ্যে ‘কথামালা’ বক্তৃতা করেছেন : রোকেয়া প্রাচী, কাজী হায়াৎ, জয়ন্ত চট্টপাধ্যায়ের মতো খ্যাতিমান অভিনেতা ও পরিচালকবৃন্দ। ‘কথামালা’র কথাগুলো ম্যাজিক লণ্ঠন-এ মুদ্রিত হয়। বলতে দ্বিধা নেই, এটি আকর্ষণীয় পত্রিকা।

ঘামর সম্পাদক সমজকর্ম বিভাগের শিক্ষক আরেফিন মাতিন। এর মোট তিনটি সংখ্যা। এর মধ্যে প্রথম দুটি আরেফিন মাতিন ছাত্রাবস্থায় আশির দশকে বের করেন। পরবর্তীতে ৩য় সংখ্যাটি গল্প সংখ্যারূপে প্রকাশ পায়।

আশির দশকের শব্দায়নর ধারায় ২০১২ সালে গণজাগরণ মঞ্চকে সামনে রেখে যোবায়ের শাওনের সম্পাদনায় বের হয় অতঃপর শব্দায়ন। গণজাগরণ-মঞ্চ আর যুদ্ধাপরাধী নিয়ে অনুভূতিমূলক কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত হয় বাঁশপাতা রঙের মলাটের কাগজটি। এটি মূলত কবিতার পত্রিকা। নবপর্যায়ে এর ৪টি সংখ্যা বের হয়েছে। সর্বশেষ মার্চ ২০১৭ তে প্রেমসংখ্যা বের হয়। হাসান আশরাফুল সজলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় শখের বসে। ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের দিন নবআনন্দে পাঠকের হাতে পৌঁছায় পত্রিকাটি। সম্পূর্ণ নতুন লিখিয়েদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর স্যাটায়ারধর্মী গল্প-কবিতা প্রকাশিত হয় এখানে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমাজ, রাষ্ট্র, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতা শখের বসের মূল উপজীব্য। আনাড়ি দেয়াল লেখকের লেখনী সম্বলিত প্রচ্ছদ থেকে সর্বশেষ ৫ম সংখ্যার প্রচ্ছদ ‘ফুল ব্লাক’।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ছাড়াও চিহ্নপ্রাণনায় বের হয় চারুকলা বিষয়ক ছোটকাগজ একাঘর সংখ্যা। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে বের করে কৃষ্ণপ্রহর। ২০১১ সালে বাংলা বিভাগের কিছু সংখ্যক উদ্যমী ছাত্র প্রকাশ করে বিন্দু নামের একটি ছোটকাগজ। এর তিনটি সংখ্যা বেরিয়েছে। মাহবুব অনিন্দ্যর সম্পাদনায় বেরিয়েছে আরশীনগর। উত্তরণ নামে একটি কাগজ ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়। এমন অনেক কাগজসৃজনের ধারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও চলমান। সমাজ-সাহিত্যের এই অবিচ্ছেদ্য সহায়ক নানান ধরনের কাগজগুলো চিরকাল বেঁচে থাকুক— এ কামনা সৃজনশীল সবার।

******************************************************

                                               গ্রন্থ ও পত্রিকা আলোচনা

পূর্বজন্মের কবিতা ॥ সিরাজুদ্দৌলা বাহার
সিরাজুদ্দৌলা বাহার প্রণীত পূর্বজন্মের কবিতা হাতে এসেছে, পূর্ণজৌলুস নিয়ে। এই বইমেলায় (২০১৭) বেরিয়েছে। শুভ্র-সফেদ ১০০গ্রাম অফসেটে চার ফর্মায় মুদ্রিত পরিচ্ছন্ন বাঁধাইয়ের কবিতাগ্রন্থ এটি। মৌহুর্তিক সৌন্দর্যের ঝলকে নাসারন্ধ্রে এসে পলকা বাতাসে ছুঁয়ে যায় এর নরোম গন্ধ। আগে তাঁর পাঁচটি কবিতার বই বেরিয়েছে, এটি ষষ্ঠ। নাম দিয়েছেন পূর্বজন্মের কবিতা। ক্রমাগত লিখে চলা এ কবিতা-মানব আমার কাছে প্রকাশ্য আসেন যমুনায় ভোর আসে কবিতার ভেতর দিয়ে। ওই গ্রন্থে নদীর-সঙ্গীতায়ন চোখে পড়ে। ধরে নিই ওর সিকস্তি-পয়োস্তি সংবাদ। তবে ওসব জীবন-সাড়ার উপকূল বিচ্ছিন্ন নয়। জীবনের বৈচিত্র্য মন্থন আর উপভোগের পাড়ভাঙ্গা তরঙ্গের কঠিন কোমল ও তীব্র আশ্লেষে জড়ানো। তা নিয়েই বাহারকে দেখি, তার গলা-কান-চোখের স্বর শুনি, তাঁর নাসারন্ধ্রের সৌগন্ধে আপ্লুত হই। ছিমছাম, সরল প্রক্ষেপণে গড়া তার অবয়ব, পূর্ণ কবিতাপ্রবণ, পূণ্য-মানুষ। কবিতা তো অলৌকিক আখ্যান। সংস্কৃতির পাড়ে বাঁধা। জীবনের প্রতিটি অবলম্বনে তা সিক্ত। সে সিক্ততা কোথায় রয়? কীভাবে? ম্যাথু আর্নল্ড ও টি.এস.এলিয়ট খুব ঘনিষ্ঠ করে কবিতার মাত্রা বুনেছেন। এর আগে জনসন, কোলরিজ, কীটস, টেনিসন, রবীন্দ্রনাথ কবিতা নিয়ে বহু কথা বলেছেন। বিশেষ করে কবি-সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ কতোভাবে তার অতীন্দ্রিয়-সত্তাকে বুনে দিয়েছেন শব্দের— ছন্দের ভেতরে। ধ্বনির আহ্বানে তপ্ত তার প্রকৃতি। উপনিষদ, বাইবেল, ক্যথিড্রাল, মন্দির-মসজিদ কিংবা বারামখানাজুড়ে কবিতার প্রাণময় উচ্ছ্বাস প্রণোদিত হয় সর্বব্যাপ্ত করে। এলিয়ট কবিতায় ‘বহিরাশ্রয়ী সংশ্লেষ’ বা ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’-র কথা বলেছেন :Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these thingsএতে কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি প্রশ্রয়, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীকতা, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। তাঁকে গুরু মানা চলে। আবার কীটসও যে ‘ডিফেন্স অব পোয়েট্রি’র কথা বলেন তাও কবিতাসূত্রে অলঙ্ঘনীয়। আর একালের জীবনানন্দ দাশ মহাকালিক সৌরবিশ্বের বিচ্ছুরণের কণিকার ভেতরে কবিতাকে বেঁধে ফেলার কথা বলেন। সিরাজুদ্দৌলা বাহার কোনো গদ্যে বা ইশতেহারে কবিতার আশ্লেষ করেননি। ঠিক অনুভবের গভীরতায়, অভিজ্ঞতার নান্দনিকতার প্রলুব্ধতায় যে প্রণোদনা— তাঁকে তাই ঠিক ঠিক কাব্য করে তুলেছেন— বস্তুত ইঙ্গিতময়তা থেকে, প্রণতি জানিয়ে, দিকসঞ্চারী অভিবাদনে অবলুপ্ত করে; ভেতরের এক অনির্বচনীয় গুচ্ছে কবি লিখে ফেলেন : ‘একটি শাপলা ফুল/ একটি জীবন’। শাপলার ভাসমান অভিলাষ, তপ্ততার হাতছানি, গহীন রঙের প্রণয়— চোখে মন্থনার রূপ তৈরি করে। প্রণয়বসত গড়ে। প্রণয়িকার সন্ধিৎসাও নির্মাণ করে। কবিজীবন তখন তার ‘নিকষিত হেম’— হয়ে রয়। পুরো জীবনের রঙে সে নিজেকে রাঙায়, রাঙিয়ে তোলে। তাই শেষ স্তবকেও বলা হয় : ‘একটি ফুটন্ত শাপলা,/ আমার আকণ্ঠ জীবন’। ঠিক কোনো সংজ্ঞায় নয়— বোধের অনুরণিত যাঁতাকলই বিধৃত সংশ্রবের অনুকূল আশ্বাস প্রণয়ন করেন। ‘শাপলা’ ওই কাঠমোতেই হয়ে ওঠে ইমেজবন্দী। কার্যত, এ ইমেজটা একমুখি নয়, বিচ্ছুরিত— বহুরাঙা। ব্যবহৃতও হয় বহুময়রূপে। হাওয়া, আকাশ, মেঘ, জল, মাছ, পাখি কোনোটাই তুচ্ছ নয়, কবির কাছে। কারণ, When you sit doen to read poetry leave aside all religious bias তাই তা মিথও বটে। প্রত্যেকটি এই ভূগোলের ভেতরে মোড়ান এবং গড়াও। সেখানে আসঞ্জন-উল্লাস¯্রােতমন্থিত। সবটুকু ধরেই এ আলিঙ্গনের অনুরুদ্ধতা। এক অর্থে, এটি আত্মকথারূপেও আসক্তপ্রবণ, বলা যায়। এই প্রকৃতি-শৈশব-শ্রেষ্ঠা রসনিষ্পত্তির বাতায়নে সতত পুষ্ট। তাই নদীমুখি বা কেন্দ্রায়িত নদী; তাইতো নদীর ভেতরের অবলোকনে তা পাগলা-পারা। কবি বাহার বলেন : ‘পাগলা হারিয়ে আজ কবি আর পাগল হয়েছি।’ এর দার্শনিক অকুস্তলটুকু নিছক ধারণা নয়। ঐতিহ্যিক এবং মেধাময়। ব্যাপক অর্থে লেজেন্ডারিও। তাই এরূপ পাঠকৃতি আমাদের কৃষ্টিকে চিনিয়ে দেয়— দাঁড় করায় শ্রেয়োশীলতার খা-ব-অস্তিত্বে।

সিরাজুদ্দৌলা বাহার বিষয়ক এমন ভূমিকা পেরিয়ে ‘পূর্বজন্মে’র ইমেজের পাটাতনের কিছু অভিলক্ষ্য আমলে নিই। প্রথমে শরণ নিই নন্দনতাত্ত্বিক বুচারকে :The sting of the pain, the disquiet and unrest arise from the selfish element which in the world of reality clings to these emotions. The pain is expelled when the taint of egoism is removed[বাস্তব জগতের ভাবের সাথে যে স্বার্থ জড়িত থাকে, তা থেকেই অস্থিরতা, অশান্তি ও বেদনার দংশন তৈরি হয়। সে স্বার্থ বা অহং দোষমুক্ত হলে বেদনাও তিরোহিত হয়] এইটি এ সময়ের অর্থ! এলিয়ট থেকে যা বলেছি, কবি বাহার অভিজ্ঞতায় বিভাব, অনুভব ও সহচরী ভাবের সংযোগ ঘটিয়েছেন। কিন্তু রস তো অলৌকিক! তাই বলি, ভাবই রসে নীত হয় আর এই ভাব (আবেগ/ রোমান্টিক/ বস্তুসাপেক্ষ) তো অভিজ্ঞতার বা লৌকিকতার ভেতরেই সমস্থিত। সৌন্দর্যটি সেখানেই গড়ে ওঠে। সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের “প্রতিকৃতি” থেকে উদ্ধৃত করি :

                                                সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, শুধুই সশস্ত্র—

                                                কাঁধে চকচকে কালাশনিকভ!

                                                কালো আবলুস, কাফ্রি পুরুষ

                                                দু’উরুর ফাঁকে—

                                                পতাকার মত নমিত শিশ্ন

                                                নিচে—

                                                ঝুলন্ত অ-কোষ।

কবিতাটির মেসেজ কী? নামকরণেই বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত। এর আগের কবিতা “ফলাফল”ও তাই। উপমান ও উপমেয় যথাক্রমে পপিফুল ও দরোজা— আলাদা ইমেজ বসায়। স্তবকের ব্যবধানে বক্তব্যটি রসনিষ্পত্তির অবসর পায়, পরের স্তবকেই পূর্ণ-সংবেদ প্রতিষ্ঠিত। ততোধিক অর্থের রূপরেখায় আচ্ছন্ন হয়। একদল শিশুর জন্মরহস্যটি এ বাংলাদেশের ‘ম্যালথাস’ ধারণায় পর্যবসিত। তুচ্ছ সংবাদে বাহার সেটিকে কূলে পৌঁছে দেন। ওঁর কবিতা তাই তুচ্ছ থেকে বহুজ্ঞাপক  দৌত্য। দূরগন্ধবাহীতেও স্থিত। তবে তাঁর কবিতায় কিছু দৃশ্যচঞ্চল্যতা আছে, ধরে নিই “কাওয়াই ব্রিজের ছবি দেখে”, “পতিসর”, “অটোস্ট্যান্ডে এক অপরাহ্নে” ধরনের কবিতায় আমার ব্যক্তিগত আপত্তি আছে। কবিতাকে ওভাবে কঠিন বাস্তবানুগ করা চলে না। তাতে তার আহত হয়, কখনোবা মৃত্যুও। বাহার সে ধরনের চালে না গিয়ে “পাখি”, “পূর্বজন্মের কবিতা”, “নিয়তি”, “পাপ”— এমন ধারায় কুঁদে কুঁদে নিজেকে গড়ানো সমীচীন মনে হয়। এ গ্রন্থে ওঁর দৃশ্যচঞ্চল কবিতার রস তেমন আকুল করে না। তার চেয়ে দার্শনিক অভীপ্সায় মেরিট তৈরি হলে, সেটি নতুন অর্থ দান করে, ততোধিক অন্যর্থ পয়দায় প্রাবল্যময়ও বটে। নামকবিতাটি উদাহরণে আনি :

                …            …            …

                কে ছিলাম, কীবা নাম আর তুমি, তোমার কপাল

                চন্দন চর্চিত আর সাক্ষাতে চোখে চেয়েছিল—

                খোঁপায় হলুদ ফুল, লালশাড়ি, অপরূপ নর্তকীর সাজে

                তোমাকে বুঝিনি আমি, আমাকে তুমি বুঝেছিলে।

এটি কাব্যময় কবিতা। শুধু তাই নয়, আধুনিক কবিতারসের সরল বিচ্ছুরিত অনুভব দানার ভেতরে এক ধরেনের দার্শনিক-অতুল্যতা গড়ে ওঠে— যাতে শ্রুতি ও স্মৃতি দুটোই সন্নিষ্ঠতা পায়। তবে শুধু তাই নয়, তাত্ত্বিক বুচারের অভিমতটিও এ লক্ষ্যে আমাদের কানে পড়ে। সেটি হলো ‘ংঃরহম ড়ভ ঃযব ঢ়ধরহ’। এইটিই আসল কথা। বাহার বড় কবিতা যেমন লেখেন না তেমনি গুরুভার শব্দও প্রয়োগে শামিল নন। খুব চটুল কিছু বিষয়ও আছে। তবে সেক্ষেত্রে “হাটকথা” একটু ব্যতিক্রমী। কথন-রচন প্রয়াসও আছে। ছন্দ গাদ্যিক। প্রবাহ বহিরাশ্রয়ী সংশ্লেষময়। চলতি মেসেজটা আরও পাই “বিশ্বায়ন” নামে :

                                এখন কোথায় যাবে

                                কার কাছে

                                কেন ও কীভাবে—

                                                তোমার মুঠোয় আজ বন্দী তুমি

                                                তোমার শরীরে, তোমার শৃঙ্খল!

দারুণ! সরস কিন্তু কঠিন ও বিশদ। সহজময়তার ভেতরে প্রচুর আলোর দার্শনিক সন্তাপ। বিনয় মজুমদার কিংবা উৎপলকুমার বসুর কথা মনে হয়। তবে কিছুতেই আমাদের রুদ্র বা আবুল হাসান ধরনের নয়। আবিদ আজাদও নন। সিকদার আমিনুল হকও না। সত্তরে আবু হাসান শাহরিয়ার আর পরে খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ধারাটি ¯্রােতরেখা পায়। তরঙ্গও বিচ্ছুরিত। তবে এ প্রতিশ্রুতিতে বাহার স্বীয়, স্বতন্ত্র। নব্বুই থেকেই লেখেন এপর্যায়ে এসে; তাঁর মতো হয়ে উঠেছেন, তাঁর ধারায় চলছেন। তবে আবার ওই একই কথা, দৃশ্যচাঞ্চল্য বুঝি ছাড়তে হবে তাঁর। লিরিকপ্রবণতার চেয়ে “পাপ” কবিতার ‘কোথাও কিছু একটা ঘটেছে/ তাই এই খরা-ঝড়-ঝঞ্ঝা-/বর্ষণ-প্লাবন’— এতেই প্রসিদ্ধি। এবং নতুনও। চিরনতুনময় হতে পারে। আকাক্সক্ষা ও আশা, অন্তত আমার।

আবার একটি উদ্ধৃত করি :

Love, that for very life shall not be sold,

                                          Nor bought nor bound with iron nor with gold

সুইনবার্নের এ কবিতাটিতে ঠিক প্রয়োজন বলে কিছু নেই, যতোটা মেলে কল্পনা-বিলাস। এই কল্পনা-বিলাস কেন্দ্রে রেখে বাহারের কিছু কবিতা আগে পড়েছি। নদীর কল্পনা, প্রকৃতিবাঞ্ছা তৎপরতা ছিল। এখানেও আছে ‘পাহাড়গুলো দুমড়ে মুচড়ে গোল ও সমতল’। সেটিকে বুঝি তাঁর কথায় ‘মানুষের পাপ’ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর আদৌ কী প্রয়োজন আছে? কবিতা তো! তবে কবির হাতে কলম তুলে নিলে শুধু সাময়িক চাকচিক্য আর স্বস্তি-শান্তির বসতদায় কেন কবি নেবে? কবির তো সে কাজ নয়! “পরিকল্পনা” বা “তোমার কলম তুমি যারে দাও” আরও অনেক অভিব্যক্তি ধারণ করার শক্তি রাখে, সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের চিত্তে তা আছেও— কিন্তু কেন যে তার উপযোগিতা খোঁজা— কেন যে ধ্বংসপাত আর রক্তপাতের ভেতরে আটকে যাওয়া— ঠিক জানি না। কবি বাহার এ পর্যায় থেকে বেরুনোর শক্তি রাখেন, তাঁকে (ওঁকে) বেরুতে বলি। আজকের ভূমিতে ওসব ‘পশু আর পেশীর আজন্ম লড়াই’ প্রত্যক্ষ করার নেই, অধিক পরোক্ষ হয়ে নিজেকে আরও ‘খরভবষবংং ষরভব ড়ভ হরমযঃ’ করে তোলা সম্ভব। তাঁর পরবর্তী রচনায় সেটি পেতে চাই। কারণ, পদার্থময় চরণের স্মৃতি ও শক্তি তাঁর আছে। সেটি যেন সত্য হয়। চিরসত্যের কিছু উঠে আসুক তাঁর হাতে, সেটি অভাবিত নয়— নিরূপিত ও নতুনরূপে।

‘কবিতা বস্তুরূপ হইতে রূপের সংকেতলোকে পৌঁছায়’— সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের আটান্নটি কবিতায় সে ইঙ্গিতটির প্রবলতা পরি¯্রুত। সেটিকে আরও অভীপ্সিত করে তোলা সম্ভব হয় যদি তাতে তুমুল শ্রেয়ো ও প্রাপ্তিলোকের পদার্থময় অনুধ্যানের পটরেখার প্রতীক্ষা থাকে। পূর্বজন্মের কবিতা তা উৎরানোর পথমাত্র। তবে তাতে আরও নতুন পালক যুক্ত হতে পারে। আমিত্মক এ মন্ময়-পর্যালোচনায় তার প্রতীক্ষা ও প্রসারণ কামনা করি। এবং অবশ্যই তা চিরন্তনতার মোহ ও চিন্ময় যাতনার অভিক্ষেপ থেকে। জয়তু কবিকে।
শহীদ ইকবাল

******************************************************


বিজন অশ্রুবিন্দু ॥ সম্পাদক : মাহমুদ মিটুল
মার্চ ২০১৭ ॥ বরিশাল ॥ ++++++
‘ধানসিড়ি সাহিত্যপত্রে’র আয়োজনে বৃহত্তর বরিশালের আড্ডারুদের মুখপত্র বিজন অশ্রুবিন্দু। মার্চ ২০১৭ তে এটির নবম সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে। পত্রিকাটির ‘আমাদের সেকালের গ্রন্থকথা’ অংশে এককালে সাড়া জাগানো বৃহত্তর বরিশালের পাঁচজন লেখকের লুপ্তপ্রায় পাঁচটি গ্রন্থের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে রয়েছে অশ্বিনীকুমার দত্তের কর্ম্মযোগ, লোককবি আব্দুল গণি বয়াতি ও তাঁর জারি গান, আব্দুস শহীদের কারা-স্মৃতি, কুসুমকুমারী রায়চৌধুরাণীর ¯েœহলতা এবং বজলুর রহমানের জিজ্ঞাসা গ্রন্থের আলোচনা। দ্বিতীয় অর্থাৎ আমাদের একালের গ্রন্থকথা অংশে থাকছে চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলের সাতজন সমসাময়িক সাহিত্যিকের সাতটি গ্রন্থের আলেচনা এবং তৃতীয় অংশে আড্ডারুদের সাহিত্যকথায় তরুণদের উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশে প্রকাশ করা হয়েছে।

আমাদের সেকালের গ্রন্থকথা অংশের পাঁচটি আলোচনার মধ্যে অন্যতম একটি হল- আব্দুস শহীদের কারা-স্মৃতি। আব্দুস শহীদের কারা-স্মৃতি : একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া এবং খারাপ-স্মৃতির ভূমিকা শিরোনামে রায়হান আলীম ও সরদার ফজলুল করিমের আলোচনা দুটি বিজন অশ্রুবিন্দুর পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। কমরেড আব্দুস শহীদ (১৯১৭-১৯৯৬) কমিউনিস্ট পার্টির নিবেদিত কর্মী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ সাত বছর পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীজীবন কাটান। এর মধ্যে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিবর্ষণে সাতজন বিপ্লবী নিহত হয় এবং আব্দুস শহীদ আহত হন। আব্দুস শহীদের দীর্ঘসাত বছরের বিপ্লবীচিন্তার কথা ও জেলের প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ বিপ্লবীদের যৌথজীবনের কথাই হচ্ছে কারাস্মৃতি। কারাস্মৃতি লেখকের স্মৃতিচারণমূলক লেখা হলেও এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে জড়িত। জনতার মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গকারী বিপ্লবীদের আন্দোলন, জীবনযাপন এবং আত্মত্যাগের কথা স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে গ্রন্থে।  অপামর জনসাধারণের আন্দোলনকে সঠিকভাবে জানতে এবং উপলব্ধি করতে আব্দুস শহীদের কারাজীবনের স্মৃতিকথা সমৃদ্ধ এবং অকাট্য দলিল। আব্দুস শহীদের সংবেদনশীল মন, দেশপ্রেমিক সত্তা এবং  লেখক মানসের অপূর্ব সমন্বয় এই গ্রন্থের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবলুপ্তির পথে। আলোচকদ্বয় উক্তগ্রন্থের বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট আলোচনা করে কারাস্মৃতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখসাপেক্ষ গ্রন্থটির সংরক্ষণের দাবী জানিয়েছেন।

কুসুমকুমারী রায়চৌধুরানী বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। আমাদের ‘সেকালের গ্রন্থকথা’ অংশে উল্লেখযোগ্য এই ঔপন্যাসিকের প্রথম উপন্যাস  স্নেহলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

বিজন অশ্রুবিন্দুর দ্বিতীয় অংশ সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের আলোচনা। এটি ২০১৬র বইমেলায় প্রকাশিত ফেরদৌস মাহমুদের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। আগন্তুকের পাঠশালার আলোচনায় মাহমুদ মিটুল বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, কবিমানস এবং কবির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ আলোচনার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে কবি নির্দিষ্ট শৃংখলে আবদ্ধ থাকেন নি- উন্মুক্ত করেছেন। সীমাবদ্ধতার গ-ি পেরিয়ে তার কবিতায় ব্যক্তি-সমাজ রাষ্ট্র ইতিহাস নানা রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘আগন্তুকের পাঠশালা’র তিনটি অংশে মোট ৪৬ টি কবিতা প্রকাশ পেয়েছে।

‘আমাদের একালের গ্রন্থকথা’ অংশে একটি অনবদ্য এবং অসাধারণ উপন্যাসের আলোচনা হল— ‘আবদুল জলিল যে কারণে মারা গেল : দুঃসহতার কালচিত্র’। ২০১৫ সালে একুশের বইমেলায় প্রকাশিত মঈনুল আহসান সাবেরের এই উপন্যাসটি ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কারে’ ভূষিত হয়। হোসনে আরা মনি আলোচিত এই উপন্যাসটিকে সাবলীল ভাষার মাধ্যমে আলোচনার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন। মঈনুল আহসানের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল গুরুগম্ভীর বিষয়ের আটপৌরে প্রকাশ। ‘আবদুল জলিল যে কারণে মারা গেল’ উপন্যাসটি বর্তমান সময়ের প্রতিচ্ছবি। ঔপন্যাসিক এবং আলোচক দুজনের মাধ্যমেই আমরা দেখতে পাই যে, এখানে অনুপুঙ্খভাবে এসেছে সরকার যন্ত্রের কৌশলে মৃত্যুর কাছে পরাজিত হওয়া সাধারণ এক মানুষের কাহিনি।

‘আড্ডারুদের সাহিত্যকথা’ অংশটি বিজন অশ্রুবিন্দুর সর্বাধিক আকর্ষণীয় অংশ। তরুণ ও নবীনদের আড্ডাভূমি এবং মনের ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে এ অংশটি। এখানে আড্ডারুদের মোট ২১টি কবিতা এবং ১টি অনুগল্প প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়ের বৈচিত্র্য প্রত্যেকটি কবিতার মধ্যে লক্ষ্যণীয়। যেখানে ভালোবাসা-প্রেম (জপমালা, সুখের লাইগা’ সে’); ইতিহাস (ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং ইমতিয়াজ মাহমুদ); স্বাধীনতা (আমাদের স্বাধীনতা, পরাধীন), আধ্যাত্মিকতা (পরাণ পাখি, জন্মাদ্ধবোধ); সাম্প্রদায়িকতা (অভিশাপ্ত); সমসাময়িক সমস্যা (মৃত্যুনগরে কবির প্রশ্ন, একজন কাবেরী এবং কতিপয়, বসন্ত বিলাপ) বিষয়গুলো মুখ্য হয়ে উঠেছে।

ছোটন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তার ‘একজন কাবেরী এবং কতিপয়’ উক্ত কবিতাটি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে কুমিল্লা ক্যান্টরমেন্টে কলেজছাত্রী এবং নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ এবং হত্যাকা-কেই ঈঙ্গিত করেছেন। কবিতার কাবেরীর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে তনুকেই প্রতিফলিত করা হয়েছে। কবির ভাষায় :

                এক পাত্র সুধা আর দুগ-া অসুর ছিলো,

                একজন আবৃত্তি শিল্পী আর আটজন নিষ্ঠুর শ্রোতা ছিলো।

                বস্তির ঐ বদ্ধ ঘরে সেদিনও কাবেরী আবৃত্তি করেছিলো—

                রবি বা নজরুল নয়। গুণও নয়।

                ওর কণ্ঠে দিয়ে ঘৃণা ঝরেছিলো—

                নপুংসক জাতির জন্য ধিক্কার ঝরেছিলো।

‘মৃত্যুনগরে কবির প্রশ্ন’ কবিতায় ইয়াসিন হীরা ২০১৩ সালে সাভারের গার্মেন্টস রানা প্লাজার ভয়াল মৃত্যুর কথাই তুলে ধরেছেন। মাত্র ১০টি লাইনের এই কবিতায় মৃত্যু এবং ভুক্তভোগীদের আর্তনাত ভয়ালরূপে প্রকাশ পেয়েছে :

                রুদ্রর বাতাসে লাশের গন্ধ

                টুকরো টুকরো বোধ,

                ছিন্ন-ভিন্ন আর্তনাদ।

                তবুও রানার প্রসাদা…

                তবুও কালের পাম্পার…

‘বসন্ত বিলাপ’ কবিতায় তানভীর কায়ছার পরিবেশ দূষণের চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। কলকারখানার কালো ধোয়া, গাড়ী ও তামাকের ধোয়ায় আমাদের দেশের ষড়ঋতু এবং গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে একথাই কবিতার মূল বিষয়বস্তু।

হাসান মেহেদীর কবিতার দ্বিতীয় অংশটিতে পরাধীন বাংলাদেশের রূপ ফুটে ওঠে। গদ্যছন্দে লেখা কবিতাটিতে ’৭০র নির্বাচন, ষড়যন্ত্র করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ক্ষমতা দখল, পূর্ব-পাকিস্তানীদের উপর নৃশংস অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদির চিত্রায়ণ রয়েছে উক্ত অংশটিতে। বিজন অশ্রুবিন্দু আমাদের সাহিত্যের একটি অসামান্য কাজ বলে মনে করি।
লিমু

******************************************************


শঙ্খচিল ॥ সম্পাদক : মাহফুজ পাঠক ও +++
+++++++++

সাধারণত কোনো বিশিষ্ট কবি-লেখকের প্রয়াণের পর তাঁকে নিয়ে বিশেষ স্মরণ সংখ্যা প্রকাশের চল এখন অধিক। ছোটকাগজ শঙ্খচিল-এর ‘শহীদ কাদরী’ সংখ্যাটিও প্রকাশ পেয়েছে কবির প্রয়াণের পর, কিন্তু সংখ্যাটি প্রকাশের জোগাড়যন্ত্র আরম্ভ হয়েছিল এর অনেকটা সময় আগেই। এজন্য পত্রিকার সম্পাদকদ্বয় মাহফুজ পাঠক ও ইকবাল মাহফুজ কবির কাছে চিঠি পাঠিয়ে অনুমতি-প্রার্থনাও করেছিলেন। সম্পাদকদ্বয় দুজনই তরুণ, কিন্তু তাঁরা ৩৫২ পৃষ্ঠার এই বিশেষ সংখ্যাটির নির্মাণ দারুণ দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছেন, তা পাঠান্তে বলাই যায়। যেন সংখ্যাটি হয়ে উঠেছে শহীদ কাদরীর সমগ্র দিক ধারণ করে থাকা একটি কোষগ্রন্থ।

‘স্মৃতিমেঘ’ বিভাগে যেমন রয়েছে কবির ঘনিষ্ঠজন কবি আল মাহমুদ ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর রচনা, তেমনি আছে তাঁর বেশ ক’জন নিকটাত্মীয় আর এমনকি ব্যক্তিগত চিকিৎসক আমর আশরাফের অভিজ্ঞতার বিবরণও। এই বিভাগটি থেকে কবির শৈশব থেকে মৃত্যু অব্দি নানা অজানা ঘটনার বিবরণ মেলে। ‘জলছায়া’ বিভাগে যাঁরা ঠিক শহীদ কাদরীর ব্যক্তিগত সান্নিধ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে পাননি, কিন্তু তাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিলেন বরাবরই— এমন কয়েকজন লেখকের আন্তরিক ব্যক্তিগত গদ্য সংকলিত হয়েছে। আড্ডাবাজ হিসেবে খ্যাতি ছিল শহীদ কাদরীর, তাঁর বেশ ক’টি সাক্ষাৎকার ও তাঁর সাথে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি সংকলিত হয়েছে যথাক্রমে ‘সাক্ষাৎকার’ ও ‘আড্ডা’ বিভাগে। প্রথম বিভাগে কবিকে নিয়ে তাঁর তরুণকালের সুহৃদ কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার এক বিশেষ প্রাপ্তি বৈকি। আর দ্বিতীয় বিভাগের উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে রয়েছে প্রয়াত আরেক কবি সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে কাদরীর চকিত কিন্তু সহৃদয় সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা। শহীদ কাদরীর কবিতার একাধিক দীর্ঘ মূল্যায়ন, তাঁকে নিবেদিত কবিতা, নিবেদিত গল্প, তাঁর কবিতা থেকে তৈরি গানসমূহের হালসাকিনও রয়েছে এখানে। কবির একাধিক অপ্রকাশিত চিঠিপত্র, তাঁর অগ্রন্থিত গদ্য ও কবিতাও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের মনে আকর্ষণ জাগাবে অবশ্যই। কাইয়ুম চৌধুরী ও মুর্তজা বশীরের মতো খ্যাতনামা শিল্পীদের আঁকা শহীদ কাদরীর একাধিক প্রতিকৃতিও এখানে মুদ্রিত হয়েছে। শেষাংশে কবির জীবনপঞ্জি সংক্ষিপ্ত হলেও সংহত-যথাযথ।

আর বিশেষ করে বলতে হয় শঙ্খচিল-এর মুদ্রণসৌকর্যের কথা। এত যতœবান প্রকাশনা সাধারণত বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজগুলোতে চোখে পড়ে না। চমৎকার অলংকরণ, রুচিশীল অক্ষরবিন্যাস আর শহীদ কাদরীর প্রচুর দুর্লভ ছবির সংযুক্তি একে অবশ্যদ্রষ্টব্য করে তুলেছে। তবে খটকা এই, এরকম সুসম্পাদিত-সুনির্মিত একটি বিশেষ সংখ্যায় কোনো সম্পাদকীয় নেই কেন?
মুহিত হাসান

******************************************************

সুরমস ॥ সম্পাদক : জফির সেতু
++++++++++++++
“বুঝিলাম সে তো কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভনিতা, পা-ুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের পর বসে আছে সিংহাসনে— কবি নয়— অজর, অক্ষর অধ্যাপক; দাঁত নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি,

কবিতার সমালোচকদের এভাবেই সমালোচনা করেছেন জীবনানন্দ দাশ— সমালোচকদের সমালোচনার জবাবে। এর মানে এই নয় যে, সমালোচকদের জীবননানন্দ অপছন্দ করতেন, তিনি অপছন্দ করতেন সেইসব সমালোচকদের যারা চিন্তায় একদেশদর্শী, বিশ্লেষণে হয়তো বা অমূয়াপ্রবণ।

বোঝা যায়, সমালোচক আর কবির মধ্যে উপলব্ধির ফারাক বেশি হলে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারেন না, যদিও তার দরকারও খুব বেশি আছে তা নয়। কিন্তু কবিতার সমালোচনা কবিতার গতিপথকে বিশ্লেষণ করতে পারে দারুণভাবে।

সমালোচক যদি কেবলই নিন্দা করে যেতে থাকেন কিংবা প্রশংসা করে যেতে থাকেন তাহলে তা কারুরই কাজে আসেনা— না কবির, না পাঠকের।

তবে, “সমালোচকের উচ্ছ্বসিত আবেগপ্রসূত নিন্দা কিংবা প্রশংসার দিন আজ শেষ হয়েছে। একালের বাস্তবাদী মানসিকতা দিয়ে সমালোচকেরা সাহিত্যকে দেখেন। সমালোচনাতো ব্যক্তির বিশেষের দেখামাত্র নয়, অপরকে দেখতে শেখানোর চেষ্টাও তো বটে,”

— সাহিত্য বিচার: তত্ত্ব ও প্রয়োগ

উপরের এত কথা বলার প্রয়োজন হতো না, যদি সমালোচক আর কবির উপলব্ধির প্রকট পার্থক্য না থাকতো। প্রায়শই দেখা যায়, সমালোচক আর কবি পরস্পর বিরোধাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। একথা মানতেই হয় যে, কবিতার সমালোচনা, সমালোচনা সাহিত্যের মধ্যেঅন্যতম দূরূহ কাজ। আর এ কাজটিই সাবলীলভাবে করেছে সুরমস। কবিতা নিয়ে ‘সুরমস’ গদ্য কাগজ অনবদ্য বিশ্লেষণ করেছে।

সাহিত্যের আদি নির্দশন উপন্যাসও নয়, ছোটগল্পও নয়; সে হলো কবিতা— আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে পদ্য। কবিতা অনেকেই লেখ, কিন্তু ভালো কবিতা হয়ে ওঠে কোনগুলো এটি নির্ণয় করা কম কঠিন নয়— কেননা শেষ বিচারে কবিতা তো নন্দনতত্ত্বের বাইরে না। ফলে একজনের কাছে যা ভালো কবিতা, অন্যজনের কাছে তা নাও হতে পারে। তবে কি কবিতার ভালোমন্দের কোন বিচারই চলে না? তৈমুর খান, ভালো কবিতা’ চিরন্তন প্রঞ্জালোকের ব্যপ্তির অভিমুখে’ নিবন্ধে এ নিয়েই আলোচনা করেছেন। তিনিও মানছেন” “কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে কী দেখে এই ভালোত্ব তা আজ পর্যন্ত আমার কাছে স্পষ্ট নয়,” কবিতা যদিও কবির ব্যক্তির জীবনের একান্ত প্রচ্ছায়া, নিজস্ব অভিব্যক্তির ভাষা,তারপরও কবিতা থাকে সবই ব্যক্তি, সমাজ, ইতিহাস, দর্শন, এমনকী বিজ্ঞানও। তবে খটকা লাগে লেখক তৈমুর খান ফ্রয়েডীয় মনো বিশ্লেষণের সাহায্য নিয়েই কবিকে দেখতে চেয়েছেন। এটি হয়তো ভুল নয়— তবে একেবারে সঠিক নয়, দর্শন ও যৌন চেতনার বাইরেও মানুষের নানা মাত্রা রয়েছে। সেগুলোর ওপর আলোকপাত করলে কবিকে ও কবিতার ভালোত্বকে বোঝা হয়তো আরেকটু সহজ হতো।

জওয়াহের হোসেন, শেখর দেব, নেসার শহীদ, সুমন আজাদ, মেহেরুন নিশা তাদের রচনার মধ্যে কবিতাকে খুঁজেতে চেয়েছেন, বুঝতে চেয়েছেন নানা আঙ্গিক থেকে। কবিতা নিয়েও যে অনেক ভাববার আছে, এ ধারণাটি প্রায় মৃত প্রায় হয়ে উঠেছিল গত কয়েক দশকে— কবিতার পাঠক যদিও অন্যান্য সাহিত্য মাধ্যমের তুলনায় তুলনামূলক কমই। মানবমনের অনুভূতির আদিমতম শিল্পিত প্রকাশ কবিতার ভেতর পাওয়া যাবে তার আত্মিক পরিচয়— এমনকি চিন্তা কাঠামোও। এদকি থেকে উপরোক্ত লেখকদের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবীদার। প্রত্যেকের লেখাই কবিতা বুঝতে  চাওয়া যেকোন পাঠকের কাছে ভালো লাগবে, এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

অমিতাভ চৌধুরী শতবর্ষ পরে আবারও ‘পড়ো জমিতে’ খনন করেছেন নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য। একটি প্রবন্ধে গোটা ইউরোপকে তুলে আনা সহজ কাজ নয়। ইয়েটসকে সামনে রেখে তিনি সে কাজ করেছেন অসাধারণ প-িত্যের সাথে।

সদ্য প্রয়াত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীর উপর ও তাঁর “উত্তরাধিকার” কাব্যগ্রন্থের উপর ছোট কিন্তু যথার্থ আলোচনা করেছেন শামস্ আলদীন। এছাড়াও জফির সেতু, আজির হাসিব, মাসুদ পারভেজ অনবদ্য আলোচনা করেছেন কবি শামীম রেজা শামসের আনোয়ার ও মোহাম্মদ সাদিকের কবিতার উপর।

সমসাময়িককবিদের পাঠ না করলে কবিতার গতি-প্রকৃতি বোঝা যায় না সহজে। তারা সমসাময়িক দুজন কবির উপর আলোকপাত করে সেই কাজটিই করেছেন। প্রশংসার দাবীদার তারা নিঃসন্দেহে।

সুদূর কানাডার আদিবাসীদের কবিতার উপর লিখেছেন শাহানা আকতার মহুয়া। ভৌগোলিক পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষের কাব্যচেতনার কোন এক জায়গায় যে এক সেতুবন্ধন আছে তা এ প্রবন্ধ পাঠ করলেই বোঝা যায়।

বাংলা কবিতার অন্যতম প্রাণ পুরুষ উৎপল কুমার বসু। তাকে যথার্থভাবে নিয়ে এসেছেন সঙ্ঘমিত্রা হালদার।

ওগডেন ন্যাশকে সামনে রেখে পাশ্চাত্যের ব্যঙ্গ কবিতার উপর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেছেন জিললুর রহমান। পাঠকের ভালো লাগবে— এ প্রবন্ধটি তা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

এছাড়া সুমন গুণ, হেনরী স্বপন, পাবলো শাহি প্রমুখের কবিতা নিয়ে লেখাগুলো চিন্তার খোরাক জাগায়।

‘সুরমস’ কবিতার বিশ্লেষণে যে ভূমিকা রাখছে তা নিঃসন্দেহে কাব্যপ্রাণ সমস্ত পাঠকের মনের খোরাক জোগাবে এবং কবিতার পাঠকদের সামনে আরো নতুন নতুন দিক উন্মোচিন করবে এটাই প্রত্যাশা।
ফজলে রাব্বী

******************************************************


চৈতন্যপুর ॥ গওহর গালিব
শোভাপ্রকাশ, ঢাকা ॥ বই মেলা ২০১৭
‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তিতে এগিয়ে চলে সমাজ ও সভ্যতা’। ছোটগল্পও এর অনুগামী; এটি আদতে জীবনেরই শিল্পভাষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে আরম্ভ করে বাংলা ছোটগল্পের বয়স দেড়শ বছর। এর মাঝে, এই সাহিত্য প্রকরণটির খোলনলচে বদলেছে কালেকালে, বারবার। আখতারুজ্জমান ইলিয়াসে’র মতো পাওয়ারফুল লেখকও সন্দিহান হয়ে উঠেছেন, বাংলা ছোটগল্পের ভবিতব্য নিয়ে— ‘বাংলা ছোটগল্প কি মনে যাচ্ছে?’ মানুষের জীবনে সংকট তো বহুমাত্রিক, কোনটি ধরে লেখক রচবেন তাঁর শিল্পভাষ্য? এরপরও বাংলা ছোটগল্পের প্রবাহমানতা স্থবির হয়নি, বয়ে চলেছে। তবে ¯্রােতটা ক্ষীণ। প্রশ্ন রয়ে যায় বিষয় নিয়ে, ভাষা নিয়ে, সর্বোপরি মান নিয়ে। অবশ্য এসব বিতর্ক-প্রতর্ক থামবে না, কালের গতিতে চলতেই থাকবে। অন্তত, যদতিন শিল্প আছে, মানুষের মগজ খাটাবার সুস্থতা-নান্দনিকতা আছে।

গওহর গালিবে’র লেখার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় বেশি দিনের নয়। পাঠের দ্বারোৎঘাটন ছোটগল্পের মাধ্যমেই; চিহ্নের ৩২তম সংখ্যায়। চৈতন্যপুর সংখ্যার বিচারে তাঁর তৃতীয় গল্পগ্রন্থ। পূর্ব-প্রকাশিত দুটি গল্পগ্রন্থ— চেনাতে অচিন এবং শেকড়ের ঘ্রান। এর বাইরে তিনি লিখেছেন স্বদেশ-সারথি নামের একটি উপন্যাস ও শিশুতোষ রচনা। একজন লেখকের প্রকৃত মানস তাঁর লেখার মাঝেই আঁকা থাকে। সেজন্য আকাশ-পাতাল হদিসের প্রয়োজন পড়ে না। প্রোক্ত দৃষ্টিকোন মেনে বলতে হয়— ক্রিয়েটিভিটি এই নবীন কথাকারের যাপনেরই একটা অনিবার্য অংশ। ‘যাপন’ শব্দটিতে সবিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি একারণে যে— চৈতন্যপুর গল্পগ্রন্থের সাতটিগল্প গৌণার্থে গওহর গালিবে’র যাপনেরই মুদ্রিতভাষ্য, মুখ্যার্থে জীবনাভিজ্ঞতার ফসল। চৈতন্যপুরর গল্পগুলি তিনি দাঁড় করিয়েছেন বাস্তবভূমিতে, এমনকি ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশনের শরীরী প্রশ্রয়ও এখানে একেবারে অনুপস্থিত। অর্থাৎ, নিজের দেখা ছড়িয়ে দিতে চান তিনি, সরলভাষ্যে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; উত্তরকালের তিন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের শক্তিমত্তায়-প্রচেষ্টায় ‘বাংলসাহিত্য ভাষা’র একটা মার্জিত কাঠামো দিয়ে গেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের লেখকদের প্রচলিত আলস্য। ফলে, ‘বাংলাসাহিত্য ভাষা’র কাঠামোগত নিরীক্ষাহীনতা প্রায় প্রথায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, নিজের জন্য একটা আলাদা-স্বকীয় ভাষা তৈরি করে লিখবেন; দু’একজন সতীনাথ ভাদুরী, কমলকুমার মজুমদার বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যে সে উদাহরণ বিরল। গওহর গালিব সেই প্রচলিত প্রথারই অনুগামী, প্রতিকূলের কেউ নন। সাতটিগল্প তাঁর বক্তব্যে-বিবরণে; যে ভাষা-শরীর পায়, তা পাঠকের গতানুগতিক পাঠোভ্যাসকেই প্রশ্রয় দেয়।

চৈতন্যপুরর সাতটিগল্পে যে জীবন আমরা পাই— আমাদের ছোটগল্পের প্রথাগত ‘সতীত’¡ অনুসারেই তা মানব জীবনের সমগ্রতার বার্তা দেয় না। একারণে- ‘উপন্যাসের তুলনায় ছোটগল্পের পাঠক বরাবরই কম’ কথাটি চৈতন্যপুরেও ধ্রুব। গল্পগুলোয় নি¤œিবত্ত, নি¤œ-মধ্যবিত্ত এবং নাগরিক মধ্যবিত্তের নকশা দাঁড় করাতেই গওহর গালিবে’র বিশেষ প্রচেষ্টা-আগ্রহ-যতœ। যেহেতু, ‘মানবসমাজে শ্রেণিভেদ বিশ্বজনীন’— সাহিত্য স্বাভাবিকভাবে সে ছবিই আঁকবে। প্রথমগল্প স্বীকারোক্তির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নুরু’কে কেন্দ্র করে। যার দ্বিবিধ পরিচয় আমাদের সামনে উন্মুক্ত— প্রথমত নুরু ভিক্ষুক, এটি তার প্রধান পরিচয়। দ্বিতীয়ত নুরু পাগল, এটি অপ্রধান পরিচয়। নুরু’র সহজাত বোধ-বুদ্ধি-কায়দা তাকে অন্তত ‘নি¤œবর্গ’ তকমার উপরে তুলেছে। গ্রামীণ পটভূমির এ গল্পটি আদতে সমকালীনতায় পরিকীর্ণ। পটভূমিসহ নুরু’কে ঘিরে ভাষা পায় আমাদের পরিচিত অসুস্থতাই— গ্রাম্য রাজনীতি, নির্বাচন, অপদার্থ জনপ্রতিনিধি, হত্যা, ধর্ষণ, নেশা; তথাকথিত দেশজ সভ্যতার সকল উপাদান এখানে হাজির। আমাদের রাষ্ট্রীয় সামগ্রিকতার এক আঞ্চলিক-খ-িত রূপ স্বীকারোক্তি। এর পরিবেশ-প্রতিবেশ পাঠকের অপরিচিত নয়।

বিলবোর্ড গল্পটি নাগরিক জীবনের; সোজাকথায় দাম্পত্যের। কর্পোরেট ‘সমাজ ব্যবস্থায় উৎপন্ন ব্যক্তির বিশেষ কোন সমস্যা কী সংকট…’ এখানে মুখ্য। গল্পটির সূচনা কবিতা ও মৃদুলে’র সংসার বাঁধার প্রক্রিয়া দিয়ে। যা কিনা প্রেমেন্দ্র মিত্রে’র শুধু কেরানী গল্পের ছেলেটি আর মেয়েটি’র নীড় বাঁধার প্রাথমিক সুখস্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু, সময়ের বদলটা এখানে বড় বিষয়। কর্পোরেট ব্যবস্থায় ব্যক্তির আত্ম-সংকট, মিডিয়া, কর্মজীবী নারী বাড়িয়ে চলে কবিতা-মৃদুলে’র দাম্পত্যের উত্তাপ। নিত্যসংকট সেখানে আগুনে ঘৃতাহুতির আসন নেয়। ফলে, দুঃকজনক বিচ্ছেদে নীড় শুধু নষ্টই হয়না, হয় ভষ্মীভূত। কবিতা ও তাঁর বান্ধবী’র সংলাপ জানান দেয় বিলবোর্ডের নারীর দিকে তাকানো মৃদুলের মুগ্ধতা— ‘যে মানুষ মানুষের দিকে তাকায় না, বিলবোর্ডের দিকে মুদ্ধ দৃষ্টি মেলে থাকে- তাকে আর ফেরানো যায় কী’। না, ফেরানো যায় না। ফেরার মৃদুল সেই মধ্যবিত্ত ‘দ-িতঅপুরুষ’; যার ভাগ্য উইলিয়ম শেক্সপিয়র বহুকালপূর্বে রচনা করেছেন ‘টু বি অর নট টু বি’ সত্যভাষ্যে। তাই, বাস্তবতা ফেস করা থেকে সে মুক্তি খোঁজে, চায়। রক্ত-মাংসের দেহ নয়, বিলবোর্ডের উন্নতবক্ষাই তার আরাধ্য। এর সাথে দরকার দৈহিক-মানসিক মাস্টারবেশন। একজীবন কাটতে কতক্ষণ!

চৈতন্যপুর গ্রন্থটির নাম গল্প। সংকট সৃষ্টি এবং ফ্ল্যাসব্যাকে ঘটনা বর্ণনা গওহর গালিবে’র সহজাত প্রবণতা। এখানেও তার ব্যবহার আছে। আমরা দেখি— গল্পের শুরু হয় জয়নাল ও তাঁর পুত্র গুলজারের সম্পর্কের তিক্ততা দিয়ে। গুলজার বখে যাওয়া সন্তান, পিতার মুিদখানা দেখভালে তার নজর নেই— বেকার, বাবার অমতে বিয়ে করা যুবক, গর্ভবতী স্ত্রীর অপদার্থ স্বামী। গল্পে সংকটের মাত্রা চড়ে যায় কামার্ত গুলজার যখন হারান কবিরাজে’র স্কুলপড়–য়া মেয়েকে টেনে বাঁশঝাড়ে নিয়ে যায়, কাম চরিতার্থের উদ্দেশ্যে। গ্রাাম্য শালিসে দোররার আঘাতের পর নির্বাসিত হয় সে। তখন, লেখক আরেক দুষ্টবুদ্ধি খেলান এই ছোট্ট-গ্রাম্য-নষ্টের মাথায়। ‘ধর্মের তৈয়ার করা জমিতে অধর্মের বীজ বপনে’— গুলজার কাজে লাগায় বজলু চোরা’কে। মুসলমানদের দেয়া আগুনে জ্বলে ওঠে হিন্দুপাড়া। বিচারপ্রার্থী হারান কবিরাজ বাস্তুচ্যুত হন। হারান এখানে প্রতীক মাত্র। তার বৃদ্ধ-অসহায় মায়ের মতোই পড়ে থাকে শতসহ¯্র হতভাগ্যের বাস্তুভিটে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরের ঘটনাকেই গুলজার চৈতন্যপুরে প্রতিস্থাপিত করে। প্রাণভয়ে পলাতক হারানে’র অনুপস্থিতে বজলুর মায়ের যে মানবিক সংকট উপস্থিত হয়, তা আমাদের চৈতন্যে নাড়া দেয়। কিন্তু হায়! সাম্প্রদায়িকতার, রাষ্ট্রদৈত্যের চৈতন্য নাড়াবে কে? তাই অশ্রুতেই ধুতে হবে সে পোড়া ছাই। তোমায় বলবো বলে গল্পটি কৈশোর উত্তীর্ণ প্রেমের তাপ ছড়ায়, রাজনৈতিক অব্যবস্থা যার শুভ্রতায় আঁকে ব্যর্থতার পদচিহ্ন। দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা— এক তরুণী বই ক্রেতা এবং প্রকাশকের অভিজ্ঞতা বদলের গল্প। অপরদিকে, বিপ্রতীপ এবং দ্বৈরথ গল্পদ্বয়ে নারী-পুরুষের মন নিয়ে কাটাছেঁড়া চলে। তবে, এখানকার পুরুষ চরিত্রগুলোও মৃদুল নামক আর্কিটাইপ থেকেই তৈরি, দ্বিধাজর্জর।

চৈতন্যপুর গল্পগ্রন্থের সাতটিগল্পে গওহর গালিব আমাদের সামজ, সমষ্টি, রাষ্ট্র ও ব্যক্তিক চেহারার যে ছবি আঁকেন, যুগভাষ্য দেন— তা প্রশংসার দাবিদার। তবে, ক্রমাগত বর্ধিষ্ণু নাগরিক সহিষ্ণুতা এই গল্পগুলোর টেস্ট কিছুটা পানসে করবে। নাড়াটা; সে হৃদয়েই হোক, কিংবা মগজেই হোক, আরো প্রচ- দরকার। যা পাঠককে আক্রান্ত করবে সহজেই। সামনের দিনে এই নবীন কথাকারের কাছ থেকে সাহিত্যমোদীরা আরো তৃষ্ণার জল পাবে, এমন প্রত্যাশা রাখছি।
নাজমুল হাসান পলক

******************************************************


বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত ॥ শহীদ ইকবাল
কথাপ্রকাশ, ঢাকা ॥ প্রথম প্রকাশ ঃ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬
সন্দেহ নেই, শিল্প-সাহিত্যই হল একটি জাতির মানস সম্পদ। বস্তুগত সম্পদ, যেমন— বাড়ী-ঘর, যানবাহন, পোষাক-পরিচ্ছদ, রেডিও-টেলিভিশন-টেলিফোন, গহনা-অলঙ্কার— এ রকম আরও আরও অনেক কিছুই, এমন কি গরু-ছাগল-ভেড়া, এগুলি মানুষের জীবন যাপনকে করে তোলে সুগম। তবে, এর প্রয়োজন হল ব্যবহারিক। দেহকে টিকিয়ে রাখার জন্য, তার আরাম-আয়েশের জন্য এ সবকে বিকল্পহীন বলে ভাবাও অযৌক্তিক নয়। কেন না, দেহ ছাড়া আত্মার, অন্ততঃ পৃথিবীতে, আর কি দাম আছে! জীবিত মানুষেরা তার শান্তি কামনা তরে, তার মুক্তিও চেয়ে থাকে, কিন্তু ঘটনা তো ঐ পর্যন্তই। আবার টাকা-পয়সা থাকলে বস্তু সম্পদের কোন অভাব হয় না। ক্রয় ক্ষমতাই রস্তু সম্পদ ভোগের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। তাই সম্পদের মালিকানা ও বণ্টন কিংবা ভোগের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া মানব সমাজে একটা বড় ব্যাপার। আর এ ভাবেই সমাজে শ্রেণীবিন্যাসই বলি,আর শ্রেণীবৈষম্যই বলি, সৃষ্টি হতে থাকে। এই সম্পদের মালিকানা ও তার বণ্টনের ভেতর দিয়েই প্রকাশ ঘটে ক্ষমতার। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও তার আইন-কানুন কিংবা সামাজিক কায়েমী স্বার্থবাদ সাহায্য করে এই ক্ষমতাকেই অব্যাহত রাখার। এক সময় এই ক্ষমতার বিবরণকেই পরিগণনা করা হত ইতিহাস বলে। রাজা-বাদশারাই ছিল এই ক্ষমতার নায়ক। কায়েমী স্বার্থবাদী শ্রেণীই ছিল তার পরিপুরক শক্তি। ঢাল-তলোয়ার ঘোরানো কিংবা যুদ্ধ-বিগ্রহ করা — এক কথায়, ক্ষমতার সামরিকায়নই ছিল সেখানে মুখ্য। এটাই ছিল রাজার নীতি অর্থাৎ রাজনীতি। এ কারণে রাজনৈতিক ইতিহাসকেই বিবেচনা করা হত ইতিহাস বলে। কিন্তু কালে কালে, সঙ্গত কারণেই, পরিবর্তিত হয়েছে সে বোধ। কেননা, মানুষের জীবন প্রবাহ তো কেবল রাজ-আনুগত্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে থাকে না। তার জীবনের বস্তু সম্পদ, সেখানে প্রাচুর্য় থাকুক আর তা সীমিতই হোক, তাকে সে পল্লবিত করে তুলতে চায় নিজেদের সৌন্দর্য চেতনার রঙ ও তুলিতে। রাজা-বাদশাদের সময়েও তা হয়েছে। এখন হয়ত তারা নেই, কিন্তু অন্য ফর্মে হলেও ক্ষমতার প্রতিভূরা তো রয়েছে। তবে তাদের ইতিহাসটাও, কেবল মাত্র ইতিহাস হয়ে নেই। তা পরিণত হয়েছে ইতিহাসেরই একটা অংশে। এ বাদে মানুষের জীবন প্রবাহের অন্যান্য দিকের, বিশেষ করে ভাব জগতের বিষয়গুলি, যেমন — স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, ও সাহিত্যের ভেতর দিয়ে অবিরত সম্প্রসারণ ঘটছে তার মানস সম্পদের। আর কে না জানে, জৈবিকতা কিংবা বস্তুবাদিতা নয় — ভাব জগতের ঐ বিষয়গুলির ভেতর দিয়ে নান্দনিকতার যে প্রকাশ, তাই তাকে রূপ দিয়েছে পরিপুর্ণ মানবের।

আবার এটাও মনে না করবার কোন কারণ নেই যে, একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয় খুঁজে পাবার জন্য রাজনৈতিক ইতিহাস যতটা প্রয়োজন,তার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল ঐ বিষয়গুলির অনুসন্ধান করা। কি ভাবে তা বিবর্তিত হয়েছে কিংবা তার রূপটাই বা কেমন, সেটা দেখতে গিয়ে যে বৈশিষ্ট্যগুলি পাওয়া যায়, তাই হয়ে দাঁড়ায় জাতিত্ব নির্দেশক। আর

আমরাও তো একটি জাতি। কাজেই, আমাদের জীবনে ঐ বিষয়গুলি কি ভাবে এসেছে, তা জানাটার কোন বিবল্প আছে কি? মোটামুটি ভাবে, ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে এই কাজটি শুরু হয়েছে। তার একটি প্রধান স্থান দখল করে আছে সাহিত্যের ইতিহাস।

এ প্রসঙ্গে যেটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার, তা হল, আমরা একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও এটা বলে যে, ভাষাকে কেন্দ্র করেই আমাদের জাতিত্বের সূচনা ও বিকাশ। আমাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা— যার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেছে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠা, তারও ভিত্তি ছিল ঐ ভাষা। আর এই ভাষাই হল সাহিত্যের মাধ্যম। এ ভাবে দেখলেও, সাহিত্যের ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে কতটা বেশী, তা বোধ হয় আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না। সুতরাং শহীদ ইকবাল রচিত ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি যে সেই প্রয়োজনীয়তারই ফসল, তাই বা অস্বীকার করা যায় কি ভাবে?

তবে বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত বা ইতিহাস না হয়ে এটা বাংলাদেশের হয়েছে কেন, তার শানে নজুলও, বোধ করি, আমাদের সবারই জানা। ১৯৪৭ সালে বাংলাভাষাভাষী অঞ্চল সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতি ও বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ডিভাইড অ্যা- রুল নীতির বাস্ত-বায়নের কারণে দুটো দেশের অংশ হয়ে গিয়েছিল। কেন হয়েছিল, এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার সুযোগ বা প্রয়োজন এখানে কোনটাই নেই। তবে যেটা বলার, তা হল, এক অংশের  সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। আবার এটাও ঠিক যে, আলাদা রাষ্ট্র হবার কারণেই তার অধিবাসীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন রকম হয়ে তাদের সামাজিক ও সাংস্বৃতিক তথা জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে এনে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য। আকাক্সক্ষার নতুনতর প্রেক্ষিত ও অহরহ বিরাজমান রাস্তবতার পরিবর্তিত রূপের মুখোমুখী হওয়টা সৃষ্টিও করে চলেছে জাতিসত্তারও ভিন্নতা। এ জন্য, ভাষা এক হলেও অন্যান্য নানা বিষয়ের মতো সাহিত্যের ফরম্যাটের আলাদা হয়ে যাওয়াটাও অযৌক্তিক নয়। আবার  এটও সত্য যে, বর্ণমালা এক হলেও প্রকাশভঙ্গীর ক্ষেত্রে ভাষারও নতুন রূপ ধারণ করাটা বিচিত্র কি?

সেটা, হয়ত, ঠিকই আছে। তবে এ প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা সামনে নিয়ে আসা, বোধ করি, জরুরী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম যে দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার সাংবিধানিক পরিচয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। প্রচলিত অর্থে তাই বাংলাদেশ। তার একটি আয়তন আছে। তা ন্যুনধিক ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। সীমানা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ বাদে উত্তরে ও পূর্বে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশ। পশ্চিমেও তাই। তরে বিশেষ ভাবে যেটা বলার, তা হল, পশ্চিম দিকের ভারতের এই প্রদেশের নাম পশ্চিম বঙ্গ। এই পশ্চিম বঙ্গ ও বর্তমানের বাংলাদেশ মিলে যার সাধারণ পরিচয় আমাদের কাছে — অবিভক্ত বাংলা কিংবা বঙ্গদেশ। আপনাদেরকে মূর্খ ভেবে স্কুলপাঠ্য এই তথ্যগুলো দিচ্ছি বলে বিজ্ঞ পাঠক আহত বোধ করবেন না। তবে কি এটা ঠিক নয় যে, এমন একটি ধারণা আমাদের মাঝে প্রচলিত রয়েছে, উক্ত অবিভক্ত বাংলা কিংবা বঙ্গদেশ ভেঙেই পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত পূর্ববঙ্গ, —পরে পূর্ব পাকিস্তান— যা এখনকার বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গ গঠিত হয়েছিল? এমনটি আসলে হয়েছে বৃটিশ ভারতের প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সম্পর্কে পরিজ্ঞাত না থাকার জন্যে। সেখানে দেখা যায়, যেটাকে বলা হয়েছে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী —যা  বেঙ্গল নামে পরিচিত, তার ভেতরে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ তো ছিলই, অধিকন্তু বিহার ও উড়িষ্যারও অংশ ছিল যুক্ত। শচীন্দ্রনাথ সেন তাঁর সিরাজদ্দৌলা নাটকে, এরও আগের আলীবর্দী খাঁকে নবাবই বলেছেন ‘বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার’। তার ধারাবাহিকতাই দেখা যায় বৃটিশ আমলে। এ থেকে রোঝা যায়, ১৯০৫ সালের যে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা, তা কেবল বঙ্গদেশের  হিন্দু-মুসলমানের ভাগাভাাগির ব্যাপার ছিল না, সেখানে পূর্ববঙ্গের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিল আসামকেও।

কথাগুলো বলা এ জন্যই যে, আজকের দিনে যে ভূখ- বাংলাদেশ, তার সাহিত্যের ইতিহাসই হোক আর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে কোন বিষয়েয়ই হোক, তা কি কেবল ১৯৭১ সাল থেকে হিসেবের মধ্যে আনতে হবে? না কি ঐতিহাসিক কাল থেকে তার যে ভৌগলিক অবস্থান, সেখানে সংঘটিত বিষয়াবলীকে আলোচনার অন্তর্ভূক্ত করতে হবে? সে ক্ষেত্রে ভূখ-গত ধারাবাহিকতার পরম্পরাকেই আমরা গ্রহণ করেছি। এটা যে কেবল বাংলাদেশের জন্য আলাদা কিছু, তা নয়। পৃথিবীর সর্বত্রই এটা মেনে নেয়া হয়েছে। সে হিসাবে প্রাচীন যুগ(দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত) ও মধ্যযুগ(ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত)-এর  কেবল সাহিত্য নয়, সামগ্রিক ভাবে সব কিছুই ইতিহাসের উপাদান হয়ে রয়েছে। এমন কি আধুনিক যুগ— যার শুরু ধরা হয় ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে, তখন থেকে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ পর্যন্ত সময়ও এই ইতিহাসের অন্তর্ভূক্ত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতেও এ কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে।

পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের পরের বিষয়াবলীকে বাংলাদেশের বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। এটা, বোধ করি, করা হয় এ জন্যই যে, ঐ সময় থেকেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতিত্বের ধারণা ভিত্তি পায়। হিন্দু ও মুসলিম— এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়েরই মাতৃভাষা বাংলা। বৃটিশ ভারতে পরাধীনতার বোধ থেকে যে দেশপ্রেমের প্রত্যয় বিকশিত হয়, সেখানে ঔপনিবেশিক শাসন-মুক্তির আন্দোলনই হয়ে ওঠে প্রখর। রাজনৈতিক আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন ঘটে তার ভেতর। কংগ্রেস সর্বভারতীয় মানুষের প্রতিনিধিত্ব দাবী করে ভৌগলিক স্বাধীনতা লাভকে মুখ্য করে তোলে। অন্য দিকে মুসলিম লীগ সর্বভারতীয় মুসলিমদের সংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে, শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। এ সময় বাঙালী হিন্দুরা সাধারণ ভাবে ছিল কংগ্রেসের অনুবর্তী। আর বাঙালী মুসলমানেরা ভোট দিয়েছিল মুসলিম লীগের পক্ষে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পর পশ্চিম বঙ্গের অধিবাসী ভারতীয় হিন্দু বাঙালী নাগরিকদের,বোধ হয়, আত্মসন্তুষ্টি লাভের পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পূর্ববঙ্গের বাঙালী মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের ভেতর দিয়েও পুঁজির বিকাশ থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের সম্প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টির যে সম্ভাবনার বথা তারা ভেবেছিল, সেখানে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা অতি দ্রুতই নেমে আসে। তখন নিজেদেরকে বাংলা ভাষী হিসেবে সনাক্ত করার তাগিদ অনুভব করতে থাকে। এই ভাষিক পরিচয়ই অন্য ধর্মাবলম্বী বাঙালীদেরকেও একই প্লাটফরমে সংগঠিত করতে অনুপ্রাণিত করে। বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’-ও এক সময় ‘মুসলিম’ পরিচয় ঝেড়ে ফেলে। তার পর তো রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারবাহিকতার ভেতর দিয়ে ঘটে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা — যা পূর্ববঙ্গকে পরিণত করে স্বাধীন ও সার্বভৈাম বাংলাদেশ-এ। এবং যার শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে। সুতরাং তখন থেকে বাংলাদেশের কর্মপরিধির সূচনা গণনাকে যৌক্তিক বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে। এ কারণে, শহীদ ইকবালও, বোধ করি, তাঁর গ্রন্থের ভূমিকার প্রথম লাইনেই বলেছেন, ‘১৯৪৭ সালে বিভাগোত্তর পূর্ববাংলায় বাংলাদেশের সাহিত্যের বীজ রোপিত হয়’।

তবে ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমানায় সৃষ্ট সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বোধ করি, আরও একটি বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। ঢাকা— যা ১৯৪৭—এর পরের পূর্ববাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী, সেখানে বিভাগোত্তর কালের পূর্ব থেকেই বাংলা সাহিত্য চর্চার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রভূমি ছিল। কিন্তু সে সময় প্রাদেশিক রাজধানী ছিল কলিকাতা। অনেক কবি-লেখকই— যারা বিভাগোত্তর কালে ঢাকায় চলে আসেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠাও ঘটে সেখানে। এ রকম য়ারা, তাঁদের অনেকের নামই ঊল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন,— সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমেদ, জসীম উদ্দিন, আবদুল কাদির, আহসান হাবীব, বেনজির আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, শাহাদৎ হোসেন, বন্দে আলী মিয়া, শওকত ওসমান, আবু রুশদ মতিন উদ্দিন, কাজী আফসার উদ্দিন, সরদার জয়েন উদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল ফজল,আবু জাফর শামসুদ্দিন, আবুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আজিজুল হাকিম, শামসুদ্দিন আবুল কালাম প্রমুখ। এ ছাড়া, অধিকতর তরুণ আশরাফ সিদ্দিকী, চৌধুরী ওসমান, মযহারুল ইসলাম প্রমুখও কলিকাতা কেন্দ্রিক পত্রপত্রিকাতে লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন। কাজেই শুধুমাত্র সময় হিসাব করে তাঁদের কলিকাতা-কেন্দ্রিক লেখাকে বাংলদেশের সাহিত্যের অন্তর্ভূক্ত না করারও কোন কারণ নেই। শহীদ ইকরাল এ রকম অনেক কবি-লেখকদেরই তাঁর আলোচনায় জায়গা দিয়েছেন। তবে আমার, মনে হয়, বিষয়টা আরও নির্দিষ্ট করা যেত। কেননা, ১৯৪৭ সাল শুধু তো সময়ের হিসাব নয়, তার আগের পরের ব্যাপারগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে জাতীয় মানস প্রবণতারও বিষয়।

ইতিহাস রচনা, তা যে বিষয়েরই হোক, কাজটি যে শ্রমসাধ্য ও সময়-সাপেক্ষ, সে নিয়ে  কারোই দ্বিমত না থাকারই কথা। শহীদ ইকবাল এক রকম ব্রত নিয়েই এটা করেছেন। শ্রমসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ কাজ তাঁর আরও আছে।  এর পূর্বে তিনি ‘বাংলাদেশের উপন্যাস: রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য’, ‘বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস, ‘বাংলাদেশের কবিতার সংকেত ও ধারা’ সহ আরও অনেক ইতিহাসমূলক ও অন্যান্য প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটিও এ রকম শ্রম ও সময় প্রদানের জলন্ত উদাহরণ।

এক সময় বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করেছিলেন বাঙালীর ইতিহাস নেই। সে অভাব পূরণ করার জন্য নিজেও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে লেখাও শুরু করেছিলেন। আসলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে অতীত আবিষ্কারের যে অনুপ্রেরণা এসেছিল, তা ছিল এরই ফলাফল। সাহিত্যের ইতিহাসও এ ভাবেই লেখা শুরু হয়। আমাদের সামনে তার যে উদাহরণগুলি রয়েছে, তার কিছু কিছু  উল্লেখ করাটা, বোধ করি, অপ্রয়োজনীয় নয়। এতে, আশা করি, এই উদাহরণগুলো সামনে রেখে শহীদ ইকবালের কাজের ক্যানভাসকে মূর্ত করা যেতে পারে। দীনেশচন্দ্র সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, অসিত কুমার বন্দ্যেপাধ্যায়, গোপাল হালদার, — এঁদের লেখা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থগুলো আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান লিখিত একটি গ্রন্থ রয়েছে। তাতে অবশ্য সৈয়দ আলী আহসান লিখিত অংশ নিয়ে তখনই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া, আবু সুফিয়ান নাজিরুল ইসলাম কিংবা দীন মোহাম্মদ রচিত ইতিহাস গ্রন্থও কম-বেশী পরিচিতি পেয়েছিল। মুহম্মদ এনামুল হকের বইটিতে মধ্যযুগের মুসলিম রচিত সাহিত্য নিয়ে যে পর্যালোচনা রয়েছে, তা খুবই মূল্যবান। তার পরও, বোধ করি, আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থ যথেষ্ট নয়। এ কারণে, এ রকম একটি দুরূহ কাজ করতে শহীদ ইকবাল যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং পর্যাপ্ত শ্রম ও সময় দিয়েছেন, তা অবশ্যই উল্লেখ করার মতো।

গ্রন্থ পরিকল্পনায় দেখা যায, সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক— কবিতা-উপন্যাস, ছোটগল্প-নাটক-প্রবন্ধ-অনুবাদ-শিশূসাহিত্য, এবং স্মৃতিকথা-আত্মজীবনী ও ভ্রমণ সাহিত্য নিয়ে যৌক্তিক কারণেই আলাদা আলাদা অধ্যায় সাজিয়েছেন। এবং তা খুব বিস্তৃত ভাবেই। তথ্যের সন্নিবেশও বেশ সমুৃদ্ধ। তবে ছড়াকারেরা এতে অভিমানাহত হতে পারেন। শিশুসাহিত্যের আলাদা অধ্যায় থাকলেও ছড়া তো কেবল শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা হয় না, বড়দের বিষয়ও তাতে উপস্থাপন করা যায়। বুড়োখোকারই তো ভারত ভেঙে ভাগ করেছে, আর ছড়াতে তা এসেছেও। টেলিফোন-মোবাইল-নেটের সুবিধা আজকাল আর চিঠিপত্র লিখতে উৎসাহ জোগায় না, তা বলে পত্রসাহিত্যও তো সাহিত্য হতে পারে। কিংবা ভূতের গল্প বা গোয়েন্দা কাহিনী বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যারা লেখেন, ঈর্ষনীয় পাঠকপ্রিয়তা নিয়ে তারা অনুল্লেখিত  থেকে যাবেন, সেটাও একটা আক্ষেপের কারণ বৈ কি! সাহিত্যের ইতিহাসের মূল জিনিসগুলো এসেই গেছে। এটা করলে কলেবরও বৃদ্ধি পাবে সামান্যই। আর একটি বিষয় হল, কবি-লেখকদের ক্রম, দু‘চারটে জায়গায় কালানুক্রমিক হয়নি। সেগুলোও সহজেই সংশোধন যোগ্য। তবে এগুলো যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হয়েছে— আমি তা মনে করি না। একটা বড় কাজ করতে গেলে সব দিকে মনোযোগ দেয়াটা হয়ে ওঠে না। শহীদ ইকবালের বয়স কম,আবার সময়ের সাথে সাথে সাহিত্যের বিস্তার থেমে নেই, সে জন্য, মাঝে-মধ্যেই পরিবর্ধিত সংস্করণের অনিবার্যতা দেখা দেবেই। তখন এই অপূর্ণতাটুকু আর থাকবে না, আশা করি।

ভূমিকাতে শহীদ ইকবাল একটা কথা বলেছেন, তা হল, ‘পঞ্চাশের দশকের বাসি, পচা, কর্কশ শূন্যতার মরুভূমিতে ষাটের দশক প্রাচুর্যময়তা পায়।’ কোন বিবেচনা থেকে তিনি কথাগুলো বলেছেন, ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি কিন্তু পঞ্চাশ দশকের ব্যাপারটা অর্থাৎ বাংলাদেশের সাহিত্যের সময় গণনার শুরু যেখান থেকে, তার পজিটিভ দিকটাই তুলে ধরতে চাই। ‘নতুন কবিতা’ — কাব্যসংকলনের কথা তিনি নিজেই বলেছেন যেটা পঞ্চাশের দশক শুরুর বছর খানেক আগে প্রকাশিত হয়েছে। আবার পঞ্চাশের দশকেই হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলেন গুরুত্বই বা অস্বীকার করা যাবে কি করে? এ ছাড়া, ঐ দশকের ভেতরেই বাংলাদেশের কবিদের প্রতিনিধিত্বশীল অন্ততঃ দুটো কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। একটি মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্পাদিত ‘পুর্ববাংলার কবিতা’ এবং আবদুর রশীদ খান ও মোহাম্মদ মামুন সম্পাদিত ‘প্রেমের কবিতা’। আবদুল কাদির সম্পাদিত, মনে হয়, একটি কাব্য সংকলনও ছিল, —‘কাব্যবীথি। কবিতার বই কিংবা কাব্য সংকলন প্রকাশিত হলেই কবিতা আহা মরি হয়ে যায়, তা অমি বলছি না। এগুলোর উল্লেখ শুধু এ কারণেই করছি যে ঐ সমস্ত কাব্য সংকলনে যে সব লিখেছেন, তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের কাব্য জগতকে করেছেন সমৃদ্ধিময়। আর শুধু কি কবিতার ব্যাপার? পঞ্চাশ দশকের মাথাতেই এসেছে আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জেগে আছি’-র মতো গল্পগ্রন্থ কিংবা শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’- মাঝামঝি। আবু ইসহাকের ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’-র ঠিকানাও ঐ পঞ্চাশ দশক। এ ছাড়া, যারা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, শওকত ওসমানসহ, তাদের অনেকেরই ঊল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বেরিয়েছে এ সময়। পঞ্চাশ দশক সম্পর্কে কথা বলতে গেলে, একটি বিষয়, বোধ হয়, মাথায় রাখা প্রয়োজন, তা হল, যে জাতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা আমাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে প্রজ্জ্বলিত করে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে, তার সূতিকাগারই ছিল সে সময়। জাতির সেই আত্যন্তিক চাহিদার প্রতিফলন ঘটেছে শিল্প-সাহিত্যেরও পরিশীলনে। বরং ষাট দশক, যে দশক সম্পর্কে শহীদ ইকবাল উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, সেখানে কিন্তু আমার বক্তব্য একটু ভিন্ন। এটা ঠিক যে, সেটা ছিল রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত হবার দশক, যার পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এ সময় শিল্প-সাহিত্যে যে একটি ঢং-এর ব্যাপার এসেছিল, তা কি অসত্য? তিরিশের অনেক কবিই যেমন আন্তর্জাতিকতাবাদের নামে সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা রকম তাত্ত্বিক আগ্রাসনের স্বীকার হয়েছিলেন, সে রকমেরই একটি ব্যাপার ঢাকাতেও ঘটতে যাচ্ছিল। স্যাড জেনারেশন-না গোষ্ঠী-হাংরি জেনারেশন— এরা কি করেছিল? যে দেশে শিল্প বিপ্লবই হয়নি, সে দেশে ইনডাস্ট্রিয়াল সোসাইটির ভাইসেসগুলোকে অঙ্গভূষণ করে শুরু হয়ে গিয়েছিল নাচানাচি। যে দেশের মানুষেরা ডিক্লাসড হওয়া শেখেনি, সেখানে মার্কসীয় বদহজম হওয়া ছাড়া আর কি হবে?, তাও অনেক কবি-লেখকের সমাজ বিপ্লবের বাহন হয়েছিল। এ ধরনেরই একটি ব্যাপার এখন আবার বিশ্বপুঁজির মালিকেরা তত্ত্ব আকারে নিয়েও আসছে। সমাজের সার্থকতার সাথে এর কোন যোগ নেই, কিন্তু ধমক তো খেতে হচ্ছে উত্তর আধুনিকতার!

যা হোক, এগুলো তো মতামতের ব্যাপার। শহীদ ইকবালের সব কথা যে আমাকে মানতে হবে কিংবা আমার কথা তাকে, তাও তো নয়। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসের যে সব তথ্য মৌমাছির মতো তিনি সঞ্চয় করেছেন, তার কৃতিত্ব তো তার অবশ্যই প্রাপ্য।

শহীদ ইকবাল, তার এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদ-কে। কাদেরকে এক জন পছন্দ করেন, তার ভেতর দিয়ে তার মানস বৈশিষ্ট্যেরও পরিচয় ফুটে ওঠে। কাজেই এক জনকে বোঝার জন্য এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই এই উৎসর্গ করার ভেতর দিয়ে শহীদ ইকবাল কেও আমরা অনেকটাই চিনে নিতে পারি। তবে কথা কিন্তু আমার শুধু এটুকুই নয়। এঁদেরকে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সময়ের সক্রেটিস’। এই গ্রীক দার্শনিকের নাম আমরা সবাই জানি। নাম তো জানি, কিন্তু আর কতটুক জানি? নিজেকে জানার নিরন্তর একাগ্রতা চিন্তায় ও অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসার এক সিমবলিক উপস্থাপনা রূপে তাকে, বোধ করি, শোকেসে সাজিয়ে রাখাটাই আমাদের আনন্দের কারণ হয়ে থাকে। তাই নিজেকেও জানা হয় না, তাঁকেও না। একই ভাবে আহমদ শরীফ কিংবা আহমদ ছফা কিংবা হুমায়ুন আজাদও তাই। তাঁদের তিনজনের অবস্থান হয়ত এক রকম নয়। কিন্তু যেটুকু তাঁদের কাছ থেকে আমাদের নেয়ার, তা তো নিতেই পারি।

‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশের কথাটা আমি একটু বিশেষ ভাবে বলতে চাই। সন-তারিখসহ কবি-লেখকদের ধরে ধরে তাদের প্রকাশিত গ্রন্থের একটি দীর্ঘ তালিকা এখানে সংযোজিত হয়েছে। তাই, শুধু ইতিহসের নয়, এটি একটি আকর গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে বলে মনে করি।

আর কি বলব? মুদ্রণ শিল্পের মনোহারিত্ব বইটিকে করেছে দৃষ্টিনন্দন। বইয়ের স্থায়িত্ব নিয়ে অতি উৎসাহী কিংবা ভাব-ভঙ্গীতে বিপ্লবী হয়ে অনেকেই এখন প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকেন। কিন্তু, আমার মনে হয়, বিষয়টা পাত্রের নয়, পাত্রে রাখা জ্ঞান-প্রবাহের। মানব সমাজ তা নিজের প্রয়োজনেই, প্রযুক্তিগত ধারাবাহিকতায়, ফর্ম যাই হোক, সংরক্ষণ করবে। গ্রন্থের স্থান যদি আর্কাইভেও হয, তা কি বাঁধাগ্রস্ত করতে পারবে জ্ঞান-পিপাসুদেরকে?

আশা করি, শহীদ ইকবাল রচিত ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি পাঠক সমাজে সমাদর লাভ করবে।
জুলফিকার মতিন

******************************************************


সম্প্রতি প্রকাশিত পত্রিকা ও পুস্তক পরিচিতি

হৃদয়বর্ণের কবিতাগুচ্ছ
মহীবুল আজিজ
মনন প্রকাশন ॥ চট্টগ্রাম
প্রকাশ : স্বাধীনতার বইমেলা ২০১৭
‘লেখক-কবি-সাহিত্যিক-অধ্যাপক’- চতুর্বিধ পরিচয়ে মহীবুল আজিজ আমাদের কাছে বহুমাত্রিক মানুষ। লিখেও চলেছেন দুহাতে, অবাধ বিচরণে, সব্যসাচীর মতো। কবি মহীবুল আজিজের বড় গুণ সুখপাঠ্যতা। সদ্য প্রকাশিত হৃদয় বর্ণের কবিতাগুচ্ছও এর প্রমাণ দেয়। সঙ্গে এখানকার কাব্যভাবনাতে ও রয়েছে বহুমাত্রিকতার জলস্পর্শ। ‘প্রেম-প্রত্যাশা, বিরহ-সংশয়, মাটি-মানুষ, ইতিহাস- ঐতিহ্য-পুরাণ, ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতা, নস্ট্যালজিয়া থেকে রাজনীতি’— সবই তাঁর ঋদ্ধ কলমে-হৃদয়ে নির্মল বাণীরূপ পেয়েছে হৃদয়বর্ণের কাবিতাগুচ্ছর অর্ধশত কবিতায়। যা পাঠকের মনে রেখে যায় স্থায়ী স্পর্শের প্রয়াস। কাব্যকাঠামো নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট এখানকার বাড়তি পাওনা।

বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের আলোচনা ও অন্যান্য আরিফ হায়দার
অনার্য ॥ ঢাকা
প্রকাশ : বইমেলা ২০১৭
ব্যক্তি যখন আত্মনিমগ্ন হন কর্মে, তখন তার নামের সাথে জুড়ে বসে কাজের তকমা। যেমন- আরিফ হায়দার থিয়েটারের মানুষ। সেটা আগাগোড়াই। থিয়েটার নিয়ে তার ক্রিয়েটিভ-কর্মের পরিমাণ যেমন বিপুল, তেমনি ভাবনার পরিধিও অত্যাল্প নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণাও করেছেন থিয়েটার ভাবনা নিয়ে। এবার তার চাক্ষুষ রূপ আমরা পেলাম বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের আলোচনা ও অন্যান্য গ্রন্থে। অনার্যের করা বইটি পেশাদারি নিবন্ধ সংকলন। ভাবনার মার্জিতবুদ্ধিতে, প্রকাশের চারুতায় যা হয়ে উঠেছে অনন্য। যাকে সার্টিফাইড করেন হাসান আজিজুল হকও। এখানে বিষয় হিসেবে আরিফ হায়দার নির্বাচন করেন- বাংলাদেশের উল্লেখ্য কয়েকটি নাট্য সংগঠন এবং নাট্যচর্চা বিকাশে তাদের কনক্রিট ক্রিয়া-কর্মকে। গ্রন্থে’র একদিকে যেমন আছে উৎপল দত্তের মতো অভিনেতার সাথে চাক্ষুষ আলাপের বর্ণিল স্মৃতি, ঋত্বিক ঘটকের থিয়েটার সম্পৃক্ততা তেমনি অপরদিকে আছে রামেন্দু মজুমদার, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদের মতো বিশিষ্ট নাট্যজনদের থিয়েটার ভাবনার সন্নিবেশ। নাটকের সাহিত্য-আঙ্গিক, উপস্থাপন-আঙ্গিক, মঞ্চ-স্থাপনা, অভিনয়ে স্টাইল নিয়ে লেখকের মৌলিক-অমৌলিক চিন্তাও গ্রন্থটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। ‘বিভক্তি নাট্যচর্চা রাজধানী মফস্বল’ শিরোনামের লেখাগুলোতে আরিফ হায়দার দৃকপাত করেন মফম্বলের নাট্যচর্চার সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে। নাট্যসংগঠনগুলো যখন স্লোগান নির্বাচন করছেন— ‘নাটক শাণিত হচ্ছে, শোষকেরা সাবধান’ তখন নাট্যচর্চার সংবাদ গরিষ্ঠের কাছে পৌঁছে দিতে এমন গ্রন্থ সময়ের চাহিদা বলেই মানতে হয়।

কবিতার ইন্দ্রজাল
জফির সেতু
বেহুলা বাংলা ॥ ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৭
কবিতার ইন্দ্রজাল জফির সেতুর প্রবন্ধের বই। কবিতার এক অর্থ তো ইন্দ্রজালই— যা ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’। কবিতার সাথে গাঢ় আত্মীয়তা ইমোশনের। সুতরাং, মাথার বিষয় প্রবন্ধও যে এখানে হৃদয়জলে ভিজবে, পাঠের মায়া জন্ম দেবে— নামই এমন বার্তা দেয়। আর সেই সিম্ফনি ক্রমেই বাড়িয়ে চলে, জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, আবুল হাসান, শহীদ কাদরীর মতো কবির উপস্থিতি। মোহনীয় প্রচ্ছদপটের কবিতার ইন্দ্রজাল তিন-পর্বে বিভাজিত। প্রথম পর্বে কবির আত্মবোধ, আত্মস্বীকার, নিয়ে খোঁজ চলে। আত্মবোধকে জফির সেতু মেনে নেন চেতনার অংশ হিসেবে। সঙ্গে এ পর্বে প্রকাশ ঘটেছে কবিতা-কাব্যকলা নিয়ে লেখকের মৌলিক-অমৌলিক চিন্তার। একখানে কবিতাকে তিনি দেখেন নৃত্যের যমজের চেহারায়। মুদ্রা ও শব্দের পাখায় ভর করে এক করে দেন দুটোকে : ‘নৃত্য মুদ্রার লীলা/ কবিতা শব্দের লীলা’। দ্বিতীয় পর্বে এসে পাঠের গতি কিছুটা শ্লথ হয়, এখানে প্রবন্ধের চেহারা মেলে বেশ। কিছুটা একাডেমিক। অশোকবিজয় রাহা, হাসন রাজা, দিলওয়ার, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, জিল্লুর রহমান, হেনরি স্বপনকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো ভাবনার ভাঁজ খোলে, প্রবিষ্ট করে চিন্তার নতুন পরত। তৃতীয় পর্বটি মূলত নস্ট্যালজিয়ায় পরাভূত-গর্বিত। জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, আবুল হাসান, শহীদ কাদরীর কবিতার সাথে নিজের অ-বয়সকালের স্মৃতি মিশিয়ে জফির সেতু পৌঁছেন এক চিরলব্ধ রসায়নে। যেখানে খুঁজে ফেরা ‘আমি’র বিস্তার। ‘প্রবল প্রেম ছিল শিরায় শোণিতে আমার’— তাঁর এ উচ্চারণ- স্বীকারোক্তি কেবলমাত্র কোনো তীব্র ‘তরুণী’র জন্য নয়, কবিতার জন্যও। কবিতার ইন্দ্রজাল এ বিষয়ে আমাদের নিঃসন্দেহ করে।

কাব্যসমগ্র
বায়তুল্লাহ্ কাদরী
লেখাপ্রকাশ ॥ ঢাকা
প্রকাশ : বইমেলা ২০১৭
বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ কবিতা সংগ্রহের প্রচলন গত শতাব্দীর ঘটনা; অর্র্ধ-শতাব্দীরও অধিককাল অতিক্রান্ত হয়েছে। উত্তররৈবিক কবিদের অনেকেই অস্বস্তিবোধ করেছিলেন ‘শ্রেষ্ঠ’ অভিধাটি নিয়ে। নিজের শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় ‘বুদ্ধদেব বসু’ শ্রেষ্ঠ অভিধাটিকে দেখেছেন— ‘ওটা একটা চলতি কথা, ব্যবহারযোগ্য নাম মাত্র’। কাব্যসমগ্র এর পরের ঘটনা। স্বস্তিদায়কও বটে! কারণ, কবি এখানে মুক্তি পান নিজের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের গুরুভার থেকে। লেখাপ্রকাশ থেকে সম্প্রতি বেরিয়েছে কবি বায়তুল্লাহ্ কাদরীর কাব্যসমগ্রর নতুন সংস্করণ। কলাপাতা রঙ্গের মনকাড়া প্রচ্ছদে। সমগ্রে সংকলিত কাব্য ৯টি— শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য, ত্রিনাচিকেতের নাচ, কিম্ভূত হবার কথা ছিল, প্রজন্ম লোহিত, আড়ম্বর, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে, প্রিয় মধ্যবিত্ত, আমি ডাকছি আসুন, গোধূলির নূড়িশস্য, জগৎ ভ্রমিয়া। আছে, অপ্রকাশিত পা-ুলিপির একাংশ আমি পক্ষিগোত্র। নব্বুইয়ের দশকের অন্যতম প্রধান কবি বায়তুল্লাহ্ কাদরীর পরিচিতি সর্বজনবিদিত। এককথায় কবিতায় নিমগ্ন মানবসত্তা তিনি। ‘প্রকৃৃতি-প্রেম- জৈবিকতা’ বাণীরূপ পায় তাঁর কলমে, কবিতায়। কবিতার ভাষা, স্টাইল এবং দর্শনে বায়তুল্লাহ্ কাদরী পুরোপুরি আলাদা, নিজস্ব। কাব্যপ্রকরণের ক্ষেত্রেও তিনি স্পর্শ করেন নবতর মাত্রা। আর, পাঠকের জন্য নির্ভার হবার সব থেকে বড় সংবাদ হলো— তাঁর কবিতার মেদহীনতা, সুখপাঠ্যতা। ফলে, কাব্যসমগ্র পাঠে পাঠকের একটি ক্লান্তিরহিত-¯িœগ্ধ জার্নি হয়ে যায় তাঁর কাব্যভুবনের সাথে।

কতিপয় মুখস্থ মানুষ
আহমেদ মাওলা
বিদ্যাপ্রকাশ ॥ ঢাকা
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৭
আহমেদ মাওলা পরিচিত প্রাবন্ধিক। কথাসাহিত্যক পরিচিতি তাঁর হালের সংযোজনা। অবশ্য নিয়মিত-অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লিখে চলেছেন অনেকদিন ধরেই। কথাসাহিত্যেকের মলাটবন্দী হয়ে সামনে এলেন, ২০১০ সালে। সেখানে বিষয় হিসেবে বেছেছিলেন, ভাষা আন্দোলনকে। এর পরিক্রমায় লিখলেন উপন্যাস কতিপয় মুখস্থ মানুষ। উপন্যাস হিসেবে এটি দ্বিতীয় রচনা, পরিণতও বটে। আহমেদ মাওলা উপন্যাস লেখেন- ‘সমাজের দিকে চোখ রেখে,’ তাকে ছাপিয়ে ওঠে ব্যক্তি। মূল্যবোধহীনতা, অবক্ষয়, লোভজর্জরতা যে সমাজের প্রাধান চারিত্র, তিনি সেই সমাজেরই আঁকিয়ে। আর, এসব বাণী পায় সমকালের মোড়কে। কতিপয় মুখস্থ মানুষের প্রোটাগনিস্ট আবদুল মতিন— ‘মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদের পুত্র’ যার প্রাধান পিতৃপরিচয়। স্বাধীন দেশে যৌবনে লালিত রাজনৈতিক বিশ্বাস তার ভাষা পায় না। ভাষাহীনতা, ¯¦প্ন-ভঙ্গুরতা, কর্মজীবন মিলে তার শ্রেণিবদল ঘটে। সমাজের পাঁকে, যাপনের টেনশনে বিপর্যস্ত হন ব্যক্তি আবদুল মতিন। ‘নীল অত্যাচারে লাল হয়ে ওঠা’ তার পরিণতির ভাষ্য এমন : ‘সকালে সবাই দেখে বিদ্যুতের তারে ঝুলে আছে সম্পূর্ণ রঙ্গিন এক বাংলাদেশ। অখ- এক আবদুল মতিন’। ‘জীবনের ক্ষয় ও আত্মবিনাশ’-এ উপন্যাসের প্রধান টেক্্রট। কাহিনী বয়ন-নৈপূণ্যে কতিপয় মুখস্থ মানুষ অর্জন করে সমকালীন জীবনসত্যের অভিলক্ষ্য।

পানপাত্রে ডাইনির ঠোঁট
আরিফুল হক কুমার
প্লাটফর্ম ॥ ঢাকা
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৭
‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুইরকম উৎসারণ’— সুতরাং, মানতেই হয় মানব ও কবিতার ভাষা অভিন্ন। প্রকাশই তার ধর্ম-রীতি। সত্তুরের দশক থেকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লিখে চলেছেন কবি আরিফুল হক কুমার। চলার পথে— ‘প্রেম, মিথ, নিসর্গ, সমকাল, স্বদেশ, সমাজ ও রাজনীতিকে করে তোলেন তাঁর কাব্যসারথি। কথা বলেন মানবের ভাষায়। প্রথমকাব্য ঘাসের আঙ্গোট বেরোয় ২০০৯ সালে। পরিণত কাব্য। পানপাত্রে ডাইনির ঠোঁট তাঁর পঞ্চম কাব্য। ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন আছে; তবে, নামই বার্তা দেয় তাঁর কাব্যভুবন এখানে স্বপ্নালুতায়-ভাবালুতায় সিক্ত হবে না। বরং, চলতি যাপন, কালের অভিজ্ঞানে চড়ে যায় তার সিম্ফনি, কাব্যদেহ হয় রক্তাক্ত। যা থেকে বাদ পড়ে না পাঠক হৃদয়ও। সমকালীনতাই মূলভাষ্য আরিফুল হক কুমারের কাব্যটি। লেখনীর গুণপনায় তা হয়ে ওঠে দৃষ্টিগ্রাহ্য, সুখপাঠ্য। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলা, নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক ঘটনা থেকে রাস্তায় পড়ে থাকা রেজাউল করিম সিদ্দীকির নিথর দেহ— কিছুই বাদ থাকেনা তার সর্বজ্ঞ দৃষ্টিতে। ফলে, বক্তব্যে-বিবৃতিতে পানপাত্রে ডাইনির ঠোঁট পায় সমকালীন প্রমাণ্যমাত্রা। ‘জননী আমাদের জন্মান্তর হোক/ তোমার আঁচল ছায়ায় নবজন্ম’—এমন উচ্চারণ সেখানে ঘটায় আশাবাদী ছেদ।

ভূমিপুত্রের শীতনিদ্রা
কাজল কাপালিক
চিহ্ন ॥ রাজশাহী
প্রকাশ : বৈশাখ ১৪২৪
কবি হিসেবে কাজল কাপালিকের আত্মপ্রকাশ যদি একতারাটি বেজে ওঠে কোথাও দিয়ে। বছর না ঘুরতেই আমরা তাঁর দ্বিতীয় কাব্য ভূমিপুত্রের শীতনিদ্রা হাতে পেলাম। এটা মানতেই হয় দ্বিতীয় কাব্যে তাঁর কবিসত্তা আরো সংহত হয়েছে। কবিতার বিষয় হিসেবে কাজল কাপলিক নির্বাচন করেন জীবনঘনিষ্ঠ অনেক কিছুই। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে ভূমিপুত্রের শীতনিদ্রার ৩৯টি কবিতায় তিনি মুখ্য করে তোলেন নিত্যদিন-যাপনের অভিজ্ঞতাকেই। এ কাব্যের কবিতাগুলো টানাপাঠের তৃপ্তি দেয়।

দূর্বা
সম্পাদক : গাজী লতিফ
বর্ষ : ১৭ ॥ সংখ্যা : ১৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৫৫ ॥ মে ২০১৭
নবীনবাগ ॥ গোপালগঞ্জ
দূর্বা গাজী লতিফ সম্পাদিত একটি মাটিবর্তী ছোটকাগজ। পত্রিকাটির ১৭ বর্ষের ১৩ সংখ্যাটি স্বপ্ন সংখ্যা। স্বপ্নের বিভিন্ন উপস্থাপনা রয়েছে এখানে। প্রবন্ধ, আখ্যান, নিবন্ধ ও বিবিধ এই চারভাগে পত্রিকাসূচি বিন্যস্ত। স্বপ্নের বর্ণ, স্বপ্নের কলকব্জা, স্বপ্নের সাতকাহন বহুমাত্রিক রসদে পূর্ণ  সাতজন প্রাবন্ধিকের প্রবন্ধ। আখ্যানটিও বর্ণিল স্বপ্নপ্রভায়। নিবন্ধ অংশটি দীর্ঘ এবং অনেক নামিদামী লেখকের আনাগোনায় ঋদ্ধ। বিবিধও অনুরূপ। স্বপ্ন নিয়ে একটা নিরীক্ষার প্রয়াস আমরা পাই সংখ্যাটিতে। বেশ পরিপাটি, ব্যতিক্রম সূচিবিন্যাস, ঝকঝকে মুদ্রণ; সংখ্যাটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

পাঁপড়
সম্পাদক : অদ্বৈত মারুত
বর্ষ : ১৬ ॥ সংখ্যা : ১১
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৭২ ॥ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
পাঁপড় ছড়ার ছোটকাগজ, মূলত নবীনদের ছড়া ও কবিতা প্রকাশ করে। এর এগারোতম সংখ্যাটি সামনে এসেছে শিশুদের পাঠোপযোগী ছড়ার সন্নিবেশে। প্রত্যেকটা ছড়ার বিষয় ও ভাববস্তু আলাদা। শতাধিক  ছড়াকারের ভাবনা—চিন্তন এবং শিশুসাহিত্যের মূল্যয়নসহ পাঁপড় বিগত সংখ্যার সীমা অতিক্রম করেছে।

একাঘ্নী
সম্পাদক : নাজ
বর্ষ : ১ম ॥ সংখ্যা : ১ম
পৃষ্ঠা : ৪০ ॥ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
একাঘ্নী চিহ্নপ্রাণিত শিল্পের ছোটকাগজ। এটি ‘সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করা’  স্লোগান নিয়ে সৃষ্টি। নাজ সম্পাদিত একাঘœীর প্রথম সংখ্যাতেই রয়েছে বিশেষ চমক। পত্রিকার অন্তর্জগৎ গতানুগতিক ধারার বাইরে এবং শিরোনামগুলোও মনকাড়া। প্রবন্ধ এবং নিয়মিতবিভাগ এই দুটি অংশে বিভাজিত সংখ্যাটি। প্রবন্ধ অংশে পাঁচটি প্রবন্ধ আছে— যেখানে ক্রম পেয়েছে শহীদ ইকবাল থেকে কাঞ্চন রায়ের লেখা। নিয়মিত বিভাগে মিডিয়া-বিমুখ একজন শিল্পীকে নাজ-র মূল্যয়ন এবং স্মৃতি দাসের— ‘ড. এবনে গোলাম সামাদের সাথে কিছুকথা’ পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ এবং অনেকাংশে ঋদ্ধ করেছে। পত্রিকাটির গেটআপ-মেকআপ রুচিসম্মত, নান্দনিক। একাঘ্নীর পথচলা দীর্ঘ হোক।

******************************************************

আত্মকথা ……………………………………….
হোসেনউদ্দীন হোসেন
লেখক ও বীর-মুক্তিযোদ্ধা হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)। থাকেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগর গ্রামে। লেখালেখি তার প্যাশন। তিনখ-ের বাংলার বিদ্রোহ কিংবা রণাঙ্গণে একাত্তর নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতাড়িত গ্রন্থ ছাড়াও লিখেছেন কবি আহসান হাবীব বা টলস্তয়-ভলতেয়ারের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুণী লেখকদের নিয়ে নানা আয়তনের গ্রন্থ। ভ্রমণপিয়াসী এ লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি তার কাছে স্মৃতিমুদ্রার এক বীররসাত্মক এপিক আখ্যান। প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, স্বার্থত্যাগী, নিরহংকারী এ মানুষটির গল্প-উপন্যাস-কবিতার হাতও অপ্রশংসিত নয়। এই দুর্মুখ সমাজে ব্যতিক্রমী এ মানুষটি এখন প্রায়— আনন্দময়রূপে ‘একা’। তাঁর জীবন-অধ্যায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার যে সুলুকসন্ধান তিনি এ অংশে ধারাবাহিকরূপে শুরু করলেন তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্মকে অনেককিছু জানতে ও বুঝতে শেখাবে। অভিনন্দন এ গুণী লেখককে। (সম্পা.)

******************************************************

ধুলায় ধূসর-১
১. পূর্ব-পুরুষেরা
আমার জন্ম হয় ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪১। ১০ই মহরম, ১৩৬২। ১৬ই ফাল্গুন, ১৩৪৮। সুবেহ সাদিকের রক্তিমাভা পূব আকাশে দেখা দিয়েছে। সেদিন ছিল শুক্রবার। মসজিদের আজান ভোরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সময় ছিল মনোরম ও শিশির স্নিগ্ধ।

যেহেতু মহরম মাসের ১০ম তারিখে আমার জন্ম, সেইহেতু আমার নাম রাখা হয় হোসেন। হোসেন শব্দের অর্থ সুন্দর বা সৌন্দর্যময়। একই তারখে এবং একই দিবসে কারবালা যুদ্ধে শহিদ হন হজরত ইমাম হোসেন। এই দিবসটি মুসলিম জগতে নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্মরণীয় ও বরণীয় দিবসটির পবিত্রতা উপলব্ধি করে আমার নামও রাখা হয় হোসেন। অর্থাৎ আমি যেন আশীর্ব্বাদস্বরূপ এই জগতে মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছি। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আমাকে উপঢৌকন হিসাবে আমার মায়ের কোলেই প্রেরণ করেছেন। বাতাসে বাতাসে ভাসছে আনন্দধ্বনি। যে পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে, এই পরিবারটি কৃষি পরিবার। এককালে এই পরিবারের অগাধ ভূ-সম্পত্তি ছিল। এই দিগরে ছিল বিশেষ প্রতিপত্তি। সকলেই মান্যগণ্য করতো। পদবি ছিল ম-ল। সর্বসাধারণ ‘ম-ল’ না বলে ‘মোড়ল’ বলেই ডাকাডাকি করত। সামন্ততান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় গ্রাম সমাজের শালিশে বিচার থেকে গ্রাম শাসনের জন্য ছিল কর্তৃত্ব। সে প্রভাব ও প্রতিপত্তির আজ বদল ঘটেছে।

আমার পিতার নাম কলিমউদ্দিন। ডাক নাম কালু। কালু ম-ল নামেই ছিলেন সমধিক পরিচিত। মায়ের নাম আরিছননেছা। পিতা ঐতিহ্যসূত্রে লাভ করেন পিতৃ প্রদত্ত ভূ-সম্পত্তি। দাদার নাম তুবন ম-ল। পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, কোম্পানী আমলের আগে এই ম-ল পরিবারটি স্থানীয় পঞ্চায়েতের মোড়ল হিসেবে ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ভূমি-ব্যবস্থার আমূল বদল ঘটলে ম-ল পরিবারের অবস্থাও বদলে যায়। এখন এই স্থানটির নাম ঝাঁটি নগর। এখানে কপোতাক্ষ নদের নীতে জিন্নিংগজ নামে একজন ইংরেজদের নীল কুঠির ছিল। ঝাঁটি শব্দটি তিনি উচ্চারণ করতেন জান্টি নামে। জায়গাটি ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের পক্ষে উপযুক্ত স্থান। জিন্নিংগজ তার নীল ব্যবসার সুবিধার্থে ক্রমান্বয়ে গ্রামের মোড়লদের একত্রিত করেন এবং নীল উৎপাদনের বিপুল প্রসার ঘটান। ঝাঁটিনগর থেকে দক্ষিণের কলারোয়া পর্যন্ত ছিল জিন্নিংগজ সাহেবের একচ্ছত্র আধিপত্য। তাঁর নীল উৎপাদন এবং ব্যবসায়ের ব্যবস্থাপনার কর্ণধার ছিলেন আর একজন ইংরেজী বণিক হেনরী ম্যাকেঞ্জি। মনিরামপুরের রাজগঞ্জেও ছিল তাদের আর একটি শাখা কুঠি।

জিন্নিংগজ সাহেব মোড়লদেরকে বড্ড খাতির করতেন। তিনি নীল আবাদের জন্য যে গ্রামে যেতেন, সেই গ্রামে মোড়লদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। এর ফলে এলাকায় মোড়ল পরিবারের প্রভাব আবার বৃদ্ধি পায়। মোড়ল বংশের বংশমর্যাদা ছিল কিন্তু বংশবৃদ্ধি ছিল না। দাদার বাবা ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। বংশের লোকবল না থাকলেও প্রচুর জমি থাকার কারণে এলাকার লোকজন তাকে সমীহ করত। এই বংশটি ছিল এই গ্রামের আদি পরিবার। হিন্দু-মুসলিম যারা এই গ্রামে আদি বাসিন্দা ছিল তাদের মধ্যে কোন সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ও রেষারেষি ছিলনা। ছিল বর্ণ ও বর্গ প্রথা। মুসলমানদের মধ্যেও ছিল একই রকম উচ্চ ও নিচু বর্ণের প্রচলন। গোত্রের বর্ণানুযায়ী বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের বিধি ব্যবস্থার রীতি ছিল। এই রীতিনীতির বাইরে যাওয়ার কারো ক্ষমতা ছিল না।

সমাজের কোথাও কোনো বিরোধ ও গোলমাল দেখা দিলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মোড়লরা একত্রিত বসে যে রায় দিত, তা নিঃশর্তে মানতে বাধ্য হত সকলকে। সাজা হিসাবে ছিল ‘একঘরে’ করে রাখার মৌখিক আইন। মোড়লরা যা আদেশ-নির্দেশ করতেন সেইটাই হত সমাজে বলবৎ।

নবাগত জিন্নিংগজ সাহেব নীলের কারবার করতে এসে এই বিষয়টি ভালোরকমই মনস্তাত্ত্বিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, মোড়লরাই হচ্ছে গ্রাম সমাজের প্রধান। তাদেরকে কৌশলে বাগে এনে জিন্নিংগজ সাহেব নীলের কারবারে হাত দিয়েছিলেন। তাই দাদার বাবাকে সঙ্গের সাথী করে এ গ্রামে ও গ্রামে ঘুরতেন এবং নীলের কারবার মজবুত করে তোলেন।

জিন্নিংগজ সাহেবের ইংরেজ মহলেও ছিল বিশেষ প্রভাব প্রতিপত্তি। যশোহরেই প্রথম যারা কারখানা শিল্পের পত্তন ঘটিয়েছিলেন, জিন্নিংগজ ছিলেন তাদের অন্যতম। একটি রিপোর্টের মাধ্যমে জানা যায় :

The manufacture of Indigo by British entrepreneurship began in Jessore when Bond, a free merchant established a factory at Rupdia near jessore town in 1795. He wanted to establish another factory at Alinagar near Nowapara. In the beginning of 1796 tuft, another British citizen, obtained per mission to Indigo works in Mohammad Shahi, Taylor established Indigo factories at Mirpur in 1800 and in the same year gennigs opened an Infigo factory at Jhikargacha, nine miles west of Jessore.

এই সময় কোম্পানীর শাসন ব্যবস্থায় নানারকম সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। দস্যু ও তস্করের উৎপাতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি দেখা দিয়েছিল। সারাদেশে চলছিল অরাজকতা। প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে যশোহরকে জেলা হিসাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কয়েক বছর আগে যশোহরের কালেক্টর ও জজ ছিলেন হেঙ্কেল সাহেব। তখন মুরলী ছিল জেলার সদর দপ্তর। এখন হেঙ্কেল সাহেবের বদলে রোক সাহেব তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি মুরলি থেকে পার্শ্ববর্তী সাহেবগঞ্জে দপ্তর স্থানান্তর করেছেন। বেশ একটা গোছ গোছ সহকারে প্রশাসনের সবদিক নিয়ন্ত্রণ করে চালাচ্ছেন রোক সাহেব।

জিন্নিংগজ সাহেবের সঙ্গে রোক সাহেবের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই হেতু জিন্নিংগজ সাহেবের সঙ্গে থেকে সমাজে আরো মর্যাদাবান হয়ে উঠছেন দাদার বাবা মোড়লও। কয়েক বছরের মধ্যেই মৌজার নামও বদলে গেল। ঝাঁটি নগর বলে যে জায়গাটির নাম ছিল, তার নাম হলো জিন্নিংগজা। সেইসঙ্গে আমাদের গ্রামটির নাম বদল ঘটলো। ম্যাকোঞ্জি সাহেবের নামানুসারে গ্রামটির নামকরণ হলো: ম্যাকোঞ্জিগঞ্জ। জিন্নিংগজ নামটি স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্চারণ করত জিন্নিংগজা। জিন্নিংগজা থেকে বর্তমান রূপ নিয়েছে ঝিকরগাছা। পরবর্তীকালে ১৮৮০ সালের দিকে কলকাতা-খুলনা রেলপথ চালু হলে এখানে একটি ষ্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ষ্টেশনটির নাম ফলকে লেখা হয় : ‘ঝিংকরগাছা’। ম্যাকেঞ্জি সাহেবের নামে বর্তমান কোনো মৌজা নেই। ম্যাকেঞ্জিগঞ্জের নামের বদলে মৌজার নাম হয়েছে কৃষ্ণনগর।

দাদীর বাবা জিন্নিংগজ সাহেবের নীল চাষের জন্য ভূমি বন্দোবস্তের মধ্যস্থতা করে দিতেন। ভূমি ব্যবস্থা ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে জমিদারের অধীন। নীল চাষ করে নীল ব্যবসায়ীরা রাতারাতি ধনবান হয়ে ওঠেন। এর ফলে যত্রযত্র নীল ব্যবসায়ীদের কুঠির সংখ্যা বাড়তে থাকে। জমিদারের আওতাভূত সামান্য কিছু জমি নিয়ে সাহেবরা প্রথমে রাইয়তের সাহায্যে নীল চাষ শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যে কুঠিয়ালের সংখ্যা অধিক পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় কুঠিয়ালদের মধ্যে দেখা দেয় ভূমি দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ। প্রথম বিবাদ শুরু হয় জমির সীমানা এবং প্রজাবিলি নিয়ে। এক কুঠিয়ালের সঙ্গে আরেক কুঠিয়ালের কোনো সুসম্পর্ক ছিলনা। চারদিকে দেখা দিতে লাগলো অরাজকতা। বিভিন্ন স্থানে লেঠেল বাহিনীর হামলা-পাল্টা হামলা হতে লাগলো। অবস্থা এমন সংকটাপন্ন হয়ে উঠলো যে জিন্নিংগজ সাহেব এবং রূপদিয়ার বন্ড সাহেব যশোহরের তৎকালীন কালেক্টর থমাস পোনের দরবারে গিয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করলেন যে, বিবাদমান বিষয়টি আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হোক।

কালেক্টর সাহেব এক ইস্তাহার জারি করে জানালেন যে, এক কুঠির দশ মাইলের মধ্যে অন্য কুঠি স্থাপন করা যাবে না। এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের জন্যে গভর্ণর জেনারেলের নিকট তিনি সুপারিশ করলেন। গভর্ণর জেনালের জবাব দিলেন যে, এ রকম আইন প্রণয়ন করলে ২০ মাইল বা লক্ষাধিক বিঘা জমির উপর একজন নীলকরের প্রাধান্য স্থাপিত হবে। যার ফলে জমিদাররা হবেন ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

অতএব কালেক্টর সাহেবের ইস্তেহার কার্যকর হলো না। সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠলো। নীল কুঠিয়ালরা দ্বিগুণ উৎসাহে যত্রতত্র কুঠি নির্মাণ করতে লাগলেন। কয়েক বছরের মধ্যে যশোহর জেলার সমগ্র অঞ্চল নীল উৎপাদনের বৃহত্তর ক্ষেত্র হয়ে উঠলো। কৃষকদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেল। নীল ছাড়া অন্য কোন ফসল উৎপাদন করতে তারা পারত না। কৃষকরা ছিল অসহায় ও নিপীড়িত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে মূলত কৃষকরাই ছিল জমির মালিক। নিজের চাষ করা জমির উপর তার অধিকার ছিল। সেই অধিকার থেকে কোম্পানি সরকার তাদেরকে উৎখাত করলো। ১৭৯৭ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ‘হপ্তম আইন’ নামে একটা আইন জারি করেন। এই আইন অনুযায়ী জমিদারদের প্রজার উপর জুলুম করার অধিকার দেওয়া হয়। রোইয়তরা জুলুমের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ জানিয়েও প্রতিকার পেত না। প্রজারা যাতে আইনের সাহায্য না পায় সেই জন্যে ১৮১২ সালে সরকার আর একটি আইন পাশ করে— সেই আইনটির নাম ছিল : পঞ্চম আইন। এই আইনটি ছিল বাংলার ও কৃষক প্রজাদের মৌলিক অধিকার ও স্বার্থবিরোধী। আইনে উল্লেখ ছিল যে, জমিদার ও জমিদারের গোমস্তাদের বিরুদ্ধে মামলা মকদ্দমা করাটা দ-নীয় অপরাধ। এই আইনটি যদিও জমিদারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, তবুও জমিদাররা সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। ১৮১৯ সালে আরো একটি নতুন আইন প্রবর্তন করেন কোম্পানি সরকার। তাতে জমিদারদের নিজ জমিদারি অধঃস্তন পত্তনিদার ও দরপত্তনিদারদের মধ্যে বিলি বণ্টন করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এর ফলে জমিদাররা, পত্তনিদাররা, দরপত্তনিদাররা প্রজাদের উপরে শোষণের মাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার ছিল না। দেশের মধ্যে একটা গণঅসন্তোষ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো।

একদিকে চলছিলো প্রজাদের উপর আইনের সাহায্যে জুলুম, অন্যদিকে চলছিলো আইন বহির্ভূত জুলুম। জমিদাররা নানা অজুহাতে চালু করেছিল বে-আইনি কর। বাংলার কৃষি অর্থনীতিতে এতে করে মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেয়।

১৮১৯ সালে অষ্টম আইন প্রবর্তিত হওয়ার পর যশোহর জেলার মধ্যে অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হয়। জমিদাররা নীল কুঠিয়ালদের নিকট থেকে উচ্চহারে সেলামি নিয়ে তাদেরকে বড় বড় পত্তনি প্রদান করেন। সদর কুঠিতে বসে জিন্নিংগজ সাহেব পত্তনি জমিগুলো নিয়ন্ত্রণ করবেন।

দাদার বাবা জিন্নিংগজ সাহেবের কর্মকা-ের সহযোগিতা করলেও তিনি কখনো তার অধস্তন কর্মচারি বা আমলা ছিলেন না। ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা নির্ভীক মানুষ। সাহেবের কুঠিতে নিয়োজিত ছিল অনেক দেশীয় কর্মচারী। কর্মচারীদের মধ্যে যিনি প্রধান ছিলেন তাকে বলা হত দেওয়ান বা নায়েব। মাসিক হিসেবে তিনি পেতেন যে আমলে ৫০ টাকা বেতন। নায়েবের অধীনে ছিল একজন গোরস্তা। রাইয়তদের হিসাবপত্রের তিনিই রাখতেন। নানারকম ফন্দিফিকির করে তিনি ঘুষ গ্রহণ করতেন এবং অসৎ উপায়ে প্রচুর পয়সার মালিক হতেন।

গোমস্তা ছাড়াও ছিল আরো কর্মচারি। যিনি জমি মাপামাপি করতেন, তাবে বলা হতো আমিন। নীল ওজনের জন্য ছিল ওজনদার। যারা কুলির কাজ করতো, তাদেরকে বলা হতো জমাদার। রাইয়তদের নীলচাষের জন্য যারা গ্রামের প্রভাবশালী মোড়ল-মাতুব্বর। সাহেবের সদর কুঠিতে গিয়ে প্রায়শঃ মোড়লরা সাহেবের কাজের সহায়তা করত। সাহেবের কর্মচারিবৃন্দ তাদের কুশি করার উদ্দেশ্যেই যথার্থ খিদমত করত। শ্রেণী-বিশেষ এক একজন মোড়লের জন্য বরাদ্দ ছিল আলাদা আলাদা ব্যবস্থা।

দাদার বাবা ছিলেন রাশভারি লোক। সাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মাখামাখি ছিল বটে কিন্তু কথাবার্তা বলতেন খুবই কম। একটা সমস্যা হলেই বিশেষভাবে ডাক পড়তো দাদার বাবাকে। তিনি হাজির হতেন। দুজনে বসে শলাপরামর্শ করতেন। অনেকটা নির্ভরশীল ছিলেন দাদার বাবার উপর। বিশেষভাবে কোথায় ও গোলমাল হলো তার উপরই তিনি মীমাংসার জন্য দিতেন দায়িত্ব। কোনো উদ্বেগ-উত্তেজনা দাদার বাবার মাথায় ছিল না। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতেন। এই কারণে তিনি ছিলেন তার প্রিয় পাত্র। জিন্নিংগজ সাহেব খুশি হয়ে এটা ওটা মাঝে মধ্যে তাকে উপঢৌকন দিতেন। তার বাড়তি কোনো চাহিদা ছিল না। না ছিল ধনদৌলতের প্রতি মোহ, না ছিল কিছু আদায়ের জন্য কোনো কামনা-বাসনা এবং আকাক্সক্ষা। তার মনের মধ্যে ছিল একটা হাহাকার। মোড়ল বংশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথার মধ্যে ছিল একটা ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তা। সহায় সম্পত্তি আছে। বাগ-বাগিচা আছে। শতাধিক গৃহপালিত পশু আছে। গরুর সংখ্যা প্রায় অর্ধ শতাধিক। একদিকে ছাগল আর গরু, অন্যদিকে চাষাবাদের জমি। গরু-ছাগলের জন্য খড়ের মাঠ। বড় বড় দশটি ধানের গোলা, বাড়ির বাইরের প্রাঙ্গণে মাইন্দারদের জন্য বড় একটা বৈঠকখানা। বিশাল একটা গোয়ালঘর। শতাধিক ছাগল-গরুর লম্বা-চওড়া আস্তানা। প্রাঙ্গণের আর একটা কোণে বিশাল উঁচু একটা খড় আর বিচালির গাদা।

চারজন মাইন্দারের উপর দায়িত্ব রাতের বেলা নাঙলের গরুগুলোকে জাবনা দেওয়া। গোয়ালের নান্দা বেশ বড়সড়। বাতাসে ভাসতো খৈলের টাটকা গন্ধ। প্রতিটি গরু বলবান এবং স্বাস্থ্যবান। চাষাবাদের জন্য ছিল আরো পাঁচজন মাইন্দার। কোনো অভাব-অনটন নেই। অভাব কেবল একটাই। তার কোনো পুত্র সন্তান নেই। মনের মধ্যে দারুন একটা হতাশা। সমস্ত বাড়িটা যেন শূন্য, ফাঁকা হয়ে আছে। একটা পুত্র সন্তান ছিল। বিশ বছর বয়স হতে না হতেই রক্তবমি হয়ে মারা গিয়েছে। বাড়িটা শূন্য। কোনো আনন্দ উল্লাস নেই। এত কিছু বিষয় সম্পদ থাকলেও মনটা বিষণœতায় পরিপূর্ণ। এই গ্রামের আদি বাসিন্দা ছিলো এই বাংলা। বংশের কোনো ডালপালা নেই। জাতি-গোষ্ঠী নেই। শুধু কেবল একজনই একমাত্র বংশ খ-। অন্যান্য মোড়ল বংশ এই গ্রামে দু-একঘর আছে বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে এই পরিবারের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। বংশের ডালপালা না থাকার কারণে ম-ল পরিবারের ঘিরে পাড়াও গড়ে ওঠেনি। গোত্র ও গোষ্ঠী প্রথাও সৃষ্টি হয়নি। মাথার মধ্যে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তা শেষ পর্যন্ত কি তার পূর্বপুরুষের রক্তের ধারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?

একটা নৈরাজ্য ও বিষণœতা তাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তুলেছিল। বৈষয়িক চিন্তা তার মাথার মধ্যে বিশেষ ছিল না। মাথার মধ্যে একটা মাত্র চিন্তা, ম-ল বংশ কি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?

তৎকালের রীতি অনুসারে চৌদ্দ বছর বয়সে আট বয়সের এক বালিকা বিয়ে করেছিলেন তিনি। বালিকা বধু বয়স যখন তেরো, তখন তার গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় তার প্রথম পুত্র সন্তান। ষোলো বছর বয়সেই তাকে বিয়ে দিয়েছিল। সংসারে কোথাও কোনো দুঃখ বিষাদ ছিল না। ম-ল পরিবারে ছিল এক আনন্দঘন সুখময় পরিবেশ। সেই আনন্দময় সংসার এখন নিরানন্দময় হয়ে উঠেছে। সামাজিক পরিস্থিতিও কেমন ঘোরালো হয়ে উঠেছে। যেন কোথাও কোনো সুখ ও আনন্দ নেই। ক্রমান্বয়ে ম-লের মনটা আরো অশান্ত হয়ে উঠলো। সংসার ভাঙছে। পৈতৃক সমাজটাও ভাঙছে। ভূমি ব্যবস্থার বদল ঘটছে। চাষাদের জমির ওপর কোনো অধিকার নেই। জমিজমার উপর নতুন নতুন খাজনা ও করের বোঝা চেপে বসেছে। এ রকম ব্যবস্থা এর আগে কখনো ছিল না। যে জমি অনাবাদি ছিল, সে জমির কোন খাজনা ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হানি হলে জমির খাজনা মওকুফ করা হতো। সে ব্যবস্থা এখন নেই। ফসল উৎপাদন হোক আর না হোক কোম্পানি সরকারের কিছু এসে যায় না। খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের উপর জুলুম করা হচ্ছে। খাজনা পরিশোধ করতে না পারায় ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে চাষাদের। এরপরেও শুরু হয়েছে নতুন আর একটা উৎপাত। কুঠিয়াল সাহেবরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে হুকুম করছেন, নীল ছাড়া অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা যাবে না।

কুঠিয়াল সাহেবরা জমিদারের সেরেস্তা থেকে জমি পত্তনি নিয়েছেন। ভূমির মালিক এখন কুঠিয়ালরা। সাবেকী গ্রাম সমাজ অনবরত ভেঙে পড়ছে। শান্তি-শৃঙ্খলা অবনতি ঘটছে। দস্যু তস্করের সংখ্যা বাড়ছে। খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে।

কর্ণওয়ালিসের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠত হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে সঙ্কটে পড়েছে গ্রামের চাষাভুষোরা। তাঁতিদের অবস্থাও ভালো নেই। তাদের ওপরেও শুরু হয়েছে নানারকম উৎপীড়ন। সুতো তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাকুর কাজ পুরোপুরি বন্ধ। বিলাত থেকে কলের যন্ত্রে সুঁতো তৈরি হয়ে আসছে। হাতগুটিয়ে বসে আষে গ্রামের তাঁতিরা। আগে এদেশ থেকে কাপড় ওদেশে যেতো। এখন বিলাত থেকে আসছে কলের তৈরি কাপড়। হু-হু করে দাম বাড়ছে। আধ পয়সার মাল এখন এক পয়সা।  মুদ্রা বিনিময়ে লেনদেন শুরু হয়েছে। এখন বাস্তব দৃশ্য তিনবেলা দুচোখে দেখছেন মোড়ল। সবকিছু বদলে যাচ্ছে। কিছুকাল আগেও এক একটা গ্রাম ছিল কয়েকশ’ বিঘা জমি আবাদি বা অনাবাদি জমির একটা এলাকা। এই গ্রামটার প্রধান ছিল ম-ল পরিবার। ম-লের উপর ছিল গ্রাম তদারকির দায়িত্ব। ম-ল গ্রামবাসিদের মধ্যকার সকল রকম সমস্যার মীমাংসা করত। খাজনা আদায়ের কাজ করত। গ্রামবাসিদের অবস্থা ও স্বার্থ নিয়েই তিনি ভাবনা-চিন্তা করতেন। তিনিই ছিলেন গ্রামের মূলকর্তা। গ্রামের সীমানা কখনো বদলে যায়নি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা মারী মড়কে গ্রামগুলো বিধ্বস্ত হলেও সেই একই নাম, একই সীমানা এবং ছিল একই স্বার্থ। একান্নবর্তী পরিবারসহ গ্রাম। কে রাষ্ট্রের সম্রাট হলো, কোন রাজশক্তির পরিবর্তে কোন রাজশক্তি সিংহাসনে বসলো, এটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা ছিল না। গ্রাম যে একই গ্রাম। একই ম-ল। সেই গ্রামের মাথা, সেই গ্রামের অধিকর্তা। তাঁর একমাত্র দায়িত্ব হলো গ্রামবাসিদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা এবং যথাসময়ে রাজার সেরেস্তায় জমা দেয়া। কখনো কেউ এসে জোর জুলুম করে খাজনা আদায় করেনি। এমন কি ফসলের াঠ হুকুম দখল করে নির্দিষ্ট ফসল বোনার জন্য বাধ্য করেনি।

কুঠিয়ালদের ভয়াল চেহারা দেখে মোড়ল শঙ্কিত হয়ে উঠলো। তাদের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বেশ কিছু জমি ছিল। সেই জমিগুলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদারের অধীনে চলে গেছে। দখলিস্বত্ব ব্যবস্থা নেই। প্রতি বছর খাজনা দিতে হয় জমিদারের সেরেস্তায়। একটু হেরফের হলে জমি অন্যের হাতে চলে যায়। প্রজার এ ব্যাপারে করণীয় কিছু নেই। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সেই জমিগুলোর উপরে যে খাজনা ও বাড়তি কর ধার্য করা হয়েছে, তা জমিদারের সেরেস্তায় দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে মোড়লকেও। অবশেষে সেই জমিগুলো জমিদারের সেরেস্তায় গিয়ে নিজের নামে পত্তনি নিয়ে আসতে হয়েছে। সেই জমির ওপরেও সাহেবের নজর পড়েছে। দুর্ভাবনায় আছেন মোড়ল। জিন্নিংগজ সাহেবও বিষয়টি জানতেন। সব চাষারাতো নীল চাষ করছে এবং নীল চাষের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু তুবন মোড়ল তো নীল চাষ করছে না? তুবন মোড়লের উচিৎ নীল চাষ করা।

জিন্নিংগজ সাহেব একদিন বললেন, মোড়ল, তোমার জমিতে কি কি ফসল উৎপাদন হয়?

মোড়ল বললেন, ধান, পাট, ছোলা, মশুরি, রবিশস্য, আলু-পটল, বেগুন, কুমড়ো, ডাটা শাক, ঝিঙে, লাউ, উচ্চে, শসা, কাঁকুড়—মটোর—।

জিন্নিংগজ সাহেব মোড়লের পিঠ চাপড়ালেন, খুবই ভালো কথা। তুমার জমিটে খুউবই ভালো ফসল হয়। ধন্যবাদ। তবে নীল চাষ করলে কেমন হয়?

মোড়ল জবাব দিলেন, সবাই যদি নীল চাষ করে, তবে খাদশস্য আবাদ করবে কারা? লোকে তো না খেয়ে মরবে— আরে, লোকে কি খাবে আর না খাবে, তার কি দরকার? টুমিও খাচ্ছো, আমরাও খাচ্ছি। খাচ্ছে তো সবাই< এটা ভাবনা-চিন্তা করে আমাদের লাভ কি? সাহেব হাসতে হাসতে বললেন।

— সাহেব তুমি কি চাও, আমিও নীল চাষ করি?

— না, না, না। এটা কথার কথা মাত্র। সাহেব আবার পিঠ চাপড়ে দিলেন। আমি বলতে চাচ্ছি যে, নীলের আবাদ করলে কেমন হয়?

— মোড়ল বললেন, এই আবাদটা আমি করতে চাচ্ছি না সাহেব।

— সাহেব হাসলেন, সবাই করছে, তুমিই বা কেন করবে না মোড়ল?

— মোড়ল জবাব দিলেন না। ঝিম মেরে সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন। সোজা সরল মানুষ। কোনো প্যাচঘোর বোঝেন না। শুধু উপলব্ধি করলেন, সাহেব ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসেছেন। এবার তার ঘাড়েই সওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

জিন্নিংগজ সাহেব এতকাল ছিলো এলাকার মোড়লদের প্রতি নির্ভরশীল। তাঁর নীলের কারাব মোড়লরাই শক্তি জুগিয়ে শক্ত একটা অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। নীল উৎপাদন করে তিনি নিজে বহু টাকার মালিক হয়েছেন এবং ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। কিন্তু চাষারা নীল চাষ করে হয়েছেন নিঃস্ব ও গরিব। তারা মানুষের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করেছেন, সে সম্পর্ক প্রীতির সম্পর্ক নয়— স্বার্থ ও মুনাফা লাভের জন্য সম্পর্ক। জিন্নিংগজ সাহেব বললেন, মড়োল, তুমিতো আমার সেরেস্তারই প্রধান মড়োল, তুমি নীল চাষ করলে অনেক লাভবান হবে। আমিতো ভালো রকমই দরদাম দিচ্ছি। সবাই আমাকে বলছে, তোমার জমিই নীলচাষের জন্য উৎকৃষ্ট।

মোড়ল ঘাড় বাঁকিয়ে জবাব দিলেন, না সাহেব, আমার জমিতে কখনো আমি নীল চাষ করব না। আমার জমি হচ্ছে ধান চাষের জন্য উৎকৃষ্ট। নীল চাষ আমি কখনোই করব না।

মোড়ল কুঠিয়ালদের মতিগতি বুঝতেন। সাহেবদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, সে অভিজ্ঞতা ছিল এই নীল চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক ছিল না। নীল চাষ করে যে টাকা পাওয়া যেত, তাতে উৎপাদন খরচ উঠত না। যারা নীল চাষ করত তাদের খাজনা বাবদ সাহেব কেটে রাখতেন ১০ আনা, বীজ বাবদ ১০ আনা, চাষ করত হতো ১ ্ (এক) টাকা, বুনতে চার আনা, নিড়ান দেওয়া ৮ আনা, নীল গাছ কাটা বাবদ ৪ আনা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট খরচ হতো ২ টাকা ১৪ আনা। এটা ছাড়াও ছিল কুঠিয়ালদের নিকট থেকে কর্জ বাবদ টাকা নেওয়ার একরারনামার ষ্ট্যাম্প খরচ বাবদ ২ আনা।

কোনোক্রমেই নীল উৎপাদন কৃষকদের জন্য লাভজনক ছিল না। এক বিঘা জমিতে নীল উৎপাদন হতো ৮ থেকে ১২ বান্ডিল। এটা ছিল আসল হিসাব। নীল চাষ করে যে টাকা পাওয়া যেতো, তা ছিল লোকসানের নামান্তর। মোড়ল বিষয়টি ভালোরকমই উপলব্ধি করে নীল চাষ করতে চাননি। একবার নীল চাষ করলে ইচ্ছামত ধান চাষ বন্ধ করা যেত না। কুঠিয়াল সাহেবরা নানারকমভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাষ করার জন্য বাধ্য করত। সবকিছু বুঝেশুনে জিন্নিংগজ সাহেবের প্রস্তাবটি নাকোচ করে দিলেন মোড়ল। জিন্নিংগজ সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। মোড়লের চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল লৌহদ-ের মত। এলাকার বাসিন্দারা তাকে সামন্ত আমলের রীতিনীতি মোতাবেক মান্যগণ্য করত। কোথাও কোনো সমস্যার উদ্ভব হলে মোড়লই ছিলেন প্রধান শালিস বিচার কর্তা। তিনি কারো প্রতিপক্ষ ছিলেন না এবং প্রতিদ্বন্দ্বিও ছিলেন না। ছিলেন কৃষক সমাজের একজন সত্যিকার হিতৈষী। ঘাড় বাঁকা করে ম-ল সেই যে ‘না’ বললেন, অনেক চেষ্টা করেও জিন্নিংগজ সাহেব আর ‘হ্যাঁ’ বলাতে পারলেন না। তবুও ক্ষিপ্ত হলেন না জিন্নিংগজ সাহেব। ক্ষিপ্ত না হওয়ার কারণ ছিল একটা। সেই কারণটা ছিল এই—–ম-ল লেখাপড়া না জানলেও বৈষয়িক বিদ্যায় ছিলেন পাকা। তিনি জোতজমির চাষ সম্পর্কে ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। সে আমলে বাঙালির মূল পেশা ছিল কৃষিকাজ। সাধ