স্নান ৩০

সম্পাদকীয়

সাহিত্যে নোবেল জয়ী গড়ে তোলে শান্তিনিকেতন আবার শান্তিতে নোবেল জিতে কেউ করে সিরিয়া আক্রমন। যুদ্ধং চাহি যুদ্ধং চাহি। যুদ্ধ ছাড়া শান্তি নাহি। আজকের স্নান’র অনুপ্রেরণা সাহিত্য নয় যুদ্ধ, শান্তির জন্য ডেকে আনা যুদ্ধ। ‘শান্তির জন্য যুদ্ধ’ শুনলে আমি নির্বাক হয়ে যাই। স্তব্ধ হয়ে যায় কথা।

 

গান দিয়ে শুরু

কথা ও সুর : শ্যাম সাগর মানকিন
১.
মেয়েটির কালো কালো চোখের মনিতে
লাল নীল স্বপ্নেরা ভিড় জমাতো
তারাদের সাথে তার কতো ভাব
শুধু দুষ্টু প্রজাপতিটা ধরা নাহি দিতো
পরীদের মতো তার উড়বার ডানা ছিলো
পাখিদের মতো তার সুর ছিলো গান ছিলো
পাহাড়ী ঝরণার মতো তার চপলতা ছিলো
আর মুখভরা কতো কথার খই ফোটাতো
শুধু সন্ধ্যায় ফেরা পাখি একা ঘরে যেতো
ফুলেদের মতো তার কতো রংচং ছিলো
রোদ্দুর-বৃষ্টি-মেঘ-রংধনু ছিলো
সবুজের মতো তার অবুঝ এক টিয়াপাখি ছিলো
আর কতোশত মুগ্ধতায় বুক জুড়াতো
শুধু ঘাস ফড়িঙটা তাকে একটু জ্বালাতো
এমন স্বপ্নময় বালিকা
থমকে যেতো পাহাড়গলিতে
মাংসভুক সব পিশাচগুলো
তাকে রোজ গিলতো হিংস্র মন্ত্রে
একদিন হঠাৎ ঘৃণা নিয়ে
সমাজটাকে থুথু দিয়ে
স্বপ্নময় বালিকা গেলো না ফেরার দেশে
এমন করে না যাস কন্যা, না যাসরে
ফিরে আয় ফিরে আয়
লড়ার আগে হেরে যাওয়া কেমন জানি
লড়াই চাই লড়াই চাই।।

২.
মাদল বাজেরে মাদল বাজেরে
এই বাজে বাজে বাজে বাজেমাদল বাজেরে।
আমার চেতনার রঙেমাদল বাজেরে
রক্ত ভেজা রাজপথেমাদল বাজেরে
চাঁদ ভৈরো দ্রোহমন্ত্রেমাদল বাজেরে।
হাজংমাতা রাশিমনিরমাদল বাজেরে
রাজপথে ঐ শ্লোগানেতেমাদল বাজেরে।
নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোরমাদল বাজেরে।

প্রজেক্ট প্যালিন্ড্রম  ।। মূল : রে ব্রাডবুরি (ইংরেজি)  ।। অনুবাদ : মাহবুব সুমন

বিজ্ঞাপনে লেখাই ছিলো যে শুধু নির্বাচিত কিছু প্রার্থীকেই মৌলিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হবে। তবে এতোটা নির্বাচিত হবে ব্যাপারটা আন্দাজ করে উঠতে পারে নি গ্রাউস। পেপারে অ্যাডটা দেখেই একটু অন্যরকম লেগেছিলো। আর দশটা অ্যাডের মতো জমকালো নয়। স্রেফ সাদার মাঝে কালো দিয়ে ছাপা। একজন প্রোগ্রামার চাওয়া হয়েছিলো। যোগ্যতা হিসেবে বলা ছিলো গণিতের প্রতি তীব্র মমত্ববোধ থাকতে হবে। এ ধরনের নরম বিশেষণ আজকাল চোখেই পড়ে না। সবাই ভীষণ তেতে থাকে। গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টি ধরিয়ে দিন, সুবর্ণ সুযোগ, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, এগুলোই এখন পেপার-পত্রিকার ভাষ্য। সেখানে গণিতের প্রতি তীব্র মমত্ববোধ।
ইন্টারেস্টিং লাগাতেই একটা অ্যাপ্লিকেশন ড্রপ করা ওর। তা গণিতের প্রতি মমত্ববোধ গ্রাউসের আছে বৈ কি। একদম ছোটবেলা থেকেই সংখ্যা ভীষণ টানতো ওকে। বাবা ছোট বেলায় ওকে সংখ্যার জাদু বইটা গিফ্ট করেছিলেন। সেই থেকে শুরু। গণিত অলিম্পিয়াডে ওর যে সাফল্য তাও সে কারণেই। যতো দিন গেছে ততো অবাক হয়ে গ্রাউস সংখ্যার শক্তি আবিষ্কার করেছে। পুরো বিশ্ব চরাচর বাঁধা পড়ে আছে সংখ্যাতেই। সব কিছুকেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায়। গ্রহ নক্ষত্রের পরিমাণ থেকে শুরু করে পরমাণুতে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন-প্রোটন সবই সংখ্যার শক্তিতে চলছে। একটি অরবিটালে কয়টা ইলেকট্রন থাকতে পারে তাও নির্ধারিত আছে সংখ্যাতত্বের ভিত্তিতেই। সংখ্যার ভিতরও কতো মজা। মৌলিক সংখ্যা, যৌগিক সংখ্যা কতো কী। সংখ্যাই যে সব কিছুর মূলে তা কম্পিউটারের দিকে তাকালেই পরিষ্কার বোঝা যায়। শুধু ‘শূন্য’ আর ‘এক’ এর কী দারুণ খেলা!
মিলানের একটি ফ্লাটে বসে সংখ্যা নিয়ে সাত-পাঁচ ভাবছে গ্রাউস। দেখছে আজকে ভাইভা দিতে কেবল ও-ই এসেছে। তবে যে ঘরে সে বসে আছে সেটা কিছুতেই কোনো অফিসের অভ্যর্থনা কক্ষের মতো নয়। ওকে প্রথমেই বাইরে জুতো খুলে আসতে হয়েছে। ঘরে সোফা-টোফাও নেই। সারা ঘরে আলো-আঁধারির খেলা। রিসিপশনে কম্পিউটার আর কয়েকটা ছোট ছোট চেয়ার। কেমন যেনো একটা পবিত্র ভাব খেলে গেলো গ্রাউসের মনে।
দেয়ালে কিছু বিমূর্ত ছবি ঝোলানো। এছাড়া কোথাও কিছু নেই। কিছুক্ষণ পর বেয়ারা এসে ওকে ভিতরে নিয়ে গেলো। ভেতরে ঢুকে হতাশই হতে হলো ওকে।
অফিসের বস এ রকম!
একটা শতরঞ্চিতে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন একজন। এক সৌম্যদর্শন লোক। মাথার চুল কামানো। পরনে গেরুয়া রংয়ের সেলাইবিহীন দুই প্রস্থ কাপড়। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। এ তো দেখি ধর্মশালার ভিক্ষু!
হ্যাঁ আপনি ঠিকই ধরেছেন…
গমগমে একটা কণ্ঠ গ্রাউসের চিন্তাসূত্র ছিন্ন করে দিল। চমকে গেল ও।
বাহ! থট রীডার নাকি?
ভদ্রলোকের ‘বসুন’ বলাতে গ্রাউস তাকিয়ে দেখল যে ওই ঘরে বসার জন্য চেয়ার-টেয়ার কিছু নেই। অগত্যা ভদ্রলোকের স্টাইলে মাটিতেই বসতে হলো তাকে। তবে মেঝেতে কোনো ধুলো-বালি নেই।
দেখুন মিস্টার গ্রাউস আপনার সিভি দেখে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আপনিই আমাদের কাজের জন্য সেরা লোক।
কিন্তু কাজটা কী?
আপনার প্রিয় বিষয় মানে সংখ্যা নিয়ে কাজ করা আর কি।
আপনাকে একটি বিশেষ সংখ্যা খুঁজে পেতে হবে যা সামনে থেকে আর পিছন থেকে একই রিডিং দেয়।
ভিক্ষুর মতো হলেও ভদ্রলোকের শব্দচয়ন আর উচ্চারণের পরিশীলতা নজর এড়াচ্ছিলো না গ্রাউসের।
ওহো! সরি! আমার পরিচয়টা আসলে আগেই দেয়া বিধেয় ছিলো-
আমি ধর্মাত্মা ত্রয়োদশ। পড়াশোনা ক্যামব্রিজে। তুলনামুলক ধর্মশাস্ত্রে ডক্টরেট করেছিলাম একসময়।
একটু ধাক্কাই খেলো যেনো গ্রাউস। হাইলি কোয়ালিফায়েড ভিক্ষু দেখা যাচ্ছে।
আবার বাস্তবে ফিরলো গ্রাউস।
ভদ্রলোক প্যালিন্ড্রমের কথা বলছিলেন। এটা একটা মজার বিষয় ওর কাছে। কিছু সংখ্যা আছে যা সামনে আর পেছন থেকে পড়লে একই পাঠ দেয়। যেমন ১২১। সাধারণত কোনো সংখ্যার সাথে তার বিপরীত সংখ্যা যোগ করলে প্যালিল্ড্রম পাওয়া যায়। ওই ১২১ যেমন এসেছে ৮৩ আর ৩৮ এর যোগফল থেকে। এই যোগ করার কাজটি একটি ধাপেই সম্পন্ন হতে পারে বা লাগতে পারে কয়েকটি থেকে শত শত হাজার হাজার ধাপ।
চাকরি মনে করলে চাকরি; ফান ভাবলে ফান। তবে এজন্য আপনাকে কম্পিটিটিভ স্যালারি অফার করছি আমরা। এরপর ভদ্রলোক একটা সংখ্যা বললেন। আবার বিষম খেলো গ্রাউস। স্বীকার করতে ওর দ্বিধা হওয়ার কথা নয় যে এতো স্যালারি নিজের জন্যও কখোনোই ভাবেনি
এখন বলুন, আপনি আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী কি না…
আপনারা ঠিক কী করছেন তা না জেনে তো কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারি না। এমনও তো হতে পারে আপনারা বেআইনী কোনো কাজ করছেন বা উগ্রবাদী কোনো সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা আছে আপনাদের…
রাইট।
কোনো দায়িত্ব নেয়ার আগে অবশ্যই সবকিছু ভেবে নেয়া দরকার। তবে এটুকু বলতে পারি আমরা কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের নই। ধর্মীয় সংগঠন তা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আর প্রকৃত ধর্মের ভেতর উগ্রপন্থার আসলে কোনো স্থান নেই।
আসলে গৌতম বুদ্ধের সময়কাল থেকেই আমাদের এই সার্কেল টিকে আছে। যদিও খুবই সীমিত আকারে। পৃথিবীর প্রায় সব স্থানে আমাদের মতাদর্শী কিছু লোকজন আছেন তাদের অনেকে আবার বেশ বিত্তশালী। তো তাদের আর্থিক সহায়তাই কাজ চলে যায় এর। ভগবান বুদ্ধের সমসাময়িক আরেক মনীষী ধর্মাত্মা প্রথম এর প্রবর্তক। আমরা তাঁকে বলি প্রভু ধর্মাত্মা। তো তিনি অনেক ধ্যান করে বের করলেন যে মহাপ্রভু বা পরমাত্মা এই বিশ্ব ভ্রহ্মা- তৈরি করেছেন সংখ্যার ইট দিয়ে। অর্থাৎ সংখ্যার পর সংখ্যা বসিয়ে তৈরী করা হেেছ জীব-জড়ের সমস্ত কিছু। গ্যালাক্সির বিন্যাস থেকে শুরু করে ক্রোমোজেমের ডিএনএর সিকুয়েন্স সবই সংখ্যার সাম্যে তৈরি। তাই প্রভু ধর্মাত্মা বললেন তোমরা সংখ্যার ভেতরেই পরমপ্রভুকে খুঁজবে। সেই থেকেই একটা দল অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেই সংখ্যা নিয়ে কাজে নেমে পড়লো। সংখ্যার হরেক রকম বিন্যাস আছে। সবই আমরা বিন্যাস করছি গত তিন হাজার বছর ধরে। শেষে এসে আটকালাম ওই প্যালিন্ড্রমের মধ্যে।
আমাদের বিভিন্ন দল বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করছে। তো আমার ওপর দায়িত্ব বর্তেছে প্যালিন্ড্রমের সমাধান করা। আমি তো আর প্রোগ্রামার বা সংখ্যা বিশেষজ্ঞ নই। আপনার সিভি দেখে আমার ধারণা জন্মেছে যে আপনিই আমার সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। ‘এটা তো খেলা। খেলার জন্য গাঁটের পয়সা খরচ করছেন?’ গ্রাউস বললো।
দেখুন গ্রাউস এটা আমাদের একান্ত ধর্মীয় বিশ্বাস। সবই কিন্তু বিশ্বাসকেই পুঁজি করেই জীবনপাত করছে। আমরাও তাই। তবে ধর্মের বিশ্বাসের কারণে হিংসা হানাহানি একদম পছন্দ করি না আমরা।
যা হোক আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো। রিসিপশনে আপনার জন্য একটা অ্যাপয়নমেন্ট লেটার রেখেছি। যাবার সময় নিয়ে যাবেন। টার্ম এ- কন্ডিশনস্ সব লেখা আছে। আমরা একটু কনজারভেটিভ বলে কিছুু বিধি-বিশেষ থাকবে। আপনি রাজি হলে আমাদের সাথে যোগ দিতে পারেন। তবে সিদ্ধান্ত দ্রুত জানাবেন আশা করি।
কারণ আপনাকে না পেলে আমরা দ্বিতীয় আরেকজনকে নেবো।
ওকে?
পথে বেরিয়ে গ্রাউস কিছুটা বিভ্রান্ত। আসলে সে কী করবে? যোগ দেবে এই পাগলামির সাথে; নাকি না করে দেবে?
আবার টাকার অংকটাও অবজ্ঞা করার মতো নয়।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেখেই মুগ্ধ হলো সে। পেশাদারিত্বের ছাপ সর্বত্র। টাকার অংকটা ফাঁকা। গ্রাউসকে যেকোনো সংখ্যা লিখে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। তিন মাসের অগ্রীম ওরা ওর অ্যাকাউন্টে আগেই নাকি পাঠিয়ে দেবে।
মজা করতেই যেন শূণ্য ঘরে ২০০০০০ অংকটা লিখে ও অ্যাকসেপটেন্স লেটার পাঠিয়ে দিলো।
চার দিনের মাথায় নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিশাল অংকের অর্থ জমা হবার খবর জেনে বেশ দমেই গেলো গ্রাউস।
লোকটা পাগলামি করছে না তাহলে? পুরো সিরিয়াস? কিন্তু ছোট্ট একটা কাজের জন্য এত টাকা!
নাকি কাজটা মোটেই ছোট্ট কাজ নয়?
একটা বড় প্রজেক্টের-প্যালিন্ড্রম।
শেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো গ্রাউস কাজটা নেবে। আর কিছু না হোক অ্যাডভেঞ্চার তো হবে।
এরপর একটা সপ্তাহ যেনো কাল বৈশাখীর ঝড়ে উড়ে গেলো। বাসা ছেড়ে দিয়ে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গেলো। সারলো ব্যক্তিগত কিছু কাজ । কিছু ধার দেনা ছিলো তাও মেটালো। কারণ চুক্তির শর্তানুসারে সে আগামী দুবছর চাইলেই ছুটি পাচ্ছে না। দুবছর পর কন্ট্রাক্ট বাড়তেও পারে নাও পারে।
একদিন অফিস থেকে জানানো হলো তিন দিনের বেসিক ফাউন্ডেশন ট্রেনিং নিতে ওকে কোয়ান্টামে যেতে হবে। ওখানে একটি টট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের। সেখানেই ট্রেনিং নিতে হবে। অন্যান্য নতুন কলিগদের সাথেও পরিচয় হবে সেদিন। রেস্ট হাউসে পৌঁছে গ্রাইস দেখলো অন্যরা কেউ তখনো আসে নি। ভ্রমনের ক্লান্তি দূর করতে দুপুরের খাবার  খেয়েই শুয়ে পড়লো ও। এরপর আর কিছু মনে নেই।
কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছে বলতে পারবে না। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন কোয়ান্টামের লাল রুক্ষ পরিবেশের বদলে সবুজ শান্ত একটা পরিবেশে নিজেকে আবিষ্কার করলো গ্রাউস। ও শুয়ে আছে ধবধবে সাদা একটি বিছানায়। ছিমছাম পরিপাটি ভাবে সাজানো একটি ঘর। লাগোয়া বাথরুমও আছে একটা। জানালার গ্রিল দিয়ে সামান্য দূরে বিশাল এক প্যাগোডার মতো স্থাপনা চোখে পড়লো । তাহলে রেস্ট হাউসে খাবারের সাথে ঘুমের বড়ি মেশানো ছিলো? তারপর ঘুমন্ত গ্রাউসকে কোনো গাড়িতে চাপিয়ে এখানে এনে রাখা হয়েছে? জায়গাটা পাহাড়ের মধ্যে। পাবর্ত্য অঞ্চলের কোথাও সন্দেহ নেইতবুও বেশ ভয়ই পেয়ে গেলো গ্রাউস।
আদম পাচারকারীদের হাতে পড়ে নি তো?
উঠে ফ্রেশ হতেই প্যাগোডার মতো স্থাপনায় নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। কয়েকজন আদিবাসী তাকে এসকর্ট করে নিয়ে গেলো। তারা দুর্বোধ্য কোনো ভাষায় নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলো। সেখানে গিয়ে ধর্মাত্মা ত্রয়োদশকে দেখে প্রাণে একটু পানি পেলো গ্রাউস। একমাত্র পরিচিত জন।
দুঃখিত গ্রাউস, হাস্যোজ্জ্বল মুখে শুরু করলেন তিনি, নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতেই আপনার ওপর একটু জুলুম করে ফেলেছি আমরা।
আমাদের প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও ভাব-গাম্ভীর্য বজায় রাখার স্বার্থে ব্যাপারটা জরুরি। আপনার ফ্যামিলির আপডেট নিয়মিতই আপনি পাবেন। প্রয়োজনে আমার স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে তাদের সাথে কথা বলতেও পারবেন। তবে এখানকার ঠিকানা আপনাকে বলা হবে না। তারাও জানবে না। যদি একান্তই কেউ চিঠিপত্র পাঠাতে চায় সেটি লন্ডন অফিস থেকে রিডিরেক্ট হয়ে এখানে আসবে। যাবেও লন্ডন ঘুরে। আপনার লেখা চিঠি অবশ্যই এডিট করবো আমরা। একটু পরেই আপনাকে বিজ্ঞানালয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আপনার কর্মস্থল হবে ওটাই। ওখানে একটা মোটামুটি শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার সিস্টেম গড়ে তুলেছি আমরা। ক্রে জাগুয়ারের মতো দানবীয় শক্তি না থাকলেও আমাদের পেটাক্লপস মেশিনটি একদম কমও নয়। সেকেন্ডে এক কোয়াড্রিলিয়ন হিসেব করতে পারে এইচপির এই মেশিনটি। বলা যায় দুলক্ষ উচ্চ গতির ল্যাপটরে সমতুল্য এই মেশিন। যেটায় কাজ করার পর গর্ববোধ করবেন আশা করি। এই অঞ্চলে এতো শক্তিশালী সিসেটম আর একটিও নেই।
সত্যি সত্যি মেশিনের সামনে এসে বিস্ময়ে প্রায় বোবা হয়ে গেলো গ্রাউস। যেনো পুরো একটি টি এন্ড টি এক্সচেঞ্জ। শত শত কেবিনেট, ওয়ার, মনিটর।
তবে ইনপুট দেবার সনাতন কী বোর্ড পদ্ধতি দেখে মনে সামান্য বল পেলো গ্রাউস।
ওর প্রজেক্টের নাম ‘প্রজেক্ট প্যালিন্ড্রম’। সব অনাবি®কৃত প্যালিন্ড্রম বের কতে হবে। কাজটি খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। মেশিনকে কয়েকটা লজিক দিতে হবে যেনো প্রতি সংখ্যার সাথে তার বিপরীত সংখ্যা সে অটোমেটিক যোগ করে যায় যতোক্ষণ না প্যালিন্ড্রম পাওয়া যায়। তার পর বসে বসে অপেক্ষাকখন সেরকম একটা সংখ্যা বের করা যায়।
গ্রাউস জানে যে এখন পর্যন্ত ১৯৬ সংখ্যাটিকে তার বিপরীত সংখ্যার সাথে হাজার বার যোগ করার পরও কোনো প্যালিল্ড্রম সংখ্যা পাওয়া যায় নি। তাই প্রথমে ১৯৬ নিয়েই পড়লো সে। প্রথম দুমাস দিন রাত খেটে সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় লজিক লিখলো ও। তারপর মেশিনে ফিট করে কাজ শুরু করে দিলো।
অনেক শক্তিশালী মেশিন। সেকেন্ডে এক হাজার ট্রিলিয়ন অংক কষতে পারে। মেশিন স্টার্ট করার সাথে সাথেই পুরো ঘর জুড়ে সেঁটে থাকা শত শত মনিটরে সংখ্যা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। একঘেঁয়ে ভাবে মনিটরের পর্দার ওপর থেকে নিচের নামছে সংখ্যাগুলো। কদিনের মধ্যেই একটা রুটিনের মধ্যে বাঁধা পড়ে গেলো জীবন। মেশিন মোট ষোল ঘন্টা চালু থাকে প্রতিদিন।
গ্রাউসকে সারাক্ষণ বসে থাকতে হয় না। ও মাঝে মাঝে এসে সামারি রিপোর্ট পর্যালোচনা করে। কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা তা বের করে। অনেকের সাথে পরিচয় হলো এর ফাঁকে। বোঝা গেলো তারা সবাই এই সংখ্যার কাজে খুবই আগ্রহী। মাঝে মাঝে ধর্মাত্মাও দর্শন দেন।
এক সময় কাজের উপর বিরক্ত ধরে গেলো গ্রাউসের।
একদিন ধর্মাত্মাকে কাছে পেয়ে ও প্রশ্ন করলো।
আচ্ছা এই সবচেয়ে বড় প্যালিন্ড্রম বের করার চেষ্টা করছেন সেটা কেনো করছেন? বের করতে পারলে কী লাভ হবে? ব্যাপারটা আপনার কানে কেমন শোনাবে জানি না। তবে আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে যে পরমপ্রভু একটি মিশন দিয়ে মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তা হলো তাঁর প্রকৃত পরিচয় খুঁজে বের করা। তবে তা লুকোনো আছে কোনো সংখ্যার মারপ্যাঁচে। আমাদের নানান দল নানান বিষয় নিয়ে কাজ করছে। যেমন আমরা আপাতত প্যালিন্ড্রম নিয়ে কাজ করছি। আমাদের ধর্মগুরুরা হাজার বছর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন যে হাজার বছর পরে হয়তো তার উত্তর পাওয়া যাবে।
উত্তর পেলে তারপর কী হবে?
আপনাদের মিশন তো তখন শেষ হয়ে যাবে। তখন?
তখন নিশ্চয় আমাদের আর কিছু করতে হবে না। যা করার পরমপ্রভুই করবেন।
শাস্ত্রমতে যে মুহূর্তে তার নামের কোড ব্রেক করতে পারবো আমরা ঠিক সেই মুহূর্তেই চিরকাঙ্খিত মাহেন্দ্রক্ষণটি এসে হাজির হবে।
কী সেই মহেন্দ্রক্ষণ?
মহাপ্রলয়…
বেশ কৌতুক অনুভব করল গ্রাউস। দুনিয়ায় কতো কিসিমের পাগল যে থাকে!
নামের কোড বের করতে পারলেই পৃথিবীর সমাপ্তি? একদম দ্যা এ-!
ধর্মাত্মা যে থট রিডার তা আগেই দেখেছিলো গ্রাউস। এবারও তার অবিশ্বাস দেখে একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা ভিক্ষুর ঠোঁটে দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেলো।
এরপর আরো ক’মাস কেটে গেছে। সেই একই বোরিং জীবন। আর ভাল্লাগছে না গ্রাউসের। ভাবছে রিজাইন দেয়া যায় কিনা। টাকা কিছু কম পেলেও এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।
আজই ধর্মাত্মাকে ব্যাপারটা বলতে হবে।
কন্ট্রোলরুমের চেয়ারে বসে তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিলো। হঠাৎ তির তির একটা শব্দে ঘোর কাটল গ্রাউসের। অবাক হয়ে দেখলো মনিটর স্থির হয়ে গেছে। লাল জিজিট গুলো সবুজ আলো হয়ে জ্বলছে। এমনই প্রোগ্রাম করেছিলো ও। সংখ্যা খুঁজে পেলে লাল ডিজিট সবুজ হয়ে যাবে। তার মানে ওই বিশেষ প্যালিন্ড্রম সংখ্যাটি পাওয়া গেছে।
সামারি শিট বলছে ১৯৬ কে মোট তের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মিলিয়ন বার যোগ পাটল্টা যোগ করার পরই মিলেছে এই বিশেষ সংখ্যা। সংখ্যটি বেশ বড়। ঠিক কতো বড় তা ভেবে বের করতে পারলো না গ্রাউস। তবে কেউ যদি সংখ্যাটি পড়তে শুরু করে তাহলে হয়তো কয়েক কোটি বছর লেগে যাবে।
সে যাই হোক..
প্রজেক্ট প্যালিন্ড্রম সফল সমাপ্তির মুখ দেখছে এটাই বড় কথা। এবার এমনিতেই এখানকার পাট চুকানো যাবে। ভাবতেই একটা ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিলো গ্রাউস।
তখনই খেয়াল হলো তির তির শব্দটা যেনো আরো বেড়েছে। সুপার কম্পিউটার যখন চলত তখনো তো এরকম শব্দ হতো না!
ভালো ভাবেই তাকাতেই ব্যাপারটা খেয়ালে এলো ওর। প্রায় প্রতিটি প্রসেসর কেবিনেটই একটু একটু কাঁপছে। যাচাই করতে কাছে গিয়ে একটাতে হাত ছোঁয়াতেই কাঁপনটা স্পষ্ট টের পেলো। ভূমিকম্প হলে যেমন কাঁপে প্রায় সেরকম। একবার ভাবলো ইন্টারকমে ধর্মাত্মাকে জানাবে। পরক্ষণেই কী হচ্ছে জানতে নিজেই বিজ্ঞানালয়ের বাইরে বেরিয়ে এলো। তখনই বুঝলো কারণটা।
সামনের বিশাল পাহাড়টা আড়াআড়ি দুভাগ হয়ে যাচ্ছে।
গ্রাউস ভয়ে বিস্ময়ে নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেললো।
ওর বিস্ফোরিত চোখের সামনে দিয়ে আজদাহা সাপের মতো ফাটলটা এগিয়ে আসছে ওরই দিকে।
মহাপ্রলয়!
———-

 

ভাবনার লেন্স  ।।  দীপ্ত উদাস

খপ কইরা হাতখান ধইর‌্যা ফালাইলো আরাখ্যান পরিচিত হাত। কণ্ঠটাও খুবই আপন আর পরিচিত। কিন্তু কিছুদিন যাবৎ অর উপর হগল ভালোবাসা, মায়া, মমতা ঘেন্ন্যায় ভইর‌্যা উঠছিলো। মাইকোরো বাসটার ধাক্কায় যেদিন পা থাইক্যা রিক্সার প্যাডেলটা ফসকাইছিলো তার লগে লগে জীবনের সব আশা-ভরসাগুলান ফসকাইয়্যা গ্যাছে। ঐ ঘটনার পর যে কত খরচ! জমানো ট্যাহা মাত্র ১৩৫০। ট্যাহার কথা হুনার লগে লগেই বাপ-দাদার মুখে হুনা ১৩৫০ সালের দুর্বিক্ষের কথা মনে পইড়্যা গ্যালো। তহন ভাবলাম আমার জমানো ১৩৫০ দিয়াই কি আমার জীবনের দুর্বিক্ষ আরম্ভ হইলো? চোখ দুইডা আর ভালো হইলো না। কোন উপায়ে তিন পোলা-মাইয়্যা আর বউডারে উপার্জন কইর‌্যা খাওয়ামু হেইড্যা আর ঠিক করতে পালাম না। যখনই এই চিন্তা মাথায় আহে তহন কাসার থালিতে চামুচ দিয়া বাড়ি দ্যাওনের মত ঠংংংংং কইর‌্যা ওঠে। মনডারে সামলাইতে পারলেও প্যাডের ক্ষুধারে সামলাইতে পারলাম না।
পরথম কয়দিন খাওনের সমস্যা হইলেও কিছুদিন পর আর অয় নাই। বউডা হন্ধ্যায় বাইরে যাইতো আর মাঝ রাইতে ঘরে ফিরতো। এই বড় শহরটাতে দিনে যেমন কামের অভাব অয় না তেমনি রাইতেও অনেক কামে ভাত অয়। যহন রাইত-বিরাইতে রিক্সা চালাইতাম তহন দেখছি। কতো প্যাসেঞ্জার যে নিয়া গেছি! কত যে অলি-গলি চিনছি! তয়, আমার বউডাও কি…!
আমি যে মালিকের রিক্সা চালাইতাম ঐ মালিক আমারে খুব ভালোবাসতো। তারই দয়ায় ৩০০ ট্যাহা ভাড়া দিয়া এই ঘরটাতে আমাগো ঠাঁই হয়ছিলো। আমার এ অবস্থা দেইখ্যা হেই ভাড়া সে মাফ কইর‌্যা দিছে। ৬০ বছরে পা দেওয়া সাদা ধবধবে দাড়িওয়ালা নুরানি চেহারার মানুষডা আমার বউডার উপর ক্ষিপ্ত হইয়্যা উঠলো। সেদিন যা বইল্যা গেলো; চোখ দ্ইুড্যা থাকলে তার কথার লগে লগে পোলা-পানগুলোনের চোখের পিটপিটানি দ্যাখতে পারতাম। খাওনের লাইগ্যা আমার বউয়ের এমন উপার্জন নাকি ইসলাম সমর্থন করে না। ‘পথের ধারে; মুসলমানের বাচ্চা হইয়্যা এইসব কাজ, ছি! ছি! ছি!’ এ নাযায়েজ কাম বন্ধ না করলে ঘর ছাইড়্যা দেওনের হুমকি দিয়া গ্যালো।
বউডার এমন রাত কইর‌্যা বাড়ি ফেরোনের কথা সারা বস্তিতে রাজ্য হইয়্যা গ্যালো।  বস্তির পোলা-পাইনগুলান বউডার দিকে খারাপ ইঙ্গিত দিতো, বাদ পড়লোনা আমার যুবতী মাইয়্যাডাও। চোখ দুইটা অন্ধ বইল্যা কান তো আর বন্ধ কইর‌্যা রাহন যায় না। গেরামের বাড়িতে যে ফির‌্যা যামু হেই রাস্তা তো তিন শতক জমি বিক্রি করনের লগে লগেই বন্ধ কইর‌্যা দিছি।
অর উপার্জনের কেনা ব্রিস্টল সিগারেটের ধোঁয়ায় অহন মনে অয় কলিজাডা সত্যি সত্যিই কালা হইতাছে। মহাজনের কতা হুননের পর থাইক্যা খাওন আর গলা দিয়া নামবার চায় না। গলায় আবর্জনার লাহান কি জানি আটকা পড়ে। এমন উপার্জন খাওনের আগে মরণই ভালো আছিলো। ভাইবাও কল্পনায় আনবার পারি নাই। আমার কপালডা এমন অইবো।
নিজের প্রতি ঘেন্ন্যার কথা নিজের মনডারে ছাড়া কাউরে বলতে পারি না। বাড়ির থাইক্যা বাইর হইলাম। আইজ কপালে যা আছে তাই অইবো। তবু অর হাতের খাওন আর খামু না। আর ফিরমু না ঐ পাপের মহলে, না খাইয়্যা মরমু, দয়া-দক্ষিণা নিয়া খামু, বাস, টেরাকের ধাক্কায় মরমু তবুও ঐ মাগীর হাতে…
‘এই হাড্ডি কাপানো যারে আমারে খুঁজতে খুঁজতে অ্যাতো দূর আইছো। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘইট্যা যাইতো! তাইলে আমার ক্যাডা থাকতো কইবার পারো?’ কোমল, স্নেহভরা অথচ বিচলিত সেই কণ্ঠটি। হাতটা আরো শক্ত কইর‌্যা ধইর‌্যা কইলো ‘আহো, এই হানেই বইয়্যা থাকো। আমার লগে বাড়িত যাইও।
মা শীতকালে ভাপা পিঠা বানানোর সময় আমি চাউলের আডার গুড়া নাড়তাম। আমার বউটা হাত ছাড়ানোর পর সেই রকম গুড়া আমার হাতে লাইগ্যা আছিলো। যেইহানে বইয়্যা আছিলাম ঐহান থাইক্যা খেজুরের গুড়ের ঘেরানে মায়ের কথা মনে পড়লো। তয় কি আমার বউ রাস্তার ধারে…
————

 

ওয়াকিল-হত্যার নেপথ্য-নায়ক  ।।  (সব চরিত্র কাল্পনিক)  ।। রফিক সানি

মেহেরুন ছাত্রাবাস। টিন শেড। পলেস্তারা খসা দেয়াল। ছাত্রাবাসের সিনিয়র বাসিন্দা ৫ জন। গিয়াস, তরুণ, প্রদীপ, কাফি ও রজন। তবে এ নাম গোপন বৈঠকের ও অপারেশনের। সবার মূল নামের পূর্বে সীল-মোহর এমডি আছে।  তবে সে নাম জাতীয় পরিচয় পত্র ও সার্টিফিকেটে সিমাবদ্ধ। জনসাধারণ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সকলে তাদের চেনে সার্টিফিকেটের নামে। অধিকাংশ নাম পিতা-মাতা রেখে ক্রেডিট অর্জন করেছে। দুটি নাম শুধু বিহ্বল করে দেয়। তার একটি হলো এমডি মীর জাফর। কি করে একজন পিতা অথবা মাতার পক্ষে আধুনিক বাংলায় সন্তানের এমন নাম রাখা সম্ভব! ভাবা যায় না। না কি তারা পলাশি ভুলে গেছে নাকি ইচ্ছা করে ভোলার চেষ্টা করছে। বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে এ নামও বিলুপ্ত হওয়ার কথা,  হয়ও। মীর জাফর নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদের সাথে দোসরতা করেন। সেই থেকে মীর জাফর মানে বিশ্বাসঘাতক। আর সে কারণে তারপর থেকে কেউ সন্তানের নাম মীর জাফর রাখে না। শুধু জাফর, আবু জাফর বা জাফরউল্লাহ অনেক শোনা যায়। যেমন জাফরউল্লাহ খান শারাফাৎ, বিশিষ্ট ধারাভাষ্যকার। যদিও মীর একটি বংশের নাম। ঐ বংশে কারো নাম জাফর রাখলে হয় কিন্তু কোনো মীর বংশে আর কোনো জাফরকে দেখা যায় নি। আমাদের এ জাফর মীর বংশীয় না। তিনি সৈয়দ বংশীয় মীর জাফর। তাদের এমন নাম  থেকে  তারা অবশ্য সেখান থেকে কাটিং সেটিং করে ছোট্ট নামে ডাকতে অভ্যস্থ। মীর জাফরকে তরুণ ডাকে মিরর বলে। সে নাকি তার ছায়া মিররের মধ্যে দেখতে পায়। মিররের বৈঠকী নাম কাফি। বাহ্যিক আচরণে কাফিরা না বরং মীর জাফরেরা সাবার কাছে খুব প্রিয়।
তাদের এ নাম বহুল উচ্চারিত হতে শোনা যায় ঐ ছাত্রাবসের ২০৬ নম্বর রুমে রাত্রি দ্বিপ্রহরে এবং অপারেশন স্পটে। ছাত্রাবাসে আরো ১২ জন আছে তাদের শিক্ষানবিস। আর বাকি ২৪ জন ঐ ১২ জনের টার্গেট প্রাপ্ত। কিন্তু তারা গোপন বৈঠকে আসতে পারে না। এ ৩৬ জনের সাংগঠনিক উদ্দেশ্য  গিয়াস, তরুণ, প্রদীপ, কাফি ও রজন পর্যায়ে যাওয়া। সবার জিন্দেগির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক। যে করেই হোক বাংলাদেশের মাটিতে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিধন করতে হবে ইসলামের শত্রু । সবাই এ ওয়াদায় কঠিন কমিটেড। এদের নেতৃত্ব দেয় তরুণ।
কিছুদিন আগে ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের মধ্যে ভীষণ গুলিবর্ষণ হয়েছে। উভয়ের উদ্দেশ্য ছিলো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যে দুটি পক্ষ এ যুদ্ধ করেছে তাদের এক পক্ষ তরুণদের মতাবলম্বী। যদিও তারা ঐ দলের না বলে দাবি করে। তারা মনে করে আমরা শুধু আল্লাহর গোলামি করি এবং তার সেবায়-ই সর্বদা নিজেদের নিয়োজিত রাখি। আমাদের সাথে অন্য দলের পথ ও মত মিলতেই পারে।  আর অপর পক্ষ সমান্তরালে চলা ঐ দলকে নিধন করার ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে মিথ্যা ট্রাইব্যুনালের নামে। তাদের ফাদারদের মেরে ফেলছে এক এক করে। যখন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল তখন দ্বিতীয় পক্ষের একজনকে দেখা যায় পিস্তল উঁচিয়ে সামনে থেকে অনবরত গুলি ছুড়তে। যেনো হলিউডের কোনো মহানায়ক। দৃশ্যটা বেশ দৃষ্টিনন্দন, উপোভোগ্য। ভার্সিটির প্রতিটি ছাত্র তাদের হার্ড ডিস্কের সংগ্রহে  রেখেছে। কিন্তু ‘দেয়ালেরও কান আছে’ বলে তারা দরজার শিকল লাগিয়ে পরে দেখে। অতি সঙ্গোপনে। গোপন বৈঠকে বসে বার বার ব্যাক ফরোয়ার্ড করে দৃশ্যটা সবাইকে দেখায় তরুণ। ‘এর নাম ওয়াকিল। ভালো করে দেখো তোমরা। আমাদের প্রথম টার্গেট।’ বলে তরুণ।
ওয়াকিল আকৃতিতে বেশ বলিষ্ঠ নয়। একেবারেই হালকা গড়ন। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির ঊর্ধ্বে নয়। যেকোনো অবস্থায় একজন সাধারণ মানুষ এক চড়েই ঘায়েল করতে পারে। কিšুÍ তার পিস্তল চালানো দেখে তা মনে হয় না। পেশায় একজন ছাত্র। যদিও ডিপার্টমেন্টে তার নাম নেই। পরিতাপের বিষয় অন্যখানে। সে যে দলের হয়ে জীবনকে বাজী রেখে সামনে থেকে যুদ্ধ করেছে সেই দলই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে কিছুদিন আগে। বহিষ্কার হওয়ার কারণ নিজের দলের নেতা সম্বন্ধে কটূবাক্য উচ্চারণ এবং তার রেষ ধরে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ। অবশেষে দলে একজনের অপমৃত্যু। তবে ওয়াকিল দাবি করে সে তার দলের ফাদারের আদর্শে বিশ্বাসী। যদিও কাজের বেলায় সে আদর্শটা  চুলায় যায়।
ভিডিও প্লেয়ার  মিনিমাইজ করে তরুণ একটি ফোল্ডার ওপেন করে। ফোল্ডারের নাম রাবি ক্যাম্পাস। ক্লিক করতেই আরো চারটি ফোল্ডার খুলে যায় ইস্ট, ওয়েস্ট, সাউথ ও নর্থ নামে। এবার তরুণ পাশে বসা বিশ্বস্ত একজনকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘কাফি, তোমাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিলো তার খবর কী?’ কাফি উত্তর দেয়,  ‘ভাই, কাজ যথেষ্ট। দুমাস ধরে আমি ওয়াকিলের উপর নজর রেখেছি। কখন কোথায় যায় কী করে তার খবর রেখেছি। ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ও আমাকে কাছে ঘেষতে দেয় নি। ওর পিছু ছাড়ি নি তবু । যেখানে ওয়াকিল যেতো আমি যেতে চাইতাম। খোঁজখবর নিতাম ফোন করে। আস্তে আস্তে ওর পাশে জায়গা করে নিলাম। ওয়াকিল আমাদের ডাকা একাটি হরতালের বিরুদ্ধে মিছিলে আমাকে নিয়ে যায়। মিছিলে কটটেল বিস্ফোরণে ও মারাত্মক আহত হয়। ওর আগের বন্ধুরা সবাই প্রাণের তাগিদে পালিয়ে যায়। আমি প্রাণ হাতে রেখে ওকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। এমন বিপদের সময় একমাত্র আমাকে কাছে পেয়ে ওর চোখ দিয়ে সেদিন অশ্রুর ফোয়ারা বইছিলো, ভাই।’ একথা বলতে বলতে কাফির গলাটা একটু ধরে আসে। একটু সময় সে থেমে আবার শুরু করে, ‘ভাই, ওয়াকিল আমাকে তার প্রকৃত বন্ধু মনে করতে শুরু করে। ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়লে আমি সাহায্য করতাম। ওয়াকিলও হুটহাট করে আমাকে মাঝেমধ্যে মোটা অংকের টাকা দিতো। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর কিছুদিন পর ওয়াকিল একটি মেয়েকে পছন্দ করল। তার একান্ত ইচ্ছা মেয়েটির সাথে প্রেম করা। দায়িত্ব এলো আমার উপর। এক কথায় দায়িত্বটা আমিই নিলাম। উদ্দেশ্য ওর সাথে বন্ধুত্ব অটুট করা। মেয়েটি কোনোভাবেই ওয়াকিলের সাথে সম্পর্ক করতে রাজি হয় না। সে বলে, “এরকম একজন ক্যাডারের সাথে প্রেম করে বিয়ের আগেই বিধবা হবো নাকি?” অবশেষে বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিয়ে এবং অস্ত্র দেখিয়ে তাকে রাজি করানো গেলো। চলতে থাকলো ওয়াকিল-রুবিনা প্রেম। আমার দায়িত্ব সেখানেই শেষ হলো না। ওদের সান্ধ্যকালীন অভিসারে আমি নিযুক্ত হলাম পাহারাদার। দিনে দিনে আমি ওয়াকিলের এত প্রিয় হলাম যে, ওর পকেটে রাখা প্রিয় রিভলবারটা পর্যন্ত আমাকে দিতো পাহারার সময়। এর মধ্যে আমি সিগারেট, মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল খাওয়ার অভ্যাস করে নিয়েছি। কোনো কোনো দিন পদ্মার চরে মধ্যরাতে বসে ড্রিংস্ করছি। মাতাল হয়ে পিস্তলে গুলি লোড করে আমাকে দিয়ে বলে, “নে ধর, আমাকে শুট কর তো কেমন পারিস।” আমি পিস্তল হাতে নিই। শক্ত করে দুহাত দিয়ে চেপে ধরি। ট্রিগারে ডান তর্জনি স্থাপন করে ভাবি এই হলো শ্রেষ্ঠ সুযোগ। গুলি ছুড়বো ঠিক ঐ মুহুর্তে আমার হাত কাঁপতে শুরু করে। আমি পারলাম না। ওয়াকিল আমার কম্পমান হাত দেখে মাতাল হাসি দিয়ে বলে, “যাহ শালা তোকে দিয়ে হবে না। দেখ্ আমাকে দেখ্।” তাই বলে সে নিজের মাথায় পিস্তলের নল স্থাপন করে। আমি মনে মনে ভাবিÑ যা শালা নিজে নিজে মর। মাতাল ওয়াকিলের কাজে আগ্রহ বাড়াতে আমি বলিÑ না তুই গুলি ছুড়বি না। মাতালকে যা বলা হয় তার উল্টোটা করে কি না। কিন্তু ওয়াকিল সত্যিই গুলি ছোড়ে না। এবার আমার দিকে পিস্তল তাক করে বলে “দেখ শালা কেমন করে মানুষ খুন করতে হয়।” ওয়াকিল একবার আমার দিকে একবার পিস্তলের দিকে তাকাতে থাকে। আমার প্রাণ ঠোঁটের আগায় চলে আসে। চোখ বড়ো হয়ে যায়। বুক ধপাস ধপাস করে কাঁপতে থাকে। আমার জীবনের অন্তিম সময়। আমি মনে মনে কালেমা পড়তে থাকি। আমাকে এমন বিহ্বল দেখে ওয়াকিল বলে ওঠে, “ ধুর বোকা তুই আমার বন্ধু না! তোকে মারতে পারি?” আমি তখন ওর বুকের সাথে মিশে আছি। চেয়ে দেখি ও আমাকে বুকে চেপে ধরেছে।’ কাফি একবার চোখ মুছে নেয়। আবার বলতে শুরু করে, ‘ও আমাকে সেদিন বলেছিলো “শোন্ কাফি আমি হলাম সাপের মতো। যে আমার মুখে একবার চুমু দেয় আমি তাকে কখনও দংশন করি না।” আজ আমি তাকে মারার ষড়যন্ত্র করতে পারবো না। আপনাদের সাথে আমি আর থাকতে পারবো না। আমি চলে যাবো।’
চরম শত্রুকে পরম বন্ধুতে পরিণত করার দীর্ঘ কাহিনি শুনে সবাই হতবাক। সবাই ভাবছে এরকম একজন কমিটেড মুজাহিদ কিভাবে বিপথগামী হয়! বিপথগামী হয়ে যদি কোনো সুপথে যায় তাহলে কথা থাকে না। কিন্তু ওয়াকিলের মতো একজন কাফিরের পথ অনুসরণ, এটা মেনে নেওয়া যায় না। তবে তরুণের মুখম-লে মোটেও অবাক হওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। কারণ কাফি ছিলো তার হাতের ক্রীড়নক মাত্র। তার সব কাজ তরুণই করিয়েছে আড়ালে থেকে। কিন্তু কাফির শেষ কথাটি শুনে একটু দমে যেতে হয় তাকে।  সে কয়েক সেকেন্ড থেমে ভেবে নেয় । হঠাৎ মনে দৃঢ়তা পায়। ভাবটা এমন যে, এটা কন্ট্রোল করা তার কোনো ব্যাপার না। সত্যিই তাই অপারেশন করতে গিয়ে এরকম অনেক ঝামেলা মেটাতে হয়েছে তাকে। মুহূর্তেই তার চোখে মুখে একটা উজ্জ্বল ভাব ফুটে ওঠে। সে বলে, ‘কাফি, এতো আবেগী হলে চলবে না। তুমি কি ভুলে যাচ্ছ যে তুমি একজন মুজাহিদ? তুমি আল্লাহর পথে জেহাদকারী। ওয়াকিল আল্লাহর ও আমাদের শত্রু। সে তোমার জাতির তোমার ধর্মের শত্রু। তাকে কতল করা আমাদের  জন্য ফরয। এ ভিন্ন তোমার ইহকাল পরকাল উভয় আশাহীন। তাছাড়া ভুলে যাচ্ছ কেনো তুমি আল্লাহর কাছে ওয়াদাবদ্ধ। ওয়াদা ভঙ্গকারী মুনাফিক। আর মুনাফিকের স্থান জাহান্নামের নি¤œস্থানে।’
কুইনিনের মতো কাজ হলো। এমন কোনো লোক নাই যে ধর্মের কাছে কাবু নয়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় কাফি। বলে, ‘ঠিক আছে ভাই , আমি আপনাদের সাথে থাকবো।’ যেনো এতোক্ষণ কোনো মিথ্যা ঘোরের মধ্যে ছিলো সে। দ্বীন প্রতিষ্ঠার ওয়াদা পালন করতে গিয়ে বন্ধুকে হত্যার জন্য উদ্যোগ নেয় সে। ‘বলুন ভাই, আমার কী করতে হবে?’
তোমাকে কিছুই করতে হবে না। তুমি শুধু ওয়াকিলের প্রতিদিনের রুটিন বলো।
ভাই, ও প্রতিদিন বেলা এগারোটার দিকে ঘুম থেকে ওঠে। উঠেই আমাকে ফোন দেয়। জানতে চায় আমি কোথায় আছি। তারপর…
আহা তোমাকে অতো ডিটেলস্ বলতে কে বলেছে? কাফিকে থামায় তরু। ‘শুধু সময় বলো, কাজ আর স্থান।’
ঠিক আছে ভাই, ১১টা ৩০মিনিটে ক্যাম্পাসে আসে। টুকিটাকিতে আড্ডা দেয় ঘণ্টাখানেক। তারপর ক্যম্পাসের বিভিন্ন যায়গায় বাইক নিয়ে শোডাউন দেয়। দুপুর ২টায় বৈশাখী হোটেলে যায় লান্স করেতে। বিকালে আবার আসে ৪টার দিকে। ৪টা থেকে ৫টা ৩০মিনিট পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকে বিভিন্ন যায়গায়। তারপর আসে রুবিনা। তারপর সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ঘোরে। তখন আমি একটু দূরে দূরে থাকি। এরপর সে রুবিনাকে রাখতে পশ্চিম পাড়ায় যায়। তখন আমি সাথে যাই না। সেখান থেকে এসে আমাকে নিয়ে…
থাক , আর বলতে হবে না। কাফিকে থামিয়ে তরুণ মাউস ধরে। ল্যাপ্টপ স্ক্রিনে থাকা ওয়েস্ট ফোল্ডারে ক্লিক করে সে। রুবিনা কোন হলে থাকে?’
খালেদা জিয়া হলে, ভাই।
ওকে, খালেদা জিয়া টুÑ আচ্ছা ওরা ঐ সময় থাকে কোন দিকে?
ইবলিশ চত্বর, ফোর্থ সাইন্স বিল্ডিং আর তুত বাগানের দিকে।
অভিসার কি প্রতিদিন করে? বলতে বলতে খালেদা জিয়া হল থেকে ইবলিশ চত্বর, ফোর্থ সাইন্স বিল্ডিং এবং তুত বাগানের ডেটিং স্পট পর্যন্ত রেড মার্ক করে।
ইবলিশ চত্বর থেকে খালেদা জিয়া হল এস্ট্রেট। দূরত্ব¡ ২’শ গজ। সবগুলোই সচল। ‘ক্রস’। ফোর্থ সাইন্স বিল্ডিং থেকে হলে যেতে একটি মোড়। দূরত্ব ৩’শ গজ। প্রতি ৭৫ গজে দুটি করে মোট ৮টি ল্যাম্পপোস্ট। ৪টি সচল। ‘ক্রস’। তুত বাগানের ডেটিং স্পট থেকে হল পর্যন্ত চারটি মোড়। তিনটি মোড় ঘুরতে হয় থার্ড সাইন্স বিল্ডিং এর পেছনে। দূরত্ব ৪’শ গজ। এখানে হলের দিকে ৬টি ল্যাম্পপোস্টের ৩টি সচল। অন্যদিকে ল্যাম্পপোস্ট নেই। ‘ইয়েস’ বলে তরুণ থার্ড সাইন্স বিল্ডিং এর একটি কোণ সংলগ্ন মোড়ে রেড সার্কেল দিয়ে মার্ক করলো। এবার সে কাফির দিকে তাকায়। কাফির বুকটা ধাক করে উঠলো। তরুণের প্রশ্ন :
যখন ওরা হলের দিকে যায়, বাইকের গতি কেমন থাকে?
ঘণ্টায় ৫কিলোমিটার, ভাই।
হুম, রোমান্টিক ড্রাইভিং। বলে সে ক্যালকুলেশন সিস্টেমে ক্লিক করে। নিজে নিজে একটা ক্যালকুলেশন করে বলে, ‘ওকে।’
তরুণ এবার স্ক্রিনে একটি ক্যালেন্ডারের ছবি আনে। কিছুক্ষণ পরখ করে দেখার পর সে একটি তরিখের উপর মার্ক করে। ২১ নভেম্বর। ডেটের নিচে অ্যাশ কালারে লেখা আছে স্কাই মে বি ক্লাউডেড। সবার উদ্দেশ্যে বলে সে
তারিখটি দেখে রাখো সবাই। এদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। বৃষ্টি হবে না। এদিনই আমাদের অপারেশন করতে হবে। ওকে? আমাদের মার্কিং স্পটে ওয়াকিলের আসতে সময় লাগবে এক মিনিট। আমি সবাইকে যাস্ট টাইমে একটি এ্যাকশন এসএমএস দেবো। এক মিনিটের মধ্যে কাজ করে চলে আসতে হবে। কাফি, তোমার কাজ হলো ২১ তারিখে ওয়াকিলকে তুত বাগানে নিয়ে যাওয়া, বাই এ্যনি কস্ট। এবং যখন ওরা  ডেটিং শেষ করে উঠবে তখন আমাকে একটা এসএমএস দেবে। রজন, তুমি যাবে বিদ্যুৎ অফিসে। এসএমএস পাওয়ার সাথেই ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ অফ্ করবে। ওখানে গিয়ে আমার নাম বললেই হবে, ওকে? আর প্রদীপ ও গিয়াস তোমাদের নেতৃত্বে দুজন করে মোট ৬ জন যাবে অপারেশনে। প্রদীপ কাজলা গেটে এবং গিয়াস থাকবে মেইন গেটে। মনে রাখবে বিদ্যুৎ অফ্ থাকবে মাত্র ৩ মিনিট। তবে সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে তোমাদের উপর এ দায়িত্ব এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে।
২১ নভেম্বর। সন্ধ্যা ৭টা। মেহেরুন ছাত্রাবাসে তরুণ ফোন হাতে কাফির এসএমএস’র জন্য অপেক্ষমান। এসএমএস আগে থেকেই রেডি করে রেখেছে সে। কাফি এসএমএস দিলেই হয়। চেহারায় কেমন উদ্বিগ্ন ভাব। ইজি চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে আর বাম হাতের গ্লাসের কালো পানিটুকু দুলে দুলে উঠছে। অধিক টেনশনে থাকলে তাকে এটা খেতে দেখা যায়। দেখা যায় বলতে, সে নিজে নিজে দেখে। ঐ সময় অন্য কারও রুমে ঢোকা নিষেধ। প্রতি চুমুকে সে ফোনের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
ওয়াকিল রুবিনাকে হলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাইক রেডি করছে। অনতিদূরে মোবাইল ফোন টিপছে কাফি। এই ফোনটি ওয়াকিলের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে দামি জন্মদিনের উপহার।
রিসিভার তুলে ভিসি সাহেব মিষ্টি কণ্ঠে যখনই বললেন, ‘হ্যাঁ, বাবা মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলো’ তখনই তাকে স্বগোতোক্তি করতে হয় ‘যাহ শালা, এখন লোড শেডিং দিলো কোন শালায় রে?’

বেশরম  ।। মানব মণ্ডল

রাজাধিরাজ আমি, গুলজার জাতিসত্ত্বা
হস্ত পদে এঁকেছি রাজনীতি-মোনালিছা
জনগণ ধুতরার হেমলকে শুভেচ্ছিত
চোখ খুললে কালকূটে হবে কালগ্রাসি।
আমি মন্ত্রীঝি ‘জনগণেশে’র বন্ধু
সম্মান সম্ভাষণে ট্যাকা, ঘুস কী?
আ মি    ভূ মি ব ল,    ব ড়    ‘ই-উ কি ল’
গরীবের রক্ত শোষণের উত্তরাধিকারী
আমি বিধানচন্দ্র, মহাচিকিৎসক
জীবনের বেচাকেনায় মাকালফলী।
আমি শিক্ষক, মহাপ-িত
আমার শিক্ষা রাজনীতির সুতার পাগড়ি।
তরুণ আমিঅতি দূর্বার
সুদুর্নীতির ঘিয়ে ঢেলেছি অগ্নি
আজ সারা দুনিয়ার জিন্দাকে বাদ
দূর্নীতির নীতিতে আমি মহাকাল।
হা হাহাহ হা হা
আমি ডিজিটাল আমি ডিজিটাল।

 

সবকিছু ভেঙে ফেলবো  ।। আহমেদ মেহেদী হাসান নীল
(তোমার মুখে আমার মুখ দেখি, তাই আয়না কিনি না। মোহনাতোমাকে।)

এসব আমি মানি না মানি নি মানবো না
আমি কিছু গড়ি না গড়ি নি গড়বো না
আমি শুধু ভাঙি ভাঙছি ভাঙবো
একবুক যন্ত্রণা; আমি মানুষ! অসহ্য অসহ্য
সংবিধান! কিসের বিধান? হাবিজাবি অসুখ অসুখ
পতাকা পুড়ছে, সিগারেট পুড়ছেÑআমি প্রথম নারীতে পুড়বো
চুম্বন ছাড়া আমার চলবে না
তিনভাগ জলে আমিও থাকি বৃষ্টিতে কী এসে যায়?
জলের ভয় আমি করি না করি নি করবো না
আমার কিছু ভালো লাগে না লাগে নি লাগবে না
সমাজ ব্যবস্থা-সস্তা রাজনীতি…
রাস্তার ছেলেটি এখনো ভিক্ষা পেলো না
তামাশা তামাশা
আমার চেয়ার চাই গদি চাই সংসদের পাশকৃত বিল চাই
পাশের বাড়ির বৌদির আঙুর চাই
তুমি ক্যামন আছো? জানতে চাই জানতে চাই
আমার বুকের অসুখ অ-কোষের বৃদ্ধি মাইগ্রেনের ব্যাথা
ওষুধ চাই ওষুধ চাই
তোমার জ্বর, মাসিক চলছে, ব্লিডিং হচ্ছে?
আমার পিঠে আঙুলের চাপ বাড়াওÑচুলের মুঠি ধরো
ব্লিডিং বন্ধ হবে
এসব আমি মানি না মানি নি মানবো না।

আমি যুদ্ধ বলছি  ।।  ইবনে মোজেজা

আমি যুদ্ধ বলছি বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিল থেকে
প্রতিটি বালুকণা পদাঘাতে উত্তপ্ত হয়েছিল আরও একটু
বালুময় লুটিয়ে পড়েছিল কতিপয় দোপেয় জন্তু
প্রতি ঘরে ঘরে আতঙ্কের একরাশ শুভেচ্ছাবাণী
আকাশে মেঘহীন গর্জন, হঠাৎ আগুনের ফুলকির দীপ্ত চমক
পদাঘাতে মৃতপ্রায় মাকড়ের অভিশাপ
‘তোরা জ্বলে পুড়ে রক্তাক্ত হয়ে মরবি’।
আমি যুদ্ধ বলছি সৈন্যের প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে
সবাই বলছে‘শান্তির জন্য যুদ্ধ চাই’।
কুচকাওয়াজ ওদের পশুবৃত্তির আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে
আর আমি যুদ্ধ, আমি হাসছি অট্টহাস্যে
আমি হাসছি পুলকে, আনন্দে, গলাফাটিয়ে চিৎকার করে
হা! হা! হা!
আমি থামবো না আর, আমি মানবো না আর
আমি দেখে নেবো এই পৃথিবীর রক্তাক্ত লাশ।
আমি ভাঙবো, আমি জ্বালবো
শান্তির আয়নাকে টুকরো টুকরো করে
পাঠিয়ে দেবো অশান্তির গহ্বরে।
সেখানে বিবেক, মনুষ্যত্ব আর প্রতিফলিত হবে না
পদাঘাতে ভূমিষ্ঠ করে; বক্ষ, ললাট ছিন্ন করে
আমি গড়বো মানুষের রক্তাক্ত স্তম্ভ।
আমি যুদ্ধ বলছি ধ্বংসস্তূপ থেকে
সেখানে সুন্দরের কোন ছাপ ছিলো না, কোন চিহ্ন ছিলো না
মৃত্তিকা তোলপাড় করে, ল-ভ- করে সব ধ্বংস করেছি আমি।
পৃথিবীর বুকে আমি সৃষ্টি করেছি বড় বড় সব গর্ত
সেখানে জন্ম নেয় নি আর কোন জীব, আর কোন উদ্ভিদ
আমি দূষিত করে দিয়েছি সেখানকার বাতাস।
আমি যুদ্ধ বলছি কবরস্থান থেকে
সেখানে ঝরা রক্তে জমাট বেধে চটচটে মরা মানুষের সমারোহ
আমি মানুষের দেহকে করেছি ছিন্নভিন্ন
অসংখ্য লাশ একযোগে সমাহিত হয়েছে সেখানে
কারো কারো হাড়কেও আমি করেছি নিশ্চিহ্ন
কবরস্থান নয়, শ্মশান নয়, আমি সৃষ্টি করেছি মৃত লাশের ভাগাড়।
আমি যুদ্ধ বলছি বৃদ্ধা জননীর জীর্ণ কুটির থেকে
ঐ জননীর বুক থেকে আমি কেড়ে নিয়েছি চার চারটে সন্তান
সন্তানহীন জননীকে আমি করেছি বুভুক্ষুু
সেখানে স্পর্শ করে নি আর কোন মানুষের পদচিহ্ন
তিল তিল করে নিঃশেষ করেছি ঐ বৃদ্ধা জননীদের।
আমি যুদ্ধ বলছি ভবিষ্যৎ মৃতপ্রায় পৃথিবীর হয়ে
পৃথিবী বলবে‘সেদিন বাতাসে ছিল না কোন অক্সিজেন
ভবনের ভাঙা স্তূপ ছেদ করে জন্ম নেয় নি আর কোন উদ্ভিদ
মড়ক ধরেছিল ঐ দোপেয় জীবদের, তারা আমাকেও করেছিল আহত’।
আর আমি যুদ্ধ…
আমি হাসবো প্রচ- অট্টহাস্যে ভিনগ্রহ থেকে
হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে বলতে থাকবো
মনুষ্যত্বের মুখোশ পরা যে জন্তু তার নাম নাকি আবার মানুষ!
হা! হা! হা! হা!
[এইমাত্র ভূমিষ্ঠ হলো যে শিশুটি সে কি জানে পাপ-পুণ্যের হিসাব নিকেষ? হোক সে জাতি নষ্ট, মিথ্যে আর অন্যায়ের জাতক; তার ঔরষে জন্ম হলো যে শিশুর কী তার পাপ? কষ্ট পাই যখন দেখি গুলিবিদ্ধ কোনো শিশুর লাশ ধরে হাহাকার করছে কোনো মা। বিষ্ফোরকের আঘাতে ঝলসে যাওয়া কোন শিশুর মুখম-ল পড়ে আছে রাস্তায়, আবর্জনার স্তূপে, কষ্ট পাই। যে সমাধান রচনা করে যুদ্ধ তা পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় শিক্ষিত মানুষ কেন যুদ্ধ ছাড়া করতে পারে না? তবে কি আজও শিক্ষা, মনুষ্যত্ব আলোকহীন বদ্ধ গুহায় ধরাশায়ী? কোন অর্থে যুদ্ধ হয় শান্তির পথ? মানি না যুদ্ধ, বীভৎস মৃত্যুকে ঘৃণা করি। আর তাই পৃথিবীর ময়লা পাতা থেকে মুছে যাক অন্যায়, মিথ্যে, অন্ধত্বের সকল লেখাযোখা। নতুন শিশুর হাসির ইসতেহারে মুখরিত হোক পৃথিবীর আকাশ-বাতাস। উদ্ভিদ আর প্রাণির অপরূপ মায়ায় মাখামাখি করুক মৃত্তিকার বিছানা। শিশুর চোখে মেখে দাও মায়া, তার হাতে তুলে দাও পুস্তক, তার কণ্ঠে মিলিয়ে দাও সুর। যুদ্ধ নয়; সুশিক্ষা, মানবতা হোক মুক্তির নিশান। আমার এ কবিতা পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সকল যুদ্ধে নিহত শিশুদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি। নক্ষত্রেরা যেমন আকাশে জ্বলে থাকে কী যেন এক আপন বৈভবে তেমনি শিশুগুলো নক্ষত্রের মতো জ্বলে থাক সকল মানুষের হৃদাকাশে।]

 

নৌকা  ।।  বাসুদেব পাল

গন্তব্য ঠিক; ঢেউয়ের পোশাক সমস্ত শরীর জড়িয়ে
বি”ক্ষণ জ্যোৎস্নাগুলোর আজ অবস্থান সেখানেই।
যাদের দ্যাখা যায় না কোনো কালে, মহাকালে
অথবা সময়ের কোলাহলে প্রতিষ্ঠিত মানুষের রূপ বাঙালিশাস্ত্রে।
অথচ মাঝরাতে তারা ছন্নছাড়া পাগলের মতো ধারণ করেভালোবাসা
ভাসিয়ে দ্যায় বুদ্ধির মূর্তি, রাজনৈতিক প্রেম, বন্ধুত্বের অপরাধ
-আর শেষ মন্তব্য।
যারা প্রেম লুকিয়ে রেখে খুন করে দুঃখকে,
বাঁচিয়ে রাখে; স্থান দ্যায় ভূমিতে, তোমাদের।
মস্তিষ্ক ঋণ দ্যায় জাতির কাছে,
অথবা রেহাই পেতে চায় সর্বদা জীবন থেকে
আপাতত তাদের অবস্থান আজ এখানেই।
কিন্তু দাবি কর, কখনো কখনো মামলাও কর-
এই নৌকার অধিকার নাকি তোমাদের;
মৃতরা ভূমিতেই থাকে, জেনে রাখো।

সাম্রাজ্য বদল   ।।  সদ্যসমুজ্জ্বল

সমস্ত পথ রোদে ভিজে আমি তোমার কাছে এসেছিÑ
পাগলের মতো অদ্ভুত বেদনা শুধু আমার কাছেই আছে জমা
দেবো বলে রতিক্লান্তির শোক ভুলে আবার এসেছি
তোমার যতেœ গড়া দর্পণে পূর্ণিমা হয়ে
তুমি ক্লান্ত হতে চাও, শুনেছি জলের কাছে
প্রভাতের শিশিরে পা ভেজাও দুপুরের ঘাস বলেছে গোপনে
আমি এসেছি পরমা ভেজাতে তোমাকে
ভালবাসায় নয়জলের সেনাপতি হয়ে কামনায়
সংকটে গড়া মুখে বেমানান তুমি এসো পরম-স্নানে;
রূপালি চাঁদ হাতে নিয়ে ভিজিয়ে দ্যাখো
তার ক্ষতে জমা থাকা বেদনা শুধু কাতরায়কয়
আরাধ্য দেবতার পূজা হয় না শেষ সাম্রাজ্য বদলে।

 

বিভীষণ ।।  অতন্দ্র অনিঃশেষ

কোন সে বিভীষণ তুমি ?
জ্বালা বাড়াও ক্ষুধার্ত প্রাণে ।
অসভ্য আবেগের হাতছানিতে
কেনো কাছে ডাকো আমাকে ?
কি মায়াজালে টানো ?
ভিতরে বাহিরে
সুরের তালের মতোই সমান্তরাল
পাখির কণ্ঠের ন্যায় আওয়াজ
পথের ন্যায় বিভক্ত
সমুদ্রের ন্যায় উত্তাল ।
অথচ,
আমার কঠিন মনন
তোমার সরলতার কাছেও হার মানায়
অথবা,
আমাদের জীবন, আমাদের শৈশব
এবং কিছু জমানো স্মৃতির বন্দিশালায়
কিংবা,
কাঁথার সুতার মতই
একপাশে খোলা আরেকপাশ ঢাকা
যৌবনের ঢেউ শুধু অঙ্গে লাগে না
লাগে তন্দ্রেও ।

আলোচনা