স্নান ৪৩

স্নান পাঠকদের,
অতীত হইতে শিক্ষা লইয়া বর্তমানকে কাজে লাগাইয়া দৃঢ় করিয়া ভবিষ্যতের পানে আগাইয়া যাইবার নামই তো জীবন। জীবন চলিয়া যায়। ক্রমে ক্রমে ধূসর হইতে থাকে জীবনের স্মৃতিগুলি। সুখ আর দুঃখের স্মৃতিগুলি মলিনতায় কাতর হইতে থাকে। ফিরিয়া তাকাইতেই বিদ্যুতের রেখার মত একবার ঝলক দিয়া বারংবার ঝাকাইতে থাকে।

বর্তমান তো বলিদানের সময়। দুই হস্তে বিলাইয়া দেয়ার সময়, সময়কে বির্নিমাণ করিবার সময়। বর্তমানে চিমটি কাটিবার সময়টুকু নেই। তবুও একবার স্থির হইবেন। স্নান করিবেন। তবে মস্তকের পূর্বে পদ চালাইবেন না।

অতীত আর বর্তমান বলিবে, আপনার ভূত-ভবিষ্যতের কথা। আয়নার মত করিয়া ভবিষ্যতের প্রতিবিম্ব দেখাইবে অতীত আর বর্তমান। ভবিষ্যতে বাঁচিয়া থাকাটাই অতীত বর্তমানের চরম সার্থকতা। তাহার জন্য চাহি যুদ্ধের প্রস্তুতি। আগামীতে যুদ্ধ চলিবে। যুদ্ধ। যুদ্ধ থামিয়া গেলে, জীবন থামিবে।
সম্পাদক

***************************************************

প্রিয় হিল্দিতা, আলেইদিতা, কামিলিও ও আর্নেস্তো,

তোমরা যখন এই চিঠি পড়ছো তখন আমি পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তোমরা আমাকে মনে করতে পারবে না খুব একটা। আর তোমাদের ছোটজন আমাকে পুরোপুরিই ভুলে যাবে।

তোমাদের বাবা ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি, যা সব থেকে ভাল হবে বলে মনে করতেন তাই করতেন আর তিনি ছিলেন নিজের বিশ্বাসের প্রতি স¤পূর্ণরূপে অনুগত। তোমরা ভাল বিপ্লবী হয়ে বড় হও। কঠোর চেষ্টা করো প্রকৃতিকে বুঝতে। যেটা তোমাদের প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে।

মনে রেখো, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে বিপ্লব আর আমাদের কেউই, আলাদা ভাবে বিন্দুমাত্রও মূল্যবান নয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সংবেদনশীল হও, তোমাদের সবচেয়ে ভেতরকার সত্তায়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যে কারো বিরুদ্ধে সংঘটিত যেকোনো অন্যায়ের প্রতি।

আমার সন্তানেরা, আমি সর্বদা তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমি তোমাদের আবার দেখার আশায় রয়েছি।

একটি বড়, শক্তিশালী চুম্বন তোমাদের বাবার কাছ থেকে।

[মৃত্যুর পূর্বে সন্তানদের কাছে লেখা চে গ্যাভেরার চিঠি ॥ অনুবাদ করেছেন মাশকুর]

***************************************************

প্রিয় চামেলি হাতের মানুষ,

মাকে বলবেন আমি ভাল আছি। মা নিশ্চয় ভাবছেন আমি তার কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছি। এবারও আসার সময় তার শাড়ি কেনার টাকাটা নিয়ে এসেছি। কিন্তু এরকম ঘটনার সাথে আমি পরিচিত— মা সেটা বুঝছেন না কেন! একবার তো আমাকে টাকা পাঠিয়ে আপনারা কাঁঠাল সিদ্ধ করে খেয়ে ছিলেন দু‘তিন দিন। এতেও আমি ব্যথিত হইনি। এই চিত্র আমার একার ক্ষেত্রে নয়- অধিকাংশের। আমরা যদি ভেঙে পড়ি তাহলে মেধাহীন রাষ্ট্রের কলঙ্ক কে দূর করবে? রাষ্ট্রের পচন সারানোর জন্য, ভুল নিয়ম-নীতি সংশোধনের জন্য, বিক্রিত বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ উন্মোচনের জন্য, আপনারা (চামেলি হাতের মানুষ) ঠকছেন, আপনাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও তো আমাদের বাহুতে-মনে শক্তি রাখতে হবে—তাই না? আর শান্তার জন্য কিছু বই পাঠাচ্ছি। এলাকায় তো ভালো মানের লাইব্রেরিও নেই। যা একটা দুটো আছে তাতে ‘মোকছেদুল মোমেনিন, কাসাসুল আম্বিয়া, টেক্সট বইয়ের উত্তরপত্র’ জাতীয় বই দ্বারা ভর্তি। আপনার সাহস আমাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। আপনি আগের মতই থাকুন।
আর হ্যাঁ ওই যে বলতেন ‘দেশ পরিবর্তনের দায়িত্ব তোর না’— এই ধারণাটাও বদলাবেন।

আপনার ঊর্ধ্বগামী উত্তরসূরীঅর্বাক আদিত্য

***************************************************

 

সুবিনয়,
তুই চিঠি লিখতে বলেছিস, কি লিখব তোকে?কি সমাচার তোকে দেই! বেদনাক্রান্ত হাত জাগে না আমার, কি লিখব তোকে!

রাহুগ্রাসে গিলছে সূর্যালোক, অন্ধ চোখ, প্রাণ! বড্ড কাতর শুশ্রƒষা পেতে অথচ দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়, সুবিনয় প্রতিরাতে কি ভয়ানক শোক আমায় আচ্ছন্ন করে ফ্যালে, তোকে বোঝানো যাবেনা। কেমন লকলকে জিভ! কি ঘৃণ্য জঘন্য! কুৎসিত! চাটছে আমার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল! বাগানের শেষ গোলাপটি উপড়ে নিচ্ছে হেলেদুলে একদল হায়েনা শাবক। ধর্মালয়ের মেঝেতে শুকনো রক্তের দাগ খুন হয়ে গেছে কতটা কোমল! সবচেয়ে সুন্দর সন্তানকে পুড়িয়ে মারছে বেতনভুক্ত রক্ষীরা, আরেক দল কেটে ফেলছে ভাস্করের দশটি আঙুল।

সুবিনয়, তোকে আমি কি লিখব? এইসব অবিশ্বস্ততা মানুষ মানুষকে বলে না, আমিও বলি না কাউকে, সুবিনয় সারাদিন মুখের হ্যাঙারে হাসি ঝুলিয়ে ঘুরিফিরি যেন স্বাভাবিক আমার স্বদেশ। রাতে বিছানায় যাই ক্লান্তিতে চোখ বুজে, ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুমোতে পারি না যেন মনে হয় আমারই সহোদর এইসব দুঃস্বপ্ন। সুবিনয়, আমি কি বেঁচে আছি সুবিনয়!
ফেরত চিঠিতে জানিয়ে দিস, ভাই আমার।

অরুণ আবীর

***************************************************

সুহৃদ,
অন্ধ বাঁশিওয়ালার কোনো সঙ্গী ছিলো না। একা মাঝ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বাঁশি বিকোত। কথা বলতো না কোনো, শুধু মোহন সুরে বাঁশি বাঁজিয়ে মানুষের চোখ ফেরাতো। তখনো আমরা কেউ কাউকে ছুঁতে দেই নি হয়তো। হার্টের ভেতর পতাকা পুতে দু’জন দু’ধারে বসে থেকে চন্দ্রবিজয়ী ভেবেছি। স্বপ্নের ভেতরে ভুলেছি যতবার সে পথ, ততবার পেয়েছি নূরনগরের ঠিকানা। এখানে বারোমাস ধরে অফ্সিজন। এখানে মানুষ কেন তবু এত হৃদয় ছুঁয়ে ভালোবাসি কয়! আমরা তবু পাই শুধু এ নগরের ঠিকানা! এখানে পুরুষেরা বিনিময় করে র্স্পাম, নারীরা ভ্রুণ। পরিণামে হয় সঙ্গমশোক। আমরা তখনো সত্যিই ছুঁতে দেই নি কেউ কারো। আমাদের মৃত্যুর পরে একটু জিরিয়ে নিই বলে জাগ্রত সমাধিস্থলে চোখ বুঁজি। এখানেও বিচলিত করে! লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে তখন নূরনগরের বেশ্যা পাগল। রাক্ষসী বিস্ফোরণ দেখবি? ভয়ে দুহাত পেছাতেই সে কাপড় খোলে। যোনি যেনো দেড় কেজি বোমা। কালো বারুদে হলদে আগুন দেখা যায়। আমরা আরো পেছাই আর বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। তারপর বহুকাল শান্ত হই নি। আবলুস চোখে বেপথু চাঁদ দ্যাখে সূর্যের গরম কাহিনি। সস্তা তেজের গল্প নূরনগর আর শোনে না। বহুাকাল শান্ত হই নি আমি তুমি আমরা। তখন সে বাঁশিওয়ালা নগরের মোড় ছেড়ে পথে প্রান্তরে ঘুপচি গলিতে ঘুরে ঘুরে, মোহন সুরে বাঁশি ফুঁকে মানুষের চোখ ফেরানোর তদবির করে। আমরা এক বৃষ্টিসন্ধ্যায় বাঁশিওয়ালার ভেজা বাঁশির সুর শুনে তন্ময় হই। না, যেন শান্ত হই। আমরা বাঁশিওয়ালার কাছে গিয়ে আহত হই। সে কোনো সুর শেখায় না। শুধু বাঁশি বিকোয়। দুদ- বসে সুর শুনতে চাইলে তার দেহ অন্ধ দুচোখ বেপথু হয়। বাঁশি থেমে যায়।আমরা যেন অবিশ্বাসের প্রতীক। আমরা তখন আরো অশান্ত হয়ে বিস্ফোরণোন্মুখ হৃদয়ের কথা ভাবি। আর বাঁশিওয়ালার অশান্ত চোখের কথা। তাঁর ভেতরেও এত অশান্ততা!

নূরনগরে সতর্ক হুইসেলের শব্দ। পুলিশি তল্লাশি আমাদেরও বিভ্রান্ত করে। এক অন্ধ বাঁশিওয়ালা এই পথে গেছে কিনা বলুন। সে খুনি। আমি কৌতুক চোখে বলি সে অন্ধ, সে বাঁশিওয়ালা, সে অসমর্থ। কর্মকর্তা আমাকে ছবির পরে ছবি দেখায়। এরা মৃত। অন্ধবাঁশিওয়ালা খুনি। সুহৃদ,নূরনগরের পাগল বেশ্যার বিস্ফোরণোন্মুখ ছবি দেখে মনে হয়, মাতৃজঠর তার পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক জাদুঘর।আমরা আশ্রিত ভ্রুণ।
সুবন্ত যায়েদ

***************************************************

আয়শা,
প্রকৃতি কখনো কখনো এমন অবস্থার তৈরি করে যে অপেক্ষা করার শক্তি মানুষের থাকেনা। তুমি বিশ্বাস করবেনা হঠাৎ হঠাৎ ইচ্ছে হয় সব বাঁধন ছিঁড়ে ছুটে যাই। তমালদের পুকুরপাড়ের মত করে তোমায় কাছে টেনে নিই। কিন্তু সেই উপায় আমার নেই আশা, সেটা আমি খুব ভাল করে জানি। আমার উপর অভিমান জমিয়ে রাখাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এতটুকু বিশ্বাস আমায় করো লক্ষী, আমার ভিন্ন উপায় ছিলনা। আমার উপর অভিমানের পাহাড় গড়ে তুলেছ জানি তবু একটা বার বলবে, কেমন আছো তুমি? আশা তোমার থেকে বিদায় নেবার সাহস আমি দেখাইনি, কারণ তুমি জানো আমি বরাবরই ভীতু। চোখের সামনে তোমাকে রেখে এই যাত্রা আমি কখনই শুরু করতে পারতাম না। আর বাবার কথা ধরো, পৃথিবীতে আমিই তার একমাত্র অবলম্বন। বাবা আমায় কখনো হাসি মুখে বিদায় দিতেন? বাড়ির বাইরে সামান্য বাজার আনতে গেলেও বাবা দুশ্চিন্তায় থাকেন, তিনি কীভাবে আমায় বিদায় জানাতেন তাও দেশের এমন পরিস্থিতিতে। আমি আর বাবা অপেক্ষাই বা করতাম কীভাবে, যেখানে বাবাই আমার পরিবার। তাই এরূপে চুপচাপ চোরের মত আমায় আসতে হয়েছে। আশা, বাবা কেমন আছেন? বুড়ো মানুষটার দিকে একটু খেয়াল রেখো। ওনাকে বুঝিয়ে বলো জরুরি কাজে ভার্সিটিতে আসতে হয়েছে। গ্রামের সবার কাছেও এটা বোলো। না হয় নেমকহারামেরদল তোমাদের অযথা হয়রান করবে। মোতালেব মিয়াকে তো তুমি চেনো। ওনার কাছ থেকে বাবা প্রচুর টাকা সুদে নিয়ে বিভিন্ন সময় আমায় পাঠিয়েছেন। আমি এখানে আসার কদিন আগেই হঠাৎ আমাকে পাঠালেন, তার উদ্দেশ্য আমি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলাম। তুমিতো জান তিনি আমাদের এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি বললেন, দেশের এই সঙ্কটে তোমাদের মত জোয়ান মেধাবী ছেলেদের খুব প্রয়োজন। বেঁচে থাকতে শান্তি কমিটিতে যোগ দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। হাবিবুলদের ঘরটা চোখের সামনে জ্বালিয়ে দিয়েছে ওই মোতালেব মিয়া। আমি শপথ নিয়েছি ওকে শাস্তি দেবার। এই অবস্থায় আমার পালিয়ে আসাটা তুমি এখনও অসঙ্গত মনে করবে? তাছাড়া মোতালেব মিয়া ঠিকই বলেছেন, এ সময় আমাকে দেশের খুব প্রয়োজন। তবে সেটা বাংলাদেশের। হ্যাঁ আশা, আমরা দেশটাকে স্বাধীন করবই! স্বাধীন দেশের খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আমি তোমার ঠোঁটে চুমু আঁকবো। এই সুন্দর দেশটাকে আমার কাছে তোমার ঠোঁটের মত মনে হয়। আমার অধিকার তবু আমি বঞ্চিত হই। আমাকে চোরের মত লুকিয়ে বেঁচে চলতে হয়। না আশা, আমার অধিকার আমি একান্ত করে পেতে চাই। এতক্ষণে আশা করি তোমার অভিমান কিছুটা হলেও কমেছে। তোমার অভিমান ভাঙ্গাতে কখনই আমার খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। কি ভেঙ্চি কাটছো? আচ্ছা ডজন খানেক চুমুর পরেও অভিমান বাঁচিয়ে রাখতে পারতে? যখন অপরাধ আরও শুরু হত, দুইজোড়া ঠোঁটের লেপ্টালেপ্টিতে তা ঠিকই ধুয়ে যেত। তখন কেবল গরম ভারী নিঃশ্বাসের উঠানামা। আমার ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে তোমার দুষ্টু চোখ কী চাইত তা স্পষ্টই বুঝতে পারতাম। আশা ওই চাহনি ওই হাত দুটি দিয়ে কোমর পেঁচিয়ে ধরা, ওই গরম নিঃশ্বাস…এই অনুভূতি আমি আর একটাবার ছুঁতে চাই! মাঝে মাঝে ভাবি, বাড়ি ছেড়ে এসে কী লাভ! মাথার মধ্যে ভূতের মত সারাক্ষণ তোমার আনাগোনা। শেষ যেদিন তমালদের পুকুর পাড়ে সন্ধ্যায় আমরা দেখা করলাম, সেদিনের কথা তোমার মনে আছে? যুদ্ধের ময়দানে সবাই যখন জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত চারিদিকে পোড়াগন্ধ, তুমি শুনলে আশ্চর্য হবে ঠিক তখনি তোমার ঠোঁটের উষ্ণতা আমি অনুভব করি। আমি উন্মাদের মত ঝাঁপিয়ে পড়ি শত্রুর বুকে। আমার বন্ধুরা অবাক হয়, প্রশ্ন করে হঠাৎ আমার কী হয়ে যায়? আমি আড়ালে মুখ লুকোই। আমি কি ভাবি জান? তোমার ওই উষ্ণ অধরের পথে পাকহানাদাররা কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওদের শেষ করতে পারলেই তোমার ছোঁয়া পাব। এই ভেবেই শত্রুর বুকে বুলেট গাঁথি। ওরা প্রত্যেকটা আমার প্রেমের পথের কাঁটা। হেদায়েতের কথা মনে আছে তোমার? ক্যাম্পাসে এক সুন্দরী সিনিয়রের পেছনে ঘুরল টানা দুবছর। মাঝে মাঝে আমার মনে হত অনার্সেওর একমাত্র কোর্স হচ্ছে ওই সিনিয়রের পেছনে ঘোরা। হেদায়েতের মধ্যে কখনো ক্লান্তি দেখিনি। কিছু জয় করার জন্য তো এমন অধ্যবসায়ী হতে হয়। আর এমন অধ্যবসায়ী হলে লক্ষ্য ধারনা দিয়ে কিরূপে থাকবে? এই দেশের স্বাধীনতার জন্য আমরা লাখ হেদায়েত সর্বশক্তি দিয়ে লেগেছি। আশা, স্বাধীনতা একদম নিকটে। আমি দেখতে পাচ্ছি এই ক্যাম্পে প্রথম যেদিন আসি স্বভাবতই কিছুটা অস্বস্তি লাগছিল। সম্পূর্ণ অচেনা একটা জায়গা, চারপাশে আমারই মত অচেনা সব তরুণ। আমি ঘরে ঢুকতেই দেখি এক কোণে কাঁথামুড়ি দিয়ে একজন বসে আছে। চেনা মনে হল, কাছে যেতেই আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। হেদায়েত! জ্বরে থরথর করে কাঁপছে। মাত্র কদিনে শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। ঢাকায় ওর সাথে দেখা হল, কত কথা হল। কিন্তু ও একবারের জন্য ও বলেনি যে যুদ্ধে যাচ্ছে। আমি কখনো ভাবিনি ওকে এখানে দেখব। কারণ আমি জানতাম সিনিয়রের হৃদয় জয় করা ছাড়া ওর জীবনে দ্বিতীয় স্বপ্ন থাকতে পারেনা। তোমায় আগেই বলেছি, ক্যাম্পাসে এই তরতাজা যুবককে দেখে মনে হত না সিনিয়রের বাইরে আলাদা কোনপৃথিবী ওর আছে। হেদায়েতকে এখানে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। তবে যখন জানলাম ওর প্রথম লক্ষ্যটা পূর্ণ হয়ে গেছে তখন বিশ্বাস না করে উপায় কী? হ্যাঁ আশা, সেদিনই জানলাম সেই সিনিয়রকে কেউ বিয়ে করে ফেলেছে! তোমার মত আমার ও চোখ কপালে উঠল। একবারে বিয়ে!

তোমায় একটু আগে যে কথাটা বলেছিলাম সেটার প্রমাণ পেলে?প্রমাণ অবশ্য আমি এখান থেকেই নিয়েছি। চরম অধ্যবসায়ী হলে স্বপ্ন ধরা না দিয়ে কিরূপে থাকবে! এক হেদায়েত তার অধ্যবসায় দ্বারা কাক্সিক্ষত নারীকে জয় করেছে, লাখ হেদায়েত তাদের জীবন দিয়ে দেশটাকে জয় করতে পারবেনা? হেদায়েত আমার মতই ভাবত। স্বপ্নে নারী আর ওর মাঝে একমাত্র দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্বর পাকিস্তানিরা। ঠিক যেমনি তোমার আর আমার ঠোঁটের মাঝে পাকিস্তানিদের বন্দুকে গুলি করল। দেশের জন্য তরুণদের অনুভূতিটা এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না। আরও একটা জিনিস এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না, আমার দেশটা কত সুন্দর। আমার দেশটাকে কত ভালোবাসি। আশা, তুমি বলতে আমার পড়াশোনা শেষ হলে আমরা বিয়ে করে সুন্দর কোন দেশে পাড়ি জমাব। সুন্দর একটা দেশের স্বপ্ন তুমি সব সময় দেখতে। কিন্তু তুমি কি জান এই দেশটার তোমার স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর! স্বর্গের মত সুন্দর এই ভূমিতে শুধু এটুকুই বেমানান, কাফেরদের দেহের গন্ধ আর আমার মা বোনের হাহাকার। এইটুকু চিরতরে মুছে দিতে চাই আমরা। আশা সত্যিই এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না তুমি।

হেদায়েতের সাথে যখন একাকী থাকি ও আমার মাথা খারাপ করে দেয়। ওর বাসরের সব গল্প সরস বর্ণনায় উঠে আসে। আর আমি আরেকটা যুদ্ধ জয় করার মত স্বাভাবিক থাকি। আশা, সেই বৃষ্টির দিনের কথা তোমার মনেপড়ে? আমার যখনি মনে পড়ে নিজেকে সর্বশক্তি দিয়ে গালাগাল দেই। কেন সেদিন অবাধ্য হলাম না! বাবা বাইরে গেছেন, আমি ঘরের পেছনের বারান্দায় বাঁশের খুটি ধরে দাঁড়াই। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই তুমুল বৃষ্টি। এরই মধ্যে খেলাম একটা আছাড়। কাদায় সমস্ত শরীর মাখামাখি। আমার আবার ঠা-ায় খুব ভয়। বৃষ্টিতে ভিজতে পারিনা। এ নিয়েও তুমি কত খোঁটা দিতে আমায়। কিন্তু সেদিন কাদা জলে ভালই মাখামাখি হয়েছি। পেছন থেকে সামনের বারান্দায় আসতেই দেখলাম উঠনে তুমি দাঁড়িয়ে। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম বৃষ্টি ভেজা এক অপূর্ব দেবীকে। আমি মাটিতে বসে গেলাম প্রণাম করতে। তুমি অদ্ভুত ভঙ্গিতে একপায়ের পাজামা টেনে উপরে তুললে, বাড়িয়ে দিলে আমার দিকে। আমি আলতো চুমু আঁকলাম তোমার নগ্ন পায়ে। আশা সেদিন তোমার দেহের কাঁপুনি আজও স্পষ্ট মনেপড়ে। তোমার ফর্সা পায়ের উপর বৃষ্টির ফোঁটার সৌন্দর্য আমি বহুদিন খুঁজে ব্যর্থ হয়েছি। তোমায় দুহাতে কোলে তুলে ঘরের ভেতর নিয়ে আসলাম। ততক্ষণে চোখ দুটি তুমি বন্ধ করে ফেলেছ। সেদিন আমার কাঁধে তোমার গরম নিঃশ্বাস অচেতন মনে আমি আজও অনুভব করি। সেদিন অপারেশনে গিয়ে সাঁই করে একটা বুলেট কানের খুব কাছ দিয়ে চলে গেল। মনে হল কানের নিচটা গরম হয়ে উঠল। সেদিন যখন প্রথম চুমুটা তুমি ঘাড়ে দিয়েছিলে। ঠিক একই অনুভূতি, এই বোধহয় আমি নাই হয়ে গেলাম। কিন্তু আমি দুবারের একবারও নাই হয়ে যাইনি। বরং নতুন করে জীবন পেয়েছি। বেড়ে গেছে আমার উন্মাদনা। যুদ্ধের মাঠে নতুন উন্মাদনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম শত্রুর বুকে, আর সেদিন উন্মাদ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম তোমার বুকে। যেখানে পৃথিবীর সব সুখ স্তন আকারে জমে আছে। সেদিন তোমার কামিজটা বারবার যেন প্রতিবাদ করছিল আমায়। তার সযতেœ লালিত ঐশ্বর্য আমি কেন পিষে ফেলছি। কামিজটা তোমার কোমল শরীর কামড়ে ধরেছিল। সে কোনো ভাবেই তোমাকে আমার সামনে উন্মুক্ত হতে দেবেনা। কিন্তু ও কি জানত যে আমি আজন্ম যোদ্ধা? গতকাল পাকিস্তানি আর্মিসুদ্ধ বিশাল ভ্যান উড়িয়ে দিয়েছি। ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছি শত্রুর দেহ। তোমার কামিজ আমার পথে শত্রু। বৃষ্টির পানিকে সহায় করে সে আটকে রইল তোমার শরীরে। কিন্তু ও জানত না, তোমার শরীরের ভাজে ভাজে লেপ্টে থেকেও যে কামনার আগুন আমার দেহে জ্বালিয়েছিল তাই ওকে ধ্বংস করেছে। চোখের পলকে ছিঁড়ে টুকরো হয়ে গেল তোমার দেহের আর্মি। তোমার দেহটা আমার দেশ, আমার সম্পদ। দেশ ও আমার মধ্যে যে আর্মি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার রক্ষে নেই। দেশ যেমন তাঁর বুক থেকে জারজ আর্মি সরিয়ে দিলে খুশি হয়। তুমিও তোমার বুকটাকে স্বাধীন করে দেয়ায় খুশি হয়ে উঠলে। পরম আদরে আমার মাথাটা চেপে ধরলে তোমার খোলা বুকে। তোমার দেহের উষ্ণতা, ঘ্রাণ আর স্বাদের নেশা ধরিয়ে দিল আমায়। আদিম উন্মাদনায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলাম তোমার শহরের যত গোপন গলিতে। কিন্ত সেখানেই বাধা তোমার। মুখটাকে চেপে রাখলে নরম বুকে। এখানেই যেন তোমার সব সুখ। আশা নিজেকে গালদেই, চুল টেনে ছিঁড়ি কেন সেদিন অবাধ্য হলাম না! সেদিন কেন কেবল গভীর নাভিকূপে কাদার আলপনা এঁকেই সন্তুষ্ট থাকলাম! সেদিন একটা বার অবাধ্য হলে আজ যুদ্ধের ময়দানে শহিদ হয়ে গেলেও কোন আফসোস থাকত না। আশা তোমার প্রেমের শক্তি, তোমাকে পাবার বাসনা আমাকে দুর্ধর্ষ করে তুলেছে। ক্যাম্পে আমার বিশেষ নামডাক। শুধু তোমার জন্য। শুধু একটিবার আমি তোমায় কাছে পেতে চাই সেই বৃষ্টির দিনের মতো। স্বাধীন দেশের মাটিতে হবে আমাদের সেই বৃষ্টিস্নাত বাসর। তুমি অপেক্ষা কর আমার জন্য। আমি আসব তোমার কাছে যখন দেশের বুকে শেষ শত্রুটিও বেঁেচ থাকবে না। আদিম খেলায় মেতে উঠতে আর শত্রুর বন্দুকের নলের বাধা থাকবে না।

আশা, সারা জীবন আমি কষ্ট করেছি। আর বাবার কথা কী ই বা বলবো। মায়ের চলে যাওয়ার পর এই মানুষটা একটু একটু করে বাঁচিয়ে রেখেছেন আমায়। আজ এ সময়ে এসে শুধু সুখের স্বপ্ন দেখতে আমার বড় ভাল লাগে। স্বাধীন দেশের ছোট্টগ্রামে একটা ছোট্ট সংসার। তোমায় বউ করে ঘরে আনতে বাবার কত শখ! আশা, যুদ্ধরত একটা দেশে আমার ভালোবাসা বেঁেচ রয়েছে দূরের ওই  গ্রামে। বাবাকে দেখে রেখো। বাবাকে দেখতে তোমায় আর বেশিদিন ছুটে ছুটে আসতে হবে না, শীঘ্রই আমার দুষ্টু হরিণীকে আমি ঘরে নিয়ে আসব। এইতো আরক’টা দিনমাত্র। আশা, তোমার গোলাপের গাছটায় ফুল এসেছে? কথা ছিল প্রথম ফুলটি আমায় দেবে, ডায়রির ভাঁজে শুকনো হলেও প্রথম ফুলটা আমার চাই। মনে থাকে যেন। আশা আমি বড় ভীতু, বড় দুর্বল। যুদ্ধে নয়, জীবন সংগ্রামে আমি ক্লান্ত। একটু চোখ বুজে শান্তি করতে ইচ্ছে জাগে। আমার জন্য দোয়া রেখো। অনেক বেশি ভাল থেকো প্রিয়তমা আমার। আর অপেক্ষায় থেকো, তোমার জন্য একটা স্বাধীনদেশ নিয়ে খুব শীঘ্রই ফিরবো।

পরিশিষ্ট:
[সুদূর কানাডার মন্ট্রিলে বসে আয়শা বেগম ওরফে আশার চোখ দুটো ভিজে উঠল। তিনি শহিদ মুক্তিযোদ্ধা সুলতানুল আরেফিনের একাত্তরের চিঠিখানা ভাঁজ করে আবার ডায়রির ভেতর রেখে দিলেন। এগারো বছরের পুরনো গোলাপটা চিঠিটার উপর পড়ে থাকল। আয়শা বেগমের বুকের গভীর থেকে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।]

সুলতানুল আরেফিন

***************************************************

আঁধার রাতের কাব্য পাপিয়া,
তুই কি জানিস মাঝে মাঝেই আমার ইচ্ছে করে, তোর ঐ গহীন কালো চোখ দুটোতে হারাতে। তোর কপালের ঐ কালো টিপ মুছে দিতে। উষ্ণ আদরে তোর নরম কোমল ঠোঁট দুটোতে আকণ্ঠ ডুবে ঐ গোলাপি লিপস্টিক মুছে দিতে মিশে যেতে। তোর ঐ ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা একটুসখানি আদুরে হাসিটাতে তোর প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসে আর হৃদস্পন্দনে মিশে আন্দোলিত হতে। তোর দেহের ভাঁজে ভাঁজে মুখ লুকিয়ে থাকতে পরম নির্ভরতায়। তোর উষ্ণতার চাদরে নিজেকে ঢেকে রাখতে। তোর মনের অলি-গলিতে ভ্রমণ করতে এসবই জানি হবে একদিন, যেদিন তুই-আমি নিমজ্জিত হবো পরস্পরের তরলে কোন এক দিনের শেষে রাতজাগা তারার আলোয়। আমরা একে-অপরের চোখে খুঁজে পাব আমাদের সর্বনাশ। যখন নামবে আঁধার, ফুরাবে দিনের আলো নিভে যাবে মেইনরোডের সব নিয়ন আলোর প্রহরীরা। ঠিক তখন সাদা-কালো স্বপ্নেঘেরা হাজারো কৃত্রিমতা আর মেকিত্বে ভরা এই শহরে চলবে তোর-আমার আদিম-অকৃত্রিমফুলশয্যা। শতাব্দীর সব চেয়ে সুন্দর পঙ্তিমালা দিয়ে রচবো আমরা আমাদের আঁধার রাতের কাব্য।

তোকে ধরতে চাওয়া এক বামন
মুনতাসির মামুন

***************************************************

কিউট বেবি,
এতটা কিউট বেবি জন্মাতে পেরেছ এই জনমে…? যতবার প্রেগনেন্ট হয়েছ ততবারই তুমি অনুভবের ওমে সুখী পায়রার মত ফর্সা হয়ে উঠেছো।

দাগটানা দেয়ালের ক্যালেন্ডারে একেকটি দিন কেটেছে তোমার স্বপ্নভেজা রাতের মধুরতায়। দেয়ালে টাঙানো পৃথিবীর সব সুন্দর সুন্দর চাঁদের ছবি দেখে জঠরের বর্ধিত অংশে প্রতিনিয়ত পূর্ণতার লহমায় একাগ্র আরাধনার জল ঝড়েছে…

কতটুকু লোনাজল আর কতটুকু মিষ্টি হাসি মিলিয়ে বারবার দেখতে চেয়েছিলে অনাগত এক নিষ্পাপ পুতুলপ্রাণ। চোখের কথা আর হাতের আঙ্গুল ধরে কোন স্বপ্নীল যাপনে হারাতে চেয়েছিলে।

যাপিত জীবনে কতবার বদলাতে পেরেছ ঔরসের বাদামী জলের লবনাক্ততা! পেরেছ কি নার্সিসাস কিংবা আফ্রেদিতির জননী হতে! জনকের আদিগন্ত বিশ্বাস নিয়ে বহুবার জন্মেছে তোমার সন্তানেরা!

প্রতিবিম্বের বিপরীতে ঈশ্বরের নার্সিং হোমে তবে কেন সাদারাতের বুনন কলা।

সীমান্ত হেলাল

***************************************************

আনন্দিতা,
কেমন আছো তুমি? এখানে রাত বারোটা পাঁচ মিনিট। তোমাকে দুবার ফোন করলাম। ফোন ব্যস্ত। আমার ডানপাশে সমুদ্রের ধার ঘেষে রাস্তার শৈশব শুরু করেছে সরকার। হয়তো তাই ল্যামপোস্ট চোখ বুজে আছে। সিগারেটের আলোয় রাস্তা দেখে চলেছি। কি নিঃশব্দ চারপাশ। জনশূন্য। অথচ সেই ঘুমপ্রিয় ভীতু আমি অন্ধকারে কেমন নির্ভিক হেঁটে চলেছি হত্যা মামলার ফেরারীর মত গন্তব্যহীন। হয়তো চাতকের বৃষ্টির মত ভোরের দেখা পাবো কিছুক্ষণ পর শহরের এই নির্জন গলির চারপাশ সূর্যের প্রথম আলোতে বদলাবোরূপ। পরিত্যক্ত কনডমে পা পড়ে পিছলে যাবে পরিছন্নকর্মীর মজবুত পদক্ষেপ। অসম্ভব স¦ার্থপর হয়ে তলপেটে চিনচিন ব্যথার মত ব্যস্ত হবে এ নগরী কিন্তু আমার বুদ হয়ে থাকা নেশাগ্রস্ত এ হৃদয় অন্ধকারে এ জীবন উগরে দেবে ভেদবমির দুর্গন্ধ। এ হয়তো তুমি বীর্যের আষঁটে গন্ধের মাধুর্যতা থেকে বেরিয়ে ¯œান সেরে নিচ্ছো। পাখিরাও কিচির মিচির শ্লোগানে আন্দোলনে জুড়েছে যৌবন। কালো লোমশ বুকের বাঁধনে জড়িয়ে গেছো হয়তো নীলের মিশ্রণের মত। আমি অনেক সুখে শান্ত আছি খুব। হার্টের ফুটো টা একটু প্রসারের খবর দিয়েছে ডাক্তার। অথচ দ্যাখো, তা থেকে এখন স্পষ্ট তোমার নাম অবিরাম উগরে দিচ্ছে নির্ভুল। ভিনেগার ও বরফ কুচির মমতা আমাকে আপন করেছে, ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তুমি যৌবনা থেকো চির। পতিতালয়ের উন্মুক্ত দরজায় আমার স্বর্গবেশ্যার বক্ষখাতে মুখ থুবড়ে পুড়তে থাকুক ।

আহমদ মোস্তাক

***************************************************

সুশীল সমাজ,
জাতি গঠনে সাহিত্যের ভূমিকা লিখন শিল্পকে এককথায় সাহিত্য বলা যায়। অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্যরস ও শিল্পের লিখিত প্রকাশ হচ্ছে সাহিত্য। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা ভাষার সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। সাহিত্যের সূচনা ঘটেছে মানুষ যখন জঙ্গল থেকে গুহায় উঠে এসেছে, পেটে খাবার জুটেছে, মনে কিছুটা ফুর্তি জেগেছে তখন থেকে। সমাজের বিবর্তনের সাথে সাহিত্যেরও পরিবর্তন এসেছে। মানুষ জন্মকাল থেকে কৌতুহলপ্রবণ। আজ থেকে হাজার বছরের সেই সভ্যতা, সংস্কৃতির একমাত্র চিত্র সুনিপুণভাবে বর্তমান মানুষের কাছে ফুটিয়ে তুলতে সাহিত্যের কোন বিকল্প নেই। সাহিত্য দ্বারা সমাজের জীবনযাপন, রীতিনীতি সবকিছু সুস্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে। সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ তদানীন্তন সমাজ ব্যবস্থার একমাত্র সাক্ষী। মানুষ তার আশেপাশের পরিবেশ থেকে প্রতিনিয়ত জ্ঞানার্জনের উপকরণ আরোহণে ব্যস্ত। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মাঝে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত ইতিহাস, চরিত্র লুকায়িত রয়েছে। এই অবারিত জ্ঞানসমুদ্রই পারে পিপাসিত মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে। একটি জাতি কতটা সভ্য, কতটা সমৃদ্ধিশালী তা একমাত্র তার সাহিত্য দিয়েই বিচার করা যায়। কেননা একমাত্র সাহিত্যেই দেশের সভ্য মানুষের সভ্য চিন্তা লিপিবদ্ধ থাকে। জাতির সাহিত্য চর্চা বলতে আসলে কিসের চর্চা বোঝায়, প্রথমে সেটা অনুধাবন করতে হবে। একটা শিশু যখন জন্মের পর থেকে মায়ের সংস্পর্শে নিজের দৈহিক বৃদ্ধিসাধন করতে থাকে, তেমনি সাহিত্য হলো শিশুর আত্মিক উন্নতির হাতিয়ার । মানুষ যখন কোন গল্প, উপন্যাস পড়ে তখন সেই সব উজ্জ্বল চরিত্রের মাঝে নিজেদের কল্পনা করতে থাকে। আর যখন একটি শিশু এরকম উজ্জ্বল পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে তখন তার জীবন হয় নির্মল সুন্দর। সে জন্য পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি অন্য বইগুলো পড়তে হবে। একমাত্র বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের মন নির্মল সৌন্দর্যে ভরে উঠে। শৈশব হতে বই পড়লে একটি সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আর মানুষ যখন সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠবে তখন দেশও সুন্দর হবে। সাধারণত হাসপাতালে মানুষের দেহের চিকিৎসা করা হয়, আর লাইব্রেরীতে মানুষের মনের চিকিৎসা করা হয়। মন সুস্থ না থাকলে দেহ সুস্থ থাকতে পারে না। বিখ্যাত প-িত ক্যালভিন কলিজ এর মতে, ‘দেশে সুনাগরিক গড়ে তোলার প্রধান উপায় একটাই, তা হল সুলিখিত এবং সৃষ্টিশীল ও মননশীল বই’। বই পারে মানুষের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সকল কালে নিয়ে যেতে। যে দেশে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, একমাত্র বইয়ের মাধ্যমেই সে দেশের স্বরূপ চোখের সামনে ফুটে উঠতে পারে। বর্তমান প্রজন্ম কেউ মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি কিন্তু বই সেই ইতিহাসকে অনায়াসে চোখের সামনে তুলে ধরতে পারে। একটি ছোটগল্প মানুষের জীবনের খ-কাহিনি তুলে ধরতে পারে। একটি কবিতা মানুষের মনের প্রশান্তি এনে দিতে পারে। বই একমাত্র সাথী যার সাথে কোন শত্রুতা সৃষ্টি হয় না। মানুষের অবসরের নির্মল আনন্দের খোড়াক বই, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার বই। যেই সময় থেকে মানুষের মাঝে সাহিত্যের রসবোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেইসময় হতে মানুষের মাঝে ভালোবাসা, মায়া, আবেগের জন্ম হতে শুরু করেছে। আমরা একটি মানসিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাজে চলার জন্য তৈরি হই। মনমানসিকতা গড়ে তোলার জন্য সাহিত্য গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্কের গঠন ও বুদ্ধির বিকাশের জন্য বইয়ের বিকল্প কখনই হতে পারে না। সঠিক বুদ্ধির বিকাশ প্রতিফলিত হয় কর্মদক্ষতায়। যে কোন জটিল ব্যাপার সহজ করে দিতে পারে অতীতে পঠিত কোন বই। আসলে সাহিত্যহীন একটি জাতি হলো অন্তসারশূন্য জাতি। যারা বই পড়ে নিঃসন্দেহে তারা, যারা বই পড়ে না তাদের থেকে ভিন্ন। আমাদের দেশের সাহিত্যের প্রতি অতটা অনুরাগ এখনো সৃষ্টি হয়নি। অথচ ইউরোপ আমেরিকার বাস বা রেল স্টেশনে অপেক্ষা করার সময় দেখা যায় সবাই একটা না একটা বই পড়ছে(অবশ্য আজকাল ই-বুক রিডার দিয়েও পড়ে)। একজন শিশুকিশোর যখন কোন থ্রিলারধর্মী বই বা কিশোর উপন্যাস পড়বে তখন সে চরিত্রগুলো নিজের মত করে কল্পনা করে নিতে পারে। শিশু কিশোর যদি কল্পনা করা না শিখল, তাহলে তার জীবনে পাওয়ার মত আর কি থাকলো। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইস্টাইন বলেছিলেন, ‘জ্ঞান থেকে গুরত্বপূর্ণ হচ্ছে কল্পনা করা’। একমাত্র সাহিত্যই মানুষের মাঝে কল্পনাশক্তি জাগ্রত করার ভার নেয়। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ভলতেয়ার বলেছেন, ‘সে দেশ কখনো নিজেকে সভ্য বলে প্রতীয়মান করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার বেশিরভাগ অর্থ চুইংগামের পরিবর্তে বই কেনার জন্য ব্যয় হবে’। সাহিত্য হচ্ছে মনকে সজীব, সতেজ, সচল ও গ্রহণশীল রাখার শ্রেষ্ঠ উপায়। সাহিত্য কোন ব্যক্তি-বিশেষের বা কোন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়, এটি সমগ্র জাতির অভ্যন্তরীণ প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যের মূল উপাদান জাতীয় চরিত্র, ধর্মতত্ত্ব এবং সভ্যতা। জাতির মনের কথার লিখিত রূপ হলো সাহিত্য। জাতি গঠনে সাহিত্যের ভূমিকা কত বড় তা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র উক্তি থেকে বোঝা যায়, ‘আমাদিগকে বড় হইতে হইবে। আর বড় হইতে হইলে চাই আমাদের জাতীয় সাহিত্য। রোম, গ্রীস, আরবের ইতিহাস পড়, ইংল্যান্ডের ইতিহাস পড়, দেখিবে জাতীয় সাহিত্যের উন্নতির সহিত জাতীয় উন্নতি কেমন একতারে বাজে’। তাই জাতীয় উন্নতি, সুশীল সমাজ ও সভ্য রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য দরকার সাহিত্য আলোচনা।
সুমন সোহান

***************************************************

 

অমিতাভ রেজা চৌধুরীকে,
আমি জানি, আপনি ভাল আছেন। আবার হয়তো ভাল নেই। কারণ আপনার চিন্তা আপনাকে হয়তো এলোমেলো করে দিচ্ছে প্রতিক্ষণে। আবার এই এলোমেলো চিন্তাই হয়তো আপনাকে ভাল রাখে। বাংলা চলচ্চিত্রে নির্মাতা হিসেবে আপনার আবির্ভাব খুব বেশি দিন হয়নি। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই আপনি পেয়েছেন কোটি মানুষের ভালোবাসা। ভালোবাসাটা এসেছে সব শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে। সবাই আপনার ‘আয়নাবাজি’ দেখেছে আগ্রহ নিয়ে। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়টা ওই ‘আয়নাবাজি’ দিয়েই। আগে চিনবো কী করে! চেনার মত কাজটা তো আপনার ‘আয়নাবাজি’ই। একদম ‘বাজিই’! আর এই ‘বাজিই’ আমাকে আপনার দিকে টেনেছে। আর আমি চলে গেছি আপনার ভক্তবনে।

যাইহোক, ‘আয়নাবাজি’ পাইরেসি হয়ে গেল। খুব খারাপ লাগলো। ভাবলাম, এতো ভাল একটি চলচ্চিত্র, অনেক ব্যবসা সফল হবে। এটা পাইরেসি হবে কেন? পাইরেসি আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। এটার সমাধান হওয়া উচিত। পাইরেসি হলেও হলগুলো ছিল হাউজফুল আর ব্যবসা সফলও হয়েছে। আমি আপনার চলচ্চিত্রটি একদমই হাউজফুল অবস্থায় দেখেছি। দেখেছি মানুষের কী উচ্ছ্বাস! এখনো পর্যন্ত হলে দেখা আমার সবগুলো চলচ্চিত্রের মধ্যে আপাতত বলা যায় এটাই সবচেয়ে ভাল লেগেছে। এটা মৌলিক কাহিনি নির্ভর, আর এজন্যই হয়তো ভাল লেগেছে। এ রকম মৌলিক কাহিনি নির্ভর চলচ্চিত্র আমাদের দেশে খুবই অভাব। এজন্য অমিতাভ রেজা চৌধুরী আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনি শুধু বড় পর্দায়ই সফলতা পেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। এবার রমজানের ঈদে আপনার ‘মার্চ মাসের শুটিং’টাও ছিল অসাধারণ। নাটকটিতে আমি পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের এক খ- চিত্র। আপনি এতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও বলেছেন। এর সংলাপগুলো এ রকম ‘এদেশের সাধারণ মানুষদের কিছু রঙিন স্বপ্ন দেখানো, কী লাভ হয়েছে তাতে? সিনেমার শক্তি হচ্ছে অনেক বড় শক্তি, তোমাদের মতো রঙিন জগতের মানুষ সেটা কোনোদিনই বুঝবে না… কোন পথে হাঁটছো তোমরা?’সত্যিই তো আমরা কোন পথে হাঁটছি? আমাদের দেশের চলচ্চিত্র কোন পথে হাঁটছে, পরিচালক, অভিনয়শিল্পীরাই বা কোন পথে হাঁটছে? চলচ্চিত্র কি এভাবেই হারিয়ে যাবে?না, এদেশের চলচ্চিত্রও মানুষ দেখবে। ‘আয়নাবাজি’র মতো করে। কারণ অমিতাভ রেজা চৌধুরীর মত সিনেমা তৈরির কারিগররা এখনো এদেশে আছেন। তাঁরাই আমাদের চলচ্চিত্রের সঙ্কটকে বুঝবেন এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে একটা ভাল জায়গায় নিয়ে যাবেন।

শুনেছি আপনার পরবর্তী সিনেমা ‘রিক্সা গার্ল’। অপেক্ষায় রইলাম আরেকটি মৌলিক কাহিনির চলচ্চিত্র উপভোগের জন্য। আপনার প্রতি রইল অনেক অনেক শুভকামনা। ভাল থাকবেন।
শফিকুল ইসলাম

***************************************************

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়,
আশা করছি ভাল আছেন। পশুদের চোখে পটি বেঁধে যেমন করে যানবাহনে চড়ানো হয় তেমন করে আপনারা পৃথিবীতে বিরাজমান। যার ফলে আপনারা ভাল থাকতে পারছেন। তা নাহলে যাদের অবদানে পৃথিবী সজীব, তাদের সঞ্জীবনী পরগাছার মতো আপনারা চুষে খাচ্ছেন। আসলে তো আপনারা নিজেদেরকে ধ্বংস করছেন।

ধরিত্রীর শক্তি ও শান্তি স্থাপনকারীকে নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলবেন না। সকল সৃষ্টি ও সৃষ্টি-কণার সাথে আমাদের অতি নিপুণ সম্পর্ক। আজ বৃক্ষ ছাড়া আপনাদের/ আমাদের জীবন সঙ্কটপূর্ণ, আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ বৃক্ষদের দ্বিধায় ও সঙ্কটে ফেলে দেয়। একটি ধাপ পৃথিবীর বুকে পদাপর্ণ করলে পরের ধাপটি অনিবার্য। তাহলে কেন বৃক্ষকে নিয়ে এত মিলিয়ন-বিলিয়ন খরচের নামে ধ্বংসের পাঁয়তাঁরা করা হচ্ছে? একটি মানুষকে যেমন বাঁচতে হলে অন্ন দরকার, ঠিক তেমনি পৃথিবীর অন্য শক্তি গাছ নামের প্রাণটি। যদি পৃথিবীতে বৃক্ষের ঠাঁই না হয়, তাহলে জেনে রাখবেন একদিন আমরাও ধ্বংস হয়ে যাব। বৃক্ষকে যে কোন মূল্যে টিকিয়ে রাখবেন। কিন্তু না, যেভাবে যে কায়দায় বৃক্ষের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে, তাতে বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। বৃক্ষ আছে বলেই আমাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আজও আছে। বৃক্ষ আছে বলেই বর্ষায় মাটি বুকে আকড়ে ধরে রাখে। গরমে নিজেকে পুড়িয়ে  অন্যকে শীতল বাতাস বিলিয়ে দেয়। পশুপাখির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে।

বন রক্ষার নামে হিং¯্র থাবা বসাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। খুব তো চুক্তিতে মেতেছেন আপনারা, পরিণামে বৃক্ষের কী হয়েছে? ঘটা করে চেয়ারে বসে পরিবেশ দিবস পালন করেন। গদিতে বসে বড় বড় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা কয়টা বৃক্ষরোপণ করেছেন? ধোঁকাবাজি করবেন না। আপনারা যেখানে বসে আছেন সেটা তো বৃক্ষরই অবদান। সকল ইতিহাসের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নীরব স্বাক্ষী বৃক্ষ। পৃথিবীর সকল তথ্য বৃক্ষের কাছে থাকে। বৃক্ষের নজরদারির বাইরে কেউ নয়। বৃক্ষের আওতায় সবাই। চৈত্রের প্রখর রৌদ্রে চারিদিকে হাহাকার অবস্থা, জনমানব শূন্য। কিন্তু বৃক্ষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঠের কৃষক দিশেহারা হয়ে ছুটে আসে বৃক্ষের ছায়াতলে। আর আসবেই বা না কেন? বৃক্ষ যে কোমল, শীতল ও পরোপকারের প্রতীক। বৃক্ষের সজীবতায় ও শীতল বাতাসের পরশে আমাদের প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সেটা দেখে আপনারাও তৃপ্ত হন। রাতে অন্ধকারে একটি মেয়ের বুক ভাঙা হৃদয়বিদারক আর্তনাদ, তাকে হননে মেতে ওঠে কিছু হায়নার দল। তেমনি মনে হয়, ঝাপিয়ে পড়ে সেই সজীব শ্যামল বৃক্ষের উপর। আজলেখক-কবি-সাহিত্যিকরা বৃক্ষকে যেটুকু মূল্যায়ন করেছে, আপনারা সেটুকুও করেননি। সময় থাকতে নিজেদেরকে কল্যাণের পথে ধাবিত করুন।
সুমন বিন আমজাদ

***************************************************

প্রিয় হুমায়ুন আজাদ,
আজ আপনার নিকট একটি প্রথাহীন পত্র লিখব। তাছাড়া তো আপনি আবার ‘প্রথাগত-প্রথাগত’ বলে গ্রহণ করবেন না। প্রথমত আমরা আপনার সম্মতিক্রমে কবিদের আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্মাদ ঘোষণা করতে চাই, যদিও আপনি প্রায় শ’তিনেক কবিতা লিখেছেন, এ সমাজে আর কেউ কবিতা লিখবে না, কবিতা পড়বে না। অবশ্য আমরা আর কবিতা পড়ি না। তার বদলে আমাদের বুকে গুবরেপোকার বাস হাজার বছর ধরে কবিতা লেখার এই প্রথা ভাঙতে হবে। আমাদের কাছে মগজের চেয়ে পেশি শক্তির দাম অনেক; শিক্ষার চেয়ে সন্ত্রাসের। আপনি কোন দিন বুঝবেন না আল-ফাতাহদের মতোন দাড়ি দিয়ে উল্টো পিরামিড বানানোতে মত্ত থাকার মহত্ব; জানবেন না সত্যি সত্যিই পড়তে পড়তে পাগল হওয়ার চেয়ে পড়ার অভিনয় করার আনন্দ। সবসময় শিক্ষকদের থেকেই শিক্ষা নিতে হবে কেনো? ধর্ষণ, ছিনতাই, উৎকোচরাজ পুলিশকে কি আমরা কোন গুণ ছাড়াই বই মেলার শিক্ষকতার দায়িত্ব দিয়েছি ? আমাদের পাঠ্য তালিকা তারা যতœ করে ঠিক করে দেয়।

আপনি ৬০-এর অধিক বই রচনা করেছেন। কী হয়েছে তাতে ? আরো কিছু মানুষকে পাগল বানানোর পরিকল্পনা? কী হয়েছে ৩০ কার্টুন সিগারেট পুড়ে ‘নারী’ লিখে? আচ্ছা করে, ধর্ষণের পর ধর্ষণ করে আমরা নারী অধিকার চর্চা করি। বাসায় গিয়ে বালিকাকে, বস্তিতে গিয়ে বধূকে, তাছাড়া রেইনট্রির মতোন ব্রথেলতো আমাদের আধুনিক ধর্ষণের সূতিকাগার। শিল্পকলার চেয়ে ধর্ষণকলার মূল্য কম কীসে? সম্মতির চেয়ে কষ্ট করে পাওয়া শরীর অনেকটা তৃপ্তিদায়ক; কেউ কেউ আবার অস্ত্র ধরে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে, এই প্রকৃতির ধর্ষণ অবশ্য ততটা সুখকর নয়। এখানে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট জন্মে না। রোকেয়াদের জন্য আমরা ওয়ান-ওয়ে-পাসপোর্ট করে রাখি। ‘অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু’ নিয়ে এখানে কেউ থাকতে পারবে না। চোখে শুধু কাম থাকতে হবে। আমাদের শিশ্নানুভূতি ও ধর্মানুভূতি সহোদর। অমর্যাদা অসহনীয়। শামসুর রাহমানকে পারি নি, কিন্তু আপনাকে? আপনি বলেন- আমরা বন্ধ্যা জাতি! আমরা কি আপনাতে থেমে আছি? নেই। অতিজিৎ দীপনদের কি আমরা মাঝে মাঝে রক্ত ঝরাই না? আমরা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলকে ‘অগ্নি¯œানে সূচি’ করি। রামু, গাইবান্ধা, লংগদু যেখানে ইচ্ছা।

চারিদিকে আজ শুভব্রতের স্বর্ণযুগ। দ-িত কবির রক্তাক্ত পদতল। শুভব্রতের অনুসারীদের জন্য আমরা আকাশযানের ব্যবস্থা করি। আমরা জ্ঞানচর্চার পাছায় চাটি দিয়ে বিষফোঁড়ার স্বীকৃতি দিয়েছি। ‘শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা’ পথে পথে রক্তাক্ত। ‘লাল নীল দ্বীপাবলি’ নিভিয়ে দিয়েছি। আমরা যেই অত্যাচারিত মায়ের মতোন বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলাম সেই মাকেও উপর্যপুরি ধর্ষণ ক’রে গর্ভবতী করেছি। আপনি বলেছিলেন- এক সময় বাঙালির মুখ থেকে ভাষা নির্গত হবে, কিন্তু তা থেকে কোন অর্থ বিচ্ছুরিত হবে না। আমরা সেই ধারায় গর্বিত প্রবর্তক।

অর্জন-অর্জন-অর্জন আমাদের সব কিছুতেই এত অর্জনে আমরা দিশেহারা। আমাদের অসীম প্রাপ্তিতে আমরা অন্ধ। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে। বিকেলের রোদ, বকুলের মিষ্টি গন্ধ নষ্টদের অধিকারে গেছে। ধানক্ষেত, মধুমাখা গাঁ-ও নষ্টদের অধিকারে গেছে। ভাটিয়ালি গান, দোয়েলের ঠোঁট নষ্টদের অধিকারে গেছে। বাংলার  কিছুই আর ভাল নেই। আপনি একবার তবুও কি আপনার প্রাণের বাংলায় ফিরে আসতে পারেনা? দেখতে ইচ্ছা করে না নিষ্পাপ চড়–ই পাখির মুখ? ইচ্ছে করে না একবার ডাহুকের ডাক শুনতে? আড়িয়াল বিলের দিকে দুটো চোখ রাখতে? কাদায় আপনার দুটোপায়ের ছাপ রাখতে? ইচ্ছে করে না? জানোয়ারদের চোখের দিকে তাকিয়ে চশমার ভেতর দিয়ে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাতে, যারা আপনার বাংলাকে চিত করে শুইয়ে রেখেছে। একবার আপনার তপ্ত নিঃশ^াস বাংলার বায়ুতে ফেলতে? কলমের খোঁচায় আততায়ীদের বুক ফুটো করতে? ভ-দের বুকে কাঁপন ধরাতে? এই-দুঃসময়ে কি করে পারেন সব কিছু সহ্য করতে? সবকিছু মেনে নিতে? আপনাকে আজ ভীষণ প্রয়োজন। বঙ্গপোসাগরে বিলীন হবার পূর্বেই বাংলার মৃত্যু হবে। দান্তের নরকে কি এর চেয়েও বেশি কষ্ট? যেতে ইচ্ছে করে।
আরিফ তুরহান

*************************************************

প্রিয়তমা পৃথিবী,
তুমি-ই তো বলতে— আমার জন্ম থেকে শুরু করে তোমাকে পাওয়া পর্যন্ত সবই নাকি অভিনব এবং চমৎকার। আমার মৃত্যুর ধরনটাও তর্কাতিতভাবে অভিনব, কিন্তু চমৎকার কিনা জানি না। এই যে এতদিন, এতসময়, এতক্ষণ জুড়ে তোমার হাত ধরে ঝুলে আছি আকাশের পানে। একটু পরেই তুমি আমার হাত ছেড়ে দেবে। আর আমার মৃতদেহটা পড়তে শুরু করবে আকাশের দিকে। অভিনব নাঃ? অভিনব এই কারণে যে, পৃথিবী থেকে এই প্রথম কেউ সশরীরে চলে যেতে পারছে। চমৎকারও বটে। কারণ তুমিই একমাত্র অন্য পৃথিবী যে আমার চলে যাওয়া অনুভব করতে এমনকি দেখতেও পাচ্ছ।

অথচ, কী আশ্চর্য! কিছুদিন আগেও আমরা জানতাম শুধু মৃতদেহ কেনো, সকল জীব, এমন কি জড়রাও নাকি আটকে থাকে পৃথিবীর আকর্ষণে। মধ্যাকর্ষণ বলে এক ধরনের শক্তি নাকি আছে। নাহঃ আজ আমি বড্ড বুঝতে পারছি— নিউটন বড়ই ভুল তত্ত্ব প্রচার করে খ্যাতি লাভ করেছেন। ওসব মধ্যাকর্ষণ-ফাকর্শন সবই ভুয়া। আসল সত্য হচ্ছে, জীব এবং তার মৃতদেহ এমনকি জড়বস্তুকেও পৃথিবী তার নিজের সাথে আটকে রাখে ততক্ষণ, যতক্ষণ তার থেকে সে কিছু পাওয়ার আশা রাখে। আশা করতে করতে যখন বস্তুর উপযোগিতা সম্পূর্ণরূপে শেষ হয় তখনই সে তাকে ছেড়ে দেয়। আর জীব এবং জড়দের পৃথিবী ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। তারা চলে যায় মহাশূন্যের গর্ভে। চলে যায় বায়বীয় পদার্থ হয়ে। পৃথিবীর কেউ তা টের পায় না। টের পায় কেবল পৃথিবী আর যে চলে যায় সে-ই। ঠিক তেমনিভাবে জীবের আগমণের ক্ষণ টের পেয়েছিল কেবল পৃথিবী এবং যে এসেছিল সে। পৃথিবীর কোন মানুষ টের পায় না কারো আগমণের বার্তা। মানুষ টের পায় তখনই যখন তার প্রকাশ ঘটে। আমারও আগমন ঘটেছিলো এমনিভাবে। কাউকে না জানিয়ে অতি সন্তর্পনে। আমার প্রথম প্রকাশ টের পেয়েছিল মা। তারপর পরিবার।

তারপর এইতো জীবন! জন্মাবধি আমার কাছে পৃথিবী শুধু চেয়েছে। পৃথিবী চেয়েছে আর আমি দিয়েছি। চিমটি কেটে আমার কাছে কান্না চেয়েছে, আমি কান্না দিয়েছি, বাহবা দেখিয়ে হাসি চেয়েছে, আমি হাসি দিয়েছি। বৃদ্ধি চেয়েছে বৃদ্ধি দিয়েছি, কৈশোর দিয়েছি, পরিণতি দিয়েছি, কর্ম দিয়েছি, উপার্জন দিয়েছি। মান-অভিমান, অপমান, রাগ-অনুরাগ, বিরাগ, প্রেম-বিরহ, ভালোবাসা সব; সব আমি পৃথিবীকে দিয়ে দিয়েছি। সবর্স্ব হারিয়ে উপযোগিতাহীন হয়ে যখন আমার পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়ার উপক্রম ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার দু’খানি হাত পেয়েছিলাম হাতের মুঠোয়। দেখেছিলাম মাটির মত সুন্দর একখানা মুখ। তোমার অঙ্গে ছিলো মাটির সোদা গন্ধ। আর আলিঙ্গনে ছিলো পৃথিবী প্রাপ্তির সুখ। এটুকুই আমার বড় প্রাপ্তি।

আর কত ঝুলিয়ে রাখবে? আমি উপযোগিতাহীন হয়েছি। এবার তবে হাত দু’খানি ছাড়। যেতে হবে। মহাশূন্যাকর্ষণ আমার প্রতিক্ষা করছে।
রফিক সানি

*************************************************

অপরাহ্ণকে,

খোলা আকাশের নিচে আজ

এক শান্ত পথের সন্ধানে,

অনেক বছর পার করে এসে

আলো আঁধারের মাঝখানে।

 

কষ্টের নদী বয়

অগ্নি জলের সীমাহীন গতি,

স্রোতের ভেতরে কান্নার আরতি

ছিন্ন-ভিন্ন, রুক্ষ-ক্লিষ্ট বিগলিত এ হৃদয়।

 

মনমাঝি কথা কয়,

ব্যথিত হৃদয়, ক্ষুধিত আত্মা,

প্রাণহীন এই জীবন সত্তা,

আর কত প্রাণে সয়?।

 

পথ খুঁজে পেতে হাঁটি

এখানে-সেখানে দিবস রজনী,

সাগর পাহাড় রিক্ত ধরণী

তপ্ত বালুকা বন্ধুর আর বিস্তৃত সমমাটি।

 

সংশয় আছে জানি

তোমরা যতই বলছ সহসা,

সত্য নামের বিরাট মিথ্যা

সভ্যতা দেবে আনি।

 

মিথ্যাবাদীরা অত্যাচারীরা শোন্

তোদের দুরাশা তাসের ভরসা,

ভেঙ্গে দিতে আজ জাগি উঠিতেছে

লাখ কোটি যৌবন।

 

আর বেশি নয় দূর

যেদিন প্রভাতেঅবনী  পরেতে,

সাগরে-পাহাড়ে,আকাশে-বাতাসে

বাজবে বিজয় সুর।

হেমকান্তি

 

জনপ্রিয় সেই যৌনকর্মীকে যে কুকুর ও মুগুর পুষতো,

 

আমি কুকুরকে বুঝতে চেষ্টা করি

কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ওঠে

 

কুকুরের মুখ থেকে মাংস ছুটে যায়

আমি মাংসের দিকে তাকাই

মাংস-আমার ও কুকুরের দিকে

 

আমি চেয়ে থাকি

কুকুর চেয়ে থাকে

মাংস ভয়ে থাকে

আমি ভীতু মাংসকে বুঝতে চেষ্টা করি

মাংস বুঝতে চেষ্টা করে কুকুরকে

মাংস কুকুরকে বোঝে

আমি কুকুরকে বুঝি

কুকুর আমাকে বোঝেনা

কুকুর মাংস বোঝে

ভুল ভগবান

*********************************************

সংযুক্তি

ইমরান কামাল-এর ছোটকাগজ কথন,                                        

আজকের বিকেলে আমার পক্ষ থেকে সকলের জন্য রইল শুভেচ্ছা। আজ স্নানর নয় বৎসর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। একটা আন্দোলন ¯স্নানর নবম বর্ষযাপন অনুষ্ঠানে

যে কিনা নয় বৎসর পার করে দিয়েছে, নয় বৎসর পার করে এদেশে এ সময়ে দাঁড়িয়েছে এবং আত্মরূপে জন্মকে উদযাপন করছে, তার এই দাঁড়িয়ে থাকার জন্যই তাকে আমার তরফ থেকে অভিনন্দন। ছোটকাগজ নামে এতদিন টিকে থাকা, এতদিন চলা, এতদিন প্রতিবাদের জায়গাটা ধরে রাখতে পারা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিতো রাখেই, বিস্ময়েও কারণ হয়। তবে এটা আমার ভেতরে এক ধরনের আশঙ্কাও জাগায়। আশঙ্কার কারণ ছোটকাগজের চরিত্র। যাকে বলা হয় ক্ষণস্থায়ী। বড় বেশি বাঁচতে গিয়ে ¯স্নান কী তার চরিত্র হারিয়েছে? গোড়ার কথায় আসি, বাংলা সাহিত্যে ছোটকাগজ ‘লিটল ম্যাগ’ এই শব্দটা প্রথম (সম্ভবত) ব্যবহার করেন বুদ্ধদেব বসু। ‘সাহিত্যপত্র’ নামক তাঁর একটা প্রবন্ধে ১৯৫৩ সালে। বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যে ছোটকাগজ নামটা ঠিক ওভাবে দেন নি। লিটল ম্যাগ এর অনুবাদটা করেছেন সাহিত্যপত্র এই অর্থে এবং এর মধ্যে একটা ভাবও করেছেন। সাহিত্যপত্র বলতে তিনি সাহিত্যের গবেষণা পত্রিকা বোঝেন নাই, বুঝেছেন যে, সাহিত্য কল্পনার উপর প্রতিষ্ঠিত, কল্পনা যেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই সাহিত্য নিয়ে যে কাগজ কাজ করে তাকে। বুদ্ধদেব বসুর ‘সাহিত্যপত্র’ অভিধাকে আমলে নিলে লিটল ম্যাগ বা ছোট কাগজের সংজ্ঞাটা দাঁড়ায়— এমন পত্রিকা যা আকারে ছোট, প্রচারে ছোট, আয়ুতে ছোট। বুদ্ধদেব তারপর বলছেন প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের কথা। যা থাকে ছোটকাগজের গঠনে, নির্মাণে, বিষয়ে।  বুদ্ধদেবের চিন্তা ধার করলে এটা বোঝা যায় ছোটকাগজ বাজারি বিক্রি-বণ্টনের জায়গা নয় এবং ‘প্রতিষ্ঠা’ এই শব্দ ছোটকাগজের বেলায় ঠিক খাটে না। তাহলে ছোটকাগজ কী? বুদ্ধদেবের কাছে তা এক ধরনের সুস্থ সাহিত্যচর্চার চেষ্টা বা এমন কিছু। অবশ্যই ছোটকাগজ বলতে এখন আমরা যা অনুভব করি এ সব বৈশিষ্ট্যম-িত সংজ্ঞা বোধ করি তার ক্ষেত্রে এক মাত্র হবে না, এটা দিয়ে শুধু বাংলা সাহিত্যে ছোটকাগজ এমতো একটা নাম গজিয়ে উঠছিল তাকে চিহ্নিত করা যাবে মাত্র। তারপরও বুদ্ধদেব বসুর চিন্তার সাথে মনে হয় আমরা কিঞ্চিৎ একমত…এখনো। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আসুন বুদ্ধদেব বসুতে ফিরি। কারণ, বুদ্ধদেব বসু এই শব্দটাকে বাংলা সাহিত্যের সাথে পরিচিত করালেন (অবশ্য তিনি এও দেখিয়েছেন, লিটিল ম্যাগ শব্দটা চালু হওয়ার আগেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তার ছাচটা তৈরি হয়েছিল)। যাই হোক, শব্দটি বাংলায় প্রচলন করার পেছনে তাঁর গুরুভূমিকা ছিলো ফলে বাংলা সাহিত্যে ছোটকাগজ নিয়ে চিন্তা করতে বসলে তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নাই। এখন প্রশ্ন হলো শব্দটি তিন প্রকারেই ছোট কেন? আকারে ছোট কেন?প্রচারে ছোট কেন? আয়ুতে ছোট কেন? যদি একবার সবাই মিলে ভেবে দেখি তাহলে, এরা ছোট, এখানে যারা চর্চা করে তারা একদিন বড় হবে, ফলে যার কিছু ছিল না তার বড় হওয়ার ক্ষেত্রে এটা একটা সিঁড়ির মত কাজ করবে। তো এটা যদি হয় ব্যাখ্যা, তাহলে আমি বলবো পুরো ঘটনাটাকেই ঋণাত্বকে দেখা হলো। বিষয় কে যদি একটু ঘুরিয়ে ভাবা যায় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াবে— ‘ছোট’ কোন অর্থে ছোট? আকারে ছোট? নির্দিষ্ট কোনো আকার ছোটকাগজের আছে, এটা বললে বলাকেই গড় করা হয়। একেকটা ছোটকাগজ একেক ধরনের আকৃতির, একেক ধরনের ডিজাইন, একেক ধরনের প্রকাশ এবং সময়ের রুচিতে বিচার করে নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা মেনে ছোটকাগজ বের হয় কখনও…তাও বোধ হয় না। দ্বিতীয়, ছোটত্ব যদি হবে প্রচারে! প্রচারে ছোট অর্থ—অসংখ্য পাঠক যুক্ত হবে না। তাহলে, তার পাঠক তৈরির জায়গাটা খুব নির্দিষ্ট। পাঠকের সাথে তার সম্পর্ক গড় নয় বিশেষ, নির্দিষ্ট সম্ভবত এই অর্থেও। তার মানে, একটা বিশেষ কিছুর দিকে তার নজর সে রাখে। একটা বিশেষ কিছু সে ঘটাতে চায়, করতে চায়। আর তার এই করার সঙ্গে পাঠকের যুক্ততার প্রয়োজনও বোধ করে। এই অর্থে যদি সে প্রচারে ছোট হয় তাহলে আমি আপনাদের ভেবে দেখতে বলবো— বাজারে বড় বলে যে মহাজনেরা আছেন, প্রধান বলে যে ধারা আছে, অসংখ্য পাঠকের সঙ্গে যারা টানতে চান, সেইসব পত্রিকা, তারা, তাদের কী এই খায়েস আছে? তারপর আসেন, আয়ুতে ছোট কেন? সেই প্রশ্নে। ছোটকাগজ নিয়ত নতুন কিছু করতে চায়। নতুন কিছু করতে চাওয়া মানে পুরনোর গর্ভ থেকে রসদ নিতে নিতে নতুন হয়ে ওঠা এবং একসময় পুরোনোকে খারিজ করতে পারার মতো জায়গায় পৌঁছনো এমতো ভাবলে নিয়ত যে নতুন কিছু করতে চায়, সে কী করে বেশিদিন বাঁচবে? কোন নতুনই কি খুব বেশিদিন নতুন থাকে? ফলে, প্রতিস্থাপন হয় তার পরবর্তী বা উত্তরসূরী ধাপে। একটা ছোটকাগজ নতুন ছিল, তাকে ভেঙে আরেকটা ছোটকাগজ হচ্ছে, সে নতুন অভাব, নতুন ভাব হয়ে উঠছে, তাকে ভেঙে আবার আরেকটা ছোটকাগজ আসছে, সে আবার নতুন হয়ে উঠছে। এই যে নতুনের অভিযাত্রা, এটাকে সম্ভবত লিটল ম্যাগ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত যারা তারা নাম দিতে চান ‘প্রগতি’। এই জায়গায় এসে আমি একটু অবাক হই এই ভেবে যে, নয় বছর থেকে ¯œান চলছে, তার ভেতরে একটা ইন্টারনাল চেঞ্জ আছে, এটা বোঝা যায়। একটা সংখ্যার সাথে আরেকটা সংখ্যার সম্পর্ক আছে, আবার পার্থক্যও আছে। ¯œান নিজেকেই ভাঙ্গছে, নিজেকে গড়ছে, চলছে। কিন্তু ¯œানর নিত্য এই থাকা মানে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমনকিছু এ তল্লাটে পয়দা হয় নাই। তাহলে বুঝতে হবে যে, ¯œান কে প্রতিস্থাপন করার মত আরও শক্তিশালী ক্ষুরধার কাগজ আসলে আসে নাই। ন’বছর ধরে একটা ছোটকাগজ টিকে আছে, তাকে আক্রান্ত করার মত আরেকটা শক্তিশালী ছোটকাগজ হাজির হয় নাই; অর্থ একটা প্রবল শূন্যতা আছে। এই শূন্যতাটা নিয়ে আমি চিন্তিত।

২.

একটু ফিরি ছোটকাগজের ইতিহাসে, বুদ্ধদেব বসুর কথা তো বললাম, তিনি ছোটকাগজকে মূলত চিহ্নিত করেন ‘সাহিত্যপত্র’ হিসেবে। তো সাহিত্যপত্র মানে ‘লিটারারি ম্যাগ’। বুদ্ধদেব বসু ১৯৫৩ তে যখন লিখেছিলেন, তখনও লিটারারি ম্যাগ আর লিটল ম্যাগ এই দু’য়ের মধ্যে ফারাক বোঝার প্রয়োজনটা অনুভূত হয় নাই। এই ভেদটা বাংলায় এসেছে তারও পরে। তার আগের দশাটা কী? ইউরোপে একটা বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে ১৯১২ সালে। পাউন্ডের মতো চিন্তকেরা এমতো ভেবেছেন ন্যাচারালিজম মারা যাচ্ছে, ও নিয়ে আর আগানো যাবে না। ফলে কাবিতাকে নতুন করে বাঁচাতে হবে। কবিতাকে কবিতা দিয়েই বাঁচাতে হবে। বাঁচানোর উপায় কি—তখন ইমেজিসম আসছে এবং একটা মুখপত্র তৈরী হচ্ছে, নাম চড়বঃৎু। এই চড়বঃৎু-ই মার্কিন সাহিত্যের দুনিয়ায় বড় ধরনের ভাঙ্গন ধরাচ্ছে। তার পাশাপাশি আগে-পরে দেখবেন একে একে ইউরোপে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। অনেকগুলো বড় বড় শিল্প আন্দোলন। তারপর পাঁচের দশকে আসছে অ্যাংরি ইয়াংম্যান। এই যে অভিযাত্রা, এই অভিযাত্রায়, ইউরোপের পুঁজিবাদ আশ্রিত সংস্কৃতির যে বৃদ্ধি তার বিরুদ্ধে এক ধরনের পরিষ্কার লড়াই আছে। বিষয়টা ইউরোপের নিজস্ব অর্থনৈতিক—রাজনৈতিক সংকটের সাথে জড়িত। একটা ব্যাপার খেয়াল করার বিষয় যে ইউরোপে— পুঁজিবাদ এবং মুদ্রণশিল্প একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত হয়ে প্রিন্ট ক্যাপিটাল দাঁড়াচ্ছে। জাতীয়তাবাদ, জাতি রাষ্ট্রের কল্পনা বা ভ্রমও মিশ্রণের ফসল। ছাপাখানার কাছে পুঁজিবাদী সংস্কৃতি, ক্ষমতা কাঠামোর দায় অনেক, দায় পুঁজিবাদ আশ্রিত জাতীয়তাবাদ কিংবা প্রাসঙ্গিক ভাবাদর্শগুলোরও। ছাপাখানার ম্যাস প্রডাকশনের ওপরই প্রকাশনার বাজার, তার জগৎ-রাজনীতি দাঁড়িয়ে থাকে। এখনো আপনারা দেখবেন পুঁজিবাদী ভাবাদর্শগুলো যে দাঁড়িয়ে আছে তার একটা বড় কারণ এই ম্যাস প্রডাকশনের ওপর স্থিত প্রকাশনার বাজার। এরা একে অপরের সাথে মিলে চলছে। একে অপরের ক্ষমতাকে স্থিতি দিচ্ছে। একই সাথে সাহিত্য ও সাহিত্যের প্রডাকশনের বিকল্প সম্ভবনাগুলোর বারোটা বাজাচ্ছে। এই গতিতে এখানে এদেশেও (অবশ্যই ইউরোপের মতো করে নয়) প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য বলে একটা শব্দ তৈরি হচ্ছে, প্রচলিত সাহিত্য বলে একটা শব্দ তৈরি হচ্ছে, সাহিত্যকে পপুলার করার চেষ্টা হচ্ছে, প্রচুর মানুষের কাছে সাহিত্যকে পৌঁছে দেয়ার পায়তারা হচ্ছে এবং সেটা খারাপ না, দিকবিচারে ভালই। কিন্তু গ-গোল বাঁধছে তখন, যখন এই সব বাজারি পাঁয়তাঁরা আর ক্ষমতাকৈন্দ্রিকতার প্রতি নিরলস প্রেম আত্মস্থিতির স্বার্থে প্রকাশ্যে কখনো নিরবে অপরাপর নতুন সম্ভবনাকে ¯্রফে নাই করে দিতে চাচ্ছে।

এটা খেয়াল রাখা দরকার, মানুষ একসময় যখন সাহিত্যচর্চা করেছে, মুখে মুখে কথ্যে। তখন সেখানে যোগাযোগটা ছিল অনেকটা পারফরমেন্সকে ভিত্তি করে। একধরনের লীলার মত আরকি। তখন শরীরের সঙ্গে শব্দে এবং ভাবের এক সমন্বয় ছিল (এখনো আপনারা চোখকে নিচে রাখলে এই সমন্বয় দেখতে পাবেন)। ফলে সেখানে গল্প কথক, গল্প এবং শ্রোতা সবমিলে একটা কমিউনিটি তৈরি হতো। এই কমিউনিটির সাহিত্য আমাদের মধ্যযুগে ছিল, ইউরোপেও একটা সময় ছিল (সে জগৎ থেকে ইউরোপ বেরিয়ে এসেছে)। আগে যে দেখছে, শুনছে এবং যে বলছে এই দু’য়ের মধ্যে ভেদটা ছিল কম। ভেদটা বেড়ে যায়, যখন কেউ বুঝতে শুরু করে যে লিখতে হবে বা ইতিহাসের সেই কর্তা যে নিজেকে লিখতে পারে, যে শুধু বলেছে, যে লেখা হয় নাই তাকে ইতিহাস জায়গা দিল কই? ফলে এটা পরিস্কার লেখ্য সাহিত্যের জগত আপসে-ই ভেদ করে। এটাকে অতিক্রম করার সুযোগ লেখ্য জগতের ভেতর থেকে কী আছে? লিটলম্যাগ এই প্রবল প্রথম স্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে? আপনি যখন লেখার জগতে প্রবেশ করেন তখন আপনি স্টাবলিস্ট হন। তার কারণ, যাই আপনি লিখছেন, তাই তৈরি হচ্ছে এবং থেকে যাচ্ছে। লেখার ভেতরেই এক প্রকারে সংরক্ষণবাদ আছে। পুরো ঘটনার ভেতর দিয়ে বিষয়টা এভাবে দেখা যায়, আপনি একটা দলিল করছেন, যে দলিলের ভিত্তিতে আপনি আসলে আপনার সম্পদকে সংরক্ষণ করেন। আপনি একটা কিছু লিখছেন, সেটা কবিতা হতে পারে, গল্প হতে পারে, উপন্যাস হতে পারে এবং সেই লেখালেখির ভেতর দিয়ে আপনি একটা কিছুকে সংরক্ষণ করেন, পড়ার মধ্য দিয়ে, বই জমানোর মধ্য দিয়ে আপনার পাঠকও সংরক্ষণ করে। এই সংরক্ষণবাদ আছে লেখ্যজগতে কিন্তু তাকে অতিক্রম করার পথ? উত্তরকাঠামোবাদীদের মানলে লেখ্যে অর্ন্তগত ভাঙনও আছে। সৎভাবে নিজেকে প্রশ্ন করেন—আপনি কী চান?জমাজলে অঞ্জলি দিতে চান নাকি উল্টো?

৩.

উৎপাদনকে বিষয় মানলে দেখা যাবে—যিনি লিখছেন এবং যিনি পড়ছেন এর ভেতরে আরও কিছু পদ তৈরি হচ্ছে। এডিটর আসছে, সম্পাদক, প্রকাশক আসছেন, প্রুফ রিডার আসছেন, ছাপাখানাতো আছেই। এই যে লেখক এবং পাঠক, এর মাঝখানে এতোগুলো শব্দ, এতগুলো পদ, এতগুলো পজিশন, এই পজিশনগুলোর ভেতর দিয়ে লেখকের লেখাটা আজকের যুগে পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা জিনিস যুক্ত হচ্ছে, যেহেতু আপনি এখনও একদম কোণের ভেতর সাহিত্যচর্চা করেন না, আপনি যখন একটা বিরাট কমিউনিটির প্রেক্ষিতে সাহিত্যচর্চা করতে যান, বা বিরাট কমিউনিটির জন্য কিছু লিখতে যান, তখন আপনার পাঠক কল্পিত হয়ে যায়। আপনাকে কল্পনা করতে হয়। আপনি, আপনারা পাঠককে ভেবে নেন, বুঝে নেন। ফলে যেটা হয়, যে আপনি জেনারেলাইজ করেন, এই জেনারেলাইজশনের ভেতর দিয়ে সাহিত্যচর্চা এক ধরনের সীমাবদ্ধতার জন্ম দেয়। আবার দেখুন একাধিক পদের ভেতর দিয়ে লেখকের চিন্তা পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, এটা একটা মেশিন, যে মেশিনের ভেতর দিয়ে লেখকের চিন্তাটা ঠিকঠাক হয়ে পাঠকের কাছে যায় এবং সেই উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে লেখক কখনই যুক্ত থাকে না, পাঠকও না। এটা একটা অজানা জগৎ, নোম্যান্সল্যান্ড লেখকের জন্য, পাঠকের জন্যেও। পাঠক উপন্যাস পড়ছেন, গিলছেন, খাচ্ছেন এবং তার সঙ্গে সঙ্গে লেখকের জগৎ বোঝাপড়ার চেষ্টা করছেন ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই পুরো ঘটনায় পাঠক এবং লেখক একটা ভয়ংকর দূরত্ব তৈরি করে। কারণ এই দূরত্বের ভেতর দিয়ে লেখক আস্তে আস্তে এই পুরো প্রসেসে সবচেয়ে ভলনারেবল অবস্থার মধ্যে পড়ে। কারণ, তার টিকে থাকাই উৎপাদন-কাঠামো, প্রকাশনা-ব্যবসার ওপর নির্ভর করে। ফলে লেখকের স্টেপ কোনটা, সে স্টেপ তার উপর থাকে না। তার পদ চ্যুত হয়। প্রিন্ট ক্যাপিটালের এই ঘটনাতে আরও একটা মজার কাজ হয়। আরেক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। লেখকের নিজের সৃষ্টির সাথে লেখকের নিজের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় (মানে ব্যক্তিসত্তা তার সৃজনসত্তার চিৎকার শুনতে ব্যর্থ হয়)। এটা কীভাবে ঘটে? লেখক একটা কিছু লিখছেন, একজন লেখক যখন লেখেন, তিনি তার জীবনটাকেই লেখার ভেতর দিয়ে যাপন করেন। এখন তার মধ্যেও যখন অন্য কেউ ছুঁরি চালায়, যে এভাবে লিখলে পাঠক নেবে, এভাবে লিখলে নেবে না। এই সিদ্ধান্তগুলো যখন তার উপর এসে চাপে, তখন লেখকের সাহিত্য শুধু নয়, তার পুরো জীবন সংকটাপন্ন হয়। তিনি  চেতন-অচেতনকে যেভাবে যাপন করেন, সেভাবে প্রকাশ করতে এবং করতে দিতে চান, সেই প্রকাশেও ইন্টারভেনশন হয় বাইরে থেকে, যখন তা বাধাগ্রস্থ হয়, তখন তার পক্ষে আর নিজেকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করাই সম্ভব হয় না।

তারপর দেখেন, যখন মুদ্রণপ্রক্রিয়া এরকম পর্যায়ে গিয়েছে যখন প্রচুর পত্রিকা বাজারে আছে, আসছে এবং সেই পত্রিকাতে সাহিত্যকে অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করার একটা চেষ্টা আছে। এ সব পত্রিকায় সাহিত্যের জন্য নির্দিষ্ট মাপ আছে (এরাই আবার মাপে আপনি বড় না ছোট সাহিত্যিক)। এর বাইরে আপনি যেতে পারবেন না। ফলে একটা খুব পরিষ্কার কাঠামো এবং যে কাঠামোটা পাঠককেও একটা ছাঁচে তৈরি করে, লেখককেও একটা ছাঁচে তৈরি করে। এই যে উৎপাদনের ম্যাকানিজম, এই ম্যাকানিজমের বিরুদ্ধে প্রথম যে আওয়াজ, চিৎকার, সেই চিৎকার থেকে লিটল ম্যাগের জন্ম। এখন, লিটল ম্যাগ তাহলে কি করেছে, এখনো তার ওপর কোন দায়িত্ব বর্তাবে? আপনারা দেখতে পারেন যে, লিটল ম্যাগ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। যেমন ধরুন, বলা হচ্ছে এ্যান্টি নভেল, এ্যান্টি পয়েট্রি। কথাগুলোর আবির্ভাব হওয়ার কারণ কি? কারণটা আমি বুঝি এভাবে যে, ধরুন আপনি একটা সার্ভে করলেন, উপন্যাস পড়ছে এমন পঞ্চাশ জনের মধ্যে। তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কেন লেখাটা তার কাছে উপন্যাস মনে হচ্ছে? দেখবেন, এ বিষয়ে অধিকাংশই সচেতন না, বা সচেতন হওয়ার কোনো প্রয়োজনই বোধ করে না। কিন্তু সে বলবে এটা উপন্যাস হয়েছে, বা সে বলবে গল্প হয়েছে, সে বলবে এটা কবিতা হয়েছে বা কবিতা হয়নি, খুব সহজে স্টেটমেন্ট বানিয়ে দেবে। তার মানে একটা ছাঁচ আছে, যে ছাঁচটা তার কল্পনার জগতে এমন ভাবে প্রবেশ করে বসে আছে, সে এই ছাঁচের বাইরে পড়লে সে বলে যে এটা উপন্যাস হয়নি, ভেতরে পড়লে বলে যে উপন্যাস হয়েছে। আশ্চর্যবিষয়টা কতো গভীরে গিয়ে জায়গা করেছে!অভ্যস্ততায় নাড়া দিয়ে বসেছে। বলাবাহুল্য এই পরিণতির পেছনে ম্যাস-প্রডাকটিভ প্রকাশ-ব্যবস্থার বোড়ি, থোড় আর খাড়ামার্কা প্রডাক্টগুলোই মূলত দায়ী [অবশ্যই এই ছাঁচ মানুষের ভেতরে হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা সৃজনসত্তার না, রূপের সঙ্গে সহজাত যে, নন্দন তারও না, ওটা অনেকটাই মেকাপের মতো {যদিবা আপনি ভাবেন মেকাপই আসল তবে কোনো কথা নাই}]। এই জিনিস (রংসর্বস্ব জুস) খাওয়াতে খাওয়াতে মানুষকে সিডাকশনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার কম্মেই এরা চলছে। সেই অভ্যস্ততার বাইরে যদি কিছু এসে হাজির হয় (যদিতা লেখকের দারুণ মনে হয় বা বিরাট অচেতন)—আপনি পাঠক ভড়কে যাবেন। এই ছাঁচ ভাঙার চেষ্টা লিটলম্যাগ গোড়া থেকেই করছে, ভেবে দেখুন এখনো (এমনকি এই সাইবার সংস্কৃতির যুগেও) এটাই কি তার গুরুদায়িত্ব না? আজ কিংবা আগামী যেকোনো সময়ে এই মৌলিক দায়িত্ব ভুলে থাকলে, সবকিছুই তাদের পক্ষে যাবে, যার এবং যাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে লিটলম্যাগ, লিটলম্যাগ হয়ে ওঠে।

*********************************************

একবার পায় তারে…
পেরিয়ে পেরিয়ে পার হয়েছিল অনেক বসন্ত। পার হয় গরু, পার হয় গাড়ি। হায়রে সে নদী! প্রকৃতি আর মানুষের মায়া নিয়ে হেরিংবোন-শরীর মাড়িয়ে শিউলিফোটা সকালগুলো এগিয়ে আসে। তখন রাতভর বৃষ্টি হয়ে গেছে। সিক্তবসনার কোণ ধরে দূর থেকে কলাইপাতার সার এড়িয়ে কুদ্দুসস্যার লুঙ্গি পরে আসেন আর আমাদের কীসব পড়ান। তিনি খুব পুরনো ঘড়ি হাতে পরতেন। ওটা বুঝি কারো দেওয়া! স্যারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা তার হাতঘড়িটাকেও সমীহ করি। তখন নতুন ব্ল্যাকবোর্ডে অতিরিক্ত অতিথি আসার ঐকিক নিয়মের অঙ্ক লেখেন তিনি। হা-মেলে সবুজ ব্লাকবোর্ডে সুন্দর লেখাগুলো যখন আমরা পড়ছি তখন পেছনে ক্যাচ করে কী এক শব্দ হয়। দেখা যায়, ন্যাদো পায়ের ফাঁদে কী একটা ফেলে শব্দ করছে…। ন্যাদো আমাদের খুব প্রিয় বন্ধু এবং দক্ষ সতীর্থ। বলা যায়, ম্যাজিকম্যান। সে বাঁশি বাজাতে পারে। হা-ডু-ডু খেলতে পারে। কানামাছি-দাড়িয়াবান্ধাতে সেরা। হাইজাম্পে প্রথম। সেবার স্কুলের পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় যে হাইজাম্পের প্রতিযোগিতা হয়েছিল তাতে সে প্রথম হয়। কিন্তু ন্যাদোর পড়া ভালো নয়। কুদ্দুস স্যার তাকে যখন মারতে শুরু করেন, তখন জুঁই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। আমরা খুব মন খারাপ করে বসেছিলাম। মনে হচ্ছিল স্যারের মারের তোড়ে ন্যাদো হয়তো আর কোনোদিন স্কুলে আসবে না। সে না এলে আমাদের অবসর সময়গুলো খুব নীরব হয়ে যাবে। এই নীরবতা নিয়ে আমরা যখন খুব চিন্তিত, তখন শোনা গেল সৈয়দ আলী মৌলবী স্যার কী একটা প্রয়োজনে তাকে ডাকছেন। কিন্তু ওসব আর শোনার সময় হয় না ন্যাদোর। সে লেখাপড়া ছেড়ে চলে যায়। কদিন বাসের কন্ডাকটরি নিয়েছিল। তারপর টেকেনি। পরে মুদির দোকান দিয়ে বসে। তাও হয় না। একদিন বিয়ের বিনিময়ে সে যৌতুক নিয়ে কী সুন্দর একটা পান-বিড়ির দোকান দেয়! কিন্তু তা প্রথম দিকে চললেও এক সময় তাতে ভাটা পড়ে। ধ্বস নামে। গুলিয়ে যায়। শ্বশুরবাড়ির লোকরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। পরে আবার বুঝি সে বাসের হেল্পারি নেয়। কিন্তু মাঝে-মধ্যে বাঁশিও বাজাতে চেষ্টা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় উপরের ছাদে ভাড়া কালেকশনের সময় বাসের ডাল লেগে সে নীচে পড়ে যায় এবং মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করে। এ পর্যন্ত থাকলে হয়তো ন্যাদোর গল্প শেষ হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। সে মরে গিয়ে বেঁচে যায়। আমরা তাঁর নামে শিন্নি দেই। যে শিউলিতলায় সে প্রত্যহ দাঁড়াত ওখানে দল বেঁধে ফুল দিই। আর ক্লাসরুমের কক্ষে তার জায়গাটা অনেককাল ফাঁকা রাখি। এই জীবনে সে আর ফিরে আসবে না কিন্তু তার স্মৃতি নিয়া বকুল বাঁচে, শেফালী বাঁচে আর জুঁই প্রতিদিন কাঁন্দে আর খবর নেয়। ন্যাদো ভালো না মন্দ সে অন্য কথা। কিন্তু বাঁচার চেষ্টা তার ছিল। লেখাপড়া না করেই সে বাঁচতে চেয়েছিল। ভাল রকম এবং সৎভাবে সে বাঁচতে চেয়েছিল। অন্যায় সে করে নি। অপছন্দও করত। কিন্তু জীবন আর জীবনের তাগাদায় সমস্ত ফুলগাছ ভরে সে সকলের হয়ে রইলেও মানব থেকে যাওয়ার রহস্য নিয়ে। তাই কুদ্দুস স্যারও একদিন বলে ফেলেন, ‘ন্যাদোটাকে স্কুলে আসতে বলিস, ও ফ্রি পড়বে।’ সত্যিই আমরা সবাই তাঁর জন্য ফ্রি করতে চেয়েছিলাম সবকিছু কিন্তু সময় আর হাওয়ার অশনিতে সে আর ফিরে আসে নাই। স্নানের ভেতরে অনেকেই হয়তো ন্যাদোর মতো ফেরে না তবে তো কেউ কেউ ফেরে এবং সে ফেরা স্মৃতি নিয়েই অনেকে বেঁচে থাকে। কারণ, এ যে অকর্মণ্যদের কাজ সব্বাই যে একযোগে ন্যাদোর সঙ্গী কারণ, এ পৃথিবী একবার পায় তারে পায় নাকো আর।

চিহ্নপ্রধান
৩০ আষাঢ় ১৪২৪

আলোচনা