স্নান ৩৬

স্নান ৩৬


 একটি চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ
 সপ্তমবর্ষযাপন সংখ্যা, ২৬ মার্চ, ২০১৫

পোকাবাছক
 সুবিদ সাপেক্ষ

প্রচ্ছদকার
 নূর আলম

সূচিপত্র

……………………………………………………..

……………………………………………………..

……………………………………………………..

……………………………………………………..

……………………………………………………..

……………………………………………………..

……………………………………………………..

……………………………………………………..

প্র ব ন্ধ

শশী আলিওশা
সকল ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাই

একুশ, জাতীয় মুক্তির পথে এক অনন্য ধাপ। আবার এলো একুশে ফেব্র“য়ারি, পলাশের রঙে রাঙা ৮ই ফাল্গুন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা আর জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের পথে প্রথম পদটি পড়ে বায়ান্ন’র এই দিনে। এর সাথে জড়িয়ে ছিলো যেমন একদল গণতন্ত্রকামী মানুষের নিজ ভাষাকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি ঠিক তেমনি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ানো অর্থনৈতিক দাসত্বের হাত থেকে মুক্তির সুতীব্র আকাক্সক্ষাও। পাকিস্তান রাষ্ট্র উর্দুকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করলেও এই জনপদের মানুষ ভাষার দাবিতে নেমে আসে রাস্তায়, প্রতিবাদ প্রতিরোধে গর্জে ওঠে রাজপথ, প্রাণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঢেলে দেয় বুকের তাজা রক্ত, শহিদ হন সালাম, রফিক, বরকতসহনাম না জানা আরো অনেকে। ভাষার দাবিতে জালেম পাকিস্তানের এ অন্যায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্ঠার বিরুদ্ধে তাঁদের এ আন্দোলনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ দেশের মানুষের স্বৈরাচার ও সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান। তাই আজও একুশ আমাদের এদেশের মানুষসহ পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী নিপীড়িত মানুষকে আহ্বান জানায় সমস্ত প্রকার অন্যায় জুলুমের বিদ্ধে প্রতিবাদের, প্রতিরোধের। একমাত্র নয়, অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা বার বার হয়েছে বৈষম্য আর নিপীড়নের শিকার। ভাষা আন্দোলন, এর পূর্বের উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বাংলা ভাষীদের পশ্চাদপদ অবস্থান খতিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্বে বাংলা আধিপত্য আর নিপীড়নের শিকার হয়েছে সংস্কৃত, ফারসি, ইংরেজিসহ অন্যান্য ক্ষমতাসীন ভাষা দ্বারা। আর পাকিস্তান শাসনামলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বাংলাকে আরো একবার দমনের সুযোগ করে দেয়। আবার তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলা, উর্দু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধুসহ আরো অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের বসবাস ছিলো। তাই যদি উর্দুকে পাকিস্তানের ‘একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় তাহলে বাংলা যেমন বৈষম্যের শিকার হতো ঠিক তেমনি অন্যান্য ভাষাভাষীরাও একই বৈষম্যের শিকার হতো। তাই সে সময়ে এ দেশের জনমানুষ দাবি তোলে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ও স্বীকৃত দেবার, যাতে অন্যান্য ভাষাগুলোও বৈষম্যের শিকার না হয়। এর মধ্য দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় ভাষিক ও অন্যান্য আধিপত্যশীলতার বিদ্ধে এ জনপদের মানুষের দ্রোহের চেতনা। ভাষা আন্দোলন এবং মানুষের মুক্তির বাসনায় এদেশের মানুষেরা তাদের শাসকদের দ্বারা বারবার বঞ্চনার শিকার হয়েছে। এই বঞ্চনা করেছে যেমন রাজা, বাদশা ও জমিদাররা ঠিক তেমনি নিজেদের সভ্য হিসেবে দাবি করে আসা ইংরেজরাও। তাই বারবার শোষণে বিপর্যস্ত এ জনপদের মানুষের মনে জাগে মুক্তির বাসনা। এ মানুষেরা স্বপ্ন দেখে এক নতুন রাষ্ট্রের যেখানে তারা রেহাই পাবে তাদের উপর হাজার বছর ধরে চলে আসা জুলুম আর নির্যাতনের হাত থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে; দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা পায় এক নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। কিন্তু যে ঔপনিবেশিক আধিপত্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি মত দেয় এ জনপদের মানুষ সেই পাকিস্তানেই আবার হাজির হয় জুলুমের নতুন রূপ নিয়ে। আর এ জুলুমের প্রথম রূপটি দেখা যায় ভাষার মাধ্যমে তাদের আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তাই দেশের ছাত্রসমাজ যেমন ভাষার ওপর পাকিস্তান রাষ্ট্রের এই বর্বর আধিপত্যের প্রতিরোধে নেমে আসে ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষেরা অন্যায়ের নতুন রূপ হিসেবে হাজির হওয়া এই ভাষিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। খুব সহজে বোঝা যায় যে, শ্রমজীবী মানুষের সাথে সংবিধান-রাষ্ট্র-কর্তৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু যে ভাষার মাধ্যমে মানুষ চিন্তা করে বেঁচে থাকে সে ভাষার উপর আক্রমণ যে নিজ অস্তিত্বের ওপর আক্রমণের সামিল! তাই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষার স্থান থেকে বাতিলের দাবিতে যখন ছাত্রসমাজ আন্দোলনের ডাক দেয় তখন শ্রমজীবী মানুষেরা তাদের সাথে একাত্ম ঘোষণা করে, সামিল হয় অন্দোলনে। এর পেছনে যেমন ছিলো নতুন জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষা; ঠিক তেমনি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদও। এই শ্রমজীবী মানুষের সন্তানরাই পড়তো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা ভেবেছিলো এরা অফিস আদালতে কাজের সুযোগ পাবে আর তাতে অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে। আর যদি উর্দুই হয়ে ওঠে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তাহলে উর্দুই হবে অফিস-আদালতের ভাষা। ফলে উর্দু ভাষাভাষী মানুষেরাই যেকোনো কর্মক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। বাংলাভাষীরা যে অর্থনৈতিক উন্নতির আশায়পাকিস্তানের প্রতি মত দিয়েছিলো তা আর সম্ভব হবে না। তাদের আশা যখন নিরাশায় পরিণত হবার দিকে এগোয় শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয় পথে নামতে, নিজ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। খোদ নিপীড়িত বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বিদ্ধ হলেও বাংলা পেয়েছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি। আর আজ এই স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ঐ ছাত্রসমাজ যারা নিজ ভাষায় কথা বলার আর অবাধ জ্ঞানচর্চার সুযোগ পাবার আশায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলো কিংবা ঐসব শ্রমজীবী মানুষ যারা নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন আশায় সামিল হয়েছিলো ভাষা আন্দোলনে, তাদের কারোর স্বপ্নই বাস্তবায়িত হয়নি এই স্বাধীন ভূখণ্ডে। আজো এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। এমনকি এদেশের ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করতে হয় ইংরেজিতে। অনেক কর্মক্ষেত্রেই চাকরির জন্য আবেদন করতে গেলে বলা হয় ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা না থাকলে আবেদনের প্রয়োজন নেই! বিজ্ঞাপন আর বিনোদনের অনেক জায়গায় ইংরেজি আর বাংলার বিকৃত মিশ্রণ জাহির করা হয় তথাকথিত স্মার্টনেসের নামে! তাই এই লড়াকু আর শহিদের রক্তে ভেজা বাংলা আজো নানা ক্ষেত্রে আধিপত্যের শিকার হচ্ছে। আবার অন্যদিক থেকে দেখলে দেখা যায় বাংলাই হয়ে উঠেছে এদেশের আদিবাসীদের ভাষার উপর আধিপত্যশীল। আজো আদিবাসীরা পায়নি তাদের ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জ্ঞানচর্চার সুযোগ তো দূরের কথা। এমনকি তাদের ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করে এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র। তাই সকল ভাষার সমান মর্যাদার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে যে আন্দোলন-লড়াই শুরু করেছিলো এদেশের মুক্তিকামী মানুষেরা (যে লড়াই কিনা স্বাধীন বাংলার পথে প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত) তার মূল উদ্দেশ্য আজো হাসিল হয়নি। ভাষার স্বাধীনতাই চিন্তার স্বাধীনতা, ভাষার স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে চিন্তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। বিদ্যায়তনিক পাটাতনে দাঁড়িয়ে দেকার্তে আমাদের তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। এই চিন্তাই মানুষকে মনুষ্যত্বের উপলব্ধি দেয়। চিন্তার মাধ্যমে তার আবেগ, অনুভূতি, ঘৃণা, প্রেম, ভালোবাসা, দ্রোহ এসব মানবিক বোধ তৈরি হয়। সে নিতে পারে স্বাধীন সিদ্ধান্ত। আবার চমস্কির ভাষাতত্ত্ব অনুসারে মানুষ সহজাতভাবেই সৃজনশীল। আর সৃজনশীল মানুষই স্বাধীনভাবে চিন্তার সক্ষমতা রাখে। তাই যার নিজ সিদ্ধান্ত নিজে নেবার সামর্থ্য আছে তার অন্যের দ্বারা শাসিত হবার প্রশ্নই আসে না। আর এই কারণেই সমস্ত প্রকার শাসন ও কর্তৃত্ব অবৈধ-অন্যায্য। আর তাই কারো ভাষার উপরে যখন আঘাত আসে তখন সেই আঘাত আসে তার অস্তিত্বের উপরেই। এই একুশের চেতনা হোক ভাষার স্বাধীনতা যখন সকল স্বাধীনতার পথে প্রথম ধাপ, তখন আদিবাসীদের ভাষিক স্বীকৃতি না দেয়া, তাদের ভাষা সংস্করণ ও বিকাশের উদ্যোগ না নেয়া তাদের পরাধীনতাকেই প্রতীয়মান করে তোলে। আজো তারা এক স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করে চিন্তায়-মননে-কাজে পরাধীনতার শেকল ধারণে বাধ্য হয়। তাদের এমন পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্ত করতে চাই আদিবাসীদের ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান, তাদের ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ। আরো চাই সে সকল ভাষায় সকল প্রকার জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি। সেই সাথে আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণের সকল পদক্ষেপ গ্রহণও অন্যতম বিষয়। তাই এই হোক একুশের চেতনা, সকল ভাষা পাক সমান মর্যাদা। নতুবা এই দেশের মানুষের মুক্তির দাবিতে যে অনন্য পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিলো ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে, তারতাৎপর্য আরো অর্থহীন হয়ে যাবে।

হাফিজুল ইসলাম
আমরা ও স্বাধীনতা

অনেক আগে পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম, নিজের ইচ্ছেমত জীবন পরিচালনা করাকেই স্বাধীনতা বলে; যদি সেই ‘ইচ্ছেমত’ জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে অন্যদের অনুরূপ ‘ইচ্ছেমত’ জীবন পরিচালনায় ব্যাঘাত না ঘটে। অর্থাৎ, অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা হলো স্বাধীনতা ভোগেরপূর্বশর্ত।

খুব ভালোই লেগেছিল উক্তিটি পড়ে। তখন মেলানোর চেষ্টা করতে লাগলাম, জন্ম থেকেই যেহেতু স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীন দেশ দেখছি, পরাধীন অবস্থায় আসলে আমাদের দেশের অবস্থা কেমন ছিলো। মিলিয়ে নেয়ার আশায় তাই স্বাধীনতা-পূর্ব আমাদের সামাজিক অবস্থা নিয়ে বেশ জানার চেষ্টা করতে লাগলাম। বেশ কিছু ফলাফলও তাতে হাতে এসে জুটল, যেমন—

* পরাধীন দেশে মানুষ প্রথমত সরকার বিরোধী বা শাসক বিরোধী কোন কর্মকাণ্ড করার অধিকার রাখে না। সেক্ষেত্রে ভয়াবহ উপায়ে তাদের দমন করা হয়।

*  পরাধীন দেশে সকল নাগরিক সমানুপাতিক হারে মৌলিক চাহিদা ভোগ করার সুযোগ পায় না। যেমন- সবাই সমান চিকিৎসা সুযোগ, শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ, যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র পাওয়ার সুযোগ কিংবা চাহিদা অনুযায়ী বাণিজ্য করার সুযোগ লাভ করে না। এমনকি কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা অনুযায়ী মজুরী পাওয়ার সুযোগও থাকে না।

*পরাধীন জাতি শাসক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না; তা সে যতই যোগ্য কিংবা জনপ্রিয় হোক।

* বিচার ব্যবস্থা থাকে শাসক শ্রেণির আওতাধীন— যেখানে আইনানুযায়ী বিচার হওয়াটা মুখ্য নয়; বরং শাসকের স্বার্থ সংরক্ষণটাই মূল বিবেচ্য।

*পরাধীন দেশের সংস্কৃতি নিজ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সেখানে অনুপস্থিত থাকে; অবহেলিত বা অস্বীকৃত থাকে।

* সাধারণ জনগণ তার রায় প্রদানের কোন সুযোগ পায় না, সেটা শাসক দেশের বা ব্যক্তিগত- যেই পর্যায়ের-ই বিষয় হোক।

আরও থাকলেও এগুলোই মূলত চোখে বেশি পড়েছিলো। তাই এগুলোকেই পরাধীন দেশের মূল চারিত্রিক বিশেষত্ব বলে ধরে নিয়েছি। সংক্ষেপে বলতে গেলে— ‘যখন একটা দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ সেই দেশের জনগণের অনুকূলে না থাকে, তাকেই পরাধীন দেশ বলে।’

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোনো শাসক গোষ্ঠী-ই সেই দেশ গড়ার, সেই জাতিকে উন্নত করার মূল কারিগর হিসেবে নিজেদেরকে প্রমাণ করে গেছে। তাই বলা যায়, অন্য দেশের দ্বারা বিজিত হলেই  কোনো অঞ্চল পরাধীন হয় না, আবার তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করলেই স্বাধীন হওয়া যায় না। সমাজকে, জাতিকে, দেশকে স্বাধীন করতে হলে, সেই দেশের জনগণকে স্বাধীন করতে হয়; তাদেরকে পূর্ণ অধিকার ভোগেরশতভাগনিশ্চয়তা প্রদান-পূর্বক তার বাস্তবায়ন করতে হয়। শুধুমাত্র স্ব-জাতীয় মানুষের হাতে ক্ষমতার চাবি উঠলেই দেশ স্বাধীন হয় না।

যাই হোক, এইবার পরবর্তী আলোচনায় আসা যাক— পরাধীন দেশের এই সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়ার পর আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থার সাথে এর তুলনা করতে শুরু করলাম। তাতে ফলাফল যা খুঁজে পেলাম, তা যেমন হতাশা-ব্যঞ্জক, তেমনি ভীতিকর। সংক্ষেপে একটু আলোচনা করি—

আমাদের দেশে সরকারের সমালোচনা কিংবা বিরোধিতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত, অথচ তা কেউ করতে গেলে অতীতে দেখেছি, শাসক শ্রেণির রোষানলে পরে তার জীবন তেজপাতা হতে বাধ্য। তাকে দলীয় লোক দ্বারা, গোপনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের দ্বারা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দমন করা হতো। আর এখন তো আরও সুবিধা হয়েছে, আইনানুগভাবেই সাজা প্রদানের ব্যবস্থাও সাথে যুক্ত হয়েছে।

সাধারণ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও সরকার প্রচুর আশ্বাস দেয়, অনেক আইন করে, এমনকি সংবিধানের মূল অংশেও তা স্বীকৃত আছে এমনকি নিয়মিত তার আধুনিকায়নও করা হয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনেক আলাদা। এখানে যোগ্য ছাত্র তার পছন্দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা যোগ্য চাকুরী প্রার্থী তার উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রে, বা রোগী তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না। নিজের চাহিদা অনুযায়ী বাণিজ্য করাটাও বাঘের চোখ হাতে নেওয়ার মতোই দুষ্কর।

শাসক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে পরিবারের পরিচয় থাকতে হয় কিংবা অর্থের প্রাচুর্য। সাধারণ জনগণ সেখানে শুধুই সাধারণ জনগণ।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, যখন যার শাসনে দেশ, তখন সংস্কৃতিও তার ইচ্ছা মাফিক পরিচিতি লাভ বা পৃষ্ঠপোষকতা পায়।

আইন, শাসন আর বিচার বিভাগ এখানে মূলত একই সূত্রে গাঁথা। এখানে শুধু সাধারণদেরই বিচার হয়, তাদের জন্যই আইন প্রণীত হয়।

এক কথায় বলতে গেলে— ‘আমরা আসলে স্বাধীন দেশ পাইনি, পেয়েছি স্ব-জাতীয় শাসক; যাদের আচরণ শুধুই শাসকের মতো।’

আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে শুনেছি, আবার জাতি হিসেবে আমরা পরাধীন ছিলাম প্রায় ২২০ বছর, তাও শুনেছি, তৎকালীন জীবন সম্বন্ধেও জেনেছি আর বর্তমানের অবস্থা দেখছি। খুব বেশি পরিবর্তন তো খুঁজে পাচ্ছি না! পৃথিবীতে সব যুগেই পরিবর্তনটা ক্রমবর্ধমান হারেই হয়েছে এবং হচ্ছে, তাই অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন আমাদের হয়েছে কিংবা হচ্ছে, গড় হিসেব করলে ব্রিটিশ শাসন আমলে চরম পরাধীনতার মাঝেও এতোটুকু উন্নয়ন ঘটেছিলো। পাকিস্তান আমলের পুরো ২৪ বছর তো আসলে আমরা পরাধীন ছিলাম না; বস্তুত আমরা প্রথম একদেশ ছিলাম এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রসৃষ্টির প্রায় দেড় যুগ পর থেকে মূলত আমরা ক্রমেই পরাধীন হতে থাকি। প্রথম অবস্থায় আমরা ছিলাম একই দেশের একটি অবহেলিত প্রদেশ । আর সেই অবহেলাই ক্রমে পরাধীনতায় রূপ  নেয়। অর্থাৎ, যখন আমরা একদেশ, তখন আমরা পরাধীন ছিলাম না; ছিলাম অবহেলিত। পাকিস্তানী শাসকদের চরম স্বেচ্ছাচারিতায় যখন আমরা বিচ্ছিন্ন হতে উদ্যোগী হই, তারপর থেকে মূলত আমরা হই পরাধীন। এরপর আমরা স্বাধীন হই।

হ্যাঁ, আমরা স্বাধীন ভূ-খণ্ড পেয়েছি, স্ব-জাতীয় শাসক পেয়েছি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছি, কিন্তু আমাদের দেশের জনগণ কতোটুকু স্বাধীন হয়েছে?

নিজস্ব সংবিধান, নিজের  ভোটে নির্বাচিত সরকার আমাদের কি দেয় বা কি দিয়েছে? আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আজকে কতোটুকু মুক্তি অর্জন করেছে? আজকে একজন মুসলমান যদি তার ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়, তাহলে সে হাসির পাত্র, সন্দেহের বস্তু। একজন মানুষ যদি ধর্ম নিরপেক্ষ বা ধর্মে অবিশ্বাসী হয়, তবে তার ফাঁসি চাওয়া হয়, একজন মানুষ যদি শাসক শ্রেণির কাউকে তিরস্কার করে, তবে সে আইনানুগভাবে শাস্তির সম্মুখীন হয়, মেধাবী ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পায় না, অযোগ্য লোক, অদক্ষ প্রতিযোগী প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়, একজন বৃদ্ধ সরকারী কর্মচারী তার অবসর ভাতা উঠানোর প্রয়োজনে নিজের পৈতৃক আশ্রয় বিক্রি করে, জনগণ ভোট না দিলেও সরকার গঠিত হয় আবার জনগণ সমর্থন না দিলেও এক দল দিনের পর দিন জনদুর্ভোগ বাড়াতে ভয়াবহ সব কর্মসূচি দিয়ে চলে। আবার কখনো সুষ্ঠু পন্থায় ক্ষমতা গ্রহণকারী সরকারের এক সপ্তাহ কাটার পূর্বেই বিরোধীদল সরকার পতনের আন্দোলনের নামে জনগণের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়া শুরু করে। যখন যে গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকে, সেই গোষ্ঠীর পছন্দ অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়। রাস্তায় নামতে গেলে সাধারণ জনগণ কখনো পুলিশের ভয়ে কখনো আবার বিরোধীদল আবার কখনো  সংগঠিত সন্ত্রাসীদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে থাকে, তাহলে এর মাঝে স্বাধীনতা কোথায়? কে বলে তাহলে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে? জোরপূর্বক ক্ষমতা গ্রহণ, আবার তার পতন ঘটানো ছাড়া এই দেশে বিভিন্ন দলীয় শাসক গোষ্ঠী কী করেছে?

তাই শেষে বলতে চাই, এতোটুকু বয়স পর্যন্ত আমাদের দেশের স্বাধীনতা আর পরাধীনতার বিশ্লেষণ করে যে ফলাফল খুঁজে পেয়েছি, তা হলো— ‘আমাদের দেশ স্বাধীন দেশের তকমা পেয়েছে আর আমাদের দেশের জনগণ নিজ দেশে রাজনীতি করার অধিকার পেয়েছে, আর পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ স্থায়ীভাবে কেউ পায়নি, শুধু যখন যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠান লাভ করে, তারা আর তাদের অনুসারীরা দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হয়, যদিও তারা একটু বেশিই স্বাধীনতা পায়, তাদের জন্য সেই স্বাধীনতার উক্তির যেই শর্ত আছে যে, অন্যের স্বাধীনতায় বাঁধা না দেয়া— সেই শর্তও শিথিল হয়ে যায়। তখন তারাই থাকে স্বাধীন আর বাকিরা পরাধীন। অর্থাৎ, আমরা অনেক সাধনার মাধ্যমে, অনেক সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের মাতৃভূমির জন্য শুধু একটি স্বাধীন সরকার ব্যবস্থা অর্জন করতে পেরেছি, আর সেই সরকার শুধু নিজের জন্যই কাজ করে; জনগণ সেখানে অবাঞ্ছিত।

তাই বলছি, খারাপ কাজকে কেউ খারাপ কাজ জানলে সেটা পরিত্যাগের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু কেউ যদি খারাপ কাজকে পুণ্যের কাজ মনে করে, তাহলে তার ফেরার কি কোনো উপায় আছে? আজকে আমরা স্বাধীনতার মোড়কে পরাধীন একটা জাতি; যারা দেশের বিভিন্ন দলীয় ক্ষমতালোভী কিছু মানুষের কাছে পরাধীন হয়ে আছি, স্বাধীন হয়েও যেহেতু পরাধীন, তাই আমাদের আর স্বাধীন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, আমাদের করণীয় বলতে শুধু একটা কাজই অবশিষ্ট আছে, যা হলো- আমাদের ব্যক্তিগত উন্নয়ন। যাকে আশ্রয় করেই আমরা ক্রমেই হয়ে উঠতে পারি একটি শক্তিশালী, সম্মানিত আর অনুকরণীয় জাতি।

রেজওয়ানুল হক রোমিও
হাজার বছরের কথপোকথন : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

মুক্তির স্লোগানে মুখরিত এ বঙ্গভূমি স্বাধীনতার স্বাদ চেয়েছিলো, ইতিহাস এমনটাই বলে। মৌর্য, গুপ্ত, গৌড়, হর্ষবর্ধনের পালাবদলে এ বর্ণিল বাংলা পাল, সেন কিংবা সুলতানি আমলে কিছু আক্ষেপ হয়তো রেখে এসেছিলো কিন্তু সময়ে সময়ে এ পরিবর্তন বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। বাংলার বারো ভুঁইয়া এবং নবাবি আমল এর সাথে জুড়েছে ভিন্ন মাত্রায়। কিন্তু ইংরেজদের আগমনের সাথে সাথে যে অশনি সংকেত বীণা বেজে উঠেছিলো তা শুধু আমাদের আক্ষেপের এক অধ্যায়-ই নয়, এখনও আমাদের প্রতিনিয়ত পোড়ায়, রক্তে আগুন জ্বালায়। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ে, তাঁর রণকৌশল যতোটা না প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন রেখে গিয়েছিলো মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায়। অবিশ্বাসের বীজ গ্রথিত হয়েছিলো সেদিন, তারপর তার আগুনে পুড়তে হয়েছিলো ১৯০ বছর। দেশবিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত।

বিষয়টি ঠিক এমন নয় যে, এই সুদীর্ঘ সময়ে এদেশের সাধারণ মানুষেরা ইংরেজদের রক্তচক্ষুকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছিলো বরং বক্সারের যুদ্ধ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ কিংবা স্বদেশী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদেশের পবিত্র মাটি বার বার ¯œাত হয়েছে বীর সন্তানদের বক্ষে ধারণ করে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা হয়তো অনেকটাই ঠুনকো ছিলো ইংরেজদের গোলা বারুদের সামনে কিন্তু যে বিশ্বাস বুকে ধারণ করে তিতুমীর স্বাধীনতার স্বপ্ন এঁকেছিলেন পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যেকটি মানুষকে নতুন করে জেগে ওঠার প্রেরণা যুগিয়েছিলো। লর্ড ক্লাইভ, লর্ড কর্নয়ালিশ থেকে শুরু করে লর্ড মাউন্টব্যাটেন পর্যন্ত প্রতিটি ইংরেজ ভাইসরয় তাঁদের স্বার্থসিদ্ধির নিমিত্তে শস্য-শ্যামলীমায় ভরা এ ভারতবর্ষকে শকুনের চোখ করে রেখেছিলো। তারা তাদের কার্যসিদ্ধিতে যে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই। দীর্ঘ সময়ের এ শাসনামলে তারা অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করার পাশাপাশি আঘাত হেনেছিলো ধর্মীয় অনুভূতিতেও। শরীরে এবং মনে শাসনের যে চিহ্ন তারা রেখে গিয়েছিলো তা আজও আমাদের চোখে অশ্র“ নিয়ে আসে গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাসের পাতায় পাতায় মুদ্রিত হয়ে।

অবশেষে ১৯৪৭ সালে এ ভারতবর্ষ আবার নতুন করে নিজেদের ফিরে পায়। অনেক স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে সেদিন সৃষ্টি হয়েছিলো পাকিস্তান এবং ভারত নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েই এদুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিলো। পূর্ব পাকিস্তান এবং পাকিস্তান মিলে যে পাকিস্তান নামকরণ করা হয় সেদিন সেখানে স্বপ্ন এক ছিলো, ছিলো একে অপরকে নিয়ে বেঁচে থাকার দীর্ঘ আশ্বাস। কিন্তু পাকিস্তানের স্বৈর-শাসকেরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে হয়তো ভিন্ন কিছু চেয়েছিলো। যার ফলশ্র“তিতে সর্বপ্রথম ভাষায় হাত এবং এরপর সার্বভৌমত্বে। ভাষার আন্দোলনে ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়ে রফিক, শফিক, জব্বার, বরকতের শরীরের তাজা রক্ত যে স্ফুলিঙ্গের বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছিলেন তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলো। স্বাধীনতার প্রশ্নে নির্বিচার এদেশের উপর যে বর্বর হামলা চালিয়েছিলো তা শুধু সাধারণ মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে হত্যার মধ্যে দিয়ে তা এক নির্লজ্জ রেখার সমাপ্তি আঁকে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের মহান আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় যে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলো সেখানে আজীবন কৃতজ্ঞতায় বাঙালি জাতি তাঁদের মনে রাখবে। সেই সাথে মনে রাখবে সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ কণ্ঠ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম…’।

অনেক স্বপ্ন নিয়ে পদ্মা, মেঘনা, যমুনার অববাহিকায় গড়ে ওঠে এই সোনার বাংলাদেশ। যার ইতিহাস, এক চিরন্তন রক্তের সমুদ্রের ইতিহাস। যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মাটি ও মানুষের আবেগের কথা দিবারাত্রির কাব্যে উচ্চারিত হয় একসাথে। রাখালের বাঁশির সুরে এদেশের প্রান্তে প্রান্তে সুরের মুর্ছনা মানুষের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে যাবে প্রতিনিয়ত। এমন স্বপ্ন নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিলো এ পূণ্যভূমির। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী কিছু অপশক্তি সর্বদাই সচেষ্ট ছিলো এদেশের প্রভূত উন্নয়নের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে বিভিন্ন ধরণের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বাকশালের নাম করে যারা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করেছিলো ১৯৭৫ সালের ১৫-ই আগস্ট, যে মানুষ সারাটি জীবন এদেশের কল্যাণার্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। পাকিস্তানের শাসকদের দুর্বিনীত চাওয়ার কাছে কখনোই মাথা নত করেন নি। সেই মানুষটি কী উপহার পেয়েছিলো জীবনের শেষ দিনটিতে? এতো বিশ্বাস আর ভালোবাসায় তিনি যে দেশ গড়তে চেয়েছিলেন সেখানে রক্তের গঙ্গাস্রোতে হারিয়ে যেতে যেতে তিনি কী আফসোস করেছিলেন নাকি আক্ষেপ করে শেষ নিঃশ্বাসের কষ্টে বলেছিলেন, এমন করে মৃত্যুর জন্য কী প্রতিটি রাত জেগে জেগে রাজপথে মিছিল করেছিলাম? যদি আর কখনো ফিরে আসি তবে যেন এ বঙ্গমায়ের কোলেই আসি, এ যে আমার আরাধ্য।

এরপর শুরু হয় নেতৃত্বের পালাবদল। ঠিক যেমনটি রাজা যায় রাজা আসে। স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নূর হোসেনের পিঠে লেখা ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ আজও গণতন্ত্র উদ্ধারের ভাষা হয়ে ঠাঁই নেয় ব্যানারে ব্যানারে। নূর হোসেনের রক্তের ছাপ আজও মানুষের মুখের স্লোগান হয়ে ফোটে সময়ের প্রতিটি আন্দোলনে। স্বৈরশাসকের বৃত্ত থেকে একটা সময় বের হয়ে আসতে পারলেও ক্ষমতার লোভ কখনোই ক্ষমতাসীনদের পিছু ছাড়ে নি। নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দল আসলেও সাধারণ মানুষেরা বরাবরই ছিলো উপেক্ষিত। সব থেকে অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো এখনো ভোটের আগের রাতে ৩০০ টাকা দরে প্রতিটি ভোট বিক্রি হয়। এই হল গণতান্ত্রিক সরকার আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ। নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রকে স্বর্গ বানাতে চাওয়া হলেও নির্বাচন পরবর্তীতে সেই মাননীয় সাংসদদের দেখা পাওয়াই ভার। যদিও অনেকদিন পরপর দেখার সৌভাগ্য হয় কিন্তু তারা থাকেন সুসজ্জিত স্টেজে, গভীর নিরাপত্তা বলয়ে আর সাধারণ মানুষেরা দূর থেকে তাদের মুখদর্শন করে নিজেদের জীবনকে ধন্য বলে মনে করেন। এই সবকিছুর মাঝখানে রাষ্ট্র হয়ে যায় মেশিনচালিত এক যন্ত্র যেখানে অনেক কথা থাকে কিন্তু প্রশ্ন রাখার কোনো অবকাশ নাই। সংসদে বিরোধী দলীয় নেতারা বরাবর-ই অনুপস্থিত। পদ্মা সেতু কেনো হলো না কিংবা হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনায় অর্থমন্ত্রী কীভাবে বলতে পারেন যে, দুই হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না! আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষিতে যা অনেক বড়ো অঙ্কের টাকা। মন্ত্রীরা অপরাধ করলে বিচার না করে দেয়া হয় দপ্তরবিহীন মন্ত্রীর পদমর্যাদা। রানা প্লাজার মতো ঘটনায় নেই কোনো সুষ্ঠু বিচার যেখানে হাজার হাজার প্রাণের সাথে চলে গেছে হাজার হাজার পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও। তারপর সরকারি দল ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে যখন দেখবেন পায়ের নিচের মাটি অনেকটাই নড়বড়ে তখন সংবিধান পরিবর্তন করে দাও নির্বাচন। সব সম্ভবের এ দেশে কি না অসম্ভব? এরপর শুরু হবে বিরোধী দল পর্ব। টানা হরতাল অবরোধ ডেকে দেশের পরিস্থিতি, সে তো এক ভয়াবহ অবস্থা। পেট্রোল বোমায় পুড়ছে মানুষ, পুড়ছে দেশ। আজ যে মানুষটি ঘর হতে বের হবে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না যে, সে বাড়ি ফিরে আসবেই। সন্তানের লাশ নিয়ে বার্ন ইউনিট থেকে ফিরছে বাবা। পোড়া লাশের গন্ধে প্রতিবেশিরা নাকে চেপে ধরছে রুমাল। পুরো দেশ যেন আজ একটি বার্ন ইউনিট। লক্ষ লক্ষ মানুষের সন্তানকে পেট্রোল বোমার কূপে ডুবিয়ে রেখে বিরোধী দলীয় নেত্রী তাঁর নাতনীর কপালে অঙ্কিত চুমু দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দিচ্ছে আর আশীর্বাদ করছে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য! ওপাশে হয়তো মার্কিন মুলুকের কাছে অভিযোগ পাঠানো হচ্ছে এই মর্মে যে, দেশে এখন কোনো গণতান্ত্রিক সরকার নেই। তাই বৈদেশিক সকল প্রকার সাহায্য বন্ধ করা হোক।

এর নাম কী তবে স্বাধীনতা? ক্রসফায়ারে মরে ঐ পচা নর্দমার পাশে পড়ে থাকা! এই স্বাধীনতার জন্য কী জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের শহিদেরা? আজ সারা দেশটাকে ইংলিশ মিডিয়াম বানানোর অপচেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেওয়া হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’ অথচ সেখানে কোনো বাংলা বিভাগ নেই। তাহলে কি এই ভাষার জন্য নিজেদের সর্বস্বটুকু উজাড় করে দিয়েছিলো বায়ান্নর ভাষা শহিদেরা? আজ শরীরে একটু কিছু হলেই মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে সদলবলে দৌড়ান মন্ত্রী-মিনিস্টারেরা। আর সাধারণ মানুষের জন্মই বুঝি এদেশের কসাই নামক ডাক্তারদের সুই আর সিরিঞ্জের মধ্যে নিজেদের সমর্পণ করার জন্য। খাদ্যে ফরমালিনে ছেয়ে গেছে দেশ। ফলমূল নিজেই জানে না কবে তাদের পচতে হবে। মানুষের মাঝে আজ আর স্বচ্ছ বিবেকের কোনো জায়গা নেই। ধর্ম নিয়ে এক দল মেতে আছে হত্যার উৎসবে আর প্রগতিবাদীরা নিজেদের কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি আজও। উপজাতিরা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে এদেশের প্রান্তে প্রান্তে সংখ্যালঘু অপবাদ নিয়ে।

অতএব প্রশ্ন থেকেই যায় তাহলে কি এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই? সব সম্ভাবনা নিয়ে অস্তমিত সূর্য কি এভাবেই অন্ধকারে ডুবে যাবে? নাকি ঐ পূর্ব দিগন্ত আলোকিত করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার আহ্বান জানাবে? পৃথিবীতে বোধ করি বাংলাদেশিরাই একমাত্র ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে যা সত্যিই বিরল এক ঘটনা। অমিত সম্ভাবনার দ্বার খুলে সেদিন যে স্বপ্ন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিলো বাংলাদেশ তা আজ এভাবে থমকে দাঁড়াতে পারে না, পারে না ইতিহাসের পাতায় আক্ষেপের আর এক নাম হতে। সেজন্য প্রয়োজন আর এক শেখ মুজিবুর রহমানের। যার মহান চিন্তা প্রতিটি মানুষকে হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলার সাহস যোগাবে দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে। এ তরুণ সমাজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সেই নেতৃত্ব। হয়তো জঞ্জাল সাফ করতে গিয়ে কিছু ময়লা শরীরে লাগবেই কিন্তু কবি তো বলেই গিয়েছেন,

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

ভয় নাই ওরে ভয় নাই

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই…’

কবিতা

জিয়াউল হক সরকার
রক্তজবার ক্ষত

ভোরের রক্তজবার মতো আমিও খুন হচ্ছি
প্রতিদিন। নক্ষত্রের নির্বুদ্ধিতা আর সাদা গোলাপের
কৃত্রিম শোভায় ব্যর্থ হলো আমার উঠতি যৌবন।
স্বপ্নের বেসাতি আর রঙধনুর হৈ-হুল্লোয়
তছনছ হলো স্বপ্নের বাসর।
এখন আপন যৌবন যেনো ক্যান্সার
স্বপ্ন যেনো ভিক্ষুকের থালা।
তবুও পদ্মপাতার পুরোনো ঝিলটি
দোলা দেয় আমারই মনের আঙিনায়।
বাঁশঝাড়ের জোনাকির দলকে দেখলাম
শাহবাগের ল্যাম্পপোস্টের নিচে।
অসময়ে শিস্ দিলো কয়েকটি দোয়েল
আর পাতাকুড়ানো মেয়েটি দিয়ে গেল
সূর্যসেনের শেষ চিঠি।
বলুন তো— ইন্দ্রিয়হীনের মতো বেঁচে থেকে কী লাভ?
আসুন, বরং বৃষ্টিতে ভিজি।

চল্ নষ্ট হই

ভাসবি নাকি বানের জলে?
উড়বি নাকি পাখা মেলে?
খাবি নাকি হাওয়াই মিঠাই?
হবি নাকি জেঠামশাই?

নষ্ট হবি, হবি কিনা বল্?
নষ্ট যদি হতেই চাস্
আমার সঙ্গে চল।

নষ্ট যখন কর্তাবাবু
নষ্ট হলো শ্যামকুল
নষ্টের হয়ে ফুর্তিতে মাতে
রাষ্ট্রনায়ক আর ভ্রাতৃকুল।
নষ্ট যখন নীতি-নৈতিকতা
নষ্টের বীজে রাজনীতি
আমিও তখন নষ্ট হয়ে
দিয়েই চলি ডিগবাজি।

নষ্ট যখন ভোরের হাওয়া
বারুদ-মাখা গন্ধে
আমার মনেও আনন্দ বয়
নষ্ট হবার ছন্দে।

নষ্ট যখন ইঞ্চি ইঞ্চি
প্রতি ইঞ্চি, প্রত্যেক ক্ষেত্র
আমিও তখন হাত বাড়াই
নষ্ট হয়ে যত্রতত্র।

নষ্ট যখন ডাল-ভাত আর
কাগজ-কলম-মন্ত্র
ভোঁতা হয়ে বাঁচে তখন
লাঙল-হাতুড়ি-যন্ত্র।

নষ্ট নষ্ট-নষ্ট আমরা
নষ্ট সাধুবাদ
চূড়ান্ত নষ্ট হলেই পরে
পাবো জিন্দাবাদ।

আনন্দ কিশলয়
নিরুদ্ধ নিঃশ্বাস

নীড়ে ফেরা পাখিদের সন্ধ্যায়
ভেসে এলো স্লোগানের ডাক।
জোনাকিনিবাস থেকে চিৎকার উঠেছে
বাঁচতে চাই, বাঁচতে দাও।
কাকেরা তখনো কা-কা’য় ব্যস্ত
নিরম্বু ফসলের মাঠগুলোতে
রক্ত মাখা, লালিমায়।
ভরা ফসলের মাঠ আর
পাকা ধানের গন্ধ এখন শুধুই স্বপ্ন
কর্পোরেট যুগে ফ্যাসিবাদী প্রভাবে
এসব এখন গাঁজাখুরি গল্পের মতোই।
তাই যান্ত্রিক সভ্যতা আর স্যাটেলাইট মিডিয়ায়
মানুষগুলো ঝুকছে বাঁচার নেশায়
স্বপ্নহীন- কর্মহীনতায়।

রহমতে রাব্বী
বিজ্ঞাপন

প্রতি প্রত্যুষে ছোপ ছোপ রক্তের মতো
আকাশ রঞ্জিত হলে বের হই দ্বারে দ্বারে
বিক্রির আশায় নয়, বিজ্ঞাপনের আশায়।
ফুসফুসে বিষাক্ত বাতাস নিয়ে এই যাত্রায়
বোধহয় টিকে গেছি; সঙ্গীহীন আমি
কৃশকায় শরীর— জীবনীশক্তি অফুরান
অশরীরি ডাকে যখন তন্দ্রা ভাঙে
নিউজপ্রিন্ট কাগজের খোঁজে দিশেহারা
ঈশ্বর তখনো পুরোপুরি ক্লান্ত হননি,
আজ তিনি ভীত আর আমি বিভ্রান্ত
আচমকা ফেরিওয়ালার ডাকে কপাট খুলি
তার কর্কশ কণ্ঠধ্বনি আশ্চর্য বিদ্রƒপাত্মক
আত্মার অস্থিরতাকে দ্রুত নাড়া দিয়ে গেলো।
আরশোলার মতো ইতস্তত দুপুর এলো
গর্তে ঢোকা নেংটি ইঁদুরের তাড়া নেই
কিন্তু শৃঙ্খলতা আমাকে গ্রাস করতে চায়,
নদীর বুকে খোলা নৌকার পাটাতনে শুয়ে
আমি বাঁচতে চাই মৃত্যুর পরের জগতে।
কারবালার মতো নিথর-নিস্তব্ধ সন্ধ্যা নামে
এখনো আমি বোতলবন্দী হয়ে অন্ধকারে,
দিনে আর বের হতে পারি না
ছোট ছেলেমেয়েরা তেড়ে আসে ঢিল হাতে
এই ভূখণ্ডের সবাই যেনো প্লেটো হয়ে গেছে,
শকুনের ডানার নিচে আঁধার নেমে এলে
আমি আবার বের হই ঝোলা হাতে
বিক্রির আশায় নয়, বিজ্ঞাপনের আশায়।

বেনামী আত্মার নামসর্বস্ব হাহাকার

কীসের জন্য হাহাকার করো তুমি হে মানব?
ক্ষয়িষ্ণু কৃষাণির উদ্ভ্রান্ত চলাচল পৃথিবীর পথে
ধর্মশালার অযৌক্তিক আহ্বান যত্রতত্র প্রলোভন
আর আমার আত্মার অস্থিসর্বস্ব আর্তচিৎকার,
বলবে, তোমার জীবন প্রভাবহীন; ঊর্দির নিচে
তবে ক্ষতচিহ্নগুলো— দগদগে ঘা ঢেকে রাখো।
রাখাল বালক একদিন বলেছিলো সন্তর্পণে
কেনো তুমি আসো মলিন হয়ে যাওয়া ঘাসের পাশে?
বেনামী আত্মার পরিচয় খুঁজতে— উত্তর দিয়েছিলাম,
সরল চাহনিতে রাখাল চেয়েছিলো মুখের পানে
যেনো এমন উত্তর কস্মিনকালেও আশা করেনি,
আমি কার্তিকের এক বিকেলে একটু আনন্দিত হলাম
নারীর ঘনকেশে নাক ডুবিয়ে ভালোই আছে তারা।
চিন্তার রেশ কেটে গেলে ফিরে আসি সড়কের পাশে
কামনার রসে সিক্ত যুবক আমায় দেখে বিলক্ষণ হাসে,
গতরাতে পূর্ণিমা ছিলো বলতে বলতে ফিরে চায় এক তরুণী
অস্থির তার চোখজোড়া অথচ শান্ত দেহ
পালিয়ে এসেছিলো যে যুবকের হাত ধরে,
বটগাছের নিচে এসে বসেছে এক বৃদ্ধ— কপালে ভাঁজ
চেয়ে আছে মাঠের দিকে নিবিষ্ট মনে,
মনে হলো এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অনেকদিন পরে
স্বপ্নের ঘোরে।

গ ল্প

রফিক সানি
ভায়নার বড়ি

একদা স্বর্গের দেবতাগণ কিন্নর কিন্নরীদের থামাইয়া বলিলো, তোমাদের এই সংগীত বারংবার শুনিতে শুনিতে আমরা অতিষ্ট হইয়া উঠিয়াছি। এই সংগীত আমরা আর শুনিতে চাই না। তোমরা মর্তে নামিয়া যাও। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরো। শোনো মানুষেরা কি বলিতছে। তাহাদের মুখের শ্রেষ্ঠ কথাটি আমাদের জন্যে লইয়া আসো। আজ থেকে আমরা তাহাই শুনিবো। কিন্নর ও কিন্নরীগণ স্বর্গবাস ছাড়িলো।

রবিবার বাজার শেষে জনপদের মানুষেরা ফিরছিলো ঘরের দিকে। তাদের হাতে থলেভর্তি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি— হাট-বাজার। কেউ ফিরছে তাদের ব্যসাতি বিক্রি করে খালি ধামা-ডালা এবং বাখ-দড়ি নিয়ে। ক্ষেত থেকে চাষিরা উঠে আসছে রাস্তায়। চাষিদের কারো হাতে কাচি, কারো হাতে কোদাল, আবার কারো মাথায় বিশাল বোঝার ঘাস অথবা ধান। শাখা পথ থেকে ক্রমে তারা মিলিত হয় বড়ো রাস্তায়। ক্ষেত হোক বাজার হোক সবার মিলিত হবার রাস্তা এই বড়ো রাস্তা। বাজারী হোক, চাষি হোক রাস্তা তাদের একটাই। এখানে এসে সবাই এক হয়ে যায়। একাকার হয়ে সবাই হাঁটতে থাকে জনপদের রাস্তায়।

তখনও ফাল্গুনের গোধূলী রং পাকেনি। পশ্চিম আকাশে কেবল সূর্যটা মরবে মরবে ভাব। জনপদের মানুষের মুখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। তবু একে অন্যের সাথে কথা বলছে যেচে যেচে— ‘কি হে বিপিন, মাছ আজ বেঁচলে কেমন?’ বিপিন উত্তর দেয়— ‘গত বাজারের চাইতে খারাপ খুড়ো। মাছের বাজার নেই।’ কেউবা হাক ছাড়ে— ‘ও নরেন, কি লাগাইলি ভুঁইতি, গোম না কলই?’ নরেন উত্তর দেয়— ‘এবার গোম বুনিছি ম্যা বাই। তুমার ছাওয়ালেরে যে কইছিলাম জমিতি আসতি, আসলো না তো?’ ‘কাল পাঠায়ে দিবানি’ বলে সে চলে যায়। ধীরে ধীরে সূর্যের প্রতাপ কমে যায়। গোধূলী রঙে জনপদের মানুষের পথচলা যেনো এক চলন্ত ছবি।

হঠাৎ এই ছবি থেমে যায়। চলন্ত মানুষেরা সবাই অনড় পাথর হয়ে যায়। কোনো এক নির্দিষ্ট দিকে কান খাড়া করে দিয়ে তারা কী যেনো শুনতে চেষ্টা করে। স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। ঠিক এক শক্তিমান চিত্রশিল্পীর আঁকা কোনো ছবি। যে ছবি একটাই অথচ তার রঙ বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন। যে ছবি হরেক রকমের রং পাল্টায়, যে ছবির যাত্রা আলোর থেকে অন্ধকারের দিকে। ঠিক কতো সময় জুড়ে জনপদের মানুষ অনড় হয়ে থাকে তা তারা বুঝতে পারে না। যখন তারা বাড়ি ফেরে, জানতে পারে তাদের এক প্রহরের কাজ বাকী থেকে গেছে। তখন তারা বুঝতে পারে তারা একপ্রহর সময় জুড়ে শক্তিমান কোনো চিত্রকরের ছবি হয়ে ছিলো। তারা ধীরে ধীরে এও বুঝতে পারে যে তারা ওই সময়ে কান খাড়া করে একটা সুর শোনার চেষ্টা করছিলো। গানের সুর। নারী-পুরুষে মিশালি এক মায়াবী কণ্ঠ। তাদের কাছে মোটামুটি পরিষ্কার হয় যে, সে গানের সুর ছিলো বড়োই মোহনীয়। কী তার বাণী, কী তার ঝঙ্কার! কী এক মুর্ছনায় তারা কেঁপে কেঁপে উঠছিলো! জনপদের মানুষ চর্যাগীতিকার গানের কথা শুনেছে, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির কথা শুনেছে। শুনেছে বাঁশির সুরে রাধার পাগল হয়ে ভুল-বেভুলের কাহিনি। কিন্তু এমন মোহনীয় সুর তারা কখনও শোনেনি। এ এমন সুর ক্লান্তি শেষের রাতে বিছানার বিশ্রাম নিতে ভুলিয়ে দেয়।

পরদিন সকালে সবার মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। কে কে শুনেছে আর কে শোনেনি এই যাচাই চলতে থাকে। গুঞ্জরণের ফল— সবাই সুর শুনেছে এবং একই গান, কিন্তু কোথা হতে এ সুর এসেছে কেউ জানে না। শুরু হলো সুরের উৎসভূমি খোঁজা। সবার মোটামুটি ধারণা পশ্চিম দিকে যে মাঠটি আছে, তারপরে যে বন সেটাই এই গানের উৎসভূমি। সমস্ত কর্মকাণ্ড ভুলে জনপদের মানুষ সেদিকে যাত্রা শুরু করে। সাত দিন ধরে তারা খোঁজার চেষ্টা করেও কোনো উৎস খুঁজে পায় না। এই সাতদিনে জনপদের মানুষ উন্মাতাল হয়ে ছুটে বেড়ায় যেখানে সেখানে। সমস্ত মাঠ, বন, বসতি; সমস্ত জায়গা খুঁজেও গানের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না।

সাত দিন পর অকস্মাৎ গান শুরু হয়। বাতাসে ভেসে আসে সুর। তাদের মধ্যে কেউ একজন আবিষ্কার করে ফেলে সেই উৎস। তারপর একে একে সবাই সেদিকে ধাবিত হয়। তারা দেখতে পায় সত্যি গহীন বনে কেউ একজন বসে আছে। তারা কাছে যায়। চিনতেও পারে— ইনি কিন্নর, স্বর্গের গায়ক। যেমন তার মোহময় কণ্ঠ তেমন তার রূপ। তারা মনে মনে ভগবানের কৃপার প্রতি কৃতজ্ঞ হলো। তারা ভাবলো জনপদের জন্য এই কিন্নর এক অসীম অনুগ্রহ। তারপর তারা কিন্নরের সামনে গড় হয়ে বসলো।

তারা বললো— ‘ও গো দেবতা, আমরা তুমার কাছে এক আর্জি নিয়ে আইছি। রাখবা কও? আমাগে তুমি গান শুনাও। গান শুনায়ে পাগল করে দাও।’

কিন্নর হাসলো। বললো ‘তোমাদের তো আমি গান শোনাইতে আসি নাই। আমি আসিয়াছি তোমাদের কথা শুনিতে।’

জনপদের মানুষ বললো, ‘ছি ছি, দেব, লজ্জা দিয়েন না। আমরা তুমার গান শুনে পাগল হইছি। আবার গান দিয়েই তুমি জ্ঞান দেও।’

কিন্নর বললো, ‘আচ্ছা, আমি শোনাইবো তোমাদের গান।’

মানুষেরা বলিলো, ‘কোন্দিন শুনবো তুমার গান?’

কিন্নর ভেবে বললো, ‘যেহেতু আমি স্বর্গ ছাড়িয়াছি রবিবারে সেহেতু রবিবারেই গানের আসর বসিবে। ঠিক সন্ধ্যার আগে, গোধূলীর রং যখন টাটকা হইয়া ওঠে, যখন দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন ঘটিয়া যায় তখনই আমি গাইতে বসিবো।’

জনতা বললো, ‘আইচ্ছা’ এই বলে তারা উঠতে শুরু করলো। এমন সময় কিন্নর বললো, ‘একটা শর্ত রহিয়াছে। গানের আসরে আমার পাশে একজন সুললিত, সুদর্শন যুবককে রাখিতে হইবে।’

এ কথা শুনে জনপদের মানুষের মধ্যে একটা রব ছড়িয়ে পড়লো। তারা বুঝতে পারলো কিন্নর সুললিত, সুদর্শন যুবককে নিয়ে গান শেখাবে। এ কথা সবার জানা যে কিন্নরের পাশে বসে গান শুনতে পারলে সে সুকণ্ঠী গায়ক হয়ে যায়। তখন সবাই আওয়াজ তুলতে শুরু করলো ‘আমি যাবো, আমি যাবো’ বলে। অনেক গুঞ্জন চললো। ঘরে ফিরে তারা একটা সমাধানে আসতে চেষ্টা করলো। এক সময় পরলোও— একজন নির্বাচিত মাতবর থাকবেন। তিনিই পছন্দ করবেন কে কিন্নরের পাশে বসে গান শুনতে পারবে। কে আগে যাবে? এটি নির্ধারিত হবে সুললিত্যে এবং সুদর্শনে।

পরের রবিবার আসলো দীর্ঘ দীর্ঘ সাতটি দিন পাড়ি দিয়ে। জনপদের মানুষ একজন সুললিত সুদর্শন যুবককে সঙ্গে করে আসরে হাজির হলো। সমস্ত জনপদের মানুষ আজ কিন্নরের গানের আসরে। যুবক গেলো কিন্নরের পাশে। গান শুরু হলো। সবাই মোহিত হয়ে শুনলো। গান চললো এক প্রহর সমান সময় জুড়ে। গান থেমে গেলো। সবাই আবিষ্টতা ছেড়ে ঘরে ফিরতে আরম্ভ করলো। সবাই গানের বাণীর কথা বলতে বলতে প্রস্থান করছে। সবাই যুবককে খুঁজছে। তার সাথে কথা বলতে আগ্রহ সবার। তারা দেখলো, যুবক তাদের মধ্যে নেই। তখন ঘোরের মধ্যে কেউ সেটার তোয়াক্কা করে নি। কিন্তু সত্যিই যুবককে আর পাওয়া যায় না। পুরো সপ্তাহ জুড়ে সে কোথাও নেই। অনেকে বলতে থাকে তাকে হয়তো কিন্নর পছন্দ করে নিয়ে গেছে। মধ্যবয়সীদের কেউ কেউ মাথায় হাত চাপড়ায়, বলে, ‘হায়! আবার যদি যৈবন ফিরে পাতাম!’ যুবক শ্রেণির মধ্যে সাড়া পড়ে গেলো। সবাই আগে যেতে চায়। কিন্নরের পাশে বসলে কিন্নরের সাথে যাওয়া যায়, এ কথা এখন সবার মুখে।

যথারীতি পরের রবিবারে গোধূলী বেলায় জনপদের মানুষ আসরে হাজির হলো। সেদিনও গান শুরু হলো । শেষও হলো। আজও সুদর্শন যুবকটি ফিরলো না। এভাবে চললো কয়েক আসর। কিন্নরের পাশে বসা কোনো যুবককে জনপদে পাওয়া যাচ্ছে না।

যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রাস ছড়িয়ে পড়লো। কেউ আর যেতে চাইছে না। কাউকে ধরেও আসরমুখী করা যাচ্ছে না। এদিকে জনপদের মানুষের মধ্যে গান শোনার নেশা চেপে বসেছে প্রচণ্ড রকমে। রবিবার সন্ধ্যায় গান না শুনলে বুঝি প্রাণহানি ঘটে! তারা সুদর্শন যুবক খুঁজতে শুরু করলো। কালি পূঁজার মতো তারা বলির জন্য একজন যুবককে প্রলোভন দেখিয়ে অথবা জোর করে ধরে নিয়ে যায়।

যে যুবককে নিয়ে যাওয়া হয় সে আর ফেরে না। ধীরে ধীরে জনপদ যুবহীন হয়ে পড়তে থাকে। কোনোদিকে মাতবরের কোনো খেয়াল নেই। তার মাথায় এখন গান শোনার নেশা। প্রবল সে নেশা। গান শোনার জন্য সে যাকে ইচ্ছা তাকে ধরে আনতে পারে। এমনকি নিজেকে সপে দেওয়ার মতো ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তও তিনি নিতে প্রস্তুত। কয়েকবার যুবক না পাওয়া গেলে তিনি এমন মতের কথা বলেছেন। কিন্তু তার যাওয়া হয়নি, তার একটাই কারণ— বয়স বড়ো বেশি।

অনেক দিন পর। পশ্চিম দিক থেকে হাঁটতে হাঁটতে এক যুবক জনপদের দিকে চলে এলো। সুস্বাস্থবান, সুঠাম দেহ, আকর্ষণীয় চোখ, মৃদু মোলায়েম দাড়ি বেষ্টিত মুখ, দেখতে, একবাক্যে সুন্দর। চোখে কী জানি কি খুঁজে ফেরা ভাব। বুক স্ফিত ফোলা, সাহসের বিরান-ভূমি। যুবক এসে মাথা উঁচু করে ঠায় বড়ো রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে। জনপদের মানুষ তাকে দেখে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো, যেনো তারা বিশ^াস করতে চায় না যে এটা মুক্ত ভূমি। যুবনিধন-ত্রাসে সমস্ত এলাকায় সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিলো— এই জনপদে কোনো যুবক আসলে তার আর ফেরা হয় না। আগে অনেকে আসতো গান শুনতে। এখন গানটা তাদের কাছে কিংবদন্তি হয়ে আছে। আগ্রহ আছে এই জনপদে আসার, আসতে পারে না। জীবনের তো একটা মায়া আছে!

যুবক যখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে সে দেখতে পায় এক যুবককে বেঁধে কোথায় যেনো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কয়েকজন সামনে থেকে ছেলেটাকে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই পেছনে থেকে কী এক অদ্ভুত সুরে গাইতে গাইতে যাচ্ছে। সুরটা নয়া যুবকের কাছে খুবই বিচ্ছিরি শোনায়। কিন্তু এক সাথে গাইতে থাকলে সুরটা বেশ ভালোই লাগে। যুবকের কৌতূহল বাড়ে। তার দেখতে ইচ্ছা হয় কী ঘটতে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সে জনপদের মানুষের সাথে মিশে যায়। চলে যায় আসরে।

শুরু হয় গান। সেই গান দিয়েই কিন্নর গাইতে শুরু করে যা জনপদের মানুষ গাইতে গাইতে আসছিলো। গান শুরু করার আগে কিন্নর বেঁধে আনা যুবকের দিকে ভালো করে তাকিয়ে নেয় একবার। তার কাঁধে হাত রাখে। ধীরে ধীরে দৃশ্যের পরিবর্তন হয়। গান পরিবর্তন হয়। নয়া যুবককে কোনো গান আবিষ্ট করতে পারে না। সে বিরক্তভাবে চারিদিকে দেখতে থাকে। আসর ঘিরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। মঞ্চের যুবক ধীরে ধীরে কিন্নরের দেহের সাথে পিষ্ট হতে শুরু করে। কিন্নর তাকে কাছে টেনে নেয় ক্রমে। প্রতিটি গানের অন্তরাতে সে দেহের সাথে আরো মিশে যেতে থাকে। গান চলে। সবাই অন্ধ হয়ে, মোহিত হয়ে শুনতে থাকে আর মাথা ঝাঁকাতে থাকে। গানও আস্তে আস্তে শেষ হয় এক সময়। যুবকটিও আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়তে থাকে। তার মৃত্যু হয় নীরব-শান্তভাবে, কোনো যন্ত্রণা ছাড়া। গান শুনতে শুনতে মৃত্যু হলে কার আর যন্ত্রণা থাকে!

প্রতি আসরে এমনই করেই একটি করে যুবক নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। সবাই অন্ধ হয়ে গান শুনছে। একটি করে যুবকের মৃত্যুতে কিন্নরের এক সপ্তাহ জনপদে থাকার নিশ্চয়তা হচ্ছে। গান শেষে সবাই একটি যুবককে হারিয়ে চলে আসছে। কেউ সেটা দেখছে না। গানে মাতাল হলে এমনই হয়। নয়া যুবকই প্রথম এ কথাগুলো বুঝলো।

সবাই আসর ছেড়ে চলে যায়। নয়া যুবকও তাদের সাথে জনপদে চলে আসে। কয়েকদিনে সবার গানের ঘোর কাটে। আবার তারা হন্যে হয়ে ওঠে। নতুন সুদর্শন ও সুললিত যুবক খুঁজতে তারা তৎপর হয়। এরই মধ্যে তারা জানতে পারে নতুন এক যুবক জনপদে এসেছে। তারা তাকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু খুঁজে পায় না। সমস্ত জনপদ তন্ন-তন্ন হয়ে যায়। তবু যুবক লাপাত্তা। এদিকে দিনও কাছাকাছি হয়ে যায়। সবার অবস্থা কুকুর-পাগল প্রায়। কালই শেষ দিন। এর মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না হলে গান শোনা হবে না— কিন্নরের শর্ত।

সেদিন নয়া যুবক নিজেই আসে মাতবরের বাড়ি। দীপ্ত কণ্ঠে সে বলে ‘কাল আমি যাবো কিন্নরের মঞ্চে।’

মাতবর আশ্চর্যের চোখে তাকিয়ে থাকে। যুবকের সাহস দেখে তার বিস্ময়ের যেনো অন্ত নেই। তিনি হতভম্ভ হয়ে যান। তার সৌন্দর্য দেখে তিনি মুগ্ধ, যেনো রাধা, কৃষ্ণকে দেখছে। তার চোখে যে দীপ্তি তা তার সাহস ও উচ্ছলতার চিহ্ন। অনেক দিন তিনি এমন করে কাউকে দেখেননি। এখন যুবকদের দিকে তার দৃষ্টি মারাত্মক। প্রথম কিছু বছর তিনি যুবকদের দিকে তাকাতেন মুগ্ধ হয়ে। তারা সবাই ইচ্ছা করেই আসতো মাতবরের কাছে। গান শুনতে নিজেদের উৎসর্গ করতো তারা। এখন যুবকেরা আর আসে না। জীবনের ভয়ে। ধরে আনতে হয়। আজ এতোদিন পরে সেই সাহস দেখে মাতবর সত্যিই কথা বলতে পারে না।

অনেক্ষণ পর মুখ খোলেন মাতবর, ‘তুমার নাম ধাম কী? বাড়ি কোন জনপদে, বাছা?’

নয়া যুবক উত্তর দেয়, ‘নাম— অমৃত¯œাত সাধন, বাড়ি এই জনপদেই। এতোদিন পশ্চিমের একটি জনপদে বাসের জন্য গিয়েছিলাম। আজ থেকে এখানে থাকবো আবার।’

‘তুমি এহানে কেনো আইছো বাপ! তুমি জানো না ইডা এহন যুবকগে জন্যি এট্টা পুড়া জমিন!’ আক্ষেপের সাথে মাতবর বলে।

যুবক এসব কথা না শুনেই চলে যায়। তবে জানা যায় এই যুবক এক স্বপ্ন দেখে আপন জনপদে ফিরে এসেছে। স্বপ্নে তার মা নাকি তাকে হাতছানিতে আয় আয় বলে ডেকেছে। সে তার মাকেই খুঁজতে এসেছে এখানে। কিন্তু এখানে এসে সে এ কী হটকারী সিদ্ধান্ত নিলো! মাদবর হা-হুতাশ করে।

বিস্ময় থাকা সত্ত্বেও জনপদে ধুম পড়ে যায়। এক যুবক স্বেচ্ছায় কিন্নরের মঞ্চে যেতে রাজি হয়েছে। এর চেয়ে সুখের খবর জনপদের মানুষের কাছে আর কী হতে পারে! সবাই নিজেদের মধ্যে একটা সাজ সাজ আমেজ নিয়ে আসে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে তারা প্রস্তুতি নেয়। পরিপাটি করে পোষাক পরে। কানে ও নাকে কস্তুরীর সুগন্ধ মাখে। রবিবারের গোধূলী বেলা এসে যায়।

কিন্নর আলতো করে সাধনের কাঁধে হাত রাখে। এখনই শুরু করবে গান। সবাই মাতাল হয়ে শুনবে। কিন্তু না। এক ঝটকায় কিন্নরের হাত সরিয়ে দিলো সাধন। আসরের মানুষ অবাক হয়ে গেলো। স্তব্ধ হয়ে রইলো তারা। কী হতে যাচ্ছে কেউ বুঝতে পারছে না। তাদের ভেতর চরম উত্তেজনা খেলা করে। উত্তেজনা কিন্নর ও সাধনের ভেতরেও জমা হয়। উচ্চ কণ্ঠে সাধন বলে ওঠে—

‘শোনো আমার জনপদের মানুষ, আজ থেকে এই আসরে গান শোনা হবে না। আজ থেকে এই আসরে হবে কবিতা।’

এ কথা বলেই সে শুরু করলো—
স্বর্গের পরীরা, তোমরা পৃথিবীতে এসো না— স্বর্গেই থাকো।
পৃথিবী ক্লেশহীন কৃষকের, দুঃখ-সাগরে দাড় টানা মাঝির।
হে স্বর্গকামী ভূত, তুমি পৃথিবীতে এসো না— দূরে থাকো।
পৃথিবী শ্রদ্ধাহীন শ্রমবহুল চামারের, কামারের, কুমোরের
পৃথিবী সভ্যতার অগ্রপথিক শ্রমিকের। পৃথিবী মানুষের।

উত্তেজনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায় কিন্নর। উত্তেজনার ঘর্ষণে ভীষণ তাপ ছড়াতে থাকে সে। ধীরে ধীরে দহন শুরু হয় তার ভেতরে। দহনে দহনে নিজেকে ভস্ম করে নেয় কিন্নর। কিন্নর আর আসর জমিয়ে গান গাইতে আসে না। তবু আসর থেমে থাকে না। চলে কবিতা। কবিতার যুগে স্বর্গিয় কিন্নর শুধুই গল্প হয়ে থেকে যায়।

নুরসাদুল সরকার বাঁধন
তাড়না

                           ‘আমরা বাঙ্গালি আর কতকাল মরবো মাথা কুড়ে
বুক ফুড়ে চেতনা জাগিছে রক্তের অক্ষরে’

রক্ত! রক্তের নেশা বাঙ্গালির জন্ম-জন্মান্তরের নেশা। শালার মশাগুলোও দেখি এই নেশা রপ্ত করেছে। বাঙ্গালির সাথে বাস করে বাঙ্গালির রক্ত পান করবে? এত্ত বড় স্পর্ধা কখনোই মানতে পারে না আক্ষেপ। কাজেই এক থাপ্পড়ে মেরে ফেলে বাঁ হাতের আঙুলের ডগায় বসে থাকা রক্তচোষা মশাটাকে। ডান হাতের তালুতে খানিক রক্ত লেগে থাকে। মনটা হালকা ফুরেফুরে অথচ খারাপ হয়ে যায়। কার জন্যে? মশাটার জন্যে? নাকি নিজের রক্তের জন্যে? রক্ত! কীসের রক্ত! কার রক্ত? নিজের নাকি মশার? নানান প্রশ্ন ঘুরেফিরে আছড়ে পরে খান খান হয়ে যায় মুহূর্তের  দুশ্চিন্তায়। দুশ্চিন্তার ‘দু’ বাদ দিতে চায় আক্ষেপ। দু’ এর মধ্যে কেমন জানি একটা দুঃখ দুঃখ ভাব আছে। এক্কেবারে বাঙ্গালি শব্দটার মতো। ভালোও লাগে আবার কষ্টও হয়।

হাতের তালুতে লেগে থাকা রক্তটায় বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে ডলা দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করে আক্ষেপ। কিন্তু রক্ত মুছে যায় না। এ যেন মিশে থাকে তার নিজের অস্থিমজ্জায়। সেদিনকার হাইওয়ের কালো পিচ ঢালায় যে ভাবে লেগেছিলো এক বীভৎস আল্পনা। রক্ত! রক্তের শান্ত-¯িœগ্ধ ধারা। মানুষের রক্ত! এখনো সে দুঃসহ দুর্ঘটনাটা মাথার মগজে অস্থিরতার জট লাগিয়ে দেয়। যন্ত্রণার জট মাথায় লাফালাফি করে।তারই সামনে টুক পড়ে যায় সোহাগ। তার রুমমেট। যে কীনা একটা বেসরকারি কোম্পানিতে ক’দিন হলো জয়েন করেছে। বেডিং পত্র নিয়ে উঠেছে আক্ষেপের রুমে। সামান্য কেনাকাটার উদ্দেশ্যে দুজনে বিকেলে রওয়ানা হয়েছিলো বাজারে। কদিন ধরে চলা টানা অবরোধ আর হরতালে হাপিয়ে ওঠা মানুষেরাও বিকেলে প্রশান্তির দুশ্চিন্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নিজস্ব ব্যস্ততায়। হঠাৎ সেই অবরোধকারীর মিছিল…! আক্ষেপের হাত ধরে টেনে পালানোর সময়— ‘সোহাগ!’ একটা শব্দ! আর মুহূর্তেই পাকা ফলের মতো রাস্তায় পড়ে যায় সোহাগ।   কিংকর্তব্যবিমূঢ় আক্ষেপ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে নিষ্পলক। বসে পড়ে সোহাগের পাশে। একটা লাল প্রবাহ ধারায় আক্ষেপের হাত ধুয়ে যায় সোহাগের বুকের উষ্ণতায়। তাৎক্ষণিক বিষণ্নতায় মানুষগুলো দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। আক্ষেপ স্থির। তার সমস্ত শরীর যেনো আটকে গেছে পাকা রাস্তার অদৃশ্য টানে। পুলিশের গুলির শব্দটা এখনো কানে বাজে তার। রক্ত! এত রক্ত রাস্তায়! সোহাগের রক্ত!

মৃত মশাটার দুটো ঠ্যাং ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে আক্ষেপ। রাগে,ক্ষোভে,বিতৃষ্ণায়। মশার রক্ত তার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রক্ত! নিজের রক্ত! সোহাগের রক্ত! সে হাত থেকে মুছে ফেলতে চায় সকল রক্তের দাগ। কিন্তু এ রক্ত আরো গাঢ় জমাট হয়ে চেপে বসে হাত ছাপিয়ে বুকের মধ্যে। রক্তের নেশায় মাতাল হয়ে নাচতে ইচ্ছে করে তার। কেনো এতো রক্তপাগল মোরা! এ বিস্ময়ের শেষ সে আবিষ্কার করেছে। ‘আমরা রক্ত ভালোবাসি। রক্ত দিতে ও নিতে। মশাটাকে পুড়ে ছাই করে নেবে সে। আগুন জ্বালাবে চতুর্দিকে। আগুন! ওহ নো! আগুন জ্বলে চোখের কোটরে। আগুনটা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে দিগন্তে। যুদ্ধ! যুদ্ধের প্রস্তুতি! পাকিস্তান এসে পড়েছে। জ্বলছে সব। শহর-বন্দর,যাত্রীবাহী বাসে চলছে আগুনের উন্মাদ নৃত্য। চিৎকার আর চিৎকার। মানুষের চিৎকার। কত অসহায় বাঙ্গালির জীবন্ত চিতা দেশের রাজপথের জ্বলন্ত গাড়ি। পুড়ে যায় কার তিন মাসের দুলাল। বৃদ্ধটা! কী যেনো  নাম? সাদেক। সাদেকের শরীরটা অঙ্গার হয়ে গেছে। চটচটে কালো ছপছপে দাগ। পোড়া রক্ত! আলকাতরার মতো চটচটে পোড়া রক্ত! বাসের সিটে সিটে পোড়া রক্ত ছড়িয়ে আছে। অজানার যাত্রী।রক্তের নেশা জন্ম-জন্মান্তরের পাগলা নেশা। রক্ত চায় আক্ষেপ?

—না রক্ত সে চায় না। মাথাটা কী সব ওলট পালট দুশ্চিন্তায় বন বন করে ঘোরে তার। দুশ্চিন্তার ‘দু’ বাদ দিয়ে সে চিন্তা করতে চায়। শালারা হরতাল না করলে কী হয় না? স¦গত জিজ্ঞাসার সদুত্তর দিতে না পারায় মাথার রক্ত জমে যায়। রক্ত সে সহ্য করতে পারে না। পারবেনা। মশাটা মারা ঠিক হয়নি। নিশ্চই ঠিক হয়নি। কেনো যে আলতু-ফালতু শব্দগুলো আসে।না! আর ভাববেনা আক্ষেপ। এসব ভাবনার কোনো কারণ নেই। আক্ষেপ জানালা খুলে বাইরে তাকায়।

ফুলের বাগান হতে হাসনাহেনার মৃদু ঘ্রাণ এসে লাগে নাকের ডগায়। যেখানে বসেছে আরো একটি মশা। এটাকে মারা উচিত? না তাকে মারবেনা। আবার সেই রক্ত। যেটা সে চায় না। ফিলিপ্স্ বাতির চকচকে পরিষ্কার আলোয় টলমল করে বাগানের ফুলগুলো।নানান প্রজাতির ফুলের উপর চোখ বুলিয়ে নিতে ভালই লাগে তার। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে গাদা ফুলগুলো। যেনো সযতেœ হলুদের সামিয়ানা টেনে দিয়েছে কেউ। ইচ্ছে করে সেই সামিয়ানায় চোখ বুজে শুয়ে থাকতে। বেশ ক’জাতির ডালিয়া ফুটেছে।সাদা,হলুদ,লাল, টুকটুকে লাল। রক্তের মতো লাল। যেনো এক পিণ্ড রক্ত জমাট হয়ে ফুটে আছে। রক্ত! জমাট রক্ত! ক্লাসের সামনে সে দেখেছিলো ডালিয়ার মতো জমাট বাধা রক্ত। ইসমাঈলের রক্ত।ওর ডান পায়ের গোড়ালি কেটেছিলো দুর্বৃত্তরা। রক্ত গড়িয়ে জমাট বেধেছিলো বারান্দার কংক্রিটের মেঝেতে।ফুলের মতো লাল হয়ে জমে থাকা জমাট রক্ত আজো চোখে ভেসে আসে তার।

এলোমেলো দুশ্চিন্তাগুলো (‘দু’ কোনোমতে বাদ যায় না) পল পল করে লাফিয়ে বেড়ায় স্মৃতির আঙ্গিনায়। দুপ-দাপ লাথি মারে হৃৎপিণ্ডে। সেই লাথি গিয়ে তাড়না দেয় শিরায়-উপশিরায়, রক্তকণিকায়। রক্ত গরম হয়ে যায় আক্ষেপের। রক্ত! রক্ত সে চায় না। না! না! না!

উদ্ভ্রান্ত মনটা তার শাসনও শুনতে চায় না। নিয়ন্ত্রণেও থাকতে চায় না। তবু জোর করে মনটাকে বাগানের ফুলের দিকে ঘুড়িয়ে নেয় সে। আবার হাসনাহেনার ঘ্রাণ নাকে লাগে। আহ! বুক উত্তাল করা সুবাস।তাইতো হাসনাহেনার গন্ধে নাকি সাপ আসে। গন্ধে কখনো সাপ আসে না। সে জানে ফুলের গন্ধে পোকা আসে। পোকা খেতে আসে ব্যাঙ, আর ব্যাঙ ধরতে সাপ। ব্যাঙ আর সাপ। সাপ আর ব্যাঙ। ব্যাঙ সে চেনে। ব্যাঙ গবেষণার বিষয়। জীববিজ্ঞানের প্রাকটিক্যাল ক্লাসে একবার সে ব্যাঙ কেটেছিলো। ব্যাঙেরও রক্ত আছে। সে দেখেছে। রক্ত তার হাতে লেগেছিলো। আক্ষেপ হাতের দিকে তাকায়। তাই তো! রক্ত! এত্ত রক্ত কোথা থেকে এলো? মাথা ঘুরে তার। একটা মশার এত রক্ত হতে পারে না। কিন্তু সে পুরো হাতটাই রক্তে ভেজা দেখতে পায়। মশার রক্ত। নিজের রক্ত। সোহাগের রক্ত। সাদেকের, দুলালের,  ব্যাঙের রক্ত তার হাতে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স¦াধীনতা, কিন্তু এক হাত রক্ত দিয়ে কী করবে আক্ষেপ? এই মুহূর্তে তার কেবলি মনে হচ্ছে সকল মানুষের রক্তে তার হাত ভিজে গেছে। না, না, না! রক্ত সে চায় না। মৃত মশাটা বিছানায় বালিশের পাশে চেপ্টা হয়ে পড়ে থাকে। বিচ্ছিরি লাগে তার। দুই আঙ্গুলে চিমটি দিয়ে তুলে জানালার বাইরে ফেলে দেয় সে মশাটাকে। কিন্তু—! কোথায় পড়লো ওটা? ওইতো উড়ে যাচ্ছে। মৃত মশা কী করে উড়ে? না, মশা না। উড়ন্ত জিনিসটা আবার ফুলের উপর ঘুরতে থাকে। ফুল দেখলে ভালো লাগে তার। সব ফুল ভালো লাগলেও লাল ফুল তার বেশি প্রিয়। লাল! না আর সে লাল ভাববে না। আক্ষেপ বুঝতে পারে উড়ন্ত জিনিসটা  আসলে মশা না, মৌমাছি। ফুল থেকে নিশ্চয়ই মধু সংগ্রহ করতে এসেছে। মধু আর মৌ। একই কথা। মৌ আর মাছির কী গভীর মিতালি। মৌমিতালি। মৌমিতা! মৌমিতাকে সে ভালোবাসে।মৌমিতার কথা ভাবলেই তার সুখের মতো লাগে।কী সুন্দর তার চুল।কী মিষ্টি তার হাসি।কথার মধ্যে কী অদ্ভুত হাসি।কথার মধ্যে কী অদ্ভুত মধু। আজীবন গাঁথা শুনলেও আশ মিটবেনা।মায়াবী দুটো চোখ। না একটি।চোখের কথা মনে পড়লে ভীষণ খারাপ লাগে তার। বুকটা খা খা করে।তছনছ হয়ে যায় বুকের ভিতর। কষ্ট! কষ্ট! ভীষণ কষ্ট! মৌমিতা কলেজে পড়তো। এইচ এস সি’র গণিত পরীক্ষার দিন আবার সেই হরতাল, পিকেটিং। একটা আস্ত ইট মৌমিতার কপালের নিচে ডান চোখে  লেগেছিলো। কপাল আর চোখ ফেটে পড়েছিলো রক্ত।রক্তের ফুল্লরা। সেই মায়াবী চোখ রক্তের আভরণে দানবীর মতো হয়ে ওঠে।অথচ ইট টা পাশে বসে থাকা আক্ষেপের চোখে লাগতে পারতো। কিন্তু লাগেনি। অটোরিকশার পেছনে তো দুজনেই ছিলো। আক্ষেপ হাত দিয়ে চেপে ধরেছিলো রক্ত। মৌমিতার রক্ত, তার ভালোবাসার রক্ত। মায়াবী চোখের রক্ত। মৌমিতার ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।গণিত পরীক্ষার আগেই তার জীবনের অঙ্কে একট চোখের বিয়োগ ঘটে। আক্ষেপের হাতে যেনো এখনো সেই লাল রক্ত বেয়ে নামছে। রক্ত! মশার রক্ত! নিজের রক্ত! সোহাগের রক্ত! সাদেকের, দুলালের, না ব্যাঙের রক্ত! মৌমিতার রক্ত! পৃথিবীর সমস্ত জীবের রক্তে যেনো তার হাত ¯স্নানরত। আক্ষেপ শুধু রক্ত দেখে,রক্ত। তার চতুর্দিকে রক্তের অদৃশ্য বেড়ি, রক্তের এক মহাসাগরে সে নিমজ্জিত। পরিত্রাণ চায়। রক্তের সাগর সাতরে সে উঠে আসতে চায়। মুক্তি চায়। সূর্য চায়, রক্তিম সূর্য।

আক্ষেপ আর নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। সে চিৎকার শুরু করে। বিকট চিৎকার, ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে সে হঠাৎ দৌড়াতে থাকে।

‘রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেবো।
তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো…’

কবিতা

আহসান হাবীব
তার শাড়ীর আঁচলের তলে

এখানে জীবন নির্জন দ্বীপের মতোন—অন্ধকার—বিস্বাদ;
সূর্যের মাদকতায়, চাঁদের নিটোল স্নিগ্ধতায় উন্মত্ত হবার—ঘুমোবার সাধ—
খানিক বৃষ্টির উষ্ণ জলের আস্বাদ,
ভেজা মাটির গন্ধ—কাঁঠালের ঘ্রাণ, পাকা পেঁপের উপর বসে থাকা পাখি—
বাষ্পের মতো উবে গেছে—ডুবে গেছে নিবিড় অন্ধকারে!

এই শহর ছেড়ে শান্ত, সবুজ সেই দেবীপুরে যাবো আমি—চাষা হবো;
খুব সহজ কোনো দেবীর সাথে ঘর বাঁধবো সবুজ মাঠের পাশে—
কোনোদিন— হয়তো বা অনেক ভোরে লাঙল নিয়ে মাঠে যাবো,
সকাল গড়িয়ে দুপুর হবে যখন—সংসারের সব কাজ ফেলে ছুটে আসবে সে,
অনেক যত্নে তার শাড়ীর আঁচলের তলে—
এক থাল আলুভর্তা ভাত আর দুই গাল ভালোবাসা হাতে।

নুসরাত নুসি
উদ্বাস্তু আদিম

ঘূর্ণন শেষে— ফুরালো বালিকার চিকচিক খেয়ালের রূদ্ধস্রোত
অস্বচ্ছ আয়নার ভেতর দিয়ে জীবনকে খুঁটে খুঁটে,
অবশেষে মেলানো গেলো না আর।
নাড়িমাটি জেনে গেছে শ্যাওলা উদ্বাস্তু আদিম,
নাড়িমাটি ভীত হারিয়েছে— উদামশূণ্য করতল।
উল্টোরেখায় পথ খুঁজে খুঁজে আত্মজ-আরশিতে শুধু বিলাপ বিভ্রম।

দিক জানা নেই

দিক জানা নেই।
উত্তাল সৃষ্টিতে নি—িদ্র পর্দা ঝুলে আছে। ধোঁয়া, ধোঁয়া-কুয়াশা কেটে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছি। দৃষ্টিভ্রম অথবা স্বপ্নে নেই— তবু স্বপ্ন দৌড়ের মতো অবোধ আশ্চর্য গতিহীন। বাকীসব সাঁই সাঁই। মনে হয় স্পষ্ট দিক জানা নেই।
পথে আছি— গন্তব্যের কাছাকাছি নয়। নদী হলে কি অনায়াসেই যাওয়া যেতো কিনারায়। রঙিন পথের ধূলোয় বুদ্ বুদ্ ছড়িয়ে অফুরান গল্পগুলো ঠাঁই নিতো, সহসা খুঁজে পেতো দিক, আকাশ ও দিগন্তের মিলনের মতো কোনো শীতল মোহনায়।

অ নু বা দ  গ ল্প
মূল: ল্যানি ক্যারোল

এস এম মামুনুর রহমান
মধ্য-শরতের চাঁদ

হ্রদটি আলোকোজ্জ্বল, জীবন্ত। নৌকায় বাঁধা গোলাকার লণ্ঠনগুলোর সোনালি আভা যেনো শত শত সূর্যকণিকার মত জ্বল-জ্বল করছে। চাঁদটাও এতটাই অবিশ্বাস্য উঁচুতে উঠে আকাশ ছুঁয়েছে, যেনো এর চেয়ে উঁচুতে ওঠা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নৌকার হাল আঁকড়ে ধরে খোশমেজাজী শেয়ালগুলো মিটিমিটি হাসছে। যদিও তারা ভেতরের অসহিষ্ণুতা আর উন্মাদনাকে পুরোপুরি রোধ করতে পারছে না; তবুও তারা খুব ভালোভাবেই জানে কীভাবে অভিজাত পুরুষের মতো আচরণ করতে হয়। পুতুলগুলোও অনুরূপ সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে তুলেছে তাদের চেহারায়, যা কিনা তারা প্রায়শ তাদের বালিকা মনিবদের মুখে দেখতে পেতো।

আচমকা একটা নৌকার উপর নিজেদের উপস্থিতি টের পেয়ে পুতুলগুলো ভীষণ অবাক হয়েছে। তাদের একান্ত আশ্রয় থেকে এভাবে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া নিঃসন্দেহে ভীষণ বিস্ময়ের। তাদের একজন শুয়েছিল ফুলের তৈরি নরম বিছানায়, হঠাৎ একটা শেয়াল জানালা গলে এসে তাকে তার মনিবের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ফিতে লাগানো দোলনায় দুলছিল অন্য একজন। তারপর অপার বিস্ময়ের সাথে সে একসময় নিজেকে আবিষ্কার করে একটা শেয়ালের মুখের ভেতর।

নৌকায় এভাবে আচমকা পুতুলগুলোর একসাথে হওয়া একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা হলেও, তারা বিষণœ বা হতাশ নয়। কেননা সকল নারীই চায় একজন সুদর্শন- অভিজাত পুরুষের দ্বারা অপহৃত হতে। তাই যদিও ফেলে আসা ক্ষুদ্র বালিকাদের কথা ভেবে পুতুলগুলোর কিছুটা দুঃখ হচ্ছে, তবু তারা ভেতরের আনন্দের অনুভূতিটিকেও উপেক্ষা করতে পারছে না।

একসময় হ্রদের ঝলমলে রূপালী জলের মধ্যে কালো রেখার মতো আনন্দদ্বীপটি সবার চোখে পড়লো। শেয়ালগুলো উত্তেজনায় অধীর হয়ে উঠলো, কিন্তু পুতুলগুলোর চোখে নেমে এলো উদ্বিগ্নতা। একি! দ্বীপের কোল ঘেষে তাদেরই মতো হাজার হাজার পুতুলের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অঙ্গের মতো ওগুলো কি দেখা যাচ্ছে? দু’একটা পুতুল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো। সাথে সাথেই বুদ্ধিমান শেয়ালেরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাদের বোঝাতে শুরু করলো। বললো, হে সুন্দরী রমণীরা, তোমরা জলপথে অভ্যস্থ নও। তাই জানো না, এখানে কত অদ্ভুত রকমের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকে। তোমরা যা দেখে ভয় পেয়েছো সেগুলো আসলে গতসপ্তাহের ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া গাছের কচি ডালপালা ছাড়া আর কিছুই নয়।

নিজেদের মূর্খতার কথা ভেবে পুতুলগুলো ভীষণ লজ্জা পেলো। তারপর নৌকাগুলো তীরে পৌঁছালে শেয়ালেরা খুব যতেœর সাথে সবাইকে নামিয়ে নিলো।

এটা ছিলো মধ্য-শরতের চাঁদ-উৎসব। এ এক মহিমান্বিত রাত। মানুষের হাসি উল্লাস আর সঙ্গীতের সুমধুর ধ্বনি বাতাসে ভেসে এসে আছড়ে পড়ছে  হ্রদের টলমল রূপালী জলে। কিন্তু শেয়ালগুলোর আজকের উৎসবের কাছে মানুষের ওই ভোজ-উৎসব কিছুই নয়।

সুক্ষ্ম কাজ করা একটা গালিচা বিছিয়ে দেওয়া হলো ঘাসের উপর। পাশেই অসংখ্য চন্দ্রমল্লিকা মৃদু বাতাসে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ছে। পুতুলেরা গালিচার উপর খুব সাবধানে— রেশমি কাপড়ের গোড়ালি ঢেকে বসে পড়েছে। তাদের বুকের ভেতরটা হামিংবার্ডের পাখার মতো দুরু দুরু কাঁপছে। শেয়ালগুলো এরপর কী করবে তাদের সাথে সে ভাবনাতেই পুতুলেরা উদ্বিগ্ন।

মুহূর্তমাত্র ব্যবধানে শেয়ালেরা গালিচার উপর একটুকরো রেশমি কাপড় বিছিয়ে দিলো। এবং তার উপর পিকনিক-হ্যাম্পারগুলো রাখলো। এর মধ্যে পুতুলগুলোর জন্য এক অপার বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। সুস্বাদু তরমুজ আর বিচিত্র সব পিঠায় সেগুলো ছিলো পরিপূর্ণ। পুতুলদের ছোট ছোট হাতের সাথে একদম মানানসই মূল্যবান পাথরের কাপে তাদেরকে পরিবেশন করা হল শিশিরের মতো মিষ্টি মদ। প্লেটে রাজহাঁসের লাল মাংস আর ভাজা কাঁকড়া সাজানো হলো। আজীবন একটা টি-পার্টির স্বপ্ন দেখে কাটানো পুতুলগুলো আচমকা এতো সুস্বাদু খাবার একসঙ্গে  দেখে, বিস্ময়ে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। তাই একটা পুতুলের জন্য যতটুকু মদ খাওয়া ভদ্রতা, তারা খেয়ে ফেললো তার চেয়ে অনেকটা বেশি।

মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে শেয়ালগুলো একদৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো। কেননা তারা প্রত্যেকেই জানে যে এই পুতুলগুলোর হৃদয়নির্যাস ধ্বংস করতে পারলেই তারা সন্ধান পাবে অমরত্বের। যদিও পুতুলের হৃদয়নির্যাস যে আসলে কি সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে স্বচ্ছ কোনো ধারণা নেই। তবু আজ এই মধ্য-শরতের চাঁদনি রাতে শেয়ালেরা সিদ্ধান্তে এসেছে যে, মুক্তা খাওয়ানোর মাধ্যমে পুতুলদের ভেতরে হৃদয়নির্যাস তৈরি করা সম্ভব। কেননা এর আগে তারা পুতুলকে সোনা ও অর্কিড খাইয়ে পরীক্ষা করেছিলো।

এবার শেয়ালেরা পুতুলগুলোকে পোনামাছের সাথে নাইটিংগেল পাখির ডানা পরিবেশন করলো। যা সুন্দরভাবে মুক্তার দানা দিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো করে সাজানো হয়েছে। পুতুলেরা বিস্ময়ে এবং আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলো এবং অত্যন্ত আগ্রহের সাথে সব খাবার— এমনকি শেষ মুক্তাদানাটি পর্যন্ত নিঃশেষ করে ফেললো।

অতঃপর এল সেই কাক্সিক্ষত মুহূর্ত। শেয়ালগুলো তাদের সামনের পা পুতুলগুলোর কাঁধে আলতো করে রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, ঐ দ্যাখো, চাঁদের মধ্যে একটা রূপালী বুড়ি। আর ঐ যে দ্যাখো, একটা চরকা কাটা তারা। হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার তাকাও ওই রাখালের দিকে।

পুতুলেরা তাদের ছোট্ট মাথাগুলোকে আকাশের দিকে মেলে ধরলো। এবং সেই সুযোগে শেয়ালগুলো পরম তৃপ্তি নিয়ে পুতুলদের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেললো। কিন্তু এবার কি তারা সফল হলো?

অমরত্বের চিহ্ন দেখার জন্য তারা একে অন্যের দিকে তাকালো। যদিও পুতুলের হৃদয়নির্যাসের চেয়ে অমরত্বের ধারণাটা তাদের কাছে আরো বেশি ঘোলাটে। তারা জানে না অমরত্ব দেখতে কেমন? বাতাসে নিশ্চয়ই আজ একটা নতুন ঔজ্জ্বল্য থাকার কথা, একটা সম্পূর্ণ নতুন দীপ্তি। অমরত্বের খোঁজে তারা পুতুলগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। তবু কিছুতেই তারা বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে, মধ্য-শরতের অন্যান্য চাঁদনি রাতের মতো তাদের আজকের রাতটিও নিছক ব্যর্থতায় নিঃশেষিত হয়েছে।

অবশেষে তারা ব্যর্থতা পিঠে করে নৌকায় ফিরে এলো এবং সৈকতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। তাদের লণ্ঠনগুলো অনেক আগেই নিভে গেছে। অদূরে থেমে গেছে মানুষের আনন্দোৎসবের হর্ষধ্বনি। ঘন মেঘের আড়ালে চাঁদটাও নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই। এখন সমস্ত রাত্রি নিশ্চুপ এবং অন্ধকার। একটা হিমশীতল বাতাস নৌকার উপরে বসে থাকা শেয়ালগুলোর শরীরকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেলো। এবং যখন তারা সৈকতে নিজেদের গুহায় পেঁৗঁছালো; তখন শীতের হাত থেকে বাঁচতে লেজ দিয়ে চোখ ঢেকে গুটিসুটি মেরে পড়ে রইলো।

শীতের আগমনে আনন্দদ্বীপটি তুষারে ঢাকা পড়ে গেলো। গাছের কালো কালো শাখায় দু’একটা মৃত পাতার নড়াচড়া ছাড়া দ্বীপটিতে আর সবকিছুই একেবারে স্থির অচঞ্চল পড়ে রইলো। পুতুলগুলো অধীর হয়ে ভাবছিলো তাদের ফেলে আসা বাড়ি এবং ক্ষুদ্র বালিকাদের কথা; যারা তাদেরকে ভীষণ ভালোবাসত। কিন্তু হায়! সে সব এখন কেবলই মুছে যাওয়া অতীত। তাদের রক্তের মতো লাল আর বসন্তের মত নীল রেশমী পোশাকগুলো এখন গাছের নিচে তুষারে ঢাকা পড়েছে।

সময়ের আবর্তনে তুষার গলে গলে তাদের পোশাক চারপাশের কাদার সাথে মিশে মলিন হয়ে গেলো। বসন্তের আগমনে পুতুলগুলোর চোখে ফাঙ্গাস জমে সেগুলো উজ্জ্বল বাদামি থেকে রুক্ষ সবুজে বদলে গেলো। তারপর গ্রীষ্মের প্রখর সূর্যতাপে তাদের হাত-পাগুলো ঝলসে একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেলো।

অবশেষে আজ আবার ফিরে এসেছে শরতের সেই মহিমান্বিত রাত। রাতের বাতাস ঢোলের বাদ্যধ্বনিতে মুখরিত। সুন্দর সুসজ্জিত নৌকায় বসে আছে শেয়ালগুলো। তাদের লাল পোশাকে নৌকার লণ্ঠনের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। একসময় তারা আনন্দদ্বীপে পৌঁছালে নৌকার যাত্রীরা বেলাভূমিতে অসংখ্য ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন পুতুল দেখে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলো। এবং বরাবরের মতোই তাদেরকে আশ্বস্ত করা হলো।

খুব শীঘ্রই একটা আনন্দোৎসব হতে যাচ্ছে। এবং কেনইবা আমরা তা উপভোগ করবো না? সম্ভবত এটাই সেই চাঁদ যা নিশ্চিত করবে অমরত্ব। সম্ভবত, এই চাঁদটিই আজ সকল তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে নিয়ে আসবে সত্যিকারের ভালোবাসা। এবং সম্ভবত, এটাই সেই মধ্য-শরতের আকাক্সিক্ষত চাঁদ, যার জন্য আমরা সবাই অধীর অপেক্ষা করে আছি।

সোহেল সিরাজীর ছড়া

হাসে হাসিনা
হাসে মমতা
ওরা হাসবেই
ওদের ক্ষমতা
কাঁদে জনতা
কানে হাত দাও
কেনো শোনো তা?
আমাদের কাজ নেই
বসে বসে কাঁদি
ওদেরও লাজ নেই
হাসে আহ্লাদি
আমরা বোকা
আমাদেরই দোষ
ওরা চালাক
তাই ওরা খোশ

২.
আমাদের রক্ত গেলাসে ঢেলে
ওরা খায় মদ
তবু ওরাই দেশপ্রেমিক
আমরাই বদ

৩.
মন চায় গিলে খাই
পূর্ণিমা চাঁদ
বিষ মাখা ঠোঁটেতে
নেশা উন্মাদ
তৃষ্ণায় ফাঁটে বুক
নিরাশার চর
আঁধারে মনে হয়
নিজেকেই পর

৪.
প্রেমিক দেহ বোঝে
মন বোঝে ঠাকুরে
মাংসের স্বাদ বোঝে
পাগলা কুকুরে

৫.
আহা! ক্ষমতার স্বাদ
মদের গেলাসে চাঁদ

কুড়িয়ে পাওয়া জীবনাংশ

একটি কুড়িয়ে পাওয়া ডায়েরির শেষাংশ যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে সুস্পষ্ট করে তোলে। যা নষ্ট করে দেয়, ধ্বংস করে দেয় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিকে।

এ ডয়েরির  মালিক যে ব্যক্তি তাঁর পরিচয় আমাদের অজ্ঞাত।

গু চ্ছ  ক বি তা

দীপ্ত উদাস এর কবিতা
শামুক ও শালিকের ফাঁদ

এখন হয়তো আর সম্ভব নয়।
কষ্ট করে নষ্ট নীড়ের খড়কুটোতে
রাতের তারার ঝিরিঝিরি সিম্ফোনিতে গা ভাসিয়ে জলসা ঘরে মাতলামোতে।

তুমি তো সাঁতার জানো না!
তোমায় নিয়ে পানিতে নামতেই পিলে যেনো টগবগিয়ে আস্ফালন করে।
যদি আমাকেই ভাবো খড়কুটো আর ভয়।
হয়, যদি বিদঘুটে আঁধারে কষ্ট করে জাগিয়ে রাখো ঘুম।
চোখের আলোয় লিখতে অজুহাতে হাতেনাতে চাক্ষুষ কবিতার শরীর।
সাদামাটা চাঁদে ধরা দেবে মোহনীয় ফাঁদ।
চরমই তো পরম্পরা আলতো করে নিবিড় আঁচড়।
জলসা ঘরে ওরা কারা?
কাড়ছে যেনো মানবতা!
বাহ্ রে বাহ্
নাচ্ছে দ্যাখো
তা
ধিন
তা।

রক্ত এতো কেনো লাল?
উৎসবের মতো!
বেদনা তুমি বেঁচে গ্যাছো
নয়তো তোমায় নিয়েও চলতো হলি ফি-বছর।


ক চ ট ত প

প্রতিটি রাত হোক শরতের জ্যোৎস্নার বারুণি
রূপালী আলোয় পথ চিনে ঠিক পৌঁছে
যাবো চোখের চিলেকোঠায়।
উন্মাদ বেঘোরে হাতড়ে নেবো আগুন।
পুড়ে
পুড়তে
পুড়তে
জ্বলে
জ্বলে

জলে
একাকার মৌনতার দীর্ঘশ্বাস…

ক্লান্ত বুকের হাঁপরে বিশ্রামের
তপ্ত শ্বাস ফেলবো
তোমার বুকে।

অতঃপর রবিবার আমরা ভ্রমন করবো শালিকের ডানায় ভর করে…

এন্টেনা : ণ

নিপুনতার প্রতিযোগিতায় পরাজিত হবে ভাস্কর্যশিল্পী। মডেলের নখটিপুনির প্রতিকৃতি তো নড়েচড়ে বিঘœ ঘটাবে! কিন্তু নিপুণ ঠোঁটের ভ্রমণে মমি হবে তুমি খোদার কসম। শেষযাত্রার আয়োজনে গোর-খোদক হয়তো পরিপাটের ভানকরবে। কেননা কিছুটা তাড়াহুড়া থাকবে তাতে কিছু মৃত্যু ভয় ও নিঃসন্দেহে। তবে মসৃণ অঙুলি চালনায় আমার ভক্তিই থাকবে নির্ভয়ে। পেন্সিল-কলমের স্কেচে নয় ঠোঁট তোমার অলি-গলি ঘুরে এসে রিপোর্ট জমা শেষে জানাবে জার্নিটা ভালোই ছিলো!

এখন বিশ্রামাবশ্যক।

বার্ণ-থিউস!

তোমার যে বয়স এখন আর লুকিয়ো না সিগারেটের আগুন!
পথে দেখছো না কতো যুবতী প্রেমের আগুন বুকে নিয়ে শো-ডাউন দেয়।
অথবা দেখবে তোমাকেই দেখাবে আগুনে
পুড়ে
পুড়ে
কীভাবে ইস্পাত দিয়ে অস্ত্র হয়ে যায়।

তোমার যে বয়স এখন আর লুকিয়ো না সিগারেটের আগুন!
এই যে বিয়ে হয়, আচ্ছা যে কোনো অনুষ্ঠানই হোক-
আতসবাজি হয়।
তাতে আকাশের একটা পশমও কি দেখা যায়?

তোমার যে বয়স এখন আর লুকিয়ো না সিগারেটের আগুন!
হরতাল হয়!
দেখছো তো?
না কী দ্যাখো না!
ভান ধরে আছো?
কুমিল্লা, রংপুর, গাইবান্ধা, রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, শাহবাগের জ্বলা আগুনের কথা কী শোনোও নি?
একমুঠো আগুন নিয়ে ওরা আগুনকে কতো সহজে বৃহত্তে পরিণত করছে-
পলকে।

ওরা হয়তো জ্বলে উঠছে আপন অপশক্তিতে!

এতো আগুনের বাজারে তোমার হাতের ওই জোনাক টিমটিম সিগারেটের আলো নিয়ে ঘুরতে লজ্জা হয় ভীষণ।
তাইনা?
আমাকে দেখে লজ্জাই পেলে নাকি ভয়?
তবে যাই পেয়ে থাকো-
তোমার যে বয়স এখন আর লুকিয়ো না সিগারেটের আগুন!

রিংকু রাহী এর কবিতা
পুরনো বাতাসের ভিতর

এভাবেই তোলা হয় ভিনগ্রহের মাটি
যেভাবে তোমার করোটি,
চাটি।
শুধু কবিতা নয়, যেনো রাষ্ট্রের জিনিসও উঠে এসেছে মুখে।
তাই চুষে নিলাম
দিব্য লজেন্স।
হয়তো সে-কারণে,
হয়তো সে-কারণেই
দোযখ নয়, মানুষ
চেয়েছি দোযখের দু’হাত
হাতের ভিতর প্রভাত,
প্রভাতের মৃত আলো
এবং প্রেমিকার নীল— স্বদেশ।

২.
জীবন এ-গানই শুনুক
তোমার বুকে রেখেছি মুখ
কেননা,
জন্ম আমার তৃতীয় বিশ্বে,
ক্ষুধা আমার স্বর্গীয় সুখ।
তাই তো
ঝিনুক কুড়ানো মেয়ে তুমি,
শহরের জলজ রাস্তায়
একলা হেঁটে চলো
একান্তের ঐদিকে।

৩.
ওখানে নেই ওখানকার মানুষ,
ওখানে শুধু জং ধরা ক্রুশ।
ওখানে শুধু বর্ডার,
বোতল,
আর বারুদ।
বারুদের ভিতর উন্মাদের মুত,
মুতের ভিতর মরা নদ,
নদের বুকে গত শতকের মাটি,
মাটির ভিতর কাক্সিক্ষত মানুষ
পতাকা পোড়ায়,
পতাকা ওড়ায়।

৪.
মুক্তি নেই ডাহুক! আমাদের উড়তেই হয়
কুয়াশার জলে।
পুড়তে
পুড়তে
ম্যাচের কাঠির হিসেব আমরা
করতে পারি না।
আমরা কেবলই দেখি মাটি-মানচিত্র
এবং বাহিরের চুতিয়াপনা
ভিতরের নীল বৃক্ষ আমাদের অচেনা।

৫.
যে রাস্তা মানচিত্র চেনায় না,
যে ধুলো লিখে রাখেনি রক্তের নাম,
যে নাম আজও গড়াগড়ি খায়
আমার বেজন্মা মৃত্যু, তাকে দিলাম।

৬.
তোমার হৃদয় পোড়ে, আমার পতাকা ওড়ে
কথোপকথন শেষ।

আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীল
স্বলিখিত সংবিধাননামা

আজ যদি কোনো ফতোয়াবাজের সন্তান মাল খায়
তাহলে সালিশে সেটা হালাল হয়ে যায়।
সামন সারির চেয়ারে বসে থাকা বলদেরা তা মেনে নিয়ে মাথাও ঝাঁকান।
আজ বাদে যদি কোনো ফতোয়াবাজের সন্তান মাগি খায়
তবুও সামন সারির চেয়ারে বসে থাকা এইট পাশ বলদেরা তা মেনে নিয়ে মাথা ঝাঁকাবেন।
বলবেন, ‘ধর্মের স্বার্থে সেটাও জায়েজ’।

নূহশাপে শাপান্বিত এরা এইরূপে নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনবে।


মূলত পক্ষি শিকার করা আমার পূর্বপুরুষদের পেশা ছিলো, মাছও। মদ্দাকথা, উনারা পাক্কা শিকারী ছিলেন। শুনেছি আমার পরদাদুরা এক কোপে জলের ভেতর থেকে ঘড়িয়াল উঠাতেন। সমস্তদিন শিকার শেষে উনারা, একাধিক নারীসঙ্গ নিতেন। এতে এতটুকুও ক্লান্তি থাকতো না উনাদের। যে কারণেই উনাদের একাধিক বিবি ছিলো। সেই মোতাবেক আমার বাবারও একাধিক নারীর সঙ্গ পাবার কথা। পূর্বানুসারীসূত্রে উনি তা পেয়েছেন। কিন্তু আমার বাবা জীবহত্যা একদম পছন্দ করেন না। গোটা জীবনটাই অ-আমিষে কাটিয়ে দিয়েছেন।
এখন বংশের উত্তরসূরী আমরা চার ভাই। জ্যেষ্ঠ আমি, প্রতিরাত্রে লক্ষ্মীপুরে দু’হাতে বত্রিশ’শ পার্শ্বযুগল শাসন করি। বাকি তিনটের খবর জানি না।


এক শীতের সকালে মাস্টারবেশন করছিলাম। বলাবাহুল্য সেটাই আমার প্রথম এবং শেষ এক্সপেরিয়েন্স। চরম মুহুর্তে একটি বিকট শব্দে আমি চমকে উঠি। মুখ ফসকে বলে ফেলি, ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সোবাহানাকা ইন্নি কুমতুম মিনায-জলেমিন’! বলেই তড়িঘড়ি শার্টের বোতাম খুলে একগাল থুথু দিলাম। এর খানিক পরেই ঝমঝম করে শিলাসহ বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। ভীষণ ভয় পেলাম। ভয়ের চোটে জানালা বন্ধ করলাম। বৃষ্টি দেখে এরকম ভয় তো বাপের জন্মেও পাইনি, তবে কেনো? নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম। তখন বিবেক মনে করিয়ে দিলো আমার ব্যক্তিগত চেহারার কথা। প্রথম জন্মে প্রথম যখন বৃষ্টি দেখেছিলাম, সামগ্রিক বিপদগ্রস্থ ভেবে আমি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারপর থেকে বৃষ্টিপূজারী হই। আগুনের ক্ষেত্রেও ওই একই ঘটনা ঘটেছে। সেই থেকে আর মাস্টারবেশন করিনি। তবে ভয়ে নয়, আমি নিশ্চিত ঐ সুন্নত কার্য সম্পন্ন করতে গেলেই বৃষ্টি ঝরবে; শিলাসহ। পৃথিবীকে পবিত্র রাখার দায়িত্ব তো আমার একার নয়!


যখন প্রথম রিভালবার হাতে নিয়েছিলামস্মরণ হয় একটুও কাঁপাকাঁপি করিনি। কৌতূহলবশত নয় বরং এর সঠিক ব্যবহারের জন্যই তুলে নিয়েছিলাম। প্রধানত অস্ত্র নিয়েছিলাম ফুটপাতের শিশুদের জন্য, আধপেটা কৃষকদের জন্য। প্রথম প্রথম যন্ত্রটি আমাকে ফালতু পীড়া দিতো। মিছিলেও রাখতাম, সেলুনেও রাখতাম এরকম একটা ব্যাপার। একবার শ্বশুরবাড়িতেও গেলাম। আমি জেলখানা থেকে অনেকবার প্রিয়তম প্রিয়তম সম্বোধনে চিঠি লিখেছি কিন্তু কোনো ডাকযোগেই তা পোস্ট করা হয়নি। পরবর্তীতে তীব্র উজ্জ্বল হয়ে আমি প্রত্যাবর্তন করেছি। এখন আর শিশু, শ্রমিক, কৃষক-কুলি এ সমস্ত ছোটোখাটো জিনিস নিয়ে ভাবি না। সমগ্র জাতিকে নিয়ে ভাবি। আজকাল নতুন একটা রাখছি। একান্তই নিজস্ব বঞ্চিত দ্রোহ দিয়ে নির্মিত এক পরম পারমানবিক অস্ত্র। যা একদা তৈরি হয়েছিলো মানুষের কল্যাণহেতু আজও এর ব্যতিক্রম হবে না। এর আগলা স্বীকার হতে পারে এমেরিকা, সিরিয়া, পাকিস্তান অথবা অভিশপ্ত আমিরাত।


এখনকার কথাসাহিত্যিকরা গল্প উপন্যাস লিখতে জানেন না। এগুলোর নাম করে তাঁরা আত্মজীবনী লেখেন। নইলে চরিত্রে উচ্চবিত্ত ঘরের নায়িকা বাছাই করেন যার সিক্সথ সেন্স আছে! একজন বাউণ্ডুলে যুবক থাকে যার ঘরের দরজায় তালা ঝুলানো থাকে। আর একজন খিটখিটে মেজাজের মুরুব্বিটাইপ লোক থাকেন যিনি রাগান্বিত হলে আট বছরের বাচ্চাকেও কষে থাপ্পড় মারেন। আর একজন কম কথা বলা মহিলা থাকবেন যিনি বেশ্যা এবং যুবকের নিখোঁজ মা। এই কিসিমের গল্প উপন্যাসের প্লট।
আচ্ছা, আপনারা ছিঁড়ছেনটা কী? গণতন্ত্রের কথা না হয় বাদই দিলাম। অন্তত সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলুন!
কবিরা তো বার-বেশ্যা নিয়ে পার করছে অস্থির সময়। কবিতারও গাড় মারা গেছে। দয়া করে আপনারা কিছু একটা করুন, অভিজিৎ মারা গেছে।


যাবে না।
এদেশে মিছিল করা যাবে না।
আন্দোলন করা যাবে না, আন্দোলন করলে ক্রসফায়ার হয়।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরা যাবে না, এ দেশে শিরোচ্ছেদ হয়।
এ দেশে একনায়কতন্ত্র আছে অথচ সুষ্ঠু মতোন হুইস্কি খাবার ব্যবস্থা নেই।
মসজিদ-মন্দিরে যাওয়া গেলেও এ দেশে পতিতালয়ে যাওয়া যায় না; পুলিশ ধরে।
এদের কার্যকলাপে অবাক হয়ে যাই অথচ দুটোই ইবাদতের জন্য উপযুক্ত স্থান এবং আমি এইট্টিন প্লাস।
তাদের মাকে খালা, বোনকে বেয়ান পর্যন্ত বলা যাবে না
যাবে না, এ দেশে কাউরে কিছু বলা যাবে না।
বলবেন ক্যামনে? আপনার তো বাক-স্বাধীনতা নাই।


গেরিলা-বানরকে বিশ্বাস না করে ব্যাঙকে বিশ্বাস করুন। ব্যাঙজাতির সাথে মানবজাতির অনেকটা সমিল আছে। সুখের সময় সঙ্গমে সঙ্গমে বর্ষা যাপন করে। সহযোগিতা পেলে আহ্লাদে লাফায়। বিপদে পড়লে প্রার্থনা করে। যেভাবে বিষাক্ত সাপের মুখে, যেভাবে কিপিল ফাতিরেরা গুঁইসাপ হয়ে যায়। আবার এরা ভয় পেলে দুজনই গর্তে লুকায়।
শীঘ্রই দুই জাতির পানিকুমড়া ফাঁটবে


রবিবার আড্ডাফেরত আমি পরিবহণ মার্কেটে গেলাম। এনামুল ভাইয়ের দোকানে চা-সিগারেট খেলাম। তবুও অস্থির লাগলো, প্রচণ্ড অস্থির। সৈকতের সামনে গেলাম। বিরাট বাঘের মুখ। ঢুকতেই কলারে এক হ্যাঁচকা টান। ‘কোনো কথা ক’বি না’ এই বলে সারারাত আমারে নামতা মুখস্থ করিয়ে ছেড়ে দিলো।
অন্লি যুবকদের জন্য ‘এলিজা’ ধারাপাত।


‘নীল,
যা-ই বলিস তা-ই বলিস ভাই
কাকা কিন্তু আমাদের একটাই
এইচ চাইলে ওয়াই চাইলে ‘না’ নাই
এফ চাইলে আইন্যা দেয়
জি চাইলে আইন্যা দেয়
কে টানবি? কোকেন কোকেন?
সেটাও পাবি
মিজানের মোড়ে কেউ কিছু কয়
এমন কারো বুকের পাটা নাই
কাকা কিন্তু আমাদের একটাই…
হিমেল ভাই এসব বলেন। আমিও হো হো করি। বেশিরভাগ টাইমে এফ আর জি চাই। নাজমুল কাকা তখন ডাক ছাড়ে, ‘আশেকাবানু, ও আশেকাবানু…’

১০
বিনোদপুরে আজ—
বিকট শব্দে কয়েকটি ককটেল ফুটেছে
পুলিশ একভ্যান শিবির ধরেছে
কয়েকটি মেয়ে পাছা দুলিয়ে হেঁটে গেছে
পাড়ার স্টাইলমার্কা যুবক মোকাব্বের আলি মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে গেছে
একটি তেইশ বছরের পাগল সবার সম্মুখে হাত মারছে
এক ভদ্রমহিলা একপাতা কনডম কিনেছেন।

মহিদুল ইসলাম এর কবিতা
এখনও যুদ্ধ হয়নি শেষ

সংবাদ মানচিত্র—১
বগুড়ায় ৭২ ঘণ্টার হরতাল
রাজশাহীতে ককটেল নিক্ষেপ ও পেট্রোল বোমায় নিহত ৭;আহত ২৪
ঢাকায় শ্বশুর কর্তৃক গৃহবধূকে ধর্ষণ (গৃহবধূ ছিলেন জনপ্রিয় মডেল ম. রাইহান এবং শ্বশুর সামিয়া গ্র“পের মালিক এম.ডি. মিলান)
সিরাজগঞ্জে মাদ্রাসার এক কক্ষে বালিকার ধর্ষিতা লাশ উদ্ধার
পাবনায় দুই হাজার বিঘার ফসল পুড়ে ছাই
নারায়ণগঞ্জে পুনরায় বসতি উচ্ছেদ
জাল ভিসার প্রলোভনে বিদেশ যাওয়ার নামে দেশেই জেল খাটছেন রহিম মিয়া ও সজীবের মতো দুই হতদরিদ্র (যারা সবটুকু জমি বিক্রি করেই বিদেশ যাওয়ার উপায় করেছিলো)।

সংবাদ মানচিত্র—২
ইভানের সংসারে ইভানই এখন সর্বশেষ সদস্য,
যাকে দুর্বৃত্তরা ঐ রাতে খুন করতে পারে নি—
আর নির্মম ও প্রচণ্ড সত্য এই যে, দুর্বৃত্তরা ইভানের ১২ বছরের বোনকে এবং মাকে পর্যন্ত ধর্ষণ করে মৃতদেহ রেখে গেছে—
গ্রামবাসী ভয়ে সে রাতেও যেমন নিরব ছিলো, এখনও তারা ভয়ে মুখ খুলছে না।

সংবাদ মানচিত্র—৩ (সামগ্রিক)
ক)       গ্রাম্য বালিকার হাতেও থ্রিজি, সুতরাং সকল ধর্ষণের জন্য দায়ী ঐসব    বালিকা-ই। কেবল যুবকের মাতলামি এর জন্য দায়ী নয়, বরং দায়ী তার নিজস্ব কিছু নষ্টামি— এখানে মিডিয়া নির্দোষ— বাণী দিয়েছেন যোগাযোগ মন্ত্রী।
খ)       ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করে আমরা রাজনীতি করি না,বরং রাজনীতিই নাড়াচাড়া করে আমাদের ধর্মকে। বলেছেন—ড.এম. লোকমান।
গ)       এসব ৭১-এরই আলামত। বুঝেছি, আবার যুদ্ধ করতে হবে মানে… ইয়ে…  কেননা¬, বান্দারা বাঙ্গালি।
মন্তব্য: জনৈক মুক্তিযোদ্ধা (তথা রাজাকার)

১৯১৪; ১৯৩৯ নম্বর প্রশ্নের প্রাপ্ত উত্তর
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কসমিক কবি ও পরকীয়া কবিতা

শূন্য সংখ্যক প্রশ্নের প্রাপ্ত উত্তর
আধুনিক বাংলা কাব্য (কোর্স : ৪০১)
ক.       বলো, কবির কেনো ঈশ্বর নেই,
বলো, কবি চিরধর্মহীন, বর্বর—উদাসীন। (কবির জন্মকালীন প্রতিজ্ঞা, ১)
খ.       যেমন কবির না আছে মা, না আছে বোন, না আছে সংসার;
তদ্রƒপ কবি না পুরুষ, না নারী, না উভয় লিঙ্গবিধ
কবিমাত্রই অতিমানব ও মানুষ। (কবির বৈশিষ্ট, ২)
গ.       কবিতা তাই— যা (ছিন্ন প্রেম ছিন্ন করেই)
নিষ্ঠুরতম দ্বিতীয়-অদ্বিতীয় প্রেমিকরা ছিনতাই করে,ধর্ষণ করে থাকে।
ঘ.       কবিতা হচ্ছে সারাদিনের বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞানের অভিশাপ শেষে রাতের ঘুমহীন জেগে থাকা; কৃষক, রিক্সাওয়ালা ও বেকার যেভাবে জেগে থাকে; অথবা অযোগ্য কাপুরুষের পৌরুষহীনতার ছাপমাখা যুবকের মুখে একটি ডার্বি সিগারেট বা একটি আকিজ বিড়ির ব্যর্থ ধোঁয়াও সকল কবিতার শ্রেষ্ঠ কবিতা।
ঙ.       স্রষ্টা আছেন জেনেও, স্রষ্টা নেই— এ কথা বলার দুঃসাহস-ই কবিতা।
চ.        তোমাকে পাবো না জেনেও, তোমাকে ভালোবাসা-ই কবিতা।
ছ.       তুমি আমাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করো জেনেও তোমাকে ঘৃণা না করাই কবিতা।

কবিতার সংজ্ঞা : (সংক্ষেপিত বসতির জঞ্জালরূপে)
নিম্নবিত্ত ঘরে জন্মগ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন
পুঁজিহীন সংসারে মায়ের চোখের জল, বড় ভাইয়ের বেকারত্ব,
বড় বোনের জারজ সন্তান নষ্ট করা, ছোটো ভাইয়ের অসুস্থতা,
মায়ের অপারেশন, ছোটো বোনের ক্যান্সারের খরচহীনতা,
পতিতার আবেগ ও প্রেম, বান্ধবীর সাথে অবাধ সেক্স,
একাধিক পরকীয়া সম্পর্ক করা, কথা দিয়ে কথা না রাখা,
মিথ্যাবাদীতা, অসহ্য দর্শনযন্ত্রণা ও নাস্তিকতাকে কবিতা বলে।
(কবিতা কী ও কেনো? পাতা : ৬৪৩+৭ দ্রষ্টব্য)

কবিতার ধর্ম : (ব্যাঙ্গাত্মক ঈর্ষায়)
ক.       সাদাকে সাদা বলার অপরাধে পরকীয়াকারীদের মুখে চুনকাম মাখানো ও কালোকে কালো বলার শাস্তি প্রদানকারীদের মুখে চুনকালির পাল্টা জবাবের কলমই কবিতার শ্রেষ্ঠধর্ম। (বিদ্রোহী কবিশ্বর: ৪৫৯ পাতা)
খ.       উল্লেখ্য যে, ব্যাঙ্গাত্মক ঈর্ষায় কবির মহাজাগতিক নোবেল ও কবির রূপতৃষ্ণার সমকামী চলচ্চিত্রের অস্কার হচ্ছে— কবির দারিদ্র্য, দুর্বলতা, ভালোবাসা তথা উজানের টানে অবৈধ প্রেম-প্রভৃতির বুকে চাবুক স্বরূপ, কবিকে লাঞ্চিত করে দেশ ত্যাগ ও দুনিয়া ত্যাগের হুমকি প্রদান করা।
(হুশিয়ারী কবিবাণী: ৩০৩ পাতা, আলামত: ৭১)

কবি ও কবিতার সমালোচনা: (দৈহিক সহবাসের পরও বীর্য চেপে রেখে অনুধাবন)
ক. কবিমাত্রই সাইকো ও সমাজের শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী কীট
কেননা—ইহারা গঞ্জিকাকে সিদ্ধি বলে পতিতাকে রাণী বলে;
আর বউকে বলে বাইজি! ইহাদের ধরাধাম হইতে আজাব প্রদান করিয়া (অর্থাৎ হাত ও পা প্রভৃতি কাটিয়া দিয়া) পঙ্গু ও বোবা বানাইয়া রাখা প্রত্যেক শরিয়তী ও ইনসাফগ্রস্থ সরকার ও জনগণের কর্তব্য।
(আধুনিক ও নাস্তিক কবির শাস্তি : ১১৪ পাতা— মা.ড. শাহজাদা শাহনেওয়াজ)
খ. এঁর কবিতা আগামী পঁয়ত্রিশ বছর টিকে থাকবে—
কারণ এই রাজনৈতিক কবি দেশকে অনেক ভালোবাসেন;
তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি বরেণ্য নেতাকে তিনি (কবি) গুরুমান্য করেছেন—
আর এঁর লেখা কবিতায় আছে আমাদের দলের অদম্য ভক্তি
এই বিচক্ষণ কবিকে বাংলা সাহিত্যেই ম্যানবুকার দেওয়া উচিৎ
খুব শীঘ্রই সরকারকে এ ব্যাপারে নজর রাখা কর্তব্য;
এবং বিরোধীদল যাতে এঁর কোনো প্রকার ক্ষতি করতে না পারে
এ ব্যাপারে তাঁকে দলীয় সার্টিফিকেট ও মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মান দেওয়া উচিৎ। (অনন্তর বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: খবরটি দেশময় প্রচারের জন্য রয়েছে ডব্লিউ পিটিভি)
গ. বলো, তেলাপোকাকে মারতে হবে প্রতিজ্ঞায়
কবিমাত্রই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর তেলাপোকা।
(কবিনিধন সংঘ, সংবিধাননামা: ৩২৫।
সংকল্প: কবিনিধন চক্র: ৪০৭)
ঘ. এই হারামি আগামী আমাদের সরকার আমলেই মরবে—
কেননা—পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।
(সর্বব্যাপী বিরোধীদল: ৪০৬; প্রতিশ্র“তি: বাবিদ)

কবি ও কবিতার সমালোচনা (সমালোচক যখন কবি নিজেই)
বলো, কবির অহংকার যে— কবির কলম মানেই রক্তদান;
বলো, কবি সকল ধর্ম, বর্ণ, সমাজ, পরিবার ও ঈশ্বরেরও উর্ধ্বে এবং চিরনির্ভয়।
(কবির ঈশ্বরতত্ত্ব ও ঈশ্বরপ্রাপ্ত : ৪০৫)
কেননা, কবি ও কবিতা ঈশ্বরের মহা আদেশের মহাদেশ—
কবি যে মরু মহাদেশের মহানবী।
(কবিতার নবী, কবি : ১৪৯)

উপর্যুক্ত আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে,
কবি ও কবিতা বিচিত্র প্রভুর আদেশের হিমালয় ভেঙ্গে
গর্জে ওঠা যমুনা নদীর ভাঙ্গন হয়ে ইউফ্রেটিস্ ও স্বর্গীয়
নদী নীলনদের সমকামী কিছু বিদ্রোহ ও অসময়ের হাতিয়ার।
অতএব, কবি মৃত্যুসূত্রে চির অমর—
কবিতা অবিনশ্বর সূত্রে কবির তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বীরাঙ্গনা।

মাকছুদা ইয়াছমিন
তুমিতো প্রতিবন্ধী

না না না না কোনো কথা বলো না
চুপ করো!
চারদিকে তাকিয়ে দেখো— কেমন ভয়ানক নিস্তব্ধতা।
এখানে কোনো ফুল নেই,
থাকলে তো সুবাস ছড়াতো!
কোনো পাখি নেই,
থাকলে, সুমধুর সুরে নাইবা গাইলো
অন্তত কিচিমিচি ডেকে ঘুম ভাঙাতো।
নদী থাকলে তবু তার বয়ে যাওয়ার
শব্দ ভেসে আসতো।
কোনো মানুষ নেই এখানে
থাকলে নিশ্চয়, নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যেতো!

বুম বুম বুম… একের পর এক
বিকট শব্দ কিসের?
পৃথিবীর আকাশ তো নীল ছিলো তাইনা,
তবে তা আজ অমন ধূসর ছাই বর্ণের কেনো?
আকাশের ঐ নীল শাড়ি পুড়ে বুঝি
অমন ছাই বর্ণের হয়ে গেছে!
কি সর্বনাশ! আকাশ তো আর কখনো
কাঁদতে পারবে না
ছাই বর্ণের পোড়া শাড়িতে
তার দেহ যেভাবে ঢেকে আছে
এক ফোঁটা চোখের জলেই খুলে পড়ে,
ও তো একেবারেই বিবস্ত্র হয়ে পড়বে।

এমন, এমন আর্তনাদ কিসের?
ও কি, এ কিসের চিৎকার?
জন্মের নাকি মৃত্যুর—
নাকি জন্ম-মৃত্যুর সাথে একত্রিত
জীবনের দুঃখসকল মিলিয়ে
এই চিৎকার।
তাই হবে, নইলে এমন ভয়ানক চিৎকার তো
কখনো কানে আসেনি!
কোন্ স্থান হতে আসছে এ চিৎকার—
একি ধ্বংসযজ্ঞ ব্যবিলন, গ্রীস, রোম
আফগান, ইরাক, নিরীহ গাজা
নাকি আমার বাংলাদেশ!
না, এ আমার গ্রাম নয়, শহর নয়, দেশ নয়
এ আমার পৃথিবী—
আর এ চিৎকার ধরণী মায়ের।

এচিৎকার তুমি শোনার চেষ্টা করো না
শুনতে পাবে না—
তুমি তো শ্রবণ প্রতিবন্ধী!

ঐ চিৎকার আর আর্তনাদের রূপ তুমি দেখতে চেয়ো না
দেখতে পাবে না—

তুমি তো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী!
কি অমন বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছো!
ওসব ভেবোনা তুমি।
তোমার মাথায় কি ওসব ঢুকবে?
তুমি তো বুদ্ধি প্রতিবন্ধী!

মৃত্যু ও একটি ফিনিক্স পাখি

লম্বা একটা স্কুলবারান্দায় কেউ বেরুতে পারে না, কারণ এখন ওইমাথায় চৌধুরী স্যার চতুর্থ শ্রেণি খ-এর ক্লাশ করিতেছেন। হঠাৎ একটা ফিঙে ল্যাজ দুলাইয়া ফুড়ুৎ উইড়া বসে, উঁচু কড়িবর্গায়। ভোঁ দৌড় দিয়া নামিয়া আবার পিচ্ছিল বারান্দায় চঞ্চল চোখে দাঁড়ায়, বিদ্রুপ করে। তখন বুড়ি বলে—ওহ্, ওইটা না ম্যায়া পাখি। পাখিটার মাথা মুখ যেমন চঞ্চল তেমনই ফিরতি হাওয়ায় স্কুল পাশে চইলা যাওয়া রাস্তায় আরও ভীরু চঞ্চল কেউ একটা ছিল, সে বারবার ডাকছিল, আয়… আয়… আয়…। আমরা চৌধুরী স্যারের ভয়ে নিশুতি বারান্দাটা তখন ফিঙে পাখিটাকে ছেড়ে দেই আর ওই রাস্তাটায় কোনো চাঞ্চল্যমাখা কাউকে দিয়া দেই। কিন্তু বদ্ধ চিড়িয়াখানার যন্ত্রণা আমাদের আত্মাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। বোবা হাওয়া পেছনের ভাঙা দরোজাটায় এতো ঝাপটায়— যে কোনো কাজ হয় না। খালি উড়–ক্কু মনের বায়না আছড়ায়। কিন্তু ধড়াস! একদিন চৌধুরী স্যার মরিয়া গেলেন। কী অপ্রত্যাশিত সে মৃত্যু! গভীর ডঙ্কায় মেঘ বাজিয়া ওঠে তখন, গরুর ঘাড় নষ্ট হইয়া যায়, কাঁঠাল গাছের লম্বা ডাল মধ্যফাড়া হয়, জোনাকীদের বাড়িতে কীসের যেন বুকফাটা কান্নার সুর ওঠে। তার বোল অনেকদূর তরঙ্গ তোলে। চিক্কন পাতার বাঁশঝাড়, কেরামত পাগলার কবর, ওরসের মাঠ, গোঠের প্রান্তর পেরিয়া অনেকদূর। এই জোনাকীই সেদিন ভীরু চোখে আয় আয় ডাকিয়াছিল। যে জোনাকীর স্তন ছিল সুডৌল, মুখশ্রী ছিল শ্যমলা গাভীর মতো চকচকে, চোখ ছিল তুমুল রোদ্দুরমাখা, কান ছিল ভরাট মায়ার পাতলা বুননিতে বাঁধা আর চুল যেন ভারী নিতম্বের অন্ধকার— সে এখন কাঁদে, হুহু করিয়া কাঁদে। ছওয়ালের ভয়ে কাঁদে। মর্সিয়া মায়ায় কাঁদে। হ, এ বাড়িতেই কেউ মরিয়া গিয়াছে। কিন্তু চৌধুরী স্যার তো বজ্রপাতের মরা নন। হঠাৎ, ঘুমের মরা। বোবার মরা। তিনিই বলেন, মরিয়া যাইব, তোরা কোরান পড়িস আর আমার হারানো আত্মাকে খুঁজিয়া ফিরিস। আমিও অন্য মরার মতো হারাইয়া যাইব। মানুষ মরিলে এক্কেবারে হারাইয়া যায়। আর পাওয়া যায় না কোনোদিন। আকাশে-বাতাসে-হাওয়ায়-মৌনতায়-শব্দেনিঃশব্দে সে এক্কেবারে বিলীন। ক, আমি মরিলে তোরা আমারে খুঁজিয়া ফিরবি! এসব গরম হাওয়ার দুপুরের উদ্ভট প্রশ্ন, কিন্তু কিচ্ছু বোঝা যায় না। চৌধুরী স্যার খুব ভয়ের মানুষ, তার কথা তো কিচ্ছু বোঝা গেল না। খালি ডর করে, আর আব্বা ডাকা কাতর ভয় ঘিরিয়া ধরে। কিন্তু সত্যিই তিনি যখন মরিয়া গেলেন তখন এই স্কুল বারান্দা শোকাহত হয়, রোল ওঠে গোলাপজলের বাসনার, আতর আর ধূপের গন্ধ ওরাল দিয়া রাস্তাটা ছাইয়া যায়, জোনাকী গমগম করেÑ কালো রাত ভরাট হইয়া হড়-হড় করে, পড়ালেখাটা হইবো তো! তোরা পড়ার ভয়ের ভয় করোস, আর আমি এখন কব্বরে শুইয়া তোদের ভয় করি, যাহ্ সক্কলকে ছাইড়া দিলাম। সবাই জোনাকীর ডাকে বাইরে চইলা আয়। ভীড় কইরা আনন্দ কর। জোনাকীর সৌন্দর্যে সরু রাস্তার হোলি উৎসবে মাইতা বইলা যা, আমাদের তো বয়স হইছে, সাত বচ্চর হইলো, আর চৌধুরী স্যার এখন কিচ্ছু কইবো না। পারমিশন দিয়া দেছে, এখন হাওয়া মে উড়তা যায়ে… আসো ওই হাওয়ায় ওরাল তুলি… জয়, জয় জয় জয় হে…।

চিহ্নপ্রধান

আলোচনা