স্নান ১

স্নান-১
(একটি চিহ্ন পরিপূরক ছোটকাগজ)
১ম সংখ্যা: ২৬ মার্চ ২০০৯

কেন স্নান? অসম্পাদকীয় বা প্রথম অ-‘বক্তৃতা’ ও নিবেদন পর্ব :  স্বয়ম্বরসভায় অর্জুনকে যে কারণে দ্রৌপদী বরমাল্য দিয়েছিল আমরা সে কারণে স্নান করি, আসুন! স্নান করা শুরু হলো। এ স্নানে দিকপ্লাবী হয়ে উঠি। সেটা হতে পারে মোটা-ভারী-চিকন নানা মেজাজে। হ, সব নিয়ে চলুক স্নান অবারিত, মহাকাল পর্যন্ত। হাঁটুক নানাভাবে, ধীরে বা আন্তে, ত্রন্ত বা দম্ভ সহকারে, সব বুকে নিয়ে। আমরা এক ঝাঁক তরুণকে ডাক দিয়ে চলছি প্রতিদিন… ওহে ভাই! বলুন-লিখুন-জানুন বাঁচতে হলে এসব দরকার। বরুনা ভালোবেসেছিল, করুণা কেন কথা রাখেনি, বাসন্তী শেষ পর্যন্ত ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেন ডাকাত স্বামীর ঘর করে? খোঁজ আছে কি? খুঁজুন অনবরত। খুঁজতে থাকুন, জবাবের অপেক্ষার কী দরকার! আমরা ক্রমশ বড় হই এ ক্যাম্পাসে, হাজার রঙিন প্রজাপতির মেলার এ ক্যাম্পাস। বনবীথিতলে এসেছে সব সুকন্যারা, আর এসেছে পুংরেণু নিয়ে ঈষাণ-বিষাণে ওঙ্কার তুলে ব্যক্তিত্বপূর্ণ সব শ্রীমানকুল। তাঁদের স্নান করতে বলি, রৌদ্রেমেঘেঝড়েগম্ভীরে। তারা হয়ে যাক সব শ্রাবণসন্ন্যাসী। আমরা এসব ব্যাপারে খুব উত্তাল-উত্তুঙ্গ। লিখুন না একটা কবিতা বা গল্প বা অন্যকিছু। কবে, আজ বা কাল; অথবা যে কোনো সময়, হতে পারে জ্যোৎস্নায়, তবু সে দেখিল কোন্ ভূততার আক্ষেপে, অথবা থ্যাতা ইঁদুরের রক্তমাখা ঠোঁট মুখে নিয়ে; তার জন্য লিখুন। কেন লিখবেন না, লিখুন, লিখতে হবে।                                     দয়া করে যা-তা লিখবেন না। চিন্তা ছাড়া চলবেন না। চিন্তায় লিখুন, নিজের চিন্তা, অন্যের না, একান্তের, আপনার, ব্যক্তিগত, সাহসে ভর করে বজায় রাখুন নিজের কৃতিত্ব ও মর্যাদা। ঘর্ষণে-কর্ষণে জ্বালুন আলো, জীবনের আলো, জাতীয় উৎসবের আনন্দ সর্বাত্মক, মিলি মুক্তির পতাকায়।                                                                                                                          একটি লেখার জন্য প্রথমবারের আহ্বানটিই এখানে র’ল। পরেরবার আর আহ্বান নয়, নিজেদের ‘‘কর্মকাণ্ড ও ইচ্ছে’’ বিষয়ে ‘আমাদের কথাটি রহিবে’।                                        আজ আমাদের স্বাধীনতা, স্বাধীনতা দিবস। দেশটিকে কীভাবে ভালোবাসি, আত্মসমালোচনাটুকু করি, সেখানে যেন না করি প্রতারণা, না হই প্রবঞ্চক।
মাতা মাতৃভাষা মাতৃভূমি পরম শ্রদ্ধার বস্তু, আবার ছবক নিই সব্বাই, সক্কলে …

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান
২৬.০৩.২০০৯

কবিতা

আহমেদ ইউসুফ
স্বপ্নের দিকে বেঁকে যাওয়া সন্ধ্যা

স্বপ্নের দিকে বেঁকে যাওয়া সন্ধ্যা নেমে গেলো মাধবীর ঠোঁটে; ভুল হলো
মাধবীর ঠোঁট নয়… মাধবীর দ্রাক্ষারসের সুতীক্ষè খঞ্জরে। আর জানোইতো
স্বপ্নেরা কেবল চায় কুসুম কোমল পেলবতা; চেয়ে থাকে কাঁটাহীন আঁধারে
গোলাপের শকুন্তলা… ফলে স্বপ্নের রক্তাক্ত মুখ বেদনা ভুলতে চলে গ্যালো
মমিরসের ফেনোচ্ছলে… রক্ত পূঁজ বমি তার দৃশ্যসঙ্গী। আমি স্বপ্নের কাছে গিয়ে
সুবর্ণার কথা বললাম। একথা উচ্চারিত হতেই সমস্ত কর্মের অপলাপ, বিষণœ ও বিভ্রাট
ফেলে ছুটে গেলো সুবর্ণার কাছে। জানি না সুবর্ণার নিয়ন তরঙ্গ আলো তার বেদনাকাতর
দেহে চন্দ্রমুখীর মমিরস জুটিয়েছিলো কিনা… আহত ঘোড়ার ধর্মে হয়েছিল কিনা
ইতিহাসের নিঃসঙ্গ সাদা কবুতর অথবা হয়েছিলো কিনা শূন্য প্রান্তরে সবুজ ঘাসের
চলন্তট্রেন জানি না জানি না। যারা দুবাই আলুবর্জ, বসুন্ধরার সিনে কমপ্লেক্স আর সিয়ার্স টাওয়ারের প্রকৃত তলোয়ার… তারা তার খোঁজ রাখেনি কোনো কেজিবি ফেয়ারফ্যাক্স। অবশ্য সারা গায়ে বব উলমারের ডাকটিকিট নেই… তার দেহে ফেরে না… ফেরে না কপালের নাম গোপাল।                                                                                                                      আমি তোমার মুখ ভাবতে ভাবতে চলে গিয়েছিলাম প্রান্তরের মাঠে শুয়ে থাকা
স্বপ্নের দিকে বেঁকে যাওয়া সন্ধ্যায়… ফিরিনি সন্ধ্যার ধূসর আত্মীয় হয়ে…
ফিরিনি ক্লাইভের বুশের পলাশীর ওয়ান ইলেভেনে…

গৌতম দত্ত
জলকন্যা

গোধূলিতে বাঁকা চাঁদ ওঠে, জোনাকীর আলো হাতে পরশ পাথরে
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিস্মিত রাখাল, শুন্য হাতে ফিরে গেছে অনেকেই
নিরণœ নীড়ের প্রাত্যহিক খুঁটিগুলো নড়ে ওঠে হঠাৎ। ঝাপসা হয়ে আসে
দেয়ালের মানচিত্র। ও দিকে তুই ব্যস্ত নিমগ্ন আরাধনায়
ওরা তোকে কেমন করে খুঁজে পাবে বল? পুব থেকে পশ্চিম
আধেক পৃথিবীর সমস্ত দায়ভার তোর সুষমায় ছড়িয়ে দিয়ে ওরা
চলে গেছে, বলে গেছে নীল প্রজাপতি বসিয়ে দিবে তোর চোখের ছাদে
পাপড়িতে ভর করে ডানা মেলে দিবে তোর দুটি চোখ। জানি
এখনো এমনই স্বপ্ন দেখিস তুই, খুঁজলে এখনও পাওয়া যাবে
বালিশের ভাঁজে বাঁকা চাঁদের মত দু’চারটে কবিতার লাইন।
দৃষ্টিকে কালের খেয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে তার মাঝে সাজিয়ে দিতি
হাসির ডালা। সময়ের বৈঠা হাতে বল্তি, ‘স্বপ্ন সাধের স্বচ্ছ সরোবরে
øাত হয় কয়জনা বল?’ ডানা মেলে উড়ব আর কতক্ষণ
চারদিকে সাদা কুয়াশার মিছিল। আমাদের অন্বিত সময়
ছিন্ন করে নিজের অজান্তেই বলে উঠি, ‘রাত্রির তপস্বী যাতনায়
অসংখ্য আঁধারের বুকে চাঁদের ভেলা ভাসানোর সমর্পিত সাধনায়
আর কত দীপাবলীÑঅরণ্য উৎসবে জ্বলবে তোর নির্জন দীপাধার।

ইসলাম জাহিদ
অসীমের সন্ধানে

অসীমের সন্ধানে;
পৃথিবীর বুকে প্রেম নিয়ে আসে এক সাদা নক্ষত্র
তীব্র আলো ছড়ায়; হাঁটতে থাকে সাগরের বুকের ভিতর;
গভীর হৃদয়ের স্পন্দন সাদা বাতাসের শব্দে অমলিন
ভাষা হারায়; ফাগুনে শিমুল বনে সূর্যের হাসি ফুটে
অবিরাম; লাল টকটকে স্বপ্ন সমীরাঙ্কে ভেসে বেড়ায়;
কলাবতী শাখার লাল টকটকে ফুলের মত।                                                                       সবুজের বুকে পৃথিবীর রূপ দেখা যায়
তোমার হৃদয়ের মত উষ্ণতা কিছু বাস্তব কিছু কল্পনা;
একটা জোনাকি উড়োজাহাজের মত আলো ছড়াতে ছড়াতে
স্পর্শ নিয়ে আসে; তোমার অনুভূতির স্পর্শ;
তারপর প্রবল বেগে ছুটে চলে বৈশাখী ঝড়ের মত
অনন্ত দিগন্তের প্রান্তে, যেখানে সূর্যের ব্যর্থতা,
গাঢ় অন্ধকারে লীন তোমার অস্পষ্ট প্রত্যাশা।
কোথাও প্রেম নেই; হৃদয়ের মাঝেও নেই;
অস্পষ্ট চাওয়াতে জীবন ছুটে চলে কালের স্রোতে
ব্যর্থভাষা বুঝবার প্রয়াস নেই প্রয়াস আছে আবেগের;
উত্তপ্ত হয় ক্ষণিকের মোহে আবার যায় হারিয়ে
পাওয়া যায়না আর হৃদয়েরদ্বীপ খুঁড়ে কোথাও।
ভাবনায় স্বপ্ন আসে মৃত্তিকা খুঁড়ে খুঁড়ে জল কুড়ানোর মত
তবুও আকাশ খুঁজে খুঁজে নক্ষত্র বের করি নীফের সন্ধানে
শনি-মঙ্গল-বৃহস্পতি-আরও দূরে-নক্ষত্রের কাছে
তুমি স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার মাঝে; তোমার বাঁশরিতে আমার সুর,
আমার হৃদয়ে তোমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ;
তবুও অসীমের সন্ধান অসীমেই রয়।

তুষার বিশ্বাস ছবি
সন্ধ্যার গ্রাম

সূর্যের আলো নিভে জ্বলে পিদিমের আলো ঘরে ঘরে
তাড়িয়ে গরু-বাছুরের পাল রাখাল ছেলে ফেরে।
উড়ে যায় দুর আকাশে বলাকার দল
জলাশয় ছেড়ে আসে হাঁসের পাল,
উঠান ঝাড় দিয়ে যায় ঘরে লক্ষী বউ
ধানের শীষে দেয় দোলা বায়ু ঢেউ।
কলসি কাখে ছোটে বধু পুকুর পাড়ে
উনুনে ভাতের হাড়ি ঢুুকবে সে রান্না ঘরে।                                                                            পণ্ড করে খেলা ফেরে খোকা খুকি ঘরে
অদূর বাগানে ডাকে শিয়াল ককর্শ সুরে।
জ্বলন্ত সিগারেট মুখে রাস্তায় নামে অবাধ্য যুবক
স্রষ্টারে স্মরণ করে বৃদ্ধ ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস,
কুনোব্যাঙ লাফিয়ে করে আলোর সন্ধান
হাছনাহেনার সুবাসে ভরেছে সারা অঙ্গন।
বাঁশ বাগানে অবিরাম চলে পাখিদের সভা
ধীরে নেমে আসে আঁধারের আভা।

মুহম্মদ কাওছার
তবুও ভালোবাসি, …এই মেঘ রৌদ্রছায়া

এখনো বৃষ্টিরা দল বেধে এসে ছড়িয়ে নগ্নতা
পৃথিবীর বিশালতা দেয় ঢেকে অনায়াসে
এখনো প্রেমিকেরা জুঁটি বেধে সব পাড়ি দেয়
পদ্মার ওপার চরে; নিঃসঙ্গ সুখ পেতে                                                                                     এখনো মেঘেরা চৈত্রে সভা ডাকে
চারদিক অমানিশার বাণ ডেকে
শূন্যতায় ভরে তুলে তারা
নিদারুণ ক্ষোভ থেকে থেকে জাগে                                                                                       তবুও ভালোবাসি এই মেঘ রৌদ্রছায়া
বিকেলবেলার লুকোচুরি জীবনভর
ক্লান্তিহীনতা আর নষ্টালজিয়ার এই আবহ
ভালোবাসি; আমি ভালোবাসি তোমার মত।

নিশীথ দাস
দ্বিধার চামুচ

দ্বিধার চামুচে তুলেছ ঢেউ-নিঃশ্বাস
রোদকহিত অন্ধকারে
আমি আর কেউ না তোমাদের
বিতাড়িত কণ্ঠস্বর
সীমানা এবার কাঁটাতারে ঘেরো !
উপচে পড়ছি যখন চোখ থেকে
আলো থেকে
বৃষ্টি থেকে
বন থেকে
আমাকে চিনতে গেলে বোধের স্কুলে যেতে হবে।

মাকসুদা লাবনী
ব্যথিত বাস্তবতা

কলাবিদ্যায় পারদর্শী ছিল সে।
মধ্যবিত্ত জীবনের হাজার বছরের
গ্রাম্য ইতিহাস বিষয়েও দক্ষ।
সুন্দর পেশাকে সজ্জিত হত
তার সুগঠিত শরীর।                                                                                                                       সব আয়োজন শেষ হলে দেখি 
লেখকাগজে অঙ্কিত চিত্রের
হিসাব মেলেনি মোটেও।

হুমায়ূন পলাশ
জল রং এর স্বপ্ন

রাতের গভীরতা একটু একটু করে ক্লান্ত হবে। লীন হবে মৌন হৃদয়ের বিরহ।
ইন্দ্রধনু শিশিরের বুকে এঁকে যায় জলরং এর চিত্রকল্প। বিমূর্ত মৌনতা
বিদ্রোহী হয়ে ফেরারী তারাদের সাথে ঝরে পড়ে কোন প্রাগৈতিহাসিক
মুগ্ধতার পাশে। ঝরাপাতার নিঃসঙ্গতার মতোই বৃষ্টিরা স্বাপ্নিক জালে
আটকা পড়ে যায়। টি টেবিলটা একাকী পড়ে রয় বাসি খবরের কাগজ নিয়ে
যুগান্তরের মতোই। পিয়াসীমন বেহালার করুণ আর্তনাদে স্বপ্নসারথীকে
সমীরণের সুনীল খামে লিখে যায় স্তব্ধতার অনন্ত কোরাস।                                                 যোজন যোজন ব্যবধানে আশার মাঝে সমাধীর এপিটাফ। সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা
গোধূলীর আলো আঁধারীতে মাখা উড়ে যাওয়া গাঙচিল। অধরা কল্পনাগুলো
দৃশ্যমান আলোয় অঙ্কুরোদ্গমের জন্য কিনারা খোঁজে আধো ঘুম জাগরণে।
স্বপ্নবিলাসী পাখির মতো ফিরে ফিরে স্মৃতিরা আজও করে কৃত্রিম জোছনায়
øান। হারিয়ে গোপন অভিসারে আশায় আশায় শব্দসৃষ্টির কোলাহলে
উড়িয়ে মন আজ ঘুড়ি, নক্শীকাঁথায় এঁকে যাই অনির্বাণ কবিবাসনা।

তাসু মুসাফির
দুঃসাহসিক পথচলা

দৈবাৎ, সমুদ্রের কল্লোল যেন থামিয়ে দেয় পথচলার গতি,
মনে পড়ে রক্তে রঞ্জিত স্মৃতিময় দিনের কথা,
ঈষৎ বক্ররেখায় চলতে থাকে মাতালের টালমাটাল বেশে
নিস্তব্ধ নির্জীব মন।
কিন্তু, সহসা সে শত সহস্র বিদ্যুতের স্ফুলিংঙ্গ হয়ে
উত্তপ্ত তপনের সাথে একাত্ম হয়ে কঠিন প্রতীক্ষায় অঙ্গিভূত হয়,
সে অঙ্গীকার স্বীয় স্বার্থের তরে নয়,
শুধু অবৈধ পুঁজিবাদীদের অত্যাচারের ষ্ট্রিমরুলারকে
ভেঙ্গে চুর্ণ-বিচূর্ণ করার নিমিত্তে।
মনে হয় মধ্যালোকে বিরাজিত শোষণ, বঞ্চনা
ও অবিচার কে পদদলিত করে
ভীরু-কাপুরুষের বুকে লাথি মেরে
সহস্র সিংহের গর্জনে সত্যের ঝান্ডা
হস্তে দুর্দাম গতিতে পথচলি।

সন্দীপন বিশ্বাস
সময়ের ক্ষত

নয় কোন দিশেহারা মাতালের মতÑ
মদের নেশায় নয়Ñ অনাবিল প্রেমের নেশায়
তোমারে জড়ায়ে রাখিÑ ফিরে ফিরে ডাকি
সুকৃত্রিম সময়ের ওগো মহামায়া (!)
তোমার প্রেমের টানে নিশিদিন আমি
জীবনের আলোময় পথভুলে থামি
পুঁতি-গন্ধ-বুকে নিয়ে যত
নিদারুণ সময়ের বিভিষীকাময়
বেদনার দুর্নিবার ক্ষত।

মেঘবালিকা
অবিমৃষ্য সংসার

’২৫ ’২৬ ইনটু পিলখানা
নূহের প্লাবন বুঝি দরবার হলে
এক পিল-আড়াই ঘর,
বিষাক্ত ছোবলে তিক্ত স্বাদ
ভালবাসার ঘ্রাণ খোঁজে আজ
রক্তাক্ত রাজপথ
মা, মাটি ও মানুষ …
নিমজ্জিত জনতা-খবর নেই একজনের
কোন সেই জন?
দগ্ধ হৃদয় নিয়ে বুঝি অপেক্ষারত
কোথায় অমর অগ্নিঝরা
৭ মার্চের ভাষণ?

মৌরি
বিদ্ধ অনুভূতি

রাত্রির বিষণœ নিরবতায়
সেই যাত্রীহারা
পিউ পাপিয়ার
ডানা ঝাপটানোর শব্দ
এখনো বেজে ওঠে
বারে বারে।                                                                                                                                  এখনো নির্জন রাতে
ঘুম ভেঙে শুনতে পাই
তার ক্লান্ত কণ্ঠের
অবিরাম সেই ডাক                                                                                                                  পিউ কাহা, পিউ কাহা,
পিউ কাহা …                                                                                                                                   সেই অবিরত ডাক
এখনো স্পর্শ করে
আমার হৃদয়।                                                                                                                          কাদাখোঁচার
চঞ্চু প্রহারের মতো
এখনো বিদ্ধ হয়
আমার অনুভূতি।

ছড়া                                                                                                                                                 হুমায়ূন কবীর
টেনশন

টেনশনে মুক্তি
টেনশনে জয়
টেনশনে করতে
করো না যে ভয়।                                                                                                                             টেনশনে ভালবাসা
টেনশনে বিয়ে
জগতের সব কাজ
টেনশন নিয়ে।                                                                                                                                  টেনশনে লেখাপড়া
টেনশনে সুখ
টেনশন-ই রাখে যে
উজ্জ্বল মুখ।                                                                                                                                    তাই করো টেনশন
মেনশন ছাড়া
টেনশনের আলো জ্বালো
পৃথিবীটা ভরা।

গল্প                                                                                                                                                       মর্মরিত ঊষাপুরুষ
প্রজন্ম

উৎসর্গ : আজকের প্রবাদ পুরুষ, সেদিনের সেই দুই ভাই হুমায়ুন আহমেদ ও মোহাম্মদ জাফর ইকবালকে। ষর্ষিনার পীরসাহেব আশ্রয় না দিলেও বাংলা মা আজও তার প্রিয় দুই সন্তানকে আঁচলে ঢেকে রেখেছেন। আর এই মা মাটি সেই ভয়ঙ্কর দিনে যাদের রক্ষা করতে পারেননি, ষর্ষিনার পীরের আস্তানা থেকে যারা আর ফিরে আসেননি তেমন হাজার জোড়া ভাই ও লাঞ্ছিত বোনদের পূন্যপদতলে।

(ভাজাওয়ালা হেঁকে উঠলো, ‘ভাজাখাবেন ভাজা। হরেক রখম ভাজা। মুখরুচি বারোভাজা।’ আর লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। ভাজাওয়ালার কাছে মুখরোচক বারোভাজা দিতে বলে দাঁড়িয়ে আছি। একটু দেরি হবে। আরো কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। সে যখন সুন্দর কায়দায় ভাজামেখে চমৎকার করে কাগজের ঠোঙায় দেয় তখন দাঁড়িয়ে থেকে সে দৃশ্য দেখারও মজা আছে। হঠাৎ চোখে পড়ল সে একটি ডায়েরির পেছনের পাতা একটি করে ছিড়ছে আর চমৎকার ঠোঙা বানিয়ে ফেলছে। ঠোঙাভরা ভাজা নিয়ে অবাক হলাম। সুন্দর ঠোঙায় অসম্ভব সুস্বাদু ভাজার চেয়েও বেশি সুন্দর ঠোঙার গায়ের লেখাগুলো। চমৎকার গোটা গোটা হাতের লেখা। ভাজা শেষ করে ডায়রিটা হাতে নিলাম ততক্ষণে আরো কিছু পাতা ছেড়া হয়ে গেছে। প্রথম দিকে পড়ে বুঝলাম এতে চমৎকার কিছু লেখা আছে। তাই দশ (১০) টাকা দিয়ে কিনে নিলাম। ভালোভাবে পড়ে দেখলাম তাতে কয়েকটি গল্প লিখা। সব গল্পই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক। গল্পগুলো ভালো লেগেছে, বলা যায় মুগ্ধ হয়েছি। এত মূল্যবান একটা ডায়েরির কত পাতা যে এভাবে হাতে হাতে চলে গেছে ! মনটা খুব খারাপ হলো। ডায়েরীর প্রথম গল্পের নাম ‘অবাক সূর্যোদয়।’ এটি অর্থাৎ ‘প্রজন্ম’ ঐ ডায়েরীর দ্বিতীয় গল্প। আরো আছে কয়েকটি খুব সুন্দর সুন্দর গল্প। গল্প পড়ে মনে হয় গল্প লেখক নতুন। কাঁচা হাতের লেখা হলেও গল্পগুলো পড়ে সম্ভবত সত্যিকারের বাঙালীর বুকে চিনচিনে ব্যাথা করবে। সেই ব্যাথার জন্য দোষী অথবা গল্প পড়ে ভালো লাগার কৃতিত্ব আমার নয়, ডায়েরীর মালিক গল্পলেখকের। উৎসর্গের অংশটুকুও গল্প লেখক নিজেই লিখেছেন। গল্পের শুরু করার আগে সবুজ কালিতে ঐ কথাটা লেখা ছিল।)

০১.
২০০৮ সালের কোন একদিন। বছরের শেষের দিকে হবে। এসময় জিহাদে ইসলাম বাংলাদেশ লিমিটেডের নেতাকর্মীরা এক চরম সঙ্কটের মধ্যে পড়ল। নেতাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ল। স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর বিস্তৃতপরায়ন বাঙালী হঠাৎ করে স্বাধীনতার চেতনায় জ্বলে উঠেছে। তখন জিহাদে ইসলামের নেতারা হাত তুলে আল্লাহর করুনা প্রার্থনা করল। আর জনৈক মাওলানা কণ্ঠ একেবারে খাদে নামিয়ে, কখনো উচ্চ স্বরে, কখনোবা নাক চেপে কান্নার ভান করে, নাকি সুরে আল্লাহর পদতলে মাথা নুইয়ে প্রার্থনা করল, হে রাব্বুল আলামিন ষরষিবাড়ির পীর মাওলানা আবুজাফর মোহাম্মদ সালেহর মতো কুদরাত ক্ষমতা সম্পন্ন একজন নেতার বড়ই অভাব। তার মতো একজনকে পাঠাও খোদা। তাছাড়া তো প্রাণে বাঁচিনা। আর ভেবে দেখ মাবুদ আমরা মরে গেলে তোমার তসবি টানবে কে? তার এ প্রার্থনা টনিকের মতো কাজ করল মনে হল। সেদিন রাত্রেই আল্লাহপাক করুনা করে পীর সাহেবের আত্মাকে দুনিয়াতে ছেড়ে দিলেন। সেই আত্মা পবিত্রভূমি জিয়ারত করে করাচী হয়ে, পাকসার জমিন সাদবাদ গেয়ে পবিত্র হয়ে বাংলাদেশে ঢুকলেন। প্রথমেই আসলেন নিজের বাড়িতে। তিনি যখন বাড়ির দরজায় ঢুকবেন ঠিক তখন দেখলেন তাদের বাড়ি পাহারাদার কুকুর লালু এখনো আছে। বড় ভালো লাগল পীর সাহেবের। বেঁচে থাকতে এই কুকুরকে খুব ভালোবাসতেন, মোটামুটি ভাব ছিলো কুকুরটার সাথে। বাসায় আসলেই একেবারে কাছাকাছি এসে মাথা নত করে কুর্নিশ করার মতো দাড়িয়ে থাকত। বড় ভালো লাগতো তাঁর। এ দৃশ্য দেখে প্রায়ই একটা কবিতার কথা মনে পড়ত ‘সবার আমি ছাত্র’। মনে মনে ভাবতেন প্রভুর সামনে কিভাবে মাথা নত করে থাকতে হয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই কুকুরটা। ঈমানের দৃঢ়তা বেড়ে যেত পীর সাহেবের। মনে করতেন সব মুসলমানের এ দৃশ্য একবার করে দেখা উচিৎ। তাহলে আর কোন মুসলমান বেঈমান থাকতে পারতো না। এই কথা এক বন্ধুকে বলায় তাঁর বন্ধু মন্তব্য করেছিলো তাহলে আল্লাহ নবী-রাসুল না পাঠিয়ে কুকুর পাঠাতেন। নাউযুবিল্লা এইটা কি বলেন ভাই ধর্ম নিয়ে রসিকতা করবেন না বলে তিনি আবার বলতে শুরু করেন আর প্রত্যেক বাঙালির দিনে একশবার দেখা উচিৎ। সালা বজ্জাৎ জাত প্রভূর (পশ্চিম পাকিস্তানী) প্রতি সম্মান দেখাতে জানে না। আরে তারা হল প্রভূ আর তোরা হলি কুকুর ভুলে যাস কেন? কুকুরটা অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে ছিল। পীর সাহেব পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন। কুকুরটার কাছাকাছি এসে গভীর মমতায় তার চোখে জল এসে গেল। আদর ভরে হাত রাখলেন কুকুরটার মাথায়। আর অমনি কুকুরটা গা ঝেড়ে উঠে দুরে সরে গেল। আর ঘেউ, ঘেউ করতে লাগল। আর পীর সাহেব শুনলেন ছি, ছি, ছি…। পীর সাহেব এদিন ওদিক তাকালেন, কে বলছে ছি, ছি, ছি। আশেপাশে কেউই নেই। আবার শুনলেন ঘে, ঘে, ঘে, ছি, ছি, ছি। তিনি বুঝলেন কুকুরটাই বলছে ছি, ছি, ছি। তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। আবার সন্দেহও দুর হলনা বললেন এই কুত্তা, এই, যা, যা!
     খেদান ক্যা? কই যামু? আপনে ক্যান আইছেন? আপনে যান।
     সালা বলে কী! আমার বাড়ি আর আমি যামু?
     হ, যাবেন, এই বাড়ি আর আপনের নাই।
     কেন?
     আপনে মইরা গ্যাছেন তাই। আপনের জায়গা, আপনের ছেলে লিচে। লন এখন বিদায় হন।
     তুই কথা বলছিস কিভাবে?
     ক্যান, আমার ভাষায়।
     তোর ভাষায়। মানে ঘেউ, ঘেউ… করে। তাহলে আমি শুনতে পাচ্ছি কিভাবে? বুঝতে পারছি কিভাবে!
     হতাশ হইয়েন না আমার উন্নতি হয়নি। কিন্তু আপনে নিচে নামতে নামতে আমার সমানে সমান হইছেন তাই আমার ভাষা বুঝতে পারছেন।
     চুপ কর সালা কুত্তা।
     সাহেব, নিজেরে গাল দিলেন? বলেই কুকুরটা হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল। পীর সাহেব,
     কাঁদিস ক্যান?
    দুঃখে কাঁদিনা ভণ্ডপীর, আনন্দে কাঁদি। সারা দেহের মুক্তিকামী জনতা, তোরে কুত্তা বলে গাল দিছে, স্বাধীনচেতা জনতা কুত্তা বলে গাল দিছে। কিন্তু আজ তুই নিজেই নিজেরে গাল দিলি। আইজ আমার সবচেয়ে সুখের দিন। আইজ আমার আনন্দ আরো দ্বিগুন হচে, কারণ আইজ তোর এক বিশেষ দিন। আর আইজ তুই কুত্তা বইলা নিজেরে গাল দিলি। আইজ আমি মরলেই আনন্দে মরমু। হা. হা।

পীর সাহেব কিছুতেই মনে করতে পারলেন না, কি সেই বিশেষ দিন। কিন্তু অন্য অনেককিছু মনে পড়ল তার। এই তো মাত্র কদিন আগে ১৯৭১। সারাদেশে যুদ্ধ চলছে। তিনি তখন ষরষেবাড়ি মাদ্রাসার প্রধান। অনেক বড় কামেল লোক। ‘পীর সাহেব’ বলে ডাকে সবাই অনেকে আবার ‘পীর বাবা’ও বলে। যেই মিলিটারির ভয়ে সারা বাংলা থর থর কম্পমান তারাও অপারেশনে যাওয়ার আগে পীর সাহেবের দোয়া নিয়ে যায়। প্রায় সময় নিজেই আসে। আসতে না পারলে টেলিফোনে দোয়া চেয়ে নেয়। পীর সাহেবের তখন টেলিফোনে সরাসরি সদরের সাথে যোগাযোগ ছিল। মিলিটারিরা বড় ভালোমানুষ ছিল। বজ্জাত বাঙালি তার কদর বোঝেনি। প্রতিদিন তারা গরু, খাসি, এনে পীর সাহেবকে দিত। অফুরন্ত সোনাদানা, টাকাকড়ি দিত। তা দিয়ে প্রতিদিন পীর সাহেব ছিন্নি দিতেন। রাত্রে পাকবাহিনীর জন্য মিলাদ পড়তেন। খাস দিলে দোয়া করতেন। আর বাঙালীদের গালমন্দ করতেন। মিলিটারিরা আরেকটি কাজ করত। প্রতিরাত্রে পীর সাহেবের জন্য একজন কুমারী মেয়েও দিয়ে যেত। পীর সাহেবও আপত্তি করেননি। এইসব মেয়েরা হল ‘মালে গনিমত’ তাদের ভোগ করা যায়েজ আছে। প্রতিদিন একজন করে কিশোরী মেয়ে পেয়ে পীর সাহেব যেন নবযৌবন ফিরে পেলেন। সারারাত জিকির আজগর করতেন। সকালে গোসল করে নামাজের আগে পরে খাস দিলে পাকস্থানের (?) জন্য দোয়া করতেন। তার আস্তানা মোটামুটি নিরাপদ ছিলো বলে অনেক নারী পুরুষ তারা আস্তানায় আশ্রয় নিতেন। সুন্দরী কিছু মেয়েদের তিনি আলাদা করে রেখে দিতেন আর অন্যদের রাত্রে মিলিটারির হাতে তুলে দিতেন। প্রতিদিন শতশত মানুষ তার হেফাজতে প্রাণ হারাতো। আর যেসব মেয়েদের ঐ হানাদারদের হাতে তুলে দিতেন তাদের খবর কেউ জানেনা। গোয়ারেখার মাওলানা অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন পীর সাহেবের। তার আশ্রয়ে ছিল এক পুলিশ অফিসারের দুইছেলে আর স্ত্রী। তিনি পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও এই অসহায় পরিবারটির কল্যাণে ব্রত ছিলেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার জীবন থাকতে এদের কোন ক্ষতি হতে দেবেন না। সেই মাওলানা একদিন পীর সাহেবের আস্তানায় নিয়ে এলেন দুই ভাইকে। পীর সাহেবের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা চাইলেন। মাওলানা মিথ্যা বলেন না। তিনি এও বললেন এদের বাবা নিখোঁজ। তিনি একজন সৎ পুলিশ অফিসার। খবর পেয়েছি তিনি নাকি মিলিটারির হাতে শহীদ হয়েছেন। ব্যাস

আর বলতে হয়নি। সেখানে আশ্রয়ও হয়নি দুই ভায়ের। তাদের জীবনের ঝুকি নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। (অথচ তাদের হারালে বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি হতো। অপূরণীয় ক্ষতি হতো) গোয়ারেখার মাওলানা ছিলেন বলেই হয়তো তারা দুই ভাই প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলেন। কিন্তু যাদের মাওলানার মতো সৎ ও পীর সাহেবের ভক্ত নিয়ে যায়নি তারা। তারা কেউ ফিরে আসেনি। ফলে বাংলাদেশের হয়েছে অনেক অপূরণীয় ক্ষতি।

এই বাংলাদেশ শব্দটা মনে হতেই মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল পীর সাহেবের। ভাবলেন কি লাভ হয়েছে, এত ষড়যন্ত্র করে, এত দোয়া করে, ভণ্ডামী করে। দেশতো ঠিকই স্বাধীন হল। লাল সবুজের পতাকা উড়ল। মনটা হাহাকার করে উঠল পীর সাহেবের, চান-তারার পতাকা কতো ভালো ছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়াতে বেশি ক্ষতি অবশ্য হয়নি পীর সাহেবের। বিস্মৃতিপরায়ন বাঙালী বিজয়ের আনন্দে ভুলে গেল পীর সাহেবের অত্যাচারের কথা। স্বাধীনতার মাত্র নয় বছর পর ১৯৮০ সালে তাকে দেওয়া হল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মানের পুরস্কার। যে পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছে, বঙ্গবীর আতাউল গনি ওসমানী, রনদা প্রসাদ সাহা, কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, মুনীর চৌধুরীর মতো গুণী লোকদের।

 মিথ্যে কথা (কুকুরটি বলতে লাগল) সম্মানিত নয় ‘অসম্মান’ করা হয়েছে। তাদের আত্মা সে পুরস্কার প্রত্যাক্ষাণ করেছে। আর তোকে যেদিন ঐ পুরস্কার দিছে সেদিন থ্যাকে ঐ পুরস্কারও অপবিত্র হয়ে গ্যাছে।
আর সহ্য করা সম্ভব হলনা পীর সাহেবের তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখলেন খাটে তার একমাত্র পুত্র গভীর নিদ্রায় অচেতন। যোগ্য পিতার যোগ্য পুত্র। সেও এদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের জেহাদে ইসলাম বাংলাদেশ লিমিটেডের অঙ্গ সংগঠনের সেক্রেটারি। আর মাত্র কয়েক মাস তাহলেই সভাপতি। মনটা খারাপ হয়ে গেল পীর সাহেবের। একদিন তার ছেলেকেও কোন কুকুর নিজের দলের ভাববে, ভাবতেই তার সমস্ত নাড়িভূড়ি দুমড়ে মুচড়ে উঠল। ছেলের দিকে আর তাকাতে পারলেন না। চোখ সরিয়ে নিলেন। পাশে তাকাতেই চোখ পড়ল সামনেই খুব যতœ করে রাখা তার সেই সর্বোচ্চ পদকটি। তিনি কাছে এগিয়ে গেলেন। নিজের হাতে পুরস্কারটি তুলে নিতে চাইলেন। পারলেন না। তার সমস্ত শক্তি দিয়েও ঐ পুরস্কারটা তুলতে পারলেন না। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল পীর সাহেবের হঠাৎ মনে হল পেছনে কেউ বুঝি দাড়িয়ে আছে। তিনি ঘুরে তাকালেন। দেখলেন সামনে একটা প্রাণী দাঁড়িয়ে। তার চেহারা এত বিভৎস যে বুকের মাঝে শিউরে উঠে। তারপরও তারতো আর মরার ভয় নেই, ভেবে তাকালেন। দেখলেন প্রাণীটি উচ্চতায় প্রায় তার সমান। দেখে মনে হয় কোন এক ধরনের সরীসৃপ। মনে হয় জীবন্ত কোন প্রাণীর চামড়া খুলে নেওয়া হয়েছে। সারাদেহ হলদেটে থিক-থিকে তরলে ভেজা। গা থেকে টপটপ করে সেই তরল ঝরে পড়ছে আর চারিদিকে অসহ্য গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্রাণীটির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাইরে ঝুলছে। বড় মাথা খুলি নেই। সেখান থেকে এন্টেনার মতো অনেকগুলো কি যেন বের হয়েছে। লম্বা মুখ, কয়েক সারি ধারালো ফলার মতো বড় বড় তীক্ষè দাঁত। লাল টকটকে চোখের রগগুলো বাইরে ঝুলছে বুকের পাশঘেষে হাত আর পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর পেছনের দিকে আছে মস্তবড় লেজ। প্রাণীটা মুখ খোলার সাথে সাথে সাপের মতো জিহ্বা বেরিয়ে আসে। যার লেজ ভেতরে আর বাইরের মুখ ফনাতুলে গর্জন করতে থাকে।

ভয় পেয়ে তিনি পেছন দিকে সরে এলেন দেখলেন প্রাণীটাও পেছনে সরে গেল। তখন আতঙ্কে তার সারা মুখ পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। তিনি দেখলেন সামনে আয়না আর আয়নাতে তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি। আর দাঁড়িয়ে থাকলে পারলেন না। হাটু ভেঙ্গে বসে পড়লেন। তারপর কোনমতে হামাগুড়ি দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলেন। বাইরে হালকা চাঁদের আলোয় যে দৃশ্য দেখলেন তাতে তার মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল হাওয়া বয়ে গেল। সামনে যতদূর দেখা যায় মানুষের দেহ। শ্যামল পৃথিবীতে হালকা সোনালী আলোতে তার প্রথমে মনে হল এগুলো মৃতদেহ। কিন্তু ভালো করে তাকিয়েই দেখলেন মানুষগুলো জীবন্ত। তারা কিলবিল করে নড়ছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে তাদের বুক উঠানামা করছে। পীরসাহেব ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন, ছেলে আছে, মেয়েও আছে। মেয়েদের পরনে কাপড় নাই। তিনি চিনতে পারলেন এরা সেইসব মেয়ে যাদের তিনি ১৯৭১ সালে ভোগ করেছিলেন। এরা সেই কিশোরী, বালিকা, যুবতি যারা শত চিৎকারেও, শত চেষ্টাতেও নিজের ইজ্জত বাঁচাতে পারেনি। জীবন্ত লাশগুলো কিলবিল করতে করতে তার চারিদিক ঘিরে ধরতে লাগল। তিনি ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। দৌঁড়ে পালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি যতই দৌঁড়াচ্ছেন লাশগুলো ততই এগিয়ে আছে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তিনি এসে দাঁড়ালেন পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মিলন মোহনায়। দেখলেন নদীতে পানি নেই। রক্তের স্রোত বইছে, এই রক্ত বাঙ্গালির রক্ত। পীর সাহেব আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন। কতক্ষণ বসে আছেন মনে নেই। তার মন বিষন্ন, বড়ই বিষণœ। এক ধরনের অস্থিরতা মনকে অশান্ত করে রেখেছে। পীর সাহেব অন্যমনষ্কভাবে আকাশের দিকে তাকান একটা ভাঙ্গা চাঁদ উঁকি দিয়ে আবার মেঘের আড়ালে ঢুকে গেল। তাই চারিদিকে ভয়ঙ্কর আবছা ও ধূসর। এই শেষরাত্রে সামনে প্রবাহিত নদীটিকে একটি অতিপ্রাকৃত দৃশ্য বলে মনে হতে লাগল। পেছনে বিশাল বটগাছের সারি বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। এখন যে দৃশ্যের অবতারণা হতে যাচ্ছে তারা সেই অসম দৃশ্যের দর্শক, একমাত্র নিরব সাক্ষি হতে চায়না। হাহাকারের মতো সেই বটগাছগুলোর বুকের ভেতর বিচিত্র এক শুন্যতা এসে ভর করে। একদিন এই বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তরুন ছাত্র নেতা ভাষণ দিয়েছিল, স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়েছিল, এখান থেকেই দৌঁড়ে গিয়েছিল, মায়ের জন্য, মাটির জন্য সবার আগে প্রাণ দেবে বলে, এই গাছেরই ছায়ায় গভীর রাতে মুক্তি সেনারা সারা দিনের ক্লান্তি দুর করেছিল তখন এই বটগাছের সারিই ছিল তাদের অতন্দ্র প্রহরী। অথচ আজ এখানে যা ঘটতে যাচ্ছে তা হতে দেওয়া যায়না। কিন্তু বলতে না পারার যে কষ্ট তার সাথে তারা ছাড়া কেউ পরিচিত নয়। যে হতাশা তার মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই বলে চাঁদ মেঘের আড়ালে আত্মগোপন করেছে।

আজ এখানে আত্মা বিনিময় হবে। জিহাদে ইসলামের অঙ্গ সংগঠনের সেই নেতার মাঝে ঢুকে গেল তাঁর বাবা ষরষিনার পীর সাহেবের আত্মা। এভাবেই সৃষ্টি হল ষরষিনার মাওলানা পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহর প্রজন্ম। যথাযোগ্য উত্তরাধিকার।

এই প্রজন্মের পূর্বপুরুষ শুধু হিংস্র ছিল, জঘন্ন ছিলো তাদের মন-মানসিকতা, বিশ্বাসঘাতকতা তাদের সত্তার সাথে মিশে ছিল তারা জোর করত, মায়া দেখাত না। কিন্তু এই প্রজন্ম মায়াও জানে। আগের পুরুষ মারত বটে ভুলাতোনা কিন্তু এরা মারে আবার ভুলায়ও। স্বাধীনতার পর বীর মুক্তি সেনাদেরও একটি প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছে, নিজের দেশ বলে একটা দেশ পেয়েছে পরিপূর্ণ মুক্তির আনন্দ। এরা খুব সহজেই পীর সাহেবের প্রজন্মদের মায়ায় ভোলে। তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে এরা নিজেদের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে। এরা দেখে কি অপূর্ব মায়াবি চোখ, সে চোখে চিক চিক করে পানি। চোখের মাঝে কি ভয়ঙ্কর বিস্ময়কর গভীরতা। স্বাধীনতার উত্তরাধিকারীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের বুক দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে। তারপরও তারা কিছুতেই সেই মায়াকে উপেক্ষা করতে পারেনা। তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হতে থাকে যেন সেই চোখের গভীরে প্রবেশ করে যাচ্ছে। মনে হতে থাকে এই গভীরতার গভীরে এক গভীর শুন্যতা। শুন্যতার হাহাকারে মন আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়। মনে হয় আদি-অন্তহীন এক বিশাল বেলাভূমিতে তারা দাঁড়িয়ে আছে। মহাসমুদ্রের গর্জন ভেসে আসে দুর থেকে। ঢেউয়ের ফেনায় নিমজ্জিত এ প্রজন্ম নিজেদেরই খুঁজে পেতে ব্যার্থ হয়। তাদের দৃষ্টি পতনেই প্রলয়ঙ্কারী ঢেউ বুকের মাঝে আচড়ে পড়ে। তাই সমস্ত রক্ত দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। আর তখন এই নিরীহ প্রজন্ম ঐ মায়া প্রজন্মের চোখের আরো গভীরে প্রবেশ করে, নরম বালুতে পা ফেলে এগিয়ে যায় আরো সামনে স্বাধীনতা তখন আরো দুরে সরে যায়। এরা আরো এগিয়ে যায় স্বাধীনতা আরো দুরে সরে যায়। নিরীহ স্বাধীনতার রক্ষকেরা শুধু তাকিয়ে দেখে স্বাধীনতা চলে যাচ্ছে আরো দুরে… বহু দুরে। এবার তাদের চৈতন্য ফিরে কিন্তু হায় তখন বড় দেরি হয়ে গেছে, শত চেষ্টাতেও ধরতে পারেনা পূর্ব প্রজন্মের অর্জনকে। একবার ছুয়ে দেখতেও পারেনা। মনে হয় সেই অর্জন যেন দুর দিগন্তে মিশে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে চিরদিনের জন্য। এই স্বাধীনতার প্রতীকেরা উন্মুক্ত বেলাভূমিতে বায়ুর সাথে মিশে যেতে থাকে। সমুদ্রে ঢেউ এর পর ঢেউ হয়, আর তারা এক গভীর শুন্যতায় হারিয়ে যায়। এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গ অনিশ্চয়তায় বিলীন হয়ে যায় এক আদিম অন্ধকারে এক নির্জনতায় এক নীল নৈঃশব্দে।

এভাবেই স্বাধীনতার মশালবাহী, বাংলাদেশের পতাকার রক্ষক মুক্তিসেনাদের রক্তে মাংসে পরিপুষ্ট হয়ে শহীদদের কবরের উপর ওরা মাকড়সার মতো নীল নীল নকশা কাটে। বীরশ্রেষ্ঠদের অযোগ্য প্রজন্মের বুকে গজিয়ে ওঠে ষরষিনার পীর সাহেবদের সুযোগ্য প্রজন্মের মহীরুহ।

মো. মোজাফ্ফর হোসেন
উড়ে যায় সাদা শকুন

আমি জন্ম নিলাম রাজপ্রাসাদে-
পরিত্যক্ত ঘোড়ার ঘরে।
প্রাসাদের সমবয়সিরা ছিল উদ্দাম
ফেরেস্তাদের মত সুন্দর কিন্তু আমি কুতকুতে কালো
যেন স্রষ্টার আশির্বাদ বঞ্চিত।

আমি গাইতাম ওদের থেকেও ভক্তি দিয়ে
অথচ পড়তোনা হাতে হাত, বাজতোনা বীণ
রাস্তার ছেলেরা বলতো-‘নর্দমার কীট’
অথচ আমার জন্ম রাজপ্রাসাদে
অসংখ্য তারকা খচিত কক্ষের মাঝে
পরিত্যক্ত ঘোড়ার ঘরে!
যেন স্রষ্টার আশির্বাদ বঞ্চিত।

আজ দীর্ঘ ২৫ বছর পর দেশে ফিরছি। বিমানের তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় বেশ স্বস্তির সাথেই বসে আছি। প্রথম শ্রেণীতে আসীন হবার সামর্থ্য থাকলেও ইচ্ছে হয়নি, নিুবিত্তের মানিয়ে নেওয়া এখনো মেনে চলছি। মানিকতলার সেই বাঁশ বাগানের নিচে একটি কুঁড়ে ঘর, স্যাঁতসেঁতে কলের পাড়, বাড়ির সামনের পচা নর্দমায় একটি মাছের জন্য কেটেছে অনেকগুলো অলস দুপুর। মানিকতলার ‘১৪ বছর’ আমার জীবনে এতই সত্য হয়ে উঠেছিল যে দীর্ঘ ২৫ বছর আমেরিকার প্রগতিশীল যান্ত্রিক জীবনে থেকেও মুখ ফেরাতে পারিনি মানিকতলার সেই তীব্র হাহাকার থেকে। আমার ১৪ বছরের না খেতে পাওয়ার ক্ষুধা আর মিটবে না বোধ হয়, বেঁচে থাকার তীব্র জিজ্ঞাসা এখনো থেকে গেছে মনের গহীনে। শান্তি আছে অথচ স্বস্তি পাইনি কখনো, শান্তি তখনও ছিল বাঁশ বাগানের ঠাণ্ডা বাতাসে অস্থিসার দেহের ভার এলিয়ে, মায়ের পরম শাসনে, শিশির øাত দুর্বা ঘাসের  আইল ধরে অজানার পথে ভেসে বেড়ানোতে, নর্দমার কাদাপানিতে শরীর ঠাণ্ডা করার ব্যর্থ প্রয়াশে। কিন্তু স্বস্তি পাইনি কখনো, না সেদিন বট বৃক্ষে চেপে , না আজ বিমানের তৃতীয় শ্রেণীতে চড়ে।

অনেকদিন পর দেশে ফিরছে, একটু আবেগে আপ্লুত হবার কথা, একটু অন্যরকম ভালোলাগার কথা কিন্তু স্বপন শীতল হয়ে বসে আছে, ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, শুধু একটি নির্দিষ্ট বিরতি নিয়ে কেঁপে উঠছে চোখের পাতা, এটা দেখেই বিমানবালা বুঝে নিচ্ছে কোন লোকসান ঘটেনি এখনো।

মার সাথে খুব বেশি সখ্যতা ছিল না আমার, অভাবের সংসার, তার ওপর আমার ভবঘুরে বাবার মায়ের গর্ভে ঘনঘন বীজ বপণ। সংসারের দৈর্ঘ্য বেড়েছে প্রতি বছরে, বেড়েছে খাবারের সংকট। আমি তাঁদের ১০ম সন্তান। ১১তম মারা গিয়েছিল জন্মের তিন দিন পরে। দীর্ঘ ১০ মাস পেটে থেকেও পুষ্ট হতে পেরেছিল না সে। তার পর ১২তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে দুজনেই গেল। মা যতদিন বেঁচে ছিল জন্ম দিয়েছিল পাতি  ছাগলের মত যত্রতত্র যেখানে সেখানে। ছাগল হলে অনেক বাজার দর  হত মার যেটা সে মানুষ হয়েও পায়নি কখনো। সারাদিন অন্যের বাড়ীতে কাজ করে আমাদের অন্ন জোগানো, সন্ধ্যায় বাঁশের পাতা কুড়িয়ে রান্নার ব্যবস্থা করা, মধ্যরাতে ‘এক স্তন ধরে শিশুর কান্না অন্য স্তনে বাবার শক্তির পরীক্ষা।’ এই একটি জায়গায় লোকটি হারেনি জীবনে। ব্যতিক্রম না ঘটলে মানুষ ৫ বছর পর্যন্ত স্তন্যজীবী প্রাণী থাকে আমার বাবা ছিলেন সারাজীবন।

বাড়ি বলতে আমাদের যা ছিল তা হলো দুই খোপযুক্ত একটি কবুতরের খাঁচা। তারই মধ্যে দশ দশটি ‘প্রাণ,’ প্রাণ না বলে ‘দেহ’ বলাই ভালো। আশে পাশে জায়গার অভাব ছিল না যদিও তবুও স্বপন সাহেবের বাবার এই দয়াটুকুই ছিল আমাদের জন্য উপচে পড়া যার ঋণ আমার বাবা-মা না পারলেও অনেকখানি পুশিয়ে দিয়েছিলো আমার বোনেরা। আমি প্রবাস জীবনে বহুবার প্যাডের পৃষ্ঠার মাঝখানে ক্ষুদ্র একটি বিন্দু বসিয়ে এঁকেছি আমার বাড়ির মানচিত্র। এতকথা যে জন্য বলছি, এক ঘরে আমি, বাবা, মা সঙ্গে আরো দু’ভাই-বোন থাকতাম। মাঝে মধ্যে মধ্যরাতে মাকে লাথি মেরে উঠে যেত বাবা তবে বেশির ভাগ সময় মা করতো সমঝোতা। বৈবাহিক সম্পর্কে ভালোবাসা না থাকলেও চলে। প্রাচীন শাস্ত্রে মনু বলেছেন, ‘পুত্রার্থে ক্রিয়াতে ভার্যা’ অর্থাৎ পুত্র জন্ম দেওয়ার জন্য বৌ আনা। আধুনিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের স্ত্রী তোমাদের শয্যাক্ষেত্র, তাই তোমরা তোমাদের শয্যাক্ষেত্রে যেভাবে খুশি প্রবেশ করতে পারো’ (বাকারা: ২২৩)। আসলে সব রসুনের এক পুটকি। তা না হলে খাল কেটে কুমির আনবে কে! তাছাড়া প্রতি রাতে কিছু না টিপলে আমাদের পুরুষদের চলে না। পতিদেব না সাজলে তাদের অত্যাচারের যে ধরন তাতে করে প্রতিরাতে মেয়েদের লাথি খেতে হত। পুরুষদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে তাঁদের সৃষ্টিকর্তাকে তাঁরা তাঁদের আদলেই পেয়েছে। তাছাড়া, বিজ্ঞান বলে সন্তান জন্ম দিতে ভালোবাসা লাগে না। ধর্ষণ করলে কি গর্ভ হয় না? আসলে আমরা এক একজন ছিলাম এক একটি ধর্ষণের চূড়ান্ত পরিনাম। আমার মেজো বোন দেহের ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে সর্দার চাচার (স্বপন সাহেবের বাবা) সাথে ধরা পড়লো, গ্রাম শুদ্ধ লোক তাঁর বিচার করলো অথচ আমার মাকে প্রতি রাতে বলপূর্বক ধর্ষণ করেও বিচার হয়নি আমার পিতৃদেবের। বাঙলাদেশে শতভাগ মেয়েই ধর্ষণের শিকার হয় এবং তা বিবাহ নামক ধর্মসিদ্ধ অতি পুণ্যকর্মটি সম্পাদন করার পরেই, এ জন্যই কোন বিচার হয়না। ফলস্বরূপ জন্ম হয় আমাদের মত এক একটি অসুস্থ’্য সত্ত্বার। তিনবার কবুল বলা অথবা আগুনকে কেন্দ্র করে সপ্তপাকে চক্কর দেওয়ার সময়টুকুকে যদি পরবর্তী দশ, বিশ অথবা পঞ্চাশ বছরের জীবন থেকে বড় করে না দেখা হয় তাহলে আমরা বাঙালিরা বেশিরভাগই এক একটি নির্মম ধর্ষণের পরিকল্পিত (!) ফসল। জন্মনিয়ন্ত্রণ কিম্বা গর্ভপাতের কথা উঠলেই আমার বাবা-মা ধর্মের কত শত অজুহাত এনে খাঁড়া করতো অথচ তাঁদেরকে আমি নামায পড়তে দেখিনি কোনদিন। জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং গর্ভপাত নাকি শিশুহত্যার শামিল আর শিশু হত্যা হচ্ছে মহাপাপ। তাই আমাদের জন্ম দিয়েছে হিড় হিড় করে তারপর তিলে তিলে মেরেছে। আমরা জীবিত থেকেও মৃতের স্বাদ পেয়েছি প্রতিটা ক্ষণে। তবু খুশি হয়েছেন  সৃষ্টিকর্তা তাঁর ভক্তকুলের অনাবশ্যক বিস্ফোরণ দেখে, স্বস্তি পেয়েছেন আমাদের পিতা-মাতা, কী ংঃঁঢ়রফ ংবহঃরসবহঃ !

প্রায়ই মনে হয়, এইতো সেদিন। আমার ছোট বোন, তার বয়স তখন বার, সে যে বাড়ীতে কাজ করতো সেই বাড়ীর সদ্য লেখা পড়া শেষ করে ফেরা স্বপন সাহেব, আমি কত গর্ব করেছি যাঁর নামে আমার নাম হওয়াতে। ১০ টাকার লোভ দেখিয়ে আমার বোনকে নিয়ে গেলেন বিছানাতে, আমি দরজার এপাশে ১০ টাকায় কী কী কিনতে পারি সেই হিসাবে পাগলপ্রায়। তারপর সে যখন ঘর থেকে বের হল তার পায়জামা রক্তে ভিজে একাকার। ঐ রক্ত নিয়েই ছুটে গেছি আমরা গঞ্জের হাটে, রক্ত ঝরতে ঝরতে ৭ দিনের মাথায় মারা গেল সে। ভাবতে ভালো লাগে অনেক কিছুই ‘মন ভরে’ খেয়েছিলাম সেদিন। ভাই বোনের অভাব আমার ছিল না। যদিও শেষ পর্যন্ত এই অভাবটাই সব অভাবকে ছাড়িয়ে যায়। বড় দুই ভাই ডাকাত দলে নাম লেখানোর ৫ দিনের দিন মারা পড়লো। এক ভাই জেলে, আরেক ভাই এর ওর বাড়ীতে থেকে লেখাপড়া শিখে শহরে চলে গেল আর ফেরেনি কখনো। বড় বোনের ‘পেটের ক্ষুধা আর দেহের ক্ষুধা’ যেদিন একাকার হয়ে গেল চলে গেল মালো পাড়ায়, বাবা মা আর ঘরে তোলেনি তাঁকে। সমাজকে তাঁরা বড় বেশি মান্য করতো যদিও সমাজপতিরা আমার বাবাকে ‘মুচি’ ছাড়া ডাকেনি, আমার মেজো বোনকে গর্ভধারণ করিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে, আমার তিন বোনের যে কোন একটি যদি বেশ্যাবৃত্তি করতো আল্লাহর কসম আমাদের কোন অভাব থাকতো না। সমাজপতিরা তাদের স্বার্থেই বাঁচিয়ে তুলতো আমাদের। আমরা যখন প্রতিটা ক্ষেত্রেই সমঝোতা করে চলেছি এক্ষেত্রে করলেই কী বা এমন ক্ষতি হতো। সমাজ-নীতির দোহাই দিয়েছেন আমার বাবা-মা। যে সন্তান বাঁচতে চেয়েছে তাকেই করেছেন ত্যাজ্য, অথচ আমার মা যখন মারা গেলেন, জানাযা হল না তাঁর, পুতে রাখা হল গর্তে। আমার বয়স তখন ৮। বাবা আবার বিয়ে করলেন। সংসারের এত ঘাটতি সহ্য হলেও এই একটি জিনিসের ঘাটতি তিনি কিছুতেই মানতে পারলেন না। আমার আশ্রয় হল দাদীর কাছে। ৮০ বছরের বৃদ্ধা, অভাবের সংসারে তাঁর এই অনর্থক দীর্ঘজীবিতে আমি কোন যুক্তি খুঁজে পেতাম না। মাঝে মধ্যে মনে হত বালিশ চাপা দিয়ে মেরে দিই বুড়িকে। না মেরে ফল অবশ্য ভালোই হয়েছে। ওই বুড়ির কারণে আরও চারটা বছর বাড়িতে ঠাঁই হয়েছিল। দাদীর মৃত্যুর পরপরই আমি মানিকতলা ছেড়েছি, ছেড়েছি আমার পরিচয়। আজ খুব দাদীর কথা মনে পড়ছে। মানুষটা খুব কষ্ট পেয়েছেন জীবনে তবুও নিয়মের এদিক ওদিক হননি এক বিন্দুও। মাঝে মাঝে দাদার কথা বলে খুব কান্নাকাটি করতেন। লোকটি নাকি ‘অসম্ভব ভালো’ ছিল, দাদীকে ভালোবাসতো প্রচণ্ড, আমার বাবা যখন পেটে, দাদীর বয়স তখন তের, দাদীর দেখাশোনা করার জন্য তাঁর বিধবা বোনকে বাপের বাড়ী থেকে আনালেন, ১০ দিনের দিন সকালে দাদা আর দাদীর বোনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, খুঁজে পাওয়া যায়নি দাদীর সারা জীবনের গোছানো সঞ্চয়, মাঝখান থেকে রেখে গেছে আমার বাবাকে, দাদীর কাছে যা যক্ষের ধন হলেও বাস্তবে ছিল বড় রকমের যন্ত্রণা। দাদীকে খুব ভালোবাসতো দাদা। দাদী এই বিশ্বাস নিয়েই ৭১ বছর পার করে দিলেন অনায়াশে। মানুষ মাঝে মাঝে তাঁর ঈশ্বরকেও ছাড়িয়ে যায়। দাদী তা পেরেছিলেন কিনা জানিনা তবে দাদী যে দিন মারা গেলেন আমি তাঁর পায়ে মাথা রেখে বলেছিলাম যতদিন সত্যিকারের কারো সন্ধান না পাচ্ছি ততদিন তোমাকেই রেখে দিলাম। দাদী মারা যাওযার আগে পোলাও খেতে চেয়েছিলেন। মানুষ মারা যাওয়ার আগে পুনরায় শিশু হয়ে যায়, বড় আজব আজব ইচ্ছা পোষণ করে তখন। আমার দাদী চেয়েছিলেন পোলাও খেতে, যা ছিল আমাদের সামর্থের শেষ সীমানায়, বাবা তাই এড়িয়ে গেছেন বিষয়টি। একদিন ভর দুপুরে দাদী স্বপন সাহেবদের রান্না ঘরের পিছনে বসে ছিলেন। আমিও ছিলাম। খুব অদ্ভুত একটা জিনিসের গন্ধ পাচ্ছিলাম আমরা। দাদী অনেকক্ষণ বসে ছিলেন তারপর বাড়ীতে এসে পিঁড়িতে মাদুর পেতে শুলেন, আর ওঠেননি। অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম সেই গন্ধটি ছিল পোলাওয়ের। আজ ভাবতে ভালো লাগে জীবনে শেষ ইচ্ছেটার অন্তত খুব কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন তিনি।

বিমানবালা স্বপনের দিকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দেয়। স্বপন টের পায় না কিছুই। বাঙালিদের কাঁদতে হয় না, কান্না নিজ থেকেই আসে। প্রতিটা শিশু মায়ের পেটে থাকতেই এমন করে জব্দ করে আসে এই কঠিন শিল্পটা যে ভবিষ্যতে এর থেকে সহজ আর কোন কিছুই হয়ে ওঠে না। গরীবের সন্তানেরা ছোট থাকতে কারণে অকারণে এত বেশি কাঁদে যে পরবর্তীতে কান্নার প্রতি এক প্রকার বিতৃষ্ণা চলে আসে। তবে স্বপন খুব বেশি কাঁদেনি জীবনে, কাঁদতে পারলে অন্তত নিজেকে ভুলিয়ে রাখা যেতো। এখন একটু কাঁদবার চেষ্টা করে সে তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে।
‘কেমন আছিস খোকা?’
‘মা তোমাকে না কতবার বলেছি আমাকে খোকা বলবে না। আমার খুব ভাল একটা নাম আছে ।’
‘ও তাই তো! আমার মনে থাকে না বাবা। তা কেমন আছিস স্বপন?’
‘মানিকতলার কুঁড়ে ঘরের এক ছেলে, ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ এমন যাদের অবস্থা, এখন সে বিমানে বসে আয়েশ করে ঘুম পাড়ছে, তার কি খারাপ থাকা উচিৎ হবে?’
‘এভাবে বলছিস কেন বাবা? তুই কি তবে ভালো নেই?’
‘আমার কথা বাদ দাও মা, তোমার কথা বলো। আচ্ছা মা সৃষ্টিকর্তা কি সত্যিই আছেন?’
‘ছি: বাবা এভাবে বলতে হয় না, তিনি রাগ করবেন।’
‘সৃষ্টিকর্তা রাগ করলে কি খুব বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে মা? মানিক তলার সেই স্বপন সাহেবদের তিনতলা সাদা ধবধবে বাড়ির পাশে এক পরিত্যক্ত ঘোড়ার ঘরে জন্ম হল আরেক স্বপনের। সৃষ্টিকর্তার আমাদের ওপর অনেক রাগ, তাই না মা?’
‘এমনিতেই তিনি অনেক নরম, দয়ার অথই দরিয়া, তিনি তাঁর মমতাকে একশভাগ করে মাত্র এক ভাগ তাঁর সকল সৃষ্টির মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু রেগে গেলে তাঁর থেকে কঠিন বস্তু আর মিলবেনা। তাঁর যে কথা শুনবেনা তাকে দিবেন এমন শাস্তি যা আমাদের ধারনার বাইরে।’
‘আমি তোমার অবাধ্য হয়েছি যখন তখন। কই তুমি তো আমাকে একচুলও আঘাত করোনি। তাহলে এত দয়ার সাগর যিনি তিনি তাঁর সন্তানদের এত কঠিন শাস্তি দিবেন কেমন করে?’
‘কার সাথে কার তুলনা! তাঁর শক্তি সীমাহীন তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন।’

‘শক্তি থাকলেই অনেক কিছু করা যায় তাই না মা? এজন্য বাবা তোমার ওপর যখন যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে করেছে, বাবার ওপর করেছে স্বপন সাহেবরা, আর সবার ওপর সৃষ্টিকর্তা, আচছা মা সৃষ্টিকর্তা কি বাবার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী?’
‘পাগল ছেলে আমার! তুলনারও তো যথার্থ উপলক্ষ থাকা চাই।’
‘তাহলে তো তোমার কষ্টের পাল্লাটা এখন আরো ভারি?’
‘তা তো একটু হবেই, পাপ করেছি শাস্তি হবে না!’
‘তুমি আবার পাপ করার সময় পেলে কখন! যতদিন বেঁচে ছিলে গাধার মত সংসার টেনেছো, ভার বয়েছো আমার বাবার গন্ডারের মত দেহের। উনি কেমন আছেন মা?’
“খুব ভালো আছেন। শুনেছি মৃত্যুর আগে খুব অসহায় একটা মেয়েকে বিয়ে করে ‘সামাজিক স্বীকৃতি’ দিয়েছিলো তাই সৃষ্টিকর্তা তাঁর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়ে জান্নাত বাসী করেছেন। তাঁর জন্য দোয়া করিস বাবা”।
‘সৃষ্টিকর্তা ‘সত্যি সত্যিই’ খুব ‘দয়ালু,’ তাই না মা?’
‘হু!’
টানা নিঃশ্বাস ছাড়ে মা। তারপর অনেকক্ষণ কেউ কথা বলে না।
‘দাদী কেমন আছেন মা?’
বিমান বালার আলতো স্পর্শে ঘুম ভেঙ্গে যায় স্বপনের।
‘স্যার আপনি ঘামছেন।’
তারপর স্বপনের দিকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দেয়।
‘আপনি ফ্রেস হয়ে নিন আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে বাংলাদেশে অবতারণ করবো।’
এদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ না হয়ে পারেনা স্বপন। সাধারণত বাসে যারা কাজ করে তাদেরকে বলা হয় ‘হেলপার’, ট্রেনে যাঁরা কাজ করে তাঁরা হল ‘টিটি’ আর বিমানে ‘বিমানবালা’। পেশাটা একই অথচ হেলপারদের মানুষ বলে মনে করা হয় না, টিটিরা মানুষের মত, আর বিমানবালারা পরিপূর্ণ মানুষ। যানবাহন সমাজে বিমান হচ্ছে     ‘মৌ-লোভী’ গোছের তাই তো এখানে রাখা হয়েছে উচ্চ প্রজাতির সেবিকাদের। ভোগ করার ক্ষমতা যাদের আছে তাঁরা শুনবে কেন? হাসতে হাসতে বিমান থেকে নেমে পড়ে স্বপন। মাটিতে পা দিয়ে টানা নিঃশ্বাস নিয়ে মনে মনে বলে ওঠে ‘আমার মানিকতলা’।
‘মানিকতলা’ এখন আর ‘মানিকতলা’ নেই, হয়ে গেছে ‘স্বপন নগর’। মানিক নামের এক ব্যক্তি, আজ থেকে শত শত বছর আগে, এই গ্রামের পত্তন ঘটায়, গ্রামটির নাম হয় ‘মানিকতলা’। শহর থেকে, সভ্যতা থেকে অনেক দূরে একটি লোকালয়, ‘মানিকতলা’, আজ নিজেই যেটি একটি পরিপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছে, হয়ে উঠেছে সভ্যতার চারণক্ষেত্র, ‘স্বপন নগর’। স্বপন সাহেবের দানবাকৃতির দুইটা ফ্যাক্টরি এখন এই গ্রামের ত্রান কর্তা। ‘ধন’ থাকলে ‘ধনের’ চাহিদাও বেড়ে যায়। ভাবতে ভালো লাগছে আমার মানিকতলায় আর আমার মত স্বপনের জন্ম হয়না। জন্ম হয় স্বপন সাহেবের।
স্বপন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোন আপনজনদের সন্ধান পায় না, সন্ধান পায় না অস্তিত্বের। ত্রিশ বছরের মধ্যে একটা পরিবার বিলীন হয়ে যায় চিরতরে। স্বপনের কোন পরিচয় থাকে না, থাকে না কোন ঠিকানা।
এখন স্বপন সাহেবের গেষ্টরুমে বসে আমি। বাইরের কেউ এই গ্রামে আসলে স্বপন সাহেবের বাড়িতে বিশেষ ‘আদর আপ্যায়ন’ পায়,্ আমি এখন বাইরের কেউ। স্বপন সাহেবের বাড়ির উত্তরে ভুতুড়ে এক বাঁশ বাগান ছিল, যার নিচে ছিল আমাদের কুঁড়ে ঘর, সেখানে গড়ে উঠেছে ‘স্বপন ক্যাবলস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’। ইতোমধ্যে আমার সামনে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি খাবার দেওয়া হয়েছে, ঘৃতান্নও আছে তার মধ্যে। এই স্বপন সাহেবের কাছে নানান ভাবে ঋণী আমরা। স্বপন সাহেবের বাবার কল্যাণে আমার মেজো বোন আত্মহত্যার একটি উপযুক্ত উপলক্ষ খাঁড়া করতে পেরেছিল, মরেই বেঁচেছিল বেচারি। ভাবতে ভালো লাগে মরবার আগে অন্তত ‘দেহের ক্ষুধাটা’ মিটেছিল তার। স্বপন সাহেবের বিশেষ কৃপায় সেদিন ঐ ১০ টাকায় অনেক কিছুই খেয়েছিলাম আমরা, তাঁদের বদৌলতে আমার দাদীর শেষ ইচ্ছাটা অনেকাংশে পূরণ হয়েছিল। খাওয়া শেষ করে চলে আসবার সময় স্বপন সাহেবের হাতে হাত মেলায় স্বপন যে হাতে একদিন পিষ্ট হয়েছিল তার বোনের কচি দেহ, টিকে থাকার পূর্বশর্ত এটাই। স্বপন শুধু বেঁচে থাকতে চায় না টিকেও থাকতে চায়। মেইন গেটের বাইরে এসে পিছনে ফিরে তাকায় স্বপন, বড় বড় স্বর্ণাক্ষরে লেখা ‘হাজী স্বপন ভবন’। নিজের নামটা এভাবে দেখে গর্বে বুকের ভেতরটা ‘হু হু’ করে জ্বলে ওঠে। বাম দিকে মায়ের বুকের ওপর গড়ে উঠেছে অতিকায় ‘স্বপন ক্যাবলস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’। মা’র মত ক্ষুদ্র একটা মানুষের এত বড় সম্মাননা! আনন্দে অশ্র“ এসে যায় স্বপনের।

রাতুল পাল
যুক্তিবাদী

জলন্ত সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে হোটেলের অন্ধকার বারান্দা থেকে শোবার ঘরে ঢোকে মুক্ত। ছোট্ট ঘরটাতে ডিম লাইট জ্বলছিল। ঘরের ডান পাশের খাটটাতে অঘোরে ঘুমাচ্ছে ওর দোস্ত বাচ্চু। ‘দোস্ত’ না বলে ‘পার্টনার’ বলাই ভাল। নিছক স্বার্থের উদ্দেশ্য যে   অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে তাকে আর যাই হোক দোস্তি বলা যায় না। এমন পার্টনার আরও গোটা ছয়েক আছে মুক্তর। তবে কাজের সময় পার্টনারদের নীবিড় একান্ততা       ‘দো¯ী—’কেও হার মানায়। এই তো একটু আগেই, কি দারুণ একটা কাজ করে এলো সবাই মিলে। কাজটাকে আজ নিছক কাজই মনে হয় মুক্তর কাছে। তবে এই মনে হওয়ানোর প্রক্রিয়াটা নিতান্ত সহজ ছিল না। শুধুমাত্র দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততা মনে হবার জন্য যথেষ্ট ছিল না মুক্তর কাছে। আধা পরিপক্ব মস্তিষ্কটাকে কাজে লাগাতে হয়েছিল মুক্তর। কিন্তু ধারাবাহিক অনুশীলন সেই মস্তিষ্ককে ক্ষুরধার করে তুলে দিয়েছে এমন কিছুর সন্ধান, যা অনেক সাধারণ পরিপক্বের চিন্তাজগতের বাইরে। কাজটার প্রসঙ্গে আসা যাক। রাত ন’টার দিকে শহরের শেষ প্রান্তে একটা বাড়িতে মুক্তসহ মোট আট জনের একটি ডাকাত দল যায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে টাকাওয়ালা বাড়িওয়ালাটাকে খুন করে সন্ধানলব্ধ দামী জিনিসপত্র আর নগদ কিছু টাকা নিয়ে সাধারণের নজর এড়িয়ে এই হোটেলটাতে উঠেছে ওরা। সবই হয়েছে পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটা ব্যাপার বাদে। বাড়িওয়ালার ১৮-১৯ বছরের মেয়েটিকে উপরি পাওনা হিসাবে পেয়েছিল মুক্তরা। কাজে গেলে প্রতি বাড়িতেই এমন একটা পাওনার আশায় থাকে ওরা, কোনদিনই হয়ে ওঠেনা। কিন্ত এবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। সেই সুপ্রসন্নতা ওদেরকে করে তুলেছিল উন্নত আর মেয়েটিকে নিস্তেজ। শরীরটা বেশ করঝরে লাগছে মুক্তর। চরম উত্তেজনার পর কোন কাজে সাফল্য এলে এমনই হয়। কিন্তু মনের কোণায় একটা প্রশ্ন, একটা খচখচানি। একারণেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও ওর এত রাত অব্দি জেগে থাকা। অমন খচখচানি বা দ্বন্দ্বগুলোকে মন থেকে ঝেটিয়ে তাড়াতে শুধু ভালইবাসে না মুক্ত, রীতিমত অভিজ্ঞ । অজ্ঞ ও একেবারেই নয়, পাঁচ বছর আগেই কলেজের গণ্ডি পেরোনো হয়ে গেছে, যদিও সেটাই ছিল ইতি। মাঝেমধ্যেই পাটনাররা ওকে দীর্ঘক্ষন ধরে কি যেন ভাবতে দেখে, ভারী বিরক্তিকর ব্যাপার। তারপরও কিছু বলা হয়না মুক্তকে। বয়সে ছোট হলেও ও যে স্কুল কলেজে গেছে এটা সবাই জানে বলেই হয়তো। বাকি পার্টনাররা বুঝে পায় না ও কি চিন্তা করে, আর মুক্ত বুঝেও সব সময় হিসাব মিলাতে পারে না। তবুও নিরলস পরিশ্রম করে চলা মস্তিষ্কে, আর অবশেষে যুক্তিতে মুক্তি। হ্যাঁ মুক্ত যু্িক্ত চায়, সব কিছুর যুক্তি চায়। এটাই ওর দোষ, হয়তোবা গুণও। সব কিছুর পিছনে যুক্তি খোঁজার ইচ্ছাটাও ওর যুক্তির ধারে শাণিত মস্তিষ্কের ফসল। গত গত পাঁচ বছর  ধরেও  যা করে আসছে, তা অত্যন্ত ও প্রাকৃতিক। অনেক আগেই মুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝানো হয়ে গেছে ম্ক্তুর। কিন্তু একটু আগেই ওই মেয়েটির সাথে যা করে এলো ওরা, সেটাকে যুক্তির ছাঁচে ফেলেত বার বার ব্যর্থ হচ্ছে ম্ক্তু। দুই ঘণ্টা ধরে পাথচারী চলছে তো চলছেই। পুরানো অকাট্য আর একই সাথে অসাধারণ কার্যকর যুক্তিগুলোকে আবার মাথায় একটু খেলিয়ে নেবার চেষ্টা চালায় মুক্ত। পুরানা যুক্তিগুলোর ধারাবাহিক প্রবাহ আজকের যুক্তিটা খুঁজে পেতে হয়তো ওকে নতুন গতি দেবে। ছোট বেলা থেকেই একটু বদমেজাজী মুক্ত। না হলে নিজের বাবার মাথায় দরজার খিলের বাড়ি বসিয়ে বাড়ি থেকে পালাবে কেন ও। বাকিটাও ছিল হিংস্র প্রকৃতির, অন্তত ম্ক্তুর ধারণা তাই। সব ব্যাপারে খবরদাবি করাটা কেইবা সহ্য করতে পারে। উপরন্তু মারের হাতটাও বেশ চওড়া ছিল ওর বাবার। সেই দিন সামান্য রাত করে বাড়ি ফেরাতে যে বেদম চড়টা মেরেছিল ওর বাবা। আজও গালের বাম পাশে হাত দিলে মনে পড়ে ম্ক্তুর। তার চেয়েও বেশি মনে পড়ে ঠিক তার পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা। ম্ক্তুর কয়েক পা পেছনে দরজার মোটা খিলটা ওর জন্য প্রস্তুত-ই ছিল। স্থির অবস্থান থেকে বাবার মাথায় সজোরে আছড়ে পড়তে ওটার সময় লেগেছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ভাগ্য-ভালো ঘরে মুক্তর-মা ছিল না। বাবার থেতলে যাওয়া মাথাটা ভালো ভাবে দেখে ওঠার সময় চিল না মুক্তর কাছে। মূহুতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে ও। যে দৌড়টা সেদিন বাড়ির উঠান থেকে শুরু হয়েছিল, তার গতিকে আজ কিছুটা হলেও স্থিমিত হয়েছে। বাবাকে মারা কি খুব অপরাধ ছিল মুক্তর। মুক্ত তা মনে করে না। মনে না করাতে নিজেকে বাধ্য করেছে ও। একটা প্রাণী আরেকটা প্রাণীকে মারতেই পারে, এতে আশ্চর্যের কি আছে? বাবা? বাবা সেও তো প্রাণী। তবের ওর জন্মদাতা প্রাণী। তাতে কি আসে যায়। নিজের সত্তার সাথে ওর বাবার কি এমন কোন সম্পর্ক আছে যা দিয়ে কর্তৃত্ব ফলানো যায়। বাবার শরীরের অভ্যন্তরস্থ যে পদার্থ দিয়ে ও গঠিত, তা থেকে তো ওর মায়ের গর্ভে অন্য কেউ হতে পারতো ঠিক তেমন অন্য কোন নারীর গর্ভে অন্য কোন পুরুষ দ্বারাও তো হতে পারতো ওর জন্ম। নারী-পুরুষের সংখ্যা সমান ধরে সমগ্র পৃথিবীর শুধুমাত্র মানুষের সংখ্যা ৬০০ কোটি হলে, দম্পতির সংখ্যা দাড়াবে ৩০০ কোটি যোদিও মানুষ অত ভালো না। এরূপ ৩০০ কোটি দম্পতির মধ্যে ওর বাবা-মা একটি। গণিতের সম্ভব্যাতার বিচারে-ওর বাবা-মায়ের ঘরে ওর জন্ম নেবার-সম্ভবনা ছিল ১/৩০০ কোটি। যদিও হিসাবটা এর চেয়েও জটিল, দম্পতি পিছু একটি সন্তান ধরে নেওয়াটা যৌক্তিক নয় এছাড়াও রয়েছে পশু পাখি, পোকা ,অনুজীব, যারা প্রজননের প্রত্যক্ষ অংশীদার। তো এই তুচ্ছ, নগণ্য, গৌণ সম্ভবনার বাস্তবায়নের কাকতালীয় ব্যাপারটার জোরে ওর বাবা ওকে সারাক্ষণ চোখ রাঙ্গাবে। তাছাড়া বাবার একার পক্ষে কি ওকে পৃথিবীতে আনা সম্ভব ছিল। জন্মের পিছনে বাবা মায়ের অবদান অর্ধেক অর্ধেক। কিন্তু অর্ধেক ভূমিকা পালন কখনোই মুখ্য কিছু নয়। তার চেয়ও বড় কথা, পুরুষ মানুষ এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে ভূমিকা পালনের শুরুর অংশটুকুই করতে বেশি আগ্রহী, নিজের জীবন দিয়ে এটা বুঝেছে মুক্ত। সামাজিক কিছু ঠুনকো নিয়ম না মানলে হয়তো ঐ পুরুষটি ওর বাবা হতেন না। তবে পুরুষটি তাকে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেছিলেন, এটা ঠিক। কিšু— এটাও কি খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে। মুক্তর মা কে বাবার সঙ্গী হিসাবে প্রয়োজন ছিল, তার ফলশ্র“তিতেই ওর জন্ম। জন্মের পর নিজের  আর্থিক সামর্থ আর মর্যাদার প্রতীক হিসাবে মুক্তকে গড়ে তোলার হীন প্রচেষ্টার বাস্তবায়নে বাবা খরচ করতেই পারেন। কিšু— অনেক শিশুকে তো ঝোপে-ঝাপে, নির্জন  রাস্তার পাশে এমনকি টাকার জোরে হাত বদল হতেও দেখা যায়। মুক্ত যদি ঐ অবুঝ হতভাগাদের মত হত, তবে কোথায় যেত পিতৃত্ব। সামগ্রিকতা দিয়ে বিচার করলে আপাত সুন্দর ক্ষুদ্র পটভূমিগুলো থিতু হয়ে আসে। সবচেয়ে বড় কথা ওর বাবার খবরদারি। সব সময় তার উদ্ভট উপদেশ আর হুকুম কেন মানতে হবে মুক্তকে। ওকি বাবার গোলাম। মানুষ যাকে ঘৃণা করে তার থেকে মুক্তি চাইতেই পারে, সে দূরে সরে এসেই হোক বা তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েই হোক। মুক্ত অবশ্য দুটোই করেছিল। ম্ক্তুর নতুন জীবনের শুরুর  দিকটা কেটেছিল রেল লাইনের পাশে একটা ঝুপড়িতে। একটা টোকাইয়ের সাথে দারুণ ভাব জমে গিয়েছিল। পথে নামলে পথের মানুষের সাথে বন্ধত্ব হতে কতক্ষণ। ঝুপড়িটা ঐ টৌকাইটারই ছিল। সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনও ক্রমশ শক্ত হতে থাকে ওদের। তবে বন্ধুত্বের পর ওদের কার্যকলাপের পেন্ডুলামটা টৌকাইয়ের পেশার দিকেই ঝুকে পড়েছিল। ঝুকতে বেশি সময়ও নেয়নি মাত্র ১৬ দিনের মাথায় একটি বাসে পকেট মারতে টৌকাই বন্ধুর সাহায্যকারী হিসাবে মুক্ত নেমে পড়ে, টৌকাইটার উপরিপেশা ছিল ওটা। এর পর একদিন নিজেই প্রধান দায়িত্ব নেয় সাফল্য অবধারিত ছিল, বুদ্ধির তীক্ষèতা হাতের নিপুণতা বাড়াতে বেশি সময় নেয় নি। পকেট মারার পেছনে যুক্তি খুঁজে বের করাও খুব কঠিন কিছু ছিল না। কেড়ে এই জগতে কে কারটা নেয় না। সবাই নেয় নিচ্ছে নিত নেবে। ওটাই বেঁচে থাকার উপায়। নিগূঢ় জটিল অর্থে। সমাজের রাঘব-বোয়ালরা নেয় বুদ্ধির জোরে, মুক্ত নিত হাতের কৌশলের জোরে। ওরটা অবশ্য একটু নিু মানের কৌশল, তবুও কৌশল তো। সততা অসততার চরম আপেক্ষিক আর ম্যাড়মেড়ে বিচার বাদ দিলে দুটোকেই নিছক কৌশল ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। মুক্তর কৌশলের ধারাবাহিক উন্নতি এক পর্যায়ে চুরি থেকে ডাকাতিতে পৌঁছায়। চুরি ডাকাতির পিছনে নতুন করে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হয়নি মুক্তর। পকেটমারার সাথে সামান্য সাহসিকতার যোগফলই চুরি আর তার সাথে আক্রমনাত্মকতা যোগ করলেই হয়ে যায় ডাকাতি। মূল ভিত্তিটা সেই একই। কিন্তু একটি আগে পালাক্রমে করে। আসা ক্রিয়াটার ভিত্তি কি? মুক্তর মাথা এবার চলতে শুরু করেছে। যা নিয়ে ওর বর্তমান চিন্তা, তাকে সাধারণ ভাষায় ধর্ষণ বলে। আগে যেমন ঘৃণা মনে হতো বিষয়টি, নিজে অংশীদার হয়ে ততোটা মনে হয়নি মুক্তর। প্রথমেই যা একটু চেচামেচি করেছিল মেয়েটি, একটু পরতো নিস্ক্রিয়ই হয়ে পড়েছিল। খুব খরাপ হয়ে গেছে কি কাজটা? মুক্তর জানা মতে, এমন কোন দেশ, জাতি, কাল নেই যেখানে কাজটি হয় নি। কাজটার ভেতর মারাত্মক হিংস্র ভাব থাকলেও পৃথিবীর আদি থেকে চলে আসা অপরাধগুলোর মতো ওটিকেও কেন গৌন বা স্বাভাবিক অপরাধসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না?


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা