পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের কবিতার বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো কবিতা শুরু হয় না, বিচারও হয় না। নির্ধারিত কালখণ্ডেই থাকে এর কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জদ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় তা স্নাত ও ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। এটির স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশে। বস্তুত, ত্রিশোত্তর কবিতার অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের কবিতার ধারা।

২.
পাকিস্তানের জন্য ‘উন্মাদ’ কবিকুল বহাল থাকেন, তদ্রুপ ঐতিহ্যে কবিতা লিখতে থাকেন। অপরদিকে ক্রমশ নিজেদের আত্মপরিচয় আর বাঙালির স্বতন্ত্র চেতনার পথটি অবমুক্ত হতে লাগল, প্রথমত : মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দস্তুর পূর্ব-বাংলার মাটির সমন্বয়ী দৃষ্টি স্ফটিক রূপে, এমত সমর্থনটি আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, দ্বিতীয়ত : ক্রমশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন। ইত্যাকার এর ভেতরে মূল কাব্যধারাটি অঙ্গীকৃত হয়ে পড়ে এবং নিজেদেরও সমন্বয়ী চেতনার স্বাতন্ত্র্যরূপে নতুন ফুল-পাখি-নদী-নারী আর নক্ষত্রের গানে স্বচিন্তায় সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। এখানে চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিদের পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। তবে তখন থাকে অল্প বয়সের আবেগ, যুক্তিহীনতা, নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা। ‘নতুন কবিতা’র কবিদের পঙ্ক্তি তার প্রমাণ। তবে পাকিস্তান-আবেগ বা নিজ ধর্মের বিশ্বাস অবসিত হতে সময় লাগে। একপ্রকার ঝুঁকিও। তবে কবিদের প্রারম্ভিক এ পর্বটির উত্তেজনা দেখার মতোই ব্যাপার। তবুও থিতু হওয়ার পথটি তৈরি হয় উজানের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার পথ অর্জনে একদিকে কায়েম হয় ত্রিশোত্তর কবিপ্রভাব এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাম্যবাদী কবির অনুপ্রেরণার আবর্ত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেমনটা বলেন, ‘ক্রম-প্রসারমান মধ্যবিত্তের কর্মজীবনের অন্তরালে যে আবেগ-আকাঙ্ক্ষা নিহিত ছিলো–তারই প্রকাশ ঘটেছিলো ঐসব কবিদের রচনায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দীনজ্জএঁরা সকলেই এই সময়ে কাব্য সাধনা শুরু করেন। এঁদের শৈল্পিক সাফল্য অবশ্যই তুল্যমূল্য নয়; কিন্তু সেই কবিকুলের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো—এঁরা সবাই নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। এবং সেই সূত্রে এঁদের কবিতার ভাষা, ফররুখ আহমদের অনুসরণে, মিশ্র নয়, বিশুদ্ধ বাংলাজ্জরূপক, উপমা, প্রতীকের ব্যবহারে এঁরা বাংলা কাব্যের অবিভাজ্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। প্রায়শ তিরিশের কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে লগ্ন। সে কারণে এইসব কবিদের প্রাথমিক রচনায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব একেবারে আকস্মিক নয়।…’ এক্ষেত্রে পঞ্চাশের কবিদের একটি উল্লম্ফন যুগ রচিত হয়। বাংলাদেশের কবিতা এগুতে থাকে প্রধানত সদ্য চলমান মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। এবং প্রসঙ্গত কবিরাও নিজেদের ভেতরে বদলাতে থাকেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক।
পূর্বাপর এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্ম হলে বাঙালি মুসলমান ঢাকাকে আশ্রয় করে নতুন স্বপ্ন দেখে। সাম্রাজ্যবাদের মুক্তির লগ্নে, বাঙালি মধ্যবিত্ত বসতি নেয় ধর্ম-ঐক্যের ভেতরে। পরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কর্মচঞ্চল্য। দীর্ঘবঞ্চিত জীবনে উপনিবেশিত বা হিন্দু আধিপত্যের ভেতরে ‘পথহারা পথিক’ যেন পথ খুঁজে পায়। বাঙালির নগর জীবনও তৈরি হয় তখন থেকেই। পুঁজির বিকাশ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারটিও তখন ঘটতে থাকে নানাকৌণিক। গ্রাম ছেড়ে শুরু হয় শহরে আসা। কিন্তু গ্রামীণ রূপসী বাংলার আবেগ থাকে চিত্তে। সবকিছু বুকে নিয়ে নাগরিক বসতি শুরু করেন ভাগ্যসন্ধানী মানুষ। পুঁজির প্রকোপে তাঁরা ছড়াতে থাকেন নিজেদের মতো করে। অভিবাসনও চলতে থাকে। অধিকন্তু পূর্ব-বাংলার চল্লি¬শের কবিরা কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ‘ত্রয়ী’ এ সময়ের আগেই কবি পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাষার দাবি যতো দৃঢ়তর হচ্ছিল ততোই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। কবিরাও যেন পাচ্ছিলেন মাটির লালিত্য। প্রসঙ্গত এসব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঐ মধ্যবিত্ত। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বার্থপরতা পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ব-বাংলায় তাদের মনোনীত এজেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। তরুণ-কর্মপ্লাবী-সাহসী-পরার্থসেবী তরুণদের সামষ্টিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রশক্তির এ অপতৎপরতায় সদ্য স্বাধীন মুসলমানদের অনেকেই স্বার্থভোগী হয়ে ওঠেন। নতুন আবেগের ভেতরে কিছু শ্রেণি বা স্বার্থপর গোষ্ঠী তৈরি হবে–এ আর নতুন কি? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এ সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁদের কবিতায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতের অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফ্রন্টের জয়লাভজ্জএসব কবিতার পক্ষে উক্তি ও উপলব্ধিকে তৈরি করে। একটি কবিভাষাও তাঁদের ক্রমশ আয়ত্তে আসছিল। আর মধ্যবিত্তও একটা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করছিল। তবে এর বিপরীতে ইসলামপন্থি অংশটিও যে ‘হয়ে ওঠে’ না, তা নয়। তাঁদের দ্বিধান্বিত স্বরটি ‘পাকিস্তান’ আর ‘কায়েদ-ই-আযমে’ আটকানো। তবে তফাতটা উপর্যুক্ত অংশের আলোচিত কবিদের কবিতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা সম্ভব। তবে সদ্য সচল একটি সমাজে যে সবকিছুই পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান থাকবে, তা সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের কোপানলে যে মধ্যবিত্ত তা শুধু অনিবার্য বাঁচার অংশ ও অধিকারটুকু চেয়েছিল, সে যখন স্বাধীন হল তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠল। ঘটল যাবতীয় সীমাবদ্ধতার অবসান। আবেগের যেন মহীরুহ প্রত্যাবর্তন। ‘নতুন কবিতা’ কিংবা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলনের লেখকরা শুধু বিষয়বুদ্ধি নয়, বিষয়াতীত বিষয়কেও তারা কবিতায় উপাদানরূপে আনতে চাইলেন। কবিতার মূলধারাটি বজায় রেখে সামষ্টিক প্রবণতায়, সমন্বয়বাদী ভাবনায় শিল্পকে বহুমুখি করে তুলতে চাইলেন। এবং বোধকরি পরের দশকে তা পরিপূর্ণরূপে কূলে ফেরার পালা। অবশ্য সে অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়া তো ‘কাব্যকে বৃহৎ কাল-চৈতন্যের সমান্তরাল একটি সরল রেখায় বয়ে নিয়ে’ আসার প্রত্যয়।
পঞ্চাশের কবিরা একটা দশকে সীমাবদ্ধ নন। কবিত্ব নির্ণয়েও তাঁদের প্রারম্ভ ও প্রতিশ্র“তিটি এখানে বজায় থাকে। এ দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। বাঙালি মুসলমান পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে কাব্যভূমির মৌল সূত্রটি সন্ধান করছে এ দশকে। যাঁরা পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন সে কবিতায় উঠে আসে লোকজ জীবন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্পর্শগন্ধময় আকুতি, ফুল-প্রকৃতির প্রণয় আর পরিশুদ্ধ মূল্যবোধের চর্চার মত্ততা। চেতন-অবচেতনভাবে মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতে নির্ধারিত সৃষ্টিসত্তা রূপান্তরিত হয় নদী-প্রকৃতির নিস্পৃহ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায়। নদী ও মানুষের কবিতা লেখেন সানাউল হক। লোকায়ত নন্দনে সাত-নরী হার লেখেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অনেকেই ফেরেন স্নিগ্ধ মহিমান্বিত উজ্জ্বল জীবনে। সেখানে এক রকমের সংস্কার যে থাকে না তা নয়। কিংবা মানবতার জন্য দায় বা নিরঙ্কুশ আকুতি, নারীর শরীরী প্রণয়, আসঙ্গলিপ্সা, জৈবিক প্রণোদনা এমনসব বিষয়গুলো আড়ষ্ট; কারণ, রোম্যান্টিকতার পূর্ণায়ত রূপটি তখনও তেমন করায়ত্ত হয়নি তাঁদের নিকট। এ পঞ্চাশে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক ক্রমশ অধিকার করছেন জীবনের যাবতীয় ও সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। কবিতার উপাদানগুলোতে তুলে এনেছেন মানবতার সর্বোচ্চ ক্ষেদ। নাগরিকতার অন্তর্ভুক্তিও পায় কবিতা।
বায়ান্ন থেকে আটান্ন বাংলাদেশের কবিতায় স্ফূর্তি আসে। এরপর বাষট্টি পর্যন্ত বিপর্যস্ত। বাষট্টির পর পূর্ণ প্রবাহ। শামসুর রাহমান পঞ্চাশের গোড়ায় শুরু করলেও প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ষাটে। প্রায় একই ঘটনা সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং এ পর্বের অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। তবে কবিমেধার পূর্ণতা আসে একটা সময়ে। সে সময়কে চিহ্নিত করা একটু মুশকিল। কারণ, এ বিচার অনেকটা সাবজেক্টিভ এবং আপেক্ষিক। আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমানের মতো অনেকেই কয়েক দশক ধরে কাব্যসাধনা করেছেন। কবিরূপে অনেক পরীক্ষার আবর্ত যেমন তাঁরা অতিক্রম করেছেন তেমনি তাঁদের প্রতিমায় সাধিত হয়েছে ‘নিকষিত হেম’ সমৃদ্ধি। এক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাটিও বিচিত্র। প্রথম কাব্যে শামসুর রাহমান যেভাবে উপস্থিত–রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) তা পরিবর্তিত। কারণটি নিহিত দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিপার্শ্ব চেতনায়। যে দৃশ্যমান জগত থেকে কবিচেতনা দিব্যমূর্তি লাভ করে। অবচেতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় যে সত্তাটি–সেখানে অভিজ্ঞতা-অন্বেষিত স্মারক প্রস্তুত করেন কবি। স্মর্তব্য, এ সময়টায় সম্পাদিত কবিতা সংকলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন–এসবে যে নতুন মধ্যবিত্ত উঠে আসে তাঁরা অনেকটা পরিশোধিত। অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবিক কল্যাণের বিষয়সমূহই তারা সামনে এনেছেন। ধর্মীয় সংস্কার ও জাতপাত-শ্রেণিভেদ তাঁরা অস্বীকার করে। শাশ্বত শিল্পচেতনাকে দেয় প্রাধান্য। এ বিশ্বাস আসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের ভেতর দিয়ে। তবে অবাঙালি শ্রেণিশক্তি বা সামন্তগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় ‘অনুগত চর’রা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালান। এতে করে দ্বন্দ্বাত্মক আবহ যে রচিত হয় না তা নয়। এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই পূর্ব-বাংলার নব-উত্থিত মধ্যবিত্তশ্রেণিটি সমাজসম্ভূত শিল্পজগতটি নির্মাণ করতে থাকে। প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না। কিন্তু এসব অন্তরায় আদর্শ সচেতন নতুন মধ্যবিত্তকে কিছুতেই পরাস্ত করতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায়, বিপরীতমুখি ধর্মীয় চেতনা ধারার কবিরা ম্লান হওয়াই শুধু নয়জ্জক্রম-অপসৃত হতে থাকেন। এ পটভূমিতে সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পত্রিকাকে ঘিরে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিচর্চা আরও বেগবান হয়। তাঁদের যাত্রা পঞ্চাশের মধ্যভাগে। কিন্তু প্রকরণগত ঔজ্জ্বল্য পরীক্ষা করলে ষাটের প্রথমার্ধেই অনেকটা চকিত। হয়ে উঠেছেন স্থির, বাড়ন্ত।
১৯৫৮তে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৯০৭-১৯৭৪) পাঞ্জাবি সামরিক সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন। এতে এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। বিভ্রান্তি আর স্থিরতা জন্ম নেয় সমাজস্তরে। উল্লিখিত মধ্যবিত্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ, অনেকক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবে, আইয়ুব অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! চিরকালই ক্ষমতালোভীর দল, চাটুকারের দল, হালুয়া-রুটির সন্ধানী, উচ্ছিষ্টভোজীরা এমন সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। উপনিবেশবাদ অবসানে নতুন রাষ্ট্রে এমন শ্রেণিকাঠামো অনুপস্থিত থাকে না। আর পাকিস্তানের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রপুষ্ট রাষ্ট্রে এ সুযোগ আরও বেশি। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিপতির অনুগত দলবাজ, ফড়িয়া শ্রেণি প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়। আসন্ন ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’ (১৯৬২)র নামে দ্বিধাবিভক্তি আর আত্মক্ষয়ের অধ্যায় রচিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশে ভাগ হয়ে যায়। একজন পশ্চিমা সমর্থক অন্যজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এরূপ নানামুখি বিভ্রান্তিতে গণসমাজে ডিক্টেটর আইয়ুব খানই ‘হিরো’ তে পরিণত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক উঠতি মধ্যবিত্ত আত্মমগ্ন ও অন্তর্লীন হয়ে পড়ে। একটা বিচ্ছিন্নতা, বৃত্তায়ন আর বিড়ম্বনা গ্রাস করে। কবিরা তেমন এগুলেন না। কবিতা ‘গ্রহণ-ধরা ছায়ার মতো’; অনালোকিত। তবুও চণ্ড আইয়ুবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপন সম্পন্ন হয়। বোধকরি কবিরা এরপর আর অক্রিয় থাকেননি। এ পর্বে একদিকে লোকায়ত এবং নাগরিক চেতনা দুটোই এগুতে থাকেজ্জআর বলতেই হয় কবিভাষার অবলম্বন-বিভাবে জাগরিত ঐ ত্রিশের উত্তরাধিকার।
ষাটের প্রারম্ভ থেকেই পূর্ব-বাংলার জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার বোধটির সঙ্গত প্রকাশ ঘটাতে থাকে। এ দশকের প্রথমার্ধের কবিরা মুখোমুখি হন মৌলিক গণতন্ত্র বা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতাশ, বঞ্চিতজ্জযতোটা স্পন্দিত ছিলেন ঠিক ততোটাই হলেন মলিন। কবিতায় তখন বাহুল্য হয়ে ওঠে যৌনতা, বিচ্ছেদ, উগ্রতা; কিংবা পরাবাস্তব (surrealist) চিত্র। শামসুর রাহমান পরিবর্তিত; আল মাহমুদ আধুনিকতার সমস্ত শর্ত বজায় রেখে গ্রামীণ লৌকিক জীবনে ফেরা আর আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তব প্রকরণে আটকান। তবে এসবের ভেতরে কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে কায়েম হতে থাকে স্বাজাত্য, স্বদেশপ্রেম। সেটা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পঙ্ক্তিতে, কখনও উপমাপ্রতীকে। এগুলো ষাটের প্রথমার্ধে শুরু হলেও স্পষ্টতর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে অধিকারের জানালা খুলে দেয় ‘ছয়দফা’র স্বায়ত্তশাসনজ্জযেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যচিন্তা বেগবান। একটু পরিচিতি কবিরা এগুলেন, পৌঁছালেন নিজ বাসভূমে, লিখলেন পয়ারে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা। অদ্যাবধি বাংলাদেশের কবিতার সবচেয়ে প্রজননোচ্ছল সুদিন এ সময়টি। প্রসঙ্গত, তখন কিছুকাল আগে মৃত্যু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের (মৃত্যু ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (মৃত্যু ১৯৬০); বুদ্ধদেব বসু জীবিতজ্জ তিনি করে ফেলেছেন কবি শার্ল বোদলেয়ার ও মারিয়া রিল্কের কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে (টি. এস. এলিয়টের অনুবাদক) কিংবা অমিয় চক্রবর্তী দুর্দাম লিখে চলেছেন। ষাটের প্রান্তিক এ কবিরা এসব থেকে প্রবল বৈশ্বিক হয়ে পড়েন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক সুররিয়ালিস্ট, পাশ্চাত্য অনুগত; নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যক্ষ, নিরাবরণ, গণমানুষের পক্ষের পদাতিক। আর মহাদেব সাহা রুগ্ন রোম্যান্টিক। রফিক আজাদ চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মর্মদাহনে নির্ণীত। এঁরা এগিয়েছেন একাত্তরের ভেতর দিয়ে, এ পর্যন্ত।
৩.
কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রত্ন অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবি– তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : ÔPoetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছেজ্জযেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তাণ্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কল্পসৌন্দর্যই সেখানে মুখ্য। অবচেতন বা নির্জ্ঞানসত্তায় স্বপ্ন তথা যৌনবিহার অহং-রূপটি এক কল্পপ্রতিমার ধারণার জন্ম দেয়। কল্পনা বা আবেগই সেখানে মুখ্য।
একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না– কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল– এই স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তাদের স্বার্থরক্ষায় অনুগত মুৎসুদ্দি শ্রেণি তৈরি করে। আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব শিল্পী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। অজাচারজ্জ‘অনাহার’ চললেও পরিশুদ্ধি তো চলেই। এখনও অনেক কবি নির্মোহ, নির্লোভ। সত্তর দশক এ বিধ্বস্ত, হতাশার মুখে; রচিত ইমেজজ্জস্রোতের বিপরীতে। ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, অবক্ষিণ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লেখেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। নানা রকমে এ সময়ের কবিরা প্রস্ফুটিত। কেউবা আত্মমগ্ন, অন্তর্লীন; কেউবা অনুকরণপ্রিয় রোম্যান্টিক। একটা স্ববিরোধীতা, দ্বন্দ্ব-দোলাচলতা দেশ-কালসাপেক্ষে চলতে থাকে। এ সময়ের কবিরা একদিকে যেমন উত্তরণের চেষ্টা করেন তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদে হয়ে ওঠেন স্পষ্টভাষী। নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মোহন রায়হান সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুক্তমানবতার বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন। কবিরা আশাবাদের বাণীই প্রত্যয়দীপ্ত করেন। এ সময় স্বাধীন দেশে অনেকেই মূল্যবোধের ভিত্তিটি তৈরি করেন। প্রধানত মুক্ত স্বদেশে, স্বাধীন এ দশকে, বাঙালির আবেগ হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। নারী বা শ্যামলী নিসর্গ যোজনা করে নতুন মাত্রার। স্বপ্ন-সম্ভাবনার মূর্তিমান বিন্দুতে থাকে যাবতীয় অস্থিরতার অবসানের আর্তি। কবিরা একটা স্থির ও স্থায়ী প্রকরণ-নির্মাণে পরিশ্রমী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তির আনুগত্য, ব্যক্তিবলয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় শুভ ইঙ্গিত। সেখানে চিহ্নিত থাকে সময়ের বলিরেখা। এ দশক অনেক প্রলম্বিত, এঁদেরই অনুবর্তী পরবর্তী দশকের কবিরা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ শতকের কবিরা নতুন কবিভাষায় যেমন উঠে আসেন তেমনি পূর্বের কবিকুলও অর্জন করেন অপরিহার্য প্রত্যাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পরে থিতু হওয়া, অভিজ্ঞতা আবেগরহিত, সত্তরের প্রবাহ পৌঁছায় আশিতে। একই ধারায় ও আচরণে, তবে চেতনার শুদ্ধতা পরিপক্ব, বুদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি, আরও অধিক নিরীক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা জারি, বেশি ঢুকে পড়ে স্থূল পারিপার্শ্বিকতা। শুদ্ধশব্দ নির্মিতির চেষ্টায় কৃত্রিমতা নেই তা বলা যাবে না, তবে কৃত্রিমতা একটা পর্যায়ই বলতে হবে এ সময়ে; তবুও আসলেন অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনের বিপরীতে, লিট্লম্যাগে ভর করে, সমস্ত আগ্রাসী শক্তিকে অভয়ে এড়িয়েজ্জযদিও তা জটিল কিন্তু কবিতার জন্য সবই রপ্ত হতে থাকে। ‘পরাভব-প্রাণ’ কিছুতেই নয়, ততোধিক আবেগঘন প্রাণে বাজল জীবনের বাঁশী। স্বদেশমুখরিত, স্বাধীনতার অনতি পরের আবেগের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্রজ্জকিন্তু এগুনোটা, বোধের ব্যাপারটায় আশি পূর্ণাঙ্গ, আর ধারায় তো অবশ্যই অখণ্ড। কবিতা যে সমকাল ও সমাজকেই রাখবে তার ভেতরেজ্জতা তো নয়, সেটা হতেও পারে না। নন্দনকর্ম অবশ্যই পরিবেশ চায়, সেজন্য তার অপেক্ষা ও গুরুত্ব আছে, কিন্তু অনির্বচনীয় বলে যে কথাটা কবিতায় অনিবার্য তা কীভাবে এলো? আশিতে কবিরা পূর্ব-পাঠ, পাঠ-অভিজ্ঞতায় সমাজধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রত্নদৃষ্টি অর্জন করেন। ঢাকার নাগরিক হিসেবেও অভিজ্ঞ। অশনির বিরুদ্ধে উজানে যেমন চলছেন তেমনি শেকড়েও ফিরে শানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি নাগরিক অভিজ্ঞতা। চেতন-অবচেতন বিন্দুটি শ্লোগানতাড়িত, সাম্রাজ্যবাদ ফুঁসছে; কবিতা ব্যঙ্গে হাসছে, জীবন নিয়ে যেমন পরীক্ষা, উক্তিতেও পরীক্ষাজ্জনন্দন পরিমণ্ডলটির ভিত্তি এরূপেই নির্ণীত হতে থাকে। প্রজ্ঞাঋদ্ধ প্রতীকপ্রতিমা, উপমা-ভাষা, শুদ্ধশব্দ; খিস্তিখেউড়, আঞ্চলিকতা নিয়ে আশির ভিন্ন বাতাবরণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সামরিক শাসন-কাঠামোর ভেতর-বাহির পটচিত্র অংকন করেন, রূপকথা বা উপকথার অর্থারোপটি তাঁর অনেক কবিতার প্রাণভোমরা। শোয়েব শাদাব কিংবা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এখনও এরকম সোনা-রূপার কাঠি বা ‘সমুদ্দুর’ পুরাণে আছেন। তবে তাঁরা জীবিত, এ পর্যায়ে হয়তো এমনটা এখন নিশ্চিত, তাঁরা কবি হিসেবে চলমান। তাদের ভবিষ্যৎ জানা মুশকিল। তবে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা এজন্যই স্বার্থ-অভাব-সংসার-কর্মব্যাপদেশ-ভোগবিলাস সবমিলে ‘অনেক আলোর ঝলকানি’র তো অনেকেই ধরাশায়ী। তবুও যাঁরা কবিজীবী তাঁদের প্রণাম।

৪.
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়েছে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় কবিতা নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে এখন তা চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে। নব্বুইয়ে কিছু কবিপ্রতিভা এলেও ঐ একইরূপে অখণ্ডরই খণ্ড বলতে হবে তাঁদেরও। তবে পরীক্ষিত কি-না সেটা বলা এখনও কঠিন। এ নিরীক্ষার জন্য এখনও সময়ের প্রয়োজন। ধীর অভিজ্ঞতার সন্দর্শনও কাম্য। এখন এই নতুনদের জন্য পরিচর্যার পরিসীমা, কবিদৃষ্টির সামর্থ্য এখনও অপেক্ষমান। উত্তর-আধুনিকতা এসেছে অনেকভাবে, কার্যকর যুক্তিটি কিছুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকর টেক্সট নেই। কবিতায় অনেক আশা-সম্ভাবনা-অনিবার্যতা আসবেই, উপাদান-উপকরণও থাকবেজ্জসেটা তো বাজারী, বহ্বাস্ফোট, মিডিয়া কারবারি হলে চলে না। আর কবিতার মতো শিল্পে তো অসম্ভব। কবিতায় প্রত্যয় ও পরিচর্যা কিংবা মেধা-যুক্তি-আবেগ বললে জীবনানন্দ-সুধীন-বিষ্ণু-বুদ্ধদেব আর একালে আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুবকর সিদ্দিক উদাহরণ তো বটেই। এঁদের অনুগামী ধারাতেই নতুনরূপে আসেন কবিপ্রজন্ম। তাঁরও অর্জন করে স্বদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির গন্ধ। অবশ্যই তাঁদের সে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা
শহীদ ইকবাল

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের কবিতার বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো কবিতা শুরু হয় না, বিচারও হয় না। নির্ধারিত কালখণ্ডেই থাকে এর কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জদ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় তা স্নাত ও ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। এটির স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশে। বস্তুত, ত্রিশোত্তর কবিতার অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের কবিতার ধারা।

২.
পাকিস্তানের জন্য ‘উন্মাদ’ কবিকুল বহাল থাকেন, তদ্রুপ ঐতিহ্যে কবিতা লিখতে থাকেন। অপরদিকে ক্রমশ নিজেদের আত্মপরিচয় আর বাঙালির স্বতন্ত্র চেতনার পথটি অবমুক্ত হতে লাগল, প্রথমত : মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দস্তুর পূর্ব-বাংলার মাটির সমন্বয়ী দৃষ্টি স্ফটিক রূপে, এমত সমর্থনটি আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, দ্বিতীয়ত : ক্রমশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন। ইত্যাকার এর ভেতরে মূল কাব্যধারাটি অঙ্গীকৃত হয়ে পড়ে এবং নিজেদেরও সমন্বয়ী চেতনার স্বাতন্ত্র্যরূপে নতুন ফুল-পাখি-নদী-নারী আর নক্ষত্রের গানে স্বচিন্তায় সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। এখানে চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিদের পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। তবে তখন থাকে অল্প বয়সের আবেগ, যুক্তিহীনতা, নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা। ‘নতুন কবিতা’র কবিদের পঙ্ক্তি তার প্রমাণ। তবে পাকিস্তান-আবেগ বা নিজ ধর্মের বিশ্বাস অবসিত হতে সময় লাগে। একপ্রকার ঝুঁকিও। তবে কবিদের প্রারম্ভিক এ পর্বটির উত্তেজনা দেখার মতোই ব্যাপার। তবুও থিতু হওয়ার পথটি তৈরি হয় উজানের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার পথ অর্জনে একদিকে কায়েম হয় ত্রিশোত্তর কবিপ্রভাব এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাম্যবাদী কবির অনুপ্রেরণার আবর্ত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেমনটা বলেন, ‘ক্রম-প্রসারমান মধ্যবিত্তের কর্মজীবনের অন্তরালে যে আবেগ-আকাঙ্ক্ষা নিহিত ছিলো–তারই প্রকাশ ঘটেছিলো ঐসব কবিদের রচনায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দীনজ্জএঁরা সকলেই এই সময়ে কাব্য সাধনা শুরু করেন। এঁদের শৈল্পিক সাফল্য অবশ্যই তুল্যমূল্য নয়; কিন্তু সেই কবিকুলের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো—এঁরা সবাই নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। এবং সেই সূত্রে এঁদের কবিতার ভাষা, ফররুখ আহমদের অনুসরণে, মিশ্র নয়, বিশুদ্ধ বাংলাজ্জরূপক, উপমা, প্রতীকের ব্যবহারে এঁরা বাংলা কাব্যের অবিভাজ্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। প্রায়শ তিরিশের কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে লগ্ন। সে কারণে এইসব কবিদের প্রাথমিক রচনায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব একেবারে আকস্মিক নয়।…’ এক্ষেত্রে পঞ্চাশের কবিদের একটি উল্লম্ফন যুগ রচিত হয়। বাংলাদেশের কবিতা এগুতে থাকে প্রধানত সদ্য চলমান মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। এবং প্রসঙ্গত কবিরাও নিজেদের ভেতরে বদলাতে থাকেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক।
পূর্বাপর এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্ম হলে বাঙালি মুসলমান ঢাকাকে আশ্রয় করে নতুন স্বপ্ন দেখে। সাম্রাজ্যবাদের মুক্তির লগ্নে, বাঙালি মধ্যবিত্ত বসতি নেয় ধর্ম-ঐক্যের ভেতরে। পরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কর্মচঞ্চল্য। দীর্ঘবঞ্চিত জীবনে উপনিবেশিত বা হিন্দু আধিপত্যের ভেতরে ‘পথহারা পথিক’ যেন পথ খুঁজে পায়। বাঙালির নগর জীবনও তৈরি হয় তখন থেকেই। পুঁজির বিকাশ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারটিও তখন ঘটতে থাকে নানাকৌণিক। গ্রাম ছেড়ে শুরু হয় শহরে আসা। কিন্তু গ্রামীণ রূপসী বাংলার আবেগ থাকে চিত্তে। সবকিছু বুকে নিয়ে নাগরিক বসতি শুরু করেন ভাগ্যসন্ধানী মানুষ। পুঁজির প্রকোপে তাঁরা ছড়াতে থাকেন নিজেদের মতো করে। অভিবাসনও চলতে থাকে। অধিকন্তু পূর্ব-বাংলার চল্লি¬শের কবিরা কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ‘ত্রয়ী’ এ সময়ের আগেই কবি পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাষার দাবি যতো দৃঢ়তর হচ্ছিল ততোই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। কবিরাও যেন পাচ্ছিলেন মাটির লালিত্য। প্রসঙ্গত এসব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঐ মধ্যবিত্ত। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বার্থপরতা পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ব-বাংলায় তাদের মনোনীত এজেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। তরুণ-কর্মপ্লাবী-সাহসী-পরার্থসেবী তরুণদের সামষ্টিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রশক্তির এ অপতৎপরতায় সদ্য স্বাধীন মুসলমানদের অনেকেই স্বার্থভোগী হয়ে ওঠেন। নতুন আবেগের ভেতরে কিছু শ্রেণি বা স্বার্থপর গোষ্ঠী তৈরি হবে–এ আর নতুন কি? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এ সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁদের কবিতায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতের অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফ্রন্টের জয়লাভজ্জএসব কবিতার পক্ষে উক্তি ও উপলব্ধিকে তৈরি করে। একটি কবিভাষাও তাঁদের ক্রমশ আয়ত্তে আসছিল। আর মধ্যবিত্তও একটা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করছিল। তবে এর বিপরীতে ইসলামপন্থি অংশটিও যে ‘হয়ে ওঠে’ না, তা নয়। তাঁদের দ্বিধান্বিত স্বরটি ‘পাকিস্তান’ আর ‘কায়েদ-ই-আযমে’ আটকানো। তবে তফাতটা উপর্যুক্ত অংশের আলোচিত কবিদের কবিতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা সম্ভব। তবে সদ্য সচল একটি সমাজে যে সবকিছুই পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান থাকবে, তা সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের কোপানলে যে মধ্যবিত্ত তা শুধু অনিবার্য বাঁচার অংশ ও অধিকারটুকু চেয়েছিল, সে যখন স্বাধীন হল তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠল। ঘটল যাবতীয় সীমাবদ্ধতার অবসান। আবেগের যেন মহীরুহ প্রত্যাবর্তন। ‘নতুন কবিতা’ কিংবা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলনের লেখকরা শুধু বিষয়বুদ্ধি নয়, বিষয়াতীত বিষয়কেও তারা কবিতায় উপাদানরূপে আনতে চাইলেন। কবিতার মূলধারাটি বজায় রেখে সামষ্টিক প্রবণতায়, সমন্বয়বাদী ভাবনায় শিল্পকে বহুমুখি করে তুলতে চাইলেন। এবং বোধকরি পরের দশকে তা পরিপূর্ণরূপে কূলে ফেরার পালা। অবশ্য সে অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়া তো ‘কাব্যকে বৃহৎ কাল-চৈতন্যের সমান্তরাল একটি সরল রেখায় বয়ে নিয়ে’ আসার প্রত্যয়।
পঞ্চাশের কবিরা একটা দশকে সীমাবদ্ধ নন। কবিত্ব নির্ণয়েও তাঁদের প্রারম্ভ ও প্রতিশ্র“তিটি এখানে বজায় থাকে। এ দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। বাঙালি মুসলমান পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে কাব্যভূমির মৌল সূত্রটি সন্ধান করছে এ দশকে। যাঁরা পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন সে কবিতায় উঠে আসে লোকজ জীবন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্পর্শগন্ধময় আকুতি, ফুল-প্রকৃতির প্রণয় আর পরিশুদ্ধ মূল্যবোধের চর্চার মত্ততা। চেতন-অবচেতনভাবে মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতে নির্ধারিত সৃষ্টিসত্তা রূপান্তরিত হয় নদী-প্রকৃতির নিস্পৃহ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায়। নদী ও মানুষের কবিতা লেখেন সানাউল হক। লোকায়ত নন্দনে সাত-নরী হার লেখেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অনেকেই ফেরেন স্নিগ্ধ মহিমান্বিত উজ্জ্বল জীবনে। সেখানে এক রকমের সংস্কার যে থাকে না তা নয়। কিংবা মানবতার জন্য দায় বা নিরঙ্কুশ আকুতি, নারীর শরীরী প্রণয়, আসঙ্গলিপ্সা, জৈবিক প্রণোদনা এমনসব বিষয়গুলো আড়ষ্ট; কারণ, রোম্যান্টিকতার পূর্ণায়ত রূপটি তখনও তেমন করায়ত্ত হয়নি তাঁদের নিকট। এ পঞ্চাশে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক ক্রমশ অধিকার করছেন জীবনের যাবতীয় ও সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। কবিতার উপাদানগুলোতে তুলে এনেছেন মানবতার সর্বোচ্চ ক্ষেদ। নাগরিকতার অন্তর্ভুক্তিও পায় কবিতা।
বায়ান্ন থেকে আটান্ন বাংলাদেশের কবিতায় স্ফূর্তি আসে। এরপর বাষট্টি পর্যন্ত বিপর্যস্ত। বাষট্টির পর পূর্ণ প্রবাহ। শামসুর রাহমান পঞ্চাশের গোড়ায় শুরু করলেও প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ষাটে। প্রায় একই ঘটনা সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং এ পর্বের অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। তবে কবিমেধার পূর্ণতা আসে একটা সময়ে। সে সময়কে চিহ্নিত করা একটু মুশকিল। কারণ, এ বিচার অনেকটা সাবজেক্টিভ এবং আপেক্ষিক। আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমানের মতো অনেকেই কয়েক দশক ধরে কাব্যসাধনা করেছেন। কবিরূপে অনেক পরীক্ষার আবর্ত যেমন তাঁরা অতিক্রম করেছেন তেমনি তাঁদের প্রতিমায় সাধিত হয়েছে ‘নিকষিত হেম’ সমৃদ্ধি। এক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাটিও বিচিত্র। প্রথম কাব্যে শামসুর রাহমান যেভাবে উপস্থিত–রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) তা পরিবর্তিত। কারণটি নিহিত দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিপার্শ্ব চেতনায়। যে দৃশ্যমান জগত থেকে কবিচেতনা দিব্যমূর্তি লাভ করে। অবচেতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় যে সত্তাটি–সেখানে অভিজ্ঞতা-অন্বেষিত স্মারক প্রস্তুত করেন কবি। স্মর্তব্য, এ সময়টায় সম্পাদিত কবিতা সংকলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন–এসবে যে নতুন মধ্যবিত্ত উঠে আসে তাঁরা অনেকটা পরিশোধিত। অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবিক কল্যাণের বিষয়সমূহই তারা সামনে এনেছেন। ধর্মীয় সংস্কার ও জাতপাত-শ্রেণিভেদ তাঁরা অস্বীকার করে। শাশ্বত শিল্পচেতনাকে দেয় প্রাধান্য। এ বিশ্বাস আসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের ভেতর দিয়ে। তবে অবাঙালি শ্রেণিশক্তি বা সামন্তগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় ‘অনুগত চর’রা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালান। এতে করে দ্বন্দ্বাত্মক আবহ যে রচিত হয় না তা নয়। এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই পূর্ব-বাংলার নব-উত্থিত মধ্যবিত্তশ্রেণিটি সমাজসম্ভূত শিল্পজগতটি নির্মাণ করতে থাকে। প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না। কিন্তু এসব অন্তরায় আদর্শ সচেতন নতুন মধ্যবিত্তকে কিছুতেই পরাস্ত করতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায়, বিপরীতমুখি ধর্মীয় চেতনা ধারার কবিরা ম্লান হওয়াই শুধু নয়জ্জক্রম-অপসৃত হতে থাকেন। এ পটভূমিতে সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পত্রিকাকে ঘিরে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিচর্চা আরও বেগবান হয়। তাঁদের যাত্রা পঞ্চাশের মধ্যভাগে। কিন্তু প্রকরণগত ঔজ্জ্বল্য পরীক্ষা করলে ষাটের প্রথমার্ধেই অনেকটা চকিত। হয়ে উঠেছেন স্থির, বাড়ন্ত।
১৯৫৮তে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৯০৭-১৯৭৪) পাঞ্জাবি সামরিক সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন। এতে এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। বিভ্রান্তি আর স্থিরতা জন্ম নেয় সমাজস্তরে। উল্লিখিত মধ্যবিত্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ, অনেকক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবে, আইয়ুব অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! চিরকালই ক্ষমতালোভীর দল, চাটুকারের দল, হালুয়া-রুটির সন্ধানী, উচ্ছিষ্টভোজীরা এমন সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। উপনিবেশবাদ অবসানে নতুন রাষ্ট্রে এমন শ্রেণিকাঠামো অনুপস্থিত থাকে না। আর পাকিস্তানের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রপুষ্ট রাষ্ট্রে এ সুযোগ আরও বেশি। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিপতির অনুগত দলবাজ, ফড়িয়া শ্রেণি প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়। আসন্ন ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’ (১৯৬২)র নামে দ্বিধাবিভক্তি আর আত্মক্ষয়ের অধ্যায় রচিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশে ভাগ হয়ে যায়। একজন পশ্চিমা সমর্থক অন্যজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এরূপ নানামুখি বিভ্রান্তিতে গণসমাজে ডিক্টেটর আইয়ুব খানই ‘হিরো’ তে পরিণত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক উঠতি মধ্যবিত্ত আত্মমগ্ন ও অন্তর্লীন হয়ে পড়ে। একটা বিচ্ছিন্নতা, বৃত্তায়ন আর বিড়ম্বনা গ্রাস করে। কবিরা তেমন এগুলেন না। কবিতা ‘গ্রহণ-ধরা ছায়ার মতো’; অনালোকিত। তবুও চণ্ড আইয়ুবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপন সম্পন্ন হয়। বোধকরি কবিরা এরপর আর অক্রিয় থাকেননি। এ পর্বে একদিকে লোকায়ত এবং নাগরিক চেতনা দুটোই এগুতে থাকেজ্জআর বলতেই হয় কবিভাষার অবলম্বন-বিভাবে জাগরিত ঐ ত্রিশের উত্তরাধিকার।
ষাটের প্রারম্ভ থেকেই পূর্ব-বাংলার জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার বোধটির সঙ্গত প্রকাশ ঘটাতে থাকে। এ দশকের প্রথমার্ধের কবিরা মুখোমুখি হন মৌলিক গণতন্ত্র বা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতাশ, বঞ্চিতজ্জযতোটা স্পন্দিত ছিলেন ঠিক ততোটাই হলেন মলিন। কবিতায় তখন বাহুল্য হয়ে ওঠে যৌনতা, বিচ্ছেদ, উগ্রতা; কিংবা পরাবাস্তব (surrealist) চিত্র। শামসুর রাহমান পরিবর্তিত; আল মাহমুদ আধুনিকতার সমস্ত শর্ত বজায় রেখে গ্রামীণ লৌকিক জীবনে ফেরা আর আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তব প্রকরণে আটকান। তবে এসবের ভেতরে কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে কায়েম হতে থাকে স্বাজাত্য, স্বদেশপ্রেম। সেটা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পঙ্ক্তিতে, কখনও উপমাপ্রতীকে। এগুলো ষাটের প্রথমার্ধে শুরু হলেও স্পষ্টতর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে অধিকারের জানালা খুলে দেয় ‘ছয়দফা’র স্বায়ত্তশাসনজ্জযেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যচিন্তা বেগবান। একটু পরিচিতি কবিরা এগুলেন, পৌঁছালেন নিজ বাসভূমে, লিখলেন পয়ারে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা। অদ্যাবধি বাংলাদেশের কবিতার সবচেয়ে প্রজননোচ্ছল সুদিন এ সময়টি। প্রসঙ্গত, তখন কিছুকাল আগে মৃত্যু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের (মৃত্যু ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (মৃত্যু ১৯৬০); বুদ্ধদেব বসু জীবিতজ্জ তিনি করে ফেলেছেন কবি শার্ল বোদলেয়ার ও মারিয়া রিল্কের কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে (টি. এস. এলিয়টের অনুবাদক) কিংবা অমিয় চক্রবর্তী দুর্দাম লিখে চলেছেন। ষাটের প্রান্তিক এ কবিরা এসব থেকে প্রবল বৈশ্বিক হয়ে পড়েন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক সুররিয়ালিস্ট, পাশ্চাত্য অনুগত; নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যক্ষ, নিরাবরণ, গণমানুষের পক্ষের পদাতিক। আর মহাদেব সাহা রুগ্ন রোম্যান্টিক। রফিক আজাদ চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মর্মদাহনে নির্ণীত। এঁরা এগিয়েছেন একাত্তরের ভেতর দিয়ে, এ পর্যন্ত।
৩.
কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রত্ন অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবি– তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : ÔPoetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছেজ্জযেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তাণ্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কল্পসৌন্দর্যই সেখানে মুখ্য। অবচেতন বা নির্জ্ঞানসত্তায় স্বপ্ন তথা যৌনবিহার অহং-রূপটি এক কল্পপ্রতিমার ধারণার জন্ম দেয়। কল্পনা বা আবেগই সেখানে মুখ্য।
একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না– কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল– এই স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তাদের স্বার্থরক্ষায় অনুগত মুৎসুদ্দি শ্রেণি তৈরি করে। আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব শিল্পী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। অজাচারজ্জ‘অনাহার’ চললেও পরিশুদ্ধি তো চলেই। এখনও অনেক কবি নির্মোহ, নির্লোভ। সত্তর দশক এ বিধ্বস্ত, হতাশার মুখে; রচিত ইমেজজ্জস্রোতের বিপরীতে। ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, অবক্ষিণ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লেখেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। নানা রকমে এ সময়ের কবিরা প্রস্ফুটিত। কেউবা আত্মমগ্ন, অন্তর্লীন; কেউবা অনুকরণপ্রিয় রোম্যান্টিক। একটা স্ববিরোধীতা, দ্বন্দ্ব-দোলাচলতা দেশ-কালসাপেক্ষে চলতে থাকে। এ সময়ের কবিরা একদিকে যেমন উত্তরণের চেষ্টা করেন তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদে হয়ে ওঠেন স্পষ্টভাষী। নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মোহন রায়হান সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুক্তমানবতার বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন। কবিরা আশাবাদের বাণীই প্রত্যয়দীপ্ত করেন। এ সময় স্বাধীন দেশে অনেকেই মূল্যবোধের ভিত্তিটি তৈরি করেন। প্রধানত মুক্ত স্বদেশে, স্বাধীন এ দশকে, বাঙালির আবেগ হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। নারী বা শ্যামলী নিসর্গ যোজনা করে নতুন মাত্রার। স্বপ্ন-সম্ভাবনার মূর্তিমান বিন্দুতে থাকে যাবতীয় অস্থিরতার অবসানের আর্তি। কবিরা একটা স্থির ও স্থায়ী প্রকরণ-নির্মাণে পরিশ্রমী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তির আনুগত্য, ব্যক্তিবলয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় শুভ ইঙ্গিত। সেখানে চিহ্নিত থাকে সময়ের বলিরেখা। এ দশক অনেক প্রলম্বিত, এঁদেরই অনুবর্তী পরবর্তী দশকের কবিরা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ শতকের কবিরা নতুন কবিভাষায় যেমন উঠে আসেন তেমনি পূর্বের কবিকুলও অর্জন করেন অপরিহার্য প্রত্যাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পরে থিতু হওয়া, অভিজ্ঞতা আবেগরহিত, সত্তরের প্রবাহ পৌঁছায় আশিতে। একই ধারায় ও আচরণে, তবে চেতনার শুদ্ধতা পরিপক্ব, বুদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি, আরও অধিক নিরীক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা জারি, বেশি ঢুকে পড়ে স্থূল পারিপার্শ্বিকতা। শুদ্ধশব্দ নির্মিতির চেষ্টায় কৃত্রিমতা নেই তা বলা যাবে না, তবে কৃত্রিমতা একটা পর্যায়ই বলতে হবে এ সময়ে; তবুও আসলেন অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনের বিপরীতে, লিট্লম্যাগে ভর করে, সমস্ত আগ্রাসী শক্তিকে অভয়ে এড়িয়েজ্জযদিও তা জটিল কিন্তু কবিতার জন্য সবই রপ্ত হতে থাকে। ‘পরাভব-প্রাণ’ কিছুতেই নয়, ততোধিক আবেগঘন প্রাণে বাজল জীবনের বাঁশী। স্বদেশমুখরিত, স্বাধীনতার অনতি পরের আবেগের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্রজ্জকিন্তু এগুনোটা, বোধের ব্যাপারটায় আশি পূর্ণাঙ্গ, আর ধারায় তো অবশ্যই অখণ্ড। কবিতা যে সমকাল ও সমাজকেই রাখবে তার ভেতরেজ্জতা তো নয়, সেটা হতেও পারে না। নন্দনকর্ম অবশ্যই পরিবেশ চায়, সেজন্য তার অপেক্ষা ও গুরুত্ব আছে, কিন্তু অনির্বচনীয় বলে যে কথাটা কবিতায় অনিবার্য তা কীভাবে এলো? আশিতে কবিরা পূর্ব-পাঠ, পাঠ-অভিজ্ঞতায় সমাজধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রত্নদৃষ্টি অর্জন করেন। ঢাকার নাগরিক হিসেবেও অভিজ্ঞ। অশনির বিরুদ্ধে উজানে যেমন চলছেন তেমনি শেকড়েও ফিরে শানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি নাগরিক অভিজ্ঞতা। চেতন-অবচেতন বিন্দুটি শ্লোগানতাড়িত, সাম্রাজ্যবাদ ফুঁসছে; কবিতা ব্যঙ্গে হাসছে, জীবন নিয়ে যেমন পরীক্ষা, উক্তিতেও পরীক্ষাজ্জনন্দন পরিমণ্ডলটির ভিত্তি এরূপেই নির্ণীত হতে থাকে। প্রজ্ঞাঋদ্ধ প্রতীকপ্রতিমা, উপমা-ভাষা, শুদ্ধশব্দ; খিস্তিখেউড়, আঞ্চলিকতা নিয়ে আশির ভিন্ন বাতাবরণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সামরিক শাসন-কাঠামোর ভেতর-বাহির পটচিত্র অংকন করেন, রূপকথা বা উপকথার অর্থারোপটি তাঁর অনেক কবিতার প্রাণভোমরা। শোয়েব শাদাব কিংবা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এখনও এরকম সোনা-রূপার কাঠি বা ‘সমুদ্দুর’ পুরাণে আছেন। তবে তাঁরা জীবিত, এ পর্যায়ে হয়তো এমনটা এখন নিশ্চিত, তাঁরা কবি হিসেবে চলমান। তাদের ভবিষ্যৎ জানা মুশকিল। তবে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা এজন্যই স্বার্থ-অভাব-সংসার-কর্মব্যাপদেশ-ভোগবিলাস সবমিলে ‘অনেক আলোর ঝলকানি’র তো অনেকেই ধরাশায়ী। তবুও যাঁরা কবিজীবী তাঁদের প্রণাম।

৪.
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়েছে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় কবিতা নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে এখন তা চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে। নব্বুইয়ে কিছু কবিপ্রতিভা এলেও ঐ একইরূপে অখণ্ডরই খণ্ড বলতে হবে তাঁদেরও। তবে পরীক্ষিত কি-না সেটা বলা এখনও কঠিন। এ নিরীক্ষার জন্য এখনও সময়ের প্রয়োজন। ধীর অভিজ্ঞতার সন্দর্শনও কাম্য। এখন এই নতুনদের জন্য পরিচর্যার পরিসীমা, কবিদৃষ্টির সামর্থ্য এখনও অপেক্ষমান। উত্তর-আধুনিকতা এসেছে অনেকভাবে, কার্যকর যুক্তিটি কিছুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকর টেক্সট নেই। কবিতায় অনেক আশা-সম্ভাবনা-অনিবার্যতা আসবেই, উপাদান-উপকরণও থাকবেজ্জসেটা তো বাজারী, বহ্বাস্ফোট, মিডিয়া কারবারি হলে চলে না। আর কবিতার মতো শিল্পে তো অসম্ভব। কবিতায় প্রত্যয় ও পরিচর্যা কিংবা মেধা-যুক্তি-আবেগ বললে জীবনানন্দ-সুধীন-বিষ্ণু-বুদ্ধদেব আর একালে আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুবকর সিদ্দিক উদাহরণ তো বটেই। এঁদের অনুগামী ধারাতেই নতুনরূপে আসেন কবিপ্রজন্ম। তাঁরও অর্জন করে স্বদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির গন্ধ। অবশ্যই তাঁদের সে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা
শহীদ ইকবাল

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের কবিতার বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো কবিতা শুরু হয় না, বিচারও হয় না। নির্ধারিত কালখণ্ডেই থাকে এর কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জদ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় তা স্নাত ও ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। এটির স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশে। বস্তুত, ত্রিশোত্তর কবিতার অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের কবিতার ধারা।

২.
পাকিস্তানের জন্য ‘উন্মাদ’ কবিকুল বহাল থাকেন, তদ্রুপ ঐতিহ্যে কবিতা লিখতে থাকেন। অপরদিকে ক্রমশ নিজেদের আত্মপরিচয় আর বাঙালির স্বতন্ত্র চেতনার পথটি অবমুক্ত হতে লাগল, প্রথমত : মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দস্তুর পূর্ব-বাংলার মাটির সমন্বয়ী দৃষ্টি স্ফটিক রূপে, এমত সমর্থনটি আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, দ্বিতীয়ত : ক্রমশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন। ইত্যাকার এর ভেতরে মূল কাব্যধারাটি অঙ্গীকৃত হয়ে পড়ে এবং নিজেদেরও সমন্বয়ী চেতনার স্বাতন্ত্র্যরূপে নতুন ফুল-পাখি-নদী-নারী আর নক্ষত্রের গানে স্বচিন্তায় সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। এখানে চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিদের পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। তবে তখন থাকে অল্প বয়সের আবেগ, যুক্তিহীনতা, নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা। ‘নতুন কবিতা’র কবিদের পঙ্ক্তি তার প্রমাণ। তবে পাকিস্তান-আবেগ বা নিজ ধর্মের বিশ্বাস অবসিত হতে সময় লাগে। একপ্রকার ঝুঁকিও। তবে কবিদের প্রারম্ভিক এ পর্বটির উত্তেজনা দেখার মতোই ব্যাপার। তবুও থিতু হওয়ার পথটি তৈরি হয় উজানের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার পথ অর্জনে একদিকে কায়েম হয় ত্রিশোত্তর কবিপ্রভাব এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাম্যবাদী কবির অনুপ্রেরণার আবর্ত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেমনটা বলেন, ‘ক্রম-প্রসারমান মধ্যবিত্তের কর্মজীবনের অন্তরালে যে আবেগ-আকাঙ্ক্ষা নিহিত ছিলো–তারই প্রকাশ ঘটেছিলো ঐসব কবিদের রচনায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দীনজ্জএঁরা সকলেই এই সময়ে কাব্য সাধনা শুরু করেন। এঁদের শৈল্পিক সাফল্য অবশ্যই তুল্যমূল্য নয়; কিন্তু সেই কবিকুলের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো—এঁরা সবাই নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। এবং সেই সূত্রে এঁদের কবিতার ভাষা, ফররুখ আহমদের অনুসরণে, মিশ্র নয়, বিশুদ্ধ বাংলাজ্জরূপক, উপমা, প্রতীকের ব্যবহারে এঁরা বাংলা কাব্যের অবিভাজ্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। প্রায়শ তিরিশের কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে লগ্ন। সে কারণে এইসব কবিদের প্রাথমিক রচনায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব একেবারে আকস্মিক নয়।…’ এক্ষেত্রে পঞ্চাশের কবিদের একটি উল্লম্ফন যুগ রচিত হয়। বাংলাদেশের কবিতা এগুতে থাকে প্রধানত সদ্য চলমান মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। এবং প্রসঙ্গত কবিরাও নিজেদের ভেতরে বদলাতে থাকেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক।
পূর্বাপর এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্ম হলে বাঙালি মুসলমান ঢাকাকে আশ্রয় করে নতুন স্বপ্ন দেখে। সাম্রাজ্যবাদের মুক্তির লগ্নে, বাঙালি মধ্যবিত্ত বসতি নেয় ধর্ম-ঐক্যের ভেতরে। পরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কর্মচঞ্চল্য। দীর্ঘবঞ্চিত জীবনে উপনিবেশিত বা হিন্দু আধিপত্যের ভেতরে ‘পথহারা পথিক’ যেন পথ খুঁজে পায়। বাঙালির নগর জীবনও তৈরি হয় তখন থেকেই। পুঁজির বিকাশ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারটিও তখন ঘটতে থাকে নানাকৌণিক। গ্রাম ছেড়ে শুরু হয় শহরে আসা। কিন্তু গ্রামীণ রূপসী বাংলার আবেগ থাকে চিত্তে। সবকিছু বুকে নিয়ে নাগরিক বসতি শুরু করেন ভাগ্যসন্ধানী মানুষ। পুঁজির প্রকোপে তাঁরা ছড়াতে থাকেন নিজেদের মতো করে। অভিবাসনও চলতে থাকে। অধিকন্তু পূর্ব-বাংলার চল্লি¬শের কবিরা কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ‘ত্রয়ী’ এ সময়ের আগেই কবি পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাষার দাবি যতো দৃঢ়তর হচ্ছিল ততোই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। কবিরাও যেন পাচ্ছিলেন মাটির লালিত্য। প্রসঙ্গত এসব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঐ মধ্যবিত্ত। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বার্থপরতা পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ব-বাংলায় তাদের মনোনীত এজেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। তরুণ-কর্মপ্লাবী-সাহসী-পরার্থসেবী তরুণদের সামষ্টিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রশক্তির এ অপতৎপরতায় সদ্য স্বাধীন মুসলমানদের অনেকেই স্বার্থভোগী হয়ে ওঠেন। নতুন আবেগের ভেতরে কিছু শ্রেণি বা স্বার্থপর গোষ্ঠী তৈরি হবে–এ আর নতুন কি? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এ সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁদের কবিতায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতের অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফ্রন্টের জয়লাভজ্জএসব কবিতার পক্ষে উক্তি ও উপলব্ধিকে তৈরি করে। একটি কবিভাষাও তাঁদের ক্রমশ আয়ত্তে আসছিল। আর মধ্যবিত্তও একটা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করছিল। তবে এর বিপরীতে ইসলামপন্থি অংশটিও যে ‘হয়ে ওঠে’ না, তা নয়। তাঁদের দ্বিধান্বিত স্বরটি ‘পাকিস্তান’ আর ‘কায়েদ-ই-আযমে’ আটকানো। তবে তফাতটা উপর্যুক্ত অংশের আলোচিত কবিদের কবিতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা সম্ভব। তবে সদ্য সচল একটি সমাজে যে সবকিছুই পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান থাকবে, তা সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের কোপানলে যে মধ্যবিত্ত তা শুধু অনিবার্য বাঁচার অংশ ও অধিকারটুকু চেয়েছিল, সে যখন স্বাধীন হল তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠল। ঘটল যাবতীয় সীমাবদ্ধতার অবসান। আবেগের যেন মহীরুহ প্রত্যাবর্তন। ‘নতুন কবিতা’ কিংবা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলনের লেখকরা শুধু বিষয়বুদ্ধি নয়, বিষয়াতীত বিষয়কেও তারা কবিতায় উপাদানরূপে আনতে চাইলেন। কবিতার মূলধারাটি বজায় রেখে সামষ্টিক প্রবণতায়, সমন্বয়বাদী ভাবনায় শিল্পকে বহুমুখি করে তুলতে চাইলেন। এবং বোধকরি পরের দশকে তা পরিপূর্ণরূপে কূলে ফেরার পালা। অবশ্য সে অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়া তো ‘কাব্যকে বৃহৎ কাল-চৈতন্যের সমান্তরাল একটি সরল রেখায় বয়ে নিয়ে’ আসার প্রত্যয়।
পঞ্চাশের কবিরা একটা দশকে সীমাবদ্ধ নন। কবিত্ব নির্ণয়েও তাঁদের প্রারম্ভ ও প্রতিশ্র“তিটি এখানে বজায় থাকে। এ দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। বাঙালি মুসলমান পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে কাব্যভূমির মৌল সূত্রটি সন্ধান করছে এ দশকে। যাঁরা পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন সে কবিতায় উঠে আসে লোকজ জীবন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্পর্শগন্ধময় আকুতি, ফুল-প্রকৃতির প্রণয় আর পরিশুদ্ধ মূল্যবোধের চর্চার মত্ততা। চেতন-অবচেতনভাবে মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতে নির্ধারিত সৃষ্টিসত্তা রূপান্তরিত হয় নদী-প্রকৃতির নিস্পৃহ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায়। নদী ও মানুষের কবিতা লেখেন সানাউল হক। লোকায়ত নন্দনে সাত-নরী হার লেখেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অনেকেই ফেরেন স্নিগ্ধ মহিমান্বিত উজ্জ্বল জীবনে। সেখানে এক রকমের সংস্কার যে থাকে না তা নয়। কিংবা মানবতার জন্য দায় বা নিরঙ্কুশ আকুতি, নারীর শরীরী প্রণয়, আসঙ্গলিপ্সা, জৈবিক প্রণোদনা এমনসব বিষয়গুলো আড়ষ্ট; কারণ, রোম্যান্টিকতার পূর্ণায়ত রূপটি তখনও তেমন করায়ত্ত হয়নি তাঁদের নিকট। এ পঞ্চাশে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক ক্রমশ অধিকার করছেন জীবনের যাবতীয় ও সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। কবিতার উপাদানগুলোতে তুলে এনেছেন মানবতার সর্বোচ্চ ক্ষেদ। নাগরিকতার অন্তর্ভুক্তিও পায় কবিতা।
বায়ান্ন থেকে আটান্ন বাংলাদেশের কবিতায় স্ফূর্তি আসে। এরপর বাষট্টি পর্যন্ত বিপর্যস্ত। বাষট্টির পর পূর্ণ প্রবাহ। শামসুর রাহমান পঞ্চাশের গোড়ায় শুরু করলেও প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ষাটে। প্রায় একই ঘটনা সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং এ পর্বের অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। তবে কবিমেধার পূর্ণতা আসে একটা সময়ে। সে সময়কে চিহ্নিত করা একটু মুশকিল। কারণ, এ বিচার অনেকটা সাবজেক্টিভ এবং আপেক্ষিক। আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমানের মতো অনেকেই কয়েক দশক ধরে কাব্যসাধনা করেছেন। কবিরূপে অনেক পরীক্ষার আবর্ত যেমন তাঁরা অতিক্রম করেছেন তেমনি তাঁদের প্রতিমায় সাধিত হয়েছে ‘নিকষিত হেম’ সমৃদ্ধি। এক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাটিও বিচিত্র। প্রথম কাব্যে শামসুর রাহমান যেভাবে উপস্থিত–রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) তা পরিবর্তিত। কারণটি নিহিত দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিপার্শ্ব চেতনায়। যে দৃশ্যমান জগত থেকে কবিচেতনা দিব্যমূর্তি লাভ করে। অবচেতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় যে সত্তাটি–সেখানে অভিজ্ঞতা-অন্বেষিত স্মারক প্রস্তুত করেন কবি। স্মর্তব্য, এ সময়টায় সম্পাদিত কবিতা সংকলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন–এসবে যে নতুন মধ্যবিত্ত উঠে আসে তাঁরা অনেকটা পরিশোধিত। অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবিক কল্যাণের বিষয়সমূহই তারা সামনে এনেছেন। ধর্মীয় সংস্কার ও জাতপাত-শ্রেণিভেদ তাঁরা অস্বীকার করে। শাশ্বত শিল্পচেতনাকে দেয় প্রাধান্য। এ বিশ্বাস আসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের ভেতর দিয়ে। তবে অবাঙালি শ্রেণিশক্তি বা সামন্তগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় ‘অনুগত চর’রা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালান। এতে করে দ্বন্দ্বাত্মক আবহ যে রচিত হয় না তা নয়। এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই পূর্ব-বাংলার নব-উত্থিত মধ্যবিত্তশ্রেণিটি সমাজসম্ভূত শিল্পজগতটি নির্মাণ করতে থাকে। প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না। কিন্তু এসব অন্তরায় আদর্শ সচেতন নতুন মধ্যবিত্তকে কিছুতেই পরাস্ত করতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায়, বিপরীতমুখি ধর্মীয় চেতনা ধারার কবিরা ম্লান হওয়াই শুধু নয়জ্জক্রম-অপসৃত হতে থাকেন। এ পটভূমিতে সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পত্রিকাকে ঘিরে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিচর্চা আরও বেগবান হয়। তাঁদের যাত্রা পঞ্চাশের মধ্যভাগে। কিন্তু প্রকরণগত ঔজ্জ্বল্য পরীক্ষা করলে ষাটের প্রথমার্ধেই অনেকটা চকিত। হয়ে উঠেছেন স্থির, বাড়ন্ত।
১৯৫৮তে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৯০৭-১৯৭৪) পাঞ্জাবি সামরিক সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন। এতে এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। বিভ্রান্তি আর স্থিরতা জন্ম নেয় সমাজস্তরে। উল্লিখিত মধ্যবিত্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ, অনেকক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবে, আইয়ুব অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! চিরকালই ক্ষমতালোভীর দল, চাটুকারের দল, হালুয়া-রুটির সন্ধানী, উচ্ছিষ্টভোজীরা এমন সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। উপনিবেশবাদ অবসানে নতুন রাষ্ট্রে এমন শ্রেণিকাঠামো অনুপস্থিত থাকে না। আর পাকিস্তানের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রপুষ্ট রাষ্ট্রে এ সুযোগ আরও বেশি। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিপতির অনুগত দলবাজ, ফড়িয়া শ্রেণি প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়। আসন্ন ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’ (১৯৬২)র নামে দ্বিধাবিভক্তি আর আত্মক্ষয়ের অধ্যায় রচিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশে ভাগ হয়ে যায়। একজন পশ্চিমা সমর্থক অন্যজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এরূপ নানামুখি বিভ্রান্তিতে গণসমাজে ডিক্টেটর আইয়ুব খানই ‘হিরো’ তে পরিণত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক উঠতি মধ্যবিত্ত আত্মমগ্ন ও অন্তর্লীন হয়ে পড়ে। একটা বিচ্ছিন্নতা, বৃত্তায়ন আর বিড়ম্বনা গ্রাস করে। কবিরা তেমন এগুলেন না। কবিতা ‘গ্রহণ-ধরা ছায়ার মতো’; অনালোকিত। তবুও চণ্ড আইয়ুবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপন সম্পন্ন হয়। বোধকরি কবিরা এরপর আর অক্রিয় থাকেননি। এ পর্বে একদিকে লোকায়ত এবং নাগরিক চেতনা দুটোই এগুতে থাকেজ্জআর বলতেই হয় কবিভাষার অবলম্বন-বিভাবে জাগরিত ঐ ত্রিশের উত্তরাধিকার।
ষাটের প্রারম্ভ থেকেই পূর্ব-বাংলার জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার বোধটির সঙ্গত প্রকাশ ঘটাতে থাকে। এ দশকের প্রথমার্ধের কবিরা মুখোমুখি হন মৌলিক গণতন্ত্র বা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতাশ, বঞ্চিতজ্জযতোটা স্পন্দিত ছিলেন ঠিক ততোটাই হলেন মলিন। কবিতায় তখন বাহুল্য হয়ে ওঠে যৌনতা, বিচ্ছেদ, উগ্রতা; কিংবা পরাবাস্তব (surrealist) চিত্র। শামসুর রাহমান পরিবর্তিত; আল মাহমুদ আধুনিকতার সমস্ত শর্ত বজায় রেখে গ্রামীণ লৌকিক জীবনে ফেরা আর আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তব প্রকরণে আটকান। তবে এসবের ভেতরে কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে কায়েম হতে থাকে স্বাজাত্য, স্বদেশপ্রেম। সেটা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পঙ্ক্তিতে, কখনও উপমাপ্রতীকে। এগুলো ষাটের প্রথমার্ধে শুরু হলেও স্পষ্টতর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে অধিকারের জানালা খুলে দেয় ‘ছয়দফা’র স্বায়ত্তশাসনজ্জযেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যচিন্তা বেগবান। একটু পরিচিতি কবিরা এগুলেন, পৌঁছালেন নিজ বাসভূমে, লিখলেন পয়ারে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা। অদ্যাবধি বাংলাদেশের কবিতার সবচেয়ে প্রজননোচ্ছল সুদিন এ সময়টি। প্রসঙ্গত, তখন কিছুকাল আগে মৃত্যু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের (মৃত্যু ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (মৃত্যু ১৯৬০); বুদ্ধদেব বসু জীবিতজ্জ তিনি করে ফেলেছেন কবি শার্ল বোদলেয়ার ও মারিয়া রিল্কের কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে (টি. এস. এলিয়টের অনুবাদক) কিংবা অমিয় চক্রবর্তী দুর্দাম লিখে চলেছেন। ষাটের প্রান্তিক এ কবিরা এসব থেকে প্রবল বৈশ্বিক হয়ে পড়েন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক সুররিয়ালিস্ট, পাশ্চাত্য অনুগত; নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যক্ষ, নিরাবরণ, গণমানুষের পক্ষের পদাতিক। আর মহাদেব সাহা রুগ্ন রোম্যান্টিক। রফিক আজাদ চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মর্মদাহনে নির্ণীত। এঁরা এগিয়েছেন একাত্তরের ভেতর দিয়ে, এ পর্যন্ত।
৩.
কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রত্ন অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবি– তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : ÔPoetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছেজ্জযেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তাণ্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কল্পসৌন্দর্যই সেখানে মুখ্য। অবচেতন বা নির্জ্ঞানসত্তায় স্বপ্ন তথা যৌনবিহার অহং-রূপটি এক কল্পপ্রতিমার ধারণার জন্ম দেয়। কল্পনা বা আবেগই সেখানে মুখ্য।
একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না– কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল– এই স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তাদের স্বার্থরক্ষায় অনুগত মুৎসুদ্দি শ্রেণি তৈরি করে। আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব শিল্পী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। অজাচারজ্জ‘অনাহার’ চললেও পরিশুদ্ধি তো চলেই। এখনও অনেক কবি নির্মোহ, নির্লোভ। সত্তর দশক এ বিধ্বস্ত, হতাশার মুখে; রচিত ইমেজজ্জস্রোতের বিপরীতে। ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, অবক্ষিণ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লেখেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। নানা রকমে এ সময়ের কবিরা প্রস্ফুটিত। কেউবা আত্মমগ্ন, অন্তর্লীন; কেউবা অনুকরণপ্রিয় রোম্যান্টিক। একটা স্ববিরোধীতা, দ্বন্দ্ব-দোলাচলতা দেশ-কালসাপেক্ষে চলতে থাকে। এ সময়ের কবিরা একদিকে যেমন উত্তরণের চেষ্টা করেন তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদে হয়ে ওঠেন স্পষ্টভাষী। নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মোহন রায়হান সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুক্তমানবতার বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন। কবিরা আশাবাদের বাণীই প্রত্যয়দীপ্ত করেন। এ সময় স্বাধীন দেশে অনেকেই মূল্যবোধের ভিত্তিটি তৈরি করেন। প্রধানত মুক্ত স্বদেশে, স্বাধীন এ দশকে, বাঙালির আবেগ হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। নারী বা শ্যামলী নিসর্গ যোজনা করে নতুন মাত্রার। স্বপ্ন-সম্ভাবনার মূর্তিমান বিন্দুতে থাকে যাবতীয় অস্থিরতার অবসানের আর্তি। কবিরা একটা স্থির ও স্থায়ী প্রকরণ-নির্মাণে পরিশ্রমী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তির আনুগত্য, ব্যক্তিবলয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় শুভ ইঙ্গিত। সেখানে চিহ্নিত থাকে সময়ের বলিরেখা। এ দশক অনেক প্রলম্বিত, এঁদেরই অনুবর্তী পরবর্তী দশকের কবিরা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ শতকের কবিরা নতুন কবিভাষায় যেমন উঠে আসেন তেমনি পূর্বের কবিকুলও অর্জন করেন অপরিহার্য প্রত্যাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পরে থিতু হওয়া, অভিজ্ঞতা আবেগরহিত, সত্তরের প্রবাহ পৌঁছায় আশিতে। একই ধারায় ও আচরণে, তবে চেতনার শুদ্ধতা পরিপক্ব, বুদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি, আরও অধিক নিরীক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা জারি, বেশি ঢুকে পড়ে স্থূল পারিপার্শ্বিকতা। শুদ্ধশব্দ নির্মিতির চেষ্টায় কৃত্রিমতা নেই তা বলা যাবে না, তবে কৃত্রিমতা একটা পর্যায়ই বলতে হবে এ সময়ে; তবুও আসলেন অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনের বিপরীতে, লিট্লম্যাগে ভর করে, সমস্ত আগ্রাসী শক্তিকে অভয়ে এড়িয়েজ্জযদিও তা জটিল কিন্তু কবিতার জন্য সবই রপ্ত হতে থাকে। ‘পরাভব-প্রাণ’ কিছুতেই নয়, ততোধিক আবেগঘন প্রাণে বাজল জীবনের বাঁশী। স্বদেশমুখরিত, স্বাধীনতার অনতি পরের আবেগের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্রজ্জকিন্তু এগুনোটা, বোধের ব্যাপারটায় আশি পূর্ণাঙ্গ, আর ধারায় তো অবশ্যই অখণ্ড। কবিতা যে সমকাল ও সমাজকেই রাখবে তার ভেতরেজ্জতা তো নয়, সেটা হতেও পারে না। নন্দনকর্ম অবশ্যই পরিবেশ চায়, সেজন্য তার অপেক্ষা ও গুরুত্ব আছে, কিন্তু অনির্বচনীয় বলে যে কথাটা কবিতায় অনিবার্য তা কীভাবে এলো? আশিতে কবিরা পূর্ব-পাঠ, পাঠ-অভিজ্ঞতায় সমাজধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রত্নদৃষ্টি অর্জন করেন। ঢাকার নাগরিক হিসেবেও অভিজ্ঞ। অশনির বিরুদ্ধে উজানে যেমন চলছেন তেমনি শেকড়েও ফিরে শানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি নাগরিক অভিজ্ঞতা। চেতন-অবচেতন বিন্দুটি শ্লোগানতাড়িত, সাম্রাজ্যবাদ ফুঁসছে; কবিতা ব্যঙ্গে হাসছে, জীবন নিয়ে যেমন পরীক্ষা, উক্তিতেও পরীক্ষাজ্জনন্দন পরিমণ্ডলটির ভিত্তি এরূপেই নির্ণীত হতে থাকে। প্রজ্ঞাঋদ্ধ প্রতীকপ্রতিমা, উপমা-ভাষা, শুদ্ধশব্দ; খিস্তিখেউড়, আঞ্চলিকতা নিয়ে আশির ভিন্ন বাতাবরণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সামরিক শাসন-কাঠামোর ভেতর-বাহির পটচিত্র অংকন করেন, রূপকথা বা উপকথার অর্থারোপটি তাঁর অনেক কবিতার প্রাণভোমরা। শোয়েব শাদাব কিংবা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এখনও এরকম সোনা-রূপার কাঠি বা ‘সমুদ্দুর’ পুরাণে আছেন। তবে তাঁরা জীবিত, এ পর্যায়ে হয়তো এমনটা এখন নিশ্চিত, তাঁরা কবি হিসেবে চলমান। তাদের ভবিষ্যৎ জানা মুশকিল। তবে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা এজন্যই স্বার্থ-অভাব-সংসার-কর্মব্যাপদেশ-ভোগবিলাস সবমিলে ‘অনেক আলোর ঝলকানি’র তো অনেকেই ধরাশায়ী। তবুও যাঁরা কবিজীবী তাঁদের প্রণাম।

৪.
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়েছে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় কবিতা নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে এখন তা চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে। নব্বুইয়ে কিছু কবিপ্রতিভা এলেও ঐ একইরূপে অখণ্ডরই খণ্ড বলতে হবে তাঁদেরও। তবে পরীক্ষিত কি-না সেটা বলা এখনও কঠিন। এ নিরীক্ষার জন্য এখনও সময়ের প্রয়োজন। ধীর অভিজ্ঞতার সন্দর্শনও কাম্য। এখন এই নতুনদের জন্য পরিচর্যার পরিসীমা, কবিদৃষ্টির সামর্থ্য এখনও অপেক্ষমান। উত্তর-আধুনিকতা এসেছে অনেকভাবে, কার্যকর যুক্তিটি কিছুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকর টেক্সট নেই। কবিতায় অনেক আশা-সম্ভাবনা-অনিবার্যতা আসবেই, উপাদান-উপকরণও থাকবেজ্জসেটা তো বাজারী, বহ্বাস্ফোট, মিডিয়া কারবারি হলে চলে না। আর কবিতার মতো শিল্পে তো অসম্ভব। কবিতায় প্রত্যয় ও পরিচর্যা কিংবা মেধা-যুক্তি-আবেগ বললে জীবনানন্দ-সুধীন-বিষ্ণু-বুদ্ধদেব আর একালে আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুবকর সিদ্দিক উদাহরণ তো বটেই। এঁদের অনুগামী ধারাতেই নতুনরূপে আসেন কবিপ্রজন্ম। তাঁরও অর্জন করে স্বদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির গন্ধ। অবশ্যই তাঁদের সে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।

কী লিখি কেন লিখি ৬

আজ থেকে আনুমানিক পনের বছর আগে নজরুল ইনস্টিটিউট আয়োজিত এক কবিতা পাঠের আসরে একজন ভক্ত শ্রোতার সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি আর কি লেখেন? পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন কবি-প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদ। তিনি আমার হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ যা যা লিখতেন ইনিও তার সবই লেখেন। সে মুহূর্তে একটু অপ্রতিভ হয়েছিলাম। মজিদ মোটামুটি ঠিকই বলেছিলেন। ঠাকুরের মতো অনেক ধরনের সাহিত্যই লিখি আমি, কেবল নাটক ছাড়া।
প্রথমে কবিতার কথা বলি। কবিতা দিয়েই তো আমার সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়েছিল। আরম্ভটা বোধ হয় কোনো-না-কোনো মুগ্ধতা থেকে হয়। নিজেকে আবিষ্কারের অন্তঃপ্রণোদনা থেকে লেখা-লেখির সূত্রপাত ঘটে! তারপর সামনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয় মাথায়। হৃদয়ে কতো রকম অনুভূতি যে হয় তার শেষ আছে? একজন কবিমানুষ সেসব ধরতে চান তার লেখায় অর্থাৎ কবিতায়। এমন অনেক অনুভব-আবেগ-সংবেদ আছে যেগুলোকে চেহারা দিতে হয় শুধু কবিতায়। গল্পে বা অন্য ধরনের গদ্যে সেগুলো সাকার করে তোলা যাবে না তা নয়, কিন্তু কাব্যই হচ্ছে সেসব অনুভব প্রকাশের যোগ্যতম স্থান। কাজেই ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কবিতার কোনো বিকল্প নেই। আর এখন, অনেককাল যাবৎই, এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো দুটি কারণ। ১. অভ্যস্ততা ২. প্রয়োজনের তাগিদ।
কবিতা প্রসঙ্গে আমার বাইন মাছের কথা মনে পড়ে। বাইন মাছের একে তো আঁশ নেই, তার ওপর ভীষণ পিচ্ছিল। ছাই দিয়েও তাকে আটকানো যায় না অনেক সময়। কবিতা ওই বাইন মাছ। জোৎস্নারাতে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় বনদেবী। কী তীব্র তার হাতছানি, কী মোহময় তার পা ফেলার ভঙ্গি! তার মুখমণ্ডল ভালো করে দেখা যায় না। তার খুব কাছে পৌঁছার আগেই সে উধাও। আবার একঝলক দেখা যায় অদূরে ঝোপের পাশে। দৃষ্টিনন্দন দেহভঙ্গি, আলোলিত চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! কবিতা ওই পূর্ণিমা রাতের বনদেবী!
পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি সময় যাবৎ কবিতার সঙ্গে আছি। কাব্য নিয়ে থাকা মানে কুয়াশাগ্রস্থ থাকা, এক রকম আচ্ছন্নতার মধ্যে থাকা। কবিতার মতো এতোটা কুহকপ্রধান, এতোটা আলো-ছায়াভরা শিল্পমাধ্যম পৃথিবীতে আর নেই, আমার এমনটাই মনে হয়। কবিতা আমাকে সুনাম দিয়েছে। নিন্দার কাঁটাও কম হজম করিনি কবিতাকে ভালোবেসেই। এই কবিতাই আমার ব্যক্তিগত বিষাদকে উসকে দিয়েছে অসংখ্যবার। তারপরও কবিতাকে আঁকড়ে আছি কেনো? আদৌ আর কবিতা লিখবো না এমন ভাবতে পারছি না কেনো এখনো? তার কারণ কবিতা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অনেক কিছুই তো লিখি। কিন্তু কেবল কবিতা লেখার ভেতর দিয়েই আমার সৃষ্টিশীল নিঃসঙ্গতাকে উদ্যাপন করতে পারি, আমার অনুভূতিরাশি কতোখানি প্রকাশ করতে পেরেছে আমারই প্রযুক্ত শব্দমালা! তাই, আবার, কবিতা না লিখে থাকতে পারি না।
এবার গদ্যের প্রসঙ্গ। আমার প্রথম গদ্যপ্রয়াস ছিলো একটি ছোটগল্প। ১৯৮১ সালে ‘দরজা’ নামের গল্পটি পত্রস্থ হয় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’য়। ষাটের দশকের কবি ও সম্পাদক, পণ্ডিত রণজিৎ পাল চৌধুরী (রণপা চৌধুরী) ছিলেন তখন ওই দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক। মনে আছে তার বছরখানেক পর একই কাগজের জন্য লিখেছিলাম একটি প্রবন্ধ, আবুল হাসানের ওপর। যতোদূর মনে পড়ে ওটাই আমার প্রথম প্রবন্ধপ্রয়াস। পুরো দু’পৃষ্ঠার সাহিত্য সাময়িকী তো আর শুধু কবিতা ও রিভিউ জাতীয় লেখা দিয়ে ভরানো যেতো না। সেজন্য দরকার ছিলো অনেক অনেক মুদ্রণযোগ্য গদ্য রচনা। কবিতার পাশাপাশি তাই, মাঝেমাঝে আমি গল্প/প্রবন্ধ ছাপতে দিতাম ‘দৈনিক বার্তা’য়। পরে, ততোদিনে আমি ঢাকায়, ১৯৮৭/৮৮ আমার প্রবন্ধ নিয়মিত বেরুতে শুরু করলো একাধিক জাতীয় দৈনিকে। তার পেছনে চিন্তামূলক গদ্য লেখার অন্তর তাগিদ যেমন ছিলো তেমনি ছিলো দুটো পয়সা উপার্জনেরও গরজ। কেননা সেসময় আমি ছিলাম বলা চলে অর্ধবেকার। গল্প, প্রবন্ধ, আলোচনা, বই পর্যালোচনা, স্মৃতিকথা, উপন্যাস—এই-যে বিচিত্র রকম গদ্যের নিরবিচ্ছিন্ন চর্চায় লিপ্ত আমি দীর্ঘকাল, তার অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে পয়সা প্রয়োজন। কে না জানে গদ্যের সঙ্গে টাকার একটা সম্পর্ক আছে। ন্যূনতম যোগ্যতা নিয়েই তো একজন কবিযশোপ্রার্থী তরুণ গদ্য লিখতে আরম্ভ করেন। কেউ কেউ হয়তো নিছক পার্থিব প্রয়োজনে শুরু করেন না; কিন্তু লিখতে লিখতে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই তার গদ্যের উন্নয়নের দিকে—তার শাব্দিক ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের দিকে দিকে মনোযোগী হন। সাধ্যমতো ওস্তাদী অর্জন করেন। আমার বেলায়ও তাই হয়েছে। আর আমার ছোটগল্প ঢাকাস্থ পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত বেরুতে থাকে নব্বইয়ের দশকে।
কবিতার সঙ্গে আবেগের এবং অন্তঃপ্রণোদনার সম্পর্ক অতি নিবিড়। কথাসাহিত্যের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ভাব জীবনের বহুরূপী বাস্তবতার। আর প্রবন্ধের সঙ্গে যুক্ত লেখকের ব্যাপক পাঠ অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধি। জীবনের অভিজ্ঞতাও এতে নতুন মাত্রা যোগ করে বৈকি। কিন্তু চিন্তাপ্রধান রচনার ক্ষেত্রে সেটা গৌণ বিষয়।
ভেবে দেখেছি, অনেক বছর একত্রে বসবাস করা হয়ে গেছে এমন পরীক্ষিত স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর যে সম্পর্ক, কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখন সেরকম। সম্পর্কটা খুব মধুর নয়, আবার দ্বন্দ্বময়ও নয়। সম্পর্কটা আসলে অম্লমধুর। কাব্যের মতো বিষয়কে যারা জীবনের ধ্র“বতারা বলে মেনে নিয়েছেন তাদরে মনোবেদনা অন্তহীন। এই যে, সৃষ্টিশীল মুহূর্তগুলো অতুলনীয়। আর মানসম্মত কিছু লিখে উঠবার পরের অনুভূতি ঠিক অক্ষরে প্রকাশযোগ্য নয়। তাইতো সাহিত্যকরা লেখেন। নানান বাধা-বিপত্তির পরও লেখাটা চালু রাখের তারা। রেখেছি আমিও।

পাঠ : এ্যালবাম সম্পাদক : মনজু রহমান : রাজশাহী

শরতের দরজায় হেমন্ত শিশির ভেজা পায়ে কিছুটা আগেই কড়া নাড়ে। এই শরৎ হেমন্তের মধ্যলগ্নে বিশ শতকের সত্তর দশকে পথে নামে এবারের এ্যালবাম। মনজু রহমানের (জ. ১৯৫৬) সম্পাদনায় কবিতার ছোটকাগজ এ্যালবাম। প্রাচীন কাল থেকে কবিতার যে পথ চলা তার; আধুনিককালে এসেও অনেক দীর্ঘ। আর এই দীর্ঘ পথের সঙ্গী হয়েছে এ্যালবাম। আধুনিক কালে ফেসবুক, টুইটারে যখন একদল আসক্ত ঠিক অপরদিকে মনের কল্পনা ভাবনা চিন্তাকে আরেকদল কবিতা, গল্পে ভরে তুলছে। তরুণদের প্রেরণা উচ্ছ্বাস ও লেখালেখিতে আজও বেঁচে আছে অনেক ছোটকাগজ। বয়সের তারুণ্য নয় মনের তারুণ্যই বাঁচিয়ে রাখে ছোটকাগজকে। শিল্প সহিত্যের ছোটকাগজ এ্যালবামের প্রচ্ছদে যেন এক কাগজের তৈরি প্রাচীন স্থাপত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন খালিদ আহসান। এ সংখ্যাই ষাট দশকের কবি ও সাড়া জাগানো লিটলম্যাগ বিপ্রতীক (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৭) এর সম্পাদক প্রয়াত ফারুক সিদ্দিকীর (১৯৪১-২০১৪) স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। আলোচ্য সংখ্যাটিতে কবি ফারুক সিদ্দিকী স্মরণে তার সতীর্থদের শ্রদ্ধাঞ্জলি, তার নির্বাচিত কবিতা, কবির চিঠিপত্র, বিপ্রতীক-এ প্রকাশিত লেখা পুনঃমুদ্রণ, পাঁচ দশকের পঞ্চাশজন কবির গদ্য-পদ্য এবং সর্বশেষে গ্রস্থালোচনা স্থান পেয়েছে।
কবি ফারুক সিদ্দিকী স্মরণে তার সতীর্থদের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে উঠে এসেছে অনেক কথা। ফারুক সিদ্দিকীর জীবনের ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র, লিটলম্যাগ সর্ম্পকে নানা কথা উঠে এসেছে এখানে। ৬৭-এর বিপ্রতীক শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজে এক জ্বলন্ত শিখা। ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে জোয়ার শুরু হয় তার অগ্রভাগে ছিলেন কবি ফারুক সিদ্দিকী। সুদীর্ঘকাল সম্পাদনা করে গেছেন বিপ্রতীক। তবে বিপ্রতীক, এর প্রথম সংখ্যাটির যৌথ সম্পাদক ছিলেন, মহাদেব সাহা ও কাজী রব। প্রকাশক ছিলেন ফারুক সিদ্দিকী। বাংলার কাব্যাঙ্গনে এক আলাদা মাত্রার লিটল ম্যাগাজিন বিপ্রতীক। ফারুক সিদ্দিকী বগুড়ায় জন্ম নিয়ে জন্ম দেন ছোটকাগজের। তিনি একাধারে কবি ও সম্পাদক হিসেবেই ছিলেন সমধিক পরিচিত। তিনি মাত্র দুটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। একটি কাব্যগ্রস্থ স্বরচিহ্নে ফুলের শব অপরটি প্রবন্ধগ্রন্থ তামসিক নিসর্গে ঈশ্বরনামা ও অন্যান্য। তিনি সবসময় প্রতিষ্ঠা-বিরোধী চেতনা আমৃত্যু লালন করে গেছেন। তার লেখার মধ্যে এক ধরনের ভিন্ন ভাব, ভাষা, ছন্দ ছিল। শব্দকে তিনি ভালোবাসতেন তাই তাঁর কবিতা মানেই শব্দময়-‘আনন্দ, চিরায়ু রৌদ্রে পৃথিবীর রূপরেখাময় মৃগনাভিরাঙ্গা। ক্রমভয়াল পথ মোচনের উঠে আসা বেপুথপদ আশ্বাস’ (কৃষ্টিতে মৌমাছির চিত্র) ফারুক সিদ্দিকী ছিলেন সহজ, সরল ও শিশুসুলভ। তিনি শুধু কবিতাই লেখেন নি, কবিতা বিষয়ক গদ্যও লিখেছেন অনেক। তিনি কবিতাকে ঐতিহ্যাশ্রিত শিল্পরীতিতে সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। ঐতিহ্যের গণ্ডি পার হতে চাননি। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেনÑ ‘বাস্তবতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের কষ্টকর গ্লানির একরৈখিক দৈর্ঘ্য বাংলাদেশের অধিকাংশ কবিদের বিষয়বস্তু আজও হতে পারেনি। ফলে কবিতা অনেকাংশে হৃদয়-সংবেদী হয় না, ‘ভুঁইফোঁড়া, মর্মহীন মনে হয়’। কবি ফারুক সিদ্দিকী জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন ছোটকাগজের প্রতি। আর কবিতা যেনো তার জীবনেরই একটি অংশ। ফারুক সিদ্দিকীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চারজনের কথায় এসবই উঠে এসেছে। সত্তর দশকের কবি মনজু রহমানের সঙ্গে ষাটের দশকের কবি ফারুক সিদ্দিকীর একটা ভালো যোগাযোগ ছিল। আলোচ্য সংখ্যাটিতে ফারুক সিদ্দিকীর লেখা নয়টি পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। পত্রগুলোর প্রাপক মনজু রহমান। অধিকাংশ পত্রে প্রেরক মনজু রহমানের কাছ থেকে ভালো প্রবন্ধ লেখা চেয়েছেন সেটিই তুলে ধরা হয়েছে।
কবিতা এক বিশাল সমুদ্র। অনন্ত, অসীম। আর এই বিশাল সমুদ্রে কবি খালিদ আহসনের যাত্রা শুরু দেশ স্বাধীনতার সময় থেকে। নিজের অনুভূতি ছাড়াও অন্যের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তার কবিতায়। প্রত্যেক কবিরই একজন প্রিয় কবি থাকে, তেমনি খালিদ আহসানের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ। তার মতে, ‘রবীন্দ্রনাথ যেন বাঙালির এক পরম আশ্রয়, আত্মার অনাবিল শান্তি’। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, সামাজিক ঘটনা সবই যেন কবিতায় তুলে ধরেন কবি খালিদ আহসান। তার নদী নেমে এলো কবিতায় দেখিÑ ‘নদী তুমি কোথা থেকে এলে/ পাহাড় গড়িয়ে নামলে/ পাহাড়ের বুক চিরে ফিরে এসে/ আমার সাদা কাগজের উপর থামলে/ কলমের পাশে দাঁড়ালে’। দৃশ্যরূপ, কল্পনা এবং নিরাশ্রয় অশরীর ভাবরূপগুলোকে একত্রিত করে অপরূপ মূর্র্তিতে বচন শিল্প, শব্দশিল্প ও বাক্যশিল্পের দ্বারা কাব্যকে সম্পূর্ণতা দান করে নাজমীন মর্তুজা। নারী, চাওয়া পাওয়া, সতী, বাঁদরামি খেলা, ব্রজধাম এই পাঁচটি কবিতার বেশিরভাগ স্থানেই তিনি নারীকেন্দ্রিক কথা বলেছেন। নারীরা প্রেমে পড়লে কত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়েও পাথরের মত শক্ত হতে পারেন তা তিনি নারী, কবিতার মধ্যে দিয়ে বুঝিয়েছেন। ‘তৃপ্ত প্রেমে পড়া নারী/ যমুনা সেতুর মত শক্ত/ তক্তার উপরে সানন্দে শুয়ে থাকে/ প্রেমে পড়া মেয়ে।’ তার কবিতার মধ্যে দুঃখ, কান্না, রাগ অভিমান, প্রেম-বিরহ, আনন্দ, শূন্যতা প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তার কবিতার মধ্যে ছন্দের গঠনগতরূপ তেমনভাবে প্রকাশ পায়নি। কাব্যিক ভাব, ভাষা, ছন্দ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন কবি শামীম হোসেন। তার কবিতার মধ্যে প্রকৃতির চিত্রই বেশি চোখে পড়ে। কবিতার লাইনে তিনি যেন এক মহুয়া নারী। আত্মকেন্দ্রিক কবিতায়Ñ ‘আমাকে বাঁধার আগে বেঁধো তুমি স্বরের কুসুম/ এই মাটিগন্ধী মন প্রজাপতি হবে-/ নৌকার গলুই ধরে পাড়ি দেবে সমুদ্রের পথ।’
বেদনার রং কি তা হয়তো না জানলেও একটা ধারণা যে তা নীল। আর এই নীল যে শুধু বেদনা, কষ্টের প্রতীক তা নয়। নীল যে ব্রহ্ম, নীল যে আকাশ, নীল কৃষ্ণ-জনার্দন হতে পারে তা বুঝিয়েছেন কবি সুস্মিতা চক্রবর্তী, তাঁর নীলাভিলাষ কবিতার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন নীলের জয়গান গেয়েছেনÑ ‘নীলের মধুতে তুমি শ্রীমধুসূদন/ নীলের যাতনা জ্যোতি কৃষ্ণ-জনার্দন।’ শাসক কবিতায় তিনি কবিতার নামকরণের যে সার্থকতা তা তিনি অবলীলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। শাসকের রূপ তুলে ধরেছেন। কবি সুস্মিতা চক্রবর্তী মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কলম হাতে সৃষ্টি করেছেন কবিতার।
প্রেমের বিরহে কেউ হয়েছে সন্ন্যাসী, কেউ হয়েছে পাগল আর কেউ হয়েছে কবি। কবি তৌহিদ ইমামের কবিতার জন্ম বিষণœতা থেকে। আর এ বিষণœতা প্রেমের। সংরক্ত, পরকীয়া, রাত্রিপুরাণ-১, রাত্রিপুরাণ-২, লোনা জোয়ার, সংগীতিকতায় এই পাঁচটি কবিতার প্রত্যেকটি কবিতায় ধরা দিয়েছে প্রেম, বিষণœতা। সংরক্ত কবিতায় দেখিÑ ‘মাঝে মাঝে মনে হয়/ আমিই কেন হলাম না তোমার প্রথম প্রেম?/ কেন আমার জন্যই ফুটল না তোমার আদিম হৃৎপদ্ম?’ কবিতার ভাষার মধ্যে এক ধরনের কামনা ভাব জাগ্রত করেছে কবি এবং কবিতায় নিঃসঙ্গতা ও ধরা পড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষেত্রে।
কবি প্রত্যয় হামিদের কবিতার মধ্যে পরিচিত শব্দের নতুন করে ব্যবহার এবং ভাবনার দিকগুলো ফুটে উঠেছে সুন্দর ভাবে। নারীকে স্পর্শ করার আকাক্সক্ষা প্রত্যেক মানবেরই থাকে। আর এই স্পর্শ ১ থেকে ৫ সংখ্যক কবিতায় এই ধারণাগুলোই কাব্যিক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রেম, ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে স্পর্শ করার যে অনুভূতি তা তিনি বুছিয়েছেন এই ভাবেÑ ‘এই ঠোঁট, এই হাতের তালু-/ এগুলো আমি, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম।’
মাহমুদ হাসানের মুক্ত গদ্য সাতমাথার স্বপ্নের ফেরিওয়ালা-তে বগুড়া শহরের সাতমাথার মোড়ে তার যে জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে তা তিনি উপস্থাপন করেছেন। নিজের জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশকে তুলে ধরেছেন এখানে। কবি হওয়ার স্বপ্ন, কবিতা প্রকাশের ইচ্ছা, লিটন ম্যাগাজিনের সাথে সম্পর্ক সব রকম কথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন। মৃত্যুর কাছাকাছি এসেও তিনি আজও কবিতা লেখেন। কবির জীবনে নানা কবি চলে গেছেন না ফেরার দেশে, কেউ হয়তো কবিতা ছেড়ে দিয়েছেন আবার কেউ আঁকড়ে ধরে রয়েছেন কবিতাকে এসব কথায় ভরে তুলেছেন মুক্তগদ্যটিকে।
রৌদ্রবঞ্চিতলোক শিবলী মোকতাদির রচিত মুক্তগদ্য। এই মুক্তগদ্যে তিনি কাব্যিক রূপ, ভাষা, ছন্দ প্রয়োগ করে লিখেছেন। তবে এটির ভাব জানা একটু কষ্টকরই বটে। কবিতাকে নিয়ে লেখা এই মুক্তগদ্যটি এক নতুন আঙ্গিকে লেখা। এবং তা কিছুটা হলেও দুর্বোধ্য। এই মুক্তগদ্যটিতে বারবার একটি চরিত্রেরই সন্ধান পাই তা হল ইমারত আলী।
মনজু রহমানের কবিতায় রাজনীতি, সমাজ, অবক্ষয় ও কাল উদ্ভাসিত হয়ে নারীর মুখ ও অনুভবের চিত্ররূপে। এক আলাদা শব্দ ও প্রতীকের ব্যঞ্জনায় অনুরণিত হয়েছে তার কবিতায়। আর অনেক শব্দ কবিতার অলঙ্কার হয়েছে। কবিতার গাঁথুনি, ভাষার প্রয়োগ, ছন্দ, উপমা সবকিছুই যেনো ধরা দিয়েছে তার কবিতার মধ্যে। ‘আমি কেন নতজানু হবো চপল কৃষ্ণ তোর মোহনী রূপে!/ যদি নত হই, চলে যাবো বনলতার চোখের উঠোনে।’
সর্বশেষে মনজু রহমানের কাব্য জয়তি নিয়ে আলোচনা করেছেন অনুপম হাসান। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, জয়তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার প্রেক্ষাপট আর প্রতিচিত্র। জয়তু মাতৃভূমি। আর এই মাতৃভূমিকে কীভাবে লণ্ডভণ্ড করা হয়েছে তারই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র এক নারীকে প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হয়েছে জয়তি কাব্যে।
ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা থেকেই হয়তো কবিতার সৃষ্টি, আর এই সৃষ্টির স্রষ্টা হলেন কবিরা। আধুনিককালের যে কবিতা এর সাথে জড়িয়ে আছে মুখশ্রী। কবিতায় শব্দ প্রয়োগ একটি বড় বাহক এ সম্পর্কে ঝ.ঞ. ঈড়ষবৎরফমব বলেছেন ইবংঃ ড়িৎফ রং ঃযব নবংঃ ড়ৎফবৎ আলোচ্য সংখ্যাটিতে অনেক তরুণ, প্রবীন কবির কবিতা পাই। প্রত্যেকের লেখার ধরন ভিন্ন ভিন্ন, তবে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্বল। সবই যে কবিতার গাঁথুনিতে এ্যালবাম আরও বড় হোক, সর্বত্র বিস্তার করুক। এ্যালবামের প্রতিটি পাতায় এক একটি কবিতা চিত্র হয়ে উঠুক। নবীন-প্রবীন লেখকদের দীপ্ত লেখায় এটি শাণিত হোক নিয়ত।

পাঠ : মাসিক কবিতাপত্র

মাসিক কবিতাপত্র আকস্মিক হাতে এলো সোনাপাড়ার কবি মাসুদারের মাধ্যমে। উনি স্কুলশিক্ষক। কবি ও কবিতাকর্মী। ধরাবাঁধা প্রচারবিমুখ। নেশাগ্রস্ত-মাতাল ভণ্ডামী বা স্টান্ট নয়, এমনি-এমনি আকস্মিকের খেলায় রত ওঁর কবিতা। সেই একদিন স্ব-দায়ে পাঠালো মাসিক কবিতাপত্র। গেরুয়া মলাটে ঠাসা লেখা, কোনো ফাঁক নেই, কৃপণের কৃপাণ; কিন্তু কাজ হয়েছে প্রচুর। তরতাজাও। নেশা হলো, কবে পাবো, মাসিকটি। পেলামও। এক, দুই, তিন…পর পর বারো পর্যন্ত, হতাশা কাটলোÑ যে ওদের প্রতিশ্র“তি পাই পাই করে শোধ করে দিয়েছে; যেমন বলা তেমন কাজ। তখন এই কমিটমেন্টের ভেতরে আমার কাগজটি হাতে নিই, কিছু অর্জন করার চেষ্টা করি, মিলিয়ে নিয়ে, ধারাবাহিকতাটুকুও দেখি, একের পর এক সংগ্রন্থন, অতঃপর বাঁধাইয়ে দিয়ে, কিছু ঔজ্জ্বল্য চিহ্নিত করা। অতঃপর আমার সহ-সম্পাদক রফিক সানিকে বলি ওটা নিয়ে আমাকে কাজ করতে হবে, কবিতাসংখ্যায়। সেমতে এই অনুসন্ধান, এবং পুরনো পড়াটাও আবার এক লহমায় ঝালিয়ে নেওয়া।
বলে নিই, এটি বেরোয় কলকাতা থেকে, সম্পাদকমণ্ডলী আছে, নির্ধারিত সম্পাদক চেখে পড়ে না, নানাঅঞ্চলের সব সম্পাদক, ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়িয়ে বাংলা কবিতার চর্চার কথা বলছেন। একবছরের প্রজেক্ট। বেরোয় প্রতি ইংরেজি মানের ১৫ তে। আমার হাতে ক্রম-সংখ্যায় মোট বারোটিই আছে। বিস্ময়কর যে, এরও বারোমাস্যায় মনের বদল ঘটেছে। কিছুই যে সর্বদা একরকম থাকে না, তাইতো প্রমাণ। একবার আমরা জলপাইগুড়িবাসী গৌতমগুহরায়-এর একটি মজার বই করি। সে বইয়ে অরুনেশ ঘোষ, ফালগুনী রায়দের মতো ‘লেফটিস্ট’ লেখকদের চিনে ফেলি। খুব পুলক হয়, আগে ওদের নাম তেমন জানতাম না। এই বইয়ে ওঁদের ডেডিকেশন আর পরিচর্যা সম্পর্কে খবর পেয়ে লজ্জায় গুটিয়ে যাই। এমনটাও ছিলÑ এ বাংলা ভাষায়, বাংলাভাষার এমন কমিটেড মানুষ, হায়! একবার পায় তারে কী! মাসিকপত্রটির ১-এ অরুণেষ ঘোষ-এর লেখা দিয়ে শুরু, অন্যরকম কবিতার ভাষা ‘মৃত্যুর আগের রাতে’। মলয় রায়চৌধুরী, শ্যামল কান্তি দাসসহ অনেকেই, আর শুরু হলো রাজীব সিংহের লেখা “ভালো আছো, নয়ের দশক”। রাজীব সিংহের জন্ম ৬৯ কিন্তু কথা বলছেন অভিজ্ঞ ভাষায়, সাহিত্য নিয়ে গালগল্প, কবিতা নিয়ে কথাবার্তা, পত্র-পত্রিকার রুচি আর দর্শন নিয়ে আলোচনা সন্নিবদ্ধ। রণজিৎ দাশ নিয়ে গৌতম গুহরায়ের লেখা। পরের সংখ্যায় “ব্লাড লিরিক” ও “ডেথ মেটাল” নামে লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরী, জীবনানন্দ নিয়ে জীবতোষ দাস, অনীক রুদ্রর অন্য ধারাবাহিক (অরুণ মিত্র নিয়ে), রাজীব সিংহের “ভালো আছো, নয়ের দশক”-এ পর্বের ব্যবচ্ছেদ ফালগুনী রায়। তৃতীয় সংখ্যায় উৎপলকুমার বসুসহ অনেক কবি (অ-কবিও আছেন নিশ্চয়), দীর্ঘ কবিতায় উৎপল ফকির (আগে চিনতাম না), বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ধারাবাহিকসমূহ। পরের সংখ্যায়ও কবিতার পাশাপাশি লেখক ধারাবাহিকে যুক্ত হয়েছেন এবং সমাসীন অনীক রুদ্র; অন্যরাও চলমান, এর পরে শূন্য দশক নিয়ে পরের সংখ্যা। ৬ সংখ্যাটি ‘বাংলা সনেট’ বিষয়ক। শুরু মধুসূদন শেষ একালের কবিবৃন্দ দিয়ে। দুটি সুন্দর গদ্য শিরোনাম ‘সনেটের কথা’ ও ‘বন্ধনেই মুক্তি’। ৮ম সংখ্যার মূলকেন্দ্র দীর্ঘকবিতা ‘অতন্দ্র বিমান’। লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য। সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে :
নানান প্রতিকূলতা ও আর্থিক সংকটে ধুকতে ধুকতে মাসিক কবিতাপত্রের ৮তম সংখ্যায় আমরা পা রাখলাম। মাসিক কবিতাপত্র এখনো পর্যন্ত প্রতি মাসের ১৫ তারিখে বের করতে পেরেছি আমরা তিন/চারজন বন্ধু নিজেদের পকেট খরচ, নেশার খরচ কাটছাঁট করে। পত্রিকার প্রথম দু-একটা সংখ্যা বেরোনোর পর আশ্চর্য, প্রায় একই কথা সাবধানবাণীর মতো বলেছিলেন, ফোনে, বাংলা কবিতার সর্বজনমান্য শ্রদ্ধেয় প্রবীন কবি থেকে সত্তর দশকের অন্যধারার প্রিয়কবি এবং দিল্লিনিবাসী প্রিয় সিনিয়র কবি ‘সাবধান। এবার কিন্তু শত্র“ বেড়ে যাবে তোমাদের। গালাগাল প্রশংসা সবই তোড়ে ধেয়ে আসবে এবার’। সন্তান যতো বড়ো হয়েছে, ততো দুশ্চিন্তা বেড়েছে আমাদের।
নবারুনের কবিতা এ সংখ্যাটিকে উচ্চতা দিতে সক্ষম হয়েছে। ৯তম তে আছে অনীক রুদ্রর পাণ্ডুলিপি, ধারাবাহিক নিয়মিত, তবে বিষয় পাল্টাচ্ছে। মার্কেজ আছেন ১০ম সংখ্যায়, ১২তম তে আছে ‘ঘরছাড়া’, সেই রাজীব সিংহের ‘ভালো আছো, নয়ের দশক?’
কবিতাপত্রের গুণ ও প্রাণ এর ধারাবাহিকসমূহ। রাজীব সিংহের টানা গদ্যটি ছাড়া অন্য অনেকেই ১২ সংখ্যার মধ্যে ধারাবাহিক গদ্য নিয়ে এসেছেন চলে গেছেন। কিন্তু কাজ রেখে গেছেন। তারা দায়িত্বশীলও বটে।
২.
কবিতাপত্র কবিতার কাগজ। কবিতা বিষয়ক গদ্যের কাগজ। লেখকগণ কবি, কবিতাই তাদের প্রাণধর্র্ম। বাংলাভাষার কবি ও কবিতার অনবদ্য একটি প্রচারপত্রের কাজ করেছে মাসিক কবিতাপত্র। বারো মাসের বারোটি সংখ্যা একঘেয়ামি নয়। আলাদা। মেজাজ ও ভঙ্গিও স্বতন্ত্র। স্বাদেও পার্থক্য বিরাজমান। অরুণেশ, প্রণবেন্দু, মলয় রায়চৌধুরী, অরুণ মিত্র, শান্তি লাহিড়ী, জয়দেব বসু, অমিতাভ দাশগুপ্ত, সিদ্ধেশ্বর সেন, ফালগুণি রায়, রবীন সুর, মণিভূষণ ভট্টাচার্য নানাভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। এঁদের কবিতাপ্রসিদ্ধি বা খ্যাতি কম নয়। প্রণবেন্দু তো শেরপা। জয় গোস্বামী লেখেন : ‘সমস্ত ভাঙনের মুখে গড়িয়ে পড়তে পড়তেও উঠে আসবার, ঘুরে দাঁড়াবার এই ইতিহাস প্রণবেন্দুর আজীবনের লেখার মধ্যে ধরা আছে। স্পষ্ট, একমুখী কোনও সরলরেখায় নয়Ñ ধরা আছে নানা উচ্চতায়, বহুবিধ অনিশ্চয়তার এপারে ওপারে… প্রণবেন্দুর কবিতা বাণী দেয় না, ভর্ৎসনা করে না, সভায় সফল হয় না, আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে ওঠে না…’ এরকম করে পাওয়া যায় না অনীক রুদ্রর লেখায়। তিনি লেখেন : ‘প্রণবেন্দু দাশগুপ্তকে কখনো রাগ, বিরক্তি বা উষ্মা প্রকাশের ব্যাপারে আমি দেখিনি। … তাঁর কবিতা নিয়ে সেভাবে কখনোই ভালোমত আলোচনা হয়নি পত্র-পত্রিকায়। তবু তিনি এক বিশিষ্ট কাব্য ব্যক্তিত্ব ও মানুষ…।’ অনীক রুদ্র অনালোকিত কবিদের ও কবিব্যক্তিত্বকে চমৎকার ইঙ্গিতে তুলে এনেছেন। জয় গোস্বামীর উদ্ধৃতি আবার দিই : নব্বুই পেরিয়েও অরুণ মিত্র লিখতে পেরেছেন প্রেমের কবিতা। লিখতে পেরেছেন স্পর্শের কথাই বলছি। শুধু নারী নয়, এই স্পর্শ বন্ধুত্বের, পাখি, পতঙ্গ গাছপালায়, রাস্তায় অচেনা শিশু, কাজের মেয়ে পিয়ারিয়া, থলে হাতে একসঙ্গে সবজিবাজারে ঘোরা মুখচেনা প্রতিবেশি, রংঝাল দেওয়া মিস্ত্রি, জুতো সারাইয়ের মুচি থেকে, নারকেল গাছে ঝুলতে থাকা ডাবের কাঁদি, পানের বরজের গাঢ় হয়ে থাকা, কচুপাতার রঙ ঠিকরে দেওয়া পর্যন্ত এই স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ত। জগৎজীবনজোড়া এক স্পর্শের কথা তাঁর কবিতায়Ñ সেটাই যাকে বলে প্যাশনÑ অথচ তার তীব্রতা লুকিয়ে আছে নীচে, যেন সেই কবিতার উপরে হাত ছোঁয়ালে বোঝা যায় তার স্পর্শের তাপ।’ অনীক রুদ্র ‘সময়ের অর্জন : সঙ্গদোষ বা গুণ পর্বে’ লিখেছেন : ‘বাংলা কবিতা নিয়ে কথা বলতে বলতে প্রায়শই তিনি ঝাক্ প্রেভের, ঝুলে সুপেরভিয়েল, লুই আরগঁ,আঁরি মিশো-তে চলে যেতেন। নাজিম হিকমত তাঁর প্রিয় কবিদের একজন। তবু অরুণদা আমার দেখা আদ্যোপান্ত এক বাঙালি যাঁর আত্মা ও শিকড় বিস্তৃত ছিল জন্মভূমির সুখ-দুঃখ-শোক-রাজনীতির ও বাস্তবতার খুঁটিনাটিতেই।… আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স, ইয়োরোপ ও লাটিন আমেরিকার কবিতার দিগন্ত খুলে দিতে পারতেন কবি অরুণ মিত্র।’ এভাবে অনীক বামপন্থী জয়দেব বসু নিয়ে বলেন : ‘টানা বছর কুড়ি জয়দেব মন দিয়ে কবিতাই চর্চা করেছেন। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মগ্রন্থও তার উৎসাহের বিষয় ছিল’। স্মৃতিচারণায় সত্তরের কবি শামশের আনোয়ার প্রসঙ্গেও বলেছেন অনীক রুদ্র। এ কবি সম্পর্কে গৌতম গুহরায়ের মন্তব্য : ষাটের যে কয়েকজন কবির উচ্চারণে বাংলাভাষার প্রাঙ্গনে অন্যরকমের ধ্বনি জাগছিল তাদের প্রধানতম এই শামশের আনোয়ার। মাত্র তিনটি কবিতার বই, ছড়ানো ছিটানো আরও কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ রেখে বিদায় নিলেন। শামশের কাব্যিক বিদায় নিলেন ঠিক নয়, এক ধরনের নির্মম আক্রমণের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ছিল তাঁর মৃত্যু। শামশের, যার প্রিয় গাণিতিক সংখ্যা… শূন্য।’ এভাবে প্রতিতুলনার বিবেচনা আমার মতেÑ রুদ্রর স্মৃতিচারণার পাশাপাশি মিলে যাক কবির ‘ক্লান্তি’ ও উৎসারিত অভিমুখÑ যা সম্পূর্ণতার পরিলেখ, সামগ্রিকতার সম্ভার। রাজীব সিংহের ধারাবহিকটি কবিতার রুচি ও নন্দন পরিচর্যার, উপভোগ্য ও আকর্ষণীয়। ধারাবাহিকগুলো কবিতাপত্রকে দিয়েছে বাড়তি মূল্য। যে বারোটি পর্বে ‘নয়ের দশক’ তৈরি হতে দেখি তাতে পশ্চিম বাংলার সামগ্রিক আর্থ-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, মনন-রুচি-মনস্বীতা, সাহিত্য আন্দোলনের অভিমুখ, লেখকগোষ্ঠী, লেখকদের দান-অবদান, বৈশ্বিক প্রতিমূর্তি দারুণ এক প্রতিচ্ছবি উৎকীর্ণÑ দু-আড়াই পৃষ্ঠা জুড়ে। স্যালুট, রাজীব সিংহকেÑ আমাদের সমৃদ্ধ করবার জন্যে। এতে নয়ের দশকের কবিতাভাষাটি চেনা যায়। এ ভাষা পশ্চিমবঙ্গের ধুলোমাটির উত্তাপে প্রতিশ্র“ত। সমাজ-রাজনীতির আন্দোলনে পুনর্গঠিত, রূপান্তরিত। লেখক বামপন্থা চেতনায় কবিমন ও সমাজের তল-খুঁত পর্যবেক্ষণ করেছেন, চেয়েছেন পরিবর্তনসূচক হিতকর কিছু, বণ্টন-বৈষম্য চিন্তায় কবির কাজ, বিপরীত-অশুভ সবকিছুর জন্য রাগী মনোভাবÑ লেখায় গড়ে ওঠে কর্পোরাল সুবিধাভোগীদের স্বরূপ, তাতে তৈরি শ্রেণিকাঠামোÑ এবং তার বিদ্রƒপের ভেতরে কবিতা ও কবিকণ্ঠÑ বিশেষ করে নব্বুই কবিতার প্রতিরোধী ভাষা, সমীর রায়, সুজন সেন, নিখিলেশ রায়, তুষার রায়, বিশ্বজিৎ পাণ্ডা প্রমুখÑ স্মৃতি-নস্ট্যালজিয়ায় ষাট-সত্তর-আশির প্রবাহ ও কর্মদ্যোগী সমগোত্রীয় কবিকুলÑ এক কথায় এটি চমৎকার সিরিজ। বাংলাদেশের বাইরের বাংলাভাষার আলাদা স্বর ও গড়ে ওঠা রাজনৈতিক কষ্ঠস্বর অবশ্যই নতুন পাঠ। এর বিস্তৃতি ও বিস্তার বাংলা কবিতাকে দিতে পারে বাড়তি উচ্চতা, এদেশের কবিরাও এর টেস্ট গ্রহণ করতে পারেন। এ দশকে শুধু কবিতা ও কবিকণ্ঠের কথাই নয় বিবরণ আছে লিটলম্যাগচর্চা ও বিভিন্ন ম্যাগের সম্পাদক, সম্পাদনাভাষ্য, প্রশ্নশীল গোষ্ঠীচেতনা, পূর্বাপর কবিদের ধারা ও প্রবাহ যাচাই প্রভৃতি। বৈশ্বিক যোগসূত্র, ভারত ও বিশ্বসমাচারের মাল-মসলা, নির্বাচিত স্টেটসম্যান মাও, লেনিন, মায়াকোভস্কি। রাজীব সিংহ মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এ সিরিজে, নিজের আবেগ ও অনুধ্যানও যুক্ত করেছেন তত্ত্বের পাশাপাশি। নীরস নয়, তথ্যকে ইতিহাস-পাঠে উন্নীত করা এবং তার বোধ ও বিশ্বাসকে অনুগত করা : ‘সভ্যতার অনিবার্য প্রভাবে মানুষের গোষ্ঠীজীবন ক্রমশঃ রূপান্তরিত হয় কলোনরি জটিল জীবনে। এই পৃথিবীর পরিমণ্ডল, তার জড় ও জীব, প্রকৃতি ও প্রাণী প্রত্যক্ষের অভিঘাতে বিক্রিয়া ঘটায় সৃজনশীল মনে। ¯্রষ্টার সূক্ষ্মতম অনুভব লিপিরূপ পেয়ে ওঠে কবিতায়, মূর্ত হয়ে ওঠে ছবিতে-গানে।…’ অনেক প্রশ্ন তুলেছেন, সাহিত্যকে ভাগ করা যায় না, কোনো দশকেও বাধা যায় না, কোনো অঞ্চল বা সীমায় বা কেন্দ্রে কুক্ষিগত করা যায় নাÑ লিটলম্যাগ এ পর্যায়ে স্বাভাবিক ভূমিকা গ্রহণ করে, তাই প্রশ্নের ভেতরেই বুঝি আমরা উত্তর পেয়ে যাই। তবে এ পর্যায়ে নব্বুইয়ের কবিতা সম্পর্কে একটি স্টেটমেন্ট উদ্ধৃত করি, যা পরবর্তী কবিতার ক্ষেত্রকেও চিহ্নিত করতে পারে : ‘নয়ের দশকের বাংলা কবিতা প্রধানত দুটি ধারার। যাঁরা এই সময়ে লিখতে এলেন, আশ্চর্য তাঁদের কবিতায় খুব সুস্পষ্ট ভেদরেখা টানা খুব সহজেই সম্ভব। ছন্দ ও প্রকরণ নিয়ে একটি ধারা, মূলতঃ নয়ের দশকের প্রথম ছয়-সাত বছরে এটিই প্রধান ¯্রােত। অন্যদিকে একটি চোরা¯্রােত, প্রথাগত ছন্দোবদ্ধতা থেকে মুক্তির আরেকটি ধারা। পরবর্তী সময়ে এটিই প্রধান ধারা হয়ে উঠবে। লক্ষ্য করা যায়, ছন্দ নিয়ে বেশ ভালো কাজ হয়েছে এ সময়ে। পূর্ববর্তী দশকে বাংলা কবিতা যেভাবে প্রথাগত ছন্দবর্জিত হয়ে ক্রমশ পাঠকবিমুখ হয়ে গেছিল, সেখান থেকে এই সময়ের কবিরা অনেক প্রস্তুত, তাঁরা প্রথা মেনেই প্রথাবিরুদ্ধ হয়েছেন। ছন্দ জেনেই তাঁরা ছন্দ ভেঙেছেন। সরে গিয়েছেন গদ্যের অমোঘ আকর্ষণে। নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও কম হয়নি এ সময়ে। লিরিক-আশ্রয়ী কবিতার পাশাপাশি অন্যধারার কবিতা, সেখানে ফর্ম-এর চেয়ে বিষয় অনেক বেশি গুরুত্ব পেলো। আবার টানা গদ্য, অক্ষরবৃত্তের ক্রম-ব্যবহার, স্বপ্নের মতো নির্মাণ আর বিনির্মাণ, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন ঐতিহ্যের সঙ্গে খুঁজেছে তার উত্তরাধিকার। পাল্টে গেল কবিতার চিরাচরিত ভাষা। পরিবর্তিত সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া, মানুষে মানুষে পালটে যাওয়া মূল্যবোধ, প্রেম, যৌনতা ও সম্পর্ক বিষয়ে নতুন নতুন ধারণা, নারী-পুরুষ-উভলিঙ্গ ও সমকামী সম্পর্ককে একই নিক্তিতে ওজন করবার নিজস্ব দর্শন ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ কবিতাকে সত্য কথা বলবার সুযোগ করে দিল।’ এইটিই সম্প্রতিক কবিতার মৌল পাটাতন। যার প্রবাহ এখন চলছে। সময়ে তারও পরিবর্তন ঘটবে, সে অপেক্ষার অনুবর্তনও পরিগৃহীত রয়েছে তার ভেতরে।
ষাটের অপরার্ধ্ব ও বাংলা কবিতার বিস্ফোরণ নিয়ে সন্দীপ দত্তের ধারাবাহিক, তত্ত্বপ্রবণ, হাংরি, শ্র“তি, ধ্বংসকালীন কবিতা আন্দোলন, প্রকল্পনা সর্বাংগীন কবিতা, থার্ড লিটারেচার আন্দোলন প্রভৃতির স্বরূপ-স্বীকৃতি ও ইতিহাস বয়ান। যশোধারা রায়চৌধুরীর মেয়েদের প্রতিবাদী কবিতা ভিন্ন তথ্যের প্রতিপাদ্য। আলাদা স্বাদের রচনা। কবিতা সিংহ, কৃষ্ণা বসু, তসলিমা নাসরীন, মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরুষতন্ত্র, মাতৃত্ব, নীতিবোধ, অধিকার নিয়ে কবিতার ব্যাখ্যাই শুধু নয় প্রতিবাদের বিস্তৃত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তিনিষ্ঠ রচনা তৈরি করেছেন যশোধারা রায়চৌধুরী।
৩.
মাসিক কবিতাপত্র প্রচুর কবিতাও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের কবিদের কবিতাও আছে। দুফর্মা-একফর্মার পাণ্ডুলিপিও ছেপেছে। নবারুল ভট্টাচার্যের আকর্ষণীয় পাণ্ডুলিপি অতন্দ্র বিমান, অনীক রুদ্রর এ পর্যন্তÑ অবশ্যই আকর্ষণীয়। আনন্দময়। ৬ষ্ঠ সংখ্যাটি সনেট নিয়ে। সনেটের আস্বাদনটুকু পূর্ণমাত্রা উজ্জীবিত এখানে। বিভিন্ন কবিদের প্রয়াসে তা হয়ে উঠেছে ভিন্নরূপে আস্বাদনযোগ্য। বিভিন্ন প্রয়াসে মাসিক কবিতাপত্র অনবদ্য ও আকর্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজ্যের কবিদের কবিতা ও কবিভাষা নিয়ে এই কবিতাপত্রটি একটি আকর্ষণীয় কাজ দাবি করতে পারে। যা বাংলাদেশের কবিদের অনুঘটকস্বরূপ। এবং প্রেরণারও। বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি অবশ্যই বাড়তি মাত্রা। আমরা নিয়মিত পেতে চাই। নিজেরা সমৃদ্ধ হতে চাই।

পাঠ : চিহ্ন ¬২৭

পরিবর্তনই সাহিত্যের ধারা। সংখ্যা তেরো পর্যন্ত ছোটকাগজের মেজাজ তারপর এখন পর্যন্ত সাহিত্যের কাগজ-মেজাজে প্রকাশ পাচ্ছে চিহ্ন। পরিবর্তন, পরিবর্ধনে হয়তো বেশি সময় অতিবাহিত হয় নি তবে এই পনের বছরে সাতাশটি সংখ্যার প্রকাশ সাহিত্যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা হয়তো সময়ই বিচার করবে। ধারাবাহিক বিভাগ, পাশাপাশি পঁচিশ সংখ্যা থেকে বিশেষ বিষয়ের উপর সাজানো হচ্ছে চিহ্ন। ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’ আর এবার অর্থাৎ সাতাশে এসে ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ হাতে পেয়ে অবাকই হতে হয় যেমনটা অবাক করে চিহ্নর প্রতিটি সংখ্যা। অন্যান্যের মতো এবারো আছে বিশেষ গল্প ফিচার ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’ সাথে নিয়মিত বিভাগÑ‘কী লিখি কেনো লিখি’, তিন গল্প, গুণীজনস্মরণ এবং অন্যান্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টার বিভাগসমূহ। পত্রিকাটির খণ্ডবিভাগের প্রথম খণ্ডটুকু উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত কবি আবুল হোসেনকে আর দ্বিতীয় খণ্ডাংশ উৎসর্গিত হয়েছে বিরল উজ্জ্বল বাতিঘর সরদার ফজলুল করিমের নামে। সম্পাদকীয়তে আগামী সংখ্যার কবিতার আহ্বান ও শেষ পাতার সংবাদÑ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…’ হয়তো বিশেষ একটি সংখ্যার ইঙ্গিত অথবা পরিবর্তনের আশ^াস দেয়।
বড়োদের বেড়ে ওঠা কিংবা তাদের কিশোরবেলার স্মৃতিকে সাহিত্যিক রূপ দিয়ে সাজানো ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’। আলফ্রেড খোকন, অলোক বিশ^াস, সৈয়দ তৌফিক জুহুরী, মর্মরিত ঊষাপুরুষ, নূর-ই আলম সিদ্দিকী, মৌসুমী জাহান নিশাÑস্মৃতিকাতরতায় হয়তো কখনো প্রথম ভালোবাসা অথবা ছুঁইছুঁই রিরংসা অথবা পাখি হত্যায় হৃদয়কাঁপার মতোই আনন্দের বেশি অংশ জুড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন। মনের আক্ষেপ সমবয়সী বন্ধু না পাওয়ার। আর পাবেই বা কেমনে? যদি বোধের শুরু হয় বই পড়ার অভ্যাস দিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা যা নিজের জীবনকে বদলে দিয়েছে। কাদা মাখামাখিতে বেড়ে ওঠার মাঝেও কারো হৃদয়ের কোণার দুঃখ হয়তো মনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। নতুবা কখনো তা চোখের কোণায় জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। একাকীত্বই হয়তো অনেকের জীবনের সঙ্গী হয়, আর নব্বই দশকে হয়তো একাই বাস করতে হচ্ছে ছোট্ট ক্লাসেÑমহাভারতের অর্জুনকে উপস্থাপন করার কারণে। মৃত্যু; যদি তা স্বেচ্ছায় হয়, তার কারণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো অনেকেই প্রেফার করে, অনেকেই ঘেন্না করে, তবে ওই যে ওই ছেলেটাÑযার মনের সামান্য ইচ্ছা, যদি পূর্ণ না হয় তবে? মরণকামীদের দল অবশ্যই সংগঠিত হবে। নিরাশা নয় ভরসা নিয়ে। এমনই ভরসায় কল্পরথের লাগাম ধরে হয়তো কবিই হয়ে ওঠে অনেকেই কিংবা উপন্যাসের চরিত্রে নানা এ্যাঙ্গেল থেকে নিজেকে মেলাবার চেষ্টা চলে এই অংশে। বড়োদের কাছে নস্টালজিয়া শুনতে হয়তো রূপকথার কথাই মনে পড়ে যায়। তবে এই অংশে প্রণোদিত হবার আকাক্সক্ষা বড্ড বেশি।
এই যে এতো লেখা-লেখি এটা কেনো? লেখক কি নিজের কথাই লেখেন না কি নিজের অভিজ্ঞতার কথা কলম-খাতায় উঠিয়ে আনেন। নাকি লেখার জন্য ভেতরের কোনো সত্তা এসে যাতনার সৃষ্টি করে? শেষমেষ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লিখতে বসে যাওয়া। লেখা হয়ে যাবার পর যদি তা ভালো না লাগে অথবা কেউ প্রশংসা না করে তাতে ক্ষতি থাকে না। যদি কেউ অনুপস্থিতিতে অথবা উপস্থিতিতে প্রশংসা করে বসেন তা ফুয়েলের কাজ করে। কথাশিল্পী আবুবকর সিদ্দিকীর কাছে এমনই ফুয়েল পেয়ে যান নূরুননবী শান্ত। লেখা ছাড়তে পারেন নি তিনি। লিখছেন, লিখবেন। কী লিখছেন, কেনো লিখছেন তা হয়তো তিনি জানেন না, কিন্তু যা তিনি লিখছেন তা তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছে।
বাংলা সাহিত্যের পরিক্রমায় ‘নিম সাহিত্য’ সাহিত্যের আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। বারীন ঘোষালের উপস্থাপনায় উঠে আসে রবীন্দ্র গুহ। রবীন্দ্র গুহ জন্মগ্রহণ করেন বরিশালে ১৯৪৩ সালে। তবে ১৯৭০-এ দূর্গাপুরে তিনি আরো কয়েকজনকে পেয়ে যান, যাঁদের দ্বারা উত্থান ঘটে নিম সাহিত্যের। নিম সাহিত্যের ভাবনা-ভবিষ্যৎ নিয়ে পথ চলা শুরু হলেও তা অতি অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। তার আগের হাংরির রেশ তারা ধারণ হয়তো করে নি তবে কমিটমেন্ট ছিলো দৃঢ়। আত্মপ্রতিষ্ঠা নয় বরং সাহিতকে নতুন মাত্রা উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ছিলো রবীন্দ্র গুহর। নিমরা টেনশন পোষে, স্ত্রীর সাথে বিছানায় হয়তো অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে তবে স্ত্রীকে বুঝতে দেয় না, গল্পের নীচে আগুনের তাপ দেয়, তারা সমাজের মাথা হতে চায় তবে মাথায় বসতে চায় না, যৌনতাকে তারা আদর বলে না, রাজা ও প্রজার ক্ষুধা তাদের কাছে সমান, অলস সময় কাটানোতে এদের এ্যালার্জি, নার্সিসাস-কমপ্লেক্সকে তারা পজেটিভ করে দেখে। নিম সাহিত্য ম্যানিফেস্টোÑ১৯৭০ ঈড়সসবহঃ ধং ঃড়ফধু’ং ৎবষবাধহপব-
Ñ সাহিত্য অভিজ্ঞতার ফল নয়, অবিকৃত অভিজ্ঞতাই সাহিত্য
Ñ জীবনের কোনো ব্যথা নেই, কার্যকারণের ভবিষ্যৎ নেই
Ñ শিল্পহীনতার থেকে বন্ধনহীনতার দিকে
Ñ বোধের মূলে নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করুন
Ñ ব্যক্তিগত বিস্ফোরণ চাই, সূর্যের দিকে সরাসরি তাকান।
রবীন্দ্র গুহ অথবা নিম সাহিত্যের সমৃদ্ধ উপস্থাপন করেছেন বারীন ঘোষাল। চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। যদিও নিম সাহিত্য তিন/চার মাসের বেশি টেকে নি তবুও সাহিত্য গদ্যের গতিদানে সময় ও সাহিত্যটি গুরুত্বের দাবি রাখে ।
রকিবুল হাসানের তিতাস-এর শেকড় ও কারুণ্যশ্র“তি সাদামাটা ধারাবাহিক উপস্থাপন। বয়ে যাওয়া নদীর ধর্ম। বহমান অঞ্চলের রাণি হয়ে থাকে নদী। যেমনটা তিতাস। ধারণ করে যাপিত জীবনের চিত্র; মুর্শিদি, বাউল, মারফতি, পদ্মাপুরাণ, পুঁথি; গ্রামবাংলার প্রেম, রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিবতার গণ্ডি না পেরোনোর বার্তা, নদী ভাঙনের দুর্দশা। বাসন্তীরও সারাজীবনের পরিক্রমা মূলত তিতাসের মতোই। হয়তো ভালোবাসা সে পায়, মানসিক তৃপ্তির অনুভব তার জাগে তবে তা অন্যের প্রয়োজনে। নিজেকে অন্যের করে বিলিয়ে দিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রবন্ধটির শেষের বার্তায় হতবাকই হতে হয়।
নিঃসঙ্গতার কবি ও কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুকে ‘বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য: ভাষার ভেলায় ভাসাই তরী’ আত্মপক্ষ সমর্পণ করে তারেক রেজা নানা যুক্তির মুনসিয়ানা দেখিয়েছেন। যদিও দশভূজার শক্তি ছিলো এক হাতেই তবুও বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তুলনীয় নন। তবে কবিতার জগত তাঁকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। কিন্তু অনেক গদ্য কবিতার চেয়ে বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য উচ্চমান ধারণ করে তারেক রেজার মত তেমনই। তিনি আশিস কুমার দে’র ‘আবর্ষক গদ্যশৈলী : অব্যর্থ তীরন্দাজ’ গৌতম কুমার দাসের বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি’ বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ প্রবহমানতা, গদ্যে ইংরেজি পদান্বয়ের প্রভাব, বিশেষ যুক্তির প্রভাব এবং গদ্যভাষার নবীনতাÑপ্রভাবগুলোর উপস্থিতি তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তার কথাসাহিত্যে যে বুদ্ধদেব বসুরই জীবন-ছাপ প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট তার উল্লেখ করেছেন। তবে উদাহরণস্বরূপ ড্যাস (Ñ) এর ব্যবহারের কথা তুলে এনেছেন। গদ্যে কি পদ্যে বুদ্ধদেব বসুর রাসায়নিক বিশেষণ তাঁকে মহিমান্বিত করে।
সজল বিশ^াস, সোলায়মান সুমন ও মূর্তালা রামাতের ‘শর্ষে ফুল ও কর্পোরেট ভালোবাসা’, ‘দলিত চাঁদ’ ‘একদিন রক্তের দিন’ গল্প তিনটিতে ইনার ইমোশন ও ভালোলাগার বিষয় থাকলেও গদ্যের ভাষা কিংবা কাহিনি তেমনটা আন্দোলিত করে না। তবে ভাবনার জায়গার স্থিতি কিংবা একই বই বিশেষ কাউকে উৎসর্গ করার আনন্দ, কিংবা তোরাবের মৃত্যু, বা মতির হাতেই মতির মায়ের স্বেচ্ছামৃত্যুর কারণটা কেবল হৃদয় দিয়েই অনুভব করার বিষয়।
এ পর্বে সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যশিল্পী-সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকীর স্মরণে তাঁরই সাথে কবিতাকথনের সাক্ষাৎকারটি পুনঃপত্রস্থ হয়েছে। কথা বলেছেন কবিতার আত্মা ও শরীর নিয়ে। কবিতার শব্দ নির্বাচন, মেনে অথবা না মেনে কিংবা অবচেতনায় ছন্দের ব্যবহার, বিশ^ামিত্রের ধ্যান ভাঙাতে মেনকার দেহ-ভাঙ সেটা প্রথম নৃত্য তবে মনোমুগ্ধকর। কবিতা তেমনি। আজন্ম মনোমুগ্ধকর। তবে অনূদিত কবিতা নিয়ে তাঁর আপত্তি অথবা কবিতার মূল ইমোশনের অগ্রিম বিপত্তি ঘটার ব্যপারে তিনি সন্দিহান। মূল ইমোশনের জায়গা রক্ষা করা কতোটা শক্ত এ ব্যপারে বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে অনুবাদের ঝঞ্ঝার কথা তুলে ধরেছেন।
‘একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন’ স্মরণে কামরুল ইসলাম একজন মাঝি নয় পাঞ্জেরিকেই তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সাতাশ বছর একবিংশ লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে অতিক্রম করেছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের তত্ত্বাবধানে। ছোটকাগজের নানামুখী বিতর্ক চক্রের বাইরে এসে একবিংশ পত্রিকাটিকে সাহিত্যের পত্রিকা ভেবে তার মান নির্ণয়ই করার চেষ্টা এখানে করা হয়েছে। কবিতা, কবিতাভাবনায় তরুণদের যোগ করা; তবে পরবর্তীতে তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করে। যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে কখনো সময়, কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রিকা হয়েছে একবিংশ। এই প্রাণপুরুষ শেষজীবন কাটান নিঃসঙ্গতায়। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছেন। গিয়েছেনও আমাদের ছেড়ে তবে সাহিত্য-সময় তাকে ছাড়ে নি।
‘ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স’ সরোজিনী সাহু অনুবাদ করেছেন মাহবুব অনিন্দ্য। ব্যতিক্রমী নারীবাদী লেখিকা সরোজিনী সাহু। অনুবাদে আক্ষরিকতার ভীতি থাকলেও তা কাটিয়ে অনুবাদের নির্যাস দিতে সক্ষম হয়েছেন অনুবাদক। তবে সরোজিনী সাহুর লেখায় খাপছাড়া বিষয়টি কিছুটা লক্ষণীয়। হয়তো তা প্রবন্ধের অনুবাদ সে কারণে এমনটা। নারীরা আজন্ম ব্যবহৃত হচ্ছে পুরুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসেবে। সরোজিনী সাহু তাঁর লেখনীতে নারীর স্বাধীনতা এবং তাঁর চরিত্রগুলোকে স্বাধীন করে দেখানোর চেষ্টায় সফল হয়েছেন। যা নারীদের মনোজগতের চেতনার জাগরণ ঘটাতে সক্ষম।
চিহ্নর ধারাবাহিক বিভাগগুলোর মধ্যে ‘রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাÑ ১১’ শিরোনামে এসেছে স্বননÑ একটি আবৃত্তি নির্ভর সংগঠন। তবে চিহ্ন কি কেবল রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্যের ধারাবাহিক উপস্থাপন করবে নাকি দেশের অন্যান্য যারা বা যে সংগঠনগুলো শিল্পে-সাহিত্যে শ্রম বিনিয়োগ করছে তাদের নিয়েও কাজ করবে? এ জিজ্ঞাসাটি থেকেই যায়।
মুহাম্মদ হাসান ইমাম সমাজবিজ্ঞানের মানুষ। সমাজবিজ্ঞানের কগনিশন তত্ত্বকে প্রভাবক করে মানুষ তার দ্বারা কীভাবে আবর্তিত হয় অথবা মানুষের লাজুক ও চঞ্চল হবার প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী কুলি, পিয়াগেট ও মিডের গবেষণার বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেছেন। মানুষের সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক এবং যাবতীয় পারিপার্শ্বিকতার কারণে মেয়ে ও ছেলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন। আর মনোবিজ্ঞানের নানারকম টার্মের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মিথ থেকে বেরুতে যেমন একই ধারণা ৪৬ প্রজন্মকে লালন করতে হবে তেমনই আমাদের এই প্রক্রিয়াটি থেকে বের হতে সময় লাগবে। লেখাটি ধারাবাহিক। অপেক্ষায় থাকা যায় পরবর্তী সংখ্যার জন্যÑনতুন কোনো সমাজতত্ত্বের জন্য।
চিহ্ন-২৭ এর বিশেষ ক্রোড়পত্রে বিশেষ ভাবনা ছিলো ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ নিয়ে। বাংলা সাহিত্যে ভাষার মোড় নেবার ক্ষেত্রে সবুজপত্রের ভূমিকা উজ্জ্বল। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে ( ১৩২১-এর ২৫শে বৈশাখ) সাহিত্যের আর এক গতির জন্ম নেয় সবুজপত্র। বর্তমানে দাঁড়িয়ে পেছনে একশ বছরের ব্যবধান লক্ষণীয় তবে এই একশ বছরে আমরা বিচ্ছিন্ন হই নি সাহিত্য থেকে আরেকভাবে বললে হয়তো এভাবে বলতে হবে যে, সবুজপত্রের ভাষা থেকে আমরা বেরুতে পারি নি। রবীন্দ্রনাথের গদ্যে চলিত প্রমিত ভাষার প্রবেশ বলি আর অন্যান্যদের কলমে বাতাস লেগে এক বাঁকে চলার কথাই যদি বলি তাহলে কিন্তু সমস্ত প্রশংসা সবুজপত্রেরই প্রাপ্য। চলিত ভাষাই চলছে বর্তমান সাহিত্যে। প্রমথ চৌধুরীকে নানাভাবে অনেকেই সম্পাদনায় সাহায্য করেছেন। তবে হতাশার কথা সবুজপত্রকালীন লেখা পাওয়া বা চলিত ভাষায় লেখার লেখক তেমন পাওয়া যায় না। গেলেও বর্তমানে কিন্তু পরিস্থিতি আরও বিপরীত। ঐ সব সংখ্যার কথা যে সব সংখ্যায় মূলত সম্পাদকীয় ব্যতীত সমস্ত লেখাই রবীন্দ্রনাথের, অথবা সম্পাদক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলে সংখ্যাগুলোর উপযোগ কিন্তু আজও ফুরায় নি। কিন্তু অনেকেই লিখেছেন সে সময়ে। সংকটের কথা তুলে ধরতে উদাহরণটি দেয়া মাত্র। নন্দলাল বসুর তালপাতার প্রচ্ছদটি এখনো চিরসবুজের বিজয় কেতনের সিম্বল বহন করে।
প্রাতিষ্ঠানিক কথা। সাহিত্যে একশ বছর হয়তো তেমন সময় নয়। ফল ভোগের ব্যাপারটি হয়তো আরও পরের বিবেচ্য বিষয়। তবে সবুজপত্রকে সবার নমস্কার জানানোই (সবুজপত্রবিষয়ক মতামতধর্মী লেখাগুলোতে) কী দায়িত্ব? আর যাঁরা বলতে চাইলেনও তাঁরা কিছু জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিয়ে কলম থামালেন। একটি ভাষার পরিবর্তন হলোÑতা কি নিয়ম মেনে? অবশ্যই। সেটাই প্রমাণ করেছে সবুজপত্র। তবে সে নিয়মগুলো আসলে কী? ভবিষ্যৎ! একশো বছরের পরিবর্তন কতোটা। সেটা হয়তো সাহিত্যের সময়ই বিবেচনা করবে। তবে যা বর্তমানে হচ্ছে তার সঠিক প্রভাব প্রয়োগ কী ঘটছে? নাকি অন্য কোনো দিকে চলে যাচ্ছে? উত্তর মেলে নি।
রাজধর্ম থেকে গণধর্মে নেমে আসা ভাষা তেরোটি বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে। আমরা উপকৃত সবুজপত্র-এ প্রকাশিত লেখার তালিকার মাধ্যমে।
নিয়মিত-অনিয়মিত বিভাগ, ধারাবাহিক বিভাগ, বিশেষ বিভাগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে চিহ্ন। হয়তো এটাই তার বৈশিষ্ট্য রূপ নিতে যাচ্ছে। ভিন্ন ভাবনার মিশেল হয়তো পাঠককে সমৃদ্ধ করে। তবে বিশেষের প্রতি নজর সবার ‘বিশেষ’ই থাকে সেই কারণেই সে বিষয়ের প্রাচুর্য অনুমেয় হয়। চিহ্ন কবিতার অনুপস্থিতি টিপ ছাড়া প্রিয়তমার মতোই মনে হয়। যদিও পরবর্তী বিষয়টি কবি ও কবিতা বলেই ঘোষিত। সাহিত্যের প্রয়োজনে যে বিষয়গুলো এসেছে তা হয়তো কিছুটা পরিপাটের প্রয়োজন ছিলো। গল্প মন মাতাতে না পারলেও প্রবন্ধগুলো ছিলো বেশ সময়োপযোগী। স্মরণে এসেছেন যাঁরা তাঁদের প্রণিপাত। যাঁরা জীবন থেকে তিল তিল করে সময় ও শ্রম বাঁচিয়ে ডিপোজিট করেছেন সাহিত্যে। চিহ্ন তেমনই ডিপোজিটর। সাহিত্যের সময়, শ্রম, মেধার ডিপোজিটর।

পাঠ : চিহ্ন ¬২৭ সম্পাদক : শহীদ ইকবাল : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদকের সাথে পরিচয়ের আগেই তার পাঠক নির্বাচনের তালিকায় আমি প্রথম সংখ্যা থেকেই অন্তর্ভুক্ত। যুগ পেরিয়ে শৈশব অতিক্রান্ত কৈশরে পত্রিকায় সংখ্যার টগবগে প্রাণোচ্ছল চিহ্ন এখন ২৭তম যুবক সাব্বাশ চিহ্ন। সাহিত্য মাঠের দৌড়ের প্রতিযোগিতায় যে বয়সে কৃতিত্ব সাফল্য ঈর্ষা জাগায় নিঃসন্দেহ তথাস্থানে আসন পেয়েছে নাকি নিয়েছে চিহ্ন। প্রশ্ন থেকে কিউরিসিটি নিয়ে একটু পা বাড়াতে প্রণোদনা মনে শক্তি যোগায়, সাহস বাড়ায়। ভূমিকার গৌড়চন্দ্রিকায় চিহ্ন পাঠের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খোলার ইচ্ছায় আমি মুর্খ কলম ধরেছি।
চিহ্নকে ওজনের দাঁড়িপাল্লায় মাপতে নয়। এর প্রয়াসের জাস্ট পাঠ প্রতিক্রিয়া। চিহ্নর আছে গদ্যনির্ভর বিশেষত্ব সৃষ্টিশীল আলাদা উদ্দেশ্য বা লক্ষ। দৌড়চ্ছে একটানা গতিতে। লেখক হয়ে কেউ জন্মে না। লেখক হতে হয় ত্যাগের মহিমায়, একনিষ্ঠ সাধনায়। অভিজ্ঞতার আলোকসম্পাতে সততাকে ধারণ করে। চিহ্নর লেখক বানানোর প্রচেষ্টা ধারাবাহিক প্রয়াস অব্যাহত। তরুণেরা চিহ্নের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সফলতা তাকে কতটা তৃপ্ত করেছে জানিনা। পাঠক হিসাবে অতৃপ্তি থাকছে। এ দেশে গদ্য লেখকের আকাল রয়েছে জানি। প্রশ্ন এসে জাপটে ধরে চিহ্ন পেরেছে কি সে আকাল তাড়াতে? কল্পনায় আমি মহাশূন্যে ভ্রমণ করি। আকাশে মেঘ ছুঁই। নক্ষত্র ফুল কুড়িয়ে এনে যৌনাবেদনময়ী পছন্দের সেলিব্রেটির হাতে তুলে দেই। স্বপ্নের বাসরে ঘুমহীন রাত কাটে। সাহিত্য সাধনা, চর্চা যাই বলি সবই অজানাকে আবিষ্কারের রহস্য। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার রাজকুমার। স্বপ্নের দেবীকে ধরতে পারলে রাজ্যপাঠ ও রাজকুমারি দখলসহ সুপারহিরো হালের মুম্বাইয়ের আইকন শাহরুখ খান। শ্রমসাধনার সাফল্য লাভেই আসে সার্থকতা। সময়ের ব্যবধানে দূরত্ব নিকটে আসে। চিহ্ন আমাদের কত নিকটে এসেছে, না কি আসতে চায় না। আন্তরিকতায় তাকে টেনে নিই কাছে। কাছে টানলেও দূরত্ব কমে না, কবি আর কবিতার সাথে। গদ্যের মাঠ চষে ফসল ফলিয়ে মেটাতে পারি না চিহ্নর ক্ষুধা। যুবকের দেহপুষ্টিতে চাই একই খাবার তা কী করে হয়। ভাতের সাথে মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি, ফল, মিষ্টান্ন, দই, টক, তেঁতো না হলে সুষম খাদ্য বিলাস পরিপূর্ণ হয় না। পরিবেশকের পরিবেশনের গুণেও আহারে পরিতৃপ্তি আনে। সম্পাদক তো পরিবেশক। পাতে যা পড়বে সব চেটে মুছে খাবো নুলো হাতে, এমন দায়বব্ধতা কিম্বা বাধ্যবাধকতা নিশ্চয় পাঠকের বর্তায় না। পাঠকেরও স্বাধীনতা অবশ্যই স্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে অবশ্য হাঁড়ি-চাটা প্রাণীরা ব্যতিক্রম।
চিহ্নর ঘোষণা উজানের টানে । ব্যতিক্রম দেখলাম ২৭-তম সংখ্যায়। চিহ্ন ¯্রােতে ভেসে গেল ভাটিতে। আজ হতে শতবর্ষের অতীতে কার যেন সবুজ সংকেতে। উনিশের সাহিত্যাঙ্গনে মেলে ধরা ছাতা সবুজপত্র যার ছায়াতলে ছিল বিশ্বকবির এতচ্ছত্র আধিপত্য অবাধ বিচরণ। মাসিক সবুজপত্রর শততম স্মরণে যাকে চিহ্ন-এ সনাক্ত করা হয়েছে ‘ক্রোড়পত্র’ অভিধায়। এতে দু‘বাংলার প্রবন্ধকারের অলোচনায় পরিব্যাপ্ত হয়েছে সবুজপত্র। বিশেষকরে মিথুন ব্যানার্জীর প্রবন্ধে সবুজপত্রের ভাষারীতি প্রসঙ্গে জটিলতা পরিষ্কার হয়েছে। সংক্ষেপে বলা চলে এই শতকে কথ্যরীতিতে বা চলিত ভাষায় গদ্য রচনার প্রাধান্য বিস্তারে প্রমথ চৌধুরী অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আধুনিকতার জয়গান উচ্চকিত এক কথায় যাকে বলা যায় ‘উই শ্যাল ওভার কাম’। রঘুনাথ ভট্টাচার্য তাঁর প্রবন্ধে সবুজপত্রের লেখকদের পরিচয় তাদের সাহিত্যচিন্তা ও লেখা সম্পর্কিত আলোচক সমালোচকের মতামত সবুজপত্রের প্রকাশিত লেখার সূচিক্রম তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। এছাড়াও তার লেখায় সুবজ পত্রে প্রকাশিত লেখায় সাহিত্য তত্ত্বের দ্বিত্ব মতবাদ। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ নাকি ‘জীবনের জন্য শিল্প’ সর্ম্পকিত সবুজপত্রের অবস্থান ও সম্পাদকের ভূমিকা তুলে এনেছেন। তার এ প্রয়াস চিহ্ন পাঠকদের সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে। এ সম্পর্কে ভারতের প্রখ্যাত চলচিত্রকার ঋত্বিক ঘটক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অল আর্ট এক্সপ্রেশন্স সুড বি গেয়ার্ড টুওয়ার্ডস্ বেটার মেন্টস অব ম্যান ফর ম্যান’।
সবুজপত্রের প্রকাশের কুশীলবদের উদ্যোগ ও তার বাস্তবায়ন সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্য পত্রিকার উল্লেখ বা সে সব পত্রিকার সাথে সবুজপত্রের তুলনামূলক আলোচনায় সবুজপত্রের গৌরবদীপ্ত ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পত্রিকার প্রথম বর্ষের প্রকাশনাসহ উল্লেখ যোগ্য সংখ্যাগুলোর আলোকপাত সবুজপত্রকে চেনা জানা ও বুঝার ক্ষেত্রকে সহায়ক করে তুলেছে যা পাঠক মাত্রই ঋণী হয়ে থাকবে। ক্রোড়পত্রের মূল প্রাবন্ধিকদের আরেকজন জোতির্ময় ঘোষ তাঁর লেখায় সবুজপত্র ও সম্পাদকের সাথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততা সহযোগিতা ভূমিকা অবদান কিম্বা সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান তৈরিতে ইউরোপীয় সাহিত্যের সমন্বয় সাধন কতটা জরুরি ছিল। এ নিয়ে সবুজপত্রের করণীয় বিষয়াদি বিস্তারিত তুলে এনে সে সময়ের বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা সাহিত্য প্রবেশের সূচনাপর্বে সবুজের অভিযান চালিয়েছেন। তিনি তার প্রবন্ধের সংশ্লিষ্ট সবুজ পত্রের সব সংখ্যার লেখক সূচি পরিবেশন করে সাহিত্য গবেষকদের চূড়ান্ত সহায়কের ভূমিকা পালন করেছেন।
ক্রোড়পত্র আলোচনায় সম্পাদকের লেখাটি খুবই প্রাসঙ্গিক হলেও তা পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে যথেষ্ট নয়। ক্রোড়পত্রাংশে অভিমত প্রকাশকদের তালিকা না বাড়িয়ে অন্যতর হতে পারতো। যেমন সবুজপত্রের উল্লেখযোগ্য সম্পাদকীয় প্রকাশিত যুগান্তকারী কোন লেখার পুনঃমুদ্রণ। তাহলে সবুজপত্রের শতবর্ষ উদযাপনের মূল্যায়ন ও সাহিত্যের ইতিহাস সার্বিক বিবেচনায় সম্পূর্ণতা পেতো বলে মুর্খের লব্ধবিশ্বাস।
চিহ্ন-২৭তম সংখ্যার প্রতিক্রিয়ায় পাঠক্রমণিকা অনুসরণ করলে এ নিয়ে চিহ্ন সমান আরেকটি পত্রিকা জন্মাবে অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি ভিন্ন একটি গ্রন্থ রচনা সম্ভব হবে। এই বাগড়ম্বরতা ছেড়ে পাঠক্রমে আমার ভালোলাগা উল্লেখিত অংশের আলোকপাত করছি মাত্র। চিহ্ন-এ প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধে প্রথমটি আমার একান্ত শ্রদ্ধেয় ভারতের বিশিষ্ট কবি গবেষক সাহিত্য তাত্ত্বিক বারীন ঘোষালের। আমি ভারতের অজন্তা ইলোরা দেখেছি বারীনদাকে দেখি নি। বিখ্যাত কৌরব পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশের সুবাদে দু‘যুগ নিয়মিত পত্র যোগাযোগ টেলিফোনে (এক দু‘দিন) কথা হয়েছে বারীনদার সঙ্গে। বারীনদা এখন কৌরব সম্পাদনা (অন্যের কাছে শোনা) ছেড়েছেন । তাঁর কাছে পাওয়া ই-মেইল টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ। এখন তার ¯েœহ সান্নিধ্য থেকে বঞ্ছিত। চিহ্ন-এ প্রকাশিত বারীনদার লেখা পড়ে আমি অজন্তা ইলোরা দর্শনের আস্বাদন পেয়েছি। অনুধাবন করেছি অভিনিবেশ মনোযোগে। এ লেখায় তিনি গদ্যভাঙার গদ্য রচনা করেছেন যা ক্লাসিক বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রবন্ধ পড়ে যেমন আমি গদ্যের মহাপর্বের পাঠ নিয়েছি । প্রচলিত ধারা থেকে গদ্যসাহিত্য রূপান্তরে আলাদা মাত্রা নির্মাণে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে প্রবন্ধটি সে স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর লেখার উপপাদ্য ও যথোচিত। প্রকৃত একজন কবির সাক্ষাৎকারে তার সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটন করে সঠিক মূল্যায়ন বাংলা ভাষার সমস্ত পাঠকের কাছে তুলে ধরা এক অসাধারণ আবিষ্কার। বারীনদা কবি রবীন্দ্র গুহকে চয়েস করে তিনি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিকতা নির্ণয় করেছেন নিঃস্বার্থে। এখানে তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতার বিচরণভূমিতে সন্দেহাতীতভাবে মহাজ্ঞানীর পরিচয় দিয়েছেন। এমন একটি যুগান্তকাররী লেখা উপহার দিয়ে চিহ্ন বারীন ঘোষালের প্রবন্ধের মাধ্যমে কবি রবীন্দ্র গুহকে জানার সুযোগ করে দেয়ার জন্য পাঠকের অভিনন্দনে অভিসিক্ত হবে তা বলাই বাহুল্য। বারীনদা ও রবীন্দ্র গুহ পরষ্পরের পরিপূরক হয়েছেন। কবি ও গদ্য শিল্পী হিসাবে আন্তরিক সততার উচ্চাসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন। সততার গুণে গুণান্নিত হওয়া কবি লেখকদের জন্য অপরিহার্য। বারীনদা রবীন্দ্র গুহকে নিয়ে এ লেখায় ফুল মার্ক পেয়েছেন। অ্যাবস্যালুটলি হান্ড্রেডে হান্ড্রেড। প্রচলিত গদ্যরচনার রীতি ভেঙে আধুনিক গদ্য নির্মাণের অভিযাত্রা প্রবর্তন করে নতুন ধারার দিক নিদর্শন করে সাহিত্য দিগন্তে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা রাখলেন তা আমাদের বিশাল অর্জন। চিহ্নর এ সংখ্যার এটি সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজন। বারীন‘দা আপনাকে আমার স্যালুট জানাচ্ছি। রকিবুল হাসান অদ্বৈত্ব মল্ল বর্মণের তিতাসের শেকড় সন্ধানে নেমে ঝিনুক কুড়িয়েছেন মাত্র। ঝিনুকের খোলসে ভরা মুক্তা যতটা আহরণ করেছেন তার‘চে ভাসিয়েছেন তিতাসের ¯্রােতে। লেখক এখানে উপন্যাসের চরিত্র উদ্ধৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ঔপন্যাসিকের দ্রোহের মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য দেয়া অপরিহার্য ছিল। অদ্বৈত্বর তিতাসে শ্রেণি-চেতনার বিষয়টি ঘনিষ্ঠতার সাথে জড়িত। এ ছাড়াও লেখকের অনুধাবনে সক্ষমতা প্রকাশে নিস্পৃহ রয়েছেন এ প্রশ্ন আমার বোধগম্যতার অতীত। অদ্বৈত্ব মল্ল বর্মণ নিজের উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন তিতাসের তীরে রাজা বাদশার ইতিহাস নেই। স¤্রাট সামন্ত প্রভুর ইতিবৃত্ত নেই। বাবু বণিকের ইতিকথা নেই। যা আছে তা মানুষের ইতিহাস। আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে রাজ-রাজরাদের বিলাসী জীবন ও নৃশংসতার যে কাহিনি বর্ণিত তা মূলত ইতিহাস নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো মানুষের জীবন সংগ্রাম ও তা বিবরণ। মহামতি কার্ল মার্কস যে বলেছেন মানুষের ইতিহাস মূলত শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। এই সত্যেই শিল্পিত প্রয়াস অদ্বৈত্বর তিতাস একটি নদীর নাম।
শেষ প্রবন্ধে তারেক রেজা তিরিশের ইনটেলেকচুয়াল কবি নামে খ্যাত বুদ্ধদেব বসুর কথা সাহিত্য নিয়ে বড় লেখাটি লিখেছেন। বুদ্ধদেব ইউরোপীয় সাহিত্য প্রভাবিত বাংলা সাহিত্যে সমন্বয়কারী প্রতিভাবান বুদ্ধিদীপ্ত কবি। শক্তিমান সব্যসাচী লেখক বুদ্ধদেব তার লেখনিতে সে স্বাক্ষর রেখেছেন। কবিসত্তার আধারে লেখক বুদ্ধদেব প্রজ্জ্বলিত দেদীপ্যমান। তারেক একথা স্বীকার করেছেন তার প্রবন্ধে। তদুপরি তার প্রবন্ধে গদ্য লেখক বুদ্ধদেবকে আবিষ্কারে প্রয়াস দেখিয়েছেন। কবি বুদ্ধদেব বসু সে লেখায় অনুপস্থিত। এখানে খণ্ডিত বুদ্ধদেব বসু উপস্থিত। প্রথমে বুদ্ধদেব বসু একজন কবি তারপর লেখক এভাবে তাকে মূল্যায়নের মানদণ্ডে মূল্যায়িত করাই শ্রেয়। প্রবন্ধকার উপন্যাসিক বুদ্ধদেবের উপন্যাস গল্প নাটক ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’ বুদ্ধদেব রচিত গ্রন্থের উল্লেখের মাধ্যমে। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের পাত্র-পাত্রীর আলোচনায় যে বিশ্লেষণ করেছেন তাতেও সম্পূর্ণতা আসে নি। বুদ্ধদেব মনস্তাত্ত্বিক মনের কারবারি। ফ্রয়েডিয় দর্শনের নিরিখে উপভোগী বা ভোগবাদী জীবনের প্রতি আকৃষ্ট। তাই তাঁর কথাসাহিত্যের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে আত্মকেন্দ্রিকতার প্রাধান্য লক্ষণীয়। বুদ্ধদেবের চিন্তাচেতনায় মননে-মানসে পাশ্চাত্য সাহিত্যের ধ্যান-ধারণার বাইরে সামগ্রিকতার অবকাশ ছিল না। এখানে তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বুদ্ধদেব বসু ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী বলেই মনে হয়। বুদ্ধদেব বসু তার লেখনির যাদুস্পর্শে পাঠককে সম্মোহিত করলেও গণমানুষের কাতারে সামিল হতে পারেন নি। যেমনটা হতে পেরেছিলেন তার সমসাময়িক অন্যতম কবি বিষ্ণু দে। বুদ্ধদেব জন্মদেশ থেকে নির্বাসিত বলেই দেশমাতৃকার টান দেশমানুষের ভালোবাসা প্রেমে ছিলেন নিঃস্পৃহ বিমুখ। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ছিলেন অতিশয় বিমুখ। বুদ্ধদেবের লেখায় আমিও ভীষণ আকৃষ্ট। কিন্তু তার দেশপ্রেম ও মানবীয় প্রেমে অনীহা দেখে ছিটকে পড়ি নক্ষত্রলোক থেকে গ্রহলোকে। তবুও এ কথা অনস্বীকার্য তিরিশের আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশ ও উন্নয়নে তিনি অন্যতম পুরোধা। এ কবি উনিশ শতকের সব‘চে প্রভাবশালী আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ডের (পুরোনাম এজরা ওয়েস্টন লসিম পাউন্ড) ইমেজিস্ট আন্দোলনের ম্যানুফেস্টো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইমেজিস্ট আন্দোলন সে সময় বিশ্বকবিতার আধুনিকায়নে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল এজরা পাউন্ডের নেতৃত্বে। আধুনিক কবিতার অগ্রযাত্রায় তিনি ছিলেন ইউরোপ আমেরিকার সমন্বয়কারী কবি ব্যক্তিত্ব। পাউন্ড ইমেজিস্ট আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছিলেন মূলত চীনের ক্লাসিকাল কবিতা ও জাপানের হাইকু নামের কবিতার দ্বৈতসত্ত্বা থেকে। ১৯১২-১৭ সাল পর্যন্ত ইংলিশ ও আমেরিকার সাহিত্যে এ আন্দোলন বিকশিত ছিল। ইমেজিস্ট কবিতা সম্পর্কে ইমেজিস্ট পত্রিকার সম্পাদক এমি নাওয়েল ঝড়সব ওসধমরংঃ ঢ়ড়বঃং কবিতা সংকলনের ভূমিকায় লিখেছেন মুক্তভাবে যে কোন বিষয়কে বেছে নেওয়া নিজস্ব ছন্দ নির্মাণ সাধারণ কথ্যভাষার ব্যবহার একটি ইমেজের উপস্থিতি যা হবে স্পষ্টঘন এবং গতানুগতিক কাব্য উপকরণ ও কাব্য নির্মাণ কৌশলকে পরিহার করা। পাউন্ডের একটি ইমেজিস্ট কবিতার উদাহরণ ওহ ধ ংঃধঃরড়হ ড়ভ গবঃৎড় নামের কবিতাটি হলো ঞযব ধঢ়ঢ়ধৎধঃরড়হ রহ ঃযব ভধপবং ড়ভ ঃযব পৎড়ফি চবঃধষং ড়হ ধ বিঃ নষধপ নড়ঁময কবিতাটি প্রকাশিত হ্যারিয়েট মনরোর পোয়েট্রি পত্রিকায় ১৯১৩ এপ্রিল সংখ্যায়। বুদ্ধদেব বসু নিজে ভালো কবিতা লিখতে পারেন নি সমালোচকরা বলেন। তিনি কোন ভালো কবিতা না লিখলেও ছিলেন কবিতার শিক্ষক। বুদ্ধদেব আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দকে খাঁটি আধুনিক কবি স্বীকৃতি দিয়ে সে প্রমাণ রেখেছেন।
মগজের কারফিউ ভাঙ্গার অভিযাত্রী চিহ্ন তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। অকাল মৃত্যুর অনাকাক্সিক্ষত আঘাতে হানা দেয় নি পাঠকের বুকে। এজন্য চিহ্নস্বাদে ভক্তরা স্বস্তিতে ফ্রেশ অক্সিজেন নিয়ে শ্বাসে-প্রশ্বাসে সাহিত্য ক্ষুধা মেটায়। চিহ্ন স্বাতন্ত্র্যিক ধারায় শুরুর পর থেকে ধাপে ধাপে উপরে উঠছে। আঙ্গিক-সৌষ্ঠব থেকে পরিসরে বিস্তৃতি ও বৈচিত্র আনয়নে সচেষ্ট। বেশকিছুদিন আগে থেকে চিহ্ন পলিসি পাল্টেছে। কোন একটা আবেগাশ্রিত ইস্যু নিয়ে লেখার প্রয়াস পরিলক্ষিত। ফলিত ফসল কতটা সাহিত্য আবেগের সঙ্গে খেয়ালীপনার সম্পর্ক বিজড়িত। আবেগের খনিতে উৎপাদিত খেয়াল বশে রচিত লেখা আর যাই হোক গুণমান সম্পন্ন সাহিত্য নয়। আবেগ উজ্জীবিতকরণের জ্বালানি মাত্র। এসব লেখায় সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ক্ষুধা মেটে না, মিটবে না। চিহ্নসাহিত্য ভাণ্ডারে কতটা রসদ জোটাতে সক্ষম হয়েছে ভবিষ্যৎ সে বিচার করবে। তবে এতটা বলা চলে চিহ্ন প্রয়াস সাহিত্যের সে উপত্যকায় পৌঁছে নি। ক্ষুদ্রজ্ঞানে আমি অধম প্রশ্নবিদ্ধ। এ প্রয়াস কি চিহ্নর মগজের কারফিউ ভাঙার অঙ্গীকার! আলোচ্য সংখার বিষয় ছিল ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’। এ সংখ্যার দলে ভিড়েছেন আটজন। লেখকদের বেশিরভাগ যে আনন্দে আন্দোলিত কৈশর বা কৈশরোত্তীর্ণ অবৈধ নারী প্রসঙ্গ স্মৃতিচারণের দিনলিপি নিছক কল্পনাপ্রসূত রচনায় ভরা। এ শিরোনামের তালিকাভুক্তির মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু অলোক বিশ্বাস, অনুপম মুখোপাধ্যায়, নূর-ই আলম সিদ্দিকী। আনন্দে আন্দোলনের প্রসঙ্গের লেখায় উল্লিখিতরা কেবল সফলতার সাথে উতরে গেছেন বলে বোধদয় হয়েছে।
স্মরণ অধ্যায়ে সন্নিবেশিত প্রয়াত দু‘জন কবি ও সম্পাদকের মধ্যে ফারুক সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকার পড়ে ব্যক্তিগতভাবে মনোবেদনা থেকে স্বস্তি পেয়েছি। ফারুক ভাইয়ের সাথে সু-সম্পর্ক ছাড়াও পেশাগত জীবনে দু‘জনে একই পেশার। একই স্থানে দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। একস্থানে থাকাকালে অফিস শেষে তার চেম্বারে বসে প্রতিদিন আড্ডা হতো। ভারতের হাওয়া-৬৯ পত্রিকায় আমার একটি কবিতা পুনঃপ্রকাশ করে ফুটেজ লিখেছিলেন কবির সাথে যোগযোগ সম্ভব না হওয়ায় তার প্রতিনিধিত্বশীল কবিতাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। ফারুক ভাই ফুজেট মন্তব্যে খুব খুশি হয়েছিলেন। তার বাসায় গেলে সংগ্রহ করা হাওয়া পত্রিকা আমাকে দেখিয়েছিলেন। ফারুক ভাই ভাব গম্ভীর ও ব্যক্তিত্বশীল রাশভারি মানুষ ছিলেন। এজন্য ভুল ব্যাখ্যায় অনেকেই তাঁকে অহঙ্কারী বানাতেন। তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য না পেলে তাঁকে ভুল বোঝার অবকাশ থেকে যায়। জয়পুরহাট থাকার সময় বিপ্রতীকর জন্য ভারতীয় লেখক কবিদের লেখা পাওয়ার আগ্রহের কথা জানালে আমি বারীনদা‘র কাছ থেকে একটি গদ্য এনে দিয়েছিলাম। বারীন ঘোষালের লেখা পেয়ে বিস্মিত ও খুশি হয়েছিলেন তিনি। কাজে-কর্মে বগুড়া গেলে তিনি অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর সাথে দেখা করা ছিল আমার রুটিন ওয়ার্ক। ফারুক ভাইকে নিয়ে বেশি কিছু লেখার অবকাশ কম। তার সম্পাদিত বিপ্রতীক বাংলা সাহিত্যের ছোট কাগজের ইতিহাসে মাইলস্টোন হিসাবে চিহ্নিত। ফারুক ভাই কবি হিসাবে যত না খ্যাতিমান তার অধিক বিপ্রতীক সম্পাদক হিসেবে। তিনি সম্পাদনায় ছিলেন সম্পাদকের সম্পাদক।
দ্বিতীয় আলোচিত কবি-সম্পাদক আশির দশকের খোন্দকার আশরাফ হোসেন। বয়সে না মানালেও তিনি নিজেকে আশির কবি দাবি করেছেন। মূলত আশরাফের সত্তরের কবি তালিকাভুক্ত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। স্বেচ্ছায় তিনি আশিতে অবস্থান নেওয়ার কারণ দশক শীর্ষে নিজের অবস্থান থেকে মোড়লীপনা করা। তাঁর সম্পাদিত একবিংশর প্রশংসা পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই গানের কথা স্মরণে আসে। ‘তোমার পূজার ছলে আমি তোমায় ভুলে ছিনু’। আলোচ্য প্রবন্ধের একবিংশর অতি প্রশংসার আড়ালে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে টেনেটুনে বের করা কষ্টসাধ্য। ছোটকাগজের ভাণ্ডারে একবিংশর অন্তর্ভুক্তি ও ভূমিকা অবদান যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে যা অনস্বীকার্য। একবিংশ হাতে নিয়ে আশরাফ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অনেকরদূর অগ্রসর হয়েছেন। একবিংশ ঢাকা কলকাতার স্টারদের আনুকুল্য লাভে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে এর (রাজধানীর) বাইরে সে ফোকাস পড়ে নি বলেই কেন্দ্রাভিক সাহিত্যের কারিগররা যেমন উপকৃত হয়েছেন তেমনি একবিংশর লেখার সুযোগ থেকে উপেক্ষিত বঞ্চিতদের পাল্লা ভারি হয়েছে। একজন সৎ সাহিত্য সম্পাদকের কাছে যা ছিল অপ্রত্যাশিত। একবিংশ হাতে থাকায় তার মুরিদ সাগরেদের অভাব হয় নি। কবিগোত্রের সামিলে আছি তাই সকণ্ঠে বলছি জয় হউক খোন্দকার আশরাফ হোসেনের। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। তিন গল্পকারের গল্পে ন্যূনতম স্বাদ বা তৃপ্তি মিটে নি। এরকম গল্প লিখে গল্পকারের তালিকা বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব গল্প নিয়ে আলোচনা করে পাঠক ঠকানোর ভাঁড়ামো না করাই উত্তম।
নারীবাদী লেখিকা সরোজনী সাহুর লেখার অনুবাদ মনে হয় নি, মনে হয়েছে এটি কোন মৌলিক লেখা। এ অনুবাদক তাঁর সক্ষমতা ও সাফল্যের প্রমাণ রেখেছেন। একজন সুফল অনুবাদক হিসাবে তার এবং দুর্লভ লেখা উপহার দেয়ার জন্য সম্পাদক প্রশংসার দাবিদার। নিয়মিত বিভাগ যথারীতি। সমাজ গবেষক মুহম্মদ হাসান ইমামকে সাধারণ পাঠকের কাছে যেতে হলে সরল ও প্রাঞ্জল ভাষারীতি রপ্ত করতে হবে। লজ্জাবিষয়ক প্রবন্ধটি বোদ্ধা পাঠক ব্যতীত সাধারণ পাঠকের বোধগম্যের অতীত বলে বিবেচিত হয়।
উৎসর্গের সূচিতে আছেন ল্যাটিন আমোরিকার গার্বিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম ও কবি আবুল হোসেন। শ্রদ্ধার স্মরণে দু‘জনের ছবি পত্রিকায় ছাপা হলেও মার্কেজের ছবি না থাকার কোন ব্যাখ্যা নেই। চিহ্নমেলা ও পুরস্কার প্রবর্তনে পত্রিকার আলাদা ইমেজ গড়েছে। পুরস্কার নিয়ে নানা বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। চিহ্ন সে প্রভাব থেকে মুক্ত থাকুক এ প্রত্যাশা করেও চিহ্নর অগ্রযাত্রা সাফল্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক এ হোক আমাদের একান্ত কামনা।

ঈশানের বাতাসে ছিল কিছু নিশানা

কবে, একদা সেখানে সাতটি পুকুর ছিল। কাবিখার খালটি পশ্চিম থেকে বেঁকে বায়ু কোণ ছুঁয়ে ঈশান কোণে হারিয়ে গিয়েছিল; সাতটি পুকুর সাক্ষী ছিল তার পাশাপাশি। খাল হারানোর নিখোঁজ সংবাদটি হয়তো রটে গিয়েছিল, আজ তা সকলে বোধহয় মনে রাখে নাই। সেখানে সাতটি পুকুর যে ছিল, তার একমাত্র সাক্ষী খালটি, তার খোলস বেয়ে ওদিকে গেলে গোধূলি উতড়ানো প্রহরে, হারানোর বেদনায় ফুঁ দেয় যে বাতাস, কার কান্নার মতো বেজেছিল! তখন আমি আট ক্লাসে পড়ি। সেই সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এলে মা বলেছিল—সাতপুকুরের যে তাল-খেঁজুরের বাগান, সেইখানে না-কি জ্বিন-পরিদের বাড়ি। সেখানে সন্ধ্যায় গেলে বাতাস লাগে গায়ে। গায়ে বাতাস লাগলে মানুষ না-কি আওলা রকম করে! কী করে, কী বকে; স্যান-খাওয়ার ওয়াক্তের কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না! দুইপরবেলায় আনচান করে না-কি জান।
…একদিন ভাইট্যিল বেলায়, সোজা ঈশানের দিকে সাপের ছড়ানো খোলসের মতো মৃত ক্যানালের গতর বেয়ে, পুকুর পাড়ের তাল-খেঁজুর-নারকেল গাছের চূড়ায় সভয়, সাবধানী নজর রেখে চলে যেতে চেয়েছি; কান খাড়া করে কানে আঙুল দিয়ে শুনতে চেয়েছি জ্বীন-পরীদের বিয়ের বাদ্যি-বাজনা; শুনতে চেয়েছি নয়Ñতটস্থ থেকেছি, যদি শুনে ফেলি সেই ভয়ে। সেইদিন গিয়েছিলাম, কতে দূর…
বাতাস বোধহয় লেগেই ছিল গায়ে, মা-কে তা বলি নি। তা-না-হলে সে তখন স্বপ্নে আসে ক্যান, ক্যান কয়—অমন দুষ্টমি করে না সোনা! কে সে? সে কি ইমা, মরিয়ম না-কি স্বর্ণলতা? যেই নাম হোক তার, তবু সেই নাম ইমা। সেই ঈশান কোণে ইমাদের বাড়ি। কিংবা সেইদিন তাল-খেঁজুরের চূড়ায় জ্বিন-পরী নয়, সাতপুকুরের বিলের সমতলে মিশে যাওয়া সাতটি পুকুরের আত্মার কোলাহল ছিল বোধহয়। কোলাহল না-কি বিদেহী আত্মার রুমঝুম সেই বাতাসে? সেই বাতাস যদিবা ঈশান কোণে ওঠে, ডাল ভাঙা তার কর্তব্য নয় যেন; মিঠে তালে দোলায়, ফিনফিনে হিম হিম; তন্ত্রি বাজানো সে বাতাস; তারে বাউল বাতাস কয়? তবে তা ঝড়ো নয় নিশ্চয়, অন্তত গাছেরা তা স্বীকার করে না। সূচালো খেঁজুর পাতায়, ঝিরিঝিরি নারকেলের ডালে আর তালের যেই পাতা, যেন আসমানের কোনো দানব নেড়ে চলেছে কান সেই বাতাসে; তা তো ঝড়ো নয়। সেইদিন, সেই বাতাস লেগেছিল তবে গায়ে, মা কক্খনো জানে নি। তখন বাতাসে পাতলে কান ঝুমঝুম শব্দ শুনতে পাই। তখন বসন্তদিন, শীত পেরুনো বিকেল, সকাল-দুপুর-রাত… কড়াই ফুলের হলদাভ, শিমুলের লালে ডালে ডালে বসে কাক, না-কি কোকিল! মনে বেজে চলে ‘…কী যে বরষা, কী যে বসন্ত দিন/চোখে চোখ… আমি দৃষ্টি বিহীন’। কিন্ত কারে জানায়? আমার তো চোখে চোখ রাখা হয় নাই, কেবল তার নেচে যাওয়া দেখেছি… সে ঈশান কোণের ঈশানী! গাঢ় লাল কিবা নীলে, পায়ের চপ্পলে তার ধূলি আর নূপুরের ঝুমঝুম। সে যে-পথে যায়, যদি বা ধূলি না-উড়ায় সে—মনে হয় যেন বিরুদ্ধ বাতাস। তার গমনের পথে আম ফুলের রেনুমাখা ধূলি না-নিলে শ্বাসে, আনচান বুক তবে কি দিয়া জুড়াই! ঈশান কোণে মেঘ করলে কাল কালবোশেখী হয় জানি, আবহাওয়া পূর্বাভাসে কয়; কিন্তু, সে তো হয় বৈশাখে; তবে আমার এই বসন্তে কী যে হয়, তার স্কুল ফেরার পথে ভাঁটফুলে বিকেলের শিশির মাড়িয়ে আকন্দ পাতার ধূলোয় আঁচড় কেটে তার নাম লিখে আসি; সেই নামের পাশে যোগ চিহ্নর যাদুতে যুক্ত করে আসি আমার রিক্ত নাম। তখন সাতপুকুরের মোড়ে বাবলা তলায় বান্ধা মহিষের বাথান বাবলা ফল খায়। বাবলার ডালে ডালে তখনো যেন আগুন লাগা; থোকা থোকা ফুল, জড়ানো আলোক লতার আলো, দেখে বলি—এই রূপ তার মুখ রঙ। কোমল আদরে বাবলা গাছে তার জন্য ভালোবাসা রেখে আসি, এ-পথে যাবার কালে সে যেন এই পরশ পায়!
যেই কথা গোপন রাখি; গায়ে লাগে বাতাস, মনে দেয় দোল; চোখ তখন ভিন্ন কথা বলে, পা তখন ভিন্ন পথে চলে, স্থির গন্তব্য বুঝতে পারা ঢঙে তাতে দিশাহীন দোলাচল। বায়ু চাগান দেয়া মাথায় সরিষার তেল মাখা চুলও বশে থাকে না। মুরব্বিগণ বলেন তখন—বায়ুগ্রস্ত ছাওয়াল-পাওয়াল। কী করি কখন, দুপুরের ঘুমের বেলা আমতলা গিয়ে গাছের গায়ের মাছি তাড়াই, কচি আমপাতার ঘ্রাণ শুঁকি আনমনে, তবু এইরূপে আর দুপুর কাটে না। প্রাকবিকেলে, দুপুরটাকে ফাঁকি দিয়ে উত্তর-পূর্বে হারানো ক্যানালের আত্মা ভর করলে, ফিনিক্স সাইকেলটা আর বারান্দায় থাকে না। যদি না-থাকে বাইকের চাকায় হাওয়া, তবু চলে আওলা বাতাসে; লিলেনের জামা গায়ে, স্কুল ড্রেসের নীল প্যান্ট আর রূপসা চপ্পল পায়ে সাইকেল ধায় ঈশানে ডাঙাপাড়ায়। ডাঙাপাড়ার বাতাসে কি গো থাকে অগ্নিলেলিহান, না-কি আলোরও এতো উত্তাপ থাকে! আমি বোধহয় মোমের পুতুল, মনে হয়। কিংবা, পতঙ্গপ্রায় ইমাদের বাড়ির বাহির উঠানে ছুটে যায়। যেই দোল দেখে আসি ইমাদের আমগাছে বাঁধা ঝুলনায়, তার অনুছন্দে দোলে দশদিক। ভূ-তলে দেহ ভেলা ভাসিয়ে মান্দাসি হই পদ্মাপুরানের। এই বেহুলা যদি আসে মাঠের সবুজে, চারা মসুরের পাতা পিষে তার রসে ধুয়ে দেবো তার পা; এ মতন ধ্যান ভাঙে মসুরবীজ খুঁটে খাওয়া পায়রার দল ফটফটায়া উড়ে গেলে উড্ডীন পাখার ধ্বনি বৈকল্যে; যেন বা সহ¯্র কলতালি রোল, তখন পশ্চিমে সুর্যের তীর্যক চোখে মাখা সোনালি উপহাস! সবুজ ঘাসের সাথে এমন বন্ধু ভাবাপন্ন হলে না-কি কেন্নোরা নাক-কান দিয়ে মগজে ঢুকে যায়; ফলে গেঁয়ো রাস্তার বাঁকে বাটুল গাছের ঘাড়ে ঠেকনা দিয়ে রাখা ফিনিক্স সাইকেলে ফেরা হয় ঘরে কাঁচা রাস্তার মেরুদণ্ড বরাবর। ঘরে ফেরার চোখে সন্ধ্যাবিদীর্ণ আসন্ন সকাল, স্কুলঘর, বারান্দা, স্কুলমাঠ আর ছাত্রীকমন রুম আর নীল ফ্রকের রূপালি জরির ঘাগরার কাস এইটের সিলেবাসবিহীন পাঠ।
এই-বেলা জানি মানুষের জীবনে কতো কতো গল্পের জন্ম হয়। সময় পিঠে চেপে বসলে মানুষ এমনি-ই দৌড়ায়, আর পিছনে গল্প পড়ে থাকে। ‘কী করিলে কী হয়’, এই শিরোনামের রেলের হকার থেকে বাবার কেনা বই পড়ে তখনো বোঝা যায় নি—কারণ বিনা হয় না কার্য সাধন। ফলে ঘটনার জন্ম হয়, জন্ম মানবকূলে ও সমাজে, এই কারণেই। তবু, সেইদিন করতে হয়েছিলো গল্পের আয়োজন, যাপনের নয়। যাপনের গল্প তবে সর্বদা যথেষ্ট নয়। সময়কে পিঠে নিয়ে নবম শ্রেণিতে উঠে আসি, সেই কালে সাতপুকুরের বিলের পাওটা পথে মেটে থালার মতো পুকুরের তল থেকে উঠে আসে শাপলা। প্রথমে মাথায় বেণী, গোলাপি ফিতায় বাঁধা, যেন বা শাপলার পাপড়ি পিঠের সবুজ গোপন করে বুকের গোপালি তল চিতিয়ে ধরে হেমন্তের সকালের রোদে; এর পর একে একে উঠে আসে কাঁধ, সাদা ওড়না, নানান রকম পাতার ছাপে বিচিত্র নীল-বেগুনি-সবুজাভা-আকাশির কামিজের পুতুল নাচ; সাদা সালোয়ারের প্রান্তে আঁচলের খুঁট দাঁতে ধরা লাজুক কিশোরীর মতো চোরা মুখ উন্মোচনে আসে রূপালি নূপুর, হাওয়াই চপ্পলে ওড়ানো ধূলির গঞ্জনা তোয়াক্কা না-করে। তার সাথে খুব ভাব হয়। ঢুকে পড়া যায় ইমাদের গল্পবৃত্তে; শাপলা সেই দোর খুলে দেয়। শাপলা-ইমাদের সাথে খুব ভাব হলে তখন অনেক অনেক গল্পের দরকার হয়। ফলে গল্পের জন্য অভিযানে যেতে হয়, গল্পের জন্য ভাবনা হয়, গল্পের জন্য দুপুরের ঘুম কিংবা সন্ধ্যায় পড়তে বসা হয় না। সুতরাং হেমন্তের সন্ধ্যায় পড়তে বসা হয় না শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকে। এক শেয়াল ডাকলে অনেক শেয়াল ডেকে ওঠে, আর আমার, আর আমাদের শেয়াল তাড়াতে আফাজ বাঙালের বাঁশঝাড় কিংবা যুগোল সরকারের পুকুরের পাড়ে যেতে হয়, যদিও শীতের আগমনীতে হেমন্তের মধুশীত তখন। কিন্তু, মনে হয় কী গরম সে-আবহাওয়া! শরীরের কার্বোহাইড্রেট ভাঙা উত্তাপের জন্ম হলে স্কুলের সাধারণ বিজ্ঞানের তাপবিদ্যুৎ অধ্যায় হাতে কলমে পড়া হয়ে যায়। বহু দূর দৌড়ে গেলে শেয়াল পাওয়া যায় না-মনে হয়, কাল তবে কি শোনাবো ইমাদের! তবু মনে হয়–নাহ, পাওয়া যাবে। পেয়ে যাই, পুকুর পাড়ের নরম কাদামতো মাটিতে শেয়ালের পায়ের চিহ্ন, মুরগি কিংবা হাস কিংবা অচেনা পাখির পালক। তবু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, এগুলো আসলে মুরগির পালক, নিশ্চয় বারেকের মায়ের সেই মুরগিটার, পরশু সন্ধ্যায় যেটি খোয়াড় থেকে খোয়া গেল; যদিও হতে পারে পুকুরে চরা হাসে তা, কিন্তু গল্প হবে বারেকের মায়ের আছাড়ি-পিছাড়ি কান্নার দৃশ্য সংম্বলিত। আর আমাদের ডহরে শেয়ালেরা সন্ধ্যায় মাছ খেতে আসে আমন ধানের নাড়ার ভিতর, মাছ খেতে গেলে কাঁটা বেঁধা গলায় শেয়াল কেমন খক খক কাশে তার গল্পও তুলে রাখা হয় ইমাদের জন্য। কিংবা পুবের জানালা খুলে সন্ধ্যায় আর পড়া হয় না, কেন না, সাতপুকুরের বিল পার তাল-খেজুরের বাগানে সন্ধ্যার পর জ্বিন-পরিদের মেলা বসে; মা এমন বলেন। তখন পুবের জানালা খুললে সন্ধ্যা উৎরালে আমিও দেখিÑদবির ফকিরের পুকুর পাড় থেকে একটা আলোর কুণ্ড দপ করে জ্বলে উঠে লতাইড়ি জবেরের বাপের মৃতপুকুর পাড়ের বেত ঝাড়ে গিয়ে বসে। সুতরাং ভাবনা হয়, ভয় হয়। এমন ভয়ের লোম শিউরানো গল্পটি শোনাবো ইমাদের, এমন পুলকের নিঃশ্বাসে নাকি সাতপুকুরের বিল তাড়ানো খেতি বাতাস ঢুকে পড়ে ঘরে, বোঝা যায় না, তবে কেরোসিনের টিমটিমে বাতি আর টিকে না। পড়া হয় না। অনেকক্ষণ ঘুমও হয় না। এমন ভয়-লাগা পথে শাপলা তবে কীভাবে আসে! একলা আসার পথে যদি কোনো দিন তুলে নিয়ে যায় জ্বিনে! জ্বিনেরা না-কি পরির মতন মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়, আর পরিরা না-কি রাজপুত্রের মতো ছেলেদের, আর বিয়ে দেয় তাদের স্বগোত্রে। কিংবা যদি ইমাকেই তুলে নেয়, তবে কী উপায়ে উদ্ধার করা যায়, কী কী যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করা যায় জ্বিনদের বিরুদ্ধে; এই রোমাঞ্চে ঘুম পালায়। এক রাতে মনের সেলুলয়েডে যে কতো কতো আলিফ লায়লা কিংবা সিন্দাবাদের বা আরব্য রজনীর এপিসোড পার হয় হিসেব থাকে না। ফলে, তোমার কতো গল্প চাই ইমা! কতো!
কোথায় আছে মানুষের এমন একান্তের আড়াল! যদি কেউ দেখে ফেলে! কোথাও কি আছে? চিঠির ভাষ্য সামান্য ছিল। কিন্তু তখনো জানা যায় নি কী আছে চিঠিতে। তখন আরো এক বসন্ত চলে আসে। মাঠে মাঠে আখের খেত নাই, কাশবন নাই; নূর দাদার উলুবন ছিল। শুনেছি উলুবনে বড় বড় দাঁড়াস সাপের বাসা, যদিও কোনো দিন দেখি নি, কিন্তু খোলস তো পড়ে থাকতে দেখেছি; সুতরাং বিশ্বাস দৃঢ়; ফলে চিঠি পড়ার আড়াল কোথায়? চিঠি পড়তে গেলে তুতুল দেখে ফেলে, আজগর পিছু নেয়, সেহাম আব্বাকে বলে দেবে বলে হুমকি দেয়; ফলত, গোল করে ভাজ করে হাফ প্যান্টের সেলাইয়ের ভিতর লুকানো চিঠি আর পড়া হয় না। জানা হয় না ইমার মোহন কথা, দুর্লভ অক্ষর-বিন্যাস, আনাড়ি শব্দ সমাবেশ। তারপরে দাঁড়িআলার (দাঁড়িঅলা নামের বহুব্যবহারে উনার আসল নামটি প্রবীণতার সম্ভ্রমে ঢাকা পড়ে) পুকুরের পেছনে যেই ভাঙা কবর তার পাশের খেঁজুর ঝোপের আড়ালে সেই চিঠি পড়তে বসলে কবর থেকে যে শেয়ালটি বেরিয়ে দৌড়ে পালায়, মনে হয়েছিল কোনো প্রেতাত্মাই বোধহয়, কেনো না, প্রথম পলকে দেখা গিয়েছিল তার পা ছিল শূন্যে ভেসে আর ভয় জড়ানো দিশেহারা চোখের রঙান্ধদোষও বোধহয় দেখা দিয়েছিল সেই সময়; ফলে এরপর কিছুক্ষণ আর চোখে কোনো অক্ষর দেখি নি। অকাট রোমাঞ্চবিরহিত শেয়াল। অবশ্য এর আগে-পরে কখনো জানতে পারি নি শেয়ালদের আসলেই কোনো রোমাঞ্চরসবোধ আছে কী-না। যদিও পড়া গিয়েছিল সেই চিঠি, কিন্তু পাঠপর তার লুকানোর কোনো স্থান ইহজগতে সংকুলান হয় না।
দিশেহারা হবার কিংবা দশদিকে ছোটার দিন সেদিন কিংবা আরো অনেক দিন। কিংবা, সে-সকল দিনে মন নাচিছে ঘূর্ণিবায়। আমাদের স্বাধীনতার দিন, আমার স্বাধীনতার দিন ছাব্বিশে মার্চ। হিসাব মৌকুফের দিন। মাত্র পঞ্চাশ টাকা পকেটে থাকলে আর কিছু লাগে না। সারাদিন, সারাদিন! যেমন খুশি তেমন সাজো, বস্তাদৌড়, রিলেরেস, হাইজাম্প, বাদ্যের তালে তালে বালিশ খেলা বা চেয়ার নাচ, বিস্কিট দৌড় আর ইমার নীল ফ্রকে লাল পাজামার ঘেরে রূপালি নূপুর আর ঠোঁটে লাল আইসক্রিম। সারাদিন ঘোরাঘুরি, দৌড়াদৌড়ি আর দুপুরে না-খাওয়ার ক্লান্তি ভুলে যাই আইসক্রিমসিক্ত ইমার ঠোঁটের শীতল লালিমায়। কতোবার কতো ছুতোয় তার কাছে যাই, পাশে বসার বাহানা নানামাত্রিক, তাকে হাসানোর কলাবিদ্যা না-জানায় জোকার হয়ে থাকি; কেনো না, দুর্গাপুরের মাঠে আর হাপানিয়ার বিলের মসুর আর ছোলা খেতের সাদা পায়রার নাচানাচি আমি ভুলতে পারি না, নেশা লাগে; ইমার হাসিতে সেই পায়রার নাচ দেখা যায়। নীল ফ্রক, স্বর্ণলতার আভামাখা চুলের প্রতিবেশে সেই হাসি এক ঝাঁক সাদা পায়রার মতো উড়ে বেড়ায়। কিংবা ষোলই ডিসেম্বরে বিকেলে মুরগি বা হাসের ডিম দিয়ে বনভোজনের খেলা চলে সন্ধ্যা উৎরানোর কালব্যাপী। বড় বড় ঢেলা মাটির ত্রিকৌণিক অবস্থানের মাটির চুলায় আলু-ডিম একসাথে সিদ্ধ হয়। সকলের ঘর থেকে আনা প্রত্যেকের একপোয়া করে চাল জমিয়ে একপাতিলে ফুটতে ফুটতে সাতপুকুরের বিলে সন্ধ্যা ঘনায় আর বাতাসের হিম বাড়ে। তখন গা কিংবা মন ভারি হয়। বনভোজনের রান্না শেষের কালে খেতে আর উৎসাহ থাকে না। রান্নার প্রথম ভাত আগে ভুতেরে ছিটায়, নচেৎ আছর ঠেকানো যায় না—অন্যরা বলে। বিল পেরিয়ে বাতাস মৃতপুকুর আর খালের ধারের খেঁজুর নারকেল গাছে শনশন গীত জুড়লে ইমার কথা মনে পড়ে, বাতাসের সব হিম চোখে ভিড় করে; আমি কেঁদে ফেলি। অন্যরা ভয় পায়, আমার আচরণে বাতাস লাগার লক্ষণ স্পষ্ট হলে, সকলে সাবধানে আমাকে নিয়ে ঘরে ফেরে। মা শুনে বকে, খুব বকে, খুব। আমার শরীর খারাপ হয় না যদিও, মন খারাপ হয়। কিন্তু পর দিন হুজুর আসে, অনেক মন্ত্র পড়ে কাঁসার থালে ফুঁ দিয়ে আমার পিঠে লাগায়, বার বার; কিন্তু লাগে না, হুজুর রেগে গিয়ে বাতাসেরে দোষায়, বলে—বড় ত্যাঁদড় বাতাইস গো! মা কিংবা হুজুর এ-বাতাসের উৎস বোঝে না। তারপর অনেক অনেক হাসি-কাঁদি, নাচি-কুঁদি মা আর সকলের চোখ এড়িয়ে; এই বাতাস আরো অনেক অনেক দিন গা ছাড়ে না!

হায়! সেদিনের ঝড়টা কি কখনো…

দোলা বৌদির কথা মনে পড়ে আজও। দোলামনি নামের ভিনপাড়ার মেয়েটি যেদিন আমাদের দোলা বৌদি হয়ে এলো সেদিন আমরা বাড়ির সবাই দল বেঁধে দেখতে গিয়েছিলাম। বউ দেখার পর আমাদের একেক জনের একেক মন্তব্য। আমার কাছেও মন্তব্য জানতে চেয়েছিলো আমার ছোটদি। সদ্য কৈশোরের আমি তখন বুঝে কিংবা না বুঝেই মন্তব্য করেছিলাম—কি সুন্দর! ছোটদি বলেছিলো—ঝাক্কাস! আর মেজদির মন্তব্য—দোলামনি সত্যি মনে দোলা দেওয়ার মতো। মেজদির এই মন্তব্যটির সাথে একমত হলো অনেকেই। বিশেষ করে আমার পিসতুতো দাদা বিনয়। মেজদির কথাটা শুনতেই বিনয়দাও মন্তব্য করে সত্যি মনে দোলা দেওয়ার মতো। কথাটা বলেই বিনয়দা মেজদিকে কী একটা ইশারা করে। আর সেই ইশারায় মেজদি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। সুন্দর চেহারার মেজদির মুখটাকে সেদিনই প্রথম আমি বিকৃতভাবে ভ্যাংচাতে দেখি। বিনয়দার ইশারা মেজদির মুখ ভ্যাংচানো কোনটিরই মানে সেদিন বুঝিনি। এখন চেষ্টা করলে হয়তো একটা মানে দাঁড় করাতে পারবো। কিন্তু সেই চেষ্টাটা আর করা ঠিক হবে না। বিনয়দা এখন আমার মেজদির স্বামী। সেই দিনের বছর খানেক পরেই বড়দিরও আগে মেজদির বিয়ে হয়। ভালোই আছে দুজন। তবে খারাপ আছে বড়দি আর ছোটদি। মেজদির কারণে মাঝে মাঝেই কথা শুনতে হয় তাদের। অমলদা, মানে আমার বড়দির স্বামী—মুখের ভাষায় কোনো লাগাম নেই তার। গালিগালাজে চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার না করে ক্ষান্ত হয় না। পাছা থেকে শুরু করে শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যা নিয়ে গালি তৈরি বাদ যায়। সত্যিই বলছি আমার গালি শেখার হাতেখড়ি ঐ অমলদার কাছেই। বড়দিকে যখন গালিগালাজ করতো আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতাম। কোনো গালির মানে বুঝতাম আবার কোনো গালির বুঝতাম না। গালির ভাষায় কখনো কখনো লজ্জা পেতাম আবার কখনো মজা পেতাম। আমার খুব মনে পড়ে অমলদা একদিন রাগের মাথায় বড়দিকে গালিগালাজ করছিলো আর আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে তা শুনছিলাম। হঠাৎ অমলদা বলে ওঠেছিলো, ‘খানকি মাগি, মুখের উপর পেচ্ছাব করে দিলে তখন ঠেলা বুঝবি।’ আমি তখন খানকি মাগির মানে বুঝি নি। তবে মুখের পেচ্ছাব করে দেওয়ার কথা শুনে হা হা করে হেসে ওঠেছিলাম। হাসি শুনে বড়দি এসে আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি কাঁদতে শুরু করলে বড়দিই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আমার চেয়েও জোরে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করে। আমি আমার কান্না থামিয়ে বড়দির মুখের দিকে চেয়ে থাকি। আঘাত পেয়ে নয় আঘাত দিয়েও যে কেউ কাঁদতে পারে সেদিনই প্রথম দেখি আমি। তারপর বড়দির বাড়িতে যাওয়া হয় না অনেকদিন। যে বড়দি আমাকে দুই সপ্তাহ না দেখলেই খবর পাঠাতো বারবার সেই বড়দি আমাকে টানা এক বছর আর ডেকে পাঠান নি। কেনো ডেকে পাঠান নি সেটিও বুঝতে পারি নি তখন। আমার গায়ে গতরে বড় হওয়াটা মানসিক বড় হওয়ার চেয়ে অনেকটাই বেশি ছিলো। তাই অনেক কিছুই অনেক সহজেও বুঝতে পারতাম না। এর পেছনে কারণও ছিলো। ছোটবেলা থেকেই পড়–য়া ছেলে হিসেবে আমার যে খ্যাতি তা এসেছিলো সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়াশুনা করবার জন্য। খেলতেও পর্যন্ত যেতাম না আমি। বন্ধু-বান্ধব বলতে ক্লাসের সকল সহপাঠী। কেননা কারো সাথেই বিশেষ কোন সখ্যতা ছিলো না আমার। আমার বড়দা তো মাঝে মাঝেই হুঙ্কার ছাড়তেন— ‘পোয়াতিটা ঘর থেকে বারায় না ক্যান?’ পোয়াতি কী? দাদা আমাকে কেনো পোয়াতি বলতো তাও বুঝতাম না। একদিন বই ঘেঁটে পোয়াতির মানে বের করে প্রচুর কাঁদলাম। তারপর মা কাছে ডেকে বলেছিলো— ‘সারাদিন ঘরের ভিতর থাকিস তাই তোর দাদা অমন কথা বলে। একটু বাইরে যাবি, ঘুরবি, খেলবি দেখবি তখন আর বলবে না।’ তারপর থেকে হঠাৎ করেই পাল্লা দিয়ে আমার বাইরে বেরোনো শুরু হলো। যে আমি ক্লাসের বাইরে এক মুহূর্তের জন্যও বাড়ি থেকে শুধু নয় বরং ঘর থেকেও বের হতাম না, রাতে ঘুমানোর আগে কানের সাথে এলার্ম ঘড়িটা গামছা দিয়ে বেঁধে রাখতাম যাতে সময়মত উঠে পড়তে বসতে পারি সেই আমি পাল্টে গেলাম। আমার অনেক বন্ধু হলো। স্কুলের বাইরেও বাড়ির বাইরে সময় কাটানোর শুরু হলো আমার। আমার এই শুরু হওয়াতে প্রথম সহায়তা করলো বড়দি। দু-সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমাকে ডেকে পাঠাতো। বড়দির বাড়িতে যেতে আমার ভালো লাগতো না মোটেও, তবু যেতাম। কেন যেতাম বা যেতে চাইতাম খুব একটা বুঝতাম না। সেটাও একদিন বড়দা-ই বুঝিয়ে দিলেন। একদিন অমাকে নিয়ে হাাসহাসি শুরু হলো। হাসির কারণ বড়দার কথা। শুভাশিস কি আর পোয়াতি থাকতে চায় না নাকি? দাদার এই কথাটাতেও অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। তবে কষ্টটা বেশিক্ষণ টেকে নি। কেননা পরক্ষণেই মনে হয়েছিলো আমার পোয়াতি নামটা ঘুঁচেছে। মেজদির বাড়িেেত যাওয়া হতো না আমাদের কারোরই। ছোটদির বাড়ি অনেক দূর। বছরে একবারও যাওয়া হয়ে ওঠে না। দীর্ঘদিন বড়দির বাড়ি থেকে ডাক বন্ধ হয়। কিন্তু আমি ততদিনে আর ঘরে বসে থাকার পাত্রটি নেই। কারণে-অকারণে আমি বাড়ির বাইরে যাই। আমার বেশ কিছু মন্দ বন্ধুও হয়। হ্যাঁ মন্দ। ওরা টাকা বাজি রেখে মার্বেল খেলে। একজন তো আনছার বিড়ি টানে। আমাকেও বেশ কয়েকবার বিড়ি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলো, নে একটা টান দে। তিন পোয়া দুধের কাজ হবে। আমি বিড়ির বিশ্রি গন্ধটা সহ্য করতে পারি নি বলেই হয়তো টানটা দেয়া হয় নি। তা না হলে আমার নামও হয়তো হয়ে যেত বিড়িখোর শুভাশিস। আমার এই বন্ধুগুলো মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলতো তা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়তাম। আমার এই আকাশ থেকে পড়াতে তারা আমার একটা নাম দিলো—ভোদাই। এই নাম নিয়ে তুমুল গণ্ডগোল বাঁধানোর ইচ্ছে হয়েছিলো আমার। কিন্তু পারি নি। আমার বুকের পাটা ওদের সাথে লাগার মত শক্ত হয় নি তখনও। তাছাড়া ওরা যেসব কথা বলতো ওরকম কথা আমি বলতেও পারতাম না। একদিন স্কুলঘরের পেছনে আমবাগানের পাশে ওরা সবাই মার্বেল খেলছিলো। আমি ওদের বইপত্র ও ব্যাগ নিয়ে বসে ছিলাম। বসে ছিলাম না পাহারা দিচ্ছিলাম। এমন সময় দোলাবৌদি ঐ দিক দিয়ে একা একা হেঁটে যাচ্ছিলো। প্রিন্টের একটা জর্জেট শাড়ি পরনে, কপালে লাল রঙের একটা ইয়াবড় টিপ, মাঝ কপাল পর্যন্ত সিঁথির সিঁদূরে দোলা বৌদিকে লাগছিলো অপূর্ব। সেদিনও আমার বুকের থেকে সেই কথাটিই বের হয়েছিল—কী সুন্দর! আমার বন্ধুরাও দোলাবৌদিকে দেখে মুগ্ধ হলো। তবে আমার মতো ‘কী সুন্দর’ কারো মনে হলো না। আমার যে বন্ধুটা আনছার বিড়ি টানতো ওর কাছে দোলা বৌদিকে একটা মাল মনে হলো। ও তো বলেই ফেলল-মাল একটা বৌদি। বৌদিকে মাল কেনো বলেছিলো সেই মুহূর্তে সেটাও আমি বুুঝতে পারি নি। আমি যে বুঝতে পারি নি তা ওদের বুঝতেও দিলাম না। কেননা দোলা বৌদিকে কেনো মাল বলা হলো জানতে চাইলেই ওরা যে শুরুতেই আমাকে আবার ভোদাই বলবে তা আমি ততোদিনে বুঝে ফেলেছিলাম। দোলা বৌদি হাঁটতে হাঁটতেই কথাটা শুনে ফেলেছিলো। আর কথাটা শুনতেই থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের সবার দিকে তাকায়। দোলাবৌদির তাকানো দেখে ওরা সবাই দৌড়ে পালায়। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার দাঁড়িয়ে থাকা দেখে আনছার বিড়ি টানা বন্ধুটা চিৎকার করে বলেছিলো– ‘ঐ শালা ভোদাই, দাঁড়ায় আছিস ক্যান, পালা’। ওর কথা শুনে আমি বুঝতে পারি দৌড়াতে হবে। দৌড়ানো শুরু করবো এমন সময় দোলা বৌদি বলেছিলো– ‘শুভাশিস, এদিকে এসো’। আমি আর দৌড়াতে পারলাম না। ধীরে ধীরে হেঁটে দোলাবৌদির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
‘তুমি ওদের সাথে কি করো?’
‘বৌদি ওরা আমার বন্ধু।’
‘ঐ খারাপ ছেলেগুলো তোমার বন্ধু!’
দোলা বৌদির মুখে খারাপ শব্দটা শুনে আর ওদের দৌড়ে পালানোর কথা মনে পড়ে। আমি দোলাবৌদিকে আমচকা একটা প্রশ্ন করি— ‘বৌদি মাল কি খারাপ কথা?’
আমার এ কথা শুনে দোলা বৌদি প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলো তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। বলে— ‘চলো আমার সাথে।’
তারপর থেকে দোলা বৌদি আমার নতুন বন্ধু হয়ে গেল। বৌদিতো সাফ সাফ আমাকে সেদিন বলে দিয়েছিলো— ‘যদি বাইরে বের হতে ইচ্ছে হয় সোজা আমার কাছে চলে আসবে। তবু ঐ বন্ধুদের কাছে যাবে না।’ বৌদি যখন কথাটা বলেছিলো তখন কথাটাকে খুব আমলে না নিলেও বৌদির আদর আপ্যায়ন আর মজার মজার গল্পে আমলে না নিয়ে পারি নি। দোলা বৌদি শুধু দেখতেই সুন্দর না কথাও বলে সুন্দর। কথায় মুগ্ধ হওয়ার শিক্ষাটা দোলা বৌদির কাছে প্রথম শেখা আমার। সেই মুগ্ধতার টানেই রোজ বিকেল আর সন্ধ্যা কাটতে শুরু হয় দোলা বৌদির সাথে। কম দুষ্টু ছিলো না দোলা বৌদি। আমাকে মাঝে মাঝেই সন্ধ্যাবেলা পাশের বাড়ির বাঁশঝাড়ে নিয়ে যেত। আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে লটকো গাছে উঠে লটকো পাড়তো। দোলা বৌদির সাহস আর গাছে ওঠা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। আমার অবাক হয়ে যাওয়া দেখে হাসিতে লুটিয়ে পড়তো বৌদি। একদিন আমি তার হাসির কারণ জানতে চাইলে দোলা বৌদি বলে উঠেছিলো— ‘মরদ হও দেওর বাবু, আর কত কাল!’ বৌদি আমাকে মরদ হওয়ার কথা কেনো বলেছিলো তাও সেদিন বুঝতে পারি নি। মরদ মানে তো ছেলে। আর আমি তো ছেলেই। নতুন করে ছেলে হওয়ার কি আছে? আমি কি মেয়ে নাকি! আমার ভাবনার কথাটা দোলা বৌদিকে অনেকবার জিজ্ঞেস করতে চেয়েও পারি নি। হঠাৎ করেই দোলা বৌদির স্বামী কার্তিকদা চিটাগাঙ থেকে চলে আসে। একটা সোয়েটার কোম্পানিতে চাকরি করতো সে। কোনো এক কারণে চাকরিটা তার চলে যায়। কার্তিকদা আসার পর আমার দোলা বৌদির কাছে যাওয়া কমে যায়। কমে যায় বললে ভুল হবে, আমি গিয়েছিলাম কিন্তু দোলা বৌদি তেমন করে সময় না দেয়ায় ফিরে আসতাম। দোলা বৌদির আমাকে সময় না দেয়াটাতে আমি ভীষণ কষ্ট পেতে লাগলাম। কেন কষ্ট পেতাম তাও তখন বুঝতাম না। না বুঝেই কষ্ট পেতাম আমি। একদিন সেই কষ্টটা আরো দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা বেলায় দোলা বৌদির বাড়িতে গিয়ে দেখি কার্তিকদা দোলা বৌদিকে ভীষণ মারছে। একটা মানুষ একটা মানুষকে অমন করে মারতে পারে তাও জানতাম না আমি। দোলা বৌদিকে কেনো মারছে জানতে বড় ইচ্ছে করছিলো কিন্তু বৌদির মার সহ্য করতে না পেরে মুখ লুকিয়ে ফিরে আসতে থাকি। আসার সময় কার্তিকদার একটা কথা আমার কানে আসে— ‘মাগি নাঙ ধরেছিস!’ কথাটা কানে আসতেই থমকে দাঁড়াই আমি। এই কথাটা এর আগেও বেশ কয়েকবার শুনেছিলাম। অমলদা মেজদিকে নিয়ে এমন কথা বলতো। অমলদার কাছে নাঙ শব্দটা অনেকবার শুনলেও কখনো মানেটা জানতে ইচ্ছে করে নি। কিন্তু সেদিন কার্তিকদার মুখে আবার শুনে বড় ইচ্ছে করলো মানেটা জানার। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দোলা বৌদির কাছেই মানেটা শুনে নেয়ার। তবে সেটা জানতে আমার সময় লেগে গেলো অনেক দিন। কার্তিকদা চাকরি ছেড়ে আসায় বাড়ি থেকে খুব একটা বের হতো না। আর কার্তিকদা বাড়িতে থাকলে বৌদি আমার সাথে ঠিকমত কথা বলতো না। সেদিনের মারের পরে তো একেবারে না। আমি ধীরে ধীরে দোলা বৌদির বাড়িবিমুখ হতে থাকলাম। আমার সেই বন্ধুগুলোর সাথে আবার সখ্যতা হতে শুরু হতে লাগলো। হঠাৎ একদিন ঠিক সন্ধ্যায় দোলা বৌদি আমায় ডেকে পাঠায়। আমার বুকের ভিতর ততদিনে বেশ অভিমান জমে এমন হয়েছিলো যে, যতই ডাকুক আমি কিছুতেই আর তার কাছে যাবো না। কিন্তু বৌদির ডাক পেতেই মুহূর্তেই সব অভিমান কোথায় যেনো পালিয়ে গেল। আমি এক রকম ছুটেই চলে যাই বৌদির কাছে। ছুটে যাই বটে তবে বৌদির সামনে গিয়ে একেবারে থমকে দাঁড়াই। আমার মুখ কতটা গোমড়া হয়েছিলো তা বলতে পারবো না, তবে দোলা বৌদি বলেছিলো—‘কিরে মুখের মধ্যে রাজ্যের মেঘ জমায় রাখছিস কেন!’ আমি বৌদির কোনো কথার জবাব দিতে পারি নি বরং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁন্না পাচ্ছিলো আমার। কী বলবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে সেই মুহূর্তেই প্রশ্নটা করে ফেলি আমি।
‘বৌদি নাঙ কী?’
আমার এই প্রশ্নে বৌদি প্রথমে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যায়। বৌদির চোখদুটো ছলছল হয়ে ওঠে। সেই চোখ দেখে ভয় পেয়ে যাই আমি। না জানি কী ভুল প্রশ্ন করলাম। স্তব্ধতা কেটে এক সময় বৌদির ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে ওঠে। সে হাসি আমার অচেনা। দোলা বৌদির সাথে সখ্যতার কোনদিনই অমন হাসি দেখি নি আমি। বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে সেই দিন প্রথমবারের মত আমার নিজের থেকেই নিজেকে ভোদাই মনে হয়েছিলো। হয়তো সে কারণে মাথাটা নিচু করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দোলা বৌদি আমার কাছে এসে মাথাটা আলতো ছোয়ায় তুলে ধরে বলে—
‘নাঙ কী জানতে চাস?’
কথাটা বলেই দোলা বৌদি তার ঠোঁট জোড়া আমার ঠোঁটের উপর চেপে ধরে। আমি কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার শুধু তখন ছোটবেলার ললিপপ কিংবা লাঠি চকলেটের কথা মনে পড়ছিলো। স্কুলে পিটি করার সময় আরামে দাঁড়াও সোজা হও করার মতো আমার হাতদুটো তখন সামন-পেছন করছিলো। একসময় আমি বুঝতে পারছিলাম আমার শরীরে কেমন একট শিহরণ কাজ করছে। আরামে দাঁড়াও, সোজা হও করা হাতদুটো আমার অজান্তেই দোলা বৌদিকে জড়িয়ে ধরে। আমার হাতদুটো দোলা বৌদিকে জড়িয়ে ধরতে কেমন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে দোলা বৌদি। আমাদের ঔষধের দোকানের জুলফিকারকে একবার ইলেকট্রিক শক খেয়ে এমন ঝাঁকুনি খেতে দেখেছিলাম। ঝাঁকুনির সাথে সাথেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো দোলা বৌদি। দোলা বৌদির ধাক্কা সামলিয়ে কোনোরকমে নিজেকে স্থির করার পর আমি বুঝতে পারি আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে। দোলা বৌদির দিকে তাকিয়ে দেখি হাঁপানি রোগিগুলোর মত কেমন জোরে জোরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। আমি বৌদির মুখের দিকে তাকাই। চমকে উঠি। আমার শরীরের কাঁপুনি আরো বেড়ে যায়। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে দোলা বৌদি। অতোবড় চোখ আমি তার আগে দেখি নি। এমনকি কোনো মানুষের চোখ অতোবড় হতে পারে ভাবতেও পারি নি। শরীরের কাঁপুনি আর বুকে দুরুদুরু ভয় নিয়ে এক লাফে তিন কদম পেছাতে গিয়ে ধাক্কা খাই এক লোহার দরজার সাথে। ফিরে তাকিয়ে দেখি কিসের লোহার দরজা, কার্তিকদা দাঁড়িয়ে আছে। একটা মানুষের শরীর যে লোহার মত শক্ত হতে পারে সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম আমি। আজ বুঝি, আজও সেই দিনটা ঝড় হয়ে বয়ে চলেছে আমার। সেদিনের সেই ঝড়টা কি কখনো থামবে… আমার অথবা দোলাবৌদির কিংবা কার্তিকদার!

আমাদের ঘুম ভাঙাবে পরজন্মের পাখিরা!

প্রাক্কথন

অনেক অনেক দিন পর আজ আবার ভাঙাচোরা জ্যোৎস্নার নিচে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মুখরা হয়ে উঠল আমাদের না-বলা কথামালা। সম্মুখে বিশালাকার অশ্বের মতোই কিছু অন্ধকার গাছপালা তারই একান্ত শ্রোতা। বৃষ্টি এইমাত্র ছুঁয়ে গেল আমাদের, আর বলে গেল সে আর কখনও আসবে না এভাবে! আমরা তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। চুপচাপ। সে চলে গেল। আমাদেরও কি দাঁড়িয়ে থাকা উচিত? একটা লুনাটিক অশ্বের খুড়ে এই প্রশ্ন যখন ছটফট করছে ঠিক তখনই দেখি চাঁদও বিদায় নিচ্ছে আকাশের শামিয়ানা থেকে। অতএব আরো কিছুক্ষণ আহাম্মকের মতোই দাঁড়িয়ে থাকা, আর কনফেশন বক্সে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলা একান্ত শিশুর মতো।

এক

কীভাবে এলাম বলা মুশকিল। শুধু এটুকু বলতে পারি, এসেছি। আসলে আসার কথাই যে ছিল না আমাদের। সেই কবে ডুবে যাচ্ছিলাম জলে। সেই কবে ভেসে যাচ্ছিলাম ঝোড়ো হাওয়ায়। সেই কবে ঝুলে পড়েছিলাম মাঝরাতে। তবু আছি। চোখ মেলে দেখছি। নাড়ি টিপে দেখছি। আছি। আর আছি বলেই এত ঝঞ্ঝাট। ঝামেলা। আছি বলেই কেবল ছুটে গেছি তোমার দিকে। আর তুমি সেই সুদূরের পলাশবনে উড়ে যাচ্ছো পাখিদের মতো। অথচ তোমার সাথেই এক পঙক্তিতে উড়ে যাবার কথা ছিল আমারও। তা আর হল না। আমাদের আকাশটাকে খেয়ে নিল ভাটার চিমনিগুলো। আমাদের নীল রঙ আমাদের ভালোবাসার সকল নীল রঙেদের আস্ত খেয়ে নিল কালো ধোঁয়া। তবু আমরা নিরোধের ঘন আঁধার থেকে এসে একে অপরকে খুঁজে বেড়িয়েছি উন্মাদের   মতো। কেবল ব্যর্থতা বারে বারে। ভাবলাম, শেষ করে দেব সব। সব কিছু। কী হবে! কী হবে এভাবে হেঁটে হেঁটে! পায়ের নিচে কাঁটা ফুটেছে বহু আগে। তবু চলা। আর কতটা? ‘আর করদূর গেলে আমাদের বাড়ি?’ কেবল শূন্যতার সাথে এক অদ্ভুত খেলা। কেবল অস্তিত্বহীন মরা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের সকল জামাকাপড় খুলতে খুলতে পেঁয়াজের খোসার মতো শূন্যতায় পৌঁছে যাবো ভাবি নি। তবু মানুষ বাঁচে। বেঁচে থাকে। এভাবেই। তাদের সখ আহ্লাদ নিয়ে। তাদের মৈথুন নিয়ে। এভাবেই হাসে। এভাবেই কাঁদে। এভাবেই চলে যায়। খুব আশ্চর্য লাগে। আমি কেবল চেয়ে থাকি। নীল রোদ্দুরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকি। আর ভাবি মানুষের একদিন পাখি হবার কথা ছিল, অথচ পাখি মানুষ হবার কথা ভাবে না কখনও।

দুই

হেরে গেলাম। আসলে হারার কথা ছিল না। আসলে ভাবি নি শেষমেশ তুমিও এভাবে চলে যাবে ‘ঝোলা গুড় নিয়ে মরিশাসে’! একটা বন্দুক চাই। আর তাই ছুটে গেলাম কারখানায়। ফিরে এলাম। বন্দুক বুকে নিয়ে ফুলশয্যা। কাল সকাল হতেই তুমি আর আমি এক সাথে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাবো। আসলে সবই যখন শূন্য তখন কি হবে এই সব বেঁচে থাকায়! জানো, প্রতিটি রাতে খুব কেঁদেছি। খুব মেরেছি নিজেকে। খুব বমি করেছি। আর এক সকালে তোমার পায়ের সামনে বন্দুক রেখে হারিয়ে গেছি কাপুরুষের মতো। তুমি হেসেছো। তোমার বন্ধুরাও হেসেছে খুব। তোমার কুকুর তোমার প্রিয় কুকুর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে পড়ে গেছে সোফা থেকে। তবু সুখে আছো সুদূরের মায়াবী নগরে শ্রীলা। শেয়াল আর প্রিয় কুকুরদের নিয়ে। আর আমি? বন্দুকহীন সিন্দুকহীন রাতে এক চিরন্তন ক্যাবলার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছি নিজ লিঙ্গের দিকে আর জপ করছি তোমার নাম। জানি এভাবে সারে না আমাদের অসুখবিসুখ। জানি এভাবে বাড়ছে হাহাকার। তুমি আমি সে। আছো এবং থাকবো। থাকবেও এই সকাল এই নীল বিকেল এই গোধূলি এই সোনালি দিন রূপালি রাতের মায়াভরা গল্পেরা, এই জোছনার কান্না, হাহাকার, আর ইছামতীর ঋতুহীনতা।

তিন

শূন্যের মাঝে আরো শূন্য হওয়া শ্রীলা। আরো আরো গল্পের মধ্যে নিজেকে বেঁধে ফেলা। কী লিখি এর মাঝে? কী সব ছাইপাঁশ লিখি? কার জন্য লিখি? কার জন্য ঢের ঢের সময় নষ্ট করে এভাবে আরো এক উন্মাদনের দিকে ছুটে যাচ্ছি এই অবেলায়? আত্মার চিৎকার আর হৃদয়ের গোপন হাহাকারের নিচে তুমি আর তোমার ঘরবাড়ি আরো আরো পিনোদ্ধতায় উঠছে বেড়ে ক্রমশ। তবু নির্বিকার তোমার তুমি। তবু অন্য ঠোঁটের নিচে আলো ফেলে মেখে নিচ্ছ আজকের শুভ সকাল কিংবা মখমলের প্রিয় দস্তানা। আমাদের কেউ নেই। আমাদের কিছু নেই। আস্তাকুঁড়ের মতো এদিক সেদিক উড়ে যাবার আগে গলা ছেড়ে দিলাম আর বেরিয়ে এল গতজন্মের রক্তের মতো কিছু বধির শব্দ, যাকে তুমি মায়া বলো, যাকে তুমি প্রতিমা বলো, যাকে তুমি সন্তান বলো, যাকে তুমি দু-দণ্ড শান্তি বলো। আর এরই ফাঁকে ক্রমশ বড়ো হচ্ছে আমাদের গাছপালা। এভাবে চৈত্র দুপুরে বড়ো হচ্ছে আমাদের ছায়া-অপচ্ছায়ারা, যার নিচে তোমার তুমিকে অকস্মাৎ পেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছো বুনোহাঁসের মতো!

চার

সম্পর্ক এক অদ্ভুত ধাঁধা! এই উড়ছে, আবার এই অদৃশ্য আকাশযমুনা থেকে। তারপর বসে থাকা চুপচাপ। তারপর রোমন্থন। তারপর হাহাকারের আলপনা বুকে এঁকে নিয়ে হেঁটে যাওয়া বহুদূর। আমার এক নীলকণ্ঠ পাখি ছিল শ্রীলা। দূর দেশ থেকে তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসতো। সেও হারিয়ে গেল এক ঝোড়ো হাওয়ার দিনে। এখন কেবল ভাঙা। নিজেকে। ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে যাওয়া ফড়িংয়ের দেশে। এখানে নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হয়। এখানে নিজেকে চিমটি কেটে বেরিয়ে আসি প্রকাশ্য আলোকে। দেখি আরশোলাগুলো খেয়ে ফেলেছে কাঁচামিঠে রোদ্দুর, দেখি কাকের পিঠে চলছে আমাদের দিনযাপনের গীতমালা। অগত্যা নেমে পড়ি। নামতে নামতে লিখে ফেলি নিজেকেই, নিজের হতাশ্বাস, অসম্পূর্ণ মৈথুনরাত্রি, অন্ধ প্রেমিকার চুলের গন্ধ কিংবা কেরোসিনের বাটিতে চোবানো বিবাহবার্ষিক। এভাবেই অসুখবিসুখ এভাবেই মনখারাপ এভাবেই আত্মহত্যার পাঁচালি।

পাঁচ

অগত্যা মুক্তির খোঁজে বেরিয়ে পড়া। কীসে মুক্তি? কেমনে মুক্তি? এ-সব কঠিন প্রশ্ন যখন ঘুরপাক খায় মাথার মধ্যে তখনই আচম্বিতে দেখি তুমি উড়ছো ফড়িংয়ের মতো আমাদের ঘাসবনে। না, আজ আর আঠা পাটকাঠি নিয়ে নেমে পড়া নয়। আজ কেবল চেয়ে থাকা। আজ কেবল শিশিরের গায়ে লেগে থাকা যত সব ক্ষত আছে তা তুলে নিয়ে নিমেষেই মেখে নেওয়া, আজ জোছনার নিচে যে সকল পরম ব্যাথা আছে তা কেবল তুলে রাখা পরজন্মের পাখিদের জন্য। এখন কেবল অবিরাম সন্তরণ। এখন কেবল ঘুমের খোঁজে নেমে পড়া। এখন কেবল পলাশবনের নিচে শুয়ে শুয়ে এক ঘন স্বপ্নে বিভোর হওয়া। তুমি বোধহয় জান না, এই সব আকাশের কাছে, এইসব বাতাস, রোদ্দুর, এইসব বৃষ্টিকণার কাছে, এইসব গাছপালা-পাতার কাছে কেবল দু-দণ্ড মুক্তি চেয়েছি। আর ফিরে ফিরে গেছি বারে বারে। যেন আমাদের কোনো মুক্তি নেই। যেন আমাদের মুক্তির মুখাগ্নির নিচে সদাহাস্যমান তোমার তুমি। দেখো, কাঁদছি শিশুর মতো, দেখো কাঁদছি বৃষ্টির মতো, দেখো কাঁদতে কাঁদতে একদিন হারিয়ে ফেলেছি আলো আর ঢলে পড়ছি ঘুমের কোলে একটু একটু করে।

ছয়

সন্ধ্যে নামার ঢের আগেই ঘরগোছানো পাখিদের মতো তোমার পদচারণার শব্দে বৃষ্টি নামল। চেয়ে দেখি নীল হতাশার মতো আকাশের বুকে সোনালি আঁচড় কিংবা পুকুরের জলে তোমার প্রতিমা। বোধহয় এখনই ভেঙে পড়বে প্রাসাদ। মনে হয় নদীগুলো আত্মহত্যার বাঁক থেকে ফিরে হাউহাউ করে কাঁদবে দরজা আটকে। এই সব ছোঁয়াচে দৃশ্যের মাঝে লোপাট হয়ে যাওয়া তোমার মুখের মতো যাপন থেকে যাপনে ভেসে বেড়ানো বুনোহাঁসেদের পাখনার নিচে এসো একদিন ঘুমিয়ে পড়ি, আর ডুবে যাই একসাথে।

সাত

হিমেল হাওয়ায় দূরে সরে যাচ্ছে প্রজাপতির আলো। এখন কেবল এক অন্ধকার সম্বল করে শুয়ে থাকা নিজের মৃতদেহের পাশে। নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করে হাত মুখ ধোয়া, দুটো পরোটা-লুচি ইত্যাদি। ফর্মালিনের গন্ধে ভরে গেছে সপিং মল, মাল্টিপে¬ক্স আর তোমার বগলের গাঢ় অন্ধকার। তবু লিপ্স্টিকে আঁকছ উত্তরাধুনিক হাসি। আর তাতেই খুশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খাস মালীরা।

মিথ্যের কাঁচুলিতে কেমন মগ্ন দেখো, আমাদের ঘুম ভাঙাবে বোধহয় পরজন্মের পাখিরা! তাই এইসব বসে থাকা। তাই উঁইয়ের ঢিবির নিচে নিজেকে কোনো এক সন্ধ্যায় পাচার করে দিয়ে হারিয়ে যাব ষাট লক্ষ বছর। বোধহয় তখন পাখিদের দেশে সেরে উঠবে আমার অসুখবিসুখ। তার আগে, তার ঢের ঢের আগে আমাকে একটু কাঁদতে দাও, আর আমার কান্নার রঙে ভরে উঠুক ঘাসবন কিংবা আমার মিথ্যে জলসাঘর।

বাউলা ঝড়ে উদাস পথিক

সেই আমার হৃদয় মাঝে প্রথম শ্রাবণ-ছন্দ

কী ছিলো না এই গ্রামে! মোহন, জসিম, বাঁধন, কুসুম, নার্গিস, বাদল এক বয়সী সব বাধ না মানা দামাল-দস্যুর দল। আসমানের সপ্ততারকাগুচ্ছ যেনো। এদের সাথে মিশতে পারায় এক ধরনের আনন্দ ছিলো, গর্ব ছিলো। এক সাথে দল বেঁধে কেমন করে সারা গাঁ উথালি-পাথালি করে বেড়ানো। স্কুল পালিয়ে গিয়ে মৌচাকে ঢিল ছোঁড়া, রাতে মুরগী চুরি করে পিকনিক। রাস্তায় কোনো দাদা বা নানা বা ইয়ার্কি-সম্পর্কিত কারোর সাথে দেখা হলে তো মহাবিপদ তার। একদম বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! মন্দিরে ঢাক-ঢোল-কাসা ছিলো। সন্ধ্যায় ছিলো বাড়ি বাড়ি সঙ্খ আর হুলুধ্বনি। আর ছিলো মসজিদের মিনারে সাইফুল ভাইয়ের সুমিষ্ট কণ্ঠের মাগরিবের আযান। সমস্ত কলতানকে ভেদ করে মিলিয়ে যাওয়া সুর-তরঙ্গ। কী ধ্বনি! প্রায় প্রতি মাসেই পুজো-পার্বণ ছিলো, উন্মাদ নৃত্য ছিলো—মজা ছিলো। পুজোর সময় ঘুম ছিলো না। কতো রাত পর্যন্ত জেগে জেগে থাকা, মণ্ডপ সাজানো, পাল কাকার মূর্তি-গড়া দেখা। পুজো ঈদ মিলে একাকার হয়ে যেতো। কোনো তফাৎ ছিলো না কারো মনে। কোনো কোনোদিন মসজিদে শিরনি-সেমাই হতো। বিলানোর দায়িত্ব ওদের হাতে। ওরা দায়িত্ব নিতো বা দায়িত্ব দিতে বাধ্য হতো যেনো ইমাম সাহেব। অথবা ওদের চেহারার একটা সুমূল্যায়ন ছিলো।

কিন্তু, এদের ওই একটাই কাজ—সারাক্ষণ কোন খুড়োর গাছে পেয়ারা কোন দাদুর গাছে আম বা কাঁঠাল পেকেছে এইসব খুঁজে বেড়ানো। বেলা আধঘড়ি হোক, মাথার উপর টনটনে সূর্য থাকুক কোনো কিছুই মানা মানি নেই। বিকাল হলেই কু-কু-কু ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তো সারা গ্রামে। দুই জন এক হলেই শুরু। ডাক দিয়ে যাওয়া হতো যেনো কোনো যুদ্ধে। ভাবী কাকীরা আঙিনার বেড়া ফাঁক করে উকি মেরে দেখতো যুবক দলকে। কী পুলকে তারা হাসতো যে! আহা সেই শুকলার মাঠ! রাস্তার পাশে নিচু জমিতে দাগ টেনে কাটা হতো নুনদাঁড়ি, নুন-গাতির কোট। গোল্লাচ্ছুট, কানামাছি, গবোর চটপটি—খেলার কি কোনো শেষ ছিলো! আবার সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়া দল বেঁধে। কোন্ দিদি পিঠা বানায় ভালো, কার বাড়ি আজ মুরগী কাটা হয়েছে সব যেনো ওদের নখ-দর্পণে ছিলো। শুধু রান্না হওয়ার অপেক্ষা। তারপর ব্যস্। একসাথে সাত আটজন হামলে পড়া। মিনিটেই হাড়ি শেষ। ‘পিঠেগুলি হেবি মজার, দিদি ভালো থাকো।’ আর কি! বিরক্ত দিদির না হেসে উপায় আছে? সেলিমের কাছ থেকে এসব কথা আমি শুনি। আমাদের ক্লাসের সেলিম ওদের দলের মানুষ। বয়স আমাদের সবার থেকে একটু বেশি। শরীর স্বাস্থ্যও আমাদের থেকে উন্নত। সুঠাম দেহ, মারামারি মুখ, সোজা-খাড়া চুল। কিন্তু চোখে একটা মায়া মায়া ভাব আছে যেনো। ও গল্প করে আর হাসে। আমার চোখ তখন কিছু বলতে চায় সেলিমকে। হয়তো বলতে চায়—আমারে তুমাগে দলে নিবা। আমি যাবো। মুখে কোনো কথা আমি বলি না। বলতে পারি না। কারণ আমি জানি, বললেও সেলিম নেবে না। এ কথা ও অনেকদিন বলেছে, ‘তোর মতো পুচকে ছাওয়ালেরে দিয়ে চলবে না। তুরা তো বইয়ের পুকা। তুগে দিয়ে শুদু বই কাটা অবে।’ কোনোদিন সাহস পাই নি বলার।

মধ্য রাতে বাঁশি ছিলো অহিদুল ভাইয়ের ঠোঁটে, তার সে কী সুর! অহিদুল ভাইও ওদের দলের একজন—আমার স্বপ্নের পুরুষ। ঠিক বুঝতে পারতাম শুকলার মাঠের মাঝখান থেকে সুর ভেসে আসছে। যখনই ঘুমের সময় হতো তখনই শুরু হতো সুর, আমি উঠে বসতাম বিছানায়। মাঠের শুরু থেকে বাড়ি পর্যন্ত কয়েক সারি আম জাম কাঁঠাল আর সুপারির গাছ। সে সকল বাধা উপেক্ষা করে সে সুর চলে আসতো আমার কাছে। শুধু আমারই কাছে যেনো। আমি উঠে ঘরের পেছনে পুকুর ঘাটে গিয়ে শুনি। প্রায় প্রতিদিনই শুনি। একদিন জানতে পারি বাঁশির সুর শুধু আমার কানে যায় না। শুধু আমারই ভালো লাগে না। বড়ো আপারও ভালো লাগে। ‘আমি কেমন করে পত্র লিখি গো’– এই ছিলো সেদিনের বাঁশি। বাঁশি শেষে হঠাৎ কাঁঠাল গাছটার তলে আবিষ্কার করলাম আপাকে। আপা আমাকে বলল, ‘তুই এখানে ক্যান্ রে’। বললাম, ‘বাঁশি অহিদুল ভাই বাজায়, না আপা?’

পাড়ার সব বয়সী মেয়েরা অহিদুলের গানের জন্য পাগল ছিলো। কী সে সুর! তার গানের কণ্ঠও বেজায় মনকাড়া। ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি আরো কতো গান! শুক্লপক্ষের প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের আঙিনায় আসর বসতো। গানের আসর। গানের নায়ক অহিদুল ভাই। যেদিন অহিদুল ভাই আমাদের বাড়িতে আসতো সেদিন পড়ার মাথায় পা। মেঝো কাকী, রিজি আপু, জরিন দিদি সবাই আসতো গান শুনতে। মাঝে মধ্যে তাবাচ্ছুমও আসতো রিজি আপুর সাথে। জোসনা জোসনা রাত। বিছানো নারিকেলের পাতার উপর চুপটি মেরে বসে গান শোনা। মায়ের অনুপস্থিতিতে মাঝে মাঝে অহিদুল ভাই কাকীমার সাথে কী যেনো বলে হেসে কুটিকুটি হতো। তার হাসি কী! গম্ভীর কলস থেকে বের হতো মনে হয়। অহিদুল ভাইয়ের কথা শুনে আমি হাসতাম সলজ্জে। আবার গান ধরতো ভাই। একের পর এক গান। মা বলতো এবার এটা গাও, এবার ওটা। এভাবে চলতো অনেকক্ষণ। আমি হয়তো কোনোদিন মায়ের আদেশে ঘুমাতে চলে গেছি। বাবা হয়তো কোনোদিন রাতে তাড়াতাড়ি ফিরেছেন। তিনিও যোগ দিয়েছেন গান শোনায়। আমি শুনে চলেছি ঘরে বসে। আর ভালোবেসে চলেছি সেই সুর, সেই গান, সেই মানুষকে। প্রাণের পরম জনকে। শ্রীকান্তের পাঠ হয় আরও অনেক পরে। তখন থেকে কেনো জানি আরও বেশি করে অনুভব করতে থাকি তাকে। বালক শ্রীকান্তের প্রাণপ্রতিম যেনো ঘর-ছাড়া বিবাগী-বাউল ইন্দ্র। অহিদুল ভাই কি জানে আমি তাকে গোপনে এতো ভালোবাসি? আমি চাই তার বাঁশি বাজানোর সময় পাশে বসে থাকি। তাকে পাহারা দেই। তার যেনো কোনো ভয় না করে। বড়ো আপাকে কখনও গানের আসরে দেখি না। বড়ো আপা এমনিতেই লুকোচুরি স্বভাবের। অহিদুল ভাই আসলে আরো বেশি লুকিয়ে রাখতে চায় নিজেকে। বড়ো আপা হয়তো তখন বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি খায়। নইলে হয়তো কোনো এক নতুন জগত নিয়ে আসে তার লম্ব দৃষ্টিতে। গান চলে। আমি ভাবি—অহিদুল ভাইকে একদিন বাড়িতেই বাঁশি বাজাতে বলবো। জানি না তখন বড়ো আপা কী ভাবছে…

তোমার রঙে রাঙিয়ে নিলাম ছবির ক্যানভাসটুকু

এক সময় ছিলো, বাবা রোজ রোজ যাত্রার রিহার্সাল দিয়ে দেরি করে বাড়ি ফিরতেন। আর রোজ মা বাবাকে বকতেন। কোনোদিন খাবার থাকতো, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। কোনোদিন না খেয়েই ঘুমাতেন। আমার যেনো ঘুম না ভাঙে সে জন্য চুপিচুপি মশারি টেনে পাশে শুয়ে পড়তেন। তারপর এক গাল বিড়ি-নিঃশ্বাস। পাশে মায়ের বকুনিতে আগেই ঘুম ভেঙে যায়। বাবাকে তাই রোজ একটি প্রশ্ন করার সুযোগ পেতাম– ‘বাবা খাইছো?’ বাবাও রোজ রোজ একই উত্তর দিতেন– ‘হ্যাঁ বাজান খাইছি, তুমি খাইছো?’ বাবার কথা শুনেই বুঝতে পারতাম কোন্-দিন বাবা খেয়েছেন, কোন্-দিন খান নি। পাশে মা একাধারে বকে চলতেন ‘হ হ যাত্রাই যানো উনার সংসার, ঘর। নিজির তো খাওয়া লাগে না, আমাগে কথাও তাই ভাবে না পোড়া কপাল আমার, এমন মানষির হাতে আল্লা আমারে ফেলাইছে। পোড়া কপাল, যাত্রা আমার সতীন অলো।’ হ্যাঁ, সত্যিই তাই যেনো—মায়ের সতীন ছিলো যাত্রা। বাবার সাথে আমাকেও নিয়ে যেতেন মাঝে মাঝে। তিনি যখন রিহার্সালে থাকতেন আমি দেখে অবাক হতাম। বাবার এমন চিকনা পাতলা দেহাবয়ব! অথচ কী সুন্দর রাজার প্রধান সেনাপতির পদে অভিনয় করে চলতেন। কয়েক মিনিটের জন্য আমি ভুলেই যেতাম উনি আমার বাবা—আমরা এক বিছানায় ঘুমিয়ে থাকি রাতে। বাবা যখন এক নিঃশ্বাসে কাপা কাপা কণ্ঠে ডায়ালগ থ্রো করতেন, বীরদর্পে রাজাকে বাঁচাতে একের পর এক শত্রু নিধন করে এগিয়ে চলতেন, আর রাজা বাবাকে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানাতো। আমার বুক ফেঁপে যেতো নিঃশ্বাসে। নিঃশ্বাস ছাড়তাম গোপনে—কেউ যেনো টের না পায়। কিন্তু বুকটা ফাঁপাই থাকতো, কমতো না। মঞ্চে মাঝে মাঝে বিলাসি পিসি এসে কীসব বলতে বলতে বাবাকে জড়িয়ে ধরতেন। আর বাবা কেনো জানি কান্নায় অশ্রু ঝরাতেন। আমার তখন ভীষণ লজ্জা লাগতো। মুখ লাল করে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম। বাবাকে প্রথমে চিনতে না পারলেও বিলাসি পিসিকে চিনতে ভুল হতো না। উনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। বাবার সাথে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কথা বলতেন হয়তো অভিনয় নিয়ে। বিলাসি পিসি মাঝে মাঝে মায়ের সাথেও কথা বলতেন রান্নাঘরে। মা-ও পিসিকে খুব ভালোবাসতেন। তবে মায়ের ঐ একটাই কথা ‘তুমার দাদারে এট্টু বুঝাও বিলাসি। ও যে একদম ঘর ছাড়া অয়ে গেলো!’ পিসিও মাকে কথা দিতেন ‘ঠিক আছে বৌদি।

আমি দেখবুনে।’ পিসির যে কী মোহনীয় কণ্ঠ! উনি বাড়িতে এলে আমি সারাক্ষণ তাঁর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, উনার কণ্ঠ শোনার জন্য। বাবাকে উনি অর্জুনদাদা বলে ডাকতেন। আমি একদিন পিসিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘পিসি, আমার বাবার নাম তো লতিফ, তুমি বাবাকে অর্জুনদাদা বলো কেনো?’ পিসি বলেছিলেন ‘ও তুমি বুঝবে না বাবলু।’ আমাকে আদর করে পিসি বাবলু বলে ডাকতেন। রিহার্সাল করতে করতে বাবা এমন ভুলোমন হয়ে যেতেন যে, আমি ছোট্ট বাচ্চাটি সাথে এসেছি তাও ভুলে যেতেন। কোনোদিন হয়তো মা গিয়ে আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসতেন। যেদিন মা যেতেন না সেদিন হয়তো রিহার্সাল ঘরের এক কোণে ঘুমিয়ে রয়েছি, আর বাবা আমাকে রেখে বাড়ি চলে গেছেন। গভীর রাতে বাবার সাথে মা বকতে বকতে এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন।

সকালে আমাকে বাবা হাতে হাতে যাত্রার রোল শেখাতেন। বাবা চেয়েছিলেন আমি একদিন পাক্কা যাত্রার অভিনেতা হবো। এই তো আমার বাবা। আমার প্রথম শিক্ষক।

ফুলগুলি মোর কুড়িয়ে পাওয়া, এই তো পূজার ফুল

শেফালিদি আমার খুব প্রিয় ছিলো। স্কুলে গান গাইতো, নাচতো। স্বাধীনতা দিবসে স্কুলে ব্রতচারী নৃত্য করতো বিকালে। আমাকে খুব ভালোবাসতো শেফালিদি। ২৬ মার্চ আসলে আমি কোনো সময়ই তার পিছু ছাড়তাম না। বলতাম, ‘শেফালিদি, কখন যাবা স্বাধীনতায়?’—বার বার একই প্রশ্ন করতাম আর শেফালিদি একই উত্তর দিতো‘—এই কাজটা শেষ করেই যাবো, দাঁড়া।’ কী জানি কারণে গ্রামবাসী শেফালিদির সাথে আমার যাওয়াটা ভালো চোখে দেখতো না। কেনো যে তারা এটা ভালোভাবে নিতো না তা ভাবতে যাই নি কখনও। আমি শুধু চিনতে শুরু করেছি শেফালিদিকে, তার গলা আর গানকে। লাঠি খেলায় দিদির কোনো তুলনা ছিলো না। মাঠভরা দর্শকের চোখ ঐ একজনের দিকেই থাকতো—শেফালিদি, হলদে শাড়ি, লম্বা চুল। সবাই বলাবলি করতো এই যে হলুদ শাড়ি পরা এই মেয়েটা ভালো খেলছে। সেখানে হয়তো তার পরিচয় নিয়েও কথা হতো। কোন গ্রামের কোন ঘরের মেয়ে, বাপের নাম কী ইত্যাদি। তাদের কথা শুনে মনে হতো দিদিকে তাদের এতো পছন্দ হয়েছে যে তারা তাদের ছেলের সাথে দিদির বিয়ের পয়গাম পাঠিয়ে তবে ক্ষান্ত দেবে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কোনোদিন তার বিয়ের পয়গাম নিয়ে কোনো ঘটক আজও আসে নি। ব্রতচারি নাচে দিদি ছিলো রাণী। প্রজাপতি নাচে দিদিকে দুইদিকে অন্যরা শাড়ি ঘিরে ধরতো—আমি উচ্ছ্বাসিত নয়নে চেয়ে থাকতাম। শাড়িগুলো এমন দুলতো যে মনে হতো দিদি সত্যিই কোনো রংবাহারি প্রজাপতি হয়ে গেছে। কি যে চমৎকার দেখাতো! ওদিকে মাইকের চোঙ থেকে ভেসে আসতো বজলু স্যারের কণ্ঠ— ‘পিয়ারী পিয়ারী সাথী হও ঝিলমিল কিছু নাও’। অনেক রাত পর্যন্ত শেফালি দি’র সাথে ঘুরতাম। কতো মানুষ তাকে কতো কিছু কিনে দিয়ে যেতো তার ইয়াত্তা নেই। সমস্তই জমা হতো আমার হাতে। স্টেজে দিদির আধিপত্ত একচ্ছত্র। গান, নাচ, কবিতা প্রত্যেক বিষয়ে দিদির অংশগ্রহণ ছিলো।

রাতে দিদির সাথে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বলতাম, ‘দিদি, উরা তোমার কি অয়?’ ‘কারা রে?’ দিদির প্রশ্ন শুনে আবার বলতাম, ‘যারা তুমারে এসব কিনে দেলো?’ হাসি হাসি মুখ নিয়ে দিদি বলতো, ‘কিচ্ছু না।’ ‘তালি এতো কিছু কিনে দেলো যে তুমারে?’ দিদি যেনো আমার কথা শুনতে পাই নি। দিদি হাসতে থাকে। আমি বলি, ‘দিদি, তুমার বিয়ে অবে কবে?’ অমনি দিদির মুখ মলিন হয়ে যায়। বলে, ‘আমারে খিডা বিয়ে করবে রে পাগল।’ ‘কেনো? তুমারে বিয়ে করবে না কেনো? তালি এতো মানুষ এতো কিছু কিনে দেলো যে?’ দিদি বলে, ‘আরো বড়ো হ, তালি বুঝবি।’ ‘না, আমি জানি, উরা তুমারে বিয়ে করবে, তুমার বিয়ে হলি আমি কিন্তু তুমার সাথে যাবো। আমারে নিবা কও?’ দিদি অমনি আমাকে ধরে কপাল গাল ঠোঁট ভিজিয়ে দেয় চুমুতে। মাথাটি তার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। হাত থেকে সমস্ত পত্তি ছড়িয়ে যায় রাস্তায়। বিকাল থেকে রাত ন’টা অব্দি দোলায় দোলায় যতো ঘর্মাক্ত ক্লান্তি জমা হয়েছিলো যে ভাঁজে, আমার নাক গিয়ে পৌঁছায় ঠিক সেইখানে। ঈষদোষ্ণ গন্ধ আমার নাসিকামূল ভেদ করে যেনো ফুসফুসে চলে যায়। তারপর সমস্ত শরীর।

আমার গান যখন শুনবে, তখন…

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পর্কে তখনও আমার কোনো ধারণা হয় নি। জানতে পারি নি, নারীদের ঠোঁটের ও চোখের জাদু বৃত্তান্ত। তবু কেনো জানি তাবাচ্ছুমকে নিয়ে ছবি আঁকতাম মনে মনে। সংসার সংসার খেলা। যদিও সংসার মানে কি— জানতাম না। শুধু আমি আয় রোজগার করবো, বাজার করবো, বাহির সামলাবো আর ও রান্না করবে— ভেতর সামলাবে, এই সব। সংসার মানে আর একটা জিনিস বুঝতাম সারাদিন দুজনের খুনসুটি লেগে থাকা আর রাতে একসাথে পাশাপাশি ঘুমানো। ওই ঘুমানো পর্যন্তই, বেশি কিছু নয়। দেখে দেখে শিখেছি— বাবা-মাকে, চাচা-চাচিকে, বড়ো ভাই-ভাবীকে। জানতাম ওরা স্বামী-স্ত্রী। ওদের মধ্যে সংসার আছে। বাবা-মা, চাচা-চাচি, ভাই-ভাবী রাতে পাশাপাশি ঘুমায়। তাবাচ্ছুমের সাথে রাতে ঘুমানোর কথা ভাবতাম কল্পনার জগতে। আর কথা সাজাতাম। বেকার তো শুয়ে থাকা যায় না! কথা সাজাতাম— কি কথা বলবো। বাড়ির পাশেই বিস্তির্ণ মাঠ। শুকলার মাঠ। তার পাশ দিয়ে রাস্তা বয়ে গেছে। নতুন মাটি তুলেছে রাস্তায়। রাস্তার সেই ঢালু দিয়ে দৌড়ে নেমেছি। আর মনে মনে কল্পনা করেছি সামনেই বোধ হয় তাবাচ্ছুম দাঁড়িয়ে আমার জন্য। শুক্রবার বিকালে বিটিভিতে সিনেমা দেখা তখন আমাদের একমাত্র বিনোদন। বিনোদন শুধু বিনোদন নয়। তার কল্যাণে অনেক অঙ্গ-ভঙ্গিমা শিখে নিয়েছি। নায়কের সাথে নায়িকার দেখা হলে হাত দুখানি যে আবেদনে সামনে থাকে, তেমনিভাবে হাত উঠিয়ে ঢালু থেকে দৌড় দিতাম। আবার ওঠা, আবার দৌড়ে নামা।

শুধু তাই না। রাতে তাবাচ্ছুমকে পাশে ভেবে নিয়ে ঘুমিয়েছিও। শ্রাবণের রাত। ছম ছম বৃষ্টি পড়ছে মাটির টালি-ছাউনি চালে। বৃষ্টি অঝরে ঝরেই চলেছে। ঈষৎ শীতে কাথাটা টেনে নিয়েছি, তখনও আমি স্বপ্নে বিভোর। ভীষণ বৃষ্টি। দুজনে হাত ধরাধরি করে ছুটছি। অনেক অনেক দূরে। একা একা এতো দূরে আসার সাহস আমার নেই। কিন্তু আজ কোন খেয়ালে চলে এসেছি। তাবাচ্ছুম পাশে থাকলে আরো আরো দূরে চলে যেতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কারণ আমি জেনে গেছি ও আমাকে ঠিক ঠিক বাড়ি পৌঁছে দেবে। আমার থেকে গ্রামকে গ্রাম ওর বেশি জানা। বয়সটাও হয়তো একটু বেশিই হবে। আমার চেয়ে শারীরিক অবয়বে একটু বাড়ন্ত যেনো। ক্লাস থ্রিতে এসে ভর্তি হয়েছে অল্পদিন আগে। সবার সাথে ভাব হওয়ার আগেই আমার সাথে খাতির জমে গেছে। আমাদের বাড়িতে আসে প্রায়ই। মায়ের সাথে বেশি খাতির। আমিও যাই ওদের বাড়িতে। তাই নিয়ে বন্ধুদের কতো শেষ বিদ্রুপ। আমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। অনেক বড়ো ক্লাসের ভাইরা এসে ওর কথা জানতে চায়। আমার কদর বাড়ে। আমি ওর সকল খবর দিয়ে দিই। সকল আসা যাওয়া, সকল ভালো লাগা জেনে যায় সবাই। থেকে যায় শুধু তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে খোলা মাঠে দৌড়ানো। সাদা সাদা একাকার পানিতে থপাস থপাস করে পা ফেলা। মাঝে মধ্যে ভেজা অথচ শক্ত মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া আর খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়া। মাটি খুঁড়ে কুয়ো বানানো। কোমর পানিতে নেমে বুড়বুড়ি হাওয়ায় প্যান্ট ফোলানো। দুজনের প্যান্ট ফুলে উঠলে হাঁটু ভাজ করে কিছুক্ষণ জলে ভাসতে থাকি। রাজ হাঁসের মতো। জলের উপরে ওর ফুলে ওঠা শ্যালোয়ার ঠিক পাশের জমিতে জেগে থাকা দুটি ঘাসের ঢিবির মতো। তার ঠিক উপরে আরো দুটি ছোট্ট ঢিবি ভেজা কামিজের নিচে। সেদিকে দেখে জলের নীচে তার আর আমার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য কল্পনা করি। এরই মধ্যে পানিতে সহচরীর অজান্তে বৃষ্টির গরম জলে আরো কিছু কুসুম-গরম জল মিশিয়ে দিই। তখন আরো বেশি করে হাসি। যেনো ও বুঝতে না পারে কিছু। মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে পাশে শুয়ে থাকা দাদীমার একলা বকুনিতে। তখনও বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। ঝম ঝম আওয়াজ মাথার উপরে। শো শো শব্দ উঠানে গাছের ডালে। বিছানাটা ভেজা ছপছপে। চালের টালি একটা ভাঙা ছিলো। বাবার মেরামত করার কথা ছিলো। করেননি বোধ হয়। দেখি আমি উলঙ্গ হয়ে আছি। একটু আগেও প্যান্ট পরা ছিলাম। তাবাচ্ছুম আমার সাথে ছিলো। উলঙ্গ অবস্থায় কোনো মেয়েকে পাশে কল্পনা করতে ভীষণ লজ্জা লাগে।

তবু ওকে সে জগত থেকে মুক্তি দিতে পারি না। হঠাৎ হঠাৎ তাবাচ্ছুমকে দেখে চমকে উঠি। বিদ্যুৎ শিহরণের মতো। কথা বলতে গিয়ে থেমে যাই। ও-ই এসে প্রথম কথা বলে। হাসাহাসি হয়। তারপর হাত ধরা-ধরি করে ছুট দিই। শ্যামা ঘাসগুলো পায়ের তলে মুড়িয়ে পড়ে। পেছনে এসে তাবাচ্ছুম সেগুলো সোজা করে দেয়। আবার দৌড়াই। বইচি গাছ আমাদের উদ্দেশ্য। কামিজের কুচি ভর্তি করে পাকা কালো কুচকুচে বইচি পাড়ি। খোলা মাঠে খেজুর গাছের সারি যেখানে ঘনছায়া সৃষ্টি করেছে সেই আইলে বসি। দুজনে বইচি ফল খাই। কথা হয়– কাল সকাল সকাল স্কুলে যাবো।

একদিন শীতের সন্ধ্যায় দাদীমা হঠাৎই যেনো সবজান্তা-বুড়ি বনে গেলো। সবার বয়স শুনে বলে দিতে লাগলো— কার জোড় দুনিয়ায় এসেছে, আর কার আসে নি। আমার বয়স ১০। আমার জোড় আসেনি। তাবাচ্ছুমের বয়স ১০, ওর জোড় এসেছে। অদ্ভুত। ব্যাচ্, তাবাচ্ছুমের জোড় আমি নই। বাদ গেলো আমার কল্পনার জগত থেকে। তবু ‘ক্যান, দাদীমা, আমার বয়েসও ১০ তাবাচ্ছুমিরও ১০, ওর জোড় হলি আমার অবে না ক্যান্?’ দাদীমা উত্তর দেয়, ‘বড়ো হ সেখন বুঝবি…’

ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…

আমি বড়ো হয়েছি। সেই পুচকে আমি বড়ো হয়েছি। সেলিমের থেকেও অনেক বড়ো। বয়সও ওদের থেকে অনেক বেশি। ওদের মতো দস্যিপনা করতে না পেরেই ওদের বয়স ছাড়িয়ে গেছি। শহরে কারা যেনো কি একটা নিয়ে গণ্ডগোল করেছে। আমাদের কান পর্যন্ত সে খবর আসে না। ওসব বড়োদের ব্যাপার। তারপর থেকে একে অপরের মুখ দেখাদেখি নেই। থেমে গেলো সেলিমদের সেই মজা-মস্তি, দল বেঁধে পাড়া মাতামাতি। সেলিম এখন নসিমন চালায়, মোহন নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করে, জসিম ঢাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আর বাঁধন মোড়ে দোকান দিয়েছে। এতো কিছু দেখতে দেখতে আমি বড়ো হয়েছি। বড়ো আপার বিয়ে হলো। শুকলার মাঠে গভীর রাতে অহিদুল ভাইয়ের বাঁশি থেমে গেলো। জোসনা রাতে বাড়ির আঙিনায় গানের আসর ভঙ্গ হলো। আহা, অহিদুল ভাই, পরম-পুরুষ, তুমি জানতেই পারলে না শুধু বড়ো আপা নয়, আমিও কতো ভালোবেসেছিলাম তোমাকে? সেই যে গ্রাম ছাড়লে আর এলে না! যদি সেদিন জানতাম, আমি ছোট বলে বড়ো আপার বিয়ের ব্যাপারে আমার কথা অগ্রাহ্য, তাহলে আমি বড়ো হয়েই জন্মানোর কামনা করতাম।

কিন্তু এখন আমি বড়ো। বাবা বলে, ‘তুই যথেষ্ট বড়ো হয়েছিস, একটু আয় রোজগার কর, আর কতোকাল বসে বসে থাকবি?’ আমি যাত্রার অভিনেতা হতে পারিনি। তবু অভিনয় করে যাচ্ছি নিরন্তর। বাবার মতো প্রধান সেনাপতি হয়ে রাজার কল্যাণে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। বাবার রাজ্যের রাজা কৃতজ্ঞ ছিলো। আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করি তার মালিক আমাকে কুর্নিশ করে না।

আমি বড়ো হয়েছি। শেফালি দিদিকে ধিক্কার শুনতে শুনতে গ্রামছাড়া হতে দেখে বড়ো হয়েছি। শুনেছি শহরে কোন দোকানে নাকি কাজ করে শেফালি দিদি। শহরে গেলেই একবার সেনাবাজার, একবার বউ-বাজার, একবার নিউ মার্কেট, ঘুরে ঘুরে দেখি। কোনো বাজারে তাকে খুঁজে পাই না। জানি না কোন্ পুরোনো বাজারে তুমি দোকানদারী করো! দিদি, তুমি কি আমাকে খোঁজো কোনো দিন!

তাবাচ্ছুমের বিয়ে হয়ে গেলো এক ব্যাংকারের সাথে। পর পর দুই বছরে দুটি বাচ্চা হলো। ওদের সংসার এখন ফুটফুটে। তখন আমি মাত্র ১৫তে। আজ যখন অফিস থেকে ফিরছিলাম ইচ্ছে করছিলো ওদের বাড়িতে একবার যাই। দেখে আসি ওর ফুটফুটে সংসার। বাড়ির গেট থেকে ফিরে আসতে হলো। সেই শ্যামা ঘাসের মাঠ পেরিয়ে বইচি খাওয়ার দিন, সেই কোমর পানিতে রাজ হাঁসের মতো ভেসে থাকার দিন কী আর আছে!

হ্যাঁ, এখন আমি যথেষ্ট বড়ো। আমি বুঝতে শিখেছি কেনো বিলাসী পিসি বাবাকে অর্জুন দা বলে ডাকতো। আর যে মা গান শোনার জন্য অহিদুল ভাইকে রোজ খবর পাঠাতো সেই মা কেনো যাত্রায় গেলে বাবাকে বকতেন। আহা রে যাত্রাপালা! গাঁয়ের যাত্রা আজ থেমে গেছে। মাতব্বরেরা বিলাসী পিসিকে কতো রকম গালি দিয়ে গ্রামছাড়া করলো! বাবাকে শাসিয়ে গেলো। আমার চোখের সামনে, বাবা স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আর কোনোদিন তাঁর যাত্রায় অভিনয় করা হয়নি। কার জন্য কেনো কিভাবে ক্রমে ধ্বংস হলো আমাদের লোক-উৎসব—আমি সব জেনে গেছি। শুধু বুঝতে পারি নি দাদীমার কথা। দাদীমা মারা গেলো! কাকে গিয়ে বলবো— ‘দেখো, আমার বয়স এখন ২৫। এখনও আমার জোড়া আসে নি দুনিয়ায়। বাঁশবাগানে, যেখানে দাদীমা ঘুমিয়ে আছে, সেখান থেকে হয়তো অস্ফূট স্বরে বার্তা আসে— ‘হ্যাঁরে, তোর জোড় দুনিয়ায় আয়ছে রে। সে আসলো, তাইতো আমার চলে আসতি অলো। তুই তারে খুঁজে নে। এমনি এমনিই সে কি তোর ঘরে চলে আসবে রে বুদ্ধু!’

আমি সে বার্তা শুনতে পাই না…

অনিঃশেষ রিলে-দৌড়

‘জল ছিল আকাশ ছুঁয়ে

ভূমি ছিল আগুন

পীত রঙ শরীর ধুয়ে

কেন এলে ফাগুন?’

কেন যে আসে জানা হল না আজও। শুধু এটুকু বুঝি তুষার যুগ যখন মানুষকে ধ্বংস করে ফেলতে পারেনি তখন আমূল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত মানুষ এক পরিব্রাজকের ভূমিকা পালন করেই যাবে। যুগ শতাব্দী সহস্রাব্দী জুড়ে ঘটে চলবে তার পদসঞ্চার। ‘মানুষের ফসিল থেকে উঠে আসবে মানুষ’। জীবন এক আশ্চর্য প্রদীপ নিয়ে তরঙ্গে ভেসে চলবে। আর জীবন নিয়ত বহমান হলে আগুন ফাগুন যৌবন অবধারিত। আগুনের কথা হোক তবে। আগুন পোড়ায়, দহনে দহনে সোনা ঝরায়। একটু সাহস নিয়ে বলে ফেলি ‘আমার আগুন’। তাতে পুড়তে পুড়তে দেখি কোথায় দাঁড়াতে পারি।

‘যৌবন’, ‘প্রেম’, ‘ঝড়’ শব্দ তিনটিকে আলাদা করলাম এবং পরপর লিখলাম। কোনও আলাদা তাৎপর্য আছে কি এর? কখনও হয়ত আছে, কখনও হয়ত নেই। এই লেখার ক্ষেত্রে প্রথমটি প্রযোজ্য। কেননা উদ্দীপক আমাকে সে কথাই জ্ঞাপন করছে। তাতেই উদ্দীপনা।

জন্মালেই যৌবন আসবে এমনটি নয়। আবার না জন্মালে যৌবন কোনোমতেই আসতে পারে না। তাই প্রথম শর্ত জন্মানো। জন্ম আর যৌবনের মাঝে পড়ে থাকে মাঠ মাঠ নানা পর্ব। শৈশব, কৈশোর, কৈশোরোত্তীর্ন যন্ত্রণা। জন্মের পর থেকে নানাভাবে সলতে পাকানো চলতেই থাকে। যৌবন গড়ে উঠতে থাকে শৈশব-কৈশোরের গর্ভগৃহে।

কেমন ছিল এ বান্দার শৈশব? দু-চার কথায়। ক্ষয়াটে রোগা ভোগা, দারিদ্র্য আর না-পাওয়া। ওপার থেকে ছিন্নমূল বাবা এপারে অথৈ জলে। এক উপার্জনে একান্নবর্তী পরিবারে দিনেই পান্তা ফুরায়। দুই মৃত সন্তানসহ মার অষ্টম গর্ভ আমি। কী দেবেন ছেলেমেয়েদের মুখে সে চিন্তায় কৃশা তিনি। এরই মধ্যে দাদুর মৃত্যু। বলহরি হরিবোল। চোখে জল সবার। আমার চোখেও। অকারণে। দেখে দেখে হয়ত। কারণ বোঝে না এমনই শৈশব। সেই কান্নার শুরু। পরেও কারণে অকারণে চোখে জল। কবিতার পাণ্ডুলিপি। অভাবের সংসারে হঠাৎই একদিন মা হাতে তুলে দেন পাঁচ পয়সা। হাতে পয়সা, দিন দুনিয়ার মালিক, এক ছুট্টে মাইলটাক পেরিয়ে হাজারীবাগান প্রাইমারি স্কুলে। পাঁচ পয়সার দুটো আইস্ক্রিম দু-হাতে। একবার এ হাতের টা আরেকবার ওই হাতের টা চুষে নেওয়া। আহা জিভের সেই স্বাদ। প্রথম আস্বাদ। প্রথম উদ্দাম ছুট। আহ্লাদ। ৬-৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীতে বাড়ির এক অনুষ্ঠানে আধো বলে হাত-পা নাড়িয়ে রবীন্দ্র ছড়া আবৃত্তি। দুলকি চালটা কানে এসে মাথায় ঢুকে শরীর নাড়িয়ে দেওয়ার শুরু তখন থেকেই। সবিতা দিদিমনি খাতায় পদ্মফুল হাঁস পাখি এঁকে বলতেন… এ রকম এঁকে আনবি। অসম্ভব সুন্দরী সবিতা দিদিমনির চোখের মনি হতে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের কী রেষারেষি। সবিতা দিদিমনিকে স্কুলের বাইরেও আড়াল থেকে দেখার অদম্য লোভ। দিদিমনি হয়ত কোনোদিন জানতেও পারেননি এই বালক শিশুর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কথা। স্কুলে পড়তেই সেই দিদিমনির বিয়ে চোখে জল নিয়ে এসেছিল। মনখারাপ করা বোধহয় সেই প্রথম। খুব ভোরে মাঝেমধ্যে ঘুম ভেঙে যেত যৌথগানে। ভোরের টহলে বোষ্টম আর বোষ্টমী গান গেয়ে যেত কর্তাল বাজিয়ে। ঘুম রেশে পাখির কাকলির মধ্যে সে গান কেমন স্বর্গীয় মনে হত। পরে, মাধুকরি সংগ্রহে এলে ওদের ধামায় আমিই দৌড়ে গিয়ে চাল-আলু-মুলো-কাঁচকলা। এক ধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ। প্রতি বছর কালী পুজোর পরের ক’দিন গ্রামে পালাকীর্তন, কবিগান ইত্যাদির আসর বসত জাঁকিয়ে। কবিগান শুনতে শুনতে শুধু লড়াই-এর মজা পেতাম না, একটা রোমাঞ্চে ওদের অনুকরণ করতাম। কবিয়াল হতে বড় সাধ হতো। পরিপাট্যহীন শৈশব এভাবেই গড়িয়ে গেল পর্বান্তরে।

বয়সের মধ্যে দাগ কেটে শৈশব কৈশোর ভাগ করা যায় না। আমাদের শৈশব কৈশোর দুই-ই কিঞ্চিত বড়। জীবন ছিল বড় সরল একরৈখিক একস্থানিক এবং ছোট্ট। অভিজ্ঞতা, সে নেহাৎই সামান্য। শুধু টুকরো-টাকরা সঞ্চয়। পঞ্চাশ-চোর খেলায় সামান্য ভুলচুকে শিখা নামে মেয়েটির পিঠে দুমদুম কিল মেরে অভিভাবকের ভয়ে চৌকির নিচে সেঁধিয়ে থাকা কয়েক ঘণ্টা আমার মন খারাপ করে দিত। শিখার কথা ভেবে খারাপ লাগত। শিখা এসব পাত্তাই দিত না। ডানপিটে। অবশ্য ঘুরিয়ে মারত না। হেসে হাত ধরে মিটমাট করে নিত। দিদির পুরস্কার পাওয়া বই শিবরাম চক্রবর্তীর নিখরচায় জলযোগ আমায় উদোম হাসির ¯্রােতে ভাসাত। আবার বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী আমার মনের শুভ্র কাশের ওপর একটা ঝোড়ো ট্রেন চালিয়ে দিত। দুর্গার মৃত্যুতে অঝোর কান্না লুকোনো যেত না। এক ধরনের অদ্ভুত মন খারাপ। ছড়া কবিতার বইও পাঁপড়ি মেলল। মজাদার সুকুমার, দুলকি সত্যেন্দ্রনাথ, বুঝি না বুঝি রবীন্দ্রনাথ, তেজী নজরুল, আর সপ্রশ্ন সুকান্ত। আবৃত্তির জন্য, আবার কখনও হার্দিকভাবে নিভৃতে। মৃত্যুভয়ও এসময়। ভাগিরথীর জলে সপরিবার নৌকাডুবি। তাতে আশ্চর্যরকমভাবে বেঁচে ফেরা। ভয় সেঁধিয়ে যাওয়া মনে। আবার গরুরগাড়ি থেকে পড়ে তারই চাকা পেটের ওপর দিয়ে চলে যাওয়ায় ক্ষণিকের দমবন্ধ হয়ে আসা। মৃত্যুভয় জাগিয়ে রাখল। আরও নানা ভয়। সঙ্গে কুহক। কিছু রহস্যের হাতছানি। অবাধ ছিল না কৈশোর। কিন্তু বাধা ছিল কম। সুযোগ পেলেই বন্ধুরা মিলে জেলেদের নৌকা বেয়ে চলে যেতাম কাটিগঙ্গায়। জলে ভেসে থাকা পানিফলের জংলা। প্রায় স্বাদহীন পানিফল অমৃত মনে হত। মোষের পিঠে চড়ে ঘুরি ঘাসের মাঠ। দুলে দুলে চলি। কখনও দুলকি চালের সঙ্গে মুখস্ত কবিতা আওড়াই। হাফ-প্যান্টের ডোরে বাঁশের বাতার তরবারি বেঁধে ঝুলিয়ে দিই, মাথায় আমপাতার মুকুট। রাজা-বাদশাদের ডায়লগ মুখে। এক শীত-সরস্বতীর সকালে সামনে থেকে মোষের বাচ্চা হতে দেখি। বন্ধুরা মিলে এক সময় শরীর সম্বন্ধীয় কিছু রহস্য উন্মোচনের চেষ্টায় মাতি। খেলাচ্ছলেই সমবয়সিনীদের শরীর দেখা ও বোঝার আকূতির মধ্যে কিংবা নারী শরীরের অপার রহস্য আলোচনাতে নিজেদের সাবালক ভাবতে শিখে যাই। একদিন কয়েক বন্ধু মিলে পেয়ে যাই এক অনাস্বাদিত স্পর্শকাতরতা, যা আনন্দে উদ্বেল করে তোলে শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরা, সহস্র রসের ধারা এ শরীর থেকে অসহ্য স্ফুর্তির ঝলক ক্ষরণের মধ্যে পেতে চায় পূর্ণতা। রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে যায় যখন এই শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে কবিতার শরীর তার ডালপালা মেলতে শুরু করে। কৈশোরোত্তীর্ণ যন্ত্রণার মধ্যে কবিতা আশ্রয় হয়ে উঠতে লাগল। কী যেন চাই, কী যেন পাই না, রহস্যের মোচড়, পেয়ে হারাই, কষ্টানুভূতির মধ্যে কবিতাই প্রিয় হয়ে উঠল। কবিতার জন্য আবেগের তাড়নাতে লম্বা পাটক্ষেতের আলে আলে, ফাঁকা মাঠে, বাড়ির ছাদে, স্কুলের লম্বা করিডোরে, নদীর ধারে, জোনাক সন্ধ্যার গাবতলায়, কিংবা হঠাৎ একা হয়ে যাওয়া নিজস্ব কুঠুরীতে জোরে বা আস্তে কবিতা আওড়ে যাই। কৈশোরে কুহক যেমন, সবকিছুকে প্রশ্নে যাচাই করার প্রবণতাও তেমন। প্রশ্ন আর প্রশ্ন। অধিকাংশের উত্তর অজানা। তবু প্রশ্ন। প্রশ্নই বড় করে তুলল, অনেকটা পৌঁছে দিল পরবর্তী স্তরের দোরগোড়ায়।

‘ঝড়’ উঠেছিল। প্রশ্নের ঝড়, আবেগের ঝড়, যৌবনের ঝড়। এ তো আভ্যন্তরীণ। বাইরেও প্রবল ঝড়। যৌবনের শুরুয়াৎ-এর সময়টায় বারুদের গন্ধ ছিল। মৃত্যু আর হত্যা। কারা যেন স্কুল বিল্ডিং-এ লিখেছিল ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’। কারা যেন মেতেছিল একটা আমূল পালটে দেওয়ার ইচ্ছায়। রাষ্ট্র বনাম কিছু মানুষের বিপব চেতনার সংঘর্ষ। কত কত হত্যা আর যুবকের জীবন দান। পুলিশের গুলি বেয়নেট আর ধর-পাকড়। জেলের পাগলাঘণ্টি আর সার সার মৃতদেহ। উত্তাল হয়ে যাওয়া সময়ের তাল ধরে না রাখতে পারার বেদনা। একটু কমে আসতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। পড়শি দেশ হিসেবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। সেখানেও হত্যা আর সারি সারি মৃতদেহ। গণকবর। সীমান্তে আছড়ে পড়া মানুষের ভিড়। শিবির। পথে পথে স্কোয়াডিং করে ত্রাণ সংগ্রহ আর পাঠিয়ে দেওয়া শিবিরগুলিতে। শেষে যুদ্ধজয়। স্বাধীন বাংলাদেশ। আমরি বাংলা। এই দুয়ে মিলে এক উত্তেজনার আগুন, এক বেদনার আশঙ্কা, এক দ্রোহকাল, এক কথা বলিয়ে নেবার পলাশ সময়, লেখা লিখিয়ে নেবার স্পর্শকাতর স্বপ্ন সময়। এ সময়েই আমার মধ্যে জারণ, বিজারণ, স্বতঃজারণ।

‘ঝড়’ উঠেছিল লাল কৃষ্ণচূঁড়া প্রেমে আর অবিচ্ছেদি কবিতায়। কেমন ছিল তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ? কেমন ছিল সেই কল্পপ্রেমিকা ওরফে কন্যা? কী নিবেদন তাকে ঘিরে? একদিকে— ‘বুকের মধ্যে উঠে আসে তেরফলা ট্রাক্টর’। একটা রাগ একটা ক্ষোভ আর একটা কষ্ট কেমন দলামুচড়ে থাকে ভেতরে। অন্যদিকে—‘আগুনে পোড়ানো ভুট্টা খেলে তোমার মুখের ভৌগলিক পরিবর্তন/ আমি বলে দিতে পারি ঠিকঠাক/ কিন্তু তখন কি এক ঐন্দ্রজালিক সময়… আমি নির্বাক থেকে যাই।’ কিংবা প্রেমিকার কাছে জলসত্র চেয়ে বসা। ‘ছাব্বিশ, এবার জন্মদিনে আমাকে একটা কির্লোস্কার / পাম্পসেট উপহার দিও, অনন্যা!’ চাই, কাউকে চাই গভীর এবং নিবিড়ভাবে। ‘অনেকেই আসে অনেকেই যায়, কেউ কেউ দাগ রেখে যায়’। ভালোবাসার গভীরতার মধ্যে যেমন আক্ষরিক অর্থে কবিতা লুকিয়ে থাকে, তেমনি কবিতার গভীরে আক্ষরিক অর্থে নর-নারীর অপার ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। সে আমার স্পষ্ট অনুভবে এসেছিল, তার ঘ্রাণ টেনেছিলাম, তার সুষমায় মুগ্ধতা ঢেকেছিল আমার বোধ। সেও এক প্রেরণা, এক টান, এক নেশা, এক অমোঘ ঘোর, ভালোবাসা শব্দ ছাড়া আর কিছু দিয়ে যাকে বোঝানো যায় না। পাওয়ার মধ্যে মাঝেমধ্যেই না-পাওয়ার বেদনা বড় বেশি মূর্ত হয়ে পড়ে। সেই কল্প প্রেমিকা কি আসে?

‘কেউ কি সারারাত দরজার ওপারে স্বপ্নের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে?

যে আসে সে কড়া নাড়ে না

যে আসে সে পায়ের শব্দ তোলে না

যে আসে সে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে… আমি ভেতরে প্রতীক্ষায়।’

কিন্তু চাই, এক রহস্যের আবরণ সরাতে চাই, একটা হাত চাই, চাই লগ্ন হতে। ‘আমাদের প্রত্যেকের একজন নার্স চাই/ অসুস্থ বিছানায় থার্মোমিটার ভাঙা জ্বরে/ ঘনঘন জলপটি বদলাবে… একজন নার্স চাই।’ সেই কল্পকন্যারও কি এক অদ্ভুত কষ্ট ছিল? নাকি সে কষ্ট আমার কল্পনা, আমারই কষ্টের রেশ।

ঈপ্সিতার ঈপ্সিত কিছু ছিল না

সে ঘর সাজাতো, বাগান করত

মৃদুস্বরে রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি করত

অন্ধকার রাতে অপলক চেয়ে থাকত আকাশের দিকে।

……………

ঈপ্সিতা ঘর সাজাতো, বাগান করত

কিন্তু নিজেকে সাজাতো না…

আমি ক্ষুদ্র, আমার প্রাণ অসীম বড়। নিষ্প্রাণ আমি জড়, আমার জীবন জড়তার প্রতি ক্রমাগত বিরুদ্ধাচরণ এবং অসম্ভব সজীব। বিচিত্র বহুধামুখী অভিজ্ঞতা, কিন্তু আহ্লাদ করে কনসেন্ট্রেটেড করতে চায় এক মুখে। কিছুতেই ফোকাস সরাতে দেয় না, মুক্তি দেয় না যন্ত্রণা থেকে বেদনা আর ভালোবাসা থেকে। সব কিছুর সংশেষণে যে জীবন, তার যাপন থেকে যা কিছু উপলব্ধি আর অনুসন্ধান কেন যে অন্যকেও তাতে জারিত করতে চাওয়া, সেও তো এক সত্যানুসন্ধানই। কিছু কথা বলতে চাই, এও তো এক পীড়ন। অনেক কথা বলতে চাইলেও বলতে না পারা সেও এক অবদমন। সেই পীড়ন থেকে অবদমন থেকে রিলিজ খুঁজে নিতে চাওয়া। অগত্যা কলম এবং সাদা কাগজের মধ্যে গুঁজে দেওয়া নিজের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপ।

‘ঝড়’ উঠেছিল মনের আরও নানাদিকে। ফলশ্রুতি কবিতার ছোট্ট কাগজ, দুই বন্ধু মিলে। ‘শ্রাবস্তী’। কী উন্মাদনা আর আবেগ। অর্থ নেই, বন্ধুরা সবাই মিলে এগিয়ে এল দু-চার টাকা করে। লেখাপত্র সংগ্রহ, প্রেস, প্র“ফ, ব্লক, ছাপা কাগজে কালির অদ্ভুত গন্ধ। একটা ঘোর, একটা বন্ধন। দু-তিন বছরে ৭-৮ টা সংখ্যা প্রকাশ পেয়ে দম ফুরোলো ‘শ্রাবস্তী’র। সেই যে জড়িয়ে যাওয়া তার বাঁধন মাঝেমধ্যে আলগা হলেও খুলে পড়ল না আজও।

কল্পকন্যা কখনও কখনও রূপ পরিগ্রহ করে। তার রহস্য কুহক কবিতার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। হা-হা করে ওঠে মনটা। একটা ছারখার করে দেবার বাসনা কেমন উগ্র হয়ে ওঠে। যেন ইচ্ছে করেই ভেঙে দিতে চাই, হারাতে চাই। ‘উনুন সাঁজছে উপোসী/ বিনুনী বাঁধছে রূপোসী/ ওর উনুনে আগুন দে/ ওর রূপেতে আগুন দে।’ আবার আলো এসে সবকিছু শান্ত সমাহিত করে দেয়। এক অজানা আনন্দে তখন ‘তুমি’কে বন্দনা করে ফেলতে হয়। অসীম মনে হয় তাকে।

মৌসুমী বাতাসে চোখ ধুয়ে ভোরবেলা

প্রথম তোমাকেই দেখলাম

মৃত নদীখাতে এত আলো আগে দেখিনি

তুমি আলো হলে সূর্যও চন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়।

অথৈ ভালোবাসায় থই না পাওয়া এক যুবক শরীরের ওমটুকু লবণের স্বাদে শরীরের ব্যঞ্জনায় মেশাতে চায়। হয়ত সাময়িক পারে, আবার পারেও না। কিন্তু থই মেলে না।

আমাকে যারা আঘাত করে

তাদের কব্জির ক্ষমতা আমি জানি

আমার নিখাদ ঘুমে যারা ব্যাঘাত ঘটায়

তাদের চঞ্চলতার অর্থটুকু বুঝি

কিন্তু ভালোবাসে যে চোখ

তার কোনো থই পাই না কেনো?

একটু কথা বলার চেয়ে জমে যাওয়া কথাই বেশি। একটু আলতো ছোঁয়া পাওয়ার নাছোড় বাসনা। একটু সান্নিধ্য। একটু তার কাছে হিরো বনে যাওয়া। ভালোবাসার মহিমা।

যৌবনের এই ঝড়োয়া সময়ে আমি প্রেমে-কবিতায় মিলেমিশে। এর আলাদা কোনও রূপ নেই, রস নেই। নেই বিচ্ছিন্ন করার উপায়। বাইরের ঝড় ভেতরের ঝড় একাকার। তাই আলাদা করে আমার কোনো কবিজন্ম নেই। যেমন অন্য দু-চারটে কাজ করি, যেমন হাসি কাঁদি, নাচি, কুঁদি, খাইদাই, দাবা খেলি, অফিস করি, বাবার মৃত্যুতে হবিষ্যি করি, কলেজ পালাই, সিনেমা দেখি, প্রেম করি রসিয়ে, কাউকে শেষ করি কষিয়ে, আনন্দ হুল্লোড়ে মাতি, দশে মিলে পিকনিকে বেরিয়ে পড়ি, হেঁটে যাই একাকী আদিগন্ত মাঠ, ঘুমাই, স্বপ্ন দেখি, অসুখে যন্ত্রণায় কাতরাই, পড়ি বই— গড়ি মূর্তি— ছুঁড়ি ক্রিকেট বল, তেমনি কবিতা লিখি, এই মাত্র… কী এমন গূঢ় রস যা আমায় ঠেলেছিল! কী সেই ঘর্ষণ সংঘর্ষ যা আমাকে ভেঙেছিল! শত টুকরোয় আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাপনের ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে, তবু কেন এই কেন্দ্রমুখটিই কেড়ে নিল সব টান সব রক্ত সব আনন্দ-বেদন? সে এক বিমূর্ত কলাবউ দেখার রহস্য, একতারা খসে পড়ার রিন্ঝিন্-রিন্ঝিন্ শব্দানুভূতি, এক জেলি ত্বক কঠিন শরীরে স্পর্শানুভূতি আর বিষম শূন্যতায় আবেগী মনখারাপের সানাই। প্রেম যেমন এক আশা আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলল জীবনে, কবিতা তেমনি এক আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ালো।

প্রেমের যেমন বহু রূপ তেমনি প্রেমিকারও বহু আধার। সবকিছুতেই প্রেমের আবিষ্কার এই মহাসময়ে। কিন্তু বাস্তবে এসে অসীমের মধ্যে সীমা খুঁজে নিতে হয়, বহুর মাঝে এককে। ভালোবাসার গভীরতাই বলি আর অমোঘতারই দাবি হোক ভালোবাসার মানুষের সঙ্গেই ঘরকন্যা শুরু। সেও এক প্রেম বহিঃপ্রকাশের প্রথম পাঠ। এক ভয়ের, অজানার, আশঙ্কার অথচ কিছুতেই এড়ানো না যাওয়াকে অভিবাদন জানানো। এক ধরনের দায়, একটা টান, একটা বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া। যৌথ সৃষ্টি সন্তান। কবিতা এসব থেকে দূরে নয় কখনও। সংসার থেকে কবিতার জন্য প্রশ্রয় পেয়ে যাওয়া ক্রমাগত। প্রকৃত অর্থে ঘরনীর সতীনের প্রতি ভালোবাসা আমার থেকে কম নয় কখনওই। এ বড় কম পাওয়া নয়।

আর স্বপ্ন। সে তো দু-রকমের। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন, আর জেগে থেকে স্বপ্ন। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন কিছু কম নয়। কিন্তু জেগে থেকে স্বপ্ন তার থেকেও বেশি। কত তার রূপ কত তার ভাবনা। কত কত পাল্টে ফেলার অভীপ্সা। যৌবন স্বপ্নময়। সমস্ত স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে সে দাঁড়িয়ে। সমস্ত প্রচল থেকে তার মুক্তি বাসনা। সমাজ সংসার রাজনীতি অর্থনীতি সব কিছুর আমূল বদল। প্র্রেমকে মহিমাময় করে তোলার নিরন্তর বাসনা। পুড়ে যাওয়ার ইচ্ছে। ইচ্ছে সোনা হওয়ার। আনন্দ। আনন্দের ফোয়ারায় নিজেকে ভাসিয়ে তোলা। আনন্দের সন্তান আমরা। সেই আনন্দেই বিলীন হয়ে থাকার স্বপ্ন। অনেক সময়ই সে স্বপ্ন ভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগে না। মুহূর্তে পাল্টে এক অসহায় অবস্থা। হয়ত একটা গভীর খাদ, অন্ধকার, কিচ্ছু দেখা যায় না, এক হাতে খাদের কিনারা ধরে ঝুলছি অনাদি কাল থেকে, হাতের শিরা ফুলে উঠেছে, যেকোনো মুহূর্তে ছুটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে, উদ্ধারের আশায় পা ছোঁড়া অনর্গল, এক সময় তারও ক্ষমতা লুপ্ত। হয়ত একটা সাপ সে মুহূর্তেই উঠে আসছে সেই হাত বেয়ে, যে হাত ধরে আছে খাদের কিনারা। ঝটপট দেখার চেষ্টা সত্যিই সাপটা ঠিক কোথায় উঠে এল! এ সব স্বপ্নকাণ্ডের থিম তো একটাই— একটা পৌঁছুতে না পারা, শত চেষ্টাতেও নাগাল না পাওয়া, একটা অতৃপ্তি, অসহায়তা, ক্ষমতা থাকলেও শেষ করতে না পারা। এও তো জীবনেরই অঙ্গ।

যৌবন যেমন একদিকে স্বপ্ন তৈরি হতে দেখে তেমনি স্বপ্নভঙ্গও তার অভিজ্ঞতা। আমারই চোখের সামনে আবেগী অথচ আদর্শপূর্ণ কত স্বপ্ন গড়ে উঠল, আবার আমার সামনেই সে স্বপ্নসৌধ ভেঙে পড়ল। কিন্তু যৌবনের এমনই আউল-বাউল বাতাস, এমনই তাপ, এমনই নির্মাণক্ষমতা সে আবারও কোনো স্বপ্ন গড়ে নেয়। স্বপ্ন ছাড়া সে বাঁচে না, বাঁচতে পারে না। একদিকে স্বপ্ন গড়ার আবেগ উত্তাপ অন্যদিকে স্বপ্নভঙ্গের ব্যথা কষ্ট যন্ত্রণা। আর সব কিছুকে ছাপিয়ে প্রেমের মত্ততা ঝড় হয়ে দেখা দেয়। নিজেকে সেই বন্যায় ভাসিয়ে নিতে যে আনন্দ, তাই যৌবনের সঞ্চয়, যা বাকি জীবনের রসদ গড়ে তোলে। প্রেম একদিকে উন্মত্ততায় আবেগে যুক্তিহীনতায় ভাসিয়ে নেয়। আবার অন্যদিকে এক সূক্ষ্ম বেদনার অনুভূতি এক বিষাদভরা অতৃপ্তির কষ্টানুভূতি জাগিয়ে তোলে। আর দুই-এ মিলে জীবন তরীটি টলমল করলেও এক লক্ষ্যের দিকে এগুতে থাকে। জীবন-তরী। সময়ের ঢেউ-এ এগিয়ে যাওয়া। টলমল তো করবেই। ‘রিদমিক’ এই টলমলেই দুলকি চালটা। আর তরীর সঙ্গে ঢেউ-এর ছোট্ট মোলায়েম বা কর্কশ সংঘর্ষে অ্যাকশান, রিয়্যাকশান, ইনটার্যাকশান। অভিজ্ঞতা। অগ্রসরমানতাই অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাই অগ্রসরমানতার বিছন। ইনপুট, শুধুই ইনপুট। নিরত-নিরন্তর। জারণ বিজারণ জীবন নামক এক আশ্চর্য মননে। গ্রহণ আর উদ্গীরণ। আউটপুট। গ্রহণের পুনরালোচনা। কবিতা যার আধার। সে আমাকে দিওয়ানা করেছে, করেছে কাঙাল। সেই যৌবনেই কাঙাল। দ্রোহে কাঙাল, প্রেমে কাঙাল। আলো অন্ধকারের খেলায় সাত রঙের স্পেকট্রাম মুহূর্তে যা খুলেছিল তার জন্য কাঙাল। রঙের কাঙাল। অরূপের বিশাল সম্ভার যা রূপের মধ্যে সহসাই ধরা দিয়েছিল, সেই রূপের কাঙাল। স্পর্শাতীতও কখনও কোনোসময়ে তার স্পর্শ বুলিয়ে চলে যায় এই চড়া বালির শরীর, সেই স্পর্শের কাঙাল। গন্ধের কাঙাল। এই কাঙালেপনা যে ঝড় তোলে ভেতরে, বাইরের ঝড় তাকে প্রশমিত করতে পারে না। তখনই সূচীমুখ খুলে নিজেকে আরেকটু ব্যাখ্যান, নিজেকে সবার মধ্যে পড়তে চাওয়া।

কাঙাল শুধু চায়। আবার চায়ও না। চাওয়া না-চাওয়া দুয়েতেই তার আনন্দ। তার এক হাত বলেÑ দ্যাখো, এই করপুটে অঢেল ভাঁড়ার, সব কিছু ভরা, না চাইতেই এত যার, তার কী প্রয়োজন, কী চাইবে সে, আর কেনই বা? অন্যহাত বলেÑ শূন্য করতল। শূন্যের সব কিছু চাই। শূন্যের সঙ্গে যা কিছু যোগ হোক, শূন্য বেড়ে চলে। কিন্তু শেষাবধি কাঙাল চাইতে পারে না। কাঙালেপনার নমুনা ঝোলাভর্তি পথশশ্রম, একতারাময় বেভুল বাতাস, আর পারানির জন্য জমানো খুদকুঁড়ো নিঃশেষে তুলে দেওয়া। তখন বসে থাকা, ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায়। আবার ভরা যখন তখনও চাই। তখন কাঙালেপনা আসে না। দস্যুবৃত্তি ভালো বোঝে। ‘আরো চাই আরো চাই’ এর ডুগডুগি বাজিয়ে ত্রিশুল নাচিয়ে রণস্থল করে তোলে প্রলয় নাচনে। কোনও বেছেবুছে চাওয়া নয়, সমূল চাওয়া, চাওয়া আদিগন্ত। নিত্য নিত্য শৃঙ্গ জয়ে চোখে খুশির ঝিলিক। চাওয়া আর না-চাওয়া কখনও সমার্থক হয়ে পড়লে উল্লাস কমে আসে, আনন্দ খরচ হয়ে যায় বেহিসেবি পথচলার ঔদ্ধত্যে। কাঙালের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায় বসে থাকা আর দস্যুর অশ্বারোহিত গতির মাঝখানে এক চেনা আধচেনা, ভোলা-খ্যাপা নয়, উদ্দেশ্যকে প্রধান করে প্রাণপাতী নয়, কিন্তু আবার উদ্দেশ্যহীনও নয়, কী চায় কী চায় উগ্রতা নেই, কিন্তু কিছু তো চায়। কী চায়?

চায় ভালোবাসা, প্রেম। কেউ যেন না জানে, প্রেমিকা নামক এক রমনী চাই। একটু আড়াল চাই, একা একা দুজন হওয়া চাই, চাই অন্যস্বাদের এক পৃথিবী। একটা আকাশ পাতা চাই, মনুষ্য-হাড়ের কলম চাই, রক্ত ভরে দাও কলমে। উড়ু উড়ু বাতাসে মনে একটা বসন্ত চাই, দুকলি গাইতে চাই, পাঁচটা পঙক্তি লিখতে চাই ওই আকাশী পাতায়। একটু ভালোবাসা চাই যাতে ফাঁকা হয়ে যেতে পারে পাথর বুক, একটু দহন চাই যাতে ক্রোধে শুধুই বাতাস না লাগে, একটা মানসী চাই যেখানে সব দিয়ে নিঃশেষে শূন্য হতে পারি। একটা মানুষ যা চায়, চাইতে পারে, তার সবই চায় যৌবন। একটা মানুষ যা চায় না, চাইতে পারে না, তাও চায় যৌবন। এই চাওয়ার নাম যৌবন। এই চাওয়াই ঝড় তোলে। এলোমেলো করে দেয় সবকিছু।

চাইলেও অনেক সময়ই মেলে না। মিলবে কেনো? চাওয়ার মত চাইতে হবে তো? মিনমিন করে কাকে যে চাইলাম, সে নেমে গেল দূর অবগাহে। কাঙালের মত অন্য তোমাকে চাইলাম, অন্য সে তুমি ধূ-ধূ মাঠের জ্যোৎস্নায় মিশে গেলে। দস্যুর মত দাবড়ে চাইলাম, কর্পূর হয়ে গেল সব, মরিচীকা। মন প্রাণ হৃদয় দিয়ে চাওয়া হয়নি কি তবে? চাওয়ার ওপরেও কিছু চাওয়া বাকি রয়ে গেছে, রয়ে যায়। সব কিছু দিয়ে, নিজেকে শূন্য করে আহা যদি একবার চাইতে পারতাম!

শৈশব থেকে কৈশোর এমনই নানা উপাদান আর নানা অভিঘাতে আমার যৌবনকে ঋদ্ধ করেছে। আমাকে নষ্টও করেছে স্বাভাবিক সরল যাপনে। সময়ের ঢেউ আমাকে নানান অভিজ্ঞতা আর বোধের আত্তীকরণ ঘটানোর একটা ছোট্ট দায় চাপিয়ে পীড়িতও করেছে। সেই পীড়ন আর অপ্রকাশজনিত অবদমনই যৌবনে আমার কলমের সূচীমুখে। এ একই জীবনের মূর্ততা, যার কিঞ্চিৎ প্রকাশ ঘটেছে বলেই আমি মোক্ষতার দিকে দশ ধাপ এগিয়ে আর নয়ত সব কিছু ব্যর্থ হয়ে যেত এমনও নয়। তবু একটা চাহিদা, প্রকাশের চেয়ে অপ্রকাশের মাত্রা বেশি বলেই। যে পঙক্তিটি সেই কৈশোর থেকে লিখতে চাই, তা যৌবনেও লেখা হয়ে উঠল না। অতৃপ্তির কলম তাই চলতেই থাকল। তাই ছুটে চলা কিংবা অভিনিবেশ। বারবারই মনে হয়, এইতো কলমের ডগায়, মনের গোল্লাছুটে, মস্তিষ্কের ছাকনায় আটকে পড়েছে। পরক্ষণেই বুঝি, না এ সে নয়। হয়ত প্রেম আর কবিতার রহস্যের খোঁজ আমাকে সহস্র জন্ম আর যৌবনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাবে। আমি যাব। অনিঃশেষ রিলে-দৌড়ের ফিতের দিকে আমার অভিসার চলতেই থাকবে। ঝড়ের পূর্বাভাস সে কথাই বলছে। তারপর কখনও অন্ধকার জড়িয়ে ধরলে কোনো দুঃখ বা বিষাদ নেই।

তোমার ছাতার নিচে চল এই বৃষ্টিটুকু পার হয়ে যাই

‘আয় বৃষ্টি ঝেপে’ কারা যেন জন্মান্তর থেকে গেয়ে চলেছে

কাণ্ডজ্ঞান নেই কোনো, তুমি আর কত গা ঘেষে চলতে পারো?

‘ধান দেব মেপে’ কোথাও প্রতিশ্র“তিটুকু গাইছে না দোহারেরা।

ঝেপে ছাড়, বৃষ্টিই আসে না, ছাতা বন্ধ করতেই

আমাদের ব্যবধান দেখে আকাশও হেসে ওঠে।

কেনো বা এলাম, কেনোই বা চলে যাচ্ছি

শুধু এক মৃত্যুপ্রবণ নদীর কাছে গয়নাগুলো খুলি

বিন্দু থেকে কোথায় যেতে পারি। শূন্য হতে পারি সীমান্ত মেঘ।

লতাবাকল ছুঁড়ে বিমল শরীর পালকে পোশাকে ঢাকি।

শূন্য থেকে কোথায় ভেসে চলি অন্যঘাট, কলমিশাক,

মাটি পায় না শেকড়Ñ তবু জন্ম, তবু যৌবন, বিচিত্র বাঁচার সাধ

আর শুধু আরোহণের মাইলপোস্ট গুনে যাওয়া উৎকণ্ঠায়

হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লে সবার নজর উথলে ওঠে, বলে ‘আহ্লাদ আহ্লাদ’।

আসলে,

তীব্র হুইসেলে একটা সত্যি ট্রেন চলে না গেলে বুঝতেই পারতাম না

কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি আর কিসের অপেক্ষায়

[গদ্যে ব্যবহৃত সমস্ত কবিতা আর কবিতাংশ লেখকের কৈশোরোত্তীর্ণ বা যৌবন বয়সের।]

ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস

চিহ্নের শেষ পৃষ্ঠার আহ্বান ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’। এ আহ্বানে সাড়া দিতে নিপতিত মননের ঝড়ে। ঝড়ে কেঁপে উঠে আত্মজৈবনিকতার বাউল বাতাস গায়ে লাগে। জেগে ওঠে মনন, অবগাহনে নেমে পড়ি। আলোটা নেভালে নন্দিতা চারপাশে গরিলা অন্ধকার। কারফিউ কবলিত কাজল কালো রাত কাঁদে পৃষ্ট চিৎকারে। সুইচের বোতাম টিপলেই আলো নিভে অন্ধকার নামে। চিরন্তন এ সত্য শাশ্বত বিজ্ঞানের আবিষ্কার বিশ্বাসে অমলিন। এ কথা স্বীকার করি বলেই যৌতিক উচ্চ কণ্ঠে বলি; সত্যমঃ শিবমঃ সুদরমঃ। এই সত্য বিশ্বাস বোধে প্রতিষ্ঠিত। আলোহীন জীবন কারফিউ কবলিত স্বভাব বিরুদ্ধ দুঃশাসনে নিয়ন্ত্রিত। তাই কবি এখানে নিমজ্জিত অন্ধকারে প্রশ্নের সম্মুখিন। উদ্ধৃতিতাংশের ব্যাখ্যা বিশেষণ এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য নয়। সেজন্যই এ প্রসেঙ্গর ইতি টানছি তিন তালাক দিয়ে।

কোনো কিছু লেখা তো লেখকের স্বাধীন সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন। নিবিষ্ট চিত্তের একনিষ্ঠ সাধনা। খোদা ভক্তদের মতে যা কি-না পবিত্র এবাদতের সামিল। লেখক তার লেখনির ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ সার্বভৌম। স্বাধীন সত্বায় সৃষ্টিতে ক্রিয়াশীল। একান্তই লেখকের নিজেস্ব সে জগতে কারো অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ। চিন্তার মলিকিউল ভাঙছে মগজের কারফিউ। মলিকিউল ভেঙ্গে ভেঙ্গে সৃষ্ট পরমাণু। যার রূপান্তর পারমানবিক বা আনবিক শক্তি। আনবিক শক্তি বলে পৃথিবী নামক ভু-খণ্ডে গ্রহবাসী জনগণ শাসিত ও শোষিত। শাসকের নির্যাতনে নীপিড়নের শিকার নিরীহ এক প্রাণি গিনিপিক। অনুরূপ মগজ শাষিত নিয়ন্ত্রণাধীনে মানবের দৈহিক সচলতা অনস্বীকার্য। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাছে হাঁটুভাঙ্গা অচল যুক্তি দর্শন অবান্তর।

ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস প্রাকৃতিক তত্ত্বে প্রসঙ্গ প্রতিপাদ্য এক মহাদুর্যোগ। নিপতিত দুর্যোগ ভাঙ্গছে মগজের কারফিউ। স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধে খড়গ উদ্যত। খণ্ড বিখণ্ড অস্তিত্ব আমার বেসামাল নিপতিত দুর্যোগে। জীবন চলার পথ পরিক্রমায় আমি ঝড়ের প্রতিকূলে। অতিক্রান্ত তারুণ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সামরিক শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ। চারিদিকে তখন গেরিলা অন্ধকার। কারফিউ কবলিত কাজল কালো রাত ডুকরে কাঁদে পৃষ্ট চিৎকারে।

সবে শৈশব উত্তীর্ণ। কৈশোরাম্ভে গ্রীষ্মের ছুটির একদিন। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে কোকিলের কুহুতানে মাতাল প্রকৃতি। বসন্তের বাউল বাতাসে উতাল চারদিক। ‘ফুল ফুটুক আর না ফুকুট আজ বসন্ত।’ উদাসী হাওয়ায় দোলা লাগে উচাটন মনে। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামদেশে গ্রীষ্মের ছুটিতে একদিন। গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় ঘেরা উদাসী বনের বায়ে বাড়ির আম বনে ছেলে মেয়ের একসঙ্গে তুমুল আড্ডা। সূর্য আসেনি তখনো মাথার উপর। খেলার সঙ্গিনী এক আত্মীয়া বালিকার বাসনা।

কাঁচা আমের টক টক গন্ধে বুঝি তার জিভে এসেছিল জল। তার বায়না মেটাতে উঠেছি আম গাছে। আম ডালে ঝাঁকি দিতেই একটা আম সজোরে পড়লো তার পিঠে। লেগেছিল বুঝি, কাঁদলো হাউ মাউ করে। ঝড় এসে আঘাত হানলো আমার উপর। আমি নন্দ ঘোষ আমার শত দোষ। দোষী সাব্যস্তপনায় আমি নন্দ অভিযুক্ত। বাবা কর্মজীবনে ছিলেন জমিদারের নায়েব। জমিদারের মত সহায় সম্পদ আমার বাবার নেই। তবে বাবার ছিল জমিদারি মেজাজ। তাঁর কড়া সামরিক শাসনে সারাক্ষণ টতস্থ থেকেছি আমরা। পান থেকে চুন খসলেই বাবার রক্ত চক্ষু শাসন থেকে রেহায় পাওয়া ছিল দুষ্কর। মা বাবার প্রথম সন্তান হওয়া সত্বেও অপরাধের শাস্তি পাওয়া থেকে নিস্তার পাইনি কখনো। আত্মীয় বালিকার কান্নার অভিযোগে শাস্তি এতোদিন পরেও মনে দাগ কেটে আছে। শাস্তি পেয়ে জেদ চাপলো। সে আমার মনের মনি কোঠায় জায়গা দখল করলো। ঠিক যেন ইংরেজ শাসক লর্ড উইলিয়াম মাউন্টব্যাটন এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার সামিল। এ আমার ভালোবাসা। আমার প্রথম প্রেমে পরিণত হলো চুপ কথার অন্তরালে নীরবে। মনের মনি কোঠায় ভালোবাসার রাজ্যপাটে অধিষ্ঠিত দেবী সম্রাজ্ঞীর আগমনে ঝড় উঠেছে। বাউল বাতাস খেলছে লুকোচুরি দীর্ঘদিবস দীর্ঘরজনী। মহুয়া নেশায় মাতাল। ঝড়ের সে তাণ্ডব তোলপাড় করেছে হৃদয়ের খনি।

ঘড়ির কাঁটার সাথে সময়ের পাল্লা দৌড়ে এগুতে এগুতে শিক্ষা জীবনে রাজনীতি সংগঠন আর এলো কবিতার ঝড়। দ্বৈত ঝড়ে সমান্তারাল গতিতে চলেছি। একাত্তরে সারাদেশ উত্তাল। মাতৃভূমির স্বাধীনতা উদ্ধারে হানাদার বর্বরের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালিরা। তখন রাজপথে গণগণ মিছিল। অগ্রভাগের সৈনিক আমিও। শরিক হয়েছি উনসত্তর থেকে একাত্তর। উন্মত্ত সেই মহাদুর্যোগে আমি অপরাজিত। আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছি মাত্র। সার্বিক মুক্তি আসেনি। স্বাধীনতার পর লেখাপড়া শেষে কর্মের সংস্থান। চাকুরিতে স্বদেশে শুরু হয় প্রবাসী জীবন যাপন। সে সময় কলকাতা, বহরমপুর (ভারত), ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, বাগেরহাটে বান্ধবীদের সাথে পত্রমিতালী। স্থানীয় উদীচী-তরুণীর প্রেমঝড়ে আমি স্বপ্নের রাজকুমার। সবাই তারা ছ্যাঁকা পেয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে গেছে। মনে দাগা পেয়ে ভাটির টান পড়লেও কবিতা সুন্দরীর লোভের জোয়ার উজানে টেনেছে বরাবর।

উজানের ¯্রােতধারায় মিলেছি দেশ বিদেশের অনেক কুলে ও মোহনায়। দেশের ও বিদেশের বিশেষ করে ভারত ত্রিপুরা, আসাম কবি লেখকের সাথে পত্রযোগে সাক্ষাতে ঘটেছে পরিচয়। যোগাযোগের মাধ্যমে আমার সাহিত্য চর্চার দিগন্ত হয়েছে প্রসারিত সম্প্রসারিত। সেই আলোকে বেড়েছে পড়াশুনা, সঞ্চিত হয়েছে অভিজ্ঞতা। তাগিদ অনুভব করেছি লেখা প্রকাশের। সাহিত্য চর্চার জন্য সাহিত্যের সংগঠন পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্র ছাড়াও রাজনীতি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে জড়িয়ে নিজের খেয়ে ব্যয় করে বনের মোষ তাড়িয়েছি। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যখানে ঝড় উঠেছে। বাউল বাতাস লেগেছে দেহ মনে। উতাল বাতাসে উত্তোলিত আলোড়িত আন্দোলনের বিরুদ্ধ গতিতে সামিল হয়েছি। কলেজে পড়ার সময় এক স্যার (প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাপ্ত ইতিহাসবিদ পরবর্তীতে জাতীয় যাদু ঘরের কিউরেটর) বলেছিলেন সাহিত্যের পথ বড় কণ্ঠকাকীর্ণ। এ পথে এসো না। তার কথা হাড়ে হাড়ে টের পাই। এখানে নোংরামী সততার অভাব তোষামদ চাটুকার সিন্ডিকেট ক্ষমতার অপব্যবহার প্রভাব বিস্তার পুরস্কার কেনা বেচা বৌ দখল দালালী তাবেদারি আমলাবাজি প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কোন অপকর্ম হয় না? পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বৈধ অপেক্ষা অবৈধ জারজের উৎপাদন সংখ্যাতীত। ফলে এখানে প্রকৃত মেধাবীরা মূলহীন অপাংক্তেয়। ব্যতিক্রম ছাড়া মূলত: সাহিত্য রাজধানী কেন্দ্রিক। সেখানে ছুরি কাঁচি হাতে অনেক নাপিত কামানোর জন্য বসে থাকেন। অনেকে মিডিয়া এজেন্সি নিয়ে বসে আছেন। তাদের সনদপত্র নিয়ে কবি লেখকরা অনেকেই জাতে ওঠেন। প্রবাদ আছে— প্রচারে প্রসার। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই কবিতা স্বরণযোগ্য। ‘বিজ্ঞাপনে ঢেকেছে মুখ।’ আমাদের দেশে অনেকেই আছেন, যাদের বয়সের সমান বা দ্বিগুণ তিনগুণ বই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এর উল্টোও আছে। কবি হেলাল হাফিজের মাত্র একটি কবিতার বই। আবুল হাসানের তিনটি। আলোর জন্য এক ঘরে একাধিক মোমবাতি অপ্রয়োজনীয়। বাংলা একাডেমীর পুরস্কার যাদের হাতে সেটা বাগাতে (পুরস্কার প্রত্যাশীরা) তাদেরকে আবার পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রকৃতার্থে কি আছে আমাদের সাহিত্য ভাণ্ডারে। রাজনীতি সমাজ ও দেশ নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনীতিকরা দেশ চালায়। এদেশের গণতন্ত্র কাগজে কলমে আর ভাষণে। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। গণতন্ত্রের নামে দূর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি। লাগামহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতা দখলের রাজনীতি এদেশে। সাহিত্যাঙ্গনও সে দূষণমুক্ত নয়।

কাঁচা শরীরে ঝড়ের সময় চুম্বনে অভিসিক্ত করার মতো আমার পক্ষে ওকালতির কেউ ছিল না। দাদাকে নানাকে দেখি নি। দাদী মরার সময় বয়স ছিল ৬/৭ বছর। নানী ভারতের নাগরিক। তাকে শুধু চোখেই দেখেছি। তার মধুমাখা যাদুকরি স্নেহ মায়া ও আমার জন্য ‘এ্যকনা কণ্যা’ সঙ্গিনীর পক্ষে তার মুখে ঝড় ওঠেনি। ‘এ্যকনা কণ্যা’ লাগতো যখন সে ঝড় উঠেছে বাউল বাতাসে ছুটে গেছে মন কবিতার ছন্দে। সে দোলায় থামেনি কবিতার প্রকম্পন। বইছে আজো নিরন্তর। একই সময়ে রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িয়ে থাকা নিয়ামক শক্তি আমাকে প্রবল দেশাত্ববোধে উদ্দীপ্ত করে। সে প্রণোদনায় দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ি। তাই শারীরিক ঝড়ে বাউল বাতাসে পরাজিত হইনি। আমার রাজনীতির দর্শন আমাকে আত্মমর্যাদাশীল একজন সৎ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার প্রণোদনা যুগিয়েছে। দেশ মাটি ও মানুষের ঘনিষ্ঠতায় শিকড়ে প্রবেশের প্রয়াস পেয়েছি।

আপাত রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও স্বাধীনতার সুফল বঞ্চিত ভাগ্যহীন বাঙালি জাতি। এখনো মৌলিক অধিকার হননের শিকার। স্বাধীনতার সুফল ছিনতাইকারী সামরিক জান্তার যাতাকলে পিষ্ট বাঙালি। বিকৃত ইতিহাসে পরিচিত বাঙালি নামের আড়ালে বাংলাদেশী। ষড়যন্ত্র অভূত্থান যেন নিয়তির লিখন এ জাতির। তা এখনো থামেনি। মুক্তির লড়াই চলছে। এ লড়াই চলবে। অপপ্রচারের গোয়েবলীয় মিথ্যাচারের মারণাস্ত্র এনেছে বিভ্রান্তি বিভাজন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণেরা ঐক্যবদ্ধ। এ সাহস হোক আমাদের পাথেয়।

আমার সফলতার বিফলতার মূল্যায়ন হয়তো হবে কিম্বা হবে না তা সময় সাপেক্ষ। তবু দেশোদ্ধারে স্বপ্নের স্বাধীনতার সম্মুখ লড়াইয়ে অদম্য কলম সৈনিক আপ্রাণ লড়ছি। প্রতীজ্ঞা প্রত্যয়ে দৃঢ় বিশ্বাসে আজীবন সংগ্রামী। ভোগের উজ্জ্বল শিখা ত্যাগের ফুৎকার স্বমহিমায় দ্রোহের বাতি ঘরে স্বপ্নের সাতমহলায় ক্ষুব্ধতায় বোনে আনন্দ অক্ষর মালা। জীবনের যাত্রা পথে খুঁজে ফিরি অপার আনন্দ।

ঝড় উঠেছে, বাউল বাতাস গায়ে লাগে পৃথীবির আবাসস্থলের বাসিন্দা বলে। সমাজ বিচ্যুত প্রাণি নই। একলা আমার জগতে হতাশা নামক সংক্রামক ব্যাধির ছোঁয়া গ্লোবস পরা দুহাতে আবর্জনা সরিয়ে ফেলি। দুর্দমনীয় প্রচেষ্টায় কানে আসে শৈশবের শোনা অচেনা গায়কের কণ্ঠে গাওয়া চেনা সে গানের সুর। ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস আজকে হলো সাথি, সাতমহলার স্বপ্নপুরের নিভলো হাজার বাতি’ আলো নেভালো নন্দিতা। চারপাশে নেমেছে গরিলা অন্ধকার। চলেছি অন্ধকারের পথে একাকী যাত্রী। আঁধারের গর্ভজাত আলোর ওপারের পৃথিবী আলোময়। অন্ধেরাও দৃষ্টিতে আলো দেখে। সে আলো দেখার মানস চক্ষু চাই। বেশি দূরে নয় সে আলো। সে আলো খুঁজে দেখি প্রত্যেকেই অন্তরের পর্দায়। নিজের ভেতরে সে প্রদীপ জ্বলুক চিহ্ন মনলোকে। পথের দিশারি হোক পথ পরিক্রমায়।

পঞ্চাশ-আশির দশকের কবিতা

পঞ্চাশের দশক

 

শামসুর রাহমান

একটি কবিতা

বহুদিন থেকে

আমাদের পৃথিবীতে শান্তি পলাতক।

তবুও শান্তির খোঁজে নিরলস মনে

আমরা হেঁটেছি বহু জনতার ভিড়েঃ

সন্ধ্যায় পাখির মতো

আমরা খুঁজেছি শান্তি আঁধারের-আলোয়,

আমরা খুঁজেছি শান্তি পৃথিবীর মাঠের সবুজে

রাত্রির ঢেউয়ের সুরে, নগরের পথে পথে,

আকাশের নিবিড় ছায়ায়।

বহুদিন থেকে

আমাদের পৃথিবীতে শান্তি পলাতক…

তবু যেন

কোথাও সান্ত¡না জেগে আছে,

কেননা আকাশে শুনি আজো

হাওয়াদের গানঃ

আজো পৃথিবীর আদিবাসী

বলিষ্ঠ প্রত্যয় আনে জীবনের গানেঃ

আজো দিকে দিকে নবাঙ্কুর কাঁপে

প্রাণের স্পন্দনেঃ

হৃদয়ের রোদ আজো দেখি দীপ্তিমান ॥

যদিও কবোষ্ণ কান্না আর

অনেক তুহিন দ্বীর্ঘশ্বাস জমা আছে

পৃথিবীর অশান্ত হৃদয়ে

তবু এইটুকু…

চাঁদ ফুল পাখি মেঘ নক্ষত্র শিশির আর নারীর প্রণয়

আজো মিথ্যা নয়…

নতুন ধানের স্বপ্ন মিথ্যা নয় কভু।

বহুদিন থেকে

আমাদের পৃথিবীতে শান্তি পলাতক।

সময়ের বিমর্ষ কিনারে এসে তবু

সোনালী দিনের আশার রাখিঃ

সেই আশা চিরঞ্জীব হয়ে রয় নবজাত সূর্য্যরে ললাটে ॥

[নতুন কবিতায় প্রকাশিত]

 

ষাটের দশক

 

আল মাহমুদ

সোনালী কবিন

৮.

লোবানের গন্ধে লাল চোখ দুটি খোলো রূপবতী

আমার নিঃশ্বাসে কাঁপে নক্শাকাটা বস্ত্রের দুকূল?

শরমে আনত কবে হয়েছিল বনে কপোতী?

যেন বা কাঁপছো আজ ঝড়ে পাওয়া বেতসের মূল?

বাতাসে ভেঙেছে খোঁপা, মুখ তোলো হে দেখনহাসি

তোমার টিক্লি হয়ে হৃদপিণ্ড নড়ে দুরু দুরু

মঙ্গলকুলোয় ধান্য ধরে আছে সারা গ্রামবাসী

উঠোনে বিন্নীর খই, বিছানায় আতর, অগুরু।

শুভ এই ধানদূর্বা শিরোধার্য করে মহিয়সী

আবরু আলগা করে বাঁধো ফের চুলের স্তবক,

চৌকাঠ ধরেছে এসে ননদীরা তোমার বয়সী

সমানত হয়ে শোনো সংসারের প্রথম সবক

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল

গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।

 

ষাটের দশক

 

শহীদ কাদরী

রাষ্ট্র মানেই লেফট্ রাইট লেফট্

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে স্বাধীনতা দিবসের

সাঁজোয়া বাহিনী,

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে রেসকোর্সের কাঁটাতার,

কারফিউ, ১৪৪ ধারা

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে ধাবমান খাকি

জিপের পেছনে মন্ত্রীর কালো গাড়ি,

কাঠগড়া, গরাদের সারি সারি খোপ

কাতারে কাতারে রাজবন্দী;

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় মিছিল থেকে না-ফেরা

কনিষ্ঠ সহোদরের মুখ

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় তেজগাঁ

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা,

হাসপাতালে আহত মজুরের মুখ।

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় নিষিদ্ধ প্যামফ্লেট,

গোপন ছাপাখানা, মেডিক্যাল

কলেজের মোড়ে ‘ছত্রভঙ্গ জনতা—

দুইজন নিহত, পাঁচজন আহত’— রাষ্ট্র বললেই

সারি সারি ক্যামেরাম্যান, দেয়ালে পোস্টার:

রাষ্ট্র বললেই ফুটবল ম্যাচের মাঠে

উঁচু ডায়াসে রাখা মধ্য দুপুরের

নিঃসঙ্গ মাইক্রোফোন

 

রাষ্ট্র মানেই স্ট্রাইক, মহিলা বন্ধুর সঙ্গে

এনগেজমেন্ট বাতিল,

রাষ্ট্র মানেই পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত

ব্যর্থ সেমিনার

রাষ্ট্র মানেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাওয়া

রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা

রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা মানেই

লেফ্ট্ রাইট্, লেফ্ট্ রাইট, লেফ্ট্—!

 

ষাটের দশক

 

আবুবকর সিদ্দিক

এলোমেলো পরমায়ু

সন্ধের চেয়েও ঘন মেঘ করে আসে।

আঁচলে হলুদ মুছে মেজবউ ঘরে এসে ডাকে,

ও মোহন, দ্যাখ দিকি হাটুরেরা ফিরে এলো নাকি?

 

নেই নেই পথে নেই দিগন্তেও নেই,

সড়কের সংসারে একটিও খড়কুটো নেই,

ডুবন্তের হাতনাড়া নেই জলতলে।

এইখানে ঘট ছিলো, এইখানে বাঁধাবট ছিলো।

যারা যারা ছায়াশানে পঞ্চায়েতে বসে ছিলো,

কেউ এলো না তো।

আদুল গেরস্থ সব পথে পথে ঘোরে ভিনগাঁয়ে।

 

সম্বরা দিতে গিয়ে মেজবউ আখা ভেবে মন ঠেলে দিলো,

দুয়োরে শিকল তুলে একবস্ত্রে নেমে চলে গ্যালো।

সন্ধেতারা চুরি করে তুলে নিলো তাকে,

এলোমেলো হয়ে গ্যালো গোছগাছ পরমায়ুটুকু।

 

আবছায়া ফিশ ফিশ স্বরে ডেকে বলে,

ভাঙাচুড়ি পড়ে আছে চাঁদের নিচেয়।

এ মাটিতে পথরেখা চিনবার আর কোনো ধুলোছাপ নেই,

আর কেউ নেমে গিয়ে ফিরে আসে না তো।

 

ষাটের দশক

 

ওমর আলী

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি

আইভি লতার মতো সে নাকি সরল, হাসি মাখা;

সে নাকি স্নানের পরে ভিজে চুল শুকায় রোদ্দুরে,

রূপ তার এদেশের মাটি দিয়ে যেন পটে আঁকা।

 

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো

মায়াবী উচ্ছ্বাস দুটি চোখ, তার সমস্ত শরীরে

এদেশেরই কোন এক নদীর জোয়ার বাধভাঙা;

হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে।

 

সে চায় ভালবাসার উপহার সন্তানের মুখ,

এক হাতে আঁতুড়ে শিশু, অন্য হাতে রান্নার উনুন,

সে তার সংসার খুব মনে-প্রাণে পছন্দ করেছে;

ঘরের লোকের মন্দ-আশংকায় সে বড় করুণ।

 

সাজানো-গোছানো আর সারল্যের ছবি রাশি রাশি

ফোটে তার যত্নে গড়া সংসারের আনাচে-কানাচে,

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর এ ব্যাপারে খ্যাতি;

কর্মঠ পুরুষ সেই সংসারের চতুষ্পার্শ্বে আছে।

 

ষাটের দশক

 

আবদুল মান্নান সৈয়দ

মরণের অভিজ্ঞান

সবুজ চাঁদের নিচে প’ড়ে আছে আমার শরীর।

চেতনা, তারার নিচে। আমার চীৎকার উঠে যায়

অলীক ফিটনে চ’ড়ে ঘুরে-ঘুরে আরক্ত চাকায়

নীল শূন্যে। নদীঃ আমার জীবন; বাকি সবঃ তীর।

 

প্রবেশ করেছি ধীরে মরণের ধবল প্রাসাদে—

মর্মর-পাথরে তৈরি মেঝে, ছাদ সময়ে বানানো।

মাথা ফেটে সব স্বপ্ন চূর্ণ-চূর্ণ প’ড়ে আছে যেনঃ

সবি খাবে বিশদ বিড়াল, কেবল কৃতিত্ব বাদে।

 

লুপ্ত ঐ একতান গোধূলির তাম্র অনুতাপ;

ধ’সে পড়ে স্তনের গম্বুজ; চৈতন্য, একটি তিলঃ—

নিসর্গ, রমণী, সত্তাঃ নিরর্থ পাগল অনুলাপ।

তৃণ শীর্ষে শুয়ে হিশেব করবো আজ, যায় কে-কে?—

সব নদীর উপরে ধবল-ধূসর গাঙচিল

ওড়ে মরণের, নীল নৌকোর জীবনে যায় ঠেকে ॥

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

রফিক আজাদ

পিছনে ফেলে আসি

পিছনে ফেলে আসি :

একটি বাড়ি—

নিকানো নয়, পরিত্যক্ত, ভাঙা ইটের সারি,

বয়ঃপ্রাপ্ত কিছু বৃক্ষ, শুকনো ডালপালা;

 

পিছনে ফেলে আসি :

কিশোর ঘুড়িগুলি,

আদিগন্ত দীর্ঘ হালট, শিউলি-ঝরা ভোর,

বোষ্টুমিদের নাড়–মোয়া, ঝকঝকে ঘর-দোর,

এবং তাদের মিষ্টি ঠাট্টা : ‘ওগো-হ্যাঁগো’, হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

 

পিছনে ফেলে আসি :

পায়ে-চলা পথ, রেশমি ঘাসের বন,

কয়েকটি খুব পুরনো গাছপালা,

শ্যাওলা-সবুজ জলের পুকুর,

পুকুরে সাঁতরানো বুকে

স্তব্ধ হ’য়ে থাকা

রল-উলরোল সাত-সমুদ্রের ঢেউ।

 

পিছনে ফেলে আসি :

গভীর গহন হাতি-ঘাসের বন,

চিনিচম্পা আমের দুপুর

কিংবা কোনো আকাশ-উপুড়

জলবতী মেঘের মৃদু একটানা বর্ষণ

 

পিছনে ফেলে আসি :

কুয়োর মতো গভীর দু’চোখ অশ্রুভেজা : মা;

অনাবাদি জমির মতো ধূ-ধূ দৃষ্টি : বাবা;

প্রবীণ লাঙল, বৃদ্ধ বলদ, জরাজীর্ণ বাড়ি;

কয়েকটি খুব ক্ষুধার্ত মুখ, তোবড়ান গাল, ক্লিষ্ট হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

পিছনে ফেলে আসি :

কলাগাছের ছায়ায় ওড়া অপেক্ষাতুর

একটি সবুজ শাড়ি,

‘বিদায়-বলা একটি মুখের কান্নাচাপা হাসি,

পিছনে ফেলে আসি ॥

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

মোহাম্মদ রফিক

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ঝরে পাতা শীতার্ত সন্ধ্যায়

ধুলোবালি খড় নিয়ে কিছু আলো কিছু অন্ধকার

প্রতি ঘরে-ঘরে টেমি হাওয়ার আঘাতে কেঁপে ওঠে,

 

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ভয়ার্ত বাথানে গোরু-মোষ

তীব্র শব্দে শ্বাস ফেলে চারিধারে সন্ত্রস্ত বিহ্বল

খাল বিল ছেড়ে এসে হাঁসের খোপের ধারে-ধারে

 

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে হেঁটে যায় ছাড়া আঘাটায়,

ঝোপের আড়ালে লোভে জ্বলে ওঠে দুটি তীব্র চোখ

ক্ষণিক চমকে যায় বাঁশবনে ঝুলন্ত বাদুড়,

 

হাঁটা-চলা খড়ের চালের পর অচেনা পায়ের

ঝুপঝুপ শব্দ ওঠে শ্যাওলা পচা পুকুর ঘাটায়

তেঁতুলগাছের ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে নামে

 

অকারণ; বিষ্ণুপুর জুড়ে ভয়ে ভয়ে দেহগুলি

জড়সড় পুরনো কাঁথার নীচে আবেগে নিথর

কয়েকটা কুনো ব্যঙ নড়ে ওঠে চৌকির ওপর,

 

কাছাকাছি কড়–ই গাছের ভিড়ে গোঙায় ভুতুম,

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ছম-ছম ঘুম নেমে এলে

কালকেউটে গর্ত ছেড়ে বের হয় হিংস্র ফণা মেলে।

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

আবুল হাসান

ভালো লাগছে, রহস্যপ্রবণ লাগছে

ভালো লাগছে। এতকাল পরে আজো মানুষকে ভালো লাগছে।

রহস্যপ্রবণ লাগছে।

বড় তরতাজা লাগছে। যেমন যুবতী, যেমন জরায়ু, যেমন শিশির।

 

ভালো লাগছে। ফুল ও পূর্ণিমা, পুরাতন ভালোবাসা ভালো লাগছে।

মানুষ এখন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে ফিরছে। মানুষকে ভালো লাগছে।

মানুষকে মারা আজ কোনো কঠিন ব্যাপার নয়; সব সহজ।

 

জর্জর সঙ্গম, ফুল, জন্মে জেগে ওঠা মৃত্যু, অন্ধকার। সব সহজ।

কোনোকিছু আজ আর কোনোকিছু কঠিন ব্যাপার নয়।

ভালো লাগছে। বেরিয়ে আসছে বিষ, ক্ষয়, মৃত্যু ও জরা।

ফুলের মালায় বেরিয়ে আসছে অবেলায় অজগর, ভালো লাগছে।

রহস্যপ্রবণ লাগছে।

ফুল ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে ফের বলছে ফুল ছিঁড়িও না।

কুকুরের মধ্যে ফের কুকুর বসিয়ে ফের বলে উঠছে কুকুর হইতে সাবধান!

 

ভালো লাগছে। মানুষকে ভালো লাগছে। ভালো লাগছে। সারাদিন

ভালো লাগছে। সারাদিন রহস্যপ্রবণ লাগছে, ভালো লাগছে,

ভালো লাগছে না।

 

সত্তরের দশক

 

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

খতিয়ান

হাত বাড়ালেই মুঠো ভ’রে যায় ঋনে,

অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা।

রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে,

আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা।

 

টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুরের ঘাম,

ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল,

নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম,

চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল।

 

ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে,

উড়াও নিরবে নিভৃত রুমালখানা।

পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে,

আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা—

 

টোকা দিলে ঝ’রে পড়বে পুরোনো ধুলো

চোখের কোনায় জমা এক ফোঁটা জল।

কার্পাশ ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো,

থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল।

 

জাগবে না বনভূমির সিঁথানে চাঁদ,

বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া

পড়বে না মনে, অমীমাংসিত ফাঁদ

অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া।

 

হাত বাড়ালেই মুঠো ভ’রে যায় প্রেমে,

অথচ আমার ব্যাপক বিরহ ভূমি।

ছুটে যেতে চাই— পথ যায় পায়ে থেমে,

ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নোখে তুমি।

 

সত্তরের দশক

 

আবিদ আজাদ

জন্মস্মর

স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল

 

সেই প্রথম আমি যখন আসি

পথের পাশের জিগা-গাছের ডালে তখন চড়চড় করে উঠেছিল রোদ

কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড-খণ্ড রূপালি আগুন

ঘাসে-ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য-ঝরানো গুচ্ছ-গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ

এইভাবে আমার রক্তপ্রহর শুরু হয়েছিল

সবাই উঁকি দিয়েছিল আমাকে দেখার জন্য

সেই আমার প্রথম আসার দিন

হিংস্রতা ছিল শুধু মানুষের হাতে,

ছিল শীত, ঠাণ্ডা পানি, বাঁশের ধারালো চিলতা, শুকনো খড়

আর অনন্ত মেঝে ফুঁড়ে গোঙানি—

আমার মা

স্বপ্নের ভিতর সেই প্রথম আমি মানুষের হাত ধরতে গিয়ে

স্তব্ধতার অর্থ জেনে ফেলেছিলাম,

মানুষকে আমার প্রান্তরের মতো মনে হয়েছিল—

যে রাহুভুক।

 

অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল

তিনজন বিষণ্ন অর্জুন গাছ।

সেই থেকে আমার ভিতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছি—

 

মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে?

 

সত্তরের দশক

 

ময়ুখ চৌধুরী

নৈতিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে

বাইরে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

চলো ওগুলো ঢুকিয়ে রাখি ফ্রিজে

যখন দরকার হবে তখন না হয়…

 

প্রতিদিন কেউ না কেউ দরজা খুলে নেমে যাচ্ছে নিচে।

গতকাল টমেটোর লাল মাংস ছুটে ছুটে গেছে ক্যামেরার মুখে।

আজ গাড়ির দরজার মতো খুলে যাচ্ছে ফ্রিজ,— নামছে

উপচে পড়া ফুলকপি স্বামীকে ছাড়িয়ে

মাছের সন্ত্রাসী লেজ মুড়োসহ চলে যাবে কাল

বর্ধিত সভায়

 

এইভাবে প্রতিদিন ওঠানামা করে এটা ওটা। আর, তারা

দরজায় একঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কতোদিন!

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে স্বপ্ন দেখে— রোদ আর হাওয়া।

 

অচল দ্রব্যের সঙ্গে থেকে একদিন ফ্রিজটাও অচল হয়ে যাবে।

 

সত্তরের দশক

 

দাউদ হায়দার

পথিক জন্ম যদি

মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বেদনা বেজে ওঠে—টের পাই

গভীর যন্ত্রণা-দুঃখ! —হৃদয়ের সানুতটে সুখ নাই

কে যেন নিয়েছে প্রেম, নিশ্চিত, উদ্বেল, উত্তাল—

পথিক, তিষ্ঠ ক্ষণকাল!

মেঘ-লণ্ঠনে আলো নেই। বিদ্যুৎ আকর্ষণে

অনন্ত নক্ষত্রবীথি। রম্য নীহারিকা বিভাজনে

ঈশ্বরী যিনি, রমণীর নতজানু প্রার্থনায়

শিশুস্তন দেয়নি ফিরে; নিবেদিত দ্রাক্ষায়!

 

মনস্তাপে উৎক্ষিপ্ত বন্দনা, যদি ঝর্ণায় ক্ষীয়মাণ

তবে কেন, স্থির তাপিত মানুষ, নন্দিত বাসস্থান

ফেলে রেখে গান গায়? —দেখি, মানুষের সারা অঙ্গে

হাহাকার। —পথিক জন্ম যদি তব বঙ্গে!

 

সত্তরের দশক

 

শিহাব সরকার

ফিরে যা গ্রামে

থেকে যাবে শুধু তোর ভেজা পংক্তিমালা

সামনে রয়েছে গভীর খাদ

ওখানে কী এমন দেখিস ভাই আমার!

কোনো অনিবার্য মহান মূর্তি, তোর ভবিষ্যৎ দিন?

 

তুই ফিরে যা তোর প্রাক-পৃথিবীর গ্রামে

ওখানে বেদনা ও বিষাদের অন্য কোনো ভাষা নেই

আমাদের দ্ব্যর্থ সঙ্কেতের কুহেলিতে ডুবে মরে গেছে

তোর অনেক অনেক পূর্বসূরি

তুই ফিরে যা তোর প্রাক-পৃথিবীর গ্রামে

অন্ধকার তোর জন্য কোমল শান্তি হবে

ঠোঁট-টেপা বোনের মতো চুম্বন দেবে ভোরের সূর্য

 

তোর পংক্তিগুলো এক ধরনের অদ্ভুত অমরতা পেয়ে যেতে পারে

তুই জানতেও পারবি না, এসবের ভিতর থেকে

আমরা কীভাবে খুঁড়ে আনবো হিরণ্য ছাই, অমর হাহাকার

 

কী খুঁজিস তুই ঢাকা শহরে, জ্বলন্ত গোলাপ, বিদ্যুচ্চমক?

 

সত্তরের দশক

 

মাহবুব কবির

মঙ্গলের যাত্রাকালে

পৃথিবী ধ্বংসের আগে ডেরা গড়েছি মঙ্গলে।

 

মঙ্গলে যাত্রাকালে প্রভু জিজ্ঞাসিলেন,

পৃথিবীর স্মারক কী নিচ্ছো হে?

আমি বাক্স খুলে দেখলাম কবর খুঁড়ে তুলে-আনা

মায়ের দেহাবশেষ।

প্রভু ফের জিজ্ঞাসিলেন, পিতার হাড়গোড় কই?

আমি বললাম,

জন্মের পরই পিতা আমাকে প্রভুর তুষ্টিতে

বলি দিতে চেয়েছিলেন।

মা দুই স্তনের খাদে লুকিয়ে আমাকে রক্ষা করেছেন।

আমার সকল ভাইবোনকে পিতা প্রভুর উদ্দেশে

বলি দিয়েছেন।

আমি পিতাকে ঘৃণা করি।

 

এটুকু বলে পেছন ফিরে দেখি, প্রভু নেই।

দেখি, প্রভুভক্ত কুকুরটি আমার পিছু নিয়েছে।

 

আশির দশক

 

খোন্দকার আশরাফ হোসেন

প্রার্থনায় নম্র হও পাবে

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও পাবে,

কামে-ঘামে আমি নেই, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।

 

পাখিরা প্রমত্ত হলে সঙ্গিনীকে ডেকে নেয় দেহের ছায়ায়—

ছায়া নয়, রৌদ্রতাপ জ্বালবার শক্তি ধরো, কেবলি আমাকে

তপ্তজলে দগ্ধ করো, রুদ্ধ ক্রোধে দীপ্ত করো, পাবে।

পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহঙ্কার আমার কবিতা

বিষাদে বিশ্বাসে পূর্ণ হৃদয়ের জলাধারে ধরো,

আমাতে নিবদ্ধ হও পূর্ণপ্রাণ ফলবন্ত হও—

আমাকে পাবে না ফলে, পরাগ-নিষিক্ত হও, পাবে।

 

আমি তো নিষিদ্ধ প্রেম, শুদ্ধ ব্যথা, বিষাক্ত আঙুর,

আমার বিষের দানা জিভে কাটো, রক্তরস যিশুর রুধির

পান করো, নতুন দানা প্রজন্ম সাধ তুঙ্গ করো, পাবে।

আমাকে পাবে না দুঃখে, একটি হতাশা শুধু পাবে।

ছুরির ফলায় জমা একফোঁটা প্রাকৃতিক স্বেদের মতোন

তীক্ষ্ণ করো, মূর্ত করো, পাবে।

 

তেত্রিশ বছর ধরে বুকের সন্তাপ জমা সে সন্তাপ তুলে নাও চুলে,

মেঘের উড়াল-দেয়া পাখিদের ফেলে যাওয়া অবিন্যস্ত ছায়া

চোখের মণিতে গাঁথো, উড়ালে বিশ্বাসী হও পাবে।

 

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও, পাবে,

তৃপ্তির সন্ত্রাসে নয়, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।

ষাটের দশক

 

আল মাহমুদ

সোনালী কবিন

৮.

লোবানের গন্ধে লাল চোখ দুটি খোলো রূপবতী

আমার নিঃশ্বাসে কাঁপে নক্শাকাটা বস্ত্রের দুকূল?

শরমে আনত কবে হয়েছিল বনে কপোতী?

যেন বা কাঁপছো আজ ঝড়ে পাওয়া বেতসের মূল?

বাতাসে ভেঙেছে খোঁপা, মুখ তোলো হে দেখনহাসি

তোমার টিক্লি হয়ে হৃদপিণ্ড নড়ে দুরু দুরু

মঙ্গলকুলোয় ধান্য ধরে আছে সারা গ্রামবাসী

উঠোনে বিন্নীর খই, বিছানায় আতর, অগুরু।

শুভ এই ধানদূর্বা শিরোধার্য করে মহিয়সী

আবরু আলগা করে বাঁধো ফের চুলের স্তবক,

চৌকাঠ ধরেছে এসে ননদীরা তোমার বয়সী

সমানত হয়ে শোনো সংসারের প্রথম সবক

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল

গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।

 

ষাটের দশক

 

শহীদ কাদরী

রাষ্ট্র মানেই লেফট্ রাইট লেফট্

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে স্বাধীনতা দিবসের

সাঁজোয়া বাহিনী,

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে রেসকোর্সের কাঁটাতার,

কারফিউ, ১৪৪ ধারা

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে ধাবমান খাকি

জিপের পেছনে মন্ত্রীর কালো গাড়ি,

কাঠগড়া, গরাদের সারি সারি খোপ

কাতারে কাতারে রাজবন্দী;

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় মিছিল থেকে না-ফেরা

কনিষ্ঠ সহোদরের মুখ

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় তেজগাঁ

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা,

হাসপাতালে আহত মজুরের মুখ।

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় নিষিদ্ধ প্যামফ্লেট,

গোপন ছাপাখানা, মেডিক্যাল

কলেজের মোড়ে ‘ছত্রভঙ্গ জনতা—

দুইজন নিহত, পাঁচজন আহত’— রাষ্ট্র বললেই

সারি সারি ক্যামেরাম্যান, দেয়ালে পোস্টার:

রাষ্ট্র বললেই ফুটবল ম্যাচের মাঠে

উঁচু ডায়াসে রাখা মধ্য দুপুরের

নিঃসঙ্গ মাইক্রোফোন

 

রাষ্ট্র মানেই স্ট্রাইক, মহিলা বন্ধুর সঙ্গে

এনগেজমেন্ট বাতিল,

রাষ্ট্র মানেই পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত

ব্যর্থ সেমিনার

রাষ্ট্র মানেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাওয়া

রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা

রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা মানেই

লেফ্ট্ রাইট্, লেফ্ট্ রাইট, লেফ্ট্—!

 

ষাটের দশক

 

আবুবকর সিদ্দিক

এলোমেলো পরমায়ু

সন্ধের চেয়েও ঘন মেঘ করে আসে।

আঁচলে হলুদ মুছে মেজবউ ঘরে এসে ডাকে,

ও মোহন, দ্যাখ দিকি হাটুরেরা ফিরে এলো নাকি?

 

নেই নেই পথে নেই দিগন্তেও নেই,

সড়কের সংসারে একটিও খড়কুটো নেই,

ডুবন্তের হাতনাড়া নেই জলতলে।

এইখানে ঘট ছিলো, এইখানে বাঁধাবট ছিলো।

যারা যারা ছায়াশানে পঞ্চায়েতে বসে ছিলো,

কেউ এলো না তো।

আদুল গেরস্থ সব পথে পথে ঘোরে ভিনগাঁয়ে।

 

সম্বরা দিতে গিয়ে মেজবউ আখা ভেবে মন ঠেলে দিলো,

দুয়োরে শিকল তুলে একবস্ত্রে নেমে চলে গ্যালো।

সন্ধেতারা চুরি করে তুলে নিলো তাকে,

এলোমেলো হয়ে গ্যালো গোছগাছ পরমায়ুটুকু।

 

আবছায়া ফিশ ফিশ স্বরে ডেকে বলে,

ভাঙাচুড়ি পড়ে আছে চাঁদের নিচেয়।

এ মাটিতে পথরেখা চিনবার আর কোনো ধুলোছাপ নেই,

আর কেউ নেমে গিয়ে ফিরে আসে না তো।

 

ষাটের দশক

 

ওমর আলী

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি

আইভি লতার মতো সে নাকি সরল, হাসি মাখা;

সে নাকি স্নানের পরে ভিজে চুল শুকায় রোদ্দুরে,

রূপ তার এদেশের মাটি দিয়ে যেন পটে আঁকা।

 

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো

মায়াবী উচ্ছ্বাস দুটি চোখ, তার সমস্ত শরীরে

এদেশেরই কোন এক নদীর জোয়ার বাধভাঙা;

হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে।

 

সে চায় ভালবাসার উপহার সন্তানের মুখ,

এক হাতে আঁতুড়ে শিশু, অন্য হাতে রান্নার উনুন,

সে তার সংসার খুব মনে-প্রাণে পছন্দ করেছে;

ঘরের লোকের মন্দ-আশংকায় সে বড় করুণ।

 

সাজানো-গোছানো আর সারল্যের ছবি রাশি রাশি

ফোটে তার যত্নে গড়া সংসারের আনাচে-কানাচে,

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর এ ব্যাপারে খ্যাতি;

কর্মঠ পুরুষ সেই সংসারের চতুষ্পার্শ্বে আছে।

 

ষাটের দশক

 

আবদুল মান্নান সৈয়দ

মরণের অভিজ্ঞান

সবুজ চাঁদের নিচে প’ড়ে আছে আমার শরীর।

চেতনা, তারার নিচে। আমার চীৎকার উঠে যায়

অলীক ফিটনে চ’ড়ে ঘুরে-ঘুরে আরক্ত চাকায়

নীল শূন্যে। নদীঃ আমার জীবন; বাকি সবঃ তীর।

 

প্রবেশ করেছি ধীরে মরণের ধবল প্রাসাদে—

মর্মর-পাথরে তৈরি মেঝে, ছাদ সময়ে বানানো।

মাথা ফেটে সব স্বপ্ন চূর্ণ-চূর্ণ প’ড়ে আছে যেনঃ

সবি খাবে বিশদ বিড়াল, কেবল কৃতিত্ব বাদে।

 

লুপ্ত ঐ একতান গোধূলির তাম্র অনুতাপ;

ধ’সে পড়ে স্তনের গম্বুজ; চৈতন্য, একটি তিলঃ—

নিসর্গ, রমণী, সত্তাঃ নিরর্থ পাগল অনুলাপ।

তৃণ শীর্ষে শুয়ে হিশেব করবো আজ, যায় কে-কে?—

সব নদীর উপরে ধবল-ধূসর গাঙচিল

ওড়ে মরণের, নীল নৌকোর জীবনে যায় ঠেকে ॥

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

রফিক আজাদ

পিছনে ফেলে আসি

পিছনে ফেলে আসি :

একটি বাড়ি—

নিকানো নয়, পরিত্যক্ত, ভাঙা ইটের সারি,

বয়ঃপ্রাপ্ত কিছু বৃক্ষ, শুকনো ডালপালা;

 

পিছনে ফেলে আসি :

কিশোর ঘুড়িগুলি,

আদিগন্ত দীর্ঘ হালট, শিউলি-ঝরা ভোর,

বোষ্টুমিদের নাড়–মোয়া, ঝকঝকে ঘর-দোর,

এবং তাদের মিষ্টি ঠাট্টা : ‘ওগো-হ্যাঁগো’, হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

 

পিছনে ফেলে আসি :

পায়ে-চলা পথ, রেশমি ঘাসের বন,

কয়েকটি খুব পুরনো গাছপালা,

শ্যাওলা-সবুজ জলের পুকুর,

পুকুরে সাঁতরানো বুকে

স্তব্ধ হ’য়ে থাকা

রল-উলরোল সাত-সমুদ্রের ঢেউ।

 

পিছনে ফেলে আসি :

গভীর গহন হাতি-ঘাসের বন,

চিনিচম্পা আমের দুপুর

কিংবা কোনো আকাশ-উপুড়

জলবতী মেঘের মৃদু একটানা বর্ষণ

 

পিছনে ফেলে আসি :

কুয়োর মতো গভীর দু’চোখ অশ্রুভেজা : মা;

অনাবাদি জমির মতো ধূ-ধূ দৃষ্টি : বাবা;

প্রবীণ লাঙল, বৃদ্ধ বলদ, জরাজীর্ণ বাড়ি;

কয়েকটি খুব ক্ষুধার্ত মুখ, তোবড়ান গাল, ক্লিষ্ট হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

পিছনে ফেলে আসি :

কলাগাছের ছায়ায় ওড়া অপেক্ষাতুর

একটি সবুজ শাড়ি,

‘বিদায়-বলা একটি মুখের কান্নাচাপা হাসি,

পিছনে ফেলে আসি ॥

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

মোহাম্মদ রফিক

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ঝরে পাতা শীতার্ত সন্ধ্যায়

ধুলোবালি খড় নিয়ে কিছু আলো কিছু অন্ধকার

প্রতি ঘরে-ঘরে টেমি হাওয়ার আঘাতে কেঁপে ওঠে,

 

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ভয়ার্ত বাথানে গোরু-মোষ

তীব্র শব্দে শ্বাস ফেলে চারিধারে সন্ত্রস্ত বিহ্বল

খাল বিল ছেড়ে এসে হাঁসের খোপের ধারে-ধারে

 

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে হেঁটে যায় ছাড়া আঘাটায়,

ঝোপের আড়ালে লোভে জ্বলে ওঠে দুটি তীব্র চোখ

ক্ষণিক চমকে যায় বাঁশবনে ঝুলন্ত বাদুড়,

 

হাঁটা-চলা খড়ের চালের পর অচেনা পায়ের

ঝুপঝুপ শব্দ ওঠে শ্যাওলা পচা পুকুর ঘাটায়

তেঁতুলগাছের ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে নামে

 

অকারণ; বিষ্ণুপুর জুড়ে ভয়ে ভয়ে দেহগুলি

জড়সড় পুরনো কাঁথার নীচে আবেগে নিথর

কয়েকটা কুনো ব্যঙ নড়ে ওঠে চৌকির ওপর,

 

কাছাকাছি কড়–ই গাছের ভিড়ে গোঙায় ভুতুম,

সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে ছম-ছম ঘুম নেমে এলে

কালকেউটে গর্ত ছেড়ে বের হয় হিংস্র ফণা মেলে।

 

ষাটের অপরার্ধ্ব

 

আবুল হাসান

ভালো লাগছে, রহস্যপ্রবণ লাগছে

ভালো লাগছে। এতকাল পরে আজো মানুষকে ভালো লাগছে।

রহস্যপ্রবণ লাগছে।

বড় তরতাজা লাগছে। যেমন যুবতী, যেমন জরায়ু, যেমন শিশির।

 

ভালো লাগছে। ফুল ও পূর্ণিমা, পুরাতন ভালোবাসা ভালো লাগছে।

মানুষ এখন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে ফিরছে। মানুষকে ভালো লাগছে।

মানুষকে মারা আজ কোনো কঠিন ব্যাপার নয়; সব সহজ।

 

জর্জর সঙ্গম, ফুল, জন্মে জেগে ওঠা মৃত্যু, অন্ধকার। সব সহজ।

কোনোকিছু আজ আর কোনোকিছু কঠিন ব্যাপার নয়।

ভালো লাগছে। বেরিয়ে আসছে বিষ, ক্ষয়, মৃত্যু ও জরা।

ফুলের মালায় বেরিয়ে আসছে অবেলায় অজগর, ভালো লাগছে।

রহস্যপ্রবণ লাগছে।

ফুল ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে ফের বলছে ফুল ছিঁড়িও না।

কুকুরের মধ্যে ফের কুকুর বসিয়ে ফের বলে উঠছে কুকুর হইতে সাবধান!

 

ভালো লাগছে। মানুষকে ভালো লাগছে। ভালো লাগছে। সারাদিন

ভালো লাগছে। সারাদিন রহস্যপ্রবণ লাগছে, ভালো লাগছে,

ভালো লাগছে না।

 

সত্তরের দশক

 

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

খতিয়ান

হাত বাড়ালেই মুঠো ভ’রে যায় ঋনে,

অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা।

রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে,

আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা।

 

টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুরের ঘাম,

ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল,

নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম,

চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল।

 

ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে,

উড়াও নিরবে নিভৃত রুমালখানা।

পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে,

আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা—

 

টোকা দিলে ঝ’রে পড়বে পুরোনো ধুলো

চোখের কোনায় জমা এক ফোঁটা জল।

কার্পাশ ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো,

থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল।

 

জাগবে না বনভূমির সিঁথানে চাঁদ,

বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া

পড়বে না মনে, অমীমাংসিত ফাঁদ

অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া।

 

হাত বাড়ালেই মুঠো ভ’রে যায় প্রেমে,

অথচ আমার ব্যাপক বিরহ ভূমি।

ছুটে যেতে চাই— পথ যায় পায়ে থেমে,

ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নোখে তুমি।

 

সত্তরের দশক

 

আবিদ আজাদ

জন্মস্মর

স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল

 

সেই প্রথম আমি যখন আসি

পথের পাশের জিগা-গাছের ডালে তখন চড়চড় করে উঠেছিল রোদ

কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড-খণ্ড রূপালি আগুন

ঘাসে-ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য-ঝরানো গুচ্ছ-গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ

এইভাবে আমার রক্তপ্রহর শুরু হয়েছিল

সবাই উঁকি দিয়েছিল আমাকে দেখার জন্য

সেই আমার প্রথম আসার দিন

হিংস্রতা ছিল শুধু মানুষের হাতে,

ছিল শীত, ঠাণ্ডা পানি, বাঁশের ধারালো চিলতা, শুকনো খড়

আর অনন্ত মেঝে ফুঁড়ে গোঙানি—

আমার মা

স্বপ্নের ভিতর সেই প্রথম আমি মানুষের হাত ধরতে গিয়ে

স্তব্ধতার অর্থ জেনে ফেলেছিলাম,

মানুষকে আমার প্রান্তরের মতো মনে হয়েছিল—

যে রাহুভুক।

 

অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল

তিনজন বিষণ্ন অর্জুন গাছ।

সেই থেকে আমার ভিতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছি—

 

মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে?

 

সত্তরের দশক

 

ময়ুখ চৌধুরী

নৈতিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে

বাইরে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

চলো ওগুলো ঢুকিয়ে রাখি ফ্রিজে

যখন দরকার হবে তখন না হয়…

 

প্রতিদিন কেউ না কেউ দরজা খুলে নেমে যাচ্ছে নিচে।

গতকাল টমেটোর লাল মাংস ছুটে ছুটে গেছে ক্যামেরার মুখে।

আজ গাড়ির দরজার মতো খুলে যাচ্ছে ফ্রিজ,— নামছে

উপচে পড়া ফুলকপি স্বামীকে ছাড়িয়ে

মাছের সন্ত্রাসী লেজ মুড়োসহ চলে যাবে কাল

বর্ধিত সভায়

 

এইভাবে প্রতিদিন ওঠানামা করে এটা ওটা। আর, তারা

দরজায় একঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কতোদিন!

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে স্বপ্ন দেখে— রোদ আর হাওয়া।

 

অচল দ্রব্যের সঙ্গে থেকে একদিন ফ্রিজটাও অচল হয়ে যাবে।

 

সত্তরের দশক

 

দাউদ হায়দার

পথিক জন্ম যদি

মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বেদনা বেজে ওঠেÑটের পাই

গভীর যন্ত্রণা-দুঃখ! —হৃদয়ের সানুতটে সুখ নাই

কে যেন নিয়েছে প্রেম, নিশ্চিত, উদ্বেল, উত্তাল—

পথিক, তিষ্ঠ ক্ষণকাল!

মেঘ-লণ্ঠনে আলো নেই। বিদ্যুৎ আকর্ষণে

অনন্ত নক্ষত্রবীথি। রম্য নীহারিকা বিভাজনে

ঈশ্বরী যিনি, রমণীর নতজানু প্রার্থনায়

শিশুস্তন দেয়নি ফিরে; নিবেদিত দ্রাক্ষায়!

 

মনস্তাপে উৎক্ষিপ্ত বন্দনা, যদি ঝর্ণায় ক্ষীয়মাণ

তবে কেন, স্থির তাপিত মানুষ, নন্দিত বাসস্থান

ফেলে রেখে গান গায়? —দেখি, মানুষের সারা অঙ্গে

হাহাকার। —পথিক জন্ম যদি তব বঙ্গে!

 

সত্তরের দশক

 

শিহাব সরকার

ফিরে যা গ্রামে

থেকে যাবে শুধু তোর ভেজা পংক্তিমালা

সামনে রয়েছে গভীর খাদ

ওখানে কী এমন দেখিস ভাই আমার!

কোনো অনিবার্য মহান মূর্তি, তোর ভবিষ্যৎ দিন?

 

তুই ফিরে যা তোর প্রাক-পৃথিবীর গ্রামে

ওখানে বেদনা ও বিষাদের অন্য কোনো ভাষা নেই

আমাদের দ্ব্যর্থ সঙ্কেতের কুহেলিতে ডুবে মরে গেছে

তোর অনেক অনেক পূর্বসূরি

তুই ফিরে যা তোর প্রাক-পৃথিবীর গ্রামে

অন্ধকার তোর জন্য কোমল শান্তি হবে

ঠোঁট-টেপা বোনের মতো চুম্বন দেবে ভোরের সূর্য

 

তোর পংক্তিগুলো এক ধরনের অদ্ভুত অমরতা পেয়ে যেতে পারে

তুই জানতেও পারবি না, এসবের ভিতর থেকে

আমরা কীভাবে খুঁড়ে আনবো হিরণ্য ছাই, অমর হাহাকার

কী খুঁজিস তুই ঢাকা শহরে, জ্বলন্ত গোলাপ, বিদ্যুচ্চমক?

 

সত্তরের দশক

 

মাহবুব কবির

মঙ্গলের যাত্রাকালে

পৃথিবী ধ্বংসের আগে ডেরা গড়েছি মঙ্গলে।

 

মঙ্গলে যাত্রাকালে প্রভু জিজ্ঞাসিলেন,

পৃথিবীর স্মারক কী নিচ্ছো হে?

আমি বাক্স খুলে দেখলাম কবর খুঁড়ে তুলে-আনা

মায়ের দেহাবশেষ।

প্রভু ফের জিজ্ঞাসিলেন, পিতার হাড়গোড় কই?

আমি বললাম,

জন্মের পরই পিতা আমাকে প্রভুর তুষ্টিতে

বলি দিতে চেয়েছিলেন।

মা দুই স্তনের খাদে লুকিয়ে আমাকে রক্ষা করেছেন।

আমার সকল ভাইবোনকে পিতা প্রভুর উদ্দেশে

বলি দিয়েছেন।

আমি পিতাকে ঘৃণা করি।

 

এটুকু বলে পেছন ফিরে দেখি, প্রভু নেই।

দেখি, প্রভুভক্ত কুকুরটি আমার পিছু নিয়েছে।

 

আশির দশক

 

খোন্দকার আশরাফ হোসেন

প্রার্থনায় নম্র হও পাবে

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও পাবে,

কামে-ঘামে আমি নেই, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।

 

পাখিরা প্রমত্ত হলে সঙ্গিনীকে ডেকে নেয় দেহের ছায়ায়—

ছায়া নয়, রৌদ্রতাপ জ্বালবার শক্তি ধরো, কেবলি আমাকে

তপ্তজলে দগ্ধ করো, রুদ্ধ ক্রোধে দীপ্ত করো, পাবে।

পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহঙ্কার আমার কবিতা

বিষাদে বিশ্বাসে পূর্ণ হৃদয়ের জলাধারে ধরো,

আমাতে নিবদ্ধ হও পূর্ণপ্রাণ ফলবন্ত হও—

আমাকে পাবে না ফলে, পরাগ-নিষিক্ত হও, পাবে।

 

আমি তো নিষিদ্ধ প্রেম, শুদ্ধ ব্যথা, বিষাক্ত আঙুর,

আমার বিষের দানা জিভে কাটো, রক্তরস যিশুর রুধির

পান করো, নতুন দানা প্রজন্ম সাধ তুঙ্গ করো, পাবে।

আমাকে পাবে না দুঃখে, একটি হতাশা শুধু পাবে।

ছুরির ফলায় জমা একফোঁটা প্রাকৃতিক স্বেদের মতোন

তীক্ষ্ণ করো, মূর্ত করো, পাবে।

 

তেত্রিশ বছর ধরে বুকের সন্তাপ জমা সে সন্তাপ তুলে নাও চুলে,

মেঘের উড়াল-দেয়া পাখিদের ফেলে যাওয়া অবিন্যস্ত ছায়া

চোখের মণিতে গাঁথো, উড়ালে বিশ্বাসী হও পাবে।

 

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও, পাবে,

তৃপ্তির সন্ত্রাসে নয়, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।

নব্বই-শূন্য দশকের কবিতা

নব্বুইয়ের দশক

 

বায়তুল্লাহ্ কাদেরী

যে গন্ধে সন্দেহ ছিল

মরে গেছি জলে, জলে আমি এমনি মরেছি

জলশ্যাওলার আগুনের চিতায় গভীর চোখের

মাছ

হয়তো জিয়েছি, হয়তো জিয়ল হয়ে

লাজুক হয়েছি.. এখানেই শেষ নয়

আমি খুব ক্ষুদে খাদ্যাতির জল

পাছায় পোকার অগ্নি দম দম

নেভে ফের জ্বলে এরকমই ঠাণ্ডা হুতাশন

উত্তরের বায়ুনড়া হু হু হুতাশন-

যেন পোড়ে বাঘের ছায়ার বাদামি পাহাড়,

আর আর্মির সবুজ গন্ধ পোশাকের , মাটির, ঘাঁটির

কিংবা চোখ রাইফেল দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দূর ম্যানশন থেকে

জিপের কোমল নারী ফর্সা, স্পা-শেষের ব্লিচ-ত্বক ফর্সা

নারী খুব ফর্সা হাসে কিংবা হেঁটে যায় শাড়ি ঝেড়ে

এইভাবে চোখ শান্তি-মিশনের দূরবীনে

আমাকে করেছে জললোভেী, হস্তীময় দাগি

সন্ত্রাসীর মতন ওরফে ওল্লা, জোল্লা কেল্লা

ঘেটু, পিচ্চি আমাকে করেছে

শব্দচোর, নৃত্যচোর, স্বরচোর আর

গীতিচোর, লোকে হয়তোবা

সে-পায়ের গন্ধই বেশি শুঁকে

যে গন্ধে সন্দেহ ছিল, সন্ধ্যার মতন

ধূসর সন্দেহ শহরের দিকে গেছে

কিংবা নদীতীর ধরে নৌকোর বাতিতে ঘোর

কলিকাল এলো বলে

কলির সন্ধ্যার শুরু… … …

আমাকে বলেছে উতলার এটিও ধরন এক;

এটিও পলির বৈশিষ্ট্যের নিবিড় দেহাবয়ব।

রাশখেলার পরেই একটি কি দুটি হুলির ঘুম

চোখে মুখে কিংবা তাজিয়া যুবক

বুক কেটে ফেলেছে চাকুর তীব্র প্রেমে

…ঘোড়া হারানোর পরে

ইতস্তত ঢোল বেজে গেছে চৈতালির শেষে

ধূলি জমেছিল তানপুরায়.. আশ্বিনে

ধঞ্চে গাছের দিকেই যত পাখি শবে বরাতের মত

পটকা ফাটায়…গেল রাতে দুর্গা চড়েছে সবে পেঁচকের শিরে

পেঁচক-বাহনা সবে আসিতেছে.. পূর্ণিমায় পুচ্ছ

মাঠের বিস্তারে মণ্ডপের চৌতাল অথবা শহরের উঁচু টাওয়ারের খাম্বায়

গুচ্ছের ঢোলক শব্দ রাতের কাহিনী যত ঢুকে গেছে

ঢোলকোলাহলে একবার মুসলিম হয়ে হিন্দু হয়

আরেকবার হিন্দু হয়ে মুসলমান..কখনো কখনো

খ্রিস্টানের মতো হয়ে যেতে থাকে কোট ও ধোপদুরস্ত।

কেকের মধ্যেই শতবৃক্ষের জীবনী পাঠান্তে আবার

কীরকম বাউলের মতো হয়ে যেতে থাকে, বুঝি না,

কিছুই বুঝি না ধুতি…পাগড়ি…বো…টাই… কীরকম গোলমেলে

ক্রিশমাস…ক্রিশমাস… শুধু হয়ে যাও পলির বৈশিষ্ট্যে

গড়ে ওঠো মূর্তিমান ভিতরে ব-দ্বীপে

পলির বৈশিষ্ট্যে

দেখা তো হবেই পথে ঘাটে বিচ্ছিরি ঢঙে

অঙ্গভঙ্গি অতি বিশ্রী আর পুরাতন

দেখা তো হবেই মুখচোরাবেশে

কোথাকার মিচকে শয়তানের মত

আমাদের দেখা তো হবেই

ছোট্ট দুঃখিনী ব-দ্বীপে!

 

মুজিব ইরম

শারদীয়া : আদি রূপ

 

তোমাদের বাড়িতে যাবো গো আমি শারদীয়া ভোরে…যেন একটু একটু বৃষ্টি হয়…একটু একটু শীত হয় যেন…যেন একটু একটু কুয়াশা হয় কাশবনে, মনুপাড়ে, দেবীর কৃপায়…পূজামণ্ডপের মাঠে, আরতি নৃত্যের তালে, তোমাকেই আড়চোখে যাচনা করিবো…তোমাকেই অগ্নি ভেবে ধূপধুনি হবো…আমিও বাদক হবো, আমিও নাচিয়ে হবো সুগন্ধি অনলে…সেই শরতসন্ধ্যায় তুমি শুধু একবার দেবী হয়ে ওঠো!

 

শারদীয়া : উত্তর রূপ

বড়োই খায়েস নিয়ে বাঁচি

শুধু একবার

আরতি নৃত্যের তালে

রোদনামা সন্ধ্যা ঘনঘোরে

তোমাকেই জপে জপে হুঁশহারা হবো…

এই সাজ সাজ মণ্ডপের পাশে আমিও নাচুনে হবো

আমিও অঙ্গার হবো

তোমারই দেহপাত্রে, সুগন্ধি অনলে…

ওহে ঢোলক বাদক

তোমাদের বাদ্যতালে

তোমাদের লাই দেওয়া সুরে

আমি যেন মাটিপাত্রে সুগন্ধি আগুন হয়ে জ্বলি

আমি যেন নারিকেলের ছোবড়া হয়ে সুগন্ধি বিলাই!

 

 

আহমেদ স্বপন মাহমুদ

অলৌকিক তলদেশ

 

অলৌকিক গর্তের ভিতর ঢুকে তুমি হাসছো।

সার্কাস এক আশ্চর্যরকম খেল!

রাতভর শীতার্ত বায়োস্কোপ দেখে

টিকটিকি ও তরল জুসের প্যাক মন ভার করে আছে।

এখনো ভোর হয় নি

অনন্ত রাতের দীর্ঘতম তলদেশ আরো গভীর হচ্ছে।

আর সমস্ত ফায়ার ব্রিগেড, নিষ্পলক ১৬ কোটি মানুষ

সার্কাস ও ক্যামরার মহড়া দেখছে

আমাদের ৬ ফিট মন এক লাফে ৬০০ ফুট

সরলতা নিয়ে উপরে ওঠে ভেলকি দেখছে

উৎকণ্ঠার অলৌকিক পর্দায়।

আমাদের চোখগুলো নিয়ে তামাশা করছে

রেলওয়ে কলোনীর দীর্ঘতম পাইপ;

৬০০ ফুট গভীর হাসি উড়ায়ে তেলাপোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে

রাতভর অলৌকিক গর্তে ভেসে বেড়াচ্ছে সরল আকুতি।

আমরা কতদিন হাসি না মা ছয় শ ফুট

আমাদের ভালোবাসা কোনোদিন যেতে পারে নাই ছয় শ ফুট

৬ হাজার বা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল কোনোদিন পারে নাই যেতে।

আমরা কেবল ১৪৪। ৪ প্লাটুন চতুর রাইফেল।

মা রে, সার্কাস এক আশ্চর্যজনক খেল!

 

ওবায়েদ আকাশ

রূপনগর

রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস…এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল– এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ। …রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে

 

শূন্য দশক

 

জুয়েল মোস্তাফিজ

আমাদের বাঁশির নাম অ্যাম্বুলেন্স

 

পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, আপনি যখন অন্তরভেদি বাজাচ্ছেন বাঁশি, ঠিক তখন আমাদের ভূখণ্ডে দিগ্বিদিক ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স। আমাদের অ্যাম্বুলেন্সের বাঁশিটা খুব অবুঝ! আপনার বাঁশির মর্ম বোঝে না। প্রাণের বাঁশি পুড়ে গেলে সেই সুরের নাম থাকে না। কেউ কেউ তাকে লাশ বলে। এ এক ভীষণ সুরের ভেদ-আপনার বাঁশি আর আমাদের অ্যাম্বুলেন্স…

 

প্রিয় চৌরাশিয়া, এমন সময়-এমন করে-কেন বাজালেন? আমরা পুড়ে গেছি, পুড়ে যাচ্ছি, পুড়ে যাব আরো। আমাদের বাঁশির নাম অ্যাম্বুলেন্স, তার গোঙানিতে আমরা আপনার বাঁশি শুনতে পাচ্ছি না…কিছুতেই না। ভোররাতে বাজছে আপনার বাঁশি। আর আমাদের শ্বাসনালির ফুটায় আটকে গেছে বাতাস। আমাদের অ্যাম্বুলেন্সটা বাঁশি বাজতে বাজতে ছুটছে…

 

অতনু তিয়াস

আমাকে ইচ্ছে করো

 

লালন বাতাস বহে আরশিনগরে

দূর থেকে উড়ে আসা যাযাবর পাখিগুলো ডানায় ডানায়

আমাকে শুনিয়ে যায় প্রবুদ্ধ সংগীত

 

একবার তোমার ভেতর যদি অনঙ্গ বউ বলে বেজে উঠতাম একতারা স্বভাবে

বুকের পাথর গলে গলে

একজোড়া নদী হয়ে নেমে যেতো সমতল গ্রাম ছুঁয়ে ছুঁয়ে

 

আমার এ আজন্ম সাধ কবিতা লেখার

আমার এ আজন্ম সাধ বিবাগী হওয়ার

কাকে যে স্পর্শ করি

কারে যে বুঝাই!

 

তোমার শরীর বেয়ে উঠে আসা সুগন্ধি সাপগুলো যদি

আরো বেশি দংশনপ্রিয় হয়ে ওঠে

বুকের পৃষ্ঠা দেবো খুলে

মৃত্যুনীল বিষে তবু লেখা হোক একটা কবিতা

অন্তত একবার কবিতা হও মেয়ে

অন্তত একবার আমাকে ইচ্ছে করো

আমাকে ইচ্ছে করো

কবিতার ভেতর-বাহির

কথা

ভিতরের মাটির রসায়ন অবচেতনায় ভেজা। চেতনায় উপ্ত অসদুপেয়মান হলে সময়ে ফুলের প্রকাশ। কতো বর্ণ-গন্ধ-শক্তি আয়ু আরো অজানিত সীমাহীন স্বপ্ন স্বরিভূক মানবিক বোধের। অনুভব জাগরণ তাই বাহির। তবু কি বাহির। যা বলা আছে শব্দে শব্দে। শব্দেরও নানা রঙ। ভিন্ন শব্দের সঙ্গ আবেশে ভিন্ন ভিন্ন মানে। এক ঝোঁকেও বদলে যায় কতো জীবনার্থ।

কবিতার পেঁয়াজ পরত আছে— খুলে খুলেও শেষ নেই। কবিতার হাজার দুয়ার। এক দরজা পেরুলে আরেক দুয়ার। আরেক। আরেক। নৈঃশব্দের ঝর্ণা।

এক কবিতা প্রতি মনে মনে আলাদা রঙ পায়। ‘বনলতা’ প্রতি মনে আলাদা, ভিন্ন নারী অজস্রের। ‘বনলতা’ যে পড়ে তার একার। একার অভিজ্ঞতা জারিত কল্পনার খুঁজে ফেরা মুখশ্রীর বিচূর্ণ আলোর পুনর্নির্মাণ।

কাল আকাশে অনেক রঙ ছিল। পুরো আকাশটাই কবিতা– পাখি ফেরা। আমার চোখ কতোটুকু পরিধি বা ধরলো এই অসম্ভব মেঘ রক্তিম আলোর বন্যার। একটা পাখির মনকেও কি বুঝলাম। নীড়ে কে এলো? ঝরে গেলো। এটাই কার শেষ রাত।

আকাশময় একটা না দেখা মেয়েকে দেখলাম, অন্তহীন মেঘের আঁচল উড়িয়ে বৃষ্টি হলো না। রঙ বৃষ্টিতে ধুয়ে আলেয়া হয়ে অন্তর্হিত। কবিতার ভাব এলো। সর্বস্ব শব্দের এ্যাসিড ধোঁয়ার নীচে নিখাদ গলিত অসহ্য দহন স্পন্দন সৃষ্টির সোনা— ভুল বোঝবার শব্দবন্ধে কবিতা হলো না। কবিতার প্রাণ আত্মা রহস্যময়। কোথা থেকে আসে জানা হলো না। উড়ছে পাখি কোন নীড় থেকে আকাশে এলো সোনালী ডানা জানা হলো না।

একটা শব্দের ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে অনুসরণে অনেক শব্দের আকাশে ভীড়। যথার্থ শব্দই ওড়ে দম পায়— বাকির ভোকাট্টা— চির আকাশে। মনটাকে জানা হলো না। ধারে ধারে কিছু ফুলকি উঠে আসে বুক চিরে শব্দে সেজে। এরা পাখি। কবিতার প্রেয়সী আমার হলো না।

খুব এলোমেলো ব্যথা। ভাবনাগুলো এমন এলোমেলো হয়। ধীরে ধীরে যথার্থ শব্দে আদল পেতে পেতে। কখনো কারো পায় অবিস্মরণীয়। এই তো কবিতা। ভেতর বাহির।

কবিতা

সেই তো মৌচাক

১.

কালো সূর্য, অন্ধকার নিঃসীম শিকড়

চুম্বকীয় টানে— কৃষ্ণবিবর ব্যাদান।

২.

সত্য আলো চেয়ে স্বপ্ন যদি

দীর্ঘ খরা তাপে তাপে অসহ্য চূড়ায়

অতীব দাহ্য হয়— হৃদয়ে হৃদয়ে একটি কাঠির ডগার ফসফরাস সর্প ফোঁস

বা বলা যায় সূক্ষ্ম ড্রাগনের আত্ম বজ্রবিদ্যুৎ নির্দোষ,

আগুন তো ছড়াবেই মিছিলের

পল্লবে পল্লবে আরণ্যক দাবানল।

শাহবাগ সেই তো মৌচাক

দিবানিশি অতন্দ্র পাখার হৃৎস্পন্দন গুঞ্জরণ

শক্তির সঞ্চিত চেতনার নিরন্তর মধু।

ঢিল ছুঁড়লেই বিলাশে উড্ডীন রাগিঝাঁক

প্রত্যেক প্রাণভোমরা অব্যর্থ গাণ্ডীব হুল।

মেধা ভেতরেই ছিল, প্রজন্মের—

‘জয় বাংলা’ প্রকম্পে শানিত হলো

মেঘ ভাঙা লক্ষমুখ আলোর বল্লম।

যে বীজে শালপ্রাংশু পাতার পতাকা

শাহবাগে সেই শব্দ। আপাত নিঃশব্দ

ঝড় এলে সত্তাজুড়ে শাল শব্দের প্রপাত

সংক্ষুব্ধ ধমণী মোহনায় সৌভ্রাতৃত্বের স্বোপার্জিত জাগরণ।

ধারাবাহিক রচনা– বিচিত্র সমাজতত্ত্ব সংগীতের সমাজতত্ত্ব

মিউজিকোলজি সীমা থেকে অসীমের প্রতি ধাবমান এক শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। পূর্বে বিখ্যাত কম্পোজার, তাঁদের সাধনা, হস্তলিপি থেকে বর্ণ, যৌনতা, জ্যাজ বা রকের উৎপত্তি ও সম্পৃক্ততা নিয়ে আজ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সংগীতের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে পাঠ্য-সমালোচনা, আনুষ্ঠানিক বিশ্লেষণ, প্যালিওগ্রাফি, বর্ণনার ইতিহাস বা আর্কাইভিভিত্তিক গবেষণা থেকে বর্তমানে ডিকনস্ট্রাকশন, উত্তর-উপনেবিশক বিশ্লেষণ; অবভাসতত্ত্ব ও পারফরম্যান্স পাঠের বিষয়গুলো চলে এসেছে। অর্থাৎ দার্শনিকতা, সমালোচনাতত্ত্বের বিতর্ক ও সাক্ষ্যপ্রমাণের নতুনতর পদ্ধতিতত্ত্বের হাওয়া মিউজিকোলজির সমগ্র পরিমণ্ডলকে প্রসারিত করেছে। নতুনভাবে সাংগীতিক টেক্সের ধারণা, নতুন বিশ্লেষণী কৌশল ও বিষয়ী-সম্পর্কিত নতুন ভাবনা-চিন্তা একত্রিত হচ্ছে।১ আর সংগীতের সমাজতত্ত্ব সমাজ পরিসরে সংগীতের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাবের দিকটি গভীরভাবে জানতে চায়। সংগতি নিঃসন্দেহে হৃদয়গ্রাহী, সংহতি-শক্তির আধার। মানুষকে এবং মানুষের আন্তঃক্রিয়াকে বহুমুখী করতে প্রভাব রাখে। আবার সংগীতের আবহে মানুষ উন্মনা, স্থির ও আধ্যাত্মিক ভাবে নিমজ্জিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সংগীত কথার চেয়ে বেশি অর্থপূর্ণ। কবে কখন সংগীত কি আকারে আবির্ভূত হয়েছে তা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে মানুষের ভাষার আগে শব্দের বা ইংগিতের যে ব্যবহার শুরু হয়েছিল তাতেও সংগীত লুকিয়ে ছিল। আমরা যাকে বাজনা বলি সংগীতের এই অনিবার্য উপাদানটি পূর্ণাঙ্গ সংগীতের পূর্বসূরী বলা যায়। মানুষ যখন ভাষা শিখলো, অর্থময়তায় আবদ্ধ হলো, বাণীর সৃষ্টি হলো, তখন পূর্ব থেকে চর্চিত বাজনার তালে তালে সেই বাণী উচ্চারিত হতে থাকলো। এই উচ্চারণ ক্রমাগত পরিশীলিত হতে হতে সুসংবদ্ধ সুরের সৃষ্টি করলো। এর সাথে রাগ-তাল যুক্ত হয়ে সংগীতকে সর্বোৎকৃষ্ট একটি শিল্প হিসেবে মানবীয় সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করলো বয়েমারের মতে ‘সোসিওলজি অব মিউজিক’ হলো: A discipline that examines the interrelations of music and society. Properly speaking it is neither musicology nor sociology, but may borrow from both, whatever tools and technique its requires to establish and implement the conceptual framework and methodology that is musicology, that is peculiar to itself.৮

সংগীতের সমাজতত্ত্ব দেখতে চায় সমাজের উৎসমুখগুলো কিভাবে সংগীত-সৃষ্টি, অনুশীলন ও সম্পাদনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। যদিও ক্ষেত্র বিশেষে আত্মসুখ লাভের জন্য সংগীত সাধনা করা হয়ে থাকে, কিন্তু সে-সংগীতের বাণী অনেক ক্ষেত্রে সমাজসঞ্জাত। সংগীতের শ্রবণ, শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে এক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সম্পর্ক যে একমুখী তা নয় শ্রোতা তার শ্রবণের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ভাষায়, আচরণে, কখনো সমাজে কখনো শিল্পীর উদ্দেশ্যে। শ্রবণ একটি অনিঃশেষ ক্রিয়া; কোথায় কখন যে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে বলা কঠিন। তাছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে সংগীত-সৃষ্টি ও সম্পাদন একটি দলীয় তথা সামাজিক ব্যাপার। শুরু থেকেই সংগীতের দলীয় অভিব্যক্তি-আয়োজন সংগীতের সামাজিকতাকেই প্রকাশ করে।

আমরা জানি সংগীতের ধরনগত পার্থক্য রয়েছে। দেশে দেশে সংগীত তার নিজস্ব মূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষত উচ্চাংগ সংগীত, আধুনিক সংগীত ও জনপ্রিয় সংগীতের ধারা যেনো অনেকটা সাধারণ। সংগীতের উৎপত্তি যে-জঙ্গলেই হোক, রাজদরবারে স্থান ও পৃষ্ঠপোষকতা পাবার গৌরব সে পেয়েছে। আবার গণমানুষের সংগীত হিসেবে ঈশ্বরবাদী, আধ্যাত্মবাদী, দেহতাত্ত্বিক, প্রভৃতি সংগীতের স্বসৃষ্ট জগত লক্ষ্য করা যায়। এদের শ্রোতাকেও আলাদা করা যায়। যদিও শ্রোতাদের স্থান পরিবর্তন হয়েছে, সময়ের সাথে সংশ্লিষ্টতার তারতম্য ঘটেছে, তবে একটি শ্রেণীচরিত্র পাওয়া যায়। অর্থাৎ শ্রেণীভিত্তিক সংগীত-শ্রোতাদের একটা বিভাজন লক্ষণীয়।৩ ব্ল্যাকস্টোন বলেন, The abstract, ethereal and fleeting nature of music has after been construed as a bridge, a mediator between the earthly and the heavenward. … I am talking of histories of sound that come down to us as whispers of which we are dimly aware: whether from ancient, mystical tradition or, from analysis that posit the act of listening as socially constructed or, turn the true in cultural studies that redefined listening as active act.

আজকের দিনে সংগীত অনেক স্থায়ী ও সহজলভ্য হয়েছে রেকডিং ও ইলেকট্রনিক-ব্যবস্থার সুযোগে। এতে করে সংগীত শুধু শিল্প হিসেবে বিস্তৃতি লাভ করেছে তাই নয়। পণ্য হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। এই পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যারা সংযুক্ত তাদের সংখ্যা অজস্র। এসব কারণে সংগীতের সমাজতত্ত্ব ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে, তরান্বিত হচ্ছে, প্রতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাধারণভাবে বলা যায়, সামাজিক ক্রিয়া হিসেবে সংগীতের সৃষ্টি ও শ্রবণ সততঃ মতৈক্যের ও পুনর্গঠনের বিষয়বস্তু রয়ে গেছে। শ্রোতার কাছে সংগীত স্বীকৃত হয় প্রথাগত ধারা ও অনুশীলনের ধরন ও নিয়মনীতির কারণে। সুতরাং অপ্রথাগত ও অসংগত সংগীতকে শ্রোতৃমন্ডলী প্রত্যাখ্যান করে। শ্রোতার এই প্রত্যাখ্যানের একটি বড় কারণ হলো প্রজন্ম পরম্পরায় এক ধরনের সংগীত চেতনার সাথে বসবাস করে আসছে। কোন সংগীত যখন তার অন্তর্নিহিত সংগীত-চেতনার সাথে মিলে না তখন তা পরিতাজ্য হতে পারে। তবে এখানে আরেকটি বিষয় চলে আসে তা হলো যারা কম সংগীত শুনেছে, বা যাদের মধ্যে সংগীতের ঐতিহ্য সৃষ্টি হতে পারেনি, তারা যা কিছু নতুন শুনবে তাকেই গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চালাবে। দলগত হলে এটি আরো সহজেই লক্ষণীয় হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, দলগত একাত্মতা দৃষ্টিগ্রাহ্য সংগীতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহজ-অনুধাবনীয় একটি দিক। আমরা জনপ্রিয় সংগীত বা ভাব-সংগীতের ক্ষেত্রে এই দলগত শ্রবণ ও পরিবেশন লক্ষ্য করলেও অন্যান্য সংগীতের ক্ষেত্রেও এলাকা, দেশ এমনকি জাতিগত একাত্মতা আবিষ্কার করা সম্ভব। যেমন রবীন্দ্র সংগীতের শ্রোতামন্ডল অনেক বেশি একাত্ম ও সংগঠিত। আবার লালন-ভক্তদের একাত্মতা ও নিবিড় বন্ধন তাঁদের শ্রবণের একটি বিশেষ প্রলক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত এমনকি নিরক্ষর জনগণ সমানভাবে পল্লীগীতির পিপাসু।

ল্যাস্ক বলেন I attempt … to elucidate why sociological interpretation of music can become a reality only once the experimental verification procedures I call psycho-musicological are fully operative. On the basis of this things I propose three model of sociological inquiry into music, called the first, second and third sociological interpretation. While the first sociological interpretation concerns the cognitive basis of music making, the second refers to the developmental basis of musical functioning. The third sociological interpretation of music concerns the environmental conditions of music acquisition to the extent that they are determined by the sonic habitat in which humans live. ৪ তাঁর শেষ কথা হলো সিস্টেমেটিক মিউজিকোলজি একটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান হতে পারে যা মনোসংগীততত্ত্ব, সমাজসংগীততত্ত্ব ও সংগীত বিশ্লেষণের তিনটি ধারাকে সম্মুন্নত রাখবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ‘সংগীতের সমাজতত্ত্ব’ নয় বরং ‘সিস্টেমেটিক মিউজিকোলজি’ গুরুত্ব পেয়েছে।

সংগীতের সমাজতত্ত্ব এখনো সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এরকম সমস্যা অন্যান্য শাস্ত্রীয় শাখায়ও রয়েছে। এছাড়া সংগীতের মতো একটি বহুমুখী মানবীয় শাখার সমাজতাত্ত্বিক অনুধাবন এখনও ব্যাপক নয়। ক্যাডি (১৯৬৩) অনেক আগে বলেছিলেন The new area of emerging knowledge is still embryonic in the state of differentiation and organization|৫ তিনি শাস্ত্রীয় সংগীত, সংগীত থেরাপি, সংগীতের ইতিহাস, গণযোগাযোগ, সংগীত শিল্পীর পরিবেশন, সংগীত শিক্ষার প্রভৃতি বিষয়গুলোর উল্লেখ করেছেন যেগুলো সম্পর্কে গবেষণা ও আলোকপাত সমাজবিজ্ঞানের এই নতুন শাখাকে করতে হবে।

যদিও সমাজতত্ত্ব-অনুরাগী বিশ্লেষকরা সংগীতের মধ্যে ও বাইরে আন্তঃক্রিয়াশীল মানুষকে খুঁজেছেন, আলোচক-সমালোচক কিন্তু ‘সংগীতের সমাজতত্ত্ব’ বিষয়টিকে বাঁকাভাবেই দেখেছেন। যাহোক, অ্যাডোর্নোর একটি কথা আমাদের আস্থাকে সমুন্নত রাখার জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয়। আর তা হলো: All music – even which in terms of struggle is the most highly individualistic is in disputably vested into a collective content: every single sound sage ‘we’৬ এই যৌথতার কথা আমরা ভুলে যাই বলেই সমাজ-উদ্ভূত বিষয়কে সমাজবিচ্যুত ভাবি। সমাজের বিমূর্ততা আমাদেরকে তার অস্তিত্বহীনতার কথা ভাবতে শেখায়। সংগীতের মধ্যে সমাজ-অনুসন্ধান সেকারণে দৃষ্টিকটু মনে হয়।

বলিং ‘দি সোসিওলজি অব মিউজিক’ (১৯৮৪) গ্রন্থের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, Rather than a sociology of music, this is a sociological exposition of the social surrounds of music. The authors give general evidence that people involved in music are social beings: they organize, interact through institution, are affected by social changes and social prejudice, communicate with words, actions and convention of clothing, they associate musical style with classes, types and races of people. But the ideas are not structured, analysed or presented here in any consistent way৭

গ্রিন (১৯৯৭) পিটার মারটিনের গ্রন্থ (১৯৯৫) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন, People sometimes use the expression ‘the sociology of music’ when it might be more accurate to use ‘the social history’ or ‘the social context’ of music. the ‘logy’ bit of sociology – that which indicates a discipline of study – can seem to get lost. Even those theorists most traditionally and functionally identified as sociologists of music, such as Silberman, Adorno and Supicic, have tended to employ music in the service of broad, not musically sociological concerns; and as Peter Martin says, a recognized, coherent sociological perspective on music has yet to emerge. The most helpful aspect of their excellent book is precisely its insistence on identifying principles which are fundamentally sociological, and employing them with relation to music৮

অর্থাৎ অনেকের মূল্যায়নে এটি স্পষ্ট যে, সংগীতকে বিশ্লেষণ করার মতো সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত আয়োজন সমাজবিজ্ঞানের নেই। মারটিন সঠিকভাবেই বলেছেন যে, A key position of the book is that the task of sociologists of music is not to make judgment about the nature of music, about musical meaning or musical values, but rather to examine the processes by which music, its meanings and values come to be produced, accepted, maintained and contested by particular social groups in particular times and places.৯ যাহোক, পর্যালোচকদের অনেকে ‘সংগীতের সমাজতত্ত্বের’ তেমন অযৌক্তিকতা আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি। বরং সার্বিকভাবে ‘সংগীতের সমাজতত্ত্বের’ মৌলিকত্ব ও গ্রাহ্যতা স্বীকৃত হয়েছে।

থিওডর অ্যাডোর্নোর Introduction to the Sociology of Music (ইংরেজি অনুবাদ) বেরুলো ১৯৭৬ সনে। ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের এই বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী প্রথম সংগীতের সমাজতত্ত্বকে দাঁড় করিয়েছেন বললে ভুল হবে না। সংগীতের সমাজ ঘনিষ্টতা বুঝতে ও তুলে ধরতেও তিনি ১৯৬১-৬২ সালে বারোটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ফ্রাঙ্কফুট স্কুল ফর স্যোসাল রিসার্চের অফিসিয়াল জার্নালের শুরু-সংখ্যায় তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি ছাপা হয় ’On the Social Situation of Music’ নামে। তারপর অনেক সময় কেটে গেলেও অ্যাডার্নোর সংগীত বিষয়ক অনুরাগ, সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও একটি প্রধান তাত্ত্বিক ধারা এখনো অব্যাহত আছে। অ্যাডর্নো ১৯৬১-৬২ সময়-পরিসরে ইউনিভারসিটি অব ফ্র্যাঙ্কফুটে মিউজিক মোসিওলজির উপর অনেকগুলো বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারপর তাঁর এ বিষয়ে প্রকাশিত রচনাসমূহ তাকে বিশেষ স্থান প্রদান করে দিয়েছে।

কার্ল মার্কস, রবার্ট স্পেন্সার, জর্জ সিমেল, এমিল দুরখা, ম্যাক্স ওয়েবারসহ অনেক আদি সমাজবিজ্ঞানীদের সংগীতের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। সেগুলো পরবর্তী আলোচনায় আসবে। বলাবাহুল্য মার্কস শুধু দার্শনিক নন, পরিবর্তনের স্বপক্ষে উচ্চারিত কণ্ঠস্বর যা সামাজিক বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে।১০

টীকা

১. Martha Feldman, ‘General Introduction To Critical Musicology’, Music and Marx: Ideas, Practice, Politics, New York: Routledge, 2002, vii.

২.            উদ্ধৃত, Anthony Seeger, 1985, “General Articles on Ethnomusicology and Related Discipline”, Ethnomusicology, 29:2, pp. 345-351.

৩              Lee Blackstone, Remixing the Music of the Spheres: Listening to the Relevance of an Ancient Doctrine for the Sociology of Music, International Review of the Aesthetics and Sociology of Music, 2011, 42:1, pp. 3-31.

  1. 4. Otto E Laske, 1997, “Verification and Sociological Interpretation in Musicology”, International Review of the Aesthetics and Sociology of Music, 8:2, pp. 211-236.
  2. 5. Cady, 1963:25.
  3. 6. Theodor Adorno, 1976, Introduction to the Sociology of Music, New York: Seabury.
  4. 7. Madelon Bolling, . Review of The Sociology of Music by Fablio Desilva; Anthony Blashi, David Dees, (Notre-Dame IN: University of Notre-Dame Press, 1984), Ethnomusicology, 30:2, 1986, pp. 348-349.
  5. 8. Lucy Green 1997, Review of Sounds and Society: Thames in the Sociology of Music by Peter Martin, Manchester University Press, Manchester, 1995), Popular Music, 16:21, pp. 229-231.

৯.            প্রাগুক্ত।

১০.         যেমন Marx’s analyses of the commodity and of modes of producing form a crucial basis of much recent critical theory, yet music scholars who have increasingly taken an interact in that theory as a means of exploring the cultural role of music have worked with Mark’s ideas primarily in derivative form দেখুন: R.B. Qureshi, 2002, Introduction to R.B. Qureshi (ed), Music and Marx,, প্রাগুক্ত।

[ট্রিলজি]–সমস্ত ধূসর পিয়

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

মাখনুন বিশাল কাঁঠালতলার ছোট্ট কোণার সময়গুলা ছাড়িয়া একদিন সেই কাঁঠালগাছের ছোট্টমুচিধোয়া ফোঁটা পানির গড়ানো অংশে হাত রাখে। কাঁঠালমুচির অংকুরোদ্গম দেখে। ফলবান বৃক্ষের আত্মদান অভ্যাসে নয়, চিরায়ত আনন্দে— তা দেখে নেয়। এ গাছটা কবে কোন হিন্দু স্বর্ণকার রোপণ করিয়াছিলেন, কে জানে? শোনা যায় তার নাম বসন্ত বৈরাগী। কতো বড় সেই গাছ, এর শাখা-প্রশাখা মসৃণ কোমল, বড় খালার থাইয়ের মতোন। অনেক উঁচুতে উঠে বসে থাকতে খুব মজা লাগে। এক রকমের উষ্ণতাও আছে তাতে। যেন খালার বুকের ময়লা নরোম কাপড়ের ওমে মুখ গুজানো বাসনা। ওতেই কী ডিম পাড়ে ডেকি মুরগীটা! গোল থাইয়ের ওপর মচমচা গরম আমেজ আর দুলুনির কোছায় মগ্ন তামান শরীর। খালি লুকাতে চায়। আর ভেতর থেকে গুগলি ওঠে। তাতে রক্তবীজের ধারায় মর্ত্যে নাইমা আসে শিশু। সে নতুন উষ্ণতার সন্ধান করে। আলোয় আলোয় আকাশ দেখে। আকাশের ওপারে তাকিয়া কয় অন্ধকার থেকে কই আইসা পড়লাম। তাতে উষ্ণতা ভর করলে হঠাৎ বন্দ চোখ খুইলা তাকাইয়া দেখে এ তো কাঁঠালগাছের মোটা ডাল। তয় এইটাই কী বড় খালার থাইয়ের মতোন লাগছে? কী ধরনের আরামকোণা আছে এই থাই-ডালগুলায়, তাতে পাখি বসে, কাক ওঠে, ঘুঘু আসে, শালিক ঠ্যাং তুইলা পাখা ঝাপটায়। ফুড়–ৎ কইরা এপাতা ওপাতার নাচনের সঙ্গে যেন বায়না আনে। সে বায়নায় তুরতুরা ঠোঁটে পশম খুঁটে, ঝপঝপ ডানা ঝাপটায় আর কুচকুচ পশমহানা বাকুম তোলে। এতে গাছের মগডালের সঙ্গে রোদছায়ার উল্কিতে বোল ওঠে। তির্যক কমলা রঙের রোদ তাতে নকশা আঁকে। শিরশির আনন্দের ভেতরে তৃপ্ত ঠাণ্ডা বাতাস ছুঁইয়া দেয়। কাঁপে, দোলে, আর ভর দিয়া বোঁটার সাথে গড়ে তোলে চিক্কন মোনালি সংযোগ। অপার মুখে সে ভালোবাসা মানুষের বুকে ওরাল তোলে, গুরুগম্ভীর প্রার্থনা বইয়া আনে। মাখনুন তখন শতকিয়া আর মানসঙ্কে ঘর মেলায়। কঠিন মাষ্টারের মুখের দাড়ি নড়ে, হাত দিয়া টানে, একটু কাঁপেও। স্কুলের উত্তর দিকের দরোজা দিয়া তখন হু-হু করা হাওয়া তীক্ষè হয়া ঢোকে। তিন বেঞ্চের শেষটার কোণায় মাখনুন শীতে কাঁপে। আজ তার গায়ে হাফ হাতা মলিন শার্ট। বুকপকেট কোচকানো। সবুজ হাফ প্যান্টের তিনবোতামের একটা অন্যসুতায় আটকানো। এ কাঁপুনি আরও বেশি বোধ হয়, কারণ আজ সালোক সংশ্লেষণ বিষয়ক পড়া। তখন একপ্রকার নিজেকে নেতিয়ে নেয় সে, আরামের ভাপে তার মাইয়া বন্ধু জুঁইয়ের কথা মনে হয়। ফুলতোলা সাদা কামিজের তলে মোটা রানে আনন্দ ওঠে। পরিষ্কার লোমছাড়া থাইয়ে নীচে নামানো পায়ে তার হাইট মাপা যায়। উপচানো আলাপে ওই ধানভানা মেশিনপাড়ের ঢকঢক কলের পানিপড়া আওয়াজে কয়, ‘খুব ভালো ছেলে’। পাশের আলাদা লাইনে সেও তখন পড়া নিয়া ব্যস্ত। কিন্তু আরাম হয়। তীব্রতর স্বর ওঠে। ভেতরে টকমিষ্টি আওয়াজ ঘনায়া আসে। হঠাৎ স্কুলঘরটা দুইলা ওঠে। এ কি ভূকম্পন! একবার দুবার অনেকবার। তখন কঠিন মাস্টার ভয়ে দোয়া পড়ে। বলে এই তোরা সানা পড়। ওইটা ছোট দোয়া। এর মধ্যে হেডমাস্টার বাইরে এসে বলে, সকলকে স্কুল মাঠে আইতে কন। ভূমিকম্প আসচে। হেডস্যার নোয়াখালির মানুষ বলে পরিচিত। আড়ালে সবাই তাকে নোয়া স্যার বলে ডাকে। মাখনুন ভূকম্পনে ভয়ের চেয়ে স্বস্তিই পায়। এসব সালোক সংশ্লেষণ পড়া সে বোঝে না। বাইরে যাওয়ার অর্ডার আসলে মনটা ভরে ওঠে। সে পেছনের ভাঙা দরোজা দিয়ে বাইরের প্রান্তরে তাকায়। নুয়ে পড়া আকাশে ভোরের কণারাশির আলাপে মুগ্ধ হয়। আকাশজোড়া এতো আলো সে কখনো দেখেনি। আলোর মাঝে বিপুল বিকিরণে তীরমাথা যুক্ত হয়। ওতে কী লাল দেখা যায়! নাকি কমলা লাল। বড় বড় ইলেকট্রিক পোলে ছাওয়া, দুলন্ত তারের চিক্কনরেখা মনে করিয়া দেয় তার প্রাচীন সুখদ প্রলয়মাখা দিনকে। তা কি অনেককালের কোনো কথা? তখন তারা নিজ গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল এখানে। বিরাট স্কুলবাড়ির এই পেছনটায়। এসব ভাবলে রিফুজি মনে হয় এখন। ধীরে ধীরে হাঁটা পথে বাঁকা রাস্তা ঘুরে ঘুরে আঙরার বিলের ওপর দিয়া এখানে আসে। এই মাঠেই তখন সার্কাস চলে, মোগলে আযম আর পুতুল নাচের খেলা। আসতে আসতেই তা শুরু হয়ে যায়। তখন কেমন যেন এক মামা তিনি বলেন, এখন আর নয়, পরের শোতে। শো আবার কী! এখন এই আকাশ দেখে তার শোর কথা মনে হয়। শো, আহা সেই শো। তারপর ভোরের আলোরেখা সবকিছু ছেদ করিয়া ছিনিয়া নেয় অন্ধকারকে। রক্তমাংসের তুমুল আক্রমণ ছিল তাতে। গড়ানো বালুকণা আর কিম্ভূত এক দরগার ভয়মাখানো আওয়াজ। অনেকদিন পর এই প্রান্তরে এইসব মনে পড়ার সুযোগ হলো। এই সুযোগ আর কোনোদিন সে পাইবে না। নোয়া স্যার যে ব্যবস্থা কইরে দিলেন, মনে মনে তারে সে শ্রদ্ধা জানায়। বইয়ের পাতা সেদিন আর ফিরে আসে নাই। উড়ন্ত আলোয় কালো অক্ষরকে আর কোনো স্যার সেদিন তারে পায় নাই। ভূকম্পনটাই তাকে সবরকম ভালোবাসা দিয়া গেল। এ যেন জুঁইয়ের চাইয়াও তখন অনেক বেশি আপন।

এই জুঁই তাকে মায়া করে, একটু একটু ভালোও মনে করে। কিছুতেই বিরোধ নাই, যা কওয়া যায় তাই শোনে। সমর্পিত মানুষকে যেমন সবাই ভালোবাসে তেমন। সাহস নাই, খালি মনের ভেতরে কুৎকুৎ করে। মনের কথা বাইরে ঘোষণা না করলেই সবাই ভালো কয়, ভদ্র কয়। এই গাছের পাতাটাও সেরকমই ঠেকে, সে বাতাসে বাতাসে হেলে— মাখনুনের মতো। পরে জুঁই তাকে কইছিলো, যুথি ফুল চিনিস। আমাদের বাড়িত আব্বা লাগাইছিল। ভারি মজার বাসনা। তোর গালগুলাও জুঁইফুলের মতোন। এসব নিয়া কাঁঠালপাতা আর বসন্ত বৈরাগীর গাড়া এ গাছ সম্পর্কে নিজেকে সে সুন্দর কইরা তোলে। বাঁশী হাতে নরেশ কৃষ্ণের সুকুমার মুখ তার মনে বাসা বাঁধে। বিশুদের বাড়িতে এক বিরাট ছবি দেখে একপ্রকার ভয় আর পাপবোধ মনে জাগে। এইসব মানুষকে জীবন দেবে কে? কেন ওদের মূর্তি হয়। আসলে এসব কাজে সকলের যোগমায়া রচিত হয়। যেমনটা গাছে বসা পাখিটাতেও আছে। এই পাখির ডানার ছাঁটে কী চমৎকার রঙ নিয়া ওড়ে কিন্তু পাখির আনন্দ কেন মানুষের আনন্দ হয় না! মাখনুন প্রায়ই এই গাছে ওঠে, প্রাচীরে পা দিয়া, ডাল কাটা গর্তে পা রেখে আস্তে আস্তে উপরে ওঠে। ওখানে পছনের জোড়া ডালে বসে নীচে-উপরে তাকায় আর স্বপ্ন বোনে। সারাটা জেবন এই ডালেই গাছবসতি করলে কেমন হয়, মোজাম্মেল স্যার বলেন পাখি আর মানুষের মন এক, গাছ সেটা টের পায়। কখনো গাছ কাটিস না। এসব শুনলে মাখনুনের কান্না আসে, তাহলে বড়রাস্তায় জামগাছটা কাটল কেডা! এখানে বসেই একদিন সে পাখির স্বপ্ন দেখিয়াছিল, নীল আকাশের সাদা ভেলায় পাখি-বিমান উড়িলে তখন সে ঘুমিয়া পড়ে, নানীর ডাক পিছলে পা ফসকে সে গাছ থেকে পইড়া যায়, বুকে আছাড় খায়, তারপর ঘোর আসে। নিইভা যায় চান্দের বাতি। ফর্সা বাতিটা চিমনীর আলোয় রঙ ধরে, বেত দিয়া মাস্টার পেটায়, তড়পাতে থাকলে রহমান পিওন দড়ি আনে, ক্যারে তুই গাছোত ক্যা! তারপর হুমহুম করি মেলেটারি যায় পচ্চিমে আঙরার বিল ভাঙে, মেলেটারি ছোল কাড়ি নেয়, আর দেয় না, এই-ওই করে আর কয়, মাও তুমি চইলে যাও। এই নাদুসনুদুস ছাওয়াল আর দেওয়া হবি না, আমরা নেমো। দেয় না, দোলায় দুলে দুলে চলে, মেলেটারি আসে যায়, আবার আসে যায়, দুরুদুরু কান্নায় তপ্ত ভাপে বেলা ওঠে, গড়ায়, পেছায়, হঠাৎ কমান্ডার আইলে, ছোলের ঝামেলা বা শখ মিটা যায়, মা ফেরত যায়। কী ইচ্চা মানষের, যদি গুলি করে তয় কিচ্ছু করবার নাই, হুট হুট করে মওদুদ বিএসসির সাদা পাঞ্জাবী নাকি চান্নির আলো নাকি রইচের দোকানের ফর্সা ঘোলা বাল্ব– কুত্তা এত্তেলা দিয়া তড়পায়, কোপান দিলে, বিস্কুটের ঠোঙা ছাড়ি দৌড়ায়, সেও দৌড়ায় পচ্চিমে-পূবে ওড়াল ওঠে, মিছিল বারায়, ভোট ভোটার ১৫ নং ১৩নং ভালো খবর, জিতিবে। হোসেন জিতিবে, বিষ খাইবে না, আছে নবীজীর দোয়া। দুলদুল আর দরুদ-বারুদ সবই। তড়পায় বিরাট কালা পিঁপড়ার কামড়ে সচেতন হলে দেখে সে কাঁঠালের ডালের খোপেই বইসে আছে। এখানে মাখনুন বাঁইচ্যা আছে। সে ঘুমে-কষ্টে-আনন্দে স্বপ্ন দেখে, এই গাছতলার নীচের কোটার ঘরে। রূপদিয়ার মোকাম এটা। অনেকেই বলে এই গাছটিই সীমানা। এখান থেকে দেড় ক্রোশ সোজা হাঁটা দিলে ডুবাপুকুরের আইল শুরু। এ রাস্তায় কখনো চাঁদ ওঠে ভরা জোয়ার নিয়া, কখনো কালিগোলা আন্ধার। ছাতা দুলিয়া, পাঞ্জাবীর হাত গুটায়া পান মুখে নিয়া রাস্তা হাঁটেন মওদুদ বিএসসি। সক্কলেই কয়, মাষ্টারের মুখের সামনোত কেটা দাঁড়াবি, বুকের পাটা কয়টা। মাখনুনের বাড়ির কাঁঠালছায়া আর মওদুদ বিএসসি অন্তরমন এক তুলনা হয়। একরূপ আবেগে গাছটা যেন ছায়া দোলায়, পুনর্বার ঝড় উঠলে গর্জন তোলে। একসময় সে গর্ভবতী হয়, প্রচুর ফলে আমজনতার আহার রক্ষা করে, মিষ্টি সে আহারে গন্ধঢালা মনে পাড়া জুড়ানো মানুষের আনন্দে রোল ওঠে। চিক্কুর ওঠে কার বাড়ির কাটোল রে বা? ওর ছোলের বেটা হবি, দোয়া করি। তখন কানাবুড়ি আশীর্বাদ দেয়, রাঙার মা বর দেয় বাড়ির ছেলের জন্যে। এ গাছবাড়ির দরোজা জানালা চেয়ার টেবিল সবকিছু গরিব এবং মহৎ বিদ্যুতময়। ওখানে কাষ্ঠাসন করেন বড় অফিসার, কাজী সাহেব, থানার দারোগা বড়বাবু। বেড়া আটকানো এই খাঙ্গায় অনেক সিদ্ধান্ত হয়, শালিস বসে, মীমাংসা নিয়া চলে যান দর্শনার কুতুব মৌলবী কিংবা হাজেরা বিবি। তাদের সমস্যার সমাধান এই চেয়ারে বইসাই নিষ্পন্ন হয়। এই আজও সকালে দূরের মৌলবী আসিয়াছেন কীসের যেন এন্তেজাম নিয়া। তার আলোচনা করে বহুক্ষণ। মাখনুন হাবিলদারের ব্যাটার মতো চালাক নয়, কিন্তু সে একরোখাগোছের। যে কোণার ঘরটা আছে সেটা সে নিজের বলে অধিকার নিতে চায়। কিন্তু হয় না। একঘরে বাপমাভাইবোন গোলাগুলি থাকতে ঘেন্না করে। রাত হলে বাজার খরচের আর হারিকেনের ত্যাল পুড়ি খালি বিষাদসিন্ধু শোনা। বিষাদসিন্ধুর কথা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। খালি কষ্ট আর কান্নাকাটি। ছবির লাকান ভাইসা ওঠে পাগড়ি পড়া মাসহাব কাক্কা। সম্মুখ সমরে জয় ওঠে। ভীড় কাটাইয়া দর্শকের শব্দে আকাশ কাঁপে। ফোরাত কূল চাক্ষুষ হইয়া ওঠে। সশস্ত্র এসব অভিযানের ভরকেন্দ্র জুইড়ে গড়ে ওঠে মাখনুনের স্পর্শধায়ী মগোজ। চলতে থাকে যুদ্ধ আর ক্রন্দনের তপ্ত মেশামেশি। বাপের গদি বিছানায়, মায়ের থুতনিতে বাপের জামাফেলা হাঁটু আর শ্রবণে আক্রান্ত মগোজ ভীষণ আক্রমণে আটকানো সেই যুদ্ধের তরবারি। এ যুদ্ধে ভয় আর জয়ের সাহস গড়িয়া ওঠে। বিষাদসিন্ধুর গদ্যের তরবারিতে ভৈরবীরাগ প্রস্তুত হয়।

তবে ফোরাতকূল আর দুলদুল ঘোড়ার আওয়াজ মাখনুনের কান বিড়বিড় করলে ঝমঝম করে কাঁঠাল গাছের শাখা-প্রশাখা বেয়ে সরসর বৃষ্টির পানি গড়ে পড়ে। অন্ধকারের ভেতরে কুমকুম করে ত্যাল কমে আসা হারিকেন। টিনের চালে পটপট দমকা বাতাসে বৃষ্টির ফোঁটা নামে। হারকেনের ত্যাল না থাকলে চিক্কন ফিতাডার মাথায় কানি বের হয়। তা একপ্রকার লম্বাও হয়। সে লম্বা শীশে চিমনির এক অংশে কালো কালি জমে। ঘোলা হয়া আসে হারিকেন। বিষাদসিন্ধুর পাতা লালচে হয়। কালো অক্ষরগুলা রঙ পাল্টায়। কাছে এসে দুলদুল ঘোড়ার কাহিনি আবেগের কম্পন আওড়ালে মাখনুন কান্দে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলা চোখোত পড়ে। সে চোখে আন্ধারের ভেতর অল্প ক্রম-আলোতে বালিশটা ভিজিলে কখন যেন চোখ বন্ধ হয়। ভীষণ পানির তোড় তাকে তাড়া দেয়। মাখনুন ঝাঁপ দেয়। বিলের বাতা কিংবা করতোয়া নদীর ওপর পুল থেকে উল্টালাফের ফলে পংগোরের তির্যক কাঁপুনি গোটা শরীরকে ভিইজা দেয়। পানির ওপর হাঁটা, তার স্বরের ওপর ঘুষি মারা আর পংগোরে পংগোরে নিমতলা পার হয়া একাকি অনেকদূর চইলে যাওয়ার খুব সুখ লাগে। মওদুদ বিএসসি কয়, পানি আর আলো মানুষের জীবনের সঙ্গে রিলেটেড। জল জল আর জল এছাড়া মানুষের চলে না। আবার একে ভয়ও করে মানুষ। জলের ছায়া কিংবা জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা বলা, লেক-পাহাড় নিয়া মানুষের উৎসব কাতরতা সবকিছুই মানুষের আগ্রহের বিন্দু। আলোও তাই। পতঙ্গের মতো মানুষও আলো ভালোবাসে। আর পরিবেশের সঙ্গে সবকিছু জড়িত। পূর্ণিমার আলো, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা আর মানুষের আবেগ-অনুরাগের শরীর এক বেণীতে আটকানো। মওদুদ বিএসসি হরোস্কোপের ব্যাপারে আগ্রহী নন কিন্তু প্রসঙ্গ তোলেন। পরে আবার শোরগোল তোলে বিনষ্ট মনের ফেরারি মানুষকে দায়ি করেন সবকিছুর জন্য। মানুষের আয়রনি হচ্ছে, সভ্যতার খাতিরে পরিবেশ সে বিনষ্ট করবে এবং সেই আবার পরিবেশ ফিরিয়েও আনবে। মাখনুন এসব ভাবলেও জলের ইশারা খুঁজে পায় না। অনেক জোড়াতালির পালতোলা নৌকায় সে একবার কাঁদতে বসে, এঞ্জিন নষ্ট হলে খালি চারআঙ্গুল বাদ দিয়া নৌকা কাঁপা শুরু করে মাঝ যমুনায়। হায়রে পানির বলকানি। মাঝি কয়, নড়েন না, চুব হয়্যা থাকেন। অনেকক্ষণ পর স্যালো চালু হলে বড়খালের ফাঁকা তীরে নামি দিয়া কয়, আজ আর নৌকা চালাবানাও ত্বরা কোটে যামেন যাও। সেই ভয় আর মওদুদ মাস্টারের কথাকে মেলালে মাখনুন আগুন আর পানির শব্দ শুনতে পায়। হারকেনের আগুন আর পানির আওয়াজ মেল্যা দূর পৌঁছায়। বড়খালে তখন মানুষ ঘুমায় আর কুত্তার রোল ওঠা কান্না গাঢ়তর হয়। খালি তখন শিরশিরা হাওয়া কুসারের ক্ষেত আর শর্ষের আল দিয়া বাতাস বোলা মায়ায় ভাসে, দৌড়ায়। মাখনুন তখন উষ্ঠা খায়, আর দিশেহারা হয়া কয়, ‘এরামে বাঁচি থাকা যায়, বড়ফুপুর নাকান মরিলে কীসের দায়’— লক্ষ্য যে অনেকদূর! অনিঃশেষ কাশবিছানো মাঠ ধরে হাঁটে, কী গভীর মগ্ন আকাশ, পাখির ডানা আর যমুনার পাড়কাঁপানো সুর। এ এলাকার সংস্কৃতিটা বেশ আলাদা ঠেকে। মাটি থকথকে, জলের ছোঁয়ায় তার সিক্ত পরিণতি জুড়ে দিয়েছে হাওয়াই মন। মনের উত্তাপে বাইরের রূপ শক্ত ভেতরে কাদা। সবকিছুর ভেতরে রহস্য, রহস্যের তালে সামনে দিয়া অগোছালো ঘর, বাড়ির বউ, আর কষ্ট-যন্ত্রণার চিৎকার। উদামপীঠে চাক্কুর মায়ের সংসার। কবে গত হইছে তার স্বামী, চাক্কুই এখন সংসার চালায়। উদাম বাড়িতে মাখনুন ঢুকলে খাবার জন্য তেষ্টা ওঠে, যদিও আজ ভরা পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমায় দিনেরবেলা খাদ্য আহার বারণ, সমুদ্রে জোয়ার দিছে, শরীর এর শালীন থাকার কথা কয়– কবে কইছিলো জেঠুবাবা, শালা কম খা, খাওনের জন্য খালি বাসনার পিছে পিছে হাঁটিস। তারপর সেসব মিথ্যাদিনে জেঠুর চোখ ছাড়িয়া এই বড়খালের তুচ্ছ জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়লে দূর থেকে সে এলেকশানের আওয়াজ শুনতে পায়। স্বাধীনের পরে খুব কম সময়ে হারানো বড় ফোর্সের নায়ক মশাররফ মরিয়া গেছেÑ ভারতের দালাল বলিয়া, কেউবা প্রতিশোধে তার নিজের আগার মিটাইছে। স্বাধীনের সুবাতাস নাই, কেন এ দেশের মাটির মানুষ সুখ সুখ করিয়া ভার হইয়া আছে– তাহার খোঁজ কে রাখে। কিন্তু ক্ষমতাও কী ভাগ হইছে। মাখনুন চাক্কুর মায়ের হাতের ডালভাত খাইয়া মোড়ের দিকে ভাষণ শুনতে যায়। কাল পরীক্ষার জন্য উৎসব পড়িয়া গিয়াছে। সে পরীক্ষায় কতো মানুষ এলাকায় আসিবে! কার ভালো কে চায় সেটি বোঝা কষ্টকর। সাইকেলে সাইকেলে মাখনুনদের আশেপাশের চিরচলাফেরার এলাকা ভরিয়া যাইবে। রওশনপুর, কুতুবপুর পার হইয়া অনেক দূরদেশের ডিস্ট্রিক্টের লোক আসিবে। তাহারা ফেসিলিটি চায়, সাপ্লাইয়ের বন্দোবস্ত খোঁজে। বড় লম্বা মানুষ, বিদেশি স্যুট আর টি-শার্ট গয়ে লইয়া মাখনুনরে কয়, ‘তোমাদের এখানে ভালো দপ্তরী কে? উনার সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা আছে কী?’ এই ভোটঘর, ধানেরশীস-তালা-মই-আনারস মার্কার লারেলাপ্পাটা এখানে ভালোই। কাছে আসেন লাভলু দা। লাভলু দা এই এলাকার হলেও মাখনুনের জাতবন্ধু। কয়েকদিন ও ওকে নিয়া বিড়ি খাওয়া আর পরে পাড়ের ঢালে ভেতরে পুরানা সিনেমা হলে সুচরিতার ছবি দেখতে নিয়া গেছে। তখন শুনছিল ভোরে এক বিরাট জীবনের সংবাদ। নাচুনি বুড়ির ভেতরে মেলা ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষের প্রলয় নৃত্য। তখন বিরাট শোরগোল শোনা যায়। এক অন্ধ আলো ঘিরে ফেলে প্রবল ছায়াগুলো, সে তখন আকাশের গুচ্ছ তারার দিকে চোখ মেলিয়া ডাকে, আয় আয় আয়! মাখনুনের ডাক পাড়া কণ্ঠ আর নাচুনি বুড়ির প্রলয় নৃত্য হাওয়ায় ভাসে না, মনের বারান্দায় হুমড়ি খাইয়া মৃত মানুষের কথা শোনায়। না মৃত নয়, মোহাম্মদ আবুল নামে একজন, যে অন্যায় ভাবে খুনের দায়ে এক চিক্কন বারুদ পান করিয়াছিল। কেউ কিচ্ছু বলে নাই। সবাই বিশ্বাস করে সে বারুদে বিষ নাই, ধ্বক নাই, গন্ধ নাই। কেউ তার চিহ্নমাত্র পাইবে না। সেটার কোনো মালিকানা রইবে না। হজমের ভেতরে তার তেজ ফুরাইয়া যাইবে। সেই কাম ঠিক ঠাকই চলে। কিন্তু বিধির বিধান কাটবে ক্যামনে। তা ফিইরা আসে। জানান দেয় খুনীর খুনের শার্লোক পরিক্রমা। রব ওঠে। প্রিয়তমার চোখের জল প্রবল বর্ষণ আনে। সেই বৃষ্টির ফাঁদে সমস্ত হাহাকার সকলকে সঙ্গী করে। কোলের কাঁখের হ্রেষা দূরন্ত হইয়া কয় : আয়, আয়, আয়। সত্যিই আইসা গেল, সব গুপোন কতা বাইর হইয়া পড়লো। কী নির্মম আর কতো তুচ্ছ মৃত্যু। সেখানে প্রবল অত্যাচার, নিরুপম হাহাকার, আর তীব্র কষ্ট খরা রোদের ফড়িং চীৎকার, চিরকালের হারানো জাফরান বেদনার ভার চুইয়া ওঠে কন্যা আর প্রিয়তমার স্বর। কেউ তা দেখে নাই, হায়রে অভাগা জীবন। কুৎকুঁতে স্বার্থে সব ভুইলা যায়, দ্যাশ বেচেÑ জীবন বেচে। কী স্বার্থ আছিল তাতে। পাপ কী বাঁচে? পাপের সমুদ্র কেউ কী দ্যাখছে। নিদারুণ তার আর্তনাদ। সমুদ্রের কোলাহলও তাতে পরাস্ত। মাখনুন সমুদ্র দেখে নাই, ছবি দেখছে। পাগলী বুড়ি ওই ছবিতে নামে, নীল সাগরে পঙ্গর দেয় আর আবুল বাবার ইশারায় ডাক পাড়ে। তখন খুব দ্রুত ঐশী বাণী চিক্কুর দিয়া ধমকের সাথে কয়, চেনোস বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনরে চেনোস। শিইখ্যা রাখ ভরা জীবনের লাইগ্যা : ‘যারা আক্রান্ত হয়নি, যতক্ষণ না তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের মতো ফুঁইসা উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হইবো না’, হয়নি তা কোনোদিনও। নুনের সামনে ভেসে ওঠে আবাস সেই ফটিকছড়ি। মাঘনিশীথের রাতে ডাক ওঠে। পেছনে পিস্তল ঠেকাইয়া মারিছে। বউ কান্দে, কষ্টে হুপ হুপ কইরা কান্দে কোলের শিশু। টুপ কইরা নেওর পড়ে, কানের গোড়া দিয়া। দূরে তিনটা কুত্তা একসঙ্গে গা মোচড়ায়। সড়াক কইরা উইড়া যায় বাজপাখি। শান্ত সমান সবুজ জমিনে নির্জনতা আরও গাঢ়তর হয়ে আসে। জোনাক পোকার আলোও ক্লান্ত হয়ে কমে আসে। তখন কি সব মানুষ ঘুমায়! বুড়ির নৃত্য তো বহুদূর তখন। যাত্রার ফ্লুট বাজানোর মতোন মিইয়া থাকে। মিহিটা আরও গভীর। এতো নিথরতার ভেতর ‘টাস’ আওয়াজ হয়। ফ্যাটকা টাস। তাতেই আবুল মইরা যায়। কলঙ্ক লিপিত হয়। কাহার নির্দেশে ঘুচায় আলো। অন্ধকার প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে। ঘিরিয়া ধরে। অধর্মের অপরাধে দুর্যোধনের ন্যায় সকলের মদ্যেই খালি গোয়ালাকে দেখে। পানিতে দেখে, দ্রোণাচার্যকে দেখে, ভীষ্মকে দেখে, বিদূরকে দেখে। গোয়ালার প্রভাবে সে নিজেকেও ভুল দেখে। সে কী ভুলিয়া গেল নিজেকে? পানিতে মুখ দেখিতে গেলে এ তো গোয়ালা! কীসের এতো প্রতাপ তাহার, আমি মানি না। এই গোয়ালাই তো আবুল। তাহারে সরাইয়া দেছে। আর কোনো শত্রু নাই। কেউ আর পেছনের দরোজা দিয়া আসিলে ভয় নাই। আবুলরে নিয়া আছিল মহা বিপদ। সে খালি ন্যায়ের কথা কয়। ট্যাকা চেনে না— বোকার কোনেকার। এভাবে জীবন নিয়া কতো মক্কোর মানুষেরÑ এ্যাঁ। থুবড়ে পড়ে গোটা শরীর। রক্ত নাই। খালি ঠ্যাং উঁচু করা একটা কালো পাখি লম্বা সুরে ধুম ডাক পাড়ে। ডাকের ভেতরে হাহাকার। চিনচিনা ব্যথা। ঘিরে থাকে কুসন্নী ডাক। পুরানা মসজিদের ভেতর থাকি জ্বীন বহির হইয়া আসে। ইঁদুর পাশ দিয়া মুখ শুঁকে হাঁটাহাঁটি করে। জন্তুকুল নিজের মতোন ডাকে। বিরাট হয়া ওঠে লাশ। কতোক্ষণ আগেই সে বাঁচার জন্য আল্লাকে ডাকিছে। পশুপাখির কাছে মাফ চাইছে। এখন সব থেকে সে অবসিত। নিশ্চিত তার মিনতি ছিল অনেক। কতো মায়া, দয়া, আকাক্সক্ষা সব বরবাদ। কীসের জন্য এতো সুন্দর সবকিছু! যেখানে মানুষ নাই, জেবনের দাম নাই, আবুল মইরা গেলে কিচ্ছু হয় না। কারণ ছাড়াই সিংহ নিরীহ শাবকের ওপর চড়াও। রক্তশোষকের মতো ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। মহাসিন্ধুর ডাক সে চেনে না। সার্কিট হাউজের কোণায় তখন টেনশানে হাঁটে মাখনুন। লাভলুও থাকে। কয়, ফাঁকোত চুব কবি থাকিস। মেলেটারি আসিছে। কাকো বাঁচাবি না। বিড়াল চকচকে চোখে তাকায়। মাখনুন বাঘের বাচ্চাই মনে করে ওকে। শালা ভয়ঙ্কর।

পাঁচ.

মুকুলভাইয়ের মুখে মাখনুন দূরপাল্লা-মাঝারীপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়া গল্প শোনে, কিন্তু সে গল্পের মুকুলভাই কবেই মইরা গেছেন, ক্যামনে মরেন কান্দোন আসে বৃষ্টিতে ভাইস্যা কান্দন চিকচিক করে, পাতা চুইয়া বৃষ্টি নামে, আমড়া গাছ চুইয়া ঝরা পানি পড়ে, চোখ ডলে বৃষ্টি নামে হঠাৎ মরেন একসময় স্মৃতিভরা শেখসাহেব— ‘ত্বরা কারা, ক্যান আইচস’ তহনও টিকটিকি লাফায় ফুচকি মারে, এক ইশারায় রাইফেলের নটে চাপ দিয়া লুটাইয়া দেন তারে সিঁড়িঘরের রানায়। বাইরে তখন কালো কুচকুচা আন্ধার, গুড়–ম বিজলীরেখায় ক্লান্ত গোমরা আকাশ, কুত্তছানা এনিতেই বেশি চিক্কুর দিতে থাকে। সোনার দ্যাশ শ্যাষ হইয়া গেছে তার নির্মম বয়ান পাড়ে ওই কালোকিষ্টি নধরকান্তি সেক্সী কুত্তার থুলথুলা শরীর। দ্যাশটারও দশা এই কুত্তাডার ভীরু চিক্কুরের লাকান। মাখনুনের এসব মনে নাই। মাঝে মাঝে ঝড়পোড়া বাউরা আসি ঠেসি ধরে তাকে। তার ভেতর আউলা-বাউলা এসব কানোত পড়ে, কখনো শির শির করি ঠ্যাং কাঁপে। মুকুল ভাইয়ের সাথে আবার শেখসাহেব ক্যা। তাই তো সগ্গোল সময় শেখসায়েবের গুষ্টি উদ্ধার করিছে। ঢাকাত থাকি বাড়িত আসলে খালি উল্টা-পাল্টা কথা কয় শেখসায়েবোক নিয়া। ভার্সিটির শহীদুল্ল্যা হলোত এখন খালি বড় বড় নেতা আর রেবলবারের গপ্পো— মুকুল ভাই নিজেই নাকি সেগলা হাতে নিয়া চলেন। সবাই তাক ডাকে আর সন্মান করে। পুকুর পাড়োত বসি খালি মন্ত্রী আর হলের নেতাদের সম্পর্ক নিয়া কীসব কথাবার্তা কন। তখন ভার্সিটি ভ্যাকান্ট হলে প্রকাশ খলিপ্যার দোকানোত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সে সব শৌর্য-বীর্যের কাহিনি বলিয়া চলেন। মাখনুন এক কানে তা শোনে। খালি শোরগোল। ঘুমালেই এসব শোরগোল তাকে ঘিরিয়া ধরে। জিয়ার মৃত্যুর দিন থাকি কেমন একটা শোরগোল তখন চারিদিকে। কান্না আসচিলো সেইদিন। শহরের সব দালানকোঠা, গাড়ি-বাড়ি, রেলওয়ে-স্টীমার মরহুম জিয়াকে আলোচ্য কইরে তোলে। পরে এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ওই পদে বসিলে তার জন্য গণভোট হয়। থমথম হওয়া পরিবেশ অনেককাল টাইনে চলে। মাখনুন সে ভোটের পোস্টার নিয়া সাইকেলের পেছনে অনেকদূর হাঁটি আসার পর বিরাট সামিয়ানার পাশে প্রাইমারী স্কুলের বারান্দার সিঁড়িত বসে খোর্মা আর একপিচ গুড়ের জিলিপি খাইচিলো। পরে ময়লা হাত চেটে গুড়ের স্বাদ নিলে আরেকটা জিলিপির জন্য খুব লোভ হয়। এ বয়সী কয়েকটা ছেলেকে পাশ কাটিয়া ভীড় ঠেইলে অনেক বড় জিলিপির বস্তার দিকে তাকায়া থাকে। হঠাৎ লম্বা স্যুট পরা মখলেছ মামা স্টেজের পাশে দাঁড়াইলে সাদা দাঁত বার কইরা কয় : ‘ক্যারে আরও জিলিপি নিবু? চিক্কুর দিয়া ৫খ্যান জিলিপি ধরি দিয়া কয় যা, বাড়িত যা। ফকিরের ডৌল আর ঘুরিস না।’ মখলেছ মামা প্যাটোয়ার বান্দা ঢোলা প্যান্ট আর সাদা শার্ট পরে বেশ ঝাঁকি দিয়ে উঁচা মঞ্চের ওপর ওঠেন। কান্নাবিজড়িত আবেগে বলেন : এইবার ভোটে সাবেক বিচারপতিকে ভোট দিয়া মানুষ জেনারেল জিয়াহত্যার প্রতিশোধ নিবি। ভাইসব চট্টগ্রামের লৌহমানব সাবেক মন্ত্রী এখন আপনাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নিয়া আসবেন। এসব কথায় মখলেছ মামার খুব নাম হয়, মাখনুন জিলিপি হাতে নিয়া বাইরে আসে। একা একা নিরানন্দ মনে হয়। পাশের শিরিসের তলে বসে সে সবকটা জিলিপি খাইতে পারে নাই, তখন দুমদুম আওয়াজ তোলা ধানভানা মেশিনের পাশ দিয়া একটা ক্ষীণ শোঁসানো শব্দ তার কানে আসে। দুটা হেরিংবোন রাস্তার স্পর্শবিন্দুর পাশে প্রাইমারী স্কুল মাঠ। সেখানে নিজ নিজ কাজে যখন ব্যস্ত সবাই, তখন এক খারাপ জিনিস তার চোখে পড়েছিল। সেটি খারাপই তো, চালমেশিনের পাশে ছোট্ট ফাঁকা দিনের অন্ধকারে কীসব খারাপ কাজ সেখানে চলছিল। সে মানুষটার নাম মাখনুনের মনে নাই। কিন্তু সে চেনে তাকে। এরকম আরও কয়েকটা লোক একসঙ্গে হয়ে মাঝে মাঝে এখানে বসে বিড়ি ফুঁকায় আর কী কী সব বলে। মাখনুন, বিশু, হাবলু এসব অনেক কাজের সাক্ষী। কিন্তু হাবিলদারের বেটা এসব বললে বিশ্বাস করে না বা চেপে যায়। কারণ কী! কারণ এর মধ্যে সেও আছে। কেন একদিন তো সে স্বীকারই করেছিল, গর্ব করে বিবরণও দিয়েছিল সে খারাপ কর্ম্মের। কিন্তু সাক্ষাৎ এ ঘটনাটি বেশ কিছুদিন তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। একি জীবনেরই কোনো স্বরূপ! বা পুরুষ পোকা স্ত্রী পোকা, পুং মৌমাছি স্ত্রী মৌমাছি মাটি ও জলে সাপের প্যাঁচানো শরীর আলিঙ্গনের কাম্য রূপটি কীভাবে তাহা এ নিষেধের তটে খারাপ বলিয়া প্রতিভাত হইলো!

একটা বড় মুড়ির টিনের মতো গাড়ি আসিয়া থামিল। এ গাড়িটা বেশ বুড়া। সময়টাও বুড়া। কারণ মানুষগুলা চলতে ফিরতে সময় লাগে অনেক। এর প্যাটে অনেক মানুষ ধরে। সময় নিয়া থামি থামি সে জিলা শহরের দিকে চলে। সেমেন্টে বাঁধা চিকন রাস্তা, রাস্তায় কেউ থাকলেই তাকে তুলে নেয়। মাখনুনের পুরানা মাটির একটিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় এ গাড়ির নিত্যদিনের যাতায়াত। সে রোদে বসিয়া ‘মহৎ প্রাণ’ গল্প পড়ছিল। এক সৎ মানষের কাহিনি। কিন্তু এ গাড়ি আসলে উঠতে চায়। দূরেদেশে যাইবে সে। যেভাবে মওদুদ বিএসসির ছেলে চলিয়া গিয়াছে। সে তো বিদেশ কিন্তু মন আড়ষ্ট হইয়া, ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বিরান পাথার অবমুক্ত হয়। কেউ নাই সেখানে। অনেককালের মাটি হাতে ছানিয়া বিএসসি কয় মাখনুন এই দ্যাশে আর থাকোন যাইবো না। ত্বর বাইজানের নাহান চইলা যাইবো। আবার বুঝি যুদ্ধ লাগবে। কেমন একটা গরম গরম ভাব। খালি চোরাগুপ্তা খুন আর ফাঁসানো মৃত্যুর দড়ি ভালো ভালো মুক্তিযোদ্ধা মেলেটারির গলায় পড়ছে। খালেদ, হায়দার, তাহের সবাই বিচারের নামে, ক্ষমতার নামে, গদি দখলের নামে খুন হচ্ছে। যারা খুন করছে তারাও একসময় হয়তো খুন হবে। এই দ্যাশ কী খুনীদের হাতে চলে গেল! মাখনুন এতোক্ষণ মুখোমুখি থাকলেও এসব জ্ঞান কুলিয়ে উঠতে পারে না– সইরে আসি কয়, হামার কী হইবে! মুকুল ভাইয়ের নাহান আবোল তাবোল বকলেও কাম আছিল। বড়ো গাড়ির সামনে আসলে এসব নানা চিন্তা মাথায় আসে। বিএসসি এখন বাড়ির বাইরে যান না। খাঙ্গা ঘরেই তার সময় কাটে। আর এসব আশঙ্কা নিয়া বলিরেখার বলয়ে বসবাস করেন। সেদিন কী কারণে বিড়বিড় করে আরও কী কী সব বললেন। মাখনুন বোঝে না, হাতড়ায়, সে স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার পাগড়িতে আর শায়েস্তাখানের আটমন চালের গন্ধ নিয়া ওখানে দাঁড়াইয়া থাকে। (চলবে)

সামন্ত পরবর্তী পুঁজিতান্ত্রিক চেতনাধারায় সাহিত্য

প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত সভ্যতার দুটি ধারা বহমান রয়েছে। এই দুটি সভ্যতার মধ্যে একটির নাম গ্রীসীয় সভ্যতা এবং অপরটির নাম কার্থেজীয় সভ্যতা। দুটি সভ্যতা প্রচীন ও সমৃদ্ধশালী। গ্রীসীয় সভ্যতার উৎপত্তি হয়েছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞান-পাণ্ডিত্য-দর্শন ও সাহিত্য-চারুকলার ভিত্তিতে। এবং কার্থেজীয় সভ্যতার ভিত নির্মিত হয়েছিলো ব্যাবসা বাণিজ্যের উৎকর্ষের ভিত্তিতে।

দুটি সভ্যতার রূপ, আকৃতি এবং প্রকৃতি দু’রকমের। এবং দুটিরই রয়েছে ভিন্ন তাৎপর্য। গ্রীসীয় সভ্যতায় ছিলো আত্মা ও মননের বিকাশ সাধনের কর্ষণ। কার্থেজীয় সভ্যতায় ছিলো জাগতিক জীবনে অর্থনৈতিক বিকাশের চর্চা।

গ্রীস যখন উন্নতির মধ্য গগনে ছিলো, তখন সে চিত্তেরই ঐশ্বর্য দিয়েছে, কামনা বা লালসার আভাস থাকলেও তা ছিলো অতি নগণ্য। ঐশ্বর্য বলতে বোঝায় তার মূলধনের ব্যাপ্তি। সেই ঐশ্বর্য ছিলো গ্রীসীয় সাহিত্যে। কালে কালে গ্রীসীয় ঐশ্বর্য ম্লান হয়ে গিয়েছিলো কার্থেজীয় বণিক সভ্যতার দাপটে। সেই বণিক সভ্যতার দাপট আজও অব্যাহত রয়েছে। চিত্তবৃত্তির জায়গা আজ দখল করে নিয়েছে বাণিজ্যবৃত্তি।

চিত্তবৃত্তির কখনও মৃত্যু ঘটেনি। তার প্রকাশের পরিমাণ তার নিজের মধ্যেই। সে নিত্তনৈমিত্তিকের আশু প্রয়োজনের ক্ষুদ্র সীমায় নিঃশেষিত হতে হতে মিলিয়ে যায় না। সে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলে শাল-তমালেরই মত, তার কাছ থেকে দ্রুত ফসল ফলিয়ে নিয়ে তাকে কুড়াল দিয়ে কেটে বাতিল করা হয় না। সে বরং আরো বিচিত্র ফুলে ফলে ডালে ডালে, ভাবের এবং রূপের সমন্বয়ে, সমগ্রতায় নিজের অস্তিত্বের চরম গৌরবের কথা স্থায়ী কালের বৃহৎক্ষেত্রে ঘোষণা দিয়ে থাকে।

মানুষ ভাষাযোগে তার প্রয়োগসীমা অনেক দূরে ছড়িয়ে দিয়েছে। সন্ধান ও যুক্তির আলোকে তথ্যগত সংবাদ সে পরিণত করেছে বিজ্ঞানে। এই বিজ্ঞান তার প্রাত্যহিক ব্যক্তিগত বন্ধনকে দিয়েছে ঘুচিয়ে। যে জগতে মানুষের অস্তিত্ব, সেই অস্তিত্বের অনুভবে মানুষ বিরাট জ্ঞানের জগত রচনা করেছে। বিশ্ব জগতে মানুষের যে অস্তিত্বের উপলব্ধি ইন্দ্রিয়বোধের মাধ্যমে, সেইটিই জ্ঞানের মাধ্যমে অধিকার করে নিয়েছে সকল দেশের সকল কালের মানুষের বুদ্ধি। ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে মানুষের আর কষ্ট করতে হয়নি। সে তার সকল উপলব্ধি ও চিন্তার ক্ষেত্রে চাষ দিয়ে উৎকর্ষ সাধন করেছে— ভাষার দিয়েছে উদবেগের প্রবর্তনা, ছন্দ এবং সুরও যোগ করেছে তাতে। ব্যক্তিগত বেদনাকে সে ফুটিয়ে তুলেছে বিশ্বজনীনরূপে। সে পরস্পরের মধ্যে মনের মিলনও ঘটিয়েছে। সেই মিলনই হচ্ছে সাহিত্যের মাধ্যমে মিলন। মানুষ বিশ্ব প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। মানব সংসারে বাস্তব ঘটনাবলীর সঙ্গে মানুষের মনের সক্রিয় সম্পর্ক রয়েছে। ঘটনা যখন বাস্তবের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে কল্পনার বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরিত হয় তখনই মানুষের মনের কাছে সাহিত্য হয় বিশুদ্ধ ও বাধা-বন্ধনহীন। মানব জীবনে অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন সংঘটিত হয়ে চলেছে। এই ঘটনাগুলির মধ্যে কোনো ঐক্য নেই— এবং একটির সঙ্গে আর একটির কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ বাস্তব জগতকে চোখের দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করলেও— তার আর একটা দৃষ্টি রয়েছে। সে দৃষ্টি হলো কল্পনার দৃষ্টি। এই কল্পনার দৃষ্টি সব ঘটনার মধ্যে ঐক্যকে সন্ধান করে। মানুষের মন যখন কল্পনার দৃষ্টিতে জীবনের অসংলগ্ন ঘটনাকে ঐক্যে স্থাপন করে, তখন বিষয়টি হয়ে ওঠে বিশেষ তাৎপর্য। এই বিশেষ তাৎপর্য যখন সমগ্র হয়ে ওঠে তখনই সাহিত্যের দেখা সম্ভব হয়।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষের সাথে চলছে মানুষের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য দিয়ে মানুষ তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে চলেছে মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্দ জ্ঞান দ্বারা তার মনের মধ্যেই গড়ে তুলেছে আর একটি জগতÑ সেই জগতের নাম মানস জগত। মানুষ তার অভিজ্ঞতার জগতে প্রকাশ বৈচিত্রবান মানুষের নৈকট্য কামনা করে এসেছে চিরকাল। মানুষের এই কামনা মানুষের মনের গভীরে চিরকাল প্রবল হয়ে রয়েছে।

মানুষ এই বিশ্ব সংসাররেক দুইভাবে ভোগ করছে। একদল মানুষ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ভোগ করছে বিশ্বের যাবতীয় সহায় সম্পদ, অন্য আর একদল মানুষ ভোগ করছে তার বিপুল ভাব সম্পদকে। সাহিত্যে রয়েছে সেই চিরকালের ভাব সম্পদ।

মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই প্রকৃতিকে ব্যবহার করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলো। এই আবিষ্কারের মধ্যেও ছিলো একটা চেতনা। যেদিন থেকে মানুষ তার জীবনযাত্রার প্রয়োজনে শুধুমাত্র রিপুর তাড়নাকে প্রাধান্য দিয়েছে। সেইদিন থেকে সেই মানুষ তার চারদিকে নিরন্ধ্র দেয়াল তুলে চৈতন্যকেও সঙ্গী করে রেখেছে। চৈতন্য যার বন্দী, বিশ্বের সঙ্গে, জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে, দর্শনের সঙ্গে এবং সাহিত্যলাভের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ গড়ে ওঠেনি। কারণ তার রয়েছে বিপুল বাধা— তার রয়েছে কল্পনা দৃষ্টির অন্ধতা।

জ্ঞানের পথ এবং ভাবের পথ উন্মুক্ত। যে মানুষের মুক্ত স্বরূপ নেই, সে মানুষ কখনও অপ্রয়োজনের আয়োজনে তার আত্মসম্মানবোধের ঘোষনা দিতে পারে না। অপ্রয়োজনের আয়োজন হলো বিশ্বের সাথে যোগ; কল্পনার যোগ। এই যোগের মধ্যে কোনো কাম নেই— রয়েছে নিষ্কাম সম্বন্ধ। এই সম্বন্ধের মধ্যে রয়েছে যে চাওয়া সে চাওয়া হলো একান্ত আবশ্যিকতার থেকে মুক্তি।

যারা বৈষয়িক মানুষ— তারা জগত সংসারকে আবশ্যিক বলে গ্রহণ করে এসেছে। বস্তু জগতের কর্মকাণ্ড নিয়েই তারা ব্যস্ত। তারা সম্পূর্ণ পৃথক মানুষ। তাদের চাওয়া ভিন্ন। এই চাওয়ার মধ্যে কবি, সাহিত্যিক এবং শিল্পীর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। মানব সমাজে একান্ত আবশ্যিকতা থেকে মুক্তিলাভের জন্য মানুষ যে নিষ্কাম সম্বন্ধের কথা স্বীকার করে, সেই স্বীকারের কথাটাই তুলে ধরেন কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী। সে নিজেকে মিলিয়ে নেয় অপনার চারিদিকের সঙ্গে— মিলিয়ে নেয় ভাবরসের মাধ্যমে বিশ্বকে এবং মানুষকে।

বিশ্বজগত মানুষের কাছে বিশুদ্ধ প্রাকৃতিকতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেও মানুষ কখনও প্রাকৃতিক হয়ে ওঠেনি— কারণ তার মধ্যে রয়েছে মন। এই মন সে বিভিন্নভাবে বিভিন্নক্ষেত্রে তার প্রয়োজনে অহরহ কাজে লাগায়। বিশ্বের প্রত্যেক বস্তুর সঙ্গে মানুষের মনেরও একটা সামঞ্জস্য রয়েছে।

মানুষ প্রকৃতির মধ্যে বাস করলেও সে প্রকৃতির অধীন নয়। নিজের মতো করে মানুষ পৃথিবী গড়ে তুলেছে। মানুষের গড়া এই পৃথিবীটাকে মানুষই নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ জগতটাকে মানুষ গড়ে নিয়েছে মানুষের ভাবানুষঙ্গে।

প্রচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক পৃথিবীকে মানুষ তার নিজের বুদ্ধি ও পেশা দ্বারা আপন ইচ্ছানুসারে গড়ে তোলার সাধনা করে এসেছে। পৃথিবীকে নিজের মতো করে গড়তে গিয়ে মানুষ রপ্ত করেছে নানা রকম কলাকৌশল। পৃথিবীর কাছ থেকেই সে গ্রহণ করেছে উপকরণ। গ্রহণ করেছে শক্তি। এই উপকরণকে কাজে লাগিয়ে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। জল-স্থল, আকাশেও আজ মানুষের ঘটেছে ইচ্ছার বিজয়। অর্থাৎ মানুষ সব কিছুরই নৈকট্য লাভ করেছে। সে দূরকে করেছে নিকট। এই নৈকট্য কিসের নৈকট্য? সাহিত্য যে নৈকট্যের কথা বলছে, বিশ্বের সঙ্গে মিলনের কথা বলছে, এ নৈকট্য সে নৈকট্য নয়।

মানুষ বস্তুজগতের উপর নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর চেষ্টা করলেও মানুষের অন্তরজগতের মান বাড়েনি। যতই মানুষ আত্মিক উন্নতির চরম শিখরে উঠছে, ততোই মানুষের অন্তরের জগত হয়ে উঠছে শূন্য। ব্যবহারিক জগত নির্মাণ করতে গিয়ে মানুষের অন্তরজগত হয়ে উঠেছে অন্তসারশূন্য। একথা সত্য যে মানুষ তার আশ্চর্য কর্মশক্তি দিয়ে শ্রমের মাধ্যমে পৃথিবীকে নির্মাণ করেছে এবং গড়ে তুলেছে সমাজ রাষ্ট্র ও সা¤্রাজ্য। এইগুলি গড়তে গিয়ে মানুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়েছে। সামাজিক সংগঠনও হয়েছে বহুস্তরে বিভক্ত। মানুষই সৃষ্টি করেছে মানুষের মধ্যে প্যাট্রিশিয়ান, যোদ্ধা, প্লিবিয়ান ও ক্রীতদাস। ভূতপূর্ব ঐতিহাসিক যুগেও ছিলো সমাজে বিভিন্ন বর্গের এমনি একটা জটিল বিন্যাস। এক শ্রেণী থেকে আর এক শ্রেণীর জন্ম হয়েছে। সমাজেও ঘটেছে নব নব রূপান্তর। সৃষ্টি হয়েছে শ্রেণীর অভ্যন্তরে শ্রেণীর স্তরভেদ। এর মূলে রয়েছে দুটি জিনিস। তা হলো মুনাফা ও কর্তৃত্ব।

মানুষ যেদিন থেকে ব্যাবসা বাণিজ্য করতে শিখেছে, সেইদিন থেকে তার মনে জেগে উঠেছে মুনাফা। মুনাফা অর্জন করতে গিয়ে কর্তৃত্বের লোভও তার মনে দেখা দিয়েছে। এভাবে মধ্যযুগে ভূমিদাসের অভ্যন্তর থেকে প্রথম শহরগুলিতে উদ্ভব হয় স্বাধীন নাগরিকদের।

স্বাধীন নাগরিকেরা নদীপথে এবং সমুদ্রপথে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ব্যবসা ও বাণিজ্যবৃত্তির প্রচলন শুরু করে। যেদিন মানুষ নৌপথে আমেরিকা আবিষ্কার ও আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করার সুযোগ লাভ করে, সেদিন থেকে উঠতি বুর্জোয়াদের চোখের সামনে খুলে যায় নতুন এক দিগন্ত। বাণিজ্যের মাধ্যমে বণিকরা দখল করে নেয় পূর্বভারত ও চীনের বাজার। আমেরিকাকে করে উপনিবেশ। একদিকে চলে উপনিবেশ গড়ার কাজ। অন্যদিকে বাণিজ্য ও বিনিময় ব্যবস্থার তথা সাধারণভাবে পণ্যের প্রসার বাণিজ্যে নৌযাত্রায় শিল্পে দান করে অভূতপূর্ব একটা উদ্যোগ।

ক্রমান্বয়ে বিশ্ববাজার সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং তার সঙ্গে চাহিদাও বাড়তে থাকে। অতঃপর বাষ্প ও কলের যন্ত্রে বিপ্লবী পরির্বন ঘটে শিল্প উৎপাদন ক্ষেত্রে। হস্তশিল্পের পরিবর্তে গড়ে ওঠে আধুনিক শিল্প। অর্থাৎ নৌপথ আবিষ্কারের ফলে বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠা লাভ করে আধুনিক শিল্পে। এই বাজারের ফলে বাণিজ্য, নৌযাত্রা ও স্থলপথে যেগাযোগের প্রভূত বিকাশ ঘটে। সে বিকাশ আবার প্রভাবিত করছে শিল্প প্রসারকে এবং অনুপাতে শিল্প, বাণিজ্য নৌযাত্রা ও রেলপপথের প্রসার, সেই অনুপাতেই বিকশিত হয়েছে বুর্জোয়া, বাড়িয়ে তুলেছে তার পুঁজি, মধ্যযুগ থেকে আগত সমস্ত শ্রেণীকেই ঠেলে দিয়েছে তার পেছনে। বিকাশের পথে বুর্জোয়া শ্রেণী প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সমানে চলেছে সে শ্রেণীর রাজনৈতিক অগ্রগতি। যে বুর্জোয়ারা ছিলো একদিন সামন্ত প্রভুদের আমলে নিষ্পেষিত শ্রেণী, মধ্যযুগে তারাই সামন্ত মনিব ও প্রভুদের কাছ থেকে স্থানীয় স্বশাসন ও রাজনৈতিক অধিকার আদায় করে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করে তৃতীয়মণ্ডলী। হস্তশিল্প পদ্ধতির প্রকৃত পর্বে যারা আধা সামন্ততান্ত্রিক অভিজাতবর্গকে দাবিয়ে রেখেছিলো, সেই বুর্জোয়া শ্রেণী অবশেষে আধুনিক যন্ত্রশিল্প ও বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের জন্য পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। সামন্তসমাজের মধ্যে যেসব বিচিত্র বন্ধন ছিলো, তা বুর্জোয়ারাই নির্মমভাবে ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এরাই মানুষের সঙ্গে মানুষের অনাবৃত স্বার্থের বন্ধনকে ধ্বংস করে দিয়ে নগত টাকার বন্ধনকে কার্যকরী করে তোলে। এরাই নষ্ট করে দেয় ধর্মীয় উন্মাদনা, শৌর্যবৃত্তির উৎসাহ এবং কুপমণ্ডুক ভাবালুতা। লোকের ব্যক্তিমূল্যকে এরাই পরিবর্তন করে বিনিময় মূলে। অগনিত অনস্বীকার্য সনদবদ্ধ স্বাধীনতার স্থানে এরা এনে খাড়া করেÑ একটি মাত্র নির্বিচার স্বাধীনতাÑ যার নাম অবাধ বাণিজ্য। এই অবাধ বাণিজ্যিক বৃত্তির মধ্যে রয়েছে নগ্ন নির্লজ্জ এবং সাক্ষাৎ পাশবিক শোষণ।

মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোকে এযাবৎকাল সম্মান করে এসেছে এরা তার মাহাত্মকে ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইনজীবী, পুরোহিত, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী— সকলেই এরা পরিনত করেছে তাদের মজুরীভোগী শ্রমিকে। ফলে সাহিত্য যেভাবে বিশ্বের সঙ্গে এবং মানুষের মনের সঙ্গে মিলন ঘটাতে চেয়েছিলো, সেই মিলন বুর্জোয়া সভ্যতায় কখনো সম্ভব হয়নি। বুর্জোয়া সমাজে যে সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে— এই সংস্কৃতির মূল দর্শন হলো বৈষয়িক। শ্রেণীগতভাবে বৈষয়িক উন্নয়নের পারস্পারিক প্রতিযোগিতায় মানুষের চিত্তের অপমৃত্যু ঘটেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন এসেছে তা হলো মানুষের বিপুল আশাবাদী মনোভাবের নৈরাশ্যে রূপান্তর। শুধু তাই নয়— মানুষ পরস্পরের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ জন্ম থেকেই একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। সেই বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটেছে। এই বুর্জোয়া যুগে মানুষের সব চাইতে বড়ো ভাবনা মানুষের কল্যাণ নিয়ে, মানুষের সুখ শান্তি নিয়ে এবং তার কর্মপদ্ধতি নিয়ে। কিভাবে মানুষ তার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখবে এই নিয়ে তার ভাবনা।

বর্তমান বুর্জোয়া সংস্কৃতির মান নিয়েও নানা রকম প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মানুষ কি প্রথম শ্রেণীর শিক্ষাকে বর্জন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং চিন্তা ধারার অনুসরণ করছে? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন এলিয়ট। হ্যাঁ, নিশ্চতভাবে বলা যায় যে বর্তমান যুগ— অবনতির যুগ। পূর্বের তুলনায় সাংস্কৃতিক মানের দারুণ অবনতি ঘটেছে এবং মানুষের যাবতীয় ক্রিয়াকর্মে এই অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শুধু এলিয়ট নয়— ইউজিন ও নীল-এর মন্তব্য: সব মানুষকে এই আধুনিক যুগের পীড়ায় ভুগতে হবে। ভুগবেন লেখক, চিত্রকর, গায়ক, স্থপতি, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ প্রমুখ মৌলিকগুণসম্পন্ন সকলেই।

লয়েড মরিস বলেছেন যে এই পীড়ার সৃষ্টি হয়েছে প্রাচীন ঈশ্বরের মৃত্যুতে, এতদস্থলে নতুন ঈশ্বরের প্রতিষ্ঠায় এবং সর্বোপরি বিজ্ঞান ও বস্তুবাদের ব্যর্থতার ফলে।

তারা আরো বলেছেন যে মানুষকে এমন এক সমাজে বাস করতে হবে, যে সমাজে যৌন কুরুচিপূর্ণ প্রেমের কাহিনি রচয়িতাকে দেওয়া হবে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার। যে চলচ্চিত্রের তীব্র প্রতিযোগিতায় ব্রডওয়ে নাট্যমঞ্চের হবে পরাজয়। আবার চলচ্চিত্রের পরাজয় হবে টেলিভিশনের কাছে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের শ্রেষ্ঠ শিল্পীর সম্মান পাবে নির্লজ্জ ভাঁড় এবং ওই সমাজে কাব্যের থাকবে না বিন্দুমাত্র কদর।

বুর্জোয়া সংস্কৃতি যুগের এই অভিযোগটাকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্যরকমভাবে বলা যেতে পারে: বৃহদাকার উৎপাদন ব্যবস্থার যুগে মানুষ উৎকৃষ্ট মোটরগাড়ী এবং নাইলন বস্ত্র পেয়েছে বটে কিন্তু বিদ্যাবুদ্ধির ক্ষেত্রে শিক্ষার মান নেমে গেছে অনেক নিচুতে। একথা অনস্বীকার্য যে বুর্জোয়া শ্রেণী বিশ্ববাজারকে কাজে লাগাতে গিয়ে প্রতিটি দেশেরই উৎপাদন ও উপভোগে একটা বিশ্বজনীন চরিত্র দান করেছে। প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষুব্ধ করে তারা শিল্পের পায়ের তলা থেকে কেড়ে নিয়েছে সেই জাতীয় ভূমিটুকু, যার উপর শিল্প আগে দাঁড়িয়েছিলো। সাবেকী জাতীয় শিল্পেরও এভাবে ধ্বংসপ্রাপ্তি ঘটেছে। এদের স্থান দখল করে নিয়েছে এমন এক নতুন নতুন শিল্প যার প্রচলন সকল সভ্য জাতির পক্ষেই মরা বাঁচার সামিল। এমন শিল্প যা শুধু দেশীয় কাঁচামাল নয়— দূর অঞ্চল থেকে আনা কাঁচামালে কাজ করছে; এমন শিল্প যার উৎপাদন শুধু স্বদেশে নয় পৃথিবীর সর্ব অঞ্চলেই ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশজ উৎপন্নে যা মিটতো, তেমন সব পুরাতন চাহিদার পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে নতুন চাহিদা, যা মেটাতে দরকার সুদূর দেশ-বিদেশ ও নানা আবহাওয়ায় উৎপন্ন। পূর্বেকার স্থানীয় ও জাতীয় বিচ্ছিন্নতা ও স্বপর্যাপ্তির বদলে ঘটছে সর্বক্ষেত্রেই লেনদেন, জাতিসমূহের বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা। বৈষয়িক উৎপাদনে যেমন তেমনই মনীষার ক্ষেত্রেও। এক একটা জাতির মানসিক সৃষ্টি হয়ে পড়ছে সকলের সম্পত্তি। জাতিগত একপেশেমি ও সঙ্কির্ণচিত্ততা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অসংখ্য জাতীয় বা স্থানীয় সাহিত্য থেকে জেগে উঠেছে একটা বিশ্ব সাহিত্য। এই অভিযোগ যেমন সত্য তেমন গুরুতর। তবুও আমরা এই অভিযোগের ভিত্তিতে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে কতকগুলি বিষয় বিবেচনা করছি। বিবেচনাসমূহ হলো এই:

প্রথম মহাযুদ্ধের আগে সাহিত্যক্ষেত্রে নতুন সুরী ও সংস্কারকদের মধ্যে তেমন কোনো নৈরাশ্য দেখা যায়নি। বরং তার উল্টোটাই লক্ষ্যগোচর হয়েছে। ওই সময়টুকু চলছিলো শিল্পের ক্ষেত্রে ‘ইমেজিজম’, ‘পোস্ট ইম্প্রেশনইজম’, ‘কিউবিজম’ ও ‘রিয়েলিজম’ থেকে শুরু করে ‘সোস্যালিজম’ ‘কম্যুনিজম’ ইত্যাদি উদারপন্থী মতবাদ নিয়ে আন্দোলন।

আলফ্রেড স্টিগলিজ তখন আধুনিক শিল্পের বৈশিষ্ট্য প্রচার করছিলেন এবং শ্রমিক আন্দোলন চলছিলো বিভিন্ন দেশে। ফ্রয়েড ডেল এবং রবীন্দ্রনাথ করছিলেন সাহিত্যের মুক্তি সাধনা। সবারই চোখে মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলো প্রগতিবাদের বিজয় সমৃদ্ধ এক স্বর্ণোজ্জ্বল স্বপ্ন। পরিতাপের বিষয় এই যে, মহাযুদ্ধের ডঙ্কাধ্বনি বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বর্ণোজ্জ্বল স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। প্রগতির রথচক্র পিছিয়ে যায় হাজার বছর পেছনে। মানুষের মনোভাবে আসে বিরাট এক পরিবর্তন।

সাহিত্যিকেরা সাহিত্যকর্মে বিষয় হিসেবে তুলে ধরলেন সমসাময়িক সমাজের হীনতা ও নির্মমতাকে। চারদিকে ধ্বনিত হলো নৈরাশ্যের সুর। অনেকের রচনায় ফুটে উঠেছিলো নোংরামী ও ভাবপ্রবনতার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা। সে ঘৃণার উৎস ক্রোধ নয়— উৎস নৈরাশ্য। কেউ কেউ শিল্প-সাহিত্যে সামাজিক অনাচারের মুখোশ খুলে ধরেছিলেন।

সেই সময়কার নৈরাশ্যময় পরিবেশেও দেখা গেছে যে সাহিত্য ও শিল্প রাজনীতি ও ব্যবসায়ীদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। ঊনিশশো দশ সালে শিল্পের যে ধারা প্রচলিত হয়, সেই ধারার পরিবর্তে এই সময় নতুন আর একটি ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। সাহিত্যে সচেতনতার অর্থই তখন হয়ে ওঠে জীবনের প্রকৃতি ও পৃথিবীর গতি সম্পর্কে একটা উৎসাহহীনতা। সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যবোধ তখন সকলের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব ছিলো না। এই পরিবেশটা স্থায়িত্ব লাভ করে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। ১৯৩০ সালের পর আর একটি ভাবাবেগ সাহিত্য ও শিল্পক্ষেত্রে প্রবেশ করে। অর্থনীতিতে তখন ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। আকাশে বাতাশে ধ্বনিত হচ্ছে বিপ্লবের বাণী। পৃথিবীর সবদেশের সাহিত্যিকেরা পুঁজিবাদের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কলম ধরলেন। নৈরাশ্যের পরিবর্তে সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে তুলে ধরা হলো সংগ্রামের সুর।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই সাহিত্যে চিত্রিত করলেন সৈনিকদের নিষ্ঠুরতার বিজয়। আবার সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দেখা দিলো নৈরাশ্য।

১৯৪৮ সালে এ সম্পর্কে ডব্লিউ. এইচ. অডেন মন্তব্য করেছেন: ‘সমসাময়িক ঔপন্যাসিকগণকে যদি বলা হয় যে, তারা দুই মহাযুদ্ধের অন্তর্বর্তী কালের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচনা করেছেন, তাহলে তারা একটা বিশ্রী অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়বেন। কারণ য়্যূরোপ থেকে ফিরে আসার পর আমার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, এরকম বাজে সাহিত্য আর কোনো কালে কেউ রচনা করেননি। য়্যূরোপে যে সকল জাতি সবচেয়ে বেশী আশাবাদী, সবচেয়ে বেশী সংহতি সম্পন্ন এবং সবচেয়ে বেশী স্বাধীন বলে সারা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে, সেইসব জাতি কি করে দেশের বুদ্ধিজীবী নাগরিকদের রচনার মধ্যে নিজেদেরকে দুর্বল ও অসহায় রূপে চিত্রিত দেখতে পারে, তা ভেবে আমার বিস্ময়ের অবধি থাকে না। বহু উপন্যাসে দেখা যায়, নায়কের না আছে কোনো সম্ভ্রম, না আছে কোনো ঐতিহ্য। উপন্যাসের নায়কেরা প্রলভনের কাছ এত সহজে হার মানে যে, তারা যে প্রলুব্ধ হয়েছে এ কথাও বুঝতে পারা যায় না। আবার কোনো কোনো নায়ক চরিত্র সার্থক হয়েছে বলে মনে হলেও তারা সৌভাগ্যের নিষ্ক্রিয় অধিকারী বলেই পরিচিতি পায়। আবার এমন নায়ক চরিত্রও সৃষ্টি হচ্ছে, যার একমাত্র গুণ হলো সকল দুঃখ যন্ত্রণা নরীবে সহ্য করার ক্ষমতা। ঔপন্যাসিকেরা কি তাহলে মান্ধাতা আমলের সৃষ্টি আদর্শ অনুসরণ করে চলেছেন? আজকাল উপন্যাসের চাহিদা হ্রাসের অন্যতম কারণ কি তা হলে এই যে, আজকালকার পাঠকদের চিন্তাধারা লেখকদের চিন্তাধারার চেয়ে বেশী অগ্রগামী? অনেক লেখকের ধারণা যে, ভালো উপন্যাস সৃষ্টি করা খুবই কঠিন। এই ধারণার ফলেই কি ঔপন্যাসিকরা পাঠকদের কাছে তাদের বক্তব্য পৌঁছে দেবার কৌশলের দিকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছেন? আজকাল ঔপন্যাসিকদের মধ্যে একটা পরাজয়ের মনোভাব সংক্রমিত হয়েছে। এরই ফলে কি তারা সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নৈরাশ্য পোষণ করছেন?

কবিতার ভেতর-বাহির

কথা

কারো মাতৃভাষা বাংলা, কারো চাকমা, কারো-বা ফারসি, ফরাসি, আরবি, ইংরেজি, চৈনিক, হিন্দি, হিস্পানি, জাপানি…। পৃথিবীতে কত জাতি, কত জনগোষ্ঠী, আর তাদের ভাষা, তাদের বুলি কতটা বিভিন্ন ও বিচিত্র! কিন্তু অনুভূতির মৌলিক ভাষা এক, অভিন্ন। আর সেই বিমূর্ত অনুভূতির সৎ ও মূর্ত প্রকাশই কবিতা। কবিতাকে তাই বলা হয় সমগ্র মানবজাতির মাতৃভাষা। মাতৃভাষা আমাদের যা-যা দেয়, যা-কিছু জোগায়— সৌন্দর্য, মাধুর্য, সহজতা, জৈবটান, মাধ্যাকর্ষণ, শুশ্রুষা, উপশম, প্রেরণা, এষণা, সাহস, শক্তি, উদ্দীপন, অক্সিজেন, করণ, বাহন, মাধ্যম…, সে সবের অনেক কিছুই আমরা পাই কবিতার কাছ থেকে।

কবিতা একটি শিল্পমাধ্যম। অপরাপর সৃজনশীল শিল্পমাধ্যমের মতো এটিও একটি সৃজনশীল মাধ্যম, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম। কারণ, মানুষের অনুভূতির ও উপলব্ধির সবচাইতে সৎ ও অকৃত্রিম প্রতিফলন ঘটে কবিতায়, আর সেই অনুভূতি ও উপলব্ধি একজন সৃজনশীল শিল্পীর অনুভূতি ও উপলব্ধি।

শিল্পীর অনুভূতি ও উপলব্ধি— কথাটি এজন্য বলছি যে, একজন শিল্পীর ফার্স্ট সিগনালিং সিস্টেম থাকে শক্তিশালী। কবিদের, শিল্পীদের ইন্দ্রিয় থাকে নিত্যজাগর, সদাপ্রখর। বাইরের জগতের যে-কোনো সংকেত— হোক তা সুখের কিংবা অসুখের, আনন্দের কিংবা ব্যথার, ভয়ের বা নির্ভয়ের, হোক সে-সংকেত উত্তাল কিংবা নিস্তরঙ্গ, লাউড কিংবা হাস্কি কিংবা মাফল্ড— সবচেয়ে আগে ধরা দেয় শিল্পী তথা কবির অ্যান্টেনায়। সাড়া তোলে তাঁর সংবেদী চেতনায়, তৈরি হয় সে-সম্পর্কিত অনুভূতি ও উপলব্ধি। আর যেহেতু কবি সৃজনশীল, তাই তাঁর সেই অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রতিফলন তিনি ঘটান এমন এক কাব্যিক জগৎ তৈরির মধ্য দিয়ে, এমন এক প্রকৃতি-সৃজনের ভেতর দিয়ে যে, সেই জগৎ, সেই প্রকৃতি, এই প্রচলিত জগতের বস্তু-বাস্তবতা, শব্দ-নৈঃশব্দ্য দিয়েই গড়ে ওঠে বটে, কিন্তু গাঁথা হয়ে ওঠে এক ভিন্নতর সম্পর্কসূত্রে, বিন্যস্ত হয় যেন এক অপ্রাকৃত বিন্যাসে, এক আপাতছদ্ম যুক্তিসিলসিলায়। এজন্যই, কবি যা সৃষ্টি করেন তাকে বলা হয় ‘বিকল্প জগত’, ‘বিকল্প প্রকৃতি’, যেখানে খেলা করে অন্য আলো-ছায়া, অন্য মেঘ-রোদ্দুর, অন্য নিসর্গ—ভিন্ন চালে, ভিন্ন লজিকে। আর এই ‘বিকল্প জগত’ সৃষ্টির যে-রসায়ন, তাতে অবলীলাক্রমে, এক অকপট বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, সংশ্লেষ ঘটে নানা ছন্দ ও স্পন্দন, প্রতিমা ও প্রতীক, উপমা ও রূপকের। আর মানুষের মনের ওপর ছন্দ-স্পন্দন, প্রতিমা-প্রতীক, উপমা-রূপকমেশানো ভাষার অভিঘাত সবসময়ই হয় তীব্র ও কার্যকর। ভালো কবিতা তাই ছুঁয়ে যায় পাঠকের যুগপৎ হৃদয় ও মনন, দুলিয়ে দেয় তাকে, হন্ট করে চলে প্রতিনিয়ত। একটি উৎকৃষ্ট কবিতা কোনো-না-কোনোভাবে ছাপ ফেলেই যায় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে।

এগুলি তো আছেই, কবিতার গুরুতর দিক আমার বিবেচনায় অন্যত্র। কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে, যে-শব্দরাশি একটি জনগোষ্ঠীর ভাষার অন্তর্গত, যে-ভাষা ফের সামাজিক সম্পদ। আর ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল, স্থিতিস্থাপক, সৃজনমুখর ও সৃষ্টি-উন্মুখ দিকগুলি নিয়েই কবিতার কারবার। শব্দের প্রচলিত, অভিধানসিদ্ধ অর্থেও অতিরিক্ত, সম্প্রসারিত ও নব্য অর্থের সম্ভাবনাকে ক্রমাগত উসকে দিতে থাকে কবিতা। টালমাটাল করে দিতে থাকে শব্দের প্রথাগত অর্থ, উৎপাদন করে নতুন-নতুন অর্থ। ভাষার বিভিন্ন সুপ্ত শক্তি ও সম্ভাবনাকে বিচিত্র ধারায় উন্মোচন করে করে এগিয়ে চলে কবিতা। পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ইউজ অব ল্যাংগুয়েজ। মানুষ ভাষিক প্রাণী; সমাজ একটি ভাষাবদ্ধ ব্যবস্থা। আর কবিতা সেই ভাষার মধ্যে ঘটিয়ে দেয় এবং নিত্য জারি রাখে একধরনের বৈপ্লবিক অন্তর্ঘাতের ধারা, নীরবে-নীরবে, আস্তে-আস্তে, গেরিলা কায়দায়। আর এভাবে প্রতিনিয়ত ঝাঁকুনি-খেতে-থাকা ভাষার মধ্য দিয়েই ঝাঁকুনি খায় সমাজের নানা ক্ষেত্রের স্থিতাবস্থা, রক্ষণশীলতা। কবিতা ঢেউ তোলে ভাষার সাগরে আর সেই ঢেউয়ের ধাক্কা গিয়ে লাগতে থাকে সমাজে প্রচলিত নানা প্রথা ও মূল্যবোধে। কবিতার কাজ এক্ষেত্রে নীরব, অন্তর্ঘাতমূলক। আপাতদৃষ্টিতে, বাইরে থেকে হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু কাজ চলে নীরবে, ভেতরে-ভেতরে। আর বলাই বাহুল্য, এই অন্তর্ঘাত সদর্থক। এই অন্তর্ঘাত ইতিবাচক।

কবিতা ও দর্শন :

কবিতা দর্শনের আগে-আগে-থাকা একটি শিল্পপ্রপঞ্চ। এটি সবসময় তা-ই ছিল। একটি কালপর্বের কবিতার মধ্যে আগাম পাওয়া যায় সেই কালের অস্ফুট ও স্ফুটমান বিভিন্ন চিন্তা ও দর্শনের রূপরীতি, তাদের নানারকম উদ্ভাস। একটি কালখণ্ডের মধ্যে জন্ম-নেওয়া কাব্যসমুদয়ের বিপুল হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটতে থাকে, আকার পেতে থাকে সেই সময়কালের নানা চিন্তা, ভাব ও দর্শন।

কবিতার ভাষা :

কোন কবিতা যে কোন ভাষাভঙ্গি নিয়ে বেরিয়ে আসবে সার্থকরূপে, কবিতার হয়ে ওঠার ব্যাপারটি অর্থাৎ ভেতরকার ফুল ফুটিয়ে দেবার কাজটি সুন্দরভাবে সাধিত হবে যে ঠিক কোন ভাষায়, নির্দিষ্ট করে তা বলার চেষ্টা বৃথা। আগেই বলেছি, একটি কবিতা হচ্ছে কবির একটি বিশেষ অনুভূতি বা উপলব্ধির সবচাইতে সৎ ও অকৃত্রিম প্রকাশ, তাই যে-ভাষায় সেই অনুভূতি প্রতিফলিত হতে পারবে সবচেয়ে অকৃত্রিমভাবে, অর্থাৎ যে-কবিতা দাবি করবে যে-ভাষা, সেই ভাষাতেই লেখা হবে ওই কবিতা। ভাষার ব্যাপারে কবিতার তাই কোনো প্রেজুডিসও নাই, শুচিবায়ুও নাই। বলে-কয়ে-দেওয়া কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষা নাই কবিতার। কোনো ফতোয়াও খাটে না কবিতার বেলায়। আর তা ছাড়া, এমনিতেই, কবিতার স্বভাবগত কারণেই, এর ভাষা সরাসরি কখনোই মিলবে না কোনো ভাষার সঙ্গে— না নিত্যব্যবহারের ভাষা, না চলতি, না কথ্য, না প্রমিত-কোনো চেনা ভাষাভঙ্গির সঙ্গেই না, আবার হয়তো সবরকম ভাষার সঙ্গেই। কারণ কবিতায় ভাষার প্রথাগত লজিক, শৃঙ্খলা, ব্যাকরণ সবই ভেঙে পড়ে; অনুভূতির তীব্র চাপে ভাষা যায় বেঁকেচুরে, ফেটে-ফেটে। অর্থাৎ ভাষাকে ফাটিয়ে, বিশৃঙ্খল করে দিয়ে, নেমে আসে কবিতা। ভাষার ভিতরে ঘটিয়ে দেওয়া এক তুমুল রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে কবিতা। ভাষার এক শুদ্ধসৎ আরতিকতার ফসল কবিতা। উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, রূপকে, প্রতীকে, প্রতিমায় আর ভাষা ও যুক্তির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক নতুন শৃঙ্খলা, এক অভিনব গোধূলিভাষ্য। সে যেন খোদ অনুভূতিরই এক অবিকৃত সৎ প্রতিচ্ছবি, উপলব্ধিরই এক অকপট আলপনা— কবিতা। কবিতার ভাষা তাই ফাটা-ফাটা, বাঁকাচোরা, বিশৃঙ্খল ও প্রহেলিকাপূর্ণ।

কবিতা ও নিত্যব্যবহারের ভাষা :

আমাদের প্রাতহ্যিক যাপনপ্রক্রিয়া প্রায়শই থাকে নিয়ন্ত্রিত, কনডিশন্ড— সময় ও পরিবেশ-পরিস্থিতির নানা শর্তের চাপে। প্রাত্যহিক যাপনক্রিয়া তাই সম্ভব করে তুলতে পারে না আমাদের অনুভূতির, আমাদের উপলব্ধির সৎ ও অকৃত্রিম প্রকাশনা। অন্যদিকে কবিতার কাজ বা উদ্দেশ্যই হচ্ছে অনুভূতির অকৃত্রিম প্রতিফলন ঘটানো। কবিতাকে তাই কণ্ঠে তুলে নিতে হয় বিশেষ স্বর, বিশেষ ভাষা। কোনো চেনাজানা ভাষাই পারে না কবিতার দাবি মেটাতে পরিপূর্ণরূপে, প্রতিদিনকার ভাষা তো নয়ই। তবে নিত্যব্যবহারের ভাষা, তার শব্দ, বাগধারা, তার চলনভঙ্গি, এসবের জোরালো অভিক্ষেপ পড়তে পারে কাব্যভাষায়। সেটা সম্ভব, খুবই সম্ভব; তবে সে-ও অনুভূতির সৎ বহিঃপ্রকাশের তাগিদেই।

কবিতা তথা শিল্পের পরম্পরা ও প্রাসঙ্গিকতা :

সময়ের সাথে বদলে যায় সমাজ-পরিস্থিতি। বদলায় ভাষা। বদলে যায় বয়ান। চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও উন্মেষ ঘটে নতুন নতুন দিগন্তের। স্বভাবতই বদলে যায় সংবেদনাও। অবশ্য এই বদলে যাওয়ার মধ্যে থাকে একটা যোগসূত্র, একটা ধারাবাহিকতা। পরিবর্তনশীল সমাজ-পরিস্থিতির সাথে সাথে শিল্পকলাও তার যোগসূত্র ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই এগিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। অনেকটা সোপানবিন্যাসের মতো। সোপানের যে কোনো একটি ধাপের ভিত্তি যেমন তার অব্যবহিত আগের ধাপসহ পূর্ববর্তী সমস্ত ধাপ, কবিতা তথা শিল্পকলার ক্ষেত্রেও তেমনি পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাজসমূহ হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাজের ভিত্তিভূমি। নতুন প্রজন্মে শিল্পসোপানের নতুন যে ধাপটি নির্মিত হয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন নতুন সংবেদনা। অতএব, পূর্ববর্তী কাব্যকৃতির সম্ভারকে ভিত্তিভূমি ধরে নতুন সংবেদনা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ভাবকে নতুন আধারে অর্থাৎ নতুনতর স্বর-সুর-ভাষা-শৈলীতে উপস্থাপন করে নতুন প্রজন্ম। এখানে অবশ্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত থাকে, তা হলো কবি বা শিল্পীর স্বকীয় সৃজনপ্রতিভা ও প্রাতিস্বিকতা, সেইসঙ্গে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টিও ।

কবিতা বা যে কোনো শিল্পবস্তু যা করে তা হচ্ছে সমকালের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে নিয়ে নিজেকে ভবিষ্যতের সওদা হিসাবে তুলে দেয় প্রবহমান কালের গাড়িতে। এখন কোন সওদা কালের গাড়িতে কতদূর যাবে, তা নির্ভর করবে কোন মাত্রায় কতটুকু সর্বজনীনতা বা কালান্তরগম্যতা-গুণ আছে সেই সওদার ভেতর ।

যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন থাকবে তার আবেগ, অনুভূতি, সংবেদনা; ততদিন থাকবে কবিতা। বহির্জগতের নানা ঘটনাসংকেতে আলোড়িত হবেন কবি, সেগুলির ছাপ পড়বে তার চেতনায়, তৈরি হবে সে-সংক্রান্ত অনুভূতি আর সেই অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাবেন তিনি কবিতা লিখে। আর মানুষ যেহেতু থাকবে সংবেদনশীল, অনুভূতিপরায়ণ, তাই সে পড়বে সেই কবিতা।

দ্রব্যগত কোনো মূল্য নাই কবিতার। ভবিষ্যতে, খোদা-না-খাস্তা, মানুষ যদি কখনো হয়ে পড়ে নিরঙ্কুশ দ্রব্যের দাস; দ্রব্যমূল্য নাই অজুহাতে, কিংবা উল্টিয়ে দিতে পারে দ্রব্যতন্ত্রের গণেশ— এই ভয়ে যদি কোনোদিন নিষিদ্ধও করে দেওয়া হয় কবিতাকে, সম্ভবত তারপরও থেকে যাবে কবিতা। মানুষ তখনো, কবি রণজিৎ দাশের ভাষায়, ‘শহরের একপ্রান্তে ফেলে দেওয়া ভাঙা অতিকায় টেলিভিশন বাক্সের মধ্যে বসে মাফিয়া, মগজ-ব্যাংক আর রোবট-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে লিখে যাবে কবিতা’, গেরিলা কায়দায়; তারপরও পড়তে থাকবে কবিতা। বেরিয়ে আসবেই কবিতা যে কোনো বন্দিদশা থেকে, যে কোনো দমন-দলন উপেক্ষা ক’রে— হয়তো ভিন্ন ভাব ভাষা রূপরীতি নিয়ে, কখনো কখনো বাউল কিংবা অন্য কোনো রূপে (অতীতে যেমন হয়েছে), কিন্তু বেরিয়ে সে আসবেই।

কবিতা

বাণিজ্য

হ্যাকটিভিস্টরা এলোধাবাড়ি হ্যাক করে চলেছে

শত্রুদেশের ওয়েবসাইট।

তাদের সুরের চেয়ে লহরী অধিক

গমকের চেয়ে গিটকিরি…।

ওইদিকে, জন্ম—, মৃত্যু— আর বাণিজ্য-দেবতা…

তিনজনে মিলে শলাপরামর্শ শেষে

সোল্লাসে হাই-ফাইভ মেরে

তর্জনী ও মধ্যমায় ক্রস ফিঙ্গার দেখিয়ে

কল্পনায় রৌপ্যরেখা জাগিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে—

যদি বাড়ে জন্মহার,

বাণিজ্য বাড়বে তবে শিশুখাদ্য ও ডায়পারের

আর মৃত্যু বাড়লে চিরবিদায় স্টোরের।

জন্ম মৃত্যু যেটাই বাড়ুক

বাণিজ্য বাড়বেই।