স্নান ৩২

স্নানভাষ্য
কেমন আছেন? এই প্রশ্নটা কাউকে করতে পারছি না। প্রশ্নটা অভ্যাস বশতো করে বসলে নিজেকেই পরিহাসের পাত্র মনে হয়। আমরা ভালো নেই। ভালো নেই বোবা গাছগুলোও। প্রত্যেকটি দিন যায় অনিশ্চয়তার তসবী গুনে। বন্দি পাখির অসহায়ত্বের কথা আমরা লিখেছি। আমাদেরটা লিখবে কে? দলা পাকানো ক্ষোভগুলো বুমেরাং হয়ে নিজেকেই দংশন করে। ভালো খবর বন্ধ্যা হয়ে গেছে। অনেকদিন আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলি নি। মানবিক যা কিছু সব স্থবির। লক্ষ প্রাণের বিজয় আগুনে ঝলসে গেছে। রুমমেট নিখিলদার বাড়িটাও পুড়ে ছাই। পাঁচ বছরের রুবেল আর লাল বল ছুঁবে না। ওর ডান হাতের কবজীটা এখন অতীত। রঙিনস্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
সঙ্কট যমদূতের মত জেঁকে বসেছে। এর সমাধান কোথায়? কে জবাব দেবে? কে জবাব চাইবে? কেন ওরা জবাব দেবে? জবাব দেওয়ার জন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে? নিরব। আমি। আমরা। সকলে। স্বপ্নপুরুষ মাদিবাও বেঁচে নেই।

উল্টোযান
সুমি শ্রাবণী

পি.কে বসাক লেনের তিন নম্বর গলি তার গন্তব্য। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোতে সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে তার অর্থাৎ বিনুর ফেরার সময় হয়। ব্যতিক্রম ঘটল আজ। আলোগুলো একবার জ্বলেই আবার নিভে গেল। বিনুর পায়ের গতিও দ্রুত থেকে দ্রুততর হলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চায়ের স্টল। কুপিবাতির স্বল্প আলো অথবা চুলার গনগনে আঁচে সেসব জায়গা পরিণত হয়েছে আলো-আঁধারিতে। এরকম একটি আলো-আঁধারিতে সহসা তার সঙ্গ নিল চারজন যুবক। পায়ের গতিতে সমান সামঞ্জস্য রেখে তারা সঙ্গী হয়ে উঠলো। অপেক্ষাকৃত ঘন অন্ধকারে ঘিরে ধরলো বিনুকে। বিনুর ভয়ার্ত চিৎকারে আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠার আগেই চিলের চেয়েও অধিক গতিবেগে একটি মোটর বাইকের আক্রমণে যুবকগণ হতবিহ্বল। পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠার পূর্বেই আগুন্তুকের চকিত নির্দেশে বিনু উঠে বসে মোটর বাইকে এবং জীবনের সঞ্চিত সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে তার বাহনকে।
কতটা সময় এভাবে বসেছিলো জানে না বিনু। সময়, কাল, যুগ বা শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রমণ শেষে ভেসে এল একটি সাবলীল কণ্ঠস্বর, ‘এবার নামতে হবে।’ মাথা তুলে বিনু তাকিয়ে দেখে তার পরিচিত বাড়ির গেট। তার নিজের বাড়ি। বিনু   রাস্তায় নামে এবং নিয়ন আলোয় স্পষ্ট দেখে যুবকের মুখ। হ্যাঁ! এ মুখ তার চেনা। কোথায় দেখেছে মনে করতে না পারলেও বিনু নিশ্চিত এ তার চেনা মুখ। মোটর বাইক আরোহী জানায়, তার নাম অতীশ। পি,কে বসাক লেনে তার বন্ধুর বাড়ি। বিনু তাকে এভাবে উদ্ধার করার জন্য ধন্যবাদ দিতে ভুলে না কিন্তু তার বাড়িতে কোন আমন্ত্রণও জানায় না। কারণ, বি.এ পাশ করা বিনুর সন্ধ্যাবেলার এই টিউশন শেষে বাড়ি ফেরা তার বাবা-মা দু’জনেই মেনে নিতে পারে না। উপরন্তু তার এই হঠাৎ বিপদের কথায় তাদেরকে অধিক বিচলিত করা বিনুর ইচ্ছাবিরুদ্ধ ছিল।
এরপরের দু’তিন দিন অজানা ভীতি বিনুকে সন্ধ্যার পূর্বেই ঘরে ফিরিয়ে আনে। ভাবে, অতীশের বলা শেষ কথাগুলো, এসব গলি ঘুপচিতে অন্ধকারে ভালো মেয়েরা চলে না। শুধু আপনাকে চিনি বলেই এভাবে উদ্ধার করলাম। তাছাড়া অতীশের কাজই হল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। বিনু বোঝে না একটি সদ্য পরিচিতা মেয়ের সাথে এ ভাষায় কথা বলা অতিসরলতা না বাতুলতা। তবে এটুকু বোঝে, আর একটি বার তার দেখা পাওয়াটা আবশ্যক। এই চিন্তাই বিনুকে পরপর তিনদিন নিয়ে গেল সেই দুর্ঘটনার স্থানে। তার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য তাতে তৃতীয়তম দিনে পৌঁছে দিল অতীশের কাছে। রাস্তার নিয়ন আলোয় হেঁটে হেঁটে তারা এতটা সময় পার করে যে দু’জন দু’জনের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যত কল্পনা অবধি জেনে যায়। অতীশ বিনুর কাছে প্রকাশ করে তার জীবনের গভীরতম দুর্বলতার কথা। প্রথম দিন যা বলা সম্ভব হয় নি। আসল কথা হল এই যে অতীশ বিনুকে অনেক দিন ধরেই চিনতো এবং জানতো। তবে চারবার বি.এ ফেল করা অতীশ জানতো না কোন যোগ্যতায় তার ভালো লাগার কথা বিনুর কাছে প্রকাশ করবে। তার ভালো গালার এই প্রকাশ তাকে জীবনের চূড়ান্ত প্রাপ্তির দিকে নিয়ে গেল। আর বিনু তার বহু আদর যতে লালিত জীবনে এমন সরলতার দেখা পেয়ে মুগ্ধ, হোক অতীশ বি.এ ফেল কিন্তু পাশ করতে কতক্ষণ।
অতীশ বিনুকে কথা দেয় এবারে সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তাকে যে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতেই হবে। কিন্তু পরিস্থিতি তো পাল্টাবার নয়। অতীশের এত দিনের চেনা পরিমণ্ডলে সে সহসা বদলে যেতে পারলো না। আগের মতই অন্যের বিপদে যখন তখন ঝাপিয়ে পড়ে সাহায্য করা, নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজের চেয়ে অন্যের তুচ্ছ কাজকে অধিক গুরত্ব সহকারে পালন করা এবং দিন রাত পরিবারের লোকজনদের মন্তব্য,  তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তোর আর ঘরে বসে লেখাপড়ায় কাজ নেই ইত্যাদি শুনে অতীশ প্রতিবারের মতো এবারও তার ভাগ্যবদল করতে সমর্থ হল না। শুনে বিনুর খারাপ লাগলেও বাবা-মায়ের কাছে নিজের ভালো লাগার কথা জানাতে দ্বিধা বোধ করে না। একমাত্র সন্তানের এই কথায় তাদের আপত্তির যুক্তিসঙ্গত অজস্র কারণ, তাদের কটুক্তি বা মায়ের চোখের জল কোনটাই বিনুকে নিরুৎসাহিত করতে পারলো না। বরং আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে তার পাল্টা যুক্তি ছিল, মা তুমি তো উপার্জন কর না তাহলে তোমার আর বাবার সংসার সুখের হল কিভাবে?’ আর অতীশ আজ কিছু করছে না কিন্তু কালও যে করবে না তাতো নয়। তার মতো এমন পরোপকারী হিতাকাক্সক্ষী ছেলে কখনোই খারাপ হতে পারে না।’
অতীশের বাড়িতে তাকে বাঁধা দেওয়া বা বিনুকে বরণ করা কোনটাই ঘটল না। প্রত্যক্ষ সাহায্য না করলেও বিনুর বাবা-মা আশীর্বাদ করতে কার্পণ্য করলেন না। সে আর্শীবাদ আর অসীম ভালোবাসাকে ভিত্তি করে দু’জনে গড়ে তুললো ছোট্ট একটা ঘর; তথাকথিত সঙ্গার বাইরে যার বিচরণ। এই সংসারে স্ত্রী বিনু সকাল সকাল সাংসারিক কাজ কর্ম সেরে বেরিয়ে পড়ে স্কুলে মাস্টারি করতে এবং তারই রেখে যাওয়া হাত খরচের নির্ধারিত টাকা সম্বল করে অতীশ যায় পরোপকার করতে। তবে হ্যাঁ, এই সংসারে কোন অশান্তি ছিলো না। কারণ তখনো পর্যন্ত কোন অভিযোগ কোন বিরূপতা প্রকাশ পায় নি। বিনুর মুগ্ধতার ঘোর তখনো কাটে নি পরোপকারী অতীশের প্রতি। গল্প চলছিলো এভাবেই কিন্তু আবির্ভাব ঘটে এক নতুন প্রেক্ষাপটের। উল্টোধারায় চলমান এই দম্পতির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে সাত বছরের ছেলে অন্তুর। তাদের দু’কামরার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অন্তুর বাস। অন্তুর বাবা প্রবাসী। মা তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সাত বছরের ছকে বাঁধা জীবনে সে নতুন স্বাদ পায় বিনু অতীশের সংস্পর্শে এসে। তারাও অপরিসীম øেহে তার প্রবাসী বাবার অপূর্ণ স্থানটিকে পূর্ণ করে তোলে। আর মনের  গহীনে লালিত সন্তান বাসনায় তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠে বারবার। তা বাস্তব রূপদানের সাধ থাকলেও সামর্থ্যের অপ্রতুলতা বিনুকে নিরন্তর খুঁচিয়ে মারে। তার একাগ্র চাওয়াকে মূল্য দিতেই অতীশ শুরু করে এক নতুন জীবন। টাকা উপার্জনের জন্য তার চেষ্টা বিড়ম্বনায় রূপ নেয়। কোন কাজেই বেশি দিন সে ধৈর্য রাখতে পারে না। তাদের সঞ্চিত সামান্য টাকা থেকে ছোট ছোট ব্যবসায় টাকা খাটায় সে। লাভ তো নয়ই বরং লাগানো অর্থ ফেরত পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারে না অতীশ। আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, বলে ঘরে ফিরে অলস বসে থাকে অথবা ছোটে পরোপকারে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটে প্রেক্ষাপটের। বিনু চায় তার স্বামীকে অন্যরকমভাবে দেখতে। পরমুখাপেক্ষী আর পরোপকারী অতীশ স্ত্রীর সাধ পুরন করতে অক্ষম। সক্ষম, উপার্জনকারী এক নতুন অতীশকে দেখার আশায় স্ত্রী বিনু দিনের পর দিন দুর্ব্যবহার করে তার সাথে। সে সময় অতীশের একমাত্র নির্ভরতা অন্তু। শিশু মনের স্বাভাবিক উচ্ছ্বলতায় অতীশের সব মলিনতা দূর হয়। কিন্তু ঘরে বাইরে সমান পরিশ্রান্ত বিনু ক্লান্ত বোধ করে সংসারে। কষ্ট পায় ফেলে আসা অতীতের জন্য, বাবা-মাকে ভুল প্রমাণ করতে না পারার জন্য। এ কষ্ট তাকে নিরন্তর পোড়ায়। বলে, ‘এভাবে হাত পেতে টাকা নিতে তোমার লজ্জা করে না?’ সারাক্ষণ তো দুনিয়ার অশান্তি দূর কর, এদিকে আমি যে ঘরের ভেতর অশান্তির আগুনে পুড়ছি তার কি হবে? যতদিন না তুমি আমাদের সংসারে শান্তি আনতে পারবে ততোদিন তুমি আমার জন্য ছাড়া কারো জন্য কিছুই করতে পারবে না। এক সময়ের পরোপকারী অতীশ মুগ্ধ বিনু আজ প্রায় উন্মাদ। প্রলাপ তার থামে না, ‘এতোদিন যা করেছো এখন নিজেকে বদলাও।’ ‘আমাকে বদলাতে যেও না বিনু। তোমার এতদিনের চেনা অতীশ বদলে গেলে তুমি সহ্য করতে পারবে তো? অতীশের এমন কথায়ও নিসক্রান্ত হয় না সে। সে বলে, বাইরে কাজ করতে পার না ঠিক আছে, ঘরের কাজে তো আমাকে সাহায্য করতে পারো? না কি তাতে তোমার পৌরষত্বের হানি হবে?’
বিনু শোন একটু বস। বল আমাকে কী কী করতে হবে, আমি তোমর চাওয়া পূর্ণ করব। বদলাব আমি। যতদিন বাইরের কোন কাজ না পাই ততোদিন ঘরের সব দায়িত্ব আমার।’
অতীশের কণ্ঠের শীতলতায় বিনু সম্বিত ফিরে পায়। ভাবে, ‘এ আমি কি করলাম!’
লাশকাটা ঘরের হিমশীতলতা আর অসহ্য নিরবতা ছড়িয়ে পড়ে বিনুর সংসারে। চেনা পরিমণ্ডলে অচেনা হাওয়ার ঝড় ওঠে। পরদিন বিনু স্কুল থেকে ফিরে বিনুর চোখে পড়ে বাড়ির বাইরে অস্বাভাবিক জটলা। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। মুহূর্তে দুলে ওঠে তার সমগ্র বিশ্ব, ধাপ করে বসে পড়ে সে, খাটিয়ায় শোয়ানো দেখে তার প্রিয় অন্তু। অবিশ্বাসী চোখে পুনর্বার পরোখ করে। কি ঘটেছে তা সত্য, তবে কীভাবে ঘটল অন্তুর এই চরম পরিণতি জানার ব্যাকুলতায় মাথা তুলে তাকায়। খোঁজে চেনা মুখ অতীশকে। না, নেই। অতীশ নেই প্রিয় অন্তুর এই দুর্ঘটনায় সে এসে দাঁড়ায় নি তার পাশে। তার চলে যাওয়াকে সম্মান জানাতে অথবা কোন সহযোগিতা করতে। বিনুর কানে আসে জটলার দুএকটি কথা।
পা পিছলে পড়েছে ছাদের উপর থেকে।
সাত তলার ছাদ। সে কি কম কথা?
কিন্তু সাথে সাথে ডাক্তারবাড়ি নিয়ে গেলে হয়তো বাঁচতো। কেউ তো তখন বাড়িতে ছিল না, ওর মা একা। বেচারি… আর কোন কথা কানে আসে না বিনুর। নিঃশ্বাসে ছুটে যায় তার ঘরের দরজায়। দ্রুত হাতে ঘা দেয় দরজায়। অতীশ ধীর পায়ে দরজা খুলে আবার ফিরে যায়। বিমূঢ় বিনুর প্রশ্ন, ‘তুমি কি জান আমাদের অন্তুর কি হয়েছে?’ উত্তর আসে বরফশীতল কণ্ঠে, ‘জানি কিছুটা তবে যাই নি। ঘরে অনেক কাজ ছিলো। তাছাড়া ঘরের খেয়ে আর কত পরের উপকার করবো বলতো?’
বিস্ময় কাটে না বিনুর। এই বদল তো সে চায় নি! অজান্তে হত্যা করেছে তার ভালোবাসাকে! অনুতপ্ত বিনু বসে থাকে নিথর।

হোঁচট
দীপ্ত উদাস

পৃথিবীতে এতো ঘটে যাওয়া ঘটনার মাঝে আমিও একটি ঘটনার ফ্রেমে আটকে গিয়ে স্মৃতি হয়ে গেছি। মাথার উপরে ঘূর্ণায়মান সিলিং ফ্যানটি ঘুরে ঘুরে আমাকে সরবরাহ করছে বাতাস। কিন্তু মস্তিষ্ক ও মনের শীতলতা আসছে না। আজই একটি ইলেকট্রনিক দোকানে গিয়ে মন ও মস্তিষ্ক শীতল করা সিলিং ফ্যান কিনবো। এতো সুন্দর ভাবনায় ছেদ ঘটালো মোবাইল ফোনটা। খুবই ইমারজেন্সি একটি ফোন। রিসিভার বাটনটিতে চাপ দিয়েই শুধু বললাম ‘এইতো আমি রেডি, আর বেশি সময় লাগবে না।’ তাড়াহুড়ো করে রেডি হলাম। বাইরে বেরিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। রাস্তায় কত মানুষের শত ছোটাছুটি। কাঁচা তরকারি বিক্রেতা, নতুন চাকুরি পাওয়া ফরমাল ড্রেসের কেরানি, প্রেমে পড়া ভাবুক রোমিও, সদ্য ছ্যাকা খাওয়া হেলাল হাফিজ, ফুটপাতে দুই টাকা প্রার্থী ছেঁড়া ফরমাল ড্রেসের শিশু, সব ঘটনাকে ছাপিয়ে আমার দৃষ্টি কেবল বাসটার পথের দিকে। এই মুহূর্তে মোবাইলটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। তাতে বারবার সময়টা দেখছি। এমন সময় পেছন থেকে কে যেনো ডাকলো আমার নাম ধরে। ‘ওই সুজন, কৈ যাবি?’ ফিরে অবাক হলাম ঐ যুবকটিকে দেখে। যুবকটি আমার ছোট বেলাকার বন্ধু। মাছ খাবার পর একটি ছোট কাঁটা আটকে থাকার মতো আমার পেছনে লেগে থাকে। এক সাথে স্কুল পালানো থেকে শুরু করে পরীক্ষার খাতায় ফেল পর্যন্ত করেছি। শাহরিয়ারকে বললাম ‘আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বের হয়েছি। যদি তাতে সাকসেস হই তবে ডিটেইল শোনাবো। এখন সময় নেই বাস চলে এসেছে।’ বলে লাফ দিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। ওঠার পর হাফ ছেড়ে বাঁচার মতো অবস্থা। বাসে উঠেই মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। ভাবতেই পারি নি যে এমন একটা সুন্দর ব্যবস্থা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এই সময় বাসে চারটি সিট ফাঁকা থাকা অপর দিকে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে কি এগুলো কারো জন্য অগ্রিম বুকিং! না, না, একে তো লোকাল বাস তার উপর বুকিং! ভাবনার ধারণার উপর নিজের প্রতিই কটাক্ষ করতে ইচ্ছা হলো। সব ভাবনার অবসান ঘটিয়ে একটি সিটে বসে শার্টের কলারটা ঠিক করে নিজের বাহাদুরি ঘোষণা করে পাশের জানালাটা খুললাম। জানালা দিয়ে সকালের রোদের সাথে বাতাসটা মন মাতিয়ে দিলো। তখন আশেপাশের অন্যান্য প্যাসেঞ্জার এর অবস্থান দেখার জন্য মাথাটা ঘোরালাম। একি? সবাই আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে কেন? সবাই যেভাবে দেখছে তাতে মনে হচ্ছে আমি পুরুষ থেকে মাইগ্রেশন করে সুন্দরী যুবতী হয়ে গেছি। তবে চাহনীর মাঝে কটাক্ষের পাশাপাশি তিরস্কারও আছে। সবার দৃষ্টি আমার দিকে আর আমার সিটের পাশে জানালার উপর। তাই একটু কষ্ট করে হলেও বৃষ্টি প্রত্যাশিত কৃষকের মতো মাথাটা বাঁকা করে উপরে চাইলাম। ওখানে লেখা ‘সংরক্ষিত আসন (মহিলা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য)’। ওটা দেখার পর মনে মনে নিজেকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। তাতে যে যুক্তি দাঁড় করালাম তাতে এই সিটটি না ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো উপায় পেলাম না। কেউ যেমন কিছু না বলে অবাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করছিলো তেমনি আমিও চুপসে যাওয়া আঙুরের মত দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের লোকবল ভারী করলাম। ততক্ষণে আমাদের সাথেও আরো লোকজন জমতে শুরু করেছে। বামে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের পারস্পরিক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেটা ব্রেক সম্পর্ক। ড্রাইভারের ব্রেক চাপার সাথে সাথে যাত্রীদের ধাক্কা লাগা ও সম্পর্ক গাঢ়ো হওয়া। এই সম্পর্ক যখন গাঢ়ো হচ্ছিলো তখনই বাসের জানালার উপরের লেখাটি চোখে পড়লো ‘পকেট সাবধান’। লাল রঙে লেখাটি দেখে ছ্যাৎ করে বুকে একটা ধাক্কা লাগলো। বিদ্যুৎ বেগে ডান হাতটি দিয়ে মোবাইল আর মানিব্যাগ পর্যবেক্ষণ করে স্বস্তি পেলাম। একটু সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করলাম। কারণ সুপ্তির কলেজটা যে দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার বিপরীত দিকে। ঘুরতে গিয়েই একজন যাত্রীর পায়ের উপর পা পড়াতে কাউ করে চিৎকার করে উঠলো লোকটা। আমি হতভম্ভ হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করছি এই সময় সিটে বসে থাকা একজন যাত্রী জিহ্বা ও তালুর সাহায্যে বিশেষ এক চুক চুক শব্দ করলো। বিব্রতকর অবস্থায় বাঙালি যে কতোটা তিরস্কার  প্রবণ হয়ে ওঠে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। সুপ্তির কলেজ শেষ হলেও ওকে আর নজরে পড়লো না। ভাবলাম ও বুঝি আগেই নির্ধারিত স্থানে চলে গেছে। তবুও সুপ্তিকে দেখবো বলে সিটে বসে থাকা যাত্রীর মাথার উপর দিয়ে জানালার দিকে মাথাটা বাড়াতেই কাঁধে একটি হাত পড়লো। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম চোখ দুটো লাল, পনের দিন দাঁড়ি না কামানো, হাতে একপেটি বিভিন্ন মানের টাকার নোটের একটি মানুষ। মুখে পানওয়ালা হাতে নোটওয়ালা লোকটি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন ‘দেইখ্যাতো শিক্ষিতই মনে হয়। বাস চলতি অবস্থায় মাথা বাইর করতাছেন ক্যান। বমি করবেন? তাহলে কন, বাসের থইন নামাইয়া দেই। মন ভইর‌্যা বমি করেন।’ লোকটির ক্ষমতার দৌরাত্ম্য দেখে বাসে তার পজিসন সম্পর্কে আমার ভাববারও দরকার হলো না। মাথা তুলতে তুলতে বাসের অন্য দিকে তাকাতেই দেখি সেখানে লেখা ‘বাস চলতি অবস্থায় জানালা দিয়ে মাথা বের করবেন না’। ‘দ্যান ভাড়া দ্যান’ লোকটি আমাকে ইশারা করেই বললেন। মানিব্যাগ বের করে খুচরা টাকা না পেয়ে পাঁচশো টাকার নোটের সাহায্যেই দশ টাকার ভাড়া মেটাবার জন্য তার দিকে এগিয়ে ধরতেই লোকটি চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘দ্যাখতাছেন না ঐহানেতো লেহাই আছে পাঁচশো ও এক হাজার ট্যাকার নোটের ভাঙতি নাই। ভাঙতি ট্যাহা দ্যান নাইলে সামনে ইস্টপে নাইমা যান।’ বড্ড রকম বিপদে পড়ে গেলাম। কন্ট্রাকটারকে বললাম ভাই আমাকে সময় দেন আমি টাকা ভাঙতি করে ভাড়া দিচ্ছি। অপরিচিত মানুষ বলে কোনো যাত্রী ভাঙতি দিতে চাইলো না। শেষ পর্যন্ত আশার বাণী তো দূরের কথা ভাঙতিও দিলো না। বললো যে, ‘পঞ্চাশ ট্যাকার বাদাম নিলে ভাঙতি দিমু।’ এতো টাকার বাদাম নিয়ে যে বাসযাত্রীদের বিলি করবো সে পথ তো বন্ধ করে দিয়েছে ওই লাল কালির ‘যাত্রা পথে অপরিচিত ব্যক্তির হাতে কিছু খাবেন না’ কথাটি। যাই হোক, বাদাম স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, উহা এইডস হবার ঝুঁকি কমায়, বাদামে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম থাকে, উহা টিপে টিপে সময় কাটানো যায়, আমি আর সুপ্তি মিলে পার্কে বসে সময় কাটাইবো।’ বাদামের ঠোঙাটি পাশের ব্রেক সম্পর্ক গড়ে ওঠা একজনকে রাখতে দিয়ে চারশো পঞ্চাশ টাকা গুনে ফেরত নিলাম। তারপর পানখাওয়া লাল দাঁতের হরেক মানের টাকার নোটওয়ালা লোকটাকে ডেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটা দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। এমন সময় বাসের হেলপার চিৎকার শুরু করলো, ‘সি.ও বাজারের যাত্রীরা গেটে আসেন।’ আমিও সেখানেই নামবো। তাই তড়িঘড়ি করে বাসের গেটের সামনে যাচ্ছি আর ভাবছি, আমার গন্তব্যে এসে গেছি। সুপ্তি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে, গিয়েই ওকে সারপ্রাইজ দেবো। যতো কথা জমে আছে সবই আজ বলবো। আচ্ছা ঐ সময় যদি নার্ভাস হয়ে যাই তবে কি করবো? এই সব ভাবতে ভাবতে বাসের গেটের কাছে আসতেই তার উপরের লেখাটি চোখে পড়লো। আবারো লাল রঙের কালিতে লেখা। এতক্ষণ থেকে এই লাল রঙের লেখাগুলো কেবল বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কিন্তু এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত যে উপকারটি করলো তাতে আমার পঞ্চাশ টাকা বেঁচে গেলো। সেই লেখাটি দেখে আমি ব্রেক সম্পর্কের বন্ধুটির হাত থেকে বাদামের ঠোঙাটি নিয়ে আসলাম। ‘জনাব কিছু ফেলে গেলেন কি?’ কথাটি যিনি লিখেছেন তাকে ধন্যবাদ দিতে দিতে বাম পা না দিয়ে ডান পা বাড়িয়ে দেবার সাথে সাথে চিৎপাটাং হয়ে পড়ে গেলাম। বাদামের ঠোঙাটি হাত থেকে পড়ে গিয়ে ছিটিয়ে গেলো সারা রাস্তায়। কয়েকটি পাক খাবার পর যখন উঠে বসলাম তখন দেখি গা ঘেমে মাথা থেকে টুপটুপ করে ঘাম ঝরছে, বিছানা ভিজে গেছে, ঘড়িতে দুপুর বারটা বাজছে।
আজ সকাল দশ টায় সুপ্তির সাথে দেখা করার কথা ছিলো…

দ্বার ভাঙা জলে জীবনের ছায়া
নীলিমা নূর

তুমি নেই তাতে কি হয়েছেও কথা লোকে বলে। ওরাতো জানে না সত্যবদ্ধ বেদী হয়ে বুকের মধ্যে কষ্টের মাদুর পেতে বসে আছো। তোমার সুউচ্চ স্তনের মত বুকের পাজরে কষ্টের পাহাড় জমেছে যাতে প্রতিদিন একটু একটু করে জমে বিষকাটা। হৃদয়ান্তী, লক্ষ্মী আমার লোকের কথায় কি এসে  যায়? আকাশ কি তার কান্না থামায়, বাতাস কি তার গতি বদলায়। এ কথা বোঝে না হৃদয়ান্তী, দ্বার ভেঙে যায় জলেরতাতে ভেসে যায় তার হাসি-কান্না-চোখরাঙানী। হৃদয়ান্তী ঠোঁট দিয়ে তোলে যদি বিষকাটা তবে হাসিমুখে সে কাটা গেঁথে নেবো বুকে-পিঠে-পাজরে। বয়ে যাওয়া জলের স্রোতে দেখবো তোমার মুখ, দুহাতের তালুতে সাজাবো স্বপ্নের সুখ, কেবল অবিশ্বাস রেখ না ওতে।

ঈশ্বরী তোমার
তমা চৌধুরী

তুমি কি জানো ঈশ্বরী কীভাবে সৃষ্টি হয়
জানা আছে কী তাদের তার কর্ম ইতিহাস
তার চলার ধরন, গায়ের বরণ অথবা হাসির কারণ
তার চোখ কী দেখে, হাত কী ছোঁয়, ঠোট কী চায়

তুমি কী জানো ঈশ্বরী কীভাবে জন্ম নেয়
তার লাবণ্যে কেন আগুন ধরে তার হাসিতে কেন মুক্ত ঝরে
তার প্রলাপ কেন মহাকাব্য হয়ে যায়
ঈশ্বরীর ডিএনএ রির্পোট কি দেখা আছে তোমার
কোন বংশের ধারক সে, মান বাচিয়েছে কত পুরুষের
পুজোর আর্তনাদে মরা কতো পাপীর প্রাণ নিয়েছে খুব সহজে
ঈশ্বরী কৃপা করে কেমনে জানো কী মানব
গোপন নদীতে বান কখন আসে কখন সমুদ্র নোনা জলে ভাসে
কখন পাখিদের গান বিষ হয়ে কাটে জানো কী মানব

খুব জটিল নয়, কাজ ফেলে যদি আসতে পারো কোন এক চাঁদ মরা রাতে
বাড়ির সবচেয়ে বদ্ধ ঘরটায় এক বার এসে দেখো, ঈশ্বরী নয়
খুব চিৎকার করে তোমার মানবী কাঁদে।

দুঃখকে কিনুন অতঃপর ধর্ষণ করুন
সুমন প্র“স্ত

নিজের অপরিপক্ব সফলতায় অন্য পাখিদের ব্যর্থ করছে উটপাখি। ভ­াদিমির ও এস্ট্রাগন এখনও বসে আছে, লাকি হয়ত মারা গিয়েছে। ঘুমস্বভাবী মানুষেরা পরাজয় ভালবাসে। অভাবের তাড়নায় কুমির নিয়মিত হরলিক্স খেতে পারছে না ভেবে এখন মানুষ ঘুমায় পশুদের বাসায়। এদিকে বনের প্রভাবশালী বাঘগুলো খুবলে খাচ্ছে হরিণীদের এবং পাশ দিয়ে একটি জাপানি কাগজের ফুল ভেসে যাচ্ছে। কেয়া বাত! কেয়া বাত! কেয়া বাত! বিশুদ্ধ খেজুর রস বিক্রেতা আপনার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, আপনি জুস পান করছেন। হে ঈশ্বর! আমায় সত্যি ক্ষমা কর। আসলেই আমি গিরগিটি। শ্যাম্পুকে ভুলে গিয়েছি, চারিদিকে শুধু লেবু আর লেবু। অনেক ভালো লাগে যখন রাস্তার ধারে বিকিনি টাঙানো থাকে। সাবাশ! এই তো চাই। পশু বিকিনি পরে না, শুধু সময়মত নাড়াচাড়া করে। বুঝতে পারছি না, সাপ এখন আধুনিক নাকি কাক পেখম কিনছে। হে ঈশ্বর! অন্ধ হতে ক্যালকুলেটর লাগে না, লাগে ভয়; শুধু ভয় নতুবা সিলিং ফ্যান।

অনন্ত যাত্রা
ফয়সাল ইসলাম

অনন্ত হতে বিচ্যুতে
ক্ষুদ্র মায়াবী পৃথিবী
বিপুল মারণাস্ত্র ক্ষেত্র অসীম
মোক্ষম আঘাত সঠিক সময়ে, নিয়মে।
নতুবা, শেষ হলে সময়
ব্যর্থ, রিক্ত শূন্য হাতে
ধাবমান ধীরলয়ে আবার
শূন্য সেই অনন্ত পানে।

ডিপার্টমেন্ট চাই
দৌরাত্ম্য বিনয়

এই যে আমার বায়োডাটা
আনন্দ ও খুশির কোর্সÑএ পাস নম্বর নেই।
ন্যূনতমভাবে স্ফূর্তির কোর্সটা উৎরে গেছি
জেনে গেছি পাতার আড়ালের সূর্যালোকে,
আমার কোন স্নেহের কোটা নেই
নেই কোন ইমোশনাল ইফেক্ট
অবহেলায় পাঠ করবার পরেও
কষ্টের আলোকলতায় লেটার গ্রেড পেতাম।
কিন্তু চর্চার অভাবে কষ্টগুলোও ভুলে যাচ্ছি
হয়তো স্মৃতিশক্তি অন্য কাজে ব্যস্ত আজকাল
তাই আবার খুলে বসলাম কষ্টের পুরোনো আলমারি
বাছাই করে লাল কালিতে দাগ দেয়া কষ্টগুলো
হড়হড় করে পড়ে গেলাম ঝাপসা আলোতে।
দেখলাম এসব বেদনা-যাতনায় ঘুনপোকা বাসা বেধেছে
যতে র অভাবে কলুষিত সুখ খানিকটা জুড়ে বসেছে
নতুন কষ্ট বেদনা-যাতনা খুব দরকার,
আজকাল অলিতে-গলিতে আর পাওয়া যায় না।
হাতের কাছেই রাখা মুঠোফোন অথবা গুগলসপ
নইলে অভিজাত রেস্তোরাতে কষ্টের বিকিকিনি,
একদম সাধ্য নেই আমার এসব কষ্ট পাবার,
আমি অতি সাধারণ ব্যথা-বেদনাতে তুষ্ট
তাই কষ্টানন্দের কোর্সে এ-জন্মে আর পাস হলো না
শুধু কষ্ট বিষয়ক একটা ডিপার্টমেন্ট থাকলে
নিশ্চয়ই আমি হতাম প্রথম শ্রেণির ছাত্র।
আমি যে কষ্ট ছাড়া আর কোনো বর্ণ পড়তে পারি না
ইচ্ছে তাই বেদনার ঊর্ণজাল ছেয়ে ফেলুক আমাকে
কুঁরে কুঁরে খেয়ে ফেলুক আমাকে যাতনার পোকা,
আমাকে শুধু কষ্ট বিষয়ক সাবজেক্ট পড়তে দেয়া হোক
আঁধারের মতো শুদ্ধ ও পবিত্র যাতনায় আমি সন্ন্যাসী হবো।
(উৎসর্গ: যে অনুজ অগ্রজ হয়ে ওঠে)

দহন
ইরফানুর রহমান

পুড়ে যাচ্ছে পরিবহন, শাহবাগে, পুড়ে যাচ্ছে যাত্রীসমেত
পুড়ে যাচ্ছে নারী, পুড়ে যাচ্ছে পুরুষ, পুড়ে যাচ্ছে মানুষ
পুড়ে যাচ্ছে দেবদূতের মতো ফেরেশতার মতো বাচ্চারা

পুড়ে যাচ্ছে মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা হৃদয়
পুড়ে যাচ্ছে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ক্রিশ্চান নাস্তিক
পুড়ে যাচ্ছে বাঙালি চাকমা মারমা ত্রিপুরা মণিপুরী

পুড়ে যাচ্ছে শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত ক্ষমতার উৎসেরা
পুড়ে যাচ্ছে নয়নপুত্তলি পুড়ে যাচ্ছে সিঁথির সিঁদুর
পুড়ে যাচ্ছে আসমুদ্রহিমাচল পুড়ে যাচ্ছে চিম্বুকপাহাড়

পুড়ে যাচ্ছে চেতনা আর অনুভূতির নৃশংস খেলায়
পুড়ে যাচ্ছে প্রথম লজ্জার স্মৃতি, ভালবাসাবাসি, সুখ
পুড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলা আর পুড়ে যাচ্ছে মেয়েবেলা

পুড়ে যাচ্ছে জেলে মাঝি আর শাহরিক বস্তিবাসী
পুড়ে যাচ্ছে রাজধানি পুড়ে যাচ্ছে গ্রাম মফস্বল
পুড়ে যাচ্ছে ভাই বোন মুক্তাঞ্চল মায়ের আঁচল

পুড়ে যাচ্ছে তারুণ্যের তীব্রতা পুড়ে যাচ্ছে মননশীলতা
পুড়ে যাচ্ছে বার্ধ্যক্যের নিরাপত্তা পুড়ে যাচ্ছে অভিজ্ঞতা
পুড়ে যাচ্ছে শিলাবৃষ্টি পুড়ে যাচ্ছে হাওয়াই মিঠাই

দুনিয়ার দীর্ঘতম গোরস্তানের এই আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে
কয়েকটা বিদেশি দূতাবাস, ভবন আর সদন ছাড়া
পুড়ে যাচ্ছে মানুষের যা কিছু এখনো মানবিক!

দীপান্বিতারা
ফারুক ইমন

তালার দাম খুব বেড়ে যাচ্ছে।
দীপান্বিতা,
তোমার বাড়িতে!
তোমাদের প্রধান ফটকে
ইয়াবড় এক তালা!
তোমাদের বারান্দার গেটে-
বেডরুমে, বেডরুমের আলমিরায়!
আলমিরার ভেতর তোমার
একান্ত ব্যক্তিগত ড্রয়ারে…
তোমার ট্র্যাভেল লাগেজে, ভ্যানিটিব্যাগে,
ড্রয়িংরুমের টেলিফোনে, ফ্রিজে,
তোমার এন্ড্রয়েড মোবাইলে-
তালার জয়-জয়কার!
আজকাল আমার ক্যামন
একা লাগে,
তালার দাম বেড়ে যাচ্ছে!
তোমার মনেও কি সম্প্রতি
লাগিয়েছো কোন বিদেশি তালা!

জুপিটারের কথা
সাগর তরী

পুরান বটগাছটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। আর আপাদমস্তক পরগাছা ভর করে আছে। পরগাছা যদিও বটগাছের উপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে, তবে যতই ক্ষতি করুক না কেন উপকার একটা করে। গাছের গোড়াটাকে টেকো মাথা থেকে বাঁচিয়েছে। দেখুন না আসছে শীতকালে সমস্ত পাতা পড়ে গেলেও পরগাছার পাতা কিন্তু থাকবে। তবে দূর থেকে একে বটপাতা বলেই ভ্রম করে অনেকে। আবার বটে ফল ধরলে অনেক পাখিও আসে। আসলে না যার ফল আছে, তারই দাম বেশি। ধরুন না শিশির আর জুপিটারের কথাটা,
এমন বটগাছের মত দেহ নিয়ে ক্লাসে এসেছে শিশির, বসে আছে একেবারেই পেছনে; সমস্ত শরীরটা পরগাছার ন্যায় লতাগুল্ম ও জলজফুল অঙ্কিত সাদাকামিজে আবৃত্ত। আকাশ থেকে জুপিটার তীক্ষè দৃষ্টি রাখছে নীচে শিশিরের বক্ষে। শিশির তখন ক্লাসে মশগুল। জুপিটার মশা হয়ে এসে তার সারাবক্ষে উড়তে লাগল এবং নিরীক্ষণ করলো কোথায় বসে দু দণ্ড রস পাওয়া যাবে শান্তি মত। অবশেষে শিশিরের নৎবধংঃ (ব্রেস্ট) এর কোনায় বসে ইচ্ছে মত রস পান করে তার তৃপ্তি করল এবং পাছা ফুলে লাল করলো। এদিকে শিশির তার নৎবধংঃ (ব্রেস্ট) চুলকাতে চুলকাতে উত্তেজিত হলো। হঠাৎ স্যারের ধমকানিতে নড়াচড়া বন্ধ করতে বাধ্য হলো।

ঠিকানা
রাসেল রহমান

মা,
আমার প্রথম ঠিকানা
অতঃপর পৃথিবী,
সেই থেকে পৃথিবীর সৈকতে
একটি ঠিকানার খোঁজে
নিরন্তর পথ চলি।

শেষ ঠিকানার আগে
সুখ ঠিকানা ঠাঁই পাবেতো!

রাজনৈতিক ইসলাম : একটি আম-আদমি কথন
নাইটফল

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৭১ সাল থেকে। এর পূর্বে এটি পূর্বপাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। পূর্বপাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার প্রক্রিয়া এই জনপদটি শুরু করে অনেক আগে থেকেই, যা সম্পূর্ণ হয় ৭১-এ। কিন্তু আসলেই কি আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পেরেছি?

এই উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা যখন প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ (শুধু ভৌগোলিক দখলদারিত্ব) ছাড়তে বাধ্য হল, তখন আমরা দেখেছি ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেতে। তখন ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ধর্ম। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আমরা নাম পেয়েছিলাম পাকিস্তান, ‘পূর্ব পাকিস্তান’। পরে আমরা দেখেছি কিভাবে এই ‘ধর্মীয় ভাতৃত্ববাদ তত্ত্ব’ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের স্বাধীনতাকামী প্রদেশগুলোর আন্দোলন চলছে বহুদিন ধরেই, যা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নামে প্রচারিত। আর স্বাধীন বাংলাদেশ তো এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। আমরা দেখেছি যেকোন তত্ত্বই কোন না কোন সময় মূলানুপেক্ষি হয়ে পড়ে। তাই এই ধর্মীয় মৌলবাদিতার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছুড়ে দিয়েই লিখিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের নকশা।

সমসাময়িক বাংলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক যে চরিত্র তা আমাকে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করেছে, আমরা কি সত্যিই সেই নকশাতে আছি? কি ছিল সেই নকশা? আদৌ কি সেই নকশার বাস্তবায়ন সম্ভব?

বর্তমানে সংশয়পূর্ণ ভাবনার চালাচালিতে কিছু বিষয়ের পুনঃআলোকপাত জরুরী হয়ে পড়েছে। যেমনÑধর্ম, ইসলাম এবং রাজনৈতিক ইসলাম।

ধর্ম : প্রচলিত অর্থে ধর্ম বা দীনের ইংরেজি প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা ‘রিলিজন’ ব্যবহার করি। কিন্তু এই ব্যবহার সংশয়পূর্ণ। আমাদের সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে নানা অর্থে ধর্মের বা দীনের ব্যবহার আছে। রিলিজনের প্রথম অর্থ হচ্ছে কোন সংঘের বিশ্বাসে আনুগত্য। পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ প্রসারিত হয়ে ‘অসামান্য অলৌকিক সত্ত্বায় বিশ্বাস’ এ পরিণত হয়। অথচ বৈদিক সাহিত্য থেকে ধর্মশাস্ত্রে, আবার ধর্মশাস্ত্র থেকে লোকায়ত বিশ্বাসে আমরা ধর্মের প্রধান চারটি অর্থ দেখি।
ক. ধর্মের প্রধান অর্থ কর্তব্য কর্ম। এর বিপরীতে আছে অধর্ম বা অন্যায় কাজ। এখানে সর্বসাধারণ ও বিশেষের ধর্ম আলাদা আলাদা। অর্থাৎ সাধারণের ছিল এক ধরনের কর্তব্য আর সমাজের বিশেষ স্থানীয় মানুষের ছিল তার থেকে বহুগুন ভিন্ন।
খ. ধর্মের ফলকেও ধর্ম বলা হয়েছে। এখানে আবার অর্থের প্রসার হয়েছে। তাই ধর্মের অর্থ এখানে পূণ্য এবং অধর্মের অর্থ পাপ।
গ. ধর্মের তৃতীয় অর্থ হল সম্পৃক্ত, গীতায় এই অর্থেই ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়’ বলা হয়েছে অর্থাৎ ব্যক্তির গুণকর্মাদিজাত স্বভাবই ধর্মের রূপকে স্থির করে।
ঘ. চতুর্থ অর্থ হল ঋত, নিয়ম। ঋতের পথ ধর্মের পথ।

এখানে আমরা দেখেছি কত রকম প্রসারণ ঘটেছে ধর্ম শব্দের। কত বৈচিত্র্যময় অর্থের ব্যবহার ঘটেছে আমাদের জীবনে। অর্থের এই বিস্তরণ পরবর্তী সময়ে আরো বৃহৎ রূপ ধারণ করেছে। যেকোন একটি অর্থের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, সংঘর্ষের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ইসলাম : ইসলামে ধর্মের সমার্থক শব্দ হল ‘দীন’, দীনের একার্থ হল ‘ব্যাপক’। আবার একার্থ ‘বিশেষ’। আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ককে দীন শব্দে প্রকাশ করা হয়। দীনে আল্লাহ থেকে হয়েছে দীনে ইসলাম এবং সালাম থেকে ইসলাম কথাটা এসেছে। এর অর্থ আত্মসমর্পণ। আল্লাহর আদেশের কাছে কায়মনোবাক্যে আত্মসমর্পণই একজন মুসলিমের কাজ। এই দীনের প্রথম স্তম্ভ হল ইমান, এর মূল ভিত্তিই হল আল্লাহর তৌহিদে আর কোরআনের ঐশিত্বে চরম বিশ্বাস। এই ইমান থেকেই মুমিন শব্দটি এসেছে।
ইমান আর ইসলাম কি এক কথা? এ নিয়ে মতভেদ আছে। কারণ দীন ইসলাম শুধু বিশ্বাস নয় কথা আর কর্মও বোঝায়। ধর্মে যে অর্থে কর্তব্য আর আচরণের প্রয়োগ আছে, আদাবও সে অর্থে তাই। একজন মুসলিমকে তার নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থান ভেদে আদাব অনুসরণ করতে হয়, যেখানে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। আবার সমাজের ভিন্নভিন্ন স্তরভুক্ত মানুষের জন্য আলাদা আদাব রীতি আছে। বাদশাহর আদাব, সুফির আদাব বা কারিগরের আদাব এক হবে না, যেমনটি হবে না ব্যাধের আর সন্ন্যাসির আদাবের। এই ইমান আর আদাবের সমন্বই হল দীন ইসলাম।

বাংলাদেশে ইসলাম : ইতিহাসের সীমাবদ্ধতা আছে। সেটা এই অঞ্চলের প্রথম ইসলাম প্রচারকারী হিসেবে বখ্তিয়ার খিলজীর স্বীকৃতির মাধ্যমেই আবার প্রমাণিত হয়। ইসলাম এখানে বখ্তিয়ারের ঘোড়ায় চড়ে তরবারির আগায় নাচতে নাচতে আসে নি। এমনকি তার এমন কোন উদ্দেশ্যও ছিল না। তিনি এদেশে এসেছিলেন ভাগ্যের সন্ধানে। যেমনটি করে তারও পরে এসেছিল ডাচ, পর্তুগীজ, ব্রিটিশরা। হিন্দু অধ্যুষিত এ অঞ্চলে জাতপাত ব্যবস্থা যখন মৌলবাদী চরিত্র নিল, নিম্নবর্গের হিন্দুদের ভবিষ্যৎ যখন তাদের অতীত পিতৃপরিচয়ে নির্ধারিত হওয়া শুরু হল, তখনই এদেশের নিম্নবর্গের জনগণের মনোযোগ পেল ইসলাম। ইসলাম যেন অনেকটা সময়ের দাবি ছিল, ছিল ইতিহাসের সকল নিম্নবর্গের হৃদয় দিয়ে বোনা এক স্বপ্ন। ইসলামকে আসতেই হত। আমরা দেখেছি কি অসাধারণ এক সমাজ সংস্কার মুহাম্মদ (স.) করেছিলেন ইসলামের মাধ্যমে, এটা ছিল মানব ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় বিপ্লব। বাংলায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল সূফি সাধকদের দ্বারা, যেমন : শাহ পরাণ, শাহ মখদুম, পাঞ্জু শাহ, শাহ জালাল, আদম শহীদ ইত্যাদি সহ আরো অনেকে । এই সাধকরা বললেন এমন এক ধর্মের কথা যেখানে মানুষের পরিচয়, মর্যাদা, ভবিষ্যত আগে থেকেই ঠিক করা থাকবে না। এখানে বলা হয়েছে সাম্যের কথা, ভেদাভেদহীনতার কথা। যা ঐ সময়ের নিম্নবর্গের হিন্দুদের স্বপ্নের কথা ছিল। এ বিষয়ে তদানিন্তন ব্রিটিশ কর্মচারি জেমস ওয়াইজ বলেন, ‘মুসলমানদের সংখ্যা এই পূর্ববঙ্গে বৃদ্ধি পাবে (পরে যা পেয়েছিল)।’ কারণ এই বাংলা কখনই খাটি আর্যদের ছিল না। আর কোথাও হিন্দু ধর্ম এত অনাচারগ্রস্ত হয় নি। অথবা এত অধঃপতিত হয় নি। আর কোথাও গণমানুষকে হেয় করে এত দূরে সরিয়ে রাখা হয় নি। এত অমানবিক আচরণ করা হয় নি কোথাও। সঞ্জীবনী সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র বলেন, ‘যখন ইসলাম এলো পূর্ববঙ্গে তখন আনন্দের সাথে তাদের সমর্থন করেছে চণ্ডাল ও কৈবর্তরা। গ্রহণ করেছে আক্রমণকারীদের ধর্ম ইসলাম।’ ওয়াইজ উল্লেখ করেছেন, ‘এরকম ভাবা সমীচীন হবে না যে মুসলমানরা সবাই এক, তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই, শ্রেণি নেই।’ এই বিভেদ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন বাংলার ও ইসলামের জন্মস্থান মক্কার মুসলমানদের রীতিনীতির অসংখ্য পার্থক্যকে। আমাদের খুব হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে যে এই লৌকিক প্রভাব অঞ্চল ভেদে সব ধর্মকেই প্রভাবিত করেছে। তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইসলামি দেশ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার প্রতীক ‘গডুর’।
পীরদের প্রতি পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রবল আকর্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন ওয়াইজ। মুসলিম পীরদের মাজারে শুধু মুসলমান নন হিন্দুরাও যান। এসব পীরদের অধিকাংশই যুক্ত পানির সঙ্গে। যেমন : খাজা খিজির, খাজা বদর। এর কারণ কি এই যে, পূর্ববঙ্গ নদীনালা বেষ্টিত এবং এর সাথে সংগ্রাম করেই বাঁচতে হয় এ অঞ্চলের মানুষদের!

হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের অসংখ্য রীতিনীতি এক বলে উল্লেখ করেছেন ওয়াইজ। এর কারণ কি এই যে, ‘বাঙ্গালি সংস্কৃতির উৎস ও ভিত্তি ছিল অস্ট্রিক দ্রাবিড়ীয় মোঙ্গলীয় জ্ঞান বিজ্ঞান তত্ত্ব ও মনন’ বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর প্রশ্ন করেছেন। বাঙ্গালীর মনেও অধ্যাত্ম বুদ্ধি, সংখ্যা, যোগতন্ত্রের প্রভাব বারবার প্রবল রয়েছে। এমনকি এখনো দেখা যায় বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে মানত করছেন। তারা এখনো পঞ্জিকা, ঝাড়ুফুক ইত্যাদিতে বিশ্বাস করেন। তবে এর প্রধান কারণ দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের উৎপাদন পদ্ধতির নিশ্চলতা। বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয় সাধন যেমন হয়েছে তেমনি আবার উৎপাদন পদ্ধতির নিশ্চলতার দরুন ভৌগোলিক ও সামাজিক দূরত্ব বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান মতবাদ প্রয়াস ও দার্শনিক মনোভঙ্গি আলাদা করে  রেখেছে।

একটা ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। তা হল ইসলামের একক, নির্দিষ্ট, অনন্য কোন রূপ নেই। আরবের ইসলাম দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন এই উপমহাদেশে পৌঁছেছে, তখন আর তা আরবের সেই ইসলাম নেই। সে কারণেই একজন আরবের চোখে বাংলার মুসলমানদের মাঝে রূপান্তরিত হিন্দু রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠানের যে সব চিহ্ন ধরা পড়বে তার অনেক কিছুই তিনি মক্কার ইসলামে পাবেন না, আবার বাংলার ইসলামের ভক্তিবাদের সাথে আরবের ইসলামের কোন সম্পর্ক তিনি খুঁজে পাবেন না।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রধান দুটি ভাগ ছিলÑশিয়া ও সুন্নি। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের মধ্যে শিয়া আধিপত্য লোপ পায় যা আজও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নি। সুন্নিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং এদের মধ্যে নানা শ্রেণির উদ্ভব হতে থাকে। সে সময় এদের চারটি প্রধান বিভাগ দেখা গেছে :
১. সাবেকী : হিন্দুয়ানি ভাবধারার ও একটু গোড়া। কৃষকের বেশিরভাগ ও পূর্ববর্তী সুন্নিবংশধারা এই দলে।
২. ফরাজী : শরীয়তপন্থী, শরীয়তুল্লাহ ও তার পুত্র দুদু মিয়া এই দলের প্রতিষ্ঠাতা। সুন্নিদের মধ্যে নিজেদের সবচেয়ে নিয়মনিষ্ঠা বলে দাবি করে।
৩. তাইয়ুনি : মৌলবি কেরামত আলীর পাটনা মাদ্রাসার অনুসারি। ঢাকার ব্যাপক কৃষককুল, দরিদ্র জনসাধারণ ও চামড়া ব্যবসায়িরা মূলত এই উপদলের অন্তর্ভুক্ত।
৪. রাফিইয়াদায়িন : একটু ভিন্নভাবে নামাজ আদায় করে। সমৃিদ্ধশালী ও উদ্যোগী ব্যবসায়িদের মধ্যে অনেকেই এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

দীর্ঘদিন হিন্দুয়ানি আচারে অভ্যস্ত মুসলমানরা তাদের ধর্মের মধ্যেও পৌত্তলিক ধ্যানধারণা, রীতিনীতির অনুপ্রবেশ করিয়ে ফেলে। মি. গ্যাস্টিন ভাস তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন যে, ‘পৌত্তলিক ভাবধারা ও সাকার ধর্মীয় রূপ এখানে এমনভাবে আসন গেড়েছিল যা ইসলামের সারল্যের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান ছিল। এমনকি বহিরাগত বিদেশি ও স্থানীয় দলিতদের সংস্পর্শে এসে হিন্দু ধর্মও তার বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে পারে নি।’
এদিকে ইসলাম প্রসারের প্রথম দিকে লক্ষ লক্ষ হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এ জন্য সে সময় আদিবাসী জাতিসমূহের আচার অনুষ্ঠানের ইসলামকে তুলনামূলক সহনশীল অনুভূতি গ্রহণ করতে হয়েছে তাদের। আর নিতে হয়েছে উদারনীতি। স্থানীয় দেবদেবী, বিশেষ করে আপদবিপদে ও রোগেশোকে স্থানীয় আদিবাসিরা যে লোকজ দেবদেবীর শরণাপন্ন হত, সেই দেবীরা ছিল নিম্নবর্গের হৃদয়ের অতি আপন, পরবর্তী সময়ে এদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে। তাই নতুন বিকল্প ব্যাতিরেকে নয়া ধর্মান্তরিত লোকদের পক্ষে পূর্বতন রূপকের ধারণা পরিত্যাগ করা বাস্তবিকই কঠিন ছিল। সাকার ঈশ্বরের কল্পনা তাদের কাছে সহজ। তাই পরবর্তী সময়ে ইসলামে অতিন্দ্রীয় ক্ষমতাসম্পন্ন সমকক্ষ পীরফকিরের ধারণা এক অর্থে ছিল ওই সব রূপকেরই একধরনের বিকল্প।

আমরা একটু মনোযোগী হলেই ধরতে পারব আরবের মুসলমানদের বিভিন্ন আচার এখানকার থেকে কত আলাদা হয়ে গিয়েছিল। যেমন, আশুরা, তাজিয়া, বড় ওয়াফাত। এছাড়াও এখানকার মুসলমানদের কত ধর্মীয় আচার হিন্দুদের বিভিন্ন আচারের সাথে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। যেমন, অর্থের বিনিময়ে খাদেমরা মুহাম্মদের পদঃচিহ্ন দর্শন করাত যা একইভাবে পূর্বে ব্রাহ্মণরা বিষ্ণুপদ দেখাত। এছাড়াও ছিল শিয়াদের মোহররম, তাজিয়া আর হিন্দুদের দুর্গাপূজা। এম দ্য তাসিসর এর মতে, ‘এ দু অনুষ্ঠানের মধ্যে মিল ছিল অনেক দিক থেকেই।’

রাজনৈতিক ইসলাম :
ভীষণই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল দু সম্প্রদায়ের (হিন্দুÑমুসলিম) মাঝে। এরা পরস্পর অপরের ধর্মীয়, সামাজিক আচারে অংশ নিয়েছে, একে অপরের ধর্মের প্রতি হিংস্র মনোভাব তো দেখায়ই নি বরং শ্রদ্ধাশীল থেকেছে। তাহলে কোথা থেকে শুরু হলো আজকের এই অসহিষ্ণু ইসলামের? কোথা থেকে ধর্মে অনুপ্রবেশ ঘটলো রাজনীতির? আসলে এভাবে ভাবতে গেলে পা হড়কানোর সম্ভাবনা আছে। কারণ ধর্ম কি কখনো রাজনীতি বিবর্জিত ছিল? এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজাটা খুব জরুরী হয়ে উঠেছে। এক অনন্যসাধারণ সমাজ সংস্কারক থেকে শেষ পর্যন্ত যখন মুহাম্মদকে
রাষ্ট্র পরিচালনায় যেতে হল তখন তিনি এর ভয়াবহতাটা বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতার জায়গাটি ধরতে পেরেছিলেন। তাই তো তিনি তার শেষ ভাষণে বলে গিয়েছিলেন ‘আমিই শেষ নবী’।
বর্তমানে বাংলাদেশে একটি আত্মচিৎকার অহরহ শুনছি ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি মেশাবেন না’। ধর্মকে রাজনীতি মুক্ত রাখা কখনোই কি সহজ ছিল? আমরা ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম প্রচারককে দেখেছি যারা ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে এর অসাধারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা টের পেয়েছিলেন এবং অনেকেই তা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ, তার পুত্র দুদু মিয়া এর জ্বলন্ত উদাহরণ। ধর্ম ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে গৌতম ভদ্র তাঁর ইমান ও নিশান গ্রন্থে বলেন, ‘ক্ষমতাকে বাদ দিয়ে, শোষণ ও শাসন, প্রতিবাদ ও আনুগত্যের বন্ধনকে অস্বীকার করে ধর্ম/ধর্মভাব বোঝার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র।’ আমরা দেখছি ধর্ম তার স্তরভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমেই সামাজিক ক্ষমতা ও বিন্যাস নির্দিষ্ট করে দেয় এবং এটা অগ্রাহ্য করার চেষ্টা হবে ভয়ংকর উদাসীনতা।
আমরা ইতিহাসে অনেকবার দেখেছি ধর্মবোধ কিভাবে অনেক বড় বড় আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে উঠেছে এবং রাজনীতি ও ধর্ম একে অপরের প্রতি কী ভীষণ ভাবেই না নির্ভরশীল। একাত্তরে ধর্মকে ব্যবহার করে ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আমরা মুণ্ডাদের আন্দোলন থেকে দেখেছি কিভাবে একজন রাজনৈতিক অধিকার আন্দোলনের নেতাকে পরবর্তী সময়ে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ধর্মীয় নেতায় পরিণত হতে হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিসকোর্সে ইসলাম বরাবরই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে এবং বর্তমানে তা আরও প্রবল। আমরা দেখছি ধর্ম নিয়ে কি অধর্মটাই না চলছে প্রতি মুহূর্তে।  ইসলামকে সামনে রেখে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে দেশ। প্রতিদিন অজস্র মৃত্যু ঘটছে ইসলাম রক্ষার্থে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে দাড়িটুপি পরে কেউ ঘোরাঘুরি করলে পুলিশ তার দিকে আড়চোখে তাকায় আবার চাঁদের বুকে সালোয়ার হোসেন বাইজীকে না দেখতে পেলে হুজুর সাহেব মন খারাপ করেন। একদল ধর্ম বাঁচানোর কথা বলে আবার আরেক দল তাদের হাত থেকে ধর্ম উদ্ধারের প্রতিশ্র“তি দিয়ে মানুষ মেরে চলেছে। দু পক্ষের মধ্যে অনেক অজ্ঞতা আছে, আছে পরস্পরের পরস্পর সম্পর্কে ধারণা নামের আবর্জনা। আধুনিক সমাজের চিন্তা চেতনা সম্পর্কে এ দেশের নিম্নবর্গীয় মুসলমানরা কিছু জানে না আর নিম্নবর্গের মধ্যে যে ইসলামের ধারণা সে সম্পর্কে কিছু জানে না ক্ষমতাবান আধুনিক সমাজ। সমাজের সবচেয়ে আধুনিকতম সংগঠন রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এখন যেতে চায় সব দল। তাই গায়ের জোরে তাদের পিছিয়ে পড়া জঙ্গি সংগঠন হয়ত আমরা বলতে পারব কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হবে কি? আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শাপলা চত্বরের ওই মানুষগুলোকে আমরা কিভাবে ফেস করবো, তারা কি ততটুকু গুরুত্ব পাবে যতটুকু পেয়েছে শাহবাগ? আমাদের আরো সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি ধর্ম ও যুদ্ধাপরাধকে গুলিয়ে ফেলবো? আমাদের খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কোন ইসলামকে বেছে নেব, যে ইসলাম সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার দাসত্বের সম্পর্কের কথা বলছে, নাকি যে ইসলাম সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রেমের সম্পর্কের কথা বলছে? যে ইসলাম বলছে :
‘রক্ত দেখলে কাঁপবে কেন মুসলিমের অন্তরগো? অন্তরে রাইখো আল্লাহর ডর।’
নাকি যে ইসলাম বলছে :
‘কোরবানি করিতে হুকুম অতি প্রিয়জন, গরু ছাগল হইল কি তোর এতই আপনজন? নিজের থেকে প্রিয় বস্তু আর যে কিছু নাইগো, প্রেম রাখিয়ো অন্তরের ভিতর।’

স্নান-৩২ এর সম্পাদক : হাসিব হাসান রনি

আলোচনা