স্নান ৪০

স্নান ৪০
একটি চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ

 

 

চিহ্নপরিবার
১৩০, শহীদুল্লাহ কলাভবন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদক
অতন্দ্র অনিঃশেষ
প্রচ্ছদকার
সোহাগ

 

চিহ্নপ্রধান ॥ রাজার পুকুরে কেন প্রদীপ জ্বলে নি

ঘরে ঘরে তখন উৎসব। বকুল বিছানো পথে ছুঁচো সাঁতরে চলে। বেশ বেপরোয়া ছুঁচোটা। যে জঙ্গলে সে ছিল সেখানে সে পরাধীন। এখন অধীনতামুক্ত হয়ে এই বকুলতলায় ঘোরাফেরা করে। ভোরবেলায় এখন এখানে শাসন নেই। নেই মানুষের গুঞ্জন। চলাফেরা। শুধু মৃদুমন্দ বাতাস। তাতে দুটো অনাথ বালিকা ফুল কুড়োয়। ছুঁচো এখন নিজেকে সবল মনে করে। এ রাষ্ট্রে তারা তিনজন। তিনজনই অনাথ কিন্তু ক্ষমতাশালী। বলদীপ্ত। এভাবে দিন পেরুলে রাত আসে। তবে ভোরটাই তাদের ভালো কাটে। তবে ছুঁচোর স্বাধীনসত্তার আঁধার ঘুচে যায় বেলা বাড়লে। বেলার তাপে প্রদীপ জ্বলে বিশ্বব্যাপী। তখন অনাথরাও দূরে চলে যায়, খাদ্যের সন্ধানে। রাজার বাড়ির রাজঘাট পর্যন্ত। অনাথরা কোনো একদিন দেখে ফেলে রাজঘাটে অনেক মানুষ। তারা সর্বস্বান্ত। বেপথু। অস্থির। কান্নারাশিতে শোকগ্রস্ত। অনাথরা জানতে পারল এখানে যে পুকুর উৎসব তাতে আজ প্রদীপ জ্বলেনি। কারণ, জীবহত্যা হয়েছে। জীবহত্যার ক্রন্দন চতুর্দিকে তখন ছাপানো। ভয় আর অধম চিৎকারে সর্বদিক আহাজারির আঁধার। কেউ কিছু বলতে পারছে না। কার অপরাধে কে অপরাধী কেউ জানে না। কিন্তু কী উপায়! পাইক পেয়াদা উজির নাজির সব হতাশাবন্দী। পুকুরের চারদিকে অন্ধকার উৎপাত ক্রমশ জটিল হয়ে চলছে। রাজা কিছু জানেন না। কিন্তু আহাজারিতে তিনি ক্রুদ্ধ। কিছু আঁচ করতে পারেন অল্পকিছুটা। কী হয়েছে পুকুরে? এখনও কেন প্রদীপ জ্বলেনি? রাত ঘনিয়ে আসছে। মানুষের মেলা দূরীভূত হচ্ছে, বৎসরের এই একটা দিনের সত্য জিইয়ে রাখতে হবে তো! কিন্তু কেন এতো অসত্য আর মিথ্যা। তবে কী কোথাও কিছু ঘটেছে? জীবের অপমৃত্যু! সচেতনে বা অচেতনে; কাতরে বা অকাতরে— কে কোথায়, কেন? তারপর আর প্রদীপ জ্বলে না ওই দ্বীপে। অনাথরাও আর বকুলতলায় আসে না। ছুঁচোটাও ভোরবেলা ফেরে না। রাজার রাজ্যে ভোর আসে গৎবাঁধা নিয়মে। সূর্যও ওঠে-নামে তাতে কিন্তু তথাগত, যেন আনন্দ নেই। সবটাই অনিচ্ছা নিয়মের নিয়ন্ত্রণে। মানুষের মধ্যে যেন হতাশা লেগে আছে। অভিশাপ নেমে এসেছে মনে হয়। চতুর্দিকে অথর্বতার দুরাশা। শাপমুক্তিইবা ঘটবে কীভাবে? রাজা বেরিয়ে এলেন। সমস্যার সমাধান কী? তিনি খুঁজতে লাগলেন পুকুর উৎসব ভূলুণ্ঠনের কারণসমূহ। তবে কী রাজ্য এখন লোপাট? যা তার অলক্ষ্যেই ঘটে গেছে। রাজা চক্ষু বেঁধে, কান ও শরীর সংযত রেখে উপলব্ধিতে নামেন। কাজ হয় না। পরিশেষে সব অথর্ব প্রমাণিত হলে বাণপ্রস্থ নেন তিনি। সেখানেই সাধনায় ব্যাপৃত হন। দেখে নেন পৃথিবীর তাবৎ শক্তির তেজস্বী রূপ। দিনান্ত পেরিয়ে এখন তো কতো রাত কেটে যায়, আসে-যায়, সাধনায় একপ্রকার জ্যোতি তৈরি হয় তাতে। সেই জ্যোতিতে রাজা আর রাজা থাকেন না। একদিন জানতে পান, সেদিন তার রাজ্যে জীবহত্যা হয়েছিল। কতো নির্মম সে হত্যা, যেখানে ছুঁচো আর অনাথও রক্ষা পায় নি। অধিকার পায় নি। ভোরের বাতাসটুকু যে আনন্দ দিয়েছিল, পুকুরের উৎসব তাও পায় নি। শুধু যাগযজ্ঞ দিয়ে তো জীবের পুজো হয় না, মানুষের শান্তি রক্ষা হয় না, ধর্মও প্রতিষ্ঠা পায় না। তাইতো প্রদীপ ওই পুকুরপাড় থেকে নিষ্কাশিত হয়েছিল। রাজাও তখন আর ফেরেননি। পরে তিনি বৌদ্ধসিদ্ধ নিয়েছিলেন। এককালে এখন জানা যায়, পুকুরে দ্বীপ জ্বেলেছে, তার আলোতে সকল জীব অন্ধকার ছাড়িয়ে আলোতে এসে গেছে। মানুষ বুঝি এবার সকল প্রাণীর সুখ-সাম্য বুঝতে পেরেছে। লহরীর পর লহরী তাই তো এতো উৎসবের আওয়াজ। সেখানে সব কবিরা মানুষের জয়গান গাচ্ছে। জয়ের সন্তু তো সব কবি, তাই সবাই এসেছে। আলোকের উৎধারায় সর্বপ্রাকৃতিক জীবসত্তার জয় ঘটেছে, এখন তাদের হাতেই সব কৃত্য অর্থ পাবে।

এ দ্বীপ এখন আর নিভবে না। আর উৎসবও মলিন হবে না।

 

সুবন্ত যায়েদ ॥ মৃত্যুর বেঁচে থাকা এবং তার বেড়ে ওঠার গল্প

সকালের প্রথমভাগে সোনারোদ পায়ের কাছে হামাগুড়ি দেয়, গা বেয়ে উঠে চোখে-মুখে লেপ্টে গেলে উষ্ণতা এসে শীতের মোহ বাড়ায় আর আধখোলা জানালা হাট হয়ে খুলে গেলে তরল রোদ মগজের ভেতরে মন্ত্রণা দেয়, কুহকি জানালার ওপারে দুই জোড়া চড়ুইয়ের খুনসুটি মিস করলে মনে পড়ে তারা এখন দিনের প্রথমভাগ থেকে অবসরে গেছে আর দিনের মধ্যভাগে তাতানো রোদের ভেতরে জানালার গ্লাসে এসে আঁচড় কাটে, যেনো তাদের ছায়ার মতো প্রতিচ্ছবির ওপরে রাজ্যের আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে ক্ষান্তি দেবার কথা ভাবে। দিনের প্রথমভাগের মতো মধ্যভাগে এসে তাদের ভেতরে আর খুনসুটি দেখা যায় না এবং এভাবে সে দিনের শেষভাগের কথা ভাবতে গিয়ে মাতালের মতো হোঁচট খায়, রোদ তখন শরীরজুড়ে উষ্ণতা ছড়ায় আর কুহকি জীবনের ভাগে ভাগে ঘুরে বেড়াতে থাকলে বিষাদ হানা দেয়, জীবন কি শেষ পর্যন্ত বিষাদময় কুহকি, শরীরজোড়া রোদের মতো মনের ওপরে তখন গত হয়ে যাওয়া ঝোড়ো বাতাস, সময়, মায়ের কোলের গন্ধ না শোকাতেই হুটহাট কেমন শৈশব ছিনতাই হয়ে যায়, স্কুলের প্রাইমারি লেভেল ক্রস করে উঠতেই হঠাৎ বুকের দু’ধার অস্বাভাবিক ফুলতে শুরু করলে চেনা-অচেনা মানুষজনের চোখ কেমন চোখা হয়ে যায়, উপর ক্লাসের ছাত্ররা পরস্পরে চোখ টেপাটিপি করে আর ক্লাসের ফাঁকে বড়োদের প্রেরণায় ক্লাসের বদসাহসের ছোকড়াগুলো বগলের তল দিয়ে হাতা মেরে উঠতি স্তনে পাঁচ আঙুলের চাপ দিয়ে ছেড়ে দেয় এবং বাড়ির পাশের বড়ো ভাইটা যাকে রোজ সকালে শিউলি আর বকুল ফুলের মালা গেঁথে গায়ে গায়ে মাখামাখি করে মালা পরিয়ে দেয়া হতো তার নজরও আঠার মতো কচি বুকের ওপরে লেগে থাকে। মাইয়া আমার বড়ো হইয়া গ্যাছে এখন ছোটোখাটো কাপড়ে চলবো না’ তখন মায়ের তাড়নায় বাবাজি বাজার থেকে রঙ-বেরঙের চওড়া কাপড় এনে মেয়ের গলায় ঝুলিয়ে দেয় আর মেয়েও যেনো একটু আড়াল পেয়ে হাফ ছাড়ে। কী এক সম্পদের মালকিন হয়ে পড়েছে হঠাৎ পুরুষগুলো বাঘের মতো থাবা তাক করে থাকে সম্পদ লোটার ধান্দায়, মা একদিন রহস্যময় ডেকে নেয় ঘরের কোনায়, কিছু হয়ছে তর? মেয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাকে জড়িয়ে হু হু কান্নায় বুক ভাসায়া কয়, দু’দিন যাবত মাথা আর গা হাত-পা কেমন ঝিনঝিনায় আর আজকে সকালে জাইগা দেখি প্রসাবের দ্বারে রক্ত, মা তারে শান্তনা দিয়ে মিটিমিটি হাসে আর কয় এখন তুমি আর ছোটো নাই। শৈশব ছিনতায় হয়ে যায় আর বড়োরা রাতদিন বড়োত্বের তালিম দিতে থাকলে মেয়ে দেখে বিশাল খোলা মাঠ কেমন সংকীর্ণ হয়ে চারপাশে দেয়াল উঠে যায়। তখন কুহকিদের বাড়ি দোতলা হয় নাই আর হঠাৎ কুহকির পরিবর্তনে তার খেলার সখিগণ বিকেল বেলা করে এসে একতলা বাড়ির ছাদ হুল্লোড়ে মাতায় না এবং বিকেল বেলার সোনারোদ বিষণœ কুহকিদের ছাদে সন্ধ্যার আয়োজন করে, তখন একসাথে অনেক হঠাৎ’ কর্মের ভেতরে কমল ভাইয়ার পিয়ারের দোস্ত সফল ভাইয়ার আসা-যাওয়ার গতি বাড়ে বহুগুন এবং আড়াল পেয়ে একদিন হাতের মুঠোয় অক্ষর সাজানো কাগজ ধরিয়ে দিলে মায়ের নজরে ধরা পড়ে যায় আর সেই থেকে সফল ভাইয়া এই বাড়িতে নিষিদ্ধ হয় এবং সকলে ঘিরে ধরে কুহকিকে ধমক লাগায়, এ সব এ বাড়িতে চলবো না আর চালানোর চেষ্টা করলে গলা কাটা লাশ হইয়া পদ্মায় ভাসতে হইবে। কুহকি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সকলের সামনে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করলেও কারো ভেতরে কোনো মায়া কাজ করে না আর কুহুকি রাত্রে বিছানায় তুমুল তড়পাতে তড়পাতে গলা দিয়ে গোঙানি ছাড়লে মা এসে ব্যস্ত তুলে বসায় আর আকুলি ব্যাকুলি হয়ে জানতে চায় বাজে খোয়াব দেখছস কুহু, ও কুহু? ধাতস্থ হতে খানিক সময় নেয় কুহু আর তারপর ভয়ে জড়তায় কয় খোয়াবে দেখি সমুদ্রের পানিতে ভাসতাছি আর বড়ো বড়ো নখ আর মুখওয়ালা জন্তু-জানোয়ার ছিঁড়ে খুবলে খাইতাছে। মা কতোক্ষণ বিড়বিড় করে বুকের ওপরে লম্বা তিনটি ফুঁ আর অভয় দিয়ে শোয়ায় কিন্তু কুহুর মনে লম্বা নখওয়ালা জন্তু-জানোয়ার দাপাদাপি করে বেড়ায় বলে সারারাত ঘুমহীন কেটে যায়।

রোজকার মতো সকালে কুহুর বাবা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে বাড়তি ভুঁড়িটুকু আয়েশ করে ছেড়ে দিয়ে সিগারেট ফোঁকে, কুহুর মা তখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করে, রুটিগুলো ছেঁকে আর তার সাথে কয়েকটা ডিম ভেজে টেবিল সাজিয়ে বাড়ির ভেতর বাহির করতে থাকে এটা সেটা কাজে, কুহু তখন সকাল বেলার মাস্টারের কাছে বীজগণিতের সূত্র প্রয়োগের কৌশল রপ্ত করে। আধপোড়া সিগারেট হাতে হঠাৎ নড়েচড়ে বসে কুহুর বাবা কুহুর মাকে ডাক পাড়ে, শুইনা যাও, দেখতাছো তো, মাইয়া কিন্তু এখন দিনে দিনে সেয়ানা হয়, দিনকাল কেমন খারাপ, মাইয়াডার ভাবগতিক একটু বুইঝো। কুহুর মা মুহূর্তকয়েক অবহেলায় দাঁড়িয়ে কয়, মাইয়ারে আমি নজরে আর শাসনে রাখি, মাইয়ারে আমার কুপথ অধিকারে লইবে না। এসব ভাবনা না ভাইবা বরং তুমি আড়তে গিয়ে বইসো, ঢের বেলা হইছে।

তখন আরেকটু বড়ো বয়স, মাধ্যমিকের বছর দুই পেরিয়ে গেছে এবং কুহু এই দুই বছরে মনে আর শরীরে আরো ভালোভাবে নারী হয়ে উঠেছে। ক্লাসের কাছের বান্ধবী টুম্পা একদিন অনেক ভীড়ের ভেতর থেকে হাত ধরে টেনে কিছুটা নির্জন লাইব্রেরি ঘরের পেছনে একটি ছেলের সামনে এনে ছেড়ে দেয়। কুহুর বাম-বুক ধুকপুক করে ওঠে আর তলপেটে হঠাৎ চাপ ধরে আসে, তবু স্থির দাঁড়িয়ে থেকে দেখে বান্ধবী টুম্পাকে পেছন ফিরে একবার রহস্যের হাসি হেসে ফিরে যেতে। সামনে কয়েক ক্লাস ওপরের সোপান ভাইয়ার দিকে সে চোখ তুলে তাকাতে পারে না, যে কিনা কিছুদিন হবে তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে আর পায়ে পায়ে কিছু পথ পিছু পড়ে থাকে, কিন্তু সে কোনো রকম আগ্রহ দেখায় নাই, তবে মন কি একটুও টানে নাই! সেই কাঁচা বয়সেই তো বিছানায় শুয়ে পায়ে পা ঘষে কতো রঙ্গলীলা কল্পনা করে সালোয়ার ভিজিয়েছে, সেখানেও কি সোপান ভাইয়ার দখল ছিলো না? বরং মনটাও তো তখন আকুল হয়ে ছিলো সে কিসের এক ভার তার হাতে ছেড়ে দেবার জন্য। কিন্তু মুখে কোনো সায় ছিলো না, রাতের সে দুঃস্বপ্ন তখনো নিয়মিত ছিলো। কুহু তারপর দেখে সোপান ভাইয়াকে লাল গোলাপ নিবেদন করতে, এবার সে মুহূর্ত এক সোপান ভাইয়ার দিকে চোখ তুলে তাকায় কিন্তু গোলাপের দিকে হাত ওঠে না। তারপর সোপান ভাইয়া কেমন কাঁপা কণ্ঠে প্রেম নিবেদন করলে কুহুর কানে নগ্ন আর নোংরা শোনায় আর তলপেটের চাপ প্রবল মনে হলে গোলাপটা ছিনিয়ে নেবার মতো করে নিয়ে পেছন দিকে হাঁটা দেয়। সেই থেকে সোপান আরো কাছে ঘেঁষতে থাকে আর কুহু কাঁপা বুকে উভয় সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকলে আচমকা একদিন পরিবারের সকলে মিলে ধরে বসে, বাবা হুংকার ছাড়ে আর অন্ধ পশুর মতো গোঁ গোঁ করে, মায়ের চোখে আগুন যেনো তরল হয়ে ঝরে আর বড়ো ভাইটা অনবরত দাঁত কটমট করে। আমাদের চোউক্ষু ফাঁকি দিবি ভাইবাছিস? মান সম্মান জলে ডুবাইবার বাকি কি রাইখাছিস? হারামজাদী মাগি!

সহশিক্ষার স্কুল বদলে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হলে সোপানের টিকিটিও কোথাও আর দেখা যায় না আর নতুন স্কুলের ভেতরে যদিও প্রেম নিবেদনের কেউ থাকে না তবে আসতে যেতে পথে কেউ কেউ পিছু নেয়, কুহু শুধু পথই হাঁটে, তখন কি কুহু সত্যিই মরে গিয়েছিলো কিংবা এখনো কতোটুকু জীবিত? মনের ভেতরে কখনো ধোঁয়ার কু-লী পাকায়।

জানালার ওধার থেকে আসা রোদে একটু একটু করে তাপ যোগ হয় আর কুহুকি আড়মোড়া ভেঙ্গে পাশ ফিরে শুয়ে আগের জায়গায় ফিরে যায়।

দীর্ঘদিনের ধূসর একতলা বাড়ি দোতলা হতে চললে কুহুর মনে একটু আনন্দ ঝলকে ওঠে, আশেপাশের বড়ো বড়ো সব বাড়ির মাঝে তাদের বাড়িটা দৃষ্টিকটুর মতো মনে হতো আর তাছাড়াও একতলার ছাদ কেমন বদ্ধ লাগতো, এখন যদি একটু স্বস্তি হয়।

যেদিন কুহুরা নিচতলা থেকে উপর তলায় বদলি হয় আর নিচতলায় ভাড়াটে আসে, ততোদিনে কুহুর স্কুলে পড়া শেষ হয়েছে।

ছাদে ওঠার সিঁড়িতে একদিন মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলে ছেলেটা মুখের ওপর থেকে সহজে দৃষ্টি নামায় না আর তাতে করে কুহু ফোঁস করে উঠেও নিজেকে সামলে নিয়ে নিচে নেমে যায়, কিন্তু তারপর থেকে দেখা হওয়াটা নিয়মিত হতে থাকলে কুহুর মনে সন্দেহ দেখা দেয় এবং যেদিন কলেজের পথে তার পিছু লম্বা পথ হেঁটে আসে সেদিন সব সন্দেহ উবে যায়। কুহু ছেলেটাকে কাছে ডাকে আর ছেলেটা অতি উৎসাহে কাছে এসে দাঁড়ালে কুহুর দু’চোখে আগুন জ্বলে, এরপর থেকে পিছু নিলে সুস্থ থাকার আশা কইরো না, লজ্জা করে না যে আমাদের বাড়িতে ভাড়া থাইকা আমারই পিছু নাও? কিন্তু এসব কথায় ছেলেটার কোনো বিকার হলো কি? কুহুর মনে দ্বিধা দেখা যায়।

ছেলেটা সত্যিই পিছু ছাড়ে না এবং ছাদে যে তার নিজের এক জগত বেড়ে উঠেছিলো সে জগত ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে ছেলেটা তাকে ভালোবেসেছে কিনা ছেলেটার আচরণ পোস্টমর্টেম করে শুভ কোনো লক্ষণ মনে ধরে না। ছেলেটার চোখ কেমন নিমীলিত কিন্তু দৃষ্টি বড্ড চোখা মনে হয় যে, দৃষ্টির প্রখরতায় দেহ তার এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। কিন্তু এর পরেও কেনো যে বাড়িতে অভিযোগ করে নাই কুহু, সে এক দুর্বোধ্য রহস্য বটে, আকস্মিক সে পরিণতির জন্যই কি!

বর্ষার প্রথম দিককার একটি দিন যার আগে কিনা আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা দেখা যায় নাই এবং অতি খরায় পাড়া মহল্লায় চান্দিফাঁটা রোদে দাঁড়িয়ে ছেলে বুড়ো বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়ে রক্তের মতো মূল্যবান চোখের পানি ফেলে আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে ঘরে ফেরে, সেদিন দুপুরের আকাশে সত্যিই জলভরা মেঘ জমে আর ছেলে বুড়োরা রাস্তায় নেমে এসে চোখের জলের চেয়েও মূল্যবান জলের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে, মেঘ যেনো জলভরা কলস, বৃষ্টি নামে। কুহুর উতলা প্রাণ আকুলি বিকুলি করে উঠলে এক ছুটে ছাদে চলে আসে, আহা কামনার শীতল জল, হৃদয়ে ছোঁয়া লাগে। প্রিয়তম মিলনের মতো সে বাঁধন ছাড়া হয়ে ভিজতে থাকলে এক সময় শীতে শরীরে কাঁপুনি ধরায় আর তাই ছাদ থেকে নেমে যাবার কথা ভাবতে ভাবতে সিঁড়ির ওদিকে তাকায়, দেখে দুটি চোখ তার ভেজে নগ্ন দেহের ওপরে আঠার মতো লেপটে আছে। রাগে কুহুর সারা শরীরে জ্বালা ধরায় কিন্তু চুপচাপ নিচে আসে আর ভাবে এবার একটা রফা দফা না করলেই নয়। সেদিন রফা দফা করার আগেই কুহু বিছানা ধরলে সন্ধ্যার পর ডাক্তার এসে শরীর মেপে বলে একশ তিন জ্বর। কিন্তু পাঁচ সাতদিন জ্বর শুধু কমতে আর বাড়তে থাকলে কুহু হাসপাতালের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। নাকের ডগায় চশমা পরা বুড়ো ডাক্তার নতুন রিপোর্ট দেয় যে, টায়ফয়েড এবং সে টায়ফয়েড থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে তার মহাকাল থেকে সতেরোটা দিন খসে যায়। কিন্তু ততোদিনে নতুন জেগে ওঠা চরের মতো শরীরের হাড় হাড্ডি চামড়ার তল দিয়ে উঁকি দেয় আর মুখেও সহজে রুচি ফেরে না। এমনি সময়ে নির্জন এক সন্ধ্যায় যখন কিনা তার শরীরে ও মনে অবসাদ জমতে জমতে রক্তে দূষণ ছড়াতে শুরু করে, সে বিছানা ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর ধীরে শরীরকে নগ্ন করে, অবাক হয়ে দেখে শরীরের হাড় হাড্ডি তো জেগে উঠেছে, উদ্ধত আর সুডৌল স্তন তো শীর্ণ হয়ে যায় নাই, সামান্য একটু নুয়ে পড়ে নাই! আর তার যে খাবারে রুচি নাই, জিহ্বায় পানতা পড়ে গেছে, তবে কি কামেও অরুচি ধরেছে? এবার কুহু দু’হাত তার উদ্ধত স্তনের ওপরে রাখে, তারপর স্তনজুড়ে মৃদু মর্দন করতে থাকলে সহজেই নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। কুহুর মুখে এবার আলো পড়ে। জিহ্বা বিস্বাদ হয়ে গেলেও জৈবিক কামনায় তো অরুচি ধরে নাই! এবার তার সে ছেলেটার কথা মনে হয় যে কিনা রোজ সন্ধ্যায় ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়, আর তারও মুখে না হয় বিষাদ জমেছে কিন্তু কাম তো জেগে আছে আর ছেলেটার চোখে বৃষ্টিতে ভেজা সেদিনের সে স্তনজোড়াও তুমুল উদ্ধত নগ্ন। কুহু দ্রুত কামিজ আর সালোয়ার পরে নেয় আর তারপর অস্থির পায়ে সিঁড়ি বাইতে থাকে।

রোদের তাপ আরো বাড়লে শরীরে একটু একটু জ্বালা ধরায় আর তাতে শীতের মোহ কিছুটা ছুটে গেলে কুহকি উঠে বসে জানালার ওধারে একটু তাকায়, দেখে রোদের বুক ফুঁড়ে ফুড়–ৎ ফুড়–ৎ দুটো চড়–ই দৃশ্যান্তরে চলে যায়।

 

অপরেশ পাল ॥ ক্লাইম্যাক্স 

রুমার মনটা আজ বেশ ভালো। গুনগুনিয়ে যখন গান গাচ্ছিলো তখন পেটের বাবুটাও খানিক নেচেছে ওর সাথে। নাচবেই না বা কেন? ও ভালো গায়ও নাকি? বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন তখন হুট করে গেয়ে ফেলতো দু চার লাইন, তারপরে সবার মাঝে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলেও আর একটুও গাওয়ানো যেতো না ওকে দিয়ে! জামশেদ ওর প্রেমে পরে টিএসসিতে এক অনুষ্ঠানে ওর গান শুনেই। ওর এক বন্ধুর সাথে এসেছিলো অনুষ্ঠানে, পরে খুঁজেপেয়ে বের করে রুমার বাসায় একেবারে বিয়ের প্রস্তাব। ভালো পাত্র পেয়ে ওর বাবা মাও না করেনি।

সেই বিয়ের আজ দুবছর হলো, আর রুমার পেটে এখন ওদের সন্তান। আর মাত্র কয়েকটা মাস, তারপরে তুলতুলে একটা জ্যান্ত পুতুল ওর সমস্ত একাকীত্ব ভুলিয়ে দেবেই দেবে, রুমা সেটা খুব করে জানে!

জামশেদের বাড়ি ফেরার সময় প্রায় হয়েই গেলো। আর মাত্র একটা ঘণ্টা। ও তৈরী হতে শুরু করবে এখন। উলের কাঁটা দুটো সরিয়ে রেখে আস্তে আস্তে ডুপ্লেক্স বাড়িটার দোতালায় উঠলো রুমা। ময়নাকে নিয়ে জয়নালও আজ বেরিয়েছে, এই খানিক আগেই, ওরা আজ বাইরে খাবে বলে রুমা আর বারণ করেনি, ওদেরও তো এটা প্রেম করারই বয়স।

শোবার ঘরে গিয়ে পর্দাগুলো নামিয়ে দেয় ও, ধবধবে সাদা পর্দা, একবার হাত বুলায় ও, জামশেদের প্রিয় রঙ। ঘড়িতে মৃদু আওয়াজে সময় ঘোষণা হয়, সাড়ে সাতটা। একটা করে মুহূর্ত কাটে আর ওর উত্তেজনা বাড়তে থাকে, এই দুবছরেও ভালোবাসায় চিড় ধরেনি বিন্দুমাত্র। সাদা মসলিনের সাথে মুক্তার ছোট্ট গয়নাটা বের করে রুমা, জামশেদের প্রথম উপহার। আয়নাতে নিজেকে দেখে একবার, নিরাভরণা নিজেকে কেমন যেন দেবী দেবী লাগে ওর। গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি ও এখন, চেহারায় একটা নতুন আভা, চামড়া কেমন যেন স্বচ্ছ হয়ে গেছে ওর, চোখগুলোকে আগের চেয়ে বড় মনে হয়, দ্যুতিময়ও। গুনগুন করতে করতে প্রসাধন শেষ করে রুমা, আস্তে ধীরে নিচতলায় এসে বরফের ট্রেতে বরফ আছে কিনা একবার দেখে নেয়, জয়নালের কখনও ভুল হয়না, তাও প্রতিদিনই ওর একবার নিশ্চিত করা চাইই।

উলের কাঁটা দুটো নিয়ে বসতে না বসতেই দরজায় চাবি ঘোরানোর আওয়াজ, নিজের অজান্তেই একটু ভ্রু কুচকে গেলো রুমার, ও আজ পুরো পনেরো মিনিট আগে ফিরেছে, সবসময় ঘড়ি ধরে চলা জামশেদের সামান্য সময় বিচ্যুতিও অস্বাভাবিক।

জুতোমোজা খুলে হাতমুখ ধুতে ধুতেই রুমা ওয়াইন, কাজু আর বরফ সাজিয়ে ফেলে সাইড টেবিলটায়। কিচেন কাউন্টারে ঠা-া পানির বোতলটাও রেখে দিতে ভুল করে না। গম্ভীর মুখে জামশেদ রুমার হাত থেকে গ্লাসটা নেয়, কোনও কথা না বলে বসে লম্বা এক চুমুক দেয় পানীয়তে। ও অবাক হয়। নিশ্চয়ই কোনও সমস্যা হয়েছে কোথাও, সাধারণত মিনিট দশেক সময় নিয়ে জামশেদ গ্লাস খালি করে তারপরে গোসল করতে যায় বা পোশাক বদলায়। আজ এক চুমুকেই গ্লাস খালি করে আরেক গ্লাস ঢেলে নিলো, তাও বরফ ছাড়াই! অস্বস্তি হতে লাগলো রুমার।

সামান্য গলা খাকরে জিজ্ঞেস করতে যাবে রুমা, জামশেদ হঠাৎ বলে বসলো— আমার তোমাকে আর ভালো লাগছেনা, আমি তোমার সাথে আর থাকতে পারবোনা রুমা, অনেকদিন ধরেই ভাবছি কিভাবে বলবো, আজ আর পারলাম না। জানি এটা খুব ভালো সময় না তোমাকে বলার জন্য, কিন্তু কিছু ভেবোনা, আমি সব ভেবে রেখেছি, বাচ্চার নামে ব্যাংকে টাকা আলাদা করে রাখা আছে, আমি এখনও কাউকে বলিনি, কিন্তু আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলবো, তুমি কিছু ভেবোনা, তোমার কোনও অসুবিধা হবে না, আমি কোনও সমস্যায় পড়তে চাইনা, আমার চাকরির বারোটা বাজবে তাহলে। এক নিঃশ্বাসে এতোগুলো কথা বলে ফেললো জামশেদ, মাথা নিচু করে। রুমা অবাক হয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে। মানে কী এসবের? জামশেদ অনেক দিন ধরেই এসব ভাবছে? তাহলে কাল রাতের ঐ আদর? রুমার হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠলো।

চোখ বন্ধ করে নিজেকেই বুঝাতে থাকলো , যে এখনই চোখ খুলে দেখবে জামশেদ ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে, বলে বসবে যে এটা ওর সেইসব বিচ্ছিরি প্রাকটিক্যাল জোক গুলোর একটা। সেরকম কিছুই হলোনা যদিও। চোখ খুলে রুমা বুঝলো ওর বেহেস্তের খুঁটিগুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললো— তাহলে তো আজ বাইরে খাওয়া হচ্ছেনা, আমি বরং ঝটপট কিছু রান্না করে ফেলি, জয়নাল আর ময়না গেছে সিনেমা দেখতে, তুমি হাত মুখ ধুয়ে বসো।

ফ্রাইংপ্যানটা রান্নাঘর থেকে এনে কিচেন কাউন্টারে রাখলো রুমা। বড় একটা বাটিতে সামান্য মশলা দিয়ে ফ্রিজ থেকে খাসীর মাংসের টুকরাগুলো বের করে ম্যারিনেট করে, আস্তে আস্তে উপরে গেলো ও, মুক্তার গয়নাগুলো খুলে নিচে নেমে আসলো খুব ধীরে। খাবার ঘরের জানালার পর্দাগুলোর দিকে ফিরে কী দেখছিলো জামশেদ কে জানে! রুমা নেমে আসতেই, খুব আস্তে বলে উঠলো— আমি দুঃখিত রুমা, খুব দুঃখিত! রুমা থামলোনা, সিঁড়ির সামনে থেকে এগিয়ে এসে কাউন্টারের উপর থেকে ফ্রাইংপ্যানটা নিয়ে ওর সমস্ত শক্তি দিয়ে জামশেদের মাথার পেছনে আঘাত করলো, ঠাস করে কুৎসিত একটা আওয়াজের পরে এক পা পিছিয়ে আসলো ও। পাঁচ ছয় সেকেন্ড হেলদোলের পরে জামশেদের পাঁচ ফুট এগারোর শরীরটা মাটিতে পড়লো, সাথে সাইড টেবিল আর তার উপরের জিনিসগুলো নিয়ে।

যদি ধরা পড়ে তবে জেল হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু ওর বাচ্চাটার কী হবে? অনাগত সন্তানকে পেটে রেখে মাকে কি মৃত্যুদ- দেয়া হয়? আর ভাবতে পারলোনা রুমা, ওর কিছুতেই ধরা পড়া চলবেনা! কাউন্টারের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে প্যানের পিছনের রক্তটুকু মুছলো ও, গোয়েন্দার বউ হবার সমস্ত সুবিধাটুকু নিয়ে নিজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে করতে টিস্যুর টুকরো গুলোকে কমোডে ফ্ল্যাশ করলো সাবধানে।

রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রাইপ্যানটা চুলায় বসিয়ে খাসীর মাখিয়ে রাখা মাংসগুলো চুলায় চাপিয়ে আস্তে এসে ওর রকিং চেয়ারটায় বসলো রুমা। বসে বিড়বিড় করে একবার আওড়ালো— একহালি ডিম, আর কয়েকটা গোল বেগুন দাওতো সোবহান, আর একটা ছোট্ট কেক, সাথে মোমবাতি। কথাগুলোকে নিজের কাছেই মেকি আর নিষ্প্রাণ মনে হলো ওর। আবার একবার আওড়ালো— এবার একটু জোরে। হুম, এবার ঠিকই মনে হলো, তারপর আস্তে করে দরজা খুলে বেরোলো রুমা, রাস্তার ওপারের সিএসডি শপের ভিতরে ঢুকে কাউন্টারের সোবহানকে বললো একহালি ডিম, বেগুন আর কেক দিতে। দুবছরের পরিচিত সোবহান হেসে কেক কেনার কারণ জিজ্ঞেস করতে রুমাও হেসে বললো যে আজ ওদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী, বাইরে খেতে যাবার কথা ছিলো, কিন্তু জামশেদের ওর রান্না খিচুড়ি খেতে ইচ্ছা করলো তাই সেই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ওই রান্না করছে, আর জামশেদকে সারপ্রাইজ দিতে নিজেই সিএসডি এলো যেন অন্তত একটা কেক কেনা যায়। সোবহানের সাহায্য নিয়েই সুন্দর দেখে একটা কেক বাছলো ও। এরপরে সব কিছু গুছিয়ে দিয়ে সোবহান হেসে বললো— শুভ বিবাহবার্ষিকী, ম্যাডাম! মাথা নেড়ে সামান্য হেসে দোকান থেকে বেরিয়ে আসলো রুমা।

রাস্তা পার হয়ে ধীরে সুস্থে হেঁটে ফিরলো বাড়িতে, দরজা খুলে একজন সুখী স্ত্রীর আচমকা স্বামীর মৃতদেহ দেখলে যেরকম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিৎ ঠিক সেরকমই করলো, বসার ঘর পেরিয়ে খাবার ঘরের কাছে আসতেই হাত থেকে ব্যাগ আর বাক্স ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো রুমা, তারপরে খানিক কাঁন্নাকাটি, তাও গলার স্বরকে উচ্চগ্রামে তুলে। তারপরে হেঁটে গেলো বসার ঘরে, ফোনটা নিয়ে ডায়াল করলো অতি পরিচিত আর্মি হেডকোয়ার্টারের নাম্বারে। হিস্টিরিয়া গ্রস্থের মতো কাঁদতে কাঁদতে কর্তব্যরত অফিসারকে জানালো খবরটা। গোয়েন্দা জামশেদ হাসানের মৃত্যুর খবর পেয়ে ওরা দেরী করলোনা একটুও।

পনেরো মিনিটের মাঝেই জামশেদের পুরো টিম হাজির হয়ে গেলো বাসায়। কাঁদতে কাঁদতে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো রুমা, কিভাবে ও জামশেদকে সুস্থ দেখে সিএসডিতে গিয়েছিলো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে আর এসে কিভাবে ওকে পায়, মিনিট পনেরোর মাঝে কতো কিছু হয়ে গেলো! এক সহকারী তক্ষনি ছুটে গেলো সোবহানের সাথে কথা বলতে আরেকজন রুমার রকিং চেয়ারটা লাশের কাছ থেকে সরিয়ে এনে ওকে ধরে বসালো। খানিকক্ষণের মাঝেই লাশ উলটে জামশেদের সহকর্মীরা আবিষ্কার করে ফেললো যে ওকে মাথার পেছনে আঘাত করে মারা হয়েছে, আর এটা দুর্ঘটনা নয়, খুন! অস্ত্রটা কী হতে পারে, আততায়ী কিভাবে এসেছে, দরজায় আঙুলের ছাপ আছে কিনা এ নিয়ে সাথে সাথেই ব্যস্ত হয়ে গেলো উপস্থিত সবাই, একজনকে রুমার কাছে রেখে। বাসার হাতুড়ি কোথায় আছে, স্প্যানার ছিলো কিনা ওদের কোনও, কিংবা ধাতব বড় ফুলদানী এসব প্রশ্নের জবাবও দিতে হলো রুমাকে। সবাই খুবই সাবধানে, খুব আন্তরিকতার সাথে কথা বলছিলো ওর সাথে, খানিক বাদে রুমাও স্বাভাবিক হয়ে গেলো পুরোপুরিই। তারপরে যখন একজন এসে ওকে জিজ্ঞেস করলো যে চুলায় একটা মাংসের পাত্র আছে, তখনই ওর মনে পড়লো যেন হঠাৎ এভাবে বললো— ওহ, জামশেদের জন্য রান্না করছিলাম, আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী ছিলো! উপস্থিত সবাইই স্তব্ধ হয়ে গেলো। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে রুমা আবার বললো— আপনাদের কারও নিশ্চয় রাতের খাওয়া হয়নি, কষ্ট করে ফ্রিজ থেকে রুটি বের করে গরম করে খাবেন? মাংসটা এই এতক্ষণে হয়ে এসেছে, আমি মনে হয় কিছুই খেতে পারবোনা, অন্তত আপনারা কিছু খান!”

সবাই শোরগোল করে না না করে উঠলো, রুমা কারও কথাই শুনলোনা, শেষমেশ লাশ ভ্যানে উঠিয়ে রেখে সবাই টেবিলে এসে বসলো ফ্রাইপ্যান আর রুটির থালা নিয়েই। খেতে খেতে সবাই বলাবলি করছিলো যে ওদের মনে হচ্ছে যেন ওরা কিছু মিস করে যাচ্ছে, ফ্রাই প্যান থেকে মাংস নিতে নিতে একজন বললো হয়তো ওদের নাকের সামনেই রয়ে গেছে মস্ত বড় কোনও ক্লু, যেটা ওরা দেখেও দেখতে পাচ্ছেনা!

আর রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে রুমা পেটে হাত দিয়ে আস্তে করে বললো— হ্যাপি অ্যানিভার্সারি জামশেদ!

 

আরিফ মাহমুদ  ॥ সংসারযাতনে প্রেমরতনে

বেঁচে থাকার রহস্য খুঁজতে জীবন থেকে ২৫ বছর চলে যাচ্ছে … কৈশোর কিংবা মায়ের কোলের নির্মম আনন্দ ছাড়া সবটুকুই রহস্য মনে হয়েছে। সংসারে বেড়ে ওঠা সবচেয়ে ব্যথাতম ঘটনা। সংসারে বেড়ে উঠলে সংসার করতে হয়, সংসারের দায় নিতে হয়। একদিন নিজের সংসার হয়, আরেকটা সংসারের জন্ম দেয়ার নেশা হয়। এভাবে আমরা মানুষগুলোকে সংসারের জাঁতাকলে ফেলে একজীবন সময় চেয়ে নিচ্ছি। সংসার ছাড়াও কোনো রমণীর হাতে হাত রাখাটা যেনো সংসারকল্প। বদ্ধ প্রেমিকের সংসারের মতো রমণী পেলেই হাত কাটে সুশ্রী ব্লেড দিয়ে। রমণীরা সংসারের মতো রমণ পেলে বালিশের কাভার সেলাই করে ‘তোমাকে চাই’ লিখে। সংসার বারান্দায় প্রেম প্রেম খেলতে খেলতে আমরা একেকটা পেশাদারী ‘স্বামী’ আর রমণীগুলো ‘স্ত্রী’ হয়ে ওঠে। বুঝি সমাজের নাম রেখেছি সংসার ! তাই তোমার বুকের দৈর্ঘ্য মাপতে চাই নিবন্ধন। ঝুলি থেকে একটা গোলাপ এনে কোনো রমণীই এই কথা বলেনি- ভালোবাসিতো, তুমি হাত ধরো, আমরা একসাথে হাঁটি ! বহুদূর। আমাদের চেনা জানালার গ্রিল ধরে আকাশ দেখি । প্রধানতম কোনো মানুষের দেখা পেলে তুমি প্রাক্তন হয়ে যাবে, অথচ দুজনেই হবো আগামি। খেলাঘরের বাতি জ্বেলে কারো দুরারোগ্য মৈথুনকে আমরা নিমন্ত্রণ জানাবো- হে প্রিয়তমেষু, তুমি ফিরে এসো চেনা গৃহে। আমরা গৃহ থেকে বের হয়ে চলে যাই, অনন্তকাল। মানুষের মতো বিকলাঙ্গ নয়, জগতের নিয়মের মতো প্রতিদিন সূর্য উঠাই, অমাবশ্যার চাঁদের ভেলকি দেখে দেখে স্বপ্ন জাগাই। সংসার ভেঙে যাক … যা কিছু সংসার পৃথিবীর মতো বেড়ে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। আমার তুমি হয়ে যাও তোমার আমি। দায়বদ্ধ পে-ুলাম ঘুরে যাক সৌরে। মানুষ বেঁচে থাক। আলাদা সংসারের নেশায় আর কোনো অনবধ্য ঘুম নয়। ফুটপাতে বেওয়ারিশ ঘুমের মতো চাই সুখ। দরজার তালা খুলে যাক, ঘরবাড়ি উঠে যাক, গাছের পাতার নিচে ঘরপেতে ছলিমের বউয়ের আচল দিয়ে মুখ মুছুক আক্কাস। আক্কাসের ছোট্ট মেয়েকে পাঠশালায় নিয়ে যাক ছলিম। ছলিমের পিঠের ব্যথায় ওষুধ হোক আক্কাসের রূপবতী বউয়ের নরম হাত।

 

দীপ্ত উদাস ॥ চা-পাতিগরমজলকাপে ঝড়

কিছুই করবার নেই, এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। হতে পারে সেটা বয়সের দোষ, সঙ্গও হতে পারে। আবার নিজের মনকেও দোষারোপ করা থেকে বাদ রাখা যায় না। আর এমন তো শুধু আমার ক্ষেত্রে যে হচ্ছে তাও নয়। অনেকের হতে পারে আবার নাও হতে পারে। জোর করে তো আর মানুষের মন পড়া যায় না। তাই বলে স্বপ্ন আর বাস্তব কী এক হতে পারে! স্বপ্নে যা দেখছি, বাস্তবে তা কতোজন দেখে! কিংবা বাস্তবে যা দেখছি তাই স্বপ্নে চলে আসছে। তাহলে স্বপ্ন আর বাস্তবতার কী কোনো তফাৎ নেই। স্বপ্ন আর বাস্তবতা নিয়ে এতো সে কতকথা তার সমাধান? তাই বলে মশাল দেখবো! ওটা তো স্বপ্নে দেখি, ঘুমালেই একটা মশাল আমার পিছু নেয়— আমি দৌড়াই। কে যে এই মশালটা নিয়ে দৌড়ায় তা কোনোদিন দেখতে পাই নি। অবশ্য দেখতে পেলেই বা কী হতো! যে আমার পিছুপিছু ভয় দেখানোর জন্য মশাল নিয়ে দৌড়াতে পারে তার সাথে আর যাই হোক বসে আড্ডা দেয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। খটকা লাগতো না, যদি শুধু মশাল নিয়ে দৌড়ে ধাওয়া করতো। কিন্তু তার সাথে সাথে পাশ ঘেঁষা ট্রেনের হুইসেল আরো বিব্রত করে। ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়। তখন ঘুমদেবীকে হাজারো উপঢৌকনের প্রলোভন দেখিয়েও কোনো লাভ হয় না।

বাস্তবেও কোনো শান্তি নেই। ট্রেনের হুইসেলের মতো কোনো শব্দ কানে আসলেই ভয় হয়। আগুন দেখলে তো কথাই নেই। ইদানিং আগুন জ্বলছে। বিশেষ করে মনে, বনে, কামে, সংসারে, শিল্পে, অনুভূতিতে। এ এক আগুনময় সংসার। আরেকটি বিশেষ দিকে তাকালে সম্ভবত কারোরই দৃষ্টি এড়াবে না যে, একটা প্রেমময় সময় আমরা সকলেই উপভোগ করছি। অবশ্য একেকজনের প্রেম একেক দিকে। কেউ নারীর দিকে ঝুঁকছে, কেউ প্রকৃতির দিকে, অবশ্য ঝুঁকতে কেউ না কেউ সহায়তা তো করছেই। কেননা সহায়তা ছাড়া তো ওটা সম্ভব নয়। সারাদিন ফুলতলিঘাটে বসে থাকলে তো আর কবিতা হবে না, কবিতাদেবীরও প্রসন্ন হবার ব্যাপার তো থাকেই। তেমন নর-নারীর ব্যাপারেও। কেউ সংসারে ডুবে আটখানা, আবার কেউ সংসারের চাপে খানখান। যে যেভাবে নেয় আর কী। তবে প্রেমটা কিন্তু আবশ্যক। না থাকলেই নয়। তবে একটা প্রেম বর্তমান সময়ে খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘গুপ্তপ্রেম’! শব্দটা শুনলেই কেমন যেনো একটা সত্যজিত সত্যজিত ফ্লেবার। গুপ্তপ্রেম ব্যাপারটা অনেকটা রোমান্টিক। একশ্রেণির মানুষেরা এই প্রেমে পড়েছে সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই। আবিষ্কারের প্রেম। তবে এটা আবার গোপনে। যখন সেই প্রেমের সার্থকতা আসে তখন কিছু মানুষ দুইহাত দিয়ে কোমর ধরে উঁচু দালান দেখার ভঙ্গিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার আরেক শ্রেণির মানুষের চোখে খচখচানি হয়। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নিয়েই যদি বলি— দুই ভিন্ন স্থানের মানুষেরা তাঁর জন্মস্থানের প্রেমে পড়েছে। তারা দাবি করছে তাদের এলাকায় বুদ্ধের জন্ম হয়েছিলো। এতে অবশ্য অর্থনৈতিক ব্যাপার জড়িত। কেননা যে স্থান তাঁর জন্মস্থান বলে অধিক জনসমর্থন পাবে সেখানে শুভানুধ্যায়ীদের আগমন বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে অর্থাগমও ঘটবে। তাই ‘আসল’ ব্যাপার বাদ দিয়ে সবাই প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত যে তাদের নিকটবর্তী ভারতের কিংবা নেপালের স্থানটিই হচ্ছে বুদ্ধের ‘আসল’ জন্মস্থান। তাহলে অহিংসার সেই ব্যাপারটি কোথায় থাকছে! যে মানুষটা অহিংসা প্রচার করে গেলেন সারাজীবন তাঁর জন্মস্থান নিয়ে তারই তথাকথিত অনুসারিরা সহিংস হচ্ছে। মূল কাজটি থেকে, শুভ শিক্ষা থেকে সবাই কেমন যেনো অনীহাতাড়িত। কেবল বুদ্ধদেব কেন কোনো প্রচলিত প্রথায় বা ধর্মীয় শিক্ষা কী সহিংস হবার শিক্ষা দেয়? কিন্তু আমরা লক্ষ করলেই দেখি সামান্য স্বার্থের জন্য বিশেষ করে নিজ স্বার্থ কিংবা মতামত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা বেছে নিয়েছি মানুষের সবচেয়ে আবেগের, শ্রদ্ধার, ভালোবাসার স্থান ধর্মকে। যা লজ্জা, ঘৃণা ও পরিতাপের বিষয়। এতে আপামর জনতা নিজেরা বিব্রত হচ্ছেন প্রতি পদক্ষেপে। তাদের মনে সর্বদা বিরাজ করছে অবিশ্বাস আর উৎকণ্ঠা।

অন্ধকারযুগ এসেছিলো একবার মধ্যযুগে। এ ব্যাপারে আমরা সকলেই জানি। কিন্তু বর্তমান সময় চলছে আধুনিক মিথবৈজ্ঞানিক (মিথোবৈজ্ঞানিক) অন্ধকারযুগ। অস্বীকার হয়তো অনেকেই করতে পারে। কিন্তু একটু লক্ষ করলে আমরা নিজেরা নিজেকে দিয়েই বিচার করতে পারি। একদিকে আমরা মিথকে অস্বীকার করছি মুখে মুখে কিন্তু পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে ঠিকই আমরা অলৌকিকতায় আস্থাশীল হচ্ছি। আমরা যা মুখে বলছি তা হয়তো পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারছি না কথায় ও কাজে। একপ্রকার অন্ধকারে আমরা কখন যে তলিয়ে যাচ্ছি তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না। অন্ধকারে আমরা নিজের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি কিংবা হারাতে পছন্দ করছি কিন্তু অপরপিঠে আলোতে আমরা সবার মাঝেও হারিয়ে যাচ্ছি। দিনে লোকসম্মুখে আমরা নিজেকে প্রগতির ধারক বাহক আরো আরো নানা তকমা ট্যাগ করছি নিজের ব্যক্তিতের সাথে কিন্তু আসলে কী আমরা প্রগতি নামক আধুনিকতা ধারণ করি? কিংবা আমরা যারা নিজেকে ধার্মিক বলছি তারা কী ধর্মটা পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারছি? আমরা মানসিকভাবে একা হয়ে গেছি অনেকদিন যাবৎ। কেননা আমাদের পরিপার্শ্ব আমাদের একা করে দিয়েছে। একটি কাক যদি মৃত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে তার প্রতি মানুষের যেমন কোনো প্রকারের আপসোস থাকে না তেমনি বর্তমান সময়ে কোনো মানুষ পড়ে থাকলেও তার দিকে কেউ এগিয়ে আসে না। কেননা আসন্ন অনুমেয় আশঙ্কা মানুষকে তাড়া করে। সহায়তা করলে যদি বিপদ ঘটে এই ভয়ে। এই অবস্থায় সূর্যের আলো দেয়া যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দেখা যাবে যারা অন্ধ তারাই বেশি দেখতে পাচ্ছে। আসলে তারা বেশি দেখে না। আলো থাকাবস্থায় তারা অনুমান করেই সময় নিয়ে পথ চলতো। আর এই পথচলা তাদের অনুমান শক্তিকে অভিজ্ঞতায় উন্নীত করেছে। আর আলোতে চলা মানুষকে যদি বলা হয় অন্ধকারে পথ চলতে হবে তাহলে একদফা হাউমাউ করে কেঁদে নেবে তারপর ভয়ে ভয়ে খুব কষ্ট করে চললেও ঠিক চলতে পারবে না। সেরকম এক অন্ধকার সময় আমরা পাড়ি দিচ্ছি এই সময়ে। এই অন্ধকারে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিবেক, মূল্যবোধের আলো পৃথিবীতে কোনোভাবেই পৌঁছাতে পারছে না। ঠিক পৌঁছাতে পারছে না এমনটা বলা যুক্তিহীন তবে যতটুকু পৌঁছাচ্ছে ততটুকু মানুষের সাথে মানুষের সৌহার্দ্য কিংবা হৃদ্যতার সেতু স্থাপন করাতে পারছে কী? পুঁথির বিদ্যা মলাটবদ্ধ হয়েই থাকছে।

বিসংস্কৃতিকরণ! এ এক প্রচলিত ধারার মতো বইছে সেই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই। এটা যে ধারণা থেকে বলছি এমনটা নয় আবার পুরোটা অভিজ্ঞতাপুষ্ট তাও নয়। প্রচীনযুগ থেকে সাহিত্য রচনা হয়ে আসছে। কিন্তু বৃহৎ বিস্তারে আমরা প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যমোদীর পরবর্তী বংশধরদের সাহিত্যজগতে দেখতে পাই না। কেন? যাদের সাহিত্য আমাদের পথ দেখায়, ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে আমাদের সামনে তাদের কোনো ছেলে-সন্তান, নাতি-পুতি কেন সাহিত্যে আসছে না? যদিও সাহিত্য আরোপিত কোনো বিষয় নয় যে চাইলেই এ পথে আসা যায়। অর্থ, ক্ষমতা, লোভ ইত্যাদি থাকলে হয়তো অন্য রাস্তায় ভালো কিছু করা যায় কিন্তু সাহিত্য তো তেমন জায়গা নয়। তারপরেও সাহিত্যপ্রেমী হয়েও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের পরবর্তী বংশধরদের আমরা দেখি না। যারা সাহিত্যে নিজেকে সঁপে দেন তার দায়িত্ব কী কেবল নিজেকে নিয়েই ভাবা নাকি সাহিত্যের সঠিক উদ্বুদ্ধকরনও? আর তা পরিবার থেকে শুরু হওয়াটাই কী যৌক্তিক নয়? কিন্তু তা হচ্ছে কী?

আমরা যা লালন করছি তা কী পালন করতে পারছি? নাকি সব জায়গায় অদৃশ্য কোনো স্বার্থ বা গোঁজামিল রয়েছে? আমরা যাকে মূল্যবোধ নামে জানি তা কী আমাদের উপর সঠিকভাবে ভর করতে পারছে? বর্তমান সময়ে ‘সঠিক’ বিষয়টিই তো দ্বান্দ্বিক হয়ে গেছে। কোনটি আসলে সঠিক? যে যার স্বার্থে যা করছে তাই কী সঠিক? তাহলে মূল্যবোধের শিক্ষা আমাদের কী কাজে লাগছে? আমরা আমাদের স্বপ্ন নিজের বুকে আকড়ে ধরে রাখতে পারছি না। বিক্রি করে দিচ্ছি সস্তা দামে। শিক্ষাক্রমে আমরা যা শিখছি তা কী কখনো মূল্যবোধের মাপকাঠিতে মেপে দেখছি? একজন স্কুলপড়–য়া ছেলেকে সমাজ বিজ্ঞান কিংবা বাংলা বই থেকে পাঠ্য উল্লেখ করে যদি বাস্তব জীবনে তার প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা যায় তাহলে হয়তো সে প্রশ্ন করে বসবে— ‘বাস্তব কী?’ হ্যাঁ, এভাবে আমাদের সোনার বাংলা সৃজনশীল হয়ে উঠছে! কিন্তু ওই স্কুলপড়–য়াকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, কোন প্রশ্নটি এবারের পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ? তাহলে হয়তো একটা আশার বাণী শুনতে পাবেন। শুনবেন, বলছে যে, এ আর এমন কী চিন্তার বিষয়, পরীক্ষার আগের দিন ফাঁস হয়ে যা বের হবে তাই তো পরীক্ষায় আসবে। সহজ স্বীকারোক্তি! আমরা এভাবে শিক্ষার হার বাড়াতে পারি বটে কিন্তু পাশাপাশি অন্ধ, গোড়া তৈরী হওয়াও ঠেকাতে পারবো কী? আর যা তৈরী হচ্ছে তার প্রমাণ তো বিগত বছরগুলোর হামলার পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে নিজেই বুঝতে পারবেন।

আমরা বলতে শঙ্কিত হই, শিউরে উঠি। শরীর নামক অবয়বের আমার কেন সবার মায়া আছে। কিন্তু একি হচ্ছে প্রতিনিয়ত! এতো নিজের দিকেই ধেয়ে আসছে ক্রমশ। এখন আপনি কী করবেন? পিঠে দেয়াল ঠেকে যাবে এক সময়। এমন সময় কী আসে নি যে সব কিছু নতুন করে গড়ার সময়? আমাদের স্বাধীনতার এতো বছর কেটে গেল! কিন্তু রাশিয়ার স্বাধীনতার আট বছর পর যেভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মূল্যবোধের স্ফুরণ ঘটালো তারা, আমরা কেন পারছি না? আবার ভাববার সময় আসে নি কী? পঁচে যাওয়া শিকড় উপড়ানোর সময় কী আসে নি? নতুন জাতির বৃক্ষরোপনের সময় এখনই নয় কী? যে তরুণরা দেশ-জাতির কর্ণধার তারাই আজ ভ্রান্ত পথে। আর যাই হোক, মানুষের অপরাধের শাস্তি কী কখনো মানুষ দিতে পারে? তার অপরাধের শাস্তি তো কেবল মহাপরাক্রমশালী সর্বশক্তিমানই দিতে পারেন!

আমরা কেবল কল্পনায় ভাসতে পারি আর অপেক্ষা করতে পারি। কবে সেই সুদিন আসবে যেদিন আমরা রাস্তায় বেরুলে সঙ্গবিক্রেতার দেখা পাবো! আমাদের সঙ্গ দেবে একশক্তি। যার সাথে আমরা নির্ভয়ে সময় কাটাতে পারবো। যে আমাদের মানুষের কল্যাণের কথা শোনাবে। যে আমাদের বিপথে নিয়ে যাবে না। সেই প্রোফেটিক ব্যক্তিত্বের দেখা। যে শুধু নিজের গোত্র নয় সারা বিশ্বকে এক গোত্র মনে করে। সে যেমন কুমোরপাড়ার পেছনের বন্ধা জমি নিয়ে চিন্তিত হবে তেমনি বিমানভ্রমণকারীরা যাতে স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারে তারও ব্যবস্থা নিয়ে ভাববেন। সকলে, সবার কাজের মর্যাদা পাবে। পারস্পরিক হবে। নির্ভর করতে পারবে একে অপরের প্রতি। স্বপ্নে মশাল দেখলে আশান্বিত হবে।

আলো আসছে, কল্যাণের আলো, শুভ বার্তা নিয়ে। সাইরেনে যেনো বেজে ওঠে যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা। এক শান্তির, পরম প্রশান্তির দামামা। আমরা যেনো স্বপ্নে বিভোর হই, অপেক্ষা করি মঙ্গলের…

 

নিখিলেশ রনি ॥ নৈঃশব্দে নিস্তব্ধ ভাস্কর

অবনিশ দাস। জানা-চেনা সকলেই তার নামটাকে কেটে-ছেঁটে অবনি বলেই ডাকে। দেশের অন্যতম স্বায়ত্তশাসিত উচ্চ বিদ্যায়তনের ছাত্র হলেও তার স্বভাব-চরিত্রে ছাত্রত্বের গন্ধটুকুও নেই । অনেকটা তার বিদ্যায়তনের মতো। বিদ্যায়তনের ছাত্র আবাসিক হলে কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত কক্ষে তিনটি যুবক টিকটিকির সঙ্গে তার বসবাস। অবনি শহরের সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলা একটি অকাল প্রয়াত নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শুড়িবাড়ির একজন নিয়মিত খদ্দের, এই নিয়মানুবর্তিতার গুনেই সে ঐ পাড়ায় পরিচিত মুখ। সেই যে প্রথম যৌবনে প্রিয় রমণীর প্রেম প্রত্যাশা করে উপেক্ষিত হয়ে সাধের জীবন বন্ধক রেখে সময়ের বিরুদ্ধ¯্রােতে দিয়েছে উজান উড়াল- তাকে আর ফেরানো যায় নাই।

এই কর্পোরেট যুগে সহপাঠী বন্ধুরা যখন তুমুল প্রতিযোগিতায় ব্যস্ততম ক্যারিয়ার সিঁড়ির এক একটি ধাপ তরাতে গদবাধা কিছু পদ্ধতি করায়ত্ব করতে মনোযোগী , অবনির তখন একটাই স্বপ্ন। সে একটি মূর্তি গড়বে। তবে কোনো দেবী মূর্তি নয়। তবে কি সেই প্রিয় রমণীর? না। তাহলে কোনো বান্ধবীর? না। মূর্তিটি অবনির স্বপ্নে দেখা এক মুনিষীর। যার কথা মনে পড়লে অবনির শূন্য হৃদয় আরও শূন্য মনে হয়। কিন্তু কে সে ? অবনি জানে না। তবুও সে মূর্তিটি গড়বেই।

ভরা ভাদরের নিস্তদ্ধ এক রাতে অবনি তৈরি করেছিল সেই মুনিষীর মূর্তি, একাকি। সে কি গৌরব অবনির! এতদিন যার জন্য তৃষ্ণায় পুড়ে যায় অবনির একজোড়া চোখ, সে আজ দৃষ্টির আলোয় খেলা করে চলে। চোখে চোখ আটকে যায়- কালো চোখের গহীন অতলে দৃষ্টি তলাতেই অবনির তড়পানো জীবন উড়ে চলে যেতে চায়। পাখির মতো কড়া রোধ মাথায় করে উড়তে উড়তে তেপান্তরের মাঠ, নীল আকাশ পিছনে ফেলে পৌঁছে যায় কোন এক শূন্য ধামে। গা-দুলিয়ে জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নিঃসঙ্গ বকুলের ডালে বসে। যে বকুল তলায় ধ্যানে মগ্ন এক সন্ন্যাসী। অবনির গা-দুলানোর শব্দে ধ্যান ভঙ্গ হয় সন্ন্যাসীর। তারপর মুখোমুখি দু’জন…

তবে মুশকিল হলো মূর্তিটিকে অবনি ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না। কারণ মূর্তিটি পাথর কিংবা গাছের দেহ খুঁচে তৈরি নয়। এমন কি জল কাদার মিশ্রণেও মূর্তিটি তৈরি নয়। অবনি মূর্তিটি তৈরী করেছিল শূন্যে- অন্ধকারে অন্ধকার ছানিয়া। আজও অবনি নিজের মেজাজ-মর্জি মাফিক মূর্তি গড়ে চলেছে। শূন্যে- অন্ধকারে অন্ধকার ছানিয়া। এটাই তার একমাত্র নেশা। কারণ অবনি সন্ন্যাসীর মুখোমুখি বসিবার লোভ কোনদিন সংবরণ করতে পারে নাই।

 

আল আমিন হোসেন ॥ কবিতার পেণ্ডুলাম

সেইযে কাঠপেন্সিল হাতে ছেলেটি
ফিরে গেছে একা, একরাশ বেদনার বেনোজল নিয়ে !
কেউ ডাকেনি তাকে কোনদিন !
অথবা ডেকেছিল কুয়াশা মলিন
কোন রমণী এসে বলেনি, যত্ন করে আঁকাতে তাকে
সেই যে সেই ছেলেটি
কবিতা লিখবে ভেবেছিলো
এক ফাগুন চাঁদের আশায় ছুটেছিল বহুদূর
ফাগুনের চাঁদ নেমেছিলো নিথর পাথর হয়ে
রমণ পিয়াসে, রমণীর পাপে জন্মায় নবাগত
বাড়ে অনাগত নষ্ট সভ্যতার সোপান।

মলিন পা-লিপির পাতায় !
মনে হয় খুব
আজকাল এখানে কবিতা আর জন্মায় না !

 

হাসান খালিদ ॥ বি-শ্রী স্নান

এ ক্লেদাক্ত বিষণ্ন আকাশপানে একবার চেয়ে
নির্লজ্জ ছায়া পিতৃপরিচয়ের দাবিতে
অন্ধ হয়ে নীলে মিশেছে
সব্যসাচী সে নীল কোথায় ?

এ তো বেড়ে চলেছে তোমার মতোই ধীরে ধীরে
আকাশের সমস্ত নীলে
ইতিহাসের কালো ধোয়া
বৃষ্টিতে ¯স্নান করে সব রক্ত মুছে দিতে
আকাশের পানে মুখ নিয়ে
এবার চোখ খোলো

দ্যাখো !

এই বিমূর্ত  ভূমির ভীত
উগলে আসা একরাশ ঘৃণা ।

 

এ্যাপোলো ॥ অপেক্ষার শতাব্দী  

নিজেকে নিজের নিয়ে ব্যস্ত রাখি
নিদ্রাকর্ষিত চৈতিরাত আরো ব্যস্ত করে তোলে
নতুন সকালের ডাক নিয়ে হাজির হওয়া
বিহঙ্গকে বলতে না পারা …

আবার ব্যস্ত কোলাহল
সবকিছু ফিরে পাওয়া
যামিনী এলো
তবুও কয়েক শতাব্দির অপেক্ষা আবার
আমিও চেয়ে থাকবো ।

 

রাব্বি ॥ তিথী

শাণিত বায়ুঘাতে তৃপ্ত মূর্ছিত হৃদয়,
শাশ্বত স্নিগ্ধ পরশে অলংকৃত কোকিলের অস্থির পরাণ ।

স্বচ্ছ  রংগুলো গড়ে তুলেছে অস্বচ্ছ কয়েকটা মূল্যবোধের শীতল মহাকাব্য
বিচ্ছিন্ন মুহূর্তগুলো মিলনের আকাক্সক্ষায় করছে তীব্র আনন্দ মিছিল
অদৃশ্যের অন্তরায় দৃশ্যেরা বিকৃত মস্তিষ্কে বাউল হয়ে গাইছে বসন্তের হলুদ গান।

কলঙ্কের আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে  পুণ্যক্ষণ, ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যু হোক নতুন পূণ্যের তরে
খুলে যাক সকল অসংযোগের বদ্ধ দ্বার আগমনে
নিয়ন বায়ু পথ হারিয়ে খুঁজে পাক অন্তহীন সূক্ষ্ম বিধ্বস্ত রাজপথ।
অনন্তযৌবনা কমল সুখকর ধৈর্য্যরে পরিশেষে
রাজপথের ইতি প্রান্তেÍ দাঁড়িয়ে রয়েছি তিথী
যত্ন করে  মৃদু পদযুগলের মূল্যবান পদচিহ্ন দিয়
আসবি আমার শৃঙ্খলহীন বুকে।

 

খুর্শিদ রাজীব ॥ জীবন্ত ফসিল

ঘুণে ধরা প্রাচীন অনুভূতিগুলো এখন ফসিল
ঊষর লালসাগুলো অলীক আশায় সুর তোলে
অমৃতলোকের খোঁজে দিডিগ¦দিক ছড়ায় সুরের নিনাদ
আগ্নেয়গিরির স্খলিত লাভা বুক চিরে বেরিয়ে আসে
বর্ষণের মতো প্রেমের উষ্ণতায় পুড়ে নিঃস্ব হয়
চেতন প্রেতাত্মার তীব্র আর্তনাদে নৈঃশব্দে অভুক্ত
বোবা কাঁন্নার দল ভেদ করতে অক্ষম ।

তবুও পাপ করবার আদিম রিপু অঋদ্ধ স্বরে
আকুতি জানায়, জেগে উঠবার ব্যর্থ প্রয়াশ
পাপ করা হয় না পাপক ফসিলের
মহাকালের জীবন্ত ফসিল আজও শিশু আখিলে
ডানা মেলতে চায় অসীম অন্তরীক্ষের খেচর হয়ে
দুরিতের উর্বী ছেড়ে মহাশূন্যের যোজন যোজন
আরজিত ছায়াপথে বাস করবার প্রবল আকিঞ্চণ
যেখানে জীবন্ত ফসিল লয় ভেঙে বাঁচতে চায়
রক্তহীন শ্যাতশ্যাতে  অনিবার্য  বসতী।

 

এই রোদ্দুর যাত্রাপথ! গন্তব্য আবিষ্কারের কাহিনী আমরা কেউই জানিনা। এমনকি যে মাতাপিতা জন্মের উল্লাসে কলাপাতায় সেমাই বিছালো তারাও ভেবে দেখেনি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে পুরোনো ঘুমের ভার আবার চোখে বসে। আমাজন বনের এক চিজপাখি। রোজরাতে সংসার করে আর দিন এলে ঘুমোতে যায়। রাতের অন্ধকারে অনেক যুবকের হাতে জলের পাত্র দেখেছি, আগুনও। ক্রোধউল্লাসমমতায় মশাদের রক্তের জন্য মিছিলের তোরণ এঁকেছিলো দেয়ালে। বসতভিটায় একফালি ছায়ার মতো নিজের কঙ্কাল অনুভব করতাম। এই বসতে যে প্রাচীন কুঁড়েঘর অবশিষ্ট; সেখানে প্রার্থনায় নত থাকতো বৃদ্ধ দাদু। কালহাসের চোখ দেখে গল্প বলতেন রোজরাত্রে। উঠোন জোড়ানো হাসি। সেই যে নবারুন কাকু ভিটে ছেড়েছে। দাদুর গল্পও থেমে গেছে। ভিতরের ক্ষতকে পুষতে পুষতে; ক্ষতকে ভিতর করেছে। আমরা একদিন এসব ভাবতাম না। যখন জনপদ আবিষ্কারের পা-ুলিপি আমাদের হাতে আসলো তখন বুঝতে পারলাম ‘বসত’ মানুষের বুক চিরে গহীনে ওতপেতে আছে। অথচ মানুষ ছুটছে…ছুটি অবধি। দেয়ালে লিখে রাখা শব্দগুলো আমাদের সম্বল। মানচিত্রের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণার্ত কাকের মুখে কেউ কখনোই জলের পাত্র ধরতে পারেনি। উড়ে যায় ! হায় সে কেনো উড়ে যায় ? 

সম্পাদক

আলোচনা