স্নান ৩৭

স্নান ৩৭
একটি চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ 

বছর ৭, সংখ্যা ৩৭, জুলাই ২০১৫ খি.

চিহ্নপরিবার
১৩০ শহীদুল্লাহ কলাভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক
রেজওয়ানুল হক রোমিও

প্রচ্ছদকার
নূর আলম

অলংকরণ
নাজ

রেজওয়ানুল হক রোমিও
নক্ষত্র কথন
বুকের ভিতরে কষ্টের ভাঁজ
ভাঁজে ভাঁজে অশ্রুর কণা
জন্ম দিয়েছে হৃদয়ের মহাশ্মশান
এই শূন্যতায় পরিপূর্ণ মানুষ আমি।
কষ্টের তীব্রতায় লুকোচুরি ঝলমল
এই পথ অবশেষে
আঁধার চিনিয়েছে আমায়
এভাবে আলোর পথে যেতে হয়।
হাসিমাখা মুখে দুঃখের সাথে করে আঁড়ি
এই যে ছুটে চলেছে জীবন
বলনা, ললনা ওখানে কি সুখ থাকে ?
কি সুখে এই বসবাস-নিবাস
রোদের ঝলকানিতে তাকিয়ে অবাক
পড়ে থাকে এক সমুদ্রের কথা
কখনও বা স্রোত হয়ে মিশে যায় তটে।
এই আধো স্বপ্নমাখা মুখে
ফুরিয়ে যায় যদি কথা সব
যদি কখনও মনে হয়
ভালোবেসেছিলো একজন নিরবে তোমায়
ঐ নক্ষত্রের মতো
তবে তুমি কষ্ট পেওনা
ওখানে যে মিশেছে
হৃদয় আমার।

তুহিন মোহাম্মদ
বিপন্ন পঙ্কতি
ডাকপিয়ন কবেই পেয়ে গেছে পৃথিলার চিঠিগুলো!
অথচ উদ্বাস্তু আমি; ঠিকানা পেলোনা তারা…


বাসুদেব পাল
গোধূলি

কোন

              নবপ্রেমে

         তুমি এলে; এই দিনে

                 এমন

                  বিধুর বিকেলে

                   এ

                  কার চোখে

    নেশাতুর চোখে এইখানে

পৃথিবীর দিকে; আকাশের ধার ঘেঁষে

                 রক্তিম প্লাবন বেগে

                        নেমে এলে

                           পাষাণভূমিতে

নদী

মৃত্তিকা থেকে পাহাড় শরীরে

                            বন

    বরফ থেকে  শৈত্য প্রবাহে

প্রেয়সী

প্রবীন থেকে নিযুত-অবোধে

                        মানবহৃদয়ে

                কোন

                নবপ্রেমে

          তুমি এলে; এই দিনে

                  এমন

                    বিধুর বিকেলে

আহসান হাবীব
তুমি
আমার পৃথিবী থেকে কতো দূরে তুমি!
যে সুর— যে স্পন্দন আমার জ্বলন্ত হৃদয়ে—
বাষ্পকনার মতো যে জল চোখের রেখায়
ঘুরেফিরে মিশে যায় শীতল বাতাসে—
তার কোনো প্রভা ছুঁয়ে যায় তোমার প্রাণে!
সাত সমুদ্র  তেরো নদী পার হয়ে যে
অন্ধকার সাগর তার তীরে সেই পুরাতন প্রাসাদে
ঘুমিয়ে রয়েছো তুমি— নাকি বোবার মতো হয়ে
বসে আছো জানালার বিবরে ধূসর, কোমল চোখে,
মাতাল— পলাতকা ঢেউয়ের ক্লান্ত ঠোঁটে
চুমু দেবার গভীর অভিলাষে!
দিনের শেষে রক্তের মতো লাল আলো
মেঘের গা ঘেঁসে যেভাবে সন্ধ্যার কোলে যেয়ে বসে—
বন্দুকের গুলির আঘাতে সবুজ শাখার বুক থেকে
উড়ে যায় পাখির প্রাণ, এক নিমিষে—
বৈতরণীর ওপারের অন্ধকার কোনো বনে—
সেই বনে—যেখানে যাওনি কোনোদিন—সেই বন!
সেখানে কোনো বৃক্ষের ডালে সাদা সাদা বাণ দিয়ে
নির্মাণ করেছো নীড়— নিস্তব্ধ— শান্ত উল্লাসে !!
ঘুমন্ত নক্ষত্রদের শিশুর মতো বুকে নিয়ে
আমার চোখের আকাশ এখন অন্ধকারে জেগে থাকে;
ফিকে কুয়াশা চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে—
আকাশের সাথে মেঘের মৈথুন ছাড়াই
বৃদ্ধের চোখের জলের মতো অঝরে বৃষ্টি ঝরে ।
তুমি—সন্ধ্যার পাখির মতো—তুমি কোথা থেকে এলে
এই ভেজা— স্যাঁতস্যাঁতে অরণ্যের তীরে,
সেই অন্ধকার নীড়ে…যাবে কি আর ফিরে !
জানি—তুমি চলে যাবে আবার;
তবু যুগে যুগে প্রেমের দর্পণের ভিতর চোখের জলের মতো
অবিনশ্বর হয়ে দেখা দেবে— বারবার।


নিষুপ্ত শিশিক্ষু

পঞ্চ নিবেদন

একদিন,

আরো একদিন

বাতাস হালকা হলে খেলায় মেতো।

তারপর,

নীল আকাশে যখন চিল উড়বে,

বন্দুকের ভালোবাসায় লাল করে দিও।

একদিন,

রাত আকাশে যখন একটি-দুটি তারা জ্বলবে

তখন ভয় টুকটুকে

একতারা-দোতারা গুলো বাজিয়ে,

তাদের বরণ করে নিও।

হাজার বছরের বঞ্চিত ধূলি দিয়ে

ভালোবাসা মোড়ানো ট্রাফিকের

লাল-হলুদ-সবুজ সিগন্যাল

তৈরি করে নিও

তারপর, একদিন

বাতাস হালকা হলে রঙ-বে-রঙের খেলায় মেতো।

নুসরাত নুসিন
সে যাবে
বিস্তৃত সন্ধ্যায় একটি নীল মূর্তি হয়ে বসে আছে সে।

সে জানে রাত গাঢ় হলেই একটি শুভ্র সকাল ধরা

দেবে তাকে। শিশিরের জল ছুঁয়ে অনেক ঘাসের পথ

পেরিয়ে যাবে জলডাঙার বনে। প্রিয়ফুল কুড়োতে

কুড়োতে ফ্রকের কোঁচায় বন্দি হবে উম্মাতাল ঘ্রাণ

উচ্ছ্বাস রুদ্ধশ্বাস—পাখিদের চোখে তখন ঘুড়িবাসনা।

ঝরাপাতারা শুনাবে নিশ্চুপ খসে পড়ার গান।

নদীর জলেরাও কম নয়। ধ্রুপদ সংগীতের মতো

ওদের গতির ছন্দে প্রাচীন মোহ। অনেক বাক্ও

বাধের বিপত্তি বেয়ে সে ভেসে যাবে জলের নৌকোয়

সে জানে জলেদের মতো তারও দিক আছে।

তাকে যেতে হবে তার গন্তব্যে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কবির নামহীন কবিতা
রাতের অচেনা তিথি…
নেমে এলো বারিধারার মতো আলোকচ্ছটা,
আলোয় উদ্ভাসিত এক সত্ত্বা, আজ্ঞাবহ
প্রভুতায়।
বিদীর্ণ করে তঁাঁর বুক,
শুদ্ধতার স্নানে ভাসালো হৃদয়।
স্বর্ণখোচিত জ্ঞান আর বিশ্বাস,
ঢেলে দিলে চেতনাময় ।
তাঁকে যে যেতে হবে বহুদূর।
ঈশ্বরের কাছাকাছি।


এখানে শুরু প্রশস্ত পথ, স্তরে স্তরে
স্তম্ভিত আকাশ।
আজ্ঞাবহ নূর আর বিশুদ্ধ মানবের
প্রবেশগাঁথা।
প্রথম স্তরে মহান পিতা নিজ আসনে
সমাসীন, সুখ-দুঃখের গোলকধাঁধায়।
সন্তানের যুদ্ধ জয়-পরাজয়ের সাক্ষী,
সে কি করুণ অভিজ্ঞতা।
নাকি ঐ নিয়তি সৃষ্টি আদিকাল হতে
বর্তমান।
পিতৃহৃদয় কি একই সুরে বাজে?

বিরহান্ত কৃষ্ণ
আত্মনাশ

স্বাদ পেয়েছি আমি

বিষহরীর বিষের স্বাদ।

তাই মুহূর্তে মুহূর্তে সাধ জাগে মনে

দংশনের পর দংশন নিতে

ঐ নির্দয় বিষহরীর…

জ্বলে-পুড়ে নিজেকে

নিঃশেষ নয়

খাঁটি নীলকণ্ঠ বানাতে—

সাব্বির জাদিদ
বউপরায়ণ স্বামী
কী ব্যাপার! জোবায়ের সাহেব, এতো ঘামছেন কেনো? ও.. আপনি তো আবার লজ্জা পেলে ঘামেন। তা লজ্জাটা কিসের শুনি! বউকে মিথ্যা বলে এসেছেন, সে জন্য লজ্জা? না না আপনি তো তেমন মানুষ না। বউকে মিথ্যা বলে লজ্জা পাওয়ার মতো ‘বউপরায়ণ’ স্বামী তো আপনি না। তাহলে সমস্যাটা কী? আচ্ছা সমস্যা যা-ই হোক, সেটা পরে ভাবা যাবে—রুমাল দিয়ে ঘামটা আগে মুছুন তো। দেখছেন না সবাই কেমন করে আপনার ঘামা দেখছে। এ বড় অস্বস্তি! আপনি ঘাম মুছুন, প্লিজ। বারে! তবু বসে আছেন ঘাড় গুঁজে! না মুছলে না মুছুন গে, তাতে কার কী! প্রবলেম আপনারই।

এবার আপনার ঘামের রহস্যে ফেরা যাক। আপনার জড়োসড়ো ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে এই রেস্টুরেন্টে এসে আপনি লজ্জায় পড়েছেন। আর সে জন্যই এই দরদরানি ঘাম। তা লজ্জা তো একটু লাগবেই। এই রেস্টুরেন্টে যারা আসে সবাই কলেজ-ভার্সিটি পড়া ছেলেমেয়ে। তারা তো আর খেতে আসে না, আসে প্রেম করতে। এই যেমন আপনার ডানপাশের টেবিলের কপোত-কপোতি হাত ধরে কিভাবে বসে আছে মুখোমুখি। ইশ! মেয়েটার বাঁ হাত ঠোঁটের কছে টেনে এনে একটা চুমুও খেলো ছেলেটা। একটু খেয়াল করলে আপনিও দেখতে পেতেন। কিন্তু দেখতে পান নি। কারণ আপনি ঘাড়গুঁজে বসে আছেন।

আশপাশের কপোত-কপোতিগুলো আপনার উপর বিরক্ত হচ্ছে, আপনি কি তা বুঝতে পারছেন? আপনি কেনো এদের ভেতর এসেছেন? আপনি ওদের বাবার বয়সী। আপনার মেয়েটা সামনের বার মেট্রিক দেবে। এখন যদি আপনার মেয়েটাই কোনো ছেলের হাত ধরে এখানে চলে আসে! ভয়টা পাবে কে? আপনি, না আপনার মেয়ে? না কি দুজনেই?

আপনি ঘড়ি দেখছেন। আপনার এই ঘড়ি দেখা বলে দিচ্ছে আপনি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। কার জন্য অপেক্ষা করছেন? ওই যে ওই মেয়েটা, কী যেনো নাম— ও মনে পড়েছে  মিমি। আপনি আদর করে যাকে তিমি মাছ বলে ডাকেন। মিমি আপনার কবিতার ভক্ত। আর সচারচর যা হয়— কবিতার ভক্ত এক সময় কবিরও ভক্ত হয়ে যায়। মিমিও আপনার ভক্ত হয়ে গেছে। ভক্ত হয়ে সে কিন্তু আড়ালে থাকেনি। আর অনেকেই যেমন আড়ালে থাকে। মিমি একটু অন্যরকম। সবার থেকে আলাদা। আপনি কয়েকবার এই কথাটা তাকে শুনিয়েছেন—  ‘তিমি, তুমি সবার থেকে আলাদা।’

আপনার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বের হওয়ার পর মিমি আপনার ফোন নাম্বার যোগাড় করেছিলো। তারপর করেছিল ফোন। ছয়মাস ধরে আপনি মিমির সাথে কথা বলছেন। বউয়ের, মেয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে। আপনি আসলেই চালাক। চালাক না হলে বউকে ফাঁকি দেয়া কাজটা আপনি এতো সহজে পারতেন না। আর আপনি কোনোদিন মিমিকে জিজ্ঞেস করেন নি— সে কোথায় পেয়েছে আপনার নাম্বার। এখানেও আপনার চালাক-মস্তিষ্কের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। আপনি শুরু থেকেই মিমির উপর কিছুটা দূরত্ব রেখে চলেছেন। যেনো সে আপনার দ্বারা প্রভাবিত হয়।

আপনি দ্বিতীয়বার ঘড়ি দেখলেন। আরে ভাই এতো ঘড়ি দেখাদেখির কী হলো? ও.. সরি সরি। আপনাকে ভাই বলা হয়ে গেলো। আপনি তো ভাই ডাক পছন্দ করেন না। আপনি কবি। কবি ডাকলে আপনি কৃতার্থ হন। তা কবি সাহেব, এতো ঘড়ি দেখাদেখির কী হলো? মিমির আসার কথা কয়টায়? সাড়ে চারটায়? এখন বাজে চারটা সাতচল্লিশ। সতেরো মিনিটেই অধৈর্য হয়ে গেলেন? কবিদের তো এতো অধৈর্য হলে চলে না! আরেকটু অপেক্ষা করুন। নিশ্চয় এসে পড়বে। ঢাকা শহরের জ্যামের কথা একটু ভাববেন না! এই শহরে কে কবে কথা দিয়ে সঠিক সময়ে এসেছে! তার উপর মিমি আবার মেয়ে। কুড়ি না পেরোনো মেয়ে। এই বয়সী মেয়েদের কতো প্রতিবন্ধকতা! দেখা গেলো অর্ধেক পথ এসে মনে পড়েছে মেকআপ বক্স ফেলে এসেছে বাসায়। তখন আবার ফেরত যাওয়া। আজ আপনাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিন। সাজুগুজু করতেও তো একটু দেরি হতে পারে। হতে পারে আপনার জন্য কিছু কিনতে গিয়ে আটকে গেছে দামি কোনো দোকানের গোলকধাঁধায়। হয়ত কোনটাই পছন্দ হচ্ছে না। অথবা সবই পছন্দ হচ্ছেÑ নেবে কোনটা—এই নিয়ে ঝামেলায় পড়েছে। মেয়েরা কেমন খুঁতখুঁতে হয় আপনি তা ভালো করেই জানেন। রেহানার সাথে আপনার একুশ বছরের সংসার। এই একুশ বছরে তো আপনি কম আলুভাজি হন নি।

কপালের ঘাম মুছে আপনি পথের দিকে তাকালেন। মিমিকে আপনি দেখেন নি কোনোদিন। কিন্তু সে আপনাকে দেখেছে। আপনি মোটামুটি বিখ্যাত মানুষ। আপনাকে চেনা তো কারো অসাধ্য নয়। মিমির ফেসবুক একাউন্ট আছে। সে কতবার আপনাকে বলেছে— একটা একাউন্ট খোলেন, একটা একাউন্ট খোলেন। নির্মলেন্দু গুণের যদি একাউন্ট থাকতে পারে, আপনার থাকতে দোষ কী? ফেসবুক তো আর আপনার কবিতা দূষিত করে দিচ্ছে না। আপনি কথা শোনেন নি। আসলে ফেসবুক জিনিসটার প্রতি আপনি কোনো আকর্ষণ বোধ করেন নি। আপনি সেকালের মানুষ। একালের ফেসবুক আপনাকে টানবে কেনো। সবাই যেখানে কম্পিউটারে লেখালেখি শুরু করে দিয়েছে, আপনি লেখেন কাগজে-কলমে। আসলে প্রযুক্তি জিনিসটাই আপনি বোঝেন না।

মিমি আসবে নীল শাড়ি পরে। আপনিই বলেছেন নীল শাড়ির কথা। সব কবি-সাহিত্যিকের মতো নীল আপনারও পছন্দ কিনা। আপনি দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন নীলের অপেক্ষায়। এই মুহূর্তে একটা নীল শাড়ি আপনার অস্থিরতা কমাতে পারে। নীল শাড়ির এতো ক্ষমতা!

দরজা ঠেলে নীল ঢুকলো। তবে শাড়ি নয়, জামা। মিমি কি তবে শাড়ির বদলে জামা পরে এলো? নীল জামার সাথে একটা ছেলেও আছে। ঘাবড়াবেন না কবি সাহেব। এ মিমি নয়। মিমি একাই আসবে আপনার কাছে। মিমি, আপনার তিমি মাছ, অতো বোকা নয়। আবার অপেক্ষা। এবার আর বেশি অপেক্ষা করতে হলো না আপনাকে। মিনিট পাঁচেক পরেই কাচের দরজা ঠেলে ঢুকল নীল শাড়ির মিমি। আপনার আদরের তিমি মাছ। আপনি ভেবেছিলেন মিমি ঢোকার পর দোকানের সব বিজলিবাতি ম্লান হয়ে যাবে। গত ছয়মাসে মিমির মিষ্টি গলার ‘কবি’ ডাক শুনে শুনে এমনই প্রতীতি জন্মেছে আপনার। আপনার ধারণা ভুল হলেও আপনি হতাশ হলেন না। প্রথম দর্শনেই আপনি বুঝতে পারলেন— মিমির আলগা রূপ নেই। তার সৌন্দর্য হুট করে ধরা পড়ে না। আবিষ্কার করতে হয়। আপনি অপলক চোখে মিমির সৌন্দর্য আবিষ্কারে মগ্ন হয়ে পড়লেন।

মিমির হাতে একগোছা রজনীগন্ধা। আপনি একদিন বলেছিলেন রজনীগন্ধা-প্রেমের কথা। মিমি ভোলেনি সে-কথা। নিয়ে এসেছে উপহার সরূপ।

মিমি আপনার সামনের চেয়ারে বসলো। বসতে বসতে কানের পাশের চুল সরালো। তারপর হাসি মুখে বললো, দেরি করে ফেললাম, সরি-টরি বলছিনে। তা কেমন আছেন, কবি?

বরাবরের মতোই মিমির কথার মাদকতায় আপনি মাতাল হয়ে গেলেন। আপনি বুঝেতেও পারলেন না— আপনার উদ্দেশ্যে মিমি একটা প্রশ্ন ছুঁড়েছে। অথবা বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু উত্তর দেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। হা! হাহা!! এদেশের মানুষ দিনে দিনে ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে আর আপনি হারাচ্ছেন উত্তর দেয়ার ক্ষমতা। হা! হাহা!!

মিমি আপনার দিকে রজনীগন্ধার ডাটা বাড়িয়ে ধরলো। তার এই বাড়িয়ে ধরার ভঙ্গি দেখে আপনার মনে উদয় হলো এক উপমা। আপনি যেনো স্বর্ণে মুড়ানো কোনো মন্দিরের পুরোহিত আর মিমি আপনার দেবি। দেবি আপনার চরণে অর্ঘ্য নিবেদন করতে এসেছে। উপমাটা মনে হওয়াতে আপনার বেশ আনন্দ লাগলো। আনন্দটা এ-জন্য যে আপনি যেভাবে মিমির সামনে সম্মোহনের জাল ছড়িয়ে রেখেছেন, তাতে আপনি যেনো সত্যিকারের পুরোহিত। আর মিমি আপনার সত্যিকারের দেবি। আপনি দেবির অর্ঘ্য সানন্দে গ্রহণ করলেন। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখে বললেন— মিমি, তুমি পাহাড়ের মতো সুন্দর। আপনার কথা শুনে মিমি চোখ বড় বড় করে তাকালো। শিশুর মতো অবাক গলায় বললো, পাহাড়ের মতো সুন্দর! মিমির পুনরাবৃত্তি আপনি উপভোগ করলেন— হ্যাঁ মিমি, পাহাড়ের সৌন্দর্য সবাই বুঝতে পারে না। পাহাড়ের সৌন্দর্য সব চোখে ধরা পড়ে না। এভাবেই আপনি একটু একটু করে কথার জাল ছড়াতে লাগলেন এক অপরিপক্ব তরুণীর সামনে। ইতোমধ্যে ওয়েটার আপনাদের সামনে খাবার-পানীয় রেখে গেছে অর্ডার মোতাবেক। মিমি খাবারে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে আর আপনি গতকাল রাতের লেখা কবিতাটা নিচুস্বরে আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। গল্পে-কথায় কখন যেনো সন্ধ্যা নেমেছে। রাস্তার মাঝখানের ল্যাম্পপোস্টে আলো ফুটে উঠেছে। হঠাৎ রেহানা আর তিতলির কথা মনে পড়ে গেলো আপনার। এবং এটাও মনে পড়ে গেলো, আপনাকে এখন বাসায় ফিরতে হবে। কারণ ঘর-সংসারের দায়িত্ব এড়ানোর মতো মনোবল আপনার কলিজায় নেই। বাইরে আপনি যতোই তিমি মাছ নিয়ে ঘোরেন, ফেরার জায়গা আপনার একটাই। ছায়ানীড় কটেজ। আপনার যেমন রেহানা আছে, তিতলি আছে, মিমিরও সম্ভবত অমন কেউ আছে। আর সে-জন্য মিমিও হঠাৎ ওঠার কথা বললো। তাকেও ফিরতে হবে বাসায়। আপনারা উঠলেন। আপনাদের নিতম্বের ছোঁয়ায় উষ্ণ চেয়ারদুটো পড়ে রইলো পেছনে। বিদায়ী কথাবার্তা বলে আপনি দায়িত্ববান প্রেমিকের মতো মিমিকে একটা হলুদ ক্যাবে তুলে দিলেন। জানালার ওপাশ থেকে মিমি আপনার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লো। আপনিও নাড়লেন হাত। কিন্তু আপনার হাত দোলানো মিমির হাত দোলানোর মতো ছান্দিক হলো না। আপনি সেটা স্পষ্ট ধরতে পারলেন। আপনার মনে হলো— এই হাত শুধু কবিতা লেখার জন্য; কোনো তরুণীর বিদায়সম্ভাষণ জানানোর জন্য নয়। আপনি ধুর ছাই বলে একটা রিকশায় উঠলেন। রিকশা চলছে মহাখালীর দিকে। সন্ধ্যা নেমে গেছে পুরোপুরি। আপনি কবি বলেই ব্যাপারটা অনুভব করলেন। আর সামনের ছিটে বসা লোকটা রিকশাওয়ালা বলে অনুভব করতে পারলো না। সন্ধ্যা নামতে দেখলে আপনার মন খারাপ হয়। ভাবেন— যাহ! ফুরিয়ে গেলো আরো একটা অসমাপ্ত দিন! কতো কাজ জমে থাকলো জীবনে! কিন্তু আশ্চর্য! আজ আপনার একটুও মন খারাপ হলো না। কারণটা সহজেই অনুমেয়। আপনার ভেতর এখন ছড়িয়ে আছে মিমির সান্নিধ্যের রেশ। ছড়িয়ে আছে আরো একটা জিনিস—মিমির পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ। রিকশাওয়ালা একবার পেছন ফিরে আচমকা বলে উঠলো— আহ! সেন্টডা তো ফাইন। আপনার তখন খেয়াল হলোÑ আপনি নিজের অজান্তেই মিমির পারফিউমের গন্ধ বহন করে চলেছেন। গন্ধটা এত মিষ্টি আর কোমল যে আপনার মায়া লেগে গেলো। সাবান দিয়ে কাঁচলে এই গন্ধ চলে যাবে পাঞ্জাবি থেকে। আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন— এই পাঞ্জাবিটা কোনোদিন কাঁচবেন না। ভাঁজ করে ওয়ার্ডরোবের নিচের ড্রয়ারে তুলে রাখবেন। ভাঁজের ভেতর যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে গন্ধ। আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে সেই গন্ধ শুকবেন। কল্পনার এই জায়গায় এসে হঠাৎ আপনার  সন্দেহবাতিকগ্রস্থ স্ত্রীর কথা মনে পড়ে গেলো। একবার আপনি যাত্রাবাড়ি এক চিত্রকর বন্ধুর স্টুডিও দেখতে গিয়েছিলেন শখের বশে। স্টুডিও থেকে আপনার সাদা পাঞ্জাবিতে লেগে গিয়েছিল লাল রঙের ছোপ। এই রঙকে আপনার স্ত্রী লিপিস্টিক ভেবে প্রচুর জলঘোলা করেছিল। এবার এই মিষ্টি গন্ধ নিয়ে বাসায় উঠলে নিশ্চিত পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হবে আপনাকে। আপনি মাঝপথে রিকশা ছেড়ে দিয়ে এক পারফিউমের দোকানে ঢুকলেন। আপনার গায়ের ব্রান্ড খুব সহজেই ধরতে পারলো দোকানি। ধরতে তো পারবেই। পারফিউম নিয়ে তাদের সার্বক্ষণিক কারবার। কসাই যেমন চলন্ত গোরু দেখে বলে দেয়, কতো কেজি মাংস হবে, তেমনি এই দোকানিরা দূর থেকে গন্ধ নিয়েই  ব্রান্ড চিনতে পারে নির্ভুল। আপনি মিমির ইউজ করা ব্রান্ড নিয়ে বাসায় ফিরলেন। দরজা খুলেই আপনার স্ত্রী নাক কুঁচকালেন— কী ব্যাপার, তোমার গায়ে এই মেয়েলি গন্ধ কেনো? কার সাথে জড়াজড়ি করে আসলে শুনি? আপনি কোনো কথা না বলে পারফিউমের প্যাকেট স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিলেন। মেয়েদের অনেক রকম হবি থাকে। কেউ নতুন পদের খাবার রেঁধে স্বামীকে চমকে দিতে ভালোবাসে। কারো হবি— নতুন নতুন সেলাইয়ের কাজ। আপনার স্ত্রীর হবি— দেশি-বিদেশি পারফিউম কালেকশন। বিয়ের প্রথমদিকে প্রায়ই আপনি অফিস থেকে ফিরে স্ত্রীকে নতুন নতুন পারফিউম গিফট করে চমকে দিতেন। তখন ছিলো মাতাল হাওয়ার দিন। আপনারা দুজনেই খুব এক্টিভ স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। এখন আপনারা পুরোনো হয়ে গেছেন। পুরোনো হয়েছে শরীর। পুরোনো হয়েছে মন। পরস্পরকে চমকে দেবার তাগিদ অনেক আগেই আপনার বিস্মৃত হয়েছেন।

এতো বছর পর বাইরে থেকে ফিরে স্ত্রীর হাতে নতুন ব্রান্ডের পারফিউম তুলে দিতেই আপনার স্ত্রীর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো উত্তেজনায়। খুশিতে তার চোখে পানিও এসে গেলো হয়তো। তিনি ভাবলেন— আবার আপনাদের সুদিন ফিরে আসছে। আবার আপনারা লুকিয়ে লুকিয়ে ভালোবাসা-ভালোবাসা খেলবেন। আপনি মাঝে মাঝেই পারফিউম হাতে অফিস থেকে ফিরবেন। আর আপনার স্ত্রী লুকিয়ে আপনার পছন্দের পদটা রান্না করে অপেক্ষা করবে চেয়ারে। এভাবে একটা অপকর্মকে ঢাকতে গিয়ে নিজের অজান্তেই আপনি স্ত্রীকে খুশি করে ফেললেন। বেচারি জানতেও পারলো না পনেরো বছর পর আপনার পারফিউম হাতে ঘরে ফেরার রহস্য।

রাতে খাওয়ার পর আপনি লেখার টেবিলে বসেন। আর আপনার স্ত্রী টিভির সামনে। কোনোদিন আপনার লেখা আগে শেষ হয়। কোনোদিন স্ত্রীর টিভি দেখা। যে-দিন যে ফার্স্ট হয় সে-দিন সে আগে বিছানায় যায়। এবং সাথে সাথেই ঘুম। এই শহরে আপনারা বেশ যান্ত্রিক মানুষ হয়ে উঠেছেন। কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করেন না।

আজ আপনার লিখতে ইচ্ছে করলো না। আপনি শুয়ে পড়লেন। চোখ বুজে মিমিকে ভাবতে লাগলেন। মেয়েটা এতো সুন্দর! মেয়েটার কথাগুলো এতো সুন্দর! মেয়েটার চুল সরানোর ভঙ্গিমা এতো সুন্দর! মেয়েটার হাঁটার ছন্দটা এতো সুন্দর! হঠাৎ আপনার যুবক হয়ে যেতে ইচ্ছে করলো। মনে হলো, ইশ! আর বিশটা বছর পরে যদি আপনি আসতেন! অথবা মিমিই আসতো বিশটা বছর আগে! এইসব ভাবতে ভাবতেই আপনি ঘুমিয়ে গেলেন। আপনার ঘুমের পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াতে লাগলো মিমি। আপনার তিমি মাছ।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আপনি মিষ্টি একটা গন্ধ পেলেন। গন্ধটা আসছে আপনার পার্শ্ববর্তিনীর শরীর থেকে। খুবই চেনা এবং মায়া লাগানো গন্ধ। আপনি কিছু না ভেবেই মাতাল করা ওই গন্ধের আকর্ষণে পার্শ্ববর্তিনীর শরীরে উপগত হলেন। পার্শ্ববর্তিনী মানে আপনার স্ত্রী রেহানা হঠাৎ আপনার এই আচরণে খুব অবাক হলেন। আপনি দশদিন আগে একবার স্ত্রীর উপর উপগত হয়েছিলেন। হিসেব মতে পরবর্তী শারীরিক মিলন এখনো বিশদিন বাকি। আপনারা মাসে একবার ওই কর্মটি করেন। তাও খুব ম্রিয়মাণ আর দায়সারা গোছের। অথচ একটা সময় আপনারা কতো কিই-না করেছেন! আপনার স্ত্রীর ছিলো তীব্র শারীরিক ক্ষুধা। ক্ষুধা ছিলো আপনারও। বিয়ের পর প্রথম চারটি বছর আপনারা যখন-তখন মিলিত হয়েছেন। শুধু রাতেই না, দিনেও। রেহানা আপনাকে তেজি ঘোড়া বলে ক্ষ্যাপতো। আর আপনি? থাক সে কথা। সব কথা বলতে নেই।

তিতলি হওয়ার পর স্ত্রীর শরীরের আকর্ষণ কমে গেলো আপনার কাছে। আপনি আর আগের মতো সাড়া পান না ভেতোর থেকে। সবকিছু বড় বিবর্ণ আর আটপৌরে লাগতে শুরু করলো। প্রতিদিন অফিস করে ক্লান্ত হয়ে একটা মানুষের কাছে ফিরে আসা, একটা শরীরের কাছে ফিরে আসাÑ আপনার বড় একঘেঁয়ে লাগতো। সেই শুরু। এখনো আছে সেই একঘেঁয়েমি। এখন মাসে একটিবার আপনি মিলিত হন, কিন্তু একে মিলন বলে নাÑ আপনি মিলনের দায়িত্ব পালন করেন। অথচ আপনার স্ত্রীর সেই ক্ষুধা এখনো অবশিষ্ট আছে। আগের মতোই। আপনার চোখে স্ত্রী পুরনো হয়ে গেছে, কিন্তু আপনি হননি স্ত্রীর চোখে। তাইতো আপনার নিঃস্পৃহতা বুঝতে পেরেও আপনাকে জাগানোর অনেক চেষ্টা করেছেন রেহানা। আপনি জাগেননি। রেহানা পারেননি আপনাকে জাগাতে। শেষমেশ নিয়তিকেই মেনে নিয়েছেন রেহানা। তিনিও হয়ে পড়েছেন ঢেউহীন নিথর নদী। কিন্তু আজ, এই এতো এতো বছর পর, সেই নতুনকালের তীব্রতা নিয়ে উপগত হয়েছেন আপনি, আপনার ঢেউহীন নদী হয়ে যাওয়া স্ত্রীর উপর। আপনার স্ত্রী খুব অবাক হলেন আপনার এই ব্যতিক্রম আচরণে। অবাক হলেন, কিন্তু তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না নিজেকে। শরীরের প্রতিটি ভাঁজ খুলে দিতে লাগলেন আপনার সামনে। যেভাবে তিনি পেয়াজের অথবা বাঁধাকপির একেকটা আবরণ খোলেন রান্নার আগে। তা এটাও তো এক রান্নাই নাকি!

আপনি মাঝে মাঝেই স্ত্রীর বুকে মুখ ডুবাচ্ছেন। নুন-ঝাল সব ঠিক আছে কি না সেটাই কি দেখা উদ্দেশ্য? হয়তো। আপনার স্ত্রীর বুকে নুন-ঝালের গন্ধ না, বরং ভেসে আসছে সেই মিষ্টি গন্ধ; সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে মিমির শরীরে পেয়েছিলেন যে গন্ধ। এই গন্ধের কারণেই রেহানাকে আপনার এখন রেহানা মনে হচ্ছে না। রেহানাকে মনে হচ্ছে মিমি। রেহানার শীৎকারকে মনে হচ্ছে মিমির শীৎকার। রেহানাকে মিমি ভেবেই আপনি এখন পূর্ণ তৃপ্তি পাচ্ছেন। এই শুরু। এরপর প্রতিটি রাত আপনি রেহানাকে মিমি ভেবে রেহানার উপর উপগত হতে লাগলেন। তীব্রমাত্রায়। আপনাকে আগের ভূমিকায় দেখেতে পেয়ে ভীষণ খুশি আপনার স্ত্রী। লোকে যে যাই বলুক, এইবার আপনি রেহানার কাছে ‘বউপরায়ণ’ স্বামী হয়ে উঠতে পারলেন।

সুবন্ত যায়েদ
প্রকৃতি ও করালস্পর্শ
সন্ধ্যায় দরজা-জানালা বন্ধ করে পর্দা ফেলে দিয়েছি। দুদিন হলো শীতের তীব্রতা বেশী। এমন শীত আমি অন্তত পড়তে দেখিনি এ শহরে। বয়সী মানুষগুলোও হয়তো দেখেন নি। বিকেলে গলির মাথায় চায়ের দোকানটায় পৌঢ় এক ব্যক্তি বলছিলেন তীব্র এ শীত তার অদেখার কথা, এবং এটা যে আল্লার গজব, এমন কথাও শোনা যাচ্ছিলো সেখানে।

আমি গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে নিয়েছি। মোজা পরেছি হাতে পায়ে। মাথায় কয়েক প্যাচে পরেছি সেকেলে মাফলারটা। অচল বলে যেটা ওয়ারড্রপে পড়েছিলো দেড় যুগেরও বেশি। তীব্র এ শীতে এটার ওম বড়ো আরামদায়ক মনে হচ্ছে। বেশি লম্বা হবার কারণে মাথা-গলায় কয়েক প্যাচে পড়া গেছে। সবকিছু মিলে, শীতের তীব্রতা আমাকে আর ছুঁতে পারে না। সবে সন্ধ্যা হয়েছে। আমি বসেছি লেখার টেবিলে। দুপুরে আপিসে লাঞ্চের সময়ে করোটিতে হঠাৎ হানা দিয়েছিলো দুটো পঙ্ক্তি। সাথে সাথেই টুকে রেখেছিলাম। এখন টেবিলে বসেছি কবিতাটির চুড়ান্ত রূপটি দেবার জন্যে। করোটিতে ছন্দ দুলছে। টাইপরাইটারে আমার হাত। কয়েক মুহূর্তের ভেতরেই লিখতে শুরু করবো। ভেতরে বেশ উত্তেজনা অনুভব করছি। প্রতিবারই কোনো কবিতার চূড়ান্ত রূপটি দেবার পূর্বে আমি এমনটাই অনুভব করি। এ হলো সৃষ্টির উত্তেজনা। কিন্তু এ ভাব নষ্ট হয়ে যায় একটুখানি। আমার টেবিলের ওপরে একটা ছায়া জেগে উঠতে দেখি। কেমন অস্থির হয়ে ছায়াটা নড়ে। আমি ওপরে তাকাই। বেশ বড়ো একটি পোকা। আলোর ঝলকে কেমন অস্পষ্ট। প্রজাপতিই মনে হয়। লাইটের উপরে বসে পাখা নাড়ছে। ওকে হয়তো শীতে পেয়েছে। এমনিতেই ওরা আলো পিয়াসী। সে যাই হোক। প্রজাপতিটির আগমন আমাকে বিস্মিত করে তোলে। তিন তলার ওপরে আমার এই কামরা। বন্ধ দরজা-জানালার ওপর পর্দা ফেলে রাখা। তবে প্রজাপতিটি যে এলো কী করে! তারপর মনে হয় যে, এসেছে হয়তো আগেই, দিনে যখন দরজা-জানালা খোলা ছিলো। এতক্ষণ লুকিয়ে ছিলো কোথাও। আলো জ্বলে উঠলে তারপর ছুটে এসেছে।

এবার একটা টিকটিকিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ধীর এবং সাবধানী তার পদক্ষেপ। চোখদুটো জ্বলছে। আমাকে ভীতি পেয়ে বসে। এই বুঝি টিকটিকিটা ক্ষিপ্র হয়ে উঠবে। খপ করে ধরে ফেলবে প্রজাপতিটিকে। বোকাটা উড়ে যায় না কেনো? অতঃপর টিকটিকিটা মাপা দূরত্বে স্থির হয়ে পড়ে। হয়তো ঘাবড়ে গেছে। অতো বড়ো প্রজাপতিটিকে শিকারের অক্ষমতা হয়তো তার বোঝা হয়ে গেছে। তবু চোখ দুটো তার অনুজ্জ্বল হয়ে যায়নি। লোভ সংবরণ সহজ কথা নয়। হোক না শিকারটা তার অতো বড়ো। তবু হামলে পড়তে পারে যখন তখন। উদরের জন্যে সব প্রাণিই ঝুঁকি নেয়।

প্রজাপতিটি শূন্যে পাখা মেলে তারপর। বিপদের আঁচ বুঝি সে টের পেয়েছে। পাখা মেলে সে ঘরময় উড়তে থাকে। উড়ে উড়ে তারপর আমার টেবিলটার ডানে ফ্লোরপেপারের ওপরে বসে। এই প্রথম আমি বিস্ময় নিয়ে লক্ষ করি প্রজাপতিটির পাখার রঙ। আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। গাঢ় নীলের ভেতরে সবুজ রঙের বুটি দেওয়া তারা। পাখার মাঝের দুটো বড়ো। চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চমৎকার বিন্যাসে সাজানো। আমার মুগ্ধতা কাটে না। ধূসর এ শহরে এমন প্রজাপতির জন্মও তবে হয়! বালক বয়সে দেখতাম আমারই বয়সী ছেলেগুলোকে সকালে-বিকেলে প্রজাপতির পেছনে ছুটতে। ওদের দলে ছায়ার মতো আমিও থাকতাম। আমার কাছে অন্তত খেলাটা সহজ ছিলো না। আমার মনে পড়ে না যে, কোনো এক বিকেলে আমিও উল্লাসে মেতে উঠেছি। দু-আঙ্গুলে আমার রঙিন প্রজাপতি। বরং ওদের উল্লাসে বারবার দৃঢ় সংকল্প করেছি যে, আমি আর ব্যর্থ হবো না। কিন্তু কিছুতেই কিছু হতো না। ওদের মতো আমার হাতে প্রজাপতির পাখার আলগা রঙ কখনো চিকচিক করে ওঠেনি।

আমার করোটিতে কবিতা উড়ে গেছে। প্রজাপতিটির রঙিন পাখায় আমি আচ্ছন্ন হয়ে পরি। আমার বিশ্বাস হতে চায় না যে, ধূসর এ শহরের ভেতর থেকে উঠে আসতে পারে এমন প্রজাপতি। গ্রামে সবুজের ভেতরেও আমি দেখিনি এমন মায়াকাড়া রঙিন প্রজাপতি। ওটি ঠিক প্রজাপতিই তো? আমি আরো ভালো করে তাকাই। সর্বাঙ্গে তো ওটি প্রজাপতিই। কেবল মায়াকাড়া অমন বর্ণটাই আমাকে দ্বিধায় ফেলে রাখে। আমি যেনো বালকটি হয়ে উঠি। প্রজাপতির পেছনে ধাওয়া করে বেড়ানোর বয়সে আমি ফিরে যাই। অমন সুন্দর প্রজাপতি আমার ঘরে স্থির বসে আছে, আর আমি কি না একটু ছুঁয়ে দেখবো না!

বালক বয়সের চঞ্চলতা আমার ওপর ভর করে। টেবিলে লেখা ফেলে আমি উঠে আসি। প্রজাপতিটির কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আরো গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। মুগ্ধতা আমার বেড়েই চলে। স্পর্শ করবো, আমি ভুলে যাই। আমি ভুলে যাই কবিতার কথা। তীব্র এই শীতের কথা। আমার এই বয়সের কথা। যে প্রজাপতিটি আমার এই সন্ধ্যাকে মায়াময় করে তুলেছে, আমি মুগ্ধচোখে তাকেই দেখে চলি। মুহূর্তের পর মুহূর্ত ভাঙ্গে। স্পর্শের কথা আমার খেয়ালে আসে। মোজা দুটো খুলে ফেলে হাত বাড়াই। অতিসাবধানতাই হাতদুটো কেঁপে ওঠে। এই বুঝি উড়ে যাবে, ফাঁকি দেবে আমাকে। যে অভিজ্ঞতায় অভ্যস্থ আমি, নতুন করে সে অভিজ্ঞতার মুখোমুখিই আমাকে হতে হবে। কিন্তু ওড়ে না ওটি। আমার দুহাতের চারটি আঙ্গুল প্রজাপতিটির দুপাখা আলতো স্পর্শ করে উঠতে সমর্থ হয়। কেমন মখমলের মতো  কোমল। কিন্তু আশ্চর্য! প্রজাপতিটি কোনো প্রতিবাদ করছে না। নেই নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা। যেনো পরম আদরে চুপটি বসে আছে। তারপর শূন্যে তোলবার চেষ্টা করি ওকে। কিন্তু ওঠে না। গাছের মতো মাটি ফুঁড়ে যেনো শেকড় ছড়িয়েছে। এবার একটু শক্তি প্রয়োগ করি। প্রজাপতিটি আমার হাতে উঠে আসে। এবার ও প্রতিবাদ করে ওঠে। প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে। ওর এমন অস্থিরতা দেখে ছেড়ে দিই। সামান্য দূরে গিয়ে প্রজাপতিটি স্থির হয়ে বসে। আমার হাতে ওর পাখার গুড়ো গুড়ো রঙ। আমার আঙ্গুল যেখানে স্পর্শ করেছিলো, ওর পাখায় সেখানে ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। দৃষ্টি পড়ে হঠাৎ আগের জায়গাটাতে, যেখানে বসে ছিলো প্রজাপতিটি, পানির মতো চকচকে কী অমন? যেনো বৃষ্টিধোয়া মার্বেল গলে পড়েছে। আমি ঝুঁকে পড়ে দেখার চেষ্টা করি। সবুজ রঙের তরল আবরণের নিচে ঈষৎ হলদেটে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাছের ডিমের মতো কিছু। তবে কী ডিম, প্রজাপতির?

বিস্ময় এবং দুঃখবোধ দুটোই আমাকে পেয়ে বসে। বিস্ময়, কারণ, প্রজাপতিটি আমার ঘরে ডিম দিয়েছে। নিরাপদ একটি স্থান ভেবেছে আমার ঘরটিকে। অথচ আমি তার ডিমের উপর থেকে টেনে তুলেছি। দুঃখটা এই জন্যেই।

করোটিতে কবিতাটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। সময় বেশ পেরিয়ে গেছে। পঙ্ক্তিগুলো মনে মনে এবং সেখান থেকে টাইপরাইটারে সাজাতে থাকি। এভাবে, যখন কবিতাটির শেষ চরণ করোটিতে নাড়াচাড়া করতে থাকি, আনমনেই দৃষ্টি গিয়ে পড়ে প্রজাপতিটির বসবার জায়গাটায়। ভেতরটা আমার বরফ হয়ে যায়। প্রজাপতিটি উল্টে পড়ে আছে। একসার পিঁপড়ে পিলপিল করে এগোচ্ছে সে দিকে। দু-চারটে ওর পাখনা ধরে টানছে, মৃদু নড়ে উঠছে প্রজাপতিটি। বড়ো অপরাধী মনে হয় নিজেকে। বড়ো অপরাধী মনে হয়। আমার দৃষ্টি পড়ে ডিমের উপরে। ওটা ঠিকই আছে। কিন্তু মূল্য কি আর আছে? ডিম ফুটে কি বেরোবে রঙিন মায়াকাড়া প্রজাপতি, উড়বে কি ঘরময়, ধূসর এ শহরের নিষ্প্রাণ শূণ্যে?

রাত ক্রমেই গভীরে প্রবেশ করে। কবিতার শেষ পঙ্ক্তি আমার আর লেখা হয়ে ওঠে না। করোটিতে শুধু উড়ে বেড়ায় প্রজাপতিটি।

বিছানা তৈরি। ঘুমে চোখদুটো কেমন জড়িয়ে আসে। লাল-নীল সুন্দর চাদরের ওপর শুয়ে মোটা কম্বলটা টেনে নিই। উষ্ণতার ভেতরে সহজেই ঘুম আসে আমার।

প্রজাপতিটি আসে। বড়ো করুণ দেখায় ওকে। পাখার রঙ কেমন ঝলসে গেছে। উড়ে উড়ে সে ডিমের উপর গিয়ে বসে। তারপর উড়ে গিয়ে সে অন্য কোথাও বসে। আমি আর ওকে দেখতে পাই না। তারপর হঠাৎ শব্দ ভেসে আসে কোথা থেকে। যেনো ছোটো একটা বিষ্ফোরণ। ভয়ে চমকে উঠি আমি। ডিম ফুটে অজ¯্র প্রজাপতি ঘরময় উড়তে দেখি। তেমনি নীলের ভেতরে সবুজ রঙের বুটি দেওয়া তারা। ওরা পাখা ঝাপটে প্রবল অস্থিরতায় ঘরময় উড়তে থাকে। উড়তেই থাকে। ওদের পাখার গুড়ো গুড়ো রঙ আমার মুখে শরীরে অনবরত পড়তে থাকে। আর ক্রমেই ওদের পাখার রঙ ঝলসে গিয়ে ধূসর এবং ফ্যাকাসে সাদা বর্ণ হতে হতে এক সময় স্বপ্নের দৃষ্টিতে সবকিছুই অস্পষ্ট হয়ে আসে।

সকালে ঘুম ভাঙতেই ডিমের ছড়াটার কাছে আসি। কিন্তু আশ্চর্য, কিছুই নেই জায়গাটায়! কেবল বিবর্ণ একটা চিহ্ন সেখানে স্পষ্ট হয়ে আছে। পিঁপড়েগুলোকে কোথাও আর দেখা যায় না।

অতন্দ্র অনিঃশেষ
যে পথ পথের ধারে
পথের শুরু
সতীর্থের উল্লাসে নাচতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছিলাম। নাব্যতার হাতে সেলাই করা কাঁথাতে শুয়ে স্বপ্নের সিঁড়িতে উঠতেই আওয়াজ পেলাম। কানের মধ্যে ঝাপসা আলোর ধ্বনি। পৃথিবীর সব পাখি যখন ঘরে ফিরে ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘুমন্ত। আমি জেগে জেগে স্বপ্ন ছুঁই। কি যেনো আলোর সন্ধি ? লাল, নীল, হলুদ, বেগুনী—একসাথে নৃত্যরত। মদের বোতল হাতে নিয়ে সোনার মুদ্রাগুলো বিলিয়ে দিচ্ছি। সময়ের কঠিন তাপে গলে যাচ্ছি তবুও উষ্ণ হতে পারছি না। শীতার্ত রঙের মায়ায়— যতোকাল দু-হাত বিধ্বস্ত করেছি। আবার সময় হলো তরী ঠেলবার। এ তরীর গন্তব্য আদৌ রিক্ত কি না জানা নেই। সহজপ্রাণে স্বপ্নগুলোকে রশ্মি করে পথের ধারে বসে হিসেব কষছি। জানি মিলবার নয়। যে বন্ধনে সারওয়াত-মারওয়াত ডুব দিয়ে কল্যানীদের ঈর্ষায় মুখর— সে পথ আমার নয়। ছায়ায় স্বপ্ন— স্বপ্নের ছায়া সবই কল্পতার কাতরে বিত্রস্ত নতজানু।

কথা ছিলো এ পথে

বাবা অছিয়ত করে নাম রেখেছে সাফায়েত। ছিফতের দড়ি ছিঁড়ে যখন ছুটে চলি মহাকাশের পথে তখনই— মৃত বাবা আমায় অভিশাপ করে। অথচ মিথ্যা। পরম মিথ্যা। হেফাজের তরিকতে মোহিনীরা প্রতিদিন জন্ম নেয়। আর আমি স্বপ্নের হাত ছুঁয়ে বাবাকে গালি দিই। সেও অনেকদিন আগের কথা। বছর পাঁচেক তো হবেই। মরবার চরম সাধ জাগলো। আমি নির্ঘাত জান্নাতে চলে যেতাম। আমি জানি— এখন আমার পক্ষে সম্ভব নয়। জাহান্নামের তো প্রশ্নই উঠছে না। দুনিয়াতে সব পাচ্ছি। যেমনটা আলোকরশ্মি পেয়েছে। মরণ ভেবে প্রতিদিন শুদ্ধ হবার পণ করি। আবার পণ ভেবে মরণকে ছুঁড়ে ফেলি উচ্চবাহুতে। ভয়— প্রচ- রকমের ভয়। পা ফেলবার উপায় নেই। বেঁচে থাকবার উপায় নেই। দাসী হয়ে হয়ে শিরনতে পিছনে পিরামিড গড়ি। বাস্তবতার বুকে লাথি মেরে হুঙ্কার দিয়ে বলি— আমি মহাসত্য। হাত ছুঁতে ভয় লাগে। হাত ছুঁয়ে একবার মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। সেদিন থেকেই আমি ছুটে চলেছি অসীমের পথে।

                                      আগমন

বয়সের কলসি যখন পাশের বাড়ীর রহিমনের মানজায় ভর করলো— তখন বুঝতে পারলাম আমার যৌবনের পাখা গজেছে।  রসের ছাগল পুষতো রহিমন— প্রতিদিন অনেক ছাগী নিয়ে আসতো সবাই। একবার পাল দিলেই বিশ টাকা। আমি দাঁড়িয়ে দেখতাম আর ভাবতাম কত স্বাধীনতা এ ছাগলের। সুখও তার টাকাও তার। আজ আবার যখন প্রসিদ্ধ হওয়ার শখ জাগলো তখন রহিমনের কথা মনে পড়লো। স্বামী হারা এ মহিলা ছাগলের ব্যবসায় এখন নাকি সাবলম্বী। শুনলাম— রাত্রে ছাগলটা ঘরে বাঁধা থাকে। তবে আওয়াজ ঠিকই হয়। এই আওয়াজেই একদিন মরতে বসেছিলাম। তখন বুঝবার বয়স হয় নি। কেমন যেনো বুকের ভিতরে আনন্দের ছায়া ঘোরপাক খাচ্ছিলো। আজ আবার বসে থেকে সেই পথকে উল্টোরথে চালান করেছি। শুনলাম আমার দাদাও নাকি রহিমনের মায়ের সঙ্গে ব্যঙ্গ করতো। বাবার কথা বলতে কেমন যেনো লাগে— মনে হয় আমি খুব অপরাধী। তাই অনাগত দুঃস্বপ্নের কাছাকাছি যেতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মরণের সাধ জাগে— বেঁচে থাকার অনর্থক চিন্তার প্রগাঢ়ে।

পক্ষপাত দুষ্টপতি

কৈশরে একরাতে ঘুমঘরে কাকে যেনো ছুঁই ছুঁই— ঘুমভেঙ্গে গেলে দেখি পৃথিবীর সব পাপ জমা হয়েছে উদরে। যৌবন আসে না, যৌবন থেকেই জীবন আসে সুতরাং জীবন এবং যৌবনের প্রশ্নে যৌবনই সমৃদ্ধ। অন্ধকার শীতল হয়ে জন্ম নেয় আবার অন্ধকারে শীতলতার কাতরে উষ্ণতার জন্ম নেয়। মনচিত্তের পরিবর্তন স্বাভাবিক। স্বাভাবিক এবং মহাসত্য চাওয়া যৌবনের। মুখ থুবড়ে বসে থেকে ছিঃ ছিঃ – করার নাম যৌবন নয়। জন্মের সাথে যৌবনের মহাবন্ধনের রীতি সুপ্রাচীন তথা সৃষ্টিলগ্ন থেকে। প্রকৃতির আবরণে ঢেকে থাকা বিশুদ্ধ যৌবনকে উৎকৃষ্টরূপে মূল্যায়ন করাটা দোষের কিছু নয়। তখন যৌবনের অবচেতন ঘরে কল্পনার সব চরিত্রগুলো ভীড় জমাতো দিবা-রাত্রে। তারপরেই একটু চেতনা ফিরে আসে। সেই অহেতুক চেতনার ফল পাঁকাতে গিয়ে— দু’হাতে স্বাধীন যৌবনের যথেষ্ট মূল্যায়নও করেছি। মূল্যায়নের এই রীতিকে ভাঙতে কিছু নিয়মের অজুহাত চোখে পড়ে।

                                      অধ্যাদেশ

কতগুলো সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে বেড়ে উঠি বিদায় সংকীর্ণতায় ভুগতে হয়। সংকীর্ণতা সৃষ্টি হয়— ধর্ম এবং পরিবেশ থেকে। প্রতিটি পরিবেশই ধর্মের কেন্দ্রে বসবাস করে। আবার প্রতিটি ধর্মেরই একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ থাকে। সুতরাং পরিবেশের সাথে নিজের পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে চাইলে— ধর্মকে অনেক ক্ষেত্রেই না বলতে হয়। প্রকৃতপক্ষে, সীমার প্রবণতা কেন্দ্রকে অতিক্রম করতে চাওয়াটা স্বপ্নেরই প্রতিধ্বনি— তাই বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকার অহেতুক প্রয়াসে বারবার মরণের স্বরণ বাসা বাঁধে। ভালোবেসেছিলাম কোনো এক ত্রিপদীমন নারীর কোমল হাতের স্পর্শ। কোমল আবেগের পরিপক্বরূপ যে যৌবন হতে পারে তা জানা ছিলো না। আবার এই যৌবনে একদিন পরশময় আবেগের ভা-ার হয়ে জমা হয়ে আছে। এ রহস্য— মৃত্যুস্বাদ অবধি— একবার মরে দেখবার খুব ইচ্ছে হয়। মরতে গেলে কান্না আসে। হরেক রকমের কান্না। কিছু কান্না অনেক সুখের। আবার কিছু কান্না দুঃখের। সঙ্গমের সময়ের কান্নাকে শীৎকার— আবার প্রেম-বিচ্ছেদের ঘটনায় প্রেমিক প্রেমিকার কান্নাকে বিরহ— প্রেমিককে জড়িয়ে ধরে কান্নাকে আবেগ— কারো মৃত্যুর সময়ের কান্নাকে শোক বলি। সবগুলোকে কান্না বললেও এর অনুভূতির জায়গাটা ভিন্ন। মন অনুভূতি প্রকাশের চরম মাধ্যম। তাই অনুভূতির সব স্পর্শকে দ্বিধাহীন বলে ধ্বনি তুলি।

                                      কার্যকর

একরাতে রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম। হঠাৎ আওয়াজ শুনতে পেলাম। কিছুটা ঝাপসা—গাছের ভিতরে ল্যামপোস্টের আলোতে কিছুটা বোঝা যাচ্ছে সেখানে মানব-মানবী। মেয়েটির গোঙরানী শুনে প্রথমে ভয় পেয়ে গেলাম। একটু কাছে যেতেই বুঝতে পেলাম। অর্থাৎ মানুষের চরম মুহুর্তের আবেগ ঈশ্বরের সম্মুখেও পর্দার মতো। তৃষ্ণার্ত কাক জলের নেশায় যেভাবে ছুটাছুটি করে। এসব ভাবতে গেলে আমার কান্না থেমে যায় আর তখনই মনে হয়— আরো কিছুদিন থাকি। তাঁরা তো মৃত্যুর পরে বিখ্যাত হয়নি। বরং বেঁচে থেকে মৃত্যুকে জয় করে জীবনকে মুক্তি দিয়েছে। প্রতিটি জীবের জন্ম-মৃত্যুর উদ্দেশ্য সাধনে। জগতে কেউ মরেনি এরকম প্রাণি দ্বিতীয়টা পাওয়া যাবে না। কেউ মৃত্যুকে উপজিব্য বিষয় মনে করলে তার জীবনের ধারা বা গতি মন্থর হয়ে যাবে। মৃত্যু একটি স্বাভাবিক ঘটনার অস¦াভাবিক রূপরেখা। কেউ মরতে চায় না। আসলে কেউ মরতে চায় না কথাটির বিপরীতে প্রশ্ন দাঁড় করানো যায় যে— মানুষ তাহলে আত্মহত্যা করে কেনো ? আত্মহত্যা মানুষের আবেগের মুক্তির জন্য করে। পৃথিবীতে পরম সুখে আত্মহত্যা করেছে এরকম মানুষও পাওয়া যাবে! অর্থাৎ মানুষ তার অন্তর্জালে নিহিত জটিলতা থেকে মুক্তির করুণ আশির্বাদস্বরূপ বেঁছে নেয় এই পথ। কেউ আবার মৃত্যুকে উপভোগ করতে চায়। দেখতে চায় মৃত্যু কি রকম ? কোনো পথের সীমানায় দাঁড়িয়ে কখনও সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না, তেমনি— নিজেকে হারিয়ে তার সুখের অনুভূতিও জাগ্রত করা যায় না। দুইজন বিখ্যাত ব্যক্তির মৃত্যুর আগের কথা— থমাস আলভা এডিসন—  ‘সেখানে অপার সৌন্দর্য’। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পেরেছেন মৃত্যু পরম সুখের। এবং সেখানেই সকল সুখ। আবার গ্রেকো মার্কস বলেছেন— ‘আমি কি মারা যাচ্ছি প্রিয়তমা ? কেনো, এটাই শেষ কাজ যা আমি করবো’। গ্রেকোর এই কথায় স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নেন নি। ধর্ম এবং মৃত্যুর পরম সাদৃশ আছে। প্রতিটি ধর্ম মৃত্যুকে শাসন করতে চায় ভয় দেখিয়ে। আবার প্রতিটি ধার্মিক মৃত্যুকে জয় করতে চায় ধর্ম দিয়ে। ধর্মের এই জাদুকরী মন্ত্র মানুষকে এককেন্দ্রিক করে তুলে। আর এ শ্রেণির মানুষের বুদ্ধিমত্তা এক দিকে চরমভাবে ধাবিত হয়। ধর্ম নিয়ে পৃথিবীতে কেউ জন্ম নেয় না। আবার ধর্মের জন্য কারো জন্মও হয় না। পতিতালয়ে যে শিশুটির জন্ম হলো— যৌবনে তার পেশা ওটাই হবে।

                                      ধবল যে নাগ

সর্পরাজের কাছে জানতে পারিÑ কিছু সাপ বাচ্চা ফুটার পরে দু’একটা বাচ্চাকে গিলে ফেলে। অর্থাৎ মা সাপটা তখন এতো ক্ষুধার্ত থাকে যে— সে নিজের বাচ্চাকে খেয়ে শান্ত হয়। এটা তার ধর্ম। এই সাপের মতো মোড়ল পেচিয়ে দু-এক খ- ইতিহাসকে পেচিয়ে খাইয়েছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার। পদার্থ পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলাম— নিউটনের গতিসূত্রের বিপরীতসূত্র। আর ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া যে এতো মধুর হয় তা জানা থাকলে নিশ্চয় আমি নিউটনের চেয়ে বড় বিজ্ঞানী হয়ে যেতাম। কৃষকের ছেলে হিসাবে জন্ম নেওয়ায় নোবেল প্রাইজটাও হাতছাড়া হয়ে গেলো। শান্তির প্রতিক হিসাবে একটা কাগজের লিখিত সনদ পেয়েছিলাম তা অবশ্য চানাচুর বিক্রেতার কাজেও লাগতে পারে। লাগুক তাতে কি ? রাস্তার পাশে খেলাপাতুন খেলতাম— তেলাকুচার লতা কানে জড়িয়ে সতীর্থের বুকের হার্টবিট মাপতাম। এখন নাকি তেলাকুচার পাতা ভর্তা করেও খায়। তারপর সবাই মিলে রাস্তার ধূলো জড়ো করতাম। গোল করে মধ্যে ফাঁকা রেখে তাতে মূত্র দিয়ে পাটালি বানাতাম আর এমনি-এমনি খেতাম। খাওয়া শেষে সেটা দিয়েই ঘর বানাতাম। টি.ভিতে দেখেছিলাম বড় বড় বিল্ডিং- সেই নকশা আঁকতাম মুতের পাটালি দিয়ে। কখন যেনো বড়চাচা হাতটা ধরে বলে উঠলো— তুই পারবি ! তোকে দিয়ে সম্ভব আমাদের বাড়ীর মুখ উজ্জ্বল করবি। তারপর থেকেই আমি নিস্প্রভ হয়ে কৈশোরকে লাথি মেরে যৌবনে এসেছি। তবুও মিটির মিটির নিয়ন আলোতে চোখ রাখলে গোপনাঙ্গে আলো জ¦লে ওঠে।

                                                কলঙ্ক

সুপ্রান্তি পিরামিডে আগুন জালিয়ে এখন শীত খুঁজছে। দুনিয়াতে আগুন লাগানো যতো সহজ— ঠা-া লাগানো কি ততোটা সহজ ? আগুন-পানির বিলোপনে বাতায়নের পশ্চিমদিক বড্ড বেঁকে গেছে। জয়তুনের মায়ের কসম তুমি আমার কোন কথাটিকে মিথ্যা বলবে? আকাশ পশ্চিমকোণে গেলে— হেলেনার কোমর কাঁপে। আমার ধোয়াসে টিম্পায়ে টিম্পনি সুরে হাঁটু কাঁপতে থাকে। সাহস করে এগিয়ে যাই। আবার ভয় করে দুপা পিছাই। আগ-পিছ করতে নিমগ্ন খালে পড়ে গিয়ে দেখি অতল। তখন সুপ্রান্তির কথা মনে পড়ে। কতো ভালো ছেলে— বুকে সাহসও আছে। আমাকে দিয়ে এসব হবে না। চাঁদ মামার আলোতে নকশা আঁকাতে গিয়ে ভোর হয়ে গেলো তবুও শেষ হলো না। নতুন বোতল রাখার সেই সুতোতে পুরোনো এলো— বেল-তালেরা ভীর করে আকাশ ছেয়ে দিয়েছে। বরং দৌড়মাখা শৈশবের ছেঁড়া প্যান্টাই আবার পরিষ্কার করার প্রয়োজন। তবুও যদি সাহসের মাথায় ছুরি চালাতে পারি।

শর্ত

বিষাদের সুখযাপন আর প্রেমের মহাষৌধ চন্দ্র থেকে পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে বিবর্ণ রং ধারণ করে। অনুভূতির স্তব্ধতার কাছে পরাজিত প্রেমসৈনিক ধুকে মরে কাম চেতনায়। উদ্বাস্তু মনের আড়ালে জন্ম নেয় কাম-তরী। শরীরের ভাষাকে রূপান্তর করা হয় চেতনায়। জাগ্রত প্রেম, স্বগীয় প্রেম, স¦প্নে প্রেম— সর্ব প্রেমের ব্যাসে যুক্ত হয় কামনা। বৃত্তের মধ্যবিন্দু থেকে তবুও দূরত্বের তফাৎ ঘটে যৌবনের। আর কিনারায় বসে যোগ-বিয়োগের সমাপ্তি টেনে যে ফল আসে তা শূন্য। তবুও আশাহত মানুষগুলো জেগে উঠে স্পর্ধার আড়ালে। ওষ্ঠে আবারও শক্তি আসে। যৌবন-কল্পনা-ভোগ-মৃত উচাটনি জীবনের পরশপাথরের মতো। জেগে উঠতে উঠতে আবার ঘুমায়ে গেলে যে স্বপ্ন দেখি তা হয়তো পুরোপুরি সত্যে নয়। তবুও স্বীকার করি। বাঁচবার মহা ক্ষমতায় আরো একবার মৃত্যুকে লাথি মেরে দূরে ফেলি। পরক্ষণে মরবার সাধ নিয়ে রহিমা, শেফালী কিংবা ম্যাডোনাকে বুকে ধরে কাঁদতে থাকি। উল্লাসের এই চিরন্তন পথের সমাপ্তি ঈশ্বর কখনও বুঝতে পারে নি।

পদ্ম মুখোপাধ্যায়
স্বলিখিত সংবিধাননামার আবেদন সাপেক্ষে
তোমাকে পড়তে গেলে
দুনিয়ার বানান ভুল হয়
নাভিতে চুমু খেতে গেলে ঠোঁটের গতি শ্লথ হয়
তোমার উরুতে পুরুষত্ব প্রদর্শণ করলে
প্রণয়ে ব্যর্থতা আসে’

যা যা পড়লেন এগুলো এক জাতের কুকর্ম। এই জাতের নাম কবিজাত।
শুধু কোপায়, বানায় আর কোমরে তুলে ঝাঁকায়। এতেও ক্ষান্ত নন তাঁরা।
শেষ পর্যন্ত আপনার বক্ষ ও যোনির পুঙ্গি বাজিয়ে ছেড়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না।
কী করবেন বলুন?
এই মুখোশধারী বুনো শুয়োরদের কাছ থেকে সাবধানে থাকুন
না থাকতে পারলে মুখ বুজে কোপানি, বানানি, ঝাঁকুনি সহ্য করুন।


একবার খুব শখ হলো নারীকে খোঁজার। বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে প্রেমিকার কাছে গেলাম। সেক্স করলাম। তৃপ্তি পাইনি এমন নয়; খুব ঘোলা করেই খেয়েছিলাম জল। তবুও কোথায় যেনো একটা অতৃপ্তি থেকেই গিয়েছিলো। অলিতে গলিতে অনেক ঘুরলাম। এর ওর কাছে অনেক লুটলাম। একদিন এক পাক্কা খানকীর সাথে রাত কাটলো। সেদিন মনে হলো নারীরা বোধহয় ভালো ব্যবসা বোঝে। কেউ পেটের জন্য উলঙ্গ হয়, কেউ প্রেমের জন্য। মূলত প্রেম-পেট দুটোই ব্যবসা; এর বাহিরে কিছু মনে হয়নি। নারীকে খুঁজতে খুঁজতে আমি গির্জায় ঢুকে পড়েছিলাম। মূর্তিকে নিয়ে তো বিছানায় যাওয়া সম্ভব না।
অগ্যতা মেরীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এসব কী করে হলো?’


সাঁতার কাটতে চান?
আর চিলির সুইমিং পুলে যাবার দরকার নেই। এখন থেকে পার্বতীপুরে-ই পাবেন। উত্তরা
টকিজের পূর্বপাশে। সালাম ভাইয়ের পান দোকানের সাথে লাগালাগি যে তিনতারা হোটেল; দ্বিতীয় তলায় গিয়ে আবু হোসেনের হাতে দিন তিন’শ টাকা। তারপর সোজা দুই’শ বারো নম্বর রুমÑ রুমকি সুইমিং পুল। প্যান্ট পোশাক খুলে ঝাঁপ দিন। উপভোগ করুন। এটি বানাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক বিলিয়ন পুরুষাঙ্গ আর এই পুলে বীর্য আছে একশ মিলিয়ন গ্যালন।
এই পুল এতো বড় যে আপনি অনায়াসে এখানে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালাইতে পারবেন।


ভদ্রলোকের নাম উইলিয়াম শেক্সপিয়ার। প্রেমিকার অধরযুগলে চুম্বন করলে যে তৃপ্তি লাগে সেই অমৃতের সাথে সিগারেটের শেষ টানকে তুলনা করেছেন। তিনি ওষ্ঠ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলেন।
অধরে নয় যোনিতে বিশ্বাসীÑ হারামজাদার নাম পদ্ম মুখোপাধ্যায়।


রোজ দিন মদ-টদ গিলি
মাতাল হই— মাতলামি করি
পুলিশের সাথে তর্ক হয়— হাতাহাতি হয়
চড় থাপ্পড় খেয়েছি কয়েকবার
আমি ভাই গাঁজা সেবন করি
বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং-এ যাই
শ্লোগান দিই
রাজপথে নামতে আমার শরীর-হাত-পা-মুখ
একটুও কাঁপে না
আমি ভাই ঘাটের নাগর
এ ঘাটে-সে ঘাটে, উঠ-বস করি
সমাজের সাধু মানুষ যে পাড়াগুলো নিষিদ্ধ করেছে
সেসব নিষিদ্ধ পাড়াতে যাই
আমি কিন্তু কবিতাও লিখি

কাউকে বলোনা আবার!


গাছের আমে ফরমালিন আছে
ভিক্ষুকের থালায় এসিড আছে
ট্রাক বোঝাই অস্ত্র আছে
সমাবেশের মঞ্চে বোমা আছে
মাথার উপর ধান্দা আছে
বানর থেকে মানুষ হবার ওষুধ—
জ্যোৎস্না খালার আঁচলে বাঁধা আছে।


একটা ভাঙা স্টলে চা বিক্রি করি; সাথে গাঁজাও। দুইশ পঞ্চাশ টাকার আশায় সময় ব্যয় করি। জমা হলেই সর্বনাশের রাস্তায় সাইকেল চালাই। ৯০ টাকার চুপসির বোতল। ১০ টাকার একটি স্টিক।
বাকি টাকার বিনিময়ে কমলিকার সুঢেল শরীর।


রবীন্দ্রনাথ কবি
মুহাম্মদ নবী
আর, আমি এখানে বাল ছিঁড়ি?


পৃথিবীতে মোট তিনটি চাঁদ
একটি আকাশে উঠে
বাকি দুটি সুলতানা মাহ্জাবীন স্বর্নার বুকে।

১০
পাশের বাড়িতে বৌদি উলুধ্বনি দিচ্ছে
এদিকে তুমিও ঘনঘন শীৎকার।

১১
জবা দিয়ে কী হবে? আদিক্ষেতা?
শিবলিঙ্গ!
ওটাতো জড়? জাগবেও না, কোমরে তুলে ঝাঁকাবেও না। লোভী কোথাকার, চুমু খেলে আমার শিশ্নে খাও।
একটা চুমুও বিফলে যাবে না।

১২
যোণিপথে বিভিন্ন সবজিফল ঢোকে
মসজিদ-মন্দিরে সুদখোর, ঘুষখোর ঢোকে

শিশ্নের ঈমান নাই, ঈমানদারের শিশ্ন আছে

যার যেটা জায়গা, সে সেটা পাই টু পাই বুঝে নিয়েছে।
কথোপকথন শেষ

মাহমুদ রহমান 
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের বিখ্যাত গল্প ‘গোঘ্নের’ গোঘ্ন হবার রসায়ন
‘মাইকে সিরাজের দানাদার গলা শুনলে মনে হবে কোনো কথকঠাকুর কথকতা করছেন। ওর গল্পেও এই কথকতা থাকে। কথা বলতে বলতে ও সড়াৎ করে গভীরে নেমে যায় । নাইলে গোঘ্ন লেখে কি করে ?’ – শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

‘চারুমাস্টারের বেহালা শুনে দোলাই বড় কেঁদেছিল। দোলাই ছিল নরম মনের ছেলে। বলেছিল আপনার যন্তরে কী জানি কী যাদু আছে, কলজে টাটায়। হেই মাস্টারবাবু, আপনার বিটির বিভায় যত কুমড়া লাগবে, হামি দিবো। যত কলাই লাগবে, হামি দিবো’।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের বিখ্যাত গল্প ‘গোঘ্ন এভাবেই শুরু হয়। দোলাই মাস্টারের বিটির বিভায় যতো কুমড়া লাগে দেবে বলেছিলো। যত কলাই লাগে দেবে বলেছিলো। কিন্তু তার আগেই গাবতলার গোরে ঘুমিয়ে গেলো দোলাই। হারাই তাই ভাইয়ের কথা রাখতে রাঢ় অঞ্চলে এসেছে।

ভাত খেতে খেতে হারাই বলে, খাছি মা খুব খাছি। বড় মিঠা আপনারঘে রাঢ় দেশের ভাত। চারুমাস্টারের মেয়ে হাসে। ও চাচা! তোমাদের দেশের ভাত বুঝি তেতো? হারাই হাসে। দানাগুলান মোটা, বিটিরে! হামারঘে দ্যাশে রাঢ়ি চালের ভাত খায় শুধু আমির-বড়লোকে। মাস্টারের মেয়ে ত অবাক। তোমরা কি খাও, চাচা?

মোটা মাসকলাই, আটার লাহারি, ছাতু, ভুজা, গেঁহু উঠলে আম-কাঁঠালের সঙ্গে গেঁহুর আটার চাপড়ি। আউষের ভাত মাত্র মাসে কয়েকদিন— হারাই বলে। তাদের রাঢ়ি অঞ্চলের চাল নিতে বছরে একবার আসে তাও বলে।

কথাকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এরপর আমাদের জানাতে থাকেন ভাগীরথী-ভৈরবী পদ্মার পলিতে ভরাট নরম মাটির সমতল দেশে এ মিঠে ধান বড়ই অমূল্য, সারা বাঘড়ি অঞ্চলে যার নাম শাহদানা, শ্রেষ্ঠ দানা বা শস্য। রাঢ়ে শাহদানার মউসুম এলে তাই বাঘড়ি অঞ্চলে সাড়া পড়ে যায়। সোনার রাঢ়ের দিকে দলে দলে ছুটে ভুগা মুসাফির।

হারাই মুসাফির নয়। মাঙতে আসে না রাঢ়মুল্লকে। গোরুর গাড়িতে নিয়ে আসা খন্দ, ফলমূল সবজির বদলে শাহদানা নিয়ে যায়। কোথাও সংলাপ, কোথাও পরিবেশের পাশে মিশিয়ে চরিত্রের প্রয়োজনীয় স্কেচটুকু দক্ষ হাতে একে যান, বলা ভালো বলে যান সিরাজ। তার নির্মিত জগতে কখন যে ঢুকে পড়ে পাঠক, টের পাওয়া যায় না। দক্ষ কথক সিরাজ এভাবেই তার গল্পের কেন্দ্রবিন্দুপথে পাঠককে নিয়ে যাবার জন্য তার প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।

তারপরের দৃশ্যে চলে আসে ধনা, গল্পের প্রেক্ষণবিন্দু কিছুক্ষণ পর যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ও নিঃশেষ হবে। ধনা অসুস্থ। চোখের কোনায় কালি। কালো ধারা আকা। হাড়ের সার রাতারাতি ঠেলে উঠেছে। চারুমাস্টার বলে-পরিমল বদ্যিকে ডেকে নিয়ে আয়। ছ্যারানি হয়েছে গরুটার।

হারাই হাসে। এতোটুকুন বদমাইসিও আছে মাস্টারবাবু। তবে পা ফেললে থামানো যায় না। একদম পঙ্খিরাজ ঘোড়া ! চারুমাস্টারকে অবাক করে দিয়ে ধনা দাড়ায়। হারাই হাসে। বলে দেখলেন? দেখলাম-মাস্টার বলে। তবে পরিমলকে দেখিয়ে নিয়ে যাস। হারাই কথা রাখে। তারপর চলতে চলতে সন্ধ্যা। হারাই কাঁপে, কারণ সামনে ভয়ের রাত হাঁ করে আছে। রাতচরা বাঘড়ে গাড়োয়ানের ভূত ও জীনের কথা মনে হয়। গাছের ডালে আত্মহত্যাকারীরা মানুষ, শেয়াল, বেড়াল বা পাখির রূপ ধরে সামনে আসে। রাহাজানির ভয়ও আছে। দল বেধে তাই যাতায়াত করতে হয়। হেতেরপাতি রাখতে হয়। গোরু বলবান হওয়া চাই। গাড়োয়ান সাহসী হওয়া চাই। কিন্তু এখন তো মউসুম নয়। হারাই কেবল ভাইয়ের কথা রাখতে এসেছে।

রাত হয়। পিরিমল বদ্যি বলেছিল মেদীপুর বাজারে রাত জিরোতে। দু-ক্রোশ মাত্র দূর। কিন্তু ধনা অসহায়। মুখ বেয়ে ওষুধ গড়িয়ে পরে। ধনাকে সরিয়ে নিজেই জোয়াল তুলে নেয় হারাই। ধনাকে গাড়ির পেছনে বেঁধে চলতে শুরু করে। হঠাৎ হারাইয়ের সামনে অন্ধকার ফুঁড়ে উপস্থিত হয় এক আগন্তুক, নাম দিলজান। পেশায় কসাই। দিলজান ধনাকে লক্ষ্য করে বলে এ গরু রাত পোহাবে না। তার চেয়ে আমাকে দেন। হালাল করি। হারাই বুকফাটা চিৎকার করে উঠে। দিলজান দাম চড়ায়। কিন্তু হারাই তার সমস্ততা নিয়ে ‘না’।

তারপর? হারাই গঞ্জেল আরশ পড়তে পড়তে মেদীপুর চটির কাছাকাছি চলে আসে। ততক্ষণে ধনা প্রায় নির্জীব, হাটতেও পারছে না। মন্ত্রপড়া জল খাইয়ে হারাই শেষ রাত নাগাদ গরু ভালো হয়ে যাবার আশায় থাকে। শেষ রাতে হারাইয়ের পেট খিদেয় চোঁ চোঁ করে। চিড়ে গুড় খেয়ে হারাই যখন তন্দ্রামত অবস্থায়, তখন ভোরে আজানের শব্দ শুনতে পায়। ধনার দিকে তাকাতেই তার কলজে চিরিক করে ওঠে। গোরুটা দু পায়ের উপর মুখ রেখে শুয়ে আছে। অল্প অল্প নড়ছে চোয়াল।

এরপরই সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ গল্প সবচেয়ে সংবেদনশীল, মর্মস্পর্শী কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে হু হু করে কেঁদে হৃদয়ের সমস্ত আকুলতা দিয়ে হারাই বলে ওঠে—‘হামার বেটার জান মাঙি হুজুর। আর কিছু মাঙি না সংসারে। হেই পরোয়ার দিগার! হামরা মাগ-মরদে বাঁজা লই তুমার মেহেরবানিতে। তুমি এক ব্যাটার জানের বদলে হামারঘে আরেক ব্যাটার হায়াত দাও!

ব্যাটা মরবে, ব্যাটা জন্মাবে। কিন্তু গোরু মলে কোথায় পাবে হারাই। একটা গোরুর দাম জোগাতে অর্ধেক জমি বেচতে হবে। খোদা কি এটা বোঝেন না?

একটা গোরুর অভাবে তার গাড়োয়ানী বন্ধ হবে। চাষবাস বন্ধ হবে। খন্দ ফলমূল ফিরি করতে আসা হবে না রাঢ়ে। না খেয়ে মারা পড়বে হারাইয়ের বহু বেটা-বিটিরা। মুসাফিরদের মতো তাদেরও যে ভিগ মাগতে যেতে হবে রাঢ়ে। ঠিক এমনি করে একটা গোরুর অভাবে বাঘড়ির কত মানুষ মুসাফির ভিখিরি হয়ে গেছে। তাই ভেবে হারাই কাঁদে। নমাজে বসে থাকে অনেকক্ষণ। খোদাতালাকে ইনিয়ে বিনিয়ে সব কথা বোঝাতে চায়।’

এই জায়গায় এসে গল্প গল্পকে ছাড়িয়ে যায়, হয়ে ওঠে আখ্যান, গল্প শুধুমাত্র হারাইয়ের সীমাবদ্ধ থাকে না, হারাই ধরা দেয় ভারতবর্ষের প্রান্তিক কৃষককুলের প্রতিনিধি হয়ে, যাদের অস্তিত্বই গোরুর উপর নির্ভরশীল, গোরু তাই সন্তানের চেয়েও বেশি। সন্তান মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, আজ হেতু আকি নৈকট্যও বেশি, কিন্তু এই গল্পে গরু দুইক্ষেত্রেই মানুষকে প্রতিস্থাপিত করেছে, ছাপিয়ে গেছে। সামান্য কটা বাক্যে ভালবাসার তীব্র ব্যাকুলতা, প্রয়োজনীয়তা,চূড়ান্ত অসহায়তা, অস্তিত্ব সংকটের অশনি সংকেত, হৃদয়ের অকপট সরলতাসমেত হাহাকারে উদ্ভাসিত, যা পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়।

গল্পটি তাৎপর্য এখানেই শেষ হতে পারত, এরপর স্বাভাবিক নিয়মে এগোতে পারত সমাপ্তিবিন্দুর দিকে, কিন্তু ব্যক্তির মধ্য দিয়ে তার সময়, তার জনপদের মানসচিত্র আঁকা সিরাজের স্বভাব, তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী গল্প তাই নতুন বাঁক নেয়, নিতে হয়, নিয়ে আবার ফিরে আসবে হারাইয়ের কাছে, ফলে আমরা বুঝতে পারবো ধনা আসলেই হারাইয়ের পুত্রসন্তান, কিংবা তার চেয়ে বেশি, তার ভালোবাসা নিখাঁদ, গল্পকারের আরোপিত নয়, অবশ্য প্রথমেই তা বোঝা গেছে, যদিও- তা হৃদয় দিয়ে, যুক্তিতে নয়। কিন্তু এখন তার আচরণ আমাদের কাছে সব ¯পষ্ট করে দেবে, এবং তার তীব্র ও অনিঃশেষ ভালোবাসার নির্যাসে পাঠক হৃদয় তুমুলভাবে আলোড়িত হবে, যার রেশ গল্প শেষ করেও থেকে যাবে, অনেকদিন, যে কোন মহৎ গল্প পাঠের মতই।

গল্পে ফিরে আসি। পরের সকালে মুমূর্ষু ধনাকে কিনে নেয় সেই দিলজান। তারপর জোয়াল কাঁধে পথ চলতে শুরু করে হারাই। পথে বদর হাজি নামের এক শরীফ ব্যক্তির সাথে দেখা। হাজি বদর জোঁয়াল কাঁধে বলদের মতো চলতে কাউকে কখনো দেখেন নি। তার দয়া হয়। তিনি হারাইকে কারো গাড়ির সঙ্গে তার গাড়ি বেঁধে নেয়ার পরামর্শ দেন। তার ঘরে আনেন। স্বভাবসুলভ আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করেন। নিজেই হারাইয়ের পাতে মাংস তুলে দেন। আর গরুর মাংস কিভাবে পেলেন বলতে থাকেন। বললেন, দিলজান হালাল করেছে। তখন টুকরোটা হারাই কেবল মুখে পুরেছিল, আচমকা নড়ে ওঠে থুথু করে ফেলে দেয়। বমি করে। বুক ফাটা কান্নায় বলে ওঠে হেই হাজিসাব! হামাকে হারাম খাওয়ালেন! হামাকে হামার বেটার গোস্ত খাওয়ালেন!

তারপর?

গল্প ফিরে যায় পেছনে। দোলাই চারুমাস্টারের মেয়ের বিভার সব কুমড়া-কলাই দিতে চেয়েছিল। সে এখন পদ্মার পাড়ে ঘুমিয়ে। কুমড়ো আর কলাই দিয়ে হারাই ফিরে আসছে। নিয়ে আসছে ধান, চারুমাস্টারের বেহালার সুর। বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে আছে বউ। মাটির বদনায় পদ্মার জল। এ জল ধনা-মনার পা ছুঁয়ে দেবে।

গল্পকে এখানে শেষ হতে হয়, কারণ গল্পের নাম ‘গোঘ্না’। গো হত্যাকারী। বৈদিক ভারতে এই শব্দের অর্থ ছিল অতিথি। এবং অতিথিকে গোরু দিয়ে আপ্যায়িত করতে হতো। আশ্চর্যের সাথে খেয়াল করতে হয় গল্পে গোঘœ শব্দের দুটা রূপই আছে। বদর হাজি হারাইকে গরু দিয়ে আপ্যায়িত করে। ধনাকে দিলজানের হাতে দিয়ে হারাই তো গোঘ্নাই, যদিও পরিস্থিতির চাপে, তবু হারাই নিজেকে গোঘ্না ভাবে, ভাবে বলেই মনের সব দুঃখ বদর হাজির কাছে খুলে বলতে ইচ্ছে হয়, ধনাকে বেচার কথা লুকোয়, গোরুটা রাস্তায় মারা গেছে বলে। এবং ভাতের পাতে ধনার কথা জানার পর তার মানসিক যন্ত্রণা ভেতর থেকে উপচে পরে, জবাই করা প্রাণির মত ধড়ফড়ায়, আমরা জানি এক পদ্মার পানিতেও এ আগুন নিভবে না। ফলে মানবতার অব্যক্ত ক্রন্দনধ্বনিতে সিক্তহয় পাঠকহৃদয়, সঞ্চারিত হয় অপার বেদনাবোধ,— তাতে মিশমিশ ব্যক্তি। সময়। সমাজ। ইতিহাস।

রাঢ়বাংলা ও রাঢ়ের মানুষের জীবন সিরাজের গল্পের মূল চারণভূমি। তাদেরকে উপস্থাপিত করতে তিনি এনেছেন লোকজ মিথ, মানুষের চিরায়ত বিশ্বাস, আচার, প্রেম, ভালোবাসা, প্রকৃতি ও জীবন সংগ্রাম। গোঘ্না গল্পেও তার ব্যত্যয় হয়নি, অন্তজ মানুষের কঠোর কঠিন নির্মম জীবন ও পোষাপ্রাণির প্রতি কৃষকের জীবন নির্ভরতার এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য চিত্র তিনি শব্দের তুলিতে এঁকেছেন। তাতেও থেমে থাকেননি, মানুষ ও সভ্যতার ইতিহাস ভালোভাবে জানা আছে বলেই তিনি অবলীলায় বলে যেতে পারেন, ‘দুনিয়ার অনেক মানুষও তোদের মতো অবলা জানোয়ার বইকি। ঠাউর করে দেখবি, তাদেরঘে ওপিঠে ওজনদার ছালা চাপানো আছে, ধনা! তাদের কেও ছালা বহিতে হয়, বাপ। হু ঠাউর করে দ্যাখ। হাসিস না । তাদেরঘে ভি কষ্ট। ঘাড়ে কালো দাগ পড়ে। গোস্ত দরকচা পড়ে যায়। শাঁস ফেলতে হাঁপানি, পা ফেলতে জ্যাংয়ে বেথা, পিছের ভার টেনে হাঁটে। তাদেরঘে ভি মুনিব আছে। ঠাউর করে দ্যাখ।’

ইতিহাসের অনাদিকাল হতে চলা জীবন সংগ্রামের যে বিন্দুটায় মানুষ ও জন্তু একাকার হয়ে যায়, হারাই ও ধনা তার প্রতীক। এর বিস্তার পুরো দুনিয়ায়, এ গল্প তাই পুরো বিশ্বের শোষিত শ্রেণির গল্প, সমকালীন এবং শোষণ থাকা সাপেক্ষে চিরকালীন।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের রয়েছে জাদুকরি গদ্যভাষা। তার হাতে পড়ে শব্দ অলৌকিকতা পায়, গদ্যশরীর থেকে বের হয় সোদামাটির গন্ধ। প্রমিত গদ্যের ভেতর তিনি অনায়াসে মিশিয়ে দেন পটভূমিজাত উপভাষার নির্যাস। গোঘ্ন গল্পেও তার এই শৈল্পিক দক্ষতা হীরের মতো উজ্জ্বল। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ছোটগল্পের ভা-ারে সার্থক শিল্পশস্যের অভাব নেই। বাংলা সাহিত্য তার বিস্ময়কর অপার দানে সমৃদ্ধ। গোঘ্না তার শ্রেষ্ঠশিল্পের একটি। এই শিল্পসুধা পানে পাঠক নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন এই কামনা।

অনুবাদ: এস এম মামুনুর রহমান
গল্প: ব্রিজের পাশের বৃদ্ধ লোকটি
মূল: আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
[আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে (জুলাই ২১, ১৮৯৯-জুলাই ২, ১৯৬১) ছিলেন মার্কিন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। বিশ শতকের ফিকশনের ভাষার ওপর তাঁর নির্মেদ ও নিরাবেগী ভাষার ভীষণ প্রভাব ছিলো। তাঁর অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ও জনপ্রিয় ইমেজও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলেছিল। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে তিনি তাঁর অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন এবং ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তিনি সাতটি উপন্যাস, ছয়টি ছোট গল্প সংকলন এবং দুইটি নন-ফিকশন গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে আরও তিনটি উপন্যাস, চারটি ছোট গল্প সংকলন এবং তিনটি নন-ফিকশন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের অনেকগুলোই আমেরিকান সাহিত্যের চিরায়ত(ক্লাসিক) গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।]

ধুলো-ধূসরিত পোশাক আর চোখে স্টিলের রিমওয়ালা চশমা পরিহিত একজন বৃদ্ধলোক রাস্তার পাশে বসে ছিলো। পাশেই নদীর ওপর একটি ভাসমান ব্রিজ এবং তার উপর দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি, ট্রাক, পুরুষ, মহিলা এবং শিশুরা পার হয়ে যাচ্ছিলো। ঘোড়ার গাড়িগুলো ঢুলতে ঢুলতে ব্রিজ পার হয়ে ওপাশের তীরের খাড়া জায়গায় পৌঁছালে, সৈন্যরা সেগুলো ঠেলে উপরে উঠিয়ে নিতে সাহায্য করছিলো। গাড়িগুলো তীরে উঠলে অপেক্ষমান ট্রাকগুলো হাঁটু পর্যন্ত ধুলোমাখা যাত্রীদের নিয়ে গড়-গড়িয়ে ছুটতে শুরু করলো। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটি সেদিকে ভ্রুক্ষেপমাত্র না করে অনড় হয়ে বসে থাকলো রাস্তায়। সে এতোটাই ক্লান্ত ছিলো যে আর একচুলও নড়তে পারছিলো না।  ব্রিজের ওপারে গিয়ে শত্রুদের অবস্থান ও গতিবিধি স¤পর্কে খবর নিয়ে আসার দায়িত্ব ছিলো আমার উপর। আমি  যথাকর্তব্য সমাপন করে ফিরছিলাম। দেখলাম, এখন রাস্তায় গাড়ি তেমন একটা নেই। আর হেঁটে ব্রিজ পার হওয়া লোকের সংখ্যাও কমে এসেছে।  তবু বৃদ্ধ লোকটি এখনো পূর্বের জায়গাতেই বসে আছে।

আমি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কোথা থেকে এসেছো?’

সে হাসলো এবং বললো, ‘স্যান কার্লোস থেকে’।

ওটা ছিলো তার নিজের শহর। তাই শহরের কথা বলতে গিয়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সে বললো, ‘আমি সেখানে পশুপাখিদের দেখাশোনা করতাম’।

আমি তার কথা পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও ঘাড় নেড়ে বললাম,  ‘আচ্ছা’।

সে আবার বলতে লাগলো, ‘হ্যাঁ, আমি পশুপাখিদের দেখাশোনা করতাম। আর আমিই সর্বশেষ ব্যক্তিহিসেবে স্যান কার্লোস ছেড়ে এসেছি’।

আমি তার ধুলোমাখা কালো পোশাকের দিকে দেখলাম। এবং তার ধূসর মুখ ও স্টিলের রিমওয়ালা চশমার দিকেও। বৃদ্ধ লোকটি দেখতে রাখালের মতো নয়; এমনকি পশুপালক বলেও তাকে মনে হয় না। বললাম, তুমি কী কী পশুপাখি দেখাশোনা করতে? ‘বিভিন্ন ধরনের’, সে ডানে-বায়ে মাথা নেড়ে উত্তর দিলো, তাদেরকে ছেড়ে আমাকে চলে আসতেই হলো।

আমি ব্রিজটার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আফ্রিকার মতো এই এব্রো ডেলটা দেশটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম— আর কতক্ষণ সময়ই বা আছে শত্রুর মুখোমুখি হবার। প্রায় সাথে সাথেই শুনতে পেলাম শত্রুর আক্রমনের সেই চিরবিস্ময়কর আগমন সংকেত। এবং তখনও বৃদ্ধ লোকটি নির্বাকারভাবে সেখানে বসেই থাকলো।

‘তুমি ঠিক কী কী প্রাণি দেখাশোনা করতে?’ আমি কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করলাম।

সে বললো, ‘সব মিলিয়ে তিন রকমের দুটো ছাগল, একটা বেড়াল আর চারজোড়া কবুতর’।

‘সবকিছুই তোমাকে ছেড়ে আসতে হলো?’

সে বললো, ‘হ্যাঁ, কামানের গোলার কারণেই। ক্যাপ্টেন আমাকে খুব দ্রুত সরে যেতে বলেছিলো’।

দূরে ব্রিজের শেষ মাথায় কিছু ঘোড়ার গাড়ি দ্রুততার সাথে পথ চলছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে আমি বৃদ্ধ লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার পরিবারে কেউ নেই?’

সে উত্তর দিলো, ‘না, শুধুমাত্র ঐ কটি প্রাণি ছাড়া আর কেউ নেই’। তারপর বললো, ‘বিড়ালটি অবশ্যই ঠিক থাকবে। একটি বিড়াল তার নিজের খেয়াল রাখতে পারে। কিন্তু বাকীদের কি হবে আমি ভাবতেই পারছি না’।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কী পলিটিক্স করো?’

‘আমি পলিটিক্সের বাইরে’ সে বললো, ‘আমি সত্তর বছরের বৃদ্ধ। বার মাইল পথ হেঁটে এসেছি এবং আর একটুও যাবার ক্ষমতা আমার নেই।’

আমি তাকে বললাম, এটা থামার মতো উপযুক্ত জায়গা নয়। তুমি যদি আর একটু দূরে যেতে পারো তাহলে ট্রাকে করে টর্টোসার দিকে যাত্রা করতে পারবে।’

সে বললো, ‘খানিকটা বিশ্রাম নিই, তারপর আমি যাবো। ট্রাকগুলো কোথায় যায়?’

‘বার্সিলোনার দিকে।’

‘ওদিকের কাউকেই আমি চিনি না’ সে মৃদু স্বরে বললো, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তোমাকে সত্যিই অনেক ধন্যবাদ।’

ক্লান্ত এবং শূন্য দৃষ্টিতে সে আমার দিকে তাকালো। তারপর কারো কাছে দুঃখ শেয়ার করার জন্যেই হয়তবা বললো, ‘বিড়ালটি ঠিক থাকবে, আমি নিশ্চিত। বিড়ালটির সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। কিন্তু অন্যরা! বাকি প্রাণিগুলো স¤পর্কে তোমার কী মনে হয়?’

আমি বললাম, ‘তারাও সম্ভবত ঠিকঠাক থাকবে।’

‘সত্যিই?’

দূরে নদীর ওপারে, যেখানে এখন কোনো ঘোড়ার গাড়ি নেই, সেই তীরের দিকে তাকিয়ে আমি

বললাম, ‘কেনো নয়!’

‘কিন্তু কামানের গোলার সামনে তারা কী বা করতে পারবে, যেখানে আমাকেই কামানের গোলার

কারণে চলে আসতে হয়েছে।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি কবুতরের খাঁচা খুলে রেখেছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে অবশ্যই তারা উড়ে যাবে।’

সে বললো, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তারা উড়ে যাবে। কিন্তু অন্যরা। তাদের স¤পর্কে আর চিন্তা না করাটাই বোধহয় ঠিক।’

আমি ব্যস্ত হয়ে তাকে বললাম, ‘তুমি যদি এখানে বসে থাকতে চাও, তো থাকো; আমাকে যেতে হবে। নইলে তাড়াতাড়ি ওঠো এবং হাঁটার চেষ্টা করো।’

‘ধন্যবাদ’ বলেই সে উঠে দাঁড়ালো। আর এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে, আবারো ধূলোর মধ্যে ধপ করে বসে পড়লো। তারপর খুব মৃদু স্বরে আমাকে নয়, অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বললো,‘আমি পশুপাখিদের দেখাশোনা করতাম। আমি শুধুমাত্র পশুপাখিদেরই দেখাশোনা করতাম।’

আসলে তাকে নিয়ে কিছুই করার ছিলো না। দিনটি ছিলো ইস্টার সানডে এবং ফ্যাসিস্টরা এব্রোর দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছিলো। এটা ছিল ধূসর, মেঘলা একটি দিন এবং আকাশে তাদের প্লেনগুলোও দেখা যাচ্ছিলো না। এবং আসল সত্যিটা হলো, বিড়ালেরা জানে কিভাবে নিজেদের যতœ নিতে হয়; আর শুধুমাত্র এটাই ছিলো বৃদ্ধ লোকটির জন্যে চিরকালের আশ্বাস।

যারিফ মুহিব অয়ন
এ শহর অথবা কিছু অনুভূতির সংজ্ঞা।।

এ শহরে ঘুম বেচে দেই আমরা,

নানা দামে নানান জনের কাছে।

আমরা কে কতো দামে ঘুম বেচেছি এ শহরের রাস্তায়? কে জানে? শশি কতো দিয়ে বেচে দিলো? আমার থেকে কমে, না বেশিতে। কে লাভ করলো? আমি না ইমন। যারা কিনে নিয়ে গেলো, তাদের ঘরে, তারা বিছানার উত্তাপে গা জুড়ালো। আর অস্থির কয় জোড়া চোখ গিয়ে ঠেকলো ক্যামিকেলের দরজায়।

এভাবেই রাত হয়ে যায় ভোর

জেগে থাকে চোখ

কিছু সাদা রঙের ঘুম গেলার অপেক্ষায়

ওষুধের গন্ধে চোখ বুজে যায় ঠিকই,

কিন্তু স্বপ্নগুলো অধরাই থেকে যায়।

স্বপ্নের তো কোন বাস্তবতা নেই তবে দরকার কি? যে বাস্তবতা বারবার মনে করে দেয় তুমি নেই আমার, সেই বাস্তবতাকে দূরে কিভাবে ঠেলা যায়? যে কৃষ্ণচূড়া কখনও প্রেম জাগায়, কখনো রক্ত হতে আগুন হয়ে বিরহে পোড়ায়; সেই কৃষ্ণচূড়ার শহরে কি করে ভালো থাকা যায়?

অস্থিরতা তোর সিঁথিতে লাল সিঁদুর পরালাম।

আলিঙ্গন করো আমায়,

সিক্ত করো অতৃপ্ততা, যতোটা পারিস,

ছুঁয়ে যা এ শরীর।

কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে, বা নিজে থেকে অন্যকে কেমন আছি জানাতে চাইলে কিংবা কেউ কোনো সমস্যা ধরে বলতে আসলে এই একটাই শব্দ মুখে ধরে- অস্থির। আমি অস্থির আছি, তুমি অস্থির আছো, সে, তিনি, উনি সবাই, সবাই অস্থির হয়ে আছে এখানে। সব কিছুই যা এ শহরে ঘটে যায়, হয়ে যায় অস্থিরতার ফলাফলে।

চল বন্ধু হারাই, অন্য কোথাও।

যেখানে এ শহর, এর স্মৃতি, কিছুই খুঁজে পাবে না আমাদের।

হারিয়ে যাবে মুঠো ভরা এক রাশ না পাওয়া।

খুঁজে নেবো কোনো অচেনা আঁচল

মুখ ভরে চুমু খাবো ভবিষ্যৎ।

যেখানে রামধনুর সাতটা উল্টো চাঁদ চুরি করে এক করে দেবো

জন্ম দেবো নতুন এক রঙ

ছুরোছুরি খেলে, মেখে নেবো গা ময়

ঘুমিয়ে যাবো কিছু রঙিন স্বপ্নের হাত ধরে,

চল।

এ শহর, এর স্তব্ধতা, ক্যাম্পাস, অগনিত ক্লাশ, ক্লাসের একঘেঁয়ামিতে অস্থির মন বাঁচতে চায় ছুটির অপেক্ষায়। পালাতে চায় শহরের বাহিরে কোনো যাত্রার স্বপ্নে। কাজলা গেটের অটোগুলোতে স্টেশনের ডাক শুনলে বারবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ভাগ্যবান ট্রেনগুলোর কাছে। ওরা যখন চায় এখানে আসে, কিছুক্ষন থেকে ঠিক চলে যায়। খালি আমি পরে থাকি। বাহিরে ঘুরে আসার পরিকল্পনা করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

এ শহর কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। নিষ্ঠুর। বন্দী করে রাখে। দাস প্রথা কি সত্যি উঠে গেছে? গিয়ে থাকলে আমি কি? আমরা কি?

হাফিজুর রহমান
জীবনের গল্প
অনেকেই বলে জীবনটা তো কোনো সিনেমা-নাটকের গল্প নয়, যে- সব হিসেব শেষে এসে মিলে যাবে! তাঁরা ঠিক বলে। জীবন কোনো গল্প বা উপন্যাস নয় বা কোনো সিনেমা-নাটকও নয়, জীবন এর থেকেও বিচিত্র!

গল্পের শেষে এসে সবকিছু মিলে যায়, সবকিছু থাকে যৌক্তিক আর গোছানো। সেখানে কেউ ভুল-ভাল বলে না, কারো কথা স্লিপ কাটে না, সেখানে কোনো ঘটনা অযাচিত হয় না। কিন্তু জীবনে? একটা মানুষ কী তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া সবকিছুর পেছনে যুক্তি খুঁজে পায়? মানুষের সব হিসাব-নিকাশ কি গল্পের শেষে মিলে যায়? যায় না।

আপনি যদি একটা উপন্যাস পড়েন আর তারপরে যদি একটা জীবন-কাহিনী পড়েন, আমি নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি আপনার কাছে জীবন-কাহিনীটা বেশি বিস্ময়কর লাগবে। কারণ, সেখানে অনেক কিছু পাবেন অযৌক্তিক-অমীমাংসিত! অথচ একটা মানুষ যখন তাঁর নিজের জীবন নিয়ে লিখতে যায়, তখন সে তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ঘটনাগুলোকে সাজানোর চেষ্টা করে। কিছু ঘটনা বা প্রেক্ষাপট থাকে যেগুলোকে সে কোনোভাবেই সাজাতে পারে না বলে এড়িয়ে যায় আর কিছু কিছু ঘটনা বা প্রেক্ষাপট থাকে, যেগুলোকে সে সমাজ ও সামাজিকতার কারণে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যায়। তাঁর সকল চিন্তাগুলোকে সে উপস্থাপন করে না শুধু মার্জিতগুলো বাদে।

একটা গল্পে আমরা একজন বা গুটিকয়েক মানুষকে প্রধান চরিত্রে দেখি, তাঁদের জীবন বিশ্লেষণ করি আর বাকি চরিত্রগুলোকে মনে করি অপ্রয়োজনীয়। বাস্তব জীবনটাও কী তেমন নয়? আমরা তো সবসময় নিজেকে গল্পের প্রধান মনে করি। বাকি দুনিয়াকে মনে করি তাঁর পাশের বিভিন্ন দরকারি-অদরকারি চরিত্র। আসলে কী আমরা সবাই প্রধান? আপনি যদি সব জায়গায় নিজেকে প্রধান চরিত্র ভাবেন, অন্যজনও তো একই ভাবে নিজেকে সব জায়গায় প্রধান মনে করে, আর তাঁর কল্পনায় বা তাঁর জীবনে আপনি হয়তো একটা পার্শ্বচরিত্র বা কখনো কিছুই নন, তাই না?

একটা গল্পে একজন হিরো থাকে, অ্যান্টি-হিরো থাকে, অবহেলিত-নির্যাতিত চরিত্র থাকে, বাস্তব জীবনেও তো তেমনি বিভিন্ন চরিত্র থাকার কথা, তাই না? কিন্তু আমরা কখনো কী নিজেকে পার্শ্বচরিত্র ভাবতে পারি? পারি না, কারণ, নিজের জগতে আমরা সবাই রাজা। তবে এতোটুকু তো মনে রাখা উচিৎ, আমার বনে আমি রাজা হলেও অন্যজন তো তাঁর বনে রাজা। তাহলে সবার বনে আমি নিজেকে রাজা ভাবি কেনো? কোনো ঘটনায় বা কোনো  প্রেক্ষাপটে বা জীবনের কোনো অংশে আমি তো অ্যান্টি-হিরো, পার্শ্বচরিত্র বা অপ্রয়োজনীয় কেউ হতেই পারি! সেটা কি একটু উপলব্ধি করা দরকার না?

আমি প্রায়-ই একটা কথা বলি- দুনিয়ায় কোনো নিশ্চিত খারাপ মানুষ নেই। অর্থাৎ, দুনিয়ায় প্রত্যেকটা মানুষ তাঁর নিজের কাছে ভালো; ভালোই শুধু না- শ্রেষ্ঠ, নায়ক, প্রধান। এমনকি দুনিয়ার সবথেকে খারাপ হিসেবে বিবেচিত মানুষটারও একজন না একজন কাছের বন্ধু আছেন। আর আমরা খুব ভালো করেই জানি, দুনিয়ার কোনো মানুষ-ই জেনেশুনে একজন সত্যিকারের খারাপ মানুষের সাথে মন থেকেই মিশে যাবে না বা বিশ্বাস করবে না। তাহলে একটা মানুষকে যদি একটা মানুষ হলেও ভালো মনে করে, তাহলে সে খারাপ হয় কী করে? তাঁর মধ্যে ভালো কিছু অবশ্যই আছে। একই ভাবে দুনিয়ায় প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের একটু হলেও গুরুত্ব আছে। তাঁদের সকল কাজের একটু হলেও উদ্দেশ্য আছে। আপনি-ই শুধু মূল্যবান নন।

যার যার ক্ষেত্রে সে সে গুরুত্বপূর্ণ এটা ভাবতে শিখুন। সবার জীবনের গল্পেই নিজেকে নায়ক ভাবতে যাবেন না। আপনি অন্য কারো জীবনে সামান্য গুরুত্বপূর্ণ বা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নন এটাও ভাবতে শিখুন। আপনাকে তো নিজের জীবনে গুরুত্বহীন হতে বলা হচ্ছে না।

কেউ কেউ প্রেম করে ব্যর্থ হওয়ার পর দেখা যায় বলে— ‘জীবনটা যদি গল্প হতো কতই না ভালো হতো! শেষে এসে তাঁকে পেয়ে যেতাম।’ আরে বাবা, আপনি তাঁকে পাননি বলেই জীবনটা পানসে হয়ে গেলো? গল্পে তো অ্যান্টি-হিরো থাকে। আপনি তো অ্যান্টি-হিরোও হতে পারেন, তাই না? আবার সাধারণ একজন পথচারীও তো হতে পারেন? কারণ, এই গল্পটা তাঁদের, সেখানে যারা মিলে গেছে তারাই নায়ক-নায়িকা; আপনি নন! অন্যজনের গল্পে আপনি প্রধান হবেন এমন ভাবছেন কেনো? আপনার জীবনের নায়ক-নায়িকা হয়তো অন্যজন।

শেষে এসে একটা সাধারণ সিনেমা দৃশ্যের অবতারণা করি। ধরি—একজন বিশাল ডনকে ধরার জন্য পুলিশ গেলো। অনেক গোলাগুলি, বিশাল হুলস্থূল! কয়েকজন পুলিশ আর কয়েকজন সন্ত্রাসী মারা গেলেন। শেষে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডনকে হাতে বেড়ি লাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে দেখেন, ডন কিন্তু প্রথম গুলিতে মরেনি, মানে প্রথম গুলি তাঁর গায়ে লাগেনি। কিংবা কর্মকর্তা সাহেবেরও কিছু হয়নি। কারণ, এই গল্পে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এই গল্প তাঁদের, শুধুই তাঁদের। তাঁর মানে কি ওই যে মানুষগুলো মারা গেছেন তাঁদের জীবন ফালতু? তাঁরা গাছের ঝরাপাতা?না, তাঁরাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদেরও দাম আছে! তবে তাঁদের গল্প আলাদা। মারা যাওয়া একজন পুলিশের জীবনের গল্পটা তাহলে কই?বলছি-

সাধারণ ছা পোষা চাকুরি করা সাধারণ পুলিশ মানুষটির গল্প হলো— কালকে বাচ্চার স্কুলে ভর্তির টাকা লাগবে, দুই মাস পরে মেয়ের বিয়ে কিংবা বাবার হার্টে সমস্যা। অনেক টাকার দরকার তাঁর কয়েকটি কাজে অথচ কম সময়ের মধ্যে। সে জোগাড়ের চেষ্টা করতে করতেই বিশাল অপারেশনে যেতে বাধ্য হয়। অভিযানের মাঝপথে হঠাৎ একজন সন্ত্রাসী গুলি করতে করতে এগিয়ে আসতে থাকে। পুলিশ লোকটি বুঝতে পারে সন্ত্রাসী কাছে এগিয়ে এলে বিপদ, তাঁদের অভিযান ব্যর্থ হবে! জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সন্ত্রাসীর উপর। তাঁর গুলিতে সন্ত্রাসীর মৃত্যু হয় আর অন্য সন্ত্রাসীর গুলিতে তাঁর! মৃত্যুর সময়ে তাঁর চিন্তাগুলো খেয়াল করুন— সে দেশের শান্তির জন্য জীবন দিচ্ছে। পরিবার ভুলে যায় সে, সে হয়ে যায় বিশ্বস্ত, দেশপ্রেমী। পরিবারটা হঠাৎ তাঁর কাছে হয়ে যায় গৌণ অথবা পুরো দেশ হয়ে যায় তাঁর কাছে পরিবার। ত্যাগের মহিমা আর ফেলে যাওয়া কাছের মানুষদের জন্য হৃদয়-নিংড়ানো ভালোবাসা রেখে যায় সে। দেশের জন্য বিশাল অবদান তাঁর। একইভাবে তাঁর পরিবার জীবন-বাস্তবতার চরম অনিশ্চয়তায় পতিত হয়। এটাও আলাদা একটা গল্প, এখানে সমাধানটা করুণ, বিয়োগান্তক, ট্র্যাজেডিক! পাতি সন্ত্রাসী মানুষটির ক্ষেত্রেও তাই! এখানে দেখবেন জীবনের প্রয়োজনে সন্ত্রাসী বনে যাওয়া একজন মানুষ নিজেকে রক্ষার জন্য, নিজের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিষ্ঠুর পুলিশের গুলিতে নিহত হন। কাছের মানুষগুলো কষ্টে পাথর অথবা উম্মাদ হয়ে যায়। এই সিনে-দৃশ্যে ডন আর পুলিশ কর্মকর্তা মূল চরিত্র আর বাকিরা পার্শ্ব। তাই এখানে তাঁদের জীবনের মূল্য নেই তবে নিজেদের জীবনে তাঁরাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ!

প্রত্যেকের জন্যই গল্প আছে, আলাদা গল্প, পূর্ণাঙ্গ গল্প, ট্র্যাজেডিক গল্প বা মিলনের। সবসময় সবার সামনে একসাথে সব গল্প উপস্থাপিত হয় না। এক এক সময় এক এক গল্প। তার মানে এই নয় যে- অনুপস্থিত গল্প আসলেই অনুপস্থিত! এই গল্পও আছে অন্য কোথাও, অন্য কোনো বইয়ে, অন্য কারো জীবনে বা অন্য কোনো প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা হয়ে চলছে।

চলুক গল্প তার মতো, যার জীবনে তাঁর মতো! সব গল্পে এক কাহিনী হয় না, সব গল্পে এক সমাধানও হয় না। হতাশ হওয়ার কিছুই নেই! আমার গল্প এর সাথে মিলছে না, ওর সাথে মিলছে না, তাঁর সাথেও মিলছে না- তাতে কী? আমার গল্প আমার মতো-আমার ধারায়-আমার কাহিনীতে চলবে- যেখানে আমি-ই শুধু নায়ক! জানি- হয়তো আমার গল্পটা হবে পরম সুখের, আবার হতে পারে বিয়োগের, আবার হতে পারে ত্যাগের, এমনকি হতে পারে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ে সমৃদ্ধ। যেমন-ই হোক, সেটাই আমার গল্প, সেটাকে পারলে আমি পাল্টে নেবো, কিন্তু অন্যজনের গল্পে অবহেলিত হয়েছি বলে আমি কাঁদবো কেনো? সেটা তো আমার গল্প নয়!

মৃত্যু ও একটি ফিনিক্স পাখি
লম্বা একটা স্কুলবারান্দায় কেউ বেরুতে পারে না, কারণ এখন ওইমাথায় চৌধুরী স্যার চতুর্থ শ্রেণি খ-এর ক্লাশ করিতেছেন। হঠাৎ একটা ফিঙে ল্যাজ দুলাইয়া ফুড়ুৎ উইড়া বসে, উঁচু কড়িবর্গায়। ভোঁ দৌড় দিয়া নামিয়া আবার পিচ্ছিল বারান্দায় চঞ্চল চোখে দাঁড়ায়, বিদ্রুপ করে। তখন বুড়ি বলে—ওহ্, ওইটা না ম্যায়া পাখি। পাখিটার মাথা মুখ যেমন চঞ্চল তেমনই ফিরতি হাওয়ায় স্কুল পাশে চইলা যাওয়া রাস্তায় আরও ভীরু চঞ্চল কেউ একটা ছিল, সে বারবার ডাকছিল, আয়… আয়… আয়…। আমরা চৌধুরী স্যারের ভয়ে নিশুতি বারান্দাটা তখন ফিঙে পাখিটাকে ছেড়ে দেই আর ওই রাস্তাটায় কোনো চাঞ্চল্যমাখা কাউকে দিয়া দেই। কিন্তু বদ্ধ চিড়িয়াখানার যন্ত্রণা আমাদের আত্মাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। বোবা হাওয়া পেছনের ভাঙা দরোজাটায় এতো ঝাপটায়— যে কোনো কাজ হয় না। খালি উড়–ক্কু মনের বায়না আছড়ায়। কিন্তু ধড়াস! একদিন চৌধুরী স্যার মরিয়া গেলেন। কী অপ্রত্যাশিত সে মৃত্যু! গভীর ডঙ্কায় মেঘ বাজিয়া ওঠে তখন, গরুর ঘাড় নষ্ট হইয়া যায়, কাঁঠাল গাছের লম্বা ডাল মধ্যফাড়া হয়, জোনাকীদের বাড়িতে কীসের যেন বুকফাটা কান্নার সুর ওঠে। তার বোল অনেকদূর তরঙ্গ তোলে। চিক্কন পাতার বাঁশঝাড়, কেরামত পাগলার কবর, ওরসের মাঠ, গোঠের প্রান্তর পেরিয়া অনেকদূর। এই জোনাকীই সেদিন ভীরু চোখে আয় আয় ডাকিয়াছিল। যে জোনাকীর স্তন ছিল সুডৌল, মুখশ্রী ছিল শ্যমলা গাভীর মতো চকচকে, চোখ ছিল তুমুল রোদ্দুরমাখা, কান ছিল ভরাট মায়ার পাতলা বুননিতে বাঁধা আর চুল যেন ভারী নিতম্বের অন্ধকার— সে এখন কাঁদে, হুহু করিয়া কাঁদে। ছওয়ালের ভয়ে কাঁদে। মর্সিয়া মায়ায় কাঁদে। হ, এ বাড়িতেই কেউ মরিয়া গিয়াছে। কিন্তু চৌধুরী স্যার তো বজ্রপাতের মরা নন। হঠাৎ, ঘুমের মরা। বোবার মরা। তিনিই বলেন, মরিয়া যাইব, তোরা কোরান পড়িস আর আমার হারানো আত্মাকে খুঁজিয়া ফিরিস। আমিও অন্য মরার মতো হারাইয়া যাইব। মানুষ মরিলে এক্কেবারে হারাইয়া যায়। আর পাওয়া যায় না কোনোদিন। আকাশে-বাতাসে-হাওয়ায়-মৌনতায়-শব্দেনিঃশব্দে সে এক্কেবারে বিলীন। ক, আমি মরিলে তোরা আমারে খুঁজিয়া ফিরবি! এসব গরম হাওয়ার দুপুরের উদ্ভট প্রশ্ন, কিন্তু কিচ্ছু বোঝা যায় না। চৌধুরী স্যার খুব ভয়ের মানুষ, তার কথা তো কিচ্ছু বোঝা গেল না। খালি ডর করে, আর আব্বা ডাকা কাতর ভয় ঘিরিয়া ধরে। কিন্তু সত্যিই তিনি যখন মরিয়া গেলেন তখন এই স্কুল বারান্দা শোকাহত হয়, রোল ওঠে গোলাপজলের বাসনার, আতর আর ধূপের গন্ধ ওরাল দিয়া রাস্তাটা ছাইয়া যায়, জোনাকী গমগম করে— কালো রাত ভরাট হইয়া হড়-হড় করে, পড়ালেখাটা হইবো তো! তোরা পড়ার ভয়ের ভয় করোস, আর আমি এখন কব্বরে শুইয়া তোদের ভয় করি, যাহ্ সক্কলকে ছাইড়া দিলাম। সবাই জোনাকীর ডাকে বাইরে চইলা আয়। ভীড় কইরা আনন্দ কর। জোনাকীর সৌন্দর্যে সরু রাস্তার হোলি উৎসবে মাইতা বইলা যা, আমাদের তো বয়স হইছে, সাত বচ্চর হইলো, আর চৌধুরী স্যার এখন কিচ্ছু কইবো না। পারমিশন দিয়া দেছে, এখন হাওয়া মে উড়তা যায়ে… আসো ওই হাওয়ায় ওরাল তুলি… জয়, জয় জয় জয় হে…।

চিহ্নপ্রধান

আলোচনা