স্নান ৩৮

 

      স্নান ৩৮
  নভেম্বর, ২০১৫ ; অগ্রায়ন, ১৪২২

 

সম্পাদক
রেজওয়ানুল হক রোমিও

 

প্রচ্ছদকার
দেলোয়ার হোসেন

 

চিহ্নপরিবার
১৩০, শহীদুল্লাহ কলাভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

বেসিরিজনামা ও ঝিঁঝিঁডাক
রিংকু রাহী

১.
কবিতাকে বলো— ককটেল ফাটাবো
ড্রোনে চড়ে অমুকখানে যাবো
মানুষ মারবো
মানুষ পোড়াবো
কবিতাকে বলো— ককটেল ফাটাবো

২.
বিদ্রোহে নয়
বিভ্রমে নয়
তোমাকে পোড়াই তৃতীয় কারণে
এ-শরীরে নয়
এ-সময়ে নয়
পোড়া ছাই রাখি গুপ্ত তূণে

৩.
সবই তো বোঝো!
না-উড়লেও পরাজিত হতে হয় কিছু পাখিকে
সবই তো জানো!
কিছু ঠোঁট কবিতার খোরাক
কিছু হৃদয়ে ভরা থাকে দুনিয়ার আকালে!

৪.
যারা বেচে দ্যায় পেটের খিদে
যারা বেচে দ্যায় রাষ্ট্রের রং
তাদের জন্যে বরং— তোলা থাক কিছু হলদে বিকেল

৫.
বেশ্যার মতোন করো দরদাম
অথচ তুমি অঙ্কভোলা

কায়সার আলম এর কবিতা
একটি মৌসুমীরাত
দ্বিখ- আকাশ। ভাঙাচোরা পথ।
বনের ভেতরে মানুষমানুষ ঘ্রাণ।

ভরা মৌসুমীরাত।
কতকগুলো জোনাক হাতের মুঠোয় শাপল দিচ্ছে তারা
আর অন্ধকারে লণ্ঠনের আলোয় ফিরে যাচ্ছে গ্রামে।

একেকটি চাওয়া একেকটি তিমিরহনন শেষে
প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মানুষের প্রতি
সমকোণে দাঁড়িয়ে থাকছে।
কেউ দেখছে, কেউ চোখ বন্ধ করছে
কেউ অবশ্য মৃত্যু জেনেও স্বীকার করছে সত্যটা

যেনো পুরো পৃথিবীটাই হাত বদল হচ্ছে তোমার আমার।

কোন কিছুই অনুকূলে থাকে না

কোনো কিছুই অনুকূলে থাকে না
হাঁটাপথ কিংবা নদীস্রোত
বৃন্দাবন কিংবা বারান্দার প্রজাপতি
কোনো কিছুই অনুকূলে থাকে না

ধূ-ধূ বিস্ময়ের দেশ,
মরমিসাধনারত প্রত্যাখ্যাত ভূমি,
অগাদ জলের নিচে জলের ফেরেস্তা,
শূন্যতার ডায়েরি,
বিরহমানুষের ছবি?

শুধুছল, বাঁকলের গভীরে থাকে না কষের ভূমিকা।
ধূলিজমাট পথের অন্তর ফেঁটে ফেঁটে আসে হাসির অক্ষর

কোনো কিছুই অনুকূলে থাকে না
ভাঙারগানে মিথ্যে হয়ে য়ায় রবীন্দ্রনাথ,
অদূরের রেঁস্তোরায় মমতার চাঁদ পাঠক্রমে প্রশস্ত হয়

শেষাবধি, কোনো কিছুই অনুকূলে থাকে না।

গুণাকর এর কবিতা

১.
খুঁটি ঝুলে থাকে নীরবতায়
উজ্জ্বল আলোয় মাটির অশ্রুর আহাজারি।
না, আলো তো নয়… কি হাসছে অবিরত অবিকল?

এই দিকে বিরাম নেই রক্তের—
পাগলিনী প্রলাপ ছেড়ে সাপিনী হয়।
হিস্ হিস্ শব্দে ভারী হয় বাতাস, জলের প্রতিটি বিন্দু।
বেদনার শিশির আর কতো ঝরাবে হৃদয়?

রক্তের পাগলামো আর মাংসের নিস্তব্ধ নিঃশ্বাসে
থৈ নেই সেই মানবীর
ঘাতে যার নির্ভরতার ব্যর্থ শেকল।
মহামহিম আর একটু বৃষ্টি দাও,
ক্লান্তির পাতা ভারী হোক, শ্রান্ত হোক ব্যথার শীতলতা।

২.
এই ভাবে যদি চলে যেতে হয়
তবে আমি অপার্থিব বাঁশরী শুনতে চাইনা
অপারগ আমি আর কতোটুকুই বা ঋণী
যদি এইভাবে চলে যেতে হয়

আমি প্রকৃতি আচরণে অভ্যাগত হয়েছি বা কতোটুকু
আমি শেষ কবিতায় জন্ম ইতিহাসে কুণ্ঠিত হব না
যদি এইভাবে ছেড়ে যেতে হয়।

আমি মহান মহীরূহ হয়তো পেয়েছি ক্লান্ত বীজে
হয়তো আমি তরুলিপির স্বাক্ষর হতে পারবো না
কম্পিত করাঘাত তাই অকাল বৃদ্ধ পেঁচার ব্যবহার

আমি হয়তো লিখে যেতে পারবো না প্রণয় ব্যর্থতা
রিক্ততায় আমি নিজের কাছেই পরাজিত হবো আবার
অপারদর্শিতা জানি কবি হৃদয়ের নামান্তর
এই ভাবে যদি চলে যেতে হয়…

বনানী নার্গিসএর কবিতা
 ১.
আত্মহত্যাকামী চিন্তাশীল এক বৃদ্ধ

চিন্তাগুলো তবে আপন স্রোতে ভাসুক। ব্রিজের
রেলিঙয়ে বসা আত্মহত্যাকামী বৃদ্ধটি ভাবছে বসে
কী? এ কী মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে
জীবনকে ছোঁয়া!
অথচ, মৃত্যুর কাছাকাছি মৃত্যুরই তো থাকার
কথা ছিল, নাকি—
মৃত্যুর কাছে এ আবার জীবনেরই রিভিউ!
চিন্তাগুলো আপন মনে নামুক, সবগুলো সিঁড়ি
বেয়ে নিচে নেমে গেলে… সব সিঁড়ি ফুরিয়ে
গেলে তবেই তো গ্রাউন্ড ফ্লোর… সেই কাক্সিক্ষত
মাটির স্পর্শ।

২.
একজন মাতালের সমুদ্র

তুমি চিরদিন সূর্যোদয় কুড়াও…
আমি বরং কুড়াই
সমুদ্র সৈকতের ঝলমলে রোদ।
বড়শিতে টোপ গিলে হলুদ রোদেরাও ধরা পড়ে
মাছের মতোন— বৃষ্টিভেজা বজ্রপাতের দিনেও।

আমি তো মাতাল রোদের গন্ধে, বৃষ্টির
সুরে, প্যারিস রোড ধরে হেঁটে চলা বাবরি
চুলের গণেশদার বাঁশিতে।
সমুদ্র আমার লুকিয়ে থাকে অন্য কারো চোখে।

বিচ্ছিন্নতা ও বোধ!
বাসুদেব পাল

তেমন কোনো বিচ্ছিন্নতা আমাকে আর আঘাত করে না

চিনে গেছি, দিনে দিনে কারা বধির হয়েছে
প্রকাশ্য আড়াল করে নীরব থেকেছে খুব, বোধে ব্যাধি
মেখে এগোতে এগোতে বলেছে যৌথতার কথা

কাছ থেকে কারা বন্ধু ভেবেছে, চিনে গেছি
হাঁটতে হাঁটতে কে বা কারা প্রতিনিয়ত দুরত্ব মেপেছে
দাওয়াতের কথা বলে ডেকে নিয়ে তলপেটে মেরেছে কথার হাতুড়ি
ভালোবাসা হজমের আগে দিয়েছে বাটি ভরা গোলাপের কাঁটা
আর মনসার ফণা তুলে আজ কারা লুকালো গোপন-দেবতা

চিনে গেছি।
খুব চিনে গেছি, কারা খুব আপন হয়েছে! দু’বাহু তুলে ধরে
ঘাড় মুড়ে বলেছে বাবা বেঁচে থাক। তারপর তেল টেনে
ভীষণ ব্যথিত হয়েছে।
কেমন নিস্তেজ করেছে।

চিনে গেছি, আশা দিয়ে কারা আঁধারের দুয়ার খুলেছে
গর্ব করে, বলেছে আয় কাছে আয়।
কারা প্রেমিকার স্তন টিপে এসে হাসতে হাসতে বলেছে দ্যাখ
কে আমি, প্রেমিক-মদন!

চিনে গেছি, সব চিনে গেছি।

তেমন কোনো বিচ্ছিন্নতা আমাকে আর আঘাত করে না
কেননা আমি আমার পিতাকে চিনি, মা’কে আরো দৃঢ় ভাবে
প্রত্যহ তাদের সাথে আমার কথা হয়।

দেবী অরুণিমা

একটা চুমু দেবে?
সাদা ধবধবে বুকে।
দাও না, একটা চুমু!
তোমার চুমুতে আমি কলঙ্কিনী হতে চাই,
কলম?
কলঙ্কিনীর ইতিহাস রচি শুভ্র বুকে
তোমার কালিমায়।
আমি যে কাগজ!
পরতে পরতে সাজিয়ে রাখি
তোমার দেওয়া কালির আঁচড়।
*
ঋতু¯্রাবের ঋতু পরিবর্তনে;
দগ্ধতা।
আর! ফিনাইলের গন্ধ—
টয়লেট প্যান তুলির ক্যানভাস
আহা! অপূর্ব, প্রতিশ্রুতির মিলন!
*
পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে গেছি
অবনি আলোর দেখা পাবো বলে!
*
এরোনট… ‘ইনফিনিটি’
ডেন্জার!
অটো পাইলট! অটো পাইলট!
হি হি হি…
নম্রতা এই,
আমার শুদ্ধ সমীরণে।

নিত্য ভবিষ্যৎ
প্রজাপতি লিমা
কাতর গলাগলিতে অবসন্ন মন যখন,
করুণ অপমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে,
তখনও ভেসে ভেসে আসবে প্রাণে
প্রথম দিনের সুর…
‘আমার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা চাই তোমার প্রাণে।’

আক্রোশে ফেটে পড়তে চাইবে তখন
শিকলে বাঁধা মন।
মুক্তিতে তার আর জাগবে না স্বাধ।
শীতল পরশে স্বপ্ন দেখতে চাইবে সে
খুঁজে ফিরবে অতি সুপরিচিত
মাতাল হওয়া গন্ধ।
অনুভব করতে চাইবে ক্ষয়ে নিঃশেষ
হয়ে যাওয়া ক্ষণকে
তবুও মৃত্যু মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে,
মৃত্যু নয় ঠিক, প্রাণের অপমৃত্যু।

দৃশ্যপট শূন্য
অতন্দ্র অনিঃশেষ
আমি কখনো একমুঠো ভালোবাসা পাইনি।
বহু প্রতীক্ষার প্রেরণা পেয়েছি,
পেয়েছি বড় হওয়ার মস্ত বড় কৌশল
কেউ কখনও চুমু দিতে শেখায়নি।
আমি কখনো একমুঠো ভালোবাসা পাইনি।
স্কুল থেকে কলেজ
কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
অনেক বিদ্যা শিখেছি…
কেউ কখনও মমতা শেখায়নি
কেউ কখনো বলেনি— তুমি কাঁদো!
কেঁদে কেঁদে দুঃখের মোড়ক উন্মোচন করো।

হাসিব রনি

ক.
        হচ্ছেটা কী?
— কিছু না।
        কিছু না বলেই কি ‘কিছুনা’ থেকে বিরত থাকতে পারবে?
— তুমি পাশে থাকলে পারবো। সময় আছে তো?
        সময় আছে। সাথে তোমার ইচ্ছের মেরুদ- লাগবে। আছে?
— জানি না। সময় দাও।
        সময় বের করতে গিয়ে ‘সময়’ থাকবে তো!
        চুপ কেনো?
—জানি না।

থা.
        মন খারাপ কেনো?
— জানি না
        কে জানে?
— জানি না।
        অকারণে মন খারাপ, কারো মন খারাপের কারণ হতে পারে।

র.
        এখন রাত ক’টা বাজে?
— পাশে ঘড়ি নেই।
        পাশে কী আছে?
— ল্যাপটপ।
        তাতে কী হচ্ছে?
— ফেসবুক লগ ইন করা আছে।
        এতে জ্বালা কমে?
— না, বাড়ে।
        তবে মুখ গুঁজে আছো যে?
— আর কোথাও মুখ গোঁজার বুক নেই।

অ.
        ফোন ধরো নি কেনো?
— ঘুমাচ্ছিলাম।
        ক’টা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলে?
— জানি না।
        ঘুম কেমন হলো?
— ভালো।
        বের হবে বিকেলে?
— না।
        কেনো?
— আবার ঘুমাবো।

ক.
        খেয়েছো?
— না।
        না খেয়ে থাকাটা কি ফ্যাশন?
—গা জ্বালা দেওয়া কথা বলবে না।
        এখন অনেক কিছুই আর বলছি না।
— তুমি সব কিছুই বলবে।
        হুম। বলবো। ভাবছি আর কী বলা যায়!

থা.
        আছো কেমন?
— ভালো না।
        ভালো থাকো কখন?
— জানি না।
        কে জানে?
— তুমি জানো!

র.
        কতো দিন সকাল দেখোনি?
— মনে পড়ছে না।
        কী মনে পড়ে?
— জানি না।
        দু’জনে একদিন সকাল দেখবো।
— ইচ্ছে নেই।
        তোমার ইচ্ছেগুলো শামুক প্রজাতির!
— না।
        তাহলে?
— মরে গেছে।
        তুমি বেঁচে আছো যে?— ওষুধে এখনো ঘুম আসে।

গ.
        এতো রাতে ফোন কেনো?
— এমনি।
        কণ্ঠ কাঁপছে কেনো?
— এমনি।
        ঘুমের ওষুধে কাজ হচ্ছে না?
— জানি না।
        আবার হাত কেটেছো?
        চুপ কেনো?
        গলাটা কাটতে পারোনা!

ল্পি.
        একদিন বৃষ্টিতে ভিজবো, ভিজবে?
— না।
        কেনো?
— এলার্জি আছে।
        তাহলে জোছনা মাখবো, মাখবে?
— না।
        কেনো?
— যোগ্যতা নেই।
        ভালো বলেছো। আসলেই আমার যোগ্যতা নেই!
— গায়ে পেতে নিচ্ছো কেনো? ওটা আমার নেই।
        এড়িয়ে গিয়ে বেঁচে মরে থাকো!

কা.
        কোনো কথা পরিষ্কার করে বলো না।
— বলে যদি আবার চোরাবালিতে আটকে যাই।
        আমি নিজেই চোরাবালি। আটকাবেনা। একেবারেই তলিয়ে যাবে।
— জানি।
        আচ্ছা, এতো নিরব থাকো কেনো? তাহলে বুঝবো কিভাবে?
— যে আমার নিরবতা বোঝে না সে আমার ভাষাও বুঝবে না।

মুখোশে মুখ : অতলে কায়া
নুসরাত নুসিন
কেতুমি?
একটি ক্ষণিক মুহূর্তের উন্মোচন!
আমাকে জাগালে—
আজ দেখি শুরু নেই শেষ নেই
তুমি কেবল ঐটুকুই।
ইচ্ছা তন্দ্রার ভেতরে আচ্ছন্ন প্রবল
অতলপুর কায়া।

আলো ফুরায়নি এখনো। সন্ধ্যার সাদা আলোয় অস্তাচলে রঙের মহিমা। দিক নির্দিষ্ট পাখিগুলো ফিরছে। দুটি-একটি। শুনেছি ফেরার আর এক নাম প্রস্তুতি। সহজ ভঙ্গিমায় নিজেদের মুড়িয়ে নিচ্ছে ঘাসেরা। আর মাথা তুলে উত্যুঙ্গ গাছেরা উর্ধ্বত অপলক। মন্দিরের তন্ত্রীতে টুংটাং কাসর ঘন্টা। কীর্তনের সুর আশা জাগানিয়া। চলতি ধূপের ধোঁয়া কোথাও জাগিয়ে রেখেছে নিত্যকার বিশ্বাসের গুটিকায় পথ। প্রসন্ন দ্যোতনায় চরাচরে সুনিবিড় ধ্যানের গরিমা।

আর আমি মহাকালীন এই সন্ধ্যায় ধ্যানমগ্ন প্রার্থনার মতো অনুভবের সুতোয় অহরাত্র এ কাকে বুনে চলেছি? আমাকে নিরন্তর জাগিয়ে রেখেছে কে? নাড়িয়ে দিচ্ছে কে? আর আমাকে শূন্য করেই বা রেখেছে কে? শূন্য শূন্য ভীষণ দুলছি আমি। আমি এখানেই অথচ আমার মনে হচ্ছে আমি শতমাইল শূন্যতার ভেতর দিয়ে হাঁটছি। আশেপাশে কেউ নেই। ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশা কেটে চলেছি গোপনে, বাতাসের সম¯্রােতে। দোদুল্য বাতাস আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে প্রশস্ত শূন্যতা পেরিয়ে ঈশান নৈর্ঋত দিকের সীমানায়—

দিক নয়-এখানে। বিরুদ্ধ তরঙ্গ বেয়ে বিস্তৃত এক চরের মুখোমুখি। সাদা চাদরের মতো ঈষৎ আভাসিত যার জমিন। ঈষৎ আলোতেই যা তপ্ত আর সন্ধ্যা পেরোলে যার অদৃশ্য ধূ-ধূ। অনর্থ কাক্সক্ষায় আমি তারই মুখোমুখি প্রতিদিন। একা। মনে হয় একরকম প্রাচীন নৈকট্য এখানে অনাদিকাল। বিগত উদ্গত হৃদধ্বনি আকাক্সক্ষার তা¤্রবাণী আর জীবন পুরাতত্ত্ব। আদি-অন্তের মধ্যবর্তী এই সুসুপ্ত চরাচরে আহুত অনাগত যত সঞ্চয় হবে আমিও মিলতে চাই তার টুকরো হয়ে, এই সান্দ্রমধুর মুখোর মোহনায়—

আর তাই কোনো পরিপাটি সাদা কাগজের চৌকোণ শরীর বেয়ে নয়, আমি লিখে চলেছি তারই অচঞ্চল জমিন নাতিশীতোষ্ণ শরীর খুঁড়ে। বিস্তৃত চরের বুকে ধোঁয়া নেই, ফাঁকি নেই, প্রগাঢ় ছায়া নেই কোনো। শূন্য সমতলে দাঁড়িয়ে আমি তখন স্পষ্টদর্শী, স্বপ্নদর্শী। আর আমি তখন মৃত্যুদর্শীও। একটি প্রশস্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। অন্ধ মাছেরা কিভাবে গতিপথ নির্ণয় করে তা ভাবতে ভাবতে দেখি এক তরতাজা পথিক আমার পা ধরে কাঁদছে। ওকে অন্ধ ভিক্ষুকও বলা যেতে পারে। দূরের সীমানায় তার চোখ গজিয়েছে। সে এখন দুই চোখ নিয়ে আস্তানায় ফিরছে। আর পাগলের চোখ ক্রুশবিদ্ধ হয় কে বলে? আমি দেখেছি তার যাবতীয় উন্মত্ততা ও ক্ষুধার চাইতে ঐ চোখ আশ্চর্য শান্ত। সুগভীর মায়া দেয়।

সন্ধ্যা ছাড়িয়ে সময় এখন গভীর আঁধারে। চারপাশে প্রিয় মত্যুর মতো নিকষ নিস্তব্ধতা। এতো নিঃশব্দ অন্ধকার কখনো কখনো মৃত্যুকেও ছাড়িয়ে যায় কী? এখানে মৃত্যুর চেয়ে এক সুতীক্ষèসুর রাতের তলদেশে অবরুদ্ধ অত্যন্ত নিকটে। তাহলে আমার মুখোমুখি কে? অমীমাংসিত প্রান্তরের হাওয়ায় আমাকে ঝুলিয়ে রেখেছে কে? তবে কি সত্যিই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি আমি! কিন্তু কি চাই আমার? নিজেকে চিনতে চাই? নিজের উন্মোচন, পতন? কিংবা বারুদের কাঠি জ্বেলে দেখতে চাই দহনের রূপ? কিন্তু আগুন না পেলে আগুন জ্বলবে না, সলতে উস্কে না দিলে আলো বাড়বে না— আর নিজেকে না কচলিয়ে বোধোদয় হয় না¬— আমার তা নয়।

তবে? কেনোই বা সুতীক্ষèসুর আমায় টেনে নিয়ে যায়— ঐখানে। বারে বারে। আর কেনোই বা এতো ফাঁকা এতো শূন্য মনে হয়। আকাশে চাঁদ নেই— খোলা হাওয়া নেই— পেয়ালায় ধোঁয়া নেই— সব শীতল, খুব শীতল। আর সবুজ ঘাসগুলো যার কচি পাতায় একদিন গল্প লিখেছিলাম তা আজ বুড়ো পাতার মতো অবসন্ন অবনত। আর অশ্বত্থের পাতাগুলি দুলছে, না চাইতেই ভীষণ দুলছে। কেনো এতো দুলছে? তার থেকে এই বিস্তৃত চরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা ভালো। কিন্তু কদাচ মনোযোগ যা দেখা গেলো তা হলো কোনো সবুজ নেই। ছোটখাট শরীর নিয়ে যে সমস্ত ঘাস ভূপৃষ্ঠ ফুঁড়ে ওঠে— সেসব বড় অবসন্ন পড়ে আছে। বিষণœ বিরস মুমূর্ষু মৃতরঙ। আর তাই মৃত্যুর ছায়াপাতে জীবনের পূণর্গঠন দেখতে আমার ভালো লাগে না। শূন্যতার অনিঃশেষ চত্বরে দাঁড়িয়ে ইন্দ্রিয়ের তীব্রতায় সমস্ত বৈভব আমার কাছে উপহাসের রামধনু হয়ে যায়।

তবু আমি সন্তের মতো অবিশ্রাম চলেছি। বয়ঃবৃদ্ধ বটগাছ, মায়ামাঠ পেরিয়ে। কিন্তু তারপরও ঘুরেফিরে আবিষ্কার করি আমি নির্দিষ্ট পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে রয়েছি। খুব স্থির আর খুব নিরব।

মুক্তির প্রহসন : কেট চোপিনের ‘মুহূর্তের গল্প
অনুবাদক : মঞ্জুর আরিফ
মিসেস ম্যালার্ডের হৃদরোগের কথা জানায়, খুব সতর্কতার সাথে প্রায় আলগোছে তার কাছে তার স্বামীর মৃত্যুর খবর দেওয়া হলো।

তার বোন জোসেফিন তাকে বললেন, ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাক্যে, অস্ফূট ইঙ্গিতে, যা প্রকাশ পেলো আধো আধো উন্মোচনে। তার স্বামীর বন্ধু রিচার্ডও ছিলেন সেখানে, তার কাছেই। তিনিই সেখানে ছিলেন যখন ‘মৃত’ তালিকায় মি. ম্যালার্ডের নাম সবার উপরে নিয়ে খবরের কাগজের অফিসে খবর পৌঁছায়। দ্বিতীয় টেলিগ্রামে শুধু নিশ্চিত হয়ে যত দ্রুত ও যতেœর সাথে সম্ভব তিনি বন্ধুর মৃত্যুর খারাপ খবর পৌঁছালেন।

অনেক মহিলারা যেমনটা করেন, মানতে চান না ঘটনার বিহ্বলতার কারণে, তিনি তাদের মতো করে খবরটা নিলেন না। অকস্মাৎ তীব্র বেদনায় কেঁদে উঠলেন তার বোনের কোলে। যখন বেদনার ঝড় নিজে থেকেই মিইয়ে গেলো তিনি একাকি তার রুমে চলে গেলেন। চাইলেন না কেউ তাকে অনুসরণ করুক।

ঘরে একটা জানালামুখী, আরামী ঘরোয়া আর্ম চেয়ার। তিনি গা এলিয়ে দিলেন একটা নিংড়ানো পরিশ্রান্তি নিয়ে যা তার শরীর ভেঙ্গে দিয়ে এবং আরও গভীরে তার সত্তায় প্রবেশ করতে চাইলো।

বাড়ীর সামনের চত্বরে গাছের চূড়াগুলো তিনি দেখতে পারলেন। বসন্তের বাহারী জীবন। বাতাসে বৃষ্টির তাজা নিঃশ্বাসের গন্ধ। নিচের রাস্তায় ফেরিওয়ালার ফেরি করার চিৎকার। কারও গাইতে থাকা দূরবর্তী কোনো গানের অন্তরা তার কানে লাগলো আবছাভাবে, আর ঘরের কার্নিশে কিছু চড়ুইয়ের কিচিরমিচির, পশ্চিম জানালামুখে দেখতে পেলেন থরে থরে সাজানো নীলাকাশের টুকরো টুকরো মেঘ।

কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়া শিশুর মতো ফোঁপানী ছাড়া তিনি মাথা এলিয়ে পড়ে রইলেন প্রায় নিঃশব্দে।

তিনি তরুণীই ছিলেন, একটা নির্দোষ, শান্ত চেহারা, যার রেখাগুলো প্রমাণ দেয় অবদমনের এবং একটা শক্তির। কিন্তু এখন সেখানে একটা ফাঁকা দৃষ্টি যা স্থির হয়ে আছে ঐ দূরের টুকরো মেঘগুলোর কোনো একটায়। এই চাহনি নিজেকে দেখার নয় বরং কিছু সন্দেহময় অন্তর্দৃষ্টির।

কিছু একটা আগমন ঘটছিলো তার ভেতর আর তিনি তার প্রতীক্ষা করছিলেন ভয়ে ভয়ে, এটা কি? তিনি জানতেন না; নাম দেওয়ার জন্য এটা কিছুটা অতীন্দ্রিয় হেয়ালির মতো। কিন্তু তিনি টের পেলেন, আকাশের ভেতর থেকে লতিয়ে আসা, চিন্তাস্পর্শী শব্দগুলো, গন্ধগুলো, আর সেই বাতাস ভরানো রংগুলো।

তার বুকের খাঁচা দ্রুত আন্দোলিত হতে শুরু করলো। তিনি বুঝতে শুরু করলেন তাকে আবিষ্ট করার জন্য এগিয়ে আসা বিষয়টাকে, আর তিনি তার ইচ্ছা দিয়ে এটাকে ঠেলে পাঠাতে সংগ্রাম করছিলেন— তার তন্বী হাতগুলো যেমনটা করতো।

যখন তিনি হাল ছাড়লেন তার আধখোলা ঠোঁটের ফাঁক গলে কিছু একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরুলো। তার নিঃশ্বাসের উপর ভর দিয়ে বারবার বললেন, ‘মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি!’ ঘোলা চাহনি আর পেছনে আসতে থাকা ভয়ের ছায়া তার চোখ থেকে মুছে গেলো। সেগুলো অত্যগ্র আর আলোকিত হয়ে রইলো। তার নাড়ি দ্রুত হলো, আর প্রবাহী রক্তধারা তার শরীরের প্রতিটি কোণ উষ্ণ ও শিথিল করে দিলো।

তিনি জানতে চাইলেন না এটা কোনো ভীতিকর আনন্দ কি না। একটা পরিষ্কার আর সমুচ্চ উপলব্ধি তাকে এই উস্কানি অকিঞ্চিৎকর মনে করার সাহস জোগালো। তিনি জানতেন তিনি আবার কাঁদবেন, যখন তিনি মৃত্যুতে গুটিয়ে যাওয়া হাতগুলো দেখবেন; সেই স্থির নীরস মৃত চেহারাটা যা কখনই তার দিকে সঞ্চিত ভালোবাসা নিয়ে তাকায় নি। কিন্তু তিনি সেই তিক্ত মুহূর্তের ওপারে অনাগত বছরের মিছিল দেখতে পেলেন যা একান্তই তার নিজের হাতে চলেছিলো। আর তিনি উদ্বাহু হয়ে তাদের স্বাগত জানালেন।

আগামী বছরগুলোতে তার সাথে কেউ থাকবে না; তিনি নিজের জন্য বাঁচবেন। কোনো ইচ্ছাঘাতক থাকবে না যার অন্ধ অস্তিত্ব নর-নারীকে বিশ্বাস দেয় যে তারা তাদের ব্যক্তিইচ্ছা পাশের মানুষটির উপর চাপিয়ে দিতে পারে। এই স্বল্প সময়ের ভালোলাগায়, কি জানি ভালো বা নিষ্ঠুর কারণে বিষয়টা তার কাছে অপরাধের মতো ঠেকলো।

তারপরও তিনি তাকে ভালবাসতেন কখনও কখনও। প্রায়ই বাসতেন না। কি এসে যায়! জীবনের তীব্র অনুভূতিময় আত্মস্বীকৃতির কাছে অমীমাংসিত ধাঁধার মতো এই ভালোবাসা কিই-বা করতে পারে। ‘মুক্তি! দেহ আর আত্মার মুক্তি!’ তিনি বিড়বিড়িয়ে চললেন।

জোসেফিন দরজায় মুখ লাগিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছিলেন। ‘লুসি, দরজা খোলো! দোহাই; দরজা খোলো¬— অসুস্থ হয়ে পড়বে। কি করছো, লুসি? ঈশ্বরের দোহাই দরজা খোলো।’

‘যাও এখান থেকে। আমি অসুস্থ হব না।’ না তিনি খোলা জানালা দিয়ে জীবনের অমৃত পান করছিলেন। তার কল্পনা উদ্দাম ছুটছিলো সামনের দিনগুলোর দিকে। বসন্ত, গ্রীষ্ম, আর সব দিনগুলো যা তার শুধু নিজের হবে। তিনি দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা করলেন। এইতো গতকালও তিনি শিহরিত হয়ে দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা করেছিলেন।

বোনের পীড়াপীড়িতে অবশেষে দরজা খুললেন। তার চোখে বিজয়ের উত্তেজনা, তিনি নিজেকে বিজয়ী ঈশ্বরীর মতো করে সামনে আনলেন। বোনের কোমর জড়িয়ে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। রিচার্ড তাদের জন্য নিচে অপেক্ষায় ছিলেন।

কেউ একজন বাইরে থেকে চাবি দিয়ে দরজা খুলছিলো। দরজায় ব্রেন্টলি ম্যালার্ডকে দেখা গেলো, ছাতা হাতে, কিছুটা ভ্রমণক্লান্ত। তিনি দুর্ঘটনার স্থান থেকে অনেক দূরে ছিলেন, এমনকি কোনো দুর্ঘটনার ব্যাপারে জানতেনই না। তিনি জোসেফিনের আর্তচিৎকার আর রিচার্ডের দ্রুত পায়ে মিসেস ম্যালার্ডকে আড়াল করার চেষ্টার সামনে বিহ্বলের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিন্তু রিচার্ড বড্ড দেরি করে ফেলেছিলেন।

ডাক্তাররা যখন আসলেন, তারা বলেছিলেন তার (মিসেস ম্যালার্ড) মৃত্যু হয়েছিলো হৃদরোগে-সেই আনন্দে যা ঘাতক।

সোহেল সিরাজী
চাঁদের জামাই
এক.
আগে দু’একটা বললেও নাবিল এখন কারো সাথে একটা কথাও বলে না। সারা জীবনের জন্য বোবা হয়ে গেছে সে। বারো বছরের সেই কিশোর বালকটি এখন পূর্ণ যুবক। তবে সে অন্য আর দশজনের মতো নয়। মুখে তার দীর্ঘকাল সেভ না করা দাড়িগোঁফ। মাথায় আধোয়া উস্কোখুস্কো জটা চুলের জঙ্গল। দিনে সে ঘর থেকেই বের হয় না একদম। তার জীবনের সব আলো ফুরিয়ে গেছে। অন্ধকার তাকে গ্রাস করেছে; সেও অন্ধকারকে আঁকড়ে ধরেছে। তবে শুক্লপক্ষের রাতগুলোতে যতক্ষণ জোছনার আলো থাকে আকাশে ততক্ষণ সে খোলা আকাশের নীচে বাইরেই থাকে। চাঁদের দিকে একনজরে চেয়ে থাকে। ভরা পূর্ণিমায় সারা রাত সে ওভাবে কাটায়। লোকে তাকে চাঁদের পাগল বলে। কেউ কেউ বলে চাঁদের জামাই। লোক-মুখে অনেক গল্প রটেছে তার নামে। ‘চাঁদের লাহান সুন্দর এক মাইয়ার পিরিতে পইড়া ছিলো অতটুকুন ছোডো পোলাডা….’ এভাবে গল্প শুরু করে তমিজ ব্যাপারি। তারপর চলতে থাকে গল্প তার। জোছনা রাতে দাওয়ায় বসে মশগুল হয়ে শুনতে থাকে গাঁয়ের মানুষ। রাত শেষ হয়ে আসে তবু চাঁদের জামাইয়ের গল্প ফুরায় না।

দুই.

আজ জিলকদ মাসের পনের তারিখ। ভরা পূর্ণিমা। মাঝরাতে নাবিলের মা খিচতি-খেউর করে। ‘বেশ্যা নিতু মাগিটা আমার পোলাডারে পাগল বানাইছে! নাবিল, ঘরে আয় বাজান! ঘুমা। চান্দের মইদ্দে ওই মাগিডা থাহে না বাপ, ওইহানে থাকে চরকাকাটা এক বুড়ি।’ নাবিলের মায়ের চিৎকার পাড়াসুদ্ধ মানুষের ঘুম ভেঙে যায়; কিন্তু সে আওয়াজ পৌঁছে না নাবিলেন কানে। সে নেই এখানে, এই পাড়ায়। সে থাকে অনেক দূরে, অ-নে-ক দূরে।

তিন.

নিতু প্রতিমাসে চার/পাঁচ বার আসে অর্কিড ছাত্রাবাসে। প্রত্যেকবার আসার সময় নাবিলের জন্য এটাওটা নিয়ে আসে সে। নাবিল ভীষণ খুশি হয়। অনেকক্ষণ গল্প করে তারা। নিতু নাবিলের হাত ধরে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। টেনে কাছে এনে বসায়, অনেক আদর করে। শীতের দিনে লেপের ভেতর পা ঢুকিয়ে আধশোয়া হয়ে গল্প করে তারা। নিতু নাবিলকে ডাকতো ছোটো জামাই বলে। ক্লাস সেভেনের ছাত্র নাবিলের রুমমেট অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ুয়া শওকত জামিলের গার্লফ্রেন্ড নিতু। টিউশনির জন্য শওকত বাইরে থাকলে নিতু আর নাবিল গল্প-গুজব করে সময়টা পার করে। শওকত আসলে তিনজন মিলে আড্ডা দেয়। নাবিলকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করে শওকত। নিতুর নিজের হাতে তৈরি করে নিয়ে আসা হোমমেড খাবারগুলো তিনজন মিলে মজা করে খায়। সবকিছু ঠিক আছে, শুধু একটা সময় নাবিলের মন খারাপ হয়, যখন শওকত তাকে বিশ/ত্রিশ মিনিটের জন্য বাইরে কোথাও ঘুরে আসতে বলে। মাসের যে কয়টা দিন নিতু আসে, সে কয়টা দিন চরম আনন্দে কাটে নাবিলের। নিতু আসলে সেদিন সে স্কুলেই যেতে চায় না। নিতু চোখ রাঙিয়ে শাসনের স্বরে বললে তবে সে যেতে বাধ্য হয়। যাওয়ার সময় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, ‘আমি না ফেরা পর্যন্ত তুমি কিন্তু যাবা না, নিতু আপু!’

চার.

একদিন চরম আড্ডা ও গল্পের পর শওকত নাবিলকে বিশ/ত্রিশ মিনিটের জন্য বাইরে যেয়ে ঘুরে আসতে বলে। নাবিল যেতে চায় না। নিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিতু কিছু বলে না। তারপর শওকত আচমকা ধমক দিলে সে বাইরে বের হয় রুম থেকে। সেই যে বের হয়, আর ফিরে আসেনি সে অর্কিডে। কোত্থাও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি সতের দিন। অবশেষে তাকে পাওয়া যায় পার্বতিপুর রেলওয়ে স্টেশনে। সাত বছর আগে যেদিন নাবিলকে স্টেশনের একটি খুপরিতে পাওয়া যায়, সেদিন সে ছিল অর্ধমৃত। খালি গা, নোংরা কাদা-কালিতে ভরা, হাড্ডিসার। ছেঁড়া প্যান্টের পকেটে এক টুকরো ময়লা কাগজ। তাতে পেন্সিলে আঁকা একটি চিত্র। মেঘের ফাঁকে পূর্ণচন্দ্রের অর্ধেক। চাঁদের মাঝখানে লেখা¬— ‘নিতু আপু।’

স্বপ্ন(অচরিতার্থ)
নাসিমুজ্জামান সরকার
জগতে যার কোনো সহায় নেই তার ঈশ্বর আছেন। এ তত্ত্ব জুনায়েদ কখনোই স্বীকার

করেনি। বাল্যকাল থেকে সে এক মানসিক পীড়া সহ্য করে এসেছে। কিন্তু কখনোই পরাজয় মানতে চায়নি। পরিবার তাকে বেঁচে থাকার যে মন্ত্র শিখিয়েছিলো বুদ্ধিপ্রাপ্তির পর সে আবিষ্কার করেছে এ অকেজো। তার রঙিন স্বপ্নগুলো স্বার্থপর জগতের সাথে যুদ্ধ করে যখন মুমূর্ষুপ্রায় তখন তার মনে হলো পৃথিবীটা বর্ণহীন। এখানে বেঁচে থাকাটাই প্রধান সংগ্রাম। স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাও। তোমার যা প্রয়োজন তা আদায় করে নাও। জীবনের প্রতিটা ধাপই যেন নতুন একটা করে সংকট নিয়ে উপস্থিত হয়। অবশেষে তার অন্তরাত্মা উচ্চারণ করে¬— এখানে তোমাকে আপনা থেকে কেউ কিছুই প্রদান করবে না। এই নিষ্ঠুর জগতে যা তোমার বলে নির্বাচন করেছে তোমার মন, তা অধিকার করে নাও যে কোনো পন্থায়। অবশ্য তার এই মানসিক যন্ত্রণার সাথে তার জীবন সবদিক থেকে মেলে না। একদিক থেকে বিচার করলে শিশুকাল থেকে সে অত্যন্ত যতেœর সাথেই বড় হয়েছে। অনেকের তুলনায় সে পর্যাপ্ত সুখভোগ করে চলেছে। সুখের বিষয়টা মানসিক বিবেচনা করলেও সে বেশ সুখী কেবলমাত্র একটি বিষয় ব্যতীত। সে একটি বিষয়ই তার মধ্যে প্রকট আকার ধারণ করেছে কেননা তা স্বপ্নবিজড়িত। সম্ভবত কিশোর বয়সের রঙিন স্বপ্নগুলো যখন সে এক এক করে ভঙ্গ হতে দেখেছে তখনই তার মনে এ ভাবের উদয় হয়েছে। ছোট থেকেই জুনায়েদ মেধাবী। বাল্যসুলভ স্বপ্ন ও কল্পনার ভাঙ্গন মাঝপথে তার পাঠে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। কিন্তু যে মানসিক শক্তি সে সঞ্চয় করেছিলো তা তাকে এতোটা বিদ্রোহী আর কৌশলী করে তুলেছিলো যে, জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোতে সে সকল ধাক্কাই অতিক্রম করতে শিখেছিলো। এমনি করেই জুনায়েদ সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত মানুষ। সামনে, পেছনে, ডানে, বামে কোনো পিছুটান তাকে টলাতে পারেনি কখনো। তার চতুর্দিকে অসংখ্য মানুষ। কেবল কাজ আর কাজ। এই দ্রোহই তাকে বিত্তবান এবং প্রভাবশালী মানুষে পরিণত করেছে। মানুষ তাকে ভয় পায়, শ্রদ্ধা করে। সমস্ত মিলিয়ে সে এক বীভৎস সুখ অনুভব করে! কিন্তু জুনায়েদ জানে এ মানুষের সমুদ্রে তার আপন মানুষটি নাই। সে একা। স্বপ্নহীন পথে কর্মময় ছুটে চলাই তার উদ্দেশ্য হলেও পুরোনো স্বপ্নগুলো তাকে কখনোই নিস্তার দেয়নি। ক্ষণিকের অবসরেই তার কিশোর বয়সের অচরিতার্থ স্বপ্নগুলো মনে পড়ে যেতো। আর সমস্ত পৃথিবীটা মনে হতো বিষময়। এক অসহ্য যন্ত্রণা আর অশান্তি তার হৃদয়কে ভরিয়ে দিয়ে চলে যেতো। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে তার চিন্তার স্থানটা দখল করে বসলো ‘স্বপ্ন’। তার চিন্তা ও গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো মানুষের চরিতার্থ এবং অচরিতার্থ স্বপ্ন। দিবা ও নিদ্রায় মানুষ যে স্বপ্ন ও কল্পনার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে তার মনস্তাত্ত্বিক সূত্র উদঘাটনে সে সর্বদা মনযোগী হয়ে উঠলো। অবশেষে তার চিন্তা ও গবেষণা পরিণতির পথ পায়। সমস্ত সাজিয়ে তা পুস্তক আকারে মুদ্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অল্পদিনের মধ্যেই তার এই মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থটি প্রকাশিত হবে। মুদ্রণের কাজ আরম্ভ হয়েছে। অন্যান্য ব্যবসাও সফলতার সাথে অগ্রসরমান। এক রাতে বিছানায় শুয়ে জুনায়েদ এই সমস্ত নিয়ে ভাবছে। এই জগতের কণ্টকিত পথে মানুষ অসহায় পথিক। অপরিচিত পথ ধরে তার গন্তব্যহীন ছুটে চলা… হেঁটে চলেছে পথিক। তার কী গন্তব্য তা সে জানে না। সে কেবল জানে¬— তাকে যেতে হবে। থেমে থাকলে চলবে না। এ জন্যই সে ছুটে চলতে চায়। কী চেয়ে সে পথে নেমেছিলো তা সে জানে না। পথ চলতে চলতে সে আবিষ্কার করে তার কী চাওয়ার আছে। সমস্ত দিন হাঁটার পর সে এক অরণ্যের মুখোমুখি হয়। তারপর অরণ্যের জঙ্গল বরাবর হেঁটে চলে। সন্ধ্যা হয়ে আসে। জঙ্গল থেকে বের হবার পথ সে খুঁজতে থাকে কিন্তু পায় না। ফিরে আসার পথও সে বিস্মৃত হয়। সুতরাং সামনে এগোনো ছাড়া উপায় নেই। এভাবে জঙ্গলেই রাত আরম্ভ হয়। ঝাপসা আলো-অন্ধকার, শুনশান নিরবতা, গা ছমছম করা স্তব্ধ পরিবেশ। থেকে থেকে জোনাকির ইতস্তত আলো আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক রহস্যের উদ্রেক করে। পথিক বেরুবার উপায় খুঁজতে থাকে কিন্তু বের হবার পথ কিছুতেই আবিষ্কার করতে পারে না। সে ভাবে, জঙ্গলের এই রাতই হয়তো তার জীবনের শেষ রাত হবে। মনকে পরিস্থিতির অনুকূলে নিয়ে আসলে প্রসন্নতা প্রাপ্তি ঘটে। পথিক বোধ হয় সে উপায়ই আবিষ্কার করেছে। রাত কিছুটা অতিক্রান্ত হলে আকাশে জ্যোৎ¯œা দেখা দেয়। ভয়ানক আলোকিত জ্যোৎ¯œা। গাছের পাতার ফাঁকে চাঁদের আলো মাটি ও ঘাসের উপর পতিত হয়। মৃদু বাতাসে গাছের ছায়াগুলো ইতস্তত কাঁপে। হঠাৎ তার কানে মানুষের কণ্ঠনিসৃত আওয়াজের ন্যায় ধ্বনি ভেসে আসে। ধ্বনিটি অকস্মাৎ থেমে যায়। সে চমকে ওঠে। ভাবে, এই গহীন অরণ্যে মানুষ আসবে কোথা থেকে? এ নিশ্চয় তার মনের ভুল। আবার তার মনে আশা জেগে ওঠে। হয়তো নিকটেই কোনো লোকালয় রয়েছে কিংবা এই অরণ্যে হয়তো কোনো মানুষের আবাস আছে। সে বিমনা হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর সে পুনরায় পূর্বোক্ত ধ্বনিটি শ্রবণ করে। সে নিশ্চিত হয় এ নিশ্চয় কোনো মানুষের আওয়াজ। পথিক চিৎকার দেয়— ‘কেউ আছেন? কোথাও? কেউ আছেন?’ কোনো সাড়া জাগে না। সে আবার হাঁটতে থাকে। সামনে অগ্রসর হলে ধ্বনি আরো কিছুটা স্পষ্ট হয়। সে বুঝতে পারে ধ্বনিটি সামনে থেকেই আসছে। আরেকটু এগিয়ে গেলে সে একটা আলপথ সনাক্ত করে। তার মনে হয়, নিশ্চই এ পথে মানুষের চলাচল রয়েছে। সে দ্রুত আলপথ ধরে এগিয়ে চলে। চাঁদের আলোয় দূর থেকে একটা কুঁড়েঘর দৃশ্যমান হয়। কুঁড়েঘরটি নিতান্তই কুঁড়ে। উপরের চালা জায়গায় জায়গায় খসে গেছে, বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে কোনো কোনো স্থানে খড় লুপ্ত হয়েছে। সে আরো দ্রুত এগিয়ে চলে। কুঁড়েঘরটির কাছাকাছি আসলে ধ্বনিটি প্রকট হয়। মনযোগ দিয়ে শুনলে পথিক বুঝতে পারে এ কোনো একক ধ্বনি নয়, এ যুগ্মধ্বনি। নর ও নারীর মিলিত স্বর। বোঝা যায় তারা কখনো হাসছে, কখনো গুনগুন করে কথা কইছে। পথিক কুঁড়েঘরের আরো নিকটে উপস্থিত হয়। সে শোনে নরনারী দুজনে সমস্বরে হাসছে। সে এক আশ্চর্য মোহনীয় হাসি। এরকমভাবে পথিক নিজে কখনো হাসে নি, কাউকে হাসতেও দেখে নি। সে তখন বিহ্বল হয়ে চিন্তা করছে— এমন অবাধ প্রাণখোলা হাসি মানুষ হাসে কেমন করে। পূর্বোক্ত অভিপ্রায় ভুলে পথিকের মনে নরনারীর হাসি দেখার কৌতূহল প্রকট হয়। সে কেবল জানতে চায় এমন করে তারা কীভাবে হাসে। কুঁড়েঘরের প্রবেশপথ বেড়া দিয়ে তৈরি একটা ঝাঁপি দিয়ে আটকানো। সেটি আলগা করে লাগানো আছে, ভেতর থেকে রুদ্ধ করা হয়নি। আলতো করে পথিক ঝাঁপিটি সরায়। উপরের চালা থেকে খড় খসে যাওয়া ফোকর দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে প্রবেশ করেছে। পথিক দেখতে পায়, ঘরের ভেতরে একটি সজ্জা। সেখানে দুজন যুবক-যুবতী একটি জীর্ণ কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে। কারো মুখম-ল দৃষ্টিগোচর হয় না। পথিক আস্তে করে ডাক দেয়- ‘কে ওখানে?’ ভেতরের যুবকটি কাঁথা সরিয়ে পথিকের দিকে তাকায়। উপরের চালা থেকে চাঁদের আলো যুবকের মুখে এসে পড়ে। সে আলোয় তাকে স্পষ্ট সনাক্ত করা যায়। পথিক দেখে, যে মুখম-ল তার দিকে তাকিয়ে আছে তা তার নিজেরই মুখ। সে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। পেছনের সমস্ত বিস্মৃত হয়ে সে পুনরায় ছুটতে থাকে। এই মোহিনী জগতকে ফাঁকি দিয়ে যেনো সে পালাতে চায়। পলাতক পথিক ছুটতে ছুটতে নিজের অজান্তেই জঙ্গলের রজনী থেকে নিষ্কৃতি পায়। সে এখনো জীবিত রয়েছে এই তার প্রধান ভরসা। তখন শেষরাত। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সম্মুখে পড়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। বিশাল ধূ-ধূ প্রান্তর, জনশূন্য, কোনো লোকালয় নাই। পথিক বালির পথ ধরে হেঁটে চলে। অনেকটা পথ হাঁটার পর পথিক তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। সে পানির উৎস সন্ধান করতে থাকে কিন্তু বিশাল প্রান্তরের মধ্যে কোথাও কোনো পানির চিহ্ন নেই। আরো খানিকটা পথ সে অতিক্রম করে। ততক্ষণে পূর্বগগন ভেদ করে ভানু উদিত হয়েছে। পথিক অনেকটা দূরে দেখতে পায় সূর্যের কিরণে একটা বিশাল সরোবরের পানি চিক চিক করছে। পথিকের মনে আশার সঞ্চার হয়। পথিক দ্রুত সরোবরের দিকে এগিয়ে চলে। পথিক জানে, সূর্যকিরণে মরুভূমির মধ্যে মরীচিকার প্রাদুর্ভাব ঘটে। কিন্তু এ মধ্যগগনের সূর্য নয়, প্রভাতের সূর্য। সরোবরের নিকটে গেলে পথিক বুঝতে পারে, এ তার ভ্রম নয়, এ প্রকৃতই সরোবর। পথিক সরোবরে নেমে মনের ইচ্ছামতো তৃষ্ণা নিবারণ করে। সরোবরের পানি এতোটা উজ্জ্বল যে, একেবারে তলা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। পানি খাওয়া শেষে পথিক লক্ষ্য করে সরোবরের নিচে পানির মধ্যে স্বচ্ছ কাচনির্মিত একটি ঘর। সেখানে সজ্জার উপর একটা শুভ্র বিছানা পাতা। বিছানায় এক যুবক সজ্জিত। সে ডানদিকে পাশ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। তার পৃষ্ঠদেশ দেখা যায়। বোঝা যায় যুবক নিদ্রিত। তার শিয়রের নিকটে এক রমনীয় যুবতী মাথা বাঁকিয়ে বসে আছে। তাকে সনাক্ত করা যায় না। মনে হচ্ছে যুবতী অনেকক্ষণ যাবৎ যুবকের মাথায় হাত বুলানোর জন্য ইতস্তত করছে কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না পাছে যুবকের নিদ্রাভঙ্গ হয়। পথিক সরোবরের হাঁটুজল পর্যন্ত নেমে অবাক দৃষ্টিতে রমনীর এ লীলা চেয়ে চেয়ে দেখছে। অবশেষে যুবতী রমনী যুবকের মাথায় তার কোমল হাতটি ছুঁইয়ে দেয়। অমনি যুবকের নিদ্রাভঙ্গ হয়ে যায়। যুবতী তৎক্ষনাৎ তার হাত সরিয়ে নেয়। যুবক মাথা বাঁকিয়ে যুবতীর দিকে তাকায়। যুবকের মুখম-ল তখন পথিকের দৃষ্টিগোচর হয়। পথিক পুনরায় দেখে, যে মুখম-ল সে দেখছে তা তার নিজেরই মুখ। পথিক লাফিয়ে সরোবর থেকে উঠে দৌড়াতে শুরু করে। এই মোহিনী জগৎ থেকে সে পুনরায় পালাতে আরম্ভ করে। মধ্যাহ্ন পর্যন্ত সে ভাবলেশহীনভাবে দৌড়ায়। দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে সে কিছুক্ষণের জন্য বসে পড়ে। বিশ্রাম শেষে এ দীর্ঘ অবসাদের পর তার শ্রান্তি বোধ হয়। সম্মুখে তাকিয়ে পথিক দেখে সুশোভিত এক উদ্যানপানে এসে সে উপস্থিত হয়েছে। সুশোভিত সে উদ্যানে, অপূর্ব শীতলতায় পথিকের শ্রান্তি লঘু হয়। বিচিত্র ফল ও ফুলের বৃক্ষ দ্বারা সমস্ত উদ্যান পরিপূর্ণ। পশুপাখি অবাধে সে উদ্যানের ফল ভক্ষণ করে। পাখির মুখর কলরব মনোহর ধ্বনিচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পথিক সে উদ্যান থেকে প্রয়োজনমতো আহার সেরে নেয়। তারপর সেই উদ্যানমধ্যে হাঁটতে হাঁটতে অপরাহ্ন হয়ে আসে। পথিক দূর থেকে গগনমুখী একটি চূড়ার মতো কিছু লক্ষ্য করে। সম্মুখে এগিয়ে গেলে পথিক সনাক্ত করে উদ্যানপ্রান্তে একটি বিশাল বিচিত্র অট্টালিকা। নিরীক্ষণ শেষে পথিকের বুঝতে বাকি থাকে না— এ এক সুদৃশ্য প্রাসাদ। পথিক কৌতুহলী হয়ে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যায়। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। উদ্যানমধ্যে শুনশান নিরবতা। মাঝে মধ্যে সন্ধ্যাপাখির আশ্চর্য মায়াময় ডাক। পশুপাখির বিচিত্র মুখরতা যেনো অকস্মাৎ গায়েব হয়ে গেছে। প্রকৃতির এ নির্জন অসহায়ত্ব পথিকের কাছে কটাক্ষের মতো মনে হতে লাগে। এমন সময় এক নতুন কৌতূহল পথিককে বিভোর করে তোলে। পথিক দূর থেকে লক্ষ্য করে প্রাসাদের বহির্বারান্দায় এক যুবতী বসে আছে। তার সম্মুখে একটা কিছু লম্বালম্বিভাবে রাখা। পথিক নিকটে এগিয়ে যায়। সে যুবতীর মৃদু ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করে। রমনীর পৃষ্ঠদেশ পথিকের সম্মুখবর্তী সুতরাং তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না। পথিক রমনীর ক্রন্দনের হেতু আবিষ্কারের চেষ্টা করে। সে আরো নিকটে এগিয়ে যায়। পথিক দেখে— রমনীর সম্মুখে কফিনের ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা সজ্জা। সজ্জাটি এক যুবকের লাশ, তার শিয়রে বসে যুবতী মৃদুস্বরে কাঁদছে। লাশটির মুখম-ল উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। মুখটি যুবতীর মুখের দিকে বাঁকানো। রমনীর চোখের পানিতে যুবকের গ-দেশ, মুখম-ল, বুকের লোমগুলো ভিজে যাচ্ছে। দূর থেকে মুখটি সনাক্ত করা যাচ্ছে না। পথিক লাশটির মুখম-ল দেখতে চায়। সে কে, যার জন্য এই নির্জন উদ্যানে রমনী একাকী ক্রন্দন করছে? পথিক যুবতীর ঠিক পশ্চাতে দাঁড়িয়ে কফিনে রাখা লাশটির মুখম-ল সনাক্ত করার চেষ্টা  করে। পথিক দেখে, লাশটির যে মুখম-ল সে সনাক্ত করেছে তা তার নিজেরই মুখ।

অকস্মাৎ ল্যান্ডফোনে রিং বেজে ওঠে। উন্মুক্ত জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করেছে। অচরিতার্থ প্রশান্তির স্বাপ্নিক আয়োজন সমাপ্ত হয়ে আসে। জুনায়েদের ঘুম ভেঙে যায়। ফোন ওঠালে অপরপ্রান্ত থেকে খবর আসে— ‘স্বপ্ন’ নামে তার যে পুস্তকটি মুদ্রণের অপেক্ষায় ছিলো সেটির মুদ্রণের কাজ শেষ হয়েছে। জুনায়েদ কোনো কথা বলে না। নিরবে ফোন রেখে দেয়। এবার তার সেলফোন বেজে ওঠে। জুনায়েদ ফোন ওঠায়। খবর আসে— তার কোম্পানিতে যে নতুন পণ্য আমদানি করা হয়েছে তার শেয়ারের মূল্য তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুনায়েদ কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না। জুনায়েদের অপর সেলফোনটি বেজে ওঠে। খবর আসে— কোম্পানির নতুন শেয়ারের বর্ধিত লভ্যাংশ ব্যাংকে ড্রপ করা হয়েছে। জুনায়েদের সেলফোনে একটি বার্তা আসে— চৌদ্দ বছর ধরে সে যে কুকুরটি লালন-পালন করছিলো সে মারা গেছে। জুনায়েদ তার দুই হাতের আঙুলগুলো মাথার চুলের মধ্যে সঞ্চালিত করে অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ভাব বিমোক্ষণ ঘটলে জুনায়েদ তার ঘরে বিদ্যমান বড়ো দর্পণটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকক্ষণ ধরে সে নিজেই নিজের মুখম-ল নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করে। তার মনে হতে লাগে দর্পণের বাইরে অস্তিত্বমান যে এবং দর্পণের ভেতরে সে যাকে দেখছে দুইজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি। দর্পণের আরো সম্মুখে গিয়ে সে নিজেকে আরো নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করে। জুনায়েদ দেখে, তার দাড়িগোঁফ এবং চুলের অর্ধাংশ পেকে গেছে। কম্পমান ঠোঁটে সে চীৎকার করে ওঠে‘ড্রাইভার, গাড়ি বের র্ক, খুব দ্রুত’।

নীলপদ্ম
নাজমুল হক লিংকন
আজ আড্ডা থেকে ফিরতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এখন একটা রিক্সা পেলে হয়। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে এগারোটা বাজে। দাঁড়িয়ে আছি রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে। রাতের নিস্তব্ধতায় পুরো এলাকাটি এক অন্যরূপ ধারণ করেছে। চারিদিকে ভীষণরকম শূন্যতা জেঁকে বসেছে।

একটা রিক্সা দেখা গেলো। ডাক দিলাম, ‘এই রিক্সা যাবে?’

রিক্সাওয়ালা আমার কথা শুনলো বলে মনে হলো না, আপন মনে গান গাইতে গাইতে চলে গেলো। রমনা পার্কের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আজ সম্ভবত পূর্ণিমা। মাথার উপর বেশ বড়সড় একটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চাঁদের আলো ফিকে হয়ে আসে। এ এলাকায় ছিনতাইকারীর উপদ্রব আছে কিনা কে জানে। চারপাশে হালকা কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। হঠাৎ কুয়াশার কথা মনে পড়লো। ওকে ফোন দেয়া দরকার। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ডায়াল করলাম। রিং হচ্ছে। ওপাশ থেকে ওর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো…

-হ্যালো, দুপুরে ফোন ধরলি না কেনো?

-ব্যস্ত ছিলাম।

-তোর আশেপাশে কুকুর ডাকছে কোথায়? তুই কি বাইরে?

-হুম।

-এতো রাতে বাইরে কি করিস?

-ফোন করেছিলি কেনো সেটা বল।

-জানিস আজকে না একটা ছেলে আমাকে প্রপোজ করেছে।

-বলিস কি? তোর মতো পেত্নী কে…

-উফ… ফাজলামো করবি না।

-তারপর, তুই কি বললি?

-বলেছি ভেবে দেখতে হবে।

-তা কি ভেবে দেখলি?

-ভাবাভাবির কিছু নেই। আমার অলরেডি কয়েকটা আইটেম পেন্ডিং হয়ে আছে। এখন আমার প্রেম করার সময় নেই।

-আইটেমটা আবার কী?

-মেডিকেলের ছোট ছোট পরীক্ষা।

-তাহলে ছেলেটাকে সরাসরি না বলে দিলেই তো পারতি…

-ছেলেটা আমাকে বললো তার নীলপদ্মগুলো সে আমাকে উৎসর্গ করতে চায়। আমি সেগুলো গ্রহণ করবো কিনা। একথা শোনার পর আর আমি ওর মুখের ওপর না বলতে পারি নি।

-আরে গাধা ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’ বইটা পড়িসনি?

-ও আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। তা এতো পেঁচিয়ে বলার দরকার কী? সরাসরি বললেই তো হয় আই লাভ ইউ।

-তোর মতো রসকষহীন মানুষের সাথে কেউ কোনোদিন প্রেম করবে না।

-তো প্রেম করার জন্য কি এখন আমাকে এরকম ন্যাকামো করে কথা বলতে হবে?

-ও, তোমার কাছে এটা ন্যাকামো মনে হচ্ছে? আর তুমি নিজে যে ফেসবুকে দার্শনিক টাইপের স্ট্যাটাস দিয়ে বেড়াও সেটা ন্যাকামো না?

…আমি হাসলাম…

-যাই হোক, ছেলেটাকে পরে তুই কী বলবি?

-এখনও বুঝতে পারছি না।

-তোর বয়ফ্রেন্ড আছে একথা বললেই তো হয়।

-মিথ্যে বলতে পারবো না।

-হুম।

-আশ্চর্য তো, হুম কী? আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়?

-কী কাজ?

-তোকে আমার বয়ফ্রেন্ড বানিয়ে ফেলি, তাহলে আমাকে আর মিথ্যে বলতে হবে না।

…একথা বলে মেয়েটা খিলখিল করে হাসতে লাগলো।

ওর হাসিটা সুন্দর। আমি চুপ করে রইলাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে হয়তো মেয়েটা আরো বেশি মজা পেলো…

-রুশো…

-হুম। বল।

-প্রেম করবি আমার সাথে?

…ওর কণ্ঠের মধ্যে এক ধরনের দুষ্টুমির আভাস…

-আমার মোবাইলের বোধহয় ব্যালেন্স শেষ, রাখি।

…মেয়েটা আবার খিলখিল করে হাসতে লাগলো। আমি ফোন কেটে দিলাম। নিজের অজান্তেই একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। কুয়াশার মুখে এ ধরনের কথা আমি আগেও শুনেছি। প্রথম প্রথম মনে হতো ও হয়তো আমার প্রতি ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যাপারগুলো ওর কাছে কখনোই সিরিয়াস ছিলো না। আমি জানি, আমি ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে ও আরো বেশি দূরে সরে যাবে।

নিস্তব্ধ রাস্তায় আমি একা হেঁটে চলি। হয়তো আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য চাঁদটাও আমার সাথে সাথে চলতে থাকে। শিরশির করে মাঝেমাঝে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। বয়ে যাবার সময় কানের কাছে ফিসফিস করে কি যেনো বলতে চাইছে। হয়তো বলছে আমার নীলপদ্মগুলোও এরকমই কোনো এক কুয়াশাঘেরা রাস্তায় চলতে চলতে কুয়াশার মাঝে হারিয়ে ফেলেছি নিজের অজান্তেই।

তাঁর জন্য অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করেছি…

বেঞ্চে তখন অনেকেই। বাইরে নতুন কুয়াশা। নিষ্পাপ রোদে ছেয়ে গেছে মোটা ঘাসের ডগা। সার বাঁধা আমগাছগুলা ভূত ছেড়ে জুবথুবু। আলোর কারণে সব ভূত পালিয়েছে। নেই টোনাটুনির আওয়াজ। শুধু আকাশজোড়া ছড়ানো দিগন্তের শেষ কিনারের উৎসব আর বিরহের দাপদাপি তখন। একছেলে প্রথম এক সুযোগ পাওয়া দুপুরে ঘনিষ্ঠ এক রমণীর শরীরে হাত রেখেছিলো। সে হাত কীভাবে তরঙ্গ কেটে তাকে স্পর্শ করেছিলো, কেউ জানে না। নাকি রমণীই অতিরিক্ত আবেগে যুবকের হাতটি নিয়ন্ত্রণে আনিয়া মনে মনে খুব বেশি পছন্দের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ খেলার ছলে বুকের ওপর ফেলিয়া দিয়াছিলো, কে জানে। আহা! তখন তো তড়পানো গরমে ঘোরানো ফ্যানের বাতাসও ভর করে সর্বত্র। বাইরের আলোয় অনেক পাখি ছিল আর হাটের মানুষের সম্মিলিত আওয়াজ ছিলো মন-কাঁপানো। তারপর অনেকক্ষণ কাটে। হাতটা কোনো কাজ করে নাই। পরে যদিও সেই হাত সবটুকু দখলে নিতে সামর্থ হইয়াছিলো। অনেককাল সেসব ঘটিয়া চলে। পদ্মার তীরে, ফোলানো জলের নৌকোয় আর ওপারের কাশঢাকা চরের নিস্তব্ধ দুপুরে বালুকাবেলায়। পাকশীর রেলব্রীজে খুব দৌড় হইয়াছিলো দুজনের। এপাড়া-ওপাড়ার ভিসা পেরিয়ে রেলিং বেয়ে পদ্মা দেখে দেখে সুখসুর টেনে টেনে ইক্ষু গবেষণার প্রাচীর পেরিয়ে কড়া মিষ্টির আমতলার নীচে বসা কতো রূপকথার কাহিনি সকলের তরে ফাঁদানো হতো! গোগ্রাসে তা হজমও করতো চাঁদ। হায়রে আমার দুঃখচাঁদ, যে এতোদিন নিশ্চয়ই জ্যোৎ¯œা দিতে ভুলিয়া গিয়াছিলো! তাই পালানো বেলায় হঠাৎ রেলের যাত্রী ছাউনিতে হাতে হাত মিলিয়া কথা কহিয়া চলে। কোনোদিন আর ওসব পাওয়া হইবে না। কতোকাল যেনো আর ওখানে ওই বাতাসের ধ্বনি নির্দিষ্ট লয়ে বহাইয়া চলে কিন্তু দুটি মানুষ চিরকাল নাই হইয়া থাকিবে। আর ওই ছাউনির পাশ দিয়া বুঝি আর কখনো ট্রেন চলে না। রেলগাড়ির ঝমাঝম শব্দও মিলিয়া গিয়াছে বহুকাল। সেই উঁচা মেঠোপথ আর ঢালু আলপথে কোনো বাবুই খেলিয়া চলে। নাই-হীন সুরে সে কেবল বৃথাই কিচিরমিচির করে। তাইতো হয় নাই আর এক রিক্সায় চলা। না কোনো মানুষ নয়, তবে কেউ বুঝি নাই কতোকাল। চলবেও না অনেকদিন। আমরা হারাইয়া গিয়াছি। মৃত্যু আমাদের নিয়া গেছে বহুদূর, অনেকদূর পরাপারে। না ফেরার মসনদী এক পেল্লাই জগতে।

কিন্তু সে আটষ্যড়ি, জাহাজ কোম্পানীর মোড়, আলোহীন তিনকোণা বিল্ডিং, মালদা হোটেল কিংবা কারমাইকেল কলেজের সিমেন্ট বাঁধা পথ নিঃশেষ না হইয়া এখনও বাঁচিয়া আছে, ছাইয়া দিয়া যায় সব। ঘরে তোলা মানুষের ন্যায় আয় আয় করে সব। কবেই না সব চলিয়া গিয়াছে— কলেজের সহপাঠি আবদুল আজিজসহ। যার কথা মাজেদ স্যর ইংরেজির ক্লাসে মাঝে মাঝে বিগড়াইয়া বিগড়াইয়া কন আর হতাশ করেন এই বলিয়া যে, ‘আজীজের মৃত্যুর কী দাম দেবে এই রাষ্ট্র কিংবা যে দল সে করিতে চাইতো তাহার নেতারা?’ কিন্তু হায় কিছুই হয় নাই। প্রতিশোধ হিসেবে শুধু তারা মিঞা ৯০০ বিঘা জমি প্রাণছুট দিয়া এরশাদ ভবনে আশ্রয় নিয়া বাঁচিয়াছেন। এখন তিনিও তো নাই, কবেই কোন পাকুড়তলায় শায়িত হইছেন ঔরসজাত তিন তিনটা কন্যাকে জন্ম দিয়া। মানুষটা বুঝি তার সময়ে আটকা নাই। কারণ, চাঁদ বা সূর্য তাহাকে নিয়তিতে বাঁধিয়াছিলো। তাইতো বেঞ্চের সম্মুখে রহিম স্যর ন্যূব্জ ঠ্যাঙে ভর করিয়া বলিয়া চলেন ‘এদেশ লেগেছে ভালো নয়নে’; একসময় কান্দিয়া ফেলেন— কারণ, ওইটা রবীন্দ্রনাথের লেখা। এতো বাস্তব আর নিজের মোহের তরীতে তা চিহ্নিত— বোঝাবার নয়। কলস কাঁদিয়া বাজে— কথায় এতো সত্যে মাখা আর স্থির করা নিরুপায় নিদান-উৎসব। আসমা, রুলি, সামাদ, নবাব, কনক, সহেলি, শামীম, মনির স্যরের কান্নায় স্তম্ভিত হইয়া পড়ে। আসমা ভিন্ন উচ্চতায় স্যরের প্রশংসা করিয়া কয়, কী চমৎকার তাহার বচনকৌশল। গলাটা অনেকটাই মজির স্যরের ন্যায়। সে সকল শুনিয়া বোধ করি আমরা প্রথম শিক্ষিত হইয়া পড়ি। তারপর সে শিক্ষায় মতিহার হলের ডাইনিং-এর পাশের মোহন বাগানের সজ্জায় ছাড়াইয়া বসি। মহুয়ার মাতাল গন্ধে ছুটিয়া আসে দুলালের পায়ে— তখন সে আসমার কাহিনী কয়। সত্য করিয়া বলে, ‘ও ভালো পোর্ট্রেট আঁকে।’ এমন মেয়ের জন্যই তো অপেক্ষা, এই মতিহারের মধ্যালোকিত জ্যেৎ¯œায় তীর সোজা বৃষ্টিতে অনেক রাত করা সময় ছাপাইয়া চলে। সিগ্রেট আর বিড়ির ধোঁয়ায় তখন সকলেই ঘামায় কিংবা ব্লু ফিল্মের শো দেখিয়া লুঙ্গি চাপিয়া অন্যত্র চলিয়া যায়। রমণপিপাসুরা কীসের এক আয়োজনে ব্যস্ত হয়। ধ্যাৎ, আসমা কী ওরকম মেয়ে! তবে সেই বাত্যাতাড়িত উনপঞ্চাশ বায়ু আমাদের খুব দ্রুত শহীদ মিনারের দিকে তাকাইতে প্ররোচিত করে। শহীদ মিনারের পাদদেশে পৌঁছাইয়া যে আলোকবাতি জ্বলিয়া ওঠে আসমারা সেটা কয়েকগুণ আরও বাড়াইয়া দেয়। কারণ, প্রাণহীন সমাধিতে অনেকেই তখন প্রভাতফেরি করে— হাজির, আজ মহান ভাষা দিবস, এই শপথের ভেতরেই স্বৈারাচারের নিপাত সত্য ঘোষিত হইবে।

পুনরুক্তিতে মনে পড়ে, সবকিছুই এখন আর নাই। মৃত। অমর। মরণোত্তর। নাইহীন নাই। উপশহরের সেই কলাপ্সিবল গেট আর শূন্য স্মৃতিমোড়া বাড়িটার রাস্তায় যে মেয়েটি কহিয়াছিলো, আজ ইলিশ আনছি। রান্না হইছে। খাইয়া নাও। আমিই খাইয়া দেই। হাত, মাখা হাত, আর তারপর জড়ানো সুখের আলাপ কতোদিন সেসব সুখের মধ্যে মরিয়া গিয়াছে। সেসব আর ফিরিয়া আসিবে না। এইসব স্মৃতির জন্য হুহু বাতাস বয়। মায়া রহিয়া যায়। তৈরি হয় হারানো মেয়ের জন্য সবটুকু স্নেহাশিস। তার হস্তনখচুলমুখমাথাঠোঁটবুকপীঠবাহুজঘন বহিয়া দুঁহু কান্না লোপাট হইয়া চলে। হায়রে আমার পরাণ! কিন্তু একবারটির জন্য যখন সে স্বপ্নের তলে দুঃখের কথা কয় তখন বেলা তো ডুবিয়া গিয়াছে, নির্জন রাস্তায় কতো মানুষ আখ্যানভরা হইয়া উঠিয়াছে আর শোনাইছে, ‘বাদ দেও’। যাহাতে সুখ নাই সক্কলটি ছোট্ট মনে হয় সেই কথা কমু না, তখ্খনিই জড়াইয়া ধরিয়া ঠোঁটে ঠোঁট পুরিয়া দিয়া তুমুল আলোড়নে স্তন মাখাইয়া ধরিয়া ভাঙা চাঁদের দিকে মুখ ফিরিয়া কয় ‘কখ্খনো আমারে ছাড়িয়া যাইবানা’। সুখ সুখ করিয়া স্বপ্নের সেই বোঝা ক্রমশ বাড়াইয়া সমস্ত রাস্তার কোণার অন্ধকারে বাঁশমতি গন্ধ হইয়া সে অনেক বড়রূপে জাগিয়া ওঠে, ওই মনের কুঠুরিতে। মন আর মান তখন ধন্দে পড়ে। তারপর… সকাল-দুপুর-সাঁঝে তাহার আর সাজা হয় নাই। সত্যিই বুঝি সে সাজা ভোগ করিয়াছিলো। পাইয়াছিলো আত্মার আস্বাদ। আমরা সেই সত্যের আর অমরত্বের আনুকূল্যে অনেকদিন বাঁচিয়া আছি। বাঁচিয়া রই। তুচ্ছ হয় নাই কিছু বলিয়াই বাবুই দোলানো বুড়া তালগাছটায় ভরিয়া ওঠে অনেক আলো আর প্লাবিত কমলা রোদ।

[বি. দ্র. : সৎ-অনুভূতি বিজনে তো বটেই এমনকী শতকর্মেও উপযুক্ত সময়ে ঠেসাঠেসি করিয়া জন্মানো বৃক্ষের অনেক ফলের মধ্যে শক্ত বোঁটায় আটকাইয়া থাকে এবং আকারধারণ করে।]
[৬ অগ্রহায়ণ ১৪২২ বঙ্গাব্দ]
চিহ্নপ্রধান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আলোচনা