স্নান ৪৪

আত্মবিভৎসতায় গুমরে থাকা সয়ংসম্পূর্ণ কীট গুলো সীমাহীন বিষাক্ত হয়ে ফিরেছে। চেতনার পথ অন্ধকার। বিষাক্ত কীটগুলো গ্রাস করছে অঙ্কুরিত ভাবনাকে। প্রতিনিয়ত বিষ ঢেলে দেয়ার পাঁয়তারা করছে। সেই সুযোগে কুসংষ্কারগুলো সৎ ব্যবহার করছে চিন্তার চারপাশে। ভাবনার সমস্ত অলিগলি নিষিদ্ধ। তাই নিষিদ্ধ চিস্তার জগৎ থেকে সম্পাদক এ সংখ্যার সম্পাদকীয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে।

********************************************

বাঙালি মুসলমান, এবং একজন সত্যান্বেষী
নাজমুল হাসান পলক

পঞ্চম শতকের আগে, এমন কি মৌর্য কালেরও আগে প্রাচীন বাঙলার জনপদেরা সমাজবদ্ধ হইয়া বাস করিত, তাহাদের সমাজ ছিল, রাজা ছিল, রাষ্ট্রও ছিল। তাহারও আগে যখন রাজা ছিল না, কৌমসমাজ ছিল, ইতিহাসের সেই ঊষাকালে সেই সমাজেরও একটা শাসন পদ্ধতি ছিল।  — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস

আগে বাঙালি, পরে মুসলমান হওয়া ‘বাঙালি মুসলমান’ জনগোষ্ঠীও নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে সেই কৌমসমাজের উত্তরাধিকার বহন করে। এদের ‘শতকরা পঁচানব্বই জন হাড়ি, ডোম, বাগদি, চাঁড়াল, মুচি, মেথর থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে।’ এই প্রাচীন-আদি জনগোষ্ঠীতে আর্যরক্ত সংমিশ্রিত হবারও অনেক পূর্বে সংমিশ্রিত হয়েছিল অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, ভোটচীনা রক্ত। আরও পরে সেমেটিক ও কেন্দ্রিয় এশীয় রক্ত; কিছু পরিমাণে ইউরোপীয় রক্তধারা। অর্থাৎ, বাঙালি বলে নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে বাঙালি মুসলমানও দেহে বহন করে বিচিত্র জীন-সমষ্টি। সামাজিক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি মুসলমানের ধর্মের বদল ঘটেছে বারবার। ধনে-মানে-বিদ্যায় এই মানুষগুলো সমাজে ছিলেন একেবারেই অপাংক্তেয়-অচ্ছুত-নিম্নবর্গ; বর্ণবৈষম্যজাত নিগ্রহ-নির্যাতনের শিকার। ফলে, তারা বোধ করেন আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকে নিরাপত্তা-আত্মরক্ষার তাগিদ। আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১)‘র ভাষ্য— ‘মূলত বাঙালি মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হবার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হল, এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তাঁরা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাঁদের কোন মতামত বা বক্তব্য ছিল না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল। ‘কালেকালে, বারবার ধর্ম বদলালেও, এই প্রক্রিয়ায় বাঙালি মুসলমানের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল; যা তাদের নৃতাত্ত্বিক-জাতিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যজাত। তারা চাইলেই আরোপিত ধর্মের আহ্বানে ফেলে দিতে পারেননি তাদের বাঙালি-উত্তরাধিকারের চিহ্ন— ‘যে আদর্শ যে ভাব স্রোতের আলোড়ন, ঘটনার যে তরঙ্গ যখন আসিয়া লাগিয়াছে, বাঙলাদেশ তখন বেতসলতার মত নুইয়া পড়িয়া অনিবার্য বোধে তাহাকে মানিয়া লইয়াছে এবং ক্রমে নিজের মত করিয়া তাহাকে গড়িয়া লইয়া নিজের ভাব ও রূপদেহের মধ্যে তাহাকে সমন্বিত ও সমীকৃত করিয়া লইয়া আবার বেতসলতার মতই সোজা হইয়া স্ব-রূপে দাঁড়াইয়াছে। যে দুর্মর অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি বেতস গাছের, সেই দুর্মর প্রাণশক্তিই বাঙ্গালীকে বারবার বাঁচাইয়াছে।’ বাঙালির এই প্রাণশক্তির গভীরে যেসব বৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল, সেসবের মধ্যে প্রধান ভাষাগত ঐক্য; যে ভাষা গড়ে উঠেছিল তাদের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ের মতোই সকল জনগোষ্ঠীর ভাষিক উপাদানে। অনেক চেষ্টা-অপচেষ্টার পরও বাঙালি মুসলমানরা আজ অব্দি তাদের ধর্মীয় পরিচয়কেই সকল মেনে সে উত্তরাধিকারের বাইরে আসতে পারেনি। বাঙালি নি¤œবর্গের হিন্দুরা যেমন নিজেদের কর্ম-কৃতির সাক্ষর রাখতে পারেননি, তেমনি পারেননি বাঙালি মুসলমানরাও। ফলে, কালেকালে জাতিতাত্ত্বিক পরিচয়ের বদলে, ধর্মীয় পরিচয়কে মুখ্যতা-প্রধান্য দেবার কারণে তাদের নেতৃত্বটি চলে যায় বিজাতী-বিভাষীয় মুসলমানদের হাতে। ভাষাগত দিক থেকে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে যাদের বিন্দুমাত্র সং¯্রব ছিল না। এরা ছিলেন মধ্যএশীয়া ও তুর্কি থেকে আগত সেই মুসলমান শাসক শ্রেণি-ভিনদেশী; পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজ অনুসৃত নীতির ফলে যাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছিল শোচনীয়। Sir William Wilson Hunter (১৮৪০-১৯০০) অবস্থান পরিস্কার না করে এদের কথাই লিখেছিলেন তার বিখ্যাত The Indian Musalmans (1871) গ্রন্থে— ‘Hundread and fifty years ago it was impossible for a Musalman to be poor.’  এই ধারাবাহিকতাতেই ইংরেজ আমলে বাংলার কথিত রেনেসাঁস কালে আমরা পাচ্ছি নওয়াব আবদুল লতিফ (১৮২৪-১৮৯৪), সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮), ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫)‘র মতো উঁচুকোটির মুসলিম নেতৃশ্রেণিটিকে। আবদুল লতিফ, আমীর আলীরা উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ (১৮১৭-১৮৯৮)‘র পথানুসরণ করে বাঙালি মুসলমানদের উন্নতির কথা চিন্তা করেছিলেন। কিন্ত, মানতেই হবে তারা সৈয়দ আহমদের মতো প্রগত চিন্তার অধিকারী ছিলেন না। উর্দুভাষী আবদুল লতিফের চিন্তা ছিল চাকুরি-বাকুরি বিষয়কেন্দ্রিক; আর তাঁর মানসজুড়ে ছিল মক্তব-মাদ্রাসার অনাধুনিক শিক্ষা-পদ্ধতি। বাংলাভাষীদের তিনি জ্ঞান করতেন ‘ইতর’, ‘ছোটলোক’ বলে। অপরদিকে, বিলেতীবিদ্যা¯œাত সৈয়দ আমীর আলী মাদ্রাসাশিক্ষার প্রশ্নে একমত হতে না পারলেও ছিলেন নারী শিক্ষার ঘোরতর বিরোধী। ইংরেজ প্রবর্তিত নীতি-বৈষম্যের বিষয়টি বারবার ইতিহাসে আলোচিত হলেও, সব থেকে গুরুত্বের কথা নতুন যুগের হাওয়া, ইংরেজি শিক্ষা এসবের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানরা খাপ খাওয়াতে পারেননি— ‘এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, উনিশ শতকে হিন্দুরা যখন তাদের সমাজ সচেতন, বাস্তবমুখী ও জ্ঞানদীপ্ত নেতৃবৃন্দের অনুপ্রেরণা ও প্রচেষ্টার ফলে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে সে সময় বাঙালি মুসলমানদের নেতৃত্বে দেখা দিয়েছিল চরম সংকট। মুসলমানদের দৃষ্টি সামনের দিকে প্রসারিত না হয়ে ছিল পশ্চাদমুখী। তারা ছিল গৌরবজ্জ্বল অতীতের স্বপ্নে বিভোর।’ এক্ষেত্রে তাদের নেতৃশ্রেণির অনাধুনিক চিন্তা-ভাবনাকে বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে, বাঙালি হিন্দুদের মতো জাতিগত পুনর্গঠনের পরিবর্তে বাঙালি মুসলমানরা আরো পিছিয়ে পড়েন। ১৮৯০ সাল অব্দি আমরা উল্লেখ করবার মতো কোন বাঙালি মুসলমান পাই না; যিনি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত— ‘১৮৮৪ সালের আগে কোন বাঙালি মুসলমান গ্রাজুয়েট হয় নাই। বাড়ির কাছে স্কুল পেয়ে মুসলমান কৃষকরা ছেলেদের স্কুলে পাঠালো। কাজেই ১৮৯০ থেকে বাঙালি মুসলমান শিক্ষার সুযোগ পেল।’ এরপর থেকে বাঙালি মুসলমানদের মাঝে সংঘবোধ-স্বাজাত্যবোধ দেখা দিতে আরম্ভ করে। এ সম্পর্কে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি (২০০৬) গ্রন্থে ড. গোলাম মুরশিদ (জ.১৯৪৩) লিখেছেন— ‘তবে ১৯০০ সাল নাগাদ তাঁদের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের স্বরূপ নিয়ে সচেতনতা দেখাতে আরম্ভ করেন। তাঁরা বঙ্গদেশের লোক কিনা, তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা কিনা স্বরূপ সম্পর্কিত এসব প্রশ্ন নিয়ে তাঁরা ভাবিত হন।’ এরপরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ।

২.

মানবতাবাদী-দার্শনিক-সত্যান্বেষী আরজ আলী মাতুব্বর (১৯০০-১৯৮৫) জন্মগ্রহণ করেন বাঙালি মুসলমান সমাজের এমন যুগমানসেই। বরিশালের কীর্তনখোলা নদী থেকে দশ-বারো কিলোমিটার দূরে শান্ত এক পল্লীতে; নাম লামচরী। আরজ আলীর জন্মের কথা বলতে গিয়ে জীবনীকার ছোট্ট-নান্দনিক কয়েকটি বাক্যে বেঁধে ফেলেন তাঁর সারাটি জীবনকে— ‘আরজ আলী মাতুব্বর। নাগরিক পরিসর থেকে অনেক দূরে জন্ম তাঁর। জীবনভর একটানা সংগ্রাম-সংঘাতের মধ্য দিয়ে একই স্থানে সারাটি জীবন বসবাস করেছেন। ভীষণ একাকীত্বে, নিরিবিলিতে নিজ গ্রামে থেকে আপন যেটুকু জমি-জিরাত তাতে ফসল ফলিয়েছেন। আর তার ফাঁকে ফাঁকে মানব জীবনের সত্যানুসন্ধান করে ফিরেছেন।’ বাবার মৃত্যুর পর খাজনা বাকি পরায় নিলামে তুলে তাঁদের শেষ সম্বল-অন্নসংস্থানের জমিটুকুও দখল করেছিল সামন্তপ্রতিভূ জমিদার। দু’বেলা অন্ন যোগাতে মাকে নিতে হয়েছিল পরের বাড়ীতে ভৃত্যের কাজ। এমন প্রতিবেশে মাতুব্বর বাড়ীর ছোট্ট এক খুপরিতে মা-বোনকে নিয়ে বড় হতে থাকেন পিতৃ-ভ্রাতৃহারা ছোট্ট আরজ আলী। একাডেমিক কোন শিক্ষাই ছিলনা এই সত্যদ্রষ্টা দার্শনিকের। বিনা বেতনে ছোটবেলায় ভর্তি হয়েছিলেন মুনশি আবদুল করিমের মক্তবে, কিন্ত গ্রাম্য-প্রতিকূলতায় সে পাটও চুকেছিল অচিরেই। তারপর তিনি শিক্ষা নেন পৃথিবীর পাঠশালা থেকে; যেখানে সবার তিনি ছাত্র। জীবনকে আরজ আলী দেখেছিলেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে, প্রশ্ন করে করে। আর এখান থেকেই তৈরি হয়েছিল তাঁর সুতীব্র পাঠের তৃষা, জানার আকাক্সক্ষা— ‘এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরজ আলী বিপুলভাবে ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। বাংলা ভাষায় লিখিত এবং প্রাপ্ত অধিকাংশ গ্রন্থাদি অধ্যয়ন তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় বাদ পড়েনি।’ তিনি পড়াশোনা করতে শুরু করেন বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরিসহ আশপাশের গ্রন্থাগার গুলোতে। এজন্য যাতায়াত মিলিয়ে প্রতিদিন তাঁকে পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হতো চব্বিশ কিলোমিটার পথ। জগৎ-জীবন, ধর্মকে জানার যে প্রবলকাক্সক্ষা তা আরজ আলীর মাঝে চরম মাত্রা পেয়েছিল একটি মৃত্যুর মাধ্যমে; তাঁর মায়ের মৃত্যু। কিন্তু, সেটি সারদা দেবীর মৃত্যুর মতো— ‘সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর’ ছিল না। মা আরজ আলীকে ¯েœহ-মমতা-আনন্দ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সারাজীবন, ধার্মিক মহিলা ছিলেন। ফলে, জীবনে কখনো ছবি তোলেননি। সেই মা চলে যাবার পর আরজের ইচ্ছে হলো মায়ের একখানি ছবি রাখার। ইচ্ছে অনুযায়ী বরিশাল থেকে ফটোগ্রাফার এনে তিনি মৃত মায়ের একটি ছবি তোলেন। কিন্তু, এতে বাধা সাধলো তাঁর গ্রামবাসী— ‘তখন গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ সংকারাচ্ছন্ন। চিন্তা-চেতনায় পিছিয়ে থাকা অশিক্ষিত ও সরল লামচরী গ্রামের মানুষ ছবি তোলার ব্যাপারটিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারলো না। তাদের বিশ্বাস ফটো তোলা এমনিতেই নিষিদ্ধ। তদুপরি নারীর মৃতদেহের ছবি তোলা! এ হারাম, একেবারেই হারাম কাজ।’ তারা আরজের মায়ের জানাজা না পড়েই ফিরে যায়। ঘটনাটি সংবেদনশীল আরজ আলী মাতুব্বরের মনে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, সঙ্গে জন্ম দেয় যুক্তিসঙ্গত কতগুলো প্রশ্নের। তার মায়ের জানাজা পড়া হলো না কেন? ছবি তোলা যদি সত্যই হারাম কাজ হয়ে থাকে তার জন্য তো সে নিজে দায়ী। তাঁর মৃত মা কোন ভাবেই দায়ী হতে পারে না। আর, এর জন্য শাস্তি হলের তারই হবার কথা, তার মায়ের নয়। ধর্মীয় কুসংস্কার-অন্ধবিশ^াস তাঁর চোখে প্রকট হয়ে ওঠে। এসবের নিগর হতে মুক্তির জন্য তিনি মনোনিবেশ করেন সত্য অনুসন্ধানে। লিপ্ত হন বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায়; দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত, জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে করেন সুপ্রচুর লেখাপড়া। তার চোখের সামনে অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে যায়, মনের মুক্তি ঘটে, প্রশ্নের পাথরে শাণ দিয়ে তিনি দেখা পান সত্যের। আরজ আলী মাতুব্বর দেখেন— ‘ধর্মজগতে এরূপ কতগুলি নীতি, প্রথা, সংস্কার ইত্যাদি এবং ঘটনার বিবরণ প্রচলিত আছে, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নহে, এবং এগুলি দর্শন ও বিজ্ঞানের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতও বটে।’ আরজ আলী বোধ করলেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে আলোর পথে আনতে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। মানুষকে করে তুলতে হবে প্রশ্নবান-যুক্তিবাদী। আর, এজন্য সমাজে প্রচলিত অন্ধবিশ^াস, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে তিনি লেখনি ধারণ করেন। যুক্তিতর্কের মাধ্যমে মানুষকে যুক্তির পথে উদ্বুদ্ধ করেন, ‘বিশেষ করে ধর্মের সাথে যুক্ত উদ্ভট ও অলীক উপাদানগুলোকে ছেঁটে কেটে ফেলতে সচেষ্ট হলেন।’ এজন্য তাঁকে হাজতবাস পর্যন্ত করতে হয়েছিল, তবুও এই সাহসী সত্যান্বেষী কখনো পিছপা হননি। বহুগুণের সমাবেশ ঘটেছিল আরজ আলী মাতুব্বরের চরিত্রে— জানতেন যন্ত্রবিদ্যা, কাঠ-উদ্ভিদবিদ্যা, ভাল বাঁশি-ঢোল-তবলা বাজাতে পারতেন, ছিলেন তাঁর অঞ্চলের নামজাদা আমীন— এটি তাঁর পেশাও ছিল। ভোজনরসিক না হয়েও মিতাহারী আরজ আলী ছিলেন অসামান্য রন্ধনশিল্পী; অধ্যাপক শামসুল হক এ বিদ্যাকে তাঁকে তুলনা করেছেন বাখ, বিটোভেন, মোৎসার্ট, শুবার্ট এর সুরসৃষ্টির সঙ্গে। ব্যক্তিজীবনে আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ, ভাবতেন বেশি, বলতেন কম, লিখতেন আরো কম— ‘তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় বক্তব্য প্রকাশ করা ছাড়া বাহুল্য লেখা পছন্দ করতেন না। সেজন্য তাঁর লেখার পরিমাণ খুবই কম। ব্যক্তিগত জীবনে মৃদু এবং মিষ্টভাষী ছিলেন। তাঁর মতের পরিপন্থি কোন বিষয়ের অবতারণায় তিনি সহজে উত্তেজিত হতেন না। মৃদু হেসে ধীরস্থিরভারে যুক্তিসহকারে পরমত খ-ন করতেন। এমনকি যুক্তিপূর্ণ হলে ভিন্নমত সহজভাবে গ্রহণ করতেন।’ ‘আরজ আলী মাতুব্বর সমকালীন গ্রামীণ সমাজের সকল প্রকার গোঁড়ামী ও কুসংস্কারের ঊর্দ্ধে উঠে এক মহাজীবনের আলোক সন্ধানী পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন নিজেকে।’ ১৯৮৫ সালে মৃত্যুর পর তাঁর দেহটিও তিনি দান করে যান চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা মানব কল্যাণে; মৃতদেহ দানপত্রে অকম্পিত হস্তে এই সত্যান্বেষী লিখেছেন— ‘কস্য মৃতদেহ দান পত্রমিদং কার্যাঞ্চাগে আমি মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পর আমার মৃতদেহটি বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজে দান করলাম।’ আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯) যাকে বলেছেন ‘শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ’ সেই চোখ দুটিও দান করে যান আরজ আলী মাতুব্বর; অধ্যাপক শামসুল হক লিখেছেন— ‘মাতুব্বর আরো দুটো চোখ দান করে যান, যা কুসংকারাচ্ছন্ন সমগ্র জাতিকে চক্ষুষ্মান করবে— তা হলো সত্যের সন্ধান ও সৃষ্টি-রহস্য গ্রন্থদ্বয়।’

৩.

আরজ আলী মাতুব্বর দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। তাঁর লেখকজীবন বিস্তৃত ছিল প্রায় ত্রিশ বছর। ‘এই সময় পরিধির মধ্যে তিনি বেশ ক’খানা পা-ুলিপি প্রণয়ন করেছেন। একজন স্বশিক্ষিত লেখকের পক্ষে মনোজগতে শুদ্ধ চিন্তা ও সংস্কারবিহীন ভাবনা উদ্রেককারী এতগুলো পা-ুলিপি রচনা বিস্ময়করই বটে।’ আরজ আলীর জন্ম-বেড়ে ওঠা একেবারেই গ্রামীণ-কুসংস্কারাকীর্ণ পরিবেশে; কিন্তু জগৎ-সমাজ-জীবন কিংবা লোকবিশ^াস সম্পর্কে প্রদত্ত তাঁর ব্যাখ্যা-বিবৃতিগুলো মৌলিক-মূল্যবান এবং বিজ্ঞানভিত্তিক। তাঁর জীবনীকার অনুসন্ধানপূর্বক এর পেছনে দুটি কারণ পেয়েছেন— ‘প্রথমত প্রচুর পড়াশোনা করে চিন্তায় পরিচ্ছন্নতা আনয়ন এবং অর্জিত বোধ ব্যাক্ত করার দুর্মর সাহস।’  আরজ আলী মাতুব্বরের পা-ুলিপির সংখ্যা ১৫ টি; জীবদ্দশায় তিনি প্রকাশ করতে পেরেছিলেন মাত্র চারটি গ্রন্থ— সত্যের সন্ধান (১৯৭৩), অনুমান (১৯৮৩), সৃষ্টি রহস্য (১৯৭৮) এবং স্মরণিকা (১৯৮২)। আরজ আলী মাতুব্বরের প্রথম গ্রন্থ সত্যের সন্ধান প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে, বইটির পা-ুলিপি তিনি প্রণয়ন করেছিলেন ১৯৫১ সালে; তারপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে নানা জটিলতার মাঝ দিয়ে। এমনকি গোঁড়া ম্যাজিস্ট্রেট আরোপিত কম্যুনিস্ট তক্মা নিয়ে তাঁকে কারাভোগ পর্যন্ত করতে হয়েছিল। কারাগার থেকে মুক্ত হলেও পরাধীন দেশে আদালতের নির্দেশে বই প্রকাশ করতে পারেননি। সত্যের সন্ধান গ্রন্থটি প্রচুর প্রশ্নে আকীর্ণ; যা মূলত ধর্মকেন্দ্রিক এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-যুক্তি-বিবৃতির পথ বেয়ে সত্য-অন্বেষণে প্রয়াসী। গ্রন্থটিকে আরজ আলী মাতুব্বর বিভাজিত করেছেন চারটি ভাগে, যাতে রয়েছে ছ’টি প্রস্তাব— আত্মা বিষয়ক, ঈশ^র বিষয়ক, পরকাল বিষয়ক, ধর্ম বিষয়ক, প্রকৃতি বিষয়ক এবং বিবিধ। ধর্মের বসনে যুগযুগ ধরে প্রচলিত অবাস্তব-অলীক-কার্যকারণহীন কাহিনীগুলোকে তিনি বিজ্ঞানসম্মত যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। সত্যের সন্ধান গ্রন্থের প্রথম প্রস্তাবে ‘আমি কে?’ শিরোনামে তিনি লিখেছেন— ‘মানুষের আমিত্ববোধ যত আদিম ও প্রবল, তত আর কিছুই নহে। আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি দেখিতেছি, আমি শুনিতেছি, আমি বাঁচিয়া আছি, আমি মরিব ইত্যাদি হাজার হাজার রূপে আমি আমাকে উপলব্ধি করিতেছি। কিন্তু যথার্থ আমি— এই রক্ত-মাংস-অস্থি-মেদ-মজ্জায় গঠিত দেহটিই কি আমি? তাহাই যদি হয়, তবে মৃত্যুর পর দেহের উপাদান সমূহ পচিয়া-গলিয়া অর্থাৎ রাসায়নিক পরিবর্তনে কতগুলি মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হইবে, তখন কি আমার আমিত্ব থাকিবে না? যদি না-ই থাকে, তবে স্বর্গ-নরকের সুখ-দুঃখ ভোগ করিবে কে? নতুবা আমি কি আত্মা? যদি তাহাই হয়, তবে আত্মাকে আমি না বলিয়া আমার— ইহা বলা হয় কেন? যখন কেহ দাবী করে যে, দেহ আমার, প্রাণ আমার এবং মন আমার, তখন দাবীদারটি কে?’ এভাবেই আরজ আলী মাতুব্বর যুক্তি দিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়েছেন তাঁর সত্যের সন্ধান গ্রন্থে; অনেক সময় টানেননি কোন সচেতন সিদ্ধান্তও। তবে, নিষ্ঠ পাঠক মাত্রই তার এই প্রশ্ন-যুক্তিজাল ভেদ করে পেয়ে যেতে পারেন সিদ্ধান্ত। ফলে, তাঁর গ্রন্থ পাঠে মানুষের অন্তরে লালিত অন্ধ বিশ্বাসগুলোর অসাড়তা প্রমাণ হয়, বাতিল হয়ে যায়। আর, এক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করে জিজ্ঞাসার পরতে পরতে ছড়ানো তাঁর দুর্ভেদ্য যুক্তিজাল। অনুমান আরজ আলী মাতুব্বরের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ; গ্রন্থের ভূমিকায় মাতুব্বর লিখেছেন— ‘মূলত অনুমান তুচ্ছ বিষয় নয়। এর আশ্রয় না নিয়ে মানুষের এক মুহূর্তও চলে না। অনুমান করবার শক্তি ক্ষীণ বলেই ইতর প্রাণী মানুষের চেয়ে এত পিছনে এবং মানুষ এত অগ্রগামী তার অনুমান করবার শক্তি প্রবল বলেই। ভবিষ্যতের চিন্তা মাত্রেই অনুমান, কতক অতীতেরও। আর ভবিষ্যৎ ও অতীত বিষয়ের চিন্তা ও অনুমান করতে পারে বলেই মানুষ মানুষ হতে পেরেছে।’ এই গ্রন্থটিতে আরজ আলী মাতুব্বর ছ’টি বিষয় আলোচনা করেছেন— রাবণের প্রতিভা, ফেরাউনের কীর্তি, ভগবানের মৃত্যু, আধুনিক দেবতত্ত্ব, মেরাজ এবং শয়তানের জবানবন্দি। এছাড়া গ্রন্থের শেষে রয়েছে একটি অতিরিক্ত আত্মজৈবনিক রচনা। এই গ্রন্থে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মে প্রচলিত বেশ কিছু উদ্ভট কাহিনীকে সরল-রসাত্মক কথনে ভিত্তিহীন প্রমাণের চেষ্টা করেছেন তিনি; যুক্তি মাধুর্যতায় যা অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। ‘রাবণের প্রতিভা’য় প্রচলিত সংস্কারের বাইরে গিয়ে রাবণকে নিয়ে  তিনি লিখেছেন— ‘রামচন্দ্র লঙ্কায় গিয়েছিলেন কপিকুলের (বানরের) সাহায্যে মাটি-পাথর কেটে বাঁধ নির্মাণ করে, দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায়। কিন্তু লঙ্কা থেকে ভারতের দ-কারণ্য তথা পঞ্চবটী বনে রাবণ যাতায়াত করেছিলেন পুষ্পক নামক বিমানে আরোহণ করে অতি অল্প সময়ে। রাবণ যে একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বা বৈমানিক এবং কারিগরিবিদ্যা-বিশারদ ছিলেন, তা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এক্ষেত্রে রাবণের সহিত শ্রীরামের তুলনাই হয় না।’  সৃষ্টি রহস্য (১৯৭৮) আরজ আলী মাতুব্বর রচিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ; এটি তাঁর দীর্ঘ গ্রন্থও বটে। গ্রন্থটির ভূমিকায় দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এর মন্তব্য— ‘আলোচ্য পুস্তককে নানাবিধ জ্ঞান সংক্রান্ত চিন্তাধারার একখানা ক্ষুদ্র বিশ্বকোষ বলা যায়। কারণ মানবজীবন তথা এ বিশ্বের নানাবিধ সমস্যার সমাধানকল্পে গঠিত ও আবিস্কৃত নানা সিদ্ধান্তের এক একটা রূপ তিনি এতে সন্নিবেশিত করেছেন।’ এই দীর্ঘগ্রন্থে আরজ আলী মাতুব্বর ১১ টি বিষয় নিয়ে তথ্যঋদ্ধ-বিশদ আলোচনা করেছেন; ভাবনার গভীরতায় যা অতি সূক্ষ্ম। বিষয়গুলো হলো— আদিম মানবের সৃষ্টিতত্ত্ব, ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব, বিজ্ঞান মতে সৃষ্টিতত্ত্ব, সূর্য, কৃত্রিম গ্রন্থ, বংশগতি, সভ্যতার বিকাশ, সভ্যতা বিকাশের কতিপয় ধাপ, কতিপয় ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি, প্লাবন ও পুনঃসৃষ্টি ও প্রলয়ের পর পুনঃসৃষ্টি। এখানে তিনি প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে প্রচলিত মতবাদগুলো বিবৃত করেছেন এবং বেদ, পার্সি, ইহুদি, খ্রিস্টান, ইসলাম, বৌদ্ধ ধর্মের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রাচীন দার্শনিক থেলিস থেকে আরম্ভ করে চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২); এমনকি বিজ্ঞানের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য তিনি এখানে সন্নিবেশিত করেছেন। গ্রন্থটি সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে আরজ আলী মাতুব্বরের ‘গভীর অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞানরাজ্যে অপরিসীম দখল নিশ্চিত করে।’  তাঁর জীবদ্দশায় সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ স্মরণিকা(১৯৮২); এটি কোন সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে রচিত হয়নি। আরজ আলীর জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা, লাইব্রেরী উদ্বোধন ও বৃত্তি প্রদানানুষ্ঠানে দেয়া অভিভাষণগুচ্ছ, সংবাদপত্রে মুদ্রিত প্রতিবেদন ও নিবন্ধ, আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরী পরিচালনার রূপরেখা, মৃতদেহের দানপত্র এবং তাঁর প্রকাশিত-অপ্রকাশিত পা-ুলিপির তালিকা সন্নিবিষ্ট হয়েছে। মাতুব্বরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের জন্য স¥রণিকা সংকলনটি পাঠকের সহায়ক হতে পারে। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত মুক্তমন গ্রন্থটি বিভিন্ন লেখক, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, রাষ্ট্রনেতাদের রচনা সংকলন। ২৬৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে ২৮ টি রচনা সংকলিত হয়েছে; বিষয় হিসেবে যেগুলো গর্ভে ধারণ করে— ধর্ম, দর্শন, সমাজ, জীবন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। বিভিন্ন চিন্তা-মানসিকতার প্রতিফলন আমরা দেখি রচনাগুলোতে। মুক্তমন নিয়ে তাঁর জীবনীকারের মন্তব্য— ‘আরজ আলী মাতুব্বরের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি পক্ষপাত ছিল, দুর্বলতা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুক্তমন বইটি সংকলনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন— জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শুধু আপন বিশ^াসই নয়, সকল মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিৎ।’

৪.

বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী বাঙালি মুসলমান সমাজের অগ্রগতির প্রশ্নে আমরা ব্রিটিশ সরকারের সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি দেখি ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একটা এনলাইটমেন্ট এখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। এর সবচেয়ে পরিচিত যে ফসলটি আমাদের সামনে হাজির হয়— সেটি মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখা গোষ্ঠী। নব্যশিক্ষিত বাঙালি মুসলিম মানস গঠনে তাদের ভূমিকা-প্রচেষ্টা-দান স্বীকার করতেই হয়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বর্ষের কার্যবিবরণীতে কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১)‘র বক্তব্য ছিল— ‘আমরা চাই সমাজের চিন্তাধারাকে কুটিল ও পঙ্কিল পথ হইতে ফিরাইয়া প্রেম ও সৌন্দর্য্যের সহজ সত্য পথে চালিত করিয়া আমাদের দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে।’ কিন্তু, সমাজের চিন্তাধারার গতি বদলাতে বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় সংস্কার কিংবা প্রথার গোঁড়ায় যতটা কুঠারাঘাত দরকার ছিল তা শিখা গোষ্ঠীর সদস্যরা করতে পারেননি। এর মূলে আছে দুটি কারণ— প্রথমটি, ধর্ম নিয়ে খোলা আলোচনা আমাদের সমাজ-ক্ষমতা-গণমাসিকতা অনুমোদন করে না। ইতিহাস বলে— এক ঘরোয়া সভায় ইসলাম নিয়ে শিখা গোষ্ঠীর সদস্য শামসুল হুদার কথায় ঢাকায় হইচই পড়ে গিয়েছিল। এর পরের ঘটনা; আহমদ শরীফ সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন— ‘নবাব বাড়ির কর্তা সবাইকে ডেকে ধমকান। ড. শহীদুল্লাহ্ ছিলেন শিখা কমিটির মেম্বার। তিনি ঐ ঘরোয়া সভায় উপস্থিত ছিলেন না। অধ্যাপক এ. ডব্লিউ. মাহমুদের কাছে শুনেছি, ড. শহীদুল্লাহ্কে ঢাকার নবাব বাড়িতে (আহসান মঞ্জিল) ডাকলে শহীদুল্লাহ্ বলেন, এমন কথা বলে থাকলে তো শামসুল হুদার মাথা কেটে নেওয়া উচিত। তবে সবাই ক্ষমা-টমা চেয়ে রক্ষা পেলেন। আবুল হুসেন বিরক্ত হয়ে এখানকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোলকাতায় চলে গেলেন এবং অল্প দিনের মধ্যে ৪৪/৪৫ বছর বয়সে কর্কটরোগে মারা গেলেন।’ দ্বিতীয় কারণটি হলো প্রতিশ্রুতির অভাব। শিখা গোষ্ঠীর সদস্য, ‘মানবতন্ত্র’ প্রবন্ধের লেখক আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩)‘র শেষ বয়সে টুপি মাথায় দিয়ে সিরাত মজলিসে গমন কিংবা ১৯৭৩ সালে এডুকেশন রির্ফমেশন কমিটিকে ধর্ম শিক্ষা আবশ্যিক করার পরামর্শ দানকে শুধুমাত্র বয়স হয়ে যাওয়া অথবা বাঙালি মুসলমানের সহজাত প্রবৃত্তি ‘খোলা থেকে আগুনে, কিংবা আগুন থেকে খোলায়’ লাফানো বলে পাশ কাটাবার উপায় নেই। বরং, প্রতিশ্রুতির ঘাটতির ফলেই একজন মানুষ এমন হতে পারেন।। ফলে, এস. ওয়াজেদ আলী ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ প্রবন্ধে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন— ‘আমি যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখি, তাতে কেরাণী-সৃষ্টির আগ্রহ নাই; গোঁড়া হিন্দু, গোঁড়া মুসলমান-সৃজনের উৎকট প্রয়াসও নাই; অতীতের প্রাণহীন দেহগুলি সাজিয়ে রাখবার যাদুঘর সে প্রতিষ্ঠান নয়!’— প্রায় শতবছরের ব্যবধানে নব্যশিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের উত্তরাধিকারীরা আজ দাঁড়িয়ে আছেন এর সম্পূর্ণ বিপরীতে। আরজ আলী মাতুব্বর একাডেমি কেন্দ্রিক ¯্রােতের একেবারেই বাইরের মানুষ, একইকালে জন্মেও নব্য শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান পরিচিতি যেমন তাঁর নেই, তেমনি নেই কোন পরিম-লগত পরিচিতি-পরিচর্চা। তাহলে কি তিনি ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচিতির বাইরের কেউ? না, তা নয়; তবে আলাদা। আর, আলাদা একারণেই যে তিনি প্রতিশ্রুতিশীল। ফলে, সত্যান্বেষী পরিচয়টিই তাঁর সব থেকে বড়। প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনেও এসেছে; কিন্তু, সত্য-অন্বেষণে, প্রতিশ্রুতির প্রশ্নে তিনি উত্তাল সাগরে এক নিঃসঙ্গ-শান্ত নৌকোর মতোই একা লড়াই করে গেছেন। কখনো টলেননি। শহুরে মধ্যবিত্ত কিংবা গ্রামীণ ক্ষমতাবান, কারুর গ্রহনযোগ্যতার জন্যই তিনি লালায়িত হননি। আরজ আলী মাতুব্বরের এই প্রতিশ্রুতিশীলতাই তাঁর নির্মোহ দর্শনের উচ্চমূল্য আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (জ.১৯৩৬) ‘র ভাষায় বলতে হয়— ‘সাহস দু’রকমের হয়। এক রকম সাহস নাটকীয়, আরেক রকম সাহস শান্ত। নাটকীয় সাহস ঢাকঢোল বাজায়, এবং সেই বাজনার উত্তেজনা থেকে রসদ নিয়ে নেয়। শান্ত সাহস ধীর স্থির এবং অনমনীয়। আরজ আলী মাতুব্বরের সাহস এই দ্বিতীয় ধরনের। তিনি সর্বদাই শান্ত এবং সর্বক্ষণ অনমনীয়। যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু যুদ্ধের সাজ নেই। জয়ী হয়েছেন। কিন্তু বিজয়ীর দম্ভ নেই।’

সহায়ক গ্রন্থসমূহঃ
১.বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), নীহাররঞ্জন রায় ২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ডক্টর এম. এ রহিম ৩. বাঙালি মুসলমানের মন, আহমদ ছফা ৪. ঞযব ওহফরধহ গঁংধষসধহং, ডরষষরধস ডরষংড়হ ঐঁহঃবৎ ৫. হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ ৬. আহমদ শরীফ শ্রদ্ধাঞ্জলী, আফজালুল বাসার সম্পাদিত ৭. চিহ্ন ৩০, শহীদ ইকবাল সম্পাদিত ৮. আরজ আলী মাতুব্বর, আইযুব হোসেন ৯. আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র, পাঠক সমাবেশ ১০. মুসলিম সাহিত্য সমাজ: সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম, খোন্দকার সিরাজুল হক ১১. ভবিষ্যতের বাঙালী, এস. ওয়াজেদ আলী।

********************************************

পাল চিত্রের ইতিকথা
সুমন

উপমহাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘকাল ও ক্ষমতাবান শাসক গোষ্ঠী হিসেবে আর্বিভূত হয়ে ছিলো; পাল রাজাদের নাম সবার আগে আমাদের স্বরণে আসে। পাল সা¤্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ধ্রুপদি যুগের একটি সা¤্রাজ্য। এই স¤্রাজ্যের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলা অঞ্চলকে নিয়ে। অধুনা বাংলা ও বিহার ভূ-খন্ড ছিল পাল সা¤্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই স¤্রাজ্যের প্রধান শহরগুলো ছিল পাটালীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী, বরেন্দ্র, মুঙ্গের তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দল। একাধিক প্রধান শহর থাকলেও পাটালীপুর ছিল পালদের রাজধানী। অষ্টম শতাব্দীতে এই বংশের গোড়াপত্তন হয়েছিলো। পরবর্তী চারশত বছরের অধিক সময় রাজত্ব করে। দ্বাদশ শতাব্দীতে এই বংশের পতন ঘটে। পাল বংশের বিস্তারের বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান। পাল স¤্রাটরা ছিলেন ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শনসাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য শিল্পের বিশিষ্ট পৃষ্টপোষক। তাঁরা একাধিক বৃহদায়তন মন্দির ও মট নির্মাণ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সোমপুর মহাবিহার। তাঁরা নালন্দা ও বিক্রমশিলারও পৃষ্টপোষকতা করতেন। তাঁদের রাজত্ব কালেই প্রোট্রো-বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে। পাল স¤্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তার ঘটেছিলো স¤্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকালে। তাঁদের মধ্যে স¤্রাট রামপাল ছিলেন সর্বশেষ শক্তিশালী পাল স¤্রাট। বাংলার ইতিহাসে পালযুগকে অন্যতম সুবর্ণযুগ মনে করা হয়। এই যুগেই প্রথম সাহিত্যকর্ম ‘চর্যাপদ’ রচিত হয়ে ছিলো। সেই সঙ্গে শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছিলেন। ধর্মীয়দিক থেকে পালদের গুরুত্ব অপরীসিম। ধর্মীয়দিকটা বেশ উৎকর্ষ লাভ করেছিলো। পাল স¤্রাটরা ছিলেন মহাযান। বৌদ্ধ ধর্মের গৌতম বুদ্ধের দেশের শাসক হিসেবে পাল স¤্রাটরা বৌদ্ধ বিশ্বে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে ছিলেন। পাল স¤্রাটরা সংস্কৃত প-িতদের পৃষ্টপোষকতা করতেন। তাদের কয়েকজন পাল অধিক বিত্ত ছিলেন পাল শাসন কালেই। গৌররীতি নামক রচনাশৈলী বিকাশ লাভ করে। অনেক বৌদ্ধ তান্ত্রিকগ্রন্থ পাল যুগে রচিত ও অনূদিত হয়। পালযুগ বাংলাদেশর শিল্পকলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ধর্মপাল ও দেব পালের আমলে দুই বরেন্দ্র শিল্পী ধীমান ও তাঁর পুত্র বীতপাল শিল্পকলার ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিব্বতি ঐতিহাসিক ‘লামাতরনাথ বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস’(১৬০৮), নামে যে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে আমরা এই তথ্য জানতে পারি। এই দুই শিল্পী ভাস্কর্যে, ধাতুমূর্তি গড়নে (গবঃধষ পড়ংঃরহম) আর চিত্রকার্যে বিশেষ নৈপুন্যর পরিচয় দিয়ে ছিলেন। তাদেরকে শিল্পী শ্রেষ্ট চূড়ামণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। এ কথা আমাদের জানা প্রয়োজন যে পাল সা¤্রাজ্য বিহার ও বাংলা জুড়ে বিস্তৃত ছিলো। তাই পাল চিত্রকলাকে যেমন বিহার তার নিজের শিল্পকলা বলে দাবি করতে পারে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশও ঠিক তেমনি দাবি করতে পারে। পালযুগের ভাস্কর্যের সাথে অনেকেরই পরিচয় আছে। অনেক নিদর্শন দেশের বাইরে চলে গেলেও দেশের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার যথেষ্ট সংগ্রহ বিদ্যমান রয়েছে। অবশ্য পালযুগের চিত্রকলার সাথে পরিচিত হবার অবকাশ খুবই সংকীর্ণ। কারণ, অধিকাংশ সংগ্রহ এদেশে নেই বললেই চলে। সবই দেশের বাইরে চলে গেছে। প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে পালযুগের চিত্ররীতির একটা বিশিষ্ট স্থান আছে। আর এই চিত্রকৃতির বিষয়বস্তু ও গুণগত সৌন্দর্য কম সমৃদ্ধ নয়। নিদর্শনের দূরধিগম্য তাই এ পরিস্থিতি উদ্ভব ঘটিয়েছে। পালযুগের চিত্রকলার নিদর্শন আমরা পাই সে সময়ের চিত্র সংযুক্ত পুঁথিতে। দু’একখানি ছাড়া পুঁথিগুলো সবই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থের অনুলিপি, পাল স¤্রাটদের যুগে পূর্ব ভারতে প্রস্তুত হয়েছিলো। অধিকাংশ পুঁথিতে বিভিন্ন পাল স¤্রাটদের নামাঙ্কিত দেখা যায়। কতক গুলো পাওয়া যায় সমসাময়িক অন্য রাজাদের তারিখ। খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে শেষ থেকে দ্বাদশ শতকের অন্ত অবধি কম করে পঁচিশটি তারিখ যুক্ত পুঁথির সন্ধান এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। মোট চিত্র সংখ্যা প্রায় চারশ। অনেক পুঁথিরই চিত্রিত কাটের পাটা। পালযুগের চিত্রকলা সমন্ধে আরো দেখতে পাই অশোক মিত্রের ‘ভারতের চিত্রকলা’ বইতে প্রতিটি চিত্রিত পাতায় সাধারণ তিনখানি চিত্রিত ছবি দেখা যায়। একটি ঠিক মাঝখানে, বাকি দুটি দুইপাশে কোন কোন পাতায় আছে ঠিক মাঝখানে মাত্র একটি বড় লম্বা ছবি, আবার কিছু পুঁথিতে শুধু দুটি ছবি দেখি। পাতার দু’পাশে মধ্যখানে মাত্র একটি বড় লম্বা লেখা। পরবর্তী কালের পুঁথিতে অনেক সময়ে পুঁথির ধারের ফুটোর চারদিকে ছবি বা অলঙ্কার দেখা যায়। পুঁথির মত পাটার প্রতিটি পিঠেই ছবি থাকতো। পুঁথি গুলি নিয়মিত পূঁজো করা হতো। পুঁজোর অনুষ্ঠানে ঘি সিঁদুর চন্দনের প্রলেপে পাটার উপর ও নিচ দিকের দুটি ছবি অনেক সময়ে অস্পষ্ট বা নষ্ট হয়ে গেলে, নতুন করে চিত্রিত পাটা তৈরী হত। প্রতিটি ছবির দু’পাশে দুটি অতি সুন্দর ভাস্কর্য গুণম-িত, লিপির স্তবক, মধ্যস্থল থাকতো যেন দুইপাশে দুই প্রশস্ত অপূর্ব অলংকৃত ফ্রেমে বাঁধা পুঁথির ছবির সারি। পূর্ব ভারত বা নেপালি পুঁথিতে সমগ্র লিপির সমান গাঢ় কাজল কালিতে লেখা হত। অনেক জৈনপুঁথিতে দেখি লিপির একই স্তবকে কালির গাঢ়ত্বে একটি গাঢ় আর ফিকের মিশ্রণ। বৌদ্ধ গুহাচিত্রের মূল বিষয় ছিল জাতক উপাখ্যান, অর্থাৎ বিনা ছেদে ক্রমান্বয়ে এক জাতকের গল্প থেকে অন্য জাতকের গল্পে বিচরণ। সেই কারণে গুহাচিত্রের ছিল কানেক্টিং লিংক কম্পোজিশনের প্রবণ রোটেশন পারস্পেকটিভ, যার সাহায্যে দর্শকের চোখে এক গতিশীল ঘটনা থেকে পরবর্তী ঘটনার অনুধাবন করা যায়। অজন্তা বা অন্যান্য গুথাচিত্রের মূল গুনই ছিল গতিশীল আখ্যান পরম্পরা। জৈন পুঁথিচিত্রে জৈন ধর্মের মূর্তি চিত্রে ও ধ্যান ছাড়াও হিন্দু ধর্মাশ্রয়ী ও লৌকিক পুরাণ ও আখ্যান চিত্রে পাই অথচ পাল পুঁথি চিত্রের প্রধান উপজীব্য বিষয় হলো বৌদ্ধ তন্ত্রাশ্রয়ী দেব-দেবীর আলেখ্য বার্তাদের বৈভব ও কীর্তির বিবরণ। পনেরো শতকে পশ্চিম ভারতে চিত্রিত পুঁথির আদর বাড়ার ফলে পুঁথি চিত্রণ কাজ দুই হিসাবে বেশ সমৃদ্ধি করে। প্রথম জৈন ধর্মাবলম্বী ব্যাঙ্কিং কাজে লিপ্ত বড় বড় পরিবার গুলি তাদের নিজেদের শ্লাঘা ও তৃপ্তির উদ্দেশ্যে প্রভৃতি ভাবে চিত্রিত বহু মূল্য কল্পনাসূত্র কালকার্য কথা ও মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। সোনা, ইন্দ্রনীল, কার্সাইন প্রভৃতি বহুমূল্য ধাতুরতœ, আগে যা অল্প পরিমাণেই পুঁথির বিচিত্র ব্যবহৃত হত। সেগুলির এখন মুক্ত হস্তে প্রচলন শুরু হলো। এই সব রঙে চিত্রিত পুঁথির সংখ্যাও বেড়ে গেলো। উপরন্ত পুঁথির প্রতিটি ছবির পাড় হিসাবে বিশদ ভাবে স্থাপত্য, বহুমূল্য বস্ত্রের ও কার্পেটের নকশা ও অলঙ্কার বিচিত্র ভাবে নানা রঙে আঁকা হত। এ সব চিত্রে পারসীক চিত্ররীতির প্রভাব সুস্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে, প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট বা সামাজিক দৃশ্যের আকারে প্রচলন ছিলো। এই সব লক্ষণাদি বারোবের সান্নিকটে গন্ধোর বন্দরের কাছে আনুমানিক ১৪৭৫ খ্রিষ্টাব্দে লিখিত একটি পুঁথিতে সব থেকে বেশি পাওয়া যায়। কিছু দিনের মধ্যে এই গন্ধোর বন্দরের পুঁথিটি হয়ে উঠলো অন্যান্য পুঁথি চিত্রণের আদর্শ। এই রীতিতে আঁকা সব থেকে পুরনো পুঁথির ১৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে, ‘বসন্ত বিলাস’, এটি যে একক পুঁথি নয়, উলটো একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করলো তার প্রমাণ হলো পর পর আরো কয়েকটি লৌকিক পুরাণ বিষয়ক পুঁথি। যেমন ‘দয়মন্তীকথা’, ‘মাধবানন্দকামকগুলা’। ছোট ছোট চিত্রকলা থেকেই আজকের বিশাল চিত্র সৃষ্টি হয়েছে। পর্যায় ক্রমিক প্রচার ও প্রসারে চিত্র পেয়েছে তার আপন ভুবন।

********************************************

ছায়া ও কায়া
সুবন্ত যায়েদ

সকালে বন্ধুরা এলো আর দুপুরে এলো প্রেমিকা, হেমন্তের বিকেলে ঝেপে এলো কুয়াশার মতো বিষণ্নতা। সন্ধ্যার আকাশ হলদেটে লাল হয়ে এলো বলে পৃথিবীর কুটিল দৃশ্যগুলো কেমন মায়া মায়া হয়ে উঠলো। আমি একশো বছরের পুরনো রেল স্টেশনে বসে সমস্তদিনের ক্লান্তি থেকে জেগে উঠতে চাইলাম, মায়া দিয়ে ঢাকতে চাইলাম বিষণœতা। তখন আমার কিসের কথা যেনো মনে হলো হঠাৎ যেনো কিসের কথা, মনের ভেতরে যেটা ছায়া হয়ে ধরা দিলো। আমি দক্ষ ডুবুরির মতো অরেকটু নিমগ্ন হতে চাইলাম কিন্তু মনের অতল তলে কোনো ঠাঁয় খুঁজে পাওয়া গেলো না। অথচ ভেতরে কেমন অস্বস্তি নড়তে চড়তে লাগলো এবং আবারো ঝেপে বিষণœতা নেমে এলো। আমি তবু একটি কায়ার কথা ভাবতে চাইলাম যেখান থেকে একটি ছায়ার জন্ম হয়। কিংবা আমি একটি অবয়বের কথা কল্পনা করতে চাইলাম যেটা দেয়ালের মতো দৃঢ় এবং প্রকাশমান। কিন্তু মনের ভেতরে ছায়া বিজয়ীর মতো হাসলো এবং আড়ালে কোনো কায়া দেখা গেলো না। আমি মুখভরে নোংরা খিস্তি করলাম এবং থোরাই কেয়ার ভাব ধরে এ সমস্ত থেকে বের হবার চেষ্টা করলাম। তখন পুরনো স্টেশনটায় তিনটা ঘণ্টা বাঁজলো আর ঝিমিয়ে পড়া কয়েকজন যাত্রী সজাগ হয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে উঠলো। আর আমার চোখদুটো উত্তর দক্ষিণ পশ্চিম করে পূব দিকে পড়তেই খানিক চমকিত হলো। মেকাপ মাখা রূপসীর মতো ঝকমকে একখানা চাঁদ কখন যেনো রেললাইন বরাবর ঝুলে পড়েছে। আরো দূরে যেখানে স্ট্রিট লাইটের আলো থমকে গেছে আর আধো জোসনায় আন্ধকারে মাখামাখি হয়ে আছে কুয়াশার পাতলা শরীর। আমি একশো বছরের পুরনো প্লাটফর্ম ধরে নেমে এলাম এবং কুয়াশার পাতলা শরীর কেটে চাঁদ বরাবর হাঁটতে থাকলাম। ভাবলাম একটা মানুষ কি এভাবে হারিয়ে যেতে পারে সহসা কোথাও যেখানে পৃথিবী বুকের মতো উদার হয়ে আছে। অন্তত রেললাইন ধরে এই আধো জ্যোৎ¯œা অন্ধকার পাতলা কুয়াশায় মাখামাখি পথে অদৃশ্যলোকের একটি পথ খুঁজে পাওয়া যেতো কি যেখান থেকে আর জনপদের পথ পাওয়া যায় না। তবে জ্যোৎ¯œায় কুয়াশায় এই পথ দারুণ মায়াময় হয়ে উঠলো আর আমি নেশাগ্রস্তের মতো হেঁটে গেলোম। কিন্তু সে ছায়াকে আর ভুলে থাকা গেলো না, আমি জানি না মনের ভেতর এমন কে যায় আসে যার কোনো কায়া দেখা যায় না। তাহলে কি আমি তারে খুঁজেছিলাম জন্ম-জন্মান্তরে আর একান্ত অগোচরে। কেনো আমি আজ ভীষণ বিষণœ বিভ্রান্ত পথিক অথচ একদিন কেমন জেগে উঠেছিলাম যেনো শীতের ফসলের মাঠ, গাঢ় কুয়াশার চাদরে মোলায়েম জেগে ছিলাম। হঠাৎ ভেতরের কান্না সরোবর ঘন হতে লাগলে মনে হলো হৃদয়ের স্বচ্ছলতার দিনে রোজ রোজ এক ফোঁটা করে কান্না জমেছিলো ভেতরে। আমি যেনো সে কান্নার চাপে আরো নুয়ে পড়লাম আরো বিষণœ হলাম এবং আরো আরো বিভ্রান্ত হলাম। তখন মৌসুমি ভৌমিকের সে আকুতির কথা মনে হলো যার গভীরে আছে ভীষণ কান্না, থকথকে ঘায়ের মতো বেদনা। আমিও বললাম দয়া করো, এই খরায় আমার সমস্ত দেহ পুড়ে পুড়ে ছাই দয়া করো…আমার সমস্ত যাত্রা ব্যর্থ সামনে কোনো আর সদর রাস্তার সন্ধান নাই। যে ধরা দেয় দেয় না তারে আর কেমনে খুঁজে পাই যখন মনের ভেতরে আর আশা উঁকি দেয় না। আমি তবু কেন চলি কিংবা চলতে থাকলাম সেটা মনে হলে সমন পাগলের কথা মনে হলো। যখন সূর্য্য দেশান্তরি হয়ে যেতো আর অন্ধকার ছড়িয়ে পড়তো তখন সমন পাগলার মাথা  বিগড়ে যেতো। সে স্টেশন ছেড়ে অথবা মাংসের বাজার থেকে গলি ঘুপচিতে ঢুকে দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে বলতো, মোনা দরজা খোলো, মোনা। আহা সেকি মধুর ডাক কিন্তু গভীরভাবে শুনলে তার কণ্ঠে গাঢ় উৎকণ্ঠা বোঝা যেতো। কিন্ত মোনা তো নাই কেউ দরজা খোলে না আর সেও বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াতো না, পাশের বাড়ির দরজায় আবার সে কড়া নাড়তো, মোনা, দরজা খোলো মোনা।

আমি আবার বিষণœতায় নুয়ে পড়লাম আর উথলে উথলে কান্না এলো। তখন সমস্ত অন্ধকার আধো জ্যোৎনা আর পাতলা কুয়াশার পর্দা কেটে রাতের ট্রেনটা সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি হন্যে হয়ে ছায়ার ভেতর দিয়ে কায়াকে খুঁজতে থাকলাম কিন্তু পথ খুঁজে পেলাম না।

****************************

তিমিরে
হেমকান্তি

রেললাইন ধরে মাতালের মতো হাঁটতে হাঁটতে রাতদুপুরে সে নিষিদ্ধ পাড়ার সামনে এসে পড়লো। আর অমনি, বন্দুকের নল উঁচিয়ে হেঁকে উঠলো খাকি পোষাকধারি পুলিশ। এই শালা ভাগ এখান থেকে! রাতের আকস্মিতায় সে দারুন ভয় পেয়ে দৌড় দিলো। যুবক টলমল শরীরে দৌড়াতে দৌড়াতে হোঁচট খেতে খেতে টাল সামলালো আধভেড়ানো দরজার সামনে। ভেতরে কুপি জ্বলছে। একজন যুবতী বুক চিতিয়ে দেয়ালে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে হাসছে আধো অন্ধকারে। যুবক চমকে উঠলো। গা ছমছম প্রায় অন্ধকার ছোট ঘরের দেয়ালে তার ছায়া। আধখোলা দরজা দিয়ে বাইরের জলো হাওয়া টেনে আনছে। এক কোণায় রাখা মিটি মিটি কুপির আলোটা দুলছে। যুবকটি আবার মেয়েটার দিকে তাকালো এবং মুখে না বললেও মনে মনে বলল, আমাকে কিছুক্ষণ আশ্রয় দাও। ভাবতে ভাবতে যুবকটি অস্পষ্ট আলোয় দেখলো যুবতী মেয়েটি খুবসুরত না হলেও একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। দারুন একটি তেজী শরীর। তার লাল লিপিষ্টিক মাখা চকচকে ঠোঁটে সে তেজ আগুন হয়ে উঠেছে। এ আগুনের কোনো সময় অসময় নেই।

মেয়েটি যুবকের হাত ধরলো। তখন দেয়ালের ছায়া আরেকবার চমকে উঠলো। হঠাৎ যুবক নিজের ভেতরে খানিকটা সেঁধিয়ে গেলো। মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে হাসতে নিচু গলায় বললো, আজ রাতের জন্য আমি তোমার গোলাম তুমি আমার মালিক। দেয়ালের কেঁপে চলা ছায়ার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো যুবক। হাত ছাড়িয়ে নেবার কথা মনে থাকলো না। নিজের ঠা-া হাত অনেকটা ঐ কুপির মৃদু আগুনের মতন একটি গরম হাতের মাঝখানে পড়ে স্থির হয়ে গেলো। মেয়েটা তাকে টানছে। নিজের দিকে টানছে। পেছনে পড়ে আছে কত স্মৃতির টান। কিন্ত মেয়েটি যে কেমন করে বলল মালিক কথাটি। আহ্, আর কখন কে যে কার মালিক হয়। এই জগত সংসারে কত কথাই হারিয়ে গেছে। আবার রয়ে গেছে কত। যেমন মালিক কথাটি। কিংবা রয়ে গেছে আজ থেকে ঠিক দুটি দিন আগে মধ্যরাতের কলিজা ধরে নিচু সুরের গুনগুন গানখানি। ঝলসানির দমক মিলিয়ে গেলো আস্তে আস্তে। আলো থিতিয়ে অন্ধকার উঠে এলো। যুবক আস্তে আস্তে কথা বললো, রাস্তায় পুলিশ ধাওয়া করলো তখন। পুলিশ তাড়া করেছিলো বুঝি? বলে খিল খিল করে হাসলো আর কথা বললো মেয়েটি। পাশের ঘর থেকে তখন কারো কাতরানি শোনা গেলো। ঘরের ভেতরে একটি মোটা-সোটা বিড়াল দেয়ালের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকলো। আধো অন্ধকার ঘরে একটি জোনাকি বেরোবার পথ হারিয়ে বুঝি পথ খুঁজতে থাকলো। ঝড়ের যে কম্পমান মন এতক্ষণ শরীরের আনাচে-কানাচে আশ্রয় খুঁজছিলো তা যেনো আস্তে আস্তে থিতু হতে না হতেই দুলে উঠলো সমস্ত শরীর। মাথার ভেতরে বহতা নদীর স্রোতে হঠাৎ জেগে উঠলো ঘূর্ণি। অসহায় বৃষ্টিভেজা কাকের মতন কেঁপে উঠলো যুবক। চোখবুঁজে বুঝতে পারলো মেয়েটি তাকে টেনে শুইয়ে দিয়েছে চৌকিতে। বুঝতে পারলো তার খোপা খুলে পড়েছে তার বুকের উপর। যেনো রামচন্দ্রজীর সীতা তাকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। আড়াল করেছে তার সমস্ত শক্তিটুকু দিয়ে। পৃথিবীর যে জ্বলন্ত শ্মশানের দিকে এতদিন ফিরেও তাকানো হয়নি সে আগুনের তাপ বুঝি এতকাল পরে বুকে নেমে এসেছে। মেয়েটি ফিসফিস করে বললো, কাঁপছো কেনো পুরুষ, হা? যুবক কোনো জবাব দিতে পারলো না। আসলে কি জবাব দেবে সে?

মেয়েটি মুখের কাছে ঝুঁকে এসে বললো, ভয় কি? এটাতো রাস্তা নয় সখির ঘরে এসে পড়েছো। এখানে কেউ তোমায় দেখতে পাবে না। বলে মেয়েটি কামচোখে তাকালো। তখন যুবকের ভেতরে সাহস সঞ্চারিত হলে মেয়েটির কোমর জাপটে ধরলো। কিন্তু এতোটুকুই, সে আর সামনে এগোলো না। মেয়েটি বললো বেটা মানুষের এত ভয় কিসের অ্যাঁ? ভয় তো করবো আমরা। যুবক চমকে উঠলো। বলে কি মেয়েটা! কোথায় ঘা দিতে চলেছে সে? মেয়েটি বলে চললো। হ্যাঁ, ভয়তো করবে আসলে মেয়েরা। কিন্ত কি আশ্চর্য দেখো, নিত্য নিত্য কত অচেনা অজানা পুরুষ মানুষকে ঘরে তুলছি। কে যে কেমন, কোথেকে যে এসেছে কিছুই তো জানি না। তবু ভয় পাই না এক ফোঁটাও। আমি কি আর আমার আছি যুবক? আমি তো তোমার, আমি তো তার, সকলের।

মেয়েটি তারপর তার কপালে চিবুক রেখে একটি নিঃশ্বাস ফেললো। আর যুবকটি ভাবলো সংসারের নিয়ম কানুন কতো অদ্ভুত। যে মেয়েটিকে সমাজ বেশ্যা বলে খিস্তি করে আর সে মেয়ে বিশ্বাস করে সে আসলে সকলের। সকল সমাজের। এবং সত্য তো সেটাই, তার কাছে সকল ঈশ্বরের প্রতিনিধিরা আসে। পৃথিবীর কোনো বিভেদ এখানে খাটে না। যুবক দারুণ আলোকিত হয়ে অন্ধকারে চোখ মেললো। চোখ মেললো সে ঊনত্রিশ বৎসর ধরে সকলের হয়ে থাকা মেয়ের নির্ভর চোখে। তার ভেতরে শান্তি নামলো। সেখানে আর কোনো কান্নার দাগ নেই। রাত্রির নদীপথে নৌকায় দুলতে দুলতে সে নতুন গন্তব্যে ভেসে চললো।

****************************

গল্পের অযুহাতে
দীপ্র জেরিন

জয়পুরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। সাধারণ অখ্যাত শহরের ছোট্ট সুন্দর একটি স্কুল। ব্যস্ত পথের পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। সময়টা ভাদ্র আশ্বিনের মাঝামাঝি, শরতের দুপুর। চকচকে নীল আকাশ। বরফের মতো মেঘ। ঝকঝকে সোনালী রোদ মাথার উপর হতে একটু পশ্চিমে হেলেছে মাত্র। ঢং.. ঢং.. ঢং..। টিফিনের ঘণ্টা। মুহূর্তেই শ্রেণিকক্ষের সকল নীরবতা ইতি টানলো। সমস্ত মাঠ জুড়ে হইচই, গল্প আর খেলার ছলে হাসির ঢল নেমে পড়লো। যেন দোলনায় টুকটুকিটার ঘুম ভেঙেছে। কানা মাছি ভোঁ..ভোঁ.. যাকে পাবি তাকে ছোঁ কখনও এলন্টি বেলন্টি এক-দুই-তিন! তখন খেলার বেলা একগুচ্ছ ফুলের। চঞ্চল কয়েকটি ভোমরার। এদের ভেতরে সবচেয়ে প্রাণবন্ত যে, কেরানি আব্দুলের সাইকেলে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো। বাকিরা দেখার আগেই ইতস্তত হয়ে তড়িঘড়ি উঠে পড়লো। বন্ধুরা মুখ টিপে হেসেছিল দেখে সে ঠোঁট ফুলিয়ে চলে গেলো। বলল, খেলবো না যাহ্! বাঁধা পড়লো ছুটির দুটি চোখ। সে তখন ক্লাস এইটে। পড়াশোনায় বেশ ভালো। চঞ্চল। ভিন্নতা এই, কারণে অকারণে হাসতো। পরীক্ষার হলে বসে হাসতো, ক্লাসে পড়া ধরলে হাসতো। বলতো, আমি পাগল। হাসতে ভালোবাসি। হাসাতে ভালোবাসি। গানও গাইতো, শোনাতো। বাকপটু। মাঝে মাঝে একা দাঁড়িয়ে থাকতো তিন তলার বারান্দায়। চোখজুড়ে অন্ধকার। কানে ভাসছে, কানা মাছি ভোঁ.. ভোঁ..। ছুটি হাত বাড়িয়েছে সামনে পেছনে। শেষ পর্যন্ত খপ্ করে ধরেও ফেললো এক হাত। চমকে উঠে বললো, এই ছুটি, হাত ছাড়! আমি খেলছি না। তারপর রুমালের গিঁট খুলে চাইলো। কোঁকড়া চুলে আবক্ষ দুটি বেণী; নীল কামিজে সাদা ওড়না জড়ানো ইউনিফর্মে অপ্রস্তুতের মত সামনে দাঁড়িয়ে আছে অমায়িক চেহারার শ্যামাঙ্গিনী এক মেয়ে। আরেক কৃষ্ণকলি! চাহনিটা খুব শান্ত। নাম তানজি। দুজন সহপাঠী তবে বন্ধুত্ব তেমন নাই। যতটুকু না হলেই নয় সেটুকু মাত্র। সেদিন এভাবেই শেষ হলো। পরদিন ক্লাসে নোটিশ নিয়ে হাজির রসায়ন স্যার। বললেন, কদিন পর একটা সায়েন্সফেয়ার আছে সকলে যেন কিছু প্রজেক্ট তৈরি করে। ল্যাবে দল ঠিক করে দেওয়া হলো। একটা গ্রুপ মিমি, তানজি আর ছুটির। প্রজেক্ট তৈরি, ফেয়ারের তিন দিন ১২নং স্টলে একসাথে থাকা। বন্ধনের এ-ই যোগসূত্র। ভালোবেসে শুধু ছুটিই তানজি বলে ডাকতো! ওর নাম মূলত তানজিলা। সে বছর দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল। সাথে কিছু মাস। ওরা ক্লাস নাইনে। আগামী বছর মাধ্যমিক।

ছুটি প্রথমবারের মত ক্লাসে বসে চিরকুট ছুঁড়ে দিলো। তুই খুব মিষ্টি। কখন ভালোবেসে ফেললাম জানি না। সে বুঝি এমন-ই হয়! লজ্জাবতীর মত পলক ফেলে পদ্ম ফুলের হাসি হেসে চিরকুটটা রেখে দিল স্কুল ব্যাগে। আড়ালে থাকা সবচেয়ে ছোট পকেটটায়। ঢং..ঢং..ঢং..। মাঠে ছুটি নাই। বিষণœ সময়ে সে অনেকদিন পর তিন তলায়। বারান্দার পাশে ছাদ। তারই আড়াই ফুট সীমানার উপর চোখ বুজে কাকতাড়–য়ার মত দক্ষিণে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে একা। কেবল কিছু কাকের কা-কা ডাক। আকাশ জুড়ে ঘিয়া রঙের মেঘ। শীতের সকালের মত আবছা শূন্যের আমেজ। ফুরফুরে বাতাসে ঘাসের মত দুলছে ওর কাঁধের সাদা স্কাফটা, কপালের ছোট ছোট চুল। দমকা হাওয়ায় বুকটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। ফুসফুসটা ভরে উঠছে নির্মল সতেজতায়, এক দীর্ঘ প্রশ্বাসে! তখন পেছনে আরও পেছনে। শৈশবে। মেঘলা আকাশ ছুটির দোলার মত লাগে। বিনসিঁড়া গ্রামের সেই ছোট্ট দোলা! বয়সে দু-এক বছর কম। বাড়ির আঙিনায় সকাল-বিকাল মার্বেলে ঠোকাঠুকি, পাঁচ কড়ি, পুতুলের বিয়ে, চড়ুইভাতি কত্ত খেলা! সেই যে চলে গেল আর দেখা হলো না। ছুটিরাও শহরে। সত্যিই কখনও দেখা হবে না আর! না না না। দোলা! নাই নাই নাই। পেছন থেকে কেউ তানজির জামা ধরে। ও বোঝে এটা কে। মুখ না ফিরিয়েই বলে, ছুটি! যদি পড়ে যেতাম? পড়তে বুঝি দিতাম! তুই আমার তানজি না! টুক্ করে ধরে নিতাম। তারপর বুকে। ছুটি আর তানজি হাত ধরে নেমে পড়ে। তোর মন খারাপ? জানি না! একা ভালো লাগে। ঠিক একা না; ওদের অনুভব করি। মেঘলা আকাশ? হুম, খুব কাছের। আর ঝলমলে আকাশটা রহস্যের। স্বপ্ন আঁকা যায় রঙ-তুলিতে। ভালোবাসি ঐ নীলকে। দলা পাকানো মেঘ তার পথ। হলদে পরীটা লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। আমি গল্প করি। ও বোঝে। খিলখিল করে হাসে! আমিও হাসি। তাই? জানিস ছুটি, প্রায় আমার মন খারাপের দিন বৃষ্টি আসে। ওরা সব বোঝে। তারপর পুরো দু’ঘণ্টা টানা ঝমঝম বৃষ্টি। বাড়ি ফেরার পথে অর্ডিনারি চায়ের দোকানটায় দু’জনে ঢুঁ মারে। এক ফোটা দু’ফোটা করে জল চুইয়ে চুইয়ে পড়ে ছাউনির ত্রিপল থেকে। মাঝ বয়সি ছেলেটা গ্লাসে বেশি করে চিনি দিয়ে নাড়ে। টিনটিন টিনটিন শব্দ করে। চা চামচে দ্বন্দ্ব। ভ্রু কুঞ্চিত করে ঠোঁট মুচড়িয়ে সিপ্ করে ওঠে ছুটি। তানজি বলে গর…ম। আদা দেওয়া খয়েরি চায়ে মিষ্টি চুমুকের যে কত দাম! আহা! কাপের ইন্দ্রজালিক ধোঁয়াটা মিলিয়ে যায় ক্ষাণিক পর তানজি বলে, কত হলো? দেন ছয় টেকা করে বারো টেকা।

ছুটি বলে, খুচরা নাই, দশ নাও। বারো টাকা দিতে পারবো না।

চা খ্যায়েও দরদাম! যা হাবে তাই দ্যান।

নিচু রাস্তায় পানি জমা হয়েছে খুব। মাদ্রাসা রোডের অপরাজিতাগুলো জলন্ত নীল হয়ে আছে। ছাতা মাথায় দুজন কাঁধে হাত রেখে হাঁটে কিছু পথ। কেডস্ পুরো পানির নিচে। ছুটি ইচ্ছে করে পানিতে ছপাৎ ছপাৎ শব্দ করে। কখনও বিল্ডিং এর ছাদ থেকে পড়া পানির নিচে ছাতাসহ দাঁড়ায়। শব্দ হয়। রিকশা চলে যায়। পানি ছিটায়। ও রাগে না বরং হাসে। তানজি বলে, এমন করিস না। ময়লা পানি! তো? মাঝে মাঝে ময়লা দরকার। না হলে পরিষ্কারটাকে আঁচ করা যায় না বুঝলি! তুইও মাখ। তারপর আলাদা পথ। যে যার মতো চলে যায় বাড়ির দিকে। সেদিন বিকালটা হারিয়ে যায় বৃষ্টিতে ভিজে। সন্ধ্যায় আবার ছিপছিপ টিপটিপ। পাড়ার সমস্ত লাইটপোস্ট গুলো অফ। বেলকুনির পাশে বহুদিনের ইউক্যালিপ্টাসটা কালো দানবের মতো হয়ে আছে! ঘাড়ে ঠ্যাঙা শাকচুন্নি আবার খিক-খিকিয়ে হাসে; খুব ঢং। তানজির খুব কথা বলতে ইচ্ছা হয় ছুটির সাথে। কী যেনো ভেবে আর বলা হয় না। পড়ার টেবিলে হারিকেন জ্বলছে। ঘরের বাকি সব অন্ধের মত নিমগ্ন। পানির টপাটপ ছাড়া কোনো শব্দ শোনা যায় না। ছুটি একভাবে দ্যাখে কাঁচের ভেতরটা। দোদুল্যমান আগুন। ওর একটা ধাঁধাঁ মনে পড়ে।

লোহার খুঁটি, কাঁচের ঘর,

ভেতরে তার আলোর বর।

আগে অনেক খেলেছে! এখন আর সেসব নাই। বায়োলজি বইটা খুলে কঙ্কাল তন্ত্র নিয়ে বসে। কত রকমের সব অস্থিচক্র আর সমন্বয়। মাঝে মাঝে নিজের হাত-পায়ে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখে। পূর্ব দেয়ালে বড় ছাঁয়া। তানজি তাও দেখে..। সে ছায়ায় খেলা করে। দু’হাতের আঙুল দিয়ে শামুক বানায়। প্রজাপতি, হরিণ আবার পাখনা দোলানো মাছও বানায়। মজা পেয়ে নিঃশব্দে হাসে। রাত আরেকটু গড়িয়ে যায়। তানজি ড্রয়ার থেকে একটা বই বের করে। হারিকেনের মাঝারি ধাতের আলোয় মলাটের লেখাগুলো চকচক করে। বাবা উপহার দিয়েছিল জন্মদিনে। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি। ছুটির দেয়া সেই চিঠিটার কথা হঠাৎ ই মনে পড়ে যায়। পেন্সিল বক্সে রাখা ছিল। সে রাতে ওটা আরেকবার পড়ে আর ভাবে।

আমার দুষ্টু মিষ্টি ছুটি,

আজ পড়ায় মন নেই। মধ্যরাতে তোকে ভাবছি। জানালার শিক পেরিয়ে পশ্চিম পুকুরের কালো জল। ঘাটে নৌকা। পাড়ে জাম গাছটা। তোকে দিয়েছিলাম না? ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে রীতিমত ধাঁধাঁ লাগিয়ে দিচ্ছে। আমি জানি, তুই কেমন আছিস। এমনই এভাবেই ভালো থাকিস। আমার বিশ্বাস, তুই হাসলে ঐ আকাশটাও হাসে। তার মায়ার পরিসীমা বুঝেছি। দিন চলে যায়। মাধ্যমিক আর পাঁচ মাস বাকি। প্রতিদিনের মত এক সাথে বাড়ি ফেরা, স্কুল করা।  তানজির কানে আবার যেন বেজে ওঠে ঢং..ঢং..ঢং..। তবে তার সময় ফুরিয়ে আসায় মন খারাপ হয়ে যায়। চিঠিটা বক্সে তুলে রাখে। মাস কয়টা কেটে যায় এক ভিন্নতার সাথে। মাধ্যমিকটা সেবার তানজিকে একা দিতে হলো। সময়ের জালে আবেগের মাঝে সত্যটা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে। এদিকে সত্য কঠিন আর জীবন তো জীবন। বাস্তবতায় গড়া পাহাড়। বেলকুনির সামনে বিড়ালছানা হয়েছিল ক সপ্তাহ আগে। গায়ের রঙটা বেশ হয়েছে। সুন্দর ফুটফুটে। ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটা পড়া আছে তাই তানজি মনে মনে শখ করে তার নাম দিয়েছিল মার্জারী। প্রতিদিন ভোরে তাকে দেখে। রোদের প্রথম আলোটা মুখে পড়তেই সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বেলে ঘুমটা ভেঙে যায়। একদিন সকালে তিনটে কুকুর মার্জারীকে ঘিরে ফেলেছিলো। ঘেউ ঘেউ ঘেউ! প্রতিটি ফাঁকে মার্জারী উঁকি দিয়েছিলো মুক্তির জন্য। অবশেষে পথ খুঁজে না পেয়ে অসহায় ও করুণ স্বরে বাঁচার শেষ চেষ্টায় ম্যাও ম্যাও করে চলেছিলো। কিন্তু তার মা ওখানে ছিলো না আর থেকেও লাভ হতো কিনা সন্দেহ। তানজি কিছুই করতে পারেনি। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছিল। তবে ও বোঝে এ রাগটা নিরর্থক। সে দোষ তানজি মানে। তবে এতো পথিক চলে যায় তারা কেউ কেন কিছু বলে না! কেনো বোঝে না মার্জারীর কষ্ট! পথিক না এগোলে থেকেই বা কি করবে অপারগ মা বিড়াল! কি ই বা করবে তানজি! পরিস্থিতি তখন হাতের বাইরে। কেউ শোনে না। ঐ চোখে যে তখন কি হাহাকার সে দেখেছে। ওরা কি দেখে না সে চোখের আকুতি! ছানাটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। তার বুকের ভেতরটা ছটফট করছিলো বাক্সবন্দি প্রজাপতির দুটি ডানার মত। ভেতরের সমস্ত কোমলতা, আনন্দের উচ্ছলতা এক মুহূর্তে ভেঙে গিয়েছিল কৈশোরের সেদিনের মতই। অবশ্য এ তো কুকুরের জন্য স্বাভাবিক। স্বভাবজাত।

তবে অস্বাভাবিক, ব্যধিগ্রস্ত কুকুরও তো আছে যারা মানুষের মতো দেখতে। না, একটু ভুল হলো। খাস বাংলায় কুত্তা। কুকুর বললে কিছু মার্জিত ভাব থাকে। কুকুরের চেয়ে ওদের চোখা দাঁত বহুগুণে বেশি। বিষের অধিক বিষাক্ত! কুৎসিত- বিভৎস মুখ! ওদের রসনা লকলক করে। মোহান্ধ রসে টসটস করে। ওরা জ্যান্ত মাংসপি- থেকে মজা লুফে নেয়। এক থাবাতেই ক্ষত- বিক্ষত করে বুকের পাঁজর। ওরা কোমল অনুভূতির রক্ত চুষে খায়। কুত্তার সাথে ওদের বীর্যে কোনো তফাৎ নাই। মাঝে মাঝে পৌরসভা থেকে কিছু কর্মী এসে জলাতঙ্ক ছড়ায় এমন কুকুরদের ইনজেকশান দিয়ে মেরে ফেলে। একসাথে ছয়-সাতটা। আর কুকুরের চেয়েও তো ওরা বিকৃত। তবে ওদের কেন নিয়ে যায় না! তবে কি ধূসর মগজ চকচকে কাগজের মতো ভাইরাসে আক্রান্ত! তানজির ভাবনা থেকে আগুনের হল্কা বের হয়। চোখে স্পার্ক! ও জানে, এখন ওর অর্ধেক ছুটি। তাই এমন হচ্ছে। ছুটি, এসব বদলাবে না? বদলাবে না…

পারবি না? পারবি না…

তানজি জানে সব অনুভূতির মানে হয় না। কখনও উদ্দেশ্যহীন বা পরিণাম থাকে। তবে মনের জোরটা বাড়ায়। সে এক আবছা অবয়ব। তাকে ছোঁয়া যায় না। ছুটি ছুটিই। সে কেবল তানজিরই থেকে গেলো, যেখানে ভালোবাসা জমা থাকলে আর তলানি পড়ে না। সেখান থেকে ছুটি কখনও মিলবে না তানজির! ঐ নীলে, সবুজে, কিংবা চাঁদে।

****************************

অকাল প্রয়াণ
শাহেদ হাসান

সাপে লেখা কিংবা বাঘে দেখা

মৃত্যু অনিবার্য ছিলো, কিন্ত মরিনি।

যেদিন সন্ধ্যাবেলা একটা একটা করে

সবগুলো বাতি নিভে গ্যালো, আগরবাতি জ্বললো

দূর-দূরান্ত থেকে কতো মানুষ জড়ো হলো

কেউ মাথায় হাত রাখলো,

নিয়তির কথা বলে সান্ত¦না জানালো

সুরেলা কান্না আর এতো সান্ত¦নার ভীড়ে

সেদিন মরেও যেতে পারতাম, কিন্ত মরিনি।

যেদিন আকাশে তারা ছিলোনা

পাড়ার তিনপাওয়ালা কুকুরটাও দেয়ালের কোণে

কাঁপতে কাঁপতে ঘুমাচ্ছিলো,

ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে, মেউপাখির ডাকে

ভয়ংকর সেই রাতে, স্মৃতিচারণে মগ্ন হয়ে

কপালটাকে চাপড়ে সেদিন হয়তো

মরেও যেতে পারতাম, কিন্ত মরিনি।

তাই কোন এক শীতের সকালে

নদীর খুব কাছাকাছি এসে

তোমার চোখে চোখ রেখে

আমি মরে গেলাম।

****************************

গান:
কথা ও সুর: অনি হক

 

চুল            যদি ঢেউয়ের সাহসে দেবদারু

শরীরকে                    ভেবে বসি তটিনী

তখন তো    হাতের নখ আলতা মাখা সরণি

যেন        বাতাসে কাঁপা দোয়েল পাখা দুরু!

 

পথের গায়ে ধূলোর মত আমাদের শরীরে

নদীর ফেনা পুলক দেয়;

কমিয়ে আনে মর্মের ব্যয়

আঁখির পাতা বাতাস প্রাণে করে-

শরৎ এলে শিশির মিশে ফাগুন করে শুরু-

 

আজীবন সে আলোক চাঁদে নিভৃতে ঠাঁই নিলো

আমার দেশে নতুন কুঁড়ি,

চাঁদের দেশে সুতোর বুড়ি

বাতাস বুনে ভাবের চিঠি দিলো!

ফুল ফোঁটার মতন ভাব- শরমে আবরু!

****************************

শতাব্দী
মিরান শাহ্ মুন্না

শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে

নিঃশ্বাসে তবু সেই চিরচেনা গন্ধ

আকণ্ঠ পান করেছি মৃত্যুসুধা

ফেরবার সব পথ আজি বন্ধ।

 

শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে

পুরোনো শরাবে মাতাল হব হবেনা ভুল

অসংলগ্ন গানের কলি গলার ভাঁজে ভাঁজে

পায়ের নিচে পিষ্ট হবে ফুল।

শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে

আমার মুখের দেয়ালে আগুন ঝরা শ্লোগান

শোষণের ঝলসানো আগুন চিরটাকাল

প্রদীপ্ত আলোর ম্লান।

 

শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে

নারী আবারো সেই মাংসপি-ের ভালোবাসা

যতবার এসে দাঁড়াবে সামনে

পুরোনো প্রণয়ের রুদ্ধ হবে ভাষা।

 

শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে

ঘুরে-ফিরে আবারও রুদ্রঝড়

তা-বলীলায় ভাসিয়ে নেবে

সমস্ত সাজানো সপ্নঘর।

 

শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে

তবুও একা রিক্ত আশা নিয়ে বসবাস

স্নেহময়ী কোন এক নারীর হাত

কুৎসিত মুখের বালিরেখা করবে হ্রাস।

****************************

কোরানে-পুরাণে ভালো থাকুন ঈশ্বর
ইয়াসির আরাফাত

কোরানে-পুরাণে ভালো থাকুন ঈশ্বর

কাটাকাটি করে মরুক মানুষ

আদিপাপের বিশ্বাসে।

খ্রিস্টান যিশুকে বারবার ক্রুশ বিদ্ধ করুক

অনন্তকাল ধরে বেঁচে যাক

অনাগত পাপের প্রায়শ্চিত্ত  থেকে।

হিন্দু তাদের নাম বদলাক হাজার বার

গো-মাংসে বেঁধে রাখুক পাপ পূণ্য

হাজার হাজার মানুষ মেরে

রামরাজ্যের স্বপ্ন দেখুক দিন-দুপুরে।

বোধিচিত্তের ধ্যান ভেঙে

কুড়াল হাতে নেমে পড়–ন ভিক্ষু মহাশয়

ইচ্ছা মতন গলা কাটুন ক্ষুধার রাজ্যে

নিদ্বিধায় পান করুন মানুষের রক্ত।

অধমেরা ভুলে

পালন করুক হত্যা প্রথা

বোমা মেরে খন্ডিত করুক জমিন

তলোয়ারে কেটে নিজেদের করুক একশ কোটি টুকরা।

 

আদিম ঝড়ে পৃথিবী ভেসে যাক

কোরানে -পুরাণে ভালো থাকুন ঈশ্বর।

****************************

অংস
দিদারুল ইসলাম দিগন্ত শেখ

তুমি সঙ্গমসঙ্গী খুঁজে

শেষাবধি গর্ভবতী করো ধরণী মাটি।

মৈথুন সুখে বীর্যপাতে…

অন্যদের কর্ণগোচরে সুর প্রবাহিত হয়।

যারা বেশ্যা হতে পারে না

তারা ঝুলে মরে সিলিং ফ্যানে।

****************************

বিষাক্ত বায়ু আজ বাসা বেঁধেছে সবার ফুসফুস জুড়ে

দূরীভূত কর, ভাবনা জাগাও জীর্ণ মস্তিষ্ক খুঁড়ে

নির্বাপিতা
তুহ্ফাতুল ইসলাম তপু

ভালোবাসার সময় নেই আমার।

বলেছিলাম তোকে-

আমার শঙ্কার কথা

আমার সংকীর্ণতার কথা

মর্মের ভেতরকার ক্ষোভের কথা

যা আমার, আমার অস্তিত্বকে প্রতিক্ষণে

মৃত্যুবরণ করতে বলে।

ভালোবেসে কাজ নেই

নিরুপায় আমি আজ

ভালোবাসবার মতন মন নেই আমার,

ভালোবাসা আজ বড়ই নিরুপায়।

তুই বড়ই নিরুপমা আর আমি নিরুপম

এই হৃদয়ের ক্ষোভানলে পোড়াতে চাই না

দ্বিতীয় কোনো হৃদয়।

এ হৃদয় অনবরত দগ্ধ হয় ক্ষোভের আগুনে

জ্বলন্ত হৃদয়ের পাঠোদ্ধার করবি?

হৃদয়ের সাথে হৃদয় জ্বালিয়ে

সম্পূর্ণ সমর্পিতা হয়ে, বিদগ্ধ হয়ে

আগুনের স্পর্শে আপন আত্মাকে পোড়াতে হবে

মোহনীয় হতে হবে স্বতঃফুর্তভাবে।

আগুনের কাছে মোহনীয় মনোযোগ কেউ দিতে পারে না

সার্থপরতার মায়াজাল কাটিয়ে

কেউ আত্মবিনাশের পথ আপনা থেকে পরিশুদ্ধ করে না।

বরঞ্চ তুই, তুই অর্ন্তজয়া হয়ে

সবার হৃদয়ের আগুন নেভানোতে মনোনিবেশ কর।

বরঞ্চ ত্ইু, তুই আমার জ্বালাময় আগুনের মত প্রথম চুম্বন;

প্রথম সঙ্গমকে বুকে ধারণ করে হয়ে ওঠ সার্বক্ষণিক দমকলকর্মী।

ধরে নে, এটা তোর অদৃষ্ট,

ধরে নে, আমি তোর জাত ব্রাহ্মণ কুলীন বর;

যার বর পেয়েছিলি জীবনে একটিবার ।

****************************

 

মঞ্চসজ্জায় ভুল হয়েছে

দক্ষ অভিনেতার প্রতিভা ঢলে পড়েছে আনাড়ির চিল্লানিতে

আপাতত বন্ধ থাকুক
জারিফ এ আলম

আপাতত বন্ধ থাকুক প্রত্যাশার অলিগলি,

কৃষকের উৎপাদন, শ্রমিকের ঘাম,

ভালোবাসা আর কাম।

আপাতত বন্ধ থাকুক

এলিট সম্প্রদায়ের উচ্চাভিলাষ,

কর্পোরেট জীবন বন্ধ থাকুক।

বন্ধ থাকুক নষ্ট গ্রহের পূর্ণ স্বাধীনতা,

বন্ধ থাকুক জিঘাংসার সমস্ত ক্যানভাস।

বন্ধ থাকুক স্বপ্ন দেখার পূর্ণ জ্যোৎনা,

আপাতত অন্ধকারে ঢেকে থাকুক দিনের আলো;

মানুষ বুঝুক তার মূল্য কতখানি।

আপাতত বন্ধ থাকুক ধর্মশালা, বেশ্যালয়;

উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সকল অভিপ্রায়।

মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা,

উদ্যম ছুটে চলা আপাতত বন্ধ থাকুক।

বন্ধ থাকুক সন্তানের প্রতি বাবার ¯েœহ,

বন্ধ থাকুক মাায়ের অপরিশোধ্য ভালোবাসা।

আপাতত  বন্ধ থাকুক বিশ্বাসের সহোদর

আপাতত বন্ধ থাকুক আজন্মের কীর্তিকলাপ

আপাতত বন্ধ থাকুক নৃশংস হত্যা আর গুম।

আপাতত বন্ধ থাকুক শিল্পের স্বাধীনতা

মানুষ দেখুক, মানুষ বুঝুক—

এখানে এই পৃথিবীতে পারমাণবিক শক্তির কত অপচয়।

বন্ধ থাকুক সেই সব খোলা সুইচ

যেখানে ভ্রুণ হত্যার উৎসব হয়।

বন্ধ থাকুক সেই সব প্রবৃত্তি

যেখানে কামুকের হিংস্র উল্লাস;

আপাতত বন্ধ থাকুক মানুষের অবদমন।

মানুষের স্বার্থ, মানুষের জন্ম, মানুষের মৃত্যু

আপাতত বন্ধ থাকুক।

বন্ধ থাকুক সস্তা নীতির চরম অবক্ষয়।

মানুষ বুঝুক কত রক্তপাত হলে

একটা পূর্ণ জীবন পাওয়া যায়।

মানুষ বুঝুক কত জনম পেরোলে

একটা স্বার্থক জীবন পাওয়া যায়।

তাই আপাতত বন্ধ থাকুক একটি জীবন,

আপাতত আর কিছুর প্রয়োজন নেই

শুধু আরেকবার জেগে উঠুক

বিবেকের মিসাইল।

****************************

সময়ছিন্নের দিনে
আহমদ মোস্তাক

নাহয় আমার জিভ হিংস্র থাবায় ছিঁড়েনিন

বিষাক্ত রাজনীতি-হায়েনার দল,

আমার প্রিয়তমার স্তন্যের উষ্ণতা মেপেনিন

জৈবিক লালসার তীক্ষ্ণ তুলাদণ্ডে।

কেঁড়েনিন আমার বোনের নারীত্বের অধিকার

পালাক্রমে সারারাত সান্ধ্যনিয়মের ধর্ষণে।

শোষণ করেনিন শহিদের রক্তের উত্তাল

জালাময়ী হুংকার,

আমার মাতৃভূমির পবিত্র মাটি থেকে।

আমার রাষ্টের হৃদপি-ে ঈষৎছিদ্র সঞ্চার করে

অট্রহাসির চাতুর্যতায় আড়চোখে দেখেনিন

ক্রমশ নিঃস্ব আমার পিতার দুঃসহ

শ্বাসকষ্টের চিৎকার ।

 

কিন্তু হে স্বৈরী পরিষদজন,

হিসেবের সুক্ষ্মগণন নিপুন যত্নেই কষে রাখুন,

কারণ, কালদংশনে সমস্ত পাওনা মিটিয়ে নিতে জানে

আমার ন্যায্য বিধ্বংসী নাগরিক অধিকার।

****************************

সমাজের ঘুনপোকাদের জন্য আমরা কীটনাশক স্বরূপ

 

নিঃসঙ্গ খঞ্জের নিয়তি
আরিফ তুরহান

ওই খোঁড়া হারামজাদা হামাকরে থ্যাক্যা ট্যাক্যা ল্যায়, এল-লাইনের দোকানি করে থ্যাক্যা ল্যায়, আবার ওই গলির মোড়ের মাগি করে থ্যাক্যাও ল্যায়। আচ্ছা, ওরকে না হয় পনরো মিনিটের নাপাক কামাই। হামা করে তো আর তা লয়। অদের মদ্দে আস্তাত গাড়ি চলালে তারপর ট্যাক্যা পাই। শরীরে দৈন্যের ছাপের জন্য বন্ধুমহলে ‘মরা’ নামে পরিচিত মোরশেদুল অভিযোগের সুরে দেলোয়ারকে বলছিলো। সকালে চাঁদার টাকা না দিতে পারায় মেরাজ তার ভ্যান দু’ঘন্টার জন্য আটকে রেখেছিলো। সে ধার করে মেরাজকে টাকা দিয়ে তারপর আবার গাড়ি রাস্তায় নামায়। ততক্ষণে ভালো ভালো কয়েকটা ট্রিপ তার হাত থেকে ফসকে গেছে। রক্তাক্ত নেত্রের উত্তেজিত মরাকে ঠান্ডা করার জন্য লিটন বলে,

—ভাই রে, হামাকরে পাটি এ্যাকন ক্ষমতা ত নাই। হামাকরে গোয়াত ঘাও।

—সেই ঘাওয়ের ওপর চোদন দিলে ভালো লাগবি? আর কিসের পাটির কতা কস, উই তো সারা জীবন বালের জামাতি করলো। এ্যাকোনো তো মুকোত দাঁড়ি আছেই, খালি টুপি কোনা খুলছে।

—ওর হাতত মানুষ আছে। নেতা আর পুলিশোক্তো উই-ই ট্যাকা তুল্যা দেয়। আর হমাকরে গাড়িতো অবৈদো।

—হ, গাড়ি অবৈদো, কিন্তু তার তোলা বৈদো। শালাক জিয়ে কয় বাড়ি দিয়্যা হামি ওর অন্য পা-ডাও ভ্যাঙ্গ্যা দেই। সুযোগ প্যালে ওর একদিন হামি জান লিমো!

—অতো আগ করিস ক্যা। আল্লা বিচ্যার করবি।

—হামরা এর করে হাতত না মরলেতো তো আর আল্লা বিচ্যারক করব্যার সুযোগ প্যাচ্ছে না। দিন শেষে যে এলের জাগাত শোতমো, তাও চট ফ্যাল্যা দখল কর‌্যা থোছে। শুতপ্যার চ্যালে চ্যাটের লবাবক দশ ট্যাক্যা দ্যাও, তারপর শোতো।

—লে, এ্যাকন নিন আয়। উই অ্যাস্যা শুনলে আবার গ-গোল করবি। শীত্তির ভিতর বেশি আত জাগিস ন্যা। সকালে ওঠা লাগবি।

—উই শুনলে হামার বাল পানিত পোলো! মোড়ত উই আজ নানীর কাছে গ্যাছে। আসতে দেরি হবি। নাপাক শরীর লিয়্যা আজ হামাকরে কামায়ের পাক ট্যাক্যা লিবি।

—এই মরা, লতুন মাল বলে অ্যাচ্ছে?

—কে কয়? কদ্দিন রে দেলু? উচ্ছসিত ভাবে মোরশেদ প্রশ্ন করে।

—মেরাজ-ই লিজে গত শুকোরবারে হামাক কোলো।

—ও, তাই ক। ওড্যা লতুন লয়, টাঙ্গাইল থ্যাক্যা আচ্ছে। ও-টি হুজুরেরা ওর কেরে ঘর ভ্যাঙ্গে দিছে তো, ত্যাই ট্যানিস্পার লিছে। নানার সাথে তোর তালে আজকাল ভালোই খাতির জমছে।

—না, না খাতির লয়। তুই এতো কিছু জানলু ক্যাঙ্করে তাই ক?  বারান্দা দেক্যা আচ্ছু নাকি?

—লে, এ্যাকন হামাক নিন ধরিচ্ছে।

—না, আগে ক। কপাট ক্যাঙ্কা?

—কপাটের বয়স হছে, ভালোমতো লাগে না। এ-বার ঘুম দে।

টিকেট-কাউন্টার বন্ধ। কাউন্টারের সামনে কিছু মানুষ গাদাগাদি করে ঘুমোচ্ছে। লাইটের আলো তাতে বাঁধ সাধতে পারছে না। বাইরে কুয়াশায় নিজের হাতটুকুও ভালো মতো দেখা যাচ্ছে না। চাঁদের আলো পরিবেশকে অতিপ্রাকৃত করে তুলেছে। টিনের চালে শিশির পড়ছে টপ-টপ করে। দু’একটি গণিকা এই তীব্র শীতেও পাতলা কাপড় পরে কোত্থেকে যেনো আসছে – যাচ্ছে। দূরে কোথাও থেকে মাঝে মাঝে কুকুর আর্তনাদ ভেসে আসছে। দু’একটি ট্রেন তার পেট থেকে মানুষ নামিয়ে দিয়েই কুয়াশায় কালো ধোয়া ছেঁড়ে বাঁশিতে বিদায় ফুঁক দিয়ে চলে যাচ্ছে। দূরের যাত্রিদের কয়েক জোড়া চোখ শুধু নিশুতি প্রহর গুনছে।

অধিকাংশ মানুষ রংপুর অঞ্চল থেকে মরশুমি ধান কাটার জন্য এসে রাতের ঠিকানা হিসেবে এই কাউন্টারের জায়গা বেছে নিয়েছে। অতি পুরাতন এই ইস্টিশনকে সম্মান জানাতে যাত্রিবাহী সব ট্র্রেন-ই এখানে থামে।

শোনা যায় চাঁদপুর থেকে আসা এক অজ্ঞাত প্রসূতি মেরাজকে জন্ম দিয়েই মারা যায়। গতিক সুবিধার না দেখে সাথের পুরুষটিও চম্পট দিলে সে রেলের এক বৃদ্ধ কর্মচারির কছে শিশুকাল অতিক্রম করেছে। সে-বৃদ্ধের মৃত্যুর পর তার সাংসারিক সমস্ত বন্ধন টুটে গেছে। বিশ্বসংসারে সে এখন একা। অসম্ভব প্রাণ শক্তি আর সাহস তাকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে।

গণিকালয়ে তার জন্য বিশেষ গণিকার ব্যবস্থা রয়েছে। সে-‘নানা’ আর গণিকাটি ‘নানী’ নামে খদ্দেরদের কাছে বেশ পরিচিত।

এমনি এক কনকনে শীতের রাতে উদ্দীপ্ত রিরংসার এক মাতালের সাথে মধ্যরাতে মেরাজের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছিলো—

মাতাল: নানা, ওই বার তোক একশ ট্যাক্যা দিনু, তুই রূপসিক পঞ্চাশ ট্যাক্যা দিছলু। এই বার বিশ ট্যাক্যা কম থো।

মেরাজ: রেট-ই তাই। কম নাই।

মাতাল: উই দিয়া পায় পঞ্চাশ ট্যাক্যা, আর তুই দালালি কর‌্যা লিবু পঞ্চাশ ট্যাক্যা? তুই একশ ট্যাক্যা গোটায় থো। গোয়া আজ হামি তোরডা-ই মারমো। শালা দালালের গুষ্ঠিচুদি।

মেরাজ: দালাল কবুন্যা কচ্ছি!

মাতাল: বেশ্যার প্যাটত থ্যাক্যা হয়্যা আবার বেশ্যার-ই দালালি করিস! আবার তার গরম দ্যাকাস?

মেরাজ: শালার মাতালক আজ হামি…

কার আকাশটা যেনো দুলে উঠলো।

আকাশে ভরা চাঁদ। কুয়াশা চাঁদের আলোর সঙ্গম দেখার জন্য বাইরে কেউ নেই।

একটি পাখি মাঝে মাঝে গাছের ডাল নেড়ে প্রকৃতির নীরবতা গেঙ্গে দিচ্ছে। আজ ট্রেন চলাচল বন্ধ। যে-ট্রেন ধরতে গিয়ে সে এক পা জন্মের মতো হারিয়েছিলো, সে- ট্রেন আজ তাকে সামনে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বেচ্ছাচারি ট্রেন ইচ্ছার নিয়ম ভেঙে আজ সময়ের আগে এসে পৌঁছেছে। হেডলাইটের আলো কুয়াশা ভেদ করে তার মুখের ওপর পড়েছে। হয়তো তাকে শেষ বারের মতো দেখতে এসেছ।

মরা চোখ বড় বড় করে তার মৃত দেহের পাশে উবু হয়ে বসে আছে। নিজের চোখকে হয়তো সে বিশ্বাস করতে পারছে না। একটু পরে সে মূর্ছা গেলো। যাকে সে খুন করতে চেয়েছিলো, তার-ই মৃতদেহ দেখে সে শয্যা নিলো।

****************************

দায়সারা ফঁড়েয়া দালাল ব্যক্তিহারা

পালিত পরম্পরা

লাথি মারার অভ্যেস কর

গলা টিপে ধর গলা টিপে ধর 

**************************************

অনাদর্শ রাষ্ট্রের বিধিমালা
অর্বাক আদিত্য

১.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের মিডিয়া হবে স্বচ্ছ। রাষ্ট্র এবং শাসকের ক্ষতি হয় এমন অনেক সত্যকেও তারা ধামাচাপা দেবে, এই বিধি যদি কোন মিডিয়া এজেন্ট না মানে, তবে তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এক্ষেত্রে সংবাদ এবং সম্প্রচার দেখাশোনা করবেন শাসকের সাগরেদ সংগঠন। মিডিয়া সাহসী ও বেপরোয়া হয়ে উঠলে অনাদর্শ রাষ্ট্র ভেঙে যাবে। তাই রাষ্ট্রের কঠোর ও অমোঘ বিধি হিসেবে এই বিধি বাধ্যতামূলক।

২.

অনাদর্শ রাষ্ট্রে শান্তির প্রতীক হবে শকুন। শান্তির শর্তে শকুন বাবুই থেকে চড়–ই যেকারো মগজ আচড়াতে কিংবা ঠুকরাতে পারবে। এমনকি কোকিল থেকে টিয়ে পর্যন্ত তার/তাদের আধিপত্য বৈধ বলে বোধ হবে। শকুন সমাদরকারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন। শকুনের দীর্ঘায়ুর জন্য মাঝে মধ্যে রাষ্ট্রের নিজস্ব ধারণচিত্রে শকুন কর্তৃক অন্যান্যদের নিরাপত্তা ও বিলাসী জীবনের দৃশ্য ভাইরাল করা হবে। অনাদর্শ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্য এই বিধিতেও অনড় অবস্থান নেবেন সম্মানিত শাসকগণ।

৩.

অনাদর্শ রাষ্ট্রে কোনপ্রকার ধৈর্য পরীক্ষা করা হবে না। এজন্য রাষ্ট্র জোর করে কোন নাগরিককে কবিতা, গান, নাটক কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাজির করাবেন না। তবে রাজনৈতিক সমাবেশে জোর করানো রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য বিবেচিত হবে। সাংস্কৃতিক মনস্ক কোন নাগরিক যদি এর বিরোধিতা করে তবে তাকে হয়রানী করার জন্য মিথ্যে মামলা এবং হুমকি বৈধ বলে স্বীকৃত হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রের ভেতর দ্রোহ তৈরী হবে। রাষ্ট্র তার নিজস্ব সুরক্ষার জন্য এই বিধিতেও তিল পরিমাণ ছাড় দেবেন না।

৪.

অনাদর্শ রাষ্ট্র একদল অতিলৌকিক ক্ষমতাধর মানুষকে নিজস্ব খোরাকিতে পুষবেন। এই দল কোন নিরীহকে খুন করলে রাষ্ট্র তাকে গ্রেট অব অনার দেবেন এবং দলের ওপর দায়েরকৃত সমস্ত মামলা রাষ্ট্র গোগ্রাসে গিলে খাবেন। নিরীহ ব্যক্তির মৃত্যুতে রাষ্ট্র শোকাহত হবেন। রাষ্ট্রের শোকবিবৃতি প্রস্তুত করবেন একজন সৎ শ্বর। অনাদর্শ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্য এটুকু সুক্ষ্ম ছলনা বৈধ এবং অস্তিত্বের প্রশ্নে খুবেই গুরুত্বপূর্ণ বিধি বলে বিবেচিত হবে এটি।

৫.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের জনগণ হবেন হুজুগে এবং আবেগী। এখানে একজন মহিলামন্ত্রীর নাচ দেখার জন্য অডিটোরিয়ামে লাখ লাখ দর্শক উপস্থিত হবেন। মহিলামন্ত্রী ভালো নাচতে পারবেন না কিন্তু দর্শক মুগ্ধ হবেন। যেহেতু নাচের থেকে মুগ্ধতাকে তারা বেশি প্রাধান্য দেবেন। তবে এই মুগ্ধতার সময়সীমা হবে স্বল্প। তাই রাষ্ট্র ঘন ঘন নাচুনে মহিলামন্ত্রীর পরিবর্তন করবেন। এই পরম্পরা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হেতু এই বিধি আজীবন মান্য হিসেবে গৃহিত হবে।

৬.

অনাদর্শ রাষ্ট্রে কেউ যদি রাত বারোটায় গাছের আগালে বসে গান করে, সেটাকে শিল্পচর্চা হিসেবে প্রচারিত করা হবে এবং তাকে তারকা খ্যাতিসহ একটা গাধা পুরস্কার দেবেন। পুরস্কৃত ব্যক্তি হাওয়ায় ভাসবেন। উদ্ভটদের বাগে নিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্রের কার্যকারী বিধি বলে বিবেচিত হবে এটি।

অনাদর্শ রাষ্ট্রে অপহরণ, যৌন হয়রানী যেকোন সময় (দিন দুপুর অথবা রাতদুপুরে) হতে পারবে। উদ্ধারের দাবীতে আন্দোলন হলে রাষ্ট্র কৌশলে তা দমন করবেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সহায়ক হবেন মেধাহীন নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রের পালনকৃত বাহিনী। রাষ্ট্রের এই বিধিটি আপাতদৃষ্টিতে হালকা মনে হলেও প্রায়োগিক হেরফেরতার কারণে রাষ্ট্রের ধ্বংস হতে পারে। তাই বিধিটি অতি আবশ্যকীয় এবং দূরদর্শিতার পরিচায়ক।

৮.

অনাদর্শ রাষ্ট্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকবেন শাসকবান্ধব প্রশাসন। শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসন হলে, শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবেন এবং রাষ্ট্রের পতন পর্যন্ত হতে পারে। তাই ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন নিষিদ্ধ করা হবে। এবং যোগ্যতা-অযোগ্যতা নয় বরং নিবেদনের ওপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের এই কৌশল বা বিধি, সার্বভৌমত্বের জন্য অপরিহার্য।

৯.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের অস্থিরতা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হবে। রাষ্ট্র শাক দিয়ে মাছ ঢাকা প্রবাদের সফল প্রয়োগ করতে অভ্যস্ত হবে। রাষ্ট্রের সীমানা শাক বিস্তারে পরিপূর্ণ হলে, রাষ্ট্র তার শাসককে পরিবর্তন করবেন। নতুন শাসকেরা পুরোনো শাক পরিষ্কার করে আবারো শাক বিস্তারে মনোযোগী হবেন। রাষ্ট্রের শাসকের এই নিয়োগ পরিক্রম চলমান এবং চিরন্তন হবে। রাষ্ট্রের জঞ্জাল ও সমস্যা সমাধানের জন্য এই বিধি অধিকগ্রহণযোগ্য এবং অলঙ্ঘনীয় বলে বিবেচিত হবে।

১০.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীক বিধি হবে নাগরিকবান্ধব। তবে এই নাগরিকবান্ধব হল আলগা এবং উপরি। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণে তা নাগরিক বিরোধী ও ঠকানোর ফাঁদ। আবার এই ফাঁদে প্রত্যেক নাগরিকের পা আটকে থাকবে কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারবে না। রাষ্ট্রের এই বিধি অপরিবর্তনীয় এবং সর্বদা ও সর্বোচ্চ প্রয়োগ- রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে বৃদ্ধি করবে। এই বিধি সময়ের সাথে পরিবর্তনীয় এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের।

১১.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংগঠন দুটো ভাগে বিভক্ত হবে। একটা শাসক বিরোধী লালবুক পাগল আর অন্যটা বই-টইয়ের ধার ধারে না নেতৃবর্গের অর্ডারকেই সর্বেসর্বা মনে করে। আবার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও তাই। একটা চামচামী করে আর অন্যটা ফায়দা নেই জেনেও গলা ফাটায়। রাষ্ট্রের সামঞ্জস্যের জন্য এটা প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কোন নাক গলাবে না। রাষ্ট্রের এই বিধানও সর্বদা মেনে চলতে হবে।

১২.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের ধর্মীয় অনুভূতি প্রখর ও তুখোড়। তাই রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য, ধর্মীয় সংস্কার, কুসংস্কার এবং গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কখনো কথা বলবেন না। বরং এই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটা রাষ্ট্রের জন্য সুবর্ণ সুযোগও বটে। রাষ্ট্র এভাবেই মানুষের অনুভূতির মূল্যায়ন করবে। রাষ্ট্রকে এই বিধিতে বিশ্বাসী এবং প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিধিটিও গুরুত্বের।

১৩.

অনাদর্শ রাষ্ট্রের বেকারত্বের রেখা হবে উর্ধ্বমুখি আর কর্মসংস্থান রেখা নিম্নগামী। শাসক বেকারদের বিস্ফোরণ রোধে মিথ্যে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দেবেন। মিছে মিছে কর্মসূচি, কর্মপরিকল্পনার পদক্ষেপ নেবেন। বেকারত্ব যেহেতু কমবে না। তাই বেকারদের ভেতর হতাশা ঢুকে যাবে এবং তারা নিস্তেজ হয়ে যাবে। এতে রাষ্ট্রে দ্রোহ কিংবা শক্ত কোন আন্দোলন হবে না। আবার হতাশায় আত্মহননের সংখ্যাও বাড়বে। রাষ্ট্রের জন্য এটি খুবই মঙ্গলজনক। রাষ্ট্রেকে নিজের কল্যাণে এতোটুকু মিথ্যের আশ্রয় নিতে হবে। রাষ্ট্রের এই বিধিটি তাই ভয়াবহ গুরুত্বের।

******************************************

কঙ্কালের চোখ খুলে পড়েছে মুখে

মানবতাস্তনের দুধ আছে কি তোর বুকে

একবার পায় তারে…
পেরিয়ে পেরিয়ে পার হয়েছিল অনেক বসন্ত। পার হয় গরু, পার হয় গাড়ি। হায়রে সে নদী! প্রকৃতি আর মানুষের মায়া নিয়ে হেরিংবোন-শরীর মাড়িয়ে শিউলিফোটা সকালগুলো এগিয়ে আসে। তখন রাতভর বৃষ্টি হয়ে গেছে। সিক্তবসনার কোণ ধরে দূর থেকে কলাইপাতার সার এড়িয়ে কুদ্দুসস্যার লুঙ্গি পরে আসেন আর আমাদের কীসব পড়ান। তিনি খুব পুরনো ঘড়ি হাতে পরতেন। ওটা বুঝি কারো দেওয়া! স্যারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা তার হাতঘড়িটাকেও সমীহ করি। তখন নতুন ব্ল্যাকবোর্ডে অতিরিক্ত অতিথি আসার ঐকিক নিয়মের অঙ্ক লেখেন তিনি। হা-মেলে সবুজ ব্লাকবোর্ডে সুন্দর লেখাগুলো যখন আমরা পড়ছি তখন পেছনে ক্যাচ করে কী এক শব্দ হয়। দেখা যায়, ন্যাদো পায়ের ফাঁদে কী একটা ফেলে শব্দ করছে…। ন্যাদো আমাদের খুব প্রিয় বন্ধু এবং দক্ষ সতীর্থ। বলা যায়, ম্যাজিকম্যান। সে বাঁশি বাজাতে পারে। হা-ডু-ডু খেলতে পারে। কানামাছি-দাড়িয়াবান্ধাতে সেরা। হাইজাম্পে প্রথম। সেবার স্কুলের পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় যে হাইজাম্পের প্রতিযোগিতা হয়েছিল তাতে সে প্রথম হয়। কিন্তু ন্যাদোর পড়া ভালো নয়। কুদ্দুস স্যার তাকে যখন মারতে শুরু করেন, তখন জুঁই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। আমরা খুব মন খারাপ করে বসেছিলাম। মনে হচ্ছিল স্যারের মারের তোড়ে ন্যাদো হয়তো আর কোনোদিন স্কুলে আসবে না। সে না এলে আমাদের অবসর সময়গুলো খুব নীরব হয়ে যাবে। এই নীরবতা নিয়ে আমরা যখন খুব চিন্তিত, তখন শোনা গেল সৈয়দ আলী মৌলবী স্যার কী একটা প্রয়োজনে তাকে ডাকছেন। কিন্তু ওসব আর শোনার সময় হয় না ন্যাদোর। সে লেখাপড়া ছেড়ে চলে যায়। কদিন বাসের কন্ডাকটরি নিয়েছিল। তারপর টেকেনি। পরে মুদির দোকান দিয়ে বসে। তাও হয় না। একদিন বিয়ের বিনিময়ে সে যৌতুক নিয়ে কী সুন্দর একটা পান-বিড়ির দোকান দেয়! কিন্তু তা প্রথম দিকে চললেও এক সময় তাতে ভাটা পড়ে। ধ্বস নামে। গুলিয়ে যায়। শ্বশুরবাড়ির লোকরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। পরে আবার বুঝি সে বাসের হেল্পারি নেয়। কিন্তু মাঝে-মধ্যে বাঁশিও বাজাতে চেষ্টা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় উপরের ছাদে ভাড়া কালেকশনের সময় বাসের ডাল লেগে সে নীচে পড়ে যায় এবং মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করে। এ পর্যন্ত থাকলে হয়তো ন্যাদোর গল্প শেষ হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। সে মরে গিয়ে বেঁচে যায়। আমরা তাঁর নামে শিন্নি দেই। যে শিউলিতলায় সে প্রত্যহ দাঁড়াত ওখানে দল বেঁধে ফুল দিই। আর ক্লাসরুমের কক্ষে তার জায়গাটা অনেককাল ফাঁকা রাখি। এই জীবনে সে আর ফিরে আসবে না কিন্তু তার স্মৃতি নিয়া বকুল বাঁচে, শেফালী বাঁচে আর জুঁই প্রতিদিন কাঁন্দে আর খবর নেয়। ন্যাদো ভালো না মন্দ সে অন্য কথা। কিন্তু বাঁচার চেষ্টা তার ছিল। লেখাপড়া না করেই সে বাঁচতে চেয়েছিল। ভাল রকম এবং সৎভাবে সে বাঁচতে চেয়েছিল। অন্যায় সে করে নি। অপছন্দও করত। কিন্তু জীবন আর জীবনের তাগাদায় সমস্ত ফুলগাছ ভরে সে সকলের হয়ে রইলেও মানব থেকে যাওয়ার রহস্য নিয়ে। তাই কুদ্দুস স্যারও একদিন বলে ফেলেন, ‘ন্যাদোটাকে স্কুলে আসতে বলিস, ও ফ্রি পড়বে।’ সত্যিই আমরা সবাই তাঁর জন্য ফ্রি করতে চেয়েছিলাম সবকিছু কিন্তু সময় আর হাওয়ার অশনিতে সে আর ফিরে আসে নাই। স্নানের ভেতরে অনেকেই হয়তো ন্যাদোর মতো ফেরে না তবে তো কেউ কেউ ফেরে এবং সে ফেরা স্মৃতি নিয়েই অনেকে বেঁচে থাকে। কারণ, এ যে অকর্মণ্যদের কাজ সব্বাই যে একযোগে ন্যাদোর সঙ্গী কারণ, এ পৃথিবী একবার পায় তারে পায় নাকো আর।

চিহ্নপ্রধান
৩০ আষাঢ় ১৪২৪

আলোচনা