sfsfsdj

স্নান ৪২

সম্পাদকীয়

এ এক অদ্ভূত যাপনের কাল। সমুদ্র, নদী আর পানাপুকুর কণ্ঠ মিলিয়েছে। আমাদের কাছে সে সংবাদ এসেছে বহুকাল আগে। তখন কেউ কেউ সদ্য জন্ম নেয়া মানবের কপালে কালো সূর্য এঁকে ভুত তাড়াতে চায়ছে। তখনকার এক সন্ধ্যাবেলায় ঘুট্ঘুটে অন্ধকারে শুরু হলো যাত্রা। কেউ কেউ কয় এমন সন্ধ্যা নাকি এসেছিলো অনেক পুরনো দিনে, লাল টুকটুকে সূর্যের চমক দেখানো এক ভোরের আগে। কিন্তু এ আবার কেমন দিনের অবতারণা, ত’য়ের হয়ে আছে কিসের ক্ষেত্র সে! এখন রাত্রি দিনের ভেদাভেদ ঠাহর করা যায় কই। কি এক আজীব খেল শুরু হয়েছে দুনিয়া জুড়ে। ল্যাংটা বালক বালিকা কয়টা মাত করে রেখেছে যতো আছে শরীরী আত্মা, যখন কিনা পৃথিবীর বহু মানুষ আর সাবালক হয় না। ওপার থেকেও আর কেউ মায়াচোখে তাকিয়ে রয় না, হাত বাড়ায় না ‘বুকে আয় আত্মার আত্মীয়রা।’ তবে চলতে লেগেছি কোন সুদূরের পথে, আধাঁরে। সমুখ বলে এখনো কি কিছু দেখা যায়? কেউ কয়ে যায় নাকি, অনেক মরণ কেনো মরতে দেয় নি দুটি চারটি দশটি প্রাণের, ব্যর্থতা না অতৃপ্তি, অথচ রোজ মহাপ্রয়াণের ঘোষণা প্রচারিত হয়। তবু অথর্ব বুদ্ধিবাজরা মগজ বিকিয়ে মাথায় চড়ে শুধু বাণী আওড়ায়। আমরা তো এখনো বলি না গোয়াল ভরা মানব, পুকুর ভরা জোঁক আর গোলা ভরা নষ্ট বীর্যের কীট। শুধু লাল টুকটুকে সূর্যের ভোর— এখনো চোখের তারায় উষ্ণতা তাড়া করে। আমাদের যাত্রা চলেছে, আমরা গড়িয়ে গেছি বহুদূর।

************************************

আঞ্জুমানআরা আনছারী
উপনিবেশিত মনের আত্মপরিচয় অন্বেষণ

আমি এমন একজন ঔপন্যাসিকের শিল্পসংকটের কথা ভাবছি যে আজ বা আগামীকাল চাইতে পারে সে যে-বাক্যটি রচনা করবে আর সেই বাক্যের ভেতরে যে-অর্থটি ভরে দিতে চাইবে তার মাঝখানে একমাত্র সংযোজক হিসেবে সেই থাকবে লেখক হিসেবে, কথক হিসেবে; সে কোনো কলোনির প্রজা হিসেবে কলোনির কোনো শিক্ষা তার বাক্যের ভিতরে ভরে দেবে না। আমি এমন একজন ঔপন্যাসিকের কথা ভাবছি যে আজ বা আগামীকাল চাইতে পারে— সে স্বাধীন, তার লেখা স্বাধীন ও সেই লেখায় নিহিত অর্থও স্বাধীন।

দেবেশ রায় এভাবে ইংরেজ আরোপিত আধুনিকতার বদলে বিকল্প এক আধুনিকতার অন্বেষণ করেন- যে আধুনিকতা লেখককে উপনিবেশের দুর্ভেদ্য প্রাচীরের বাইরে নিজস্ব সত্তার নির্মাণে সহায়তা করবে, স্বাধীনভাবে লেখার ও স্বাধীনভাবে অর্থ আরোপের অধিকার দেবে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বাঙালির মেরুদ- ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করেছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে। কিন্তু ভারতবর্ষের বিপুল অংশ ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে আত্মসমর্úণ করলেও অগ্রসর বাঙালি সমাজ দূরত্ব বজায় রেখেছে। ঔপনিবেশিক চক্রান্ত আমাদের ইতিহাসের বাস্তবতাকে লুপ্ত করে দিয়ে যে নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই বাস্তবতায় হারিয়ে যাওয়া আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে পুনরুদ্ধারকল্পে সময়ের ব্যবধানে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত হয়ে ওঠে। তারা উপনিবেশের বিপরীতে দাঁড়াতে চায়, গড়ে তোলে উপনিবেশোত্তর চেতনা। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্যের সূচনা এবং এখনও তা চলছে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন দেশগুলোর জীবনযাত্রার বিভিন্ন স্তরে প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্যমান উপনিবেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে।

ব্রিটিশ শাসনামলে দুইশত বছর এবং উপনিবেশোত্তরকালেও বিশ্বায়নের নামে নব্য-সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্নভাবে শোষণ করে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা পুঁজিবাদী শক্তি ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ঔপনিবেশিক শক্তিকে দৃঢ় ভিত্তি দান করে। আর ঔপনিবেশিক শক্তির অপচ্ছায়ার কবলে পড়ে মানুষ হয়ে যায় অসহায়, শেকড়হীন পরগাছার মতই। এই শেকড়হীন মানুষের আত্মপরিচয় সংকট ও প্রতিরোধী চেতনার রূপায়ণের মাধ্যমে উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখকরা পেরিয়ে যান ঔপনিবেশিক আবহের জটিল পিছুটানগুলি। আধিপত্যবাদী চেতনার বিপরীতে তাঁদের সাহিত্য হয়ে ওঠে মূর্ত প্রতিবাদ। ‘আধুনিককালে উপনিবেশবাদের অবসান ও জাতিসৃষ্টিতে সাহিত্য যে কতটা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে, চিনুয়া আচেবে, ওলে সয়েঙ্কো, জর্জ ল্যমিং, ন্যাদিন গর্ডিমার, এম জে কোয়েৎজির লেখায় সেই দূরদৃষ্টির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়।’

ঔপনিবেশিক শক্তি মানুষকে কেন্দ্রচ্যূত করে তার আপন ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করায় সে হয়ে পড়ে আত্মপরিচয়হীন। ঔপনিবেশিক শক্তির সর্বগ্রাসী ভয়াল থাবা এভাবে মানুষকে গ্রাস করে ফেলায় শেকড়চ্যূত হয়ে একসময় সে পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে আত্মপরিচয় অন্বেষণে। পশ্চিমা সভ্যতার আধিপত্যের বিপরীতে আত্মপরিচয় অর্জনের এই প্রয়াস উত্তর-উপনিবেশি মনের বাসনা। উনিশ শতকে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ও বিকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে। এ শতক থেকেই প্রাক্-ঔপনিবেশিক স্মৃতি আর ঔপনিবেশিক কালের অভিজ্ঞতার দ্বৈততায় বাঙালির পরিচয় ও সত্তা বারবার সংকটের মুখে পতিত হয়। একদিকে ঔপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্যের চর্চা অন্যদিকে শেকড়ের টান ও উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্য— এই দুই বিপরীতমুখী টানাপোড়েনে ক্ষত-বিক্ষত সাহিত্যিকরা কখনো ঔপনিবেশিক প্রভাবে আবর্তিত  হন, আবার কখনো সোচ্চার হয়ে ওঠেন ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে, বি-উপনিবেশায়নের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক প্রতাপের বিপরীতে তাঁদের সৃজনশীলতা নির্মাণ করে বিকল্প সাহিত্যধারা।

ঔপনিবেশিক শক্তি কীভাবে একটি জাতির অতীত ও বর্তমানকে পুনর্নির্মাণ করে তা পর্যালোচনা করতে গিয়ে ফ্রাঞ্জ ফানো তাঁর দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ গ্রন্থে বলেন, উপনিবেশবাদ শুধু জনগণকে এর আয়ত্তাধীনে শৃঙ্খলিত করেই তৃপ্ত থাকে না, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মস্তিষ্কের বিকাশকে অসার করে লাঞ্ছিত জনগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ করে এবং তাদেরকে অবয়বহীন করে দেয়। কেনীয় লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো উপনিবেশবাদী শক্তির এই ঘৃণ্য চক্রান্তকে বলেছেন ‘সাংস্কৃতিক বোমা’। তাঁর মতে, ‘এই সাংস্কৃতিক বোমার লক্ষ্য হল মানুষের নিজেদের পরিচয়, নিজেদের ভাষা; নিজেদের প্রতিবেশ, নিজেদের সংগ্রামের ঐতিহ্য, নিজেদের ঐক্য, নিজেদের ক্ষমতা এবং সর্বোপরি খোদ নিজেদের উপর থেকেই বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়া। নিজেদের অতীতকে অর্জনহীন এক পোড়োভূমি বলে পরিচয় করাতে চায় এবং মানুষের মধ্যে নিজভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতা লাভের স্পৃহা তৈরি করার প্রয়াসে থাকে এই সাংস্কৃতিক বোমা।’ এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর অরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে দেখান কীভাবে ইউরোপীয়রা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতীয়মান করার তাড়নায় পৃথিবীব্যাপী উপনিবেশ থেকে শুষে নিয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে আধুনিক হয়ে উঠার সমস্ত উপকরণ। আর তা দিয়ে নিজেদের দেশে শিল্পবিপ্লব সাধন করে, শিল্প কারখানাসহ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সমৃদ্ধ করে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধসম্পন্ন আধুনিক মানুষরূপে। মলয় রায়চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন- ‘ইউরোপের আধুনিকতা সমৃদ্ধ হয় উপনিবেশ থেকে আনা দ্যোতকের সহায়তায়। পিকাসো, গগাঁ, ককতো, মাতসে, দেরাঁ ছবি আঁকায় এবং ডি. এইচ.লরেন্স, ই. এম. ফর্সটার, টি. এস. এলিয়ট, ভার্জিনিয়া উল্ফ সাহিত্যে। আধুনিকতা আন্দোলনটি ইউরো-মার্কিন তো বটে কিন্তু অনেক সাংস্কৃতিক আঙ্গিক অন্তর্ভুক্ত হয়েছে উপনিবেশ থেকে।’ এভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন চিহ্ন বিকৃত করে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিশ্চিহ্ন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে। দু’শো বছর ধরে চলতে থাকা এই প্রক্রিয়ায় যে আত্মপরিচয়ের সাথে আমরা আজ একাত্ম তা মূলত ঔপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য ও সংস্কৃতির প্রভাব থেকেই উদ্ভূত। এই আত্মপরিচয় এমন একটা হীনমন্যতায় দূষিত যে, আমরা পশ্চিমাদেরকে ‘উন্নত’ আর নিজেদেরকে ‘অনুন্নত’ ভেবে থাকি যেখানে আমরা সভ্য অসভ্যের প্রশ্নও তুলে থাকি। ফয়েজ আলমের মতে, ‘এই আত্ম-পরিচয় পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাম্প্রতিক ব্যাপক আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। কাজেই আমাদের আত্মপরিচয়ের মধ্যে উপনিবেশি প্রভাবগুলো চিহ্নিত হওয়া দরকার। সেই সাথে দরকার উপনিবেশ পূর্ব বাঙালি আত্মপরিচয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো খুঁজে বের করা যা আমাদের প্রকৃত আত্মপরিচয়ের ভিত্তি কাঠামো।’ উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখকরা এ কাজটি-ই করেন।  অবক্ষয়ের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবনায় ঋদ্ধ হয়ে বি-উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় আত্মানুসন্ধান করেন। যেভাবে অভিজিৎ সেন (জন্ম ১৯৪৫) রহু চ-ালের হাড় (১৯৮৫) উপন্যাসের বাজিকরগোষ্ঠী, অমিয়ভূষণ মজুমদার (১৯১৮-২০০১) ফ্রাইডে আইল্যান্ড অথবা নরমাংসভক্ষণ এবং তাহার পর (১৯৮৮) উপন্যাসের জেফ এবং জেডের মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের সন্ধান করেছেন।

ঔপনিবেশিক সমাজে রহু নিজের অপহৃত ভূখ- উদ্ধার করতে পারেনি বলে ভ্রাম্যমান বাজিকরগোষ্ঠী এক টুকরো ভূ-খ- খুঁজে বেড়ায়— যেখানে স্থিতিশীল হতে পারবে, নিজেদের অস্তিত্ব এবং রহুর বংশধর হিসেবে আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু তাদের এই অন্বেষণ বারবার হারিয়ে যায় চোরাবালিতে, বহুধা বিভাজিত এই সমাজে তাদের স্থায়ী আবাস কিংবা স্বীকৃতি জোটে না। অথচ স্থায়ীত্বের আশায় তারা নিজস্ব ঐতিহ্য, প্রথা, স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে ধর্মান্তরিত হয় কিন্তু অধিকার আদায় করতে পারে না; বরং প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। টিকে থাকার সংগ্রামের কাছে বিসর্জন দেয় নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়। লুবিনি তাই শারিবাকে জিজ্ঞাসা করে- ‘তখন রমণীরা পরত ঘাঘরা আর কামিজ, পুরুষেরা পরত নুগরু আর কুর্তি। সেসব ছেড়ে দিল, তার নিজের ভাষা, নিজের পোশাক, নিজের আচার-আচরণ, নিজের ক্রিয়াকর্ম সব। কেন রে শারিবা?’ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না শারিবা, উত্তর দিতে ব্যর্থ উপনিবেশিত জনগণ। আপন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য হারিয়ে বাজিকরগোষ্ঠী হীনম্মন্যতায় ভোগে, যেমনটা দেখা যায় অমিয়ভূষণ মজুমদারের ফ্রাইডে আইল্যান্ড অথবা নরমাংস ভক্ষণ এবং তাহার পর উপন্যাসের জেফ এবং জেডের মধ্যে। ঔপনিবেশিক শক্তির প্রবল চাপের মুখে নিজের ধর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়ায় জেফের মনে দেখা দেয় হতাশা। তার ভিতর আফ্রিকী আদি ধর্মবোধ আর খ্রিস্টানধর্মবোধের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একদিক থাকে আফ্রিকার ‘রা’ দেবতা অন্যদিক যিশু। ব্লাক স্কিন হোয়াইট মাস্কস গ্রন্থে ফ্রাঞ্জ ফানো বলেন, উপনিবেশি শাসনের কারণে উপনিবেশক ও উপনিবেশিত উভয়ের মধ্যেই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে। উপনিবেশকদের সচেতন চেষ্টায় স্থানীয়দের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ক্ষয় হতে হতে একসময় বিলীন হয়ে যায়। উপনিবেশিতের সাংস্কৃতিক শেকড়ের এই মৃত্যু তার মনে জন্ম  দেয় হীনম্মন্যবোধের। এরকম হীনম্মন্যতায় ভোগে জেড ও জেফ। তারা ঐতিহ্যচ্যূত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ যারা উপাধির সাথে পিতৃপরিচয়ও খুঁজে পায় না। বৃহত্তর সমাজ-পরিবেশে যত পরিবর্তনই আসুক, শেকড়হীন এই শ্রেণির প্রান্তিকায়িত জীবনে তার ঢেউ লাগে না। ঔপনিবেশিক ধর্ষণের শিকার জেফের ছড়ানো নাক আর পুরু ঠোঁট, শ্বেত গাত্রবর্ণ নিপীড়নের চিহ্নই বহন করে। জেফ আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির নিপীড়নের জীবন্ত উদাহরণ। ‘যে ইউরোপীয়রা নিজেদের আধুনিক মনে করে, তাদের দুষ্কর্মে আরেক আধুনিক মানুষের জন্ম হয় নতুন এক গঠন নিয়ে, তৈরি হয় মিশ্র সংস্কৃতি, মিশ্র ধর্মরীতি।’ শুধু জেফ কিংবা জেডই নয়, তাদের মনিব জন জোয়াকিম ফ্রেডাও আত্মপরিচয় সংকটে ভোগে। ফ্রেডা জানে না তার আদিপুরুষ কোথায় কিংবা তার বর্তমান আবাসস্থল ‘ফ্রেডা কাস্লে’র প্রকৃত ইতিহাস কী? ফ্রেডার কাছে তার জন্মপরিচয়ের বিষয়টা অস্পষ্ট।স্মৃতির অনেকটাই সে বিস্মৃত। ঔপনিবেশিক শক্তি এভাবেই উপনিবেশিত মানুষের শেকড় উপড়ে ফেলে  নিজস্ব শেকড় ও শক্তিমত্তাকে প্রোথিত করে মানুষকে করে তোলে আত্মপরিচয়হীন।

উপনিবেশকরা সব সময়ই উপনিবেশিতকে নিকৃষ্টরূপে চিত্রিত করেছে। উত্তর-ঔপনিবেশিকতা এর বিপরীতে তৈরি করে প্রতিরোধী জ্ঞানভাষ্য। আর সে প্রতিরোধ তৈরি হয় দীর্ঘদিন ধরে ঔপনিবেশিক শক্তি নিপীড়নের পাশাপাশি উপনিবেশিতদের সম্পর্কে নিকৃষ্ট, হীন, বর্বর, অসভ্য, অপর প্রভৃতি অসম্মানজনক পরিচয় প্রবণতার যে প্রকল্প গড়ে তুলেছে তার বিরুদ্ধে। এই প্রতিরোধী মনোভাব থেকেই সাহিত্যিকরা কেন্দ্র ও প্রান্তের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে হয়ে ওঠেন শেকড়-সন্ধানী, তুলে ধরেন দেশীয় ঐতিহ্য। এ উপন্যাসেও উপনিবেশের শিকারে পরিণত মানুষেরা তাদের প্রান্তিক অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য অতীতের প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের ইতিহাস অন্বেষণ করে। ফ্রাইডে হয়ে যায় ঈশ্বরের প্রতিচ্ছায়া। শ্বেতাঙ্গ ঔপন্যাসিক ডিফোর ঘটনা বর্ণনায় অনাস্থা তৈরি হয় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জেডের।

ঔপনিবেশিকতায় বহু জনগোষ্ঠীর শেকড়চ্যূতি ঘটেছে। কখনো তারা স্বেচ্ছায় উন্নত অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে, কখনো দাস করে তাদেরকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ফলে সেই সব জনগোষ্ঠী হয়ে পড়েছে ইতিহাসহীন, স্মৃতিহীন, শেকড়হীন। স্থানচ্যূত মানুষেরা উপনিবেশকের সংস্কৃতিকে আয়ত্ত করে গড়ে তুলেছে সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতি। নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে তারা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ হয়েছে তবুও তাদের উপনিবেশিত মন খুঁজে ফেরে আপন ঐতিহ্য, পিতৃপরিচয় ও নিজস্ব  শেকড়কে। এভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্যায়ে জেগে ওঠা এতদিনের নির্যাতিত, শোষিত শ্রেণি অনুসন্ধান করে নিজস্ব সংস্কৃতি; ফিরে পেতে চায় তাদের হারিয়ে যাওয়া পরিচয়। উত্তর-উপনিবেশবাদ উপনিবেশি জ্ঞানভাষ্য ও সংস্কৃতির প্রভাবগুলো চিহ্নিত ও দূর করার মধ্য দিয়ে উপনিবেশ পূর্ব ভাব ও সংস্কৃতির জগৎ পুনর্নির্মাণের প্ররোচণা দেয়। এক্ষেত্রে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে বি-উপনিবেশায়ন। ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া সচল থাকা অবস্থায়ই বি-উপনিবেশায়নের তৎপরতা শুরু হয়। এই প্রতিরোধের ভিত্তি কখনো প্রাক্-ঔপনিবেশিক চিন্তাকে আঁকড়ে ধরে হয়, কখনো প্রাক্-ঔপনিবেশিক চিন্তার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। উনিশ শতকের শেষার্ধে ভারতবর্ষে শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে বি-উপনিবেশায়নের যে ধারার সূত্রপাত হয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত আছে। এক্ষেত্রে প্রাক্-ঔপনিবেশিক শিল্পরীতিতে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা যেমন লক্ষণীয়, তেমনি রূপান্তরের প্রবণতাও বিদ্যমান।

************************************

শরাফউদ্দীন সৈকত
কয়েকটি যুবকের এক সন্ধেবেলার কেচ্ছা

আমরা বেশ সরব হয়ে ছিলাম সমস্ত বিকেলজুড়ে। কিন্তু সন্ধ্যা হলে আমাদের ওপরে নীরবতা নামে। যে নীরবতা সম্পর্কে আমরা কেউ সচেতন নই। সন্ধ্যার আগে দূর গ্রামের মাথার ওপর দিয়ে লাল সূর্যকে ডুবতে দেখেছিলাম। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক পাখি উড়ে যাবার শব্দে সেদিকে তাকিয়েছিলাম। তখন থেকেই হয়তো নীরব হয়ে আছি। তারপর আকাশের লাল রঙ মুছে গেছে। নদীর ওপারে গাঢ় সন্ধ্যা নেমেছে। তখন আমি প্রথম সচেতন হয়ে ওদের দিকে তাকাই। ওরা এখনো কিসে মগ্ন। একটু অবাক হই বৈকি। কোলাহল থামিয়ে হঠাৎ আমরা কেমন নীরব হয়ে গেছি। প্রথমত নিজের কথাই ভাবি। নদীর ওপারে সবুজ গ্রামের মাথার উপর দিয়ে লাল সূর্যটার ডুবে যাওয়া প্রথমে উপভোগ করেছিলাম। তারপরে মনে হয়েছিলো আরো একটা দিনের মৃত্যু ঘটে গেলো। তখন হতাশা জাগলো। এভাবে দিনে দিনে কতোটা জীবন পার হয়ে গেলো। আজন্ম জীবন একই বৃত্তের ভেতরে পাক খেয়ে চলেছে। এ বৃত্ত থেকে বেরোনোর পথ কই। অথচ বৃত্তের বাইরে মুক্ত পৃথিবী প্রতিনিয়ত ডাকে। এভাবে আমার মতো ওরাও কি ভাবছে জীবন জন্ম নিয়ে! ওদের ভেতরে চঞ্চলতা ফিরে আসে। আমার কোনো সন্দেহ থাকে না এখনি কেউ কথা বলে উঠবে। কিন্তু আমিই সুমনকে প্রশ্ন করি, তুই কি ভাবছিলিস বলতো ওমন মগ্ন হয়ে? সুমন একটু হেসে বলে, কী যে ভাবছিলাম। ঘাসের উপরে বসে হাঁটুতে মুখ ঠেকিয়ে কথা বলে গণেশ, এভাবে আর চলে না চান্দু। ওর কণ্ঠে অনুশোচনা। অবশ্য সে কারণটা আমাদের জানা। সে এক গল্প। মির্জাপাড়া গ্রাম আমাদের গাঁয়ের কাছেই। সেখানে একটা বিয়ের নিমন্ত্রণ ছিলো। ছেলেটা আমাদেরই বন্ধু হতো। দীর্ঘদিন যোগাযোগহীনতায় সে অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো। অল্প বয়সেই সৈনিকের চাকুরি পেয়েছিলো। সে বন্ধু তার বিয়েতে আমাদের দাওয়াত দিয়ে বসলো। আমরাও হৈ হৈ করতে করতে গেলাম কজন। আনুষ্ঠানিকতা ছিলো সন্ধ্যার পরে। বাড়ির আঙ্গিনা ঝলমলে আলোয় ভরপুর। কতো রঙ। সবার ভেতরে উৎসব। তার ভেতরে মানব মানবীর মিলন, বড়ো মধুর সে মিলন। দেখে আমাদের মনেও খোঁচা লাগলো। কল্পনায় এমন মুহূর্ত কতোবার মধুর হয়ে উঠলো। কিন্তু সত্যিকারের সামর্থ নেই। অথচ দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রিটা পকেটে পুরে ঘুরছি কতোদিন হলো। এভাবে বন্ধুর বিয়ের আসরে আমরা হতাশার বেদনাই বোধ করতে থাকলাম। খাবার টেবিলেও সে বেদনা উড়ে গেলো না। তার ভেতরে ঘটলো কা- এক। গণেশ। ওর ভেতরে ধর্মের কোনো প্রভাব নেই জানি। তবু সামাজিক নিষেধাজ্ঞার কারণে গরুমাংসের ওপর তার ঘৃণা ছিলো স্বাভাবিকভাবে। তাকে কখনো গরুমাংস খেতে দেখি নি। কিন্তু সেদিন তাকে নিজ হাতে গরুমাংস খেতে দেখে আমাদের চোখ ফুটে বের হয় হয়। খুব তৃপ্তি নিয়েই সেদিন সে মাংস খেলো। আমরা ভাবলাম কেনো আজ ও এমন করলো। মনে হলো আমাদের বিষণ্নতার ভেতরে একটু চাঞ্চল্য আনতেই এমন কা- করেছে। কিন্তু বিপদ হলো পরে। কে যেনো সংবাদটা পৌঁছে দিয়েছে গণেশের মায়ের কাছে। তার মা বিশ্বাস করে নি প্রথমে। গণেশ ঘরে ঢুকতেই প্রশ্নবাণ। গণেশ মাথা নিচু করে থাকলে তার মায়ের আর বুঝতে বাকি থাকে না। তারপর তার মায়ের রূপ কেমন হয়েছিলো সে বর্ণনা গণেশ দিতে পারে না। গণেশ পা ধরতে চেয়েছিলো মায়ের। মা কড়া নিষেধ করে দিলো না ধরতে। এখন বাড়ির অনেক কিছুই গণেশের জন্য নিষিদ্ধ। বাড়ি থেকেও যেনো বাড়ি নেই। মা কথা বলেন না আর। বেশ কিছুদিন তো হয়ে গেলো, অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। গণেশের এখন অনুশোচনার শেষ নেই।

এখনো শীত পড়তে শুরু করে নি।  তবু নদীর ওপারে কুয়াশার মতো মনে হয়। আমরা নদীর দিকে মুখ করে বসে থাকি। জায়গাটা আমাদের ভালো লেগে যায়। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় দুই কিলোমিটার এসে এই জায়গাটা আমরা খুঁজে পাই। পেছনে দেবদারু বন সামনে বিস্তৃত নদীর বুক। বাতাস এসে মাখনের মতো গায়ে লাগে। আমরা এখনো কেমন উদাস বিচ্ছিন্ন। আপন জগতে মগ্ন। তারপর কখন যেনো বিচ্ছিন্নতা দূর হয়। আমরা পরস্পরের কথায় মন্তব্য করতে শুরু করি। আলোচনার বিষয়ও যেনো নির্ধারিত হয়ে যায়। যেহেতু আমরা বেকার। তাই দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়েই ঘুরে ফিরে ফোঁড়ন কাটি। অন্যদের মতো আমিও বড়ো তেজের সাথে কিছু বক্তব্য দিই। কিন্তু সংযত হই। মনকে বলি চুপ রহো। খুব তো পারো মুখ চালাতে। অমন কথা দেশের আনাচে কানাচে সবাই বলে। তারপর আমি সত্যিই চুপ হয়ে যাই। আস্তে আস্তে সবাই যেনো চুপসে যায়। সন্ধ্যার অন্ধকারে কেমন ভুতুড়ে গন্ধ। ভেতরে কিন্তু ঝড়। সেখানে যেনো আমরা জীবন মরণ ভাবনায় নির্বাক হয়ে আছি। বাস্তবিকই কি আমাদের যাবতীয় সমস্যা জীবন মরণের নয়! নদীতে একটা নৌকা চলে যায়। কূলে তার ঢেউ ভাঙ্গে। আমাদের মনেও কতো কিছু ভাঙ্গে গড়ে। সে খোঁজ আপনে আপনে জানে। নকীব হঠাৎ বলে এসো বিপ্লব করি। গণেশ কয় কার বিরুদ্ধে? নকীব একটু ভেবে কয় আদর্শহীন সব কিছুর বিরুদ্ধে। সুমন হা হা করে হাসে। গণেশ কপালে ভাঁজ ফেলে বসে থাকে। নকীব একটু বেশি আশাবাদী। তাই বুঝি আবারো কথা বলে। আমরা কিন্তু জাতি হিশেবে কর্মঠ, সহনশীল। কিন্তু এ জাতিকে সঠিক শিক্ষা দেয়া হয় নি। তাই একের পর এক ভুল করে যায় মানুষ। এক কথায় আমরা জাতিকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। স্বাধীনতার আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে এলো। কি হলো আর না হলো, গোলমেলে। উন্নতির চূড়ায় উঠতে উঠতে আবার ব্যর্থতার খাদে নামে। অথচ সিঙ্গাপুর পঞ্চাশ বছর আগে একটি জেলেপল্লি ছিলো।

আকাশে কখন চাঁদ উঠেছিলো, দেবদারু বনের আড়ালে ছিলো তাই চোখে পড়ে নি। চাঁদটা মুখ তুলে আমাদের সমুখে আসে। নদীর ছোটো ছোটো ঢেউয়ের সাথে মিশে কিশোরী মেয়ের মতো নৃত্য করে। আমরা বসে বসে তাই দেখি দীর্ঘক্ষণ। আমাদের মনের ¯্রােত পরিবর্তন হয়। রাজ্যের সব জটিলতা দূর হয়ে কোমল এক পৃথিবী জাগে। এ পৃথিবীতে কোনো সংগ্রাম নেই। হাহাকার নেই। শুধু মায়া আত্মার ভেতরে জেগে থাকে। সুমনের গলায় মধু নেই। তবু গান ধরে। ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো…  তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে বলে, গণেশ তুই গানটা গা।

গণেশের গলা ভালো। তবু ডানে বামে মাথা নাড়ে। মনে তার মধুর স্বপ্ন জেগেছে কিনা। সেখানেই তলিয়ে থাকে। আমার মনটা ভার। আমার ভেতরে কোনো মায়ার পৃথিবী জাগে না। চাঁদের আলো আমিও দেখি বটে। নদীর জলে জোছনার ঝিলিমিলিও চোখে পড়ে। মনের দরজায় কেবল মধুর স্বপ্ন কড়া নাড়ে না। এদের ভেতরে আমিই একটু বেশি হতাশাবাদী।

গণেশের গলায় সুর ওঠে শেষে। ওর গলাটা সত্যিই মধুর। পা ছড়িয়ে বসে দুলে দুলে গান গায়। নকীব মাঝে মাঝে কণ্ঠ মেলায়। আমাদের ইশারা করে তাল দিতে বলে। আমরা বিরক্ত হই গণেশের গলা নির্ভেজাল শুনতে পাচ্ছি না বলে। এদিকে রাত বাড়ে। আমাদেরও বেশ হাঁটা পথ। গান শেষ হতেই তাড়া দিয়ে উঠে পড়ি। জোছনার তল দিয়ে নদীর পাড় ধরে বাড়ির দিকে হাঁটি। কথায় কথায় গণেশ নকীবকে ধরে গল্প করে। শোন তবে বিপ্লবের গল্প। আমার ঘনিষ্ট একজন ছিলো বাম করতো। বিপ্লব করার জন্য তৈরি ছিলো। সেও বলতো এ জাতিকে সঠিক শিক্ষা দেয়া হয় নি। ঠিক বলেছিস তুই, সেও শতোভাগ ঠিক। মাঝখান থেকে সে এখন ডান দলের উঠতি নেতা। মিছিলে আগের চেয়ে দ্বিগুন ফোলানো বুক। সত্য বলেছিস। এ জাতিকে সঠিক শিক্ষা দেয়া হয় নি।

************************************

আব্দুল্লাহেল কাফী
গল্পদাদুর শেষরাত্রি

রাজপথরে নর্লিপ্তি চোখ দখেে ভক্ষিুকটি শামুকরে মতো এগয়িে গলেো রাজপথরে দকি। রাজপথ মুর্হূতইে জোঁক হয়ে গলেো, খোসা বদলালো আফ্রকিান পাতার মতো। ভক্ষিুকটরি ভাঙ্গা থালায় থু থু দয়িে তলপটেে লাথি মরেে ফলেে দলিো রাজপথ রাজপথ।নির্লিপ্তিতা গরল ঢলেে ঘুমায় আজ পরম শান্ততি। আর ভিক্ষুক অকালে কাল খুঁজে পয়েছে, বুক চেপে ধরে বসে থাকে রাজপথ। প্রতিদিন মৃত্যু ঘটে স্বপ্নের সখের প্রেমের নিজের। প্রতদিনি ক্ষয় হয় অমূল্য র্বীযরে, সে ঋণ শোধ হয় না কখনোই। ক্ষয় হয় মজ্জার, চোখরে রসরে। একটা নোনা স্রোত নীরবে বয়ে যায়। ভিক্ষুকটির সে নোনা রসে ভজিে প্রাণ পায়-সাফ হয় রাজপথ।

বাইরে প্রচুর বৃষ্টি ঝরছ। কুয়াশা রঙরে বাকল ভিজে যখন কালো হয়ে যায়, তখন ইচ্ছে করে এক একটি রাত পার করি ঐ ভেজা বাকলরে সাথ।কলাগাছরে গা বয়েে বয়েে যখন জল গড়য়িে পড়, ইচ্ছে করে কামুকের ঠোঁটে তীব্র চুমু খাই ঐ গাছরে রসালো গায়, শুষে খাই চুইয়ে পড়া কামরস। নাম না জানা অজস্র গরীব ব্যাঙ ঝিঁঝিঁ পোকার সাথে পাল্লা দয়িে ডাকছ। কী সুখ অথবা শোক ওদরে হৃৎপিণ্ডে -ধমনিতে শিরায়-উপশরিায়! জলে ডোবানো কলমি লতার ফাঁকে ব্যাঙ অথবা পাতাবাহাররে আড়ালরে ঝিঁঝিঁ পোকার দারুণ চৎিকার ধ্বনতি হোক তোমার জীবন।ভেজা পাতার মতো রসালো ও সবুজ হোক তোমার জীবন। ভজো কাঠরে সোঁদা গন্ধ আতর ছড়াক তোমার চুলে।

সে মেয়েটি ঘুময়িে আছে কপালের  উপরে ছড়ানো লালচে চুল। নরম কানের লতি গলার ভাঁজে চিকন ঘামের স্রোত, তাঁর তেলওঠা মুখে কীভাবে অন্ধকার এসে চুমু খায়। মশারি র্গবে বুক ফুলায় এই ভবে যে- সেই মেয়েটা ঘুময়িে আছে তাঁর মধ্যে। তাঁর প্রতিটি নিশ্বাসে বুকের কোমল মাংসপণ্ডিদ্বয় যখন ওঠানামা করে।  তাঁর ঠোঁটের মাংসল ভাঁজ, সইে ময়েটেি এগুলোর হসিবে রাখে নি কোনোদনি জানি, আ আ আমি কিন্তু তাঁর কোমল বুকের প্রতিটি ওঠানামা সারারাত বসে গুনি।

তিন চার দনি ধরে টিপ টিপ বৃষ্টি।  থামে আবার এই শুরু, বিকেলে একটু থেমেছিলো। সেদিন সন্ধ্যাবলো, সারাদনি বৃষ্টি ঝরয়িওে সাধ মটেনেি তাঁর, এই সন্ধ্যাবলোয়ও আকাশ কালো করা মেঘ, বাইরে মানুষরে গন্ধটুকুও নাই। আবার শুরু হলো, বাড়ির সামনের নিম গাছটা বাতাসে দুলছে, ভিজে জুবুজুবু কলাপাতা বাড়ি খাচ্ছে,কেরোসিন শূন্য প্রায় বাতিটা দুলে দুলে নিবু নিবু জ্বলছে, জোরে বাতাস বইলইে নিভে যাবে। বাতাসে কাঁচা হলুদ পাতা এসে ভড়ি করছেে আমার বারান্দায়, জানালার পাশে আমি একা, বাড়ি খাচ্ছে জানালার কপাট, জানালার কপাটে বৃষ্টরি ছাঁটরে সাথে অন্ধকারেরও ছাঁট এসে লাগছে,অন্যদনিরে মতো পাখরি ডাক শোনা যাচ্ছে না আজ, ছাই রঙরে সন্ধ্যা কাটয়িে অন্ধকার গাঢ় থকেে আরো গাঢ় হয়ে উঠছে,  কমেন থমথমে একটা ভাব, নীরব, অন্ধকার।

চরিপ্রহরী গাছগুলো খোসা বদলাবে, শক্ত শরিদাঁড়াওয়ালা ঘাস সাদা হবে, মাকড়সা গা পাল্টাবে, নিষ্ঠুর বছিাগুলো কোমল প্রজাপতি হবে শেষ বয়সে,পায়রে তলার ধুলো কাদা হবে র্বষায়, সব পাল্টাবে কালে কালে।শুধু গল্পদাদুর চাওয়া পূরণ হবে না। হুমায়ুন আজাদরে কথা সত্য হবে আমি জানি। সব কছিু নষ্টদরে অধকিারে যাবে।সবচে সুন্দর মেয়ে দুই হাতে টেনে সারারাত চুষবে নষ্টের লিঙ্গ।

রাত বেড়েই চলেছে। গাছ পাতা পুকুর ল্যাম্পপোস্ট ভিজে যাচ্ছে একা একা। পাগল করা বৃষ্টি শুরু হলো। স্মৃতি এবং আশাগুলো জোট বেধেহ্যাঁচকা টান মারছে কলিজা ধরেচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। দম আটকে যাচ্ছ।হ্যাঁ, এইতো, গল্পদাদুর স্বপ্ন এবার পূরণ হবে।

************************************

মাহমুদ পারভেজ
উৎসব

আজগুবি সব ইতিহাস তৈরী হচ্ছে এখানে, ছাদের নিচে, চতুষ্কোণ দেয়ালে আবডালে, নরম বিছানায়। ছায়া ডিঙিয়ে যাচ্ছে ছায়া আর মায়ার শেকল হচ্ছে মজবুত, ধারালো হচ্ছে ধার। গতিতে মন্থরতা, হিসেব নিকেশ গুলিয়ে যাচ্ছে কবিতার, কবির। শেয়ালচোখ গভীর রাত চিরে এগিয়ে যাচ্ছে দূরে, অজানা গন্তব্যে, গরম বিছানার আদর পায়ে ঠেলে বহুদূর। অলস কাকাতুয়ার চোখে জমে উঠছে স্মৃতিউৎসব, রাতের কালোয়, চাঁদের আলোয়। মেঘের কাব্য ছেড়ে আজ থেকে আমরা কাকাতুয়ার স্মৃতিকাব্য নিয়ে মেতে উঠবো, উৎসব জমে উঠবে এবার।

**********************************

মুহিদুল মুহিত
কয়েকটি নাম

এই যে শুনুন, কয়েকটি নাম শুনবেন?

শফিউল স্যার রেজাউল স্যার অথবা জলি ম্যাডামের নাম?

কিংবা শুনবেন নাকি বাবা মায়ের কিছু মৃত স্বপ্নচারীর নাম?

মোতালেব হোসেন লিপু অথবা সান্তনা বসাক;

আরো অনেক নাম আছে সামনে হয়তো করতে হবে যোগ

কিন্তু কালি নেই কলমে কিংবা

অযথাই শুধু দুঃখভোগ।

প্রতিটি নামের ছিলো বিরাট প্রাণ

বাঁচতে হয় কিভাবে নামগুলো শেখাতো

কোনো নাম হাঁটতো

নিরাপত্তাহীন রেললাইন অথবা কোনো নিশ্চুপ হলের করিডোরে,

সবুজ ক্যাম্পাসে ঘন এই স্বপ্নোদ্যানে কিছু জন্তু লুকিয়ে থাকে

রক্তের অপেক্ষায়…

বলুন তো? এই সব উপভোগ শেষ হবে কবে

লিখতে হবে কতো আর নাম যদিও

কালি নেই কলমে

অযথাই দুঃখভোগ।

**********************************

রিভার তানজিম
আত্মকথন

বড্ড নোংরা হয়ে উঠেছি,

দুর্নিবার এই চরকিপাকে বাঁধা অনুভূতির

কি নাম দেব?

আমার শিরায় শিরায় দূষিত রক্ত পঁচে

উঠেছে- যেখানে ধর্ষিতার শাপ আর মিথ্যে

স্বপ্নের ভার আমার লোলুপতার সাক্ষী…

আমি অন্ধ হলে হয়ত বেঁচে যেতাম,

শান্তিতে থাকতাম আরো কিছু মুহূর্ত

আমায় ভিজে উঠতে হত না আকুলজলে

হয়ত…

আরো কিছু সময় পশুর মতই কাটিয়ে দিতাম

ভুলেছিলাম আমি, মানবজন্ম মনুষ্যত্ব

অভিশাপ

**********************************

আশরাফুল ইসলাম
হে বিষ, আমার জীবন

চেতনার এই দ্বিতীয় প্রসবে ছিন্নমূল আজ আমি তোমারই করতলে,

সময়ের বিষাক্ত নাগিনী আমাকে সাতপাকে জড়িয়ে

মুখোমুখি তুলে ধরেছে তার ফণা,

আমি ভয়ঙ্কর ধ্বংসের শিখরে জেগে উঠেছি আজ একা,

অমোঘ ত্রিশুলে আমায় পাতাল থেকে টেনে বের করেছে শয়তান।

হে বিষ, আমার জীবন।

**********************************

তুহফাতুল ইসলাম তপু
কামনা

দুরন্তপনা নয় আমার দোষ

তোমার প্রেমেই সদা আক্রোশ

দুর্গতিনাশিনী তুমি

শান্ত করো নির্বাণ করো

চুম্বন করো বাধ্য করো

অবাধ্য হৃদয়ভূমি।

আমার ভূমিতে রুক্ষতা বারোটা মাসে

তোমার ঋতু প্রতিটা মাসেই আসে

চির বাসন্তী তুমি

চৌচির মনের নিনাদ মুছে

সবুজ করো মরুভূমি।

**********************************

দিদারুল ইসলাম দিগন্ত শেখ
পাঠক

তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখবো ভাবতেই

বীর্যপুকুর থৈ থৈ

পতত্রি কোন প্রেমে খড়কুটো ভর্তি

নীড়ে তাদের ঢেলে দেয়, তাদের

অনেকেই উপলব্ধিত প্রেম লেখে,

আমি সেই লিখিত প্রেমেরই ব্যর্থ

পাঠক। আমি হতভম্ব হয়ে বসে

থাকি স্কুলমাঠে, প্রাথমিক স্কুল।

**********************************

ফারজানা শারমিন
ফসিল

পৃথিবীর ইতিহাস যতোদূর গড়ালো মানুষের ইতিহাস ততোদূর নয়। এক সময় পৃথিবীতে চরে বেড়াতো বৃহদাকার ভয়ঙ্কর সব প্রাণী। তাদের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ইতিহাসে তারা ফসিল হয়ে বেঁচে আছে। তারপরের যুগটাই সম্ভবত মানুষের। সেখান থেকে এই এতোদূর পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস বলতে মানুষের ইতিহাস। কিন্তু এই এতোদূর এসেও মানুষের সম্মুখযাত্রা আসলে কতোটা রমণীয় হয়েছে, বড়ো প্রশ্ন রয়ে গেছে। আদিকাল থেকে মানুষে মানুষে নানা ধরনের বিভাজ্যতা রয়ে গেছে। যেটা আধুনিক সভ্যতার চূড়ান্ত উৎকর্ষতার এই যুগেও সমানভাবে বিদ্যমান। এই যেমন আমরা (মেয়েরা) যে জীবন যাপন করি, সে এক নারীর জীবন। এ জীবন কতোটুকু মানুষের কিংবা আদৌ মানুষের কিনা তা নিয়ে ক’জনেরই বা মাথা ব্যথা। নজরুল সেই কবে সাম্যের গান গেয়েছিলেন। বেগম রোকেয়া মুঠো শক্ত করে সমাজপতিদের মুখের ওপরে ছড়ি ঘুরিয়েছিলেন। এখনো কেউ কেউ নারী আন্দোলনের পুরোধা হয়ে জীবন শঙ্কার মুখে ফেলে। তবু নারীদের যাপন কতোটুকু মানুষের হলো। এখন অনেক ক্ষেত্রে পুরুষেরা করুণা করেই নারীকে সামনে এগিয়ে দেয়। গণপরিবহণগুলোতে লেডিসদের জন্য আলাদা সিট বরাদ্দ হয় তাও আবার শিশু আর প্রতিবন্ধীদের সমতুল্যে। কথায় কথায় উচ্চারিত হয় লেডিস ফার্স্ট। এই সব চিত্র সেই শৈশব থেকে যখন আমাদের নারী শরীর বিকশিত হয় নি। তখন থেকেই সমাজের সবাই মেয়েকে নারী হয়ে ওঠার সকল আয়োজন প্রস্তুত করে রাখে। মেয়ের মগজ তো বটেই শরীরটাও তাদের পছন্দমতো গড়ে তোলে। বিভাজ্যতার বড়ো একটা জায়গা হলো পোশাক।

একজন নারী ক্ষমতা রাখে তার শরীরে নতুন প্রাণ ধারণ করতে। এই ক্ষমতাকে পুরুষেরা বড়ো রকমের দুর্বলতা ভাবে। নারী পুরুষের সম্পর্কের ভেতরে পুরুষেরা সুযোগ পেলেই এই জায়গাটাতেই আঘাত করে। নারীদের শারীরিক গঠনকে হেয় কিংবা তাচ্ছিল্য করে হাসার প্রবণতাও পুরনো। বাজারের পণ্যের মতো নারীদেহের দরকষাকষি সভ্যসমাজে বেড়েছে বৈ কমে নি। এভাবে নানা ধরণের ভয় আর ক্ষয় নিয়ে একজন মেয়ে কিভাবে যে বড়ো হয়। যে ভয় আর ক্ষয় ঘরে এবং বাহিরে। যে সব মেয়েরা নিজের অস্তিত্ব বিষয়ে সচেতন তাদেরও অস্তিত্বের বিপন্নতার ভয় সর্বত্র। এ প্রশ্নও কখনো পিছু ছাড়ে না যে আজও কি মানুষ হতে পারলাম যেখানে পুরুষ আমাকে নির্মাণ করেছে নারী হিসেবে। দেবীর আসন দিয়ে পূজা করেছে। কিন্তু জানার চেষ্টা করে নি নারী কি চেয়েছে। বেগম রোকেয়ার ভাববক্তব্য এখনো দিতে হচ্ছে যে, একটা সময় আমি ছিলাম পুরুষের গৃহে বন্দি। শারীরিক মুক্তি ছিলো না। আর আজ পুরুষ আমায় ঘরের বাইরে টেনে এনেছে। তাতে শারীরিক মুক্তি ঘটেছে কিন্তু মানুষিক মুক্তি ঘটে নি। আমি আজও পুরুষের আজ্ঞাবাহী দাসী। পুরুষ আমাকে যেমন করেই পেতে চায় আমি নিজেকে তেমন করেই প্রদর্শন করি। লেখকরা তাদের গল্পের নায়িকাগুলোকে নিজের কল্পনা দিয়ে যেভাবে তৈরি করে, বস্তবতায় আমি সেখানে নেই। সেখানে আমি নারীসত্তাকে খুঁজে পেলেও মানবসত্তাকে খুঁজে পাই কই! কখনো মনে হয় প্রগৈতিহাসিকযুগের প্রাণীদের মতো আমিও যেনো হাজার বছর বেঁচে আছি ফসিল হয়ে, মানুষের ফসিল।

**********************************

আবু উবায়দাহ তামিম
তিনটি অণুগল্প

বন্ধু

ক্লাস নাইনে থাকতে একটি মেয়ে আমাকে পছন্দ করত, আমিও তাকে পছন্দ করতাম। একদিন সে আমাকে তার বাড়িতে ঘুরতে নিয়ে গেল, আমি গিয়ে তার ঘরে বসলাম। দেখলাম- তার ঘরে অনেক কয়টা ছেলের ছবি ঝোলানো রয়েছে এবং আরেকটি ছবি তার টেবিলে সাঁটানো। মেয়েটি আমাকে বলল, ঝোলানো ছবিগুলো আমার বন্ধু আর টেবিলের ছেলেটি আমার ভালো বন্ধু। আমি তার কথায় শুধু হাসলাম। তারপর আমাদের আর কোনো কথা হয় নি। এটা উনিশ’শ আটান্নর কথা।

তারপর আজ দেখি, টেবিলে সাঁটানো সেই ছবিটি মেয়েটার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ ওদের কোনো ছায়া নেই।

হাসি

আমরা টিনেজার বন্ধুরা মিলে একটি বাসে চড়েছিলাম। সেই বাসে কোত্থেকে যেন একটি পাগল উঠেছিল। পাগলটি বারবার আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লুঙ্গির এক পাশ কোমর পর্যন্ত উঠাচ্ছিল আর নামাচ্ছিল, আর আমরা তা দেখে খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ে এলিয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু আমরা পাগলটাকে কিছু বলছিলাম না বা পাগলটাও আমাদের হাসিতে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিল না। সে তার মতো সারা বাস ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর নিজের লুঙ্গিটাকে ওঠা নামা করাচ্ছিল। এক সময় বাসটি ধীরে চলতে শুরু করলে পাগলটি নেমে পড়ল ও সেই সাথে আমাদের হাসিও বন্ধ হলো।

নেমে যাওয়ার সময় পাগলটি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, বালকগণ, পৃথিবী হাসাহাসির জায়গা নয়। সিরিয়াস হও। তারপর আমরা আমাদের পকেটে হাত দিয়ে দেখি আমাদের পকেটে কোনো টাকা নেই। বাসটি আবার চলতে শুরু করল।

বাস্তবতা

আমার বাবা বারবার আমাকে বলতেন আমি নাকি বাস্তবতা বুঝি না, এবং আমি যেন শীঘ্রই বুঝে ফেলি। আমি বাবার কথা রাখতে চেয়েছিলাম, বলেছিলাম শিখে নেব বাস্তবতা। তারপর আমি একদিন আমার গার্লফ্রেন্ডের কাছে ব্যাপারটি খুলে বলেছিলাম। গার্লফ্রেন্ড বলল, আরে এটা শেখা তো কোনো ব্যাপারই না। আমি বাস্তবতা স¤পর্কে ভালো জানি। তুমি এক রাতে আমার কাছে এসো, শিখিয়ে দেব। বাস্তবতা শেখার তাড়নায়, সত্যিই একদিন রাতে তার কাছে আমি গেলাম। ভেবেছিলাম, সে আমার সঙ্গে সেক্স করাকে বলবে বাস্তবতা। কিন্তু না, সে তা করে নি। সে খুব ভালো মেয়ে জেনেছিলাম।

সেই রাতে সে আমার পাশের ঘরে শুয়েছিল। আর আমি রাত জেগে জেগে শুনেছিলাম অন্য একটি পুরুষের সঙ্গে তার শীৎকারের শব্দ। সকালে উঠে সে আমাকে বলল, তুমি ঘুমাও নি? চোখ লাল কেন? আমি চোখ ডলতে ডলতে বললাম- আমি বাস্তবতা শিখে ফেলেছি। আমি যাই?

**********************************

সুবিনয় শাফাত
বৃষ্টি

চারিদিকে ফসলের মাঠ। অনেক দূরে দূরে ছায়ার মতো গ্রাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় মাঠের ওপারে, সবুজ গ্রামের মাথার ওপরে আকাশের সীমানা। মাঠের এদিকটায় তেমন ঘর বাড়ি নেই। অনেক দূর পর পর কাঁচা সরু পথ সাপের মতো করে বেঁকে বেঁকে কতোদূরে কতোভাবে গিয়েছে। এসব পথে মূলত কৃষকরা দিন শেষে ফসল নিয়ে ঘরে ফেরে। গাঁয়ের গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা, রাখালেরা গরু ছাগল চরাতে নিয়ে আসে। সকাল হলে আশপাশের দশ গাঁয়ের প্রায় সকল মানুষ মাঠের দিকে মুখ করে হাঁটে। মাঠে নানান ফসলের বাহার। খেসারির সবুজ ডগায় ডগায় নীল ফুল বাতাসে কাঁপে। মসুরির সাদা ফুল, কালাইয়ের লকলকে ডগা আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। ধানের মৌসুমে সবুজের ঢেউ যতোদূর চোখ যায়। পাকা ধানের মৌসুমে মাতাল করা গন্ধ বাতাসে ভেসে থাকে। এ যেনো বিরক্তিহীন অপার উচ্ছাসের মহিমা চারিদিকে।

মাঠের পাশেই যেদিকটা ঘর-বাড়ি কম। সেখানে ছোটো একটা খুপরি ঘর। দূর থেকে মনে হয় মাঠের পাশে জমিয়ে রাখা নাড়ার স্তুপ। কবেকার ঝড়ে মাঠের ভেতরে উড়ে এসে পড়েছিলো কয়েকটা টিন। সে টিনের ছাউনি দিয়েই মূলত খুপরি ঘর তৈরি। সেখানে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল বাঁচিয়ে দুটো মানুষের বসবাস। যেনো ভিন্ন গ্রহের প্রাণ। বুড়িটা ঘরেই থাকে। ধান কাটার মৌসুমে কখনো মাঠে মাঠে ঝরা শীষ কুড়াতে বেরিয়ে পড়ে। বুড়ো সকালে উঠে দুটো খায়। তারপর গ্রামে গ্রামে ভিক্ষে করতে বের হয়। এ গ্রাম ও গ্রাম ঘুরে যা জোটে, তাই সংসার চালানোর মূলধন। দীর্ঘদিন এই পেশায় থেকে বুড়ো দক্ষ হয়ে উঠেছে। মানুষের কঠিন দিল নরম করার কৌশল বুড়োর ভালোই জানা। দিন শেষে তাই বুড়ো যা পায় তা একেবারে মন্দ নয়। দিন চলে যায়।

বুড়ো ভিক্ষার ঝোলা কাঁধে নিয়ে একটু সকাল সকালেই বের হয় সেদিন। কয়েকটা সরু কাঁচা পথের পরে বড় রাস্তায় ওঠে। সেটাও কাঁচা পথ কিন্তু অনেক গাঁয়ের সেটিই প্রধান পথ। মাঝ বরাবর দীর্ঘ ঘাস। দুপাশে গরু মহিষের গাড়ির চাকা অনুসারে সরু সাদা পথ। বুড়ো তার একটি পথ ধরে হেঁটে গ্রামে আসে। প্রথমে গ্রাম শুরু হতেই বড়ো একটি বাগান। বাগানের পাশেই ভাঙ্গা গেটওয়ালা বাড়ি। বুড়ো সে বাড়িতেই করুণ সুরে ভিক্ষা চায়। সে করুণ সুরে গেটের কাছে ঘুমন্ত কুকুরটা অর্ধঘুমন্ত হয়। বাড়ির ভেতর থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। বুড়ো আবার বলে, কেউ কিছু দাও মা, খোদা মঙ্গল করবেন। কিন্তু কেউ আর বের হয় না। বুড়ো রাস্তায় এসে মনে মনে ভাবে, মানুষের মনে আর আগের মতো সুখ শান্তি নেই খোদা, মানুষ আর ভিক্ষে দিতে চায় না। ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হাঁটতে, কয়েক বাড়ি ব্যর্থ হয়ে অন্য একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িটা সেকালের রাজাদের মতো। কিন্তু খুব নির্জন বাড়িটা। মানুষের কোনো চলাচল দেখা যায় না। কয়েকদিন আগে বাড়ির কর্তা মরেছিলো। সেই শোক এখনো আছে হয়তো। বুড়ো ভিক্ষুক গেটের উপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কন্ঠ করুণ করে মা সকলকে ডাকে। সাড়া মনে হয় মেলে না, ভেবে আবারো করুণ করে ডাকে। একজন তরুণ মেয়ে বের হয়ে অসে। তার মুখটা বিষাদমাখা। সাদা হাত বাড়িয়ে বুড়োর দিকে ধরে। বুড়োর চোখ বড়ো হয়। পাঁচশো টাকার নতুন নোট। বুড়ো সঙ্কোচ করে হাতটা বাড়ায়। তরুণ মেয়েটি কাঁপা গলায় বলে দোয়া করবেন। গেট বন্ধ হয়ে যায়।

বুড়ো সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলে বুড়ি রাঁধে। বুড়ো বুড়ি খেয়েদেয়ে তারপর শুয়ে পড়ে। ঘুমানোর আগে একটা দুটো কথা বলে। পাঁচশো টাকার আনন্দ নিয়ে বুড়ো সহজেই ঘুমিয়ে পড়ে সেদিন। বুড়ির চোখে ঘুম আসে না। বুড়ির শুকনো কাশির রোগ রাতে বাড়ে। একবার কাশতে শুরু করলে আর থামার নাম নেই। সেদিনও বুড়ি খকখক করে কয়েকবার কাশে। বুড়োর ঘুম ভেঙ্গে গেলে মুখ খারাপ করে ধমক দেয়। বুড়ি তাতেই বাইরে চলে আসে নয়তো অন্যদিনের মতো কোমর বরাবর লাথি বসাবে সে ভয়ে। বুড়োটারই বা দোষ কি, সারাদিন রোদ বৃষ্টি মাথায় করে এ বাড়ি ও বাড়ি টই টই করে ঘুরে ক্লান্ত হয়। সন্ধ্যার পরে শুতেই চোখে গভীর ঘুম আসে। তখন কানের কাছে খক খক করে কাশলে কার-ই বা মাথা ভালো থাকে। বুড়ি তাই বাইরে গিয়ে কেশে এসে একটু শান্ত হয়ে বুড়োর পাশে গিয়ে শোয়। দুনিয়া তো ঘুমিয়ে পড়েছে, মাঠে শন শন বাতাসের শব্দ। ঝিঁঝিঁ পোকা মাথার খুব কাছেই ডাকে। মুখের ওপরে তারাবাতি খেলতে খেলতে কয়েকটা জোনাকি ওড়ে। বুড়ি এদের সাথেই রাত্রি যাপন করে।

সকাল থেকেই আকাশের মেজাজ ভালো না। সকালেই একবার বৃষ্টি হয়ে যায়। ঠা-া বাতাস বয়। বুড়োর এদিন আর ভিক্ষে করে সুবিধা হয় না। বিকেল না হতেই যেনো সন্ধ্যা হয়ে আসে। মেজাজ খারাপ করে বুড়ো অকারণে বুড়ির ওপর ক্ষেপে যায়। তবু বুড়ি ধুঁকতে ধুঁকতে রান্না করে বুড়োকে খাওয়ায়। ঠা-া বাতাসে আবার বুড়ির সর্দি কাশি বেড়েছে। সকাল থেকেই নাড়ি ছিঁড়ে কাশি উঠছে। বুড়ি চিন্তায় মরে, আজ আর বিছানায় শোবার ভাগ্য হবে না। দমকে দমকে যে কাশি হয়, সে কাশি চেপেও রাখা যায় না। বুড়ো মেজাজ খারাপ করে সকাল সকাল শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। বুড়ি বাইরে বসে কতো সময় কেশে কেশে ঘরে আসে। বাইরে থাকা যায় না ঠা-ায়। বিছানায় এসে বুড়ি ভয়ে শোয় না। শুলে কাশি বেশি হয়। কিন্তু বসে থেকেও নাড়ি ছিঁড়ে কাশি বের হতে চায়। মুখে আঁচলচাপা দিতে গিয়ে যন্ত্রণায় চোখ বড়ো হয়। আর বুঝি ধরে রাখা যায় না। বুড়োর খসখসে পায়ের লাথির ভয়ে বিছানার কোনায় সরে যেতে চায়। তখন হঠাৎ ঝমঝম শব্দ। টিনের চালে তুমুল বৃষ্টি নামে। বুড়িরও নাড়ি ছিঁড়ে কাশি বের হয়। বৃষ্টির শব্দের ভেতরে বুড়ির কাশির শব্দ মিলে একাকার হয়ে যায়। পাশেই বুড়ো বেঘোরে ঘুমায়। কাশির শব্দ আর তার কানে যায় না। বুড়ি আরাম করে কাশে। কাশতে কাশতে গলা বেয়ে রক্ত ওঠে। বুড়ি তবু শান্তি করে কাশে। টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি।

**********************************

খুর্শিদ রাজিব
সোডিয়ামের হলুদ বাতি

নগরে মৌন সন্ধ্যা। সোডিয়াম বাতির নিরঙ্কুশ আলোয় সব কালো ঢাকা পড়ে। মৃতনগরীর মতো অচেনা আলো জেগে উঠে কেমন যেনো ঢং করে। গলির দেয়ালে গা ছেড়ে দাঁড়ানো বেশ্যার মতো। রঙের খেলায় মজে উঠতে জানায় নগ্ন আবেদন। লোভের ফাঁদ। জোড়ায় জোড়ায় তরুণ তরুণীরা রাস্তায়। হাতে হাত গায়ে গা লাগিয়ে পরস্পরের সৌন্দর্য দেখে। ঠোঁটজোড়া হঠাৎ ভিজে উঠলে শৈশবের চকলেট চোষার কথা মনে পড়ে। বৃদ্ধদের মুখ মৃতের মতো ফ্যাকাশে হলুদ। কিছু সবুজ পাতা বিরহীর মতো একা হলুদ বৃষ্টিতে ভেজে। কালো পিচের রাস্তায় স্বর্গ নরকের দিকে যাতায়াত। নগরে মেকি সৌন্দর্য বিলাতে জুড়ি নেই সঙ বাতিগুলোর। আমি শুনেছি বৃষ্টির মতো হলুদ আলোও নাকি কান্না শুষে নেয়। ভেজা হৃদয়টার ওপরে ফেলে নির্মোহ প্রলেপ। যাক তবে, এখন স্বস্তি মেলে। অভিনয় করে ক্ষুধা লুকোনোর দরকার নেই। মুখে সস্তা আর রূপ লুকোনো আলো মেখে, রাতের রাণীদের মতো দেহ বেঁচে ক্ষুধায় কাতর স্বপ্নালু চোখে ক্ষণিক তৃপ্তি দিয়ে ফেরা যাক। তবে চিরকালের নয়। ভেবে দেখেছি ঢের। শহরের পরিত্যক্ত গলি, সরু রাস্তাগুলো, ডাস্টবিনের মতো আদর্শবাদী। তোষামোদের ব্যবসা করতে সে জানে না। ফুটপাথ যেনো মায়ের আঁচলের মতো মমতা বিলাতে শিখেছে। সোডিয়াম বাতির আলোয় মায়ার এই শহরে একটি টিনের বাড়ি বানানোর চিন্তা। বৃষ্টি এলে নেচে নেচে যাবে সমস্ত কিছু। নগরে বৃষ্টির নাচন পরিশুদ্ধ সুন্দর। সবুজ পাতার কদর্য চুয়ে চুয়ে কালো রাস্তায় ফেনা হয়ে ভাসে। সোডিয়াম বাতির হলদে চোখের ছায়ায় মায়াভরে চোখ মেলে উদযাপনের বেলা। শহরে নাকি চাঁদ ওঠে না। সোডিয়াম বাতি নগরীর মায়াচাঁদ। সন্ধ্যা হলে তার নিরপেক্ষ আলোয় কলম তুলে লিখবো অনাগতের রূপকথার গল্প। যে সন্তান আমার নগরের।

**********************************

জাকির হোসেন
স্বর্গবাসীর দুনিয়াদারী ভাবনা

কোথাও ত্রুটি হয়েছে নিশ্চয়। স্বর্গে বাস করে ইচ্ছেমতো ভাবনা চিন্তার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু সে কীভাবে এতে সক্ষম হয়ে উঠলো সেটা বিস্ময়। ঈশ্বরের অধিনস্তদের গাফিলতি কিনা। ইতোমধ্যে সে সমস্ত ভোগ বিলাস ছেড়ে দিয়ে ভাবনা চিন্তায় মগ্ন হয়। একটু দূরে হুরগুলো মোহনীয় মুদ্রায় নাচছে। বিচিত্র সব গাছে গাছে ফলগুলো পেকে পেকে ঝুলছে। মধুর নদী দুধের নদী বিনা ¯্রােতে বয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করলেই এসব এখন তার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। কিন্তু ইচ্ছে করে না। হুরগুলো তাকে আনন্দ দিতেই সদা তৎপর।  সেক্সডলের মতো তাদের কোনো ইচ্ছা অনিচ্ছা নেই। যেমন খুশি তেমন খেলানো যায়। কিংবা এগুলোকে বলা যেতে পারে স্বর্গীয় সেক্সডল। একেবারে ব্যক্তিত্বহীনতার চূড়ান্ত রূপ।

স্বর্গে কোনো অসুন্দরের স্থান নেই। চারপাশে এতো সুন্দর আর শৃঙ্খলা দেখে দেখে এখন এসব অসুন্দর লাগে। যেখানে অসুন্দরের কোনো স্থান নেই সেখানে সুন্দর কীভাবে সুন্দর হয়। আসলে তার মাঝে মাঝে অসুন্দর কিছু দেখতে ইচ্ছে করে। ধূসর শুকনো পাতা, কালো পানির কাদা, ময়লার স্তুপে কাক। কিন্তু এখানকার নদী পাহাড় সবুজ বন আর সুবিশাল উদ্যান এতোটাই শৃঙ্খল যে মাঝে মাঝে এসব দেখতে দেখতে হাঁফ ধরে যায়। এখানে সে যা খেতে চায় তাই পায় সবসময়। ব্যাপারটা নিদারুণ একঘেয়ে আর নিরানন্দ। গাছে উঠে গায়ের ঘাম ঝরিয়ে ফলপ্রাপ্তির উচ্ছাস কোথায়। পুকুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে হঠাৎ বড়ো মাছ পাবার মতো আনন্দ কোথায়। আর নেই এখানে রূপকথার দম আটকানো গল্পের অস্তিত্ব। যেহেতু এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সবি নীরস বাস্তব।

তার মনে পড়ে, স্বর্গে তার বাবার সাথে দেখা হয়েছিলো একবার। তখন হুরদের সাথে তার বাবার ভোগ বিলাসে মত্ত দেখে বিব্রত হয়ে ফিরে এসেছিলো। আর সে সংবাদ পেয়েছে তার মা নরকে আছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার বটে, মায়েরা যে কখনো খারাপ হতে পারে এ সংবাদ স্বর্গ মর্তের কারো জানা ছিলো না।

স্বর্গে কোনো কবিকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। সম্ভবত কবিরা স্বর্গে প্রবেশ করতে পারে না। প্রবেশ করলেও কল্পনার গুরুত্বহীনতায় কবির কবিত্ব মরে গেছে। অথর্ব ইন্দ্রিয়সর্বস্ব হয়ে ভোগ বিলাসে ডুবে আছে।

তার একটা প্রেমিকার প্রয়োজন অনুভব হয়। যে তার কিছু কথা শুনবে কিছু শুনবে না। তাদের ভেতরে বিরহ মিলন ভরপুর হয়ে থাকবে কিন্তু বিরহে মিলনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে না। কিংবা কাব্যপ্রেমী প্রেমিকা, যে তাকে কবিতার চেয়ে একটু বেশিই ভালোবাসবে।

স্বর্গ আসলে অনন্ত বিস্তৃত এক কারাগার। সেকি এতোই ইতর যে শুধু খাওয়া দাওয়া আর কিছু সেবাপরায়ণ দাসী পেলেই খুশি থাকবে! সে তো মানুষ। সুখ দুখ আনন্দ বেদনা আবেগ অনুভূতির রাজ্যে তার বাস। একটা ইতর প্রাণীর জন্য স্বর্গ নির্মাণ করা যেতে পারে, যার কোনো মুক্তির আকাঙ্খা নেই, একটা সীমার মধ্যে বাস করে জৈবিক চাহিদা পুরণ করেই সুখী।

সে পৃথিবীর কথা ভাবে। পৃথিবীর ঘাসে পা ডুবিয়ে তার হাঁটতে ইচ্ছে হয়। সাথে একটা হাত থাকলে ভালো হয়। অথবা সেটা সে কল্পনা করে নিতে পারে।

**********************************

অর্বাক আদিত্য
ফেরারি শেখাও

দিক দিগন্ত নয়, ফেরার সময় হলে সবাই ফেরে

যার ঘর আছে, ঘরে

যার দু’চোখজুড়ে আগুনের মাঠ, মাঠে—

কুয়াশা পছন্দ হলে

তুমিও হয়ে যাও অতিথি পথিক

খুলে ধরো পৃষ্ঠা পা-ুলিপির অক্ষর

আমি নীরদ নিতাই শিখে নিই স্বাক্ষর

হুররাম হুলস্থুল করে এ পথে এসো

এটাই সঠিক।

কক্ষপথ ও গ্রহ

এ শহরে, কোনো রমণীর সঠিক গন্তব্য পাই নি

তারা কার ঘরে যায়?

কার দেহে জ্বালায় আগুন!

এইটুকু মনে আছে

একবার এক সুন্দরীর কবরে জলের বদলে দিয়েছি জুঁই

আর এক নারী নিজে থেকে বলেছিলো, এসো শুই।

আবাসিক কথোপকথন

বখশিশ দিলে কাজ হবে মরুর ওপার

ছলনায় পোষ মানাবো উত্তেজিত ঘোড়া

চেনাবো গুহার পথ পড়াবো প্রথম শপথ আর

চতুর চুম্বনে নিভিয়ে দেবো তোমার আগুনের চোখজোড়া

অধমের নিদানে পাশে থেকো

অধিক পাপে করো ক্ষমা

তোমার শরীরে আদায় করতে চাই পবিত্র হজ্জ্ব

পূর্ণ করো বান্দার এজাজ

লিখে দেবো জমানো রহস্য রমরমা।

**********************************

আহমদ মুস্তাক
নর্তকী

যৌবনে ঝাঁকি দিয়ে মঞ্চ কাঁপানোর কৌশল

আয়ত্ত করতে কিছু নিপুণ মুদ্রা

ব্যবহার তার নখদর্পণে

মানুষ উল্লসিত হয় নিপুণ নৃত্যমুদ্রা

দেখে নয়। দোদুল্যমান শরীরের তা খুব

ভালো করে জানা

মধ্য মাঘ মাস গভীর রাত

অর্ধ উলঙ্গ পুরুষশরীর ঘামে ভিজে যায় কেন?

সে কথা আমার ভগবান জানেন!

**********************************

সুজন হালদার
যাত্রা

প্রাণপাখি উড়ে যাবে জানি

শূণ্য বাহনে অজানার পানে একদিন

নিয়তির অন্ধ তামাশা তবু প্রকৃতির আদলের মতো

মৃত্যু- আঁচল পেতে চেয়ে আছে করুণ।

দেহের আবরণের মতো এ পৃথিবীর এক একটি বস্তু

মুহূর্তে খসে পড়ে,

কলি থেকে ফুল হলে

পাপড়ির বিন্যাস, ঝরে পড়ে

প্রলয় পার্বণের মতো এ দেহের ভাঁজ

মিশে যায় সবুজ শয্যায়।

তবুও তো ফোটে নতুন কলি

নবপল্লবের সবুজ ছায়া, কান্নার ধ্বনি স্বপ্ন আনে

উদয়ের পথে,

মৃত্তিকার বদ্ধভূমিতে তারো ইতিহাস লেখা হবে একদিন

চিরায়ত যাত্রার।

**********************************

সৈয়দ কামাল হুসাইন
দয়াল

দুপাশে ধানক্ষেত। গাছগুলো হাঁটু সমান উঁচু। স্নিগ্ধ সবুজ মাঠের মতো লাগে। মাঝখানে আল। আলের দুপাশে ছোট ছোট ঘাস। সে ঘাসে হলুদ ফুল। নাকফুলের মতো। এই ফুলগুলোকে বলে হাঁচিফুল, গন্ধ মৃদু ঝাল। পাপড়িগুলো ছিঁড়ে হাতের তালুতে নিয়ে নাকের কাছাকাছি ধরে শ্বাস টানলে নেশার মতো হয়, অনর্গল হাঁচি আসে। কলিম উদ্দিন এই রকম পথে কতদিন আগে হেঁটেছে, ঠিক তার মনে নেই। অনেকদিন আগে যখন সে ছোট, বর্ণমালার বই বুকে নিয়ে স্কুলে যেতো। একাকী স্বীয় কণ্ঠে তৈরী সুরে অর্থহীন গান গেয়ে অদূরে কাঁচা সড়কের পানে চেয়ে কী যেন ভাবতো তখন। এই সরু আল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনো পাকা কখনো কাঁচা ধানের গন্ধ নিয়ে, কাছের বড় রাস্তায় মরা গাছ কিংবা ছাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছের পানে চেয়ে কত বিকেলের টুকরো স্মৃতি, অন্ধকারের ভেতরে হঠাৎ যেনো আলো উদ্ভাসিত হয়। ধোবাউড়া বাজারের মসজিদ রোডের টিয়া বস্ত্রালয়ের মালিক তখন বললেন, দয়াল দশটা টাকা নাও, আর এই ঘাসগুলো পরিষ্কার করে দাও।

ঘাসগুলো দেখে কলিম উদ্দিনের মগজের ভেতরে ঘোলা ¯্রােতের পানির মতো পাক দিয়ে ওঠে, সেখানে যেনো কোন জনমের দৃশ্য ভেসে ওঠে, সেই শৈশবে, যখন তিনি স্কুলে যেতেন। মাকে গিয়েই বলতেন, ভাত দাও। টিনের একচালা ঘর। বাতার  বেড়া। ঘরে  দুটো চৌকি। একপাশে মাচা। মাচায় তেমন কিছু থাকতো না। কয়েকটি হাঁড়ি, স্টীলের একটা ট্রাঙ্ক, বাঁশের চাঁচাড়ি দিয়ে বানানো অর্ধেক শূন্য গোলা। মা বাবা থাকার চৌকির সাথে লম্বা টেবিল থাকতো, সে  টেবিলে রাখা হতো ভাত তরকারির হাঁড়ি, কলসি, জগ, গেলাস। টেবিলের এক কোণে সাজানো থাকতো কলিম উদ্দিনের ভাত। তার মনে পড়ে ক্লাস ফোরে পড়ার সময় একদিন বিকেলে স্কুল ছুটির পর এসে দেখেন ভাত রান্না হয়নি। পেটে তার ক্ষুধা ছিল প্রচুর। তাই সেদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। এতোটাই সক্রন্দন ছিলো যে পাশের বাড়ির  চাচি পর্যন্ত চলে এলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বাবা বলে ডেকে নিয়ে গেলেন, সরপুঁটি আর শিমের তরকারি দিয়ে খাবার দিয়েছিলেন। ভারি সুস্বাদু লেগেছিল খেতে। পঞ্চাশ বছরের কলিম উদ্দিন দূর্বা খামচাতে খামচাতে দশ  বছরের সরল দিনগুলিতে আঁচড় কাটতে থাকলেন।

ছোট শিশুদের হাসাবার জন্য স্পর্শকাতর জায়গায় মানুষ যেমন সুড়সুড়ি দেয় কলিম উদ্দিন দু’হাতে এমন ভাবে দূর্বা তুলতে থাকেন। মগজ ঘুরপাক খেয়ে বারবার সেই শৈশবে, তিনি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছেন সরু আল দিয়ে। সে আলে ঘাসফুল, হাঁচিফুল। সপ্রতিভ বসে হাঁচিফুল ছিঁড়ে নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছেন। এখানে যে কুকুরের প্র¯্রাব ছিলো, বিষ্ঠা ছিলো, রাজ্যের কদর্য ছিলো, কলিম উদ্দিন সেসব উপলব্ধি করলেন না। সেই ছোট সময়ে যেমন দু’হাতে বই চেপে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে যেতেন ঠিক এমনিভাবে দূর্বা আর ময়লাগুলো তুলে ফেলে এলেন খালে।

টিয়া বস্ত্রালয়ে এসে টেবিলের উপরে রাখা কাঁচের ছোট গেলাসে চায়ের তলানিটুকুর দিকে লক্ষ্য করে ক্ষীণ গলায় কলিম উদ্দিন বলেন, মামা আরো খাবেন?

টিয়া বস্ত্রালয়ের মালিক নিস্প্রভ হেসে বলেন, নাহ।

মুহূর্তেই চুমুক দিয়ে তলানিটুকু শেষ করে দোকানে উপস্থিত অন্যান্য লোকদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে কলিম উদ্দিন বিদায় নেন। যাবার সময় মুখ থেকে তার অস্পষ্টভাবে বের হয় দয়াল দয়াল।

এই পৃথিবীতে ত্রিশ বছর পর্যন্ত কলিম উদ্দিনের নাম কলিম উদ্দিন ছিলো। প্রাইমারি পাস করে কলিম উদ্দিন একদিন বাবাকে বললেন,

বাবা পড়া তো অনেক অনেক হলো, তুমি রোজ রোজ কষ্ট করবে আর আমি বাবু সেজে স্কুলে যাবো তা হয় না। আমিও তোমার সাথে কাজ করব।

কলিম উদ্দিনের বাবা হাসতে হাসতে স্ত্রীকে ডেকে বলেছিলেন, শোনো তোমার ছেলে কী বলে।

কলিম উদ্দিন কাঁচুমাচু হয়ে বলেছিলেন, মা আমি আর পড়ব না, বাবার সাথে ভ্যানগাড়ি চালাবো।

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে স্নিগ্ধ গলায় বলেছিলেন, এমন বলতে নেই বাবা, তুমি পড়বে, অনেক পড়বে, একদিন মস্ত ডাক্তার হতে হবে তোমাকে।

মায়ের কথায় কি যেন মেশানো ছিলো, বড় গভীর মায়া, সে মায়ায় কলিম উদ্দিন আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে গেলেন। মায়ের চোখের দিকে  চেয়ে আদুরে গলায় বলেছিলেন, আমি পড়বো মা অনেক পড়বো, ডাক্তার হবো।

মা বাবা দুজনেই তার দিকে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়েছিলেন। বাবা হেসে হেসে বলেছিলেন, আমাদের কলিম উদ্দিন কতো ভালো তার হিসেব নেই।

আড়ালে বসে কে যেনো হাসে। সে হাসি প্রসন্ন না অপ্রসন্ন তার বিচার কে করে। বছর কয়েক পরে সেদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে কলিম উদ্দিন দেখলেন, উঠোনে কাঁঠাল গাছের নিচে বাপ তার সবুজ চাদরে আচ্ছাদিত। অনেক মানুষের ভেতরে মায়ের কান্নার শব্দ শুনে তার কলিজায় মোচড় দিয়ে উঠলো। মাথার পাশে দাঁড়িয়ে বাবাকে শেষ দেখা দেখলেন। কদম ফুলের মতো হলুদ মুখটির দিকে তাকিয়ে  কান্না মেশানো গলায় ডেকেছিলেন, বাবা।

জানা যায় দুপুরে কাজ শেষে গা জিরিয়ে ভাত খেতে চায়লেন। ভাত ছিলো না বলে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে বাসি রুটিই খেতে বসলেন। হঠাৎ গলায় রুটি আটকে গেলো। পানি খেতে চেয়ে জলের গেলাস হাতে নিলেন কিন্তু মুখে দেবার পূর্বমুহূর্তে স্টিলের গেলাস পড়ে ঝনঝন করে মাটিতে গড়ালো। কলিম উদ্দিনের বাবা ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ধরাধরি করে হাসাপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করলেন। সে অধ্যায় শেষ হলো। মাস তিনেকের ভেতরে দেখা গেলো সংসারের অবস্থা বিপজ্জনক। মা এর ওর থেকে ধার দেনা করে সংসার চালান। রাতে কলিম উদ্দিন দূরে জ্বলতে থাকা লাল আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, কিছু করতে হবে, নইলে সবকিছু ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ঘরের মতো উলোটপালট হয়ে যাবে। তখন ডাক্তার হবার চিন্তা দিলের এক কোণে লুকিয়ে রেখে ভ্যান ড্রাইভার হবার কথা ভাবলেন। এই ইচ্ছে সরিষা ফুলের রেণু সমানও তার মন্দ লাগলো না। তিনি যেন জানতেনই একদিন তার ভ্যান ড্রাইভার হতে হবে। তাদের ডাক্টার হবার ইচ্ছে কল্পনার বিলাস ছাড়া কিছু না। তাই আর দেরি করলেন না, ভ্যান চালাতে শুরু করলে মায়ের মুখও যেনো উজ্জ্বল হলো। ভ্যান নিয়ে রোজ সকালে বের হয়ে সন্ধ্যায় ফিরতে থাকলেন। প্রথম প্রথম প্রচুর কষ্ট হতো, হাত লালচে দাগে ভরে থাকতো। হাতে পায়ে কোমরে তীব্র ব্যথা হতো, তবুও মাকে বুঝতে দিতেন না। মায়ের সম্মুখে এমন ভাব দেখাতেন যেন ভ্যান চালানো ভারী সুখের কাজ। ঝিরঝিরে বাতাসের মতো মা ছেলের সংসারে সুখ দুঃখের ছায়া এলো গেলো। দু’বছর পর আরেকটি স্বাভাবিক ঘটনা ঘটলো। ডানদিকে স্বামীবিয়োগ, বাম দিকে অসুস্থতা, ঊর্ধ্বভাগে ছেলের জন্য নানান দুর্ভাবনা। এমনই অবস্থায় একদিন অঘ্রানের সকালে মা বিদায় নিলেন। কলিম উদ্দিন পৃথিবীতে খুব একা হয়ে গেলেন। উঠোনের সামনে অর্ধমৃত ডালিম গাছটির মতো একা। যে ঘরে বাবা থাকতেন, মা থাকতেন, সে ঘরে  খুব একা। তিনি বোধ করলেন একটা সবল ভয় গোপনে তাকে দৌড়াচ্ছে। তিনি ছটফট করলেন, দৌড়ালেন। মায়ের শোক ভুলতে লাগলো বহুদিন। পর্যায়ক্রমে তিনি বুঝতে পারলেন, পৃথিবীতে জন্ম মৃত্যুর ভার মানুষের হাতে নেই। কেঁদে কিংবা শোক করে কোনো প্রাপ্তি নেই। ঝড় শেষে মানুষ যেমন নতুন করে ঘর বাঁধে তিনি তেমনি নিজেকে শক্ত করে বাঁধলেন। পনেরো ষোলো বছরের কলিম উদ্দিন থামলেন না, রাতে দিনে কাজ করে চললেন। টাকা জমালেন, জমি বন্ধক রাখলেন। ধান চাষে মন দিলেন। বরাবর ফলনও হলো ভালো। অবস্থার উন্নতি হলো দ্রুত। টিনের ছাপড়া ভেঙে দু’চালা করলেন। বিদ্যুৎ চমকের মতো এক টুকরো সুখ এলো যেনো তার ঘরে। কলিম উদ্দিন বিয়ে করলেন। বিয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন পাশের বাড়ির চাচি। ঠিক তখনো বুঝতে পারলেন না তার জীবনের বীভৎস ঘটনাটি ঘটতে এখনো বাকি। দু’হাতে খেটে টুকটাক জমিজমা করেছেন ততদিনে। তাতে ভালো ফসল  হয়, ভাবলেন আর দুঃখ কি জীবনে। জমি আছে, ধান আছে, টাকা আছে। কচি সতেজ পাতার মতো চারপাশ। সেখানে ফুলের গন্ধ, নিষ্পাপ পাখিদের উড়াউড়ি। কলিম উদ্দিন এসব দেখে মন ভরে নিতে থাকলেন। একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন, গ্রামের অনেক মানুষ একটা মাইক্রোবাস সাজিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখলেন তারা দয়াল নেশা বাবার উরশে যাচ্ছেন। টেপরেকর্ডারে প্লে হচ্ছিলো ৩১শে ডিসেম্বর রাতের মতোন দেশি বিদেশি গান। কেউ মুরগী, কেউ ছাগল, কেউ পোলাও, কেউ বা চাল তরকারি নিয়ে যাচ্ছিলেন। কলিম উদ্দিন বিস্মিত, একজনের কাছে জিগগেস করলেন আমারে নিবাইন রশিদ চাচা?

আব্দুর রশিদ হাসলেন, কলিম উদ্দিনের দিকে তাকিয়ে সতেজ গলায় বললেন, নিতাম না ক্যারে, তুই যাবি কলিমুদ্দি?

কলিম উদ্দিন মাথা নেড়ে হেসে হেসে বললেন, কিন্তু আমার লগে যে কিছু নাই।

আব্দুর রশিদ মাথার টুপি ঠিক করে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, তুইতো পয়লা যাইতাছস, কিছু লওন লাগতো না।

কলিম উদ্দিন রাজি হলেন, বউ এর কাছে গিয়ে বললেন, আমি দয়াল নেশা বাবার উরশে যাচ্ছি।

বউ বাঁধা দিলেন না, হেসে স্থির গলায় বললেন, সামনের বার আমিও যাবো।

কলিম উদ্দিন মাথা নেড়ে বিদায় নিলেন।

পৃথিবীর ভেতরে যে এমন এক স্থান আছে, যা মানুষের হৃদয়ের মতো গোপন, কলিম উদ্দিন জানতেন না। ভারি আশ্চর্য হলেন। একটা গোরে অসংখ্য জ্বলন্ত মোমবাতি, সেখানে কেউ ফুল ছিটাচ্ছে, কেউ টাকা, কলিম উদ্দিনও দশ টাকার নোট ফেললেন। দয়াল নেশা বাবা চারপাশে ঘুরে দেখছেন। কেউ তার সাথে কথা বলছেন, কেউ তার পা ছুঁয়ে সালাম, কেউবা কপাল ছুঁয়ে সালাম করছেন। কলিম উদ্দিন মন্থর পায়ে হাঁটলেন। দয়াল নেশা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। নেশা বাবার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সুগঠিত শরীর। মাথায় লম্বা চুল। পরিষ্কার সেভ করা মুখ।

কালো পাঞ্জাবি, পাগড়ি। নেশা বাবা ইশারা করলেন। কলিম উদ্দিন ঠিক বুঝলেন না, অন্যজন বুঝিয়ে দিলেন বাবা তাকে পা ছুঁয়ে সালাম করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কলিম উদ্দিন তাই করলেন। সালাম শেষে নেশা বাবা তার মাথায় হাত রাখলেন, ইঙ্গিতে বললেন ঘরে যেতে। ঘরটি ছোট। তেমন আসবাবপত্র নেই। বাবার সম্মুখে কাঠের টেবিলে কতগুলো বই ছড়ানো। কাঁচের কয়েকটি বোতল। সাদা রঙের দুটো কৌটা। দেয়ালে দয়াল নেশা বাবার নামে ক্যালেন্ডার। নেশা বাবা মিম্বরের মতো উঁচু স্থানে বসে উপরের দিকে চেয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। কলিম উদ্দিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। নেশা বাবা তার দিকে চেয়ে রেকর্ডিংকৃত গলায় বললেন, তোমার বাবা মা কেউ নেই, অনেক পরিশ্রম করে এই পর্যন্ত এসেছো, বিয়ে করেছো। আমি তোমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি খুব ভালো, পৃথিবীর দশজনের মধ্যে তুমিই একজন হবে।

মেঘলা আকাশ হঠাৎ দীপ্তিময় হবার মতো মনে মনে কলিম উদ্দিনের সমস্তটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। নেশা বাবার দিকে তাকিয়ে খানিক ভেবে বললেন, আমার ভাগ্য এতো সুপ্রসন্ন আপনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, কী যে দিই আপনাকে…

নেশা বাবা হাত নেড়ে থামিয়ে বললেন, আমাকে কিছু দিতে হবে না শুধু তিনটা শর্ত মানতে হবে।

কলিম উদ্দিন ভাবলেন, বাবা লুব্ধ নন, নিজের জন্য তিনি কিছুই চান না। ছোট শিশু মেলায় যাবার জন্য যেমন মায়ের সব কথা মেনে পড়তে বসে, কলিম উদ্দিন তেমনি উৎসাহিত হয়ে প্রফুল্ল গলায় বললেন, কী শর্ত বাবা?

নেশা বাবা একটা কৌটা থেকে পুঁথির মালা বের করে বললেন, এইটা গলায় রাখো।

তারপর আলমারি থেকে কালো কাপড়ের টুকরো বের করে ছ’বার ফুঁ দিয়ে কলিম উদ্দিনের হাতে দিয়ে বললেন, এটা প্রতি মুহূর্ত মাথায় রাখবে শুধু গোসলের সময় ছাড়া।

কলিম উদ্দিন আনন্দচিত্তে মালা গলায় দিয়ে কাপড়ের টুকরো মাথায় বাঁধলেন। সামনের টুলে বসার ইঙ্গিত দিয়ে নেশা বাবা বললেন, প্রথম শর্ত হলো, আমাদের এখানের সব বিষয় তোমাকে গোপন রাখতে হবে, এমনকি তোমার স্ত্রীকে পর্যন্ত বলতে পারবে না। দ্বিতীয় শর্ত হলো, টানা একশো ছেষট্টি দিন মাজারের খেদমতে থাকতে হবে। তৃতীয় শর্ত হলো, তোমার বাড়ি বাদ দিয়ে একশ ছেষট্টি দিনের জন্য তোমার স্ত্রীর খাদ্য বস্ত্রাদি রেখে সবকিছু মাজারে দান করতে হবে যার দ্বিগুন তুমি ফিরে পাবে বিশেষ দোয়ার বরকতে। আর দান করতে হবে খুব গোপনে।

খানিক থেমে বললেন, তুমি ভেবে সাতদিন পর এসো। আর মনে রেখো শর্তগুলোর উপর আমার পীরের নেক দোয়া আছে। শর্তের সাথে কোনরূপ বেয়াদবি হলে সে ক্ষতির মধ্যে থাকতে থাকতে মরে। বদদোয়া তামান পুড়িয়ে ছারখার করে।

কলিম উদ্দিন কোথায় যেন চলে গেলেন। তিনি বসে আছেন সোনার তৈরী ঘরে। স্নিগ্ধ শব্দে সোনার ফ্যান ঘুরছে। পাশে বসা তার স্ত্রী বললেন, ফ্যানের শব্দ বাঁশির সুরের মতো, তাই না?

কলিম উদ্দিন ঠোঁট নাড়িয়ে মৃদু হেসে বললেন, নেশা বাবার জন্য আমরা কত কী পেলাম, জীবনটা যেনো বেহেশত। তখন বুঝি মা বাবার কথাও দুঃখের সাথে মনে পড়ে।

নেশা বাবার ডাকে কলিম উদ্দিন সম্বিত ফিরে পেয়ে বললেন, বাবা আমি খুব শীঘ্র আসব। নেশা বাবা মধ্যমা আঙ্গুল স্বীয় কপালে ছুঁয়ে পায়ের দিকে আঙ্গুল ঘুরালেন। কলিম উদ্দিনের বুঝতে বিলম্ব হলো, পরে যান্ত্রিক মানুষের মতো নেশা বাবার পায়ে কপাল ঠেকিয়ে সেজদা করলেন। বাড়ি ফিরে এসে কলিম উদ্দিন নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। নেশা বাবার শর্তগুলোর কথা ক্রমাগত ভাবলেন। বিড়বিড় গলায় বললেন দয়াল দয়াল।

স্বামীকে এমন চিন্তিত দেখেন নি আর মাসুমা। তিনি বিস্মিত এবং চিন্তিত হলেন। কলিম উদ্দিন বারান্দায় মেঝের উপর বসে শেষ সিদ্ধান্ত নিলেন, নেশা বাবা বড়ো বুজুর্গ মানুষ, তিনি মিথ্যা বলেন না, লোভীও নন। সশব্দে বলে উঠলেন, দয়াল দয়াল। এই সময় মাসুমা স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে স্থির গলায় বললেন, আপনার কি শরীর খারাপ? ঠিকমতো খান না, রাতে ঘুমান না।

কলিম উদ্দিন উঠোনের শিম গাছের নীলাভ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, নেশা বাবার কথা ভাবছিলাম। দয়াল দয়াল।

মাসুমা স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, এইজন্য না খেয়ে না ঘুমিয়ে থেকে কী এমন মুনাফা হয়?

কলিম উদ্দিন এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ব্যস্তকণ্ঠে বললেন, বাজার থেকে ঘুরে আসছি, তুমি সরপুঁটি ডাটা আর মুসুরি ডাল টমেটো দিয়ে রান্না করো। হনহন করে তিনি ছুটে গেলেন। দিন চারেক পরে কলিম উদ্দিন মাসুমার হাতে দুই লাখ উনিশ হাজার ছয়শো টাকা ও আরেকটি বান্ডিলে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বললেন এগুলো তোমার কাছে রাখো। আমি নেশা বাবার দরবারে কিছুদিন থাকবো। প্রয়োজনে খরচ করবে। হাসপাতালের ডান পাশে সাত শতাংশ জমির দাম ছিল ন’লাখের উপরে অথচ কলিম উদ্দিন চার লাখেই বেঁচে দিলেন। এভাবে স্কুলের পাশে বাজারের দক্ষিণের জমি সব মিলিয়ে বারো লক্ষ টাকা। স্ত্রীকে একশ ছেষট্টি দিনের খাদ্য চিকিৎসার খরচ দিয়ে বাকিটা নেশা বাবার জন্য রাখলেন। কলিম উদ্দিন এতো দ্রুত ও সস্তায় জমি বেঁচলেন মানুষ যেমন খুব বিপদে পড়লে সর্বস্ব বেঁচে দেয়। মাসুমা খুব অবাক হয়ে বললেন, আমি একা থাকবো কী করে? কলিম উদ্দিন চঞ্চলকণ্ঠে বললেন, আমাদের ভালোর জন্যই নেশা বাবার দরবারে যাচ্ছি, তুমি বরং ক’দিন মায়ের কাছে থাকো। আর বাবার দরবারে সেবা করার এই সময়ে কোনো মূল্যেই আমার সাক্ষাত পাওয়া যাবে না। তুমি বরং এই সময় মায়ের কাছেই থাকো।

মাসুমা বললেন আমার কষ্ট হবে।

কলিম উদ্দিন হেসে বললেন, ক’দিন কষ্ট করো, দুনিয়াতে কষ্ট ছাড়া সুখ নেই, দয়াল দয়াল।

কলিম উদ্দিন নগদ সব টাকা নেশা বাবার পায়ের কাছে সমর্পণ করলেন। তারপর নেশা বাবার পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। নেশা বাবা কাশতে কাশতে বললেন, একশ ছেষট্টি দিন পর বাড়ি পৌঁছে দেখবি সব পাল্টে গেছে।

কলিম উদ্দিন অতি আবেগী শিশুর মতো বললেন, আপনার পায়ের কাছে সব সমর্পণ করলাম বাবা।

নেশা বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, দয়ালের উপরে ভরসা রেখে দয়াল রে ডাক।

দয়াল দয়াল।

কলিম উদ্দিন একশ ছেষট্টি দিন মাজারে কাটালেন, বাবা ও বাবার ভক্তদের সেবাযতœ করে দয়াল জপে জপে। তারপর নির্দিষ্ট সময় শেষে বাড়িতে গিয়ে দেখলেন কেউ নেই। পরিবর্তন হবার কথা ছিলো হয়েছেও বটে, বিপরীত দিক থেকে। সোনার আলোর মতো কিছুই তো ঝিকমিক করে না। বাড়ি ফাঁকা, উঠোনে শুকনো পাতা ডালে ভরা। ঘরের দক্ষিণের বারান্দা মাটিতে সেজদারত। যেন জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা একটা ঘর। কলিম উদ্দিনের মগজে দ্রিম করে বাড়ি খেলো। সে অবিরাম কাঁপতে থাকলো। কিন্তু মনে আবার কোথাও বিশ্বাস জেগে থাকলো যে তার জন্য চমকপ্রদ কিছু নিশ্চয় অপেক্ষা করে আছে। তারপর তিনি শ্বশুর বাড়ি গিয়ে দেখলেন স্ত্রীর মৃত্যুর পরওয়ানা জারি হয়ে গেছে। জটিল রোগে সে দু’মাস শয্যাশায়ী, ডাক্টার সময় বেঁধে দিয়েছে। তখন কলিম উদ্দিনের বুক চিরে কয়েকটি আগুনের সাপ কিলবিল করে ভেতরে তোলপাড় জুড়ে দিলো। মগজ যেনো ঈশ্বরের আত্মার মতো থরথর করে কেঁপে নাম জপতে থাকলো দয়াল। তারপর তিনি সবুজ মাঠ দেখলেন। ফসলের মাঠের ওপাশে একটি বালক আপন মনে ধানের কচি শীষ চিবোচ্ছে। তার পাশেই টিনের ছাপরা ঘরে দাওয়ায় বসে বালকের মা বাপ বলছে আমাদের কলিম উদ্দিন কতো ভালো, ছেলেটা ডাক্টার হবে।

টিয়া বস্ত্রালয় থেকে কলিম উদ্দিন হেঁটে যান। তার কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের মলিন ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর বাসি পরোটা, ছোট পলিথিনে খানিক ডাল। একটা মোড়ানো কাগজে খিচুড়ি, গামছায় প্যাঁচানো মুড়কি। তার মুখটা ভাঙা ভাঙা, রোদে পোড়া মুখ। মুখে বেশ কদিনের না চাঁছা দাড়ি। পান খাওয়া কুৎসিত দাঁতগুলো দেখা যায় মরচে ধরা লোহার মতো। তার শরীর যেনো বহুদিনের খরায় ফেটে যাওয়া মাতৃভূমি। টিয়া বস্ত্রালয়ের মালিক কলিম উদ্দিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যতক্ষণ না সে চোখের অদৃশ্য হয়।

**********************************

এ্যাপোলো
কথকের গল্প

সমান্তরাল শতাব্দীর শেষ প্রচেষ্টা তবে বিফলে যাবার উপক্রম। নিপীড়িত মানবতার যেন শেষ প্রশ্ন হিসেবে ‘এই চুপ করে আছো কেন?’ একটি বাক্যই স্তব্ধ করে দিয়েছে সমস্ত কিছু। আচমকা থেকে থেকে প্রশ্নবাণ শফিকের হৃদস্পন্দনকে ত্বরান্বিত করে হৃদস্পন্দনের শব্দকে জ্যামিতিক হারে রূপ দিয়েছে। সময়টা নষ্ট। সময় সবচেয়ে বড় অসুখ। আবার সময়ই তার বড় ঔষধ। কৃষ্ণকলি তখন সবে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ। একটা দায়বোধ এসে ভর করেছে যৌবনে। একটু স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন কৃষ্ণকলির শারীরিক রিদমকে খাপছাড়া ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। সেখানে শফিক হয়ে যায় একটা ক্ষুধার নাম। যে ক্ষুধা গ্রাস করে নেয় রাতের শেষভাগ, শিশিরের পবিত্রতা, প্রগতিশীলতার গতি, আদিমতার অদম্যরূপ। শফিক সভ্যতার কারিগরও বটে, নিয়ন্ত্রক একজন পুরুষ।

রাতের শেষভাগ। সামান্য আলো নিয়ে বেঁচে আছে চাঁদ। অল্প কিছু অপেক্ষা, তার পরেই আরেকটা দিনের শুরু। কৃষ্ণকলি একটা চেয়ারে বসে। শফিক সামনে পানি এগিয়ে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। শফিকের গানগুলো সারা ঘরে টইটম্বুর একটা ভাব জাগিয়ে তুলেছে।  তখন কবিতাগুলো আওরাচ্ছে নীচুস্বরে। হঠাৎ “এই চুপ করে আছো কেন?” প্রশ্নটা সবকিছু মুহূর্ত কয়েক থমকে দেয়। সভ্যতা যেনো কচ্ছপের পিঠে হোঁচট খায়। শফিক ও কৃষ্ণকলি পালিয়েছে। এটা এখন শহরের সবচেয়ে বড় খবর। সমাজ, ধর্ম, পরিবার, জাত, বর্ণ সব এক বিন্দুতে এবারই প্রথম মিলিত হওয়ার প্রচেষ্টা নয়, কবে প্রথম শ্যামের বাঁশি বেঁজেছিল তা মালুম করা ভার। তার পরেও এই খবরে উত্তাল সব কিছু। ফেইসবুকে পরিচয় স্বনামধন্য মুসলমান ব্যবসায়ীর ছেলে শফিকের সাথে নিরামিষভোজী ব্রাহ্মণ হিন্দু মেয়ে কৃষ্ণকলির। তারপরের সূত্র সরল রেখা ধরে এগিয়েছে। এখন সব ছেড়ে মানুষ হবার চেষ্টায় ভালোবাসা নামক জীবনের শক্রর মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে করা আজন্ম পাপ। দেখতে খুব সুন্দর নয় শফিক কিন্তু তার কণ্ঠে সুমনের ‘জাতিস্বর’ অনেক সুন্দর। কৃষ্ণকলির প্রেমে পড়া ওখানেই। সন্ধ্যা থেকে না খেয়েই বসে আছে দুজনেই নিভৃত এক পল্লীতে। একটু আগে এক বন্ধুর সাথে কথা হয়েছে মুঠোফোনে। কৃষ্ণকলির দিদিকে শহুরে মুসলমানরা ধর্ষণ করেছে। তাদেরকে খুঁজে পাওয়া গেলে দুজনকেই হয়তোবা জীবনের লেনদেন চুকিয়ে আবার ‘জাতিস্বর’ গাইতে হবে। কৃষ্ণকলি আর শফিক সামনে প্রাণনাশী পানীয় নিয়ে বসে আছে। কিছু মুহূর্ত অপেক্ষা করে তারা। মানুষ মৃত্যুকে বরণ করতে চায় নি, বা চায় না কখনোই। কিন্তু আজ সব কিছু এক বিন্দুতে মেলানোর জন্য মৃত্যু খুবই দরকার। মৃত্যুই এখানে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। আরব বসন্তের হাওয়া যেমন দুর্বার হয়েছিলো, তেমনি মাঝে মাঝে মৃত্যু অস্ত্র হয়ে ওঠা দরকার।

আরেকটা সকালের জন্ম হচ্ছে ধীরে ধীরে। সকল নীরবতা ভেঙ্গে কৃষ্ণকলি সভ্যতার বুক চিরে বেরিয়ে আসে, চুপ করে আছো কেন?

**********************************

রফিক সানি
লিটলম্যাগ আন্দোলন : স্নান

‘লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেলো যে, জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদমূল্যে বড়বাজারে বিকোবে না কোনোদিন, কিন্তু হয়তো কোনো একদিন এর একটি পুরোনো সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এজন্য যে, এটি কখনও মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল। চেয়েছিলো নতুন সুরে নতুন কথা বলতে। কোনো এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিলো নিন্দা, নির্যাতন ও ধনক্ষয়ে প্রতিহত না হয়ে। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা— এটাই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম।’

এসব কথাগুলোর ধারালো জৌলুস সম্ভবত প্রথমবার আঘাতপ্রাপ্ত হলো গত শতকের সত্তরের দশকের শেষের দিকে। তারপর আশিতে মরচে, মধ্য-আশিতে ক্ষয়, নব্বইয়ে প্রায়-ম্লান এবং এই শতকে এসে তা প্রায় ধ্বংসের দিকে চলে গেছে। এখন যারা বয়সে তরুণ তাদের কাছে মশাল তুলে দেওয়ার মানুষের সংখ্যা অতি নগন্য। এখন যে কোনো একটি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার মানুষ যেমন নেই, ডাক দেওয়ার মানুষও তেমন নেই। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন কল্পনাতীত, স্বাভাবিক ন্যায্য দাবি আদায়ের মিছিলেও কেউ স্বর তুলছে না। চিন্তাশীল ও সৃষ্টিশীল মেধাকে হত্যা করা হচ্ছে প্রকাশ্যে রাজপথে। সেই হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে আতশবাজির মতো বিকট শব্দে। নিবেও যাচ্ছে আতশবাজির মতো। নিবে যাচ্ছে, কারণ আন্দোলনকারীদের মধ্যে টিকে থাকার মতো শক্তি নেই। শক্তি নেই তার কারণ তাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নেই। চর্চা নেই কারণ বিঘিœত পরিবেশ। কারফিউ, কাঁটাতার, ক্লোজসার্কিট আর বিপত্তি-সংকুল আপ্যায়ন। মিডিয়াবাজদের চাপাচাপিতে শিল্প-সাহিত্য বা শিল্পী-সাহিত্যিকের অবস্থা পারদপড়া আয়নার মতো অস্বচ্ছ। তবে সে আয়নার ফ্রেমটা বেশ চমকময়। চারদিকে সাহিত্য পুরস্কারের ছড়াছড়ি। পিঠ চুলকাচুলকির মতো এ ওকে পুরস্কার দিচ্ছে তো সে তাকে দিচ্ছে। কে কিসের জন্য কাকে পুরস্কার দিচ্ছে সেটা গৌণ হয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে চুলকানোর আরাম। এটা কি ভঙ্গুরতার শেষ পর্যায় নয়? সময় এসেছে দেয়াল তোলার। এর পরই নির্মাণ হবে নতুন আগামী। আর এখনই তার যথোপযুক্ত সন্ধিক্ষণ।

বিশ্ব একটি নতুন দিকে যাত্রা করার অপেক্ষায়। এর পরের ইতিহাস ইতিহাসের কোন পাতায় লেখা হবে বোঝা যাচ্ছে না। ঠিক এখনই উচিত নব উদ্যোমে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হেতু আন্দোলনে নেমে পড়া। ছোটকাগজ-ই সাহিত্য-আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ঠিক এমন উপলব্ধিতে ‘নতুন সুরে নতুন কথা’ বলার অভিপ্রায়ে জন্ম নিয়েছে ¯স্নান।

টকটকে লাল সূর্যের দিকে উড়ন্ত ছুটে চলা— ‘গতি’ নিয়ে স্নানর যাত্রা শুরু ২৬ মার্চ ২০০৯-এ। প্রথম সংখ্যায় ¯স্নান আহ্বান করেছিলো ‘স্বয়ম্বরসভায় অর্জুনকে যে কারণে দ্রৌপদী বরমাল্য দিয়েছিলো আমরা সে কারণে ¯স্নান করি, আসুন!’ একটু ভেবে দেখা দরকার বরমাল্য অর্জুনের গলায় কী কারণে স্থান পেয়েছিলো। স¤্রাজ্ঞী হওয়ার লোভ সেখানে মুখ্য ছিলো নাকি তার সমর্থ আর সাহস? প্রথম সংখ্যায় আরো বলা হয়েছিলো— ‘ওহে ভাই, বলুন-লিখুন-জানুন— বাঁচতে হলে এসব দরকার।… কেনো লিখবেন না, লিখুন, লিখতে হবে।’ তবে ‘দয়া করে যা-তা লিখবেন না। চিন্তা ছাড়া চলবেন না। চিন্তায় লিখুন, নিজের চিন্তা, অন্যের না, একান্তের, আপনরার, ব্যক্তিগত সাহসে ভর করে বজায় রাখুন নিজের কৃতিত্ব ও মর্যাদা।’ —এমন সতর্কবাণীও সেখানে ছিলো।

সময়ের অস্থিরতাকে শিল্পের স্মৃতিফ্রেমে ¯œাত করে দুর্বার এগিয়ে চলার প্রয়াস নিয়ে, অবারিত মৌন-শৃঙ্খল ভাঙার প্রেরণায় ¯œানর যাত্রা শুরু হয়েছিলো। তার সেই উদ্যোগে সমস্ত নতুন লিখিয়েদের একাত্ম হওয়ার উদাত্ত আহ্বান ছিলো সেখানে। কে লেখক আর কে অ-লেখক সেই বিতর্কে না জড়িয়ে তারা চেয়েছিলো বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অবাধ বিচরণভূমি হয়ে উঠতে। নবযাত্রার সেই কমিটমেন্ট ¯স্নান কতোটুকু ধারণ করতে পেরেছে? দূর থেকে দাঁড়িয়ে নয়, পাতা উল্টিয়ে দেখা দরকার— ‘বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অবাধ বিচরণভূমি’ হওয়ার যে দৃপ্ত শপথ তারা নিয়েছেলো তা বজায় থাকলো কি না।

উপন্যাস বাদে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে ¯স্নানর এক্সপেরিমেন্ট চলেনি। কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, গান, ছড়া, অনুবাদ, রম্যরচনা, মুক্তকথা, চিঠি সবই ছাপা হয়েছে। মৌলিক রচনা ছাড়াও মননশীল অনেক লেখাও ¯স্নান-এ দেখা যায়। ছাপা হয়েছে কুড়িয়ে পাওয়া ডায়েরি। প্রতি সংখ্যার মূল টেক্সট ছাড়াও ছাপা হয়েছে নতুন চিত্রশিল্পীর নতুন প্রচ্ছদ। কোনো কোনো সংখ্যার অলঙ্করণও করা হয়েছে নতুন শিল্পীর আঁকা অলঙ্কার দিয়ে। এই মূল টেক্সটগুলোর যে খুব বেশি সাহিত্য-মূল্যমাণ আছে তা নয়। তবু এসেছে। ছাপাও হয়েছে। একজন নতুন আনকোরা লিখিয়ে আর কতোটুকু সাহিত্য-মূল্যের লেখা লিখতে পারে! তবু তার লেখা নিয়েছে। দেখেছে। তাকে নিয়ে, তার লেখাটি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়েছে। গাঁটের পয়সা খরচ করে চা খেয়েছে খাইয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত লেখক পাওয়া গেলে খুব ভালো কথা। কাজ সহজ হয়। কিন্তু একজন অভিনেতাকে বা একজন খেলোয়াড়কে অথবা একজন ‘বাদাইম্যা’ ছেলেকে ধরে তার কাছ থেকে লেখা আদায় করেছে ¯স্নানর সম্পাদকেরা। তার ছাপ ¯স্নানর প্রতি সংখ্যায় স্পষ্ট।

¯স্নানর এক্সপেরিমেন্ট বিভিন্ন রকম। প্রতিটি সংখ্যায় কবিতা, প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় গল্প ও প্রবন্ধ আছে। ২০তম সংখ্যায় শুধু একটি নাটক জোবায়ের শাওনের ‘পদস্খলনের পর’। কাব্য-নাট্য। একটি নাটক দিয়েই একটি সংখ্যা। বিভিন্ন সংখ্যায় বিভিন্ন লিখিয়ের নিকট থেকে নেয়া হয়েছে অনুবাদ। ৩০তম সংখ্যায় প্রকাশিত মাহবুব সুমনের ‘প্রজেক্ট প্যালিড্রম’ নামক অনুবাদটি এ যাবৎ স্নানর সর্বোচ্চ মানোত্তীর্ণ অনুবাদ। কবিতায় গৌতম দত্ত, আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীল, রিংকু রাহী, ফারুক ইমন তখনকার নতুন কবিরা খুব ভালো কবিতা লিখেছেন। আর গদ্যে মর্মরিত ঊষাপুরুষ, মোজাফ্ফর হোসেন এবং শেষের দিকে সুবন্ত যায়েদের লেখায় আছে অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা আর প্যাশনের বিস্তর প্রমাণ। এই লেখকদের একটা দক্ষতা পাঠককে জার্নি করানোর ক্ষমতা এবং উইট আর হিউমার প্রয়োগ।

শুধু টেক্সটসবর্স্ব নয় সম্পাদনার ক্ষেত্রে সম্পাদনা শেখার বড় জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছোটকাগজ ¯স্নান। আট বছরে ৪১টি সংখ্যা বের করতে দায়িত্ব পালন করেছেন ৩৪ জন নতুন সম্পাদক। প্রথম বছরে দশটি সংখ্যা বের হয় দুই বা ততোধিক সমন্বয়কের সম্পাদনায়, পরের বছর থেকে দ্বিমাসিক হারে এবং ৩৭তম সংখ্যা থেকে বর্তমান পর্যন্ত চতুর্মাসিক হারে বের হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সম্পাদক থাকছেন একজন। তাঁরা সম্পূর্ণ স্বাধীনচিত্তে পত্রিকাটির আকার আকৃতিগত এক্সপেরিমেন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিরোনামায় সংখ্যা বের করতেও চালাচ্ছেন নিরীক্ষা। এমন কি নিরীক্ষা চলছে গল্প-কবিতার ফর্ম নিয়েও। ক্রমে তাঁরা শিখে নিচ্ছেন সম্পাদনা। পাকিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের হাত। তৈরি করছেন নতুন আঙ্গিক। তৈরি করছেন নতুন লেখক। সর্বোপরি চালিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলন।

প্রতি সংখ্যা শেষে মোটামুটি কাজ শিখলে দায়িত্ব নিচ্ছেন নতুন সম্পাদক। এই নতুন শপথ গ্রহণকারীদের কারো সামনে প্রস্তুতকৃত লেখক ছিলো না কোনো কালে। প্রত্যেকেই খুঁজে বের করেছেন নতুন নতুন লেখক। তাদের কাছ থেকে আদায় করতে চেষ্টা করেছেন নিজের মর্জি মাফিক লেখা। কিভাবে? বাদ দিয়েছেন দুপুরের ঘুম। লাইব্রেরিতে কাটিয়েছেন অবসর সময়টুকু। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় অংশ নিয়েছেন নিয়মিত, নতুন পুরোনো লেখকদের সাথে কথা বলেছেন, রেখেছেন যোগাযোগ। সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতি নিয়ে থেকেছেন সচেষ্ট-সচেতন। একবেলার খাবারের দাম বাঁচিয়ে বই কিনে ঝালাই করেছেন আপন মস্তিস্ক। অন্যবেলার টাকা দিয়ে চায়ের খরচ মিটিয়ে বসেছেন নতুন লেখকদের সাথে। কথা বলেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বেরিয়ে এসেছে একটি অনবদ্য লেখা। স্থান দিয়েছেন ¯স্নানর কোনো একটি সংখ্যায়। সাজিয়ে ফেলেছেন আপন আপন সংখ্যা। প্রকাশ করেছেন ছোটকাগজ আন্দোলনের মুখপত্র স্নান। ¯স্নান-এ সম্পাদনার ক্ষেত্রে সব চেয়ে বেশি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয়েছে মোল্লা মামনের সম্পাদনায় ৯, ২৩ ও ২৪ সংখ্যা তিনটি। প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে পরের সংখ্যার আহ্বান পর্যন্ত তাঁর সম্পাদনা ছিলো অভিনব ও চমকপ্রদ। বিশেষ করে তার প্রকাশিত টেক্সটগুলোতে শব্দ নিয়ে খেলাটা মন কাড়ে বেশি। সুবিদ সাপেক্ষ সম্পাদিত ৩৭তম সংখ্যাটি আর একটি বিশেষ কারণে সমাদৃত, তা হলো সাহসিকতা। প্রতিষ্ঠান বিরোধী কথাগুলো তিনি-ই ¯স্নান-এ প্রথমবার সাহসিকতার সাথে বলেছেন। সাথে সাথে তিনি এই আন্দোলনকে বেগবান করার প্রয়াসে সংখ্যার প্রথম পাতায়-ই ব্যবহার করেছেন এই কথাটি— ‘পাঠ শেষে কপিটি অন্যকে দিন। যদি না দিতে পারেন, তবে সামনে এগোবেন না। এখনি সম্পাদককে ফেরত দিন।’

ছোটকাগজ আন্দোলন একটি কাগজ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরো অনেক দায় আছে। বিশেষ করে নতুন লেখক তৈরি করা একটি বড়ো দায়িত্ব। লেখক না থাকলে লেখা আসবে না। আর লেখা না আসলে পত্রিকা করার কথা চিন্তা করা যায় না। তাই নতুন লেখক তৈরি করতে ¯œানকে বিভিন্ন সময়ে করতে হয় বিভিন্ন আয়োজন। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটিয়ে বা সাক্ষাতে অথবা ফোনালাপে লেখা আহ্বান করা ¯œানর কাছে খুবই মামুলি ব্যাপার। লেখক তৈরিতে ¯স্নান আরো অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে মাঝে-মধ্যে। ¯স্নানকর্মী বা সম্পাদকগণ নতুন কারো সাথে পরিচয় হলেই বলেন, ‘¯স্নানএকটি ছোটকাগজ। ¯স্নান-এ একটি লেখা দিবেন।’ কখনো কখনো বাংলা-ঢোল পিটিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে ৩৯তম সংখ্যার সম্পাদক নিখিলেশ রনি সবার উদ্দেশ্যে আহ্বান রাখেন, ‘লিখুন, লিখুন। ¯স্নান-এ লিখুন। গল্প কবিতা প্রবন্ধ বা অন্য কিছু লিখুন। পুঁজির বিরুদ্ধে লিখুন, লিখুন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে…’ আবার কখনো কোনো সম্পাদক কোনো একটি জনবহুল জায়গায় গাছের নিচে ফুলের পসরা সাজিয়ে ব্যানার লাগায়, ‘অস্ত্র ছাড়–ন, কলম ধরুন, ¯স্নান ৪০-এ লিখুন।’ ¯স্নানকর্মীদের অধিকাংশের বিচরণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়ায় একটি অতিরিক্ত ফ্যাসিলিটি তাদের আছে— সেটা হলো অ্যাডমিশন টেস্ট। এ সময় আসে অনেক নতুন মুখ। হঠাৎ হঠাৎ তাদের কাছে গিয়ে ৪০তম সংখ্যার সম্পাদক অতন্দ্র অনিঃশেষ কাগজ কলম ধরিয়ে দিয়ে বলেন ‘একটি কবিতা লিখুন।’ যদিও এমনভাবে কবিতা হয় না। তবু তারা কেউ কেউ লেখে। তাদের উৎসাহ দিতে ¯স্নান দেয় ‘দিনশেষে পুরস্কার’। একটু প্রেরণার বন্দোবস্ত। এভাবেই এ যাবৎ ¯œানর নতুন মুখের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। তাঁদের কেউ কেউ প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হয়ে উঠেছেন। প্রতিনিয়তই লিখছেন।

সম্পাদনা শেখা, পত্রিকা প্রকাশ, নিজে লেখা, অন্যকে লেখায় উৎসাহিত করাতেই এ আন্দোলন শেষ হয়ে গেলো না। কেবল কিছু লেখা হলো। এই লেখাগুলো তো পড়তে হবে। তার জন্যও পাঠক দরকার। অনেকে এই দায়িত্বকে অস্বীকার করেন। মনে করেন, ‘আমার কাজ লেখা, আমি লিখেছি। যার ভালো লাগে পড়বে না ভালো লাগলে পড়বে না! পাঠকের দায় তো আমার না।’ কিন্তু ¯স্নান তা মেনে নেয়নি। আর তাই তারা কোনো সংখ্যার গায়ে কোনো ক্রয়মূল্য রাখেনি। যেনো প্রত্যেক্কেই পড়তে পারে ¯স্নান। তারা প্রতি সংখ্যা প্রকাশের পর ‘কাঠগড়া’র নামে আড্ডা বসায় ¯স্নানচত্বরে। তারা অ্যাডমিশন টেস্টের সময় ‘এক টাকায় এক কবিতা’ শিরোনামে হাজার দুয়েক কবিতা পড়িয়েছে পাঠকদের। পাঠক সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ¯স্নানর পাতায় লিখেছেন, ‘পাঠ শেষে কপিটি অন্যকে দিন।’ বছরে অন্তত একবার ব্যান্ড বাজিয়ে বিশাল র‌্যালি করে ‘ছোটকাগজ’-এর আহ্বান পারিপার্শিক সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। মাইক নিয়ে কর্মীরা বসেন। ছোটকাগজ কী কেন ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে আড্ডা দেন। তর্ক করেন। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। একজন প্রাজ্ঞ বক্তা আনেন যিনি প্রায় অপরিচিত। নতুন নতুন মানুষের সামনে তিনি ‘ছোটকাগজ কথন’ শিরোনামে উপস্থাপন করেন ছোটকাগজের বিভিন্ন দিক। উৎসাহিত হন অনেকেই। সেই নতুনদের অনেকেই স্নানকরেন। কেউ বা নতুন একটি কাগজ করেন। তারা ছোটকাগজ করেন।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে ¯স্নানর সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ৩১ জন প্রচ্ছদকার, ৩৪ জন সম্পাদক, আড়াই শতাধিক লেখক এবং পরোক্ষভাবে যুক্ত অগণিত পাঠক, কর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের মনকে না জুগিয়ে জাগিয়ে তুলে সময়ের সেবা না করে ¯স্নান একটি সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে নিরন্তর। সে ক্ষেত্রে নিন্দা বা ধনক্ষয়ে সে প্রতিহত হবে না কখনো এ কমিটমেন্ট তাদের রয়েছে। আর তাই ৩৩ তম সংখ্যা থেকে স্নানর শ্লোগান ছিলো ‘দেশের একমাত্র ছোটকাগজ’। এমন সাহসী কথা বলতে পারেনি আর কেউ।

মন জুগিয়ে চলেনি বলে ¯স্নানর ‘হচ্ছে না, হবে না’, ‘বাজে’, ‘বেপরোয়া’, ‘একগুঁয়ে’, ‘বদ্ধ-উন্মাদ-পাগল’, ‘লেঠেল বাহিনি’ নিন্দাও রয়েছে বেশ। প্রশাসন, সুধীজনজের চাপাচাপিও রয়েছে উদাহরণযোগ্য। স্নানকর্মীদের উপর বঞ্চনা বা নিপীড়নও এসেছে কম নয়। এগুলো সব ¯স্নানর অর্জন। তা না হলে এটাকে ঠিক আন্দোলন বলা যেতো না।

******************************************

আজ কেন এতো ফাগুনবাতাস!

শানবাঁধা কুয়োতলায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় জ্যোতস্নায় কার মুখ দেখেছিলেন, ঠিক তিনি বুঝি আর মনে করতে পারেন না, তাঁর মৃত্যুর পর তার রুহানি আত্মা আমাদের ডাক দিয়ে যায়— যখন সেদিন হাজী বুড়ো ঢুলতে ঢুলতে পড়ে গিয়ে মারা গেলেন। যিনি কাচারি ঘরে বসে একদিন জাহাজে চড়ার কেচ্চা বলছিলেন। তখন তিনি পবিত্র হজ্জ্বব্রত পালনের ইতিহাস বলিয়া চলেন। অন্ধকার আলোয় জোনাকী পোকার ন্যায় আমরা গোল করে বসছিলাম। বিদ্যুৎবিহীন পাঠে তখন পৌষপাড়া ঘুমিয়া থাকে। আমরা জেনে যাই কাল থেকে বসন্ত শুরু। বাসন্তীও আসে। বুড়োর সেবার নথ একটা যেন। তখন প্রাত্যহিক শিমুল-পলাশের রক্তরাগ ফুটে উঠেছিল পূবালী কোণে। ‘তোরা তৈরি হ, বান্দরের দল’— হাজী সায়েবের কাছে সব্বাই তখন বান্দর। তবে আমরা ঠিক বান্দর দেখি নাই, বান্দরের খেলা দেখেয়াছি আর দেখেছি সুলতানা ডাকুর বান্দর খেলা! তাই তো বান্দর আমাদের তখন খুব প্রিয়। আমরা অখুশী হইয়া মাকে নালিশ দিলে— তখন কন, ‘উনি তোমার নানা হন, তিনি যা কইবেন তাই শুনবা, মুরুব্বী মানুষ, অনেক তার বাতেনী কাম আছে।’ সেজন্য আমরা পুণ্যাহরূপে তার অনুগত হই। সব্বাই মিলে প্রায় বান্দর হয়া থাকি। এরূপে তার কাছে সকল বান্দর যখন গপ্পো শোনে তখন ঝরা বকুলের গন্ধও মিলিয়া আসে, ফুরফুরা প্রেমঘন মোটা শিকের বাতায়ন দিয়া। তাতে মায়া পড়িয়া যায়। তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে রেকর্ডের বোলও ধরিয়া আসে। কে যেন কয়, ‘বান্দরের দল বাইর হ’। একদিন এই কেচ্চা শেষ হয়, হাজী সায়েবের পড়ন্ত মৃত্যুর পর। তারপরও কত্তোদিন আমরা বান্দর ছিলাম ঠিক জানি না। হায়রে! সাত্তার মাষ্টারের বকন বাছুরের ডাক, বাঁশতলার ঘন অন্ধকারের পিয়ালের আওয়াজ আর কোষ্টাক্ষেতের বুনোবৃষ্টির রোদছায়ায় একটু গোপন সুড়সুড়ির সময় কখন কাটিয়া গিয়াছে কেউ জানে না। কামেল মানুষগুলাও এখন আর ঘিরিয়া থাকে না। বসন্তের বাসন্তীরা একটা বান্দরকে কানে কানে কী           সব কয়! সে বুঝি তবে পোড়ামুখি? কালো তার গায়ের রঙ, পুতপুতা হাতের আঙুল,

******************************************

আলোচনা